Tuesday, November 15, 2016

ঘুষ নেওয়ার সময় ধরা পড়লেন মন্ত্রী

রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আলেক্সেই উলিইউকায়েভ
ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আলেক্সেই উলিইউকায়েভকে আটক করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। রাশিয়ার প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ইনভেস্টিগেটিভ কমিটি জানিয়েছে, আলেক্সেই দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের অর্থ ঘুষ নিয়েছেন। কমিটির মুখপাত্র সভেতলানা পেত্রেনকো বলেন, হুমকি দিয়ে একটি তেল কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার ঘটনায় আলেক্সেইকে আটক করা হয়েছে।
তাঁকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। আলেক্সেইর বিরুদ্ধে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হবে বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা। দোষী সাব্যস্ত হলে আলেক্সেইর ৮ থেকে ১৫ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। আলেক্সেইর মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক মতামতের পর গত অক্টোবরে সরকার-নিয়ন্ত্রিত রোসনেফট নামের তেল কোম্পানি আরেকটি তেল কোম্পানির ৫০ শতাংশ কিনে নেয়। রোসনেফটের কাছ থেকে আলেক্সেই ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আতঙ্কের কিছু নেই, শান্ত হোন

যুক্তরাষ্ট্রে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে
বিক্ষোভ চলছেই। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে। রোববারের ছবি। রয়টার্স
বিক্ষোভকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করে তাঁদের শান্ত হতে বললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের বিজয়ী প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সিবিএসের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বিক্ষোভকারীদের প্রতি এই আহ্বান জানান। নির্বাচনের পর এটাই ট্রাম্পের প্রথম কোনো সাক্ষাৎকার, যা স্থানীয় সময় গত রোববার প্রচার করা হয়। এতে অভিবাসী, সংখ্যালঘু, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ, নিজের বেতনসহ নানা ইস্যুতে কথা বলেন ট্রাম্প।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা আমাদের দেশকে ফিরিয়ে আনব।’ এ সময় তিনি বলেন, তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় সংখ্যালঘুদের ওপর হয়রানি ও হুমকির হার বেড়ে গেছে বলে প্রকাশিত খবরগুলোয় ‘কষ্ট’ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এ ধরনের কিছু শুনতে ঘৃণা করি। আমি খবরটা শুনে খুব কষ্ট পেয়েছি। যদি আমার কথায় কিছু হয়, তাহলে আমি ক্যামেরার সামনেই বলব, এসব বন্ধ করুন।’ নির্বাচনে জয় পাওয়ার আগের সংখ্যালঘু ইস্যু কিংবা মুসলিমবিরোধী অবস্থান থেকে সরে এলেও ট্রাম্প অভিবাসী ইস্যুতে আগের অবস্থানেই রয়ে গেছেন। সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সন্ত্রাস বা অপরাধের রেকর্ড রয়েছে কিংবা মাদক চোরাচালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন ৩০ লাখ অভিবাসীকে হয় তিনি জেলে ঢোকাবেন, নতুবা দেশ থেকে বের করে দেবেন। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের অবস্থানে তিনি এখনো অটল। সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির একটি শূন্য পদে দ্রুত মনোনয়ন দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন তিনি। ট্রাম্প আশা করছেন, রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাত নিরোধ এবং আগ্নেয়াস্ত্র বহনের সাংবিধানিক অধিকারকে সমর্থন করবে। তিনি বলেন, ‘বিচারপতিরা হবেন জীবনমুখী।’ সমকামী বিয়ে বৈধকরণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন করবেন না বলেও সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘এটা আইন। সুপ্রিম কোর্টে এটা নিষ্পত্তি হয়েছে।
এবং এ ব্যাপারে আমার কোনো আপত্তি নেই।’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কোনো বেতনও নেবেন না বলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ট্রাম্প। প্রচারণার সময় দেওয়া তাঁর প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে এটাও একটি। ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বার্ষিক চার লাখ মার্কিন ডলার করে বেতন পেয়ে আসছেন। এর সঙ্গে তিনি ব্যয়ের জন্য বছরে ৫০ হাজার, করমুক্ত সফরের জন্য ১ লাখ এবং বিনোদনের জন্য ১৯ হাজার ডলার করে পেয়ে থাকেন। প্রেসিডেন্টের বেতনসংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিলটি ১৯৯৯ সালে মার্কিন কংগ্রেস এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন অনুমোদন দেন। বিলটি কার্যকর হয় ২০০১ সাল থেকে। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আইন অনুযায়ী যেহেতু পারিশ্রমিক নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কাজেই তিনি বছরে এক ডলার করে বেতন নেবেন। এদিকে, রোববার স্থানীয় সময় রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের কথা হয়। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর সংশ্লিষ্ট ট্রাম্পের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে গতকাল সোমবার বিষয়টি জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানানোর জন্য সি চিন পিংকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ট্রাম্প। টেলিফোনে দুই নেতা পারস্পরিক সম্মানবোধের বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন এবং দুই দেশের উন্নয়নে তাঁদের পারস্পরিক শক্তিশালী সম্পর্ক বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপ

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গতকাল সোমবার ওই ফোনালাপে ওয়াশিংটন-মস্কো সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ব্যাপারে একমত হন তাঁরা। ক্রেমলিন বলছে, দুই নেতা ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ট্রানজিশনাল টিম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন পুতিন। ট্রাম্পের ঐতিহাসিক জয়ে অভিনন্দন জানানোর জন্য ফোন করেন রুশ প্রেসিডেন্ট। ক্রেমলিন জানায়, পুতিন ও ট্রাম্পের ফোনালাপে দুই নেতা একমত হন যে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার বর্তমান সম্পর্ক একেবারেই অসন্তোষজনক। এই সম্পর্ক উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতেও হবে। তাঁদের আলোচনায় সিরিয়া ইস্যুও স্থান পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে একমত হন এই দুই নেতা। ফোনে ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সাফল্য কামনা করেন পুতিন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ট্রানজিশনাল টিমের বিবৃতিতে বলা হয়,
ট্রাম্প বলেছেন তিনি রাশিয়ার সরকার ও দেশটির জনগণের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ার জন্য সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। বিবিসির খবরে বলা হয়, ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমালোচনা করে নেতা হিসেবে তাঁকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রেখেছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, নেতা হিসেবে ওবামার চেয়ে অনেক অনেকগুণ এগিয়ে পুতিন। ওই সময় পুতিনও ট্রাম্পকে অসাধারণ ব্যক্তি ও সন্দেহাতীত মেধাবী মানুষ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। মার্কিন নির্বাচনের ফল প্রকাশ হওয়ার পরপর রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনগুলোতে ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলা হয়, জনগণের নেতার জয় হয়েছে। কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে ওবামার যুক্তরাষ্ট্র আর পুতিনের রাশিয়া। যার সর্বশেষ প্রকাশ ঘটেছে সিরিয়ায়। মস্কো সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর ওয়াশিংটন সমর্থন দিচ্ছে বাশারবিদ্রোহীদের। তবে মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পর ওয়াশিংটন-মস্কো সম্পর্ক উন্নয়নের আভাস মিলছে।

রূপরেখা তৈরির আগেই চুক্তি বাস্তবায়নের চাপ

বাজার করার আগেই অতিথি চলে এলে গৃহকর্তার যে অবস্থা হয়, মরক্কোর মারাক্কেশে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের অবস্থাও হয়েছে অনেকটা তাই। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির আগেই তা বাস্তবায়নের দাবি উঠেছে। মারাক্কেশে ২২তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের কারিগরি অধিবেশন গতকাল সোমবার শেষ হয়েছে। আজ মঙ্গলবার শুরু হবে রাষ্ট্রনেতাদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫৪টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা এতে বক্তৃতা করবেন। সবার আশা, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নের রূপরেখা এই সম্মেলন থেকেই শুরু করার তাগিদ দেবেন তাঁরা। মারাক্কেশে সাত দিন ধরে ১৯০টি দেশের জলবায়ু সমঝোতাকারী প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বনেতারা গত বছরের সম্মেলনে ২০২০ সালের মধ্যে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির সময়কাল ঠিক করেছিলেন।
তাঁরা ভেবেছিলেন, রাষ্ট্রগুলো ওই চুক্তি অনুমোদন করতে বছর তিনেক সময় নেবে। তবে গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেই ৪০টি দেশ প্যারিস চুক্তি অনুমোদন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে আদৌ স্বাক্ষর করবে কি না, তা নিয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যেমন চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) রাষ্ট্রগুলোর সংশয় ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হওয়ার আগেই নির্বাহী আদেশে ওই চুক্তি অনুমোদন দেন। ১৯৯৭ সালে প্রথম জলবায়ু চুক্তি কিয়োটো প্রটোকলে স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র তা অনুমোদন করেনি। তাই প্যারিস চুক্তির শর্তের মধ্যে ছিল, কোনো দেশ চুক্তি অনুমোদনের চার বছরের মধ্যে তা বাতিল করতে পারবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদনের পর বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন ও ভারত তা অনুমোদন করে। অনুমোদন করে আরও শতাধিক রাষ্ট্র। আর মারাক্কেশ আলোচনার সাত দিনের মাথায়, গতকাল পর্যন্ত ১০৯টি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য অধ্যাপক মিজার আর খান প্রথম আলোকে বলেন, মারাক্কেশে মোট ১১টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর যে আলোচনাগুলো চলছে, সে জন্য আরও দুই বছর রয়েছে বলে ভাবা হয়েছিল। এখন শতাধিক দেশ চুক্তি অনুমোদন করায় তা এই সম্মেলন থেকেই কার্যকরের চাপ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু কোনো বিষয়ে আলোচনায় এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। এই পরিস্থিতিতে মারাক্কেশ আলোচনার ফল কী হবে, তা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এবং নাগরিক সংগঠনগুলো অপ্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। জলবায়ু বিপন্ন রাষ্ট্রগুলো সবুজ জলবায়ু তহবিল থেকে দ্রুত অর্থছাড় এবং সরাসরি অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার দাবি তুলছে। কিন্তু সবুজ জলবায়ু তহবিলে এ পর্যন্ত মাত্র ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে উন্নত দেশগুলো। সেই অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিকাঠামো তৈরি হয়নি। গতকাল বাংলাদেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামালউদ্দিন আহমেদ, মরক্কোর পরিবেশমন্ত্রী হাকিমা হেল হইতে, জার্মানির পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণমন্ত্রী বারবারা হেনড্রিকস, ফ্রান্সের প্রতিবেশ ও জ্বালানিমন্ত্রী সেগোলিয়েনে রয়েলসহ ১২ জন মন্ত্রী এক যৌথ বিবৃতি দেন। তাঁরা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, প্যারিস চুক্তি তাঁদের পরিবেশ, জলবায়ু নিরাপত্তা ও অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্ত। আজ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্যারিস চুক্তিবিষয়ক নীতিনির্ধারণী ফোরামের (সিএমএ) সভা শুরু হতে যাচ্ছে। এর আওতায় প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন রূপরেখা (আপা), জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি (লস অ্যান্ড ড্যামেজ), অভিযোজন তহবিল, সবুজ জলবায়ু তহবিল (জিসিএফ), ওয়ারশো আন্তর্জাতিক ম্যাকানিজমের (যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে) বিষয়গুলো চূড়ান্ত করে সিএমএ কমিটির কাছে জমা দিতে হবে।
কিন্তু গত সাত দিনের আলোচনায় এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য যুগ্ম সচিব নুরুল কাদির প্রথম আলোকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির আলোচনায় আমরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসিত ব্যক্তিদের অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরছি। চেষ্টা করছি, যাতে তা প্যারিস চুক্তির রূপরেখায় স্থান পায়।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে এখনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আসেনি। এই প্রতিনিধিদলের বেশির ভাগ সদস্যই ওবামা প্রশাসনের সদস্য। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে চুক্তি বাতিল করে দেবেন—এই আশঙ্কা বিশ্ববাসীর মতো তাঁদের মধ্যেও দেখা গেল। অনানুষ্ঠানিক আলোচনাগুলোতে তাঁরা হতাশা এবং সম্মেলনে তাঁদের অবস্থান নিয়ে দ্বিধার কথা জানিয়েছেন। তবে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেননি। বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতির এত সব বড় বিষয়ে হয়তো বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর খুব বেশি কিছু করার নেই। তবে তারা তাদের জলবায়ু বিপন্নতার কথা তুলে ধরবে, বেশি করে তহবিল ও প্রযুক্তি চাইবে। এটাই বলছেন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা নাগরিক সংগঠনের হয়ে সম্মেলনে আসা সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি রেজাউল করিম চৌধুরী। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে সবুজ জলবায়ু তহবিল থেকে সরাসরি অর্থায়ন চেয়েছি। অভিযোজন তহবিল থেকে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার দাবি তুলেছি।’

দেশে দেশে সুপারমুন দেখার হিড়িক

প্রায় সাত দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় চাঁদ উঠছে আকাশে। সুপারমুন। উজ্জ্বল চাঁদ দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছেন না অনেকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাতের আকাশে চাঁদের সৌন্দর্যপিপাসুরা তাই গতকাল সোমবার ভিড় জমিয়েছেন সুউচ্চ ভবনগুলোতে। ক্যামেরাবন্দী করতে ভোলেননি অসাধারণ সেই মুহূর্ত। সাধারণত এশিয়ার দেশগুলো থেকেই রাতে বড় ও উজ্জ্বল চাঁদ দেখা যায়। সুপারমুন দেখার জন্য অনেক মহাকাশপ্রেমী এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পানে ছুটছেন। সেখানেই এটি প্রথমে দেখা যাবে। তাঁরা আশা করছেন, মেঘ বা দূষণের কারণে তাঁদের সুপারমুন দেখা বাধাগ্রস্ত হবে না।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে কেউ একজন সুপারমুন দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এরপরই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। বহু দর্শনার্থী পিকনিকের আয়োজন নিয়ে সিডনির পূর্বাঞ্চলে হাজির হন। আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। তবে তাঁদের হতাশ হতে হয়নি। মেঘের ফাঁক দিয়ে বড় চাঁদ ক্ষণিকের জন্য উঁকি দেয়। আর তখন সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে হাজারো উল্লসিত মানুষ। তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে শ খানেক লোক সারিতে দাঁড়িয়ে পড়ে টেলিস্কোপ দিয়ে সুপারমুন দেখতে। আরও বহু মানুষ তাইপের ১০১ তলা ভবনের চাঁদে উঠে পড়ে চাঁদ দেখতে। সুপারমুন দেখতে দেশে দেশে নানা আয়োজন করেছেন জ্যোতির্বিদেরা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক সন্ত্রাস বাড়াবেন?

ইরাকের মসুলের একাংশ থেকে আইএস হটানোর
পর শিয়া যোদ্ধাদের উল্লাস। এএফপির ফাইল ছবি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের ফলে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ আরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের এই অপ্রত্যাশিত বিজয় এবং তাঁর মুসলিমবিরোধী বক্তব্যকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো নতুন সদস্য সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছে বলে ইসলামপন্থী নেতারা নিশ্চিত করেছেন। তালেবান ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নেতারা বলছেন, ট্রাম্প ইসলামবিরোধী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। এ বিষয়গুলো কাজে লাগিয়ে তরুণদের উজ্জীবিত করা যাবে, বিশেষ করে হতাশ তরুণদের দ্রুত দলে ভেড়ানো যাবে। আফগানিস্তানে আইএসের অন্যতম কমান্ডার আবু ওমর খোরাসানি রয়টার্সকে বলেন, ‘এই ব্যক্তি (ট্রাম্প) পুরোই পাগল। মুসলমানদের প্রতি তাঁর বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য আমাদের কাজকে আরও সহজ করে দেবে। আমরা হাজারো সদস্য নিয়োগ করতে পারব।’ পরে অবশ্য ট্রাম্প মুসলমানদের বিষয়ে সুর নরম করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছিলেন তা শুধু একটা প্রস্তাব ছিল। তিনি কেবল সাময়িক সময়ের জন্য ওই সব দেশ থেকে অভিবাসী প্রবেশ নিষিদ্ধ করবেন, যাদের সন্ত্রাসবাদ রপ্তানির ইতিহাস রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন,
তিনি নির্বাচিত হলে সাঁড়াশি অভিযানে উগ্র ও সন্ত্রাসবাদী ইসলামি সংগঠনগুলোকে পরাস্ত করবেন। ঠিক যেমনটা করা হয়েছিল শীতল যুদ্ধের সময়। কিন্তু কখনোই তাঁর সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ সম্পর্কে খোলাসা করেননি তিনি। আল-কায়েদা, তালেবান ও আইএসকে মোকাবিলায় কী পরিকল্পনা রয়েছে, তা-ও জানাননি ট্রাম্প। ইরাকের শিয়া মতাবলম্বী ধর্মীয় নেতা মুক্তাদা আল সদর বলেছেন, তিনি (ট্রাম্প) উগ্র ও মধ্যপন্থার ইসলামের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারেন না। এ ছাড়া তিনি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে তাঁর উগ্র পদক্ষেপ আরও উগ্রবাদের জন্ম দেবে। এই শিয়া নেতার দৃষ্টিভঙ্গি আইএস ও আল-কায়দার কট্টর সুন্নি মতাদর্শের বিপরীত। তিনি পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণকে সমর্থন করেন না। গত জুনে অরল্যান্ডো নাইট ক্লাবে হামলা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় হামলা। হামলাকারী ওই সময় আইএসের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। দেশটির গোয়েন্দারা বলছেন, সামনের দিনগুলোতে এমন আরও হামলা হতে পারে। কেননা, আইএস তার অনুসারীদের বলে দিয়েছে, ‘নিজের দেশেই হামলা চালান।’ আইএস নেতা খোরাসানি বলেন, সংগঠনটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মার্কিন নির্বাচন খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল, মার্কিনরা নিজেরাই নিজেদের কবর খুঁড়বে। কিন্তু সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনাই ঘটল। খোরাসানি বারাক ওবামাকে ‘উদারপন্থী কাফের’ মনে করেন। তবে ট্রাম্পের তুলনায় ওবামাকে তিনি মুসলমানদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ মনে করেন।

ধর্ষণ মামলায় অ্যাসাঞ্জকে জিজ্ঞাসাবাদ

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
সুইডেনে দায়ের হওয়া একটি ধর্ষণ মামলায় উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ২০১০ সালে দায়ের করা ওই মামলায় গতকাল সোমবার তাঁকে সুইডেন ও ইকুয়েডরের কৌঁসুলিরা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। গ্রেপ্তার এড়াতে অ্যাসাঞ্জ বর্তমানে লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে অবরুদ্ধ জীবন যাপন করছেন। গতকাল সুইডেনের প্রধান কৌঁসুলি ইংগিরিদ ইসজেরেন সেখানে ইকুয়েডরের একজন কৌঁসুলির মাধ্যমে গিয়ে অ্যাসাঞ্জকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। অ্যাসাঞ্জ তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী পার স্যামুয়েলসন বলেছেন, এর আগে সুইডেন ও ইকুয়েডরের দূতাবাসের মধ্যে কূটনৈতিক অনৈক্য ছিল। এ কারণে অ্যাসাঞ্জকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেরি হলো।
তিনি সুইডেনের একটি বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘আমি নিরপেক্ষভাবে খুবই আশাবাদী... অ্যাসাঞ্জ যেভাবে চেয়েছিলেন জিজ্ঞাসাবাদের সবকিছু সেভাবেই হয়েছে।’ অ্যাসাঞ্জকে আরও কয়েক দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে তিনি জানান। কৌঁসুলিরা দূতাবাসে পৌঁছালে দূতাবাসের বাইরে থাকা বিক্ষোভকারীদের একটি ছোট দল ‘অ্যাসাঞ্জকে মুক্তি দাও’ এবং ‘তোমরা উইকিলিকসকে বন্ধ করতে পারবে না’ এ জাতীয় লেখা ব্যানার হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করেন। অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে করা চুক্তি অনুসারে জিজ্ঞাসাবাদের সময় সুইডেনের পুলিশের একজন পরিদর্শক উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর ডিএনএ নমুনা নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তদন্তকারীরা। আফগানিস্তান ও ইরাকযুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ লাখ গোপন নথি প্রকাশ করে উইকিলিকস। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার ভয়ে অ্যাসাঞ্জ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুইডেন যেতে আপত্তি জানিয়ে আসছেন।

জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে মরক্কো গেলেন প্রধানমন্ত্রী

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিতে গতকাল সকালে
মরক্কোর উদ্দেশে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দর ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাসস
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসি) ‘কনফারেন্স অব পার্টিস’-এর (কপ-২২) উচ্চপর্যায়ের দুটি পর্বে যোগ দিতে গতকাল সোমবার মরক্কো গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মারাক্কেশ শহরে ইউএনএফসিসির ২২তম বিশ্ব জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে সকালে মারাক্কেশের উদ্দেশে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়ে। ফ্লাইটটি মরক্কোর স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে মেনারা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে মরক্কোর জাতীয় শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণমন্ত্রী রচিড বেলমোখতার বিনাবদেল্লাহ, মরক্কোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুলতানা লায়লা হোসেন ও বাংলাদেশ দূতাবাস ও মরক্কো সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে মোটর শোভাযাত্রাসহকারে হোটেল লা মামৌনিয়াতে নেওয়া হয়। সফরকালে তিনি এ হোটেলে অবস্থান করবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী আজ সকালে কপ-২২-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেবেন। বিকেলে কপ-২২, সিএমপি-১২ (১২তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস সারভিং এজ দ্য মিটিং অব দ্য পার্টিস অব দ্য কিয়োটো প্রটোকল) এবং সিএমএ-১-এ (ফার্স্ট কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস সারভিং এজ দ্য মিটিং অব দ্য পার্টিস অব দ্য প্যানিস অ্যাগ্রিমেন্ট) উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেবেন। বাব ইগলি কনফারেন্স ভেন্যুতে মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও ইউনিসেফের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি পেট্রিসিয়া এসপাইনোসা প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন। এদিন অন্যান্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে শেখ হাসিনা মরক্কোর বাদশাহর দেওয়া এক ভোজসভায় যোগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় ও সমন্বিত প্রয়াস এগিয়ে নিতে প্রচারাভিযান জোরদার করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আগামীকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

ভূমধ্যসাগরে রুশ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

রাশিয়ার যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ অ্যাডমিরাল কুজনেতসভ।
এই জাহাজে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয় যুদ্ধবিমানটি। রয়টার্স
রাশিয়ার যুদ্ধবিমান মিগ ২৯ ভূমধ্যসাগরে বিধ্বস্ত হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিমানবাহী জাহাজ অ্যাডমিরাল কুজনেতসোভে অবতরণের সময় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে। রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজের যে বহর সম্প্রতি সিরিয়ার উপকূলে মোতায়েন করা হয়েছে, তার অন্যতম হলো অ্যাডমিরাল কুজনেতসোভ। এই বহর মোতায়েনের সময় ন্যাটো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিল, সিরিয়ার আলেপ্পোতে অভিযানের জন্য এই যুদ্ধজাহাজে থাকা বিমান ব্যবহার করা হতে পারে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ফ্লাইট পরিচালনার সময় ‘কারিগরি ত্রুটির’ কারণে যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি সুস্থ আছেন। ফ্লাইট পরিচালনাও অব্যাহত রয়েছে। অ্যাডমিরাল কুজনেতসোভ কয়েক ডজন বোমারু বিমান ও হেলিকপ্টার বহনে সক্ষম। গত মাসে ইংলিশ চ্যানেল হয়ে ভূমধ্যসাগরে যায় এটি।

৬৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল চাঁদ

৬৮ বছর পর গতকাল পৃথিবীবাসী আবারও দেখল
‘সুপারমুন’। রাজধানীর মিরপুর স্টেডিয়াম থেকে
বিপিএল খেলা চলাকালে তোলা ছবি। শামসুল হক
৬৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল চাঁদ। ইংরেজিতে যা সুপারমুন হিসেবে পরিচিত। গতকাল সোমবার রাতে যাঁরা চাঁদের এই রূপ দেখেছেন, শিগগিরই হয়তো তাঁরা তা ভুলবেন না। চাঁদের এ রকম উজ্জ্বলতম রূপ শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৪৮ সালে। আবার দেখা যাবে ১৮ বছর পর, ২০৩৪ সালের ২৫ নভেম্বর। গতকাল সুপারমুন দেখতে নানা আয়োজন ছিল রাজধানী ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে চাঁদ নিয়ে নানাজন নানা কথাও লিখেছেন। কেউ কেউ লিখেছেন কবিতা। চাঁদের ছবিও পোস্ট করেছেন অনেকে। সব মিলিয়ে আকাশের পাশাপাশি ফেসবুকও ছিল চাঁদময়। জ্যোতির্বিদেরা বলেছেন, গতকাল পৃথিবীর ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫০৯ কিলোমিটারের মধ্যে এসে পড়ে চাঁদ। ব্যতিক্রমী এবং বড় আকারের এই চাঁদ সুপারমুন নামে পরিচিত।
সুপারমুনের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে ‘পেরিজি মুন’। পেরিজি অর্থ হচ্ছে ‘পৃথিবীর নিকটতম’। চাঁদ যখন পূর্ণ পূর্ণিমায় থাকে এবং বার্ষিক প্রদক্ষিণের সময় পৃথিবীর কাছাকাছি চলে আসে, তখন একে সুপারমুন বলা হয়। নাসার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীকে ঘিরে চাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তার আকৃতি ডিম্বাকার হওয়ায় কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করার সময় চাঁদ কখনো পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসে, আবার কখনো অনেক দূরে চলে যায়। চাঁদ যখনই পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসে, তখন তা পৃথিবী থেকে খুব উজ্জ্বল দেখায়। গতকালের সুপারমুন সবচেয়ে ভালোভাবে দেখতে পেয়েছেন উত্তর আমেরিকার মানুষ। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এ দেশে গতকাল সন্ধ্যা সাতটা থেকে সুপারমুন দেখা যায়। জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এফ আর সরকার প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণ সুপারমুনের ক্ষেত্রে চাঁদ ১২ শতাংশ বড় ও ১৪ শতাংশ বেশি উজ্জ্বল দেখায়। কিন্তু এবারের সুপারমুন ১৪ শতাংশ বড় ও ৩০ শতাংশ বেশি উজ্জ্বল দেখিয়েছে। জ্যোতির্বিদদের মতে, ১৯৪৮ সালের পর এই প্রথম পৃথিবীর এতটা কাছে এসেছে চাঁদ। যুক্তরাষ্ট্রে সোমবার ভোরের দিকে এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সোমবার রাতে সুপারমুন দেখা যায়।

সাঁওতালরা ত্রাণ ফিরিয়ে দিলেন

সাঁওতালদের ওপর হামলায় আহত বিমল কিছকু রংপুর
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎ​সাধীন। গতকাল
বেলা ৩.৫৩ মিনিটে তাঁকে হাতকড়া পরা অবস্থায়
দেখা যায়। রাতে হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। প্রথম আলো
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে নির্যাতনের শিকার সাঁওতালরা সরকারি ত্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন। ‘বাপ-দাদা’র জমি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা ত্রাণ নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে শিল্পসচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কাউকে চিনিকলের জায়গা দখল করে থাকতে দেওয়া হবে না। তবে সরকার সাঁওতালদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। গতকাল সোমবার সকালে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল হান্নান গাইবান্ধার এই উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর ও জয়পুর গ্রামে যান। দেড় শ পরিবারের প্রত্যেককে ২০ কেজি চাল, এক লিটার তেল, এক কেজি ডাল, এক কেজি আলু, এক কেজি লবণ ও দুটি করে কম্বল বিতরণের কথা ছিল। ইউএনও মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে ত্রাণ নেওয়ার অনুরোধ জানালেও কেউ ত্রাণ নিতে রাজি হননি। সকাল থেকে মাদারপুর গির্জার সামনে ত্রাণ নিয়ে অপেক্ষা করে সন্ধ্যায় তিনি উপজেলা শহরে ফিরে আসেন। সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমিন বাস্কে মুঠোফোনে বলেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা প্রশাসনের কোনো ত্রাণ নেবেন না। তাঁরা বাপ-দাদার জমি ফেরত চান। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। ফিলিমিন বলেন, সাঁওতালদের নিহত হওয়া, বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্ত কমিটি পর্যন্ত হয়নি। উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁদের হয়রানি করা হচ্ছে।
৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে তিরবিদ্ধ হয়েছেন নয়জন এবং গুলিবিদ্ধ হন চারজন। এ সংঘর্ষের ঘটনায় তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। এ ঘটনায় শুধু পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানায় ওই রাতে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা করা হয়। গতকাল বিকেল পর্যন্ত চারজন সাঁওতালকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ঘটনার নয় দিনেও এখানকার সাঁওতাল-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মাদারপুর গ্রামের জোবা টুডু (৫৫) বলেন, তাঁর এক ছেলে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ে। ভয়ে কলেজে যেতে পারছে না। মেরি টুডুর নতুন বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরোনো বাড়িতে লুটপাট হয়েছে। তাঁদের ঘরে খাবার নেই। প্রশাসন নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও সাঁওতালরা স্বস্তি পাচ্ছেন না। গত রোববার গাইবান্ধার ওই অঞ্চল থেকে ঘুরে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত। গতকাল রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছি আপনারা কী চান? তারা বলেছে জমি চাই। জিজ্ঞেস করেছি জীবন বড়, না জমি বড়? তারা বলেছে, বাপ-দাদার জমি তাঁরা ফেরত চান।’ ঢাকায় নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, শিল্পসচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া গতকাল মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ৬ নভেম্বর চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গিয়েছিলেন পাশের একখণ্ড জমিতে আখের বীজ কাটতে, উচ্ছেদ অভিযানে নয়।
কিন্তু অবৈধ দখলদারেরা তাতে বাধা দেন। তির-ধনুক নিয়ে তাঁরা আক্রমণ করেন। কিছু স্বার্থান্বেষী ভূমিদস্যু এ ঘটনায় ইন্ধন দেয়। নিরীহ ও সহজ-সরল প্রকৃতির সাঁওতালরা পরিস্থিতির শিকার। তাঁদের প্রতি সরকার অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। সেখানে হতাহত ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে ভূমিহীন সাঁওতালদের পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সরকারি মালিকানাধীন চিনিকলের জায়গা দখল করে কাউকে থাকতে দেওয়া হবে না। পুলিশের গুলিতে সাঁওতালরা নিহত হয়েছেন কি না, সে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে বলে উল্লেখ করে মোশাররফ হোসেন দাবি করেন, পুলিশ ওই দিন কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়েছিল। এতে কারও প্রাণহানি হওয়ার কথা নয়। শিল্পসচিব আরও বলেন, ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। ইন্ধনদাতাদের সম্পর্কে সংবাদকর্মীদের নিশ্চিত করতে তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করেন। মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, রংপুর চিনিকলের জন্য সরকার ১৯৫৪ সালের দিকে ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। তখনই এসব জমির মালিকদের আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে চিনিকলটি যখন সম্পূর্ণ বন্ধ (লে-অফ) ছিল, তখনো কেউ সেখানে জমির দাবি নিয়ে আসেনি। হঠাৎ গত ১ জুলাই ‘ভূমি উদ্ধার কমিটি’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে সাঁওতালরাসহ এলাকার ও এলাকার বাইরের কিছু লোক এসে চিনিকলের জমিতে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ শুরু করে। তারপর থেকে এ ধরনের ঘরের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে প্রায় ২৫০টিতে পৌঁছায়। বিষয়টি নিয়ে চিনিকলের কর্মকর্তারা ও স্থানীয় প্রশাসন তাদের সঙ্গে কথা বলে। পরে একটি সমঝোতা সভারও আয়োজন করা হয়। কিন্তু তারা চিনিকলের জমির দখল ছাড়তে রাজি হয়নি। বরং ১২ ও ১৬ জুলাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই তারা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। সংবাদ সম্মেলনে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার বিষয়ে শিল্পসচিব বলেন, ঘটনার পেছনের ইন্ধনদাতারা আগুন দিয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্যে ‘বিরক্ত’ লোকজনও এতে অংশ নিয়ে থাকতে পারে। অবশ্য ওই ভূমির দলিল ও পুরোনো কাগজপত্র পর্যালোচনা করে অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, জমি যে সাঁওতালদেরই তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কাগজে দেখা যায়, ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই একটা চুক্তির মাধ্যমে চার মৌজার ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। চুক্তিপত্রের ৫ ধারায় বলা আছে, চিনিকল এবং আখ চাষের জন্য এ জমি নেওয়া হলো। যদি কখনো এ জমিতে এ ছাড়া (আখ চাষ ছাড়া) অন্য কিছু হয়,
তাহলে এটা মূল মালিকদের ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগেই ২০০৪ সালে চিনিকল লে-অফ ঘোষণার পরে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীকে নামে-বেনামে এ জমি লিজ দেওয়া হয়েছে। অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক বারকাত বলেন, অধিগ্রহণের সময় তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল এমন তথ্য তিনি এখনো কোনো কাগজে পাননি। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অধিগ্রহণের শর্তই ছিল আখ চাষ না হলে জমি ফেরত দেওয়া হবে। একই তথ্য দিয়ে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, ১৯৪৮ সালের অধিগ্রহণ আইন অনুসারে যে চুক্তি হয় তাতে বলা হয়েছে, জমিতে আখ ছাড়া অন্য ফসলের চাষ হলে প্রকৃত মালিকদের জমি ফেরত দিতে হবে। কিন্তু ১ হাজার ৮৪২ একর জমির মধ্যে মাত্র ১০০ একর জমিতে আখ চাষ করা হচ্ছে। বাকি জমিতে ধান, তামাকসহ বিভিন্ন শস্য চাষ হচ্ছে। তাই তাঁরা এখন জমি ফেরত চান। এর আগে গত শনিবার গাইবান্ধায় সাঁওতাল-অধ্যুষিত দুটি গ্রামে হামলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন সাঁওতাল নেতারা। তাঁরা বলেন, চিনিকলের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ মেটাতে সাংসদ আবুল কালাম আজাদ ও ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদের সহযোগিতায় তাঁরা চার বছর আগে আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু সাংসদ ও চেয়ারম্যান মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সহিংস ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছেন। সাংসদ ও চেয়ারম্যান অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। হাতকড়া খোলার নির্দেশ হাইকোর্টের: নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, চিকিৎসাধীন তিন সাঁওতালের হাতকড়া খুলে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও গাইবান্ধার পুলিশ সুপারের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে ১৬ নভেম্বরের মধ্যে তিন কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ বিষয়ে রুল জারি করেন।
পুলিশ ও চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ চরণ সরেন, বিমল কিছকু ও দ্বিজেন টুডু এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের হাতকড়া পরা অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এমন একটি ছবিসহ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদন যুক্ত করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে গতকাল রিট আবেদনটি করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। আদালতে রিটের পক্ষে তিনি নিজেই শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, আহত তিনজনের মধ্যে দ্বিজেন টুডু ঢাকায় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে এবং চরণ সরেন, বিমল কিছকু রংপুর মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন। তাঁরা গুলিতে আহত হয়েছেন। শারীরিকভাবে নিজেরা চলতে অক্ষম। তাঁদের পালানোর কোনো সম্ভাবনাও নেই। এভাবে হাতকড়া পরানো মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এসব যুক্তিতে রিটটি করা হয়। রুলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনকে হাতকড়া পরানো কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। রংপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিমল কিছকুর হাতে হাতকড়া ছিল। তাঁর বাঁ পায়ের তালু এবং ডান পায়ের হাঁটুর ওপরে ব্যান্ডেজ। তবে চরণ সরেনের হাতে হাতকড়া ছিল না। চরণের স্ত্রী পানি মুরমু বলেন, ‘সাংবাদিক ও অন্য লোকজন আসার আগে হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। চলে গেলে আবার হাতকড়া লাগানো হয়।’ বিমল কিছকুর স্ত্রী ডিজিলিয়াও একই অভিযোগ করেন। এ প্রসঙ্গে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত সরকার বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশের পর হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়েছে।
মানববন্ধন-সমাবেশ: গতকাল বিকেলে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর সড়কের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটা এলাকায় মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার দাবিতে সাপমারা ইউপির চেয়ারম্যান এ কর্মসূচির আয়োজন করেন। সমাবেশ প্রসঙ্গে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, যারা সাঁওতালদের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে, তারাই মানুষের কাছে ভালো সাজার জন্য এই সমাবেশ করেছে।

বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত ৪

নরসিংদীর রায়পুরার নীলক্ষা ইউনিয়নে গতকাল দুই
পক্ষের সংঘর্ষের সময় টেঁটা হাতে লোকজন। দুপুরে
নীলক্ষা মাঠ থেকে তোলা ছবি। প্রথম আলো
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নীলক্ষা ইউনিয়নের বর্তমান ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। এ ছাড়া বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। নির্বাচনী বিরোধ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন নীলক্ষা ইউনিয়নের আমিরাবাদ গ্রামের শাহজাহান মিয়া (২৭) ও মানিক মিয়া (৪৫) এবং সোনাকান্দী গ্রামের মোমেন মিয়া (২২) ও খোকন মিয়া (৩২)।
তাঁরা সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকারের সমর্থক ছিলেন। এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নীলক্ষা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকার রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে তাজুল ইসলাম ও আবদুল হক সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ চলছে। সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে তাজুল ও আবদুল হক চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন চান। শেষে তাজুলকে দলীয় প্রার্থী মনোনীত করা হয়। মনোনয়নবঞ্চিত হলেও আবদুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে না গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। নির্বাচনে তাজুল বিজয়ী হন। নির্বাচনের পর দুই পক্ষে বিরোধ আরও বাড়ে। দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে গত সাত মাসে ১৫ বার সংঘর্ষ হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে তিন শ লোক আহত হন। ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে শতাধিক বাড়িঘর। এসব ঘটনায় পাল্টাপাল্টি একাধিক মামলাও হয়েছে। এলাকাবাসী বলেন, গত শনিবার সন্ধ্যায় নীলক্ষা ইউনিয়নের বীরগাঁও গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বাধে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। শনিবারের সংঘর্ষের সূত্র ধরে রোববার দুপুরেও টেঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে উভয় পক্ষ। সংঘর্ষ নীলক্ষা, বীরগাঁও, দড়িগাঁও এবং হরিপুর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষের অর্ধশত লোক আহত হন। এর জেরে গতকাল সকাল থেকে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। সকাল থেকে উভয় পক্ষের সহস্রাধিক সমর্থক টেঁটা, বল্লম, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হরিপুর,
গোপীনাথপুর, কান্দাপাড় ও বীরগাঁও গ্রামে ছড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় ব্যক্তিরা আরও বলেন, দুপুরের দিকে প্রথমে মানিক মিয়া টেঁটাবিদ্ধ হন। এরপর হন মোমেন ও খোকন। বিকেলে টেঁটাবিদ্ধ হন শাহজাহান। তাঁরা প্রত্যেকে ঘটনাস্থলে মারা যান। নিহত চারজনকেই নিজের সমর্থক দাবি করে সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকার প্রথম আলোকে বলেন, সকাল থেকে তাজুল সমর্থকেরা টেঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পুরো ইউনিয়নে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পুলিশ থাকলেও কিছুই করতে পারেনি। শেষে তাজুল পক্ষ তাঁর পক্ষের লোকজন ওপর চড়াও হয়। যোগাযোগ করা হলে বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ জন্য তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। তবে তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ, আবদুল হক পাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন ও অস্ত্র ভাড়া করে এনে তাদের ওপর হামলা চালান। দড়িগাঁও গ্রামে চেয়ারম্যান তাজুলের পক্ষের লোকজনের অর্ধশত বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। চেয়ারম্যান তাজুলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গোপীনাথপুরের আবদুল জব্বার মিয়া অভিযোগ করেন, নিহত চারজনই পুলিশের গুলিতে নিহত হয়ে থাকতে পারেন। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) আমেনা বেগম বলেন, পুলিশ একটি লাশ নিজেদের হেফাজতে নিতে পেরেছে। মরদেহের শরীরে টেঁটার আঘাত রয়েছে। বাকিগুলো গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি বলেন, সকাল থেকে পুলিশকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়। পুলিশ সদস্যরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। এসপি আমেনা বেগম বলেন, সংঘর্ষের সময় ঢিলের আঘাতে রায়পুরা থানার ওসি আজহার উদ্দিনসহ পুলিশের আরও পাঁচ সদস্য আহত হন। ঘটনা তদন্তে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিবুল আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) বশির উদ্দিন বলেন, সংঘর্ষের পর উভয় পক্ষের ১৩ জনকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক সংঘাতে চিন্তিত আওয়ামী লীগ

সাঁওতালদের ওপর হামলায় আহত বিমল কিছকু রংপুর
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎ​সাধীন। গতকাল
বেলা ৩.৫৩ মিনিটে তাঁকে হাতকড়া পরা অবস্থায়
দেখা যায়। রাতে হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। প্রথম আলো
দলের মধ্যে ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্ব নিয়ে চিন্তিত আওয়ামী লীগ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায় ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর সহিংসতার পেছনে দলের নেতাদের ইন্ধনের অভিযোগ এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়টিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ দুটি ঘটনায় একধরনের চাপে পড়েছে দল ও সরকার। ঘটনা দুটি অসাম্প্রদায়িক আদর্শের মূলে আঘাত বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক হামলা ও গাইবান্ধায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের তিনজনের প্রাণহানির বিষয়ে সরকারের দুজন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুজন সদস্যসহ কেন্দ্রীয় কমিটির ছয়জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলেন, সরকার ও দলের ভাবনা হচ্ছে এসব ঘটনার পেছনে দলের নেতাদের সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ এসেছে, তা ব্যক্তিস্বার্থের কারণে। অতীতেও টেন্ডারবাজিসহ নানা ঘটনায় এমনটা দেখা গেছে। ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মতো গুরুতর বিষয়ে দলের নেতাদের ইন্ধনের খবর তাঁদের চিন্তায় ফেলেছে। এসব অপরাধীর দায় দল নেবে না। ইতিমধ্যে সরকার আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, সরকার ও দলের ভেতরেই আলোচনা আছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্বের কারণে নাসিরনগরের ঘটনাটি বড় হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে মূলত মন্ত্রীর সঙ্গে এই সাংসদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। সরকারি সূত্র বলছে,
নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর ধারাবাহিক হামলার পেছনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাজ করেছে—এটা পুলিশের তদন্তেও কিছুটা এসেছে। এই প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না পেলেও ইতিমধ্যে একাধিক গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত খবর বেরিয়েছে। সরকারের শরিক ১৪ দল থেকেও এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার প্রসঙ্গটি বিভিন্নভাবে তোলা হয়েছে। সাংগঠনিক চ্যানেলে খোঁজ নিয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা নিশ্চিত হয়েছেন যে নাসিরনগরের ঘটনা বড় হয়েছে দলের কোন্দলের কারণে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯ নভেম্বর গণভবনে দলের কয়েকজন নেতার কাছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মোকতাদির চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। নাসিরনগরের ঘটনায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশে-বিদেশে বিক্ষোভ হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের পদত্যাগ চেয়ে ঢাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। এটা সরকার ও দলকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ ও সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সবকিছুই করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তাঁর দাবি, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য একটা চক্র পেছনে কলকাঠি নাড়ছে।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে দলের কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে জড়িয়ে পড়ে, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। নাসিরনগরের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মন্ত্রী ছায়েদুল হক গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে হরিপুরে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক মিয়াকে। কিন্তু তাঁর বাবা যুদ্ধাপরাধী, এমন অভিযোগ তুলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোকতাদির চৌধুরী মনোনয়ন দেন ব্যবসায়ী ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য দেওয়ান আতিকুর রহমানকে। ওই অবস্থায় দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে ফারুক মিয়া সমর্থন দেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রাশেদ চৌধুরীকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আতিকুর রহমান জয়ী হন। এরপর থেকেই ফারুক মন্ত্রীর লোক ও আতিকুর সাংসদ মোকতাদিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পান। ছায়েদুল হক জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। ইউপি নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে সুপারিশ পাঠান জেলা সভাপতি মোকতাদির চৌধুরী। সর্বশেষ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় আতিকুরের বিরুদ্ধে ইন্ধনের অভিযোগ উঠেছে। এর বাইরে স্থানীয় একটি বিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। অবশ্য আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের কেউ কেউ মন্ত্রী ছায়েদুল হকেরও সমালোচনা করছেন। ওই নেতারা বলেন, নিজের নির্বাচনী এলাকায় হিন্দুদের ওপর হামলার পর মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াননি। চার দিন পর তিনি এলাকায় গেছেন।
এ ছাড়া নিজ নির্বাচনী এলাকায় বিপুলসংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস সত্ত্বেও তাদের বিষয়ে মন্ত্রীর উদাসীনতা রয়েছে বলেও মনে করেন অনেক নেতা। দলীয় সূত্র জানায়, নাসিরনগরের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের একাধিকবার গণভবনে ডেকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছেন। এরপর দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সমন্বয়ে আলাদা দল পাঠিয়েছেন। সর্বশেষ দুটি গোয়েন্দা সংস্থাকে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দল সাত বছর ধরে ক্ষমতায়। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নানা স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। দলীয়ভাবে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার কারণে বিভক্তি চরমে পৌঁছেছে। জমি দখল থেকে শুরু করে সরকারি উন্নয়নকাজের টেন্ডার দখল—সবকিছুতেই পক্ষ-বিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই। এসব নিয়ে কখনো নিজেদের দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। কখনো চলে ‘প্রক্সি ওয়ার’ (ছায়াযুদ্ধ)। এক পক্ষ বিপদে পড়লে আরেক পক্ষ ঘায়েল করার কাজে নেমে পড়ে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল অধ্যুষিত দুটি গ্রামে সহিংসতার পর আওয়ামী লীগের দুজন সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি দল রোববার ওই এলাকা পরিদর্শন করে। দলটির সদস্যরা গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর গির্জার সামনে এক সমাবেশে অংশ নেন। সেখানে সাঁওতালরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছে,
তাদের ওপর সহিংসতায় সরকারদলীয় সাংসদ আবুল কালাম আজাদ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদের ইন্ধন রয়েছে। এ সময় জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, জাতীয় আদিবাসী ফোরাম ও বিশিষ্ট নাগরিকদের দুটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। কেন্দ্রীয় কমিটির যে দলটি সাঁওতাল এলাকা পরিদর্শনে যায়, ওই দলের দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশ গাইবান্ধার ঘটনায় সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় ছিল। তবে সাংসদের বিরুদ্ধে ইন্ধনের অভিযোগের ভিত্তি তাঁরা পাননি। এই দুই নেতার দাবি, সাঁওতালরা মনে করছে, সাংসদের পরামর্শ ছাড়া পুলিশ গুলি করত না। এ জন্যই তারা সাংসদের বিষয়ে অভিযোগ করছে। এ ছাড়া এলাকাটি জামায়াত অধ্যুষিত। তাদের ইন্ধনও থাকতে পারে। আবুল কালাম আজাদ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জয়ী হন। পরে তিনি দলের উপজেলা শাখার সভাপতি হন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। তিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। ফলে ওই এলাকায় দলে বেশ বিভাজন রয়েছে। সাঁওতালদের অভিযোগ, চিনিকলের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ মেটাতে সাংসদ আবুল কালাম ও ইউপি চেয়ারম্যান শাকিলের সহযোগিতায় তাঁরা চার বছর আগে আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু সাংসদ ও চেয়ারম্যান পরে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সহিংস ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছেন। এ কারণে সাঁওতালদের বাড়িঘর পুড়িয়ে, তাদের হত্যা করে উল্টো সাঁওতালদের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বৈষয়িক লাভের বিষয়টি কাজ করে। এর পেছনে ইন্ধনও থাকে। এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও গাইবান্ধার ঘটনা আওয়ামী লীগের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেশি কমবে ব্যাংকঋণ

সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেশি হওয়ায় চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে তেমন অর্থ ধার করতে হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সচিবালয়ে গতকাল সোমবার আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার-সংক্রান্ত সমন্বয় কাউন্সিল এবং বাজেট তদারকি ও সম্পদ কমিটির দুই বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, এবার সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেশি। এর অবশ্য অন্য একটি দিকও রয়েছে। তা হচ্ছে, বিক্রি বেশি হলে সরকারের খরচও গুনতে হয় বেশি। কারণ, অন্য যেকোনো আমানতের সুদের হারের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারটা বেশি ধরা হয়। অর্থমন্ত্রী অবশ্য এ-ও বলেন, ‘সমাজের একটা শ্রেণি আছে, যারা সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল।’
তারপরও সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কিছুটা সমন্বয়ের কথা চিন্তা চলছে বলে জানান মুহিত। সমন্বয় মানে কি সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো—এমন প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আপাতত চিন্তা করছি না। তবে বিবেচনা করব। অবশ্য এর মধ্যে কী হয়, বলতে তো পারি না।’ চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ১৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্য ধরা হলেও অর্থবছর শেষে নিট বিক্রি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ৩৮ হাজার ২৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই বলছেন, এর মধ্যে বড় অংশই ব্যয় হবে সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধে। আগের অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের সুদ-আসল পরিশোধে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। অর্থমন্ত্রীর কথার সূত্র ধরে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুলাই-সেপ্টেম্বরে ১১ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে এবং তিনি মনে করছেন, এবারও লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাবে। সে হিসেবে তিন মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যের অর্ধেকেরও বেশি। গতবারের অভিজ্ঞতা ও এবারের প্রবণতা বিশ্লেষণে সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ধারণা, অর্থবছর শেষে এবার নিট বিক্রি ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
আগামী বাজেটের আকার: আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৩ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা দেন মুহিত। বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ৩ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার কম হবে না। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের পর্যালোচনা বৈঠক শেষে বাজেটের আকারটা বলা যাবে।’ বিদ্যুতে একটা নীতি সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে সাংবাদিকদের জানান অর্থমন্ত্রী। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে জনগণের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর যে লক্ষ্য ঠিক করেছিল, অর্থমন্ত্রী মনে করছেন ২০১৮-১৯ সালেই তা পূরণ হয়ে যাবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এক হিসাবে বিদ্যুৎ হচ্ছে কল্যাণমূলক সেবা। কৃষিতে আমরা যেভাবে প্রণোদনা দিই, চিন্তা করছি সাধারণ মানুষের জন্যও তা দেওয়ার। প্রণোদনা অবশ্য আছেও। তবু চিন্তা করছি আরও এক-আধটু দেওয়া যায় কি না।’ বৃহৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ৪৯ শতাংশের বাস্তবায়ন হয়ে গেছে বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহ পরিস্থিতিও ভালো বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘নিকট অতীতের তুলনায় এবারের রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি ভালো। যেমন গতবারের একই সময়ের তুলনায় এবার ২২ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে।’

অবৈধ পথে আসছে প্রবাসী আয়

দেশে ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলাবাজারে মার্কিন ডলারের দামের পার্থক্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকার বেশি। ব্যাংকে প্রতি ডলারের মূল্য গড়ে ৭৮ টাকা, খোলাবাজারে তা ৮২ টাকার কাছাকাছি। একইভাবে প্রবাসীরাও অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে দুই ধরনের প্রস্তাব পাচ্ছেন। বেশি টাকার আশায় অনেকেই অবৈধ পথকে বেছে নিচ্ছেন। আবার নগদ ডলারের সংকটের প্রভাবও পড়ছে প্রবাসী আয়ে। এতে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে দেশের প্রবাসী আয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য উঠে আসার পর গতকাল সোমবার প্রবাসী আয় আহরণকারী শীর্ষ ৩০টি ব্যাংকের সঙ্গে সভা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীর সভাপতিত্বে এসব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা সভায় অংশ নেন। সভায় প্রবাসী আয় আহরণের দিকে নজর দিতে এমডিদের তাগিদ দেওয়া হয়। প্রবাসী আয় কমছে কেন, খতিয়ে দেখা হোক—প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত এ সভার আয়োজন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এিদকে, অর্থমন্ত্রীও প্রবাসী আয় অবৈধ পথে আসছে বলে গতকাল মন্তব্য করেছেন। গতকাল বাজেট তদারকি ও সম্পদ কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে প্রবাসী আয় কমার একটি কারণ হচ্ছে বিদেশ থেকে হুন্ডি বা অবৈধ পথে দেশে অর্থ আসা। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আমাকে বলেছে, কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে তারা। ডলারের দর ৮০ টাকার মতো হয়েছে তো, আশা করছি সমস্যাটা মিটে যাবে এবং প্রবাসী আয় বাড়বে।’ হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসী আয় আসা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো নয় উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘হুন্ডির মাধ্যমে ভারতবর্ষ ঘুরে দেশে প্রবাসী আয় আসে। এতে এদের (হুন্ডির দালাল) কিছু লাভ হয়। তবে প্রকৃতপক্ষে দেশে প্রবাসী আয় আসা কমেনি।’ গতকালের বৈঠক উপলক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে নগদ ডলারের সংকট রয়েছে। এ সংকটের কারণে ব্যাংক ও খোলাবাজারে দামের পার্থক্য বাড়ছে। ফলে অবৈধ পথে প্রবাসী আয়ও বাড়ছে। নগদ ডলার আমদানি করা গেলে এ সংকট দূর করা যেত। জানা গেছে, সবশেষ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক নগদ ৩৫ লাখ ডলার আমদানি করে। তবে কর আরোপ থাকায় অন্য কেউ আর ডলার আনতে রাজি হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ডলার আমদানিতে কর অবকাশ-সুবিধা দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হলেও কর প্রত্যাহার করা হয়নি।
পর্যবেক্ষণমতে, ডলারের বিপরীতে পাউন্ড, ইউরো, রিঙ্গিত, সিঙ্গাপুর ডলারসহ প্রভৃতি মুদ্রার মূল্যমান কমে গেছে। ফলে এসব দেশের শ্রমিকদের আয়ের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা কম পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের দাম কমায় শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। অনেক দেশে শ্রমিকদের বেতনও অনিয়মিত হয়ে গেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের হয়রানিতে পড়তে হচ্ছে। পাঠানো টাকার প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, তা জানতে চাইছে। বৈধ সময়ে কাজের আয় ছাড়া অন্য আয় পাঠানো যাচ্ছে না। এতে আরও উঠে এসেছে, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে বিকাশের নামে টাকা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে ডলারের বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। এর পুরোটাই অবৈধ পথে দেশে আসছে। এসব কারণে ক্রমেই প্রবাসী আয় কমছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ধারাবাহিকভাবেই কমছে প্রবাসী আয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে প্রবাসীরা ৪২৫ কোটি ৫৭ লাখ মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫০৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসী আয় কমেছে ৭৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার বা ১৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের অক্টোবরে প্রবাসীরা ১০১ কোটি ৯ লাখ ডলার প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন, যা গেল অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে ৮ কোটি ৭৪ লাখ ডলার বা ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ কম। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসী আয় এসেছিল ১০৫ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৩৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এভাবেই ধারাবাহিকভাবে কমছে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ। এসব পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে গতকালের সভায় আলোচনা হয়, এক্সচেঞ্জ হাউস চালুর সময়ে নিরাপত্তা হিসেবে রাখা হয়েছিল ২৫ হাজার ডলার। এর পরিমাণ কমিয়ে আনতে কাজ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় কিছুটা কমবে। পাশাপাশি ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোকে এজেন্ট নিয়োগ করে প্রবাসী আয় আহরণ করার বিষয়ে তাগাদা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সভার বিষয়ে এস কে সুর চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, প্রবাসী আয় প্রদানকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাংকিং চ্যানেলে সব আয় আনার ব্যবস্থা করতে এমডিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী গ্রাহকদের নিয়ে গ্রাহক সমাবেশ, আলোচনা করার তাগিদও দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে কোন ব্যাংকের মাধ্যমে কী পরিমাণ প্রবাসী আয় আসে, তা দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গণতন্ত্র: আদর্শহীন ব্যবস্থা?

গণতন্ত্র আদর্শ হিসেবে হোঁচট খেয়েছে আর ব্যবস্থা হিসেবে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মানছি যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় এ ভাবনাগুলোকে হালনাগাদ করে দিয়েছে। তবে ভারতে নরেন্দ্র মোদির বিজয় বা তুরস্কে এরদোয়ানের জুলাইয়ের ব্যর্থ অভ্যুত্থান-পরবর্তী কার্যকলাপ আগেই গণতন্ত্রকে কাঠগড়ায় তুলেছিল। গণতন্ত্রের বাঁধা বুলি পাকিস্তান আমল থেকেই শুনে এসেছি। সত্যিই পাকিস্তান শাসিত হয়েছে স্বৈরাচারী কায়দায়—কখনো সরাসরি সামরিক কর্তৃত্বে, কখনো বেসামরিক ছদ্মবেশে। গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানকে শেষ পর্যন্ত রণাঙ্গন অবধি টেনে আনতে হয়েছে সেই জগদ্দল ভাঙার জন্য। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা এনেছি—মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র ও অধিকারহীন পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক স্বাধীন দেশে বসবাস। পাকিস্তান আমল আর নেই, সেকালের চেয়ে অনেক ভালো আছি তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু আমাদের চলমান গণতন্ত্রে আদর্শ গুরুত্ব হারিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যথেষ্ট ঘাটতির মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্ন হলো, এর চেয়ে ভালো বিকল্প কি বর্তমান ব্যবস্থায় পাওয়া সম্ভব? যদি না হয়, তাহলে ব্যবস্থা পাল্টানোর প্রশ্ন উঠবে। সেই প্রশ্নটা মাথায় রেখে আমরা যে তিন নেতার কথা গোড়ায় বলেছি, তাঁদের প্রসঙ্গে একবার আসি। ট্রাম্প বিজয়ের জন্য আমেরিকাকে আবার মহান বানানোর যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন,
তাতে আফ্রিকান-আমেরিকান, হিস্পানিক জনগোষ্ঠী, এশীয় ও মুসলিম অভিবাসীদের প্রতিপক্ষ দাঁড় করিয়ে বস্তুত জনসংখ্যার ৭০ ভাগ শ্বেতাঙ্গ মার্কিনদেরই তাঁর পক্ষভুক্ত করতে চেয়েছেন। অর্থাৎ অভিবাসীনির্ভর দেশটি যে ঐতিহ্যগতভাবে সব ধর্মবর্ণের মিলনপাত্র হয়েই মহান হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে, তাকেই জবাব দিয়ে অর্থাৎ বিদায় করেই ট্রাম্পের মহান রাষ্ট্র তৈরি হবে! নরেন্দ্র মোদি ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে হিন্দুত্ববাদের জিগির তুলেই বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। এরদোয়ান তুরস্কের প্রশাসন ও জনজীবনে আধুনিক প্রগতিশীল অংশকে দুর্বল—সম্ভব হলে ধ্বংস—করে দেওয়ার জন্য ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সুযোগটাকে যেকোনোভাবে সর্বোচ্চ কাজে লাগাচ্ছেন। তাঁরা তিনজনই গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন—ট্রাম্পকে যদিও আরও দুই মাস অপেক্ষা করতে হবে ক্ষমতা ভোগ করার আগে। ট্রাম্প, মোদি, এরদোয়ান নির্বাচিত হয়েছেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, ভোটারদের রায়ে, কিন্তু সে রায় পক্ষে পেতে তাঁরা প্রচারণায় যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা কি গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? বিষয়টা দাঁড়াল এই যে আদর্শের কোনো প্রয়োজন নেই, ব্যবস্থার ফায়দা যেভাবে আদায় করা যায়, সেভাবেই করো। ফলে প্রচারণায় রাজনৈতিক আদর্শের কথা মূল্যহীন; আক্রমণের বিষয় হতে পারে, ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায়। এতকাল এসব ছিল অজুহাতের মতো, কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটে আলোচিত বিষয়, যেমন টুইন টাওয়ারে হামলার জন্য কতিপয় সন্ত্রাসী দায়ী, যারা মুসলিম ও মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ। ট্রাম্প কথার মারপ্যাঁচে যাননি, সরাসরি প্রতিপক্ষ কারা চিনিয়ে দিয়েছেন। এরদোয়ানও প্রতিপক্ষ ঘায়েল করতে গিয়ে নিজের স্বরূপও খুলে ধরেছেন। মোদি অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁর গোপন অ্যাজেন্ডা হিন্দুত্ববাদকে এখনো গণতন্ত্রের আবরণে ঢেকে চলেছেন। যদিও বলা যায় রাষ্ট্রে তাঁর কর্তৃত্ববাদী চেহারা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রশ্ন হলো ব্যবস্থার ন্যায্যতার কী মূল্য যদি আদর্শের (এবং মূল্যবোধের) ন্যায্যতা টিকতে না পারে? আদর্শের অনুপস্থিতি কার্যত মূল্যবোধের অবক্ষয় ডেকে আনে।
আর মূল্যবোধের ক্ষয় পাওয়ার অর্থ মনুষ্যত্বের গভীর সংকট সৃষ্টি হওয়া। সমাজে সেই সংকট নানাভাবে ফুটে উঠছে, কেবল আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপীই তা চলছে। দেখুন, আমরা আলোচনার নিজস্ব গতি ও পরিণতিতে কোথায় এসে পৌঁছেছি। কবুল করতে হচ্ছে যে গণতন্ত্র চলছে, তাতে তো মনুষ্যত্বের সংকট তৈরি হচ্ছে। ভোটের মূল্যেই মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে যে রাজনীতি, তার নিজের কোনো মূল্যবোধ নেই। এই রাজনীতি আদতে দেশ ও মানুষের সেবার অধিকারের সঙ্গে কর্তৃত্বের চাবিকাঠিও বিজয়ীর হাতে তুলে দেয়। সেবা একটি মূল্যবোধ, তাই এর কেতাবি কিংবা আলংকারিক মূল্য আছে, কিন্তু প্রকৃত মূল্য হলো ক্ষমতার এবং তা খাটানোর অধিকার কতটা ভোগ করা যাচ্ছে, তার। তাই সব বিজয়ীই চান প্রশ্নাতীত ক্ষমতা ও অবস্থান, অর্থাৎ জবাবদিহিমুক্ত স্বাধীন অধিকার। ট্রাম্পের পক্ষে মোদি বা এরদোয়ানের মতো বেপরোয়া হওয়া সম্ভব হবে না বলেই ভাবতে চাই। কারণ, প্রায় সোয়া দুই শ বছরের আমেরিকান গণতন্ত্র অনেক সফল প্রতিষ্ঠান গড়েছে এবং সেই সঙ্গে অনেক সচল প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধও তৈরি করেছে। সমাজে এসবের শিকড় যথেষ্ট গভীর, একজন ট্রাম্প একটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে তা ওপড়াতে পারবে বলে বিশ্বাস হয় না। ভারতেও মোদিকে অনেক ক্ষেত্রে আপস কিংবা গতি শ্লথ করতে হয়েছে, কারণ তাঁদের সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সবটা আপসকামী নয়, স্বাধীন অবস্থান রক্ষায় ও আদর্শিক লড়াইয়ে অনেকেই প্রস্তুত এবং তাতে শামিল হচ্ছেন। তুর্কিরা পুরোনো যোদ্ধা জাতি, আবার তেমনি সমাজ সুপ্রাচীন সুফি আধ্যাত্মিকতার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। সেখানে কট্টরপন্থীদের ওপর অতিনির্ভরতার ফলাফল কী দাঁড়াবে বলা মুশকিল। তবে তাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য বেশ বিবর্ণ, আতাতুর্ক চেয়েছিলেন রাতারাতি আধুনিক ইউরোপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে। জবরদস্তি ছাড়া তা সম্ভব ছিল না। তাই তুরস্কের গণতন্ত্রের খুঁটি ছিল সামরিক বাহিনী বা জেনারেলদের ইচ্ছাধীন! এবার বোধ হয় বাংলাদেশের দিকে চোখ ফেরাতে পারি।
স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রয়াস হোঁচট খায় দুই তরফে—দলীয় লোকজনের ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জাসদের হঠকারী অতি বা প্রতিবিপ্লবী কর্মকাল। তাঁকে, অনিচ্ছায় হলেও, বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকেই যেতে হলো। এখন সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত, সরকার ও দলের অন্যদের ক্ষমতা-যোগ্যতার চেয়েও আনুগত্যের গুরুত্ব যে বেশি, তা স্পষ্টই বোঝা যায়। এ বাস্তবতায় আদর্শগত বিচারে নিশ্চয় গণতন্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে। শেখ হাসিনার দেশপ্রেম তর্কাতীত, মানুষের জন্য ভালোবাসা নিয়েও কোনো প্রশ্ন নেই, হয়তো গণতান্ত্রিক আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রতি তাঁর অন্তরের শ্রদ্ধাবোধেও কমতি নেই। যদি গণতন্ত্রকেই সাক্ষী মেনে প্রশ্ন করা যায়, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে তাঁর বিকল্প কে আছেন? না, অনেকের মনে যে নামটি আসবে তিনি কোনোভাবেই হাসিনার বিকল্প নন। কারণ, বাংলাদেশের নিয়তি পাকিস্তান হওয়া নয়, তাকে বাংলাদেশই হতে হবে। আমরা স্বপ্ন দেখি আমাদের বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠবে। তবে তার চেয়েও জরুরি হলো বাংলাদেশের স্বতন্ত্র স্বকীয় দর্শনটি স্পষ্ট করা, যাতে এ দেশে রাজনীতির ভিত্তিরেখাটি স্পষ্টভাবে দাঁড় করানো যায়। কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা একাত্তরের ইতিহাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ কাজ করে দেবে না। তবে তার আগে স্বীকার করতে হবে যে দেশ ও বিশ্ব বর্তমানে এমন একটা ঘূর্ণিপাকের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যখন গণতন্ত্রের আবরুটুকু বাঁচানোকেই নেতারা যথেষ্ট ভাবছেন,
পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের কথা আপাতত তুলে রাখছেন। এ নিয়ে স্বভাবতই অনেকের অভিযোগের কমতি নেই। ঠিক আছে, কিন্তু সত্যিই যে ঘূর্ণিপাকে জেরবার হওয়া যুগান্তরেই আছি আমরা, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। ঘূর্ণিস্রোতে বেসামাল তরণিতে একনায়কের উত্থান ঘটা অস্বাভাবিক নয়। তাহলে আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে এটা সত্যিই গণতন্ত্রের আকাল। আকালের গণতন্ত্র তার বৈভব দেখাতে চাইছে বৈষয়িক চাকচিক্যে, তারই বহর ও নহর দেখছি আমরা। এর প্রবাহে সারা দেশে গণতন্ত্রের খুদে খুদে অতন্দ্র প্রহরীরা যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে দখল বুঝে নিচ্ছে। গণতন্ত্রের আবরু রক্ষা হচ্ছে কি না জানি না। কিন্তু বুঝি যে জিয়াউর রহমানের ফর্মুলাই জয়ী হচ্ছে, রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে, প্রক্রিয়ার মধ্যে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে বণিকদের রাজনীতিক জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন নয়তো নিজেরা বণিক হয়ে টিকে থাকার লড়াই করছেন। অবশ্য গণতন্ত্র আদতে ক্ষমতার রাজনীতি নয়, অধিকারের রাজনীতি। সবার, বিশেষ করে দুর্বল ও প্রান্তজনের, আজকের দিনে গাছপালা, পশুপাখি, মাছ, কীটপতঙ্গ, এমনকি নদী-পাহাড়-জলাশয়ের অধিকার রক্ষার জন্যও শর্ত আরোপ হতে পারে, কারও ক্ষমতার জন্য নয়। এ অর্থে রাজনীতি ও গণতন্ত্রের পরিসর বাড়ছে। আসুন, আমরা এক হয়ে সবার অধিকার আদায়ের কথা ও কাজে নেমে পড়ি। সেটাই গণতন্ত্রের দাবি আমাদের কাছে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

একচিলতে সুখের উল্টো পিঠের কিছু গল্প

নিউইয়র্ক শহরের একটি এলাকা
কয়েক দিন আগের কথা। শীতের সকাল। আগের দিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলো। টান টান উত্তেজনায় রাত জেগে ফলাফল জানল শহরের মানুষজন। অথচ বাইরের জনজীবন ঠিক প্রতিদিনকার মতোই স্বাভাবিক। স্বাভাবিক নেই শুধু প্রকৃতি। শহর জুড়ে অন্ধকার। হালকা বৃষ্টির মাঝে হাঁটছি ওয়েস্ট ফোর স্ট্রিট ধরে। একে একে পেরোচ্ছি অ্যাভিনিউ নাইন, টেন...। অতঃপর নির্দিষ্ট ঠিকানার সামনে এসে দাঁড়াই। ছাইরঙা ইটের দালান। সামনে প্রশস্ত ফুটপাতে ছাইরঙা একটি একলা কবুতর আর মাথার ওপরেও সেই ছাইরঙা মেঘলা আকাশ। গেট পেরিয়ে ইনফরমেশন ডেস্কে বসা নারীকে ফাইলটি বুঝিয়ে দিয়ে ফিরছি আমি আর আমার প্রতিবেশী এক দাদা।
আমরা দুজনই এসেছিলাম আমাদের সন্তানদের হাইস্কুলে ভর্তির কাগজপত্র জমা দিতে। ট্রেন স্টেশনের উদ্দেশে হেঁটে যেতে যেতে দাদা পুরোনো দিনের গল্প করছিলেন। সুউচ্চ বাড়িগুলোর মাঝে দু-একটি ছোট দোতলা পুরোনো বাড়ি এখনো রয়ে গেছে। এখানেই ৫০৯ নম্বর বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ালেন ক্ষণিক। যে বাড়িটিতে তিনি বসবাস করেছেন আজ থেকে অনেক বছর আগে। ব্যাচেলর বাঙালিরা থাকতেন বাড়িটিতে সেই সময়ে। বাদ বাকি সকলেই শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। বললেন, সেই সময়কার যাপিত জীবনের কথা। সাদারা কেবলই ম্যানেজমেন্টে অভিযোগ করত জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টারত কিছু যুবকের বিরুদ্ধে। তাঁদের অপরাধ, তাঁরা রোজ বাঙালি মসলাযুক্ত খাবার রান্না করে। রান্নার সেই সব গন্ধ অ্যাপার্টমেন্টটিতে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের অপরাধ সারা দিন কাজের শেষে পরিবার পরিজনহীন এই শহরে বাড়ি ফিরে তাঁরা গল্পে মশগুল হয়, উচ্চস্বরে হেসে ওঠে কিংবা শব্দ করে হাঁটে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মাঝেও আমার বাড়ি ফিরবার তাড়া নেই। গল্প শুনছি। শুনতে শুনতে আমি যেন সেই সময়ে ফিরে যাচ্ছি। কারও পেছনের কালের গল্প শুনে কেউ কি সেই সময়কে ধারণ করতে পারে? কিন্তু আমি যেন সেই সময়কেই ধারণ করছিলাম। দাদা একটি সুউচ্চ দালান দেখিয়ে বললেন, এই যে দালান, এটি সেই সময়ে ছিল না। এখানে একটি পার্ক ছিল।
একদল মাতাল এই পার্কটিতে জটলা করে থাকত দিনভর। তিনি আঙুল উঁচিয়ে দূরে দেখালেন। তাঁকে অনুসরণ করে সেদিকে তাকাই। বললেন, ওই যে রাস্তার মোড়, ওখানে বসে আমি বই বিক্রি করতাম কনকনে শীতের দিনে, কখনো তুষারের মাঝে। আয়কৃত ডলার দেশে পাঠাতাম। পুরোনো সেই সব গল্প করতে গিয়ে তিনি বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠছিলেন। হবেনই বা না কেন! এই জায়গাটায় কেটেছে তাঁর বিগত সময়ের অনেকটাই। এখানেই যে মায়ায় জড়িয়ে থাকা স্ট্রিট, অ্যাভিনিউ আর শেওলা পড়া বাড়িটি। তিনি এ দেশে এসেছেন গত শতকের সাতের দশকে। ১৯৭৭ সালে। স্টুডেন্ট ভিসায় এলেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি অর্থ সংকটে। অনেক চড়াই উতরাই শেষে বৈধ কাগজপত্র পেয়েছেন। দুটো বাড়ি কিনেছেন। এখন পরিবার নিয়ে ভালো আছেন। প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে টিকে থাকতে কত মানুষ কতভাবেই না শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন ভিনদেশে। পরিবারের একচিলতে সুখের উল্টো পিঠে কিছু গল্প থাকে। সাহসী সেই সব মানুষদের গল্পগুলো ভিন্ন ভিন্ন যদিও, কিন্তু আবেগে ভিন্নতা নেই কারওরই।