Sunday, November 30, 2025

গাজায় ইসরায়েলের জাতিহত্যামূলক যুদ্ধের প্রতিবাদে ইউরোপজুড়ে লাখো মানুষের বিক্ষোভ

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের জাতিহত্যামূলক যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে গতকাল শনিবার ইউরোপের বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর বৈশ্বিক ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবসকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভ হয়। যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় এই বিক্ষোভ হলো।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, এ পর্যন্ত উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

গতকাল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রধান সড়কগুলোতে আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিক্ষোভকারীরা ‘গাজা, গাজা; প্যারিস তোমার সঙ্গে আছে’ এবং ‘প্যারিস থেকে গাজা, প্রতিরোধ’ স্লোগান দেন। তাঁরা ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে ইসরায়েলি ‘জাতিহত্যার’ নিন্দা জানান।

এক বিক্ষোভকারী আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এটি মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এখনো ন্যায়বিচার বা জবাবদিহি থেকে অনেক দূরে।’

আরেক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারি, এটি (ইসরায়েলের যুদ্ধ) খারাপ। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা কেন এটি বুঝতে পারেন না?’

ফ্রান্স প্যালেস্টাইন সলিডারিটি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অ্যান তুয়াইলোঁ বলেন, গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সাত সপ্তাহ পরেও কোনো কিছুরই সমাধান হয়নি।

প্রায় ৮০টি বেসরকারি সংস্থা, ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দল এই বিক্ষোভের আয়োজন করে। এগুলোর একটি ফ্রান্স প্যালেস্টাইন সলিডারিটি অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির প্রধান তুয়াইলোঁ যুদ্ধবিরতিকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। মানবিক সহায়তা আটকে দিচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বিক্ষোভের আয়োজকেরা জানিয়েছেন, প্রায় এক লাখ মানুষ এই প্রতিবাদী কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি ‘অপরাধের’ জবাবদিহি দাবি করেন। অবরুদ্ধ গাজার ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষার দাবি জানান।

ইতালিতে গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে গণবিক্ষোভ হয়। পাশাপাশি ইউনিয়নের নেতাদের নেতৃত্বে ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়।

দেশটির রাজধানী রোমে অনুষ্ঠিত মূল বিক্ষোভ সমাবেশে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড-বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টার ফ্রানচেসকা আলবানিজ ও জলবায়ু অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ অংশ নেন।

আলবানিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, ইসরায়েল শুধু গাজায় নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে জাতিহত্যা চালাচ্ছে।

এ ছাড়া জেনেভা, লিসবনসহ ইউরোপের অন্যান্য শহরেও বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকাটিতে ৩৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮৮৯ জন। এই সময়ে ইসরায়েল প্রায় ৫০০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেছেন, এত বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষকে হত্যা, পুরো জনগোষ্ঠীকে বারবার বাস্তুচ্যুত করা, মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছে, ঘোষিত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় এখনো জাতিহত্যা চালাচ্ছে। নতুন করে হামলা করছে। গুরুত্বপূর্ণ ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ। ২৯ নভেম্বর ২০২৫
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ। ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

রাজনীতিটা এখন ব্যবসায়িক জায়গায় পরিণত হয়েছে: বদিউল আলম মজুমদার

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, রাজনীতিটা এখন ব্যবসায়িক জায়গায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে অর্থবিত্তের মালিক হওয়া এখন প্রায় নিশ্চিত। ভবিষ্যতেও যদি রাজনীতিকদের ক্ষমতায় গিয়ে সম্পদ আহরণের ধারা চলতে থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ সহজ হবে না। জনপ্রতিনিধিরা যদি জনগণের সেবা করতে গিয়ে নিজেদের সেবা করেন, তাহলে মানুষকে হয়তো আরেকবার জেগে উঠতে হবে।

আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন বদিউল আলম মজুমদার। ‘ভয়েস নেটওয়ার্ক’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

সেমিনারে বদিউল আলম মজুমদার ২০০৮ সালে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত মেয়রদের সম্পদের হিসাব তুলে ধরেন। তিনি জানান, নির্বাচনের পর পাঁচ বছরে খুলনা সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে সাড়ে ১৪ হাজার শতাংশের বেশি। বরিশাল সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ৫ হাজার ৯১৭ শতাংশ। রাজশাহী সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ২ হাজার ৩০৮ শতাংশ। আর সিলেট সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ৬০৮ শতাংশ।

বাংলাদেশের নির্বাচনী অঙ্গনকে অপরিচ্ছন্ন বলে উল্লেখ করেন বদিউল আলম মজুমদার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাকা দিয়ে কেনা যায়, এমন একটা গণতন্ত্র এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সরকারের উপদেষ্টারা যদি নির্বাচনে অংশ নেন, তাহলে আরপিও (নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অনুযায়ী তা নিয়মের ব্যত্যয় হবে কি না, সে বিষয়ে সেমিনারে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।

দেশের রাজনীতিবিদদের চাহিদা অসীম উল্লেখ করে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরা বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মতো কাজ যতই করা হোক, মানসিকভাবে যদি আমরা আমাদেরকে অন্তর থেকে ধৌত করতে না পারি, তাহলে অন্য কোনো বিষয় দিয়ে কোনো কিছু হবে না।’

বিএনপির এই নেতা মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ যদি জাতি হিসেবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে না পারে, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে দেখলে নির্বাচনকে খুব সহজ মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে এটা অত্যন্ত জটিল সমীকরণ।

জেসমিন টুলি মনে করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। তাই সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আগেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

আগামী নির্বাচনে যাতে ফ্যাসিস্টরা কোনোভাবে অংশ নিতে না পারে, তা খেয়াল রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকিয়ে আছি নির্বাচন কমিশনের দিকে, তারা যাতে সুষ্ঠুভাবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।’

নির্বাচন ঘিরে গণমাধ্যমে যাতে সঠিক সংবাদ প্রচারিত হয়, সেই আহ্বান জানান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য। নির্বাচনের সময় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে সংঘর্ষের ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকে কমিশনের কার্যক্রম এখনো জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, বিশেষ করে সম্প্রতি যে নির্বাচন কর্মকর্তা অথবা ডিসি-এসপির যে নিয়োগগুলো হয়েছে, এগুলো কিছুটা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। কোনো একটি দলের দিকে তাঁরা হেলে পড়ছেন কি না, এই প্রশ্নটিও আসছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এখনো নিরপেক্ষতার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যেকোনো সময় সরকারের এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি মনে করেন, আগামী নির্বাচনে যদি কোনো জবরদখলের ঘটনা ঘটে, তা দেশের জন্য কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বিগত সময়ে দেশের মানুষের ভোটাধিকার আইসিইউতে চলে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। তিনি বলেন, ‘এটা থেকে বের হওয়াটা এখন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

বিভিন্ন হেভিওয়েট প্রার্থীর পিএসকে থানার ওসিরা ‘স্যার’ ডাকেন বলে অভিযোগ করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও জনপ্রশাসন মূলত এখনো পেশিশক্তি যেদিকে, সেদিকে হেলে থাকে। একটা চাঁদাবাজির মামলা নেওয়ার আগে পুলিশ বারবার খোঁজ নেয়, তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না। তাঁদের এই হচ্ছে অভিজ্ঞতা।

অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে আহ্বান জানিয়ে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, আগামী নির্বাচনে যেন আওয়ামী লীগের কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীও অংশ নিতে না পারেন। ফ্যাসিবাদ ও তার দোসররা যাতে অংশ নিতে না পারে। ডামি নির্বাচনে যারা অংশ নিয়েছে, তারাও যাতে অংশ নিতে না পারে। এ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সাহাবুল হক। সভাপতিত্বে করেন ভয়েস নেটওয়ার্কের চেয়ারপারসন মো. জসীম উদ্দিন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।

আয়োজকেরা জানান, ভয়েস নেটওয়ার্ক নামের এই প্ল্যাটফর্মে ২১টি নিবন্ধিত পর্যবেক্ষক সংস্থা যুক্ত আছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সংলাপ, গবেষণা, বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা কাজ করবে।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ারেছুল করিম, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি প্রমুখ।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-30%2Fwgobduw2%2FBadiul-Alam.jpeg?rect=242%2C0%2C1038%2C692&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার। আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে। ছবি: প্রথম আলো

দ্য উইকে শেখ হাসিনার নিবন্ধ, অস্বীকারের রাজনীতি ও অসত্য চর্চার নমুনা by শাহাদাৎ স্বাধীন

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোশ্যাল মিডিয়ার বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে ‘স্ক্রিম অব ফ্রাস্টেশন’ বা ‘হতাশার চিৎকার’-এর পাশাপাশি এখন কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন।

শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদেরও কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভারতীয় গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন।

এসব বক্তব্যে যেসব অসঙ্গতি ও অপতথ্য থাকে তা যেমন আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীর জন্য হতাশাজনক, বাংলাদেশের জনগণের প্রতিও অবমাননাকর।

বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যম এসব বক্তব্যের হুবহু অনুবাদ প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করছে। অথচ শেখ হাসিনার দাবি করা বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা এবং সঠিক তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল।

গত ১৫-১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় শেখ হাসিনার নীতি ছিল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বারবার বলা। এটি করতে গিয়ে তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হতেন। লেখক হুমায়ুন আজাদও বলেছিলেন, ‘সত্য একবার বলতে হয়, সত্য বারবার বললে মিথ্যার মতো শোনায়। মিথ্যা বারবার বলতে হয়, মিথ্যা বারবার বললে সত্য বলে মনে হয়।’ দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা সেই তাঁর আগের নীতি এখনো অবলম্বন করছেন।

দেশে একটি রক্তস্নাত গণ-অভ্যুত্থানের মাত্র ১৫ মাস হতে চলেছে, অথচ সেই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শক্তি, ছাত্রদের শক্তি, নাগরিক সমাজ ও কলমসৈনিকেরা নানা দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে গেছেন। যে সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমেছিল, তাদের অনেকের প্রত্যাশা ফিকে হয়ে গেছে। কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর ও ন্যায্য দাবির প্রতি যেমন কর্ণপাত করা হয়নি, তেমনি উপেক্ষিত হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়।

গণ-অভ্যুত্থানের নারী কণ্ঠ যেমন অদৃশ্য হয়ে গেছে, তেমনি গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে একটি বিশেষ মতাদর্শকেই বিশেষ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ফলে ৩ আগস্টের শহীদ মিনার কিংবা ৫ আগস্টের সকালের যে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধে ছিল জাতি, তা আজ নানা দলে-উপদলে বিভক্ত। গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বা স্পিরিট বিনির্মাণের পক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও চিন্তাচেতনার বিকাশে জাতি হিসেবে আমাদের কাজ এখনো খুবই অল্প।

এ দুর্বলতার সুযোগে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা নানা মিথ্যার ফুলঝুরি নিয়ে আবার হাজির হচ্ছেন। দ্য ইনডিপেনডেন্ট, এএফপি, রয়টার্স–এর সঙ্গে সাক্ষাৎকার শেষ করে তিনি এবার দ্য উইক–এ একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সম্প্রতি দিল্লি থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাটিতে ‘অতীতেও আমি অনির্বাচিত রাজনীতিবিদদের মোকাবিলা করেছি’ শিরোনামে শেখ হাসিনার নিবন্ধটি প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর এই লেখা যেন ‘বাঘ আর বোকা কৃষকের গল্পের’ পুনরাবৃত্তি। তিনি ভাবছেন, দেশের মানুষ বোকা কৃষক।

শেখ হাসিনার নিবন্ধটিতে অপতথ্যের অনেক উপাদান আছে। কারণ, তিনি অনেক অসত্য তথ্যকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেন তা সত্য মনে হয়; আর সত্যকে এমনভাবে গোপন করেছেন যেন তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে বর্ণনা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের মানুষের ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের সংগ্রাম, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জনের প্রাণহানি (জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন অনুযায়ী) এবং ২০ হাজার মানুষের আহত হওয়াকে অসম্মান ও অমর্যাদা করেছেন।

১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তিরা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ‘মুসলিম ভাইকে আলাদা করার গভীর ষড়যন্ত্র’ হিসেবে তুলে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানকে ছোট করতে চায়; শেখ হাসিনা যেন ভিন্নভাবে তাদের একটি রূপ ধারণ করেছেন। নিবন্ধে শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলকে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে বলে উপস্থাপন করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে জবাবদিহিহীন এলিটদের ‘অনির্বাচিত’ সরকার হিসেবে বর্ননা করেছেন।

কিন্তু কেমন ছিল শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের স্বর্ণযুগ? তিনি অসংখ্য গুম, খুন ও হেফাজতে মৃত্যু ঘটিয়েছেন; বিরোধী দল ও মতকে নির্যাতন, দমন–পীড়নের ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। আয়নাঘরের মতো নিকৃষ্ট বন্দিশালা বানিয়েছেন।

বাংলাদেশি মানবাধিকার গবেষকদের মাধ্যমে নথিভুক্ত তথ্য ও সুইডেনভিত্তিক নেত্র নিউজের বিশ্লেষণ অনুসারে, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত ২ হাজার ৫৯৭ জনকে বিচারবহির্ভূত ও হেফাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছে। (নেত্র নিউজ, ১৩ নভেম্বর ২০২৩)।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদনকে উদ্ধৃতি করে প্রচারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ২ হাজার ৬৯৯টি বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ৬৭৭টি জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে। (দৈনিক বণিক বার্তা, ১২ আগস্ট ২০২৪)

শেখ হাসিনার শাসনামলে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের নামে সাংবাদিক, অ্যাকটিভিস্ট ও নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, যা বর্ণনাতীত। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের পাঁচ বছর সময়ে এই আইনের অধীন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মীসহ ৪ হাজার ৫২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৫৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। (দৈনিক প্রথম আলো, ৩০ এপ্রিল ২০২৪)। এই আইনে লেখক মুশতাক আহমেদ তাঁর ফেসবুক পোস্টের কারণে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, কারাগারের হেফাজতে তাঁর মৃত্যু ঘটে।

শেখ হাসিনা যে বর্তমান সরকারকে অনির্বাচিত সরকার বলছেন, তা টেকনিক্যালি সঠিক, তবে এই সরকার বিশেষ পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মতামতের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীদের মতানৈক্যের ভিত্তিতে এবং সংস্কার ও একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজনের জন্য তা গঠন করা হয়েছে। আর এটি গণ-অভ্যুত্থানের সরকার। গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা আসা সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিত বলাই তো অপ্রাসঙ্গিক।

শেখ হাসিনা তাঁর কলামে স্বীকার করেছেন, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করায় তা অংশগ্রহণমূলক ছিল না। তিনি এ দায় ২০১৪ সালের বিরোধী দলের সহিংসতার ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো সংকটে পড়ে তাঁর সরকার একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করায়।

বিরোধী দলকে দমন–পীড়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে হাসিনা সরকার। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে তাঁর অধীন নির্বাচনের মাধ্যমে ডামি প্রার্থী দিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। ২০১৮ সালে তাঁকে বিশ্বাস করে বিরোধী দল ভোটে গেলে তাঁর সরকার রাতেই ভোটের ব্যালট বাক্স ভরে রাখে।

বিরোধী দল দমনে তিনি কঠোর ছিলেন তা বোঝা যায় এক পরিসংখ্যান থেকে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭১টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার আসামির সংখ্যা ৪০ লাখের ওপরে। (দৈনিক প্রথম আলো, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩)।

‘আমার পিতা সব করেছেন, আমি সব করেছি’—এই আত্মমুগ্ধতার চক্র থেকে শেখ হাসিনা এখনো বের হতে পারেননি। তার নিবন্ধের পুরোটা জুড়ে এর প্রতিফলন আছে। তিনি নিজেকে এখানে আবার ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যেখানে শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ছিল, যা ফাঁস হওয়া ফোনালাপে স্পষ্ট হয়েছে এবং সাবেক আইজিপিও রাজসাক্ষী হিসেবে স্বীকার করেছেন।

১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি, যার মধ্যে ১০ থেকে ১২ শতাংশ ছিল শিশু, এমন নৃশংসতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজেকে ‘ভিকটিম’ বা ভুক্তভোগী হিসেবে প্রচার করা একধরনের ভিক্টিমহুড পলিটিকস। শেখ হাসিনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ঘুরিয়ে দিতে চান, অথচ তাঁকে কৃতকর্মের জন্য আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

নিবন্ধে শেখ হাসিনার ভাষায়, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মের বিক্ষোভের পর থেকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে হারিয়ে যাওয়া প্রত্যেক বাংলাদেশির জীবনের জন্য তিনি শোকাহত। পরক্ষণেই তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে যেখানে তাঁর সরকার প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তাঁর রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা অস্ত্র হাতে মাঠে ছিলেন, নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালিয়েছেন, তার দায় ‘নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের ভুল সিদ্ধান্তের ওপর চাপিয়েছেন’।

অথচ শেখ হাসিনা তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে চলা এ হত্যাকাণ্ড চলাকালে দেশের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা জানানো বা নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শোকপ্রকাশের বদলে মেট্রোরেলের কাচ ভাঙা দেখতে গিয়ে কেঁদেছেন।

শেখ হাসিনা নিবন্ধজুড়ে তাঁর সরকারের উন্নয়ন বাহাস করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর সরকার প্রত্যেক বাংলাদেশিকে উন্নত গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু এগুলোর পেছনে যে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, তা এড়িয়ে গেছেন তিনি।

ঢাকা শহরের গণপরিবহনের পরিস্থিতি তো আমরা জানিই। প্রশ্নপত্র ফাঁস, জিপিএ–৫ ও পাসের হার বাড়িয়ে দেওয়া, নিয়োগ বাণিজ্যসহ শিক্ষাখাতে যে অরাজকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, তা–ও কখনো ভুলবার নয়। সরকারের সমালোচনার কারণে আবরার ফাহাদকে চরম নির্যাতন করে হত্যাই করা হলো। আরও বহু নিপীড়নের ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো পরিবেশবিরোধী প্রকল্প তিনি বাতিল করেননি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে উঠেছে।

শেখ হাসিনা তাঁর এমপি–মন্ত্রী–নেতা ও ঘনিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে একের পর এক ব্যাংক লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাঁদের অর্থপাচারের ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় পর্যন্ত তোলপাড় তুলেছে।

শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তিনি একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থা গড়েছেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ আইনের অধীন সমানভাবে আচরণ পাবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁর সরকারের সময়ে ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধমন্দিরের হামলা ও ভাঙচুরের বিচার তিনি সম্পন্ন করেননি। শুধু রামু নয়, নাসিরনগর, কুমিল্লা, রংপুরসহ অনেক জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে।

২০২১ সালে তাঁর সরকারের সময়ে ১৯টি জেলার দুর্গামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ সহিংসতার ৫৩টি ঘটনা ঘটে। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১)। তাঁর সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালের এসব ঘটনায় ৫৪টি মামলা হয়, কিন্তু ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুসারে ৪২টির কার্যক্রম শুরু হয়নি। (দৈনিক প্রথম আলো, ১৮ অক্টোবর ২০২৩)।

এসব সাম্প্রদায়িক হামলায় তাঁদের দলের অনেকের সম্পৃক্ত থাকারও অভিযোগ আছে। ফলে তিনি নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ঠিকাদার হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যা আসলে অসংগতিপূর্ণ।

নিবন্ধের শেষে শেখ হাসিনা প্রার্থনা করেছেন, ‘দেশ আবারও সত্যিকারের গণতন্ত্রে ফিরে আসুক।’ হ্যাঁ, দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য এত সংগ্রাম, ত্যাগ, তিতিক্ষা। ১৬ বছর ধরে দেশকে অগণতান্ত্রিক পথে নেওয়ার যাবতীয় কার্যক্রমই তিনি করেছেন। পরিহাসের বিষয় হলো, সেই তিনিই আবার ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ হিসেবে ভূষিত হতেন নিজ দলে।

প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার কাছে ‘সত্যিকারের গণতন্ত্র’ কোনটি? তাঁর ১৬ বছরের শাসনামলে যে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, সেটিকেই কি তিনি সত্যিকারের গণতন্ত্র বলছেন? তাহলে তিনি নিশ্চয়ই আবারও ভুল করছেন।

* শাহাদাৎ স্বাধীন
, গণমাধ্যমকর্মী ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

শেখ হাসিনা

কর্নাটকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব নিয়ে কি দুই নেতার বিরোধ মেটাতে পারবে কংগ্রেস

ভারতের কর্নাটক রাজ্যে নেতৃত্বের সংকট কীভাবে কখন মেটানো হবে, কংগ্রেস হাইকমান্ডকেই সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আজ শনিবার দলের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ মেনে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া বৈঠকে বসেন উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারের সঙ্গে। কর্নাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে সিদ্দারামাইয়ার বাসভবনে সেই প্রাতরাশ বৈঠকের পর দুই নেতাই গণমাধ্যমকে বলেছেন, তাঁদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ দেখাও দেবে না। তাঁদের লক্ষ্য একটাই, পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।

কর্নাটকে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে ২০২৩ সালে বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে হারিয়ে। সেই থেকে মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন ৭৭ বছর বয়সী সিদ্দারামাইয়া। ৬৩ বছরের উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারের অনুগামীদের দাবি, তখনই ঠিক হয়েছিল আড়াই বছর পর মুখ্যমন্ত্রিত্বের বদল হবে। দায়িত্ব নেবেন শিবকুমার। সেই প্রতিশ্রুতি মানা হোক।

এই দাবিতে শিবকুমারের অনুসারীরা কয়েক দিন ধরে দিল্লিতে দরবার করছেন। পাশাপাশি সিদ্দারামাইয়া জানিয়েছেন, রাজ্যের জনতা তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে পুরো পাঁচ বছরের জন্য।

দুই প্রভাবশালী নেতার এই দাবির মুখে কংগ্রেস হাইকমান্ড জানিয়েছিল, বিবাদ দুই নেতাকেই মেটাতে হবে। তাঁরা আলোচনা করে ঠিক করুন, বিবাদের মীমাংসা কীভাবে হবে। সেই অনুযায়ী আজ সকালে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া প্রাতরাশের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন শিবকুমারকে।

ঘণ্টা দেড়েকের সেই বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে প্রাতরাশের ছবি দিয়ে লেখেন, ‘শিবকুমারের সঙ্গে নাশতা খেলাম।’

শিবকুমারও নাশতা খাওয়ার কথা জানিয়ে বাড়তি লেখেন, ‘মাসখানেক ধরে কিছু বিভ্রান্তি চলছিল। এখন তা কেটে গেছে।’

এরপর গণমাধ্যমকে দুজনেই বলেন, তাঁদের মধ্যে অনেক কিছু নিয়েই কথা হয়েছে। তাঁদের প্রথম লক্ষ্য পুরসভা ও পঞ্চায়েত ভোটে জেতা। পরের লক্ষ্য ২০২৮ সালে বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করা। এই লক্ষ্যেই তাঁরা এগোচ্ছেন। দুজনেই বলেছেন, তাঁদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। ভবিষ্যতেও কোনো বিবাদ দেখা দেবে না।

বার্তা সংস্থা এএনআইকে সিদ্দারামাইয়া বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। এই একতা অটুট থাকবে। আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা বিবাদ নেই।’

আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও ২০২৩ সালে নির্বাচনে জয়ের পর ঠিক হয়েছিল প্রথম আড়াই বছর মুখ্যমন্ত্রী হবেন সিদ্দারামাইয়া। পরের আড়াই বছর দায়িত্ব নেবেন শিবকুমার। ২০ নভেম্বর সিদ্দারামাইয়ার আড়াই বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া মাত্র শিবকুমারের অনুগামীরা দিল্লিতে দরবার শুরু করেন।

সরাসরি দাবি না জানালেও শিবকুমার ‘এক্স’ মারফত জানিয়েছিলেন, কথা দিয়ে কথা রাখাই আসল শক্তি। পাল্টা ‘এক্স’ বার্তায় সিদ্দারামাইয়া লেখেন, জনতার রায় পাঁচ বছরের। দায়িত্বও পাঁচ বছরের। তা রক্ষা করাই আসল শক্তি। এই পরিস্থিতিতে হাইকমান্ড জানায়, দুই নেতা আগে নিজেদের মধ্যে কথা বলুন। তারপর হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে।

সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীর কাছে এটাই এই মুহূর্তের বড় চ্যালেঞ্জ। বিহার বিপর্যয়ের পর এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে কর্নাটকের সরকার টলে যায়। দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের কাছেও এটা বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি কর্নাটকেরই ভূমিপুত্র। তাঁর সময়েই রাজ্য জয়। দেশের মাত্র তিন রাজ্যে কংগ্রেস নিজের জোরে ক্ষমতায় রয়েছে। কর্নাটক ও তেলেঙ্গানা ছাড়া তৃতীয় রাজ্য উত্তর ভারতের হিমাচল প্রদেশ।

সর্বভারতীয় স্তরে দলের অবস্থা যে ভালো নয়, বিবদমান দুই নেতাও তা জানেন। বিহার জয়ের পর বিজেপি যে আরও দুর্নিবার, সে কথাও জানা। ৮ ডিসেম্বর থেকে কর্নাটক বিধানসভার অধিবেশন শুরু। বিরোধী বিজেপি ও জেডি (এস) ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তারা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনবে।

সিদ্দারামাইয়া ও শিবকুমারকে এই প্রাথমিক সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে। তারপর বিবেচিত হবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন। যদিও বিধানসভায় বিজেপির আসন ৬০, জিডি (এস)–এর ১৮। কংগ্রেসের আসন ১৪০।

কংগ্রেস সূত্রের খবর, বিধানসভার পরবর্তী নির্বাচনের আগেই শিবকুমার মুখ্যমন্ত্রী হবেন। তবে তা করা হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়, যাতে প্রবীন সিদ্দারামাইয়াকে অসম্মানিত হতে না হয়।

সিদ্দারামাইয়ার পক্ষে এটা মেনে নেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় রাস্তাও নেই। আগামী বছর তিনি ৭৮ বছরে পা দেবেন। এই বয়সে নতুন দল গঠন তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। গত নির্বাচনী প্রচারেই তিনি বলেছিলেন, এটাই তাঁর শেষ ভোট। আর দাঁড়াবেন না। লোক দল, জনতা দল ও জনতা দল (এস) ঘুরে তিনি কংগ্রেসে এসেছিলেন ২০০৬ সালে।

রাজ্যে দ্বিতীয় শক্তি বিজেপি, যেখানে যাওয়া সিদ্দারামাইয়ার পক্ষে সম্ভবপর নয়। তৃতীয় দল জেডি (এস)। সেই দলের দরজাও তাঁর জন্য বন্ধ। অথচ অনগ্রসর কুড়ুবা শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে সিদ্দারামাইয়ার ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা প্রবল। রাজ্যের দলিত ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থনও রয়েছে তাঁর দিকে। কংগ্রেস নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই চাইবে না তাঁকে রুষ্ট করে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে।

অন্যদিকে শিবকুমার প্রভাবশালী ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের নেতা। দক্ষিণ কর্নাটকে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল জেডি (এস) প্রধান সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়ার। তাঁর মোকাবিলা করে শিবকুমার ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের এক বড় অংশের সমর্থন কংগ্রেসে টেনেছেন। তাঁর সাংগঠনিক শক্তিও প্রশ্নাতীত। কংগ্রেসের কাছে তিনিও অপরিহার্য। গান্ধী পরিবারের প্রতি শিবকুমারের আনুগত্যও প্রবল। পরিবারের কথার অন্যথা তিনি কখনো করেননি।

আজ বৈঠকের পর দুই নেতাই বলেছেন, হাইকমান্ডের নির্দেশ তাঁরা মেনে চলছেন। চলবেনও। তাঁদের নজরে রয়েছে ২০২৮ সালের বিধানসভা ভোট। কংগ্রেস সূত্রের খবর, আগামী বছর ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া পর্যন্ত উপমুখ্যমন্ত্রী শিবকুমারই থাকবেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। বিধানসভার অধিবেশনের পর মন্ত্রিসভা রদবদলে শিবকুমারের কয়েকজন অনুগামীকে জায়গা দেওয়া হবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-29%2Fu608pi04%2Fkarnatok.jpg?rect=149%2C0%2C999%2C666&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার সঙ্গে বৈঠকে ডি কে শিবকুমার। ২৯ নভেম্বর ২০২৫, বেঙ্গালুরু। ছবি: এএনআই

ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ‘পুরোপুরিই বন্ধ’ বিবেচনা করা উচিত: ট্রাম্প

ভেনেজুয়েলা ও এর আশপাশের আকাশপথ ‘পুরোপুরিই বন্ধ’ বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। এতে করে লাতিন আমেরিকার দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান উত্তেজনা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

ট্রাম্প পোস্টে লিখেছেন, ‘সব এয়ারলাইনস, পাইলট, মাদক কারবারি এবং মানব পাচারকারীদের প্রতি আহ্বান থাকবে—অনুগ্রহ করে ভেনেজুয়েলার ওপরের এবং আশপাশের আকাশপথকে পুরোপুরিই বন্ধ বলে বিবেচনা করুন।’ কিন্তু এর দ্বারা কী বুঝিয়েছেন, তা ট্রাম্প ব্যাখ্যা করেননি।

জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ তৈরি করতে সম্প্রতি ক্যারিবীয় অঞ্চলে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অঞ্চলটিতে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ মোতায়েন করা হয়েছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি।

ওয়াশিংটনের দাবি, মাদকের পাচার ঠেকাতে এই সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু কারাকাসের দাবি, মাদুরো সরকারকে উৎখাত করাই ওয়াশিংটন আসল উদ্দেশ্য।

গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকে ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ২০টির বেশি ‘মাদকবাহী’ নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় ৮০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব নৌযান ভেনেজুয়েলার বলেও দাবি করা হচ্ছে।

কিন্তু এসব নৌযান মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। তা ছাড়া নৌযানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছিল, এমন কোনো প্রমাণও তারা দিতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযান এবং সামরিক শক্তি মোতায়েনের কারণে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি উড়োজাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষ ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় চলাচলকারী বেসামরিক উড়োজাহাজকে ‘সতর্কতা অবলম্বনের’ নির্দেশ দিয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, ‘ভেনেজুয়েলা ও আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং সামরিক তৎপরতা বেড়েছে।’

এই সতর্কবার্তার পর দক্ষিণ আমেরিকার আকাশপথে চলাচলকারী ছয়টি বড় এয়ারলাইনস ভেনেজুয়েলাগামী নিজেদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। এয়ারলাইনসগুলো হলো—স্পেনের ইবেরিয়া, পর্তুগালের টিএপি, কলম্বিয়ার অ্যাভিয়াঙ্কা, চিলি ও ব্রাজিলের ল্যাটাম (এলএটিএএম), ব্রাজিলের গোল (জিওএল) এবং তার্কিশ এয়ারলাইনস।

ফ্লাইট স্থগিতে ক্ষুব্ধ কারাকাস এসব এয়ারলাইনসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ভেনেজুয়েলার অভিযোগ, এসব কোম্পানি ‘মার্কিন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে।’

শুক্রবার নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিকোলা মাদুরো ফোনে কথা বলেছেন। দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য এক বৈঠক নিয়েও আলোচনা করেছেন।

ট্রাম্প-মাদুরো ফোনালাপের খবর প্রকাশের আগের দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, স্থলপথে ভেনেজুয়েলার মাদক পাচার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগির পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর ওয়াশিংটন-কারাকাস উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। নরওয়ের নেসোডেন শহর ও বিগডয়ের দ্বীপের কাছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। নরওয়ের নেসোডেন শহর ও বিগডয়ের দ্বীপের কাছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

রাশিয়ার দেওয়া নথিকে অনুসরণ করে যুদ্ধ বন্ধের পরিকল্পনা তৈরি করেছেন ট্রাম্প

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনা মস্কোর দেওয়া নথিপত্রের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। গত অক্টোবরে ওই নথিপত্রগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছিলেন রুশ কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে জানাশোনা আছে—এমন তিনটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।

গত অক্টোবরে ওয়াশিংটনের হাতে অনানুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া ওই নথিগুলোয় যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর বিভিন্ন শর্তের কথা উল্লেখ ছিল বলে জানিয়েছে সূত্র। যেমন একটি শর্ত হলো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের কিছু ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়া। এর ঠিক আগেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প।

এ বিষয়ে জানতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং ওয়াশিংটনে রুশ ও ইউক্রেন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে রয়টার্স। তবে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও এ পরিকল্পনা নিয়ে আশাবাদী ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এবং আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকল ইউক্রেনীয়দের সঙ্গে দেখা করবেন।

তবে কী ভেবে রুশ নথির ওপর ভরসা করে ট্রাম্পের প্রশাসন নিজেদের শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা পরিকল্পনায় থাকা রাশিয়ার শর্তগুলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছিলেন, ইউক্রেনীয়রা হয়তো সব শর্ত মানবে না।

যুক্ত ছিলেন ট্রাম্পের জামাতাও

সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রাশিয়া নথিগুলো জমা দেওয়ার পর রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে ফোন দিয়েছিলেন মার্কো রুবিও। সেখানে নথিপত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তাঁরা। চলতি সপ্তাহে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বৈঠকেও অনানুষ্ঠানিকভাবে অনেক নথিপত্র পাওয়ার কথা সাংবাদিকদের বলেছিলেন মার্কো রুবিও।

আরেকটি বিষয় হলো রুশ নথি থেকে পুরো ২৮ দফা পরিকল্পনা বা এর কিছু অংশ তৈরির সময় ট্রাম্পের জামাতা জেরাড কুশনার, ট্রাম্পের দূত উইটকফ ও রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা কিরিল দমিত্রিয়েভ আলোচনা করছিলেন বলে জানিয়েছে সূত্র। এই আলোচনার বিষয়ে অবগত আছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হোয়াইট হাউসের হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তাও।

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় রুশ প্রভাবের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় গত মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদন থেকে। তাতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও পুতিনের আলাপ নিয়ে ক্রেমলিনের কর্মকর্তা ইউরি উশাকভকে ফোন দিয়েছিলেন উইটকফ। ফোনকলের রেকর্ড অনুযায়ী, তখন উশাকভ ও উইটকফ সম্ভাব্য একটি ২০ দফা পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পরে দমিত্রিয়েভের সঙ্গে উইটকফ ও জেরাড কুশনারের আলোচনায় সময় এই পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত করা হয়।

ক্ষোভের মুখে পরিকল্পনা সংশোধন

২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার মতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ইউরোপে ইউক্রেনের মিত্রদেশগুলোও। এ নিয়ে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। গত রোববার জেনেভায় শুরু হয় ওয়াশিংটন-কিয়েভ আলোচনা। এবিসি নিউজের খবর অনুযায়ী, ওই আলোচনার পর ২৮ দফা পরিকল্পনা থেকে ৯টি দফা বাদ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি—দুই দলের সিনেটরদের একটি দল জানিয়েছিল, ২৮ দফা পরিকল্পনা কোনো মার্কিন প্রস্তাব নয়, বরং রাশিয়ার ‘ইচ্ছাপূরণের তালিকা’ বলে তাদের কাছে উল্লেখ করেছিলেন রুবিও। যদিও হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে যে রুবিও এভাবে ওই কথা বলেননি।

পরে গতকাল মঙ্গলবার ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, সবশেষ আলাপ-আলোচনার পর সংশোধিত যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাকে শান্তিচুক্তির একটি কাঠামো হিসেবে সমর্থন করছেন তাঁরা। তবে এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়—রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের ভূখণ্ড ছাড়ের দফাটি বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বোঝাপড়া করতে চান জেলেনস্কি।

‘পরিকল্পনার পর্যালোচনা প্রয়োজন’

জেনেভায় আলোচনার পর ট্রাম্পের পরিকল্পনার বর্তমান যে রূপ দাঁড়িয়েছে, তা ‘ব্যাপক হারে পর্যালোচনার প্রয়োজন বলে আজ বুধবার উল্লেখ করেছেন ক্রেমলিনের কর্মকর্তা উশাকভ। সংশোধিত এই পরিকল্পনা নিয়ে চলতি সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার আলোচনা হয়নি বলেও জানান তিনি।

উশাকভের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবুধাবিতে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের মধ্যে ‘খুবই সংবেদনশীল কিছু বিষয়’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল বন্দিবিনিময় ইস্যু। আবুধাবিতে রুশ কর্মকর্তারা মার্কিন আর্মি সেক্রেটারি ড্রিসকলের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

পরে রাশিয়ার টেলিভিশন সাংবাদিক পাভেল জারুবিনকে উশাকভ বলেন, সংশোধিত পরিকল্পনাটি রাশিয়ার কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে এ নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। এই পরিকল্পনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা ও আলোচনা প্রয়োজন। পরিকল্পনার কিছু বিষয় ইতিবাচকভাবে নেওয়া হয়েছে। তবে অনেকগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা হতে হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Saturday, November 29, 2025

খারাপ চুক্তি, নয়তো আরও যুদ্ধ—মহাসংকটে জেলেনস্কি

সিএনএন বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে ২৮ দফার শান্তিচুক্তিতে সম্মতি দেওয়ার জন্য ইউক্রেনকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু কিয়েভের ইউরোপীয় মিত্রদের চাপের মুখে ট্রাম্প তা থেকে সরে এসেছেন। এরই মধ্যে ইউরোপীয়রা একটি পাল্টা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে চলছে নিবিড় কূটনৈতিক দর-কষাকষি।

কিন্তু যতই দর-কষাকষি হোক, দিন শেষে যে চুক্তি হবে, তা ইউক্রেনের পক্ষে যাবে না। আর কিয়েভ যদি এই ‘খারাপ চুক্তিতে’ রাজি না হয়, তাহলে তাকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইউক্রেন কত দিন রাশিয়ার সেনাদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে, তা যথেষ্ট শঙ্কার বিষয়।

দর-কষাকষির জন্য ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আবারও শিগগির মস্কো সফরে যাবেন। সফরে পুতিনসহ রাশিয়ার অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। উইটকফের এবারের সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য সম্ভবত ইউক্রেনের ভূমি ছাড়ের বিষয়ে রাশিয়াকে ছাড় দিতে রাজি করানো। বিশেষ করে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের দোনেৎস্কের দাবি ছেড়ে দিতে মস্কোকে সম্মত করা। রাশিয়া এটা ছাড়তে রাজি হবে কি না, তা কিছুদিনের মধ্যে স্পষ্ট হবে।

ইউক্রেনে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরোদমে হামলা শুরু করে রাশিয়া। কিন্তু ইউক্রেনের পূর্ব দিকের দনবাস অঞ্চলে মূলত ২০১৪ সাল থেকে সরকারি সেনাদের সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘাত চলছে। বিদ্রোহীদের সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক—এই দুই প্রশাসনিক অঞ্চল নিয়ে দনবাস গঠিত। লুহানস্কের প্রায় পুরোটা রুশ সেনারা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। দোনেৎস্কের অধিকাংশ অঞ্চলও রুশ সেনাদের দখলে। শান্তিচুক্তির জন্য রাশিয়ার অন্যতম প্রধান দাবি, দনবাসের পুরোটা রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হবে। বিনিময়ে ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলের দখলকৃত ভূখণ্ড ছাড়বে রাশিয়া।

যুদ্ধের এই পর্যায়ে ইউক্রেনের আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। বর্তমানে রণক্ষেত্রের পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবেও নানা সমস্যায় জর্জরিত ইউক্রেন। আজ শুক্রবার দুর্নীতি তদন্তকারীরা ইউক্রেনের চিফ অব স্টাফ ও প্রধান আলোচক আন্দ্রিয় ইয়ারমাকের বাড়ি তল্লাশি করেছেন। মার্কিন শান্তি প্রস্তাব মেনে যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে চাপে থাকা জেলেনস্কি প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা।

এদিকে রণক্ষেত্রে ইউক্রেনের বড় সংকটগুলোর মধ্যে সেনা সংখ্যার ঘাটতি অন্যতম। তা ছাড়া কিয়েভ আগামী বছর ইউরোপীয় মিত্রদের থেকে কতটুকু তহবিল পাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এসব সংকটের পাশাপাশি রণক্ষেত্রে ইউক্রেন বর্তমানে তিনটি পৃথক প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে। রুশ সেনারা জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছেন। ধীর হলেও পোক্রোভস্ক ও দোনেৎস্ক অঞ্চলেও রুশ সেনাদের গতি অব্যাহত রয়েছে। উত্তর দিকের কুপিয়ানস্ক অঞ্চলেও রুশ সেনারা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। একসঙ্গে এতগুলো অঞ্চলে রুশ সেনাদের অগ্রগতি থামানোর সামর্থ্য জনবল-ঘাটতিতে থাকা ইউক্রেনের নেই। এ নাজুক অবস্থায় চলতি শীতে দোনেৎস্কের যেসব অঞ্চল এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আছে, তা-ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।

শুধু তা-ই নয়, রুশ সেনারা ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র ক্রামাতোরস্কের বেশ কাছে চলে এসেছেন। তাঁরা সেখানে এখন স্বল্পপাল্লার ড্রোন দিয়ে নিয়মিতভাবে হামলা চালাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে হারানো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ইউক্রেনের সেনারা সহজে নিতে পারবেন, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং এখন কিয়েভ ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মূল চাওয়া, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে রাশিয়া অস্থিতিশীল হয়ে পড়ুক।

কিয়েভ ও তার মিত্রদের আরেকটি গোপন আশা, যত বেশি সম্ভব রুশ সেনাদের প্রাণহানি এবং যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া যে অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, তা ভেঙে পড়ুক। এ চাওয়া সম্ভবত বেশ দুর্বল। কারণ, রাশিয়ার মতো একটি আবদ্ধ সমাজ এসব চাপে কতটা ভেঙে পড়বে, তা পূর্বাভাস করা প্রায় অসম্ভব।

২০২৩ সালের রাশিয়ার ভাড়াটে বেসরকারি সামরিক বাহিনী ‘ওয়াগনার’ বিদ্রোহ করেছিল। রণক্ষেত্র থেকে বাহিনীটির সেনারা বিদ্রোহ করে মস্কোর দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এ বিদ্রোহ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গুটিয়ে গিয়েছিল। বাহিনীর প্রধান ইভগেনি প্রিগোশিন বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন।

তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, জেলেনস্কির কাছে এখন দর-কষাকষির তেমন সুযোগ নেই। অন্যদিকে গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বলা যায়, একটি চুক্তি প্রায় আসন্ন। এখন ট্রাম্পের প্রস্তাব মেনে চুক্তি করা বা বড় ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই জেলেনস্কির। অন্যদিকে মস্কোয় রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে উইটকফের আসন্ন আলোচনা শেষে শান্তি প্রস্তাব মেনে নিতে ট্রাম্প ইউক্রেনকে হয়তো আরেকটি সময়সীমা বেঁধে দেবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-28%2Foxavz1v0%2FAS3656042724.JPG?rect=0%2C0%2C1202%2C801&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখন এক অচিন্তনীয় শান্তি প্রস্তাবের মুখোমুখি। ফাইল ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কী কথা হলো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি অব্যাহত রাখার মধ্যে এই আলোচনা হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানেন এমন দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, সপ্তাহের শেষ দিকে ফোনে দুজনের কথা হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানায়, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রে দুজনের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এমন বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা নেই।

দুই নেতার ফোনে কথা বলার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এর মাত্র কয়েক দিন পরই পররাষ্ট্র দপ্তর মাদুরোকে ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামক একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করার পর ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ কার্যকর করে।

ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁদের লক্ষ্য হলো মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ করা। তবে তাঁরা এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁরা মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান, প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে।

গত অক্টোবরে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাদুরো উত্তেজনা প্রশমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাঁর দেশের তেলক্ষেত্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব দেওয়ার এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য আরও অনেক সুযোগ–সুবিধার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। ফলে মার্কিন কর্মকর্তারা গত মাসের শুরুতে সেই আলোচনা বন্ধ করে দেন।

হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যেকার ফোনে কথা বলা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ভেনেজুয়েলার সরকারও এ নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

তবে ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন, দুই নেতার মধ্যে সরাসরি ফোনে কথা হয়েছিল। প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তাঁরাও নিজেদের নাম–পরিচয় দিতে চাননি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-26%2Fao9mc3it%2FMaduro-2.jpg?rect=56%2C0%2C524%2C349&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। রয়টার্স ফাইল ছবি

ওয়াশিংটন সফরে বড় জয় হাতিয়েছেন মোহাম্মদ বিন সালমান by মোহাম্মদ এলমাসরি

যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ নভেম্বর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সফরটি হোয়াইট হাউসের কূটনৈতিক সফর-ইতিহাসে সবচেয়ে নজরকাড়া সফরগুলোর একটি হয়ে থাকল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মোহাম্মদ বিন সালমানকে আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয় অভ্যর্থনা দিয়েছেন। মেরিন ব্যান্ডের সংগীত, অশ্বারোহী বাহিনীর কুচকাওয়াজ, সামরিক বিমান উড্ডয়ন প্রদর্শনী, ২১ বার তোপধ্বনি—সবই ছিল তাঁর জন্য। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার বাইরে ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা।

এটি ছিল যুবরাজের ২০১৮ সালের অক্টোবরে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যা ও তাঁর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করার ঘটনার পর প্রথম ওয়াশিংটন সফর। সে ঘটনার কারণে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় একঘরে হয়ে পড়েছিলেন।

এ সফরের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে ‘খাসোগি অধ্যায়’ কার্যত বন্ধ হলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোহাম্মদ বিন সালমানের সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরে এল।

বৈঠকটি সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন দিক নির্দেশ করল। দুই দেশ এমন এক পর্যায়ের সহযোগিতায় সম্মত হলো, যা ভবিষ্যতে তাদের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

বৈঠক থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে।

আদতে খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, এ বৈঠক তা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করল।

যুবরাজ সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করলেও ঘটনাটির সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয়েছিল। সিআইএর তদন্তে বলা হয়েছিল, সালমান ব্যক্তিগতভাবে এ হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

২০১৯ সালের মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণায় জো বাইডেন বলেছিলেন, তিনি সৌদিদের ‘যে ধরনের একঘরে হওয়া উচিত, সে রকমই করবেন’ এবং খাসোগি হত্যার জন্য তাঁদের ‘মূল্য দিতে বাধ্য করবেন’।

কিন্তু পরে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদের খুব বেশি চাপে রাখেনি। সম্ভবত ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব হলো, সৌদি আরবকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

মঙ্গলবারের যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে একটি মুহূর্ত বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো ছিল। এবিসি নিউজের সাংবাদিক ম্যারি ব্রুস খাসোগি প্রসঙ্গে সরাসরি যুবরাজকে প্রশ্ন করেন।

ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে মাঝখান থেকে বাধা দিয়ে তাঁর হয়ে উত্তর দিতে শুরু করেন। তিনি এবিসিকে ‘ফেক নিউজ’ বলেন এবং চ্যানেলটিকে সাংবাদিকতার সবচেয়ে খারাপ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বলে আখ্যা দেন।

ট্রাম্প দাবি করেন, খাসোগি ‘খুব বিতর্কিত ব্যক্তি’ ছিলেন এবং ‘অনেকেই তাঁকে পছন্দ করতেন না’।

হত্যা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটে, কিন্তু (যুবরাজ) এর কিছুই জানতেন না। পরে তিনি ব্রুসকে ‘ভয়ংকর মানুষ’ এবং ‘ভয়ংকর রিপোর্টার’ বলেও আক্রমণ করেন।

ট্রাম্পের এ প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের দৃষ্টিতে খাসোগি হত্যার বিষয়টি এখন ইতিহাসের পুরোনো ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবারের সফরের আগেই ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে হলিউড পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সৌদির অর্থ প্রবাহিত ছিল। তবে এবার সেই অর্থ আরও ব্যাপকভাবে বাড়বে।

গত মে মাসে মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৬০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। মঙ্গলবার তিনি সেই অঙ্ক বাড়িয়ে এক ট্রিলিয়ন ডলার করার ঘোষণা দেন। এতে ট্রাম্প খুবই খুশি হন।

এ বিনিয়োগ ট্রাম্পকে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে বড় সহায়তা করতে পারে।

এক ট্রিলিয়ন ডলার প্রায় সেই অঙ্কের সমান, যা যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আট বছরের যুদ্ধে খরচ করেছিল। এ কারণে এটি মার্কিন কোম্পানিগুলোকেও বড় ধরনের সুবিধা দেবে।
ট্রাম্প মনে করেন, এসব বিনিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রে ‘অনেক চাকরি’ তৈরি হবে।

তবে এত বিশাল বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি শক্তির ভারসাম্যে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনবে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র সৌদির ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারত। কিন্তু সৌদির এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এত বড় প্রভাব তৈরি হওয়ায় সেই ভারসাম্য সৌদির দিকেই ঝুঁকছে।

এ বিনিয়োগের মাধ্যমে যুবরাজ কার্যত রাজনৈতিক প্রভাবই কিনে ফেলেছেন। যে খাতগুলোর ব্যবসা সৌদির অর্থে চলবে, তারা ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারে সৌদির পক্ষে লবিং করবে।

এ বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সৌদির মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অন্যান্য নীতি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বা (এআই) ও পারমাণবিক শক্তিতে সৌদির বিনিয়োগ তাদের বিশ্ব ও আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াবে। মোহাম্মদ বিন সালমান বহুদিন ধরে উন্নতমানের কম্পিউটার চিপ কিনতে চেয়েছেন, যাতে রাষ্ট্রীয় এআই প্রতিষ্ঠান হিউমেইন বৃহৎ ডেটা সেন্টার চালাতে পারে।

বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিমাণে চিপ বিক্রির অনুমোদন দেবে। এই চিপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিজ্ঞান সৌদিকে যে ক্ষমতা দেবে, তাতে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। কারণ, ইউএই-ও বৈশ্বিক এআইয়ের কেন্দ্র হতে চায়। ইউএই সম্প্রতি এনভিডিয়ার কাছ থেকে কয়েক লাখ এআই চিপ কেনার চুক্তি করেছে।

যুবরাজ ও ট্রাম্প একটি পারমাণবিক চুক্তিও সই করেছেন। এ চুক্তি সৌদির বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিকে অনেক এগিয়ে নিতে পারে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, উপকরণ ও দক্ষতা চাইছে, যাতে তারা ইরান ও ইউএইর পারমাণবিক সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।

২০২৩ সালে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান বলেন, তাঁদের লক্ষ্য ‘সম্পূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি চক্র’। এর মধ্যে ইয়েলোকেক উৎপাদন, কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি এবং পারমাণবিক জ্বালানি প্রস্তুত করা—সবই রয়েছে।

চুক্তির বিস্তারিত পরে জানানো হবে। যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির অনুমতি দেবে কি না বা ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ১২৩ অ্যাগ্রিমেন্ট’ মানতে বলবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও যুবরাজের জন্য এটি বড় জয়।
মঙ্গলবার যুবরাজ যে সাফল্যগুলো পেয়েছেন, এর মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতের অর্জন সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প সৌদি আরবকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (এমএনএনএ) ঘোষণা করেছেন এবং একটি মার্কিন-সৌদি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে (এসডিএ) সই করেছেন।

এই প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্ভবত কাতারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা চুক্তির মতো হবে। যদিও সৌদি আরব আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি রক্ষা করতে বাধ্য হবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুবরাজ ও ট্রাম্প এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতেও পৌঁছেছেন।

এফ-৩৫ বিক্রি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ, মার্কিন আইন অনুযায়ী, যেকোনো চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হয়, সব আরব ও মুসলিম দেশের তুলনায় ইসরায়েলের ‘গুণগত সামরিক সুবিধা’ বজায় রাখা হবে। আরেকটি উদ্বেগ হলো, এই প্রযুক্তি চীনের হাতে চলে যেতে পারে।

এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরায়েলই এফ-৩৫ ব্যবহার করে। সৌদি আরব এ ধরনের ৪৮টি জেট চায়, যা কিনা ইসরায়েলের হাতে থাকা এফ-৩৫ বিমানের সংখ্যার চেয়ে বেশি।

যদিও আগে খবর এসেছিল, সৌদির এফ-৩৫-এর সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হবে, যাতে ইসরায়েলের সুবিধা বজায় থাকে। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, সৌদি বিমানগুলো হবে ‘টপ অব দ্য লাইন’, অর্থাৎ মানের দিক থেকে সেগুলো হবে সর্বোচ্চ।

এমএনএনএ মর্যাদা, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং এফ-৩৫ কেনা—সব মিলিয়ে সৌদির প্রতিরক্ষা শক্তি অনেক বেড়ে যাবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে।

ইসরায়েল এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে থাকবে, কিন্তু সৌদি আরব সেই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ফেলবে এবং ইরানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে ছাড়িয়ে যাবে।

* মোহাম্মদ এলমাসরি, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডির মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমান
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিরতির আলোচনা: ইউক্রেনকে ছাড় দেবে না রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে শান্তি পরিকল্পনায় রাশিয়া বড় ধরনের কোনো ছাড় দেবে না। দেশটির জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ইউরি উশাকভ গত বুধবার এ মন্তব্য করেছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ইউরি উশাকভের টেলিফোনে আলাপের নথি ফাঁস হয়। ওই আলাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কীভাবে প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে, সে বিষয়ে মস্কোকে পরামর্শ দিয়েছেন উইটকফ।

আগামী সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মস্কো সফর করার কথা রয়েছে উইটকফের। তিনি সেখানে গিয়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ২৮ দফা পরিকল্পনা সামনে এনেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে রাশিয়া। তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনা সংশোধন–পরিমার্জন করে আরেকটি প্রস্তাব এনেছে ইউক্রেন ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও গত মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কাঠামো এগিয়ে নিতে তিনি প্রস্তুত। তবে বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি আলোচনা করতে চান। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় মিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ট্রাম্পের প্রস্তাব ও উইটকফের ফাঁস হওয়া ওই ফোনালাপ ঘিরে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকানদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা চলছে। আইনপ্রণেতা ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক কৌশল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উইটকফের ফোনকলকে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ

ধরনের হাস্যকর পার্শ্বনাটক ও গোপন বৈঠক বন্ধ হওয়া দরকার।

রিপাবলিকান সাবেক সিনেটর মিচ ম্যাককনেল বলেন, রাশিয়াকে কোনোভাবেই পুরস্কৃত করা উচিত নয়। সমালোচনা সত্ত্বেও ট্রাম্প বলেন, অগ্রগতি হচ্ছে এবং মস্কো ছাড় দিচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানালেও রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বুধবার মস্কোতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মূল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় বা আমাদের অবস্থান থেকে সরে আসার প্রশ্নই ওঠে না।’

নথি ফাঁস

ব্লুমবার্গ নিউজে উইটকফ ও পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভের মধ্যকার

একটি ফোনালাপের নথি ফাঁস হওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মস্কো। ওই ফোনালাপে মার্কিন দূত উইটকফ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে

কীভাবে একটি শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে উশাকভকে পরামর্শ দেন। তবে এ নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা উড়িয়ে দেন। মস্কো বলেছে, এই নথি ফাঁস শান্তি প্রচেষ্টা ব্যাহত করার একটি অগ্রহণযোগ্য চেষ্টা এবং এটি হাইব্রিড যুদ্ধের শামিল।

শান্তিচুক্তি নিয়ে কথা বলার সময় আসেনি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর দূত উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার আলোচনা করবেন। রুশ কূটনীতিক উশাকভ বলেছেন, ‘উইটকফের বিষয়ে আমি বলতে পারি, প্রাথমিকভাবে একটি সমঝোতা হয়েছে যে তিনি আগামী সপ্তাহে মস্কো আসবেন।’

শান্তিচুক্তি কি তাহলে কাছাকাছি—এমন প্রশ্নে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভকে উদ্ধৃত করে রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানায়, ‘অপেক্ষা করুন। এখনো এ বিষয়ে বলার সময় আসেনি।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-27%2Fk3x47jdi%2FUntitled-1.jpg?rect=40%2C0%2C432%2C288&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের সঙ্গে কথা বলছেন। গতকাল কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে এক সম্মেলনে। ছবি : এএফপি

সাড়ে ৩ কেজি সোনা পরেন রাজস্থানের ফল ব্যবসায়ী, এখন চাঁদা দাবি করছে সন্ত্রাসীরা

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের চিতোরগড়ের ব্যবসায়ী কানাইয়ালাল খাটিকের অভিযোগ, গ্যাংস্টার রোহিত গোদারার সঙ্গে সম্পর্ক আছে দাবি করে কিছু লোক ফোন করে তাঁর কাছে চাঁদা চেয়েছে। খাটিক ফল ব্যবসায়ী।

প্রচুর সোনা পরার প্রতি খাটিকের আগ্রহের কারণে চিতোরগড়ের মানুষের কাছে তিনি ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী–সুরকার ‘বাপ্পি লাহিড়ী’ নামে পরিচিত। তিনি বাপ্পী লাহিড়ীকে দেখেই নাকি এভাবে সোনা পরার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, দুই দিন আগে খাটিকের মুঠোফোনে প্রথম একটি মিসড কল আসে। এরপর একই নম্বর থেকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ কল আসে। তিনি ফোন ধরেননি। এরপর তাঁর ফোনে একটি অডিও রেকর্ডিং পাঠানো হয়। এতে ভয়েস দেওয়া ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন।

খাটিক পুলিশকে জানিয়েছেন, মুঠোফোনে কল করা ওই ব্যক্তি তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দাবি মানা না হলে তিনি ‘সোনা পরার মতো অবস্থায়ও আর থাকবেন না’।

এ ছাড়া খাটিককে চুপচাপ বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

খাটিক কোনো কিছু না বলায় তাঁর মুঠোফোনে আবারও কল আসে। সেখানে অপর প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আবার পুরোনো কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। চিতোরগড়ের কোতোয়ালি থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে।

৫০ বছর বয়সী খাটিক ফল ব্যবসা শুরু করার আগে একসময় হাতে টানা ভ্যানে সবজি বিক্রি করতেন। আপেলের ব্যবসা শুরু করার পর তার ভাগ্য বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সোনার গয়নার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন।

বর্তমানে খাটিক প্রায় সাড়ে ৩ কেজি সোনার গয়না পরেন। এ জন্য স্থানীয়দের কাছে তিনি বেশ পরিচিত। এ কারণে চিতোরগড়ের মানুষ তাঁকে ‘গোল্ডম্যান’ নামে ডাকে।

‘গ্যাংস্টার’ রোহিত গোদারা কে

বিকানেরের লুনাকারানের বাসিন্দা গোদারা বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হয়। ভারতের বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ৩২টির বেশি মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গোদারা রাজস্থানের ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজি করতেন, তাঁর একটি বড় বাহিনী ছিল। গত বছরের ২৯ মে পাঞ্জাবের মানসা জেলায় গুলিতে নিহত হওয়া পাঞ্জাবি র‍্যাপার সিধু মুস ওয়ালার চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম গোদারা। তিনি সিকারের গ্যাংস্টার রাজু থেহাট হত্যাকাণ্ডেরও প্রধান অভিযুক্ত আসামি।

২০২২ সালের ১৩ জুন গোদারা ‘পবন কুমার’ নামে একটি জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে নয়াদিল্লি থেকে দুবাই পালিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করা আছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-28%2Fc9b6p7it%2FWhatsApp-Image-2025-11-28-at-3.39.25-PM.jpeg?rect=0%2C0%2C1200%2C800&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বিপুল পরিমাণ সোনা পরিহিত রাজস্থান রাজ্যের ব্যবসায়ী কানাইয়ালাল খাটিক। ছবি: খাটিকের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

বিশ্বে জনবহুল নগরীর তালিকায় সাত ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা

শহরমুখী মানুষের ঢল বিশ্বব্যাপী নগরায়ণকে ত্বরান্বিত করছে। বাড়ছে জনসংখ্যা, বাড়ছে মেগা সিটির সংখ্যা। জাতিসংঘের সদ্য প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শহরভিত্তিক এই জনঘনত্বের নতুন চিত্র। যেখানে বড় উল্লম্ফন হয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার। এক লাফে সাত ধাপ এগিয়ে উঠে এসেছে দ্বিতীয় অবস্থানে।

বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল নগরের শীর্ষস্থান দখল করেছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। পূর্বের তালিকায় শীর্ষে থাকা টোকিওকে পেছনে ফেলে এখন ৪ কোটি ১৯ লাখ মানুষের আবাস এই উপকূলীয় শহরটি। ঢাকার অবস্থানও পাল্টে গেছে নাটকীয়ভাবে। আগের তালিকার ৯ নম্বর থেকে এক লাফে উঠে এসেছে দ্বিতীয় অবস্থানে। বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। জাতিসংঘের পূর্বাভাস, বর্তমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে জাকার্তাকেও ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরে পরিণত হতে পারে ঢাকা।

জাতিসংঘের ‘ইউনাইটেড নেশনস ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স’ প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের তথ্য হালনাগাদ করে শহরে বসবাসকারীদের বিস্ময়কর বৃদ্ধির নতুন ট্রেন্ড তুলে ধরা হয়েছে। স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে- এটি মূলত ভবিষ্যৎ অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি একটি মূল্যায়ন।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে জাপানের রাজধানী টোকিও। প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ মানুষের শহরটির জনসংখ্যা গত ২৫ বছরে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও জাকার্তা ও ঢাকার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৫ ও ৭ গুণ। বিশ্বের মেগা সিটির সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বর্তমানে এক কোটির বেশি জনসংখ্যার শহর রয়েছে ৩৩টি। যেখানে ১৯টি এশিয়ায়। শীর্ষ ১০-এর মধ্যে ৯টিই এশিয়ান নগরী।

জাকার্তা, ঢাকা ও টোকিওর পর ৪ নম্বরে আছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি (বাসিন্দা ৩ কোটি ২ লাখ), চীনের সাংহাই (২ কোটি ৯৬ লাখ), চীনের গুয়াংজু (২ কোটি ৭৬ লাখ), ফিলিপাইনের ম্যানিলা (২ কোটি ৪৭ লাখ), ভারতের কলকাতা (২ কোটি ২৫ লাখ) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল (২ কোটি ২৫ লাখ)। ৯. সিউল (২ কোটি ২৫ লাখ)

এশিয়ার বাইরে একমাত্র প্রতিনিধি মিশরের রাজধানী কায়রো, যার জনসংখ্যা ৩ কোটি ২০ লাখ। লাতিন আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল শহর ব্রাজিলের সাও পাওলো (১ কোটি ৮৯ লাখ)। আর সাব-সাহারান আফ্রিকার মধ্যে দ্রুততম প্রবৃদ্ধির শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নাইজেরিয়ার লাগোস।

mzamin

তিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার: ছাত্র–জনতা হত্যাকাণ্ডে ক্ষমা চাইলেন না শেখ হাসিনা

গত বছর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার একযোগে শেখ হাসিনার তিনটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারগুলো প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট। সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয়েছে ই–মেইলে।

সাক্ষাৎকারগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যায় তাঁর দায়, আসন্ন নির্বাচন, দেশে ফেরা, ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে লিখিত প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এগুলোই পলাতক জীবনে তাঁর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকার।

তিনটি সাক্ষাৎকারেই শেখ হাসিনা একই ভাষায় কথা বলেছেন। নিজে কোনো কিছুর দায় নেননি, কোনো কিছুর জন্যই অনুশোচনা করেননি। ছাত্র-জনতার হত্যার জন্য মাঠপর্যায়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়ী করেছেন। এমনকি গণ–অভ্যুত্থানকে ‘সহিংস বিদ্রোহ’ দাবি করে এর দমনকে সাংবিধানিক অধিকার বলেও বর্ণনা করেছেন তিনি।

আবার নিজে পরপর তিনটি একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চেয়েছেন। নিজে প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বিভেদ বাড়ালেও এখন বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে দেশে বিভেদ বাড়বে।

ক্ষমা চাইতে অস্বীকার

দ্য ইনডিপেনডেন্ট তাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে বলেছে, ১৫ বছরের বেশি সময় কঠোরভাবে দেশ শাসন করা হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, গত বছর নিহত আন্দোলনকারীদের পরিবারের কাছে তিনি ক্ষমা চাইবেন কি না, তখন হাসিনা বলেন, ‘আমি আমাদের জাতি হিসেবে হারানো প্রতিটি সন্তান, ভাই-বোন, আত্মীয় ও বন্ধুর জন্য শোক প্রকাশ করি এবং তা করতে থাকব।’

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা গত বছরের বিক্ষোভ দমনের সময়কার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন। তবে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তিগত দায় স্বীকার করেন না, আর ওই আন্দোলন ছিল একটি সহিংস বিদ্রোহ।

শেখ হাসিনার দাবি, বেশিসংখ্যক প্রাণহানির জন্য দায়ী ছিল ‘মাঠপর্যায়ে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন নেতা হিসেবে আমি অবশ্যই সামগ্রিক দায় স্বীকার করি, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে—যে আমি নিজে নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালাতে বলেছিলাম, এটা ঠিক নয়।’

শেখ হাসিনা দাবি করেন, প্রথম দিকের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাঁর সরকারই একটি স্বাধীন তদন্ত শুরু করেছিল, কিন্তু পরে তা বন্ধ করে দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমি ব্যক্তিগতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছি, এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘চেইন অব কমান্ডের মধ্যে কিছু ভুল অবশ্যই হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে, সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত ছিল পরিমিত, সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এবং যতটা সম্ভব প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যে।’ তিনি এ প্রসঙ্গে ইনডিপেনডেন্টকে আরও বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা, যাঁদের সুপ্রতিষ্ঠিত কার্যক্রম পরিচালনাবিষয়ক নির্দেশিকা মেনে চলার কথা ছিল। এসব নির্দেশিকায় বিশেষ পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া ছিল। এমনটা হতে পারে যে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যেগুলো ভুল ছিল।’

নিজের বিচার প্রসঙ্গে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের। শেখ হাসিনাকে ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে, শেখ হাসিনা ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ফলে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, ছাত্র আন্দোলনের সময়ের ১ হাজার ৪০০ মৃত্যুর সংখ্যাটি ‘অতিরঞ্জিত’। তাঁর ভাষায়, ‘এই সংখ্যা ট্রাইব্যুনালের প্রচারণার কাজে লাগে, কিন্তু বাস্তবে তা বাড়িয়ে বলা।’

এ নিয়ে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, ‘যদি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তাতে আমি অবাক হব না বা ভয়ও পাব না। এটি একটি প্রহসনের বিচার, যার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করছে। এই ট্রাইব্যুনাল একটি প্রহসনের আদালত, যেটি পরিচালনা করছে আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে গঠিত একটি অনির্বাচিত সরকার। এই প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকেই আমাকে সরাতে যেকোনো কিছু করতে পারে।’

ইনডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, আদালতে এমন অডিও রেকর্ডিং বাজানো হয়েছে, যেখানে হাসিনাকে বলতে শোনা যায় যে তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে বলছেন। তবে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, এই রেকর্ডিংগুলো প্রসঙ্গের বাইরে কেটে নেওয়া ও বিকৃত করা হয়েছে। হাসিনা এ নিয়ে বলেছেন, ‘সহিংসতা ঘটেছে মাঠপর্যায়ে থাকা কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে, সরকারের আদেশে নয়।’

দ্য ইনডিপেনডেন্ট এ পর্যায়ে মন্তব্য করে বলেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা হবে এবং সম্ভবত তিনি জানেন ইতিহাস তাঁকে সদয়ভাবে বিচার করবে না। যদিও শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সহিংস বিদ্রোহের মুখে দেশ রক্ষায় সাংবিধানিক কর্তব্য পালনের জন্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কোনো নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত নয়।’

শেখ হাসিনা সব দায় অস্বীকার করলেও দ্য ইনডিপেনডেন্ট মন্তব্য করেছে যে গত বছর বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, তা বিশ্বকে শোকার্ত করে তুলেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উপ–আঞ্চলিক পরিচালক বাবু রাম পান্ত তখন বলেছিলেন, বাড়তে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের বিক্ষোভকারী বা ভিন্নমতের প্রতি একেবারেই অসহিষ্ণুতাকে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক তখন বলেছিলেন, ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ বিশেষভাবে দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনেও বলা হয়, বাংলাদেশে গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভ চলাকালে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন, আহত হন কয়েক হাজার। এসব হতাহতের বেশির ভাগ হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে। এটি ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে সহিংস ঘটনা। পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শেখ হাসিনা সরকারকে বিরোধীদের দমন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার ও একতরফা নির্বাচনের জন্য অভিযুক্ত করেছিল।

দেশত্যাগ ও উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে

দেশত্যাগ প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট দেশে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ায় তিনি চলে যান। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘থেকে গেলে আমার জীবন যেমন ঝুঁকিতে পড়ত, আশপাশের মানুষদের জীবনও তেমনি বিপদে পড়ত।’ তবে নির্বাসনে থাকলেও তিনি বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর ভাষায়, ‘শুধু অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই দেশকে ঠিক করতে পারে।’

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো সরকার যদি এমন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়, যেখানে তাঁর দল থাকবে না, তবে তিনি সেই সরকারের অধীনে বাংলাদেশে ফিরবেন না। তিনি ভারতে থাকার পরিকল্পনা করেছেন।’

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ একদিন আবার বাংলাদেশের ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখবে, সরকারে থাকুক বা বিরোধী দলে। আর এই দল পরিচালনার জন্য তাঁর পরিবার দরকার নেই। তিনি বলেন, ‘এটা আমার বা আমার পরিবারের বিষয় নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সংবিধান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর। কোনো ব্যক্তি বা পরিবার দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।’

তবে এ ক্ষেত্রে রয়টার্স উল্লেখ করে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী তাঁর ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ গত বছর রয়টার্সকে বলেছিলেন যে দল চাইলে তিনি নেতৃত্বের কথা বিবেচনা করতে পারেন।

ভোট বর্জন

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে তাদের লাখ লাখ সমর্থক নির্বাচন বর্জন করবে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অবিচারই নয়, এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। পরবর্তী সরকারের অবশ্যই নির্বাচনী বৈধতা থাকতে হবে। লাখ লাখ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। এখন যে অবস্থা রয়েছে, তাতে তারা ভোট দেবে না। আপনি যদি একটি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা চান, তাহলে আপনি লাখ লাখ ভোটারকে বঞ্চিত করতে পারেন না।’

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়া হবে সে আশা প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের অন্যান্য দলকে সমর্থন করতে বলছি না। আমরা এখনো আশা করি, বোধোদয় হবে এবং আমাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হবে।’

আর এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগসহ সব বড় রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা মানে দেশে ভবিষ্যৎ বিভেদের বীজ বপন করা।

গুম নিয়ে কথা বলেননি

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুতির পর তাঁর সমর্থকদের ওপর বড় ধরনের দমন অভিযান চালানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে একটি অভিযানে হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা রাষ্ট্র অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে।

এ নিয়ে রয়টার্স সবশেষে বলেছে, তবে নিজের শাসনামলে গোপন বন্দিশালায় নিখোঁজ হওয়া শত শত মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে শেখ হাসিনা কিছুই বলেননি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-29%2Ftkvckt24%2FUntitled-4.jpg?rect=0%2C0%2C1377%2C918&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গত বছর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গণহত্যা বন্ধ হয়নি, গাজায় হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল: অ্যামনেস্টির সতর্কর্তা

ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মাঝেও গাজায় হামলা ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক সতর্কবার্তায় বলেছে, গাজায় এখনও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব। সংস্থাটির দাবি গত সাত সপ্তাহে ইসরাইল ৫০০ বার যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে অ্যামনেস্টির সেক্রেটারি-জেনারেল অ্যাগনেস কালামার্ড বলেন, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন এনেছে এমন প্রমাণ নেই। বরং মানবিক সহায়তা ও জরুরি সেবার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ফিলিস্তিনিদের শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে দেশটি। তার ভাষায়, বিশ্বের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই যে ইসরাইলের গণহত্যা এখনো শেষ হয়নি।

এদিন সকালে গাজার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বুরেইজ শরণার্থী শিবির ও খান ইউনিসের পূর্বাংশে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এসব হামলা যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেই পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি গাজা সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের।

এদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ক্বালকিলিয়া, তুবাস, হেবরন, তুলকারেম ও নাবলুসে নতুন করে অভিযান চালিয়ে বহু ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইল। তুবাসে অভিযানের সময় অন্তত ২৫ জনকে মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দক্ষিণ গাজার ইয়েলো লাইন-এর ইসরাইল অধিকৃত অংশের টানেলে আটকে থাকা কয়েক ডজন হামাস যোদ্ধার পরিস্থিতি উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ইসরাইলের দাবি, গত সপ্তাহে এদের অন্তত ২০ জনকে তারা হত্যা করেছে। হামাস বলছে, এসব আক্রমণ যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।

গাজায় আন্তর্জাতিক অস্ত্রধারী স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন, গাজায় একটি অস্থায়ী আন্তর্জাতিক প্রশাসন এবং পুনর্গঠন পরিকল্পনা- এসব নিয়ে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা চলছে। কায়রোতে তুরস্ক, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতাকারীরা বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তবে ইসরাইলের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো মোহাম্মদ শেহাদার মতে, ইসরাইল এখনো গাজাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অযোগ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেনি।

অ্যামনেস্টির কালামার্ড আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি যেন ইসরাইলের চলমান নৃশংসতার আড়াল না হয়। তার আহ্বান- ইসরাইলের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা, গাজা থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং পূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা। 

mzamin

Friday, November 28, 2025

হংকংয়ে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু বেড়ে ৭৫, কেন এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ল

হংকংয়ের বেশ কয়েকটি সুউচ্চ ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৬০ বছরের মধ্যে শহরটিতে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। খবর অনুযায়ী, এ ঘটনায় ২৭০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। হাজার হাজার বাসিন্দাকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এখনো বেশ কয়েকটি ভবনে আগুন জ্বলছে। ঘন ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে চীনা ভূখণ্ডের আকাশসীমা ছেয়ে ফেলেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আগুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এ ঘটনায় হতাহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে ‘দায়িত্ব পালনকালে নিহত একজন ফায়ার ফাইটারও’ রয়েছেন।

আগুন লাগার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এ পর্যন্ত যা জানা গেল, সেটা দেখে নেওয়া যাক।

কোথায় এবং কখন আগুন লাগে

বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ২টা ৫১ মিনিটে হংকংয়ের তাই পো এলাকায় বৃহৎ আবাসন কমপ্লেক্স ওয়াং ফুক কোর্টে আগুন লাগে।

ওয়াং ফুক কোর্ট ৩১ তলা উচ্চতার আটটি ভবন নিয়ে গঠিত। তাই পো এলাকার কাউন্সিলর মুই সিউ-ফাং বিবিসি চায়নিজকে জানিয়েছেন, এর মধ্যে সাতটি ব্লক আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

১৯৮৩ সালে নির্মিত এসব ভবনে সংস্কারকাজ চলাকালে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।

তাই পো হলো হংকংয়ের উত্তর অংশে অবস্থিত একটি আবাসিক এলাকা, যা মূল চীনের শেনজেন শহরের কাছাকাছি।

২০২১ সালের সরকারি শুমারি অনুযায়ী, এই কমপ্লেক্সে ১ হাজার ৯৮৪টি অ্যাপার্টমেন্টে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ বাসিন্দা বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ৬৫ বা এর বেশি।

আগুন লাগার কারণ কী

আগুন লাগার কারণ অজানা। তবে হংকংয়ের নিরাপত্তা সচিব বৃহস্পতিবার ভোরে জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, আগুন অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ছড়িয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ভবনের বাইরে জালযুক্ত কাপড় এবং প্লাস্টিকের শিট পাওয়া গেছে—যার কোনোটিই অগ্নিপ্রতিরোধী বলে মনে হচ্ছে না।

ভবনের জানালায় স্টাইরোফোমও পাওয়া গেছে। পুলিশ বলেছে, এসব নির্মাণসামগ্রীর কারণেই আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫২ থেকে ৬৮ বছর বয়সী তিন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন একটি নির্মাণ সংস্থার পরিচালক এবং অন্যজন প্রকৌশল পরামর্শদাতা।

পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, তদন্তকারীরা নির্মাণ সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা খতিয়ে দেখছেন। মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের এমন বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে কোম্পানির কর্মকর্তারা দায়িত্বে গুরুতরভাবে অবহেলা করেছেন। এর ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।’

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, ভবনের ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি।

অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা কতটুকু

হংকংয়ে কমপক্ষে ৬৩ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এটিকে লেভেল ফাইভ অ্যালার্মে (সর্বোচ্চ স্তর) শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

খবর পাওয়ার ৪০ মিনিটের মধ্যে এই অগ্নিকাণ্ডকে লেভেল ফোর অ্যালার্ম ঘোষণা করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে স্তরটি আবারও বাড়ানো হয়।

স্থানীয় গণমাধ্যম এর আগে জানিয়েছিল, ভবনের ভেতরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার হোসগুলো উঁচু স্তরে পৌঁছাতে পারছিল না।

অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবার উপপরিচালক ডেরেক আর্মস্ট্রং চ্যান গণমাধ্যমকে বলেন, আগুনের তীব্র তাপের কারণে ফায়ার ফাইটাররা উদ্ধার অভিযান চালাতে ভবনের ভেতরে ঢুকতে পারছিলেন না।

ঘটনাস্থলে ৭৬৭ জন ফায়ার ফাইটার, ১২৮টি ফায়ার ইঞ্জিন, ৫৭টি অ্যাম্বুলেন্স এবং প্রায় ৪০০ পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছিল।

ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পর্কে কী জানা যায়

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৭ বছর বয়সী অগ্নিনির্বাপণকর্মী হো ওয়াই-হো রয়েছেন, যিনি শা টিন ফায়ার স্টেশনে ৯ বছর ধরে কাজ করছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ওয়াই–হোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং প্রায় আধা ঘণ্টা পর তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

হংকং ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, অন্তত আরও একজন অগ্নিনির্বাপণকর্মী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যরা লাউডস্পিকার ব্যবহার করে বাসিন্দাদের তাঁদের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পেতে সহায়তা করছেন।

কী কারণে আগুনের তীব্রতা বেড়েছে

ওয়াং ফুক কোর্টের ভবনগুলো বাঁশের মাচা এবং সবুজ নির্মাণ জাল দিয়ে ছাদ পর্যন্ত ঢাকা ছিল। কারণ, সেখানে সংস্কারকাজ চলছিল।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার জন্য সংস্কারকাজে ব্যবহৃত জাল, প্লাস্টিকের শিট ও স্টাইরোফোমের মতো উপকরণকে দায়ী করেছে।

নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না মনিটরের চেয়ারম্যান জেসন পুন সংবাদমাধ্যম ইনিশিয়াম মিডিয়াকে বলেছেন, আগুনের কারণ যা–ই হোক না কেন, ভবনের বাইরে সঠিক জাল ব্যবহার করা আগুন ছড়ানো রোধে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি যোগ করেন, নিম্নমানের জাল দ্রুত আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে।

আরেক প্রকৌশলী বলেন, তাঁর বিশ্বাস, হংকংজুড়ে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বেশির ভাগ জালই অগ্নিপ্রতিরোধক উপাদান দিয়ে তৈরি নয়।

এ ছাড়া মাচার ওপর প্রায়ই কার্ডবোর্ড, ধ্বংসাবশেষ এবং পেইন্ট থিনার পাওয়া যায়, যা শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গে মিলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে।

অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ আগে বলেছিলেন, সংস্কারকাজে ব্যবহৃত বাঁশের মাচা আগুনকে আরও বাড়িয়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সরকার নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাঁশের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে ধাতব মাচা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে চাইছিল।

হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিয়াং লিমিং উল্লেখ করেন, ওয়াং ফুক কোর্টের ভবনগুলো ছিল ‘তুলনামূলকভাবে পুরোনো’। তাই ‘জানালার কাচগুলো ততটা অগ্নিপ্রতিরোধী নয়’।

লিমিং আরও বলেন, আধুনিক ভবনে ডবল পেনের কাচের জানালা থাকে। কিন্তু এর জন্য সম্ভবত তারা শুধু একক পেনের কাচ ব্যবহার করেছিল, যা আগুনের তাপে খুব সহজে ভেঙে যেতে পারে এবং আগুন তখন বাইরের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-27%2Fygvvsnvk%2Fhongkong.JPG?rect=0%2C1%2C5500%2C3667&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ২৭ নভেম্বর ২০২৫, হংকং। ছবি: রয়টার্স

মামদানি পারলেও নাহিদরা কেন পারছেন না? by নুরুল হুদা সাকিব ও ইকরামুল হক রিয়ন

মাত্র এক বছরের প্রচারণায় নিউইয়র্ক শহর কাঁপিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আলোড়ন তুলেছেন জোহরান মামদানি। ৩৪ বছর বয়স্ক এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেতা উগান্ডায় জন্ম নেওয়া মুসলিম। নিউইয়র্কের শত বছরের ইতিহাসে তিনি সর্বকনিষ্ঠ এবং প্রথম মুসলিম মেয়র।

মামদানিকে মোকাবেলা করতে হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ধনকুবের সহযোগীদের বিপরীতমুখী অবস্থান, নেতিবাচক মিডিয়া ন্যারেটিভ আর নানা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকূলতা। এসবের মাঝে অ্যান্ড্রু কুমোর মতো প্রভাবশালী ও ঝানু রাজনীতিবিদকে হারানোটা ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার মতো।

নিউইয়র্কের কর্মজীবী বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে জীবনঘনিষ্ঠ সমস্যা ছিল জীবনযাত্রার খরচ জোগানো। মামদানি তাঁর নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছিলেন এ সমস্যাটিকে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘোরা ও ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে নাগরিকদের সমস্যা জানা, নির্বাচনী প্রচারণায় সেগুলোকে উল্লেখ করাসহ নিজের ব্যক্তিজীবনের স্বচ্ছতা তুলে ধরে মামদানি এই জয় ছিনিয়ে এনেছেন। তাঁর এই জয় প্রমাণ করে বিদ্যমান ব্যবস্থার বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও জোট করতে পারলে তরুণদের পক্ষে প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে জনসমর্থন আদায় করা সম্ভব।

২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী সরকার পতনে নেতৃত্ব দেওয়া নাহিদ ইসলামদের হাত ধরে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়েছে। ১৪০০-এর অধিক শহীদ আর অসংখ্য আহত ব্যক্তির নেতা নাহিদ ইসলামরা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন। আমাদেরও দেখাচ্ছেন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পার হলেও, বিএনপি ও জামায়াতের দ্বিমেরুর বাইরে তাঁদের তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠা নিয়ে সংশয় দৃশ্যমান। বিভিন্ন সময়ে করা নানান সংস্থার জরিপে তাঁদের কমতে থাকা জনসমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর নাহিদদের সহযোদ্ধাদের হাত ধরে প্রথমে লিয়াজোঁ কমিটি ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ ও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এনসিপিকে মনে করা হচ্ছিল আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারুণ্যের স্বপ্নের সারথি। কিন্তু বিভিন্ন সময় এনসিপির কিছু নেতা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁরা সেগুলোকে অস্বীকার করলেও অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা নেননি। ফলে অভিযোগগুলো প্রমাণিত না হলেও সেগুলো নাগরিকদের কাছে তাঁদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকেই তাঁদের বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মুদ্রার অপর পিঠ বলছেন, যেখানে ক্ষমতা আর দুর্নীতি হাত ধরে চলে।

নাহিদরা শুরু থেকে তাঁদের লক্ষ্য হিসেবে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ এর কথা বললেও সাধারণ নাগরিকরা সেই ধারণার সঙ্গে পরিচিত নন। নাহিদরা তাঁদের এই সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার কোনো রূপরেখাও পরিষ্কার করে উত্থাপন করতে পারেননি। তাঁরা কী চায়, কেন এবং কীভাবে চায়, সেটার স্পষ্ট কোনো ধারণা নাগরিকেরা এখনো পায়নি।

অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শকে একটি ‘কোর থিম’-হিসেবে নাগরিকদের সামনে উত্থাপন করেছে, নাহিদরা সেখানে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিএনপির বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কিংবা জামায়াতের ইসলামি রাজনীতি মানুষের কাছে যতটা সহজভাবে প্রতীয়মান হয়, নাহিদদের বাংলাদেশপন্থা ততটা হয় না। রাজনীতি তো জনগণের জন্য। জনগণের কাছে আধিপত্যবাদবিরোধী, আদর্শ-উত্তর, সেকেন্ড রিপাবলিকের ধারণা পরিষ্কার না হলে তারা নতুন মেরুকরণেও আগ্রহী হবে না। এ ক্ষেত্রে মামদানি বেশ সফল। তিনি খুবই স্বল্প সময়ে তাঁর ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট আদর্শকে কেবল প্রচারই করেননি, বরং সেটাকে নাগরিকদের কাছে সহজবোধ্য ও জীবনঘনিষ্ঠ করে উত্থাপন করে তাদের সমর্থনও আদায় করে নিয়েছেন।

গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে ৩ জন ছাত্র প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে নাহিদ ইসলাম পরবর্তী সময়ে পদত্যাগ করে এনসিপির হাল ধরেছেন। তিনিসহ বাকি দুজন ছাত্র প্রতিনিধি যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিয়েছিলেন, সেগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন তা অস্পষ্ট। বিশেষত গণমাধ্যম এবং জনপ্রশাসনে ফ্যাসিবাদী আমলের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে ছাত্র উপদেষ্টাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁরাও নানা সময় স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার বিষয়ে অভিযোগ তুললেও দায়িত্ব ছাড়েননি। ফলে তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দায়িত্ব ছাড়ার পর নাহিদ ইসলাম তাঁর কার্যক্রম কিংবা সাফল্যের কোনো প্রতিবেদন নাগরিকদের সামনে উত্থাপন করেননি। অন্য দুজন করবেন কি না, তা-ও অনিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে মামদানি বেশ ভিন্ন। তিনি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির মেম্বার হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন, নাগরিকদের কাছে তা স্পষ্ট করেছেন এবং জনসমর্থন আদায়ে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজেও লাগিয়েছেন।

সামনের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো আসন বণ্টন ও প্রচারণা শুরু করেছে। ইতিমধ্যে জামায়াত প্রায় ৩০০ আসন এবং বিএনপি ২৩৭ আসনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করছে। এনসিপি এখানে অনেকখানি পিছিয়ে আছে। তাদের সব নেতার এখনো আসন নির্ধারিত হয়নি। এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদে থাকা দুজন ছাত্র প্রতিনিধি কোন আসন থেকে নির্বাচন করবেন, আদৌ নির্বাচন করবেন কি না কিংবা করলেও সেটা এনসিপি থেকে করবেন কি না, সেটাও এখনো স্পষ্ট না। এ ছাড়া প্রচারণা শুরু করলেও তাঁদের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

মামদানি তাঁর প্রায় ১ লাখো স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে ১০ লাখের বেশি ভোটারের দ্বারে কড়া নেড়েছেন। নতুন আদর্শ প্রচারে এটি অপরিহার্য এবং বেশ কার্যকর। তবে সময় ও লোকবল বিবেচনায় এনসিপি এটা কতটুকু করতে পারবে বলা মুশকিল। বাড়ি বাড়ি না গিয়ে শুধু পথসভা আর জনসংযোগ করে ভোটার আকৃষ্ট করা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশ কঠিন। এনসিপির কয়েকজন প্রার্থী সে পথে হাঁটলেও বেশির ভাগই এ বিষয়ে এখনো নিষ্ক্রিয়। প্রান্তিক জনতার শক্ত সমর্থন না থাকলে এভাবে প্রচারণা করাও মুশকিল।

এ ক্ষেত্রে তাঁরা মামদানির মতো অনলাইন প্রচারনাকে গুরুত্ব দিতে পারেন। মামদানি ফেসবুক, এক্স, টিকটকের মতো জনপ্রিয় ডিজিটাল মিডিয়া সাইটগুলো ব্যবহার করে তাঁর ভোটারদের বৃহৎ অংশের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়েছেন। কেবল একটা টিকটক ভিডিও থেকেই তিনি ২ দশমিক ৫ লাখো ডলার তহবিল উত্তোলন করেছেন।

তবে নিউইয়র্কের প্রেক্ষাপটে এই কাজ যতটা সহজ, বাংলাদেশে ততটা সহজ হবে না। পরিবর্তনকামী যে জনগোষ্ঠীকে নাহিদদের ভোটার হিসেবে ধরা হচ্ছে, তাদের একটা বড় অংশ শহুরে এবং জেন-জি। এদের কাছে ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার করে পৌঁছানো তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু বাংলাদেশে নিউইয়র্কের চেয়ে ডিজিটাল লিটারেসি অনেক কম। জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশ ডিজিটাল বলয়ের বাইরে অবস্থান করায় এবং ডিজিটাল মিডিয়াকে রাজনৈতিক সচেতনতার কাজে না লাগানোয় শুধু অনলাইন প্রচারণায় সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

নির্বাচনের খরচ জোগাতেও ভুগতে হতে পারে এনসিপিকে। মামদানি তাঁর নির্বাচনী ব্যয়ের একটা বড় অংশ গণচাঁদা থেকে পেলেও বাংলাদেশে এই পদ্ধতি এখনো জনপ্রিয় না। খরচ জোগাড় করতে গিয়ে তাঁরা কোনো অনৈতিক পন্থা নিচ্ছেন কি না, সেদিকেও সবার কড়া নজর থাকবে। তাঁরা কীভাবে এই খরচ জোগাড় করেন ও ব্যয় করেন, সেটা ভোটারদের অন্যতম আগ্রহের জায়গা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলের সমার্থক হচ্ছে তার প্রতীক। ভোটাররা বিএনপি বা জামায়াতের প্রার্থীকে না চিনলেও ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লা প্রতীক চেনে। কিন্তু নাহিদদের নিবন্ধন আর প্রতীক নিয়ে দীর্ঘ জটিলতা জনসাধারণের কাছে তাদের পরিচিত করার পথে অনেকখানি পিছিয়ে দিয়েছে।

আগামী নির্বাচনে জোটসঙ্গীদের সবাইকে নিজস্ব দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে করতে হবে। ফলে জোট কিংবা একক, যেভাবেই নাহিদরা নির্বাচন করুন না কেন, শাপলা কলি প্রতীককে জনগণের কাছে পরিচিত করানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে এই কাজে যেখানে মামদানি পেয়েছেন বছরের বেশি সময়, নাহিদদের তা করে দেখাতে হবে মাত্র ৪ মাসে।

এ ছাড়া নাহিদরা যাদেরকে নিজেদের মূল ভোটার হিসেবে বিবেচনা করছেন, সেই তরুণ ভোটারদের মাঝেও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে কি না, সেটা ভাববার অবকাশ রয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে গণ-অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা নাহিদদের সহযোদ্ধাদের ছাত্রসংগঠন ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ’ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের প্যানেলে নির্বাচন করেছে। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমর্থন না পেয়ে বাকি দুটিতে তারা কোনো প্যালেনও দেয়নি। সম্প্রতি তারা সংগঠনের নামও পরিবর্তন করেছে। তাদের সমর্থন হারানোর এই বাস্তবতা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা দ্বারা পরিচালিত জরিপে ফুটে উঠেছে।

এ বছরের জুলাইয়ে সানেম-এর জরিপে যেখানে এনসিপির প্রতি ১৬ শতাংশ জনসমর্থন দেখা গিয়েছিল, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে তা ২-৫ শতাংশে ঠেকেছে। অথচ মার্চে এনসিপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক মোট ভোটের ৩০-৩৫ শতাংশ পেয়ে বিরোধী দলে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন।

এই অবনমনের পেছনে কিছু দৃশ্যমান কারণও রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে নাহিদদের দূরত্ব ক্রমাগত বেড়েছে। এর পেছনে গণ-অভ্যুত্থানের অংশীদারত্ব এককভাবে নিজেদের কাছে রাখার প্রবণতাকে কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এর পেছনে অন্যদের রাজনৈতিক স্বার্থবাদিতা থাকলেও নাহিদরা পুরোপুরি দায় এড়াতে পারেন না। যেই অপরায়ণের রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁদের দৃঢ় অবস্থান ছিল, জাতীয় নাগরিক কমিটি থাকাকালীন তাঁদের বিরুদ্ধে সেই অপরায়ণের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের কারণে অন্যদের মাইনাস করার এই অভিযোগ তাঁদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে কালিমা লাগিয়েছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি নাহিদদের কাছের কয়েকজন গণ-অভ্যুত্থানের নেতাকে অনলাইনে একে অপরের প্রতি বিষোদ্‌গার করতে দেখা গেছে। একে অপরকে ব্যক্তিগত স্বার্থে দলীয় ক্ষমতা ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের জন্য দায়ী করেছেন। দলীয় পরিসরে জবাবদিহি না করে গণপরিসরে পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি বাংলাদেশের প্রথাগত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নতুন বন্দোবস্তের উদ্দেশ্য তো ছিল পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভেঙে নতুন সংস্কৃতি নির্মাণ করা। ফলে নতুন মোড়কে পুরোনো রাজনীতি ভোটের মাঠে ফিরছে কি না, ভোটারদের সেটা ভাববার অবকাশ রয়েছে।

* নুরুল হুদা সাকিব, সভাপতি ও অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
* মো. ইকরামুল হক রিয়ন, প্রভাষক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
- মতামত লেখকদের নিজস্ব

নিউইয়র্ক সিটির সদ্য নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতৃবৃন্দ
নিউইয়র্ক সিটির সদ্য নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতৃবৃন্দ। ছবি: এএফপি ও প্রথম আলো

সন্তানদের নিয়ে দ্বন্দ্ব, গ্রেপ্তার আতঙ্কে দুবাইয়ের শাসক পরিবারের সাবেক বউ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে শাসক পরিবারের এক সদস্যের সাবেক স্ত্রী জয়নাব জাভাদলি গ্রেপ্তার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সাবেক স্বামী শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুম তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় পুলিশের কাছে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করার পর এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগে বলা হয়েছে, জয়নাব তাঁদের তিন মেয়েকে অপহরণ করেছেন।

শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুম দুবাইয়ের শাসকের ভাইয়ের ছেলে। ২০১৯ সালে জয়নাব জাভাদলির সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এর পর থেকেই শিশুসন্তানদের নিজেদের হেফাজতে রাখা নিয়ে সাবেক স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ চলছে।

গত কয়েক সপ্তাহে এই বিরোধ তীব্র রূপ নিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সন্তানেরা কখনো মায়ের কাছে আবার কখনো বাবার কাছে ছিল। দুজনই একে অপরের বিরুদ্ধে সন্তানদের অপহরণের অভিযোগ এনেছেন।

সবশেষ বিরোধের ঘটনাটি অনলাইনে এসে সরাসরি অভিযোগ করার কারণে জয়নাবকে সাইবার অপরাধের অভিযোগেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

জয়নাব বলেছেন, তিনি ঝুঁকি নিয়েই কাজটি করেছিলেন।

ব্রিটিশ আইনজীবী ডেভিড হেই-কে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় জয়নাব বলেন, ‘আমি জানতাম, এটি আমার শেষ সুযোগ। কারণ, তাঁরা আর আমাকে তাদের দেখার সুযোগ দেবেন না। আমি সত্যিই ধরে নিয়েছিলাম যে এটি আমার শেষ সুযোগ। তাই আমি সরাসরি অনলাইনে এসে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলাম।’

জয়নাব জাভাদলি তাঁর দুবাইয়ের বাড়ি থেকে ভিডিও বার্তাটি দিয়েছেন। বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ মেয়েরা বাবার সঙ্গে থাকার পর তিনি তাদের ফেরত নিয়ে এসেছেন।

জয়নাবের দাবি, ২০২২ সালে দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের সঙ্গে এক চুক্তির মাধ্যমে তিনি সন্তানদের নিজের হেফাজতে রাখার অনুমতি পেয়েছিলেন। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, সন্তানেরা ১৮ বছর পর্যন্ত তাঁর হেফাজতে থাকবে এবং তাদের জন্য একটি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে। মেয়েদের স্কুলের খরচ বহন করবেন তাদের বাবা।

আইনজীবী ডেভিড হেই বলেছেন, এসবের বিনিময়ে জয়নাবকে কিছু কাগজে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। এসব কাগজে উল্লেখ করা ছিল—তিনি তাঁর পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আর কোনো কথা বলবেন না এবং কোনো কিছু আর সরাসরি সম্প্রচার করবেন না।

পরে আদালত সন্তানদের শেখ সাঈদের হেফাজতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। তবে জয়নাব জাভাদলি বলেন, তাঁর মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, এতে দুবাইয়ের শাসকের সঙ্গে করা চুক্তির ওপর প্রভাব পড়বে না।

দুই মাস আগে পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি বজায় ছিল।

তবে হঠাৎ একদিন সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাতের সময় জয়নাব একটি বার্তা পান। দুবাই পুলিশের মাধ্যমে সাবেক স্বামীর বার্তাটি তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল। বার্তায় বলা হয়, সন্তানেরা সেদিন তাঁর (জয়নাব) সঙ্গে যাবে না। তিনি যেন অপেক্ষা না করেন।

এরপর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সন্তানদের সঙ্গে জয়নাবের আর যোগাযোগ হয়নি। অবশেষে তাঁকে শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রে তিন ঘণ্টার জন্য সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। ৮ নভেম্বর তিনি তাঁর গাড়িচালককে নিয়ে সেখানে যান। জয়নাব দাবি করেন, সুরক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে তিনি দেখেন তাঁর সন্তানেরা সেখানে নেই।

জয়নাব যখন ভবন থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন দেখেন সন্তানেরা তাঁর দিকে ছুটে আসছে।

সন্তানেরা চিৎকার করে বলছিল, ‘মা, আমাদের এখান থেকে নিয়ে যাও!’

জয়নাব তাঁর গাড়িচালককে বলেছিলেন, দরজা বন্ধ করে বাড়ি নিয়ে যেতে। তবে তাঁর অভিযোগ, সাবেক স্বামীর কর্মীরা তাঁদের পথ আটকে দিয়েছিল। তখনই তিনি লাইভস্ট্রিম খুলে সাহায্যের আবেদন জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানতেন, এতে আমিরাত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্বাক্ষর করা চুক্তি ভঙ্গের ঝুঁকি রয়েছে এবং গ্রেপ্তারও হতে পারেন। এরপরও তাঁর মনে হয়েছে, এটাই একমাত্র পথ।

জয়নাব তখন থেকে শিশুসন্তানদের সঙ্গে বাড়িতেই অবস্থান করছেন। তিনি বলেছেন, গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে বাইরে যেতে সাহস পাননি। তাঁর তিন মেয়ের বয়স—নয়, সাত ও ছয়।

মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকজন আমিরাতি কর্মকর্তার সঙ্গে বিবিসি যোগাযোগ করেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে আদালতের নথিপত্র দেখে শেখ সাঈদের মনোভাব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

সর্বশেষ নথিতে ৮ নভেম্বরের ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, জয়নাব তাঁর চালকের সহায়তায় শিশুদের জোর করে তাঁর গাড়িতে উঠিয়েছিলেন এবং তাঁদের অপহরণ করেছিলেন। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করার মধ্য দিয়ে জয়নাব তাঁর সাবেক স্বামীর মানহানির পাশাপাশি রাষ্ট্রের অবমাননা এবং রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

দুবাইয়ের শাসকের ভাইয়ের ছেলে শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুমের সাবেক স্ত্রী জয়নাব জাভাদলি
দুবাইয়ের শাসকের ভাইয়ের ছেলে শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুমের সাবেক স্ত্রী জয়নাব জাভাদলি। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

শেখ হাসিনার রাজনীতি কেন এতটা বিধ্বংসী হয়ে উঠেছিল by সালেহ উদ্দিন আহমদ

বর্তমান পরিবেশে শেখ হাসিনা সম্বন্ধে খুব মৃদুভাবে সত্য উচ্চারণ করতে হলে বলা যায়, তিনি একজন পরাজিত ও বিতাড়িত রাজনীতিবিদ। কিন্তু মৃদু উচ্চারণে এখন কেউ তাঁর নাম উচ্চারণ করেন না। তাঁকে নিয়ে যেসব বিশেষণ এখন শোনা যায় তা হলো—প্রতিশোধপরায়ণ, স্বৈরাচারী, আক্রমণাত্মক, হিংসাপরায়ণ এবং মারাত্মক একগুঁয়ে।

বাংলাদেশে তাঁর নামে ভালো বিশেষণ যোগ করার লোকেরও অভাব নেই। তবে তাঁরা বর্তমান পরিবেশে চুপ থাকছেন। রাজনীতিবিদ পিতার ঘরে জন্ম নিলেও বাবার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত হাসিনার পরিচয় ছিল একজন গৃহবধূ ও পরমাণুবিজ্ঞানীর স্ত্রী। আমরা শেখ হাসিনার রাজনীতি জীবনের কিছু প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে বুঝতে চেষ্টা করব, কেন তিনি দিনে দিনে আরও বেপরোয়া ও বিধ্বংসী হয়ে উঠেছিলেন।

মুজিব পরিবার হত্যা

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপরিবারে পরিবারের হত্যাকান্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনা তাঁর বাবা-মা ও তিন ভাইকে হারান। তিনি ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা তখন ছিলেন বিদেশে। স্বাভাবিকভাবে এই একটা ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে তাঁর জীবনকে সুনির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেলে। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু ঘটনা যোগ হয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।

শেখ হাসিনা যখন রাজনীতিতে যোগ দেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৪ বছর। তখনই তিনি তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছিলেন। তিনি অনেককেই তখন তাঁর প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছার কথা বলেছেনও। হাসিনা বলেছেন, রাজনীতিতে আসার তাঁর প্রাথমিক প্রেরণা ছিল তাঁর ‘বাবার হত্যার বিচার চাওয়া এবং বিচার করা’।

সাধারণত যাঁরা পারিবারিক ট্র্যাজেডি নিয়ে আচ্ছন্ন থাকেন, তাঁরা পরিবারের বাইরে অন্য কাউকে সহজে বিশ্বাস করেন না। এই অবিশ্বাসের মূল কারণ হলো, অন্যরা তো তাঁর মতো ভিকটিম বা ভুক্তভোগী নন। তাই যাঁরা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এনেছিলেন, সেই ড. কামাল হোসেন ও আবদুর রাজ্জাকের মতো নেতারা দ্রুতই শেখ হাসিনার আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

প্রকৃতপক্ষে পুরোনো কোনো আওয়ামী লীগ নেতাই কখনো শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ছিলেন না, যদিও অনেকেই দলে স্থান পেয়েছিলেন। হাসিনার দারুণ ক্ষোভ ছিল, তাঁর পিতার হত্যার পর কেন এই নেতারা রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ করেননি। অন্যদিকে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। হাসিনাকে তাঁদের নাম কখনো উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি। যেকোনো আনন্দ ও বিপদের সময় তিনি তাঁর ছোট বোন রেহানাকে তাঁর কাছে রাখতেন।

এক ঘরে দুই পির

শুধু শেখ মুজিবই নন, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আরেকজন জনপ্রিয় নেতা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শরিক হলেন আরেক শোকাতুর পরিবারের প্রতিনিধি। তিনি বেগম খালেদা জিয়া। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে যাঁরা হত্যা করেছিলেন বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাঁরা বিভিন্নভাবে চরম শাস্তি পেয়েছিলেন।

বেগম জিয়ার মধ্যে তাই রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার মধ্যে প্রতিশোধের কোনো উপকরণ ছিল না। তাঁর মূল বাধ্যবাধকতা ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষা করা। জিয়ার মৃত্যুর পর এম এ মতিন, জামাল উদ্দিন আহমেদ ও শাহ আজিজুর রহমানের উপদলীয় কোন্দলে বিএনপি একটি অকেজো রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল।

এই দুই পরিবারের প্রতিনিধি দুই ব্যক্তিগত কারণে রাজনীতিতে নামলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময়ে। তাঁরা একটা সাধারণ লক্ষ্য নিয়ে সখ্য গড়ে তুললেন। সেই লক্ষ্য হলো—এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা, যদিও দুজনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। এরশাদের রাজত্ব শেষে পরের দশক ছিল এই দুই নেত্রীর নিজেদের ক্ষমতা দৃঢ়করণের সময় এবং কে কাকে কোণঠাসা করে ক্ষমতা থেকে সরাতে বা দূরে রাখতে পারবেন, সেই প্রতিযোগিতার।

কয়েকবার দুই নেত্রীর মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হলো। একদল ক্ষমতায় গেলে অন্য দল সংসদ বয়কট করতেন। মূলত সহাবস্থানের পরিবর্তে এই দুই দলের একে অন্যকে অস্বীকার করার রাজনীতি দেশে এক অস্বাস্থ্যকর রাজনীতির উত্থান ঘটাল।

স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক

আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, দুই দলের শীর্ষে ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দুই অগ্রগামী সৈনিক। তাঁদের মৃত্যুর পর এই দুই দলেরই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা না করে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ ছিল। তার পরিবর্তে দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক নতুন বিতর্ক—কে প্রথম ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা?

শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণা ও জিয়াউর রহমানের কালুরঘাট বেতারের ভাষণকে কেন্দ্র করে দুই দলই দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল। শেখ হাসিনা বিএনপির এই উদ্যোগে খুঁজে পেলেন স্বাধীনতাসংগ্রামে শেখ মুজিবের অবদানকে অবনমন করার নতুন ষড়যন্ত্র। বিএনপির বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমণ আরও ধারালো হয়ে ওঠে। কখনো কখনো বেগম জিয়ার ওপর হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রমণ অশালীনতার পর্যায়ে উঠেছিল।

আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে জিয়াউর রহমানকে একজন ভালো সেক্টর কমান্ডার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসছিল। কিন্তু যখন বিএনপি তাঁকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ দাবি করে শেখ মুজিবের বিপরীতে দাঁড় করল, হাসিনার দল তখন জিয়ার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন শুরু করল। বলা হলো, জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের চর এবং তিনি যুদ্ধের সময় নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

হাসিনা ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ নিয়ে বিএনপির দাবিতে দারুণ ক্রুদ্ধ ছিলেন। অনেক পর্যবেক্ষক বলবেন, হাসিনার মানসিক জগতে এই একটি উপকরণ নানাভাবে অনেক বিষক্রিয়া ছড়িয়েছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সভায় শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা হলো। নিহত হলেন আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদক আইভি রহমানসহ অনেকে। বেগম জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী। হাসিনা সরাসরি বিএনপিকে দায়ী করলেন এই হামলার জন্য। বিএনপি শাসনামলের গ্রেনেড হামলার ঘটনা নতুন জ্বালানি ঢালল শেখ হাসিনার পিতামাতা হত্যার প্রতিশোধের আগুনে।

ওয়ান ইলেভেন সরকারের নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের মানুষ দেখল এক নতুন হাসিনাকে। ধীরে ধীরে সেই হাসিনা আরও বেপরোয়া, আরও আত্মবিশ্বাসী এবং কুক্ষিগত ক্ষমতার ধারক হয়ে ওঠেন। এই ১৫ বছরের শাসনকালে বলা যায় তিনি ক্রমান্বয়ে তাঁর বিরোধীদের নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার সব চেষ্টা চালিয়েছেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলায় চেক অনিয়মের অভিযোগে হাসিনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছিলেন যে, বেগম জিয়া গ্রেনেড হামলায় তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে অনুকম্পা দেখিয়ে জেলে রাখার বদলে গৃহবন্দী রাখার ব্যবস্থা করেছেন।

বিরোধীদের যেকোনো উপায়ে কোণঠাসা করে রাখাকে হাসিনা আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে দেখতেন। তিনি তাঁর আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতির জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যা ও তাঁর ওপর গ্রেনেড হামলাকে সচেতনভাবেই যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতেন। শেখ হাসিনা মনে করতেন, তাঁর পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার জন্য প্রতিপক্ষরা সব সময় সচেষ্ট। তাই তিনি ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন’ পাস করিয়েছিলেন ২০০৯ সালে।

যেকোনো উপায়ে হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। যাঁদের তিনি তাঁর শত্রু মনে করতেন কিংবা যাঁদের তিনি দেশের জন্য ‘ক্ষতিকর’ মনে করতেন, তাঁদের রাজনীতি নিশ্চিহ্ন বা সীমিত করাকে তিনি তাঁর অধিকার মনে করতেন। শেখ হাসিনার বিগত দিনের বক্তৃতা-বিবৃতি খুঁজে দেখলে একটা জিনিস পরিষ্কার হবে। সেটি হলো, তিনি ভাবতেন, তাঁর ও তাঁর পরিবারের প্রতি দারুণ অবিচার করা হয়েছে এবং সেগুলোর প্রতিবিধান করা তাঁর দায়িত্ব ও অধিকার।

অনেকেই মনে করেন, পারিবারিক ট্র্যাজেডিগুলোর জন্য তিনি দারুণভাবে মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। হাসিনা নিজের নামের চেয়েও তাঁর বাবার নামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাকে অগ্রাধিকার দিতেন। হাসিনা মনে করতেন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে তিনি বঙ্গবন্ধুর ‘লিগ্যাসি’ ও অর্জন দেশে সম্পূর্ণভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে যেতে পারবেন। তিনি দেশের প্রতিটি বড় সরকারি উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর নাম জুড়ে দিতেন এবং যত্রতত্র বঙ্গবন্ধুর স্ট্যাচু বসিয়ে জনগণকে তাঁর কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চেষ্টা করতেন।

হাসিনার ‘অতি চেষ্টা’ সফল হয়নি বরং হিতে বিপরীত হয়েছে। এখন আমরা এই দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঠিকানা মুছে ফেলার জন্য কিছু লোককে বুলডোজার নিয়ে ৩২ নম্বর রোডে ঘোরাফেরা করতে দেখছি।

আর শেখ হাসিনা? হয়তো ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়েই তাঁকে বাকি জীবন দেশের বাইরে কাটাতে হবে।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-25%2F2hhb5xef%2Fsheikhhasina-cartoon.jpg?rect=18%2C0%2C737%2C491&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

কড়াইল বস্তিতে কেন বারবার আগুন? by ফাহিমা আক্তার সুমি ও মোহাম্মদ রায়হান

বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে। এতে সহায় সম্বলহারা হন নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়। আগুনের কারণ এবং ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশও দেয় কমিটি। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়মিতই হচ্ছে। বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসে এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের নানা কারণ। এর মধ্যে দুর্বল অবকাঠামো, অবৈধ গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগকে অগ্নিকাণ্ডের বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়। সেখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের অসচেতনতাকে আগুনের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। আবার বারবার এসকল আগুনের পেছনে নাশকতাকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। ফায়ার সার্ভিস বলছে, কড়াইল বস্তিতে পূর্বের অগ্নি দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী তদন্তে বেশির ভাগ সময়ই  দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে অগ্নি দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে।

এসব বস্তিতে অসংখ্য বিদ্যুতের সংযোগ অবৈধভাবে টানা থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেগুলো আবার থাকে পুরনো তারের। আবার সেই চোরাই সংযোগে হিটারও চালানো হয়। থাকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। দাহ্য বস্তুতে বৈধ-অবৈধ অনেক কিছুই থাকে এই বস্তিতে। যার কারণে ঘনঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর মহাখালী কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দেড় হাজারের মতো ঘর-বাড়ি ও মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে নিঃস্ব হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। শেষ আশ্রয়স্থলটুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত পেরিয়ে দিনভর অবস্থান করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার। ঘরের ছাই ও পোড়া টিনের স্তূপের মধ্যে খুঁজে ফেরেন তাদের শেষ সম্বলটুকু। আগুন লাগার ঘটনার পরে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের চেষ্টায় দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা পর বুধবার সকালে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত ও প্রাণহানি ঘটেনি। কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। আগুন লাগার পরপর বস্তির বিভিন্ন ঘরে থাকা রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার একের পর এক বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। এতে দ্রুত আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে চলতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে এই বস্তিতে লাগা আগুনে পুড়ে যায় অসংখ্য ঘর। গত বছরের ২৪শে মার্চ ও ১৮ই ডিসেম্বরেও আগুনে পুড়ে কড়াইল বস্তির অংশ বিশেষ। প্রায় নব্বই একর জায়গার ওপর ১০ হাজারের মতো ঘর রয়েছে এই বস্তিতে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার খবর পাওয়ার ৩৫ মিনিট পর তিনটি স্টেশনের ইউনিট সেখানে পৌঁছায়। ঢাকার যানজটই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। বড় গাড়িগুলো সরু রাস্তায় ঢুকতে পারেনি। বাধ্য হয়ে দূর থেকে পাইপ টেনে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়েছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আগুন ‘ডেভেলপমেন্ট স্টেজে’ পৌঁছে যায়। যত্রতত্র বিদ্যুতের তার এবং বাসায় থাকা গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে আগুনের উৎস তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বলেন, প্রতি বছরই কড়াইল বস্তিতে ফায়ার সার্ভিস মহড়া আয়োজন করে। কিছুদিন আগেই সর্বশেষ মহড়া করা হয়েছিল। সে জন্য দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে; না হলে আরও দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারতো। পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ি, ওয়াসা এবং পাশের ড্রেনের পানি ব্যবহার করা হয়েছে। তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বস্তিতে বিভিন্নভাবে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, কোন আন্দোলন সংগ্রামের সময় কিংবা পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা থাকে। কড়াইল বস্তিতে তো এর আগে বহুবার আগুনের ঘটনা ঘটেছে সেই সময়গুলো কখন? আমরা দেখি অধিকাংশ সময় হলো আন্দোলনের সংগ্রামের সময়। কিংবা আন্দোলন পরবর্তী অবস্থায় নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করার সূত্র ধরে বস্তি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা কিংবা নানা জায়গাতে নানা ভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আর আমাদের এখানে তো প্রান্তিক বা সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত মানুষকে পুঁজি করে রাজনীতি তো বহু হয়েছে আরও হবে। যদি ত্রুটি থাকে বা কোনো ধরনের সতর্কতার ঘাটতি থাকে সেটা কীভাবে সংশোধন করা যায় সেক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থা নিবে সেটা আমরা প্রত্যাশা করি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার মানবজমিনকে বলেন, কড়াইল বস্তির মঙ্গলবারের অগ্নি দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে বিধায় সে বিষয়ে এখনই কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে কড়াইল বস্তির আগের অগ্নি দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী তদন্তে বেশির ভাগ সময়ই দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক থেকে অগ্নি দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। তিনি বলেন, বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার জন্য মূল ঝুঁকিগুলো হলো; অসাবধানতা, অনিরাপদ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ ও ব্যবহার, বিড়ি-সিগারেট, মশার কয়েল ও খোলা বাতির ব্যবহার।

নিঃস্ব দেড় হাজার পরিবার
মোসাম্মৎ বানু। একদিন আগেও ঘর-সংসার, আসবাবপত্র সবই ছিল তার। মঙ্গলবার মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন সব কেড়ে নিয়েছে তার। শুধু একটি পাটি আর ভর দিয়ে হাঁটা লাঠিই এখন অবলম্বন এই সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধার। তাই গতকাল দুপুরে তার ওই পোড়া ঘরের মেঝেতে বসে বিলাপ করছিলেন মোসাম্মৎ বানু। অশ্রুসিক্ত হয়ে বারংবার বলছিলেন-কিচ্ছু নেই ঘরে, আমার ঘরে কিচ্ছু নেই। আমি কোথায় যাবো? কী খাবো? মানুষের তো ছেলে আছে। মেয়ে আছে। স্বামী আছে। আয়-রোজগারের লোক আছে, আমার তো ছেলেমেয়ে, স্বামী কেউ তো নেই? আমাকে কে জায়গা দিবে? আল্লাহ আমারে কেন উঠায় নেয় না! আমি এখন নতুন ঘর কোথায় পাবো? সারা জীবন ধরে যা দুই-এক টাকা জমা করেছিলাম তাও আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।  

মোসাম্মৎ বানু মানবজমিনকে বলেন, আমার চোখে সমস্যা, অপারেশন করা হয়েছে। এর আগে স্ট্রোক হয়েছে আমার। লাঠি ছাড়া এখন আর চলাফেরা করতে পারি না। মঙ্গলবার বস্তিতে দাউ দাউ করে আগুন লাগার পরও একা ঘর থেকে বের হতে পারিনি। দুই জনে ধরে আমাকে আগুন লাগা ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। এর আগে ২০০৪ সালে যখন আমাদের বস্তিতে আগুন লাগে তখনো একই রকম পরিস্থিতি হয়েছিল। ২০১৭ সালেও আগুনে ঘর পুড়েছে আমার। এই নিয়ে তিনবার। তিনি বলেন, আগে তো দশ জনের কাছ থেকে হাত পেতে নিয়ে এসে কোনো রকমে চলেছি কিন্তু এবার আমি কি করবো!

মোসাম্মদ বানুর মতোই কড়াইল বস্তির অন্তত ১৫ শ’ পরিবারের ঘর আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এদের বেশির ভাগই পরনের কাপড় ছাড়া ঘর থেকে কিছুই নিয়ে বের হতে পারেননি। তাই ঘর পোড়া ছাইয়ের মধ্যে গতকাল অনেক মানুষকে তন্য তন্য করে খুঁজতে দেখা যায় জীবনের শেষ সম্বল, যদি কিছু মেলে। কিছু মানুষকে আবার আগুনে পোড়া ঘরের টিন, ধাতব বস্তু, লোহা- লক্কড় জড়ো করে ভাঙাড়ির কাছে বিক্রি করতে দেখা গেছে। আর সেগুলো পোড়া স্তূপের পাশেই বসে ছিলেন ফাতেমা আক্তার। মলিন মুখ, হাত দিয়ে চোয়ালে ঠেস দিয়ে বসে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছেন। কাছে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতেমা বলে ওঠেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমার ঘর, দোকান, সব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই দোকান দিয়ে আমাদের সংসার চলতো। এখন কিচ্ছু নেই। আমার যত পুঁজি ছিল সব এই দোকানে ঢেলেছিলাম, কিছুই রইলো না। ফাতেমা আক্তারের ঋণের টাকা দিয়ে বানানো দোকান পরিচালনাকারী তার স্বামী শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, আমাদের দোকান, বাসা থেকে একটু দূরে ছিল। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অসুস্থ। তাই দুজন মিলেই ভাগে দোকানটা চালাইতাম। মঙ্গলবার যখন আগুন লাগে তখন আমরা বাড়িতে ছিলাম। আগুন লাগার সময় বাইরের চিল্লাচিল্লি শুনে বাইরে এসে দেখি- আমাদের ঘরের চালে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চারদিকে আগুন আর আগুন। প্রথমে ঘর থেকে মালপত্র বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনি। এরপর দোকানের কথা মনে পড়তেই দৌড়ে দোকানের এদিকে আসি। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। কোনোভাবেই দোকানটাকে বাঁচাতে পারিনি।
এখন শুধুমাত্র মোবাইল ফোনটা আর দু’জনের গায়ের কাপড় ছাড়া কিচ্ছু নেই আমাদের। বাসার আসবাবপত্র, থালা-বাসন, টাকা-পয়সা, স্বর্ণ সব পুড়ে গেছে। দোকান ছাড়া আমাদের কোনো আলাদা আয়ের কোনো উৎস নেই যে, তাই করে খাবো। এখন এই পৃথিবীতে আল্লাহ্‌ই আমাদের একমাত্র ভরসা।
১৯৯৩ সালে বরগুনা থেকে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে চাকরি নেন মো. জসিম। ওঠেন কড়াইল বস্তিতে। কয়েক বছর চাকরি করার পর নিজেই থাকার ঘরের পাশে পাঁচটি সেলাই মেশিন কিনে শিশুদের পোশাক তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। মঙ্গলাবারের কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন তারও ব্যবসা ধ্বংস করে দিয়েছে। জসিম বলেন- আগুন যখন লাগে তখন আমি, আমার স্ত্রী, ছেলের বউ, নাতিসহ আমরা পাঁচজন বের হয়ে গেছি। সম্বল ছিল আমার সেলাইয়ের মেশিনগুলো। এই আগুন আমার সব পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার সবগুলো সেলাই মেশিই পুড়ে শেষ।

ফাতেমা, জসিমদের মতো কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুনে সর্বস্ব খুইয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে শত শত মানুষ। বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, কড়াইল বস্তির প্রবেশমুখগুলোতে শত শত মানুষ ভিড় করেছে। সকলের চোখে- মুখে হতাশার ছাপ। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন, এনজিওসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা তাদের সাধ্যমতো ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করছেন। কেউ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, কেউ পানি বিতরণ করছেন, কেউবা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় কড়াইল বস্তিতে লাগা ভয়াভহ আগুনের কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ৫ সদস্যের কমিটির সভাপতি ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ ও সদস্য সচিব ফায়ার সার্ভিস ঢাকার  পিএফএম’র সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান। কমিটির সদস্যরা হলেন- ফায়ার সার্ভিস ঢাকা জোন ০২-এর উপ-সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা,  ফায়ার সার্ভিসের তেজগাঁও স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার, মো. নাজিম উদ্দিন সরকার এবং ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা ২৩-এর ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মো. সোহরাব হোসেন।

mzamin