Friday, June 22, 2018

নিপীড়ন আর হত্যাযজ্ঞ কেন ‘দুই পক্ষের সংঘাত’ আখ্যা পায়? by ড. রামজি বারুদ

গ্রেট রিটার্ন মার্চ কর্মসূচি চলাকালে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি স্নাইপারের গুলিতে আহত বিক্ষোভকারীকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন সহযোদ্ধারা। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির পক্ষে ছবিটি তুলেছেন সাংবাদিক আদেল হানা।
ড. রামজি বারুদ মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে লিখছেন ২০ বছর ধরে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার-এ ফিলিস্তিন অধ্যয়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন তিনি। ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া আরব বংশোদ্ভূত এই আমেরিকান বেড়ে উঠেছেন পৃথিবীর বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগারখ্যাত গাজা উপত্যকার শরণার্থী শিবিরে। তার বাবা জীবনভর লড়েছেন ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার দাবিতে। বারুদ নিজেও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার পক্ষে একজন সোচ্চার কণ্ঠস্বর। বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিদ্বান হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন বিশ্বজুড়ে। বারুদ ২০টিরও বেশি দেশে বক্তৃতা করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন অতিথি-প্রভাষক হিসেবে। স্বনামধন্য এই আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্টের সাড়া জাগানো বই ‘পৃথিবীর প্রান্তে: একটি ফিলিস্তিনি আখ্যান’ (দ্য লাস্ট আর্থ, অ্যা প্যালেস্টানিয়ান স্টোরি)। সার্চিং জেনিন, দ্য সেকেন্ড প্যালেস্টাইনিয়ান ইন্তিফাদা, মাই ফাদার ওয়াজ অ্যা ফ্রিডম ফাইটার : গাজাস আনটোল্ড স্টোরি নামেও বই লিখেছেন তিনি।
১৯৯৯ সাল থেকে প্যালেস্টাইন ক্রনিক্যাল সম্পাদনা করছেন বারুদ। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দুই বছর দায়িত্ব পালন করেছেন লন্ডনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের উপ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে। কাতারভিত্তিক আল জাজিরার হয়েও একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আলজাজিরা-ইংলিশের গবেষণা ও অধ্যয়ন বিভাগের শীর্ষ ব্যক্তির পদেও ছিলেন তিনি। ফরাসি, তুর্কি, আরবি ও কোরিয়ানসহ নানা ভাষায় তার বইয়ের অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদার সময় বারুদ ১৫ বছরের কিশোর। কাতারভিত্তিক আলজাজিরায় গত বছর (২০১৭) ডিসেম্বরে লেখা তার এক নিবন্ধ (চিলড্রেন অব স্টোনস: দ্য ডে প্যালেস্টাইন ওয়াজ রিবর্ন) থেকে জানা যায়,  মুক্তির লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় যুক্ত ছিলেন তিনি। ওই বছরেই ইসরায়েলি দখলদারিত্ব আর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের সূচনা করেছিল ফিলিস্তিনিরা। পরিচয় আর মর্যাদা রক্ষায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভারি মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের মুক্তিকামী প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল পাথরকে অস্ত্র বানিয়ে। বারুদ মনে করেন, তার নিজের পাশাপাশি প্রত্যেক ফিলিস্তিনির পুনর্জন্ম প্রথম ইন্তিফাদার মধ্য দিয়ে, তারা প্রত্যেকেই ‘পাথরের সন্তান’।
প্যালেস্টাইন ক্রনিক্যাল ও মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে বারুদ ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংকটকে ‘সংঘাত’ নামে ডাকার ভয়াবহতা উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন। সংকটের নেপথ্যের মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতির রাজনৈতিকতাকে সামনে এনে তিনি ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষার অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি নতজানু নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সেই অংশকে তিনি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি শুড নট স্ট্যান্ড বাই এজ ইসরায়েল অ্যাবিউজ প্যালেস্টানিয়ানস’ শিরোনামে লেখা বারুদের সেই নিবন্ধের পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য তুলে ধরা হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকের জন্য। ভাষান্তর করেছেন, ফাহমিদা উর্ণি।
ফিলিস্তিনে যা ঘটছে তাকে ঠিক ‘সংঘাত’ বলা যায় না। আমরা শব্দটি ব্যবহার করি ঠিকই, তবে ‘সংঘাত’ শব্দ দিয়ে আসলে সেখানকার পরিস্থিতি বোঝানো যায় না। ‘সংঘাত’ বললে মনে হয়, যেন জাতিসংঘের অগণিত প্রস্তাব লঙ্ঘনকারী সামরিক শক্তি ইসরায়েল আর অবদমনের শিকার ফিলিস্তিন একই কাজ করছে। ‘সংঘাত’ এমন এক অস্পষ্ট পরিভাষা যা ব্যবহার করে জাতিসংঘের মার্কিন দূত নিকি হ্যালি ইসরায়েলের ‘নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতের অধিকার’ থাকার কথা বলতে পারেন। তার কথায় মনে হয়, যেন সামরিক দখলদারিত্বে উপনিবেশিত থাকা ফিলিস্তিনিরাই তাদের দখলদার আর নিপীড়ক ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আসলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কুয়েত উত্থাপিত এক খসড়া প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে হ্যালি ইসরায়েলের সুরক্ষার প্রশ্নটি সামনে এনেছিলেন। নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত ওই খসড়া প্রস্তাবটিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যুনতম পর্যায়ের সুরক্ষা চাওয়া হয়েছিল। হ্যালি ওই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিলেন। যার মানে, ফিলিস্তিনিদের দুর্দশাকে উপেক্ষা করে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ধারাবাহিকতা রক্ষা। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র যে এ পর্যন্ত ৮০টি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে, তার বেশিরভাগই ইসরায়েলকে সুরক্ষার জন্য। ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম কোনও প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিলো ১৯৭২ সালে। আর সর্বশেষ হ্যালি নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিলেন গত ১ জুন।
ভোটাভুটির আগে খসড়া প্রস্তাবটিকে নমনীয় করতে তিনবার পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রথমে খসড়া প্রস্তাবটিতে ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে সব ফিলিস্তিনির সুরক্ষা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তাবে শুধু ‘গাজা উপত্যকাসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পদক্ষপ’ নেওয়ার কথা বলা হয়। তারপরও হ্যালির কাছে একে ‘প্রচণ্ডরকমের একপেশে’ বলে মনে হলো। ঐকমত্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে থাকা কুয়েতের খসড়া প্রস্তাবটি হ্যালির নিজস্ব একটি প্রস্তাবের কারণে পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়। হ্যালির ওই খসড়া প্রস্তাবে দাবি করা হয়, ফিলিস্তিনি গ্রুপগুলো গাজায় ‘সব ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড’ চালাচ্ছে। ‘উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড’ বলতে গাজা উপত্যকায় বসবাসরত লাখো ফিলিস্তিনির কয়েক সপ্তাহের গণ-আন্দোলনকে ইঙ্গিত করেছেন হ্যালি। কয়েক সপ্তাহ ধরে [ভূমি দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘গ্রেট রিটার্ন মার্চ’ নামে] শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছিলেন ফিলিস্তিনিরা। তাদের আশা ছিল, এ বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে গাজায় ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিষয়টিকে জাতিসংঘের আলোচ্যসূচিতে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে।
ভূমি দিবসের কর্মসূচি 'গ্রেট রিটার্ন মার্চ'
নিজেদের পাল্টা প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি ভোটই পেতে সমর্থ হয়েছে, সেটি তাদের নিজের ভোট। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ ধরনের দৈন্যকে যুক্তরাষ্ট্র পাত্তা দেয় না। যেনতেনভাবে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতে নিজের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও পররাষ্ট্র নীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতেও ভ্রুক্ষেপ করছে না দেশটি। এমনকি যে নিরস্ত্র পর্যবেক্ষকেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কেবল প্রতিবেদন তৈরি করেন; তাদের হাত থেকেও ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়ার তাগিদ বোধ করে যুক্তরাষ্ট্র। যেমনটা ঘটেছিল টেম্পরারি ইন্টারন্যাশনাল প্রেজেন্স ইন হেবরন (টিআইপিএইচ) নামের পর্যবেক্ষক দলের ক্ষেত্রে। ১৯৯৬ সালের মে মাসে টিআইপিএইচ প্রতিষ্ঠিত হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনি শহরের পরিস্থিতি নিয়ে বেশকিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদনটি ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত এলাকা এইচ-টু এর পরিস্থিতি নিয়ে। কিছু সহিংস অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ওই অঞ্চলটি ইসরায়েলি বাহিনী নিয়ন্ত্রণাধীন রাখত। নরওয়েজিয়ান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল জ্যান ক্রিস্টেনসেন টিআইপিএইচ-এর নেতৃত্ব দিতেন। প্রথমে এর সদস্য সংস্খ্যা ৬০ থাকলেও তা বাড়িয়ে পরে ৯০ করা হয়। ২০০৪ সালে হেবরনে এক বছরের মিশন পরিচালনা শেষে তিনি বলেছিলেন: ‘হেবরনের এইচ-টু এলাকায় সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা মিলে  অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি করছে। এক অর্থে সেখানে নিধনযজ্ঞ চলছে। অন্য অর্থে, এ পরিস্থিতি যদি আরও কয়েক বছর ধরে চলতে থাকে, তবে আর কোনও ফিলিস্তিনি সেখানে থাকবে না।’
তখন থেকে হেবরনে কী পরিস্থিতি চলছে, কারও পক্ষে সেটা কেবল কল্পনাই করা সম্ভব। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা এতোটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠে যে তারা ফিলিস্তিনিদের ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করতে শুরু করে। এর জন্য তাদের কোনও পরিণামও ভোগ করতে হয় না। একবার ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল ঠাণ্ডা মাথায় খুনের এক ঘটনা। ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে এক ইসরায়েলি সেনা প্রতিবন্ধী এক ফিলিস্তিনির মাথায় গুলি চালায়। নিহত ব্যক্তির নাম আব্দ আল-ফাত্তাহ আল শরিফ। তার বয়ষ ছিল ২১। হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যটি ভিডিও করেন ইমাদ আবু শামসিয়া নামের এক ব্যক্তি। ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ইসরায়েলকে চরম লজ্জার মুখে ফেলে দেয়। আল শরিফের হত্যাকারীর বিরুদ্ধে বিচার শুরু করতে বাধ্য হয় তারা। বিচার শেষে হত্যাকারীকে লঘু দণ্ড দেওয়া হয়। আর কারামুক্তির সময় তাকে দেওয়া হয় নায়কোচিত সংবর্ধনা। উল্টোদিকে ওই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ধারণকারী আবু শামসিয়া ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের হয়রানির শিকার হন। অসংখ্যবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয় তাকে।
ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আহত এক ফিলিস্তিনি শিশু
ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আহত এক ফিলিস্তিনি শিশু
খবরদাতাকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা ইসরায়েলে নতুন নয়। ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে তার কিশোরী মেয়ের সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করায় আহেদ তামিমির মা নারিমানকে আটক করে সাজা দেওয়া হয়েছিল। ইসরাযেলি সেনাদের অত্যাচারের শিকার ফিলিস্তিনি যদি নিজেই সে ঘটনা রেকর্ড করেন তবে তার জন্যও শাস্তি পেতে হয়। একইসময়ে সেনাদেরকে তাদের খেয়াল-খুশিমতো চলার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিনের এ বাস্তবতাকে আইনে পরিণত করার জন্য এখন প্রক্রিয়া চলছে। মে মাসের শেষ দিকে ইসরায়েলি পার্লামেন্টে (নেসেট) একটি প্রস্তাব আনা হয়। ওই প্রস্তাবের আওতায় ‘ইসরায়েলি সেনাদের দখলদারিত্বের ছবি ও ভিডিও’ ধারণ নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়। বলা হয়, যারা দায়িত্ব পালনরত সেনাদের ছবি তুলবে ও ভিডিও ধারণ করবে তাদেরকে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে। এই ধারারর ‘অপরাধী’দেরকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার সুপারিশ করা হয় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান সমর্থিত প্রস্তাবটিতে। প্রায়োগিক অর্থে যার মানে হলো ইসরায়েলি সেনাদের ওপর যেকোনও ধরনের নজরদারিই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বলে বিবেচিত হবে। একে অব্যাহত যুদ্ধাপরাধের অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?
মায়ের সঙ্গে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীকে রূপান্তরিত আহেদ তামিমি
দ্বিতীয় একটি প্রস্তাবে সামরিক অভিযানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সন্দেহভাজন বলে বিবেচিত সেনাদের দায়মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এলি বেন দাহানের উদ্যোগে বিলটি উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং ইসরায়েলি নেসেটে তা সমর্থন কুড়াচ্ছে। ইসরায়েলি +৯৭২ ওয়েবসাইটে ওরি নয় লিখেছেন: ‘সত্যি কথা হলো, দাহানের বিলটি একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।’ ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিনের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করেছেন ওরি নয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অধিকৃত ভূখণ্ডে যেসব সেনা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী বলে অভিযোগ করা হচ্ছে তাদের জন্য প্রায় পূর্ণাঙ্গ দায়মুক্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে।’ এখন ফিলিস্তিনিরা আগের চেয়ে অনেক বেশি অসহায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে ইসরায়েল এখন আগের চেয়ে আরও বেশি নিষ্ঠুর। এ ট্র্যাজেডি দিনের পর দিন চলতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো-যারা কিনা যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও তাদের লজ্জাজনক ভেটো থেকে স্বাধীন; তাদেরকে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের নৈতিক দায়িত্ব নিতে হবে। ফিলিস্তিনিদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে কার্যকর সুরক্ষা।
ইসরায়েল মুক্তভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যেতে পারে না।  আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও নিরন্তর উন্মোচিত হতে থাকা এসব রক্তক্ষয়ী দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা উচিত নয়।

একটি অসম প্রেম বিয়ে, অতঃপর...

ভালোবেসে নিজের ঘর ছেড়েছেন, দেশ ছেড়েছেন ডায়ানা ডি জয়সা (৬০)। পাড়ি জমিয়েছেন শ্রীলঙ্কায়। সেখানে গিয়ে বিয়ে করেছেন ২৬ বছর বয়সী হোটেলবয় প্রিয়ঞ্জনা ডি জয়সাকে (২৬)। এক ছুটির দিনে তাদের জানাশোনা হয়। তারপর তা প্রেমে গড়ায়। তাদের মধ্যে এমন অসম প্রেম গড়ে উঠলেও সব কিছু চলছিল ঠিকঠাক। তাতে ছন্দপতন ঘটে গত বছর। ওই সময় তার স্বামী প্রিয়ঞ্জনাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই থেকে হাজার হাজার পাউন্ডের ঋণে আটকা পড়ে আছেন ডায়ানা। তার কাছে এখন শ্রীলঙ্কার জীবন এক বন্দিশিবিরের মতো। ওই ঋণ তিনি শোধও করতে পারছেন না। ফিরে যেতেও পারছেন না নিজের দেশ বৃটেনের এডিনবার্গে। তাই তার কাছে মনে হচ্ছে তিনি আটকা পড়েছেন শ্রীলঙ্কায়। তার ধারণা সেখানেই তাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। তিনি বলেছেন, স্বামী প্রিয়ঞ্জনা ডি জয়সাকে সব মিলিয়ে এক লাখ পাউন্ডের মতো দিয়েছেন গত বছর সে মারা যাওয়ার আগে। ডায়ানার বিশ্বাস ওই অর্থের খবর পেয়ে কুচক্রীমহল তার কাছে ঘুষ বা উৎকোচ দাবি করেছিল। তা না পেয়ে তারা হত্যা করেছে তার স্বামীকে। এখন তার হাতে বৃটেনে ফিরে যাওয়ার মতো অর্থ নেই। অথচ শ্রীলঙ্কায় এসে হোটেল কাজ করা তার স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে তিনি স্কটল্যান্ডের রাজধানীতে নিজের বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কা থেকে ডায়ানা ডেইলি রেকর্ডকে বলেছেন, আমি শ্রীলঙ্কায় আটকা পড়েছি। এখানেই আমাকে মরতে হবে। শ্রীলঙ্কা ছাড়তে হলে আমাকে দেশে বাদবাকি যা আছে তা বিক্রি করতে হবে। তারপর আমি বিমানের টিকিট কেটে ফিরতে পারবো দেশে। হয়তো সেখানে গিয়ে একটি ফ্লাট নিয়ে নিতেও পারবো। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় গত এক বছরে তেমন পরিবর্তন দেখিনি। শুধু আমিই প্রচুর পরিমাণে ঋণে ডুবে গিয়েছি। ডায়ানা বলেছেন, তিনি যে বাড়িটি কিনতে ৬০ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন তা এখন বিক্রি করে দিতে চান। কিন্তু এতে বাকি আত্মীয়-স্বজন তাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এখানেই শেষ নয়। একটি মিনিবাস কিনতে নিজের স্বামীকে ৩১ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন ডায়ানা, যাতে সে একজন চালক হয়ে উঠতে পারে। ডায়ানা বলেন, প্রিয়ঞ্জনার এক বন্ধু আমাকে বলেছেন, তারা তাকে নিয়ে ঈর্ষান্বিত ছিল। কারণ, প্রিয়ঞ্জনা অর্থশালী হয়ে উঠেছিল। সে একটি চমৎকার বাড়ি কিনেছিল। একটি মিনিবাস ও একটি টুক-টুক কিনেছিল। ওইসব বন্ধু তাকে ব্লাকমেইল করেছিল। তাই প্রিয়ঞ্জনা তাদের কিছু অর্থ দিয়েছিল। তারা তার কাছে আরো অর্থ দাবি করছিল। কিন্তু সে তাদেরকে বাড়তি অর্থ দেয়নি। এ জন্য তারা তাকে গুলি করে।
একনজরে ডায়ানা ও প্রিয়ঞ্জনা: ২০১১ সালের নভেম্বরে শ্রীলঙ্কায় এক ছুটি কাটাতে এসেছিলেন ডায়ানা। সেখানে হোটেলের এক কর্মচারী তখন প্রিয়ঞ্জনা। সেখানেই তাদের সাক্ষাৎ হয়। গড়ে ওঠে আন্তরিকতা। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের জুনে ডায়ানা আবার প্রিয়ঞ্জনাকে দেখতে ফিরে আসেন শ্রীলঙ্কা। এবার প্রেমে বাঁধা পড়েন তিনি। সেই বাঁধন তিনি ছিঁড়তে পারেননি। এর শেষ পরিণতি ঘটে তাদের বিয়ের মধ্য দিয়ে। বিয়ের পর ডায়ানা ফিরে যান দেশে। ওই বছরের নভেম্বরে তিনি তার এই স্বামীকে দেখতে আবার ফেরেন শ্রীলঙ্কায়। এ সময়েই তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিক ছবি ধারণ করে তা প্রকাশ করা হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিয়মিতভাবে নিজের দেশ স্কটল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় আসা-যাওয়া করতে থাকেন ডায়ানা। তিনি ছিলেন এডিনবার্গ কাউন্সিলের একজন ওয়ার্কার। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এডিনবার্গে নিজের বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে চলে আসেন শ্রীলঙ্কায়। প্রিয়ঞ্জনা শ্রীলঙ্কায় ভিন্ন একটি শহরে কাজ পাওয়ায় ওই বছরের জুনে তিনি অল্প সময়ের জন্য ফিরে যান স্কটল্যান্ডে। আবার সেপ্টেম্বরে তিনি ফিরে আসেন। কারণ, তিনি স্বামী প্রিয়ঞ্জনা থেকে আলাদা থাকতে চাননি। ২০১৭ সালের মে মাসে প্রিয়ঞ্জনাকে গুলি করা হয়। অভিযোগ করা হয় একদল মানুষ তার কাছে উৎকোচ দাবি করছিল। তা না পেয়ে তারা তাকে গুলি করে। আর এ বছরের জুনে ডায়ানা বললেন, তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে যেতে পারছেন না। কারণ, তিনি অনেক ঋণে ডুবে আছেন। তিনি আরো বলেছেন, জমানো অর্থ খরচ করে নিজেকে এবং প্রয়াত স্বামীর পরিবারকে চালিয়ে নিচ্ছেন। তার নিজেরও চিকিৎসা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

নারী নির্যাতন মামলায় কম সাজার নেপথ্যে by মরিয়ম চম্পা

নারী নির্যাতন মামলা হয়। কখনো কখনো আসামিরা জেলও খাটে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শেষ পরিণতি হয় মীমাংসা। সামাজিক মর্যাদা, সম্মানহানি, কখনো কখনো আসামি পক্ষের সঙ্গে সমঝোতায় মাঝপথে থেমে যায় মামলার গতি। এমন অনেক ঘটনার মধ্যে মোহনার কাহিনীও একটি। আবেগ আর ভাবাবেগে ভেসে বেড়িয়েছে সুমন ও মোহনা। দীর্ঘ সময় প্রেমের হাওয়ায় দুলে তারা সিদ্ধান্ত  নেয় বিয়ে করার। বিয়েও করে। বছর দুয়েক ভালোই চলছিল তাদের সংসার। এ সময়ের মধ্যে মোহনার কোলজুড়ে আসে এক পুত্র সন্তান। হঠাৎ ঠুনকো এক বিষয় নিয়ে শুরু হয় দাম্পত্য কলহ। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, মোহনা তার স্বামী সুমনকে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়। উঠেন বাবার বাড়ি। রাগে-ক্ষোভে মোহনাকে নিয়ে তার পিতা রহিম মাতব্বর ছুটেন আদালতে। আইনজীবীর পরামর্শে  মোহনাকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। একদিন পর ফিজিক্যাল এ্যাসাল্ট সনদ নেয়া হয়। কাজী অফিস থেকে কাবিননামার কপি সংগ্রহ করে ফের ছুটে যান আইনজীবীর কাছে। এরপর দেয়া হয় নারী নির্যাতন মামলা। মোহনা বাদী হয়ে স্বামী, বৃদ্ধ শ্বশুর ও শাশুড়িকে আসামি করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল’ আদালতে মামলা করেন। বিজ্ঞ বিচারক মোহনার জবানবন্দি শুনে মামলাটি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জকে মামলা এজাহার হিসেবে গণ্য করে নিয়মিত মামলা রুজু করার নির্দেশ দেন। ওসি মামলাটি এজাহার হিসেবে রুজু করে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রেরণ করেন। চার্জশিট দাখিলের আগ পর্যন্ত স্বামী সুমন ও তার বৃদ্ধ মা-বাবা ওই মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যায়। প্রথমত জামিন অযোগ্য ধারার অপরাধ, দ্বিতীয়ত এ মামলায় জামিন দেয়ার এখতিয়ার সাধারণত নিম্ন আদালতের নেই। মামলা থেকে বাঁচতে আসামিরা বাদী মোহনার সঙ্গে আপোষের চেষ্টা চালায়। মোহনাও নিজ সন্তান ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে আপোষে রাজি হন। কিন্তু এরই মধ্যে স্বামী সুমন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। মোহনা ছুটে যায় থানায়। ওসি ও তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আপোষের কথা খুলে বলেন এবং তার স্বামীকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু এখানে রয়েছে আইনের মারপ্যাঁচ। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়ার সুযোগ নেই। বাদী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যান আদালতে। সুমনের আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন, বাদী মোহনা ও তার আইনজীবী আদালতে দাঁড়িয়ে ‘আসামির সঙ্গে আপোষ-মীমাংসা হয়ে সুখে দাম্পত্য কাটানোর কথা বলে আসামির জামিনে অনাপত্তির আবেদন জানায়। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার্যযোগ্য হওয়ায় এবং ম্যাজিস্ট্রেটের জামিন দেয়ার এখতিয়ার না থাকায় ম্যাজিস্ট্রেট জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। সুমনের জায়গা হয় জেল হাজতে। নিম্ন আদালতের নথি তলব, জামিন শুনানির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ শেষে প্রায় দেড় মাস পর সুমন জামিনে মুক্তি পায়।
আরেক ঘটনা। রাজধানীর শ্যামলীতে ১৩ বছরের পিংকীকে উত্ত্যক্ত করতো এলাকার দুই যুবক। ২০১০ সালের ১৯শে জানুয়ারি পাড়ার ওষুধের দোকানে অপেক্ষারত দুই যুবক মেয়েটির হাত ধরে টানাহেঁচড়া করে, চড়-থাপ্পড় মারে। রাগে ক্ষোভে ও অপমানে ঘরে ফিরে পিংকী আত্মহত্যা করে। মারা যাওয়ার আগে আত্মহত্যার কারণ চিরকুটে লিখে যায়। অভিযুক্ত দুজন গ্রেপ্তার হয়ে বছর না ঘুরতেই জামিনে বেরিয়ে আসেন। গত সাড়ে সাত বছর ধরে এ ঘটনার আদালতে বিচার চলছে। এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনজন আত্মীয়। ২০০৭ সালে ঢাকায় আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরছিল ১৩ বছরের এক মেয়ে। পূর্বপরিচিত দুজন তরুণ তাকে ডেকে নিয়ে সারা রাত আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পরে ধর্ষিতার মা মামলা করেন। ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পেয়েছিলেন ডাক্তার। কিন্তু পুলিশ এক আসামির হদিস বের করতে না পারায় তিনি অব্যাহতি পান। অন্যজন প্রায় আট বছর বিচার চলার পর সাক্ষীর অভাবে খালাস পান। মেয়েটির পরিবার বলছে, দুজনই এখনও এলাকায় আছেন।
ঢাকা জেলার একাধিক ট্রাইব্যুনালে আসা ট্রাইব্যুনালগুলোর বিচারিক নিবন্ধন থেকে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌতুকের জন্য হত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা আর যৌন পীড়নের মতো গুরুতর অপরাধে ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আসা ৭ হাজার ৮৬৪টি মামলার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছে একটি গণমাধ্যম। তখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল ৪ হাজার ২৭৭টি মামলা। সাজা হয়েছিল মাত্র ১১০টি মামলায়। অর্থাৎ সাজা হয়েছিল ৩ শতাংশের কম ক্ষেত্রে। বাকি ৯৭ শতাংশ মামলার আসামি হয় বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে, নয়তো পরে খালাস হয়ে গেছে। মামলাগুলো বেশির ভাগ থানায় করা। কয়েক শ’ মামলা হয়েছে সরাসরি ট্রাইব্যুনালে। সবক’টিরই তদন্তের ভার পুলিশের। তদন্তে অবহেলা, গাফিলতি ও অদক্ষতাও দেখা গেছে। আদালতে সাক্ষী আনা আর সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে পুলিশ আর পিপিদের অযত্ন ও গাফিলতি থাকে। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কখনো আদালতের বাইরে আপোষ হয়। অভিযোগকারীদের বড় একটি অংশ দরিদ্র। এসব অভিযোগকারীরা স্বল্প আয়ের পোশাককর্মী, গৃহকর্মী, বস্তিবাসী বা ছিন্নমূল নারী ও শিশু। তারা থানা আর আদালতে ঘুরে ঘুরে খরচপত্র করে একটা সময় গিয়ে আর মামলা টানতে পারেন না।
সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, নারী নির্যাতনের মামলায় নির্যাতিত নারীর দায়িত্ব হচ্ছে সঠিক সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করা। আর যে মামলায় সঠিক সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকবে উক্ত মামলা তো খারিজ হয়ে যাবে এবং আসামিও খালাস পেয়ে যাবে। কাজেই এই জাতীয় মামলায় বাদীকে অবশ্যই সঠিক সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করতে হবে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে মামলার আইনজীবীকে নির্দিষ্ট তারিখ বা কর্মদিবস সম্পর্কে সচেতন ও দায়িত্ববান হতে হবে। এক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় যে, বাদীপক্ষের আইনজীবী মামলার শুনানির তারিখে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকে। একইভাবে কখনো কখনো বাদী পক্ষের সাক্ষী নির্দিষ্ট তারিখে হাজির হতে পারে না। ফলে মামলা দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং বাদীপক্ষ আগ্রহ বা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কাজেই মামলার আইনজীবী, বাদী ও সাক্ষীর কনটিনিউটি ঠিক থাকলে মামলা তাড়াতাড়ি অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এতে করে বাদীপক্ষ যেমন আগ্রহ হারাবে না একই ভাবে আসামিরও খালাস পাওয়ারও সুযোগ থাকে না। 
মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, প্রাথমিকভাবে এই জাতীয় মামলা সিরিয়াস হলেও পরবর্তী কিছু দিন পরে আসামি কোনো না কোনোভাবে জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর নির্যাতিতাকে ভয় দেখানো, মামলা তুলে নেয়ার চাপ দেয়া থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে হ্যারাস করতে থাকে। এই ধরনের মামলায় আসামির বেল পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সময় শেষে আসামি কোনো না কোনো ভাবে জামিন পেয়ে যায়। প্রথমত অধিকাংশ বাদীই মামলা করার কিছুদিন পর উক্ত মামলার প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। যার জন্য মামলার ধীরগতিই দায়ী। তাই এই জাতীয় মামলা নির্দিষ্ট কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ১৫ দিনের মধ্যে পুলিশের চার্জশিট প্রদানসহ যাবতীয় কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া মামলার নিয়মিত নজরদারি ও একইসঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকতে হবে। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ, ডাক্তার, ভিকটিম, সাক্ষী, আইনজীবী ও বিচারক সকলকেই হেল্পফুল ও পজেটিভ হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এ বিষয়ে সরকারকে সবচেয়ে বেশি আন্তরিক হতে হবে। 
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার এবং সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ বলেন, নারী ও শিশু আইনের অধিকাংশই হচ্ছে মিথ্যা মামলা। কাজেই মামলা মিথ্যা হলে সেটা তো আর প্রমাণ হবে না। এই জাতীয় মামলার বেশির ভাগই সঠিক তদন্ত ও সঠিকভাবে পরিচালনার অভাব রয়েছে। কাজেই যেকোনো মামলার সুষ্ঠু তদন্তের অভাবে বা তদন্তের গাফিলতি থাকায় সে মামলা সঠিক ভাবে পরিচালিত হয় না। এছাড়া মামলা পরিচালনা করেন যে পাবলিক প্রসিকিউটর তাদের অধিকাংশেরই অদক্ষতা এর সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে কিছু কিছু বিচারকের কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৯৫% আসামি খালাস পেয়ে যায়। লিগ্যাল এইড সার্ভিস (ব্লাস্ট)’র আইনজীবী শারমিন আক্তার বলেন, এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে নির্যাতিত অধিকাংশ নারীই যে ভুলটি করে সেটা হচ্ছে তারা মামলার এজাহারে শুধুমাত্র যৌতুকের জন্য স্বামী মারধর করেছে কথাটি লিখে। একই সঙ্গে তাকে তালাকও দিতে চায় এ কথাটি না লিখে শুরুতেই মামলাটি হালকা করে ফেলে। অথচ প্রাথমিকভাবে তালাকের কথা উল্লেখ করলে আসামির খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। এছাড়া সরাসরি আদালতে পিটিশন মামলার ক্ষেত্রে ইনভেস্টিগেশনে যদি না আসে যে বাদিনী থানায় মামলা করতে গেলে স্থানীয় থানা মামলা না নেয়ায় বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা করেছে তাহলে আসামি খুব সহজেই খালাস পেতে পারে। অর্থাৎ অধিকাংশ ঘটনাই সত্য হওয়ার পরেও আইনের মারপ্যাঁচে বেশির ভাগ আসামি খালাস পেয়ে যায়। এক্ষেত্রে আইনজীবীরা যদি মামলাটিকে প্রপারলি পরিচালনা করে এবং বিচারকরা একটু কেয়ারফুল হলে আসামিদের খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

৯০ বছরেও জোটেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড by ‌মো. নজরুল ইসলাম টিটু

ক্রই হ্লা মারমা
বয়সের ভারে ন্যুব্জ ক্রই হ্লা মারমা। লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। স্বামী নেই। নেই সন্তানও। তার ভরণপোষণ বহনের নেই কেউ-ই। ৯০ বছরেও জোটেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড। তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘কতজনকেই দেখলাম, বয়স্ক ভাতার কার্ড পেতে। খালি আমারই জুটলো না। স্বামীকে হারিয়েছি অনেক আগে। অথচ, বিধবা ভাতাও পাইনি কখনও।’
বান্দরবানের থান‌চি সদর উপ‌জেলার সদর ইউনিয়‌নের ২নং ওয়ার্ড ছান্দাক পাড়ার বৌদ্ধ বিহা‌রে থাকেন ক্রই হ্লা মারমা। তিনি জানান, অনেক আগে তার স্বামী মারা গেছেন। এক সন্তান ছিল, সেও ছোটকালে মারা গেছে। আপন বলতে আর কেউ নেই তার। কাজ করার শক্তি হারানোর পর থেকে আশ্রয় নিয়েছেন বৌদ্ধ বিহা‌রে।
ক্রই হ্লা মারমা বলেন, ‘যারা বিধবা ও বয়স্ক ভাতা পায়। এ টাকা দিয়েই তাদের ভালোই চলে যায়। এসব ভাতা পাওয়া দূরের কথা, এ নিয়ে কেউ কখনও আমার কোনও খোঁজখবরই নেয়নি।’
তি‌নি ব‌লেন, ‘আমি এখন অনেক দুর্বল। এ বয়‌সে একটু‌ আরামের জন্য আমার এক‌টি বিছানা, বালিশ, পরিধানের কাপড় (থামি), স্যান্ডেল, তরল খাদ্য (হরলিকস, বার্লি, সাগু) ও ওষুধ প্রয়োজন। কিন্তু এসবের ব্যবস্থা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বৌদ্ধ বিহার আমার জন্য আর কত কর‌বে? তা‌দের কা‌ছে আর কত চাইবো? তা‌দের কার‌ণে তো‌ আমি এখনও বেঁচে আছি।’
চহ্লা মারমা নামে থান‌চির এক বা‌সিন্দা ব‌লেন, ‘আমি এই বৃদ্ধা‌কে বয়স্ক ভাতার কার্ড পাইয়ে দিতে অনেক‌দিন ধ‌রেই চেষ্টা চালি‌য়ে যা‌চ্ছি। কিন্তু এখনও সফল হতে পারিনি।’
এ ব্যাপারে উপ‌জেলার সদর ইউনিয়‌নের ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের নারী সদস্য চ‌লি চং মারমা ব‌লেন, ‘আমি অনেক দিন ধ‌রেই বৃদ্ধাকে চি‌নি। তি‌নি সরকারি কোনও সহ‌যো‌গিতা পাননি। আমি তা‌কে অনেকবার সহ‌যো‌গিতা দেওয়ার জন্য ভোটার আইডি‌ কার্ড চে‌য়ে‌ছি। কিন্তু তি‌নি আমা‌কে ব‌লে‌ছেন, এসব সহ‌যো‌গিতা আমার লাগ‌বে না; আমি ‌তো বৌদ্ধ বিহা‌রেই থা‌কি, খাই।
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি তার ভোটার আইডি কার্ড সংগ্রহ ক‌রে থান‌চি উপ‌জেলা সমাজ সেবা অফি‌‌সে জমা দি‌য়ে‌ছি। আশা কর‌ছি, শিগগিরই তি‌নি বিধবা ভাতা ও বয়স্ক ভাতা পা‌বেন।’ ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী‌ ক্রই হ্লা মারমার বর্তমান বয়স ৯০ বছর বলেও জানান তিনি।
এ ব্যাপারে বান্দরবান সমাজ‌সেবা অধি-দফত‌রের উপ-প‌রিচালক মিল্টন মুহুরী ব‌লেন, ‘আমি এ বৃদ্ধার বিষ‌য়ে আগে কখ‌নো শু‌নি‌নি। এখন জান‌তে পারলাম। আমি খবর নি‌য়ে  এই বৃদ্ধার জন্য যা যা কর‌তে হয়, করব।’