Sunday, February 16, 2014

দিল্লিতে রাষ্ট্রপতির শাসন

শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে রাষ্ট্রপতির শাসনই জারি হচ্ছে। গতকাল শনিবার রাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় দিল্লির জন্য রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আজ রোববার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। এর আগে উপরাজ্যপাল নাজিব জং, রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির কাছে লেখা চিঠিতে এই সুপারিশ করেছিলেন। তবে বিধানসভা জিইয়ে রাখার প্রস্তাবও তিনি দিয়েছিলেন। উপরাজ্যপাল ওই চিঠির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ইস্তফাপত্রও রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেছেন। এসব পদক্ষেপে অবশ্য বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল চিন্তিত নন। গতকাল একটি টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে তিনি আবার মুকেশ আম্বানির কথা উল্লেখ করে তাঁর সঙ্গে কংগ্রেস ও বিজেপির ‘অসত্ যোগসাজশের’ অভিযোগ এনেছেন। মনমোহন সিং, চিদাম্বরম, কমলনাথসহ বহু বিশিষ্ট নেতা দেশের জন্য ভাবেন না বলেও তিনি মনে করেন। তাঁদের ‘ইমানদার’ বলেও মনে করেন না কেজরিওয়াল। তাঁর ব্যাখ্যায়, তাঁরা সবাই বৃহত্ শিল্পগোষ্ঠীর হাতের পুতুল, তাদের স্বার্থে সরকার পরিচালনা করেন। কেজরিওয়াল আরও জানান, লোকসভা নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং যাঁরা ‘দুর্নীতিগ্রস্ত, অপরাধী, সাম্প্রদায়িক ও রাজনীতিকে পারিবারিক উত্তরাধিকার মনে করেন’, তাঁদের জয় ঠেকাবেন।
তবে কেজরিওয়ালের পদত্যাগের পরে আম আদমি পার্টিকে (এএপি) যেসব সমালোচনা সহ্য করতে হচ্ছে সেগুলোর অন্যতম হলো, প্রশাসনিক দিক থেকে তাঁরা অনভিজ্ঞ এবং আদৌ দায়িত্বশীল নন। তাঁদের চরিত্র পলায়নমুখী। এ কারণে তাঁদের কাছ থেকে সুশাসিত স্থিতিশীল সরকার পাওয়ার আশা কম। প্রধানত বিজেপি এবং কিছুটা কংগ্রেস এভাবেই এএপিকে আক্রমণ করছে। কেজরিওয়াল তাতে বিচলিত নন। তাঁর দাবি, পদত্যাগের পর সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় আরও বেড়ে গেছে। যদিও এটা ঠিক যে সমাজের শিক্ষিত এবং সচ্ছল মানুষদের মনে এএপির কাজকর্ম সম্পর্কে কিছুটা বিরূপ ধারণা জন্ম নিয়েছে। এই শ্রেণীর ব্যাপক সমর্থন এএপি দিল্লি নির্বাচনে পেয়েছিল। গত শুক্রবার রাতে এএপির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের সুপারিশ করেন। রাষ্ট্রপতির শাসন এড়ানোর একমাত্র উপায় ছিল বিকল্প সরকার গঠন। সেই সম্ভাবনা যে একেবারেই ছিল না, তা নয়। বিজেপি অনায়াসেই সরকার গড়তে পারত। ৭০ আসনবিশিষ্ট বিধানসভায় তাদের ৩২ জন সদস্য ছিলেন। আম আদমি পার্টি থেকে বহিষ্কৃত বিনোদ কুমার বিন্নি, জনতা দল (সংযুক্ত) সদস্য শোয়েব ইকবাল এবং স্বতন্ত্র সদস্য রাজবীর শৌকিন বিজেপিকে সমর্থন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। এএপি থেকে ভাগিয়েও সরকারের স্থায়িত্ব বাড়ানো যায়। কিন্তু বিজেপি সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। বিধানসভার বিরোধী নেতা হর্ষবর্ধন গত শুক্রবারই বলে দেন, তাঁদের লক্ষ্য নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দিল্লির মসনদ দখল করা।

তাঁঁরাও টানলেন

প্রিন্স উইলিয়াম (বাঁয়ে) ও প্রিন্স হ্যারি
যুক্তরাজ্যের বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন যুবরাজ প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারি। বন্যার পানি থেকে গ্রামবাসীর ঘরবাড়ি রক্ষায় দুই ভাই গত শুক্রবার সেনাদের সঙ্গে ডেসিট বাঁধের নির্মাণকাজে অংশ নেন। এ সময় বালুর বস্তা টানেন তাঁরা। একসময় সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন রাজপরিবারের এই দুই সদস্য। তাঁদের দাদি রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য খাদ্য ও ঘুমানোর সরঞ্জাম পাঠিয়েছেন তিনি। দেশটিতে ২৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে আর্দ্র শীতকাল চলছে। এএফপি।

কংগ্রেস, বিজেপি না তৃতীয় জোট?

 প্রায় দুই সপ্তাহ ভারতের দক্ষিণের তিনটি রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং আমাদের পশ্চিম সীমান্তের রাজ্য পশ্চিম বাংলায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। নিছক বেড়ানো হলেও চেষ্টা করেছিলাম ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের হালহকিকত বুঝতে। কারণ, ভারতের রাজনীতি এখন সরগরম, বিশেষ করে আসন্ন ১৬তম লোকসভার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে। যদিও ভারতের রাজনৈতিক উত্তাপ এবং আসন্ন নির্বাচনের হাওয়া বড় বড় শহর ছাড়া তেমন উপলব্ধি করা যায় না, তথাপি ছোট শহরগুলোর দেয়াল আর লাইটপোস্টগুলোতে সাঁটানো এবং ঝুলন্ত পোস্টারগুলো মনে করিয়ে দেয় যে নির্বাচন আসন্ন। দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি একেবারেই নেই। এমনকি ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ কম। বিগত কয়েক দশকে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে গড় ভোটের হার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। প্রধান কারণ, ভারতের সাধারণ ভোটারদের কাছে দুই বৃহৎ জোট আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে। অনেকেই মনে করেন, এ কারণেই দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ‘আম আদমি পার্টির মতো স্বল্পপরিচিত দল রাজ্য সরকার গঠন করতে পেরেছে। 
আম আদমি পার্টিও (এএপি) তাদের সাফল্যের বিস্তৃতি ঘটাতে তৎপর। অপরদিকে হঠাৎ গর্জে ওঠা এই পার্টির বিস্তার ঠেকাতে উভয় জোট নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে বলে এএপি অভিযোগ তুলছে। এপিপির অভিযোগে বলা হচ্ছে যে বিজেপি দিল্লি সরকারকে উৎখাত করতে প্রায় ২০ কোটি রুপি খরচ করছে। শুধু এএপিই নয়, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার নেতৃত্বে সম্ভাব্য তৃতীয় জোট গঠনের আগেই বিজেপি বিরোধিতায় নেমেছে। তৃতীয় জোট গঠনে দক্ষিণের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল এআইএডিএমকে ঘিরে সম্ভাবনা গড়ে উঠছে কংগ্রেস এবং বিজেপি বিরোধী জোটের। এ জোটে হয়তোবা শামিল হতে পারে উত্তর প্রদেশের শাসক দল বহুজন সমাজ পার্টি। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেসের দিকেও নজর রয়েছে সম্ভাব্য এই জোটের। তবে এই জোট নির্বাচন-পূর্ব, না পরবর্তী সময় গঠিত হবে, তা নিয়ে দক্ষিণের দলগুলোর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। যদিও বহুজন সমাজ পার্টি নেতা মুলায়ম সিং এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো পক্ষেই প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য এখন পর্যন্ত দেননি। এই জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হতে পারেন জয়ললিতা, সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা মুলায়ম সিং যাদব কতখানি উৎসাহ দেখাবেন, তা দেখার বিষয়। এই জোট যদি নির্বাচন-পূর্ব সময় গড়ে ওঠে, তা দুই বৃহৎ জোটের বৃহৎ শরিক বিজেপি ও কংগ্রেসের জন্য কত বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তা হয়তো মাস খানেকের মাথায় দৃশ্যমান হবে।
দুই আসন্ন নির্বাচন আগামী মে মাসে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বৃহৎ দলগুলো এপ্রিল মাসে নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছে। এ বিষয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন মতামত দেয়নি। অঙ্কের হিসাবে আগামী লোকসভা নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। ক্রমেই আগাম নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা বেশ কিছুদিন থেকে মাঠে গড়িয়েছে বিভিন্ন রাজ্য ও শহরগুলোতে দুই বড় দল তথা জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের বিশাল বিশাল জনসভার মাধ্যমে। এতে অগ্রগামী রয়েছেন বিজেপির নেতা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, যদিও রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী কি না, তা নিয়ে খোদ কংগ্রেসের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। অপরদিকে বিজেপির তথা জোটের প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদির সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। যতটুকু দৃশ্যমান তাতে মনে হয়, এযাবৎ বিজেপির পাল্লাই বেশ ভারী। যদিও ১৯৯৪ সালে ভারতের গুজরাটের দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসের অভিযোগের ও প্রচারণার জবাবে পুনর্জীবিত হয় ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর ১৯৮৪ সালে শিখ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। ১৯৮৪ সালে সবচেয়ে বড় দাঙ্গা হয় দিল্লির রাজনগরে। আগামী নির্বাচনে ওই দাঙ্গার বিষয়টি বেশ বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াতে এই দাঙ্গা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক।
এ বিতর্ক কংগ্রেসকে ক্রমেই কোণঠাসা করছে। এই বিতর্কে যোগ দিয়েছে দিল্লির এএপি সরকার। ইতিমধ্যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এবং কেবিনেট ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার ওপরে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এসআইটি) গঠনের সিদ্ধান্ত দিল্লির লে. গভর্নরের কাছে সুপারিশ আকারে পাঠিয়েছে। লে. গভর্নরের অনুমোদনের পর প্রায় এক বছর লাগবে তদন্ত সমাপ্তির। বিষয়টি এএপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে দূরত্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজেপি শুধু পালে হাওয়া দেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। প্রসঙ্গত দাঙ্গা ঘটার ৩০ বছর পার হলেও বিচার হয়নি। শুধু ১৯৮৪ সালের দাঙ্গাই নয়, কংগ্রেসকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক হচ্ছে ১৯৮৪ সালের ৩ থেকে ৮ জুন অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির অভিযান ‘অপারেশন ব্লুস্টার’-এ অত্যধিক শক্তি ব্যবহারে ব্যাপক প্রাণহানি এবং ওই সামরিক অভিযানে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা নিয়েও স্মরণযোগ্য যে, ওই অভিযানের জের হিসেবেই ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শিখ দেহরক্ষীদের হাতে নিহত হন। ব্রিটেন অবশ্য সক্রিয় সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে শুধু পরামর্শের কথা বলে জানিয়েছে যে ভারত ব্রিটেনের পরামর্শ গ্রহণ না করে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিল। বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনার আশা রাখি। এসব বিতর্ক কংগ্রেসকে যথেষ্ট বেকায়দায় ফেলেছে। তার ওপরে রয়েছে বিগত ১০ বছরের দুর্নীতি আর অব্যবস্থার। বিজেপি এসব বিষয়কেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অনেকেই মনে করেন।
তিন বিজেপি এবার বেশ চাঙা অবস্থাতেই রয়েছে বলে মনে হয়। এরই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। নরেন্দ্র মোদি এখন বিজেপির সম্মুখ সিপাহসালার, যে কারণে মোদি সারা ভারত চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্যের সমর্থন আদায়ের প্রয়াসে। নজর রয়েছে উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিম বাংলার দিকে। বিজেপির টার্গেট ২৭২ আসন অথবা ততধিক যে অঙ্কটি এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না, আগামী নির্বাচনে ভারতের কেন্দ্রে একক দল হিসেবে কোনো দল সরকার গঠনের মতো সমর্থন পাবে। সে কারণেই কংগ্রেস ও বিজেপিকে আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এ কারণেই বিজেপির টার্গেট অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে লোকসভার ৪৪ আসনের পশ্চিম বাংলার দিকে। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনের আগাম প্রচারণা হিসেবে কলকাতায় এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। বিভিন্ন মিডিয়া এবং তথ্য অনুযায়ী কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে বিজেপির জনসভায় প্রায় ১ দশমিক ৫ লাখ (এক লাখ পঞ্চাশ হাজার) লোকের সমাগম ঘটে। ওই জনসভায় মোদি বামপন্থীদের ৩৪ বছরের শাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, উন্নয়নধারাকে আরও জোরদার করতে হলে কেন্দ্রে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বাংলা-দরদি লোকের প্রয়োজন। ওই সভায় মোদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেননি, যদিও এর আগে একই স্থানে অন্য এক জনসভায় মমতা মোদিকে ইশারা করে বলেছিলেন যে তিনি দিল্লিতে ‘দাঙ্গার মুখ’ দেখতে চাইবেন না। তথাপি মমতা মোদির ভাষণের প্রতিবাদ করেননি। মোদি তাঁর ভাষণে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিম বাংলাকে অবহেলা করার অভিযোগ বারবার উত্থাপন করেন।
এমনও অভিযোগ করেন যে বাংলার সবচেয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদকেও কংগ্রেস উপেক্ষা করেছে। তিনি বলেন যে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেসের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা থাকলেও ‘দাদা’কে ওই পদ না দিয়ে বাংলার প্রতি একধরনের অন্যায় করেছে। মোদি কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে পারলে মমতাকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করে বাংলার চেহারা পাল্টানোর অঙ্গীকার ওই সভায় একাধিকবার করেছেন। এত তুষ্টির পরও তৃণমূল অথবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। অপরদিকে বিগত বাম সরকারের কঠোর সমালোচনা করাতে সিপিএম সহজে মোদিকে গ্রহণ করছে না। সিপিএমের মতে, মোদি-মমতার কোনো ধরনের সমঝোতা হলে তাতে মমতার ক্ষতিই হবে। কারণ পশ্চিম বাংলায় প্রায় ২৪ শতাংশ ভোট রয়েছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের। মোদির ‘দাঙ্গা মুখ’ ওই ভোটারদের মমতাবিমুখ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিপিএম মমতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া উঠতে পারে। অবশ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দিল্লির সমীকরণে এক বড় ফ্যাক্টর, তা সব জোট বা ভারতের বড় দলগুলোর ধর্তব্যের মধ্যে রয়েছে। বাংলায় মোদির গ্রহণযোগ্যতা এবং মমতা-মোদি নির্বাচন-পূর্ব বা পরবর্তী সমীকরণ কেন্দ্রে বিজেপি সরকার গঠনের জন্য এক বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকবে। আর যদি তৃতীয় জোট গঠিত হয় সেখানেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠবেন অপরিহার্য। যেভাবেই হোক, পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী সরকার গঠনে বড় ফ্যাক্টর। তাই, মমতা রয়েছেন ফুরফুরে মেজাজে।
চার ভারতের আসন্ন লোকসভার নির্বাচন যে কংগ্রেস ও বিজেপির কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ, তার আলামত বিভিন্নভাবে প্রতীয়মান। তবে ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের তথা শাসক জোটের অবস্থা যে তেমন ভালো নয়, তা বেশ দৃশ্যমান। এককভাবে না হলেও বিজেপি জোটবদ্ধভাবে ভারতের পরবর্তী শাসক জোট হতে যাচ্ছে, তেমনটাই প্রতীয়মান। নরেন্দ্র মোদিই যে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন না অনেকেই। মোদি তাই তাঁর অতীত ছবি পরিবর্তনে সংখ্যালঘুদের ভোট অর্জনের সব চেষ্টা করেছেন। ব্রিগেড ময়দানের ভাষণে মোদি তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভারত থেকে বিতাড়িত করবেন বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা অবশ্যই আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়। মোদির এ দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানে যে পরিবর্তন হবে, তাতে সন্দেহ নেই। শুধু এ কারণেই নয়, বহুবিধ কারণে বাংলাদেশের কাছে ভারতের আগামী নির্বাচন যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করে। zএম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

বিএনপিকে মাঠে নামাতে মন্ত্রীদের উসকানি!

কূটনীতিকেরা বিএনপিকে দুই বছরের মধ্যে আন্দোলন না করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে গতকাল একটি পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ খবরের সত্যাসত্য সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। তবে বিএনপির নেতাদের হাবভাব দেখে মনে হয়, তাঁরা দুই বছর না হলেও আন্দোলনের জন্য সরকারকে কিছুটা সময় দিতে চান। এর আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের আগে দল গোছানোর কথা বলেছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি এ কথাও জানিয়ে দেন যে তাঁরা খুব বেশি দিন অপেক্ষা করবেন না। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৯-দলীয় জোটের ভেতরেও যে আন্দোলনে নামা না-নামা নিয়ে চাপান-উতোর চলছে, নানা সূত্রে তারও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এক মাস বয়সী সরকারের কতিপয় মন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলটিই চাইছে না বিএনপি বেশি দিন আন্দোলনের বাইরে থাকুক। মাঠ গরম না হলে এই শেষ শীতের দিনে তাঁদের ভালো লাগে না। গত বৃহস্পতিবার শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে উপজেলা নির্বাচনে অংশ কেন নিচ্ছে, সে জন্য বিএনপির কাছে কৈফিয়ত তলব করেছেন। এ নিয়ে মন্ত্রীর আত্মশ্লাঘার কিছু নেই। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণেই তো আমির হোসেনের মতো আরও অনেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে যিনি প্রথমে মন্ত্রীই হতে পারেননি।
কেননা, তিনি বিএনপির একজন নবীন নেতার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় খাদ্যমন্ত্রী হন এবং উপনির্বাচনে ইলেন ভুট্টোকে হারিয়ে সাংসদ হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার ইলেন ভুট্টোই নির্বাচিত হন। হেরে যান আমির হোসেন আমু। সে ক্ষেত্রে বিএনপি নির্বাচনে না আসায় তাঁর অন্তত সুবিধাই হয়েছে। বিএনপির কাছে কৈফিয়ত না চেয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারতেন। আর নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করে থাকলে সে জন্য জনগণ তাদের কাছে কৈফিয়ত চাইবে। এখন যদি বিএনপি ভুল বুঝতে পেরে উপজেলা নির্বাচনে শরিক হয়েও থাকে, সে জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে কেন? আমির হোসেন আমুরা যেহেতু নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধি মনে করেন, তাঁদেরই উচিত জনগণের কাছে কৈফিয়ত দেওয়া। এক মাসের বেশি সময় হলো, তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। এই সময়ে তাঁর মন্ত্রণালয়ে কী কাজ হয়েছে, সেটি জানার অধিকার দেশবাসীর আছে। এত দিন সব দুর্গতির জন্য তাঁরা বিরোধী দলের সংঘাত-সংঘর্ষ, হরতাল-অবরোধের অজুহাত দিতেন। এখন তো সেসব নই। তাহলে কেন শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ছে না? কেন কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না? কেন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলোর লোকসান বাড়ছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমির হোসেন আমু শিল্পবহির্ভূত বিষয় নিয়ে কথাবার্তাই বেশি বলছেন। আরেক মন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন একই দিন ফরিদপুরে ছাত্রলীগের কর্মী সম্মেলনে বিএনপির উদ্দেশে বলেছেন, তাদের আন্দোলন ঠেকাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। তাঁর এ কথাটি পত্রিকায় পড়ে দুই দশক আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য মনে পড়ে।
সে সময় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছিলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে ছাত্রদলই যথেষ্ট। আমাদের দেশে ক্ষমতা বদলায়, দল বদলায়, ক্ষমতাবানদের চরিত্র বদল হয় না। কঠিন সত্য হলো, খালেদা জিয়ার ছাত্রদল বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলা করতে পারেনি। তাঁকে শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। আর এখন তো বিরোধী দল আন্দোলনই করছে না। সংসদের ভেতরে যাঁরা বিরোধী দলের আসনে বসেছেন, তাঁরা নিষ্ক্রিয়, নির্জীব। একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলেও আছেন। দলের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন না করেও সাংসদ হয়েছেন, বিশেষ দূত হয়েছেন। রওশন এরশাদ নির্বাচন করে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ এখন সংসদেও গড়িয়েছে। রঙ্গভরা বঙ্গদেশে আরও কত কিছু দেখতে হবে। আর সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি ভোটে পরাজিত না হলেও রাজনৈতিক কৌশলে পরাজিত হয়ে এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরোধ ও দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। কর্মীদের অভিযোগ, নেতাদের কারণে আন্দোলন সফল হয়নি। এই অবস্থায় বিএনপির নেতারা যখন শিগগিরই আন্দোলনের চিন্তা করছেন না, তখন মন্ত্রীদের উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতির কী যুক্তি থাকতে পারে? বাংলায় একটি প্রবাদ আছে। সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। দেশে আন্দোলন নেই, হরতাল-অবরোধ নেই এটি সম্ভবত মন্ত্রীদের ভালো লাগছে না। এ কারণেই কি মন্ত্রীরা উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন? তবে গত মন্ত্রিসভার সদস্য যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে নব্য মন্ত্রীদের শিক্ষা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। সেই মন্ত্রিসভায় যাঁরা বড় বড় কথা বলতেন, তাঁদের অনেকেই এখন মন্ত্রিসভার বাইরে। পাঁচ বছর তাঁরা বিএনপি তথা বিরোধী দলকে গালমন্দ করে নিজেদের সফল মন্ত্রী হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। দিনের শেষে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। কেননা, শেষ বিচারে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার দায় শেখ হাসিনাকেই নিতে হবে।
বর্তমানে বিএনপি নাজুক অবস্থায় আছে, মানি। এর অর্থ এই নয় যে আওয়ামী লীগ খুব ভালো অবস্থায় আছে। বিএনপি নির্বাচন করেনি, তাই সংসদে বা সরকারে তার কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, ভালোমন্দের দায়ও তাদের নিতে হবে। কে কীভাবে নেন সেটাই দেখার বিষয়। ইতিমধ্যে মন্ত্রী পদমর্যাদার চিফ হুইফ সাহেব এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। দলের নেতা-কর্মীদের কাছে ক্রেস্ট না দিয়ে ক্যাশ নিয়ে আসার জন্য হুকুম দিয়েছেন। বিগত সরকারের ক্যাশ আদায়কারীরা এখন দুদকের সন্দেহ ও তদন্তের আওতায়। আমরা জানি না, উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে মন্ত্রীরা বিরোধী দলকে মাঠে নামাতে চাইছেন কেন? দেশে শান্তি আছে, এটি তাঁদের পছন্দ নয়? আবার কি মন্ত্রীরা ৫ জানুয়ারির আগের অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে নিতে চান? শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের মেয়াদ মাত্র এক মাস কয়েক দিন। এই কয়েক দিনে নিশ্চয়ই সরকার টের পেয়েছে, বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কৌশলে হারানো যত সহজ, দেশ চালানো তত সহজ নয়। এই এক মাস সময়ের মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে, এই এক মাস সময়ের মধ্যেই দাম না পেয়ে কৃষকেরা আলু রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন। এই সময়ের মধ্যেই জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি-সুবিধা সহজে ফিরিয়ে দিচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই সরকারপ্রধানকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি সাধ্যমতো সেগুলো সমাধানেরও চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রীই সম্ভবত সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছেন না। আর সে কারণেই বিরোধী দলকে রাজপথে নিয়ে আসার জন্য উসকানি দিয়ে যাচ্ছেন। এটি থামানো প্রয়োজন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net