Monday, February 15, 2016

ভূমিকম্পে পর্বতে ধস

নিউজিল্যান্ডে আঘাত হানা ভূমিকম্পে ক্রিস্টচার্চ শহরের সমুদ্র উপকূলের কাছে একটি
শিলা পর্বত ধসে পড়ে। সেখান থেকে ধুলা ও বর্জিতাংশ ওই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
৫.৭ মাত্রার এ ভূকম্পনে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। হোয়াইট ওয়াশ
হেড এলাকা থেকে রোববার তোলা ছবি রয়টার্স

কোন দলে মনোনয়ন পাচ্ছেন কে?

যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনে কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। দলীয় মনোনয়ন লাভের জন্য জোর তৎপরতায় ব্যস্ত প্রধান দু’দল ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান পার্টি। দু’দলেরই মনোনয়ন লাভের জন্য লড়াইয়ে ব্যস্ত প্রার্থীরা। এর মধ্যে ডেমোক্রেট দলে শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও ভারমন্ট রাজ্যের সিনেটর বার্নি স্যান্ডারস। অন্যদিকে সমানতালে পাল্লা দিয়ে চলেছেন রিপাবলিকান শীর্ষ বাছাই ডোনাল্ড ট্রাম্প ও টেড ক্রুজ। এছাড়া দু’দলেই রয়েছেন আরও কিছু প্রার্থী। সবে শুরু হয়েছে মনোনয়ন লাভের প্রাইমারি নির্বাচন বা ককাস নির্বাচন। মাত্র দুটি রাজ্যে তা সম্পন্ন হয়েছে। ১ ফেব্র“য়ারিতে আইওয়া রাজ্যের ককাস নির্বাচন হয়। সেখানে হিলারি ক্লিনটন বিজয়ী হয়ে অর্জন করেছেন ৩২টি ডেলিগেটস। অন্যদিকে ৯ ফেব্রুয়ারি নিউ হ্যাম্পশায়ারে অনুষ্ঠিত হয় প্রাইমারি নির্বাচন। এতে হিলারিকে পরাজিত করে ৩৬টি ডেলিগেটস অর্জন করেন বার্নি স্যান্ডারস। এখনও বাকি রাজ্যগুলোর ককাস বা প্রাইমারি হবে। তাতে বাকি রয়েছে ৪৩২৪টি ডেলিগেটস। মনোনয়ন লড়াইয়ে জিততে হলে এর মধ্যে একজন প্রার্থীকে কমপক্ষে ২৩৮২ জন ডেলিগেটস পেতে হবে। এটা হল ডেমোক্রেট দলের চিত্র। অন্যদিকে আইওয়া রাজ্যের ককাসে রিপাবলিকান দলের শীর্ষ স্থানীয় প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজিত হন টেড ক্রুজের কাছে। এতে তিনি পান ১১ জন ডেলিগেটস। তবে তা আবার নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রাইমারিতে পুষিয়ে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি বিজয়ী হয়ে ওই রাজ্যের ১৭ জন ডেলিগেটই তার পকেটে। রিপাবলিকান দলের এখনও বাকি ককাস ও প্রাইমারি মিলে ডেলিগেটস রয়েছে ২৪২৬ জন। একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন পেতে হলে কমপক্ষে ১২৩৭ জন ডেলিগেটস পেতে হবে। কেবল এ মাসেই এই ককাস বা প্রাইমারি নির্বাচন শুরু হয়েছে। এখনও এ নির্বাচনের অনেক বাকি। চলবে ১৪ জুন পর্যন্ত। ফলে এখনও বলা সম্ভব নয় দলীয় মনোনয়ন লাভের দৌড়ে কোন দল থেকে কোন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হবেন। যারাই প্রাইমারিতে নির্বাচিত হন তাদের নভেম্বরে চূড়ান্ত নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। এ পর্ব শেষে ককাস ও প্রাইমারি মিলে প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে হবে ডেলিগেটসের ভিত্তিতে। ওদিকে সবার নজর এখন ডেমোক্রেট শিবিরে। কে এই দল থেকে মনোনয়ন পাবেন হিলারি ক্লিনটন নাকি বার্নি স্যান্ডারস। নাকি অন্য কেউ। এ দু’জনের মধ্যে যাচাই করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা হিসাব কষছেন ২০০১ সালে প্রথমবার নির্বাচিত সরকারি পদে আসীন হন হিলারি ক্লিনটন। ২০০৯ সালে সেই পদ থেকে সরে যান। তিনি ৮ বছর ওই দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে বার্নি স্যান্ডারস ১৯৮১ সালে প্রথমবার নির্বাচিত সরকারি পদে আসীন হন। তারপর থেকে এখন অবধি সেই দায়িত্বে আছেন। মোট তার কার্যকাল ৩৪ বছর। গড়ে একজন প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থীর যে সময় অভিজ্ঞতা থাকে তার চেয়ে তিনি ১৯ বছরের বেশি সরকারি পদে দায়িত্ব পালনকারী। অর্থাৎ হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞতার ঝুলি তার সরকারি পদে। তবে জনমত জরিপ বেশি ভাগ ক্ষেত্রেই যাচ্ছে হিলারি ক্লিনটনের দিকে। অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের শীর্ষ প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো সরকারি দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী। অকস্মাৎ রাজনীতিতে তার প্রবেশ। এরই মধ্যে তিনি নানা বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন। মুসলিম বিদ্বেষী হিসেবে সারাবিশ্বে প্রচার পেয়েছেন। তার দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী টেড ক্রুজ ২০১৩ সালে সরকারি নির্বাচিত দায়িত্বে আসেন। দু’বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন। ডেমোক্রেট দলের প্রার্থীরা হলেন হিলারি ক্লিনটন, বার্নি স্যান্ডারস, মেরিল্যান্ডের সাবেক গভর্নর মার্টিন ও’ম্যালে, রোড আইল্যান্ডের সাবেক নিরপেক্ষ গভর্নর ও রিপাবলিকান সিনেটর লিঙ্কন চ্যাফি, ভার্জিনিয়ার সাবেক সিনেটর জিম ওয়েব, হার্ভাডের প্রফেসর লরেন্স লেসিগ। তবে এরই মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন লিঙ্কন চ্যাফি, লরেন্স লেসিগ, ওম্যালে ও জিম ওয়েব।

‘বিচার’ হলে মাহ্ফুজ আনামের কেন? by আসিফ নজরুল

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামকে নিয়ে অভাবিত কর্মকাণ্ড চলছে দেশে। আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন এবং তাঁর পদত্যাগ ও তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার দাবি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাজপথে ছাত্রলীগের মিছিল হয়েছে, ছাত্রলীগ নেতাদের কর্তৃক এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত এক ডজনের বেশি মানহানির মামলা হয়েছে। সরকারের একজন আইনজীবী কর্তৃক তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের নালিশও করা হয়েছে।
মাহ্ফুজ আনামের ‘অপরাধ’ তিনি একটি স্বীকারোক্তি করেছিলেন কয়েক দিন আগে প্রচারিত একটি টিভি অনুষ্ঠানে। ২০০৭ সালের ১/১১-র সময় রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক প্রেরিত সংবাদ তিনি যাচাই না করে ছেপেছিলেন—এ জন্য তিনি সেখানে দুঃখ প্রকাশ করেন।
তিনি যে সংবাদ ছেপেছিলেন তাতে আওয়ামী লীগের একজন নেতা কর্তৃক আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার ‘দুর্নীতি’-এর বিবরণ দেওয়া ছিল। উপরিউক্ত বিবরণ রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা থেকে অন্য জাতীয় দৈনিকগুলোতেও সরবরাহ করা হয়েছিল। নূরুল কবীর সম্পাদিত নিউ এজ ছাড়া অন্য সব জাতীয় দৈনিকে এসব সংবাদ ছাপা হয়েছিল। তাঁদের কেউ এ জন্য দোষ স্বীকার করেননি, শুধু মাহ্ফুজ আনামই সেদিন প্রসঙ্গক্রমে এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ সে জন্যই তাঁকে এখন নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।
মাহ্ফুজ আনামের স্বীকারোক্তি ছিল শুধু শেখ হাসিনার তথাকথিত দুর্নীতির খবর যাচাই না করে ছাপানো নিয়ে। সেখানে প্রশ্ন হতে পারত: ১/১১-র আগে-পরে বা এখনো কি তিনি ও অন্য সম্পাদকেরা যাচাই না করে সংবাদ ছাপেন না? যেমন: ১৬৪ ধারায় বা পুলিশ-র্যা বের রিমান্ডে যেসব তথ্য স্বীকার করা হয়েছে বলে সংবাদপত্রকে জানানো হয়, তা কি তাঁর পত্রিকা বা অন্য কোনো সংবাদপত্র যাচাই করে দেখে? ১/১১-র সময়ে বা এর পরে যাচাই না করে অন্য রাজনীতিবিদ বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এসব সংবাদ ছাপানোর কারণে সম্পাদকদের কি দুঃখ প্রকাশ করা উচিত? বাংলাদেশে কখনোই কি সাংবাদিকদের সবকিছু যাচাই করার মতো সৎ সাংবাদিকতার পরিবেশ ছিল বা আছে? এর দায়ই বা আসলে কার?
আলোচনায় আসতে পারত যে সংবাদ মাহ্ফুজ আনাম ছেপেছিলেন তা সৃষ্টির দায়দায়িত্ব নিয়েও। কারা আওয়ামী লীগ নেত্রীসহ অন্য রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে দুর্নীতির খবরের জন্ম দিয়েছিলেন? কারা এগুলো ছাপানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন? তাঁদের কোনো বিচারের আওতায় আনা উচিত কি না? উচিত হলে তা কেন করেনি সরকার গত আট বছরে? সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এসব আলোচনা হলে দেশের রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য তা ভালো হতো।
কিন্তু এসব আলোচনার ধারেকাছে যাওয়ার উৎসাহ দেখা গেল না ক্ষমতাসীন সরকার ও তার অনুগত মহলগুলোর মধ্যে। তারা বরং শুধু ব্যক্তি মাহ্ফুজ আনামকে অভিযুক্ত করার দিকে গেল। এবং সেটিও অনেকাংশে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে।
২.
মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে অন্যায় অভিযোগ হচ্ছে তিনি নাকি এক-এগারোর প্রেক্ষাপট রচনা করেছিলেন। অথচ নির্জলা বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে এক-এগারো এসেছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে নির্বাচনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব–সংঘাত থেকে। বিএনপি সে সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ব্যবহার করে সাজানো একটি নির্বাচন করতে চেয়েছিল। আওয়ামী লীগ সর্বাত্মকভাবে তা প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল। একপর্যায়ে সাজানো নির্বাচন হলে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ ব্যাহত পারে—এমন আশঙ্কার মুখে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের চাপে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করা হয়। প্রশ্ন আসে এখানে এক-এগারো সৃষ্টির দায় কীভাবে মাহ্ফুজ আনাম বা অন্য কোনো গণমাধ্যমের হতে পারে?
এটি সত্যি যে সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা থেকে এক-এগারো সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে একে স্বাগত জানানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগ নেত্রীও তাঁর দলের নেতাদের নিয়ে নিজে সেনা-সমর্থিত এক-এগারো সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছিলেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই পরিবর্তনকে সমর্থনও করা হয়েছিল। এক-এগারোর সরকারকে স্বাগত জানানো যদি এর প্রেক্ষাপট রচনা হয়ে থাকে, তাহলে এর দায়দায়িত্বও কি মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশের নয়?
এক-এগারো সরকারের দুটো সমালোচিত পদক্ষেপ ছিল ঢালাও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে বিরাজনীতিকরণ ও রাজনৈতিক সংস্কারের নামে দুই নেত্রীকে মাইনাস করার চেষ্টা। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হলে প্রথমদিকে অন্য বহু মহলের মতো এটিকেও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা স্বাগত জানিয়েছিলেন। এরপর একপর্যায়ে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে মাহ্ফুজ আনাম নিজে প্রথম পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় লিখে তাঁর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন, দুই নেত্রীর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ হয়েছিল গণমাধ্যমের আরও কিছু অংশ থেকেও।
আমরা জানি, গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সম্পাদকীয় রচনাই একটি পত্রিকার বক্তব্যকে প্রতিফলিত করে। চাপে পড়ে প্রেরিত সংবাদ ছাপানো প্রতিফলিত করে মূলত সে সময়কার সরকারের মানসিকতাকে। তারপরও শেখ হাসিনার (এবং অন্য যে কারও) বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্পর্শকাতর বিষয় বলে অবশ্যই যাচাইহীনভাবে এটি না ছাপানোর চেষ্টা করা উচিত ছিল। কিন্তু এখানে মূল অপরাধটি ছিল দুর্নীতির খবরটি তৈরির এবং তা প্রকাশের চাপ সৃষ্টির। এটি যারা করেছিল, তাদের কারও প্রতি রুষ্ট না হয়ে (বরং তাদের কাউকে কাউকে নানাভাবে পুরস্কৃত করে) এ সংবাদ যে পত্রিকাগুলো ছেপেছিল, তার মধ্যে একটি পত্রিকার সম্পাদককে ঢালাওভাবে সমালোচনা করার আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে কি?
এক-এগারোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল মাইনাস-টু ফর্মুলা। দুই নেত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতার পরিবর্তন, রাজনৈতিক দলের ভেতর গণতন্ত্রায়ণ ও তৃণমূলের মতামতে দল পরিচালনা করা প্রয়োজন—এসব এক-এগারোর বহু আগে থেকে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ এমনকি কিছু কিছু রাজনৈতিক নেতার মুখেও শোনা যেত। এক-এগারোর সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু নেতা প্রকাশ্যে দলের সংস্কারের কর্মসূচি নিয়ে নামেন। বিএনপি নেতাদের একটি অংশ এমনকি পৃথক দলও গঠন করেন।
সংস্কারপন্থী নামে পরিচিত এসব নেতার অনেককে বিএনপির নেত্রী কখনোই ক্ষমা করেননি, কিন্তু আওয়ামী লীগ নেত্রী তাঁদের প্রায় সবাইকে ক্ষমা করে দেন, অনেককে মন্ত্রিসভায়ও স্থান দেন।
রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রায়ণের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাটি অপরাধমূলক ছিল না, তবে এর পদ্ধতিটি ছিল ভুল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পদ্ধতিটির যাঁরা কুশীলব ছিলেন, এতে যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন—অন্যায়টা তাঁদের, নাকি যাঁরা শুধু সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে স্বাগত জানিয়েছেন তাঁদের? বিচার করতে হলে কাদের করা উচিত?
৩.
মাহ্ফুজ আনাম বিরোধিতার আরেকটি অদ্ভুত দিক হচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলোর ধরন। তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির অধিকাংশ মামলা করেছেন ছাত্রলীগের নেতারা। তাঁদের দলের নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগটি করা হয়েছিল এবং এটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল বহু আগে। প্রায় ১০ বছর পর কোনো সম্পাদক যদি বলেন যে এটি ঢালাওভাবে ছাপানো ঠিক হয়নি, তাতে তো বরং দুর্নীতির অভিযোগটি ভিত্তিহীন ছিল, সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়। আমাদের তথ্যমন্ত্রী এ জন্য তাঁকে প্রশংসিত করেছেন, এই স্বীকারোক্তির জন্য সেটিই তাঁর প্রাপ্য।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, ঢালাও মানহানির মামলার একটি প্রচলন আমরা বর্তমান সরকারের আমলে লক্ষ করেছি। খালেদা জিয়াসহ বিরোধী দলের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের বহু মামলার একজন বাদী পত্রিকায় নিজে স্বীকার করেছিলেন যে আওয়ামী লীগ নেত্রীর চোখে পড়ার জন্য এবং ভালো একটি চাকরির জন্য তিনি এসব মামলা করেন। তারপরেই তাঁর দায়ের করা মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও দেশের বরেণ্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানান সময়ে ঢালাও অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান করা হলেও তাদের কোনো মানহানি মামলার শিকার হতে হয়নি। এই বৈষম্য কোনোভাবেই সমাজে আইনের শাসনকে প্রতিফলিত করে না।
মানহানির মতো ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনার একটি রীতিও এই সরকারের আমলে গড়ে উঠেছে। এসব অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রেই ঠুনকো বা ভিত্তিহীন। যেমন মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে আনা সংবিধান সংশোধনীর অধীনে বিচার চাওয়া হয়েছে সংসদে, অথচ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগটি ২০০৭ সালের! সংবিধানের আলোচিত সেই সংশোধনী অনুসারে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ বা সংবিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা বা অবমাননাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ হিসেবে বিচারের বিধান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের উত্তেজিত নেতারা ভুলে গেছেন সেই সময়ে শেখ হাসিনা সরকারের কেউ ছিলেন না, ‘সংবিধান’ সমতুল্যও ছিলেন না!
আর সরকারি কৌঁসুলির নালিশি আবেদনে মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১২৪ক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ১২৪ক ধারায় সরকারের প্রতি ঘৃণা, আনুগত্যহীনতা সৃষ্টির অপরাধের বিবরণ রয়েছে। ২০০৭ সালে শেখ হাসিনা সরকারের কোনো অংশ ছিলেন না। তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ কী করে এবং কোন বিবেচনায় রাষ্ট্রদ্রোহ হবে?
৪.
মাহ্ফুজ আনাম ও ডেইলি স্টার-এর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার কোনো ব্যক্তিবিশেষের ওপর বিচ্ছিন্ন আক্রমণ নয়। এ দেশে আগেও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীন সত্তার ওপর আক্রমণ এসেছে। পত্রিকা বন্ধ করে, বিজ্ঞাপন বন্ধে চাপ দিয়ে, সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, সাংবাদিককে হত্যা করে, সংবাদ প্রচারে হস্তক্ষেপ করে এবং সম্পাদক-সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গণমাধ্যমের শক্তিকে খর্ব করার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্রবণতা বাড়ছে, বাড়ছে অপপ্রচার, হুমকি আর উসকানির মধ্যে কদর্যের মাত্রা।
কোনো গণতান্ত্রিক শক্তি বা মহলের কাছে এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ কে না জানে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ আর সাংবাদিকদের সন্ত্রস্ত রাখা শুধু স্বৈরাচারিতাকেই শক্তিশালী করে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

যুদ্ধবিরতিতে রাশিয়ারই লাভ by শশাঙ্ক জোশি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের শান্তির জন্য যে মিউনিখ চুক্তি হয়েছিল, তার প্রসঙ্গ বাদ দিয়েই বলা যায়, সিরিয়ায় যে শান্তিচুক্তি হয়েছে তা খুবই গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ, আর সেটা দীর্ঘস্থায়ীও হবে না। এটাকে ‘বৈরিতার অবসান’ বলা যায়, কারণ এটা প্রকৃত অর্থে যুদ্ধবিরতি নয়। এই চুক্তিকে কূটনীতির এক চমৎকার নিদর্শন হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়, কারণ সিরিয়ার চলমান যুদ্ধটি একরকম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। এর ফলে অন্তত কিছুটা রেহাই পাওয়া যাবে।
বর্ষীয়ান কূটনীতিক লর্ড উইলিয়ামস বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘দুই পরাশক্তি অনেকটা স্নায়ুযুদ্ধের আদলে সমস্যাটির মালিকানা নিয়ে নিয়েছে।’ বস্তুত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সমস্যাটির মালিকানা নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে, আর রাশিয়া যেন তার সমাধান আঁকড়ে ধরে আছে। কথা দিয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষে রাশিয়াকে এই চুক্তি মান্য করানোর বিশ্বাসযোগ্য উপায় নেই, সেটা সম্ভব লক্ষ্যহীন বোমা বর্ষণের মাধ্যমে, যদিও সেটা খুবই কার্যকর। সে কারণে এই যুদ্ধবিরতিতে বড় রকমের গলদ রয়ে গেছে, যার মধ্য দিয়ে রুশ জেট বিমান উড়তে পারে।
১৭টি দেশ নিয়ে গঠিত জোট ইন্টারন্যাশনাল সিরিয়া সাপোর্ট গ্রুপ (আইএসএসজি) এই মর্মে ঐকমত্যে এসেছে যে তারা ‘দেশব্যাপী বৈরিতার অবসান চায়’। এই দেশগুলোর মধ্যে অনেকে সিরিয়ায় পক্ষে, আবার অনেকেই তার বিপক্ষে। কিন্তু আইএস, জাবাত-আল-নুসরাসহ ‘জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনকে’ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা যৌক্তিক। কিন্তু রাশিয়া ও ইরান উভয়েই চায়, আলেপ্পোর আশপাশে তৎপর সব সিরীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে এই বড় শ্রেণিতে ফেলা হোক। এই দুটি দেশই সিরিয়ার স্থলবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছে, একই সঙ্গে রাশিয়া সেখানে বিমান হামলাও চালাচ্ছে।
কিন্তু সত্যটা বড় জটিল। আলেপ্পো ও তুরস্কের মধ্যে যে ছোট অঞ্চলটি বিদ্রোহীরা দখল করে রেখেছে, সেখানে আল-নুসরা খুবই শক্তিশালী। কিন্তু তারা তুরস্ক ও সৌদি-সমর্থিত বৃহত্তর বিদ্রোহী জোট জয়েশ আল-ফাতাহ্র অংশ হিসেবে কাজ করে, যার মধ্যে এমন কিছু গোষ্ঠী আছে যারা অতটা চরমপন্থী না হলেও অত্যন্ত রক্ষণশীল। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আহরার আল-শাম। কথা হচ্ছে, আইএস নয়, এসব গোষ্ঠীর ওপরই রাশিয়া বেশি হামলা করেছে, তা ক্রেমলিন যে প্রচারই চালাক না কেন।
ইসলামপন্থীদের নিয়ন্ত্রিত এই মধ্যবর্তী ভূমি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন, আঙ্কারা, রিয়াদ ও দোহা একমত হতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র বোঝে, বাশারের পর সিরিয়ায় যে বহুত্ববাদী ও সিভিল সমাজ গড়ে উঠবে, সেটার সঙ্গে তাদের পার্থক্য অনেক। সৌদি আরব ও তুরস্ক আসলে সেটাকে তেমন একটা পাত্তা দেয় না। কিন্তু কেউই এটা চায় না যে তাদের বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হোক। আইএস এই শূন্যতার সুযোগ নিতে পারে, আর ওই ছোট ছোট চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে একসময়ের আল-নুসরার সহযোগীদের সঙ্গে জুড়ে দিতে পারে।
মিউনিখ চুক্তির আলোকে বলা যায়, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ নেতৃত্বে গঠিত আইএসএসজি টাস্কফোর্স আইএস ও আল-নুসরার ভূমি ভাগ করে নেবে, আর পরবর্তী সময়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হলে তার সুরাহা করবে। কিন্তু আলেপ্পোর উপশহরের জটিল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এসব গোষ্ঠীগুলো পরস্পর জড়িয়ে আছে, আর তাদের পরিচয়ও নির্দিষ্ট নয়।
রাশিয়া গত কয়েক মাসে যুদ্ধক্ষেত্রে যে দারুণ সফলতা অর্জন করেছে, সে কারণে তারা সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদাকে তেমন পাত্তা দিতে নারাজ। রাশিয়ার আগ্রাসন তার জন্য দুভাবে সুবিধাজনক হয়েছে। না, শুধু বাশারই জিতছেন না, এ যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ইউরোপমুখী শরণার্থীর স্রোতের কারণে ইউরোপ মরিয়া হয়ে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইছে, তা সে যে মূল্যেই হোক না কেন।
ওদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে জোর গলায় বলেছেন, ‘আমি এ কথা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—রাশিয়া ও ইরান শুরুতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।’ এটা সৌদি আরব ও তুরস্কের গায়ে হুল ফোটানোর মতো। ব্যাপারটা খুবই উল্লেখযোগ্য। এই দেশগুলো এ মর্মে উদ্বিগ্ন ছিল যে বাশারের পর রাজনৈতিক উত্তরণ না ঘটলে যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে বিরাজমান অবস্থা একরকম স্থায়ী হয়ে যাবে, এতে বাশারের জামানাই থেকে যাবে আর আইএসও টিকে যাওয়ার সহায়ক পরিবেশ পেয়ে যাবে।
গত সপ্তাহে বিদ্রোহীদের অবস্থান ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়েছে। সাধারণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এমন ভাবনাও তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। ওদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ময়দানে নামার অনিচ্ছার কারণে উক্ত দেশগুলো যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন দিচ্ছে। কিন্তু কেরি মস্কো ও তেহরানকে নিষ্কৃতি দেওয়ায় তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রভাবের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় আশঙ্কা বোধ করছে।
এই যুদ্ধবিরতি রাশিয়া ও তুরস্কের সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে বাশারের এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সামরিক বাহিনীর বিজয়ে বলীয়ান হয়ে বলেন, ‘যারা যুদ্ধবিরতির পরামর্শ দেয়, তারা আসলে “সন্ত্রাসবাদের অবসান চায় না”, তারা শুধু বিদ্রোহীদের সহায়তা করতে চায়।’ তারপরও বাশারের পক্ষে এই চুক্তি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই, এটি যেন তাঁর ঘাড়ের ওপর চাপানো হয়েছে। তাঁর সেনাবাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে; সেখানে বোমা বর্ষণ করছে রাশিয়া, আর ইরান-নেতৃত্বাধীন স্থলসেনারাই স্থলযুদ্ধ করছে। বাশারের সরকার বেঁচে গেছে, কিন্তু কূটনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় তিনি স্নায়ুদৌর্বল্যে ভুগছেন, যার কারণে তাঁর নিজের ভবিষ্যৎও আক্রান্ত হতে পারে।
রাশিয়া তার সামরিক অভিযান থামিয়ে দেবে, তেমনটা মনে হচ্ছে না। তারা শুধু তুরস্কের কাছ থেকে বিদ্রোহীদের সরবরাহ প্রাপ্তিই বন্ধ করতে পারবে না, অন্যান্য স্থানের ভূমির নিয়ন্ত্রণও তারা নিতে পারে। আলেপ্পো দখল যদি সম্ভব হয়, তাহলে পালমিরা নয় কেন? ভিতালি নাউমকিন নামের এক রুশ একাডেমিক সিরিয়ার কূটনীতির সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘বাশার সরকার পূর্বাঞ্চলে আইএসের শক্ত ঘাঁটিতে আক্রমণ চালানোর জন্য ভিত্তি প্রস্তুত করছে।’ যেখানে শুধু আইএসই একমাত্র শত্রু, সেখানে এটা তেমন জটিল কিছু হবে না। কিন্তু যেখানে তা নয়, অর্থাৎ দক্ষিণের দিরায় আমাদের আবারও পুরোনো এক বিতর্কের মুখে পড়তে হবে, সেটা হলো কে সন্ত্রাসী আর কে নয়।
কেরি পরিষ্কারভাবেই আশা করেন, এই যুদ্ধবিরতির তাৎপর্য আরও বড় হবে। আজকের আইএসএসজি ছয় মাসের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তরণের মহান লক্ষ্য অর্জনের ওপর জোর দিয়েছে, যার মধ্যে আছে নতুন নির্বাচন ও সংবিধান। কিন্তু রাশিয়া যদি সামরিক সমাধানের ব্যাপারে লেগে থাকে, তাহলে তারা চুক্তির ফসল ঘরে তুলতে পারবে। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের চাপ কমলে বা বাশারের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়লে বাশারকে হটানো ও রাজনৈতিক সংস্কারের আশা ফিকে হয়ে আসবে। যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা একত্রে প্যাকেজ আকারে শুরু করা উচিত। এর বদলে রাশিয়া ছেড়েছে কম, কিন্তু পেয়েছে অনেক।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
শশাঙ্ক জোশি: রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো।

শহীদদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা by কামাল আহমেদ

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কেমন ছিল, তা আজকের তরুণদের জানার কথা নয়। যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে পা রেখেছেন, কিংবা গত কয়েক বছরে সেখানকার লেখাপড়ার পাট চুকিয়েছেন, তাঁদের অনেকেরই সেই ইতিহাস জানার প্রয়োজন পড়েনি। প্রয়োজন পড়বেই বা কেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের শেষ যেবার নির্বাচন হয়েছিল, সে বছরে যাঁদের জন্ম হয়েছে, তাঁদেরও এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে পেশাজীবন শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। এই সময়ের প্রজন্ম যে ছাত্ররাজনীতি দেখেছে, তা হলো হল দখলের, টেন্ডারবাজি-লাইসেন্সবাজি বা তদবিরবাজি করে লাখ–কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার রাজনীতি। ওই রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কিংবা মৌলিক অধিকার আদায়ের প্রশ্ন অবান্তর।
ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে সাবেক সামরিক শাসক আর গণতন্ত্রের সৈনিকদের মাখামাখি দেখতে দেখতে একধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে গেছে। এখন আর তাই ৮৩-র আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের অনেককে পতিত স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি দেখে কেউ ছি ছি করে না। এই আড়াই যুগের ছাত্রনেতাদের দু-একজন তো নিজেরাই অনুমোদন বাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসেছেন। একালের ছাত্রনেতাদের তাই সমৃদ্ধিবাদী বললে খুব একটা ভুল হবে বলে মনে হয় না। এঁরা নিজেদের সমৃদ্ধিতেই দেশের সমৃদ্ধির সুখ উপভোগ করেন। এঁদের কাছে সর্বজনীন শিক্ষার অধিকার প্রশ্নে সংগ্রামের এখন আর তেমন গুরুত্ব নেই।
৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতার পরিণতি ঘটে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে। সেই গণ-অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল কার্যকর গণতন্ত্রে ফিরে আসা। অথচ গণতন্ত্রচর্চার এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান ভোটের অধিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও কোনো না কোনোভাবে হরণ করা হয়েছে বা লঙ্ঘিত হচ্ছে। ওই আন্দোলনের চেতনায় ছিল স্বৈরতন্ত্রের অবসান। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটলেও আমাদের রাজনীতিতে স্বৈরতান্ত্রিক ধ্যানধারণা বহাল আছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। আর যে বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল, সেই শিক্ষাব্যবস্থায় এখন বৈষম্য আরও বেড়েছে। আর যে স্বৈরাচারী সেনাপতি ‘বিশ্ব বেহায়া’র খেতাব পেয়েছিলেন, তিনি এখনো ক্ষমতার ভাগীদার হিসাবে সুখ ভোগ করে চলেছেন।
ক্ষমতালিপ্সু সেনাপতি বলতে এই ভূখণ্ডে যদি কেউ জন্মে থাকেন, তিনি হলেন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতার দর-কষাকষিতে এখন যাঁরা তাঁকে সকালে এক কথা বলে বিকেলে তার উল্টোটা বলতে শুনে বিস্মিত হন, তাঁরা সম্ভবত ভুলে যান যে এই ব্যক্তিই একটি নির্বাচনের ছয় মাসের মধ্যেই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর এক অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করেছিলেন ১৯৮২-র মার্চ মাসে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি তাঁর স্বৈরাচারী শাসন চালিয়ে গেছেন ৯০-এর ডিসেম্বর অবধি। তবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি কখনোই অবদমিত থাকেনি। তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের পরদিন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষাঙ্গনে বারবার উচ্চারিত হয়েছে স্বৈরাচার অবসানের আওয়াজ। জেনারেল এরশাদ তখন যে শুধু গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন তা নয়, তিনি একই সঙ্গে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বৈষম্যমূলক এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে আর্থিক সামর্থ্যই ছিল কে কী ধরনের শিক্ষার সুযোগ পাবে, তার নির্ধারক। মজিদ খানের সেই গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্রসংগঠনগুলো তখন এক হয়ে গড়ে তোলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
৮২-র ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস পালনকে কেন্দ্র করে তখন গড়ে ওঠে ওই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তারপর ১৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষিত হয়। সেদিনের সেই কর্মসূচিতে ঢাকা শহরের ছাত্রছাত্রীদের যে বিপুল অংশগ্রহণ ছিল, তাতে মিছিলের প্রথম ভাগ যখন হাইকোর্টের মাজার গেটে, তখনো কলাভবনের বটতলায় তার পেছনের অংশ। কিন্তু স্বৈরাচারী শাসকেরা যেমন নিষ্ঠুর হন, ঠিক তেমনই ছিলেন জেনারেল এরশাদ। হঠাৎ করেই মিছিলের ওপর চালানো হয় গুলি। গুলির পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাস, লাঠিপেটা ও ধরপাকড়। শহীদ হন জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালি সাহাসহ অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে শহীদদের লাশ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে ফেলে রাতভর হলে হলে চালানো হয় অভিযান। ছাত্র আন্দোলন দমনের অভিযান কতটা কঠোর হতে পারে, তার এক নজির স্থাপিত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। শহরের আরেক প্রান্তে অসংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা পরিস্থিতি আলোচনার জন্য মিলিত হন প্রবীণ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেনের বাসায়। সেখান থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। শেখ হাসিনাকে নেওয়া হয়েছিল মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত ভবনটিতে, যেটি আগেই রূপান্তরিত হয়েছিল একটি সেনাক্যাম্পে। কাউকে কাউকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত জায়গায়। কিন্তু ওই সব হত্যা, গ্রেপ্তার, নিপীড়ন কোনো কিছুই গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে দমাতে পারেনি। বছর না ঘুরতেই আবার সংগঠিত হতে থাকে আন্দোলন। পরের বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস।
এখন ১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা ঘটা করে পালন করি ভালোবাসা দিবস। ভালোবাসা দিবস ইউরোপে চালু ছিল অনেক আগে থেকেই। খ্রিষ্টান যাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মরণে এই দিবস খ্রিষ্টধর্মপ্রধান দেশগুলোয় বহুদিন ধরে পালিত হয়ে আসছে। আর ভ্যালেন্টাইনকে প্রেমিকের প্রতীক ধরে নিয়ে ভালোবাসা দিবস পালনের চল প্রথম চালু হয় ইংল্যান্ডে। তাও কোনো কোনো বর্ণনামতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ১৯৮৩-র স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-গণ-আন্দোলনের দিন অবধি আমাদের দেশে এর কোনো চল ছিল না। কাগজে-কলমে আমাদের দেশে এই দিনটি পালনের কথা প্রথম লেখা হয় আরও কয়েক বছর পর। দিনটিকে ঘিরে পাশ্চাত্যে বাণিজ্যেরও অনেক প্রসার ঘটেছে (বিশেষ করে চকলেট, কার্ড, ফুল, অলংকার ও পর্যটন বাণিজ্য)। বিশ্বায়নের কালে ভালোবাসা-বিষয়ক বাণিজ্যের স্রোত হয়তো স্বাভাবিকভাবেই কোনো একদিন আমাদের এই বদ্বীপে এসে ঠেকত। সে কারণে আমি বাংলাদেশে এই দিনটি আমদানির জন্য সাংবাদিক শফিক রেহমান বা তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেকালের সাপ্তাহিক যায়যায়দিনকে দোষ দেওয়ার পক্ষপাতী নই। দোষ যদি কিছু থেকে থাকে সেটা আমাদের। আমাদের রাজনৈতিক বিবেচনাবোধের।
সর্বসম্প্রতি এতে যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে প্রেমিক বা প্রেমিকাকে নয়, ঢাকাকে ভালোবাসানোর এক অভিনব উদ্যোগ। ঢাকাকে ভালোবাসতে শহরকে আবর্জনামুক্ত করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্ব পালন করুক আর না করুক—নাগরিকেরা যেন তাঁদের দায়িত্বটুকু পালন করেন, সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে নতুন মেয়রদের একজনের এই উদ্যোগ। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের দুর্ভাগ্য যে তিনি চমক দেখাতে মুম্বাই থেকে বলিউডের নায়িকাদের উড়িয়ে আনতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভগ্নহৃদয়ে দেশীয় তারকাদের নিয়েই তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। বলিউডের নায়িকা-গায়িকাদের প্রতি কেউ মোহাবিষ্ট থাকলে থাকতেই পারেন। কিন্তু প্রচারকৌশলে চমক যুক্ত করতে তাঁদের শরণাপন্ন হওয়ায় নিজেদের যে অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশ হয়ে পড়ল, তার কী হবে? ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই ভাষার মাস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে বলে অনেকে এই মাসে হিন্দি ছবির নায়িকাদের নিয়ে মাতামাতির সমালোচনা করেছেন। আবার ছাত্র-তরুণদের অনেকে এই পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকতার জন্য স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসকে বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আমি এই দ্বিতীয় গোষ্ঠীর যুক্তিগুলোকেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করি। ১৪ ফেব্রুয়ারি যদি কোনো জঞ্জাল পরিষ্কার দূর করার প্রশ্ন ওঠে, সেটা হচ্ছে গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টিকারী নানা আপদ অপসারণের শপথ নেওয়ার প্রশ্ন। দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যে হুমকি, যাকে অনেকে ভয়ের সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেন, তার অবসান ঘটানো। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়রের কাছ থেকে অবশ্য সেটা আশা করার কোনো কারণ নেই। আপাতত আমরা যা পারি, তা হলো আমাদের অক্ষমতার জন্য শহীদদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা।
ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নবজাগরণ ঘটিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দেশটির বহুল বিতর্কিত নেতা নরেন্দ্র মোদি স্বচ্ছ ভারত কর্মসূচি দিয়ে রাস্তায় ঝাড়ু নিয়ে নেমেছিলেন। স্বভাবতই তাঁর এই উদ্যোগে তাঁর ভক্তকুল ছাড়াও নামীদামি তারকারাও যোগ দিয়েছিলেন। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ অনেক শহরেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল। ধারণা করি, সৃজনশীলতার অভাব এবং অনুকরণপ্রিয়তার স্বভাব থেকে আমরাও ঢাকায় একই ধরনের কর্মসূচির কথা ভেবেছি। দিল্লির মতো এখন নাকি ঢাকাতেও ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণে সপ্তাহের এক দিন জোড় সংখ্যার রেজিস্ট্রেশন এবং পরের দিন বেজোড় সংখ্যার নম্বরওয়ালা গাড়ি চলতে দেওয়ার নিয়ম চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। ভালো জিনিস, ভালো নিয়ম, ভালো সংস্কৃতির অনুকরণে ক্ষতি নেই। কিন্তু আমরা আবার শুধু ভালোটুকু গ্রহণেই থেমে থাকি না। খারাপটাও নিই। সাধারণত খারাপটা বেশিই নিই। তাই আশঙ্কা হয় যে এ ক্ষেত্রেও তেমনটি না হয়। যাঁরা দিল্লির খবর রাখেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন যে দিল্লিতে এ মাসের শুরুর দিকে দিন দশেক পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কর্মবিরতি করায় রাস্তায় রাস্তায় জঞ্জালের স্তূপ জমে গিয়েছিল। এর পেছনের কারণ কিন্তু রাজনীতি। মোদিজির ভারত জয়ের গৌরবকে কয়েক মাসের মধ্যেই ম্লান করে দিয়েছিলেন যে অরবিন্দ কেজরিওয়াল, দিল্লির সেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধের জেরেই দিল্লিবাসীর ওই ভোগান্তি। ভারতে এখন ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার চর্চা যে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, সে কথাও এখন সবার জানা।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

ভ্যালেন্টাইন এরশাদ by ফারুক ওয়াসিফ

আজ ভ্যালেন্টাইনস দিবস, তথা ভালোবাসা দিবস। আজ দিন এরশাদের। তেত্রিশ বছর আগেও যেমন, তেত্রিশ বছর পরেও তেমন। তেত্রিশ বছর আগে এই দিনে এরশাদের স্বৈরশাসন রুখতে গিয়ে ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছিলেন। এবং ‘তেত্রিশ বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি’—সেই শহীদেরা বিস্মৃতপ্রায়, কিন্তু দারুণ জাগ্রত ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসা এমনই রঙিন, কেবলই এরশাদের কথা মনে আসে। প্রেমিকের ভাবমূর্তি নিয়ে তিনি আজও ‘বর্তমান’।
সোয়া বছর আগেও তাঁর প্রেমিক হৃদয় বলে উঠেছিল, ‘এখন আর প্রেম-ভালোবাসা নেই। সমাজ থেকে প্রেম-ভালোবাসা উঠে গেছে’ (আমাদের সময়, ৯ ডিসেম্বর ২০১৪)। এরশাদ যে প্রেমিক, এ তাঁর অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করবে না। আমাদের আশির দশক এরশাদের প্রেমের দশক। আর সেই প্রেমের ইতিহাস প্রতারণারও ইতিহাস। এক প্রেমিকাকে তিনি দলের সংরক্ষিত কোটায় সাংসদ বানিয়েছিলেন, পরে ছুড়ে ফেলেছিলেন। আরেক নারী যুক্তরাজ্যে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছিলেন। তাঁর আরেক স্ত্রী বিদিশাকে তো একরকম নির্যাতিত ও অপমানিত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল। এরশাদের প্রেমঘটিত কাহিনিগুলো তাঁর পতনের পরে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত হয়।
অনেকের কাছে এসব এখনো মজাদার গল্প। কিন্তু এই মজার আড়ালে চাপা পড়ে যায় এরশাদ আমলের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো। ১৪ ফেব্রুয়ারির ভ্যালেন্টাইনস দিবসের রমরমার তলায় চাপা পড়ে গেছে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ইতিহাস। এরশাদের শাসন আর তাঁর শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। ঢাকার হাইকোর্টের সামনের রাস্তায় পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চন প্রমুখ। ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সরকার স্বীকার করে মাত্র একজনের মৃত্যুর কথা। পরদিন চট্টগ্রামে নিহত হন মোজাম্মেলসহ আরও কয়েকজন। সেই থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস।
কিন্তু এ এমন এক যুগ, যখন ইতিহাস ও স্মৃতির বাছাই চলছে। যে ইতিহাস ও স্মৃতির পক্ষে ক্ষমতা ও ব্যবসা আছে, সেটাই কেবল জীবন্ত হয়। সেই স্মৃতিই পুষে রাখা হয়, যা নাকি ক্ষমতাবানদের জন্য নিরাপদ। বাকিদের পাঠানো হয় বিস্মৃতির হিমঘরে। ভালোবাসা দিবস তাই যত জাগ্রত, তত জাগ্রত নয় ১৪ ফেব্রুয়ারির শহীদদের আত্মদানের রক্ত-অশ্রু-দ্রোহের কথা। একটি নিলে আরেকটিকে ভুলে যেতে হবে, এমন ছোট হবে কেন প্রেমিকের মন, এমন খাটো হবে কেন তাদের স্মৃতি?
কিন্তু ভালোবাসার সঙ্গে বিদ্রোহ-বিপ্লবের তো কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। রণাঙ্গন থেকে কিংবা জেলখানা থেকেই তো যুগে যুগে লেখা হয়েছিল হৃদয় নিংড়ানো প্রেমের কবিতা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে প্রেম, বিদ্রোহ ও কবিতা পাশাপাশি হেঁটেছিল তরুণদের মিছিলে, মঞ্চের বক্তৃতা ও কবিতার আবৃত্তিতে। নব্বইয়ের এক ছাত্রনেতার মুখে শুনেছি, এরশাদের পতনের খবর শুনে নাকি আবেগে ছেলেমেয়েরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। পরে গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে শামসুন্নাহার হলে ন্যক্কারজনক পুলিশি অভিযানের সময়ে যে তীব্র আন্দোলন তৈরি হয়েছিল, তার সোনালি মুহূর্তটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরীর পদত্যাগ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তখন আমরণ অনশন চলছিল শিক্ষার্থীদের। পুলিশের নির্মম মার, ছাত্রদলের হুমকি, বিভিন্ন পক্ষের ষড়যন্ত্রের মধ্যে দিনরাত শত শত ছেলেমেয়ের জমায়েত চলছিল শহীদ মিনারের বেদিতে। বিজয়ের খবরে ছেলেমেয়েরা হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে নেচেছিলেন আর গাইছিলেন প্রাণভরে। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও সংগ্রামের আবেগ তাঁদের এক করেছিল। ভালোবাসা দিবসে এই সব সংগ্রামী ভালোবাসারও স্থান থাকুক, সেই শহীদদের জন্যও নিবেদিত হোক না কিছু কবিতা ও কিছু লাল গোলাপ।
সৌন্দর্য ঘাতক ও সমালোচককে একসঙ্গে যে মুগ্ধ করতে পারে, তার প্রমাণ এরশাদ ও তাঁর ঘোরতর সমালোচক সাংবাদিক-লেখক শফিক রেহমান। উভয়েরই প্রিয় ফুল লাল গোলাপ, উভয়ই প্রেম ও কবিতার আশিক। এরশাদের আমলের মধ্যসময়ে তিনি যায়যায়দিন নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন। সেখানেও প্রেম ও প্রতিবাদ একসঙ্গেই চলেছিল। ওই পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হতো মিলা ও মঈন নামের দুই কল্পিত চরিত্রের প্রেমালাপ। তাদের সেই আলাপের বড় অংশজুড়েই থাকত রাজনৈতিক ঘটনাবলি এবং অবধারিতভাবে উঠত এরশাদের সমালোচনা। এমন সব লেখার জন্য শফিক রেহমানকে দেশছাড়া হতেও হয়েছিল কিছুদিনের জন্য। আর শফিক রেহমানই তাঁর ‘লাল গোলাপ’ নামের টেলিভিশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে ১৪ ফেব্রুয়ারির ভ্যালেন্টাইনস দিবসের প্রচার শুরু করেন। সেই অনুষ্ঠানে তিনি লাল গোলাপ হাতে আসেন, অতিথিদের তা উপহারও দেন। ইতিহাস এ রকমই পরিহাসময়। একসময়ের এক তীব্র এরশাদবিরোধীর মাধ্যমেই এরশাদ আমলের এক বিয়োগান্ত অধ্যায় আড়ালে পড়ে যেতে শুরু করে। ক্ষমতার মতোই প্রেমও সময়ে সময়ে অন্ধ বটে। আজকের প্রেমান্ধরা কি স্বৈরাচারীর অপরাধ দেখবেন না? আর ক্ষমতান্ধরা কি চিরকালের মতো প্রেমের পথে বাধাই হয়ে থাকবেন?
১৪ ফেব্রুয়ারিতে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস আর ভালোবাসা দিবস একসঙ্গেই চলতে পারত হাত ধরাধরি করে। তা যে হলো না, কারণ ভালোবাসা-বাসির সঙ্গে জড়িত সব পণ্যের বাজার বড়ই চাঙা। কারণ, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক চেতনা খুবই দুর্বল। গণতন্ত্র দাবি করতে যে সাহস লাগে, যে সংগ্রাম ও সততা লাগে, তাও যেন কমে আসছে আজকের তরুণদের মধ্যে।
পরাজয়ের স্মৃতি মানুষ ভুলে যেতে চায়। নব্বইয়ে এরশাদের পতন হলেও গণতন্ত্রের জয় টেকসই হয়নি। এককালের গণতন্ত্রের প্রহরীরা এখন এরশাদের প্রতিই ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে আছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির পিতৃপুরুষ এরশাদই, সবাই যেন তাঁর মতো একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করতে চায়। সেই পথে যেতে যেতে তাঁরা মাড়িয়ে চলেন ১৪ ফেব্রুয়ারিসহ আশির দশকের সব
শহীদ তরুণ-তরুণীদের অবদান। হয়তো ভবিষ্যতের অন্য কোনো তরুণেরা প্রেম ও বিদ্রোহের নামে আবার তাদের আত্মদানের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলবে। সে সময় পর্যন্ত কি এরশাদের মতো মানুষদের মেকি হাসি মেকি কান্না আমাদের দেখে যেতে হবে?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

সাংঘর্ষিক রাজনীতি শুভ নয় by ইয়াসেক রস্তফ্‌স্কি

ইউরোপে কমিউনিজমের পতনের পর ব্রিকস গঠনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা আধিপত্য প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা ২০০০-এর দশকে এই জোট গঠন করে। এই দেশগুলোর অর্থনীতি দ্রুত বর্ধমান, আবার দুনিয়ার প্রায় অর্ধেক মানুষের বসবাস এই অঞ্চলে। ফলে ব্রিকস গঠনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপকেন্দ্রিক ক্ষমতাবলয়ের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে।
তবে আজ ব্রিকসকে পশ্চিমের জন্য অতটা ভূরাজনৈতিক হুমকি হিসেবে মনে হচ্ছে না। রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে আছে, ওদিকে চীন আবার খাবি খাচ্ছে। শুধু ভারতই নিজের ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখতে পারছে। কিন্তু তারপরও পশ্চিম আবার চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে, এমনকি তার ঘরের পেছনেও সে এই চাপে পড়তে যাচ্ছে। এবারের চ্যালেঞ্জটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নয়; কারণ এমন চরিত্রের কিছু রাজনীতিকের উত্থান হয়েছে, যাঁরা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে আনন্দ পান, যাঁরা দেশীয় বা আন্তর্জাতিক আইন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের তোয়াক্কা করেন না।
আমি এই প্রকৃতির নেতাদের ‘পেকো’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকি, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চারজন নেতার নামের আদ্যক্ষর দিয়ে এই আমি শব্দটি তৈরি করেছি: রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, পোলিশ রাজনীতিক ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি ও হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী অরব্যান ভিকতর।
এই পেকো রাজনীতিকে বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য অর্জনে সম্মিলিত আবেগ ব্যবস্থাপনার শাস্ত্র হিসেবে গণ্য করে না, যে লক্ষ্যগুলো হচ্ছে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আয়ের অধিকতর সুষম বণ্টন, বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা, ক্ষমতা ও মর্যাদা। বরং তাদের কাছে রাজনীতির মানে হলো, ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে একের পর এক ষড়যন্ত্র করা ও শুদ্ধি অভিযান চালানো। এই পেকো রাশিয়ার বিপ্লবী নেতা ভ্লাদিমির লেনিনের নীতি মেনে চলে: ‘রাজনীতি অর্থনীতির রাশ টানবে’। বস্তুত তারা অন্য সব নীতিগত বিবেচনার চেয়ে রাজনীতিকেই বেশি মূল্য দেয়। তাদের কাছে রাজনীতি লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার নয়, তারা রাজনীতির বাতাস থেকে নিশ্বাস নেয়, আর নীতি হচ্ছে চিরজীবন ক্ষমতায় থাকার সংগ্রামের হাতিয়ার।
তবে আজকের এই পেকোকে ১৯৩০-এর দশকের ‘মহান একনায়কদের’ সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করাটা ভুল হবে। পেকোরা জাতীয়তাবাদী হতে পারে, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের বৈঠকখানায় তাদের মতামত ঠিক বেসুরো ঠেকত না (নাৎসি ও স্প্যানিশ ফালাঙের ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায় না)।
আবার তাদের অর্থনৈতিক নীতি পুরোপুরি রাষ্ট্রবাদী নয়। পুতিনের মধ্যে নিশ্চিতভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াদির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রবণতা আছে, আর অরব্যান ও কাচিনস্কিকে যদি এই তকমা দেওয়া যায়, তাহলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দে গলকেও এই ধারার মানুষ বলতে হয়। ওদিকে তুরস্কের এরদোয়ান কামালের রাষ্ট্রবাদী ধারা থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তবাজারের নীতি গ্রহণ করেছেন।
মহান একনায়কদের সঙ্গে পেকোদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে, পেকোদের বারবার ভোটারদের মুখোমুখি হতে হবে। বস্তুত, সাংঘর্ষিক রাজনীতিই তাদের টিকে থাকার প্রধান মাধ্যম। তাঁদের সবাই সমাজকে বিভক্ত করে ক্ষমতায় এসেছেন, যার মাধ্যমে তাঁরা আবার নিজেদের ভোটারদের একত্র করেছেন।
আধুনিক গণমাধ্যমের কারণে আবার পেকোর রাজনৈতিক স্টাইল পোক্ত হয়েছে, এই গণমাধ্যম পাঠক-দর্শক পাওয়ার প্রতিযোগিতায় খবর সরলীকরণ ও চমকপ্রদ করে প্রচার করে। সে কারণে তারা একদম বিরোধাত্মক বিবৃতি ও অবস্থানকে ফলাও করে প্রচার করে। ফলে এই সংঘর্ষপ্রিয় রাজনীতিকেরা ভালো সুবিধা পেয়ে যান, যার পরিণতি হিসেবে ভোটারদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয় আর পেকোরা ক্ষমতায় টিকে যান। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে কার্যকর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৫ সালে রাশিয়ায় প্রকৃত মজুরি ৯ শতাংশেরও বেশি পড়ে গেছে, আর পর্যাপ্ত খাবার ও কাপড় পায় না এমন রুশ পরিবারের সংখ্যা ২২ শতাংশ থেকে ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তারপরও পুতিনের সমর্থকের সংখ্যা ৮০ শতাংশ।
চূড়ান্ত বিচারে ব্রিকসের উত্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হলেও পেকোর উত্থান কিন্তু প্রকৃত হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে তারা নিজেদের সাংঘর্ষিক মনোভাব পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সুশাসনে প্রয়োগের চেষ্টা করছে বলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়ে গেছে। প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক ফার্মগুলোর উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। কমিউনিজমের পতনের পর গত ২৫ বছরে তারা নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে, তারা মূলত অর্থনীতির অঙ্গীভূতকরণ ও নিয়মতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে সেটা করেছে। পেকোর ঝুঁকি এড়ানোর জন্য নতুন নতুন কৌশল প্রণয়ন করতে হবে তাদের, যার ওপরই নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ।
পেকোর ধারা পশ্চিমের কেন্দ্র পর্যন্ত চলে যেতে পারে, সেটা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। যেমন, কাতালান ও ব্রিটিশ জাতীয়তাবাদীদের কথা বলা যায়, যারা যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে। এই প্রস্তাবে তাদের নিজেদের সমাজেরই যে বিশাল ক্ষতি হবে, সেটা তারা অত্যন্ত বাজেভাবে অগ্রাহ্য করছে।
একইভাবে অন্তত পশ্চিমের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা পেকোর মতো আচরণ করছেন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট নেতা মারিন লো পেনের কথা বলা যায়, শেষোক্ত ব্যক্তি ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য লড়বেন। তাঁরা যদি ক্ষমতায় যেতে সফল হন, তাহলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
ইয়াসেক রস্তফ্স্কি: পোল্যান্ডের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী।