Wednesday, July 14, 2010

ওয়ানডেতে অলরাউন্ডারের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন সাকিব

সদ্যই অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন সাকিব আল হাসান। কিন্তু আইসিসি র‌্যাংকিংয়ে ওয়ানডেতে সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে এখনো শীর্ষস্থানটা ধরে রেখেছেন তিনি। আর বোলিং র‌্যাংকিংয়ে নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরির পর অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশের অন্যতম সফল এই অফ স্পিনার। আইসিসি আজ মঙ্গলবার দুবাই থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করে।
৮৫টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে সাকিব করেছেন ২২৮৮ রান। উইকেট পেয়েছেন ৯৫টি। আইসিসি র‌্যাংকিংয়ে ৩৯০ পয়েন্ট নিয়ে ওয়ানডের সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে শীর্ষস্থানে সাকিব, সাকিবের চেয়ে ৮ পয়েন্ট কম নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে শহীদ আফ্রিদী আর ৩৬৭ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে শেন ওয়াটসন এবং চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে আছেন জ্যাক ক্যালিস ও ড্যানিয়েল ভেট্টোরি।

এসিড-সন্ত্রাসীদের বিচার দ্রুততম সময়ে শেষ করতে হবে -অসহ্য যন্ত্রণা, কষ্ট আর আতঙ্কের দিন

এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণের ঘটনা বিরল নয়। তবে এ ধরনের সন্ত্রাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো, এতে বহু মানুষের জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। বহু জীবন ধ্বংস হয়ে যায়; অসহ্য যন্ত্রণা আর কষ্টকে সাথি করে পার করতে হয় জীবনের উল্লেখযোগ্য সময়। কিন্তু এসিডদগ্ধ ও তার পরিবারের ওপর যে বিপর্যয় নেমে আসে, সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁদের নতুন করে জীবনের স্বপ্ন তৈরি করতে সহায়তা করা সংবেদনশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এসিড-সন্ত্রাসের শিকার ব্যক্তির ভবিষ্যতের জন্য তাই সুবিচারপ্রাপ্তি অতীব জরুরি।
গত সোমবারের প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষণ গ্রামে এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার প্রায় দুই বছর পরও চারজনের এখনো আতঙ্কে দিন কাটছে। এসিড ছোড়ার ঘটনায় তাঁরা যে মামলা করেছিলেন, সেটি তুলে নেওয়ার জন্য তাঁদের হুমকি দিচ্ছেন আসামিরা। অভাবের কারণে তাঁরা প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে পারছেন না, সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এভাবে এসিড-সন্ত্রাসের কারণে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে না।
এসিড-সন্ত্রাস একটি পূর্বপরিকল্পিত অপরাধ, আর এর শিকার হওয়া মানুষের অধিকাংশই নারী। এসিড-সন্ত্রাস কঠোরভাবে দমনের উদ্দেশ্যে আইন এবং সচেতনতা তৈরির নানা কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও এ অপরাধ অব্যাহত আছে। সারা দেশে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, মামলা গ্রহণে পুলিশের গড়িমসি, অভিযোগপত্র সঠিকভাবে না দেওয়া, সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া, নানামুখী তদবির প্রভৃতি কারণে মামলা প্রায়ই নিষ্পত্তি হয় না। দোষী ব্যক্তিদের বিচার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ অনেক কমে যাবে। চরফ্যাশনের এসিডদগ্ধদের যাঁরা মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাশাপাশি এসিডদগ্ধ হওয়ার কারণে কেউ যেন কোনো সামাজিক বাধার সম্মুখীন না হন, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। সমাজ থেকে এসিড-সন্ত্রাসের মতো নৃশংস ঘৃণ্য অপরাধ নির্মূল করতে সন্ত্রাসীদের বিচার অবশ্যই দ্রুততম সময়ে শেষ করতে হবে।

ন্যায়বিচারের পক্ষে নিম্ন আদালত -কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন

কোনো নাগরিকই যে আইনের ঊর্ধ্বে নন, সে কথাই প্রমাণিত হলো নাটোরের সিংড়ার ব্যবসায়ী আনসার আলী হত্যা মামলায়। পুলিশ বিভাগের লোক বলে আসামিরা এত দিন আদালতের নির্দেশও অগ্রাহ্য করে আসছিলেন। রোববার প্রথম আলোয় এ-সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশিত হলে আসামিরা নাটোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং বিজ্ঞ বিচারক তাঁদের জামিনের আবেদন নাকচ করে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন। এতে অন্তত মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
নিম্ন আদালত সম্পর্কে জনগণের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, এ রায় নিঃসন্দেহে তা অপনোদনে সহায়ক হবে। মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য থানা-পুলিশ ও আদালতের আশ্রয় নেয়। পুলিশের দায়িত্ব অভিযোগ তদন্ত করা এবং তার ভিত্তিতে আদালত বিচারকাজ সম্পন্ন করবেন। পুলিশ তদন্তে গাফিলতি করলে ফরিয়াদির প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ তিরোহিত হয়ে যায়। ব্যবসায়ী আনসার আলী হত্যা মামলার ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ও অভিযোগ তদন্তকারী ব্যক্তি উভয়ই পুলিশ বিভাগের লোক। সে কারণেই কি সিংড়া থানার কর্মকর্তারা আদালতের আদেশ অগ্রাহ্য করেছেন? অর্থাৎ তাঁরা বিচারপ্রার্থীর আদেশ আমলে না নিয়ে অভিযুক্তকে রক্ষা করতে সচেষ্ট ছিলেন।
২০০৮ সালের ২৩ জুলাই আনসার আলী পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর সেই একই গল্প ফাঁদা হয়েছিল। ২৭ জুলাই কাকিয়ান বাজারে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁর লাশ পাওয়া যায়। পুলিশের দাবি, তিনি ক্রসফায়ারে মারা গেছেন। কিন্তু গত বছরের ১৮ আগস্ট নিহত আনসার আলীর বাবা সিংড়া থানার ১৪ পুলিশসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে নাটোরের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম বিচার বিভাগীয় তদন্ত করেন এবং তদন্তে থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ১২ জন পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় নয়জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়।
নিরাপত্তা হেফাজতে আসামির নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কোনোভাবেই এ দায় তারা এড়াতে পারে না। সিংড়া থানার পুলিশের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া স্পষ্ট আদালত অবমাননা। মামলার আসামি ছিলেন ২৩ জন, আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন ১১ জন। বাকিদের গ্রেপ্তার করার দায়িত্ব সিংড়া থানার পুলিশের। সে ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
কেবল সিংড়ায় কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই যে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা নয়। ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারের নামে নিরাপত্তা হেফাজতে আসামির মৃত্যুর ঘটনা অহরহই ঘটছে। সবার পক্ষে মামলা করাও সম্ভব নয়। সম্প্রতি রাজধানীতে নিরাপত্তামূলক হেফাজতে তিন আসামির মৃত্যুর ঘটনা শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে গড়িয়েছে। আদালত ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, যেহেতু পুলিশ এখানে অভিযুক্ত. সেহেতু তাদের এ দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। আশা করি, এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বোধোদয় ঘটবে এবং তাঁরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত থাকবেন। অন্যথায় সিংড়ার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ১১ পুলিশ সদস্যের ভাগ্য তাঁদেরও বরণ করতে হবে।

রুশ গুপ্তচরেরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করতে পারেননি: যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, রুশ গুপ্তচরেরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও এই সময়ে তাঁরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করতে পারেননি। তাঁরা বলেন, গুপ্তচরেরা তথ্য পাচারের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেছেন, ‘রুশ গুপ্তচরদের মাঝেমধ্যেই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তাঁরা তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অথবা কোনো গোয়েন্দা তথ্য তাঁরা পাচার করতে পারেননি।’
মার্কিন প্রভাবশালী টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে রবার্ট গেটস আরও বলেন, মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গুপ্তচর বিনিময়ের ঘটনা দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অতীতের চেয়ে উন্নতি লাভ করছে। দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক বছরের সম্পর্কের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।’
ওয়াশিংটন শুক্রবার ১০ জন গুপ্তচর ও তাঁদের সন্তানদের রাশিয়ার কাছে ফেরত পাঠায়। একই সঙ্গে রাশিয়াও চার গুপ্তচরকে ফেরত দেয়। তাঁদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ রয়েছে।
মার্কিন এটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডার রোববার সিবিএস টেলিভিশনকে বলেছেন, ১০ গুপ্তচরের কারও কারও সন্তান জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তাঁদের কেউ কেউ প্রাপ্তবয়স্ক। মা-বাবার ইচ্ছায় তাঁদের মস্কোয় ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁরা কোথায় থাকবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁদের দেওয়া হয়েছিল।

আল-কায়েদার বোমা বানানোর কৌশল

বাড়িতে বসে কীভাবে বোমা বানানো যায়। জিহাদের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়। অথবা সংকেতের সাহায্যে কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব—এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা।
ইংরেজি ভাষায় প্রথমবারের মতো একটি সাময়িকী প্রকাশ করেছে আল-কায়েদা। গত রোববার অনলাইনে এ সাময়িকীর প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। সেখানে বাড়িতে বসে বোমা বানানো ও জঙ্গি তৎপরতার নানা বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণ সংস্থা (এসআইটিই) জানিয়েছে, ইয়েমেন ভিত্তিক আল-কায়েদা ইন দ্য অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা (একিউএপি) ৬৭ পৃষ্ঠার এ সাময়িকী প্রকাশ করেছে।
সাময়িকীতে ‘রান্নাঘরে বোমা তৈরি করো’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়েছে। অনুচ্ছেদটির লেখকের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দি একিউ শেফ’। জিহাদে যাওয়ার সময় কী কী জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে হবে, সেগুলোরও একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে সাময়িকীতে।
‘রান্নাঘরে বোমা তৈরি করো’ শিরোনামের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এক বা দুই দিনে তৈরি করা একটা বোমায় কমপক্ষে ১০ জনকে হত্যা করা সম্ভব। আর এক মাস সময় নিয়ে বানানো একটা বোমায় শত শত লোককে হত্যা করা সম্ভব।
এই অনুচ্ছেদে বোমা বানানোর কৌশলেরও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চিনি, বারুদ, একটি নল, একটি বাতি, একটি ব্যাটারি ও একটি ঘড়ি হলেই বোমা বানানো সম্ভব। অনুচ্ছেদের লেখক বলেছেন, ‘সামরিক প্রশিক্ষণকে আপনার ঘরে নিয়ে যাওয়াই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য। এ প্রশিক্ষণের জন্য আপনার যেন কোনো ভোগান্তি পোহাতে না হয়, সে জন্যই আমাদের এ দিকনির্দেশনা।’
‘জিহাদের জন্য প্রস্তুতি’ শিরোনামের অনুচ্ছেদে বিদেশে গিয়ে জিহাদে অংশ নিতে ইচ্ছুক যোদ্ধাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘আপনি যখন জিহাদে অংশ নেবেন, তখন আপনাকে অবশ্যই স্থানীয় ভাষা জানতে হবে। যতটা সম্ভব বিদেশে যাওয়ার আগে সেখানকার সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানতে হবে।’
এই অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, ‘আপনি বিদেশে জিহাদে গেলে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, সঙ্গে ভারী কিছু নেওয়া যাবে না। ব্যাগটিও হতে হবে ভালো মানের। এ ছাড়া আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো পোশাক, প্রসাধনসামগ্রী ও আরামদায়ক জুতা নিতে হবে।’
কম্পিউটার ও এমপি থ্রি সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাবে বলে সাময়িকীটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মুঠোফোন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এতে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া ক্যামেরা সংযুক্ত মুঠোফোন ব্যবহারকেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
সাময়িকীটির একটি অংশে জিহাদে থাকাকালীন পড়াশোনার জন্য সঙ্গে ধর্মীয় বই রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অপর একটা অংশে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য সাংকেতিক বার্তা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মাওবাদীদের মুখপাত্র হচ্ছেন কিষানজি

ভারতে মাওবাদীরা তাদের মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ করতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় নেতা কিষানজিকে। মাওবাদীদের তৃতীয় শীর্ষ নেতা চেরুকুরি রাজকুমার ওরফে আজাদের মৃত্যুর পর মাওবাদীরা এই সিদ্ধান্ত নেয়। চেরুকুরি রাজকুমার সম্প্রতি অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
জানা গেছে, দলের নয় সদস্যের পলিটব্যুরোর সভায় কিষানজিকে মুখপাত্র করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে পলিটব্যুরোর মুখপাত্র হিসেবে কিষানজির ভাই মল্লজুলা ভেনুগোপাল ওরফে সোনুকে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিষানজিকে দলের মুখপাত্র করার পাশাপাশি ভ্যানগার্ড, পিপলস মার্চ ও ক্রান্তি পত্রিকাগুলো দেখার দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে।
সোনু ইংরেজি বলতে না পারার কারণেই কিষানজিকে মুখপাত্রের পদে বসানো হচ্ছে। অন্যদিকে কিষানজি মাওবাদী রাজনীতির তাত্ত্বিক ও প্রয়োগগত দুই দিকেই অত্যন্ত দক্ষ। তিনি বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, তেলেগু, সাঁওতালি ভাষাসহ প্রায় ১২টি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে ও লিখতে পারেন।
কিষানজির পুরো নাম মল্লজুলা কোটেশ্বর রাও। বাড়ি অন্ধ্র প্রদেশের করিমনগর জেলায়। দেড় দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল এবং সমতলের পাঁচটি জেলায় মাওবাদী কার্যকলাপের প্রচার ও প্রসারের দায়িত্বে রয়েছেন কিষানজি।

১০ কোটি মানুষের আবাসভূমি হতে যাচ্ছে চীনের হেনান প্রদেশ

চীনের হেনান প্রদেশের জনসংখ্যা চলতি মাসের শেষ দিকে ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। তখন এটিই হবে ১০ কোটি জনঅধ্যুষিত চীনের প্রথম প্রদেশ। গতকাল সোমবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে এ কথা জানানো হয়।
চীনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জনবহুল প্রদেশ হেনানের বেশির ভাগ অঞ্চল গ্রামীণ। বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতির ক্ষেত্রে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে চীন। এই সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে হেনানের মানুষ।
চীনা বার্তা সংস্থা জানায়, পঞ্চাশের দশকে হেনান প্রদেশের জনসংখ্যা ছিল চার কোটি। নব্বইয়ের দশকে তা নয় কোটিতে পৌঁছায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ মাসেই প্রদেশের লোকসংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

নেপালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রস্তুতি

রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল নেপালে একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দ্বিতীয় মেয়াদের সময়সীমাও শেষ হচ্ছে। সে অনুযায়ী নেপালের পার্লামেন্ট একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। দুই বছরের মধ্যে দেশটিতে তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন হবে এটি। নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো এ ব্যাপারে কোনো মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেনি। গতকাল সোমবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মাধব কুমার নেপাল দ্রুত নতুন একটি সরকার গঠনের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
গত ৩০ জুন মাধব কুমার প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর থেকে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেপাল শাসন করছে। এই সময়ে বড় তিনটি দল সর্বদলীয় একটি সরকার গঠনের ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বকারী ২৫টি দলের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে পারেনি।
একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট রাম বরন যাদব চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত দ্বিতীয় মেয়াদে সময়সীমা বেঁধে দেন। এর আগে রাজনৈতিক দলগুলো প্রথম মেয়াদের সময়সীমার মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়ে গত সপ্তাহে আরও সময় দেওয়ার অনুরোধ জানায়। বর্তমান মেয়াদের পর প্রেসিডেন্ট আরও এক দফা সময় বাড়াতে আগ্রহী না হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, এ সপ্তাহেই ৬০১ সদস্যের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের ভিত্তিতেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হবে।
মাওবাদীরা নেপালের প্রধান বিরোধী দল। দলের উপপ্রধান নারায়ণ কাজি শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, তাঁর দল অন্য দুই বড় দল নেপালি কংগ্রেস (এনসি) ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল—ইউনিফাইড মার্ক্সসিস্ট লেনিনিস্টের (ইউএমএল) প্রতিনিধিদের সঙ্গে আরেক দফা বৈঠকে বসবে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিন দলের জন্য শেষ মুহূর্তে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব ।
দলের সামরিক শাখাকে আলাদা করে ফেলার নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর মাওবাদীদের সঙ্গে বাকি দুই বড় দলের সম্পর্কের অবনতি হয়। ক্ষমতাসীন জোট অভিযোগ করেছে, মাওবাদীরা শান্তির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও হত্যা অব্যাহত রেখেছে। বড় তিন দলের এই মতপার্থক্যের কারণে নেপালে নতুন একটি সংবিধান প্রণয়নের কাজ স্থগিত রয়েছে। নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণাও এ জন্য আটকে রয়েছে।
আগামী শুক্রবার দেশটির চলতি অর্থবছরের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গতকাল ১১০ কোটি রুপির একটি সীমিত আকারের বাজেট ঘোষণার করেছে। এই সীমিত বাজেটে বিদায়ী সরকার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পাবে। অর্থাৎ নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সে দেশে উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোও থমকে থাকবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেই নেপালের সমস্যা সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপালের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা থাকার পরও মাওবাদীদের বিরোধিতায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

ইরানি নারীকে পাথর ছুড়ে হত্যার সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত

ইরানে ব্যভিচারের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া নারী সাকিনে মোহাম্মদী আশতিয়ানিকে আপাতত পাথর ছুড়ে হত্যা করা হচ্ছে না। ইরানের বিচার বিভাগের প্রধানের নির্দেশে পাথর ছুড়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। গত রোববার বিচার বিভাগের একজন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়।
ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের বিচার বিভাগের প্রধান মালেক আজদার শরিফি বলেন, সাকিনে একটি ঘৃণ্য অপরাধ করলেও তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। বিচার বিভাগীয় প্রধান যখন সিদ্ধান্ত নেবেন, তখনই তাঁর দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হবে।
আজদার শরিফি বলেন, সাকিনের অপরাধের জন্য যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই কার্যকর করা হবে। এটি তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্যও বটে। কিন্তু মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং বিচার বিভাগের প্রধানের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ রায় আপাতত কার্যকর করা হচ্ছে না

জাপানে উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাল ক্ষমতাসীন ডিপিজে

জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ কাউন্সিলর পরিষদের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানের দল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপান (ডিপিজে)। এর ফলে দেশটিতে আইন পাসের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের দারুণ সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অবশ্য ডিপিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
পার্লামেন্টের ২৪২ আসনের কাউন্সিলর পরিষদে ডিপিজে ৪৪টি আসন পেয়েছে। গত রোববার ১২১টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডিপিজের ৬১টি আসনের প্রয়োজন ছিল। পার্লামেন্টের বিরোধী দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৫১টি আসনে জয়লাভ করেছে। ডিপিজের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম শরীক পিপলস নিউ পার্টি কোনো আসনেই জিততে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান গত ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাপানে এই প্রথম কোনো নির্বাচন হলো।

ত্রাণবাহী নৌবহরে অভিযানে সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা ছিল

ইসরায়েলের এক সামরিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মে মাসে গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহরে অভিযান চালানোর সময় ইসরায়েলের সেনাবাহিনী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেনাবাহিনীর মারাত্মক কিছু ভুলের কারণে সেখানে হতাহতের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কমান্ডো সবার মধ্যেই সমন্বয়ের অভাব ছিল। গোয়েন্দা তথ্যও সঠিক ছিল না। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জিয়োরা এইল্যান্ডের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক তদন্ত কমিশন গত রোববার ইসরায়েলের সেনাপ্রধান জেনারেল গ্যাবি আশকেনাজির কাছে ১৫০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন পেশ করে। গতকাল সোমবার দিন শেষে সেটি জনসম্মুখে প্রকাশ করার কথা।
ইসরায়েলের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওই প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি।
ইসরায়েলের ইয়োদিয়োথ আরোনথ পত্রিকা প্রতিবেদনটির তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, নৌবহরটি গাজায় পৌঁছার আগে সেটিকে বাধা দেওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যাপক গলদ ছিল। তা ছাড়া কমান্ডোদের যে কায়দায় বাধা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল তাতেও বিস্তর ত্রুটি ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন, সেনাবাহিনী জাহাজের ডেকে নামার পর জাহাজে থাকা লোকজন যে তাদের ওপর হামলা চালাতে পারে, সে বিষয়টি তারা আগেভাগে আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাহাজের লোকজন তাদের ওপর হামলা চালানোয় সেনাবাহিনী পাল্টা হামলা চালায় এবং তাতে নয় তুর্কি ত্রাণকর্মী নিহত হন। তারা প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে বলে পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে ওই প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো যেত।

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী তাড়াতে নতুন কৌশল

যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ অভিবাসী তাড়াতে নতুন কৌশল বেছে নেওয়া হচ্ছে। বাড়িঘরের বদলে কর্মস্থলে চালানো হচ্ছে অভিযান। অবৈধ অভিবাসীকে কাজ দিলে জরিমানা করা হচ্ছে ওই প্রতিষ্ঠানকে। এ ব্যাপারে নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চলছে নীরব অভিযান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। তাদের নিয়মিত করা নিয়ে সাধারণ সমঝোতার অভাবও সব মহলে তীব্র।
নতুন কর্মী নিয়োগের আগে অভিবাসনের বৈধতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মন্দা অর্থনীতির এ সময়ে অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজ পাওয়া দুরূহ হয়ে উঠেছে। অভিবাসন আইন ও অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। সম্প্রতি অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী আইন প্রণয়নের পর এ নিয়ে চরম হতাশায় অভিবাসী গোষ্ঠীগুলো।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা এক কোটি ২০ লাখ। প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে করা হয়। গত ১০ বছরে অবৈধ অভিবাসনের হার ব্যাপক হারে বেড়েছে।
মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ঘরবাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে এবং সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেপ্তার করে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে গড়ে তিন লাখ অবৈধ অভিবাসীকে জোর করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ব্যয়বহুল এ বিতাড়ন-প্রক্রিয়ার বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজ বন্ধ করে স্বেচ্ছায় চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে অবৈধ অভিবাসীদের।
গত এক বছরে প্রায় তিন হাজার চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়েছে সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের ব্যক্তিগত কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে। গত ছয় মাসে অবৈধ কর্মী নিয়োগের অভিযোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়। বৈধতা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান কয়েক হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়।
ওয়াশিংটন গ্রোয়ার্স গ্রুপ নামের খামারপ্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক মাইক গ্যাম্পলার বলেন, কর্মস্থলে আকস্মিক তল্লাশির চেয়ে নথিপত্র তল্লাশির পরিণাম ভয়াবহ। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সময় কৃষি খামার, গরু ও মুরগির খামারে আকস্মিক তল্লাশি চালানো হতো। এভাবে অবৈধ অভিবাসী গ্রেপ্তার করে তাড়ানো হতো। এখন নথিপত্র নিরীক্ষা করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবৈধ অভিবাসীদের চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
আলাবামা থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা সিনেটর জেফ সেশনস বলেন, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কড়া কথা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কড়াকড়ি যথার্থ নয়। এদিকে কর্মস্থলে তল্লাশির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খামারগুলোতে তীব্র কর্মীসংকট সৃষ্টি হয়েছে।

উগান্ডায় বোমায় নিহত ৭৪

উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় গত রোববার রাতে পৃথক বোমা হামলায় মার্কিন নাগরিকসহ ৭৪ জন নিহত হয়েছে। একটি রাগবি ক্লাব ও একটি হোটেলে এই বোমা হামলা চালানো হয়। এ সময় বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা দেখতে সেখানে বহু লোক জড়ো হয়।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার মদদপুষ্ট সোমালিয়ার কট্টরপন্থী গোষ্ঠী আল-সাবাব এ হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে উগান্ডা। তবে হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি।
উগান্ডার পুলিশপ্রধান জানান, কাম্পালায় একটি রাগবি ক্লাব এবং এর ১০ কিলোমিটার দূরে ইথিওপীয় এক হোটেলে পৃথক বোমা হামলা চালানো হয়। হামলার জন্য তিনি সোমালিয়ার আল-সাবাব জঙ্গি গোষ্ঠীকে দায়ী করেন। পুলিশের মুখপাত্র জুডিথ নাবাকোবা বলেন, ‘ভয়াবহ এই হামলায় ৭৪ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে রাগবি ক্লাবে নিহত হয় ৪৯ জন।’ ওই সময় রাগবি ক্লাবে খেলা দেখছিলেন জুমা সেইকো। তিনি বলেন, ‘আমরা খেলা দেখছিলাম। ম্যাচটি শেষ হওয়ার তিন মিনিট আগে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।’
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ফেলিক্স কুলাইজি বলেন, তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে একজন সোমালীয় নাগরিকের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মস্তক শনাক্ত করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তি আত্মঘাতী হামলাকারী। তিনি আরও বলেন, হামলার জন্য আল-সাবাবকে দায়ী করা হচ্ছে। কারণ সংগঠনটি উগান্ডায় হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে আসছিল।
কাম্পালায় মার্কিন দূতাবাসের একজন মুখপাত্র বোমা বিস্ফোরণে একজন মার্কিনির নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বোমা বিস্ফোরণের পর উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। আশপাশের সব সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল ঘিরে রাখেন।
আহতদের মধ্যে অধিকাংশকেই কাম্পালার মুলাগু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের মধ্যে তিনজন মার্কিন নাগরিক রয়েছে। গুরুতর আহত মার্কিন ক্রিস স্লেজ (১৮) বলেন, ‘আমরা ফাইনাল খেলা দেখার জন্য ইথিওপীয় ওই হোটেলে গিয়েছিলাম। সেটাই আমাদের জন্য কাল হলো।’ ক্রিস পায়ে ও চোখে মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন।
এদিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে আল-সাবাবের কমান্ডার শেখ ইউসুফ ইসে ওই হামলার প্রশংসা করেন। তবে এই হামলার জন্য কারা দায়ী তিনি তা জানেন না বলে উল্লেখ করেন। শেখ ইউসুফ বলেন, ‘উগান্ডা একটি নাস্তিক দেশ। তারা সোমালিয়ার তথাকথিত সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।’
সোমালিয়ার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইসলামি জঙ্গিরা। তারা বিশ্বকাপ ফুটবলের কোনো খেলা না দেখার জন্য তরুণদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছিল। তাদের মতে, পাগলদের লাফালাফি দেখে সময় ও অর্থ নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। এই নির্দেশ অমান্য করায় আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়ার মধ্যে খেলা চলার সময় রাজধানী মোগাদিসুতেই দুই জনকে হত্যাও করা হয়। হিজবুল ইসলাম নামের একটি জঙ্গি গোষ্ঠী হত্যার দায় স্বীকার করে। পরে জঙ্গিরা জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে খেলা দেখার সময় ৩০ জনকে আটক করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সোমালিয়ার প্রেসিডেন্টের নিন্দা
কাম্পালায় বোমা হামলার নিন্দা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট শরিফ শেখ আহমেদ।
প্রেসিডেন্ট ওবামা হতাহত মার্কিন নাগরিকদের জন্য শোক প্রকাশ করে এই হামলাকে দুঃখজনক ও কাপুরুষোচিত বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, উগান্ডা চাইলে হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে যেকোনো ধরনের সহায়তা দিতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত রয়েছে।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট শরিফ শেখ এক বিবৃতিতে হামলাকে ঘৃণ্য কাজ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের এই অঞ্চল থেকে মূলোৎপাটন করতে হবে।

৮৬৫ গ্রামের দখল নিয়ে সম্মুখ সমরে মহারাষ্ট্র-কর্নাটক

গ্রামের দখল সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চলেছে ভারতের মহারাষ্ট্র ও কর্নাটক রাজ্য দুটি। মারাঠিভাষী অধ্যুষিত ৮৬৫টি গ্রাম কর্নাটকের কাছ থেকে ফিরে পেতে চাইছে মহারাষ্ট্রের মানুষ। এ ব্যাপারে মহারাষ্ট্রের সবকটি রাজনৈতিক দল একই সঙ্গে লড়ছে।আজ মঙ্গলবার এ ব্যপারে কংগ্রেসের নেতা ও মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী অশোক চ্যাবন জানান, মহারাষ্ট্রের লোকজনের ভাবাবেগের ব্যাপারটি কেন্দ্র সরকারকে বোঝানো হবে।শিবসেনা দল তাদের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে জানিয়েছে, যেকোনো মূল্যে তারা কর্নাটকের ওই গ্রামগুলোকে মহারাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করবেই।মহারাষ্ট্র সীমান্ত লড়াইয়ে নামার সঙ্গে সঙ্গে কর্নাটকও পিছিয়ে নেই। তারা ওই ৮৬৫টি গ্রাম ছাড়তে নারাজ।
এর আগে মুম্বাই শহরকে পেতে মারাঠিরা লড়াইয়ে নামে প্রায় ৫০ বছর আগে। তখন ‘আমছি মুম্বাই’ অর্থাত্ আমাদের মুম্বাই শ্লোগান তুলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর মুম্বাইকে ছিনিয়ে নেয় এবং মুম্বাই শহরকে মহারাষ্ট্রের রাজধানী করা হয়। এবারও তেমনই শ্লোগান তুলেছে শিবসেনা দল। ফলে একই দেশের মধ্যে দুই রাজ্যের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেল।

চাতলাপুর স্থলবন্দর দিয়ে ত্রিপুরায় এক কোটি ইট রপ্তানি হচ্ছে

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার চাতলাপুর স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের উত্তর ত্রিপুরায় প্রাথমিক চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে এক কোটি ইট রপ্তানি করা হচ্ছে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হবে এক কোটি ২০ লাখ টাকা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চাতলাপুর স্থলবন্দর দিয়ে ইতিমধ্যে ইট রপ্তানির কাজ শুরু হয়ে গেছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা এখন ব্যস্ত রয়েছেন।
চাতলাপুর স্থলবন্দর সূত্রে জানা গেছে, এই বন্দর দিয়ে উত্তর ত্রিপুরার জেলা কৈলাসহরে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত সিমেন্ট, চিপ পাথর ও মাছ রপ্তানি করা হয়। সেখানে স্থাপনা নির্মাণে ইটের সংকট থাকায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এখন বাংলাদেশি ইটের দিকে ঝুঁকছেন।
চাতলাপুর স্থলবন্দর এলাকায় ভারতীয় ব্যবসায়ী লিটন জামান প্রথম আলোকে গত শনিবার জানান, প্রাথমিকভাবে তিনি ঋণপত্র (এলসি) খোলার মাধ্যমে চাতলাপুর স্থলবন্দর দিয়ে এক কোটি ইট নিচ্ছেন। তাঁকে চাতলাপুর স্থলবন্দর পর্যন্ত পরিবহন-ব্যয়সহ প্রতি হাজার ইট সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় সরবরাহ করছেন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান খন্দকার এন্টারপ্রাইজের মালিক আতিক সেলিম।
লিটন জামান আরও জানান, উত্তর ত্রিপুরায় এখন ইটের বেশ সংকট চলছে। তা ছাড়া ত্রিপুরায় তৈরি ইটের মানও তেমন ভালো নয়। সে জন্য তাঁরা বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক গুণগত মানসম্পন্ন ইট আমদানি করছেন। আর সেখানে বাংলাদেশি ইটের ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে।
বাংলাদেশি রপ্তানিকারক আতিক সেলিম প্রথম আলোকে জানান, তিনি এ পর্যন্ত দুই লাখ ইট রপ্তানি করেছেন। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী এক কোটি ইট রপ্তানি করতে প্রয়োজনে তিনি দেশীয় আরও কয়েকজন ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নেবেন।
আলাপকালে চাতলাপুর স্থলবন্দরের অভিবাসনবিষয়ক (ইমিগ্রেশন) কর্মকর্তা এ এস আই কবির হাসান প্রথম আলোকে বলেন, এটি একটি এলসি স্টেশন ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। এখানে অবকাঠামোগত তেমন উন্নয়ন হয়নি। তা সত্ত্বেও এই পথ ব্যবহার করে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ব্যবসা করে সরকারকে বছরে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব দিচ্ছেন।
কবির হাসান জানান, প্রতিটিতে এক টাকা ২০ পয়সা হিসাবে এক কোটি ইট রপ্তানির ফলে সরকার এক কোটি ২০ লাখ টাকার রাজস্ব পাবে। তিনি আরও জানান, এটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তর করা এবং এর অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ইমিগ্রেশন) ও কাস্টমসের মহাপরিদর্শক চাতলাপুর স্থলবন্দর পরিদর্শন করে গেছেন। এ সময় তাঁরা এটাকে অচিরেই একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তরিত করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে বলে আশ্বাস দেন।

বড় পরাজয়ে শেষ সিরিজ জয়ের স্বপ্ন্ন

ব্রিস্টলের সুখস্মৃতি এভাবে ধুয়েমুছে গেল এজবাস্টনে গিয়ে? সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা মিটিমিটি উঁকি দিয়েও হারিয়ে গেল হতাশার আড়ালে! দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৫ রানের জয়ের পর কালকের শেষ ম্যাচটা ইংল্যান্ডের মতো বাংলাদেশের জন্যও ছিল সিরিজ জয়ের হাতছানি। ইংল্যান্ডের ৭ উইকেটে ৩৪৭ রানের জবাবে ৪৫ ওভারে ২০৩ রানে অলআউট হয়ে বাংলাদেশের সে আশা অপূর্ণই থেকে গেল। ১৪৪ রানের বিশাল হার, সঙ্গে হয়ে গেল সিরিজ পরাজয়ের আনুষ্ঠানিকতাও।
বৃষ্টির কারণে খেলা শুরু হলো ৪৫ মিনিট দেরিতে। টসে জিতে ইংলিশ কন্ডিশনে আগে বল করার সুযোগটাই লুফে নিয়েছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। ইনিংসের প্রথম ওভারের চতুর্থ বলেই ওপেনার ক্রেইগ কিসওয়েটারকে বোল্ড করে সিদ্ধান্তের সপক্ষে একটা উদাহরণও দাঁড় করালেন নিজেই। কিন্তু এরপর? ইংল্যান্ড ইনিংসের বাকিটাকে বলতে পারেন কেবলই অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস-জনাথন ট্রট শো। দলের ১ রানে প্রথম উইকেট পড়ার পর ৪০ ওভার একসঙ্গে থেকে ২৫০ রানের জুটি গড়েছেন দুজন, যা ওয়ানডেতে যেকোনো জুটিতে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ রান। বাংলাদেশের বিপক্ষেও যেকোনো উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটি এখন এটাই। ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের আগের জুটিটি ছিল ২২৬ রানের, ২০০৪ সালে লর্ডসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই কীর্তির মালিক স্ট্রাউস আর অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ। আর বাংলাদেশের বিপক্ষে আগের সর্বোচ্চ রানের (২২৫) জুটিটি ছিল কেনিয়ার দীপক চুদাসামা ও কেনেডি ওটিয়েনোর।
ওয়ানডেতে চতুর্থ সেঞ্চুরি আর ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলে নতুন রেকর্ডেও নাম লিখিয়েছেন অধিনায়ক-ওপেনার স্ট্রাউস। ১৪০ বলে ৫ ছক্কা আর ১৬ বাউন্ডারিতে ১৫৪ রান করে স্ট্রাউস রুবেলের বলে সাকিবের ক্যাচ হয়েছেন ইনিংসের ৪.৩ ওভার বাকি থাকতে। মাশরাফির বলে সাকিবেরই ক্যাচ হয়ে ওয়ানডেতে প্রথম সেঞ্চুরি পাওয়া ট্রট ফিরে গেছেন এর ৫ ওভার আগে। ইংল্যান্ড ইনিংসে ছোটখাটো একটা ধস নামিয়েছিল ওই আউট। ট্রটকে ফেরানোর পরের বলে লুক রাইটের কট বিহাইন্ডে জেগেছিল মাশরাফির হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা। কিন্তু সর্বনাশ যা হওয়ার তা তো আগেই হয়ে গেছে। ইয়ান বেলের জায়গায় দলে আসা রবি বোপারা কেবল কফিনে শেষ পেরেকটাই ঠুকলেন। ৪৫.৩ ওভারে দলীয় ২৮৩ রানে স্ট্রাউস ফিরে যাওয়ার পর উইকেটে এসে মাত্র ১৬ বলে করেছেন অপরাজিত ৪৫ রান, এর মধ্যে ২৬ রানই শফিউলের শেষ ওভারে। তিন ছক্কা আর এক বাউন্ডারিসহ মোট ২৮ রান দিয়েছেন শফিউল ওই ওভারে। ইংল্যান্ডের শেষ ৫ ওভারে উঠেছে ৬৬।
বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের স্বপ্ন ততক্ষণে ভেঙেচুরে শেষই বলা চলে। মাথার ওপর চেপে বসা রানের বোঝা সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল ব্যাটসম্যানদের জন্য। দলের ২৪ রানের মধ্যেই দুই ওপেনারকে হারানো সেটারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে হয়তো। কোমর আর পিঠের ব্যথার কারণে শুরুতে এ ম্যাচে খেলাটা অনিশ্চিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাঠে নেমে তামিম ইকবাল করলেন ১৬ রান, আরেক ওপেনার ইমরুল কায়েস ৪। জুনায়েদ সিদ্দিক ও জহুরুল ইসলামের সাময়িক প্রতিরোধের পরও উইকেট হারানো নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ইনিংসে। ১২৪ রানে ৭ উইকেট পড়ার পর অষ্টম উইকেটে মাহমুদউল্লাহ-রাজ্জাকের ৫৬ রানের জুটিতে বাংলাদেশের হারটাই কেবল বিলম্বিত হয়েছে, সিরিজ জয়ের স্বপ্ন পাখা মেলতে পারেনি।
সাফল্য-ব্যর্থতার ইংল্যান্ড সফর শেষে বাংলাদেশ দলের পরবর্তী মিশন আয়ারল্যান্ড। ১৫ জুলাই বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড দুই ওয়ানডের সিরিজের প্রথম ম্যাচ।

সবার ওপরে ফোরলান

সোনার বলটা পেলেন সেমিফাইনাল থেকে ফিরে যাওয়া এক নায়ক, ডিয়েগো ফোরলান। অবাক হচ্ছেন? জার্মানির অ্যাকুয়ারিয়ামে সাঁতার কাটতে থাকা অক্টোপাস পলের দ্বারস্থ হলে হয়তো এমন হোঁচট খেতে হতো না। তাকে তো শুধু যেকোনো ম্যাচের বিজয়ী দলের নাম বলতে বলা হয়েছিল। সে ঠিক ঠিক বলে দিয়েছে। সোনার বল কে জিতবে, এটা জানতে চাইলেও কি সঠিকটাই বলতে পারত? কে জানে, এখানেই হয়তো বড় ভুলটা করত পল। সোনার বলের বিচারটা হয়েছে সাংবাদিকদের ভোটে। সাংবাদিকদের মতিগতির আঁচ পাওয়া বড্ড কঠিন কাজ।
সাংবাদিকদের সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ পেয়েছেন উরুগুয়ের অধিনায়ক ডিয়েগো ফোরলান। পেয়েছেন ২৩.৪ শতাংশ ভোট। হল্যান্ডের ওয়েসলি স্নাইডার ২১.৪ ভোট পেয়ে জিতেছেন রুপার বল। আর যাঁর হাতে আপনি সোনার জুতা ও সোনার বল ওঠা দেখার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন, সেই ডেভিড ভিয়া ১৬.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ব্রোঞ্জ-বল বিজয়ী।
স্পেনের বিশ্বজয়ের এই নায়ক কোথাও শীর্ষস্থানে নেই। চারজনের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচ গোলের মালিক হলেও ভিয়া পেয়েছেন রুপার জুতা। সোনার জুতার মালিক জার্মানির ২০ বছর বয়সী তরুণ টমাস মুলার। হুন্দাই সেরা যুব খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন প্রত্যাশিতভাবেই। সবাইকে চমকে দিয়ে জিতলেন অ্যাডিডাস সোনার জুতাও। ব্রোঞ্জ-জুতা বিজয়ী হল্যান্ডের ওয়েসলি স্নাইডার।
ফিফা এবার থেকে একটা নিয়ম চালু করেছে। শীর্ষ গোলদাতাদের গোলসংখ্যা সমান হয়ে গেলে একটা মানদণ্ডে ব্যবধান তো গড়তে হবে। এ কারণেই দেখা হয়েছে, গোল করার পাশাপাশি কতগুলো গোলে অবদান আছে। সেখানেও সমতা থাকলে বিবেচিত হবে কত কম সময় খেলে এই গোল। এখানে পরিষ্কার ব্যবধানে সবাইকে ছাড়িয়ে মুলার। পাঁচটি গোল করেছেন, সতীর্থকে দিয়ে করিয়েছেন তিনটি। পাঁচ গোলের অন্য তিন মালিক ভিয়া, স্নাইডার ও ফোরলানের ক্ষেত্রে গোলে সহায়তা মাত্র একবার করে। কিন্তু এই তিনজনের মধ্যে ভিয়া আবার খেলেছেন সবচেয়ে কম সময়—মোট ৬৩৪ মিনিট। স্নাইডার ও ফোরলান খেলেছেন ৬৫২ ও ৬৫৪ মিনিট করে।
ভিয়ার কি মন খারাপ? তাঁর ভেলায় ভেসে স্পেন গেল ফাইনালে। গোল করার পর উসাইন বোল্টের ভঙ্গিতে ছুটে এসে মাটিতে দুই হাঁটু গেড়ে ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া শরীরটাকে বানিয়ে ফেললেন ‘সিগনেচার মোমেন্ট’, আর তিনিই সবচেয়ে বড় দুটি ব্যক্তিগত পুরস্কারের তালিকায় নিচের দিকে! দলের সঙ্গে জয়োৎসবে মেতে থাকা ভিয়াকে দেখে কে বলবে এই ভিয়ার মন খারাপ! অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াস সুখের কান্নার স্রোত থামিয়ে তাঁকেই তো জড়িয়ে ধরলেন আগে।
২০০৬-এর এ রকম এক জুলাইয়ের রাতেই এই ট্রফিটি গিয়েছিল ইতালির অধিকারে। পরশু খেলা শুরুর আগে সেটি সকার সিটি স্টেডিয়ামে নিয়ে এলেন ফ্যাবিও ক্যানাভারো। শেষবারের মতো ট্রফিতে চুমু খেয়ে ইতালি অধিনায়ক তা রেখে দিলেন মাঠের এক কোনায়। নতুন বিজয়ী কোনো অধিনায়কের অপেক্ষায়। ঠিক এমন সময় কোত্থেকে এক পাগল-দর্শক ছুটে এসে হাত দিতে চাইল ট্রফির গায়ে। কিন্তু কঠিন কঠোর প্রহরা পেরিয়ে ট্রফির গায়ে হাত দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার পূরণ হয়নি। প্রহরীদের আঘাতে আগেই সে ভূপাতিত। আর তারপর ট্রফিটা আর মাঠের মধ্যে রইল না। যেমন সেটি সাজানো ছিল গত ২০০৬ ফাইনালে বার্লিনের মাঠে। কে জানে, অতিরিক্ত সতর্কতা থেকে ফিফাও তাই পুরস্কারের মঞ্চটা গ্যালারিতে সরিয়ে নিয়ে গেল কি না! ওই মঞ্চেই ভিয়া নাচলেন শাকিরার গানের তালে তালে। ওই মঞ্চেই স্পেনের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলের মালিক জয়ধ্বনি তুললেন, ‘ভিভা এস্পানা, ভিভা এস্পানা।’ মন খারাপ হবে কেন তাঁর? স্পেনকে বিশ্বসেরার গৌরবে ভাসাতে যে অবদান রেখেছেন, সেটাই তো তাঁর পুরস্কার। তবে ফুটবল পৃথিবীর রংটা যে আগামী চার বছরের জন্য লাল-হলুদ হয়ে গেল, তাতে ভিয়াও নিমিত্ত মাত্র। স্পেনকে তো জেতাল বার্সেলোনা।
বিশ্বজয়ের পুঁজি ৮ গোলের সব কটিই করেছেন বার্সেলোনার তিন খেলোয়াড়। ভিয়া ৫টি, ইনিয়েস্তা ২টি, ১টি পুয়োল। যে মাঝমাঠটা স্পেনের বিজয়ের চালিকাশক্তি হয়ে থাকল, সেখানে কারা ছিলেন মূল সেনাপতি? জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেটস।
ফাইনাল শুরুর আগে মিডিয়া সেন্টারে এসে আর্জেন্টিনার ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জয়ের মারিও কেম্পেস ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, স্পেনই জিতবে। কেন জিতবে? তাঁর বিশ্লেষণ, এই স্পেন বার্সেলোনার স্পেন। বার্সেলোনার ফুটবলকে হারানো কঠিন।
খেলা শেষে আর্জেন্টিনার সাংবাদিকেরা ‘ভিভা এস্পানা’ না বলে স্লোগান তুললেন, ‘ভিভা বার্সেলোনা’। আরে, এ তো বার্সেলোনার জয়! মেসি নেই, আর্জেন্টিনা পারেনি, মেসির বার্সেলোনা তো জিতেছে! হল্যান্ডের এক নায়কই হল্যান্ড-বধের অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন প্রতিপক্ষের হাতে—ইয়োহান ক্রুইফ। এ তো তাঁরই হাতে গড়া বার্সেলোনা।
হায় রে, হতাশা কিংবা আত্মতৃপ্তি কত সুড়ঙ্গ খুঁজে নিতে পারে! অবশ্য ভিয়া কিংবা স্পেনের আনন্দ এই সুড়ঙ্গ নিশ্চয়ই খুঁজছে না। তাদের আকাশটা ১১ জুলাই রাত থেকে অনেক বড় হয়ে গেছে।

কান্নাই নিয়তি ডাচদের

কিছু কমলা জার্সি এলোমেলো পড়ে আছে মাটিতে, বিয়ারের বোতলগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এখানে-ওখানে। কোনোটা আধ-খাওয়া, কোনোটার ছিপিই খোলা হয়নি। কিছু মানুষ হাঁটুতে মাথা গুঁজে যেন ভাবছিল—কী থেকে কী হয়ে গেল!
ছন্নছাড়া অবস্থাটা ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর হল্যান্ডের আমস্টারডাম স্কয়ারের। বড় পর্দায় খেলা দেখতে আমস্টারডাম স্কয়ারে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ডাচ-সমর্থক। ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময় নেচে-গেয়ে আর পান করে কেটেছে তাঁদের। উৎসব করতে করতেই ম্যাচের শেষ দিকে হল্যান্ডকে গোল খেয়ে বসতে দেখল তাঁরা। উৎসবটাও উধাও হয়ে গেল খেলা শেষের মিনিট তিনেক আগেই।
এরপর শেষ বাঁশি বাজল, পরাজয়ের শোক ছেয়ে ফেলল পুরো আমস্টারডাম স্কয়ারকে। পরাজয়ক্লান্ত অবসন্ন মন নিয়ে কেউ কেউ হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে পড়লেন সেখানেই। কেউ হাতে থাকা বিয়ারের বোতল, কেউ গায়ের কমলা জার্সিটা ছুড়ে ফেলে চলে গেলেন হতাশা নিয়ে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আশার সমাধি হতে দেখে কেউ কেউ কাঁদল অঝোরে।
আমস্টারডাম স্কয়ারে খেলা দেখতে গিয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সী রাফি ফ্রেইডমান। হল্যান্ডের পরাজয়টা তিনি মেনেই নিতে পারছেন না। ‘এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। খুব হতাশার ব্যাপার। অনেক দূর গিয়েছিলাম আমরা। অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়ার পর বোকার মতো একটা গোলে হারতে হলো’—মুখে কমলা পতাকা আঁকা ফ্রেইডমানের হতাশার বহিঃপ্রকাশটা ছিল এ রকমই।
খেলা দেখে ভাঙা মন নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন ২৬ বছর বয়সী ভিওলা ভেরহায়েফ। গায়ের কমলা জার্সিটা খুলে ফেলতে ফেলতে বললেন, ‘এখন বাড়ি ফিরে যাব, আর সবকিছু ভুলে যাব!’ এমন অভিমান নেই ফরিদ হামিদির। ২২ বছর বয়সী যুবকের সোনালি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কষ্ট, ‘খুব খারাপ লাগছে। এই তৃতীয়বারের মতো আমরা ফাইনালে হারলাম। এবারেরটা এ রকম ছিল যে এখন নয় তো কখনোই নয়।’
ইঁদুর মারার কল থেকে বারবিকিউর তৈজস—সবকিছু কমলা রঙে সাজিয়ে নিয়েছিল ডাচরা। বাড়ি-ঘরে করেছিল কমলা রং। উৎসবের সব আয়োজনই ছিল সম্পন্ন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হলো না। রটারডামে বড় পর্দায় খেলা দেখতে যাওয়া মানুষগুলো পরাজয়ের হতাশা নিয়ে নীরবেই ফিরেছে বাড়ি। রটারডামের ক্রিস বাড়ি ফেরার সময় সঙ্গে নিয়ে গেছেন একটা উপলব্ধিও, ‘খুব খারাপ লাগছে আমার। তবে এটা সত্য, জয় আমাদের প্রাপ্য ছিল না। খুব লজ্জার ব্যাপার এটা।

উৎসবের দেশ স্পেন

রাতের অন্ধকার, শহরের রাস্তাঘাট ফাঁকা। শেষ বাঁশি শোনার অপেক্ষায় কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। এর মধ্যেই বেজে উঠল রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েবের শেষ বাঁশি। রাতের অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে এল উল্লাসধ্বনি—ভিভা এসপানা (জয়তু স্পেন)। কেঁপে উঠল মাদ্রিদ, কেঁপে উঠল আসলে পুরো স্পেন। নিশুতি রাতের নীরবতা ভেঙে স্প্যানিশরা সমস্বরে ঘোষণা করল বিশ্বজয়ের বার্তা—‘ওলে-ওলে, চ্যাম্পিয়ন।’
উৎসব-রসদ সাজানোই ছিল। হাওয়ার্ডের শেষ বাঁশি বাজল, হল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল স্পেন। সেই উৎসবে পরশু মেতে উঠেছিল গোটা স্পেন। রাতের বুক চিরে ফুটল হাজার হাজার আতশবাজি। আলোকিত হয়ে উঠল স্পেন, নেমে এল আলোকের ঝরনাধারা। লক্ষ-কোটি স্প্যানিয়ার্ডের দু চোখ দিয়ে ঝরল জল। প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস ঝরে পড়েছে আনন্দাশ্রু হয়ে।
সবচেয়ে বড় উৎসবটা হয়েছে মাদ্রিদেই। মাদ্রিদের পাসেও ডি কাস্তেল্লানা এভিনিউতে বড় পর্দায় খেলা দেখছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। আতশবাজি, ভুভুজেলা, গাড়ির হর্ন বাজিয়ে জয়োৎসব করে তারা। প্রায় সবার হাতেই ছিল স্পেনের লাল-সোনালি পতাকা আর কণ্ঠে ছিল গান—স্প্যানিশ, স্প্যানিশ, আমরা স্প্যানিশ।
শুধু মাদ্রিদেই নয়, বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছিল স্পেনের প্রায় সব কটি শহরে। লাল-সোনালি পতাকায় মুড়ে গিয়েছিল পুরো স্পেন। শহরের রাস্তায় বড় পর্দায় খেলা না দেখে যারা বার বা বাড়িতে বসে খেলা দেখেছে, ম্যাচ শেষে তারা বেরিয়ে এসেছিল রাস্তায়। জয়ধ্বনিতে মুখরিত করেছে চারপাশ।
মাদ্রিদে কাল রাতে তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। তীব্র গরম সহ্য করেও জয় উদ্যাপন করতে রাস্তায় নেমেছিলেন ১৮ বছর বয়সী রাউল আর ষাটোর্ধ্ব হুলিও। মুখে রং দিয়ে লাল-সোনালি পতাকা আঁকা রাউল হাঁপাতে হাঁপাতেই বললেন, ‘আমরা খুব গর্বিত এবং খুব আনন্দিত। আমরা সবাই ভেবেছিলাম টাইব্রেকারে যাবে, কিন্তু ইনিয়েস্তা আমাদের বাঁচিয়েছেন এই জয়টা আমাদের প্রাপ্যই ছিল।’
স্পেনের ঐতিহাসিক জয়ের ক্ষণে পরশু মিলিয়ে গিয়েছিল সে দেশের ধনী-দরিদ্র আর রাজা-প্রজার ব্যবধান। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী অন্য সবার মতো রাস্তায় নেমে আসেননি, তবে আর দশজন স্প্যানিয়ার্ডের মতো তিনিও উচ্ছ্বাসে প্রগলভ। ‘আমি খুব খুশি এবং আবেগপ্রবণও হয়ে পড়েছিলাম’—রেডিও ক্যাডেনা সারকে বলেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী হোসে লুইস রদ্রিগেজ জাপাতেরো।
কাতালোনিয়া ও মাদ্রিদের দ্বন্দ্বের গল্প বহু পুরোনো, বলে শেষ করা যাবে না। রাজনীতি, সংস্কৃতি, ক্রীড়া—সবকিছুতেই সর্বদা বিভক্ত মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা। কিছুতেই যেন তারা একমত হতে রাজি না, কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাতে রাজি না। অথচ পরশু একটি দিনের জন্য সব বিভেদ দূর হয়ে গেল। মাদ্রিদের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলল বার্সেলোনার। কাতালোনিয়ান আর মাদ্রিদিয়ানরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘ভিভা এসপানা’।

স্বপ্ন এবার অলিম্পিক

বর্ণবাদ, খুন, ছিনতাই, চুরি-ডাকাতি, এইডস—মোট কথা অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশ হিসেবেই পরিচিতি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। তার ওপর ভালো স্টেডিয়াম, অতিথিদের জন্য থাকা-খাওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা—এ রকম অনেক বিষয়েই সীমাবদ্ধতা ছিল দেশটির। কিন্তু বিশ্বকাপের সফল আয়োজনের পর কট্টর সমালোচকেরাও বলতে বাধ্য হচ্ছেন, আয়োজক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা সফল।
এই সাফল্যে দক্ষিণ আফ্রিকার আত্মবিশ্বাসের পারদ অনেক ওপরে ওঠে গেছে। প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার চোখে তাই এখন নতুন স্বপ্ন, ‘এবারের বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, আমরা সফল আয়োজক। তাই ভবিষ্যতে অলিম্পিক আয়োজনের বিডে দক্ষিণ আফ্রিকার না থাকার কোনো কারণ দেখছি না

ক্যাসিয়াসের আগে

পরশু জোহানেসবার্গের শিরোপা-মঞ্চে বিশ্বকাপটা উঁচিয়ে ধরে ইকার ক্যাসিয়াস মনে করিয়ে দিলেন দিনো জফকেও। ইতালির এই অধিনায়ক ১৯৮২ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। ক্যাসিয়াসের আগে গোলরক্ষক-অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি ছিল তাঁরই। প্রথম কীর্তি অবশ্য ছিল আরেক ইতালিয়ান জিয়ানপিয়েরো কোম্বির। ১৯৩৪ বিশ্বকাপজয়ী দলটার গোলরক্ষক-অধিনায়ক ছিলেন তিনি। তবে দিনো জফের কীর্তিটাই বেশি আলোচিত। কারণ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন ৪০ বছর বয়সে। যে কীর্তি হয়তো ভাঙবে না আর কোনো দিনই!

বিদায়বেলায় হতাশ, আবার খুশিও

১৯৯৬ সালে যখন অভিষেক, তখন কি সুন্দরতম কল্পনাতেও ভাবতে পেরেছিলেন ক্যারিয়ারের শেষটা হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে? এই বছরের মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা যাত্রার প্রস্তুতিপর্বে যখন ঘোষণাটা দিয়েছিলেন ‘এই বিশ্বকাপই আমার শেষ’, তখনো হয়তো এতটা সুন্দর স্বপ্ন তিনি দেখেননি।
তিনি কল্পনা করুন না করুন, অদৃশ্যে বসে সৃষ্টিকর্তা লিখে রেখেছিল সেটাই। পূর্ব ঘোষণামতো ১৪ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটা হল্যান্ড অধিনায়ক জিওভানি ফন ব্রঙ্কহর্স্ট খেললেন পরশু রাতে, জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে। স্পেনের বিপক্ষে যে ম্যাচটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল। বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে ক্যারিয়ারে ইতি, ব্রঙ্কহর্স্ট কোথায় হাসবেন সৌভাগ্যবানের হাসি, না ম্যাচ শেষে তাঁর বুকফাটা আর্তনাদ, ‘হায় ঈশ্বর, লিখলেই যখন, শেষটা আরও সুন্দর করে লিখলে না কেন!’
বিদায়ী ম্যাচ শেষে কাঁদলেন ব্রঙ্কহর্স্ট। কাঁদল তাঁর দেশ হল্যান্ড। ব্রঙ্কহর্স্ট আর ডাচদের হূদয় ভেঙে দিয়ে স্বপ্নের ফাইনালে বিজয়ী স্পেন। বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে পারার গর্ব আছে, আনন্দ আছে। কিন্তু অন্তিম সময়ের গোলে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নটির মৃত্যু পুড়িয়ে মারছে তাঁকে, ‘শেষের মাত্র চার মিনিট আগে গোল। তার অর্থ আমরা অনেক কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম...।’ শিরোপাবঞ্চিত হওয়ার হতাশা আছে, তবে ফাইনাল খেলতে পারার গর্ব তাতে মুছে যাচ্ছে না, ‘আমি খুশি, আমি এটা (বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা) অর্জন করেছি। কিন্তু টুর্নামেন্টের শেষটায় আমরা হতাশ। তবে পুরো টুর্নামেন্টে যা করেছি, তাতে আমরা গর্ব করতে পারি।’
ব্রঙ্কহর্স্টের বিশ্বাস, ম্যাচের ফল অন্যরকমও হতে পারত। কিন্তু এর জন্য গোল করতে হতো আগে, ‘আমরা যদি আগে গোল করতে পারতাম, তবে শেষটা অন্যরকমও হতে পারত। স্পেনের বিপক্ষে আপনি কখনোই বেশি সুযোগ পাবেন না। যে দু-একটি সুযোগ আমরা পেয়েছি, তাতে গোল করতে না পারাটা ছিল হতাশার।’
১০৬ ম্যাচের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে হারের সঙ্গে কষ্ট আরেকটা, বিদায়ী ম্যাচের পুরোটা খেলতে পারেননি। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়েও খেলছিলেন। কিন্তু ৯৮ মিনিটে ইনিয়েস্তাকে ট্যাকল করতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিংয়ে ব্যথা পাওয়ায় দৌড়াতে পারছিলেন না। ফলে বাধ্য হয়েই মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে।
৩৫ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারের ভবিষ্যৎটাও প্রায় ঠিক। ডাচ ক্লাব ফেইনুর্দের টেকনিক্যাল স্টাফ হিসেবে যোগ দেবেন। প্রস্তাব আছে হল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলের সহকারী কোচেরও। বিদায়বেলায় তাঁর প্রার্থনা, আগামী ইউরোতে ভালো করবে হল্যান্ড, ‘আমি দল ছেড়ে যাচ্ছি। আমি মনে করি, সামনের ইউরোতে দল ভালো করবে। দুই বছর কঠোর পরিশ্রম করে আমরা অনেক (বিশ্বকাপ শিরোপার) কাছাকাছি এসেছিলাম। এখন আবার ইউরোর জন্য শুরু করতে হবে।’

পলকে ইনিয়েস্তার অভিনন্দন

স্পেন কার সৌজন্যে বিশ্বকাপ জিতল? ভিয়ার পাঁচ গোল, মাঝমাঠে জাভি-ইনিয়েস্তার দারুণ পারফরম্যান্স, পোস্টের নিচে ক্যাসিয়াসের নির্ভরতা, রক্ষণে পুয়োল-পিকের দেয়াল—সব মিলিয়ে দলীয় পারফরম্যান্সেই ফাইনালে এল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ফাইনালে ইনিয়েস্তার গোলেই তো শিরোপা জিতল স্পেন!
কিন্তু খোদ ইনিয়েস্তা বলছেন, স্পেনে এখন তাঁদের মতোই জনপ্রিয় নাকি ‘পল’। হ্যাঁ, সেই ‘মহান অক্টোপাস’। সেমিফাইনাল থেকেই জার্মানির এই অক্টোপাস স্পেনের পক্ষে ভবিষ্যদ্বাণী করছে। আর সেই অনুযায়ী জিতেও চলল স্পেন!
কৃতিত্বটা খেলোয়াড়দের, নাকি পলের—সে নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু স্প্যানিশদের তা নিয়ে বয়েই গেছে। দেশটাতে পল দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফাইনালের আগেই স্প্যানিশ মন্ত্রী-আমলারা পর্যন্ত পলের বন্দনায় মেতেছিলেন।
ইনিয়েস্তা বলছেন, পলের গণনা সত্যি করে স্পেন বিশ্বকাপ জেতায় তাঁদের দেশে পলের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যাবে। এই জনপ্রিয় গণককে তাই অভিনন্দন জানিয়ে দিয়েছেন বার্সেলোনার মিডফিল্ডার, ‘অক্টোপাসটা এখন স্পেনে দারুণ জনপ্রিয় হতে যাচ্ছে।’

ব্ল্যাটারের আক্ষেপ

টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রার্থিত, আকর্ষণীয় ম্যাচটাই কিনা অনাকর্ষ এক কদর্য চেহারা নিয়ে ফেলল! ১৪টি হলুদ, একটি লাল এবং ৪৭টি ফাউলের ফাইনাল ম্যাচটা ভালো লাগেনি সেপ ব্ল্যাটারেরও। ফিফা সভাপতি তাই আক্ষেপ নিয়েই বলেছেন, মাঠে হল্যান্ড আর স্পেনের খেলোয়াড়দের কাছে আরও ভালো ব্যবহার তিনি আশা করেছিলেন। রেফারি ও তাঁর সহকারীদের নিয়েও অনেকে সমালোচনা করছেন। কিন্তু ব্ল্যাটার বলছেন, এই সমালোচনা অন্যায়। বরং কঠিন এক দায়িত্বই পালন করেছেন এঁরা।

রেফারিং নিয়ে সন্তুষ্ট ফিফা

বিশ্বকাপে এবার আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ওপরের দিকেই ছিল রেফারিং-বিতর্ক। কারণে-অকারণে কার্ড প্রদর্শনের অভিযোগ তো আছেই, বড় ধরনের বেশ কিছু ভুলও হয়েছে, যা পুরো ফুটবল-বিশ্বকেই করেছে বিস্মিত। অথচ ফিফার পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছে, রেফারিং নিয়ে তারা খুবই সন্তুষ্ট। ফিফার রেফারিং কমিটির প্রধান হোসে মারিয়া গার্সিয়া আরান্ডা বলেছেন, মাঠে রেফারিদের নেওয়া সিদ্ধান্তের ৯৬ শতাংশই নাকি সঠিক ছিল!
স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া গোলটি কী কারণে বাতিল করে দিয়েছিলেন রেফারি, সেটি এখনো অজ্ঞাত। দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয়েছে ইংল্যান্ড। ল্যাম্পার্ডের ভলি জার্মান গোললাইন অতিক্রম করলেও রেফারি গোল দেননি। দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচেই মেক্সিকোর বিপক্ষে কার্লোস তেভেজের করা প্রথম গোলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অফসাইড বিতর্ক।
কিন্তু ফিফা রেফারিং বিভাগের প্রধান রেফারিদের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টই। মাঠের ভুলগুলো সাবধানতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে ফিফার রেফারিং কমিটি বলছে, ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই নাকি রেফারিরা সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। ‘এটা বড় একটা সাফল্য। আমাদের বিষয়টা মানতে হবে, কারণ, এটা কারও মতামত নয়, বাস্তবতা’—বলেছেন গার্সিয়া আরান্ডা। রেফারিরা ভুল করেছেন মেনে নিয়েও তাঁর মত, ‘অল্প কিছু ভুলই হয়েছে, আমরা সেগুলো লুকোচ্ছিও না।’
বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ইংলিশ রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েব। অভিযোগ তাঁর বিপক্ষেও আছে। টেকো মাথার ওয়েব সে অভিযোগ মানছেনও। কিন্তু তাঁর দাবি, সেসব ভুল মারাত্মক কিছু নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনামাত্র।

যত দোষ রেফারির!

বিশ্বকাপ আরও একবার ডাচদের উপহার দিল স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। হতাশ রোবেন, কিউটরা পরাজয়ের জন্য সরাসরিই দায়ী করেছেন রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েবকে। শিষ্যদের মতো সরাসরি না হলেও আকারে-ইঙ্গিতে রেফারির ঘাড়ে দায় চাপিয়েছেন বার্ট ফন মারউইকও। তবে স্পেনকে প্রাপ্য কৃতিত্বটাও দিতে ভোলেননি হল্যান্ড কোচ।
‘রেফারি কী করল, সেটা নিয়ে ভাবার লোক আমি নই। আমি বিশ্বাস করি, সেরা দলটাই সাধারণত জেতে। তবে আমার মনে হয়, রোবেনকে করা ফাউলটার জন্য পুয়োলের দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পাওনা ছিল। আমার মনে হয়, রেফারি ম্যাচ ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি’—ম্যাচ শেষে ফন মারউইকের কণ্ঠে একটু যেন স্ববিরোধী কথা। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পেয়ে জন হেইটিঙ্গা মাঠ ছাড়ার পর হল্যান্ডের মূল লক্ষ্য ছিল ম্যাচটাকে টাইব্রেকারে টেনে নেওয়া। সেটার খুব কাছাকাছি চলেও গিয়েছিল তারা, শেষ রক্ষা হয়নি। তবে স্পেন যোগ্য দল হিসেবে জিতেছে, ডাচ কোচ স্বীকার করেছেন এটাও, ‘চার মিনিট বাকি থাকতে ফাইনাল হারাটা খুব তিক্ত অভিজ্ঞতা। ভেবেছিলাম, ১০ জন নিয়েও অন্তত টাইব্রেকার পর্যন্ত যাওয়া যাবে। বিস্বাদময় অভিজ্ঞতা, তবে এটাই খেলা। আমাকে বলতেই হবে, যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছে স্পেন।’
কোচের মতো এত ভদ্রোচিত বক্তব্য শোনা যায়নি শিষ্যদের কণ্ঠে। ক্ষুব্ধ ডাচরা ইংলিশ রেফারির সমালোচনায় কোনো রাখঢাক রাখেননি। সিলভার বল ও ব্রোঞ্জ বুটজয়ী তারকা ওয়েসলি স্নাইডার বলেছেন, ‘রেফারি ডাকাতি করেছে। এটা ফুটবলের জন্য একটা লজ্জা।’ স্নাইডারের সঙ্গে যাঁর শীতল যুদ্ধ চলছে বলে জোর গুজব, সেই রবিন ফন পার্সির কণ্ঠও ছিল একই রকম ঝাঁঝালো, ‘ওই লোকটা (রেফারি) মাঠে কী করছিল? বিশ্বকাপ ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে সে তিনটা বাজে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এটা খুব বেদনাদায়ক।’
ফাইনালের একমাত্র গোলদাতা ইনিয়েস্তার গোলের সময়টায় মাঠেই থাকা উচিত ছিল না বলে মনে করেন ফন পার্সি, ‘ইনিয়েস্তাকে অনেক আগেই বের করে দেওয়া উচিত ছিল, কারণ সে ফন বোমেলকে লাথি মেরেছিল। রোবেনকে ফেলে দেওয়ার জন্য পুয়োলেরও দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পাওনা ছিল। তবে শুধু রেফারিই দায়ী, আমি তা বলব না। আমরাও অনেক সুযোগ হাতছাড়া করেছি, তবে রেফারির ভুলগুলো পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।’ হারের পর ডাচ ড্রেসিংরুমেও প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল রেফারিং, জানাচ্ছেন আরিয়েন রোবেন, ‘ড্রেসিংরুমে আমাদের শুধু রেফারিং নিয়েই কথা হয়েছে। সবাই হতাশ। কিছু কিছু বিষয় আছে, মেনে নেওয়া খুব কঠিন। এখন অবশ্য এসব নিয়ে কথা বলার কোনো মানে হয় না।’
রেফারিং নিয়ে এত অভিযোগ ডাচদের, কিন্তু রেফারির কল্যাণে হেইটিঙ্গার অনেক আগেই আরেকটি লাল কার্ড দেখা থেকে বেঁচে গেছে হল্যান্ড। ম্যাচের সবচেয়ে কুৎসিততম ফাউলটি করেছিলেন নাইজেল ডি ইয়ং, জাবি আলোনসোর বুকে খুব বাজেভাবে লাথি মেরেও বেঁচে যান স্রেফ হলুদ কার্ড দেখে। এ জন্যই বোধহয় একটু নরম শোনা গেল এই মিডফিল্ডারের কণ্ঠ, ‘ওয়েব কিছু কৌতূহলী সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তবে রেফারিকে দোষ দেওয়া সব সময়ই সহজ। আমরাই ঠিকভাবে ম্যাচটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।’
হল্যান্ডের খেলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন ছিল পুরো টুর্নামেন্টেই। ফাইনালে ২৮টি ফাউল করার পর আবারও উঠে এসেছে সেই প্রসঙ্গ। রেফারিংয়ের মতো এই ব্যাপারেও ডাচ কোচের বক্তব্যকে মনে হলো স্ববিরোধী, ‘আমরা এখনো সুন্দর ফুটবল খেলতে চাই। কিন্তু আজ (পরশু) আমরা খুব ভালো একটা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলছিলাম। ওদের হারাতে আরও কৌশলী হওয়া প্রয়োজন ছিল। এটা হয়তো আমাদের খেলার স্টাইল নয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়টাই তো আসল।’
সুন্দর ফুটবল কিংবা শিরোপা, বিশ্বকাপ থেকে হল্যান্ড শেষ পর্যন্ত পেল না কিছুই!

১৪টি হলুদ একটি লাল

শুরু করেছিলেন ম্যাচের ১৫ মিনিটে, রবিন ফন পার্সিকে দিয়ে। ১২১ মিনিটে জাভিকে দিয়ে থামলেন যখন, রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েব ততক্ষণে দেখিয়ে ফেলেছেন ১৪টি হলুদ কার্ড! বিশ্বকাপের ফাইনালে এটি রেকর্ড তো বটেই, বিশ্বকাপের যেকোনো পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কার্ড দেখার জন্য ‘কুখ্যাত’ হয়ে আছে যে ম্যাচটি, সেটিও হলুদ কার্ড এর চেয়ে বেশি দেখেছে মাত্র দুটি।
১৪ হলুদ কার্ডের নয়টিই দেখেছেন হল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা। এর মধ্যে জন হেইটিঙ্গা একাই দেখেছেন দুটো। যোগফল হিসাবে একটি লাল কার্ডও দেখতে হয়েছে এই ডিফেন্ডারকে। রেফারিকে দুষছেন অনেকেই। কিন্তু ৪৭টি ফাউল হয় যে ম্যাচে, তাতে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যে হয়নি, তাতে ওয়েবকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। সব মিলে ১৫টি কার্ড আর ফাউলের হাফসেঞ্চুরি করে ফেলা এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ‘নোংরা’ ফাইনাল কি না, সেই প্রশ্নও এখন উঠছে।
বিশ্বকাপে কার্ডের প্রচলন হয়েছে ১৯৭০ এর আসরে। তবে সেবার কার্ড বের করার প্রয়োজনই বোধ করেননি কোনো রেফারি। ফলে হলুদ আর লাল কার্ডের অভিষেক আসলে ১৯৭৪ বিশ্বকাপে। এর আগে খেলোয়াড়দের সতর্ক এবং বহিষ্কার করতেন রেফারিরা। পরশু ম্যাচের আগ পর্যন্ত ১৮টি ফাইনালে (১৯৫০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল-উরুগুয়ে ম্যাচটি ধরে) মোট হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছিল ১৪টি। পরশু এক ফাইনালই দেখে ফেলল তার সমান!
ফাইনালে সর্বোচ্চ হলুদ কার্ডের রেকর্ড এর আগে ছিল ছয়টি, ১৯৮৬ আর্জেন্টিনা-পশ্চিম জার্মানি ফাইনালে। পরশু এর দ্বিগুণেরও বেশি হলুদ কার্ড বের করতে হলো রেফারিকে। পুরো টুর্নামেন্টে আগের ছয় ম্যাচে মাত্র তিনটি হলুদ কার্ড দেখেছিল যে স্পেন, তাদেরও পাঁচ খেলোয়াড়ের নাম উঠে গেল রেফারির হলুদ খাতায়। ‘কিছুতেই স্পেনকে ছন্দ নিয়ে খেলতে দেব না’ পণ করে মাঠে নামা হল্যান্ডের ভাগেই হলুদ কার্ডের সংখ্যা পড়ল বেশি। লাল কার্ডটিও তাদের খেলোয়াড়েরই। এমনিতে ফাইনালে লাল কার্ড দেখা খেলোয়াড়দের সংখ্যাও বিরল। পরশু হেইটিঙ্গাকে নিয়ে সংখ্যাটি ৫। হেইটিঙ্গার সঙ্গী হয়ে মাঠের বাইরে যেতে পারতেন নাইজেল ডি ইয়ংও। নিজের কুংফু-কারাতে প্রতিভা দেখাতে শূন্যে ভেসে কিক মেরে বসেছেন জাবি আলোনসোর বুকে। ফাইনালটি যে ফাইনালের মতো হয়নি, তাতে ২৮টি ফাউল করা হল্যান্ডের দায়ই বেশি। ১৯টি ফাউল করা স্পেনকেও এর ভার নিতে হবে। গোটা পঞ্চাশেক ফ্রি-কিক নিতে হয় যে ম্যাচে, সেটার আধা ঘণ্টাই তো ফ্রি-কিক নিতে ব্যয় হয়ে যায়!