Friday, October 24, 2014

গোলাম আযমের মৃত্যু- রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার

অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর পর রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ-র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য। একই সাথে ইসলামিক দলগুলোর ডাকা রোববারের হরতালকে কেন্দ্র করেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ডিএমপি’র উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে অবনতি না ঘটে সেজন্য পুলিশ সতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, যে কোনো ধরনের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাব তৎপর আছে। এজন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। র‌্যাবের প্রতিটি ইউনিটকে তার দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর পরদিন আজ শুক্রবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম ও এর আশপাশের এলাকায়, কাকরাইল, মগবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ ও এলাকার মোড়ে মোড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়।

নামাজের কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে পল্টন, দৈনিক বাংলা, গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট ও মতিঝিল এলাকায় সড়কে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন দেখা যায়। বায়তুল মোকাররমের সবগুলো প্রবেশপথে কড়া নজরদারির পাশাপাশি মুসল্লিদের ব্যাগ তল্লাশি করে মসজিদে ঢুকতে দেয়া হয়। পোশাকধারীদের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশকেও ওই এলাকায় দায়িত্ব পালনে দেখা যায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের মৃত্যুর পর কেউ যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করতে না পারে সেজন্য বায়তুল মোকাররম এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে হজ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ থেকে বহিষ্কৃৃত ও মন্ত্রীপদ থেকে অপসারিত লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতারের দাবিতে ইসলামিক সংগঠনগুলো ডাকা রোববারের হরতালকে সামনে রেখে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে।
বিভিন্ন দেশে অধ্যাপক গোলাম আযমের গায়েবানা জানাজা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে কাতার, পাকিস্তান, মরক্কো, তিউনিসিয়া ও সুদানে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়।
কাতারে অনুষ্ঠিত জানাজায় ইমামতি করেন আন্তর্জাতিক ইসলামিক স্কলার ড. ইউসুল আল কারজাবি।

সরকারি পুকুর ভরাট করছেন ছাত্রলীগ নেতা- আগে ছিল নূর হোসেনের দখলে by মনিরুজ্জামান

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের দখলে থাকা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজের) পাঁচটি পুকুরের একটি বালু ভরাট করে দখল করে নিচ্ছেন তাঁর শ্যালক ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলম খান। জায়গাটির বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর সেতুর পূর্ব প্রান্তে কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ পাশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের চারটি পুকুর রয়েছে। নূর হোসেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর পুকুরটি দখল করে মাছ চাষ শুরু করে দেন। সরকারের কাছ থেকে ইজারা না নিলেও সওজের কর্মকর্তারা ভয়ে এর প্রতিবাদ করেননি।

>>বালু ভরাট চলছে সওজের পুকুরে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর সেতুর পূর্ব প্রান্তের এই পুকুর দখলে নিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের সাত খুেনর মামলার আসামি নূর হোসেনের শ্যালক। গতকাল সকালে ছবিটি তোলা l প্রথম আলো
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সাত খুনের পর নূর হোসেন পালিয়ে যাওয়ায় পুকুরের মাছ পুলিশের সহযোগিতায় কাঁচপুরের আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা লুট করে নিয়ে যান। মাছ চাষ বন্ধ হওয়ার পর নূর হোসেনের শ্যালক সোনারগাঁ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম খান কাঁচপুর সেতুর নিচে শীতলক্ষ্যা নদীতে খননযন্ত্র বসিয়ে বালু দিয়ে ভরাট করে পাঁচ বিঘা আয়তনের পুকুরটি গত সোমবার থেকে দখল নিতে শুরু করেন।
জায়গাটি দেখভালের দায়িত্ব নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের। সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের প্রধান কার্যালয় থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে সরকারি এ জায়গা প্রকাশ্যে বালু ভরাট করে দখল করে নিলেও সওজ কর্তৃপক্ষ, পুলিশ কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি কর্মকর্তা বাধা দিচ্ছেন না।
গতকাল যোগাযোগ করা হলে নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির আলম বলেন, সওজের মালিকানাধীন পুকুরগুলো নূর হোসেন সরকারি কোনো অনুমতি ছাড়াই দখল করে মাছ চাষ করছিলেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। সওজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই দখলদারির বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেননি, তা তিনি জানেন না। কারণ, এই কার্যালয়ে তিনি নতুন যোগ দিয়েছেন। এখন নূরে আলম খানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে কাঁচপুর সেতুর পূর্ব প্রান্তের ঢালুতে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর নিচে বালু উত্তোলনের খননযন্ত্র বসিয়ে নূরে আলমের লোকজন বালু ফেলে পুকুরটি ভরাট করছেন। আর ছাত্রলীগের ২০-২৫ জন ক্যাডার নদীর পারে দাঁড়িয়ে বালু ভরাট কাজের তদারকি করছেন। তদারকির সঙ্গে জড়িত নূরে আলমের সহযোগী ছাত্রলীগের কর্মী রাসেল মিয়া বলেন, ‘যেহেতু পুকুরগুলো আগে নূর হোসেনের দখলে ছিল, তাই আমরা তাঁর আত্মীয় হিসেবে একটি পুকুর ভরাট করে এখানে বালুর ব্যবসা করব। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেই আমরা কাজ শুরু করেছি। এসব পুকুর অব্যবহৃত পড়ে আছে। এখানে ব্যবসা করলে দোষের কী?’ তবে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাসেল মাহমুদ বলেন, নূরে আলমের অপকর্মের কোনো দায়িত্ব তাঁরা নেবেন না।
স্থানীয় কাঁচপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, সরকারি পুকুরগুলোতে আগে অবৈধভাবে জোর করে মাছ চাষ করতেন নূর হোসেন। এখন তাঁর শ্যালক নূরে আলম বালু দিয়ে ভরাট করে একটি পুকুর দখল করে নিচ্ছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশে আইন, প্রশাসন বলতে এখন আর কিছু নেই। জানা যায়, উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নূরে আলমের বিরুদ্ধে কাঁচপুর শিল্প এলাকায় জমি দখল ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত মার্চে কয়েকটি শিল্পকারখানার মালিক পুলিশ সদর দপ্তরে তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও নানা অপকর্মের লিখিত অভিযোগ দেন।
তিন মাস আগে ঢাকার মালিবাগে ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে একটি গাড়ি (কার) দুমড়ে-মুচড়ে যায়। রেলওয়ে পুলিশ ওই গাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে। পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে, গাড়িটির মালিক নূরে আলম খান। আর অস্ত্রটির মালিক নূর হোসেন। পুলিশ নূরে আলমের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে জিআরপি থানায় মামলা করে। মামলার পর থেকে নূরে আলমকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায় না। তবে গত মঙ্গলবার কাঁচপুরে এসে বালু ভরাট কাজের তদারকি করে আবার ঢাকায় চলে যান বলে এলাকার লোকজন জানান। নূরে আলমের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি, দুটি ফোনই বন্ধ রয়েছে। সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিজাউল হক জানান, অস্ত্র আইনের মামলা ছাড়াও নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে নূরে আলমের বিরুদ্ধে। তবে পলাতক থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না।

ষড়যন্ত্র, হত্যা, নির্যাতনের দায়ে সাজা হয়েছিল তাঁর

মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম আযম যে অপরাধ করেছিলেন, তা ছিল মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাঁকে সর্বোচ্চ সাজা না দিয়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই এ রায় ঘোষণা করা হয়।

গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগ যেভাবে নিষ্পত্তি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল:
ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ছয়টি ঘটনা এবং পরিকল্পনার অভিযোগে তিনটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে গোলাম আযম মানবতা–বিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনের ষড়যন্ত্র এবং পরিকল্পনা করেন।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, টিক্কা খান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে গোলাম আযম ও তাঁর সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী আধা সামরিক বাহিনী গঠনে যৌথভাবে ভূমিকা রাখেন। তাঁরা শান্তি কমিটিকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেন; রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রভৃতি বাহিনী গঠন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে আসামি আহ্বান জানিয়েছেন ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’ রাজাকারদের অস্ত্র সরবরাহের জন্য, মুক্তিকামী বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করতে রাজাকারের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য। আসামির কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, তিনি ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যার ফলে আসামির অধীনস্থ আধা সামরিক বাহিনীগুলো দেশজুড়ে ব্যাপক গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করে। এ দুটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় গোলাম আযমকে ১০ বছর করে ২০ বছর কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।
উসকানি: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে উসকানির ২৮টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ ছিল, একাত্তরে গোলাম আযম বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়ে তাঁর অনুসারীদের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনে উসকানি দেন।
রায়ে বলা হয়, গোলাম আযমের হিংসাত্মক বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে হিন্দুদের প্রতি আসামির বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক অনুভূতি প্রকাশ করে, যাতে একই সঙ্গে রয়েছে এই ধর্মীয় গোষ্ঠীকে দেশ থেকে বিতাড়ন বা ধ্বংসের গূঢ় ইচ্ছা। অথচ উপমহাদেশের ইতিহাস বলে, গত এক হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলমান শান্তিপূর্ণভাবে ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে বসবাস করছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করা স্পষ্টভাবে গোলাম আযমের ঊর্ধ্বতন অবস্থান নির্দেশ করে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনে রাজাকারদের উসকানি দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত করে। উসকানি কোনো অপরাধের প্রাথমিক পর্ব এবং গোলাম আযম তাঁর অধীনস্থ আধা সামরিক বাহিনীকে অপরাধ সংঘটনে স্পষ্ট উসকানি দিয়েছেন। এ অভিযোগটিও প্রমাণিত হওয়ায় গোলাম আযমকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সহযোগিতা: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার ২৩টি ঘটনা অভিযোগ আকারে উপস্থাপন করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, পাকিস্তানি সেনা ও অন্য আধা সামরিক বাহিনী যেমন শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রভৃতি গোটা বাংলাদেশে যে নৃশংসতা চালিয়েছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ দাখিল করেছে। এসব আধা সামরিক বাহিনী পূর্ণ ছিল মূলত জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের দিয়ে। জামায়াতের আমির হিসেবে এসব বাহিনীর ওপর গোলাম আযমের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। নেতা ও সংগঠনের মধ্যে ঊর্ধ্বতন-অধস্তন সম্পর্ক থাকলে এবং অধস্তন বাহিনী সরাসরি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করলে, অধীনস্থ বাহিনীর অপরাধের দায় ঊর্ধ্বতনের ওপর বর্তায়। গোলাম আযম পূর্ণ জ্ঞানে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে নানা উপায়ে অধস্তন বাহিনীকে অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেছেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গোলাম আযমকে আরও ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
হত্যা ও নির্যাতন: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে হত্যা এবং নির্যাতনের অভিযোগও আনা হয়। এতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম আযমের নির্দেশে কুমিল্লার সিরু মিয়া দারোগা ও তাঁর ছেলে আনোয়ার কামাল, নজরুল ইসলাম ও আবুল কাশেমসহ ৩৮ জনকে হত্যা ও নির্যাতন করা হয়।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, গোলাম আযম চাইলে তাঁর অধীনস্থ পেয়ারা মিয়াকে নির্দেশ দিয়ে সিরু মিয়া ও আনোয়ার কামালের জীবন বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, বরং নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দিয়ে অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গোলাম আযমকে ৩০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

প্রতিটি শাস্তি ধারাবাহিকভাবে একটির পর একটি বা মৃত্যু পর্যন্ত চলবে বলে আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
কাঠগড়ায় গোলাম আযম
১ নভেম্বর, ২০১১
মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল। অভিযোগ: মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি, সংশ্লিষ্টতা এবং হত্যা ও নির্যাতন
১১ জানুয়ারি, ২০১২
ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা। আবেদন খারিজ করে কারাগারে প্রেরণ
১৩ মে, ২০১২
অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু
১৫ জুলাই, ২০১৩
রায় ঘোষণা। অপরাধ মৃত্যুদণ্ডতুল্য, বয়স বিবেচনায় ৯০ বছরের কারাদণ্ড
৫ আগস্ট, ২০১৩
রায়ের বিরুদ্ধে গোলাম আযমের আপিল
১২ আগস্ট, ২০১৩
রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল। আগামী ২ ডিসেম্বর আপিল শুনানি শুরুর দিন ধার্য
২৩ অক্টোবর, ২০১৪
রাতে হাসপাতালে মৃত্যু

কংগ্রেসের ক্ষয়ে যাওয়া সুখকর নয় by কুলদীপ নায়ার

হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রে রাজ্যসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, এটা প্রত্যাশিতই ছিল। যাঁরা ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টি রেখেছেন, তাঁরা জানেন, কংগ্রেস এখন এক অতীতের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে তারা এমনভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে যে জনগণের চোখে তাদের কোনো ভাবমূর্তি নেই বললেই চলে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মতো দলগুলো এখন জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে।
যেমন হরিয়ানার কথাই ধরুন না কেন। এ রাজ্যে আগের নির্বাচনে বিজেপি কোনো দিন ১০টির বেশি আসন পায়নি। এবার দলটি সেখানে এককভাবেই সরকার গঠন করেছে। এর মাধ্যমেই বোঝা যায়, বিজেপি কতটা এগিয়েছে। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা কংগ্রেসের মতো মহিরুহের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু সেখানে বিজেপি কখনোই গণনার মধ্যে ছিল না। আর এখন তারা যৌথভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
ব্যাপারটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাদুতে ঘটেছে কি না, সেটা আর এখন আলোচনার বিষয় নয়। কোনো সন্দেহ নেই, মোদি ভারতের জাতীয় নেতায় পরিণত হচ্ছেন, আর বিজেপি জাতীয় দলে পরিণত হচ্ছে। এটা সত্য, মোদির হাতে ট্রাম্পকার্ড হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, যার মূল সুর হচ্ছে সংকীর্ণতা। সেকু্যলার শক্তিগুলো কোনো রকম গাঁইগুঁই না করেই আত্মসমর্পণ করছে।
আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র সাধারণভাবে প্রগতিশীল হলেও খুব কম নারীই এবার সেখানে নির্বাচিত হয়েছেন। এর জন্য দলগুলোই দায়ী। কারণ, তারা খুব কমসংখ্যক নারীকেই মনোনয়ন দিয়েছিল। আবার ভোটারদের মধ্যে পুরোনো চিন্তার প্রভাবও খুব বেশি। স্বাধীনতার সাত দশক পেরিয়ে গেলেও নারীরা এখনো তাঁদের প্রাপ্য পাননি।
আমার মনে হয় না, আগামী এক দশকের মধ্যে কংগ্রেস আবার ফিরে আসবে। সেটা করতে হলে তাদের নতুন নেতৃত্ব লাগবে, নতুন প্রাণশক্তি লাগবে। কিন্তু দলটির সভাপতি সোনিয়া গান্ধী পারিবারিক রাজনীতির বাইরে যেতে পারেননি, ফলে দলটি যে আবার ঘুরে দাঁড়াবে, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বেশ কয়েক বছর দেখার পরও তিনি এখনো এটা বুঝলেন না যে রাহুল গান্ধীর মধ্যে কোনো সারবস্তু নেই, তাঁকে দিয়ে কিছু হবে না।
কংগ্রেসের মধ্যে যে বিশৃঙ্খলা চলছে, তা এখন প্রকাশ্য হয়ে গেছে। দলের কর্মীদের ওপর হতাশা জেঁকে বসেছে। কংগ্রেসের অনেক পুরোনো যোদ্ধা অবশ্য সাহস করে বলেছেন, রাহুল গান্ধী ও তাঁর ঘনিষ্ঠরাই এ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। কিন্তু দলের ভেতরে এমন সাহসী উচ্চারণের শেষ পর্যন্ত অকালমৃত্যু ঘটবে। সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী দল পরিচালনা করেন। কথা হচ্ছে, তাঁরা উভয়েই ব্যর্থ হওয়ায় মানুষ এখন কাদের দিকে ঝুঁকবে। তাঁরা দুজনেই নাকি একবার পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন; কিন্তু কংগ্রেসের অনুগত কার্যকরী কমিটি তাঁদের পদত্যাগপত্র গ্রহণে আপত্তি জানিয়েছে। তাঁরাই পার্টি, তাঁরাই নেতৃত্ব। তাঁরা দুজনেই নিশ্চিত করছেন, তাঁদের পরিবারের বাইরে কেউ যেন নেতৃত্বে আসতে না পারেন।
স্বাভাবিকভাবে রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার পর পর দুটি ব্যর্থতার পর শেষ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। প্রথমত, লোকসভা নির্বাচন ও পরবর্তীকালে রাজ্যসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবি ঘটেছে। কিন্তু পারিবারিক রাজনীতিতে এরূপ বিতর্কের কোনো স্থান নেই। কংগ্রেসের বেঁচে থাকার জন্য গান্ধী পরিবার অনিবার্য। সোনিয়ার শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় রাহুল কংগ্রেসের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাহুলের কাজের ধরন নিয়ে আপত্তি থাকলেও দলের মোসাহেবরা এখনো আশাবাদী, তিনি একদিন না একদিন ঠিকই নেতা হয়ে উঠবেন।
বলা যায়, এটাই হচ্ছে কংগ্রেস ও সোনিয়া গান্ধীর কৌশল। দলের নেতারা রাহুলকে সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করছেন, ব্যাপারটা অবাক করার মতোই। লোকসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির কারণ খুঁজতে এ কে অ্যান্টনি যে প্রতিবেদন পেশ করেছেন, তাতে দেখা গেল এই ভরাডুবির জন্য দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই দায়ী করা হয়েছে, রাহুল গান্ধীকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি। অথচ হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রে নির্বাচনী প্রচারণার সময় রাহুল গান্ধীকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়েছিল। কারণ, তাঁর জন্য সেখানে প্রচারণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সোনিয়া এক চিঠিতে স্বীকার করেছেন, পার্টির পুনরুজ্জীবন ঘটানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ—ব্যাপারটা ভালো। দলের নেতাদের কাছে লেখা তাঁর চিঠির ভাষা ছিল অনুপ্রেরণামূলক, প্রতিকূল পরিবেশ জয় করার মতো আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া সেখানে ছিল। ‘এটি দীর্ঘ এক পথ, এটা জয় করতে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করতে হবে। কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়তা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনারা এই প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠবেন। আপনাদের সঙ্গে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে’—চিঠিতে সোনিয়া গান্ধী এ কথা বলেছেন।
আশাহত নেতাদের জন্য এ চিঠি কোমল টনিক হিসেবে কাজ করেছে। নেতারা স্বীকার করেছেন, চিঠিটির ভাষায় একধরনের শান্তিদায়ক বিনয় আছে; যে স্বস্তি তাঁদের অনেক প্রয়োজনীয় ছিল, সে স্বস্তি তাঁরা পেয়েছেন—রাহুল এ রকম নন। তাঁদের কাছে এটা বিস্ময়ের ব্যাপার, রাহুল কেন এখনো সেই পরামর্শকদের ওপর নির্ভর করছেন, যাঁদের কারণে দলটির ভরাডুবি হয়েছে।
সোজা কথা হচ্ছে, কংগ্রেস-সমর্থকদের এই পরিবার ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। একটি পরিবারই স্বাধীনতার পর থেকে দলটি চালাচ্ছে। জওহরলাল নেহরুকে বটগাছের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যার নিচে কোনো কিছু জন্মাতে পারে না। কংগ্রেস তাঁর ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরিণামে তাঁর মৃত্যুর পর দলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো কেউ ছিল না। তাঁর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে তিনি নিজের হাতে রাজনীতি শিখিয়েছেন, দলে প্রথম দিকে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও ধীরে ধীরে ইন্দিরা দলের শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসেন।
কংগ্রেসের এভাবে ক্ষয় হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য মোটেও সুখকর হবে না, কারণ দলটি ধর্মনিরপেক্ষতার মঞ্চ হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। আরও অস্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে, দলটির পরাজয়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি পূরণ করছে এমন একটি শক্তি, যারা ভারতের অখণ্ডতার জন্য বৈরী হয়ে উঠতে পারে। তারা দেশে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে, এটা ইতিমধ্যে দেশে একধরনের বৈষম্যের আবহ সৃষ্টি করেছে। নয়াদিল্লিতে মণিপুরি মানুষদের ওপর হামলা এর এক সাম্প্রতিক নজির।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মোদির মত্ততা তৈরিতে আরএসএসের আশীর্বাদ রয়েছে। এটা সুশাসনের পথে হস্তক্ষেপের শামিল। আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগওয়াত দূরদর্শনের পর্দায় হাজির হয়ে বললেন, তাঁদের আদর্শ সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এটা সত্যিই দুঃখজনক।
বর্তমানে মোদি উন্নয়নের মহাসড়কে ঢুকেছেন, আরএসএসের দর্শন নিয়ে এ মুহূর্তে তিনি তেমন একটা ভাবিত বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতার স্বার্থে তাঁকে আরএসএস থেকে দূরে থাকতে হবে। মুসলমানরা অনিরাপদ বোধ করছে। হিন্দুরা যেমন ভালো ভারতীয়—এ বোধ তাদের মধ্যে আছে—তেমনি মুসলমানদের মধ্যেও এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে। মোদি কীভাবে তা করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে তাঁকে এটা করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

ভারত-পাকিস্তান: ‘ছোড়ো বুলি, মারো গোলি’ by হাসান ফেরদৌস

এক মাস ধরে বিক্ষিপ্তভাবে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে গোলাগুলি চলছে। ইতিমধ্যে উভয় পক্ষের বেশ কিছু মানুষ হতাহতহয়েছে। তাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। সবচেয়ে মারাত্মক সংঘর্ষ ঘটে সপ্তাহ দুয়েক আগে জম্মু ও কাশ্মীরের বিবদমান সীমান্ত বরাবর, উভয় পক্ষই যখন ঈদুল আজহা উদ্যাপনে ব্যস্ত ছিল। জন্মের গোড়া থেকেই এই দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে ঠোকাঠুকিতে লেগে আছে। উভয় পক্ষই শান্তির কথা বলতে গিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলে, কিন্তু গুলি ছোড়ার পর ‘আমরাই বড়ে বাহাদুর’—এ দাবিও ছাড়ে না। এবারের ঘটনার কথা ধরুন। উভয় পক্ষই দাবি করেছে, তারা আক্রমণ শুরু করেনি, বরং আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু সে কথা মুখ থেকে খসে পড়তে না পড়তে উভয় পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে, হামলার এমন জবাব দিয়েছি যে বাবাজির আর এমুখো হতে হবে না।

বন্দুকযুদ্ধে ভারত অবশ্য কিঞ্চিৎ এগিয়ে, কারণ তারা বেশি সংখ্যায় পাকিস্তানি হতাহত করতে পেরেছে। সর্বশেষ গোলাগুলিতে মোট ১৯ জন নাগরিক নিহত হয়েছে, যার ১১ জন পাকিস্তানি, আটজন ভারতীয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর যোদ্ধাদের যুদ্ধজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন বটে, তবে তাঁর গলার স্বরটি কিঞ্চিৎ মিনমিনে। অন্যদিকে ভারত সরকারের ছোট-বড় সব মন্ত্রী সমস্বরে বলছেন, খুব করেছি, বেশ করেছি। পাকিস্তানকে আর এক ইঞ্চিও ছাড় দেওয়া হবে না। এর পরে আর কখনো যদি এক পা এগোয়, তো পুরো ঠ্যাংই ভেঙে দেব। ‘এখন থেকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে পেশিবহুল। পাকিস্তান যদি অ্যাডভেঞ্চারের চেষ্টা করে, তাহলে তার দাঁতভাঙা জবাব পাবে,’ বলেছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি। তাঁর নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অত কূটনৈতিক কথাবার্তার দিকে না গিয়ে এক জনসভায় প্রকাশ্যেই বলে দিয়েছেন, এখন থেকে আর শুধু বাক্যব্যয় হবে না, সরাসরি গুলি চলবে। তাঁর কথায়, ‘ছোড়ো বুলি, মারো গোলি।’
নরেন্দ্র মোদি ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হওয়ার পর পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। নিকট-উপদেষ্টাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং দিল্লিতে তাঁকে আন্তরিক স্বাগতও জানিয়েছিলেন। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে বৈঠক বসবে দিল্লিতে। কিন্তু সে বৈঠক শেষ পর্যন্ত হলো না, কারণ ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও দিল্লিতে পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আবদুল বাসিত কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। তার পর থেকেই দুই পক্ষে বাগ্যুদ্ধ ও সীমান্ত বরাবর বন্দুকযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।
যার শুরুটা এমন চমৎকার, দুই মাস যেতে না যেতেই তিনি হঠাৎ এমন খেপে উঠলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ভারতীয় পণ্ডিতেরা সব দোষ চাপিয়েছেন পাকিস্তানের ওপর। তাঁদের যুক্তি, রাজনৈতিক ঝামেলায় পড়লেই পাকিস্তানের নেতারা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের পাঁয়তারা শুরু করেন। এই ‘ইন্ডিয়া কার্ড’ সে দেশের সামরিক-বেসামরিক সব সরকারই ব্যবহার করেছে। একদম অযৌক্তিক নয় এই ব্যাখ্যা। ইমরান খানের ‘নওয়াজ হটাও’ আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের সরকার এখন চাপের মুখে রয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মতো হজমি দাওয়াই পাকিস্তানিদের জন্য দ্বিতীয়টি নেই। অতএব, দেশের মানুষের নজর সে আন্দোলন থেকে সরিয়ে দেশরক্ষার পবিত্র কাজে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতে আক্রমণ শাণানো হয়েছে। অবশ্য অন্য মতও শোনা গেছে। ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসী ভারতীয় পণ্ডিতেরা যুক্তি দেখাচ্ছেন, মোদির আমন্ত্রণ পেয়ে নওয়াজ শরিফ যে তড়িঘড়ি ভারতে উড়ে এলেন এবং তাঁর হাতে মিষ্টি খেয়ে ও নিজের মায়ের জন্য শাড়ি পেয়ে অতি ডগমগ হলেন, পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ আইএসআই তাতে মোটেই খুশি হয়নি। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক নয়, তার সঙ্গে লাঠালাঠি জিইয়ে রাখলেই তাদের অধিক লাভ। চালকের আসনে যে তারাই বসে, নওয়াজ শরিফ নন, সে কথা জানানোর জন্য তাদের হাতে যে ব্রহ্মাস্ত্র আছে, সেটাই তারা ছুড়েছে।
এই তত্ত্বে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল মোশাররফ। গৃহবন্দী অবস্থায় থেকেই এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, মোদি মুসলমানবিরোধী ও পাকিস্তানবিরোধী। অতএব, যেভাবে সম্ভব তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতে হবে। তিনি হুমকি দিয়েছেন, ‘সেনাবাহিনী ছাড়াও কাশ্মীরে আমাদের নিজস্ব ক্ষমতার উৎস (সোর্স) রয়েছে। তাদের ব্যবহার করতে হবে।’ বলাই বাহুল্য, তিনি লস্কর-ই-তাইয়েবার মতো সন্ত্রাসীদের কথাই ইঙ্গিত করেছেন। আইএসআইয়ের সম্মতিতেই যে সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
যদি ধরে নিই, আরেকটা সামরিক অভ্যুত্থানের লক্ষ্যে আইএসআই সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে চায়, তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, মোদি ও ভারত সরকার আইএসআইয়ের এই পাতানো ফাঁদে পা দিচ্ছে কেন? সেনাকর্তাদের উসকানির জবাবে যদি পালটা উসকানি দেওয়া হয়, তাতে সে দেশের রাজনৈতিক সরকারের হাত দুর্বল হয়। তাতে ভারতের লাভ কী? পাকিস্তানকে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা ভারতের আছে, সে কথা ফলাও করে বলারই বা দরকার কী?
ভারতের বেসরকারি টিভি চ্যানেল এনডিটিভি যাঁরা মাঝেমধ্যে দেখে থাকেন, তাঁদের পক্ষে এই প্রশ্নের একটি উত্তর খোঁজা কঠিন হবে না। গত সপ্তাহে এই চ্যানেলের ‘বিগ ফাইট’ অনুষ্ঠানে বিজেপি, কংগ্রেসসহ দেশটির প্রধান দলগুলোর প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছিল। আলোচনার বিষয় ছিল ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানের দুজন সাংবাদিক-ভাষ্যকারও তাতে যোগ দেন। তঁারা দুজন যে সেনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য তোতা পাখির মতো আওড়াবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু এই লেখককে যা বিস্মিত করেছে, তা হলো ভারতীয় পক্ষের প্রত্যেক বক্তার ঠিক একই রকম অতি-আক্রমণাত্মক সুরে কথা বলা। তাঁদের দাবি, মোদির ভারত আর আগের ভারত নেই। সে এখন মস্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি, চীনকে ধমক দেওয়ার ক্ষমতা পর্যন্ত তার আছে। এই আঞ্চলিক ‘পরাশক্তির’ তুলনায় পাকিস্তান কোন নস্যি! ভারতের বৈদেশিক নীতি যে এখন ‘মাস্কুলার’, সে কথা চৌদ্দবার স্মরণ করিয়ে বলা হলো, আক্রমণকারী যে-ই হোক, মুখ বুজে সহ্য করবে না ভারত। শুধু বিজেপি বা তার সহযোগী দল নয়, প্রতিপক্ষ কংগ্রেসের প্রতিনিধিও একই সুরে কথা বললেন। তা নিয়ে বেশ হাসাহাসিও হলো। (তাহলে বাবা, তোমরা এখন আমাদের নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছ?)
বুদ্ধিমান ও পরিণত বয়সের এসব নেতা ও বুদ্ধিজীবীর কথা শুনে আমার ধারণা হয়েছে, তাঁরা কেউ আসলে এখনো বিশ্বাস করেন না যে ভারত একটি বৃহৎ শক্তি। চারদিকে বলা হচ্ছে, এশিয়ায় চীনের পর ভারতই এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি, কিন্তু নিজের দেশের ভেতরে তাকিয়ে ভারতীয়দের সে কথায় আস্থা জাগে না। ‘আমি মস্ত শক্তি’—এ কথা বলে সে নিজেকেই বারবার স্মরণ দেয়। তার পরও স্বস্তি আসে না, বাতাসে তলোয়ার ঘোরাতে হয়।
নরেদ্র মোদি ভারতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে চান, এ কথা নানাভাবে বলেছেন। কিন্তু ভারতের উন্নয়নের একটি পূর্বশর্ত প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। যদি যুদ্ধপ্রস্তুতিতে তঁাকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাহলে উন্নয়নের চাকা মন্থর হতে বাধ্য। বর্তমানে ভারত তার মোট জাতীয় আয়ের প্রায় আড়াই শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করে (পাকিস্তান করে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ)। এই ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। দুটি দেশই এখনো ভীষণ রকম গরিব। ভারত মঙ্গল গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে তা ঠিক, অথচ তার মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের শৌচাগার নেই। গ্রামাঞ্চলের ৭২ শতাংশ মানুষ এখনো প্রকৃতির ডাক এলে বাড়ির পেছনে গাছের নিচে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তানের কথা না-ই বললাম, সেখানে ৬০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর। সেখানেও গাছের নিচে মলত্যাগী মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি।
ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ, যার কথাই বলি, সমরায়োজনের পেছনে অর্থ ব্যয়ের ঘোড়ারোগ এদের কারও পোষায় না, এ কথা বুঝতে রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না। কিন্তু যদ্দিন প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতিবিদেরা বন্দুকের ঘোড়ায় আঙুল রেখে কথা বলা বন্ধ না করছেন, অবস্থা বদলাবে না। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে মনে হয়, এই কাজ সবার আগে ভারতকেই করতে হবে। সে বড় দেশ, এই অঞ্চলে তারই নেতৃত্ব নেওয়ার কথা। কিন্তু ভারত যদি ভেবে থাকে গায়ে-পায়ে সে বড় বলে সবাই তাকে সালাম ঠুকবে, তাহলে মস্ত ভুল করবে। ভারতের বড় ভাইসুলভ আচরণের কারণে দেশটির প্রতি তার প্রতিবেশীদের একদিক ভীতি, অন্যদিকে অবিশ্বাস রয়েছে। সামরিক শক্তির সমীকরণ যা-ই হোক, ঘৃণা-অবিশ্বাস-প্রতিযোগিতার এক নষ্ট চক্রে আমরা আটকে আছি গত ছয় দশক। একমাত্র ভারতই পারে সেই চক্র ভাঙতে। প্রায় দুই দশক আগে তেমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন আই কে গুজরাল। ১৯৯৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি যে পাঁচ দফা প্রস্তাব রেখেছিলেন, তার এক নম্বরই ছিল পাল্টা লাভের আশা না করেই ভারত তার প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জনের জন্য এককভাবে উদ্যোগ নেবে।
আই কে গুজরাল নেই। মোদির ভারতে তাঁকে কেউ মনে রাখবে, এ কথা ভাবাও বাতুলতা। ভারতীয় নেতারা এখন নিজেদের হাতের গুলতি দেখাতে ব্যস্ত।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

রক্তস্নাত ফিলিস্তিন ও মুসলিম বিশ্ব by ড. মো: ময়নুল হক

ইতিহাসের পাতা উল্টালে যে চিত্র ভেসে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ কর্তৃক সৃষ্ট অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলÑ তার পেছনের পাতায় ফিরে যাওয়াটা নিতান্তই সময়ের দাবি। ইসলামের চিরায়ত শত্রু হিসেবে পরিচিত ইহুদিরা ১৭৯২ সালে বিশ্বসম্মেলন করে প্রটোকল গ্রহণ করে যাতে তারা পৃথিবীতে তাদের জাতিসত্তার নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা তাদেরই সৃষ্ট। রাসূল সা:-এর যুগে তাদের দাদন ব্যবসায় যা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ গ্রহণ করার মাধ্যমে সমাজকে শোষণ করার হাতিয়ার ছিল, যুগপরিক্রমায় তা সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার প্রচলন করে যা পুঁজিবাদ নামে ইউরোপ-আমেরিকায় রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন ঘটে ফরাসি বিপ্লব ও আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের পর। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়ার মাধ্যমে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। ১৯০৪ সালে ইহুদিরা দ্বিতীয় বিশ্বসম্মেলন করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তাদের এই পরিকল্পনা ছিল যুদ্ধ বাধিয়ে বিশ্বমানচিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো এক বৃহৎ শক্তির সহায়তা নিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং তারা তাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় খেলাফত ধ্বংস করে দেয় পাশ্চাত্ত্য জগৎ তথা খ্রিষ্টানরা, আরব ও তুরানি জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে। ব্রিটিশদের দখলে চলে যায় মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশ, যার মধ্যে ফিলিস্তিন ছিল অন্যতম। ইংরেজরা ইহুদিদের সামনে তিনটি অপসন দিয়েছিলÑ ১. মুজাম্বিক, ২. সাইপ্রাস ও ৩. ফিলিস্তিন। কিন্তু ইহুদিরা শেষেরটিকে বেছে নেয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মূসা আ:-এর জন্মভূমি হিসেবে। ২ নভেম্বর ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য কায়েম করা হয় অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল। কিন্তু জবরদখল করা ভূখণ্ডে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে নিজেরাই ছিল সন্দিহান, ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধানোটা তাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। জার্মানির হিটলার কর্তৃক পোলা আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধে পাঁচ-ছয় লাখ ইহুদি মারা যায় হিটলারের হাতে। কিন্তু যুদ্ধে হিটলারের পরাজয়ের পর রাশিয়া ও আমেরিকার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে তারা ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় করে নেয় ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘ থেকে। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইহুদিদের এবং জবর দখল করে বসতি স্থাপন করে গিলে ফেলা হয় তিন চতুর্থাংশ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড। ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘকর্তৃক স্বীকৃতি ইসরাইলের পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরি করে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে পাশ্চাত্ত্যের সহযোগিতার কারণে ইসরাইলের সীমানা সম্প্রসারিত হয়। অদ্যাবধি ইউরোপ-আমেরিকাসহ গোটা পাশ্চাত্ত্য বিশ্ব নির্লজ্জ বেহায়ার মতো এই অবৈধ রাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী নীতিকে অর্থ ও সামরিক সাহায্যের মাধ্যমে সহযাগিতা দিয়ে আসছে। ফিলিস্তিনের জনগণ বাপ-দাদার সম্পত্তি ও স্থাপনা হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে জীবনযাপন করছে বিভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। আর যারা ইটপাটকেল নিয়ে জায়নবাদী ইহুদিদের মোকাবেলা করার চেষ্টা চালাচ্ছে পাশ্চাত্ত্য তাদেরই বলছে সন্ত্রাসী। একজন অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে মানুষ খুন করছে, বুলডোজার দিয়ে বসতভিটা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, বিমান হামলা করে বাড়িঘর ও জানমালের ক্ষতি করছে সে সন্ত্রাসী নয়, সে হলো নিজের নিরাপত্তা বিধান করছে। আর এ হামলার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে যারা তারা স্বীকৃতি পাচ্ছে জঙ্গিগোষ্ঠী হিসেবে। কী বিচিত্র সেলুকাস এ পৃথিবীর মানবাধিকার!
শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তনে ব্যস্ত এখন আমেরিকা। আর সেই সুযোগে ইহুদি অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল তার সীমানাপ্রাচীর বাড়ানোর চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের স্বপ্ন খায়বার ও মদিনাসহ জাজিরাতুল আরবে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন। গাজায় অব্যাহত সামরিক হামলা তারই প্রমাণ। জোর গুজব রয়েছে খোদ সৌদি রাজতন্ত্র নিজের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মিসরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইসরাইল নামে বিষবৃক্ষের সাথে গোপন আঁতাত করে সফলকাম হয়েছে। খাল কেটে কুমির এনে এখন আমেরিকার সেবাদাস বনে যাওয়া ছাড়া সৌদি আরবের যে আর কিছুই করার নেই। ফিলিস্তিনের মুসলমানের রক্তের বদলা কে নেবে? দেখেশুনে কবি নজরুলের কবিতার চরণ মনে পড়ছে: ‘যত লাথি গুঁতো খাই বলি দাদারে আমার বড়ই সুখ, মেরে নাও দুটো দিন আসিতেছে ইমাম মেহেদি... ইমাম মেহেদি আসুক আর না আসুক আমরা হয়েছি মেহেদি লাল, শত্রুরা মেরে মোদেরকে করেছে হাঁড়ির হাল।’
ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই ইহুদি জাতি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছে। অর্থনৈতিকভাবে বলিষ্ঠতা অর্জনের পর তারা এখন বিশ্বের নেতৃত্ব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। বিশেষভাবে পাশ্চাত্ত্য রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতায় কে থাকবে আর কে থাকবে না সেটা নির্ধারণ করছে ইহুদিরা। এখানেও তারা সেসব লোককে ক্ষমতায় নিয়ে আসছে যারা চরম ইসলামবিদ্বেষী। অর্থলগ্নি ছাড়াও প্রচারণায় সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে তাদের প্রার্থীর বিজয়কে সুনিশ্চিত করছে। শোনা যায়, সম্প্রতি ভারতের ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছেন মোদি ইহুদিদের সার্বিক সহযোগিতায়। বিশ্বের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব কিভাবে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানো যায় সে জন্য তারা যুগে যুগে বিভিন্ন মতবাদের জন্ম দেয়া ও তার বিস্তার ঘটানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। অন্যের ঘাড়ে অস্ত্র রেখে তাদের মূল উদ্দিষ্ট মুসলিম জাতিসত্তার বিনাশ।
১৯৮৫ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের মধ্য দিয়ে উত্থান ঘটে একক সুপার পাওয়ার আমেরিকার। পৃথিবীতে সামরিক ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি করে। আমেরিকা নতুন শত্রু আবিষ্কার করে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল কিনটন ঘোষণা করেনÑ ‘পৃথিবীতে লালবিপ্লব সফল হতে দেইনি, সবুজবিপ্লবও সফল হতে দেবো না।’ অর্থাৎ ইসলামি বিপ্লব সফল হতে দেবো না। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান ১৯৯৩ সালে বই লেখেন দ্য কাশ অব সিভিলাইজেশন এ রিমেকিং ওয়ার্ল্ড অর্ডার, যাতে আমেরিকার ভবিষ্যৎশত্রু সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করা হয় এই বলেÑ ‘কোনো একসময় ইসলাম ও চৈনিক সভতা একত্র হয়ে পাশ্চাত্যকে থ্রেট করবে।’ সুপার পাওয়ার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হয়ে বুশ ঘোষণা করেনÑ ‘আমেরিকা যদি মনে করে কোনো দেশ তার দেশ বা জনগণের ক্ষতি করবে বা করতে পারে তাহলে প্রি-মেজারমেন্ট অনুযায়ী ওই দেশে হামলা চালানোর অধিকার রয়েছে আমেরিকার।’ সে থেকে অদ্যাবধি ইসলাম ও মুসলমানকে টার্গেট করে বিশ্বব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে আমেরিকার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য বিশ্ব। একই পথে প্রচারণা চালাচ্ছে ইসলাম ধর্ম সন্ত্রাসবাদী ধর্ম এবং মুসলমানেরাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী। পাশ্চাত্যের ইসলামভীতি থেকে উৎসারিত এই প্রচারণায় এখন কায়েমি স্বার্থবাদী মুসলিম শাসক শ্রেণীও আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। পাশ্চাত্যের শেখানো বুলি এখন তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। ইসলামভীতি পাশ্চাত্যকেই শুধু নয়, গোটা মুসলিম দুনিয়ার শাসক শ্রেণীকেও ক্ষমতা হারানোর ভীতিতে ফেলেছে। আলজেরিয়ার সালভেশন ফ্রন্ট এবং মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড গণতান্ত্রিকভাবে বিজয় অর্জন করলেও তাদের ক্ষমতায় যেতে দেয়া হয়নি বা ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। আরব বসন্ত বলে পাশ্চাত্ত্যের গণতান্ত্রিক বিশ্ব মুখে খই ফোটালেও যখন ইসলামি শক্তির উত্থান দেখতে পেল, তখন তারা তাদের পুরনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য কখনোই ইসলামের বিজয় সহ্য করতে পারেনি। তাদের কাছে গণতন্ত্র হলো ইসলামশূন্য গণতন্ত্র। বিশ্বব্যাপী ইসলাম ধর্মকে খাটো ও হেয় করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আমেরিকার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য শক্তি ইসলামভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে গোটা দুনিয়ায়; তার পরও ইসলামের প্রসার দিন দিন বেড়েই চলেছে। কারণ এটা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা : ‘তারা ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, আর আল্লাহ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণতা দেবেন, কাফেররা যতই অপছন্দ করুক না কেন’ (আল কুরআন)।
মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার চলছে তার জবাব দিতে হবে উত্তম পন্থায়। মধ্যপন্থা অবলম্বন করে ইসলামবিরোধী শক্তির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যেকোনো চরমপন্থা বোকামি ও মূর্খতার শামিল। কাফের শক্তির পদলেহন না করে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে নিজেদের সম্পদ ও জনগণের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। এর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং দুশমনের মোকাবেলায় সামরিক শক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রয়াস চালাতে হবে। মুসলিম সমাজ একটি দেহের মতো, দেহের কোনো অঙ্গে আঘাত পেলে সারা শরীরে সে ব্যথা অনুভূত হয়। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অন্যায়ভাবে একজন মুসলমানের রক্ত ঝরলে অন্য প্রান্তের কোনো মুসলমান বিনিদ্র রজনী যাপন করার কথা, ব্যথাতুর হওয়ার কথা; কিন্তু যখন এ চেতনাই অনুপস্থিত তখন আসলে আমাদের ঈমান আছে কি না সেটাই বড় প্রশ্ন।
লেখক : অধ্যাপক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

সন্তানদের প্রতি হজরত লোকমানের উপদেশ by অ্যাডভোকেট খোন্দকার আতিয়ার রহমান

বর্তমান সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে অন্যায়-অত্যাচার, অনৈতিকতা, অনিষ্টতা, দুর্নীতি, ভেজাল, ঘুষ, খুন, গুম, ছিনতাই, মাদকতাসহ বিভিন্ন অপরাধ। এক কথায়, এমন কোনো কুকর্ম নেই যা চলছে না। সমাজের নি¤œস্তর থেকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নৈতিকতার চরম স্খলন ঘটেছে। আর এ অনিয়ম ও অনাসৃষ্টির মূল হোতা হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের শিক্ষিত সমাজ। পত্রপত্রিকায় অহরহ সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ; শিক্ষা, সড়ক, নৌপরিবহন, পুলিশ ও শুল্ক বিভাগসহ বেশির ভাগ দফতরই দুর্নীতি ও ঘুষবাণিজ্যে নিমজ্জিত, যার পেছনে রয়েছে চরম লোভ ও লালসা। এদের কারণে দেশ ও জাতি মহাক্ষতির সম্মুখীন হলেও প্রতিরোধে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। তাই সর্বত্র আমজনতার মধ্য ফুটে উঠেছে চরম ক্ষোভ ও হতাশা।
এ অবস্থা নিরসনে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে পবিত্র কুরআনের সূরা লোকমানে সন্তানদের সুন্দর চরিত্র গঠনে হজরত লোকমান আ: তাঁর ছেলেকে যে ১১টি সৎ উপদেশ দিয়েছিলেন তা হলো নিম্নরূপ-
আল্লাহর সাথে শিরক কোরো না : ‘হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে শিরক কোরো না, নিশ্চয় শিরক হলো বড় জুলুম ও মহাপাপ’ (সূরা লোকমান : ১৩)। একজন মানবশিশুকে অবশ্যই জীবনের শুরু থেকে আল্লাহর তাওহিদে বিশ্বাসী হতে হবে। কারণ, তাওহিদই হলো যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতার একমাত্র মাপকাঠি। তাই প্রথমে তিনি তার ছেলেকে আল্লাহর সাথে ইবাদতে কাউকে শরিক করা থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দিয়েছেন।
মাতাপিতার প্রতি সদাচরণ করো : ‘আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার ব্যাপারে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি শুকরিয়া আদায় করো। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই’ (সূরা লোকমান : ১৪)। পিতামাতা সন্তানের কাছ থেকে আনুগত্য, সদাচরণ ও খেদমত পাওয়ার অধিকারীÑ এই শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের দেয়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।
মাতাপিতা যখন সন্তানকে শিরক বা কুফরের আদেশ করেন তখন তা মানা যাবে না : ‘সে ক্ষেত্রে উপদেশ দেয়া হয়েছে দুনিয়ায় তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করার।’
(সূরা লোকমান : ১৫)।
অতি ক্ষুদ্র অপরাধও করা যাবে না : লোকমান আ: তাঁর ছেলেকে অতি ুদ্র অপরাধ করতেও নিষেধ করেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! নিশ্চয়ই পাপ-পুণ্য যদি সরিষা দানার পরিমাণও হয়, অতঃপর তা থাকে পাথরের মধ্যে কিংবা আসমানগুলোতে বা জমিনের মধ্যে; আল্লাহ তাও নিয়ে আসবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী সর্বজ্ঞ’ (সূরা লোকমান : ১৬)।
সালাত কায়েম করো : ‘হে আমার প্রিয় বৎস! সালাত কায়েম করো’ (সূরা লোকমান : ১৭)। লোকমান আ: তাঁর সন্তানকে সালাতে তার ওয়াজিব ও রোকন সমূহ আদায় করতে বলেছেন।
সৎ কাজ করো ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকো : তিনি তাঁর সন্তানকে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখার পরামর্শ দেন। পবিত্র কুরআনে ভালো কাজের বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি ভালো কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে মানুষকে নিষেধ করো’ (সূরা লোকমান : ১৭)।
 বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করো : ‘যে তোমাকে কষ্ট দেয় তার ওপর তুমি ধৈর্য ধারণ করো।’ অর্থাৎ বিপদে-আপদে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। যখন সমস্যার সম্মুখীন হবে তখন করণীয় হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।
ব্যবহারে শিষ্টাচার ও বিনয় অবলম্বন : ‘হে বৎস! মানুষের সাথে কথোপকথনের সময় শিষ্টাচার অবলম্বন করো।’ পবিত্র কুরআনে বিষয়টি উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না’ (সূরা লোকমান : ১৮)।
অহঙ্কার ও গর্বভরে পদচারণ কোরো না : এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অহঙ্কার ও হঠকারিতা প্রদর্শন করে জমিনে হাঁটাচলা করবে না’ (সূরা লোকমান : ৩১)।
নমনীয় হয়ে হাঁটাচলা করো : মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআন কারিমে বলেন, ‘আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো’ (সূরা লোকমান : ১৯)। চলাচলে যেন কোনো প্রকার সীমা লঙ্ঘন না হয় সে দিকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
নরম সুরে কথা বলো : হজরত লোকমান আ: তাঁর ছেলেকে নরম সুরে কথা বলার উপদেশ দেন। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমার আওয়াজ নিচু করো’ (সূরা লোকমান : ১৯)। মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ।’ এখানে কথা বলার সময় বাড়াবাড়ি না করে নরম আওয়াজে কথা বলার উপদেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, বিকট আওয়াজে কথা বলা মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে একেবারেই অপছন্দীয়।
তাই চরম সঙ্কটের পথে অগ্রসরমাণ এই সমাজকে বাঁচাতে রাষ্ট্রকে কঠোর আইন তৈরি এবং তা বাস্তবায়ন করে অসৎ উপায়ে উপার্জিত সব সম্পদ সরকারি খাতে বাজেয়াপ্তকরণ, আর্থিক দণ্ড ও সর্বোচ্চ সাজা দিয়ে এ অবস্থার নিরসন করতে হবে এবং পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সূরা লোকমানে হজরত লোকমান আ:-এর উপদেশ অনুযায়ী বাল্যকাল থেকেই আমাদের সন্তানদের মধ্যে এই শিক্ষা দিয়ে আগামী প্রজন্মকে সৎ, আদর্শবান ও নির্ভীক হিসেবে গড়ে তুলে অন্যায়-অত্যাচার, অনিয়ম-দুর্নীতি, ভেজাল, নেশা প্রতিরোধ করে সুখী ও সুন্দর সমাজ গঠন করে উচ্চ মর্যাদাবান গর্বিত জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে।
লেখক :  প্রবন্ধকার

শামসুর রাহমান- তার কবিতায় দেশপ্রেম by নিখিলেশ ঘোষ

কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) বাংলা কবিতার জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার কাব্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসুন্দরের বিরুদ্ধে দ্রোহ, স্বদেশপ্রীতি, স্বাধীনতার আকাক্সা ও তাৎপর্য চিত্রিত হয়েছে। তার প্রায় সত্তরটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে স্বদেশপ্রীতিমূলক কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে (১৯৭৭), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২), দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে (১৯৮৬), অবিরল জলভূমি (১৯৮৬), বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় (১৯৮৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শামসুর রাহমানের স্বদেশপ্রীতি ও ব্যক্তিপ্রেমসঞ্জাত কবিতার পাশাপাশি গণচেতনা ও প্রকৃতিপ্রেম জায়গা করে নিয়েছে। তিনি রাজপথের দাবিমুখর আন্দোলনের প্রতিও ঐক্যের সুর প্রকাশ করেছেন কাব্যে। ‘ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯’ কবিতায় কয়েকটি কাব্য পঙ্ক্তিতে তা স্পষ্ট : দেখলাম রাজপথে, দেখলাম আমরা সবাই/জনসাধারণ/দেখলাম সালামের হাত থেকে নক্ষত্রের মতো/ঝরে অবিরত অবিনাশী বর্ণমালা/আর বরকত বলে গাঢ় উচ্চারণে এখনও বীরের রক্তে দুঃখিনী মাতার অশ্রুজলে/ফোটে ফুল বাস্তবের বিশাল চত্বরে। বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য বাঙালি রাজপথে রক্ত দিয়েছে। ভাষাপ্রেমে তথা স্বদেশপ্রেমের এ দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসীর নিকট প্রশংসিত। এ আন্দোলনের মাধ্যমে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শহীদের প্রতি কবির শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হয়েছে কাব্য পঙ্ক্তিগুলোতে।
কবি কেবল স্বদেশপ্রীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। স্বদেশের শান্তিকামী, সহজ-সরল সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘব করার জন্য তিনি সত্যিকার ভাবনাব ভাবুক ছিলেন। আমরা যখন মানবতাবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীল সমাজে এবং রাষ্ট্রে বসবাস করতে পারব তখনি শান্তি পাবো। স্বদেশকে তিনি ভেবেছেন নিজের প্রিয়া হিসেবে। স্বদেশভূমির সর্বত্রই তার ভালোবাসার ছোঁয়া। কবির ভাষায় ‘স্বদেশকে প্রিয়ার একান্ত নাম ধরে ডেকে/অগ্নিবলয়ের মধ্যে গড়েছিল প্রেমের প্রতিমা/নিজে পুড়ে পুড়ে। তোমার প্রেমার্ত পঞ্চান্ন হাজার/ একশো ছাব্বিশ বর্গমাইলে আনাচে-কানাচে/পৌঁছে গেছে। বাউলের গেরুয়া বস্ত্রের /মতো মাটি, মাছ আর আকাশের কাছে।’
কবি শামসুর রাহমান স্বদেশপ্রীতির চেতনা ‘বন্দীশিবির থেকে’ কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষভাবে স্বাধীনতার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ও আকর্ষণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে সর্বত্র : ‘স্বাধীনতা শব্দ এত প্রিয় যে আমার/কখনো জানিনি আগে। উঁচিয়ে বন্দুক /স্বাধীনতা, বাংলাদেশ এই মতো শব্দ থেকে ওরা/আমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে সর্বদা। অথচ জানে না ওরা কেউ গাছের পাতায়, ফুটপাতে/ পাখির পালকে কিংবা নারীর দু’চোখে /পথের ধুলায়/বস্তির দুরন্ত ছেলেটার/হাতের মুঠোয়/সর্বদাই দেখি জ্বলে স্বাধীনতা নামক শব্দটি।’

শামসুর রাহমান রাজনীতিসচেতন কবি। তার কবিতায় স্বদেশী জনগণের আকাক্সা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজনীতি থেকে গণমুক্তির আকাক্সা প্রকাশ করেছেন কবিতায়। রাজনৈতিক অপশক্তি, দেশদ্রোহী ও দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্যের প্রতি তার উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও নিন্দা অব্যাহত ছিল। দেশাত্মবোধক কাব্যে ও রাজনৈতিক কাব্যে তার বলিষ্ঠ চেতনা লক্ষণীয়। অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও অনিরাপত্তাজনিত সমস্যা জনগণকে উদ্বিগ্ন করে। পরাশক্তির ইশারায় দেশে দেশে সামরিক শাসকদের ক্ষমতায়ন, জাতীয়তাবাদী নেতাদের হত্যা, জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য তৎপরতা চলে। উত্তর ঔপনিবেশিকতার কুপ্রভাব আমাদের দেশেও চেপে বসেছিল। সেনা শাসনের দুঃসহ পরিস্থিতি, ‘অবরুদ্ধ স্বাধীনতার আদর্শ আর মহৎ আদর্শের স্খলিত চেতনায় স্বদেশের যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা কবির কাছে মনে হয়েছে : ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ/হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।/ এর চেয়ে মর্মন্তুদ বৃত্তায়ন কাহিনী আর কী হতে পারে।’
কবি ছিলেন একান্তে অন্তর্মুখী। বিষণ্নতার কথা, সংশয়ের কথা, প্রেমের কথা আমরা পাই তার প্রথম দিককার কবিতায়। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে বাঙালির মনকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল। তার বিখ্যাত কবিতা ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে অন্যরকম ভালোবাসাÑ ‘তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার? / উনিশ শো বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি/বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী। সে ফুলের একটি পাপড়ি ও ছিন্ন হলে আমার সত্তার দিকে/ কত নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।’
‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটিতে প্রতিফলিত হয়েছে স্বদেশের প্রতিচ্ছবি। রক্তমাখা বস্ত্রখণ্ডটি স্বদেশ রক্তাক্ত পরিস্থিতির ঘোষক। ‘আসাদের শার্ট’ প্রতীক হয়ে উঠেছিলো এভাবেÑ ‘আসাদের শার্ট’ আজ আমাদের প্রাণের পতাকা। স্বদেশ-সমাজ ও গণমানুষের প্রতি কবির ভালোবাসা সিক্ত হয়েছে কাব্যের অভ্যন্তরে। কবিতার ভেতরে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমখচিত আলোকধারা প্রকাশ করে গণচেতনা ও গণ-আন্দোলনকে তিনি শানিত করেছেন। স্বাধীনতার প্রতি প্রেরণাবহুল কাব্য পঙ্ক্তি উদ্বুদ্ধ করেছিল মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের জন্য। সংগ্রামী জনতার অনবদ্য প্রেরণা হিসেবে তার কাব্য যুদ্ধাস্ত্র হয়ে উঠেছিল। স্বদেশের গণ-আকাক্সাই ভাষা পেয়েছিল তার কাব্যে।

বাইরের বিপদ: ভেতরের বিপদ by ড. মাহফুজ পারভেজ

রাজনৈতিক হৈচৈ আর হট্টগোল দেশের মধ্যে এমনই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, বাইরের অনেক কিছু সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের বিরাট মচ্ছব এখন। একের পর এক ইস্যুতে বাংলাদেশের মানুষ উত্তেজিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে থাকলে কারও কারও সুবিধা হয় বৈকি! সে সুবিধা নিতে কসুরও করে না সংশ্লিষ্টরা। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ভারত আরও ১৬টি ব্যারেজ ফারাক্কার উজানে  নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশ নিজেকে নিয়ে উত্তেজিত ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকলে ভেতরের বিপদেই কাবু থাকবে; বাইরের বিপদ দেখা বা সামলানো তখন কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের এখন তেমনই অবস্থা। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে পানি সন্ত্রাস বা পানি আগ্রাসনের মতো বিষয়টিও বাংলাদেশের ওপর আরও কঠিনভাবে আরোপের চেষ্টা চলছে।
এমনিতেই বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে উজানের দেশ ভারতের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। টিপাইমুখের ইস্যু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বিপদের কারণ হয়েছে। তিস্তার পানি না পাওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লি-কলকাতা নাটকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। এখন আবার ফারাক্কার উজানে ১৬টি ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে পানিশূন্য হয়ে মরুপ্রক্রিয়ার শিকার হতে বিশেষ বিলম্ব হবে না বাংলাদেশের! পানি আগ্রাসন বা সন্ত্রাসের খবরটি পাওয়া গেল এমনই সময়ে যখন শুষ্ক মওসুম আসন্ন। পানির তখনই বিশেষ দরকার। শীতে বাংলাদেশে বৃষ্টি হয় না। নদীতে পানি থাকে না। অথচ সে সময় রবিশস্য ও শাক-সবজি চাষের জন্য পানির বিশেষ প্রয়োজন। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনৈতিক কাঠামোতে রবিশস্য বা শীতকালীন শাক-সবজির অবদান অপরিসীম। ব্যক্তিগতভাবে কৃষকদের লাভবান করা ছাড়াও দেশের অর্থনীতির একটি প্রধান ক্ষেত্র হলো এই শীতকালীন চাষাবাদজাত উৎপাদন। এখন পানির অভাবে এই চাষ মার খেলে বাংলাদেশের কৃষক মার খাবে। কৃষি মার খাবে। অর্থনীতি মার খাবে। মার বাংলাদেশের মানুষ নানা দিক থেকেই খাচ্ছে। বিদেশের শ্রম বাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসছে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রতিক্রিয়ায়। মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোতে শ্রমবাজার হারানোর আশঙ্কা বিদ্যমান। সৌদি আরব ইতিমধ্যেই বাইরের শ্রমিকদের ব্যাপারে কঠিন নীতি গ্রহণ করেছে। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও পত্রিকায় যে সব রিপোর্ট ছাপা হয়, সেগুলো আশাজনক নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের কোন খবর চোখে পড়ে না। বরং মালয়েশিয়ার জঙ্গলে বিপদের সম্মুখীন বাংলাদেশী শ্রমিকদের নানা কষ্টের বিবরণই শোনা যাচ্ছে।
এই যে বাইরের নানা বিপদ, তার জন্য দেশের ভেতরে আমরা কি করতে পারছি বা করছি? করতে তো পারছিই না, বরং ভেতরের নানা বিপদ আগলে বসে আছি। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর বচন যেমন আছে, তেমনি আছে ড. পিয়াস করিমের মরদেহ। আছে আরও নানা ইস্যু। বিভিন্ন ইস্যুতে  লড়াই ও তর্ক-বিতর্কে মশগুল থাকলে ভারত পানি দিলো কিনা, কৃষি ও কৃষক বাঁচলো কিনা, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার রইলো কিনা, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক জেলে বা গুলিতে প্রাণ হারালো কিনা, সে প্রশ্ন আর কে করবে! অতীতে আমরা জাতীয় স্বার্থে সোচ্চার হয়েছি। সুদূর ভিয়েতনামের ঘটনায় এখানে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের গুলিতে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করেছে। এখন আমরা নিজেরাই মরছি নিজেদের হাতে, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কলহে। আর ফেলানী বা অন্যরা সীমান্তে গুলি বা বিদেশের কারাগারের ভেতরে মরলেও ভ্রূক্ষেপ করছি না। তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ছি না। নিজের সঙ্গে নিজেরাই লড়ে লড়ে শক্তি নাশ করলে বাইরের বিপদের সঙ্গে পারা কতটুকু সম্ভব হবে! বিপদ বিপদই। বাইরের হোক আর ভেতরের। বিপদকে মোকাবিলা না করলে সেটা ক্যান্সার হবে। ভেতরে হলেও হবে। বাইরের হলেও হবে। অতএব বিপদ আর না বাড়িয়ে বরং কমানোর ব্যবস্থা করাই বুদ্ধিমানের কাজ এবং মানুষের জন্য সুখ আর নিরাপত্তার পূর্বশর্তও এটাই।

বাইরের বিপদ: ভেতরের বিপদ by ড. মাহফুজ পারভেজ

রাজনৈতিক হৈচৈ আর হট্টগোল দেশের মধ্যে এমনই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, বাইরের অনেক কিছু সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের বিরাট মচ্ছব এখন। একের পর এক ইস্যুতে বাংলাদেশের মানুষ উত্তেজিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে থাকলে কারও কারও সুবিধা হয় বৈকি! সে সুবিধা নিতে কসুরও করে না সংশ্লিষ্টরা। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ভারত আরও ১৬টি ব্যারেজ ফারাক্কার উজানে  নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশ নিজেকে নিয়ে উত্তেজিত ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকলে ভেতরের বিপদেই কাবু থাকবে; বাইরের বিপদ দেখা বা সামলানো তখন কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের এখন তেমনই অবস্থা। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে পানি সন্ত্রাস বা পানি আগ্রাসনের মতো বিষয়টিও বাংলাদেশের ওপর আরও কঠিনভাবে আরোপের চেষ্টা চলছে।
এমনিতেই বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে উজানের দেশ ভারতের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। টিপাইমুখের ইস্যু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বিপদের কারণ হয়েছে। তিস্তার পানি না পাওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লি-কলকাতা নাটকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। এখন আবার ফারাক্কার উজানে ১৬টি ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে পানিশূন্য হয়ে মরুপ্রক্রিয়ার শিকার হতে বিশেষ বিলম্ব হবে না বাংলাদেশের! পানি আগ্রাসন বা সন্ত্রাসের খবরটি পাওয়া গেল এমনই সময়ে যখন শুষ্ক মওসুম আসন্ন। পানির তখনই বিশেষ দরকার। শীতে বাংলাদেশে বৃষ্টি হয় না। নদীতে পানি থাকে না। অথচ সে সময় রবিশস্য ও শাক-সবজি চাষের জন্য পানির বিশেষ প্রয়োজন। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনৈতিক কাঠামোতে রবিশস্য বা শীতকালীন শাক-সবজির অবদান অপরিসীম। ব্যক্তিগতভাবে কৃষকদের লাভবান করা ছাড়াও দেশের অর্থনীতির একটি প্রধান ক্ষেত্র হলো এই শীতকালীন চাষাবাদজাত উৎপাদন। এখন পানির অভাবে এই চাষ মার খেলে বাংলাদেশের কৃষক মার খাবে। কৃষি মার খাবে। অর্থনীতি মার খাবে। মার বাংলাদেশের মানুষ নানা দিক থেকেই খাচ্ছে। বিদেশের শ্রম বাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসছে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রতিক্রিয়ায়। মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোতে শ্রমবাজার হারানোর আশঙ্কা বিদ্যমান। সৌদি আরব ইতিমধ্যেই বাইরের শ্রমিকদের ব্যাপারে কঠিন নীতি গ্রহণ করেছে। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও পত্রিকায় যে সব রিপোর্ট ছাপা হয়, সেগুলো আশাজনক নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের কোন খবর চোখে পড়ে না। বরং মালয়েশিয়ার জঙ্গলে বিপদের সম্মুখীন বাংলাদেশী শ্রমিকদের নানা কষ্টের বিবরণই শোনা যাচ্ছে।
এই যে বাইরের নানা বিপদ, তার জন্য দেশের ভেতরে আমরা কি করতে পারছি বা করছি? করতে তো পারছিই না, বরং ভেতরের নানা বিপদ আগলে বসে আছি। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর বচন যেমন আছে, তেমনি আছে ড. পিয়াস করিমের মরদেহ। আছে আরও নানা ইস্যু। বিভিন্ন ইস্যুতে  লড়াই ও তর্ক-বিতর্কে মশগুল থাকলে ভারত পানি দিলো কিনা, কৃষি ও কৃষক বাঁচলো কিনা, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার রইলো কিনা, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক জেলে বা গুলিতে প্রাণ হারালো কিনা, সে প্রশ্ন আর কে করবে! অতীতে আমরা জাতীয় স্বার্থে সোচ্চার হয়েছি। সুদূর ভিয়েতনামের ঘটনায় এখানে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের গুলিতে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করেছে। এখন আমরা নিজেরাই মরছি নিজেদের হাতে, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কলহে। আর ফেলানী বা অন্যরা সীমান্তে গুলি বা বিদেশের কারাগারের ভেতরে মরলেও ভ্রূক্ষেপ করছি না। তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ছি না। নিজের সঙ্গে নিজেরাই লড়ে লড়ে শক্তি নাশ করলে বাইরের বিপদের সঙ্গে পারা কতটুকু সম্ভব হবে! বিপদ বিপদই। বাইরের হোক আর ভেতরের। বিপদকে মোকাবিলা না করলে সেটা ক্যান্সার হবে। ভেতরে হলেও হবে। বাইরের হলেও হবে। অতএব বিপদ আর না বাড়িয়ে বরং কমানোর ব্যবস্থা করাই বুদ্ধিমানের কাজ এবং মানুষের জন্য সুখ আর নিরাপত্তার পূর্বশর্তও এটাই।

গল্প- ঘুমের দহন by এম বাশার

নূরুল কবীর এ নিয়ে দশ নম্বর চাকরি খোয়ালো ঘুমের বদৌলতে। ঘুমে এ রকম আসক্তি বিরল। সে কতবার ট্রেন কিংবা বাস ফেইল করে আবার হাসিমুখে বাড়িতে ফিরে এসে ঘুমের আয়োজনে মেতে উঠেছে। তবে অসম্ভব বিলম্বে আসা ট্রেন তার যাত্রাপথে শুভ লণ।
এ নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তা বা লজ্জা নেই। তার মতে একটা কিছু ব্যতিক্রম থাকা ভালো। এতে বিখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ছাত্রাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ঘুমের ঐতিহ্যটা বেশি করে রপ্ত করেছে। এ ছাড়া রয়েছে ঘুমের দীর্ঘকালের বংশধারা।
মেধার জোরে একে একে নতুন চাকরির মুখ দেখলেও বিভ্রাট শুরু হলো সংসারজীবনে। বিয়ের দিন সকাল ছ’টায় ট্রেনে চেপে যেতে হবে শালিখা। ট্রেন থেকে নেমে রিকশা অথবা ভ্যানগাড়িতে চাপতে হবে।
ভোর ছ’টায় যাওয়ার কথা শুনতেই তার চোখে মুখে বিরক্তি। হাই উঠতে লাগল। তার মা হনুফা বেগম ছেলেকে ডেকে অনেক বোঝালো। ‘অবশ্যই ভোর পাঁচটায়  উঠে সব গোছগাছ করে নিবি।’ গভীর আগ্রহে কথা বলে যখন ছেলের মুখের দিকে তাকালো, তখন তার গা রাগে গরগর করছে। নূরুল কবীর ইজি চেয়ারে বসে একেবারে ওর বাবার মতো মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছে।
ভোর পাঁচটা হতেই শুরু হলো বরকে ঘুম থেকে তোলার কসরৎ। বাড়ির লোকজন দুই-তিনজন করে পালাক্রমে হাঁকডাক শুরু করল। কিন্তু কোথায়? কোনো সাড়াশব্দ নেই।
হনুফা বেগম ও তার স্বামী মোস্তফা কবীর দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে এলো ছেলের ঘরের দরজার কাছে। একবার হনুফা বেগম ডাকে ‘নুরু’। মোস্তফা কবীর ডাকে ‘নুরুল্যা’। এভাবে নুরু ও নুরুল্যা শব্দে তোলপাড়। প্রতিবেশীদের ঘুম ভেঙে গেছে। কিন্তু তার ঘুমের গহিনে এতটুকু ছেদ পড়েনি।
তারা দু’জন ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাওয়ার কালে হনুফা বেগম তার স্বামীর দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল ‘ঘুমের গুষ্ঠি’। বলে দাপাতে দাপাতে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে শিশুর মতো কাঁদতে লাগল। তার এ প্রতিবাদে কোনো সুফল হলো না। সময় গড়াচ্ছে। সবার মধ্যেই বেধড়ক উত্তেজনা। বিয়ের আয়োজন ভেস্তে যাচ্ছে শুধু ঘুমের কারণে। হনুফা বেগমকে থামাতে ব্যস্ত ঘরভর্তি মানুষ। তারা উপদেশ দিয়েছে ‘শুভদিনে কাঁদতে হয় না।’ এ দিকে নূরুল কবীরের সবচেয়ে ছোট বোন জেদ করে ডাকতে গেল ভাইয়াকে। সে অনেকণ ধরে দরজা ধাক্কালোÑ ‘ভাইয়া, ওঠো ভাইয়া, ট্রেনের সময় শেষ।’ একপর্যায়ে গলার স্বর বেরোচ্ছে না। ডাকাডাকির মাত্রা আর একটু বাড়ালে গলা ভেঙে যাবে। পা দিয়ে দরজায় শব্দ করে লাথি মারল। শেষে চোখমুখ লাল করে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে নীরবে চুপচাপ বসে থাকল।
বাড়ির কাজের ছেলে দুলা মিয়া। সেও মনিবপুত্রের ওপর েেপ আছে। সে দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে বললÑ ‘আমি ভাইজানের ঘুম ভাংগায়া ছাডুম।’ বলেই একটি বড় পাতিল এবং দু’টি টিনের কৌটা এনে দু’জন সহযোগীসহ বেদম পেটাতে শুরু করল। এ কাণ্ড দেখে সবার মধ্যে খুশি খুশি ভাব।
‘এবার ঘুমোও দেখি কেমন ঘুমের মরা’Ñ বলে চিৎকার করছে হনুফা বেগম। অবশেষে রফা হলো। পুবের জানালার ধারে বেসুরো ও বিদঘুটে আওয়াজ হচ্ছে। কান ভাঁজানো শব্দের তোড়ে নূরুল কবীরের ঘুমের জাল ছিন্ন হলো। বাড়ির লোকজনের মুখে এক কথা, ঘুমের দোষে বিয়েটা বুঝি ভণ্ডুল হলো। ওদিকে হনুফা বেগম সমানে তার স্বামীর বংশ উদ্ধার করে চলেছেÑ ‘ওর বাবা কি আমাকে কম জ্বালিয়েছে? বিছানায় গা দিতেই মরার মতো পড়ে থাকত।’
ওরা যখন স্টেশনে এসে দাঁড়াল চার দিকে বোঁটকা গন্ধ। পচা ইলিশের পেটি থেকে নোংরা পানি গড়াচ্ছে। বোনজামাই নাকেমুখে রুমাল ঠুসে এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের যাত্রী। রেলস্টেশনের এমন চেহারা আগে কখনো দেখেনি।
ট্রেনে চেপে গন্তব্যে পৌঁছে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারতে রাত প্রায় তিনটে। পরদিন ফেরার কথা। নূরুল কবীর বাসরঘরে ঢুকেই ঘন ঘন হাই তুলতে শুরু করল। বাসরঘরের সাজসজ্জা ও নববধূর মুখশ্রীর চেয়ে তাকে আকর্ষণ করল পরিপাটি করা বিছানা। বিছানার দিকে তাকাতেই মনে হলো বালিশটা যেন তাকে সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছে। বলছেÑ ‘আয় নূরু আয়’। সে বিছানায় গিয়ে নাটকের মতো করে শাওলীর চিবুকে হাত ছুঁয়ে বললÑ ‘তুমি কত জনমের প্রতীা।’ এ রকম দু-এক কথা বলতে-না-বলতেই কান্ত নূরুল কবীর ঘুমের মধ্যে ডুবে গেল। শাওলী বাকি রাত দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছে। চোখেমুখে অতৃপ্তির ছোঁয়া। মনে অজানা আশঙ্কা। বাসর রাতে স্বামীর এ আচরণ দেখে নিদারুণ কষ্ট পাচ্ছিল।
পরদিন বাড়িতে ফিরে সরগরম অবস্থা। নববধূকে দেখার জন্য দলে দলে দর্শনার্র্থীর ভিড়। নূরুল কবীর এই সুযোগে ঘরের দরজা আটকে অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
শাওলী প্রথম রাতের ঘটনা সামলে নিয়েছে। আজ কিছুটা ফুরফুরে ভাব। কিন্তু সে ভড়কে গেছে। পরের রাতেও অনুরূপ ঘটনা। নূরুল কবীর বিছানার কাছে যেতেই কোলবালিশটা যেন নূরুল কবীরের দিকে গড়াতে গড়াতে আসছে। বাসর রাতের মতোই দু-একটা কথা বলতে-না-বলতেই সে ঘুমের ঘোরে নেতিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে শাওলীর বান্ধবী অজন্তার টেলিফোন পেয়ে যেন নতুন জীবন ফিরে পেল। অফুরান কথার ফাঁকে অজন্তা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলÑ ‘কিরে তোর উনি কোথায়?’
শাওলী কিছু না ভেবেই বলল ‘ঘুমোচ্ছে’। অজন্তাÑ ‘বলিস কি-রে ? এখন তো অনেক বেলা।’ অজন্তার মধ্যে হাসির বন্যা ছুটে চলেÑ ‘কিরে সারা রাত বেচারাকে ঘুমোতে দিস না বুঝি?’
শাওলীর মুখে বর্ষার মেঘ। অজন্তা কী করে বুঝবে এ ঘুমের দহন ? সে টেলিফোন ছেড়ে অনেকণ তাকিয়ে দেখল ঘুমের মানুষটাকে।
শাওলীর কাছে সবটাই দুঃস্বপ্নের মতো। মানুষের প্রতি এত অশ্রদ্ধা সে কখনো দেখেনি। আজ গভীর কান্নায় ভেঙে পড়ল। অধিক মাত্রায় ফোঁপাচ্ছে। ক’দিনের মধ্যে তার সুন্দর মুখচ্ছবিতে বড় রকমের পালাবদল ঘটেছে। দুঃসহ দাহ তাকে অনুণ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। শাওলীর এ অভিমান যার উদ্দেশ্যে, সে তখন বিছানায় মাথা গুঁজে নির্বিকার ঘুমোচ্ছে।
রাত পোহালেই শাওলী চলে যাবে। বাড়িতে প্রস্তুতির হাওয়া। শাওলী জানালার কাছ থেকে বিছানায় এসে বসল। হঠাৎ তার মনে হলো ঘুমন্ত স্বামীকে এক ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দিলে কেমন হয়?
বান্ধবী অজন্তার কাছে শুনেছে সাধারণ মানুষের চিন্তাশক্তির স্থিরতা ‘তিন সেকেন্ডের’ বেশি থাকে না। অর্থাৎ তিন সেকেন্ডের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সে ধাক্কা মারার সিদ্ধান্ত নিলো। যেই হাত উঁচু করে কাজ সমাধা করবে অমনি নূরুল কবীর দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে জেগে উঠল। সে চমকে তাকালÑ শাওলী জড় পদার্থের মতো স্থির হয়ে আছে। নূরুল কবীর বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলÑ ‘তুমি! জেগে আছো?’
শাওলীর চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরছে। যেন চৈত্রের নদীর বাঁকে নতুন বৃষ্টির জোয়ার। সে জাপটে ধরে শাওলীকে। নুরুল কবীরের পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছে।
শাওলী আজ আর ােভ উত্তেজনায় কিছুই বলতে পারছে না। তবুও বললÑ প্রলাপের মতোÑ ‘আমার অপমান তুমি বুঝতে পারো না? তুমি এমন করে ঘুমোলে আমি এ বাড়িতে আর ফিরে আসব না।’ শাওলীর দেহটা ফুলে উঠছে অভিমানে।
নুরুল কবীর নড়েচড়ে বসল। সে এক নিমেষে অনেক কিছু ভেবে নিলো। এত চাকরি নয় ইচ্ছে হলেই ইস্তফা দিয়ে নতুন চাকরিতে জয়েন করবে।
এই প্রথম নূরুল কবীর খুব গভীর করে শাওলীকে কাছে টেনে নিলো। এমন করে আর কখনো সে ভালোবাসেনি। এক ফাঁকে শাওলীকে বললÑ ‘তোমায় কথা দিচ্ছিÑ আর এমনটি হবে না।’
শাওলী ব্যাকুল। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সকালে বাবার বাড়িতে পাঠানো লোককে জানালো এখন তার যেতে ইচ্ছে করছে না। ক’দিন পর যেন কাউকে পাঠিয়ে দেয়। কথা শুনে বাড়িতে অন্তহীন কানাঘুষা। মুখটিপে হাসাহাসি। কেউ বললোÑ ‘নতুন বিয়ে তো...।’
শাওলী তার স্বামীর কাছে পুরোপুরি সমর্পণের প্রতীায় বিভোর। তার মুখে ভোরের নতুন রোদ। সে দিনটা যেন একেবারেই অন্য রকম। সারাটা দিন কখন কিভাবে কেটে গেল। শাওলী অনেক কথা জমিয়ে রেখেছে। আজ সব কথা শোনাবে ঝড়ের বেগে। রাতে টুকিটাকি কাজ সেরে ঘরে ঢুকতেই দেখল ঘর অন্ধকার। কোনো সাড়া শব্দ নেই। সে মৃদু আলো জ্বালাল। বিস্মিত হলো শাওলী। পুবের জানালা খোলা। নূরুল কবীর জানালার গ্রিল ধরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে শরতের জোসনা। ভাবল চাঁদের আলো দেখছে। ওর মনটাও নেচে উঠল।
শাওলী মৃদু পায়ে এগিয়ে গেল। পিঠে হাত রেখে বললÑ ‘দেখছো কী সুন্দর আকাশ! চলোÑ অনেক রাত হলোÑ শোবে না?’ কিন্তু নূরুল কবীরের কোনো সাড়াশব্দ নেই।
‘তুমি কি আমার কথায় কষ্ট পেয়েছো। কী, কথা বলছো না কেন?’ তবুও কোনো উত্তর নেই। শাওলী আবেগে গা ঘেঁষে ঝাঁকুনি দিতে গিয়ে দেখে নূরুল কবীর জানালার গ্রিলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
শাওলীর মগজে হঠাৎ করে আগুন জ্বলে উঠল। তার মনে হলোÑ ‘লোকটা কি মানুষ? সে কি নির্বোধ? সে চট করে ভেবে নিলোÑ তিন সেকেন্ড সময় পাবে। এর মধ্যে সে কিছু একটা করবে। চিৎকার করে বললÑ ‘এই প্রেতাত্মা। মানুষের জীবন কি তোর কাছে কাদামাটি?’ বলে এক ধাক্কা দিলো প্রচণ্ড বেগে।
নূরুল কবীরের শুধু চাপাকণ্ঠের আওয়াজ ‘উহ্’! বলে চোখের ওপরের অংশ চেপে ধরল। গ্রিলের সাথে লেগে জায়গাটা থেঁতলে গেছে।
শুধু নির্বিকারভাবে নূরুল কবীর বললÑ ‘শাওলীÑ এত দিনে বুঝলাম আমার বাবার দাঁড়িয়ে ঘুমোনোর অভ্যাসটা আমিও রপ্ত করে ফেলেছি।’
শাওলী এর কী জবাব দেবে? সে ভীষণ কুণ্ঠা ও লজ্জায় কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। লোকটার এতটুকু অনুযোগ নেই। এক হাতে তস্থান চেপে দাঁড়িয়ে আছে।
এরপর থেকে কী যে হলো। নূরুল কবীর আর ঘুমোতে পারে না। প্রতি রাতেই কপালের ব্যথাটা চিনচিনিয়ে ওঠে। একটু শোয়, একটু ওঠে। কপাল চেপে বসে থাকে কিন্তু মুখে কোনো যন্ত্রণাকাতর শব্দ নেই। মাঝে মধ্যে উঠে পানি খায়। অস্থির ভাবে পায়চারি করে। অন্ধকারে ঘরের বাইরে বকুল তলার বেদিতে গিয়ে বসে, গায়ে বকুল ঝবে পড়ে।
শাওলীর যন্ত্রণার দাহ আগের চেয়ে তীব্র হলো। তার স্বামী তার জন্যই তো ঘুমহীন হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মনে হলো কয়েক বছর বয়স বেড়ে গেছে। তার ঘুমহীন চোখ দুটো লাল আঙুরের মতো। মুখটা বিবর্ণ।
শাওলীও ইদানীং ঘুমোতে পারছে না। স্বামীর সেবা নিয়ে ব্যস্ত। সারা রাত কপালে হাত বুলিয়ে ঘুম দিতে চায়। কিন্তু কিছুতেই ঘুমোতে পারছে না।
শাওলী প্রচণ্ড কান্তিতে আজ ঘুমের বাঁধনে ফেঁসে গেছে। সে ভোর রাতে স্বপ্নে দেখল ‘নূরুল কবীর তাকে বলছে করুণ স্বরেÑ ‘শাওলী তুমি আমার আজন্মের ঘুম কেড়ে নিলে। আমার বংশধারার ঐতিহ্য ছিনিয়ে নিলে কেন? আমি তো সারা জীবনের জন্য ঘুমহীন হয়ে গেলাম।’
শাওলী ভয়ে আর্তচিৎকার করে জেগে উঠল। সে জেগে দেখল নূরুল কবীর তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
পরদিন সকালে ওকে নিয়ে যাওয়া হলো ক’জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে। পরীা নিরীা সেরে ডাক্তার বিস্মিত হলেন। এমন জটিল রোগী আগে কখনো পাননি। অনেক ভেবেচিন্তে কিছু হালকা ওষুধপত্র দিয়ে বললেনÑ‘এই রোগীর ঘুম ভীষণ জরুরি’। রোগী আপাতত একটানা পাঁচ দিন শুয়ে থাকবে। এ পাঁচ দিনে সে চোখের পাতা একদম মেলবে না। ঘুম ভেঙে গেলেও চোখের পাতা বুজে শুয়ে থাকবে। জটিল চিকিৎসা। নূরুল কবীর পরামর্শ শুনে ঘাবড়ে গেছে। ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে অনুনয়ের সুরে বললÑ ‘স্যার আমাকে সারা জীবনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিন।’
ডাক্তার মৃদু হেসে বললেনÑ ‘আগে পাঁচ দিন ঘুমিয়ে নিন তো।’
শাওলী ডাক্তারের কথায় প্রচণ্ড মুষড়ে পড়েছে। ওখানেই টেবিলে মাথা রেখে ফোঁপাতে শুরু করল।
শাওলী ক’দিন ধরে ল করছে নূরুল কবীরের চোখের পাপড়িগুলো ঝরে যাচ্ছে। মুখটাও কেমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। শাওলী অনুভব করল তার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। যে ঘুমোতে চায় তার ঘুম কেড়ে নেয়া যায় না। এই সরল বিষয়টি সে বুঝতে চায়নি। তার মধ্যে প্রচণ্ড অপরাধবোধ জেগে উঠেছে।
পাঁচ দিন চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা চিকিৎসা চলেছে। নূরুল কবীর দশ নম্বর চাকরিটা গতকাল হারিয়েছে। মুখে বিষণœতার হাহাকার। সে শাওলীর হাত সজোরে চেপে ধরে বললÑ ‘আমি আর এভাবে পারছি নাÑ আমি চোখ মেলে তোমাকে দেখতে চাই।’ শাওলী স্বামীর বুকে মাথা আছড়ে বললÑ ওগো, আমি তোমার ঘুম চাই-ঘুম। তুমি আমার চোখের ঘুম কেড়ে নাও।

মাদকের স্বর্গরাজ্য সাভার by হাফিজ উদ্দিন

সাভার উপজেলায় প্রায় ২০ লাখের অধিক লোকের বসবাস। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলছে এ এলাকায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে অপরাধী চক্র তৎপর হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে বহু গুণ। আর দিন দিন সাভার পরিণত হচ্ছে মাদকের স্বর্গরাজ্যে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে মাঝেমধ্যে তৎপর থাকলেও কতিপয় পুলিশের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীর সখ্যের কারণে মূল গডফাদাররা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদিকে মাদক বন্ধের জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বিভিন্ন সভা করলেও ভেস্তে যাচ্ছে সব পরিকল্পনা। সভাস্থল থেকে ফিরেই জড়িয়ে পড়ছে মাদক বিক্রিতে- এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে সাভার মডেল থানার ওসি মোস্তফা কামাল দাবি করেন, সাভারে কোথাও মাদক নেই, এমনকি মাদক স্পট পর্যন্ত নেই। তবে বক্তারপুরে বেদেপল্লীতে কিছু মাদক বেচাকেনা হয় বলে ওসি স্বীকার করেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাভারের দুই শতাধিক মদকের স্পর্ট রয়েছে। এর মধ্যে ইমান্দিপুর, মজিদপুর, ব্যাংক কলোনি, রাজাশন, বিরুলিয়া, আমিনবাজার, সাধাপুর, বক্তারপুর, নিরিবিলি, জোরপুল, আনন্দপুর, কর্ণপাড়া, নামাগেন্ডা, ব্যাংক টাউন, নামাবাজার, আশুলিয়া, আকরাইন, গেরুয়া, মনসুরনগর, চাঁপাইন, শিমুলিয়া, কলমা, রাজফুলবাড়িয়া, শ্যামপুর, সামাইর, বেদেপল্লী, বেগুনবাড়ী, জিরাব, ধরেন্ডা, বলিয়ারপুর, নয়ারহাট, গাজিরচট, বুড়িবাজার, সাভার কাঁচাবাজারসহ বেশ কয়েকটি মাদকের স্পর্ট উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বাজার রোডের একটি ধানের চাতালে ও নামাবাজার ফেন্সি সুপার মার্কেটের ভেতরে মাদকের স্পট রয়েছে। এসব স্পটে পাইকারি ও খুচড়া মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। মাদকদ্রব্যের মধ্যে হেরোইন, ফেনসিডিল বেশি বিক্রি হচ্ছে। ‘ইয়াবা’ ট্যাবলেট সাভারে পাইকারি বিক্রি হচ্ছে এমনও গুজন রয়েছে সবার মুখে মুখে। তবে ইয়াবা ট্যাবলেটেরও রয়েছে বিভিন্ন কোড নম্বর। নম্বর ভেদে ট্যাবলেটের দাম বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী হচ্ছে ডব্লিউআর ৪ শ’ টাকা, এক্স ওয়াই ৩৫০ টাকা, চম্পা ৩৫০ টাকা, ডব্লিউআই ৩৫০ টাকা, আর ৪৫০ টাকা। এসব স্পটে আবার হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা ট্যাবলেটের পাশাপাশি গাঁজা ও বাংলা মদের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক হারে। আবার কিছু কিছু এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা অভিনব কায়দায় শার্টের কলার ও হাতলের ভাঁজে, মানিব্যাগে, জুতার ভেতরে, দিয়াশলাই ও সিগারেটেরে প্যাকেটের ভেতরে রেখে খুচরা ইয়াবা ট্যাবলেট ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছে। সাভারে শুধু মাদকেই শেষ নয়। এ মাদকের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে অপরাধীর অভয়ারন্য। আমিনবাজার একটি মার্কেটের বেইজমেন্টে দীর্ঘদিন ধরে বিাভন্ন মাদকদ্রব্য বেচাবিক্রি হচ্ছে বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, মাদকের স্পটগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে মাদক ব্যবসায়ী সোসাইটি এলাকার সিদ্দিক, স্বত্তা, আব্বাস, মেজর, নিত্যানন্দ, হারুন, স্বপন, রাজু ও ভান্ডারি। এর মধ্যেই এসব এলাকায় পুলিশ ও র‌্যাব একাধিকবার অভিযান চালিয়ে কয়েক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করলেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের আগের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। সাভার পৌর এললাকার মজিদপুর ও ছোটবলিমেহের মহল্লায় র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত মাদক সম্রাট মুন্নার স্ত্রী শিল্পী আক্তার, খলিল, ফিরোজ, ইদ্রিস, মুক্তি, কহি, সোহেল ও আনোয়ার। ডগরমোড়া এলাকায় জুয়েল। দিলখুশাবাগে তুষার ও মাছ বিক্রেতা সুজিত। মিটন গ্রামের নূর আলম, দারোগ আলী, ব্যাংকলোনীর ফরহাদ, কাতলাপুর মহল্লায় স্বপন, মোহাম্মদ আলী, আনন্দপুরের ফজলু, নামাগেন্ডায় রিপন ও ভাগলপুরের শিপন। চাঁপাইন এলাকায় রকি, রাসেল ও পিয়ার আলী। সিআরপি রোডে জুয়েল। বনপুকুর এলাকায় জুম্মত, পাগলা, নাহিদ ও কামরুল। নিমেরটেক এলাকায় মোতালেব, ইমান আলী, বিপ্লব ও মোখলেছ। জোরপুল এলাকায় হাসান, ইয়াদ আলী, ইজু ও হাফেজ। চাকুলিয়ার তানজিল, বনগ্রামের রশিদ ও সাদাপুরের চুন্নু। আমিনবাজার এলাকায় সোহেল ও কালাচাঁন। সলমাসির ইয়ার আলী ও ঝাউচরের বারেক। ভাটপাড়া এলাকার সিদ্দিক, আব্বাস ও মিজান। বেদেপল্লীর মেজর, বিবি, খোকন, শাহীন, এরশাদ, আফসার, সোহেল, সোহান ও সৌকত। জামসিং এলাকার সাইফুল, বিল্লাল, গোপাল, রিপন ও নান্নু। রেডিও কলোনি এলাকায় শান্তিবাবু। বিরুলিয়া এলাকার রসুল, আয়নাল, হাসনা, কালাম, সলিম, বাতেন, আনোয়ার। ছোট কালিয়াকৈরের হামিদ। ভবানীপুরের আল আমিন, তারেক। হেমায়েতপুরের দুদু, মনির, শামীম ও মোতালেব। যাদুরচর এলাকার আনসু। রাজফুলবাড়িয়ার সোহেল ও পারভেজ। পানপাড়ার যাদব, আক্তার ও শামীম। বলিয়ারপুরের আকালি। এ ছাড়া সাভার থানা পুলিশের একাধিক সোর্স মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এদিকে দিলখুশাবাগে মাদকব্যবসায়ী সুজিতের সঙ্গে সাভার থানার এএসআই আহাদ আলীর রয়েছে সুসম্পর্ক। প্রায় রাতেই তাদের দু’জনকে একত্রে দেখেছে অনেকেই। এসব এলাকায় র‌্যাব একাধিকবার অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করলেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের আগের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে তারা। অনেকেই অভিযোগ করেন, এসব স্পট থেকে থানা পুলিশ মাসোয়ারা পেয়ে থাকেন।

থাকেন ভারতে বেতন জমা হয় ব্যাংকে

শিক্ষিকা লিপিকা সরকার ভারতে। তাও এক বছর আগে থেকে। অথচ তার বেতন-ভাতা সব জমা হচ্ছে ব্যাংকে। আবার সেই অর্থ তুলেও নেয়া হচ্ছে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালেরই ঐতিহ্যবাহী নুরিয়া স্কুলে। গতকাল এ ঘটনা টের পেয়ে শিক্ষা অফিসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্কুলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়ে হাজিরা খাতা জব্দ করে নিয়ে যান। তবে সভাপতি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, নুরিয়া স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা লিপিকা সরকার (ইনডেস্ক নং-১০৫৯৭৬৮) চিকিৎসার জন্য ঢাকা যান ২০১৩ সালের নভেম্বরে। এরপর তিনি আর দেশে আসেননি। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরকারি বেতন প্রতি মাসে উত্তোলন করে রূপালী ব্যাংকের লিপিকা সরকারের নিজস্ব অ্যাকাউন্টে (১২৩২০০ নং) জমা করতে থাকেন, যা এখনও অব্যাহত আছে। শুধু তাই নয় ব্যাংকে সংবাদ নিয়ে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর সংবাদ। গত জুন মাসে এ অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। লিপিকা ছুটিতে যাওয়ার পর তার বেতন বিলের পক্ষে প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর করেছেন। এমনকি ঈদ ও কোরবানির বোনাসও একইভাবে তার অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়। আবার এ অ্যাকাউন্ট থেকে এ বছরই ২-৩ বার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিপ্তরের আইন শাখার এক কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের ছুটি হলো বিশেষ ছুটি। যা বিনা বেতনে এবং এ ছুটিকালীন সময়ে তার অভিজ্ঞতা কাউন্ট হবে না। এ ব্যাপারে স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। সূত্র জানায়, তিনি বর্তমানে ঢাকায় আছেন। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সাবেক কাউন্সিলর মীর জসিম জানান, এ ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। প্রধান শিক্ষক আমার কাছে বিল নিয়ে এলে আমি সরল বিশ্বাসে বিলে স্বাক্ষর করি। আর প্রতি শিক্ষকের বেতনের অর্থ তাদের নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জমা হয়, যা অন্য কারও পক্ষে উত্তোলন সম্ভব নয়। তবে লিপিকা সরকারের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। এদিকে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গতকাল স্কুলে শিক্ষা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছুটে যান। তিনি হাজিরা খাতায় লিপিকা সরকারের কোন স্বাক্ষর না দেখতে পেয়ে অবাক হন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ঢাকায় থাকায় সহকারী প্রধান শিক্ষক জানান লিপিকা সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। এর সত্যতা যাচাইয়ে ছুটির আবেদনপত্রটি দেখতে চাইলে তা প্রধান শিক্ষকের কাছে বলে জানান। এরপর ওই কর্মকর্তা হাজিরা খাতা জব্দ করেন বলে জানা গেছে। বিকালে ওই খাতার অনুলিপি সহকারী প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে সত্যায়িত করে খাতা ফেরত দেন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামে স্ত্রীর সামনে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিলেন সৌরভ

চট্টগ্রামে সৌরভ পাল (৩৩) নামের এক প্রকৌশলী চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এই সময় তার স্ত্রীও তার সঙ্গে ছিল। গতকাল সকালে নগরীর কর্নেল হাটের কৈবল্যধাম সংলগ্ন ছাইপাড়া রেল লাইনে হঠাৎ দৌড়ে ঝাপ দেন তিনি। পরে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনার কোন কারণ জানা না গেলেও দাম্পত্য কলহের জের ধরে তা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার আত্মীয়স্বজনরা। নিহত সৌরভের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান ঊনসত্তর পাড়ায়। তার পিতার নাম গোপাল চন্দ্র পাল। চুয়েট থেকে পাস করে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানিতে কাজ করছিলেন তিনি। সৌরভ একজন বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী। শহরের নাছিরাবাদ মহিলা কলেজের পাশে তার ভাইয়ের বাসায় থাকতেন।তার দুই বন্ধু মানবজমিনকে বলেন, ঘটনাটি ঘটে গতকাল সকাল ১১টায়। ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেয়ার আগে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে রাস্তায় ঝগড়া করছিলেন। একপর্যায়ে একটি ট্রেন আসতে দেখে তিনি দৌড় দেন। এ সময় তার স্ত্রী আশপাশের লোকজনকে স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আকুতি করতে থাকেন। মুহূর্তের মধ্যে সৌরভ  কর্নেল হাটের কৈবল্যধামসংলগ্ন ছাইপাড়া রেললাইনের ওপর শুয়ে পড়লে ট্রেনে কাটা পড়েন তিনি। তার ডান পা ও বাম হাত দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান। নিজের স্বামীকে চোখের সামনে ঝাঁপ দিতে দেখে তার স্ত্রীর চিৎকার আশপাশের মানুষের কানে আসছিল। তিনি বারবারই বলছিলেন, তুমি এমন কাজ করো না। আমি একা হয়ে যাবো। আমার কথা শোনো। ভুল হয়ে গেছে। ঝাঁপ দেয়ার সময় সৌরভ তখন তাকে বলেছিলেন, আমি মরেই প্রমান করবো তোমাকে কতো ভালোবাসি। স্থানীয় কয়েকজন অটোরিকশা চালক এসব কথা জানান মানবজমিনকে। চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার এসআই অহিদুল হক জানান, ঘটনাটি মর্মান্তিক। বিয়ের এক বছরের মাথায় এ ধরনের ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক। আমরা প্রথমে শুনে ভেবেছিলাম রেলের নিচে কাটা পড়েছে হয়তো কেউ। পরে খবর নিয়ে দেখলাম একজন প্রকৌশলী আত্মহত্যা করেছেন। সৌরভের পারিবারিক সূত্র জানায়, বেশ ভালো বেতনে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে ৩ বছর আগে তিনি অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান। পরে দেশে ফিরে ব্যস্ত হয়ে যান সাংসারিক কাজে। এক বছর আগে বিয়ে করলেও স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ তৈরি হয়। গতকাল সকালে তাকে নিয়ে শান্তির জন্য কৈবল্যধাম আশ্রমের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। এরপর পথে ঘটে এ ঘটনা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বিকালে সৌরভ পালের মেজো ভাই সবুজ পাল মানবজমিনকে বলেন, কিছুই বলার নেই। সে আমাদের পরিবারের খুব প্রিয় একটি ভাই ছিল। কিন্তু অস্থিরতায় ভোগার কারণে সে এমন পথ বেছে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাস্তা থেকে এক ব্যক্তি আমাদের ফোন করে বলেন আপনার ভাইয়ের লাশ পাওয়া গেছে। একজন মহিলা সঙ্গে রয়েছেন। পরে হাসপাতালে গিয়ে দেখি সেটি ছিল সৌরভের লাশ। কালীপূজা উপলক্ষে বিকালে তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিলো।

নাটোর দুর্ঘটনা- হতাহতের ওপর দিয়ে চলে যায় হানিফের গাড়ি by ইসাহাক আলী

নাটোরের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহতের কারণ উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই গতকাল সকাল থেকে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। অবৈধ যান চলাচল বন্ধসহ অভিযানে গাড়ির ফিটনেস ও আনুষঙ্গিক নানা বিষয় খতিয়ে দেখে মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে। নাটোরের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের বনপাড়া থেকে গুরুদাসপুর কাছিকাটা টোলপ্লাজা পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার এলাকায় বাস, ট্রাকসহ যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিং  নিয়ন্ত্রণে জন সচেতনতা সৃষ্টির জন্য অভিযান পরিচালনা করছে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এসব স্থানে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফুয়াদ রুহানী জানান, দুপুর পর্যন্ত ৫টি বাস আটক ও ১০টি বাসের কাগজপত্র সঠিক না থাকায় মামলা দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০শে অক্টোবর বড়াইগ্রামের রেজুর মোড়ে ফিটনেসবিহীন অথৈ পরিবহন ও কেয়া পরিবহনের সংঘর্ষে ৩৬ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হয়। এদিকে এ ঘটনায় নিহত পরিবারের প্রত্যেককে জেলা পরিষদ প্রশাসকের পক্ষ থেকে বুধবার রাতে ১০ হাজার করে টাকা প্রদান করা হয়েছে। এর আগে এ দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহত ও ৪৪ জন আহত হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি তিন দিনের মধ্যেই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নাটোরের জেলা প্রশাসক মো. মশিউর রহমানের কাছে কমিটির আহ্বায়ক নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলী এই প্রতিবেদন দাখিল করেন। কমিটি দুর্ঘটনার তদন্ত কাজ শেষ করে ১৭টি সুপারিশ সহ সাত পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে সোমবারের সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে ওভারট্যাকিং, উভয় বাসের ফিটনেস না থাকা ও অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়ি চালানো হচ্ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত দু’টি বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট না থাকার পাশাপাশি ও লোকাল বাস অথৈ পরিবহন বাসের রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেটটি ভুয়া বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুই বাসের সংঘর্ষের পরপরই আহত যাত্রীরা যখন মহাসড়কে পড়েছিল তখন হানিফ পরিবহনের একটি বাস তাদের পিষে দিয়ে চলে যায়। এতে হতাহতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ১৭ সুপারিশের মধ্যে এই মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালক, মালিক ও এলাকাবাসীকে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে সচেতন করে তোলার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
সোমবার দুর্ঘটনার পরপরই উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে নাটোরের জেলা প্রশাসক মো. মশিউর রহমান নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলীকে আহ্বায়ক এবং বড়াইগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মাহফুজুজ্জামান আশরাফ ও বিআরটিএ’র নাটোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আশরাফুজ্জামানকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত  কমিটি ওই দিন রাতেই তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। দ্রুত ও ভালভাবে তদন্ত করার জন্য পরে কমিটিতে হাইওয়ে পুলিশের বগুড়া অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার খলিলুর রহমান ও বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. শরিফুন্নেছাকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই পাঁচ সদস্যের কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।

গণধর্ষকদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি নিরাপত্তাহীনতায় ধর্ষিতা

হাসপাতালের বেডে শুয়ে এখনও মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে ধর্ষণের শিকার এক নারী। শরীরে প্রচণ্ড জ্বর, তলপেটে ব্যথা আর বমি বমি ভাব  রয়েছে অব্যাহত। থেকে থেকে ঘুমের ঘোরে আঁতকে উঠছেন। রোগীর সেবায় নিয়োজিত স্বজনদের দাবি হায়েনাদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত এ নারীর দিন কাটছে চরম আতঙ্কে আর উৎকণ্ঠায়। তার চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদের দাবি অধিক মাত্রায় নির্যাতন আর নৃশংস অত্যাচারের কারণে তার শরীরের অভ্যন্তরে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা সারতে সময় লাগবে। এ ছাড়া অধিক রক্তক্ষরণ আর ভয় পাওয়ার কারণে শরীরে জ্বর জ্বর ভাব আর বমি দেখা দিচ্ছে। এ ছাড়া দুর্বৃত্তদের রাতভর পালাক্রমে নির্যাতনের ফলে তিনি মারাত্মক ভয় পেয়েছেন। যা দূর হতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। এদিকে নিরাপত্তার কারণে ওই নারীকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের একটি বিশেষ ওয়ার্ডে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের আরএমও শামছুল ইসলাম দোদুল বলেন, যেহেতু ঘটনাটি সেনসেটিভ। মিডিয়ার কারণে ঘটনাটি ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাছাড়া ভিকটিমের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তাকে কিছুটা হলেও নিরাপদে রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অপরদিকে এই ঘটনায় মামলা হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে যুবলীগ ক্যাডার কুচেমোড়া গ্রামের হাতকাটা রাজু ও তার বাহিনীর সদস্যরা। গত রাতে ওই বাহিনীর সদস্যদের অব্যাহত হুমকি ধমকির কারণে  হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়েছিলেন ভিকটিম ও তার ভাই। পরে রাত ১২টার দিকে আবারও তাদেরকে একটি বেসরকারি ক্লিনিক থেকে জেনারেল হাসপাতালের ওই কেবিনে ভর্তি করে কিছুটা হলেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ঘটনাটি পুলিশকে অবহিত করে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পরও এর সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি শার্শা থানা পুলিশ। উল্টো এই ঘটনাকে নিয়ে থানা পুলিশ চোর-পুলিশ খেলা শুরু করেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ঘটনার পর থেকে হাতকাটা রাজুসহ তার ক্যাডাররা এলাকায় অবস্থান করলেও পুলিশের দাবি তারা তাদেরকে পাচ্ছে না। উল্টো এলাকাবাসী ফোন করে দুর্বৃত্তদের বিষয়ে তথ্য দিলে পুলিশ তা আসামিদের কাছে ফাঁস করে দিচ্ছে। গতকাল ঘটনাস্থল যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী কুচেমোড়া গ্রামে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এলাকাবাসী জানান, এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন অন্ত নেই। সরকারি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে এই চক্রটি ধরাকে সরাজ্ঞান করেছ। তারা এহেন কোন অপকর্ম নেই যার  সঙ্গে জড়িত নয়। চোরাচালান, অস্ত্র ব্যবসা, ছিনতাই, ডাকাতি, সরকারি রাস্তার গাছ লুট থেকে শুরু করে সব রকমের অপকর্মের সঙ্গে এই চক্রটি সম্পৃক্ত। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ইলিয়াছ কবির বকুলের খোদ লোক হিসেবে পরিচিত এই হাতকাটা রাজু স্থানীয় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে পুলিশ ইচ্ছা করে তাকে বা তার ক্যাডারদের আটক না করে অভিযানের ভ্যান করছে। কুচেমোড়া গ্রামের ইয়াকুব আলী নামের একজন জানান, গত রাতে হাতকাটা রাজু বাহিনীর ক্যাডাররা গোটা এলাকায় শতাধিক হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তার দায় চাপানো হচ্ছে প্রতিপক্ষদের ওপর। ফলে গতকাল সকাল থেকে এই ঘটনার যারা প্রতিবাদ করছিলেন তাদেরকে এলাকা ছাড়া করা হয়েছে। যাতে করে তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় কথা বলার কেউ না থাকে।
শার্শা থানার ওসি আব্দুর রহিম বলেন, গত রাতে এলাকায় বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে সত্য, তবে এর সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। গণধর্ষণের ঘটনায় কোন আটক আছে কিনা জানতে চাইলে ওসি বলেন, এ ঘটনায় রাতে থানায় মামলা হয়েছে। এসআই বায়েজিদকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি বলতে পারবেন মামলার সর্বশেষ অবস্থা কি। তবে যদ্দূর জানি এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে মামলার আইও বাগআঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক বায়েজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আসামিদের আটকের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, যখনই পুলিশ এলাকায় ঢুকছে তখনই কে বা কারা পটকা বা বোমা ফাটিয়ে আসামিদের সতর্ক করে দিচ্ছে। ফলে পুলিশ এলাকায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আসামরিা পালিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে আটক করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে যশোর পুলিশের মুখপাত্র এএসপি হেড কোয়ার্টার রেশমা শারমিন বলেন, এই ঘটনায় শার্শা থানায় হাতকাটা রাজুসহ ৫ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আসামিদের আটকের চেষ্টা চলছে। অপরদিকে গণধর্ষণের শিকার নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

বাসায় থাকবে অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ মগবাজারের বাসায় রাখা হয়েছে। মরহুমের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলেরা বিদেশ থেকে ফিরলে তার জানাজা ও দাফনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এর আগ পর্যন্ত লাশ বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সে বাসায় রাখা হবে। রাজধানীর মগবাজারে পারিবারিক কবরস্থানে পিতার কবরের পাশে অধ্যাপক গোলাম আযমকে দাফন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্র জানায়।

বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অধ্যাপক গোলাম আযম। রাতেই সেখান থেকে লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। ময়না তদন্ত শেষে আজ সকালে তার লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মরহুমের ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আজমি পরিবারের পক্ষ থেকে লাশ গ্রহণ করেন। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে লাশ মগবাজারের বাসায় নেয়া হয়।
এদিকে হাজার হাজার শুভানুধ্যায়ী ও দলীয় কর্মী অধ্যাপক গোলাম আযমকে একনজর দেখার জন্য তার মগবাজারের বাসার সামনে ভিড় করেন। একপর্যায়ে কর্মী সমর্থকদের চাপে মগবাজার ওয়্যারলেস মোড় থেকে তার বাসা পর্যন্ত রাস্তায় সব যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। এছাড়া ওই এলাকায় কঠোর নিরপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সবার দেখার সুবিধার্থে মরহুমের লাশ সকালে ও জুমার নামাজের পর বাসার সামনে রাখা হয়।

পিয়াস করিম ও লতিফ সিদ্দিকী এবং আওয়ামী বিচারের মাপকাঠি by সিরাজুর রহমান

বেশ কিছুকাল থেকে ভাবছি ‘মান’ ও ‘সম্মান’Ñ এই দুটো শব্দ বাংলা অভিধান থেকে মুছে ফেলা হয়েছে কি না। তবে কিছু দিন ধরে পত্রিকার পৃষ্ঠায় পড়ছি প্রধানমন্ত্রীর অবমাননা কিংবা মানহানির অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে এর-তার বিরুদ্ধে আদালতে পাইকারি হারে মামলা হচ্ছে। অর্থাৎ শব্দ দুটোকে এখনো ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়নি। কেউ কেউ ভাবছে সম্মানীত ব্যক্তি এখনো কিছু অবশিষ্ট আছেন, অন্তত থাকা উচিত। ছোটবেলায় বাড়িতে গুরুজনেরা এবং স্কুলে শিক্ষকেরা এই সম্মান দেয়া-নেয়ার ব্যাপারটা জোর দিয়ে শেখাতেন। তাদের শিক্ষার আসল বক্তব্যটা ছিল ‘যিনি জ্ঞানে কিংবা অভিজ্ঞতায় বড় তাকে সম্মান দিতে শেখো। তা হলে এক দিন তুমিও সম্মান পাওয়ার উপযোগী হবে। স্কুলের নিচু কাসে একটি ছেলে এক গুণীজন সম্বন্ধে ‘সে’ এবং ‘বলেছে’ ইত্যাদি ভাষায় রচনা লিখেছিল। মাস্টার মশায় ওকে গোটা কাসের সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছিলেন, ‘কার সম্বন্ধে লিখেছিস তুই? সে লোকটা তোর বাড়ির চাকর নাকি?’ বাড়ির কাজের লোকদেরও যারা বয়সে বড় ছিল তাদেরও আপনি করে বলতে শেখাতেন আমার বাবা-মা। দেশের বিদগ্ধ কারো কারো সাথে মাঝে মধ্যে কথা হয়। তার থেকে যতটুকু বুঝতে পারছি বাংলাদেশে এখন প্রকৃত পুঁথিগত কিংবা নৈতিক শিক্ষা দেয়া হয় না। সন্তানদের ওপর পিতামাতার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে বলা চলে। সন্তানেরা জানে কষ্ট করে লেখাপড়া শিক্ষার প্রয়োজন নেই; আওয়ামী লীগের ক্যাডারভুক্ত হলেই টাকা-পয়সা ও প্রভাবের অভাব থাকবে না, আর টাকা দিলেই রাজনীতিকদের মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু-একটি সার্টিফিকেট সহজেই কেনা যাবে। বাবা-মাও বুঝে গেছেন সন্তান যখন ক্যাডারভুক্ত হয়ে গুণ্ডা-গার্দি করবে, তখন তাদের আদব-কায়দা শেখানোর চেষ্টা অরণ্যে রোদন হবে। আমাদের দিনে আরেকটা রোল-মডেল ছিল। সমাজের যারা মাথা ছিলেন আর যারা রাজনীতি করতেন নম্রতা, বিনয় ও সম্ভ্রম প্রায় সময়ই তাদের মধ্যে লক্ষ করা যেত। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ জাতীয় নেতাদের কাছে থেকে জানার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সাধারণ মানুষও দেখা করতে এলে তারা সৌজন্যের সাথে তাদের সাথে কথা বলতেন। ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত উর্দু পড়েছি। নেতাদের আচরণ থেকে ‘বড়োঁ কা দেমাগ ভি বড়া হোতা হ্যায়’ প্রবাদটার সার্থকতা নেতাদের মধ্যে দেখে খুশি হয়েছি। আরো একটি বিষয় লক্ষ করেছি। তারা সবাই অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেনÑ আধুনিককালে যাকে বলা হয় ক্যারিশমা। আর এখন কী দেখছি? রাজনৈতিক নেতা এবং মন্ত্রী যারা হচ্ছেন মুখে কিংবা আচরণে এতটুকু ভদ্রতা কিংবা সৌজন্য নেই তাদের মধ্যে। বর্ণাঢ্যতা কিংবা ক্যারিশমার তো প্রশ্নই ওঠে না। শিক্ষা কিংবা অভিজ্ঞতার যোগ্যতা তাদের নেই। পদোন্নতি কিংবা আধিপত্যের আশায় কটুকাটব্য আর খিস্তি-খেউড়ের প্রতিযোগিতা পড়ে যায় তাদের মধ্যেÑ যেন জন্মের সময় মা তাদের মুখে মধুর পরিবর্তে দিয়েছিলেন ধুতুরার বিষ। দিনরাত টেলিভিশনে এবং সভা-সমিতিতে এসব গালিগালাজ শুনছে ছেলেমেয়েরা। মা-বাবার শিক্ষার বিরুদ্ধে একটা স্বাভাবিক প্রতিরোধ তাদের মনে গড়ে ওঠে।
জাতীয় লজ্জা ও অপমান
আশা করি বুঝতে পারছেন অধ্যাপক ড. পিয়াস করিমের কথা মনে করেই কিছু কথার অবতারণা করেছি। এই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের সাথে আমার কখনো পরিচয় হয়নি। কিন্তু মিডিয়া থেকে তার অনেক মন্তব্য ও অভিমত জানতে পেরেছি এবং জেনে উপকৃত হয়েছি। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং তাদের পরগাছারা এই জ্ঞানী-গুণী ও সম্মানিত শিক্ষাবিদকে নিয়ে যা করেছে, তার জন্য পুরো জাতি লজ্জিত ও অপমান বোধ করছে। একই সাথে বিশ্ববাসীকে আমরা জাতীয় বৈশিষ্ট্যের যে পরিচয় দিয়েছি সেটা মোটেই গৌরব করার মতো নয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আমাদের জাতীয় গরিমার অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত। ৬২ বছর আগে মাতৃভাষা সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রপ্রীতির তাড়নায় আমরা ভাষা আন্দোলন করেছিলাম। অন্তত চারজন ছাত্র সে বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি আত্মদান করেছিলেন। তাদের স্মৃতিকে এবং নিজেদের আত্মগরিমাকে অমর করে রাখার লক্ষ্যে আমরা শহীদ মিনার গড়েছিলাম। তখন থেকে কোন জাতীয় সংগ্রামকে সমুন্নত করার অথবা কোনো বিদেহি জাতীয় বীরকে শ্রদ্ধা নিবেদনের লক্ষ্যে জাতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হতে চায়। অধ্যাপক ড. পিয়াস করিমের মরদেহ সবার শ্রদ্ধানিবেদনের উদ্দেশ্যে শহীদ মিনারে স্থাপন করার প্রস্তাবও উঠেছিল সে কারণে। মনে হচ্ছে শ্রদ্ধা গৌরব আর গরিমার ভাষা যারা বোঝে না, শহীদ মিনারকে তারা ছিনতাই করে নিয়েছে। দেশে যারা এখন ক্ষমতার আসন জুড়ে বসে আছে ইংরেজি অভিধানে তাদের বলতে হবে ‘স্কোয়াটার’Ñ জবর দখলকারী। ভোট দিয়ে দেশের মানুষ তাদের ক্ষমতার আসনে বসায়নি, গুণ্ডা-গার্দির জোরে তারা গদি দখল করেছে, আর দিবারাত্রি দেশে ও বিদেশে গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে গলা ফাটাচ্ছে। অবৈধ ক্ষমতা পোক্ত করার আশায় তারা একে একে দেশের সব অনুশাসন ও প্রতিষ্ঠানকে দখল করে নিচ্ছে ও ধ্বংস করছে। শহীদ মিনারকেও তারা এখন ছিনতাই করে নিয়েছে মনে হয়। অথচ বর্তমান শাসক দলের বিশেষ কোনো দাবি কিংবা অধিকার নেই ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনারের ওপর। এসব খবর আমি নিজে ছেপেছি পত্রিকার পাতায় : অমর একুশের দিনে আইন ভঙ্গ করে আত্মাহুতি দানের ঘোরতর বিরোধিতা করেছিল আওয়ামী লীগ। তখন বলাবলি হচ্ছিল যে পাকিস্তান সরকার শিগগিরই পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার নির্বাচন দিতে যাচ্ছে এবং আওয়ামী লীগ নিশ্চিত ছিল যে তারাই জয়ী হবে এবং গদি পাবে। সরকার ও পুলিশের সাথে বিবাদ করে তারা নির্বাচনের সম্ভাবনা ভণ্ডুল করে দিতে চায়নি। একুশে ফেব্রুয়ারিতে কোনো কারাগারের জানালা থেকে কোনো চিরকুট বর্ষিত হয়নি। আসলে আওয়ামী লীগ কোনো আদর্শের দল নয়, তারা গদির দল। একাত্তরেও তারা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়নি, মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে পালিয়ে গিয়ে তারা গা বাঁচিয়েছে, কিন্তু এ দেশটাকে তারা এখন পৈতৃক সম্পত্তি বলে দাবি করে।
পিতার পরিচয়ে সন্তানের বিচার হতে পারে না
ড. পিয়াস করিমের বিরুদ্ধে তাদের আক্রোশের আসল কারণ কারো বুঝতে বাকি নেই। বিশেষজ্ঞের চোখ দিয়ে তিনি সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করতেন টেলিভিশনের টকশোতে। তাতে সরকারের অসত্য কথাবার্তা আর দুর্নীতি ও হত্যাকাণ্ডের মুখোশ ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল। অর্থাৎ তারা আর ‘বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাতে’ পারছিল না। পিয়াস করিম এখন গত হয়েছেন। তার কণ্ঠে এখন আর প্রতিবাদ নিঃসৃত হওয়ার ভয় নেই। এ সুযোগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার এবং তার পিতার চরিত্র হনন করে গায়ের ঝাল মেটাচ্ছেন। এবং তারা ভ্রান্ত আশা করছেন এভাবে দেশের মানুষের মনে পিয়াস করিমের অতীতের বিশ্লেষণ ও মন্তব্যগুলোর যে স্মৃতি গেড়ে আছে সে স্মৃতিও তারা মুছে ফেলতে পারবেন। আওয়ামী লীগ ওয়ালাদের বক্তব্য : পিয়াস করিমের বাবা একাত্তরে পাকিস্তানিদের গঠিত শান্তি কমিটির স্থানীয়পর্যায়ের নেতা ছিলেন। সে অভিযোগ সত্যি হলেও প্রশ্ন ওঠে, ব্যক্তির পরিচয় কি বাপের পরিচয় দিয়ে হয়? গুজরাটের গ্রামীণ রেলস্টেশনের চা ভেণ্ডারের পুত্র নরেন্দ্র মোদিকে আজ আর চা-ওয়ালা বলে অবজ্ঞা দেখানোর হিম্মৎ আওয়ামী লীগ নেতাদের হবে? আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা নিজেদের রবীন্দ্রনাথের আদর্শের ধারক ও বাহক বলে দাবি করতে চান। রবীন্দ্রনাথও কি তার ‘ফুল বলে’ গানটিতে লিখে যাননি, ‘জন্ম নিয়েছি ধূলিতে, দয়া করে দাও ভুলিতে, দাও ভুলিতে’? তা হলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে (যে শহীদ মিনার কারো বাবার সম্পত্তি নয়) পিয়াস করিমের শবদেহ জনসাধারণে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণ রাখার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ক্রুসেড ঘোষণা কেন? এবং মনে রাখতে হবে, অতীতেও মৃতদের স্মৃতিকে বহুবার অপমানিত করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন, শেখ মুজিবুর রহমানের সমমর্যাদার আওয়ামী লীগ নেতা, তাজউদ্দীন আহমদের এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের মন্ত্রী এবং একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমদের জন্য বাংলাদেশের রাজধানীতে জানাজার নামাজ আদায় করতে দেয়নি আওয়ামী লীগ। একবারও কি তাদের মনে হয়েছে, যে ব্যক্তি জীবিত কিংবা মৃত অন্যদের শ্রদ্ধা দেখাতে জানে না শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্যতা তার নেই?
গতকালের হিরো আজকের ভিলেন
একাত্তরে অধ্যাপক পিয়াস করিম ও তার পিতার ভূমিকার সঠিক বৃত্তান্ত দিয়েছেন সরকারের আইনমন্ত্রী (এবং মুজিব হত্যা মামলার প্রধান সরকারি কৌঁসুলি) আনিসুল হক। তিনি বলেছেন পিয়াস করিমের পিতাও আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। একাত্তরে পিয়াস করিম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করছিলেন বলে পাকিস্তানিরা তাকে গ্রেফতার করে। তারপর তার মুক্তিপণ হিসেবে তার পিতাকে শান্তিকমিটিতে যোগ দিতে বাধ্য করে। এই সত্যটি প্রকাশের কারণে শেখ হাসিনার সরকারের মূল্যবান আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আওয়ামী ওয়ালারা যে তাণ্ডব শুরু করেছে (অবশ্যই সরকারের সায় নিয়ে) তাকে রীতিমতো কুৎসিত ও অশ্লীল না বলে উপায় নেই। আমি যত দূর জানি আনিসুল হকের বংশগত আনুগত্য আওয়ামী লীগের প্রতি। আজ তিনি রাজাকার হয়ে গেলেন! এবং এখনো কেউ ভুলে যায়নি যে মাত্র কিছু দিন আগেই মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এবং শেখ হাসিনার সর্বশেষ বৈধ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার মার্শাল এ করিম খোন্দকারের বিরুদ্ধেও অনুরূপ কুৎসিত আন্দোলন হয়েছে, তাকেও রাজাকার বলে অপবাদ দেয়া হয়েছে। কী অপরাধ ছিল এয়ার মার্শাল করিম খোন্দকারের? তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন যে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। একই কথা শেখ মুজিবুর রহমানের অতি ঘনিষ্ঠ সহকর্মী এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ (তার কন্যা শারমিন আহমদের রচনা অনুযায়ী) আরো অনেকে বলে গেছেন, এমনকি আমি নিজেও বহুবার প্রমাণ ইত্যাদিসহ লিখেছি। তাহলে কি এ কথা না বলে উপায় আছে যে আওয়ামী লীগ মোটেও আদর্শভিত্তিক দল নয়, এ দলের ভিত্তি সম্পূর্ণ মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং দলটি টিকে আছে শুধু গদির লোভে এবং গদির কল্যাণে?
লতিফ সিদ্দিকী ভাগ্যবান
এর বিপরীতে এখন তুলনা করা যাক হাসিনার সরকারের সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রসঙ্গকে। এই মন্ত্রী সম্বন্ধে বহু অভিযোগ প্রকাশ্যেই আলোচিত হয়েছে। মন্ত্রী পদে আসীন থাকাকালীন বহু দুর্নীতি ও অনিয়মিত কাজ তিনি করেছেন। কিন্তু সেসব কারণে তার চাকরি যায়নি, এমনকি নতজানু দুদকও কোনো তদন্ত করেনি তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিউ ইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রীর প্রিয়ভাজন ১৮৫ জন সফরসঙ্গীরও অন্যতম ছিলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। কিন্তু তিনি এবং আরো বেশি করে সরকার এখন বিপদে পড়েছেন এই সফরের কারণে। নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে প্রবাসী টাঙ্গাইলবাসীর এক ঘরোয়া বৈঠকে লতিফ সিদ্দিকী ইসলামের মহানবী সা:, ইসলামের পাঁচ খুঁটি কালেমার অন্যতম হজ এবং তাবলিগ সম্বন্ধে বহু অবমাননাকর ও কটূক্তি করেছেন। লতিফ সিদ্দিকীর এসব কদর্য উক্তি বাংলাদেশে তো বটেই বিশ্বব্যাপী ঈমানদার মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। কিন্তু কোনো প্রতিবাদ হয়েছে কি আওয়ামী লীগ থেকে? কোনো মিছিল হয়েছে প্রতিবাদে? কেউ তার কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে?Ñ যেমন এখন প্রতিবাদ হচ্ছে আনিসুল হকের বিরুদ্ধে? এমনকি লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রী পদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য পদ এবং এ দলের সদস্য পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে? সরকার উদ্যোগী হয়ে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো চেষ্টা হয়েছে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে? মহানবী সা: ও ইসলামের অপমান এবং বিশ্ব মুসলিমের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা দূষণীয় নয়, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের সমালোচনা এবং স্বাধীনতা ঘোষণার মিথ্যা দাবি অস্বীকার করা চরম অপরাধ!
অব্যাহতির আসল কারণ
অনেক ধানাইপানাই ও কালক্ষেপণ করে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে ‘অব্যাহতি’ দেয়া হয়েছে। অথচ সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি মন্ত্রী পদে বহাল থাকেন ‘প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টি’ অনুযায়ী, তার মন্ত্রী থাকা না থাকার সিদ্ধান্ত নেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। ইচ্ছা করলে যেকোনো মুহূর্তে তিনি লতিফ সিদ্দিকীকে বরখাস্ত করতে পারতেন। রাষ্ট্রপতির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা প্রকৃত কারণ ছিল না। তা ছাড়া বর্তমানে যেসব রুচিহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারীরা মন্ত্রী পদ ‘অলঙ্কৃত’ করছেন তাদের দায়দায়িত্ব নিতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের রুচিতে কুলাবে কি না আমার সন্দেহ আছে। তবে লতিফ সিদ্দিকীকে এখন ‘অব্যাহতি’ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা মহানবী সা:-এর অবমাননা, হজ সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য কিংবা তাবলিগের বিরোধিতা করার জন্য নয়Ñ ভিন্ন কারণে এই ‘অব্যাহতি’ বলে অনেকেই সন্দেহ করছেন। জ্যাকসন হাইটসের সে বৈঠকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয় সম্বন্ধে ‘তুচ্ছতাচ্ছিল্য’ করে কিছু কথা বলেছেন এবং কিছু অপ্রিয় তথ্যও প্রকাশ করেছেন, যা সরকারকে বিব্রত করে। সাধারণ লোকের ধারণা, এই বেফাঁস কথার কারণেই এই মন্ত্রীকে ‘অব্যাহতি’ দেয়া হয়েছে। আওয়ামী ওয়ালাদের ধৃষ্টতা বেড়েই চলেছে। তারা এখন ‘ফতোয়া’ দিতে শুরু করেছে। সম্মানিত কলামিস্ট ফরহাদ মজহার, ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, দৈনিক মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক মাহফুজ উল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল ও আইনজীবী তুহিন মালিকসহ ৯ জনকে (অর্থাৎ বাংলাদেশে যারাই সত্য কথা বলবেন তাদের সবাইকে) শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। যেন শহীদ মিনার কারো পৈতৃক সম্পত্তি। বাইরে নোটিশ টাঙিয়ে দিলেই হলো : ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি, প্রবেশ নিষেধ’।
লন্ডন, ২১.১০.১৪
serajurrahman34@gmail.com

ষোড়শ সংশোধনী : নয়া বাকশালের পদধ্বনি by মো: আসাদ উদ্দিন

গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতিদের অভিশংসন বিল পাসের মধ্য দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা নেয়া হলো সংসদের হাতে। সংবিধানের ৯৬(৩) দফায় বর্ণিত ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল’-এর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণপ্রক্রিয়া ছেঁটে ফেলে দিয়ে চালু করা হলো সংসদের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণপ্রক্রিয়া। এখন দেশের সবচেয়ে সম্মানিত, জ্ঞানী, শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মানুষদের ‘অযোগ্য’ ঘোষণার অধিকার পেল জাতীয় সংসদের সেসব সদস্য, যাদের অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এদের মধ্যে খুনের আসামি, কালোবাজারি বা দুর্নীতিবাজ হিসেবে অনেকে পরিচিতি পেয়েছেন। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খাইরুল হক উল্লেখ করেছেন, ‘ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয়, যেকোনো রাষ্ট্রে যখনই সুপ্রিম কোর্ট তথা বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভাকে সংবিধান ও আইনের আওতায় রাখতে ব্যর্থ হয় এবং নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ হয়ে দাঁড়ায় তখনই রাষ্ট্রে ও নাগরিকদের জীবনে চরম বিপত্তি দেখা দেয়।’ যদিও তিনি নিজেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরবর্তী সময়ে স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। এখন সুপ্রিম কোর্টের নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প রইল না। বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষমতা তো ছিলই, শেষমেশ তাদের অপসারণের ক্ষমতাও বাগিয়ে নিলো সরকার। অতএব সরকার যা বলবে, যেভাবে চাইবে সেটাই গুরুত্ব পেতে বাধ্য।
অতি প্রাচীন ইংল্যান্ডের বিচারব্যবস্থায় রাজার ইচ্ছা ও শর্তানুসারে বিচারক নিয়োগ হতো এবং বিচারকেরা রাজার নামে ও তার পক্ষে বিচার কাজ পরিচালনা করতেন। রাজার অসন্তুষ্টির কারণ হলে বিচারকেরা তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হতেন। এ কারণে বিচারকেরা অন্য রাজ কর্মচারীদের মতো রাজার একান্ত বশংবদ সেবক থাকতেই নিজেদেরকে সন্তুষ্ট ও গর্বিত মনে করতেন। বাংলাদেশের বিচারপতিদেরও সেই প্রাচীনকালে ফিরিয়ে নেয়ার পথ তৈরি করা হলো সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে। তৎকালীন ইংল্যান্ডের মতো বাংলাদেশেও মূলত শাসন চলে একজনেরই। প্রধানমন্ত্রী যা ইচ্ছা করেন, তা-ই হওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান কোনো রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ওই দলের সংসদ সদস্যদের ভোট দেয়া বা মতামত দেয়ার পথ রহিত করে দিয়েছে। দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সে সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দেয়াই অবশ্য কর্তব্য দলীয় সংসদ সদস্যদের। অনির্বাচিত হলেও যেহেতু সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংসদ সদস্যই এখন সরকারি দলের, সেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিজে অথবা কারো ইচ্ছায় বা প্ররোচনায় কোনো বিচারপতির প্রতি কোনোভাবে অসন্তুষ্ট হলে তার আর রক্ষে নেই।
মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার ১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে ‘পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারালয়ে ন্যায্য ও প্রকাশ্য শুনানি লাভের অধিকার’। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদেও এ অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। একইভাবে সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান করতে বলা হয়েছে। এরই আলোকে ২০০৭ সালের নভেম্বরে বিচার বিভাগকে স্বাধীন বলে ঘোষণাও করা হয়েছে। এ রকম সুনির্দিষ্ট আইন সৃষ্টির অনেক আগে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কু তার ‘দ্য স্পিরিট অব লজ’ গ্রন্থে ‘ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি’র ব্যাখ্যা দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচারবিভাগীয় ক্ষমতাকে যদি পৃথক করা না হয়, তা হলে ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকতে পারে না; যদি একে আইন বিভাগের সাথে একত্রীকরণ করা হয় তা হলে একই ব্যক্তি আইন প্রণেতা ও বিচারকর্তা হয়ে দাঁড়াবে এবং ব্যক্তির জীবন ও স্বাধীনতা স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। যেখানে একই ব্যক্তির হাতে নির্বাহী, আইন ও বিচারÑ এই তিন ধরনের ক্ষমতা একীভূত করা হয় সেখানে কিছুই বাকি থাকবে না।’ সুতরাং সংসদের হাতে বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতার্পণের অর্থ হলো বিচার বিভাগ চলে গেল এক প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীনে। তার হাতে বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতনভাতা ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই ছিল এবার অপসারণের ক্ষমতাও বগলদাবা হয়ে গেল।  ষোড়শ সংশোধনী বিলটি পাসের আগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি এই সংসদে বিলটি পাসের পক্ষে ১০১টি কারণ বলতে পারব। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, এই সংসদ সংবিধান অনুযায়ী জনগণের নির্বাচিত সংসদ। সুতরাং আমরা এই সংসদে বিলটি পাস করতে পারি।’ আসলে কি তাই? যে সংসদের ৩০০ জন সদস্যের মধ্যে ১৫৩ জনই বিনা নির্বাচনে, বিনা ভোটে সদস্য হয়েছেন এবং বাকিরাও নির্বাচিত হয়েছেন অনুল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটে সে সংসদকে জনগণের নির্বাচিত বলা শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু হতে পারে কি?
আইনমন্ত্রীসহ এ বিলের পক্ষপাতিত্বকারী অনেক রথী মহারথীই যুক্তি হিসেবে ব্রিটেন, আমেরিকা, ভারত, জার্মানি, ফ্রান্সসহ পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে এ বিধান রয়েছে মর্মে বলার চেষ্টা করে থাকেন; কিন্তু তারা এ কথা চিন্তা করেন না সেসব রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের কাঠামো এবং ভিত্তি কত মজবুত। বাংলাদেশের মতো অনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দিয়ে তাদের পার্লামেন্ট গঠিত নয়। তাদের পার্লামেন্ট বিরোধী দলহীন নয় এবং জনগণের প্রতিনিধিত্বহীন নয়। বিভিন্ন দল ও মতের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা আর আস্থাহীনতা দিয়ে ভরা নয়। তাদের গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত ও পূর্ণরূপে বিকশিত। তাদের নির্বাচনে পক্ষপাতদুষ্ট সূক্ষ্ম আর স্থূল কারচুপির সয়লাব বয়ে যায় না। সর্বোপরি এসব দেশের বিচার বিভাগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, উল্লেখ করার মতো এমন কোনো নজির নেই বললেই চলে। সুতরাং অবাস্তব ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ উদাহরণ টেনে ‘লিয়াকত আলী আর জুতার কালী’কে এক করে দেখার এবং বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা সংসদের হাতে নেয়াকে যুক্তিপূর্ণ ও যথোচিত বলার কোনো সুযোগ নেই। প্রসঙ্গত একটি কথা না বললেই নয়, এ ধরনের একটি স্পর্শকাতর, জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কারো সাথে কোনো পরামর্শ করারও প্রয়োজন মনে করেনি সরকার। অথচ যেকোনো আইন প্রণয়ন বিশেষ করে সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে দেশের প্রথিতযশা আইনজীবীদের সাথে আলোচনা করা এবং দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর কি না সে বিষয়ে গভীরভাবে হিসাব-নিকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। সংবিধানের এ ষোড়শ সংশোধনীর আদৌ কি কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল? কারণ বিদ্যমান ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল’-এর বিধান সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কোনো সমালোচনা বা অভিযোগ শোনা যায়নি। কেউ কোনো সন্দেহ বা প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। তাহলে কেন সেটিকে ছেঁটে ফেলতে হবে?
বাস্তবতা হলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হাঁটছেন তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পথ ধরে। ‘সংবিধান, সাংবিধানিক আইন ও রাজনীতি : বাংলাদেশ প্রসঙ্গ’ বইয়ের লেখক মোহাম্মদ আবদুল হালিম উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশে মুজিবের সময়কাল সংসদীয় প্রকৃতির ছিল না, ছিল প্রধানমন্ত্রী শাসিত একনায়কতান্ত্রিক’। একইভাবে আবারো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের উদ্দেশ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ ষোড়শ সংশোধনী। যেভাবে কিছু দিন আগে প্রণীত হয়েছে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা। এ ছাড়া সরকারের যাবতীয় কার্যক্রম দেখে সচেতন নাগরিক মাত্রেরই বোঝার বাকি থাকে না যে, এ দেশের ভাগ্যাকাশে মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায় নয়া বাকশালের পদধ্বনি। ধেয়ে আসছে কালবৈশাখী। ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা সব কিছুকে তছনছ করে দেবে সে ঝড়। সুতরাং অবধারিত সত্য এটাই যে, জনগণকে আবার জাগতে হবে। জনগণের আন্দোলনই হবে একমাত্র সমাধান। ইতিহাস সাক্ষী, সংগ্রামের পথ বেয়েই আসে সত্যিকার মুক্তি।
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
asadiuk@yahoo.com

ভর্তির সুযোগের সমতা নেই by জসিম উদ্দিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষার নিয়মে পরির্বতন আনতে চাচ্ছে। নতুন নিয়মে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় ছাত্ররা একবারের বেশি অংশ নেয়ার সুযোগ পাবেন না। দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হওয়ার যে সুযোগ এত দিন ধরে চলছিল, তা আর থাকছে না। কর্তৃপক্ষ নিয়মটি আগামী বছর থেকে কার্যকর করতে চায়। তাহলে এবার প্রথম যারা ভর্তি পরীক্ষা দিলেন আগামীবার তাদের জন্য আর সুযোগ থাকছে না। এবার যারা প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন, তারা এমনিতেই প্রস্তুতির জন্য কম সময় পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তে বিুব্ধ হয়ে তারা আন্দোলন করছেন। এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তীর্ণদের ৫৬ শতাংশ দ্বিতীয়বারের। বাকি ৪৪ শতাংশ প্রথমবার পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কোনো সময় না দিয়ে এখন হুট করে দীর্ঘ দিন চলা এ পদ্ধতি বাতিল করলে নিঃসন্দেহে এ বছরের ছাত্ররা বঞ্চিত হবেন। দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নেয়ার প্রধান কারণ পছন্দমাফিক বিষয় না পাওয়া। এটি স¤পূর্ণ চাকরির বাজারকেন্দ্রিক একটি চিন্তা। বেকারত্বের অভিশাপ আমাদের ওপর যেভাবে চেপে বসে আছে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার বাসনা থেকে উদ্ভূত। শিক্ষার লক্ষ্য এতটা বস্তুবাদী হওয়ার কথা না থাকলেও পরিস্থিতি বাধ্য করছে তাদের। এরা প্রায় সবাই ঢাকা কিংবা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার ভর্তি হন। দ্বিতীয়বার যখন কাক্সিত বিষয় পান, তা ছেড়ে আসেন। তাদের ছেড়ে আসা আসনগুলো খালি পড়ে থাকে। যেখানে অন্য একজন শিক্ষার্থী সুযোগ পেতে পারতেন। এই কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ৪২১টি, ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে ৪১৬টি এবং ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ৪২৯টি আসন শূন্য হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নিয়ম এমন সিস্টেম লসকে প্রতিরোধ করবেন। কিন্তু যেভাবে বিনা নোটিশে সিদ্ধান্তটি চাপিয়ে দিতে চাইছে কর্তৃপক্ষ তা দয়ামায়াহীন।
কর্তৃপক্ষ এবার ভর্তি পরীক্ষা এক মাস এগিয়ে আনে। প্রস্তুতির জন্য নতুন ছাত্ররা মাত্র দুই মাস সময় পান। অন্য দিকে দ্বিতীয়বারে অংশ নেয়া ছাত্ররা বছরজুড়ে সময় পেয়েছেন। একটি ব্যবস্থা দীর্ঘ দিন চলে আসছে। এ পদ্ধতি পরিবর্তন করার জন্য কয়েক বছর সময় দেয়া দরকার। ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের মানসিক প্রস্তুতির একটা ব্যাপার আছে। এবারই যদি এ সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয় অনেকে মুষড়ে পড়বেন। অন্য দিকে কমপক্ষে এক বছর সময় দেয়া হলে এবারের ছাত্ররা যেমন সুযোগটি পাবেন অন্য দিকে নতুন যারা ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসবেন তারা মাথায় রাখবেন, এরপর আর সুযোগ থাকবে না। সুতরাং প্রস্তুতিটাও তারা সেভাবে রাখনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের তুলনায় এর আসন সংখ্যা সীমিত। একটি আসনের বিপরীতে ৫০ জন ছাত্র প্রতিযোগিতা করেন। এ ধরনের আসন স্বল্পতার মধ্যে গড়ে চার শ’র বেশি আসন মাস্টার্স পর্যন্ত শূন্য থাকা বিরাট অপচয়। এই আসনগুলো যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি নতুন বছরের আসনের ওপর পুরনো বছরের ভর্তি-ইচ্ছুকেরা ভাগ বসাচ্ছেন। নতুন ও পুরনোদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা হয়। যেমন এবার যারা পাস করে ভর্তি পরীায় বসেছেন, তারা সময় পেয়েছেন দুই মাসেরও কম; কিন্তু আগের বছরের শিক্ষার্থীরা, তারা প্রস্তুতির জন্য পেয়েছেন এক বছরের বেশি সময়। ভর্তি পরীায় জালিয়াতির জন্য দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় আসা ছাত্ররা প্রধানত দায়ী। মোবাইল ফোনে প্রশ্ন বলে দেয়া, হলে নকল করা। এ ছাডা এক শ্রেণীতে সিনিয়রের সাথে জুনিয়রদের কাস করার েেত্রও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও দেখা দেয়। এসব কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী বছর থেকে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীায় অংশ নেয়ার সুযোগ থাকবে না। একবার ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার পক্ষে এসব যুক্তি দিয়েছেন শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তবে তিনি ক্ষুব্ধ শিার্থীদের একটি দাবির পক্ষে মত দিয়েছেন। তা হলো সিদ্ধান্তটা যেন আগামীবারের পর অর্থাৎ ২০১৬ থেকে কার্যকর করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ছাত্ররা খুবই খারাপ ফলাফল করেছেন। ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য কেবল দু’জন উপযুক্ত ছাত্র পাওয়া গেছে। চারুকলা ইনস্টিটিউটের ভর্তি পরীক্ষায় ৯৬ শতাংশের বেশি ছাত্র ফেল করেছে। এ অবস্থায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, শিক্ষার মান ঠিক আছে। তিনি বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেছেন জিপিএ ৫ বাড়ার অর্থ শিক্ষার মান বেড়েছে এমন বোঝায় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তির জন্য একটি সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতির প্রস্তাব করা হচ্ছে মন্ত্রীর পক্ষ থেকে। এর সাথে সুর মিলিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাফর ইকবাল অভিযোগ করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা শিক্ষামন্ত্রীকে মানছেন না। সে জন্য তিনি সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী কোনো নির্দেশ দিলে তা না মানার সাহস পাবেন না ভিসিরা। তার এ ধরনের বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিরুদ্ধে শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ হয়ে অনেকটা হুমকির মতো মনে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, তা ভণ্ডুুল করার আহ্বান জানাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে। অনেক শিক্ষক তার এ বক্তব্যে আহত হয়েছেন। কারণ সর্বাত্মাক কর্তৃত্ববাদী শাসনের এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যদি তাদের স্বাধীনতা হারায় আর কিছুই বাকি থাকবে না।
শিক্ষার মানের যে অবনতি হয়েছে সে ব্যাপারে স্বীকার করতে না চাইলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম থেকে এটা প্রমাণ হচ্ছে, এরা ব্যাপারটি নিয়ে শঙ্কিত। এত দিন নানা পক্ষ থেকে সতর্ক করা হলেও এরা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে থেকেছে নির্বিকার। এখন ২০০৬ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এইচএসসি পরীার ফলাফলের পরিসংখ্যান প্রস্তুত করেছে শিা মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালের এইচএসসি পরীায় যেখানে মোট শিার্থীর ৯.৯৭ শতাংশ জিপিএ ৫ পেযেেছ, ২০১৩ সালে পেয়েছে ৭.০৩ শতাংশ। আর ২০০৬ সালে ২.৯৪ শতাংশ এবং ২০০৭ সালে তা ছিল ৩.০৬ শতাংশ। প্রত্যেক বছর জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ও পাসের হার বাড়ছে। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কাছে তথ্য চাওয়া হবে, সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক পরীায় উত্তীর্ণ শিার্থীরা কেমন ফলাফল করছে। এসএসসি ও এইচএসসিতে পাসের হার ও জিপিএ’র শতকরা হার বাড়ার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে কতজন শিার্থী বিভিন্ন বর্ষে প্রথম শ্রেণী পাচ্ছে তা তুলনা করা হবে। এ বোধোদয়কে সাধুবাদ জানাতে হয়। এ সূত্র ধরে শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয় যদি তাদের ভুল শোধরাতে অগ্রসর হয় তাতেই জাতির কল্যাণ।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রচলিত ভর্তিপদ্ধতি ছাত্রদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলছে। ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণে সমন্বয় না থাকার কারণে ছাত্র ও অভিভাবকেরা বিপদে পড়েন। আবার একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগওয়ারি ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন রয়েছে। বাড়তি ফি আদায়ের জন্য এ ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতি রয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেন। এ ধরনের জটিলতা নিরসনে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মেডিক্যালের মতো গুচ্ছপদ্ধতির ভর্তি-প্রক্রিয়ার পে মত দিয়েছেন। সারা দেশের পরীার্থী যদি এক দিনে পরীা দেন এবং মেধাক্রম অনুসারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছড়িয়ে দেয়া হয়, তাহলে একজনকে সাত-আট জায়গায় পরীার দুর্ভোগে পড়তে হয় না, নকলের সুযোগও কমে। হতে পারে যে একেকটি অনুষদের জন্য একেক গুচ্ছপরীা। সে েেত্র শিার্থীদেরও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীার জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় পছন্দের জন্য ছাত্ররা একটি পছন্দের ক্রম দেবেন। মেধা স্কোরের ভিত্তিতে তার ফয়সালা করা হবে।
এ ধরনের হলে সর্বোচ্চ মেধাবীরা যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ নিতে পারবেন। একইভাবে যারা চাইবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেলে বাড়ির কাছে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন তারও সহজ সুযোগ ঘটবে। প্রায় একই সাথে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ছাত্র ও অভিভাবকদের হয়রানির অবসান হতে পারে। দেশে ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এগুলোর মান উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। সব বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ কমবে। ফলে যশোর, কুমিল্লা, পটুয়াখালীর ছাত্ররা সেখানে পড়তে চাইবেন। ভালো শিকেরা যাতে ঢাকার বাইরে থাকতে রাজি হন, সে জন্য তাদের বিশেষ বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা দিতে হবে। ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিকদের আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চমাধ্যমিকের পর পরই যদি এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তাহলে কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য থাকে না। কোচিং ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। একজন ডাক্তার নিজের পেশায় না গিয়ে অধিক আয়ের জন্য কোচিং ব্যবসায়কে বেছে নিচ্ছেন। একইভাবে প্রকৌশলীদের অনেককে এ কাজে জড়িত হতে দেখা যাচ্ছে। অথচ সরকার তাদের পেছনে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে অর্জিত শিক্ষা নির্দিষ্ট পেশায় ব্যবহারের জন্য।
সরকার নাগরিকদের নির্বিশেষে ভর্তির সমান সুযোগ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বেশ কয়েক বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদরাসাছাত্রদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এখন এটি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েও প্রধান ১৩টি বিভাগে ভর্তি হতে পারবে না। কারণ তিনি মাদরাসা বোর্ড থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগে ভর্তির জন্য শর্ত যোগ করা হয়েছে। ইংরেজিতে পেতে হবে ২০ এবং ঐচ্ছিক ইংরেজিতে পেতে হবে ১৫। মাদরাসাছাত্রের বাইরে এ শর্ত পূরণ করতে পেরেছেন মাত্র দু’জন ছাত্র। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া আবদুর রহমান ২০০ নম্বরের মধ্যে ১৬৮ দশমিক ৯৮ পেয়েছেন। ১৩ বিষয়ে প্রথমেই অযোগ্য হয়ে যাওয়া এই ছাত্র ইংরেজিতে পেয়েছেন ২৮ দশমিক ৫০। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ২০০ নম্বরের ইংরেজি না পড়ায় তিনি এ বিভাগে ভর্তি হতে পারছেন না। ১০০ নম্বরের ইংরেজি পড়েও তিনি যে সবচেয়ে বেশি ইংরেজি শিখতে পেরেছেন, তা মূল্যায়ন করতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছাত্রদের যোগ্যতার বিচারের প্রতিবন্ধক। যদিও তা আরোপ করা হয়েছে অধিকতর যোগ্যদের বেছে নেয়ার নামে।
মাদরাসাছাত্ররা ভর্তি পরীক্ষায় সব শর্ত পূরণ করেও পছন্দনীয় বিভাগ পাচ্ছেন না। অন্য দিকে যোগ্য ছাত্রদের না পেয়ে শর্ত শিথিল করে অনেক বিভাগে এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তি করাতে হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সি ইউনিটে মাদরাসাছাত্রদের ভর্তির ফলাফল ‘অন্যান্য’ নামে প্রকাশ করা হয়েছে। ‘অন্যান্য’ নামে শ্রেণীকরণ করে মাদরাসাছাত্রদের জন্য একটি কোটা করে দেয়া হচ্ছে। ইতিহাস বিভাগে প্রথম হয়েছেন মাদরাসাছাত্র। এ বিভাগে তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র দু’টি আসন। এর ফলে অন্য ছাত্ররা তাদের চেয়ে অনেক কম নম্বর পেয়েও ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন। মেধা তালিকায় প্রথম দিকে থেকেও তারা বিভিন্ন বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন না। পিছিয়ে পড়াদের জন্য সুযোগ করে দিতে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা রয়েছে। এ কোটা আরো ব্যাপকভাবে রয়েছে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে। এখন এ কোটা পদ্ধতির ব্যবহার হচ্ছে একটি বিশেষ শ্রেণীকে ঠেকিয়ে দেয়ার জন্য। এ ধরনের উল্টো কোটার ব্যবহার পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমেই অনেক বিভাগে মাদরাসাছাত্রদের ভর্তির সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অন্যান্য বিশ্বাবিদ্যালয় তা-ই অনুসরণ করতে চাইছে নানাভাবে শর্ত আরোপ করে। আমাদের সংবিধানের ১৯ ধারায় নাগরিকদের মধ্যে সুযোগের সমতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। সরকার এ অধিকারের রক্ষক হবে। মাদরাসাছাত্রদের সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত করার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশ নিয়েও কর্তৃপক্ষ টালবাহানা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক শিক্ষকের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এমনটি হচ্ছে। এরা ধর্মের বিরোধিতা করতে গিয়ে নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার হরণ করে চলেছেন। স্বায়ত্তশাসনের আড়াল নিয়ে অল্প কিছুসংখ্যক শিক্ষক চোরাগোপ্তা কায়দায় এ বঞ্চনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে লুকিয়ে থেকে একদল ছাত্রকে বঞ্চিত না করে এসব সম্মানিত শিক্ষকের মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে তাদের মতামত প্রকাশ্যে ব্যক্ত করা উচিত। এখন মাদরাসা বোর্ডও ২০০ নম্বরের ইংরেজি ও ২০০ নম্বরের বাংলা পড়ানোর ব্যবস্থা করছে। এই ছাত্ররা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসবেন তখন এসব শিক্ষক আবার কোনো নতুন শর্ত জুড়ে দেয় কি না সেই আশঙ্কা করছেন অনেকে।
jjshim146@yahoo.com