Showing posts with label সমাজ. Show all posts
Showing posts with label সমাজ. Show all posts

Thursday, September 26, 2024

অসহিষ্ণু সমাজের আলাপ by মোহাম্মদ আরিফ

সমপ্রতি ‘গণপিটুনিতে মৃত্যু’- শীর্ষক কয়েকটি সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের  লেখালেখিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব। চলছে আলাপ- ঝড় উঠছে আড্ডায় চায়ের কাপে। বাংলাদেশ অনেকদিন ধরে হত্যাপুরী হয়ে উঠেছে। ধর্ষণ করে হত্যা, বিরুদ্ধ মতে হত্যা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হত্যা, বিচার-বহির্ভূত হত্যা, ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধিতে হত্যা, পরকীয়ার কারণে হত্যা, জমিজমা-ঘরবাড়ি দখলকে কেন্দ্র করে হত্যা, পুড়িয়ে হত্যা, বিষ খাইয়ে হত্যা, কুপিয়ে হত্যা, আত্মহত্যা, গণপিটুনিতে হত্যা ইত্যাদি এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

প্রশ্ন জাগে, সমাজ কি ক্রমাগত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে? তাহলে কেন? স্বাধীনতার অনেক স্বপ্নের একটি ছিল স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা কায়েম করা। যেখানে মানবিক অধিকার সমুন্নত থাকবে। বস্তুত তা হয়নি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর একদল লোক মেতে ওঠে লুণ্ঠন আর হত্যায়। সমাজে বিশৃঙ্খলার বীজ রোপিত হয়। সদ্য স্বাধীন  দেশের মানুষের স্বপ্ন ভুলুণ্ঠিত হতে শুরু করে।

আমাদের সামাজিক অধঃপতনের অনেক কারণ। তবে অন্যতম কারণ বৈষম্য। সমাজে নানা ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। এর মধ্যে ধর্মীয় এবং অর্থনীতি- এই বিশেষ দু’টি কারণে সমাজ সবসময় অস্থিতিশীল থাকে। চলমান অসহিষ্ণুতার পেছনেও এ দু’টি কারণ রয়েছে মনে বলে করি। বিগত চার দশকে এদেশে এক  শ্রেণির লুটেরা, লুম্পেন সম্পদের পাহাড় গড়েছে।

অপরদিকে মধ্যবিত্তের অনেকেই নেমে গেছেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। আর্থিক অসঙ্গতি সাধারণের মধ্যে সার্বক্ষণিক চাপা ক্ষোভ তৈরি করছে। কাঙ্ক্ষিত জীবন অর্জনে ব্যর্থতা সমাজে তৈরি করছে অসম প্রতিযোগিতা। বেকারত্ব সৃষ্টি করছে হতাশা। একই সমাজে উচ্চ শ্রেণির বর্ণাঢ্য জীবন নিম্নবিত্তকে ঈর্শাকাতর করছে। প্রেমে পরাজয় জন্ম দিয়েছে প্রতিহিংসার। ধর্মীয়  গোঁড়ামির ফলে বেড়েছে উন্মাদনা। অযোগ্য ব্যক্তির উত্থান এবং যোগ্যতমের পতনে তৈরি হয়েছে বিভেদ। সমাজের এই অসম বাস্তবতা সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। তারা মানসিকভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের সমাজ জীবন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করেছে রাষ্ট্র পরিচালকগণ। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আর্থিক বৈষম্য। এদেশের  বেশির ভাগ মানুষ যেখানে মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খায়, সেখানে লুটেরা শ্রেণি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিত্তবৈভবে আয়েশি জীবনযাপন করে। তারা আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, লন্ডনে সেকেন্ড হোম গড়ে তোলেন। হাওয়া বদলাতে উড়াল দিয়ে চলে যান পৃথিবীর নামি-দামি সৈকতে। বিনোদনের জন্য বেছে নেন জগৎসেরা সব এমাউজমেন্ট হোটেল। তাদের ব্যাংক হিসাবে থাকে কোটি  কোটি টাকা।

অপরদিকে দেশের সাধারণ নাগরিক তিনবেলা ঠিকমতো  খেতে পায় না। চিকিৎসার খরচ  জোটে না। করতে পারে না মাথাগোঁজার একটু খানি ঠাঁই। জীবন-যাপনের ন্যূনতম চাহিদা  মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। তবু শাসকগোষ্ঠী ‘উন্নয়ন’-এর জোয়ার বইয়ে দিয়েছেন গণমাধ্যম আর রাজনীতির ময়দানে।
গত কয়েক দশক ধরে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি বেশ উচ্চারিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদগণ মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কথা বলে উন্নয়নকে ফিতে দিয়ে মাপবার চেষ্টা করেন। অথচ তারা জানেন না এদেশে একজন  পোশাক শিল্প শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কত? এই সামান্য টাকায় একজন মানুষের পরিবার চলে কী করে? তারা খোঁজ রাখেন না  দেশের এটিএম বুথগুলোয় যারা সিকিউরিটির জব করেন, তাদের। তারা জানেন না, গ্রামে কৃষিক্ষেত্র  থেকে আয় দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসায় অনেক কৃষক নগরে পাড়ি জমাচ্ছেন। শহরে এসে রিকশাচালক বা দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে বেঁচেবর্তে আছেন।

বর্তমান সমাজে চারপাশে এত অন্যায়, বৈষম্য, বিভেদ সাধারণকে মনে মনে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সেজন্য তুচ্ছ ঘটনাতেও হিংস্র হয়ে উঠতে দেখা যায়। মানুষের ভেতর থেকে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই নিষ্ঠুর, পাশবিক হয়ে উঠছি। সাধারণ মানুষ এখন তার ক্ষুদ্ধতাকে কোথাও না কোথাও উগরে দিতে চায়। যা আমরা মব জাস্টিস বা গণপিটুনিতে দেখতে পাই। সুযোগ পেলেই সে এই কাজটি করে। কারণ অন্যকিছু নয়। মূলত পেশি শক্তিই হয়ে উঠছে ব্যক্তির কাছে ন্যায্যতার অন্যতম হাতিয়ার। তাই, খুনের মতো অমার্জনীয় অপরাধ করতে  কেউ দ্বিধা করছে না।

সমাজ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার  পেছনে রাজনীতির দায়  কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। গত তিন তিনটে নির্বাচনে মানুষ  ভোট দিতে পারেনি। গণতন্ত্র হয়েছে ভুলুণ্ঠিত। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। সাধারণ মানুষ আইনানুগ সহায়তা পায়নি। হত্যা, গুম, খুনের কোনো বিচার হয়নি। অসহায় মানুষ নির্যাতিত হয়েছে। ধর্ষিত নারী পায়নি সুবিচার। রাজনৈতিক গুণ্ডারা জবর দখল করে নিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য। ফুটপাথের ভিখারীকেও চাঁদা দিতে হয়েছে। খুনি, অত্যাচারী সমাজে বুক চিতিয়ে ঘুরে  বেড়িয়েছে। কেন না তাদের ছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সনদ। সরকারবিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক নেতারা পালিয়ে  বেড়িয়েছে। সরকার অনেককে করেছে দেশান্তরী।

উক্ত বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না, তবে খুঁজতে হবে মুক্তির উপায়। সদ্য আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনদিন  দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। মাঝের দিনগুলোতে ঢাকাসহ সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, হত্যাসহ অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনা ঘটেছে। সরকার গঠনের পর চুরি, ডাকাতি কমলেও হত্যাযজ্ঞ থামেনি। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। হত্যাযজ্ঞ থামাতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এককভাবে দায় দেয়া যাবে না। আমরা জানি, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীর কর্মকাণ্ড বিতর্কিত হওয়ায় বিদ্যমান পুলিশর দায়িত্ব পালনে পূর্ণ পেশাদারী হয়ে উঠতে পারছে না।

মনে রাখতে হবে প্রতিহিংসাপরায়ণতা শান্তি আনতে পারে না। শান্তি আসে অহিংসায়। আমাদের অনেক  ক্ষোভ আছে, না পাওয়ার কষ্ট আছে, হারানোর বেদনা আছে। কিন্তু প্রতিহিংসা এর কোনোটারই সমাধান নয়। 

mzamin

Monday, May 30, 2011

মুক্তিযোদ্ধাদের স্থান হবে সবার ওপরে by মহিউদ্দিন আহমদ

বছর দুই আগে একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা পড়েছিলাম পত্রিকায়—একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভার পর অতিথিদের খাবারের উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করছেন নিজ পরিবারের জন্য। এটা পড়ে আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা কেঁদেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যত দিন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা অভুক্ত থাকবে, তত দিন আমি বঙ্গভবনে যাব না।’ তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন কি না জানি না।
আমি সেই খবরটি পড়ে আহত হয়েছি, অবাক হইনি। গত চার দশক ধরে আমরা দেখছি একই চালচিত্র। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার যে সিঁড়িগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেটা মাড়িয়ে অনেকেই ক্ষমতা আর বিত্তের চূড়ায় উঠে গেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বিরাট অংশ পড়ে আছে পাদপ্রদীপের নিচে, অন্ধকারে।
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তবে আমার কাছে কোনো সার্টিফিকেট নেই। এর প্রয়োজন কখনো অনুভব করিনি। দেশ এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধায় ছেয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, একটা প্রমাণপত্র থাকলে মন্দ হতো না।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সহসভাপতি শামসুল কাউনাইন আমার স্কুলজীবনের সতীর্থ। কাউন্সিলের পুনর্বাসন ও কল্যাণ মহাসচিব মনিরুল হক ও আমি একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। তাঁদের কাছে আমার ইচ্ছার কথা জানাতেই তাঁরা আমাকে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার একটি লম্বা ফিরিস্তি দিলেন। আমি বললাম, ‘মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যদি প্রমাণের জন্য আমাকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে তোমাদের কাজটা কী?’ দুই দিন পর তাঁরা আমাকে জানালেন, একটা কর্মসূচি উপলক্ষে তাঁরা এক দিনের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাবেন, আমি যেন তাঁদের সহযাত্রী হই। আমি সানন্দে রাজি হলাম।
১৯ মে ভোরে রওনা হয়ে পৌঁছালাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে। সংসদের জেলাপ্রধান হারুনুর রশীদ আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। জেলা পরিষদ মিলনায়তনে দেখা হলো মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল হক সরকার ও আখতার হোসেন সায়িদের সঙ্গে। জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অপেক্ষা করছিলেন সংসদের জেলা উপপ্রধান রতন মিয়া। মিলনায়তন কানায় কানায় ভরা। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধা সমবেত হয়েছেন। সবাই প্রবীণ। শরীর ভেঙে গেছে, চোখ কোটরাগত। অনেকের হাতে লাঠি। কেউ বা অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছেন। যে তরুণেরা একদা রাইফেল হাতে শত্রুনিধনে ছোটাছুটি করেছেন, আজ তাঁরা অবসন্ন এবং অনেকটাই অপাঙেক্তয়। তাঁদেরই নাকি বলা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান! মলিন বেশভূষায় দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। আমার রবীন্দ্রনাথকেই মনে পড়ল:
ওই যে দাঁড়ায়ে নতশির
মূক সবে, ম্লান মুখে লেখা
শত শতাব্দীর বেদনার করুণ কাহিনী।
স্কন্ধে চাপে যত ভার
বহিচলে মন্দ গতি যতক্ষণ
থাকে প্রাণ তার।
রিকশাচালকের সামাজিক মর্যাদা নেই। এই বয়সে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধা রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করবেন, এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। এই উপলব্ধি থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তাদের পুনর্বাসনের একটি উদ্যোগ নিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা রিকশাচালককে দুটো করে রিকশা দেওয়া হবে, যা ভাড়া দিয়ে তাঁরা সংসার চালাবেন। ব্যাপারটি আমার কাছে খুব একটা সুখকর মনে হলো না। আরেকজনকে দিয়ে এই ‘অমর্যাদাকর’ কাজটি করিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁর মর্যাদা বজায় রাখবেন, এটা কেমন সমাধান হলো? পুনর্বাসনের আর কোনো লাগসই উপায় আছে কি না, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তা ভেবে দেখতে পারে।
আমার পাশেই বসা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। বয়সের ভারে নত, চোখে ছানি পড়েছে। মোট চারজন মুক্তিযোদ্ধাকে দুটি করে আটটি নতুন রিকশা দেওয়া হলো। মনিরুল হক দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য তাঁদের চিন্তাভাবনার কথা বললেন। বললেন, এখন আড়াই হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয় প্রতি মাসে। এটা বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে পাঁচ হাজার করা হবে। শামসুল কাউনাইনের সঙ্গে আলাপচারিতায় সংসদের যাত্রারম্ভের সময়কার মহাসচিব, আমার আরেক সতীর্থ, আবদুল আজীজ বীর প্রতীকের প্রসঙ্গ উঠল। আমরা স্মৃতিতাড়িত হলাম। আজীজ ওই সময় অমানুষিক পরিশ্রম করেছিল সংসদকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
আমি চার দশক আগে ফিরে গেলাম। ফ্ল্যাশব্যাকে দৃশ্যমান হলো সবুজ জমিন, কাঁধে গামছা, হাতে কালো কারবাইন, নগ্নপদে জমির আল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা কজন—ভাদুগড়ের আলী আকবর, নাটঘরের লিয়াকত আলী, চাপুরের ফয়েজ, ধনাশীর ওয়ালীউল্লাহ, কোনাউরের মোখলেস, কালঘরার রফিক, নিলখির রেণু, নবীনগরের আলম, ধরাভাঙ্গার লতিফ। লতিফ ছিলেন আমাদের দলনেতা। পরে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন। সম্প্রতি প্রয়াত। আলম ও ওয়ালীউল্লাহ আর নেই। আলী আকবরের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলো। অন্যরা কে কেমন আছে জানি না।
মনিরুল হক যখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি শোনাচ্ছেন, আমি ভাবলাম, জাতি কি এই দু-চার-পাঁচ হাজার টাকা মাসিক ভাতা দিয়ে তাঁদের ত্যাগের প্রতিদান দেবে? একজন উঁচু পদের সরকারি কর্মকর্তা যে হারে অবসর ভাতা পান, জাতির একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান কোন যুক্তিতে তার চেয়ে কম পাবেন?
আমি মনে করি না, নানান রকম ইহজাগতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাঁদের ত্যাগের প্রতিদান দেওয়া সম্ভব। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি বিবেকের তাড়নায়, বেতন-ভাতার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। দেশের সব নাগরিকের দেখভাল করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দেশে একটি মানুষও অনাহারে থাকবে না, সবার মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে, তাদের সন্তানেরা স্কুলে যাবে, অসুখ-বিসুখে চিকিৎসাসেবা পাবে, এটাই তো রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত। তা না হলে রাষ্ট্রের প্রয়োজন কী? কিন্তু যদি সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠে অগ্রাধিকার নির্ণয়ের। এই অগ্রাধিকার বিবেচনায় সাংসদেরা বিনা শুল্কে গাড়ি পাবেন, শিল্পপতিরা ট্যাক্স হলিডে পাবেন, নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা হবে?
অনেক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেখা যায়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরিয়ে হুইলচেয়ারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। তারপর রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সামনে দিয়ে হেঁটে যান, দু-একবার কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। এ ছবি টেলিভিশনের পর্দায় দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। আমার প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোর সামনের সারিটি কেন তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য বরাদ্দ থাকবে না?
মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের জন্য চার দশক আগে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল। অনেক লাভজনক প্রতিষ্ঠান এই ট্রাস্টের আওতায় আনা হয়েছিল, যাতে করে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া যায়। ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চুরি-চামারির কারণে প্রায় দেউলিয়া হয়ে গেছে। যারা এর জন্য দায়ী, তাদের কি বিচার হয়েছে?
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মায়াকান্না কম হয়নি। তাঁরা তো ভিক্ষা চান না? তাঁরা চান একটি সুন্দর জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আমরা যদি একটি ‘অর্ডার অব প্রিসিডেন্স’ দিয়ে সমাজে কৌলীন্যপ্রথা চালু রাখি, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের কেন সবার ওপরে রাখা হবে না? আমরা মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনার কথা বলি, তার প্রাথমিক শর্তই হলো মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করা। বাগাড়ম্বর দিয়ে এই চেতনার বাস্তবায়ন হবে না।
নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যে রকম ভয়াবহ রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে, তা থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদও মুক্ত নয়। গুটি কয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া এই বিভাজনের দগদগে ঘা ছড়িয়ে পড়েছে সমাজদেহের সর্বত্র। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তার মর্যাদা অনেকটাই হারিয়েছে এই রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির জন্য। এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
প্রয়োজনমতো টাকা আর যোগাযোগ থাকলে এ দেশে সহজেই এমপি হওয়া যায়, মন্ত্রী হওয়া যায়, রাজনৈতিক দলের মালিক হওয়া যায়; কিন্তু চাইলেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় না। এ সুযোগ ইতিহাস আমাদের একবারই দিয়েছিল। যাঁরা সেদিন দেশ ও মানুষের মর্যাদা ও মুক্তির লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের অবহেলা করে, চরিত্র হনন করে বা অনুকম্পা দেখিয়ে এই জাতি কখনোই বড় হতে পারবে না।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক, গবেষক।
mohi2005@gmail.com

Sunday, April 17, 2011

নারীনীতি, হুংকার এবং বাউলদের ওপর আক্রমণ by জোবাইদা নাসরীন

গত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে ৭ মার্চ মন্ত্রিপরিষদে নারীনীতির খসড়া অর্থাৎ জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, ২০১১ অনুমোদন করা হয়। সেই নারীনীতির বিপক্ষে ফজলুল হক আমিনী ৪ এপ্রিল হরতাল ঘোষণা করেন। বিএনপি ও তার শরিক দলের নৈতিক সমর্থন ছিল এই হরতালের প্রতি। বিএনপি জোরেশোরে কিছু বলতে পারছে না, তার কারণ, এ দেশে ৫০ শতাংশ ভোটার নারী। পাছে যদি ভোট নষ্ট হয়!
যে সরকার দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছে নারীদের হাতে, পিতার অভিভাবকত্বের পাশাপাশি মায়ের নাম অভিভাবক হিসেবে যোগ করেছে, সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে নারীকে যুক্ত করে বাহ্বা পেয়েছে, ধর্ষণের ফলে জন্মগ্রহণকারী শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছে, মায়ের মাধ্যমেও সন্তান নাগরিকত্ব পাওয়ার আইন করেছে আর সেই সরকারের নারীনীতি থেকে ১৪ বছর পর উত্তরাধিকারে সমসম্পত্তির ধারা উঠে গেল! যে সরকার ১৯৯৭ সালেই নারীর এই সম-অধিকারের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেছিল, এখন আর সেভাবে ভাবছে না? দেশ কি তবে ১৪ বছর পিছিয়েই গেল? কিন্তু পরিসংখ্যান আমাদের ভিন্ন তথ্য দেয়। এ দেশে ১৯৯৭ থেকে ২০১১ সালে নারী এগিয়েছে অনেক দূর—কর্মে, চিন্তায়, বিশ্বাসে, অভিজ্ঞতায়, দক্ষতায়। প্রশ্ন হলো, শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় রাজনীতি দিয়েই লিখিত হবে সেক্যুলার বাংলাদেশের নারীদের ভবিষ্যৎ?
এই আমিনীরা সেই গোষ্ঠী, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা মুক্তিযুদ্ধকালে এ দেশের নারী নির্যাতনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। তারা বলে, যুদ্ধের সময় নারী ধর্ষণে কোনো অপরাধ নেই। তারা ফতোয়ার পক্ষে সর্বশক্তি দিয়ে লড়ে যায় এবং সব ক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ এবং সম-অধিকারবিরোধী তারা।
পর পর দেশে চারটি নারীনীতি হয়েছে, ১৯৯৭, ২০০৪, ২০০৮ ও ২০১১ সালে। দেশ কি আসলেই মূল্যবোধের দিক থেকে, সমতার মনোভাব থেকে সরে এসেছে? তা ছাড়া এই আওয়ামী লীগ সরকারই নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, তারা ক্ষমতায় এলে ১৯৯৭ সালের নারীনীতির বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু কোথায় গেল সেই প্রতিশ্রুতি? বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম-সংশ্লিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান তাহলে বাংলাদেশকে আরও বেশি ধর্মাশ্রয়ী হিসেবেই দাঁড় করাচ্ছে। সংবিধানের বিভিন্ন ধারার ওপর ভর দিয়ে তৈরি হওয়া নারীনীতির নির্ধারকেরা একবারও খেয়াল করেননি যে সংবিধান ও নারীনীতি সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ২৮ থেকে ৩২-এর ধারার বিভিন্ন উপধারায় নারী-পুরুষের সমতার কথা উল্লেখ থাকলেও উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমানাধিকার কীভাবে নারীনীতিতে এখনো আনতে পারল না? আরও প্রশ্ন থাকে যে সরকার কোন কোন হুমকিকে গুরুত্ব দেয় আর কোনটিকে দেয় না।
তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, নারীনীতি নিয়ে এত হইচই, আশা-আকাঙ্ক্ষা, তিনটি ভাগে বিভক্ত ৪৯টি ধারা আঁকড়ে থাকা সেই নারীনীতিতে কোথাও উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন, কিংবা নারীর অধিকার কী হবে, সেই বিষয়ে কোনো ধারা তো দূরে থাক, একটি বাক্যও নেই। তবে দুটো ধারায় এই সম্পর্কে কিছু কথা বলা আছে। তার মধ্যে একটি হলো, জাতীয় অর্থনীতির সব কর্মকাণ্ডে নারীর সক্রিয় ও সমানাধিকার নিশ্চিতকরণ। সাবহেডে ২৩.৫ ধারায় বলা হয়েছে: সম্পদ কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারি দেওয়া। আরও কিছু দূর গেলে পাওয়া যাবে আরেকটি ধারা, যেটি ‘নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন’ শিরোনামের আরেক সাবহেডের মধ্যে পড়েছে। সেখানে বলা হয়েছে: উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা। এই নারীনীতির সমালোচনা করেছেন অনেকেই। কেউ কেউ বলেছেন, এটি একটি পানসে নারীনীতি। বাম দলগুলো প্রশ্ন তুলেছে, এই নীতিতে সমাজের নিপীড়িত ও বঞ্চিত নারীদের কথা নেই। সরকারের অনেক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে, হরতাল হয়েছে। কিন্তু সরকার সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। তাহলে সংসদের দুটি আসনের মালিকানাধীন ইসলামি দলগুলোর তুচ্ছ হুমকিতেই সরকার ভয় পেল? আর অন্যান্য সিদ্ধান্তের সময় লোকজন প্রতিবাদ করতে পারে—এই ভয়ে সরকার ভীত হয় না কেন? আসলে সমস্যাটা কোন জায়গায়? সমস্যা যদি ধর্মই হয়, তাহলে তিউনিসিয়া, মরক্কো ও সেনেগালের মতো মুসলিম দেশগুলোতে কীভাবে সম্পত্তিতে সমান অধিকার পেল নারী?
নারীনীতিকে কেন্দ্র করে নারীর বিরুদ্ধে যখন দেশে হুংকার চলছে, তখনই রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুরে জোর করে লালনভক্ত ২৮ জন বাউলের চুল, গোঁফ কামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ দেশে বাউলসংস্কৃতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে সমাজের সব ধরনের সমতার ভিত্তি। তাই বাউলদের ওপর আক্রমণ আমাদের জানান দেয়, এ ধরনের আক্রমণের শিকার আমি-আপনি যে কেউই হতে পারি। প্রগতিবিরোধী লোকজন শুধু আমিনীর দলে নয়, আশপাশের অনেক জায়গায়ই আছে। কারও জীবনাচরণ কারও অপছন্দ হতেই পারে, তাই বলে তার ওপর আঘাত করা হবে কেন? এবং পত্রিকা থেকে আমরা জানতে পারি, হামলাকারীরা অনেকেই ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের। বছর কয়েক আগেও এ দেশে বাউল-ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল। সরকার যখন আমিনীদের হুংকারকে অগ্রাহ্য করে নারীনীতি বাস্তবায়ন করতে চাইছে, তখন এই অসাম্প্রদায়িক বাউলদের ওপর আক্রমণ একভাবে সেই আমিনীদেরই সামনে নিয়ে আসে।
আজ প্রয়োজন নারী-পুরুষের সম্মিলিত লড়াই। যে লড়াই সম-অধিকারের পক্ষে, সব ধরনের সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের বিরুদ্ধে। আশা করি, সরকার অবিলম্বে রাজবাড়ীতে বাউলদের ওপর যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার ও বিচার করবে।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

Saturday, October 23, 2010

বিত্তবানের ভোগসংকোচন আর ঋণগ্রস্তের ভোগবিলাস by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

আমার এক বন্ধুবর চলমান ক্ষুদ্র-বৃহৎ নানা ঘটনার মাধ্যমে আমাদের ও সমাজের বৈষম্য আর অসুস্থ উন্নয়ন প্রতিকূল সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে আমার সঙ্গে দূরালাপনিতে দীর্ঘক্ষণ ধরে মাঝেমধ্যেই হূদয়গ্রাহী আলাপ করেন। একসময় লিখতেনও ভালো। সম্ভবত লেখার অকার্যকারিতা ব্যাখ্যা উপলব্ধি করে লেখা ছেড়ে দিয়েছেন, তবে নিজের চিন্তা, অনুভূতি, চলমান ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে আলাপ করা এখনো ছাড়েননি। তাঁর আলাপ-আলোচনা থেকে পাওয়া তথ্য নিয়েই এই লেখা।
ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আর রাষ্ট্রদূতদের একটি সভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এটা বলতেও ভোলেননি, যেহেতু ব্রিটেনের বর্তমান অর্থনীতি ভালো নয়, নিশ্চয়ই আপনারা ফার্স্ট ক্লাস কিংবা বিজনেস ক্লাসে নয়, ইকোনমি ক্লাসেই যাতায়াত করবেন। দেশের নাজুক অর্থনীতির সমাজপালেরা কীভাবে সামাল দেবেন, কীভাবে ব্যয়সংকোচন করবেন, সাধারণ মানুষকে মিতব্যয়ী হতে শেখাবেন, তা নিয়ে নিশ্চয়ই বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আমরা সাধারণত সভা-সমিতির বক্তব্য, উপদেশ, নির্দেশ, আদেশ সভায়ই রেখে আসি, যা উন্নত দেশের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের লোকজনও পালনে সচেষ্ট থাকে।
এরপর কোনো একটি ব্রিটিশ সংস্থার সভায় জানানো হলো, তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ বিধায় তাঁরা শুধু গরম পানি সরবরাহ করবেন, চা খাওয়ার জন্য টি-ব্যাগ প্রত্যেককে নিয়ে আসতে হবে। ফার্স্ট ক্লাস থেকে ইকোনমি ক্লাসে যাতায়াতের পরামর্শ সর্বপর্যায়ে ব্যয়সংকোচনে কীভাবে কার্যকরভাবে অনুশীলন করা হয়, এর চেয়ে তার অভিনব উদাহরণ আর কী হতে পারে? আরও জানা গেল যে ওই সংস্থাটির মাধ্যমে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড সাহায্য পেয়ে থাকে। শুধু তা-ই নয়, সাহায্যকারী এই সংস্থাটির প্রধান নির্বাহীর ব্যবহারের জন্য সার্বক্ষণিক কোনো গাড়িও নেই।
পক্ষান্তরে আমরা নানা দেশ থেকে ঋণ আর সাহায্য নিয়ে বছরের পর বছর ঋণের বোঝা ভারী করছি। অনাগত শিশুরা জন্মই নেবে হাজার হাজার টাকার বোঝা নিয়ে, যা সে কখনো ভোগ করেনি। এই ঋণ ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের আছে কি না, তাও জানা নেই। তবে দারিদ্র্য বিমোচনের নামে যে টাকা আনা হয়, এর একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে, বিদেশভ্রমণে এবং অনুৎপাদনশীল খাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্য অপরিবর্তিত রেখে কিংবা অধিকতর দারিদ্র্যে ঠেলে দিয়ে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীদের তালিকায় একাধিক ভারতীয়র নাম থাকলেও ভারতের রাস্তায় বাংলাদেশের মতো এত দামি গাড়ি নজরে পড়ে না।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতের জাতীয় সংসদের স্পিকার সোমনাথ চ্যাটার্জিকে গাড়ি বরাদ্দ করতে হিমশিম খেতে হয় সরকারকে। কোনো দামি গাড়িই তিনি ব্যবহার করবেন না, এমনকি ১৩ লাখ রুপি দামি গাড়িও। যদিও প্রায় একই সময়ে পত্রিকান্তরে প্রকাশ সাত গুণ ছোট বাংলাদেশ, বহুগুণ ছোট অর্থনীতির দেশের স্পিকারদের জন্য ৫০ কোটি টাকার গাড়ি কেনা হলো। একদিন সংসদ অধিবেশনে আমাদের মাননীয় সাংসদেরা বললেনও, জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা ১৯৮৮ সাল থেকে এ সুবিধা পেয়ে আসছেন, তা চালিয়ে যেতে অসুবিধা কী? ব্রিটেনে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ, তাঁরা ইকোনমি ক্লাসে আকাশভ্রমণ করবেন, সভায় টি-ব্যাগ দিতে পারবেন না, কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তো ভালো, যদিও তাঁদের চেয়ে বছরে ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড সাহায্য নিয়ে থাকি।
আমাদের সাংসদেরা যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের গড় উপার্জন বিশ্বের গড়ের হয়তো বা এক-দশমাংশ। দরিদ্র জনগণের প্রতিনিধিরা ত্যাগে অসাধারণ হতে পারেন, তাই বলে ভোগে অসাধারণ হবেন কেন? তাহলে কীভাবে তাঁরা এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে দেশ গড়ার কাজে লাগাবেন। সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা অনুভব করার জন্য, উপলব্ধি করার জন্য তাদের কাছে আসতে হবে, তাদের দুঃখের সাথি হতে হবে। যিনি বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন না, তাঁর টাকা থাকলে ইচ্ছামতো ভোগ করলেও বলার কিছু নেই, কিন্তু জনগণের প্রতিনিধি এমন অবিবেচনার কাজ থেকে বিরত থাকবেন, তা সবাই প্রত্যাশা করেন। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি প্রায় ৮০ বছর বয়সে তাঁর হাঁটুর অস্ত্রোপচারের জন্য ভারতীয় মাটিকেই বেছে নিয়েছিলেন। এ ঘটনায় নিশ্চয়ই ভারতীয় ধনকুবেরেরাও দেশের মাটিতে এমনকি জটিল চিকিৎসসেবা গ্রহণে উৎসাহিত হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, দেশের চিকিৎসাসেবার মানও নিশ্চয়ই উন্নত হয়েছে।
অতিসম্প্রতি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সফল হওয়ায় দেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের এমডিজি পুরস্কার গ্রহণ করে আমাদের কিছুটা হলেও অনুপ্রাণিত করেছেন। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর সংখ্যা নাকি ছিল ১০৩। ভারত আমাদের চেয়ে সাত গুণ বড় দেশ, তার অর্থনীতি নিশ্চয়ই আরও অনেক বড়। তাদের প্রতিনিধিদলের আকার কত বড় ছিল কিংবা পাকিস্তানের, মালয়েশিয়ার, কোরিয়ার? ব্রিটেনের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ বলে রাষ্ট্রদূতেরা ইকোনমি ক্লাসে যাতায়াত করেছেন, আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা কি তার চেয়েও ভালো?
বিগত চারটি নির্বাচনের ফলাফল হলো, জনগণ সরকারি দলকে প্রত্যাখ্যান করেছে (বিরোধী দলকে গ্রহণ করেছে বলাটা নিশ্চয়ই অতিরিক্ত বলা হয়ে যাবে)। দরিদ্র দেশ, অনেক চাহিদা, সম্পদ অপ্রতুল, সব চাহিদা মেটানো যাবে না। সুতরাং সরকারি দলের পুনর্নির্বাচন মোটেও সহজ নয়। বর্তমান সরকার দিনবদলের অঙ্গীকার করেছে। এই অঙ্গীকার সামনে রেখে ব্যয়সংকোচনে নেতাদের অগ্রে থেকে নেতৃত্ব দান করতে হবে। পত্রপত্রিকান্তরে প্রকাশ, নানা স্থানে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকারি দলের ব্যানারে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির সমস্যা। সাংসদেরা কিছু সুবিধা ভোগ করলে তাঁর জয়ের পেছনে যারা শ্রম দিয়েছে, তাদেরও তো কিছু প্রত্যাশা জাগ্রত হয়। এমনটি যদি মনে হয়, দুর্বল অর্থনীতির দেশের পক্ষে এ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়, তাহলে এমন প্রত্যাশা যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে—জনপ্রতিনিধিদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা থেকে বিরত থাকতে হবে।
একবার হংকংয়ের এক সদাশয় অধ্যাপক আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ব্যস্ত নগর, প্রত্যেক মানুষ শুধু কাজের পেছনে দৌড়াচ্ছে। চায়নিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের অতিথি ভবন থেকে লক্ষ করলাম, তিন মিনিট অন্তর একটি করে ট্রেন আসছে। হংকংয়ে আবার কেসিআর, এমটিআর এসব নামে একাধিক সাবওয়ে রেল সার্ভিস চালু আছে। আমাকে একজন অধ্যাপক বললেন, একটি সাবওয়ের কিছুটা অংশ সরাসরি না হয়ে একটি আয়তক্ষেত্রের অপর তিন বাহু বরাবর হয়েছে, কারণ লাইনটি সরাসরি করতে হলে পাথরের পাহাড় ভেদ করে টানেল তৈরি করতে হয়। পরে অর্থনীতিবিদেরা হিসাব করে বের করেছেন, প্রতি যাত্রায় ৩০ সেকেন্ড করে বেশি সময়, দিনে প্রতি যাত্রী কবার যাতায়াত করে গুণ ৩৬৫ গুণ প্রতিদিনের যাত্রীসংখ্যা গুণ বছরের সংখ্যা। এভাবে দেখানো হলে প্রতি ভ্রমণে ৩০ সেকেন্ড সময় হারানোর মাধ্যমে হংকং কী বিশাল ক্ষতি বহন করছে। সরকার টানেল করতে বাধ্য হলো। জনগণও বুঝল, তাদের ৩০ সেকেন্ড সময় দেশের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে কিন্তু সদাশয় সরকার প্রতি মুহূর্তেই বোঝাচ্ছে, সাধারণ জনগণের সময়ের কোনো দাম নেই। যেকোনো উপলক্ষেই যানজট সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী অনেকবারই উচ্চারণ করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নই তাঁর লক্ষ্য। সুতরাং দিনবদলের অঙ্গীকার সামনে রেখে বর্তমান সরকারকে নানা সমস্যার মধ্যে রাজধানীতে যানজটেরও একটি কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এ ছাড়া অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যাতায়াতজনিত কারণে যানজটের বাড়তি দুর্ভোগ কারও জন্য কাম্য হতে পারে না। উন্নত দেশগুলোর নেতাদের যাতায়াত কিন্তু কখনো জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করে না। আমাদের দুর্বল অর্থনীতির দেশের নেতারা আমাদের চাহিদা মেটাতে পারবেন না, এটা সহজেই অনুমেয়। তবে তাঁদের যাতায়াতকে নিষ্কণ্টক করতে মানুষ অসীম যানজটের স্বীকার হবে, তা-ও কাম্য নয়।
সাধারণ মানুষকে শেখাতে হবে, তার সময় দেশের জন্য কত মূল্যবান, যা হংকংয়ের জনগণকে দেখানো হয়েছে। আমাদের দেশের অর্থনীতি যদি দুর্বল হয়, তাহলে আমাদের নেতাদের ব্যয়সংকোচন অনুশীলন করে সাধারণ মানুষকেও ব্যয়সংকোচনে উৎসাহিত করতে হবে। ব্রিটিশরা যদি ব্যয়সংকোচনের জন্য সভায় চা সরবরাহ বাদ দিতে পারে, তাহলে ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে আমাদের অনেক কিছুই করার আছে। সুখের বিষয়, আমাদের বর্তমান নেতৃত্বেও এমন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রয়েছে।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

Sunday, June 27, 2010

ইভ টিজিং নাকি অ্যাডাম টেররাইজিং by আইরিন খান

সম্প্রতি বিবিসির ওয়েবসাইটে দুটি খবর পাশাপাশি গেছে—আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে বাংলাদেশ নারী পুলিশ কর্মকর্তা নিযুক্ত করবে এবং সরকার ১৩ জুনকে ছাত্রীদের উত্যক্তকরণ প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে মনোনীত করেছে। একদিকে অগ্রগতি আর অন্যদিকে পেছন দিকে চলা। এ দুই খবর আজকের বাংলাদেশে নারীর জন্য যে ভগ্নমনস্ক অবস্থা বিরাজ করছে তার নজির।
যে দেশে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা নারী, সে দেশে নারী ও কিশোরীরা পুরুষের লোলুপ চাহনি, বিদ্রূপ বা কটু মন্তব্য, লাঞ্ছনা, হয়রানি, যৌন নিগ্রহ, গায়ে পুরুষের হাত বা আকস্মিক হামলার শিকার না হয়ে রাস্তায় হাঁটতে পারেন না, কিংবা বিদ্যালয়, দোকান, উদ্যান বা অন্য কোনো সামাজিক পরিসরে যেতে পারেন না, জনপরিবহন ব্যবহার করতে পারেন না—আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসিড আক্রমণ, অপহরণ বা হত্যার শিকার হন।
এমন অভিজ্ঞতার ফলে অল্প বয়সী কিছু মেয়ে এতটাই যন্ত্রণার্ত ও লাঞ্ছিত বোধ করেছে যে তারা আত্মহত্যা করেছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের মতে, ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েদের প্রায় ৯০ শতাংশই সামাজিক পরিসরে যৌন হয়রানির শিকার। আর কলেজছাত্র, বেকার যুবক থেকে শুরু করে ফেরিওয়ালা, রিকশাচালক, বাসচালক, সহযাত্রী, সহকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক পর্যন্ত সবাই এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত। অর্থ্যাৎ তরুণ-বৃদ্ধ, ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সব পুরুষ এমন অপরাধ করে থাকেন।
ভিকটিমরাও তেমনি বিচিত্র—কারখানাশ্রমিক ও গৃহপরিচারিকা থেকে ছাত্রী এবং অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন পেশাজীবী নারী সবাই। দারিদ্র্য এর ঝুঁকি বাড়ায়, কিন্তু আর্থিক সংগতি নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে স্বীকৃতি মিলেছে যে ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের পিছু নেওয়ার মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করার মাত্রা এত তীব্র হয়েছে যে কিছু বিদ্যালয় বন্ধ এবং পরীক্ষা স্থগিত করে দিতে হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের একটি পথ হলো শিক্ষা। অথচ শিক্ষাক্ষেত্রও লিঙ্গীয় সহিংসতার কাছে জিম্মি। মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন মা-বাবা বহু মেয়েকে বিদ্যালয় থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন, বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ফলে বাল্যবিবাহ ও কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা সমস্যা বাড়ছে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ছে।
সিগমুন্ড ফ্রয়েড লিখেছিলেন, ‘জীবদেহের গঠন নিয়তিনির্ভর।’ তাঁর এ কথা বাংলাদেশের বাস্তবতায় নতুন অর্থ তৈরি করে। ব্যাপক মাত্রায় চর্চিত লিঙ্গীয় সহিংসতার আতঙ্কে নারী ও কিশোরীর জীবন, জীবিকা, সচলতা ও স্বাধীনতা এখন বিপর্যস্ত।
অন্ধকার নেমে এলে আপনি বাইরে বেরোতে পারেন না। তরুণদের লোলুপ দৃষ্টি সবখানে ছড়ানো যে সামাজিক পরিসরে সেটি আপনি পরিহার করেন। আপনার নিরাপত্তার জন্য আপনি পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল। অন্যের দৃষ্টি এড়াতে আপনি ঢিলেঢালা পোশাক অথবা হিজাব পরেন। আপনি অবমাননা হজম করেন, আর ভান করেন যেন লোলুপ দৃষ্টি, লাম্পট্যপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি, বারবার অগ্রসর হওয়া এবং গায়ে হাত দেওয়া আপনি খেয়াল করছেন না। আরও আক্রমণের শিকার হওয়ার ভয়ে অথবা এই আক্রমণের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আপনার ওপরই আসার আশঙ্কায়, এমনকি আপনার চলাফেরার ওপর পরিবারের আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আশঙ্কায় আপনি অভিযোগ করার সাহস করেন না।
যে দেশে নারী সম-অধিকার ভোগ করেন না এবং যে রক্ষণশীল সমাজে নারীর ওপর কলঙ্কচিহ্ন পড়ে, নারীকে লজ্জিত হতে হয়, সেখানকার সামাজিক পরিসরে লিঙ্গীয় নিগ্রহ হলো পুরুষের ক্ষমতার নির্লজ্জ প্রদর্শনী। কোনো পুরুষ সেখানে নারীকে অপমান করে, আক্রমণ করে, তাঁর জীবন ধ্বংস করে দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারেন। আইন অপর্যাপ্ত, সমাজ নিস্পৃহ অথবা এতে সহযোগীর ভূমিকায়।
‘ইভ টিজিং’ বা ‘ওমেন টিজিং’ শব্দগুচ্ছই এই অপরাধ যে কতটা গুরুতর, সেটিকে হালকা করে ফেলে। টিজিং তো কৌতুকপূর্ণ, নিরিহ আচরণ। ছোট ছেলেরা ছোট মেয়েদের চুলের বেণী ধরে টান দেওয়াকে বর্ণনা করতে এটা ব্যবহার করা যেতে পারে; কিন্তু নারীর স্তনে বা নিতম্বে পুরুষের হাত দেওয়া, নারীর উদ্দেশ্যে কটু বাক্য ছুড়ে দেওয়া, নারীর পিছু নেওয়া বা জনসম্মুখে তাঁদের পোশাক টেনে ধরার বর্ণনা দিতে গিয়ে নয়।
ইলোরা, পিংকি, তন্বী, সীমা, রুমি, রুনা, রিনা ও অন্যরা টিজিংয়ের শিকার নয়। নির্যাতন ও ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে যা ঘটছে তা যৌন-সন্ত্রাস। এটা সন্ত্রাস, কারণ এর শিকার হওয়া নারী শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এটা সন্ত্রাস, কারণ অপরাধ সংঘটনকারী তার শিকারকে বশে আনতে, আতঙ্কিত ও ধ্বংস করতে তার অপ্রতিসম ক্ষমতা কাজে লাগায়।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় নানা দেশে সরকার জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে মানবাধিকারকে কাটছাঁট করে। আর বাংলাদেশে যৌন-সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় সমাজ ও পরিবার নারীর স্বাধীনতায় লাগাম পরাচ্ছে অধিকতর শারীরিক নিরাপত্তার আশায়। কিন্তু ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ আমাদের দেখাচ্ছে যে নিরাপত্তা অর্জনের জন্য স্বাধীনতা বিসর্জন শেষ পর্যন্ত উভয়েরই ক্ষতি করে। যৌন-সন্ত্রাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নারীর স্বাধীনতার ওপর বাধানিষেধ বেড়েই চলেছে, কিন্তু তাদের জীবন একটুও নিরাপদ হয়নি।
মেয়েদের পিছু নেওয়া ঠেকাতে শিক্ষামন্ত্রী সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের আহ্বান জানিয়েছেন। এটা ভালো, কিন্তু যথেষ্ট নয়। যাঁরা এই সন্ত্রাসের শিকার তাঁদের সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়া, নারীর মানবাধিকারকে তুলে ধরা, অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া এবং এমন সহিংসতার মূল কারণগুলোকে আঘাত করার জন্য আরও অনেক কিছু করার প্রয়োজন আছে।
সব ধরনের যৌন হয়রানি নিষিদ্ধ করে সংসদে আইন করা উচিত। লিঙ্গীয় সমতাভিত্তিক আইন প্রণয়নের বিষয়কে জরুরি ভিত্তিতে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
পুলিশি ব্যবস্থা যাতে নারীর নিরাপত্তায় দ্রুত সাড়া দেয় সেভাবে গড়ে তোলা দরকার। উদাহরণস্বরূপ, এমন সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য পুলিশের একটি নিবেদিত অভিযোগ কক্ষ এবং হেল্প লাইনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
যৌন হয়রানির বিষয়ে গত বছর হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রশ্নটিকে রাষ্ট্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। কোন প্রতিষ্ঠান তা না করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত।
আক্রান্তদের সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর জন্য সুশীল সমাজের সংগঠন ও নারী সংগঠনগুলোকে অধিকতর সম্পদ দেওয়াা উচিত।
অনেক অপরাধী বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্য বা সহযোগী অথবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া কোনো দুর্বৃত্ত। আমাদের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে আছেন নারী। তাঁরা কেমন করে এই অবমাননা সহ্য করেন? নিজ নিজ দলের ভেতর তাঁদেরকে এই সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করা উচিত এবং নারীর ক্ষমতায়ন ঘটানো উচিত যেন তাঁরা নিপীড়কের অবস্থান যে রাজনৈতিক স্তরেই হোক না কেন তাঁর বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে পারেন।
দমনমূলক সামাজিক পরিবেশ কিশোর ও তরুণদের মনে নারীর নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করে। কোন নারী নিজের মতো চলতে চাইলে ধর্মীয় নেতারা তাঁকে দুশ্চরিত্র বলে নিন্দা করেন। বলিউডের সিনেমায় নারীকে উপস্থাপন করা হয় যৌন আকাঙ্ক্ষার বস্তু হিসেবে।
নারী-পুরুষ বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে ওঠার ফলে ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রেখে বেড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ হয়। যৌনশিক্ষা নিষিদ্ধ থাকার ফলে না ঘরে না বাইরের বিদ্যালয়ে অল্প বয়সীরা তাদের শরীরে যৌনতাকেন্দ্রীক পরিবর্তনকে অনুভব করতে পারার সময়টাতে যৌনতাকে বুঝতে পারা এবং এ অবস্থায় তারা কী ধরণের আচরণ করবে তার বিহিত করার কোনো সুযোগ থাকে না। কেন মেয়েদের সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখতে হবে সে বিষয়ে ছেলেরা কিছু মাত্রায় শিখতে পারবে যদি বিদ্যালয়ে যৌনতা বিষয়ে এবং সমাজে লিঙ্গীয় ভূমিকা ও লিঙ্গীয় সহিংসতা বিষয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করা যায়।
সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের সন্তানদের আমরা কেমনভাবে লালনপালন করব, সেটাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেক মা-বাবা তাঁদের সব ছেলে ও মেয়েকে সমান চোখে দেখেন না। ছেলে ও মেয়ের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন নৈতিক বিধি প্রয়োগ করে তাঁরা যে শুধু আইনি বৈষম্যকে উৎসাহিত করেন তাই নয়, বরং মেয়েদের মধ্যে হীনম্মন্যতা আর ছেলেদের মধ্যে উচ্চম্মন্যতার অনুভূতি সঞ্চারিত করেন।
পিতৃতান্ত্রিক আচরণ, কুসংস্কার, সাংস্কৃতিক প্রথা, অসম নীতি এবং বৈষম্যমূলক আইন, যা নারীকে অবমূল্যায়ন করে ও অধিকারবঞ্চিত রাখে, এই সবকিছুর কারণে যৌন-সন্ত্রাস বাড়ে। এই সন্ত্রাস দূর করতে দরকার রূপান্তরমূলক সামাজিক পরিবর্তন। এ কাজটি হবে চ্যালেঞ্জিং, বিতর্কিত, জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির অনেক কিছু করার আছে। এ পথেই নারী ও কিশোরীর জন্য নিরাপদ হবে রাস্তাঘাট, বিদ্যালয় ও সামাজিক পরিসর।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
আইরিন খান: সাবেক মহাসচিব, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।