Wednesday, December 11, 2013

৫০টি পদের গ্রেড উন্নতি অনৈতিক- নির্বাচনকালীন সরকার

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও জনপ্রশাসনের ৫০টি পদের গ্রেড উন্নীত করার সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দলের বেপরোয়া মনোভাবকে আরও বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।
তাদের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বজনীন ধ্যান-ধারণার পরিপন্থী। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি দুর্বল হিসেবে সমালোচিত নির্বাচন কমিশন যে আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে, এটা তার সঙ্গেও কার্যত সংগতিপূর্ণ নয়।

এটা পরিহাসমূলক যে নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি প্রণয়নের পরে তা লঙ্ঘনের অভিযোগে মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আদৌ নৈতিক কর্তৃত্ব খাটাতেও উদ্যোগী হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না। অথচ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এটা অভাবনীয় যে, দলীয়করণের প্রবল সমালোচনা সত্ত্বেও সরকারি কর্মকর্তাদের খুশি করতেই বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের ৩৩টি পদকে জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড ১ এবং আরও ২০টি পদকে গ্রেড ২-এ উন্নীত করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত সন্দেহাতীতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেছিলেন, তফসিল ঘোষণা করার পরে তিনি কেবল রুটিন কাজ করবেন, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেবেন না। যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা সরকারের প্রশাসন চালানোর জন্য জরুরি নয়। কারণ, যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের সভাপতিত্বে ২০১২ সালের অক্টোবরে নেওয়া হয়েছিল। সুতরাং যে কাজ এক বছর ধরে পড়ে ছিল, তা নির্বাচনের আগেই, বিশেষ করে নির্বাচন মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নাটকীয়ভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজন ছিল না।

বিশেষ করে দলীয় সরকারের প্রশাসনও যে চাইলে দলনিরপেক্ষ আচরণ দেখাতে পারে, সে রকম উদাহরণ নেই বললেই চলে। অথচ পারস্পরিক আস্থা অর্জন তো বটেই, জাতীয় অগ্রগতি ও গণতন্ত্র উন্নয়নের জন্যও তা অপরিহার্য। আমরা যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে থাকি, কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দলীয় সরকারকে সব পরিস্থিতিতে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য থাকার বিষয়ে তাদের যোগ্যতার পরিচয় দেওয়া রপ্ত করতে হবে। ক্ষমতা আছে বলেই তার অপব্যবহার কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ক্ষমতাসীন সরকার যদি নির্বাচনী প্রশাসনকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে এবং নির্বাচন কমিশন যদি তা প্রতিরোধে ক্রমাগত অক্ষমতা ও অসামর্থ্যের পরিচয় দিয়ে চলে, তাহলে বিরোধীদলীয় সমালোচনা এবং তাদের উদ্বেগ জনগণের সামনে আরও বৈধতা পেয়ে চলবে।
আমরা আশা করব, নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে একটি সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে তার মর্যাদা ও অবস্থান সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হবে। অন্যথায় নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের বিতৃষ্ণা ও বিরূপ মনোভাব ক্রমাগত বেড়ে চলবে।

দুই দলই আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত: তারানকো

দুই দলই আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো।

আজ বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তারানকো এ কথা বলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
পাঁচ দিনের সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে তারানকো বলেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতার মানসিকতা থাকলে সংকট সমাধান সম্ভব। তিনি আশা করেন দুই দল সংকট সমাধানে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাবে।
তারানকো বলেন, জাতিসংঘ বিশ্বাস করে বাংলাদেশে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, গত কয়েক দিন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তিনি একাধিকবার আলোচনা করেছেন। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়েও তিনি বৈঠক করেছেন। নেতারা তাঁকে জানিয়েছেন, সংকট সমাধানে এই সংলাপ তাঁরা চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, বিশ্ব সম্প্রদায় আশা করে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।
৬ ডিসেম্বর তারানকো ঢাকায় আসেন। সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন।

এ ছাড়াও সংকট সমাধানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দুই দফায় বৈঠক করেন জাতিসংঘ মহাসচিবের এই প্রতিনিধি।

জনতার স্রোতে ‘বাকশালী নৌকা’ ডুবে যাবে: নজরুল

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, চলমান রাজনৈতিক সংকটের ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।
আজ বুধবার বিকেলে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।

বিএনপির এই নেতা বলেন, তাঁদের দলের সব নেতাকে গ্রেপ্তার করেও আন্দোলন দমন করা যাবে না। জনতার তীব্র স্রোতের বিপরীতে ‘বাকশালী নৌকা’ ডুবে যাবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো চলে যাওয়ার পর দুই দলের মধ্যে আলোচনা বন্ধ হয়ে গেলে তা সম্মানজনক হবে না। জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত কোনো ভিন দেশের রাষ্ট্রদূত নন, তাই জাতিসংঘের মধ্যস্থতা অসম্মানজনক নয় বলে তাঁরা মনে করেন। তারানকোর মধ্যস্থতায় দুই দলের দুই দিনের আলোচনার ফলাফল নিয়ে কিছু জানাতে রাজি হননি তিনি।

দশম জাতীয় নির্বাচনের তফসিল স্থগিত করার আহ্বান জানিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ১৯৭৩-এর পর দেশে যত নির্বাচন হয়েছে এবারই সবচেয়ে কম সংখ্যক দল ও প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। একতরফা প্রহসনের নির্বাচন করলে নির্বাচন কমিশনকে কালো তিলক মাথায় নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

সরকারের উদ্দেশে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এখনো সময় আছে, জাতির কল্যাণের স্বার্থে আত্মঘাতী পথ পরিহার করুন। তফসিল বাতিলের ব্যবস্থা নিন। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি মেনে নিন।’ তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা সব সময় আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান চেয়েছেন। কিন্তু সরকার একতরফা নির্বাচনে সংকল্পবদ্ধ।

নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, সরকার সারা দেশকে একটি কারাগারে পরিণত করেছে। বিরোধী দলের আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ করতে মানুষ পুড়িয়ে মারছে। তিনি বলেন, সরকারের নিষ্ঠুর অত্যাচার নির্যাতন মোকাবিলা করে কঠিন পথ অতিক্রমের মধ্য দিয়ে গণমানুষের ন্যায়সংগত আন্দোলনকে চূড়ান্ত বিজয়ে রূপ দিতে তাঁরা সংকল্পবদ্ধ। রাষ্ট্রের সব অঙ্গ সরকারের সেবাদাসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের ভারসাম্যহীনতা, নৈরাজ্যের ফলে সৃষ্ট যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ী থাকবে।

সপ্তাহের হালচাল- তারানকোর সফরের পর কী by আব্দুল কাইয়ুম

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সমঝোতা চেষ্টা কতটা সফল, তা আজ জানা যাবে। তবে স্বীকার করতেই হবে, তিনি একটি ভালো দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন।

জাতীয় নির্বাচন- আইনি বাধা নেই তফসিল পুনর্বিন্যাসে by এম সাখাওয়াত হোসেন

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল মোতাবেক আগামী দশম সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ হচ্ছে ৫ জানুয়ারি ২০১৪।

রংপুর-লালমনিরহাট থেকে এরশাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন

রংপুর-৩ (সদর) ও লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) আসন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়ের দুদিন আগে আজ বুধবার এরশাদের পক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়।

রংপুরে এরশাদসহ জাতীয় পার্টির পাঁচজনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে। এরশাদের পক্ষে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করেন রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান। সেই সঙ্গে রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে মসিউর রহমান, রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে আসাদুজ্জামান চৌধুরী, রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনে করিমউদ্দিন ভরসা ও রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসন থেকে নূর আলমও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করেন। রংপুর-৬ আসন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়নপত্র নিয়েছেন।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও রংপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদ আহাম্মদ এরশাদসহ অন্যদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন পেয়েছেন বলে জানান।
মসিউর রহমান বলেন, এরশাদের নির্দেশে সব আসনে দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে।

এরশাদ লালমনিরহাট-১ ও তাঁর ভাই জি এম কাদের লালমনিরহাট-৩ (সদর উপজেলা) আসন থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন।

আজ বিকেল সোয়া চারটার দিকে লালমনিরহাট জেলার নির্বাচন কর্মকর্তা ফজলুল করিমের কাছে এরশাদ ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম এম কাদেরের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন করেন রংপুর মহানগর জাপার সভাপতি মসিউর রহমান।

লালমনিরহাট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফজলুল করিম বলেন, লালমনিরহাট-১ আসনে এরশাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদনপত্র এবং লালমনিরহাট-৩ আসনের জন্য কাদেরের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন জমা নিয়েছি।

এরশাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের চিঠি ফেরত

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের চিঠিতে তারিখ ভুল লেখার কারণ দেখিয়ে তা গ্রহণ করেননি ঢাকার জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে ‘সহযোগিতা’ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন এরশাদের ব্যক্তিগত সহকারী।

আজ বুধবার এরশাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে দলের একদল প্রতিনিধি ঢাকা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান।

এরশাদের ব্যক্তিগত সহকারী খালেদ আক্তার মুঠোফোনে প্রথম আলো ডটকমের কাছে অভিযোগ করেন, ‘পার্টির চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতিনিধিরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে গেছেন। কিন্তু সেখানে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।’

তবে ঢাকা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা জিল্লার রহমান প্রথম আলো ডটকমের কাছে দাবি করেছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে এরশাদের দলের দুজন প্রতিনিধি এসেছিলেন। কিন্তু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের চিঠিতে তারিখ লেখা ছিল ৫ ডিসেম্বর। যেহেতু ওই দিন মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের তারিখ ছিল, তাই বিভাগীয় কমিশনার ওই চিঠি গ্রহণ করেননি।’

জিল্লার রহমান আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে এরশাদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। জাপা চেয়ারম্যান ভুলের বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন।

কাদের মোল্লার চিঠি by গোলাম মাওলা রনি

ছোট্ট একটি ব্যক্তিগত দায় থেকে আজকের লেখাটির অবতারণা। কাসিমপুর জেল থেকে মুক্তির দিন সকালেই ঘটলো ঘটনাটি।

তসলিমা নাসরিনের ছোট গল্প, ‘সেক্স বয়’ by তসলিমা নাসরিন

চৈতালি অপেক্ষা করছে সেক্সবয়ের জন্য। সন্ধেও নামবে, সেক্সবয়ও নামবে কলকাতায়। অন্ধকার সরিয়ে সরিয়ে দক্ষিণ কলকাতার এই গলিতে ঢুকবে বিমানবন্দর থেকে আসা সেক্সবয়ের ট্যাক্সি। বোম্বে থেকে আসছে সে। চৈতালির ফ্ল্যাটেই উঠবে।
দু’জনের গত ছ’মাস যাবৎ প্রায় সব হয়েছে, শুধু সামনাসামনি দেখাটাই হয়নি। ফেসবুকে প্রথম কথা হয়, মূলত সেক্সের কথা। চৈতালিকে আকৃষ্ট করেছিল সেক্সবয় নামটি। প্রোফাইলের ছবিটি উলঙ্গ পুরুষের। এর সঙ্গে সেক্স ছাড়া আর কী বিষয়ে কথা বলা যায়! চৈতালি সেক্স নিয়ে কথা বলতেই সেক্সবয়কে বন্ধু হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। নিজের যৌনসম্পর্কহীন জীবন বড় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল।
শহরে এত যুবকের ভিড়, আর চৈতালির মতো সুন্দরী বিদুষী মেয়ের জন্য কোনো প্রেমিক জোটে না! সত্যিই জোটে না। যে লোকটির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার, সেটিও হয়েছিল বাবার ঠিক করে দেওয়া পাত্র। অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে সুব্রতকে ডিভোর্স করেছে চৈতালি। এরপর একেবারেই যে কারও সঙ্গে কিছূই ঘটেনি তা নয়। দশ বছরের ছোট এক কলিগ অশোকের সঙ্গে প্রায় একমাস মতো একটা সম্পর্ক ছিল চৈতালির। কিন্তু অশোকের বিয়ের পর ওই সম্পর্কটা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয় সে। চৈতালি চায়নি ঘরে তরুণী স্ত্রী রেখে তার সঙ্গে গোপনে শুতে আসুক অশোক।
একটি ইংরেজি দৈনিকে চাকরি করে চৈতালি। অনেকদিনের চাকরি। অনেক দায়িত্ব। কিন্তু কোনো অফিসের কোনো বোঝা চৈতালি বাড়ি বয়ে আনতে চায় না। বাড়িতে থাকতে চায় সে ভাবনাহীন। সামান্য কিছুক্ষণ সময় নিজের জন্য রাখতেই তো হয়, কিছুক্ষণই তো সময়! ওদিকে মেয়ে পড়ছে দিল্লিতে। ওর খোঁজখবরও করতে হয়। আজকাল মোবাইল যুগে খোঁজ খবরের ব্যাপারগুলো জলের মতো সোজা। অফিস তো অফিস, চৈতালি না থাকলেও অফিস থাকবে। মেয়ের জীবনও মেয়ের জীবন। চৈতালি মরে গেলেও মেয়ে দিব্যি মানিয়ে নেবে। চৈতালির বাবা ও মা মারা গেছেন। চৈতালিই ছিল একমাত্র সন্তান। মা-বাবার কথা তার এখন খুব মনেও পড়ে না।
অফিস থেকে ফিরে চৈতালি আগে একটা বই নিয়ে বসতো পড়তে। এখন ফেসবুক নিয়ে বসে। ফেসবুক যে কী ভয়ঙ্কর এক নেশার মতো! আসলে, ফেসবুক নয়, সেক্সবয় প্রতিদিন যে বলছে চৈতালির সঙ্গে বিছানায় সে কী কী করবে, কী করে চৈতালির সারা শরীরে চুমু খাবে, কী করে ঠোঁটে, বুকে আদর করবে, কী করে চৈতালির স্বাদ নেবে, আর তাকে ঘন ঘন শীর্ষসুখ দেবে… সেসব পড়ার নেশা। এই নেশাটা তাকে প্রচুর অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন সে রাস্তাঘাটে বা অফিসের যুবকগুলোর দিকে আগের মতো চাই চাই চোখে তাকায় না।
সেক্সবয় চৈতালির দৈনন্দিন জীবনকে অনেক পূর্ণ এবং তৃপ্ত করেছে। মনে মনে সে কৃতজ্ঞ সেক্সবয়ের কাছে। ফেসবুকে সম্পর্কটা এখন আটকে নেই। দু’মাস যাবৎ প্রায় প্রতিদিন কথা হচ্ছে ফোনে, আর শেষ কয়েকদিন স্কাইপেতে দু’জনের সেক্সও ঘটেছে। সেক্সবয়ের আসল নাম বিজয়, মারাঠী, আর্কিটেক্ট, বয়স পঁয়ত্রিশ। এর চেয়ে চমৎকার জুটি আর কী হতে পারে!
বোম্বে থেকে কলকাতায় উড়ে এসে চৈতালির সঙ্গে সত্যিকার সেক্সের প্রস্তাবটি চৈতালিই দিয়েছিল বিজয়কে। শুধু তাই নয়, বোম্বে কলকাতা আসা যাওয়ার টিকিটও ইমেইল করেছিল। টিকিট পেয়ে ‘লেটস ফাক হোল উইক’ বলে লাফিয়ে উঠেছিল বিজয়। বিজয়কে ছুঁয়ে দেখতে চায় চৈতালি। সত্যিকার মৈথুন চাই, হস্তমৈথুন শরীর আর নিতে চায় না।
সাতদিনের ছুটি নিয়েছে চৈতালি, আজ বিকেলেই।
অশোক জিজ্ঞেস করেছে, ‘হঠাৎ এতদিনের ছুটি কেন? কোথাও যাচ্ছো?’
চৈতালি হেসে বলেছে, ‘ক্লাউড নাইনে’ যাওয়ার ফ্লাইট বুক করেছি। যাবি?
‘বিয়েটা না করলে ঠিক ঠিকই যেতাম।’
চৈতালির ঠোঁটে একচিলতে হাসি। অশোকের জন্য সেই আকর্ষণ আর নেই চৈতালির, বিজয় এসে অশোকের জায়গা, চৈতালি জানে না, কবেই দখল করে নিয়েছে। অশোকের বিয়ের পর বিজয়ের মতো একজন পুরুষেরই দরকার ছিল তার জীবনে, এরকম বানের জলের মতো কেউ, পুরানো সব স্মৃতি ভাসিয়ে নেবে, স্নিগ্ধ শীতল নতুনতা ছড়িয়ে তাকে আরও উজ্জ্বল করবে, যেন সে জন্ম নিল এইমাত্র, অতীত বলে কিছু ছিল না কখনও তার।
অশোক অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছে, ‘কী কারও প্রেমে পড়েছ নাকি, দেখতে আরও উজ্জ্বল হয়েছ।’
মিষ্টি হেসে চৈতালি বলেছে, ‘এই, মুনা কেমন আছ? চলছে তো সব ঠিকঠাক?’ বলে, অশোকের উত্তরের জন্য না অপেক্ষা করেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেছে চৈতালি। প্রতিদিন যখন বেরোয় তার চেয়ে খানিক আগেই বেরিয়েছে। শরীর জুড়ে বিজয় তার। সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে।
বাড়িতে এসে গান গাইতে গাইতে ধ্যান করেছে। এত সময় নিয়ে চৈতালি ধ্যান করে না খুব। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেজেছে। পারফিউম মেখেছে। শোবার ঘরটা সাজিয়েছে। নতুন চাদর বিছিয়েছে বিছানায়। দুটো শুধু বালিশ ছিল, নতুন দুটো বালিশ যোগ করেছে। বড় ফ্ল্যাট চৈতালির। তিনটে শোবার ঘর। একটায় চৈতালি থাকে। আরেকটা অতিথির জন্য। আরেকটায় থাকে শকুন্তলা। শকুন্তলা পুরানো কাজের লোক।
শকুন্তলা জিজ্ঞেস করেছে, ‘আজ অশোক বাবু আসছে নাকি চৈতি, এত সাজগোজ করছ যে?’ শুনে বিরক্ত কণ্ঠে চৈতালি বলেছে, ‘তুমি যে দিদি কী আবোলতাবোল বকো, অশোক বউ নিয়ে সুখের সংসার করছে, ও আসবে কেন?’
‘তাহলে, নতুন ভাগ্যবানটা কে শুনি?’
চৈতালি হেসে বলেছে, ‘এলেই দেখতে পাবে।’
শকুন্তলা প্রচুর রান্না করেছে আজ। বিজয় আর চৈতালি ক্যান্ডেল-লাইট ডিনার করবে। তারপর শোবার ঘরে চলে যাবে, দরজা বন্ধ করে দেবে ঘরের। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দেওয়া। বিছানা থেকেই জানালার ওপারের চাঁদটা দেখতে পাবে। জ্যোৎস্না ঘর ভরে যাবে, আর ওই আলোয় তারা শরীরে শরীর ডুবিয়ে ধ্যান করবে সারা রাত। শোবার ঘরটায় চৈতালি জুঁইয়ের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে রাখে। নিজের গায়েও সুগন্ধী। বাড়িটায় যেন ফুলের উৎসব হচ্ছে।
কণিকার রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি চালিয়ে দেয়। ‘হৃদয়বাসনা পূর্ণ হলো’ গানটি বাজতে থাকে। চৈতালি গাইতে থাকে কণিকার সঙ্গে। কখনই খুব ভালো গাইতে জানে না চৈতালি। কিন্তু গান ভালোবাসতে ভালো জানে। চৈতালি একটা নীল রঙের শাড়ি পরেছে। ইচ্ছে করেই খুব বড় গলার ব্লাউজ পরেছে। স্তনজোড়া উঁকি দিচ্ছে, দিক। লরিয়েলের কালো রঙ চৈতালির চুলে। সামান্যই পেকেছে যদিও, চৈতালি মুছে ফেলেছে সাদার চিহ্ন। চল্লিশের টান টান শরীর, কিন্তু চুলে পাকন, ঠিক মেলে না। এমনিতে কালো সাদায় তার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সেক্সবয়ের সঙ্গে সাতটা দিন ঘনিষ্ঠ সময় কাটাবে, বয়সের চিহ্নটিহ্ন এসে না হয় এই সাতটা দিন না জ্বালাক।
বিজয় ফোন করেছে দমদমে নেমেই। রেড লেবেলের একটা বোতল আর দুটো গ্লাস এনে শোবার ঘরের খাটের পাশের টেবিলে রাখে চৈতালি। এরকম অ্যাডভেঞ্চার আগে কখনও করেনি সে। একটা অচেনা মানুষের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হলো, তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কে যাওয়ার জন্যই সব আয়োজন দু’জন করছে, কোনো প্রেম হলো না, কেউ কারও জন্য ভালোবাসি শব্দটা উচ্চারণ করলো না, যৌনতা ছাড়া জগতের অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হলো না! দু’জনের কিন্তু কারওরই মনে হচ্ছে না খুব বিচ্ছিরি কোনো কাজ তারা করছে। দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক। দু’জনই একা থাকে। কোনো স্বামী বা কোনো স্ত্রীকে ঠকিয়ে কিছু করছে না তারা। শরীর চাইলে শরীর তারা তবে কেন মেলাবে না!
সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে। চৈতালীর মনে হতে থাকে সে নিতান্তই ষোলো বছর বয়সী এক কিশোরী। না হয় সে ষোলো বছর বয়সীই। ষোলো বছর যখন বয়স, তখন সে কঠিন কঠিন বই পড়ে। কাটিয়েছে, চল্লিশ বা পঞ্চাশ বয়সীরা যা করে। সেই ষোলোটা ফেরত পাওয়ার যদি সুযোগ হয়, তবে ফেরত সে নেবে না কেন! কাউকে তো দিব্যি দেয়নি যে ফেলে আসা কোনো বয়স সে কোনোদিন ফেরত নেবে না।
চৈতালির কাছে বিজয় সম্ভবত আস্ত একটি পুরুষাঙ্গ ছাড়া আর কিছু নয়। সে বলে-কয়েই সাতদিন শুতে আসছে চৈতালির সঙ্গে। শুধু শরীরের আকর্ষণকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে একটা সম্পর্ক। চৈতালি ভাবে, সবসময় যে আগে মন, পরে শরীর হতে হবে তারইবা কী মানে, শরীর আগে, মন পরে হওয়াটাই বরং বেশি যৌক্তিক। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চয়ই বিজয় ওকে জড়িয়ে ধরে গভীর করে চুমু খাবে। তারপর সোজা শোবার ঘরে। দৃশ্যগুলো কল্পনা করে চৈতালি। আবেগে চোখ বোজে। শরীরে নিভৃতে গর্জন করে সুখের স্রোত।
শকুন্তলাকে বলে রেখেছে, ঘরের দরজা বন্ধ করে যেন সে শুয়ে থাকে, দরকার হলে ডাকবে। কেবল খাবার সময় শকুন্তলার ডাক পড়ে। শকুন্তলা জানে নিয়মগুলো। অশোকের সময় এরকমই ঘটতো। চৈতালির ডিভোর্সের পর শকুন্তলা বলেছে অনেকবার, ‘এবার একটা বিয়ে করো চৈতি’। বিয়ে করব না করব না বলে কয়েক বছর পার করেছে। তারপর অশোকের সঙ্গে যখন প্রেম করছে চৈতালী, শকুন্তলা বলেছে, ‘তাহলে একজন বন্ধুকেই পার্মান্যান্ট করে নাও। কাউকে যে ইচ্ছে করলেই কিছু করে নেওয়া যায় না, তা শকুন্তলাকে শত বলেও বোঝাতে পারে না চৈতালি। শকুন্তলা চৈতালির জন্মের সময় থেকে এই বাড়িতে আছে। বিয়ে করেনি। অথচ চৈতালির বিয়ে না করা আর স্থায়ী সঙ্গী না নেওয়া নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। নিজের চেয়ে মনিবের পরিবারকে আপন করে দেখলে বুঝি এই হয়।

২.
বিজয় এল। ফোটো দেখে বা স্কাইপেতে দেখে যেমন অনুমান করেছিল, তার চেয়ে অন্যরকম, যতটুকু লম্বা ভেবেছিল, তার চেয়ে বরং খানিকটা বেশি, যতটা মোটা লাগছিল, তার চেয়েও স্লিম, যতটা সুদর্শন ভেবেছিল, তার চেয়েও বেশি সুদর্শন বিজয়। দু’জন হাই বিজয়, হাই চৈতালি বলে হাত মেলাল। শোবার ঘরে নেওয়ার বদলে চৈতালি বসার ঘরে নিয়ে এল বিজয়কে। দু’সোফায় মুখোমুখি বসল দু’জন। একটুখানি দৃষ্টি বিনিময়। একটুখানি হাসি দু’জনের ঠোঁটে। চৈতালি বসে আছে বিজয় উঠে এসে ঠিক স্কাইপেতে যেমন বলত, ‘ইউ লুক সো হট হানি। কাম অন, লেটস হ্যাব সেক্স’ বলে কিনা। বিজয় নিজেই কাপড় খুলে ফেলত, ক্যামেরাকে নামিয়ে দিত উরুসন্ধির দিকে, আর চৈতালিও খুলত বুকের কাপড়। দুটো যৌনকাতর নারী-পুরুষ আজ মুখোমুখি বসে আছে। দু’টো শরীরের বাসনা আজ পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে দু’জনের কথোপকথনে যৌনতার তিলমাত্র কিছু নেই।
- একটু জল খাবো।
– আই অ্যাম সরি। জল আগেই দেওয়া উচিত ছিল। চা বা কফি কিছু খাবে?
– না। আমি খাই না ওসব।
– তবে কি, হুইস্কি খাবে?
– হুইস্কি তো আমি খাই-ই না।
– ও
– ক’টার সময় রাতের খাবার খাও?
– ঠিক নেই। বেশ সুন্দর সাজানো ফ্ল্যাট। এত বই কার? সব তোমার?
– হ্যাঁ আমার।
বিজয় উঠে বইয়ের তাকগুলোর দিকে যায়, মগ্ন হয়ে বই দেখতে থাকে। অনেকক্ষণ কেটে যায় এভাবে। চৈতালি জল এনে দিলে বই দেখতে দেখতেই জল খায়।
– ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমি কি কিছু বই বের করতে পারি এখান থেকে?
– হ্যাঁ নিশ্চয়ই, গো এহেড।
বিজয় তিনটে বই নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। সোফায় এসে বলল, তুমিও দেখছি রডি ডয়েলের বই পছন্দ কর। দ্য ডেড রিপাবলিক পড়েছ?
চৈতালি হেসে বলল, ওর শুধু তিনটে পড়েছি, প্যাডি ক্লার্ক হাহাহা, এ স্টার কল্ড হেনরি আর দ্য গাটস।
– তোমার অসাধারণ কালেকশন।
– ক্লাসিকস বেশ কিছু আছে।
– ক্লাসিকসের কথা বাদ দাও। ওগুলো ছোটবেলায় পড়েছি। ইদানীং বিল ব্রাইসন থাকলে আমার আর কিচ্ছু চাই না।
– আছে বিল ব্রাইসন বেশ কটা।
চোখেমুখে খুশি উপচে ওঠে বিজয়ের।
– তুমি বিল ব্রাইসনও পছন্দ কর? বাহ! কোনগুলো আছে বল না। শেষটা আমার এখনও পড়া হয়নি।
– আমার সবচেয়ে পছন্দ এ সর্ট হিস্টরি অব নিয়ারলি এভরিথিং।
– ও বইটার তুলনা হয় না।
– আমার কাছে আছে আই অ্যাম এ স্ট্রেঞ্জার হেয়ার মাইসেল্ফ, অ্যট হোম, নাইদার হেয়ার নর দেয়ার…
– ওয়ান সামারটা তো এখনও বেরোয়নি বোধহয়।
– এই অক্টোবরে বেরোবে।
বিজয়ের মধ্যে একটা কিশোর বাস করে। দেখে ভালো লাগে চৈতালির। চৈতালির মতোই সে উজ্জ্বল উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে সময় সময়। বইয়ের গল্পে মেতে ওঠে বিজয়। যেন দু’জনে কোনো বুক ক্লাবের মেম্বার। বইয়ের পছন্দে এত মিল আর কারও সঙ্গে নেই চৈতালির। তারপর কথায় কথায় বেড়ানোর কথা উঠল, ভারতের কোথায় কোথায় কে গেছে। তাতেও মিল, দু’জনে বর্ণনা করতে থাকে দু’জনের পছন্দের জায়গাগুলোয় নিজেদের অভিজ্ঞতা। এক সময় খাবারের প্রসঙ্গ ওঠে, ওতেও মিল। দু’জনই বাঙালি খাবার পছন্দ করে।
দশটা বেজে যায় গল্প করতে করতে। জল ছাড়া কেউ আর কিছু পান করে না। ফলের রসও, বিজয় বলেছে, খাবে না। শকুন্তলাকে ডাকে চৈতালি। শকুন্তলা টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেয়। না, মোমবাতি জ্বালানোর প্রয়োজন মনে করে না চৈতালি।
খেতে খেতে বিজয় বলে, ‘বাহ, বেশ কম তেলে কম মশলায় রান্না তো। আমার মা’র রান্নার মতো। ‘শকুন্তলা ভালো রাঁধে। শকুন্তলার বেশ প্রশংসা করল। বিজয়। চৈতালির থালায় নিজে খাবার বেড়ে দিল। খাওয়া শেষ হলে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের থালা নিজেই ধুয়ে রেখে এল। পরিপূর্ণ ভদ্রলোক। দেখে বেশ ভালো লাগে চৈতালির। কলকাতায় আজ অবধি এমন ভদ্রলোক সে দেখেনি। খেয়ে ওঠার পর বিজয় বলল চৈতালিকে কাল ডিনারে নিয়ে যাবে সে, কলকাতার সবচেয়ে ভালো বাঙালি খাবারের রেস্টুরেন্টে।
শকুন্তলা জিজ্ঞেস করল, বিজয়ের মা কী কী রাঁধেন, শুধু মারাঠী রান্না, নাকি বাঙালি রান্নাও? বিজয় অনেকক্ষণ চুপ হয়ে থেকে বলে যে তার মা মারা গেছেন এক বছর হলো। সড়ক দুর্ঘটনায়। বিজয় মায়ের সঙ্গেই থাকত। বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে দাদা। গাড়িটা সেদিন চালাচ্ছিল বিজয় নিজে। দাদার বাড়ি থেকে ডিনার খেয়ে ফিরছিল বান্দ্রায় নিজের বাড়িতে। মদ্যপান করেছিল। বোমার মতো একটা ট্রাক ছুটে আসছিল তার গাড়ির দিকে, দেখতে পায়নি। ট্রাক এসে ধাক্কা মারল, আর গাড়িটা গড়াতে গড়াতে খাদে পড়ে গেল। ওখানেই মারা যায় মা। বিজয় চোট পেয়েছিল, তবে হাসপাতালে দুদিন থাকার পর তা সেরে যায়। সেদিনের পর থেকে বিজয় আর মদ ছোঁয়নি। মায়ের কথায় মায়ের কথা আসে।
শকুন্তলাও মায়ের গল্পে যোগ দেয়। চৈতালি অনেকদিন ভুলে ছিল নিজের মাকে। আজ যেন মা তার সামনে এসে বসেছে। স্মৃতির ঝাঁপি সকলেই খুলে বসে। সকলের চোখ ভিজে ওঠে। বিজয় তার মায়ের প্রসঙ্গ না তুললে সম্ভবত এভাবেই চৈতালি ভুলে থাকত মাকে। বারোটা বেজে যায়। বিজয় বলে, ‘আমি কোথায় ঘুমোব?’
চৈতালি কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর হেসে বলে শকুন্তলাকে, ‘তুমি দিদিসোনা গেস্টরুমের বিছানাটা ঠিক করে দাও। চাদরটা চেঞ্জ করে দিও। আমার ঘরে এক্সট্রা বালিশ আছে, নিয়ে যেও।’
বিজয় আগে কখনও কলকাতায় আসেনি। চৈতালি বলে, কাল তোমাকে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে নিয়ে যাব। আর মার্বেল প্যালেসে। তোমার ভালো লাগবে।
বিজয় ‘অ্যাট হোম’ বইটি হাতে নিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, ‘এই বইটা কি রাতে পড়ার জন্য নিতে পারি? এটা আমার পড়া হয়নি।’

৩.
যে কটা দিন ছিল বিজয়, কিশোর-কিশোরীর মতো চৈতালি আর বিজয় কলকাতার রাস্তায় টই টই করে ঘূরেছে, রাস্তার কিনারের তেলেভাজা থেকে ভজহরি মান্নার খাবার কিছু বাদ দেয়নি। হাতেটানা রিকশায় চড়েছে গঙ্গায় নৌকো চড়েছে, যেদিকে খুশি সেদিকে চলে গেছে। চৈতালি ভুলে গেছে তার চাকরিবাকরি, তার কন্যা, তার অতীত ভবিষ্যৎ। যেন সে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, সবার নাগালের বাইরে, কোনো অচেনা আকাশে উড়েছে। সত্যিকার ‘ক্লাইড নাইন’ বোধহয় একেই বলে।
শকুন্তলাকে বিজয় উপহার দিয়েছে দু’টো চমৎকার শাড়ি, এত ভালো শাড়ি নাকি শকুন্তলা ইহজন্মে পরেনি। চৈতালির জন্য গনেশ পাইনের একটা পেইন্টিং। প্রথম একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, যার সঙ্গে ভাবনা চিন্তার প্রায় সম্পূর্ণই মিল পেল চৈতালি। জীবনের অনেক কথা বলেছে সে বিজয়কে। স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্সের কথা, মেয়ের মেয়ের কথা, অশোকের কথা, একরাশ দুঃখসুখের কথা। সব মন দিয়ে শুনেছে বিজয়। বিজয়ও বলেছে, তবে বলার চেয়ে বিজয় শুনতেই বেশি পছন্দ করেছে। মাত্র ক’টা দিনে কী অসম্ভব আপন হয়ে উঠেছে বিজয়। যেন বিজয় তার ছোটবেলার কোনো বন্ধু। যেন বিজয়ের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর জুড়ে চৈতালি এক্কাদোক্কা খেলেছে, মার্বেল লাটিম খেলেছে, পুকুরে মাছ ধরেছে।
মাঝে মধ্যে অতীতের কোনো ঘটনা বলতে গিয়ে চৈতালির চোখে জল এসেছে। আলতো করে বুকে টেনে তাকে শান্ত করেছে বিজয়। বিজয়ের ওটুকু স্পর্শই পেয়েছে চৈতালি গোটা সাতদিনে। চুমু খেতে একবার দু’বার চেয়েছিল, কিন্তু বারণ করেছে নিজেকে। ভেবেছে, বিজয় বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু ভাবছে না।
বিজয় চলে যায়, চৈতালিকে দিয়ে যায় চৈতালির শ্রেষ্ঠ সময়। চৈতালির আর জিজ্ঞেস করা হয়নি, ফেসবুকে সেক্সবয় নামের আড়ালে বিজয়ের চরিত্র কেন তার ফেসবুকের বাইরের বিজয়ের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত? জিজ্ঞেস করেনি, অনুমান করে নিয়েছে, মায়ের মৃত্যুর কারণে যে ভীষণ গ্লানি আর শোকে ভুগছে বিজয়, তা থেকে মুক্তি পেতেই আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে, ভিন্ন চরিত্রে। চৈতালি কেন আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে! তার তো কোনো গ্লানি নেই, শোক নেই! কিছু হয়ত চৈতালির ভেতরেও আছে, চৈতালি জানে না। বিজয় জানে কি? জিজ্ঞেস করা হয়নি বিজয় জানে কি না।
এ ক’দিনে একবারও চৈতালির শরীরে বান ডাকেনি। শুধু মনেই ঝরেছে ঝড়বৃষ্টি। চৈতালির ফেসবুকের চরিত্রটা কি চৈতালির সত্যিকারের চরিত্র নয়! চৈতালি ভাবে, কোন বিজয় সত্যিকারের বিজয়! যে বিজয়ের সঙ্গে নেটে দেখা হয়, নাকি যে রক্তমাংসের বিজয়ের সঙ্গে কলকাতায় দেখা হলো! রক্তমাংসের বিজয়ই তো ফেসবুকের সেক্সবয়, যার সঙ্গে রাতে রাতে তার শরীরের উৎসব হয়। কত যে রহস্য একজন মানুষের ভেতর। সম্ভবত কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে বাস করে একজন মানুষের মধ্যে। একজন আরেকজনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
বিজয়কে এয়ারপোর্টে সি অফ করে যখন বাড়ি ফিরছিল, উদাস তাকিয়েছিল গাড়ির জানালায়, তখন এসএমএস আসে।
বিজয় লিখেছে, আই লাভ ইউ।
বুক কাঁপে চৈতালির। তীব্র ভালো লাগা মন থেকে শরীরে ছড়িয়ে যায়।
চৈতালি লিখল, মি টু।
ঘরে ফিরে দেখে সেই যে কণিকার সিডিটা বাজছিল, সেটা বেজেই চলেছে, কণিকার কণ্ঠে তখন, ‘চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে…’
সঙ্গে সঙ্গে গায় চৈতালি, ‘চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে…’।

(গল্পটি পাক্ষিক অনন্যায় প্রকাশিত হয়েছিল)

লোকসভায় একাই লড়বেন মমতা

কংগ্রেস বা বিজেপির জোটসঙ্গী হিসেবে নয়, লোকসভা নির্বাচনে একাই লড়বেন তৃণমূল কংগ্রেস। মঙ্গলবার দিল্লিতে সংসদভবনের বাইরে একথা ঘোষণা করেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি। গত লোকসভা ও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে ভোটে লড়েছিলেন মমতা। সংসদে ঢোকার মুখে এদিন জোট সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে মমতা বলেন, ‘আমরা একাই চলছি। কারও সঙ্গে জোট নিয়ে কথা বলছিল না। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা হতেই পারে। কংগ্রেস-বিজেপির সঙ্গে আমরা নেই। লোকসভা নির্বাচনে একাই লড়বে তৃণমূল কংগ্রেস।’ চার রাজ্যের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের পর্যদস্ত হওয়াকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের রাগের বহির্প্রকাশ বলেই মনে করছেন মুখ্যমন্ত্রী। তার সাফ কথা,
‘সময় এসেছে আঞ্চলিক দলগুলো একজোট হয়ে কেন্দ্রে একটি উপযুক্ত ও স্থায়ী সরকার গঠন করার। কংগ্রেস দিল্লিতে এবার সরকার গড়তে পারবে না। ভারতজুড়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে সিপিএম-সিপিআইসহ সব কমিউনিস্ট দল। আগামী সাধারণ নির্বাচনের পর একমাত্র আঞ্চলিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ শক্তিই পারবে একটি স্থায়ী এবং উপযুক্ত সরকার দিতে।’ এদিন সংসদের সেন্ট্রাল হলে মমতা বিভিন্ন রাজ্যের সংসদ সদসদের সঙ্গে কথা বলেন। আলোচনা করেন অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে তেলেঙ্গানা তৈরি থেকে শুরু করে নানা বিষয় নিয়েও। বিকেলে দিল্লির জামা মসজিদের ইমাম বুখাতিরের সঙ্গে দেখা করেন। ইমাম তার ছেলের বিয়েতে মমতাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু তিন দিন আগে বিয়েতে না আসতে পারলেও এদিন এসে দেখা করেন। বুখারির শিগগিরই কলকাতায় আসবেন বলেও মমতাকে জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মমতা জানান, কেন্দ্রীয় সরকার একের পর এক যেসব জনবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছে তাতে সাধারণ মানুষ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। পেঁয়াজ, রান্নার গ্যাস ও পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করে তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষের কথা শুনে তার নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার কাজ করছে। চার রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে দিয়েছে কংগ্রেসবিরোধী ভোট বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। একইভাবে তিনি কমিউনিস্ট দলগুলোকেও আক্রমণ করেছেন।

ঘৃণা করতে শেখানো গেলে ভালোবাসাও শেখানো যায়

বাবার শেষ সময়টা কেমন ছিল স্মৃতির পাতা থেকে সে কথাই বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন নেলসন ম্যান্ডেলার মেয়ে মাকাজিউয়ে ম্যান্ডেলা। সারা বিশ্বের মানুষের মনে স্থান করে নেয়া এই মানুষটির মৃত্যুর সময়টিতে তার পাশে ছিলেন স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনি সবাই। আর তাই বাবার এ সময়টিকে ‘চমৎকার’ শেষ সময় বলেই অভিহিত করেছেন মাকাজিউয়ে। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘শেষ বিদায় জানানোর জন্য তার (ম্যান্ডেলার) কাছে ছিলেন স্ত্রী গ্রাসাসহ সন্তান ও নাতি-নাতনিরা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আমাদের কাছে পেয়েছেন। আমরা সবসময়ই তার চারপাশে ছিলাম। বৃহস্পতিবার সারাটা দিন একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা তার সঙ্গেই বসেছিলাম।’ মাকাজিউয়ে আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, গত সপ্তাহের শুক্রবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত খুবই চমৎকার একটি সময় ছিল। কেননা, আমরা সবাই সেখানে ছিলাম’। ম্যান্ডেলার প্রথম দাম্পত্য জীবনে চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র জীবিত মেয়ে মাকাজিউয়ে। গত কয়েক মাস ধরেই তিনি বাবার খোঁজখবর রেখেছেন।
তার সঙ্গে নিয়মিত দেখাও করতেন। বাবার শেষ সময়ের বর্ণনায় ম্যাকাজিউয়ে বলেন, ‘চিকিৎসকরা যখন আমাদের বললেন, সেটা মনে হয় বৃহস্পতিবার সকালের দিকেই...তাদের আর কোনোকিছু করার নেই এবং তারা আমাকে এও বললেন যে, ‘বাকি যারা তাকে দেখতে চান এবং বিদায় জানাতে চান তাদের সবাইকে ডাকো’; সবার উপস্থিতিতে তখন সেই দিনটা খুব চমৎকারই ছিল। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি চারদিকে ঘিরে থাকায় মনে হচ্ছিল বাবাকে যেন রাজার মতো সেনারা পাহারা দিয়ে রেখেছে।’ জীবদ্দশায় বাবার লড়াইটা কেবল রাজনৈতিক মুক্তির জন্য নয় বরং আধ্যাÍিক মুক্তির জন্যও ছিল বলে মন্তব্য করেন মাকাজিউয়ে। বাবা যে শিক্ষা দিতেন সে সম্পর্কে মাকাজিউয়ের উক্তি, ‘তিনি ক্ষমা করার সৎ সাহসের কথা বলতেন। এই ক্ষমা এক কঠিন জিনিস। আমি মনে করি, তিনি জানতেন, ক্ষমা করতে না পারলে আধ্যাত্মিক মুক্তি মিলবে না। আর তাই অন্যকে ক্ষমা করার সাহস থাকাটা আমরা তার জীবন থেকেই শিখেছি।’ ‘অন্যকে ঘৃণা করার মানসিকতা নিয়ে আমাদের কেউ পৃথিবীতে আসেনি- আমাদের ঘৃণা করতে শেখানো হয়েছে। আর মানুষকে ঘৃণা করতে শেখানো গেলে ভালোবাসতে শেখানো যায়।’ শোক, শ্রদ্ধা, প্রার্থনা আর প্রশংসার মধ্য দিয়ে এখনও ম্যান্ডেলাকে স্মরণ করছে দক্ষিণ আফ্রিকা।

ম্যান্ডেলার বৃষ্টিভেজা বিদায়

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে ভারি বৃষ্টিপাতের আশংকাও দমাতে পারছে না নেলসন ম্যান্ডেলাপ্রেমী মানুষদের। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই জোহানেসবার্গের সোবেতোর এফএনবি স্টেডিয়ামে (সসার সিটি স্টেডিয়াম) জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। ৯৫ হাজার উপস্থিতি ধারণে সক্ষম ২০১০ ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক এই স্টেডিয়ামেই স্থানীয় সময় বেলা ১১টা (বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা) থেকে শুরু হয়েছিল ম্যান্ডেলার স্মরণানুষ্ঠান। অবশ্য, বৃষ্টির কারণে আয়োজনে কিছুটা বিঘ্ন ঘটায় স্মরণানুষ্ঠান শুরু হতে কিছুক্ষণ দেরি হয়েছে বলে দেশটির সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে। তবে, ইতিমধ্যে আগত ম্যান্ডেলাপ্রেমীরা তাদের নেতাকে স্মরণ করে বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীত পরিবেশন করছেন। কেউ নেচে গেয়ে ভুলতে চাইছেন প্রিয় নেতার বিয়োগের শোক। কেউ গাইছেন ‘আম্যান্ডেলা লো, আবামাজিয়ো, আবাকাজে বামবোনে’ (উনি সেই ম্যান্ডেলা, যাকে আপনারা চেনেন, তার মতো আর কেউ নয়!)। আবার কেউ গাইছেন, ‘আমরা তোমায় ভালোবাসি বাবা মাদিবা’। সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাথি এমথেথবা স্টেডিয়ামের মিডিয়া বক্সে অবস্থান করছেন।
তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে সেলফোনে আয়োজন নিয়ে প্রয়োজনীয় আলাপচারিতা সারছেন। জানা গেছে, ম্যান্ডেলার পরিবার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেতাদের উপস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকান জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হবে প্রিয় ‘সন্তান’কে বিদায়ের পর্ব। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সূর্য ওঠার আগ থেকেই ম্যান্ডেলার স্মরণানুষ্ঠানস্থল জোহানেসবার্গের সোবেতোর এফএনবি স্টেডিয়ামে (সকার সিটি স্টেডিয়াম) জড়ো হতে শুরু করেছেন হাজার হাজার মানুষ। ৯৫ হাজার উপস্থিতি ধারণে সক্ষম এই স্টেডিয়ামে স্মরণানুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ বিদায় জানাতে জড়ো হচ্ছেন বিশ্ব নেতারাও। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা আরও জানান, ইতিমধ্যে উপস্থিত হওয়া জনতার গায়ে ম্যান্ডেলার ছবিসংবলিত টি-শার্ট, শার্ট ও চাদর দেখা যাচ্ছে। কারও হাতে ঝুলছে প্রিয় নেতার ছবিসংবলিত ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও জাতীয় পতাকা। কেউ অশ্র“সিক্ত স্বরে গাইছেন, ‘প্রিয় মাদিবা, তুমি আমাদের হৃদয়ে থাকবে, তুমি বিদায় নিচ্ছো না, তুমি থাকছো আমাদের হৃদয়ে!’স্মরণানুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ও ?মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। উপস্থিত থাকছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটন, জিমি কার্টার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলান্দে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন,
জার্মান প্রেসিডেন্ট জোচিম গ্যঁক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কমিশনের প্রেসিডেন্ট জোসে ম্যানুয়েল বারোসো, ডাচ রাজা উইলিয়াম আলেক্সান্ডার, স্পেনের যুবরাজ ক্রাউন প্রিন্স ফিলিপ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রৌসেফ, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, ভারতীয় প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি, পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট মামনুন হুসাইন, জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে প্রমুখ। প্রিয় ম্যান্ডেলার স্মরণানুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মী ও ইংরেজ সঙ্গীতশিল্পী পিটার গাব্রিয়েল, আইরিশ সঙ্গীত শিল্পী পল ডেভিড হিউজনসহ (বোনো) অনেক অভিনেতা অভিনেত্রীও। স্মরণানুষ্ঠানের পর ১৫ ডিসেম্বর রোববার আনুষ্ঠানিক শেষকৃত্য শেষে শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাম কুনুতে চির নিদ্রায় শায়িত করা হবে মহাকালের এই মহানায়ককে। গত ৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতে জোহানেসবার্গের নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কালের এই মহানায়ক। প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবারের স্মরণানুষ্ঠানের পর প্রিটোরিয়ায় প্রেসিডেন্টের বাসভবন ‘ইউনিয়ন বিল্ডিংয়ে’ তিন দিন রাখা হবে ম্যান্ডেলার মরদেহ। তারপর ১৫ ডিসেম্বর রোববার রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য শেষে পূর্বাঞ্চলীয় ক্যাপে প্রদেশের নিজ গ্রাম কুনুতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে মানবতার মহানায়ককে।

সুন্দরবন আর জনকূটনীতি

ছাই-কাদায় ধ্বংসপ্রায় এমোরি নদী
সুন্দরবন থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরে বাগেরহাটের রামপালে হতে যাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সুন্দরবনকে হুমকিতে ফেলে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির এ পরিকল্পনা অর্থনৈতিক উন্নয়ন বনাম প্রকৃতি বা পরিবেশ সংরক্ষণের পুরোনো বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে স্বাভাবিকভাবেই।
যাঁরা পক্ষদলে আছেন, তাঁরা দেশের উন্নয়নে বিদ্যুৎ-ঘাটতি কমানোটাকে অনেক বেশি জরুরি বলে মনে করছেন। তাঁরা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই মুহূর্তে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং কারিগরি দক্ষতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁরা যুক্তি দেখাচ্ছেন, ‘সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি’র সর্বোচ্চ প্রয়োগ সুন্দরবনকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করবে। বিরোধী পক্ষের দাবি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুরুর প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় স্থান নির্বাচন, জমি অধিগ্রহণ, দুর্বল এবং পক্ষপাতমূলক পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ), নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পরিবেশগত ছাড়পত্র সংগ্রহ, প্রকল্পের দূরত্বভিত্তিক অবস্থানের বিতর্ক প্রভৃতির পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রকল্প নিশ্চিতভাবে সুন্দরবনের বিনাশ করবে। তবে দুই পক্ষের তর্ক-বিতর্ক ছাড়িয়ে এখন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে একটা নতুন প্রবণতা খুব লক্ষণীয়। তা হলো স্যাটেলাইট চিত্রের জনকূটনীতি। এর অংশ হিসেবে সংসদে প্রদর্শন করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন লোকালয়ে অবস্থিত গুগলের তোলা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচ-ছয়টি স্যাটেলাইট চিত্র। মহাশূন্য থেকে তোলা এসব স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে সরকারপক্ষ রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, লোকালয়ে অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অনেক দূরবর্তী স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে কি ভূমিতে ঘটে যাওয়া পরিবেশগত বিপর্যয়ের আসল চিত্র জনসাধারণের পক্ষে বোঝা সম্ভব? এখানে স্যাটেলাইট চিত্রের অন্তত একটি, তথা বিজ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রকেই বেছে নেয়। যদিও অস্ট্রেলিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কুইন্সল্যান্ড ও নিউ সাউথ ওয়েলসের যেসব উন্মুক্ত খনি থেকে কয়লা সংগ্রহ করা হয়, সেগুলোর পরিবেশগত বিপর্যয় এবং তার রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশদ বিবরণ পাওয়া যাবে ২০১২ সালে প্রকাশিত শ্যারিন মানরো কর্তৃক রচিত ম্যাকমিলান পাবলিশারের রিচ ল্যান্ড, ওয়্যাস্ট ল্যান্ড: হাউ কোল ইজ কিলিং অস্ট্রেলিয়া গ্রন্থটিতে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পরিবেশগত ভূমিস্থ বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এই ‘ফটো-কূটনীতি’র আওতাভুক্ত হয়েছে, সেটির নাম হলো ‘কিংস্টন ফসিল পাওয়ার প্ল্যান্ট’। টিনেসি রাজ্যের রোন কাউন্টিতে ১৯৫৫ সালে ১ দশমিক ৭ গিগাওয়াট বা এক হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এটি মূলত এমোরি ও ক্লিঞ্চ নদীর মোহনায় অবস্থিত। এর অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য অনেকটাই মেলে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে। বাংলাদেশের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রও পশুর নদ ও শিবসা নদীর মোহনায় অবস্থিত।
এমনকি রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তাবিত অবকাঠামোগত নকশায় ছাই ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তাবিত পুকুরের অবস্থানগত আদল অনেকটাই কিংস্টন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুকুরের মতো। উভয় ক্ষেত্রে পুকুর দুটি নদীর মোহনাসংলগ্ন। ৮৪ একরের কিংস্টন বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই পুকুরটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপজাত হিসেবে ছাইয়ের কাদা নিঃসরিত হতো। এই ছাই-কাদা পুকুর থেকে আস্তে আস্তে চুইয়ে এমোরি ও ক্লিঞ্চ নদীতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই চুইয়ে পড়া ছাই-কাদা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটায় ২০০৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ। চার মিলিয়ন ঘনমিটার পরিমাণ এই ছাই-কাদা প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। এতে নদীর দুই তীরের লোকালয়েও পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসে। মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হওয়াসহ প্রায় ১০ কিলোমিটারজুড়ে নদীর পানিও দূষিত হয়ে পড়ে। এর ক্ষতিকর প্রভাব স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য পানির ওপরও পড়েছিল। এই পানিতে লেড, থ্যালিয়াম, পারদ ও আর্সেনিকের মাত্রাও সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক ওপরে উঠে গিয়েছিল। ছাই-কাদায় ঢেকে যাওয়া এমোরি নদী। (উৎস: উইকিপিডিয়া) যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি জানিয়েছিল, নদীগুলো দূষণমুক্ত করতে চার-ছয় সপ্তাহ লাগবে। কিন্তু ছয় মাস পরে দেখা গেল, নিঃসরিত ছাই-কাদার মাত্র ৩ শতাংশ সরানো সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কিংস্টন বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা টিনেসি ভ্যালি অথরিটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি প্রচারপত্রের মাধ্যমে দাবি করে যে নদীতে নিঃসরিত এই ছাই-কাদা ‘দূষণ-সম্ভাবী নয়’। এই কিংস্টন ফসিল পাওয়ার প্ল্যান্ট দূষণের তিক্ত অভিজ্ঞতা ২০০৯ সালে মার্কিন সিনেটে আলোচিত হয় এবং দেশজুড়ে অবস্থিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই ব্যবস্থাপনার পুনর্মূল্যায়নের দাবিও কংগ্রেসে উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে মার্কিন কংগ্রেসের প্রাকৃতিক সম্পদসংক্রান্ত পর্ষদ ছাই ব্যবস্থাপনার পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত একটি বিলও পাস করতে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারপক্ষ থেকে দূরবর্তী স্যাটেলাইট চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে যে জনকূটনীতির সূচনা ঘটানো হলো, অন্তত তা কিংস্টন ফসিল পাওয়ার প্ল্যান্টের অভিজ্ঞতায় কোনো সততার প্রমাণ দেয় না; বরং এটা নিশ্চিত করে, যে তারা মননে জনবিচ্ছিন্ন এবং তাদের কাছে জনস্বার্থের চেয়ে অন্য কিছু এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই সরকারপক্ষের জনকূটনীতি জনকূটচালে আটকা পড়ে গেছে। এ সবকিছুই সুন্দরবনকে ঘিরে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে যাঁরা বলছেন, তাঁদের নৈতিক পরাজয়ের প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু নয়। তাই জনবিক্ষোভের আশঙ্কায় বাগেরহাটের রামপালে অবস্থিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে হয় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায়!
মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি সাক্ষাৎকারের ময়নাতদন্ত

বাংলা সাহিত্যে একসময় কবি-সাহিত্যিকদের একেকটি বন্ধুবৃত্ত ছিল। কলকাতায়ও ছিল, ঢাকায় ছিল। সমমনা ও অভিন্ন রুচিসম্পন্নদের নিয়ে গড়ে উঠত সেই বৃত্ত। ঢাকায় একসময় একটি চমৎকার বন্ধুবৃত্ত ছিল। এবং তা অটুট ছিল তাঁদের কারও কারও মৃত্যু পর্যন্ত। সেই বন্ধুবৃত্তে ছিলেন কবি আবুল হোসেন, কথাশিল্পী রশীদ করীম, কবি ও অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এবং কবি শামসুর রাহমান।
তাঁরাই ছিলেন প্রধান, তবে কখনো তাঁদের বৈঠকে আরও কেউ যোগ দিতেন। তাঁদের কারও না কারও বাড়িতে ছুটির দিনগুলোয়, সকালের দিকে অথবা সন্ধ্যায়, তাঁরা বসতেন। দীর্ঘ আড্ডা হতো। তাঁরা সবাই ছিলেন বিদগ্ধ ও রুচিমান। শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি প্রভৃতি নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রুচিশীল আলোচনা হতো। কী সুন্দর ছিল সে আলোচনা! প্রচুর বিতর্ক হতো। ভিন্নমত দিতেন কেউ। কিন্তু শেষ হতো কী চমৎকারভাবে। আমার সঙ্গে তাঁদের বয়সের ব্যবধান ছিল অনেক। তা সত্ত্বেও তাঁদের প্রশ্রয়ে সেই মনোরম আড্ডায় যোগ দিতাম। তাঁদের মননশীল কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। তাতে অশেষ উপকৃত হয়েছি। তাঁদের আড্ডা নিয়ে আশির দশকে দৈনিক বাংলার সাহিত্যের পাতায় একটি নিবন্ধও লিখেছিলাম। একদিন ওই মোহন আড্ডায় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খানের শাসনামলের কথা উঠল। তিনি ছিলেন সামরিক একনায়ক। সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধেই অধিকাংশ। রশীদ করীম ভিন্নমত দিলেন। তাঁর কথা ছিল: আইয়ুব অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। মৌলিক গণতন্ত্র চালু করে রাজনীতিকে কলুষিত করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করেছেন। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে পাকিস্তানের অধিকাংশ সরকারপ্রধানের চেয়ে ছিলেন দক্ষ। তিনিই যদি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতেন, গণতান্ত্রিক আচরণ করতেন, দেশ উপকৃত হতো। রশীদ করীমের এই বক্তব্যে খুব সাবলীলভাবে তাঁর আর তিন বন্ধু দ্বিমত করেননি। যেসব দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি রয়েছে, সেখানে যেকোনো পেশার মানুষই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে পারেন। কুড়ি শতকের দুজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন সেনাবাহিনীর জেনারেল।
তাঁরা ক্যুদেতার মাধ্যমে ক্ষমতায় যাননি। ছিলেন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের খ্যাতিমান সমরনায়ক ছিলেন ডুইট ডেভিড আইসেনহাওয়ার। সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে হন পুনর্নির্বাচিত। বিশিষ্ট ভদ্রলোক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। যদিও তাঁর সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম ও কোরিয়ার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তাঁর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের স্মৃতিকথা ক্রুসেড ইন ইউরোপ একটি অসামান্য গ্রন্থ। দুবার ক্ষমতায় থেকে ১৯৬০ সালে জন এফ কেনেডির কাছে আইসেনহাওয়ার ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কুড়ি শতকের ফরাসি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেনারেল শার্ল দ্য গল। তিনিও ছিলেন নির্বাচিত, ক্ষমতা জবরদখলকারী নন। বিপুল ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে চক্রান্ত করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখল করেন। তাঁর নিজের ভাষায়ই তাঁর ওই ক্ষমতা গ্রহণের ‘সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না’। ক্ষমতায় গিয়ে তিনি দল গঠন করেন। নিজের ক্ষমতাকে একটি সাংবিধানিক বা অসামরিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু জনগণ তার স্বীকৃতি দেয়নি। তাই জনরোষে তাঁকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করতে হয়। দীর্ঘ কারাবরণও করেন। কারাগার থেকেই পাঁচটি আসনে নির্বাচিত হন। তাঁর দল জাতীয় পার্টিও অনেক আসন পায়। পর পর কয়েকটি নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে,
জাতীয় পার্টি দেশের তৃতীয় বড় দল। এখন আর তাঁর পরিচিতি সামরিক স্বৈরশাসক হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক দলের নেতা হিসেবে। কেউ কেউ যথার্থই বলেন সাবেক স্বৈরশাসক। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে দেশের মানুষের ধারণা খুবই পরিষ্কার। নির্বাচন এলেই তাঁর কদর বাড়ে বড় দুই দলের কাছে। নীতি ও আদর্শগত দিক থেকে জাতীয় পার্টি বিএনপির কাছাকাছি। কিন্তু খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পর্যায়ে দূরত্ব রয়েছে—মাঝেমধ্যে কাছাকাছি এলেও। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর দলের ঘোষিত নীতির দূরত্ব বিরাট, কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে কিছু কারণে তাঁর সম্পর্ক কাছের। তাঁর কর্মকাণ্ড ও কথাবার্তার কারণে সংবাদমাধ্যম তাঁকে আলোচনার বিষয়বস্তু বানায়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সময়ও তিনি আলোচিত হচ্ছেন। প্রায় নয়টি বছর তিনি দেশ শাসন করেছেন। তার পর থেকেই আছেন রাজনীতিতে। তাঁর অভিজ্ঞতা কম নয়। ক্ষমতায় যখন ছিলেন, তখন কোনো ভালো কাজ করেননি, তা-ও নয়। দেশের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জেনারেল এরশাদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিজানুর রহমান খানকে যে সাক্ষাৎকার দেন, তার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সেটি সাধারণ সাক্ষাৎকার নয়। তাঁর সমর্থক ও প্রতিপক্ষের উচিত তাঁর কথাগুলো মূল্যায়ন করা।
তাঁর কিছু কথা আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক। তাঁর কিছু কথা সত্যের নিকটবর্তী নয়। কিছু কথা অসত্যও নয়। কিন্তু বিভিন্ন প্রসঙ্গে তাঁর কিছু কথা এই মুহূর্তে খুবই প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও তা অনেকের ভালো না-ও লাগতে পারে। মিজানুর রহমান খান যখন বলেন ‘আপনাকে হঠাৎ ভারতবিরোধী মনে হচ্ছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আপনার দীর্ঘ সখ্য রয়েছে’; তখন তার জবাবে এরশাদ বলেন, ‘ভারত আমাদের বন্ধু প্রতিবেশী। ইন্দিরা গান্ধী আমাকে ছেলের মতো জানতেন।... বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত যদি আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়, তাহলে সেটা ভারতের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হবে না। উপরন্তু শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিলে দেশের মানুষ অহেতুক ভারতবিরোধী হতে পারে।’ তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশে ভারতবিরোধীদের কানে খুবই মধুর শোনাবে, পেশাদার ভারতপন্থীদের মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার করবে, সত্যিকারের ভারতবান্ধবদের করবে বেদনাহত। জনাব খানকে জাপার নেতা আরও বলেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্রসচিব আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমি তাঁকে বললাম, নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে এখন ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তিনি (সুজাতা সিং) বলেছেন, তাহলে কী হতে পারে। আমি বলেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন করে সরকারের পরিবর্তন ঘটানো।’ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে এবং সেটা থাকা স্বাভাবিক। সে জন্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটকে ভারত ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তাই এরশাদ জানান, ভারত চায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচন করে জাপা নির্বাচনকে বৈধতা দিক।
১৮ দল ক্ষমতায় গেলে জামায়াতের উত্থান ঘটবে। এই প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারের কথাবার্তা এই রকম: প্রথম আলো: ভারতের চারটি রাজ্যের নির্বাচনের পর ইঙ্গিত মিলছে, বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারে। তাহলে দুই দেশ একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এরশাদ: হ্যাঁ, আমরা যে কারণে বিজেপি সম্পর্কে বলতে পারি না, একইভাবে তারাও পারে না। প্রথম আলো: যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও জাতিসংঘ বিএনপিকে নিয়ে এবং ভারত বিএনপিকে বাইরে রেখেও নির্বাচন চাইছে। এই ধারণা ঠিক কি না? এরশাদ: ঠিক। তবে বিদেশিদের কেউ বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা দিতে পারবে না। এটা দেবে জনগণ। যেহেতু এরশাদের লজ্জা ও চক্ষুলজ্জা কম, তাই চক্ষুলজ্জাবশত যাঁরা অনেক কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন, তিনি তা বলেছেন। তাঁর এ কথা একজন দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক নেতার মতোই। বাংলাদেশে কিছু বিরক্তিকর ভারতবিরোধী রয়েছে। তাদের সংখ্যা ৪ থেকে ৫ শতাংশের বেশি হবে না। বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ মানুষই যে ভারতবিরোধী নয়, বরং ভারতবান্ধব এবং ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী, তা ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু পাঁচ বছর পর বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ মানুষের মনের অবস্থা কী? আজ অফিস-ফেরতা কেরানি ও ভ্যানে সবজি বিক্রেতাসহ ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ মানুষ ভারত সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। তার জন্য মহাজোট সরকারই দায়ী—তা এরশাদের মতো প্রায় সবারই ধারণা। এরশাদ যে এসব কথা এখনই প্রথম বললেন, তা নয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকেই তিনি বলছেন। মহাজোট সরকারের কারণে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও ইসলামি মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। এ কথা তিনি বললেও, তিনিই শাপলা চত্বরের ধর্মান্ধদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। সেখানেই তাঁর চারিত্রিক সংহতি বা ইনটেগ্রিটির অভাব।
বছর খানেক যাবৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ের ওপর বর্বর আক্রমণ হচ্ছে। মন্দিরের প্রাণহীন অথচ পবিত্র প্রতিমার গায়ে আঘাত হানা হচ্ছে। কোনো দুষ্কৃতীকেই ধরা হয়নি, আইনের আওতায় এনে বিচার করে শাস্তি দেওয়া হয়নি। মহাজোটের নামজাদা অনেক নেতা যেন এই বর্বরতা উপভোগই করছেন। রাজনৈতিক অবস্থা বিচার করে সাধারণ মানুষ মনে করতে পারে, মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর ১৮-দলীয় জোটকে ক্ষমতার বাইরে রাখারই পূর্বসূচক বা পূর্বপ্রস্তুতিমূলক তৎপরতা। তাদের সেই অনুমান যদি সত্য হয়ে থাকে, তার চেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপার আর হতে পারে না। একে বলে গণতন্ত্র? স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বলতে দুনিয়ার শিক্ষিত মানুষ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বোঝেন এক কথা, আর বঙ্গীয় ক্ষমতাসীনেরা বোঝেন অন্য কথা। স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অর্থ একই দলের সরকার বা একই ব্যক্তির দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা নয়। জনগণের ইচ্ছায় নির্বিঘ্নে সরকার বদলই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে স্থির থাকাই স্থিতিশীলতা। ভারতে মিসেস গান্ধীর পর মোরারজি দেশাই ছিলেন মাত্র সোয়া দুই বছর। চরণ সিং ছয় মাসের কম। মিসেস গান্ধী আবার চার বছর। রাজীব গান্ধী পুরো মেয়াদ। ভি পি সিং এক বছরের কম। চন্দ্রশেখর মাত্র সাত মাস। নরসীমা রাওয়ের পুরো মেয়াদের পর অটল বিহারি বাজপেয়ি প্রথমবার ১৬ দিন। দেব গৌড়া ১০ মাস প্রধানমন্ত্রিত্ব করেন। তাতে ভারতের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও স্থিতি ক্ষুণ্ন হয়নি। বাংলাদেশ অন্য রকম দেশ। এখানকার সবকিছুর সংজ্ঞা অন্য রকম। দেশপ্রেমের সংজ্ঞাও। বাংলাদেশে এমন একটি মধ্যশ্রেণী গড়ে উঠেছে গত ৪০ বছরে, যার একটি ক্ষুদ্র অংশ এতই স্বার্থান্ধ যে আজ যদি বলিভিয়া বা হাইতি বাংলাদেশকে দখল করে নেয়, পরদিন তার সপক্ষে উপসম্পাদকীয় লেখার লোকের অভাব হবে না। মধ্যরাতে টক শোতে অংশগ্রহণকারী তিনজনের দুজনই থাকবেন বলিভিয়া বা হাইতির নিযুক্ত প্রশাসকের পক্ষে।
উপস্থাপকও হাত নেড়ে এমন প্রশ্ন করবেন, যেন উত্তরটা বলিভিয়া বা হাইতির পক্ষেই যায়। কারও দ্বারা নিয়োগ দেওয়া প্রশাসক আর নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী একেবারেই দুই জিনিস। কোনো সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকার নামই গণতন্ত্র। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত প্রবাসী সরকারের মহিমা ও মুক্তিসেনাদের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা যদি মহাজোটের সরকারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা যে শুধু আওয়ামী লীগের জন্য ট্র্যাজেডি, তা-ই নয়; আমাদের জন্যও বেদনার। একটি প্রশ্নে আমার বিশ্বাস অবিচল, তা হলো যে জাতির জীবনে বায়ান্ন আসে, বাষট্টি আসে, উনসত্তর আসে এবং আসে মহত্তম বছর একাত্তর, সে জাতি যেকোনো ষড়যন্ত্র ও নীলনকশা নস্যাৎ করার ক্ষমতা রাখে। রাজনৈতিক নেতাদের দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন করার স্পর্ধা আমাদের নেই। তাঁরা ছাড়াও বাংলার রাজনীতিতে আজ পাত্রপাত্রী অনেক। মুসলমান মৌলবাদীরা জানেন না তাঁরা দেশটির শুধু নয়, ইসলামের কত ক্ষতি করছেন। পলিটিকসে নাক গলানোর আগে বাঙালির সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁদের পাঠ গ্রহণ করতে হবে। প্রগতিশীলেরা জানেন না মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে তাঁরা কতটা ব্যর্থ হয়েছেন। গত ৬৫ বছরে লাখ লাখ হিন্দু ভারতে চলে যাওয়ার পরও, বাংলাদেশে এখনো এক-দেড় কোটি হিন্দু রয়েছে। তাদের সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা শুধু আওয়ামী লীগ বা তরীকতের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। ধর্মপন্থী মুসলমান ও হিন্দু নেতাদেরও আজ অন্তর্বীক্ষণের ও চিন্তার পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। জাতিগত সংখ্যালঘুদের বেদনার কথা কেউ ভাবছেন না। আজ আমরা সবার সুখ-শান্তির জন্য সামগ্রিক ব্যবস্থার যদি পুনর্গঠন না করি, প্রত্যেকের অবস্থান স্পষ্ট না করি, সমন্বয় না করি, তাহলে একতরফা নির্বাচন তো নয়ই, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনও জাতিকে সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

দুই নারী, দুটি ধর্ষণ এবং দুটি দল

ক্ষমতাকেন্দ্র রাজধানীতে বসে দুই নারী যুদ্ধ করছেন; জনগণের হাত-পা বাঁধা। যশোরে মা ও মেয়ে একত্রে ধর্ষিত হয়েছেন, বাবা-ভাই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তা সহ্যকরেছেন। আত্মরক্ষার কোনো সহায় তাঁদের ছিল না। যদি সিনেমার মতো সমান্তরালে জাতীয় ও পারিবারিক দুটি কাহিনি দেখি, তাহলে হয়তো ঘটনা দুটিকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হবে না। দুই দিকে দুটি আয়োজন চলছিল। জাতিসংঘের দূত তারানকো যখন ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে বৈঠক চালাচ্ছিলেন, তখন যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় ১০ জন পুরুষ একজোট হচ্ছিল। রাতের ঢাকায় যখন দিনের শেষ ককটেলটি ফুটছিল, তখন যশোরের একটি বাড়ির দরজা ভাঙা হচ্ছিল। দুই নেত্রী এবং তাঁদের নায়েব-উজির-সিপাহসালাররা যখন ঘুমের আয়োজন করছেন, তখন হাত-পা বাঁধা হচ্ছিল মায়ের স্বামী-পুত্রের এবং বোনের বাবা-ভাইয়ের। বিটিভিতে তখন আমাদের বিষণ্ন সুন্দর জাতীয় সংগীতের শেষ চরণটি বাজছিল, ‘ওমা তোর বদনখানি মলিন হলে, আমি নয়নজলে ভাসি’, তখন মাতৃজাতির মেয়েটিকে মায়ের ঘরে আর মাকে উঠানে রাখা চৌকিতে চরম নির্যাতন করা হচ্ছিল। যখন টক শোয়ে মাতোয়ারা হচ্ছিলেন আলোচক ও দর্শক, তখন বাবা-ভাই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দর্শক হচ্ছিলেন নিজেরই স্ত্রী-কন্যা, মা-বোনের ধর্ষণযজ্ঞের।
(বাবা-ছেলেকে আটকে মা ও মেয়েকে ধর্ষণ...)
যা দেখার নয়, যা সহ্য করার নয় তা যখন দেখতে ও সইতে হচ্ছিল তাঁদের, তখন দেশবাসীও যা দেখার কথা ছিল না, তেমন রাজনীতির অসহায় দর্শক হয়ে থাকছিলেন। আমরা সবাই যেন ভয়াবহ নির্যাতনের সাক্ষী শুধু নই, আমরা নিজেরাও এর শিকার। নিজ গৃহে নিজেরই কন্যা-জায়া-জননীর ওপর পাশবিক নির্যাতন যতটা মর্মান্তিক; জনপ্রিয় দুই নেত্রীর দেশবাসীর এই দুর্ভোগ চেয়েচেয়েদেখা ততই দুঃখজনক। যে দেশের নেতা-নেত্রীরা এ রকম দায়িত্বহীন, সেই দেশের ভয়ার্ত গ্রামবাসীর ঘুম ভাঙে ধর্ষিতা আর তাঁদের স্বজনের আর্তনাদে। সেই অক্ষম আর্তনাদে কেঁপে ওঠেনি বঙ্গভবন, কালো হয়ে যায়নি শুভ্র সংসদ ভবন, লজ্জিত হয়নি জাতীয় পতাকা, থমকে যায়নি রাজনীতির ইয়াজুজ-মাজুজেরা। কেবল শহীদ মিনারই অধোবদন।

মা মধ্যবয়সী, মেয়ে বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ভাইটির বিবরণ খবর থেকে পাওয়া যায় না। হয়তো সে কিশোর বয়সীই হবে। এবং বাবা একজন রিকশাচালক। রিকশাচালক হলেও গ্রামের মানে তাঁরা মোটামুটি সচ্ছলভাবেই দিন গুজরান করছিলেন। প্রতিটি পরিবারে যা স্বপ্ন থাকে, তাঁদেরও সেটাই ছিল। চারপাশের বিপদ-আপদ, রোগ-বালাই এড়িয়ে পরিবারটার আর্থিক ভিত আরও মজবুত করা, ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করা। এসব মৃদু মানুষের স্বপ্নগুলোও এতটাই মৃদু ও নির্বিরোধ, তা-ও যেন সম্ভব নয় আজ। রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ এসব মৃদু মানুষের মৃদুমন্দ ব্যক্তিগত ইতিহাসের ওপর ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। কেউ পুড়ছে, কেউ সর্বস্বান্ত হচ্ছে, কারও পেটে টান পড়ছে, কারও মূল্যবান সময় খোয়া যাচ্ছে। মা-মেয়ের ধর্ষণ এবং গ্রামবাসীর চোখে একটি পরিবারের ভয়াবহ পতন, দেশের আরও অজস্র পারিবারিক বিপর্যয়ের একটি। হায়, এঁরাও পরিবার আর আমাদের দুই রাজকীয় ঘরানার কেন্দ্রেও রয়েছে দুটি পরিবার। কোটি পরিবারের আশা আর দুটি পরিবারের চাহিদা কত আলাদা? সারা দেশে যা হচ্ছে, যশোরের মনিরামপুরে সেটাই হচ্ছে। তবে তার থেকে কিছু বেশি। সেখানে সাংবাদিকও যেতে পারেন না, সড়কে গাছের গুঁড়ির বাধা যদিওবা পেরোতে পারেন, পিকেটারদের আগুনে মোটরসাইকেল পোড়ানো ঠেকাবেন কীভাবে? পুলিশও সেখানে যেতে ভয় পায়।
ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত, বিচার—সব তাই থমকে থাকবে। জাতীয় সমস্যার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ ব্যস্ত থাকবে বিরোধী ঠেকাতে, কিন্তু সাধারণ মানুষ কি ততক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকবে? এই পরিস্থিতিই তো সুবর্ণ সুযোগ দুর্বৃত্ত ও দস্যুদের। সংবাদটি গণমাধ্যমে সামান্য গুরুত্বই পেয়েছে। অথচ এটাই হতে পারত আজকের জাতীয় পরিস্থিতির শিরোনাম, প্রধান সংবাদ। যদি হতো, তাহলে হয়তো অনেকেরই অনুভূতিতে কাঁপন ধরত। অনেকেই ক্রোধে ফেটে পড়তেন। কিন্তু তা হয়নি। এ রকম অরাজনৈতিক ‘মানবিক কাহিনি’র দাম এখন কম। এখন এরশাদ কাহিনি, সুজাতা-তারানকো কাহিনি, হাসিনা-খালেদা কাহিনির রমরমা। দুই দল ক্ষমতার পাঞ্জা লড়ছে। এ অবস্থায় মা ও মেয়ের ধর্ষণ তো অরাজনৈতিক ‘হিউম্যান স্টোরি’, নিতান্তই একটি গরিব পরিবারের পারসোনাল ট্র্যাজেডি। ‘দ্য পারসোনাল ইজ পলিটিক্যাল’ বলেছিলেন মার্কিন নারীবাদী ক্যারল হ্যানিশ্চ। কথাটাকে টেনে ব্যাখ্যা করতে পারি আমরা। যখন দুই নেত্রীর পারসোনাল রেষারেষি ও পারিবারিক অভিলাষের মূল্য দিচ্ছে দেশ, তখন পারসোনাল অবশ্যই পলিটিক্যাল। যখন এই হানাহানির সুবাদে অবলীলায় দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যেতে পারে একদল ধর্ষক, যখন তাদের পারসোনাল অভিলাষের অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করে, তখন দেশের যেকোনো মানুষের দুর্ভোগ, যন্ত্রণা,
নির্যাতন অবশ্যই রাজনৈতিক ঘটনা। কে না জানে, বড় রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রপ্রশাসনই আজ সব রকম খুনি-দুর্বৃত্ত-লুটেরা-দুর্নীতিবাজ ও ধর্ষকদের অভয়াশ্রম। বড় দলের সদস্য হবেন বা প্রশাসনের সঙ্গে দহরম-মহরম রাখবেন, আপনার অপরাধ করার ক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে অপরাধের দায়মুক্তির সুযোগ। যত দিন না আমরা রাজনৈতিক ঘটনার কেন্দ্রে এসব মৃদু মানুষের জীবনকে প্রতিষ্ঠা করতে পারব, তত দিন দাপুটে পরিবারগুলোই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। ওই ১০ ধর্ষকের যে ছয়জন মাকে নিপীড়ন করেছিল, আর যে চারজন কন্যাকে চরম সহিংসতার শিকার করছিল, তারা সংসদে সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু দলের প্রতিনিধি কি না, আমরা জানি না। তবে এটা বলতে পারি, তারা প্রথম ধর্ষণটি ঘটায় দেশের প্রতীক মায়ের সঙ্গে। দ্বিতীয় ধর্ষণটি ঘটে কন্যাটির ওপর, যে হতে চাইছিল ভবিষ্যৎ। এই বাস্তবতায় দুই নারী যেন আমাদের দেশ ও ভবিষ্যতেরই প্রতীক। আমাদের সহনশীলতা হলো তৃতীয় ধর্ষণ, যা আমরা আমাদের সঙ্গেই করে চলেছি। ইতালীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ভিক্তরিও ডি সিকা তাঁর দেশের লাঞ্ছনার প্রতীক করেছিলেন আশ্রয়ের সন্ধানে পলায়নরত মা ও মেয়ের ধর্ষণ ও তার পরের পরিস্থিতিকে। আমাদের দেশের কোনো অন্তর্দর্শী চলচ্চিত্রকার কি এই সময়ের অসহায়ত্বের প্রতীক হিসেবে এই মা ও মেয়ের ঘটনাটি বেছে নেবেন? এই দুই নারীর বিপরীতে দেশের শীর্ষ ক্ষমতাধর দুই নারীর অপরিণামদর্শী অমানবিক কোন্দলকে কি চিহ্নিত করবেন? আর পটভূমিতে রাখবেন, হাত-পা বাঁধা অসহায় দেশবাসী আর হাত-পা বাঁধা বাবা-ভাইয়ের কলিজা-পোড়া আর্তনাদের সুর?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com