Thursday, August 27, 2026
দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন by ডা. হিমেল বিশ্বাস
লেড বা সিসা একটি মৌলিক উপাদান, যা মাটি ও পরিবেশে সব জায়গায় বিদ্যমান। ফলে গাছপালা এবং প্রাণিজ খাদ্যে সামান্য পরিমাণে সিসা থাকা স্বাভাবিক। তবে এই সামান্য উপস্থিতি থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি এবং জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্কের মধ্যে একটি বড় ফারাক রয়েছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘ঝুঁকি উপলব্ধির ব্যবধান’।
ঝুঁকির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে শিশুরা
সিসার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট জানিয়েছে, শিশুদের জন্য সিসার সংস্পর্শে আসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। এমনকি সামান্য মাত্রাও তাদের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করে, যা বুদ্ধিমত্তার বিকাশে বাধা দেয়। বাংলাদেশেও কোটি কোটি শিশু সিসা দূষণের শিকার।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার শিশুদের রক্তে সিসার গড় ঘনত্ব হলো লিটারপ্রতি ৬৭ মাইক্রোগ্রাম। মার্কিন রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নিরাপদ মান লিটারপ্রতি ৩৫ মাইক্রোগ্রাম, মানে স্বাভাবিকের চেয়ে এই মাত্রা অনেকটা বেশি বলতে গেলে প্রায় দ্বিগুণ। সিসা কোনো মাত্রায় গ্রহণযোগ্য নয়। এই নীরব বিষ শিশুদের আইকিউ কমিয়ে দিচ্ছে, আচরণগত সমস্যা বাড়াচ্ছে।
তবে এ সমস্যায় আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঝুঁকির মাত্রা পরিমাপের ক্ষেত্রে ‘ডোজ’ বা পরিমাণের গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) সিসা গ্রহণের যে সর্বোচ্চ দৈনিক সীমা (আইআরএল) নির্ধারণ করেছে, তা যথেষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই করা হয়েছে।
আমাদের করণীয় কী?
১. খাদ্যের বৈচিত্র্য: সিসা দূষণ এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা। কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার বেশি পরিমাণে বা নিয়মিত না খেয়ে, সব ধরনের খাবার পরিমিত পরিমাণে খান। এটি সিসাসহ যেকোনো পরিবেশগত দূষণকারীর সংস্পর্শ কমিয়ে দেবে।
২. সরকারি নজরদারি: সিসার প্রধান উৎস, যেমন পুরোনো রং, দূষিত পানি ও ব্যাটারি কারখানার বর্জ্য—এগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।
৩. সচেতনতা বৃদ্ধি: সিসাযুক্ত মসলা, খেলনা বা প্রসাধনী ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের মাটি বা পুরোনো পেইন্টযুক্ত দেয়ালে খেলতে নিরুৎসাহিত করুন।
প্রয়োজন দ্রুত ও সম্মিলিত পদক্ষেপ
২০৪০ সালের মধ্যে ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নে গৃহীত কর্মপরিকল্পনাগুলো হচ্ছে:
১. উৎস অপসারণ: সিসা দূষণের হটস্পট চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণ ও মাটি পরিষ্কার করা।
২. নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগ: সিসাযুক্ত রং, মসলা ও পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রির ওপর কঠোর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
৩. জনসচেতনতা: সিসা দূষণ প্রতিরোধের উপায় (যেমন: ঘন ঘন হাত ধোয়া, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ও পুরোনো রং করা দেয়াল থেকে শিশুদের দূরে রাখা) নিয়ে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি করা।
সিসা নিয়ে ‘ভূতের ভয়’ নয়, বরং বৈচিত্র্যময় ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাসই হোক সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সিসামুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
সোর্স: ওয়েব এমডি, জার্নাল অব হেলথ অ্যান্ড পলিউশন
* ডা. হিমেল বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল স্টাফ, স্নায়ুরোগ বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা
![]() |
| দারুচিনি, আপেল এমনকি প্রোটিন পাউডারের মতো জনপ্রিয় পণ্যগুলোয়ও সিসা পাওয়া যাচ্ছে। ছবি: গ্রাফিকস |
পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ্যাপক ডা. আজফার উদ্দীন শেখ
ভেরিকোসিলে সমস্যা
ভেরিকোসিলের জন্য অণ্ডকোষ/ অণ্ডথলি মোটা দেখায়, হালকা ধরনের বিরক্তিকর ব্যথা থাকে; যা অণ্ডকোষ, কুঁচকি হয়ে পশ্চাৎ পিঠেও যেতে পারে। শিশুকাল বা যৌবনের শুরুতে ভেরিকোসিল হলে অণ্ডকোষ ছোট হয়ে যেতে পারে। ভেরিকোসিল থাকলে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা ও ফ্রি–রেডিকেল বেড়ে যায়, ফলে স্বাভাবিক শুক্রাণু উৎপাদন ও এর চলন ব্যাহত হয়। শুক্রাণুর এসব সমস্যা পুরুষের বন্ধ্যত্বের জন্য দায়ী। তা ছাড়া ভেরিকোসিল থাকলে অণ্ডকোষ থেকে টেস্টোসটেরন হরমোন তৈরি কমে যেতে পারে, এ কারণে যৌন দুর্বলতা ও যৌন সম্পর্কে অনাগ্রহ দেখা দিতে পারে।
কারণ
অণ্ডকোষের শিরাগুলো যদি ঠিকভাবে রক্ত অণ্ডকোষ থেকে পেটের ভেতর বহন করতে না পারে, তাহলে ভেরিকোসিল হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিরার ভেতরের ভালভগুলো নষ্ট হয়ে যায় বা কাজ করে না। তা ছাড়া পেটের ভেতরের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ রক্ত রিফ্লাক্স হয়ে বা উল্টোপথে অণ্ডকোষে চলে এলে সেখানকার তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
রক্ত জমে থাকতে থাকতে শিরাগুলো ফুলে যায় ও আঁকাবাঁকা হয়ে যায়। অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, ফ্রি–রেডিকেল ও শুক্রাণুর ডিএনএতে ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে ভেরিকোসিল শুক্রাণু উৎপাদন ও চলনের ক্ষতি করে বন্ধ্যত্ব সৃষ্টি করতে পারে। তাই যাঁদের সন্তান হচ্ছে না ও সিমেন অ্যানালাইসিসে শুক্রাণুর সমস্যা আছে, তাঁদের ভেরিকোসিল আছে কি না, পরীক্ষা করে দেখতে হবে এবং এর চিকিৎসা নিতে হবে।
চিকিৎসা
● ওষুধের মাধ্যমে ভেরিকোসিলের ভালো চিকিৎসা নেই। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথার জন্য ওষুধ ও অণ্ডকোষের সাপোর্ট বা টাইট আন্ডারওয়্যার ব্যবহার করলে সাময়িক আরাম পাবেন; কিন্তু পুরোপুরি রোগ নিরাময় হবে না।
● অনেক ক্ষেত্রে অনেক দিন ধরে অণ্ডকোষে ব্যথা থাকে। ব্যথার ওষুধ আর অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে অনেকে আশ্বাস পান যে এতেই ভালো হয়ে যাবেন। এমন রোগীর অনেকেরই কিন্তু ভেরিকোসিল আছে, যা ধরা পড়তে দেরি হয়। তাই ভেরিকোসিল সন্দেহ হলে বা অণ্ডকোষে ব্যথা হলে অভিজ্ঞ ইউরোলজিস্ট ও ইন্ডোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
● ভেরিকোসিলের সঠিক ও সর্বোত্তম চিকিৎসা হলো মাইক্রোসার্জিক্যাল ভেরিকোসিলেকটমি। এতে রোগটি ফিরে আসার আশঙ্কা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা নেই বললেই চলে। এ পদ্ধতিতে সর্বাধুনিক মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে মাইক্রোসার্জিক্যাল সেন্টারে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের জন্য মাত্র এক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। দুই দিন পর থেকেই স্বাভাবিক কাজকর্ম করা সম্ভব। এ অস্ত্রোপচার অত্যন্ত নিরাপদ ও সবচেয়ে কার্যকর।
* অধ্যাপক ডা. আজফার উদ্দীন শেখ, বিভাগীয় প্রধান, ইউরোলজি ও ইন্ডোলজি, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ
| ভেরিকোসিল থাকলে টেস্টোসটেরন হরমোন তৈরি কমে যেতে পারে। ছবি: আনস্প্ল্যাশ |
Wednesday, August 26, 2026
৯ মিনিটের এই সহজ শরীরচর্চায় বদলে ফেলুন জীবন by মমতাজ মোস্তফা
একদিন রাতে ফোন স্ক্রল করতেই তার সামনে এল থ্রি ইনটু থ্রি ফিটনেস রুল নামে ছোট্ট একটি ভিডিও। তিন মিনিট তিন মিনিট করে তিন বারে মোট ৯ মিনিটের ছোট্ট একটি ওয়ার্কআউট।
একধরনের কৌতূহল থেকেই সেটা করে দেখার সিদ্ধান্ত নেন রিচা।
ফোনে তিন মিনিটের টাইমার সেট করে প্রথম ধাপের স্ট্রেচিং শুরু করেন রিচা, তার মনে হয় যেন অনেক পুরোনো জং ধরা একটা দরজা খোলার চেষ্টা করছেন। তারপর স্কোয়াট এবং লাঞ্জ করেন। সবশেষের ধাপ ছিল জাম্পিং জ্যাক। যখন টাইমার বিপ বাজে তখন রীতিমতো হাঁপাচ্ছিলেন রিচা, দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা কফি না খেয়েই ঘুম ঘুম ভাব, অলসতা কেটে গিয়ে বেশ চনমনে লাগতে থাকে।
দ্বিতীয় দিন যথারীতি দেরিতে ঘুম ভাঙলে ভাবলেন আজ আর ওয়ার্কআউট করবেন না। কিন্তু যেই মনে পড়ল ওয়ার্কআউটটা মাত্র ৯ মিনিটের, আবার করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। এভাবে চতুর্থ দিনে তার মধ্যে শরীরচর্চাটি নিয়মিত করার ব্যাপারে একটা আগ্রহ তৈরি হলো। পছন্দের কিছু মিউজিক বাছাই করে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয়নার সামনে শরীরচর্চা করতে লাগলেন। দুই সপ্তাহ পরে রিচা কিছু ছোট ছোট পরিবর্তন লক্ষ্য করেন।
এনার্জি (শক্তি): রিচার নিজের কাছে নিজেকে বেশ ঝরঝরে, প্রাণবন্ত ও কর্মচঞ্চল মনে হয়। আগে যেখানে এক কাপ কফি ছাড়া ঘুম কাটিয়ে কাজে মনোনিবেশ করতে পারতেন না, এখন মাত্র ৯ মিনিটের এই শরীরচর্চা তাঁর কাজের উদ্দীপনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ফোকাস বা মনোযোগ: কাজ শুরুর প্রথম থেকেই তাঁর চিন্তা ও মনোযোগ ঠিকঠাক কাজ করছিল। কাজের বিষয় ও পরিকল্পনা মাথার মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় তা এগিয়ে নেওয়া দ্রুত ও সহজ হয়।
মেজাজ: সকাল থেকেই মেজাজ ঠান্ডা রেখে কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল। অকারণে লোকজনের ওপর রেগে যাওয়া, মাথা গরম করে ফেলার প্রবণতা কম লক্ষ করা যাচ্ছিল।
ধারাবাহিকতা: নিজের মধ্য অস্থিরতা অনেক কম মনে হচ্ছিল। কাজের সঙ্গে একাগ্রভাবে লেগে থাকা, একটার পর একটা ধারাবাহিকভাবে করে যাওয়া অনেকটা সহজ মনে হচ্ছিল। রিচা জানান ওজন কমানো বা ফিট দেখানো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। কেবল অলসতার কারণে অপরাধবোধে না ভুগে কর্মোদ্দীপনা নিয়ে সুন্দরভাবে একটা দিন শুরু করতেই এই ওয়ার্কআউট শুরু করেন।
রিচা জানান, ফিটনেসের সবচেয়ে কঠিন অংশ শরীরচর্চা নয়, বরং শরীরচর্চা শুরু করা। যখন আমরা অনলাইনে ওয়ার্কআউট প্ল্যান দেখি, তখন সেগুলো বেশির ভাগ সময় ৪৫ মিনিট বা এক ঘণ্টার শরীরচর্চা বা যোগব্যায়াম হয়ে থাকে। এত দীর্ঘ সময়ের শারীরিক কর্মকাণ্ডের কথা ভেবে উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু বিষয়টা যখন মাত্র তিন মিনিটের হয়, তখন তা আর অতটা ক্লান্তিকর মনে হয় না।
রিচা জানান, অভ্যাসের মধ্যে আসার পর এই ৯ মিনিটের সঙ্গে তিনি মাঝেমধ্যে পুশআপ যোগ করে শরীরচর্চাটাকে আরও বেশি সময় ধরেও চালিয়ে নেন। তাঁর মতে, থ্রি ইনটু থ্রি রুল একটা ছোট্ট নিয়ম কিন্তু একটা বিরাট পরিবর্তন। যা কেবল তার সকালটাই নয়, নিজেকে দেখার ধরনটাও বদলে দিয়েছে। তাই বাড়িতে, ভ্রমণে যেখানেই থাকুক না কেন, ৯ মিনিটের ছোট্ট এই শরীরচর্চা কখনোই বাদ দেন না রিচা।
পরিশেষ রিচা জানান, এটি সম্পূর্ণই তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ওপর ভিত্তি করে লেখা। কোনো চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য বা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার আগে যদি প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: মিডিয়াম
| ফোনে তিন মিনিটের টাইমার সেট করে প্রথম ধাপে স্ট্রেচিং শুরু করতে পারেন। ছবি: সুমন ইউসুফ |
Tuesday, August 25, 2026
পুরুষ বন্ধ্যত্ব কেন হয়, সমাধান কী by ডা. অবন্তি ঘোষ
কারণ
● অতিরিক্ত ধূমপান করা।
● অ্যালকোহল, নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা।
● কম সক্রিয় জীবনযাপন।
● ওজনাধিক্য।
● অতিরিক্ত স্ট্রেস।
● হরমোনজনিত সমস্যা (টেস্টোস্টেরন, থাইরয়েড, প্রোলাকটিন)।
● জিনগত কারণ।
● সংক্রমণ যেমন ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া ইত্যাদি।
● শুক্রনালির ব্লকেজ।
● অণ্ডকোষের টিউমার, ভেরিকোসিলি, মামস অরকাইটিস।
● দীর্ঘ সময় গরম আবহাওয়ায় কাজ করা।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়
বীর্য পরীক্ষার মাধ্যমে পুরুষ বন্ধ্যত্ব শনাক্ত করা সম্ভব। এর নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। তিন দিন সহবাস বন্ধ রেখে বীর্য পরীক্ষা করতে হবে। একটি বীর্য পরীক্ষার রিপোর্ট যদি খারাপ আসে তাহলে এক মাস পরে আরেকটি বীর্য পরীক্ষা করতে হবে। সেটিও যদি খারাপ আসে তাহলে অণ্ডকোষের আলট্রাসনোগ্রাফি ও হরমোন পরীক্ষা করতে হবে।
যা করতে হবে
* ওজন কমানো, প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটাচলা করা, সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া, তৈলাক্ত ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা।
* স্ট্রেস কমানো এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
* ধূমপান, মদ্যপান পরিহার করা।
* শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতির উন্নতির জন্য কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট দেওয়া হয়। যেমন লেবোকারনিটিন, ভিটামিন সি, ই, ডি, বি কমপ্লেক্স, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।
* তিন মাস পর্যবেক্ষণের পর যদি শুক্রাণুর সংখ্যার উন্নতি না হয়, তাহলে ইন্ট্রাইউটেরাইন ইনসেমিনেশন বা আইভিএফ/ইকসি করা যেতে পারে।
* ভেরিকোসিলি (অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়া) বা শুক্রনালি বন্ধ। এ-জাতীয় সমস্যা থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সার্জারি লাগতে পারে।
* হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে এর চিকিৎসা করতে হবে।
* যদি শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতির মাঝারি ধরনের সমস্যা থাকে, তবে সাধারণত আইইউআই এবং যদি শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতির অনেক বেশি সমস্যা থাকে তবে ইকসি করা হয়।
* কিছু ক্ষেত্রে বীর্যে কোনো শুক্রাণুই পাওয়া যায় না, যাকে অ্যাজোস্পারমিয়া বলা হয়, সে ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ থেকে শুক্রাণু নিয়ে ইকসি করা হয়।
* ডা. অবন্তি ঘোষ, গাইনি, প্রসূতি ও বন্ধ্যত্ব রোগবিশেষজ্ঞ, আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা
| সব বন্ধ্যত্ব-দম্পতির ক্ষেত্রে ৩০-৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষজনিত কারণই দায়ী। ছবি: আনস্প্ল্যাশ |
Monday, August 24, 2026
কেবল গ্লুটেন নয়, ফ্রুকটানের জন্যও হয় হজমের সমস্যা—জানিয়েছে দ্য ল্যানসেট সাময়িকী by রাফিয়া আলম
ফ্রুকটান কী
ফ্রুকটান হলো গমে থাকা শর্করাজাতীয় উপাদান। এই উপাদান অন্ত্রে পানির পরিমাণ বাড়ায়। কারণ, ফ্রুকটানের বৈশিষ্ট্যই হলো পানি ধরে রাখা।
মানবদেহে ফ্রুকটান হজম করার জন্য প্রয়োজনীয় সব এনজাইম না থাকায় তা খাওয়ার পর ভাঙে না। এ অবস্থায় ফ্রুকটান যখন বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়, তখন সেখানে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে এই ফ্রুকটানের ফারমেন্টেশন বা গাঁজন হয়। তাই সেখানে বেশি পরিমাণ গ্যাসও তৈরি হয় এই ফ্রুকটানের কারণে।
অবশ্য কেবল গম নয়, পেঁয়াজ, রসুন, তরমুজ, আঙুর, আনার, কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম, রাই, বার্লি প্রভৃতিতেও থাকে ফ্রুকটান।
যে সমস্যা হয়
ফ্রুকটানের এমন সব বৈশিষ্ট্যের কারণে পেটব্যথা ও বদহজম হতে পারে। ঢেকুর উঠতে পারে। অতিরিক্ত গ্যাস হতে পারে। কারও কারও মলত্যাগের ধরনেও আসে পরিবর্তন। তবে সবারই এমন সমস্যা হয় না।
যাঁদের ফ্রুকটানে সংবেদনশীলতা আছে, কেবল তাঁদেরই এমন সমস্যা হয়ে থাকে। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমে (আইবিএস) আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকের ফ্রুকটানের মতো উপাদানে সংবেদনশীলতা থাকতে পারে।
কেবল গ্লুটেনই দায়ী নয়
গমের তৈরি খাবার খেলে যাঁদের হজমজনিত কোনো সমস্যা হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই ধারণা করা হয় যে সমস্যাগুলো গ্লুটেনের প্রতি সংবেদনশীলতার কারণে হচ্ছে। তখন গ্লুটেন-ফ্রি ডায়েট মেনে চলা হয়। এটা ঠিক যে গ্লুটেনের প্রতি সংবেদনশীলতার জন্যও এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে যে গ্লুটেনই দায়ী নয়, তা খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
গম ও নানা ধরনের শস্যদানা এবং আরও কিছু খাবার ও পানীয়তে গ্লুটেন থাকে। তাই গ্লুটেন-ফ্রি ডায়েট মেনে চলতে গেলে খাদ্যতালিকা থেকে আপনাকে অনেক কিছুই বাদ দিতে হবে। অথচ সবার ক্ষেত্রে এত নিষেধাজ্ঞার আদতে প্রয়োজন নেই। কারণ, অনেকের ক্ষেত্রে তো কেবল ফ্রুকটানের জন্যই সমস্যাগুলো হয়।
ফ্রুকটানে সংবেদনশীলতায় করণীয়
ফ্রুকটানসমৃদ্ধ খাবার খেলে যাঁদের সমস্যা হয়, তাঁদের যে এসব খাবার একেবারেই এড়িয়ে চলতে হবে, তা নয়। তবে পুষ্টিবিদের তত্ত্বাবধানে এসব খাবারের মাত্রা নির্ধারণ করে নেওয়া উচিত। দীর্ঘ মেয়াদে একইভাবে ফ্রুকটানের মাত্রা কম রাখারও প্রয়োজন হয় না এবং সেটা উচিতও নয়।
সূত্র: দ্য ল্যানসেট, ওহাইও স্টেট হেলথ অ্যান্ড ডিসকভারি, হেলথলাইন, ওয়েবএমডি, সায়েন্সডিরেক্ট
![]() |
| ফ্রুকটান হলো গমে থাকা শর্করাজাতীয় উপাদান, যা অন্ত্রে পানির পরিমাণ বাড়ায়। ছবি: পেক্সেলস |
Saturday, August 22, 2026
ডায়াবেটিস রোগীর কাঁধে ব্যথার কারণ ও প্রতিকার by এম ইয়াছিন আলী
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় বেশি কাঁধের ব্যথায় ভোগেন। এর কারণ, অ্যাডহেসিভ ক্যাপসুলাইটিস বা ফ্রোজেন শোল্ডার। ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এটি বেশি হয়।
এর ফলে ব্যথার পাশাপাশি কাঁধের সংযোগস্থল শক্ত হয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে রোগী হাত ওপরে ওঠাতে পারেন না, পিঠের দিকে নিতে পারেন না, পোশাকও পরতে পারেন না। এমনকি চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতেও কষ্ট হয়।
কারণ কী
আগেই বলা হয়েছে, রক্তে অনিয়ন্ত্রিত শর্করা ফ্রোজেন শোল্ডারের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া হাত দিয়ে ভারী কিছু ওঠাতে গিয়ে আগে কখনো ব্যথা পেয়েছিলেন, কিন্তু গুরুত্ব দেননি; তা থেকেও ব্যথা হতে পারে। এ ছাড়া স্ট্রোকের (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) পরও এমন সমস্যা হতে পারে।
সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলোসিস রোগে ঘাড় ও বাহুর ব্যথার কারণে রোগী হাতের নড়াচড়া কমিয়ে দেন। এতে ক্রমেই কাঁধের সংযোগস্থল শক্ত হয়ে যেতে পারে। চালক হঠাৎ কষে ব্রেক করলে গাড়ির যাত্রীরা নিজেদের রক্ষার জন্য হাতল বা কোনো কিছু শক্ত করে ধরে ফেলেন বা ধরার চেষ্টা করেন। এতে অনেকে ব্যথা পেয়ে থাকেন, যা পরে কাঁধব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিকার কী
কাঁধে খুব ব্যথা না হলে ব্যথানাশক ওষুধ পরিহার করা ভালো। তবে মাংসপেশি স্বাভাবিক (রিলাক্স) করতে মাসল রিলাক্সেন্ট–জাতীয় ওষুধের প্রয়োজন পড়ে। পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক ও সময়োপযোগী ফিজিওথেরাপি। এ রোগের চিকিৎসায় কিছু ইলেকট্রো থেরাপিউটিক এজেন্ট খুব উপকারী।
রোগীকে প্রতিদিন কিছু ব্যায়াম করতে হয়। অবশ্যই রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ফ্রোজেন শোল্ডার ধীরে ধীরে সারে। পুরো সারতে কয়েক মাস, এমনকি বছরও লেগে যেতে পারে। ধৈর্য ধরে ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে।
* এম ইয়াছিন আলী, চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল
![]() |
| ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় বেশি কাঁধের ব্যথায় ভোগেন। ছবি: পেক্সেলস |
Friday, August 21, 2026
শত ক্যানসার যোদ্ধা এক হলেন যুদ্ধজয়ের শক্তি নিয়ে by রাফিয়া আলম
ক্যানসার শব্দটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আতঙ্ক। নিজের কিংবা প্রিয়জনের ক্যানসার হলে তা মেনে নেওয়াই দুরূহ এক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তবে সেই সত্যকে মেনে নিয়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ীও হন বহু মানুষ। তেমনই ১০০ যোদ্ধা সেই সকালে হাজির হয়েছিলেন স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের মিলনায়তনে। নিবন্ধন পর্ব শেষে তাঁরা যোগ দিয়েছিলেন মূল অনুষ্ঠানে।
সূচনায় নতুন উদ্যোগের ঘোষণা
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন হাসপাতালটির চিফ অপারেটিং অফিসার মো. এসাম ইবনে ইউসুফ সিদ্দিক। সূচনা বক্তব্যে তিনি জানান, ক্যানসারজয়ী একজন ব্যক্তির (ক্যানসার সারভাইভার) প্রতিবছর নিয়মিত যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হয়। আজীবন বিশেষ মূল্যে সেসব করানোর সুযোগ থাকবে স্কয়ার হাসপাতালে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁদের এ উদ্যোগ।
বাস্তব যখন ভীষণ কঠিন
সূচনা পর্বের পর শুরু হয় প্যানেল ডিসকাশন। স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও শল্যচিকিৎসকেরা অংশ নেন এ আলোচনা পর্বে। ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যে শারীরিক ও মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান, সে সম্পর্কে আলোচনা করেন তাঁরা।
সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের সামাজিক পরিসরে ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের রোল মডেল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, তাঁরাই হয়ে উঠতে পারেন বহু মানুষের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।
এ আয়োজনে নিজের জীবনের গল্প সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন ক্যানসারজয়ী প্রণতি রানী দাস। ২০২০ সালে যখন করোনা অতিমারির কারণে কোনো হাসপাতালে সরাসরি চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ পাচ্ছিলেন না, তখন স্কয়ার হাসপাতালেই সেই সেবা পেয়েছিলেন বলে জানালেন।
প্রণতি বললেন, ‘স্কয়ার হাসপাতালে বিশ্বমানের সেবা পেয়েছি। ক্যানসার ধরা পড়ার পরও মনোবল হারাইনি। বিশ্বাস ছিল, আমি হারব না। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি নিয়েও অফিস করেছি। আমার স্বামীও আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে একটা মিনিট দেরি করেননি।’
ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের জন্য ১০ বছর ধরে লড়ছেন সামিয়া হাসান। তাঁর মতে, ক্যানসারে আক্রান্ত একজন রোগীর স্বজনের কখনো ছুটি হয় না। এই স্বজনদের লড়াই চলে প্রতিনিয়ত। ১০ বছরের এ পথচলায় স্কয়ার হাসপাতাল তাঁর ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হয়ে উঠেছে বলেই জানান তিনি।
ভিন্নধর্মী আয়োজন
যোগব্যায়াম, চিত্রকর্ম আর সুরের মাধ্যমে সুস্থতার চর্চার আয়োজন ছিল অনুষ্ঠানের বাকি অংশে। যোগব্যায়াম ও মিউজিক থেরাপির দায়িত্বে ছিলেন যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক কুশল রায় ও তাঁর সহকারীরা। তাঁর নির্দেশনায় যোগব্যায়ামে অংশ নেন ক্যানসারজয়ীরা। তাঁর সহকারীরা সঠিকভাবে যোগব্যায়ামের ভঙ্গিগুলো শিখতে সাহায্য করছিলেন তাঁদের।
সবাই মিলে সুস্থতার এ উদ্যোগে অংশ নেওয়া বেশ ভিন্নধর্মী বিষয়ই বটে। চিত্রশিল্পী মেগান এডওয়ার্ডের তত্ত্বাবধানে ‘গারডেন অব হিলিং’ থিমে ছবি আঁকছিলেন ক্যানসারজয়ীরা। তাঁদের প্রতি মেগান এডওয়ার্ডের নির্দেশনা ছিল, নিজের জীবনের বিজয়ের কঠিন গল্পটাকে একটা বাগান হিসেবে ফুটিয়ে তোলার। নিজেকে একটা বীজ হিসেবে কল্পনা করতে বলেছিলেন তিনি। সেই থিম নিয়েই নিজেদের মনের ভাব ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছিলেন এই লড়াকু মানুষেরা।
![]() |
| ব্রেস্ট ক্যানসার সারভাইভারস মিট ২০২৫-এ যোগব্যায়ামে অংশ নেন ক্যানসারজয়ীরা। ছবি: স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের সৌজন্যে |
ঘাড়, কোমর, হাঁটু বা কাঁধের ব্যথা বারবার ফিরে আসে কেন, সমাধান কী by ডা. সাকিব-আল-নাহিয়ান
ব্যথা হলে আমরা একটি ব্যথানাশক ওষুধ খাই, কিছুদিন বিশ্রাম নিই, ব্যথা কমে গেলে আবার আগের জীবনে ফিরে যাই।
কিন্তু কিছুদিন পর দেখা যায় একই ব্যথা আবার ফিরে এসেছে, কখনো আরও বেশি তীব্র হয়ে ফিরে আসে। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়?
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা ব্যথার কারণ নয়, শুধু উপসর্গের চিকিৎসা করি। ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন (পুনর্বাসন) চিকিৎসার এমন একটি ধরন, যা শুধু ব্যথা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যথার কারণ খুঁজে বের করে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।
ব্যথা সব সময় রোগ নয়, একটি সংকেত। ব্যথা অনেকটা অ্যালার্মের মতো। এটি শরীরের কোনো সমস্যার সতর্কবার্তা। কোমরের ব্যথা হতে পারে দুর্বল কোর মাংসপেশির কারণে।
ঘাড়ের ব্যথা হতে পারে দীর্ঘ সময় মুঠোফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারের ফলে। হাঁটুর ব্যথা হতে পারে ওজন বৃদ্ধি বা ভুলভাবে হাঁটার কারণে। শুধু ব্যথার ওষুধ খেয়ে সাময়িক স্বস্তি মিললেও মূল সমস্যা থেকে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মাংসপেশি ও হাড়-জোড়ের রোগ বর্তমানে কর্মক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম কারণ।
পুনর্বাসন চিকিৎসা আসলে কী
অনেকেই মনে করেন রিহ্যাবিলিটেশন মানেই ফিজিওথেরাপি; বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। একজন ফিজিয়াট্রিস্ট বা ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ রোগীর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করেন।
ব্যথার উৎস, মাংসপেশির শক্তি, অস্থিসন্ধির (জয়েন্ট) কার্যক্ষমতা, কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি, দৈনন্দিন অভ্যাস ও মানসিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন।
চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে—জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নির্দিষ্ট ব্যায়াম, ভঙ্গি সংশোধন করা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ, ইন্টারভেনশনাল পেইন ম্যানেজমেন্ট, ফিজিওথেরাপি অকুপেশনাল থেরাপি, পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ।
শুধু ব্যথা-বেদনা নয়, স্ট্রোক, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, ব্রেন ইনজুরি, সেরিব্রাল পালসি, পারকিনসনস ডিজিজ, অঙ্গচ্ছেদ, খেলাধুলাজনিত আঘাত, দীর্ঘমেয়াদি বাতরোগ, ক্যানসার–পরবর্তী দুর্বলতা, এমনকি হার্ট ও ফুসফুসের রোগের ক্ষেত্রেও রিহ্যাবিলিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চলাফেরা হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ। সঠিকভাবে পরিচালিত শারীরিক কার্যক্রম ও ব্যায়াম নিজেই একটি শক্তিশালী চিকিৎসা। নিয়মিত ব্যায়াম শুধু ব্যথা কমায় না; এটি পেশি শক্তিশালী করে, জয়েন্ট সচল রাখে, হাড় মজবুত করে, হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখে ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করে।
তবে সব ব্যায়াম সবার জন্য নয়। বয়স, রোগ এবং শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম নির্বাচন করা জরুরি।
* ডা. সাকিব-আল-নাহিয়ান, সহকারী অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা
| ঘাড় ও মেরুদণ্ডের জয়েন্টের একটি রোগ সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিস। নানা কারণে এ সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। ছবি: প্রথম আলো |
Wednesday, August 19, 2026
ঠোঁট ফাটা দূর করার উপায় by আলিয়া রিফাত
ঠোঁটে কোনো তেলগ্রন্থি নেই। ঠান্ডা বাতাসে, এমনকি ঘরের তাপমাত্রায়ও ঠোঁট পানিশূন্য হয়ে যায়। জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজালে, পর্যাপ্ত পানি না খেলে এসব সমস্যা আরও বাড়ে। ভয়ের কিছু নেই।
সঠিকভাবে সঠিক উপকরণ ব্যবহার করে ঠোঁটের যত্ন নিতে হবে। মেনে চলতে হবে কিছু অভ্যাস। তাহলে শীতজুড়েই আপনার ঠোঁট থাকবে কোমল ও উজ্জ্বল।
মরা চামড়া এক্সফলিয়েট করুন
কোমল ঠোঁটের জন্য আপনাকে অবশ্যই নিয়মিত এক্সফলিয়েশন করতে হবে। এক্সফলিয়েটর হিসেবে ব্যবহার করতে হবে একটি ভালো মানের লিপ স্ক্রাব। ঘরোয়াভাবেই লিপ স্ক্রাব তৈরি করা যায়। মধু ও চিনি মিশিয়ে লিপ স্ক্রাব তৈরি করতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে চিনি ও মধুর অনুপাত হতে হবে ১: ১। চাইলে অলিভ অয়েলও মেশাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে চিনির পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। এই লিপ স্ক্রাব সপ্তাহে অন্তত এক দিন ব্যবহার করা প্রয়োজন।
প্রতিবার এক মিনিট ধরে লিপ স্ক্রাব দিয়ে ঘষে ঘষে ঠোঁটের মরা চামড়া তুলে ফেলতে হবে। এ ছাড়া এক্সট্রা সফট টুথ ব্রাশ দিয়ে ঠোঁটের মরা চামড়া তুলে ফেলতে পারেন। প্রতিবার এক্সফলিয়েশনের পর ঠোঁটে লিপ বাম ব্যবহার করতে ভুলবেন না।
এতে ঠোঁট মোলায়েম হবে। নিয়মিত এক্সফলিয়েট করা ঠোঁটে ময়েশ্চারাইজার লাগালে ঠোঁট খুব ভালোভাবে সেটি শুষে নেবে। খুব ঘন ঘন এক্সফলিয়েট করবেন না। সপ্তাহে দুই দিন এক্সফলিয়েট করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত এক্সফলিয়েশনের ফলে ঠোঁটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
নিয়মিত ঠোঁট ময়েশ্চারাইজ করুন
ঠোঁটে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং লিপ বাম ব্যবহার করতে হবে। শিয়া বাটার, নারকেল তেল কিংবা কোকো বাটার-সমৃদ্ধ লিপ বাম ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। এসব উপাদান প্রাকৃতিকভাবে ঠোঁট কোমল করে।
ভিটামিন ই এবং বিজওয়াক্স ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখে। ফেটে যাওয়া ঠোঁট সারিয়ে তুলতেও উপাদান দুটি কার্যকর। দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার ঠোঁটে লিপ বাম দিতে হবে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে। এটি ঠোঁটে পুষ্টি জোগাতে খুবই প্রয়োজন।
পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খান
শীতকালেও আপনার পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেতে হবে। পাশাপাশি গ্রিন-টি খেতে পারেন। এতে আপনার শরীরের ও ঠোঁটের পানিশূন্যতা দূর হবে। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে ঠোঁটে তার চিহ্ন ফুঁটে ওঠে।
চরম আবহাওয়া থেকে ঠোঁটকে রক্ষা করুন
বাইরে বের হওয়ার আগে এসপিএফ-যুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করুন। এতে আপনার ঠোঁট ঠান্ডা বাতাস ও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা পায়। বাইরের অতিরিক্ত ঠান্ডায় খসখসে হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে ঠোঁট স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে রাখতে পারেন।
বদভ্যাস এড়িয়ে চলুন
জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজানো, দাঁত দিয়ে কামড়ানো, খুঁটতে থাকা, ঠোঁটের চামড়া তোলা—এসব বদভ্যাস বাদ দিতে হবে। এসব করলে ঠোঁট আরও শুকিয়ে যায়, ফাটা সহজে সেরে ওঠে না।
এসব নিয়ম মেনে চললে শীতকালেও আপনার ঠোঁট থাকবে কোমল ও মসৃণ।
সূত্র: উইকিহাউ
![]() |
| সঠিকভাবে যত্ন নিলে শীতেও ঠোঁট থাকবে কোমল, উজ্জ্বল। ছবি: পেক্সেলস |
Tuesday, August 18, 2026
হার্ভার্ডের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি কুদসিয়া হুদা, বিস্তারিত জানুন তাঁর সম্পর্কে
কঙ্গো থেকে ইন্দোনেশিয়া, ইরান থেকে ইয়েমেন, ভারত থেকে জর্ডান—যেখানে মানবিক বিপর্যয়, সেখানেই ছুটে যান কুদসিয়া হুদা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের তিনি প্রধান। তাঁর ছুটে চলা জীবনের গল্প শুনেছেন তানজিনা হোসেন
২০০৪ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ইরানের কেরমান প্রদেশের অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। মারা যান ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ। আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেন গৃহহারা হাজারো মানুষ। দুর্গত এলাকায় ছুটে যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কুদসিয়া হুদা। একদিন এক আশ্রয়শিবিরে ছোট্ট এক মেয়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ। চার বছরের ফুটফুটে মেয়েটির সঙ্গে ওর বাবা ও ভাইও আছেন। আলাপের একপর্যায়ে কুদসিয়ার কাছে মেয়েটার আবদার, ‘তুমি কি আমার মাকে এনে দিতে পারবে?’
‘কোথায় তোমার মা?’ জানতে চান কুদসিয়া।
জবাবে মেয়েটি আর তার বাবা যা বললেন, শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান কুদসিয়া। শেষ রাতে যখন ভূমিকম্পে সবকিছু কেঁপে ওঠে, মেয়েকে কোলে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন মা। আর তার বাবা হাত ধরে টেনে এনেছিলেন ছেলেকে। খানিকটা পথ আসার পর ছোট মেয়েটা কাঁদতে শুরু করে। কারণ, তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী খেলনা পুতুলটা ঘরে ফেলে এসেছে। মুহূর্ত না ভেবেই মেয়েকে বাবার কোলে দিয়ে মা বলেছিলেন, ‘তোমরা যাও, আমি এক্ষুনি পুতুলটা নিয়ে আসছি। যাব আর আসব।’
সেই যে গেলেন, আর ফিরে এলেন না মা!
কুদসিয়ার হৃদয়-আয়নায় নিজের মেয়ের ছবিটা ভেসে ওঠে। দূর দেশে এই মেয়ের বয়সী সন্তানকে রেখে এসেছেন তিনি। বুকটা হু হু করে ওঠে। এক মায়ের সন্তানবৎসল হৃদয়কে উপলব্ধি করে চোখে পানি আসে। চোখের পানি মুছে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে কুদসিয়া বললেন, ‘নিশ্চয়ই একদিন মায়ের সঙ্গে তোমার দেখা হবে। সেদিন তুমি মাকে জানিও যে তুমি তাকে কত মিস করেছ। আর এ জন্য নিজেকে দায়ী কোরো না।’
ভূমিকম্পের ওই বছরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন কুদসিয়া। এরপর মা-হারা সেই মেয়েটার মতো দেশে দেশে আরও অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়েছে। সেই যে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে সুনামিতে সবাইকে হারানো নারী, কুদসিয়ার মাথায় হাত দিয়ে যিনি আশীর্বাদ করেছিলেন।
আফগানিস্তানে যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা এক চিকিৎসকের অসহায় মুখ, দায়িত্ব পালনের সময় জানতে পারেন বোমার আঘাতে উড়ে গেছে তাঁর পুরো পরিবার। আর সুনামিতে আক্রান্ত এলাকায় সব হারানো সেই তরুণ, আশ্রয়শিবিরে গান গেয়ে যিনি শিশুদের আনন্দ দিতেন।
বর্তমানে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স (দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন) বিভাগের প্রধান কুদসিয়ার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা আছে এমন অনেক মানুষের মুখ, হৃদয়স্পর্শী সত্য গল্প।
কোনো কোনো গল্প তাঁকে যেমন ঘুমাতে দেয় না, তেমনি কোনো গল্প এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও দেয়। সেদিন আলাপের সময় তেমনি কিছু আশ্চর্য গল্পের ঝাঁপিই খুলেছিলেন কুদসিয়া হুদা।
নিজেও পড়েছেন বিপদে
মিসরে কর্মরত অবস্থায় ২০১১ সালে একবার স্বামী-সন্তানকে কায়রোতে রেখে অফিসের কাজে ওমান গেছেন কুদসিয়া। মাসকাটে বসেই শোনেন আরব বসন্ত শুরু হয়ে গেছে। উত্তাল কায়রো আর ততোধিক উত্তাল তাঁর অতি পরিচিত তাহরির স্কয়ার।
একসময় স্বামী-সন্তানের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এদিকে মাসকাট থেকেও কিছুতেই আর কায়রোতে ফিরতে পারছিলেন না। তারপর কী কষ্ট আর কত ঝামেলা করেই না অগ্নিগর্ভ কায়রোতে পৌঁছালেন।
কারফিউয়ের মধ্যে পথে পথে কূটনৈতিক পরিচয়পত্র দেখিয়ে স্বামী-সন্তানের কাছে গেলেন। তারপর পুরো পরিবার গৃহবন্দী। সে এক অদ্ভুত সময়। চারদিকে সামরিক ট্যাংক বহর ঘুরছে, থরথর করে কাঁপছে পুরো বাড়ি।
বন্দী অবস্থায় আরও কিছুদিন থাকার পর বিশেষ বিমানে জাতিসংঘের অন্য কর্মীদের সঙ্গে মিসর ছাড়তে সক্ষম হন।
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহুবার এমন ঝুঁকির মুখে পড়েছেন কুদসিয়া। আফগানিস্তানে কাজ করার সময় প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত হোটেলে থাকার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ভূমিকম্পে সব ভেঙে যেতে থাকল।
সুরক্ষিত জায়গাটাই তাঁদের জন্য হয়ে উঠল মরণফাঁদ। ঠিক একইভাবে ইরাকে কাজ করতে গিয়ে পার্শ্ববর্তী ভবনে আকস্মিক বোমা হামলা থেকে স্রেফ কপালগুণে বেঁচে গিয়েছিলেন।
আরাম দেয় লেখালেখি
দুর্গত মানুষেরা যেমন মানসিক কষ্টে ভোগেন, তেমনই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিতরাও নানা রকম ট্রমার শিকার হন। বিপর্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করতে গিয়ে অনেকে অস্বাভাবিক হয়ে পড়েন।
কুদসিয়া হুদা বলেন, ‘আমাদের এ জন্য নানা রকম প্রশিক্ষণ নিতে হয়। তারপরও মাঝেমধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।’
এ জন্য এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কুদসিয়া হুদা শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করেন, নিয়ম করে ধ্যানও করেন। মন ভালো না হলে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আমার বরের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করেও আমি অনেক স্বস্তিবোধ করি। তবে সবচেয়ে যে জিনিসটা আমাকে প্রশান্তি এনে দেয় তা হলো, লেখালেখি। আমার স্ট্রেস দূর হয় এতে।’
কুদসিয়া হুদার লেখক নাম দীপা ফিরোজ। তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। ছোটবেলায় শেখা গানের চর্চাও ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিপজ্জনক আর চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করতে গিয়েও প্রিয় পোশাক শাড়ির প্রতি ভালোবাসা হারাননি। জেনেভায় নিজের অফিসে প্রতিদিন শাড়ি পরেন। যেকোনো দেশে বিপর্যয়ের খবর পেয়ে উড়াল দেওয়ার সময় স্যুটকেসে অন্তত একটা শাড়ি নিতে ভোলেন না কখনো।
ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরাম কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সম্মেলন, জলবায়ু সম্মেলনে পুরোপুরি বাঙালি বেশভূষায় হাজির হন কুদসিয়া।
পৃথিবীর নানা ভাষা আর সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করতে সমস্যা হয় না। তিনি বলেন, ‘যে দেশ বা যে কমিউনিটিতে কাজ করি, তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার জন্য দরকার তাদের জীবনযাত্রার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
যেমন ইরানে কাজ করার সময় লম্বা পোশাক পরতে হতো, আমার দীর্ঘ চুল তখন পিন দিয়ে আটকে স্কার্ফে মাথা ঢাকতে হতো। এত সব কাজের মধ্যেও আমাকে মাথার স্কার্ফ সামলে চলতে হতো। ইয়েমেন, সিরিয়া, সোমালিয়া, ইরাকে কাজের সময় পরতে হতো বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আর হেলমেট।
আফ্রিকায় ইবোলা সংক্রমণে কাজ করার সময় পরতে হতো জীবাণুরোধী পোশাক। কাজ চালানোর মতো ফরাসি, আরবি ও ফারসি ভাষা শিখেছি। একজীবনে বিচিত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মের মানুষের আপনজন হয়ে ওঠা—এ এক পরম পাওয়া।’
অনেকেই বলেছিলেন, কুদসিয়ার ক্যারিয়ার হবে না
কুদসিয়া হুদার বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ঢাকায়। ছোটবেলায় গান শিখেছেন, নেচেছেন, ছবি এঁকেছেন, স্কুলে পড়ার সময় ফুটবলও খেলেছেন। ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে এসএসসি আর হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি।
এরপর ভর্তি হয়েছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে। মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। প্রথম সন্তানের জন্ম চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময়। বিয়ের পর অনেকে বলেছিলেন, কুদসিয়াকে দিয়ে পড়াশোনা হবে না। সন্তান হওয়ার পর তাঁরাই বলতে থাকলেন, তাঁকে দিয়ে আর ক্যারিয়ার হবে না।
সবার কথাই ভুল প্রমাণ করেছেন কুদসিয়া। ১৯৯১ সালে এমবিবিএস পাস করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে যোগ দেন। কাজ করতে করতেই স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিসিএস দিয়ে পঞ্চগড়ে যোগ দেন।
সেখানে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে কাজ করেছেন। জনস্বাস্থ্য বিষয়টি তখন প্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে। তাই পরে এসে যোগ দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে। পরবর্তীকালে এই বিষয়েই উচ্চতর ডিগ্রি নিতে যান যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
হার্ভার্ডে পড়তে পড়তেই একটি মাস্টার্স কোর্সে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পান। সেটি ছিল হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ, টাফট বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একটি সমন্বিত কোর্স।
আমন্ত্রণ পেয়েও দ্বিধায় ছিলেন কুদসিয়া। ছোট ছোট দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে হার্ভার্ডে পড়তে গিয়েছিলেন তিনি। যাদের একজন তখনো দুগ্ধপোষ্য শিশু। দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে একা বোস্টনে থাকা, স্কুলে ও ডে কেয়ারে রাখা, আনা-নেওয়া, রান্নাবান্নাসহ সব কাজ করে পড়তে বসতেন গভীর রাতে।
কুদসিয়া ভাবলেন আবেদন করে কী হবে, এত কিছু তিনি সামাল দিতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর পরামর্শক রিচার্ড ক্যাশ পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘কেন তুমি আবেদন করবে না? মাত্র ২০ জনকে এই সুযোগ দেওয়া হবে। আরেকটা কথা মনে রেখো, তোমার এই সন্তানেরাই তোমার শক্তি। আমার বিশ্বাস, তুমি দুটো মাস্টার্স প্রোগ্রাম করতে পারবে।’
রিচার্ড ক্যাশের কথাটাই এখনো বিশ্বাস করেন কুদসিয়া। আসলে যা যা মানুষ প্রতিবন্ধকতা, বাধা বা দুর্বলতা মনে করে, প্রতিটিই জীবনে শক্তিদায়ী রূপে দেখা দিতে পারে। জনস্বাস্থ্যে পড়াশোনা শেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন ২০০৪ সালে। এরপর সংস্থাটির নানা পদে কাজ করেছেন।
কুদসিয়া বললেন, মা-বাবার পর সব সময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন তাঁর স্থপতি স্বামী আর সন্তানেরা। একজন বিবাহিত নারীর এমন যাত্রায় বরের ভূমিকা অনেক। বোঝাপড়া না হলে সবকিছু সামলানো কঠিন!
কুদসিয়ার দুই মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে দক্ষিণ ভারতের কোদাইকানাল, মিসরের কায়রো থেকে বিলেত—নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে বড় হয়েছেন। দুজনই এখন প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরে এনার্জি সেক্টরে কাজ করেন, আর ছোট মেয়েটি বাবার মতো স্থাপত্য পেশা বেছে নিয়েছেন।
কুদসিয়া হুদার কাছে জানতে চাই, ‘আপনি একজন এশীয়, তার ওপর বাংলাদেশি নারী। এই পরিচয়গুলো বৈশ্বিক সমাজে কি আপনার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কখনো?’ কুদসিয়া হুদা হেসে বলেন, ‘যেসব বিষয় নিয়ে আমি কাজ করি, যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়, তা একজন বাংলাদেশির চেয়ে ভালো আর কে বুঝতে পারে? বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, লঞ্চডুবি—এসব দেখেশুনে আর মোকাবিলা করেই বড় হই আমরা।’
![]() |
| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের প্রধান কুদসিয়া হুদা। ছবি: সংগৃহীত |
Sunday, August 16, 2026
ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে কোন কোন খাবারে by মো. ইকবাল হোসেন
কারসিনোজেন কিসে থাকে
১. প্রক্রিয়াজাত মাছ-মাংসে ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম উপাদান থাকে। হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন হলো এমন সব রাসায়নিক যৌগ, যা মাছ–মাংস উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার সময় তৈরি হয়। বিশেষ করে মাংস গ্রিল করা, আগুনে ঝলসিয়ে কাবাব বানানো ও ভাজার সময় এগুলো বেশি তৈরি হয়। এই যৌগগুলো কারসিনোজেন হিসেবে বিবেচিত এবং কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
২. কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) সমৃদ্ধ অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করা খাবারে অনেক বেশি কারসিনোজেন যৌগ থাকে। শর্করাকে উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজা বা সেঁকা হলে অ্যাক্রিলামাইড নামক কারসিনোজেন যৌগ তৈরি হয়। এমন খাবারগুলো হলো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ক্র্যাকার, চিপস, তেলেভাজা বিস্কুট, চানাচুর। এমন খাবারগুলো নিয়মিত খেলে পরিপাকতন্ত্রের ক্যানসার ও কোলন ক্যানসারে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
৩. ট্রান্সফ্যাট (ক্ষতিকর চর্বি) সমৃদ্ধ খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। চিপস, চানাচুর, শিঙাড়া, পেঁয়াজু, পিৎজা, বার্গার ইত্যাদি ফাস্ট ফুড ট্রান্সফ্যাট সমৃদ্ধ। ট্রান্সফ্যাট শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি করে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণা অনুযায়ী, উচ্চমাত্রায় ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ কলোরেক্টাল, ওভারিয়ান ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৪. প্রিজারভেটিভ সমৃদ্ধ খাবার ক্যানসারের জন্য দায়ী—বিশেষ করে নাইট্রেট ও নাইট্রাইটস সমৃদ্ধ প্রিজারভেটিভ। এগুলো সসেজ, হ্যাম, বেকন, হটডগসহ বিভিন্ন ফাস্ট ফুড এবং প্রক্রিয়াজাত মাংসে ব্যবহার করা হয়। এটি উচ্চ তাপের সংস্পর্শে কারসিনোজেন গঠন করে, যা পাকস্থলীর ক্যানসারে ভূমিকা রাখে।
৫. তামাক বা তামাক জাতীয় পণ্য থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। তামাকের ধোঁয়ায় নাইট্রোসামিন নামক কারসিনোজেন উৎপন্ন হয়। এটি মুখের ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে।
৬. বর্তমানে ভেজাল খাবারের পাশাপাশি শাকসবজিতে কীটনাশকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। কীটনাশকে হেভি মেটাল (ভারী ধাতু) ও অর্গানোফসফেটসহ অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হয়। অর্গানোফসফেট কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করলে তা শাকসবজি ও ফলমূলে কিছুটা অবশিষ্ট থাকতে পারে। এই শাকসবজি নিয়মিত খেলে পাকস্থলী ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৭. অ্যালকোহল পানের ফলে শরীরে অ্যাসিটালডিহাইড তৈরি হয়। এটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনকে সক্রিয় করে। তাই নিয়মিত অ্যালকোহল পান করলে পরিপাকতন্ত্রের ও লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে।
* মো. ইকবাল হোসেন, জ্যেষ্ঠ পুষ্টি কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল
![]() |
| বিশেষ কিছু খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। ছবি: পেক্সেলস |
৫ কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো যে উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম by শিশির মোড়ল
তরল খাইয়ে রোগীর কলেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, তা নিয়ে ১৯৫২ সালের দিকে কলকাতায় একটি গবেষণা হয়েছিল। ওই গবেষণার ফলাফল নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট–এর ১৯৫৩ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ লেখেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের কলেরা ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হেমেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি।
প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে কলেরায় আক্রান্ত কিছু রোগীর বমি বন্ধ ও পানিশূন্যতা দূর করার জন্য অ্যাভোমিন ট্যাবলেটের সঙ্গে পাথরকুচির পাতার রস খাওয়ানো হয়েছিল। তাতে ফলও পাওয়া গেছে।
গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে বা তারও কিছু আগে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কলেরা নিয়ন্ত্রণে কিছু গবেষণা হয়েছিল। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল। আমাদের এখানে এই গবেষণা করেছিল পাক–সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (আজ যা আইসিডিডিআরবি)।
মাঠপর্যায়ে ওআরএসের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা হয় আইসিডিডিআরবির চাঁদপুরের মতলব ও ঢাকা হাসপাতালে। এ পর্যায়ের গবেষণায় মূল গবেষক ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড ক্যাস। তাঁদের সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম ও মজিদ মোল্লা। অনেকে এই বিজ্ঞানীদের ওআরএসের উদ্ভাবক বলে মনে করেন।
১৯৬৮ সালের আগস্টে ল্যানসেট তাদের গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে। গবেষণা প্রবন্ধের মোদ্দাকথা ছিল, কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানোর পর ভালো ফল পাওয়া যায়।
ওই প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, খাওয়ার দ্রবণের এই উপাদানগুলো সস্তা ও সহজে পাওয়া যায়। এসব উপাদান সংরক্ষণ বা মজুত করা সম্ভব। আর পানি দিয়েই এই দ্রবণ তৈরি করা যায়।
ঢাকা ও কলকাতায় কতটা সমান্তরালভাবে ওআরএস নিয়ে গবেষণা চলেছিল, দুই শহরের বিজ্ঞানীদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল, তার একটি বর্ণনা ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টভিউ প্রেস থেকে প্রকাশিত কলেরা: দ্য আমেরিকান সায়েন্টিফিক এক্সপেরিয়েন্স ১৯৪৭–১৯৮০ বইয়ে পাওয়া যায়। ওই গ্রন্থে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে বিশদ বর্ণনা আছে।
ওই বছরের জুন নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীশিবিরে কলেরা দেখা দেয়। তখন বনগাঁও এলাকার শরণার্থীদের প্রথম ওআরএস খাওয়ানো হয়। এটাই ছিল ওআরএসের প্রথম ব্যাপক ব্যবহার। ভারতে এই কাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিলীপ মহলানবিশ।
তাই একক কোনো প্রতিষ্ঠান, একক কোনো বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী দল খাওয়ার স্যালাইন উদ্ভাবন করেনি। ওআরএসের গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি হওয়ার আগে অনেকে অনেক ধরনের কাজ করেছেন। ম্যানিলায় কিছু কাজ হয়েছে, কিছু হয়েছে ঢাকায়, কিছু কলকাতায়। ওআরএসের চূড়ান্ত রূপটি এসেছে ১৯৬৭ বা ১৯৬৮ সালের দিকে।
পানি–লবণ–গুড়ের ঘুঁটা
স্বাধীনতার পর দেশে ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রকোপ ছিল প্রবল। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও ছিল ডায়রিয়া। তখন মানুষের বাড়ি বাড়ি ওআরএসের প্যাকেট পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। ওই পটভূমিতে ওআরএস বা মুখে খাওয়ার স্যালাইনকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, বিশ্বের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনে তা বিরল।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির পদ্ধতি বা কৌশল শিখিয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা। ১৯৮০ সালে ডায়রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ও বাড়িতে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির প্রকল্প শুরু করে ব্র্যাক। ‘এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি’—এই ফর্মুলা নিয়ে মাঠে নামে ব্র্যাক।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্র্যাকের কর্মীরা শিখিয়েছিলেন: প্রথমে ফুটিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে, একটি পাত্রে আধা সের (আধা লিটারের কিছু বেশি) পানিতে এক চিমটি লবণ ও এক মুঠ গুড় নিয়ে ভালো করে গুলতে বা ঘুঁটতে হবে। সেই দ্রবণ ডায়রিয়ার রোগীকে খাওয়াতে হবে। ব্র্যাকের লক্ষ্য ছিল দেশের প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনকে এই দ্রবণ তৈরি শেখাতে হবে। ব্র্যাকের পাশে ছিল সরকার।
বেঁচেছে পাঁচ কোটির বেশি প্রাণ
ল্যানসেট–এর ১৯৭৮ সালের ৫ আগস্ট সংখ্যার সম্পাদকীয়র বিষয় ছিল ওআরএস। তাতে বলা হয়েছিল, ওআরএসের উদ্ভাবন চিকিৎসাক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার ২৮ বছর পর ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি—এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে টাইম ম্যাগাজিন।
এগুলো বিশ্বের মানুষের কাছে ওআরএসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বেড়ে যাওয়ার উদাহরণ। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ওআরএসের ব্যবহার বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনা ও ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে। তার নেতৃত্বে ছিলেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষকেরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে শরীর থেকে দ্রুত পানি বের হয়ে যায়। ওআরএসের মাধ্যমে সেই পানি প্রতিস্থাপন করা হয়। ওআরএস ব্যবহার করে এ পর্যন্ত পাঁচ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছে।
বছরে বিক্রি ১৫০ কোটি প্যাকেট
এখন রক্তচাপ কমে গেলেও খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) খেয়ে নিচ্ছে মানুষ। প্রখর রোদে ক্লান্ত–ঘর্মাক্ত রিকশাচালক রাস্তার পাশের দোকান থেকে আধা লিটার পানির বোতল কিনে তাতে এক প্যাকেট খাওয়ার স্যালাইন গুলে খেয়ে নিচ্ছেন। বহু মানুষের বাড়িতেই ওরস্যালাইন এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।
কেউ কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে, বাক্স–পেটরা গোছানোর সময় দেখে নেন, খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট নেওয়া হয়েছে কি না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকান থেকে শুরু করে রাজধানীর অভিজাত হাসপাতালেও পাওয়া যায় ওরস্যালাইন।
দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী, নিরক্ষর, শিক্ষিত—সব শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে এটি। ওআরএস এ দেশের মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের যেসব দেশে ওআরএসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার অন্যতম। ওষুধটি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীদের বড় ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে ওআরএস পৌঁছানো এবং বাড়িতে ওআরএস তৈরি করার পদ্ধতি–কৌশলও উদ্ভাবন করেছে এ দেশের মানুষ। সারা দেশে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) ওআরএসের একক আধিপত্য।
এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, ‘সারা বছর এসএমসির প্রায় ১৫০ কোটি প্যাকেট ওরস্যালাইন বিক্রি হয়। বাজারের ৯৫ শতাংশ ওরস্যালাইন এসএমসির।’
এসএমসি ছাড়া আরও কয়েকটি কোম্পানির ওআরএসের প্যাকেট বাজারে বিক্রি হয়। এরা বছরে প্রায় আট কোটি প্যাকেট ওআরএস বিক্রি করে। এ ছাড়া মানুষ নিজেই ঘরে বা বাড়িতে পানির সঙ্গে লবণ ও চিনি বা গুড় গুলিয়ে খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করে। বাড়িতে বানানো এই মিশ্রণও ওআরএস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো উদ্ভাবন মানুষের জীবনের সঙ্গে এমন মিশে যাওয়ার উদাহরণ বিরল।
(বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫–এ প্রকাশিত)
![]() |
| লবণ ও গুড় মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করছেন মতলবের একজন নারী, ১৯৭৯–৮০ সাল। ছবি: আইসিডিডিআরবি |
Friday, August 14, 2026
শীতে শরীর ব্যথার আগাম প্রস্তুতি কেমন হবে?
প্রশ্ন: শীতকালে আমার মায়ের সারা শরীরে তীব্র ব্যথা হয়। গরমের সময় অন্য সমস্যা থাকলেও ব্যথার সমস্যায় খুব একটা ভোগেন না। মায়ের বয়স এখন ৬৫ বছরের মতো। বেশি ঠান্ডা পড়লে বিছানা থেকেও নামতে পারেন না। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে কী করতে পারি?
রিফাত, কানাইপুর
পরামর্শ: এই বয়সে বিভিন্ন কারণে শরীরে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে আর্থ্রাইটিস বা বাত রোগ, ভিটামিন ডি ঘাটতিজনিত সমস্যা। হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার কারণেও হাড় ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়। তবে কিছু সচেতনতা অবলম্বন করলে শীতকালে এই ব্যথার সমস্যাকে অনেকটাই সহনীয় করে তোলা সম্ভব।
প্রথমেই ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করা জরুরি। তাই যত দ্রুত সম্ভব আপনার মাকে নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি এবং হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করিয়ে নিন। ভিটামিন ডির অভাব থাকলে কিংবা হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে চিকিৎসকের নির্দেশনায় ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করুন। বাতজনিত ব্যথা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস কিংবা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় থেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর এবং ভিটামিন ডিসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। আপনার মাকে গরম পোশাক ও গরম পরিবেশে রাখার চেষ্টা করুন। ঘর গরম রাখতে দরজা-জানালা বন্ধ রাখুন। খুব শক্ত বা খুব নরম বিছানা পরিহার করুন। ব্যথার জায়গায় কুসুম গরম পানি বা হিটিং প্যাড দিয়ে সেঁক দিতে পারেন। বাতজাতীয় ব্যথা রাতে ও সকালে বেশি অনুভূত হয়। হাঁটাচলায় কিছুটা কমে। দীর্ঘ সময় শুয়ে-বসে থাকলে তা আরও বেড়ে যায়। শীতকালে রাত দীর্ঘ হওয়ায় বাত রোগীরা ব্যথা ও জড়তা বেশি অনুভব করেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম কিংবা কিছু সময় হাঁটাহাঁটির অভ্যাস গড়ে তুললে, ১৫-২০ মিনিট রোদে থাকলে উপকার পাবেন।
আশা করি, এই বিষয়গুলো মেনে চললে এই শীতে আপনার মায়ের ব্যথার সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে।
![]() |
| ব্যথা উপশমে সেঁক দেওয়ার প্রচলন অনেক পুরানো। ছবি: পেক্সেলস |
Wednesday, August 12, 2026
মস্তিষ্কের বয়স বাড়ে পাঁচ ধাপে, এসব ধাপে মানুষের কী পরিবর্তন আসে
গবেষণার ফল গতকাল মঙ্গলবার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, আমাদের বয়স যখন ত্রিশের কোঠার শুরুর দিকে পৌঁছায়, তখনো আমাদের মস্তিষ্ক কৈশোরে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কেন ভিন্ন ভিন্ন হয়, তা বুঝতে সাহায্য করতে পারে এই গবেষণা।
মানুষের মস্তিষ্কের বয়সের যে পাঁচটি ধাপ রয়েছে, সেগুলো হলো—শৈশব: জন্ম থেকে ৯ বছর পর্যন্ত; কৈশোর: ৯ থেকে ৩২ বছর পর্যন্ত; প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা: ৩২ থেকে ৬৬ বছর বয়স পর্যন্ত; বার্ধক্যের শুরু: ৬৬ থেকে ৮৩ বছর বয়স পর্যন্ত এবং বার্ধক্যের শেষ ভাগ: ৮৩ বছর থেকে বাকি জীবনকাল।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘নেচার কমিউনিকেশনসেও’ প্রকাশ করা হয়েছে গবেষণাটি। গবেষকদের ভাষ্য, বহু মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যানিং করার কারণেই এখন এ তথ্যটি জানা গেছে। মানুষের মস্তিষ্কের বয়সের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা পড়াটা একটি বড় চমক। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে বয়সের এই শুরু ও শেষ কিছুটা আগে-পরে হতে পারে।
মস্তিষ্কের বয়সের ৫ ধাপ
শৈশব: মানুষের জন্ম থেকে ৯ বছর পর্যন্ত মস্তিষ্কের শৈশবকাল চলে। এ সময় মস্তিষ্কের আকার দ্রুত বাড়তে থাকে। তবে একই সময়ে জীবনের শুরুতে তৈরি হওয়া মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যকার অতিরিক্ত সংযোগ কমতে থাকে। এই কোষগুলোকে বলা হয় সাইন্যাপস।
এই সময়ে মস্তিষ্ক কম কর্মক্ষম থাকে। বলতে গেলে একটি শিশুর মতো কাজ করে। একটি শিশু যেমন নির্দিষ্ট এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার বদলে উদ্দেশ্যহীনভাবে পার্কে ঘুরে বেড়ায় বা যেখানে খুশি সেখানে চলে যায়, বিষয়টি ঠিক তেমন।
কৈশোর: মানুষের জীবনের ৯ বছর থেকে হঠাৎই মস্তিষ্কে বড় পরিবর্তন আসা শুরু করে। এই সময় থেকে মস্তিষ্কের কোষের সংযোগগুলো ব্যাপক দক্ষতার একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। তবে চিন্তার বিষয় হলো, মস্তিষ্কের বয়সের এই সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শুরু হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি থাকে।
মানুষ যখন শারীরিকভাবে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়, তখন মস্তিষ্কেরও কৈশোর শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে দুটির মধ্যে মিল রয়েছে। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা আগে যেমনটা ধারণা করতাম, তার চেয়েও বেশি সময় ধরে মস্তিষ্কের কৈশোর থাকে। এ সময় ধারণা করা হতো ১৯ বছর পর্যন্ত মস্তিষ্কের কৈশোর থাকে। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, এটি ত্রিশের কোঠার শুরুর দিক পর্যন্ত চলে।
মস্তিষ্কের বয়সের সব পর্যায়ের মধ্যে কৈশোরেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে বলে উল্লেখ করেছেন গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. অ্যালেক্সা মাউসলি। তিনি বলেন, এটি মস্তিষ্কের বয়সের একমাত্র পর্যায় যখন স্নায়ুকোষের সংযোগগুলো আরও বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে।
প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা: কৈশোরের পর আসে মস্তিষ্কের প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা। এই পর্যায় চলে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে—তিন দশকের বেশি। এই সময়টাতে আগের তুলনায় মস্তিষ্কে পরিবর্তন ধীরে হয়। অ্যালেক্সা মাউসলি বলেন, এই পর্যায়টি বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বের একটি স্থির অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বার্ধক্যের শুরু: এই পর্যায় শুরু হয় ৬৬ বছর বয়স থেকে। তবে এই পর্যায়ে হঠাৎ করে মস্তিষ্কের সক্ষমতা কমে যায় না। এর বদলে মস্তিষ্কের কোষের সংযোগে ধরনে বদল আসে। এ সময় পুরো মস্তিষ্ক একটি একক হিসেবে কাজ করার বদলে, এর অংশগুলো আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ হয়ে কাজ করে।
বার্ধক্যের শুরুতে মস্তিষ্ককে সুস্থ মনে হলেও এই পর্যায়ে ডিমেনশিয়া ও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে শুরু করে। এগুলো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
বার্ধক্যের শেষ ভাগ: মানুষের বয়স ৮৩ বছর হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্ক। বার্ধক্যের শুরুর পর্যায়ের মতো শেষ পর্যায়েও একই ধরনের পরিবর্তন আসে। তবে সেগুলো আরও বেশি স্পষ্ট হয়।
অ্যালেক্সা মাউসলি বলেন, মস্তিষ্কের বয়সের বিভিন্ন পর্যায়গুলোর সঙ্গে মানুষের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মিল রয়েছে। পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে বয়ঃসন্ধি, জীবনের শেষের দিকে স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ এবং ত্রিশের কোঠার শুরুতে মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের কারণে বড় সামাজিক পরিবর্তন।
![]() |
| মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান করা চিত্র। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, July 28, 2026
মলত্যাগের পর মল ভেসে থাকা কি কোনো রোগের লক্ষণ
কখনো কখনো কেন মল পানিতে ভাসে
সাধারণত মল পানির চেয়ে ভারী হয়। স্বাভাবিকভাবেই তাই মল পানিতে ডুবে যায়। তবে মলের ভেতর যদি বাতাসের পরিমাণ বেশি থাকে, তাহলে মল পানির চেয়ে হালকা হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে মল পানিতে ভেসে থাকে। আবার মলে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলেও ঘটে একই ঘটনা।
কেন এমন হয়
ইউরোপিয়ান জার্নাল অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বিষয়টি উঠে এসেছে। ১ হাজার ২৫২ জন রোগীর ওপর করা সেই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীদের ২৬ শতাংশই জানিয়েছেন, মলত্যাগের পর তাঁদের মল পানিতে ভাসে। এখানে ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডার সম্পর্কে একটু বলে রাখা প্রয়োজন।
গঠনগত বা অন্য কোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও যখন একজন ব্যক্তির অন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না, তখন ধরে নেওয়া হয় তিনি ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডারে ভুগছেন।
অন্ত্র ছাড়া পরিপাকতন্ত্রের অন্যান্য অংশেও এমন ‘ফাংশনাল’ সমস্যা হতে পারে। অর্থাৎ সে ক্ষেত্রেও বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নেই, তবু পরিপাকতন্ত্রের কাজে দেখা দেয় গন্ডগোল।
ওই গবেষণায়ই জানা গেছে, ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডার ছাড়াও পরিপাকতন্ত্রের অন্যান্য ফাংশনাল সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ শতাংশ ব্যক্তি মলত্যাগের পর মল ভেসে থাকতে দেখেছেন। বিভিন্ন ফাংশনাল সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অতিরিক্ত গ্যাস হয়ে থাকে।
আঁশসমৃদ্ধ খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে অন্ত্রে গ্যাসের মাত্রা বাড়তে পারে। কারণ, অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে বাস করা ব্যাকটেরিয়াগুলো এসব আঁশের ওপর কিছু ফারমেন্টেশন, অর্থাৎ গাঁজন ঘটায়। তাতে তৈরি হয় গ্যাস।
শাক, শিমজাতীয় সবজি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, মসুর ডাল প্রভৃতিতে প্রচুর আঁশ থাকে। ফল ও সবজির খোসায়ও প্রচুর আঁশ থাকে।
এ ধরনের খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে মল পানিতে ভাসতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে দুধের ল্যাকটোজ এবং ফলের ফ্রুকটোজের কারণেও অন্ত্রে গ্যাসের মাত্রা বাড়ে। সে ক্ষেত্রেও মল ভাসতে পারে পানিতে।
একইভাবে মলে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে, যদি কেউ অতিরিক্ত তেল-চর্বিজাতীয় খাবার খান। তবে কারও যদি খাবারের চর্বি স্বাভাবিকভাবে শোষণে কোনো বাধা সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রেও তাঁর মলে চর্বির মাত্রা বেড়ে যাবে। অন্ত্র, অগ্ন্যাশয় বা পিত্তথলির নির্দিষ্ট ধরনের রোগে এমনটা হতে পারে।
করণীয়
মল পানিতে ভাসলেই তা কোনো রোগের লক্ষণ না-ও হতে পারে। তবে প্রায়ই এমন হলে আপনি কী খাচ্ছেন বা কীভাবে খাচ্ছেন, সে বিষয়ে একটু যত্নশীল হতে পারেন। অর্থাৎ আপনি খেয়াল করতে পারেন, অতিরিক্ত বায়ু উৎপন্নকারী খাবার বা খাবারে অতিরিক্ত চর্বি থাকার কারণে এমন সমস্যা হচ্ছে কি না।
তবে কারণটা আপনি খুঁজে না পেলেও সাধারণত কোনো ক্ষতি হয় না। অবশ্য কিছু লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন, যেসব দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে
* একটানা বেশ কয়েক দিন যদি মলত্যাগের পর পানিতে মল ভাসে।
* যদি মলের স্বাভাবিক গন্ধের চেয়ে আলাদা ধরনের দুর্গন্ধ হয়।
* যদি মল বেশ আঠালো হয়।
* যদি মলের পরিমাণ খুব বেশি হয়।
* যদি মলের সঙ্গে রক্ত আসে বা টয়লেট পেপারে রক্ত দেখা দেয়।
* কোনো চেষ্টা না করার পরও ওজন কমতে থাকে।
* পেটব্যথা হয়।
* অতিরিক্ত গ্যাস বের হয়।
এমন কোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসক সমস্যার কারণ খুঁজে বের করবেন এবং প্রয়োজনমাফিক চিকিৎসার নির্দেশনা দেবেন।
![]() |
| মলত্যাগের পর কমোড বা প্যানের পানির স্তরের নিচে মল ডুবে যাওয়াই স্বাভাবিক, তবে কখনো কখনো মলত্যাগের পর মল ভেসে থাকতে পারে। ছবি: পেক্সেলস |
Saturday, July 25, 2026
মুখের ক্যানসার কেন বাড়ছে, প্রতিরোধে করণীয় by অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী
যেসব অভ্যাসের কারণে মুখগহ্বরের সরাসরি ক্ষতি হয়, সেগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক। যেমন তামাক মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির শত্রু। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের কারণে মুখগহ্বরের ও খাদ্যনালির কোষে ক্ষত সৃষ্টি হতে থাকে। এই ক্ষত থেকেই একসময় ক্যানসার হয়।
মুখে কেন ক্যানসার হয়
* সিগারেট, ই-সিগারেট, পান, সুপারি, চুন, জর্দা, গুল, খইনি—সবই মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যানসারের জন্য দায়ী।
* আমাদের দেশে যত মানুষ মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত, তাঁদের ৮০-৯০ শতাংশেরই তামাক বা তামাকজাত পণ্য সেবনের কারণ রয়েছে।
* কেউ কেউ মদপানও করেন। যাঁরা মুখগহ্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে যত্নশীল নন কিংবা যাঁদের দাঁতের অংশ অত্যধিক ধারালো, তাঁদের ঝুঁকি বেশি।
* প্রক্রিয়াজাত খাবারেও হতে পারে।
* ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে মুখের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে বেশি।
উপসর্গ ও শনাক্ত
যদি মুখে ঘা তৈরি হয় ও চিকিৎসার পরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই বায়োপসি বা মাংসের টিস্যু পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ, মুখের ঘা বা সাদা ক্ষতকে বলা হয় ক্যানসারপূর্ব ক্ষত।
ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, রিউমাটিক ডিজিজ, পরিপাকতন্ত্রের রোগ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ওষুধ খান, কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার করেন, ধূমপান করলে অবশ্যই দাঁত ও মুখে যেকোনো ঘা দেখা দেওয়ামাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
যদি দেখেন মুখগহ্বরের ক্ষত বা ঘা শুকাচ্ছে না, রক্তক্ষরণ বা গিলতে অসুবিধা হচ্ছে, সব সময় গলায় কোনো কিছুর উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মুখগহ্বরের কোষকলায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করুন।
প্রতিরোধে করণীয়
* তামাক ও তামাকজাত পণ্য সেবন বন্ধ করুন।
* দুবেলা ব্রাশ ও খাওয়ার পর ভালোভাবে কুলকুচি করুন।
* দাঁতের কোনো অংশ ধারালো থাকলে চিকিৎসা করান।
* প্রচুর ফল, শাকসবজি ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খান।
* ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।
* অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
* অতিরিক্ত ঝাল বা গরম খাবার ও পানীয় বর্জন করুন।
* সব ধরনের মাদক ও অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে।
* অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী, দন্তবিশেষজ্ঞ
![]() |
| বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অনেক বেশি, নতুন রোগীও বাড়ছে। ছবি: পেক্সেলস |
যে কারণে কথায় কথায় অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না by ডা. কাকলী হালদার
অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স কী
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালস রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর এক নীরব মহামারি, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে হার মানাচ্ছে। এতে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসাশাস্ত্র উভয়ই হুমকির মুখে পড়ছে মারাত্মকভাবে।
অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্সের মানে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবীগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসকারী ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। ফলে একসময় যেসব সংক্রমণ সহজেই সারানো যেত, সেসবই আবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
মূল কারণ কী
এ সমস্যার মূলে বিশেষ করে আছে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গালের যথেচ্ছ ব্যবহার, যা অণুজীবদের বিবর্তনে সাহায্য করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল ড. টেড্রোস আধানম ঘেব্রেইসাসও বলেছেন, ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী পরিবারগুলোর স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।’
একটি সাধারণ সংক্রমণ যখন চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে ওঠে, তখন অস্ত্রোপচার, ক্যানসার থেরাপি বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাগুলোও খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
করণীয়
এ মুহূর্তে ‘অ্যাক্ট নাউ’ বা এখনই পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে কেবল বিজ্ঞানী বা চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করা নয়, বরং এ লড়াইয়ে আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে।
১. সচেতন ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রেই কার্যকর। ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়াটিক অকার্যকর।
২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: সংক্রমণ রোধের জন্য নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ও টিকা নেওয়া অপরিহার্য। এটি অণুজীবের বিস্তার রোধ করে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা কমায়।
৩. নতুন উদ্ভাবনে বিনিয়োগ: সরকার ও সংস্থাগুলোর উচিত নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ও রোগনির্ণয়ের উন্নত প্রযুক্তির গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করা।
শেষ কথা
‘প্রোটেক্ট আওয়ার প্রেজেন্ট’ মানে হলো আমাদের বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থা, যার ওপর আমরা নির্ভর করি, তাকে সচল ও সুরক্ষিত রাখা। আর ‘সিকিউর আওয়ার ফিউচার’ মানে হলো এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, যেখানে আমাদের শিশুরা যেন সাধারণ সংক্রমণে মারা না যায়।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যার জন্য প্রয়োজন একীভূত ও বহুক্ষেত্রীয় পদক্ষেপ। এখনই সম্মিলিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে আমরা এই নীরব হুমকি মোকাবিলা করতে পারি এবং মানবতার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি।
* ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাউক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা
![]() |
| চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। ছবি: পেক্সেলস |
Saturday, July 18, 2026
শিশুর সুস্থতায় শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবারের গুরুত্ব by অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী
কেন আঁশযুক্ত খাবার দরকার
* বৃহদন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়া এসব আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করে প্রোবায়োটিকস, যা অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুগুলোকে পুষ্টি জোগায়।
* পরিপাকতন্ত্রে থাকা বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন এবং ক্যানসার তৈরির উপাদান বিনষ্ট করে দেয়।
* মলের আয়তন ধরে রাখে। ফলে শিশুর কোষ্ঠবদ্ধতার নিরসন হয়।
* আঁশ পাকস্থলী থেকে খাবার অন্ত্রে যাওয়ার সময় বৃদ্ধি করে মানে পরিপাকতন্ত্রের চলনকে ধীর করে এবং এভাবে শিশুর খিদে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
* ফলমূল-শাকসবজি খাওয়া হলে শর্করাজাতীয় পানীয় পানের ফলে দেহে হঠাৎ করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি কম থাকে।
* শিশুর দৈনন্দিন খাবারে আঁশযুক্ত ফলমূল, শাকসবজি বা দানাদার খাবার শিশু বয়সে ডায়াবেটিস, মুটিয়ে যাওয়া, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, কোলন ক্যানসার ও আইবিডির মতো অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে উপকারী।
শিশু কতটুকু আঁশ খাবে
শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন ন্যূনতম আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ নির্ণয়ে নিম্নোক্ত ফর্মুলা ব্যবহার হয়। শিশুর বয়স (বছর) + ৫ = আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ (গ্রাম হিসাবে)। যেমন—১ বছর বয়সের একটি শিশুর জন্য আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ হবে: ১+৫ = ৬ গ্রাম/প্রতিদিন।
* অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
![]() |
| শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার থাকা দরকার। ছবি: পেক্সেলস |
Monday, July 13, 2026
শিশুকে ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে কী হয় by ডা. মানিক মজুমদার
রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় প্রভাব
শিশুকে অপ্রয়োজনে বারবার অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো তার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এতে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শিশুর হজমশক্তি স্বাভাবিক রাখা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে জরুরি। বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে শিশু ঘন ঘন অসুস্থ হয়। সাধারণ সর্দি-কাশির সঙ্গেও শিশুর ইমিউন সিস্টেম লড়াই করতে পারে না।
ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স। অপ্রয়োজনে বা অসম্পূর্ণ কোর্সে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে শিশুর শরীরের ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে সেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরে যখন শিশু সত্যিকারের মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে আক্রান্ত হয়, তখন অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। বাংলাদেশে এখন এমন শিশু নিয়মিতই পাওয়া যায়, যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না। এ পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর তা কল্পনারও অযোগ্য।
মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব
অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর ডায়রিয়া, বমি, অ্যালার্জি বা ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—শিশুর জীবনের প্রথম দিকে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দিতে পারে। মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও নানা আচরণগত সমস্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
করণীয়
প্রথমত, কখনো নিজ থেকে বা দোকানির পরামর্শে শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াবেন না। কেবল নিবন্ধিত চিকিৎসক বা শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শে খাওয়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, মনে রাখবেন—ভাইরাসজনিত সাধারণ সর্দি, কাশি বা জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। সঠিক যত্নে এসব কিছুটা সময় নিয়ে এমনিতেই সেরে যায়। শিশুর পুষ্টি ও বিশ্রামের দিকে নজর দিন। তৃতীয়ত, চিকিৎসক যদি অ্যান্টিবায়োটিক দেন, পুরো কোর্স শেষ করুন। মাঝপথে বন্ধ করলে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে। চতুর্থত, স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে শিশুকে সঠিক সুষম পুষ্টিকর খাবার দিন। সংক্রমণ এড়াতে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি ও হাঁচি–কাশির শিষ্টাচারের দিকে লক্ষ রাখুন।
* ডা. মানিক মজুমদার, কনসালট্যান্ট (শিশুরোগ) পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি. ময়মনসিংহ
![]() |
| বাংলাদেশে এখন এমন শিশু নিয়মিতই পাওয়া যায়, যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না। ছবি: পেক্সেলস |
Thursday, July 9, 2026
বড়দেরও কি নিয়মিত কৃমির ওষুধ প্রয়োজন by ডা. তাসনোভা মাহিন
কৃমি এবং অন্যান্য বহু জীবাণু প্রতিরোধের উপায় হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন এবং খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাসের বিকল্প নেই। বাসনকোসন ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া এবং কাঁচা খাওয়া যায়—এমন খাবার ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়াও জরুরি।
শৌচকর্মের পর ভালোভাবে হাত ধোয়ার গুরুত্বও সবারই জানা। খালি পায়ে মাটিতে হাঁটলে কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই এ ব্যাপারও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
শিশু–কিশোরদের জন্য কেন বাড়তি সতর্কতা
সব বয়সেই কৃমি প্রতিরোধের জন্য এসব বিষয় মেনে চলা উচিত। তবে বাস্তবতা হলো, শৈশব-কৈশোরে স্বাস্থ্যরক্ষার অনেক দিক সব সময় মেনে চলা সম্ভব না-ও হতে পারে। ঘাসের ওপর দৌড়ে যাওয়ার অবিশ্বাস্য সুন্দর অনুভূতি থেকে আপনিও নিশ্চয়ই আপনার সন্তানকে বঞ্চিত করতে চাইবেন না।
কিন্তু বাড়ন্ত বয়সের আনন্দের মধ্যে পুষ্টিহীনতার কারণ হয়ে উঠতে পারে কৃমি। পুষ্টির ঘাটতিতে বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে প্রতিবছর নিয়মমাফিক তাদের কৃমির ওষুধ খাওয়ানোই ভালো। বড়দের জন্য আলাদাভাবে এমন নিয়ম নেই।
বড়দের মধ্যে কারা নেবেন কৃমির ওষুধ
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের কৃমি সংক্রমণ ও সংক্রমণজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি, সংক্রমণের উপসর্গ না থাকলেও তাঁদের প্রতিবছর কৃমির ওষুধ খেতে বলা হয়।
বাকিদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণের উপসর্গ না থাকলে কৃমির ওষুধ তেমন প্রয়োজনীয় নয়। জেনে নিন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বড়দের মধ্যে কারা আছেন ঝুঁকিতে।
* যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম (যেমন ৬৫ বছর পেরোনো ব্যক্তি, কেমোথেরাপি বা দীর্ঘ মেয়াদে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবনকারী ব্যক্তি)
* খালি পায়ে মাটিতে হাঁটেন বা কাজ করেন, এমন ব্যক্তি (যেমন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি)
* গর্ভধারণ করতে সক্ষম, এমন নারী (গর্ভাবস্থায় নয়)
* যে এলাকায় কৃমির প্রাদুর্ভাব বেশি, সেই এলাকায় বসবাসরত যেকোনো বয়সী নারী-পুরুষ (কখনো কখনো সরকারি উদ্যোগেও কোনো এলাকার সবাইকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর কর্মসূচি হতে পারে)
একটি ওষুধ খেলেই চলবে?
সাধারণত কৃমি প্রতিরোধে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বছরে একবার ৪০০ মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। তবে আমাদের দেশে যেসব কৃমির প্রাদুর্ভাব আছে, সেসব প্রতিরোধ করতে এরই সঙ্গে আরেকটি ওষুধ সেবন করা প্রয়োজন। ওষুধটির নাম আইভারমেকটিন।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওজনের ওপর নির্ভর করে আইভারমেকটিনের ডোজ নির্ধারণ করতে হয়। প্রতি কেজি ওজনের জন্য ২০০ মাইক্রোগ্রাম। তাই সঠিক ডোজ জেনে নিতে একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
কখন খাওয়া ভালো
দিনে নাকি রাতে, খাওয়ার আগে নাকি পরে—কখন কৃমির ওষুধ খাওয়া ভালো, এ নিয়ে দ্বিধায় পড়বেন না। আপনি নিজের সুবিধামতো সময়েই কৃমির ওষুধ খেতে পারেন। তবে যেকোনো দুই বেলার খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে কৃমির ওষুধ খাওয়া ভালো।
এক বেলার খাবার খাওয়ার দু-তিন ঘণ্টা পর খেতে পারেন, যার দু–এক ঘণ্টা পর আরেক বেলার খাবারের সময় হয়ে যায়। অনেকে আবার রাতে কৃমির ওষুধ খান। মৃদু কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে সেই সময় বিশ্রাম নিলে তা উপশম হতে পারে। রাতে কৃমির ওষুধ খাওয়ার কোনো আলাদা উপকারিতা নেই।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানা থাক
কৃমির ওষুধ খাওয়ার পর সাধারণ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই। এ ধরনের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—
* বমি ভাব
* বমি
* পেটে হালকা ব্যথা
* পাতলা পায়খানা
* মাথা ঘোরানো
* মাথাব্যথা
* একটু ঘুম ভাব
* মৃদু বা মাঝারি জ্বর
* পেশিতে হালকা ব্যথা
তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এ ধরনের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—
* তীব্র পেটব্যথা
* চোখ বা প্রস্রাব হলুদ হয়ে যাওয়া
* ত্বকে গোটা সৃষ্টি হওয়া
ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই খেয়াল রাখুন
* গর্ভাবস্থায় কৃমির ওষুধ খেতে নেই। কৃমির ওষুধ খাওয়ার আগে ও পরে (এক মাস পর্যন্ত সময়) গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। এমনকি গর্ভধারণ হয়েছে কি না, এ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও কৃমির ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
* কোনো কৃমির ওষুধে অ্যালার্জি থাকলে তা খাওয়া যাবে না।
* অন্য কোনো ওষুধ চলমান থাকলে বা কোনো রোগের উপসর্গ থেকে থাকলে কৃমির ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ওষুধ খাওয়ার আগেই কৃমি সংক্রমণ হয়ে থাকলেও ভিন্ন ডোজ বা ভিন্ন ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।
* যে মা সন্তানকে দুধ খাওয়ান, তাঁর ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রয়োজন।
![]() |
| সাধারণত কৃমি প্রতিরোধে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বছরে একবার ৪০০ মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। ছবি: পেক্সেলস |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...















