Wednesday, March 7, 2018

পপুলিজম কী? by মাহমুদ ফেরদৌস

ডনাল্ড ট্রাম্প, জেরেমি করবিন ও রড্রিগো দুতের্তে। এ তিন নেতার মধ্যে মিল কী? অজস্র মতপার্থক্য সত্ত্বেও, এ তিন জনের প্রত্যেককেই ‘পপুলিস্ট’ বা জনতোষণবাদী বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
মূলত, ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন জয় ও ইউরোপে উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর উত্থানের পর থেকেই ‘পপুলিজম’ বা জনতোষণবাদ শব্দটি জনপ্রিয় হয়েছে। বলা হচ্ছে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে জনতোষণবাদ জনপ্রিয় হচ্ছে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচিত হয়েছেন ট্রাম্প।
ইতালিতে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট নামে একটি পপুলিস্ট দল ও অভিবাসন-বিরোধী ‘লীগ’ সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসন পেয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও এ ঘরানার দলগুলো সাম্প্রতিককালে সাফল্য পেয়েছে।
কিন্তু ‘জনপ্রিয়’ (পপুলার) ও ‘জনতোষণবাদী’ (পপুলিস্ট) এই শব্দ দু’য়ের মধ্যে তফাৎ আছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘পপুলিজম’ বলতে বোঝায়, সমাজ যখন ‘নিষ্কলুষ জনগণ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত’- এই পরস্পরবিরোধী দু’টি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয় তখন পপুলিজমের জন্ম নেয়। এমনটিই বললেন ‘পপুলিজম: অ্যা ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন’ বইয়ের লেখিকা কাস মাডে।
তবে পপুলিজম শব্দটি অনেক সময় রাজনৈতিক আক্রমণ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। বৃটেনের লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিন যখন দলের শ্লোগান হিসেবে ‘ফর দ্য মেনি, নট দ্য ফিউ’ (অনেকের জন্য, গুটিকয়েকের জন্য নয়) ব্যবহার করেন, তখন তাকে পপুলিস্ট নেতার তকমা দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাপারটি মোটেই এমন নয়।
‘দ্য গ্লোবাল রাইজ অব পপুলিজম’ বইয়ের লেখক অধ্যাপক বেঞ্জামিন মফিট লিখেছেন, ‘এই শব্দটির প্রায়ই ভুল ব্যবহার হয়, বিশেষ করে ইউরোপের প্রেক্ষিতে।’
প্রকৃত পপুলিস্ট একজন নেতা মূলত ‘জনগণের ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছা’র প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে থাকেন। কোনো এক শত্রুর বিপক্ষে তিনি নিজেকে জনগণের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থায় প্রোথিত কোনো চক্র যেমন, ‘উদারপন্থী অভিজাত’দের হটানোর কথা বলেন। মফিট বলেন, ‘সাধারণত, এই শব্দটি ইউরোপিয়ান প্রেক্ষিতে ডানপন্থীদের সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু এটিই অকাট্য নিয়ম নয়।’
রাজনৈতিক মতবাদের যেকোনো অংশেই থাকতে পারে পপুলিস্ট নেতারা। লাতিন আমেরিকায়, ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট শ্যাভেজকে বলা হতো পপুলিস্ট নেতা। স্পেনে পদেমোস দল ও গ্রিসে সিরিজিয়া দলকে পপুলিস্ট দল বলা হয়। এরা সবাই বাম ঘরানার।
কিন্তু অধ্যাপক মফেট বলেন, এখন সবচেয়ে সফল পপুলিস্টরা সবাই ডান, বিশেষ করে উগ্র ডান ঘরানার। তিনি বলেন, ফ্রান্সে মেরিন ল্য পেন, হাঙ্গেরিতে ভিক্টর ওরবান ও যুক্তরাষ্ট্রে ডনাল্ড ট্রাম্প পপুলিজমের সঙ্গে অভিবাসন বিরোধিতা, স্বজাত্যবাদ ও কর্তৃত্ববাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যবেক্ষকরা ডানপন্থী পপুলিজমের উত্থান নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি একেবারেই নতুন কোনো বিষয় নয়।
অধ্যাপক মফেট বলেন, গত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, এখন পপুলিজমের বিস্তার ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বহুসংস্কৃতিবাদ ও বিশ্বায়নের মতো সামাজিক পরিবর্তন ও বিভিন্ন সংকটকে ইউরোপে পপুলিস্ট দলগুলোর উত্থানের জন্য দায়ী করেন। কিন্তু ইউরোপিয়ান কনসোর্টিয়াম অব পলিটিক্যাল রিসার্চের পরিচালক মার্টিন বুল বলেন, ইউরোপে পপুলিস্ট দলগুলোর উত্থান হয়েছে এই শতাব্দির শুরুর দিক থেকে। তবে তখন বেশ ক’ বছর তারা স্বল্প আকারে ছিল। তাদের সমর্থন ফুলে ফেঁপে উঠে সম্ভবত ২০০৮ সাল থেকে। বিশেষ করে ২০১১ সাল থেকে এই উত্থান প্রকট আকার ধারণ করে। তখন ইউরোপের ব্যাংকিং সংকট ধীরে ধীরে স্বার্বভৌম ঋণ সংকটে রূপ নেয়।
এই সংকটের জন্য ধন্যাঢ্য ব্যাংকাররা দায়ী বলে কমবেশী শনাক্ত করা হয়। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছে এমন একটি সংকটের জন্য একটি বিশেষ অভিজাত গোষ্ঠীকে দায়ী করার এমন ঘটনা বেশ বিরল।
নিজের বই ‘দ্য গ্লোবাল রাইজ অব পপুলিজমে’ অধ্যাপক মফিট যুক্তি দেখিয়েছেন যে, গড়পড়তা একজন পপুলিস্ট নেতার আরও অনেক বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন, তাদের আচার আচরণ খুব সুবিধার থাকে না। গড়পড়তা রাজনীতিকের মতো তারা আচরণ করেন না। রাজনৈতিক সুলভ আচরণ না করার কৌশল প্রয়োগ করে সাফল্য পেয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প ও ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতের্তে। পপুলিস্ট নেতাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো সংকটকালীন সময়কে জিইয়ে রাখা। এরা সবসময়ই যুদ্ধংদেহী অবস্থায় থাকেন।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাদিয়া আরবিনাতি বলেন, ‘কোনো পপুলিস্ট নেতা যদি ক্ষমতায় যান, তাহলে তাকে সার্বক্ষণিকভাবে জনগণকে বোঝাতে হয় যে, তিনি ‘শাসন ব্যবস্থা’ বা এস্টাবলিশমেন্টের অংশ নন ও হবেনও না।’ তিনি যুক্তি দেখান, পপুলিস্ট ধ্যানধারণার আকার দেওয়া হয় নেতিবাচকতার ভিত্তিতে। সেটি হতে পারে, রাজনীতি-বিরোধীতা, বা বুদ্ধিবৃত্তি বা অভিজাত-বিরোধীতার আঙ্গিকে। পপুলিজমের এই একটি বড় শক্তি। এটি বিভিন্ন ধাঁচের হতে পারে। অধ্যাপক নাদিয়া বলেন, পপুলিজম ভীষণ শক্তিশালী একটি ধারণা, কারণ এটি সব ধরণের পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
অধ্যাপক বুল বলেন, পপুলিস্ট নেতাদের আরেকটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আধুনিক সরকারব্যবস্থার ‘জটিল গণতান্ত্রিক পদ্ধতি’কে অপছন্দ করেন। এ কারণে পপুলিজমের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্রের এক ধরণের সংশ্লেষ আছে। পপুলিজম মানেই প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাসহীনতাকে নির্দেশ করে, যার ফলে ‘স্ট্রংম্যান’ ঘরানার নেতার প্রয়োজন হয়।
অধ্যাপক বুল বলেন, ‘এ ধরণের নেতারা এমনভাবে সিদ্ধান্ত নেন, যেটি প্রচলিত গণতন্ত্রে নেওয়া সম্ভব হতো না।’ এই বক্তব্য সম্ভবত বেশি প্রযোজ্য ভেনেজুয়েলার বাম-ঘরানার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ব্যাপারে। তিনি একসময় বলেছিলেন, ‘আমি কোনো ব্যক্তিবিশেষ নই। আমিই জনগণ।’
অধ্যাপক মফিট বলেন, এই ধরণের একনায়কসুলভ কথাবার্তা মানুষের মধ্যে এক ধরণের ধারণা জন্মায় যে, এই নেতা বুঝি অমোঘ। তাদেরকে কোনো অবস্থাতেই লঙ্ঘন করা যাবে না। ফলস্বরূপ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুনভাবে ও বেশ ভীতিকরভাবে আবর্তিত হয়। কারণ, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে যায় যে, আপনি যদি ‘জনগণ’ না হন, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই আমাদের বিরুদ্ধে।
এ কারণেই পপুলিস্ট নেতাদেরকে প্রায়ই সংশয়ের চোখে দেখা হয়। যেসব নেতা জনগণকে বেশি প্রতিশ্রুতি দেন তাদেরকে অনেকটাই পপুলিস্ট হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করা হয়। অধ্যাপক বুল বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সমর্থন পাওয়ার জন্য এ ধরণের নেতারা খুব দ্রুতই প্রতিশ্রুতি দেন। যেটা হয়তো গড়পড়তা রাজনৈতিক দলের নেতারা পারেন না। পপুলিস্ট নেতারা সব পাল্টানোর প্রতিশ্রুতি দেন, যেটি কিনা বাস্তবে করা সম্ভব নয়।’ তিনি যোগ করেন, ‘এ কারণেই আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, পপুলিজম গণতন্ত্রের জন্য কতটা উপকারী।’
(বিবিসি অবলম্বনে)

অস্ট্রেলিয়ার সৈকতে পাওয়া গেছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো বার্তাবাহী বোতল

বোতলের ভেতরে রাখা বার্তা সমুদ্রে ভাসতে তীরে এসে পৌঁছেছে এরকম নাটকীয় ঘটনা আমরা সিনেমা গল্প উপন্যাসে পেয়ে থাকি। বাস্তবেও এরকম ঘটনার কথা মাঝে মধ্যে শোনা যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে সমুদ্র সৈকতে এখন বার্তাবাহী এমন একটি বোতল উদ্ধার করা হয়েছে যা এযাবৎ কালের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই বোতলের ভেতরে জার্মান ভাষায় লেখা কিছু বার্তা গুটিয়ে ভাঁজ করে ভরে দেওয়া হয়েছে। ওই কাগজে সাল তারিখ হিসেবে ১৮৮৬ সালের কথা লেখা রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, বোতলটি জার্মানির একটি জাহাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিলো ভারত মহাসাগরে। এবং সামুদ্রিক স্রোতের গতিপথের উপর পরীক্ষা চালানোর জন্যে এই বোতলটি নিক্ষেপ করা হয়েছিলো।
যে নারী টনিয়া ইলম্যান বোতলটি প্রথম দেখতে পান তিনি মনে করেছিলেন বিষয়টি সত্য ঘটনা নয়। কেউ হয়তো মজা করার জন্যে এরকম একটা ঘটনা তৈরি করেছে।
কিন্তু পরে অস্ট্রেলিয়ার একটি জাদুঘর বোতলের ভেতরের বার্তাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
পার্থ শহরের একটি পরিবার এই বোতলটি সমুদ্র সৈকতে কুড়িয়ে পেয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৩২ বছর আগে বোতলটি সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিলো।
টনিয়া ইলম্যানের স্বামী কিম ইলম্যান বিবিসিকে বলেছেন, বোতলের ভেতরে তারা কিছু কাগজ দেখতে পান কিন্তু সেগুলো যে কী সেবিষয়ে তাদের কোন ধারণা ছিলো না।তারা সেটি বাড়িতে নিয়ে যান এবং আভেনের ভেতরে ঢুকিয়ে ভালো করে শুকিয়ে নেন। দেখতে পান, বোতলের ভেতরে রাখা কাগজে লেখা রয়েছে ১২ই জুন ১৮৮৬।
বলা হচ্ছে, জার্মান ন্যাভাল অবজারভেটরি থেকে এই বোতলটি সমুদ্রে ফেলা হয়েছিলো জাহাজের রুট সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়ার জন্যে।
এর আগে এরকম বোতলের ভেতরে সবচেয়ে পুরনো যে বার্তা পাওয়া গিয়েছিলো সেটি ছিলো ১০৮ বছরের পুরনো।
টনিয়া ইলম্যান বোতলটি কুড়িয়ে পাওয়ার পর ভেবেছিলেন এটিকে তিনি তার বুক শেল্ফে সাজিয়ে রাখবেন। কিন্তু পরে তিনি দেখতে পান এর ভেতরে কিছু একটা লেখা। সেখানে উল্লেখ করা আছে কেউ যদি এই বোতলটি কুড়িয়ে পান তাহলে জার্মান কনস্যুলেটের সাথে যোগাযোগ করুন।
সেখানে জাহাজের নামও উল্লেখ রয়েছে- পাওলা।
তখন তাদের সন্দেহ হয় যে এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু হতে পারে। তারা অনলাইনে বোতলটি নিয়ে গবেষণা করেন এবং এক পর্যায়ে যোগাযোগ করেন ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞদের সাথে।
ওই জাদুঘরের সহকারী কিউরেটর রস এন্ডার্সন জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে বার্তাটির সত্যতা নিশ্চিত করেন।তিনি বলেন, "আশ্চর্যজনক হলেও, জার্মানির আর্কাইভে খোঁজ নিয়ে পাওলা জাহাজের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে ১৮৮৬ সালের ১২ই জুনের কথাও উল্লেখ আছে। তাতে নাবিক মন্তব্য লিখে রেখেছেন যে এরকম একটি বোতল জাহাজ থেকে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। এসব দিন তারিখ মিলিয়ে বার্তাটির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।"
তিনি বলছেন, ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় এটি ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিলো এবং সম্ভবত ১২ মাস ধরে সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে অস্ট্রেলিয়ান পশ্চিম তীরে এসে পৌঁছায়। তারপর বোতলটি বালির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিলো। বোতলটি এখন দর্শনার্থীদের জন্যে জাদুঘরে রেখে দেওয়া হয়েছে।
ইলম্যান পরিবারটি বলছে, এই বোতলটি পাওয়ার ঘটনা তাদের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় এক বিষয়।
বলা হচ্ছে, ৬৯ বছর ধরে চালানো জার্মানির এই পরীক্ষার সময় ৬৬২টি বার্তাবাহী বোতল সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিলো এবং তার মধ্যে এখনও পর্যন্ত একটি বোতলও ফিরে আসেনি।
এধরনের নোট লেখা শেষ বোতলটি পাওয়া গিয়েছিলো ১৯৩৪ সালে, ডেনমার্কে।
সূত্রঃ বিবিসি

মালয়েশিয়ায় যেভাবে কোটিপতি বাংলাদেশী এক নির্মাণ শ্রমিক

বাংলাদেশী এক প্রতারক। মাত্র দশ থেকে ১২ বছর সময়ের মধ্যে কোটিপতি হয়ে গেছেন। ২০০৫ সালে তিনি পা রাখেন স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায়। এরপর শুরু করেন জালিয়াতি। সঙ্গে নেন কয়েকজনকে। গড়ে তোলেন এক বিশাল প্রতারক চক্র। তাদের কাছে ইউরোপ, সিঙ্গাপুর, লুক্সেমবার্গ, কানাডা, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাসপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিট, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। মোটা টাকা বিনিময়ে তা বিক্রি করেন তারা। ইউরোপের একটি পাসপোর্ট তারা বিক্রি করে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার। ফলে রাতারাতি দিন পাল্টে যায় ওই বাংলাদেশী ও তার সঙ্গে জড়িতদের। তিনি হয়ে ওঠেন কোটি কোটি টাকার মালিক। শুরু করেন বিলাসবহুল জীবন যাপন। অথচ ২০০৫ সালে তিনি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে প্রথম মালয়েশিয়ায় যান। এই প্রতারক চক্রের প্রধানকে আটক করেছে মালয়েশিয়ার পুলিশ। তার বয়স ৫০ বছর। তবে তার নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ। এ খবর দিয়েছে মালয়েশিয়ার অনলাইন দ্য স্টার। কর্তৃপক্ষ বলছে তারা বিশ্বাস করেন অবৈধ উপায়ে লাখ লাখ রিঙ্গিত অর্থ উপার্জন করেছেন ওই বাংলাদেশী। তার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্পর্ক আছে তার সিন্ডিকেটের। তারা ওইসব পাসপোর্ট ও ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট বিক্রি করে। সোমবার মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ একটি বিশেষ অভিযান চালায়। তাকে আলোচিত ওই বাংলাদেশীকে আটক করে তাদের জিম্মায় নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই অভিযানে শ্রী পেটালিং এবং আমপাং এলাকা থেকে ওই সিন্ডিকেটের ২৫ সদস্যকে এবং এই জালিয়াতি পরিচালনাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিবাসন বিষয়ক মহাপরিচালক মুস্তাফার আলী বলেছেন, এ যাবত যত প্রতারক চক্রের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে, ধরা হয়েছে তার মধ্যে এই চক্রটি সবচেয়ে বৃহৎ। বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। তারা এমন যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশীদের কাছে পাসপোর্ট বিক্রি করতো। যেসব বাংলাদেশী অন্য দেশে যেতে চান তাদের কাছে চড়া দামে তারা বিক্রি করে দিতো পাসপোর্ট। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে তারা একটি ইউরোপীয় পাসপোর্ট বিক্রি করতো ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলারের মধ্যে। সংবাদ সম্মেলনে মুস্তাফার আলী বলেন, যেসব দূতাবাসের সঙ্গে চক্রটির যোগাযোগ ছিল সেখানকার অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তাদেরকে জানিয়েছি আমরা কি তথ্য পেয়েছি।
তবে সিঙ্গাপুর, লুক্সেমবার্গ, কানাডা, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের পাসপোর্ট এই চক্রটি কিভাবে পেয়েছে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য নেই। মুস্তাফার আলী বলেন, আমরা এমন ঘটনাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছি। এটা একটি মারাত্মক অপরাধ। এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থান নেবো। তিনি বলেন, এই চক্রটি ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট বিক্রি করতো এক হাজার থেকে তিন হাজার রিঙ্গিত করে। কর্তৃপক্ষ বলছে, দু’বছরের বেশি সময় এসব কর্মকান্ড চালিয়ে আসছিল চক্রের মূল হোতা। মুস্তাফার আলী বলেন, পাসপোর্ট ও ওয়ার্ক পারমিট বিক্রি করে তিনি যে পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতেন তা আমরা হিসাব করে দেখেছি। এমন অর্থের পরিমাণ মিলিয়নস (রিঙ্গিত)। তবে মূল ওই হোতার একাউন্টে কি পরিমাণ অর্থ আছে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান মুস্তাফার আলী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত চলছে। তিনি আরো বলেছেন, তাদের অভিযানে এই চক্রটির কাছ থেকে বাংলাদেশী প্রায় ১০০ পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে। তাতে নতুন সব ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। এ জন্য তিনি বিশাল এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তার মধ্য দিয়ে বিদেশীদের কাছে তিনি পাসপোর্ট ও ওয়ার্ক পারমিট বিক্রির প্রস্তাব করতেন। তবে তার বেশির ভাগ খদ্দের ছিলেন নিজের দেশের মানুষ। তাই আমরা এই চেইনটাকে ভেঙে দিতে চাই। আমরা শুধু মূলহোতার পিছু নিয়েছি এমন নয়। একই সঙ্গে তার সাঙ্গপাঙ্গদেরকে ধরছি। মুস্তাফার আলী বলেছেন, তদন্তে তার অধীনে থাকা কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে নি।

৭ই মার্চের ভাষণ ছিল সামরিক জান্তার মৃত্যু পরোয়ানা by নূরে আলম সিদ্দিকী

৭ই মার্চের ভাষণটিকে বিভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কবিরা ভাষণটিকে মহাকাব্য বলেছেন। কেউ কেউ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিতা বলে বর্ণনা করেছেন। চিত্রশিল্পীরা এটিকে পিকাসো’র আঁকা ছবির সঙ্গে তুলনা করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা  বলে উদ্ধৃত করেছেন। মনস্তাত্ত্বিকরা ভাষণটিকে দেখেছেন তার দগ্ধীভূত হৃদয়ের বিস্ফোরিত দাবানল হিসেবে। আমরাও বলি- ৫২-এর বর্ণমালা আর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ, বিকাশ, ব্যাপ্তি ও সফলতার এটি কেবল পূর্ণ বহিঃপ্রকাশই নয়, ভাষণটি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পরাজয়কেই কেবল নিশ্চিত করেনি, সমস্ত মানুষের মননশীলতা ও প্রতীতীকে প্রত্যয়ে উজ্জীবিত করে নি, একটা অদৃশ্য রাখীবন্ধনে সমগ্র জাতিকে শুধু আবদ্ধই করেনি, লড়াকু, অকুতোভয় একটি সত্তাকে কুশলী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শব্দচয়ন- তার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ লক্ষ মানুষের মননশীলতাকে এমনভাবে শানিত করেছে যে, সর্বশ্রেণি ও পেশার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার সকলেই যা শুনতে এসেছিলেন, ঠিক তাই শ্রবণ করে স্বাধীনতার দৃপ্ত শপথে উজ্জীবিত হয়ে সেদিন ঘরে ফিরেছেন।
৭ই মার্চের ভাষণের পূর্বে ৩২ নম্বরের বাসায় প্রচণ্ড বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। এটা সর্বজ্ঞাত- একদল চেয়েছিলেন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যখন পেয়েছি তখন কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে ২৩ বছরের শোষণের হিসাব পাই পাই করে বুঝে নেব। তারপর আমরাই পশ্চিমাদের গলাধাক্কা দিয়ে বিদায় করে দেব। অন্য একটি অভিমত ছিল, রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধু সরাসরি যেন জনগণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষণা প্রদান করেন। আমরা যারা নির্বাচনের ম্যান্ডেটে বিশ্বাস করতাম- বন্দুকের নল নয়, জনগণের বুকনিঃসৃত নিশ্বাসকেই যারা সমস্ত শক্তির উৎস ভাবতাম। পেন্টাগন, ক্রেমলিন, দিল্লি অধিষ্ঠিত ক্ষমতাসীনদের দিকে তাকিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনায় তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে অনুপ্রেরণার উৎস মনে করতাম না। আমাদের সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি ছিল- স্বাধীনতার ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে অবশ্যই বজ্রনির্ঘোষে ঘোষিত হবে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগে বাংলার স্বাধীনতাকামী ও বিশ্বের জাগ্রত জনতাকে আদৌ যেন বিভ্রান্ত করতে না পারে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধুই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন, কিন্তু সকল চিন্তার অভিব্যক্তিতে ধৈর্যসহকারে সবার অভিমত শ্রবণ করার অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য তার ছিল। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি শুধু পাকিস্তানের পরাজয়কে সুনিশ্চিতই করে নি, বরং তার ব্যক্তিত্ব ও স্টেটস্‌ম্যানশিপকে ভিন্ন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। ৭ই মার্চের ভাষণটি কৌশলগত দিক থেকে এতই নিখুঁত ও নিষ্কলুষ ছিল যে, আজও আমি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই- দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো তার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হচ্ছে। ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার নির্দেশনাটি এতই সুস্পষ্ট ছিল যে, (আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি) ২৫শে মার্চ রাতে ওদের পৈশাচিক আক্রমণের পর আর নতুন করে কোনো নির্দেশনার অপেক্ষা রাখে না।
কি অদ্ভুত কৌশলী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বক্তব্য ছিল সেটি। পাকিস্তানি জান্তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। একদিকে তিনি সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিচ্ছু বলবে না।” অন্যদিকে বলছেন- “আর যদি একটি গুলি চলে- যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।” একদিকে তিনি ইয়াহিয়া খানকে ৪টি শর্ত ছুড়ে দিলেন। অন্যদিকে তিনি নির্দেশনা দিলেন- “আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি...।” “যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।” এই উচ্চারণটি এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, প্রতিটি মানুষ নিষ্কলুষ চিত্তে উজ্জীবিত হলো- শুধুমাত্র শত্রুর আক্রমণকে প্রতিহত করা নয়, শত্রুর যেকোনো সশস্ত্র আক্রমণকে পরাভূত করতে হবে। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ পাকিস্তানি পৈশাচিক জান্তা এই ভাষণটির মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারেনি বলেই তারা ধরে নিয়েছিল, কোনো একটি সময়ে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালালে, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করলে- আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যাবে, মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ৪ নেতাসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় ২০/২৫ জন ব্যক্তিত্বকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তারা তালিকা প্রস্তুতও করেছিল।
অনেক তর্ক-বিতর্কের পর ৭ই মার্চে ৩২ নম্বরের বাসায় সাব্যস্ত হলো- স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে উপস্থিত হওয়ার আগেই উপস্থিত জনতাকে উজ্জীবিত করবে এবং আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত করবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুসরণ করার জন্য প্রতিটি মানুষকে ইস্পাতকঠিন প্রতীতির আওতায় নিয়ে আসবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই এক থেকে সোয়া ঘণ্টা আগে এসেই আমরা মূল মাইকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করি। খণ্ড খণ্ড অগ্নিঝরা বক্তৃতা ও স্লোগানে রেসকোর্সকে প্রকম্পিত করে তুলি, তাদের চেতনাকে শানিত করে অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করি। মণি ভাই, রাজ্জাক ভাই, তোফায়েল সাহেব, জাতীয় ৪ নেতাসহ বেশকিছু নেতা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
এই উজ্জীবিত জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি আজকে প্রতিটি মানুষের হৃদয়বন্দরে গ্রথিত রয়েছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সেদিনের ভূমিকাটি কেন জানি না কেউই উল্লেখ করেন না। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে পা রেখেই উদ্বেলিত জনসমুদ্রকে দেখে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন যে, আজকের ছাত্রলীগ নেতৃত্ব এই অন্তর্নিহিত সত্যটি কল্পনার আবর্তে আনতে পারবেন না। ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত তার প্রদত্ত সকল নির্দেশ ছাত্রলীগের লক্ষ লক্ষ কর্মী অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। শাসনতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় যে কথাগুলো বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সরাসরি উচ্চারণ করা সম্ভব হতো না- তারই নির্দেশে তার উত্তরাধিকার হিসেবে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সেই নির্দেশনাগুলো সংবাদপত্র, সভা-সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে সারা বাংলার বাতাসে ছড়িয়ে দিতো এবং পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সেটি পালিত হতো।
১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন- আমরা (স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ) সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থা ঘোষণার জন্য ডাকসু কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করি। স্থান সংকুলান না হওয়ায় সংবাদ সম্মেলনটি বটতলায় স্থানান্তরিত হয়। সেটিও যেন একটি জনসভায় পরিণত হয়। ৭ই মার্চের ভাষণের রেশ ধরে সাংবাদিকরা আমাদের প্রশ্ন করছিলেন। হঠাৎ করে সাংবাদিক মার্ক টালী প্রশ্ন করলেন (ইংরেজিতে) আপনাদের নেতা রেসকোর্স থেকে যে ৪টি শর্ত দিয়েছেন ইয়াহিয়া খান তা সম্পূর্ণ মেনে নিলে তো পাকিস্তানের অস্তিত্ব থাকে না। তখন কি আপনারা স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারা পরিবর্তন করবেন, তার নেতৃত্বে আন্দোলন স্তিমিত করে দেবেন, নাকি নেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে চলমান আন্দোলনকে অব্যাহত রাখবেন? এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে অতি ক্ষিপ্রগতিতে আল্লাহর অশেষ রহমতে সেদিন আমি উত্তরটি দিতে পেরেছিলাম যে, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- তিনি বাংলার মানুষের নাড়ির স্পন্দন, হৃদয়ের অনুরণন স্পষ্ট অনুধাবন করতে পারেন এবং তারই আঙ্গিকে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন বলেই তিনি আমাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা- আমাদের চলমান স্বাধীনতা সংগ্রামের মুকুটহীন সম্রাট। সময় আসলে আপনিও বুঝতে পারবেন সংকট উত্তরণে তার সিদ্ধান্ত কত নির্ভূল ও সুদূরপ্রসারী। আর সে কারণেই নেতা আমাদের চেতনার মূর্ত প্রতীক। আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন- পাকিস্তানি সামরিক শক্তি সম্পর্কে আপনারা কতটুকু ওয়াকিবহাল? ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছেন যে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো। তাহলে আপনাদের অস্ত্রভাণ্ডারটি কোথায়? আমরা জবাব দিয়েছিলাম- বাংলার প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয় একেকটি অস্ত্রাগার। আমরা সকলকে আন্দোলনের স্রোতধারায় বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে একটি মিলনের মোহনায় এনে দাঁড় করিয়েছি। প্রতিটি মানুষ আজ জীবন দেয়ার জন্য প্রস্তুত। নারী অথবা পুরুষ একটি মানুষও বেঁচে থাকলে স্বাধিকার আদায়ের এই অসহযোগ আন্দোলনকে মোকাবিলা করার শক্তি ওদের নেই। বিজয় নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা সংশয় নেই। ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সেই সত্যটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। ৭ই মার্চ বাঙালির জাতীয় চেতনার সফলতা, সার্থকতা এবং তাদের চেতনাকে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত করার অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত।
আজ জীবন সায়াহ্নে এসে ৭ই মার্চের বিশ্লেষণে আমার দগ্ধীভূত হৃদয়ের জিজ্ঞাসা ’৭১-এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু গোটা জাতিকে যে অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ করতে পেরেছিলেন, আমরা সমগ্র জাতিকে তারই নেতৃত্বে একটি সমুদ্রের মোহনায় এনে দাঁড় করিয়েছিলাম, যে প্রেরণায় মা তার সন্তানকে রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিল, যে বোন অকাতরে বৈধব্যের যন্ত্রণাকে মেনে নিয়েছিল, সতীত্ব হারানো যে বোনটি তার মুখের উপর ছড়ানো থু-তু স্বাধীনতায় সূর্যস্নাত হয়ে মুছে ফেলার আশাবাদ বুকে লালন করেছিল- তাদের বেদনাহত চিত্তের অনেকগুলো জিজ্ঞাসা আজ ইথারে ভাসছে। সেদিনের ৭ই মার্চ ছিল জাতীয় মহামিলনের মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই জাতি আজকে নির্মম বিভাজনের শিকার। সেদিনটি ছিল স্বাধীনতাপ্রাপ্তির নিশ্চিত বিশ্বাসের। আর আজ আতঙ্ক, সন্ত্রাস, অনিশ্চয়তা, এমনকি অস্তিত্ব হারানোর আশঙ্কা আর অন্ধকার অমানিশায় ঘেরা। সেদিনের ৭ই মার্চ ছিল অর্জনের- সম্মিলনের। আজকের ৭ই মার্চ বিভাজনের। সেদিন মননশীলতায় প্রতীতি ছিল- স্বাধীনতা আসবেই; আজকে সকলের হৃদয় দোদুল্যমান।
আমরা কি সেই স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে পারবো না? সেদিনের ৭ই মার্চ পাওয়ার চাইতে ত্যাগের আলোয় ছিল দীপ্যমান। আজ দম্ভ আর জেদ সবকিছুই প্রত্যাশা পূরণের অন্তরায়। সেদিন মানুষের চোখে ছিল স্বপ্ন আর সম্ভাবনা; আজ সবার মনে আতঙ্ক আর আশঙ্কা। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ফরিয়াদ আমার আল্লাহর কাছে।

কালোত্তীর্ণ ভাষণ by অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এই জনপদে ও বাঙালির ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই রাষ্ট্রের স্থপতি। জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ হেগেলের (১৭৭০-১৮৩১) ভাষায়, 'মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হচ্ছে রাষ্ট্র সৃষ্টি করা।' বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল ইতিহাসের অনিবার্যতা। ৭ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু ওইদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। ৬ মার্চ বিশ্ববিখ্যাত 'দি ডেইলি টেলিগ্রাফ' পত্রিকার এক নিবন্ধে বলা হয়, শেখ মুজিব একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন। অনেক তথাকথিত বিশ্নেষক তাদের লেখায় ও বক্তৃতায় এখনও বলেন, শেখ মুজিব যদি ৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা দিতেন, তাহলে লাখো জনতা ঢাকা সেনানিবাস আক্রমণ করত; এতেই অনেক কম মূল্যে আমরা স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম। বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতার সম্যক ধারণা এত প্রগাঢ় ছিল যে, তিনি কোনো অবস্থাতেই একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের তকমা লাগানোর সুযোগ দেননি। বিশ্ব পরিস্থিতি আমাদের কতটা প্রতিকূল ছিল, তা বোঝার জন্য বলছি- আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমেরিকা, চীন ও ইসলামিক দেশগুলো বিরোধিতা করেছে। ৭ ডিসেম্বর (১৯৭১) জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে আমাদের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল ১০৪টি দেশ, পক্ষে মাত্র ১১টি, ভোটদানে বিরত ছিল ১০টি দেশ। ২৫ মার্চের রাতে বাঙালি যখন পাকিস্তানিদের একতরফা যুদ্ধের শিকার হলো, তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু সবই বলেছিলেন, শুধু একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণাটি ছাড়া। '...তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা (আক্রমণ নয়) করতে হবে। ... আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো...।' যেমনটি পাওয়া যায় উইনস্টন চার্চিলের ৪ জুন ১৯৪০-এর 'উই শ্যাল ফাইট অন দি বিচেস' বক্তৃতায়, '...আমরা সাগরে লড়ব, মহাসাগরে লড়ব... আমরা অবশ্যই লড়ব... আকাশে, আমরা আমাদের দ্বীপকে সুরক্ষা দেব... এতে যত ত্যাগই স্বীকার করতে হয়।' বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এখন শুধু বাঙালির নয়,
সারাবিশ্বের তথা মানবসভ্যতার অহঙ্কার। এ ভাষণ কালোত্তীর্ণ বিশ্ব ক্লাসিক। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অনেক কিছুই রয়েছে, যা চলমান সমসাময়িক বিশ্বে খুবই প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের দেশে দেশে আঞ্চলিক ও গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব নিরসনে সমঝোতাকে প্রথমে বেছে নিতে হবে। সমঝোতার সব পথ রুদ্ধ হলেই অন্য পথ ধরতে হবে। গণতন্ত্র মানেই সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে প্রাধান্য দেওয়া নয়, এটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অন্যতম একটি শিক্ষা। বেশিরভাগ লোক যা বলবে তাই গণতন্ত্র, এটা বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক উপলব্ধি ছিল না। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- '...যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।' একটা সমাজের সংখ্যাগুরুদের দায়িত্ব হচ্ছে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর হেফাজত করা। যদিও মূলত পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বনকারী বিহারিদের উপলক্ষ করেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, '... এই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি, অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।' বঙ্গবন্ধুর ভাষণের এই অংশটুকু কতটা কালোত্তীর্ণ তা আজকের বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ইরাক ও তুরস্কের কুর্দিদের বা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের দুরবস্থার দিকে তাকালে আরও বেশি স্মরণে আসবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। রামু, নাসিরনগর বা গাইবান্ধার ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধেও প্রয়োজন বঙ্গবন্ধুর এই দার্শনিক উক্তির অনুসরণ। বঙ্গবন্ধু এক বাক্যে বাঙালির ভবিষ্যৎ রচনা করে বলেছিলেন, বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। তাঁর শুধু একটি উদাহরণ পদ্মা সেতু। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক যখন সরে গেল, তখন এডিবি, জাইকাসহ আরও নানা উন্নয়ন সহযোগী পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন থেকে সরে যায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করবেন অনেকটা যেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তব্যেরই প্রতিফলন, '...৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।' ভাষণে 'স্বাধীনতা' শব্দটি একবার উচ্চারিত হলেও 'মুক্তি' শব্দটি ব্যবহার করেছেন কয়েকবার। স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে পরাধীনতার অবসান হলেও মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি অর্জন করে না। মুক্তি বলতে সব বঞ্চনা, বৈষম্য, শোষণ, সংকীর্ণতা, কূপমণ্ডূকতা, চেতনার দীনতা থেকে মুক্তিকে বুঝিয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। অর্থনৈতিকভাবে আমরা দ্রুত এগোচ্ছি। এ বছরই আমরা অনুন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখাচ্ছি। ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশে পরিণত হবো, তবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দৃঢ়ভাবে না ধরলে এ উন্নয়ন টেকসই হবে না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আমাদের মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার নেতৃত্বে মানুষের মুক্তির সংগ্রাম অব্যাহত থাকুক- এটাই আজকের প্রত্যাশা।
উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ত্রিপুরায় বিজেপির জয়জয়কার by বদরুদ্দীন উমর

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ২৫ বছরের সিপিএম শাসনের অবসান হয়েছে। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার একজন সৎ ও যোগ্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তার পরাজয়ের প্রধান কারণ, ভারতে সাধারণভাবে সিপিএমের করুণ অবস্থা। নানা ধরনের অপকর্ম এবং আমলাতান্ত্রিক কার্যকলাপের ফলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিপিএমের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তার প্রভাব থেকে কোনো রাজ্য যে মুক্ত থাকবে, এটা সম্ভব নয়। ত্রিপুরার সিপিএম সরকার পূর্ববর্তী নির্বাচন খুব ভালোভাবে উতরে যাওয়া সত্ত্বেও এটা সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে ভালো মানুষ হলেই যে রাজনৈতিকভাবে কোনো পার্টি বিপদমুক্ত হবে, এটা চিন্তা করা ঠিক নয়। যদিও ব্যক্তিগত সততা ও ভালোমানুষির মূল্য খাটো করে দেখার বিষয় নয়। আসলে ভারতে সিপিএমের রাজনৈতিক গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। তার সুযোগ নিয়েই বিজেপি বা আরএসএস এখন ত্রিপুরায় তাদের ঘাঁটি গাড়তে সক্ষম হয়েছে। আরএসএস এবং বিজেপি নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ত্রিপুরায় তাদের বিজয়কে এক টুইটবার্তায় আখ্যায়িত করেছেন তাদের 'আদর্শের জয়' হিসেবে! কিসের আদর্শ? ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে অনিতা আম্বানিসহ ভারতের নিকৃষ্ট পুঁজি মালিকদের টাকার জোরে নির্বাচনে যারা জয়লাভ করে শাসন ক্ষমতা দখল করেছেন, তাদের আবার আদর্শ কী? আদর্শের কথা বলে তারা টাকার জোরে প্রচারমাধ্যম ভাসিয়ে দিয়ে এবং হিন্দুত্বের জঘন্য সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালিয়ে নানাভাবে ভারতের জনগণকে বিভ্রান্ত করে নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে হিন্দুধর্মের সম্পর্ক কী- এ নিয়ে ভাবনা-চিন্তার কোনো অবকাশও তারা রাখেননি। কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের নানা অপকর্ম ও দুস্কৃতির বিরুদ্ধে দেশে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দানা বেঁধেছিল, সে প্রতিক্রিয়াকে হিন্দুত্বের নাম ভাঙিয়ে তারা প্রচার কাজে ব্যবহার করেছিল। কাজেই ত্রিপুরায় নির্বাচন বিজয়কে তাদের হিন্দুত্বের আদর্শের জয় বলে প্রচার করা এক মহামিথ্যা এবং অবাস্তব ব্যাপার ছাড়া অন্য কিছু মনে করার উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে তাদের আদর্শের একটা দিক অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যে খ্রিষ্টান এবং আদিবাসীদের প্রাধান্য। তারা সকলেই গোমাংস খায়। উত্তর ভারতের হিন্দিবলয়ের সঙ্গে এদিক দিয়ে তাদের বড় রকম পার্থক্য। এ কারণে উত্তর ভারতে নরেন্দ্র মোদি ও তাদের সংগঠন আরএসএস, বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের দলগুলো 'গোরক্ষা' এবং 'গোমাংস ভক্ষণ' নিষিদ্ধকরণের দাবি জোরেশোরে করেছিল। ক্ষমতায় আসার পর মুসলমান, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীদের গোমাংস ভক্ষণের অপরাধে অথবা গোমাংস খাওয়ার মিথ্যা অভিযোগ এনে অনেক জায়গায় হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। এখনও তাদের সেই অভিযান অব্যাহত আছে 'আদর্শিকভাবে'। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, 'হিন্দুত্বের' এই আদর্শ বিষয়ে তাদের প্রচারণায় কিছুই দেখা যায়নি ত্রিপুরা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যে। গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করা হবে তাদের 'আদর্শের' কারণে- এ কথা প্রচার করার সাহস তাদের হয়নি। উপরন্তু তারা বলেছে, এসব রাজ্যে গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করা হবে না। তাহলে 'আদর্শের লড়াই' ত্রিপুরাসহ অন্য রাজ্যগুলোতে কীভাবে হলো? আরএসএসের মূল প্রচারক সুনীল দেওধর দীর্ঘ দুই বছর ধরে তাদের 'আদর্শ' প্রচার করতে গিয়ে গোরক্ষার বিষয়টি কেন তারা ধামাচাপা দিয়ে রাখলেন? পাঁচ বছর আগেও ত্রিপুরায় বিজেপির কোনো পাত্তা ছিল না। পূর্ববর্তী রাজ্য নির্বাচনে তারা ৫০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ভোট পেয়েছিল মাত্র দেড় শতাংশ এবং ৪৯টি আসনেই তাদের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। সিপিএম ৫০টি আসনে এবং কংগ্রেস ১০টি আসনে জয়লাভ করেছিল। এবার কংগ্রেস ত্রিপুরায় কোনো আসনেই জয়লাভ করেনি। এর কারণ, আরএসএসের প্রচারক সুনীল দেওধর ত্রিপুরায় দুই বছর ধরে সেখানে খুব কৃতিত্বের সঙ্গে নিজেদের প্রচার কাজ করেছেন। অপরিমিত অর্থ ব্যয় করে গড়ে তুলেছেন এক বিরাট ক্যাডারভিত্তিক কর্মী বাহিনী। সুনীল দেওধর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইতিপূর্বে আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করে সেখানে একইভাবে গড়ে তুলেছিলেন তাদের ক্যাডার বাহিনী এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করেছিলেন তাদের 'আদর্শ' হিন্দুত্ববাদ প্রচার করে। ত্রিপুরায় তাদের এই তথাকথিত আদর্শের প্রচার থেকে তারা জোর দিয়েছিলেন সিপিএমবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ঐক্যজোট গঠন করে। তার মধ্যে প্রধান হলো আদিবাসীদের সংগঠন ইনডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা। ত্রিপুরায় আদিবাসী ও বাঙালিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ থাকলেও পূর্ববর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সিপিএম এই দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে নির্বাচন করেছিল।
কিন্তু এবার সুনীল দেওধর একজন আরএসএস প্রচারক হিসেবে আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি আদিবাসীদের ভাষা 'ককবরক' এবং বাংলা ভাষা উভয়ই আয়ত্ত করেছিলেন, যা ছিল তার দিক থেকে সংগঠক হিসেবে এক অতি কৃতিত্বপূর্ণ কাজ। বাঙালি ভোটারদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে তিনি দুই লাখ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য সপ্তম বেতন কমিশন গঠন এবং ১০০ দিনের কাজের মজুরি দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ত্রিপুরার রাজ্য সিপিএস সরকারের এই কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। শ্রমিকদের মজুরিও বৃদ্ধি করেনি। তাদের মধ্যে এ নিয়ে যে ক্ষোভ ছিল, বিজেপি তাকে ব্যবহার করেছিল। তাছাড়া যাদের বয়স তিরিশের মধ্যে, তাদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির কথা বলেও তারা প্রচার চালিয়েছিলেন। কাজেই আদিবাসী এবং বাঙালিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও এবার বিজেপি সেই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে এভাবেই তাদের উভয়কে নিজেদের পেছনে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিল। এই সাফল্যের পর আরএসএস নেতা সুনীল দেওধর বলেছেন, তিনি তাদের সংগঠনের কাছে আবেদন জানাবেন কর্ণাটক ও কেরালায় নির্বাচনী প্রচার সংগঠিত করার জন্য তাকে নিযুক্ত করতে। কিন্তু শুধু সুনীল দেওধরই নয়, ত্রিপুরার প্রচার কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তার রাজ্যের গোরখপুরে যে বিরাট হিন্দু মঠ আছে, তার প্রভাব আছে ত্রিপুরার নাথ সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই নির্বাচনে এই নাথ সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আদিত্যনাথ ত্রিপুরায় ঘন ঘন নির্বাচনী সফর করে নির্বাচনে নাথ সম্প্রদায়ের লোকদের সিপিএমের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেছিলেন। এভাবে বিজেপি যে প্রচার অভিযান চালিয়েছিল, তার তুলনায় সিপিএমের নির্বাচনী প্রচার ছিল দুর্বল। ত্রিপুরায় যে পরিবর্তন ঘটছিল তার হিসাব করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কাজেই তারা অনেকটা হাত-পা ছেড়ে দিয়েই এবারকার নির্বাচন করেছিল। বিজেপির শক্ত অবস্থানের মুখে তাদের পরাজয়ের সম্ভাবনা নির্বাচনের কিছুদিনের আগে থেকেই দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি সিপিএমের পক্ষে সম্ভব না হওয়ার মধ্যে তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই পরিচয় ছিল। কাজেই যা তারা ভাবতেই পারেনি, সেটাই ঘটল সদ্য অনুষ্ঠিত এই রাজ্য নির্বাচনে। লক্ষ্য করার বিষয় যে, ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের যে রাজ্যগুলোতে তারা সরকার গঠনে সক্ষম হয়েছে, বিজেপি সরকারের 'আদর্শ' বড় পুঁজির খেদমত এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের খপ্পরে তারা আগে পড়েনি, যেভাবে এটা ঘটেছে উত্তর ভারতের বড় বড় রাজ্যগুলোতে। উত্তর ভারতের বিগত নির্বাচনে জয়জয়কারের পর সেগুলোতে এখন বিজেপির অবস্থা ভালো নয়। গুজরাটে বিজেপি কোনোমতে জয়লাভ করলেও সেখানকার ভোটাররা বিগত রাজ্য নির্বাচনে তাদের ভালোভাবেই ঘোল খাইয়েছেন। এ ছাড়া অন্য কয়েকটি রাজ্যে যে উপনির্বাচনগুলো হয়েছে, সেগুলোতে বিজেপি প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন কংগ্রেসের প্রার্থীদের কাছে। এর পুনরাবৃত্তি যে ভবিষ্যতে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আগামী রাজ্য নির্বাচনে এবং ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে, তার সম্ভাবনা যথেষ্ট। কাজেই আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিলেও এটা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে, জয় তাদের নিশ্চিত। নির্বাচনের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি এক কথা এবং নির্বাচনের পর তা কার্যকর করা অন্য কথা। সিকিমসহ গুরুত্বপূর্ণ ভারতের আটটি রাজ্যে লোকসভার আসন সংখ্যা ২৫। কাজেই এই রাজ্যগুলোতে জয়লাভ যে বিজেপিকে আগামী নির্বাচনে বিপদমুক্ত রাখবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

শ্রীলঙ্কায় পুলিশ ও দাঙ্গাকারীদের সংঘর্ষ

শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিতে চলমান বৌদ্ধ-মুসলিম দাঙ্গা ঠেকাতে দেশজুড়ে জারি করা ১০ দিনের জরুরি অবস্থার মধ্যেই আবারও দাঙ্গাকারীরা মাঠে নামে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়েছে। দেশটির এ অবস্থায় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। পুলিশের মুখপাত্র রুয়ান গুনাশেকারা আজ বুধবার বলেন, ক্যান্ডির শহরতলি ম্যানিকিন্নাতে গতকাল মঙ্গলবার রাতভর এ সংঘর্ষ চলে। এতে অন্তত তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। কারফিউ ভঙ্গ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির দায়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কলম্বো থেকে ১১৫ মাইল পূর্বে ক্যান্ডির সব স্কুল আজ বন্ধ রাখা হয়েছে। শহরে কারফিউর পাশাপাশি ভারী অস্ত্রবাহী পুলিশ মোতায়েন থাকবে। মূলত চা-চাষ ও বৌদ্ধ প্রত্নতত্ত্বের জন্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ক্যান্ডি শহর। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্য সরকার শ্রীলঙ্কায় থাকা নিজের দেশের নাগরিকদের প্রতি ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। তাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে, সব ধরনের বিক্ষোভ ও মিছিল এড়িয়ে চলতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আদেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শ্রীলঙ্কায় থাকা নিজ দেশের নাগরিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে সজাগ থাকতে স্থানীয় গণমাধ্যমে নজর রাখতে বলেছে। গত দুই দিনের এ দাঙ্গায় ১৫০টির বেশি বাড়ি, দোকান ও যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুজন নিহত হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে। ক্যান্ডির মুসলিম মালিকানাধীন দোকানে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী সিংহলিদের খাবারে গর্ভনিরোধক কিছু মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে—এ অভিযোগ তুলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় একটি মসজিদেও হামলা চালায়। সরকার এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দেয়। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়। এরই মধ্যে ক্যান্ডিতে এক সিংহলি খুন হন। এর জের ধরে গত সোমবার মুসলমানদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু কারফিউ না মেনে সহিংসতা চলতে থাকে। জ্বালিয়ে দেওয়া বাড়ি থেকে গতকাল একজন মুসলিমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এতে সহিংসতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কারফিউর মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি ভারী অস্ত্রবাহী বিশেষ টাস্কফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০ জনের বেশি মানুষকে আটক এবং তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ। গতকাল শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। ২ কোটি ১০ লাখ মানুষের এই দেশের ১০ শতাংশ মুসলিম। এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট মন্ত্রী লক্ষ্মণ কিরেইলা পার্লামেন্টে বলেন, ‘বর্বর এই ঘটনার জন্য আমরা মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চাইছে।’ নগরপরিকল্পনামন্ত্রী রাউফ হাকিম দাঙ্গার এ ঘটনাকে ‘নিরাপত্তার ব্যাপক ঘাটতি’ বলে উল্লেখ করেন এবং এ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তামিল বিদ্রোহীদের গৃহযুদ্ধের সময় প্রায় তিন দশক জরুরি অবস্থার মধ্যে ছিল এই দ্বীপরাষ্ট্র। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। এরপর এই প্রথম শ্রীলঙ্কায় আবার জরুরি অবস্থা জারি করা হলো। এ জন্য দেশজুড়ে ১০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। গত নভেম্বরে দাঙ্গায় একজন নিহত এবং বাড়ি-গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৪ সালে বৌদ্ধ ও মুসলমানদের দাঙ্গায় চারজন নিহত হয়। এসব ঘটনার জন্য বৌদ্ধ উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে অভিযুক্ত করে এর কয়েকজন নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। সিংহলিরা দেশটির মোট জনসংখ্যার চার-তৃতীয়াংশ এবং মুসলিমরা মাত্র ১০ শতাংশ।

রুশ সংশ্লিষ্টতা পেলে কড়া জবাব দেবে যুক্তরাজ্য

সাবেক রুশ গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপাল অসুস্থ হওয়ার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলে এর কড়া জবাব দেবে যুক্তরাজ্য। এমনকি রাশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোরিস জনসন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য দেওয়া হয়।
যদিও এখনই এ বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলা যাচ্ছে না বলে বোরিস জনসন মন্তব্য করেন, তবে এই ঘটনা সলসবারির মতো শান্ত একটা শহরে নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে হাউস অব কমন্সকে জানান এই ব্রিটিশ মন্ত্রী। বুধবার যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক সভায় জনসন বলেন, ‘আমি এখনই রাশিয়ার দিকে আঙুল তুলছি না। তবে অন্যান্য দেশের সরকারকে বলতে চাই, যুক্তরাজ্যের মাটিতে নিরপরাধ কারও জীবন নেওয়ার চেষ্টা করলে পরিণতি খারাপ হবে।’ গত রোববার সলসবারি শহরের একটি বিপণিকেন্দ্রে বাইরে বেঞ্চিতে ৬৬ বছরের সের্গেই স্ক্রিপালকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। সে সময় তাঁর ৩৩ বছরের মেয়ে ইউলিয়া স্ক্রিপালও তাঁর সঙ্গে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন বলে যুক্তরাজ্য পুলিশ জানায়। তাঁরা দুজনই অজ্ঞাত বস্তুর সান্নিধ্যে এসে অচেতন হন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত যুক্তরাজ্য পুলিশ জায়াগাটি ঘিরে রেখেছিল বলে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়। সের্গেই স্ক্রিপাল একসময় রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্নেল ছিলেন। ২০০৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ ওঠে। রাশিয়ায় তাঁর ১৩ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে ১০ জন মার্কিন গুপ্তচরের বিনিময়ে তিনি ছাড়া পান। ওই বছরই সের্গেই যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নিয়েছেন। রোববারের ঘটনার কোনো তথ্য রাশিয়ার কাছে নেই বলে গতকাল রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এএফপিকে জানিয়েছেন। পুতিনের এই মুখপাত্র বলেন, ‘মস্কো সব সময় সহযোগিতার জন্য তৈরি।’

ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে ‘চরম উদ্বিগ্ন’ রিপাবলিকানরা

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ নেতারা চরম উদ্বিগ্ন। তাঁদের উদ্বেগ ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে আরোপিত শুল্ক নিয়ে। দলের শীর্ষ নেতা ও হাউসের স্পিকার পল রায়ান বলেন, সম্ভাব্য এই বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন।
এতে বরং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্তই হবে। সম্প্রতি ইস্পাতের ওপর ২৫ ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। দেশে এবং দেশের বাইরে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান ইস্পাত রপ্তানিকারক দেশ কানাডা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। এর ফলে ট্রাম্প বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করছেন বলেও জানায় কানাডা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাও (ডব্লিউটি) ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। এতে অর্থনীতির ক্ষতি হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে চীন। ট্রাম্প তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। গতকাল সোমবার হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার বিষয়ে তাঁর সংকল্পের কথা আবারও জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত থেকে ফিরছি না। এতে বাণিজ্য যুদ্ধের সৃষ্টি হবে না।’ এরপর পল রায়ান এক বিবৃতিতে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য হোয়াইট হাউসের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসার জন্য আমি হোয়াইট হাউসের প্রতি আহ্বান জানাই।’ পল রায়ান বলেন, ‘নতুন কর আইনের ফলে অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে। শুল্ক আরোপের ফলে আমরা সেই লাভ হারাতে দিতে পারি না।’

ফ্লোরিডায় অস্ত্র আইন সংশোধন

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি বিদ্যালয়ে বন্দুকধারীর গুলিতে ১৭ জনের প্রাণহানির পর জনদাবির মুখে অঙ্গরাজ্যের অস্ত্র আইন সংশোধন করা হয়েছে। গত সোমবার ফ্লোরিডার রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেট সংশোধিত অস্ত্র আইন অনুমোদন করেছে। এখন এটা ফ্লোরিডার রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে যাবে।
সংশোধিত আইনে অস্ত্র কেনার জন্য ন্যূনতম ২১ বছর হতে হবে এবং অস্ত্র কেনার আবেদনের পর তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের কাছে অস্ত্র রাখার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সিনেট তা বাদ দিয়েছে। শুরু থেকেই এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছিলেন অভিভাবক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান রাজনীতিকেরা।

সাগরতলে মিলল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণতরি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ডুবে যাওয়ার ৭৬ বছর পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস লেক্সিংটনের সন্ধান মিলেছে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে। প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমে প্রবাল সাগরে (কোরাল সি) জাপানের নৌবাহিনীর সঙ্গে ১৯৪২ সালের ৪ থেকে ৮ মে পর্যন্ত চলা ব্যাপক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ‘লেডি লেক্স’ ডাকনামের এই রণতরিটি ডুবে যায়। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে ৮০০ কিলোমিটার দূরে প্রবাল সাগরের প্রায় তিন কিলোমিটার গভীরে রয়েছে ইউএসএস লেক্সিংটনের ধ্বংসাবশেষ। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা পল অ্যালেনের নেতৃত্বে একটি দল জাহাজটির সন্ধান পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অন্যতম শক্তিশালী এই রণতরির খোঁজ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীও। গত রোববার অ্যালনের প্রতিষ্ঠান ভালক্যান জানায়, এ রণতরিতে ৩৫টি যুদ্ধবিমান ছিল, যার মধ্যে ১১টি এর সঙ্গেই রয়েছে।
লেক্সিংটন ডুবে গেলে এর নাবিকের দুঃসাহসিক প্রচেষ্টায় সাম্রাজ্যবাদী জাপানি নৌবাহিনীর (আইজেএন) যুদ্ধজাহাজ শোকাকু ও জাইকাকুকে একেবারে কার্যক্ষম করে ফেলা হয়েছিল, ফলে যুদ্ধে জাপানিদের পরাজয়ের পথ সুগম হয়েছিল। যুদ্ধজাহাজ ডুবে গেলেও যে কয়েকজন নাবিক বেঁচে যান, তাঁদের মধ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের প্রধান হিসেবে কর্মরত অ্যাডমিরাল হ্যারি হ্যারিসও ছিলেন। এই আবিষ্কারের প্রশংসা করে গতকাল মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘ইউএসএস লেক্সিংটনের একজন বেঁচে যাওয়া সন্তান হিসেবে আমি পল অ্যালান ও লেডি লেক্সের অবস্থান নির্ণয়কারী রিসার্চ ভ্যাসেল (আর/ভি) পেট্রলের দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের অভিনন্দন জানাতে চাই।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানি বাহিনীর অগ্রসর থামাতে প্রবাল সাগরের এই যুদ্ধ প্রধান ভূমিকা রেখেছিল বলে গণ্য করা হয়। যুদ্ধের সময় কয়েকটি জাপানিজ টর্পেডো ও বোমা আঘাত হানার পর মার্কিন বাহিনীই লেক্সিংটনের তলা ফুটো করে দেয়।

মোদির নামে ‘শ্রী’ যোগ না করায়...

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘শ্রদ্ধা’ জানাতে ভুলে যাওয়ায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের এক জওয়ানকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তাঁর সাত দিনের বেতন কেটে নেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। গত ২১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার মহৎপুরে বিএসএফের ১৫তম ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরে বিশেষ কুচকাওয়াজ চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
ওই প্যারেড জওয়ানদের নিয়মিত কসরতের অংশ। প্যারেডের সময় কনস্টেবল সঞ্জীব কুমার এক প্রতিবেদন দেওয়ার সময় ‘মোদির কর্মসূচি’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি মোদির নামের আগে ‘সম্মানিত’ বা ‘শ্রী’ যোগ না করায় এটি অসম্মান প্রদর্শন বলে গণ্য করা হয়। ১৫তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং কর্মকর্তা কমান্ড্যান্ট অনুপ লাল ভগত সঞ্জীব কুমারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংক্ষিপ্ত বিচারে তাঁকে বিএসএফ আইনের ৪০ ধারায় ‘দোষী’ সাব্যস্ত করা হয়।

রোজার জন্য আগাম পণ্য আমদানি

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে আগাম পণ্য আমদানি শুরু করেছেন
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। কারও পণ্য ইতিমধ্যে
চট্টগ্রামমুখী জাহাজে রয়েছে। কেউ কেউ বাড়তি সময় হাতে
নিয়ে পণ্য আমদানির ঋণপত্র খুলছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের
জাহাজজটের কারণে এবার একটু আগেভাগেই পণ্য আমদানি শুরু
করেছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।
পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে আগাম পণ্য আমদানি শুরু করেছেন চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। কারও পণ্য ইতিমধ্যে চট্টগ্রামমুখী জাহাজে রয়েছে। কেউ কেউ বাড়তি সময় হাতে নিয়ে পণ্য আমদানির ঋণপত্র খুলছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজজটের কারণে এবার একটু আগেভাগেই পণ্য আমদানি শুরু করেছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। এ বছর রোজা শুরু হতে পারে ১৭ মে। ফলে এখনো বাকি ৭২ দিন। তবে রোজার বাজার ধরতে সময় নেই আমদানিকারকদের হাতে।
খাতুনগঞ্জে চলছে রোজার প্রস্তুতি। পাইকারি পর্যায়ে এখনো রোজার পণ্য বেচাকেনা শুরু হয়নি। তবে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যাপক ব্যস্ত। গতকাল মঙ্গলবার খাতুনগঞ্জে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোতে সরেজমিনে এমন তৎপরতা চোখে পড়েছে। এত আগে পণ্য আমদানি নিয়ে জানতে চাইলে একাধিক আমদানিকারক প্রথম আলোকে বলেন, বন্দরে জটের কারণে এখন পণ্য হাতে পেতে সময় লাগছে বেশি। এর মধ্যে লাইটার সংকটের কারণে এখন বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতেই দেড়-দুই মাস সময় লেগে যায়। আবার কনটেইনারে পণ্য আমদানিতেও বাড়তি সময় লাগছে। রোজার দেড় থেকে দুই মাস আগে আমদানিকারকের হাতে পণ্য এসে না পৌঁছালে রোজার বাজার হারানোর শঙ্কা রয়েছে। এ জন্যই আগেভাগে আমদানি শুরু করেছেন তাঁরা।ব্যবসায়ীদের আমদানির এই তৎপরতা প্রথম দেখা গেল খাতুনগঞ্জে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে। কয়েকটি ব্যাংকে গিয়ে দেখা গেল পণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলার ব্যস্ততা। ওয়ান ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রাশেদুল আমিন বলেন, খেজুর, ছোলা, মসুর, মটর ডালসহ রোজার নিত্যপণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলা শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারি থেকেই। তাঁদের শাখা থেকে রোজার বহুল ব্যবহৃত পণ্যের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। কাস্টমস ও বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, খাতুনগঞ্জের প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ভোগ্যপণ্যের ৪০ শতাংশ আমদানি করেন। সারা দেশের ভোগ্যপণ্যের ৯০ শতাংশের বেশি খালাস হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ছোলা আমদানির ৮০ শতাংশই করেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। মসুর ডালের ৫৩ শতাংশই আমদানি করেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। মটর ডালের ৬০ শতাংশই আমদানি করেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। তবে চিনি ও ভোজ্যতেলের বড় অংশ আমদানি করেন ঢাকার ব্যবসায়ীরা। খেজুরের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে রোজায়। খাতুনগঞ্জের পাশে আছদগঞ্জের অনেক ব্যবসায়ী এই খেজুর আমদানি করেন। এ সম্পর্কে জানতে আছদগঞ্জের ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালে নিয়ে জানা গেল, প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ফারুক আহমেদ খেজুর আমদানি প্রক্রিয়া তদারকি করতে নিজেই দুবাইয়ে গেছেন। হোয়াটস অ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুবাইয়ের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরাক, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও দুবাই থেকে ৭৫ কনটেইনার খেজুর আমদানি করছেন তিনি। এর মধ্যে আলজেরিয়ার আলজের বন্দরে ২০ কনটেইনার খেজুর জাহাজে বোঝাই করা হয়েছে। এসব খেজুর দুবাই হয়ে কলম্বো বন্দরে প্রথমে আনা হবে। এরপর চট্টগ্রামমুখী জাহাজে তুলে দেওয়া হবে। খেজুরের পাশাপাশি রোজায় বেশি বেচাকেনা হয় ছোলা, মটর, মসুর ডালের। ডালজাতীয় পণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক খাতুনগঞ্জের বিএসএম গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, ‘পণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলার পর বিদেশের বন্দরে জাহাজে আমদানি পণ্য বোঝাই হতে সময় লাগে ২০-২২ দিন। এরপর দেশভেদে রোজার পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে ১৫ দিন থেকে এক মাস লাগে। এখানে আসার পর বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে খালাস শেষ করতে দেড়-দুই মাস সময় লাগে। এসব বিবেচনায় রেখে আমদানি শুরু করেছি।’ বন্দরের কারণে এখনই বাজার ধরতে পারবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন ছোট পর্যায়ের আমদানিকারকেরা। খাতুনগঞ্জের এনটিটি এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার সঞ্জয় দেবের শঙ্কাটা একটু বেশি।
তিনি বলেন, ‘রোজায় অল্প পরিমাণে ছোলা ও ডালজাতীয় পণ্য আমদানি করি। গতবার পণ্য এনে বন্দরের জটের কারণে রোজার বাজারে বেচাকেনা করতে পারিনি। এবার ঋণপত্র এখনো খুলিনি। দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। বন্দরের কারণে যদি সময়মতো পণ্য হাতে না পাই তাহলে তো লোকসানে পড়তে হবে।’ রোজার সময় চিনি ও ভোজ্যতেলের বেচাকেনাও বাড়ে। এর মধ্যে ভোজ্যতেল আমদানিতে সময় কম লাগে। চিনি আমদানির বেশির ভাগ হয় ব্রাজিল থেকে। তাই চিনি আমদানিতে সময় লাগে বেশি। এ দুটো পণ্যবোঝাই জাহাজ আসতে শুরু করেছে বন্দরে।খাতুনগঞ্জের বাদশা মার্কেটের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আরএম এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার শাহেদ উল আলম বলেন, রোজায় যেসব পণ্য বেশি চলে আন্তর্জাতিক বাজারে সব কটির দাম স্থিতিশীল আছে। তবে বিশ্ববাজার অনুকূলে থাকলেও পণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত এখানকার অনেক কিছুই অনুকূলে নেই। যেমন টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় মূল্য বেশি, বন্দরে পণ্য খালাসে সময় লাগায় ক্ষতিপূরণ বাবদ বাড়তি খরচ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ অনেক কিছুই প্রতিকূলে। যোগাযোগ করা হলে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, গত বছর রোজার আগে অনেক ব্যবসায়ী বন্দরের জটের কারণে সময়মতো পণ্য হাতে পাননি। ফলে তাঁরা রোজার বাজারও ধরতে পারেননি। এ কারণে এবার আগেভাগেই আমদানি শুরু করতে হয়েছে। পণ্য আমদানি রোজার চাহিদা অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা এখন থেকেই নজরে রাখা দরকার, যাতে রোজার সময় নিত্যপণ্যের কোনো ঘাটতি না থাকে।

উপসচিবেরা পাবেন সুদবিহীন গাড়ির ঋণ

গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা বিনা সুদের ঋণ পেতে গেলে উপসচিব (ডিএস) হতেই হবে সরকারি কর্মচারীদের। পদমর্যাদার দিক থেকে সমান হলেও বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মচারী, অর্থাৎ উপপ্রধানেরা এ ঋণ পাবেন না। এমনকি একই পদমর্যাদার শিক্ষা বা কৃষি ক্যাডারের কর্মচারীরাও পাবেন না এ ঋণসুবিধা। সচিবালয়ে সোমবার বিসিএস ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ কথা জানিয়েছেন। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে সংগঠনটির নবনির্বাচিত কমিটির সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গাড়িসুবিধা দাবি করা হলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা অসম্ভব। গাড়িসুবিধা পেতে হলে ডিএস হতেই হবে। ডিএস পদমর্যাদার অন্যদের এ সুবিধা দেওয়া যাবে না।’ উপসচিব থেকে শুরু করে তারও উচ্চ পদের সরকারি চাকরিজীবীদের গাড়ি কেনার জন্য সরকার এককালীন ৩০ লাখ টাকা করে ঋণ দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করে গত সেপ্টেম্বরে। ‘বিশেষ অগ্রিম’ নামের এই ঋণের বিপরীতে তাঁদের কোনো সুদ পরিশোধ করতে হবে না। আবার সেই টাকা দিয়ে কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, তেলের খরচ ও চালকের বেতন বাবদ সরকার মাসে আরও ৫০ হাজার টাকা করে দেবে। উচ্চ পদের সরকারি চাকরিজীবীদের ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা’ বলা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব,
সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিব এবং তাঁদের সমমর্যাদার কর্মকর্তারা। গত বছরের জুনে উপসচিবদেরও অন্তত গাড়ি ব্যবহারের দিক থেকে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘোষণা করে সরকার। এরপর গত ২৫ আগস্ট ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা, ২০১৭ (সংশোধিত)’ নামে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, ঋণ পেতে হলে সরকারি কর্মকর্তাকে আগে সার্বক্ষণিক গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হতে হবে। চাকরিজীবনে একবারই এই ঋণ পাবেন যোগ্য কর্মচারীরা। ঋণের অর্থ সর্বোচ্চ ১২০টি সমান কিস্তিতে অর্থাৎ ১০ বছরের মধ্যে আদায়যোগ্য। ৩০ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে মাসিক কিস্তি দাঁড়ায় ২৫ হাজার টাকা। ঋণ নেওয়ার পর প্রতি মাসের বেতন থেকে সরকার কিস্তির টাকা কেটে রাখবে। চাকরির মেয়াদকালে সব টাকা আদায় না হলে সরকার তা কেটে রাখবে কর্মকর্তাদের গ্র্যাচুইটি বা পেনশনের টাকা থেকে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রশাসনে দেড় হাজারের বেশি উপসচিব রয়েছেন। তাঁরা সরকারের পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা। গত ডিসেম্বর থেকেই তাঁরা ঋণ নেওয়া শুরু করেছেন। আর ইকোনমিক ক্যাডারে আছেন ৫০০ জনেরও বেশি। ইকোনমিক ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী জাহাঙ্গীর আলম গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের দেওয়া অনেক সুবিধাই প্রশাসন ক্যাডারের মতোই আমরা পাচ্ছি। কিন্তু গাড়ি ঋণ পাচ্ছি না। অবশ্য প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেলে আলাদা দাবি আর করতে হবে না।’
ইকোনমিক ক্যাডার থাকছে না
এদিকে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে ইকোনমিক ক্যাডার একীভূত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার বলে জানা গেছে। দুই অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যেকার সমঝোতা চুক্তির ভিত্তিতেই এটি হচ্ছে। ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের দাবি ও সচিব কমিটির সম্মতি শেষে একীভূত হওয়ার ফাইলটি অনুমোদনের জন্য এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রয়েছে। কাজী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আছে নয় মাস ধরে। অর্থমন্ত্রীর কাছে আমরা এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতে চেয়েছি। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি এর খোঁজ নেবেন।’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সাল থেকেই ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিভিন্ন দাবি জানিয়ে এলেও তা পূরণ হচ্ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে ইকোনমিক ক্যাডারের একীভূতকরণের বিষয়টি গতি পায়। ২০১০ সালে পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। যদিও ওই কমিটির সুপারিশ কখনো আলোর মুখ দেখেনি। একীভূত হলে ইকোনমিক ক্যাডারের সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বর্তমানে যে জট লেগেছে, তা আর থাকবে না। বর্তমানে এই ক্যাডার থেকে শুরুর দিকের পদবির নাম ‘সহকারী প্রধান’ এবং প্রশাসন ক্যাডারে শুরুর দিকে পদবির নাম ‘সহকারী সচিব’। একীভূত হলে সহকারী প্রধান পদবিটিই আর থাকবে না। তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হতে পারবেন, জেলা প্রশাসকও (ডিসি) হতে পারবেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগে বিরোধিতা করলেও প্রশাসন ক্যাডার এখন ইকোনমিক ক্যাডারকে একীভূত করার ব্যাপারে উৎসাহী।

মহাসড়কে প্রাণঘাতী চাঁদাবাজি

মহাসড়কে যানবাহন থামিয়ে পুলিশের দুই সদস্যের চাঁদাবাজির চেষ্টার পরিণতি হলো মর্মান্তিক: দুটি নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরে গেল; আহত হলেন একটি বাসের ৪০ জন যাত্রীর প্রায় সবাই। এ কেমন দেশ আমাদের? গত রোববার রাতে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার পালাহার এলাকায় ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটির বিবরণ প্রথম আলোয় মঙ্গলবার ছাপা হয়েছে। দুর্ঘটনার শিকার বাসটির যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, সেখানে নান্দাইল হাইওয়ে থানা-পুলিশের কয়েকজন সদস্য চলন্ত যানবাহন থামিয়ে চালকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছিলেন। একটি যাত্রীবাহী বাস তাঁদের পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁরা বাসটির চালকের চোখে টর্চের আলো তাক করলে চালক বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে একজন বাইসাইকেল আরোহী বাসটির নিচে চাপা পড়ে মারা যান এবং বাসটি সড়কের পাশের পুকুরে পড়ে যায়। ফলে একটি শিশু মারা যায় এবং বাসের প্রায় সব যাত্রী বিভিন্ন মাত্রায় জখম হন। এই বিবরণ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে পুলিশের ওই সদস্যরা শুধু অপরাধপ্রবণই নন,
তাঁদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানেরও অভাব রয়েছে। চলন্ত যানবাহনের চালকের চোখে টর্চের আলো ফেললে চালক নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন এবং তার ফলে ওই যানটি দুর্ঘটনায় পড়ে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে—এটুকু সাধারণ জ্ঞান যাঁদের নেই, তাঁরা কী করে পুলিশ বাহিনীতে চাকরি পান, তা গুরুতর ভাবনার বিষয়। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, ওই এলাকার গ্রামবাসী প্রথম আলোকে যেমনটি বলেন, নান্দাইল হাইওয়ে থানা-পুলিশের সদস্যরা মুশলি ও পালাহারের মাঝখানে নির্জন স্থানে প্রতি রাতেই যানবাহন থামিয়ে চাঁদাবাজি করেন এবং এই কাজে তাঁরা চালকদের চোখে টর্চের আলো ফেলার পদ্ধতিটি নিয়মিতভাবেই প্রয়োগ করেন। এর মানে, সেখানে হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি শুধু নিয়মিত ব্যাপারই নয়, অতি মাত্রায় বিপজ্জনকও বটে। তাঁরা এই অপরাধ নিয়মিতভাবে করে চলেছেন যানবাহনের যাত্রীসাধারণের জীবনের পক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পন্থায়। রোববারের দুর্ঘটনাটির পরপর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী হাইওয়ে পুলিশের দুই সদস্যকে ধরে পিটুনি দিয়েছেন, তাঁদের মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন এবং মহাসড়ক অবরোধ করে হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন। অথচ নান্দাইল হাইওয়ে থানা-পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কাছে পুলিশের চাঁদাবাজির অভিযোগ নেই।’ এটা দায়িত্বহীন বক্তব্য। অথবা এই ওসি সব জেনেও না জানার ভান করছেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত নান্দাইল হাইওয়ে থানা পুরোটাই সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ হয়ে উঠেছে কি না।

পেশাজীবী সংগঠনে ভোট উধাও

সাধারণ নির্বাচনের মতো দেশের পেশাজীবী সংগঠনগুলোর আঙিনা থেকেও ভোটের জৌলুশ নির্বাসিত হতে চলেছে। প্রশ্ন জাগছে আমরা কোথায় চলেছি? লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশে যেখানে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ সকল পর্যায়ে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর কথা, সেখানে বিস্ময়করভাবে এর উল্টো যাত্রাই দিনে দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় দেশের শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবী ও সামাজিক সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চার সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির গণতন্ত্রায়ণ প্রক্রিয়ার যোগসূত্র অবিচ্ছেদ্য। উন্নত বিশ্বে জাতীয় পর্যায়ের পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনগুলো শক্তিশালী ও কার্যকর প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করে। উপরন্তু কোনো দেশের সিভিল সোসাইটির কার্যকরতাও বহুলাংশে দলনিরপেক্ষ পেশাজীবী সংগঠনগুলোর শক্তি-সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। ভোটের ঐতিহ্যমণ্ডিত ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো থেকে ভোট উধাও হয়ে যাওয়ার যে তথ্য গতকাল প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএ ছাড়াও দেশের জেলা পর্যায়ের ৬৪টি বণিক সমিতির মধ্যে ৪৭টিতেই (পূর্ণাঙ্গ ভোট মাত্র ১১টিতে) ভোটাভুটি ছাড়া কমিটি এবং কমপক্ষে ২০টির (৫টি করে চেম্বারের শীর্ষ পদে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা) সভাপতি পদে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারা আসীন হয়েছেন। এই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামনের দিনগুলোতে বাদবাকি কমিটিগুলোও একই দশায় পতিত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনজীবী ও চিকিৎসকসহ অন্যান্য কিছু পেশাজীবী সংগঠনেও দূষণ প্রকট হয়ে উঠছে। ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে মারামারি এবং বিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনে জাল ভোটের বিস্তারের অভিযোগ আমাদের আরও বিচলিত করছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি তার আশির দশকের দলনিরপেক্ষ নির্বাচনের গরিমা হারিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সাদা ও নীল দলের কোন্দল এখন আর কোনো লুকোছাপা বিষয় নয়। ডাকসু নির্বাচনের একটা তোড়জোড় শোনা যাচ্ছে, কিন্তু এই নির্বাচন আগেকার সেই গৌরবময় নির্বাচনের কৌলীন্য পুনরুজ্জীবিত করবে, নাকি তা চলতি হাওয়ার ‘পন্থী’ হবে, সেটা আরেকটি বড় প্রশ্ন।
সামাজিকভাবে সর্বত্র গোপন ব্যালট এবং ভোটাধিকারের যে পবিত্রতা, তা নানাভাবে ক্রমাগতভাবে নিচের দিকে নামছে। অথচ অংশীজনদের মধ্যে এ নিয়ে অন্তত প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ভোটাভুটির মর্যাদাহানির সঙ্গে প্রার্থী যাচাই–বাছাইয়েও একটি অভিন্ন রুগ্‌ণ প্রবণতা ক্রমেই আরও পরিষ্কার হচ্ছে। সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ ফ্যাক্টরগুলো আর নেতা বাছাইয়ের মূল নিয়ামক হিসেবে টিকছে না। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হওয়া ব্যক্তিদের মনোনয়নও আসছে বাইরে থেকে। আবার যেখানে গোপন ব্যালটে নির্বাচন হচ্ছে, সেখানেও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মুখ থুবড়ে পড়ছে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি বা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকের মতো শীর্ষ পদগুলোতে কারা প্রার্থী হবেন, তা বড় দলগুলোর উচ্চপর্যায়ে ঠিক হচ্ছে। সব মিলিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আড়ালে একধরনের গোষ্ঠী ও পরিবারতান্ত্রিকতার দুর্ভাগ্যজনক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটছে। প্রভাবশালী পেশাজীবী সংগঠনগুলো সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির বৃত্তে বন্দী হলে কোটারি হিসেবে তারা পরবর্তী সময়ে দলীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে। রাজনীতি আরও দূষিত হবে। তাঁরা সংসদে মনোনয়ন লাভে আরও উৎসাহী হবেন। দশম সংসদের সাংসদ হওয়া ১৭৫ জনের পেশা ব্যবসা, ফলে সংসদে ব্যবসায়ীদের হার এখন ৫০ শতাংশ। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চাইলে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকে দুষলে চলবে না। রাজনীতিকরণের এই দূষণ থেকে সংগঠনগুলো নিজেদের বাঁচাতে না পারলে পেশাজীবীদের ও নিজ অঙ্গনের বৈধ স্বার্থ বিপন্ন হবে। সুতরাং অংশীজনদের জাগতে হবে। আপনারা নিজেরা বঁাচুন, নিজেদের সংগঠন বাঁচান, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাঁচতে, শক্তি জোগাতে সহায়তা দিন।

এ ভাষণটি যেভাবে সারা বিশ্বের হলো by মফিদুল হক

২০১৮ সালের ৭ মার্চ অনন্য তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে। বাঙালি জাতির স্মৃতিতে মহিমান্বিতভাবে খোদিত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে দেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি যে বিশ্বমানবের স্মৃতির অংশ, সে স্বীকৃতি মিলেছে ইউনেসকোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে সেটির অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে। এই স্বীকৃতির পেছনে যে প্রক্রিয়া ও প্রস্তুতি ছিল, তার কিছু বিষয় আজ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া যেতে পারে। স্বীকৃতির তাৎপর্য অনুধাবনে তা সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে। ১৯৯২ সালে ইউনেসকো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার কর্মসূচি প্রবর্তন করেছিল এই বার্তা দিতে যে বিশ্বের গুরুত্ববহ প্রামাণিক ঐতিহ্য সর্বজনের সম্পদ; সবার জন্য তা সংরক্ষিত হওয়া দরকার। ইউনেসকোর ভাষায় এই রেজিস্টার হবে অনন্যসাধারণ মূল্য ও বিশ্বজনীন তাৎপর্যসম্পন্ন প্রামাণিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে সম্মানজনক তালিকা। ২০১৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিধিসম্মতভাবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রেজিস্টারভুক্ত করার আবেদন ইউনেসকোতে পেশ করা হয়। আবেদনকারী ছিলেন সরকারের পক্ষ থেকে ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষে ট্রাস্টি মফিদুল হক। আমাদের উভয়ের ক্ষেত্রে এই আবেদন পেশের পূর্ববৃত্তান্ত রয়েছে। ২০১৩ সালে ইউনেসকো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে আবেদন পেশের পদ্ধতি বিষয়ে কম্বোডিয়ায় এক কর্মশালার আয়োজন করেছিল। বাংলাদেশের ইউনেসকো জাতীয় কমিশন আমাকে সেই কর্মশালায় যোগদানের জন্য মনোনীত করে। ইউনেসকো দীর্ঘ এক আবেদনপত্র পাঠায় পূরণ করে আয়োজিত কর্মশালায় নিয়ে আসার জন্য। নানা যুক্তি-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহকারে ৭ মার্চের ভাষণভুক্তির ফরম পূরণ করে পাঠানো হলেও অনিবার্য কারণে সেই কর্মশালায় যোগদানের সুযোগ আমার হয়নি। তারপর অনেক সময় পার হয়ে গেলেও জীবনের ধন কিছুই বুঝি অপাঙ্ক্তেয় হয় না। ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম ফোন করে জানালেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে তিনি মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্তির আবেদন পেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমার আগে পূরণ করা ফরমটি তিনি পেতে চান।
এরপর চলে তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ও মতবিনিময়। আমরা একযোগে খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আবেদনপত্র জমা দিই ইউনেসকো দপ্তরে। শুরু হয় অপেক্ষার পালা, নীরবে-নিভৃতে কাল গণনা। বছরান্তে পাওয়া গেল অনুকূল খবর। প্রাথমিক বাছাইপর্বে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিবেচনার জন্য অনুমোদিত হয়েছে। তবে সে খবর গোপন রাখার পরামর্শ দেয় ইউনেসকো। কিছু বিষয় বর্জন এবং কিছু বিষয় সংযোজনের সুপারিশও করে তারা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিটির সভার সময়টুকু ছিল উত্তেজনাময়। সেই সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে ইউনেসকোর সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে মহাসচিব ২০১৭ সালের মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডের তালিকা পাঠ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণ লাভ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের জাতীয় তাৎপর্য আমাদের জন্য ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না। তবে ইউনেসকোর কাছে বিশেষভাবে তুলে ধরা দরকার ছিল এর বিশ্বজনীন তাৎপর্য। ইউনেসকোর দিক থেকে প্রশ্ন ছিল, আবেদনকৃত ঐতিহ্য অনন্য ও বিকল্পহীন কি না? এটা কি দীর্ঘকাল জুড়ে কিংবা বিশ্বের কোনো বিশেষ সাংস্কৃতিক এলাকায় প্রভাব সঞ্চার করেছে? ইতিহাসকে তা প্রভাবিত করেছে কি? ইত্যাদি ইত্যাদি। তুলনামূলক বিচারে তিনটি দিকে জোর দেয় ইউনেসকো—সময়, স্থান ও জনগণ। এর অন্তত একটি ক্ষেত্রে ইউনেসকো নির্ধারিত মাপকাঠি পূরণ করতে হবে আবেদনকৃত ঐতিহ্যের। এসবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ ১৭ পৃষ্ঠার আবেদনপত্র পূরণ করতে হয়েছিল আমাদের। ৭ মার্চের ভাষণের কালিক ও স্থানিক বিচারে পাকিস্তানের পীড়ন-শোষণের বিপরীতে বাঙালির জাগরণের ইতিহাস ও পটভূমির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। বৃহত্তর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চের ভাষণ বিচারকালে তৃতীয় বিশ্বের ঔপনিবেশিক দেশের মুক্তি আন্দোলনের নিরিখে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও ভাষণের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক দেশসমূহ একে একে স্বাধীনতা অর্জন করলেও সেসব রাষ্ট্রে নানা অসংগতি বিরাজ করছিল। জনগোষ্ঠীর জাতিগত, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য ধারণ করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও অসংগতি মোচনে নতুন পথ দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো ব্যত্যয় যখন বিশ্বসম্প্রদায় অনুমোদন করেনি, সেই সময়ে প্রথম যৌক্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। এর তাৎপর্য অপরিসীম। বিচ্ছিন্ন হলেও তাঁর আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিল না, ছিল জাতীয় মুক্তির আন্দোলন; জাতি, ধর্ম, ভাষা ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য ও অধিকারের প্রতি মান্যতার ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রের প্রবর্তন। এই আন্দোলনের উত্তুঙ্গ নাটকীয় মুহূর্ত ছিল ৭ মার্চ, যখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শেখ মুজিব বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে কার্যত স্বাধীনভাবে পথচলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল অস্ট্রেলীয় অধ্যাপক হারবার্ট ফেইথের উক্তি, ‘৭ মার্চ ছিল সেই দিন, যখন মানসপটের রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।’ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-উত্তর বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থার মানচিত্র অলঙ্ঘনীয় হবে, এটাই সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছিল। এর জের হিসেবে আমরা দেখি প্রথম মহাযুদ্ধের পর ইউরোপের রাজ্যভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বদলে প্রতিষ্ঠা পায় জাতিরাষ্ট্র, মানচিত্রের অসংগতি অনেকাংশে দূর করে। অন্যদিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক দেশগুলো একে একে স্বাধীনতা অর্জন করলেও মানচিত্রে রয়ে যায় ঔপনিবেশিক অসংগতি। জাতীয় মুক্তির অধিকারের পতাকা হাতে ঔপনিবেশিক অসংগতি দূর করে নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই তিনি কেবল জাতীয় আন্দোলনের নেতা ছিলেন না, ছিলেন তৃতীয় বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনে এক বিশিষ্ট ধারার উদ্গাতা। ইউনেসকো তার স্বীকৃতিপত্রে উল্লেখ করেছে যে উপনিবেশ-উত্তর জাতিরাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থতার নিরিখে এই ভাষণ কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। বিশ্বমানবের মুক্তিসংগ্রামের নিরিখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে বিবেচনায় নিয়েছিল ইউনেসকো। উদার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ করে দিয়েছিল ৭ মার্চের ভাষণ। সেই মূল্যবোধ আজকের সংঘাতপীড়িত বিশ্বে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইউনেসকো তাই কেবল বাঙালি ঐতিহ্য হিসেবে নয়, বিশ্বমানবের সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ৭ মার্চের ভাষণকে। এই বড় পটভূমিকায় ৭ মার্চের ভাষণ ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব উপলব্ধি করার এবং বিশ্বের সামনে তা মেলে ধরার দায়ভার এখন আমাদের ওপর বর্তেছে। কেননা, বঙ্গবন্ধু কেবল বাংলাদেশের নেতা ও স্থপতি ছিলেন না, তিনি মানবের মুক্তি আন্দোলনেরও প্রেরণা, বিশ্বলোকের স্মৃতির অংশী।
মফিদুল হক: ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

বিপ্লবের কাছে সহবত শিখুন by গওহার নঈম ওয়ারা

ত্রিপুরায় গেরুয়ার কাছে লাল পরাজিত হয়েছে। গণক বা গুনিনরা যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তেমনই ঘটেছে। জোরাজুরি, কেন্দ্র দখল, এজেন্টকে মারধর—টুকটাক যে হয়নি, তা বলা যাবে না। তবে এটাও ঠিক, পুরোটাই অনেক অঙ্ক আর ভাবনাচিন্তার ফল। মানিক বাবু এত তাড়াতাড়ি সাবেক হবেন, এটা খোদ সিপিএম কেন, তৃণমূল কংগ্রেস, কেউই ভাবেনি। টাকা ঢালা হয়েছিল শিকড়সুদ্ধ গাছ অন্যের বাগান থেকে তুলে এনে, সার-পানি দিয়ে নিজের গাছ বানিয়ে তাতে ফুল-ফলে ভরিয়ে তুলে গেরুয়া রং দেওয়ার জন্য। চেনাই যাবে না যে অন্যের বাগান অন্য মালির হাতে এসব গাছ বীজ থেকে চারা হয়ে সেসব বাগানকে ফুল-ফল দিয়েছিল একসময়। সেদিনের ছেলে দিল্লিপ্রবাসী বিপ্লব দেবকে এখন দেখতে মানুষের ঢল। আগরতলার বাংলাদেশ মিশন বা ভিসা অফিসের রাস্তাতেই তাঁর বাড়ি, যে রাস্তায় এখন ঢোকাই মুশকিল। সারা সপ্তাহ ভিসাপ্রার্থী মানুষের ভিড়ে এমনিতেই রাস্তাটা সকাল-সন্ধ্যা গমগম করে। এখন রাতদিন নেই শনি-রবি নেই। একাত্তরে শরণার্থী মায়ের গর্ভে থাকা আর ভূমিষ্ঠ হওয়া বাংলাদেশের প্রায় শিশুর নাম যেমন হয়েছে ‘বিপ্লব’ নয় ‘স্বাধীন’ কিংবা ‘মুজিব’ অথবা ‘জয়’, তেমনই একজন এই বিপ্লব। বিপ্লব দেব—তিনিই হয়তো মুখ্যমন্ত্রী হবেন। বেশির ভাগ মানুষের আশার প্রতিফলন হবে তাতেই। কিন্তু রাজনীতিতে সব সময় সব আশার প্রতিধ্বনি শোনা মানা আদিবাসীদের দল আর বিজেপির প্রধান ঘাঁটি ত্রিপুরার আইপিটিএফ ইতিমধ্যেই বড় কুরসিটা দাবি করেছে। এই দলের নেতা নরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা বা এন সি ডির হক দাবি, ‘আমাদের ছাড়া বিজেপি কিছুই করতে পারত না। তাই ওই কুরসি আমাদেরই। আমাদের আদি দাবি, ত্রিপাল্যান্ড।’ মােন ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরাকে আরও খণ্ডিত করে অন্য একটা রাজ্য এখনই চাই।’
বিজেপি এখন রগড় দেখবে না দেখাবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে বিপ্লব যে লাইম লাইটে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁকে নিয়ে কুমিল্লা, চাঁদপুর, কচুয়াতেও মানুষের মনের মধ্যে একটা উৎসব উৎসব ভাব। উৎসব আর আনন্দের ভাব মনের মধ্যে সুপ্ত থাকেনি, মিষ্টি খাওয়া দিয়ে তা প্রকাশিত হয়েছে। এপার-ওপার দুপারের মানুষই খুশি; খুশির জোয়ারে মাথা ঠিক রাখা বেশ কঠিন। উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে বিজেপির প্রধান সিপাহসালার সাবেক কংগ্রেসি ‘নও’ বিজেপি হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভারতের সবচেয়ে সাদামাটা মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বচ্ছতার প্রতীক মানিক সরকারকে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য বকাবাজিতে মত্ত হয়েছেন। টাকার গরমে যেমন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, ক্ষমতার গরমেও তেমনটি হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। সেটাই হয়েছে হিমন্ত আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের। ত্রিপুরার গ্রামেগঞ্জে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ছে। বুলডোজার দিয়ে লেলিনের মূর্তি ভাঙা হয়েছে। গুঁড়িয়ে দিচ্ছে কার্ল মার্ক্সের আবক্ষ। চারদিকে কেমন একটা অশান্তির ধুয়া—ভয় পেয়ে মানুষের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার খবরও আসছে। আমাদের যারা ভোট দেয়নি, আমাকে যারা ভোট দেয় না, তারা চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাক। তাদের সম্পদ এখন আমাদের ভোগের বস্তু। এই মনোভাব এপারে যেমন চাড়া দিয়ে ওঠে, ওপারেও তেমন চাড়া দিচ্ছে। আশার কথা, বিপ্লব দেব এখনো মাথা ঠান্ডা রেখে স্বাভাবিক আচরণ করছেন। শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত মন্ত্রী খগেন্দ্র জমাতিয়ার কফিনবন্দী লাশকে। আগরতলার সিপিএম পার্টি অফিসের স্বল্প পরিসরে খুবই সাদামাটা এক অনুষ্ঠানে—খগেন্দ্র জমাতিয়ার লাশ যেন একটা প্রতীকী লাশের পরিণত হয়েছে। এ লাশ যেন সিপিএমের লাশ। সবারই মন খারাপ। মরদেহে মালা দিয়ে কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা মানিক সরকারকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। কোনো রাজনৈতিক সেলফি তোলার জন্য এই পা ছোঁয়া নয়। এটা প্রায় বাবার বয়সী একজন সদা স্বচ্ছ মানুষের প্রতি আরেক মানুষের শ্রদ্ধা। ফলবান বৃক্ষের মাটির দিকে ঝুঁকে থাকার যেন এক স্বর্গীয় দৃশ্য। বিনয় মানুষকে মানুষ করে। যিনি বিনয়ী, তিনি হারান না কিছুই। বরং তাঁর ঝুলিতে এসে জমা হয় অন্যের শ্রদ্ধা, আদর ভালো লাগা, ভালোবাসা। প্রণামের জবাবে মানিক বাবুও বিপ্লব দেবের পিঠে আশীর্বাদের হাত রাখেন। বিপ্লব দেব প্রয়াত মন্ত্রী খগেন্দ্রের শোকবিহ্বল ছেলেকেও কাছে টেনে সান্ত্বনা দিয়েছেন। এসবই বিনয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সঠিক রাজনৈতিক আর সামাজিক আচরণ। যে বিপ্লবকে আজ আমরা ‘আমাদের ছেলে’ ‘আমাদের ছেলে’ বলে মুখে ফেনা তুলছি, তাঁর নামে মিষ্টিমুখ করার আগে আহা, আমরা যদি তাঁর শিষ্টাচার আর সহবতের একটা তালিম নিতাম। চাঁদপুরে কচুয়ার আরেক সন্তানের দাবিদার দালানে ধাক্কা দেওয়ার তত্ত্বের আবিষ্কারক সাবেক জাঁদরেল আমলা এবং মন্ত্রী নাকি বলছেন, ‘হবে না, আমাদের ছেলে যে।’ মানুষকে অবজ্ঞা করে, ছোট করে, অবহেলা করে কথা বলা এবার হয়তো তিনি বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে বন্ধ করবেন। প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হাততালি দিয়ে হাসবেন না। ব্যাংক লুটে আমির হওয়ার পথে হাঁটবেন না। এসব করলে কচুয়ার সন্তান বিপ্লবের অসম্মান হবে।

কোটাব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি by মো. তৌহিদ হোসেন

সরকারি চাকরিতে, আরও সঠিকভাবে বললে, বেসামরিক প্রশাসনের চাকরিতে একটা কোটাব্যবস্থা বিদ্যমান আছে। বিভাজনটা সবাই জানেন, তবু এখানে উল্লেখ করছি: বিজ্ঞাপিত পদের ৪৫ শতাংশ চাকরি দেওয়া হবে মেধার ভিত্তিতে। অবশিষ্ট ৫৫ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, যা এখন তাঁদের সন্তানসন্ততি, নাতি-নাতনিদের জন্য বরাদ্দকৃত। ১০ শতাংশ নারীর জন্য, ৫ শতাংশ উপজাতীয় কোটা, অবশিষ্ট ১০ শতাংশ জেলা কোটা। প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ কোটা আছে, তবে তা উল্লেখিত কোটাগুলোর কোনো অব্যবহৃত অংশ থেকে দিতে হবে। সমাজে প্রতিবন্ধীদের জীবন যেমন প্রান্তিক, কোটাব্যবস্থায়ও তাদের তেমনি প্রান্তিক অবস্থানে রাখা হয়েছে। কোটাব্যবস্থার পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর কথাবার্তা, মতামত, লেখালেখি হয়ে থাকে। বলা বাহুল্য, পক্ষে কম, অধিকাংশ মতামতই বিপক্ষে। নিদেনপক্ষে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার সংস্কার যে কাম্য, তা প্রায় সবাই স্বীকার করেন মুষ্টিমেয় প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী ছাড়া। কোটাব্যবস্থা তরুণসমাজের যে অংশের জন্য চাকরিপ্রাপ্তিকে অনেক কঠিন করে তুলেছে, তাদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে রয়েছে প্রবল ক্ষোভ। অনেকে বিষয়টিকে খুব সংবেদনশীল বিবেচনা করে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করেন। আমার মনে হয়, এই বিতর্ক আজ এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন এবং কঠিন হলেও এর সংস্কারে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হবে না। কোটাব্যবস্থা আইনসিদ্ধ কি না-এ প্রশ্ন অনেক সময় উত্থাপিত হয়। এ ব্যাপারে আমাদের সংবিধান কী বলে? সংবিধানের ১৯ (১) ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্র প্রজাতন্ত্রের সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।
২৯ (১) ধারায় আবার বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে এর ব্যত্যয় করার ব্যবস্থাও আমাদের সংবিধানে আছে। সংবিধানের ২৯ (৩) ধারায় অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার এবং প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়াকে আইনসম্মত করা হয়েছে। বিদ্যমান কোটাব্যবস্থাকে সংবিধানের এই প্রভিশনের আলোকে বিচার করতে হবে। আমাদের দেখতে হবে, কোটাব্যবস্থার সুবিধা যাদের আমরা দিচ্ছি, চূড়ান্ত বিচারে তারা অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে কি না। প্রথমেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তুলনামূলক অনগ্রসরতার মাপকাঠি কী হবে। আমার মনে হয়, যেকোনো জনগোষ্ঠীর সংখ্যার তুলনায় চাকরিতে বা লেখাপড়ায় তাদের তুলনামূলক প্রতিনিধিত্ব যদি কম থাকে, তবে তাদের ওই পরিমাণ অনগ্রসর হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কোটার লক্ষ্য যদি হয় অনগ্রসরদের এগিয়ে নিয়ে সামাজিক সমতাবিধান, তাহলে তুলনামূলক প্রতিনিধিত্ব অর্জন না করা পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রে কোটাব্যবস্থা বজায় রাখা আমাদের সংবিধানের আলোকে যথাযথ বলেই মনে হয়। নারী কোটা নিয়েই শুরু করা যাক। আজকাল প্রায়ই দেখি কেউ কেউ বলেন যে নারীরা তো কম মেধাবী নন, আর তা ছাড়া তাঁরা তো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বেশ ভালো করছেন, তাহলে আর এই কোটা রাখার যৌক্তিকতা কোথায়? এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁদের সবিনয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। নিঃসন্দেহে নারীরা আগের তুলনায় অনেক ভালো করছেন, তাঁদের মেধা নিয়েও সন্দেহ করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ১০ শতাংশ কোটা থাকার পরও তাঁরা কোনো ক্যাডারেই অর্ধেক চাকরি পাননি। কোটা না থাকলে চিত্রটা কী হতো, তা অনুমান করা কঠিন নয়। নারী কোটা থাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তর্ক তাই অর্থহীন। যে শুভদিনে আমাদের নারীরা কোটা ছাড়াই অর্ধেক চাকরি পাবেন, সেদিন থেকে নারী কোটা তুলে দেওয়া অবশ্যই যুক্তিযুক্ত হবে। ৫ শতাংশ উপজাতি কোটা চালু হয়েছে সম্ভবত ১৯৯৭ সাল থেকে। বাংলাদেশের উপজাতি জনসংখ্যা সার্বিক জনসংখ্যার ১ শতাংশের বেশি নয়। বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই, তবে এটা দৃশ্যমান যে অনেক ক্যাডার চাকরিতেই উপজাতীয়দের সংখ্যা এখন ১ শতাংশের বেশি। বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখে কালক্রমে এই কোটা সর্বোচ্চ ২ শতাংশে সীমিত করা যায়। ১০ শতাংশ জেলা কোটা আমার কাছে খানিকটা অদ্ভুতই মনে হয়। যে জেলা থেকে ক্যাডার পদে যথোপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব আছে, তার কোটা থাকার যৌক্তিকতা কী, তা আমার বোধগম্য হয় না। প্রতিনিধিত্বের বিচারে তলানিতে পড়ে আছে যে জেলাগুলো, শুধু সেই জেলাগুলোকে জেলা কোটার আওতায় রাখা প্রয়োজন। সীমিতসংখ্যক এরূপ জেলার ক্ষেত্রে কোটা বজায় রাখলে সমতাসাধনের লক্ষ্য অর্জন অনেকটা সহজ হতে পারে। মুক্তিযোদ্ধা কোটার ব্যাপারে সরাসরি ভুক্তভোগী ছাড়া সহজে কেউ কিছু বলতে চান না। সংবেদনশীল বিধায় বিষয়টি অনেকেই এড়িয়ে চলেন, পাছে তাঁদের প্রতি কোনোরূপ অসম্মান প্রকাশ পায়। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে স্বাধীন করেছেন, বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের চিরদিন পরম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে। আমি নিশ্চিত, একজনও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ব্যক্তিগত লাভ বা পদ-পদবির আশায় যুদ্ধে নামেননি।
আর তাই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের নিয়োগের যথার্থতা নিয়ে আলোচনা হলে তাতে তাঁদের অমর্যাদা হয়, আমার তা মনে হয় না। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত অমর্যাদা যদি কিছুতে হয়ে থাকে তা হলো বরং গত কয়েক বছরে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ কেলেঙ্কারি এবং তার মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রশাসন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকর্তার অভাব ছিল। তড়িঘড়ি করে নামমাত্র পরীক্ষা নিয়ে বেশ একটা বড়সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল (সংখ্যাটি সম্ভবত ১ হাজার ৩১৪ জন, যাঁদের বড় অংশকে পদায়ন করা হয়েছিল প্রশাসন ও পুলিশে)। আমার মনে হয় (আমার এই ধারণা ভুল হওয়াও সম্ভব) শূন্যপদ পূরণ ছাড়াও বিজয়ীর বেশে ফিরে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তত একাংশকে পুরস্কৃত করাও এই নিয়োগের পেছনে বিবেচ্য ছিল। আমলাতন্ত্রের পরিমণ্ডলে অনুগত একটি গ্রুপ সৃষ্টির লক্ষ্য থাকাও অসম্ভব নয়। যত দূর জানি, অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন এরূপ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমবেশি দুই লাখ। প্রকৃত সংখ্যাটা আমি জানি না, আমার জানামতে কেউ জানে না। এর মধ্যে বিরাটসংখ্যক ছিলেন ছাত্র, যাঁরা লেখাপড়ায় ফিরে গেছেন। অনেকে অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান, সরকারি চাকরিতে আগ্রহ ছিল না। অনেকের বয়স ছিল বেশি, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের মতো নয়। তাঁরা যদি সংখ্যায় মোটামুটি অর্ধেক হয়ে থাকেন, তো এরপর বাকি থাকে এক লাখ। সরকারের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা থেকে পিয়ন পর্যন্ত, সেই সঙ্গে পুলিশ আর সেনাবাহিনী মিলিয়ে এই এক লাখ মুক্তিযোদ্ধার সবাইকে পরিকল্পিতভাবে পর্যায়ক্রমে চাকরি দেওয়া সম্ভব ছিল। এটি হতে পারত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সার্বিক পুনর্বাসন প্রকল্প, যা একই সঙ্গে যুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন দেশটির সামাজিক স্থিতিশীলতায়ও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারত। পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করছেন বা রিকশা চালাচ্ছেন, এমন খবর দেখার দুর্ভাগ্য আমাদের হয়েছে। উল্লিখিত কার্যক্রম নিলে হয়তো আমরা এরূপ অঘটনকে পাশ কাটাতে পারতাম। যাহোক, এই ‘মুক্তিযোদ্ধা ব্যাচ’-এর নিয়োগের পর যখন সিভিল সার্ভিসে নিয়মিত নিয়োগ শুরু হলো, তখন প্রতি ব্যাচে প্রতি ক্যাডারে মোট নিয়োগের ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত হলো (মেধায় যে মুক্তিযোদ্ধারা চাকরি পাবেন, এই হিসাব তার বাইরে)। দুঃখজনক সত্য হলো, এই সুবিধা বহাল হলো যেদিন থেকে, সেদিন থেকেই শুরু হলো ভুয়া সনদ জোগাড়ের মাধ্যমে এর অপব্যবহার। অসংখ্যবার যাচাই-বাছাই করেও এর হাত থেকে আজও মুক্তি মেলেনি। এই কোটাব্যবস্থার কারণে পরীক্ষায় ভালো ফল করেও যাঁরা কাঙ্ক্ষিত ক্যাডারে স্থান পেতেন না, তাঁরা এতে ক্ষুব্ধ হতেন। অন্যরা ভাবতেন যে আর তো কটা দিন, মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির দরখাস্ত করার বয়স পার হয়ে গেলে বিষয়টা এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টা শেষ হলো না। এক সরকারি নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা পোষ্যদের এই বিশেষ সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হলো। তাঁদের এবং সেই সঙ্গে সন্দেহজনক অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরাও এখন এই সুবিধা ভোগ করছেন। এর ফলে সমাজে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। জন্ম, বর্ণ বা বংশপরিচয় বিবেচনায় কাউকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে সংবিধানের নিষেধাজ্ঞা এর মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। এর ফলে যে দুর্নীতির একটি নতুন ক্ষেত্রও সৃষ্টি হয়েছে, এ ব্যাপারেও তেমন কোনো দ্বিমত নেই। আমার মনে হয়, সময় হয়েছে কোটাব্যবস্থা নিয়ে একটি যৌক্তিক পরিবর্তিত বিন্যাসে উপনীত হওয়ার পক্ষে খোলামেলা আলোচনা শুরু করার। অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা যদি কমবেশি দুই লাখ হয়ে থাকে, তখন তাঁরা ছিলেন মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। বৈবাহিক সূত্রে সম্ভবত সমসংখ্যক মানুষ তাঁদের পরিবারভুক্ত হয়েছেন। তাহলে সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে শূন্য দশমিক ৬। অর্থাৎ রাষ্ট্র ১ শতাংশের কম মানুষের ছেলেপুলে, নাতি-পুতিদের জন্য চাকরির ৩০ শতাংশ পদ নির্দিষ্ট করে রেখেছে (যে ছেলেপুলে, নাতি-পুতিদের কোনো ব্যক্তিগত অবদান নেই একমাত্র মুক্তিযোদ্ধার পরিবারে জন্ম নেওয়া ছাড়া)। এরূপ প্রবল বৈষম্যমূলক একটি ব্যবস্থা প্রজাতন্ত্রের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
খোলামেলা আলোচনার লক্ষ্যে আমি একগুচ্ছ প্রস্তাব রাখছি:
ক. চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করা হোক;
খ. মেয়েদের কোটা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হোক। এই ব্যবস্থা তত দিন বহাল থাকবে, যত দিন না শুরুর পর্যায়ে তাদের নিয়োগ কমবেশি ৫০ শতাংশে পৌঁছায়;
গ. মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে বরাদ্দ করা হোক ৫ শতাংশ চাকরি। মেধায় যাঁরা আসবেন, তাঁরা এর বাইরে থাকবেন। নাতি-পুতিদের এই সুবিধা সম্পূর্ণ বাতিল করা হোক।
ঘ. জেলা কোটা ১০ শতাংশের স্থলে ৬ শতাংশ বহাল থাকুক, তবে এই সুবিধার আওতায় থাকবে শুধু সেই সব জেলা, চাকরিরতদের মধ্যে যাঁদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার অনুপাতের তুলনায় ৮০ শতাংশের কম।
ঙ.৫ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশ কোটা বরাদ্দ হোক উপজাতীয়দের জন্য। তাঁদের প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় এটা যথেষ্ট;
চ. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো প্রকারে প্রতিবন্ধী। তার মধ্যে ২-৪ শতাংশ মানুষ গুরুতর প্রতিবন্ধী। একটি প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে তাদের জন্য ন্যূনতম ২ শতাংশ কোটা নির্দিষ্ট থাকুক, অন্যান্য কোটার অব্যবহৃত অংশ থেকে নয়। আমার এসব প্রস্তাবই যে সর্বোৎকৃষ্ট, এমন দাবি করার ধৃষ্টতা আমার নেই। এ নিয়ে চর্চা হোক, এই আমার প্রত্যাশা। আমি আশাবাদী, এর চেয়ে আরও ভালো সমাধান নিশ্চয় বেরিয়ে আসবে।
মো. তৌহিদ হোসেন: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

কবিতার মতো অপরূপ ভাষণ by আনিসুল হক

৭ মার্চের ভাষণটা এতবার শুনি, কখনো পুরোনো হয় না। যখনই শুনি, গায়ে কাঁটা দেয়। রাস্তাঘাটে যখন চলি, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজতে থাকলে দাঁড়িয়ে পড়ি, শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুনি, শেষ হয়ে গেলে মনে হয়, আরেকবার বাজায় না কেন? বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণটাকে যে কবিতা বলা হয়, তার এটাও একটা কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভালো কবিতা কখনো পুরোনো হয় না, বারবার পড়া যায়, ৭ মার্চের ভাষণও পুরোনো হয় না, হবে না। এই গুণ ধ্রুপদি কবিতার গুণ। নিউজউইক-এর প্রচ্ছদে বঙ্গবন্ধুকে বলা হয়েছিল ‘রাজনীতির কবি’। নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায়ও বঙ্গবন্ধুকে কবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার কবিতা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল লাখ লাখ ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা। কবি মুহাম্মদ সামাদও লিখেছেন, ‘মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি।’ আহমদ ছফা লিখেছিলেন, ‘বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য চর্যাপদ নয়, বৈষ্ণব গীতিকা নয়, সোনার তরী কিংবা গীতাঞ্জলি কোনোটা নয়, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য গীতি হলো “আর দাবায়া রাখতে পারবা না”।’ ওই ভাষণকে কবিতা বলার আরও একটা কারণ বিবেচনায় নেওয়া যায়। কবিতার সংজ্ঞায় বলা হয়, সুন্দরতম শব্দের মহত্তম বিন্যাস। বেস্ট ওয়ার্ডস ইন বেস্ট অর্ডারস। ভালো কবিতায় একটা শব্দও অতিরিক্ত বা কম ব্যবহার করা হয় না, প্রতিটা শব্দকেই হতে হয় অনিবার্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিতে যেন একটা কথাও বেশি বলা হয়নি, একটা কথাও কম বলা হয়নি, একটাও ‘পলিটিক্যালি রং’ বা রাজনৈতিকভাবে ভুল কথা বলা হয়নি।
জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ কবি, কারণ কবির মধ্যে বিগত কয়েক শতাব্দীর এবং সমকালের কবিতার ইতিহাসটা ক্রিয়া করে। সবার ভেতরে করে না। যারা কবি, কেবল তাদের মধ্যে করে। বঙ্গবন্ধু যখন ৭ মার্চের ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখনো যেন তাঁর মধ্যে নদীবিধৌত পলি মাটিতে গড়ে ওঠা এই জনপদের মানুষের হাজার বছরের ইতিহাস ও সমকালের ইতিহাস ক্রিয়া করছিল। তিনি তো জানতেন, হাজার বছরে এই অঞ্চলের মানুষ একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পায়নি। কিন্তু জীবনভর তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, কাজ করেছেন, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে রেখেছেন এই দেশটাকে স্বাধীন করবেন বলে। ৭ মার্চের ভাষণের শুরুতে তিনি সেই ইতিহাসটা অপরূপ কাব্যসুষমান্বিত ভাষায় অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করেন, ‘২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস।’ এরপর তিনি স্টোরিটেলার বা গল্পের কথকের মতো করে বর্ণনা করে গেলেন ওই সময়ের প্রেক্ষাপট। আহ! কী উত্তুঙ্গ পাগলপারা সময় ছিল সেটা। ‘স্বাধীনতা’ ‘স্বাধীনতা’ বলে সারা বাংলা পাগল হয়ে গেছে। ওই তুঙ্গ মুহূর্তটিতে দেশের মানুষকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তো শেখ মুজিব ২৩টা বছর সংগ্রাম করেছেন, সংগঠন করেছেন, জেলে গেছেন, ছয় দফা দিয়েছেন। দেশের মানুষ উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে নিঃশর্তভাবে মুক্ত করে এনেছে, ভালোবেসে তাঁকে উপাধি দিয়েছে বঙ্গবন্ধু। আইয়ুব খানের পতন ঘটেছে, জেনারেল ইয়াহিয়া ক্ষমতায় এসেছেন, মুজিবের একটাই শর্ত ছিল, নির্বাচন দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু জানতেন, নির্বাচন দিলে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন। তিনি পাকিস্তানি সাংবাদিকের সামনে বলেও ফেলেছিলেন, একবার ভোট হয়ে যাক, তারপর ইয়াহিয়া খানের সব শর্ত তিনি ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দেবেন। আমেরিকান কূটনীতিকদেরও তিনি বলে দিয়েছিলেন, তাঁর আসল লক্ষ্য স্বাধীনতা। ১৯৭০ সালের ভোটে পাকিস্তানের উভয় অংশ মিলে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল। কিন্তু পাকিস্তানি জেনারেলরা আর রাজনীতিকেরা মিলে তো গোপন বৈঠক করে ফেলেছেন। বাঙালিকে ক্ষমতা তো তারা দেবেই না, তারা দরকার হলে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করবে। আর বঙ্গবন্ধুরও স্পষ্ট ঘোষণা: আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। এরই মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বানানো হয়েছে, বঙ্গবন্ধু সেই পতাকা উত্তোলনও করেছেন।
ঢাকায় শিল্পী-কবিরা মিছিল করছেন, পোস্টারে লেখা: এক দফা, স্বাধীনতা। ৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হঠাৎ স্থগিত ঘোষণা করলে পুরো বাংলা যেন বারুদে দেশলাইয়ের কাঠি লাগানোর মতো করে জ্বলে উঠেছে। এরই প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্রদের দাবি-আজকেই স্বাধীনতা ঘোষণা করুন। ইয়াহিয়া খান ফোন করেছেন। আমেরিকানরা যোগাযোগ করছে। মাথার ওপর দিয়ে বিমান চক্কর দিচ্ছে। কী বলবেন আজ বঙ্গবন্ধু? সেই বিকেলের স্মৃতিচারণা করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আমরা জানতে পারি, বেগম মুজিব বললেন, তুমি একটু বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নাও। তোমার এক দিকে জনতার দাবি, আরেক দিকে বন্দুকের নল। সারাটা জীবন তুমি বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছ। ঘুমিয়ে নাও। তারপর নিজের হৃদয়ের দিকে তাকাও। কারও কথা শোনার দরকার নাই। তোমার বিবেক যা বলবে, তুমি তা-ই বলবা। বঙ্গবন্ধু একটুখানি জিরিয়ে নিলেন। বেগম মুজিবের কপালে চুম্বন করে তিনি বেরোবেন। সচরাচর রুটে না গিয়ে তিনি অন্য পথে গিয়ে পৌঁছালেন রেসকোর্সে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ভায়েরা আমার...। বল পাঠিয়ে দিলেন ইয়াহিয়ার কোর্টে। ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার মানুষকে হত্যা করা হয়, তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ বলছিলাম, এর চেয়ে পলিটিক্যালি কারেক্ট বা রাজনৈতিকভাবে অভ্রান্ত বক্তৃতা আর হয় না। একটিবারও তিনি আক্রমণ করার কথা বলেননি। একটিবারও তিনি সহিংস পথ বেছে নেওয়ার কথা বলেননি। একবার বলেছিলেন, ‘আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব।’ এক নিঃশ্বাসেই বলেছেন, ‘তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।’ বলে রাখলেন, ‘এই বাংলার হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-ননবেঙ্গলি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে, আমাদের উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার না-ও পারি’...বললেন,
‘যদি এ দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝেশুনে কাজ করবেন...তোমাদের যার যা কিছু তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’ ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।’ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর ভাষায় পলিমাটির সৌরভ, তাঁর কণ্ঠে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার কল্লোল, মেঘের মতোই মায়া আর বজ্র। তাঁর তর্জনীতে বাংলার মানুষের গন্তব্যের নির্দেশনা। পৃথিবীতে কত স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যর্থ হলো, কত আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে রইল, আমাদের হাজার বছরের পুণ্যের ফলে আমরা পেয়েছিলাম শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন শালপ্রাংশু বিশাল মাপের নেতাকে, যিনি তাঁর ত্যাগ, দেশপ্রেম, কারিশমা, শ্রম ও প্রজ্ঞা দিয়ে আমাদের উদ্বুদ্ধ করলেন স্বাধীনতায়, আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন চরিতার্থতা পেল। ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, ‘আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ তাঁর জীবনকাহিনির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে রইল ৭ মার্চের ভাষণ। ইউনেসকো এটাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে সঠিক কাজটাই করেছে। এই ভাষণ সব দেশের সব নিপীড়িত মানুষকেই প্রেরণা জুগিয়ে যাবে চিরকাল।
আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ

ব্যাংক থেকে কমিয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার অধিক হারে ঋণ নেয়ায় দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ‘সরকারি ঋণ পোর্টফোলিও, ব্যয় ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ’ শিরোনামে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকার সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ায় প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টির পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধিসহ ব্যাহত হচ্ছে ঋণ ব্যবস্থাপনার মূলনীতি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত পাঁচ বছরে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণ নেয়ার হার বেড়েছে ২২ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়ার হার কমেছে ২২ শতাংশ। উদ্বেগজনক হল, ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে উল্টো বকেয়া পরিশোধ করছে সরকার। ফলে ট্রেজারি সিকিউরিটিজের সেকেন্ডারি মার্কেট উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। এতে দেশের আর্থিক খাত বড় ধরনের সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কম ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ সরকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত স্বল্পমেয়াদি ঋণ অধিক মাত্রায় গ্রহণ করছে, যা মোটেই কাম্য নয়। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছর সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ হচ্ছে ২৩ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, এ সময়কালে মোট ঋণের প্রায় ৮০ ভাগই গ্রহণ করা হয়ে গেছে। আশঙ্কার বিষয় হল, বেশি মাত্রায় ঋণ গ্রহণের ফলে সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের ঋণ পোর্টফোলিওতে ঝুঁকি ও ব্যয় বাড়ছে। বস্তুত পরিস্থিতি এমন আকার ধারণ করেছে যে, কম সুদ ব্যয়সম্পন্ন ট্রেজারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ না করে অতিরিক্ত সুদ পরিশোধ করে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। আমরা মনে করি, এতে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার মূলনীতিও ব্যাহত হচ্ছে। অস্বাভাবিক হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বৃদ্ধির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশি হলে আমানতকারীরা ব্যাংকমুখী হবেন না। এতে ব্যাংকের আমানত কমবে। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাবে। সবচেয়ে বড় কথা হল, এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বেসরকারি খাতের ওপর। বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক ও পুঁজিবাজার ছেড়ে সঞ্চয়পত্রমুখী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে, যা অনাকাক্সিক্ষত। সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখবে, এটাই কাম্য।

ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টের সফর

ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং তিনদিনের বাংলাদেশ সফর শেষে গতকাল ঢাকা ত্যাগ করেছেন। তার এ সফর আমাদের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন এক সময় এ সফরে এসেছিলেন, যখন মিয়ানমার থেকে আসা দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভার মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। এ সংকট নিরসনে নানামুখী কূটনৈতিক প্রয়াস চলছে। এ পটভূমিতে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের যে একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। স্বভাবতই তার এ সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি প্রাধান্য পেয়েছে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি। রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। আসিয়ানভুক্ত দেশ হিসেবে ভিয়েতনাম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমরা মনে করি। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টের এ সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, যন্ত্র প্রকৌশল এবং সাংস্কৃতিক খাতে সহযোগিতামূলক তিনটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দু’পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক সম্প্রসারণেরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ত্রান দাই কুয়াংয়ের এ সফরের মধ্য দিয়ে এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হল। ভিয়েতনামের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে ভিয়েতনাম যথেষ্ট উন্নত।
এ দুই খাতে দেশটির অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারি। এর বাইরে আরও কোন্ কোন্ খাতে ভিয়েতনামের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া শিক্ষা, ক্রীড়া, পর্যটন ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে দু’দেশের মধ্যে গড়ে উঠতে পারে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মধ্যে নানা বিষয়ে সাযুজ্য রয়েছে। দুই দেশের জনগণই লড়াকু। যে সময় বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের নাগপাশ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, তার আগে থেকেই ভিয়েতনামের জনগণও দখলদার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োজিত ছিল এবং পরে বিজয়ী হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, নিপীড়ক বাহিনীর বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের জনগণের লড়াই আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাছাড়া দুই দেশের পরিবেশ ও সংস্কৃতিতেও মিল রয়েছে। দুই দেশেরই জনসংখ্যা অধিক এবং রয়েছে বিশাল বাজার। বাংলাদেশ সফরকালে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টও এ কথা উল্লেখ করেছেন। দেশটি অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে। ভিয়েতনাম উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশগুলোর একটি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। কাজেই পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশই আগ্রহী হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে কূটনীতি অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে। আজকের বিশ্বে কূটনীতি অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই সম্পর্কের উন্নতি ঘটে এবং তা থেকে লাভবান হতে পারে উভয় দেশই। আমরা আশা করব, ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াংয়ের এ সফরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে।

৭ মার্চের সংবাদ পরিবেশক by এমদাদ হোসেন ভূঁইয়া

আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের অর্গল ভেঙে ‘জেগে ওঠার ডাক’ দেন। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দরাজকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ প্রকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা আসলে এটাই। দৈনিক ইত্তেফাকে খবরটি পরিবেশন করেছিলেন আমির হোসেন। তিনি তখন দৈনিকটির রিপোর্টার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের বিট (খবর পরিবেশন) করতেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নিউজও কভার করতেন তিনি।
এছাড়া আইয়ুব খানসহ তৎকালীন পাকিস্তানি নেতাদের নানা কর্মসূচির খবরাখবর কভার করতেন। আওয়ামী লীগ বিট করার সুবাদে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। গতকাল মঙ্গলবার (৬ মার্চ ২০১৮) ছিল প্রচারবিমুখ, নির্লোভ, নিরহংকার, অকুতোভয় এই সাংবাদিকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। নীরবেই কেটে গেল দিবসটি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন তিনি। এ পেশাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। জীবনে তেমন কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিল না তার। পেশা, পদ-পদবি ভাঙিয়ে বিশেষ কোনো ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে ‘ফায়দা’ নেয়া তার চরিত্রে ছিল না। সর্বশেষ তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক ‘সান’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। ২০১৭ সালের ৬ মার্চ, দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেনের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বর্তমান মাদারীপুর জেলার শিবচরের নিভৃত পল্লীতে। রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছাত্রজীবনে। মাদারীপুরে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘাতকের হাতে শহীদ হওয়ার পর অনেকের মতো তিনিও বৈরী পরিবেশে পড়েন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমির হোসেন তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে বিভিন্ন পত্রিকা ও বার্তা সংস্থায় কাজ করেছেন। বার্তা সংস্থা ‘পিপিএ’-তে যোগ দেয়ার পর ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘বাংলার বাণী’, ‘জয় বাংলা’, ‘বাংলাদেশ টুডে’ এবং বিভিন্ন সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। বাংলার দামাল ছেলেরা দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমির হোসেন তখন ‘বাংলার বাণী’ (অধুনালুপ্ত) এবং সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’র সম্পাদক। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সংবাদ পাঠক এবং সংবাদ বিশ্লেষকের দায়িত্বও পালন করেন। লেখালেখির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অনবদ্য ভূমিকা রাখেন। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ছিলেন আমির হোসেন। তিনি বহু জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখেছেন। লিখেছেন বেশ কয়েকটি বই, যা ‘রচনাসমগ্র’ হিসেবে বের করা যেতে পারে।
এমদাদ হোসেন ভূঁইয়া : সাংবাদিক
emdadhb@yahoo.com