Monday, April 27, 2015

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব সব অংশীদারের by এম সাখাওয়াত হোসেন

২৮ এপ্রিল ঢাকা, চট্টগ্রামসহ তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা এখন শেষ সপ্তাহে পৌঁছেছে। প্রার্থীরা দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছেন ভোটারদের মন সন্তুষ্ট করতে। এই তিন শহরের প্রায় ৬০ লাখ ভোটার ভোট প্রয়োগ করার যোগ্য। আমাদের দেশে তথা সমগ্র উপমহাদেশে ভোট প্রদান বাধ্যতামূলক নয়। ঐচ্ছিক হলেও ভোটারদের রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের প্রতি কর্তব্য হিসেবে ভোট প্রদান একটি পবিত্র দায়িত্ব বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মতামত দিয়ে থাকেন।
আমাদের দেশের সাধারণ ভোটাররাও অত্যন্ত রাজনীতিসচেতন। কাজেই খুব বেশি সমস্যা না হলে উৎসাহের সঙ্গে ভোট প্রদান করে থাকেন। তবে তার পূর্বশর্ত পরিবেশ। বিশেষ করে নারী ভোটারদের বেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শান্ত পরিবেশ এবং নির্বাচন-প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা থাকলে সমাগম সবচেয়ে বেশি হয়। মনে রাখতে হবে যে বর্তমানেও নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের প্রায় সমান। যেহেতু তিন সিটি নির্বাচন শহরকেন্দ্রিক, কাজেই ধরে নেওয়া যায় এখানে নারী ভোটারদের ভোট থেকে বিরত রাখার আর সব উপাদান প্রায় অনুপস্থিত। কাজেই ভোটের আগে এবং ভোটের দিনের নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এ ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার শুধু নির্বাচন কমিশনের, অন্য কারও নয়। নির্বাচন কমিশনের বিবেচনা ও কাজে অন্য কোনো সংস্থা বা ব্যক্তির পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের দেশের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনে নিরাপত্তা বিধানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশাল সদস্যের প্রয়োজন হয়। ভোটারদের আশ্বস্ত করতে এবং পরিবেশ সমুন্নত রাখতে মাত্রাতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজন হয়। এর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংস্কৃতির নিম্নমুখী অবস্থান। মনমানসিকতায় নির্বাচনে যেমন করেই হোক জেতার প্রবল ইচ্ছা ধারণ করার কারণে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য রাজনৈতিক দল তথা প্রার্থীদের যে সহযোগিতার প্রয়োজন, তা পাওয়া যায় না। তা ছাড়া অনেক প্রার্থীর, বিশেষ করে এ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী, অতীত কর্মকাণ্ড সমাজে একধরনের অস্বস্তির সৃষ্টি করে। এসব কারণেই ভোটাররা এবং সরকারি দলের বাইরে অন্যান্য দলের প্রার্থীদের মধ্যে আস্থার অভাব তৈরি হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর, বিশেষ করে পুলিশের কিছু কিছু সদস্যের বেশ কিছু আচরণ ও অবস্থান পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হয়নি।
বর্তমান দাবির প্রেক্ষাপটে বেশির ভাগ প্রার্থী এবং ভোটারদের আস্থাহীনতাই প্রধান কারণ মনে হয়। বিশেষ করে সরকার-সমর্থিত প্রার্থী নন এমন বেশির ভাগ প্রার্থী এমনকি সরকারের সঙ্গে থাকা জাতীয় পার্টি-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে এমন অনাস্থার কথা প্রকাশ করে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি তোলা হয়েছে। এর অধিকতর বিশ্লেষণ হলো সরকার-সমর্থিত প্রার্থী এবং সমর্থনকারী গোষ্ঠী ছাড়া সিংহভাগ প্রার্থী ও ভোটার একধরনের আস্থাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমানে এই তিন নির্বাচনে বিবেচ্য বিষয় হলো নির্বাচন কমিশনের পক্ষে জনগণের তথা ভোটারদের আস্থা অর্জন। তবে আমার অভিজ্ঞতায় চট্টগ্রামের নির্বাচনে অতীতেও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতির সামাল দিতে সাহায্য করেছিল।
যেমনটা বলেছি যে আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিম্নমুখী, কোনোভাবেই উন্নত বলা যায় না। রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ধরনের আচরণ, বাক্যবাণ ব্যবহার হয় তা এই অবস্থানের প্রমাণ। সে কারণেই কোনো প্রার্থী, বিশেষ করে সরকারি দলের বা সমর্থিত প্রার্থী ছাড়া নির্বাচনে পরাজয় সহজে মেনে নিতে চান না। পরাজয়ের কারণের প্রথম তিরের লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে ভেবে দেখতে হবে তাদের করণীয় কী হতে পারে। এ বাস্তবতা এবং আস্থার সংকট উভয়ই অতীতে সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে সরকারি দল জয়ী হলে পরাজিতরা সেনাবাহিনীর অনুপস্থিতিকেই বড় করে দেখাবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হবে। সেনা মোতায়েন করা হলে এ অভিযোগের জায়গা কমে আসবে, অন্যথায় সুষ্ঠু নির্বাচনও অনুকূলে না গেলে ভিন্নমাত্রা পাবে।
এখনো আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সহনশীলতার লেশমাত্র দৃশ্যমান নয়। ইতিমধ্যে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে আক্রমণের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এ পরিবেশ যাতে আরও উত্তপ্ত না হয়, নির্বাচন কমিশনকে সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।
অবশ্য এরই মধ্য এই তিন সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তরফে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হলেও এখন বলা হচ্ছে যে সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে না। ফলে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া বা না নেওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকল বলে মনে হয় না। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপ্রতুলতা নয়, নির্বাচন কমিশনকে সব দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেনাবাহিনীর সাহায্য নিতে হলে তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি। কারণ, সেনাবাহিনী বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত নয়, ২০১১ সালে সংজ্ঞাটি পরিবর্তিত হয়েছে।
নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। একই আঙ্গিকে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি, আইনশৃঙ্খলার ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবেই কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত। একইভাবে আস্থার পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে সরকার ও অন্য শরিকেরা সহযোগীর ভূমিকা পালন করে মাত্র। এখানে অবশ্যই সরকারের ভূমিকা মুখ্য। কোনো পক্ষেরই এ এখতিয়ারে দখল দেওয়া বা যা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা, তেমন বিষয়ে কারোরই বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়। এ ধরনের বক্তব্য নির্বাচন কমিশনকে এক কঠিন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়। এমনিতেই আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনকে কমবেশি সব সময়েই কোনো না কোনো পক্ষের সমালোচনার মধ্যে থাকতে হয়।
যা-ই হোক ভোটারদের নিরাপত্তা, আস্থার পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ইত্যাদি বিষয় মাথায় রেখেই সেনা নিয়োগের অথবা না নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বা করা হবে। মনে রাখতে হবে সার্থকতার বহু দাবিদার হবে কিন্তু ব্যর্থতার দায়ভার নেওয়ার কাউকে পাওয়া যাবে না (Succes has many fathers, failure is orphan) আমাদের দেশটি ইউনিটারি ব্যবস্থার। এখানে ভারতের মতো আলাদা সেন্ট্রাল রিজার্ভ ফোর্স নেই, সে কারণেই সেনাবাহিনীর দাবি ওঠে। যা-ই হোক, এ সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের।
সুষ্ঠু নির্বাচন যে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে বিশেষ বাহিনীর উপস্থিতিতেই নিশ্চিত হতে পারে বা নির্বাচন কমিশন এককভাবে সম্পাদিত করতে পারে, তেমনটি মোটেই নয়। নির্বাচন কমিশনের সব পক্ষেরই সহযোগিতা প্রয়োজন, যার মধ্যে প্রার্থীদের দায়িত্বও রয়েছে। ভোট গ্রহণের দিন প্রতি বুথে প্রার্থীর যে এজেন্ট নিয়োগ করা হয়, ওই দিনে তাঁর দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার পূর্বাভিজ্ঞতায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, বেশির ভাগ প্রার্থী যেনতেনভাবে এজেন্ট নিয়োগ করেন। এজেন্টের কাজ শুধু সঠিক ভোটারকে শনাক্ত করাই নয়, বরং বুথের সমগ্র কর্মকাণ্ড এবং সেন্টারে ভোট গণনা ও ফলাফলের সনদ গ্রহণ পর্যন্ত তাঁর দায়িত্ব।
অতীতে এজেন্ট বিষয়টি নির্বাচনী আইন ও বিধিতে তেমন বিস্তারিত উল্লেখ ছিল না। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী এজেন্টদের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্বাচনী বিধিতে বিশদভাবে বিধৃত করা হয়েছে। প্রতিটি প্রার্থীর উচিত স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) বিধিমালার ধারা ২৫ এবং ওই ধারার তফসিল ও সংলগ্নিগুলো ভালোভাবে প্রতিটি এজেন্টকে অবহিত করানো, অন্যথায় এজেন্টের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন যেকোনো প্রার্থী। এ ধারা বেশ নতুন এবং হয়তো বহু প্রার্থীই সঠিকভাবে অবহিত নন। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন স্ব-উদ্যোগে ধারাটি সম্বন্ধে প্রার্থী অথবা প্রার্থী প্রধান নির্বাচনী এজেন্টদের সম্যক ধারণা দিতে পারেন অথবা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বেসরকারি সংগঠন এ কাজটি করতে পারে। বিষয়টি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
আমাদের দেশে বহু পরাজিত প্রার্থীকে অভিযোগ করতে শোনা যায় যে ব্যালট বাক্স পরিবর্তন করা হয়ে থাকে। যার মানে আগাম ব্যালট ভর্তি করে গণনার সময় ব্যালট বাক্স পরিবর্তন করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এ ধরনের অভিযোগকারী বর্তমান স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সম্বন্ধে হয় কোনো ধারণাই রাখেন না অথবা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেন। এ বিষয়টি এখন অতীত। বর্তমানে যে আধুনিক ব্যালট বাক্স ব্যবহার করা হয়, তার প্রতিটি ইউনিক নম্বর দ্বারা চিহ্নিত, যার রেকর্ড ডিজিটাল পদ্ধতিতে নির্বাচন কমিশনে প্রতিটি বুথের হিসাবে রক্ষিত। তা ছাড়া পাঁচটি লক স্ট্রিপে আলাদা ইউনিক নম্বর রয়েছে। ভোট গ্রহণের আগে, আইন ও উল্লিখিত বিধির ধারা ২৮ মোতাবেক, পোলিং অফিসার লক-এর ইউনিক নম্বর এবং ব্যালট বাক্সের নম্বর এজেন্টদের নির্বাচনী বিধিতে উল্লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য। ভোট গণনার সময় এজেন্টদের উপস্থিতিতে ব্যালট বাক্স খোলার আগে এজেন্টদের এবং প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব ওই সব নম্বর মেলানোর পর বাক্সের লক-বা সিল ভাঙা। উল্লেখ্য যে, শুধু বাক্সেই নয়, বাক্সের প্রয়োজনীয় সিল বা লকও আমদানীকৃত, দেশে নকল করা সম্ভব নয়। এবং এসব সিল বা লক একেবারেই ব্যবহারযোগ্য।
প্রতিটি নির্বাচনের আগে প্রার্থী এবং ভোটার প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ব্যবস্থাপনার এসব বিষয়ে জনগণ ও ভোটারদের জ্ঞাত করালে নির্বাচন কমিশনের ওপরে অহেতুক চাপ ও অভিযোগ কম হবে বলে বিশ্বাস।
আগামী তিনটি নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করতে এসব বিষয় নির্বাচন কমিশন ধর্তব্যের মধ্যে নেবে বলে আশা করি। নির্বাচন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হলে এর দাবিদার অনেকেই হবে। তবে তেমন না হলে এর দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ছাড়া আর কেউ বহন করবে না। আশা করব নির্বাচন কমিশন এসব বিষয় নিয়ে আরও দৃশ্যমান হবে।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

সমান সুযোগ ছাড়াই নির্বাচন by মেহেদী হাসান

আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন (ইসি) সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে পারেনি; সরকার সমর্থক প্রার্থী ছাড়া এ অভিযোগ এখন সব মহলের। তাই নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই ছড়িয়ে পড়ছে ভীতি আর আতঙ্ক। এত দিন পর্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিরোধী প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তা এখন ছড়িয়ে পড়ছে ভোটার থেকে সাধারণ নগরবাসীর মধ্যে। বিশেষ করে নির্বাচনী মাঠে সেনা মোতায়েন না রেখে তাদের ব্যারাকে রাখার সর্বশেষ যে সিদ্ধান্ত ইসি নিয়েছে তাতে উদ্বেগের মাত্রা বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে ৮৬ শতাংশের অধিক ভোটার মনে করেন নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়নি। গত ১৭ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ নির্বাচনী এলাকার ৪৬১ জন ভোটারের ওপর পরিচালিত হয় এ জরিপ। সিটি নির্বাচনের পরিবেশ এখন এতই ভীতিজনক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, বিএনপি এখন ভোটকেন্দ্রের জন্য পোলিং এজেন্ট পাচ্ছে না। যারা পোলিং এজেন্ট ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য নাম জমা দিয়েছিলেন তাদের অনেকে নাম প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন ভয়ে। এত দিন পর্যন্ত বিরোধী প্রার্থী এবং নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়া কর্মীদের ওপর হামলা ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি-ধমকি চলছে। কিন্তু এখন অনেক এলাকায় ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাবধান করে দেয়া হচ্ছে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার ব্যাপারে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের আইডি কার্ড জব্দ করার খবর বেরিয়েছে সরকার সমর্থক প্রার্থীদের পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে। রোববার মধ্যরাত থেকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত বেশির ভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী মাঠেই নামতে পারেননি। প্রচারণার মাঠ থেকে এ পর্যন্ত সাতজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে শত শত কর্মী-সমর্থককে। গুমেরও শিকার হয়েছেন কয়েকজন কর্মী। ঢাকা উত্তর ও দণি সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ৯৩টি সাধারণ ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিল প্রার্থী ৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। কারো কারো বিরুদ্ধে আট-দশটি করে মামলা রয়েছে এবং এর প্রায় সবই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা। কেউ কেউ জামিন পেলেও তারা ভয়ে নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে নামতে পারছেন না। মামলা, গ্রেফতার ও হুমকির কারণে অনেক প্রার্থী এলাকা ছাড়া, অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ইসিতে শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি, বাড়ি, অফিস ও স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, মারধরের ঘটনা, প্রার্থী ও কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি, প্রচারণা চালাতে না দেয়াসহ গ্রেফতার বিষয়ে শতাধিক অভিযোগ করা হয়েছে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। কিন্তু এসবের কোনো প্রতিকার হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন প্রার্থীরা। ১৮ মার্চ সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ইসির বিরুদ্ধে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির ব্যর্থতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও সে ক্ষেত্রে ইসির বিরুদ্ধে নির্বিকার ভূমিকা পালনের অভিযোগ রয়েছে। গত শনিবার রাত ৩টার দিকে কারওয়ান বাজার এলাকায় হামলার শিকার হন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মেয়রপ্রার্থী মাহী বি চৌধুরী। এ সময় তার স্ত্রী ও গাড়িচালকও আহত হন। একই দিন রাজধানীতে বিএনপিসমর্থিত এক কাউন্সিলর প্রার্থীর মিছিলে গুলি, জামায়াতের এক প্রার্থীর মিছিলে ককটেল হামলা এবং সরকার সমর্থক এক বিদ্রোহী প্রার্থীর ওপর হামলায় আঙুল কাটার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে চার দফা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার ওপর আক্রমণকারীদের নাম-পরিচয় ও ছবি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এমনকি এরা ছাত্রলীগ-যুবলীগের কোনো পদে রয়েছে তাও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব আক্রমণকারী বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ঘটনার পর নির্বাচন নিয়ে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। বিএনপি প্রার্থীদের পক্ষে পোলিং এজেন্ট প্রত্যাহার করে নেয়া একজন কর্মী জানান যেখানে সরাসরি বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর হামলা হয় সেখানে ভোটকেন্দ্রের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা কে দেবে। তাই ভীত হয়ে তিনি নির্বাচনী দায়িত্ব পালন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিন বিএনপি-জামায়াতের, কোনো না কোনো প্রার্থী ও তাদের অনেক কর্মী-সমর্থকের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে সরকার সমর্থক প্রার্থীর পক্ষের লোকজন কর্তৃক। সরকারদলীয় প্রার্থীদের একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘন আর বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারণা চালাতে না দেয়া, গ্রেফতার, মামলা ভয়ভীতি, বাড়ি তল্লাশি প্রতি পদে পদে শুরু থেকে ইসির বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে নির্বাচন কমিশন সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনিÑ এ অভিযোগ এখন সর্বত্র। নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে বলে অভিযোগ বিরোধী প্রার্থীদের। নির্বাচনী প্রচারে বিরোধী প্রার্থী এবং তাদের কর্মীদের ওপর সরকারদলীয় লোকজন কর্তৃক হামলার ঘটনা ঘটলেও ইসি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের অধীন। শুধু নির্বাচন কমিশন নয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালনের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে বিরোধীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ নয়। তারা নিরপেক্ষ আচরণ করছে না ব্যাপক দলীয়করণের কারণে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু হয় কি না তা নিয়েই সংশয় ছড়িয়ে পড়েছে বিরোধী মহলে। গতকাল দুপুরের পর নির্বাচন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন, সেনা মোতায়েনকে ভোট ডাকাতির ক্ষেত্রে বাধা মনে করছে সরকার। তারা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তার জন্য কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। সরকারের ভোট ডাকাতির পরিকল্পনার দোসর হয়ে ইসি গুপ্ত কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়রপ্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, উত্তরের মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালসহ অনেক প্রার্থী। রোববার নির্বাচনী প্রচারণার সময় আফরোজা আব্বাস অভিযোগ করেছেন সরকার ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করতে চায়। তাবিথ আউয়াল অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। সেনা মোতায়েন নিয়ে ইসির সর্বশেষ তালবাহানা এ সংশয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণের মেয়রপ্রার্থী আবদুল্লাহ আল কাফী অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনে হুমকি-ধমকি আর অর্থের ছড়াছড়ি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ নির্বাচন কমিশন।

ক্ষমতা গেলে আ’লীগ নেতাদের বোরকা পড়ে চলতে হবে : কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বলেছেন, ক্ষমতা গেলে আওয়ামী লীগের নেতারা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে পারবেন না, হাঁটলেও তাদের বোরকা পড়ে চলতে হবে। আজ সোমবার ময়মনসিংহের ফুলপুর ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে শান্তির দাবীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী একথা বলেন। কাদের সিদ্দিকী আরো বলেন, ৫ জানুয়ারির ভোট চুরির নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে, রাজনীতিকে মানুষের কাছে নিন্দনীয় করেছে। আইয়ুব খানের শাসনামলেও কিছু মানুষ ভোট দিতে পেরেছে, কিন্তু শেখ হাসিনা সে অধিকারও কেড়ে নিয়েছে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে কোনো আগ্রহ নেই উল্লেখ করে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, এ দেশের মানুষ সিটি নির্বাচন নয়, জাতীয় নির্বাচন চায়। তারপরও ভোটাররা যদি সিটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ১০ ভাগ ভোটও পাবে না। বঙ্গবীর বলেন, সরকার এমন জালেম ও জাহেল হয়েছেন যে তিনি অন্তর থেকে কাঁদতেও পারেন না, তাকে গ্লিসারিন দিয়ে কাঁদতে হয়। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ফুলপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম-সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান, ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির আহবায়ক রিফাতুল ইসলাম দীপ, কাশেম মেম্বার, শাহীনুর আলম প্রমুখ। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীকে আলোচনায় বসতে এবং খালেদা জিয়াকে অবরোধ প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়ে গত ২৮ জানুয়ারি থেকে টানা ৬৪ দিন মতিঝিলের ফুটপাতে অবস্থান শেষে ২ এপ্রিল থেকে সারা দেশে অবস্থান কর্মসূরি পালন শুরু করেন কাদের সিদ্দিকী। এই কর্মসূচির ৯১তম দিনে তিনি আজ সোমবার ময়মনসিংহের ফুলপুরে অবস্থান করছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলায় অবস্থান করবেন বঙ্গবীর। এদিন বিকেলে সেখানকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে তিনি মতবিনিময় করবেন।
‘ভোট সুষ্ঠু না হলে আন্দোলন আরও জোরদার’
সিটি নির্বাচনে ভোট সুষ্ঠু না হলে ভোটের অধিকারে যে আন্দোলন চলছে, তা আরও জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ। সোমবার নয়া পল্টনে দলের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, যদি ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়া হয়, এজেন্টদের যেতে দেয়া না হয়, তাহলে আমরা স্পষ্টভাষায় বলে দিতে চাই, ভোটের অধিকারের যে আন্দোলন চলছে, তা আরও জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, আমরা বলতে চাই, সিটি নির্বাচনে ওই রকম নীল নকশা বাস্তবায়ন করা হলে এই সরকারের অধীনে আর কোন নির্বাচনে আমাদের অংশ নেয়া সম্ভবপর হবে না। মওদুদ আহম্মেদ বলেন, সরকার পুলিশ ও র‌্যাবকে দিয়ে নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে নিতে নীল-নকশা প্রণয়ন করেছে বলে আমরা শুনতে  পেরেছি, তা কাল (মঙ্গলবার) আমরা যাচাই করতে পারব। ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সবার সমান সুযোগ থাকা তো দূরের কথা, বিরোধী দলের প্রার্থীদের অনেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানি ও নিপীড়নের কারণে প্রচারণায় অংশই নিতে পারেননি। বিরোধী প্রার্থীদের পোস্টার লাগাতে দেয়নি। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ বলেন, ভোট পর্যবেক্ষণে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সকাল ৮টা থেকে ‘মনিটরিং সেল’ কাজ শুরু করবে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণে মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বাড়িতে একটি এবং ও উত্তরে মহাখালীর অ্যাংকর টাওয়ারে আরেকটি মনিটরিং সেল কাজ করবে। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয় থেকেও ভোটের ওপর নজর রাখা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

মনজুরের আপদ, নাছিরের বিপদ by সোহরাব হাসান

বন্দরনগর চট্টগ্রাম অনেক দিক দিয়ে অগ্রগামী। এই চট্টগ্রামেই ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে যুব বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই চট্টগ্রামেই রচিত হয় একুশের প্রথম কবিতা—‘আমি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। এই চট্টগ্রামেই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়। পাহাড় ও সমুদ্রবেষ্টিত চট্টগ্রাম একদা প্রাচ্যের রানির শিরোপা পেলেও এখন অনুজ্জ্বল, শ্রীহীন। ১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম পৌরসভা, যা সিটি করপোরেশনে রূপ নেয় ১৯৯০ সালে। এই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হতে যাচ্ছে ২৮ এপ্রিল। শহরজুড়ে সড়কের মোড়ে মোড়ে, দেয়ালে, ভবনে বিভিন্ন প্রতীকসংবলিত সাদাকালো পোস্টার শোভা পাচ্ছে। মেয়র ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা জোর প্রচার চালাচ্ছেন। কখনো প্রার্থীরা হেঁটে, কখনো গাড়িতে করে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন, ভোট চাইছেন। তাঁরা নিজ নিজ পরিকল্পনার কথা বলছেন। কখনো প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করছেন। আনন্দের কথা, নির্বাচন কমিশন শুরু থেকে কড়া নজরদারিতে রাখছে প্রার্থীদের। অভিযোগ পাওয়ার পর তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। কাউকে শোকজ করছে, কাউকে জরিমানা করছে। তার পরও নগরবাসী শঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না। তঁাদের প্রশ্ন, নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে কি না? নগরবাসী তঁাদের পছন্দসই প্রার্থী বেছে নিতে পারবেন কি না?
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মোট ১২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল প্রার্থী দুজন চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের মোহাম্মদ মনজুর আলম এবং নাগরিক কমিটির আ জ ম নাছির। মনজুরের পক্ষে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের কর্মীরা এবং নাছিরের পক্ষে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মীরা মাঠে নামার ঘোষণা দিলেও সবাই নামছেন না। সিিট করপোরেশনের ৪১টি কাউন্সিলর পদে ২১৩ জন এবং সংরক্ষিত ১৪টি নারী আসনে ৬২ জন লড়ছেন। কাউন্সিলর পদে দুই দলের সমর্থক প্রার্থী থাকলেও এখন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।’
চট্টগ্রামের একজন সাংবাদিক বন্ধুর মতে, প্রধান দুই দলেই অন্তর্বিরোধ আছে। যে দল সেই বিরোধ কমিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে নামবে, সেই দলের প্রার্থীরই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আরেক সাংবাদিক জানান, এ ক্ষেত্রে নাছিরের চেয়ে মনজুর কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন। কেননা, নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদত হোসেনের কেউ প্রার্থী হননি। ফলে বিএনপিতে গ্রুপিং কম। কিন্তু নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের মধ্যে শেষোক্তজন প্রার্থী হয়েছেন। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের সব নেতাকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে নাছিরের পক্ষে কাজ করতে বলেছেন। অনেকে মাঠে সরব হলেও নীরব মহিউদ্দিন চৌধুরী। এই নীরবতা নাছিরের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। অনেকে মনে করেন, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখনো মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিকল্প নেই।
সাংবাদিক বন্ধু আরও জানালেন, বিএনপিতে অন্তর্দলীয় বিপদ কম হলেও অন্য আপৎ আছে। সেটি হলো বৃষ্টি। যে বৃষ্টি ২০১০ সালে মনজুরের জন্য আশীর্বাদ হয়েছিল, সেই বৃষ্টিই এখন তাঁর জন্য মহা আপৎ। ২০১০ সালে নির্বাচনের এক দিন আগে বৃষ্টিতে সয়লাব হয়ে যায় চট্টগ্রাম নগর, যার সুফল পান মনজুর আলম।
এবারেও সিটি নির্বাচনের প্রধান ইস্যু জলাবদ্ধতা। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, মনজুর আলম জলাবদ্ধতা দূর করতে কার্যত কিছুই করেননি। বরং একদা পরিচ্ছন্ন চট্টগ্রাম এখন নোংরা আবর্জনার শহরে পরিণত হয়েছে। সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী নগরের সড়কগুলো প্রশস্ত করেছিলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সিটি করপোরেশেনর আয় বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরি মনজুর আলম সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেননি। তবে তাঁর প্রধান গুণ সবাইকে নিয়ে চলা। তিনি সিটি করপোরেশনকে দলীয় আখড়ায় পরিণত করেননি। চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের নেতারা মনজুরের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে আরেকবার সুযোগ চান। কিন্তু প্রতিপক্ষ নাগরিক কমিটির দাবি, পাঁচ বছর যিনি ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি আগামী দিনেও কিছু করতে পারবেন না। তিনি নগরবাসীকে নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত করেছেন। তাঁরা মনজুরের বিপরীতে আ জ ম নাছিরের কৃতিত্ব তুলে ধরছেন। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ক্রীড়াঙ্গনকে বদলে দিয়েছেন। মেয়র নির্বাচিত হলে মহানগরকেও বদলে দেবেন।
এই দুই পক্ষের বাহাসে নগরবাসী বিভ্রান্ত। তাঁরা কারও ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না। নির্বাচনের ফলাফল কী হতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ের একজন অধ্যাপক জানালেন, নগরবাসী এখনো মনস্থির করেননি। ভেবেচিন্তে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি আরও বললেন, যদি বৃষ্টি হয়, মনজুর বিপদে পড়বেন। আর যদি মহিউদ্দিন চৌধুরীর গোস্সা বা নীরবতা না ভাঙানো যায়, তাহলে নাছিরের জন্য সেটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
গত বৃহস্পতিবার মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছে সিটি নির্বাচন নিয়ে মতামত চাইলে তিনি বলেন, ব্যালটের অধিকার রক্ষা করতে হবে। নগরের উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা দুটোই নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর কথায় দুজনের প্রতিই অনাস্থার আভাস পাওয়া যায়। তবে সাবেক এই মেয়র খোলাসা করে কিছু বলেননি।
গত শুক্রবার মনজুর আলম শুলকবহরে যান নির্বাচনী প্রচারে। কিন্তু একটি গলিতে পানি ছিল আগের রাতের বৃষ্টির কারণে। এরপর তিনি সেই গলিটিতে আর ঢোকেননি বলে জানান তাঁর প্রচারে সঙ্গে থাকা এক সাংবাদিক।
অন্যদিকে আ জ ম নাছির যেহেতু আগে সিটি করপোরেশনের কোনো দায়িত্বে ছিলেন না, তাই সিটি করপোরেশনের সাফল্য বা ব্যর্থতা তাঁর জন্য ইস্যু হবে না। ইস্যু হবে তাঁর অতীত রাজনীতি। মামলা ইত্যাদি। তবে নাগরিক কমিটির একজন নেতা বললেন, নিজে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রার্থী বলে নাছির তরুণদের ভোট বেশি টানবেন। তাঁর প্রচারক দলেও তরুণদের সংখ্যা বেশি। কিন্তু ছাত্রলীগের ও যুবলীগের এই উৎসাহী কর্মীরা তাঁর সম্পদ হবেন, না বিপদ হবেন—সেটি নির্ভর করবে তাঁদের আচরণের ওপর।
চট্টগ্রামের নির্বাচনে আরেকটি নিয়ামক শক্তি হলো জামায়াতে ইসলামী ও সংখ্যালঘু ভোট। চট্টগ্রামে ২ লাখ ৬৮ হাজার সংখ্যালঘু ও আদিবাসী ভোটার আছেন বলে জানালেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের এক নেতা। তাঁর মতে, ২০১০ সালে নির্বাচনে মনজুর আলম জামায়াতসহ সব ইসলামী দলের ভোট পেলেও মহিউদ্দিন চৌধুরী অধিকাংশ সংখ্যালঘুর ভোট পাননি। তবে তাঁরা মনজুর আলমকেও ভোট দেননি। অনেকে কাউন্সিলর পদে পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিলেও মেয়র পদটি খালি রেখেছেন। একটি গোশালার দখলদারি নিয়ে অগ্নিযুগের বিপ্লবী প্রয়াত বিনোদবিহারী চৌধুরীর সঙ্গেও তিনি বিরোধে জড়িেয় পড়েছিলেন।
এবার কী হবে? জামায়াত-হেফাজতের ভোট মনজুর আলমের বাক্সে পড়বে। আর সংখ্যালঘুদের ভোট পাবেন আ জ ম নাছির।
এত দিন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন আরেকবার প্রার্থী হবেন, নগরবাসীকে শেষবারের জন্য সেবা করার সুযোগ পাবেন, কিন্তু দলীয় নেতৃত্ব তাতে সায় দেয়নি। এটিকে মহিউদ্দিন চৌধুরী ভালোভাবে নেননি। আবার আওয়ামী লীগ মহলে এ কথাও বেশ চাউর আছে যে শারীরিক অসুস্থতার কারণে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলেমেয়েরাই চাননি তিনি প্রার্থী হোন।
চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে মহিউদ্দিন, ছালাম ও নাছির—এই ত্রিপক্ষীয় বিরোধ বহু পুরোনো। তিনজনই মেয়র পদে আগ্রহী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত শিকা ছিঁড়ল নাছিরের ভাগ্যে। আর আবদুচ ছালামকে অারও দুই বছরের জন্য সিডিএ চেয়ারম্যান করে তাঁকে সন্তুষ্ট করা হয়েছে। আর মহিউদ্দিন চৌধুরীর সব পথই কি বন্ধ? এ প্রশ্নের জবাবে এই প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা বলেছেন, সবার সব দিন একভাবে যায় না। তাঁর কথায় মনোবেদনার ছাপ স্পষ্ট।
এখন মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর গড়া প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ব্যস্ত আছেন। সেখানে তাঁর অনুসারীরা আসেন, গল্প করেন, তাঁর আশীর্বাদ নেন; কিন্তু সিটি নির্বাচন নিয়ে একটি কথাও বলেন না। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মনোবেদনা ক্ষোভে পরিণত হয়েছে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের এক চিঠিতে। তিনি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনা নির্মাণে সিডিএর অনুমতি কেন নেওয়া হয়নি, জানতে চেয়েছেন। এর কড়া জবাব দিয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এই চিঠি চালাচালি এবং নীরবতা যদি তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, তার প্রভাব ভোটের বাক্সেও পড়া অসম্ভব নয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

ধন্যবাদ মোদি : মনিষা

ভয়াবহ ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গেই নেপালের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ দিয়েছেন নেপালের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বিপি কৈরালার নাতনি ও বলিউড অভিনেত্রী মনিষা কৈরালা। নেপাল বংশোদ্ভূত এই তারকা দ্রুতই নেপালের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য রোববার কৃতজ্ঞতা পেশ করেন। টিভিতে ভূমিকম্পের খবর দেখে কেঁদে ফেলেন কৈরালা। ভূমিকম্পের মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই নেপালকে সাহায্যের ঘোষণা দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুধু ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি তিনি। দ্রুত সহায়তাও পাঠান বিপর্যয়কবলিত দেশটিকে।
শনিবার সকালে দিল্লির মেট্রো ট্রেনে চেপে রাজধানীর দ্বারকায় একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। এর মধ্যেই ভূমিকম্পের খবর পেয়ে টেলিফোন নিয়ে বসে পড়েন তিনি। প্রথমেই মোদি ফোন করেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালাকে। কৈরালা বিদেশে ছিলেন। তাকে না পেয়ে নেপালের প্রেসিডেন্ট রামবরণ যাদবকে ফোন করেন তিনি। জানান, ভারত দ্রুত সাহায্য পাঠাচ্ছে। পরে কৈরালার সঙ্গেও কথা হয় মোদির। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতীয় বিমানবাহিনীর সি১৩০জে হারকিউলিস বিমান ত্রাণসামগ্রী ও উদ্ধারকারী বাহিনী নিয়ে কাঠমান্ডু রওনা হয়ে যায়। পরে আরও তিনটি বিমান পাঠানো হয়। নেপালে যেসব ভারতীয় পর্যটক আটকা পড়েছে তাদের উদ্ধার করারও নির্দেশ দেন মোদি।

জাপানে এমন ভূমিকম্প সবসময় হয়

হিমালয় অঞ্চলের যে ভূমিকম্প ধ্বংস করে ফেলেছে নেপালকে, তা জাপানে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এজন্য জাপানকে ভূমিকম্পের দেশ বলা হয়। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গড়ে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প জাপানে সবসময় ঘটে। অথচ সেখানে একজন মানুষেরও মৃত্যু হয় না। ধসে পড়ে না একটা ভবনও। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভূগর্ভের গঠন পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে কেঁপে উঠছে পৃথিবী। তার প্রবল ঝাঁকিতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে জনপদ। আর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটি এমন যে, এর কোনো আগাম সংকেত দেয়া যায় না। ভূমিকম্পের পূর্বঘোষণা নেই, আবার প্রতিরোধও নেই। কিন্তু সতর্কতা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতিমুক্ত থাকা যায়। যার উৎকৃষ্ট উদারহণ জাপান। হিমালয় ভূতত্ত্ববিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াদিয়া ইন্সটিটিউট অব হিমালয়ান জিওলোজি’র গবেষক অজয় পাল বলেন, উৎকৃষ্ট নগর পরিকল্পনাই ভূমিকম্প প্রতিরোধের কার্যকর টেকনিক। তিনি বলেন, পরিকল্পনা ও খাপ খাওয়ানোর মাধ্যমে ভূমিকম্পের জন্য আমাদের প্রস্তুত করতে হবে।
আমরা প্রস্তুত থাকলে ৯০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। জাপানের ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প নিয়মিত ঘটনা। অথচ ক্ষয়ক্ষতি হয় না বললেই চলে। এর কারণ ভবনগুলো নির্দিষ্ট ফ্যাশনের ও অভ্যস্ততার সূত্রে ডিজাইনের। সুপরিকল্পিত উপায়ে নগরায়ন ও বসবাস হলে ভূমিকম্প কোনো প্রভাব ফেলবে না। অজয় পাল বলেন, জাপানিদের সঙ্গে আমাদের জ্ঞানের পার্থক্য নেই। আমরা জানি কীভাবে সাজাতে হবে। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের (ইউজিএসজি) ভূমিকম্পবিদ ডেভিড ওয়ালড জানান, ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হবে ভিন্ন ভিন্ন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি ১০ লাখ মানুষে প্রাণ হারাতে পারেন ১০ থেকে ৩০ জন। একই সময়ে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে পাকিস্তান, ভারত, ইরান ও চীনে। অপরিকল্পিত নগরায়নেই বাড়ছে দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি। দ্য নেশন।

ধুলোয় মিশে গেল নেপালের ঐতিহ্য

নান্দনিক মহত্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল হাজার বছরের সাংস্কৃতিক নিদর্শন। বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করছিল আঞ্চলিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। কিন্তু মুহূর্তেই বিধ্বস্ত সেই সমৃদ্ধ রাজ্য। আকাশে উদ্ধত সেই উঁচু মিনার এখন ভূপাতিত। কয়েক সেকেন্ডের তাণ্ডবে ঝুপঝুপিয়ে ঝরে পড়ল সভ্যতার সাক্ষী বহনকারী স্থাপনা। ভূমিকম্প কেবল হাজার হাজার মানুষকে কবরস্থ করেনি, পুঁতে ফেলেছে মানুষের ইতিহাস। রোববার এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত নেপালের ঐতিহাসিক ধর্মীয় মন্দির ও ঐতিহ্যবাহী ভাস্কর্যগুলো একেবারে বিলীন হয়ে গেছে। দেশটির প্রাচীন রাজাদের শাসনামলের স্মৃতি বহন করছিল এসব স্থাপনা। নেপালের ঐতিহাসিক ধারাহারা টাওয়ারটি এখন যেন একটি বেদি। দুর্বার স্কয়ারে ২০০ সর্পিল সিঁড়িবিশিষ্ট ৯ তলা এ টাওয়ারটি দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ।
কিন্তু তা যেন মিশে গেছে মাটির সঙ্গে। এর ধ্বংসস্তূপই হয়েছিল কয়েকশ’ মানুষের মৃত্যুর ফাঁদ। কাঠমান্ডুর দরবার স্কয়ার দেখে আর চেনার উপায় নেই। এতদিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ৫০ মিটার উঁচু ভীমসেন টাওয়ার বা ধারাহারা টাওয়ার, সেখানে খাড়া রয়েছে ১০ মিটারের একটি ভাঙা অংশ। ১৮৩২ সালে তৈরি এ মিনার ৭.৯ রিখটারের ভূমিকম্প বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেনি। অন্তত ২০০ পর্যটক নিয়ে ভেঙে পড়েছে। বহুদিন বন্ধ থাকার পর মাত্র বছর দশেক হল এ মিনার দর্শকদের জন্য ফের খুলে দেয়া হয়েছিল। এখান থেকে কাঠমান্ডু উপত্যকার সৌন্দর্য্য যিনি দেখেছেন তিনি সারা জীবন তা মনে রাখবেন। কাঠমান্ডুরই বসন্তপুর দরবার স্কয়ার এলাকার প্রাচীন মন্দিরগুলোর অবস্থা ভালো নয়। এ অঞ্চলের প্রাচীনতম মন্দিরগুলো ১১ শতাব্দীতে তৈরি বলে দাবি করেন অনেকে। এ মন্দিরগুলো তৈরির কাজ মহারাজ শঙ্করদেবের আমলে তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। অনেকের দাবি শঙ্করদেব নন তার কয়েকশ বছর পর রত্নমল্ল এখানকার মন্দিরগুলো তৈরি করান। এখানকার বিখ্যাত হনুমানধোকা অঞ্চলে এক সময় নেপালের মল্ল ও শাহ বংশীয় রাজাদের বাসভবন ছিল। পরে এ অঞ্চলটির বেশিরভাগ ভবনকেই হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে একাধিক জাদুঘরও। এদিকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনিতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনও স্পষ্ট হওয়া যায়নি। কাঠমান্ডু থেকে ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমের এ স্থানে ২৬০০ বছর আগে বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের ঐতিহাসিক এসব নিদর্শন আর পুরোপুরি মেরামত করা সম্ভব নয়। এর আগে ১৮৩৩ ও ১৯৩৪ সালে দুটো ভয়াবহ ভূমিকম্পে কাঠমান্ডু উপত্যাকার অনেক স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো আজও মেরামত করা সম্ভব হয়নি।

এই ভূমিকম্পই শেষ নয় বড় মাত্রার শংকা সামনে!

হিমালয়কন্যা নেপালকে লণ্ডভণ্ড করে শনিবারের ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পটি গত ৮০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভূমিকম্পই শেষ নয়, এর চেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাতের অপেক্ষায়। শনিবারের ভূমিকম্প একটি বড় ভূমিকম্প, কিন্তু সবচেয়ে বড়টা এখনও সামনে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে রোববার নেশন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ভারতের বিখ্যাত বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট আইআইটির অধ্যাপক শংকর কুমার নাথ দীর্ঘদিন ধরে হিমালয় অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ‘কাঠমান্ডুর ৭.৯ মাত্রার এই ভূমিকম্প ১০ কোটি টন জ্বালানি বিস্ফোরণের মতো শক্তিশালী।’
এর আগে ১৯৩৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিহার ও নেপাল অঞ্চলে ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। আর ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা চীন সীমান্তবর্তী ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। হিমালয় সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ভূগর্ভস্থ দুই বিশাল শক্তিশালী টেকটোনিক প্লেটের মিলনস্থল। ভারতীয় ও ইউরেশীয় নামের এই দুই প্লেটের আন্তঃমিথস্ক্রিয়া, ফাটল ও সংঘর্ষ বড় বড় ভূমিকম্পের সৃষ্টি করছে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে বলছেন ভারতীয় পাথরটি ক্রমশই উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার দিকে সরে যাচ্ছে। আর সেটা ঢুকে যাচ্ছে ইউরেশীয় প্লেটের নিচে। ভূগর্ভস্থ এই দুই প্লেটের রেষারেষির ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমায় ফেলা এটম বোমার থেকেও ৫০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এর ফলেই কেঁপে উঠছে ভূ-অভ্যন্তর।
ভারতের হায়দ্রাবাদভিত্তিক জাতীয় ভূগঠন গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক হারেশ কে গুপ্ত বলেন, এই অঞ্চলের ভূ-অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে যে কোনো সময় ৮ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হতে পারে। আর তা চলতে পারে ধারাবাহিক। তিন বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে ভূ-পদার্থবিদদের এক বার্ষিক সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, হিমালয় ও প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্পের আশংকা বাড়ছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, কাছাকাছি সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ওই সম্মেলনে সারা বিশ্বের প্রায় ২০ হাজার ভূ-পদার্থবিদ ও বিজ্ঞানী অংশ নিয়েছিলেন। তাই বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলেন বড় ভূমিকম্প আঘাতের আশংকাই সত্য হয়ে দাঁড়াবে।

রাশি রাশি প্রতিশ্রুতি আর আইনি বাস্তবতা by আলী ইমাম মজুমদার

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ আর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন দ্বারপ্রান্তে। জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন সিটি মেয়র ও কাউন্সিলর পদগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীরা। উদ্দেশ্য একটাই—ভোটারদের সপক্ষে এনে জয়লাভ। কোনো কোনো প্রার্থী এসব প্রতিশ্রুতি আবার ইশতেহার আকারেও প্রকাশ করছেন। জনজীবনের বহু সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার রয়েছে সেসব ইশতেহারে। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর সমস্যা বহুলাংশে দূর হবে। তাই নির্বাচনী প্রচার অভিযানে এগুলোর মূল্য আছে। এসব অঙ্গীকারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ভোটারদের অনেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। তবে সবাই নন। কেউ কেউ হয়তো-বা সিদ্ধান্ত নেবেন প্রার্থীদের অতীত, তাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা দলীয় আনুগত্য বিবেচনায়। তাহলেও এসব বিচ্ছিন্ন প্রতিশ্রুতি কিংবা এর সমন্বিত রূপ নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়টি উপেক্ষণীয় নয়।
এসব নির্বাচনী অঙ্গীকারের ভিত্তিতে যাঁরা ভোট দেবেন, তাঁদের প্রত্যাশা থাকবে, নির্বাচিত হলে সেই প্রার্থী এগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করবেন। যাঁরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তাঁদের ভাবনাও একই রকম হওয়ার কথা। যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের ভোট নিলেন, তা বাস্তবায়ন করা নির্বাচিত ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিশ্রুতিকে ভোটার ও নির্বাচন প্রার্থীর মধ্যে একটি পবিত্র চুক্তি বললেও অত্যুক্তি হবে না। তবে যেসব প্রতিশ্রুতির বিবরণ খবরের কাগজে দেখা যায়, নির্বাচিত হলেও সেগুলো বাস্তবায়ন তাঁদের দ্বারা কতটুকু সম্ভব, এটি প্রার্থীরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এমনটি তো মনে হয় না। জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দল কিংবা প্রার্থীর পক্ষ থেকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, নির্বাচিত প্রার্থীদের পক্ষে তা বাস্তবায়ন সিটি করপোরেশনের চেয়ে অনেকাংশে সহজ। কেননা, সেখানে আইনি বাধা থাকলেও আইন পরিবর্তনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদে রয়েছে। আর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই যেহেতু সরকার গঠন করে, তাদের পক্ষে এ বাধা অনতিক্রম্য নয়। আর্থিক কিংবা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হয়তো-বা সম্ভব হয় না। সেগুলো ভোটাররা মেনে নেন। সদিচ্ছার অভাবেও বেশ কিছু অঙ্গীকার পূরণ করা হয় না। এ সম্পর্কে ক্ষুব্ধ থাকেন ভোটদাতা জনগণ।
তবে সিটি করপোরেশন আইন দ্বারা গঠিত সংস্থাবিশেষ। তাদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব আইনে নির্ধারিত। করারোপের ক্ষমতাও সীমিত। সেখানে তারা চাইলেও অনেক কিছুই তাদের এখতিয়ারের বাইরে থাকে। শুধু দেনদরবার করতে পারে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে। রাজনৈতিক অনুকূল পরিবেশে থাকলে প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হতে পারে। এতেও তেমন কিছু ফল দেয় না, এমনটা আমরা নিকট অতীতে অখণ্ড ঢাকা সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে দেখেছি। সে ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি দেওয়া কিংবা সেগুলো ইশতেহার আকারে প্রকাশে প্রার্থীদের সতর্ক হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি বিতরণব্যবস্থায় এ করপোরেশনগুলোর কোনোই এখতিয়ার নেই। ভিন্ন ভিন্ন আইন ও বিধি দ্বারা এগুলো পরিচালিত। অথচ প্রার্থীদের অনেকেই এসব সমস্যা সমাধানের ঢালাও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিষয়গুলোর নগরজীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বটে। এগুলোর সমাধানও সবাই চান। তা সমাধান করতে কারও না কারও এগিয়ে আসাও সংগত। তবে সিটি মেয়র ও কাউন্সিলরদের এ ক্ষেত্রে বিরাজমান আইনি পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কোনো অবদান রাখার সুযোগ নেই। তেমনি বড় কোনো সুযোগ নেই যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখার। রাস্তাঘাট মেরামত ও আবর্জনা দূরীভূত করে তাঁরা এতে প্রান্তিক পর্যায়ে অবদান রাখতে পারেন। উল্লেখ্য, যন্ত্রচালিত যানবাহন রেজিস্ট্রেশন ও চলাচলব্যবস্থা আইনে বিআরটিএ আর মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতায় রয়েছে। ইমারত নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা রাজউক কিংবা সিডিএর। তারা যথাযথ পার্কিং-সুবিধা ছাড়াই অথবা কাগুজে ব্যবস্থা রেখে বড় ধরনের যানজটের কারণ ঘটাচ্ছে। এ সংস্থাগুলোও সিটি করপোরেশনের আওতায় নেই। কেউ কেউ ঢাকা মহানগরকে হরতালমুক্ত রাখার বিষয়েও অঙ্গীকার করছেন। প্রতিশ্রুতিটি সম্পূর্ণ সমর্থনযোগ্য হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তা ব্যতিরেকে এটা করা আদৌ সম্ভব কি না, ভেবে দেখার বিষয়। আবার কেউ-বা বলছেন মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নগর গড়ে তুলবেন। এ দুটো বিষয়ে কোনো আইনেই সিটি করপোরেশনের কোনো ভূমিকা নেই।
তাহলে আমরা বিবেচ্য নির্বাচনকালে আসা এসব প্রতিশ্রুতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করতে পারি? সমস্যা যেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো আশু সমাধানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো বিতর্ক নেই। সবাই চান সমাধান। নিশ্চয়ই চাইবেন ভোটপ্রত্যাশীরাও। তবে এগুলোর সমাধান সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত নয়। এটা জানা দরকার ভোটারদের। আর নির্বাচন প্রার্থীদের তো বটেই। এগুলোকে আমরা তাঁদের পবিত্র ইচ্ছারূপে দেখতে চাই। আর দেখতে চাই এসব সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশনগুলোর আইনে তাদের ক্ষমতায়ন করা হোক। অপরিকল্পিতভাবে সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করার আগে যেগুলো আছে, সেগুলো কার্যকর করা আবশ্যক। নগর-পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ আর ট্রাফিক-ব্যবস্থা নগরবাসীর নিত্যদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই এর সব ও পূর্ণ ক্ষমতা সিটি করপোরেশনগুলোরই থাকা উচিত। আইনকানুনের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধন করে এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে করপোরেশনগুলোর আওতায় আনার প্রস্তাব যৌক্তিক। এসব বিষয় নিয়ে নগর সরকারের ধারণা এসেছে। সমন্বয়ের প্রয়োজনে এ ধরনের কাজে নতুন কোনো সংস্থা চাপিয়ে দেওয়া সমস্যাকে আরও জটিল করবে। নির্বাচিত সিটি করপোরেশনগুলোর হাতে এ দায়িত্ব দেওয়া সব বিবেচনাতেই সংগত। উল্লেখ্য, আমাদের দেশের সব কটি সিটি করপোরেশনের আয়তন, জনসংখ্যা, সম্পদ ও অবকাঠামো এক রূপ নয়। তাই সূচনাতে ঢাকার দুটো এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে নিয়ে দেশের রাজধানী ও বাণিজ্যিক রাজধানীতে এ ধরনের নগর সরকার চালুর ভাবনা এখন সময়ের দাবি। এ করপোরেশনগুলোর প্রতিটিতে বসবাসকারী জনসংখ্যা পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। তাই কেন্দ্রীভূত প্রশাসনের ধারণা থেকে প্রকৃত প্রস্তাবে বেরিয়ে আসা দেশের শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সবকিছুরই সহায়ক হবে। এতে রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্র বিনষ্ট কিংবা সরকারের মৌলিক নিয়ন্ত্রণে বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা আদৌ নেই। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নগর গড়ার মতো দায়িত্ব এই মুহূর্তেই নগর সরকারের কাছে দেওয়া হয়তো-বা সম্ভব হবে না। তবে তারা জনমত সংগঠিত করে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করতে পারে। ওই সংস্থাগুলোর এ বিষয়ে শৈথিল্য কিংবা যোগসাজশ থাকলে আনতে পারে সরকারের নজরে। করপোরেশনগুলোর সম্পদে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাদের অনুদাননির্ভর না রেখে সম্পদ সংগ্রহের জন্য বাস্তব ও ন্যায়সংগত আইনি ব্যবস্থাও সরকারকে করে দিতে হবে। পাশাপাশি সস্তা জনপ্রিয়তার হাতছানি উপেক্ষা করে ন্যায্য করারোপ ও আদায়ে তাদের উদ্যোগী হওয়ারও আবশ্যকতা থাকবে।
নগর সরকারের বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দলেরই অঙ্গীকার নেই। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার তাদের আছে বটে; তবে বাস্তবে তারা করে চলে উল্টোটা। তা না হলে বিস্তৃত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা বহাল থাকতে সব সরকারের সময়েই প্রত্যেক সাংসদের বরাবরে বছর বছর কয়েক কোটি টাকা করে পূর্ত কাজের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা হতো না। আর এসব বিবেচনায় রেখে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তাঁদের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা আর ইশতেহার তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। তাঁরা তা কতটুকু করেছেন, এ বিষয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। সরলমনা ভোটারদের কাছে চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হবেন। পরে সূচনাতেই হোঁচট খাবেন এসব বিষয়ে। ‘বুদ্ধিমানেরা’ হয়তো প্রতিশ্রুতির ধারেকাছেও যাবেন না। যাঁরা যাবেন, তাঁরা শেষতক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা এরূপ কিছু একটা অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার গ্লানি ঢাকতে চাইবেন। এমনটা হওয়া আদৌ সংগত নয়। সিটি করপোরেশনগুলোর প্রকৃত ক্ষমতায়নের দাবি যৌক্তিক। যাঁরা নির্বাচিত হবেন, তাঁরাই দলমত-নির্বিশেষে এ দাবির সঙ্গে সুর মেলানোর প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি যে ক্ষমতা এখন তাঁদের নেই, সে বিষয়ে কোনো কার্যক্রম গ্রহণের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেওয়াও যেকোনো প্রার্থীর জন্য অসংগত ও অনৈতিক।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

রাজপথে খালেদার বিচার! by আসিফ নজরুল


প্রথমে কিছুটা রাখঢাক ছিল। এখন তাও নেই। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে তৃতীয় দফা হামলাকালে সরাসরি অংশ নিয়েছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। তৃতীয় দফা হামলা হয় সরাসরি খালেদা জিয়ার গাড়ির ওপরই। গাড়িতে তাঁর ঠিক পেছনের সারির পাশের জানালা ভেঙে যায়। এলোপাতাড়ি লাঠি, ঢিল আর কোমরে অস্ত্র নিয়ে এ রকম হামলা অব্যাহত থাকলে খালেদা জিয়া নিজেও আহত হতে পারেন।
খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে তিন দফা হামলায় তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা বেধড়ক মারের শিকার হয়েছেন, কেউ কেউ রক্তাক্ত হয়েছেন। হামলাকারীরা কখনো জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে, কখনো ছাত্রলীগের ঘাঁটির ঘোষণা দিয়ে আক্রমণ করেছে। হামলাকারীদের ছবিতে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা গেছে, বুধবারের হামলায় অংশ নেওয়া ছাত্রলীগের নেতাদের নাম-পরিচয় পর্যন্ত পত্রিকায় এসেছে। এ ধরনের হামলা দেশের ফৌজদারি আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ এবং দেশের নির্বাচনী আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। যেকোনো সভ্য দেশে এ জন্য হামলাকারীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করত, নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার জন্য পুলিশের কাছে জবাবদিহি দাবি করা হতো। এ দেশে তা হয়নি, হবেও না। বরং হামলাকারীরা নিজেরাই মামলা দিয়েছেন হামলার শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, এই সুযোগে এখন পুলিশকে দিয়ে গ্রেপ্তার ও হয়রানিও করা যাবে বিএনপির নেতা-কর্মীদের।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, একাধিকবার ছিলেন সংসদে বিরোধী দলের নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রচারণার পরও বহু মানুষ বিশ্বাস করে তিনি এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুজন নেতার একজন। তাঁর বা অন্য নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর যেকোনো হামলাকে বহু দলনিরপেক্ষ মানুষও নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। তাঁর ওপর এ ধরনের অব্যাহত হামলা শুধু অপরাধমূলক বা চরম শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ নয়, এটি নির্বাচনী কৌশলের দিক দিয়েও আওয়ামী লীগের জন্য বুমেরাং হতে পারে। এই হামলায় জনমত প্রভাবিত হতে পারে, দেশে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সরকারের ইমেজ আরও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সুস্থ রাজনীতির পুনঃপ্রবাহের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা এসব হামলার ঘটনায় ইতিমধ্যে কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। বিএনপির কর্মীরা এখন পোলিং এজেন্ট হতে বা কেন্দ্রে ঠিকমতো দায়িত্ব পালনে ভীতসন্ত্রস্ত হতে পারেন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এতে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, তারপরও একের পর এক হামলা কেন চালানো হচ্ছে?
খালেদা জিয়ার ওপর অব্যাহত হামলার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে দুটো। এক. তাঁকে নির্বাচনী প্রচারাভিযান থেকে বিরত রাখা। দুই. বিএনপিকে নির্বাচন বর্জন করতে প্ররোচিত করা। খালেদা জিয়া সরকার বা সংসদে বিরোধী দলের কেউ না বলে নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সুযোগ পাচ্ছেন, যা প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা পাচ্ছেন না। প্রচারাভিযানে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত উপস্থিতি বহু ভোটারকে প্রভাবিত করতে পারে, এই আশঙ্কা সরকারের মধ্যে থাকতে পারে। এ জন্য তাঁর ওপর হামলা করে তাঁকে বিরত রাখার চিন্তাও তাঁদের মধ্যে থাকতে পারে। যদি সে ধরনের মানসিকতা থেকে হামলাগুলো হয়ে থাকে, তাহলে তা অসুস্থ, অন্যায় ও অশুভ। শক্তি প্রয়োগ করে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঢাল ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীকে স্তব্ধ করার চেষ্টা চরমভাবে অগণতান্ত্রিক।
২....
খালেদা জিয়ার ওপর হামলার আগে প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছিলেন, খালেদা নির্বাচনী অভিযানে বের হলে জিজ্ঞেস করবেন, তিনি কেন মানুষ পোড়ানোর আদেশ দিয়েছিলেন। এ ধরনের প্রশ্ন করার অধিকার যেকোনো মানুষের আছে, এ ধরনের আহ্বানও প্রধানমন্ত্রী করতে পারেন। কিন্তু এটি অর্থবহ করতে হলে আগে মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে খালেদা জিয়া নিজে পেট্রলবোমা মারার নির্দেশ দিয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রচারিত খালেদা জিয়ার কোনো বক্তৃতা-বিবৃতিতে এ ধরনের নির্দেশ দিতে দেখা যায়নি। তিনি ৫ জানুয়ারি-পরবর্তী সময়ে পুলিশ প্রহরায় অবরুদ্ধ ছিলেন বলে বাইরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথা বলার কোনো সুযোগও ছিল না। তিনি কি তাহলে ফোনে বা ইন্টারনেটে এ ধরনের কোনো নির্দেশ দিয়েছিলেন? তিনি যদি তা করে থাকেন, সরকারের কাছে অবশ্যই তার রেকর্ড থাকার কথা। যদি সরকারের কাছে এমন রেকর্ড থাকে, তাহলে গণমাধ্যমে তা প্রচার হওয়ার কথা। আমরা এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো গণমাধ্যমেও পাইনি, আইন-আদালতে দাখিল করার কথাও শুনিনি।
গণমাধ্যমে সরকারি দলের নেতারা ও কিছু আলোচক বলে থাকেন যে বিরোধী দলের কর্মসূচিকালে পেট্রলবোমার প্রয়োগ হয়েছে বলে এই দায়দায়িত্ব তাদের বা আরও সুনির্দিষ্ট করলে খালেদা জিয়ার। তাঁদের এই বক্তব্য সঠিক হতে পারে। কিন্তু তাহলে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি চলাকালে বা তারা বিরোধী দলে থাকাকালে লগি-বইঠা, গানপাউডার আর বোমার আঘাতে যেসব প্রাণহানি ঘটেছে, তার দায়দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নেত্রীর ওপর বর্তাবে। বর্তমান সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যেসব গুম ও ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ঘটেছে, তার দায়দায়িত্বও সরকারপ্রধানের ওপর বর্তাবে। আগের আমলের ক্রসফায়ারের জন্য একইভাবে দায়ী হবেন বিএনপির নেত্রী।
১৯৯০ সালের পর বহু প্রাণহানির ঘটনার জন্য তাহলে জনগণের অধিকার থাকবে দুই নেত্রীর কাছে জবাব চাওয়ার। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ ধরনের জবাবদিহির একটি মাত্র সুযোগই আমরা সৃষ্টি করেছি। তা হচ্ছে নির্বাচন। গত চার মাসে সরকার অক্লান্তভাবে নাশকতা ও পেট্রলবোমার জন্য খালেদা ও বিএনপিকে দায়ী করেছে। এখনো নাহয় তা অব্যাহত থাকুক! কিন্তু বিচারের দায়িত্ব জনগণের নির্বাচনী সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হোক, ছাত্রলীগ-যুবলীগের পিস্তল-লাঠি আর পেশিশক্তির ওপর না। প্রয়োজনে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে পেট্রলবোমার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। কিন্তু সেটি যেন হয় ন্যায়বিচার, আরোপিত বিচার নয়।
যিনি বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাঁর বিচার রাস্তাঘাটে হতে পারে না। অশ্লীল গালাগালি করে লাঠি হাতে তাঁর দিকে মারমুখী হয়ে ছুটে যেতে পারে না ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগ। এসব ঘটনা আর ছবি মানুষকে শুধু আওয়ামী লীগ না, গোটা রাজনীতির ওপরই বিদ্বিষ্ট করে তুলতে পারে।
৩....
ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি পরিদর্শনে ১৭ কূটনীতিক
রাজনীতি সব সময় পরিচ্ছন্ন কোনো প্রতিযোগিতা নয়। গণতন্ত্র সব সময় শালীন নয়। বহু বছর আগে স্যামুয়েল হান্টিংটন যৌথভাবে ক্রাইসিস অব ডেমোক্রেসি নামক রিপোর্টে আমেরিকা ও ইউরোপের উন্নত গণতন্ত্রের অনেক সংকটকে চিহ্নিত করেছিলেন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এই সংকট দিনে দিনে আরও তীব্র হয়েছে। গত কয়েক বছরে এসব অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়া ও তিউনিসিয়ার মতো কয়েকটি দেশ বাদে অন্য সব অঞ্চলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে, নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, বিরোধী দলের প্রতি সহনশীলতা হ্রাস পেয়েছে।
আমাদের এই অঞ্চলে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবনতি ঘটেছে, শ্রীলঙ্কায় ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিরোধী দলের ওপর চরম নিপীড়ন হয়েছে, মালদ্বীপে একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর ভিন্নমতের ওপর রাষ্ট্রীয় খড়্গ নেমে এসেছে। বাংলাদেশ যে বহু প্রতিবন্ধকতার পরও ১৯৯০ সালের পর অব্যাহতভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এ দেশে একটি মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংস্কৃতি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের পর আমাদের গণতন্ত্র মারাত্মক হোঁচট খেয়েছে। তার প্রতিফলন শুধু দেশের অর্থনীতি নয়, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের ওপর পড়েছে।
এ দেশে এখন নারকীয় পেট্রলবোমা প্রতিবাদের ভাষা হয়েছে, বিরোধী দলের নেতার গুম হওয়া সহনীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে, জবাবদিহির জন্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উল্টো ক্ষমতাসীনদের নিপীড়ন-নির্যাতনের সহযোগী হয়েছে, মিথ্যাচার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নামতে নামতে আমরা যদি এমন এক জায়গায় চলে যাই যে রাস্তাঘাটে সরকারি দলের পান্ডারা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে অনবরত আক্রমণ করতে পারবে, তাহলে এ দেশে গণতন্ত্র পুরোপুরিই বিপন্ন হয়ে যাবে একসময়। সামাজিক সম্প্রীতি ও শিষ্টাচারবোধও হবে বিপর্যস্ত।
বাংলাদেশের যেকোনো গণতান্ত্রিক শক্তির উচিত খালেদা জিয়ার ওপর অব্যাহত হামলার তীব্র প্রতিবাদ করা। বিরোধী দলের আন্দোলনকালে নাশকতার জন্য যাঁরা তাঁর সুষ্ঠু বিচার বাঞ্ছনীয় বলে মনে করেন, তাঁরা অবশ্যই তা মনে করতে পারেন। কিন্তু তাঁদেরও উচিত তাঁর বিরুদ্ধে রাজপথে বর্বরতার নিন্দা জানানো। রাজপথে কোনো মানুষের ওপরই প্রকাশ্যে হামলা করার অধিকার কারও নেই।
আশার কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা খালেদা জিয়ার ওপর হামলায় তাঁদের অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের মনে রাখতে হবে, এই হামলা শুধু বন্ধ করা না, এর বিচার করার দায়িত্বও তাঁদের।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নীরব প্রতিশোধ নেয়ার আহ্বান

সিটি নির্বাচনে ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসীকে সরকারের অপকর্ম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে নীরব প্রতিশোধ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বলেছেন, ২৮শে এপ্রিল মঙ্গলবার নীরব প্রতিশোধ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনাদের ভোট অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বিরাট শক্তি। সঠিকভাবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করুন। নীরব বিপ্লব ঘটান। আপনার ভোট হোক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভোট। আপনারা কেউ ভয় পাবেন না। অনিয়ম ও কারচুপি দেখলে সবাই মিলে প্রতিবাদ করবেন। ভোট শেষে বিকাল থেকে ভোটকেন্দ্রে পাহারা বসাবার জন্য আমি নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। গণনা শেষে ফলাফল বুঝে নিয়ে আপনারা কেন্দ্র ত্যাগ করবেন। যাতে আপনাদের দেয়া রায় ওরা বদলে ফেলতে না পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে খালেদা জিয়া বলেন, আপনি বিনা ভোটে রাজকীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। এই দম্ভ ত্যাগ করুন। মনে রাখবেন, সবদিন সমান যায় না। এ পর্যন্ত যাই করেছেন, ৩টি সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হতে দিন। রাষ্ট্রক্ষমতা আপনার কাছে বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার মতো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। আপনি নামতে ভয় পাচ্ছেন। আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আপনার মতো প্রতিশোধপ্রবণ নই। উগ্র স্বভাব ও জিঘাংসার মনোবৃত্তি বদলান। গণতন্ত্র ও সংলাপের পথে আসুন। আমরা আপনাকে সহি সালামতে নিরাপদে নামতে সাহায্য করবো এবং একই সমতলে দাঁড়িয়ে নির্বাচন করবো। মানুষ যাকে খুশি বেছে নেবে। আসুন, সেই পথটা অন্তত খুলে দেই। সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে কেন সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তার কারণ ব্যাখ্যা করেন। সেই সঙ্গে বিচারিক ক্ষমতাসহ ভোটের দিন সশস্ত্র বাহিনীকে নির্বাচনী এলাকাজুড়ে মোতায়েনের দাবি জানান। সিটি নির্বাচন ও সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গতকাল দুপুরে নিজের গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
নীরব প্রতিশোধ নিন, নীরব বিপ্লব ঘটান
খালেদা জিয়া ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসীর উদ্দেশে বলেন, মনে রাখবেন- দেশের সম্পদ লুটপাট, আপনাদের রক্ত শুষে এরা টাকার পাহাড় গড়েছে। কাজেই এরা যে টাকা বিলাচ্ছে, সেটা আপনাদেরই টাকা। ওদের কাছ থেকে এ টাকা নিলেও ভোট বিক্রি করবেন না। টাকা নেবেন কিন্তু বিবেক অনুযায়ী ভোট দেবেন। কারণ, ভোট বিক্রি আর ঈমান বিক্রি একই কথা। আওয়ামী লীগ যেভাবে উগ্র-সন্ত্রাসী ও দাম্ভিক হয়ে উঠেছে কোনভাবে এই তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফল কেড়ে নিতে পারলে তারা আপনাদেরকে আর মানুষ বলেই গণ্য করবে না। জোর করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে গেলে মা-বোনেরা নিরাপদে থাকতে পারবেন না। ব্যবসায়ীরা ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারবেন না। প্রবীণ ও সম্মানিত নাগরিকদের সম্মান থাকবে না। তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা আরও বিপথগামী হবে। শিক্ষাঙ্গন আরও কলুষিত ও সন্ত্রাসকবলিত হবে। খালেদা জিয়া বলেন, এবার নিজেদের স্বার্থেই বুঝে-শুনে ভোট দিতে হবে এবং ভোটের ফল বুঝে নিতে হবে। আমি নগরবাসীর প্রতি আবেদন রাখছি, আপনারা দয়া করে ঢাকা দক্ষিণে আমাদের সমর্থিত প্রার্থী  মির্জা আব্বাসকে মগ মার্কায়, ঢাকা উত্তরে তাবিদ আউয়ালকে বাস মার্কায় এবং চট্টগ্রামে মনজুর আলমকে কমলালেবু মার্কায় ভোট দিন। কাউন্সিলর ও মহিলা কাউন্সিলর পদেও আমাদের সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিন। আপনার ভোট হোক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভোট। আমরা মিথ্যা ও অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দেয়ার পক্ষে নই। শুধু বলবো, আপনি দয়া করে পরিবর্তনের পক্ষে, স্বস্তির পক্ষে, শান্তির পক্ষে আপনার ভোটটি দিন। গুণ্ডামি, সন্ত্রাস, অপমানের বিরুদ্ধে ভোট দিন। মা-বোনের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য ভোট দিন। ভোট শেষে বিকাল থেকে ভোটকেন্দ্রে পাহারা বসাবার জন্য আমি নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। গণনা শেষে ফলাফল বুঝে নিয়ে আপনারা কেন্দ্র ত্যাগ করবেন। ভোটের দিন এবং এর পরে কোন উস্কানির ফাঁদে পা না দেয়ার এবং কোন গুজবে কান না দেয়ার জন্য আমি অনুরোধ করছি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তার ফলাফল মেনে নেয়ার জন্যও আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ভোট গ্রহণ, গণনা, ফল ঘোষণা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় যারা নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন তাদের সকলের প্রতি আমার অনুরোধ, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব পালন করবেন। কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবেন না।
যে ৭ কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ
খালেদা জিয়া বলেন, আমাদের আন্দোলন চলাকালে আকস্মিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ৩টি সিটিতে তার মনোনীত মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন। তারা হয়তো ভেবেছিল, সর্বব্যাপী আক্রমণে পর্যুদস্ত বিএনপি সিটি নির্বাচন থেকে দূরে থাকবে। এখন নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে সে সন্দেহ দেশবাসীর মতো আমাদেরও ছিল এবং আছে। তা সত্ত্বেও আমরা ৭টি কারণে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। কারণগুলো হচ্ছে- ১. জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের দাবি করেছি, স্থানীয় নির্বাচনে নয়। ২. দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে ২০দলীয় জোট অংশ নিয়ে সবগুলো সিটিতে বিপুল ভোটে জিতেছে। জনগণের বিপুল সমর্থন যে বিএনপি ও ২০দলীয় জোটের প্রতি রয়েছে, তা সবগুলো নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৩. সভা-সমাবেশসহ সকল গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনগণের কাছে যাবার সুযোগ আমাদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সীমিত আকারে হলেও সে সুযোগ আমরা নিতে চেয়েছি। ৪. একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে সকল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থায় আমরা বিশ্বাস করি। জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছি। ৫. একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংসদীয় পদ্ধতি ও  জনগণের সরাসরি ভোটে সিটি করপোরেশনে মেয়র নির্বাচনের ব্যবস্থাও বিএনপিই করেছে। তাই সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকাটাই বিএনপি যুক্তিসঙ্গত মনে করেছে। ৬. জনগণের ওপর আমাদের অটুট আস্থা রয়েছে বলে মনে করি, মানুষ সুযোগ পেলেই আমাদের সমর্থিত প্রার্থীদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে। ৭. এই নির্বাচনকে আমরা সরকার, শাসক দল, নির্বাচন কমিশন, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি টেস্ট কেস হিসেবেও নিয়েছি। তিনি বলেন, এটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কোন পরিবর্তন হবে না। কারচুপির মাধ্যমে তারা জনগণের রায় বদলালে আবারও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে, এদের অধীনে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবান্তর।
যে কারণে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দেবেন
ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসীর উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ক্ষমতাসীনরা ৫ই জানুয়ারি আপনাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। আপনারা ভোট কেন্দ্রে না গেলেও ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে হিসাব দিয়ে আপনাদের অপমান করেছে। ভোট ছাড়াই জনগণের ভুয়া প্রতিনিধি সেজেছে। শেয়ারবাজার লুট করে আপনাদের ফতুর করেছে। কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎখাত থেকে বেশুমার অর্থ লুটেছে। পদ্মা সেতুর টাকা চুরি করেছে। দফায় দফায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। ব্যাংকগুলো লুটে খেয়েছে। মানুষের রক্ত শুষে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে। খালেদা জিয়া বলেন, এরা আপনার সন্তান ও ভাইদের গুম, খুন, অপহরণ করে পথেঘাটে লাশ ফেলে রেখেছে। বহু মায়ের কোল খালি, অনেক বধূকে স্বামীহারা, মাকে সন্তানহারা, বোনকে ভাইহারা করেছে। রক্তপিপাসু এই শাসকদের হত্যা-নির্যাতনে ঘরে ঘরে আজ কান্নার রোল। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ঢাকা নগরীকে দ্বিখণ্ডিত করেছে কিন্তু সেবাখাতে সমন্বয়ের কোন ব্যবস্থা করেনি। নির্বাচন ছাড়াই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বসিয়ে শোষণ ও দুর্নীতি করেছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের মিথ্যা মামলায় আটক এবং তাদেরকে বহিষ্কার করে সারা দেশের ভোটারদের অপমান করেছে। খালেদা জিয়া বলেন, এরা বসবাসের অনুপযোগী করে ফেলেছে এই রাজধানীকে। নাগরিক সেবার কোন ব্যবস্থা না করে বড় বড় প্রকল্পের নামে নিজেদের পকেট ভারী করেছে কমিশনের টাকায়। মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়ে তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে। তিনি বলেন, রানা প্লাজা বিপর্যয়ে এ সরকার বহু শ্রমজীবী মানুষের জীবন নিয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকা সংগ্রহ করে তা দেয়নি। ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকারী গার্মেন্ট শ্রমিককে হত্যা ও নির্যাতন করেছে। খালেদা জিয়া বলেন, রাজধানী ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে রাতের অন্ধকারে হামলা করে এতিম ও আলেমদের রক্ত নিয়েছে। এরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন করেছে। তাদের মন্দিরের প্রতিমার স্বর্ণালংকার ও অর্থ লুট করেছে। পরিকল্পিত পন্থায় দাঙ্গা বাধিয়ে রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মন্দির ধ্বংস করেছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া সারা দেশের মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করেছে। সম্মানিত নাগরিকদের অপমান করেছে। খালেদা জিয়া বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক দখল করে নিয়ে গেছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। নিত্যপণ্যের দামের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবন দুর্বিষহ করেছে। জনগণকে দেয়া প্রতিটি ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। খালেদা জিয়া বলেন, দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, জুলুম ও দলীয়করণে প্রতিটি স্তরের মানুষকে এ সরকার অতিষ্ঠ করে তুলেছে। নারীর সম্ভ্রমহানি ও লাঞ্ছনায় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। সিটি করপোরেশনসহ সকল ঠিকাদারি কাজে টেন্ডার ডাকাতির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারসমূহকে  ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে। আড়াল করেছে প্রকৃত অপরাধীদের। এদের মদতে নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব কর্মকর্তারা ১১ খুনের পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়েছে। বিদেশী অতিথিদের দেয়া স্বর্ণপদকের সোনাও চুরি করে সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করেছে।
সরকারের সব হিসাব উল্টে গেছে
খালেদা জিয়া বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে এই নগরীতে ক’দিন জনসংযোগে নেমে জনগণের যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস দেখেছি, তাতে আমি অভিভূত। মানুষ উদ্বেলিত। পরিবর্তন কামনায় অধীর। আমি যেদিকেই গিয়েছি, বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মতো মানুষ নেমে এসেছে উচ্ছ্বসিত হয়ে, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে। এই গণজোয়ার দেখে আওয়ামী লীগ দিশাহারা হয়ে পড়েছে। তাদের সব হিসাবনিকাশ পাল্টে গেছে। তিনি বলেন, আমার হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, কামান-বন্দুক নেই, পুলিশ-র‌্যাব-বিজিপি-আনসার নেই। কোন বাহিনী বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী নেই। আমার আছে শুধু আল্লাহ্‌র ওপর ভরসা আর দেশবাসীর সমর্থন ও দোয়া। এর উপর নির্ভর করেই আমি রাজপথে নেমেছি। জনগণের কাছে যাচ্ছি। খালেদা জিয়া বলেন, এতে এতো ভয় পাবার কী আছে? কিন্তু তারা ভয় পেয়েছে। এতদিন তারা প্রচার করতো, আমি নাকি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। বিএনপি ও ২০ দলের কোন জনসমর্থন নেই। কিন্তু আমি জনসংযোগে নামতেই যে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে, তাতে তাদের এতো দিনকার সব প্রচারণা মিথ্যে হয়ে গেছে।
অল্পের জন্য বেঁচে গেছি
খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে আমার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়েছেন। প্রকাশ্যে হাজারো মানুষের সামনে ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে উত্তরা, কাওরানবাজার, ফকিরেরপুলের কাছে ও বাংলামোটরে আমার গাড়িবহরে পরপর চারদিন হামলা করেছে। হামলায় আমার উপদেষ্টা ও পুলিশের সাবেক আইজি আবদুল  কাইয়ুম, ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, আমার দুজন নিরাপত্তা রক্ষীসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও নেতা-কর্মী আহত হয়েছে। পুলিশের সহযোগিতায় হামলায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেয়। সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আমি যে-পাশে বসা ছিলাম, সেই পাশেই গাড়ির জানালার কাঁচে গুলি লাগে। এতে গ্লাস ভেদ না করলেও তা ফেটে যায়। আল্লাহর রহমতে অল্পের জন্য আমার জীবন রক্ষা পায়। এটা যে আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সুপরিকল্পিত হামলা ছিল, তাতে কোন  সন্দেহ নেই। খালেদা জিয়া বলেন, প্র্রতিটি হামলার ঘটনাই প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সরাসরি উসকানির ফল এবং সুপরিকল্পিত। এসব হামলায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অংশ নেয়। সংবাদপত্রে ও টেলিভিশনের সচিত্র প্রতিবেদনে হামলাকারীদের অনেকের চেহারা স্পষ্ট। অনেকের নামধাম ও সাংগঠনিক পরিচয় আপনাদের রিপোর্টেই তুলে ধরা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা কেউ কেউ সাংবাদিকদের কাছে হামলায় অংশ নেয়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছে। ফকিরেরপুলের কাছে আমার গাড়িবহরে হামলার সময় ঢাকা দক্ষিণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী নিজে উপস্থিত ছিলেন। কাওরানবাজারে আমার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সশস্ত্র হামলায় অংশগ্রহণকারীদের কয়েকজনকে ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পাশে থেকে তার পক্ষে প্রচার চালাতে দেখা গেছে। এই হামলাকারীদের কাউকে কাউকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পুলিশের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পাশে ছবিতে দেখা গেছে। আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বারবার হামলা চালানো সত্ত্বেও  একজন সন্ত্রাসীকেও এখন পর্যন্ত ধরা হয়নি। বরং যারা আক্রান্ত ও আহত হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেই মামলা নেয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হচ্ছে আমাদের সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের। আটক করা এবং হুমকি দেয়া হচ্ছে বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের। কিন্তু ধারাবাহিক এসব হামলা ও নির্বাচনী প্রচার কাজে বাধা দেয়ার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন কোন পদক্ষেপ নেয়া দূরে থাকুক; টু-শব্দটি পর্যন্ত করেনি। আমার প্রাণনাশের লক্ষ্যে দলীয় সন্ত্রাসীদের হামলার পর প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনাকে যেভাবে ‘নাটক’ আখ্যা দিয়েছেন এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। আমি বুঝতে পারছি, এর কোন বিচার হবে না। খালেদা জিয়া বলেন, জীবন-মৃত্যুর মালিক আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন। তিনি রক্ষা করলে আমাকে কেউ হত্যা করতে পারবে না। বিশেষ করে ঢাকাবাসীকে বলবো, আপনারা দেখছেন, ক্ষমতার দম্ভে আমার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হচ্ছে! আমার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশকে ভালবেসে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। অল্প কিছুদিন আগে আমি আমার আদরের ছোট ছেলেটিকে চিরকালের জন্য হারিয়েছি। আমার একমাত্র জীবিত সন্তানটি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে দূরদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছে। জীবনের এই প্রান্তে এসে প্রিয় মাতৃভূমিতে স্বজনহীন পরিবেশে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে এখনও আমি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সাধ্যমতো সংগ্রাম করে যাচ্ছি। এখন আপনারাই আমার স্বজন, আপনারাই আমার আত্মীয়। আমার সকল তৎপরতা আপনাদেরকেই ঘিরে। তাই সব অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিকার ও উপযুক্ত জবাব দেয়ার ভার আজ আমি আপনাদের উপরেই অর্পণ করলাম।
সুযোগ পেলে ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসী জবাব দেবে
খালেদা জিয়া বলেন, দেশবাসী নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এই টেস্ট কেসে সরকার, ক্ষমতাসীন দল, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শোচনীয়ভাবে ফেইল করে চলেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিতে তাদের ভোট ডাকাতির পরিকল্পনার দোসর হয়ে আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের কথা বলে এক ধূর্ত অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। এতে প্রমাণ হলো, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাস, ভোট ডাকাতি ও কারসাজির মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে ফেলার এবং ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখানোর যে পরিকল্পনা এঁটেছে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীকে তারা বাধা বলে মনে করছে। আমরা বিচারিক ক্ষমতাসহ সশস্ত্র বাহিনীকে নির্বাচনী এলাকাজুড়ে ভোটের দিন এবং আগে-পরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোতায়েন করতে আবারও দাবি জানাচ্ছি। খালেদা জিয়া বলেন, ক্ষমতাসীনদের ভোটার ভীতি ও পরাজয়ের আলামত সব দিক দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই তারা আমাদের প্রচার কাজে বাধা দিচ্ছে ও হামলা চালাচ্ছে। ভোটাররা যাতে ভয় পেয়ে ভোটকেন্দ্রে না যায় তেমন ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতেই তারা সর্বমুখী সন্ত্রাস চালাচ্ছে। পুলিশ বাহিনীকে তারা আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের অবস্থা যাচাইয়ে সরজমিনে জরিপের কাজে নামিয়েছে। পুলিশ ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদেরকে হুমকি দিচ্ছে। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মচারী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরকে মন্ত্রী-এমপিরা সরকার সমর্থক প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় নামতে বাধ্য করছেন। নিম্নবিত্ত ও বস্তি এলাকায় গরিব মানুষের ভোট কেনার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া যাচ্ছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মানুষ একটুখানি সুযোগ পেলেই নীরব ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে এসব অপতৎপরতা ও অত্যাচারের বদলা নেবে, উপযুক্ত জবাব দেবে।
তার কান্না মানুষ অভিনয় মনে করে
খালেদা জিয়া বলেন, বোমা হামলায় ও বিনা বিচারে প্রায় সমান সংখ্যক মানুষকে হত্যার ঘটনার ব্যাপারে আমরা আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছি। পুনরুল্লেখ করে বলছি, আমরা হত্যা, নাশকতা, সন্ত্রাস ও লাশের রাজনীতি করি না। সন্ত্রাস-নির্ভর নষ্ট রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে আওয়ামী লীগ। তারা জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ভীত হয়ে দু’ধারা ছুরির মতো অপকৌশল নিয়েছিল। আমাদের কর্মসূচি ভণ্ডুল করতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে সশস্ত্র প্রহরায় একদিকে পথে যানবাহন নামিয়েছে। অপরদিকে সেই যানবাহনে বোমা হামলায় মানুষ হত্যা করে তার দায় বিরোধী দলের উপর চাপিয়ে হত্যা, নির্যাতন, গুম, গণগ্রেপ্তার ও একতরফা অপপ্রচারের পথ উন্মুক্ত করেছে। তবে অপরাজনীতি ও একতরফা অপপ্রচার দেশের বেশির ভাগ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকীর একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, মানুষ মারায় যদি জেতার প্রশ্ন আসে শেখ হাসিনা তাতে অবশ্যই জিতেছেন। তবে কেঁদে তিনি জিততে পারেননি। তার কান্নাকে এদেশের বেশির ভাগ মানুষ ‘কান্নার অভিনয়’ হিসেবেই মনে করেন।
সরকার অপকৌশলকে কৌশল হিসেবে নিয়েছে
খালেদা জিয়া বলেন, রাজনীতিতে কৌশল থাকে কিন্তু নিম্নরুচির মানুষেরা অপকৌশলকে কৌশল ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। জনগণের সমর্থন নয়, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও অপপ্রচারকেই তারা জেতার পথ বলে ধরে নিয়েছে। যুক্তি, সংযম, সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সংলাপের পথ তারা এড়িয়ে চলতে চায়। দেশে সকল সংকটের সূত্র সেখানেই। তিনি বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমন এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ স্তব্ধ করার কাজে নিয়োজিত রেখে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। দেশে কোন অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নেই। সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে দলীয় স্বার্থে ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। দেশে এমন সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে, ক্ষমতাসীন ছাড়া আর কারও যেন সুবিচার পাওয়ার কোন অধিকার নেই। এ সময় তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ছাত্রদলের সাবেক সংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান খোকনকে নিখোঁজ নেতাদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উৎকণ্ঠা প্রকাশ ও তাদের সন্ধান দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে প্রতিবেশী নেপাল ও ভারতে বহু মানুষের প্রাণহানি এবং আমাদের দেশের আহত ও নিহতের ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত বলে মন্তব্য করেন। পহেলা বৈশাখ টিএসসি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতিতদের প্রতি সহানুভূতি জানাচ্ছি। এসব ঘৃণ্য অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
প্রশ্নোত্তর খালেদা
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, জাতীয় নির্বাচনের জন্য অবশ্যই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার লাগবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা জিতলেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ও ঠুঁটো জগন্নাথ নির্বাচন কমিশন শুদ্ধ হয়ে যাবে না। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল ২০ দল। তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে সেটার ব্যাপারে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে আমরা বসতে পারিনি। তবে বাস্তবে অবরোধ কর্মসূচি এখন অনেক নিষ্ক্রিয়। সমঝোতা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সমঝোতা আমাদের মধ্যেই হবে। এখানে বিদেশী কূটনীতিকদের প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। সিটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কিনা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমি ক্যান্টনমেন্টের ভোটার। আর ক্যান্টনমেন্ট সিটি করপোরেশনের মধ্যে নয়। গাড়িবহর নিয়ে গণসংযোগ চালানোর ব্যাপারে ইসির অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার নিরাপত্তারক্ষীদের কয়েকটি গাড়ির সঙ্গে সাংবাদিকদের গাড়ি ছিল। এখন সাংবাদিকদের আমার বহরের সঙ্গে গণ্য করা হলে সেটা আপনারাই বিচার করুন। বরং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বিধি ভঙ্গ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, স্থায়ী কমিটি সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, নজরুল ইসলাম খান, জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের আমীর মুহাম্মদ ইসহাক, এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ, ইসলামী ঐক্যজোটের আমীর আবদুল লতিফ নেজামী, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনডিপি সভাপতি খন্দকার গোলাম মোর্ত্তজাসহ বিএনপি ও জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

নেপালের ভূমিকম্প অবশ্যম্ভাবী ছিল by কেনেথ চ্যাং

আজ থেকে ২৫ মিলিয়ন বছর আগে ভারতের ভূখণ্ড এশিয়া মহাদেশে আছড়ে পড়ে, তার আগে ভারত দ্রুত অপ​স্রিয়মান শক্ত ভূখণ্ডের ওপর এক পৃথক দ্বীপ ছিল। এই দুটি ল্যান্ড মাসের মধ্যে এখনো সংঘর্ষ হচ্ছে, বছরে দেড় থেকে দুই ইঞ্চি গতিতে এরা ধাক্কা খাচ্ছে। এই শক্তির কারণেই দুনিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়ের জন্ম হয়েছে, ভয়াবহ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা কাঠমান্ডুকে এ বিষয়ে অনেক বছর ধরে সতর্ক করে আসছে। টেকটোনিক ও স্থানীয় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে শনিবারের এই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব ছিল না। নেপালের ভৌগোলিক অবস্থার কারণে কম্পন তীব্র আকার ধারণ করে, আর ভবনগুলোর দুর্বল নির্মাণ প্রকৌশলের কারণে সেগুলো এই কম্পন সহ্য করতে পারেনি।
অলাভজনক সংগঠন জিওহ্যাজার্ড ইন্টারন্যাশনালের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, প্রতি ৭৫ বছরে এ অঞ্চলে একটি বড় ভূমিকম্প হয়। ৮১ বছর আগে ১৯৩৪ সালে পূর্ব নেপালে ৮ দশমিক ১ মাত্রার এক মারাত্মক ভূমিকম্পে ১০ হাজার মানুষ মারা যায়, মাউন্ট এভারেস্টের ছয় মাইল দক্ষিণে। ১৯৮৮ সালে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার আরেকটি ছোট ভূমিকম্পে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়।
জিওহ্যাজার্ডের সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা ব্রায়ান টাকার বলেছেন, তাঁদের সংগঠন ১৯৯০ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে ১৯৩৪ সালের ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি হবে। নগরায়ণের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরবাসী হওয়ায় এবং ভবনের নির্মাণ প্রকৌশল দুর্বল হওয়ায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষ তাতে মারা যাবে।
এ মাসের হালনাগাদ খবরে জিওহ্যাজার্ড বলেছে, ‘কাঠমান্ডু শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব দুনিয়ায় সর্বোচ্চ, এই শহরের বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর ফলে এই শহরের ১৫ লাখ মানুষ ভূমিকম্পের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’
শনিবারের ভূমিকম্প কাঠমান্ডুর উত্তর পশ্চিমে তুলনামূলকভাবে মাটির অগভীর অংশে, নয় মাইল গভীরে, সংগঠিত হয়েছে। ফলে কম্পনের তীব্রতা বেশি ছিল। কিন্তু এর মাত্রা ৭ দশমিক ৮ হওয়ায় ১৯৩৪ সালের ভূমিকম্পের চেয়ে কম শক্তি নির্গত হয়েছে।
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বের অধ্যাপক রজার বিলহ্যাম দক্ষিণ এশিয়ার ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, কম্পনের স্থায়িত্ব ছিল ১ থেকে ২ মিনিট। এতে চ্যুতিটি কাঠমান্ডুর নিচে অবস্থিত ফাটলের মধ্যে আরও ১০ ফুট সরে গেছে, যে ফাটলের দৈর্ঘ্য ৭৫ মাইল।
নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন

‘ও’-টার্ন by মাহবুব তালুকদার

সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাকালে
তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের
ছবি দেখান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা l বাসস
চাচা বললেন, মিডিয়ার কাণ্ডটা দেখেছ? ওরা এখন সরকারের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে।
আজকাল মিডিয়া তো সরকারবান্ধব। সরকারবান্ধব বলেই এই সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মিডিয়ার লোকজনকে ডেকে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন। আমি বললাম, যে টক শো সম্পর্কে তার ক্ষোভ ছিল, সেই টক শোওয়ালা, এমনকি সঞ্চালকদেরও তিনি তাতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অবশ্য টক শোতে এখন সরকার সমর্থকদের মুখ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। কিন্তু নতুন করে আবার কী ঘটল?
মিডিয়া কাওরান বাজারে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাকারীদের ছবি ছেপে দিয়েছে। অত্যন্ত গর্হিত কাজ হয়েছে এটা।
তাতে কী হলো? হামলাকারীরা কেউ আওয়ামী লীগের লোক নয়। আওয়ামী লীগ এমন দাবি করেছে।
সে কথা শতকরা একশ ভাগ সত্য। হামলাকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কেউ ছিল না।
তাহলে আর অসুবিধা কী? আমাদের প্রিয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ওখানে যারা হামলা করেছে তারা সবাই কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী। বিএনপির হরতাল-অবরোধের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তারা খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করেছে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথা একবর্ণও মিথ্যা নয়।
তাহলে তো হয়েই গেল। এ নিয়ে মিডিয়ার বিরুদ্ধে আপনার আর অভিযোগ কী?
আরে ভাই! মিডিয়া ভেতরের সব গোমর ফাঁস করে দিয়েছে।
সেটা কী রকম?
কাওরান বাজারে হামলাকারীরা আওয়ামী লীগের কেউ ছিল না, সেটা খুবই সত্য। তবে তারা ছিল ছাত্রলীগের সদস্য। তাদের নামধাম খুঁজে দু-দিন পরে পত্রিকায় ছবি ছাপার কী দরকার ছিল? ছাত্রলীগের মিজান, রোমান, তুহিন, জাকির, আল আমীন, মোহন, সাগর- এদের ছবি ছাপার কোনোই প্রয়োজন ছিল না।
তবে যে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এরা সবাই কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী?
হতে পারে। হয়তো ছাত্রলীগের এদের সবারই কাওরান বাজারে দোকানপাট আছে। তিনি হয়তো ভেতরের খবর রাখেন। মন্ত্রী হয়ে তিনি তো আর মিথ্যা কথা বলতে পারেন না।
চাচা! পত্রিকায় দেখলাম বাংলামটরে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার সময় খালেদা জিয়ার একজন নিরাপত্তাকর্মীকে মাটিতে ফেলে পাড়ানো হচ্ছে। আরেকটা ছবিতে পুলিশের সঙ্গে এক হামলাকারীর একত্রে ছবি ছাপা হয়েছে, যার প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে পিস্তল উঁকি দিচ্ছে। পত্রিকায় তারও নাম ছাপা হয়েছে। তার নাম সালেহ আহমদ ওরফে হৃদয়। কিন্তু এসব ঘটনা কেন?
আমি তো সে কথাই বলতে চাচ্ছি। চাচা জানালেন, এসব ছবি পত্রিকায় ছাপার কী দরকার ছিল? তুমি যাই বলো, মিডিয়ার ব্যাপারে আমি খুব হতাশ। টক শোর লোকজন পাল্টানোতে না হয় সফলকাম হওয়া কঠিন ছিল না। পত্রিকার সাংবাদিক পাল্টানো যায় কী করে বলো তো?
আমি বললাম, সরকারের উচিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে কয়েকটা পত্রিকা বের করা। তারা যাতে একচেটিয়াভাবে সরকারপক্ষকে সমর্থন করে তার ব্যবস্থা নেয়া। আর কিছু নিজেদের লোককে দিয়ে সব পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লেখাতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
ইত্যবসরে চাচি ঘরে এলেন। বললেন, আজকের বিষয়বস্তু কী?
আমি বললাম, চাচা মিডিয়া সম্পর্কে খুবই ক্ষুব্ধ।
কেন? মিডিয়া কী দোষ করেছে?
চাচা ক্ষুব্ধস্বরেই বললেন, মিডিয়ার কাণ্ডটা দেখ। খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারের খবর প্রথম পাতায় বড় করে ছাপছে। তার গাড়িবহরে হামলার ছবিও বড় করে ছাপা হচ্ছে। কোথায় নির্বাচনের খবর ছাপবে, তা না করে খালেদা জিয়ার গাড়ি ভাঙার খবর ছাপার দরকারটা কী?
চাচি বললেন, সেদিন কাওরান বাজারের ঘটনার পর বিভিন্ন দেশের ১৭ জন কূটনীতিক ওইসব গাড়ি দেখতে খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে গেছেন। এ খবরটা দেখেছ?
হ্যাঁ। এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশীদের হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়। চাচা বললেন।
আমি বললাম, আমাদের মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু খালেদা জিয়াকে ঘরের ভেতরে বসে থাকতে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, সেটা তার জন্য মঙ্গলজনক হবে।
তিনি সব সময়ই খালেদা জিয়াকে সৎ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। চাচা বললেন, দুঃখের বিষয় হলো খালেদা জিয়া তার কোনো পরামর্শই কানে তোলেন না।
ইনু তো খালেদা জিয়াকে রাজনীতি ছাড়ারও পরামর্শ দিয়েছেন। চাচি জানালেন।
সেটাও অত্যন্ত সৎ পরামর্শ। চাচা উদ্দীপ্তস্বরে বললেন, শুধু খালেদা নয়, বিএনপির এখন রাজনীতিতে থাকার নৈতিক অধিকার নেই। তারা দেশে কেবল অশান্তি সৃষ্টি করছে। বিএনপি না থাকলে দেশটা শান্তির মরুদ্যান হতো। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অন্যায়ভাবে অংশগ্রহণ না করলে, নির্বাচন খুবই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হতে পারতো।
কিন্তু দেশে তো একটা শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা দরকার। চাচির বক্তব্য।
কে বলল বিরোধী দল নেই? জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা দলের সমর্থন পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তাদের দল কতটা শক্তিশালী তা বোঝা যাচ্ছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রচারণা থেকে।
তাকে তো নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত থাকতে বলেছে ইসি।
ইসির কথা তিনি থোড়াই কেয়ার করেন। এরশাদ সাহেব ইসির নিষেধাজ্ঞা মেনে নিলে তোমরাই বলতে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি অনুগত আচরণ করছে। শক্তিশালী বিরোধী দল চাও, আবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের শক্তি পরীক্ষা করতে দেবে না। এটা ভারি অন্যায়।
কথার মাঝখানে চাচি ভেতরে উঠে গেলেন। আমি ও বাসায় চলে এলাম। পরদিন ছিল শুক্রবার। পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে আমি এক অভিনব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। মসজিদে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের একজন প্রার্থী আকস্মিকভাবে মাইক টেনে নিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। তিনি তার মার্কা উল্লেখ করে মুসল্লিদের কাছে দোয়া চান। মসজিদে মন্দিরে গির্জায় নির্বাচনী প্রচার চালানোয় নিষেধাজ্ঞা আছে বলে জানতাম। কিন্তু কেউ এর প্রতিবাদ করলেন না। আমি আরও বিস্মিত হলাম যখন মোনাজাতের সময় ইমাম সাহেব হাত তুলে অনেকের মার্কা উল্লেখ করে তাদের কামিয়াবি চেয়ে প্রার্থনা করলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি তাদের সবাইকে নির্বাচনে কামিয়াব করে দাও।’
চাচাকে কথাটা জানাতে চাচা বললেন, মসজিদে যিনি মুসল্লিদের কাছে দোয়া চেয়েছেন, তাকে আমি চিনি। তিনি মুসল্লিদের কাছে ভোট চাননি, দোয়া চেয়েছেন। সুতরাং নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করেননি।
কিন্তু মসজিদের ইমাম সাহেব যে মার্কা উল্লেখ করে সবার কামিয়াবি চাইলেন, এটা কেমন কথা?
তিনি যদি আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থীদের কামিয়াবি চেয়ে থাকেন তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু একই সঙ্গে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের কামিয়াবির জন্য মোনাজাত করে থাকলে তা ঠিক নেই।
এটা আপনার কেমন কথা হলো?
আমি ঠিকই বলেছি। ইমাম সাহেব একই সঙ্গে উভয় দলের সাফল্য কামনা করে মোনাজাত করতে পারেন না। সেটা অ্যাবসার্ড। একই পদে দুদলের দুজন মেয়র প্রার্থী জিতবে কীভাবে?
আমি বললাম, চাচা! পত্রিকায় দেখলাম বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সরাসরি ভোট চেয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী সাঈদ খোকন। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম মিজানুর রহমান মোনাজাতে সাঈদ খোকনের জন্য দোয়া চান। এটা কী ঠিক হলো?
কেন ঠিক হবে না?
ইমাম সাহেব তো অন্য কোনো দলের প্রার্থীর জন্য দোয়া চাননি।
তোমার ঘাড় থেকে বিএনপি’র ভূত কিছুতেই নামছে না। তুমি কি চাও ইমাম সাহেব বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর জন্য দোয়া চাইবেন? কখনোই তা হতে পারে না। যারা সন্ত্রাসী ও নাশকতা সৃষ্টিকারী তাদের জন্য ইমাম সাহেব কখনো মোনাজাত করতে পারেন না। তার মোনাজাত শান্তির জন্য, নাগরিকদের নিরাপত্তা ও নগরবাসীর মঙ্গলের জন্য।
চাচা! নির্বাচন কমিশন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করেছে।
কমিশন ঠিক কাজটিই করেছে। খালেদা জিয়াকে বাসা থেকে বেরোতে দেয়া ঠিক হয়নি। বালির ট্রাকগুলো এখন কোথায় গেল? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে না।
তারা কি দোষ করল?
খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারে আদালতের আদেশ পালন করলেই সব ল্যাঠা চুকে যেত। নির্বাচনের আগে তা করা উচিত ছিল। তাকে ইচ্ছামত রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেয়া ঠিক হচ্ছে না। যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন না, সেখানে তিনি দোকানে দোকানে গিয়ে ভোট চাইবেন কেন?
আইনে তো এ বিষয়ে কোনো বাধা নেই।
নির্বাচনী আইন সংশোধন একান্ত প্রয়োজন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী থাকলে কেউ নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশ নিতে পারবেন না, এরকম একটা আইন দরকার।
কথার এ পর্যায়ে চাচি আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। নাশতা ও চা নিয়ে এসে আমাদের সামনে রাখলেন। বললেন, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটারদের উদ্বিগ্নতা ততই বাড়ছে।
উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বিএনপি কারসাজি করে যতই নির্বাচন ভণ্ডুল করার ব্যবস্থা করুক না কেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার জবাব দিতে প্রস্তুত। চাচা বললেন।
এ কথার অর্থ কী?
বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবার কোনো পোলিং এজেন্টই দিতে পারবে না।
কেন?
প্রার্থীরা আত্মগোপনে থেকে জনসমক্ষে না এলেও নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু পোলিং এজেন্টকে তো ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। সে তো আত্মগোপনে থাকতে পারবে না।
ভোটকেন্দ্রে যেতে তাদের অসুবিধা কী?
চাচা বললেন, পোলিং এজেন্টদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। ওদের প্রায় সবার নামে নাশকতার অভিযোগ রয়েছে। বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেককে যেমন আটক করা হয়েছে, পোলিং এজেন্টদেরও তেমন ছাড় দেয়া হবে না। অবশ্য বিএনপি আওয়ামী লীগ থেকে পোলিং এজেন্ট হায়ার করতে পারে।
সেটা কিভাবে সম্ভব?
আওয়ামী লীগের পোলিং এজেন্টরাই বিএনপির পোলিং এজেন্ট হিসেবেও থাকতে পারে। ডবল রোল আর কি!
আমি বললাম, চাচা! নির্বাচন কমিশন দেখছি সেনাবাহিনী মোতায়েন সম্পর্কে ‘ইউটার্ন’ নিয়েছে। এটা কেন করা হলো?
ওটা ইউটার্ন নয়, ‘ও’-টার্ন। চাচা জানালেন, ‘ও’-টার্ন হচ্ছে আগে যে স্থানে ছিল চক্রাকারে ঘুরে এসে সেখানেই আছে। ‘ও’ মানে হচ্ছে জিরো, মানে গোল্লা। এটা ‘ইউ’-এর মতো একটা ভাওয়েল। ‘ও’ সম্পর্কে বিশদ কিছু জানতে চাইলে ডিকশনারি দেখে নিও। তোমরা নির্বাচন কমিশনকে যতটা বোকা ভেবেছিলে তারা ততটা বোকা নয়। হু হু!
চাচি বললেন, এটা তো একটা ফাঁকিঝুঁকির ব্যাপার হলো। অনেকে বলছেন সেনা মোতায়েনের ব্যাপারটা হচ্ছে আইওয়াশ।
চাচা রহস্যজনক হাসি হাসলেন। বললেন, আইওয়াশ খারাপ কিছু নয়। চোখে ময়লা পড়লে আইওয়াশ তো করতেই হবে। তবে নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনী মোতায়েন সম্পর্কে অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। আওয়ামী প্রার্থীরা সেনা মোতায়েন চাচ্ছিলেন না, বিএনপি প্রার্থীরা সেনা মোতায়েনের পক্ষে ছিলেন। নির্বাচন কমিশন এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে।
এর অর্থ কী?
এর অর্থ হচ্ছে নির্বাচনে সেনাবাহিনী আছে, আবার নেইও। বিএনপির জন্য বার্তা হচ্ছে, নির্বাচনে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী মোতায়েন আছে। তাদের ডাকা হলে তারা চলে আসবে। আর আওয়ামী লীগের কাছে বার্তা হচ্ছে, নির্বাচনে সেনাবাহিনী ভোটকেন্দ্রে বা রাস্তায় নেই। তারা সেনানিবাসেই থাকবে, এখন যেমন আছে। সুতরাং চিন্তার কোনো কারণ নেই।
তোমার এ কথার মর্মার্থ বুঝতে পারলাম না। চাচি বললেন।
বন্যরা বনে সুন্দর, সৈন্যরা সেনানিবাসে। চাচা মৃদু হাসলেন।

কেমন যাবে মঙ্গলবার মঙ্গলে না অমঙ্গলে?

মঙ্গলবারের ভোট কেমন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উপচে পড়ছে। ভয়ে না উৎসবে? অবশ্য গতকাল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে র‌্যাবের ৫ হাজার সদস্য মোতায়েনের খবরে ভোটারদের মনে একটা আস্থার ভাব ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার খুব উল্লেখযোগ্য কোন নমুনা এখনও পরিষ্কার হয়নি। আওয়ামী লীগের দুটো অস্তিত্ব। একটি সরকারি দল হিসেবে। অন্যটি প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী বিভাগের পরিচালক হিসেবে। আওয়ামী লীগের একজন নেতা যখন তিনি দলের তখন তিনি কোন প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করতে পারেন। সেই বিবেচনায় মন্ত্রিসভার সদস্যদের পক্ষে কোন প্রার্থীর পক্ষে কোন প্রচারণা চালানোর কথা ছিল না। কিন্তু অনেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘন করার অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রীরা কারো প্রতি রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী হয়ে আচরণ না করার শপথ নেন।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে বর্তমানে সংসদে ও সরকারের বাইরে থাকা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার মুখ্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বিএনপি চোয়ারপারসনের কথার উত্তর শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবেই যেন দিয়েছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সুযোগ সীমিত থাকার কথা ছিল। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে খালেদা জিয়া এখন ‘প্রতিশোধের’ কথা বলছেন, এখন মানুষ যদি তার বিষয়ে প্রতিশোধ নেয়, তাহলে তিনি কোথায় যাবেন, সেটা তার ভেবে দেখা উচিত। গাড়িবহর নিয়ে চলাচলের জন্য বেগম জিয়া আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অবশ্য সরকার সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হকও ১৩ থেকে ১৪টি গাড়ির বহর নিয়ে প্রচারে নেমেছেন। এর আগে আনিসুল হকও গাড়িবহর নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে না নামতে খালেদা জিয়ার প্রতি অনুরোধ করেছিলেন। গতকাল চট্টগ্রামে মনজুর আলমের প্রচারাভিযানে হামলার অভিযোগ উঠেছে।
উল্লেখ্য, টানা তিনদিন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে প্রকাশ্যে হামলা চালালেও নির্বাচন কমিশন তাদের নিয়োজিত মোবাইল কোর্টকে তদন্ত করতে বলেনি। কিন্তু গাড়ি নিয়ে রাস্তায় চলাচল সংক্রান্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে তারা ব্যবস্থা নিয়েছে।
পর্যবেক্ষকরা বলেন, এটা অভাবনীয় যে, বেগম খালেদা জিয়ার ওপর লাগাতার হামলা চলেছে প্রকাশ্যে। ক্ষমতাসীন দলীয়রা পুলিশের দ্বারা কোনভাবে আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়নি। বরং তাদের অনেকে একই সময়ে মামলা মুক্ত হয়েছেন। বিএনপি সমর্থিত অন্তত ৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থী গ্রেপ্তার হয়েছেন। আর আত্মগোপনে রয়েছেন বিপুল সংখ্যক। তারা প্রচারণায় অংশ নিতে পারেননি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী মাহী বি চৌধুরীর গাড়িতে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে। এতে তিনি, তাঁর স্ত্রী আশফাহ্‌ হক লোপা ও তাঁর গাড়ির চালক আহত হয়েছেন। গতকাল দিবাগত রাত দুইটার দিকে রাজধানীর সাত রাস্তা মোড়ে বিজি প্রেসের সামনে হামলার এ ঘটনা ঘটে। ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎ​সাধীন অবস্থায়গত কাল রাত তিনটায় মাহী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি বেসরকারি একটি ​টেলি​ভিশন চ্যানেলে অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে বারিধারার বাসায় ফিরছিলেন। বিজি প্রেসের সামনে সিটি ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিয়ে গাড়িটি কিছু দূর এগিয়ে গেলে ৮-১০ জন দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা নিয়ে গাড়ির ওপর হামলা চালায়। তারা গাড়ির সামনের কাচ ভেঙে ফেলে। এরপর এক দুর্বৃত্ত তাঁকে (মাহী) লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে ও তাঁর চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামানোর চেষ্টা করে। এ সময় তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছিল। তাঁকে উদ্দেশ্য করে এক দুর্বৃত্ত বলে ‘তোর নির্বাচন করার সখ কেনো’?
এ সময় দুর্বৃত্তদের কয়েকজন গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে তাঁর স্ত্রীকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। দুর্বৃত্তরা তাঁর বাম হাত ও চোখে এবং চালক শহীদ মণ্ডলকে ডান কাঁধে আঘাত করে। ঘটনার পরপরই তাঁদের ইউনা​ইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মাহী জানান, ঘটনা কারা ঘটিয়েছে সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। তবে ষড়যন্ত্র চলছে। আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘আমি নিরাপত্তা চাই নাই, কারণ সব সাবেক রাষ্ট্রপতির বাসায় সরকার পুলিশি নিরাপত্তা দিলেও বি. চৌধুরীর বাড়িতে কোনো পুলিশ দেওয়া হয় নাই।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহী বলেন, ‘ঘটনার সাথে আনিসুল হক, না তাবিথ আউয়াল জড়িত তা সময়ই বলে দিবে। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াব না, নির্বাচনে আছি, থাকব, ইনশা আল্লাহ।’ সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে মাহী বলেন, ‘শনিবার সারা দিন তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বলা হয়েছে।’
মাহীর নির্বাচনী প্রচার সেলের প্রধান সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, চিকিৎ​সা নিয়ে তাঁরা বাড়ি ফিরে গেছেন।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) শাহিদা প্রথম আলোকে জানান, গাড়িতে মাহী, তাঁর স্ত্রী, তাঁর ছোট ভাই, গাড়ির চালক ও আরও একজন ছিলেন। এ বিষয়ে মাহী থানায় একটি অভিযোগ করেছেন। তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
আর গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা হামলা করলো সাবেক প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহী বি. চৌধুরীর ওপর। মাহী  এবিষয়ে যাই বলুন এবং যারা যে কারণেই এই হামলা করুন না কেন, এটা পরিষ্কার যে, এটা একটি নির্বাচনী সহিংসতা। দুর্বৃত্তরা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, তারা মাহীর মতো একজন ব্যক্তিত্বের ওপর হামলা চালিয়ে নির্বিঘ্নে পালাতে পেরেছে। তবে অনেকের মতে তার ব্যাখ্যায় ‘কোন দল নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীরা হামলা করতে পারে’ একথার কোন মানে দাঁড়ায় না। এটা হেঁয়ালিপূর্ণ। তবে এটা পরিষ্কার যে, সংবাদ সম্মেলনে তিনি সব দিক সামলিয়ে খুব বেশি সতর্কতার সঙ্গে বক্তব্য রেখেছেন। তার ব্যাখ্যায় সত্যের মুখোমুখি হওয়া নাকি পলায়নপরতার ইঙ্গিত ছিল তার উত্তর হয়তো সময় দেবে। কিন্তু তার ওপরে হামলার ঘটনাটি শান্তি নির্দেশ করে না। 
বেগম খালেদা জিয়ার ওপর হামলার দায়িত্ব স্বীকারের অভিনব ঘটনা টিভি দর্শকরা উপভোগ করেছে। একজন সন্দেহভাজন হামলাকারী টিভিতে লাইভ অনুষ্ঠানে ‘বীরদর্পে’ ব্যাখ্যা করেছেন কি পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর হামলা চলেছে। তার কথায়, অবরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কাওরান বাজারের ব্যবসায়ীরা বেগম জিয়ার ওপর হামলা করেছে! কেউ হয়তো প্রশ্ন তোলেনি পুলিশ কেন তাকে গ্রেপ্তার করেনি। তিনি কিভাবে লাইভ অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রার্থী হতে চেয়েও পারেননি। মির্জা আব্বাস শেষ পর্যন্ত প্রচারণায় নামতে পারেননি। পর্যবেক্ষকদের কাছে এটা স্পষ্ট যে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড শব্দটি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেল। সমতল মাঠ অসমতল রইলো, আর সেই অবস্থাতেই মঙ্গল-অমঙ্গলের ভোট, ভয়ে কিংবা উৎসবের আমেজের ভোট কাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে।
সর্বত্র এমনকি কূটনৈতিক পল্লীতেও একটি ছবি আলোচনার ঝড় তুলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে বেগম জিয়ার একজন ইউনিফর্মধারী দেহরক্ষীকে এক দুর্বৃত্ত পুলিশের সামনে নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছে। হামলাকারীকে মৃদু কিংবা বিনয়ের সঙ্গে বাধাদানকারী পুলিশের হোলস্টারে পিস্তল। হামলাকারীর কোমরেও গোঁজা পিস্তল।
চট্টগ্রামের ২০ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মেয়র মনজুর আলম ও তার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল নোমান নির্বাচনী গণসংযোগকালে তাদের গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছে সরকার সমর্থক নেতাকর্মীরা। এতে অন্তত ১০-১২ জন আহত হয়েছেন। তাদেরকে নগরীর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মাহমুদুল হাসান, ছাত্রদল নেতা এইএম রাশেদসহ তিনজনকে। সিটি নির্বাচনকে ঘিরে উদ্ভুত এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম নগরীতে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। নগরীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। গত রাতেই নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হওয়ায় চারদিকে একটা গুমোট নীরবতা নেমে এসেছে। আতঙ্কে ভোটার  কোন প্রার্থীর কাছে মন খুলে কথা বলছেন না। শেষ দিনের মতো আজ সকালে নির্বাচনী প্রচারণায় বের হন মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম। তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানসহ অর্ধশতাধিক দলীয় নেতাকর্মী। ছোট্ট মিনি ট্রাকে প্রচাারণা চালানো সময় নগরীর পলিটেকনিক এলাকায় তাদের গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। এঘটনার পর তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নগরীর মেহেদীবাগের বাসায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মনজুর আলম বলেন, আজ (রোববার) প্রচারণার শেষ দিন। আমদের কিছু এলাকায় প্রচারণা বাকি ছিল।  তাই ২ নম্বর গেইট এলাকা থেকে গণসংযোগ শুরু করি।  তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে রহমান নগর, কসমোপলিটন, রুবি গেইট এলাকায় গণসংযোগ করে পলিটেকনিক্যাল এলাকায় যাই। পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট অতিক্রম করার সময় পেছন থেকে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দল ইটপাটকেল  ছোড়ে ও লাঠিপেটা করতে থাকে। হামলায় আমাদের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত ভিডিও ক্যামেরাটিও ভাঙচুর করেছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এসব সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিহার করে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এদিকে শনিবার রাতে নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার নগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচএম রাশেদসহ দুইজন। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মাহমুদুল আলমকে কোতোয়ালি থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আগামীকালের ভোট নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। এটা এমন একটি নির্বাচন যা নিতান্তই স্থানীয় সরকারের, সংসদীয় কোন আসনের উপনির্বাচনও নয়। কিন্তু এটা যে গুরুত্ব পেয়েছে তা নজিরবিহীন। এক ডজনের বেশি বিদেশী দূতাবাস এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে বলে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। গত বছরের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পরে এবারই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু গোড়াতে যেমনটা আশা করা হয়েছিল যে, সরকার যতোটা সম্ভব এই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে উদ্যোগী হবে, ততোটা এখন আর আশা করা হচ্ছে না।
সর্বশেষ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসি’র নাটকীয় ভোল পাল্টানো ছিল দেখবার মতো। গতকাল তারা আরেকটি ব্যাখ্যা হাজির করে বলেছে, ‘সেনাবাহিনী মাঠে না থাকলেও তাদের কার্যকারিতা থাকবে।’ এনিয়ে তারা দ্বিতীয়বার সিদ্ধান্ত পাল্টালো বা ব্যাখ্যা দেয়ার দরকার পড়লো। প্রথম দিনের পরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অফিস আদেশ সংশোধন করে তারা বলেছে যে, সেনাবাহিনী রিজার্ভ ফোর্স হয়ে সেনানিবাসেই থাকবে। প্রয়োজনের সময় এই রিজার্ভ ফোর্স পরিণত হবে স্ট্রাইকিং ফোর্সে। অথচ ওয়াকিবহাল মহল এতে বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, সেনাবাহিনী সেনানিবাসে থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। মাছেরা পানিতে থাকবে, এটা বলা নিরর্থক। সেনানিবাসে থাকাকালে তাদেরকে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে থাকার কি দরকার। আর অন্য কথায় সেনাবাহিনী তো সেনানিবাসে প্রজাতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী রিজার্ভ ফোর্সের মর্যাদাতেই থাকেন। সেটা কেন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে পৃথকভাবে বলে দিতে হবে। সে কারণে ইসি এবিষয়ে যে সংশোধনী প্রকাশ করেছে তাকে শুদ্ধ মনে করার কারণ নেই। তবে অনেক প্রার্থী যারা আত্মগোপনে রয়েছেন তারা বলছেন, সেনা মোতায়েনে ইসির সিদ্ধান্ত শুনে তারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন তাদের ও তাদের কর্মীদের মনোবলে চোট লেগেছে। তারা বলছেন, ভোটারদের উপস্থিতি নির্ভর করবে নিরাপত্তা ও পরিবেশ কেমন থাকে তার ওপর। বাংলাদেশের অতীতের নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তারা কখনও ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে না। তাদেরকে বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাদের মোতায়েন করার বিষয়টি মূলত ভোটের দিনের আস্থা বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। সেনাবাহিনী নির্বাচনে সাধারণত শো অফ ফোর্স হিসেবে কার্যকারিতা দেখিয়েছে। কারণ সেনাবাহিনীকে অ্যাকশনে যেতে হলে নির্বাচনী পরিবেশ আর যাই হোক, তাকে শান্তিপূর্ণ বা ভয়শূন্য বলে গণ্য করার সুযোগ থাকে না।
সুতরাং আগামীকাল ভোটারদের উপস্থিতি কোথায় কতটা হবে সেটাই কোটি টাকা দামের প্রশ্ন। নগরপিতা নির্বাচনে উৎসবমুখর কিংবা তাৎপর্যপূর্ণ করতে হলে ভোটারদেরও যে একটা নাগরিক দায়িত্ব আছে এবং সেখানেও যে ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসতে হয়, সবটুকু সরকারের বা ইসির উপরে দায় চাপাতে হয় না, সেটা ভোটাররা কতটা মানেন, সেটাও কালকের জন্য দেখার বিষয়। এটা মীমাংসিত যে, ভোটাররা যত বেশি সংখ্যায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে অংশ নেবেন, নাগরিকের কর্তব্য পালন করবেন, ততোই মঙ্গল আসবে। অমঙ্গলের মাত্রা কমবে।