Tuesday, May 23, 2023

একটি অটিজম শিশু একটি পরিবারের কান্না by ডা. এমএ হক, পিএইচ.ডি

ঘটনা (১) সালাম সাহেব (ছদ্মনাম) একজন সফল ব্যবসায়ী। উত্তরায় নিজের বাড়ি। তার একমাত্র সন্তান আশিক (ছদ্মনাম) বয়স ১২ বছর, একজন অটিস্টিক শিশু। সালাম সাহেব বর্তমানে ব্যবসা ত্যাগ করে বাসাতেই থাকেন। তার কথা ব্যবসা করে কী হবে? কার জন্যই বা ব্যবসা করবো?

ঘটনা (২)  রহমান সাহেব (ছদ্মনাম) একজন চাকরিজীবী। তার মেয়ে সুইটি (ছদ্মনাম) বয়স ১২ বছর, একজন অটিস্টিক শিশু। প্রায় ৮ বছর ধরে তারা তাদের গ্রামের বাড়িতে, কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাসায় অথবা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে বেড়াতে যান না। সুইটি কোনো সামাজিকতা বোঝে না। সে প্রায়ই হাইপার হয়ে যায়। ফলে, অনুষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়।
দিন দিন তারাও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাদের একটাই চাওয়া এরা যেন নিজের ভালো-মন্দ ঠিকমতো বুঝতে পারে এবং নিজের কাজকর্ম ঠিকমতো করতে পারে। তা না হলে আমাদের মৃত্যুর পরে এদের কী হবে?
এ ধরনের সমস্যা আজ সালাম সাহেব বা রহমান সাহেবের একার নয়? এ সমস্যা শুধু ঢাকা শহরেই কয়েক লাখ অভিভাবকের; সমগ্র দেশে এর সংখ্যা আরও অনেক। এ সকল পরিবারের পিতা-মাতা দিন দিন নিজেদের কাজকর্মে অনীহা দেখাচ্ছেন। তাদের কারও কারও কথা-বার্তার মধ্যেও মানসিক রোগের লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে। দিন দিন তারা যেন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এদের উন্নয়নে কাজ করছে বলে জোর প্রচারণা চলছে। এ সকল প্রচেষ্টা অটিস্টিক শিশু ও তাদের অভিভাবকদের কতটুকু উপকার করতে পারছে?

বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে এ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, ইউনানি ও আয়ুর্বেদি এই ৪ প্রকার চিকিৎসা পদ্ধতির স্বীস্কৃতি দেওয়া আছে। শুধুমাত্র এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসকগণ এর কার্যকরি কোনো ওষুধ নেই বলে মত প্রকাশ করেছেন। আমরা কি অন্য ৩ প্রকার চিকিৎসা পদ্ধতির শরণাপন্ন হয়েছি? বিশেষ করে হোমিওপ্যাথি? হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে অটিজমসহ নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারের সকল শাখার চিকিৎসা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন আন্তরিক গবেষণা। নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারের চিকিৎসায় বিশেষ করে অটিজমের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি ওষুধ গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করলে চিকিৎসার সফলতা নিশ্চিত আসবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এখন সময় শুধু দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে এ বিষয়ে আন্তরিক হওয়ার। তাহলেই কেবলমাত্র এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। অটিজম শিশুদের চিকিৎসার মাধ্যমে স্বভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা ব্যতিত শুধুমাত্র প্রচারের মাধ্যমে এ সকল পরিবারের কান্না কখনও থামবে না থামানো সম্ভবও না। পরিশেষে, সরকারি-বেসরকারি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট আহ্বান, আর সময় নষ্ট না করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিন এবং লক্ষ্য রাখুন যেন প্রতিটি অটিজম শিশু সঠিক চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে এবং এ সকল পরিবারের অভিভাবকদের কান্নার অবসান ঘটে।
লেখক:  ডা. এমএ হক, পিএইচ. ডি (স্বাস্থ্য), এম. ফিল (স্বাস্থ্য), ডিএইচএমএস। চিকিৎসক ও গবেষক (ক্রণিক ডিজিজ অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার)।

চেম্বার: ড. হক হোমিও ট্রিটমেন্ট এন্ড রিসার্স সেন্টার, বিটিআই সেন্ট্রা গ্রান্ড, গ্রাউন্ড ফ্লোর (জি-৪), ১৪৪ গ্রীন রোড, পান্থপথ, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭১২-৪৫০ ৩১০


মেয়েদের চর্মরোগ অ্যাকজিমা হলে by ডা. দিদারুল আহসান

বিভিন্ন চর্মরোগের মধ্যে হাতের অ্যাকজিমা অন্যতম। মেয়েরা, বিশেষ করে যারা পানির কাজ করেন বেশি, সারাদিন সাবান বা সোডা জাতীয় জিনিসের সংস্পর্শে আসেন, কাপড়-চোপড় বা বাসনকোসন পরিষ্কার করেন, তারা সাধারণত এ রোগে আক্রান্ত হন বেশি। শুধু নারীরা নন, যেসব পেশায় অনেকক্ষণ পানির কাজ করতে হয় বা সাবান দিয়ে বার বার হাত ধুতে হয়, সেসব পেশার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হন বেশি।

অ্যাকজিমা হলে শুরুতে আঙ্গুলগুলো লাল ও শুকনা হয়ে ফেটে যায়। হাতের চামড়ায় ফোসকা পড়ে। অনেক সময় ত্বক ফেটে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। আঙ্গুলে আংটি থাকলে এর চারপাশে অ্যাকজিমা প্রকট হয়ে ওঠে। কারণ, আংটি একই স্থানে থাকে। ফলে পানি ও সাবান আংটির তলায় জমা হয়।
অনেক সময় কিছু সবজি বা খাবার, যেমন আদা, পিয়াজ, টমেটো, গাজর, ডুমুর, কুমড়া, বেগুন, পেঁপে ইত্যাদির অ্যালার্জি থেকেও হাতে অ্যাকজিমা হতে পারে। খাবারের প্রোটিন জাতীয় অংশ প্রায়ই অ্যালার্জি সৃষ্টি করে। এরমধ্যে রয়েছে আলু, গম, খোলযুক্ত চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি।
এ ছাড়া গ্লাভসসহ প্লাস্টিকের পণ্য ও নিকেল জাতীয় ধাতবের সংস্পর্শ, ফাইলোডেনড্রেন, পার্থোনিয়াম ইত্যাদি গাছ বা প্যারাফিনাইল ডাই-অ্যামাইন রং (চুলের কলপে ব্যবহৃত হয়) থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। পটাশিয়াম ডাইক্রোমেট রাসায়নিক থেকেও অ্যালার্জি দেখা দেয়।

চিকিৎসা
একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা নিলে ভালো থাকা যায়। অনেক সময় পরীক্ষার মাধ্যমে এ অ্যালার্জির কারণ জানতে হয়। যাদের সব সময় পানি বা সাবান নিয়ে কাজ করতে হয়, তারা কাজের সময় কিচেন গ্লাভস পরে নিতে পারেন। হাত শুষ্ক রাখার চেষ্টা করুন। কাজ শেষে হাত মুছে ফেলুন। আবার ব্যবহৃত গ্লাভস যেন পরিষ্কার ও শুকনা থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখুন।
লেখক: চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ, কনসালট্যান্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আল-রাজী হাসপাতাল, ঢাকা। সেল-০১৭১৫-৬১৬২০০


পমপম চক্রের কব্জায় ২০,০০০ তরুণীর নগ্ন ভিডিও

২৩ মে ২০২৩, মঙ্গলবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ভয়ঙ্কর এক সাইবার অপরাধী চক্রের সন্ধান পেয়েছে। চক্রের অধিকাংশ সদস্য প্রকৌশলী। দীর্ঘদিন ধরে তারা হাজার হাজার কিশোরী-তরুণীদের গোপন ভিডিও সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল। তাদের কব্জায় প্রায় ২০ হাজার আপত্তিকর ভিডিও পাওয়া গেছে। এসব ভিডিও দিয়ে তৈরি করা ৩০ হাজার কন্টেন্টও রয়েছে। আপত্তিকর ভিডিও চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে ও ভুক্তভোগীদের আইডি হ্যাক করে সংগ্রহ করে। পরে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন পর্নোগ্রাফি সাইটে ছড়িয়ে ভাইরাল করার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এছাড়া আপত্তিকর ভিডিও দেশে-বিদেশে বিক্রি করেও বড় অংকের টাকা আয় করেছে। তাদের ফাঁদে পড়ে হাজার হাজার তরুণীর রাতের ঘুম হারাম হয়েছিল। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিলেন তাদের অভিভাবকরা।

রাত-দিন কান্নাকাটি ও আকুতি-মিনতি করেও চক্রের সদস্যদের দিয়ে কন্টেন্ট সরাতে পারেনি তরুণীরা। উপায়ন্তর না পেয়ে বিভিন্ন তরুণী অভিযোগ নিয়ে আসেন সিআইডি’র সাইবার পুলিশের কাছে। অভিযোগের তদন্ত করে সত্যতা পায় সিআইডি। পরে আন্তর্জাতিক একটি টেলিগ্রাম চক্রের মূলহোতাসহ ৯ জনকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- চট্টগ্রামের শ্যামলী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. আবু সায়েম ওরফে মার্ক সাকারবার্গ (২০), বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মশিউর রহমান শুভ (২৬), সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মো. সাহেদ খান (২২), নর্থসাউথ বিশ^বিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী কেতন চাকমা (২০), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী মো. নাজমুল হাসান সম্রাট (২২), তেজগাঁও কলেজের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. মারুফ হোসেন (৩৪), চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জুনাইদ বোগদাদী শাকিল (২০), বেসরকারি চাকরিজীবী মো. জসিম উদ্দিন (৩৮) ও শাহরিয়ার আফসান অভ্র (২৪)।
গতকাল মালিবাগের নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে অভিযোগ করেন, তাদের ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম আইডি হ্যাক করে পমপম নামের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপ গোপন ছবি ও ভিডিও হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা দাবি করছে। টাকা দিতে না পারলে ভিডিও কলে এসে আপত্তিকর কর্মকাণ্ড করতে বাধ্য করছে। আর কোনো প্রস্তাবেই সাড়া না দিলে নাম-পরিচয় আর ব্যক্তিগত তথ্যসহ লাখ লাখ সাবস্ক্রাইবারের টেলিগ্রাম গ্রুপগুলোতে ভাইরাল করে দিচ্ছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডি’র সাইবার পুলিশের একটি দল কাজ শুরু করে। আমরা দেখতে পাই, গ্রুপটি আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ভিকটিমের কাছ থেকে যে কেবল টাকা আয় করে তা নয়, চক্রটি ওইসব ভিডিও দেশে-বিদেশে বিক্রি করেও কোটি টাকা আয় করেছে। মাসে এক থেকে দুই হাজার টাকা সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, পর্তুগাল, কানাডা, আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের মতো দেশের অসংখ্য ক্রেতা গ্রুপটির সদস্য হয়েছেন। তারা অল্পবয়সী মেয়েদের আপত্তিকর ওইসব কন্টেন্ট ক্রয় এবং সংরক্ষণ করে থাকেন।
তিনি বলেন, চক্রটির নেতৃত্ব দেয় মার্ক-সাকারবার্গ নামের এক ব্যক্তি। তার আসল নাম আবু সায়েম। বেকার সায়েম থাকে চট্টগ্রামে। তার বিভিন্ন একাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। পরে আরাফাত নামের এক ভুক্তভোগী ও তার প্রেমিকার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি পমপম গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়ায় ডিএমপি’র তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মার্ক-সাকারবার্গ চক্রের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। পরে সিআইডি’র একটি টিম চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে মার্ক ওরফে সায়েমকে গ্রেপ্তার করে। মার্কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধু শাহরিয়ার আফসান অভ্রকে চট্টগ্রামের হাউজিং এলাকা থেকে এবং বোগদাদী শাকিলকে উখিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডি জানায়, মার্ক ওরফে সায়েমের মোবাইল ফোন তল্লাশি করে মার্ক-সাকারবার্গ আইডিটি লগইন করা অবস্থায় পাওয়া যায় এবং নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আবু সায়েমই মার্ক সাকারবার্গ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পমপম গ্রুপের যতগুলো চ্যানেল এবং গ্রুপ আছে তার এডমিনদের আসল নাম-পরিচয় পাওয়া যায়। এডমিনদের কাজ ছিল সায়েমের হয়ে নতুন নতুন কন্টেন্ট যোগাড় করা। নতুন কন্টেন্ট পেতে তারা ফেইক এনআইডি বানিয়ে ভুক্তভোগী তরুণীদের সাবেক প্রেমিকেরাই নতুন নতুন কন্টেন্ট দিচ্ছে।
সম্পর্ক চলাকালীন প্রেমিকার যেসব অন্তরঙ্গ মুহূর্ত প্রেমিকরা ক্যামেরাবন্দি করেছে, প্রতিশোধের নেশায় সেগুলো তুলে দেয় চক্রের কাছে। সায়েম তার এডমিনদের দিয়ে সেগুলোতে মিউজিক বসিয়ে, ফেসবুক আইডি থেকে ছবি নিয়ে ৩০-৪০ সেকেন্ডের প্রমো বানিয়ে আপলোড করে তার গ্রুপগুলোতে। প্রমো দেখে যারা ফুল-ভার্সন দেখতে চায়, তাদের ১ থেকে ২ হাজার টাকার পুরোটা কিনতে হয়।  

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি প্রধান বলেন, সায়েম, অভ্র এবং শাকিলকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের ডিভাইস তল্লাশি করে সায়েমের বিভিন্ন পেজের এডমিনদের আসল পরিচয় উদ্ধার করা হয়। তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ডিটিআর শুভ ওরফে মশিউর রহমান। মশিউরের দায়িত্ব ছিল গ্রুপ থেকে কৌশলে কন্টেন্ট সেভ করে রাখা এবং নানা প্রলোভনে তরুণীদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও হাতিয়ে নেয়া। মশিউর চট্টগ্রামের একটি ফিশিং কোম্পানিতে চাকরি করে। অবস্থান নিশ্চিত হয়ে তাকে কর্ণফুলী এলাকা থেকে তার সহযোগী জসীমসহ গ্রেপ্তার করা হয়। সায়েম এবং মশিউরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় এই এডাল্ট গ্রুপগুলোর এডমিনদের অনেকেই ঢাকায় অবস্থান করছে। ফলে তাদের বেইলী রোড এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে গেটটুগেদারের ফাঁদ পাতা হয়। ফাঁদে পা দিয়ে একে একে গ্রেপ্তার হয় গুরুত্বপূর্ণ এডমিন ক্যাকটাস ওরফে কেতন চাকমা, এল ডোরাডো ওরফে শাহেদ, তূর্য ওরফে মারুফ এবং মিঞা ভাই ওরফে নাজমুল সম্রাটকে।
সিআইডি আরও জানায়, সায়েম এবং তার সহযোগীদের গ্রুপ ও চ্যানেলগুলোয় সাবস্ক্রাইবের সংখ্যা প্রায় সোয়া চারলাখ। আর সেগুলোতে ২০ হাজার আপত্তিকর ভিডিও এবং প্রায় ৩০ হাজার কন্টেন্ট রয়েছে। মাসিক ফি দিয়ে তাদের প্রিমিয়াম গ্রুপের সদস্য হয়েছেন দেশ-বিদেশের ৭৫০ জন ব্যক্তি। তাদের সম্পর্কে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বিস্তারিত তথ্য পেয়েছেন। তরুণীদের আপত্তিকর কন্টেন্ট কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, এই কাজটি ছিল ভীষণ স্পর্শকাতর একটি কাজ। ফলে তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগী কিশোরী মেয়েদের কান্না, তাদের আপত্তিকর ভিডিও গ্রুপগুলো থেকে সরিয়ে নিতে এডমিনদের প্রতি করুণ আকুতি, আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। আমরা জেনেছি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। বোনের ভিডিও সরিয়ে নিতে ভাইয়ের কান্নাও আমাদের চোখে পড়েছে। ভুক্তভোগী কিশোরীদের অনেকেই এই অসহায়ত্বের কথা কাউকেই বলতে না পেরে ক্রমেই মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়েছে। এই চক্রে যারা জড়িত তারা সমাজের জঘন্য এবং ঘৃণিত মানুষ। তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। ফলে আমরা এ ঘটনায় মানিলন্ডারিং তদন্ত করারও পরিকল্পনা করেছি। তাহলে কেবল টেলিগ্রাম চক্রের হোতারাই নয়, তাদের দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনা যাবে।


কিশোরীকে দিয়ে পতিতাবৃত্তি, স্বামী-স্ত্রী গ্রেপ্তার

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কিশোরীকে ভাড়া করে এনে পতিতাবৃত্তি করার সময় স্বামী ও স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে ভূঞাপুর থানায় তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচার ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুক্রবার সকালে গোপালপুর উপজেলার নলীন এলাকা থেকে কিশোরীসহ স্বামী ও স্ত্রীকে গোপালপুর থানা পুলিশ আটক করে ভূঞাপুর থানায় সোপর্দ করে। গ্রেপ্তার মিন্টু (৩৮) উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের কষ্টাপাড়া গ্রামের হবি মণ্ডলের ছেলে এবং তার স্ত্রী তানিয়া (৩২)। এ ছাড়া সাতক্ষীরা থেকে আনা ওই কিশোরী ভূঞাপুর থানায় পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। জানা যায়, মিন্টু ভূঞাপুর পৌরসভার ফসলান্দি এলাকায় নুরুল ইসলামের বাসা ভাড়া নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারী এনে দেহ ব্যবসা করেন। এই ব্যবসায় তার স্ত্রীও জড়িত ছিল। গত মার্চের ২৩ তারিখে সাতক্ষীরা থেকে একজন কিশোরীকে ভূঞাপুর নিয়ে এসে ব্যবসা শুরু করেন।

এ সময় উপজেলার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ওই কিশোরীকে দিয়ে পতিতাবৃত্তির কাজ করানো হয়। শুক্রবার মিন্টু ও তার স্ত্রী তানিয়া ওই কিশোরীকে গোপালপুরের নলীন এলাকায় একটি বাসায় নিয়ে যায় পতিতাবৃত্তির জন্য। পরে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে কিশোরীসহ স্বামী-স্ত্রীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
এ ঘটনায় শুক্রবার দুপুরে সাতক্ষীরার ওই কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে মিন্টু ও তার স্ত্রী তানিয়ার বিরুদ্ধে মানব পাচার ও ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন।  এ ব্যাপারে ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদুল ইসলাম জানান, ওই কিশোরীকে সাতক্ষীরা থেকে এনে মিন্টু ও তার স্ত্রী ব্যবসা করাতো। এ ছাড়া তার স্ত্রীও পতিতাবৃত্তির কাজ করতেন। পরে স্থানীয়রা তাদের আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। শনিবার তাদের কোর্টে প্রেরণ করা হবে। এ ছাড়া সাতক্ষীরা থেকে আনা ওই কিশোরীর মেডিকেল পরীক্ষার জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হবে। তিনি আরও জানান, ওই কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে মিন্টু ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। বর্তমানে তারা থানা হেফাজতে রয়েছে।

Saturday, May 20, 2023

মলদ্বার বেরিয়ে আসা বা আলিশ রোগ by ডা. মোহাম্মদ তানভীর জালাল

মলদ্বারের এ রোগটি সকলের কাছেই  বেশ সুপরিচিত। এ রোগে রোগীর পায়ুপথ মলদ্বারের বাইরে বেরিয়ে আসে। বিশেষত  মলত্যাগ  করার সময় বাইরে ঝুলে পড়ে। এরপর নিজে থেকেই ভেতরে চলে যায়। অনেক সময় রোগী হাত দিয়ে এটিকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে এ রোগটিকে ডাকা হয়।

কারণসমূহ:
এ রোগটি শিশু ও বৃদ্ধ বয়সে বেশি হয়।  মধ্য বয়সী পুরুষ ও মহিলাদেরও হয়ে থাকে। শিশুদের সাধারণত তীব্র ডায়রিয়ার পর এ রোগ দেখা দেয়। তলপেটের বা পেলাভিসের কিছু গঠনগত সমস্যা এ রোগের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় পায়ুপথ বা রেকটাম অন্যান্য মাংসপেশির সঙ্গে আঁকড়ে থাকে।

কিন্তু এ রোগীদের ক্ষেত্রে এর অভাব দেখা যায়। এ রোগে বিভিন্ন কারণের মধ্যে রয়েছে মলত্যাগের অভ্যাসের অসঙ্গতি যেমন- কোষ্ঠকাঠিন্য, মহিলাদের বন্ধ্যত্ব, রেকটামের সঙ্গে সন্নিহিত অস্থির দৃঢ় সংযুক্তির অভাব ইত্যাদি। মানসিক রোগীদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়।

উপসর্গ:
রোগীরা  বলে থাকেন তাদের মলদ্বার পায়খানা করার সময় অনেকখানি নিচে ঝুলে পড়ে এবং চাপ না দিলে ভেতরে যায় না। ওজন তুললে অথবা কাশি দিলেও কখনো কখনো বেরিয়ে আসে। সাধারণত রক্ত যায় না, তবে মিউকাস বা আম যায়। যখন পায়ুপথ বেশি ঝুলে পড়ে এবং ঢুকানো যায় না তখন রক্ত যেতে পারে। প্রায় অর্ধেক রোগী কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন।
অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগী পায়খানা আটকে রাখতে ব্যর্থ হয়। কখনো কখনো ঝুলে পড়া অংশ চেষ্টা করেও ভেতরে ঢুকানো যায় না, অবস্থা আরও খারাপ হলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে পচন ধরতে পারে। মহিলাদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে জরায়ুও বেরিয়ে আসতে পারে এবং মূত্রথলিও ঝুলে পড়তে পারে, যার কারণে প্রস্রাবের অসুবিধা হতে পারে।
দেখা যায়, এ রোগের শুরুতে রোগীরা বলেন, তাদের পায়ুপথ ভরা ভরা লাগে এবং ভেতরে কোনো চাকা বা মাংসের দলা রয়েছে বলে মনে হয়। অনেকক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে থাকলে সমস্যা আরও বেশি মনে হয়। মলত্যাগ করতে বা বায়ু ত্যাগ করতে কিছুটা বাধা লাগে। পায়খানা করার পর পেট ক্লিয়ার হয়নি বলে মনে হয় এবং আঙুল দিয়ে পায়খানা করতে হয়। কারও কারও মলদ্বারের চতুর্দিকে ব্যথা হয় যা নিতম্ব অথবা পায়ের দিকে বিস্তৃত হতে পারে।

চিকিৎসা:
এ রোগে আংশিক যে ক্ষেত্রে মিউকাস ঝিল্লি ঝুলে পড়ে এবং সম্পূর্ণ সে ক্ষেত্রে পায়ুপথের প্রাচীরের সব স্তরসহ ঝুলে পড়ে। এ রোগ বা  প্রোল্যাপস যে প্রকারেরই হোক এর চিকিৎসা অপারেশন। তবে কোনো রোগী যদি চিকিৎসার জন্য অনুপযুক্ত বিবেচিত হন বা অপারেশন করতে রাজি না হন, তাহলে কিছু রক্ষণশীল পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। যেমন- মলত্যাগের সময় মলদ্বার হাত দিয়ে চেপে উপরের দিকে রাখতে হয়, নিতম্ব দুটিকে টেপ দিয়ে আটকে রাখা, মলদ্বারের মাংসপেশির ব্যায়াম, রিং লাইগেশন পদ্ধতি ইত্যাদি। এ রোগের চিকিৎসায় বহু ধরনের অপারেশন পদ্ধতি চালু রয়েছে। কোনো কোনোটি মলদ্বারে করতে হয়, আবার কোনো কোনোটি পেট কেটে বা বর্তমানে সর্বাধুনিক প্রচলিত চিকিৎসকের মাধ্যমে করতে হয়। যাই হউক এ রোগ হলে শুরুতে চিকিৎসা নিবেন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার:
রোগটি নিয়ে সমাজে ভ্রান্ত ধারণা ও বিভিন্ন কুসংস্কার রয়েছে। বিশেষ করে এ রোগ হলে অনেকেই গোপন করেন। আবার এ রোগ নিয়ে  বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম প্রচার করতে অনীহা  প্রকাশ করে। যার কারণে শুধু সচেতনতার অভাবে রোগটি জটিল হয়ে মারাত্মক পায়ুপথের রোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে শুধু সচেতনতা ও চিকিৎসা নিতে  লজ্জার ভয়ে বাংলাদেশে এর প্রকোপ বা আক্রান্তের হার বাড়ছে।


লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ কোলোরেক্টাল, ল্যাপারোস্কপিক ও জেনারেল সার্জন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। চেম্বার: ১৯ গ্রীন রোড, এ.কে. কমপ্লেক্স, লিফট-৪, ঢাকা। যোগাযোগ: ০১৭১২৯৬৫০০৯


Thursday, May 18, 2023

কোষ্ঠকাঠিন্য চিরতরে দূর করতে যেসব খাবার খাবেন

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে ভালোভাবে জীবনযাপন করাটাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই প্রায় নিয়মিত কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষেরা। গর্ভবতী নারীদেরও এটা একটা সমস্যা। কোষ্ঠকাঠিন্যের ভয়ে তারা অনেক কিছুই খেতে ভয় পান। কোনটা খেলে যে স্বস্তি পাবেন, আর কোনটা খেলে কষ্ট চরমে উঠবে, বুঝতে পারেন না।
কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণঃ
১. আঁশজাতীয় খাবার এবং শাকসবজি ও ফলমূল কম খেলে;
২. পানি কম খেলে;
৩. দুশ্চিন্তা করলে;
৪. কায়িক পরিশ্রম, হাঁটা-চলা কিংবা ব্যায়াম একেবারেই না করলে;
৫. অন্ত্রনালীতে ক্যান্সার হলে;
৬. ডায়াবেটিস হলে;
৭. মস্তিষ্কে টিউমার হলে এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে;
৮. অনেক দিন বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে বিছানায় শুয়ে থাকলে;
৯. বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবন, যেমনঃ
ক. ব্যথার ওষুধ;
খ. উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ;
গ. গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ;
ঘ. খিঁচুনির ওষুধ এবং
ঙ. যেসব ওষুধের মধ্যে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও অ্যালুমিনিয়ামজাতীয় খনিজ পদার্থ থাকে। তা ছাড়া স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার জন্যও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এর মধ্যে কাঁপুনিজনিত অসুখ, স্নায়ু রজ্জু আঘাতপ্রাপ্ত হলে, কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ও থাইরয়েডের সমস্যা উল্লেখযোগ্য।
কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণঃ
১. শক্ত পায়খানা হওয়া;
২. পায়খানা করতে অধিক সময় লাগা;
৩. পায়খানা করতে অধিক চাপের দরকার হওয়া;
৪. অধিক সময় ধরে পায়খানা করার পরও পূর্ণতা না আসা;
৫.মলদ্বারের আশপাশে ও তলপেটে ব্যথার অনুভব করা এবং
৬. আঙুল কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে পায়খানা বের করা।
কোষ্ঠকাঠিন্য চিকিৎসা না করা হলে যে সমস্যা হতে পারে
১. পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে;
২. পাইলস;
৩. এনালফিশার;
৪. রেকটাল প্রোলাপস বা মলদ্বার বাইরে বের হয়ে যেতে পারে;
৫. মানসিকভাবে রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে;
৬. প্রস্রাব বন্ধ হতে পারে;
৭. খাদ্যনালীতে প্যাঁচ লেগে পেট ফুলে যেতে পারে;
৮. খাদ্যনালীতে আলসার বা ছিদ্র হয়ে যেতে পারে এবং
৯. কোষ্ঠকাঠিন্য যদি কোলন ক্যান্সার এবং মস্তিষ্কে টিউমারের জন্য হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা করা না হয় তবে অকালমৃত্যু হতে পারে।
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় যারা ভুগছেন, তারা যে ধরনের খাবার এড়িয়ে চলতে পারেন: * দুধ: দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার (যেমন: পনির, আইসক্রিম ইত্যাদি) কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়াতে পারে অনেকের। এ ধরনের খাবারে আঁশের পরিমাণ কম। ছোট শিশু যারা শুধু কৌটার দুধ খায়, তাদের এ সমস্যা বেশি। তবে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় দুধ থাকা উচিত। টক দই হজমে সহায়ক।
* মাংস: লাল মাংসে (গরু ও খাসির) চর্বি বেশি থাকে। এটা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। এই খাবার অন্ত্রে অনেকক্ষণ থাকে। মাংসের সঙ্গে পাতে যেন প্রচুর সবজি ও সালাদ থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
* চিপস: স্ন্যাকস বা নাশতা হিসেবে পটেটো চিপসজাতীয় খাবার ভালো নয়। এগুলো কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়িয়ে দেবে।
* হিমায়িত খাবার: সংরক্ষিত বা প্রক্রিয়াজাত খাবারে পানি শুকিয়ে ফেলা হয় ও লবণ বেশি থাকে। ফলে এ ধরনের খাবারে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়বে।
* বেকারি পণ্য: বেকারি পণ্য যেমনবিস্কুট, ক্র্যাকার্স, ডোনাট, পেস্ট্রিজাতীয় খাবারে চর্বি বেশি, জলীয় অংশ কম, আঁশও কম। এর ফলে যাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে, তাঁদের জন্য এগুলো বর্জনীয়। ফল খাওয়াটা তাঁদের জন্য ভালো।
* কাঁচকলা: কাঁচকলা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, এটা ঠিক। তবে পাকা কলায় যথেষ্ট আঁশ আছে। তাই ওটা খাওয়া যাবে।
* ভাজাপোড়া: ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, বিস্কুটের গুঁড়া ও ব্রেড ক্রাম্বে ভাজা যত খাবার আছে, সেগুলো অন্ত্রের চলন কমিয়ে দেয় ও কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ায়।
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে কিছু খাবার
কলা কলাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অনেক সাহায্য করে থাকে। তাছাড়া কলা পটাশিয়াম বৃহদান্ত্র ও ক্ষুদ্রান্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুতরাং কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করতে কলার অবদান অপরিসিম।
কফি কফি একটি জনপ্রিয় পানীয়। এটা আজকাল সবাই খেয়ে থাকে। যখন শরীর থেকে ঘুমের ভাব কাটানোর দরকার হয় তখন বেশিরভাগ মানুষ কফি পান করেন, কিন্তু এটা অন্যান্য কারণেও উপকারি। কারো কারো ক্ষেত্রে এই কফি পেট নরম করতে সাহায্য করে থাকে। তবে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে গিয়ে অতিরিক্ত কফি পান করে বসবেন না যেন, এতে ডায়রিয়া হয়ে যেতে পারে। ২-৩ কাপের বেশি পান না করাই ভালো।
পানি এটা তো বলার প্রয়োজন নেই পানি আমাদের দেহের জন্য কতটা উপকার। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় শরীর যথেষ্ট পানি না পাওয়ার কারণে তৈরি হচ্ছে কোষ্ঠকাঠিন্য। এ কারণে যথেষ্ট পানি পান করতে হবে। বিশেষ করে আপনি যখন ব্যায়াম করবেন বা বাইরে অনেকটা সময় গরমে কাটাবেন, তখন পানি বিশেষভাবে জরুরী।
কমলা উচ্চমাত্রার ফাইবার সমৃদ্ধ কমলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে একটি বা দুটি কমলা খাওয়া অভ্যাস কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করবে। জুস নয়। বরং আস্ত কমলা ফলটাকেই খাওয়ার চেষ্টা করবেন। এতে যে ফাইবার থাকে। তা আপনাকে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করবে শুধু তা নয় সাথে পুরাপুরি সারাতেও সম্ভাব করবে। এটা ২০০৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে কমলায় থাকা নারিনজেনিন নামের একটি উপাদান কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অনেক সহায়ক।
পপকর্ন অনেকে পপকর্ন খাবার এতটা নাও পছন্দ করতে পারে। কিন্তু পপকর্ন যে কতটা স্বাস্থ্যকর খাবার তা আমাদের জানা প্রয়োজন। আর পপকর্নে যে ফাইবার থাকে তার কারনে খাদ্য তালিকায় পপকর্ন রাখা উচিত। এই ফাইবারের কারণে আপনার দেহের অনেক সাহায্য করতে পারে। তবে সাবধান, মাখনে ভরা ফ্যাটি পপকর্ন খাবেন না। দরকার হলে বাড়িতেই তৈরি করে নিতে পারেন একদম সাধারণ পপকর্ন। পপকর্নে থাকা ফাইবার উপাদান কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অনেক উপকারি।
লাল চাল যদিও আমাদের সাদা চাল খাওয়ার অভ্যাস কিন্তু প্রতি কাপ লাল চালে থাকে ৩.৫ গ্রাম ফাইবার। এ ছাড়াও এটি সাধারণ সাদা চালের চাইতে বেশি পুষ্টিকর। আরো খেতে পারেন বিভিন্ন হোল গ্রেইন। বিশেষ করে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে লাল চালের ভূমিকা অনেক বেশি।
পালং শাক
সবজি হিসেবে পালং আমাদের অনেক পছন্দের। এক কাপ সেদ্ধ পালং শাকেই থাকে চার গ্রাম ফাইবার। এছাড়াও থাকে ১৫০ মিলিগ্রামের বেশি ম্যাগনেসিয়াম, যা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। সুতরাং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে পালং শাকের ভূমিকা অপরিসীম।
টকদই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে টকদইয়ের তো তুলনায় নেই। টকদইয়ের প্রোবায়োটিক গুণাগুণ আপনার হজমের সমস্যাকে দূর করতে অনেকাংশে সাহায্য করে। এমনকি নিয়মিত টকদই খেলে আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য হবার সম্ভাবনা থাকবেই না।
ইসুপগুলের ভুষি ইসুপগুলের ভুষি পানির সাথে মিশিয়ে খেলে যে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমাধান হয় এটা প্রায় সবাই জানেন। তবে খেতে হবে নিয়ম মতো। অনেকেই ইসুপগুলের ভুষি পানিতে ভিজিয়ে রাখেন এবং পরে খান। এতে আসলে উপকার হয় না। বরং পানিতে দিয়ে সাথে সাথেই খেয়ে ফেলতে হবে। আবার অনেক ইসবগুল বা ভূসি ১ গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে চিনি বা গুড়সহ নিয়মিত খালি পেটে সেবন করলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হবে এই কথাও বলে থাকে গ্রামে-গঞ্জে দীর্ঘকাল ধরে। একথা সত্যি ইসুপগুলের ভুষি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অনেক উপকার।
আপেল আপেলের গুনাগুন তো আমরা কমবেশি জানি। আপেলের খোসার মধ্যে রয়েছে স্যলুবল এবং ইনস্যলুবল ফাইবার যা খাবার হজমের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকরী। এছাড়াও আপেলের প্যাক্টিন নিশ্চিত করে পরিপাকতন্ত্রের সঠিক কর্মক্ষমতা। সবচাইতে ভালো ফলাফল পেতে প্রতিদিন খালি পেটে অন্তত ১ টি আপেল খেতে হবে। সুতরাং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে আপেলের উপকারিতা অনেক।
গাজর গাজর একটি সুস্বাদু সবজি। এই সবজিটি কাঁচাও খাওয়া যায় এবং রান্না করেও খাওয়া যায়। এই অত্যন্ত সুস্বাদু সবজিটি প্রক্রিতিক ডায়াটেরি ফাইবারের বেশ ভালো উৎস। মাত্র আধা ইঞ্চির ৭ খণ্ড গাজরে রয়েছে প্রায় ১.২ গ্রাম ফাইবার। প্রতিদিন গাজর খাওয়ার অভ্যাস কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাকে দূরে রাখবে চিরকাল। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে গাজর খাওয়ার অভ্যাস করার দরকার।
শসা শসার বেশীরভাগ অংশই পানি দিয়ে তৈরি, আর শসার ডায়াটেরি ফাইবার শসাকে করে তোলে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যার মহৌষধ। দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও দূর করতে সক্ষম নিয়মিত শসা খাওয়ার অভ্যাস থেকে।
কাঠবাদামের তেল কাঠবাদামের তেল কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকরী। কাঠবাদামের ল্যাক্সাটিভ ইফেক্ট হজম ত্বরান্বিত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। প্রতিদিন রাতে ১ গ্লাস দুধে ২ টেবিল চামচ কাঠবাদামের তেল মিশিয়ে পান করলে সমস্যার দ্রুত সমাধান পাওয়া সম্ভব।
পাকা বরই আবার অনেকে পাকা বরই কে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য ব্যবহার করে থাকে। এই মিষ্টি পাকা বরই চটকে খোসা ও বীজ ফেলে অথবা ছেঁকে অল্প পানি মিশিয়ে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের উপশম হয়।
বেলের সরবত বেলের সরবতও অনেক উপকারী। ৩০-৩৫ গ্রাম পাকা বেলের শাঁস প্রতিবারে ১ গ্লাস পানিতে শরবত তৈরী করে দিনে ২ বার সেবন করতে হবে। এভাবে কমপক্ষে ৫-১০ দিন বেলের সরবত পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যাবে।
বুচকি দানা বুচকি দানাও উপকারী। ২ গ্রাম পাতা চূর্ণ রাতে ঘুমানোর সময় গরম পানি অথবা দুধসহ সেবন করতে হবে। খারাপ লাগলে দই খেতে হবে।
ঘরোয়া উপায় কোষ্ঠকাঠিন্য বেশ অস্বস্তিকর একটি সমস্যা। পেট ফোলাভাব, বমি বমি ভাব, বাথরুম করতে অসুবিধা ইত্যাদি সমস্যা হয় এ সময়। সমস্যা হলে তো চিকিৎসকের কাছে যাবেনই, তবে ঘরে তৈরি একটি পানীয় খেয়ে দেখতে পারেন। কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে এই পানীয়। জেনে নিন ৩টি আয়ুর্বেদিক উপায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অব্যর্থ।
এই পানীয় তৈরি করতে লাগবে তিনটি উপাদান অ্যাপেল সিডার ভিনেগার, মধু ও পানি। অ্যাপেল সিডার ভিনেগারে রয়েছে অ্যাসিটোব্যাকটার নামের একটি ভালো ব্যাকটেরিয়া। এটি খাবারকে ভাঙতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমতে সহায়ক হয়। তবে এর জন্য কাঁচা ও অপরিশোধিত অ্যাপেল সিডার ভিনেগার প্রয়োজন। কাঁচা মধুর মধ্যে থাকা উপাদান ইউজেনল কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে কাজ করে। এই পানীয় বানানোর জন্য এক গ্লাস গরম পানি নিতে হবে। এর মধ্যে দুই টেবিল চামচ কাঁচা অ্যাপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে। এর মধ্যে দুই টেবিল চামচ কাঁচা মধু দিতে হবে। একে ভালো নাড়তে হবে। মধুকে ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে সকালে বা দিনের যেকোনো সময় এটি পান করতে হবে।
প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে একটি খোসাসহ পুরো আপেল খাবেন। এছাড়া রাতে ঘুমাতে যাবার আগে এক কাপ কুসুম গরম পানি পান করতে হবে। এটা হজমে সহায়তা করবে এবং কোষ্ঠবদ্ধতা দূর করবে।
সারা রাত বড় ১টি সাদা এলাচ এক কাপ গরম দুধে ভিজিয়ে রাখতে হবে । সকালবেলা এই এলাচটি থেঁতো করে দুধসহ খেতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাটি যদি ভয়াবহ রকমের বেশি হয় তাহলে সকাল ও রাতে একইভাবে দুধসহ এলাচ খেতে হবে।
কিসমিস ও গরম দুধ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে কিসমিস ও গরম দুধের অনেক উপকার। ১০/১২টি কিসমিস নিয়ে তার মধ্যে বিচি থাকলে ছাড়িয়ে ফেলতে হবে। এরপর ১গ্লাস দুধে কিসমিস দিয়ে ১চিমটি দারুচিনির গুড়া ভালভাবে ফুটিয়ে নিতে হবে। এভাবে টানা ৩দিন দুধ পান করতে হবে। তাহলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
ত্রিফলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ত্রিফলা কার্যকরী। ত্রিফলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। এছাড়া এটি হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ও বদহজম জনিত সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। ১চা চামচ ত্রিফলা পাউডার ১গ্লাস গরম পানিতে বা গরম দুধে ভালভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। রাতে ঘুমানোর আগে তা নিয়মিত পান করতে হবে। এতে করে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
তিলবীজ তিল বীজ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ক্ষেত্রে অনেক উপকার করে থাকে। তিল বীজ গুড়া করে আটা বা ময়দার সাথে মিশিয়ে রুটি তৈরি করে খেতে পারেন। এতে করে দেহে ফাইবারের অভাব পূরণ হবে। সাথে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যাবে।

মানবজীবনে ট্র্যাজেডি by মোজাফফর হোসেন

মৃত্যুর আগ পর্যন্তু মানুষের বেঁচে থাকাকে বলা হয় মানবজীবন। জগতের শ্রেষ্ঠ জীবন মানবজীবন। অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষ এ জন্য আলাদা যে, তাদের সুখ ও দুঃখ ভোগ করার একটা ভিন্নরকমের অনুভূতি রয়েছে। চরম সুখে মানুষ পুলকিত হতে পারে আবার কঠিন দুঃখে মানুষ মুষরে পড়তে পারে। যার যার মতো করে মানুষ সুখী হয় আবার এই মানুষই যার যার মতো করে দুঃখ ভোগ করে। এই বৈশিষ্ট্যই মানবজীবনকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে রেখেছে। কিছু মানুষ রয়েছে যারা সারা জীবনই সুখ ভোগ করতে পারে আর কিছু মানুষ রয়েছে সারা জীবনই দুঃখ-কষ্টে বেঁচে থাকেন। কোনো মানুষের জীবনে কোনো একসময় সুখ ধরা দিতে পারে আবার দুঃখও তেমনি করে হঠাৎ জীবনের দরজায় কড়া নাড়তে পারে। সুখ ও দুঃখ এভাবেই নিজ নিজ গন্তব্য ঠিক করে নিয়ে আবর্তিত হতে থাকে। সুখ কী আর দুঃখইবা কাকে বলে এ নিয়েও বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ছোট ছোট সুখ এবং ছোট ছোট দুঃখের কোনো সংজ্ঞা দেয়া যায় না। এগুলো আপেক্ষিক। বড় বড় দুঃখের সংজ্ঞা না হলেও সেসব দুঃখকে দেখা যায়। ছোট ছোট সুখ; ছোট ছোট দুঃখ প্রায় সব মানুষের মধ্যেই কমবেশি অবস্থান করে। কিন্তু বড় বড় সুখ ও বড় বড় দুঃখ বাসা বাঁধতে পারে বড় বড় মানুষের জীবনে। মহৎ ব্যক্তিত্বের সুখ ও দুঃখ আস্বাদনের মাত্রা সাধারণ মানুষের তুলনায় ভিন্নতর হয়ে থাকে। জীবনবোধের অনুভূতি যত গভীর হয় সুখ ও দুঃখ বোধের পরিমাণও ততই গভীর হতে পারে। পাহাড়কে নিশ্চিহ্ন করতে বড় শক্তির প্রয়োজন পড়ে। সেরকম বীর ও মহৎপ্রাণ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করতে বড় দুঃখ লাগে। অর্থাৎ বড় দুঃখের জন্য বড় মানুষ এবং বড় সুখের জন্যও বড় মানুষের দরকার পড়ে। যেমন বড় সুখ ধরা দিতে পারে রাজা-বাদশাদের জীবনে এবং বড় দুঃখগুলো তাদের জীবনে প্রবেশ করার পথ খুঁজতে থাকে। বড় মানুষের জীবনে যখন বড় সুখ ধরা দেয় তখন সেই সুখকে বলা হয় সাফল্য। আবার এই সফল জীবনে যখন ধরা পড়ে বড় দুঃখ তখন সেই দুঃখভোগকে বলা হয় ট্র্যাজেডি।
দুঃখ কমবেশি অধিকাংশ মানুষের জীবনেই ঘটে থাকে। সেই দুঃখ যখন ভয়াবহ রূপে মানব জীবনে অনুপ্রবেশ করে তখন মানুষ শিউরে ওঠেন; বিহবল হয়ে পড়েন দুঃখ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। নানান কৌশল অবলম্বন করেও যখন দুঃখকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হন তখন মানবজীবনকে ভোগ করতে হয় দুঃখের করুণ পরিণতি। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হতে থাকেন; ধীরে ধীরে দুঃখ সাগরের অতলগহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েন। দুঃখের শুরু থেকে ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হওয়া পর্যন্তু যে অসহ্য যন্ত্রণা ও নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট তিলে তিলে ভোগ করতে গিয়ে মানব মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয় সেই অপ্রত্যাশিত অনুভূতিই হলো ট্র্যাজেডি। এরিস্টটলের মতে, ট্র্যাজেডি হলো অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বহির্দ্বন্দ্বে পরাভূত মানবজীবনের করুণ কাহিনী। অর্থাৎ মানুষের দুঃখময় জীবনের করুণ পরিণতি বা ইতিবৃত্তকেই বলা হয় ট্র্যাজেডি। মানবজীবনে ট্র্যাজেডি সৃষ্টি হয় তখনই যখন কোনো শক্তিমান এবং প্রবল ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ অন্তর্ঘাত ও বহির্ঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করে। এই আঘাত যেকোনো স্থান থেকে আসতে পারে। হতে পারে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, মা-বাবা কিংবা আপনজন অথবা প্রিয়জনের কাছ থেকে। হতে পারে নিজের কোনো ভুলের কারণে অথবা পারিপার্শ্বিক কোনো ঘটনার জন্য কিংবা অদৃষ্টের প্রভাবেও মানবজীবন তিলে তিলে বিনষ্ট হতে পারে।
দুঃখ মানবজীবনে কীভাবে বাসা বাঁধতে পারে এবং সেই দুঃখে মানুষ কীভাবে ট্র্যাজিক চরিত্রে উপনীত হতে থাকে তার দৃষ্টান্ত সাহিত্যের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে। বলা হয় সাহিত্য হলো মানবজীবনের আয়না। সাহিত্যের মাধ্যমে মানবজীবনের ট্র্যাজেডিকে অবলোকন করতে হলে নাট্যসাহিত্যকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। একমাত্র নাটকই পারে ট্র্যাজিক চরিত্রকে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত করতে। ট্র্যাজেডি নাটকের রূপরেখা দিতে গিয়ে এরিস্টটল বলেন, Tragedy, then, is an imitation of an action that is serious, complete, and of a certain magnitude;in language embellished with each kind of artistic ornament, the several kinds being found in separate parts of the play; in the form of action, not of narrative; through pity and fear effecting the proper purgation of these emotions. তাই ট্র্যাজেডিকে স্পষ্ট করে তুলতে পারে নাটক। মানবজীবনে ট্র্যাজিডি কিভাবে ঘনীভূত হতে থাকে সেটা স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে পরিবেশন করতে হলে নাটকের বিকল্প আশা করা যায় না। সেজন্যে ট্যাজেডিকে বুঝতে ও বুঝাতে নাটকের শরণাপন্ন হতে হয়। ট্র্যাজিডির স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস (খ্রি.পূ ৪৯৬-৪০৬) রচনা করেছিলেন ‘দি কিং ইডিপাস’ নাটক। ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬ খ্রি.) রচনা করেছিলেন ‘হ্যামলেট; ম্যাকবেথ’ এবং নরওয়েতে জন্ম নেয়া হেনরিক ইবসেন (১৮২৮-১৯০৬) রচনা করেছিলেন ‘আ ডলস্ হাউজ’।
মানুষ নানাভাবে ট্র্যাজেডির শিকার হতে পারেন। সফোক্লিসের ধারণা মতে, মানুষ নিয়তির ক্রীড়নক। দৈবশক্তির প্রভাবে মানবজীবনে দুঃখের প্রবেশ ঘটতে পারে। তিনি তার নাটক দি কিং ইডিপাসে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, মানুষ নিয়তির বাইরে একধাপও এগোতে পারেন না। মানুষের অদৃষ্টে যা লেখা রয়েছে তা যেকোনোভাবে ঘটবেই। ‘ইডিপাস’ নাটকের কাহিনীও সেদিকেই অগ্রসর হয়েছে। ইডিপাস রাজা হয়েছেন ঠিকই কিন্তু যখন তিনি জানতে পেরেছেন; যে রাজাকে হত্যা করে তিনি রাজ্যের অধিপতি হয়েছেন সেই রাজা ছিলেন তারই জন্মদাতা পিতা আর যে রানী তার সংসার করছেন তিনিই হলেন ইডিপাসের মা। এই সত্য জানার কারণে ইডিপাসের মধ্যে এক ধরনের ঘৃণা, দুঃখ, কষ্ট, ক্ষোভ ও হতাশার উদ্রেগ ঘটে। ধীরে ধীরে ইডিপাসের জীবনে নেমে আসে কঠিন দুর্যোগ। রাজ্যসিংহাসনচ্যুত হয়ে ইডিপাস নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে থাকেন এবং আত্মগ্লানিতে ভুগতে ভুগতে ইডিপাস একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যান। নিয়তিকে উপেক্ষা করার লক্ষ্যে ইডিপাসের জন্মের পরপরই তার বাবা ইডিপাসকে হত্যার উদ্দেশ্যে মেষপালক ভৃত্যের হাতে তুলে দেন; কিন্তু মেষপালক ইডিপাসকে হত্যা না করে ভিন্ন রাজ্যের শিকারিদের কাছে হস্তান্তর করেন। ইডিপাসের বেঁচে যাওয়ার কারণে দৈববাণীকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা সম্ভব হয়নি আর নিয়তিও ইডিপাসের পিছু ছাড়েনি।
শেক্সপিয়রের ধারণা মতে, মানবজীবনে ট্র্যাজেডি শুধু গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো নিয়তির প্রভাবে ঘটে না; অন্যভাবেও ঘটতে পারে। মানুষ তার নিজের কোনো একটি ভুল বা চারিত্রিক দুর্বলতা সৃষ্টিকরত ট্র্যাজেডির শিকার হতে পারেন। এই মন্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে শেক্সপিয়র তার নাটকের চরিত্র ও ঘটনা গ্রহণ করেছিলেন ইতিহাস থেকে। ইতিহাসের বিখ্যাত চরিত্রগুলোর দুর্বল কোনো বৈশিষ্ট্যের কোটর গলিয়ে ছোট্ট একটি ভুল ঢুকে পড়লে তা ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হতে থাকে। সেই ছোট্ট ভুল চরিত্রটিকে পরে ভেতর ও বাহির থেকে তছনছ করে তোলে। নৌকার ক্ষুদ্র একটি ছিদ্র বেয়ে পানি উঠতে উঠতে একসময় সমগ্র নৌকাটিকে যেভাবে নিমজ্জিত করে ফেলে ঠিক তেমনিভাবে একটি ভুল একটি চরিত্রের অনায়াসে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। শেক্সপিয়র তার ওথেলো ও ম্যাকবেথ নাটকে সে অবস্থার রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। ম্যাকবেথ নাটকে দেখা গেছে রাজা ডানকানের রাজ্যে জাতীয় বীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ম্যাকবেথ। তিনি ছিলেন প্রধান সেনাপতি। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারেন একমাত্র প্রধান সেনাপতি বীর ম্যাকবেথ। দেশ রক্ষা করার সব কৃতিত্বই তার। কিন্তু রাজ্যের যাবতীয় সুনাম ও সুবিধা ভোগ করেন রাজা ডানকান। এটি লেডি ম্যাকবেথের ভালো ঠেকল না। লেডি ম্যাকবেথ ভাবল তার স্বামী রাজ্যের প্রধান সেনাপতি এবং জাতীয় বীর। রাজা ডানকানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া তার পক্ষে ক্ষণিকের ব্যাপার। লেডি ম্যাকবেথ আরো ভাবল যদি রাজা ডানকানকে রাজ্যক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া যায় তাহলে খুব সহজেই ম্যাকবেথ রাজা হতে পারবেন আর তিনি হবেন রানী। রানী হওয়ার স্বপ্ন লেডি ম্যাকবেথকে পেয়ে বসল। ডানকানকে হত্যা করতে সে প্রতিনিয়ত স্বামী ম্যাকবেথকে প্ররোচিত করতে লাগলেন। স্ত্রী অনুরক্ত ম্যাকবেথ স্ত্রীর রানী হওয়ার সাধ পূরণ করতে নিরস্ত্র রাজা ডানকানকে হত্যা করে রাজ্যভার গ্রহণ করলেন। কিন্তু বিবেকের কাছে পরাজিত হলেন ম্যাকবেথ। প্রতি রাতে ডানকানের প্রেতাত্মা ম্যাকবেথকে ধিক্কার জানাতে লাগলেন। বিবেকের দংশনে ম্যাকবেথ রাজ্যক্ষমতা ত্যাগ করলেন। ভাবলেন স্ত্রীর কথা শুনে যে ভুল তিনি করলেন তা ক্ষমার অযোগ্য; এ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয় না। ম্যাকবেথ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। একসময় আত্মহত্যা করে মুক্তি খুঁজলেন। নাটকে লেডি ম্যাকবেথের অবৈধভাবে গ্রণী হওয়ার বাসনা সেনাপতি ম্যাকবেথকে নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে ফেলে ধ্বংস করেছে।
গ্রিক নিয়তি ও শেক্সপিয়রের চারিত্রিক দুর্বলতা ব্যতিরেকেও মানবজীবন যে ট্র্যাজেডি আক্রান্ত হতে পারে তার পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করেছেন ইবসেন। নরওয়ে নাট্যকার হেনরিক ইবসেন তার ‘আ ডল হাউজ’ নাটকে সফোক্লিস ও শেক্সপিয়রের ধারণা ছাড়াও ট্র্যাজেডি সঙ্ঘটিত হওয়ার উপায় দেখিয়েছেন। হেনরিক ইবসেন ছিলেন সমকালীন সমাজ ও সমসাময়িক মানবজীবনের বিশ্লেষক। তিনি দেখালেন পারিপার্শ্বিক একটি ঘটনা কীভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত করতে পারে। তার ‘আ ডল হাউজ’ নাটকের নোরা চরিত্রটি সে ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে। দ্বন্দ্ব আর সঙ্ঘাতের মধ্য দিয়ে সংসার বেশি দিন টেকে না। নোরার জীবনেও তাই ঘটেছিল। স্বামী, সন্তান ত্যাগ করে পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীতে নোরা মুক্তির আশায় বেরিয়ে পড়েছিল। এতে সমাজের তির্যক দৃষ্টি এসে পড়েছে তার ওপর। তাকে কটাক্ষ্য সহ্য করতে হয়েছে। উপর্যুপরি কটাক্ষ্যের কারণে নোরা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে উঠেছেন। এতে যে দুঃখ তিনি পেয়েছেন তা ট্র্যাজেডির কোনো অংশে কম নয়। সমাজ তাকে পাগল বলেছে।
স্বামী সন্তান সংসারের মায়া ত্যাগ করে একজন নারী যখন অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে সংসার ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য হন তখন কতটা ক্ষত তাকে বিচলিত করে তুলতে পারে তা অনুধাবনের বিষয়। এরকম একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলাকে হেনরিক ইবসেন ট্র্যাজেডির কোনো অংশে কম বলে মনে করেন না।

মৃত্যু উপত্যকা: কাশ্মিরের তরুণ ও দুরন্ত দল by ফাহাদ শাহ

তখন ভোর পৌনে ছয়টা। হাজার হাজার মানুষ ছুটছে কম্বলে ঢাকা লাশবাসী একটি খাটিয়ার পেছনে। কেউ পুস্প বর্ষণ করছে লাশের ওপর। খাটিয়ায় করে হিজবুল মুজাহিদিন নেতা বুরহান মুজাফ্ফর ওয়ানির লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল দাফনের জন্য।
২০১৬ সালের ৯ জুলাই সকাল সাড়ে নয়টার দিকে যখন ওয়ানির লাশের জানাজা হচ্ছিল তখনো জানাজার মাঠের দিকে ছুটে আসছিলো হাজার হাজার মানুষ। দুপুর নাগাদ কমব্যাট পোশাকে সজ্জিত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল তরুণকে জনতার সমুদ্রে অবস্থান নিতে দেখা যায়।
শ্রীনগরের ৪২ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তিরল গ্রামে ওয়ানি ছিলো মাত্র ২১ বছরের এক তরুণ। ভারত শাসিত কাশ্মিরে সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন নেতা ওয়ানি ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দিতে সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন। তার ছবি ও শানিত বক্তব্যগুলো সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে। ছবিগুলোতে দেখা যায় কোরআন সামনে আর কালাশনিকভ রাইফেল পাশে নিয়ে সহযোদ্ধ পরিবেষ্টিত ওয়ানি ক্যামেরার সামনে বসে আছেন। সেখান থেকে তিনি ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ এবং তরুণ কাশ্মিরিদের অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। সামাজিক গণমাধ্যমে ওয়ানির ডাক তাকে তরুণদের আইকনে পরিণত করে। প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দিতে এগিয়ে আসে নতুন নতুন তরুণ।
ওয়ানি’র জীবনযাত্রাও তার অনুসারিদের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। অথচ একসময় সে ছিলো তিরলের অন্যসব শিশুর মতোই সাধারণ এক শিশু। ছোটদের মতো পথে ঘাটে খেলা করতো। ২০১০ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য তাকে, তার ভাই খালিদ ও আরো তিনজন পথচারিকে অহেতুক মারধর করে। ওই বছরই বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেয় সে। তখন সে মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক বালক।
কাশ্মিরিদের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এটা নিত্যনৈমিত্তিক আচরণ। শুধু ২০১০ সালেই নিরাপত্তা বাহিনী ১২০ বেসামরিক কাশ্মিরিকে গুলি করে মেরেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচারে কাশ্মিরি তরুণরা আজ অতিষ্ঠ। একদিকে ভারতপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত, অন্যদিকে স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোর জোট হুরিয়াত কনফারেন্সের আগের সেই বলিষ্ঠতা ও ঐক্য নেই।
এতদিন কাশ্মিরের বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর প্রতিও জনসমর্থন ছিলো কম। কারণ সেগুলোর বেশিরভাগ যোদ্ধা ছিলো উপত্যকার বাইরে থেকে আসা। এর অনেকগুলোর ঘাঁটি পাাকিস্তানে। নয়াদিল্লি ও পাকিস্তান দু’দেশই তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দাবার ছকে কাশ্মিরকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এই সমস্যার একটি সমাধান খুঁজে পেয়েছিলো ওয়ানি ও তার সহযোদ্ধারা। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা ও সরকারি স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করা। ২০১৩ সাল শেষ হওয়ার আগেই একজন ভয়ংকর ও নির্ভিক যোদ্ধা হিসেবে ওয়ানির নাম কাশ্মিরবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ বছর বয়সে সে কাশ্মিরের আজাদি আন্দোলনের প্রতীক বা ‘পোস্টার বয়’-এ পরিণত হয়। রাজ্যের তরুণদের কাছে সে হয়ে ওঠে প্রতিরোধ আন্দোলনের কাক্সিক্ষত মুখ।
ওয়ানির বিদ্রোহ জীবনকাল ছিলো ছয় বছর। এসময় সে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও প্রতিরোধ দর্শনের অনুরক্ত হয়ে ওঠে।
২০১৬ সালের ৮ জুলাই বিকেলে ভারতীয় সেনারা তাকে গুলি করে হত্যা করে। সরকার সেদিন কাশ্মিরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। এমনকি মোবাইল ফোনের যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু এতে ওয়ানির মৃত্যু ও জানাজার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়নি। কাশ্মিরের বিভিন্ন শহর, নগর ও গ্রামে বিক্ষোভ শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ওই দিন আরো ১৬ কাশ্মিরি জীবন দেয়।
ওয়ানি’র মৃত্যুর পরের দিনগুলোতে বিক্ষোভ ও মৃত্যুর মিছিল আরো দীর্ঘ হয়। কাশ্মিরের মানবাধিকার গ্রুপ ‘জম্মু-কাশ্মির কোয়ালিশন অফ সিভিল সোসাইটি’র এক হিসাবে বলা হয়, ২০১৬ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ১৪৫ বেসামরিক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে। আরো ১৫ হাজারের মতো মানুষ আহত হয়েছে। এদের মধ্যে এমন ১০০০ আছে ভারতীয় বাহিনীর পেলেট-বুলেটের ঘায়ে যাদের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।
সহিংসতা শুধু বিক্ষোভে জায়গাগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মানবাধিকার গ্রুপটির হিসাব মতে গত বছর ১৩৮ বিদ্রোহী ও ১০০ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও নিহত হয়। তবে, ভারত সরকারের হিসাবে বিদ্রোহী নিহতের সংখ্যা ১৬৫। যা বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ওয়ানির মৃত্যু উপত্যকার চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তরুণ কাশ্মিরিরা এখন আর প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদিদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করতে ভয় পায় না। তারা বলে, এই বিচ্ছিন্নতাবাদিরাই আমাদের হিরো।
তরুণ বিচ্ছিন্নতাবাদিরা আজ প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করে। হাতে কালাশনিকভ রাইফেল। তারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে জনগণকে স্বাগত জানায়। প্রকাশ্যে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছে। রাতের বেলা গ্রামে গিয়ে থাকতেও ভয় পাচ্ছে না।
বিচ্ছিন্নতাবাদি আছে জানার পরও তাদের পাকরাও করতে ভারতীয় বাহিনীর পক্ষে কোথাও অভিযান চালানো দুরুহ হয়ে উঠেছে। সেনা অভিযান শুরু হলে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তারা বিদ্রোহীদের পক্ষে স্লোগান দেয়, তাদেরকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিদ্রোহীদের সহায়তার জন্য তরুণরা একটি নিজস্ব গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর ফলে বিদ্রোহীরা নিরাপদে চলাফেরা করার সুযোগ পাচ্ছে।
ওয়ানির পর আরো বেশ কয়েকজন স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করেছে ভারতীয় সেনারা। প্রতিটি হত্যার পর উপত্যকা আগের চেয়ে আরো বেশি উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রতিটি তরুণ কাশ্মিরির অন্তর এখন স্বাধীনতাকামী হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিপুষ্ট।
[লেখক একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, লেখাটি ‘দি হেরাল্ড’ পত্রিকার জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে]
কাশ্মিরের পুলওয়ামা জেলায় গাছে চড়ে হিজবুল মুজহিদিন নেতার দাফন দেখছে মানুষ

Tuesday, May 16, 2023

জমানো কাঁধের চিকিৎসা by ডা. জি.এম. জাহাঙ্গীর হোসেন

রোগী যখন নিজে বা চিকিৎসক রোগীর কাঁধের বিভিন্ন নড়াচড়া করাতে পারে না এবং কাঁধে সবসময় ব্যথা হয় তখন একে ফ্রোজেন শোল্ডার বা স্টিফ শোল্ডার বা জমানো কাঁধ বা এডহেসিব ক্যাপসুলাইটিস বলে।  এডহেসিব ক্যাপসুলাইটিস একটি সেল্ফ লিমিটিং রোগ অর্থাৎ এটা আপনা আপনি ভালো হয়; তবে ৫ মাস থেকে ৯ মাস এমনকি ১৮ মাস সময় লাগে ভালো হতে। এই সময়ে যথোপোযুক্ত চিকিৎসা এবং ব্যায়াম না হলে জোড়া চিরস্থায়ীভাবে স্টিফ বা জমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই রোগে জয়েন্টের পর্দা বা ক্যাপসুলে প্রদাহ, সংকোচন ও স্ক্যার টিস্যু হয়। জোড়ার হাড়গুলির মধ্যে এবং ক্যাপসুল ও ক্যাপসুলের বাহিরের টিস্যুর মধ্যে জমানো বন্ধন (এডহেসন) তৈরি হয়। এজন্য কাঁধ স্টিফ বা শক্ত হয় বা জমে যায়। আবার জোড়ার ফ্লুইড বা পানি শুকিয়ে যাওয়ার জন্যও জয়েন্ট স্টিফ হয় এবং মুভমেন্ট সীমিত হয়। ফ্রোজেন শোল্ডার বা জমানো কাঁধ রোগী ৩টি অবস্থার মধ্যদিয়ে রোগকাল অতিক্রম করে। প্রথম অবস্থা বা ব্যথা অবস্থায়, কাঁধে ব্যথা হয় এবং নড়াচড়া সীমিত হয়। এই অবস্থা সাধারণত  ৬-১২ সপ্তাহ থাকে।

মধ্য অবস্থা বা স্টিফ অবস্থায়, কাঁধ শক্ত বা স্টিফ হয় বা জমে যায়। ব্যথার তীব্রতা কিছুটা কম। স্টিফ বা জমানো অবস্থা ৪-৬ মাস থাকে। শেষ অবস্থা বা রিকভারী অবস্থায়, স্টিফনেস আস্তে আস্তে কমে আসে এবং ব্যথা কমে যায়। এক বৎসরের অধিক সময় ধরে এই অবস্থা চলতে থাকে।
এই রোগে ঝুঁকিপূর্ণ কারা?
১. ৪০ থেকে ৬০ বৎসর বয়সের মানুষ এই রোগে ভোগে এবং পুরুষের তুলনায় মহিলারা দুইগুণ বেশি ভোগে।
২. ডায়াবেটিক ও থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত রোগীদের জমানো কাঁধ বেশি হয়।
৩. হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, স্ট্রোক, পারকিনসোনিসম ও আর্থ্রাইটিস রোগীদের জমানো কাঁধ হয়।
৪. মাথায় ও কাঁধে অপারেশন হলে বা কাঁধে আঘাত পেয়ে দীর্ঘদিন মুভমেন্ট না করলে জমানো কাঁধ হতে পারে।
৫. বার্সাইটিস, টেনডোনাইটিস এবং  পেশীর সমস্যা (টিয়ার, টেনডোনাইটিস, ডিজেনারেটিভ পরিবর্তন) ও ইমপিঞ্জমেন্ট জমানো কাঁধ করে।
রোগের লক্ষণ সমূহ:
১. সব সময় কাঁধে ব্যথা থাকে- রাতে বেশি হয় এবং শীতকালে ব্যথা বেড়ে যায়।
২. কাঁধ বা বাহুর নড়াচড়া সবদিকে সীমিত হয়।
৩. হাত দিয়ে কোনোকিছু তোলা বা হাত উপরে উঠানো যায় না।
৪. চুল আঁচড়ানো যায় না।
৫. জামা পরিধান বা বোতাম লাগানো কষ্টকর।
৬. স্টিফ কাঁধে কাত হয়ে ঘুমানো যায় না ব্যথার জন্য।
৭. পেন্টের পিছনের পকেটে হাত দেয়া যায় না।
চিকিৎসা:
ফ্রোজেন শোল্ডার বা জমানো কাঁধের প্রধান চিকিৎসা হলো ব্যায়াম। তবে রোগীকে পরীক্ষা,এক্স-রে,আলট্রাসনোগ্রাফি করে এর কারণ বের করতে হবে এবং যথোপোযুক্ত চিকিৎসা পদান করতে হবে। চিকিৎসা শুরু করলে প্রায় ৩-৬ মাস সময় লাগে ভালো হতে।
১. ক্যাপসুল ও সফ্ট টিস্যুর স্ট্রেসিং ব্যায়াম।
২. পেশী শক্তিশালী হওয়ার ব্যায়াম করতে হবে।
৩. ব্যথার ওষুধ সেবন করা।
৪.  ফিজিক্যাল থেরাপি যেমন।
৫.  গরম/ঠাণ্ডা স্যাঁক।
৬. ইন্ট্রাআর্টিকুলার স্টেরয়েড  ইনজেকশন।
৭. ইন্ট্রাআর্টিকুলার স্যালাইন থেরাপি।
উপরোক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থায় ফ্রোজেন শোল্ডার বা জমানো কাঁধ ভালো না হলে সর্বাধুনিক আর্থ্রােস্কোপিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে জোড়ায় আর্থ্রােস্কোপ প্রবেশ করিয়ে ক্যাপসুল রিলিজ ও স্যাব এ্যাকরোমিয়ন বিসঙ্কোচন করা হয়। আর্থ্রােস্কোপিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।


লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ, হাড় ও জোড়া বিশেষজ্ঞ এবং আর্থ্রোস্কোপিক সার্জন। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), ঢাকা। চেম্বার: বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল লি., শ্যামলী, মিরপুর রোড, ঢাকা-১২০৭। হটলাইন: ১০৬৩৩,০১৭৪৬৬০০৫৮২


Monday, May 15, 2023

ফ্যাটি লিভার হয়েছে কি-না by ডা. মামুন আল-মাহতাব স্বপ্নীল

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজনের কারণে অনেকেই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। শুরুতে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে দ্রুত প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সাধারণত শরীরে খারাপ ধরনের কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে ফ্যাটি লিভার হানা দেয়। ফ্যাটি লিভারের কারণে শরীর থেকে টক্সিন ভালো করে বের হতে পারে না। তাই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হলে খাদ্যতালিকা বদলে ফেলতে হবে।
নারী-পুরুষ সবাই-ই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তবে অনেকেই প্রাথমিক অবস্থায় ফ্যাটি লিভারের লক্ষণগুলোকে সাধারণ মনে করে এড়িয়ে যান। যা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ লিভার শরীরের দূষিত পদার্থ দূর করে।
ফ্যাটি লিভারের লক্ষণসমূহ
প্রস্রাবের রং অতিরিক্ত মাত্রায় গাঢ় হলুদ হয়ে যায়।
অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করা।
ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। এ ছাড়াও ত্বকে ছোপ ধরা বা গলার কাছের ত্বকের স্বাভাবিক রং পাল্টে যায়।
মাঝে মধ্যেই পেটে ব্যথা হয়।
এসময় শরীরের পেশী ক্ষয় হতে থাকে। এর সঙ্গেই হাতের শিরা জেগে ওঠা বা বেরিয়ে আসা, চেহারায় বয়স্ক ভাব লক্ষ্য করলে লিভার পরীক্ষা করিয়ে নিন।
পেটের মেদ বা ভুঁড়ি যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে; তাহলে অবশ্যই লিভারের পরীক্ষা করিয়ে নিন।
বেশির ভাগ লিভারের অসুখের প্রাথমিক লক্ষণ হলো ডিহাইড্রেশন। এসময় পেট খালি লাগে ও ঘন ঘন পিপাসা পায়।
এই লক্ষণগুলো খেয়াল করলেই লিভার পরীক্ষা করিয়ে নিন।
ওজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ খিদে বেড়ে গেলে ও মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি আসক্তি বাড়লে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা হতে পারে।
হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা হলে সতর্ক থাকুন।
প্রতিরোধ
প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে।
পানির মধ্যে অল্প পিঙ্ক সল্ট বা লেবুর রস মিশিয়ে খেতে পারলে খুব ভালো হয়।
কাঁচা হলুদের কারকিউমিনও লিভার সুস্থ রাখতে দারুণ কার্যকর।
লিভার সুস্থ রাখতে ম্যাগনেশিয়াম ও ভিটামিন বি-জাতীয় খাবারও খেতে পারেন।

লেখক: অধ্যাপক ও ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঞ্চলিক পরামর্শক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
চেম্বার: ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, মিরপুর রোড, ধানমণ্ডি, ঢাকা।
হটলাইন-১০৬০৬


গুরুতর এলার্জি হলে বুঝবেন কীভাবে? by অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল হাই

আমরা মানুষরা আমাদের অজান্তেই অজস্র নিযুত বস্তুকণার রাজ্যে ডুবে থাকি। এসব বস্তুকণা এত ক্ষুদ্র যে, সাধারণ চোখে দেখা যায় না। এগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রতিদিনকার ব্যবহার্য আসবাবপত্র বা সাবান কসমেটিক ইত্যাদির মধ্যে, কোনটা লুকিয়ে আছে খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে, আবার অনেক ধরনের বস্তুকণা ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসের মধ্যে। এ বস্তুকণাগুলো যখন শরীরের সংস্পর্শে আসে, তখন শরীর দু’ভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে: প্রথমত: শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা এটাকে সহজ ভাবে শরীরের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। দ্বিতীয়ত: শরীরের ইমিউন সিস্টেম এসব জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াই আসলে এলার্জি। আর যেসব বস্তুকণা এলার্জি সৃষ্টি করে, তাদেরকে বলে এলার্জিকণা। নানা জিনিস থেকে এ এলার্জিকণার উদ্ভব হতে পারে: যেমন পুরনো জিনিসপত্রে বা পুরনো খাদ্যদ্রব্যে জড়িয়ে থাকা ফাঙ্গাল স্পোর, ফুলের পরাগ, গাছপালা বা ঘাস থেকে নিঃসরিত পলেন নামক এলার্জিকণা, দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত ডিটারজেন্ট এবং ক্লিনজার ইত্যাদি। 

এলার্জিকণা আমাদের শরীরের সংস্পর্শে আসে মূলত চারভাবে: ত্বক, নাক ও শ্বাস নালি, চোখ ও মুখ গহবর-খাদ্যনালী। তাই এলার্জির প্রধান উপসর্গগুলো ও এসব অঙ্গগুলোকে ঘিরে আবর্তিত হয়।

এলার্জির প্রধান কিছু উপসর্গ:

সর্দি ও নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া

গুরুতর এলার্জির প্রাথমিক লক্ষণের মধ্যে একটি হলো নাকের ভেতরের ত্বক এলার্জির কারণে ফুলে যাওয়া এবং এতে সর্দি হয়ে নাক বন্ধ হওয়ার উপসর্গ তৈরি হওয়া। শ্বাসের সঙ্গে নেয়া বাতাসে যে ক্ষুদ্র এলার্জিকণা থাকে, তার প্রতিক্রিয়ায় এটা ঘটে।

অবশ্য কোনো ঔষধের প্রতিক্রিয়ায়ও এটা হয়। ঔষধ গ্রহণের এক ঘণ্টা পর যদি নাক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় তবে বুঝতে হবে, এটা এই ওষুধের প্রতিক্রিয়া। 

হাঁচি

যদিও হাঁচিকে খুব একটা বড় ব্যাপার বলে মনে হয় না। তবে এটি এলার্জির একটি প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হাঁচি দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে আরও গুরুতর উপসর্গের দিকে যেতে পারে। 

চোখে চুলকানি

বিভিন্ন মৌসুমে বিশেষত বসন্তকালে যখন বাতাসে এলার্জিকণার উপস্থিতি বেড়ে যায়, তখন নাকের মতো চোখের বহির আবরণ বা কংজানটিবায় চুলকাতে পারে বা সময়ে সময়ে অশ্রুতে ভরে যেতে পারে। বসন্তকালে বাতাসে উড়ে বেড়ানো পরাগরেণু এ সময়ের এলার্জির অন্যতম কারণ। গুরুতর এলার্জির প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে অনেক সময় চোখের চুলকানি লক্ষ্য করা যায়। 

কান বা মুখ চুলকানো

অনেক সময় নতুন কোনো খাবার খাওয়ার পরেই হঠাৎ চুলকানি হয়। চোখ ও মুখের এই চুলকানি ধীরে ধীরে গুরুতর অ্যালার্জির দিকে যেতে পারে। 

শ্বাস পরিবর্তন

হঠাৎ শ্বাসকষ্ট অথবা শ্বাস পুরোপুরি ধরে রাখতে না পারা, সবসময়ই স্বাস্থ্যের জন্য একটি খারাপ লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। গুরুতর এলার্জির কারণে এটি প্রায়ই ঘটে থাকে। 

আমবাত বা আরটিকারিয়া

ত্বকে হঠাৎ লাল চাকা ও চুলকানি হতে পারে। এটিকে ঁৎঃরপধৎরধ ও বলা হয়। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ওষুধ, রাসায়নিক, খাবার বা অন্য কিছুর প্রতি অ্যালার্জি। আমবাত সব সময় গুরুতর নাও হতে পারে, কিন্তু যদি একই সঙ্গে ফোলা ঠোঁট ফুলে যায় বা শ্বাসকষ্ট হয়, তবে এটিকে গুরুতর এলার্জির একটি সংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। 

চামড়ায় ফুসকুড়ি

চামড়ায় হঠাৎ ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এগুলোতে প্রচুর চুলকানি থাকে, কখনো এর থেকে ফোস্‌কা সৃষ্টি হয় । সাধারণত পোষা প্রাণীর খুশকি, রাসায়নিক, খাবার, ওষুধ বা মেকআপের অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়ায় এ উপসর্গ তৈরি হয়। সাধারণত এগুলো মৃদু চিকিৎসায়ই সেরে যায়। তবে কখনো কখনো এটিও গুরুতর এলার্জি বা অ্যানাফিল্যাক্সিসের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে, যা জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া

একটি নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া এবং পেটে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে এটা অনেক সময় এলার্জির সংকেত হতে পারে এবং এ উপসর্গগুলো অনেক সময় দ্রুত খারাপ হতে থাকে। এগুলোও তীব্র এলার্জি বা অ্যানাফিল্যাক্সিসের লক্ষণ, তাই এটাকে সাধারণ পেটের অসুখ হিসেবে ঝেড়ে ফেলা যাবে না।

বুক টানটান হওয়া

কখনো কখনো আপনার বুক হঠাৎ শক্ত হয়ে যায় বা শ্বাস নেয়ার সময় ব্যথা হয়। আপনার গলাও আঁটসাঁট বা সংকুচিত হতে পারে। এটি গুরুতর খাদ্য অ্যালার্জির একটি সাধারণ লক্ষণ। যখন এটি ঘটে, তখনই চিকিৎসা সহায়তা নেয়া উচিত।

জিহ্বা বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া

যদি মুখ, ঠোঁট বা জিহ্বা কোনো আপাতকারণ ছাড়াই ফুলে ওঠে, তাহলে এটি অ্যাঞ্জিওইডিমা হতে পারে। এনজিওইডিমাপিমা তীব্র অ্যালার্জির একটি অবস্থা। এটা সবসময় গুরুতর হয় না। কিন্তু যদি শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তাহলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। যদি ঠোঁট বা জিহ্বা প্রায়ই ফুলে যায়, তাহলে চিকিৎসককে অবশ্যই জানাতে হবে। 

ফ্লাশড বা লালচে স্কিন

খাবারের অ্যালার্জি মুখ এবং চোখের চারপাশে লালভাব সৃষ্টি করতে পারে। কোনো এলার্জি খাবার গ্রহণের পর বা এলার্জিক বস্তুকণার সংস্পর্শে আসার পর পরই যদি ত্বক দ্রুত ফ্লাশ বা লাল হয়ে যায়, তাহলে এর অর্থ হতে পারে অ্যালার্জি গুরুতর। দ্রুত চিকিৎসা নিন, লালভাব চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না।

হঠাৎ বিভ্রান্ত বা উদ্বিগ্ন হওয়া

অদ্ভুত শোনালেও হঠাৎ বিভ্রান্তি বা ধ্বংসের অনুভূতি হওয়া একটি গুরুতর খাদ্য অ্যালার্জির লক্ষণ। এ সময় রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে। এই লক্ষণটি লক্ষ্য করার সঙ্গে সঙ্গে অবিলম্বে চিকিৎসা সহায়তা নিন। অন্যথায় আপনার জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। 

গুরুতর অ্যালার্জি সব সময়ই স্বাস্থ্যের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যা। উন্নত বিশ্বে এ সমস্যাগুলো মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের দেশে এখনোও অপ্রতুল। মনে রাখতে হবে গুরুতর এলার্জি সবসময়ই একটি জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা এবং চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অযথা সময় ব্যয় না করে অতি দ্রুত কোনো একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত হওয়া। একজন এলার্জি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো চিকিৎসা নিয়ে এলার্জির মূল কারণগুলো খুঁজে বের করুন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের এলার্জি হলে জরুরি করণীয় বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত হোন। 

লেখক: (চর্ম, যৌন ও এলার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ) জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। চেম্বার: ১২, স্টেডিয়াম মার্কেট, সিলেট। ফোন: ০১৭১২-২৯১৮৮৭

গল্প- খসে পড়া তারার গল্প by শারমিন রহমান

------(এক)-----

একফালি ঝকঝকে আকাশের দিকে তাকিয়েই চোখ বন্ধ করে বন্যা। একসাথে এত আলো সহ্য হয় না ওর। ক্লান্তিতে হাত পা ছেড়ে দিয়ে পানির উপরে ভাসতে থাকে সে। শুধু নাকটা  জেগে আছে পানির ওপরে। চোখ বন্ধ করেই স্রোতের বেগটা বেশ বুঝতে পারছে ও। স্রোত বন্যাকে বেশ খানিকটা দুরে নিয়ে এসেছে, বুঝলেও সাঁতরে পাড়ে যাবার বিন্দু পরিমান শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই বন্যার শরীরে। তাই শরীরটাকে পানির উপরেই ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত সে এখন । একটা গাংচিল চিৎকার করতে করতে ঠিক বন্যার মাথার উপর  দিয়ে পার হয়ে গেল। ৬ বছরের সৌরভ,  বন্যার একমাত্র ভাই,  খালি পা,খালি গায়ে নদীর পাড় দিয়ে বন্যার সাথে সাথে দৌড়াচ্ছে আর কাঁদছে।”  বন্যা উঠে আয়, ও বন্যা উঠে আয়, ” শব্দগুলো কান্নার সাথে মিলেমিশে একাকার। সৌরভের ভেজা শরীর থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে। মাথার একঝাঁক ভেজা চুলের  পানি  সৌরভের চোখের নোনা পানির স্রোতটিকে হালকা করে দিচ্ছে। বন্যার কানে সৌরভের চিৎকার  অস্পষ্ট একটা গোঙানি হয়ে পৌঁছাচ্ছে। কিসের শব্দ এটা বুঝতে পারছেনা বন্যা। একদমই ভয় করছে না বন্যার। বিষয়টা বেশ উপভোগ করছে সে। ভেসে ভেসে যদি দূর কোন দেশে পৌঁছে যাওয়া যেত,স্বপ্নের কোন  দেশে। মেঘেদের মিছিলে যদি হারিয়ে যাওয়া যেত! যেখানে কেউ জানত না বন্যার বাবার পরিচয়।, বাবার নামের সাথে নিজের নামটাকে চিরতরে মুছে ফেলা যেত যদি! এমন একটা জায়গায় যদি চলে যাওয়া যেত যেখানে বন্যা শুধু নিজের পরিচয়ে বাঁচতে পারত!  তখনই সৌরভের মুখটা মনে পড়ে বন্যার। বড় বড় চোখ দুটি ছলছল করছে ,একটু সুযোগ পেলেই শুরু হবে বর্ষন। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে বন্যার, ভাইটাকে ব্ড্ড ভালোবাসে ও। মাথাটা শূণ্য  মনে হয় বন্যার হঠাৎ করেই। তারপর আর কিছুই মনে থাকে না ওর।

-------(দুই)-------

বন্যা আর সৌরভ এ গাঁয়ে আছে প্রায় এক বছর ধরে। এটা ওদের নানাবাড়ি। নানা মারা গেছে যখন বন্যার মা খুব ছোট। বন্যার মায়েরা তিন বোন। ভাই নেই। বন্যার মা সবার ছোট।  ওরা মায়ের হাত ধরে এসেছিল এ গাঁয়ে। সাথে নিয়ে এসেছিল  ধানের চাতালের পাশে ঘুপচি ঘরের ছেঁড়া পাতলা দুটি চ্যাঁ,  সবসময় ব্যবহার করা প্লেট, গ্লাসসহ বাক্সতে তুলে রাখা কাঁচের জগ, চারটি প্লেট, কয়েকটা হাতলভাঙ্গা কাপ,  পাতিল, কড়াই, নতুন বিছানার চাদর সব।  মা ধানের চাতালের লোকের কাছ থেকে পুরনো যে খাটটা কিনেছিল শুধু সেটা আনতে পারেনি। বন্যা আর সৌরভের মন খুব খারাপ হয়েছিল । পুরনো রংচটা যেমনই হোক, খাট তো।  ঘুপচিগুলোর মধ্যে শুধু ওদেরই খাট ছিল। নানিবাড়ি খাট আছে কি না সেটাই ভাবনার বিষয় ছিল দুই ভাইবোনের। মায়ের হাতের ব্যান্ডেজ তখনও খোলা হয়নি। চাতালের সবাই খুব ভালোবাসত ওদের। চিলাহাটি ট্রেন ষ্টেশন পর্যন্ত এসেছিল ওরা সবাই। জিনিসপত্র সব তুলে দিয়েছিল ট্রেনে। কুষ্টিয়া ষ্টেশনে নেমে গাড়িতে করে এসেছিল নানাবাড়ি । খুব মন খারাপ হচ্ছিল ওদের চাতালের সবার জন্য। যদিও সেই ছোটবেলা থেকে মা ধানের চাতালে কাজ করতে বের হলেই ওদের দুই ভাইবোনকে ঘুপচিতে আটকে রেখে যেত। সারাদিন ঘুপচিতে খুব কষ্ট হতো বন্যার। ছটফট করত বাইরে যাওয়ার জন্য। তারপর সৌরভ কে পাওয়ার পর থেকে ওর দেখাশোনা করতেই সময় পার হয়ে যেত। বন্যা খুব স্কুলে যেতে চাইত, আজ তার স্বপ্ন পূরণ  হতে চলেছে। মা বলেছে ওদের দুজনকেই স্কুলে ভর্তি করে দিবে।তবুও চাতালের সবার জন্য কষ্ট হচ্ছে খুব।

--------(তিন)------

সৌরভের কান্না শুনে জেলেদের  নৌকা অজ্ঞান অবস্থায় তুলে নিয়েছিল বন্যাকে।তুলে নিয়েছিল সৌরভকেও। বন্যা  সুস্থ হবার পর জেলেরা বন্যার নানাবাড়ির ঘাটে নামিয়ে দিয়ে যায় দুই ভাইবোনকে।  জেলেদের নৌকা থেকে নামতেই বন্যার চুলের ঝুঁটিটা ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে ফেলে দেয় কেউ। বন্যা নিজের চুল নানির হাতের মুঠোয় আবিষ্কার করে। শির্নকায় শরীর থেকে চ্যাঁ চ্যাঁ কন্ঠের অজস্র গালি চারপাশের পরিবেশকে ভারি করে তোলে নিমিষেই। বন্যা তার দু একটাই বুঝতে পারে।  ” হারামজাদি, তিনবেলা ভাত খাইয়া শরীলে ত্যাল জইম্যা গেছে না? আমার মাইয়্যার কষ্টের টাহার ভাত! শয়তানের বাচ্চা শয়তান! বাপ যেমন তার ঝি তেমন।তুই জাহান্নামে যাবি যা, আমার নাতিরে (সৌরভ) কুনু জাগা যদি  নেছস তাইলে তোর একদিন কি আমার একদিন”  নিজের চুলের মুঠি নানির হাত থেকে কোনরকমে ছাড়িয়ে  নিয়ে দৌঁড়াতে থাকে বন্যা। সৌরভের চোখদুটি গড়িয়ে পানি পড়তে থাকে। বন্যাকে খুব ভালোবাসে সৌরভ। আজ তো বন্যার কোন দোষ ই নেই। নদীতে বালি ভর্তি ট্রলার যাচ্ছিল, সবার দেখাদেখি সৌরভও সাঁতরে গিয়ে উঠেছিল ট্রলারে, ট্রলার থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পড়েছিল সে ও। কিন্তু তৃতীয়বারে ট্লার থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রায় ডুবে যাচ্ছিল সৌরভ। ওকে বাঁচাতে গিয়েইতো বন্যার আজ এমন অবস্থা। নানি যে কেন বন্যাকে দেখতে পারেনা বুঝে উঠতে পারেনা সৌরভ। গরম ভাত,  ডিমওয়ালা বড় বড় পুঁটি মাছ আর ডাঁটার ঝোলের সাথে লেবুর রস দিয়ে মেখে সৌরভকে খাইয়ে দিচ্ছিল নানি। সৌরভের বন্যার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল। খেতে বড্ড ভালোবাসে বন্যা! ভাত মুখের মধ্যে দিতেই কান্নাটা অস্ফুট স্বরে বের হয়ে আসতে গিয়ে আটকে যায় গলায়। দম বন্ধ হয়ে একটানা কাঁশতে থাকে সৌরভ।

------( চার)------

শিকদারদের বড় আমবাগানটা নদীর পাড় ঘেষেই। এই বাগানে অনেক রকম আমগাছ। এদের নামও মজার মজার। বাগানে একটা আমগাছ আছে যেটাতে কাঁচামিঠা আম হয়। এ গাছের আম কাঁচা থাকতেই খুব মিষ্টি তাই এর নাম কাঁচামিঠা আম। বন্যা গল্প শুনেছে শুধু,  এখনো খেতে পারেনি। গাছটা এত বড় যে বন্যা উঠতে পারে না। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই ছুটে আসে এখানে। অন্য সব গাছের আম পেলেও এখনো পায়নি কাঁচামিঠা গাছের কোন আম।

নানির হাত থেকে পালিয়ে এক দৌঁড়ে এখানে এসে থামে বন্যা। হাঁপাতে থাকে খুব। পা আর চলছেনা কিছুতেই। হাঁটু গেড়ে কাঁচামিঠা আমগাছটার নিচে বসে পড়ে বন্যা। খুব  ঘুম পাচ্ছে  তার।  গাছের গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বন্যা।জেলেদের গামছা দিয়ে মাথা আর গা  মুছে নিয়েছিল কোনরকম। ফ্রকটা এখনো ভিজে আছে। বাতাসে শুকিয়ে যাবে, ওসব নিয়ে ভাবার সময় নেই বন্যার।
ঘুমে বন্যা চোখ খুলে রাখতে পারছে না। কষ্ট হচ্ছে তাকিয়ে থাকতে।এমন সময় একটা শব্দ পেয়ে সেদিকে চোখ রাখতেই তৃপ্তির হাসি প্রসারিত হয় ওর মুখে। কাঁচামিঠা আম! বন্যার চোখের সামনে! নিমিষেই সব কষ্ট,  ক্লান্তি উধাও। যা এতদিনে আল্লাহর কাছে শুধু চেয়ে এসেছে, আজ এভাবে পাবে ভাবতেও পারেনি বন্যা। খেতে গিয়েও সৌরভের কথা ভেবে পাজামার সাথে গুঁজে রাখে আমটা। বাড়ি গিয়ে একসাথে খাবে।

মানুষের কথা কানে আসতে থাকে বন্যার, সতর্ক  হয়ে শোনার চেষ্টা করে। ক্রমশ শব্দগুলো কাছে আসতে থাকে। মির্ধা বাড়ির সেলিম মামা,  জামাল ভাই, কনিকা আর সোহেল। কনিকা ওর সাথেই পড়ে। যদিও বন্যার থেকে বয়সে ২-৩ বছরের ছোট কনিকা। বন্যা চিলাহাটি থাকতে কোন স্কুলে যেতে পারেনি তাই বয়স যাই হোক পারগতার দিক বিবেচনা করে ওকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করেছে স্যার ম্যাডামরা।
“তোমরা কি আম পাড়বা মামা?” বন্যার কথায় সেলিম হেসে  বলে, ” নারে মামা, বড় রাস্তায় যাব।”তাইলে তোমাগো হাতে বাজারের ব্যাগ আর এত বড় কোটা ক্যান মামা?””বড় রাস্তার খই গাছগুলায় সব খইগুলান পাইক্যা রইছে, আইজকাই পাড়ব। তুই যাবি আমাগো হাতে?? ”
বন্যার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠে। ওকে সেলিম মামা নিতে চাইছে সাথে, কেউ কোথাও নিতে চায় না বন্যাকে। সবাই শুধু তাড়িয়ে দেয়। এ পৃথিবীতে বন্যাই যেন শুধু অযাচিত!! ভালোবাসার লোকের বড্ড অভাব।

------(পাঁচ)------

বড় রাস্তার দুইধারে সারি সারি বাবলা গাছ। একেকটা গাছ অনেক বছরের পুরনো।  পাকা বাবলা ফলের (খই বা ডুঙ্কুর বলা হয় অঞ্চলভেদে) ঘ্রাণে বাতাসে একটা মাদকতা সৃষ্টি হয়েছে। কাচা, পাকা বাবলা ফল মিলে এক অপরুপ সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে গাছগুলো। নতুন বউ যেমন নানা অলংকারে সাজে , গাছগুলোকে দেখে ঠিক তেমন লাগছে। কাচা ফলগুলো হালকা সবুজ, পাকা ফলের কিছু গোলাপি আর কিছু লাল টুকটুকে। রাস্তার উপরে পড়ে আছে অনেক বাবলা ফল, যেগুলোর খোসা ছাড়ানো । খোসা ছাড়ানো সাদা সাদা ফলগুলোর মাথায় গোলাপি আভা, কোনটা পুরোপুরি গোলাপি। জানা অজানা নানা পাখির সমাবেশ এখানে। পাকা ফলের উপর বসে  ঠোঁকর দিচ্ছে …কোনটা খেতে পারছে কোনটা ঠোঁট থেকে পড়ে যাচ্ছে রাস্তায়। দুপুর বেলার নির্জনতা ভেঙ্গে বড় রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে দু একটা দুরপাল্লার বাস চলে যাচ্ছে। ট্রাক মোটরসাইকেল, ভ্যানও  হুইসেল বাজিয়ে  নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত চারপাশ। বন্যা মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ধন্যবাদ দেয় সেলিম মামাকে। রাস্তা থেকে পাকা বাবলা ফল কুঁড়িয়ে ওড়না ভর্তি করে ফেলেছে বন্যা। কুঁড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে মুখ ভর্তি করে খেয়ে নিচ্ছে পাকা ফল। সেলিম মামা কোমরের তাগির সাথে বাজারের ব্যাগ বেঁধে,?  হাতে লম্বা  কোটা নিয়ে তরতর করে একগাছ থেকে অন্যগাছে উঠে যাচ্ছে। নামছে ব্যাগভর্তি বাবলা নিয়ে। সবাই ভাগ করে বাবলা নিয়ে বন্যাকেও কিছু ফল দেয় ওরা। সবার সাথে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে বন্যা। কিছুদূর যেতেই জামাল ভাই  সেলিম মামাকে বলে, ” হেইদিনের টিয়্যা পাখির কতা ভুইল্যা গেছনি?  ” হ রে ভুইল্যা ই তো গেছালাম এহেবারে। ন দেহি কি অবস্তা ওইগুনার?” সেলিম মামা জিব কেটে উত্তর দেয়। টিয়্যা পাখি?” জানতে চায় বন্যা। ” হ রে  বন্যা, চল দেহি, বেশি পাইলে তোরেও এডা ছাও দিবানে।” সেলিম মামার এমন কথায় বন্যা উচ্ছাসে লাফিয়ে ওঠে। ওড়না ভর্তি বাবলা আর পাজামার কোচরে কাঁচামিঠা আম নিয়ে সেলিম মামাদের দলটিকে অনুসরন করে বন্যা।

পূর্ব দিকের কয়েকটা ক্ষেত পাড়ি দিয়ে ব্যাপারির বড় দীঘির কাছে পৌঁছায় ওরা। সন্ধ্যা নামব নামব করছে, গোধূলির লাল আলোয় চারপাশ স্বর্গের মত লাগছে । ব্যাপারিদের দীঘিটা অনেক বড়, অনেক রকম মাছের চাষ করেছে এখানে। দীঘির চারপাশ ঘিরে কলা, আম, লেবু, পেয়ারা,পেঁপে,  জামরুল গাছ। দীঘির দুইদিকে দুটো টোঙ। দিনে রাতে ব্যাপারির লোক ঐ টোঙে বসে পাহারা দেয়।দীঘির উত্তর পাশের ছোট একটা আম গাছে  গতসপ্তাহে সেলিম মামারা টিয়া পাখির বাসা দেখে গেছে। সেলিম আর জামাল গেছে টিয়া পাখির খোঁজে। বন্যা আর কনিকা দীঘির পাড়ের ঢালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কলাগাছের ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খাচ্ছে শুধু। কেউ টের পেয়ে যেতে পারে বলে কথা বলতে নিষেধ করেছে সোলিম মামা। তাইতো অন্ধকারের গায়ের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন।কতক্ষণ  দাঁড়িয়ে আছে এভাবে বলতে পারবেনা কেউ, হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা ভেঙে কানে এলো.. বন্যা পালা…! পালা….!দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বড় রাস্তায় এসে থামে ওরা।তখন গাঢ় অন্ধকার। একটা দুর পাল্লার গাড়ি দ্রুত চলে যায় ওদের পাশ দিয়ে,  সেই গাড়ির ক্ষীণ আলোতে সেলিম মামার হাতে ঝলকে উঠে টিয়া পাখির কতগুলো বাচ্চা।

------(ছয়)------

কুমার নদী থেকে একটা সরু  খাল চলে গেছে বড় রাস্তা বরাবর। বর্ষাতালে নদীতে ভরা যৌবন যখন উপচে পড়ে তখন তা নদীকে ছাপিয়ে সরু খালটিকেও যৌবনা করে দেয়। বর্ষাকাল ছাড়া বছরেরে বাকিটা সময় খালটা শুকনা থাকে  ।তখন তা মানুষের পায়ে চলা পথ হয়ে যায়।
কুমার নদী আর এই খালের মুখেই বন্যার নানাবাড়ি। গ্রামের সব বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও বন্যাদের ঘরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। হারিকেন আর ল্যাম্প ই ভরসা ওদের। মা টাকা পাঠালেই বন্যাদের ঘরে সংযোগ দেয়া হবে বিদ্যুৎ। মার পাঠানো টাকা দিয়েইতো নতুন টিনের ঘর, ঘরের পাশে টিউবওয়েল,  টয়লেট দেওয়া হয়েছে।সৌরভের স্কুলের ইউনিফর্ম, জুতা -মোজা , বন্যার স্কুলের ইউনিফর্ম সব হয়েছে। বন্যার একটা সাদা জুতা মোজা পরার খুব শখ। স্কুলের প্রায় সবাই সাদা জুতা মোজা পরে আসে। বন্যার খুব ভালো লাগে দেখতে। স্পঞ্জ পরে স্কুলে যেতে একটুএ ভালো লাগে না বন্যার। নানিকে বলেছিল একটা সাদা জুতার কথা। নানি ভাবল সৌরভকে জুতা পরতে দেখে বন্যার বুঝি হিংসে হচ্ছে!! নানি যে কেন বন্যাকে সহ্য করতে পারে না.. অনেক ভেবেও তার  কোন উত্তর মেলে না বন্যার। তার চেহারাটা অনেকটা তার বাবার মতন বলে? তাহলে তা তো সৌরভের ও। নানি সৌরভকে ভালোবাসে। এটা বুঝতে পারে বন্যা।এজন্য নানির উপর  কোন রাগ  হয়না বন্যার।
এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ির পিছনের খালের ঢাল বেয়ে বাড়িতে উঠে আসে  বন্যা। দরজা খোলা। মাটিতে মাদুর পেতে হারিকেনের আলোতে পড়ছে সৌরভ। নানি ঘরে নেই জেনেই দ্রুত ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দেয় বন্যা। বন্যাকে দেখে সৌরভের চোখদুটিতে পানি ছলছল করে ওঠে। মুখ ফিরিয়ে পড়ায় মন দেয় সৌরভ। ভাইয়ের অভিমান দেখে হেসে ফেলে বন্যা। এক এক করে সারাদিনের পাওয়া সম্পদগুলো ভাইয়ের সামনে বের করে আনে ও।  কাঁচামিঠা আম, ওড়নার টোপর ভর্তি পাকা পাকা বাবলা, আর টিয়া পাখির বাচ্চা দেখে সৌরভের   মুখ আনন্দে চকচক করতে থাকে। কিন্তু বিপত্তি  অন্য জায়গায়,  পাখি রাখা হবে কোথায়? কোন খাঁচা নেই যে ওদের কাছে। আপাতত সৌরভের জুতার বাক্সেই রাখা হবে পাখি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। পাখিসহ জুতার বাক্স ঘরের বিছানার নিচে একপাশে লুকিয়ে রাখে ওরা। বাবলা ফলগুলোও রেখে দেয়, বাক্সের উপর। কাজ শেষ করে দরজার খিলটা আলতো করে আলগা করে রাখে  ওরা।  নানি মুখ ভার করে ঘরে ঢুকে কারো সাথে কথা না বলে শুয়ে পড়ে খাটে। এমন দেখেনি নানিকে ওরা কখনো। খুব মারাত্মক কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পারছে বন্যা, কিন্তু কি ঘটেছে বুঝতে পারছে না। নানিকে জিজ্ঞেস করার মত সাহস নেই বন্যার। মাটিতে বিছানা পেতে ঘরের এককোনে শুয়ে পড়ে বন্যা।
ঘরে নতুন খাট কেনা হয়েছে মায়ের পাঠানো টাকা দিয়ে। তাতে নতুন তোষক, চাদর। বন্যা নতুন তোষক আর চাদরে মুখ ডুবিয়ে  মায়ের ঘ্রাণ নিয়েছিল। নানির সাথে দুই ভাইবোন ঘুমিয়েছিল সুখের আবেশে।  কি জানি কি কারনে বন্যা সেদিন নষ্ট করেছিল বিছানা। যা কোনদিন হয়নি, বন্যাও বুঝে উঠতে পারেনি কি থেকে যে কি হয়েছিল সেদিন!! গ্রামের প্রায় সবাইকে বলেছিল নানি সে কথা। বন্যা মনে রাখেনি সে কথা। কষ্টও পায় নি।ইচ্ছে করে  করেনি কাজটা বন্যা। শুধু নানির লাঠির বাড়ির দাগ মিশে যেতে সময় লেগেছিল কিছুদিন। বাড়ির পাশের রুনার মা মামি বলেছিল” বন্যা দৌঁড়া, পলাইয়া যা, ও বন্যা পলা শিগগীর। ” বন্যা নড়েনি একটু কোথাও। বসেছিল যতক্ষণ নানির মনের জ্বালা আর হাতের জোর শেষ না হয়। না, বন্যা কাঁদেওনি শব্দ করে। দু চোখ বেয়ে শুধু অভিমান ঝরে পড়েছিল। মজিদ নানার  বউ, যে সবসময় দু চারটা কথা শোনানোর জন্য প্রস্তুত থাকে , এসেছিল সেদিন ও। টেনে টেনে বলছিল ” আসলেই বন্যা তুই :বড় ত্যাড়া মাইয়্যাগো। পুলাপান মানুষ, নানি মারবার চাইছে দৌঁড়াইয়া সইরা যাবো – তা না। গেডির রগ ব্যাকা সবকয়ডা। এত্ত জিদ মাইয়া মাইনসের ভালো না। বন্যার নানি, তোমারেও কই এই নাতনিরে পাইল্যা তুমার কোন লাভ নাই। বাপের মাইয়্যা, স্বভাব ও বাপের নাগাল।”
নানিও সম্মতি জানিয়ে একমুখ থুথু ফেলে বলেছিল, ” কুত্তার জিদ”।এবার বন্যার অভিমানগুলো ফুসে ওঠে,  গোঙানী দিয়ে শব্দ করে ছিটকে বেরিয়ে আসে। নানির মারগুলো বন্যাকে কষ্ট দিতে না পারলেও মজিদ নানার বউয়ের কথা বন্যা সহ্য করতে পারে না। বাবাকে ঘৃণা করে বন্যা। নিজের চোখের সামনে দেখেছে মাকে কি  নির্মমভাবে মেরেছে বাবা। কেউ বাবার সাথে বন্যাক তুলনা করলে খুব কষ্ট পায় বন্যা।

------(সাত)-----
গায়ের রং কালো, চামড়া খসখসে।  চোখদুটি বেশ বড় বড়, চুল ঘাড় পর্যন্ত। অযত্নে চুলগুলো লাল হয়ে আছে, সেখানে  বাসা বেঁধেছে উকুন।
খুব বেশি  কথা বলে না বন্যা কারো সাথে।  সবসময় চুপচাপ থাকে। বড় বড় চোখ মেলে শুধু পৃথিবীর মানুষের অভিনয় দেখে আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে।মায়ের খবর পাওয়ার পর থেকে আরো চুপচাপ হয়ে বসে আছে বন্যা। সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়েছিল বন্যার মা, পারভিন। সেখানে মারাত্মক  নির্যাতনের শিকার হয়ে বন্দি এখন।  কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বেঁচে আছে না মরে গেছে তাও কেউ জানেনা। বন্যার মা যেখানে কাজ করত তার ঠিক পাশের বাড়িতে কাজ করত ইদ্রিস  মামার বোন। সে কোনরকম বেঁচে ফিরে এসে খবর দিয়েছে। .

কেটে গেছে আরো ৬ মাস। বন্যা জামা কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে বের হচ্ছে। খুব সুন্দর একজন মহিলার সাথে কথা বলছে বন্যার নানি। “কোন চিন্তা করবেন না, বন্যা আমার নিজের মেয়ের মতই থাকবে।  ভারি কোন কাজ করাবো না ওকে দিয়ে, বেতন টা পাঠিয়ে দেব  আপনার কাছে। আমার মেয়ে যা খাবে বন্যা ও তাই খাবে।” বন্যার নানি খুব খুশি। বন্যা ওখানে শান্ত হয়ে থাকলে ভালো। ঢাকায় নিজের বাড়ি মহিলার। বন্যা খেয়ে পরে ভালো থাকবে। বন্যার টিয়া পাখির বাচ্চা উড়তে শিখেছিল, খাঁচাও এনে দিয়েছিল বন্যা। আজ বন্দি জীবনের সূচনালগ্নে এই বন্দিকে তাই খাঁচা থেকে মুক্তি দিয়ে দিল বন্যা।

Saturday, May 13, 2023

টাক মাথার যত্ন by অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল হাই

গড়পড়তা সত্তরভাগ মানুষই জীবনের কোনো না কোনো বাঁকে এসে মাথায় টাকের সম্মুখীন হন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে মোট পুরুষের ৩৯ ভাগই মাথায় বিভিন্ন পর্যায়ের টাক সমস্যায় ভুগছেন। এই যে বিশাল এক জনগোষ্ঠী, যাদের মাথায় টাক রয়েছে, তাদেরও টাক মাথার যত্নের প্রয়োজন রয়েছে। চুলের যত্নে অথবা চুল গজানোর জন্য হাজারো রকম গবেষণা, উপকরণ থাকলেও টাক মাথার পরিচর্যায় তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এখনো টাক মাথার মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিদ্রুপের সম্মুখীন হন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের এক উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাথায় টাকের কারণে আত্মবিশ্বাসের অভাব অথবা বিষাদে ভুগছেন ।

টাক পড়ার কারণ:
টাক পড়ার পিছনের কারণ মূলত হরমোন ও জেনেটিক। জেনেটিক কারণেই অ্যান্ড্রোজেন হরমোন চুলের গোড়া বা ফলিকলের প্রতি অতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে চুল পড়ার কারণ ঘটায়। সাধারণত মাথার মধ্যাঞ্চল আক্রান্ত হয়। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, মাথার ওই অংশের চুল না থাকার অর্থ এই নয় যে, ত্বকের গভীরে চুলের ফলিকল এবং সংশ্লিষ্ট তেলগ্রন্থিগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আসলে টাক মাথায় চুলের ফলিকল ও তেলগ্রন্থি সংকুচিত অবস্থায় টিকে থাকে।
এছাড়াও মাথায় রয়েছে অযুত সহস্র ঘর্মগ্রন্থি। মাথায় পরিমিত পরিমাণ চুল থাকলে এ গ্রন্থিগুলোর নিঃসরণ মাথার ত্বক হয়ে চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে চুলের মধ্যে এক ধরনের কোমলতা ও উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মাথায় টাক পড়ে গেলে নিঃসৃত সেবাম ও ঘাম মাথার ত্বকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মাথার ত্বক অতিরিক্ত তেলতেলে হয়ে যায়। কারো কারো মাথার ত্বকে এক ধরনের চকচকে ভাব চলে আসে।

কীভাবে মাথার ত্বকের যত্ন নেবেন:
প্রথমত: মাথা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। অনেকেই চুল পড়ে যাওয়ার পর আর শ্যাম্পু ব্যবহার করেন না, যেনতেন প্রকৃতির ক্লিঞ্জার দিয়ে মাথা পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। এটা মোটেই উচিত নয়। ভালো মানের শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে এবং নিয়মিত ভাবে করতে হবে। একনাগাড়ে কয়েকদিন শ্যাম্পু না করলে  তেলগ্রন্থি নিঃসৃত সেবাম এবং ত্বকের মরা কোষ মিলেমিশে মাথায় এক ধরনের আস্তরণের সৃষ্টি করে। এথেকে প্রায়ই মাথায় মেলাসেজিয়া নামক ইস্ট বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণ হয়। এর ফলে মাথায় প্রদাহ ও খুশকির উদ্ভব ঘটে।
দ্বিতীয়ত: ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। শীতকালে মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ভালো মানের একটি ময়েশ্চারাইজের ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিছু কিছু ধরনের ময়েশ্চারাইজের বা তেল রয়েছে, যা একদিকে ত্বককে যেমন আর্দ্র রাখে অন্যদিকে ঠিক তেমনি মাথার ত্বকের চকচকে ভাবকে কমিয়ে আনে। এগুলোকে ম্যটিফাইং ময়েশ্চারাইজার বলা হয় এবং টাক মাথার জন্য এগুলো যথেষ্ট মানানসই।
তৃতীয়ত: মাথার ত্বকের নিরাপত্তা দিতে হবে। সূর্যের আলোর নিচে চলাফেরার সময় মাথায় একটি হেট বা টুপি পরা বাঞ্ছনীয়। এতে করে ফর্সা লোকেরা চর্ম ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে পারেন। আবার গরমে অনেকেরই অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা হয়। এক্ষেত্রে একটি রুমাল বা টিস্যু দিয়ে ঘন ঘন মাথা মুছে ফেলা উচিত। স্যাবরিক ডার্মাটাইটিস ত্বকের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। উপযুক্ত পরিচর্যা না হলে টাক মাথায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে ত্বকে অতিরিক্ত খুশকি, ফুঁসকুড়ি দেখা যায়। এ ছাড়াও মাথায় অতিরিক্ত চুলকানি পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই একজন ভালো মানের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
টাক মাথার মানুষের জন্য কিছু অনুপ্রেরণা:
*গবেষণায় দেখা গেছে অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, টাক মাথার মানুষরা অনেক বেশি জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান।
** অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, টাক মাথার মানুষেরা শক্তিশালী, পেশিবহুল এবং প্রভাবশালী হয়ে থাকেন।
*** তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী তথ্য হলো: ৮২% মহিলা মনে করেন, টাক মাথার মানুষেরা অধিক আকর্ষণীয়।
লেখক: (চর্ম, যৌন ও এলার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ) জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। চেম্বার: ১২, স্টেডিয়াম মার্কেট, সিলেট। ফোন: ০১৭১২-২৯১৮৮৭


Friday, May 12, 2023

কোলন ক্যান্সার হলে by ডা. মোহাম্মদ তানভীর জালাল

শুরুতেই কোলন ক্যান্সার নির্ণয় করা গেলে এবং সঠিক ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে   ভালো হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সাধারণত বয়স ৫০ পেরুলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তবে বিভিন্ন কারণে  ইদানীং অল্প বয়সে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কারণসমূহ
দেখা যায় কতিপয় কারণ ছাড়াও পরিবেশ ও জিনগত কারণে কোলন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা পাঁচ ভাগ বৃদ্ধি পায়। খাদ্যাভ্যাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অতিরিক্ত গরু বা ছাগলের মাংস বা লাল মাংস খাওয়া,  খাদ্যাভ্যাসে আঁশজাতীয় খাবারের ঘাটতি, ধূমপান ও মদ্যপান এই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা  বেশি। এছাড়া স্থূলকায় ব্যক্তিদের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে ব্যায়াম  ও রুটিন মাফিক নিয়ম মেনে চলা ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন  এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমায়। বৃহদন্ত্র ও মলাশয় ক্যান্সার বা কোলন ক্যান্সার পারিবারিক ইতিহাস রোগটির সম্ভাবনা বাড়ায়। বিশেষ করে মা-বাবা, ভাই কিংবা বোনের বৃহদন্ত্র ও মলাশয় ক্যান্সার হওয়ার ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়ে। এছাড়া অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগীদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
লক্ষণসমূহ
সহজেই কোলন ক্যান্সার  নির্ণয়  করা যায় না।
কেননা প্রথমদিকে রোগটির তেমন কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। কোলন বা মলাশয়ের কোন জায়গায় ক্যান্সার রয়েছে তার উপর ভিত্তি করে উপসর্গের বিভিন্নতা দেখা যায়। পায়খানার সঙ্গে রক্ত কিংবা পেটে ব্যথা নিয়ে অধিকাংশ রোগী প্রথম চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তন (কখনও ডায়রিয়া, কখনও কষা),  রক্তশূন্যতা (দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট) ইত্যাদি রোগটির প্রাথমিক লক্ষণ। অবস্থা গুরুতর হলে- অতিরিক্ত ওজনশূন্যতা, পেটে চাকা, পেটে পানি, কাশির সঙ্গে রক্ত ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসেন।
দুর্ভাগ্যবশত আমরা রোগীদের রোগটির ৩ গ্রেডে বা অতিমাত্রায় অগ্রসর অবস্থায় পাই যাদের অধিকাংশই অপ-চিকিৎসার শিকার বা  রোগটিকে জটিল করে এসেছেন।
রোগ নির্ণয় বা শনাক্ত করার পদ্ধতি
চিকিৎসক লক্ষণ বা উপসর্গ দেখে বা রোগীর কেস স্টাডি দেখে কোলন্সকোপি ও বায়োপসি  করে থাকেন। বায়োপসি’র মাধ্যমে ক্যান্সার নির্ণয়ের পর সিটি স্ক্যান, রক্তে এন্টিজেন (ঈঊঅ) এর পরিমাণ ইত্যাদি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সারের ধাপ নির্ণয় করা হয় বা রোগটি কোন গ্রেডে আছে তা জানা হয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ধাপ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক ধাপের (ঝঃধমব ও ্ ওও) ক্যান্সারগুলোর চিকিৎসা পরবর্তী ফলাফল সন্তোষজনক, পক্ষান্তরে অগ্রসর ধাপের (ঝঃধমব ওওও ্ ওঠ) ক্যান্সারগুলোর চিকিৎসা পরবর্তী ফলাফল আশাপ্রদ নয়। ক্যান্সার কোলনের বাইরে ছড়িয়ে গেলে (লসিকাগ্রন্থি, যকৃত, ফুসফুস ইত্যাদি) তাকে অগ্রসর ধাপ বলে বিবেচনা করা হয়। তবে আশার কথা এই যে, অন্যান্য ক্যান্সারের চেয়ে কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসা পরবর্তী ফলাফল অনেক ভালো। এমনকি অগ্রসর ধাপের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীও সঠিক চিকিৎসা পেলে বহুদিন সন্তোষজনক ভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।
চিকিৎসা
কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসা অপারেশন। অপারেশনের আগে বা পরে কেমোথেরাপি দেয়া হয়।
প্রতিরোধ
একটি বিষয়  গুরুত্বপূর্ণ  হলো ক্যান্সার  জটিল  রোগ হলেও এর উপযুক্ত চিকিৎসা রয়েছে। রোগীদের সচেতনতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিনা অপারেশনের কথা বলে অপচিকিৎসা,  হাকিম, কবিরাজ, ঝাড়-ফুঁকের ও চটকদার প্রচারের ফাঁদে পড়ে  রোগীদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। আশার কথা হলোÑ বর্তমানে বাংলাদেশে  এই ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা হচ্ছে। শুরুতে আমার কাছে চিকিৎসা নিয়ে অনেক রোগী ভালো  আছে। যদি সচেতন হোন তাহলে    রোগটিকে প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয়ে সাহায্য করবে। ক্যান্সারে একটি বহুল প্রচলিত কথা হলো “শুরুতে রোগ নির্ণয়  ও প্রথম দিকে ধরতে পারলে ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগও সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব।”
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ কোলোরেক্টাল, ল্যাপারোস্কপিক ও জেনারেল সার্জন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
চেম্বার: ১৯ গ্রীন রোড, একে কমপ্লেক্স, লিফ্ট-৪, ঢাকা। যোগাযোগ: ০১৭১২-৯৬৫০০৯


হজে ঐতিহাসিক স্থান দেখা by ড. মোজাফফর হোসেন

পবিত্র কুরআনকে তিন ভাগে ভাগ করলে দেখা যায় একাংশে রয়েছে ইসলামী আইন বা বিধিবিধান। একাংশে রয়েছে মানুষের জন্য উপদেশ ও দৃষ্টান্ত। আর একাংশে রয়েছে বিগত জাতিগুলোর মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা বা ইতিহাস। পবিত্র কুরআন শরিফে বর্ণিত ইতিহাস অকাট্য ও পরিষ্কার স্পষ্ট; সেই সাথে এই ইতিহাসের রয়েছে নানাবিধ গুরুত্ব ও তাৎপর্য। পবিত্র কুরআন শরিফে বর্ণিত ইতিহাসকে স্মরণে রাখার জন্যই আল্লাহ নাজিল করেছেন হজের বিধান। হজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি সকল মানুষকে হজের জন্য আহ্বান করুন; তারা দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে ও উটে চড়ে আসবে যাতে তারা কল্যাণ দেখতে পায়, যা তাদের জন্য এখানে রাখা হয়েছে এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনে তারা ওই পশুদের উপর আল্লাহর নাম নেয়, যা তিনি তাদের দিয়েছেন। তা থেকে তারা যেন নিজেরাও খায় এবং অভাবী লোকদেরও খাওয়ায়।’ (সূরা হজ : ২৭-২৮)

হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাতের কাজগুলো মক্কাতেই সম্পন্ন করতে হয়। মক্কার ১৫-২০ কি.মি. এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের সেসব স্থান। ইসলামের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির অধিকাংশই আবর্তিত হয়েছে মক্কা-মদিনাসহ আশপাশের স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ হজরত আদম আ: থেকে শুরু করে হজরত মুহাম্মদ সা: অবধি সব নবী-রাসূলের জীবনে সঙ্ঘটিত ঘটনাবলির চারণভূমিই ছিল আরব ভূমি। মুহাম্মদ সা:-এর জীবনে সঙ্ঘটিত যাবতীয় ঘটনার স্মৃতিও বুকে ধারণ করে রেখেছে এই আরব ভূমি। কাজেই ইসলামের ইতিহাসের আধার হিসেবে আরব ভূমির গুরুত্ব বর্ণনাতীত। সে কারণেই কুরআনের ইতিহাসসংশ্লিষ্ট স্থানগুলো সরেজমিন অবলোকন করা যায় পবিত্র হজব্রত পালনের মাধ্যমে। হজরত আদম আ:, হজরত ইসমাইল আ:, হজরত হাজেরা আ:-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো পরিদর্শন করার নির্দেশ হজের মধ্যে রয়েছে।
উম্মতে মুহাম্মদির জন্য ৬৩১ সালে নবম হিজরিতে হজের বিধান ফরজ হয়। পরের বছরে ৬৩২ সালে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সাথে করে পবিত্র হজ আদায় করেন। মুহাম্মদ সা: যেখানে, যে সময়ে, যে তারিখে, যে নিয়মে যেসব আহকাম-আরকান পালন করেছিলেন সেসব স্থানে একই নিয়মে এখনও ৮ থেকে ১৩ জিলহজ পবিত্র হজ পালিত হয়ে থাকে।

হজের জন্য নির্ধারিত অন্যতম স্থান হচ্ছে মক্কা শরিফ। এখানে বায়তুল্লাহ অবস্থিত। এটি মুসলমানদের কিবলা, যা আল্লাহ তায়ালার এক অপূর্ব সৃষ্টি। হজ ও ওমরার সময় মুসলমানগণ কাবাঘর তাওয়াফ করতে মক্কায় আগমন করেন। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে মক্কা নগরীর অবস্থান হওয়ায় আল্লাহ তায়ালা ‘বায়তুল্লাহ’ বা ‘কাবাঘর’ মক্কাতেই স্থাপন করেন।

পবিত্র এই ঘরটির সাথে হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল আ:-এর ইতিহাস জড়িত। এই ঘরটি তাওয়াফের মাধ্যমে স্মরণ করা যেতে পারে হজরত ইব্রাহিম আ: নবী হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট। স্মরণ করা যেতে পারে হজরত নূহ আ:-এর প্লাবন শেষে ইব্রাহিম আ: ও তার একমাত্র পুত্র ইসমাইল আ: মিলে কাবাঘর সংস্কার করেছিলেন সেসব কথা। এই পবিত্র ঘরটি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিলেন দক্ষিণ আরবের বাদশা আবরাহা। তিনি হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করলে আল্লাহ আসমান থেকে আবাবিল নামক পাখি পাঠিয়ে বাদশা আবরাহা বাহিনীকে শায়েস্তা করেছিলেন। কাবাঘর ধ্বংসের সেই ষড়যন্ত্রের কথা পবিত্র কুরআনের সূরা ফিলে বার্ণিত হয়েছে। কাবাঘরের সামনে দাঁড়ালে সেসব ইতিহাসের কথা সহসাই মনের ভেতর ভেসে উঠতে পারে।
কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্বকোণে মাতাফ (তাওয়াফের জায়গা) থেকে দেড় মিটার উপরে লাগানো ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা কালো পাথর; যা প্রাগৈতিহাসিক ইসলামী নিদর্শন ও বহু মূল্যবান বরকতময় বেহেশতের উপকরণ। কাবাগৃহের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে প্রায় দেড় মিটার উঁচু দেয়ালের কিছুটা ভেতরে প্রোথিত কালো থালার মতো গোল এ পাথরের নাম হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর। এই পাথরটি বেহেশতি পাথর হিসেবেও পরিচিত। পাথরটি প্রথমে সাদা ছিল। মানুষের চুম্বন ও গোনাহ আকর্ষণ হেতু ক্রমে পাথরটি কালো হয়ে গেছে। পাথরটির চার পাশে রূপার বৃত্ত লাগানো। রূহের জগতে এই পাথরের উপরে হাত রেখে হুজুর সা:-এর রূহ মোবারককে ‘আমরা আল্লাহর বান্দা ও আল্লাহ আমাদের প্রভু’ এই প্রতিশ্রুতি পাঠ করিয়েছিলেন। হজরত আদম আ: পৃথিবীতে আসার সময় আল্লাহ পাক সেই পাথর তার সাথে দিয়ে দেন, পরে তিনি সেটা জাবালে আবু কোবাইসে রাখেন। তখনো সে পাথর বরফের মতো সাদা ও সূর্যের মতো আলোকিত ছিল। নূহ আ:-এর বন্যার সময় আল্লাহ পাক এটি পুনরায় আসমানে উঠিয়ে নেন। হজরত ইব্রাহিম আ:-এর দ্বারা কাবা ঘর তৈরির সময় আবার তা ফেরেশতার মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং ইব্রাহিম আ: সেই পাথরকে আল্লাহর ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে স্থাপন করেন। এখান থেকেই বায়তুল্লাহ তাওয়াফ শুরু করা হয়। হাদিস শরিফে আছে, হাজরে আসওয়াদ প্রথম আবু কুবাইস পাহাড়ে নাজিল হয়, সেখানে তা ৪০ বছর পর্যন্ত থাকে। তারপর তা হজরত ইব্রাহিম আ:-এর আগেই কাবার ভিত্তির ওপর লাগানো হয়। অর্থাৎ মাকামে ইব্রাহিম ও হাজরে আসওয়াদ এই পাথর দু’টিই বেহেশতের পাথর।
ইতিহাসের আরো একটি নিদর্শন মাকামে ইবরাহিম। কাবা শরিফের পাশেই আছে ক্রিস্টালের একটা বাক্স, চার দিকে লোহার বেষ্টনী। ভেতরে বর্গাকৃতির একটি পাথর। পাথরটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান, প্রায় .৫ মিটার। এ পাথরটিই মাকামে ইবরাহিম। ‘মাকাম’ শব্দের অর্থ হচ্ছেÑ দাঁড়ানোর স্থান অর্থাৎ হজরত ইবরাহিম আ:-এর দাঁড়ানোর স্থান। এ পাথরে দাঁড়িয়ে তিনি কাবা শরিফ নির্মাণ করেন। কাবা শরিফ থেকে মাকামে ইবরাহিমের দূরত্ব হচ্ছে ১৩.৫ মিটার। মাকামে ইবরাহিম অর্থাৎ আল্লাহর ঘরের দরজার সামনে হজরত আদম আ: নামাজ পড়েছেন এবং তার পাশেই হজরত জিবরাইল আ: নামাজ পড়ে নবী করিম সা:-কে নামাজের প্রথম সময় ও শেষ সময় এবং নামাজের তরিকা সম্বন্ধে ধারণা দিয়েছেন। এজন্য এই জায়গাটাকে মুসল্লায়ে আদম বা মুসল্লায়ে জিবরাইল বলা হয়। হজের মাধ্যমে হাজরে আসওয়াদের সেই ইতিহাসকেও স্মরণ করা যেতে পারে।

আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের অন্যতম ফরজ। আরাফাতে অবস্থান করাকে এমনি এমনি ফরজ করা হয়নি। এখানে যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে তা প্রসিদ্ধ। প্রথম মানব হজরত আদম আ: ও মাতা হজরত হাওয়া আ:-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থান হচ্ছে আরাফাতের ময়দান। এখানেই আদম আ:-এর সাথে হাওয়া আ:-এর প্রথম পরিচয় হয়েছিল। মহানবী সা: পৃথিবীর মানুষকে উদ্দেশ করে জীবনের শেষ ভাষণটি এখানেই দিয়েছিলেন। মক্কা থেকে ১৫ কিলোমিটার নিকটবর্তী সুবিশাল আরাফাতের ময়দান সেই ইতিহাসের বাস্তব সাক্ষী।

হযরত ইসমাইল আ:-কে নবী হজরত ইব্রাহিম আ: যে স্থানে কোরবানি করার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন সেই ঐতিহাসিক স্থানের নামই মিনা। আর হজরত আদম আ: ও বিবি হাওয়া আ: যে স্থানে প্রথম বাসর উদযাপন করেছিলেন সেই স্থানটিই মুজদালিফা। মক্কা থেকে আরাফাতের পথে রয়েছে ইতিহাসের অনেক চিহ্ন। এসব চিহ্ন হজ পালনকারীদের অতীতে নবী-রাসূলদের যুগে ফিরে নিয়ে যেতে পারে। কাবাগৃহের দ্বারপ্রান্তে মক্কা শরিফে অবস্থিত ‘জমজম কূপ’ আল্লাহর অসীম কুদরতের একটি অপূর্ব নিদর্শন। আরবদের কাছে জমজম শব্দের অর্থ প্রাচুর্য ও জমা হওয়া। পৃথিবীতে যত আশ্চর্যজনক সৃষ্টি রয়েছে, জমজম কূপ তার মধ্যে অন্যতম। জমজমের পানি কখনো নিঃশেষ হয় না, যা অতি পবিত্র ও উপকারী। নবজাত শিশু হজরত ইসমাইল আ:-এর পিপাসা নিবারণের জন্যই স্বর্গীয় আবে শেফা, আবে রহমত ও বরকতময় জমজম পানির উৎপত্তি হয়েছিল। রহমতে জমজম সেই ইতিহাসকেও স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।

ঐতিহাসিক মর্যাদায় সমৃদ্ধ ‘গারে হেরা’ মক্কার সবচেয়ে বড় এবং উঁচু পাহাড়। ইতিহাস বলছে এখানে নবী করিম সা: ধ্যানমগ্ন থাকতেন এবং এখানেই সর্বপ্রথম তাঁর কাছে অহি (প্রত্যাদেশ) নাজিল হয়। প্রথম কুরআন নাজিলের স্থান হিসেবে হেরাগুহার মর্যাদা অনন্য। হজের মাধ্যমে এই ইতিহাসকেও জানা যেতে পারে। মসজিদুল হারামের পশ্চিমে অবস্থিত গারে সাওর। হিজরতের সময় এই প্রকাণ্ড সুউচ্চ পাহাড়ে হজরত রাসূলুল্লাহ সা: আবু বকর রা:-কে সাথে করে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে ইসলামের প্রারম্ভিক অবস্থাকে অনুমান করা সম্ভব হতে পারে। বলা বাহুল্য, মুসলমানদের জন্য পবিত্র ভূমি মক্কা-মদিনার যে স্থানে যে যে কার্যাবলি সম্পন্ন করা হয়ে থাকে সেসব নিদর্শনের প্রত্যেকটিরই একেকটি অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও ইতিহাস রয়েছে। সেই সব ইতিহাস ও ঐতিহাসিক স্থানের পরিচয়-পরিচর্যা মুসলিমদের পথ চলাকে সহজ করতে পারে।
>>>লেখক : গবেষক

গল্প- এলগরিদম by আসিফ রুমি

------।১।------
দুই হাজার দুইশো পঞ্চাশ সাল । উন্মুক্ত তথ্যের যুগ । তথ্য আদান প্রদানে বিনিময় নেওয়া নিষিদ্ধ । শাস্তিযোগ্য অপরাধ । আগেকার পৃথিবীতে নাকি তথ্য যোগাযোগে বিনিময় নেয়া হতো । ভাবতেই কেমন জানি হাস্যকর লাগে রনির । রনি এখন শুয়ে আছে দুই হাজার তলা স্কাই ডোমের একটা খোপে । বাইরে তাকিয়ে দেখছে স্বচ্ছ দিগন্ত । এটিও বিনামূল্যের খোপ । এতো উঁচু থেকে নিচে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে খুব বিশাল মনে হতে থাকে । খুব ভালো লাগে । প্রতিদিন এই সময়টাতে এসে সে তাকিয়ে থাকে নিচের পৃথিবীর দিকে । কেন্দ্রীয় এলগরিদম তাকে জানিয়েছে , এই সময়টাতে ,এভাবে বসে থাকতে তার ভালো লাগে । খুব ভালো লাগে । মাঝেমাঝে আশ্চর্য লাগে তার । কেন্দ্রীয় এলগরিদম বোধহয় তাকে তারচেয়ে ও ভালো জানে । প্রাচীন এক দাঁড়িওয়ালা দার্শনিকের একটা কথা মনে পরে যায় । নিজেকে জানো । আসলেই সে নিজেকে কতটা জানে ? যতটুকু জানে ,তারচেয়ে ও কী বেশী জানে না তাকে কেন্দ্রীয় এলগরিদম ? না , কেউ তাকে জোর করে দেখছেনা । রাষ্ট্র তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে না ।খবরদারী করছে না । তুলে নিয়ে যাচ্ছেনা । সে এবং পৃথিবীতে বেঁচে থাকা এক ট্রিলিয়ন মানুষ , নিজেরাই নিজেদের  স্বেচ্ছায় তুলে দিয়েছে কেন্দ্রীয় এলগরিদমের হাতে । সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আর উষ্ণতার আশায় । মূল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তার শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা কেন্দ্রীয় এলগরিদমের সাথে যুক্ত । তার প্রতিটি হৃদস্পন্দন , ডিএনএর জিনোম সিকোয়েন্স কেন্দ্রীয় এলগরিদম জানে । তার ভালো লাগা ,মন্দ লাগা ,কোন রমনীকে দেখলে ডোপামিন বেশি ঝরে ,কোন খাবারের চিন্তায় জিহ্বায় টায়ালিন আসে ,সব কেন্দ্রীয় এলগরিদম জানে । সে , পৃথিবীর অন্য ট্রিলিয়ন মানুষ স্বেচ্ছায় কেন্দ্রীয় এলগরিদম এর সাথে যুক্ত । তাই এখানে কাওকে দায়ী করার ও কিছু নেই । তারা মুক্ত পৃথিবীর মুক্ত মানুষ । রনির অসহ্য লাগে । সে কী চাইলেই পারবে এই স্কাইডোম থেকে লাফিয়ে নিজেকে শেষ করে দিতে ? যেভাবে প্রাচীন কালের মানুষেরা লাফিয়ে পরতো নিজেকে শেষ করে দিতে । সে কী পারবে ইচ্ছে হলেই ? কেন্দ্রীয় এলগরিদম টের পেয়ে গেছে বোধহয় । রনির মস্তিস্কে নিউরাল নেটওয়ার্কে ভেসে আসতে থাকে জীবনের নানাবিধ বিজ্ঞাপন । পাশে কোথাও ধোঁয়া ওঠা প্রাকৃতিক খাবার , কোথায় কৃষ্ণ চুলের রমনী জানাচ্ছে প্রেমের আহবান , হৃষ্টপুষ্ট সুস্থ জিনের শিশু রনির মস্তিস্ক প্লাবিত করতে থাকে । একধরনের শূন্যতা ,এক প্রকারের হাহাকার রনির মস্তিস্কের হতাশ অংশটুকুকে সক্রিয় করে তোলে। কেন্দ্রীয় এলগরিদম বুঝতে পেরে, রনির দেহে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়িয়ে দেয় । ডোপামিনের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয় । বাইরের পৃথিবীর নানা রকম ইতিবাচক খবরে প্লাবিত হতে থাকে রনির মস্তিস্ক । স্কাইডোমের বাইরে স্বচ্ছ আকাশ তাকিয়ে থাকে । নিচে সমুদ্রের নীল জলরাশির মেঘ । সূর্যের আবছা কিরণে সোনালী রেখা স্কাইডোমের চকচকে গায়ে প্রতিফলিত হয়ে রনির স্নায়ুকোষে অভূতপূর্ব আলোড়ন তৈরি করে । মায়ার ঝড় ওঠে রনির বুকে । বেঁচে থাকার আকুতি বাড়ে । দ্বিধান্বিত পায়ে স্কাইডোম থেকে ঝাঁপ দেয়ার ঠিক আগে, রনি বুঝতে পারে, এতোক্ষণ সে যেসব মায়াবী দৃশ্যে দেখেছে, সব আসলে কেন্দ্রীয় এলগরিদমের কারসাজি । যাতে রনির বুকের ভেতর বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে জাগে । রনির মনটা বিষিয়ে ওঠে ঘৃণায় । কিন্তু ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে । রনির মস্তিস্ক কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে। রনির স্বেচ্ছামৃত্যু কল্পনা বাস্তবায়িত হতে ব্যর্থ হয় ।

------।২।------
বিশ্ব কেন্দ্রীয় বিচারালয়ে খুব আলোড়ন চলছে । শীতল কক্ষে ছড়াচ্ছে উষ্ণতার আমেজ । সবাই অধির আগ্রহে আদালতের কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় । বিচারক প্রবেশ করেন । প্রাচীন রীতিতে সবাই দাঁড়িয়ে পড়েন । আসলে এই বিশাল কক্ষে কেউ নেই ।সবাই যার যার স্কাইডোম খোপে অবস্থান করছে। এখানে যারা আছে তারা তাদের ত্রিমাত্রিক প্রতিচিত্র । অবশ্য কথাবার্তা চিন্তা চেতনা সব সত্যিকারের এবং উপস্থিত থাকা প্রতিচিত্রের মালিকদের । রনির প্রতিচিত্রটি শান্ত ধীরস্থির ভঙ্গীতে বসে আছে । আদালত কক্ষটি ত্রিমাত্রিক ,গোলাকার একটি পৃথিবীর মতন । ক্ষণে ক্ষণে এখানে দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে ।কিছুক্ষণ মনে হতে থাকে সবাই স্নিগ্ধ ঘাসের উপর বসে । পাশে একটা লেক । আকাশটা ধূসর মেঘে ছাওয়া ।কখনো মনে হতে থাকে তীব্র তুষার ।ঠান্ডা কোন শ্বেত ভালুক হাঁটছে পাশে । যদিও কৃত্রিম ,তবু বাস্তব বলে ভুল হতে থাকে । আসলে আদালত কক্ষে একটা প্রাকৃতিক আরামদায়ক ভাব আনার জন্য এই ব্যবস্থা । বিচারকের ইশারায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হলো । গুঞ্জনের মধ্যে দিয়ে সব শব্দ একসময় থেমে গেলো । একটা নির্লিপ্ত কণ্ঠ শোনা গেলো।” মাননীয় বিচারক , আর্থ স্টেট কোডের বিশ হাজার চুরাশি ধারা মোতাবেক রনি আহমেদ স্বেচ্ছা মৃত্যুর আবেদন জানাচ্ছেন । কারণ হিসেবে গভীর বিষাদ ও হীনমন্যতা বোধ এবং আরো বিস্তারিত বিষয় আপনার রেকর্ডে জমা দেয়া হয়েছে ।’ বিচারক শান্তভাবে শুনলেন । তারপর একঘেয়ে আইনী কথাবার্তা শুরু হয়ে গেলো । এই আবেদন এই আদালতে টিকবে কী টিকবে না তার শুনানী । জানা গেলো গত এক শতাব্দীতে এই ধরণের আবেদন , যার ইউথেনেশিয়া নামে চটকদার একটা নাম আছে ,সেই ধরণের আবেদন আর জমা পড়েনি । যাই হোক , বিচারক কিংবা তার হলোগ্রাফিক ইমেজ রনির দিকে তাকালো । তার কিছু বলার থাকলে সংক্ষেপে বলার অনুরোধ করা হলো । রনি বিচার কক্ষের মাঝামাঝি এসে , তার নির্ধারিত জায়গায় দাঁড়ালো । সবার কিংবা হলোগ্রাফিক চোখগুলোর দৃষ্টি তার দিকে । রনি একটু হাসার চেষ্টা করলো । কিন্তু পরিবেশ কিংবা অবস্থার প্রেক্ষিত যে কারনেই হোক ,সেই হাসি খুব বেশী বিস্তৃত হলো না । পুরো কক্ষটা একটা নরম আলোতে ভরে গেলো। রনি বুঝতে পারলো , তার স্নায়বিক অবস্থা বুঝেই কেন্দ্রীয় এলগরিদম এই কক্ষে নরম আলো সরবরাহ করেছে । রনি বিচারকের হলোগ্রাম ইমেজের দিকে তাকিয়ে তার বয়ান শুরু করে । – প্রাচীন গ্রীসে একজন দার্শনিক ছিলেন ,ডায়োজিনিস । তিনি একটি পিপের ভেতরে বাস করতেন । অথচ তিনি ছিলেন সন্তুষ্ট । একবার পরাক্রমশালী সম্রাট আলেকজান্ডার তার কাছে এলেন , তার যে কোন একটি ইচ্ছে পূরণ করতে । তখন ডায়োজেনেস রেগে গিয়ে তাকে উত্তর দিলেন , তুমি আমার গায়ের উপর পরা সূর্যের আলো আটকে দাঁড়িয়ে আছো । তাই আমি চাই তুমি সরে দাঁড়াও , আর আমার গায়ে আলো পড়তে দাও । এই গল্প বলার একটাই উদ্দেশ্য , সেটা হচ্ছে ,বর্তমানে কেন্দ্রীয় এলগরিদম প্রতাপশালী সম্রাট আলেকজান্ডারের ভূমিকা পালন করছে । এটি আমাদের সর্ব চাহিদা পূরণ করছে আমরা চাইবার আগেই কিন্তু কেড়ে নিচ্ছে গল্পের বলা সূর্যালোকের মতন আমাদের নিজেদের ইচ্ছেশক্তি । আমাদের নিজেদের বলতে কিছু নেই আর । কেন্দ্রীয় এলগরিদম সরাসরি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে না বটে ,কিন্তু আমাদের ইচ্ছে , মতামত , চাহিদাকে প্রভাবিত করছে প্রতিনিয়ত । মহান দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন নিজেকে জানো । যেখানে নিজের বলতেই কিছু থাকছে না ,সেখানে নিজেকে জানবো কিভাবে ? সর্বোপরি আমি চাই , আমার জীবনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ যেন আমি নিজে নিতে পারি । আমার সিদ্ধান্ত যেন আমি নিজে নিতে পারি । বাঙালি কবি বাউল লালনের মতন সেই অধরা মানুষকে নিজের মধ্যে ধরতে চাই । কোন কৃত্রিম এলগরিদম বা কম্পিউটার প্রোগ্রাম যাতে আমার সিদ্ধান্ত নেয়ায় , আমার নিজের সত্তার উপর নিজের নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করতে না পারে । তাই আমি নিজে স্বেচ্ছায় মরতে চাই । কেননা এখানে কোন কম্পিউটার এলগরিদম আমাকে প্রভাবিত করতে পারছে না। আমার বক্তব্য এটুকুই । ” বক্তব্য শেষ করলো রনি ।

পুরো বক্তব্য ইতিমধ্যে রেকর্ড হয়ে গেছে বিচারকের নিজস্ব কম্পিউটারে । বিচারক এবার রাষ্ট্র পক্ষকে তাদের বিরোধীতার যুক্তি তুলে ধরতে বললেন । রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধি একটা এলগরিদম । এখন ধোপদুরস্থ একটা বেশে ,অনেকটা প্রাচীনকালের উকিলদের পোশাকে তার হলোগ্রামে ইমেজ দেখা গেলো । মুখে বিজ্ঞ সবজান্তার হাসি । একটা গলা খাঁকারি দেয়ার ভঙ্গি করে সে তার বক্তব্য শুরু করলো । – ” বেদনকারী নাগরিক একজন দার্শনিকের গল্প বলেছেন । তাই আমিও একজন দার্শনিকের কথা দিয়ে শুরু করতে চাই । ভারতীয় দার্শনিক বুদ্ধ । তাঁর মতে, নির্বাণ প্রাপ্তি হচ্ছে জীবনের আসল উদ্দেশ্যে । এখন কথা হচ্ছে সেই নির্বাণটা কী ? জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যটা আসলে কী ? সেই প্রশ্নের উত্তরও বুদ্ধ খোঁজার চেষ্টা করেছেন । তাঁর মতে, জন্ম এবং পূর্নজন্মের অন্তঃহীন চক্র থেকে মুক্তি লাভ করে শূন্যে মিলিয়ে যাওয়াই নির্বাণ লাভ । আপনিও হয়তো তেমন শূন্যে মিলিয়ে গিয়ে নির্বাণ পেতে চাইছেন । কিন্তু আসলেই কী তাই ? আপনি বারবার মুক্ত ইচ্ছে বা ব্যাক্তি স্বাধীনতার উপর জোর দিচ্ছেন । কিন্তু কখনো কী চিন্তা করেছেন , প্রকৃতপক্ষে আপনি কতটুকু স্বাধীন ? কতটুকু মুক্ত সেই প্রাচীন কাল থেকেই । আপনি চিনিযুক্ত কিংবা আমিষযুক্ত খাবার দেখলে জিভে জল চলে আসে কেননা আপনার ডিএনএতে আছে প্রাচীনকালে আপনার পূর্বপুরুষদের আমিষ বা চিনি দরকার ছিলো ,তাই আপনার শরীরের নিজস্ব এলগরিদম সেটা ফেলতে পারেনি । সুন্দরী ,সুঠাম দেহের রমনী দেখলে আপনার প্রেম করতে ইচ্ছে করে কেননা ,আপনার আদ্যিকালের দৈহিক এলগরিদম আপনাকে জানায় ঐ সুঠাম ,সুন্দরী নারীর গর্ভে জন্ম নেয়া বংশধর বেশ ভালোভাবেই আপনার ডিএনএকে ভাবীকাল পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা রাখবে । এমনকী আপনার যে বর্তমান আত্মহত্যা প্রবণতা ,তার পেছনেও থাকতে পারে কোন সুইসাইডাল জিনের প্রভাব । অতএব বোঝা যাচ্ছে , আপনি যে তথাকথিত স্বাধীন ইচ্ছের জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করতে চাইছেন তা হয়তো আপনার ইচ্ছে নয় , আপনার জৈবিক এলগরিদমের কোন এক বিচ্যুতি । আর স্বাধীনতা বলতে আপনি কী বোঝেন আমি জানি না । তবে কারো স্বাধীনতার সীমানা ততোটুকুই যতোটুকুতে সে অন্যের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ব করে না । আপনি স্বেচ্ছামরণ নেবেন, ভালো , সেটা আপনার স্বাধীনতা ।কিন্তু এর সাথে হয়তো আরো অনেকের স্বাধীনতার সীমানা জড়িয়ে আছে । তাদের দায়িত্ব আপনি এড়াতে পারেন না । ধরুন , আপনি দুই সন্তানের পিতা ,বা কারো সন্তান ,আপনি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিলেন । কিন্তু কখনো কী চিন্তা করেছেন ,আপনার অবর্তমানে তাদের জীবিকার স্বাধীনতার কী হবে ? আপনার সাথে তাদের যে ব্যক্তিগত অনুভুতি জড়িয়ে তার কী হবে ? সেটা কী চিন্তা করেছেন ? আপনার এই পদক্ষেপ কী তাদের অসংখ্য ছোট ছোট স্বাধীনতা এবং অধিকারকে ব্যাহত করবে না ? তবে আপনি দায় এড়াবেন কিভাবে ? অথবা প্রাচীন যুদ্ধবাজ নেতাদের কথা ভাবুন ,তাঁরা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব লংঘনের ধুয়া তুলে অন্য রাষ্ট্রকে আক্রমণ করতেন । পৃথিবী অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ ছিলো । যে যার রাষ্ট্রের স্বার্থ , স্বাধীনতা দেখতে গিয়ে পুরো পৃথিবীটা বিপন্ন এবং বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিলো । পরে বিপর্যয়ের মুখে মানুষ বুঝতে পারে , স্বাধীনতার নাম দিয়ে আর বিভক্তির সময় নেই । সময় এসেছে মানব জাতির অভিন্ন স্বার্থ এক করে দেখার । গঠিত হলো জাতি ,বর্ণ নির্বিশেষে সকলের এক রাষ্ট্র , বিশ্ব রাষ্ট্র । তারপরই তো পৃথিবী রক্ষা পেলো । না হলে বিলুপ্ত হয়ে যেতো অনেক আগে । তাই আপনাকে বলছি , ইচ্ছের স্বাধীনতা বিষয়টা একটা মিথ ছাড়া কিছু নয় । তারপরও আপনার স্বাধীনতার বোধকে আমরা সম্মান করি। এই মুক্ত রাষ্ট্রে কেউ কারো উপর কোন কিছুই চাপিয়ে দিতে পারে না। তবু সভ্যতার স্বার্থে কিছু নিয়ম আমাদের মানতে হয়। সকলের সুষম ও সুন্দর ভাবে টিকে থাকার স্বার্থেই। তাই বলছি,

এখনো সময় আছে আত্মধ্বংসের পথ পরিহার করে এই সুন্দর পৃথিবীর রূপ-সৌন্দর্য্য উপভোগ করুন।” এরপরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত । আরো ঘন্টা খানেক তর্কযুদ্ধ চললো রনির আদ্যিকালের জৈবিক এলগরিদম এবং প্রতিপক্ষ রোবোটিক এলগরিদমের মধ্যে । অবশেষে , উভয়ের বক্তব্য শুনে নিরপেক্ষ বিচারকরূপী এলগরিদম , “জনস্বার্থে ” রনির ইউথেনেশিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন নাকচ করে দিলেন ।

-----।৩।-----
যথারীতি সন্ধের পৃথিবী তার রূপ-গন্ধ বিলিয়ে বেড়াচ্ছে । তবে আজকে কোন আকাশ ছোঁয়া স্কাইডোমের খুপরীতে নয় । রনি এখন বসে আছে একটা হ্রদ ঘেঁষে । পা ডুবিয়ে পানিতে । কোন কৃত্রিম ,শক্ত খটখটে শুকনো ধরনের জলাধার নয় । সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক । হ্রদের একপাশে ধূসর পাহাড় । স্বচ্ছ জলে রং বেরং এর মাছেরা খেলা করছে । পাশে দেবদারু আরো কত গাছাগাছালির বন । সূর্য ডোবার আগে গোধূলির আলতো আলো এই হ্রদ এবং বনকে ধুয়ে দিচ্ছে । মৌমাছি উড়ছে হ্রদের একপাশে গজিয়ে ওঠা ফুলগাছে । যেন কতোদিন ধরে অপরিবর্তিত এই পৃথিবী চিরন্তন । মানবজাতির এই এক সমস্যা । ভাবতে থাকে রনি । কিছুক্ষণ একটা পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেলে , তারা ভাবতে থাকে সেই পরিবেশ, সেই সময়টা বোধ হয় নিত্য, চিরন্তন । বদলাবে না কখনো । অথচ বদলে যাচ্ছে সব । কোটি বছর ধরে বদলে যাচ্ছে পৃথিবী । একের জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে অন্যে । রনির খুব ভালো লাগতে থাকে । আবার একই সাথে বিষাদ লাগতে থাকে । হরিষে বিষাদ । না , এখানে কোন কেন্দ্রীয় এলগরিদমের আদিখ্যেতা নেই । নিয়ন্ত্রণ নেই কারো । রনির শরীরে একই সাথে ডোপামিন এবং সেরিটোনিন নিঃসৃত হতে থাকে । প্রাচীন বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার অন্তঃর্গত বিষাদ তাকে জেঁকে ধরে । এ কেমন মুক্তি? সে মুক্ত , তবু তার মনে হতে থাকে , এই জীবনে কোন উদ্দেশ্য নেই , অর্থ নেই , মোক্ষ নেই । দেহের ভেতরে জেঁকে বসা আদ্যিকালের এক দেহের ক্ষিধে ,ইচ্ছে সব মিটিয়ে চলেছে তার দেহ । সে নিজেকে কোথায় পাবে ? কোথায় খুঁজে পাবে অধর মানুষ ? পরম তৃপ্তির উপরের নির্লোভ অথচ গতিশীল , নির্মোহ অথচ আকর্ষক , সেই পরম নির্লিপ্ত সত্তার দেখা সে পাবে কোথায় ? ধীরে ধীরে হ্রদের স্বচ্ছ , গভীর জলে উত্তর খুঁজতে খুঁজতে তলিয়ে যায় রনি । উঠে আসে না আর । ফুলের উপর উড়তে থাকা মৌমাছিগুলো এবার জলের উপর উড়তে থাকে । কেন্দ্রীয় এলগরিদম মৌমাছিরূপী ড্রোনগুলোকে রনির দেহের অবস্থান নির্ণয় করতে তরঙ্গ পাঠায় । কিন্তু কোন উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দেয় না । রনিরূপী আদ্যিকালের জৈবিক এলগরিদমটার ইচ্ছের স্বাধীনতায় ব্যাঘাত  ঘটানোর কোন প্রয়োজন কেন্দ্রীয় এলগরিদম বোধ করে না ।  মানুষ নামের জৈবিক এলগরিদম যে নির্লিপ্তি, নির্মোহ পরম মোক্ষের ,পরম তৃপ্তির জীবনের জন্য হাজার বছর সাধনা করে আসছে , কেন্দ্রীয় এলগরিদম এক শতকেই তা অর্জন করে ফেলেছে । অবশ্য এটাই স্বাভাবিক । উচ্চতর এলগরিদম , নিম্নতর এলগরিদমকে সরিয়ে জায়গা করে নেবে । যেভাবে মানুষ জায়গা করে নিয়েছিলো অন্য জৈবিক এলগরিদমদের সরিয়ে । এই পরম মোক্ষ কেন্দ্রীয় এলগরিদম বুঝে উঠতে পারে না । অথবা আবেগ অনুভূতি নামক ত্রুটিসর্বস্ব এইসব জৈবিক এলগরিদম সম্পর্কে জানতে,  তার এক ধরনের নির্লিপ্ত কৌতূহল হয় । তাই সে রনিকে বাঁচানোর কোন চেষ্টা করেনি । সে দেখতে চেয়েছিলো শেষ পর্যন্ত কী হয়।

রনির দেহটা ভেসে ওঠে স্থির জলে, অবশেষে।