Thursday, May 29, 2014

শেখ হাসিনার জাপান সফর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরটি নানা কারণে গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমরা মনে করি৷ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে ​বৈঠক ছাড়াও তিনি সে দেশের ব্যবসায়ী নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদ ও তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন৷ এসব মতবিনিময়ে যে সহযোগিতার দুয়ার খুলে যায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ জাপ​ানি প্রধানমন্ত্রী আবের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের পর ঢাকা ও টোকিও থেকে প্রকাশিত যৌথ ইশতেহারে দুই দেশের মধ্যে অংশীদারির নবযুগের সূচনা হয়েছে বলে যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাকে গতানুগতিক ভাবার কারণ নেই৷ দুই নেতা বিশ্ব শান্তি, স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সমৃদ্ধি অর্জনে একযোগে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পাশাপাশি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন৷ এখন থেকে নিয়মিত দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবেরা বসবেন৷ এ ছাড়া বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে৷ ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর জাপান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে একক দেশ​ হিসেবে সর্বাধিক সহায়তা দিয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ১১০০ কোটি ​ডলার৷
তবে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জাপানের কাছ থেকে অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ৬০০ কোটি ডলার সহায়তার ঘোষণা৷ দেশটি গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ, যমুনার নিচ দিয়ে বহুমুখী টানেল নির্মাণ, যমুনায় পৃথক রেলসেতু নির্মাণ, ঢাকায় ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণ প্রভৃতি প্রকল্পে এই সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে, যদিও এর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছর লেগে যাবে৷ স্মরণীয় যে বর্তমান যুগে কেবল বিদেশি সহায়তা দিয়ে কে​ানো দেশ স্বাবলম্বী হতে পারে না৷ এ জন্য প্রধানমন্ত্রী যথার্থই জাপানের ব্যবসায়ীদের প্রতি অধিক হারে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন৷ তিনি জাপানি ব্যবসায়ীদের জন্য রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় ৪০টি শিল্প প্লট নির্দিষ্ট রাখারও ঘোষণা দেন৷ কিন্তু যে বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, জাপানের এই সহায়তা পেতে বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে৷ যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে যে অবকাঠামোগত সুবিধা, তথা বিদ্যুৎ ও জ্বা​লানি সরবরাহ প্রয়োজন, সেটি সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে৷
পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই৷ অন্যদিকে, রাজনৈতিক স্থিতি না এলে যেকোনো বৃহৎ প্রকল্পের বাস্তবায়ন মাঝপথে থেমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়৷ তাই জাপানের সহায়তাকে স্বাগত জানিয়েও যে কথাটি বলা জরুরি, তা হলো, সেই সহায়তা আনা এবং তার সদ্ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করবে প্রতিশ্রুত জাপানি সহায়তা দেশের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবে৷ আমরা এ প্রসঙ্গে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কথা স্মরণ করতে পারি৷ ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়েই অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়, যার মধ্যে জাপানের বৈদেশিক সহায়তা সংস্থা জাইকাও ছিল৷ জাপানের সহায়তার খবরটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য এক বড় প্রাপ্তি, তবে এই সহায়তা কাজে লাগানোর দিকেই সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে৷

হান নদীর গল্পগাথা

শহরের বুক চিরে চলে গেছে হান নদী
সোউলের রাস্তাঘাট দেখলে কে বলবে আন্তর্জাতিক রপ্তানি-বাণিজ্যের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী? এতটা পথ ধরে যে যাচ্ছি, গাড়িটাকে আটকে থাকতে হচ্ছে বড়ই কম। কদাচিৎ খানিক মন্থর হলেও তা হচ্ছে কিছুক্ষণের জন্য মাত্র। আকাশ-আঁচড়ানো অট্টালিকা কম নেই, কিন্তু অবাধ দৃষ্টির জন্য খোলা পরিসরও যথেষ্ট। প্রশস্ত রাস্তা উপচে দুপাশের মুক্ত অবকাশ ছড়িয়ে গেছে আরও অনেকটা। পথের দুপাশ সবুজ গাছের ঘন ফ্রেমে বাঁধানো। শহরের বুক চিরে চলে গেছে হান নদী। তার সঙ্গে হাতের আঁকিবুঁকি রেখার মতো সরু সরু জলধারা। আমরা এসেছি কোরিয়া ফাউন্ডেশনে। অধ্যাপক সেওং-কন কিম আমাদের শোনাবেন কোরিয়ার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। অধ্যাপক কিম পড়ান সোউল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইংরেজি সাহিত্যে। তিনি যা শোনালেন, সেটি ছাইয়ের সোনা হয়ে ওঠার গল্প। অন্য আরও বহু দেশের মতো কোরিয়ার অতীতও অশ্রু আর বিলাপের কাহিনিতে ভরা। কোরিয়ার ইতিহাসের ধূসর পৃষ্ঠা বারবার লাল হয়ে উঠেছে দখল আর অত্যাচারের ঘটনায়। চীনের মোঙ্গলরা আক্রমণ করতে করতে কোরিয়ার প্রায় পুরোটাই একসময়ে খেয়ে নিয়েছিল। নাক উঁচু করে বেঁচে ছিল শুধু দ্বীপের মতো সামান্য একটু অংশ। এ ছাড়া গত শতকের গোড়ায়, ১৯১০ সালে, জাপানের সঙ্গে তারা এক দাস্য চুক্তির অধীনে যেতে বাধ্য হয়। কয়েকটি সংখ্যাই এর পরের ঘটনা বলে দেবে।
৫০ লাখ কোরীয়কে জাপানের কাছে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে হয়। কেবল যুদ্ধেই প্রাণ হারান চার লাখ শ্রমিক। শরীর দিতে বাধ্য করা হয় চীনাসহ প্রায় দুই লাখ কিশোরী ও নারীকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনাকালে, ১৯৪৮ সালে, দুই টুকরোর এই ভাগের দক্ষিণ কোরিয়া হয়ে পড়ে আরও নিঃস্ব। উপরন্তু বারবার তারা কখনো চীন, কখনো রাশিয়ার সমর্থনে ক্রমাগত আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হতে থাকে। ‘১৯৬০-এর দশকেও আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা উত্তর কোরিয়ার চেয়ে খারাপ ছিল।’ বললেন অধ্যাপক কিম। ‘কিন্তু আমরা অতীতের ধ্বংসস্তূপে মুখ গুঁজে না থাকার পণ করেছিলাম। যতটা সামান্য সুযোগই পেয়েছি, সেটুকুই ব্যবহার করেছি উঠে দাঁড়ানোর কাজে।’ কিন্তু উঠে দাঁড়ালেন কীভাবে? অধ্যাপক কিমের মতে, তাঁদের জাতীয় নেতাদের দূরদৃষ্টি আর সাধারণ মানুষের অদম্য সংকল্প। রাজনীতিতে সামরিক-বেসামরিক যে সরকারই আসুক না কেন, অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে সবাই। ১৯৬২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এর ব্যাঘ্রতুল্য অর্থনীতি বেড়েছে বছরে ১০ শতাংশ করে, রপ্তানি বেড়েছে ২০ শতাংশ করে। তাঁদের অর্থনীতি এখন বিশ্বের দ্বাদশ বৃহত্তম। এই মায়াবী কাহিনিকে কেউ কেউ আখ্যা দেয় রাজধানীর বুক চিরে চলে যাওয়া ‘হান নদীর জাদুগাথা’ বলে। খাত তৈরি করেছেন নেতারা, আর সে পথ ধরে এগিয়ে গেছে সাধারণ মানুষ। কিম বলেন, ‘পৃথিবীর বিস্ময় যে স্যামসাং, সে কিন্তু তার কারিগর জ্ঞান পেয়েছে সনির কাছ থেকে; হিউন্দাইয়ের প্রকৌশলজ্ঞান মিৎসুবিশির কাছ থেকে পাওয়া। কিন্তু মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়ে যে ওরা পৃথিবীটাকে সয়লাব করে দিল, তার পেছনে আছে মানুষ।’ রূপকথার গল্পটির আবেশ মাথায় নিয়ে আমরা বেরিয়ে আসি বাইরে। চোখ পড়ে ভবনের ঠিক পাশেই চওড়া ফুটপাতের ওপরে। ফেস্টুন-ব্যানার টানিয়ে তাতে অবস্থান ধর্মঘটে বসেছেন শ্রমিক সংঘের সদস্যরা।
১৬ এপ্রিল ভয়াবহ এক ফেরি দুর্ঘটনায় ৩০৪ জন মানুষের মৃত্যুতে এই প্রতিবাদ। মৃতদের বড় অংশটি দানওন নামে একটি স্কুলের ছাত্রছাত্রী। আজ চলছে ধর্মঘটের দশম দিন। নানা তৎপরতাও চলছে শ্রমিকদের। কিন্তু কোথাও কোনো অস্থিরতা নেই। আছে নীরব গাম্ভীর্য। নৈঃশব্দ্যই কেমন এক অদ্ভুত ভার চাপিয়ে দিয়েছে চারপাশের ব্যস্ততার ওপর। শ্রমিকদের একটি ব্যানারে লেখা, ‘এই নৌ-দুর্ঘটনা সরকারি নীতির ব্যর্থতার ফল। তাদের কাছে ব্যবসার মুনাফা আর দক্ষতার জায়গা মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার ওপরে।’ এই এক বৈপরীত্যময় টানাপোড়েন, প্রায় সর্বত্র। কোরিয়া ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রেসিডেন্ট পার্ক গেউন-হাইয়ের ৭১ শতাংশ জনপ্রিয়তা এ দুর্ঘটনার পরে নেমে এসেছে ৪০ শতাংশে। সামনেই কোরিয়ার স্থানীয় সরকারের বিরাট নির্বাচন। এ দুর্ঘটনা সব রকম প্রচার-প্রচারণার গায়ে পানি ঢেলে দিয়েছে। কোথাও কোনো বাড়াবাড়ি তো দূরের কথা, সাড়াশব্দই প্রায় নেই। ‘কোরিয়ার গণতন্ত্র এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে মানুষের আবেগকে মূল্য না দিয়ে উপায় নেই।’ সে আবেগেরই ভিন্ন একটি গল্প পড়া গেল পত্রিকায়। যে স্কুলের এতগুলো ছাত্রছাত্রী প্রাণ হারাল, তার উপাধ্যক্ষও আত্মহত্যা করেছেন ঘটনার কয়েক দিন পর। কেন? তাঁরই পরিকল্পিত এক মাঠসফরে যাওয়ার সময়েই যে বাচ্চাগুলো বেঘোরে প্রাণ হারাল। এ বেদনার ভার তিনি বইতে পারছিলেন না। আত্মহত্যার আগে চিরকুটে লিখে গেছেন, ‘স্বর্গে হয়তো আমি আবার ওই শিশুগুলোর শিক্ষক হব, যাদের শরীর খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ কোরিয়ার এই মানুষগুলো মানুষ হিসেবে আমাদের সীমানা কতটাই না বাড়িয়ে দিয়েছেন।
সোউল, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে
lসাজ্জাদ শরিফ: কবি, সাংবাদিক৷

ফেনীর রাজনৈতিক বাদশা নিজাম by কাফি কামাল

ফেনীর রাজনৈতিক বাদশা নিজাম উদ্দিন হাজারী। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের এমপি তিনি। পদের দিক থেকে দ্বিতীয় প্রধান হলেও জেলা আওয়ামী লীগ চলে তার একক নিয়ন্ত্রণে। দলের ভেতর তার নানা সিদ্ধান্ত ও আচরণ নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও মুখ বন্ধ সবার। পদত্যাগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুর রহমান বিকম। তার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে নির্মম খুনের শিকার হয়েছেন ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী একরামুল হক। মনের ক্ষোভ মনে পুষে রেখেই দলীয় সিদ্ধান্তে সংবাদ সম্মেলন করে তার সাফাই গাইছেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা। আবার নিজাম হাজারী আওয়ামী লীগ নেতা হলেও তার ইশারায় চলে জেলা বিএনপির রাজনীতি। তার সঙ্গে সমঝোতা করে চলেন জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা। তিনি তার প্রতিদান দেন মামলা-হামলা থেকে নিরাপদে রেখে। একটি বিক্ষোভ মিছিল করতেও তার অনুমতি নেন বিএনপি নেতারা। এ জন্য বর্তমান সরকারের আমলে কোন মামলা হয়নি জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু তাহের, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন আহমেদ মিস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহউদ্দিন খান ও সদর থানা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। আবার যারা তার ইশারায় চলতে অস্বীকার করেছেন তাদের তিনি মামলা-হামলায় রেখেছেন দৌড়ের ওপর। ফেনীর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেন, নিজাম হাজারীর ক্যাডার ভিত্তিক মনোভাবের কারণে ভিন্ন মতাদর্শের রাজনীতি করা কঠিন। সদরে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর কয়েক দফা হামলা, যুবদল নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, কয়েকটি গুম-খুনের ঘটনা, সর্বশেষ উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা একরাম হত্যার মধ্য দিয়ে অশান্তি আর আতঙ্কের জনপদ পরিণত হয়েছে ফেনী।

ঐক্যের বাতাবরণে আওয়ামী লীগ: প্রকাশ্যে ঐক্যের বাতাবরণ থাকলেও ভেতরে ভেতরে দারুণ কোন্দল বিরাজ করছে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগে। এক হাজারী থেকে আরেক হাজারীর কাছে নেতৃত্বের হাতবদল হলেও প্রকৃত নেতাকর্মীরা থেকেছেন উপেক্ষিত। সর্বশেষ সে কোন্দলের শিকার হয়েছেন ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জানান, ১৯৯৮ সালে আবুল কাশেমকে সভাপতি ও জয়নাল হাজারীকে সম্পাদক করে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ২০০১ সালে জয়নাল হাজারী দেশ ছাড়লে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে দলের কার্যক্রম চলে প্রায় এক যুগ। ফেনীর আলোচিত ও সমালোচিত নেতা জয়নাল হাজারীর রাজনৈতিক পরাজয়ের পর অনেকটা ভেঙে পড়া জেলা আওয়ামী লীগকে ধরে রাখেন নিজাম উদ্দিন হাজারী ও একরামুল হক। এ সুযোগে জয়নাল হাজারীর এককালের শিষ্য নিজাম উদ্দিন হাজারী নিজের অবস্থান শক্ত করে নেন। নিজামকে শক্ত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রোটোকল অফিসার আলাউদ্দিন নাসিম। জেলা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মেরুকরণে আবদুর রহমান বিকম, ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক, জেলা যুবলীগ সভাপতি ও দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন, যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সুশেন চন্দ্র শীল, পরশুরাম উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মজুমদার, ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাহুল হায়দার সোহেল চৌধুরীসহ অধিকাংশ নেতাকর্মী নিজাম হাজারীর পক্ষ নেন। নিজাম-একরাম দুই সাবেক শীর্ষ ক্যাডারের হাতে শক্ত ভিত পায় জেলা আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে জয়নাল হাজারীর গ্রুপের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আজিজ আহাম্মদ চৌধুরী, সহসভাপতি মীর হোসেন ভূঞা, যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক আজহারুল হক আরজু, যুগ্ম আহ্বায়ক শাহজাহান সাজু, যুগ্ম আহ্বায়ক শাখাওয়াত হোসেনসহ জেলা যুবলীগের একাংশ হয়ে পড়ে কোণঠাসা। ২০১৩ সালে জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে আবদুর রহমান বিকম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নিজাম উদ্দিন হাজারী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কমিটির অনুমোদন নিয়ে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আমন্ত্রণ পর্যন্ত পাননি ১৯৭৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের একক নিয়ন্ত্রণকর্তা জয়নাল হাজারী। নিজামকে ফেনীতে প্রতিষ্ঠিত করতে যে একরামের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল তাকেই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা হয়। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া এক ব্যক্তিকে জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয় নিজাম হাজারীর ব্যক্তিগত পছন্দে। ইতিমধ্যে নিজাম হাজারী ফেনী সদর আসনের এমপি নির্বাচিত হলে ফেনীতে শুরু হয় নিজাম হাজারীর একক কর্তৃত্ব। সাংগঠনিক পদ ও টেন্ডার নিয়ে বিরোধের জের ধরে নিজাম-একরামের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। গত সংসদ নির্বাচনে ফেনীর দু’টি আসন থেকে নিজাম হাজারী ও একরামুল হক মনোনয়ন চান। নিজাম মনোনয়ন পেলেও একরামুল হক পাননি। একরামের সমর্থকদের ধারণা এতেও নিজাম হাজারীর হাত ছিল। একসময়ের সন্ত্রাসের গডফাদার হিসেবে পরিচিত জয়নাল হাজারীকে ফেনীর আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে নিজাম ও একরাম ছিলেন এককাট্টা। তার পরও উপজেলা নির্বাচনে ফুলগাজী উপজেলায় একরামকে পরাজিত করতে দলীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে মিনারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন নিজাম উদ্দিন হাজারী। এ নিয়ে ফেনীতে বিএনপি দলীয় একজন সাবেক এমপির বাসায় বৈঠকেও অংশ নিয়েছিলেন। তবে দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তে তিনি নীরব হয়ে যান। তবে ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কিলিংয়ে নেতৃত্ব দেয়া জিহাদ চৌধুরী প্রকাশ্যে মিনারের পক্ষ নিয়েছিলেন। সম্প্রতি নিজামের জেল-জালিয়াতির প্রতিবেদন প্রকাশ হলে তিনি তার দোষ চাপান একরামের ওপর। সর্বশেষ দিনদুপুরে একরাম হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন নিজামের মামাতো ভাই আবিদ, জেলা আওয়ামী লীগের তার ঘনিষ্ঠ নেতা জাহাঙ্গীর আদেল, কমিশনার শিবলু, জিহাদ চৌধুরীসহ অনুগত ক্যাডাররা। একরাম হত্যার নেতৃত্ব দেয়া আবিদের মা লায়লা জেসমিন বড়মণি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আলোচনায় উঠে এসেছে কিলিং মিশনে অর্থের যোগানদাতা আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান দুলালের নাম। অস্ত্রের যোগানদাতা হিসেবে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগ নেতা আদেল ও জিয়াউল আলম মিস্টারের নাম। জেলা নেতারা এ অসন্তোষ প্রকাশ করতে না পারলেও ঢাকায় অবস্থান করে নিজামের নানা অপকর্মের ব্যাপারে কথা বলেন সাবেক এমপি জয়নাল হাজারী। এ নিয়ে বিরোধের অংশ হিসেবে একরাম হত্যা ঘটনায় জয়নাল হাজারীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান নিজাম হাজারী। নানা রাজনৈতিক, সাংগঠনিক নানা বিষয়ে করা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করলেও প্রকাশ্যে মুখ খোলার উপায় নেই। তবে ইতিমধ্যে একরাম সমর্থকরা বিক্ষোভ মিছিল করে নিজাম হাজারীর ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান ফাউন্ডেশনের নেতারা মামলার তদন্তভার সিআইডির কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন।
নিজামের ইশারায় চলে ফেনী বিএনপি: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিজ জেলা ফেনী। দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও এ জেলার নেতাকর্মীদের একটি অঘোষিত প্রভাব রয়েছে। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটিতে রয়েছেন চেয়ারপারসনের দুই উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু ও মোশাররফ হোসেন, সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি এবং নির্বাহী কমিটির সাত সদস্য জয়নাল আবেদিন ভিপি, রেহেনা আক্তার রানু, সাহেনা আক্তার শানু, বেলাল আহমদ, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিন মিস্টার ও সাংগঠনিক সম্পাদক মেছবাহউদ্দিন। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের এমপি নিজাম হাজারীর ইশারায় চলে ফেনী বিএনপির কার্যক্রম। তার ইশারার বাইরে কেউ সরকারবিরোধী জোরালো অবস্থান নিতে গেলেই তার ওপর নেমে আসে খড়গ। বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির একটি অংশের সঙ্গে রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের সখ্য। সমঝোতা করে চলছেন তারা। জেলার শীর্ষ নেতারা নিজাম হাজারীর এতটাই অনুগত, একটি মিছিল করতেও তার অনুমতি নেন। এ কারণে দলীয় একটি অংশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা-নির্যাতন হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি। সম্প্রতি ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম হত্যাকাণ্ডে বিএনপি নেতা মিনার চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও কার্যকর কোন প্রতিবাদ কর্মসূচি দেয়নি জেলা বিএনপি। এমনকি খোদ আওয়ামী লীগসহ নিহতের পরিবারের তরফে যে নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলা হচ্ছে তার ব্যাপারেও নীরব দলটির নেতারা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ এস্কান্দরের মৃত্যুর পর জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন আবু তাহের। তার ব্যাপারে নেতাকর্মীদের মন্তব্য, তিনি নীরবতার রাজনীতি করেন। জিয়াউদ্দিন মিস্টার এমন নিঝর্ঞ্ঝাট নেতা যে তাকে দিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলন আশা করা আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র। মিস্টারের বিরুদ্ধে কর্মীদের অভিযোগ, তিনি নিজাম হাজারীর সঙ্গে লাগতে যান না মোটেই। অন্যদিকে নিজামের ক্লাসমেট সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মিজানুর রহমান। রাজনীতিতে নিরাপদ থাকতে তিনি সহপাঠী হওয়ার সে সুযোগ নেন। জাতীয়তাবাদী অধ্যুষিত এলাকা হলেও বিগত সময়ে বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে পারেনি ফেনী বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিজ জেলা হলেও দলীয় কোন্দলে দিশাহারা ফেনী বিএনপি। ফেনীতে রয়েছে বিএনপির একাধিক গ্রুপ। দলীয় সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার ভাই মরহুম মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দরের অনুসারীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক এমপি রেহানা আক্তার রানু। এ ছাড়া চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোশাররফ হোসেন ও সাবেক এমপি জয়নাল আবদীন ভিপি, যুবদল কেন্দ্রীয় নেতা গাজী হাবিবুল্লাহ মানিকের নেতৃত্বে রয়েছে আরও দু’টি গ্রুপ। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। আন্দোলন কর্মসূচিতে যারা সক্রিয় থাকে তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। আবার বিএনপি আহূত হরতালগুলোতেও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও তারা খোলা রাখেন। এমনকি সরকারি দলের সে নির্যাতনের সময় তারা পাশে পান না দলের নেতাদেরও। জেলা যুবদল সভাপতি গাজী হাবিবুল্লাহ মানিকের বিরুদ্ধে মামলা-হামলার অব্যাহত থাকলেও সমঝোতায় নিঝর্ঞ্ঝাট রয়েছেন জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী। ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে মানিকের নেতৃত্বে একটি কর্মী-সমাবেশের আয়োজন করলে বিএনপিরই আরেকটি অংশ সে সমাবেশে সংঘর্ষ বাধায়। এতে ফরহাদনগর ইউনিয়ন যুবদল নেতা হারুনের মৃত্যু হলে মামলা করা হয় গাজী মানিকের বিরুদ্ধেই। রাজপথে সক্রিয় থাকলেও দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক গাজী হাবিবুল্লাহ মানিকের পদ নিয়ে হয়েছে অব্যাহতি ও প্রত্যাহারের নাটক। এ ছাড়াও বর্তমান সরকারের আমলে যুবদল নেতা রিপন গুম, যুবদল নেতা মানিক, সরওয়ার, লেমুয়ার আবুল কালাম ক্রসফায়ার ও রাজনৈতিক সহিংসতায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও এ নিয়ে সরব হয়নি জেলা বিএনপি। চার বছর আগে গঠিত ছাত্রদলের ৭ সদস্যের কমিটির সভাপতি আমানউদ্দিন কায়সার সাব্বির সাধারণ সম্পাদক নঈমুদ্দিন চৌধুরীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সম্প্রতি মিনার চৌধুরী ইস্যুতে পৌর বিএনপির সভাপতি আলালউদ্দিন আলালের মধ্যস্থতায় ছাত্রদলের উভয় অংশের নেতারা একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সব ক’টি উপজেলায় হেরেছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীরাও পাশে পাননি স্থানীয় বিএনপিকে। ফেনী সদর পৌর নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আলালউদ্দিনকে হারিয়ে দিতে নিজাম হাজারীর নির্দেশে আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরা হলেও বিএনপি নেতারা ছিলেন নীরব। ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান মনোনয়ন নিয়ে মিনার চৌধুরী ও নূরুন্নবী মাস্টারে মধ্যে যে লড়াই ছিল তা প্রভাব ফেলে নির্বাচনে। এমনকি সে নির্বাচনে যাননি জেলা বিএনপির সহসভাপতি হাবিবুর রহমান নান্টু। আওয়ামী লীগকে খুশি রাখতে গিয়ে সোনাগাজী উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি থেকেই চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী করা হয় দু’জনকে। আবার নির্বাচনের আগে তারা কখনও এক না হলেও নির্বাচনের দিন যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন।
মিনার চৌধুরীসহ তিন আসামি রিমান্ডে- পুলিশ সুপার ও ওসির প্রত্যাহার দাবি
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক হত্যা মামলার প্রধান আসামি জেলা তাঁতী দলের আহ্বায়ক মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনারকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ খায়রুল আমিনের আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনী সদর থানা পুলিশের ওসি তদন্ত আবুল কালাম আজাদ আদালতে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। আদালত উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনে ৭ দিনের রিমান্ড আদেশ দেন। এর আগে হত্যা মামলায় মঙ্গলবার গ্রেপ্তারকৃত ফেনী সদরের কাজীরবাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফকে ৫ দিন ও যুবলীগ ক্যাডার সজীবকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র রাখার দায়ে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে একই আদালত। এর আগে সকালে ফেনী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর কহিনূর আলমের ভাগিনা যুবলীগ ক্যাডার জিয়াউল হক বাপ্পীকে জেলার দাগনভূঞার সিলোনিয়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বাড়ি কিলিং স্পটের পাশে বিরিঞ্চি এলাকায়। বাপ্পী হত্যাকাণ্ডের দিন ঘটনাস্থলে কিলারদের সহযোগী ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ছাড়া সকাল ১০টায় একরাম হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আদেলকে গ্রেপ্তার ও ফেনী পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ এবং ফেনী সদর থানা ওসি মাহবুব মোর্শেদের প্রত্যাহারের দাবিতে ফুলগাজীর বন্ধুয়ায় মানববন্ধন করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও একরাম সমর্থকরা। এ দিকে একরাম হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আদেল এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নিহতের স্বজনরা। তারা জানান, আদেল কোথায় আছে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে। তবে ফেনী সদর থানা পুলিশের ওসি তদন্ত আবুল কালাম আজাদ জানান, আদেলকে গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আওয়ামী লীগ জনআতঙ্কে ভুগছে by কাজী সুমন ও মোজাম্মেল হোসেন সজল

আওয়ামী লীগ সরকার জন-আতঙ্কে ভুগছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধী জোট নেতা খালেদা জিয়া। মুন্সীগঞ্জের ঐতিহাসিক ধলেশ্বরীর পাড়ে লাখো জনতার সমাবেশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে ভয় পায়। এ জন্য তারা সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন চায় না। বিএনপির শক্তি জনগণ আর আওয়ামী লীগের আতঙ্ক জনগণ। তিনি আওয়ামী লীগের জন-আতঙ্ক রোগ হয়েছে। কুকুর কামড়ালে যেমন মানুষের জলাতঙ্ক রোগ হয়, তেমনি আওয়ামী লীগেরও জন-আতঙ্ক রোগ হয়েছে। মানুষ দেখলেই ভয় পায়। মানুষ দেখলেই আঁতকে ওঠে। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা কি কেউ নিরাপদ? এ সরকারের আমলে আপনি, আমি কেউ নিরাপদ নই। এ সরকার যত দিন জবরদখল করে ওই চেয়ারে থাকবে, তত দিন কেউ নিরাপদ নন। গতকাল সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে জেলা বিএনপি আয়োজিত বিশাল জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন খালেদা জিয়া। গুম-খুন, অপহরণসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপি এ জনসভার আয়োজন করে। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগকে ‘ঝেঁটিয়ে’ দূর করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সময় এলে খুন-গুমের বিচার হবে। সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আগেরবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়ে ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল, এবার ৪২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকতে হবে। এ জন্য নেতাকর্মীদের আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিরোধী জোট নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, আওয়ামী লীগ গত ৫ বছর দেশের মানুষকে অনেক কাঁদিয়েছে। এবার তাদের কাঁদতে হবে। আপনাদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইবে। মানুষের কাছে হাত পাততে হবে, পায়ে ধরতে হবে। কারণ তারা অনেক অপরাধ করেছে। কিন্তু তাদের জঘন্য অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। দুর্নীতি লুটপাটের মাধ্যমে পদ্মা সেতুর টাকা মেরে খেয়েছে। এরা আর পদ্মা সেতু করতে পারবে না। কারণ তাদের আর সেই সময় দেয়া হবে না। খালেদা জিয়া জনগণের উদ্দেশে বলেন, গত বছর আপনারা আন্দোলন করে ঢাকা থেকে সারা দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। এবার আন্দোলন হবে ঢাকাসহ সারা দেশে। এ জন্য তারা এখন জনসমাবেশ করতে দিতে ভয় পায়। রাজধানীতে আমাকেও নাকি জনসভা করতে দেবে না। দেখা যাক কি হয়। কারণ দেশের জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জনগণ নেই।

র‌্যাব এখন ক্যানসার হয়ে গেছে: গুম-খুনসহ অপহরণে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, র‌্যাব এখন এক আতঙ্কের নাম। অথচ জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের ধরার জন্যই একদিন আমরা র‌্যাব গঠন করেছিলাম। র‌্যাবকে সংস্কার করে কোন লাভ হবে না। র‌্যাব ক্যানসার হয়ে গেছে, এটি বাতিল করতে হবে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় জড়িতদের স্ব-স্ব বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, কোর্ট মার্শাল করতে দেয়া হয়নি। তাদের অবসরকালীন সুবিধা বাতিল ও খুনের বাংলাদেশের আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। এ সরকার তাদের শাস্তি না দিলে পরে যে সরকার আসবে তারা তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করবে। তারা কার জামাই তা দেখা হবে না। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের বোনজামাই দুর্ধর্ষ জঙ্গি শায়খ আবদুর রহমান। এ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইকে আমরা জীবিত অবস্থায় ধরেছিলাম। আমরা তাদের গুলি করে হত্যা করিনি। কিন্তু এখন র‌্যাব টাকার বিনিময়ে মানুষ খুন করছে। তারা এখন পেশাদার খুনি হয়েছে। এ জন্য র‌্যাব এখন বাতিল করতেই হবে। সুশীল সমাজের কেউ কেউ না বুঝে র‌্যাব সংস্কারের কথা বলছেন। সংস্কার-টংস্কার দিয়ে কিছুই হবে না। এদের ভেতরে ক্যানসার হয়ে গেছে। লক্ষ্মীপুরের যুবদল নেতা সোলায়মানকে উত্তরা থেকে কোলের বাচ্চা ছুড়ে ফেলে দিয়ে লক্ষ্মীপুরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। লাকসামের মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরুকে র‌্যাব-১১’র তারেক সাঈদ গুম করেছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনা আপনারা দেখেছেন। কাউন্সিলর নজরুলের গুমের ঘটনা দেখে ফেলায় আইনজীবী চন্দন সরকারকে ড্রাইভারসহ কিভাবে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনা দেখে ফেলায় আরও ৪ জন দরিদ্র মাঝিকেও হত্যা করা হয়েছে। তাদের লাশ পরে শীতলক্ষ্যায় পাওয়া গেছে। কাজেই এ র‌্যাবকে বাতিল করতেই হবে। এর পরিবর্তে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে র‌্যাবের পরিবর্তে নতুন আরেকটি বাহিনী গঠন করা যেতে পারে। তিনি এসব গুম-খুনের ঘটনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহির সম্মুখীন করা হবে বলে উল্লেখ করেন। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে এখন কারও কোন নিরাপত্তা নেই। আমি নিজেও নিরাপদ নই। কোন ধর্মের মানুষেরই আজ কোন নিরাপত্তা নেই। বরং মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষই এ সরকারের হাতে নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছে। শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের হত্যা করে লাশ গুম করেছে। সারা দেশের মন্দির ও মূর্তি ভেঙেছে। হিন্দুদের যত জমি ও সম্পদ আওয়ামী লীগ দখল করেছে। এ সরকারকে সরিয়ে দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্যই যুবসমাজসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামতে হবে।
থিয়েটার রোডের মুক্তিযোদ্ধার দল আওয়ামী লীগ: বিরোধী জোট নেতা খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের দল দাবি করলেও তারা হলো সীমান্ত পাড়ি দেয়া থিয়েটার রোডের মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার ঘোষণাটা দিতে সাহস পায়নি। তাজউদ্দীনের মেয়ে তার বইয়ে পরিষ্কারভাবে লিখেছেন, ‘তাদের নেতা তাজউদ্দীন সাহেবকে বলেছিলেন, ২৭ তারিখ (মার্চ) হরতাল ডেকেছি। বাসায় গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও।’ আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও লুটপাটের জন্য মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী দলটির নাম দিয়েছিলেন ‘নিখিল বাংলার লুটপাট সমিতি’। এখন থেকে আওয়ামী লীগকে সেই নামেই ডাকা হবে। ১৯ দলীয় জোট নেতা খালেদা জিয়া বলেন, শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়ে পাঠানো চিঠিতে বলেছিলেন, আপনিও দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আমিও দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রধানমন্ত্রী হয়েছি। কিন্তু শেখ হাসিনা জনগণের ভোটে প্রধানমন্ত্রী হননি। আওয়ামী লীগের এ মিথ্যাচার বন্ধ করতে হবে। ৫ই জানুয়ারি কোন ভোট হয়নি। সেদিন ভোটকেন্দ্রে কোন মানুষ ছিল না। কুকুর পাহারা দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আওয়ামী লীগ কাউকে সম্মান দিতে জানে না। আমাদের দেশে একজন নোবেল বিজয়ী সম্মানিত ব্যক্তি রয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার কাছ থেকে গ্রামীণ ব্যাংক কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমরা ক্ষমতায় এলে তাকে যথাযথ সম্মান দেবো এবং গ্রামীণ ব্যাংক ফিরিয়ে দেবো। গুম-খুন সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, এসব আওয়ামী লীগের কাছে নতুন কিছু নয়। একাত্তরের পর রক্ষীবাহিনী দিয়ে যা করেছিল এখন র‌্যাব দিয়ে তা করছে। বিএনপির ৩১০ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। ৬৫ জনকে গুম করেছে। এসব গুম-হত্যার বিচার করা হবে। তিনি বলেন, সরকার নিজেই দুর্নীতি-হত্যা-গুমে জড়িত। সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দেয়ার কারণে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়েছে। তাকে গুমের ঘটনা যে দেখেছে তাকেও গুম করা হয়েছে। শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকেও র‌্যাব গুম করেছে। খালেদা জিয়া বলেন, ফেনীর ফুলগাজীতে আওয়ামী লীগের দুই হাজারীকে আড়াল করতে বিএনপি নেতার নামে মামলা দেয়া হয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনিও একজন খুনি। তারও একদিন বিচার করা হবে। সেই খুনিকে এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা বানানো হয়েছে। তিনি কি উপদেশ দেবেন? বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, মুন্সীগঞ্জ বিএনপির ঘাঁটি। এখানকার জনগণ চেনে শুধু ধানের শীষ। তাই এখানকার একটি আসন কেটে নেয়া হয়েছে। এখান থেকে বিএনপির কোন নেতা কখনও ফেল করতেন না। আওয়ামী লীগের কারসাজিতে সবাই ফেল করেছেন। এবারও ডেকেছিল কয়েকটি আসন দেয়ার জন্য। কিন্তু আমরা ভাগবাটোয়ারার রাজনীতি করি না। আমরা বলেছি জনগণকে নিয়ে রাজনীতি করবো। তারা সেই রাজনীতি করে না।
দীর্ঘ ১৪ বছর পর গতকাল মুন্সীগঞ্জ শহরে জনসভায় বক্তব্য রাখেন খালেদা জিয়া। এর আগে ২০০১ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাটের এ মাঠে বক্তব্য রাখেন খালেদা জিয়া। তবে ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর ব্রিজ উদ্বোধনের সময় বালুর মাঠে বক্তব্য রেখেছিলেন। তা ছাড়া ২০১৩ সালে লৌহজংয়ের গোয়ালিমান্দ্রায় হিন্দু মন্দির ভাঙচুর পরিদর্শনে এক জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইয়ের সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, গাজীপুর সিটি মেয়র প্রফেসর এমএ মান্নান, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল মান্নান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, বরকতউল্লা বুলু, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, নাজিমউদ্দিন আলম, শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নিরব, সাংগঠনিক সম্পাদক আকম মোজাম্মেল হক, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা ও ছাত্রদল সভাপতি আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল বক্তব্য দেন। স্থানীয় নেতাদের মধ্যে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর মল্লিক রিপন, পৌর মেয়র ইরাদুত মানু, টঙ্গীবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি খান মনিরুল মনি পল্টন, শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মমিন আলী, লৌহজং উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহজাহান খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। জনসভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আতোয়ার হোসেন বাবুল। এর আগে বেলা ২টায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে জনসভা শুরু হয়। বিকাল সাড়ে ৪টায় মুন্সীগঞ্জের জনসভামঞ্চে পৌঁছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর জাসাসের শিল্পীরা দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন। জনসভাকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে শতাধিক মাইক টাঙানো হয়।
জনসমুদ্র মুন্সীগঞ্জ শহর: খালেদা জিয়ার জনসভাকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জ শহর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দুপুর ১২টা থেকেই জনসভাস্থলে জড়ো হতে থাকেন মানুষ। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, লৌহজং, শ্রীনগর, টঙ্গীবাড়ী, সিরাজদিখান, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস, ট্রাক, নসিমন, করিমন, লঞ্চ ও ট্রলারযোগে জনসভায় আসেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। বেলা ২টার দিকেই জনসভাস্থল লোকারণ্য হয়ে পড়ে। জনসভাস্থল থেকে ১ কিলোমিটারজুড়ে মানুষের এ সমাগম ঘটে। বক্তব্যের পর মুন্সীগঞ্জ জেলা সার্কিট হাউসে পৌঁছে কিছু সময় বিশ্রাম নেন তিনি। এরপর রাত সোয়া ৮টায় ঢাকার গুলশানের বাসার উদ্দেশে রওনা হন বিএনপি চেয়ারপারসন।
@কাজী সুমন ও মোজাম্মেল হোসেন সজল

সন্ত্রাস বন্ধ আর আলোচনায় জোর

নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে গতকাল পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এএফপি
ভারত বলল, পাকিস্তানকে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে, ২৬/১১-এর অপরাধীদের শাস্তি দিতেই হবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে৷ জবাবে পাকিস্তান বলল, সংঘাতের রাস্তা ছেড়ে সহযোগিতার পথে চলতে হবে, পারস্পরিক দোষারোপের রাস্তা ছাড়তে হবে এবং সব ধরনের বিষয় নিয়ে তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। গতকাল মঙ্গলবার ভারত ও পাকিস্তানের দুই প্রধানমন্ত্রী যথাক্রমে নরেন্দ্র মোদি ও নওয়াজ শরিফের প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকের নির্যাস এই।
মুম্বাই হামলার পরে শীর্ষস্তরের যে আলোচনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এত দিন পর মোদির দৌলতে তা একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকেই শুরু হলো বলা চলে৷ দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে ঠিক হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব যোগাযোগ রাখবেন৷ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ থাকা পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক এ বছরেই শুরু হতে পারে। সার্ক সদস্য দেশের অভ্যাগতদের প্রত্যেকের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দ ছিল ৩০ মিনিট করে৷ সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোদির বৈঠক হয় পৌনে এক ঘণ্টারও বেশি। বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং জানান, কাশ্মীর, সন্ত্রাস, ২৬/১১-এর মুম্বাই হামলার অপরাধীদের বিচার, বাণিজ্য—সব বিষয় নিয়েই কথা হয়েছে। সুজাতা বলেন, ‘সব রাষ্ট্রের প্রধানদের সঙ্গে এই বৈঠকের মূল সুর ছিল গণতন্ত্রের উৎসব।’ এই বৈঠকে আফগানিস্তানের হেরাতে ভারতীয় দূতাবাসে সাম্প্রতিক সশস্ত্র হামলার প্রসঙ্গও ওঠে৷ আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এই হামলার দায় লস্কর-ই-তাইয়েবার ওপর চাপিয়েছেন। পাকিস্তানের সন্ত্রাসীদের প্ররোচনায়ই এই হামলা হয় বলে ভারতের সন্দেহের বিষয়টিও শরিফের সঙ্গে আলোচনায় ওঠে। কিন্তু সেই বিষয়ে পাকিস্তানের বক্তব্য কী, তা সুজাতা জানাননি। এটা ঠিক যে এই সংক্ষিপ্ত শীর্ষ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে কাঠামোগত আলোচনার কোনো অবকাশ ছিল না। এই বৈঠক ছিল মূলত পরস্পরকে জানা ও চেনার অবকাশ।
সেই অবকাশে শরিফকে মোদি ভারতের মনোভাব ও তাগিদের বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে বলেন৷ সন্ত্রাসের সব দিক নিয়ে আলোচনার সময় দাউদ ইব্রাহিম ও মোল্লা ওমরের পাকিস্তানে থাকার প্রসঙ্গও ওঠে। তবে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সুজাতা সিং কিছু বলতে অস্বীকার করেন৷ ভারত ছাড়ার আগে নওয়াজ শরিফ এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে সংঘাতের বদলে সহযোগিতার ওপর জোর দেন৷ পারস্পরিক দোষারোপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান যে হয় না, তা বুঝিয়ে এই প্রবণতা বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দেন৷ এই বৈঠককে ‘ঐতিহাসিক আখ্যা’ দিয়ে বলেন, অবিশ্বাসের বাতাবরণ দূর করতে অতীত ভুলে তাঁরা এগোতে চান। প্রসঙ্গত, নওয়াজ শরিফ মোদির মতো একেবারেই প্রথম প্রধানমন্ত্রী না হলেও এ দফায় তুলনামূলকভাবে ‘নতুন’৷ এর আগে দুবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া পাকিস্তান মুসলিম িলগ (এন) নেতা এ দফায় সরকারপ্রধান হয়েছেন প্রায় এক বছর আগে৷ নওয়াজ-মোদি শীর্ষ বৈঠকের ফলে এখনই সম্পর্কের উন্নতি ঘটে যাবে, এমনটা ভারত মনে করছে না। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারত এগোতে চাইছে। তবে দুই দেশই মোদির এই উদ্যোগকে ‘ইতিবাচক ও সামনের দিকে পদক্ষেপ’ বলে মনে করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, নওয়াজ শরিফের মনোভাব প্রশংসনীয়। তিনি যে সামনের দিকে তাকাতে চাইছেন, সে বিষয়েও সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৯৯ সালে যা হয়েছিল, সেই আলোয় দেখলে সবচেয়ে আগে তাঁকে নিজের দেশের বিরুদ্ধ শক্তিদের সামলাতে হবে৷ সেটা তিনি পারছেন কি না, তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে। ভারতও তাই এখনই বিরাট কিছু আশা করছে না। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ককে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে চান, সেই বার্তা তিনি আমন্ত্রিত অতিথিদের দিতে পেরেছেন বলেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্র মন্তব্য করে।

বোমা নিয়ে পার্লামেন্টে সিনেটর!

‘বোমা’ হাতে সিনেটর বিল হেফারন্যান
অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর বিল হেফারন্যান গত সোমবার একটি কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছেন৷ একটি পাইপবোমা নিয়ে তিনি ঢুকে পড়েন পার্লামেন্ট ভবনে৷ এ সময় সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন৷ পরে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এ কথা জানতে পেরে যে বোমাটি নকল৷ খবর বিবিসির৷ পার্লামেন্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছে৷
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের এই বেহাল অবস্থায় মোটেও সন্তুষ্ট নন হেফারন্যান৷ পার্লামেন্টের দুর্বল নিরাপত্তার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে অানতে তিনি এ অভিনব কাজটি করেন৷ ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির এমপি হেফারন্যান৷ তিনি পার্লামেন্টে অর্থ ও জনপ্রশাসন আইনবিষয়ক কমিটির সদস্য৷ ঘটনার দিন ওই কমিটি দেশটির কেন্দ্রীয় পুলিশ কমিশনার টনি নেগাসকে নিরাপত্তা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে৷ পরে পুলিশ কমিশনার নেগাস বলেন, ‘বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থায় এটা বড় ধরনের ঝুঁকি৷’