Sunday, January 19, 2014

কুষ্টিয়ায় শতাধিক চাতাল বন্ধ ক্ষতি ২০০ কোটি টাকা

টানা হরতাল-অবরোধ ও সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ চাল মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। হরতাল ও অবরোধের মতো কর্মসূচি আপাতত বন্ধ হলেও আগের লোকসান কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। কয়েক মাস ধরেই চালের বাজারে থেমে থেমে দাম বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক চাতাল। অস্থিরতার কারণে দেউলিয়া হতে বসেছেন দেশের অন্যতম বৃহৎ চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরের চাল ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক চাতালে। এমন অবস্থা অব্যাহত থাকলে বাকিগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাজানগরের ব্যবসায়ীরা। তিনি্ন অ্যাগ্রো ফুডের মালিক মোমিন মণ্ডল বলেন, টানা হরতাল-অবরোধে বাজার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এখন এসব কর্মসূচি না থাকলেও ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে কমপক্ষে এক বছর লাগবে। স্বল্প পুঁজি আর মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ে ঝুঁকলেও ঋণের বোঝা বেড়ে গিয়ে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসা না করতে পারায় অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না বলেও জানা গেছে। চাতাল শ্রমিক রিজিয়া ও আফরোজা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে বেকার। মালিক চাতাল বন্ধ করে দিয়েছে। এখন সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। চাতাল কবে চালু হবে তার ঠিক নেই। স্থানীয় চালকল মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, হরতাল-অবরোধ শুরু হওয়ার পর বাইরে থেকে ধান আসা বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে চাল উৎপাদনও বন্ধ রাখতে হয়। এ অবস্থায় অনেক মালিকই শ্রমিক ছাঁটাই করেন। এখন ধান আসা শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে পরিস্থিতি।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, টানা অবরোধের মধ্যে ব্যবসায়ীদের অর্ডার পেয়েও চাল সরবারহ করতে পারেননি চাতাল মালিকরা। বাইরে থেকে ধান কিনেও আনতে পারেননি তারা। অবরোধের মধ্যে রাজশাহী থেকে ধান আনতে গিয়ে অবরোধকারীদের দেওয়া আগুনে পুড়ে গেছে কুষ্টিয়াসহ দেশের অন্যতম বৃহৎ চাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রশিদ অ্যাগ্রো ফুডের ধানবোঝাই ৪টি ট্রাক। এতেই তার প্রায় এক কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। স্বর্ণ অটো রাইস মিলের একটি ট্রাক পুড়িয়ে দেয় অবরোধকারীরা। এর পর ভয়ে অর্ডার পেয়েও অনেকে চাল সরবরাহ করেননি। দাদা রাইস মিলের মালিক জানান, গত দুই মাসে এখানকার ব্যসায়ীদের প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। একই রকম কথা বলেন, ভাই ভাই, বিসমিল্লাহ ও থ্রি-স্টার রাইস মিলের মালিক। রশিদ অ্যাগ্রো ফুডের ম্যানেজার আবদুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাদের ব্যবসা ভেঙে পড়েছে। কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ব্যবসার জন্য ভালো পরিবেশ চাই। হরতাল-অবরোধের কারণে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল মজিদ বাবুল বলেন, চাতাল মালিকরা দেউলিয়া হওয়ার পথে। তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ব্যাংকের সুদ যেন মওকুফ করা হয়। ব্যাংক সুদ মওকুফ করা না হলে অনেকের প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হবে। এ ছাড়া হরতাল ও অবরোধের মতো কর্মসূচিও আমরা চাই না।

কাজের জবাবদিহি কোথায়?

'রাজধানীর অনেক সড়ক এক বছরও টিকল না' শিরোনামে শনিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি উদ্বেগজনক। ঢাকা শহরে গত বছর যেসব রাস্তার কাজ হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগের অবস্থা বেহাল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যে কোনো সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির শর্ত থাকে। রাজধানীর সড়ক সংস্কার প্রধানত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নেই হচ্ছে। অথচ দেখা যাচ্ছে, এক বছর না পেরোতেই সংস্কারকৃত অনেক সড়কের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। তাই এগুলো পুনরায় সংস্কারের জন্য তালিকাভুক্ত করতে হয়েছে। কিন্তু যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছিল তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। এতে সড়ক বা গণপূর্ত কাজে নয়ছয় করার অসাধু প্রবণতা ভালোভাবেই টিকে থাকছে। টেন্ডারে বর্ণিত শর্ত অনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে কি-না, সেটা নিশ্চিত করার আধুনিক পদ্ধতি এখনও অনুসরণ করার ব্যবস্থা হয়নি। সেই পুরনো পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতেই কাজের মান পরখ করা হচ্ছে। যেহেতু এসব কাজের অধিকাংশের সঙ্গেই রাজনৈতিক ক্ষমতাশ্রয়ীরা যুক্ত থাকেন, তাই তারা শর্ত ভঙ্গ করেও পার পেয়ে যাওয়ার আশা করতে পারেন। কিন্তু যদি নিম্নমানের কাজের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে জেল-জরিমানার ব্যবস্থা কার্যকর করা হতো এবং কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নামে-বেনামে একই ধরনের ও একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা নিষিদ্ধ করা হতো, তাহলে কেউ শর্ত ভাঙার চিন্তা সহজে করতে পারত না। রাজধানীর সড়ক সংস্কারের তহবিল জোগানদার যেহেতু প্রধানত বিশ্বব্যাংক, তাই কর্তৃপক্ষের কাজের মান নিশ্চিত করা উচিত ছিল। এ ব্যাপারে এখনও সতর্ক না হলে এ ক্ষেত্রে বিদেশি অর্থায়ন বন্ধ বা হ্রাস পাওয়া অসম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষের উচিত এসব কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় প্রায় সাড়ে পাঁচশ' সড়ক মেরামতের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭২টি সড়ক গত বছর মেরামত করা হয়। মেরামতকৃত সড়কগুলো কেন পুনরায় মেরামতের তালিকায় সে ব্যাপারে সদুত্তর হয়তো কর্তৃপক্ষ দিতে পারবে না। এসব সড়কের কাজ যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়েছিল এবং নগর কর্তৃপক্ষের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এগুলো তদারকির দায়িত্বে ছিলেন তাদের কারও কারও সঙ্গে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়। বছর না ঘুরতেই যেসব সড়কের পুনরায় সংস্কারের প্রয়োজন পড়ল সেগুলোর কাজের মান পরীক্ষা করে দেখা উচিত। দায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে নিম্নমানের কাজ করে চিরাচরিত অর্থ নয়ছয় করার অপসংস্কৃতি বদলে দেওয়া যায়।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নজর দিন

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অর্থনীতির- এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ কম। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী- এমন অভিমত বিভিন্ন মহল থেকে করা হয়। তাদের অনুমানের কারণ নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা। গত কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে নিয়ে যেতে সংকল্প প্রকাশ করেছে। কিন্তু লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি। এ ধরনের উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য যে মাত্রায় বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেটা আসেনি। এবারে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও সমস্যা হবে- এমনই ধারণা। শিল্প-বাণিজ্যের কর্মকাণ্ডে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি এবং চেম্বারের নেতারা ইতিমধ্যে এ বিষয়ে তাদের অভিমত প্রকাশ করেছেন, যাতে উদ্বেগ যথেষ্ট। ইতিমধ্যে অর্থবছরের যে অর্ধেক সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, তার বেশিরভাগ জুড়ে ছিল হরতাল-অবরোধ ও রাজনৈতিক সহিংসতা। একদিকে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি শ্লথ, অন্যদিকে রাজস্ব বিভাগ শুল্ক-কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের তরফে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কম হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় অবশ্য ততটা নিরাশ নয়। তারা এ হার কমিয়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করবে- এমন ধারণা মিলেছে। কিন্তু সরকারের লক্ষ্য তো দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। সাম্প্রতিক নির্বাচনের সময়ে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ বিশ্বের সারিতে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। সেখানে পেঁছাতে হলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির হারে বাড়তি গতি আনতেই হবে। এ জন্য আরও করণীয়- বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করা এবং তার অপরিহার্য শর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন। শনিবার সমকাল 'পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক কৌশলপত্র তৈরি হচ্ছে' শিরোনামের প্রতিবেদনে বলেছে, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে হুমকির মুখে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকেই নতুন সরকার বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছে। এ জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলপত্র তৈরির কাজ চলছে। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি উভয় ধরনের কর্মসূচি তাতে স্থান পাবে। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী মহল তাদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু প্রস্তাব সরকারের কাছে ইতিমধ্যে পেশ করেছে। সরকারের দিক থেকেও তাদের শুল্ক-কর এবং ব্যাংকিং ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা প্রদান করা হবে- এমন কথা বলা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজ সহজ হবে না। নতুন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। এ জন্য প্রধান দুটি দলের মধ্যে সমঝোতা হতেই হবে। এ কাজে বিলম্ব হলে কিংবা ফের সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির শঙ্কা থাকলে বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হবে না। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে স্বল্প হার সুদে ও দীর্ঘ মেয়াদে আর্থ-সামাজিক প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদান করে, তাদের সঙ্গে পদ্মা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থায়ন বিষয়ে সমঝোতায় পৌছানোও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উৎপাদনমূলক খাতে বেসরকারি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতেও মনোযোগী হতে হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি রাজনীতির জন্য অর্থনীতির ক্ষতি হতে না দেওয়ার বিষয়ে একমত হতে পারে, তাহলে দেশি ও বিদেশি উভয় অঙ্গনেই বিনিয়োগকারীরা একটি ইতিবাচক বার্তা পাবে। কিন্তু তেমন বার্তা কি প্রদান করা সম্ভব হবে? আমাদের রাজনীতি কি হিংসার আবর্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারবে? রাজনীতিকরা কি জনগণের কাছে এমন সুবার্তা দিতে পারবেন যে, অর্থনীতির ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে তারা বিরত থাকবেন?

মিত্র দেশের নেতাদের ফোনে আড়িপাতা হবে না :ওবামা

('ওবামার প্রস্তাব যথেষ্ট নয়') টেলিফোনে আড়ি পেতে তথ্য সংগ্রহ চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাকে (এনএসএ) অনুমতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তবে তা সংরক্ষণ ও ব্যবহারের বিষয়ে নতুন নিয়ম প্রস্তাব করেছেন তিনি। মিত্র দেশের নেতাদের ওপর আড়িপাতাও বন্ধ করেছেন তিনি। এসব পরিবর্তন যথেষ্ট নয় বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষের গ্রুপগুলো। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসি অনলাইনের। শুক্রবার মার্কিন বিচার মন্ত্রণালয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার বহুল প্রত্যাশিত এ ঘোষণা আসে। গত বছরের মাঝামাঝি সিআইর সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন এনএসএর আড়িপাতার বিতর্কিত এ কর্মকাণ্ড ফাঁস করে দিলে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাপে পড়েন ওবামা। এনএসএর কার্যক্রম পর্যালোচনারও নির্দেশ দেন তিনি। এরপর শুক্রবার কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করেন তিনি। বলা হচ্ছে, ওবামা এসব প্রস্তাবের মাধ্যমে সংস্কারে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা সম্প্রদায় এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার পক্ষগুলোর মধ্যে একটি ভারসাম্য বিধানের চেষ্টা করেছেন। ওবামা তার সংস্কার প্রস্তাবের বেশিরভাগই বাস্তবায়নের জন্য আইনসভা কংগ্রেস, শীর্ষ কর্মকর্তা, এমনকি এনএসএর ওপরও ন্যস্ত করেছেন। ওবামার এসব প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন ব্যক্তি অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী পরিচালক স্টিফেন ডবি্লউ হকিন্স বলেন, ওবামা প্রশাসন যদি ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম না চালায় তবে প্রেসিডেন্টের এসব সমন্বয় ডুবন্ত টাইটানিক জাহাজে বাদ্য-বাজনা বাজানোর ঘটনাকেই স্মরণ করিয়ে দেবে। অন্যদিকে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ওবামার প্রস্তাবনা নাকচ করে বলেছেন, এতে অবস্থার খুব কমই পরিবর্তন হবে। এনএসএ সাধারণত টেলিফোন আলাপের সময়, স্থান ও নম্বর তথা মেটাডাটা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। ওবামা তার প্রস্তাবে এ পদ্ধতি পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। ওবামা তার বক্তব্যে বলেন, বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশি নেতাদের ওপর আড়িপাতা থেকে গোয়েন্দাদের নিবৃত্ত করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের এ প্রক্রিয়া থেকে বিদেশিদের সুরক্ষায় নতুন একটি প্রস্তাবও দেন তিনি। বিদেশি নেতাদের উদ্দেশে ওবামা বলেন, আমাদের বিশ্বাস করুন, আমরা তথ্যের অপব্যবহার করব না।

পাকিস্তানে বোমা হামলায় ২০ সেনা নিহত

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ খাইবার পখতুনখাওয়ার বান্নু শহরে বোমা হামলায় অন্তত ২০ সেনা সদস্য নিহত হয়েছে। রোববার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় বিবিসি অনলাইন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর একটি দল রোববার সকালে বান্নু শহর ছেড়ে যাওয়া প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এই হামলা চালানো হয়। হামলায় আরও অন্তত ২৪ জন সেনা সদস্য আহত হয়েছে। অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী এই হামলা চালায়। এদিকে এই হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি)। সংগঠনটির মুখপাত্র শহিদুল্লাহ শহিদ বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, "আমরা এই হামলার দায় স্বীকার করছি। ভবিষ্যতেও আমরা এ ধরনের আরো হামলা চালাবো।" এর আগে গত সপ্তাহে করাচিতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলাকালে বোমা বিস্ফোরণে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছিলেন।

এলাকার উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করবেন চট্টগ্রামের চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী

বিএনপির সঙ্গে সংলাপ হবে। তবে সেই সংলাপ হবে আগামী পাঁচ বছর পর যে নির্বাচন হবে, তা নিয়ে। এ সংলাপেও আসতে হলে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে হবে বিএনপিকে। এ কথা বলছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। মন্ত্রী হওয়ায় তাকেসহ চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়া গণসংবর্ধনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। শনিবার বিকেলে নগরীর লালদীঘি মাঠে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ যৌথভাবে এ সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। সংবর্ধিত অপর তিনজন হলেন_ পানিসম্পদমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর ও ভূমি প্রতিমন্ত্র্পী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।
তবে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর। দেখা যায়নি মন্ত্রিপরিষদ থেকে বাদ পড়া সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ডা. আফছারুল আমীনসহ চট্টগ্রামের কয়েক সাংসদকেও। চট্টগ্রাম থেকে দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের উন্নয়নে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।সংবর্ধনা সভায় বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে  ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, 'আপনি স্বপ্ন দেখছেন_ আবার সংলাপ হবে, আবার নির্বাচন হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভুলে যান। আমরা পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসেছি। এর পর কীভাবে নির্বাচন হবে সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ না নিয়ে একুল-ওকুল দু'কুলই হারিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণসহ চট্টগ্রামের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাসের এক সপ্তাহ প্রয়োজনে চট্টগ্রামে অফিস করবেন বলেও এ মন্ত্রী ঘোষণা দেন।
নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংবর্ধনা সভায় সংবর্ধিত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও বক্তব্য রাখেন জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদল এমপি, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু এমপি, সাবেক গণপরিষদ সদস্য ইসহাক মিয়া, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এমএ ছালাম, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির এবং সাংসদ দিদারুল আলম, মাহফুজুর রহমান মিতা, আবু রেজা মো. নদভী, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম আমিন প্রমুখ।

জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী আজ

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগমারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দলের প্রতিষ্ঠাতার জন্মদিন উপলক্ষে এক বাণীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে রাজনীতিতে আসেন জিয়াউর রহমান। মাতৃভূমির মুক্তির জন্য নেতৃত্বহীন জাতির দিশারী হয়ে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি দু'দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ রোববার সকাল ১১টায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করবেন। এ ছাড়া দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। আজ রোববার ভোরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলের সব কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। সকালে জিয়াউর রহমানের মাজার প্রাঙ্গণে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এ ছাড়া নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ড্যাব ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও বিনা মূল্যে ওষুধ বিতরণ করবে।

এখনই এসো, কাল যদি ভালো না থাকি by মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

ফোনটা এলো বিকেলে। রোববার, ৫ জানুয়ারি। বাইরের কোনো কাজ রাখিনি সেদিন। বাড়িতে বসে আমার আগামী বইয়ের জন্য লিখছিলাম। হঠাৎ বেলভিউ থেকে ফোনে মুনমুন। বলল, 'একটু কথা বলো।' তার পরেই এক বিমুগ্ধ বিস্ময় আমার জন্য ফোনের ও পারে তিনি, সুচিত্রা সেন! গলাটা হয়তো একটু ভারী, তবে কথার মিষ্টতা আগের মতোই। আমাকে বললেন, 'চলে এসো, তোমাকে দেখতে চাই।' জানতে চাইলাম, 'কবে? আজই, না কাল?' জবাব এলো, 'এখনই এসো। আজ ভালো আছি। কাল যদি ভালো না থাকি।'
ভাইপো অভিষেককে ডেকে নিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম। মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিল। এর আগে কোনো দিন তাকে সামনে থেকে দেখিনি। পরিচয় যা, সেটা পর্দায় দেখে। এবং যে কোনো বাঙালির মতোই উত্তম-সুচিত্রা জুটি সম্পর্কে চিরাচরিত আবেগের আমিও শরিক। সেই সুচিত্রার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি! সুচিত্রা সেন, আমাদের বিশ্বজয়ী দেবকন্যা!
ঠিক দু'দিন আগেই জানতে পারি, মহানায়িকা বেলভিউতে সুব্রত মৈত্রের চিকিৎসাধীন। সে দিনই নার্সিং হোমে খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। তবে তিনি যেহেতু দীর্ঘদিন স্বেচ্ছায় নিজেকে আড়ালে সরিয়ে রেখেছিলেন, তাই তার সেই ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে দেখা করার চেষ্টা করিনি। বাইরে থেকে মুনমুন, রাইমা, রিয়ার সঙ্গে কথা বলে ডাক্তার মৈত্র, ডাক্তার সমরজিৎ নস্কর, বেলভিউর সিইও প্রদীপ টন্ডনের কাছে সব খবরাখবর নিয়ে ফিরে আসি। শুধু প্রার্থনা ছিল, ঈশ্বর ওনাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলুন। এবার দেখা করার ডাক পাঠালেন 'স্বপনচারিণী' নিজেই। মুনমুন, রাইমা, ডাক্তার মৈত্র আমাকে নিয়ে গেলেন। মনে হলো, যেন আমারই জন্য অপেক্ষা করছিলেন। প্রথম দেখা! সেই অনুভবটা ঠিক বলে বোঝানোর নয়। তার কেবিনে ঢুকতেই কাছে ডাকলেন। আমার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কত আদর করলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন, 'খুব ভালো থেকো।' সেদিন আমারও সুযোগ হয়েছিল তার হাতে-পায়ে-গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়ার। অনেকক্ষণ কথাও হয়েছিল। খানিকটা সময় তো একেবারে একান্তে আমরা দু'জন। বেশ হাসিখুশি সুচিত্রা সেনকে দেখে ফিরে এলাম। আসার আগে বললেন, 'আবার এসো কিন্তু।'
এর পরে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত তার নার্সিংহোমে থাকাকালীন আমি রোজ গিয়েছি, শুধু এক দিন কলকাতায় ছিলাম না বলে যেতে পারিনি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ও দেখা করে এসেছিলাম। শুক্রবার সকালে গিয়ে দাঁড়ালাম তার নিথর দেহের সামনে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। তাকে দেখতে গিয়ে কোনো দিন ঘণ্টা দু'-তিন থাকতাম আমি। সেই থেকে যতবার গিয়েছি, উনি কথা বলতে না পারলেও ইশারায় কাছে ডেকেছেন। হাত ধরে থেকেছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। চা-কফি খেতে বলেছেন। গত পরশুও যখন গেলাম মুনমুনের সামনেই উনি হাত বাড়ালেন। হাতে সুচ ফুটিয়ে নানা রকম ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, টিউব-পাইপ ইত্যাদি লাগানোর জন্য তার হাতের বহু জায়গায় কালশিটের মতো হয়ে গিয়েছিল। আমি সেখানে হাত বুলিয়ে দিতাম। উনি ভালোবাসতেন সেটা। নার্সকে বলেছিলাম ভালো করে তিনবার মলম লাগিয়ে দিতে। জানতে চেয়েছিলাম, 'খুব ব্যথা?' উনি বলেছিলেন, 'হ্যাঁ, খুব।' কিন্তু নিজের রোগযন্ত্রণা নিয়ে কখনও কাউকে বেশি বিরক্ত করতে চাননি। অথচ মুনমুন-রাইমা-রিয়া এবং চিকিৎসকরা যে কী আন্তরিক পরিশ্রম করেছেন ওনাকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরানোর জন্য, তা আমি কাছ থেকে দেখেছি।
এই তো কয়েক দিন আগেই আমরা নিজেরা বলাবলি করলাম, উনি নিজেই যখন আর হাসপাতালে থাকতে চাইছেন না, তখন রোববার বাড়ি নিয়ে যাওয়াই ভালো। দরকারে বাড়িতে হাসপাতালের মতো সব বন্দোবস্ত করে দেওয়া যাবে। তার আগে এক দিন খিচুড়ি খাওয়ার কথাও হলো। উনি খিচুড়ি খেতে ভালোবাসতেন। বললাম, এই শীতেই এক দিন খিচুড়ি রান্না করে আপনার বাড়ি নিয়ে গিয়ে সবাই মিলে মজা করে খাব। উনি শুনে হেসেছিলেন। দুর্ভাগ্য, কোনোটাই হলো না।
তার আরও একটি ভালো লাগার কথা জেনেছি। 'হসপিটাল' ছবিতে তার লিপে গীতা দত্তের গাওয়া 'এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়, এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু ...' গানটি খুব প্রিয় ছিল তার। বলেছিলাম, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে এক দিন আপনার বাড়ি গিয়ে ওই গানটি শুনিয়ে আসব। সব কথাই এখন স্মৃতি! আমাদের সুন্দর বন্ধনে জড়িয়ে রেখে তিনি আকাশ মায়ের কোলে অন্য শান্তির নীড় খুঁজে নিলেন। কয়েক দিন ধরেই তার শারীরিক অবস্থা খুব স্থিতিশীল ছিল না। সেটা চিকিৎসকরা তো বটেই, আমরাও বুঝতে পারছিলাম। তবু চেষ্টার ত্রুটি হয়নি। শেষের ক'দিন কথা বিশেষ বলছিলেন না। তারই মধ্যে তার মন ভালো করার জন্য মজা করতে চাইতাম, খিচুড়ি খাওয়ানোর মতো হাল্কা প্রসঙ্গ তুলতাম। কিন্তু মনের কোনায় একটা দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নবান্ন থেকে বেরিয়ে বেলভিউ যাওয়ার পথেই ফোনে জানতে পারলাম, তার অবস্থা বেশ খারাপ। ডাক্তার মৈত্র, ডাক্তার নস্কর সবাই ভেঙে পড়েছেন। তবু গিয়ে তাদের সবার সঙ্গে কথা বলে আমার মতো করে জোর দেওয়ার চেষ্টা করলাম। তার পরে ঢুকলাম মহানায়িকার কেবিনে। তিনি চোখ খোলার চেষ্টা করছিলেন। হাত ধরলেন। চোখের কোল বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে এলো। চিকিৎসক সুব্রত মৈত্র তাকে বললেন, 'চিকিৎসার কারণে আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। ক্ষমা চাইছি। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।' আসলে মহানায়িকা নিজেও আর চাইছিলেন না কষ্ট পেতে। বরং স্বমর্যাদায় শান্তিতে তার অভীষ্টলোকে চলে যেতে চেয়েছিলেন দ্রুত। তাই রক্ত পরীক্ষার জন্য সুচ ফোটালে বিরক্ত হতেন। নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন বা বাই-প্যাপ লাগাতে গেলে হাত সরিয়ে দিতেন। ভেন্টিলেশনে না দেওয়ার কথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন আগেই।
এই অবস্থায় আমরাও জেনে গিয়েছিলাম, আর বেশি সময় নেই। তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যাবেন যে কোনো সময়। দু'দিন আগে থেকেই তাই পুলিশ কমিশনার, চিকিৎসক সবার সঙ্গে কথা বলে একটা ব্যবস্থা করে রাখতে উদ্যোগী হই। সবই গোপনে। কারণ কাজটি বড় নির্মম। তবু কর্তব্য তো করতেই হবে। আমরা চাইনি তার শেষ ইচ্ছার কোনোরকম অমর্যাদা করতে। তার পরিবার যেমন বলবেন, সেভাবে সব করাটাই লক্ষ্য ছিল। মহানায়িকা নিজেকে জনবিরলে রেখেছিলেন। তাই শেষযাত্রা ও অন্ত্যেষ্টির ব্যবস্থা আগে থেকেই এমনভাবে তৈরি ছিল যাতে তার মুখ প্রকাশ্যে না আসে।
সুচিত্রা মানে কি শুধুই রোম্যান্টিক নায়িকা? গত কয়েক দিন তাকে কাছ থেকে দেখার পর আমি কিন্তু এক অন্য সুচিত্রা সেনকেও আবিষ্কার করেছি। আমাকে কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, 'অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জায়গা থেকে সুচিত্রা সেন কি আপনাকে বিশেষ নজরে দেখেছেন'? সে উত্তর তো আমার কাছে থাকার কথা নয়। যিনি জানেন, তিনি আজ অন্য লোকের যাত্রী। তবে এটা বলব, আমাকে ডেকে পাঠানোর আগে তিনি নিশ্চয় আমার কাজের ধারা সম্পর্কে একটু-আধটু জেনেছিলেন। আমার মাথায় তার আশীর্বাদের হাত তো আমি পেয়েছি! সর্বোপরি তার মনের দৃঢ়তা ছিল বলে মৃত্যু সম্পর্কেও এত উদাসীন হতে পেরেছেন তিনি।
আর ছিল ধর্মের প্রতি অগাধ আস্থা। তিনি রামকৃষ্ণ মঠের দীক্ষিত ছিলেন, সবাই জানি। কিন্তু তার প্রতিদিনের কত সময় তিনি ধর্মাচরণে কাটাতেন, নিজের ঠাকুরঘরে একান্তে পুজো-অর্চনায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন সেটা বলার মতো। এই অসুস্থতার মধ্যেও নার্সিংহোমে মঠ থেকে ফুল ও চরণামৃত এসেছে তার জন্য। তার শেষযাত্রার আগে এসেছেন মঠের সাধুরা।  তবে 'মুডি' ছিলেন খুব। মেজাজ খুশি থাকলে একেবারে হাসির ধারা। আবার কোনো কারণে মুড ভালো না থাকলে বা বিরক্ত হলে মুখের রেখায় চরম অভিমানের প্রকাশ। আমি নিজেই এটা দেখেছি। যদিও সৌজন্যের মাত্রা কখনও ছাড়াতেন না। মৃত্যুর দু'দিন আগেও আমাকে হাত তুলে নমস্কার জানাতে ভোলেননি। আর ফিটফাট ছিলেন এতটাই যে, ঠোঁটের ক্রিমটাও ঠিকঠাক মাখিয়ে দিতে হতো। সব শেষে সেই অনিবার্য প্রশ্ন। কেমন দেখতে ছিলেন এখনকার সুচিত্রা সেন? কেমন চেহারা ছিল তার? এই লেখার সেই গোড়ার প্রসঙ্গে ফিরি। আমাদের সবার স্বপ্নের নায়িকাকে প্রথম দেখতে যাওয়ার দিনে আমার মনেও এই কৌতূহল যে ছিল না, বলি কী করে! আর গিয়ে কী দেখলাম? শুনলে আশ্চর্য হবেন, ওনার চেহারা একেবারে আগের মতোই আঁটোসাঁটো। বয়স ছাড়া ভাঙনের ছাপ নেই। কারণ যাঁরা মাথা উঁচু করে চলেন, তারা তো ভাঙতে জানেন না। তার মরদেহের সামনে দাঁড়িয়েও সেই কথাটি বারবার মনে হচ্ছিল। একেবারে শান্ত, সুন্দর মুখ, যেন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছেন। নিজস্বতায় অনড় থেকে এই চলে যাওয়া তাকে চিরজয়ী করে রাখল। আমরা শুধু সেই জয়ের সাক্ষী থাকলাম।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী
সূত্র :আনন্দবাজার পত্রিকা

তখন ড্রিমগার্ল আর এখন? by প্রসেনজিৎ

উত্তম জেঠু আমার অভিনয় জীবনের প্রথম অভিভাবক। তার কাছে বড় কৃতজ্ঞ আমি। তার হঠাৎ চলে যাওয়াটা আমাকে অভিভাবকহীন করে দিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, সৌমিত্র কাকুও সবসময় আমার পাশে ছিলেন। কিন্তু যদি মিসেস সেনের কথা ভাবি? স্মৃতি বলতে আমার সম্বল শুধু একটা ফটো। যে ছবিতে 'ছোট্ট জিজ্ঞাসা'র সেটে তখনকার ছোট্ট প্রসেনজিতের গালে চুমু দিচ্ছেন মহানায়িকা। সেই শেষ! আর তো পাইনি তাকে। এই নিয়ে বহুদিন ধরেই একটা আক্ষেপ রয়েছে আমার। তিনি ইন্ডাস্ট্রি থেকে একেবারে সরে গিয়েছেন বলে নয়, তাকে কখনও আমাদের অভিভাবক হিসেবে পেলাম না বলে। উত্তম জেঠুর মতো তাকেও পাশে চেয়েছিলাম, প্রতি পদে তার পরামর্শ পেতে চেয়েছিলাম। তবে আমরা সবাই তার এই আড়ালে থাকাটাকে সম্মান করেছি। সালাম জানিয়েছি তার এ সিদ্ধান্তকে।
না, মিসেস সেনের কোনো পরামর্শ বা টিপস সরাসরি পাইনি আমি। তবে বাবার কাছেই শোনা একটা গল্প, সেটাই আমার জীবনে পরোক্ষে তার থেকে পাওয়া বিরাট পরামর্শ। বাবা তখন সবে পা রেখেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে। 'হসপিটাল' ছবিতে সুচিত্রা সেনের বিপরীতে অভিনয়ের অফার এলো। মিসেস সেন তখন তার ক্যারিয়ারের শীর্ষে। একটা দৃশ্য ছিল যেখানে বাবা বলবেন, তাকে কতটা ভালোবাসেন এবং সুচিত্রা সটান প্রত্যাখ্যান করে বলবেন, এ সম্পর্ক হতে পারে না। পরের দৃশ্যে বাবা শক্ত করে ধরবেন সুচিত্রার হাত। বুঝিয়ে দিতে চাইবেন তার ভালোবাসা কতখানি এবং এ সম্পর্ক সফল হতেই পারে। কিন্তু বাবা এতটাই নার্ভাস যে, কিছুতেই হাতটা ধরে উঠতে পারছেন না। শেষমেশ মিসেস সেনই বাবাকে ডাকলেন। বোঝালেন, এ মুহূর্তটার জন্য ভুলে যাও, তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ। ভাব, তুমি তোমার প্রেমিকার সামনে দাঁড়িয়ে। তাকেই বোঝাচ্ছ নিজের ভালোবাসার কথা। শটটি দেওয়ার পর দেখা গেল কাচের চুড়ি আটকে রয়েছে মিসেস সেনের হাতে। গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। সুচিত্রা অবশ্য নির্বিকার। বাবাকে বলেছিলেন, 'গুড শট অ্যান্ড প্যাক আপ।' বাবার কাছে শোনা এ গল্পটাই আমার কাছে সুচিত্রা সেনের পরামর্শ। আমিও তাই সবসময় আমার জুনিয়রদের সঙ্গে খুব খোলাখুলি মিশি। তাদের জড়তা কাটিয়ে অভিনয় করতে সাহায্য করি। হলে গিয়ে তার কোন ছবি প্রথম দেখেছিলাম, মনে পড়ছে না এখন। তবে টিভিতে দেখা প্রথম ছবি 'উত্তরফাল্গুনী'। এ ছবি দেখেই প্রথম বুঝেছিলাম, সুচিত্রা সেনকে। একটা সময় ছিল যখন আমি, শুধু আমি কেন, সবাই টিভির সামনে বসে পড়ত উত্তম জেঠু আর মিসেস সেনের ক্ল্যাসিক ছবিগুলোর টানে। ওই ছবিগুলো গিলেছি-টা বোধহয় সঠিক শব্দ! রিনা ব্রাউন সে সময়কার কত ছেলের ড্রিমগার্ল। বাজি রেখে বলতে পারি, এই প্রজন্মের বহু ছেলের কাছেও তিনি ড্রিমগার্লই।
মিসেস সেনের সঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ তো আর হয়নি। তবে মুনমুন এবং পরে রাইমা-রিয়া সবার সঙ্গেই কাজ করেছি। রাইমার সঙ্গে যখন 'চোখের বালি' করি, ওর মুখেই শুনেছিলাম, মিসেস সেন গোটা ছবিটা খুঁটিয়ে দেখেছেন। আমার কাজও তার ভালো লেগেছে। একই কথা 'নৌকাডুবি' সম্পর্কেও প্রযোজ্য। ওতে রাইমা-রিয়া দু'বোনই ছিল। তাই ছবিটা ওদের দিদার কেমন লেগেছে, জানার ইচ্ছে ছিল খুব। তখনও শুনেছি, আমার অভিনয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন তিনি। তার প্রশংসাই আমার কাছে অনেকখানি। কৃষ্ণা দাশগুপ্ত সাধারণ মেয়ে থেকে মহানায়িকা। বিয়ের পর অভিনয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তা তার ক্যারিয়ারে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সত্যজিৎ রায়ের ইচ্ছা ছিল 'দেবী চৌধুরানী' করার। ডেটের সমস্যায় সুচিত্রা সময় দিতে পারেননি। ছবিটা হলে নিশ্চিতভাবে আরেকটা মাইলফলক হতো।
টালিউড অভিনেতা
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

লাইনচ্যুত গণতন্ত্রের ট্রেন by আলী ইদ্‌রিস

বলা হয় একটি জাতি বা গোষ্ঠী তার যোগ্যতা অনুযায়ী নেতা-নেত্রী পেয়ে থাকে। জাতি নিজেই তার নেতা ও শাসক নির্বাচিত করে। এ নির্বাচনের মধ্যে যদি জনগণ ভুল সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে জাতি অযোগ্য,

লাইনচ্যুত গণতন্ত্রের ট্রেন by আলী ইদ্‌রিস

বলা হয় একটি জাতি বা গোষ্ঠী তার যোগ্যতা অনুযায়ী নেতা-নেত্রী পেয়ে থাকে। জাতি নিজেই তার নেতা ও শাসক নির্বাচিত করে। এ নির্বাচনের মধ্যে যদি জনগণ ভুল সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে জাতি অযোগ্য,
অদক্ষ, দুর্নীতিগ্রস্ত  নেতা বা শাসক উপহার পায়। আধুনিককালে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একটি ভোটের অনেক দাম। কারণ, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে লাখ লাখ ভোট পেয়েও এক ভোটের ব্যবধানে একজন প্রার্থী হেরে যেতে বা জয় লাভ করতে পারেন। জনগণের এই ভোটাধিকার যদি কেড়ে নেয়া হয় তাহলে গণতন্ত্র থাকে না। দশম জাতীয় নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে ৪ কোটির বেশি ভোটার তাদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার  প্রয়োগ করে পছন্দমতো নেতা-নেত্রী নির্বাচন করতে পারেননি। তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে মহাজোটের মনোনীত প্রতিনিধিবৃন্দ। এ মনোনয়ন টেন্ডার ভাগাভাগি করে নেয়ার মতো হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি জোট নির্বাচনে অংশ নেয়নি বলেই এমনটি হয়েছে। বিএনপি ১৮ দলীয় জোট কেন নির্বাচনে অংশ নেয়নি তা সবার জানা, এতে গণতন্ত্র লাইনচ্যুত হয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন লাইনচ্যুত গণতন্ত্রের ট্রেনকে লাইনে ওঠাতে হলে সব দলের অংশগ্রহণে আর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান দরকার। একমাত্র ভারত ছাড়া পৃথিবীর বহু দেশ এই ভোটারবিহীন নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করেছে। ভারতের ভেতরেও জাতীয় দৈনিকগুলো দিল্লির অন্ধ সমর্থনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। ডেইলি টেলিগ্রাফ লিখেছে- লজ্জাজনক নির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও দিল্লি সরকার আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়েছে যে জন্য ভারতকে মূল্য দিতে হবে। ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা বলেছে- ভারতের উচিত শেখ হাসিনাকে সমঝোতার পরামর্শ দেয়া। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে- গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে নতুন সরকারের বৈধতা প্রশ্নযোগ্য কিংবা সরাসরি অবৈধ। দ্য স্টেটসম্যান লিখেছে- নিজের ছকে পাওয়া বিজয়ে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার এবং অবশ্যই আওয়ামী লীগের বিশ্বাসযোগ্যতা বিনষ্ট হয়েছে। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। দি হিন্দু লিখেছে- নির্বাচন এক সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বলে শেখ হাসিনার দাবির প্রতি ভারতের সমর্থন কাজে আসবে না, বরং তারা দলীয়ভাবে পক্ষপাতী বলেই দৃশ্যমান হবে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে- ভারত দুই পক্ষের মধ্যে সৎ ও আন্তরিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে। ভারত সরকারের উচিত উভয় দেশের জনমতের মূল্যায়ন করা এবং ঐতিহ্যবান, প্রাচীন গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বাঁচানো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা হলে একাদশ সংসদের নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হতে পারে। যোগাযোগমন্ত্রী অবশেষে বলেছেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্য হয়নি। অর্থমন্ত্রী ক’দিন আগে বলেছিলেন যে এ নির্বাচন সংবিধান বাঁচানোর নির্বাচন, প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা হলে শিগগিরই (২৪শে জানুয়ারির পরে) আরেকটি সর্বদলীয় নির্র্বাচন হতে পারে। এদিকে সরকারের ভেতরে অন্য মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কেউ কেউ বলেছেন নতুন সরকার পাঁচ বছর থাকবে। তাহলে সরকারের প্রকৃত অভিলাষ কি এখনও স্পষ্ট  কিছু বোঝা যায় না। এদিকে বিএনপি জোট হরতাল অবরোধ প্রত্যাহার করে শান্তিপূর্ণ  আন্দোলনের যে কর্মসূচি দিয়েছে তাতে সরকারের অনুমতি দেয়া উচিত এবং যে সংলাপ চলছিল তা আবার শুরু করা প্রয়োজন। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে এবং সমঝোতায় পৌঁছতে বিএনপিকেও প্রয়োজনীয় ছাড় অবশ্যই দিতে হবে। তবেই দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২৩ বছর আগে  পুনরুদ্ধারকৃত গণতন্ত্র আবারও বেঁচে যাবে।

প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে ফরাজী হাসপাতাল by রাজবংশী রায়

রাজধানীর বনশ্রীতে এই হাসপাতালে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ
বিভিন্ন দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসকদের কাছ থেকে বিনামূল্যে পরামর্শ পাওয়া গেলে মন্দ কী! বিশেষ করে যাদের দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই তাদের জন্য এমন 'অফার' তো মহাসুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে রোগে-শোকে কাতর কেইবা এমন সুযোগ হাতছাড়া করবেন! অথচ কেউ কী জানে বিনা পয়সায় চিকিৎসার সুযোগ নিতে গিয়ে কী ভয়ানক প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি সমকালের এক অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে এমন এক প্রতারণার ফাঁদ। বিনা পয়সায় চিকিৎসার সুযোগ নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ প্রচুর টাকা প্রতারকদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। 'সকল শ্রেণীপেশার মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ প্রদানের জন্য অ্যাপোলো হসপিটাল, চেন্নাই এবং মাইন্ডশেয়ার গ্গ্নোবাল কনসালট্যান্সি প্রাইভেট লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে অ্যাপোলো হাসপাতাল চেন্নাইয়ের নিম্নলিখিত প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ আগামী ২১ থেকে ২৩ জানুয়ারি একটি ফ্রি হেলথ ক্যাম্প পরিচালনা করবেন। আগ্রহী নতুন ও পুরনো রোগীদের নিম্নলিখিত ঠিকানায় জেলার নাম উল্লেখ করে রেজিস্ট্রেশন করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। অ্যাপোলো হসপিটাল চেন্নাইয়ের তথ্য কেন্দ্র- মাইন্ডশেয়ার গ্গ্নোবাল কনসালট্যান্সি (প্রা.) লি. ও কনসালটেশন সেন্টার- ফরাজী হাসপাতাল লি.'। জাতীয় দৈনিকে ফ্রি চিকিৎসা পরামর্শ প্রদানের এমন চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচারণা করছে রাজধানীর ফরাজী ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড হাসপাতাল নামে একটি প্রাইভেট চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার সিফায়েত উল্লাহ সমকালকে বলেন, বিএমডিসি আইন অনুযায়ী মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে চিকিৎসা সেবা বা পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ নেই। যারা এ ধরনের কাজ করছে তারা নিশ্চিতভাবে প্রতারক চক্র। এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে আগে কয়েকবার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসার নামে প্রতারণার অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি জনসাধারণকে এ চক্রের ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক।
ফরাজী ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনরা। ফ্রি চিকিৎসা সেবা পরামর্শ দেওয়ার কথা বলে অসুস্থ রোগীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। বিদেশি ডাক্তার দেখানোর চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অনেক অসুস্থ রোগী রামপুরা থানার ১৬-১৯ হোল্ডিংয়ের ব্লক-ই বনশ্রী এলাকার ওই হাসপাতালটিতে পরামর্শের জন্য গেছেন। এর পর তারা হয়েছেন নাজেহাল। বিজ্ঞাপনে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাননি তারা।
ভুক্তভোগী কয়েকজন রোগীর স্বজন সমকালকে জানান, ফ্রি চিকিৎসা পরামর্শের জন্য ফরাজী হাসপাতালে গেলে প্রথমে পাঁচশ' টাকা জমা দিয়ে তাদের নাম রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হয়। এরপর ডাক্তার দেখানোর আগেই পাঁচ থেকে ছয় ধরনের প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করতে বলা হয়। ফরাজী হাসপাতালেই ওই টেস্ট করতে রোগীদের বাধ্য করে কর্তৃপক্ষ। এসব টেস্ট করতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এরপরই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ মেলে। ডাক্তার দেখানোর পর বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে আরেক দফা টেস্টের কথা বলে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
গত শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অভ্যর্থনা কক্ষে ২০ থেকে ২২ বছর বয়সী এক যুবক বসে আছেন। বিদেশি ডাক্তারের পরামর্শের জন্য কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে জানতে চাইলে ওই যুবক একটু অপেক্ষা করতে বলে ভেতরে চলে যান। তিন থেকে চার মিনিট পর একটি কক্ষ থেকে বের হয়ে এ প্রতিবেদককে ওই কক্ষের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে বলেন, 'ওই রুমে যান, স্যার আছেন। তার সঙ্গে আলাপ করুন।' যুবকের কথামতো অভ্যর্থনা কক্ষলাগোয়া পেছনের একটি কক্ষে গিয়ে কথা হয় আবদুর রব নামে একজনের সঙ্গে। তিনি নিজেকে অ্যাপোলো হসপিটালস ইন্ডিয়ার আবাসিক প্রতিনিধি বলে পরিচয় দেন। রোগী সেজে চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'প্রতি মাসে একবার করে ইন্ডিয়া থেকে ডাক্তার এসে ফ্রি চিকিৎসা পরামর্শ প্রদান করেন। এজন্য রোগীদের মাত্র পাঁচশ' টাকা জমা দিয়ে নাম রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।' বিদেশ থেকে চিকিৎসক এসে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করবে তাতে ওই চিকিৎসকদের লাভ কী_ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'লাভ তো আছেই, লাভ ছাড়া কেউ কি কাজ করে?' পাঁচশ' টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি কেন নেওয়া হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এই যে রোগীদের ফোন করা হয়, লোকজন নিয়োগ করে খাতায় নাম এন্ট্রি করতে হয়, খাতা-কলম খরচ হয়। এসবের খরচ হিসেবে ওই পাঁচশ' টাকা নেওয়া হয়।' একটি ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, 'যে কোনো রোগের সমস্যার জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। বিদেশি ভালো ডাক্তার দেখিয়ে দেব।'
পরে ওইদিন সন্ধ্যায় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আবদুর রবকে ফোন করা হয়। বিদেশি ডাক্তার তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা পরামর্শ দিচ্ছেন এমন কোনো অনুমতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হয়েছে কি-না এমন প্রশ্ন করলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, 'চার থেকে পাঁচ বছর ধরে আমরা এ সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। আপনার যদি কোনো রোগী থাকে নিয়ে আসুন, আমরা ফ্রি সব ব্যবস্থা করে দেব।' ফ্রি চিকিৎসা নামে রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল টেস্টের কথা বলে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, 'রোগ নিরূপণ করতে হলে প্যাথলজিক্যাল টেস্ট তো করতেই হবে। আমাদের হাসপাতালে যেহেতু টেস্ট আছে তাই রোগীদের এখানেই সব টেস্ট করা হয়। এছাড়া কারও কাছে টাকা না থাকলে আমরা ফ্রি টেস্টের ব্যবস্থা করে দিই।'

তদন্ত নিয়ে তদন্ত সংস্থাও 'হতাশ' by আতাউর রহমান

রাজধানীর গোপীবাগে সিক্স মার্ডার নিয়ে গোলকধাঁধায় পড়েছে পুলিশ। আলোচিত এ হত্যা মামলায় তদন্ত সংস্থা ডিবি পুলিশ যে ধারণা নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়েছে, সে ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো কোনো তথ্যই পায়নি। হত্যাকাণ্ডের এক মাস পার হতে চললেও কোনো খুনিকেই শনাক্ত করা যায়নি। খুনের কারণ উদ্ঘাটনও সম্ভব হয়নি। এমনকি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। কার্যত সন্দেহের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সিক্স মার্ডারের তদন্ত কার্যক্রম। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণার সঙ্গে প্রাপ্ত তথ্য ও আলামতে কোনো মিল খুঁজে না পাওয়ায় তারাও হতাশ হচ্ছেন। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর গোপীবাগের ৬৪/৬ নম্বর বাড়ির দোতলায় খুন হন কথিত পীর লুৎফোর রহমান ফারুক, তার বড় ছেলে সারোয়ার ইসলাম ফারুক ওরফে মনি, লুৎফোরের অনুসারী মঞ্জুরুল আলম, মো. রাসেল, মো. শাহীন ও মজিবুর সরকার। লুৎফোর রহমানের ছোট ছেলে আবদুল্লাহ আল ফারুক অজ্ঞাতপরিচয় ১০-১২ জনকে আসামি করে ওয়ারী থানায় মামলা করেন। আসামিরা অনুসারীর বেশে বাসায় ঢুকে পরিকল্পিতভাবে ছয়জনকে খুন করে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, শুরুতে তাদের ধারণা ছিল, খুনিদের দ্রুতই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এ জন্য সন্দেহভাজনদের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়। সে অনুযায়ী বেশ কয়েকজনকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়। তবে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে উল্লেখ করার মতো কোনো তথ্য পায়নি তদন্ত সংস্থা। ফলে তদন্ত কর্মকর্তারা হতাশ হয়ে পড়েন। এর পর ভিন্ন পন্থায় তদন্ত শুরু করেছে ডিবি পুলিশ।
আলোচিত এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর আবু আল খায়ের মাতুব্বর সমকালকে বলেন, এ পর্যন্ত নিহত লুৎফোরের পরিবারের সদস্য, স্বজন ও অনুসারী মিলিয়ে অন্তত অর্ধশত লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উল্লেখ করার মতো কিছু পাওয়া যায়নি। তাই সন্দেহজনক সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তাদের ধারণা ছিল, হয়তো খুনিরা লুৎফোরকে ফোন দিয়েই বাসায় ঢুকেছিল। হত্যাকাণ্ডের পরও ওই বাসা থেকে খুনিরা ফোনে কথা বলেছে_ এমন ধারণা থাকলেও এখনও এ ধরনের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি, যা থেকে হত্যাকারীরা শনাক্ত হতে পারে। হত্যাকারীরা উল্লেখ করার মতো কোনো আলামত ফেলে রেখে যায়নি, যা দিয়ে তদন্ত সামনের দিকে নেওয়া যেতে পারে। নিহত লুৎফোর রহমান ইমাম মাহদীর (আ.) নাম ব্যবহার করে ধর্মীয় বিভিন্ন 'বিভ্রান্তিকর' মতবাদ প্রচার করতেন। এসব মতবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কোনো উগ্র গোষ্ঠী সিক্স মার্ডারের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে নিহতের পরিবার ও তদন্ত সংস্থা ডিবি পুলিশের সন্দেহ। তবে হত্যাকাণ্ডের ২৬ দিন পার হলেও তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় নিহতের পরিবারের মধ্যে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিহত লুৎফোরের ছেলে আবদুল্লাহ আল ফারুক, লুৎফোরের স্ত্রী সালমা বেগম ও নিহত সারোয়ারের স্ত্রী ফেরদৌসী তালুকদার বীথি গোপীবাগের বাসা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের চলাফেরাও সীমিত হয়ে গেছে। আবদুল্লাহ আল ফারুক সমকালকে বলেন, খুনিরা তার বাবা, ভাইসহ ছয়জনকে খুন করার পর তাকে হত্যা করার জন্য বাসায় খুঁজেছে। তিনি ওই সময় বাসায় না থাকায় বেঁচে গেলেও এখন প্রতিমুহূর্তে মৃত্যু-আতঙ্কে ভুগছেন। খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় তাদের পুরো পরিবারই আতঙ্কে রয়েছে। ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ছয়জনকে একই কায়দায় গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর যারা এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে জড়িত_ এমন কয়েকজনকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। এসব উগ্র গোষ্ঠীর সদস্যরা কে, কোথায়_ সে তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ধরনের কেউ কারাগারে থাকলে প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।

‘এখুনি এসো কাল যদি ভাল না থাকি’ by মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

ফোনটা এলো বিকালে। রোববার, ৫ জানুয়ারি। বাইরের কোন কাজ রাখিনি সে দিন। বাড়িতে বসে আমার আগামী বইয়ের জন্য লিখছিলাম। হঠাৎ বেলভিউ থেকে ফোনে মুনমুন। বলল, ‘একটু কথা বলো।’

উপজেলা নির্বাচনে দলের একক প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

উপজেলা নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার জন্য মন্ত্রী ও এমপিদের তাগিদ দিয়েছেন। তার ভাষায়, মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে নেতাকর্মীদের দূরত্ব মেনে নেওয়া হবে না। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী উপজেলা নির্বাচন সামনে রেখে উপজেলা পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও মজবুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'খুব দ্রুত উপজেলা নির্বাচন হবে। দেরি করা যাবে না।' বৈঠকে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। তারা বলেছেন, কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। বিরোধী দলের সহিংস নৈরাজ্যজনক রাজনীতির ক্ষত এখনও শুকায়নি। তাই কিছুটা সময় নিয়ে দল গুছিয়ে উপজেলা নির্বাচনে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেছেন, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন করলে ঢাকাসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতো। সেটা না করায় বিপাকে পড়তে হয়েছে। তাই দ্রুত উপজেলা নির্বাচন করতে হবে। তিনি এ ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সফর করে একক প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য দলের সাত সাংগঠনিক সম্পাদককে নির্দেশ দেন।
দলীয় প্রধানের এ নির্দেশ কার্যকর করতে সাংগঠনিক সম্পাদকরা দ্রুত দল গুছিয়ে নিতে তৃণমূল পর্যায়ে বর্ধিত সভা-সম্মেলন, সদস্য সংগ্রহ ও সদস্য নবায়নের কর্মসূচি শুরু করবেন। দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগেই এসব কর্মসূচি শুরু হবে। এ ব্যাপারে কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংলাপ নিয়ে মন্তব্য করায় দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ কয়েকজন নেতার সমালোচনা করেন। সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, কথা কম বলা ভালো। বেশি কথা বললে বিরোধী দলসহ বিদেশিরা সুযোগ পায়।
বৈঠকে তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন এবং নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করায় স্বাগত জানানো হয়েছে। কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুর রহমান সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারের পাশাপাশি নতুন মন্ত্রিসভাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সতর্ক থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একজন নেতা একই সঙ্গে মন্ত্রী হলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি আসে না। এবারকার মন্ত্রিসভা গঠনের সময় এ দিকটি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, অস্বাভাবিক পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। সভায় শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন দলের দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান। সদ্যপ্রয়াত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঠাঁই নেই :দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য দেনদরবার করছেন। তাদের জন্য দুঃসংবাদ, আওয়ামী লীগে তাদের যোগ দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, স্বতন্ত্র এমপিরা স্বতন্ত্র হিসেবেই থাকবেন। তাদের আওয়ামী লীগে ঠাঁই হবে না। অব্যাহতি :গতকালের বৈঠকে কার্যনির্বাহী সদস্য ড. আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ পদে আসার পর তিনি কখনোই কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হননি। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটির শূন্য পদগুলো পূরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৈঠকে অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ড. হাছান মাহমুদ, আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র বোস প্রমুখ।

‘এখুনি এসো কাল যদি ভাল না থাকি’ by মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

ফোনটা এলো বিকালে। রোববার, ৫ জানুয়ারি। বাইরের কোন কাজ রাখিনি সে দিন। বাড়িতে বসে আমার আগামী বইয়ের জন্য লিখছিলাম। হঠাৎ বেলভিউ থেকে ফোনে মুনমুন। বলল, ‘একটু কথা বলো।’
তারপরেই এক বিমুগ্ধ বিস্ময় আমার জন্য, ফোনের ওপারে তিনি, সুচিত্রা সেন! গলাটা হয়তো একটু ভারি, তবে কথার মিষ্টতা আগের মতোই। আমাকে বললেন, ‘চলে এসো, তোমাকে দেখতে চাই।’ জানতে চাইলাম, ‘কবে? আজই, না কাল?’ জবাব এলো, ‘এখুনি এসো। আজ ভাল আছি। কাল যদি ভাল না থাকি?’

ভাইপো অভিষেককে ডেকে নিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম। মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিল। এর আগে কোনদিন তাকে সামনে থেকে দেখিনি। পরিচয় যা, সেটা পর্দায় দেখে। এবং যে কোন বাঙালির মতোই উত্তম-সুচিত্রা জুটি সম্পর্কে চিরাচরিত আবেগের আমিও শরিক। সেই সুচিত্রার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি! সুচিত্রা সেন, আমাদের বিশ্বজয়ী দেবকন্যা!
ঠিক দু’দিন আগেই জানতে পারি, মহানায়িকা বেলভিউতে সুব্রত মৈত্রের চিকিৎসাধীন। সেদিনই নার্সিংহোমে খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। তবে তিনি যেহেতু দীর্ঘদিন স্বেচ্ছায় নিজেকে আড়ালে সরিয়ে রেখেছিলেন, তাই তার সেই ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে দেখা করার চেষ্টা করিনি। বাইরে থেকে মুনমুন, রাইমা, রিয়ার সঙ্গে কথা বলে ডাক্তার মৈত্র, ডাক্তার সমরজিৎ নস্কর, বেলভিউয়ের সিইও প্রদীপ টন্ডনের কাছে সব খবরাখবর নিয়ে ফিরে আসি। শুধু প্রার্থনা ছিল, ঈশ্বর ওনাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলুন। এবার দেখা করার ডাক পাঠালেন ‘স্বপনচারিণী’ নিজেই।
মুনমুন, রাইমা, ডাক্তার মৈত্র আমাকে নিয়ে গেলেন। মনে হলো, যেন আমারই জন্য অপেক্ষা করছিলেন। প্রথম দেখা! সেই অনুভবটা ঠিক বলে বোঝানোর নয়। তার কেবিনে ঢুকতেই কাছে ডাকলেন। আমার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কত আদর করলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন, ‘খুব ভাল থেকো।’ সেদিন আমারও সুযোগ হয়েছিল তাঁর হাতে-পায়ে-গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়ার। অনেকক্ষণ কথাও হয়েছিল। খানিকটা সময় তো একেবারে একান্তে আমরা দু’জনে। বেশ হাসিখুশি সুচিত্রা সেনকে দেখে ফিরে এলাম। আসার আগে বললেন, ‘আবার এসো কিন্তু।’
এরপরে ১৬ই জানুয়ারি পর্যন্ত তার নার্সিংহোমে থাকাকালীন আমি রোজ গিয়েছি। শুধু একদিন কলকাতায় ছিলাম না বলে যেতে পারিনি। বৃহস্পতিবারও সন্ধ্যায় দেখা করে এসেছিলাম। শুক্রবার সকালে গিয়ে দাঁড়ালাম তার নিথর দেহের সামনে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।
তাকে দেখতে গিয়ে কোনদিন ঘণ্টা দু’-তিন থাকতাম আমি। দ্বিতীয় যে দিন তার কাছে যাই, সেদিন তুলনামূলকভাবে শ্বাসকষ্ট একটু বেশি। চিকিৎসকেরা বললেন, আমি থাকতে থাকতেই তার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। কেন জানি না, আমি কাছে গেলে তার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা অর্থাৎ স্যাচুরেশন বেড়ে প্রায় স্বাভাবিক হয়ে যেত। এমন কথা ডাক্তার মৈত্র বৃহস্পতিবারও বলেছেন। মুনমুন বলত, এটা কি মমতা-ম্যাজিক! তবে সে সবের মধ্যে আমি যাচ্ছি না। আমার কাছে অনেক বড় পাওনা হলো তার সেদিনের একটি কথা: ‘তুমি আমার কে হও?’ কোন কোন সংবাদপত্র ও সংবাদ মাধ্যমে কোনভাবে একথাটি প্রকাশিত হয়ে যায় বিকৃত এক ইঙ্গিত দিয়ে। যাতে মনে হতে পারে, সুচিত্রা সেন সেদিন এতোই গুরুতর অবস্থায় ছিলেন যে, লোক চিনতে পারছিলেন না। খবর দেখে হেসেছিলাম। কাকে কি বোঝাব! কিন্তু আজ বলছি, এটা অতি বড় ভুল ব্যাখ্যা। আসলে স্নেহ-ভালবাসার কোন গভীর স্তর থেকে এমন কথা সেদিন তিনি বলেছিলেন, আমি সেটা জানি। তাই উত্তরে আমিও বলেছিলাম, ‘আমি তো আপনার পরিবারেরই একজন, একেবারে আপনজন।’ উনি হাসলেন। সারা মুখে শান্তির ছাপ।
সেই থেকে যত বার গিয়েছি, তিনি কখনও কথা বলতে না-পারলেও ইশারায় কাছে ডেকেছেন। হাত ধরে থেকেছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। চা-কফি খেতে বলেছেন। গত পরশুও যখন গেলাম মুনমুনের সামনেই তিনি হাত বাড়ালেন। হাতে সুচ ফুটিয়ে নানারকম ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, টিউব-পাইপ ইত্যাদি লাগানোর জন্য তার হাতের বহু জায়গায় কালশিটের মতো হয়ে গিয়েছিল। আমি সেখানে হাত বুলিয়ে দিতাম। তিনি ভালবাসতেন সেটা। নার্সকে বলেছিলাম ভাল করে তিনবার মলম লাগিয়ে দিতে। জানতে চেয়েছিলাম, ‘খুব ব্যথা?’ তিনি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, খুব।’ কিন্তু নিজের রোগ যন্ত্রণা নিয়ে কখনও কাউকে বেশি বিরক্ত করতে চাননি। অথচ মুনমুন-রাইমা-রিয়া এবং চিকিৎসকরা যে কি আন্তরিক পরিশ্রম করেছেন ওনাকে সুস্থ করে বাড়িতে ফেরানোর জন্য, তা আমি কাছ থেকে দেখেছি।
এই তো কয়েক দিন আগেই আমরা নিজেরা বলাবলি করলাম, তিনি নিজেই যখন আর হাসপাতালে থাকতে চাইছেন না, তখন রোববার বাড়ি নিয়ে যাওয়াই ভাল। দরকারে বাড়িতে হাসপাতালের মতো সব বন্দোবস্ত করে দেয়া যাবে। তার আগে একদিন খিচুড়ি খাওয়ার কথাও হলো। তিনি খিচুড়ি খেতে ভালবাসতেন। বললাম, এই শীতেই একদিন খিচুড়ি রান্না করে আপনার বাড়ি নিয়ে গিয়ে সবাই মিলে মজা করে খাবো। তিনি শুনে হেসেছিলেন। দুর্ভাগ্য, কোনটাই হলো না।
তার আরও একটি ভাল লাগার কথা জেনেছি। ‘হসপিটাল’ ছবিতে তার লিপে গীতা দত্তের গাওয়া ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, এ কি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু’ খুব প্রিয় ছিল তার। বলেছিলাম, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে একদিন আপনার বাড়ি গিয়ে ওই গানটি শুনিয়ে আসবো। সব কথাই এখন স্মৃতি! আমাদের সুন্দর বন্ধনে জড়িয়ে রেখে তিনি আকাশ মায়ের কোলে অন্য শান্তির নীড় খুঁজে নিলেন।
গত কয়েক দিন ধরেই তার শারীরিক অবস্থা খুব স্থিতিশীল ছিল না। সেটা চিকিৎসকেরা তো বটেই, আমরাও বুঝতে পারছিলাম। তবু চেষ্টার ত্রুটি হয়নি। শেষের ক’দিন কথা বিশেষ বলছিলেন না। এর মধ্যেই তার মন ভাল করার জন্য মজা করতে চাইতাম। খিচুড়ি খাওয়ানোর মতো হাল্কা প্রসঙ্গ তুলতাম। কিন্তু মনের কোণায় একটি দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছিল।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাবেলা নবান্ন থেকে বেরিয়ে বেলভিউ যাওয়ার পথেই ফোনে জানতে পারলাম তার অবস্থা বেশ খারাপ। ডাক্তার মৈত্র, ডাক্তার নস্কর সবাই ভেঙে পড়েছেন। তবু গিয়ে তাদের সবার সঙ্গে কথা বলে আমার মতো করে জোর দেয়ার চেষ্টা করলাম। তার পরে ঢুকলাম মহানায়িকার কেবিনে। তিনি চোখ খোলার চেষ্টা করছিলেন। হাত ধরলেন। চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে এলো। চিকিৎসক সুব্রত মৈত্র তাকে বললেন, ‘চিকিৎসার কারণে আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। ক্ষমা চাইছি। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’ আসলে মহানায়িকা নিজেও আর চাইছিলেন না কষ্ট পেতে। বরং স্বমর্যাদায় শান্তিতে তার অভীষ্টলোকে চলে যেতে চেয়েছিলেন দ্রুত। তাই রক্ত পরীক্ষার জন্য সুচ ফোটালে বিরক্ত হতেন। নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন বা বাইপ্যাপ লাগাতে গেলে হাত সরিয়ে দিতেন। ভেন্টিলেশনে না-দেয়ার কথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন আগেই।
এ অবস্থায় আমরাও জেনে গিয়েছিলাম, আর বেশি সময় নেই। তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যাবেন যে কোন সময়। দু’দিন আগে থেকেই তাই পুলিশ কমিশনার, চিকিৎসক সবার সঙ্গে কথা বলে একটা ব্যবস্থা করে রাখতে উদ্যোগী হই। সবটাই গোপনে। কারণ কাজটি বড় নির্মম। তবু কর্তব্য তো করতেই হবে। আমরা চাইনি তার শেষ ইচ্ছার কোনরকম অমর্যাদা করতে। তার পরিবার যেমন বলবেন, সেভাবে সব করাটাই লক্ষ্য ছিল। মহানায়িকা নিজেকে জনবিরলে রেখেছিলেন। তাই শেষযাত্রা ও অন্ত্যেষ্টির ব্যবস্থা আগে থেকেই এমনভাবে তৈরি ছিল যাতে তার মুখ প্রকাশ্যে না আসে।
সুচিত্রা মানে কি শুধুই রোমান্টিক নায়িকা? গত কয়েকদিন তাকে কাছ থেকে দেখার পরে আমি কিন্তু এক অন্য সুচিত্রা সেনকেও আবিষ্কার করেছি। রোমান্টিক সুচিত্রা আমাদের সবার মনের মণিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে আছেন, থাকবেন। আমরা যুগ যুগ ধরে তার সেই চাহনি, সেই প্রেমের আবেগ, সেই মিষ্টতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি এবং থাকবো। কিন্তু রোমান্টিক সুচিত্রা সেনের মধ্যে আরও একজন আছেন। যিনি তেজস্বীতায় ভরপুর, প্রতিবাদী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুচিত্রা সেন। তার অভিনীত ‘দেবী চৌধুরাণী’তে সুচিত্রার চরিত্রের এদিকটি এমনভাবে ধরা পড়েছে, যেটা কখনই অভিনয় বলে মনে হয়নি। আসলে নিজের মধ্যে সেই মানসিক দৃঢ়তা ছিল বলেই অতো প্রাণবন্ত হয়েছে তার অভিনয়। একই কথা বলবো হিন্দি ‘আঁধি’ ছবি সম্পর্কেও। সেখানেও ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রের দৃপ্ত দিকগুলো নিজের মানসিক গঠনের ছকে ফেলে জীবন্ত করে তুলেছেন সুচিত্রা সেন। আমাকে কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জায়গা থেকে সুচিত্রা সেন কি আপনাকে বিশেষ নজরে দেখেছেন’? সেই উত্তর তো আমার কাছে থাকার কথা নয়। যিনি জানেন, তিনি আজ অন্য লোকের যাত্রী। তবে এটা বলবো, আমাকে ডেকে পাঠানোর আগে তিনি নিশ্চয় আমার কাজের ধারা সম্পর্কে একটু আধটু জেনেছিলেন। আমার মাথায় তার আশীর্বাদের হাত তো আমি পেয়েছি! সর্বোপরি তার মনের দৃঢ়তা ছিল বলে মৃত্যু সম্পর্কেও এতো উদাসীন হতে পেরেছেন তিনি।
আর ছিল ধর্মের প্রতি অগাধ আস্থা। তিনি রামকৃষ্ণ মঠের দীক্ষিত ছিলেন, সবাই জানি। কিন্তু তার প্রতিদিনের কতটা সময় তিনি ধর্মাচরণে কাটাতেন, নিজের ঠাকুরঘরে একান্তে পূজা-অর্চনায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন সেটা বলার মতো। এই অসুস্থতার মধ্যেও নার্সিংহোমে মঠ থেকে ফুল ও চরণামৃত এসেছে তার জন্য। তার শেষযাত্রার আগে এসেছেন মঠের সাধুরা।
তবে ‘মুডি’ ছিলেন খুব। মেজাজ খুশি থাকলে একেবারে হাসির ধারা। আবার কোন কারণে মুড ভাল না থাকলে বা বিরক্ত হলে মুখের রেখায় চরম অভিমানের প্রকাশ। আমি নিজেই এটা দেখেছি। যদিও সৌজন্যের মাত্রা কখনও ছাড়তেন না। মৃত্যুর দু’দিন আগেও আমাকে হাত তুলে নমস্কার জানাতে ভোলেননি। আর ফিটফাট ছিলেন এতোটাই যে, ঠোঁটের ক্রিমটাও ঠিকঠাক মাখিয়ে দিতে হতো।
সব শেষে সেই অনিবার্য প্রশ্ন। কেমন দেখতে ছিলেন এখনকার সুচিত্রা সেন? কেমন চেহারা ছিল তার? এই লেখার সেই গোড়ার প্রসঙ্গে ফিরি। আমাদের সবার স্বপ্নের নায়িকাকে প্রথম দেখতে যাওয়ার দিনে আমার মনেও এই কৌতূহল যে ছিল না, বলি কি করে! আর গিয়ে কি দেখলাম? শুনলে আশ্চর্য হবেন, ওনার চেহারা একেবারে আগের মতোই আটোসাঁটো। বয়স ছাড়া ভাঙনের ছাপ নেই। কারণ, যারা মাথা উঁচু করে চলেন, তারা তো ভাঙতে জানেন না। তার মরদেহের সামনে দাঁড়িয়েও সেই কথাটি বারবার মনে হচ্ছিল। একেবারে শান্ত, সুন্দর মুখ, যেন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছেন।
নিজস্বতায় অনড় থেকে এই চলে যাওয়া তাকে চিরজয়ী করে রাখল। আমরা শুধু সেই জয়ের সাক্ষী থাকলাম।
আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে

রাজনীতি করতে হলে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে :প্রধানমন্ত্রী

বিএনপি-জামায়াতের জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে এ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস চলবে না। রাজনীতি করতে হলে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে, গণতান্ত্রিক পথে ফিরে আসতে হবে। যত বড় মুরবি্বই থাকুক, যত বড় শক্তিই তাদের পাশে থাকুক না কেন, এই জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীদের কেউই রক্ষা করতে পারবে না। গতকাল শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে যা যা প্রয়োজন, আমরা তাই করব। এই জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেশের মানুষ মেনে নেবে না। ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং নতুন সরকার গঠনের পর ক্ষমতাসীন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রথমবারের মতো এই বৈঠকে বসল। এ সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, 'আমাদের এখন অনেক দায়িত্ব। যেকোনো মূল্যে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বন্ধ করতে হবে। জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীদের হাত থেকে দেশ ও দেশবাসীকে রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষ ও ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘুদের পাশেও দাঁড়াতে হবে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরেন এবং বিএনপি-জামায়াত এতে জড়িত অভিযোগ করে তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা দেখে ২০০১ সালের কথা মনে পড়ে যায়। তারা এবার নির্বাচনে আসেনি, তাতেই এ অবস্থা। নির্বাচনে এলে এবং আল্লাহ না করুক, তারা ক্ষমতায় এলে ২০০১ সালের চেয়েও দ্বিগুণ হামলা ও নির্যাতন হতো। তাই তারা নির্বাচনে না আসায় একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। তিনি বলেন, এই যে নিরীহ মানুষগুলো, তাদের অপরাধ কী? ভোট দেওয়াই কী তাদের অপরাধ? বিএনপির সঙ্গে জামায়াত আছে। বিএনপি অপরাধীদের সঙ্গে আছে। অপরাধ সংঘটনই তাদের কাজ। সুতরাং তারা অপরাধ করবে এটাই স্বাভাবিক।
নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের ক্ষতিপূরণ ও তাদের পুনর্বাসনে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হামলার ৫ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নিতে বলেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি তৈরি করে দেওয়ার জন্য বিজিবিকে নির্দেশ দিয়েছি। ঘরের ডিজাইনও করে দিয়েছি। তাদের স্যানিটারি ল্যাট্রিনও করে দেওয়া হবে। নির্বাচন বর্জন ও তা প্রতিহতে আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্য ও মানুষ হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়ে ভোটাররা যাতে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারে, সেজন্য তারা পেট্রোল ঢেলে মানুষ হত্যা করেছে। কেউ তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। এমনকি গরুভর্তি গাড়িতেও তারা আগুন দিয়েছে।
তিনি বলেন, এটি কোনো আন্দোলন নয়। জনগণকে সম্পৃক্ত করে তারা এ আন্দোলন করতে পারেনি। আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষ হত্যার উৎসব শুরু করেছিল তারা। এটি সম্পূর্ণ জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তবে সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে এমন দাবিও করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এত বাধা সত্ত্বেও ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। তারা যে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, তারই প্রমাণ রেখেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার জন্য দেশের জনগণ এবং প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দনও জানান তিনি। নতুন সরকার শপথ গ্রহণের পর দেশে স্বস্তি ফিরে এসেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। অতীতের সব নির্বাচনেই কোনো না কোনো সমস্যা হয়েছে। আমরা সরকার গঠনের পর দেশে শান্তি ফিরে এসেছে। যদিও জনগণের শান্তি দেখলে বিএনপিনেত্রীর ভালো লাগে না। তবে দেশের জনগণ আমাদের পাশে আছে। তাদের সঙ্গে নিয়েই আমরা এগিয়ে যাব। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে সুখী, সমৃদ্ধ আধুনিক মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বৈঠকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ নেতারা যোগ দেন।

অর্থনীতির গতি ফেরানো

অর্থনীতির গতিময়তা যে শ্লথ হয়ে পড়েছে, তা বেশ অনেক দিন ধরেই বোঝা যাচ্ছিল। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে হরতাল-অবরোধের নামে সহিংসতা যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, তাতে ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিরাট বিপর্যয় নেমে আসে। ফলে অর্থনীতি গতিময়তা হারিয়ে ফেলে। এসব বিবেচনা থেকেই একাধিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে যাবে বলে পূর্বাভাস দেয়। সর্বশেষ পূর্বাভাসটি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, যেখানে বলা হয়েছে প্রবৃদ্ধির হার হবে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। মোট কথা, প্রবৃদ্ধির হার যে ৬ শতাংশের নিচে নেমে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট। তার মানে দেশ আবার নিম্ন প্রবৃদ্ধির বলয়ে প্রবেশ করেছে। সরকারের নীতি ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতায় বিগত দুই বছরে প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত নিম্নগামী হয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতায় পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। এভাবে গত এক দশকে গড় প্রবৃদ্ধির হার যেখানে প্রায় সোয়া ৬ শতাংশ ছিল, সেই ধারা থেকেও পতন ঘটছে। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রশ্নবিদ্ধ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন সরকার ইতিমধ্যে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। আবার নির্বাচন বর্জনকারী বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিও আপাতত কোনো হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি দেয়নি। ফলে সাময়িকভাবে হলেও জনজীবনে স্বস্তি ভাব ফিরে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার স্বাভাবিক সময়ের মতো সচল হয়ে উঠছে। যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে যে এই সচল হয়ে ওঠা কত দিন বজায় থাকবে। অন্যভাবে বললে, অর্থনীতিতে গতিময়তা কত দ্রুত ফিরে আসবে?
উত্তর খুব সহজ নয়। কেননা, এর সঙ্গে কয়েকটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যা আগে বোঝা দরকার। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রথমত সরকারের, দ্বিতীয়ত বিরোধী দলের, বিশেষ করে বিএনপির। রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবসা-বাণিজ্যের যে ক্ষতি, তার সবচেয়ে বড় প্রভাবটা পড়েছে কর্মসংস্থানের ওপর। ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বিগত তিন মাসে নতুন করে কর্মসংস্থান তো হয়ইনি, বরং ছোট-বড় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোক ছাঁটাই করেছে। অর্থাৎ দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন খুব ধীর থাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে যে কাজের সুযোগ তৈরি হয়, তা-ও হয়নি। পাশাপাশি সরকারের কূটনৈতিক অদক্ষতায় মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমের বাজারও সংকুচিত হচ্ছে। ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে জনশক্তি রপ্তানি তিন লাখের মতো কমেছে। সুতরাং, কর্মসংস্থানই এখন বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা ইতিমধ্যেই ব্যবসার ক্ষতি পূরণের জন্য সরকারের কাছে কিছু প্রণোদনা-সুবিধা চেয়েছেন, যার মধ্যে আছে করের ছাড় এবং ঋণ পরিশোধের ছাড়। সাময়িকভাবে কিছু ছাড় দেওয়া প্রয়োজন হলেও এই ছাড় বা প্রণোদনা এমনভাবে প্রদান করতে হবে যেন তা অর্থবহ হয়, যারা প্রকৃতই ক্ষতিগ্রস্ত, শুধু তারাই যেন পায়।

শেখ হাসিনার যোগ-বিয়োগ

শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় আগের মন্ত্রিসভার ৫১ সদস্যের মধ্যে ৩৫ জনই বাদ পড়েছেন। ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভায় আগের মন্ত্রিসভার আছেন মাত্র ১৮ জন। বাকিরা সবাই নতুন। আগের সাতজন উপদেষ্টার মধ্যে বাদ পড়েছেন চারজন। এই যোগ-বিয়োগ কী ইঙ্গিত দেয়? এটাই ইঙ্গিত দেয় যে আগের পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাঁদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করেছেন, তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন অদক্ষ, অযোগ্য ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। অযোগ্য ও অদক্ষ না হলে তাঁরাও ১৮ জনের কাতারে এসে যেতেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নিয়মরক্ষার নির্বাচনে জয়ী হওয়া সহজ, কিন্তু মন্ত্রিসভায় ঠাঁই নেওয়া কঠিন। সে ক্ষেত্রে আগের আমলনামাটি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন বলেই শুনেছি। যাঁদের সম্পর্কে পাঁচ বছর ধরেই লেখালেখি হয়েছে, যাঁরা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই বাদ পড়েছেন। নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো দুর্নীতিবাজের দায়িত্ব তিনি নেবেন না। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিনি সবাইকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন। কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস খুঁজে বের করতে দুর্নীতি দমন সংস্থা (দুদক) মাঠে নেমেছে বলে পত্রিকায় খবর এসেছে।
দুদকের সুমতি হোক। বাদ পড়া মন্ত্রী-উপদেষ্টারা পাঁচ বছর বেশ দাপটের সঙ্গে ছিলেন, ভেতরের বা বাইরের সমালোচনা একেবারেই পাত্তা দেননি। তাঁদের কপাল পোড়ার কারণ নির্বাচনের আগেই যথারীতি সারা দেশে চাউর হয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর বাদ পড়াদের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ধরনাও দিয়েছেন। কাজ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। নির্বাচনের আগে যখন পত্রিকায় মন্ত্রী-সাংসদদের হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের বিবরণ প্রকাশিত হচ্ছিল, তখনই নাকি তিনি মনস্থির করে ফেলেন কাকে রাখবেন, কাকে বাদ দেবেন। পাঁচ বছরের আমলনামা তো তাঁর হাতে ছিলই। এখন বাদ পড়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, দলে তাঁরা বেশি বেশি সময় দেবেন। আগে কেন দেননি, সেটিও মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। এঁদের অধিকাংশের সঙ্গে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ। তাঁরা কর্মীদের সমর্থনে নেতা হননি, সভানেত্রীর আশীর্বাদে হয়েছেন। এখন সেই আশীর্বাদটুকুও আলগা হয়ে গেছে। শুধু মন্ত্রী-উপদেষ্টা নন, অনেক সাংসদও গত পাঁচ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁদের সম্পদের পরিমাণ দেখে নিজেরাও সম্ভবত লজ্জিত হয়েছেন, যে কারণে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তাদের ওয়েবসাইট থেকে হলফনামা প্রত্যাহার করতে বলেছিল। আবদার আর কাকে বলে? এই জনসেবকদের সৌভাগ্য যে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মান এখনো সেই উচ্চতায় যায়নি, যেখানে মন্ত্রী-সাংসদদের হলফনামার বাইরে থাকা সম্পদের হিসাব বের করে আনবে। বিদেশে কোন আমলে কত টাকা পাচার হয়েছে, তার বিবরণী জনগণকে জানাবে।
মন্ত্রী-সাংসদেরা হলফনামায় যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন, সেটুকুই সাংবাদিকেরা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে হুবহু তুলে দিয়েছেন। আর তাতেই সবার গা জ্বালা ধরেছে। জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগে তাঁদের কার কী সম্পদ ছিল, পাঁচ-দশ বছর পর কী পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা ওয়েবসাইটে নয়, জনসমক্ষেই প্রকাশ করা উচিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করার ওয়াদা করেও কথা রাখেনি। আর এবারে ওয়াদার ধারে-কাছেও যায়নি। মানুষ সামনে এগোয়, আর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো পেছনে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চায়। জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরই চারদিকে হইচই পড়ে যায়। মন্ত্রী-সাংসদেরা ধনাঢ্য বাবা-চাচার দোহাই দেন। এসব দেখে নাকি ন্যাপ-প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের একটি কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘শৈশবে গ্রামের বাড়িতে যাঁরা শানকিতে খেতেন এবং খালের পাড়ে গিয়ে প্রাতঃকর্ম সারতেন, তাঁরাই এখন গুলশান-বনানীর আলিশান ভবনে থেকে নিজেদের নব্য জমিদার ভাবেন।’ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পুরোনো সহকর্মীদের রক্ষায় একটি খোঁড়া যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মানুষের আয় বেড়েছে। অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে। অতএব, মন্ত্রী-সাংসদদের আয় বাড়াটাও স্বাভাবিক।’
কিন্তু সেটি কত গুণ? বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী পাঁচ বছর আগে দেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয় ছিল ৮৪৭ ডলার, আর এখন এক হাজার ৪৪ ডলার। অর্থাৎ পাঁচ বছরে মানুষের আয় দেড় গুণ বেড়েছে। কিন্তু মন্ত্রী-সাংসদদের আয় শতগুণ কিংবা তারও অনেক বেশি হলো কোন অলৌকিক উপায়ে, সেটি তদন্ত করে দেখা দরকার। ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচনটি হয়ে গেল, তাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বলা যাবে না, এতে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন। তাহলে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনটি হলে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া অনেকেই যে মনোনয়ন থেকেও যে বাদ পড়তেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় তাঁরা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছেন। বাংলাদেশ বড় অদ্ভুত জায়গা। এখানে একটি ভালো নির্বাচন, একটি ভালো সংসদ ও সরকার দিতে পারে না। যার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ২০০১ ও ২০০৯ সালে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিপুল বিজয় তাদের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। ফলে মন্ত্রী বাছাইয়ে যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত প্রতিনিধির পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানেরও প্রতিনিধি হিসেবে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে সরকারে দ্বৈত শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চেয়ে অধিক ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে হাওয়া ভবন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে দ্বৈত শাসন না থাকলেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্যই অগ্রাধিকার পায়।
অনেক জ্যেষ্ঠ নেতারই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয় না। প্রধানমন্ত্রী যাঁদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা রেখে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই সেই মর্যাদা রক্ষা করতে পারেননি। একটি মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র—দুটোই যদি পাঁচ বছর ধরে বিতর্ক ও প্রশ্নের মুখে থাকে, সেই মন্ত্রিসভাকে কী করে সফল বলা যায়? সে সময়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তাঁর সরকারের মন্ত্রীরা স্যুটেড-বুটেড ও চৌকস না হলেও সৎ ও যোগ্য! কিন্তু গত পাঁচ বছর পর দেখা গেল, তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী স্যুটেড-বুটেড ও চৌকস হওয়ার পরীক্ষায় পাস করলেও যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখাতে পারেননি। দলের ভেতরে ও বাইরে সেই মন্ত্রিসভার ব্যাপক সমালোচনাকে তখন সরকার আমলে নেয়নি। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে রাখার জন্য যদি জেদ না ধরা হতো, তাহলে হয়তো বিশ্বব্যাংকের অর্থও পাওয়া যেত এবং পদ্মা সেতুর কাজও শুরু হতো। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন পত্রিকায় বাদ পড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আমলনামা ছাপা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ‘পুরোনো মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া ৩৫ জনের মধ্যে অন্তত ২৮ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালনকালে নানা কারণে বিতর্কিত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনসহ অদক্ষতা ও অযোগ্যতার অভিযোগ ছিল।’ নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে তাঁদের অনেকের সম্পদ বেড়েছে বহুগুণ।
মন্ত্রীদের চেয়ে তাঁদের স্ত্রীরা আরও বেশি ধনী হয়েছেন। কেউ কেউ প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক, বিমা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়েছেন, স্ত্রীর নামে সম্পদ গড়েছেন। প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি দায়িত্ব পালনে চরম অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়। প্রভাবশালী দেশগুলো তাঁর প্রতি বিরক্ত ছিল। আ ফ ম রুহুল হকের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে পাঁচ বছরে তাঁর স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে ৭৮২ শতাংশ। এ সময়ে তাঁর ছেলে জিয়াউল হক বড় ব্যবসায়ী হয়েছেন। খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ নিয়ে সমালোচিত হয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক। নরসিংদী পৌরসভার মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের ভাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।’ এখানেই শেষ নয়। আরও আছে। সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে পদস্থ কর্মকর্তাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়ার অভিযোগ আছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা এবং বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার আরও অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে আছে, তাঁরা হলেন: সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, মৎস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আবদুল হাই।
দলের অন্দরমহলের উদ্ধৃতি দিয়ে ১৩ জানুয়ারি ডেইলি স্টার লিখেছে, ‘কতিপয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর অস্বাভাবিক ধন-সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় বিরক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের মন্ত্রিসভায় না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।’ তবে হলফনামায় সম্পদের যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, সেটাই সব নয়। অনেকের প্রকাশিত সম্পদের চেয়ে অপ্রকাশিত সম্পদের পরিমাণই বেশি। আর যাঁরা কেবল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তাঁদের হিসাবটাই আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু যাঁরা পাঁচ বছর ধরে উপদেষ্টা ছিলেন, যাঁরা দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের সম্পদের হিসাবটাও প্রধানমন্ত্রী একবার পরখ করে দেখতে পারেন। এ প্রসঙ্গে আরও একটি কথা বলতে হয়, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সবাই যেমন মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েননি, তেমনি বাদ পড়া সবাইও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তিনি নির্বাচন করেননি, আবার মন্ত্রীও হতে চাননি। এনামুল হক মোস্তফা শহীদ অসুস্থ থাকায় নির্বাচন করেননি। দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে একাধিক উপদেষ্টা বাদ পড়েছেন বলে বাজারে কথা চালু আছে, কিন্তু তাঁদের চেয়েও বেশি দুর্নীতির অভিযোগ যে উপদেষ্টার নামে, তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। অনুরূপ ধারণা আছে পুনর্বহাল হওয়া দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর সম্পর্কেও। অন্যদিকে, মন্ত্রিসভায় নতুন যাঁরা এসেছেন, তাঁদের বেশির ভাগ পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির হলেও অন্তত তিনজনের বিরুদ্ধে আগের আওয়ামী লীগের আমলে ব্যাপক দুর্নীতি ও দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে। তার পরও বলব, ৫১ সদস্যের মন্ত্রিসভার ৩৫ জনকে ঝেড়ে ফেলা কম সাহসের ব্যাপার নয়। প্রধানমন্ত্রীর এই যোগ-বিয়োগের সুফল দেশবাসী পাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

চাল আর চক্রান্তের খেলায় জয়-পরাজয়

রাজনীতি সার্বিক অর্থেই হচ্ছে চাল আর চক্রান্তের খেলা। সঠিক সময়ে সঠিক চাল চালতে পারা যেমন অপরিহার্য গুণ হিসেবে বিবেচিত, তেমনি চক্রান্তের জাল বোনাকেও রাজনীতির খেলায় অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না, যদি-না সেই চক্রান্ত সংকীর্ণ স্বার্থে পরিচালিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি ঘটনাকে এখানে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রথমটি হচ্ছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার খেলায় দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নানা প্রয়াস। এটা হচ্ছে রাজনীতির সেই কুটিল খেলাগুলোর একটি, নৈতিক দিক থেকে যাকে গ্রহণযোগ্য মনে না হলেও যা হচ্ছে রাজনীতির অংশ। একইভাবে বিএনপির জামায়াতকে সঙ্গে রাখাও হচ্ছে রাজনৈতিক কৌশল, যেটাকে ঠিক ষড়যন্ত্রের পর্যায়ে ফেলা যায় না। বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির অঙ্গনে যেসব ঘটনা ইদানীং ঘটে গেছে, তার সবটাই বলা যায়, ছিল চাল আর চক্রান্তের জাল বোনার খেলা। যে খেলায় এক দল বিজয়ী হয়েছে আর অন্যদের বরণ করে নিতে হয়েছে পরাজয়। এক দল জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে সহিংস রাজনৈতিক চালে প্রতিপক্ষের কিস্তিমাতের খেলায় ছিল মত্ত, অন্যদিকে প্রতিপক্ষও কুটিল রাজনৈতিক চালে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধরাশায়ী করার খেলায় কম পিছপা হয়নি। সময় সাক্ষ্য দিচ্ছে, কে সেই কুটিল চক্রান্তের খেলায় বিজয়ী হয়ে বের হয়ে এল এবং কে সেখানে হলো পরাজিত। তবে রাজনীতি যেহেতু চলমান এক খেলা, ফলে পরাজিত পক্ষের সেখানে পরাজয় মেনে নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার অবকাশ নেই। পরবর্তী চাল কীভাবে এবং কখন চালতে হবে, সেই ছক যথাসময়ে কষে নেওয়া হচ্ছে দক্ষ রাজনীতিকের দায়িত্ব। এবার সরাসরি রাজনীতির বাইরের জয়-পরাজয়ের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করা যাক।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় সংবাদমাধ্যম যেহেতু হচ্ছে রাজনীতির খেলার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, ফলে রাজনীতির জয়-পরাজয়ের প্রভাব সংবাদমাধ্যমের ওপরও কিছুটা পড়তে বাধ্য। রাজনীতির খেলার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার সংবাদমাধ্যম হলেও এই মাধ্যমের সেই অংশগ্রহণ অনেকটা যেন হচ্ছে খেলার মাঠের রেফারির সমতুল্য। রেফারিবিহীন প্রতিযোগিতা যেমন গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না, সংবাদমাধ্যমহীন রাজনীতিও অনেকটা একই অর্থে গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। ফলে রেফারি যেন খেলার মাঠের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে না ওঠেন, সেদিকে লক্ষ রাখা সংবাদমাধ্যমের নিজ স্বার্থেই কাম্য। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির আলোকে সংবাদমাধ্যম সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে কি? আমি তো বলব, না, অনেকটাই ব্যর্থতার পরিচয় সংবাদমাধ্যম দেখিয়েছে। মোটা দাগের বিভাজনে দেশের সংবাদমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী (দৈনিক পত্রিকার অনুসৃত পথ, এর কলাম লেখক এবং এর সঙ্গে যুক্ত পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল বা জাতীয় পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী) সবাই দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। টেলিভিশন টক শোর বক্তাদের এখানে আমি অন্তর্ভুক্ত করছি না। কেননা, এঁদের বেলায় বিভাজনের মাত্রা ছিল সৌজন্য রেখা অতিক্রম করে যাওয়া। পত্রিকার কলাম লেখকদেরও এ কারণে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না যে তাঁরা সবাই নিজস্ব অবস্থান থেকেই মতামত ব্যক্ত করছেন, যে অবস্থান আমাদের অনেকের কাছেই খুব পরিষ্কার। ফলে ইনিয়ে-বিনিয়ে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা তাঁরা করলেও তাঁদের লেখার মধ্য দিয়েই পরিচিত সেই অবস্থান আরও অনেক বেশি পরিষ্কার হয়ে গেছে।
তবে প্রশ্ন তোলা যায় সংবাদপত্রের নিজস্ব কলাম লেখকদের বেলায়। তাঁদের অবস্থান কিন্তু সংবাদপত্রের নিজস্ব অবস্থানকেই তুলে ধরে এবং তাঁরা যখন একতরফাভাবে কোনো একটি পক্ষের হয়ে সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন কিন্তু রেফারির নিরপেক্ষ অবস্থানকেই করে তোলে প্রশ্নবিদ্ধ। ছোট একটি দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরা যাক। যে পত্রিকার সঙ্গে ১৫ বছর ধরে আমি যুক্ত, তার এক কলাম লেখক বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর ওয়াশিংটন, লন্ডন আর টোকিওতে নিন্দা আর প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাওয়ার উল্লেখ করে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা হারানোর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে কি হয়নি, তা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ যে দ্বিধাবিভক্ত, তা আমাদের সবার জানা। তবে কথা হচ্ছে, একটি পক্ষ যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে ভোটদাতাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলার ব্রত নিয়ে ময়দানে নেমেছিল, সে রকম অবস্থায় ভগ্নাংশ ভোটারের উপস্থিতিও প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকলে আরও অনেক বেশি ভোটার হয়তো ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হতেন। ফলে পটকা আর বোমাবাজির মতো পেশিশক্তির জোর দেখিয়ে মানুষকে ভয়ে ভোটকেন্দ্রের বাইরে রাখা যে আনুপাতিক সব রকম হিসাব-নিকাশকে জলো করে দেয়, তা তো আমাদের অজানা থাকার কথা নয়। ভোট বর্জনকারীরা যদি পেশিশক্তির আশ্রয় না নিয়ে অহিংস পথে ভোট বর্জনের আহ্বান নাগরিকদের প্রতি জানাতেন এবং সেই অনুযায়ী তাঁরা কাজ করতেন, সে রকম অবস্থায় আসলেই বলা সম্ভব হতো যে দেশের ব্যাপক সংখ্যাধিক্য জনগণ পাতানো নির্বাচন বর্জন করেছে। বাংলাদেশের বেলায় তা হয়েছে কি? তবে কেন শুরুতেই পক্ষপাতদুষ্টভাবে এক পক্ষের ঠুনকো যুক্তি মেনে নিয়ে সেটাকে যুক্তিসংগত করে তোলার জন্য আন্তর্জাতিক সমাজকে সেই বিতর্কে নিয়ে আসা? হ্যাঁ, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে হতাশ এবং সেই হতাশার পেছনে নিশ্চয়ই দেশটির সংগত কিছু কারণ থেকে থাকবে। তাই বলে এটা ভেবে নেওয়া নিছক বোকামির পর্যায়ে পড়বে যে, আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বাংলাদেশের জনগণের সাফল্য দেখতে যুক্তরাষ্ট্র সদা উদ্গ্রীব।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সাম্প্রতিক সব চালের কোনোটাই বিশ্বজুড়ে এমন ইঙ্গিত দেয় না যে অন্য দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হচ্ছে ওয়াশিংটন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে বিশ্বের একনায়কতান্ত্রিক দেশগুলোর সবচেয়ে বড় মিত্র হচ্ছে ওয়াশিংটন। ফলে ভিন দেশের গণতন্ত্র নিয়ে দেশটির হা-হুতাশও কুম্ভীরাশ্রুর বাইরে কিছু নয়। বরং আমরা ধরে নিতে পারি যে, নিজস্ব লাভক্ষতির হিসাব-নিকাশ থেকেই সেই অবস্থান গ্রহণ, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নয়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি লন্ডন আর টোকিওকে টেনে আনাও ছলচাতুরী ছাড়া কিছু নয়। আমরা জানি, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে লন্ডন কিংবা টোকিও ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে—তা ইরাকে লক্ষাধিক নিরীহ মানুষের নিধন বলুন কিংবা ড্রোন হামলা চালিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মতো অমানবিক আচরণই বলুন। অর্থাৎ প্রচুর কথার হেরফের করার মতো সৎ সাহস কিংবা নিরপেক্ষ আচরণ কখনোই তারা দেখাতে পারেনি এবং বাংলাদেশের বেলায়ও যে ব্যতিক্রমী কিছু হবে, তা মনে করারও কোনো কারণ নেই। তার পরও বলতে হয়, টোকিওর অবস্থান এ ক্ষেত্রে অনেকটাই নীরব দর্শকের মতো। বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূতের দুঃখ প্রকাশ করে দেওয়া বিবৃতির বাইরে অন্য কোনো প্রতিক্রিয়া টোকিও দেখায়নি। ফলে এটাকেও ঠিক ঝড় বয়ে যাওয়া হিসেবে গণ্য করা যুক্তিসংগত হয় কি? বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন বিতর্কিত হওয়ার পরও বলতে হয়, নির্বাচন ঘিরে দেখা দেওয়া বিতর্ক আর মতভেদের আলোকে সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ এখানে হচ্ছে সংবাদমাধ্যম। রেফারি যখন একটি দলের পক্ষ হয়ে বাঁশি বাজাতে শুরু করেন, সেই খেলার ফলাফল কী দাঁড়াতে পারে, তা তো সহজেই অনুমানযোগ্য। ফলে এক দলের জয় এবং অন্য দলের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সেই খেলা শেষ হলেও সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ সেখানে, যিনি হচ্ছেন রেফারি নিজে, সেই সত্য তো সবারই জানা।

‘ডিসেম্বর অন যশোর রোড’

যশোর রোড পেছনে ফেলে নাভারন মোড় হয়ে সাতক্ষীরা-যশোর আঞ্চলিক সড়কে ঢুকতেই চালক ইব্রাহিম আলীর মুঠোফোন বেজে ওঠে। কার সঙ্গে কী আলাপ করলেন, বোঝা গেল না। কিন্তু সাফ জানিয়ে দিলেন, আর যাওয়া যাবে না। গত ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় যশোরে পৌঁছে সেখানেই রাত কাটাই। ১৬ ডিসেম্বর সকালে সাতক্ষীরায় যাওয়ার উদ্দেশে বেরিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হলো। হরতাল-অবরোধ কিছুই নেই; তবু গণপরিবহন চলাচল করছে না। কাজেই ভাড়ায় প্রাইভেট কারই ভরসা। যত দূর যেতে পারবেন, সেখানেই নেমে যাব—এ শর্তে রাজি হলেন ইব্রাহিম আলী। ইব্রাহিমের গাড়ি ছেড়ে সাতক্ষীরায় পৌঁছার উপায় খুঁজছি যখন, তখনই ঢাকা থেকে এক বন্ধুর ফোন পাই। সে জানতে চাইল, দলে দলে মানুষ নাকি দেশ ছেড়ে যাচ্ছে? বন্ধুকে আশ্বস্ত করি, এমন কিছু ঘটেনি। বন্ধুর ফোন আমাকে মনে করিয়ে দেয় এলেন গিন্সবার্গের কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। ১৬ ডিসেম্বর কোনোরকমে সাতক্ষীরা শহরে পৌঁছলেও শহরের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় করা গেল না। সহকর্মী কল্যাণ ব্যানার্জি বললেন, ‘যেসব গ্রামে আপনি যেতে চান, সেগুলো সাংবাদিকদের জন্য পুরোই অনিরাপদ এখন। তা ছাড়া যে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে চান, তাঁদের গ্রামে পাওয়া যাবে না। অপেক্ষা করেন, সন্ধ্যায় বের হব। সাতক্ষীরা শহরেই আছে গ্রাম থেকে বিতাড়িত অনেক মানুষ।
আপাতত আমরা যৌথ বাহিনীর অভিযানের খবর সংগ্রহ করি।’ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের উদ্দেশে বেরিয়ে জানতে পারি, ১৬ ডিসেম্বর সরকারি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কোনো আয়োজন হয়নি। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সাংবাদিকেরা স্পষ্টতই জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করলেন। তাঁদের মতে, ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপিও যুক্ত হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে। সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে এক দিনের জন্যও মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে গ্রামের বাড়ি কুলিয়ায় যেতে পারেননি তিনি। গেলে কী হবে—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, হয়তো কিছুই হবে না। তবে ১৮-দলীয় জোটের অবরোধ-হরতালে একজন সাংবাদিককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হামলার শিকার হয়েছেন ১২ জন সাংবাদিক ও দুজন সংবাদপত্রসেবী। সাংবাদিকদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় উৎকণ্ঠিত হয়ে প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে জেলার সাংবাদিকদের সবাইকে সাবধানে চলতে, বিশেষ করে রাতে একা না চলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। প্রেসক্লাব থেকে বেরিয়ে শহরেই কথা হলো গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা একজন পল্লিচিকিৎসকের সঙ্গে। বহু বছর ধরে দল-মত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এলাকার মানুষকে সেবা করে আসছেন যে মানুষটি, তাঁর বিশ্বাস ছিল, আর যা-ই হোক, আক্রান্ত হবেন না তিনি। তাঁর বিশ্বাস ভঙ্গ হলো ১২ ডিসেম্বর রাতে।
জামায়াতের নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের খবর প্রচার হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর দিবাগত রাত দেড়টায় হামলা হলো তাঁর বাড়িতে। তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলেন। বাড়িঘরে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হলো। পরিবার-পরিজন নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে এলেন সাতক্ষীরা শহরে। সেই থেকে শহরেই আছেন। বিজয় দিবসের ওই রাত আমার কেটেছে ঘোরে। পরের দুই দিন সাতক্ষীরার দেবহাটা ও কালীগঞ্জ উপজেলায় যাওয়ার চেষ্টা করে অবরোধের কারণে ব্যর্থ হই। পরে দেবহাটায় যাওয়ার উপায় বাতলে দিলেন মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ ঘোষ। কিন্তু নিজে গেলেন না। তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে চাইলে শহরের একটি আবাসিক হোটেলে দেখা করতে বলেন। ওই হোটেলের অভ্যর্থনাকক্ষে দীর্ঘ আলাপচারিতায় বারবার আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘একাত্তরে যুদ্ধের ময়দানে মরে গেলাম না কেন? তাহলে শহীদের মর্যাদা পেতাম।’ দেবহাটা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সভাপতি সুভাষ ঘোষ। একসময় আওয়ামী লীগ করতেন। দলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানান। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সঙ্গেও আগের মতো নিবিড়ভাবে যুক্ত নন তিনি। মাছের ঘেরে মাছ চাষ এবং গাজীরহাটের মাছের আড়ত নিয়ে ব্যস্ত দিন কাটছিল তাঁর। আড়ত বন্ধ। ঘেরে মাছ আছে, কিন্তু ধরতে পারছেন না। উড়ো খবর, তাঁদের ঘের লুট করা হবে। অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান সুভাষ।
ব্যবসা-বাণিজ্য করে আয়-উন্নতি কিছুটা বাড়িয়েছেন। ১৯৯১ সালে পুরোনো বাড়ি ভেঙে তৈরি করেছেন সুরম্য একটি দোতলা বাড়ি। ওই বাড়িতে তাঁরা পাঁচ ভাই পরিবারের ২১ জন সদস্যকে নিয়ে বাস করতেন। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের পরের দিন ১৩ ডিসেম্বর সকালে চোখের সামনে বাড়িটি পুড়ে যেতে দেখলেন সুভাষ। গানপাউডার ছড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় হামলাকারীরা। বাড়ি ছেড়ে আসার সময় পরিধানের বস্ত্রটি ছাড়া তাঁদের আর কিছুই ছিল না। সুভাষ ঘোষ বলেন, ‘কবে যে গ্রামে যেতে পারব, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আদৌ যাব কি না, তা-ও জানি না। যে বাড়ি থেকে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে এসেছি, সেই বাড়িতে যাই কী করে?’ সুভাষ আরও বলেন, জামায়াত-বিএনপি এটা করতেই পারে। কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য দায় নিতে হবে সরকারি দলের মন্ত্রী, সাংসদ ও নেতাদের। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট, হিন্দুরা দেশে থাকলে আওয়ামী লীগের জন্য ভোট। আর দেশ ছেড়ে গেলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত—সবার জন্যই জমি। তাঁদের গ্রামের তিনটি পরিবার এরই মধ্যে দেশ ছেড়ে চলে গেছে—এ তথ্য জানিয়ে সুভাষ বলেন, ‘জানি না, আমার নিয়তি কী হবে? যুদ্ধ করে যে দেশটা স্বাধীন করেছিলাম, সেই দেশ ছেড়ে পালাতে হবে?’ একটু অবস্থাপন্ন হিন্দুরা হয়তো পালিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে আবাস গড়তে পারবে, কিন্তু নির্বাচনের দিন সহিংসতার শিকার হওয়া যশোরের অভয়নগরের চাঁপাতলার মালোপাড়ার নিম্নবর্গীয় মানুষগুলো কোথায় যাবে? ফলে, নিত্য অপমান, নিরাপত্তাহীনতা আর অধিকারহীনতার মধ্যে টিকে থাকার কায়দা রপ্ত করে নিতে হবে তাদের।
রাজীব নূর: সাংবাদিক।

এবারের লড়াই ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির মধ্যে

নয়াদিল্লিতে গতকাল কংগ্রেসের অধিবেশনে বিশাল ফুলের
মালা দিয়ে স্বাগত জানানো হয় (বাঁ থেকে) দলীয়
প্রধান সোনিয়া, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন ও দলের
সহসভাপতি রাহুলকে । এএফপি
ভারতীয় সংসদের আগামী নির্বাচনের ‘রণনীতি’ কংগ্রেস ঠিক করে দিল। গতকাল শুক্রবার দলের সম্মেলনে তারা ঘোষণা করল, এবারের লড়াইটা হবে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সঙ্গে সাম্প্রদায়িক ও বিভেদকামী শক্তির। এবং সেই লড়াইয়ে ভারতবর্ষের চিরকালীন মূল্যবোধ ও ভাবধারারই জয় হবে। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং আসন্ন নির্বাচনে দলীয় প্রচারের প্রধান মুখ রাহুল গান্ধী—প্রত্যেকেই এ কথা জোরের সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা কংগ্রেসমুক্ত ভারত দেখতে চাইছে, তাদের আশাহত হতে হবে। দেশ থেকে কংগ্রেসকে কেউ মুছে দিতে পারেনি, পারবেও না।
কংগ্রেসের এক দিনের অধিবেশন ডাকা হয়েছিল দলের রণনীতি ঠিক করতে। কিন্তু আগ্রহ ছিল রাহুলকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করা হয় কি না, তা নিয়ে। বৃহস্পতিবার দলের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সেই বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যায়। সোনিয়া স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, কংগ্রেস কখনো আগাম প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করে নির্বাচনে যায়নি। অতএব এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না। আগের রাতে এই ঘোষণার ফলে শুক্রবারের সম্মেলন নিয়ে আগ্রহ অনেকটাই কমে যায়। তবু সকালবেলায় অধিবেশন শুরু হওয়া মাত্র বারবার রাহুলের নামে স্লোগান উঠতে থাকায় সোনিয়া গান্ধী তাঁর ভাষণে আরও একবার জানিয়ে দেন, আগের দিন যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা-ই চূড়ান্ত। কেন তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হলো না, রাহুল নিজেও তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী স্থির করেন নির্বাচিত সাংসদেরা। সংবিধানেই সে কথা লেখা আছে। সাংসদদের সেই অধিকারের অমর্যাদা করা যায় না। রাহুলের এদিনের ভাষণ ছিল খুবই আক্রমণাত্মক এবং বলিষ্ঠ। পাশাপাশি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও সম্মেলনকে তিনি সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘রান্নার গ্যাসের নয়টি সিলিন্ডারে বছর চলছে না। ওটা বাড়িয়ে আপনাকে ১২টা করতেই হবে।’ আগামী তিন মাসে সরকার ও দলের রোডম্যাপ ঠিক করে রাহুল বলেন, দুর্নীতি দূর করতে চূড়ান্ত যে বিলগুলো সংসদে পাস হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, সেগুলো আগামী অধিবেশনে পাস করানো হবে, মূল্যবৃদ্ধি রোধে কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলোতে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নারীর ক্ষমতায়নে সর্বত্র ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের চেষ্টা করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী পছন্দের ক্ষেত্রেও ৫০ শতাংশ নারী প্রাধান্য পাবে।
দলে কীভাবে তিনি এগোতে চাইছেন, তা স্পষ্ট করে রাহুল বলেন, দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনে এই প্রথম সার্বিক নির্বাচন হয়েছে। নেতাদের ভোটে জিততে হয়েছে। আম আদমি পার্টির ধাঁচে ‘ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি’ (প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র) তিনিও যে করতে চাইছেন, তার প্রমাণ রেখে রাহুল জানান, লোকসভায় ১৫টি আসনে সরাসরি প্রার্থী বাছাই করা হবে। ১০ বছরের শাসনে দেশের ১৪ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যরেখার ওপরে তোলার কথা বলে রাহুল জানান, এবারে লক্ষ্য দেশের ৭০ কোটি মানুষ, যাঁরা গরিবি রেখার ওপরে অথচ মধ্যবিত্তের নিচে। তাঁদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মাথার ওপর ছাদের বন্দোবস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সোনিয়া তাঁর ভাষণে ধর্মনিরপেক্ষ বনাম সাম্প্রদায়িক শক্তির লড়াইয়ের কথা জানিয়ে যে পর্দায় সুর বেঁধে দেন, সেই উচ্চগ্রামেই নরেন্দ্র মোদির নাম না করে রাহুল বলেন, ‘গণতন্ত্র কখনো কোনো একজনের শাসন হতে পারে না।’ কিছুটা ঠাট্টার ঢঙে তিনি বলেন, ‘ওদের প্যাকেজিং খুব ভালো। ওরা টেকো মানুষদের চিরুনি বিক্রি করে। এখন আবার তাদের জন্য সেলুন খুলতে চাইছে।’ ১০ বছরের সাফল্যের খতিয়ান দেখিয়ে সারা দেশের কংগ্রেসের নেতাদের রাহুল বলেন, ‘হীনম্মন্যতা নয়, নিজেদের সাফল্যকে তুলে ধরে মানুষের কাছে যেতে হবে। জিতব আমরাই।’

নজরদারি নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা ঘোষণা করছেন ওবামা

বারাক ওবামা
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) নজরদারি নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা ঘোষণা করতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন তিনি। এনএসএর সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন মার্কিন নজরদারির খবর ফাঁস করলে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর জনগণের আস্থা মারাত্মক ধাক্কা খায়। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠা ছাড়াও দেশের অভ্যন্তরে জনগণের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে।
মূলত এই অভিযোগ আমলে নিয়ে ওবামা প্রশাসন জনগণের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। গতকাল শুক্রবারই প্রেসিডেন্ট ওবামার নজরদারি নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা ঘোষণা করার কথা ছিল। তাঁর ওই ঘোষণায় গোপন আদালতে জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য পাবলিক অ্যাডভোকেট পদ সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ থাকতে পারে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গোপন আদালতের অনুমোদন নিয়ে নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এর আগে গত ডিসেম্বরে পাঁচ সদস্যের পর্যালোচনা প্যানেল নজরদারি কার্যক্রম ফাঁস ও স্নোডেনের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেয় প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছে। ওই প্রতিবেদনে ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভেল্যান্স কোর্টের (এফআইএসসি) জন্য পাবলিক অ্যাডভোকেট পদ সৃষ্টিসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। ওবামা তাঁর ঘোষণায় এই পদের পাশাপাশি বিদেশিদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আরও সুরক্ষিত করতে প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করতে পারেন। ওবামার ওই বক্তব্যের আগে এ বিষয়ে সতর্ক মন্তব্য করছে নাগরিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা নিশ্চিত করতে আন্দোলন করা সংগঠনগুলো। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জে কার্নি গত বৃহস্পতিবার জানান, নজরদারি কার্যক্রমকে আরও জবাবদিহিমূলক করতে জনগণের আস্থা ফেরানোর মতো নীতি ঘোষণা করবেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বিবিসি ও এএফপি।

ভারতের মন্ত্রী শশী থারুর স্ত্রী সুনন্দার লাশ উদ্ধার

ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শশী থারুরের স্ত্রী সুনন্দা পুশকারের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানী নয়াদিল্লির একটি হোটেল থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। মন্ত্রীর পারিবারিক কলহের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ৫২ বছর বয়সী সুনন্দা আত্মহত্যা করতে পারেন বলে পুলিশের ধারণা। কয়েক দিন ধরে পাকিস্তানি নারী সাংবাদিক মেহর তারার সঙ্গে টুইটারে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন সুনন্দা। মেহর পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের এজেন্ট এবং তাঁর স্বামীকে ফুসলানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে মেহর বলেন, শশী থারুর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। সুনন্দার মৃত্যুর পর এক টুইটে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। এর আগে সুনন্দাকে ইঙ্গিত করে এক টুইটার বার্তায় মেহর বলেন, ‘সোনালি চুলো ওই নারীর মস্তিষ্ক তাঁর ব্যাকরণজ্ঞান ও বানানের চেয়েও দুর্বল।
গতকাল দিল্লিতে কংগ্রেসের সভায় ব্যস্ত সময় কাটিয়ে সন্ধ্যায় কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে লীলা প্যালেস হোটেলে স্ত্রীর কাছে যান শশী থারুর। কিন্তু হোটেলে কক্ষটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল। এ সময় সহযোগিতা চাইলে হোটেলের কর্মীরা তালা খোলেন এবং সেখানে সুনন্দার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। ২০১০ সালে দুবাইভিত্তিক ব্যবসায়ী সুনন্দার সঙ্গে বিয়ে হয় শশী থারুর। এটা দুজনেরই তৃতীয় বিয়ে। সুনন্দা দাবি করেছিলেন, তাঁর স্বামী শশীকে মেহরের পাঠানো একটি বার্তায় লেখা ছিল, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, শশী থারুর। তোমার সঙ্গে যখন প্রেম করি, তখন নিজেকে সামলাতে পারি না। আমার ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। মনে রেখো, মেহর সব সময়ই তোমার।’ সুনন্দার দাবি, গত বছরের এপ্রিল থেকে এই ‘আহাম্মক পাকিস্তানি সাংবাদিক শশীর পেছনে লেগে আছেন’। টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিবিসি।