Saturday, July 18, 2015

মেহেদীতে রাঙানো আশফাকের হাতঃ হাসপাতালের বিছানায় ঈদ by কমল জোহা খান

হাসপাতালের বিছানাতে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভরা শিশু
আশফাকের মুখ। মেহেদী রাঙানো হাত দেখিয়ে সে কথাই
জানাচ্ছে চার বছরের শিশুটি। ছবি: কমল জোহা খান
চার বছরের শিশু আশফাকের ভাসা ভাসা দুটি চোখের দৃষ্টি এখন আর যন্ত্রণা মেশানো নয়; বরং উচ্ছ্বাসে ভরা। আজ শনিবার ঈদের দিনটা হাসপাতালে কাটালেও আনন্দের মাত্রা যেন বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। শুয়ে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ডিএমসি) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের মা ও শিশু ওয়ার্ডে। কেউ কাছে গেলেই দুহাত উঁচিয়ে ধরে। জড়ানো কণ্ঠে বলতে থাকে, ‘আমি মেন্দি (মেহেদি ) দিছি।’
অথচ কি যন্ত্রণাতেই না কেটেছে আশফাক ও তার মা পারুল বেগমের বেশ কয়েকটা দিন। গত ৩ জুন দুজনই দগ্ধ হন কারওয়ান বাজারে বাস দুর্ঘটনায়। মিরপুরের দারুস সালাম থেকে আট নম্বর রুটের একটি বাসে করে ছেলেকে নিয়ে শাহবাগ যাচ্ছিলেন পারুল। বিকেল চারটার দিকে কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনের সামনে বাসটি উল্টে যায় আরেকটি বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে। বাসের ইঞ্জিনের ফুটন্ত পানিতে ঝলসে যায় দুজনের শরীরের বেশির ভাগ অংশ। এর পর থেকেই দুজনের চিকিৎসা চলছে ডিএমসি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের পাঁচতলায়, শিশু বিভাগে। আশফাকের পেট ও ডান পা এবং পারুলের বুকের ডান পাশ, ডান পা একেবারে পুড়ে গেছে।
আহত আশফাক ও পারুলের চিকিৎসার জন্য ছিল না অর্থ আর দেখাশোনার জন্য স্বজন - কোনোটাই। বার্ন ইউনিটে গেলেই আশফাক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত সবার দিকে। কথা বলতে চাইলেই কান্না জুড়ে দিত। ১৭ কেজি শিশুটির ওজন কমে হয়েছে সাত কেজি। এ বিষয়ে প্রথম আলো অনলাইনে ২২ জুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থা। জোগাড় হয় অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত।
আশফাকের মা পারুল বেগম (৩৭) প্রথম আলোকে বলেন,‘আপনেরা রিপোর্ট করনের পর ৪০ হাজার টাকা সাহায্য পাইছি। খাবার পাইছি ২০ হাজার টাকার মতো। এই টাকাতেই ১৪ জুলাই আশফাকের অপারেশন হইছে। আমার হইব আর কদিন পর।’
পারুল বেগমের তথ্য অনুযায়ী, আশফাকের অস্ত্রোপচারের সময় চাহিদার চাইতে অনেক বেশি রক্ত পাওয়া গেছে।
পারুল বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী কোনো খোঁজ লয় না। এখন আর আগের মতো বাসা-বাড়িতে কাম করতে পারুম না। আমারে একটা চাকরি দিলে চলতে পারমু। কারও কাছে হাত পাতন লাগব না। তয় আপনাগো লাইগাই অহন বাইচ্চা আছি।’
বার্ন ইউনিটের জাতীয় সমন্বয়কারী সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘যেভাবে চিকিৎসা চলছে তাতে করে আশা করছি দ্রুত ভালো হয়ে যাবে ওরা। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় চিকিৎসার প্রয়োজন।'

‘এখন মইরাও শান্তি’- ঈদে ছিটমহলবাসীদের চোখে-মুখে আনন্দের দ্যুতি! by মোছাব্বের হোসেন

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় উত্তর গোতামারি ১৩৫ / ১ নম্বর ছিটমহলের বাসিন্দা মহির আলী (৪০)। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তির পর প্রথমবারের মতো ঈদ করলেন আজ শনিবার। তাঁর চোখে-মুখে যেন আনন্দের দ্যুতি! বলছিলেন, ‘এত দিন মানুষ কইতো ছিটের লোক। ঈদ করছি ছিটে। এইবার নিজের দেশে নিজের মাটিতে ঈদ করলাম, এর চায়া আলন্দের (আনন্দের) আর কী হইতে পারে! কী যে শান্তি লাগতেছে তা খালি আমি বুজি’। মহির আলীর স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, আনন্দ আর কী করমো? এরপরও কলিজার মধ্যে শান্তি লাগতেছে যে, হামার দেশের মাটিতেই ঈদ করবার পাইলাম।’
পরিবারের সঙ্গে প্রবীণ ছকবর আলী (৮৭) ও তাঁর স্ত্রী আশরাফুনন্নেসা
উত্তর গোতামারি ছিটমহলটি ভারতের কোচবিহার জেলার শিতলকুচি থানার পাশাপাশি একটি গ্রাম। এখানের দুটি ছিটমহলে মোট প্রায় ১১১টি পরিবারের বসবাস। মহির আলীর পরিবারের মতো এখানকার অন্য পরিবারগুলোর মধ্যেও যেন একটু অন্য মাত্রায় ছড়িয়ে গেছে এবারের ঈদের আনন্দ। এবারই তাঁরা প্রথম পেলেন দেশের মাটিতে ঈদ উদ্‌যাপনের স্বাদ।
ছিটমহলের নানা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন প্রবীণ ছকবর আলী (৮৭)। তাঁর কাছেও এবারের ঈদ অন্যবারের চেয়ে আলাদা। অকপটে বললেন মনের মধ্যে জমে থাকা আনন্দের কথাগুলো। ‘আগে ঈদ আসতো, ঈদ যাইতো। মনের মধ্যে কষ্ট লাগতো পরের মাটিতে থাকি। এইবার ঈদ আইসার আগে কয়দিন থাকি মনে আলন্দ, দেশে পরথম ঈদ করব। দেশের মাটিতে ঈদ করবার পায়া আজকে অনেক ভালো লাগতেছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেক আন্দোলন করছি, মনে হইছে বাপ-চাচার মতো আমাকেও পরের মাটিতে মরবার লাগবো। কিন্তু চুক্তি হওয়ার পর মনে অনেক শান্তি। এখন মরলেও শান্তি।’ ছকবর আলী বলেন, তাঁর অনেক আত্মীয়-স্বজন ভারতে থাকলেও তিনি এই দেশেই বড় হয়েছেন। আর এই ভিটে ছেড়ে যেতে চান না কখনো। বললেন, ‘সোনা দিয়া মোড়াইলেও এই দেশ থেকে যামো না, ভিক্ষা করি খামো তাও এটে মরবর চাই।’ ঈদে কেমন লাগছে জানতে চাইলে তাঁর স্ত্রী আশরাফুন্নেসা বলেন, ‘অনেক আলন্দ লাগছে, এমন আলন্দ আগে পাই নাই।’
পরিবারের সঙ্গে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার উত্তর গোতামারি ১৩৫ / ১ নম্বর ছিটমহলের বাসিন্দা মহির আলী।
এদিকে, এবারের ঈদের আনন্দ ও বেদনা দুটোই সমানভাবে ছুঁয়ে গেছে উত্তর গোতামারি ১৩৬ / ২ নম্বর ছিটমহলের বাসিন্দা কামাল হোসেনকে। ছয় মাস আগে তাঁর বাবা আবুল হোসেন মারা যান। তিনি ছিলেন ছিটমহল আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি দেখে যেতে পারলেন না তাঁদের আন্দোলনের ফল। আবুল হোসেনের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ছিটমহলে কবর না দিয়ে পরিবার তাঁর কবর দিয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে স্থানীয় ঈদগাহ মাঠের পাশে। কামাল হোসেন বলেন, ছিটমহলে এটাই প্রথম ঈদ বলে ভালো লাগছে, আনন্দ লাগছে। কিন্তু বাবা এই ঈদটা দেখে যেতে পারলেন না বলে দুঃখও লাগছে।
আছর উদ্দিন নামের ৮০ বছরের এক বৃদ্ধা ঈদের আনন্দ অনুভূতি ব্যক্ত করলেন এভাবে, ‘নিজের দেশে, নিজের মাটিতে ঈদ করলাম। আজকে অনেক দিনের আশা পূরণ হইলো।’

রথযাত্রায় লোকারণ্য

রাজধানীর অদূরে ধামরাইয়ে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা উৎসব। আজ শনিবার বিকেল পাঁচটায় মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে নয় দিনব্যাপী এ উৎসবের সূচনা করা হয়। পরে প্রধান অতিথি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার প্রতীকী রশি টেনে রথযাত্রা উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
আজ সকাল ১০টায় ধামরাই পৌর এলাকার কায়েতপাড়ায় মাধব মন্দিরে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান শেষে বিকেল তিনটার দিকে মাধব বিগ্রহ (মাধব মূর্তি) রথে নিয়ে স্থাপন করা হয়। এর ঘণ্টা খানেক পরই রথখোলা মঞ্চে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার বলেন, বাঙালি জাতির জন্য আজকে একটি বিশেষ দিন। হিন্দু সম্প্রদায়ের রথযাত্রা আর মুসলমান সম্প্রদায়ের ঈদ-উল-ফিতর আমরা একই দিনে উদ্‌যাপন করছি। এর মধ্য দিয়ে আমরা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি এই দেশ একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান মিলেমিশে বসবাস করে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরপরই রথযাত্রা উৎসবে আসা হাজারো নর-নারী রশি টেনে বাবার বাড়ি থেকে যশোমাধবকে ধামরাই পৌর এলাকার গোপনগরে শ্বশুরালয়ে নিয়ে যান। সেখানে নয় দিন অবস্থানের পর পুনরায় বাবার বাড়ি আনা হবে উল্টো রথযাত্রা উৎসবের মধ্য দিয়ে।
রথযাত্রা উৎসবকে ঘিরে ধামরাই পৌর এলাকায় বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। বৃষ্টি উপেক্ষা করে দুপুরের পর থেকেই ভক্তরা আসতে শুরু করেন মেলা প্রাঙ্গণে। বিকেলের দিকে রথমেলা প্রাঙ্গণ পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
উৎসব আঙিনায় যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে র‌্যাব ও পুলিশ ছাড়াও পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ শনিবার ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উদ্‌যাপন করেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রতিবছর আষাঢ়ের দ্বিতীয় তিথিতে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
.
ঢাকায় রথযাত্রা উৎসবে অংশ নেয় সনাতন ধর্মের মানুষ। ছবি: সাইফুল ইসলাম
.
শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষে ঢাকায় শোভাযাত্রা বের করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা
.
নারায়ণগঞ্জে রথযাত্রা। ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য
.
সিলেটে রথযাত্রায় অংশ নেয় সনাতন ধর্মের মানুষ। ছবি: আনিস মাহমুদ, সিলেট
.
নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে সবাই এসেছে রথযাত্রায়। ছবি: আনিস মাহমুদ, সিলেট
.
শিশুরাও যোগ দেয় রথযাত্রা উৎসবে। ছবি: আনিস মাহমুদ, সিলেট
.
আগুন নিয়ে পদাবলি কীর্তন করা হচ্ছে। ছবি: আনিস মাহমুদ, সিলেট
.
ভক্তদের মধ্যে কলা বিতরণ করা হচ্ছে। ছবি: আনিস মাহমুদ, সিলেট
.
রথযাত্রায় আসা সবাই চায় রথ ঠেলায় অংশ নিতে। ছবি: আনিস মাহমুদ, সিলেট
.
শেরপুরের গোপালবাড়ী মন্দির থেকে নয়আনী বাজার কালীমন্দির পর্যন্ত আজ রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সনাতন ধর্মের লোকেরা অংশ নেন। ছবি: দেবাশীষ সাহা রায়, শেরপুর

কারাগারে বিএনপি নেতার ওপর হামলা, প্রতিবাদে হবিগঞ্জে হরতাল

হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জি কে গউছের
ওপর কারাগারে হামলা চালিয়েছেন অন্য
একজন আসামি। উন্নত চিকিৎসার জন্য
তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
পাঠানো হয়েছে। ছবি: হাফিজুর রহমান
হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের ভেতরে এক খুনের আসামির হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সম্প্রতি সাময়িক বরখাস্ত হওয়া হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জি কে গউছ। তাকে উন্নত চিকিৎ​সার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এই হামলার প্রতিবাদে দলের স্থানীয় নেতা–কর্মীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন এবং আগামীকাল রোববার হবিগঞ্জ জেলায় হরতাল ডেকেছেন।
জি কে গউছ সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। গত বছরের ২৮ নভেম্বর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
হবিগঞ্জ জেলা কারাগার সূত্রে জানা গেছে, আজ শনিবার সকাল নয়টায় কারাগারের ভেতরে পবিত্র ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে ইলিয়াস মিয়া নামের এক খুনের মামলার আসামি হঠাৎ করে গউছের ওপর হামলা চালান। এতে তাঁর পিঠে ক্ষত এবং রক্তক্ষরণ হয়। এ ঘটনার পর প্রথমে তাঁকে কারা হাসপাতালে চিকিৎ​সা দেওয়া হয়। পরে হবিগঞ্জ জেলা হাসপাতাল থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে আনা হলে তাঁর পরামর্শে গউছকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তাঁকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি হবিগঞ্জ ছাড়ে। হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক মো. গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোর কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও কী কারণে ঘটনাটি ঘটেছে, তা জানাতে পারেননি। এ ঘটনায় কারা কোড অনুযায়ী হামলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এ দিকে জি কে গউছের ওপর হামলার খবর পেয়ে জেলা বিএনপির নেতা-কর্মীরা হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের সামনে অবস্থান নেন। তাঁরা সেখানে হবিগঞ্জ-শায়েস্তাগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসলাম তরফদার তনু জানান, জি কে গউছের ওপর হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল তাঁরা জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করবেন।
সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলায় গত বছরের ১৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এতে গউছ ছাড়াও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জঙ্গি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র (সম্প্রতি বরখাস্ত হওয়া) আরিফুল হক চৌধুরীসহ ৩৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

এক মায়ের অন্য রকম ঈদ by মাসুদ আলম

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নূরজাহান বেগম (ডান থেকে দ্বিতীয়)।
ছবিটি ১৩ জুলাই তোলা। ছবি: প্রথম আলো
নূরজাহান বেগমের ৩৭ বছর ঈদ কেটেছে অনেকটাই নিরানন্দে। ঈদের দিনগুলোতে মনটা খারাপ থাকত। হয়তো পরিস্থিতির চাপে দুঃখ ভুলতে বাধ্য হয়েছিলেন। এবার ঈদটি তিনি আনন্দেই কাটাতে চান। কারণ সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে খুঁজে পেয়েছেন তিনি। দীর্ঘ ৩৭ বছর পর শুনেছেন সেই সন্তানের প্রিয় ডাক ‘মা’।
নূরজাহান বেগমের (৬৫) বাড়ি খুলনার দাকোপ উপজেলার গুনারী গ্রামে। বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের মংলা পৌরসভার মিয়াপাড়া বালুরমাঠ এলাকায় বসবাস করেন। তিনি বলেন, ‘৩৭ বছর হন্যে হয়ে ওকে আমি খুঁজেছি। সব সময় মনে হতো মেয়ে আমার বেঁচে আছে। সবচেয়ে ওর জন্য মনটা খারাপ হতো ঈদের দিনে। আমি আমার হারিয়ে যাওয়া মণিকে খুঁজে পেয়েছি। এর চেয়ে বড় খুশি আর কী হতে পারে। এবার ঈদটা আমার আনন্দেই কাটবে।’
নূরজাহান বেগমের ছেলে আবদুস সাত্তার গাজি বলেন, ‘বোনটার জন্য ঈদের দিনগুলোতে মার মন খুব খারাপ থাকত। ও ঘুরে যাওয়ার পর মা বেজায় খুশি। মার এবার ঈদটা ভালোই কাটবে।’ তিনি বলেন, ‘বোনের কাছে আমাদের কোনো প্রত্যাশা নেই। ওকে ফিরে পেয়েছি এটাই অনেক। ও সুখে-শান্তিতে থাকুক এটাই কামনা করি সব সময়।’
মেয়ে আমেনা বেগম বলেন, ‘আমি ও জামিলা পিঠাপিঠি। বুঝতে শিখে যখন শুনেছি ও হারিয়ে গেছে তখন থেকে ওর কথা মনে হলে মনটা খারাপ হতো। ওকে পেয়ে মনটা একদম ভালো হয়ে গেছে। এবার ঈদটা আমার কাছে অনেক আনন্দের।’
নূরজাহান বেগমের (৬৫) এক ছেলে ও চার মেয়ে। সবচেয়ে ছোট সন্তান জন্ম নেওয়ার তিন বছর পর মারা যান স্বামী মোহন গাজি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে নূরজাহানের। শুরু হয় সন্তানদের নিয়ে তাঁর জীবনযুদ্ধ। কাজ নেন অন্যের বাড়িতে। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্যের জাঁতাকল নির্দয়ভাবে পিষ্ট নূরজাহান ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারেননি। ছেলে আবদুস সাত্তার গাজিকে লাগিয়েছেন কাজে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন অপরিণত বয়সে। ব্যতিক্রম শুধু ছোট মেয়ে। তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তাও আবার যুক্তরাষ্ট্রে।
নূরজাহানের জঠরে জন্ম নেওয়া চার সন্তান নিরক্ষর, দেশে জীবিকার তাগিদে নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছেন ঠিক তখনই অপর সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চপদে কর্মরত রয়েছেন। সুযোগই বদলে দিয়েছে তাঁর জীবনযাত্রা।
নূরজাহানের সন্তানদের মধ্যে ছেলে আবদুস সাত্তার গাজি (৪৫) সবার বড়। এরপর মেয়ে মনোয়ারা বেগম (৪৩), আনোয়ারা বেগম (৪১), আমেনা বেগম (৩৯) ও জামিলা (৩৭)। দেশে থাকা ছেলে ও তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। ইঞ্জিনচালিত ভ্যান চালান সাত্তার। মংলা পৌরসভার মিয়াপাড়া বালুরমাঠ এলাকায় টিনের ছাপড়ার একটি ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী, মা, দুই ছেলে, এক মেয়ে, ছেলের বউ ও এক নাতিকে নিয়ে থাকেন তিনি। মনোয়ারা বেগমের বিয়ে হয়েছিল খুলনার কয়রা উপজেলায়। আট বছর আগে তাঁর স্বামী আসগার আলী মারা যাওয়ার পর থেকে দুই ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি থাকেন মংলায় মিয়াপাড়া বালুরমাঠ এলাকায়। শ্রমিকের কাজ করেন মেঘনা সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে। মাত্র চার বছর বয়সে মেয়ে আনোয়ারা বেগমের বিয়ে হয়েছিল সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জে। স্বামী রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দিনমজুরের কাজ করেন আনোয়ারা। আমেনা বেগমের বিয়ে হয়েছে মংলার দিগরাজে। স্বামী হজরত আলী ভ্যান চালান। স্বামী ও দুই মেয়ে নিয়ে আমেনার সংসার।
ছোট মেয়ে জামিলা বর্তমান নাম এস্থার জামিনা জডিং থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। এস্থার পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড ডগলাস হাই স্কুল ও ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। ইউনিভার্সিটি অব ফিনিক্স থেকে করেছেন এমবিএ। বর্তমানে তিনি ইউএস ব্যাংকে বিজনেস সিস্টেম অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। স্বামী ল্যান্স জডিং পেশায় একজন কেমিস্ট। স্বামী ও তিন ছেলে জ্যাকসন বারলো (৭), লিংকন বারলো (৬) ও ট্যাফ জর্ডিংকে (৮ মাস) নিয়ে তিনি থাকেন ওয়াশিংটনের ভ্যাঙ্কুভারে।
গত ২৭ জুন এস্থার জামিনা জডিং প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘জন্মের পর প্রথম মাকে পেয়ে আমি ভীষণ খুশি। এ জন্য আমাকে অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। নানা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে। মাকে দেখার অপেক্ষা আর সইছিল না। বারবার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’
এস্থারের সঙ্গে আসা নাহিদ ব্রাউন এখনো দেশেই আছেন। তিনি জানান, দেশে দশদিন অবস্থানকালে এস্থার মা, ভাই, বোন, কেমন আছ, খোদা হাফেজসহ কিছু বাংলা শিখেছেন। যাওয়ার সময় কিছু বাংলাভাষা শেখার বইও কিনে নিয়ে গেছেন। মা-কে তিনি মাছ ধরতেও নিষেধ করে গেছেন। নাহিদ ব্রাউন জানান, এস্থার মূলত আর্থিক সহায়তার চেয়ে আগে মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চাইছেন। তাঁদের জন্যও তিনি কিছু করতে চান। এই জন্য যাওয়ার সময় তিনি ভাষা আয়ত্ত করে দুই-তিন বছর পর আবার বাংলাদেশে আসার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। নিয়মিত যোগাযোগের জন্য তাঁর মোবাইল নম্বর দিয়ে গেছেন এবং তাঁদের মোবাইল নম্বর নিয়ে গেছেন।

ঈদে বিজিবি-বিএসএফের মিষ্টিবিনিময়

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মধ্যে মিষ্টিবিনিময় হয়েছে। আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে হিলি চেকপোস্ট গেটের শূন্য রেখায় বিজিবি দিনাজপুর সেক্টর ও বিজিবি-৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের পক্ষ থেকে বিএসএফ রায়গঞ্জ সেক্টরের ডিআইজি ও পতিরাম ৫৭ ও ১৯৯ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের জন্য মিষ্টি পাঠানো হয়। হিলি সিপি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার আবদুল জব্বার প্রথম আলোকে জানান, এর আগে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঈদ উপলক্ষে বিএসএফের পক্ষ থেকে বিজিবি দিনাজপুর সেক্টর, বিজিবি-৩ ও ২৯ ব্যাটালিয়নের জন্য মিষ্টি পাঠানো হয়। ছবিটি আজ বেলা ১১টার দিকে তোলা। ছবি: প্রথম আলোর বিরামপুর প্রতিনিধির

আজ তারা শুধুই বেদনার স্মৃতি by কামরান পারভেজ

জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে
নিহত হন মা সখিনা ও তাঁর দুই বছরের মেয়ে
লামিয়া। তাঁদের ছবি দেখেই এখন দিন কাটে
পরিবারের অন্য সদস্যদের। ছবি: সংগৃহীত
ঈদে মা নতুন শাড়ি পরবে। এই ভেবে মায়ের জন্য নানির সঙ্গে জাকাতের কাপড় আনতে গিয়েছিল ১১ বছরের মেয়ে বৃষ্টি। মায়ের শাড়ি আনতে গিয়ে পদদলনে প্রাণ যায় তার। সঙ্গে মারা যান নানিও। আজ সেই ঈদের দিন। মা পলি আক্তার বাড়ির সামনে উদাস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। কাল থেকে নাওয়া-খাওয়া হয়নি। শুধু কয়েকবার পাশের বাড়ি থেকে মুঠোফোন নিয়ে এসেছেন। সেখানে মেয়ে বৃষ্টির একটি ছবি আছে। সেই ছবিই দেখেছেন বারবার।
কথা বলতে চাইলে পলি আক্তার বলেন, ‘ভাই আর কত কানদন (কান্না) যায়। চোক্ষের পানি শুকায়া গেছে। আমার জন্য একটা নতুন শাড়ি আনতে গিয়ে আমার মেয়ে মইর‌্যা গেল। এই কষ্ট আমি কই রাখি।’
ঈদে জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদদলনে গত ১০ জুলাই প্রাণ হারান ২৭ জন। তাঁদের মধ্যে ২২ জনই নারী। ছিল পাঁচজন শিশুও। ময়মনসিংহ শহরের অতুল চক্রবর্তী সড়কে ওই দিন নূরানী জর্দা কারখানার মালিক মো. শামীম দরিদ্র মানুষদের জাকাতের কাপড় দেওয়ার জন্য ডাকেন। নতুন কাপড়ের আশায় বাড়ির সামনে জড়ো হন অনেকে। পরে হুড়োহুড়িতে পদদলনে প্রাণ হারান ২৭ জন।
আজ ঈদের দিনে সেসব পরিবারে কেবলই কান্না। শহরতলির কাঠগোলা বাজার এলাকার অনেকের সঙ্গে ওই দিন ভোরে জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে নিহত হয় ১২ বছরের রুবি আক্তার। ব্রহ্মপুত্র নদের কাছে রুবির পরিবার একটা ঘরে বাস করে। রুবির ছোট বোন সুমাইয়া নিজের জন্য কেনা জামা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ঈদের দিন আমি আমার বইনের লগে পার্কে যাইতাম, নদীর পাড় ধইর‌্যা বেড়াইতাম, নদীর পাড়ে নানির বাড়িত যাইতাম। এইবার আমার বোন নাই।’
এই বলে আবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। রুবির বাবা রতন অসুস্থ। কথা বলতে পারছেন না। ডুকরে কেঁদে উঠে মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘আপনেরা আমার মেয়ের একটা ছবি দিবে পারবেন। আমার মেয়ের একটা ছবিও নাই আমার কাছে।’
পদদলনে নিহত হয় থানাঘাট এলাকার সখিনা ও তাঁর দুই বছরের মেয়ে লামিয়া। দুপুর ১২টার দিকে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, লামিয়ার বাবা নূর ইসলামের ঘরে প্রতিবেশীর ভিড়। বিছানায় পড়ে আছে ছোট্ট লাল একটা জামা, সাদা নূপুর আর একটা পুতুল। বাবা ঈদে মেয়ের জন্য কিনেছিলেন এসব। মেয়ে নেই। এখন সেগুলো দেখেই সময় কাটে বাবার। নূর ইসলাম বলেন, ‘মেয়েটা একটু বড় হওয়ার পর এইটা ছিল তার সঙ্গে আমার প্রথম ঈদ। আজ সারা দিন আমি মেয়ের পাশে থাকতাম। তারে সুন্দার কইর‌্যা সাজায়া ছবি তুলতাম। কিন্তু আমার কপালে নাই মেয়ে লইয়া ঈদ করা।’
একই এলাকার ১২ বছরের শিশু সিদ্দিকও ওই দিন মা রওশন আরার জন্য ঈদের কাপড় আনতে গিয়ে মারা যায়। রওশন আরা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলে কইছিল, আম্মা, তুমি কোনো চিন্তা কইরো না, চাঁন রাইতে আমি ঈদের সব বাজার কইরা নিয়া আসব।’
কিন্তু মায়ের শাড়ি আনতে গিয়ে ছেলে আর ফেরেনি। না ফেরা মানুষগুলোর কথা মনে করেই ঈদ কাটাচ্ছেন ময়মনসিংহের এসব পরিবারের মানুষ।

আপনজন ছাড়াই ঈদের আনন্দ by মানসুরা হোসাইন

শিশু পরিবারে ঈদ
মুখে সাদা প্রসাধন। চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক। বেশ ঝলমলে থ্রিপিস পরা। এই সাজপোশাকে ঘুরছিল তাসলিমা। চোখেমুখে ঈদের আনন্দ। এ আনন্দ সে ভাগাভাগি করছে তার মতো আরও কিছু শিশুর সঙ্গে। ওরাই তার আপন। কারণ বাবা-মা বা অতি আপনজন বলতে ওদের কেউ নেই।
বাড়ি খবর জানতে চাইলে তাসলিমা একটু থমকে গেল। বলল, জানি না। বাবা-মা কোথায় থাকেন—এ প্রশ্নে চোখ দুটো ছলছল হয়ে গেল। বলল, ‘আমি তো ছোটবেলায় এইখানে আসছি। তাই কিছু জানি না।’
তাসলিমা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। তাকে খুব সুন্দর লাগছে—বলতেই ছলছল চোখে খুশির ঝিলিক দেখা গেল। তাসলিমা কুঁড়িয়ে পাওয়া শিশু। তার বাবা-মা আছেন কি না, কেউ জানে না। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোট মণি নিবাসে বড় হয়েছে ও। ছয় বছর বয়স থেকে আছে রাজধানীর সমাজসেবা অধিদপ্তরের তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা)। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত থাকতে পারবে। তারপর সরকারের পক্ষ থেকই বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে বা অন্য কোনো চাকরিতে ঢোকার সুযোগ করে দেওয়া হবে।
তাসলিমার মতো এ শিশু পরিবারের বেশ কয়েকজন আছে, যারা এসেছে ছোট মণি নিবাস থেকে। অন্যদের কারও হয়তো বাবা আছে, মা নেই। আবার কারও মা আছে, বাবা নেই। কয়েকজনের বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। শিশু পরিবারে এ ধরনের মেয়েশিশু আছে ১৬৩ জন। একজন ছুটিতে গেছে। পাঁচজন ছুটিতে গিয়ে এ পরিবারে আর ফিরে আসেনি।
আজ শনিবার ঈদের দিনদুপুরে শিশু পরিবারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আজ কারও মন খারাপ করার সুযোগ নেই। আজ এ পরিবারের শিশুদের অনেক ব্যস্ততা।
বয়সে ছোটরা গোলাপি চিকেন কাপড়ের ফ্রক পরেছে। সেই ফ্রকে নীল রঙের কাপড় দিয়ে ঝালর লাগানো। কারও কারও ফ্রকে নীল রঙের কাপড় দিয়ে পাইপিং করা। হাতে মেহেদির রং। চোখে কাজল, মাথায় বাহারি ক্লিপ, পায়ে জুতা। অনেকের হাতে মেহেদি লাগানো শেষ হয়নি। শিশু পরিবারের একটু বড় শিশুরা হাতে মেহেদি লাগাতে ব্যস্ত। বৃষ্টির কারণে ছোট শিশুদের আনন্দে একটু বাগড়া পড়েছে। শিশু পরিবারের যে ছোট পার্কটি রয়েছে, সেখানে গিয়ে তারা খেলতে পারছে না।
এ তো গেল ছোটদের কথা। বড়দের তো দম ফেলারও সময় নেই। শিশু পরিবারের চারটি হাউস। এসব হাউসে বড় লিডার (দলনেতা) ও ছোট লিডার আছে। তারা গতকাল শুক্রবার সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। আজ চার হাউসের মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। কোন হাউসের মেয়েরা বেশি পদ রান্না করেছে, কোন হাউসের আলপনা অন্য হাউসের চেয়ে সুন্দর হয়েছে বা কোন হাউসের ঘর সাজানোসহ খাবারের সাজসজ্জা সবচেয়ে ভালো, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। প্রতিযোগিতা শেষে শিশু পরিবার কর্তৃপক্ষ পুরস্কার দেবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের বড় কোনো স্যার এসব সাজসজ্জা দেখতে আসতে পারেন। তাই লিডাররা দুপুর পর্যন্ত গোসল বা সাজগোজ করে উঠতে পারেনি।
শিশু পরিবার সেজেছে শিশুদের তৈরি বিভিন্ন জিনিস দিয়ে। নিজেদের ওড়না, বেলুন, কাগজ কেটে বানানো ফুল, ছোট ছোট লাল-নীল বাল্বের মধ্যে গাছ লাগিয়ে বা খাবার টেবিলে বাটিতে পানি দিয়ে তাজা ফুল সাজিয়ে যে যেভাবে পেরেছে, নিজ নিজ হাউস সাজিয়েছে।
আজ দুপুরে হাউস শাপলা নিকেতনে ঢুকে দেখা গেল, বড় একটি টেবিলের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত হরেক পদের খাবার সাজানো। এ হাউসের লিডার নাসিমা ও তাহমিনা খাবারের নাম বলে যেতে লাগল। টেবিলে আছে নুডুলস, চিংড়ি ভুনা, চটপটি, রুই মাছ, কুলি পিঠা, কেক, নকশি পিঠা, সেমাই, গোলাপ পিঠা, ডিমের কোর্মা, গাজরের সেমাই, চিড়ার বড়া, কাবাব, আলু ভর্তা এবং আস্ত ডিম দিয়ে বানানো হাঁস, পরোটা, ফালুদা, ফুলকপি ফ্রাই, পুডিং, রোল, তেলাপিয়া মাছ, হালিম, রোস্ট, নিমকি, কাস্টার্ড, স্যুপ, গরুর মাংস ভুনা, পোলাও ইত্যাদি।
তাহমিনা জানাল, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে একটি শরবত খেয়েছিল। সেখানকার লোকদের কাছে তা বানানোর পদ্ধতি জেনে এসেছিল। আজকে সুযোগ বুঝে সে শরবতও বানিয়েছে।
রজনীগন্ধা হাউস ৫০ পদের রান্না সাজিয়ে রেখেছে। এখানে রান্নার নতুনত্ব হিসেবে আছে ভারতের টিভি সিরিয়াল কিরণমালার নামকরণে কিরণমালা সেমাই। হাউস ডালিয়া নিকেতন করেছে ২৬ পদের রান্না। চম্পা নিকেতনও কম যায় না। আমড়ার চাটনি, খেজুরের চাটনি, গাজরের চাটনিসহ তারা করেছে ৪৪ পদের খাবার।
শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক ঝর্ণা জাহিন প্রথম আলোকে জানান, ঈদের আগে চারটি হাউসের লিডারদের নিয়ে সভা বসে। কোন হাউস কী রান্না করবে, তার চাহিদা চাওয়া হয়। সে অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ বাজার করে দেয়। পরিবারের পক্ষ থেকে ঈদের জামা-জুতা কেনার আগেও সভা হয়। কাপড় কিনতে যাওয়ার সময় শিশু পরিবারের কয়েকজন সদস্যও থাকে। সরকারের পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এবারের কাউন্সিলর বেল্লাল শাহ প্রতি বছর ঈদে শিশুদের এক সেট জামা, টিপ, চিরুনি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জিনিস কিনে দেন।
ঝর্ণা জাহিন জানালেন, সরকারের পক্ষ থেকে ছোট বড় সব শিশুর জন্য খাওয়া, পোশাক, চিকিৎসা, লেখাপড়া, তেল, সাবানসহ অন্যান্য খরচের জন্য মাসিক বরাদ্দ দুই হাজার ৬০০ টাকা।
শিশু পরিবারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সরকারের অন্যান্য শিশু পরিবারের মতো এখানেও আছে জনবল সংকট। চারটি হাউসের জন্য আছে দুজন বাবুর্চি। তাই বাবুর্চিকে সাহায্য করার জন্য বড় মেয়েদের পালা করে থালাবাসন মাজতে হয়। শিশুদের স্কুল-কলেজে ভালো ফলাফল পেতে প্রাইভেট পড়া ও কোচিংয়ের তেমন কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন জনকে অনুরোধ করে প্রায় বিনা মূল্যে শিশুদের জন্য এসবের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
ঝর্ণা জাহিনকে সব শিশুরা আম্মা ডাকে। তিনি কোনো হাউসে ঢুকতেই ছোট শিশুরা ছুটে এসে আম্মা বলে জড়িয়ে ধরছে। কাল রোববার এই শিশুদের বাবা বা মা বা অন্য কোনো অভিভাবক নিতে আসবেন। পাঁচ দিনের ছুটি। তবে ছোট মণি নিবাস থেকে যারা এসেছে, তাদের নিতে কেউ আসবে না। তারা এখানেই ছুটি কাটাবে।
ঝর্ণা জাহিনের সঙ্গে এসব শিশুর সম্পর্ক বেশ নিবিড়। তাঁকে ছেড়ে ওরা বাড়ি যেতে চায় কি না—জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘আমার নিজের কোনো সন্তান নেই। ওরাই আমাকে আম্মা ডাকে। সব সময় আমাকে মাতিয়ে রাখে। এখানকার শিশুদের বেশির ভাগের বাবা নেই, মা আছে। যখন ওদের নিজের মা আসেন, তখন শিশুরা দৌড়ে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওদের চেহারা দেখে মনে হয়, একেই বলে রক্তের বাঁধন! সন্তান জন্ম দেওয়ার সার্থকতা এখানেই।’

‘সেই দিন খুনিরার বিচার হইব, ওই দিনই আমরার বাড়িত ঈদ’

পরিবারের কারও মধ্যেই নেই ঈদের কোনো আনন্দ। ছোট ভাই সাজনের (৯) পরনে নেই নতুন জামা কিংবা প্যান্ট। ঘরের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করছে ক্রিকেটের একটি ব্যাট নিয়ে। জানতে চাওয়াতে বলল, ‘এইটা আমার ভাই’র...!’
আজ শনিবার সিলেট মহানগর পুলিশের জালালাবাদ থানা এলাকার বাদেয়ালি গ্রামে নিহত সামিউল ইসলাম রাজনের বাড়িতে গিয়ে চোখে পড়ল এমন দৃশ্য।
গত কোরবানির ঈদে সামিউল নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে উপহার পেয়েছিল ক্রিকেটের একটি ব্যাট। মারা যাওয়ার কদিন আগে সামিউল ব্যাটটি প্রতিবেশী একজনের কাছে বিক্রি করে দেয়। রাজন হত্যার পর সেই ক্রেতা ব্যাটটি ফেরত দিয়ে গেছেন। এর পর থেকেই সেটি হাতছাড়া করছে না সাজন।
সামিউলের মা রুবনা বেগম বললেন, সকালে সাজনের হাতে রাজনের ব্যাটটি দেখে ওর বাবা মো. আজিজুর রহমান হাউমাউ করে কেঁদেছেন। আর ব্যাটটি পেয়ে সাজন যেন ভাইকে ফেরত পেয়েছে!
ঈদের কথা বলতেই রাজনের মা বললেন, ‘সেই দিন খুনিরার বিচার হইব, ওই দিনই আমরার বাড়িত ঈদ’।
গত ৮ জুলাই সামিউলকে চোর সন্দেহে সিলেটের কুমারগাঁও বাসস্টেশনে কয়েক ব্যক্তি পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর ‘অজ্ঞাত’ বলে রাস্তায় লাশ ফেলার সময় একজন ধরা পড়েন। ঘটনার পর অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করে পুলিশ। কিন্তু পুলিশ হত্যাকারীদের বাঁচাতে এমন মামলা করে বলে অভিযোগ রাজনের বাবার।
সামিউলকে মারধরের দৃশ্য ফেসবুকে দিতে হত্যাকারীরা ভিডিওচিত্র ধারণ করে রাখে। গত ১০ জুলাই ২৮ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওচিত্র প্রথম আলোর সিলেট কার্যালয়ে পৌঁছায়। এরপর ১২ জুলাই প্রথম আলোর শেষ পাতায় ‘নির্মম পৈশাচিক!’ শিরোনামে ভিডিওচিত্রের বর্ণনা দিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই দিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামিউলকে নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হলে একে একে সামিউলের হত্যাকারীরা ধরা পড়ে। এ পর্যন্ত এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এজাহারভুক্ত চার আসামিসহ ১১ জনকে আটক করা হয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আজ ঈদের দিন ভোর থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিবেশীরা সামিউলের মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছেন। সামিউলের ছোট ভাই সাজন দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত কয়েক দিন ধরে বাড়িতে মানুষের ভিড় দেখে সাজন অনেকটা চুপচাপ হয়ে গেছে। সাজনকে কোলে তুলে নিলে শুধু একটা কথাই সে বারবার বলছে, ‘ভাই নাই! ভাইরে তারা মারি ফালাইছে। আমার ভাই আর আইত নায়।’
চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সামিউল পড়াশোনার পর সংসারের অভাবে তাকে পড়াশোনা ছাড়তে হয়। সামিউলকে প্রথম শ্রেণিতে পড়িয়েছেন বাদেয়ালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক কামাল হোসেন। ঈদের নামাজ শেষে অনেকের মতো তিনিও সামিউলের কবর জেয়ারত করেছেন। সামিউল সম্পর্কে জানতে চাওয়াতে তিনি বললেন, ‘পড়াশোনা ছাড়লেও আবার সে স্কুলে ফিরে আসবে বলেছে। কিন্তু তার তো আর ফেরা হবে না!’

রাজপথে সোয়ান গার্মেন্টস শ্রমিকদের ঈদ

বেতন ও বোনাসের দাবিতে আজ শনিবার ঈদের দিনেও রাজপথে অব্যাহতভাবে চলছে সোয়ান গার্মেন্টসের শ্রমিকদের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি। সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই কর্মসূচিতে তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ যোগ দেন।
রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, সিপিবি নেতা মনজুরুল আহসান খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, হায়দার আকবর খান রনো, বাসদ নেতা খালেকুজ্জামান, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির চন্দন, যুব ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী ও গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার রয়েছেন।
সকালে মুক্তিভবনে রান্না করা সেমাই খেয়ে শ্রমিকেরা ঈদের দিনের অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এ সময় ঈদগাহ ফেরত মুসল্লিরাও জড়ো হন। শ্রমিকদের গগণবিদারী স্লোগান এবং মর্মস্পর্শী বক্তব্যে উপস্থিত জনতার চোখে পানি আসে।
শ্রমিকদের সঙ্গে ঈদ করতে এসে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছি, আমাদের শ্রমিক ভাইবোনেরা তাদের উৎপাদনের মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতা শ্রমে-ঘামে রক্ষা করছেন। স্বাধীনতা পদক কতজনকেই তো দেওয়া হয়, স্বাধীনতা পদকের আসল দাবিদার এই শ্রমিকেরা। আজকে যখন সকলে ঈদের খুশিতে মত্ত তখন তারা রাস্তায় ঈদের দিন কাটাচ্ছেন। তাদের এই দুরবস্থা দেখে স্বাধীনতা পদক যাঁরা পেয়েছেন তাদের সে পদক ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
শ্রমিক নেতাদের মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার, শ্রমিকনেতা ইকবাল হোসেন, কে এম মিন্টু, মঞ্জুর মঈন, আব্দুস সালাম বাবুল, জয়নাল আবেদীন, নূরুল ইসলাম প্রমুখ তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।
বেতনের দাবিতে ঈদের দিন সকাল থেকে প্রেসক্লাবের সামনে পোশাকশ্রমিকদের অবস্থান। ছবি : হাসান রাজা

যেখানে ঈদের রং নীল by মানসুরা হোসাইন

ঈদে নতুন শাড়ি বা কোনো গিফট পেয়েছেন? প্রশ্ন শুনে মুখটি ম্লান হলো তাঁর। বললেন, ‘প্রায় এক মাস হলো, একটা প্যাকেট পাঠিয়েছে এক আত্মীয়। খুলে দেখিনি। আনন্দের খোলা তো নয়। গিফট খুলতে গেলেই তো শুধু ব্যথা আর ব্যথা।’
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে সারা দিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বিকেল বেলাতেও বৃষ্টির কমতি নেই। আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ প্রবীণহিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের নিবাস ভবনের বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে কথাগুলো বলেন মাসুমা সিদ্দিকী।
বৃষ্টির ঝাপটা এবং মাসুমা সিদ্দিকীর চোখের জল মিশে একাকার হয়ে গেল। তিন বছর ধরে তিনি এখানে আছেন। ঈদের দিন আর অন্য দিনের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। ঈদের দিন শুধু কষ্টের পরিমাণটা একটু বেড়ে যায়।
মাসুমা সিদ্দিকীর রুমে গিয়ে দেখা গেল ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপস্টিক, চুল বব কাটের তাঁর আগের একটি ছবি। জানালেন, খুব সাজগোজ করতেন। শৌখিন ছিলেন। এখন তাঁর গায়ের ম্যাক্সি ও মাথার বড় স্কার্ফটি মলিন। নিজেই জানালেন, মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘অযথা খরচ বাড়িয়ে তো লাভ নেই।’ জানালেন, ঘরে নাতিদের ছবি টানানো ছিল। যেহেতু পরিচয় দিতে পারেন না, তাই ছবি নামিয়ে রেখেছেন।
পরিবেশ হালকা করতেই জানতে চাওয়া, পরিবারের সঙ্গে থাকতে ঈদের দিন কী কী করতেন? চোখেমুখে খুশির ঝিলিক মেখে বললেন, কাজের কী আর অন্ত ছিল। ছেলেমেয়েদের পছন্দের জামা কিনে ভাঁজ ভাঁজ করে রাখতে হতো। কে কী খাবে, কার কী পছন্দ তা দেখতে হতো।
ঈদ আসতে আর বেশি দেরি নেই। মাসুমা সিদ্দিকীর মুখের ঝিলিক মিলিয়ে গেল। স্বামী, মা, বোন মারা গেছেন। মেয়ে মারা গেছে এক বছরও হয়নি। মেয়ে যে এত অসুস্থ তা তাঁকে জানানো হয়নি। গিয়ে দেখেছেন মেয়ের লাশ। এ কষ্ট মেনে নিতে পারছেন না। এক ছেলে তাঁর পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে থাকেন। ঈদের দিন পরিবারের কেউ তাঁকে দেখতে আসবে না। সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে। তাই ঈদের দিন শরীর ভালো থাকবে কি না—তাই বা কে জানে। ফোনে কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কেউ ফোন করে না। গলায় ছোট ব্যাগে ঝুলিয়ে রাখা ফোনটি হাতে নিলেন মাসুমা। ফোনটি কখন থেকে যে বন্ধ হয়ে আছে তা নজরেই পড়েনি।
এক সময়ে সংসারের হাল ধরেছেন, এখন তাঁর আর নেই কোনো সংসার। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটির এ প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী ২৪ জন নারী ও ২২ জন পুরুষের আছে ভিন্ন ভিন্ন জীবনের ইতিহাস। দীর্ঘশ্বাসের ধরনও আলাদা। মান–অভিমান বুকে চেপে তাঁরা এখানে কাটিয়ে দিচ্ছেন বছরের পর বছর। জীবন–মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা অবস্থায় পরিবারের লোকজন দয়া করে তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করেন। তারপর সেখান থেকেই অন্য জগতে পাড়ি দেওয়া।
এ নিবাসের বাসিন্দারা তাঁদের জীবনের কথা বলতে চান না। বিশেষ করে ঈদ নিয়ে কথা বলতে একেবারেই নারাজ। একজন বেশ খানিকটা খেপে গিয়েই বললেন, ‘এত ইতিহাস তো বলতে পারব না।’ একজন ঘরের মধ্যে বাতি নিভিয়ে বসে ছিলেন। তিনি প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর সাফ জানিয়ে দিলেন তিনি কথা বলবেন না। নিবাসীদের ঈদ বলে কিছু নেই। এখানে ঈদের রং নীল। সেই নীল রঙে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করতে রাজি নন তাঁরা।
বিকেল গড়িয়ে বাইরে সন্ধ্যা নামছে। নিবাস ভবনের প্যাসেজে কম পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। সেখানে সোফায় দীর্ঘক্ষণ বসে ছিলেন একজন। কাছে গিয়ে কথা বলতে গেলে তিনিও খেপে গেলেন। বললেন, ‘পত্রিকায় লিখে হবেটা কী? লিখে দেন, জীবনের দায়ে এখানে আছি। উপায় নাই তাই আছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রবীণ পুরুষ নিজের হাতে খিচুড়ি রেঁধেছেন। গন্ধে পুরো ঘর ভরে আছে। ঈদ প্রসঙ্গ আসতেই বললেন, ‘এ নিবাসের ঈদ তো নিরানন্দ। কোনো আনন্দ নেই। পাঞ্জাবি বেশ কয়েকটা জমে গেছে। তাই এবার আর নতুন পাঞ্জাবি কিনব না। ঈদের দিন দুইটা মিষ্টি মুখে দিয়ে নামাজ পড়তে যাব। তারপর দুপুরে নিবাসের কর্তৃপক্ষ একটু ভালোমন্দ খাবার দেবে, তা খাব। এই তো ঈদ শেষ। নয় বছর ধরে তো এভাবেই চলছে।’
প্রবীণ নিবাসের বারান্দায় বসে কয়েকজন। নিজেদের পড়ন্ত জীবনের কথাই হয়তো ভাবছেন। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
একসময় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন জানিয়ে এই প্রবীণ জানালেন, গত কোরবানির ঈদে দীর্ঘ আট বছর পর আধঘণ্টার জন্য ছেলে তাঁর বাসায় নিয়ে যায়। সেখানেই আট বছর পর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়। অতিথিদের মতো তাঁরা স্বামী–স্ত্রী কুশলবিনিময় করেন। তারপর ছেলে আবার নিবাসে পৌঁছে দিয়ে গেছে।
কথা প্রসঙ্গে ওই প্রবীণ জানালেন, তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ে এক ছেলে সবাই জীবিত। প্রচণ্ড অভিমানে বাড়ি ছেড়েছিলেন। অন্য সময় না হলেও ঈদের দিন সবাইকে কাছে পেতে মনটা কাঁদে। তাঁর ভাষায়—বেদনা বাড়িয়ে কী লাভ? ছেলে বাড়ি ফিরতে বলেছে। কিন্তু এখানেই তিনি বেশ আছেন। এ ছাড়া মনে ভয় জাগে—ছেলে, ছেলের বউ বা স্ত্রীর সঙ্গে যদি আবার ‘এডজাস্ট’ না হয়। কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে পেনশনের টাকা দিয়ে স্বাধীনভাবে জীবনটা ভালোই কেটে যাচ্ছে।
মীরা চৌধুরী প্রবীণ নিবাসে আছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাঁর স্বামী মারা গেছেন। এক ছেলে দেশের বাইরে থাকে। এলাকার মাস্তানদের উৎপাতে নিজের বাড়ি বিক্রি করে নিবাসে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। তাঁর রুমে স্বামী ও ছেলের ছবি। বান্ধবীর সঙ্গে ছবি টানানো। কালো শাড়িতে নিজের অনেক আগের একটি ছবি বাঁধাই করা। আরেকটি ছবিতে কলেজপড়ুয়া মীরা চৌধুরী। এখন ছবিই তাঁর সঙ্গী। একটি ছোট বিছানা। বিছানার সঙ্গে লাগানো একটি টুল। টেবিলে ছোট ছোট পানির বোতল। দেয়ালে ঝুলছে কয়েকটি ব্যাগ। আলনায় কাপড় রাখা। শেলফের ওপরে পলিথিনে মোড়ানো একটি পান্ডা। ঘরের সঙ্গে লাগোয়া ছোট বারান্দায় টবে কিছু গাছ। বলতে গেলে এই হলো মীরা চৌধুরীর সংসারের সীমানা। নিবাসের অনেকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব হয়েছে তাঁর। নিবাসে দর্শনার্থীরা আসেন। সেই দর্শনার্থীদের মধ্যে কারও কারও সঙ্গেও সখ্য গড়ে ওঠে। স্কুল–কলেজের বান্ধবীরা নিয়মিত খোঁজ নেন। বেশি চা খান বলে এক বান্ধবী ইলেকট্রিক কেটলি কিনে পাঠিয়েছেন।
মীরা চৌধুরীর এখন ঘর ভাগাভাগি করার সংসার। ঘরের এক কোণে তিনি থাকেন। আরেক কোণে তাঁরই মতন আরেকজন। নিজের হাতে বানানো চায়ে চুমুক দিচ্ছেন মীরা চৌধুরী। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী মীরা চৌধুরী জানালেন, ঈদের দিন নিবাসের অন্যদের সঙ্গে ভালোমন্দ খাবার খাবেন। নিবাসে ঈদের দিন সেভাবে কেউ আনন্দ করেন না। নিবাসে ভালো থাকাটা বড্ড কঠিন হয়ে যায়। তবে ভালো লাগার পরিবেশটা নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয় বলে জানালেন তিনি।
বাংলাদেশ প্রবীণহিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশরাফুল আলম কাজ করছেন ১৯৯৮ সাল থেকে। তিনি জানালেন, এখানে নিবাসীদের একক রুমের জন্য মাসে চার হাজার এবং ডাবল বা দুজনের রুমের জন্য ভাড়া দিতে হচ্ছে দুই হাজার টাকা। প্রবীণ ব্যক্তিরা নিজেরাই মেস সিস্টেম করে বাজার করে দেন। নিবাসের বাবুর্চি তা রান্না করেন। অনেকে খরচ কমানোর জন্য রুমে নিজেরাও রান্না করেন।
আশরাফুল আলম তাঁর টেবিলের কাচের নিচে একটি ছোট চিরকুট দেখালেন। ভালোবাসা দিবসে একজন নিবাসী কোনো আপনজনকে দিতে না পেরে আশরাফুল আলমকেই ইংরেজিতে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
নিবাসীদের একজন জানালেন, বিদেশে থাকা ছেলে খোঁজ নিচ্ছেন না। নিজের জমানো টাকাপয়সা কিছু নেই। নিবাসে ভাড়া দিতে না পারলে থাকতে দেবে না কর্তৃপক্ষ। আরও কয়েকজন নিজের জীবন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তবে নিজের ছেলেমেয়ের মানসম্মান যাতে নষ্ট না হয় তা নিয়ে ছিলেন সচেষ্ট। একজন মা বলে দিলেন, ‘আমার একটু সুবিধার জন্য ছেলেপুলের প্রেস্টিজ নষ্ট হোক তা তো চাইতে পারি না।’

ঈদ ও আত্মহত্যা by মাজহার মুনতাসসির

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে পরিবার, বন্ধ, স্বজন সবার সাথে সুখের সময়টুকু ভাগ করে নেয়া। ঈদের সময় সড়ক, নৌ ও রেলপথে গাঁয়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য মানুষ কতই না কষ্ট শিকার করে। শুধুমাত্র মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঈদ কাটানোর জন্য।
উৎসব উপলক্ষে বিশেষ করে রমযানের ঈদের সময় ধনী-গরিব সবাই চেষ্টা করে নতুন জামা কেনার জন্য। যে যার সাধ্যমত জামা কাপড় কিনে থাকে। অনেকে আবার নিজের পরিবারের পাশাপাশি আশপাশের গরিব প্রতিবেশিদেরও জামা, সেমাই-চিনি কিনে দিয়ে ঈদের খুশিতে অংশীদার করে। এ যেন বন্ধনের অনুপম নিদর্শন।
এবার আসা যাক উপরের শিরোনামের কথায়। ঈদের সাথে আত্মহত্যার কি সম্পর্ক। মানুষ আত্মহত্যা করে বিষাদে বা বেদনায়। আনন্দের সাথে তো আত্মহত্যার কোন সম্পর্কই থাকতে পারেনা। কিন্তু গত বছরের রমযানের ঈদের সময় যে আত্মহত্যার রেওয়াজ চালু হয়েছিল এবার ঈদ না আসলেও ইতিমধ্যে রোজার ভেতর আত্মহত্যা শুরু হয়ে গেছে।
বাংলার ঘরে ঘরে বঙ্গনারীদের কাছে শাড়ির চেয়ে যেটা সবচেয়ে প্রিয় সেটা হচ্ছে ভারতীয় কয়েকটা চ্যানেলের সপ্তাহের ৬ দিনব্যাপী সিরিয়াল। একদিন সিরিয়াল না দেখলে তাদের দৈনন্দিন কাজ যেন শেষ হয় না। সিরিয়াল যে বঙ্গনারীদের স্বামী-সন্তানের চেয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানে ‘জীবন মানে জি-বাংলা’।
গত বছর রোজার ঈদের বাজারে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল পাখি নাম একটি যাদুগরি জামা। যে জামা গায়ে দিলে তরুণীরা সব হয়ে যাবে ওই সিরিয়ালের পাখি। পাখি হলেই কাছে পাওয়া যাবে ওই সিরিয়ালের নায়ক অরণ্যকে। সিরিয়ালের বিষয়ে না গিয়ে পাঠকদের স্বরণ করিয়ে দিই শুধু মাত্র এই পাখি জামার জন্য ৭ম শ্রেণির ছাত্রী থেকে শুরু করে ৩০ উর্ধ্ব নারীও আত্মহত্যা করতে পিছ পা হয়নি। সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্য দেখা গেছে পাখি জামার জন্য স্বামীকে তালাক দিয়ে সিনেমার মত স্ত্রী ডায়ালগ ছুড়ে বলে, ‘দেখিস এই পাখি জামা পড়ে আমার নতুন স্বামী নিয়ে তোর বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাব’। খুবই এক্সাইটিং না।
গত বছর এই ঘটনার পর কয়েকটা মহল ছাড়া সর্ব মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের নীতি নির্ধারকরা এই বিষয়টা নিয়ে বিবৃতি তো দূরের কথা কোন টু শব্দও করেনি। তাদের অভিব্যক্তি গেলে কোম্পানির যাবে তাতে আমার কি। আর আমাদের চলচ্চিত্র, নাটক, মডেলিং এর তারকার তো সবচেয়ে বেশি দেউলিয়া। তারা অভিনয়ের সময় ভারতীয় তারকার যেটা গায়ে দিয়ে ফেলে দেয় সেটাই লেটেস্ট মাল মনে করে গায়ে জড়িয়ে অভিনয় কওে আর তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। তাই গত বছরের পাখি ড্রেস নিয়ে এমন ঘটনার পর আমাদের তারকারা দাঁত কেলিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। তাদের কাছে মনে হচ্ছিল এটা একটা কমেডি ড্রামা।
আমাদের তারকাদের কাছে নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি বলতে কিছু নেই। সবই আকাশ সংস্কৃতির দান। তাই সালমান শাহ মারা যাওয়ার পর সারা বাংলাদেশে যেভাবে ভক্তরা নিজের জীবনকে বলিদান দিয়েছিল সেটার নজির এখনো বিরল। আর বর্তমান সময়ের স্ব-ঘোষিত কিং খান আর কুইনরা যদি মারা যান তবে তাদের জন্য বাংলার কোনায় কোনায় খোঁজ করে চোখের জল ফেলার কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে।
গতবার আত্মহত্যার ক্লু ছিল পাখি আর এবারের ক্লু হল কিরণমালা। অলরেডি কিরণমালার জন্য আত্মহত্যার সিরিয়াল শুরু হয়েছিল। তবে কোথায় গিয়ে এই সিরিয়াল শেষ হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ভিনদেশিয় সংস্কৃতিতে প্রভাবিত হয়ে আমরা হারাচ্ছি আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা। এই জগাখিচুরি মার্কা চ্যানের বন্ধের ব্যাপারে কোন সম্ভাবনা দেখছি না। কারণ এগুলো বন্ধ হলে আমাদের নির্মাতারা কোথা থেকে উনাদের নাটক-চলচ্চিত্রের জন্য মশলাপাতি জোগার করবেন।
দেশিয় প্রেক্ষাগৃহে ভিনদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হলে লোক দেখানো কিছু প্রতিবাদ করতে দেখা যায় পরে আবার তারাই গিয়ে ওই সিনেমাটি দেখে আর সাধারণ দর্শকদের সাথে তালি দিয়ে বলে ‘ইয়া লারা কিয়া মারা তুনে’।
জানিনা আপামর মানুষ সচেতন হবে কিনা। তবে একটাই কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি সেটা হলো ‘আশায় বাঁধিয়াছি ঘর, একদিন না একদিন আঁধার কাটিয়া আসিবে অবশ্যই আসিবে ভোর’।
সেই সোনালী ভোরের প্রতীক্ষায় রইলাম।

তিন বন্ধুর দুঃসময় by নূর ইসলাম

যশোর তথা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতির ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র তিন বন্ধু তরিকুল, টিটো আর রাজু। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মহিমায় সমুজ্জ্বল। স্থানীয় সরকারের মাঠ পর্যায়ের প্রতিনিধি থেকে সবাই হয়েছেন জাতীয় নেতা। মন্ত্রী আর এমপি। তিনজনই বৃটিশ ভারতের প্রথম পৌরসভা যশোরের কখনো কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে। যশোরের উন্নয়নে তিন বন্ধুর রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। এদের কেউ যশোর উন্নয়নের কারিগর হিসেবে, কেউ সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে, আবার কেউ যশোরের নেতাকর্মীদের কাছে দাদা  হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে সর্বশেষ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এদের অনেকের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল সোনালি অতীত। শুরুতে তিন বন্ধু রাজনীতির এক পতাকাতলে থাকলেও সময়ের ব্যবধানে তারা কখনও যোজন যোজন মাইল দূরে থেকেছেন। আবার সময়ের প্রয়োজনে হয়েছেন একত্রিত। কিন্তু এসবই তাদের রাজনীতি আর মানুষের কল্যাণে। শুধু নিজেদের প্রয়োজনে কখনও তারা মধুর হোটেলের বাইরে বের হননি। তিনজনই হরিহর আত্মা হিসেবে এখনও পরিচিত। সময় সুযোগ পেলেই তারা একত্রিত হন, মিলিত হন আড্ডায়। মেতে ওঠেন নস্টালজিয়ায়। নিজেদের বিপদ আপদে তারা এখনও একে অপরের পাশে দাঁড়াতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বন্ধুত্বের খাতিরে তারা এক ও অভিন্ন। রয়েছে পারিবারিক সম্প্রীতিও। বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে যার প্রমাণ পান যশোরের মানুষ।
ষাটের দশকে সোভিয়েতপন্থি ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতির মাঠে অভিষেক হয় তরিকুল ইসলামের। সঙ্গে ছিলেন বাল্যবন্ধু খালেদুর রহমান টিটো আর আলী রেজা রাজু। নেতৃত্বের দিক  থেকে তরিকুল ইসলাম শুরুতেই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। ভালো ছাত্র হওয়ার কারণে তিনি অন্য দুই বন্ধুর তুলনায় কিছুটা সুনজর কাড়েন পূর্বসূরিদের। কিন্তু তাহলে কি হবে, তিনি সঙ্গে নিয়ে পথ চলতে শুরু করেন বাল্যবন্ধু টিটো আর রাজুকে। যশোর কলেজের ছাত্র হিসেবে তরিকুল আর টিটো ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ শুরু করেন। আর লেখাপড়ায় কিছুটা পিছিয়ে থেকে পেছন থেকে দুই বন্ধুকে উৎসাহ জোগাতে কলেজে উপস্থিত থাকতেন রাজু। কলেজ সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি, সর্বত্রই টিটো আর তরিকুলের অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে। আর রাজু যশোর শহরে দাদাগিরি করতেন। আর ওপর থেকে তাকে সাপোর্ট জোগাতেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই বাল্যবন্ধু। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও এই তিন বন্ধুর রয়েছে অসামান্য অবদান। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তারা জাতির ক্রান্তিলগ্নে গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। দেশ স্বাধীনের পর তিন বন্ধু মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে দেশ গড়ার রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। চাকরির ভূরি ভূরি সুযোগ এলেও কেউ তা করেননি। তাদের মস্তিস্কে তখন দেশসেবার ভূত ভর করে। মার্কসবাদ লেলিনবাদের রাজনীতি নিয়ে দেশ স্বাধীনের পর তিন বন্ধু জেলও খেটেছেন। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কথা বলে যেমন তারা জেল খেটেছেন তেমনি দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী হিসেবেও তাদের জেল খাটতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে তিন বন্ধু আবারও সক্রিয় হন রাজনীতির ময়দানে। তারই ধারাবাহিকতায় তরিকুল ইসলাম যশোর পৌরসভার প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে জনপ্রতিনিধির খাতায় নাম লেখান। তারও আগে রাজু সদরের কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও চেয়ারম্যান হিসেবে জনপ্রতিনিধির খেতাব লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া জাগদল গঠন করলে তরিকুল ইসলাম তার রাজনৈতিক গুরু আলমগীর সিদ্দিকীর হাত ধরে নাম লেখান সেই দলে। তার সঙ্গে হাত মেলান বন্ধু রাজু। আর টিটো থেকে যান পুরনো ব্যানার নিয়ে। বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তরিকুল ইসলাম যশোরের এমপি হিসেবে প্রতিমন্ত্রী হন। শুরু করেন জাতীয় রাজনীতির পাঠচক্র। ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ জাতীয় পার্টি গঠন করলে টিটো সেই দলে নাম লেখান। তিন বন্ধুর দুই প্লাটফর্মে অবস্থান যশোরের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে। টিটো এরশাদ সরকারের ক্যাবিনেটে ঠাঁই নিয়ে নাম লেখান নতুন ইতিহাসে। ১৯৮৫ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে সে সময় যশোর স্টেডিয়ামে এরশাদের প্রাণনাশের চেষ্টা নামক এক ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় তরিকুল ইসলাম আবার জেলে যান। আর রাজু কিছুটা আত্মগোপনে নিজেকে রক্ষা করেন। শুরু হয় বন্ধুত্বের ফাটল। তবে তা রাজনীতির মাঠে, বিবৃতি আর বক্তৃতায়; ব্যক্তিপর্যায়ে নয়। ১৯৮৯ সালে আলী রেজা রাজু যশোর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তরিকুল ইসলাম বিএনপির টিকিটে মনোনয়ন পেয়ে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা রওশন আলীর বিপক্ষে মাঠে নামেন। এ লড়াইয়ে তরিকুল ইসলাম পরাজিত হন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে নির্বাচনে পরাজিত হয়েও টেকনোক্র্যাট কোটায় বেগম জিয়ার মন্ত্রিসভার সদস্য মনোনীত হন তরিকুল ইসলাম। কিছুদিন পরেই যশোর পৌরসভা নির্বাচনে বন্ধু আলী রেজা রাজু বিএনপির টিকিটে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দুই বন্ধু মিলে সে সময় যশোরের উন্নয়নে প্রায় হাজার কোটি টাকার কাজ করেন। এ সময় জাতীয় পার্টির দুর্দিনে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন সাবেক মন্ত্রী খালেদুর রহমান টিটো। এর পরের ইতিহাস আরো রোমাঞ্চকর।
১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে দলত্যাগ করেন আলী রেজা রাজু। তিনি বাল্যবন্ধু তরিকুলের ওপর অভিমান করে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। পেয়ে যান দলীয় মনোনয়ন। আর অপর বন্ধু টিটো হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী। ফলে যশোর-৩ সদর আসনে ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তরিকুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আলী রেজা রাজু আর জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে খালেদুর রহমান টিটো নির্বাচনী মাঠে লড়াই করতে নামেন। তিন বাল্যবন্ধুর লড়াইয়ে পরাজিত হন তরিকুল ইসলাম ও টিটো। জয়ের মালা গলায় পরে মুজিব কোর্ট গায়ে জড়িয়ে জাতীয় সংসদে যান আলী রেজা রাজু। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান আর সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে এমপি হয়ে যশোরবাসীকে তাক লাগিয়ে দেন সদালাপী ও সদাহাস্যোজ্জ্বল আলী রেজা রাজু। যিনি যশোরবাসীর কাছে দাদা নামে পরিচিত। এমপি হিসেবে রাজু নির্বাচনী এলাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেন। আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতাদের পরাজিত করে তিনি যেমন দলীয় মনোনয়ন ছিনিয়ে নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে জয়লাভ করে দলীয় সভানেত্রীর সুনজর কাড়েন তেমনি তিনি জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনে যান। রাতারাতি তিনি দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। আর তরিকুল ইসলাম বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরপর রাজনীতির ঘোরটোপে টিটো যোগ দেন বিএনপিতে। বন্ধু তরিকুলের হাত ধরে তিনি জেলা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বিএনপির পতাকাতলে দুই বাল্যবন্ধুকে পেয়ে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা যারপরনাই উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে টিটো যশোর-৩ সদর আসন থেকে বিএনপির টিকিটে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন। কিন্তু দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু দলের ভাইস চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলামকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়ার চিন্তাও করেননি দলের চেয়ারপার্সন। টিটোকে যশোর-২ চৌগাছা ঝিকরগাছা অথবা যশোর-৪ বাঘারপাড়া আসন থেকে মনোনয়ন নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু টিটো নাখোশ হয়ে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। নৌকা প্রতীক নিয়ে মাঠে নামেন আলী রেজা রাজু। জমে ওঠে নির্বাচনী লড়াই। বিপুল ভোটের ব্যবধানে রাজুকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন তরিকুল ইসলাম। দলের দুর্দিনের কাণ্ডারি হিসেবে খ্যাত তরিকুল ইসলাম ঠাঁই পান বেগম জিয়ার তৃতীয় ক্যাবিনেটে। ৫ বছরে তরিকুল ইসলাম মন্ত্রী পরিষদের একাধিক দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন। বন্ধু টিটোকে পাশে রেখে তিনি যশোর বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর মেডিকেল কলেজ, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, আঞ্চলিক পাঠাগার, টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, যশোর টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ অসংখ্য স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু এমপি মন্ত্রী কোনটাই ভাগ্যে না জোটায় টিটো ডিগবাজি দিয়ে নৌকায় ওঠেন। মঈনউদ্দিন ফখরুদ্দীন সরকারের শাসন শেষে ২০০৮ সালের নির্বাচনে টিটো সদর আসন থেকে বন্ধু রাজুকে টপকে নৌকা প্রতীক জিতে নেন। লড়াইতে নামেন বন্ধু তরিকুলের বিরুদ্ধে। এ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তরিকুল ইসলাম পরাজিত হন। জিতে যান টিটো। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করলে টিটো স্বপ্ন দেখেন হয়তো ক্যাবিনেটে ডাক পাবেন। কিন্তু বাদ সাধে স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতি। তিনি দলের এমপি হন কিন্তু দলের নেতা হতে পারেননি। দলের মনোনয়ন না পেয়ে আলী রেজা রাজু ও সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার টিটোকে কোণঠাসা করে ফেলেন। দীর্ঘ ৫ বছর সরকারে থাকলেও টিটোকে দলীয় কোন কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি। পাওয়া যায়নি দলীয় অফিসেও। অভিযোগ রয়েছে, রাজনীতিতে বিসর্জন খাটলেও এমপির প্রভাব আর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এমপি ও তার পুত্রত্রয় কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। নানা কারণে এমপির প্রতি দলীয় নেতৃত্বের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে। বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটবিহীন এ নির্বাচনে আলী রেজা রাজু ও টিটোকে টপকে নৌকার মনোনয়ন লাভ করেন রাজনীতিতে নবীন কাজী নাবিল আহমেদ। ফলে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছেন টিটো। এখন অনেকটা অলস সময় কাটাচ্ছেন শহরের ষষ্টিতলার বাসায়। বিপত্নীক এ রাজনীতিকের দিন কাটছে পরিবার আর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্প গুজব করে। অপরদিকে বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ লাভ করেন তরিকুল ইসলাম। ফলে রাজনীতির সব পদ অলংকৃত করে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। অন্যদিকে রাজু ছিটকে পড়েন জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে। সর্বশেষ দলের জেলা সম্মেলনে তিনি তার পদ হারিয়ে রিক্ত-সিক্ত জীবনযাপন করছেন। মরণব্যাধি ক্যান্সার ও কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রাজু এখন অনেকটা রাজনীতিবিমুখ। করছেন ঢাকা আর যশোর।
অপরদিকে বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে একের পর এক মামলায় জর্জরিত তরিকুল ইসলাম। নানা রোগেও কাবু হয়ে পড়েছেন প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ। সময় তিন বন্ধুকে প্রায় একই বিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তিনজনেরই এখন দুঃসময়।

বড় হচ্ছে ঈদের অর্থনীতি, বেড়েছে কেনার সামর্থ্য by আবুল হাসনাত ও শুভংকর কর্মকার

কার্টুন: শিশির -প্রথম আলো
সময় অনেকটাই পাল্টে গেছে। স্বল্প আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ সদ্যই নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। মানুষের আয় আগের চেয়ে বেড়েছে। বেড়েছে কেনার সামর্থ্যও। আর এই কেনার সামর্থ্যকে পুঁজি করে বেড়ে গেছে ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। বড় হচ্ছে ঈদের অর্থনীতিও। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ঈদকেন্দ্রিক এই অর্থনীতির আকার ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিস্তার এখন শাড়ি থেকে শুরু করে গাড়িতে গিয়েও ঠেকেছে। ঈদের এই অর্থনীতির বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের চাহিদায়ও বৈচিত্র্য এসেছে। ঈদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এত দিন পোশাক আর জুতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন মানুষ ইলেকট্রনিক পণ্য যেমন কিনছে, তেমনি উপহার দিচ্ছে। আবার অনলাইনে ব্যবসা (ই-বিজনেস) বেড়েছে, এমনকি দেশে-বিদেশে ভ্রমণেও যাচ্ছে। সিপিডির এই গবেষক আরও বলেন, ঈদের অর্থনীতির আকার যা-ই হোক না কেন, দেশের ভেতরে এর মূল্য সংযোজন কতটুকু, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক পণ্যই এ উপলক্ষে আমদানি হয়ে আসে। তবে ঈদকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ঘটায় শহর ও গ্রামে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির বড় অংশজুড়েই পোশাকেরই রাজত্ব। ঈদ এবং পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করেই দেশে গড়ে উঠেছে ফ্যাশন হাউসকেন্দ্রিক বেশ বড় দেশীয় পোশাকশিল্প। দেশে সাড়ে চার হাজারের মতো ফ্যাশন হাউস আছে। এর বেশির ভাগই ঢাকা ও চট্টগ্রামে। ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির (এফইএবি বা ফ্যাশন উদ্যোগ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ফ্যাশন হাউসগুলোতে বছরে আনুমানিক ছয় হাজার কোটি টাকার পোশাক বেচাকেনা হয়। সারা বছর তাঁদের যে ব্যবসা হয়, তার অর্ধেকই হয় রোজার ঈদে।
এফইএবির পরিচালক (অর্থ) ও ফ্যাশন হাউস রঙ-এর অন্যতম কর্ণধার সৌমিক দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিবছরই ফ্যাশন হাউসগুলোর বিক্রি বাড়ছে। এবারও বিক্রি হচ্ছে। তবে যতটা আশা করেছিলাম, ততটা হয়নি।’ এমন অনুকূল পরিবেশেও কেন বিক্রি ভালো হচ্ছে না—জানতে চাইলে সৌমিক দাসের জবাব, ফ্যাশন হাউসগুলো মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। এর বাইরেও ঈদের পোশাকের একটা বিরাট বাজার আছে। সেটি আবার দখল করে আছে ভারত-পাকিস্তান থেকে আসা নানা পোশাক। ওই বাজারটা কত বড়—এমন প্রশ্ন করলে তিনি জানান, এটা তাঁদের বিক্রির অন্তত তিন গুণ হবে। সব মিলিয়ে এই পোশাকের বাজার ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো বলেই মনে করছেন দেশীয় পোশাকের কয়েকটি বড় পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা। সালোয়ার-কামিজ, শার্ট-প্যান্ট, শাড়ি-লুঙ্গির কাপড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের থান ও গজ কাপড়ের সম্ভার ইসলামপুর এখন দেশের বৃহত্তম কাপড়ের বাজার। ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির নিবন্ধিত ছোট-বড় দোকানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। এর বাইরে আছে আরও দুই হাজার ছোট-মাঝারি দোকান। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইসলামপুরে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ কোটি টাকার কাপড়ের ব্যবসা হয়। ঈদের আগে কখনো কখনো তা শতকোটি টাকায়ও গিয়ে ঠেকে। ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের অনুমান, এখানে বছরে ১৮-২০ হাজার কোটি টাকার পোশাকের বেচাকেনা হয়। এর ৩০-৪০ শতাংশ বিক্রি হয় রোজার মাসে।
জানতে চাইলে ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার ঢালী প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার দোকানগুলোতে শবে বরাতের পর থেকে ১৫ রমজান পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় থাকে। তবে এবার বিক্রি একটু কম। কারণ অনেক ব্যবসায়ীই এখন নরসিংদীর বাবুরহাট এবং রূপগঞ্জের ভুলতা-গাউছিয়া থেকে কাপড় কিনে নিয়ে আনেন। দেশে পাইকারি কাপড়ের আরেক বড় বাজার নরসিংদীর বাবুরহাটে শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, শার্ট পিস, প্যান্ট পিস, থানকাপড়, পাঞ্জাবির কাপড়, গামছা, বিছানার চাদরসহ সব কাপড়ই পাওয়া যায়। এমনিতে এখানে প্রতি শুক্র, শনি ও রোববার হাট বসলেও ঈদের আগে হাট প্রতিদিনই জমজমাট। বাবুরহাট বণিক সমিতির সভাপতি জি এম তালেব হোসেন জানান, গত তিন ঈদে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেচাকেনা বেশি হয়নি। তবে এবারের বিক্রি ভালো। প্রতি হাটেই সাত-আট শ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি হচ্ছে।
ঈদের বাহারি পাদুকা: পোশাকের পর ঈদে বেশি চাহিদা থাকে পাদুকার। পছন্দের স্যান্ডেল ও জুতা ছাড়া যেন ঈদই হয় না। এটি মাথায় রেখেই ঈদুল ফিতরের আগে এবার সারা দেশে অন্তত ২০টি শোরুম খুলেছে পাদুকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। জানা যায়, দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২০ কোটি জোড়া পাদুকা বিক্রি হয়। পাদুকার স্থানীয় বাজার বছরে আনুমানিক চার হাজার কোটি টাকার। সারা বছর যত পাদুকা বিক্রি হয়, তার ৩০ শতাংশ বিক্রি হয় ঈদুল ফিতরে। সে হিসাবে, আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার পাদুকা বিক্রি হয় ঈদে। এই হিসাব দিয়েছেন পাদুকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বে এম্পোরিয়ামের প্রধান নির্বাহী আবদুল কাদের। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাটার বিপণন ব্যবস্থাপক থাকাকালে দেশে পাদুকার বাজারের আকার নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি।
শতকোটি ছাড়ানো সেমাইয়ের বাজার: ঈদ আপ্যায়নের অন্যতম অনুষঙ্গ সেমাই। লাচ্ছা সেমাই, বাংলা সেমাইসহ নানা ধরনের সেমাই ঈদের দিন পরিবেশিত হয়। সেমাই প্রস্তুতকারক বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরে দেশে আনুমানিক ৭০ লাখ কেজি সেমাইয়ের চাহিদা থাকে। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সেমাইয়ের ২০০ গ্রামের প্যাকেট ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সর্বনিম্ন দাম ধরলেও ঈদে সেমাই বেচাকেনা হয় আনুমানিক ১০৫ কোটি টাকার। পুরান ঢাকার কয়েকজন সেমাই ব্যবসায়ী জানান, রাজধানীতে এখনো শতাধিক কারখানায় সেমাই তৈরি হয়। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বড় বড় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানও এখন সেমাই তৈরিতে এগিয়ে এসেছে।
কেনার তালিকায় অলংকার: ঈদের পরপরই বিয়েশাদির ধুম পড়ে। তাই অনেকে ঈদের আগেই বিয়ের গয়লা-অলংকার কেনেন। আর ঈদ উপলক্ষে গয়না উপহার দেওয়া তো আছেই। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) বলছে, সারা দেশে ১০ হাজার জুয়েলারির দোকান আছে। রমজান মাসে প্রতিটি দোকানে কমবেশি দুই ভরি করে বিক্রি হলেও ২০-২৫ হাজার ভরি স্বর্ণালংকার বেচাকেনা হয়েছে। টাকার অঙ্কে তা দাঁড়ায় ৯০ থেকে ১০০ কোটি। বাজুসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোজার ঈদের পর কোরবানির ঈদ পর্যন্ত অনেক বিয়েশাদির অনুষ্ঠান হয়। এর কার্যাদেশ রমজান মাসেই পান ব্যবসায়ীরা। তাই কম করে হলেও রমজান মাসে ২০-২৫ হাজার ভরি স্বর্ণালংকার বেচাবিক্রি হয়।’
ঈদে এখন নতুন গাড়ি: ঈদ সামনে রেখে লোকজন এখন গাড়িও কেনেন। এর সংখ্যাও কম নয়। এর প্রমাণ মেলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের সংগঠন বারভিডার তথ্যে। সংগঠনটি বলছে, এই রমজানে সারা দেশে এ পর্যন্ত ৩৫০টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি বিক্রি এবং কার্যাদেশ পাওয়া গেছে। ঈদ পর্যন্ত তা ৪০০-তে গিয়ে ঠেকবে। বারভিডার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘একেক গাড়ি একেক দামের। তবে গড়ে ২০ লাখ টাকা ধরলে এই ঈদে প্রায় ৮০ কোটি টাকার গাড়ি বিক্রি হয়েছে।’ তবে গত ঈদে গাড়ির ব্যবসা আরও ভালো ছিল বলে জানান বারভিডার সাধারণ সম্পাদক। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রোজায় ৫০০ থেকে ৫৫০টি গাড়ি বিক্রি হয়। প্রতিটি গাড়ির দাম গড়ে ১৮ লাখ টাকা ধরলে গত বছর অন্তত ৯০ কোটি টাকার গাড়ি বিক্রি হয়।
বেচাকেনা চলে ঈদমেলায়ও: একসময় শুধু পয়লা বৈশাখকে ঘিরে মৌসুমি মেলার আয়োজন করা হতো। এখন একই ধরনের মেলা বসে ঈদুল ফিতরের আগেও। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঈদের সপ্তাহ খানেক এমন মেলা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্থানে মেলা চলে রমজান মাসব্যাপী। এসব মেলায় শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজের পাশাপাশি পাদুকা, ব্যাগসহ অলংকারের বেচাকেনাও চলে। তবে মেলায় কী পরিমাণ পণ্য বেচাকেনা হয়, তার কোনো পরিসংখ্যান মেলেনি। বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুতকারকের ধারণা, সাত দিনের এসব মেলায় বেচাবিক্রিও কম হয় না।

‘ভুল পথে হাঁটছে বাংলাদেশ’ -ল্যার অ্যাডাকটুসন

বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নাজুক উল্লেখ করে বিবৃতি দিয়েছেন সুইডিশ ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটস, ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের ফরেন এফেয়ার্স এবং হিউম্যান রাইটস কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ল্যার অ্যাডাকটুসন। বৃহস্পতিবার দেয়া ওই বিবৃতিতে তিনি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশ এখন ভুল পথে হাঁটছে। অ্যাডাকটুসন এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বিগত নির্বাচনের সময়ে সহিংসতা, রাজনৈতিক হত্যা, কিডন্যাপ, গুম, খুনের অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, সেই নির্বাচনে ১৫০ জনের মতো মানুষ নিহত হয়েছিলো। বিবৃতিতে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশু সামিউল রাজন হত্যার বীভৎস দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করে দেশটি কতো ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যদিও দেশটির নিয়ন্ত্রণ করছে, তথাপি সিভিল সোসাইটি, ব্লগার, সাংবাদিক হত্যা একের পর এক বেড়েই চলছে এবং আইনের শাসন ক্ষয়িষ্ণু এবং গণতন্ত্র ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশটি পুলিশী রাষ্ট্র অথবা গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবেনা। দেশটির সরকারকে সহিংসতা বন্ধ এবং বিরোধীদের দমনের পন্থা বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে। গণতান্ত্রিক নির্বাচিত ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখতে হবে। যদি তা না হয়, তাহলে দেশটির নেতৃত্বের সাথে সকল ধরনের সহযোগীতা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে উইথড্র করার কথা ভাবতে হবে।

ইস্কাটনে জোড়া খুন: সাংসদপুত্রের এলোপাতাড়ি গুলির ঘটনায় অভিযোগপত্র চূড়ান্ত একমাত্র আসামি সাংসদপুত্র বখতিয়ার by নজরুল ইসলাম

বখতিয়ার আলম রনি
রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে জোড়া খুনের মামলায় সাংসদপুত্র বখতিয়ার আলম রনিকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র তৈরি করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আগামী সোম বা মঙ্গলবার আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হতে পারে। বখতিয়ারের মা পিনু খান সংরক্ষিত আসনের সাংসদ ও মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগপত্রে বখতিয়ারের ব্যবহার করা প্রাডো গাড়ির চালক ইমরান ফকিরসহ তিনজনকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এই মামলায় সাক্ষী করা হচ্ছে। আদালতে দেওয়া ইমরানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে সাক্ষীর জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণের জন্য আদালতে আবেদন করবেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ গত বুধবার অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করার এবং বখতিয়ারকে একমাত্র আসামি করার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ইমরান ফকির ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এতে তিনি জড়িত নন। তাই তাঁকে মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বখতিয়ারকে (৪২) তিন দফায় মোট ১১ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। ডিবি সূত্র বলেছে, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি গুলি করার কথা জানালেও আদালতে জবানবন্দি দিতে রাজি হননি। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সূত্রবিহীন ও আলোচিত এই মামলার খুঁটিনাটি ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তিন মাসেরও কম সময়ে তদন্ত শেষ করা হয়েছে। সোম বা মঙ্গলবার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া গাড়িচালক ইমরান ফকির গত ১ মে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে (পৌনে দুইটা) বখতিয়ারকে বহন করা প্রাডো গাড়িটি নিউ ইস্কাটন রোডে যানজটে আটকে পড়ে। এতে চালকের পাশের আসনে বসা নেশাগ্রস্ত বখতিয়ার বিরক্ত হয়ে তাঁর লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে চার-পাঁচটি গুলি করেন। বখতিয়ারের বন্ধু আবাসন ব্যবসায়ী কামাল মাহমুদ ও মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল ঘটনার সময় গাড়িটির পেছনের আসনে বসা ছিলেন। তাঁরা আদালতে জবানবন্দিতে বলেছেন, বখতিয়ার তাঁর পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছেন। এ ছাড়া ঘটনার আগে বখতিয়ারের সঙ্গে থাকা তাঁর আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলমও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের আদালতে জবানবন্দি, বস্তুগত প্রমাণ, তদন্ত ও অন্যান্য সূত্র থেকে ডিবি পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, বখতিয়ারের এলোপাতাড়ি গুলিতে দৈনিক জনকণ্ঠ-এর সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী (৪০) ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম (২৫) আহত হন। পরে তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।
হাকিম মারা যান ১৫ এপ্রিল বিকেলে। সেদিন রাতে হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, গাড়ির জানালা খুলে একজন লোক এলোপাতাড়ি চার-পাঁচটি গুলি ছুড়েছে।
ইয়াকুব মারা যান ২৩ এপ্রিল রাতে। ইয়াকুবের বুকে গুলি বিদ্ধ হয় এবং হাকিমের পেছনের অংশে গুলি ঢুকে নাভির নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়। নির্মাণাধীন ভবন এলএমজি টাওয়ারের সামনে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, জোড়া খুনের এই মামলার তদন্তভার রমনা থানার পুলিশের কাছ থেকে ২৪ মে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে ন্যস্ত হয়। সূত্রবিহীন এ মামলা তদন্তের একপর্যায়ে ডিবি জনকণ্ঠ ভবনে স্থাপিত ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধারণ হওয়া ফুটেজে ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে ওই সড়কে দুবার কালো রঙের একটি প্রাডো গাড়ির (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৬২৩৯) বেপরোয়া চলাচল দেখে। ডিবি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নথিপত্র দেখে নিশ্চিত হয়, ওই গাড়িটি সাংসদ পিনু খানের। একই সঙ্গে ডিবি তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও অন্য সূত্রের মাধ্যমে নিউ ইস্কাটনে ঘটনার আগে ও পরে বখতিয়ার ও ইমরানের অবস্থানও নিশ্চিত হয়। বখতিয়ার তাঁর মায়ের ওই গাড়িটি ব্যবহার করতেন।
পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা গাড়িচালক ইমরানকে শনাক্ত করেন এবং তাঁর অবস্থান নিশ্চিত হন। ডিবি ৩১ মে ইমরানকে আটক করে। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে ধানমন্ডির বাসা থেকে বখতিয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিনই বখতিয়ারের লাইসেন্স করা পিস্তলটি জব্দ করা হয়। ৪ জুন ডিবি ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য পিস্তলটি সিআইডির আগ্নেয়াস্ত্র পরীক্ষা শাখায় পাঠায়। এই পরীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই পিস্তল থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে এবং নিহত ইয়াকুবের শরীরে পাওয়া গুলি ও ওই পিস্তলের গুলির ধরন এক, পয়েন্ট ৩২ বোরের। ১৪ জুন প্রাডো গাড়িটি জব্দ করা হয়। ৫ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে বখতিয়ারের পিস্তলের লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করেন।
সাংসদপুত্র বখতিয়ারকে আসামি করে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে—এ কথা জানালে নিহত রিকশাচালক হাকিমের মা ও মামলার বাদী মনোয়ারা বেগম বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘জানি ছেলে ফেরত পামু না, তবুও হত্যার বিচার হইলে মনে কিছুটা শান্তি পামু।’ তিনি বলেন, ‘বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছাইড়া দিছিলাম। এত দিন মনে করছিলাম গরিবের জন্য বিচার নাই, কিন্তু এহন দেখলাম গরিবের পাশেও মানুষ দাঁড়ায়।’ তিনি ডিবি পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

রিকশার সুবিধা-অসুবিধা

ফুটপাত দখলের পর ​রাস্তায়ও উপচে পড়েছে হকারদের পণ্যের
পসরা। ছবিটি ৭ জুলাই রাজধানীর গুলিস্তান এলাকা থেকে তোলা।
এমনই অবস্থা ঢাকার অধিকাংশ সড়কের l ছবি: মনিরুল আলম
ঢাকাকে বলা হয় রিকশার নগর। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের হিসাবে, এই নগরে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ রিকশা চলাচল করে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের অনুমোদন আছে মাত্র ৭৯ হাজারের। অযান্ত্রিক এই যানটি হাঁটার কষ্ট লাঘব করে নগরবাসীকে যেমন বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে, তেমনি যান্ত্রিক বাহনের চলার পথে পর্বতসম বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রিকশার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন রাজধানীর বাসিন্দা, গাড়িচালক, পুলিশ কর্মকর্তা, নগর বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে সুবিধা-অসুবিধাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
সুবিধা
১. রিকশা অযান্ত্রিক বাহন, পরিবেশবান্ধব
২. বেশির ভাগ জায়গায় সরাসরি পৌঁছানো যায়
৩. প্রধান সড়ক থেকে বাসায় পৌঁছাতে রিকশার জুড়ি নেই
৪. গণপরিবহনের ভিড় এড়াতে রিকশা অনেকের পছন্দের যান
৫. অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়
৬. নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য উপযোগী বাহন
অসুবিধা
১. স্বল্প গতির রিকশার জন্য যান্ত্রিক গাড়ির গতি কমে যায়
২. প্রধান সড়কে রিকশা চলায় দুর্ঘটনা ঘটে
৩. বিভিন্ন সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।
৪. রিকশার ভাড়ার ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই
৫. রাখার জায়গা না থাকায় রিকশার দখলে চলে যায় ফুটপাত বা রাস্তা
৬. রিকশাযাত্রীরা সহজে ছিনতাইয়ের শিকার হন

বিনা উসকানিতে গুলি করা হলে সমুচিত জবাব -পাকিস্তানকে ভারতের হুঁশিয়ারি

কাশ্মীরের ভিম্বার অঞ্চলে ভূপাতিত কথিত ড্রোনের এই ছবি
বুধবার প্রকাশ করে পাকিস্তানের আইএসপিআর -ছবি: এএফপি
সীমান্তে চালকবিহীন বিমানের (ড্রোন) উপস্থিতি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। পাকিস্তান কাশ্মীর সীমান্ত দিয়ে ভারতের একটি ড্রোন অনুপ্রবেশ করার দাবি করে বলেছে, সেটিকে তারা ভূপাতিত করেছে। এর পাশাপাশি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্তে অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেছেন, ভারত শান্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, তবে বিনা উসকানিতে ছোড়া গুলির সমান জবাব দেবে। খবর এনডিটিভি, ডন ও বিবিসির।
কথিত ভারতীয় গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে পাকিস্তান। তবে তাদের ড্রোন পাকিস্তানের সীমান্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে নয়াদিল্লি বলেছে, এটি বরং পাকিস্তানেরই পাঞ্জাব প্রদেশের পুলিশের ড্রোন।
ইসলামাবাদ ভারতের হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠানোর কয়েক ঘণ্টা পর সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গতকাল বৈঠক করেন ভারতের শীর্ষ মন্ত্রীরা। এতে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকার। পররাষ্ট্রসচিব জয়শংকরও এতে যোগ দেন। বৈঠকের পর তিনি বলেন, ‘ভারত শান্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, তবে সীমান্তে বিনা উসকানিতে ছোড়া গুলির জবাব দেবে এবং সতর্কতায় ঢিল দেবে না।’
রাশিয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মধ্যে বৈঠকে সম্পর্ক উন্নয়নে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার খবরের এক সপ্তাহের মধ্যেই এই উত্তেজনার ঘটনা ঘটল। রাশিয়ার উফা শহরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে আগামী বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে নওয়াজ শরিফের আমন্ত্রণও গ্রহণ করেন মোদি।
সীমান্তে ড্রোনের উপস্থিতি ও অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের জের ধরে পরস্পরের হাইকমিশনারকে তলব করে পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিবেশী দেশ দুটি। জম্মু ও কাশ্মীরের সীমান্তজুড়ে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনারের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আইজাজ আহমেদ চৌধুরী সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর গুলির ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতের চালকবিহীন গোয়েন্দা বিমানটি পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ায় ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে ভারতের হাইকমিশনার টিসিএ রাঘবন পাকিস্তানের দাবি অস্বীকার করে বলেন, চালকবিহীন বিমানটি ভারতের নয়।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বুধবার এক বিবৃতিতে বলেছে, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ভিম্বারের কাছে গত বুধবার ভারতের একটি গোয়েন্দা ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে তারা। ড্রোনটি আকাশ থেকে ছবি তোলার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। তবে ভারতের সেনা ও বিমানবাহিনী এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ওই এলাকায় তাদের কোনো ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা হয়নি।
ভারতের সরকারি সূত্র বলেছে, বুধবার জম্মুর আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকায় সীমানার ওপার থেকে চালানো হামলায় এক বেসামরিক নারী নিহত হয়। এ ঘটনায় দুই ভারতীয় সেনাসহ ছয়জন আহত হয়। সূত্র জানায়, আখনুর সেক্টরের এই হামলাসহ চলতি মাসে সাতবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করা হলো।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বলেছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী ও সেনাদের গুলিতে গতকাল পাকিস্তানের শিয়ালকোট ও কাশ্মীর সীমান্তে চারজন নিহত হয়েছে।