Showing posts with label ইমদাদুল হক মিলন. Show all posts
Showing posts with label ইমদাদুল হক মিলন. Show all posts

Wednesday, March 15, 2023

গল্প- বাবার কিছু ঋণ ছিল by ইমদাদুল হক মিলন

৫ অক্টোবর ২০১৭ সকালবেলা

স্যার, একজন লোক আসছে।

কোত্থেকে?

বাইন্নানগর। ইয়ে মানে বানিয়ানগর। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকা।

চোখ তুলে জিন্নাহর দিকে তাকালাম। কী নাম?

রশিদুল।

বানিয়ানগর থেকে এসেছে শুনেই বুঝেছিলাম, রশিদুলই হবে। আমার কিশোরবেলার বন্ধু। বহু বছর তার সঙ্গে দেখা নেই, যোগাযোগ নেই। অথচ একটা সময়ে আমরা দুজন দুজনার জন্য পাগল ছিলাম। দিনের বেশিরভাগ সময় একসঙ্গে। কত রাত রশিদুলের সঙ্গে ওদের বাড়িতে ঘুমিয়েছি।

বসিয়েছিস?

জি স্যার।

চা-নাশতা দে। আসছি।

ড্রয়িংরুমের কোনার দিককার একটা সোফায় বসে আছে রশিদুল। সামনে চা-বিস্কুট-মিষ্টি। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। কেমন আছ, দিপু?

ভালো আছি, ভালো আছি। দাঁড়ালে কেন? বসো, চা খাও।

রশিদুল বসল। চায়ে চুমুক দিলো। আমি বসলাম মুখোমুখি সোফায়। অপলক চোখে রশিদুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওকে আর চেনাই যায় না। শরীর একেবারেই ভেঙে গেছে। হলুদের কাছাকাছি রঙের ময়লা ফুলহাতা শার্ট পরা। কালো প্যান্টটাও যাচ্ছেতাই রকমের ময়লা। পায়ের স্যান্ডেল নতুন। তবে খুবই সস্তা ধরনের। আমি যে-রশিদুলকে দেখেছি, কে বলবে এই মানুষটাই সে।

পাকা শবরি কলার মতো রং ছিল রশিদুলের। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় থেকে ব্যায়াম করতো। কী সুন্দর স্বাস্থ্য! চেহারা ফুটফুটে। দামি প্যান্ট-শার্ট পরতো। পকেটে সব সময় টাকা। দুহাতে আমার জন্য খরচা করতো। বাড়ির ছোট ছেলে। অবস্থাপন্ন। মা বাবা বড় দুইভাই খুবই আদর করতো। সদরঘাটে কাপড়ের দোকান ছিল চারটা না পাঁচটা। বড় দুই ছেলে নিয়ে রশিদুলের বাবা চালাতেন। পকেটে পয়সা না থাকলেই দোকানে গিয়ে নিয়ে আসতো রশিদুল। নারিন্দার মোরগ-পোলাও খাওয়াতো আমাকে। আলাউদ্দিন রোডে নিয়ে হাজির বিরিয়ানি খাওয়াতো। সোনা মিয়ার দোকানের দই মিষ্টি, গরমের দিনে গস্নলাসের পর গস্নলাস লাচ্ছি, সালাউদ্দিনের দোকানের সরভাসা চায়ের সঙ্গে পরোটা, বাকরখানি। আমার তখন শুধুই খিদা পেত। অভাবের সংসার। এতগুলো ভাইবোন। বাবার ছোট চাকরি। নিজে না খেয়ে কতদিন রশিদুল আমাকে খাইয়েছে। দুপুরের পর বা রাতের বেলা রশিদুল আমাকে নিয়ে গেছে ওদের বাড়িতে। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। ছোট ছেলের খাবার ঢেকে রেখেছেন ওর মা। একজনের খাবার দুজনে ভাগ করে খাইনি আমরা। রশিদুল বলেছে, তুমি খাও দিপু। আমার খিদা নাই …

তুমি আছো কেমন, রশিদুল?

ভালোই আছিলাম। হঠাৎ একটু বিপদে পড়ছি।

কী করছো এখন?

ওই সেই কাজটাই।

কী যেন করতে তুমি? আমি ভুলে গেছি।

ভুইলা যাওয়ারই কথা। তুমি এত ব্যস্ত লোক। এতদিন দেখা-সাক্ষাৎ নাই। আমি অনেকবার তোমারে ফোন করছি। ধরো নাই। ব্যস্ত ছিলা বা বিদেশে ছিলা। হয়তো আমার ফোন নম্বরও তোমার কাছে সেভ করা নাই।

না সেভ করা আছে। ইচ্ছা করেই ধরিনি।

একটা টাইমে আমি সেইটা বুজছি। এই জন্য আর ফোন করি নাই।

তুমি আমার এমন বন্ধু, তোমার ফোন আমি ধরছি না, তোমার মনে হয়নি, কেন তোমার ফোন আমি ধরছি না?

হয়তো কোনো কারণে আমার উপরে রাগ হইছো।

সেটা তোমার জানতে ইচ্ছা করেনি?

রশিদুল চুপ করে রইল। চায়ে শেষ চুমুক দিলো।

শুধু চা খেলে কেন?

আমি নাশতা কইরা আইছি। তুমি আসার আগে এইখান থিকা একটা মিষ্টিও খাইছি।

ডায়াবেটিস নাই তো?

না। অসুখ-বিসুখ নাই। শরীর ভালোই আছে।

আমিও আলস্নলাহর রহমতে ভালো আছি।

সেইটা তোমারে দেইখাই বুঝা যায়।

তবে তোমার শরীর ভেঙে গেছে।

হ ভাঙছে। নানান অসুবিধায় থাকি। তুমি কাজের কথা জানতে চাইছিলা। আমি বড়লোকদের বাড়ির লনে, কোনো কোনো মিলকারখানার সামনের লনে, পিছনের বাগানে মূর্তি বানাইয়া দেই। ফোয়ারা বানাইয়া দেই। এই সমস্ত কাজ করি।

তাতে চলতে পারো?

পারি। মাঝে মাঝে ভালোই কাজ থাকে হাতে। মাঝে মাঝে থাকে না। কোনো কোনো পার্টি টাকা-পয়সা নিয়া ঘুরায়। তখন বিপদে পড়ি। এইবার সেইরকম একটা বিপদে পড়ছি। নতুন একটা কাজও পাইছি। আড়াই-তিন লাখ টাকার কাজ হইব। এইসব কাজের শুরুর সময় নিজের কিছু ইনভেস্ট করতে হয়। হাতে নাই কিছুই। বড় মেয়েটা আইএ পরীক্ষা দিব, ওর লেইগাও কিছু টাকার দরকার …

তোমার তো দুটোই মেয়ে?

হ। আমি বিয়া করলাম অনেক দেরি কইরা। বড় মেয়েটা আইএ পড়ে, ছোটটা পড়ে ক্লাস নাইনে …

আর আমি দাদা হয়ে গেছি। নাতনির বয়স আট বছর।

তাই নাকি? গগনের মেয়ের আট বছর বয়েস?

হ্যাঁ। সে হচ্ছে আমার জান। সারাক্ষণ দাদার সঙ্গে। ওর জন্যই গগনকে বিজনেস বুঝিয়ে দিয়েছি। কিছুই আমি দেখি না। গগন আর ওর বউ দেখে। আমার বউমার নাম অনন্যা। সেও অস্ট্রেলিয়া থেকে এমবিএ করে এসেছে। গগনের সঙ্গেই পড়তো। দারুণ মেয়ে। যেমন হিসাবি, তেমন সংসারি। ওরা দুজন বিজনেস সামলায় আমি আর শাহিন আছি নাতনি নিয়ে। নাতনির নাম জাইমা।

তোমার ছেলের নাম গগন, এইটা আমার মনে আছে। কাকার ডাকনাম আছিল গগন। এইজন্য তুমি তোমার ছেলের নাম রাখছো।

বাবার কথা মনে হলেই আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ে। এখনো পড়ল। কী অমানুষিক কষ্ট একজন মানুষ তাঁর সংসার-ছেলেমেয়েদের জন্য করে গেছেন। আজকালকার দিনে সেটা ভাবাই যায় না। আমার ভাইবোনরা সবাই ভালো আছে। কেউ দেশে, কেউ আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ ইতালিতে, কেউ ওমানে। বাবার কষ্টের কথা, আমাদের অতীতের কথা মনেও রাখেনি। এমনকি বাবার মৃত্যুদিনটির কথাও মনে রাখে না কেউ কেউ।

আমি রেখেছি। যখনই নিজের ছেলেটিকে দেখি, নাম ধরে তাকে ডাকি না, ডাকি বাবা বলে, সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে বাবার কথা। বেঁচে থাকলে বাবার বয়স হতো এখন বিরানববই বছর। এই বয়সের কত মানুষ আছে চারদিকে। বেঁচে থাকলে বাবা দেখে যেতে পারতেন তাঁর ছেলেমেয়েরা কেমন আছে। তাঁর দিপু কেমন আছে। আহা রে, আমার বাবাকে আমি বুকে তুলে রাখতাম।

রশিদুল, তুমি এখনো সেই বাড়িতেই আছো?

হ ভাই। ওই বাড়িতেই আছি। কই আর যামু, কও? সব মিলাইয়া পোনে চাইর কাঠার মতন জায়গা। লম্বা আর চিপা। দুইজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে পারে না।

মনে আছে, মনে আছে। দোতলা টিনের ঘরটা আছে?

না, ওইসব কিছুই নাই। ভাগ-বাটোয়ারা হইয়া গেছে। আমার তো একটাই বইন আর আমরা তিন ভাই। বইনের অংশটা বড়ভাই কিনা রাখছিল। দুই ভাই সামনের অংশ নিছে, আমি পাইছি পিছনের অংশ। এক কাঠার মতন হইব। খালি আমার ঘরটাই টিনের। বড় ভাইরা দোতলা বিল্ডিং করছে। বড়ভাই মারা গেছে। তার ছেলেরা আছে। দুই ছেলে। ওরা থাকে। অবস্থা তেমন ভালো না। সদরঘাটের ফুটপাতে দোকানদারি করে। মাজারো ভাই সৌদিতে আছিল। কিছু টেকা-পয়সা আছে। ওর এক মাইয়া। বিয়া হইয়া গেছে। জামাই কিছু করে না। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়া মাইয়া আমগো বাড়িতে থাকে। জামাইটা নেশা করে। ফেনসিডিল খায়।

তোমাদের একসময় খুবই ভালো অবস্থা ছিল। এমন হলো কেন? সদরঘাটের দোকানগুলোর কী হলো?

বাবা মারা যাওয়ার পর আসেত্ম আসেত্ম সব গেছে। দোকানে লোকসান হয়। ভাইরা যে যার মতন টাকা সরায়। মা হিসাব চাইলে ঝগড়া করে। আমি কথা কইলে মারামারি লাগনের দশা হয়। মায় মরণের আগেই একটা একটা কইরা গেল পাঁচটা দোকান। এখন নাই কিছুই। তাও ওই বাড়ি না থাকলে কই যে ভাইসা যাইতাম!

রশিদুল কাতর চোখে আমার দিকে তাকালো। দিপু, বিপদে পইড়া তোমার কাছে আইছি ভাই।

আমি রশিদুলের কথার ধার দিয়েও যাই না। তোমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই কত বছর হবে, রশিদুল?

আমার বিয়ার পরপরই। বাইশ-তেইশ বছর হইব।

ঠিক তেইশ বছর। তেইশ বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা। বিয়ের আগেও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ফোনে কথা হতো। দেখা হতো মাঝে মাঝে। তোমাদের বাসায় ফোন ছিল না। পাশের বাড়ির একটা নাম্বার ছিল আমার কাছে। ওই নাম্বারে ফোন করলে ওরা ডেকে দিতো।

মনে আছে। তখন মোবাইল আসে নাই দেশে। বিয়ার আগে তো যোগাযোগ আছিলই, বিয়ার পরও কিছুদিন আছিল। তারপরই যোগাযোগ বন্ধ হইয়া গেল। আমার বিয়াতে তোমরা যাইতে পারো নাই। শাহিনরে নিয়া তুমি গেছিলা আমরিকায়।

ঠিক। একদম ঠিক। আমেরিকা থেকে এসে তোমাদের বাড়িতেও একদিন গিয়েছিলাম। তোমার বউ দেখলাম। তাকে সোনার একটা চেন দিলাম। তোমার বউকে বললাম আমরা কী রকম বন্ধু। আমি বললাম তুমিও বললে। তার পরও তোমার বউ …

রশিদুল তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকালো। সায়রা কী করছিল?

বলবো, বলবো। এতদিন পর তুমি যখন এসেছই, সে-কথা অবশ্যই বলবো। তোমাকে দেখে বাবার কথা মনে পড়ল। আমার বাবাকে তুমি কাকা বলতে। আজো বললে। ভালো লাগল খুব। ছেলের নাম গগন রেখেছি বাবার কথা ভেবে। বাবা ডাকি। যেন আমার বাবা বেঁচে আছেন, আমার সঙ্গেই আছেন। অফিস থেকে ফিরে এলে আমি যেমন সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে সঙ্গে থাকতাম, বাবা বাবা করে শুধু ডাকতাম, ছেলে বাড়ি থাকলে ওকে যখন বাবা বাবা বলে ডাকতে থাকি, মনে হয় আমি আমার বাবাকেই ডাকছি।

কাকায় তোমারে সবথিকা বেশি আদর করতো। তুমিও কাকার জন্য পাগল আছিলা। কও দিপু, সায়রা কী করছিল?

তার আগে তুমি আমার দুয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দাও। এই যে এতগুলো বছর কেটে গেল, তুমি কখনো আমার কাছে আসোনি কেন বা জানতে চাইলে না কেন, কী কারণে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি না?

ভাবছি কোনো কারণে তুমি আমার উপরে রাগ হইয়া রইছো।

যদি তাও হতো, সেই রাগ ভাঙাবার চেষ্টা করবে না? তুমি আমার এমন বন্ধু!

ওই যে বললাম, ভাবছি তুমি ব্যস্ত মানুষ, এতবড় ব্যবসা করো। বিদেশে থাকো বেশিরভাগ সময়, তোমারে বিরক্ত না করি। তারপর সংসারের চাপ, ভাইগো লগে বাড়ি লইয়া ঝগড়া-বিবাদ। কামকাইজের চাপ, সব মিলাইয়া জীবনডা আগের দিনের মতন নাই। এই আর কি! দুই-চাইরবার তোমারে ফোন কইরা দেকলাম। তুমি আমার ফোনও ধরো না, কাইটা দেও, কলব্যাকও করো না। মনে করলাম, তুমি বড় মানুষ, ছোটবেলার গরিব বন্ধুরে হয়তো মনে রাখতে চাও না, এই জন্য আর চেষ্টা করি নাই। ঠিক আছে, থাকি যে যার মতন।

আমি কিন্তু তোমার খবর রাখতাম। যদিও গেণ্ডারিয়ায় যাওয়া হয় না বহু বছর। নিজেদের বাড়ি আমাদের ছিল না। ভাড়ায় থাকতাম। শাহিনদের বাড়ি ছিল। মাঝে মাঝে সেই বাড়িতে যেতাম। তাও এক দুবছরে এক-আধবার। সেই বাড়ি ডেভেলপারকে দিয়ে দেওয়া হলো। শাহিনের একটা ফ্ল্যাট আছে। ভাড়া দেওয়া। শাহিনও সেই বাড়িতে আর যায় না। কেউ নেই তো! ওর চাচা-ফুফুরা, ভাইরা সবাই ওই এলাকা ছেড়েছে। কেউ উত্তরায় কেউ গুলশান বনানী বারিধারা বা বসুন্ধরায়। আর যেরকম ট্রাফিক জ্যাম! পুরান ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কটা শেষই হয়ে গেছে আমাদের। তবে পুরনো দিনের বন্ধুদের খোঁজখবর আমি রাখি। কে কেমন আছে, জানি। তোমার খবরও রাখতাম। দুই মেয়ে নিয়ে মোটামুটি দিন চলছে তোমার, এসব জানতাম। তোমার বউর কারণে সম্পর্কটা আর রাখতে চাইনি।

কী করছিল সে এইটা আমারে কও ভাই। আমি কিছুই বুঝতে পারতাছি না।

তোমার বিয়ের মাস তিন-চারেক পরের ঘটনা। আমি বিজনেস শুরু করেছিলাম তিন বন্ধুর সঙ্গে। অর্থাৎ আমরা চারজন পার্টনার। ওদের কাউকে তুমি চেনো না। আমার অন্য সার্কেলের বন্ধু। টাকা বেশি ওদেরই। গার্মেন্টস করলাম একটা। সেখান থেকে এখন আঠারোটা প্রতিষ্ঠান আমাদের। যখন শুরু করি, তখন থাকি মগবাজারের ফ্ল্যাটে। তারপর উত্তরায় এই বাড়ি করে চলে এলাম। যা হোক, আমার ছেলেটা ছোট। ভাইরা যে যাকে নিয়ে আছে। তাদের অবস্থা ভালো। বোনদের অবস্থা ভালো। বিজনেস নিয়ে খুবই  ব্যস্ত থাকি আমি। বিজনেসে আমাকে হেলপ করার বা পাশে থেকে একটু সহযোগিতা করার কেউ নেই। ওদিকে তুমি বিয়ে করেছ কিন্তু তোমার সেভাবে চলার অবস্থা নেই। ভাবলাম, একা একা দৌড়াদৌড়ি করি, তোমাকে রাখি সঙ্গে। আমি বিদেশ-টিদেশ গেলে তুমি সব দেখলে। যদিও পরে সেটা শাহিন করতো। আমি চাইনি আমার বউ বিজনেসে ইনভলভ হোক। পরে বাধ্য হয়ে তা করতে হলো। আমি দেশে না থাকলে শাহিন অফিসে যেত, ফ্ল্যাক্টরিতে যেত। ওই জায়গাটায় আমি তোমাকে চেয়েছিলাম। শাহিনও তাই বলেছিল। এক দুপুরে তোমাকে ফোন করলাম। পাশের বাড়ির সবাই আমাকে চেনে। তোমাকে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে দেয়। সেদিনও ডাকলো। তুমি ধরলে না, ফোন ধরলো তোমার বউ। বললাম, রশিদুলকে একটু ডেকে দাও। জরুরি কথা আছে। তোমার বউ বেশ রুক্ষ ভঙ্গিতে সরাসরি বললো, এখন ডেকে দেওয়া যাবে না। সে ঘুমায়। আমি বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেলাম। বললাম, তুমি গিয়ে আমার কথা বলো, আমার কথা বললে সে উঠে এসে ফোন ধরবে। তখন সে আরো রুক্ষ হলো। তার দরকার কী? আপনেই পরে ফোন কইরেন। রাখি এখন।

রশিদুল ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়েছিল। কোনো রকমে বলল, কও কী?

হ্যাঁ, এইভাবেই বলেছিল এবং ফোন রেখে দিয়েছিল। কেন, তুমি জানো না?

না।

না মানে? তোমাকে সে বলেনি?

না।

আমি ফোন করেছিলাম, বলেনি?

না।

বলো কী?

হ। আমারে বলে নাই। তুমি ফোন করছিলা এইটা আমি জানিই না।

নিশ্চয় বলেছে। তুমি ভুলে গেছ। তেইশ বছর আগের কথা।

যত বছর আগের কথাই হোক, তোমার ব্যাপারে কোনো কথা আমি ভুলুম না। সে আমারে কিছুই বলে নাই। কথাটা আইজ, এই পয়লা আমি শোনলাম।

আমি হতবাক হয়ে রশিদুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আশ্চর্য ব্যাপার! তোমার বউর ব্যবহারে আমি তো অবাক হয়েইছিলাম, তারপর আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম তুমি আমাকে ফোন করছো না, যোগাযোগ করছো না। ভাবলাম নিশ্চয় আমার কথা তুমি আর সেভাবে মনে রাখতে চাইছো না বা কোনো ব্যাপারে তুমি এবং তোমার বউ দুজনেই আমার ওপর বিরক্ত। এসব নিয়ে শাহিনের সঙ্গে কথা বললাম। সে একটা অদ্ভুত কথা বললো। বললো যে, রশিদুলভাই আর তার বউ বিয়েতে হয়তো আমাদের কাছ থেকে বড় রকমের কোনো কিছু আশা করেছিল। যখন দেখলো তেমন কিছু হলো না, তখন দুজনেই বিরক্ত হয়েছে। বিরক্ত থেকে হয়েছে রাগ। আশাহত হলে এমন রাগ মানুষের হতেই পারে। আমি তুমি একসঙ্গে থাকলে অন্যদিকে খেয়াল থাকে না আমাদের। বউরা কিন্তু অনেক কিছু খেয়াল করে। আমেরিকা থেকে এসে আমি আর শাহিন গেলাম তোমার বউ দেখতে। বায়তুল মোকাররম থেকে একটা চেন কিনে নিয়ে গেলাম। শাহিন সেটা দিলো তোমার বউকে। আমি খেয়াল করিনি, শাহিন খেয়াল করেছে, চেনের জন্য ছোট্ট মখমলের একটা থলি দেয় সোনার দোকান থেকে, সেই থলি থেকে চেনটা বের করে তোমার বউ নাকি হাতের তালুতে নিয়ে সেটার ওজন বোঝার চেষ্টা করছিল। সোনার জিনিস গিফট পেলে মেয়েদের মুখ আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। তার কিছুই তোমার বউর হলো না, বরং মুখে একটু অসন্তুষ্টি দেখা গেল। অর্থাৎ সে মোটেই খুশি হলো না। শাহিন পরে আমাকে বলেছে, মানে ফোনের ঘটনা শুনে বলেছে, রশিদুলভাইয়ের বউ আমাদের ওপর বিরক্ত। নিশ্চয় রশিদুলভাইকে নানা রকম কথা বলে তোমার ব্যাপারে তার মন বিষিয়ে দিয়েছে। নয়তো সে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে না কেন? কিশোর বয়স থেকে তোমরা এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু!

রশিদুল আগের মতোই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে যাচ্ছে।

তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে শোনার পর থেকেই ভেবে রেখেছিলাম, তোমাকে আমার সঙ্গে রাখবো। যে-কাজ করো ওই করে জীবন চলবে না। ধীরে ধীরে তোমার জীবনটা আমি বদলে দেবো। এজন্য তোমার বিয়ে নিয়ে সেভাবে আমি ভাবিনি। ভেবেছি তুমি তোমার মতো বিয়েটা সেরে ফেলো। তারপর তোমার চলার ভালো একটা পথ আমি করে দেবো। নয়তো তোমার বিয়েতে লাখখানেক টাকা তো আমি দিতেই পারতাম।

আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ভাবলাম এক, হয়ে গেল আরেক।

রশিদুল কাতর গলায় বললো, আমার কপাল। কপালের দোষ।

তারপর তুমি যখন এক-দেড় বছর পর, হঠাৎ হঠাৎ ফোন করতে, আমি বুঝতাম, নিশ্চয় আর্থিক অসুবিধায় পড়ে ফোন করেছো। এজন্য তোমার ফোন ধরতাম না। কেটে দিতাম। শাহিনকে তোমার ফোনের কথা বলতাম। শাহিন বলতো, রশিদুলভাই থাকুক তার বউ নিয়ে। আমাদের কী দরকার তাকে নিয়ে ভাববার? যে আমাদের কথা ভাববে না তার কথা আমরা কেন ভাবব? তুমি তো চেয়েই ছিলে তার জীবন বদলে দিতে, বউটার জন্যই হলো না।

রশিদুল হাহাকারের গলায় বলল, আহা রে, আহা। কোথায় থিকা কী হইয়া গেল! কপাল, সব আমার কপাল!

এ-সময় জাইমার গলা শোনা গেল। দাদু, দাদু। কোথায় তুমি?

আমি উঠে দাঁড়ালাম। এই তো, এখানে। দাঁড়াও, আসছি।

রশিদুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, আজ ছুটির দিন। নাতনিটা বেলা করে উঠেছে। আমি একটু ওর সঙ্গে দেখা করে আসি। আমাকে না দেখা পর্যন্ত হাতমুখ ধোবে না, খাবে না। তুমি বসো। আরেক কাপ চা দিতে বলব?

না ভাই। যেই জন্য আইছি …

বসো, বসো।

জাইমা না ডাকলেও অবশ্য আমি উঠতাম। রশিদুল কেন এসেছে তা শুরুতেই বুঝেছি। শাহিনকেও ঘটনাটা বলা দরকার। সে অবশ্য জানে না রশিদুল এসেছে। সব শোনার পর নিশ্চয় দেখা করতে আসবে। তাকে বলে দেবো বিষয়টা যেন না তোলে। তাহলে রশিদুল লজ্জা পাবে। রশিদুলকেও বলা দরকার, শাহিন এলে তাকে যেন ওসব বিষয়ে কিছুই না বলে।

দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলাম। ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বললাম। রশিদুল মাথা নাড়লো।

জাইমা আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির সামনে। বললো, কোথায় ছিলে তুমি? আমি এতক্ষণ ধরে ডাকছি? শুনতে পাওনি?

পেয়েছি তো। তোমার ডাক শুনেই তো ছুটে এলাম।

আমার গলা শুনে শাহিন বেরিয়ে এলো। জাইমাকে সে ডাকে প্রিন্সেস। বলল, প্রিন্সেস তো পাগল হয়ে গেল তোমার জন্য? কে এসেছে তোমার কাছে?

রশিদুলের কথা বললাম। শুনে সে খুবই অবাক। রশিদুলভাই এত বছর পর?

সংক্ষেপে ঘটনা তাকে বললাম। সে অবাক। বলো কী?

হ্যাঁ। দেখো তো কী কা-! একটা ফোন আর রশিদুলের বউয়ের ওইটুকু কথায় কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল! তুমি গিয়ে রশিদুলের সঙ্গে কথা বলো। আমি জাইমাকে একটু সময় দিয়ে আসছি।

জাইমা বলল, সময় আবার কী? আমাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে তারপর যাবে।

ওকে মাই ডিয়ার, ওকে।

মিনিট পনেরো পর ড্রয়িংরুমে এলাম। জাইমাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে নিজের বেডরুম ঘুরে এসেছি। জাইমাও আসতে চেয়েছিল এই রুমে। তাকে ট্যাব ধরিয়ে দিয়েছি। ওই জিনিস নিয়ে এখন গেমস খেলবে।

ড্রয়িংরুমে এসে দেখি ভালোই গল্প করছে শাহিন আর রশিদুল। আমি আসার পর শাহিন উঠল। তোমরা আড্ডা দাও। আমি যাই। রশিদুলভাই, দুপুরে আমাদের সঙ্গে খেয়ে যাবেন।

রশিদুল বিনীত গলায় বলল, না বইন, আইজ না। আরেকদিন আইসা খামুনে। আইজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হইব। অসুবিধা আছে।

শাহিন সিঁড়ির দিকে চলে গেল। রশিদুল উঠে এসে দুহাতে আমার ডানহাতটা জড়িয়ে ধরল। সায়রার কথা তুমি মনে রাইখো না ভাই। ওর হইয়া আমি তোমার কাছে মাফ চাইতাছি।

আরে না না, মাফ চাওয়ার কিছু নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তুমি বসো।

বসনের আর টাইম নাই ভাই। দুইদিন ধইরা বাড়িতে বাজার নাই। মাইয়া দুইটার শুকনা মুখ আমি আর সহ্য করতে পারতাছি না। কত জায়গায় চেষ্টা করলাম, দুইশো টাকাও জোগাড় করতে পারি নাই। উপায় না দেইখা তোমার কাছে আইছি। অন্তত পাঁচ হাজার টাকা তুমি আমারে দেও। কামকাইজ পাইলে টাকাটা আমি ফিরত দিমু। মাইয়া দুইটার মুখের দিকে আমি তাকাইতে পারি না। দিপু …

রশিদুল হু-হু করে কাঁদতে লাগল। আর আমার তখন অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো, রশিদুলের কান্নায় আমি আমার বাবার মুখটা দেখতে পাই। রশিদুলের মেয়েদের শুকনা অনাহারি মুখের কথা ভেবে দেখতে পাই আমার বোনদের অনাহারি শুকনা মুখ। আমার চোখ চলে যায় বহু বহু বছর পিছনে ফেলে আসা এক জীবনে। বাবার চাকরি নেই। বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না। বাজার করতে পারছেন না। ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছেন না তিনবেলা। ধারের আশায় অনাহারি মানুষটা কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন! এক দুপুরে খেতে বসেছেন। সামান্য ভাত আর ডাল। মা করুণ মুখে বসে আছেন সামনে। ভাত মুখে তুলতে গিয়ে এই রশিদুলের মতো করে কাঁদতে লাগলেন বাবা। চোখের পানি টপটপ করে পড়তে লাগল ভাতের থালায়। ছেলেমেয়েদের খেতে দিতে পারেন না এই কষ্টে কাঁদছিলেন মানুষটা …

রশিদুলের কান্নার সঙ্গে বাবার সেই কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আমার বুক উথাল-পাথাল করছিল। চোখে পানি আসছিল। একহাতে রশিদুলকে বুকে জড়িয়ে ধরা গলায় বললাম, কেঁদো না, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

বেডরুমে ঢুকেছিলাম টাকার জন্য। পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল খামে ভরে নিয়ে এসেছি। ট্রাউজার্সের পকেটে খামটা ছিল। বের করে রশিদুলের হাতে দিলাম। এখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। এটা দিয়ে চলো। পরে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো। দেখা যাক কী হয়।

রশিদুল তখনো কাঁদছে আর আমার মন চলে গেছে বহু বছর পিছনে ফেলে আসা একটি দিনে।

১৯৬৮ সালের কোনো একদিন

রশিদুলকে দেখার পর থেকে একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে।

শাহিন আমার দিকে তাকালো। বিকেলবেলা আমরা দুজন আমাদের বেডরুমের সঙ্গের বারান্দায় মাঝে মাঝে বসি। চা খাই, টুকটাক গল্প করি। কখনো কখনো জাইমা থাকে আমাদের সঙ্গে। স্থির হয়ে তো আর বসে না। একবার দৌড়ে আসে, আবার দৌড়ে চলে যায়। কত রকমের ব্যস্ততা তার।

আজ জাইমা বাড়িতে নেই। ছুটির দিন বিকেলে গগন আর অনন্যা মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যায়। রাতে নামকরা রেস্টুরেন্টে ডিনার করে ফেরে।

আজো সেরকম কোথাও গেছে।

জাইমা বাড়িতে না থাকলে পুরো বাড়ি ফাঁকা লাগে। নির্জন লাগে। মনে হয় বাড়িতে লোকজনই নেই।

শাহিন বলল, কোন ঘটনা বলো তো? তোমার জীবনের সব ঘটনাই আমাকে বলেছো। আমি জানি প্রায় সবই।

এটা বোধহয় জানো না। এটা তোমাকে বলা হয়নি। আমিই ভুলে গিয়েছিলাম। আজ রশিদুলকে দেখার পর মনে পড়ল।

বলো শুনি।

আটষট্টি সালের কথা। আমি আর রশিদুল ক্লাস এইটে পড়ি। বাবার চাকরি নেই। সংসারে তীব্র অভাব। কোনো কোনো দিন বাজারই হয় না। আক্ষরিক অর্থেই আমরা না খেয়ে থাকি। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বাবা কিছু জোগাড় করতে পারলে …

তোমার এসব কষ্টের কথা শুনলে তোমার জন্য আমার খুব মায়া লাগে। মনে হয় তোমার মাথায় একটু আদর করে দিই।

শোনো, ওরকম একদিনের ঘটনা। আমি কখনো স্কুল কামাই দিতাম না। তারও একটা কারণ ছিল। স্কুলে খুব ভালো টিফিন দিত। বড় একটা মালপোয়া পিঠা, লুচি-হালুয়া, জিলাপি। কোনো কোনো দিন ওই খেয়ে আমার দিনরাত কেটে গেছে। আমার টিফিন খাওয়াটা খেয়াল করে দেখতো রশিদুল। বুঝতো সকালে আমার কিছুই খাওয়া হয়নি। সে তার টিফিনটা আমাকে দিয়ে দিত। দিত এমন করে, যেন আমি কিছু মনে না করতে পারি। অনাহারি মধ্যবিত্ত মানুষের এক ধরনের অহংকার থাকে। আড়ষ্টতা আর লজ্জা থাকে। রশিদুল ভাবতো, সরাসরি তার টিফিনটা আমাকে দিয়ে দিলে আমি নাও নিতে পারি। বুদ্ধি করে কাজটা সে করতো। টিফিন হাতে নিয়ে খেতো না। হঠাৎ আমার সামনে এসে বলতো, দিপু, আমার টিফিনটাও তুমি নেও। খাইতে ভাল ল্লাগতাছে না। স্কুলে আসার আগে মায় জোর কইরা বেশি ভাত খাওয়াইয়া দিছে। একেকদিন এরকম একেক অজুহাত। আমি আড়ষ্ট ভঙ্গিতে ওর টিফিন নিতাম। আমাকে তৃপ্তি করে খেতে দেখে গভীর আনন্দে চকচক করতো রশিদুলের চোখ।

আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।

মিতু মেয়েটা এসময় বিকালের চা-নাশতা নিয়ে এলো। পাপড় ভাজা আর লিকার চা। আমি একটা পাপড় নিয়ে মুখে দিলাম। চায়ে চুমুক দিলাম। সেদিন সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। বাসায় একমুঠ মুড়িও ছিল না। সাড়ে দশটার দিকে স্কুলে এসেছি। সাধারণত আমি আর রশিদুল একসঙ্গে স্কুলে আসতাম। বানিয়ানগর থেকে ও আসতো ডিস্টিলারি রোডে, আমাদের বাসায়। তারপর দুজনে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে যেতাম। ধূপখোলা মাঠের দক্ষিণ দিককার রাস্তা দিয়ে, সাধনা ঔষধালয়ের ওখান দিয়ে সোজা গেণ্ডারিয়া হাইস্কুল। সেদিন রশিদুল দেরি করছিল দেখে আমি একা একাই স্কুলে চলে এসেছি। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক কথা হয়েছে। সে খেয়াল করছিল আমার মুখটা শুকনা। বুঝে গিয়েছিল নিশ্চয় আমার কিছু খাওয়া হয়নি। আমাদের সংসারের অবস্থা সে জানতো। টিফিনের সময় ওরকম একটা অজুহাত তৈরি করে ওর টিফিনটা আমাকে দিলো। সেদিন টিফিন ছিল লুচি-হালুয়া। বড় একটা লুচির ভিতর এক চামচ হালুয়া ঢুকিয়ে ভাঁজ করে ছাত্রদের দিত। খুব টেস্টি হতো খাবারটা। দুটো লুচি খেয়ে ভালোই পেট ভরেছে আমার। তার পরও ছুটির পর রশিদুল আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল। চলো দিপু, বাড়িত গিয়া দুইজনে মিলা ভাত খাইয়া ধূপখোলা মাঠে খেলা দেখতে যামুনে। আইজ ইসটেন কেলাবের (ইস্ট এন্ড ক্লাব) খেলা আছে। যতক্ষণ স্কুলে থাকি, ভালো থাকি। রশিদুলের সঙ্গে থাকি, ভালো থাকি। বাসায় গেলেই মার শুকনা মুখ। ভাইবোনদের করুণ  ক্ষুধার্ত মুখ। বাবা হয়তো হতাশমুখে বাসায় ফিরেছেন …। গেলাম রশিদুলের সঙ্গে। ওদের বাড়িতে ভালো মাছ রান্না হয়, গরু-খাসির মাংস প্রচুর তেল দিয়ে রান্না হয়। বড় বড় টুকরা মাংসের। মুরগি রান্না হলে রান রেখে দেওয়া হয় রশিদুলের জন্য। রশিদুল সেসব আমাকে খাওয়ায়। তখন পর্যন্ত রশিদুলের বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ওর মার সঙ্গে হয়েছে, ভাইদের সঙ্গে হয়েছে। শুধু বাবার সঙ্গেই দেখা হয়নি বা পরিচয় হয়নি। তিনি দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। সেদিন বাড়িতে ছিলেন। জ্বর। বাড়িতে ঢুকেই সামনের ঘরে আমাকে বসিয়েছে রশিদুল। এই ঘরটা বসার ঘর, আবার রশিদুলের পড়ারও ঘর। টিনের দোতলা ঘরের নিচতলা।

অনেকক্ষণ পর কথা বলল শাহিন। ওই ঘরটা আমি দেখেছি। বিয়ের পর তোমার সঙ্গে একদিন গিয়েছিলাম। রশিদুলভাইয়ের বিয়ের পরও তো গেলাম।

হ্যাঁ। যাহোক যা বলছিলাম। বাড়িতে ঢুকেই রান্নাঘরে গিয়েপেস্নলটে করে ভাত নিয়ে এলো রশিদুল। বিকাল সাড়ে চারটার মতো বাজে। গরমের দিন। পেস্নট ঠেসে ভাত এনেছে রশিদুল। খাসির মাংসের বড় দুটো টুকরা দিয়েছে আমাকে। ঝোল আলু দিয়েছে। নিজে নিয়েছে একটু কম। আমরা খাওয়া শুরু করিনি, রশিদুলের বাবা ডাকলেন, রশিদুল, ওই রশিদুল, হুইন্না যা। তুমি তো বোধহয় জানোই রশিদুলরাও আমাদের মতোই, বিক্রমপুরের লোক। ওই ভাষায়ই কথা বলে। রশিদুল অবশ্য আগে আমাকে একদিন বলেছিল আমার বাবা ওদের বাড়িতে অনেকবার গিয়েছেন। ওর বাবাকে আমার বাবা ‘দাদা’ ডাকেন। রশিদুলের বাবা বয়সে বড়। বিক্রমপুরে ভাইশ্রেণির বড়দের দাদা ডাকারই নিয়ম। আর সেই জন্যই রশিদুল আমার বাবাকে কাকা ডাকে। তো, বাবার ডাক শুনে রাশিদুল বলল, বাবায় ডাকতাছে। লও দিপু, বাবার লগে তোমার পরিচয় করাইয়া দেই। তারবাদে আইসা ভাত খামুনে। গেছি রশিদুলের পিছন পিছন। রশিদুলের বাবা কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেন খাটে। রশিদুলকে দেখে বললেন, তুই কেমুন পোলা? আমার জ্বর। ইশকুল থিকা আইয়া একবার খবরও লইলি না? রশিদুল কথাটা তেমন গায়ে মাখলো না। বললো, আর কিছু কইবেন? আমার খিদা লাগছে। আমি অহন ভাত খামু। এই যে দিপু। আমার বন্ধু। গগন কাকার পোলা। বাবার কথা শুনে রশিদুলের বাবা তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকালেন। তুই গগনের পোলা? ও আইচ্ছা। আরে তর বাপে তো আমার কাছ থিকা একশটা টেকা ধার নিছিল কয়দিন পরে দেওনের কথা কইয়া। টেকাডা তো আর দিলোই না, আমার লগে দেহাও করে না। শুনে আমার মনে হলো কেউ যেন ঠাস করে আমার গালে একটা চড় মেরেছে। লজ্জায় মুখটা চুন হয়ে গেল। রশিদুল আমার দিকে তাকাল। আমার মুখ দেখে যা বোঝার বুঝে গেল। বললো, দিপু, তুমি গিয়া বহো। আমি আইতাছি। আমি চুপচাপ বেরিয়ে এলাম। আসতে আসতে শুনি রশিদুল তার বাবার ওপর বেশ চোটপাট করছে। আপনে গগন কাকার কাছে টেকা পাইবেন হেইডা দিপুরে কইলেন ক্যা? ও শরম পাইলো না? ওরে আমি লইয়াইছি ভাত খাওয়াইতে আর আপনে ওরে এইসব কইলেন! রশিদুলের বাবা কী কী বললো সে-কথা আর আমার কানে গেল না। আমার তখন খুব কান্না পাচ্ছিল। দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে রাস্তায় বেরুলাম। খাসির মাংস আর ভাত পড়ে রইল। পেটে খিদা। তাও সেই খাবারের কথা মনে হলো না। বিষণ্ণমুখে বাসায় এসে বই রেখে ধূপখোলা মাঠের দিকে চলে গেলাম। অনেকক্ষণ পর রশিদুল আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এলো। কত রকমভাবে যে আমাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করলো! কত কিছু যে আমাকে বোঝালো! বাবার সঙ্গে সে ঝগড়া করেছে – ওসবও বললো। মনে আছে, একটা সময়ে আমি বলেছিলাম, চাকরি হলে তোমার বাবার টাকা আমার বাবা শোধ করে দেবেন। যদি বাবা না দিতে পারেন বড় হয়ে আমি দিয়ে দেবো। ওই বয়সে যেমন বলে সেনসেটিভ কিশোর ছেলেরা। রশিদুলের বাবার সেই একশ টাকা বাবা দিতে পারেননি, আমি জানি। বছর দুয়েক পর বাবার চাকরি হলো। তারপর বছরখানেক বেঁচে ছিলেন। একাত্তর সালে মারা গেলেন। আজ রশিদুলকে দেখার পর থেকে ঘটনাটা আমার বারবার মনে পড়ছে। বাবা মারা যাওয়ার পর কতদিন কেটে গেছে! রশিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধুত্ব তেইশ বছর আগ পর্যন্ত চলছিল। টাকা-পয়সাও অনেক সময় ওকে আমি দিয়েছি।
পাঁচ-দশ হাজার, বিশ হাজার। তবে একদম দায়ে না পড়লে ও কখনো আমার কাছে চাইতো না। চাইলেই বুঝতাম, একেবারেই অপারগ হয়ে চেয়েছে। আমি দিতাম। ও আরেকটা কথা বোধহয় তোমাকে বলা হয়নি। ছেলেবেলা থেকেই বিচিত্র স্বভাব ছিল রশিদুলের। নানা রকমের পাখি পালতো।

বলেছো বলেছো। আমি জানি। রশিদুলভাই অনেক রকমের পাখি পালতো। টিয়া ময়না ছিল তার। কবুতর ছিল অনেক রকমের। পোষা শালিক ছিল একটা। খাঁচায় থাকতো না শালিকটা। বাইরে থাকতো। রশিদুলভাই ডাক দিলেই তার কাঁধে এসে বসতো।

ঠিক। তোমার ভালোই তো মনে আছে। শালিকটা বিড়ালে খেয়ে ফেলেছিল। বিড়ালটাও রশিদুলের পোষাই ছিল। তারপর সেই বিড়াল আর রাখেনি সে। খুবই রেগে ছিল বিড়ালের ওপর। রশিদুল খরগোশ পালতো, সাদা ইঁদুর পালতো।

ওগুলোকে বলে বিলাতি ইঁদুর।

রাইট। পোষা বেজি ছিল একটা। আশ্চর্য ব্যাপার, রশিদুল একবার একটা সাপও পুষতে শুরু করেছিল।

বলো কী? সাপ?

হ্যাঁ। তবে বিষাক্ত সাপ না। একটা খাঁচায় আটকে রাখতো। জ্যান্ত ছোট ইঁদুর ধরে এনে সাপের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিত। সেটা প্যাঁচ দিয়ে বা থাবা দিয়ে ধরে খেতো সাপটা। অদ্ভুত ছেলে ছিল রশিদুল। ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর ওড়াতো আকাশে। একবার সেই আমলে দেড়শো টাকা দিয়ে একটা মোরগ কিনে আনলো। বিশাল মোরগ। পায়ের নখ লম্বা, ধারালো। ঠোঁট তীক্ষ্ণ। ওই মোরগের নাম ‘আসলি’। ফাইটার মোরগ। রশিদুল সেই মোরগ কোলে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মোরগের লড়াই করাতে নিয়ে যেত। দশ টাকা বিশ টাকা বাজিতে চলতো মোরগের লড়াই। আমি সেই লড়াই দেখতে কয়েকবার গেছি রশিদুলের সঙ্গে। কখনো কখনো মোরগের পায়ে ছোট্ট ধারালো চাকু এমনভাবে বেঁধে দিত, মোরগ যখন পা দিয়ে অন্য মোরগটাকে আঘাত করতো, চাকুতে ফালা ফালা হতো সেই মোরগের পা, মুখ, মাথা।

অদ্ভুত ব্যাপার।

সত্যি অদ্ভুত ব্যাপার। এবার আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা শোনো। রশিদুল এক কোরবানি ঈদে গরুর ছোট্ট এক টুকরা সলিড কাঁচা মাংস চিবিয়ে খেয়েছিল। ওদের বাড়িতেই। আমার সামনে।

শাহিন মুখ কুঁচকে ওয়াক করলো। ছি, কী বলছো?

সত্যি। রশিদুল ওই টাইপই ছিল। তবে ওর মধ্যে একটা শিল্পী মন ছিল। মাটি দিয়ে অনেক কিছু বানাতে পারতো। নানা রকমের পুতুল। হাতি ঘোড়া বাঘ ভালুক। কাঠ দিয়েও বানাতে পারতো। কোথাও শেখেনি। নিজে নিজেই পারতো। নেশা ছিল। সেই নেশাই শেষ পর্যন্ত ওর পেশা হয়ে গেল।

কথার ফাঁকে ফাঁকে চা শেষ করেছি আমরা। আমি শেষ বিকেলের আকাশের দিকে তাকিয়ে পিছনে ফেলে আসা সেই জীবনে চলে গেছি। রশিদুলকে নিয়ে কতদিনকার কত কথা মনে পড়ছে। বাবার মৃত্যুর দিন থেকে একটানা চারদিন বাড়িতে যায়নি রশিদুল। সারাটাক্ষণ আমার সঙ্গে। আমাকে বুক দিয়ে আগলে রাখছিল। কত রকমের প্রবোধ, সান্তবনা। আমার চোখে পানি দেখলেই দুহাতে আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরতো। আমার এমন বন্ধু! ওর বউর  আচরণে আমি তেইশ বছর সরে থাকলাম। এটা আমারও উচিত হয়নি। রশিদুলের কান্নাটা ভুলতে পারছি না। রাজপুত্রের মতো জীবন ছিল রশিদুলের। আর আমি ছিলাম … সময় পুরো ব্যাপারটাই উলটে দিয়েছে।

শাহিন।

বলো।

আমি একটু রশিদুলদের বাড়িতে যেতে চাই। দুয়েকদিনের মধ্যেই। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?

চলো যাই। কতদিন ওদিকটায় যাই না।

তারপর রশিদুলকে নিয়ে কিছু পরিকল্পনার কথা শাহিনকে বললাম। শাহিন হাসিমুখে বলল, বন্ধুর জন্য তো করা উচিতই। করো তুমি যা করতে চাইছো।

সাত মাস পর

কাঠাখানেক জমির পুরোটাই কাজে লাগানো হয়েছে। সুন্দর দোতলা বিল্ডিং হয়েছে। ছোট ছোট চারটা রুম একতলা-দোতলা মিলে। নিচতলায় একপাশে ছোট্ট রান্নাঘর আর বাথরুম। বাড়ির পিছনের অংশ রশিদুলের। ওদিক দিয়ে গেটও করা হয়েছে। চিপা একটা গলি আছে গেটের বাইরে। ওদিক দিয়েও চলাচল করা যায়। মূল গেট সামনের দিকে। সেই আগের মতোই বাড়িটা। দুজন মানুষ পাশাপাশি হেঁটে ঢুকতে পারবে না।

শাহিন আমার আগে আগে হাঁটছিল। বাড়িতে বেশ একটা সাজসাজ রব। আজ নিজের বিল্ডিংয়ে উঠবে রশিদুল। মিলাদের ব্যবস্থা হয়েছে। রশিদুল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

যে ধোলাইখালে বর্ষাকালে আমি আর রশিদুল সাঁতার কেটেছি সেই ধোলাইখাল এখন বিশাল রাস্তা। রশিদুলের গলিতেও গাড়ি ঢোকে। আমরা নেমেছিলাম সামনের গেটে। শাজাহান ড্রাইভার জায়গাটা এখন ভালোই চেনে। এই নিয়ে কয়েকবার এলো সে।

সাত মাস আগে রশিদুল যেদিন আমার কাছে গিয়েছিল তার দুদিন পরই বিকেলবেলা শাহিনকে নিয়ে রশিদুলের বাড়িতে এসেছিলাম। বাড়ির পিছনদিককার প্রায় ভেঙেপড়া টিনের ঘরটায় দুই মেয়ে আর বউ নিয়ে থাকে রশিদুল। ওর যে এত খারাপ অবস্থা তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। বউটা একসময় দেখতে মন্দ ছিল না। সেই মহিলা ভেঙেচুরে একেবারে শেষ হয়ে গেছে। মেয়ে দুটোর নাম মুন্নি আর তিন্নি। হামিদুলের চেহারা আর প্রথম জীবনের গায়ের রং পেয়েছে। মিষ্টি চেহারা। সেই চেহারায় দারিদ্র্য হতাশা আর বিষণ্ণতা। এত মায়া লাগছিল মেয়েদুটোর মুখ দেখে। ওই ঘরেই আমরা বসেছিলাম। সায়রা বারবার সেই টেলিফোনের ব্যাপারটা নিয়ে মাফ চাইলো, মুখে আঁচল চেপে কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমার জইন্য আপনের বন্ধুর জীবন নষ্ট হইয়া গেছে ভাই। আমি তার জীবনডা নষ্ট কইরা দিছি। আমার বড় অন্যায় হইছিল, বড় ভুল হইছিল আপনের লগে ওই রকম ব্যবহার করা। আপনের বাড়ি থিকা আইসা সে যখন সব বলল, বইলা কান্নাকাটি করল, আমার দুই মাইয়ায় আমারে খুব বকলো। তুমি এইডা ক্যান করছিলা মা? আমার বাবার জীবন নষ্ট করছো, আমগো জীবন নষ্ট করছো। তয় আপনের বন্ধু কিন্তু আমারে কিছু বলে নাই। সে খুব ভালো মানুষ। জীবনে আমার লগে খারাপ ব্যবহার করে নাই।

সায়রা আমার পা জড়িয়ে ধরতে এলো। আপনে আমারে মাপ কইরা দেন ভাই।

শাহিন তাকে জড়িয়ে ধরল। আরে এ কী! ওসব ভুলে যাও। সব ঠিক আছে। মানুষের জীবনে অনেক রকমের ভুল হয়। বসো, বসো তুমি।

রশিদুল দাঁড়িয়ে ছিল এককোণে। মুখটা নিচু করে আছে। টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মেয়েদুটো বাবার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে কাঁদতে দেখে ওরাও কাঁদতে লাগল। বোঝা গেল বাবার জন্য পাগল দুই মেয়ে।

আমি উঠে গিয়ে রশিদুলের কাঁধে হাত রাখলাম। কেঁদো না রশিদুল, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি।

মেয়েদুটোকেও সান্তবনা দিলাম।

শাহিনকে আর আমাকে দেখে, আমাদের দামি গাড়ি দেখে রশিদুলদের বাড়িতে বেশ একটা সাড়া পড়েছে। রশিদুলের বড় দুই ভাইয়ের পরিবারের লোকজন, বাচ্চাকাচ্চারা উঁকিঝুঁকি মারছিল। গেটের বাইরেও দেখা যাচ্ছে কাউকে কাউকে। ড্রাইভারকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছে।

সেদিনই পরিকল্পনাটা আমি রশিদুলকে বলে এসেছিলাম। এই পাড়াতেই তুমি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নাও। আমাদের ফ্যাক্টরির সিকিউরিটির লোকজনের, কেয়ারটেকারদের কোয়ার্টার তৈরির কাজ করে একজন কন্ট্রাক্টর। ওর নাম গোলাম হোসেন। তাকে আমি পাঠাবো। এইটুকু জায়গার মধ্যেই দেখবে কী সুন্দর দোতলা একটা বিল্ডিং করে দিয়েছে সে। কোনো কিছুই তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি শুধু কাজের তদারকি করবে। কাজটা ঠিকমতো হলো কি না দেখবে। ফ্ল্যাট ভাড়া, তোমার সংসার খরচ, মেয়েদের পড়াশোনা সব মিলিয়ে মাসে তোমার কত টাকা করে লাগবে আমাকে জানাবে। তোমার দায়িত্ব আমার। তোমার মেয়েদের পড়ালেখা বিয়েশাদি কোনো কিছু নিয়েই তুমি ভাববে না। লেখাপড়া শেষ করে ওরা চাকরি-বাকরি করবে। আমি বেঁচে না থাকলে গগন ওদের দেখবে।

রশিদুল কথা বলতে পারেনি। বারবার চোখ মুছছিল।

তারপর গত সাত মাসে তিনবার আমি এসেছি। বাড়ির কাজ কতটা হলো দেখে গেছি। গত সপ্তাহে কিছু ফার্নিচার কিনে দিয়েছি রশিদুলকে। বাড়ি গোছগাছ হয়ে গেছে। আজ ওরা উঠবে। আমি আর শাহিন এসেছি গৃহপ্রবেশে।

রশিদুলদের আত্মীয়স্বজন, পাড়ার লোকজন যাঁরা মিলাদ পড়তে এসেছিলেন প্রত্যেকে আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আজকালকার দিনে এরকম বন্ধুত্বের নজির পাওয়া যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি বলছিল। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে রশিদুলকে দেখছিলাম, সায়রা আর ওদের দুই মেয়েকে দেখছিলাম। বিষণ্ণ মুখগুলোয় যে কী অপূর্ব এক আলো খেলা করছে! এই আলো যে দেখে তাঁর অন্তরটাও আলোকিত হয়।

ফেরার সময় শাহিনকে বললাম, শাহিন, রশিদুলের জন্য এত কিছু কেন করলাম, জানো?

শাহিন আমার দিকে তাকালো। কেন বলো তো?

আমি আসলে বাবার সেই ঋণটা শোধ করলাম। যেখানে রশিদুলের বিল্ডিংটা হয়েছে ঠিক ওখানকার ঘরটায় শুয়েই আমার বাবার কাছে একশটা টাকা পাওনা থাকার কথা বলেছিলেন রশিদুলের বাবা। বাবার সেই ঋণটা বহু বহু বছর পর অন্যভাবে শোধ করলাম আমি। রশিদুল আমার জন্য সেই কিশোর বয়সে যা করেছে সেই ঋণও শোধ করলাম।

শাহিন হাসল। অদ্ভুত কথা বললে তুমি। বন্ধুত্বের ঋণ, ভালোবাসার ঋণ কি শোধ করা যায়? যেরকম ভালোবেসে, আবেগে আর মমতায় রশিদুলভাই সেই বয়সে নিজে না খেয়ে তোমাকে খাইয়েছে, তোমাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে, ওইটুকু একটা বাড়ি করে দিয়ে বা কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে তুমি সেই বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করবে? এটা হয়? হয় না দিপু। তোমার অসহায় সময়ে যে তোমার পাশে দাঁড়িয়েছে, তার অসহায়ত্বের সময় তুমি তার পাশে দাঁড়িয়েছ, এইভাবে ভাবো। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করেছ, তা কখনো ভেবো না। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করা যায় না। ভালোবাসার ঋণ শোধ করা যায় না। বাবার ঋণ শোধ করলে সেটা ভাবতে পারো।

শাহিনের কথা শুনে খুবই ভালো লাগলো। বললাম, ঠিকই বলেছ তুমি। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করা যায় না।

Wednesday, June 15, 2022

গল্প- অপূর্ব এক গোধূলিবেলা by ইমদাদুল হক মিলন

একটা গানের কথা মনে পড়ছে, মায়া। কার গাওয়া? আরতি মুখোপাধ্যায়?

অনেক দূরের ওই যে আকাশ নীল হলো

আজ তোমার সাথে আমার আঁখির মিল হলো …

তোমার সঙ্গে আমার আঁখির মিল হয়েছিল কবে, মায়া?

ওই যে বিকালবেলা তুমি আমাকে পুকুরঘাটে ডেকে আনলে, তার আগে বললে, বাচ্চুকে পছন্দ করে বকুল, শুনে আমি কিন্তু খুব অবাক হইনি। আমি তো বোকা নই। বুদ্ধিসুদ্ধি কিছুটা আছে। লেখাপড়া করেছি। শিক্ষিত বাবার ছেলে। আমি কি খেয়াল করিনি স্বর্ণগ্রামের বাড়িতে, দীননাথ সেন রোডের বাড়িতে বাচ্চু এলেই তার চোখ এদিক-ওদিক ঘুরতো। কাকে খুঁজতো সেই চোখ সেটুকু বোঝার ক্ষমতা কি আমার ছিল না?

ছিল।

আমি বুঝতাম।

আমি সবই বুঝতাম।

বকুলের চঞ্চলতাও আমি বুঝতাম। বাচ্চুকে দেখলেই বোনটির মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়। চোখদুটো আনন্দে নাচে। হাসির শব্দও যেন বদলে যায়। বাচ্চুর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য একটু যেন জোরেই কথা বলে, একটু যেন বেশিই হাসে।

এই বয়সী ছেলেমেয়েদের কেন এমন হয়, আমি কি বুঝি না!

তবে সম্পর্ক ওদের তেমন গভীর হতে পারেনি। ওই ভালো লাগা পর্যন্তই। দুজন দুজনকে ভালোবাসে, দুজন দুজনকে চায় – সেসব মুখে কেউ কাউকে বলতে পেরেছে কিনা, বা চিঠি লেখালেখি হয়েছে কিনা জানি না।

আহা রে, আহা।

বাচ্চু জানেই না, তার বন্ধুর বোনটি, তার পছন্দের মেয়েটি, যাকে নিয়ে সে হয়তো স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, দেশ স্বাধীন হবে, যুদ্ধ শেষ করে ফিরে এসে সে বকুলের সামনে দাঁড়াবে, হয়তো সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে বলবে, তোমাকে আমি চাই।

বকুল হয়তো সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিল।

বাচ্চু এখন বিলোনিয়ার ওদিকটায় যুদ্ধ করছে। জানেও না তার স্বপ্ন কীভাবে চুরমার হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার বোনটি হয়তো ভোরবেলার ওই সময়টায় স্বপ্ন দেখছিল তার মনের কোণে লুকিয়ে থাকা মানুষটির। হয়তো সেই মানুষটির মুখ তখন স্বপ্নের ভেতরে ছিল বকুলের চোখ জুড়ে।

আহা রে, আহা?

বাচ্চু আর আমি ছেলেবেলার বন্ধু। একই বয়সের। তাও বাচ্চুর আগে আমার সবকিছু হয়ে গিয়েছিল। খালাতো বোনের সঙ্গে প্রেম। ধুমধাম করে বিয়ে। গভীর ভালোবাসায় ডুবে সন্তানের পিতা হওয়া। সবকিছু, সবকিছুই তাড়াতাড়ি হলো। এক বন্ধু বাবা হতে চললো আরেক বন্ধু হয়তো তখনো তার ভালো লাগার মানুষটিকে, মনের মানুষটিকে বলতেই পারেনি, তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে চাই। এসো, আমার হাত ধরো!

বকুল কি নীল কাগজে গোলাপ পাপড়ি ছড়ানো চিঠি লিখতে পেরেছিল বাচ্চুকে? তুমি যেভাবে আমাকে লিখেছিলে? যেভাবে আমাকে লিখতে?

আমি লিখেছি।

আমিও তোমাকে অনেক চিঠি লিখেছি।

একই বাড়িতে থেকেও চিঠি লেখালেখি? অদ্ভুত না!

তুমি বলতে, চিঠি পড়ার আনন্দ অতুলনীয়। আমি যখন তোমাদের বাড়িতে না থাকি, তোমার চোখের সামনে না থাকি, তখন দোতলার খাটে শুয়ে শুয়ে তুমি আমার চিঠি পড়ো। একই চিঠি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বহুবার পড়ো। প্রথমে তোমার গ্রামোফোন, পরে চেঞ্জার, সেখানে গান বাজছে, লতা মুঙ্গেশকরের গান –

প্রেম একবার এসেছিল নীরবে

আমার এ দুয়ারও প্রামেত্ম

সে তো হায়, মৃদু পায় …

আমাদের প্রেম কি নীরবে এসেছিল, মায়া?

না। নীরবে আসেনি। মোটামুটি জানান দিয়েই এসেছিল। বাচ্চু আর বকুলের কথা বলতে বলতে তুমি আমাকে নিয়ে গেলে পুকুরঘাটে।

মনে আছে?

সেই অবিস্মরণীয় বিকালবেলাটির কথা তোমার মনে আছে?

তার আগে প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আমরা একটু হাসি-আনন্দ করলাম, মজা করলাম।

এই যে চাঁদের এক টুকরো মোহন আলো এসে এখন তোমার মুখে পড়েছে, সেই বিকালে, গোধূলিবেলায় তোমার মুখে এসে পড়েছিল অসামান্য এক টুকরো আলো। ওই আলোকেই কি ‘কনে দেখা আলো’ বলে?

কনে দেখা নাকি প্রেমিকা দেখা আলো?

গভীর ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে থাকা কোনো মুখ দেখা আলো!

কী নাম সেই আলোর?

আল্লাহপাক মানুষের পবিত্রতম মুহূর্তের জন্য কি তৈরি করেছেন ওই আলো। ঠিক ওই মুহূর্তেই কি তিনি তাঁর ওই মহান আলোটুকু পাঠান কারো জন্য? একজনের মুখে সেই আলো পড়ে, আরেকজন আলোয় ভাসা মুখখানি দেখে বুঝে যায়, এই মুহূর্তে এ-জীবন অন্যরকম হয়ে গেল। তার জন্য যে-মানুষটি নির্বাচন করা হয়েছে, এতকাল মনের রহস্যময় অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা মানুষটি এই মাত্র তার সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে। এই তো এক মানুষ খুঁজে পেয়েছে আরেক মানুষকে। যার আসার কথা ছিল, এই তো সে এসেছে। স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা। আর রাজকন্যার কাছে তার স্বপ্নে দেখা রাজপুত্র।

তুমি এমন করে আমার দিকে তাকালে, এমন করে তাকিয়ে       থাকলে, তোমার চোখে পলক পড়ে না, তোমার চোখের তারা একটুও কাঁপে না, নাকি কাঁপে, সেই মহান আলোয় তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমিও গেছি বিহবল হয়ে। আমিও তাকিয়ে আছি তোমার মতো করেই। গোধূলিবেলার আলোয় মগ্ন দুটি মানুষ, অনেক দূরের আকাশ সেদিন নীল, গভীর নীল। হাওয়ায় সবুজ পাতার গন্ধ, নাকি বিকালবেলায় ফুটে ওঠা কোনো ফুলের গন্ধ, গন্ধ নাকি সুবাস, পুকুরজলে আলো-ছায়ার ঝিলিমিলি খেলা। এক ঘোরলাগা প্রকৃতি। লিচুগাছগুলোর ওদিকটায় ডাকছিল দিনশেষের পাখি। দুজন মানুষ, দুজনে মগ্ন হয়ে বসে আছে মুখোমুখি।

আমি বুঝে গেলাম, আমি বুঝে গেলাম মায়া, আমার শরীর-মন বলে দিলো, তুমি আমার, আমার!

সন্ধ্যা হয়ে এলো। ফেরার সময় তুমি শুধু একটা কথা বললে, আমাকে আর তুই করে বলবে না।

পরদিন নীল কাগজে গোলাপ পাপড়ি-ছড়ানো চিঠি। সে ছিল এক অদ্ভুত চিঠি। শুধু একটি শব্দ লেখা। ভালোবাসি।

পুরো পৃষ্ঠায় শুধু ওই একটি শব্দ।

একশ একবার লেখা। ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি …

এক অনন্ত ভালোবাসায় আমরা ডুবে গেলাম।

তোমাদের বাড়ির কাজের বুয়া চিঠিটা এনে দিয়েছিল। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। রাতের বেলা। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যাবো, তখন। বললাম, কী?

তা তো জানি না। আফায় দিছে।

ঠিক আছে, তুমি যাও।

বুয়া চলে যাওয়ার পর খুললাম চিঠি। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলাম। সারারাত কত স্বপ্ন তোমাকে নিয়ে। শুধু তোমার মুখটাই চোখ জুড়ে সারারাত। আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় রবীন্দ্রনাথের গান –

ভালোবাসি, ভালোবাসি –

এই সুরে  কাছে দূরে  জলে স্থলে বাজায় বাঁশি

আমার জলে-স্থলে, আকাশে-বাতাসে, গাছের পাতায় পাতায়, আলো অন্ধকারে সর্বত্র তখন শুধু ওই একটি মাত্র শব্দ, ভালোবাসি, ভালোবাসি।

পাখির ডাকে, জোনাকির আলোয়, ভ্রমর গুঞ্জনে শুধু ওই একটিই শব্দ, ভালোবাসি, ভালোবাসি।

ঘুমে জাগরণে, স্বপ্নে স্বপ্নে শুধু ওই একটিই শব্দ, ভালোবাসি, ভালোবাসি।

আমার বেঁচে থাকায়, আমার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে ওই একটিই শব্দ, ভালোবাসি, ভালোবাসি।

আমরা বদলে গেলাম। ওই এক গোধূলিবেলা আমাদের বদলে দিলো। আমার জীবন বদলে দিলো, স্বপ্ন কল্পনা, অতীত হয়ে বর্তমানে আসা, বর্তমানে থেকে যাত্রা ভবিষ্যতে, এক মায়াবী যাত্রা শুরু হলো আমাদের। এক মায়াবী ভ্রমণ। একই বাড়ির মধ্যে থেকে, এই ঘর আর ওই ঘরের দূরত্ব, শুরু হলো আমাদের মানসভ্রমণ।

আমিও তোমাকে চিঠি লিখলাম। এক পৃষ্ঠায় বড় করে একটি মাত্র শব্দ ‘ভালোবাসি’।

বুয়াই পৌঁছে দিলো তোমাকে।

আমি বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি, তুমি আমার মুখোমুখি পড়ে গেলে। চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে, মুখের অদ্ভুত সুন্দর এক ভঙ্গি করে শুধু একটাই শব্দ বললে, কিপ্টা।

কেন বলেছিলে?

কয়েকদিন পর প্রশ্নের জবাব দিলে। আমি একশ একবার লিখেছি আর তুমি শুধু একবার।

ওই একবারই অনেক বড়।

ছাই বড়।

মনে আছে, মায়া?

তোমার এসব মনে আছে?

এত কিছুর মধ্যে থেকেও আমার তখন দিনগুলো কাটতে চায় না, রাতগুলো কাটতে চায় না। দিনের বেলা ইউনিভার্সিটি, ছাত্ররাজনীতি, স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকি। চারদিকে বন্ধুবান্ধব, রাজনৈতিক কর্মী, নেতারা। কত কাজ। ভোরবেলা বেরিয়ে ফিরি রাত করে। সবকিছুর মধ্যে থেকেও তোমার কথা ভেবে হঠাৎ হঠাৎ আনমনা হই। মনে হয় এক দৌড়ে চলে আসি বাড়িতে, তোমাকে একপলক দেখে যাই। দুয়েকদিন তোমার কলেজের ওখানে চলে গেছি। আমাকে দেখলেই তোমার চোখদুটো যে কী উজ্জ্বল  হতো!

প্রেম, আমার প্রেম।

ভালোবাসা, আমার ভালোবাসা।

তারপর আমরা দুজন এমন বদলালাম, এমন হলাম একজন আরেকজনের জন্য, বাইরে আমার মন টেকে না। বন্ধুবান্ধব লেখাপড়া রাজনীতি, কিচ্ছু ভালো লাগে না। আমার সারাক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করে তোমাদের বাড়িতে। কোনো না কোনোভাবে দেখতে ইচ্ছা করে তোমাকে। রাতে ঘুম আসে না। স্বপ্ন দেখি শুধু তোমাকে। ভাবি শুধু তোমার কথা। স্বপ্ন জাগরণ যা-ই বলো, সর্বত্র তুমি। তুমি।

তোমার অবস্থাও দেখছি তাই।

কোনো  না কোনোভাবে আমার কাছাকাছি আসা। আমার দিকে তাকিয়ে থাকা, আমাকে একপলক দেখা। আর দুজন দুজনার দিকে তাকালেই কোথাও যেন বেজে ওঠে এক মোহন বাঁশি, হাওয়া যেন একটুখানি উতলা হয়, সুবাসিত হয়, আলো যেন একটু বেশি প্রখর হয়, আকাশ যেন একটু বেশি নীল, ‘অনেকদূরের ওই যে আকাশ নীল হলো, আজ তোমার সাথে আমার আঁখির মিল হলো’। গাছের পাতা যেন হয়ে ওঠে একটু বেশি সবুজ, ঘাসে যেন গ্রীষ্মকালেও পড়ে থাকে হালকা শিশির, যেন বা বেশি সতেজ হয় পায়ের তলার ঘাস। পুকুরজলে যেন হাওয়া ছাড়াই ঢেউ ওঠে। জলতরঙ্গের মতো টুংটাং শব্দ হয় কোথায়। সন্ধ্যাবেলাই যেন চাঁদ উঠে যায় পুব আকাশে। বিশাল চাঁদ। প্রখর জ্যোৎস্নায় ঝিমঝিম করে চারদিক। অন্ধকার নেই, কোথাও অন্ধকার নেই। তবু জোনাকপোকাগুলো জ্বলতে থাকে। রাতপাখি ডেকে যায় এদিক-ওদিক। আর ডাকে এক দুরন্ত কোকিল। তোমার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়, ঠিক তখুনি যেন জেগে ওঠে ঘুমন্ত কোকিল। তখুনি যেন শুরু করে ডাক।

কেন এমন হচ্ছিল?

কেন বলো তো?

প্রকৃতি যেন দুজন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের অন্তর আলোকিত করছে, ভাসিয়ে নিচ্ছে ভালোবাসার তীব্র স্রোতে।

দিনের বেলা চঞ্চল পায়ে মুহূর্তের জন্য তুমি এলে আমার ঘরে। নাকি আমি গেলাম তোমার ঘরে। একটুখানির জন্য তোমাকে দেখা। তুমি একদিন আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে …’

আমার সবদিকে তখন তোমার চোখ। আমার নাশতা খাওয়া, গোসল ঘুম সব লক্ষ করছো তুমি। আমার কখন এক কাপ চা লাগতে পারে, তুমি যেন টের পাচ্ছো। ঠিক এক কাপ চা এনে দিলে আমাকে। খালার চোখ এড়িয়ে সিগ্রেট খেতে যাই লিচুতলার দিকে, ঠিক তুমি খেয়াল করছো।

একদিন বললে, যে-জিনিস লুকিয়ে খেতে হয় তা খাওয়ার দরকার কী?

আমি হাসলাম।

শুনেছি সিগ্রেটের শেষটান নাকি প্রেমিকাকে চুমু খাওয়ার চেয়েও আনন্দের।

সঙ্গে সঙ্গে হাতের সিগ্রেট ফেলে দিলাম। শেষটান আমি দেবো না, চুমু খেতে দাও।

তুমি এমন লজ্জা পেলে, দৌড়ে চলে গেলে উঠোনের দিকে।

সেই রাতে ঘটলো এক অদ্ভুত ঘটনা।

মায়া, কোথাও কি একটা পাখি ডাকলো?

ঘুমভাঙা পাখি?

কোনো গাছের ডালে, পাতার আড়ালে বসে একটুখানি কি ডাকলো?

আমি যেন শুনতে পেলাম!

গত ভোর থেকে, পাকিস্তানি … গুলো আর তাদের এদেশীয় চাকরবাকরগুলো, … গুলো যখন হত্যা করলো আমার
বাবাকে-মাকে, বোনকে, স্ত্রীকে, পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় থাকা আমার সন্তানকে, পারুল কদম বারেকের মা কোথায় গেল, বল্টু কুকুরটা, মিনি বিড়ালটা, আমাদের কবুতরগুলো …। সন্ধ্যারাতের দিকে একবার যেন কাছে কোনো গাছের ডালে, নাকি দালানের কোনো আড়ালে থেকে একবার যেন, একবার যেন মৃদু একটুখানি শব্দ শুনেছিলাম কবুতরের। নাকি সেটা ছিল আমার মনের ভুল? বিভ্রম! আসলে কবুতর ডাকেনি। আমার মনে হয়েছিল ডাকছে।

হায়রে আমার মন!

হায়রে আমার দিশেহারা তছনছ হয়ে যাওয়া অন্তর!

এরকম দৃশ্য দেখার পর আমি যে বেঁচে আছি, এখনো শ্বাস নিচ্ছি, উঠোনে কবর খুঁড়ে বাবা মা বোনকে কবর দিয়েছি প্রকৃত ইসলামি নিয়মে, তিন কবরের কাজ শেষ করে, মায়া, মায়া, তোমার কবর খোঁড়ার অর্ধেক কাজ শেষ করে ক্লান্ত বিধ্বস্ত দেহমনে তোমার পাশে বসেছি একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য, তোমাকে একটু আদর করার জন্য, একটু কথা বলা তোমার সঙ্গে, তোমার গালে-মুখে একটুখানি হাত বুলানো, অনেকদিন পর তোমাকে একটুখানি ছুঁয়ে দেখা, এ কেমন করে সম্ভব হচ্ছে মায়া? কেমন করে সম্ভব হচ্ছে?

শেষ বিকালে বাড়ি ঢুকে, ক্লান্ত বিপর্যস্ত শরীর, তার ওপর এরকম দৃশ্য, আমার সব শেষ, তারপরও আমি বেঁচে আছি কেমন করে?

আমার তো দম বন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার কথা!

আমার মাথা তো পুরো খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা!

বাবা মা বোন, ল-ভ- তুমি আর আমার সন্তান, আমার তো হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। হার্ট ফেইল করে আমার তো লুটিয়ে পড়ার কথা তোমার পাশে! আমার তো উঠে দাঁড়াবার কথা না! আমি এসব করেছি কী করে?

আমার হাত উঠে যায় মাথার কাছে। সেখানে বাঁধা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এই পতাকা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এই পতাকা আমাকে প্রকৃত যোদ্ধার শক্তি দিয়েছে। যখনই আমি একদম ভেঙে পড়ছিলাম, শরীর মনের শক্তি হারিয়ে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম তোমাদের পাশে, তখনই আমার হাত উঠে গেছে মাথায়। স্পর্শ করেছি আমার পতাকা। মুহূর্তে শরীরে ফিরে এসেছে শক্তি, মন ঝেড়ে ফেলেছে সব আবেগ।

শেষ করতে হবে।

কাজটা আমাকে শেষ করতে হবে।

ফিরে যেতে হবে যুদ্ধক্ষেত্রে।

রাত পোহাবার কত দেরি?

কিসের শব্দ বলো তো? বাড়ির চারদিকে বর্ষার পানি। কচুরিপানা ঝোপজঙ্গল। বড় মাছ ঘাই দিলো? বোয়াল কিংবা গজার। নাকি শোল?

এই মাছগুলো তক্কে তক্কে থাকে। পাড়ের কাছে এসে ওুতপেতে থাকে। ইঁদুর কিংবা ব্যাঙ পেলেই ‘খাবলা’ দিয়ে ধরে।

তেমন কোনো মাছ ঘাই দিলো?

নাকি ইঁদুর কিংবা ব্যাঙ ধরল?

আকাশে অতিধীরে চলা চাঁদ, হাওয়া নেই, গাছপালা নিঃসাড়, সাদা মেঘ ভেসে যায় চাঁদের তলা দিয়ে। ও মেঘ, তুমি কোথায় যাও? কোন অচিন দেশে?

কীটপতঙ্গ ডাকছে। ঝিঁঝি ডাকছে। এই শব্দ আসলে শব্দ না। এই শব্দ আসলে চূড়ান্ত নৈঃশব্দ্য। চূড়ান্ত নৈঃশব্দ্যে এক যোদ্ধা তার কাজ শেষ করার অপেক্ষায়।

Monday, February 18, 2019

মেয়েটা আমার সঙ্গে হাঁটে by ইমদাদুল হক মিলন

এই যে শুনুন।
মিলি শুনতে পেল না। যেমন হাঁটছিল, হাঁটতে লাগল।
ভদ্রমহিলা দ্রুতই হাঁটছিলেন। পরনে বেগুনি প্রিন্টের কামিজ আর সাদা সালোয়ার। পায়ে আরামদায়ক জুতো। অক্টোবরের শেষদিক। বিকেলবেলার পার্কে শীতলভাব। তারপরও তিনি বেশ ঘেমেছেন। মিলি শুনতে পায়নি দেখে দৌড়ে এসে তাকে ধরলেন। শুনুন।
মিলি যেন অন্য জগৎ থেকে ফিরল। ডাগর চোখে আত্মমগ্ন দৃষ্টি। বলুন।
আপনি মিলি না? সজলের ছোটবোন?
জি। কিন্তু আপনাকে চিনতে পারলাম না।
না পারারই কথা। দেখা হলো বহুবছর পর। আমারও তোমাকে চিনতে কয়েক দিন সময় লাগল। তুমি তেমন বদলাওনি। আগে স্বাস্থ্য একটু ভালো ছিল। এখন স্লিম, সুন্দর। তবে মুখটা ঠিক আছে। আমি শান্তি। তোমাদের সেগুনবাগিচার বাড়িতে ভাড়া থাকতাম।
মিলি তীক্ষ্ণ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, আপনি শান্তি আপা? কী আশ্চর্য! আপনাকে চেনাই যায় না।
শান্তি হাসলেন। চেনা যাবে কী করে? বুড়ো হয়ে যাচ্ছি না? আমরা যখন তোমাদের বাড়ি ছেড়ে আসি, তখন তুমি ফোর–ফাইভে পড়ো। আমি অনার্স পড়ছি ইডেনে। বিয়ে হয়ে গেল। স্বামীর সঙ্গে চলে গেলাম লিবিয়ায়। তোমার দুলাভাই মারা গেলেন দু–বছর আগে। দুটোই ছেলে। ওরা সিডনিতে। বছরে ছয় মাস আমি গিয়ে ওদের সঙ্গে থাকি। বিদেশে থাকতে ভালো লাগে না। ইস্কাটনে ছোট একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলেন তোমার দুলাভাই। তাঁর কত স্মৃতি সেখানে। ছয় মাস ওই ফ্ল্যাটে থাকি। বাকি সময় ফ্ল্যাটটা বন্ধ থাকে। আমার ছোট ভাই হারুন দেখাশোনা করে। ডায়াবেটিসে ধরেছে সাত–আট বছর হলো। সিডনিতে থাকলে তো হাঁটিই। দেশে থাকলে রমনা পার্কে আসি।
মিলি বুঝল শান্তি আপা বেশি কথা বলা মানুষ। বারো–তেরো বছর বয়সের পর তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়েছে কী, না মনে নেই। তখনো বেশি কথা বলতেন কি না, কে জানে। কিন্তু শান্তি আপার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছিল না তার। নিজের জগৎ থেকে ফেরার কারণে একটু বুঝি বিরক্ত।
শান্তি আপা বললেন, চলো, হাঁটি।
না থাক। দাঁড়িয়েই কথা বলি।
তোমার হাঁটা শেষ? কখন হাঁটতে আসো? কতক্ষণ হাঁটো। ডায়াবেটিস হয়নি তো?
না তা হয়নি। বিকেলেই আসি। যতক্ষণ ইচ্ছা হাঁটি। সময় মনে রাখি না।
শান্তি আপা অবাক। সময় মনে রাখো না?
না। এক–দু ঘণ্টা, কখনো কখনো তিন–চার ঘণ্টাও থাকি পার্কে। কখনো হাঁটি, কখনো বসে থাকি।
এতটা সময় পার্কে কাটাচ্ছ, তোমার ফ্যামিলি, হাজব্যান্ড বাচ্চাকাচ্চা? হাজব্যান্ড কী করে? ছেলেমেয়েরা কত বড় হলো? থাকো কোথায়?
বেইলি রোডে ফ্ল্যাট। ও বিজনেস করে। আচ্ছা যাই।
মিলি হাঁটতে শুরু করল।
শান্তি আপা অবাক। আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও। না ঠিক আছে, চলো হাঁটতে হাঁটতেই কথা বলি। এত দিন পর দেখা। আমার কথা তো বলেই ফেললাম। তোমার কথা তেমন শোনা হলো না। বাচ্চাকাচ্চাদের ব্যাপারে তো কিছু বললে না।
হাঁটার সময় কথা বলতে ভালো লাগে না।
তাহলে চলো কোথাও বসি।
না থাক। আমি একটু লেকের দিকটায় যাই।
চলো আমিও যাই। তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হলো। একা একা হাঁটতে ভালো লাগে না। আমিও তো বিকেলেই আসি। দুজন একসঙ্গে হাঁটা যাবে।
মিলি দাঁড়াল। আই অ্যাম সরি। আমি আপনার সঙ্গে হাঁটতে পারব না। আমি অন্য একজনের সঙ্গে হাঁটি।
মিলি হন হন করে হেঁটে লেকের দিকে চলে গেল। শান্তি আপা খুবই অবাক। মিলি দেখি একদম বদলে গেছে! কিশোরী বয়সে অতি উচ্ছল প্রাণবন্ত মেয়ে ছিল। তার ছুটোছুটি হইহল্লা আর হাসির শব্দে মুখর থাকত বাড়ি। বয়স কত হবে এখন? চল্লিশ–বিয়াল্লিশ। দেখে আরও কমবয়সী মনে হয়। চেহারা–ফিগার সুন্দর। হাইট ভালো। নীল টাউজার্স আর সাদা ফুলস্লিভ শার্ট পরে হাঁটছে। পায়ের কেডসটাও বেশ দামি। স্বামী যে অবস্থাপন্ন বোঝা যায়। কিন্তু সমস্যা কী মেয়েটার? কার সঙ্গে হাঁটে সে? তিন–চার দিন ধরে মিলিকে ফলো করার পর নিশ্চিত হয়েই তো তার সঙ্গে আজ কথা বললেন শান্তি! কই এ কদিন তো কাউকে তার সঙ্গে হাঁটতে দেখেননি? একা একাই তো হাঁটছে। মাঝে মাঝে একা একা বিড়বিড় করে। মুখটা হাসি হাসি হয় কখনো, কখনো স্নিগ্ধ মায়াবি। যেন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছে বা ডুবে আছে কোনো মধুর স্মৃতিতে, এ রকম একটা ভাব হয় মুখের। একটু দূর থেকে নিবিড়ভাবেই মিলিকে খেয়াল করেছেন শান্তি।
কোনো মানসিক সমস্যা হয়নি তো মিলির? কথা বলে তেমন মনে হলো না। খুবই স্বাভাবিক সুন্দর ভঙ্গিতে কথা বলল। শান্তি যা যা জানতে চাইলেন সংক্ষেপে জবাব দিল। শুধু বাচ্চাকাচ্চার প্রসঙ্গে কিছু বলল না। দিনে দিনে কত যে বদলায় মানুষ!
শান্তি অন্যদিকে হাঁটতে লাগলেন।
পরদিনও মিলিকে তিনি দেখলেন। দূর থেকে হাত তুললেন। মিলি তাঁর দিকে ফিরেও তাকাল না। নিজের মতোই পা চালিয়ে হাঁটছে। স্নিদ্ধ মুখখানা হাসি হাসি। মাঝে মাঝে একটু যেন বিড়বিড় করছে। কখনো কখনো একটু থেমে এক পাশে তাকাচ্ছে। যেন কাউকে দেখছে। যেন পাশে কেউ আছে। তার সঙ্গে যেন বিড়বিড় করে কথাও বলছে।
সেদিনের পর থেকেই কৌতূহল হয়েছিল শান্তির। মিলি বলেছে সে একজনের সঙ্গে হাঁটে। তার হাঁটার সঙ্গীটা কে? হাজব্যান্ড যে না তা বোঝা গেছে। হাজব্যান্ড হলে সঙ্গে সঙ্গেই বলে দিত। তাহলে কি কোনও বন্ধু? বন্ধুটা কি মেয়ে না পুরুষ? নাকি পরকীয়া করছে মিলি? আজকাল ওদের বয়সী মহিলারা অনেকেই জড়িয়েছে পরকীয়ায়। স্বামী তার জগৎ নিয়ে ব্যস্ত। বাচ্চাকাচ্চারা বড় হয়ে গেছে। স্ত্রীটির সময় কাটে না। এ জন্য অনেক মহিলাই নাকি ওসব করছে। ফেসবুকের কারণেও ঘটছে এসব...
কিন্তু বেশ কয়েক দিন ফলো করেও মিলির সঙ্গে কাউকে দেখতে পেলেন না শান্তি। মিলি তার মতো একা একা হাঁটে। বিড়বিড় করে, পাশে তাকায়। নির্জন কোনো বেঞ্চে একা বসেও বিড়বিড় করে। যেন পাশে কেউ বসে আছে। কারও সঙ্গে যেন কথা বলছে। সূক্ষ্মভাবে খেয়াল না করলে ব্যাপারটা বোঝাও যায় না। সমস্যা কী মিলির?
দিন কয়েক পর এক বিকেলে মিলিকে ধরলেন শান্তি। বকুলতলার ওদিককার একটা বেঞ্চে বসে আছে। শান্তি এসে পাশে বসলেন। কেমন আছ, মিলি?
ভালো আছি। আপনি?
চলে যাচ্ছে। মাসখানেক পর ছেলেদের কাছে যাব।
খুব ভালো।
আজ মিলিকে সেদিনের তুলনায় আন্তরিক মনে হচ্ছে। শান্তি খুশি হলেন। তাহলে কথা বের করতে সুবিধা হবে। ব্যাপারটা জানার খুবই কৌতূহল শান্তির। বললেন, সেদিন বললে তুমি আমার সঙ্গে হাঁটবে না, কারণ তুমি আরেকজনের সঙ্গে হাঁটো...
তারপর আপনি আমাকে ফলো করলেন এবং দেখলেন আমি একা একাই হাঁটছি, এই তো?
তাই দেখলাম।
ও রকমই দেখবে সবাই। আসলে আমি একা হাঁটি না, আমার সঙ্গে আরেকজন হাঁটে।
কে হাঁটে তোমার সঙ্গে?
আমার মেয়ে। ওর বয়স এখন সতেরো বছর।
কই ওকে তো এক দিনও দেখলাম না!
আমি ছাড়া কেউ ওকে দেখতে পাবে না।
মানে কী? চোখের সামনে তোমাকে হাঁটতে দেখছি একা, তুমি বলছ তোমার সতেরো বছরের মেয়েও তোমার সঙ্গে হাঁটছে...তুমি ছাড়া কেউ কেন তাকে দেখতে পাবে না?
না পাবে না। ওকে শুধু আমিই দেখতে পাই। আমার সঙ্গে হাঁটে, কথা বলে, এ রকম বেঞ্চে আমরা মা–মেয়ে বসে থাকি। কত গল্প করি!
শান্তি তীক্ষ্ণ চোখে মিলির দিকে তাকালেন। তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?
জানি কী প্রশ্ন করবেন? আমার কোনো মানসিক সমস্যা হয়েছে কি না, এই তো? আমি পাগল কি না? হ্যাঁ, এই প্রশ্ন আপনি করতে পারেন। যে কেউ এমন কথা শুনলে এই প্রশ্নটাই করবে। হতে পারে এটা আমার মানসিক সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার কথা আমি কখনো কাউকে বলি না। আমি একটা কলেজে পড়াই, ফ্ল্যাটে কাজের লোকজন আর হাজব্যান্ডকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি। ভাইবোনদের বাড়ি যাচ্ছি–আসছি। ভদ্রলোক বিজনেসের পাশাপাশি পলিটিক্স করেন। আমার ফ্ল্যাটে অনেক লোক আসে রোজ। ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা, বোনদের ছেলেমেয়েরা আসে, ছাত্রছাত্রীরা আসে, আমি সব নিয়ে খুবই ব্যস্ত থাকি। আমার নিজস্ব সময় এই বিকেলবেলাটা। যত ব্যস্তই থাকি বিকেলে পার্কে আমি আসবই। কারণ, মেয়ের সঙ্গে পার্কেই আমার দেখা হয়। সে আমার জন্য অপেক্ষা করে। আমি না এলে কাঁদে, মন খারাপ করে। কোনো কারণে পার্কে না আসতে পারলে আমারও হয় একই অবস্থা। এসব কথা আমি কখনো কাউকে বলি না।
তাহলে আমাকে বলছ কেন?
জানি না। বলতে ইচ্ছা করছে। আমার এখন একচল্লিশ বছর বয়স। বিয়ে হয়েছে আটাশ বছর বয়সে। ওই একটাই মেয়ে আমার। আর কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। তাও মেয়েটা আমার স্বামীর না।
ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেলেন শান্তি। এমনিতেই পুরো ব্যাপারটা তাঁর কাছে রহস্যময়। অন্যে দেখতে পায় না এমন মেয়ের সঙ্গে পার্কে হাঁটে মিলি, কথা বলে, হাসে। তার ওপর বলছে সেই মেয়ে আবার ওর স্বামীর না। পুরোটাই রহস্যময়। মিলিকে মনে হচ্ছে সূক্ষ্ম জটিল মানসিক রোগী।
মিলি বলল, ঘটনাটা শুনুন। একুশ বছর বয়সে সাজিদ নামের একটা ছেলের সঙ্গে আমার প্রেম হয়েছিল। গভীর প্রেম। দুজন দুজনার জন্য পাগল। সাজিদ ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে আর আমি পড়ছি ভিকারুন নিসায়। ওদের পরিবারটা ভালো। মা স্কুল টিচার, বাবা উপসচিব। দুটো মাত্র ভাই। সাজিদ বড়। দেখতে যেমন ভালো, মানুষ হিসেবেও তেমন। আমাদের বাড়ির সবাই ওকে পছন্দ করত। ওর সঙ্গে বিয়েতে আমাদের পরিবারের কারও আপত্তি ছিল না। ওর মা আমাকে একটু কম পছন্দ করতেন, কিন্তু বাবা আর ভাইয়ের খুবই পছন্দ আমাকে। কথা হলো, আমার মাস্টার্স শেষ হলেই বিয়ে। সাজিদ পাস করে বেরোল। ভালো একটা চাকরি পেল। অফিসের কাজে প্রায়ই বাইরে যেতে হয় তাকে। আমরা অবাধ মেলামেশা করছি। রংপুর থেকে রাতেরবেলা অফিসের গাড়ি নিয়ে ফিরছিল সাজিদ। ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ। স্পটেই মারা গেল। আমি গেলাম পাগল হয়ে। তখন আমার চব্বিশ বছর বয়স। কয়েক দিন পর শুরু করলাম বমি...
তার মানে তুমি কনসিভ করেছ?
হ্যাঁ। প্রথমে বুঝতে পারিনি। বাড়ির লোকজন বুঝে গেল। প্র্যাগনেন্সি টেস্ট করা হলো। কী কেলেঙ্কারি! এ মেয়ের কী হবে এখন? বিয়ে হবে কী করে? শেষ পর্যন্ত যা হয় আর কী! ওয়াশ করানো হলো। মুক্ত হয়ে গেলাম আমি। কিন্তু...
একটু থামলো মিলি। উদাস হলো, বিষণ্ন হলো। হেমন্তকালের শেষ হয়ে আসা বিকেলের আকাশে তাকিয়ে বলল, যখন সবাই বলাবলি করছিল আমি কনসিভ করেছি, আমি টের পাচ্ছি শরীরের ভেতরে কী যেন একটা ঘটে গেছে, আমি মা হব, ঠিক তখন থেকেই মনে হতে লাগল ফুটফুটে একটা মেয়ে হবে আমার। ভারি সুন্দর, ফর্সা গোলগাল পুতুলের মতো মেয়ে...। আমি কিছুতেই ডাক্তারের কাছে যেতে চাইনি, ওয়াশ করাতে চাইনি। কিন্তু মা–বাবা, ভাইবোন, সমাজ! বিয়ে হতে হবে মেয়ের। কাউকে বুঝতে দেওয়া যাবে না এই ঘটনা ঘটেছে মেয়ের জীবনে...। যেদিন কাজটা হয়ে গেল, মনে হলো আমার আত্মার শেষ অংশটাও চলে গেল। প্রথমে গেল সাজিদ তারপর তার চিহ্ন। আমি একা হয়ে গেলাম। তারও চার বছর পর আমার বিয়ে হলো। আশ্চর্য ব্যাপার, আমি আর কনসিভ করি না। ঢাকা–কলকাতা–ব্যাংকক, কত হাসপাতাল, কত বড় বড় ডাক্তার। কত চিকিৎসা, কত ওষুধ, কিছুই হলো না। এই নিয়ে একটু কষ্টও পেতাম। সেই কষ্ট শেষ হয়ে গেল এক বিকেলে। কলেজ, সংসার, লোকজন—সব নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি, নিজের সময় বলতে গেলে নেইই। নিজের একটু সময় দরকার। একটু একা থাকা দরকার। এই কারণে পার্কে আসতে লাগলাম। হাঁটাও হলো, একা থাকাও হলো। হাঁটতে এসে দেখি পুরোনো দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। সাজিদের কথা মনে পড়ে, যে মেয়ের স্বপ্ন দেখতাম সেই মেয়ের কথা মনে পড়ে। একদমই চলে যাই সেই সময়ে, সেই কল্পনায়। পার্কে সকাল–বিকেল অনেক লোক থাকে আজকাল। পুরুষ–মহিলা অনেক। আমি একটু নির্জন জায়গা বেছে হাঁটি। একা একা। একদিন হঠাৎ শুনি কে আমাকে কাতরকণ্ঠে ডাকল, মা, ওমা। এদিক–ওদিক তাকিয়ে দেখি, কই কোথাও কেউ নেই তো! কে ডাকল তাহলে? আমি যে পরিষ্কার শুনলাম! ভাবলাম মনের ভুল। মেয়েটির কথা ভাবছিলাম বলে এমন হয়েছে। আবার হাঁটতে লাগলাম। কিছুক্ষণ আবার সেই ডাক। মা, ওমা। এই ঘটনা ঘটল তিন–চার দিন। তারপর সেই কণ্ঠ এক বিকেলে বলল, আমাকে তুমি চিনতে পারছ না, মা? আমি তোমার সেই মেয়ে, যাকে ভ্রূণেই হত্যা করেছিলে। কিন্তু আমি মারা যাইনি। আমি তোমার আত্মার অংশ হয়ে আছি। তোমার সঙ্গেই আছি। দিনে দিনে বড় হচ্ছি। আমার এখন সতেরো বছর বয়স। মাগো, তুমি আমাকে হত্যা করেছিলে কেন? মানুষ কি তার আত্মার অংশকে হত্যা করে?
মিলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর থেকে ধীরে ধীরে মেয়ের সঙ্গে আমি জড়িয়ে গেলাম, আপা। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর থেকে পরদিন বিকেলের জন্য শুরু হয় আমার অপেক্ষা। কখন পার্কে যাব, কখন মেয়ের সঙ্গে আমার দেখা হবে। কখন সে মা ডাকে আমাকে ভরিয়ে দেবে। কখন গাল ফুলাবে, আবদার করবে, হাসবে, আমাকে জড়িয়ে ধরবে। রাগ করবে, অভিমান করবে, কাঁদবে...। আর কী যে সুন্দর হয়েছে আমার মেয়ে। যেমন আমি কল্পনা করেছিলাম ঠিক তেমন। আমি তার সঙ্গে হাঁটি আপা, তার সঙ্গে কথা বলি। মা–মেয়ে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে একজন তাকাই আরেকজনের মুখের দিকে। আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় পার্কের বিকেলগুলো। আমার মেয়ে...। মেয়ের কথা কখনো কাউকে বলি না। আপনাকে বললাম। কেন, তা–ও জানি না।
শান্তি ফ্যাল ফ্যাল করে মিলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

Friday, September 27, 2013

বিশেষ লেখা- ১০০ ডলার কি বেশি চাওয়া? by ইমদাদুল হক মিলন

আমার জাপানি বন্ধু তাকাহাসির বাংলাদেশ নিয়ে গভীর আগ্রহ। বাংলাদেশের যেকোনো দুর্ঘটনায় সে খুব বিচলিত হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে, মানুষের মৃত্যু নিয়ে দিশাহারা হয়।

Wednesday, March 27, 2013

ইমদাদুল হক মিলনের বিশেষ লেখাঃ হরতালের বিকল্প ভাবতেই হবে

মহিলা পাগলের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে এয়ারপোর্টে ঢুকলেন। ১০টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। সোয়া ১০টায় তাঁর ফ্লাইট। যানজটে ঘণ্টা তিনেক আটকে ছিলেন। ট্যাক্সি ক্যাবে করে আসছিলেন, ক্যাব ড্রাইভারের কিছুই করার ছিল না।

Thursday, January 10, 2013

বিশেষ লেখা-মঙ্গল আলোয় উদ্ভাসিত বাংলাদেশ by ইমদাদুল হক মিলন

'আংশিক নয়, পুরো সত্য'- এই মন্ত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল 'কালের কণ্ঠ'। দেখতে দেখতে তিন বছর পূর্ণ হলো সেই যাত্রার। তিন বছর পূর্তির শুভলগ্নে আমাদের প্রিয় পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, হকার এবং পত্রিকাসংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।

Tuesday, December 4, 2012

সম্পাদকের কলাম-দেশের মানুষ চায় দুই নেত্রীর সমঝোতা by ইমদাদুল হক মিলন

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিল্প, সাহিত্য ও খেলাধুলার ব্যাপারে খুবই উৎসাহী একজন মানুষ। কয়েকটি ঘটনার কথা মনে আছে। বাংলাদেশ যে বছর কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফি জিতল, শেষ বলে পাইলটের রানের জন্য অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ, সেবারও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Saturday, November 3, 2012

গাহে অচিন পাখি by ইমদাদুল হক মিলন

হাওয়ায় কী একটা ভাজা-পোড়ার গন্ধ ওঠে। ভারি মনোহর। সেই গন্ধে মাছচালার ধুলোবালি থেকে মুখ তোলে বাজারের নেড়িকুত্তাটা। তারপর প্রথমেই তার প্রভু পবন ঠাকুরকে খোঁজে। নেই। গন্ধ আর প্রভুর টানে কুত্তাটা তারপর ওঠে দাঁড়ায়।

Wednesday, October 24, 2012

যাওয়া তো নয় যাওয়া by ইমদাদুল হক মিলন

তেইশ দিন আগে সুনীলদার সঙ্গে দেখা হলো কলকাতায়। সুরমা চৌধুরী স্মৃতি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে পুরস্কারটি পেয়েছেন আরো পাঁচজন লেখক- আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, প্রফুল্ল রায়, সেলিনা হোসেন, সমরেশ মজুমদার এবং আমি আমার 'নূরজাহান' উপন্যাসের জন্য।

Tuesday, September 25, 2012

সম্পাদকের কলাম-বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানো by ইমদাদুল হক মিলন

দেশের অবস্থা কী? কোন দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি? ইলেকশন হবে? যেখানে যাই সেখানেই এ তিনটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই। তত্ত্বাবধায়ক প্রথা বাতিল হওয়ার পর মানুষ আরো অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। বিএনপি কিছুতেই মেনে নিচ্ছে না এ পদ্ধতি।

Saturday, August 11, 2012

হুমায়ূন আহমেদের অন্য রকম সাক্ষাৎকার by ইমদাদুল হক মিলন

কালের কণ্ঠের ঈদ আনন্দ ২০১০ সংখ্যার জন্য হুমায়ূন আহমেদের একেবারেই অন্য রকম একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি। সাহিত্য নিয়ে কোনো কথাই হয়নি তাঁর সঙ্গে। হয়েছে অন্য অনেক বিষয় নিয়ে। কালের কণ্ঠের পাঠককে সে বিষয়গুলো জানানোর জন্য সাক্ষাৎকারটি আবার ছাপা হলো।

Friday, August 10, 2012

সম্পাদকের কলামঃ পদ্মা সেতু ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস by ইমদাদুল হক মিলন

আড়াই-তিন বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে গিয়েছি একটা সেমিনারে। সেখানকার ওয়েস্টিন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা। আমার স্বভাব হচ্ছে পৃথিবীর যে দেশেই যাই, যে শহরেই যাই, সেখানকার বইয়ের দোকান ঘুরে দেখবই। বালি দ্বীপে গিয়েও তা-ই করেছি। প্রথম দিন সন্ধ্যাবেলাই বেরিয়েছি বইয়ের দোকানের খোঁজে। হোটেলের খুব কাছেই অভিনব ধরনের একটা শপিং এরিয়া।

Thursday, August 9, 2012

সম্পাদকের কলাম-পদ্মা সেতু ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস by ইমদাদুল হক মিলন

আড়াই-তিন বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে গিয়েছি একটা সেমিনারে। সেখানকার ওয়েস্টিন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা। আমার স্বভাব হচ্ছে পৃথিবীর যে দেশেই যাই, যে শহরেই যাই, সেখানকার বইয়ের দোকান ঘুরে দেখবই। বালি দ্বীপে গিয়েও তা-ই করেছি। প্রথম দিন সন্ধ্যাবেলাই বেরিয়েছি বইয়ের দোকানের খোঁজে।

Friday, June 29, 2012

সম্পাদকের কলাম-মানুষ কাঁদছে by ইমদাদুল হক মিলন

আমার চোখের সামনে এক কাদামাখা শিশু। হাত পা মুখ মাথা কাদায় লেপটালেপটি। যেন খেলতে গিয়ে অবুঝ শিশুটি কাদামাটিতে লেপটালেপটি করে ফেলেছে শরীর। যেন এক্ষুনি তাকে গোসল করিয়ে, ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করবেন মা। মাথাটি আঁচড়ে দিয়ে, ধোয়া জামা-প্যান্ট পরিয়ে ভাত খাওয়াবেন। তারপর ঘুম পাড়িয়ে দেবেন।

Friday, June 22, 2012

সম্পাদকের কলাম-বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী by ইমদাদুল হক মিলন

বঙ্গবন্ধুকে আমি কাছ থেকে দেখেছি দুবার। একবার স্কুলজীবনে। গেণ্ডারিয়া হাই স্কুলে পড়ি। সম্ভবত '৬৮ সাল। নাকি '৬৯! ঠিক মনে করতে পারছি না। একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরবেলা প্রভাতফেরিতে বেরিয়েছি আমি আর আমার ক্লাসের তিনবন্ধু। মানবেন্দ্র, মুকুল, হারুণ আর আমি। মানবেন্দ্রদের বিশাল বনেদি বাড়ি দীননাথ সেন রোডে। ওরা চক্রবর্তী।

Friday, June 8, 2012

সম্পাদকের কলাম-আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার by ইমদাদুল হক মিলন

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের রসবোধের তুলনা হয় না। বিটিভি শুরু হলো ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর। তখন নাম ছিল 'ঢাকা টেলিভিশন'। সন্ধ্যার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা চলত। সোমবার বন্ধ থাকত। ৩১ ডিসেম্বর স্যার প্রথম অনুষ্ঠান করলেন। টেলিভিশনে তাঁকে নিয়ে গেলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

Friday, June 1, 2012

সম্পাদকের কলাম-সাংবাদিকদের ওপর এত আক্রোশ কেন? by ইমদাদুল হক মিলন

দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে চিলেকোঠার ছায়ায় বসে আছেন বঙ্গবন্ধু। লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা। এক চেয়ারে বসে আরেক চেয়ারে পা তুলে দিয়েছেন। হাতে প্রিয় পাইপ। এরিন মোরের গন্ধে উতলা হয়েছে ছাদের হাওয়া। এ সময় একটি ছেলে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে ছাদে এলো। তার হাতে ক্যামেরা। সে ক্লিক ক্লিক করে বঙ্গবন্ধুর ছবি তুলতে লাগল।

Friday, May 25, 2012

সম্পাদকের কলাম-শিক্ষকদের গায়েও হাত তুলছেন! by ইমদাদুল হক মিলন

গগনপুর নামটা শুনে আমার বুক হু হু করে উঠল। আমার বাবার ডাকনাম ছিল গগন। তিনি শিক্ষক ছিলেন না। ছোট চাকরি করে আমাদেরকে নিয়ে গগনপুরের আজিজুর রহমান স্যারের মতোই অতিকষ্টে জীবন চালাতেন। আজিজ স্যারের মতোই ছেলেমেয়েকে অসম্ভব ভালোবাসতেন।

Friday, May 18, 2012

সম্পাদকের কলাম-নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি by ইমদাদুল হক মিলন

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আমার খুবই প্রিয় একজন মানুষ। স্বল্পভাষী, নম্র, বিনয়ী, একেবারেই সাদামাটা জীবন যাপন করা মানুষটি কঠোর পরিশ্রমী। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকখানি বদলে দিয়েছেন তিনি। শিক্ষাক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে এই মানুষটির জন্য।

Sunday, May 13, 2012

মা by ইমদাদুল হক মিলন

নিজের জীবনের চেয়েও ছেলেকে বেশি ভালোবাসেন মা। স্বামী নেই, একমাত্র ছেলেই তাঁর সব কিছু। কী যে মমতায়, কী যে যত্নে ছেলেকে বড় করেছেন। মাটিতে রাখেননি পিঁপড়ায় কামড় দেবে। মাথায় রাখেননি উকুনে কামড় দেবে। ছেলেকে রেখেছেন তিনি বুকে, হৃদয়ের কাছে।