Tuesday, December 9, 2025

দুই কেলেঙ্কারিতে চাপে আছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পদত্যাগের দাবি

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বেশ চাপের মধ্যে রয়েছেন। মাদক পাচারকারী সন্দেহে নৌকা লক্ষ্য করে হামলা এবং সংবেদনশীল সামরিক তথ্য আলোচনার জন্য ‘সিগন্যাল’ অ্যাপ ব্যবহারের মতো একাধিক কেলেঙ্কারির কারণে তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে এবং তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠছে।

সাবেক আর্মি ন্যাশনাল গার্ড মেজর পিট হেগসেথ একসময় ফক্স নিউজের সহ-উপস্থাপক ছিলেন। সেখান থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রধান হয়েছেন তিনি। চলতি বছরের শুরুতে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে অল্প ব্যবধানে তাঁর নিয়োগ অনুমোদন করা হয়েছিল।

মাদক পাচারকারী সন্দেহে ভেনেজুয়েলা উপকূলে বেশ কয়েকবার নৌকায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে একটি ঘটনায় প্রথম হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের পরে হত্যা করা হয়েছিল। আবার ইয়েমেনো অভিযান শুরুর আগে আলোচনা করার জন্য বাণিজ্যিক মেসেজিং অ্যাপ ‘সিগন্যাল’ ব্যবহার করেছিলেন হেগসেথ। এই দুটি ঘটনায় তাঁর বিরোধিতা আরও বেশি বাড়ছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, তিনি (হেগসেথ) আরও একটি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। আসলে তাঁর দুটি বড় ঘটনা এখন এক হয়ে গেছে।

ক্যানসিয়ান আরও বলেন, ‘তবে মনে হচ্ছে, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আস্থা ধরে রেখেছেন। অবশ্য তিনি বেশ কিছু রিপাবলিকানের সমর্থন হারিয়েছেন। তাই আমি মনে করি না তিনি গুরুতর পরিস্থিতির মধ্যে আছেন।’

ওবামা প্রশাসনের সময় ইউরোপীয় ও ন্যাটো নীতির জন্য উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা জিম টাউনসেন্ড বলেন, হেগসেথ ‘খুব পাতলা বরফের ওপর’ আছেন এবং ট্রাম্পের এমন ‘একজন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আছেন যিনি তাঁকে প্রচুর মাথাব্যথা দিচ্ছেন।’

টাউনসেন্ডও একমত, হেগসেথকে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের বরখাস্ত করার সম্ভাবনা কম। তবে তিনি বলেন, ‘সত্যিই রিপাবলিকান পার্টিকে বিক্ষুব্ধ করে তুলবে’ এমন কিছু ঘটলে অথবা ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ যা মাগা নামেও পরিচিত) আন্দোলনকে বিব্রত করে তুলবে। এমনটা হয়ে থাকলে সম্ভবত তাঁকে অন্য কোথাও সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

ইয়েমেন হামলা

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ নিশ্চিত করার সময় হেগসেথ বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। কারণ, তিনি আগে যেখানে কাজ করতেন, সাবেক সৈনিকদের সেই অলাভজনক সংস্থাগুলোয় আর্থিক অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত মদ্যপানের অভিযোগ এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় একজন নারীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়ও কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে মার্চের মাঝামাঝি ইয়েমেনে চালানো হামলা চালানোর আগের একটি ঘটনা।

‘দ্য আটলান্টিক’ সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর প্রধান সম্পাদক ভুলবশত সিগন্যাল চ্যাটের একটি গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, যেখানে হেগসেথসহ অন্য কর্মকর্তারা আসন্ন ইয়েমেনে অভিযান নিয়ে আলোচনা করছিলেন। পেন্টাগন প্রধান হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে তাঁর সময়সূচি এবং এতে জড়িত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র–সংক্রান্ত তথ্য মেসেজ করেছিলেন।

এ ঘটনায় পেন্টাগনের স্বাধীন মহাপরিদর্শকের কার্যালয় তদন্ত শুরু করে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের উপসংহারে উল্লেখ করা হয়, হেগসেথের এই কর্মকাণ্ডের ফলে ‘মার্কিন পাইলটদের সম্ভাব্য ক্ষতি’ হতে পারত।

মাদক পাচারকারী সন্দেহে নৌকা লক্ষ্য করে হামলা

আরেকটি বিতর্ক সৃষ্টি হয় গত ২ সেপ্টেম্বর প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারকারী সন্দেহে একটি নৌকার ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে। প্রথম হামলায় নৌকার ব্যক্তিরা বেঁচে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তী একটি হামলায় তাঁদের হত্যা করা হয়।

হেগসেথ ও হোয়াইট হাউস বারবার বলেছে, দ্বিতীয় হামলার সিদ্ধান্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেননি। বরং অপারেশনাল কমান্ডার অ্যাডমিরাল ফ্রাঙ্ক ব্র্যাডলি নিয়েছিলেন।

এ সপ্তাহে আইনপ্রণেতারা ক্যাপিটল হিলে গোপন এক বৈঠকে যোগ দেন, যেখানে তাঁদের ঘটনার সম্প্রসারিত ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়। ওই ভিডিওর শুধু একটি সংক্ষিপ্ত অংশ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে পরের হামলাগুলো ন্যায্য ছিল কি না, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী মতামত রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি জিম হাইমস বলেন, ফুটেজে দেখা গেছে ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলায় ডুবে যাওয়া নৌযানের নাবিকদের ওপর আক্রমণ করছে’।

বৈঠকে উপস্থিত রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন নৌযানের ওপর চারটি হামলাকেই ‘সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং প্রয়োজনীয়’ বলে বর্ণনা করে বলেন, বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা মাদকবোঝাই নৌযানটিকে আবার উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছিল এবং তারা ‘লড়াই চালিয়ে যেতে চেয়েছিল’।

কিছু ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা পরের হামলা এবং সিগন্যাল বিতর্কের জেরে হেগসেথের পদত্যাগ বা বরখাস্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে আপাতত তাঁর চাকরি নিরাপদ বলেই মনে হচ্ছে।

তবে ক্যানসিয়ান বলেছেন, আরেকটি কেলেঙ্কারি ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দিতে পারে।

ক্যানসিয়ান বলেন, এরপর যদি আরেকটি ঘটনা ঘটে...হোয়াইট হাউস হয়তো ধৈর্য হারাতে পারে। তিনি ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া বিতর্কগুলোকে ‘খুব বিব্রতকর’ বলে উল্লেখ করেছেন।

পিট হেগসেথ
পিট হেগসেথ। ফাইল ছবি: এএফপি

৫০ বছরে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ থেকে কী পেলো যুক্তরাষ্ট্র?

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় আগে, ১৯৭১ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে জনগণের প্রধান শত্রু ঘোষণা করে অভিযান শুরু করেছিলেন। যা পরবর্তীতে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ নামে পরিচিতি পায়। তার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে মাদকমুক্ত করা, পাচারচক্র ধ্বংস করা এবং দেশকে নিরাপদ করে তোলা। কিন্তু পাঁচ দশক পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা হয়েছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

যুক্তরাষ্ট্রে এই অভিযান কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা ও শাস্তিমূলক আইনকে শক্তিশালী করেছে। ফলে দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ কারাবন্দী হারের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের হিসাবে, মাদকবিরোধী যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু মাদকের চাহিদা বা প্রাপ্যতার ওপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। বরং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ওভারডোজ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে ফেন্টানিলের মতো সিন্থেটিক ড্রাগ প্রতি বছর এক লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণ নিচ্ছে।
১৯৬০ এর দশকের শেষ দিকে ভিয়েতনাম ফেরত সৈন্যদের মধ্যে হেরোইন ব্যবহারের বৃদ্ধি, তরুণদের মধ্যে মাদক গ্রহণ এবং সুউচ্চ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সময় নিক্সন কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন। পরবর্তীতে তার সহকারী জন আর্লিচম্যান স্বীকার করেন, প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে কৃষ্ণাঙ্গ ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকারীদের টার্গেট করতে মাদককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

নিক্সনের পর রোনাল্ড রিগানের আমলে এই যুদ্ধ আরও তীব্র হয়। ১৯৮০-এর দশকে কঠোর সাজা, বিশেষ করে ‘ক্র্যাক’ বনাম পাউডার কোকেনের সাজার বৈষম্য, কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কারাবন্দীর হার কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিল ক্লিনটনের ১৯৯৪ সালের অপরাধবিরোধী আইন পরিস্থিতিকে আরও কঠোর করে, থ্রি-স্ট্রাইক নীতি জীবনব্যাপী কারাবাসকে সহজ করে তোলে। ২০১০-এর সময় পর্যন্ত এই নীতি মূলত অপরিবর্তিত থাকে। পরে কানাবিস বৈধকরণ ও ওপিওয়েড সংকট দেখিয়ে দেয় যে কঠোর শাস্তি আসক্তি কমাতে পারে না।

বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ নীতিতে আগের পথেই হাঁটছে, তবে লাতিন আমেরিকার প্রতি আগ্রাসী অবস্থান আরও দৃশ্যমান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে ডজনখানেক নৌকায় বোমা মেরেছে। নার্কো-ট্রাফিকিং (মাদক পাচার) বন্ধ করার নামে এসব হামলা চালিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও এসব নৌকা মাদক বহন করছিল এমন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ ওয়াশিংটন উপস্থাপন করতে পারেনি। সমালোচকরা বলছেন, এটি মূলত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরানোর রাজনৈতিক অজুহাত।
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০০-এর দশক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ১.৬ মিলিয়ন পর্যন্ত মাদকসংক্রান্ত গ্রেপ্তার হতো। এর বেশিরভাগই অল্প পরিমাণ মাদক বহনের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের কারাবন্দী সংখ্যা ১৯৭০-এর দশকে ৩ লাখ থেকে চার দশকে বেড়ে ২০ লাখেরও বেশি হয়। এই পদক্ষেপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর। মার্কিন জনগোষ্ঠীর ১৫ শতাংশের কম হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণাঙ্গদের এক-চতুর্থাংশের বেশি মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় ৩.৭ গুণ বেশি হারে ক্যানাবিস-বহন সম্পর্কিত গ্রেপ্তারের শিকার হন।

রিগানের কঠোর সাজা আইন পাস হওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের হার বেড়েছিল, যা ১৯৯১ পর্যন্ত বাড়তে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় অব কানসাসের ইতিহাসবিদ ডেভিড ফারবার বলেন, ওয়ার অন ড্রাগস আসলে আমেরিকার গরিবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল, সমাধান নয়।
মাদকবিরোধী যুদ্ধ কীভাবে লাতিন আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ল
মাদকবিরোধী যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও তার সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৮০-এর দশকে, ওয়াশিংটন মাদক পাচারকে উৎসমুখেই দমন করার জন্য লাতিন আমেরিকা জুড়ে সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকে অর্থায়ন এবং প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।

ল্যাটিন আমেরিকা ওয়ার্কিং গ্রুপের মতে, ২০০০ সাল থেকে ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’ নামে পরিচিত কর্মসূচির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ায় কমপক্ষে ১০ বিলিয়ন বিনিয়োগ করেছিল, যার বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনী এবং কোকেইনের ক্ষেত ধ্বংস করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।  কলম্বিয়ান মানবাধিকার সংস্থা এবং দেশটির সত্য কমিশনের মতে, যদিও রাষ্ট্র কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দুর্বল করতে সফল হয়েছিল, কিন্তু কোকেইন চাষ শেষ পর্যন্ত রেকর্ড স্তরে ফিরে এসেছিল এবং সাধারণ নাগরিকদেরকে এর চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। এই সংঘাতের ফলে ১৯৮৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আনুমানিক ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।

মেক্সিকোতে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাদক নির্মুল অভিযান চালায়। ফলে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক হাঙ্গামা হয়। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস অনুসারে, তখন থেকে ৪ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং আরও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। স্থানীয় ছোট ছোট দলগুলো চাঁদাবাজি, জ্বালানি চুরি এবং মানব পাচারের মতো কাজে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে।

জাতিসংঘ মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) মতে, এই অভিযানগুলো মাদক পাচারের পথ অন্য দিকে সরিয়ে দেয়। যার প্রধান পথ হয়ে ওঠে মধ্য আমেরিকার দেশগুলো।
এখনও যুক্তরাষ্ট্র কথিত পাচারকারীদের লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে কথিত মাদক পাচারের জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত ২১টি সামরিক হামলায় ৮৩ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

(সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত)

mzamin

গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত হামাস ও ইসরায়েল

গাজায় ইসরায়েলের ‘জাতিগতনিধন’ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হতে প্রস্তুত ইসরায়েল ও হামাস।

তবে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর ভূমিকা কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয় এবং এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসেম নাঈম গতকাল রোববার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাবে থাকা অনেক বিষয় নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

নাঈম আরও বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির সময় অস্ত্র ব্যবহার না করা বা অস্ত্র জমা দেওয়া নিয়ে তারা আলোচনা করতে প্রস্তুত; কিন্তু নিরস্ত্রীকরণের দায়িত্ব কোনো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী নেবে—এটি তাঁরা মেনে নেবেন না।

এ নিয়ে বাসেম নাঈম বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘের বাহিনীকে স্বাগত জানাই, যারা সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান করবে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি তদারক করবে, লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তা জানাবে এবং যেকোনো ধরনের উত্তেজনা প্রতিরোধ করবে।’

কিন্তু হামাস ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ওই বাহিনীর কোনো ধরনের কর্তৃত্ব মেনে নেবে না বলেও জানান নাঈম।

হামাস কর্মকর্তার এই বক্তব্যের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করবেন এবং গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার নতুন ধাপে প্রবেশ নিয়ে আলোচনা করবেন।

রোববার নেতানিয়াহু আরও বলেন, (ট্রাম্পের সঙ্গে) বৈঠকের মূল লক্ষ্য হবে গাজায় হামাসের শাসন শেষ করা এবং এটা নিশ্চিত করা যে পরিকল্পনায় দেওয়া ‘অঙ্গীকার’ তারা পূরণ করবে।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় অবরুদ্ধ ভূখণ্ডের নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করার কথা বলা আছে।

হামাসের অস্ত্র ব্যবহার না করা বা অস্ত্র জমা রাখার বিষয়ে নাঈম হামাসের যে অবস্থানের কথা বলেছেন, তা ইসরায়েলের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবি পূরণ করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

হামাস কর্মকর্তা বলেন, হামাসও প্রতিরোধ করার অধিকার রাখে।

নাঈম আরও বলেন, অস্ত্র নামিয়ে রাখা হতে হবে এমন একটি প্রক্রিয়ার অংশ, যা একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাবে এবং যেখানে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ৫ থেকে ১০ বছর স্থায়ী হতে হবে।

গাজার জন্য মার্কিন খসড়া যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি পথ খোলা রাখা হয়েছে; কিন্তু নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাঁর দাবি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে হামাসকে পুরস্কৃত করা হবে।

গাজার মধ্যাঞ্চলের একটি শরণার্থীশিবিরে ধসে পড়া একটি বহুতল ভবনের ধ্বংসাবশেষের ভেতর মৃতদেহ খুঁজছে সেখানকার সিভিল ডিফেন্সের দল, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
গাজার মধ্যাঞ্চলের একটি শরণার্থীশিবিরে ধসে পড়া একটি বহুতল ভবনের ধ্বংসাবশেষের ভেতর মৃতদেহ খুঁজছে সেখানকার সিভিল ডিফেন্সের দল, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র বলছে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে, প্রস্তাবে বড় পরিবর্তন আনতে বলছে রাশিয়া

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ পৌঁছানো গেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এই যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে আলোচনা বড় কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে। আর মস্কোর ভাষ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে প্রস্তাবকে চুক্তির ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে, তাতে বড় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর তথ্য জানিয়েছেন ইউক্রেনবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত কেইথ কেলগ। আগামী জানুয়ারিতে এই পদ থেকে সরে যাচ্ছেন তিনি। গতকাল শনিবার ক্যালিফোর্নিয়ায় রেগ্যান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোরামে কেলগ বলেন, সংঘাতের সমাধান করার প্রচেষ্টা ‘শেষ ১০ মিটার দূরে রয়েছে।’ এই শেষ সময়টা সবচেয়ে কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আর দুটি বাধা অতিক্রম করতে হবে বলে জানান কেলগ। এর একটি হলো ভূখণ্ডবিষয়ক—বিশেষ করে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে দনবাস নিয়ে। অপরটি হলো ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে রাশিয়ার দখলে রয়েছে। কেলগ বলেন, এই দুটি বিষয়ের সমাধান হলে অন্য সমস্যাও কেটে যাবে।

এর আগে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ওই বৈঠকের পর পুতিনের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান সহকারী ইউরি উশাকভ বলেছিলেন, ভূখণ্ড নিয়ে সমস্যাগুলো আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির জন্য ইউক্রেনে পুরো দনবাস অঞ্চল চায় মস্কো।

দনবাসের অন্তত ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চল এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ভাষ্যমতে, এই অঞ্চলগুলো রাশিয়ার হাতে তুলে দিলে সেখান থেকে ইউক্রেনের আরও গভীরে হামলা চালাতে পারবে মস্কো। আজ রোববার উশাকভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাবে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। যদিও এ নিয়ে বিস্তারিত বলেননি তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে তিন দিনের আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে। শনিবার ছিল আলোচনার শেষ দিন। এদিন জেলেনস্কি বলেন, আলোচনার তৃতীয় দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ‘বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলক’ আলোচনায় নিজ দেশে প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি যোগ দিয়েছিলেন।

বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, সত্যিকারের শান্তি আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সততার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইউক্রেন। ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার পরবর্তী ধাপ এবং কাঠামো সম্পর্কে একমত বিভিন্ন পক্ষ। জেলেনস্কি আরও বলেন, যেকোনো গঠনমূলক অগ্রগতির বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে মস্কোর ওপর।

এদিকে আগামীকাল সোমবার যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। মস্কো যেন শান্তির পথে ফিরে আসে, সে জন্য চাপও দেবেন তাঁরা।

৭০০ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

যুদ্ধ বন্ধে দফায় দফায় আলোচনা ও দর-কষাকষির মধ্যে ইউক্রেনে ৭০০ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের শনিবারের আলোচনার আগে রাতভর এই হামলা চালানো হয়। ইউক্রেনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও রেলসম্পদকে এ হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

হামলায় ইউক্রেনের হাজার হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ ও পানিসংকট দেখা দেয়। হামলার পর ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ‘হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোগুলো। ইউক্রেনের লাখ লাখ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলাটাই রাশিয়ার লক্ষ্য।’ বিশাল এই হামলার কথা স্বীকার করেছে ক্রেমলিনও।

তবে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা অস্বীকার করেছে মস্কো। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, তারা শুধু ইউক্রেনের সামরিক শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। সব লক্ষ্যবস্তুতেই সফলভাবে আঘাত হানতে পেরেছে তারা।

ইউক্রেন সামরিক বাহিনীর ট্রাংকের বহর
ইউক্রেন সামরিক বাহিনীর ট্রাংকের বহর। ফাইল ছবি: রয়টার্স

খালেদা জিয়ার ‘জেন্টল পাওয়ার’ by ফয়সল মাহমুদ

বাংলাদেশে খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁদের উপস্থিতি জনমতকে আলোড়িত করতে পারে। খালেদা জিয়া তাঁদের অন্যতম। ঢাকার একটি হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বিগত কয়েকদিন ধরে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা এই অশীতিপর রাষ্ট্রনেত্রীকে ঘিরে জনমানসে থাকা গভীর আবেগেরই প্রকাশ।

সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষ ফুটপাত, আঙিনা এবং সামনের সড়কগুলোতে জড়ো হয়েছেন- কারও হাত প্রার্থনায় রত, কারও কণ্ঠে নীরব উচ্চারণ- এক নারীর প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি বহু দশক ধরে এই দেশের উত্তাল রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রে।

রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, জনমনে যে আবেগ উথলে উঠেছে তা আরও গভীর কিছু নির্দেশ করে: বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে খালেদা জিয়া আজও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জীবন্ত প্রতীক। তাঁদের ভালোবাসা স্মৃতিতে নিবদ্ধ।
অনেকে ভুলে যান যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ার আগেও খালেদা জিয়া ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে সাধারণ জীবনযাপনকারী একজন নাগরিক। তার স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁকে এমন এক ইতিহাসের পথে ঠেলে দেয়, যে পথে যাওয়ার কোনো প্রস্তুতিই তাঁর ছিল না।
তবু পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। গ্রেপ্তার, নজরদারি, ভয়ভীতি- সবই সহ্য করেছেন। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি হয়ে ওঠেন গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের এক অপ্রত্যাশিত প্রতীক।

তিনি আন্দোলন নেতৃত্ব দেন। তাকে বারবার আটক করা হয়। নিঃসঙ্গতায় দিন কাটান। তবু স্বৈরশাসনের কাছে মাথা নত করেননি। ১৯৯০ সালে সামরিক সরকার পতনের পেছনে তাঁর সংগঠিত গণআন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালে তাঁর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া চিহ্নিত করে সামরিক প্রভাবাধীন দীর্ঘ যুগের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনরুত্থান।

তাঁর শাসনে অগ্রাধিকার পেয়েছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা। তার মধ্যে ছিল শিক্ষার জন্য খাদ্য, গ্রামীণ সেবামূলক কর্মসূচি, কর্মসংস্থান, কাঠামোগত সংস্কার। এগুলো বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে আরও উদার অর্থনীতির দিকে নিয়ে গেছে।

সমালোচকরা তাঁকে কখনও সতর্ক রাজনীতিক বলেছেন। অনুরাগীরা বলেছেন স্থির-হাতে পরিচালনাকারী। কিন্তু নিঃসন্দেহে তিনি এক গভীরভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নেতৃত্বের নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করেন।
দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর স্থান অনন্য। তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রথম দিকের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী নেতাদের একজন। তিনি এমন এক নেতৃত্ব শৈলী গড়ে তুলেছেন যেখানে ব্যক্তিপূজা ছিল না। তিনি রাজবংশীয় উত্তরাধিকারী নন, নন কোনও কঠোর সম্রাজ্ঞী।

যদি তাঁর আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব শৈলীকে কেউ কেউ মনে করেন ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক পরিসর দখলের রাজনীতি, তবে খালেদার শৈলী সম্পূর্ণ আলাদা- নীরব, ভারসাম্যপূর্ণ, সংযত। এ কারণে অনেকে তাঁকে অকপটে ‘জেন্টল লেডি’ বলেন। এর মানে দুর্বলতা নয়, ভদ্রতা ও শালীনতা। তাঁর উত্তরাধিকার একাধারে রাজনৈতিক স্মৃতি এবং আবেগময় সম্পদ। ’৮০ ও ’৯০ দশকের গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিনগুলো স্মরণ করলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব মানুষের মনে ভেসে ওঠে। এক সময় যখন বাংলাদেশ দীর্ঘ শ্বাস নিতে পেরেছিল, তখন গণতন্ত্র শুধু আকাঙ্ক্ষা ছিল না, বাস্তব অনুভূতি ছিল। তিনি এমন এক সময় দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সে সময়ে তার নেতৃত্ব আজকের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত, বহুমাত্রিক এবং সহনশীল ছিল বলে অনেকের মনে গেঁথে আছে, যদিও তা ছিল অসম্পূর্ণ।

এ কারণেই হাসপাতালে তাঁর শয্যার পাশে মানুষের ভিড় শুধু একজন অসুস্থ রাজনৈতিক নেত্রীকে নিয়ে উদ্বেগ নয়- এটি প্রতিফলন করছে এক বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার: প্রতিহিংসাহীন, কম দমনমূলক, কম অসহিষ্ণু এক রাজনীতির প্রতি আকুলতা।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে ঘিরে মানুষের প্রতিক্রিয়া একটি নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি- তাঁর অবদান স্মরণ করা এবং হয়তো সেই শালীন রাজনীতির জন্য গভীর আকুলতা।
অনেকে যারা তাঁকে ভোট দেননি, তাঁরা পর্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলেন। যাঁরা একসময় বিরোধিতা করেছেন, তাঁরাও আজ আরোগ্য কামনা করেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেটি বহু সময় আড়াল করে রাখে- এই পরিস্থিতি তা আবারও প্রকাশ করেছে: নেতারা কখনও কখনও জাতির সমষ্টিগত স্মৃতির ধারক হয়ে ওঠেন- এমনকি তাঁদের বিরোধীদের কাছেও।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এই যে, সমর্থনের এসব প্রকাশে বিষাক্ততা নেই। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে বাস করছে- হাসিনা-খালেদা দ্বন্দ্বে দুই শিবিরে দেশ বিভক্ত হয়ে থেকেছে।

কিন্তু তাঁর অসুস্থতা সেই কঠোর বিভাজনকে সাময়িকভাবে নরম করেছে। মনে করিয়ে দিয়েছে- প্রসিকিউটরের মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা অবমানিত হওয়ার অনেক আগেই তিনি এমন এক নারী- যিনি ব্যক্তিগত ক্ষতি, রাজনৈতিক ঝড়-তুফান, জনসমালোচনা- সব সহ্য করেছেন শান্তভাবে।

তাঁর মানবিকতাই তাঁর রাজনৈতিক ছাপকে বিশেষ করে তুলেছে। তিনি কখনও কঠোর স্বৈরশাসক ছিলেন না। ছিলেন না জ্বালাময়ী বক্তা। মঞ্চকে তিনি নাট্যমঞ্চে পরিণত করেননি। তিনি শাসন করেছেন এক মাতৃসুলভ শান্ত মর্যাদায়- যা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সাড়া জাগিয়েছে।

হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষ মতাদর্শ নিয়ে কথা বলেন না। তাঁরা কথা বলেন মর্যাদা নিয়ে। শিষ্টাচার নিয়ে কথা বলেন। তাঁরা তাঁকে মনে করেন এমন একজন, যিনি রাজনীতির অমানবিক পরিমণ্ডলেও মানবিকতার প্রতীক হয়ে আছেন।

তিনি এই সংকট থেকে বেঁচে ফিরুন বা না ফিরুন, তাঁর প্রভাব নিঃশেষ হবে না। বাংলাদেশ তাঁকে শুধু একজন রাজনৈতিক কৌশলী হিসেবে মনে রাখবে না- মনে রাখবে নাগরিক আকাঙ্ক্ষার ধারক হিসেবে- যাঁর নেতৃত্ব ছিল বিনয়ে আবৃত।
অনেকের কাছে তাঁর উপস্থিতি এক ভিন্ন নেতৃত্বধারণার প্রতীক- যেটি কম প্রতিশোধপরায়ণ, কম হিসাবি। তাই আজও, দুর্বল শরীর নিয়েও তিনি মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে।

সম্ভবত এটাই এক রাজনৈতিক জীবনের শেষ মূল্যায়ন- কত পদ পেয়েছেন তা নয়, কতদিন ক্ষমতায় থেকেছেন তাও নয়, বরং তিনি জাতির স্মৃতিতে কত গভীর আবেগ রেখে আছেন সেটাই তার মূল্যায়ন।

* ফয়সল মাহমুদ, নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার। অনলাইন এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ

mzamin

মা-মেয়ে হত্যার পর স্কুল ড্রেস পরে পালায় ঘাতক

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাসায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন এম জেড আজিজুল ইসলাম। চারদিন আগে আয়েশা নামের এক নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যোগদান করে। গতকাল সকালে আজিজুলের স্ত্রী মালাইলা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা বিনতে আজিজ (১৫)কে ছুরি দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় গৃহকর্মী আয়েশা। পালিয়ে যাওয়ার আগে ঘাতক আয়েশা বাথরুমে গোসল করে নিহত নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পালায়। শাহজাহান রোডের ৩২/২/এ বাসার সপ্তম তলার ৭/বি ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মালাইলা আফরোজ পেশায় গৃহিণী ও নাফিসা মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তবে কি কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জানা যায়নি এবং ঘাতক আয়েশাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

নিহত নাফিসার বাবা উত্তরার সানবিমস স্কুলের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আজিজুল ইসলাম বলেন, বাসায় একজন কাজের মহিলা দরকার ছিল। সাধারণত গেটে অনেকে কাজের সন্ধানে আসেন। চারদিন আগে একটি মেয়ে আসে। বোরকা পরিহিত মেয়েটি বাসার দারোয়ান খালেকের কাছে কাজের সন্ধান করলে সে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর আমার স্ত্রী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে কাজে রেখে দেয়। পরে স্ত্রীর মুখে শুনেছি, মেয়েটার নাম আয়েশা। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর। জেনেভা ক্যাম্পে চাচা-চাচির সঙ্গে থাকে। বাবা-মা আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার শরীরেও আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েটা কাজ শুরুর পর প্রথম দু’দিন সময়মতো এসেছে। গতকাল সে সাড়ে ৯টার দিকে আসে। আজ কী হয়েছে, এটা তো আর বলার অবস্থায় নেই।

ভবনের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, নাফিসার বাবা স্কুলের উদ্দেশ্যে সকাল ৭টার দিকে বের হয়ে যান। সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরখা পরে ওই বাসার লিফটে ওঠে সাত তলায় যায় গৃহকর্মী আয়েশা। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে ড্রেস পরে মুখে মাস্ক লাগিয়ে বের হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নাফিসার বাবা বাসায় ফিরে স্ত্রী ও মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মাকে হত্যার পর ওই মেয়েটি দৌড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হয়তো ইন্টারকমে সিকিউরিটি গার্ডকে ফোন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইন্টারকমের লাইনটি খোলা পাওয়া যায়। মেয়েটি খুব সুন্দরভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে বাথরুমে গিয়ে গোসল করে শরীরের রক্ত পরিষ্কার করে নাফিসার স্কুলের ড্রেস পরে নির্দ্বিধায় গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফ্ল্যাটের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ। বাসার আলমারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা। পুলিশ জানায়, তল্লাশি করে বাথরুমে একটি সুইচ গিয়ার ও একটি ধারালো অস্ত্র পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছুরি দু’টি দিয়ে মা-মেয়েকে হত্যা করে গৃহকর্মী আয়েশা। এ ঘটনায় ওই বাসার দারোয়ান মালেককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে, মেঝেতে এবং দেয়ালে রক্তের দাগ রয়েছে। আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ তছনছ অবস্থায় রয়েছে। যা মনে করছি, প্রাথমিকভাবে কিছু খোয়া যেতে পারে। সিসি ক্যামেরা ফুটেজে আমরা একজনকেই দেখেছি, পরে দেখবো আশপাশে আরও কেউ ছিল কিনা।  পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান জানান, পুলিশ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে খবর পায়। মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে নেয়ার পর মারা যায়। পরে লাশ দু’টি সুরতহালের পর ময়নাতদন্তের জন্য সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি, সেসব যাচাই-বাছাই চলছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি, হত্যার আগে-পরে তার উপস্থিতি ও অ্যাকটিভিটিজ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবো।

https://mzamin.com/uploads/news/main/193252_le.webp

অপরাধের অভয়ারণ্য জেনেভা ক্যাম্প by সুদীপ অধিকারী

আলোচনায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’। মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্যাম্পের ভেতর ঘটছে একের পর এক সংঘর্ষ, খুন। যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানেও দমানো যাচ্ছে না সন্ত্রাসীদের। এতে আতঙ্ক বিরাজ করছে পুরো মোহাম্মদপুরে। ঢাকা উত্তর সিটির মোহাম্মদপুর থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এই জেনেভা ক্যাম্প মূলত মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারিদের আবাসস্থল। ১৯৭১ সালে বাস্তুহারা বিহারিরা যারা মোহাম্মদপুরের রাস্তা, মসজিদ, স্কুলে অবস্থানরত ছিল তাদের জন্য ’৭২ সালে লিয়াকত হাউজিং সোসাইটির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে মোহাম্মদপুর কলেজগেটের অদূরে গজনবী রোড ও বাবর রোডের মাঝের ১৭ একর জায়গা নিয়ে ক্যাম্প তৈরি করা হয়। সেখানেই বছরের পর বছর ধরে বসবাস করে আসছেন এই উর্দুভাষিরা। বর্তমানে নয়টি ব্লকে ভাগ হওয়া এই ক্যাম্পে প্রায় ৩৫ হাজার বিহারির বসবাস। ছোট্ট ছোট্ট খুপরি ঘরে ১৫-২০ জন করে থাকেন। দিনে-রাতে পালা করে ঘুমাতে হয় তাদের। মূলত রাজধানীর বিভিন্ন সেলুনে নরসুন্দরের কাজই তাদের প্রধান পেশা। তবে এই সরু গলির ঘরগুলোকে অনেকেই আবার মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলেছে। বছরের পর বছর হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের কারবার চলছে এই ক্যাম্পে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই মাদকের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতেই গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে মরিয়া হয়ে উঠে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, বোবা বিরানি, শাহ আলম, তারিক, পারমনু ওরফে গাল কাটা মনু, চেম্বার রাজ, ঠোঁট গোলাবি, ফারুক, ইমতিয়াজ, আরমান, পলু কসাই, সৈয়দপুরিয়া, ছটু মাসুদ, চারকুসহ একাধিক গ্রুপ। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল। তার হয়ে কাজ করেন তার ভাই টুনটুন, রানা, রাজন, কলিম জাম্বু, মোহাম্মদ আলী, আহম্মদ আলী, বানর আরিফ আরও অনেকে। আর চুয়া সেলিমের পক্ষে আছে পিচ্চি রাজা, আরমান, আকরাম, মোল্লা আরশাদ, পেলু, কোপ মনু, পিস্তল নাঈম, শাহজাদা গেইল হীরা, সালাম, শান্ত, ফাট্টা আবিদ। এদিকে সৈয়দপুরিয়া গ্রুপে আছে তিল্লি শাহিদ, কামাল বিরিয়ানি, ইরফান বিরিয়ানি, মোল্লা জাহিদ, সাজ্জাদ, আমজাদ আলী বাবু। এদের মধ্যে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, সৈয়দপুরিয়া গ্রুপের বাবু ওরফে আমজাদ আলী বাবু, আসলাম ওরফে মেন্টাল আসলাম ও শেখ গোলাম জিলানি মূলত পারিবারিকভাবে ইয়াবা ও হেরোইনের কারবারে জড়িত। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগসাজশের কারণে বিগত বছরগুলোতে ক্যাম্পে শক্ত অবস্থান ছিল বুনিয়া সোহেলের। আর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিরোধীদের সাপোর্টে রাজত্ব করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন চুয়া সেলিম চক্র। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চুয়া সেলিমের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, অস্ত্র লুটসহ ৩৫টি মামলা রয়েছে। অপরদিকে বুনিয়া সোহেলের বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা ও মাদক মামলা রয়েছে। তবে আগে এসব দ্বন্দ্বে লাঠি, চাকু, দা, বঁটি, ছুরি ব্যবহার হলেও এখন যোগ হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রাণঘাতী কাস্টোমাইজড ককটেল।

বুধবার রাত ৩টার দিকে মাদক ব্যবসা নিয়ে ক্যাম্পের ৪ নম্বর গলিতে এমনই এক সংঘর্ষে জড়ায় বুনিয়া সোহেল গ্রুপ ও চুয়া সেলিম-পিচ্চি রাজা গ্রুপ। এসময় গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণে মো. জাহিদ (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। জাহিদ জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মৃত মো. ইমরানের সন্তান। কিন্তু গত ২০শে অক্টোবর রাতেও জেনেভা ক্যাম্পে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ৩২টি তাজা ককটেলসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম, দেশীয় অস্ত্রসহ ৪ জনকে আটক করে। পরদিন থেকে আবারো উত্তাল হয়ে ওঠে বিহারি ক্যাম্প। এরপরেই বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এরপরই মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত জেনেভা ক্যাম্পে সেনাবাহিনী ও র‍্যাব যৌথ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকসহ চারজনকে আটক করা হয়। এর আগেও গত ২৮শে সেপ্টেম্বর রাত ৮টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০০ গ্রাম হেরোইন, ২৫০ গ্রাম গাঁজা, ১টি চাপাতি,  ২টি তলোয়ার, ১০টি গুলতি, ২ হাজার পিস মার্বেল, ২০টি হেলমেট, ১২টি লাইফ জ্যাকেট, ৫টি লোহার রডসহ ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ২২শে সেপ্টেম্বরও ১২০ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। ওই সময় তাদের কাছ থেকে ৮টি ককটেল, ২টি পেট্রোল বোমা, ৬টি সামুরাই, ৫টি হেলমেট, ৩টি ছুরি, ১১টি চোরাই মোবাইল ফোন এবং ৫০০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়। এমন একের পর এক অভিযান চলছেই।

গত ১১ই আগস্ট মাদক বিক্রি নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের পিচ্চি রাজা ও বুনিয়া সোহেল গ্রুপের দ্বন্দ্বে ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় শাহ আলম (২০) নামের এক তরুণ নিহত হন। এর আগের দিনও ওই দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেল বিস্ফোরণে এক নারীও আহত হয়েছেন। এর আগে ক্যাম্পের ৮ নম্বর সেক্টর হয়ে যাওয়ার সময় চুয়া সেলিম ও বুনিয়া সোহেল গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাজ্জেন ওরফে রহমত নামে ১৩ বছরের এক কিশোরের মৃত্যু হয়। তার আগে ১৬ই অক্টোবর মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বে নিহত হন ক্যাম্পের ৮ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা শাহনেওয়াজ কাল্লু (৩৮)। গত ১লা মে বিকালে মাহতাব হোসেন (৩২) নামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে বুনিয়া সোহেলের আস্তানায় তুলে নিয়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি  করে। এ ছাড়াও একইভাবে গত বছরের ৪ঠা সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন ক্যাম্পের বাবুল হোসেনের ছেলে অটোরিকশাচালক সানু। মাদক ব্যবসা নিয়ে তর্কাতর্কির জেরে প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন সনু। এসময় বেল্লাল, শাহ আলম, শুভ, জানে আলম, শাওন নামে আরও বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। একইদিনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন শাহেন শাহ নামের আরও একজন। মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বে ক্যাম্পের মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলে মো. সাগর নামে আরও একজন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও শান্ত হচ্ছে না জেনেভা ক্যাম্প। মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই চলছে বিভিন্ন গ্রুপের দৌরাত্ম্য। তারা বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের সবচেয়ে বেশি মাদক কারবার চলে ক্যাম্পের ৭ নম্বর ও ৪ নম্বর গলিতে। এর সঙ্গে চোয়া সেলিম, শাহ আলম, তারিক, পারমনু ওরফে গাল কাটা মনু, চেম্বার রাজ, পিচ্চি রাজা, ঠোঁট গোলাবি, ফারুক এবং ইমতিয়াজসহ বেশ কয়েকজন জড়িত। এদের কাছে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র রয়েছে। এ ছাড়াও সরকার পতনের আগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দেয়া অবৈধ অস্ত্রেরও বিশাল মজুত রয়েছে তাদের কাছে। এরা কেউ ক্যাম্পে থাকে না। ক্যাম্পের বাইরে ভাড়া বাসায় থেকে সোর্সের মাধ্যমে তারা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করে। এদের অস্ত্র ও মাদকও ক্যাম্পের বাইরে থাকে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধ ও মাদকের বিস্তার রোধে আমরা নিয়মিতভাবে  বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আসছি। অভিযানে আমরা মাদক কারবারি, মাদক বিক্রেতা, অস্ত্রের জোগানদাতা, ককটেল সংরক্ষণকারীসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করি। বিশেষ করে গত বছরের ৩১শে অক্টোবর সিলেটে অভিযান চালিয়ে বুনিয়া সোহেলকে এবং এ বছরের ৮ই জানুয়ারি ধানমণ্ডির ল্যাব এইড হাসপাতাল থেকে চুয়া সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর কিছুদিন পরেই তারা জেল থেকে বেরিয়ে আবারো অপকর্মে জড়ায়। এরা অনেক আধুনিক। তারা ওয়াইফাই ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। মোবাইল ফোনে সিম থাকে না। আবার ক্যাম্প ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় কোথায় মাদক ও অস্ত্র রেখে দেয় তাও পাওয়া যায় না। আর তাদের লোক ক্যাম্পের চারপাশে ছড়ানো থাকে। আমরা ঢোকার আগেই তারা খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। তাই আমরাও এখন আমাদের অভিযানের ধরন পাল্টাচ্ছি। যত চালাকই হোক না কেন তাদের সকলকেই আইনের আওতায় আনা হবে।

বিষয়টি নিয়ে ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) নজরুল ইসলাম, মাদক বিক্রেতার চেয়ে মূল নিয়ন্ত্রককে ধরা না গেলে ক্যাম্পের পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত করা সম্ভব নয়। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গডফাদারদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ নির্মাণে কোটি রুপির বেশি অনুদান

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে প্রস্তাবিত বাবরি মসজিদের জন্য রাখা অনুদান বাক্সগুলোতে জমা পড়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। এখন পর্যন্ত চারটি বাক্স ও অনলাইন অনুদান মিলিয়ে পাওয়া গেছে ১ কোটি ৩০ লাখ রুপির বেশি। বাকি সাতটি বাক্সের টাকা গণনা এখনো চলছে।

গত শনিবার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিনে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। অনুষ্ঠানস্থলে অনুদান সংগ্রহের জন্য ১১টি স্টিলের বাক্স রাখা হয়েছিল। হাজারো মানুষ সেদিন মসজিদ নির্মাণের জন্য মুক্তহস্তে দান করেন।

রোববার ১১টি বাক্সের মধ্যে চারটি খোলা হয়। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, সারা দিন গণনা শেষে এই চারটি বাক্স থেকে ৩৭ লাখ ৩৩ হাজার রুপি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অনলাইন ও কিউআর কোড স্ক্যান করে পাওয়া গেছে আরও ৯৩ লাখ রুপি। গণনার কাজে মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

সোমবার বিকেল থেকে বাকি সাতটি বাক্স খোলা ও গণনার কাজ শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বাক্সগুলো থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়া যাবে।

এ বিষয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘এই বাবরি মসজিদ তৈরি করতে তিন বছর সময় লাগবে।’ এ জন্য অর্থের অভাব হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দূরদূরান্তের হাজারো ভক্ত এই বাবরি মসজিদের জন্য উদার হস্তে দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একজন ভক্ত একাই ৮০ কোটি রুপি অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।’

মসজিদটি নির্মাণ করা হচ্ছে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গা ও রেজিনগরের সংযোগস্থলে জাতীয় সড়কের পাশে। এর নির্মাণকাজ বন্ধ করতে কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলা হলেও আদালত তাতে হস্তক্ষেপ করেননি। আইনি বাধা কেটে যাওয়ার পরই শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

জানা গেছে, মূল মসজিদটি তিন কাঠা জমির ওপর নির্মিত হবে। এ ছাড়া মসজিদ চত্বরের ২৫ কাঠা জমিতে একটি হাসপাতাল ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে সৌদি আরব থেকে কয়েকজন আলেম উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আসা প্রায় ৪০ হাজার মুসল্লির জন্য শাহি বিরিয়ানির আয়োজন করা হয়। মূল নির্মাণস্থল থেকে এক কিলোমিটার দূরে ভার্চ্যুয়ালি এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয়।

উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর কিছুদিন আগেই মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গায় বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দেন। এরপর গত শুক্রবার দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

রোববার হুমায়ুন কবীর বলেন, তিনি বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেবেন না। যদিও এর আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১৭ ডিসেম্বর বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ২২ ডিসেম্বর নতুন দল গড়বেন। এখন তিনি বলছেন, তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ইতি টানা হয়েছে।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যা শহরে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে ফেলে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সমর্থকেরা। ষোড়শ শতকে নির্মিত মসজিদটি ধ্বংস করার সময় সেখানে সেদিন বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বাবরি মসজিদের জন্য রাখা অনুদান বাক্সের টাকা গণনা চলছে। মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত; ৮ ডিসেম্বর
বাবরি মসজিদের জন্য রাখা অনুদান বাক্সের টাকা গণনা চলছে। মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত; ৮ ডিসেম্বর। ছবি: ভাস্কর মুখার্জী

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ২৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বৃটিশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বৃটিশ সরকার নতুন করে ২৭ মিলিয়ন পাউন্ড মানবিক সহায়তা ঘোষণা করেছে। এই সহায়তা প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার জন্য জীবনরক্ষাকারী খাদ্য, আশ্রয়, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করবে। মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুর্দশা নিয়ে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সম্মেলনের আগে এই সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা দেন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অর্থ দিয়ে খাদ্য, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ১ লাখ ৭৫ হাজার নারী ও কিশোরীর জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। এছাড়া যৌন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকারদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থাও করা হবে। কুপার বলেন, এই নতুন বৃটিশ সহায়তা বাংলাদেশে থাকা পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে খাদ্য, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী সেবা প্রদান করবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করবে। আমরা কাজ চালিয়ে যাব, যাতে সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষরা প্রয়োজনীয় সহায়তা, সুরক্ষা, মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পায়।

২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের কারণে পালিয়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সহায়তা হ্রাস পাওয়ায় খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বড় সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ বিদেশি সহায়তা বন্ধ করে দেয়া এবং ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। মিয়ানমারের রাখাইনে ২০১৭ সালে সেনা-সমর্থিত বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের হামলার পর রোহিঙ্গাদের পালানো শুরু হয়। পরে ২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর রাখাইনের আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘাত তীব্র হলে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট তীব্র হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, খুব শিগগিরই খাদ্য সহায়তা কমে গিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৬ ডলারে নেমে আসবে, যা ক্ষুধা ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দেবে। তিনি দাতাদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান দাতাদের আরও বেশি সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং নতুন সম্ভাব্য দাতাদেরও উদার সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিতে হবে, না হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।

বৃটেনের এই নতুন সহায়তা প্যাকেজের মধ্যে আছে ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় ৬ মিলিয়ন পাউন্ড, খাদ্যে ৬ মিলিয়ন, পানি ও স্যানিটেশনে ৪.২ মিলিয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবায় ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ড। বৃটিশ সরকার জানিয়েছে, এই উদ্যোগ তাদের বৈশ্বিক মানবিক প্রতিক্রিয়ায় নেতৃত্বের প্রমাণ এবং মিয়ানমারের সংকট মোকাবিলায় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। নতুন এই সহায়তার ফলে ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য বৃটেনের মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াল ৪৪৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি।

mzamin

ইরানে দৌড় প্রতিযোগিতায় হিজাব লঙ্ঘনের অভিযোগে দুই আয়োজক গ্রেপ্তার

ইরানের কিশ দ্বীপে এক দৌড় প্রতিযোগিতায় হিজাব ছাড়া নারীদের অংশ নেওয়ার ছবি প্রকাশের পর দুজন আয়োজককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার দেশটির বিচার বিভাগ এ খবর জানিয়েছে।

ইরানের বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দেশটির অতি রক্ষণশীলদের সমালোচনা বেড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক হিজাব আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ ব্যর্থ হচ্ছে। পশ্চিমা প্রভাব বৃদ্ধির আশঙ্কায় এসব সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে ২০২২ সালে দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর থেকে ইরানে অনেক নারী হিজাব আইন লঙ্ঘন করে চলেছেন। গত সপ্তাহে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দপ্তর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হিজাববিহীন এক নারীর ছবি প্রকাশ করে সমালোচনার মুখে পড়ে।

দৌড় প্রতিযোগিতায় হিজাববিহীন নারীদের অংশ নেওয়ার ছবিগুলো শুক্রবারের। এতে দেখা যায়, অনেক নারী হিজাব ছাড়া দৌড়ে অংশ নেন। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে হিজাব বাধ্যতামূলক করে ইরান।

বিচার বিভাগের ওয়েবসাইট মিজানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৌড় প্রতিযোগিতার দুই প্রধান আয়োজককে পরোয়ানার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের মধ্যে একজন কিশ মুক্তাঞ্চলের কর্মকর্তা। অন্যজন প্রতিযোগিতা আয়োজনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, কিশ দ্বীপের এ দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রায় ৫ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন।

এর আগে ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছিল, দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজকদের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে।

স্থানীয় প্রসিকিউটরের বরাতে মিজানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দেশের প্রচলিত আইনকানুন, ধর্মীয় ও সামাজিক নীতি এবং পেশাগত নীতিমালা মানার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আগেই (আয়োজকদের) সতর্ক করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানটি এমনভাবে আয়োজন করা হয়েছে, যা সামাজিক শালীনতা লঙ্ঘন করেছে।’

ইরানের ‘তাসনিম’ ও ‘ফার্স’-এর মতো রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলো এ দৌড় প্রতিযোগিতাকে আগেই অশালীন এবং ইসলামি আইনের প্রতি অসম্মানজনক উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছিল।

ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লব হয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শাহ সরকার উৎখাত হয়। নতুন প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র নারীদের পোশাকে কড়াকড়ি আরোপ করে আইন পাস করে। শুরুতেই এ আইনের বিরুদ্ধে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল।

ইরানের বর্তমান আইন অনুযায়ী, জনপরিসরে নারীদের মাথার চুল ঢেকে রাখা এবং শালীন ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা বাধ্যতামূলক।

২০২২ সালে যথাযথভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে রাজধানী তেহরান থেকে মাশা আমিনি নামের এক কুর্দি নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। নীতি পুলিশের হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদে দেশটিতে কয়েক মাস টানা বিক্ষোভ হয়। এতে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কয়েক শ বিক্ষোভকারী নিহত হন। গ্রেপ্তার হন কয়েক হাজার। এরপর হিজাব আইন মানার ক্ষেত্রে নারীদের মধ্যে শৈথিল্য দেখা যায়।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের অধিকাংশ আইনপ্রণেতা বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে হিজাব আইন প্রয়োগের ব্যর্থতার অভিযোগ আনে। পরে দেশটির প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেন মোহসেনি এজেই হিজাব আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

ইরানের পার্লামেন্ট হিজাব আইন লঙ্ঘনকারী নারীদের কঠোর শাস্তির আদেশসংবলিত একটি আইন পাস করে। কিন্তু দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার তা অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায়।

২০২৩ সালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শিরাজ শহরের এক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে নারীরা হিজাব ছাড়া অংশ নিয়েছিলেন। এ ঘটনায় ওই বছরের মে মাসে দেশটির অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মাশা আমিনির কবর জিয়ারতের জন্য শোকাতুর হাজারো মানুষের স্রোত ছুটে যায় ইরানের কুর্দিস্তানের সাকেজ শহরে। এ সময় এক নারীকে গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে কিছু বলতে দেখা যায়
মাশা আমিনির কবর জিয়ারতের জন্য শোকাতুর হাজারো মানুষের স্রোত ছুটে যায় ইরানের কুর্দিস্তানের সাকেজ শহরে। এ সময় এক নারীকে গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে কিছু বলতে দেখা যায়। ফাইল ছবি: এএফপি