Wednesday, January 17, 2018

যে শহরে নগ্ন নারীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে

ডেইলি সান অনলাইনঃ টাইমস স্কোয়ারের রাস্তায় দিন দিন নগ্ন মডেলদের চাহিদা ও অত্যাচার বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক মার্কিনী। নগ্ন নারীদের কীর্তিতে কার্যত বিরক্ত অভিভাবকেরাও। তাদের অভিযোগ, ব্যস্ত এই রাস্তায় একদল নারী নগ্ন হয়ে পর্যটকদের সঙ্গে ছবি তোলাকে কার্যত পেশা বানিয়ে ফেলেছেন।
তবে অভিযোগ মানতে নারাজ শিল্পীরা। তাদের দাবি, শৈল্পিক কলাকৌশল প্রকাশের জন্য এক নগ্ন নারীর শরীরের চেয়ে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না। যাদের গায়ে এক টুকরো সুতো পর্যন্ত নেই। রয়েছে শুধু বডি পেন্ট। দেশাত্মবোধক ছবি আঁকা পুরো শরীরে জুড়ে। আর এমন আপত্তিকর অবস্থায় ছবি তোলার জন্য এই নারীরা চার্জ করছেন ১০ ডলার করে। প্রতিবছর যেন সংখ্যাটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলাই ভালো। ধরা যাক, নিউইয়র্কে কেউ বেড়াতে এসেছেন। কোথাও বেড়াতে গেলে পর্যটকেরা কী করেন, না সাধারণত সে দেশের জনপ্রিয় কোন মনুমেন্টের ছবি তোলেন না কোন মেমেন্টো সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। টাইমস স্কোয়্যারের বৈশিষ্ট এই নগ্ন বডি পেইন্টেড মহিলারা। অনেক পর্যটক এই নগ্ন মহিলাদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য পয়সা খরচ করেন।

'সুখী মানুষ' ভান্টু দা'র গল্প

এক নামেই সবাই চেনে ভান্টু দা বলে। ভান্টু নামটি এতটাই পরিচিত যে, বাবা-মায়ের দেয়া নামটি আজ হারিয়ে গেছে। পুরো নাম অধির চন্দ্র কর্মকার। পিতা নিতাই কর্মকার। বাড়ি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির মৌকুড়ি গ্রামে ( আমতলা)। জীবনের বেশির ভাগ সময় পার করেছেন উপজেলা পরিষদের বারান্দায়। এখনও তার দিন কাটে উপজেলা পরিষদ চত্বরে। বয়স ৭০ বছর হয়েছে। তরুণ বয়সে পাতার তৈরি বাঁশি বাজিয়ে ও কথাবার্তায় অফিসের কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষকে মাতিয়ে রাখতেন। তবে বয়স হওয়ার সাথে সাথে পাতার বাঁশির কাছে হার মেনেছেন সাদা মনের মানুষ ভান্টু দা। সোমবার দুপুরে কথা হয় অধির চন্দ্র কর্মকার ওরফে ভান্টু দার সাথে। তার কাছে জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো শোনার চেষ্টা করলে তিনি এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। তারপরও মনের অজান্তেই বলতে থাকেন জীবনের হারিয়ে যাওয়া ৭০ বছরের কথা। জন্ম প্রতিবন্ধী হওয়ায় পার্শ্ববর্তী বাদশা কেরানির বাড়িতে ছোটবেলায় রাখালের কাজ শুরু করেন। গরু চড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন গাছের পাতা দিয়ে বাঁশি বানিয়ে সুরের ঝড় তোলেন। ভালো বাসতেন আমতলা বাজারে যাত্রাদলের শিল্পীদের অভিনয়। নিজেও অভিনয় করে মানুষকে হাসিয়ে মাতিয়ে রাখতেন।
গৃহকর্তা তাকে দিয়ে সব কাজ করালেও সততার কোনো কমতি পাননি তার মধ্যে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাড়ি জমান ভারতে। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরেই শিশু বয়সে বিয়ে করেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার বেলগাছি গ্রামের গীতা রানীকে। বিয়ের পর সংসার চালানোর জন্য কিছুদিন কাঠুরিয়ার কাজও করেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাঠুরিয়ার কাজ ছেড়ে দেন। এরপর আশ্রয় নেন উপজেলা চত্বরে। বিভিন্ন অফিসের বারান্দায় কাটতে থাকে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। অফিসের বারান্দায় থাকলেও ভান্টুর সততা, নিষ্ঠা ও তার গান, অভিনয়, পাতার বাঁশি ও ব্যবহারে মুগ্ধ হন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একদিন ভান্টুকে না দেখলে মনে হয় কিছু হারিয়েছে। এরপর তাকে দেওয়া হয় অফিস সহায়ক হিসেবে ঝাড়ুদার ও চা টানার কাজ। মাসিক বেতন না থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় তার সংসার সুখেই চলতে থাকে। এরই মধ্যে গীতা-ভান্টুর সংসারে একে একে ১০টি সন্তান জন্ম নেয়। এখন তার ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে জীবিত রয়েছেন। ছেলেরা বিয়ে করে তাদের মতো সংসার পেতেছে। ২ মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছেন। এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। বয়সের ভারে এখন আর পাতার বাঁশি বাজাতে পারেন না। তবে মনের জৌলুশ এখনও কমেনি। কর্মকর্তাদেরকে বিষন্ন দেখলেই কৌতুকপূর্ণ কথা বা কোনো অভিনয় করেন। এতে পড়ে যায় হাসির ঝিলিক। কখনো তার মন খারাপ দেখেছে কেউ -তা বলা দুষ্কর। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ দাবি করেন ভান্টু দা। ভান্টু দা বলেন, দাঁত পড়ে গেছে, শরীরও দুর্বল। পাতা থাকলেও এখন আর বাঁশি বাজাতে পারি না। ইচ্ছা করে বাঁশি বাজাই। তবে চেষ্টা করেও বাঁশি বাজাতে ব্যর্থ হই। দোয়া করবেন যেন বাকি জীবনটুকু ভালোভাবে কেটে যায়। বালিয়াকান্দি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া টগর বলেন, ভান্টু একজন সদালাপী, সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি। তার সততার মূল্য অনেক। তবে তাকে অনেকেই ঠকিয়েছে। সে কাউকে ঠকিয়েছে এমন নজির নেই। উপজেলা সহকারী মৎস্য অফিসার মো. রবিউল হক জানান, আমি ২০০৭ সাল থেকে ভান্টু দাকে চিনি। তিনি একজন সৎ ও ভালো মনের মানুষ। তাকে বিশ্বাস করে কেউ প্রতারিত হয়নি। অফিস পাড়াকে হাস্যজ্জ্বল করে রাখেন। তার মতো লোক এ সমাজে পাওয়া বিরল।

ফিলিস্তিনের জন্য জাতিসংঘ সংস্থা থেকে বরাদ্দকৃত অর্থ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনের জন্য জাতিসংঘ ত্রাণ সংস্থাকে দেয়া সাড়ে ছয় কোটি ডলার সহায়তা মঙ্গলবার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিয় গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিলিস্তিনকে অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার হুমকির দুই সপ্তাহ পর এমন পদক্ষেপ নেয়া হলো। ফিলিস্তিনি নেতৃবৃন্দের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য নয়, বরং অন্যান্য দেশকে সহায়তা প্রদান ও ইউএনআরডব্লিউএ-কে সংস্কারের জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনকে দেয়া সকল সহায়তা যারা বন্ধ করতে চান তাদের সঙ্গে এতে করে যে মানবিক ও কূটনৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে বলে যারা আশঙ্কা করছেন তাদের মধ্যে মতবিরোধের মধ্যেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হল। এই সিদ্ধান্তের ফলে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করে জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিয় গুতেরেস বলেন, ‘ইউএনআরডব্লিউএর ব্যাপারে আমি উদ্বিগ্ন। আমি তীব্রভাবে আশা করছি যে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইউএনআরডব্লিউএ এর জন্য তহবিল সরবরাহ অব্যহত রাখতে সক্ষম হবে। সংস্থাটিতে যুক্তরাষ্ট্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।’ তিনি আরো বলেন, সংস্থাটি ফিলিস্তিনী শরণার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিয়ে থাকে। সংস্থাটি দখলকৃত ভূখ- ছাড়াও জর্দান, সিরিয়া ও লেবাননে অবস্থানরত ফিলিস্তিন শরণার্থীদের সহায়তা দিয়ে আসছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘এই সেবাগুলো অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ । এরফলে যে শুধু এই জনগোষ্ঠিটির জন্য গুরুতর মানবিক সংকট সৃষ্টি হবে নাই নয়। পাশাপাশি এতে করে কিছু ইসরাইলির জন্যও সমস্যার সৃষ্টি হবে। এই সহায়তাটি ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নারী মুখপাত্র হেদার নয়ের্ট সাংবাদিকদের বনের, ‘কাউকে শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বের আরো অনেক দেশে তাদের চেয়েও বেশি সহায়তা দরকার বলে মার্কিন সরকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের বিশ্বাস।’ তিনি ফিলিস্তিন প্রশ্নে মার্কিন নীতিকে সমালোচনাকারী দেশগুলোকে ফিলিস্তিনীদের সহায়তার এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে ইউএন রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি ফর প্যালিস্টাইন রিফিউজি (ইউএনআরডব্লিউএ)’র প্রধান কর্মকর্তা পিয়েরে ক্রাহেনবুহল যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে জাতিসংঘের অন্যান্য সদস্যদের ফিলিস্তিনীদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

মেক্সিকোয় গণকবর থেকে ৩২টি লাশ উদ্ধার

মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য নায়ারিতে একটি গণকবরে অন্তত ৩২টি লাশ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার কর্তৃপক্ষ একথা জানায়। স্থানীয় প্রসিকিউশনের অফিসের এক কর্মকতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্রামীণ এলাকায় একটি কলা বাগানের অদূরে শনিবার প্রথম গণকবরটি সনাক্ত করা হয়। সেখানে নয়টি লাশ ছিল। সূত্রটি জানায়, পাশেই অপর দুটি গণকবর সনাক্ত করা হয়েছে। এসব কবরের লাশ প্রায় সম্পূর্ণই পচে গেছে। পরে একই অফিসের অপর সূত্র থেকে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত গণকবর থেকে ৩২টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনার তদন্ত চলছে।

জানতামই না আমার এত খুঁত! by শাহনাজ মুন্নী

ঘর গোছানো বা রান্না করার সময় গুনগুন করে গান গাওয়ার অভ্যাস রুচিতার (ছদ্মনাম)। বাড়িতে সবাই জানে ওর এই অভ্যাসের কথা। ওর গানের শব্দ শুনলেই মা বলতেন, ‘ওই যে আমার মেয়ের কাজ শুরু হয়েছে।’ বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসেও রুচিতার গুনগুনানি থামল না। ‘বউমা, তুমি তো দেখি বিরাট শিল্পী...।’ শাশুড়ি একদিন খাবার টেবিলে সবার সামনেই বলে বসলেন, ‘রাঁধতে রাঁধতে গান, ঘর গোছাতে গোছাতে গান...।’ সবার মুখ টিপে হাসা দেখে রুচিতার বুঝতে বাকি রইল না যে ওর গান নিয়ে এই বাড়িতে ঠাট্টা-তামাশা শুরু হয়ে গেছে। হঠাৎই যেন দপ করে নিভে গেল তার সমস্ত স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস। জোরে হাসে, খাবারের টেবিলে কেন কম কথা বলে—নানা বিষয়ে তাঁর খুঁত ধরতে থাকে এই নতুন সংসারের মানুষজন। রুচিতার মনে হতে থাকে—আমার এত খুঁত! এত দিন কিছুই জানতাম না। মিরা (ছদ্মনাম) বেড়ে উঠেছে ব্যবসায়ী পরিবারে। বাবা-চাচারা সব সময় রাত করে বাড়ি ফেরেন, রাত করে ঘুমান। সকালে সবারই ঘুম ভাঙে দেরি করে।
ওর শ্বশুরবাড়িতে আবার উল্টো নিয়ম। এখানে সবাই ঘুমান তাড়াতাড়ি, ওঠেনও তাড়াতাড়ি, একদম ভোরে দিন শুরু হয়ে যায় তাঁদের। প্রথম দিকে বাবার বাড়ির অভ্যাস নিয়ে খুব বিপদেই পড়েছিল মিরা। দেরি করে ওঠার জন্য মুখে কেউ কিছু না বললেও শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের চেহারা দেখেই বোঝা যেত, তাঁরা ব্যাপারটি ভালোভাবে দেখছেন না। লায়লার সমস্যা আবার অন্য রকম। ওর বাবার বাড়িতে বরাবরই দেখেছে বড় মাছে আদা-রসুন দেওয়া হয়, শ্বশুরবাড়ি এসে যখন সে নিজে রাঁধতে গেল, তখন সেই নিয়মেই রুই মাছের তরকারিতে সামান্য আদা-রসুন বাটা দিয়ে দিল। শাশুড়ি তখন পুরোই বিপক্ষেÿঅবস্থান নিয়ে বললেন, জীবনেও নাকি আদা-রসুন দেওয়া মাছের তরকারি খাননি তাঁরা। মুখে হাসি ধরে রাখলেও এই কথায় মনের মধ্যে রান্না করার ইচ্ছাটাই হঠাৎ উবে গেল লায়লার। এমনিতেই শাড়ি খুব একটা সহজে পরতে পারে না মিমি। পায়ে জড়িয়ে যায়। এর মধ্যে একটা শাড়ি পায়ে লেগে ছিঁড়েই গেল। মিমির বড় ননাস মুখ কালো করে বললেন, ‘শাড়িতে ফলস লাগাও না কেন? ফলস ছাড়া আবার শাড়ি পরে নাকি মানুষ?’ মিমির মনে হলো, বিরাট একটা অপরাধ করে বসেছে সে। অথচ এগুলো নিয়ে কোনো দিন যে কথা উঠতে পারে বা এগুলো যে উল্লেখ করার মতো কিছু, তা কখনোই মনে হয়নি তার। অথচ বিয়ের পর অনেক সময় দেখা যায় এ রকম ছোটখাটো ব্যাপারও বড় হয়ে ওঠে। এসব বিষয়ে কথাবার্তা যেন অনেকটা পিনের খোঁচার মতো, যা সামান্য হলেও পীড়াদায়ক। ‘বিয়ের পর জীবনটা আর আগের মতো থাকে না। বিশেষ করে মেয়েদের। “বিয়ের আগে ও পরে” এই নামে আস্ত একটা বই লেখা সম্ভব।’ বলছিলেন অন্বেষা (ছদ্মনাম)। সম্প্রতি বিয়ে করেছেন তিনি। তাঁর মতে, বিয়ের পর মেয়েরা নতুন একটা পরিবেশে এসে পড়ে, সেই পরিবেশে বিয়ের আগের অনেক আচরণই ঠিক খাপ খায় না।
এ ক্ষেত্রে শ্বশুরবাড়ির মানুষদের ইতিবাচক ভূমিকা রাখা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল আরাকানসাসের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিফাত আকতার এ প্রসঙ্গে বললেন, আমরা সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের বিষয়কে নারীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার একটা প্রচেষ্টা হিসেবে দেখি। কর্তৃত্বপরায়ণতা আর নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা মানুষের স্বভাবজাত ব্যাপার। বাংলাদেশের মতো একটা কঠিন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে নারী ও শিশুদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কারণ, তারা শারীরিকভাবে দুর্বল। একজন নারী যখন শাশুড়ি হন বা ননদ, ননাস—তখন তাঁরাও সুযোগ পেলে ছেলের বউ বা ভাইয়ের বউকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। সংসারে নতুন আসা সদস্যকে সহজভাবে গ্রহণ করা বা কোনো কিছু তাঁকে বুঝিয়ে বলার চাইতে কঠিন গলায় বা ধমক দিয়ে শোধরানোকেই তাঁরা নিয়ম মনে করেন। তার অবস্থানে রেখে তাকে বোঝার চেষ্টা করেন না। যেহেতু পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এই নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করে, সেহেতু শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসব না করার জন্য সামাজিক কোনো চাপও অনুভব করে না। অন্যদিকে একটা ছেলেরও কিন্তু নানা রকম আচরণগত সমস্যা থাকতে পারে, যা তাদের বিবাহিত জীবনকে প্রভাবিত করে, যেমন দেরি করে বাড়ি ফেরা, সিগারেট খাওয়া, গৃহস্থালির কাজে অংশ না নেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ছেলেটিকে কেউই বিয়ের পর তার আচরণগুলো বদলানোর জন্য চাপ দেয় না। এই অবস্থা খুব ধীরে ধীরে পাল্টায়, যখন যৌথ পরিবারের বদলে একক পরিবার নির্মিত হয়। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাইরে কাজ করেন, কিন্তু তখন আবার স্ত্রীর ওপর স্বামীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অন্য গল্প শুরু হয়ে যেতে পারে। যাক, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। আপাতত এই খুঁত ধরাই সামলানো যাক!
লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

বাড়তি লাগবে ৭৫ লাখ কোটি টাকা

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে সরকারকে যেসব নতুন কর্মসূচি নিতে হবে, এ জন্য আগামী ১৩ বছরে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ৯৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার লাগবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৭৫ লাখ কোটি টাকার সমান। এসডিজির অর্থায়ন নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক প্রাক্কলনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। আজ বুধবার থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) বৈঠকে অর্থায়নের এ হিসাব তুলে ধরা হবে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, এসডিজি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত এই অর্থ চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের প্রায় ১৯ গুণ। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এসডিজির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কী কী কর্মসূচি নেওয়া হবে, তা চলতি জানুয়ারি মাসেই চূড়ান্ত করা হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা থাকবে। ইতিমধ্যে নতুন কর্মসূচি কী নেওয়া হবে, এর প্রস্তাব পাঠিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো। একটি মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ ৭৪টি নতুন কর্মসূচির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। বেশির ভাগ মন্ত্রণালয় ৩০-৩৫টি করে নতুন কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এসডিজির অনেক কিছুই সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিস্তারিত আসেনি। এখন এসডিজির জন্য নতুন নতুন কর্মসূচি নিতে হবে। এ জন্য অতিরিক্ত অর্থ লাগবে। অতিরিক্ত অর্থের ৪২ শতাংশ সরকারি উৎস থেকে দেওয়া সম্ভব। বাকিটা বেসরকারি খাত, বিদেশি সহায়তা ও বিদেশি বিনিয়োগ থেকে আসতে পারে। তিনি জানান, উন্নত দেশগুলো তাদের মোট দেশজ আয়ের (জিএনআই) দশমিক ৭ শতাংশ স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দেবে। ওই সব দেশ প্রযুক্তি হস্তান্তর করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন ওই সব দেশের কাছে এসব সম্পদ চাইতে হবে। পাঁচটি খাত থেকে এসডিজির এই অর্থ জোগাড় করা হবে বলে জিইডির প্রাক্কলনে বলা হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি ও বেসরকারি খাতের অর্থায়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বৈদেশিক সহায়তা এবং এনজিও খাতের অর্থায়ন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪২ শতাংশ অর্থায়ন আসবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ থেকে।
এ ছাড়া সরকারি খাত থেকে ৩৫ শতাংশ, পিপিপি থেকে ৬ শতাংশ, এফডিআই ও বৈদেশিক সাহায্য থেকে ১৫ শতাংশ এবং বাকিটা এনজিও খাত থেকে আসবে। এসডিজি অর্থায়নের এই প্রাক্কলন তৈরিতে দুটি বিষয়কে মূলত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এ বিবেচনার জন্য ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) গড় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। দ্বিতীয়ত বিবেচনায় ধরা হয়েছে, এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশে উন্নীত হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই ধারা এসডিজির ৮ নম্বর লক্ষ্যের চেয়ে অনেক বেশি। এসডিজির ৮ নম্বর লক্ষ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য টেকসইভাবে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। জিইডির হিসাবে, ২০১৭ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৪ লাখ ৯৮ হাজার বিলিয়ন টাকা (প্রতি বিলিয়নে ১০০ কোটি)। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি বড় সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে জিইডির প্রতিবেদনে। এর মধ্যে প্রথমেই আছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও কার্যক্রম বাস্তবায়নে সক্ষমতা বাড়ানো। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি প্রকল্প শেষ হতে যত দেরি হবে, এর সম্ভাব্য সুফল পাওয়ার হার তত কমে যায়। আগামী ১৩ বছর ধরে কর আদায় ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট হারে বাড়ানো কঠিন হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এ জন্য অবশ্যই প্রযুক্তির ব্যবহার ও সক্ষমতা বাড়ানোর মতো সংস্কারকাজ বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গে দর-কষাকষির ওপর এ খাতে অর্থ পাওয়া নির্ভর করবে। তাই গুরুত্ব অনুসারে বাংলাদেশকে বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নিতে হবে।

দেশে গরু-ছাগলের সংখ্যা বাড়ছে

দেশে গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার উৎপাদন বাড়ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, কয়েক বছরে মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ায় গবাদিপশু পালনে আগ্রহী হয়েছেন দেশের খামারিরা। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পশুর খামার করার বেশ আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে বাজারেও গরুর মাংসের দাম কিছুটা কমেছে। ঢাকার মাংস ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রতি কেজি মাংসের দাম ৪৮০-৫২০ টাকা থেকে কমে দেশি ও ভারতীয় গরুভেদে ৪৪০-৪৮০ টাকায় নেমেছে। ঢাকার বাইরে কোনো কোনো উপজেলা শহরে দাম নেমেছে ৪০০ টাকায়। চাহিদা কম থাকা ও গরুর সরবরাহ বৃদ্ধি দাম কমার কারণ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে দেশে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজারে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ লাখ ৮৮ হাজার বেশি।
এর মধ্যে গরুর সংখ্যা বেড়েছে দেড় লাখ। দেশে গবাদিপশু পালন ও গরুর মাংস উৎপাদনে এ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনেও। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানির বিষয়ে মতামত চাইলে ট্যারিফ কমিশন এ প্রতিবেদন তৈরি করে। কমিশন গবাদিপশু ও মাংস উৎপাদনের তথ্য নিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছ থেকে। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) মো. মাজহারুল আলম আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষিত বেকার যুবকেরা এখন গবাদিপশুর খামার করছেন। গরু ও মাংস আমদানি না হলে মাংসের উৎপাদন ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি না গরু অথবা মাংস আমদানি হোক। এটা হলে দেশের খামারগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে।’ দেশে গরু পালনের এ প্রবণতা শুরু হয় ভারত সরকার সীমান্ত দিয়ে গরু আসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের পর। ২০১৪ সালে মে মাসে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু পাচার রোধে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এর আগে আনুষ্ঠানিক হিসাবে দেশে বছরে ২০ লাখের মতো গরু ভারত থেকে আসত। অবশ্য ভারতীয় গরু আসা কমে যাওয়ায় দেশে খামার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে যে ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার গবাদিপশু ছিল, তার মধ্যে গরুর সংখ্যা ২ কোটি ৩৯ লাখ, মহিষ ১৪ লাখ ৭৮ হাজার, ছাগল ২ কোটি ৫৯ লাখ এবং ভেড়া ৩৪ লাখ। এ সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তরটি।
গরুর মাংসের দাম কমেছে
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মাংস বিক্রেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি এখন প্রতি কেজি গরুর মাংস ৪৪০ থেকে ৪৬০ টাকায় বিক্রি করেন। এ দর দুই মাস আগেও ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেশি ছিল। দাম কমার কারণ জানতে চাইলে ওই বিক্রেতা বলেন, ৫০০ টাকায় গরুর মাংস কেনার সাধ্য সাধারণ মানুষের নেই। এ কারণে চাহিদা খুব কম। কাজীপাড়ার ব্যবসায়ী মো. সেলিম ছোট গরুর মাংস বিক্রি করেন। তিনি বলেন, কিছুদিন আগেও প্রতি কেজির দর ৫০০ টাকার বেশি ছিল। এখন ৪৭০-৪৮০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। কুষ্টিয়ার পৌরবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৪২০ টাকায় নেমেছে, যা কিছুদিন আগেও ৪৫০-৪৬০ টাকা ছিল। বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় গরুর মাংস বিক্রি হয় ৪০০ টাকা কেজিতে, যা কিছুদিন ৩৮০ টাকা ছিল বলে জানান সেখানকার মাংস বিক্রেতারা।

তিন হাজার বিদ্যালয়ে নতুন ভবন হবে

সারা দেশের তিন হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনসহ অন্যান্য ভবন নির্মাণ ও আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য ১০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে একেকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে সাড়ে তিন কোটি টাকা করে বরাদ্দ পেতে পারে। সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আওতায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বর্ধিত চাহিদা পূরণ ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য এই প্রকল্প গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের সভার বিস্তারিত জানান।
তিন হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য প্রকল্পটি নেওয়ার কারণ হিসেবে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা গত কয়েক দশকে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সবার জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। দেশে বর্তমানে ৩২৭টি সরকারি ও ১৯ হাজার ৩৫৭টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৯১ লাখ ৬০ হাজার। বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ প্রকল্পসহ একনেক সভায় মোট ১৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৯টি নতুন ও বাকিগুলো সংশোধিত প্রকল্প। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৪৮২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার ১৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, বিভিন্ন সংস্থা ৯৫ কোটি ও প্রকল্প সাহায্য হিসেবে ২ হাজার ১৭ কোটি ১১ লাখ টাকা অর্থায়ন করবে। একনেকে অনুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলো হচ্ছে বন্যাপ্রবণ ও নদীভাঙন এলাকায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়); জেলা ত্রাণ গুদাম কাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ; চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় মহানন্দা নদী ড্রেজিং ও রাবার ড্যাম স্থাপন; বৃহত্তর চট্টগ্রাম গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩; বৃহত্তর ফরিদপুরের চরাঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন ও দুধের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতকরণ কারখানা স্থাপন; অগ্রাধিকারমূলক গ্রামীণ পানি সরবরাহ; বরুড়া উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত চাঁপাপুর-বরুড়া, নিমসার-বরুড়া এবং খাজুরিয়া-বরুড়া জেলা মহাসড়ক তিনটি যথাযথ মানে ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বহুতল অফিস ভবন নির্মাণ। এ ছাড়া একনেক সভায় অনুমোদিত হওয়া সংশোধিত প্রকল্পের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ; রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে ৭টি র‍্যাব কমপ্লেক্স নির্মাণ; এ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্পপার্ক; জরুরি ২০০৭ ঘূর্ণিঝড় পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রকল্প (ইসিআরআরপি): এলজিইডি অংশ এবং জরুরি ২০০৭ ঘূর্ণিঝড় পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রকল্প (ইসিআরআরপি): পিসিএমইউ অংশ।

ব্যবসায়ে বোয়িংকে পেছনে ফেলল এয়ারবাস

উড়োজাহাজ ব্যবসায়ে ২০১৭ সালে মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের চেয়ে ইউরোপীয় কোম্পানি এয়ারবাস ভালো ব্যবসা করেছে। ২০১৭ সালে ১ হাজার ১০৯টি উড়োজাহাজ তৈরির ক্রয়াদেশ পেয়েছে এয়ারবাস। একই সময়ে বোয়িং ৯১২টি উড়োজাহাজ তৈরির ক্রয়াদেশ পেয়েছে। বোয়িংকে পেছনে ফেলার বছরে এয়ারবাসের ব্যবসা আগের ২০১৬ সালের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। এয়ারবাস হলো ইউরোপের একাধিক দেশের মালিকানাধীন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭০ সালের ১৮ ডিসেম্বরে এটি কার্যক্রম শুরু করে। আর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং ১৯১৬ সালে উইলিয়াম বোয়িংয়ের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে। বিক্রি ও আয়ের হিসাবে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হলো বোয়িং। গত বছরে ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও উড়োজাহাজ সরবরাহে অবশ্য এগিয়ে ছিল বোয়িং। সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৭৬৩টি উড়োজাহাজ বিশ্বের বিভিন্ন বিমান সংস্থার হাতে তুলে দিয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি। একই সময়ে এয়ারবাস ক্রেতাদের সরবরাহ করেছে ৭১৮টি বিমান। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) অনুষ্ঠিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ প্রদর্শনী দুবাই এয়ার শোতে ৭৭৬টি বিমান তৈরি ও সরবরাহের ক্রয়াদেশ পায় এয়ারবাস। এয়ারবাসের এসব বিমান কিনবে ভারতের ইনডিগো, ইউরোপের উইজ এয়ার হোল্ডিংস ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফ্রন্টিয়ার এয়ারলাইনস হোল্ডিংস। ২০১২ সাল থেকেই উড়োজাহাজ তৈরির ক্রয়াদেশপ্রাপ্তিতে বোয়িংকে পেছনে ফেলছে এয়ারবাস। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা জন লিয়াইয়ের নেতৃত্বে এ সাফল্য অর্জন করছে এয়ারবাস। ২০১৭ সালে সাত শতাধিক উড়োজাহাজ সরবরাহে এয়ারবাসকে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিশেষ করে এ৩২০ সিরিজের অপেক্ষাকৃত ছোট বিমানের ইঞ্জিন তৈরিতে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। এরপরও গত বছর এ সিরিজের ৫৫৮টি বিমান ক্রেতাদের বুঝিয়ে দিয়েছে এয়ারবাস। একই সময়ে এ৩৫০ সিরিজের ৭৮টি বিমান সরবরাহ করেছে ইউরোপীয় কোম্পানিটি। আর এয়ারবাসের সবচেয়ে বড় ও বিলাসবহুল সিরিজ এ৩৮০ সিরিজের উড়োজাহাজ হস্তান্তর হয়েছে ১৫টি।  এয়ারবাসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ফ্যাব্রিস ব্রিগার বলেন, চলতি ২০১৮ সালে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ সরবরাহের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে যাবে। এ বছর এ৩২০ নিও সিরিজের উৎপাদন বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হবে। এটা করতে পারলে এ বছরের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এই সিরিজের বিমানের ইঞ্জিন তৈরিতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান প্র্যাট অ্যান্ড উইথনি গত বছর সমস্যায় পড়ায় সরবরাহ কমে গিয়েছিল বলে স্বীকার করেন ফ্যাব্রিস ব্রিগার।

জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে by আফ্রাসিয়াব খটক

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা প্রসঙ্গে বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন, তার প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানোর কারণে পাকিস্তান ভেঙে যায়। কিন্তু তাঁর নিন্দুকেরা এই তুলনাকে কল্পনাপ্রসূত ও সুদূরপ্রসারী আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তান যে বিপজ্জনক অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা যৌক্তিকভাবে ও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হলে বোঝা যাবে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর। তখন এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লাহোরের ছাত্ররা ছোট একটি জনসভার আয়োজন করেছিলেন। গণমানুষের কবি হাবিব জিলাব এবং বিশিষ্ট বাম নেতা বেগম তাহিরা মাজহার আলী খান ছাড়া আরও কয়েকজন ছাত্রনেতা ওই সমাবেশে বক্তৃতা করেন। সেই ছাত্রনেতাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। গণমাধ্যমে আমাদের সমাবেশের খবর আসেনি। পুলিশ আমাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। এরপর দেখা গেল, ‘দেশপ্রেমিক’ রাজনৈতিক দলগুলো সামরিক অভিযানের সমর্থনে মিছিল শুরু করল। বাকিটা ইতিহাস। এরপর দ্রুত সাম্প্রতিক কালে চলে আসি, তারপর পাঞ্জাবি ভোটারদের রায় কীভাবে পাঞ্জাব প্রভাবিত নিরাপত্তা বাহিনী অস্বীকার করল, সে প্রসঙ্গে আসি।
জনসংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তানের ছোট প্রদেশ যেমন পাখতুনখাওয়া, বেলুচিস্তান ও সিন্ধের জনগণের রায় বেশ কয়েকবার লঙ্ঘন করা হয়েছে, যার কোনো বিচার হয়নি। শুধু তা-ই নয়, এখানকার মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে যখনই আন্দোলন হয়েছে, তখনই তার ওপর চরম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নেমে এসেছে। এমনকি সামরিক অভিযানও চালানো হয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের পর এই প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী পাঞ্জাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত ক্ষমতাসীন সরকারকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাল। প্রকৃত শাসকেরা রাজনৈতিক কারসাজির সব কৌশল ব্যবহার এবং গোয়েন্দাদের দিয়ে বল প্রয়োগ করিয়ে পাঞ্জাবের জনপ্রিয় নেতৃত্ব ধ্বংস করে দিতে চায়। তবে সবচেয়ে অসাধারণ ব্যাপার হলো, পাঞ্জাবের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নওয়াজ শরিফ সব রকম চাপের মুখেও নতি স্বীকার করেননি। বড় বড় গণমাধ্যম বেসামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতাকাঠামোর ভাষ্য প্রচার করে যাচ্ছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে মানুষ সত্যটা জানতে পারছে। এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বা অন্যান্য ছোট প্রদেশে জেনারেলরা যে ‘গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসার’ কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, তা পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে কাজে আসবে না। কারণটা হলো, সামরিক ও আমলাতন্ত্রের সিংহভাগ অভিজাত লোক এই প্রদেশের। কিন্তু এই দ্বিচারণে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে দুই পরিস্থিতির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য আছে, আর তা হলো আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা। ১৯৭১ সালের তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের জনতার ওপর নির্মম সামরিক নিপীড়ন চালিয়ে নিজেদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। ওই দলটি জান্তার সুনজরে ছিল না, তাই মানুষের ওপর এমন নির্যাতন চালায় তারা। এমনকি জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো বুদ্ধিমান ও উজ্জ্বল পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই বিচ্ছিন্নতার অর্গল ভাঙতে পারেননি। আর আজকের পাকিস্তান ধর্মীয় চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের কারণে মারাত্মকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভীতিকর ব্যাপার হলো, বেসামরিক সরকার যত নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, ততই দেশটিতে চরমপন্থী ও জঙ্গিদের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। যাহোক, খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী পারভেজ খটক প্রকাশ্যে ধর্মীয় চরমপন্থীদের জোট ডিফেন্স অব পাকিস্তান কাউন্সিলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে আফগানিস্তানে ‘জিহাদের’ প্রতি সমর্থন এবং দেশটিতে শরিয়াহ আইন আরোপ করা। প্রতীকীভাবে আফগান সীমান্ত লাগোয়া একটি প্রদেশকে তালেবানদের হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ হলো আফগানিস্তানে তালেবানদের যুদ্ধে সায় দেওয়া। কম করে বললেও, এই নীতি আত্মঘাতী হবে। এই নীতি কে প্রণয়ন করেছে এবং তার পরিণতি কে ভোগ করবে? আফগান প্রসঙ্গে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেন চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে। আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল খুররম এজেন্সিতে ড্রোন হামলার খবর মূলধারার গণমাধ্যমে আসেনি। কিন্তু পাকিস্তানের সেরা বন্ধুদের কাছেও তার এই চরমপন্থার প্রতি হৃদয়ে ভালোবাসার জায়গা থাকাটা হতাশাজনক। ২০১৭ সালের ব্রিকস সামিটের ঘোষণা যদি মাথায় রাখি, তাহলে বলতে হয়, চীনের মতো ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর পক্ষেও পাকিস্তানের এই রোমাঞ্চকর নীতি হজম করা কঠিন। সাধারণ নির্বাচনে কয়েক মাস আগে বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক কারসাজির কারণেও বিপর্যয় ঘটতে পারে। বেলুচিস্তান দীর্ঘতম জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহ মোকাবিলা করছে। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্বের কারণে এই প্রদেশ হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। সৌদি আরব বেলুচিস্তানে ওয়াহাবি ও সালাফি মতবাদের প্রসার ঘটাতে টাকা দিচ্ছে। জমাতুদ দাওয়া (জেইউডি) ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অনেক নতুন কেন্দ্র নির্মাণ করছে। এটাও পরিষ্কার যে ইরান চুপচাপ বসে থাকবে না। শত্রুর শত্রুকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান খুবই প্রায়োগিক। তারা কট্টরপন্থী সুন্নি আল-কায়েদা ও তালেবানদের সমর্থন করতে পিছপা হয়নি, যদিও এরা একসময় তাদের শত্রু ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা এদের সমর্থন দিয়েছে। ফলে এখন যদি তারা সৌদিদের বিরোধিতায় বেলুচ জনগণকে টাকা দেয়, তাহলে কে তাদের ঠেকাবে? এখন বেলুচিস্তানে স্থিতিশীলতা দরকার। ফেডারেশনের মধ্যে পিএমএল-এনকে ঠেকানোর জন্য বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকারকে বেছে নেওয়া হয়েছে। জানুয়ারির মধ্যে বেলুচিস্তান, পাখতুনখাওয়া ও সিন্ধের প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দেওয়া হলে এবং সেই সঙ্গে পাঞ্জাবে বিক্ষোভ হলে এবং সংসদের বিরোধীরা বিক্ষোভ করলে তা হবে চলমান অচলাবস্থা অকালে গুটিয়ে ফেলার উপায়। সমালোচকদের তুলে নিয়ে ভিন্নমত দমন করা হলে সমস্যার সমাধান হবে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলতে দিয়ে ঘর ঠিক রাখা হলে এবং চরমপন্থা ও সন্ত্রাসপন্থার মূলোৎপাটনে এনএপি বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে একমাত্র সমাধান। আমরা সবাই জানি, যারা ইতিহাস থেকে শেখে না, তারা এর পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য নেশন ডট কম থেকে নেওয়া।
আফ্রাসিয়াব খটক: পাকিস্তানের আঞ্চলিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

তিউনিসিয়ার মানুষ বিক্ষোভ করছে কেন by ইউসেফ শরিফ

তিউনিসিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক বেন আলীর পতনের সাত বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু তা উদ্যাপনের বদলে তিউনিসিয়ার মানুষ আবার রাস্তায় নেমে এল। সমস্যাটা ঠিক কোথায়? ১৯৫০-এর দশকে দেশটিতে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যেটা পরবর্তীকালে পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে যায়। এরপর সেখানে রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। জনগণকে সরকারি কার্যক্রম থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু তিউনিসিয়ার বিপ্লবের পর এই নিষেধাজ্ঞা দূরীভূত হয় এবং সেখানকার মানুষ রাজনীতি করার সুযোগ পায়। সেই ২০১১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তিউনিসিয়ার মানুষ ক্রমে রাজনীতিক হয়ে উঠেছে। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা সবার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। কিন্তু বিপ্লবের পর দেশটিতে স্বকীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দেশটির অর্থনীতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া উন্মুক্ত হওয়ার সীমা আছে এবং অব্যবস্থাপনা যখন আর সহ্যসীমার মধ্যে থাকল না, তখন মানুষ আবার ক্রোধে ফেটে পড়ল। বস্তুত, ২০১১ সালের পর থেকে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনমন ঘটেছে। ২০১০ সালে দেশটির ঋণের বোঝা ছিল তার মোট দেশজ উৎপাদনের ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৬ সালে যা দাঁড়ায় ৬০ দশমিক ৬ শতাংশে। ডলারের সাপেক্ষে তিউনিসিয়ার মুদ্রা দিনারের ৪০ শতাংশ অবনমন হয়। আর তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব তো আছেই, যার হার বর্তমানে ৩৫ শতাংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমে বাড়ছে। দেশটির সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, তাঁদের জীবনমানের অবনমন ঘটেছে। প্রতি মাসেই তাঁরা খরচের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। চলমান বিক্ষোভ শুরু হওয়ার এটাই মূল কারণ। আর আরেকভাবে বললে, গত সাত বছরে দেশটিতে যত বিক্ষোভ হয়েছে, তার মূল কারণ হচ্ছে এই অসন্তোষ। ১ জানুয়ারি দেশটিতে নতুন যে অর্থ আইন কার্যকর হয়েছে, তা যেন স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছে। এই আইন গত বছর সংসদে পাস হয়েছে। গণমাধ্যমে এটি আলোচিত হলেও মানুষ তখন ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। দ্রব্যের দাম যখন বেড়ে গেল, তখনই কেবল মানুষ বুঝতে পারল। মূলত একদল তরুণ কর্মী এই প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করেছেন, যার নাম ‘ফেক নেস্তানাউ’। প্রথমে অল্প কিছু মানুষ এই আন্দোলন শুরু করে, যা তখন মূলত দেয়াললিখন ও লিফলেট বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু দেশটির পুলিশের এখনো সংস্কার হয়নি, বেন আলীর যুগে তারা যেভাবে কাজ করত, এখনো তারা সেভাবেই কাজ করে। দেখা গেল, তারা আন্দোলনকারীদের নির্যাতন ও নিপীড়ন করে জেলে পুরল। এরপর এই আন্দোলনের গায়ে কালিমা লেপণ শুরু হলো। তবে মানুষের মনের গভীরে যে সুপ্ত ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল, তার কারণে তারা ‘ফেক নেস্তানাউ’র বাইরেও আন্দোলন করতে শুরু করে। এর সঙ্গে নৈরাজ্যিক প্রবণতার কিছু বামপন্থী দলও এই আন্দোলনে যোগ দেয়। রাজধানী তিউনিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
তখন অপরাধীরা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নানা জায়গায় লুটপাট শুরু করে। তবে চলমান সংকটটি বেন আলীর পতনের পর আরও এক বড় সংকটের মধ্যেই তৈরি হলো। দেশটিতে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দুটি দল বিজয়ী হয়েছে। একদিকে ছিল মধ্যপন্থী দল নিদা টৌনস, অন্যদিকে ইসলামপন্থী দল এনাহ্ধা। এনাহ্ধার ইসলামি রাজনীতির বিরোধিতা করেই প্রচারণা শুরু করেছিল নিদা, যদিও শেষমেশ দলটি ইসলামপন্থীদের সঙ্গে জোট গড়তে রাজি হয়। এতে দলটির তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। অনেক কর্মীই দল থেকে পদত্যাগ করেন। আর দলের নেতা বেজি কাইদ এসেবসি দেশের প্রেসিডেন্ট হলে পরবর্তী নেতা নির্বাচন নিয়ে আরেক সংকট সৃষ্টি হয় এবং দলটি ভেঙে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই এই জোট শুরু থেকেই খুব দুর্বল ছিল। বলা যায়, একধরনের অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে এটি গড়ে উঠেছিল। দুই দলের নেতা কাইদ এসবেসি ও রাচেদ ঘানুচির মতৈক্যের ভিত্তিতে যে ‘ঐকমত্য’ গড়ে উঠেছিল, তা দুই দলের ভেতরে শিকড় গাড়তে পারেনি। এই ঐক্য খুবই অকিঞ্চিৎকর ছিল। মন্ত্রী ও সাংসদেরা তাঁদের ভিত্তি থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের স্বার্থে অনেক আইন পাস ও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যার পরিসরও ছিল খুব সীমিত। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে নিদা দুর্বল হলেও প্রতীকীভাবে তারা এখনো শক্তিশালী। দেশটির বহু ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ মানুষের কাছে এই দল এনাহ্ধার ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প। তিউনিসিয়ার আমলাদের কাছে এটি পুরোনো রাষ্ট্রীয় পার্টি। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এটি তিউনিসিয়ার ‘আধুনিকতাবাদী’ রূপ। আর এনাহ্ধা মনে করে, ইসলামপন্থার ব্যাপারে যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বৈরিতা আছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে নিদা মুখ লুকানোর পর্দা হিসেবে ভালো। এই ‘ঐকমত্য’ যতই অকার্যকর হোক না কেন, এ দুই বিধ্বস্ত শত্রুর কাছে তা শ্রেষ্ঠ বিকল্প হতে পারে। সে কারণে সংসদ যখন সরকারের প্রণীত অর্থ আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, তখন ‘ঐকমত্যের’ সাংসদদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন বিরোধিতা দেখা যায়নি, যার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলেরও ভূমিকা আছে। সাংসদেরা আইনটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু জনসমক্ষে তাঁরা এর পক্ষে কথা বলেননি, এমনকি নিজের নির্বাচনী এলাকায় তা নিয়েও যেতে পারেননি। এ ছাড়া আরেকটি কারণেও এটি ঘটেনি। সেটা হলো দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইউসেফ চাহেদ ও জোটবদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে মতানৈক্যের কারণে এই অর্থ আইন নিয়ে যেমন খুব একটা প্রচারণা চালানো হয়নি, তেমনি এর বাস্তবায়নও ছিল খুব সীমিত। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক একরকম অকার্যকর, যার কারণে চলমান সংকটে আরও একটি মাত্রা যোগ হয়েছে। এ রকম অচলাবস্থায় একনায়কতন্ত্রের যুগের পুরোনো রীতি ফিরে আসতে পারে। রাষ্ট্রটি আবারও পুলিশি রাষ্ট্র হতে পারে। জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআর ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সম্প্রতি তিউনিসিয়ার সরকারকে এ ধরনের পদক্ষেপের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। সে কারণে সমাধান খোঁজার জরুরত আছে। সম্ভবত ২০১৪ সালের মতো টেকনোক্র্যাট সরকার গঠন করে ২০১৮ সালের স্থানীয় এবং ২০১৯ সালের শেষ দিকের আইনসভা ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে। দেশটির মানুষ আশা করে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিতে নতুন মুখ আসবে এবং তারা নতুন, অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল ও সক্ষম রাজনীতিক পাবে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, আল-জাজিরা থেকে নেওয়া।
ইউসেফ শরিফ: তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক ভাষ্যকার।

ট্রাম্প ও আমেরিকার বর্ণবাদী মন by হাসান ফেরদৌস

ডোনাল্ড ট্রাম্প কি একজন বর্ণবাদী? দেড় বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এই প্রশ্নে বিতর্ক করছে। ট্রাম্প নিজে নানাভাবে এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টকে তিনি বিদেশি বলে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছেন। মেক্সিকানদের ঢালাওভাবে বলেছেন ধর্ষক, আফ্রিকান-আমেরিকানদের বলেছেন অলস ও খুনে, সন্ত্রাসবাদী—এই কারণে মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করেছেন, এমনকি কু ক্ল্যাক্স ক্ল্যানের মতো শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মধ্যে ভালো মানুষ খুঁজে পেয়েছেন। তারপরও তাঁকে কেউ সরাসরি বর্ণবাদী বলেনি, তাঁর এই মনোভাবকে রাজনৈতিক রণকৌশল ভেবে তার ব্যাখ্যা করেছে। সব বদলে গেল গত বৃহস্পতিবার। এদিন হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক সিনেটরদের সঙ্গে অভিবাসন প্রশ্নে আলোচনার সময় হাইতি ও আফ্রিকার দেশগুলোকে ‘জঘন্য’ (তাঁর ভাষায় ‘শিট হোল’) দেশ বলে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘এসব দেশ থেকে আমাদের লোক নিতে হবে কেন? তার চেয়ে আমরা নরওয়ের মতো দেশ থেকে লোক নিই না কেন?’ ট্রাম্পের কথা থেকে স্পষ্ট, তিনি আফ্রিকা বা হাইতি থেকে কাউকে চান না। কারণ, তারা কালো ও দরিদ্র। তিনি নরওয়ের লোকদের স্বাগত জানাবেন, কারণ তারা সাদা ও সচ্ছল। কোনো সন্দেহ থাকল না, শুধু গায়ের রং ও অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে তিনি তাঁর অভিবাসন নীতিনির্ধারণ করতে চান। এটি যদি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হতো, তাহলে হয়তো আমরা অগ্রাহ্য করতে পারতাম। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে ট্রাম্প তাঁর জাতীয় অভিবাসন নীতি নির্মাণ করতে যাচ্ছেন, উদ্বেগটা সে কারণেই। জেমস বলডুইন বলেছিলেন, বর্ণবাদ হলো একদিকে দৃষ্টিভঙ্গি, অন্যদিকে ক্ষমতার ব্যবহার। সন্দেহ নেই, এই মানদণ্ডে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একজন বর্ণবাদী। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ নিজেদের দেশকে আধুনিক গণতন্ত্রের সেরা উদাহরণ হিসেবে দাবি করে থাকে, এই দেশকে ‘পর্বতচূড়ায় প্রতিশ্রুত উজ্জ্বল গৃহ’ বিবেচনা করে। আর এই দেশের প্রেসিডেন্ট, নিউইয়র্কার পত্রিকার রবিনরাইটের ভাষায়, তাঁর ‘শুধু এক শব্দ ব্যবহারের ভেতর দিয়ে বিশ্বের মানুষের কাছে নিজের সব সম্মান, সব মর্যাদা হারালেন।’ খবরটি প্রচারিত হওয়ার ১৫ ঘণ্টা পর ট্রাম্প বললেন, অভিবাসন নিয়ে আলোচনার সময় তিনি ‘শক্ত ভাষা’ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু ঠিক এ কথা বলেননি। অন্যদিকে সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন ডেমোক্রেটিক সিনেটর ও একজন রিপাবলিকান সিনেটর বলেন, ট্রাম্প একবার নন, কয়েকবার ‘শিট হোল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাঁর মুখের ওপরেই সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম প্রতিবাদ করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস এক বিশেষ সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছে, অস্বীকার করলে কী হবে, ট্রাম্প অবশ্যই সে কথা বলেছেন। ‘ভুলে যাবেন না, ট্রাম্প শুধু একজন বর্ণবাদী, মূর্খ, অযোগ্য ও মর্যাদাহীন ব্যক্তি নন। তিনি একজন মিথ্যাবাদীও।’ বস্তুত, ট্রাম্প কোনো রকম ভাবনাচিন্তা ছাড়াই এমন ঢালাও মন্তব্য করেছেন, এ কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। তিনি বর্ণবাদী রণকৌশল ব্যবহার করেই গত নির্বাচনে সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই বর্ণবাদ এখনো তাঁর তুরুপের তাস, অন্ততপক্ষে তাঁর নিজের অনুগত সমর্থকদের মধ্যে। এটা গোপন ব্যাপার নয় যে একদিকে মন্দাবস্থা, অন্যদিকে অব্যাহত অভিবাসনের কারণে মার্কিন নির্বাচকদের একটি অংশ প্রবল অভিবাসীবিরোধী হয়ে পড়েছে। এরা নিজেরাও এ দেশে এসেছে অভিবাসী হিসেবে, অধিকাংশই সেই সময়ের দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত দেশ থেকে। কিন্তু তাদের গায়ের রং সাদা। ফলে সাদা অভিবাসীদের নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই, আপত্তি শুধু সেসব অভিবাসীকে নিয়ে, যাদের গায়ের রং কালো অথবা পীত। আমেরিকার এই বর্ণবাদী মনটি অন্য সবার চেয়ে সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহারে সক্ষম হয়েছিলেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে এই দেশের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। অথচ সত্যি কথা হচ্ছে তাঁর সমর্থক হিসেবে পরিচিতদের কাছে তাঁর কথা যথার্থ বলেই মনে হয়েছে। ফক্স নিউজের উপস্থাপক টাকার কার্লসন বলেছেন, মার্কিনরা মনে মনে যা ভাবে, প্রেসিডেন্ট শুধু মুখে সে কথা বলেছেন।
এতে আপত্তির কী আছে? সাবেক রিপাবলিকান স্পিকার ন্যুট গিনগ্রিচ বলেছেন, ট্রাম্প যা বলেছেন, তাতে তাঁর সমর্থকদের ক্ষিপ্ত হওয়ার কিছু নেই, ঠিকই তো বলেছেন। আইওয়ার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান স্টিভ কিং টুইটারে মন্তব্য করেছেন, ‘ভীত হবেন না, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আপনি ঠিক কাজই করেছেন।’ অন্যদিকে অধিকাংশ ডেমোক্রেটিক এবং হাতে গোনা কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেট ও কংগ্রেস সদস্য ট্রাম্পের বক্তব্যের নিন্দা করে বলেছেন, এই কথায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধের প্রতিফলন নেই। যুক্তরাষ্ট্র সব সময় ধর্ম, বর্ণ ও আর্থিক অবস্থানির্বিশেষে অভিবাসীদের আশ্রয় দিয়েছে। ট্রাম্পের নিজের পরিবারও মাত্র তিন প্রজন্ম আগে এ দেশে এসেছে। রিপাবলিকান সিনেটর পল রায়ান স্বীকার করেছেন, শ–খানেক বছর আগে তাঁর হতদরিদ্র পরিবারও আয়ারল্যান্ড থেকে এসেছিল। অভিবাসীদের অধিকাংশই প্রান্তবর্তী শ্রেণির মানুষ, রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন। সে কারণে তাদের কণ্ঠস্বর সর্বদা শ্রুত হয় না। একশ্রেণির রাজনীতিক ও তথ্যমাধ্যমের কারণে মার্কিন অর্থনীতি ও সমাজে তাদের অবদান অজ্ঞাত রয়ে গেছে। সাদা মানুষের চোখে এরা সবাই অপরাধী, অলস, কাজ না করে সরকারি ভাতা খায়। অথচ প্রকৃত সত্য হলো আমেরিকার অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি এই সব অভিবাসী। আমেরিকান একাডেমি অব সায়েন্সের হিসাব অনুসারে, একজন গড়পড়তা মার্কিন অভিবাসী তাঁর জীবদ্দশায় সরকারের কাছ থেকে যে পরিমাণ আর্থিক বা অন্যান্য সাহায্য পেয়ে থাকেন, তার চেয়ে কমপক্ষে ৮০ হাজার ডলার বেশি তাঁরা কর হিসেবে সরকারের কাছে ফেরত দিয়ে থাকেন। কলেজ ডিগ্রি আছে এমন অভিবাসীর ফেরত দেওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ ডলার। অভিবাসীরা মার্কিন অর্থনীতি কীভাবে সচল রেখেছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার আপেল বা আঙুর বাগানের শ্রমিকদের দিকে তাকালেই সে কথা বোঝা যায়। একই কথা সিলিকন ভ্যালির নয়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বিদেশিদের আসা বন্ধ করে দিলে সিলিকন ভ্যালির আইটি খাত লাটে উঠবে। ট্রাম্প বিশেষ আপত্তি করেছিলেন আফ্রিকা থেকে অভিবাসী আগমনের ব্যাপারে, কারণ তারা সব দরিদ্র ও অশিক্ষিত। অন্য এক বৈঠকে নাইজেরীয়দের বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন, সে দেশের মানুষ সব পর্ণ কুটিরে থাকে। তিনি শুনে হয়তো বিস্মিত হবেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত নাইজেরীয়দের ১৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে, আর ৮ শতাংশের রয়েছে ডক্টরেট। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেত জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশের রয়েছে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, মাত্র ১ শতাংশের রয়েছে পিএইচডি। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক রাউলহিনোহোসা-ওজেদা হিসাব করে দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই মুহূর্তে যে সোয়া কোটি অবৈধ অভিবাসী রয়েছেন, তাঁদের যদি বৈধতা দেওয়া হয়, তাহলে আগামী ১০ বছরে মার্কিন অর্থনীতিতে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার যুক্ত হবে। সেই উদাহরণ দিয়ে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেস লিখেছে, ‘ইমিগ্রান্টস আর মেকার্স, নট টেকার্স।’ অভিবাসীরা শুধু নেয় না, ফিরিয়েও দেয়।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

এই কিশোরীরা কোথায় গেল? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

সাতটি কিশোরী বেমালুম গায়েব হয়ে গেল সেফ হোম থেকে। যদিও বলা হচ্ছে তারা পালিয়েছে, কিন্তু উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তো নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই তারা স্বেচ্ছায় গেছে, নাকি অন্য কোনো ধরনের ঘটনার শিকার। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফরহাদাবাদ এলাকায় অবস্থিত মহিলা ও শিশু-কিশোরী হেফাজতিদের নিরাপদ আবাসনে (সেফ হোম) থাকত এই মেয়েরা। এর পরিচালনার ভার সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের। ১০ জানুয়ারি ভোরে সাতটি কিশোরী, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৭-এর মধ্যে, নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এ ঘটনা ‘নিরাপদ’ আশ্রয়কেন্দ্রের নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এমনকি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদেরও এতে যোগসাজশ আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে এখন। বলা দরকার, সেফ হোমে থাকা মেয়েরা কেউ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে এখানে আশ্রয় নেয়নি। বরং নিজেরাই ভুক্তভোগী (ভিকটিম)।
এদের কেউ প্রতারণা, কেউ নির্যাতন, এমনকি ধর্ষণের শিকার হয়ে আদালতে এসেছিল। আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের কেউ তাদের দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়নি কিংবা নিজেরাই পুরোনো ঠিকানায় ফিরে যেতে ভরসা পায়নি। কোনো জিম্মাদার না পেয়ে আদালত তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সরকারকে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সেফ হোমে ঠাঁই হয়েছিল তাদের। এখন তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার জন্য আদালতে জবাবদিহি করার দায় কার? প্রথমেই সেফ হোমের অবস্থান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে হাটহাজারী উপজেলায় ফরহাদাবাদে সেফ হোমটি অবস্থিত। দেড় একর জায়গার ওপর ২০০৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেফ হোমের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন পুলিশের একজন সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) নেতৃত্বে ছয়জন পুলিশ ও চারজন আনসার সদস্য। তিন পালায় আনসার সদস্যরা সেফ হোমের ভেতরে এবং পুলিশ সদস্যরা ফটকে পাহারায় থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে নিরাপত্তাব্যবস্থার তেমন কমতি আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু আটটি সিসি ক্যামেরার মধ্যে চারটি নষ্ট থাকার মতো নিরাপত্তাব্যবস্থার আরও দু-একটা ত্রুটিকে আমলে না নিয়ে কর্তৃপক্ষ নিঃসন্দেহে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। তা ছাড়া, সেফ হোমের সীমানাদেয়াল মাত্র পাঁচ ফুট উঁচু। দেয়ালের ওপর কাঁটাতারের ঘেরা না থাকায় এখানে ঢোকা ও বেরিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। নিরাপত্তার স্বার্থে এই দিকগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। ঘটনার পর যথারীতি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটি নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্বে অবহেলার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। সেফ হোমের ভেতরে যে দুজন আনসার সদস্য কর্মরত ছিলেন, তাঁদের একজনের রাত ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের কথা, কিন্তু তিনি এর আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। অন্যজন রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত প্রহরায় থাকার কথা থাকলেও তিনি ভোর ৬টা ৫২ মিনিটে এসে মাত্র দুই মিনিট থেকে কর্মক্ষেত্র থেকে চলে যান। হোমের দুই নারী কর্মীও দায়িত্ব পালন না করে ঘুমিয়ে ছিলেন। এ ছাড়া সেফ হোমে পুলিশ ক্যাম্প থাকলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ সদস্যরা ওই দিন টহলে ছিলেন না বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই যদি হয় নিরাপত্তাব্যবস্থা, তাহলে তো মনে হয় এ রকম একটি অঘটন ছিল অনিবার্য। মোট ৫৬ জন কিশোরী থাকত সেফ হোমে। ১০ জানুয়ারি ভোররাতে ৮ জন কিশোরী পুরোনো রান্নাঘরের পেছনের জানালা ভেঙে বেরিয়ে যায়। পরদিন সকাল সাতটার দিকে এদের একজনকে আটক করা হয় সেফ হোমের অদূরে একটি এলাকা থেকে। জিজ্ঞাসাবাদে মেয়েটি জানিয়েছে, সে ছাড়া বাকি সাতটি মেয়ে একই কক্ষে থাকত। তারা সেফ হোম থেকে পালিয়ে গিয়ে চাকরিবাকরি জুটিয়ে নিয়ে অন্য কোথাও একসঙ্গে থাকবে বলে পরিকল্পনা করছিল বেশ কয়েক দিন ধরে। তবে আটক মেয়েটির কথা কতটা সত্য, তা নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্ত কমিটি। কেননা, মেয়েটি মানসিক ভারসাম্যহীন। তা ছাড়া, সে সম্ভবত মূল পরিকল্পনার সঙ্গে ছিল না। অন্যদের দেখাদেখি বেরিয়ে পড়েছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। ‘পালিয়ে’ যাওয়া সাত কিশোরীকে নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, তারা নারী ও শিশু পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ল কি না। সেফ হোম এলাকা থেকে রামগড়ের দিকে চলে যাওয়া এবং দালাল চক্রের সহযোগিতায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করার সুযোগ আছে বলেই শঙ্কা ও উদ্বেগ ঘনীভূত হচ্ছে আরও।
নিরাপত্তাকর্মী ও হোমের অন্যান্য কর্মীর দায়িত্বে অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তা থেকে তাঁদেরই যোগসাজশে কোনো ‘পরিকল্পনা’ বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, এ প্রশ্নটি সামনে আসছে। দায়িত্বে অবহেলার জন্য দুজন আনসার সদস্য ও দুজন আয়ার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আমরা চাই, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এনে বিষয়টি খোলাসা করা হোক। এবার ঘটনার অন্য একটি দিক নিয়ে আলোচনা করতে চাই। সাতটি কিশোরী নিজেরাই সেফ হোম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাদের যে কেউ জোর করে তুলে নিয়ে যায়নি তার প্রমাণ, তারা সঙ্গে করে তাদের কাপড়-চোপড়সহ অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রের ফাঁদে যদি তারা পড়েও থাকে, তাহলে ভালো থাকা-খাওয়া ও ভালো চাকরি পাইয়ে দেওয়ার টোপ তাদের গেলানো হয়েছে। কথা হচ্ছে, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তারা নিল কেন? তারা কি যথেষ্ট নিরাপদ ছিল না? তাদের জীবনযাপন কি সাধারণ আর দশজনের মতো স্বস্তিকর ছিল না? তারা কি কয়েদি বা বন্দীদের মতো জীবনযাপন করছিল সেফ হোমে? আগেই বলেছি, এই কিশোরীরা কেউই অপরাধী হিসেবে আসেনি সেফ হোমে। ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনই তাদের এখানে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। সুতরাং শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরের একটি প্রায় নির্জন ভবনে ‘বন্দিজীবন’ তাদের কাছে বসবাসযোগ্য মনে হবে কি না, তা-ও ভেবে দেখা দরকার। এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আহমেদ হেলাল বলেন, প্রথমে দেখতে হবে সেফ হোমটিতে পারিবারিক আবহ ছিল কি না। যেমন এসওএস শিশুপল্লির মতো মানসম্পন্ন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কয়েকটি শিশুর জন্য একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয়, এই শিশুরা তাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করে। এ রকম স্নেহ-প্রীতিময় পরিবেশ খুবই দরকার। দ্বিতীয়ত, সেফ হোমে আশ্রয় নেওয়া বিপর্যস্ত কিশোরীদের মানসিক পরিচর্যা ছাড়াও জীবনের একটি লক্ষ্য বা স্বপ্ন তৈরি করে দেওয়া দরকার ছিল, যাতে ভবিষ্যতে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তৃতীয়ত, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি তাদের অবসর সময়টাতে কোনো আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থা আছে কি না, তা-ও দেখতে হবে। আহমেদ হেলাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তুলেছেন, নিরাপত্তা হেফাজতে আসা মেয়েগুলোর জীবন কি কোনোভাবে পুনরায় নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠেছিল? তাদের জন্য সেফ হোমের পরিবেশ বিরূপ ও প্রতিকূল হয়ে উঠেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি। সাতটি কিশোরী আর কখনো ফিরে আসবে কি না, কিংবা পুলিশ তাদের আদৌ উদ্ধার করতে পারবে কি না, জানি না। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট নিয়ে কয়েক দিন মাতামাতির পর হয়তো ঢাকা পড়ে যাবে সবকিছু। জনসংখ্যাবহুল একটি দেশের অজ্ঞাতকুলশীল সাতটি মেয়ের ভবিষ্যৎ কোন অন্ধকারে হারিয়ে গেল, তার খোঁজ রাখার সময়-সুযোগও হয়তো থাকবে না আমাদের। তবে এ ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে কর্তৃপক্ষ যদি কিছুটা শিক্ষা লাভ করে, সেফ হোমে আশ্রিত যে মেয়েরা এখন আছে, তাদের জীবনমানের যদি কিছুটা উন্নতি হয়, সেটাই হবে একমাত্র সান্ত্বনা।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

ব্যবসা-বাণিজ্যের সমস্যা

গত শনিবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) আয়োজিত অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা তুলে ধরেছেন, তা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া প্রয়োজন। এই ব্যবসায়ী নেতারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কর কর্মকর্তাদের দিকে আঙুল তুলে বলেছেন, পণ্য আমদানি, পরিবহন, কর প্রদানসহ নানা ক্ষেত্রে তঁাদের নাজেহাল হতে হয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্পর্ক হবে সহযোগিতামূলক। কোনো ব্যবসায়ী আইন ভঙ্গ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তঁার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আইনের দোহাই দিয়ে রাস্তায় পণ্যবাহী ট্রাক আটকানোর চেষ্টা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অথচ মহাসড়কগুলোতে এ ধরনের ঘটনা অহরহই ঘটতে দেখি। অনেক সময় ব্যবসায়ীরাও দ্রুত পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সঙ্গে ‘আপসরফা’ করতে বাধ্য হন, চূড়ান্ত বিচারে যার খেসারত দিতে হয় ক্রেতাদেরই।
একই কথা প্রযোজ্য রাজস্ব বিভাগের জন্য। তারা আইন অনুযায়ী কর আদায় করবে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব বা আর্থিক সহযোগিতার বিনিময়ে কাউকে ছাড় দেবে কিংবা ‘আপসরফা’ করবে, আবার সেই একই কারণে কাউকে হয়রানি করবে, তা হতে পারে না। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদেরও দায় আছে। কোনো কোনো ব্যবসায়ী ইচ্ছা করেই আইন ভঙ্গ করেন কিংবা কর ফঁাকি দেন, যাতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আপসরফা করতে সচেষ্ট থাকেন। অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে কারও নাম বলে অভিযোগ না আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন ও অভিযোগ যদি খোলাখুলি বলাই না যায়, তাহলে প্রতিকার পাওয়া যাবে কীভাবে? প্রয়োজনে লিখিত অভিযোগ নেওয়া যেতে পারে। এক ব্যবসায়ী নেতা রাসায়নিক আমদানির বর্তমান নীতিমালা ব্যবসাবান্ধব নয় বলে অভিযোগ করেছেন। ব্যবসায়ীদের এ ধরনের অভিযোগ বিবেচনায় নেওয়া দরকার, তবে এসব দ্রব্যের অপব্যবহারের বিষয়টিও অস্বীকার করা যাবে না। পারলারের উদ্যোক্তা ও সেবাগ্রহীতা নারী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে পুরুষ কর্মকর্তা পাঠানোর বদভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে এনবিআরকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে হলে ছোট-বড় সব শ্রেণির ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার প্রতি যেমন সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে, তেমনি বন্ধ করতে হবে হয়রানি। এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে তঁারা আস্থাশীল ও অধিক বিনিয়োগে আগ্রহী হন।

যশোর রোডের আদিপ্রাণ বাঁচাও! by আমিরুল আলম খান

গাছখেকোদের এবার নজর পড়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো মহাশিরীষ শোভিত ঐতিহাসিক যশোর রোডের গাছের ওপর। দেশের আর কোথাও এমন দীর্ঘ ছায়ানিবিড় শিরীষসারি অবশিষ্ট নেই। বনখেকোরা কীভাবে এ দেশে বন সাবাড় করেছে, সে ইতিহাস এ দেশের সবার জানা। প্রকৃতি বিনাশে অতি উৎসাহীরা উন্নয়নের মহাসড়কে তোলার স্বপ্ন দেখিয়ে এবার যশোর-বেনাপোল সড়কের শেষ গাছগুলো গিলতে চায়। সে জন্য সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে তারা। প্রকল্প অনুমোদনের কাজ শেষ। মহারথীরা একযোগে তাতে সম্মতিও জানিয়েছেন। দেশে নেতৃত্ব দেওয়ার দায় যাঁদের, তাঁরা জনগণের মতামতের তোয়াক্কা করেন না; তাঁদের আসল উপদেষ্টা অসৎ কর্মচারীরা। বাংলাদেশ আলো করে আছেন এমন মহাক্ষমতাধর কর্তারা। তাঁরা এমন এক প্রকল্প বানিয়েছেন, যা বাস্তবায়নে নাকি গাছ নিধনের কোনো বিকল্প নেই। সে কথা জানতে পেরে নিসর্গী ও প্রকৃতিবাদী লেখক বিপ্রদাস বড়ুয়া যথার্থ মন্তব্য করেছেন, যিনি গাছ বাঁচিয়ে রাস্তা বানানোর রাস্তা খুঁজে পান না, তিনি আবার কেমন ইঞ্জিনিয়ার? একেবারে দেশের মানুষের প্রাণের কথাটি বলেছেন তিনি। জাপানে একটি গাছ রক্ষার জন্য তারা কত-কী না করে! প্রতিটি বৃক্ষ যে একেকটি মহাপ্রাণ! এ কথার অর্থ যিনি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ, তাঁর মুখেই কেবল শোভা পায়, গাছ না কেটে যশোর-বেনাপোল রাস্তা চার লেন করা অসম্ভব। আমরা চার লেন নয়, যশোর-বেনাপোল রোডকে দেখতে চাই ছয় লেন হিসেবে। কেননা, এটি এশিয়া মহাদেশীয় মহাসড়কের বাংলাদেশে অংশের প্রবেশদ্বার। আর সে পরিমাণ জমিও এ সড়কের দুপাশে আছে। সরকারের জমি। দরকার শুধু তা কাজে লাগানো। যশোর-বেনাপোল সড়কটির ঐতিহাসিক অবদান প্রভূত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেন কালীপদ পোদ্দার নামের যশোরের এক জমিদার। এই রাস্তা ব্যবহার শান্তিময় করার উদ্দেশ্যে তিনি শত শত দ্রুতবর্ধনশীল, ছায়াদানকারী মহাশিরীষ বা রেইন ট্রি লাগান রাস্তার দুপাশে। রাস্তাটি যশোর থেকে কলকাতা পর্যন্ত গেছে। বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে হরিদাসপুর থেকে কলকাতা পর্যন্ত এখনো তার পরিচিতি যশোর রোড নামেই। আমরা অবশ্য সে নাম ঘুচিয়ে দিয়েছি বহু আগেই।
সেটা করেছি আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা এবং জ্ঞানের অভাব থেকে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক অপচিন্তা আর এই রাস্তা থেকে কালীপদ পোদ্দারের নাম-নিশানা মুছে ফেলার হীন চক্রান্ত। তবু গত শতকের শেষ পর্যন্ত যশোরের মানুষের কাছে এ রাস্তা কালীবাবুর রাস্তা বলেই পরিচিত ছিল। আর তখন পর্যন্ত ছত্রাকৃতি নির্মিত ক্যানোপি মুগ্ধ করত দর্শনার্থী কিংবা পথচারীদের। বহুদূর থেকে এই রাস্তার সৌন্দর্য উপভোগ করত মানুষ। নবীন প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে যেমন কালীপদ পোদ্দারের নাম, তেমনি তার সরকারি নাম যশোর রোডও। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একশ্রেণির মানুষ সবকিছু লোপাট করা শুরু করে। সে লোপাটের প্রথম বলি রাস্তার দুপাশের গাছপালা। গাছ কাটার মহোৎসব হয় এরশাদবিরোধী লাগাতার হরতালের সুযোগে। বিশাল বিশাল বৃক্ষ কর্তন ও লোপাটের এমন সুযোগ আর কখনো আসেনি। বিশ্বাস না হলে যশোর-বেনাপোল, যশোর-কুষ্টিয়া, যশোর-খুলনা কালিগঞ্জ-চুয়াডাঙ্গা বা ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর ইত্যাদি মহাসড়কগুলো ভালো করে দেখে নিতে পারেন। এই লোপাটে শরিক রাজনীতিক, আমলা, সড়ক ও বন বিভাগ আর পুলিশ বাহাদুরেরা। এবারও এই দঙ্গলই এক হয়েছে; তবে গায়ে উন্নয়নের নামাবলি। যশোর রোড আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ। স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরু থেকেই এই রোড ধরে ভারতীয় তো বটেই, বিশ্বের নানান দেশের, এমনকি বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও এই পথে এসে স্বাধীনতাসংগ্রামের খবর সংগ্রহ করতেন। কলকাতার সঙ্গে সবচেয়ে সহজ যোগাযোগের মাধ্যম এই যশোর রোড। এই রাস্তা ধরে হাজার হাজার গৃহহারা মানুষ পাড়ি দেয় ভারতে। এই রাস্তা ধরেই বিদেশি রাজনীতিকেরা এসেছেন বাংলাদেশের লাখ লাখÿউদ্বাস্তুর অবর্ণনীয় দুঃখের ভাগীদার হতে। এই রাস্তা নিয়েই অ্যালেন গিন্সবার্গ রচনা করেন ভুবনজয়ী, হৃদয়স্পর্শী ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা। সেটিই নোবেলজয়ী গায়ক বব ডিলানের কণ্ঠে বিখ্যাত কনসার্ট হয়ে সারা আমেরিকায় বাংলাদেশের প‌ক্ষেÿজনমত গঠনে সহায়তা করে। এই যশোর রোড ধরেই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য, সংসদ সদস্য, শত শত মুক্তিযোদ্ধা, দেশ-বিদেশের শত শত সাংবাদিক এসে ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর দেশের প্রথম মুক্ত জেলা শহর যশোরে জনসভা করেন। সে সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল যশোর রোডের গায়ে যশোর টাউন হল ময়দানে। এমন একটি ঐতিহাসিক সড়কের গুরুত্ব অনুধাবনে যারা ব্যর্থ, তাদের জন্য সত্যিই করুণা হয়। আমরা জানি এবং দাবি করি, যশোর-বেনাপোল সড়ককে চার লেন কেন ছয় লেনে উন্নীত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি জমিও রাস্তার দুপাশেই রয়েছে। এই শতকের গোড়ার দিকে যশোর-বেনাপোল অংশে রাস্তার দুপাশ থেকে জবরদখলকারীদের উৎখাত করা হয়েছিল। শুধু ঝিকরগাছা বাজারে কপোতা‌ক্ষের এপার-ওপার মিলে এক কিলোমিটার মতো রাস্তার দুপাশ দখলমুক্ত করা যায়নি। তবে ঝিকরগাছা ও নোয়াপাড়ায় বিকল্প, অর্থাৎ ডাইভারশন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা দীর্ঘকালযাবৎ ফাইলবন্দী অবস্থায় রয়েছে। সুতরাং যশোর-বেনাপোল রাস্তার মূল রাস্তার সব গাছ অক্ষত রেখে দুপাশ দিয়ে আরও দুটি দুই লেনের রাস্তা নির্মাণ সম্ভব। পেট্রাপোল বা হরিদাসপুর থেকে ভারতীয় অংশে এভাবেই মাঝখানে গাছ রেখে তারা চার লেনের রাস্তা বানিয়েছে। এর একটি ব্যবহার করা হবে ভারী যান চলাচলের জন্য, অন্যটি ছোট ও শ্লথগতির যান চলাচলের জন্য। শ্লথগতির যান চলাচলের লেনটি নির্মাণ করতে হবে অপেক্ষাকৃত নিচু করে যাতে এসব যান মূল সড়ক বা হাইওয়েতে উঠতে না পারে। এমন রাস্তা পাবনা, সিরাজগঞ্জে নির্মাণ করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। এসব কথা আমাদের জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী, জেলা প্রশাসক বা সংশ্লিষ্টজনদের অজানা নয়। আমরা আশা করব, জনরোষ সৃষ্টি হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্টদের বোধোদয় হবে এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ করে এখানে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। আর তেমন পরিকল্পনা প্রণয়নে যারা ব্যর্থ, তাদের উচিত নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া।
আমিরুল আলম খান: লেখক। সাবেক চেয়ারম্যান, যশোর শিক্ষা বোর্ড
amirulkhan7@gmail.com

গণতন্ত্রের স্বার্থেই প্রয়োজন দক্ষ আমলাতন্ত্র by সৈয়দ আবুল মকসুদ

সুশাসন ও নির্বাচনে সৎ, যোগ্য প্রার্থীর জন্য হাহাকার করছি আমরা দেড় যুগ ধরে। সে জন্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি নিয়ে আর্তনাদেরও শেষ নেই। কিন্তু কারচুপির নির্বাচন তো নির্বাচনই নয়, ত্রুটিমুক্ত বা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারও যে সুশাসন দিতে পারবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? তার অর্থ এই নয় যে অলৌকিক উপায়ে একটি আদর্শ সরকার গঠিত হবে, যা জাতিকে উপহার দেবে সুশাসন। ত্রুটিমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত সরকারই সুশাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা, যাঁরা নির্বাচিত নন, নিযুক্ত; তাঁদের ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। যত ভালো নির্বাচনই হোক, অযোগ্য, অদক্ষ ও অসৎ আমলাদের দিয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। সেই রাষ্ট্র থেকে জনগণ সুশাসন পেতে পারে না। যে দেশে নির্বাচনে কারচুপি এবং কর্মকর্তা নিয়োগে অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হয়, সে রাষ্ট্রের বিপর্যয় অনিবার্য। আজকাল প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, ‘প্রশাসনে পদোন্নতিবঞ্চিতদের ক্ষোভ’। বিষয়টি অতি গুরুতর। নিয়োগের সময় চেষ্টা-তদবির খাটালেও পদোন্নতি কারও মৌলিক অধিকার নয়। ওপরের পদ খালি আছে কি না এবং সেই পদে যাওয়ার যোগ্যতা আছে কি না, সে বিবেচনায়ই প্রশাসনে পদোন্নতি হয়ে থাকে। আমলাতন্ত্র বা প্রশাসন হলো পিরামিডের মতো।
যতই ওপরে যাবে, ততই পদের সংখ্যা কমতে থাকবে। সহকারী সচিবের চেয়ে উপসচিব কম, উপসচিবের চেয়ে যুগ্ম সচিব আরও কম, যুগ্ম সচিবের চেয়ে অতিরিক্ত সচিব অল্প এবং সচিবের সংখ্যা সবচেয়ে কম। আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি ব্রিটিশ আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। ব্রিটিশ ব্যুরোক্রেসি ছিল খুবই দাপুটে, তবে দক্ষতার পরাকাষ্ঠা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সেই ধারাবাহিকতা অনুসৃত হয়, কিন্তু মান অনেকটা কমে আসে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পদ্ধতিটা একই রকম থাকে বটে, কিন্তু মানের অবনতি ঘটে। তা সত্ত্বেও যত দিন পাকিস্তান সুপিরিয়র সার্ভিসের কর্মকর্তারা ছিলেন, তাঁদের উপযুক্ত শিক্ষা ও দক্ষতা ছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিসিএস দিয়ে যাঁরা বিভিন্ন ক্যাডারে নিযুক্ত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে যোগ্য, দক্ষ ও উজ্জ্বল যাঁরা ছিলেন, হয় তাঁরা রাজনৈতিক চাপে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেননি অথবা তাঁদের যোগ্যতার মূল্যায়ন হয়নি। যোগ্যতার স্বীকৃতি না থাকলে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দেয় এবং হতাশা থেকে আসে অবসাদ। একটি সময় ছিল যখন ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে কেউ যদি কোনো রকমে যুগ্ম সচিব হতে পারতেন, তিনি মোগল সাম্রাজ্য হাতে পাওয়ার আনন্দ ও গৌরব ভোগ করতেন। ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে আমলাতন্ত্রের আকার ছিল ছোট, কিন্তু দক্ষতায় ছিল সেরা। প্রশাসনিক ক্যাডারে ব্রিটিশ আমলে ছিল ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) এবং ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সার্ভিস (আইপিএস)। ব্রিটিশ ভারতবর্ষে আফগান সীমান্ত থেকে মিয়ানমার (বার্মা) পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্যে ১৯৪৭ সালে আইসিএস-আইপিএস কর্মকর্তা ছিলেন ১ হাজার ১৫৭ জন। তার মধ্যে ব্রিটিশ ৬০৮ জন, হিন্দু-শিখ-পার্শি ৪৪৮ জন এবং মুসলমান ১০১ জন। তঁাদের মধ্যে বাঙালি মুসলমান অতি অল্প। ব্রিটিশ যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করে, পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীনতা লাভ করে, তখন আইসিএস-আইপিএস কর্মকর্তারাও ভাগাভাগি হয়ে যান। তাঁদের কে কোন দেশে থাকতে চান তার অপশন বা পছন্দ জানতে চাওয়া হয়। ১ হাজার ১৫৭ জনের মধ্যে ৯৫ জন পাকিস্তানে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই ৯৫ জনের মধ্যে ৬ জন সঙ্গে সঙ্গে অবসরেও চলে যান। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান সাংঘাতিক কর্মকর্তা-সংকটে পড়ে। রাত–দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করে কর্মকর্তারা কোনো রকমে পরিস্থিতি সামাল দেন। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান যাত্রা শুরু করে যে আইসিএস-আইপিএস আমলা বাহিনী দিয়ে, তার সংখ্যা ছিল সাকল্যে ১৫৭ জন। তাঁদের মধ্যে মুসলমান আইসিএস ছিলেন ৮৩ জন, ভারতীয় বংশোদ্ভূত খ্রিষ্টান ছিলেন ১ জন, ব্রিটিশ আইসিএস ছিলেন ৩৬ জন, মুসলমান আইপিএস ছিলেন ১২ জন এবং ব্রিটিশ আইপিএস ছিলেন ১৪ জন। তাঁদের বাইরে ১১ জন ছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বিশেষভাবে নিযুক্ত কর্মকর্তা। বাঙালি আইপিএস অফিসারদের মধ্যে কাজী আনওয়ার-উল হক, এ কে এম হাফিজউদ্দিন, মহিউদ্দিন আইজি হয়েছিলেন। [বিস্তারিত দেখুন: কম্বাইন্ড সিভিল লিস্ট ফর ইন্ডিয়া, পাকিস্তান অ্যান্ড বার্মা, নাম্বার ১৬১, জানুয়ারি-মার্চ, ১৯৪৮, লাহোর, ১৯৪৮] উচ্চপদস্থ আমলার চাকরি এক স্বপ্ন। সেখানে আছে অর্থ ও ক্ষমতা। সরকারের পরিবর্তন ঘটে, তাঁরা থাকেন যথাস্থানে। এখন যাঁরা বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁদের কাছে বিস্ময়কর মনে হবে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে সমগ্র ভারতবর্ষে মাত্র তিনজন মুসলমান ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের যুগ্ম সচিব। সেই তিনজনের একজন পাকিস্তানের কুখ্যাত বাঙালিবিদ্বেষী গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গঠন করেন পাকিস্তান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (পিএএস)। কর্মকর্তার স্বল্পতা দূর করার লক্ষ্যে বিশেষ নিয়োগের ব্যবস্থা হয় প্রশাসন, পুলিশ ও ফরেন সার্ভিসে। বাঙালিদের জীবনের দরজা খুলে যায়। ১৯৫০ সালে গভর্নর জেনারেল স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সময় পাকিস্তান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (পিএএস) নাম পরিবর্তন করে করা হয় সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি), পাকিস্তান ফরেন সার্ভিস (পিএফএস), পাকিস্তান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস সার্ভিস (পিএঅ্যান্ডএএস), পুলিশ সার্ভিস অব পাকিস্তান (পিএসপি) প্রভৃতি। জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ চট্টগ্রামের বাঙালি হিন্দু প্রভাত মুকুল চৌধুরী ওরফে পিএম চৌধুরীকে বিশেষ বিবেচনায় ফরেন সার্ভিসে নেওয়া হয়। ষাটের দশকে তিনি বার্মায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ১৯৫১ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস (সিএসএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাঁরা প্রশাসন, ফরেন সার্ভিস, পুলিশ, অডিট অ্যাকাউন্টস প্রভৃতি ক্যাডারে নিযুক্ত হন, তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা যথেষ্ট ছিল। পাবলিক সার্ভিস কমিশন কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের নিয়োগ দিয়েছে। তাঁদের প্রশিক্ষণও ছিল কঠোর। তাঁদের নিয়োগে যেমন তদবির ছিল না, পদোন্নতিতেও নয়। কঠোর নিয়ম মেনেই হতো। দেশে কার্যকর গণতন্ত্র ছিল না, কিন্তু দক্ষ প্রশাসন ছিল। দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকার বৈষম্য করত। গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে বাঙালিদের নিয়োগেও বৈষম্য হতো বলে আমাদের ক্ষোভ ছিল।
রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে চালাতে গেলে দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিকল্প নেই। সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় ছিলেন একজন সুযোগ্য আইসিএস অফিসার। তিনি আশির দশকে এবং তারপরেও আমার সঙ্গে একাধিকবার আলাপকালে বলেন, ১৯৫৭–তে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কাগমারী সম্মেলন থেকে গিয়ে তাঁকে এবং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে বলেন, মওলানা ভাসানী তাঁকে বলেছেন পূর্ব বাংলা বেশি দিন পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে না, স্বাধীন হবেই। অন্নদাশঙ্কর বলেন, আমি তারাশঙ্করকে বলেছিলাম, খুব তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে আসা ঠিক হবে না, কিছুকাল অপেক্ষা করা প্রয়োজন, যত দিন পর্যন্ত বেশ কিছুসংখ্যক বাঙালি অফিসার কেন্দ্রে যুগ্ম সচিব না হন। পূর্ব বাংলা স্বাধীন হলে রাষ্ট্র চালানোর জন্য যোগ্য কর্মকর্তার প্রয়োজন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকেও আমি বলেছিলাম, গণতন্ত্র সংহত করতে দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা তৈরি করুন। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনে সিনিয়র কর্মকর্তা কমই ছিলেন। কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই ছিলেন বয়সে তরুণ, কিন্তু তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা যথেষ্ট ছিল। তা না হলে সেই সংকটময় সময়ে দেশ চালাতে পারতেন না। যেসব কর্মকর্তার মধ্যে গণমুখী চেতনা লক্ষ করেছেন, তিনি তাঁদের বিশেষ স্নেহ করতেন। যেমন সাবেক সিএসপি অফিসার ড. এম এ সাত্তার। নতুন স্বাধীন দেশের আর্থসামজিক পুনর্গঠনে ড. সাত্তারের আগ্রহ দেখে তাঁকে প্রথমে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব ও পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব করেন। পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা সবাই ছিলেন তাঁর চেয়ে সিনিয়র। তিনি তাঁদের কাজে কোনো হস্তক্ষেপ না করলেও তাঁরা অস্বস্তি বোধ করেন। এ রকম আভাস পেতেই বঙ্গবন্ধু তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে এনে তাঁরই দপ্তরে ইকোনমিক সেক্রেটারি টু দ্য প্রাইম মিনিস্টার করেন। সেখানে তাঁর কাজ বিশেষ ছিল না। বাংলাদেশের মতো দেশে সরকার সব কাজ করতে পারে না। বেসরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন। ড. সাত্তার গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি এডুকেশন (বিএসিই)। তিনি এবং তাঁর ব্রিটিশ স্ত্রী এলেন সাত্তার শিক্ষা, নারী ও গ্রাম উন্নয়নে বহু কাজ করেছেন। সেসব কাজের সঙ্গে নারী নেত্রীদের মধ্যে যুক্ত ছিলেন সালমা সোবহান, হামিদা হোসেন, সালমা খান প্রমুখ। ড. সাত্তারের দুজন স্কুলজীবনের বন্ধু ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠ। তাঁদের একজন সৈয়দ কামরুল ইসলাম মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। ড. সাত্তার পাওলো ফ্রেয়ারের পেডাগজি আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ জনসেবা করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। আখতার হামিদ খান, নিয়াজ মোহাম্মদ খান, ডিআইটির চেয়ারম্যান মাদানী প্রমুখ তাঁদের দায়িত্বের বাইরেও কাজ করে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। নিয়াজ মোহাম্মদ খানের নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্কুল, মাদানীর নামে বারিধারায় রাস্তা তাঁদের প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। অগণতান্ত্রিক সরকার আমলানির্ভর। সামরিক বা আধাসামরিক সরকার যারা বাহুবলে বলীয়ান কিন্তু জনসমর্থনের দিক থেকে দুর্বল, তেমন সরকার চায় নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কর্মকর্তাদের নিজেদের পক্ষে রাখতে। কর্মকর্তাদের বশে রাখার অন্যতম উপায় ঘন ঘন পদোন্নতি দেওয়া। আজ বাংলাদেশে উঁচু পদমর্যাদার কর্মকর্তার সংখ্যা বিপুল। পদ নেই, তবু প্রমোশন। গণতন্ত্রের জন্যও জিনিসটি ক্ষতিকর। নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ছাড়া আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যত অর্থনৈতিক উন্নয়নই করুক, জনগণের কল্যাণ করতে পারবে না। বাংলাদেশে যে হারে কর্মকর্তাদের দলীয়করণ হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে তাতে প্রশাসন ভেঙে পড়তে পারে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য যা অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

অমল সেন: ব্যতিক্রমী জীবনাধিকারী by রাশেদ খান মেনন

কমরেড অমল সেন চলে গেছেন ১৪ বছর হয়। নতুন প্রজন্মের মানুষেরা তাঁকে বিশেষ চেনেন না। বুর্জোয়া নেতারা যেভাবে প্রচারের আলোতে থাকেন, একজন কমিউনিস্ট নেতার এ দেশে সেই সৌভাগ্য হয় না, যদিও দেশের পরিবর্তনকারী ঘটনায় তাঁদের ভূমিকা অসামান্য। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান যুগ ও বাংলাদেশ সময়-এই তিন কাল ধরে তাঁর সংগ্রামী জীবন বিস্তৃত। এ দেশের রাজনীতি, সমাজ-সম্পর্ক ও আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি যে ভূমিকা রেখে গেছেন, তাঁর একটি সময়ের হিসাবেই তাঁকে অনন্য জীবনাধিকারী বলা যায়। ব্রিটিশ আমলে কৈশোরে অমল সেন যুক্ত হয়েছিলেন অগ্নিযুগের বাংলার যুব বিদ্রোহী সংগঠন অনুশীলনে। সেখান থেকে তাঁর উত্তরণ ঘটেছিল কমিউনিস্ট পার্টিতে। আর এখানেই তিনি বেছে নেন কৃষকদের, সমাজের একেবারে নিম্নবর্গ কৃষকদের সংগঠিত করার কাজ। এই নিম্নবর্গ কৃষকদের নিয়েই তিনি গড়ে তুলেছিলেন অভূতপূর্ব কৃষক সংগ্রাম, ইতিহাসে যা তেভাগা কৃষক আন্দোলন নামে খ্যাত। তেভাগার এই আন্দোলনে তাঁর অংশের কৃষক সংগ্রামীরা জমিদার, মহাজন আর ব্রিটিশরাজের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। সেই বিজয় ব্রিটিশ আমলের বিরুদ্ধে পাল্টা রাষ্ট্রের ভিত গড়ার পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কমরেড অমল সেন তাঁর তেভাগার সমীক্ষায় কিছু কথা লিখে গেছেন। বস্তুত কোনো আন্দোলন রাজনীতি ও সমাজ-সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি তার সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষগুলোকে কীভাবে বদলে দেয়, নড়াইলের তেভাগা আন্দোলন তার প্রমাণ। অমল সেন ওই কৃষকদের সংগঠিত করতে কৃষকের সবচেয়ে নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে অবস্থান নিয়ে তাঁর কাজ শুরু করেছিলেন। নড়াইলের এগারখান অঞ্চলের এই মানুষগুলো মানুষ হিসেবে জীবন যাপন করলেও সমাজ-সভ্যতার কিছুই তাদের জানা ছিল না। অমল সেন কৃষকের দাবি নিয়ে সংগ্রাম সংগঠিত করতে গিয়ে ওই মানুষগুলোকে সেই উচ্চমানের জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত করেছিলেন। তেভাগা আন্দোলনের সময়েই ভারত ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়। আর পাকিস্তানে তেভাগা সংগ্রামী কমিউনিস্টদের জায়গা হয় জেলখানায় অথবা ভূতল বা আন্ডারগ্রাউন্ডে। তখন সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। অমল সেনরা সচেষ্ট হলেন নতুন সংগ্রাম গড়ে তুলতে।
ভাষা আন্দোলন এ দেশের মানুষকে আবার বদলে দিল। জেলখানায় বসে তিনি স্বস্তিবোধ করলেন ঘটনাবলির এই মোড় পরিবর্তনে। কিন্তু ওই পাকিস্তানের জেলখানায় কমরেডদের এই জীবনশিক্ষা দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার উপায় থাকেনি অমল সেনের জন্য। তবে ওই জেলখানাকেই আদর্শ বিদ্যাপীঠ বানিয়েছিলেন তিনি কমিউনিস্ট ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব কর্মীর জন্য। কেবল রাজনীতি নয়, রাজনীতি, সংস্কৃতি, নাটক, নাচ, গান, বাঁশি বাজানোর সবটাতেই মাতিয়ে রাখতেন কর্মীদের। কিন্তু যখন রাজনীতির দুরূহ প্রশ্ন আসত, সেখানে অমল সেন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পথচলার আসল জায়গাটি বেছে নিতে ভুল করতেন না। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মস্কো-পিকিং বিতর্কে তিনি পিকিংয়ের সংশোধনবাদবিরোধী অবস্থানের সমর্থন করলেও অন্ধভাবে পথ চলতে রাজি হননি। আর এ কারণেই নকশাল পন্থার উদ্ভব ঘটলে এবং চীন তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করলেও কমরেড অমল সেন তাকে মানতে রাজি হননি। বাংলাদেশের পিকিংপন্থী বলে পরিচিত ইপিসিপি (এম-এল) নকশাল লাইন অনুসারে শ্রেণিশত্রু খতমের নীতি গ্রহণ করলেও তিনি এর বিরোধিতা করেছেন দৃঢ়ভাবে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ইপিসিপির (এম-এল) ভ্রান্ত লাইনকে প্রত্যাখ্যান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়াননি কেবল, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে দৃঢ় ভূমিকা রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটি এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। নকশালপন্থার চরম ভ্রান্তির বিপরীতে এই সমন্বয় কমিটি দেশের অভ্যন্তরে প্রতিরোধযুদ্ধ সংগঠিত করে, যার প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকার অদূরে নরসিংদী জেলার শিবপুর অঞ্চল (দেখুন হায়দার আনোয়ার খান জুনোর একাত্তরের রণাঙ্গন-শিবপুর)। অমল সেনের এই অবস্থান সেদিন বহু কমিউনিস্ট তরুণকে ভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিল। কিন্তু ওই রাজনীতি জনগণ থেকে কমিউনিস্টদের যে বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছিল, তার থেকে দীর্ঘ সময়কাল এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে উদ্ধার করা যায়নি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ-উত্তরকালে কমরেড অমল সেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কমিউনিস্ট গ্রুপগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে পার্টিকে পুনর্গঠিত করার উদ্যোগ নেন। সবটা সফল হওয়া গেছে বলা যাবে না। তারপরও বাংলাদেশ-উত্তরকালে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি, কমিউনিস্ট সংহতি কেন্দ্র ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (হাতিয়ার গ্রুপ) ঐক্যবদ্ধ হয়ে গড়ে ওঠে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী) এবং কমরেড অমল সেন তার সাধারণ সম্পাদক হন। এই লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টিই দ্বিতীয় কংগ্রেসে ১৯৮০ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি নাম ধারণ করে। কমরেড অমল সেনকে বাংলাদেশ-উত্তর প্রজন্মের যতখানি চেনা, তা এই পার্টি সংগঠিত করার কাজের মধ্য দিয়ে। এ কাজে তাঁকে ডান-বাম উভয় দিক দিয়েই চরম বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিশেষ করে অমল সেনের নিজের কাজের অঞ্চল যশোর-নড়াইলে তাঁকে চরম বাধাগ্রস্ত হতে হয়। কিন্তু সব বাধা উড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশ-পরবর্তী সময়ে ওয়ার্কার্স পার্টির বিকাশে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। অবশ্য ওয়ার্কার্স পার্টিতে তাঁর যাত্রা সরলরৈখিক ছিল না। এই ওয়ার্কার্স পার্টিকেও দুই দফা বিভক্তির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে ঐক্যের ধারা অমল সেন অনুসরণ করতেন, তার ধারাবাহিকতায় ওয়ার্কার্স পার্টি আবার ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এবার তিনি সভাপতি হিসেবে পার্টির প্রধান হন। অমল সেন কেবল একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী জীবনের অধিকারী। বিপ্লব ও বিপ্লবী আদর্শের প্রতি তিনি যেমন একনিষ্ঠ ছিলেন, একই সময়ে মানুষ হিসেবে তাঁর জীবনবোধ, রসবোধ, জীবনকে উপভোগ করার শক্তি ছিল অতুলনীয়। তাঁর সংস্পর্শে এসে যেকোনো মানুষ আনন্দ পেত। কি বয়স্ক, কি যুবক-কিশোর-শিশু-সবার কাছেই তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। বিপ্লবের প্রয়োজনে অমল সেনকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ত্যাগ করতে হয়েছিল। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক পড়াশোনায় কেবল মার্ক্সীয় দর্শন ও তত্ত্বই নয়; সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান এমনকি চিকিত্সাশাস্ত্র সম্পর্কেও তাঁর পারদর্শিতা ছিল। ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক সবকিছুই তাঁর মনোযোগ পেয়েছে। এই বিনয়ী নম্র মানুষটি আবার সংগ্রামে ছিলেন দৃঢ়চিত্ত-সে রাজনৈতিক সংগ্রামই হোক, তাত্ত্বিক সংগ্রামই হোক। অমল সেন চলে গেছেন। রেখে গেছেন এমন আদর্শ, যার মৃত্যু ঘটে না। তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। কমরেড অমল সেন লাল সালাম। রাশেদ খান মেনন: সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।

মাদ্রাসাশিক্ষকদের অনশন ভঙ্গ

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকনেতাদের আমরণ অনশনের অবসান নিশ্চয় একটি ইতিবাচক ঘটনা। কিন্তু যে আশ্বাস নিয়ে তঁারা বাড়ি ফিরছেন, তা যেন দ্রুত হতাশায় পরিণত না হয়। এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর তরফে তিন দফা বৈঠক নিষ্ফল হতে বাধ্য ছিল। কারণ, সরকার নীতিগতভাবে তঁাদের দাবিদাওয়ার বিষয়ে কোনো কিছুই বিবেচনা করার আশ্বাস দেয়নি। তবে অতীতে কিছু ক্ষেত্রে ‘আশ্বাস’ বাস্তবায়ন করার দাবিতেও ধর্মঘটিদের পুনরায় আমরা আন্দোলনে যেতে দেখেছি। আমরা নীতিগতভাবে তঁাদের মূল দাবি সমর্থন না করার কোনো যুক্তি দেখি না। সরকার যদি ইবতেদায়ি মাদ্রাসাব্যবস্থাকে মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প পরিকল্পনা দিতে পারে, তাহলে উত্তম। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে তার আচরণে মাদ্রাসা নিয়ে সংকীর্ণ রাজনীতির সব লক্ষণই স্পষ্ট। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় আসার আগে মাদ্রাসাশিক্ষার আধুনিকায়ন ও সংস্কারের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয় না।
মাদ্রাসার পাঠ্যসূচি, পরীক্ষাপদ্ধতিতে উপযুক্ত পরিবর্তন এবং তাদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের মতো জ্বলন্ত প্রশ্নগুলোর কোনো মীমাংসা নেই। অথচ আগামী নির্বাচনের আগে সাংসদদের প্রতি আসনে পঁাচটি করে মাদ্রাসা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে অনেকটা ইবতেদায়ির আদলে সারা দেশে চালু থাকা ২০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ করা হয়েছিল। সেই যুক্তিতে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধন পাওয়া সব স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণের দাবি তুলেছে। সরকারের উচিত বিমাতাসুলভ আচরণ বন্ধ করা। একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে না পারা রাষ্ট্রের অপারগতা, সে জন্য ইবতেদায়ি মাদ্রাসা বলে তাদের অনাদরে ফেলে রাখা কোনো যুক্তি হতে পারে না। তবে বর্তমান সরকার ইবতেদায়ি মাদ্রাসাশিক্ষকদের মাসিক মাত্র ৫০০ টাকার ভাতা প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের জন্য যথাক্রমে ২ হাজার ৫০০ ও ২ হাজার ৩০০ টাকায় উন্নীত করেছে। এটা একটা অগ্রগতি, কিন্তু খুবই অপ্রতুল। ইবতেদায়ি মাদ্রাসার নিবন্ধনে কড়াকড়ি দরকার। সরকারি হিসাবে ৩ হাজার ৪৩৩টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসার মধ্যে ১ হাজার ৫১৯টি ঠিকঠাক চলে বলে দাবি করলেও ধর্মঘটি সমিতির মতে, অন্তত ১০ হাজার মাদ্রাসা কার্যকর রয়েছে। ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ওপর পূর্ণ নজরদারি ও যথাযথ নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তার পাঠ্যক্রম নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তারও অবসান দরকার।

কয়েকটি পিলে চমকানো খবর by আলী ইমাম মজুমদার

প্রথম আলোর একটি সংবাদ শিরোনাম ‘বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে উধাও ভূমি কর্মকর্তা’। ১৪ কোটি টাকা নিয়ে কিশোরগঞ্জের ভূমি হুকুমদখল কর্মকর্তা (এলএও) উধাও হয়েছেন। এর মধ্যে পরপর দুই দিনে ৫ কোটি টাকা করে তুলে বস্তায় ভরে নিয়ে গেছেন। তিনি আরও ১০ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংক চেক তৈরি করেছিলেন, কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হলে পালিয়ে যান। তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশত্যাগ ঠেকাতে সতর্ক করা হয়েছে ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরকে। আর ঘুষ লেনদেন সাধারণত হয় কোনো ব্যক্তিকে অন্যায্য সুবিধা দিতে। এমনকি ন্যায্য প্রতিকার পেতেও ঘুষ দিতে হয় বেশ কিছু ক্ষেত্রে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) যে বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণত কাজ করেন, তার মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বিরাজমান থাকে প্রায় ক্ষেত্রে। খুব দক্ষ ও সৎ জেলা প্রশাসকও তাঁর আওতায় থাকা ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সব ইউনিটকে সহজ পথে রাখতে পারেন না, এমনটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। তবে আলোচিত ঘটনাটি প্রচলিত ঘুষ গ্রহণের ধারণার আওতায় আসে না। প্রত্যাশী সংস্থা ভূমি হুকুমদখলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ডিসির বরাবর টাকা ন্যস্ত করেন। এই টাকা থাকে জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের আওতায় ডিসির একটি হিসাবে। হিসাবটি এলএও পদধারীরাই পরিচালনা করেন। এই হিসাব থেকে নিজের হাতে চেক নিজ নামে লিখে হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে পাস করিয়ে সোনালী ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়াকে ঘুষ গ্রহণ না বলে চুরি বা ডাকাতি বলে আখ্যায়িত করাই উত্তম। আইনের ভাষায় হয়তো এটা হবে সরকারি টাকা আত্মসাৎ। আত্মসাতের অনেক রকম ফের আছে।
তবে বর্ণিত ঘটনাটি অনেকটা অভিনব, এমন বলা যায়। যে জেলার আটজন নারী ইউএনও নিজেদের কীর্তির মাধ্যমে প্রশাসনের গৌরব বৃদ্ধি করে চলেছেন, সেখানে এই এলএও পদধারীর আচরণ যেন কমল বনে মত্তহস্তির মতো। এ ধরনের কাজে সাহসী হওয়ার পেছনে তাঁর খুঁটির জোর কোথায়, সেটা তলিয়ে দেখা দরকার। জানা যায়, এই কর্মকর্তা ২৪ ব্যাচে ২০০৫ সালে বিসিএসে যোগ দিয়েছেন। তাঁর অনেক কনিষ্ঠরাও এখন ইউএনও। এলএও পদটি ডিসির সহায়ক কর্মকর্তা হিসেবেই বিবেচিত। আর ইউএনও একটি প্রশাসনিক ইউনিটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। অধিকতর ক্ষমতা ও মর্যাদা ভোগ করেন। জানা যায়, কিছুদিন আগে তাঁকে শেরপুরের এডিসি হিসেবে বদলি করা হলেও তদবির করে তা বাতিল করান। পরে পিরোজপুর বা ভোলায় বদলি করলে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যান। টাকাগুলো তুলতে জেলা হিসাবরক্ষণ অফিস ও ডিসি অফিস ক্যাম্পাসেই অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের সহযোগিতা আবশ্যক হয়েছে। নিজ নামে এই কর্মকর্তা এত টাকা তুলে নিচ্ছেন, এতে তাদের সন্দেহ ও আপত্তি থাকা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সবই ঠিকঠাক চলল। শেষাবধি ১০ কোটি টাকার চেকটি আটকে যায়। আর তিনিও সটকে পড়েন। অনেক বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি দেশে হচ্ছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক উজাড় করে টাকা দেওয়া হচ্ছে ঋণের নামে। বেসরকারি মালিকানার কোনো কোনো ব্যাংকও যোগ দিয়েছে সেই কাতারে। তবে জেলা প্রশাসনে এ ধরনের আত্মসাতের ঘটনা বিরল। এটা এসব বিষয়ে ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের’ জন্য চোখ খুলে দিতে পারে। তবে অধিক সতর্ক থাকা দরকার তদারককারী কর্মকর্তাদের। আর এই কর্মকর্তাকে সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে আইনের আওতায় আনা আবশ্যক। আইনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করা প্রয়োজন তাঁর অনুপার্জিত আয়। প্রথম আলোয় উপর্যুক্ত সংবাদটি যেদিন প্রকাশিত হয়, সেদিনই ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রথম পাতায় খবর আসে পুলিশ কনস্টেবলদের কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব প্রসঙ্গে। পুলিশ সপ্তাহে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ঢাকায় সমবেত হয়ে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা ও চাহিদা সম্পর্কে সরকারপ্রধানসহ মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে বিভিন্ন জেলায় কর্মরত পুলিশ সুপার (এসপি) ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এ বিষয়টিও উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়, জেলায় রাজনৈতিক চাপে কনস্টেবল নিয়োগ দিতে হয়। আর কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা এসব সুপারিশ করেন টাকার বিনিময়ে। কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাও থাকেন এসবের যোগসাজশে। এতে নবনিয়োগকৃত কনস্টেবলদের মান কমে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে এই নিয়োগ হলে স্বচ্ছতা আসবে বলেও কেউ কেউ দাবি করেন। তবে আইনি সীমাবদ্ধতার জন্য আইজিপি বর্তমান পর্যায়ে প্রস্তাবটি বিবেচনা করতে অপারগতা জানান। এই সংবাদে উল্লেখ করা হয়, একজন পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ পেতে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। আর সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে ঘুষের পরিমাণ ১৫ লাখ টাকা। এ প্রসঙ্গে জনৈক সাবেক আইজিপির একটি বক্তব্য খবরটিতে রয়েছে। তিনি বলেছেন, পুলিশের নিচের দিকে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে জনশ্রুতি তাঁর কানেও আছে। তিনি আরও বলেন, এভাবে নিয়োগ পেলে তাঁরা কারও পকেটে ইয়াবা বা অস্ত্র ঢুকিয়ে টাকা নিতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। খবরটির বহুমাত্রিকতা আছে। ক্ষমতার প্রতি আছে মানুষের সহজাত একটি আকর্ষণ। এসপিরা চান তাঁদের ক্ষমতার বলয় আরও বৃদ্ধি পাক। তাই ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশনে দেওয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার পরিসরকেও তাঁরা হাল আমলে কিছু ক্ষেত্রে উপেক্ষা করেন বলে জানা যায়। সে ক্ষেত্রে নিজ বাহিনীর সর্বনিম্ন স্তরে নিয়োগের দায়িত্বটি ছাড়তে চাইছেন কেন, এটা গভীর কৌতূহলের বিষয়। কারণটি তাঁরাই ব্যাখ্যা করেছেন সভায়। পেরে উঠছেন না তাঁরা। আর এই অবস্থা তো মাঠপর্যায়ের সবারই। দু-একজন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে নাজেহাল হয়েছেন।
সব ক্ষেত্রে না হলেও এখন সুবোধ বালকের মতো সেসব ধরিয়ে দেওয়া তালিকা দিয়েই চলছে নিয়োগ কার্যক্রম। আর এই তালিকা প্রণয়নে অর্থ বড় নির্ণায়কের ভূমিকায় আছে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কথা থাকে, কীভাবে ধরে নেওয়া হয় কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ হলে স্বচ্ছতা থাকবে। তা-ই যদি থাকে, তাহলে এসআই নিয়োগ পেতে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়, এ কথা আসে কীভাবে? এসআইগণ তো পুলিশ সদর দপ্তর কর্তৃক নিয়োজিত। এখানেও ব্যাপক পরিমাণ ‘রাজনৈতিক তদবির’ হয়। আর একই প্রক্রিয়ায়। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, একসময় এসআই পদেও নিয়োগ দিতেন এসপিরা, ডিসির নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটির সুপারিশে। তখন কিন্তু এ ধরনের অভিযোগ ছিল বলে শোনা যায় না। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এ ধরনের টাকার খেলার কারণেই পুলিশ এখন অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের একটি অংশ জড়িত হচ্ছে অপরাধজনক কাজে। এটা কতটা বিপর্যয়কর তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) ছাড়া সব সংস্থার নিয়োগ প্রক্রিয়া মোটামুটি একই পথ ধরে চলছে। এতে স্লিপ আর টেলিফোনের ভূমিকাই মুখ্য। কিছু ব্যাংক বা এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার অংশটি আউটসোর্স করছে আর মৌখিক পরীক্ষা হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আওতায়। সেখানেও একই ধরনের স্লিপ আর টেলিফোন। পিএসসিকে কাবু করার জন্য সক্রিয় রয়েছে একটি মহল। বিশেষ একটি ছাত্রসংগঠনের সভায় দায়িত্বশীল একজন ব্যক্তি কিছুদিন আগে বলেছিলেন, লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে মৌখিকের দায়িত্ব নেওয়া হবে। সুযোগ পেলে তা হবে এই ধারণা অমূলক নয়। প্রকৃতপক্ষে সংকটটা গোটা শাসনব্যবস্থায়। এর সব স্তরে রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য সবারই জানা। এটা মেনে নিয়েই কাজ করছেন অনেকে। আর যাঁরা পারছেন না, তাঁরা হন কক্ষচ্যুত। জাতি হিসেবে আমরা একটি যুগসন্ধিক্ষণে আছি। দেশ যখন অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অগ্রসরমাণ, তখন দুর্নীতিবাজেরা মনে হয় আরও তৎপর হয়ে উঠছে। দুর্নীতি দমনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না। যে এলএও ১৪ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে নিজ নামে উঠিয়ে নিলেন, তিনি হয়তো ধরা পড়বেন। তবে বিচার কত দিনে হবে, এটা অনিশ্চিত। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক সংস্থা। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার রয়েছে টাকার জোর। ঠিক তেমনি যে এসপিগণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দায়ী, তাঁরা তাঁদের বাহিনীতে লোক নিয়োগের বিষয়ে একটি দুষ্টচক্রের কাছে অসহায়। এখন যদি ধরে নেওয়া হয় যে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনেও তাঁরা কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছেন না, তাহলে কি খুব ভুল হবে? অসহায় মানুষ শুধু ভাবে আর জনান্তিকে জিজ্ঞাসা করে, অবস্থা কি বিপরীতমুখী হবে না?
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumderali 1950@gmail.com

ডাকাত সন্দেহে ২ জনকে পিটিয়ে হত্যা

নারায়ণগঞ্জে ডাকাত সন্দেহে দুইজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় লোকজন। মঙ্গলবার রাতে বন্দর উপজেলার বালিগাঁও গ্রামের এ ঘটনা ঘটে। এতে স্থানীয় তিন ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বন্দর থানার ওসি মো. আবুল কালাম জানান, বন্দরে এলাকাবাসীর পিটুনিতে সন্দেহভাজন দুই ডাকাত নিহত হয়েছেন। তবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওসি বলেন, রাত ৩টার দিকে রফিক মুন্সীর বাড়িতে হানা দেয় একদল ডাকাত। তারা জিনিসপত্র লুট করে চলেযাওয়ার ওই বাড়ির লোকদের চিৎকারে প্রতিবেশীরা জড়ো হন। ডাকাত পড়ার কথা মাইকে ঘোষণা করলে এলাকাবাসী এসে তাদের ধাওয়া দিয়ে দুইজনকে পিটুনি দেয়। পরে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া চিকিৎসকরা মৃত বলে জানান।

যুদ্ধ ও রক্তপাত বন্ধের উপায় খুঁজছে ওআইসি

মুসলিম দেশগুলোর আন্তঃসংসদীয় সম্মেলন তেহরানে শুরু হয়েছে। এবারের সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরাইলের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা এবং ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসনসহ এ অঞ্চলে বিরাজমান যুদ্ধ ও রক্তপাত বন্ধের উপায় খুঁজে বের করার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাবশালী বলে দাবিদার কয়েকটি দেশ তেহরান সম্মেলনে যোগ দেয়নি। এ থেকে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার আগ্রহ ওই সরকারগুলোর নেই।
ওই দেশগুলো অনুপস্থিত থাকলেও প্রায় ৪০টি দেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দল সম্মেলনে অংশ নেয়া থেকে বোঝা যায়, তেহরান আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গত সপ্তাহেও আরব ও পাশ্চাত্যের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তেহরানে নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ থেকে বোঝা যায় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য তেহরান যেসব কর্মসূচি ও প্রস্তাব উত্থাপন করেছে তার প্রতি বহু দেশের সমর্থন রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয় নিয়ে কয়েকটি মুসলিম দেশের সরকারের মধ্যে মতবিরোধ বজায় থাকলেও মুসলিম দেশগুলোর আন্তঃসংসদীয় সম্মেলনে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে মতভেদ দূর করা সম্ভব। এভাবে আঞ্চলিক যেকোনো সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এতে করে পশ্চিমা এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে না এবং নিজেরাই নিজেদের সংকট বা যে কোনো মতবিরোধের মীমাংসা করতে পারবে। তেহরানে মুসলিম দেশগুলোর আন্তঃসংসদীয় সম্মেলন অনুষ্ঠান থেকে বোঝা যায়, ইরানসহ বহু দেশ নিজেদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে বিরাজমান যেকোনো বিরোধ মীমাংসার পক্ষপাতী। তেহরানে মুসলিম দেশগুলোর আন্তঃসংসদীয় সম্মেলন থেকে আবারো প্রমাণিত হয়েছে, বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই অভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংসায় তারা বদ্ধ পরিকর।

ফিলিস্তিনিদের 'শাস্তি' দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল

ফিলিস্তিনিদের সাহায্যে গঠিত জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ তহবিলে প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তার পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাকি অর্থ দেয়া হবে কি না, তা ভবিষ্যতে বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এ বছর অর্থনৈতিক সহায়তা হিসেবে সাড়ে ১২ কোটি ডলার দেয়ার কথা থাকলেও, এখন তার অর্ধেকেরও বেশি পরিমাণ অর্থ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব। ফিলিস্তিনিদের সহায়তার জন্য গড়া জাতিসঙ্ঘ তহবিলে এ বছর সাড়ে ১২ কোটি মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক সাহায্য দেয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্র এখন বলছে, জাতিসঙ্ঘকে ৬০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হবে। কিন্তু বাকি ৬৫ মিলিয়ন ডলার দেয়া হবে কি না, তা ভবিষ্যতে বিবেচনা করা হবে। মার্কিন এই সিদ্ধান্তের ফলে, ফিলিস্তিনে চলমান ত্রাণ কার্যক্রম অর্থসঙ্কটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তারা। এতে উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুটেরেস। এক সংবাদ সম্মেলনে গুতেরেস বলছেন, জাতিসঙ্ঘ ফিলিস্তিনে যে সব অতি প্রয়োজনীয় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছিলো সেগুলো চালিয়ে যেতে না পারলে, গুরুতর সঙ্কট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সেই পরিস্থিতি এড়াতে জাতিসঙ্ঘ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। ফিলিস্তিনিদের জন্য জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ কার্যক্রমের প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থ আসে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। এই বাজেটেই স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ অন্যান্য সেবামূলক কার্যক্রম সরবরাহ করা হয়। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র হিথার নিউয়ার্ট বলেছেন, কাউকে শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। বরং এই সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্র কিছু সংস্কার দেখতে চায় বলেই এটি করেছে।

রাশিয়ার হাতে এখন পরমাণু অস্ত্রবাহী ‘ড্রোন সাবমেরিন’

রাশিয়ার কাছে রয়েছে এক গোপন ড্রোন সাবমেরিন, যা বিশ্বের সবথেকে বড় নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। পেন্টাগনের এক ফাঁস হওয়া রিপোর্টে এমনটাই জানা গেছে। এর আগে রাশিয়ার কাছে আন্ডারওয়াটার নিউক্লিয়ার কেরিয়ার আছে বলে জানা গিয়েছিল। তবে এবার পেন্টাগনের লিক হওয়া রিপোর্টে সেই তথ্যই আরো স্পষ্ট হলো। রিপোর্টে জানা গেছে, ওই ড্রোন সাবমেরিন ১০০ মেগাটন ওয়ারহেড বহনে সক্ষম।
‘হাফিংটন পোস্ট’-এ প্রথম প্রকাশিত হয় এই রিপোর্ট। পেন্টাগনের দাবি, একদিকে যখন আমেরিকা পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার কমানোর উপর জোর দিচ্ছে অন্যদিকে তখন রাশিয়া তাদের পরমাণু শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। রাশিয়ার পাঁচটি নতুন নিউক্লিয়ার ডেলিভারি সিস্টেমের মধ্যে একটি হলো ‘Status-6 AUV’. AUV-এর অর্থ হলো ‘autonomous underwater vehicle’, অর্থাৎ সাধারণ ভাষায় যাকে ড্রোন সাবমেরিন বলে বর্ণনা করা যেতে পারে। পেন্টাগনের দেওয়া কোড নেম হলো Kanyon. ২০১৬ থেকে এটি রাশিয়ার কাছে আছে বলে জানা গিয়েছে। এই সাবমেরিনের রেঞ্জ হল ৬২০০ মাইল। আমেরিকা পর্যন্ত পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম এটি। ওই নথিতে আরো বলা হয়েছে যে, রাশিয়া নতুন নিউক্লিয়ার ওয়াহেড ও লঞ্চার নিয়ে আসছে। এছাড়া তৈরি করছে দুটি রেঞ্জ সিস্টেম, হাইপারসনিক ভেইকল ইত্যাদি। অটোনমাস টর্পেডোও বানাচ্ছে রাশিয়া।

নির্বাচনে জেতার আশা করেননি ট্রাম্প by মাইকেল উলফ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে লেখা বই ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ প্রকাশের পরই তোলপাড় শুরু হয়েছে মার্কিন মুল্লুকে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাইকেল উলফের বইটির প্রকাশনা ঠেকাতে আইনি পদক্ষেপও নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে তাতে কাজ হয়নি। বরং নির্ধারিত তারিখের আগেই গত ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে বইটি। প্রকাশের প্রথম দিনেই শেষ হয়ে যায় সব কপি। অগ্রিম অর্ডার দেয়া হয় দশ লাখ কপির। বইটির চুম্বক অংশ নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। ভাষান্তর করেছেন আহমেদ বায়েজীদ
[পর্ব-১]
৮ নভেম্বর, ২০১৬, বিকেলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা দলের ম্যানেজার কেলিয়ানি কনওয়ে ট্রাম্প টাওয়ারে তার অফিসে বসে আছেন। কনওয়ে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান চরিত্র, ট্রাম্প ওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ট্রাম্প নির্বাচনে পরাজিত না হলে সেটি হবে তার চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা- এই ভাবনায় প্রফুল্ল ছিলেন কনওয়ে। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, ট্রাম্প নির্বাচনে হারতে চলেছেন এবং খুব সম্ভবত ব্যবধান হবে ছয় পয়েন্টের বেশি। তবে (ট্রাম্পের) ওই বিজয় ছিল দারুণ এক বিজয়। ট্রাম্প পরাজিত হলে তিনি ভোল পাল্টাতেন : বলতেন- তার নয়, রেন্স প্রিবাসের দোষে হেরেছেন ট্রাম্প। সারা দিন রাজনৈতিক অঙ্গনের বন্ধু ও পরিচিত জনদের সাথে ফোনে কথা বলেছেন প্রিবাসের ঘাড়ে দোষ দিয়ে। যেসব টিভি প্রযোজক ও সাংবাদিকদের সাথে সম্পর্ক আছে, তাদেরও জানালেন বিষয়টি। গত কয়েক সপ্তাহে এই সাংবাদিকদের তিনি বিভিন্ন সময় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন; আশায় ছিলেন নির্বাচনের পর কোনো টিভি চ্যানেলে স্থায়ী চাকরিও পাবেন। আগস্টের মাঝামাঝি ট্রাম্পের প্রচারণা দলে যোগ দিয়েছিলেন কনওয়ে। জোরালো বক্তব্য আর সুন্দর ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি ছিলেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলতেন, নির্বাচনী প্রচারণার অন্যান্য ভয়াবহ সমস্যা সত্ত্বেও যে দুষ্টচক্র ছিল তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে তা হলো- রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির প্রধান রেন্স প্রিবাস, তার সহকর্মী ৩২ বছর বয়সী কেটি ওয়ালশ ও তাদের আরেক সঙ্গী শন স্পাইসার।
গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন লাভের পর থেকেই রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। মূলত এটিই তাদের প্রধান হাতিয়ার। যখন ট্রাম্পকে এগিয়ে দিতে পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল, তারা তা নেয়নি। এটি ছিল কনওয়ের আক্রমণের প্রথম অংশ। অন্য অংশটি ছিল, শত সমস্যা সত্ত্বেও প্রায় তলিয়ে যাওয়া একটি প্রচারণা দল আবার উঠে দাঁড়ায়। তাদের টিমের কার্যক্রম চালানোর মতো লোকবল ছিল চরম অদক্ষ- আর ছিলেন আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে প্রার্থী। কখনো ট্রাম্পের নাম উচ্চারিত হলেই কনওয়ের ভ্রু কুঁচকে যেত। তবে তিনি প্রকৃতপক্ষেই দারুণ কাজ করেছিলেন। এর মধ্যে ট্রাম্প ক্যাম্পেইন টিমের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষক জন ম্যাকলাফলিন এক সপ্তাহ বা তারও কিছু আগে থেকে বলতে শুরু করলেন যে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্টেটের সদস্যরা ট্রাম্পের সুবিধাজনক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। তবে কনওয়ে, ট্রাম্প নিজে এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার- যিনি ছিলেন প্রচারণার কার্যত প্রধান- এরা প্রত্যেকেই একটি বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন যে, তাদের এ অপ্রত্যাশিত দুঃসাহসিক যাত্রা শিগগিরই শেষ হচ্ছে। একমাত্র স্টিভ ব্যানন তার অভিজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে জোর দিয়ে বলতেন যে, ফলাফল তাদের পক্ষে আসবে। কিন্তু ব্যাননের এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্রোতের সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্পের ছোট্ট সেই প্রচারণা দলটির প্রত্যেকেরই ছিল স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। দলের সবাই তাদের রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে বাস্তববাদী ছিলেন। সবার ভাবনার মধ্যেই একটি বিষয়ে মিল ছিল, যদিও কেউ কাউকে বলতেন না সেটি- ট্রাম্প শুধু প্রেসিডেন্ট হবেন না তাই নয়; তার সম্ভবত প্রেসিডেন্ট হওয়াই উচিতও নয়। নির্বাচনী প্রচারণা যখন শেষ দিকে চলে আসে, ট্রাম্প নিজে আশাবাদী হয়ে উঠতে থাকেন। ভয়াবহ বিলি বুশ টেপ যখন ফাঁস হয়েছে, তিনি তা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। তবে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দিয়েছিল।
এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে ই-মেইলে কেলেঙ্কারির ঘটনা পুনঃতদন্তের ঘোষণা দিয়ে হিলারির নির্বাচন এক প্রকার ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। হিলারির যে বিশাল বিজয়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, তা এর মাধ্যমে তিনি পাল্টে দেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প একবার তার বন্ধু স্যাম নুনবার্গকে বলেছিলেন, ‘আমিই হতে পারি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষ।’ নুনবার্গ প্রশ্ন করেন, ‘কিন্তু আপনি কি প্রেসিডেন্ট হতে চান? (একজন প্রার্থীকে যাচাই করার জন্য এটি কোনো প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটি হওয়া উচিত ছিল ‘কেন আপনি প্রেসিডেন্ট হতে চান’?) যা হোক, নুনবার্গ সে প্রশ্নের উত্তর পাননি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ারও দরকার ছিল না ট্রাম্পের, কারণ তিনি তো আর ‘প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন না’। ট্রাম্পের দীর্ঘ দিনের বন্ধু রজার আইলেস প্রায়ই বলতেন, তুমি যদি টেলিভিশনে ক্যারিয়ার গড়তে চাও, আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াও। রজারের কথায় উৎসাহিত ট্রাম্প তার টেলিভিশন নেটওয়ার্কের বিষয়ে বিভিন্ন কথা ছড়াতে থাকেন। এটির একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ ছিল। ট্রাম্প রজারকে নিশ্চয়তা দিতেন যে, এই নির্বাচনী প্রচারণা থেকে তিনি অনেক বেশি শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ও অনেক সুযোগ নিয়ে বের হবেন। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে এক আলাপে তিনি রজারকে বলেছেন, ‘আমি সব সময় যা স্বপ্ন দেখেছি, এটি তার চেয়েও বেশি। আমি পরাজয় নিয়ে ভাবছি না, কারণ এটি (নির্বাচনে হারা মানেই) পরাজয় নয়। সব কিছুতেই আমাদের জিত হয়েছে’। শুধু তাই নয়, নির্বাচনে পরাজিত হলে তিনি কী বক্তব্য দেবেন, সেটিও ভেবে রেখেছিলেন। বলতেন, ‘ফলাফল চুরি করা হয়েছে!’ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ক্ষুদ্র প্রচারণা দল পরাজয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল। তারা জেতার জন্য তৈরি ছিল না। রাজনীতিতে কেউ জিতবে, কেউ হারবে; কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তনীয় যে, সবাই বিজয়ের চিন্তা করবে এবং আপনি সম্ভবত জিততেও পারবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি বিশ্বাস করবেন যে, আপনি জিততে চলেছেন।
তবে একমাত্র ট্রাম্পের প্রচারণা দল ছিল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ট্রাম্পের প্রচার শিবিরের মধ্যে সম্মিলিতভাবে একটি সুর ধ্বনিত হতো যে, তাদের প্রচারণা ছিল কতটা নি¤œমানের এবং এখানে যারা জড়িত আছে তারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে ট্রাম্প মনে করতেন যে, হিলারির লোকগুলো অত্যন্ত মেধাবী। এ নিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘তারা সেরা লোকগুলো পেয়েছে, আমরা পেয়েছি সবচেয়ে বাজেগুলো’। ট্রাম্পের প্রচারণার সময় তার সাথে বিমানে কাটানো সময়গুলো থেকে একটি অভিজ্ঞতা হয়েছে (লেখকের) যে, তার চারপাশে যারা আছে সবাই আহাম্মক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণার শুরুর দিকে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কোরি লেওয়ানডোস্কি। প্রার্থী নিজেই তাকে মাঝে মধ্যে অপমান করতেন। কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প তাকে ‘বাজে’ বলার পর অবশেষে জুলাই মাসে বরখাস্ত করেন। তবে এরপর আবার ট্রাম্প বলতেন, লেওয়ানডোস্কিকে ছাড়া তার নির্বাচনী প্রচারণায় ধস নেমেছে। তিনি বলতেন, ‘আমরা সবাই পরাজিত। আমাদের প্রতিটি লোক ভয়াবহ, কেউ জানে না তারা কী করছে... লেওয়ানডোস্কিকে ফিরিয়ে আনতে হবে’। এরমধ্যে প্রচারণা দলের দ্বিতীয় ম্যানেজার পল ম্যানাফোর্টের সাথেও তিক্ততা সৃষ্টি হয় ট্রাম্পের। আগস্টের নির্বাচনী বিতর্কে ট্রাম্প হিলারির কাছে ১২ থেকে ১৭ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়েন। এর মধ্যে প্রতিদিন সংবাদপত্রগুলো তার বিরুদ্ধে একের পর এক নতুন নতুন তথ্য প্রকাশ করে ‘বোমা ফাটাতে থাকে’। পরিস্থিতি এতই খারাপ হতে থাকে যে, নির্বাচনে বিজয়ের কথাও চিন্তা করারও সুযোগ হয়নি তার। এমন দুঃসময়ে বুদ্ধি তাকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। কিছু বিষয় তার পরাজিত প্রচারণা দলের ওপর ছেড়ে দেন। এ সময় রিপাবলিকান দলে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী টেড ক্রুজের সমর্থক হিসেবে পরিচিত, ধনকুবের বব মারসার ট্রাম্পকে সমর্থন দেন। সেই সাথে প্রচারণার তহবিলে দেন ৫০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান। ট্রাম্পের প্রচারণা আবারো জেগে উঠবে- এই বিশ্বাস নিয়ে মারসার ও তার মেয়ে রেবেকা লং আইল্যান্ড থেকে হেলিকপ্টারে চড়ে যোগ দেন জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানির উত্তরসূরি উডি জনসনের বাড়িতে তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানে। মারসার ও তার মেয়ের সাথে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কোনো সম্পর্ক ছিল না। আগে দু-একবার আলাপ হয়েছে মাত্র। কিন্তু তারা সমগ্র নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্ব নেয়ার পরিকল্পনাসহ একটি প্রস্তাব দেন এবং তাদের নিজস্ব লোক স্টিভ ব্যানন ও কেলিয়ানি কনওয়েকে এই কাজের দায়িত্ব দেয়ার দাবি জানান। ট্রাম্প তাদের প্রস্তাব মেনে নেন। তিনি শুধু এটুকু প্রকাশ করেছিলেন যে, কেন তারা এই কাজ করছে তা বুঝে আসছে না। মারসারকে তিনি বলেন, ‘এসব খুবই বাজেভাবে চলছে’। আসলে ট্রাম্পের প্রচারণা তখন এমন একটি অবস্থায় ছিল, যার কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো ছিল না। স্টিভ ব্যানন যাকে বলতেন ‘ব্রোক ডিক ক্যাম্পেইন’।

না বলেও যা বলে গেলেন প্রয়াত নগরপিতা by মিনা ফারাহ

পাকিস্তান আমলে মেট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন পেলে বাড়ি ভরে গেল আমাকে দেখতে আসা লোকজনে। সবার মুখে এক কথা, ফার্স্ট ডিভিশন কি মুখের কথা? বাবার গর্ব দেখার মতো। দুর্ভাগ্য, এক জীবনেই দেখতে হলো শিক্ষামন্ত্রীর মুখে ঘুষের ‘যোগ-বিয়োগ শিক্ষা’। এর পরও স্বপদে থাকার মতো অবিবেচক। তবে তিনি একা নন, এ জন্য দায়ী তার দল, যারা সংগ্রামী সংগঠনের বদলে সন্ত্রাসীদের এক প্রকার অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসেছিল অদৃশ্য ভোট কারচুপি করে। দ্বিতীয় দফায় উন্মুক্ত ব্যালট লুণ্ঠন। এদের যারাই শক্তি জোগাচ্ছে, তারাই ইরাক-আফগানিস্তানে নরকের সৃষ্টি করেছে। এদের মোটিভ আজ সবার কাছে স্পষ্ট। উদ্দেশ্য, সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির মাধ্যমে অঢেল টাকার ব্যবস্থা করা, যার পেছনে অন্ধের মতো ছুটবে সব মানুষ। দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠানগুলোই হবে অবৈধ টাকার একমাত্র ঠিকানা, যেগুলো ব্যবহার করা হবে দলীয় প্রতিষ্ঠানের মতো। শুরু থেকেই যুবসমাজের নীতিনৈতিকতা ধ্বংস করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গডফাদারদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ও পরীক্ষার রেজাল্ট ফাঁস ছাড়াও টিউটোরিয়াল সিন্ডিকেট কেন এত শক্তিশালী? কারণ, দুর্নীতিবাজদের হুকুম মানতে বাধ্য নয় দুর্নীতিবাজেরা। নগরপিতার মৃত্যুতে উল্লসিত দখলদারেরা পুনরুজ্জীবিত হয়ে দখলে নেমেছে। রাষ্ট্রকে ওরা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সেটাই জানিয়ে গেলেন নগরপিতা। এ কাজটাই হোক তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই লেখাটির উৎসও তিনি। মেয়রকে যারাই ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন, তারাও অনির্বাচিত হওয়ায় দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যেতে পারেনি প্রশাসন। দুর্নীতি কখনোই পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে আইনের শাসন থাকলে অনেকটাই সম্ভব। সে জন্য প্রয়োজন, নির্বাচিত সরকার। দেশের সর্বোচ্চ বিচারবিভাগ ও বিচারকদের সমন্বয়ে, জ্ঞানীগুণী নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে সাব্যস্ত হয়েছিল- বর্তমান সংসদ অবৈধ। সেখানে কী হলো? দুর্নীতির রোগবালাই কোন পর্যায়ে, বেসিক ব্যাংক ‘ডাকাতির পর ফারমারস ব্যাংকের ‘মখা’ই প্রমাণ। ওদের বিচারের আওতায় আনার বদলে রাজনৈতিক পরিচয়ে আরো তিনটি নতুন ব্যাংকের ঘোষণা? শেয়ারবাজার ধসের পরও একই বক্তব্য মন্ত্রীর। কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই মুহিত-বাজেট প্রতি বছরই কেন আরো বৃহদাকার ধারণ করে?
উত্তর পাওয়া যাবে কুখ্যাত আমেরিকান ব্যাংক ডাকাত উইলি সাটনের কাছে। সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ব্যাংক ডাকাতি করো কেন?’ উত্তরে সাটন- ‘ব্যাংক ডাকাতি করি; কারণ, ওইখানেই টাকা।’ গত ৯ বছরে যা দৃশ্যমান- মেগাবাজেট, কুইকরেন্টাল, একনেক, পদ্মা সেতু, ৫০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, ব্যাংক, মিডিয়া, আবাসন, সুদবাজার, গোপন ইজারা... সর্বত্রই ব্যাংক ও এর পেছনেই ছুটছে লুটেরারা। প্রয়াত নগরপিতা জানিয়ে গেলেন, বৈধ সরকার না থাকলে উল্টো দুষ্কৃতকারীরাই রক্ষা করবে অবৈধ প্রশাসন। অন্যথায়, ওয়ান-ইলেভেনের মতো হয় জেলে, নয় পালিয়ে বাঁচতে হবে। ফিরে এসে আরো বেশি অদম্য এরা। উদ্দেশ্য, ২০৪১ পেরিয়ে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রই দখলে রাখা। অন্যথায় ব্যাংক থাকবে না, ডাকাতিও সম্ভব নয়, টাকার খায়েশ ধুলায় মলিন হয়ে যাবে। ১৬তম সংশোধনী বাতিলের বিষয়টিকে খুব কমই গুরুত্ব দেয়া হলো। সিনহাকে চাকরিচ্যুত করার পেছনের শক্তি- আন্তর্জাতিক। হ্যাঁ, ১৬তম সংশোধনী বাতিল হবে। অবৈধরাই বিচারপতিদের বিচার করবেন- করছেনও। সিনহা বনাম খায়রুল হকদের দৃষ্টান্ত একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকার। সিনহা চ্যাপ্টার শেষ, গ্যাংস্টারদের এবার ঠেকায় কে? তবে ওরা শুধু এখন আর আওয়ামী লীগেই সীমাবদ্ধ নয়। রসিক নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলতে চেয়েছেন, এই প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন দিলে বিএনপির সমস্যা নেই। ব্রিটিশ আমল থেকেই ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ বলে কথা। অনেকেরই মোটিভ সম্পর্কে জনমনে স্পষ্ট ধারণা নেই। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি ইডিয়ট পার্টি, লিডাররা স্টুপিড। দলনেত্রী এদের নাম দিয়েছেন, ভূত-পেত্নি (ইত্তেফাক, ৩১ ডিসেম্বর)। এরকম একটি অকেজো বিরোধী দল থাকলে ২০০ বছর ক্ষমতায় থাকা কোনো ব্যাপার? ‘জোট সরকার দুর্নীতি করেনি’ বলব কেন? তবে ১১ বছর ক্ষমতায় না থাকাটা বিশাল ব্যাপার। এ কারণে তাদের কর্মকাণ্ড এখন অপ্রাসঙ্গিক এবং বর্তমান জনজীবনেও প্রভাবহীন। ৯ বছর ক্ষমতায় থেকেও জোট সরকারকে প্রত্যেকদিন যারাই ‘অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা দিয়ে নিজেদের ‘নির্বাচিত’ সরকার বলে দাবি করে, তারাই ৪৭ বছরের শ্রেষ্ঠ দুর্নীতিবাজ। এদের সিন্ডিকেট এত বিশাল, যার তলে মাটিচাপা পড়ে বহু আগেই ‘খাম্বা দুর্নীতি’র মৃত্যু হয়েছে। তদুপরি বর্তমান ‘খাওয়া ভবনের’ তুলনায় ‘হাওয়া ভবনকে’ শিশু বললেও ভুল হবে, বরং ভ্রুণ। নির্বাচিত সরকার থাকলে মন্ত্রীর জামাই তারেক সাঈদসহ ২৬ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর করা কিংবা হলমার্কের তানভীরের উপযুক্ত শাস্তির জন্য এতকাল অপেক্ষা করতে হতো কী? ব্যাংকখেকো বাচ্চু এবং মখাকে নিয়ে যখন তোলপাড় হওয়ার কথা, উল্টো সবাই ব্যস্ত অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা নিয়ে! যেন দাউদ ইব্রাহিমের বিচার করছে পুরান ঢাকার আদালত। অন্যান্য নেতাকর্মীর কথা বাদই দিলাম, সপ্তাহে একাধিকবার হাজিরা দিতে হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে, আর ফুরফুরে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাবেক আতিউর, বাচ্চু, মখা প্রমুখ।
বলছি, গডফাদার সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্কের কথা। আওয়ামী তিন টার্মেই শেয়ারবাজার দুর্নীতি ও আবাসন খাতে ধস। প্রতিষ্ঠান দুটো এখনো ‘কোমায়’। এর সাথে জড়িতদের অনেকেই প্রশাসনে। এক বিলিয়নিয়ার হাইকমান্ডের রাজনৈতিক উপদেষ্টাও! যুগান্তর পত্রিকা একাধিকবার তার ব্যাপক অর্থ কেলেঙ্কারি এবং জিএমজি এয়ারলাইন্সের ৩০০ কোটি টাকা খেয়ে ফেলা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিল। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের শিরোমণি এই লোক, ৩২ নম্বরের ত্রাণ তহবিলের দানবীরদের শীর্ষে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেই এসব রোগবালাই ছড়ায়, কিন্তু কাউকেই জেলে যেতে হয় না। সরকারি ও বেসরকারি- যা হচ্ছে ব্যাংকে। গ্যাংস্টাররাই ভুয়া ব্যবসায় খুলে বন্ধ দরজার ভেতরে ঋণ লেখে। নিজেরাই গ্রাহক, প্রাপক, পাচারকারী। আন্ডার ইনভয়েস, ওভার ইনভয়েস, ভুয়া দলিল। ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করা সবচেয়ে সহজ। উদাহরণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৮০০ মিলিয়ন ডলার উধাওয়ের সময়কালীন গভর্নর। মখা-বাচ্চুর মতোই তিনিও নিরাপদে! তিনি জানেন না, হতেই পারে না।
কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কয়েকটি নমুনা-
যিনি পরিবহন শ্রমিকনেতা, তিনিই মন্ত্রী। যিনি এমপি, তিনিই সারাক্ষণ মাল্টিমিলিয়ন ডলারের ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত। যিনি সংস্কৃতিমন্ত্রী, টেলিভিশন খুললেই বিজ্ঞাপনে তার কণ্ঠ। যিনি সড়কমন্ত্রী, তিনিই মহাসচিব, তিনিই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ‘বড় মাইক’। তার মন্ত্রণালয়ের অবহেলায় সড়কে প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল। সড়কে সময় দেয়ার মতো সময় তার হাতে নেই। বরং ব্যস্ত বড়বড় কাজে। উদাহরণস্বরূপ, অমৃতাক্ষর ছন্দে প্রতিদিনই যাত্রাগানের গায়কের সুরে বলেই যাচ্ছেন, এই নেত্রীকে সরকার প্রধানে রেখে নির্বাচন। ‘নাকে খত দিয়ে নির্বাচনে আসবে বিএনপি।’ ছয় বছর পরও পদ্মা সেতুর একটা ঠ্যাং ছাড়া আর কী দেখালেন! এ দিকে সড়কমন্ত্রীর উন্নয়নের মহাসড়কে ব্যাপক ধস। এই সরকারের আমলে ভূমিদস্যুরা সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া। ৯ বছরে কতগুলো বস্তিতে আগুন এবং কারা দিচ্ছে? বস্তিসিন্ডিকেট এত বেশি শক্তিশালী, কালশীর দুই বছর পর আবারো জ্বালিয়ে দিলো মিরপুরের বস্তি। অথচ কালশীতে ৯টি মৃত্যুর ঘটনায় সরাসরি স্থানীয় এমপি যুক্ত থাকার প্রমাণ মিডিয়ায় থাকা সত্ত্বেও কিছুই হলো না। আবার বলছি, জীবিতাবস্থায় একজন অসহায় মেয়রের কথা, যার মৃত্যুর পরই দখলদারেরা বেজায় খুশি।
বাংলাদেশে গুম এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। উত্তরে হাইকমান্ড- ‘ইংল্যান্ড-আমেরিকাতেও গুম হয়।’ এর একটি সুষ্ঠু জবাব প্রয়োজন। কারণ এভাবে গুমের ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। শুধুই কী ২০ দল? গুমের তালিকায় মিডিয়া, সাংবাদিক, পদক, কবর, পানামা পেপার্সের ২৬ আওয়ামী লীগার। হঠাৎ বাড়ি ঘেরাও করে অভিযানের তোলপাড়। সব মিডিয়া তখন অভিযানের দিকে ছোটে। দেশী সন্ত্রাসীরা কিন্তু বিদেশীদের মতো বাজার, ধর্মাঙ্গন বা বিয়ের অনুষ্ঠানে আত্মাহুতির ঘটনা ঘটায় না। কিন্তু রাষ্ট্র যেন কোত্থেকে আগাম খবর পায়, কোন বিশেষ বাড়িতে সন্ত্রাসীরা রয়েছে। অভিযান শেষে শুধু সন্ত্রাসীরাই মরে। ঘটনাগুলো তখনই বেশি ঘটে, যখন অবৈধ সরকারের ভিত নড়েচড়ে ওঠে। করাপশনের গভীরে পৌঁছানোর দায়িত্ব যাদের, সেই দুদক ও বিচারবিভাগ সরব নয় কেন? গুপ্ত আস্তানা ফেরত ভিকটিমদের প্রত্যেকের ঘটনাই হুবহু। মিছির আলী কিংবা দস্যু বনহুর সিরিজের মতোই রহস্য। চোখ বেঁধে ফেলে ৩ ঘণ্টার যাত্রা। এরপর বনাঞ্চলের গহীনে একটি বাড়ির শানবাঁধা মেঝেতে দিনের পর দিন রাখা। দরজার নিচ দিয়ে খাবারের প্লেট। দুই সপ্তাহ পরপর বাইরে এনে কিছুক্ষণের জন্য চোখ খুলে দেয়া। মারপিট না করা। ফেরার পথেও ৩ ঘণ্টার যাত্রা। নামিয়ে দেয়ার সময় একই বক্তব্য। ‘পেছন ফিরে তাকাস না, তাকলেই গুলি করব।’ উৎপল দাসরা নিশ্চয়ই মামাবাড়িতে বেড়াতে যান না। কিন্তু ফিরে এসে সবাই বোবা কেন? নাকি সবাই কণ্ঠনালী জমা রাখার শর্তে ফেরত আসে! বিএনপির দুই নেতাকে গুমের দীর্ঘ দিন পর হঠাৎ গ্রেফতার দেখাল পুলিশ। এরপরই জেলহাজতে রেখে রিমান্ড চাওয়া। যুক্তিবাদীরা বলবেন, ‘ভিকটিমদের প্রথম এবং দ্বিতীয় গুম-বাড়ির ঠিকানা একটাই!’ যারা সন্ত্রাসীদের আগাম তথ্য জানার মতো পারদর্শী, নিশ্চয়ই ‘গুম-বাড়িটিও’ বের করার মতো পারদর্শী।
এতকিছু বলার কারণ, অনুন্নত দেশে ১৬ কোটি মানুষের দায়িত্ব নেয়া সবচেয়ে কঠিন কাজ। কর্মসংস্থান, আইনের শাসন, মানবাধিকার... প্রতিটি ইঞ্চিতে চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ ছাড়াও ভেনিজুয়েলা, নাইজারের মতো দেশে গণতন্ত্রের নামে বিরাট ধাপ্পাবাজি। অনেক দেশে বন্দুকের নলের মুখে ভোটের বাক্স ভরে নিজেরাই ক্ষমতায়। ফলে বছরজুড়েই উত্তেজনা, অসন্তোষ, বিক্ষোভ, রায়ট, টিয়ার-গ্যাস, গুম-খুন...। ঢাকা এয়ারপোর্টের পুলিশের পক্ষ থেকেও চমৎকার তথ্য। শ্রমিকেরা নাকি কামলা। সত্যিই তাই। কারণ বিশেষ রাজনৈতিক দলের ভরণপোষণ জোগাতে গিয়ে অন্যদের কর্মসংস্থানের জায়গাগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। উপজেলা থেকে রাজধানী, সর্বত্রই চাকরির পূর্বশর্ত, দলের কিনা! রাজনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের এত বেশি ক্ষতি হয়েছে, যে জন্য লাখ লাখ যুবক বেকার। প্রতি বছরই পুরনো বেকারদের সাথে যোগ হচ্ছে আরো কয়েক লাখ। এরাই কর্মসংস্থানের অভাবে কেউ যোগ দিচ্ছে সিন্ডিকেটে, কেউ বিদেশে যেতে মরিয়া। ২০১৭ সালেই গেছে ১৩ লাখের বেশি। আওয়ামী লীগের আমলে যোগ হয়েছে ‘মহিলাকর্মী’, আসলেই যাদের এক প্রকার যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের তথ্য মিডিয়ায়। বেকারত্ব থেকে অস্থিরতা। অস্থিরতা থেকে নৈরাজ্য। আগুন সামলাতে বিদেশে নতুন নতুন শ্রমবাজার খুলতে মরিয়া হাইকমান্ড। দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা প্রায় শেষ। বেঁচে আছে ফেইক নিউজের ওপর। একমাত্র বৈধ সরকারই পারে এসবের ঊর্র্ধ্বে ওঠে জনকল্যাণে কাজ করতে। ‘সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রই বৈধ উপায়ে জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে পারে।’ গুম বিষয়ে হাইকমান্ডের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমের রেফারেন্স দিচ্ছি। যারা আইনের বাইরে গিয়ে বড়লোক হতে চায়, পশ্চিমের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের প্রতিহত করে। আর যারা সৎ পথে চলে, রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমের অর্থনৈতিক ঊর্ধ্বগতির সাথে যুক্ত হতে পেরেছে সারা বিশ্বের মানুষ। ওয়াল স্ট্রিটের সৌজন্যে গত ৩০ বছরে মিলিয়নিয়ার-বিলিয়নিয়ারদের বিস্ফোরণ ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৫ সালে যারা অ্যামাজন স্টকে এক ডলার বিনিয়োগ করেছে, বর্তমান মূল্য ৪০ হাজার ডলার। সার্বিক আবাসন খাতের মূল্য প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালে ডাউজোন্সের মূল্য বেড়েছে ২৭ শতাংশ। বুঝলাম, আমেরিকাতেও গুম হয়; কিন্তু এই প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন : ‘আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, প্রতিবারই আবাসন এবং শেয়ারবাজারে ধস নামে কেন? মেয়রের মৃত্যুর পরই দখলদারেরা আবারো সক্রিয় কেন?’
সমস্যার গোড়া, ৫ জানুয়ারির রোগবালাই। এর সাথে জড়িতদের বিচার হয়নি বলেই, রন্ধ্রে রন্ধ্রে গ্যাংস্টারদের বিস্তার। পুলিশের ঘুষ খাওয়া যেমন ওপেনসিক্রেট, তেমনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ‘সহনীয় মাত্রা’র অনুমোদিত ঘুষের ফরমান জারি করলেন মন্ত্রী নিজে। জিয়া অরফানেজের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি ক্ষয় করলেও মইনু-ফখরু সরকারকে বৈধতার ঘোষণা দিয়েছিলেন কে? যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার ব্যয়; কিন্তু এই দুইজনকে ফিরিয়ে আনতে আগ্রহ না থাকার কারণ কী? ওয়ান-ইলেভেনের ষড়যন্ত্রের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক। তবে সবার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন প্রয়াত নগরপিতা। ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতাদের কী বলেছেন জয়’- পরিচয়, নিউ ইয়র্ক, ২০ ডিসেম্বর। সারাংশ এরকম- ১. ব্যাপক হারে জোট সরকারের দুর্নীতি প্রচারের নির্দেশ; ২. মিডিয়াসহ রাস্তা ও সব প্রচারযন্ত্র দখলে রাখা; ৩. ব্যাপক হারে ক্ষমতাসীনদের উন্নয়ন প্রচারে বাধ্যবাধকতা; ৪. যেকোনো মূল্যে আওয়ামী লীগকেই আবারো ক্ষমতায় আনা।
সারমর্ম : অবৈধ সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে সঙ্ঘবদ্ধদের মধ্যে সব দলেরই লোক। কারণ সৎভাবে জীবিকার সুযোগ ধ্বংস করায় দুর্নীতিবাজদের সমর্থন না করলে না খেয়ে মরতে হবে।
ই-মেইল : farahmina@gmail.com
ওয়েবসাইট : www.minafarah.com