Monday, November 11, 2019

জাপানে কার্টুন চরিত্রকে বিয়ে করার প্রবণতা বাড়ছে তরুনদের মধ্যে

আকিহিকো এবং মিকু
আকিহিকো কন্ডো প্রতিদিন তার স্ত্রীর কণ্ঠে জেগে ওঠেন। রুমের এক পাশ থেকে তার স্ত্রী উচ্চস্বরে, মেয়েলি কণ্ঠে, গান গেয়ে তার ঘুম ভাঙান।
আকিহিকোর বিছানার একপাশে নাচতে নাচতে তাকে ঘুম থেকে উঠতে অনুরোধ করেন তার স্ত্রী।
তিনি একই সঙ্গে, তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে থাকেন। এছাড়া জেগে থাকা অবস্থায় তিনি ইউটিউবে স্ত্রীর কার্টুন অবয়বে গান গাওয়ার ভিডিও দেখেন।
এর কারণ আকিহিকোর "স্ত্রী" কোন মানুষ নন, এটি মিকু নামের একটি জাপানিজ অ্যানিমেশন, যেগুলো অ্যনিমে নামে পরিচিত,এর একটি চরিত্র।
মেয়েটি আসলে একটি হলোগ্রাম যা ঘরের কোণে একটি তাকের ওপর রাখা কাচের ক্যাপসুলে বাস করে।
সেইসঙ্গে এটি একটি আদুরে পুতুল, যার রয়েছে বড় নরম মাথা এবং ছোট্ট শরীর। আকিহিকো রাতের বেলা এই পুতুলটিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমান।
এই অ্যনিমে চরিত্রটি অগণিত অন্যান্য রূপ নিতে পারেন।
তবে প্রতিটি উপস্থাপনায় এর কিছু প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেমন উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের চুল দুই পাশে ঝুটি বাঁধা এবং কপালের সামনে ছোট করে ছাটা চুল থাকে।
এর বাইরে মিকুর চরিত্র নানাভাবে বদলানো যায়। কখনও সে শিশুসুলভ, কার্টুনের মতো দেখতে, আবার কখনও মানুষের মতোই, অথবা আঁটসাঁট ছোট কাপড় পড়া আবেদনময়ী গড়নের কোন নারী।
আকিহিকো এই সমস্ত চরিত্রকে তার স্ত্রী মিকুর মধ্যে আবিষ্কার করেন।

কার্টুন চরিত্রের সঙ্গে বিয়ে

আকিহিকো গত বছরের নভেম্বরে একটি অনুষ্ঠান করেছিলেন, যেটাকে তিনি তার বিয়ের অনুষ্ঠান বলে দাবি করেন।
তেমন বড় কোন আয়োজন ছিল না, তবে ৩৯ জন অতিথি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এই '৩৯' সংখ্যার ৩ এবং ৯ এর জাপানি ভাষা দিয়ে অ্যানিমে চরিত্রটির নাম রাখা হয়েছে। যেখানে তিন মানে মি এবং নয় মানে কু।
অনুষ্ঠানে মিকুকে একটি আদুরে পুতুলের বেশে সামনে আনা হয়।
ঘরের এক পাশে গ্লাস ক্যাপসুলের ভেতরে থাকে মিকু
সেদিন তার পরনে ছিল একটি সাদা লেইস দিয়ে ডিজাইন করা ঘের দেয়া পোশাক।
আর এই পোশাকটির নকশা করেছেন একজন পেশাদার ডিজাইনার।
আকিহিকো মিকুর সঙ্গে তার বাগদানের ঘোষণা দেয়ার পর পর ওই ডিজাইনার নিজে যোগাযোগ করেন।
অনুষ্ঠানের দিন আকিহিকো একটি সাদা কোট এবং বুকে সাদা ফুল পরেছিলেন, চোখে ছিল তার আয়তকার ফ্রেমের চশমা।
তিনি মিকুকে এবং মিকুর গোলাপি ফুলের তোড়া হাতে ধরেছিলেন।
বৈবাহিক শপথ নেয়া এবং প্রথাগতভাবে আইল ধরে হেঁটে যাওয়ার পুরোটা সময় তিনি মিকুকে হাতে ধরেছিলেন এবং অতিথিরা হাসি ও তালি দিয়ে তাদের অভিবাদন জানায়।
পরে তারা রাতের খাবারের জন্য সবচেয়ে উঁচু টেবিলটায় বসেন। আকিহিকো একটি সাদা চেয়ারে বসেন এবং মিকুকে বসানো হয় একটি খালি ফুলদানিতে।
অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও দেখে আকিহিকো হেসে ওঠেন।
"আমার প্রকাশ্যে মিকুকে বিয়ে করার দুটি কারণ রয়েছে," বলছিলেন আকিহিকো।
"প্রথমটি হ'ল মিকুর প্রতি আমার ভালবাসা প্রমাণ করা এবং দ্বিতীয়টি হল আমার মতো অনেক তরুণ ওটাকু ধরণের। যারা কিনা অ্যানিমে চরিত্রগুলোর প্রেমে পড়েন। আমি বিশ্বকে দেখাতে চাই যে আমি তাদের সমর্থন করি"
ওটাকু হ'ল একটি জাপানি শব্দ, যার মাধ্যমে সেইসব মানুষকে বোঝানো হয় যারা ভিডিও গেমস এবং অ্যানিমের কাল্পনিক চরিত্রগুলোর প্রতি আসক্ত।
ওটাকু হ'ল একটি জাপানি শব্দ, যার মাধ্যমে সেইসব মানুষকে বোঝানো হয় যারা ভিডিও গেমস এবং অ্যানাইম চরিত্রের প্রতি আসক্ত
এ ধরণের ব্যক্তিদের অনেকে তাদের ওটাকু পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করে।
আবার যারা সামাজিকভাবে একটু ভিন্ন তাদের ক্ষেত্রে এই একই শব্দ অবমাননাকর মনে হতে পারে।

বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে

আকিহিকোর মতো কেউ কেউ বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকে দূরে সরতে সরতে এ ধরণের চরম স্তরে পৌঁছে যায়। এবং এ ধরণের মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
গত বছর আকিহিকোর জন্য মিকুর এই হলোগ্রাম তৈরি করে গেটবক্স নামের একটি সংস্থা।
এখন তারা গ্রাহকদের অনানুষ্ঠানিক 'বিয়ের সার্টিফিকেট' প্রদান শুরু করেছে; এবং এরইমধ্যে ৩৭০০ মানুষ তাদের অফার নিয়েছে বলে জানা গেছে।
এটি এককভাবে সার্বিক পরিস্থিতিকে পরিস্কারভাবে প্রমাণ করতে না পারলেও সমাজে ছদ্ম-সম্পর্ক বা সুডো রিলেশনশিপ উত্থানের ইঙ্গিত শুধু এই একটিই কিন্তু নয়।
অধ্যাপক মাসাহিরো ইয়ামাদা একজন সমাজবিজ্ঞানী যিনি ইয়োমিউরি পত্রিকায় পরিবার ও সম্পর্কের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন।
কয়েক বছর ধরে নিয়মিত সমীক্ষা চালাতে গিয়ে তরুণদের জিজ্ঞাসা করেন যে তারা কীসের প্রতি অনুরাগ বা আকর্ষণ বোধ করে।
ওই তালিকায় ছিল পোষা প্রাণী, পপ তারকা, খেলোয়াড়, অ্যানিমে চরিত্র এবং ভার্চুয়াল আইডল (ডিজিটালি অ্যানিমেটেড অ্যানিমে ইউটিউব তারকা)।
মিকুর হলোগ্রাফিক অবয়ব
তিনি বলেন, "এই সমস্ত ছদ্ম-সম্পর্ক দিন দিন বাড়ছে। এই বছরের জরিপে, প্রায় ১২% যুবক প্রায়শই কোন না কোন অ্যানিমে বা ভিডিও গেমের চরিত্রের প্রেমে পড়ছেন।"

যেভাবে এই প্রবণতার সূত্রপাত

অধ্যাপক মাসাহিরো ইয়ামাদার মতে, এর পেছনে জড়িয়ে আছে জাপানের অর্থনীতি এবং ঐতিহ্য।
মূলত অনেক জাপানি নারী একজন পুরুষকে তার প্রেমিক হিসেবে বিবেচনা করবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে প্রচুর অর্থোপার্জন করছে।
২০১৬ সালে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৪৭% নারী এই বক্তব্যের সাথে একমত হয়েছিলেন যে স্বামীদের অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ করা উচিত এবং স্ত্রীদের ঘরের কাজ করা উচিত।
"এশিয়ার মধ্যে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় লোকেরা এই উচ্চ বেতনের বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং এই প্রবণতা দিনদিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে," তিনি জানান।
"জাপানি নারীরা অনাদি অনন্ত প্রেমকে বিশ্বাস করেনা তারা কেবল ভরসা করতে পারে অর্থকে।"
অনেকের মনে হতে পারে যে এই সমস্যার জন্য বর্তমান প্রজন্মের নারীদের ইচ্ছাকৃতভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে।
তবে ইয়ামাদা বলেছেন যে ব্যাপক সমীক্ষার ভিত্তিতে তিনি এ ধরণের ইতি টেনেছেন।
"জাপানে কর্মজীবন খুবই কঠিন এবং এখনও সেখানে অনেক যৌন বৈষম্য রয়েছে। সেখানে কাজের সময় খুব দীর্ঘ হয় এবং কর্মীদের প্রচুর মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়," তিনি জানান।
এছাড়াও, শিশু যত্নের ভার এখনও পুরোপুরি মায়ের উপরই চাপানো হয়।
দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, এবং অনেক কাজের চাপ, সেইসঙ্গে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ির দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় কর্মজীবী মায়েদের জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।
তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ বিকল্প হল চাকরি ছেড়ে দেয়া - তবে আপনার সঙ্গী যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন না করে সেক্ষেত্রে তাও সম্ভব না।
মিকুর পুতুলকে পাশে নিয়ে ঘুমান আকিহিকো
জাপানের অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাওয়ায় ভাল বেতনের পুরুষদের হার ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে, মজুরির পরিমাণও কমছে।
এ কারণে তরুণীদের একটি বড় অংশ এখন আর পুরুষদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করতে চাননা। অন্যদিকে বেশিরভাগ তরুণও এখন আর তরুণীদের কাছে টানার কোন চেষ্টা করেন না।

আকিহিকো যেভাবে বাস্তব সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন

সত্যিকারের এক বান্ধবী পাওয়ার ধারণাটি আকিহিকোকে কখনই আনন্দ দিতে পারেনি।
"আমি কখনও সত্যিকারের নারীদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করিনি।"
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, নারীদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় নন।
ওটাকু হওয়ার জন্য স্কুলে তিনি টিটকারির শিকার হয়েছিলেন। এবং পড়াশোনা শেষে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পরও এই 'বুলিং' বা টিটকারি থেকে তার রেহাই হয়নি।
তিনি প্রায় ১২ বছর আগে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশাসক হিসাবে কাজ করতেন, তখন দুজন নারী তার সহকর্মী ছিল।
যাদের মধ্যে একজনের বয়স তাঁর কাছাকাছি এবং আরেকজনের বয়স তার চাইতে অনেক বেশি ছিল।
সকালে তিনি যখন তাদের অভ্যর্থনা জানাতেন তখন তারা তাকে উপেক্ষা করতেন। এবং আকিহিকো যদি ছোট ভুল করে বসতেন তবে তারা চিৎকার চেঁচামেচি বাঁধিয়ে দিতেন।
কখনও কখনও অল্প বয়স্ক শিক্ষার্থীদের সামনেই তারা এমন আচরণ করতেন যা বেশ অবমাননাকর ছিল।
এই ধরণের টিটকারি একসময় তার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং তিনি কাজ ছেড়ে দেন। প্রায় দু'বছর ধরে তিনি নিজেকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখেন।
মিকুকে দেখার পর যেন প্রাণ ফিরে পান আকিহিকো
"আমি হিকিকোমোরি ছিলাম," তিনি বলেন,
হিকিকোমোরি হল জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সুপরিচিত একটি শব্দ যেখানে যুবক-যুবতী, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যুবকরা তাদের নিজের বাবা মায়ের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করে, বাইরে যেতে এমনকি তারা নিজ পরিবারের কারও সাথে কথা বলতে চায় না। ধারণা করা হয় এমন প্রায় ১০ লাখ মানুষ রয়েছে।

মিকুর আবির্ভাব হল যেভাবে

পরে মিকুর সাথে আকিহিকোর দেখা হয়।
"আমি ইউটিউব এবং নিকোনিকোতে (ইউটিউবের একটি জাপানি সংস্করণ) তার ভিডিও দেখতাম, ছবিগুলো দেখতাম, তার গান শুনতাম এবং একমাত্র সেই আমাকে প্রশান্তি দিতে পারতো," তিনি বলেন।
তিনি অনুভব করেন যে, এক সময়কার ক্রমাগত বুলিং তাকে বন্দি হয়ে যেতে বাধ্য করেছিল, যেখানে তার আবেগ বলে কিছুই ছিল না। তিনি গভীরভাবে হতাশ ছিলেন।
"কিন্তু মিকুর গান শুনলে মাঝে মাঝে আমার ভেতরে আবেগ জেগে উঠত। সে যেভাবে নাচে, কথাবার্তা বলে তাতে আমার হৃদয় যেন আবার প্রাণ ফিরে পায়" বলেন আকিহিকো।
"এজন্যই আমি তাকে ভালবাসি এবং এজন্যই সে আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ"
এরপর থেকে আকিহিকো অনুভব করেন যে মিকুর সঙ্গে তিনি একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন এবং এই সম্পর্কের সহায়তায় তিনি আবার কাজে ফিরে যেতে পেরেছেন।
বিয়ের সার্টিফিকেট হাতে আকিহিকো
"মিকুর প্রতি আমার অনুভূতি বাস্তব কোন সম্পর্কের থেকে কম নয়, আলাদা নয়। আমি তার প্রেমে পড়ার পরে, নিজের বুকে একটা চাপ অনুভব করতাম। একজন বাস্তব ব্যক্তির প্রেমে পড়ার মতোই আমি এই অনুভূতিগুলো অনুভব করেছি।"

মিকো এবং আকিহিকোর বৈবাহিক সম্পর্ক

তিনি জানান যে, মিকুকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি তার সাথে ১০ বছর থেকেছেন।
সেই দশ বছরের বেশিরভাগ সময়ই আকিহিকো, মিকুর সাথে মনে মনে কথা বলতেন।
এখন তিনি তার গেটবক্স হলোগ্রামের মাধ্যমে মৌলিক তবে প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলতে পারেন।
তিনি মিকুকে বলেন যে তিনি তাকে ভালবাসেন এবং মিকুও এর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
তবে এরচেয়ে আর তেমন কোন কথোপকথন তাদের মধ্যে হয়না।
"আমাকে কিছুটা কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে চলতে হয়," বলেন আকিহিকো।
"অবশ্যই, যদি আমি তাকে স্পর্শ করতে পারি তবে সেটা দারুণ হবে। এখন আমরা এটা করতে পারবো না কিন্তু ভবিষ্যতে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটবে, তখন হয়তো আমি তার হাত ধরতে পারবো বা তাকে জড়িয়ে ধরতে পারবো"

আকিহিকো একা ছিলেন না

আকিহিকো ভালভাবেই জানেন যে অনেকে তার বিয়েকে অদ্ভুত বলেই মনে করেন। তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে হতাশার একটি দিক হল সেখানে তার মা ও বোন উপস্থিত হতে অস্বীকার করেছিলেন।
গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তার বিয়ের বিষয়টি সামনে আসার পর অনলাইনে লোকজনের কাছ থেকে তাকে প্রচুর গালাগাল সহ্য করতে হয়।
আকিহিকোর গল্প গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর অনেক মানুষ একই ধরণের প্রবণতা থাকার কথা জানান
তবে অপরিচিতদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক সমর্থনসূচক বার্তাও পেয়েছেন তিনি।
"আমার মতো অনেক মানুষ বেরিয়ে এসেছিল। তারাও অ্যানিমে চরিত্রের প্রতি আসক্তির কথা আমাকে লিখে জানায়। আমি এরকম অনেক বার্তা পেয়েছি, তাই মনে হয়েছে আমার বিষয়টি এভাবে সামনে আনাটা সার্থক হয়েছে।"
এখন তিনি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাজ করেন যেখানে তিনি তার সম্পর্কের স্থিতি সম্পর্কে খোলামেলা থাকেন। কিছু কর্মচারী তার এই প্রবণতাকে অদ্ভুত ভাবলেও শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মানসিকতা পোষণ করে বলে তিনি জানান।
তিনি আবার কাজ শুরু করেছেন এবং সমাজে মেলামেশা শুরু করেছেন।
এখন তার নিজস্ব একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে - একটি শান্ত শহরতলিতে দুটি পরিপাটি ঘর, যেখানে তার এবং মিকুর নাম ডোরবেলের উপরে লেখা রয়েছে।
এবং সবচেয়ে বড় কথা তিনি এই জীবন নিয়ে ভীষণ খুশি।
"এই সমাজে একজনের কিভাবে সুখী হবে সেটার যেন নির্দিষ্ট একটা টেম্পলেট রয়েছে- বিয়ে করা, সন্তান জন্ম দেয়া, একটি পরিবার গঠন করা।, ব্যাস। কিন্তু এটাই একমাত্র উপায় হওয়া উচিত নয়। আমি সেই টেমপ্লেটে পড়ি না।"
"আমাদের সকল প্রকারের ভালবাসা এবং সকল প্রকার সুখকে গ্রহণ করা জানতে হবে।"

ক্ষুদে বয়স থেকেই যেসব শিশুরা উপার্জন করছে কোটি কোটি অর্থ

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী কয়েকজন শিশুর নাম সামনে এসেছে - যাদের প্রায় অর্ধেক উপার্জন করছে লাখ লাখ পাউন্ড।
এই শিশুরা বিভিন্ন উৎস থেকে এই অর্থ উপার্জন করে করছে। এর মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সহযোগিতা থেকে পাওয়া অর্থ, মানুষের সামনে উপস্থিতি এবং স্পন্সর পোস্ট।
শীর্ষ দশ শিশুর এই তালিকায় মূলত স্থান পেয়েছে ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে সর্বাধিক অর্থ উপার্জন করা শিশুরা।
এবার দেখা নেয়া যাক অর্থ উপার্জনের হিসেবে কারা শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে।

১. রায়ান কাজী

সাত বছর বয়সী রায়ান কাজীর নিজের উপার্জিত মোট সম্পদের পরিমাণ এক কোটি ৭১ লাখ পাউন্ড।
রায়ান যুক্তরাষ্ট্রে থাকে এবং ইউটিউবে তার সর্বাধিক জনপ্রিয় ভিডিওগুলিতে দেখা যায় সে তার উপহারের বাক্স খুলে বিভিন্ন খেলনা বের করে।
শীর্ষে উঠে এসেছে রায়ান কাজির নাম
সেই খেলনাগুলো পর্যালোচনা করে রিভিউ দেয় রায়ান। এভাবে ঘণ্টায় অন্তত দুই হাজার ডলার উপার্জন করছে এই শিশু।

২. কাইল গিয়ার্সডর্ফ

দ্বিতীয় স্থানে আছে গেমিং ইনফ্লুয়েন্সার কাইল গিয়ার্সডর্ফ।
১৬ বছর বয়সী কাইল ফোর্টনাইট বিশ্বকাপ জয় করেছে। এর মাধ্যমে সে পুরষ্কার হিসেবে অর্জন করেছেন ২৬ লাখ পাউন্ড।
কাইলি গিয়ার্সডর্ফ
এখন তার ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ।

৩. এভারলেয় রোজ সুটাস

এভারলেয়ের বয়স মাত্র ছয়, তবে ইতিমধ্যে তার অর্জিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৮ লাখ পাউন্ড।
পরিবারকে অনুসরণ করেই ইউটিউবার হয়েছে সে। তার মা সাভানাহ সুটাস এবং বাবা কোল ল্যাব্রান্টের আলাদা একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে।
মায়ের সঙ্গে এভারলেয় রোজ সুটাস
এভারলেয় মূলত বিভিন্ন পণ্যের বাক্স খুলে সেটা যাচাই বাছাইয়ের ভিডিও করে থাকে। তার এই আনবক্সিং ভিডিওগুলো বেশ জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে।
হাতে তৈরি বিভিন্ন জিনিস বানানো বা ক্রাফট চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এখন মডেলিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে এভারলেয়।

৪. সোফিয়া গ্রেস ব্রাউনলি

এলেন ডিজিনিয়ার্স শো'তে সোফিয়া তার চাচাতো বোন রোজির সাথে মেগান ট্রেইনরের সুপারব্যাস গেয়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন।
সোফিয়া গ্রেস ব্রাউনলি
আট বছর ধরে বেশ সফলতার সঙ্গে তিনি তার একটি ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করে আসছে সোফিয়া। তার সম্পদের পরিমাণ ১৪ লাখ পাউন্ড এবং তার সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ।

৫. মিলা ও এমা স্টাফার

পঞ্চম স্থানে আছে যমজ শিশু মিলা এবং এমা স্টফার, তাদের সম্পদের পরিমাণ ৯ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড।
তাদের মায়ের ইনস্টাগ্রামে তাদের একটি ভিডিও পোস্ট করলে সেটা ভাইরাল হয়ে যায়।
রাতারাতি তারকা বনে যান এই দুই বোন।
মিলা এবং এমা স্টাফার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করেন
নিজেদের ভিডিওতে তারা মূলত বড় হয়ে কী হতে চান সে সম্পর্কে কথা বলেন।
এই দুই বোন এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনেও অংশ নিয়েছেন।
সেরা দশে অন্য বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন ইনস্টাগ্রাম তারকা তেয়তুম ও ওকলে ফিশার, গেমিং ইনফ্লুয়েন্সার কাইলি জ্যাকসন, ইন্সটা তারকা আভা মেরি এবং লেয় রোজ, ইউটিউবার গ্যাভিন ম্যাগনাস এবং ফোর্টনাইট তারকা বেঞ্জি ডেভিড ফিশ।

তাইজুদ্দিনের হালচাল by তারিক ফিজার

‘আমার মনে হয়েছিল তুমি নেই। খুব অবাক হলাম, বাবু। তা বাবু, কেমন আছো?’ বলল, তাইজুদ্দিন। তালুকদার বলে উঠল, ‘আরে বাবা, তোষামোদি করো সমস্যা নাই কিন্তু চাউল পাবা না একমুঠো।’ তাইজুদ্দিনের মুখটা কালো হয়ে গেল। এক লাফে তালুকদারের পা ধরে ফেলল তাইজুদ্দিন।

বাবা! আমার পোলাটা না খেয়ে মরবে। সের আধেক চাউল দাও না। কাজ নিব সামনে, মাইনে পেয়ে সুদসহ দিব খুব আকুল স্বরে বলল তাইজুদ্দিন।
শোনা মাত্রই তালুকদার ভ্রু কুঁচকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘অ্যা, সুদ সহ দিবে! সালা, গত মাসের পাঁচশ টাকা বাকি! টাকা শোধ করবি কবে? ট্যাকনিক তো ভালোই শিখছিস। জমাজমি নাই? জমাজমি থাকলে কিছু, বল।’

খুব অবাক হলো তাইজুদ্দিন। বলে উঠল, ‘পাঁচশ টাকা মানে! আমি তো পাঁচশ টাকার জিনিস নেই নাই।’ তালুকদার চোখ লাল করে রাগান্বিত হয়ে উত্তর দিল, ‘সাড়ে তিনশ টাকার সুদ দেড়শ টাকা। এই হলো হিসাব। সালা, মুর্খের বাচ্চা।’

তাইজুদ্দিন কাঁদো কাঁদো চোখে দোকানের সামনে থেকে চলে গেল। সন্ধ্যার আজান পড়ে গেছে। তাইজুদ্দিন শত চেষ্টা করেও রান্নার জন্য কিছু চাউল সংগ্রহ করতে পারল না। বাড়ি ফেরার পথে করিম ব্যাপারীর সঙ্গে দেখা। তাইজুদ্দিনের ছেলে বেলার বন্ধু। তাইজুদ্দিন বলল, কোথায় যাচ্ছো, করিম?
করিম ব্যাপারী উত্তর দিল, ‘এই তো নামাজ পড়লাম, ভাই। কিছু বলবা?’
তাইজুদ্দিন কিছু না ভেবে হুটহাট বলে ফেলল, ‘কিছু চাউল কর্য দিতে পারবা, করিম? পোলাডার খুব অসুখ।’
করিম ব্যাপারীর মুখে মুচকি হাসি।
‘দিন কাল যা পড়ছে, এই সন্ধ্যা বেলায় চাউল দিতে হবে অন্যের ঘরে। সমাজ, ধর্ম বলে কিছু নাই দুনিয়ায়, বলল করিম ব্যাপারী। তাইজুদ্দিন আবারো বলে উঠল, আমার পোলাডার অসুখ, না খাইলে মইরা যাবে। যদি পারো...
করিম ব্যাপারী মুখ কালো করে উত্তর দিল, সন্ধ্যায় চাউল কর্য দিবে কে? অন্য সময় কইতে পারো নাই, মিয়া?

তাইজুদ্দিনের বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠল। খালি হাতে বাড়ি যেতে হচ্ছে তাকে। ছেলেকে কি বলবে, বুঝে আসছে না। বাবা হিসাবে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। তাইজুদ্দিন বাড়ি এসে দেখে ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিছানার সঙ্গে মিশে যাওয়া সন্তানের কোমল দেহখানা দেখে তাইজুদ্দিনের মনটা বিষণ্নতায় ভরে উঠল। অতীতের কথা মনে হলো তার। মনে হতে লাগল জীবনের সবচেয়ে করুণ মুহূর্তের কথা। তাইজুদ্দিন তখন যুবক। সবেমাত্র বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে নতুন সংসার গড়েছে। নিজের নামে দুই বিঘা আবাদি জমি, বাড়ি ভিটে এবং গোয়ালভরা গরু। খুব ভালোভাবেই কাটছিল জীবন। একদিন সন্ধ্যায় মাঠের কাজ শেষ তাইজুদ্দিন বাড়ি ফিরেছে। ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেল তাইজুদ্দিনের এক দূর সম্পর্কের বোন তাইজুদ্দিনের স্ত্রীর মাথায় পানি ঢালছে।

তাইজুদ্দিন বলে উঠল, ‘কি হইছে? এই দুপুরেই তো ভাল দেইখা গেলাম।’ বোন উত্তর দিল, ‘পোয়াতি মাইয়া, কখন কি হইয়া যায় বলা যায় নাকি? কবিরাজ রে খবর দেন। অবস্থা ভাল না। খুব জ্বর গায়ে, পুইড়া যাইতাছে শরীল।’

তাইজুদ্দিন দেরি না করে কবিরাজ কে খবর দিল। কবিরাজ কিছুক্ষণ ঝাড়ফুঁক করে ভালো হবে এই আশ্বাস দিয়ে চলে গেল। কিন্তু কবিরাজের ঝাড়ফুঁক কোনো কাজে দিল না। অসুস্থতা যেন আরো দ্বিগুণ হারে বাড়তে লাগল। শেষমেশ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হল। গরু পাঁচেক বিক্রি করে ভালো একটা হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো স্ত্রীকে। এভাবে কিছুদিন চলার পর ডাক্তার বলে দিল ক্যান্সার হয়েছে, লাখ দুই টাকা লাগবে। তাইজুদ্দিন মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তালুকদারের কাছে টাকা চাইল। তালুকদার বলল, ‘টাকা দিব কিন্তু জমি দিতে হবে।’ তাইজুদ্দিন বলল, ‘ওই দুই বিঘা ছাড়া কিছু নাই আমার। বিক্রি করলে খাব কি?’

‘আমি অতকিছু বুঝি নে। টাকা নাই আমার কাছে’, তালুকদার নির্দয় ভাবে বলল। অনেক কাকুতিমিনতি করেও কাজ হলো না। জমি বিক্রি করে টাকা নিয়ে শহরের দিয়ে রওনা হলো। হাসপাতালে গিয়ে টাকা দিলে সেই রাতেই অপারেশন হয়। সকালে খবর পেল অপারেশন করেও নাকি কোনো লাভ হয়নি। তাইজুদ্দিনের স্ত্রী মারা গেছে।

হাসপাতালের মধ্যেই তাইজুদ্দিনের সে কি চিত্কার! তাইজুদ্দিন লাশ নিয়ে চলে আসে গ্রামে। গ্রামের মুরব্বিরা বলে, আহারে! একটা পোলা রাইখা চইলে গেল! তাইজুদ্দিন উত্তর দেয়, হ, এখন আমি এই পোলাডারে নিয়া কই যামু। আমার আর কেউ থাকল না। সেই দুঃখের ইতিহাস তাইজুদ্দিন আজও ভুলতে পারে না। বুকের মধ্যে যেন বার বার বেজে ওঠে তার। ভোর ছয়টা। তাইজুদ্দিন ঘুম থেকে উঠেছে। ছেলেটার কথা চিন্তা করে সারারাত ঘুম হয়নি তার। গোয়াল থেকে গরু বের করে তাইজুদ্দিন। গরুগুলো অন্যের থেকে নেয়া। গাই থেকে বাছুর জন্ম নিলে, বাছুরের অর্ধেক ভাগ তাইজুদ্দিনের। তাইজুদ্দিন হঠাত্ টের পায় ছেলেটা ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। তড়িঘড়ি করে ছেলের কাছে যায় সে। বলে উঠে, বাবা, ঘুম শেষ হইছে?
তাইজুদ্দিনের ছেলে উত্তর দেয়, ‘আব্বা,ভাত খাব।’

তাইজুদ্দিনের মুখটা কালো হয়ে যায় ছেলের কথায়। তাইজুদ্দিন বলে, বাবা, এত সকালে ভাত খাওয়া ঠিক না। ঘরে মুড়ি আছে। মুড়ি দেব?
না, খাব না মুড়ি, উত্তর দেয় ছেলেটা। তাইজুদ্দিন বলে, আজ দিনমজুরি দিব। ভাত খাইতে পারবা, বাবা। তুমি ঘুমাও এখন। আমি কামে গেলাম, ঘুম থেকে উইঠা তোমার কাগজী খালার বাড়ি যাবা। সন্ধ্যা হইলেই বাড়ি ফিরবা কিন্তু তাইজুদ্দিনের ছেলে উত্তর দেয়, ঠিক আছে, আব্বা।

তাইজুদ্দিন ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে ছুটতে থাকে গঞ্জের বাজারে। যেভাবেই হোক টাকা জোগাড় করতেই হবে। কাজ একটা পেয়েও যায়। বিল্ডিং এ ইট টানার কাজ। সারাদিন কাজ করে দুইশ টাকা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয় তাইজুদ্দিন। যাওয়ার পথে তালুকদারের দোকান থেকে চাউল, ডাল নেয়।
তালুকদার বলে, ‘আজ না হয় কাম পাইছো। পরে কি করবা!’

তাইজুদ্দিন উত্তর দেয়, গরিব মানুষের আল্লা আছে। তাইজুদ্দিন ঘরে ফেরে। গিয়ে দেখে ছেলেটা নেই। মনে মনে বলে, এখনো ফেরে নাই কাগজীদের বাড়ি থাইকা! এক দৌড়ে কাগজীদের বাড়ি যায় তাইজুদ্দিন। গিয়ে দেখে কাজ করছে কাগজী। তাইজুদ্দিনকে দূর থেকে দেখেই জিজ্ঞাস করে, কেমন আছেন, ভাই?
তাইজুদ্দিন বলে ওঠে, আমি ভাল। আমার পোলাডা তো বাড়ি যায় নাই এখনো। কই গেছে?
কাগজী জবাব দেয়, কই! ও তো আসে নাই আজ। কথা শুনে তাইজুদ্দিনের পা থেকে যেন মাটি সরে গেল।

তাইজুদ্দিন আবারও বাড়ি যায়। আশপাশের সব বাড়িতে খোঁজ নেয়। কোথাও নেই। মাথায় কিছুই কাজ করছে না তাইজুদ্দিনের। প্রতিবেশী কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা এসে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে। কেউ বলে, কাল সকালে মাইক মারতে হবে। এছাড়া উপায় নাই। পরদিন সকালে বিছানা থেকে উঠেই কেমন যেন হৈহুল্লোড় শুনতে পায় তাইজুদ্দিন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন তাইজুদ্দিনকে বলে, ‘ভাই, পুকুর ঘাটে যান।’

তাইজুদ্দিন এক দৌড়ে পুকুর ঘাটে যায়, গিয়ে দেখে সহস্র মানুষের ঢল। তাইজুদ্দিনের মায়ের বয়সী একজন মহিলা তাইজুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হায় হায়, একটা মাত্র পোলা! কই যাস ওরে রাইখা? শুনলাম, দুইবেলা ভাত খাওয়াইতেও নাকি পারস নাই। এখন আর ভাত ভাত করবে না।’
তাইজুদ্দিনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। মহিলার কথাগুলো ঘোড়ার ক্ষুরের মতো বুকে এসে বিধে তার।

‘আমার বাবা!’ বলে জোরে একটা চিত্কার দেয় তাইজুদ্দিন। আকাশ বাতাস যেন থমকে যায় তাইজুদ্দিনের চিত্কারে। তাইজুদ্দিনের বন্ধু করিম ব্যাপারী এসে তাইজুদ্দিনকে বলে, ‘পা পিছলে হয়তো পুকুরে পড়ে গেছে। সবই খোদার ইচ্ছে। কখন যে কারে নেয়, কেউ জানে না।’

মুখে কোন কথা নাই, পাথর হয়ে গেছে তাইজুদ্দিন। তাড়াতাড়ি করে কয়েকটা যুবক লাশটা পানি থেকে ডাঙায় নিয়ে আসে, গোসল করায়। দুপুরেই জানাজা পড়ে, তারপর গোরস্থানে। তাইজুদ্দিন তখনও নিস্তব্ধ, কোন কথা নেই মুখে। চোখ বেয়ে শুধু অশ্রু ঝরে অবিরত। অবশেষে ছেলের কবরে মাটি দিয়ে বাড়ি ফেরে তাইজুদ্দিন।

সেই রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখে তাইজুদ্দিন। দেখে, ছেলেটা তাইজুদ্দিনের হাত ধরে গঞ্জের বাজারে যাচ্ছে। যাওয়ার পথে কোমল মুখে বলতে বলতে যাচ্ছে, ‘আব্বা, আজকে আমরা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাইমু, পোলাও খাইমু, মাংস খাইমু’। ঘুম ভেঙে যায় তাইজুদ্দিনের। টের পায় চোখ বেয়ে দর দর করে অশ্রু ঝরছে।

কারও কাছেই যেন পৌঁছায় না তার এই কান্নার স্বর। কোন এক গহিন অরণ্যে মিলিয়ে যায় তাইজুদ্দিন এবং তার জীবনের এই দুঃখময় হালচাল।

গুপ্তচর কবুতর, কাক আর ডলফিনের কথা শুনেছেন?

কবুতর ছিল সবচাইতে কার্যকর গুপ্তচর
হাজার বছর আগেও চিঠি আদানপ্রদানে কবুতরের ব্যবহারের কথা জানা যায় বিশ্বের অনেক অঞ্চলের ইতিহাসে।
কিন্তু খুব বেশিদিন নয়, রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কবুতর, কাক ও ডলফিন ব্যবহার করতো গুপ্তচর হিসেবে।
সম্প্রতি সিআইএ এই বিষয়ক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।

কী করতো এই গুপ্তচরেরা?

প্রকাশিত তথ্য দেখা যাচ্ছে গোপন মিশনের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হতো এসব প্রাণীদের। কবুতর স্নায়ু যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের গোপন স্থাপনার ছবি তুলতে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো।
সিআইএ কাক পাঠাতো জানালায় গোপন মাইক ফেলে আসার জন্য।
কাক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিলো জানালায় গোপন মাইক ফেলে আসার জন্য
তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো ৪০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের কোন বস্তু জানালার ধারে ফেলে আসা বা নিয়ে আসার জন্য। যেসব ভবনে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতো সেখানে তাদের পাঠানো হতো।
লেজার তাক করে তাকে কোথায় বস্তুটি ফেলতে হবে সেই টার্গেট বুঝিয়ে দেয়া হতো।
আর ছোট বাতির মাধ্যমে সংকেত দিয়ে তাকে ফিরে আসতে সাহায্য করা হতো।
ডলফিন প্রশিক্ষণ দেয়া হতো পানির নিচের মিশনে বিশেষ করে বন্দরের নিচে ঢোকার জন্য। ডলফিন দিয়ে হামলার চেষ্টাও হয়েছে।
এমনকি পরিযায়ী পাখি দিয়ে এমন গুপ্তচরবৃত্তি করানো যায় কিনা সেই চিন্তাও ছিল। কুকুরের মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ দিয়ে দুর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিনা সেই গবেষণাও হয়েছে।
ষাটের দশকের শেষের দিকে সিআইএ এসব গোয়েন্দা মিশনে প্রাণী পাঠানোর জন্য ৬ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ করতো।

সবচেয়ে সফল গুপ্তচর কবুতর

তবে কবুতর ছিল সবচাইতে কার্যকর কারণ তাদের খুব দারুণ একটা ক্ষমতা হল শত মাইল দুরের অপরিচিত কোন যায়গায় ফেলে আসার পরও তারা ঠিকই পথ খুঁজে বাড়ি ফিরে আসে।
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় গোপন তথ্য সংগ্রহে কবুতর ব্যবহার করা হতো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার গোপন কবুতর গোয়েন্দা বাহিনী ছিল। যাকে কিনা বলা হতো "সিক্রেট পিজন সার্ভিস"।
যুদ্ধ চলাকালীন তথ্য আদান প্রদানে হাজার বছর ধরে কবুতর ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই বিশেষ কবুতর গোয়েন্দা বাহিনীর এক হাজারের বেশি কবুতর সফলভাবে বার্তা নিয়ে ফিরে এসেছিলো।
জার্মানদের রাডার স্টেশন ও রকেট ছোড়ার স্থাপনা সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।
৭০ এর দশকে টাকানা নামে একটি অভিযানের অংশ হিসেবে কবুতর দিয়ে ছবি তোলার বিষয়টি চিন্তা করা হয়েছিলো।
সিআইএ সেসময় কবুতর দিয়ে ছবি তোলার পরীক্ষামূলক অভিযান শুরু করে। ৩৫ গ্রাম ওজনের ক্যামেরা তাদের শরীরে ঝুলিয়ে দেয়া হতো।
সেই ক্যামেরাগুলো ছিল স্বয়ংক্রিয়। কবুতরের কাজ ছিল সঠিক যায়গা দিয়ে উড়ে যাওয়া।
সেই ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবিগুলো বেশি পরিষ্কার ছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে গোপন স্থাপনায় তাদের কিভাবে নিয়ে যাওয়া হবে সেনিয়েও নানা গবেষণা হয়েছে।
১৯৭৬ সালের একটি নথি অনুযায়ী লেনিনগ্রাদের কাছে রাশিয়ার সবচাইতে শক্তিশালী সাবমেরিন তৈরি করতো এমন একটি বন্দরকে নির্বাচিত করা হয়েছিলো গুপ্তচর কবুতরদের মিশনের জন্য।
কিন্তু এর পর থেকে এই কবুতরেরা কতগুলো সফল মিশনে গেছে এবং তা থেকে কী ধরনের গোপন তথ্য মিলেছে সে সম্পর্কিত নথিপত্র এখনো গোপনই রয়ে গেছে।
তাই এর বেশি কিছু আর জানা যায়নি।
সাম্প্রতিক সময় মার্কিন নৌবাহিনী মাইন অপসারণের ডলফিন ব্যবহার করেছে

স্কুলের দারোয়ান থেকে যেভাবে প্রধান শিক্ষক হলেন তিনি

কখনও কখনও একজন শিক্ষক আপনার জীবন বদলে দিতে পারেন। মাইকেল এটকিন্সের জীবনও এভাবে বদলে দিয়েছেন তার প্রাথমিক স্কুলের একজন শিক্ষক। স্কুল ছাড়ার কয়েক বছর পর তার জীবনে এই পরিবর্তন আসে।
তার যাত্রা সবসময় এতোটা সোজাসাপ্টা ছিল না, তবে কিছু বন্ধুত্বপূর্ণ নির্দেশনার জন্য তিনি এখনও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। যেই দরজা তিনি এক সময় পরিষ্কার করতেন, আজ সেই দরজাই তার জন্য খুলে দেয়া হয়েছে শিক্ষা বিস্তারের জন্য। ডেনভারের লোয়ারি এলমেন্টারি স্কুলে চাকরির আগে, মাইকেল স্থানীয় কয়েকটি স্কুলের রক্ষী বা কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন।
তিনি যে এলাকায় বড় হয়েছেন এখন তিনি সেখানকারই একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। তিনি যখন স্কুলে পড়তেন তখন পড়ালেখা করাটা তিনি উপভোগ করলেও কিছু বিষয় মানিয়ে চলা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
কারণ তিনি বুঝতে পারতেন যে কিছু শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ভেদাভেদ করতেন। তারা কোথা থেকে এসেছে, তারা দেখতে কেমন, এমন কিছু বিষয়ের ভিত্তিতে তারা শিক্ষার্থীদের মধ্যেই পার্থক্য করতেন।
"স্কুলিং আমার জন্য অনেকটা মাথা নিচু করে সব সহ্য করার মতো বিষয় ছিল," এমনটাই জানান মাইকেল। হাইস্কুল ছাড়ার পর যথাযথ নির্দেশনার অভাবে দিশাহারা হয়ে পড়েন মাইকেল।
"উচ্চশিক্ষা কিভাবে গ্রহণ করতে হয় সেটা দেখানোর জন্য কেউ ছিল না। আমার পরিবারেরও আমাকে গাইড করার মতো অবস্থা ছিল না।"
কাজেই তিনি চাকরির পাশাপাশি স্টেট কলেজে ভর্তি হন। তার দ্রুত অর্থ উপার্জন করা জরুরি হয়ে পড়ে। কেননা তিনি ১৯ বছর বয়সেই বাবা হয়েছিলেন। তিনি একটা কাজ খুব ভাল পারতেন। সেটা হল শিশুদের সঙ্গে তিনি সহজেই মিশে যেতে পারতেন।
এই দক্ষতা তিনি শিখেছেন তার মায়ের কাছ থেকে। কারণ তার মা, ডে কেয়ার সেন্টারে কাজ করতেন। এজন্য তিনি কাছের একটি স্কুলে পার্টটাইম ব্যবসা শিক্ষার ক্লাস করতে যান। সেইসঙ্গে সেখানকার সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির আবেদনও করেন।
তিনি শিক্ষকের পদে চাকরিটা না পেলেও কোনভাবে বিভিন্ন স্কুলের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এমন একটি স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন তার দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষিকা।
"তিনি আমাকে দেখেই আলিঙ্গন করেন, আমার পরিবারের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। আমি তাকে বললাম আমি বাচ্চাদের সাথে কাজ করতে চাই।"
সেখানে থেকে, ক্যারোলিন রেইডলিন - যাকে স্কুলে থাকাকালীন মিসেস ব্রাউন বলে ডাকা হত - তিনি, মাইকেলের জন্য স্কুলের রিডিং ও রাইটিং প্যারা প্রফেশনালের পদ তৈরি করেন।
"তিনি আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে এমন একজন ছিলেন, যিনি আমার মধ্যে কয়েকটি ভাল জিনিস বপন করতে পেরেছেন।"
"তার মধ্যে দুটি হল - আত্মসম্মানবোধ এবং ভালবাসা। তিনি খুব যত্নশীল ছিলেন। তিনি স্কুলের তথাকথিত পড়ালেখার বাইরেও অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেন। যেগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল," বলেন মাইকেল।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মতো সামাজিক ও মানসিক বিকাশ এবং কল্যাণের শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
"যদি আমাদের সন্তানদের, তাদের পরিচয়, সংস্কৃতি, আত্মসম্মানের সঙ্গে লড়াই করে চলতে হয় তবে তাদের পক্ষে পড়ালেখা করাটা কঠিন হয়ে পড়ে।"
"যে শিশুটিকে খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে বা যার বড় ধরণের ট্রমা কাজ করে তাকে বসিয়ে একাডেমিক বিষয়ে আর দশটা বাচ্চার মতো শেখানো এতোটা সহজ হয় না।"
মাইকেল চলতি মাস থেকেই স্টেডম্যান এলমেন্টারি স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করছেন। তারপর থেকে অসংখ্য মানুষ তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন জানাতে শুরু করে।
মাইকেল মনে করেন, তার প্রথম সন্তান সেই সঙ্গে তার অতীতের অভিজ্ঞতা কাজ তাকে সফলতার পথে হাঁটতে ও আরও সংগ্রাম করার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে।
"মাঝে মাঝে ভাগ্য আমাদের সহায় হয় না। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম ও মনোযোগের মাধ্যমে সবই সম্ভব। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র নিজের মনের কথাই শুনতে হয়," -এমনটাই বলেন মাইকেল।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের নানা প্রান্তের শিক্ষকরা মাইকেলের স্কুল ঘুরে দেখতে চান। তারা মাইকেলের কাছে পরামর্শ চান যে, কোন ছাত্রকে সংগ্রাম করতে দেখলে তারা কি করবেন।
জবাবে মাইকেল বলেন, যে কঠিন সময় পার করছে তার আশেপাশে যারা আছে, তাদের টার্গেট করা উচিত। তাদের আচরণ লক্ষ্য করতে হবে।
"আমি শিক্ষার্থীদের বাবা-মা এবং শিক্ষকদেরকে বলবো তারা যেন শিশুদের নিজেদের মূল্যায়ন করার শিক্ষা দেন, যেন তারা শিক্ষা জীবন ও সংস্কৃতি উপভোগ করতে পারে।" >>>নয়া দিগন্ত,
যেই দরজা তিনি এক সময় পরিষ্কার করতেন, আজ সেই দরজায় মাইকেল এটকিন্সের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে - সংগৃহীত

ভিয়েতনামের যুদ্ধ জাদুঘর, ঘুরে দাঁড়ানোর সাক্ষী by তপন চক্রবর্তী

ভিয়েতনাম আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগি দেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে ক্রমে তারা কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারই সাক্ষী একটি জাদুঘর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা জাদুঘরটি দেখতে আসেন। কারও চোখ ভিজে আসে, কেউবা আবার প্রেরণা পায়। নতুন উদ্যমে দেশে ফেরে।
বহুতল জাদুঘরের ভেতরে বাইরে ভয়ংকর সব মারণাস্ত্র সাজানো। অস্ত্র, গোলাবারুদ তো আছে। চোখে পড়লো আস্ত ট্যাংকার আর যুদ্ধবিমানও। জাদুঘরের মূল ভবনের ভেতরে বন্দিদের অত্যাচারের নমুনা রাখা আছে। শত শত যুদ্ধকালীন ছবি। ভাস্কর্য, দলিল-দস্তাবেজ, পোস্টার, লিফলেটের সংগ্রহও বেশ।একটি বাংলা পোস্টারও আছে- ‘বিজয়ী ভিয়েতনাম লাল সেলাম, হো চি মিন লাল সেলাম’ লেখা। পুলক অনুভব করলাম বিদেশের মাটিতে।
ভিয়েতনামের যুদ্ধ জাদুঘর, ধ্বংসস্তূপে ঘুরে দাঁড়ানোর সাক্ষী। ছবি: বাংলানিউজ
ভিয়েতনাম ঘুরে দাঁড়িয়েছে। হো চি মিন নামে যে শহরটি তার আদি নাম ছিল সাইগন। দক্ষিণ ভিয়েতনামের পতনের পর নাম পাল্টে ভিয়েতনামের জাতীয় নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হো চি মিনের নামে সাবেক এ রাজধানী শহরের নামকরণ করা হয়। হোচি মিন ছিলেন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তিনি আমৃত্যু ভিয়েত কং এর নেতৃত্ব দেন।
রাজধানী হ্যানয়, কুচি গুহাসহ অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে পর্যটকদের জন্য। সব কিছু সাজানো গোছানো পরিপাটি। বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আসন দখলে মরিয়া ভিয়েতনামের মানুষ। পর্যটন, উৎপাদন, রফতানি, পরিবেশ, আতিথ্য, সেবা সব কিছুতে নজরদারি প্রশাসনের। সব মিলে মুগ্ধ করার মতো দেশ ভিয়েতনাম।

ড্রাগন-লেবু চাষে সফল শামসুল by মাহমুদ কামাল, টাঙ্গাইল ও মো. নজরুল ইসলাম

এস এম শামসুল আলম। পাঁচ বছর আগে উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তার চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। বয়স এখন ৭৫-এর কোঠায়। বয়স তাকে অবসরে নিতে পারেনি। পেশার পরিবর্তন ভেবে বর্তমানে তিনি কৃষিতে আত্মনির্ভর হয়েছেন। ৫০ বিঘা জমিতে ড্রাগন ও লেবুর বাম্পার ফলন হওয়ায় তিনি অনেকেরই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার নবগঠিত লক্ষিন্দর ইউনিয়নের মধুপুরচালায় বিশাল এলাকাজুড়ে তিনি এসবের চাষ করছেন।
সঙ্গে রয়েছে পেয়ারা, আম, লিচু, কুল, পেঁপে, মাল্টা ও কফি। একসময়ের ব্যাংক কর্মকর্তা এস এম শামসুল আলম এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা।
এস এম শামসুল আলম ১৯৪৯ সালে ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউনিয়নের কাঁশতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা তোরাব আলী মৌলভী ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ৫ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে শামসুল আলম তৃতীয়। করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে লেখাপড়া শেষে ১৯৭২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি করেছেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে ড. নাজমুন্নাহার শামস ইঞ্জিনিয়র, ছোট মেয়ে ডা. নুসরাত শামস শিশু বিশেষজ্ঞ এবং ছেলে নাজমুছ শামস ও পুত্রবধূও ইঞ্জিনিয়ার। প্রতিষ্ঠিত এই পরিবারের সান্নিধ্য ছেড়ে পাহাড়ে সমন্বিত কৃষি প্রকল্পে তিনি আত্মনিয়োগ করেছেন। বয়স হলেও এখনও নিজেই রান্না করে খান।
এস এম শামসুল আলম মনে করেন, জীবনে অবসর বলতে কিছু নেই। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোনো না কোনো কাজ মানুষকে করতেই হয়। তা পেশাই হোক কিংবা নেশাই থেকে। তিনি ব্যাংকের উচ্চপদের চাকরি শেষে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন কৃষিতে। তিনি মনে করেন বেকার তরুণেরা ৫-৭ লাখ টাকা খরচ করে দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেয়ার চেয়ে যদি সমন্বিত কৃষি কাজ করে তবে তারা যেমন উপকৃত হবে পাশাপাশি দেশও এগিয়ে যাবে।
গত বৃহস্পতিবার তার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, গাছে গাছে ঝুলে আছে অসংখ্য কাঁচাপাকা ড্রাগন ফল, লেবু, পেঁপে, মাল্টা এবং কফি।
বাগানে বেশ কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছেন। এস এম শামসুল আলম জানান, ছেলেবেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে দু’পাশে কৃষি জমি দেখে তার ভালো লাগতো। তখন ভাবতেন, বড় হয়ে সুযোগ হলে তিনি কৃষিচাষ করবেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ব্যাংকে চাকরি নেন। এক সময় তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় কাজ করেন। তখন তিনি সেখানে ধান আবাদের জন্য কৃষিঋণ কার্যক্রম শুরু করেন। এজন্য কৃষকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এভাবেই ছোটবেলার কৃষিপ্রেম আরো গভীর হয়। অফিসে বসেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভবিষ্যতে তিনি কৃষির সঙ্গে যুক্ত হবেন।
২০১৫ সালের দিকে নিজের সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঘাটাইলের মধুপুরচালা এলাকায় একটু একটু করে জায়গা কিনে বাগান গড়তে শুরু করেন। ২০১৪ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি যোগাযোগ করেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কি ধরনের গাছ, কীভাবে লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরের বছরে তিনি একই এলাকায় ৬০০ শতাংশ জায়গা কিনে ফেলেন। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও সাপমারা এলাকায় পর্যাক্রমে ২২০০ শতাংশ জায়গা লিজ নেন শামসুল আলম। অপরদিকে রসুলপুর ইউনিয়নের ধলী বিলের প্রায় ১০ একর জমি লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছেন। প্রায় ৫০ একর জমিতে মিশ্র ফল এবং মাছ চাষ করছেন। বাণিজ্যিকভাবে সুবিধা ও লাভবান হতে তিনি লেবুর প্রতি আগ্রহী হন বেশি। তার বাগানে সব সময় প্রায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করেন। বিশেষ সময় আরো অন্তত ৫০ জন শ্রমিক নিয়ে কাজ করতে হয় তাকে। গত বছর এক বিঘা জমির ১৮০টি ড্রাগন গাছে ফল উৎপাদন হয়েছে। খরচ বাদে সাড়ে চার লাখ টাকা আয় হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ওই এক বিঘা জমির ড্রগন ফল বাজারে তোলা হবে। খরচ বাদে এবারও প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাভ হবে বলে ধারণা করছেন শামসুল তিনি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রতি বিঘায় ৪০ হাজার লেবু বাগান থেকে তোলা হয়েছে যার দাম প্রায় এক লাখ টাকা। খরচ বাদে লাভ হয়েছ ৫০ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলক কফি চাষ করেছেন। ইতিমধ্যে গাছে কফি ফল আসা শুরু করেছে। আগামী বছর পুরোপুরি কফি উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাত করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন । তিনি মনে করেন, কৃষিচাষ করে মানুষের জীবনমান পরিবর্তন করা সম্ভব। দেশীয় ফল আবাদ করলে আমদানি নির্ভরতাও কমে যাবে। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, চাকরি নির্ভর মনোবৃত্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে আত্মনির্ভর হতে হবে। এজন্য কৃষি সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম।

নিরামিষভোজীরা যে ডায়েট অনুসরণ করেন তা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে

ভেগান বা নিরামিষভোজীদের ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দিলেও বাড়িয়ে দেয় স্ট্রোকের ঝুঁকি।
সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া এক গবেষণায় এমনটাই বলা হয়েছে।
ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণাটি, ১৮ বছর ধরে ৪৮ হাজার মানুষের উপর পরিচালনা করা হয়েছে।
প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে নিরামিষভোজীদের মধ্যে করোনারি হৃদরোগীর সংখ্যা মাংসাশীদের তুলনায় ১০ জন করে কম পাওয়া গেছে।
কিন্তু স্ট্রোকের ঝুঁকি রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা তিনজন করে বেশি পাওয়া গেছে।
ডায়েট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের খাদ্যাভ্যাস যেমনই হোক না কেন, বিভিন্ন ধরণের বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য বেশি ভালো।

গবেষণায় নতুন কি পাওয়া গেছে?

এপিক-অক্সফোর্ড স্টাডি মূলত একটি দীর্ঘ মেয়াদি গবেষণা প্রকল্প যা দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্য নিয়ে পরীক্ষা চালায় তাদের তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই গবেষণায়।
১৯৯৩ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অর্ধেকই ছিলেন মাংসাশী। ১৬ হাজারের কিছু বেশি ছিলেন নিরামিষভোজী।
আর সাড়ে সাত হাজার অংশগ্রহণকারী জানান যে তারা আহার হিসেবে মাছ খেতেন।
অংশগ্রহণের সময় এবং ২০১০ সালে আবার নতুন করে এসব অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য, ধূমপান এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়গুলোও আমলে নেয়া হয়েছিলো।
সব মিলিয়ে, করোনারি হৃদরোগ বা সিএইচডি'র সংখ্যা মেলে ২৮২০টি, স্ট্রোকের সংখ্যা ১০৭২টি যার মধ্যে ৩০০টি মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ জনিত স্ট্রোকের ঘটনাও রয়েছে। মস্তিষ্কের দুর্বল শিরা ছিড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হলে এ ধরণের স্ট্রোক হয়।
মাংসাশীদের তুলনায় মাছ ভোজীদের মধ্যে সিএইচডি'র ঝুঁকি ১৩ ভাগ কম ছিলো।
আর নিরামিষভোজীদের মধ্যে এই হার ২২ভাগ কম ছিলো।
কিন্তু যারা উদ্ভিদ ও শাক সবজি খেয়ে জীবন ধারণ করেন বা যারা নিরামিষভোজী, তাদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি ২০ ভাগ বেশি ছিলো।
গবেষকদের ধারণা, ভিটামিন বি১২ এর অভাবের কারণে এই ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তবে তারা বলেন যে, এর প্রকৃত কারণ খুঁজে পেতে হলে আরো গবেষণার দরকার রয়েছে।
এমনও হতে পারে যে, খাদ্যাভ্যাসের সাথে আসলে এর কোন সম্পর্ক নেই। বরং যারা মাংস খায় না তাদের জীবনের অন্যান্য কারণের জন্যই হয়তো এই ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

তার মানে কি নিরামিষভোজী অস্বাস্থ্যকর?

ব্রিটিশ ডায়েটিক এসোসিয়েশনের ডা. ফ্রাঙ্কি ফিলিপস বলেন যে, এটা নাও হতে পারে। কারণ এই গবেষণাটি শুধুমাত্র একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা মাত্র।
"তারা শুধু পর্যবেক্ষণ করেছে যে মানুষ কি খায় এবং তাদেরকে বছরের পর বছর ধরে অনুসরণ করেছে, এটা শুধু সম্পৃক্ততাই জানান দেয়, কারণ বা প্রভাব সম্পর্কে বিশ্লেষণ করে না," তিনি বলেন।
"সবার জন্য বার্তা হচ্ছে, সবচেয়ে ভালো হচ্ছে একটি পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস এবং বিভিন্ন ধরণের খাবার খাওয়া।"
"মাংসাশীরা সাধারণত বিভিন্ন ধরণের খাবার খায় না। কারণ তারা প্রতি রাতে খাবার হিসেবে মাংসই খায় এবং কোন ধরণের শাক-সবজি খায় না।"

গবেষণা শুরুর পর থেকে কি মানুষের খাবারে পরিবর্তন এসেছে?

২০১০ সালে গবেষকরা আবার অংশগ্রহণকারীদের কাছে গিয়ে তাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল।
কিন্তু ডা. ফিলিপস বলেন, নিরামিষভোজীদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছিলো।
"এই তথ্যগুলো কয়েক দশক আগে সংগ্রহ করা হয়েছিলো," তিনি বলেন।
"স্বাভাবিকভাবেই আজ থেকে ২০ কিংবা ৩০ বছর আগে নিরামিষভোজীদের
সাথে আজকের নিরামিষভোজীদের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।"
"নিরামিষভোজীদের খাবারের পরিধি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এগুলো এখন মূল ধারার সাথে যুক্ত হয়েছে।"
আমরা এখন অনেক বেশি মাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং মাংস খাওয়ার স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে অনেক বেশি জানি যা অন্ত্রের ক্যান্সার তৈরি করে।

তাহলে কি খাওয়া উচিত?

ব্রিটিশ জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ইট ওয়েল গাইড নামে খাবার সম্পর্কিত একটি নির্দেশিকা দিয়েছে। আপনি যে ধরণের খাবারই খান না কেন, আপনার থালায় এ ধরণের খাবার থাকাটা জরুরী বলে উল্লেখ করা হয়েছে এতে...
  • •দিনে কমপক্ষে ৫ ভাগ ফল এবং শাক-সবজি খান।
  • •মূল খাবার হিসেবে উচ্চ মাত্রায় আঁশ সম্পন্ন এবং শ্বেতসার বহুল খাবার যেমন আলু, রুটি, ভাত কিংবা পাস্তা রাখা উচিত।
  • •প্রোটিন ভুলে গেলে হবে না- চর্বিহীন মাংস, মাছ, সামুদ্রিক খাবার, ডাল, তফু কিংবা লবণহীন বাদাম খেতে হবে।
  • •দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার থাকতে হবে।
  • •উচ্চ মাত্রায় চর্বিযুক্ত খাবার, চিনি কিংবা লবণ যত কমানো যায় ততই ভালো।
কিন্তু যারা নিরামিষভোজী তাদের নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি গ্রহণ সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, যারা মাংস, দুগ্ধজাত খাবার এবং মাছ খায় তারা পর্যাপ্ত ভিটামিন বি১২ পায় যা স্বাস্থ্যকর রক্ত এবং স্নায়ুতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয়।
যাই হোক, যদিও সকালের নাস্তার বিভিন্ন সিরিয়াল এবং ইস্ট সমৃদ্ধ খাবারে ভিটামিন বি১২ থাকে তবু নিরামিষভোজীদের মধ্যে এই ভিটামিনের অভাব দেখা দিতে পারে।
উদ্ভিদ-জাত খাবার থেকে আয়রনও কম পাওয়া যায়। তাই যারা মাংস খান না তাই তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে তারা যাতে নিয়মিত গমের রুটি, আটা, শুকনো ফল এবং ডাল খান।
এছাড়া গত মাসে নিরামিষভোজীদের আহ্বান জানানো হয়েছিলো যে তারা যাতে মস্তিষ্কের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভিটামিন কোলিন পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করেন।