Sunday, May 11, 2014

বিশ্বকাপে ভারতের তাস বিশ্ব ক্লাব কাপ by গৌতম ভট্টাচার্য

ব্রাজিল সরকারের মতোই অতীব বিড়ম্বনার মুখে এখন ফিফা প্রধান সেপ ব্লাটার। সোমবার থেকে দু’দিনের ফিফা কংগ্রেস শুরু হল সাও পাওলোতে। সারা পৃথিবীর ফুটবল কর্তারা সেই উপলক্ষ্যে এখানেই। ব্লাটার গতকাল এগজিকিউটিভ বোর্ডের বৈঠকে বাকিদের সঙ্গে নিয়ে ব্রাজিল ফুটবল সংস্থার পাশে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন, “বিশ্বকাপ ওরা ঠিক সামলে নেবে।” ইতিমধ্যে যদিও গোটা দুনিয়া বুঝে গিয়েছে, ব্রাজিলকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হঠকারী হয়েছে। আর একটু ভেবে দেখা উচিত ছিল।

কিন্তু ব্রাজিল থেকে যদি বা রক্ষা পান, কাতারকে ২০২২ বিশ্বকাপ দেওয়া নিয়ে শুনছি ফিফা কংগ্রেসে ঝড় উঠবে। ওই বিশ্বকাপ করার দাবিদার ছিল অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং কোরিয়া। শুধু দেওয়া নয়, যে পদ্ধতিতে উৎকোচের বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে, উত্তেজনা তা নিয়েই। অথচ মাস কয়েক আগে অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ছাত্রদের সামনে বক্তৃতা করতে গিয়ে ব্লাটার বলে এসেছিলেন, “ফিফাকে লোকে ভাবে বুঝি সেই লোকগাথার নটিংহ্যামের শেরিফ। যেখানে বাস্তবে আমরা রবিনহুড জাতীয় কাজই করে থাকি।” কথাটা কাতারকে কাপ দেওয়া নিয়েই বলা।

সেই ব্লাটারই এখন সাও পাওলোতে বসে স্বীকার করছেন, সিদ্ধান্তের পদ্ধতি আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত ছিল। পশ্চিমী মিডিয়া অবশ্য  ছিঁড়ে খাচ্ছে এখনও এই সিদ্ধান্তকে। নরওয়ের এক দৈনিক লিখেছিল, তিনটে স্টেডিয়াম নিয়ে একটা দেশ ওয়ার্ল্ড কাপ করবে? তাও এমন তার হালচাল যে সমর্থক রাস্তায় বিয়ার খেলে তাকে বেত মারার ব্যবস্থা থাকে। ব্রিটিশ দৈনিকগুলো তো তথ্য সহযোগে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে বিভিন্ন ভোটার দেশকে মোট ৩৫০ কোটি টাকা উৎকোচ দিয়ে কাতারের আমির এই কাজটা করিয়েছিলেন। শোনা যাচ্ছে, এশিয়ার কিছু দেশও টেবিলের তলা দিয়ে সেই সময় পেমেন্ট পেয়েছে। নাম উঠেছে পাকিস্তান এমনকি বাংলাদেশেরও।

বাংলাদেশ আপাতত ফিফা ক্রমপর্যায়ে ১৬৫ নম্বরে। ফিফা কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁরা চার সদস্যের প্রতিনিধি দল এনেছে। বাংলাদেশ ফুটবল সংস্থার প্রেসিডেন্ট এখন কাজি মহম্মদ সালাউদ্দিন। সত্তর দশকের বিখ্যাত ফুটবলার। মুক্তিযুদ্ধের পর জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে মোহনবাগান মাঠে খেলতেও এসেছিলেন। রোববার সাও পাওলো বিমানবন্দরে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলেন, “চুনী গোস্বামীর কী খবর?” কিন্তু কাতার নিয়ে প্রশ্ন হলেই আপাতত স্বদেশি সাংবাদিকদেরও এড়িয়ে যাচ্ছেন সালাউদ্দিন।

ভারত থেকে এসেছেন এআইএফএফ কোষাধ্যক্ষ হরদেব জাডেজা আর প্রভাবশালী সদস্য গুয়াহাটির অঙ্কুর দত্ত। অঙ্কুরবাবুদের কথা শুনে মনে হল, কাতার নিয়ে বিচলিত না থেকে তাঁদের লক্ষ্য হবে, ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ ভারতে করার জন্য লবিং আরও মজবুত করা। এমনকী ২০২০-তে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ আনানো যায় কি না তার ছক তৈরি।

প্রেসিডেন্ট প্রফুল্ল পটেল আসেননি। ফাইনালের আগে যদি বা আসেন। গতবারের বিশ্বকাপে নাকি যানইনি। কলকাতা ময়দান এমনকী মিডিয়া মহলেরও জনপ্রিয় ধারণা হল যে প্রিয়রঞ্জনের ফুটবল উত্তরাধিকার হিসেবে প্রফুল্ল সম্পূর্ণ অদক্ষ। তাঁর ফিফায় প্রিয়বাবুর মতো জানাশোনা নেই। না আছে ব্যক্তিগত ফুটবল মহলে জনপ্রিয়তা।

ভারতীয় ফুটবল মহলের অনেকেই কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণকারী। তাঁদের মনে হয় প্রফুল্ল অনেক বেশি কার্যকরী। যিনি ফিফায় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার তাঁবু না খাটাতে চেয়ে দেশে বিশ্ব পর্যায়ের টুর্নামেন্ট আনার চেষ্টা করছেন। যাতে ভারত বিশ্ব ফুটবল ম্যাপে গেঁড়ে বসে। সে তাঁর টিম যতই ১৫৪ নম্বরে থাক। অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী পরিকল্পনা প্রফুল্লের যে ২০১৭ থেকে নিরন্তর টুর্নামেন্ট করে যেতে চান তিনি।

২০১৭—অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ ইতিমধ্যে চলে এসেছে।

২০১৮-২০১৯—বিশ্ব ক্লাব কাপ। যার বিডিং ভারত জমা দেবে এই অগস্টে। এক রকম যা কথা হয়ে রয়েছে, তাতে এই টুর্নামেন্ট ভারতের পাওয়ার মতোই পরিস্থিতি। আর তা হলে সেই সময়কার মেসি-রোনাল্ডোদেরও খেলতে আসাটা এক রকম অনিবার্য।

২০২০—অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। এটা সংগঠনের তোড়জোড় শুরু হবে সাও পাওলো থেকে।

এক ভারতীয় কর্তা বললেন, “প্রফুল্ল ভিড়ে না এসে ফাঁকায় সুইৎজারল্যান্ড চলে যাওয়াই পছন্দ করেন। যেখানে ব্লাটারকে একান্তে পাওয়ার সম্ভব অনেক বেশি। আর এই বৈঠকগুলো কার্যকর হচ্ছে বলেই ভারত এই সব অপ্রত্যাশিত ম্যাচ আয়োজনের দাবিদার হচ্ছে।” গোটা ফুটবল পৃথিবী তাই যখন কাতার নিয়ে আলোড়িত, ফিফা কংগ্রেসে ভারতীয় অংশগ্রহণকারীরা তখন পাখির চোখ করছেন বিশ্ব ক্লাব কাপকে। অগস্ট যে আর মাত্র দু’মাস দূরে!

শরিক খুঁজছে বিজেপি

যতই জোয়ার তুলুন, সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক আসন হবে না জেনেই এখন শরিক খুঁজছেন নরেন্দ্র মোদি। শুক্রবার এভাবেই মোদিকে তোপ দাগলেন বহুজন সমাজ পার্টির প্রধান মায়াবতী। বৃহস্পতিবার টাইমস নাও চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মোদি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, মমতা-মায়াবতী-জয়ললিতার মতো নেত্রীদের জন্য তার দরজা খোলা। তার যুক্তি ছিল, প্রাক-ভোট শরিকদের নিয়ে এনডিএ ৩৫০টি আসন পেলেও কোনো এক নির্দল সংসদ সদস্যকেও তিনি সমান গুরুত্ব দেবেন। মোদির এই বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে মায়াবতী শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে জানান, গোটা দেশে মোদি-হাওয়া রয়েছে বলে মিথ্যা প্রচার চালানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বুঝে এখন শরিক খুঁজছে বিজেপি।
ভোটের পরেও বহুজন সমাজ পার্টি কোনো অবস্থাতেই সাম্প্রদায়িক নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপিকে সমর্থন করবে না। বৃহস্পতিবারই এক সাক্ষাৎকারে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের পর প্রয়োজনে এআইএডিএমকে নেত্রী জয়ললিতা, তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ও বিএসপি নেত্রী মায়াবতীর সমর্থন চাইবেন তারা। এনডিএতে তাদের যোগ দেয়ার ব্যাপারে তিনি যে আশাবাদী, জানিয়েছিলেন সে কথাও। এরই জবাবে শুক্রবার বিএসপি নেত্রী মায়াবতীর বক্তব্য, আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চাই, কোনো মূল্যেই এনডিএকে সমর্থন করবে না বিএসপি। নির্বাচন শুরু হওয়ার আগে মোদির দাবি ছিল, এনডিএর সরকার গড়ার জন্য অন্য কোনো দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে না। জয়ের ব্যাপারে সন্দিহান না হলে কোনো দল অন্য দলের সমর্থন নেয়ার কথা বলে না... সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে ভোটাররা আমাদের ভোট দেন, তাদের মনে সন্দেহ তৈরি করতেই মোদির এই সাক্ষাৎকার। একইসঙ্গে বিজেপির বিরুদ্ধে নোংরা রাজনীতির অভিযোগও আনেন মায়াবতী। মোদির এই বার্তার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন তৃণমূলের মুখপাত্র ডেরেক ওব্রায়েনও। তার কথায়, এনডিএ-র দরজা যদি খোলা থাকে, তবে আমাদের দরজা বন্ধ করে দিয়ে চাবি ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। বিজেপির ৩৭২টি আসন জেতার স্বপ্ন অলিক কল্পনা, খুব বেশি হলে ১৮০-১৯০টি আসন পাবে তারা।
এরপরই এক সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপি নেতা অমিত শাহের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য, সরকার গড়ার জন্য ৩০০টিরও বেশি আসন জিতবে এনডিএ। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিজেপি রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতায় বিশ্বাস করে না। দেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করতে চাইলে এনডিএতে সবদলই স্বাগত। বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, যে তিন নেত্রীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে সাক্ষাৎকারে তাদের মধ্যে মমতা ব্যানার্জির পক্ষে সরাসরি এনডিএতে যোগ দেয়া কঠিন। তবু বিজেপি ক্ষমতায় এলে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখতে চাইবেন মমতা। তেমনই উত্তরপ্রদেশে মায়াবতীর সমর্থন নেয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে সংখ্যার নিরিখে। যদি উত্তরপ্রদেশে মোদি হাওয়া ঠিকমতো কাজ করে, তা হলে দলের আসন ৫০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু তা কাজ না করলে সেটি ৩০-এর কোঠায় এসে দাঁড়াবে। যদি বিজেপির সংখ্যা ৪০-ও ছাড়ায়, তাহলেও সুদূরপ্রসারী রণনীতির কথা মাথায় রেখে মায়াবতীর সাহায্য না নেয়াই ভালো। কারণ, সে ক্ষেত্রে পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিরই লোকসান। মায়াবতীও চাইবেন না, বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের ভিত নষ্ট করতে। কারণ, বিজেপি ও মায়াবতী একই ভোটব্যাংকে থাবা বসাতে চাইছে। আর মোদির এই বক্তব্যের পরে জয়ললিতার পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া অবশ্য আসেনি। 
এনডিএতে সব দলই স্বাগত
সরকার গড়ার জন্য ৩০০টিরও বেশি আসন জিতবে এনডিএ। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিজেপি রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতায় বিশ্বাস করে না
অমিত শাহ
আমাদের দরজা বন্ধ
ভোটের পরেও বহুজন সমাজ পার্টি কোনো অবস্থাতেই সাম্প্রদায়িক নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপিকে সমর্থন করবে না
মায়াবতী

আওয়ামী লীগ নীরব কেন?

সাত খুনের প্রতিবাদে সিদ্ধিরগঞ্জে মানববন্ধন
বিরোধী দল যে গণতন্ত্রের অপরিহার্য পূর্বশর্ত, এই সরল সত্যটি আমাদের গণতান্ত্রিক নেতা-নেত্রীদের অনেকেই মানেন না৷ অন্তত ক্ষমতায় থাকলে বিরোধী দলকে তাঁরা গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু বলেই গণ্য করে থাকেন৷ পাকিস্তান আমলের কথা বাদ দিলেও স্বাধীনতার পর গত ৪৩ বছরে কোনো সরকারই বিরোধী দলকে কাজে লাগানোর প্রয়োজন বোধ করেনি৷ আমাদের রাজনীতির এই অপসংস্কৃতি ঝেড় ফেলতে না পারলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই৷ সরদার ফজলুল করিমের কোনো এক লেখায় পড়েছিলাম, স্বাধীনতার পর একবার জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, ‘আপনি দেশ চালানোর দায়িত্ব নিয়েছেন৷ এখন আপনার কাজ হবে দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে তোলা৷’ জবাবে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, বিরোধী দলের তো জনসমর্থন নেই, শক্তিশালী বিরোধী দল কী করে হবে৷ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের নিরিখে দেখলে হয়তো তাঁর বক্তব্যটি ঠিক ছিল৷ কিন্তু স্বাধীনতার পর কোনোভাবেই বলা যায় না যে বিরোধী দলের জনসমর্থন ছিল না৷ ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসুর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচনে বিরোধী দলের সমর্থক ছাত্র ইউনিয়নই জয়ী হয়েছিল৷ ১৯৭২-৭৩ সালে বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন, বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন, কিংবা জাসদ-সমর্থিত ছাত্রলীগই জয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছিল৷ কিন্তু ১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনে সরকার-সমর্থক ছাত্রলীগ (ছাত্র ইউনিয়নও তার সহযোগী হয়েছিল) ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে ছাত্ররাজনীতির বুকে প্রথম কুঠারাঘাত হানে৷ এই ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের কয়েক মাসের ব্যবধানে মুহসীন হলে সাত হত্যাকাণ্ড ঘটায় ছাত্রলীগেরই একটি অংশ, যাঁর নেতৃত্বে ছিলেন শফিউল আলম প্রধান৷ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রশাসন ও সরকারি দল জবরদস্তি না করলে বিরোধী দল ২৫ থেকে ৩০টি আসন পেত এবং তাতে ক্ষমতাসীন দলটির ইতরবিশেষ ক্ষতি হতো না, বরং জোর করে জিতিয়ে আনা খন্দকার মোশতাক আহমদরা আওয়ামী লীগের ভেতরে থেকে পরবর্তীকালে অন্তর্ঘাতের সুযোগ না-ও পেতে পারতেন৷ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের সরব ও সজাগ উপস্থিতি প্রয়োজন এ কারণে যে তাতে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে, সরকারি দল যা খুশি তা করতে পারে না৷ ৫ জানুয়ারির আগে বিরোধী দল বিএনপি অযৌক্তিকভাবে সংসদ বর্জন করলেও দলের নেতারা বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলতেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে কিছুটা হলেও সচেতন থাকতেন৷ অন্তত সংসদীয় কমিটিগুলোতে তাদের উপস্থিতি সরকারি দলকে কিছুটা হলেও জবাবদিহি করতে বাধ্য করত৷ কিন্তু ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর সরকারি দলের সামনে আর কোনো বাধাই থাকল না৷ নেতা-কর্মীরা ভাবতে লাগলেন, ‘আমরা সবাই রাজা এই রাজার রাজত্বে৷’
সবাই রাজা হলে যা হয়, সেটাই দেশবাসী গভীর বেদনা ও বিস্ময়ের সঙ্গে এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে৷ দেশের বিভন্ন স্থানে সরকারি দলের নেতা-কর্মী ও ক্যাডাররা যেসব কাণ্ড করছে, তার সঙ্গে ২০০১ সালের অক্টোবর-পরবর্তী সময়ের তুলনা করা যেতে পারে৷ সে সময়ে বিএনপি তথা চারদলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা বিরোধী দল ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকে তাদের ‘নৈতিক কর্তব্য’ বলে মনে করেছিলেন, যার ফলে পুলিশ তথা প্রথাগত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে খালেদা জিয়ার পক্ষে দেশ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তিনি এলিট ফোর্স হিসেবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাব গঠন করতে বাধ্য হন৷ অতীতের রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যাবে, সেই র‌্যাবের হাতে বিএনপির যত নেতা-কর্মী ক্রসফায়ারে মারা গেছেন, তত্কালীন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা তত মারা যাননি৷ আর এখন তো নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যা ঘটছে, তাকে কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা বললে ভুল হবে৷ এটি হলো ক্ষমতাকেন্দ্রিক অসুস্থ রাজনীতির অনিবার্য পরিণাম৷ রাজনীতি যখন অবৈধ সম্পদ রক্ষা এবং সন্ত্রাসের পাহারাদারে রূপ নেয়, তখন প্রচলিত আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অকেজো হয়ে পড়ে৷ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা দেশবাসীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে নূর হোসেন নামের দানবকে রোখার শক্তি ও সাহস ক্ষমতাসীন দলটির নেই৷ এর চাক্ষুষ প্রমাণ, ঘটনার দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও দলীয়ভাবে কেন্দ্র বা স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি৷ ২০০৯-১৩ সালে সংসদে আসনসংখ্যা যত কমই হোক না কেন, সংসদে একটি বিরোধী দল ছিল৷ এমনকি বিরোধী দলের  অনুপস্থিতিতে স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম একাই সরকারি দলের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতেন৷ এখন সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রতিবাদ করার কেউ নেই৷ ফলে গত জানুয়ারি থেকে ক্ষমতাসীন দলটির নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে, প্রশাসন ও সরকারি দলের মধ্যে অশুভ আঁতাত রচিত হয়েছে৷ মাস খানেক আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা সায়াদকে যখন একই সংগঠনের একদল কর্মী পিটিয়ে হত্যা করেন, তখন কেউই ভাবতে পারেননি যে সেই হত্যার রেশ না কাটতেই নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা ঘটবে৷ আর সেই হত্যাকাণ্ডে যিনি নেতৃত্ব দেবেন, তিনি আওয়ামী লীগেরই একজন নেতা ও নির্বাচিত কাউন্সিলর৷
যিনি হত্যার শিকার হেলন, তিনিও কাউন্সিলর এবং একই দলের নেতা৷ খুনের দায়ে অভিযুক্ত কাউন্সিলর নূর হোসেন যে এ রকম একজন দুধর্র্ষ অপরাধী, তা অন্যরা না জানলেও আওয়ামী লীগের নেতাদের ভালো জানার কথা৷ যে রাজনীতির কাছে খুিন ও খুনের শিকার্তউভয়ই আশ্রয় পায়, সেই রাজনীতি কখনোই জনগণের কল্যাণ আনতে পারে না৷ এমনকি খুনের শিকার নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও একাধিক খুন ও সন্ত্রাসের অভিযোগ ছিল৷ নূর হোসেন ছিলেন বাসের হেলপার৷ হেলপার থেকে ধনকুবের হওয়ার নজির বহু আছে৷ পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি কপর্দকশূন্য অবস্থা থেকে ধনকুবের হয়েছেন৷ প্রশ্ন হলো, নূর হোসেনের ধনী হওয়ার উপায়টা কী ছিল৷ হত্যা, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, বালুমহাল দখল ও নদী দখল থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই, যা তিনি করেননি৷ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা কি তাঁর এসব অপকর্ম সম্পর্কে কিছুই জানতেন না? প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন নীরব ছিল? অভিযোগ আছে, নূর হোসেন যে কোটি কোটি টাকা অবৈধ উপায়ে অর্জন করেছেন, তার ভাগ পেয়েছেন সবাই৷ আর এসব কারণেই তিনি সাত খুনের মেতা ঘটনা ঘটাতে পেরেছেন৷ পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনে তাঁর অপকমের্র ফিরিস্তি প্রকাশ ও প্রচারের পরও নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অর্থ আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে তাঁর পাপের বোঝা স্বেচ্ছায় কাঁধে নিয়েছে৷ শোনা যায়, কেবল নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের নেতারা নন, কেন্দ্রীয় অনেক নেতাও তাঁর কাছ থেকে মাসোহারা পেতেন৷ ঘটনার দুই সপ্তাহ পর আহূত সংবাদ সম্মেলনেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নূর হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুসংবাদ আমাদের জানাতে পারেননি৷ স্থানীয় আওয়ামী লীগও নীরব৷ ‘খুনের সঙ্গে যাঁরাই জড়িত, তাঁদের অবস্থান যা-ই হোক, ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে সৈয়দ আশরাফ সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন; দলের নয়৷ নারায়ণগঞ্জের ঘটনা নিয়ে ঘোলা পানিতে বিরোধী দলকে মাছ শিকার করতে দেওয়া হবে না বলে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও তাঁর দলের কোন কোন নেতা-কর্মী পানি ঘোলা করলেন, তাঁদের সম্পর্কে কিছু বলেননি৷
নারায়ণগঞ্জের খুদে মাফিয়া ডন নূর হোসেনের যেসব অপকর্ম ও অপরাধের খবর আসছে, তার পরও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আওয়ামী লীগ কেন ভয় পাচ্ছে, সেটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন৷ সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কী বলেন? কী বলেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা? সাত খুনের আগে যাঁরা বলতেন, তাঁদের হুকুম ছাড়া নারায়ণগঞ্জে গাছের পাতাটিও নড়বে না, তাঁরা হঠাৎ খামোশ হয়ে গেলেন কেন?  ১ মে গাজীপুরের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, হত্যা ও গুমের সঙ্গে বিএনপি জড়িত৷ নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর তা প্রমাণিত হয়নি৷ আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন একাই সাত খুনের ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে আলামত পাওয়া যাচ্ছে৷ এটাই হলো আওয়ামী লীগের বিএনপি ও জামায়াতমুক্ত শাসনের নমুনা৷ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী যে দেশের ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বেড়াচ্ছে, সে সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নেতারা হরহামেশা জনগণকে সজাগ থাকতে বলছেন৷ কিন্তু নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের সঙ্গে বিএনপির কারও নাম আসেনি৷ সব নামই আওয়ামী লীগের, যুবলীগের ও ছাত্রলীগের৷ তাহলে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আসল ষড়যন্ত্র কারা করছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না৷ কেবল নারায়ণগঞ্জ বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাংলাদেশের যেখানেই হত্যা, গুম, ছিনতাই, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে, সেখানে অনিবার্যভাবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নাম আসছে৷ তাঁরা নিজেরা মারামারি-হানাহানিতে লিপ্ত৷ নিজের ক্ষমতায় না কুলালে টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করে আনছে৷ এভাবে চলতে থাকলে বিএনপি বা অন্য কোনো বিরোধী দলের প্রয়োজন হবে না, আওয়ামী লীগ িনজের ভারেই ভেঙে পড়বে৷ আগে যেকোনো ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাদের অতি মাত্রায় সরব দেখা যেত৷ কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় আওয়ামী লীগের বাকপটু নেতা-মন্ত্রীরাও নিশ্চুপ৷ এত বড় হত্যাকাণ্ডের পরও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটি মানববন্ধন বা শোকসভাও করা হয়নি৷ না নারায়ণগঞ্জে, না ঢাকায়৷ তাদের এ নীরবতা কিসের ইঙ্গিত দেয়?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

গাছ কাটা নিয়ে তদন্ত তদন্ত খেলা

যে গাছ কাটার দায় নিয়ে তদন্ত হচ্ছে
চট্টগ্রামের আমবাগান এলাকায় রেলওয়ের মালিকানাধীন ৩০টি গাছ দুই দিন ধরে কাটা হয়েছে দিনদুপুরে। ডালপালা-পত্র-পল্লবশোভিত পঁচিশ থেকে শতাধিক বছর বয়সী গাছগুলো কে কেটেছে, কেন কেটেছে বা কার অনুমতি নিয়ে কাটা হয়েছে—কিছুই জানে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তারা জানিয়েছে, রাস্তা সংস্কারের জন্য সিটি করপোরেশনের লোকজন কেটেছে এসব গাছ। সিটি করপোরেশনের ভাষ্য হলো, সড়ক সংস্কারের সঙ্গে গাছ কাটার কোনো সম্পর্ক নেই; কারণ, এসব গাছের অবস্থান ছিল সড়কের অনেক বাইরে। তাদের মতে, রেলওয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে কাটা হয়েছে এসব গাছ, এখন ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর চেষ্টা চলছে। শুধু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশন পরস্পরকে দোষারোপ করছে তা-ই নয়, খোদ রেল কর্তৃপক্ষের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আঙুল তুলছেন পরস্পরের দিকে। এতে পোয়াবারো আসল অপরাধীর। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক মকবুল আহমদ এ ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন বিভাগীয় প্রকৌশলী তরুণকান্তি বালাকে। তঁার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছেন মহাব্যবস্থাপক। বিভাগীয় প্রকৌশলী বলেছেন, গাছ কাটার ব্যাপারটি তিনি একাধিকবার মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন মহাব্যবস্থাপককে। মহাব্যবস্থাপক বলছেন, মৌখিকভাবে জানালে তো হয় না। এ ধরনের ঘটনা অঁাচ করতে পারলে লিখিতভাবে জানানো উচিত ছিল। তঁার মতে, কোনো কর্মকর্তার এলাকায় কেউ প্রবেশ করলে অবৈধভাবে সম্পদ লুটে নিলে তঁারই উচিত প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য নেওয়া। অথচ বিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে দুই দিন ধরে গাছ কাটা চললেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। দুই পক্ষের যুক্তিই অকাট্য। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে দায়টা কার। সেই তদন্ত করবে কে? গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রধান কে? তদন্ত কমিটির প্রধান বিভাগীয় প্রকৌশলী তরুণকান্তি বালা। না, পাঠক ভুল বলিনি। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে যঁার বিরুদ্ধে, সেই তরুণকান্তি বালাই তদন্ত কমিটির প্রধান। তা হলে তদন্ত প্রতিবেদনের ভবিষ্যৎ সহজেই অনুমেয়। ৪ মে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি। ছায়াশীতল আমবাগান এলাকার শিরীষ, আম, মেহগনিসহ ৩০টি গাছ নির্বিচারে নিধনের জন্য এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী করা যায়নি কাউকে। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের দায়ী করে দায়সারা একটি মামলা করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তার ভিত্তিতে কিছু ডালপালা উদ্ধার করেছে পুলিশ, আর গ্রেপ্তার করেছে দুজনকে।
একজন গাছ কাটার শ্রমিক, অন্যজন গাছ বহনকারী পিকআপের চালক। এ যেন অনেকটা রবিঠাকুরের সেই কবিতার মতো, ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা ব্যাটাই চোর।’ বিভাগীয় প্রকৌশলী তরুণকান্তি বালা, (পরবর্তীকালে তদন্ত কমিটির প্রধান) প্রথম থেকেই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে আমাদের ধারণা। তিনি সিটি করপোরেশনকে দায়ী করতে চেয়েছেন সড়ক সংস্কারের কথা বলে। উপরন্তু তিনি সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা ভাঙ্গারপুল ও আমবাগান পুলিশ বিট এলাকার দুটি সেতু মেরামতের নামে লোহার পাটাতন লুটপাট করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন। এ দুটি সেতু নির্মিত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। এসব লোহার পাটাতনের মূল্য আনুমানিক ১৫ লাখ টাকারও বেশি বলে জানা গেছে। তরুণ বাবুর অভিযোগের উত্তরে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, ‘যে কর্মকর্তা এসব কথা বলেছেন তিনি নিজেই তঁার লোকজন দিয়ে এসব লোহা নিয়ে গেছেন। তিনি হয়তো এসব লোহা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা করেননি।’ এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা—তা আমরা জানি না। তবে এ থেকে রেলের সম্পদ নিয়ে যে লুটপাট চলছে তা অনুমান করা কঠিন নয়। তা ছাড়া সাধারণ জ্ঞানে এটুকু বোঝা যায়, যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তিনি নিজেই যদি তদন্ত কমিটির প্রধান হন, তাহলে সেই তদন্ত প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন² হতে বাধ্য। দুই দিন ধরে প্রকাশ্যে গাছ কাটার জন্য সাবেক স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার ও আওয়ামী লীগের নেতা মোহাম্মদ হোসেন হিরণকে দায়ী করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী। তঁার নির্দেশেই তঁার অনুগত ব্যক্তিরা গাছ কেটে নিয়ে গেছেন বলে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসীও। পত্রিকান্তরে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও রেল কর্তৃপক্ষ মামলায় তঁার নাম উল্লেখ করেনি। অনেকের ধারণা, সাবেক কমিশনার রেলওয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে এই অপকর্ম করেছেন বলেই পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শেষ পর্যন্ত একজন কাঠ চোরাইয়ের শ্রমিক ও একজন পিকআপ ভ্যানচালকের ওপর এই দিনদুপুরে ডাকাতির দায় চাপানো হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। প্রকাশ্য দিবালোকে রেলওয়ের মালিকানাধীন বৃক্ষসম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনায় নগরবাসী যখন বিস্মিত, ঠিক তখনই বেরিয়ে এল রেলওয়েরই আরেকটি দুর্নীতির খবর। রেলের সেতু বিভাগের গুদাম অবৈধভাবে লিজ নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৪২টি দোকান। গুদামের সামনের খোলা মাঠটিতে নির্মাণাধীন আরও ৩০টি দোকান। অথচ রেলের সেতু বিভাগ এ সম্পর্কে কিছু জানেই না। এতে রেলের প্রায় ২০ কাঠা জমি হাতছাড়া হচ্ছে, যার আনুমানিক মূল্য অন্তত ১৫ কোটি টাকা। এই জমিতে গড়ে ওঠা দোকান সালামির ভিত্তিতে ভাড়া দিয়ে কোটি টাকার সম্পদ আয় করে নিচ্ছেন অবৈধ দখলদারেরা। চার বছর আগে রেলওয়ের এই গুদাম নিয়মবহির্ভূত লিজ দিয়েছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ। সেতু বিভাগের জমি লিজ দেওয়ার এখতিয়ার তাদের আছে কি না কিংবা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ভিত্তিতে তা লিজ দেওয়া হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন নাহয় ঊহ্যই থাকল, কিন্তু ২০১০ সালে যে গুদামটি বছরে সাত লাখ ১৮ হাজার টাকা ভাড়ায় লিজ দেওয়া হয়েছিল, গত চার বছরে তার একটি টাকাও আদায় করতে পারেনি রেলওয়ে বিভাগ। কাগজে-কলমে এটি আবুল মনসুর নামের একজন ঠিকাদারের নামে লিজ দেওয়া হলেও এর নেপথ্যে যে মানুষটির কথা এখন শোনা যাচ্ছে, তিনি সেই আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মোহাম্মদ হোসেন হিরণ এবং তঁার আরও দুই সহযোগী।
সহযোগীদের মধ্যে একজন আবার পূর্বাঞ্চল রেলের সাবেক মহাব্যবস্থাপক নুরুল আমিনের ভাই। লিজ গ্রহীতা আবুল মনসুর পত্রিকান্তরে বলেছেন, ‘লিজ আমার নামে হলেও সেখানে হিরণ ভাই, রেলের জিএম (সাবেক) নুরুল আমিনের ভাই আলম ও শাহ আলম নামের একজন ব্যবসায়ী আছেন।’ রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ জানিয়েছে, মালামাল রাখার জন্য বেশ কিছু শর্ত সাপেক্ষে গুদামটি লিজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে ঠিকাদার চার বছর ভাড়া পরিশোধ না করেও বহাল তবিয়তে দখল অব্যাহত রেখেছেন, তিনি যে অন্যান্য শর্ত মানার ব্যাপারেও তোয়াক্কা করবেন না, সেটাই তো স্বাভাবিক। এখন বিশাল গুদামে দুই সারি করে নির্মাণ করা হয়েছে ৪২টি দোকান, এমনকি গুদামের সামনের ২০ কাঠার খালি মাঠটাতেও তৈরি হচ্ছে আরও ৩০টি দোকান। গুদামের অভ্যন্তরে ৪২টি দোকানের প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে এক থেকে দেড় লাখ টাকায়। মাঠে নির্মাণাধীন দোকানগুলো বিক্রি হবে প্রতিটি চার থেকে পঁাচ লাখ টাকায়। এসব বিষয়ে মুখ খোলার মতো রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না। যঁারা কথা বলেন তঁাদের কথায়ও কোনো দায়িত্বশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় না। যেমন সেতু শাখার অতিরিক্ত প্রকৌশলী জাফর আহমদ পত্রিকান্তরে বলেছেন, ‘গোডাউনটি সেতু শাখার, তবে লিজ দেওয়ার বিষয়টি আমি কিছুই জানি না।’ প্রায় একই রকম কথা বললেন বিভাগীয় প্রকৌশলী তরুণকান্তি বালা। তিনি বলেন, ‘সেতু শাখা প্রকৌশল বিভাগেরই আওতাধীন, তবে গোডাউনটি লিজ দেওয়ার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ অর্থাৎ কেউ কিছু জানেন না। এত অজ্ঞতা নিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তারা কীভাবে কর্মস্থলে বহাল আছেন জানি না। তবে এই ‘অজ্ঞতার’ কারণে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশাল লোকসানের বিনিময়ে তঁারা লাভবান হচ্ছেন কি না, সেই সন্দেহই জাগবে সাধারণ মানুষের মনে। রেলওয়ের বৃক্ষসম্পদ লুণ্ঠনের ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার পর্যবেক্ষণ বা প্রতিবেদন আমরা পাইনি। রেলওয়ে গুদাম অবৈধভাবে লিজ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও হয়তো একটি কমিটি হবে। হয়তো সেই কমিটিতেও প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হবেন এমন একজন, যঁার দিকে রয়েছে সন্দেহের তির। এভাবে তদন্ত-প্রক্রিয়াটিই হয়তো একটি হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হবে। ঘুরেফিরে এক বা একাধিক চক্র লুটেপুটে খাবে রেলওয়ের সম্পদ।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

স্কিন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা কেন জরুরি

ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট
সম্প্রতি আমি দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে নয় ঘণ্টার বাস ভ্রমণ করে টাঙ্গাইলের মধুপুরে অবস্থিত আমাদের কাইলাকুড়ি স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পে এসে পৌঁছাই। বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় আমি প্রথম আলো পত্রিকার একটি কপি কিনি। ভ্রমণের সময় আমি বাংলাদেশে স্কিন ব্যাংক স্থাপনবিষয়ক একটি গোলটেবিল বৈঠকের ওপর প্রতিবেদনটি পড়ি। আমার মনে হয়েছে, বক্তারা খুব ভালো বলেছেন। আর স্কিন ব্যাংক স্থাপনের বিষয়টিও দারুণ। একটি বিষয় আমাকে অবাক করেছে।
আমার মনে হয়েছে, বক্তারা এটি স্থাপনের খরচের বিষয়টি এবং কত দামে তা মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে, সেটা নিয়ে তঁারা কথা বলেননি। যদিও এ বিষয়টি পরিষ্কার যে মেডিকেল প্রযুক্তির বিকাশ এবং এর উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে খরচও বেড়ে যায়। আর দাতব্য চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় চিকিৎসাসেবা সমাজের বেশির ভাগ মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। সেমিনারে একজন বক্তা বলেছেন, আগুনে পোড়ার বিষয়টি দুনিয়ার দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি ভোগায়। আমরা আরও কিছুটা দূরে যেতে পারতাম। দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দরিদ্রতম এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সহজেই চিকিৎসাসেবা লাভ করতে পারে না, পোড়ার ঘটনায় এরাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (তাজরীন ফ্যাশনসের ট্র্যাজেডির দিকে লক্ষ করুন) বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব। তবে আমাদের এই দরিদ্র রোগীদের সেবাকেন্দ্রে কিডনির গুরুতর রোগে আক্রান্ত মানুষ এলে আমরা তঁাদের ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য পাঠাই না। রোগীর আত্মীয়-পরিজনকে আমরা বলি, এই চিকিৎসা তঁাদের ও আমাদের উভয়ের জন্যই দামি। তঁারা যেন রোগীদের বাড়িতে নিয়ে যান, যাতে রোগী বাড়িতে মারা যেতে পারেন। সেমিনারে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। আমার বাড়ি নিউজিল্যান্ডে।
সেখানে পোড়া কোনো গুরুতর রোগীকে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সরকারি খরচে অকল্যান্ডের বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। এমনকি চিকিৎসার খরচও সরকার বহন করে থাকে। বাংলাদেশে এটা সম্ভব নয়। এখানে সব জায়গায়ই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পাওয়া যায়। সরকারি হাসপাতালেও ড্রেসিং ও চিকিৎসা হাসপাতালের বাইরে টাকা দিয়ে করাতে হয়, আর রোগীর আত্মীয়স্বজনেরই সাধারণত ড্রেসিং পরিবর্তন করতে হয়। সেমিনারে বলা হয়েছে, ৬০ শতাংশ পোড়া রোগীকে চামড়া প্রতিস্থাপন ছাড়া বঁাচানো যায় না। আমাদের গ্রামের এই ছোট্ট হাসপাতালটিতে পোড়া রোগীই ৬০ ভাগ, স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত প্রত্যয়নবিহীন মানুষেরা চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। তঁারা তঁাদের কাজ অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে করে থাকেন৷ কাজের প্রতি তঁাদের নিবেদন অসাধারণ। মমতা বেঁচে গেছেন, ১২ মাস পর তিনি তঁার বাড়িতে ফিরতে পেরেছেন। আমরা এর জন্য ৩০০ টাকা ফি নিয়েছিলাম। এক বছর পর দেহে ৬০ ভাগ পোড়াসহ এক তরুণী আমাদের কাছে আসেন। তঁাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল, কিন্তু তঁার পরিবারের জন্য সেখানে চিকিৎসা চালানো খুব কঠিন ও ব্যয়বহুল ছিল। তঁারা একটি ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে রোগীকে আমাদের কাছে নিয়ে আসেন। আমাদের হাসপাতালের বিছানার সংখ্যা ৩৫, ইতিমধ্যে ৪৩ জন ভর্তি ছিল। আমাকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হতো। রোগীর আত্মীয়স্বজন তঁাকে ভর্তি করানোর জন্য আরজি জানান। এটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম একটি কঠিন সিদ্ধান্ত। আমাদের একজন মুসলমান কর্মী রোগীর জন্য নফল নামাজের আয়োজন করেন, তিনি নিজেই ইমামতি করেন। আমরা তঁাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিই, পঁাচ দিন পর তিনি মারা যান। বাংলাদেশে একটি জাতীয় স্কিন সেন্টার হলে তা দারুণ হবে। একই সঙ্গে আমি আরও আরজি করব, খরচটা যেন কমানো সম্ভব হয়, সেবাদান প্রক্রিয়া রোগীবান্ধব ও দ্রুত হয় এবং খরচের কারণে সবচেয়ে ভুক্তভোগী শ্রেণীটি যেন সেবার আওতার বাইরে না থাকে।
এডরিক এস বেকার: মেডিকেল অফিসার, ইনচার্জ, কাইলাকুড়ি স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প৷

২০১৪ হবে রাশিয়ার বছর

ক্রিমিয়ার সিভাস্তোপোল নৌঘাঁটিতে গতকল নৌসেনাদের উদ্দেশে
ভাষণ দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ছবি: রয়টার্স
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গতকাল শুক্রবার ক্রিমিয়া সফর করেছেন৷ ইউক্রেনের ওই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি গত মার্চে রাশিয়া নিজেদের অংশ করে নেওয়ার পর সেখানে এটিই পুতিনের প্রথম সফর৷ ১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় উপলক্ষে ক্রিমিয়ার সিভাস্তোপোলে নাবিকদের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পুতিন৷ তাঁর এই সফরকে ‘ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছে কিয়েভ৷ বন্দরনগর সিভাস্তোপোলে নৌঘাঁটিতে একটি সামরিক নৌযানের ওপর দাঁড়িয়ে পুতিন যখন নৌসেনাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন, তখন আকাশে কসরত প্রদর্শন করে রুশ জঙ্গি বিমানের বহর৷ পুতিন বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, ২০১৪ সাল হবে আমাদেরই একটি বছর৷ ঐতিহাসিক সত্য ও আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে এখানকার মানুষ এ বছর রাশিয়ার সঙ্গে থাকার মতো একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷’ এর আগে নাৎসি বাহিনীকে পরাজিত করার ৬৯তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ করে রাশিয়া৷
বিজয় দিবসে মস্কোতে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, এটা এমন একটি দিন, যখন ‘দেশপ্রেমের জয়’ হয়৷ ক্রিমিয়ায় যে কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়েছিল, সেটি আকারে তেমন বড় ছিল না৷ তবে লোকজনের আগমন ছিল চোখে পড়ার মতো৷ তারা পতাকা নেড়ে পুতিনকে স্বাগত জানায়, পুতিন হাত নেড়ে তার জবাব দেন৷ রুশ উসকানির আশঙ্কা ইউক্রেনের: ইউক্রেন সংকট প্রশ্নে সম্প্রতি সুর নরম করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন৷ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে কথা বলেছেন, দেশটির পূর্বাঞ্চলের বিিচ্ছন্নতাবাদীদের গণভোট বন্ধ করতে বলেছেন এবং ইউক্রেন সীমান্ত থেকে রুশ সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলেছেন৷ তবে এটাকে রাশিয়ার উসকানির পূর্বলক্ষণ হিসেবে দেখছেন ইউক্রেনের অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী আরসেনিয়ে ইয়াটসেনিউক৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় দিবস উপলক্ষে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমি ভ্লাদিমির পুতিনের ওই বিবৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন৷ এটা একটা খারাপ অনুভূিত সৃষ্টি করছে৷ কারণ, তারা বলে এক, করে আরেক৷ ওই বিবৃতির পর, আমি ৯ মে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলাম৷’ বিবিসি ও এএফিপ৷

পশ্চিমবঙ্গে শেষ ভোটে প্রভাব ফেলবে সারদা

শেষ দফার ভোটের মাত্র তিন দিন আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিলেন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কড়া সমালোচনারই প্রতীক। তাই বিরোধী দলগুলো উল্লসিত। অন্যদিকে বহু চেষ্টা করেও সিবিআইয়ের তদন্ত ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় মমতা ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস বিচলিত। মমতার উদ্বেগের কারণ আছে। বাকি যে ১৭টি লোকসভা আসনে আগামী সোমবার ভোট হবে, তার মধ্যে রয়েছে নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরের মোট ১৬টি আসন এবং মুর্শিদাবাদ জেলার একটি আসন। সারদা কেলেঙ্কারিতে প্রতারিত যে ১২ লাখ লোক সরকারি কমিশনের কাছে আবেদন করেছেন, তাঁদের সিংহভাগই এসব জেলার কৃষ্ণনগর, বসিরহাট, বারাসাত, যাদবপুর, জয়নগর, মথুরাপুর, ডায়মন্ডহারবার, তমলুক প্রভৃতি লোকসভা আসনের অন্তর্গত অসংখ্য গ্রামের লোক। তদন্তের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট সিবিআইকে দেওয়ায় এই অঞ্চলগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন আবারও আশায় বুক বাঁধবেন। সারদার মালিক সুদীপ্ত সেন গত বছরেই পলাতক হওয়ার পরে উত্তর ভারতে গ্রেপ্তার হন। আরও পরে তৃণমূল সাংসদ কুনাল ঘোষকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে। কিন্তু সারদা চিটফান্ডের কোটি কোটি টাকা কোথায় গেল, তা রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল এত দিন কিছুই বের করতে পারেনি। রাজ্য সরকার মানুষের ক্ষোভ সামলাতে তড়িঘড়ি ৫০০ কোটি টাকার এক বিশেষ তহবিল তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে কিছু কিছু টাকা দিতে শুরু করে।
কিন্তু বিশিষ্ট আইনজীবী ও সিপিএমের নেতা বিকাশ ভট্টাচার্যসহ অনেকেই প্রশ্ন তোলেন এই তহবিলের আইনি বৈধতা নিয়ে। কিন্তু সরকারের পদক্ষেপে যে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন আশ্বস্ত হননি, তার প্রমাণ কিছুদিন ধরেই চলা দুই চব্বিশ পরগনার গ্রামগঞ্জে সারদাকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিক্ষোভ। গত বৃহস্পতিবারও সারদায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন কলকাতায় মিছিল করে সিবিআইয়ের তদন্তের দাবি তোলেন। সরকারি হিসাবেই ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের মধ্যে ১২ লাখ লোক লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। আরও পাঁচ লাখ লোক অন্য বিভিন্ন চিটফান্ডের কাছে প্রতারিত হয়ে ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন। কিন্তু রাজ্য সরকার কেন এত দিন প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টে ও পরে সুপ্রিম কোর্টে প্রাণপণে সিবিআইয়ের তদন্তে বাধা দিয়ে গেল? এ প্রশ্নের জবাবে কেউই মুখ খুলছেন না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা যে এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, সেটা স্পষ্ট করে দিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘তা হলে আমাদের দায়িত্ব শেষ, সিবিআই এখন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করুক।’ রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এখন প্রাণপণে সারদাকাণ্ডকে হাতিয়ার করতে রাস্তায় নেমে পড়েছে।

ত্রিমুখী আক্রমণে তৃণমূল প্রার্থী

দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে থাকেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাদ্যায়৷ ফলে এলাকাটি তাঁর দুর্গ হিসেবেই পরিচিত৷ ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে পেয়েছিল মাত্র একটি আসন৷ সেটি এই দক্ষিণ কলকাতা৷ প্রার্থী ছিলেন মমতা নিজেই৷ তাই এই আসনটিকে মমতার আসন হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকেই৷ তবে এবার আর এই আসনের প্রার্থী নন তিনি৷ দাঁড়িয়েছেন তাঁর দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী৷ কিন্তু তাঁর জয়ের পথ মমতার মতো মসৃণ নাও হতে পারে৷ এই আসনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) থেকে নির্বাচন করছেন তথাগত রায়৷ তিনি বিজেপির সাবেক রাজ্য সভাপতি৷ আরও লড়ছেন বামফ্রন্টের নন্দিনী মুখোপাধ্যায়, কংগ্রেসের মালা রায়৷ ২০০৪ সালে মমতা হেসেখেলে জিতলেও ২০০৯ সালে তাঁকে বেশ বেগ দিয়েছিলেন বামফ্রন্টের প্রার্থী রবীন দেব৷ সেবারও তৃণমূল ভোট করে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে৷ ২০১১ সালে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর এই আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে জয়ী হন সুব্রত বক্সী৷ তবে এবার প্রেক্ষাপট অনেক বদলে গেছে৷ মমতার সরকারের বিরুদ্ধে সারদা কেলেঙ্কারি ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে নানা দুর্নীতিসহ একাধিক অভিযোগ৷ তাই কিছুটা হলেও এই অঞ্চলে হ্রাস পেয়েছে মমতার জনপ্রিয়তা৷ প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হচ্ছিল বিজেপির প্রার্থী তথাগত রায়ের৷ তিনি জোর দিয়েই বলেন, ‘দেখুন কী হয়? অনেক পাল্টে গেছে প্রেক্ষাপট৷
মমতার আর সেই জৌলুশ নেই৷ এখন মোদি হাওয়া দেশজুড়ে৷ বিজেপির অবস্থানও বদলে গেছে৷ নিশ্চিত থাকুন, জয় এবার বিজেপিরই হবে৷ এই আসনে জিতছি আমি৷’ তথাগত আরও বলেন, ‘২০০৯ সালের নির্বাচন ছিল বামফ্রন্টকে হটানোর৷ এবার আর সেই ইস্যু নেই৷ ফলে মানুষ ভোট দেবে যোগ্য প্রার্থীকেই৷’ কংগ্রেস প্রার্থী মালা রায়ও প্রথম আলোকে বলেন, ‘জয়ের আশা নিয়েই তো নির্বাচনে নেমেছি৷ আমরা তো জয়ের আশা ছাড়তে পারি না৷ দেখুন কী হয়? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের পরাজয় নিয়ে যা বলেছে তা হবে না৷ কংগ্রেস এবার হারছে না৷’ অন্যদিকে সুব্রত বক্সী এখন এলাকায় ঘুরছেন মমতার ঝান্ডা নিয়ে৷ তাঁর শক্তি মমতা৷ সুব্রত বক্সীও বলেছেন, তাঁর জয় নিশ্চিত৷ এটা মমতার আসন৷ মানুষ জানে৷ মমতাকে ভালোবাসে৷ তাই এই আসনে এবারও অন্য কাউকে আনবে না মানুষ৷ অন্য প্রার্থীদের মতো বামফ্রন্টের নন্দিনী মুখোপাধ্যায়ও নিজের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী৷ তাঁরই এক সমর্থক তপন বসু বলেন, ‘গত নির্বাচনে এই আসনে বামফ্রন্ট প্রার্থী পেয়েছিল ৩৫ দশিমক ৩৯ শতাংশ ভোট৷ তখন তো কংগ্রেস-তৃণমূল একজোট হয়ে নির্বাচন করেছিল৷ এবার আর সেই সুযোগ থাকছে না৷ তৃণমূলের ভোট ভাগ হচ্ছে৷ মোদি হাওয়ায় বিজেপিও কিছু ভোট টানবে৷ ফলে চতুমুর্খী এই লড়াইয়ে নন্দিনী মুখোপাধ্যায় জিতে গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না৷ তপন বসু আরও বলেন, ‘আমার তো মনে হয়, তৃণমূল যতটা ভাবছে ততটা ভোট নাও পেতে পারে৷ লোকসভার দরজা খুলে যেতে পারে বামফ্রন্ট প্রার্থীর৷’