Monday, December 28, 2015

নতুন বছরে মাঠ কি গরম হচ্ছে?

তখন মনে হয়েছিল বিএনপির নেতারা এটা কী বললেন? নির্বাচন যে সুষ্ঠু হবে না, তা প্রমাণের জন্যই বিএনপি পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেবে—কোনো বড় দলের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মূল লক্ষ্য এমন হতে পারে? এখন দেখা যাচ্ছে বিএনপি সেই পথেই হাঁটছে এবং নির্বাচন কমিশনও যেন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পৌর নির্বাচনকে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্নের ওপর দাঁড় করানোর দিকে। বিএনপি নেতারা এ কথা বলেছিলেন পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার সময়ে। এরপর থেকে বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপির সব পর্যায়ের নেতার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, তাঁরা নির্বাচনে জয়লাভের চেয়ে নির্বাচনটি যে সুষ্ঠু হবে না, সেদিকেই বেশি জোর দিচ্ছেন। এর অর্থ হলো নির্বাচনের আগেই বিএনপি জেনে গেছে নির্বাচনটি কোনোভাবেই সুষ্ঠু হবে না। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, বিএনপি পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে কেন? পৌরসভা নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ওপর ক্ষমতার রদবদল নির্ভর করে না। কিন্তু এই নির্বাচনের অব্যবস্থাকে পুঁজি করে জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতির মাঠ গরম করার সূচনা করা যেতে পারে। বিএনপি তাদের এই আকাঙ্ক্ষার কথা এখন প্রকাশ্যেই ব্যক্ত করছে। সুতরাং আমরা অনুমান করতে পারি, গতবারের মতো এবারও বছরের শুরুতেই জাতীয় রাজনীতির মাঠ গরম করতে চাইছে বিএনপি। পৌরসভা নির্বাচন ৩০ ডিসেম্বর। এরপরই শুরু হচ্ছে নতুন বছর। জানুয়ারি হলো পৌষের শেষ আর মাঘের শুরুর মাস। মাঘের শীতে বাঘ কতটা কাঁপে তা জানা না গেলেও মানুষ যে কাঁপে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন দেখার বিষয় হলো, মানুষের হাড়কাঁপানো শীতের এই মাসে বিএনপি কতটা উত্তাপ ধরে রাখতে পারে।
আগুন পোহানোর জন্য খড়কুটোর কিছুটা জোগান হয়তো দিয়ে বসতে পারে স্বয়ং নির্বাচন কমিশনই। কিন্তু কথা হলো বিএনপি নিজ উৎস থেকে কতটা জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করছে উত্তাপ ছড়িয়ে দেওয়ার মাত্রা। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো যে পেট্রল উন্নত মানের জ্বালানি হওয়া সত্ত্বেও গত বছরের ব্যর্থ-অভিজ্ঞতার পর এবার এই জ্বালানিটি সম্ভবত ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না। পৌরসভা নির্বাচনের গরম হাওয়াকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে বড় দুর্বলতা বোধকরি বিএনপির দিশাহীনতা। আসলে বিএনপি ঠিক কী লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্দোলন করতে চায় তা স্পষ্ট নয়। অবশ্য মোটা দাগে একটা লক্ষ্য তাদের আছে। সেটা হলো ক্ষমতায় যাওয়া। কিন্তু কীভাবে, এ প্রশ্নেই রয়েছে অস্পষ্টতা। তারা একবার বলছে সরকার পতনের আন্দোলন করবে, আর একবার বলছে নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকারের পতন ঘটাবে। আবার সে নির্বাচন মধ্যবর্তী নির্বাচন কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। তত্ত্বাবধায়ক না নির্দলীয়-নিরপেক্ষ—এ প্রশ্নের মীমাংসাও তারা করতে পারেনি। তাদের তরফ থেকে তুলে ধরা হয়নি সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখাও। বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজ কদিন আগে বললেন, তাঁদের আন্দোলন শুরু হবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। এ বক্তব্যের মধ্যেও আছে ধোঁয়াশা। তিনি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের অপসারণের কথা বলছেন, নাকি কমিশনের সংস্কার দাবি করছেন, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কমিশনের ত্রুটিগুলো দূর করে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন অবশ্যই সময়ের দাবি। তবে এ দাবি যৌক্তিক করে তুলতে হলে সুস্পষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে। আমরা বিএনপির কর্মকাণ্ডে এ ধরনের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। তাদের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এসব প্রশ্নে রয়েছে চরম বিভ্রান্ত। এই বিভ্রান্তি নিয়ে কতটা পথ হাঁটা যাবে, তা বিএনপিকে ভেবে দেখতে হবে। পৌরসভা নির্বাচনে যদি ব্যাপক অনিয়ম হয়, তাহলে এই অনিয়মকে কেন্দ্র করে পরাজিত প্রার্থী এবং তঁাদের সমর্থকদের ক্ষোভ নিচ থেকে কতটা ওপরমুখী হবে তা কিন্তু পরীক্ষিত নয়। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় এ দেশের বড় দলগুলোর সব সিদ্ধান্তই হয় শীর্ষ থেকে নিম্নমুখী। তৃণমূলের কমিটিতে কারা থাকবেন,
নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন কে, তা এ দেশে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়। আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ যেকোনো আন্দোলন কেন্দ্র বা রাজধানীতে গড়ে না উঠলে তা নিচের পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে না। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে বিএনপির রয়েছে বেশ দুর্বলতা। তারা ঢাকায় নেতা-কর্মীদের ব্যাপক হারে মাঠে নামাতে পারেনি। সম্ভবত এই দুর্বলতা ঢাকতেই বিএনপি নিজের শক্তির ওপর নির্ভর না করে হেফাজতের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ফল যা ঘটার তা–ই ঘটেছে। পুলিশের তাড়া খেয়ে হেফাজতের কর্মীরা সরে পড়তেই ঢাকার রাজপথ ফাঁকা হয়ে যায়। একই ধারাবাহিকতায় এবার বিজয় দিবসেও বিএনপির অনেক নেতাকে তঁাদের দলীয় শোভাযাত্রায় শামিল হতে দেখা যায়নি। পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপিতে কোটিপতির সংখ্যা অনেক বেশি। এসব ব্যবসায়ী কোটিপতি নেতারা তাঁদের সম্পদ রক্ষার চেয়ে আন্দোলনের পথকে শ্রেয় ভাববেন, এমন মনে করার কারণ নেই। এ ছাড়া রয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী। দলের মনোনয়নবঞ্চিত এসব নেতা চটজলদি দলের পক্ষে মাঠে না-ও নামতে পারেন। এটা ঠিক, মাঠপর্যায়ে বিএনপির একটা বড় সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। কিন্তু কেবল সমর্থক দিয়ে যে আন্দোলন হয় না, বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি নিশ্চয়ই তা বুঝতে পেরেছে। শরিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াত ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামে অন্য দলগুলোর তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। মাঠের আন্দোলনে বিএনপি বহুল অংশেই জামায়াত-শিবিরের ওপর নির্ভরশীল। সরকার পতনের আন্দোলনের চেয়ে যেকোনো মূল্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া বন্ধ করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাই বর্তমানে জামাতের এক নম্বর এজেন্ডা। কিন্তু এ প্রশ্নে বিএনপির দোদুল্যমান অবস্থান জামায়াতকে যথেষ্ট পরিমাণেই নাখোশ করে। সম্ভবত এ কারণেই পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২০-দলীয় জোট সভায় জামায়াত অনুপস্থিত ছিল। অনেকেই মনে করেন ভোটব্যাংক ও আন্দোলন—এই দুই ব্যাপারেই বিএনপির কাছে জামায়াতের কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া বিএনপিপন্থীদের সিংহভাগের মাথায় এখনো রয়েছে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ। কাজেই যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নে বিএনপির এখন আর দ্বিমুখী অবস্থানের সুযোগ নেই। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর খালেদা জিয়া কর্তৃক বিস্ময়করভাবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন মূলত এই ভাবনারই ফল। ২২ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া কেবল শহীদদের সংখ্যা নিয়ে অসম্মানজনক উক্তিই করেননি, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যেন যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান, সে দাবি জানিয়েছেন।
অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই বক্তব্য যে মূলত জামায়াতকে খুশি করার জন্য, সে ব্যাপারে আর সন্দেহ থাকছে না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে বিএনপি তাদের এত দিনের দোদুল্যমান অবস্থানেরও ইতি টানল বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম ইদানীং বারবার বলছেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলবে। সহিংস আন্দোলন যে দলের জন্য ভালো কোনো ফল বয়ে আনেনি, সম্ভবত এটা মাথায় রেখেই মির্জা ফখরুল এ কথা বলেছেন। কিন্তু শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জন্য যে প্রজ্ঞা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়, তা জামায়াতনির্ভর বিএনপির আছে কি না, বিএনপিকে ভেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নে খালেদা জিয়া তথা বিএনপির বর্তমান সুস্পষ্ট অবস্থানের পর জামায়াত-শিবির যে নতুন উদ্যমে সহিংস হয়ে উঠবে না, এর নিশ্চয়তা কোথায়। পৌরসভা নির্বাচনের ‘অব্যবস্থা’কে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে তোলা না গেলেও বিএনপি তার সংগঠনকে নড়বড়ে অবস্থান থেকে শক্ত অবস্থানে আনার একটা সুযোগ হয়তো সৃষ্টি করতে পারত। কিন্তু তারা যে পথে হাঁটছে তাতে মনে হয় না ওই সুযোগকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে তাদের আগ্রহ আছে। মোটকথা, লেখকের প্রশ্নে এককেন্দ্রিক কোনো অবস্থানে তাদের এখনো দেখা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় নেতারাও নির্বাচনী মাঠে নেই। সাধারণের আকাঙ্ক্ষাকে তারা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেনি। এ অবস্থায় তারা বরং মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের ‘সংখ্যাতত্ত্ব’ নিয়ে নতুনরূপে হাজির হলো। নতুন এই তত্ত্বের উদ্দেশ্য কী এবং এতে শীতের এই মাঠ কি সত্যি সত্যি গরম হবে, নাকি আরও বেশি কুয়াশাচ্ছন্ন হবে, তা জানার জন্য আমাদের হয়তো আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে।
মলয় ভৌমিক: অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নাট্যকার।

রংপুরে সাংবাদিক হত্যা

রংপুরে গত বৃহস্পতিবার মসিউর রহমান ওরফে উৎস নামের এক সাংবাদিককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। পেশাগত কারণে তিনি খুন হয়ে থাকতে পারেন বলে পুলিশ ও সহকর্মীদের ধারণা। স্থানীয় সাংবাদিকেরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানালেও এখন পর্যন্ত এর কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। মসিউর রহমান রংপুরের স্থানীয় পত্রিকা যুগের আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন। তিনি উৎস রহমান নামে লিখতেন। সম্প্রতি তিনি মাদক-সংক্রান্ত কয়েকটি প্রতিবেদন করেছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা জানিয়েছেন, এরপর থেকে দুশ্চিন্তায় ছিলেন মসিউর। খুন হওয়ার দিনও যুগের আলো পত্রিকায় মাদক নিয়ে তাঁর লেখা একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মসিউর রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয় মহাসড়কের পাশে একটি গাছে রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায়। পুলিশ বলছে, হাতুড়ি বা এ-জাতীয় ভারী বস্তু দিয়ে পিটিয়ে মসিউরকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিও নৃশংসভাবে খুন হন।
অথচ আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডগুলোর সুরাহা আজ অবধি হয়নি। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) প্রতিবেদন মতে, চলতি বছরে বাংলাদেশে অন্তত পাঁচজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের অপরাধ চক্র, অপরাজনৈতিক শক্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের দুর্বৃত্তদের চক্ষুশূল হতে হয়। এ কারণে তাঁদের আইনের সুরক্ষা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু বিচারহীনতার সংস্কৃতি সাংবাদিকদের জীবন ও পেশাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। যখন একের পর এক সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না, তখন কেবল ব্যক্তি সাংবাদিক নন, তাঁর পেশাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। রংপুরের সাংবাদিকদের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দাবি করি, সাংবাদিক মসিউর রহমানের হত্যাকারীদের ধরতে পুলিশ সম্ভব সবকিছু করবে। এই মামলায় কোনো গাফিলতি যাতে না হয়, তার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও সজাগ থাকতে হবে।

দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতেই হবে by মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসু বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। এই বিশ্বখ্যাত বাঙালি অর্থনীতিবিদ বরাবরই আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব, তাঁর গবেষণাগ্রন্থ এবং প্রবন্ধগুলোতে উন্নয়ন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান প্রতিফলিত। এবারের সফরের সময় পত্রপত্রিকায় তাঁর প্রকাশিত বক্তব্যগুলোও তাই মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছি। ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। আমার কলামে সাক্ষাৎকারে প্রদত্ত তাঁর বক্তব্য এবং অব্যক্ত মতামত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, যার মধ্যে ভালোবাসার ছোঁয়া থাকলেও অতিশয়োক্তি নেই। কিন্তু একজন সফরকারী মেহমান কঠোর সত্য উচ্চারণ করলে তা মেজবানের জন্য বিব্রতকর হবে বলে তিনি বেশ কিছু কথা নরম সুরে বলেছেন। ওই বক্তব্যগুলোর আসল তাৎপর্য যদি অনুধাবন করতে ভুল করি, তাহলে তাঁর পথনির্দেশনামূলক মন্তব্যের আলোকে উন্নয়নকৌশল গ্রহণের কাজটা করতে আমরা ব্যর্থ হব।
বাংলাদেশের এবারের (মানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের) জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন কৌশিক বসু পুনরুল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। অধ্যাপক বসু বাংলাদেশের ১২ বছর ধরে এই ধারাবাহিক ৬ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনকে বিশ্বের গুটিকয় সফল উন্নয়নশীল দেশের বিরল সাফল্যের নজির বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। জাতি হিসেবে আমাদের এ জন্য গর্ববোধ করা উচিত। তাঁর ইতিবাচক ও প্রশংসামূলক মন্তব্য আমাদের উজ্জীবিত করবে। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে অবকাঠামোর ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা গেলে এবং ‘আমলাতন্ত্র কমালে’ বা ‘আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে’ বাংলাদেশের জিডিপি, জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে পৌঁছে যাবে। এখানেই তিনি কিছুটা আড়াল রেখে একটু ঘুরিয়ে যে কঠিন কথাটা বলতে চেয়েছেন, পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে এই কলামে তা সরাসরি বলছি আমি। এর মাধ্যমে তিনি দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানোর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের ইস্যুতে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক নিজেদের ঋণপ্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছে, এটা সবার জানা। বিষয়টি এখনো কানাডার একটি আদালতের মামলায় বিচারাধীন। তাই বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেক বেশি সাবধানতা অবলম্বন করাই স্বাভাবিক। ওই দুর্নীতির অভিযোগের সত্যাসত্য সম্পর্কে কিছু বলেননি তিনি। প্রসঙ্গটি পাশ কাটানোর জন্য তিনি বললেন, ওটা ছিল খারাপ ইতিহাস। কিন্তু ওই খারাপ ইতিহাস থেকে একটা খুব ভালো ফল বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ সাহস করে যে নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার অকৃপণ প্রশংসা করেছেন। এ ধরনের সাহসী অবস্থান গ্রহণ সাত–আট বছর আগে বাংলাদেশের জন্য অচিন্তনীয় ছিল, কিন্তু যখন বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, তখন এই সাহস মানায় বৈকি! কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না করে কী সুন্দর জবাব!
কিন্তু তাঁর মতো একজন মেধাবী অর্থনীতিবিদের তো বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে দুর্নীতির ইস্যু কোনোমতেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সে জন্যই বেশ কয়েকবার তাঁর সাক্ষাৎকারে ঘুরেফিরে দুর্নীতির প্রসঙ্গটি এসেছে। কারণ, বিবেকের দ্বারা পরিচালিত হয়ে কোনো উন্নয়ন–চিন্তাবিদ যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন-অনুন্নয়ন নিয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তাহলে তাঁকে বলতেই হবে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে ‘টেক অফ’ (উড্ডয়নের সূচনা বা উড্ডয়ন সম্ভাবনা) সারা বিশ্ব পর্যবেক্ষণ করছে, তাকে টেকসই করতে হলে বা স্থায়িত্ব দিতে হলে উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের লাগাম টেনে ধরতে হবে। কারণ, প্রতিবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ হারিয়ে যাচ্ছে এই দুর্বৃত্তদের বেলাগাম অপকর্মের শিকার হয়ে এবং ক্ষমতাসীনদের মার্জিন আহরণের অপরাজনীতির কারণে। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, তাঁকে কেনা যায় না। আমরা তাঁকে বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু দুর্নীতি দমনে তাঁর সরকারের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে এই একটি ব্যাপারে তাঁর সরকারের সঙ্গে তাঁর পূর্বসূরি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের তেমন গুণগত পার্থক্য তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সাংসদ, বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী এবং সর্বোপরি ‘হাওয়া ভবনের’ যুবরাজ ও তাঁর ইয়ার-দোস্তদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলোর অধিকাংশই শুরু করেছে ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের প্রবল ক্ষমতাধর দুর্নীতি দমন কমিশন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা-কর্মীও ওই সময় মামলার আসামি হয়েছিলেন, যদিও আওয়ামী লীগ ২০০১-০৬ মেয়াদে বিরোধী দলে থাকায় বোধগম্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা অনেক কম ছিল। বেশ কিছু রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী-শিল্পপতিও দুর্নীতির জালে ধরা খেয়েছিলেন জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুদকের দুর্নীতিবিরোধী অভূতপূর্ব প্রতিরোধযুদ্ধে। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য যে আইনগত ও পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে ওই সময়ে রুজু করা মামলাগুলোর কার্যক্রম পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে আইনগত ত্রুটি নতুন আইনের মাধ্যমে সংশোধন করে মামলাগুলো আবার শুরু করতে হয়েছে।
আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জারি করা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশকে তামাদি হয়ে বাতিল হতে দিয়ে এর পরিবর্তে যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন পাস হয়েছে, তাতে দুদককে অনেকটা ‘নখদন্তহীন ব্যাঘ্রে’ পরিণত করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন খোদ দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান। উপরন্তু অভিযোগ উঠেছে যে ক্ষমতাসীন জোটের নেতা-কর্মীদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়ে দুদক শুধু অতীতের সরকারের কর্তাব্যক্তিদের দুর্নীতি নিয়েই তদন্ত এবং মামলা চালানোয় বেশি আগ্রহ ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করছে।
বিরোধী মহলের এহেন যে অভিযোগ অহরহ শোনা যাচ্ছে সে ব্যাপারে দুদককে সাবধানতার সঙ্গে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেই হবে। কারণ, সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতাসীন মহলের দুর্নীতির অভিযোগগুলো বেশি গুরুত্ব পাওয়া স্বাভাবিক, এগুলো অপেক্ষাকৃত তরতাজা বলে। স্বীকার করে নিতে হবে, গত ছয় বছরে দুর্নীতি যে মোটেও কমেনি, সেটা সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের কল্যাণে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ওগুলো সবিস্তারে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুদক তো অভিযোগগুলোর বেশির ভাগই তদন্ত এবং মামলা পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে না। অতএব, দুদক যে দুর্নীতি উদ্ঘাটনে একপেশে অবস্থান নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে, তাতে ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি ও লুটপাটকে ছাইচাপা দেওয়া যাচ্ছে না। বরং এ ধরনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ দুদকের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অবশ্য এটাও বলতে হবে, বিএনপি-জামায়াত সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান যেভাবে দুর্নীতি মামলাগুলোর বিচার–প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করছেন, তাও সৎসাহসের পরিচায়ক নয়।
অন্যদিকে, এটা এখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বাধীনতা-উত্তর সত্তর ও আশির দশকের বহুল উচ্চারিত ‘দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র’ থেকে ইতিমধ্যে মুক্ত হয়ে ক্রমেই প্রবৃদ্ধির ‘ভার্চুয়াস সার্কেলে’ উত্তীর্ণ হয়ে উন্নয়নের পথে ধাবিত হয়েছে। খয়রাতনির্ভরতার গ্লানিকর অবস্থান পেছনে ফেলে উৎপাদন ও বাণিজ্যনির্ভর গতিশীল অর্থনীতি হিসেবে দেশের এই আশাপ্রদ অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার বিপদটাও কৌশিক বসুর মূল্যায়নে উঠে এসেছে। জঙ্গিবাদের ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য তাণ্ডবের মধ্যেই এই বিপদ নিহিত। তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও রুখে দাঁড়াতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর আশাবাদী উচ্চারণগুলো প্রমাণ করছে যে উন্নয়নের স্বর্ণ-সম্ভাবনা এখন বাংলাদেশকে আবাহন জানাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির এই ক্রমবর্ধমান জোয়ার অব্যাহত রাখতে পারলে বাংলাদেশ যে অতি দ্রুত মধ্যম আয়ের একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে, উন্নয়ন-চিন্তাবিদদের মধ্যে এই বিষয়ে মোটামুটি মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলা চলে।
কৌশিক বসুর প্রেসক্রিপশন, গণতন্ত্রই সবচেয়ে কার্যকর সরকারব্যবস্থা। যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক, গণতন্ত্রকেই এগিয়ে নিতে হবে। কিন্তু তাঁর যে অব্যক্ত কথাটা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই তা হলো, এই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যাত্রাপথে এক নম্বর বাধা দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের অব্যাহত ধারা। আমি বুঝি না প্রধানমন্ত্রী কেন এই দুর্নীতিবাজ ও পুঁজি লুটেরাদের বিরুদ্ধে এখনো সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন না। তাঁর এবং তাঁর দলের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের এটাই একমাত্র পথ। তাঁর সরকারের সাফল্যগুলোকে বরবাদ করার জন্য দুর্নীতিই হবে প্রতিপক্ষের হাতে সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়া ও তাঁর ছেলের মারাত্মক চালের ভুলে শেখ হাসিনা ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশশাসন চালিয়ে যাওয়ার যে স্বর্ণসুযোগ পেয়ে গেছেন, সে সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে একটা শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারলে জনগণ বিএনপি-জামায়াতের পাকিস্তান-পসন্দ নেতিবাচক রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা হাসিলের যে অপকৌশল বিএনপির রাজনীতির মূল ফোকাস রয়ে গেছে, আগামী তিন বছরে তাকে অকার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি উভয়ের বিরুদ্ধেই সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

শুধু সুন্নিদের নিয়ে জোট গঠন কেন? by রবার্ট ফিস্ক

সৌদি আরবের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক জোট গঠিত
সৌদিরা জোট করতে ভালোবাসে। ১৯৯১ সালে কুয়েত থেকে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে হটাতে তাঁরা মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি ও বিভিন্ন তেল আমদানিকারকদের পাশে পেয়েছিল। এ বছরই মাস কয়েক আগে সৌদি সামরিক বাহিনী তাদের রাজতন্ত্রের শত্রু শিয়া হুতিদের ইয়েমেনে গিয়ে আক্রমণ করেছে, সেটা করতেও তারা জোট করেছিল। সামরিক বাহিনীর জায়গায় বিশ্বের তরুণতম প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও উচ্চাভিলাষী সৌদি উপপ্রধানমন্ত্রী মোহামেদ বিন সালমান আল সৌদ পড়ুন। এই জোটে শুধু সৌদি যুদ্ধবিমানই ছিল না, কাতার, আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, মিসর, জর্ডান, মরক্কো ও সুদানও ছিল।
কিন্তু এখন নতুন হলিউডি নাটক মঞ্চস্থ করতে সৌদিরা বহুজাতিক সামরিক অভিযান শুরু করেছে, প্রতিপক্ষ হচ্ছে ইসলামি ‘সন্ত্রাসের অসুখ’। এই জোটে মুসলিম ও মুসলিম তকমা-প্রত্যাশী বেশ অনেকগুলো রাষ্ট্র রয়েছে, মহানবী (সা.)–এর সময়ের পর এতগুলো মুসলিম রাষ্ট্র আর কখনোই একত্র হতে পারেনি। ইয়েমেন অভিযানের মতো এবারও ৩১ বছর বয়সী যুবরাজ মোহামেদ দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ওদিকে সৌদি বিমান হামলায় ইয়েমেনে ইতিমধ্যে মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে অনেক বেসামরিক মানুষ মারা গেছে, বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে আমরা সে খবর পেয়েছি।
একদম গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে মোহামেদ ঘোষণা করেছেন, তাঁদের এই সর্বশেষ জোটের যুদ্ধ করতে হলে ‘খুবই শক্তিশালী পদক্ষেপ’ নিতে হবে। এই জোটের মধ্যে কারা আছে জানেন? রূপকথার মতো দেশ ‘ফিলিস্তিন’ থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত, লেবাননের মতো নখর দন্তহীন, চাদের মতো দেউলিয়া ও রিপাবলিক অব করোমোসের মতো দেশকে সৌদি আরব নিয়েছে শুধু এটা নিশ্চিত করার জন্য যে এই জোটে যথেষ্টসংখ্যক দেশ আছে। খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই এটা খেয়াল করেছে যে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া এই ৩৪টি দেশের শক্তিশালী জোটে নেই।
এটা খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার, কারণ ২০০২ সালে বালি হামলায় ২০২ জন বেসামরিক মানুষ মারা যাওয়ার পর ইন্দোনেশিয়ার ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ মধ্যে শত্রুর তালিকায় আল-কায়েদাও ঢুকে যায়। ইন্দোনেশিয়ায় ২০ কোটি সুন্নি মুসলমানের বসবাস, ফলে তারা নিজেদের সুন্নি মুসলমান ভাইদের সঙ্গে এই অভূতপূর্ব ‘জোটে’ যোগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক ছিল। অথবা এমনটা হতে পারে যে সৌদি আরবে ৩০ জন ইন্দোনেশীয় পরিচারিকাকে অন্যায্য বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে সৌদি আরবের জোটে যোগ দেওয়ার আগে তারা চায়, এই অবিচারের অবসান হোক।
তবে এই জোটে পাকিস্তানের যোগ দেওয়াটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এর আগে তাদের যখন ইয়েমেনের বিপর্যয়কর গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষে লড়াই করার জন্য বলা হয়েছিল, তখন ইসলামাবাদের সংসদ সৌদি আরবের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ, তখন সৌদি আরব পীড়াপীড়ি করেছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুন্নি মুসলমানরাই শুধু যুদ্ধে অংশ নিতে পারবে।
সার্বিকভাবে বেশ শক্তিশালী ‘জোট’ হয়েছে। এই দেশগুলোর অধিকাংশের ঘাড়েই বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা রয়েছে, তারা সব সময়ই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে আছে। ফলে এই অসাধারণ সামরিক জোট গঠনের পেছনের প্রকৃত বিবেচনা কিন্তু কত দেশ এই জোটে অংশ নিচ্ছে সেখানে নিহিত নয়, বরং সৌদি আরবকে এই ভ্রাতৃত্বসুলভ সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য দেশগুলো তাদের কাছ থেকে কত মিলিয়ন বা বিলিয়ন ডলার পাবে, তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে।
এখন একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবেই এসে যায়: এই তরুণ যুবরাজ ‘সন্ত্রাস রোগের’ কোন তরিকা ধ্বংস করতে চান? আইএস তরিকা? যদিও এই সংগঠনটি ওয়াহাবি সুন্নি বিশুদ্ধতাবাদী মতবাদের ভিত্তিতে একরকম আধ্যাত্মিকভাবেই গড়ে উঠেছে। নাকি নুসরা তরিকা, যেটা সেই কাতার থেকেই সৃষ্ট, যে কাতার এখন এই রহস্যময় ‘জোটের’ অন্তর্ভুক্ত? অথবা ইয়েমেনের শিয়া হুতি তরিকা, যাদের ইয়েমেনের সুন্নি প্রেসিডেন্ট ইরানপন্থী সন্ত্রাসী মনে করেন, যেই সুন্নি প্রেসিডেন্টকে আবার সৌদি আরব সমর্থন করে। আর সৌদি যুবরাজ ইরানের সঙ্গে আবার কোন ধরনের সম্পর্কের কথা চিন্তা করছেন, যেখানে ইরানিরা ইরাক ও সিরিয়ায় সেই একই আইএস ‘সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে লড়ছে, যাকে আমাদের প্রিয় সৌদি যুবরাজ ‘অসুখের’ অংশ বলে মনে করেন? শিয়া ইরান বা ইরাক—কেউই এই নতুন আন্তর্জাতিক মুসলিম সেনাবাহিনীর অংশ নয়, এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাহলে আমরা জানি যে একটি ‘জোট’ হয়েছে। কিন্তু সে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, আর সেখান থেকে কী ফল-ই বা পাওয়া যাবে? আর এটা কেন সুন্নি মুসলমানদের জোট, স্রেফ মুসলিম ‘জোট’ নয় কেন?
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

সিরিয়া বিষয়ে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ by আলী রীয়াজ

সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ার মাত্র শুরু,
অনেক পথ পেরোতে হবে
সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে শুক্রবার যে প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে, তাকে নিঃসন্দেহে সিরিয়া বিষয়ে এযাবৎকালের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করা যায়। এই প্রস্তাব গ্রহণের ফলে সিরিয়া সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের পথ সুগম হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রস্তাব পাস হওয়ার অর্থ হলো প্রস্তাবের প্রতি, অর্থাৎ এই প্রস্তাবে যে ধরনের রাজনৈতিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে তার প্রতি, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। ফলে এই শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। যদিও এই প্রস্তাব হচ্ছে এযাবৎকালের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ, এটিকে প্রথম পদক্ষেপ বললে ভুল হবে। আমার বিবেচনায় গত কয়েক মাসে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে এটি তৃতীয়।
চার বছরের বেশি সময় ধরে অব্যাহত গৃহযুদ্ধ সিরিয়াকে ক্ষতবিক্ষত করছে, কমপক্ষে আড়াই লাখ মানুষের প্রাণনাশ করেছে, তার ভয়াবহ পরিণতি কেবল দেশ হিসেবে সিরিয়াকেই বইতে হচ্ছে তা নয়, ইতিমধ্যে তার একটি আঞ্চলিক রূপ তৈরি হয়েছে। দেড় বছর ধরে এই অঞ্চলে আইএস বলে যে ভয়াবহ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি আমরা প্রত্যক্ষ করছি, যে সংগঠন ইরাক ও সিরিয়ার এক বড় এলাকাজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করে নিজেদের একটি রাষ্ট্র বলে দাবি করছে, তার উদ্ভবের কারণ সিরিয়ার যুদ্ধ নয়। কিন্তু আইএসের শক্তি বৃদ্ধি ও ভৌগোলিক পরিধি বিস্তারের পেছনে যে এই যুদ্ধের ভূমিকা রয়েছে, সে কথা অনস্বীকার্য। সিরিয়ায় ক্ষমতাসীন বাশার আল আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরতদের সাহায্য করার নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের গৃহীত পদক্ষেপ আইএসকে অনেকাংশেই শক্তিশালী করেছে। অভিযোগ করা হয়ে থাকে, পশ্চিমা দেশগুলো এবং তুরস্ক প্রত্যক্ষভাবে আইএসকে মদদ দিচ্ছে এবং তার উপস্থিতি থেকে সুবিধা লাভ করছে। এই বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ রাশিয়া এসে যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে। যদিও অংশগ্রহণের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে রাশিয়া বলেছে যে সে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হচ্ছে। কিন্তু এ কথা সবাই জানেন যে রাশিয়ার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বিপদগ্রস্ত মিত্র বাশার আল আসাদের সরকারকে রক্ষা করা।
পশ্চিমা দেশগুলো ২০১২ সালে সিরিয়ার রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য জেনেভায় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেয় এই কারণে যে তারা গোড়াতে সামরিকভাবে বাশার আল আসাদ সরকারকে সরাতে পারবে বলে মনে করলেও ২০১২ সাল নাগাদ বুঝতে পারে, সেটার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ২০১৪ সাল পর্যন্ত জেনেভায় আলোচনা চলে। সেই চেষ্টায় রাশিয়া যুক্ত থাকলেও শক্তিশালী আঞ্চলিক দেশ ইরানের অংশগ্রহণ ছিল না এবং অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে এই আলোচনা সফল হবে না। তাঁদের আশঙ্কা সত্য হয়েছিল, কেননা বাশার সরকার এবং বিরোধী উভয় পক্ষ আশা করছিল, তাদের প্রতিপক্ষ অচিরেই দুর্বল এবং ক্রমান্বয়ে পরাজিত হবে। এই আশা সরকারের চেয়ে বিরোধীদেরই বেশি ছিল। ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের প্রেক্ষাপটে গোটা পরিস্থিতির বদল ঘটে, আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর আরও দুটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে; প্রথমত, ব্যাপক সংখ্যায় শরণার্থীরা ইউরোপের উদ্দেশে পাড়ি জমায়; দ্বিতীয়ত, সেপ্টেম্বরে রাশিয়া প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ নিতে শুরু করে। যুদ্ধক্ষেত্রে একধরনের অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সব পক্ষই বুঝতে পারে তাদের আলোচনার টেবিলে ফিরে যেতে হবে।
সেই উপলব্ধির কারণেই এ বছরের অক্টোবরের শেষ নাগাদ ভিয়েনায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এটি ছিল সিরিয়া সমস্যা সমাধানে প্রথম পদক্ষেপ। ইরানের অংশগ্রহণ, আলোচনায় রাশিয়ার অংশীদারির মাত্রা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির অংশগ্রহণ ছিল এই আলোচনার ইতিবাচক দিক। ক্ষমতাসীন বাশার সরকারের আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকাটাও উল্লেখযোগ্য বিষয়, যা একার্থে আলোচনার অগ্রগতিতে সাহায্য করেছে; কেননা তারা বুঝতে পেরেছে যে এই পরিস্থিতি সামরিকভাবে সমাধান করা যাবে না কিন্তু শক্তিশালী অবস্থান থেকে আলোচনা করে যতটা সম্ভব আদায় করে নেওয়ার এই সুযোগ যেকোনো সময়ে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। যেহেতু রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে থাকতে নারাজ ও অপারগ, যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান থেকে পিছিয়ে এসে ইরানের অংশগ্রহণে সম্মত ও বাশারের ক্ষমতাচ্যুতিকে শর্ত হিসেবে আরোপ করেনি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভবিষ্যতে যেন আর ‘শরণার্থী সমস্যা’ পরিস্থিতির সূচনা না হয়, সে জন্য দ্রুত সমস্যা সমাধানে উৎসাহী ছিল, ভিয়েনা আলোচনার সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল বেশি। সেই সাফল্যও আসে ১৪ নভেম্বর, প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার এক দিন পরেই। অংশগ্রহণকারীরা এই বিষয়ে একমত হয় যে সিরিয়া সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নেই। সেই সময়ে এই বিষয়ে ঐকমত্য হয়, ১ জানুয়ারি জাতিসংঘ সিরিয়ার সরকার ও বিরোধীদের আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য ডাকবে; ১৪ মে ২০১৬ সালের মধ্যে সরকার ও বিরোধীরা যুদ্ধবিরতি কার্যকর করবে ও নতুন সংবিধান তৈরির কাজ শুরু হবে এবং ১৪ মে ২০১৭ সালের মধ্যে নতুন সংবিধানের অধীনে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ার মাত্র শুরু,
অনেক পথ পেরোতে হবে
আমার কাছে যেটা দ্বিতীয় পদক্ষেপ বলে মনে হয়, সেটা এক জায়গায় ঘটেনি। ডিসেম্বরের ৮-১০ তারিখ তিনটি শহরে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, ভিয়েনা আলোচনার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের উদ্যোগে যখন শান্তি আলোচনা হবে, তাতে কে বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব করবে। এই তিনটি বৈঠকের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বৈঠকটি হয় সৌদি আরবের রিয়াদে। বাকি দুটি হয় সিরিয়ার ভেতরে কুর্দি অধ্যুষিত রুমেলিয়ান শহরে এবং রাজধানী দামেস্কে। দামেস্কের বৈঠকের উদ্যোক্তা ছিল বাশার আল আসাদ সরকার, উদ্দেশ্য জাতিসংঘের আলোচনায় ‘সিরিয়ার বিরোধী দল’ বলে সরকারি পোষ্যদের হাজির করার জন্য প্রস্তুত থাকা। রুমেলিয়ানে যারা একত্র হয়েছিল, তারা অধিকাংশই ছিল কুর্দিদের সমর্থনপুষ্ট সংগঠন। যদিও তাদের কয়েকটি সংগঠন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, তথাপি তারা রিয়াদের বৈঠকে যেতে রাজি হয়নি তুরস্ক এবং অন্য কিছু গোষ্ঠীর ভূমিকার কারণে। রিয়াদের দুই দিনের বৈঠকের ১০০ জন প্রতিনিধি কেবল পশ্চিমাদের সমর্থনপুষ্ট বলেই নয়, তাঁদের নিজস্ব ভূমিকার কারণেও গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকাংশেই প্রতিনিধিত্বশীল। তাঁদের এই বৈঠকে নারী প্রতিনিধিদের সংখ্যাল্পতা নিঃসন্দেহে এই প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে দুর্বলতার প্রমাণ। রিয়াদের বৈঠকের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে যে বিরোধী গোষ্ঠীগুলো তাদের মতপার্থক্য সত্ত্বেও অনেক বিষয়ে কাছাকাছি আসতে সক্ষম হয় এবং ৩৩ সদস্যের একটি কমিশন গঠন করে। এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে তাদের মধ্যকার সব পার্থক্যের অবসান হয়েছে। এবং তাদের সঙ্গে যদিও কুর্দি গোষ্ঠীরা আছে, তথাপি রুমেলিয়ানে অংশগ্রহণকারীদের কিছু গোষ্ঠীকে যুক্ত করার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তথাপি যে ক্ষেত্রে আগে বিরোধীরা আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করছিলেন, সেখানে এই বিষয়ে তাঁদের সম্মতি ও প্রতিনিধি নির্বাচন ইতিবাচক।
এই দুই সফল পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করেই এখন জাতিসংঘ তৃতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের এই প্রস্তাবের মূল দিক হলো এই যে তাতে সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাশার আল আসাদের অপসারণের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি, অন্যদিকে জানুয়ারির শুরুতেই যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনা শুরু, ছয় মাসের মধ্যে সবার অংশগ্রহণমূলক নতুন সরকার এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। এসব আলাদা আলাদা বিষয় হলেও এগুলো অবিভাজ্য। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটা হবে না। ফলে এখন পর্যন্ত যে সাফল্য, তা একার্থে পটভূমি তৈরি করেছে।
যেকোনো শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে যেমন, এ ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত ‘মাঠের পরিস্থিতি’ এবং বাশার আল আসাদের সরকার ও তাঁর বিরোধীদের আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করবে এর সাফল্য। কিন্তু প্রধান দুই বহিঃশক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে একমত হয়েছে যে এই প্রক্রিয়া সিরিয়ানদের নেতৃত্বেই হতে হবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক; আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা মেনে নিয়েছে সামরিকভাবে এর সমাধান হবে না, রাজনৈতিক সমাধানই হচ্ছে একমাত্র উপায়। এই অঞ্চলের আঞ্চলিক শক্তিগুলো—ইরান, তুরস্ক ও সৌদি আরব এই বাস্তবতাকে গ্রহণ করে তাদের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টায় রাশ টানবে কি না, সেটাও অনেকাংশে নির্ধারণ করে দেবে সিরিয়া পরিস্থিতির রাজনৈতিক সমাধান হবে কি না। সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির যেমন আঞ্চলিক প্রভাব আছে, তেমনি এই শান্তি প্রক্রিয়া সফল হলে তারও প্রভাব পড়বে এই অঞ্চলে, বিশেষ করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে। তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ার মাত্র শুরু, এখনো অনেক পথ পেরোতে হবে।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

টিপুর স্বপ্ন ও ‘অসহিষ্ণু’ ভারত by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

পুনেতে ‘বসন্ত ব্যাখ্যানমালা’ নামে বক্তৃতামালায়
উগ্রহিন্দুত্ববাদী বীরসাভারকারের পৌত্র শ্রী বিক্রম
সাভারকার বলেছে, “প্রত্যেক হিন্দুর জীবনকালে
অন্ততঃ একজন মুসলমানকে হত্যা করা উচিত।
সে দুঃখের সঙ্গে আরো বলেছে, তার এখনও একজন
মুসলমানকে স্বহস্তে হত্যা করে উঠা সম্ভব হয়নি। তবে
তার বিশ্বাস যে, তার ভাষণ থেকে অপর হিন্দুরা
উৎসাহ লাভ করবে। তথ্যসূত্রঃ- সুধন্য দেশপান্ডে,
ক্যানিবল টাইম, সিগনাল থিয়েটার কোয়ার্টারলি পত্রিকা
ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে টিপু সুলতানের জন্মজয়ন্তী পালন নিয়ে যখন বিতর্ক-বিরোধ ও সংঘর্ষ চলছে, ঠিক সে সময়টাতে চট্টগ্রামের একটি মিলনায়তনে বসে টিপুর স্বপ্ন নাটকটি দেখলাম। ব্যাপারটি কাকতালীয় কি না জানি না, তবে এটি যে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি প্রযোজনা, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পশ্চিমবঙ্গের নাট্যদল ‘প্রাচ্য’ এই নাটক নিয়ে এসেছিল বাংলাদেশে। খ্যাতিমান নাট্যকার ও অভিনেতা গিরিশ কার্নাডের লেখা নাটকটির বাংলা রূপান্তর মঞ্চস্থ করেছে তারা এ দেশের দর্শকদের সামনে।
অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে মহীশুরের অধিপতি ছিলেন টিপু সুলতান। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন তিনি আজীবন। ইংরেজদের হাত থেকে ভারতকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই ‘জাতীয় বীর’ আখ্যা দিয়ে তাঁর জন্মজয়ন্তী পালন করার উদ্যোগ নিয়েছিল কর্ণাটক রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল কংক্রেস। কিন্তু টিপু একজন মুসলিম শাসক, তাঁর রাজত্বকালে হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিলেন তিনি—এ ধরনের কিছু বিতর্ক তুলে ওই রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপি ও কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলগুলো এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। বিরোধিতা শুধু বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এমনই সহিংসতার রূপ নিয়েছিল যে দশ জনেরও বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটেছে সেখানে। শেষ পর্যন্ত টিপুর জন্মদিন পালন করা যাবে কি না, এই বিতর্ক হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশে পরে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা গেছে টিপু সুলতানের জন্মদিনের উৎসব।
একজন বিজেপি নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মৃত্যুর ২১৬ বছর পর কেন আচমকা কংগ্রেসের টিপুকে মনে পড়ল?’ আপাতদৃষ্টিতে এ প্রশ্নকে যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস এমনই এক বিষয়, যা বর্তমানের কোনো প্রসঙ্গের হাত ধরে অতীত থেকে ফিরে আসে। যেমন ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর নাম, তাঁর অন্তর্ধান–রহস্য নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা এখনো প্রাসঙ্গিক। প্রকৃত ইতিহাস জানার আগ্রহ ও কৌতূহল মানুষের মনে জাগরূক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। চিন্তাশীল ও অগ্রসর মানুষেরা বর্তমানের বিভ্রান্তি দূর করার জন্য অতীত খুঁড়ে প্রকৃত সত্যকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন চিরকাল।
১৯৯২-৯৩ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ
ধ্বংসের পর শহরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা বাধে
সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে তাদের জোটসঙ্গী উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলগুলো ভিন্ন সম্প্রদায় ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর যেভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে, তাতে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দাবিদার ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি রীতিমতো প্রশ্নের সম্মুখীন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি না করার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ব্যাপারে তাঁর অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলেই প্রশ্রয় পাচ্ছে কট্টরপন্থীরা। গত সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের উত্তর প্রদেশের দাদরি গ্রামে ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার গুজব রটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ইখলাক নামের এক ব্যক্তিকে। এই ঘটনায় প্রথম দিকে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেও একপর্যায়ে ক্ষোভে-প্রতিবাদে ফেটে পড়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ।
সত্যের সন্ধান ও শুভ মানবিকতা যে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার উদ্যত তলোয়ারের চেয়েও ধারালো হয়ে উঠতে পারে টিপুর স্বপ্ন দেখে সে কথাই মনে হচ্ছিল আমাদের এর কয়েক দিন আগে ৩০ আগস্ট সাহিত্য আকােদমি পুরস্কারজয়ী যুক্তিবাদী লেখক এস এম কুলবার্গ খুন হয়েছেন তাঁর নিজের বাড়ির কাছে। গত দুই বছরে আরও দুজন যুক্তিবাদী লেখক গোবিন্দ পানসার ও নরেন্দ্র দাভোলকরকে খুন করেছে কট্টরপন্থীরা। খুনখারাবির ঘটনায় উগ্রপন্থীরা দল ও গোষ্ঠীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করছে না বটে, কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে শিবসেনাসহ সংঘ পরিবার যে ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে, তাতে সহিংস ঘটনায় কারা জড়িত, কাদের মদদ আছে, তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
গজলশিল্পী গুলাম আলী পাকিস্তানের নাগরিক হলেও ভারতে তিনি লাখ লাখ শ্রোতার কাছে আদৃত। এমনকি সেখানকার শিল্পীদের কাছেও তিনি আদর্শ। সেই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীকে মুম্বাইতে অনুষ্ঠান করতে দেয়নি শিবসেনা। সুর ও শিল্প যে সম্প্রদায়ের বিভক্তি, সীমানার গণ্ডি মানে না, এই ধর্মান্ধদের তা কে বোঝাবে? এসব অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন ভারতের শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা। জওহরলাল নেহরুর নাতনি বিশিষ্ট লেখিকা নয়নতারা সেহগাল ভিন্নমতের ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে তাঁর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর পথ অনুসরণ করেন ভারতের বিভিন্ন ভাষার আরও অন্তত ৪১ জন লেখক।
শাহরুখ খান, আমির খানের মতো ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নায়কেরাও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। আমির খান তাঁর স্ত্রীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে হুমকির মুখে পড়েছেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁদের দেশ (ভারত) ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কি না, এ কথা ভাবতে বলেছিলেন তাঁর স্ত্রী কিরণ রাও। এতে কট্টরপন্থীরা খেপে গেছে, তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যেতেও বলেছে। অথচ লাখ লাখ ভক্তের ভালোবাসায় সিক্ত মানুষটি কী বেদনায়, কী অভিমানে উদ্বেগের কথাটি প্রকাশ্যে বলতে বাধ্য হয়েছেন তা তারা ভেরে দেখল না।
সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দেওয়া ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশেও যুক্তিবাদী লেখক, ব্লগারদের হত্যা, মুক্তবুদ্ধির মানুষদের হত্যার হুমকি, খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে হত্যার চেষ্টা, বিদেশি নাগরিক হত্যা, যাত্রাপালায় বোমা হামলাসহ বেশ কিছু ঘটনা যেন ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিরই প্রতিচ্ছবি। নাটকের বিষয়বস্তু একই, শুধু দুই দেশের কুশীলব ভিন্ন। ভারতের ‘সনাতন সংস্থা’ আর বাংলাদেশের ‘জেএমবির’ উদ্দেশ্য, আদর্শ ও চরিত্র তো একই। ভারতে হিন্দুত্ব রক্ষার নামে আর বাংলাদেশে ইসলাম রক্ষার নামে একই কায়দায় মধ্য যুগ ফিরিয়ে আনতে চায় ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো।
মুক্তচিন্তার বিকাশকে ধ্বংস করার জন্য ধর্মকে হাতিয়ার করার এই অপচেষ্টা চলছে যুগের পর যুগ। কিন্তু এ কথা তো সত্য হত্যা-আক্রমণ-হুমকি কোনো কিছুই বিশ্বের কোথাও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাকে রুদ্ধ করতে পারেনি। বন্ধ রাখতে পারেনি ইতিহাসের অনুসন্ধান। টিপু সুলতান জাতীয় বীর, তাঁর বীরত্বের ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরা হোক, তাঁর নামে মহীশুরের একটি বিমানবন্দরের নামকরণ করা হোক—ইত্যাদি প্রস্তাব দিয়ে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন নাট্যকার-অভিনেতা গিরিশ কার্নাড। কিন্তু দমে যাননি তিনি। টিপুর স্বপ্ন নামে নাটক লিখে তিনি বলেছেন, ইংরেজদের ফরমায়েশি লেখকের ইতিহাসে টিপু সুলতানের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় না। তাঁকে হিন্দু ও খ্রিষ্টানবিদ্বেষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে ব্রিটিশরা। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো টিপুর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন অসাম্প্রদায়িক ভারত।
টিপু সুলতান সম্পর্কে যে কথা বলেছেন গিরিশ কার্নাড, সে কথারই প্রতিধ্বনি আমরা শুনি দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শৌভিক মুখোপাধ্যায়ের বয়ানেও। তিনি বলছেন, ‘টিপুকে নিয়ে যাবতীয় গবেষণার মূল উৎস হলো সে আমলে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের রিপোর্ট। শত্রুর (টিপু) সম্বন্ধে তাঁরা যে খুব একটা ভালো কথা বলবেন না, তা তো বলাই বাহুল্য।’
টিপুর স্বপ্ন নাটকটি খুবই হৃদয়স্পর্শী। যুদ্ধে একবার ইংরেজদের পরাজিত ও বিতাড়িত করেছিলেন মহীশুর থেকে। কিন্তু পরেরবার নিজের মন্ত্রী, সেনাপতি, আমির, ওমরাহদের বিশ্বাসঘাতকতায় তাঁর পরাজয় ঘনিয়ে এল। ইংরেজরা হত্যা করল তাঁকে। বাংলায় রূপান্তরিত নাটকের শেষ দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে কবি তুষার রায়ের কবিতা উচ্চারিত হচ্ছে টিপু সুলতানের মুখে, ‘বিদায় বন্ধুগণ, গনগনে আঁচের মধ্যে শুয়ে/এই শিখার রুমাল নাড়া নিভে গেলে/ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন পাপ ছিল কি না।’ ইতিহাস-বিকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রকৃত সত্যের উন্মোচনে একজন সৃজনশীল মানুষ কত বড় ভূমিকা রাখতে পারেন, এ নাটক তার একটি উদাহরণ হয়ে রইল। সত্যের সন্ধান ও শুভ মানবিকতা যে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার উদ্যত তলোয়ারের চেয়েও ধারালো হয়ে উঠতে পারে টিপুর স্বপ্ন দেখে সে কথাই মনে হচ্ছিল আমাদের।
ভারতের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক তৎপরতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে লেখক-শিল্পীসহ উদার মানবতাবাদীদের অবস্থান আমাদের জন্য শিক্ষার বিষয় হতে পারে। কেননা, প্রায় একই রকম সময় ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরাও।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের ঔদাসীন্য by শেখ হাফিজুর রহমান

এ নিয়ে কোনোই বিতর্ক নেই যে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে শিক্ষা। কিন্তু এ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নীতি, শিক্ষার প্রতি বিভিন্ন সরকারের মনোভাব, শিক্ষায় আর্থিক বরাদ্দের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলে আমরা হতাশাব্যঞ্জক চিত্রই পাই। বিনা মূল্যে পুস্তক বিতরণ, প্রাথমিক শিক্ষায় নারীদের অগ্রগতিসহ নানা বিষয়ে বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা যে শিক্ষার গুরুত্বের বিষয়টি ভালো বোঝেন, তা মনে হয়নি। রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা পুলিশ, র্যাব, সামরিক বাহিনী, প্রশাসনের আমলারাই বেশি ভোগ করেছেন। সাধারণ মানুষ, এমনকি রাষ্ট্রের ২৬টি ক্যাডারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হচ্ছে জিডিপির ২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা কিনা ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বরাদ্দের চেয়ে কম। ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ওই দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। ভারত তার ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে উচ্চশিক্ষা খাতে আগের বছরের তুলনায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে ১৩ শতাংশ।
দুই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদান করে আসছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছে, তাঁদের অনেকেই এখন আমলা, রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী বা অন্য কোনো পেশায় কর্মরত। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়বান্ধব নীতি গ্রহণ না করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের করা হয়েছে অপমান। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারছেন না যে শিক্ষকদের অসম্মানিত করে কোনো জাতি বড় হতে পারে না।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে যে অষ্টম পে কমিশন গঠন করা হয়, সেই পে কমিশন তাদের রিপোর্টে বলেছে, যত দিন পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হবে, তত দিন পর্যন্ত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আলাদা পে-স্কেলের বিষয়টি আমলযোগ্য নয়। অর্থাৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গণমুখী চরিত্র ও সরকারের ভর্তুকি তাঁদের পছন্দ নয়। লাখ লাখ দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলেমেয়েরা যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন, তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নামমাত্র বেতন, আবাসিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কারণে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে স্বল্প আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন পরিবারের মেধাবী সন্তানেরা যেমন বঞ্চিত হবেন, তেমনি বাংলাদেশে এখনো মানসম্পন্ন শিক্ষার যতখানি অবশিষ্ট আছে, তার কিছুই থাকবে না।
সম্প্রতি প্রকাশিত ২০১৪ সালের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদনে বলা আছে, ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে তাদের নিজস্ব আয় থেকে লাভজনক নিরাপদ খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া খুবই জরুরি।’ মঞ্জুরি কমিশন তার প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়ের ৫০ শতাংশ আসতে হবে এর অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। অষ্টম পে কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর্থিকভাবে পরিপূর্ণ স্বাবলম্বী হতে হবে, এদিকে মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়ের ৫০ শতাংশ আসতে হবে এর অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোত্থেকে টাকা জোগাড় করবে? ছাত্রছাত্রীদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাবলম্বী হবে, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যাংক, কল্যাণ সংস্থা (যেমন সেনা কল্যাণ সংস্থা), শপিং মল, মেডিকেল কলেজ স্থাপন করে করপোরেট ব্যবসায় নেমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে? এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় চরিত্র কি ক্ষুণ্ন হবে না? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি অব্যাহত রাখতে পারবে তার গণবান্ধব, গণতান্ত্রিক এবং শিক্ষা ও গবেষণা-সংশ্লিষ্ট ভূমিকা?
যে বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে খ্যাত ছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ এশিয়ার প্রথম ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্বের প্রথম ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই কেন, সেই প্রশ্নটি করা কি অন্যায্য হবে? এ ব্যর্থতার দায় কি রাষ্ট্রের, না বিশ্ববিদ্যালয়ের, নাকি এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা?
তিন
রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিরা ইদানীং শিক্ষার প্রসঙ্গ এলে কিছু জ্ঞানগর্ভ ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন, যেমন ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’, ‘একবিংশ শতকের উপযোগী শিক্ষা’, ‘উন্নয়ন সহায়ক মানবসম্পদ’ ইত্যাদি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এগুলো প্রতিষ্ঠা বা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের কোনো আগ্রহ বা উদ্যোগ দৃশ্যমান হয় না। জাতীয় বাজেটে উচ্চশিক্ষায় শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ বরাদ্দ দেখে আমরা বড়সড় একটি ধাক্কা খাই। এ বরাদ্দ দিয়ে ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যূনতম ব্যয়ই মেটানো কষ্টসাধ্য, গবেষণা হবে কীভাবে, একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী শিক্ষা হবে কীভাবে, আর কীভাবে উন্নয়ন-সহায়ক মানবসম্পদ তৈরি হবে, তা আমার বোধগম্য নয়।
মঞ্জুরি কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৩-১৪ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৫৪২ দশমিক ৫০ কোটি টাকা (বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বাজেট যখন প্রায় তিন লাখ হাজার কোটি টাকা, তখন উচ্চশিক্ষার জন্য বরাদ্দ মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা)। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব খাত থেকে সংগ্রহ করেছে ২৮২ দশমিক ৮০ কোটি টাকা। এ অর্থের ৭২ শতাংশই ব্যয় হয়েছে বেতন-ভাতা ও পেনশন প্রদানের জন্য, ১৬ শতাংশ গেছে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে শিক্ষাসংক্রান্ত খাতে। আর গবেষণারজন্য যা বরাদ্দ ছিল, তা নামমাত্র। বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা ও পরিবেশবিজ্ঞানের মানসম্পন্ন গবেষণার জন্য যে আর্থিক বরাদ্দ দরকার, তা না থাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মুখ থুবড়ে পড়েছে। অথচ নানা সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতির মধ্যেও অনেক শিক্ষক ও গবেষক যে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করছেন, তা পুরোপুরি ব্যক্তি উদ্যোগে। গবেষণায় বরাদ্দ বা মৌলিক গবেষণাকে উৎসাহিত করার ব্যাপারে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে সীমাহীন গাফিলতি ও বিরূপ মনোভাব।
চার
আগেই উল্লেখ করেছি যে এ ভূখণ্ডের শিক্ষা ও গবেষণার বিকাশে এবং মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রয়েছে এক অনন্য অবদান। প্রাসঙ্গিকভাবে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করতে চাই। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দশকের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণার উঁচু মান ও আবাসিক চরিত্রের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যিনি সত্যেন বোস নামে পরিচিত, একটি প্রবন্ধ পাঠান। তাঁর ওই প্রবন্ধ পড়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মতে বসু কর্তৃক প্ল্যাংক-সূত্র নির্ধারণের এই পদ্ধতিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
বিশ্বখ্যাত আরেক বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। ঢাকায় একসময়ে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী গবেষক দল, যারা মৌলিক পদার্থের প্রকৃতি সম্বন্ধে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল। এসব গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন কে এস কৃষ্ণান, এস আর খাস্তগীর, কাজী মোতাহার হোসেন ও আরও অনেকে। বিখ্যাত রোনাল্ড ফিশার ঢাকার বিমানবন্দরে নেমেই কাজী মোতাহার হোসেনের খোঁজ করতেন। এটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার শিক্ষকদের প্রকৃত পরিচয়, সত্যিকারের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের জন্যই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগন্নাথ হলে বসে লিখতে পেরেছিলেন: ‘এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসি খেলায়...’ (অধ্যাপক এ এম হারুন-অর-রশীদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব স্যুভেনির, ২০১২।) যে বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে খ্যাত ছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ এশিয়ার প্রথম ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্বের প্রথম ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই কেন, সেই প্রশ্নটি করা কি অন্যায্য হবে? এ ব্যর্থতার দায় কি রাষ্ট্রের, না বিশ্ববিদ্যালয়ের, নাকি এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা?
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের শিক্ষা কিসের ওপর দাঁড়াবে, কীভাবে মজবুত হবে টেকসই উন্নয়ন?
শেখ হাফিজুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক, অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার গবেষক।

কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে by এরিক বেইনহকার ও মাইলস অ্যালেন

জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টেনে ধরতে এক ঐতিহাসিক ঐকমত্যে পৌঁছেছে পৃথিবী। প্যারিসে শেষমেশ যা হলো, তাতে দেশগুলো প্রাক শিল্প যুগের তুলনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশ নিচে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর সেটাকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখার জন্য দেশগুলো নানা পদক্ষেপ নেবে, এমন প্রতিশ্রুতিও তারা দিয়েছে। এতে উন্নত দেশগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে, তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার চাঁদা দেবে। কিন্তু চূড়ান্ত আলোচনায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে এক নম্বর বিষয়টিই বাদ পড়ে গেছে, নিঃসরণের হার বৃদ্ধি প্রাক শিল্প যুগের তুলনায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
পৃথিবী নামক গ্রহের তাপমাত্রা কোনো এক পর্যায়ে স্থিতিশীল রাখতে হলে আমাদের আর প্রাক শিল্প যুগের তুলনায় কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের হার বাড়ানো চলবে না। পৃথিবীর পরিবেশ-সমুদ্র ব্যবস্থা অনেকটা বাথটাবের মতো হয়ে গেছে, যেটি ক্রমাগত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্য গ্রিনহাউস গ্যাসে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এর মাত্রা যত বেশি হবে, ততই তার তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে।
বাথটাবটা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে চলে গেলে যদি উষ্ণতার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে এই নিঃসরণের ট্যাপটা বন্ধ করতে হবে। যেমন ধরুন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বিজ্ঞানীরা প্রায় সবাই এ ব্যাপারে একমত যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার এর ওপরে চলে গেলে পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেবে।
মানবসভ্যতা যে তার সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারবে, সেটা নিশ্চিত নয়। তা না হলে বায়ুমণ্ডলীয় বাথটাব ক্রমাগত ভরতে থাকবে, ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৩, ৪ বা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে, যতক্ষণ না নিঃসরণ বন্ধ হয়, অথবা মানবজাতি ধ্বংস হয়। আমরা যত তাড়াতাড়ি এই ট্যাপ বন্ধ করব, তত কম তাপমাত্রায় জলবায়ু স্থিতিশীল হবে, ঝুঁকির পরিমাণও তত কম হবে। আর উষ্ণ পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের অভিযোজিত হওয়ার খরচও তত কম হবে।
বায়ুমণ্ডলে আমরা যত কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ি, তার অর্ধেকটা শুধু সেখানে থাকে, বাকিটা সমুদ্র ও জীবমণ্ডলে পুনঃ সঞ্চালিত হয়। কিন্তু সমুদ্র যত দ্রুত অভিসিঞ্চিত হচ্ছে এবং যত তার শোষণক্ষমতা কমছে, ততই এই পুনঃ সঞ্চালনের হার কমছে। একইভাবে তাপমাত্রা বাড়লে মাটির কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের হারও বাড়ে, এতে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়ে।
বায়ুমণ্ডল থেকে এই কার্বন ডাই-অক্সাইড দূর করার একমাত্র উপায় হচ্ছে আক্ষরিকভাবে এটা বের করে দেওয়া। প্রাকৃতিকভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড ফসিলে পরিণত হয়, কিন্তু সেটার গতি এত কম যে তাতে কিছু আসে যায় না। কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস) প্রযুক্তি কয়লা ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র থেকে নিঃসরিত গ্যাসের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড সরিয়ে নেয়, এরপর সেটাকে মাটির নিচে সংরক্ষণ করে। এই প্রযুক্তি বায়ুমণ্ডলে বিদ্যমান কার্বন ডাই-অক্সাইড কমাতে না পারলেও তা কয়লা ও গ্যাস থেকে নিঃসরিত কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমিয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারে। কিন্তু এটা খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার, আর বৃহৎ পরিসরে সেটা ব্যবহারের চেষ্টাও খুব ধীরগতিতে চলছে।
ভালো খবর হচ্ছে, আমরা যদি এখনই কোনোভাবে নিঃসরণ কমাতে পারি, তারপরও তাপমাত্রা একটা স্থিতিশীল জায়গায় পৌঁছার আগে আগামী কয়েক দশক ধরে তা বাড়তে থাকবে। কিন্তু নিঃসরণ এখনো বেশি থাকায় এই বায়ুমণ্ডলে আমাদের বসবাসের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এই ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ’ প্রযুক্তি আপেক্ষিকভাবে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমরা যদি বিদ্যমান পথে চলতে থাকি, তাহলে সেটাকে যে পরিসরে কাজে লাগাতে হবে, তা চিন্তা করাও মারাত্মক ব্যাপার। অর্থাৎ আমরা এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছি। বাথটাবের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার প্যারিসে নির্ধারিত ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে যাওয়ার আগেই কি আমরা নিঃসরণের ট্যাপটা ঘুরিয়ে তা প্রাক শিল্প যুগের পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারব? বস্তুত, এই ২ ডিগ্রিও যথেষ্ট নয়। প্যারিস সম্মেলনে এটা স্বীকার করা হয়েছে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে গেলে অভিযোজনের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য। বিজ্ঞানীরাও এটা মনে করেন।
ভালো খবর হচ্ছে, আমরা যদি এখনই কোনোভাবে নিঃসরণ কমাতে পারি, তারপরও তাপমাত্রা একটা স্থিতিশীল জায়গায় পৌঁছার আগে আগামী কয়েক দশক ধরে তা বাড়তে থাকবে। কিন্তু নিঃসরণ এখনো বেশি থাকায় এই বায়ুমণ্ডলে আমাদের বসবাসের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করার আগে আমরা ঐতিহাসিকভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের সীমার অর্ধেকের কম নিঃসরণ করে ফেলতে পারি। এখন আমরা যেভাবে চলছি, তাতে ২০৪০-৫০ সালের মধ্যে সেই পর্যায়ে চলে যাব।
সে কারণে অধিকাংশ বিজ্ঞানী ও ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ব্যবসায়ী নেতারা দ্ব্যর্থহীন লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানাচ্ছেন, সেটা হলো, তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি বাড়ার আগেই নিঃসরণের হার প্রাক শিল্প যুগের পর্যায়ে রাখতে হবে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স ও বিশ্বের বিভিন্ন করপোরেশনের প্রধান নির্বাহীরা ঠিক এই লক্ষ্যই নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্যারিসে বিনিয়োগকারী, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর ও ব্লুমবার্গের সিইও মাইকেল ব্লুমবার্গ একই সুরে কথা বলেছেন, কারণ হিসেবে তাঁরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ক্রমপরম্পরায় ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই লক্ষ্যের সুস্পষ্ট বার্তা হচ্ছে, কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণকারী শিল্পকে ব্যবসা বদলাতে হবে, অথবা তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। আর আমাদের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে কার্বন নিঃসরণহীন প্রযুক্তি ও ব্যবসার ওপর।
প্যারিসে আলোচনাকারীরা এই নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যটা পরিত্যাগ করলেও প্রতিটি দেশকে তার নিজ নিজ পরিকল্পনার মধ্যে এটা রাখতে হবে, যেটা আবার জি-২০ কে গ্রহণ করতে হবে, আর পরিণামে জাতিসংঘের চুক্তিতে তা যুক্ত করতে হবে। পৃথিবী নামক গ্রহের জন্য ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে হয় নিঃসরণ বৃদ্ধির হার প্রাক শিল্প যুগের সাপেক্ষ শূন্যের কোঠায় আনতে হবে, অথবা ধ্বংস হতে হবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
এরিক বেইনহকার: ইনস্টিটিউট ফর নিউ ইকোনমিক থিঙ্কিং, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
মাইলস অ্যালেন: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জিও সিস্টেম সায়েন্সের অধ্যাপক।