Saturday, November 15, 2025
পয়লা অগ্রহায়ণে ‘আদি নববর্ষ’ উদ্যাপন করবে ডাকসু
চারুকলায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্য ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে ‘আদি নববর্ষ’ উদ্যাপন করা হবে। অনুষ্ঠানটি চারটি পর্বে সেদিন রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে। প্রথম পর্বে হবে রংতুলিতে নবান্ন। দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী এবং চারুকলার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জুলাই ও নবান্ন থিমে ছবি আঁকা হবে। মোট ১৫ জন শিল্পী এই পর্বে ছবি আঁকবেন। পর্বটি শুরু হবে সকাল ১০টায়। দ্বিতীয় পর্বে হবে আদি নববর্ষ আনন্দযাত্রা। উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব এটি। চারুকলার সহযোগিতায় আনন্দযাত্রার জন্য তিনটি মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে। একটি মোটিফ জুলাই নিয়ে। একটি মোটিফ জেলেজীবন নিয়ে এবং অন্যটি কৃষিজীবন নিয়ে। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের উপস্থাপনা থাকবে এতে। তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের শুভেচ্ছা বিনিময়। বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্যের সদস্য বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণে এই পর্বে থাকবে আবৃত্তি, নাচ, গান ও জাদু পরিবেশনা। আমন্ত্রিত অতিথিদের শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে থাকবে দেশবরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় সংগীত ও পালাগান।
এ উদ্যাপনের কারণ তুলে ধরে মুসাদ্দিক বলেন, দেশজ সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নববর্ষ উদ্যাপন, যা বর্তমানে পয়লা বৈশাখ হলেও এককালে ছিল পয়লা অগ্রহায়ণ। বাংলা সনের পঞ্জিকায় যে ১২টি মাস আছে, তার মধ্যে ১১টিই নক্ষত্রের নামে। এ ক্ষেত্রে ‘বৈশাখ’ বিশাখা নক্ষত্রের নামে, ‘জ্যৈষ্ঠ’ জ্যাষ্ঠা নক্ষত্রের নামে, ‘আষাঢ়’ আষাঢ়ার নামে এবং এভাবে শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র যথাক্রমে শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, পৌষী, মঘা, ফাল্গুনী ও চিত্রার নামে। যে মাসটি নক্ষত্রের নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, সেটি হচ্ছে অগ্রহায়ণ; আর এই নামের সঙ্গে মিশে আছে বাংলার কিছু ইতিহাস, কিছু স্মৃতি এবং কিছু বিস্মৃত হয়ে যাওয়া তথ্য।
মুসাদ্দিক ইবনে আলী মোহাম্মদ বলেন, প্রায় প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে নববর্ষের উৎসব উদ্যাপিত হতো। নববর্ষের আদি অনুষ্ঠান হিসেবে ‘আমানি’ উৎসব বা ‘নবান্ন’ উৎসবের কথা বলেছেন ঐতিহাসিকেরা, যা পয়লা অগ্রহায়ণে অনুষ্ঠিত হতো। এটি ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ‘বৈশাখ’ মাসকে বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রচলন করা হয়। কিন্তু বৈশাখকে বছর শুরুর মাস আর পয়লা বৈশাখকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে বাংলার মানুষ উদ্যাপন করেনি বলে দাবি করেন তিনি।
ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। পরে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ব্যবস্থা করেন। কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারেও এভাবে ধীরে ধীরে পয়লা বৈশাখ সম্পর্কে কিছু উৎসাহ-উদ্দীপনার খবরাদি পাওয়া যায়। ১৯৬৭ সালে এই বংলায় প্রথম পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তানি শাসকেরা এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করায় পাকিস্তানবিরোধী মানসিকতার বাঙালির কাছে পয়লা বৈশাখ ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মুসাদ্দিক বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম আজ ভুলতে বসেছে, এককালে পয়লা অগ্রহায়ণই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের নববর্ষ। প্রজন্মকে সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা নবান্ন উৎসবকে আদি নববর্ষ উৎসব নামে উদ্যাপন করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি যুবায়ের, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মিনহাজ ও বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্যের সভাপতি মৃন্ময় মিজান উপস্থিত ছিলেন।
![]() |
| সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক ইবনে আলী মোহাম্মদ। আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। ছবি: সংগৃহীত |
Monday, April 14, 2025
আঁকতে যাই পাখি, হয়ে যায় মাছ
আব্বা, মা, এবং আমরা দুটি ভাই—এই নিয়ে আমাদের সংসার। এক ছুটির দিন, সকলেই বাড়িতে, আমি বোধ হয় একটু দুষ্টমি করছিলাম। তাই আমাকে শান্ত করবার জন্যে আব্বা আমাকে আদর করে কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে বড় ভাইয়ের স্লেট পেনসিল সামনে ধরে বললেন, ‘আয় তোকে একটা মজার খেলা শেখাই।’ বড় ভাইয়ের স্লেটের ওপর আমার ছোট্ট ডান হাতের পাতা উপুড় করে বসিয়ে পাঁচ আঙুলের চারপাশে পেনসিলের দাগ বসিয়ে হাতের পাতাটি স্লেট থেকে ওপরে তুলে ধরতেই চোখে পড়ল স্লেটের ওপরে আমার ছোট হাতের পাঁচটি আঙুলের সুন্দর একখানি ছবি। নিজেই আমার হাতটা পেতে দিয়ে শিশু ভাষায় জানালাম আবার আমার হাত এঁকে দিতে। আগের ছবিটি মুছে দিয়ে আব্বা আমার হাত আবার আঁকলেন—এইভাবে বারবার আঁকা চলতে থাকল। অবসর এবং ভাইয়ার স্লেট পেনসিল হাতের নাগালে পেলেই আব্বার কাছে নিয়ে উপস্থিত হতাম। তিনিও বুঝতেন এবং স্লেটের পিঠে আমার হাতের ছবি ভেসে উঠতে থাকত বারংবার। এটা আমার নিত্যদিনের খেলা হয়ে দাঁড়াল। শেষে একদিন দেখা গেল আমি নিজেই নিজের হাত বসিয়ে আঁকছি স্লেটের ওপরে। এইভাবে খেলা করতে করতে বয়স কিছুটা বেড়ে গেল। তখন কথাও বলতে পারি। এদিকে ভাইয়ার স্লেটে নিজেই নিজের হাত আঁকা আমার নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু আঁকাতেই শেষ নয়, তা নিয়ে আব্বাকে দেখাই, অন্য সব আত্মীয়স্বজন—মামা-চাচাদেরও দেখাই। বাহবা নিই।
এভাবেই খেলার ছলে কখন আমার মনের কোণে ছবি আঁকার একটি লতাগুল্ম অঙ্কুরিত হয়েছিল, বলতে পারি না। তারপর বয়স একটু বাড়তেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় এসে গেল। আব্বা বড় ভাইকে যে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন, সেই মডেল এম-ই স্কুলে আমাকেও ভর্তি করিয়ে দিলেন। ইনফ্যান্ট টু-তে। কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কুল। সাধারণ পড়াশোনার সঙ্গে ড্রইং আর মডেলিং ক্লাসের চমৎকার আয়োজন ছিল। আমি যেন এক নতুন আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে লাগলাম মনের আনন্দে। ছবি আর ছবি। আজ দেখতে পাচ্ছি আমার সেই শিশুকালটাকে। নতুন দৃষ্টি মেলে। মাত্র ডিম ফেটে বের হয়েছি, চোখ ফুটেছে কিন্তু ডানা ভালো করে মেলতে পারি না, তাই উড়তে গিয়ে বারবার পড়ে যাই। হ্যাঁ, ছবি আঁকতে যাই পাখির, হয়ে যায় মাছ। এমনিভাবে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ছবির আকাশে সেই যে উড়তে আরম্ভ করেছিলাম সে ওড়ার এখনো বিরাম নাই।
সেই বয়ঃসন্ধির কাল থেকে কানে আসতে লাগল যে ছবি আঁকলে আর্টিস্ট হওয়া যায় এবং আর্টিস্ট হলে খুব নাম হয়। লোকে আঙুল দেখিয়ে বলে ওই লোকটা খব বড় আর্টিস্ট। পয়সাও নাকি উপায় করা যায়। তবে ওটা বড়লোকদের পেশা, আর্টিস্ট হতে হলে বেশ পয়সাকড়ি খরচ করতে হয়। আবার এ-ও কানে এল যে আর্টিস্টরা খেয়ালি হয়, খাবার পয়সা জোটে না তাদের। তবুও ছবিই আঁকব, আর্টিস্ট হতেই হবে। সেই বয়সেই অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, সাধারণ পড়াশোনা আর করব না। তখনকার দিনে কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে পড়তে হলে ম্যাট্রিক না পাস করলেও চলত। এ সংবাদটিও সংগ্রহ করে ফেলেছিলাম। কলকাতা শহরে থাকতাম বলেই এসব খবরাখবর জোগাড় করা সম্ভব হয়েছিল। তা ছাড়া মনটা আমার সেই বয়সেই যেন শিল্পের রসে জারিত হয়ে গিয়েছিল। তবুও মাইনর স্কুল শেষ করে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে ক্যালকাটা মাদ্রাসায় ঢুকতে হয়েছিল। মাদ্রাসার সঙ্গেই ছিল ইংরেজির মাধ্যমে সাধারণ বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা। সেখানে গিয়ে ড্রইং ক্লাস পেয়েছিলাম এবং আজিজার রহমান নামে একজন তরুণ ড্রইং টিচার। তাঁর কাছ থেকেও উৎসাহ এবং উসকানি দুটোই পেয়েছিলাম। যার ফলে সপ্তম শ্রেণি অতিক্রম করে আর অষ্টম শ্রেণিতে যেতে পারিনি বা যেতে চাইনি বলা যায়।
অতএব ১৯৩৮ সালের জুন মাসে কলকাতার চৌরঙ্গীতে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে গিয়ে টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে এলাম। ফলাফল প্রথম বিভাগেই ছিল। যে ধর্মপ্রাণ পিতা শিশুকালে খেলার ছলে বড় ভাইয়ের স্লেটে আমার হাত আঁকা শিখিয়েছিলেন, সেই নিরীহ মানুষটিকে বাধ্য করেছিলাম আমাকে নিয়ে আর্ট স্কুলের প্রিন্সিপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তখন এইটাই নিয়ম ছিল। আব্বা বিরোধিতাও করেননি, আবার উষ্ণতার উত্তাপ দিয়ে সমর্থনও করেননি।
১৯৩৮ সালের জুলাই মাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকার অনুশীলন আরম্ভ হয়ে গেল। প্রথম দিকে মনে মনে নিজেকে বিরাট কী ভাবতাম এবং সেইভাবেই চলাফেরা করতাম। রেমব্রান্ট, মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল—সব নখের ডগায়। তারপর যত দিন যেতে লাগল, ততই ঘোর কাটতে লাগল। পাঁচ বছরের মধ্যেই কামরুল নামে নতুন এক শিশু হিসেবেই যেন আবার জন্ম নিলাম। এবং সেই থেকে নিউটনের মতোই সমুদ্রতীরের নুড়িপাথর সংগ্রহ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আজ অবধি সেই পাথর স্পর্শ করা তো দূরের কথা, তার আলোর ছটা এখনো দৃষ্টিগোচর হলো না। তবুও হাল ছাড়িনি। ছাড়বই বা কোন সাহসে, পেটে তো আর বিদ্যা নেই। আমার পিতা প্রায়ই আমার ছবি আঁকাকে সমর্থন করার জন্যে যুক্তি দিয়ে বলতেন, ‘ছবি আঁকাও তো হুনুরে কাজ, পেট চলেই যাবে ওর।’ সত্যিই, পেট তো চলেই যাচ্ছে। তাহলে কি পেট চালাবার জন্যে ছবি আঁকছি? এ প্রশ্নের উত্তর কি দেব? না, ছবি আঁকবার জন্যেই ছবি আঁকতে আরম্ভ করেছিলাম বটে, পরে সময় যত যেতে লাগল, ততই মনে নানান প্রশ্নের তাগিদ অনুভব করতে লাগলাম। নিজের ভালো লাগা সেই সঙ্গে অন্যদেরও ভালো লাগানো। এটাতেও যেন প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেলাম না। বয়স বাড়ার সাথে কিছু কিছু রাজনৈতিক চিন্তার আঘাত পড়ল মনের দরজায়। তার মধ্যে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। সে মানুষ সর্ব সমাজের, বিশেষ করে শোষিত সাধারণ শ্রেণির, নিচের তলার মানুষের আর্তনাদ যেন অধিকতর। কিন্তু শিল্পকলা তো শুনেছি চিত্তবিনোদনের জন্যে! হ্যাঁ তার মধ্যে দিয়েই নতুন বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। আমার ছবির মধ্য দিয়ে ওই কাজটি করতে হবে।
![]() |
| পটুয়া কামরুল হাসানের তুলির টানে টানে ফুটে উঠত বাংলার নকশা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য। ছবি: সংগৃহীত |
Monday, January 1, 2024
রম্যকথন: কিছুটা বিলিতিয়ানা, কিছুটা বাঙালিয়ানা by সারফুদ্দিন আহমেদ
আদতে বাঙাল-ঘরের খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদ্যাপনে বাঙালিয়ানার মিশেল আছে। তাই এই উদ্যাপন এখনো ঠিক ‘সায়েবি’ হয়ে ওঠেনি।
নিউ ইয়ারে মাই ডিয়ার টাইপের বন্ধু-ইয়ার নিয়ে বিয়ারে বুঁদ হওয়া পশ্চিমের পুরোনো রেওয়াজ। সেই ব্রিটিশ আমলে আমাদের এই অঞ্চলে সাদা সাহেবরা একত্রিংশ রজনী ওরফে থার্টি ফাস্ট নাইটে নাচগানের পার্টিতে মিলিত হতেন। তাঁদের সঙ্গে বাঙালি ‘এলিট’ নরনারীও জুড়তেন।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর ‘ইংরাজি নববর্ষ’ কবিতায় সেই রকমের একটি থার্টি ফার্স্ট নাইট পার্টির বর্ণনা দিয়েছেন: ‘নববর্ষ মহাহর্ষ ইংরাজটোলায়/ দেখে আসি ওরে মন, আয় আয় আয়/ সাহেবের ঘরে ঘরে কারিগুরি নানা।/ ধরিয়াছে টেবিলেতে অপরূপ খানা/ বেরিবেষ্ট সেরিটেষ্ট মেরিরেষ্ট যাতে/ আগে ভাগে দেন গিয়া শ্রীমতীর হাতে।’
সেই পার্টিতে বাঙালি পুরুষদের পাশাপাশি বাঙালি নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি ফুট কেটেছেন: ‘শাড়ী পরা এলোচুল আমাদের মেম/ বেলাক নেটিভ লেডি সেম্, সেম্, সেম্.../ হিপ হিপ হুররে ডাকে হোল ক্লাস/ ডিয়ার ম্যাডাম ইউ টেক দিস গ্লাস/ সুখের সখে খানা হলে সমাধান/ তারা রারা রারা সুমধুর গান।...শেরি চেরি বীর ব্রান্ডি ওই দেখ ভরা/ এক বিন্দু পেটে গেলে ধরা দেখি সরা।’
রবীন্দ্রনাথ ঋষি মানুষ। তিনি পয়লা বৈশাখের সুবহে সাদিকে লিখেছিলেন, ‘নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন বর্ষ হয় গত!.../ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বরষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’
খ্রিষ্টীয় নববর্ষকেও রবি ঠাকুর ঋষিসুলভ চোখে দেখেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মতো মৌজমাস্তির বর্ণনায় তিনি যাননি। ইংরেজিতে লেখা ‘দ্য নিউ ইয়ার’ কবিতায় নতুন বছরকে উতল হাওয়ার ঝাপটায় বৃন্তচ্যুত ফলের সঙ্গে তুলনা করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘লাইক ফ্রুট, শেকন ফ্রি বাই অ্যান ইমপেশেন্ট উইন্ড/ ফ্রম দ্য ভেল অব ইটস মাদার ফ্লাওয়ার,/ দাউ কামস্ট, নিউ ইয়ার।’
দিন বদলেছে। এই সময়ের নাগরিক পরিসরে, বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের ব্যবহারিক সংজ্ঞা ভিন্ন। হাসপাতাল চত্বরে পর্যন্ত বাজি-পটকার ঠুসঠাস, মহল্লার মোড়ে মোড়ে ধুমধাড়াক্কা মিউজিক, বাইক নিয়ে ভোঁ ভোঁ শব্দে এক শ কিলোমিটার গতিতে দশ-বারোজনের উদ্দাম রেস, ছাদে ছাদে ‘ধুম্মা চালে ধুম্মা চালে ধুম’—এসবই এখানকার নিউ ইয়ারের পিয়ারের অনুষঙ্গ।
এখানে ফি বছর পটকা-বাজি ফুটানোয় পুলিশের যত মানা আসে, তত বেশি বাজি-বোমাবাজির শব্দে নতুন বছরকে ‘বুকে আয় ভাই’ বলে স্বাগত জানায়। এখানে খ্রিষ্টীয় বর্ষের একত্রিংশ রজনীর বাস্তবিক ব্যবহারিক সংজ্ঞা হলো: ‘যে দিবাগত মধ্য রজনীতে বোমাসদৃশ কালীপটকার ব্রহ্মাণ্ডবিদারী নিনাদ ও অযুত আতশবাজির উল্লাসমুখর আলোকোজ্জ্বল আয়োজনে সদ্যাগত খ্রিষ্টীয় বর্ষকে “হ্যাপি নিউ ইয়ার” ওঙ্কারধ্বনি সহযোগে স্বাগত জানানো হয়, উহাকে থার্টি ফার্স্ট নাইট বলা হইয়া থাকে।’
এসব দেখে এখানকার খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদ্যাপনকে না ‘সাহেবি উৎসব’ বলার জো আছে, না তাকে বাঙালির উৎসব বলা যায়। কিছুটা বিলিতিয়ানা আর কিছুটা বাঙালিয়ানার মিশেলে আমাদের একটি নিজস্ব ঘরানার দো-আঁশলা কায়দায় আমরা নতুন বছরকে বরণ করি।
প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের তরুণ বয়সীদের অনেকে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ কথাটার আক্ষরিক বাংলা মানে না জানলেও জিনিসটা যে কী, তা ভালোই বোঝে।
রাত ১২টা ১ মিনিট হলেই পরস্পরের মধ্যে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলাবলি শুরু হয়। ফেসবুকের পাতা কিংবা টুইটার হ্যান্ডেলে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’খচিত ডিজিটাল স্টিকার সেঁটে দেওয়া হয়। টাইপ করে ভুলভাল বানানে লেখার ঝক্কি এড়াতে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ সংলাপধারী ভার্চ্যুয়াল কার্ড চালাচালি হয়।
তার মানে, এত হইহুল্লোড় ও পটকাবাজির বাইরেও নতুন বছর হাসিখুশিতে কাটানোর একটা প্রত্যাশা ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর মধ্যে গাঢ়ভাবেই মেশানো থাকে। একটা সর্বজনীন শুভ-ইচ্ছার দ্যোতনা তাতে মেশানো থাকে।
সামনের বছর কেমন যাবে, আমরা জানি না। ভোটপরবর্তী জোটনিরপেক্ষ বাংলাদেশ কত দূর এগোবে; মরিচের কেজি আগের বছরের মতো এক হাজার টাকায় উঠবে কি না; ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির মতো স্কুল-কলেজের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কালোবাজারে বিক্রি হবে কি না; আগের বছরের মতো টাকা পাচার হবে কি না—আমরা জানি না। এসব শঙ্কা আছে। ভালো কিছুর সম্ভাবনাও আছে।
নতুন বছরে আমরা সেই শঙ্কা আর সম্ভাবনার দোলাচলে। এর মধ্যেই বলছি, ‘পরানের দোস্ত ইয়ার, হ্যাপি নিউ ইয়ার’।
সারফুদ্দিন আহমেদ: প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
![]() |
| অলংকরণ: আরাফাত করিম |
Tuesday, April 14, 2020
বদলে যাওয়া সংস্কৃতি নাকি আধুনিকতার ছোঁয়া? by শামীমুল হক

কেউ টানছেন ডবডবি। এক উৎসবমুখর গ্রাম-বাংলা। বছরের শেষদিন চৈত্রসংক্রান্তির দিনে এবং বছরের শুরুর দিন পহেলা বৈশাখ বসতো এ বান্নি বা মেলা। থাকতো নানা ধরনের খাবার। যা শুধু মেলাতেই মিলত। এছাড়া শিশুরা নাগরদোলায় চড়তো। কেউ কেউ পুতুলনাচ দেখতো। কোনো কোনো বান্নিতে যাত্রাপালাও হতো। বাংলা নববর্ষ বলে বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য ছিল বান্নি জুড়ে। শুধু তাই নয়, ব্যবসায়ীরা হালখাতা করতেন। মিষ্টির ড্রাম নিয়ে বসতেন।
ওইদিন যাবতীয় বকেয়া পরিশোধ করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দায়মুক্তি নিতেন নির্দিষ্ট ক্রেতারা। এর অর্থ ছিল ব্যবসায়ী বা দোকানিরা বকেয়ার খাতাটি হালনাগাদ করে নিতেন। একে একে দেনাদাররা আসেন। দেনা পরিশোধ করেন। দোকানিরা তাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে বিদায় দিতেন। করতেন কোলাকুলি। পরদিন থেকে শুরু হতো নতুন বছরের যাত্রা। আর গ্রামের ঘরে ঘরে সেদিন একটু হলেও তিতা জাতীয় কিছু মুখে দিয়ে তারপর খাবার শুরু করতেন। এটাই ছিল প্রথা। কিন্তু এখন? গ্রামে গেলেও এসব আর দেখা যায় না। এতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। তিতার জায়গা দখল করেছে পান্তা আর ইলিশ। নব্বই দশকে শুরু হওয়া চারুকলার মঙ্গলশোভাযাত্রা হয়ে উঠেছে বাংলা নববর্ষের প্রধান আকর্ষণ। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। কিন্তু এ প্রাণের উৎসবে বাঙালির বাঙালিয়ানা কতটুকু আছে?
ভারতবর্ষের সম্রাট বিক্রমাদিত্য প্রবর্তন করেন পঞ্জিকা। এর নাম বিক্রম সাম্বাত পঞ্জিকা। এই পঞ্জিকা ধরেই বাংলা পঞ্জিকার যাত্রা। এই পঞ্জিকাকেই ক্যালেন্ডার বলা হতো। তখন ছিল সংস্কৃত ভাষা। এটাকে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা হয়। বারো মাসের নামগুলোও রাখা হয় একই। ইতিহাস মতে, রাজা শশাঙ্কের শাসনামলে ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। একটি কথা না বললেই নয়, পহেলা বৈশাখ শুধু বাঙালির নববর্ষ নয়, এটি পুরো দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নববর্ষ। ভারতবর্ষের শাসনক্ষমতা তখন মুঘল সম্রাটদের হাতে। পাল থেকে সেন, সেন থেকে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে মুঘলরা ক্ষমতায় আসে। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর এবং তার পুত্র দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ূন হিজরি সাল অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করলেও, তৃতীয় মুঘল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর চন্দ্র মাসের ক্যালেন্ডার পাল্টে বাংলা ক্যালেন্ডার পুনঃস্থাপন করেন। এর কারণ ছিল, খাজনা আদায়।
চন্দ্র মাস অনুযায়ী খাজনা আদায় করতে গিয়ে কয়েক বছর ঘুরে খাজনা আদায়ের সময় চলে আসে ভিন্ন ঋতুতে। এতে কৃষকদের খাজনা দিতে সমস্যায় পড়তে হয়। এই সমস্যা দূর করতে সম্রাট আকবর ইরান থেকে আসা বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ সিরাজিকে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌরবর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব দেন। এভাবেই বাংলা পঞ্জিকার নবযাত্রা শুরু হয়। এরপরও সময়ে সময়ে বাংলা ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিকায়ন হয়েছে।
কিন্তু পহেলা বৈশাখ বাঙালির হৃদয়ে বাঙালিয়ানাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছে। তবে আদি সেই সংস্কৃতি দিন দিন বদলে যাচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখানেও এসেছে পরিবর্তন। পান্তা আর ইলিশ এসেছে খাবারের পাতে। হালখাতা যেন এখন হারিয়ে যাচ্ছে। কার্ডের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানো হয়ে গেছে রেওয়াজ। নদীর পাড় থেকে বান্নি উঠে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও উঠে গেছে। এর জায়গা নিয়েছে শহরে বৈশাখী মেলা নামে। যেন গ্রামীণ ছোঁয়ার ছিটেফোঁটাও পাওয়া যায় না। সেই এক মঞ্চের মধ্যেই যেন বন্দি বাংলা নববর্ষ। আগে শহর থেকে গ্রামে যেতেন বান্নি দেখতে। আর এখন গ্রাম থেকে মানুষ শহরে আসেন মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখতে। পার্থক্য এখানেই।
Thursday, October 24, 2019
ওই দেখা যায় হাওর-পাহাড়-মেঘ by হিমাদ্রি শেখর ভদ্র
![]() |
| মেঘালয় পাহাড় (ছবি– প্রতিনিধি) |
Friday, September 27, 2019
হিমালয়ের দুর্গমতম পাস অতিক্রম করলো বাংলাদেশের বিএমটিসি by কাজী বিপ্লব
| হিমালয়ের দুর্গতম পাস তাশি লাপচা |
Wednesday, July 24, 2019
রূপচর্চায় অলিভ অয়েল ব্যবহার করবেন যেভাবে by আনিকা আলম

- *অলিভ অয়েল সামান্য গরম করে ঘষে ঘষে লাগান চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত। তোয়ালে গরম পানিতে ডুবিয়ে নিংড়ে নিন। গরম তোয়ালে জড়িয়ে রাখুন মাথায়। ১৫ মিনিট পর ভেষজ শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিন চুল।
- *নখ বড় রাখেন? নখের কিউটিকলকে আরও মজবুত রাখতে অলিভ অয়েল ঘষুন নিয়মিত।
- *পায়ের গোড়ালি ফাটার সমস্যায় অলিভ অয়েল খুবই কার্যকর। রাতে ঘুমানোর আগে অলিভ অয়েল ও গ্লিসারিনের মিশ্রণ ফাটা গোড়ালিতে ম্যাসাজ করুন। পরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন।
- *একটি ডিম ফেটিয়ে ৩ টেবিল চামচ অলিভ অয়েলে মিশিয়ে চুলে ব্যবহার করুন হেয়ার প্যাক হিসেবে। আধা ঘণ্টা পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। চুল হবে ঝলমলে।
- *ত্বকের মরা চামড়া দূর করতে মধু, ওট ও ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে অলিভ অয়েল মিশিয়ে ফেসপ্যাক বানিয়ে নিন। এটি ত্বকে ঘষে ঘষে লাগান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন।
- *অলিভ অয়েলে তুলা ভিজিয়ে ঘষে ঘষে ওঠাতে পারেন ত্বকের মেকআপ।
Tuesday, May 28, 2019
বর্ষবরণে পাহাড়ে বৈসাবি উৎসব


ফুল ভাসানো শেষে তরুণ তরুণীরা মেতে উঠেন আনন্দ উৎসবে। নদীতে স্লান শেষে বাড়ি গিয়ে বড়দের প্রণাম করেন ছোটরা।

ভোরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে নদীসহ আশপাশের বিভিন্ন খাল ও ছড়ায় গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে বাহারী রঙের ফুল দিয়ে প্রার্থনা করে বৈসাবি উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করা হয়। এটি ফুল বিজু নামে পরিচিত।
Tuesday, April 16, 2019
নববর্ষকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা by শুভংকর কর্মকার

• দেশীয় পণ্য ক্রয়ে ক্রেতাদের ঝোঁক।
• বেচাবিক্রিতে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা।
• বৈশাখী অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে।
বাঙালির সর্বজনীন উৎসব বৈশাখ। এ উপলক্ষে শহরের ফুটপাত থেকে শুরু করে অলিগলির দোকান ও বিপণিবিতানে গত কিছুদিন ধরে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। লাল-সাদাসহ বাহারি রঙের বৈশাখী পোশাক দেদার বিক্রি হয়েছে। অনলাইনেও বেচাবিক্রি জমে ওঠে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বড় ব্র্যান্ড ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারে মিষ্টিসহ বিভিন্ন ধরনের উপহার পাঠিয়ে তাদের গ্রাহকদের বৈশাখী শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।
বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী বলছেন, প্রতিবছরই বৈশাখী অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। চার বছর ধরে সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। একইভাবে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও পাচ্ছেন ভাতা। বর্ষবরণে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানও বাড়ছে। এতে করে বৈশাখকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য রাজধানী থেকে পল্লি অঞ্চলে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
পয়লা বৈশাখে কত টাকার বাণিজ্য হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদের ধারণা, সারা দেশে নববর্ষকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। ঈদ বা পূজার সঙ্গে বর্ষবরণ উৎসবের তফাত হচ্ছে, এ সময় দেশীয় পণ্য ক্রয়ে ক্রেতাদের ঝোঁক থাকে। তাই বৈশাখকেন্দ্রিক বেচাবিক্রিতে গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ চাঙা হয়ে ওঠে।
বর্ষবরণের উৎসবে নতুন পোশাকের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি থাকে। গত তিন দিন রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, নিউমার্কেট, গাউছিয়া ও গুলিস্তানের বঙ্গবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বৈশাখী পোশাক কিনতে বিপণিবিতানে ভিড় করছে মানুষ। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নগরীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে বৈশাখী পোশাক নিয়ে বসেন অনেক হকার। তবে ফুটপাতে হকার বসতে না দেওয়ার কারণে মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় গতবারের মতো এবার আর বৈশাখী পোশাকের পসরা একেবারেই দেখা যায়নি।
দেশের মানুষের পোশাকের জোগান দেওয়ার জন্য পুরান ঢাকা, কেরানীগঞ্জ, কালীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র-মাঝারি কারখানা গড়ে উঠেছে। এ ধরনের ছয় হাজার কারখানার সংগঠন অভ্যন্তরীণ পোশাক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, পয়লা বৈশাখে সারা দেশে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সমিতির সভাপতি আলাউদ্দিন মালিক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, পোশাকের ব্যবসা উৎসবকেন্দ্রিক। ঈদ ও পূজার পর বড় উৎসব এখন বৈশাখ। ১০-১৫ বছর আগে বৈশাখী পোশাক টুকটাক বিক্রি শুরু হয়। এখন সেটি বহুগুণ বেড়ে গেছে। কেরানীগঞ্জ, কালীগঞ্জের মতো পাইকারি বাজার থেকে বৈশাখের পোশাক কিনে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, গতবারের চেয়ে এবার পোশাকের ব্যবসা ২০ শতাংশ বেড়েছে।
দেশের ফ্যাশন হাউস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতি (এফইএবি বা ফ্যাশন উদ্যোগ) ফ্যাশন হাউসগুলোর বিক্রিবাট্টা নিয়ে জরিপ করছে সমিতি। সেই জরিপের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ফ্যাশন হাউসগুলোতে সারা বছর প্রায় আট হাজার কোটি টাকার বেচাবিক্রি হয়। এর মধ্যে অর্ধেকই রোজার ঈদে। ২৫-২৮ শতাংশ পয়লা বৈশাখে।
জানতে চাইলে ফ্যাশন উদ্যোগের নির্বাহী পরিষদের সদস্য আজহারুল হক গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, বৈশাখের বেচাবিক্রি হয় মূলত শেষের তিন-চার দিন। এখন পর্যন্ত যেটুকু হিসাব তার ভিত্তিতে বললে গতবারের চেয়ে বেচাবিক্রি ১০-১৫ শতাংশ বেশি হয়েছে।
একই কথা বললেন দেশের স্বনামধন্য ব্র্যান্ড আড়ংয়ের বিপণন বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) তানভীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঈদ ও পয়লা বৈশাখ কাছাকাছি হওয়ায় আমরা কিছুটা শঙ্কায় ছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত বৈশাখের বেচাবিক্রি খুবই ভালো হয়েছে।’
ইপিলিয়ন গ্রুপের ফ্যাশন ব্র্যান্ড সেইলর। গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন আল-মামুন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতবারের চেয়ে এবারের বৈশাখে আমাদের বিক্রি দ্বিগুণ।’
পয়লা বৈশাখের সঙ্গে হালখাতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। হালখাতায় ক্রেতা ও গ্রাহকদের মিষ্টি-নিমকি খাওয়ান ব্যবসায়ীরা। আধুনিক যুগে হালখাতা উৎসবের জৌলুশ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তারপরও মিষ্টি খাওয়ানোর প্রচলনটা অনেকেই ধরে রেখেছেন। সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান। তারা তাদের গ্রাহকদের নববর্ষের উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে মিষ্টিকে রাখছে সবার ওপরে। ফলে পয়লা বৈশাখে মিষ্টির দোকানের ব্যবসা অন্য সময়ের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে সারা বছরে যে পরিমাণ মিষ্টি বিক্রি হয়, তার ২০-২৫ শতাংশ পয়লা বৈশাখে হয়ে থাকে।
প্রাণ গ্রুপের মিষ্টির ব্র্যান্ড মিঠাই বৈশাখ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, জুয়েলারি, ইলেকট্রনিকসহ ৫০টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০-৩৫ টন মিষ্টি ক্রয়াদেশ পায়। সেই চাহিদা মেটাতে ৯ এপ্রিল থেকে তাদের কল্যাণপুরের কারখানায় প্রতিদিন ১০-১২ টন মিষ্টি উৎপাদন হচ্ছিল। যদিও সাধারণ সময়ে দিনে ৩ টন মিষ্টি উৎপাদন করে মিঠাই।
জানতে চাইলে মিঠাইয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) অনিমেষ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বৈশাখে আমরা ২৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১০ টন মিষ্টির ক্রয়াদেশ পেয়েছিলাম। তবে গতবারের চেয়ে এবার মিষ্টির ক্রয়াদেশ তিন গুণ বেড়েছে।’
এদিকে বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ না থাকলেও ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশ অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ফলে নগরবাসীর মধ্যে ইলিশ কেনার একধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। বাড়তি ইলিশের জোগান দিতে দেড়-দুই মাস আগে থেকে মাছ মজুত করেন ব্যবসায়ীরা। তারপরও মাছটির দাম আকাশ ছুঁয়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে বর্ষবরণে ইলিশ খাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ায় দুই বছর ধরে পয়লা বৈশাখে ইলিশ কেনার প্রতি মানুষের ঝোঁক কিছুটা হলেও কমেছে।
ঢাকার কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী শুক্কুর আলী গতকাল ৭০০-৭৫০ গ্রাম ওজনের পদ্মার এক হালি ইলিশ ৩ হাজার টাকা এবং ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের পদ্মার ইলিশ ৫ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেন। বেশ কয়েক দিন আগের হিমায়িত ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি করছেন ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা খুবই ভালো। তবে আগের মতো কাড়াকাড়ি নেই।’
পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বৈশাখী ছুটি কাটাতে কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও সিলেটে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন অনেকে। কেউবা যান বিদেশে। তবে বাড়তি ছুটি না থাকায় এবার ঘুরতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কিছুটা কম—এমনটাই জানালেন ট্যুর অপারেটর মালিকদের সংগঠন টোয়াবের পরিচালক সৈয়দ সাফাত উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বৈশাখে ঘুরতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা অন্যবারের চেয়ে কম। কারণ বাড়তি ছুটি নেই। বাচ্চাদের স্কুলও খোলা। তারপরও বালি ও শ্রীলঙ্কা যাচ্ছে কিছু মানুষ। সেখানে অফ সিজন চলছে, খরচ কম।’
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, ঈদ ও দুর্গাপূজার সঙ্গে বৈশাখী উৎসবের তফাত হচ্ছে এটি সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসবে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা থাকে। এতে করে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত জনগণ অর্থনৈতিকভাবে সুবিধা পান। তবে মুনাফার বড় অংশই শহরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যায়। সে জন্য গ্রামের উৎপাদকদের যদি ক্রেতাদের কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রি সুযোগ করে দেওয়া যায়, তাহলে বৈশাখের বেচাবিক্রিতে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও চাঙা হবে। সে ক্ষেত্রে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলীবাবা উদাহরণ হতে পারে। চীনের গ্রামীণ পণ্য সরাসরি বিক্রির সুবিধা করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
Monday, April 15, 2019
ছাত্রলীগের কোন্দলে পণ্ড বৈশাখী আয়োজন

ছাত্রলীগের একটি অংশের দাবি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন জড়িত। যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শোভন নিজে।
তবে কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েও এ আয়োজন সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে দুই দিনব্যাপী কনসার্টের আয়োজক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ বলে এতোদিন প্রচারণা চালানো হলেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর থেকে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা কনসার্টের আয়োজক ছাত্রলীগের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বলে প্রচার করেন। যদিও ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর গতকাল এক স্ট্যাটাসে দাবি করেছেন এর সঙ্গে ডাকসুর কোনো সম্পর্ক নেই। এ কনসার্ট ছাত্রলীগের। স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘নিজেরা কোটি টাকার স্পন্সরের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে মারামারি, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করেছেন। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কোণঠাসা করতে প্রচার চালাচ্ছেন এটি ডাকসু ও ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম। অথচ ডাকসুতে এই প্রোগ্রাম নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। দয়া করে নিজেদের ধান্দাবাজি, চাঁদাবাজিতে ডাকসুর নাম জড়িয়ে ডাকসুকে কলঙ্কিত করবেন না। ডাকসুর সঙ্গে এই বাণিজ্যিক কনসার্টের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত পৌনে ১টার দিকে ভিসি চত্বরে এলাকায় হঠাৎ বাইকে মহড়া দিতে থাকে ছাত্রলীগের রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারী নেতাকর্মীরা। এর পর পরই বিভিন্ন হল থেকে প্রায় শ’খানেক নেতাকর্মী এসে মল চত্বর এলাকায় কনসার্ট স্থলে নির্মিত স্টেজ, স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের ব্যানার ফেস্টুন, স্টল, বুথ, ফ্রিজসহ কনসার্টের বিভিন্ন সরঞ্জামে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলে এ অগ্নিসংযোগ। এ ছাড়াও ক্যাম্পাসজুড়ে টানানো স্পন্সর প্রতিষ্ঠান মোজোর সব ব্যানার ফেস্টুনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাত দেড়টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীসহ তার অনুসারীরা।
এরপর আসেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। এ সময় তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন হল থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। এ সময় তারা আগুন নেভায়। এরপর ছাত্রলীগের শীর্ষ এ তিন নেতা ডাকসুতে গিয়ে মিটিং করে। অন্যদিকে তাদের অনুসারী নেতাকর্মীরা মল চত্বর ও মধুর ক্যান্টিন এলাকায় মিছিল করে। ‘সন্ত্রাসীদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দেয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নেতা মানবজমিনকে বলেন, মূলত এ কনসার্ট আয়োজন নিয়ে কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে অবহিত করা হয়নি বলে তার নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা বলেন, ডাকসুতে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস মিলে কনসার্টের আয়োজন করে। অথচ কেন্দ্রীয় সভাপতি হওয়ার পরও তাকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তাই তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। অন্যদিকে সঞ্জিত চন্দ্র দাসেরও কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, আয়োজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের হলেও কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সেটিকে ডাকসুসহ ছাত্রলীগের আয়োজন বলে প্রচার করছেন।
এবং ডাকসুর ক্ষমতা জাহির করছেন। এটি নিয়ে সঞ্জিতও মনঃক্ষুণ্ন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় সেখানে মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দিয়েছেন- সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন রহমান, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আতিকুর রহমান খান, অমর একুশে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এহসান উল্লাহ, মুহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী, স্যার এফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষার, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের যুগ্ম আহ্বায়ক আমির হামজাসহ অনেকে। এরা সবাই ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারী। এদিকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর দু’টি হলে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারীদের ওপর হামলা ও কক্ষে ভাঙচুর হয়েছে। রাত ৩টার দিকে এ এফ রহমান হলে শোভনের অনুসারী সাগর, মেশকাত ও মামুনকে মারধর করা হয়। পরে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হলটিতে ভাঙচুর করা হয়েছে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের কক্ষে। আহতদের দাবি, ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেনের সমর্থকরা তাদের মারধর করেছেন।
এর কিছুক্ষণ পর শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হামজার কক্ষেও ভাঙচুর করা হয়। এ ব্যাপারে ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে গতকাল দুপুরে ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। এ সময় ভিসি তাকে বলেন, তারা যদি নিজেদের মধ্যে সমস্যা মিটিয়ে চারজন এক হয় তবে তাদের প্রোগ্রাম করতে দেয়া হবে। তা না হলে কোনো প্রোগ্রাম করতে দেয়া হবে না। এরপর বিকাল তিনটার দিকে সংগঠনটির কেন্দ্র ও ঢাবির শীর্ষ চার নেতা ভিসির বাসভবনে গিয়ে বৈঠক করেন। মলচত্বরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা প্রসঙ্গে ঢাবি ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, এ ঘটনায় যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দিয়ে মোজোর মার্কেটিং বিভাগের অপারেশন হেড (ব্র্যান্ড) আজম বিন তারেক দাবি করেন, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে তাদের প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মালামালের ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ৩৪টি স্টলের সবক’টি ভাঙচুর, ৬টিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, ২২টি ফ্রিজের মধ্যে ১৭টি ভাঙচুর করা হয় এবং ১টিতে আগুন দেয়া হয়। এ ছাড়া সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পুনরায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে সাউন্ড সিস্টেমস নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস গত রাতে মানবজমিনকে বলেন, কনসার্টস্থলে যে বা যারাই হামলা চালিয়েছে তাদের কাউকে ছাড় নয়। আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবো এবং এ হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। তারাও এ বিষয়টি দেখবেন। তবে কনসার্ট আর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
আপনারা সবাই পান্তাভাত খাইয়েছেন : লোটে শেরিং

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আজকে অনেক খুশি হয়েছি। আমি এখান থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য খুবই এক্সসাইটেড হয়ে আছি। ময়মনসিংহে আমি সাত বছর ছিলাম। এরপর ঢাকায় চার বছর এফসিপিএস করেছি। এখানে এসে মনে হচ্ছে, আমার দ্বিতীয় বাড়িতে এসেছি।’
এর আগে সকালে লিভার আয়ুশ চ্যানেল আই হাজারও কণ্ঠে বর্ষবরণ ১৪২৬’ এ সুরের ধারার চেয়ারম্যান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বে হাজারও কণ্ঠে ‘তোমার কাছে এ বর মাগি, মরণ হতে যেন জাগি গানের সুরে’ গানে বরণ করা হয় বাংলা নববর্ষ ১৪২৬। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোতে শেরিং। বর্ণিল এই উৎসবের আয়োজন বসেছে ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের উন্মুক্ত চত্বরে।
অনুষ্ঠান উদ্বোধনের সময় চ্যানেল আই এর পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, ‘ফলে ও ফসলে যেন সমৃদ্ধ হয় নতুন বছরটি।’
এরপর ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোতে শেরিং অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন।
তাকে বরণ করে নেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ এবং রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।
অষ্টমবারের মতো চ্যানেল আই ও সুরের ধারার আয়োজনে হাজারো শিল্পীর অংশগ্রহণে পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয় থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের প্রাঙ্গণ মেতে উঠে ‘লিভার আয়ুশ চ্যানেল আই হাজারও কণ্ঠে বর্ষবরণ ১৪২৬’ অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে নেমেছে শিল্পীমনা মানুষের ঢল। সব বয়সী মানুষ এখানে নববর্ষের প্রথম প্রহরটা উদযাপন করতে এসেছে।
শিল্পীদের কণ্ঠে বর্ষবরণের পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে বৈশাখী মেলার। মেলায় আছে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের উপাদান দিয়ে সাজানো স্টল। স্টলগুলোর মধ্যে রয়েছে পিঠা-পুলি, মাটির তৈরি তৈজস, বেত, কাঁথা, পিতল, পাট ও পাটজাত দ্রব্যের নানা জিনিসপত্রসহ রকমারি পণ্যের স্টল।

Sunday, April 14, 2019
নতুন আশা নতুন স্বপ্ন by কাফি কামাল

ব্যতিক্রমহীনভাবেই কবিগুরুর গানে নতুন বছরকে জানানো হবে আহ্বান। অনেকটা প্রার্থনাসংগীতের মতোই জরা ও গ্লানির পুরাতন মুছে ঘোষিত হবে মঙ্গলময় আগামী নির্মাণের প্রত্যয়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজন আর মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আজ ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানানো হবে। শুভ বাংলা নববর্ষ, স্বাগত অভিবাদন।
নববর্ষ আসে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয় নিয়ে।
সব অশুভ ও অসুন্দরকে পেছনে ফেলে নতুন কেতন উড়িয়ে বৈশাখ আসে। বিপুল বৈভব, সম্ভাবনা, নতুনের আহ্বান, পুরাতন দিনের হতাশা কাটিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাবে আজ বাঙালি। পহেলা বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে মাতবে দেশ। স্নাত হই বৈশাখের রৌদ্র খরতাপে, দূর করি বৎসরের যত আবর্জনা। গ্লানি মুছিয়ে, জরা ঘুচিয়ে শপথ নিই বিশুদ্ধতার। নতুন বছরে সবার আশা এক বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। যেখানে থাকবে না কোনো ভয়, হতাশা কিংবা অশুভ শক্তির। গণমানুষের অধিকার আদায় আর শান্তি-স্বস্তির স্মারক হয়ে উঠুক আজ। হাজার বছরের বয়ে চলা লোকজ সংস্কৃতি আমাদের নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে। নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয়ে নতুন কুঁড়ির মতো আমাদের সমাজ, জীবনে এবং রাষ্ট্রে সম্ভাবনার নতুন নতুন পালক যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা গণমানুষের। বিশ্বকবির ভাষায়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুছে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ পহেলা বৈশাখে আমরা সুন্দর, সুচি আর চিরমঙ্গলের জয়গান করি।
পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এ উৎসবের সার্বজনীনতা অসাধারণ। বাঙালি জাতি তার নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, আর এ ধারা চলে আসছে গানে-কবিতায়, লোকাচারের নানা অনুষঙ্গে, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দেশের বৃহত্তম অসামপ্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের সঙ্গে বাংলার সাহিত্য, বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই বাংলা সন গণনার শুরু মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন।
পরে যুক্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। অমর্ত্য সেন তার আর্গুুমেন্টিভ ইন্ডিয়ানে বলেছেন- ‘আকবর সব ধর্মবিশ্বাসীর সমান উপযোগী একটি বর্ষপঞ্জি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।’ আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল ‘আকবরনামা’য় লিখেছেন- ‘ফসল সংগৃহীত হয় সৌর বর্ষপঞ্জি অনুসারে। তাই হিজরি সালের পাশাপাশি একটি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন ছিল। দ্বীন-এ-ইলাহির মতো আকবর সেটির নাম দিয়েছিলেন তারিখ-ই-ইলাহি। বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয় ১৫৫৬ সালে। নক্ষত্রের নাম থেকে নেয়া হয় মাসগুলোর নাম। তারিখ-ই-ইলাহি চালুর পর ১৪টি নতুন উৎসবের কথা ঘোষণা করেন আকবর। এই রকম এক নওরোজেই শাহজাদা খুররমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল মমতাজের। এ কারণে অনেকে বলতে চান, পহেলা বৈশাখ না হলে সৃষ্টি হতো না প্রেমের অমর স্মৃতি তাজমহল।
বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। পয়লা বৈশাখ এখন সব বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সমপ্রদায়নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব। কৃষকসমাজ আজও অনুসরণ করছে বাংলা বর্ষপঞ্জি। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও পরে সংযোগ ঘটে রাজনৈতিক ইতিহাসের। আমাদের পরাধীনতার কালে এই উৎসব আয়োজনে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালিও সোচ্চার ছিল প্রতিবাদে। ষাটের দশকে রমনা বটমূলে সূচিত ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে করেছে বেগবান। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্ব্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা।
২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইউনেসকো এ শোভাযাত্রাকে দিয়েছে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা। প্রথমদিকে পয়লা বৈশাখের উৎসব ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। শহরে-বন্দরেও তা সীমিত ছিল হালখাতায়। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের চেয়ে বর্ণিল, বর্ণাঢ্য আয়োজনে এ উৎসব পালিত হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি নগর-মহানগরে। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের আদলে প্রায় সর্বত্র আয়োজিত হয় এ অনুষ্ঠান। বাংলা নববর্ষে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ রীতি এখনো এ দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির আমেজ নিয়ে উৎসবের পরিধির বিস্তার ঘটিয়েছে। আধুনিক বাঙালি তাদের বাংলা নববর্ষকে সাজিয়ে তুলছে মাতৃভূমির প্রতিটি আঙিনায় আরো বেশি উজ্জ্বলতায়। দেশের পথেঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসবমুখরতার বিহ্বলতা। পয়লা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারা দেশ। বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। সর্বত্র দেখা যায় নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস। কবির ভাষায়- ‘অনাগত আগামীর অফুরান বাদ্য/নতুনের আবাহনে হয়’।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে চাকমা, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা জনজাতি বছরের হিসাব করে বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী। নববর্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান উৎসব বৈসাবি। ত্রিপুরা জনজাতির বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাইং, চাকমাদের বিজু মিলিয়ে এ বৈসাবি। বাংলা নববর্ষকে উপলক্ষ্য করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, বাংলা ভাষাভাষি মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়ি জনপদে এখন উৎসবের অনিন্দ্য আমেজ। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিও মেতে উঠবে বর্ষবরণের নানা আয়োজনে। নববর্ষে উৎসব-পার্বণে ভোজনপ্রিয় বাঙালির খাদ্যতালিকায় রসগোল্লা, নকশিপিঠা, কদমা-বাতাসা, ভর্তা, আচার, খই, মুড়ি-মুড়কি, পায়েস অনিবার্য। পালা-পার্বণ, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় উৎসবে এসব সুস্বাদু খাবার শত বছর ধরে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। নববর্ষ উপলক্ষে চারদিকে ধুম পড়বে বাঙালির বাংলা খাবার আস্বাদনে।
নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। কেবল রাজধানী ঢাকাই নয় এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র্যাব) ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক (ডিজি) কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর আলম শুক্রবার রমনা বটমূলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে বলেছেন, পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নগরীর রমনা পার্ক, সোহরওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নাশকতা ঠেকাতে জোরদার করা হয়েছে র্যাবের নিরাপত্তা বলয়।
পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীর উৎসবস্থলগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকবে এবং তা সার্বক্ষনিক মনিটরিং করবে র্যাব। নববর্ষকে ঘিরে র্যাবের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যে কোন ধরনের নাশকতা ঠেকাতে প্রস্তুত রয়েছে র্যাব। এছাড়া রমনা বটমূলসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ভেন্যুতে ডগ স্কোয়াডসহ বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিট সুইপিং করবে। এছাড়া টহল টিম, ফুট পেট্রোল, ওয়াচ টাওয়ার, মোটরসাইকেল পেট্রোল ও অবজারভেশন পোস্ট থাকবে। বড় ভেন্যুগুলো মনিটরিংয়ের জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন, মোবাইল কোর্টসহ মেডিকেল টিম থাকবে, যাতে দেশের মানুষ নিবিঘ্নে নববর্ষ উদযাপন করতে পারে।
বর্ষ আবাহনে মূল অনুষ্ঠান: বর্ষবরণে আজ রাজধানী জুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজন থাকবে। প্রতিবছরের মত দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ছায়ানট’ ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সরোদবাদন দিয়ে শুরু করবে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ ১৪২৬ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইমেলাসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, জাতীয় জাদুঘর, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, কপিরাইট অফিস, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বিসিক নববর্ষ মেলা, আলোচনাসভা, প্রদর্শনী, কুইজ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ আায়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠানমালার। বাংলা নববর্ষের দিন সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হবে।
শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে- শিশু-কিশোর, ছাত্র-ছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের বিনা টিকিটে প্রবেশ করতে পারবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। অভিজাত হোটেল ও ক্লাব বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের আয়োজন করবে। বর্ষবরণ উপলক্ষে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র্র প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। বিকাল তিনটায় নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সকাল থেকেই আয়োজন করেছে খৈ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ও বাঙালি খাবার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।
পহেলা বৈশাখে সিলেটে মোটরসাইকেলে স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্য আরোহী নয় by ওয়েছ খছরু

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সিলেটের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে ১৫টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এই নিদের্শনার মধ্যে পুলিশ জানিয়েছে- ‘মোটরসাইকেলে চালক ব্যতিত অন্য কোনো আরোহী বহন করা যাবে না। তবে স্বামী-স্ত্রী চলাচল করতে পারবেন। একযোগে বা দলগতভাবে মোটরসাইকেল চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বা যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না।’ সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার গণমাধ্যম জেদান আল মুছা এই গণবিজ্ঞপ্তিটি প্রেরণ করেন।
গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে- ‘বাংলা বর্ষবরণ শান্তিপূর্ণ ও উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে উদ্যাপনের লক্ষ্যে নিম্নেবর্ণিত নির্দেশনাসমূহ অনুসরণের জন্য সকলকে অনুরোধ করা যাচ্ছে।’ এই নির্দেশনার মধ্য রয়েছে- বর্ষবরণের অনুষ্ঠান সম্পর্কে এসএমপি’র সংশ্লিষ্ট থানা এবং পুলিশ কমিশনার এর কার্যালয়কে অবহিত করতে হবে, বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজক কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বা নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করে অনুষ্ঠানস্থলের সার্বিক শৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি-বস্তু সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে, সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় কোনো ধরনের আতশবাজি, পটকা ফাটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যাবে না, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ব্যাগ, থলে, পোঁটলা, সুটকেস, টিফিন ক্যারিয়ার বা এ জাতীয় কোনো বস্তু বহনকে নিরুৎসাহিত করা হলো, খোলা ট্রাকে বাদ্যযন্ত্র বা সাউন্ড বক্স নিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রবেশ করা যাবে না এবং কোনো ধরনের রঙ ছিটানো যাবে না, অনুমোদিত অনুষ্ঠান আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সিসিটিভি স্থাপন, ভিডিও চিত্র ধারণ এর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষকে অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো, নির্জন বা জনগণের চলাচল কম এমন স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ প্রদান করা হলো, সিএনজিতে পূর্ব থেকে অপরিচিত যাত্রী বসা থাকলে তা এড়িয়ে চলুন অথবা পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন।
অপরিচিত যাত্রীর দেয়া কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকুন, বৈশাখী অনুষ্ঠানে যানজট নিরসনে নির্দিষ্ট পার্কিং এর স্থানে গাড়ি পার্কিং করার জন্য অনুরোধ করা হলো, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে চলাচলের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য অনুরোধ করা হলো, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের পাশে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখুন এবং প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০১৭৩০-৩৩৬৬৪৪ এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন, উন্মুক্ত স্থানে নববর্ষের অনুষ্ঠানসমূহ সন্ধা ৬টার মধ্যে অবশ্যই শেষ করতে হবে, সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা বস্তু প্রত্যক্ষ করলে পুলিশকে জানানো জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুছা জানিয়েছেন- নগরবাসীর বর্ষবরণ উদ্যাপনের এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে ১লা বৈশাখ পর্যন্ত এই আদেশ বহাল থাকবে। তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে শান্তিশৃংখলা বজায় রেখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উপভোগের স্বার্থে নগরবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন। এদিকে- গণ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনা।
Monday, April 16, 2018
প্রাণের উচ্ছ্বাস

নৃত্যগীতে বৈশাখ বন্দনার পাশাপাশি ছিল বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাজধানীতে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে আগে থেকেই নিরাপত্তা কড়াকড়ির কারণে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে জনসমাগম ছিল তুলনামূলক কম। বাড়তি নিরাপত্তায় কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। রাজধানীতে সকাল থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষের বর্ষবরণ উদযাপনে উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছিল ঢাকা। বিকালে বৈশাখের ঝড়-বৃষ্টিতে কিছুটা ছন্দপতন হয়েছিল উৎসবে।
রাজধানীতে শনিবার বিকালে আকাশ কালো করে শুরু হয় ঝড়, বৃষ্টি। এতে নগরে বৈশাখের উন্মুক্ত আয়োজন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও উৎসবের রেশ ছিল সন্ধ্যাজুড়ে। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই উৎসবমুখর মানুষ ব্যস্ত ছিলেন বর্ষবরণে। নিরাপত্তা ইস্যুতে বর্ষবরণের উন্মুক্ত আয়োজনের সময় সংকোচনে কিছুটা হতাশ ছিলেন আয়োজক ও সাধারণ মানুষ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্মুক্ত আয়োজন শেষ হলেও রাত অবধি নগরের বৃষ্টি ভেজা পথে ছিল উৎসবমুখর মানুষের ঢল। চির নতুনের ডাক দিয়ে আসা পহেলা বৈশাখের বৈচিত্র্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের রঙিন সাজে।
ছায়ানটের বর্ষবরণ: শনিবার কাকডাকা ভোর থেকে নগরবাসীকে ছুটতে দেখা গেছে রমনার উদ্দেশে। সেখানকার বটমূলে উৎসব শুরুর আগে থেকেই মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। একসময় লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় রমনা ও তার আশপাশ এলাকা। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উপলক্ষে রমনা ও তার আশপাশ এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ষাটের দশকে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের উদ্যোগে ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে শুরু হয় প্রথম বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে সংগীতায়ন ছায়ানট বরণ করেছে বিশ্বায়নের বাস্তবতায় বাঙালির আত্মপরিচয়ের তালাশ নেয়ার আহ্বানে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মর্তুজা কবিরের বাঁশিতে রাগ আহীর ভাঁয়রো পরিবেশনার মধ্যদিয়ে রমনা বটমূলে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন। এসময় একক ও সম্মেলক কণ্ঠে সংগীত পরিবেশনা আর কবিতার পংক্তিমালার মাধ্যমে ছায়ানটের শিল্পীরা নতুন বছরকে স্বাগত জানান। প্রভাতী আয়োজনে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেন, যে মাটি আমাদের পায়ের তলায় আশ্রয়, জন্মের শুভক্ষণে সেই মাটিতেই ভূমিষ্ঠ হয়েছি আমরা। জন্মসূত্রে এ মাটি আমাদের একান্ত আপন। সে মাটির বুকে শিকড়ের মতো পা ডুবিয়ে মাটি-মাতাকে জানবো আমরা। এমন স্বভাবসম্মত প্রক্রিয়ায় বেড়ে উঠে আত্মপরিচয়ে প্রত্যয়ী, আর প্রতিষ্ঠিত হবো আমরা বাংলাভূমির সর্বজন।
তিনি বলেন, বিশ্বায়ন আজ আমাদের কাছে বাস্তব সত্য। এ শব্দ নিন্দা অর্থে উচ্চারণ করছি না। বিশ্বের সংগীতে-সাহিত্যে, শিল্পকলায়-দর্শনে-বিজ্ঞানে যে মহান অর্জন তার স্বাদ নেব আমরা। আত্মস্থ করতে হবে সকল মানবিক অন্তর সম্পদ। সেই সত্য সুন্দর সমৃদ্ধ করবে আমাদের। প্রভাতী আয়োজন শুরুর পর একক সংগীত পর্ব শুরু হয়। গানের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে ছায়ানটের শিশু ও বড়দের দলের সম্মেলক গানের পরিবেশনা। সম্মেলক গান পর্বে ছায়ানটের ‘বড়দের দল’ পরিবেশন করে ‘পূর্ব গগনভাগে দীপ্ত হইল সুপ্রভাত’, ‘ওই পোহাইল তিমিররাতি’, ‘শুভ সমুজ্জ্বল হে চির নির্মল’, ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’, ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন’, ‘ও আমার দরদী আগে জানলে’ গানগুলো। এছাড়া ‘ছোটদের দল’ পরিবেশন করে ‘প্রভাত বীণা তব বাজে’, ‘আজি নূতন রতনে’, ‘মেঘবিহীন খর বৈশাখে’, ‘এলো এলো রে বৈশাখী ঝড়’, ‘বাঁধন ছেঁড়ার সাধন হবে’ গানগুলো। পরে আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফ পরিবেশন করেন হুমায়ূন আজাদের ‘শুভেচ্ছা’ কবিতাটি। প্রভাতী আয়োজনের একেবারে শেষ অংশে ছোট ও বড়দের দল যৌথভাবে পরিবেশন করে ‘ওরে আইল বৈশাখ নয়া সাজে’ গানটি।
চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা: লালনের দর্শনে ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’- এই প্রতিপাদ্যে ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ শনিবার বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। মনের আঁধার কাটিয়ে মানব বন্দনায় সোনার মানুষ হয়ে ওঠার আহ্বান এলো এবারের বর্ষবরণ উৎসবের মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে। বাঙালির বর্ষবরণের এই মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল হেরিটেজ’-এর অংশ। শনিবার বৈশাখী সাজে সব বয়সের, সব শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন। শোভাযাত্রার সামনে-পেছনে ঢাকের বাদ্যের তালে তালে চলে নৃত্য, হাতে হাতে ছিল বড় আকারের বাহারি মুখোশ, শোলার পাখি আর টেপা পুতুল। এবারের শোভাযাত্রার অগ্রভাগে ছিল ‘সূর্য’, যার চারদিকে ছিল সাতটি ফুল। চারুকলার শিক্ষার্থীরা জানান, মানুষকে আলোকিত করার প্রত্যয়ে এবার এই প্রতীক।
শনিবার বৈশাখের প্রথম সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (সাবেক রূপসী বাংলা) চত্বর ঘুরে টিএসসি হয়ে আবার চারুকলার সামনে এসে বর্ণিল এই শোভাযাত্রা শেষ হয়। শোভাযাত্রার পুরোভাগে ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান, প্রক্টর গোলাম রাব্বানী ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য সুন্দর একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসাসহ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো পূরণ হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, এই নতুন বছরে আমাদের কামনা আমরা সোনার মানুষ হয়ে সোনার বাংলা বিনির্মাণে এগিয়ে যাবো। শনিবার পহেলা বৈশাখের সকাল থেকেই চারুকলা-টিএসসিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ এলাকায় বিভিন্ন বয়সী মানুষের জনসমাগম বাড়তে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই রাজপথ পরিণত হয় বৈশাখের লাল-সাদা জনস্রোতে। অগণিত মানুষ অংশ নেন মঙ্গল শোভাযাত্রায়। এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রায় ছিল নিরাপত্তার কড়াকড়ি। পুলিশ, র?্যাব, এপিবিএন ও সোয়াটের সদস্যরা শোভাযাত্রার সামনে-পেছনে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসির সদস্যরাও ছিলেন নিরাপত্তাকাজে। আর মাথার ওপর আকাশে টহল দেয় র্যাবের হেলিকপ্টার।
এদিকে বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর যৌথ উদ্যোগে শনিবার পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হয়েছে বৈশাখী মেলা। যা চলবে ১০ দিনব্যাপী। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু শনিবার বিকালে এই মেলা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। এর আগে নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে সকালে বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র চত্বরে বর্ষবরণ, একক বক্তৃতা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। জোটের অনুষ্ঠানে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে বহ্নিশিখা, স্বভূমি লেখক শিল্পী কেন্দ্র। রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব ঘোষ।
এছাড়া আরিফ রহমান শোনান শাহ আবদুল করিমের গান। পাশাপাশি মরমী সাধক হাছন রাজার গান, ধামাইল গান, লোকগীতি, লালনগীতি, বাউল সংগীত, ভাওয়াইয়া গান পরিবেশন করা হয়। এছাড়া আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করা হয় অনুষ্ঠানে। বর্ষবরণ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন লালমাটিয়ার বেঙ্গল বইয়ে আয়োজন করেছিল গানের আসর ‘পরান ভরি দাও’। শনিবার ছিল এই আয়োজনের তৃতীয় দিন। এখানে চার দিনের উৎসবের শেষ দিনে গতকাল সন্ধ্যায় ছিল লোকগানের অনুষ্ঠান। এদিকে নববর্ষ উপলক্ষে শনিবার দিনভর রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। শেষ বিকেল থেকে রাজধানীর অনেকেই ভিড় করেন দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিলে। সেখানে ছিল মানুষের উপচে পড়া ঢল।
Saturday, April 14, 2018
সেই ‘হালখাতা’ আর নেই

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চলছে হালখাতা উৎসব। পুরনো হিসেব চুকিয়ে নতুন হিসেব খোলা মানেই হালখাতা। পুরনো পাওনা আদায় খুশির ব্যাপারই তো বটে। এ নিয়ে চলে মিষ্টিমুখও।
চট্টগ্রামের বাণিজ্যকেন্দ্র খ্যাত চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে হাজার বছর ধরে এ ঐতিহ্য চলে আসলেও বর্তমানে সে আনন্দ আর নেই। ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে হালখাতার জৌলুস।
এমন কথাই জানিয়েছেন দুই বাণিজ্য কেন্দ্রের ব্যবসায়ীদের অনেকেই।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহম্মদ বলেন, নতুন বছরের শুরুতে পুরনো পাওনা আদায় হলেও এখন আর হালখাতা উৎসব হয় না। তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রে আদায় হচ্ছে পুরনো লেনদেন। তবে এ ঐতিহ্য এখনো ধরে রাখার চেষ্টা করছেন কিছু ব্যবসায়ী।
তিনি বলেন, ১৫-১৬ বছর আগেও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা হালখাতা করতেন বাংলা নববর্ষে। পুরনো রীতিতে নতুন বছরে নতুন খাতায় হিসাব খোলেন তারা। যথাসম্ভব আদায় করে নেন পাওনা টাকা। দোকান সাজাতেন বর্ণিল সাজে। পাওনাদার এলেও হাসিমুখে তুলে দিতেন মিষ্টি। এদিন তারা বেচাকেনা ভুলে মেতে উঠতেন নানা আনন্দ-উৎসবে।
তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও আছাদগঞ্জে তিন হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় প্রায় ১৫০০ থেকে ১৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে ৮০ শতাংশ লেনদেনই হয় বাকিতে। কিন্তু তারপরও বর্তমানে সেই ঐতিহ্য এখন তেমন চোখে পড়ে না। সীমিত পরিসরে কিছু প্রতিষ্ঠান হালখাতা করে থাকে।
সৈয়দ ছগির আহমেদ বলেন, ‘গুটিকয়েক হিন্দু ব্যবসায়ীরা লাল কাপড়ে বাঁধানো খাতায় এখনো হালখাতার রেওয়াজ ধরে রেখেছেন। তবে কয়েক বছর আগেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে যেভাবে জাঁকজমকভাবে হালখাতার অনুষ্ঠান হতো তা এখন আর নেই।
এ প্রসঙ্গে কাঁচামাল আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, এক সময় খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে হালখাতা খোলার উৎসব জমজমাট করে পালন করতেন। ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দায় এখন এ ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স সততা বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী রতন রায় বলেন, নতুন বছরটা ভালোভাবে যাবে এমন আশা নিয়ে ব্যবসায়ীরা হালখাতা খোলেন। তবে একসময় বৈশাখের প্রথম দিনটি খাতুনগঞ্জে উৎসবের সঙ্গে পালন করতেন ব্যবসায়ীরা। তবে একের পর এক চেক প্রতারণা, বিশ্বাস ভঙ্গ ও অর্থনৈতিক মন্দাভাবের কারণে এখন আর হালখাতা সেভাবে উদযাপন করা হয় না।
অন্যদিকে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন ব্যবসায়িক কাজের বেশির ভাগই সম্পন্ন হচ্ছে কম্পিউটারের মাধ্যমে। টাকা-পয়সার লেনদেনও হচ্ছে ব্যাংকিং চ্যানেলে। এছাড়া দেনা-পাওনার হিসাবও হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ে। দেশে অর্থবছরের হিসাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ব্যবসায়ীরাও এখন হিসাব বর্ষ শেষ করেন জুন অথবা ডিসেম্বর। তবে খাতুনগঞ্জের কিছু ব্যবসায়ীরা এখনো বংশপরমপরায় চেষ্টা করছেন হালখাতা উৎসব ধরে রাখতে।
নগরীর চাক্তায়ের শত বছরের পুরনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাবা লোকনাথ ট্রেডার্সের মালিক হরিপদ দাশ (৭৬) জানান, হিসাব হালনাগাদ করা থেকেই হালখাতা শব্দের উদ্ভব। ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের শাসনামল থেকে নতুন বছরের শুরুতে হালখাতার প্রচলন শুরু হয়। আর আমাদের দেশে বাংলা সালের প্রথম দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে দোকানপাটের হিসাব হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াই ব্যবসায়ীদের কাছে পরিচিত হালখাতা হিসেবে।
বছরের প্রথম দিনে দেশের গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানের পাইকারি বাজার ও আড়তে আগের বছরের হিসাব-নিকাশের ফয়সালা করেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে নববর্ষের দিন থেকে নতুন খাতায় লেনদেনের তথ্য টুকে রাখতে শুরু করেন। তবে ঐতিহ্যবাহী এ প্রথার জৌলুস এখন আর আগের মতো নেই।
ঢাকাসহ দেশের বড় নগরী ও শহরগুলোর পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারগুলোতে আগের মতো হালখাতা নিয়ে মাতামাতি হয় না। দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতে আলাদা আয়োজনের দৃশ্য চোখে পড়ে না। কিন্তু সেই পুরনো জৌলুস এখন আর নেই। দিনে দিনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ প্রথার প্রচলন কমে যাচ্ছে।
ক্রেতাদেরও পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে দোকানে দোকানে গিয়ে লেনদেনের হিসাব চুকিয়ে দিতে দেখা যায় না। তবুও পুরান ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার এবং আড়তের কিছু দোকানে সীমিত পরিসরে হলেও অনেকে ধরে রেখেছেন এ রীতি।
তিনি বলেন, দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে নববর্ষে হিসাবের নতুন খাতা এখনো খোলা হয় আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। দেনাদার ও পাওনাদারদের মুখরোচক মিষ্টি ও ঠাণ্ডাপানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে পাওনা শোধ করার কথা বিনীতভাবে মনে করিয়ে দেয়া হয় এ দিনে।
আজ বর্ষবরণে জল-স্থল আকাশে কঠোর নিরাপত্তা

এছাড়া মঙ্গল শোভাযাত্রা ও ছায়ানটের বর্ষবরণ হবে পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে। থাকছে পুলিশের ওয়াচ টাওয়ার, আর্চওয়ে, ডগ স্কোয়াড, সোয়াট টিম, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, গোয়েন্দা সদস্য ও মোবাইল কোর্ট। যান চলাচল বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বহু সড়কে। এদিকে গতকাল রমনার বটমূলে র্যাবের বিভিন্ন প্রস্তুতির কথা জানান এলিট ফোর্সটির মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমদ। এ সময় তিনি বলেন, দেশবাসী বর্ষবরণের জন্য উন্মুখ। আগামীকাল উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখতে দেশব্যাপী নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে র্যাব। উৎসবের প্রাণকেন্দ্র রমনা হলেও গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীর হাতিরঝিল, রবীন্দ্র সরোবর, উত্তরাসহ বিভিন্নস্থানে অনুষ্ঠান হয়। বেশি জায়গায় অনুষ্ঠান হলে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বেড়ে গেলেও রমনায় জনসমাগমটা কম হয় না। জনগণের উৎসব আনন্দমুখর করতে আমরা যে কোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তুত। রমনাসহ অন্যান্য জায়গায় সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিশ্চিত করবে র্যাব।
তিনি আরো জানান, রমনায় প্রতিবার র্যাবের কন্ট্রোলরুম থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো হাতিরঝিলেও তা খোলা হবে। রমনা পার্ক এলাকায় পেট্রোল করা হবে। রমনা পার্ক ও মঙ্গল শোভাযাত্রা এলাকায় আকাশ থেকে হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পেট্রোল টিমের পাশাপাশি থাকবে র্যাবের চেকপোস্ট। তিনি আরো বলেন, প্রথমবারের মতো র্যাব শিশু ও বৃদ্ধদের বিশ্রামের জন্য রমনা ও হাতিরঝিলে বৈশাখী লাউঞ্জ করছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠানস্থল নজরদারিতে রয়েছে।
অবশ্য নববর্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গতকাল আশেপাশের বস্তি ও আবাসিক হোটেলে অভিযান চালায় এবং সন্দেহভাজন ও জঙ্গিগোষ্ঠীর উপর নজরদারি থাকছে বলেও জানান তিনি।
রাজধানীজুড়ে পুলিশের নিরাপত্তা বলয়: এ উপলক্ষে রাজধানীতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আরো ব্যাপক ও বহুমুখী নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এ উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, একই দিন মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান শবে মেরাজ থাকায় রাজধানীর উন্মুক্ত স্থানে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান বিকাল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সবাইকে ভেন্যু ছাড়তে হবে। তবে রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠান ৭টা পর্যন্ত চলবে। আর উন্মুক্ত স্থানে বর্ষবরণের সব অনুষ্ঠান ঘিরে থাকছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি অনুষ্ঠান স্থলে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে হবে আর্চওয়ে দিয়ে তল্লাশির মাধ্যমে। ওয়াচ টাওয়ারে পর্যবেক্ষণ করা হবে পরিস্থিতি। ধূমপান ও ইভটিজিং রোধে মাঠে থাকছে মোবাইল কোর্ট। মুখে নয়, মুখোশ রাখতে হবে হাতে। বাজবে না ভুভুজেলা। পুরো রাজধানীতে থাকছে পুলিশের সমন্বিত ও সুশৃঙ্খল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ সদস্যরা। ইতিমধ্যে ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপ করা হয়েছে বহু ভেন্যু। কোনো ধাতব বস্তু দা, নেইল কাটার, ব্লেড ও দাহ্য পদার্থ যেমন দিয়াশলাই ইত্যাদি বহনে নিষেধ রয়েছে। দমকল বাহিনী, অ্যাম্বুলেন্স এবং বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে মাঝপথে কেউ ঢুকতে পারবে না।
রমনা পার্ক ও সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট: মূল অনুষ্ঠানস্থল রমনা পার্কে শুধু প্রবেশের জন্য তিনটি গেট উন্মুক্ত থাকবে। তা হলো, রমনা রেস্তরাঁ গেট, অস্তাচল গেট (শিশু পার্কের বিপরীতে) ও অরুণোদয় গেট (সুগন্ধার বিপরীতে)। দর্শনার্থীদের বের হওয়ার দু’টি গেট হলো, উত্তরায়ণ গেট (মিন্টু রোডের পশ্চিম প্রান্ত) ও বৈশাখী গেট (আইইবির বিপরীতে)। একই সঙ্গে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য খোলা থাকবে শ্যামলীমা গেট (কাকরাইল মসজিদের দক্ষিণে) ও স্টার গেট (মৎস্য ভবন ক্রসিং)। অপর দিকে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ব্যবহার হবে ৫টি গেট। প্রবেশ পথগুলো হলো, শিখা চিরন্তন গেট, বাংলা একাডেমির বিপরীতে নতুন গেট ও তিন নেতার মাজার সংলগ্ন গেট। বের হওয়ার জন্য খোলা থাকবে কালী মন্দির গেট ও আইইবি গেট। তবে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি ও ছবিরহাট গেট দু’টি বন্ধ থাকবে।
আজ বন্ধ থাকবে যেসব রাস্তা: পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক ও সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান ও পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং রবীন্দ্র সরোবরে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। বন্ধ থাকবে বাংলা মটর-রূপসী বাংলা-শাহবাগ-টিএসসি-দোয়েল চত্বর রোড, রূপসী বাংলা-কাকরাইল-মৎস্য ভবন-কদম ফোয়ারা রোড, মৎস্য ভবন-শাহবাগ-কাঁটাবন রোড, পলাশী-শহীদ মিনার-দোয়েল চত্বর-হাইকোর্ট ক্রসিং রোড, বকশী বাজার-শহীদ মিনার-টিএসসি রোড, শহীদুল্লাহ হল ক্রসিং-দোয়েল চত্বর রোড এবং নীলক্ষেত-টিএসসি রোড।
বিকল্প রোড: তবে যান চলাচলের জন্য কিছু বিকল্প রোড হিসেবে আজ ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এগুলো হচ্ছে, মিরপুর রোড-সায়েন্স ল্যাবরেটরি-নিউ মার্কেট-আজিমপুর-বকশী বাজার-চাঁনখার পুল-গুলিস্তান রোড, রাসেল স্কোয়ার-সোনারগাঁও-রেইনবো-মগবাজার-মালিবাগ-রাজমনি-ইউবিএল-গুলিস্তান রোড, মহাখালী-সাতরাস্তা-মগবাজার-কাকরাইল-রাজমনি-ইউবিএল-গুলিস্তান রোড, ফার্মগেট-সোনারগাঁও-বাংলা মটর-মগবাজার-মৌচাক-মালিবাগ-খিলগাঁও রোড এবং ফার্মগেট-সোনারগাঁও-বাংলা মটর-মগবাজার-কাকরাইল চার্চ-রাজমনি-পল্টন-মতিঝিল রোড।
রমনা পার্ক ও সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান কেন্দ্রিক ডাইভারশন পয়েন্টগুলো: পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানস্থল রমনা পার্ক ও সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানমুখী যানবাহনগুলোকে অন্যপথ দিয়ে ঘুরে যেতে বেশ কিছু পয়েন্ট নির্ধারণ করছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ। তা হলো, সোনারগাঁও ক্রসিং, বাংলা মটর ক্রসিং, পরিবাগ গ্যাপ, নেভাল চীফ গলি, সাকুরার গলি, পুলিশ ভবন ক্রসিং, সবজি বাগান ক্রসিং, মিন্টো রোড পূর্ব প্রান্ত, অফিসার্স ক্লাব ক্রসিং, সুগন্ধা ক্রসিং, কাকরাইল চার্চ ক্রসিং, শিল্পকলা একাডেমি গলি, দুদকের গলি, কার্পেট গলি, মৎস্য ভবন ক্রসিং, ইউবিএল ক্রসিং, জিরো পয়েন্ট ক্রসিং, হাইকোর্ট ক্রসিং, রোমানা চত্বর ক্রসিং, বকশী বাজার ক্রসিং, পলাশী ক্রসিং, নীলক্ষেত ক্রসিং, কাঁটাবন ক্রসিং, আজিজ সুপার মার্কেট ক্রসিং, প্রশাসন একাডেমি গলি ও শাহবাগ ক্রসিং।
গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা: আজ গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য যে সড়কগুলোর এক লেন ব্যবহার করা যাবে সে সড়কগুলো হলো, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল রোড (উত্তর হতে আগত), পুরাতন এলিফ্যান্ট রোড (উত্তর হতে আগত), আবদুল গণি রোড (পূর্ব-দক্ষিণ দিকের গাড়িসমূহ), কার্জন হল হতে বঙ্গ বাজার হয়ে ফুলবাড়িয়া (দক্ষিণ দিকের গাড়িসমূহ), মৎস্য ভবন থেকে কার্পেট গলি (আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িসমূহ), শিল্পকলা একাডেমি গলি (আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িসমূহ), সুগন্ধা হতে অফিসার্স ক্লাব (ভিআইপি ও মিডিয়ার গাড়িসমূহ) ও কাঁটাবন হতে নীলক্ষেত হয়ে পলাশী পর্যন্ত (দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের গাড়িসমূহ)
নবযাত্রার স্বপ্ন by কাফি কামাল
![]() |
| পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রমনায় র্যাবের নিরাপত্তা মহড়া |
পয়লা বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব। এ উৎসবের সার্বজনীনতা অসাধারণ। বাঙালি জাতি তার নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, আর এ ধারা চলে আসছে গানে-কবিতায়, লোকাচারের নানা অনুষঙ্গে, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দেশের বৃহত্তম অসামপ্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের সঙ্গে বাংলার সাহিত্য, বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই বাংলা সন গণনার শুরু মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন। পরে যুক্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। অমর্ত্য সেন তার আর্গুমেন্টিভ ইন্ডিয়ানে বলেছেন, ‘আকবর সব ধর্মবিশ্বাসীর সমান উপযোগী একটি বর্ষপঞ্জি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।’ আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল আকবরনামায় লিখেছেন, ‘ফসল সংগৃহীত হয় সৌর বর্ষপঞ্জি অনুসারে। তাই হিজরি সালের পাশাপাশি একটি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন ছিল। দ্বীন-এ-ইলাহির মতো আকবর সেটির নাম দিয়েছিলেন তারিখ-ই-ইলাহি। বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয় ১৫৫৬ সালে। মাসের নামগুলো নেয়া হয় নক্ষত্রের নাম থেকে। তারিখ-ই-ইলাহি চালুর পর ১৪টি নতুন উৎসবের কথা ঘোষণা করেন আকবর। এই রকম এক নওরোজেই শাহজাদা খুররমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল মমতাজের। এ কারণে অনেকে বলতে চান, পহেলা বৈশাখ না হলে সৃষ্টি হতো না প্রেমের অমর স্মৃতি তাজমহল।
বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। পয়লা বৈশাখ এখন সব বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সমপ্রদায়নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব। কৃষকসমাজ আজও অনুসরণ করছে বাংলা বর্ষপঞ্জি। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও পরে সংযোগ ঘটে রাজনৈতিক ইতিহাসের। আমাদের পরাধীনতার কালে এই উৎসব আয়োজনে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালিও সোচ্চার ছিল প্রতিবাদে। ষাটের দশকে রমনা বটমূলে সূচিত ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে করেছে বেগবান। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসামপ্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্ব্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইউনেসকো এ শোভাযাত্রাকে দিয়েছে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা। প্রথমদিকে পয়লা বৈশাখের উৎসব ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। শহরে-বন্দরেও তা সীমিত ছিল হালখাতায়। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের চেয়ে বর্ণিল, বর্ণাঢ্য আয়োজনে এ উৎসব পালিত হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি নগর-মহানগরে। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের আদলে প্রায় সর্বত্র আয়োজিত হয় এ অনুষ্ঠান। বাংলা নববর্ষে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ রীতি এখনো এ দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির আমেজ নিয়ে উৎসবের পরিধির বিস্তার ঘটিয়েছে। আধুনিক বাঙালি তাদের বাংলা নববর্ষকে সাজিয়ে তুলছে মাতৃভূমির প্রতিটি আঙিনায় আরো বেশি উজ্জ্বলতায়। দেশের পথেঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসবমুখরতার বিহ্বলতা। পয়লা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারা দেশ। বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। সর্বত্র দেখা যায় নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস। কবির ভাষায়- ‘অনাগত আগামীর অফুরান বাদ্য/নতুনের আবাহনে হয়’।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে চাকমা, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা জনজাতি বছরের হিসাব করে বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী। নববর্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান উৎসব বৈসাবি। ত্রিপুরা জনজাতির বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাইং, চাকমাদের বিজু মিলিয়ে এ বৈসাবি। বাংলা নববর্ষকে উপলক্ষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, বাংলা ভাষাভাষি মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়ি জনপদে এখন উৎসবের অনিন্দ্য আমেজ। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিও মেতে উঠবে বর্ষবরণের নানা আয়োজনে। নববর্ষে উৎসব-পার্বণে ভোজনপ্রিয় বাঙালির খাদ্যতালিকায় রসগোল্লা, নকশিপিঠা, কদমা-বাতাসা, ভর্তা, আচার, খই, মুড়ি-মুড়কি, পায়েস অনিবার্য। পালা-পার্বণ, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় উৎসবে এসব সুস্বাদু খাবার শত বছর ধরে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। নববর্ষ উপলক্ষে চারদিকে ধুম পড়বে বাঙালির বাংলা খাবার আস্বাদনে।
নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিশ্বের বাঙালিদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন।
নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। কেবল রাজধানী ঢাকাই নয় এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে কন্ট্রোল রুম, অবজারভেশন পোস্ট ও চেক পোস্ট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি থাকছে গোয়েন্দা দলের সদস্য, বোমা ডিসপোজাল টিম ও মেডিক্যাল টিম।
বর্ষ আবাহনে মূল অনুষ্ঠান: বর্ষবরণে রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজন থাকবে। দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ছায়ানট’ ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সরোদবাদন দিয়ে শুরু করবে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপন ১৪২৫ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’- প্রতিপাদ্য ও মর্মবাণী ধারণ করে অনুষ্ঠিত হবে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দুই বছর বিরতি দিয়ে এবার বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে পহেলা বৈশাখে। বাংলা একাডেমি সকালে সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে বইমেলাসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে একাডেমি চত্বরে। বর্ষবরণ উপলক্ষে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে হাজারো কণ্ঠে’ বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। বিকাল তিনটায় নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সকাল নয়টায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সকাল থেকেই খৈ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ও বাঙালি খাবারের আয়োজন রেখেছে।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




