Tuesday, February 18, 2014

ভূরাজনীতি- চীনের কোনো বন্ধু নেই by ব্রহ্ম চেলানি

ভূখণ্ডগত দাবিদাওয়ার কারণে এই অঞ্চলের অনেক দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক যখন টানাপোড়েনের মুখোমুখি পড়েছে, যখন মিয়ানমারের ওপর তার একসময়ের প্রবল প্রভাব দুর্বল হয়েছে এবং তার একসময়ের অনুগত রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, তখন দেখা যাচ্ছে, চীন নামক শক্তিধর রাষ্ট্রটির আশপাশে সত্যিকারের কোনো মিত্র নেই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করতে এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ার আশঙ্কাময় ভূরাজনীতিতে পরিবর্তন সূচিত করতে সক্ষম হবে কি না।

মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় ২০১১ সালের শেষ দিকে, যখন মিয়ানমার চীনের সহায়তায় নির্মিতব্য সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে বিতর্কিত প্রকল্পের কাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ইরাবতী নদীর উজানে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়সাপেক্ষ মায়িস্টোন বাঁধ নির্মাণের সেই প্রকল্প মিয়ানমার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলে চীন বেশ আঘাত পায়, যে মিয়ানমারকে চীন তার মক্কেল রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। তবে সম্পর্কে এই চিড় ধরা সত্ত্বেও দেশটির প্রতি চীনের আগ্রহ আজও ব্যাপক মাত্রায় রয়ে গেছে।
মিয়ানমারের ওই সিদ্ধান্তের ফলে চীনের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও পৃথিবীর অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তার পরে একটা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে; মিয়ানমারের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর বহু বছর ধরে আরোপিত অবরোধগুলো শিথিল হয়েছে এবং মিয়ানমারের কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ঘুচেছে।
ওদিকে উত্তর কোরিয়ার তরুণ স্বৈরশাসক কিম জং-উন চীনের সঙ্গে নিজের দূরত্ব বাড়িয়ে মিয়ানমারের পথ অবলম্বনের আগ্রহ জানান দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য যদি এমন হয় যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার শীতল সম্পর্কের বরফ গলাতে চাইছেন, তাহলে তাঁকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সাবেক আমেরিকান বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যানকে তিনি স্বাগত জানানোর ফলে আমেরিকায় শুধু বিতর্কই সৃষ্টি হয়েছে। আর দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তিনি তাঁর এক সাবেক মেয়েবন্ধুকে মেশিনগানের গুলি করে হত্যা করেছেন—এতেও আমেরিকানদের কাছে তাঁর কদর কোনোভাবেই বাড়বে না।
অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, কিম তাঁর চাচাশ্বশুর জ্যাং সং-থেককে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে হত্যা করার ফলে চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের যে অবনতি ঘটে, উত্তর কোরিয়ার খামখেয়ালিপূর্ণ ও অদ্ভুত রাজনীতিতে তার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। চীনের জন্য বিষয়টি ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের। উত্তর কোরিয়ার শাসকমহলের মধ্যে থেক ছিলেন চীনের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে কিম বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেছিলেন। এগুলোর মধ্যে এমন অভিযোগও ছিল যে থেক খুব কম দামে কয়লা, জমি ও বিভিন্ন মূল্যবান ধাতু চীনের কাছে বিক্রির ষড়যন্ত্র করছিলেন।
কিন্তু চীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে খুব যত্নের সঙ্গে যে ‘রক্তের সম্পর্ক’ বজায় রেখে আসছিল, ২০১১ সালের শেষে কিম তাঁর পিতা কিম জং-ইলের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তার অবনতি ঘটতে শুরু করে। চীনের তিনটি মাছ ধরার নৌকা উত্তর কোরিয়া আটক করে, সেসব নৌকায় যে ২৯ জন মানুষ ছিল, তাদের সবাইকে ১৩ দিন ধরে আটকে রাখে (খবরে প্রকাশ, ওই সময় তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়), তারপর উত্তর কোরিয়ার জলসীমার মধ্যে মাছ ধরার দায়ে চীনের কাছে এক লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে। চীনের প্রতি উত্তর কোরিয়ার অবাধ্যতা প্রকাশের সেটাই ছিল প্রথম লক্ষণ। তারপর উত্তর কোরিয়া তৃতীয়বারের মতো পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর মধ্য দিয়ে চীনের বিরাগ সৃষ্টি করে।
বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে কিমের এসব পদক্ষেপকে চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উত্তর কোরিয়ার ‘অচীনাকরণ’ নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং এর জন্য কিমের সমালোচনা করার মধ্য দিয়ে একটা স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু কিমবিরোধী প্রচারণার বাইরে চীনের আর বেশি কিছু করার নেই। কারণ, উত্তর কোরিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ লোহা, ম্যাগনেসাইট, তামা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের মজুত রয়েছে, সেসবের প্রতি চীনের প্রবল আগ্রহ আছে। মিয়ানমারের মতো উত্তর কোরিয়ায়ও এসব ক্ষেত্রে অভিগম্যতা অটুট রাখতে চায় চীন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্তর কোরিয়ায় জ্বালানি ও খাদ্যের সরবরাহ সংকোচন করার মধ্য দিয়ে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্যোগ যদি চীন নেয়, তাহলে সেই দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী চীনে প্রবেশ করার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। চীনের দিক থেকে তার চেয়েও খারাপ কথা হলো, এর ফলে উত্তর কোরিয়ায় কিম-পরিবারের শাসন ভেঙে পড়তে পারে। সে রকম কিছু ঘটলে উত্তর কোরিয়া রাষ্ট্র হিসেবেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে পারে। তাহলে যা দাঁড়াবে তা হলো, চীনের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে একক কোরীয় রাষ্ট্রের উত্থান। চীনা সীমান্তের কাছাকাছি মার্কিন সেনাবাহিনীর অবস্থান চীনের জন্য ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।
দুই কোরিয়া এক হলে যে একক কোরীয় রাষ্ট্রের উত্থান ঘটবে, তার সঙ্গে চীনের বেশ কিছু ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে বিরোধ তীব্রতর হবে (যেমন, পিকতু পাহাড়ের গিরিখাত কোনজি হ্রদ এবং ইয়ালু ও তুমেন নদীর কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চীনের ইতিমধ্যেই বিরোধ আছে)। দুই কোরিয়ার একত্রকরণ চীন মেনে নিতে পারে কেবল এই শর্তে যে একক কোরীয় রাষ্ট্রের মর্যাদা হবে ফিনল্যান্ডের মতো, যার স্থায়ী কৌশলগত ছাড় পাবে নিকটতম পরাশক্তি রাষ্ট্র।
আজকের উত্তর কোরিয়ার মতো মিয়ানমারও সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ছিল একটি বিচ্ছিন্ন, সামরিকীকৃত রাষ্ট্র যে কি না দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অবরোধের ফলে বেশ ভুগেছে। বস্তুত কিমের ওপর হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ার ফলে চীন গত বছর উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের আরও এক দফা অবরোধ আরোপের উদ্যোগে সহযোগিতা করেছে।
কিন্তু মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মিয়ানমারের সমাজ বিচিত্র জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত, যেখানে বর্মি-অভিজাত শাসকগোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের অত্যাচার-নির্যাতনের সমস্যা নিয়ে মুশকিলে আছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার সমাজ সমগোত্রীয় বা হোমোজেনাস, কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার নিগড়ে বাঁধা; উপরন্তু উত্তর কোরিয়া একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। অন্য কথায়, বিশ্বের জন্য উত্তর কোরিয়া অনেক বেশি বিপজ্জনক একটি রাষ্ট্র।
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের ভাঙন উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটানোর সুযোগটি নিতে চায়, তাহলে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে হবে। কারণ, উত্তর কোরিয়ার জন্য চীন একটা সমস্যা, চীনের ওপর থেকে সে নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে।
মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ফলে ২০১২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইয়াঙ্গুন সফর করেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু করতে হলে প্রথমেই উত্তর কোরিয়াকে রাজি করাতে হবে বি-পারমাণবিকীকরণ সম্পর্কে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে। প্রশ্ন হচ্ছে, ওবামা সে রকম ঝুঁকি নিতে যাবেন কি না। কারণ, তিনি ইতিমধ্যেই শুধু অভ্যন্তরীণ অনেক সমস্যার মুখোমুখি নন, সিরিয়ার ব্যাপারে একটা শান্তি-সমঝোতায় পৌঁছানো এবং ইরানের সঙ্গে তাঁর পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি নিয়েও মুশকিলে আছেন। এমন অবস্থায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একটি ঝুঁকিপূর্ণ আলোচনা শুরু করার জন্য তাঁর প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পরিসর কিংবা ব্যক্তি আগ্রহ আছে কি না সেটাই প্রশ্ন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ব্রহ্ম চেলানি: অধ্যাপক, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ, নয়াদিল্লি।

সহজিয়া কড়চা- ঘটনার চেয়ে চেতনাই প্রধান by সৈয়দ আবুল মকসুদ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের চলে যাওয়ার আগে থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের সরকারি ভাষা কী হবে তা নিয়ে আলোচনা হতে থাকে দুই দেশেরই রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর অনুসারীদের প্রস্তাব হিন্দি হবে সে দেশে সরকারি ভাষা।

কলকাতার চিঠি- নন্দীগ্রামে মমতার অস্বস্তি by অমর সাহা

এমনটা ভাবেননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এভাবে ধাক্কা দেবে তাঁকে নন্দীগ্রাম। বড় বিশ্বাস ছিল তাঁর নন্দীগ্রাম নিয়ে। এই নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরের আশীর্বাদ নিয়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি।

ভূরাজনীতি- চীনের কোনো বন্ধু নেই by ব্রহ্ম চেলানি

ভূখণ্ডগত দাবিদাওয়ার কারণে এই অঞ্চলের অনেক দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক যখন টানাপোড়েনের মুখোমুখি পড়েছে, যখন মিয়ানমারের ওপর তার একসময়ের প্রবল প্রভাব দুর্বল হয়েছে এবং তার একসময়ের অনুগত রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, তখন দেখা যাচ্ছে, চীন নামক শক্তিধর রাষ্ট্রটির আশপাশে সত্যিকারের কোনো মিত্র নেই।

সহজিয়া কড়চা- ঘটনার চেয়ে চেতনাই প্রধান by সৈয়দ আবুল মকসুদ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের চলে যাওয়ার আগে থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের সরকারি ভাষা কী হবে তা নিয়ে আলোচনা হতে থাকে দুই দেশেরই রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর অনুসারীদের প্রস্তাব হিন্দি হবে সে দেশে সরকারি ভাষা।
মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ইচ্ছা উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। দুটিই বহু ভাষাভাষী মানুষের দেশ। হিন্দি ও উর্দু কোনো দেশেরই সর্বজনীন ভাষা নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ তো নয়ই, সিকি মানুষের মুখের ভাষাও নয়।

ভারতে হিন্দিকে একমাত্র অফিশিয়াল ভাষা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। বাংলা, উর্দু ও তামিলের পক্ষে ওকালতি হয়েছে। তবে কোনো আন্দোলন হয়নি, যেমনটি হয়েছে পাকিস্তানের পূর্ব বাংলায়। ১৯৬৫ সালে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দা আকাশবাণী থেকে বলেছিলেন, আজ থেকে সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দি চালু হলো। তাঁর এই বক্তব্যে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। চেন্নাইয়ে (মাদ্রাজ ছিল তখনকার নাম) ১২ জন তামিল ভাষার দাবিতে শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতি দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পরিস্থিতি সামাল দিয়ে টিকে যান।
প্রাপ্ত দলিলপত্রে দেখা যায়, পূর্ববাংলার দলমত-নির্বিশেষে নেতারা ও বুদ্ধিজীবী সমাজ বাংলাকেই পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছে। ঢাকার নবাব পরিবারের কেউ কেউ এবং দু-চারজন মৌলবাদী দালাল গোছের লোক ছাড়া বাংলার পক্ষে ছিল গোটা পূর্ব বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা উর্দু হবে না হিব্রু হবে, পাঞ্জাবি হবে না সিন্ধি হবে—তা নিয়ে বাঙালিদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তখনকার কাগজপত্র দেখে মনে হয়, কেন্দ্রীয় সরকার বা জিন্নাহ যদি বলতেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ ও পাখতুন—তাতেও বাঙালিরা আপত্তি করতেন না। তাঁদের দাবি ছিল তাঁদের ভাষার অধিকার রক্ষিত হোক, ওপারের দুম্বা বা উটের তাঁরা গলা কাটবেন না লেজ কাটবেন, তা তাঁদের ব্যাপার।
বিপত্তি বাধালেন জিন্নাহ। খুবই বুদ্ধিমান মানুষ, কিন্তু নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিলেন। ওই গুজারাতী ও খোজা মুসলিম নেতার সুন্নি ও সুফিবাদী মুসলমানদের দেশ বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সে জন্য তাঁকে বিশেষ দোষও দেওয়া যায় না। তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় নেতা। গান্ধীজি ছাড়া সবার সঙ্গেই কথা বলতেন ইংরেজিতে। বাঙালি নেতারা বরং তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন উর্দুতে। তাতে তাঁর ধারণা হয়ে থাকবে যে পূর্ব বাংলার সবাই বাংলা-টাংলা কিছু একটা বললেও উর্দু বোঝে এবং বলতে পারে। তাঁর বাংলা সম্পর্কে ভুল ধারণা ও ঔদ্ধত্যের কারণে পরোক্ষভাবে বাঙালির উপকারই হয়েছে: জন্ম নেয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা।
জিন্নাহর একটি উদ্ধৃতি ভুলভাবে ব্যবহূত হচ্ছে বহুদিন ধরে। তা হলো তাঁর সেই কুখ্যাত উচ্চারণ: উর্দু অ্যান্ড উর্দু শ্যাল বি দ্য...। মূল ভাষণটি আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। তাঁর কথাটি ছিল এ রকম: ‘লেট মি টেল ইউ ইন দ্য ক্লিয়ারেস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ,... আলটিমেটলি ইট ইজ ফর ইউ, দ্য পিপল অব দিস প্রভিন্স, টু ডিসাইড হোয়াট শ্যাল বি দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব ইওর প্রভিন্স। বাট লেট মি মেক ইট ভেরি ক্লিয়ার টু ইউ দ্যাট দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান ইজ গোয়িং টু বি উর্দু অ্যান্ড নো আদার ল্যাঙ্গুয়েজ।’ কথাটার অর্থ অবশ্য একই দাঁড়ায়, তবে উদ্ধৃতি হিসেবে ভুল। তিনি বলেছিলেন: সুস্পষ্ট ভাষায় আমি তোমাদের বলছি,...শেষ পর্যন্ত সেটা তোমাদের বিষয়, এই প্রদেশের মানুষের বিষয় যে তোমাদের ভাষা কী হবে। কিন্তু আমি তোমাদের পরিষ্কার করে বলতে চাই যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অন্য কোনো ভাষা নয়। অর্থাৎ তিনি বলেছিলেন, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা যাবে না, বাংলা প্রাদেশিক ভাষা হয়ে থাকতে পারে।
এটি ছিল একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি। তাঁর আশপাশে যাঁরা থাকতেন তাঁদের জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল: মাননীয় কায়েদে আজম, আপনি যে বক্তৃতাটা করলেন সেটাও তো উর্দুতে করেননি, করেছেন ইংরেজিতে। আপনাকে উর্দুতে কখনো কিছু লেখালেখি করতে দেখিনি। তাহলে আগ বাড়িয়ে উর্দু উর্দু করছেন কেন?
জিন্নাহ যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিলেন, তাতে শেষ পর্যন্ত কোনো বড় রকমের অগ্নিকাণ্ড ঘটত না। কিন্তু তাতে ঘি ঢেলে দেন খাজা নাজিমউদ্দিন, যার ফলে সারা পূর্ব বাংলায় দাবানলের সৃষ্টি হয়। যদিও মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন থেকে লীগের সব নেতাই ছিলেন বাংলার পক্ষে। নূরুল আমীন ১৪ আগস্টের কয়েক সপ্তাহ আগেও কলকাতায় এক আলোচনা সভায় পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা বাংলা করার পক্ষে মত দিয়ে বক্তৃতা করেন।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন রক্তপাত পর্যন্ত গড়ায় কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর হঠকারিতার কারণে, কিন্তু তার দায়দায়িত্ব বর্তায় মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের সরকারের ওপর। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির আগেও পুলিশের গুলিতে এখানে শ্রমজীবী মানুষ নিহত হয়েছেন, কিন্তু সে মৃত্যু আর একুশের শাহাদত এক রকম নয়। একুশের জীবনদান পূর্ব বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের কাজটির সূচনা ঘটায়। শুধু সাংস্কৃতিকও নয়, বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার, তার গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে একুশের রক্তাক্ত ঘটনা।
বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য যে মহৎ কোনো কিছুরই সে সদ্ব্যবহার করতে পারে না। তা থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে গিয়ে জাতিগতভাবে পায় না বিশেষ কিছু। বাঙালির এক একটি উপলক্ষ এক একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দেয়। সেই উপসর্গের ধাক্কা চলে বহুদিন। সেই ধাক্কায় ঘটনাটিই বড় হয়ে ওঠে, তার ভেতরের আসল জিনিসটি হারিয়ে যায়। যদিও ঘটনা নয়, চেতনাই আসল।
বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি সাংস্কৃতিক কর্মীদের শুধু নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আবেগের সৃষ্টি করত, স্বাধীনতার পর থেকে তা হারিয়ে যায়। সারা দেশ থেকে একুশের সংকলন প্রকাশিত হতো। সেসব সংকলনের লেখায় বিচ্ছুরিত হতো জাতীয়তাবাদী চেতনা। বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের সড়ক তৈরিতে সেসব সংকলনের লেখা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা শুধু রাজনীতিকদের সৃষ্ট নয়, অগণিত অজানা সাংস্কৃতিক কর্মীর অবদান তাতে সবচেয়ে বেশি।
আমরা আজিমপুর শেখ সাহেব বাজার এলাকায় ছিলাম বলে দেখেছি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবগাম্ভীর্য। সেই পরিবেশ এখন বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তখন মানুষের বাহারি কাপড়চোপড় ছিল না। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকেই নেমে আসত সারা দেশে শোকের ছায়া—কৃত্রিম নয়, আসল শোক। পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকেই সারা দেশের অফিস ও দোকানপাটের সাইনবোর্ডের যেগুলো ইংরেজিতে লেখা তার ওপর হয় কাগজ সেঁটে দেওয়া হতো, নয়তো কাপড়ে বাংলায় লেখা হতো। সেটা করা হতো শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে।
বিশে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের পর থেকে নগর এক নতুন রূপ ধারণ করত। ফজরের আজানের সময় থেকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়সনির্বিশেষে নারী-পুরুষ খালি পায়ে যেত আজিমপুর শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে। কোনো শব্দ নেই, ধাক্কাধাক্কি নেই, পিঁপড়ার মতো লাইন ধরে সবাই যাচ্ছে আজিমপুর কবরস্থানে। সেখান থেকে শহীদ মিনারে। তখন ফুলের চাষ হতো না। শহরে ফুল বিক্রি হতো অল্প কয়েকটি জায়গায় এবং খুবই সামান্য। আমরা ফুল জোগাড় করতাম বড়লোকদের বাড়ির বাগান থেকে। সেদিন তাঁরাও উদারভাবে উদ্যান উন্মুক্ত করে দিতেন। যাঁরা শহীদ মিনার বা কবরস্থানে যেতেন না, তাঁরাও রাস্তায় বের হতেন খালি পায়ে—তা তিনি যত সম্ভ্রান্ত ও বিত্তবানই হোন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে খালি পায়ে হাঁটার যে সুখ, তা এখনকার মানুষদের বোঝানো সম্ভব নয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে সবার জামায় ও শাড়িতে এক টুকরা কালো কাপড় সাঁটা থাকত। আজ শহীদ মিনারে ভিড় হয় বেশি, গাম্ভীর্য কম।
আশির দশক থেকে এক নতুন উপসর্গ শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারি এলেই দৈনিকগুলোর এক কোনায় এক কলামে ‘আ-মরি বাংলা ভাষা’ বা ‘মোদের গরব মোদের আশা’ জাতীয় শিরোনামে একুশে ফেব্রুয়ারির বৃত্তান্ত বর্ণনা। সেই একই ব্যাপার। ঘটনাটিই প্রাধান্য পায়—চেতনা নয়। এর মধ্যে ‘ভাষাসৈনিক’ অভিধাটি উদ্ভাবিত হয়। শুরু হয় তাঁদের জনা কয়েকের স্মৃতিচারণা ও সাক্ষাৎকার। সেকালের কাগজপত্রে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত ভাষার জন্য যাঁরা সংগ্রাম করেছেন তাঁদের নাম রয়েছে। তাঁরা কেউ নন, সেকালের যাঁদের কাগজপত্রে নাম ছিল না, স্মৃতিচারণায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায় তাঁদের। আটটি বছর বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের জন্য যাঁরা নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, তাঁদের নাম আমরা ভুলে গেছি। এখনকার মানুষ দেখতে পাচ্ছে, বাংলা ভাষার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন মাত্র কয়েকজন।
অনেক লড়াই-সংগ্রামের পর পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা স্বীকৃতি পায়। সংবিধানের ২১৪(১) অনুচ্ছেদে লেখা হয়: ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা’। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খান যে সংবিধান প্রবর্তন করেন, তার ২১৫(১) অনুচ্ছেদে লেখা হয়: ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা ও উর্দু’; কিন্তু এই অনুচ্ছেদকে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধকরূপে কাজে লাগানো যাবে না, বিশেষত ইংরেজি-ভাষা পরিবর্তনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই ভাষা সরকারি ও অন্যান্য উদ্দেশ্য প্রতিপালনের জন্য ব্যবহূত হতে পারবে।’
আজ ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কৃতিত্ব নেওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। কিন্তু একটি বিষয় আমরা আড়াল করে রাখছি। বাংলাকে অন্যতর সরকারি ভাষা করার জন্য লেখক-বুদ্ধিজীবীরা লেখালেখি ও আলোচনা করছিলেন। তাঁদের সে ভূমিকার মূল্য রয়েছে। কিন্তু আলোচনার বিষয়কে একটি আন্দোলনের বিষয়ে পরিণত করেন শ্রমজীবীরা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যখন পোস্টাপিস প্রভৃতির বিভিন্ন কর্মে ইংরেজির সঙ্গে উর্দু লেখা হলো তখনই চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীরা বুঝতে পারেন উর্দু না জানলে তাঁদের চাকরি থাকবে না।
ঢাকার ইডেন বিল্ডিং বা প্রাদেশিক সচিবালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরাই প্রথম সরকারি কাগজে উর্দু ব্যবহারের প্রতিবাদ করেন এবং সূচনা ঘটান ভাষা আন্দোলনের। তাঁদের সেই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বাইরের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ। আন্দোলন একটি মিলিট্যান্ট রূপ নিতে থাকে। কেন বুদ্ধিজীবীরা নন, শ্রমজীবী ও ছাত্র-যুবসমাজ আন্দোলন শুরু করেন? কারণ বিষয়টি শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট। শুধু উর্দু সরকারি ভাষা হলে অল্প শিক্ষিত বাঙালিরা সরকারি চাকরি পাবেন না, সব চাকরি পাবেন উর্দুভাষী মোহাজেররা। একুশের শহীদদের শ্রেণীচরিত্র দেখলেই ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব।
ভাষা আন্দোলন জাতিকে উপহার দিয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা, যা থেকে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। কিন্তু ভাষা আন্দোলন যে বলিষ্ঠ জাতি গঠনের দীক্ষাও দিয়েছিল, সে দীক্ষার সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। আমরা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে রেখেছি ঘটনাকে। খুব বড় অনুষ্ঠানের মধ্যে ঘটা করে একুশকে উদ্যাপন করছি দেশের মধ্যে শুধু নয় দেশের বাইরেও, কিন্তু একুশের চেতনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ অতি কম। যদিও চেতনাই প্রধান।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

মত দ্বিমত- আস্থা কমে যাওয়া অশনিসংকেত by রাশেদা কে চৌধূরী

পিপিআরসি যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ। তবে কোনো গবেষণাই পূর্ণাঙ্গ না। কোনো একটি গবেষণা থেকে সব প্রশ্নের উত্তরও আশা করা যায় না। সব গবেষণার কিছু শক্তিশালী দিক থাকে, কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে।
এখানে সেই শক্তির দিক যেমন আছে, তেমনি কিছু দুর্বলতাও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এ ধরনের গবেষণাকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটা প্রয়াস হিসেবে দেখা যায়। মানুষ কী মনে করে সেই তথ্যগুলো আমাদের জানা দরকার; সেটা জানানো হয়েছে। এটা শুরু, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এ ধরনের কাজ আরও হবে।

এই গবেষণা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার অভাব জোরালোভাবে দেখা গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি নতুন প্রজন্মের অনীহা জন্মানো একটা অশনিসংকেত। আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্যভাবে জানি যে এতে সত্যের প্রতিফলন ঘটেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন বা নৈরাজ্য বন্ধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে মানুষের আস্থা ধাক্কা খাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের অবস্থা বিরাজ করে অনেকের ধারণা। কিন্তু এ রকম অবস্থা দীর্ঘকাল ধরে চলতে পারে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দায়বদ্ধ, গণমুখী ও স্বচ্ছ ভূমিকা পালন করলে যেকোনো কিছু করে পার পেয়ে যাওয়া বা পার করে দেওয়ার সংস্কৃতির অবসান হবে। এর জন্য যে অঙ্গীকার দরকার, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকেই আসতে হবে। আরেকটা বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, দেশের চেয়ে দল বড় হয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই তো শতকরা ৭০ ভাগের মতো মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয় রাজনীতি প্রবেশ করানো হয়েছে।
বিচারব্যবস্থা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যে রীতি ও ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে বেশি কিছু বলা যায় না। কিন্তু এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণের প্রয়োজন, তা এই গবেষণা থেকে উপলব্ধি করা যায়। র‌্যাবের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, তাকেও পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না। অনেক ঘটনার তো খবরই হয় না। মোট ঘটনার শতকরা ২০ ভাগ যেখানে খবর হয়, সেখানে সুশাসন নিশ্চিত করার দরকারে সম্পূর্ণ চিত্রটা জানতে ও জানাতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করায় এটা জরুরি। এই জবাবদিহি জনগণের কাছে, দলের কাছে না। তবে প্রতিবেদনে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ বিশেষ নেই।
জবাবদিহি নিশ্চিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকা দরকার ছিল। অথচ প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন নিজেই লুকোচুরি খেলছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী তথ্য জানার অধিকার আমাদের আছে। ইসি যখন সেই তথ্য দিচ্ছে না বা দিতে চাইছে না, তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজ করার ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে তথ্য অধিকার কমিশনেরও কোনো ভূমিকা আমরা দেখিনি। এ ব্যাপারে আরও আলোকপাত করা দরকার।
পুলিশের বিষয়ে ক্রমাগতভাবে মানুষের আস্থা কমছে। এটা নতুন না, প্রতিটা দশকে এই আস্থা কমছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে, সরকারের চাপের কারণে দায়িত্ব পালনে বাধা পায়, সেই বিষয়টা গবেষণায় অনুপস্থিত। তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্যও তারা যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। এর বাইরে ঢালাওভাবে দলীয় নিয়োগের ব্যাপার তো রয়েছেই। আমরা দেখেছি যে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে তারা দাগি আসামিকেও ছেড়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও দলীয়করণ গভীর হয়েছে। এসব বিষয় যখন জনগণের দৃষ্টির মধ্যে আসে, তখন তো তারা আস্থা হারাবেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকলাপ যেমন র‌্যাবের বিষয়ে, বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে আরও আলোকপাত করতে হবে। জনগণের
অর্থেই তারা প্রতিপালিত হয়। তাদের দোষ-ত্রুটির কথা যদি আরও আসত তাহলে জনগণও সচেতন হতো এবং র‌্যাব-পুলিশও হয়তো তাদের জবাবদিহির ঘাটতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পারত। এ কারণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণার কথা ভাবা যেতে পারে।
ছাত্ররাজনীতির মধ্যে যে কলঙ্ক আমরা দেখতে পাই, সেটা নিরসনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাণী শুনি, কিন্তু সমাধানের কোনো ভূমিকায় তাঁরা নেই। সন্ত্রাসীদের বহিষ্কার করা হলেও আইনি শাস্তি হতে দেখছি না। বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা কিছুদিন পরে আবার দলে ফিরে আসেন। ভবিষ্যতে যে নেতারা আসবেন, তাঁদের চরিত্র তো আমরা ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। এদিকেও আশা করার সুযোগ কম। সব ক্ষেত্রেই এমন হচ্ছে।
সুশীল সমাজের বিভিন্ন অংশ যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপের মধ্যে থাকে, সেটা উঠে না আসা এই গবেষণার আরেকটি সীমাবদ্ধতা। প্রত্যক্ষভাবে তো গণমাধ্যম বন্ধই করে দেওয়া হয়, পরোক্ষভাবে নানা রকম চাপের কারণে মিডিয়া যে জবাবদিহির চাপ তৈরি করবে, সেটাও করতে ব্যর্থ হয়।
এ ধরনের গবেষণা মানুষের ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা হয়। তারপরও এই প্রয়াসটা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের গবেষণা চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাশেদা কে চৌধূরী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

ছোট্ট দ্বীপ কুতুবদিয়া by মুস্তাফিজ মামুন

সূর্য তখনো ওঠেনি। আমাদের বাস পৌঁছে গেছে চকরিয়ার হারবাংয়ে। ২০ মিনিটের যাত্রাবিরতি। আমি আরো এক কিলোমিটার পরে বড়ইতলী মোড়ে নামব। চারদিকে ঘন কুয়াশা। পূর্বাকাশ আলো মেলতে শুরু করেছে ধীরে।

বড়ইতলা নেমে দেখি এক বেবিট্যাক্সিচালক পেছনের সিটে কাঁথা জড়িয়ে ঘুমাচ্ছেন। একটু বিরক্ত হলেও যেতে রাজি হলেন। তবে ঘুম ভাঙানোর জরিমানা হিসেবে ২০০ টাকার ভাড়া গুনতে হলো ২৫০ টাকা।

মগনামা ঘাটের জেটির ওপরেই নামাল। সামনের চ্যানেলটা পার হলেই কুতুবদিয়া দ্বীপ। উঠে পড়লাম ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। শিশিরে ভেজা নৌকার পাটাতনে পেপার বিছিয়ে বসে পড়লাম। বেশিক্ষণ বসে থাকতে হলো না। আরো কয়েকজন লোক এলে মাঝি বদর বদর করে নৌকা ছেড়ে দিলেন।
কুতুবদিয়া চ্যানেলটি বেশ প্রশস্ত। এই শীতেও সামান্য ঢেউ আছে। সময় লাগল ২০ মিনিট। ২১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট দ্বীপ কুতুবদিয়া। গুগল আর্থে দেখতে লাউ আকৃতির। ঝাউবনে ঘেরা সমুদ্রসৈকত আছে। বাড়তি পাওনা জেলে-জীবন, বাতিঘর, কুতুব আউলিয়ার মাজার, দেশের সবচেয়ে বড় বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি। বন্ধু আলীম অপেক্ষায় ছিল। দ্বীপেই ওর বাড়ি। মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছে। বাড়িতে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করল; কিন্তু আমি হোটেলেই থাকতে চাইলাম। 'সমুদ্রবিলাস' সাগরের দিকে মুখ করা। বারান্দায় বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখা যায়। হোটেলে ব্যাগ রেখেই ক্যামেরা নিয়ে চলে গেলাম সৈকতে।
সৈকতটি নির্জন আর পরিচ্ছন্ন। মাঝেমধ্যে শুধু জেলেদের শুঁটকি তৈরির ব্যস্ততা। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত এখানে। সৈকতের কোথাও কোথাও সবুজ দেয়াল তৈরি করেছে ঘন ঝাউবন। কোথাও দলে দলে সি-গাল। সমুদ্রসৈকতটি দ্বীপের পশ্চিম পাশ বরাবর। মধ্যখানে এর প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র বরঘোপ বাজার। দক্ষিণ দিকের জায়গাটির নাম দক্ষিণ ধুরং। এখানেই বাতিঘর। সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের নাবিকদের পথ দেখাতে বহুকাল আগে এখানে তৈরি করা হয়েছিল এই বাতিঘর। পুরনোটি ভাঙনে বিলীন হয়েছে। তবে এখনো ভাটার সময় ধ্বংসাবশেষ উঁকি মারে। নতুন একটি তৈরি হয়েছে অবশ্য। বাতিঘর দেখে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের পথ ধরলাম, দ্বীপের একেবারে উত্তরে, আলী আকবরের ডেল এলাকায়। প্রায় এক হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে এটি। কেন্দ্রের পাশেই বড় জায়গাজুড়ে কৃষকরা লবণ তৈরিতে ব্যস্ত। এর মধ্যে দুপুর গড়াতে চলেছে। থাকার নিমন্ত্রণ না রাখলেও আলীমের খাবার নিমন্ত্রণ ছাড়তে পারিনি। টাটকা সামুদ্রিক মাছের অনেক পদ ছিল সেদিন। ঢাকা পর্যন্ত সে স্বাদ নিয়ে আসতে পেরেছিলাম।
কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন
কুতুবদিয়া যেতে হলে চড়তে হবে কক্সবাজারগামী বাসে। ঢাকা থেকে এস আলম, সৌদিয়া, শ্যামলী বা ইউনিক পরিবহনের বাসে ভাড়া ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা। বড়ইতলী থেকে বেবিট্যাক্সি মেগনামা ঘাট যেতে জনপ্রতি ভাড়া ৩৫ টাকা। কুতুবদিয়া চ্যানেল পার হতে হবে ইঞ্জিন নৌকায়, ভাড়া ২০ টাকা। কুতুবদিয়া ট্রলার ঘাট থেকে বড়ঘোপ বাজারে রিকশা ভাড়া ২৫ টাকা।
থাকার জন্য আছে হোটেল সমুদ্রবিলাস। দুজনের একটি নন-এসি কক্ষের ভাড়া ৮০০ টাকা, তিনজনেরটি ১০০০ টাকা। যোগাযোগ : ০১৮১৯৬৪৭৩৫৫, ০১৭২২০৮৬৮৪৭

কুতুবদিয়া সরকারি বালিকা স্কুল নামেই শুধু সরকারি!

অবহেলিত দ্বীপের একমাত্র সরকারি স্কুল কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালে এবং জাতীয়করণ হয় ১৯৮৫ সালে। বর্তমানে  ১২টি শিক্ষকের পদের মধ্যে ৫টি পদ এবং অফিস সহকারিসহ ৬ জন কর্মচারীর মধ্যে ৩টি পদ খালি রয়েছে। শিক্ষকদের জন্য নেই কোন আবাসিক ভবন।
ক্লাসও চলছে পরিত্যক্ত দু’টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে। এছাড়াও ৩৫০ জন ছাত্রীর যথাযথ শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতে প্রধান শিক্ষক, সহকারি প্রধান শিক্ষক, ইংরেজী, সমাজ বিজ্ঞান, গণিত ও অফিস সহকারীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো খালি হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। এত সংকটেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আজিজুল হকের অক্লান্ত পরিশ্রমে শতভাগ পাশের ধারা অব্যাহত রেখেছে শিক্ষার্থীরা। ।

বেশ কিছুদিন আগে নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে পর পর ৪ জন শিক্ষক বিএড কোর্সে চলে গেছেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে। ঠিক একইভাবে এখন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালককে ম্যানেজ করে দুজন শিক্ষকের বদলির অর্ডার করানো হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সুপারিশ ছাড়াই বদলির আবেদন করা হয়েছিল বলে সম্ভাব্য বদলী হওয়া একজন শিক্ষক নিজেই স্বীকার করেছেন। শিক্ষক সংকটে অবশিষ্টদের বদলির খবরে একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারের সুনজর না থাকায় অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগে শিক্ষার্থীদের জীবন ধ্বংসের পথে বলে অভিভাবকদের অভিযোগ। শিক্ষক না থাকায় ক্লাসের ফাঁকে স্কুলটির একাধিক ছাত্রী জানায়, শিক্ষক না থাকায় প্রতিদিন মাত্র ৪টি ক্লাস হয়। এদিকে সদ্যসমাপ্ত এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুলের ৫৩ জন পরীক্ষার্থীর ফল আশানুরূপ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন অভিভাবক ও সচেতনমহল।

সমূদ্র বেষ্টিত কুতুবদিয়া দ্বীপ হতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র by এম. শাহজাহান চৌধুরী শাহীন

পরিকল্পিত উন্নয়নে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপ একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। কুতুব আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত প্রকৃতির অপরূপ লীলাক্ষেত্র সমূদ্র বেষ্টিত সম্ভবানাময় এই দ্বীপ।
এখানে রয়েছে লবণ শিল্প, মৎস্য ভান্ডার, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গ্যাস ক্ষেত্র ও দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে এখান থেকে প্রতিবছর সরকারের প্রচুর অর্থ প্রাপ্তি ঘটতে পারে।প্রকৃতিগতভাবে কুতুবদিয়া দ্বীপটি সম্পূর্ণ সমূদ্র পরিবেষ্টিত। পশ্চিম উপকূল ঘেষে রয়েছে প্রায় ২২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বালির আঁড়িযুক্ত অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত সমুদ্র সৈকত। দৃষ্টিনন্দন সারি সারি ঝাউবীথি দেখলেই মনটা ভরে উঠে।উপজেলা সদর হতে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণেই আলী আকবর ডেইল এলাকার সমুদ্র সৈকতে রয়েছে দেশের সর্বপ্রথম বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্প। উপজেলা সদর হতে ৫ কিলোমিটার উত্তরে দক্ষিণ ধুরংয়ের আলী ফকির ডেইলের সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন বিখ্যাত বাতিঘর। এখানে সমূদ্র সৈকত হতে অন্তত ৩ কিলোমিটার পূর্বে কুতুব আউলিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি হযরত শাহ আবদুল মালেক আল কুতুবী (র.)-এর মাজার শরীফ, যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য ভক্তের আসা যাওয়া রয়েছে। উপজেলা সদরের ৩ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব চ্যানেল সংলগ্ন বিশাল লবণ উৎপাদন প্রদর্শনী খামার, যেখানে লবণ উৎপাদন মৌসুমে প্রতিদিন দেশী-বিদেশী ইতিহাসবিদ, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ ও সাংবাদিক লবণ উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখতে আসেন। উপজেলা সদর হতে ৭ কিলোমিটার উত্তরে উত্তর ধুরংয় রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন কালামার মসজিদ। এই মসজিদে প্রতিদিন অসংখ্য মুসল্লির যাওয়া আসা হয়।সবমিলিয়ে বলা যেতেই পারে, কর্মব্যস্ততার ফাঁকে মনকে সতেজ ও সমৃদ্ধ করতে কয়েকদিনের জন্য সৌন্দর্য্যরে রানী কুতুবদিয়ায় ভ্রমণে গেলে নিঃসন্দেহে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যাবে।কুতুবদিয়ায় হোটেল মোটেল না থাকলেও জেলা পরিষদের একটি ডাকবাংলো এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এখানে কম খরচে থাকা খাওয়ার ও চলাফেরার যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা রয়েছে।রাজনৈতিক হানাহানি, ডাকাতি ও ছিনতাইমুক্ত কুতুবদিয়ায় আসলে কোন ভোগান্তির শিকার হতে হয়না। বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে গাড়িযোগে সোজা পেকুয়ার মগনামা ঘাটে গিয়ে কুতুবদিয়া চ্যানেল পার হয়ে স্পিড বোটে ৫/৭ মিনিট এবং ডেনিশ বোটে ২০/৩০মিনিটের মধ্যে কুতুবদিয়ায় পৌঁছা যায়।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে দিক দিয়ে কুতুবদিয়া কোন অংশেই সেন্ট মার্টিনের চেয়ে কম নয়। সেন্ট মার্টিন একটি মাত্র ইউনিয়ন। অপরদিকে কুতুবদিয়া একটি উপজেলা এবং আয়তনে অনেক বড়; কিন্তু এই সম্ভাবনাময় দ্বীপের পর্যটন শিল্পের বিকাশে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিচ্ছেনা কোন সরকার। এটাই এলাকাবাসীর দ্বীপবাসীর দু:খ। এ দুঃখের দ্রুত অবসান হোক-দ্বীপবাসী তাই আশা করেন।

মত দ্বিমত- ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়াই মুখ্য by ইফতেখারুজ্জামান

সুশাসন নিয়ে গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) পক্ষ থেকে যে গবেষণার কাজটি হয়েছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথার্থ চিত্রই উঠে এসেছে এই গবেষণা প্রতিবেদনে।
সুশাসন বলতে স্বাভাবিকভাবে আমরা বুঝি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা, যেখানে সব শ্রেণীর নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকবে এবং তাদের স্বার্থের বিষয়টির প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে সুশাসনের ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকেই যাবে। ফলে যে চিত্র প্রকাশ পেয়েছে তা নতুন নয়, ধারাবাহিকভাবেই এ অবস্থা চলে আসছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে আমরা যে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তার কাঠামোগুলো কিন্তু রয়েছে। যেমন সংসদ, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন বা দুদক—এগুলো সবই আছে। এগুলোকে আমরা হার্ডওয়্যার হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। এই হার্ডওয়্যারগুলো আমাদের রয়েছে কিন্তু এর চর্চা বা এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। সমস্যাটি সেখানেই।
গবেষণা প্রতিবেদনে আইনের শাসন নিয়ে আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি। তবে সেখানে বিশ্লেষণ নেই। জনগণ বলছে, তাদের আস্থা কমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের ওপর। আবার র‌্যাবের ওপর বেড়েছে। এটা এক অশনিসংকেত। আমরা বুঝতে পারছি যে পুলিশ ও বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার কারণ তারা এদের মাধ্যমে কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না। আইন লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি দেওয়ার কাজটি র‌্যাবের কাছ থেকে পাচ্ছে। এটা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম আস্থাহীনতারই প্রমাণ দিচ্ছে। সুশাসনের জন্য এটা খুবই উদ্বেগজনক তথ্য। কারণ, যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিচার-প্রক্রিয়া লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত কাজের অভিযোগ রয়েছে, তার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ছে! এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা যাকে বলি ‘ট্রিগার হ্যাপিনেস’ তা আরও বাড়াতে পারে। এতে প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন দিন দিন আরও আস্থাহীন হয়ে পড়বে, তেমনি মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। আইনের শাসনের জন্য এটা খুবই উদ্বেগজনক।
শুধু এই গবেষণা নয়, আমরা বিভিন্ন গবেষণায় দেখে আসছি যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একজন সাংসদ যদি কোনো অপরাধীকে ছাড়িয়ে নিতে অনশন করেন, নারায়ণগঞ্জের এক সাংসদ যদি জনগণকে কর না দেওয়ার আহ্বান জানান বা চিফ হুইপ যদি ক্রেস্টের বদলে ক্যাশ দাবি করেন, তবে রাজনীতিবিদদের প্রতি খুব স্বাভাবিকভাবেই জনগণের আস্থা কমতে থাকবে। পত্রিকায় দেখলাম চার সাংসদ একই সঙ্গে মেয়র পদ ধরে রেখেছেন। এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষমতার প্রতি তাঁদের মোহের বিষয়টি চরমভাবে প্রকাশ পায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহতভাবে চলতে থাকায় রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে।
সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় ও কার্যকর থাকা জরুরি, সেগুলো তাদের কর্মক্ষমতা হারিয়েছে ও হারাচ্ছে দলীয়করণের কারণে। রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের স্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান পেশাদারি হারাচ্ছে এবং নিজেদের মতো কাজ করতে পারছে না। এর ফলাফল হিসেবে অন্যায় ও অপকর্ম করে পার পাওয়া সহজ হচ্ছে, অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে না, সাধারণ মানুষ বিচার পাচ্ছে না। একটা বিচারহীনতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে সমাজে অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
এই যে একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এর কেন্দ্রে রয়েছে রাজনীতির মধ্যে নিজের সুবিধা, নিজের দলের সুবিধা ও নিজের মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। রাজনীতির সবকিছুই এখন আবর্তিত হচ্ছে নিজের সুবিধা ও স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে। এই পরিস্থিতি সুশাসন সহায়ক না হয়ে সুশাসন প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে এই অবস্থাকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার বিষয়টি। জনগণ এ ধরনের পরিস্থিতিকে যেন মেনে নিতে শুরু করেছে বা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক যে জনগণ, এই বিষয়টি যেন তারা ভুলতে বসেছে।
সুশাসনের মৌলিক ইস্যুগুলো দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচ্য বিষয় নয়। ক্ষমতায় থাকা, ধরে রাখা বা যেকোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়াই রাজনীতির মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজের মধ্যেও একধরনের নিস্পৃহতা ও হতাশা বিরাজ করছে। দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে কেউ কোনো ইস্যু তুলে ধরলেই তাকে দলীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমালোচক যে শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে, সে বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনায় নেই।
আসল কথা হচ্ছে, যত দিন ক্ষমতা ও রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্তিগত সুবিধা ও মুনাফা অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহূত হবে এবং বিচারহীনতার মাধ্যমে আইনের শাসন পদদলিত হবে, তত দিন সুশাসন মরীচিকা হয়েই থাকবে।

ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

মত দ্বিমত- ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়াই মুখ্য by ইফতেখারুজ্জামান

সুশাসন নিয়ে গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) পক্ষ থেকে যে গবেষণার কাজটি হয়েছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথার্থ চিত্রই উঠে এসেছে এই গবেষণা প্রতিবেদনে।

মত দ্বিমত- আস্থা কমে যাওয়া অশনিসংকেত by রাশেদা কে চৌধূরী

পিপিআরসি যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ। তবে কোনো গবেষণাই পূর্ণাঙ্গ না। কোনো একটি গবেষণা থেকে সব প্রশ্নের উত্তরও আশা করা যায় না। সব গবেষণার কিছু শক্তিশালী দিক থাকে, কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে।

‘ভেবেছিলাম আর বাঁচব না’ -অপহূত স্বর্ণ ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরী

‘হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। পড়ে গেলাম ধানখেতের কাদাপানিতে। মনে হচ্ছিল, আমাকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরে দেখি সামনে রাস্তা, গাড়ি চলছে। এরপর উঠে দাঁড়াই।’

চট্টগ্রাম থেকে অপহূত স্বর্ণ ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরী এভাবেই বলতে শুরু করেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে আসার কাহিনি। ছয় দিন নিখোঁজ থাকার পর গতকাল ভোরে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কংস নগর এলাকায় তাঁকে ফেলে দিয়ে যায় অপহরণকারীরা। এরপর এক নৈশপ্রহরী তাঁকে বুড়িচং থানার দেবপুর পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যান।
মৃদুলের ছয় দিন কেটেছে বিভীষিকাময়। প্রতিদিনই মনে করতেন, হয়তো এক দিনের জন্য বেঁচে গেলেন। নিজের মুখে বললেন, ‘ভেবেছিলাম আর বাঁচব না। কিন্তু ভগবান আমাকে বাঁচিয়ে এনেছেন।’ ফাঁড়ির বেঞ্চে বসা মৃদুল চৌধুরীর শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। তবু সে ব্যথায় কাতর নন তিনি। বারবার চোখ মুছছিলেন। বলছিলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলেটার এসএসসি পরীক্ষা চলছে। এর মধ্যেও সে পরীক্ষা দিচ্ছে। জানি না কেমন হচ্ছে। পরিবারের সবাই আমাকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছে।’
কী হয়েছিল সেদিন? প্রশ্ন করতেই মৃদুল চৌধুরী একটু দম নিলেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘১১ ফেব্রুয়ারি সকালবেলা, সাড়ে ১০টা হবে। বাসা থেকে (চট্টগ্রামের পুরোনো টেলিগ্রাফ রোড) দোকানে যাচ্ছি। একটি মাইক্রোবাস এসে কিছু লোক নামল। এরপর ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে আমাকে কালো রঙের একটি গাড়িতে তোলে। ওরা আমাকে ধমক দিল, যেন চিৎকার না করি। আধঘণ্টা পর আরেকটি গাড়িতে তুলে মুখোশ পরিয়ে দেয়। আমাকে তুলে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলাম। ওরা বলে, কোনো ধরনের শব্দ করবি না। আমাকে নিয়ে রাখে একটি কক্ষে, মুখোশ পরিয়ে। হাত-পা বাঁধা। শুধু খাবার ও বাথরুমে যাওয়ার সময় মুখোশ ও বাঁধন খুলে দেয়। দু-তিন দিন এভাবে চলল। এরপর একজন লোক এসে আমাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। আমার দুই পা, কোমর ও সারা শরীরে পেটায়, আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। একেক দিন আমাকে একেক স্থানে নিয়ে যায়। কিন্তু স্থানগুলো সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। কাল রাতে (রোববার) আমাকে একটি গাড়িতে তোলা হয়। মুখোশের নিচের অংশ ফাঁকা থাকায় দেখতে পেলাম, এটি একটি মিটসুবিসি ব্র্যান্ডের কালো জিপ। আমি পেছনের সিটে, দুই পাশে দুজন লোক বসা। সামনের সিটে আরও দুজন। অনেকক্ষণ আসার পর পাশে থাকা দুজন পরস্পরকে বলে, সামনে পুলিশের গাড়ি আছে। নামিয়ে দে। তখনো আমার মুখোশ পরা ছিল। হাত বাঁধা। ওরা আমার মুখে কী একটা লাগিয়ে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। ধানি জমির কাদাপানিতে পড়ি। বৃষ্টি পড়ছে। মনে করেছি, গুলি করে মেরে ফেলবে। এ সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরে দেখি, রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। তখন ধানখেত থেকে উঠে দাঁড়াই। সামনে এগিয়ে আসেন একটি লোক। নাম-পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, তিনি কংস নগর বাজারের নৈশপ্রহরী, নাম হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া। এটা কংস নগর বাজার পশ্চিমছিং এলাকা। আমি তাঁকে ঘটনা খুলে বলি। কিন্তু তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করছিলেন না। তাঁর মোবাইল ফোন থেকে আমার স্ত্রীকে ফোন করি। স্ত্রীর সঙ্গে কথা শুনে তিনি আমাকে কংস নগর বাজার পর্যন্ত নিয়ে আসেন। এরপর পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসেন।’
ওরা কোনো টাকাপয়সা চেয়েছিল? মৃদুল চৌধুরী বলেন, ‘না, কিছুই বলেনি। আমি জীবনে কারও ক্ষতি করিনি। রাজনীতি করি না। যারা আমাকে তুলে নিয়েছে, নির্যাতন করেছে, তাদের কাছে আমার অপরাধের বিষয়ে জানতে চেয়েছি। তারা কিছুই বলতে পারেনি।’
র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করায় আপনাকে অপহরণ করা হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্ন করা হলে নিরুত্তর থাকেন এই ব্যবসায়ী।
মৃদুল চৌধুরীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসা নৈশপ্রহরী বুড়িচং উপজেলার ভারেল্লা ইউনিয়নের পশ্চিমছিং গ্রামের হারুনুর রশিদ বলেন, ‘কাদা মাখা লোকটিকে উদ্ধার করে পুলিশকে খবর দিই। পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।’
দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) দেবাশীষ দত্ত জানান, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কংস নগর বাজার থেকে মৃদুল চৌধুরীকে উদ্ধার করেন দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। গতকাল বেলা ১১টা পর্যন্ত তিনি দেবপুর পুলিশ ফাঁড়িতে অবস্থান করছিলেন। এখানেই তাঁর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর প্রতিবেদকের। এ সময় চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. কামরুজ্জামান ও স্বজনদের কাছে মৃদুল চৌধুরীকে হস্তান্তর করা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মৃদুল চৌধুরীর ছোট ভাই শিমুল চৌধুরী ও পিশতুতো ভাই টিটু বণিক এবং চট্টগ্রাম মহানগর কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের পুলিশ দল দেবপুর পুলিশ ফাঁড়িতে পৌঁছান। সেখান থেকে পুলিশি পাহারায় মৃদুল চৌধুরীকে চট্টগ্রামে নেওয়া হয়।
সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে পৌঁছেই মৃদুল চৌধুরীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় স্ত্রীসহ স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁরা অপহরণ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান।
কিন্তু কারা এবং কেন তাঁকে অপহরণ করে ছয় দিন আটকে রাখল, এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। পুলিশ কমিশনারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালেই প্রায় দুই ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।
মৃদুলের ভাই শিমুল চৌধুরী বলেন, ‘ভাইকে খুঁজে পেয়েছি, এটাই বড় পাওয়া।’
১১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম শহরের পুরোনো টেলিগ্রাফ রোডের বাসা থেকে দোকানে যাওয়ার সময় র‌্যাব ও ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মৃদুল চৌধুরীকে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। এর পর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এ ঘটনায় শিমুল চৌধুরী ওই দিন রাতে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে অপহরণ মামলা করেন। অপহরণের সঙ্গে র‌্যাব-পুলিশ জড়িত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে র‌্যাব ও পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

মামলার এক আসামি নিখোঁজ: অপহূত হওয়ার আগে স্বর্ণ ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরী ৮০ ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে র‌্যাব-২-এর মেজর রকিবুল আমীনসহ তিনজনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন। এই মামলার অপর দুই আসামি হলেন র‌্যাবের সোর্স ফাহাদ চৌধুরী ওরফে দীপু এবং মৃদুলের কর্মচারী বাবুল দাস। স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে গত বছরের ৩ অক্টোবর ঢাকায়।
এদিকে এই ফাহাদ চৌধুরীকে তাঁর পরিবার খুঁজে পাচ্ছে না। তাঁর ভাই মো. কামরুজ্জামান ১৬ জানুয়ারি রাজধানীর মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৯৯৬) করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, ফাহাদ চৌধুরী একজন পাথর ব্যবসায়ী। তিনি ব্যবসার কাজে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থান করেন। গত ১৫ জানুয়ারি বেলা ১১টা থেকে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর গাড়িচালক জাহাঙ্গীর জানিয়েছেন, কমলাপুর ভাঙা মসজিদের সামনে থেকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা তাঁকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।

‘ভেবেছিলাম আর বাঁচব না’ -অপহূত স্বর্ণ ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরী

‘হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। পড়ে গেলাম ধানখেতের কাদাপানিতে। মনে হচ্ছিল, আমাকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরে দেখি সামনে রাস্তা, গাড়ি চলছে। এরপর উঠে দাঁড়াই।’

নগর দর্পণ: চট্টগ্রাম- আওয়ামী লীগের মেজবান ও র‌্যাবের নতুন গল্প by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

লালদীঘির ময়দানে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন, সন্ত্রাস-সহিংসতা-সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাতকানিয়া অভিমুখে লংমার্চ করবে আওয়ামী লীগ।
শুনে মনে হয়েছিল, এটা নেহাত পলিটিক্যাল স্টান্ট। কিন্তু সত্যি যেদিন (৮ ফেব্রুয়ারি) তাঁর নেতৃত্বে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে সাতকানিয়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করল কয়েক শ গাড়ির বহর, সেদিন একধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটিয়েছে চট্টগ্রামের মানুষ। যদিও দক্ষিণ জেলা জামায়াতের নেতারা পত্রিকান্তরে বলেছেন, ‘লংমার্চে যাঁরা আসবেন, তাঁরা আমাদের মেহমান। আমরা তাঁদের স্বাগত জানাব। এ ছাড়া আমাদের কোনো কর্মসূচি নেই।’

কিন্তু সাধারণ মানুষ এতে আশ্বস্ত হতে পারেনি। কারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষিত হওয়ার দিন থেকে শুরু হয়ে গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে সাতকানিয়ায় যে ধরনের সন্ত্রাস-সহিংসতা ঘটেছে, তা নজিরবিহীন। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় তাণ্ডব শুরু হয়। ওই সময় থেকে এযাবৎ এই অঞ্চলে খুনই হয়েছে নয়জন। এ ছাড়া সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা-লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, শত শত গাছ কেটে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক অবরোধ, বিদেশি পর্যটকের ওপর হামলা, পুলিশ-বিজিবির ক্যাম্প ঘেরাও করে বোমা নিক্ষেপসহ হেন কোনো দুষ্কর্ম নেই, যা এখানে সংঘটিত হয়নি। এমনকি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর যৌথ বাহিনীর অভিযানে সাতক্ষীরা, সীতাকুণ্ডের মতো গোলযোগপ্রবণ এলাকাগুলো অনেকটা শান্ত হয়ে এলেও সাতকানিয়ার জামায়াত কর্মীরা ছিলেন সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক। সুতরাং দক্ষিণ জেলা জামায়াতের নেতারা যতই আশ্বাসবাণী প্রচার করুন যে লংমার্চের যাত্রীরা তাঁদের মেহমান, তাঁদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত তাঁরা, তাতে আশ্বস্ত হতে পারেনি এ অঞ্চলের মানুষ। বরং ‘স্বাগত’ জানানোর ধরনটি কী রকম হতে পারে, এ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান হয়নি তখনো।
যা-ই হোক, মহিউদ্দিন চৌধুরীর লংমার্চের ঘোষণা যে জনমনে শঙ্কার সৃষ্টি করেছিল, তার বাস্তব ভিত্তি নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। অবশেষে যাবতীয় শঙ্কার অবসান ঘটেছে ৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন নগর থেকে যাত্রা শুরু করে লংমার্চ পটিয়া ও দোহাজারীতে দুটি পথসভা করে সাতকানিয়ার কেরানীহাটে নির্ধারিত জনসভাস্থলে গিয়ে পৌঁছে বিকেলে। সেখানে নির্বিঘ্নে জনসভা সম্পন্ন করে লংমার্চ নগরে ফিরে আসে রাতে।
‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এই লংমার্চ মূলত আওয়ামী লীগেরই একটি কর্মসূচি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এই লংমার্চ থেকে কী পেল আওয়ামী লীগ?
সুদূরপ্রসারী লাভ-ক্ষতির হিসাবে না গিয়েও এ কথা বলা যায়, এই লংমার্চ দলীয় নেতা-কর্মীদের চাঙা করেছে। সর্বোপরি সাতকানিয়াকে জামায়াতের দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে যে মিথ প্রচারিত ছিল, সেই মিথকেও ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
কেরানীহাটের জনসভায় মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা শান্তির বাণী নিয়ে এসেছি।’ তিনি জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘সাতকানিয়াবাসী বেশির ভাগই ব্যবসায়ী। আপনারাও ব্যবসা করেন, লেখাপড়া করেন। কিন্তু সহিংসতা, নারী নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ থেকে বিরত থাকুন।’ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে যাঁরা চেনেন, তাঁরা জানেন, এই সহজ বক্তব্যের মধ্যে একধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি আছে। সাতকানিয়া জামায়াত-শিবির কর্মীরা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা নন, তাঁদেরও ব্যবসা-বাণিজ্য, লেখাপড়ার জন্য অন্যত্র যেতে হয়, এ কথাটি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি প্রকারান্তরে সহিংসতার দায়ে অন্যত্র তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, এমন বার্তাও দিয়ে রেখেছেন বলে মনে করেন মহিউদ্দিনের ঘনিষ্ঠজনেরা।
আপাতত শান্তিপূর্ণভাবে লংমার্চ শেষ করতে পেরে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা উদ্দীপ্ত। সেই উদ্দীপনাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্যই কি না জানি না, সাতকানিয়া-লোহাগাড়াবাসীর জন্য এবার মেজবানের আয়োজন করেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ২৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরের জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে এই মেজবান অনুষ্ঠিত হবে। সাংসদ ও শিল্পী মমতাজ এ অনুষ্ঠানে গান গাইতে আসবেন বলেও জানা গেছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার মানুষের সঙ্গে একটা দিন আমরা অন্যভাবে কাটাতে চাই। আমরা সাতকানিয়ার মানুষকে আস্থায় নিতে চাই, উদ্বুদ্ধ করতে চাই। যেন সহিংসতাকে সবাই রুখে দাঁড়ায়।’
চট্টগ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী আপ্যায়নের প্রথা ‘মেজবান’। সহিংসতার বিরুদ্ধে এই ঐতিহ্যের ধারা কতটা কার্যকর হয়ে ওঠে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
র‌্যাবের নতুন গল্প
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও মানবাধিকারকর্মীরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে যতই সোচ্চার হোন না কেন, সাধারণ মানুষের মনে এ নিয়ে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। একসময় ‘ক্রসফায়ার’ ও সাম্প্রতিককালে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শিরোনামে যে গল্পগুলো র‌্যাব-পুলিশের বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে, তার অধিকাংশই যে বানানো, এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই দেশবাসীর। তবে ‘সন্ত্রাসী দমনে’র এই পদ্ধতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির হয়তো উন্নতি হচ্ছে, এমন একটি আপাতস্বস্তিকর ধারণা থেকে ক্রিকেটের পরিভাষায় যাকে বলে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ তা-ই পেয়ে আসছে র‌্যাব-পুলিশ। কিন্তু পুরো বিষয়টা যে ক্রমেই বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
র‌্যাব বন্দুকযুদ্ধের একই গল্প পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে, এমন অভিযোগ উঠেছে সংবাদমাধ্যমগুলোয়। সেই বিষয়টা বিবেচনায় নিয়ে কি না জানি না, চট্টগ্রামে সম্প্রতি নতুন একটি গল্পের অবতারণা করেছে তারা।
১১ ফেব্রুয়ারি সকালে অফিসে যাওয়ার পথে মৃদুল চৌধুরী নামের একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে র‌্যাবের সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবারের লোকজন। পরিবারের অভিযোগ, র‌্যাবের বিরুদ্ধে একটি মামলা করার কারণেই এই পরিণতি হয়েছে তাঁর।
অপহূত মৃদুলের ভাই জানান, গত বছরের ৩ অক্টোবর র‌্যাব-২-এর মেজর রকিবুল আমিন এই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৮০ ভরি স্বর্ণ কেড়ে নেন। এ ঘটনায় মৃদুল চৌধুরী ঢাকার মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালতে মামলা করেন রকিবুল আমিন, র‌্যাবের সোর্স ফাহাদ চৌধুরী ও গাড়িচালক বাবুল পালের বিরুদ্ধে।
মেজর রকিবুল আমিন যথারীতি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং মৃদুল চৌধুরীকে তিনি চেনেন না বলেও জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে বিপুল চোরাই তেল উদ্ধার করেছে র‌্যাব। সেই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মেজর রকিবুল আমিন। এর পর থেকেই একটি চক্র তাঁর পেছনে লেগে আছে। সোনা কেড়ে নেওয়া ও ব্যবসায়ী অপহরণের ঘটনাটি সাজানো বলে তিনি জানান।
গল্পটি নতুন। এখন অপহরণের ঘটনাটি ‘সাজানো’ নাকি র‌্যাবের গল্পটি ‘বানানো’—এটি প্রমাণের দায় র‌্যাব বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বর্তায় না?
অপহূত হওয়ার ছয় দিন পর গতকাল সোমবার ভোরে কুমিল্লার কংসনগর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরীকে। জীবন ফিরে পেয়েছেন তিনি; তবে স্বর্ণ ফিরে পাবেন কি না, জানি না। এ ব্যাপারটি এখানেই শেষ হলে প্রকৃত রহস্যের জট কিন্তু খুলবে না।


বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

নগর দর্পণ: চট্টগ্রাম- আওয়ামী লীগের মেজবান ও র‌্যাবের নতুন গল্প by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

লালদীঘির ময়দানে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন, সন্ত্রাস-সহিংসতা-সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাতকানিয়া অভিমুখে লংমার্চ করবে আওয়ামী লীগ।

কে এই কাবুল by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

লন্ডন থেকে জাহাজে করে মিতসুবিশি শোগান ব্র্যান্ডের রুপালি রঙের দু’টি এবং কালো রঙের একটি পাজেরো এসে নামে ভারতের মুম্বইয়ের জওয়াহরলাল নেহরু সমুদ্র বন্দরে।
এমডি৫১ সিসিএন, এক্স৮৭৫ ওএভি এবং এলভি৫২ জেডআরও নাম্বারের গাড়ি তিনটি সেখান থেকে গ্রহণ করেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশী কাবুল মিয়া। ভারতের মাল্টিপল ভিসাধারী কাবুল মিয়া গাড়ি পৌঁছার আগেই ২৩শে সেপ্টেম্বর পৌঁছে গিয়েছিলেন। দামে দরে বনিবনা হওয়ায় সম্ভবত প্রথম গাড়িটি (রুপালি রঙের) ভারতেই বিক্রি হয়ে যায়। দুই সহযোগী আসকার উদ্দিন এবং আমতর আলীকে সঙ্গে করে বাকি দু’টি গাড়ি নিয়ে কাবুল মিয়া বাংলাদেশের পথে রওনা হন। প্রবেশপথ হিসেবে পছন্দ করেন সিলেটের বিয়ানীবাজারের শেওলা (সুতারকান্দি) ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। গাড়ি নিয়ে নির্বিঘ্নে চেকপোস্ট পেরোনোর ব্যবস্থা আগে থেকেই করা ছিল। কাবুল মিয়া, আসকার উদ্দিন ও আমতর আলী গাড়ি নিয়ে  ঢোকার আগে তিন দিন ওই সীমান্তে মহড়া দিয়েছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। ৩০শে অক্টোবর বিকালে বাংলাদেশে প্রবেশের প্রথম প্রচেষ্টা চালান তারা। ভারতীয় ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসে সব কাজ সম্পন্নের পরও সবুজ সঙ্কেত না পেয়ে ফিরে যান। পরদিন ৩১শে অক্টোবর সকালে ভারতের করিমগঞ্জের নোয়াগাঁয় ইমিগ্রেশন শেষে শেওলা চেকপোস্টের কাছে আসতেই কাবুল মিয়া বুঝতে পারেন এ দিনও ঠিক ছিল না সাজানো ছক। ফিরে যাওয়ারও উপায় নেই। দায়িত্বরতদের ফাঁকি দিয়ে তল্লাশি চৌকির প্রবেশ ফটকের বাঁশের খুঁটির ডান পাশের ফাঁকা জায়গা দিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়েন গাড়ি দু’টি নিয়ে। রওনা হন অজানা গন্তব্যে। তবে সিলেট নগরীতেই যে গন্তব্য ছিল তা জানা যায় রাতে গাড়ি উদ্ধারের পর। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিলেট নগরীর উপ-শহর ও কুমারপাড়া থেকে উদ্ধার করা হয় গাড়ি দু’টো। তবে মানবজমিন-এর অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা। একটি সূত্র বলছে, গাড়ি দু’টো পুলিশের জিম্মায় এসেছিল দিনেই। সূত্রটি এও নিশ্চিত করে আসকার উদ্দিনের ভাই একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের তত্ত্বাবধানেই গাড়িগুলোর সন্ধান পায় পুলিশ। রহস্যজনকভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের পর গাড়ি দু’টোর পাশাপাশি এর ভেতরে কি থাকতে পারে এ নিয়েও নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। এমনকি গাড়িতে করে ৬৫ লাখ পাউন্ড (প্রায় সাড়ে ৮২ কোটি টাকা) মূল্যের সোনা এসেছে এমন খবরও প্রচারিত হয়। পাশাপাশি গাড়িতে জাল পাউন্ড ছিল জানা গিয়েছিল। তবে পুলিশ বলছে এমন খবরের সত্যতা তারা খুঁজে পাননি।
চল্লিশ বছর বয়সী কাবুল মিয়ার গাড়ি নিয়ে বাংলাদেশের প্রবেশের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি গাড়ি নিয়ে একাধিকবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন বলে দুই পাজেরা আটকের পর পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে আগের দফাগুলোতে ছক ঠিকঠাক থাকায় সফলতারই দেখা পেয়েছিলেন। আগের সফলতায় উজ্জীবিত হয়ে এ দফা সঙ্গী করেন আরও দু’জনকে। যুক্তরাজ্য প্রবাসী রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী মো. কাবুল মিয়া ওরফে মো. কাবুল সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার নিহালের নোয়াগাঁও গ্রামের আবদুল বারী কলাইয়ের ছেলে। বৃটিশ পাসপোর্টধারী (নং পি ৪৫৪৭৯৩৩৫৬) কাবুল মিয়ার বাসা সিলেট নগরীর উপ-শহরে। এফ-ব্লকের ৩ নম্বর রোডের ৭৭ নম্বর বাসাটি তার। একটি সূত্রমতে, কাবুল মিয়ার আরও একটি পাসপোর্ট আছে আবদুর রব ড্যানি নামে। তার সঙ্গী আসকার উদ্দিন বিয়ানীবাজার উপজেলার আঙ্গুরা গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে। বৃটিশ পাসপোর্টে (নং পি ৫০৮৮৯৮৫৫৮) তার নাম আসকার উদ্দিন হলেও কবির আলী এবং আজগর আলী নামেও তিনি নিকটজনদের কাছে পরিচিত। অপর সঙ্গী বৃটিশ পাসপোর্টধারী (নং ৬৫২৪৯১৪৮৭) আমতর আলী ওরফে আনোয়ার বালাগঞ্জের ওসমানীনগর থানার ঘোষগাঁওয়ের মৃত মজম্মিল আলীর ছেলে। তারও একাধিক নাম রয়েছে তবে বেশি পরিচিতি চান্দু ওরফে বাট্টি চান্দু নামেই।
তারা চোরাকারবারী দলের সদস্য এবং এর আগেও এভাবে বিভিন্ন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে দামি গাড়ি প্রবেশ করিয়েছেন- তদন্তে এর প্রমাণ পেয়েছে বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করে পুলিশ।
বৃটেনের রয়েল অটোমোবাইল ক্লাবের সদস্য হিসেবে কাবুল মিয়া ও তার সঙ্গীরা গাড়িগুলো ‘কারনেট দ্য প্যাসেজের’ আওতায় নিয়ে আসেন। ‘দ্য কাস্টমস কনভেনশন অন দ্য টেম্পোরারি ইমপোর্টেশন অব প্রাইভেট ভেহিক্যালস অ্যান্ড কমার্শিয়াল রোড ভেহিক্যালস’ নামে একটি আন্তর্জাতিক আইন আছে, যা ‘কারনেট দ্য প্যাসেজ’ নামেই সারা বিশ্বে পরিচিত। এ সুবিধার আওতায় ফিরে যাওয়ার সময় নিয়ে যাবেন এমন শর্তে কোন পর্যটক ইচ্ছা করলে তার নিজের গাড়িটি নিয়ে বিনা শুল্কে যে কোন দেশে প্রবেশ করার আইনগত অধিকার রাখেন। কারনেটের মাধ্যমে নিয়ে আসার কারণে ভারত থেকে বের করে নিয়ে আসতে কোন সমস্যা ছিল না। সমস্যা কেবল বাংলাদেশে গাড়ি নিয়ে প্রবেশে। কারনেটের গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক পরিশোধ করতে না হলেও ফিরিয়ে নেয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে প্রযোজ্য শুল্ক (গাড়ির মূল্যের ৪০০ শতাংশ) জামানত দিতে হয়। কারনেটের অপব্যবহারের কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ শর্ত আরোপ করেছিল। শুল্ক ফাঁকি দিতেই আগে থেকে ছক তৈরি করে রেখেছিলেন কাবুল মিয়া।

কারনেট সংক্রান্ত জাতিসংঘের কোন সনদে স্বাক্ষর না করলেও বাংলাদেশও এতদিন ধরে এ সুবিধা দিয়ে আসছিল। ২০০৯ সাল থেকে বাড়তে থাকে কারনেট সুবিধার অপব্যবহার। ওই বছর কারনেট সুবিধায় আসা ১৩টি গাড়ির মধ্যে ৫টিই ফেরত যায়নি। পরের বছর এ হার আরও বাড়ে। ৪৯টি গাড়ির মাত্র ৪টি শুধু ফেরত যায়। কারনেটের গাড়ি ফেরত না যাওয়ার প্রথা ভয়াবহ রূপ নেয় ২০১১ সালে। ওই বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৬৬টি গাড়ি এলেও তার একটি গাড়িও ফেরত যায়নি। কারনেটের অপব্যবহার বেপরোয়া গতিতে বাড়তে থাকায় ২০১১ সালে প্রযোজ্য শুল্ক কর (গাড়ির মূল্যের ৪০০ শতাংশ) গ্যারান্টি হিসেবে রাখার নিয়ম করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। তবুও লাগাম টানতে না পেরে শেষমেশ ২০১৩ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ এ সুবিধাটি বাতিল করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৩ সাল পর্যন্ত কারনেট সুবিধায় ৩১৫টি গাড়ি বাংলাদেশে এসেছে যার ১১৮টিই ফেরত যায়নি। আরও ৭০টি গাড়ি খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে বন্দরে। মানবজমিন-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেরত না যাওয়া গাড়ি যাদের নামে এসেছে তাদের বেশির ভাগই সিলেটের বাসিন্দা।

কে এই কাবুল by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

লন্ডন থেকে জাহাজে করে মিতসুবিশি শোগান ব্র্যান্ডের রুপালি রঙের দু’টি এবং কালো রঙের একটি পাজেরো এসে নামে ভারতের মুম্বইয়ের জওয়াহরলাল নেহরু সমুদ্র বন্দরে।

ইথিওপিয়ার বিমান ছিনতাই, জেনেভায় অবতরণ

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিমানবন্দরে ইথিওপিয়ার ছিনতাই
হওয়া উড়োজাহাজের যাত্রীদের নামিয়ে আনছেন পুলিশ
সদস্যরা। এ সময় যাত্রীরা দুই হাত ওপরে তুলে
উড়োজাহাজ থেকে নেমে আসেন। এএফপি
ইতালির রোমগামী ইথিওপিয়ার যাত্রীবাহী একটি উড়োজাহাজ ছিনতাই হয়েছে। পরে গতকাল সোমবার জেনেভা বিমানবন্দরে ওই উড়োজাহাজ অবতরণে বাধ্য করেছে সুইজারল্যান্ডের পুলিশ। এ ঘটনায় উড়োজাহাজের সহকারী পাইলটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ড পুলিশের মুখপাত্র ক্রিস্টোফি ফোর্টিস জানান, ইথিওপিয়া সরকারের উড়োজাহাজ সংস্থা ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ইটি-৭০২ ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে ইতালির রোমে যাচ্ছিল। পথে উড়োজাহাজটি ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে।
সুইস পুলিশ জেনেভার স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ছয়টায় সেই উড়োজাহাজ অবতরণে বাধ্য করে। ছিনতাইকারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আরও জানান, ছিনতাই হওয়া উড়োজাহাজ অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জেনেভা বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রবার্ট ডিলন জানান, সহকারী পাইলট উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টার কথা স্বীকার করেছেন। মূল পাইলট শৌচাগারে গেলে সহকারী পাইলট বাইরে থেকে শৌচাগার বন্ধ করে দেন। পরে তিনি উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। সুইজারল্যান্ডে ‘রাজনৈতিক আশ্রয় পেতেই’ বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন বলে দাবি করেন সহকারী পাইলট। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, উড়োজাহাজের সব যাত্রী সুস্থ ও নিরাপদে আছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, বোয়িং ৭৬৭ উড়োজাহাজটি স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১২টায় রোমের উদ্দেশে রওয়ানা হয়। ভোর সাড়ে চারটায় এটি রোমে পৌঁছানোর কথা ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, জেনেভায় উড়োজাহাজটি অবতরণ করিয়ে রানওয়ের একপ্রান্তে নেওয়া হয়। পুলিশ এর চারদিকে ঘিরে ফেলে। বিভিন্ন জরুরি বিভাগের কর্মীরা গাড়ি নিয়ে উড়োজাহাজের আশপাশে অবস্থান নেন। কিছুক্ষণ পর যাত্রীদের বেরিয়ে আসতে বলা হয়। যাত্রীরা দুই হাত তুলে একে একে উড়োজাহাজ থেকে বেরিয়ে আসেন। ট্রিবিউন দ্য জেনেভা পত্রিকার খবরে বলা হয়, সুদানের আকাশসীমা পেরিয়ে যাওয়ার সময় উড়োজাহাজটি ছিনতাই করা হয়। ছিনতাইয়ের কারণ জানা যায়নি। জেনেভা বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটে জানানো হয়, গতকাল সকালে বিমানবন্দর থেকে যেসব ফ্লাইট ছাড়ার কথা ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। আর যেসব ফ্লাইট বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা ছিল, তা অন্য বিমানবন্দরে অবতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এএফপি ও রয়টার্স।

চিদাম্বরমকে জুতা মারার পুরস্কার!

জারনাইল সিং
ভারতের অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমকে লক্ষ করে ২০০৯ সালে জুতা ছুড়ে মেরেছিলেন জারনাইল সিং। তাঁকেই আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছে আলোচিত রাজনৈতিক দল আম আদমি পার্টি (এএপি)। আগামী এপ্রিল বা মে মাসে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য গত রোববার ২০ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এএপি। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে দলটি গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে ২৮টি আসনে জয়ী হয়ে কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন করে।
মাত্র ৪৯ দিন পর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল পদত্যাগ করেন। দিল্লিতে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি এবং মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে বলে গতকাল সোমবার লে. গভর্নর নাজিব জংয়ের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে এএপি বড় সাফল্যের আশা করছে। এএপির প্রার্থী হিসেবে জারনাইল সিং ওয়েস্ট দিল্লির একটি আসন থেকে নির্বাচনে লড়বেন। তিনি ২০০৯ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে জুতা নিক্ষেপ করে আলোচিত হন। তখন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন জারনাইল। জারনাইল জানান, ১৯৮৪ সালে শিখবিরোধী দাঙ্গায় কংগ্রেস নেতাদের ভূমিকা নিয়ে চিদাম্বরমের মন্তব্য মেনে নিতে পারেননি তিনি। তাই তিনি ‘প্রতীকী প্রতিবাদ’ হিসেবে জুতা ছুড়েছিলেন, চিদাম্বরমকে আঘাত করেননি। জারনাইল আরও বলেন, তিনি গত বছরের মে মাস থেকে এএপির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তিনি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ইতিমধ্যে শিখবিরোধী দাঙ্গার ওপর তিনটি বই লিখেছেন। নির্বাচনে তিনি দিল্লির পশ্চিমাঞ্চলে শিখ সম্প্রদায় অধ্যুষিত এলাকায় জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবেন। পিটিআই ও জি নিউজ।

তরুণ তেজপালের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র

তরুণ তেজপাল
এক নারী সহকর্মীকে ধর্ষণের ঘটনায় ভারতের তেহেলকা সাময়িকীর সাবেক সম্পাদক তরুণ তেজপালের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও নারীর শালীনতার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের অভিযোগও আনা হয়। গতকাল সোমবার সরকারি কৌঁসুলিরা দুই হাজার ৭০০ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র গোয়া মুখ্য বিচারিক হাকিম অনুজা প্রভুদেসাইয়ের আদালতে দাখিল করেন।
অভিযোগপত্র দাখিলের আগে ভুক্তভোগী ওই নারী সংবাদকর্মীসহ অন্তত ১৫২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ওই নারী সাংবাদিক বয়েসে তরুণ। তেজপালকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করতেন তিনি। সেই তেজপালই কিনা তাঁকে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি করেন। এর মাধ্যমে নারীর সম্ভ্রমের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন তিনি। গত বছরের ৩০ নভেম্বর থেকে কারাগারে আছেন তেজপাল। ওই নারী সাংবাদিক তেজপালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, নভেম্বরে সাময়িকীর পক্ষ থেকে গোয়ায় আয়োজিত অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে তিনি ধর্ষণের শিকার হন। বিবিসি।

সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে ইতালি?

মাত্তিও রেনজি
ইতালির প্রেসিডেন্ট গিওর্গিও নাপোলিতানো গতকাল সোমবার বামপন্থী ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান মাত্তিও রেনজিকে (৩৯) সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। আর রেনজিই যদি সরকার গঠন করেন, তাহলে ইতালির ইতিহাসে কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তিনি। তবে এ জন্য আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। রেনজির দল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা এনরিকো লেত্তা গত শুক্রবার প্রধামন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়েন। লেত্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ,
তিনি প্রতিশ্রুতিমতো সংস্কারকাজ করতে পারেননি। তাঁর পদত্যাগের পেছনে এই রেনজিই কলকাঠি নেড়েছেন বলে ধারণা করা হয়। লেত্তার পদত্যাগের দুই দিন পর প্রেসিডেন্ট নাপোলিতানো সরকার গঠনের আহ্বান জানালেন রেনজিকে। ৩৯ বছর বয়সী রেনজি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে তিনিই হবেন ইতালির সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তিনি বর্তমানে ফ্লোরেন্সের মেয়র। তবে কেন্দ্রীয় সরকারে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই তাঁর। এমনকি পার্লামেন্ট সদস্যও হননি কখনো। বিনিয়োগকারীরা তাঁকে অভিনন্দন জানালেও ইতালির অনেক মানুষ তাঁর সরকার চালানোর সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান। রেনজির আগে ইতালির সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন বেনিতো মুসোলিনি। তিনি ১৯২২ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর বয়স ছিল বর্তমান রেনজির চেয়ে দুই মাস বেশি। রেনজির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
পূর্বসূরি লেত্তার মতো রেনজিকেও জোট সরকার গঠন করতে হবে। তবে লেত্তাকে সমর্থন দেওয়া নিউ সেন্টার রাইট পার্টি রেনজিকেও সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছে। এর আগে গতকাল সকালে প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে যান রেনজি। তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক ঘণ্টার বেশি সময় আলোচনা করে বেরিয়ে আসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা দলীয় নেতা মারিয়া ইলেনা সাংবাদিকদের বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে নতুন সরকার গঠন করা হবে। ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে নির্বাচিত সিনেটর রবোর্তো কোসিয়ানিস বলেন, সরকার গঠনে অনেকেরই সমর্থন পাবেন রেনজি। সরকার গঠনের পর ব্যবসায়ীদের সমর্থনও পাবেন। বিবিসি ও এএফপি।

মৃদুল চৌধুরীর জবানিতে- চোখবাঁধা ৬ দিনের রোমহর্ষক বর্ণনা by মহিউদ্দীন জুয়েল

‘ওদের টার্গেট ছিল আমাকে খুন করা। খুন করার পর লাশ লুকাতে চেয়েছিল। অপহরণের পর তাদের কথাবার্তায় তাই শোনা গেছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম আমার অপরাধ কি? তারা শুধু বলেছে, তুই চুপ থাক, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা কর।’
কথাগুলো বলছিলেন অপহরণের ৬ দিন পর উদ্ধার হওয়া চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরী। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে বাসার সামনে থেকে অপহরণ করে নিয়ে গেলেও তার বা পরিবারের কাছে কোন মুক্তিপণ দাবি করেনি। বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে। সর্বশেষ গতকাল ভোর রাতে কুমিল্লায় সড়কের পাশে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। তাকে নিয়ে দুর্বৃত্তরা ঘোরাঘুরি করলেও তাদের কাউকেই চিনতে পারেননি মৃদুল। কুমিল্লা থেকে উদ্ধারের পর গতকাল চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলেন মৃদুল  চৌধুরী। ঘটনার বর্ণনা দেন নিজের জবানিতে। বলেন, ‘আমার দিন কিভাবে কেটেছে তা বলতে পারবো না। আমি বেঁচে আছি। তারা আমাকে বেধড়ক পিটিয়েছে। ছোরা দিয়ে আঘাত করেছে। ওই ঘটনা আর মনে করতে চাই না। দুঃসহ দিন গেছে আমার। যেদিন বাসা থেকে বের হই সেদিন রাস্তার ওপর ওরা ঘাপটি মেরে বসেছিল। ওরা মানে সন্ত্রাসীরা। যাদেরকে কেবল একবার দেখেছি। এরপর আর কিছু মনে নেই। মাইক্রোবাসে মুখোশ পরিয়ে দিলে সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায় আমার। যারা আমাকে তুলে নিয়ে গেছে তাদেরকে আমি চিনতে পারিনি। সত্যি চিনি না। কেন অপহরণ করেছে তা-ও জানি না। যে গাড়িতে নিয়ে গেছে তার রঙ ছিলো কালো। বাইরে থেকে কিছুই দেখা যায় না। ঘটনার দিন ৩-৪ জন লোক আমার গতি রোধ করে। এরপর পিস্তল ঠেকিয়ে জোর করে গাড়িতে ওঠায়। বলে না উঠলে গুলি করবে। আমি ভয়ে উঠে পড়ি। মাইক্রোতে তুলেই ওরা মোটা কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলে। বলে, কথা বললেই গুলি করে রাস্তায় ফেলে দেবো। চিৎকার করিস না। যদি তা করিস তাহলে মরণ ডেকে আনবি। আমি শুধু বলেছি, তোমরা কারা? তারা বলেছে, আমরা কারা বুঝতে পারবি পায়ে গুলি করার পর। আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সন্ত্রাসীরা কোথায় রাখবে তা নিয়ে ঝামেলায় পড়ে যায়। এই সময় তারা কয়েকজন ফোনে কথা বলতে থাকে। মোবাইলের ওপর প্রান্ত থেকে কেউ একজন তাদেরকে নির্দেশ দেয় দুই দিন চট্টগ্রাম শহরে রাখতে। সেই মোতাবেক ওরা আমাকে বেশ কয়েকটি বাড়িতে নিয়ে যেতে টানাহেঁচড়া করে। প্রথম দিন রাতে দেখলাম আমার হাত-পা বাঁধা। মুখোশ খুলে দিলে দেখি একটি বিশাল বাড়ি। চেয়ারের ওপর বসে আছি। চারপাশে আবছা অন্ধকার। কিছুই দেখছিলাম না। কিছু শুকনো খাবার একটি থালাতে রাখা হয়েছে। আমার পেছন থেকে একজন লোক মাথায় জোরে থাপ্পড় দিয়ে বলে, এগুলো খেয়ে নে। এরপর পিস্তলের বাঁট দিয়ে জোরে আঘাত করা হয় পেছনের দিকে। আমাকে ওরা লোহার রড দিয়ে শুইয়ে খুব পিটিয়েছে। আমি চিৎকার করছিলাম। আকুতি জানাচ্ছিলাম। ওদের একজন আমার হাউমাউ শুনে বললো, মাইরটা ভালই হচ্ছে। আরও পিটা। যেন পঙ্গু হয়ে যায়।’ নির্যাতনের চিত্র দেখাতে গিয়ে এ সময় মৃদুল তার পরনের কাপড়ের খানিক অংশ উপরে উঠিয়ে দুই পা মেলে ধরেন। তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘এই যে দেখুন লোহার রডের আঘাত। দুই উরুতে ধারালো ছুরি দিয়ে পোঁচ দিয়েছে। আমি মাইরের সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। একদিন জ্ঞান ফেরার পর দেখি তারা বলছে ওকে মেরে ফেলে দেয়ার নির্দেশ আসছে ওপর থেকে। আমি বললাম, ভাই কি জন্য আমাকে ধরেছেন? বাসায় সবাই টেনশনে আছে। আমাকে ছেড়ে দিন। জবাবে তারা বললো, বাসায় গিয়ে কাজ নেই। সোনা বিক্রি করে অনেক টাকা কামিয়েছিস। এইবার দুনিয়া ছেড়ে চলে যা। বলেই আবার মাইক্রোতে ওঠায়।’ কুমিল্লা থেকে উদ্ধার হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যার সময় ওরা আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। আবার মুখোশ পরিয়ে দেয়। শব্দ করতে যাতে না পারি সে জন্য মুখে কাপড় গুঁজে দেয়। গাড়ি যখন চলছিল তখন আমার শরীরে কোন শক্তি নেই। আওয়াজ বের হচ্ছিল না। একজন ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে বললো গাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম দিয়ে সোজা ঢুকবে।’ রাস্তায় ফেলে দেয়ার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘গভীর রাতের দিকে একজন বলে ওঠে টহল পুলিশ রাস্তায় বেরিয়েছে। যদি গাড়ি তল্লাশি করে তাহলে ধরা পড়ে যেতে পারি। এই কথা শুনে ড্রাইভার বললো, ভাই ওকে গুলি করে ফেলে দেন। ঝটপট এই রাস্তা দিয়ে চলে যাই। আরেকজন বললো, গুলি করলে বেশি দূর যেতে পারবো না। তার চেয়ে বিপদ ডেকে লাভ নেই। মুখে ওষুধ লাগিয়ে দে। তারা আমাকে চোখে মলম লাগিয়ে দেয়। এরপর গামছা দিয়ে বেঁধে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। আমি কিছুই মনে করতে পারি না। ভোররাতের দিকে হুঁশ ফিরে আসে। তখন এক লোক আমাকে বলে, কি হয়েছে? আমি কথা বলতে পারছিলাম না। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। পরে জানতে পারি ওই ব্যক্তি নৈশপ্রহরী। ’
তিনি বলেন, কেন তারা আমাকে অপহরণ করলো, কি তাদের উদ্দেশ্য ছিল কিছুই বলেনি। কোন ধরনের টাকাও দাবি করেনি। তবে ওদের টার্গেট ছিল আমাকে খুন করা। এই কথা তারা বারবারই বলেছে।’ 
মৃদুল চৌধুরী অপহরণ হওয়ার পর তাকে কুমিল্লা থেকে নিয়ে এসে বিকাল ৫টায় নগরীর বেসরকারি হাসপাতাল রয়েলে ভর্তি করানো হয়। এই সময় তার পরিবারের লোকজনকে বিমর্ষ দেখা যায়। কথা বলতে চাইলে ছোট ভাই শিমুল চৌধুরী বলেন, আমরা আতংকে আছি। সন্ত্রাসীরা মৃদুলের কোন বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেনি। তারা আবার আসবে। এইবার হয়তো বড় ধরনের কোন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা দেবে কে? চট্টগ্রাম নগর পুলিশ জানায়, গত ১১ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বাসা থেকে অপহরণ হন মৃদুল চৌধুরী। বাসা থেকে বের হলে র‌্যাব পরিচয়ে একটি দল তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আর কোন খোঁজ মেলেনি এই ব্যবসায়ীর। ঘটনার পরপরই অপহৃতের ছোট ভাই অজ্ঞাত কয়েক জনকে আসামি করে  কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, র‌্যাবের সঙ্গে পূর্বশত্রুতার জের ধরেই মৃদুল চৌধুরীকে অপহরণ করা হয়েছে। মৃদুল নগরীর নিউ মার্কেটের দুলহান জুয়েলার্স নামের একটি স্বর্ণের  দোকানের মালিক। গত বছরের অক্টোবরে র‌্যাবের বিরুদ্ধে একটি প্রতারণা মামলা করেছিলেন। আর ওই ঘটনার জের ধরেই তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। অপহৃতের ভাই শিমুল চৌধুরী এই বিষয়ে বলেন, আমাদের বাড়ি হাটহাজারীর মিরেরখিল এলাকায়। কিছুদিন আগে ভাই মৃদুল ঢাকার সিএমএম কোর্টে ৮০ ভরি স্বর্ণ লুটের ঘটনায় র‌্যাব ২-এর মেজর রাকিবুল আমিনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিলেন। বাকি দুই অভিযুক্ত হচ্ছেন র‌্যাবের সোর্স ফাহাদ চৌধুরী টিপু ও গাড়িচালক বাবুল পাল। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কথা হয় নগরীর কোতোয়ালি থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন  সেলিমের সঙ্গে। তিনি মামলা দায়েরের বিষয়টি সত্যি বলে জানান। এই বিষয়ে বলেন, প্রথম দিকে একটি জিডি করা হয়েছিল। পরে তা মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি অপরাধীদের শনাক্ত করতে।

মৃদুল চৌধুরীর জবানিতে- চোখবাঁধা ৬ দিনের রোমহর্ষক বর্ণনা by মহিউদ্দীন জুয়েল

‘ওদের টার্গেট ছিল আমাকে খুন করা। খুন করার পর লাশ লুকাতে চেয়েছিল। অপহরণের পর তাদের কথাবার্তায় তাই শোনা গেছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম আমার অপরাধ কি? তারা শুধু বলেছে, তুই চুপ থাক, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা কর।’

কলকাতার চিঠি- নন্দীগ্রামে মমতার অস্বস্তি by অমর সাহা

এমনটা ভাবেননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এভাবে ধাক্কা দেবে তাঁকে নন্দীগ্রাম। বড় বিশ্বাস ছিল তাঁর নন্দীগ্রাম নিয়ে। এই নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরের আশীর্বাদ নিয়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি।
সেই নন্দীগ্রামের আশীর্বাদ এখন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। দেখা দিয়েছে অভিশাপরূপে। অথচ এই নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুর মমতাকে ক্ষমতায় আসার পথ দেখিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছে। সেদিনের সেই নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন এবার অন্য এক পথের ঠিকানা দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই এই নন্দীগ্রামের আন্দোলন নিয়ে যে অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করেছে গত মাসে, তা এককথায় উল্টে দিয়েছে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি এবং মমতার অভিযোগকে। ফলে, এই নিয়ে ফের রাজনৈতিক হোঁচট খেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই আন্দোলনের জেরে সেদিন ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল ৩৪ বছর ধরে একটানা শাসনক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্টকে। আর রাজ্যসিংহাসনে বসিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ‘অগ্নিকন্যা’ মমতাকে।

সেদিন সেই জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনের জেরে রক্তাক্ত হয়েছিল সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম। সিঙ্গুরে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল ওই আন্দোলনের অন্যতম কর্মী তাপসী মালিককে। আর নন্দীগ্রামে সেই ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ আন্দোলনের দিনে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছিল ১৪ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। এই আন্দোলনকে অস্ত্র করে সেদিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মমতা। আন্দোলনে উত্তাল করে তুলেছিলেন গোটা পশ্চিমবঙ্গকে। বন্্ধ্, হরতাল আর মিছিল-মিটিংয়ে জেরবার হয়েছিল গোটা রাজ্য।
দেশজুড়ে ধিক্কার উঠেছিল। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই ঘটনার প্রতিবাদে মাঠে নেমেছিল। মমতাও সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে একটানা ২৬ দিন অনশনও করেছিলেন। সেদিন রাজ্যসরকার নন্দীগ্রামের গুলিবর্ষণের ঘটনা সিআইডি দিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে রাজ্যজুড়ে। দাবি ওঠে, এই তদন্ত করাতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই দিয়ে। এই দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও হয়। হাইকোর্ট অবশেষে নন্দীগ্রামের ঘটনা সিবিআইকে দিয়ে তদন্ত করানোর নির্দেশ দেন।
মূলত, পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে একটি রসায়ন শিল্পাঞ্চল গড়ার জন্য তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একইভাবে আন্দোলন চলে হুগলি জেলার সিঙ্গুরে সেই ২০০৭ সালে। সেখানে ভারতের টাটা কোম্পানিকে সস্তায় একটি মোটরগাড়ি কারখানা গড়ার জন্য ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে তা তুলে দেওয়া হয় টাটার হাতে। মমতা দাবি তোলেন, ৪০০ একর জমির মালিক টাটাকে জমি দিতে রাজি নয়। মমতাও ঘোষণা দেন, ক্ষমতায় এলে তিনি অনিচ্ছুক কৃষকদের সেই ৪০০ একর জমি ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার আড়াই বছর কেটে গেলেও সেই জমি ফিরিয়ে দিতে পারেননি মমতা এখনো। চলছে সুপ্রিম কোর্টে মামলা।
এদিকে নন্দীগ্রামেও ২০০৭ সালে ২৫ হাজার একর জমি নিয়ে একটি বৃহৎ রসায়ন শিল্পাঞ্চল গড়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদ্যোগ নিলেও আপত্তি তোলেন মমতা। যদিও শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার নন্দীগ্রামে কোনো জমি অধিগ্রহণ করেনি। তবু নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ সিদ্ধান্তকে সামনে এনে নন্দীগ্রামে মমতা শুরু করেন আন্দোলন। এই নন্দীগ্রামে আন্দোলনের জেরে ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ পুলিশের গুলিবর্ষণে ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
এরপর এই ঘটনা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন কলকাতা হাইকোর্ট। সিবিআই দীর্ঘদিন পর ওই ঘটনার চার্জশিট দেয় গত মাসে। সেই চার্জশিটে বলা হয়েছে, ১৪ মার্চ কোনো গোপন অপারেশন হয়নি। পুলিশ তিন মাস ধরে অবরুদ্ধ নন্দীগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য নন্দীগ্রামে যায়। সেখানেই পুলিশ বাধাগ্রস্ত হয় মমতাদের গড়া নন্দীগ্রামের ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের দ্বারা।
পুলিশ ওই এলাকায় ঢুকতে গেলে প্রতিরোধ কমিটির অন্তত পাঁচ হাজার সদস্য প্রথমে আক্রমণ করে পুলিশের ওপর। এরপর পুলিশ লাঠিপেটা, টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেও পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে না পেরে অগত্যা শূন্যে গুলি ছোড়ে। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। এতে আটজন গ্রামবাসী নিহত হয়। বাকিরা নিহত হন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। চার্জশিটে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয় তাঁদের অধিকাংশই তৃণমূলের নেতা-কর্মী ।
এই চার্জশিটের কথা প্রচারিত হওয়ার ফলে কার্যত রাজনৈতিকভাবে ধাক্কা খায় শাসক তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও মমতা অভিযোগ করে আসছিলেন, ওই ঘটনায় বহু গ্রামবাসীর প্রাণহানি হয়েছিল পুলিশের গুলিতে। তাদের লাশ পাচার করা হয়েছিল নৌকায় করে। বহু গ্রামবাসী নিখোঁজ হয়েছিল। কিন্তু সিবিআই এই অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়নি। সিবিআই ওই দিনের ঘটনাকে কোনো গোপন অপারেশনের সঙ্গে তুলনা না করে বরং চার্জশিটে বলেছে, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বারবার মাইকে গ্রামবাসীকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানালেও তাতে গ্রামবাসী সাড়া দেয়নি। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ।
এই চার্জশিটের কথা প্রচারিত হওয়ার পর চরম অস্বস্তিতে পড়েন মমতা এবং তাঁর দল তৃণমূল। আর বিরোধীদলীয় নেতা সূর্যকান্ত মিশ্র চার্জশিট প্রদানের সুবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেই দিয়েছেন, নন্দীগ্রাম নিয়ে মিথ্যা প্রচার ও অপপ্রচার চালিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস। সিবিআইয়ের চার্জশিটে তারই প্রমাণ ফুটে উঠেছে। ফলে এই চার্জশিট দেওয়ার ঘটনায় ভারতের লোকসভা নির্বচনের আগে এক রাজনৈতিক ধাক্কা খেলেন মমতা এবং তাঁর দল। আগামী এপ্রিল-মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

ফখরুলের উদ্দেশে হানিফ- ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না

আল-কায়েদা নেতা জাওয়াহিরির অডিও বার্তার সঙ্গে বিএনপিসহ যাঁদের সম্পর্ক পাওয়া যাবে, তাদের বিচার হবে বলে হুঁশিয়ার করলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

‘যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করেত আওয়ামী লীগ আল-কায়েদার সঙ্গে বিএনপিকে জড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছে’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে হানিফ বলেন, ‘আপনার কথা শুনে মনে হয় ‘‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’’। অস্বীকার করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। জঙ্গিদের রাষ্ট্রীয় মদদ দিয়েছেন এটা প্রমাণিত। আপনার দল যখন ক্ষমতায় ছিল তখন আপনার দলের বড় নেতা দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে দুবাইয়ে বৈঠক করেছেন। মুফতি ইজহারুলকে আপনারাই প্রশ্রয় দিয়েছেন। গ্রেনেড হামলা হয়েছে। তাই শুধু জঙ্গিদের বিচার করা হবে না, এর সঙ্গে যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের বিচার করা হবে।’

সাংসদ মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘কয়েক দিন আগে বিএনপির নেতারা যেভাবে লাদেনের মতো ভিডিওবার্তা পাঠিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে উত্সাহিত করতেন; ঠিক সেভাবে আয়মান আল জাওয়াহিরি একটি অডিও বার্তা দিয়েছেন। এর সত্য-মিথ্যা এখনো অনুসন্ধান করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, এ কথা ভাবার অবকাশ নেই যে বাংলাদেশে আল-কায়েদার নেটওয়ার্ক নেই। মুফতি ইজহারুল আফগানিস্তান থেকে ফিরে এসে লিখলেন ‘ঘুরে এলাম স্বপ্নের আফগানিস্তান’। সুতরাং তাঁদের মতো অনেকেই এ দেশে থাকতে পারে।


হানিফের দাবি, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তিনবার জাওয়াহিরি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে তিনি জানান। তিনি দাবি করেন, ‘শুধু জামায়াতই জঙ্গিবাদের মদদ দেয়নি; বিএনপিও পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। বিএনপির সঙ্গে সন্ত্রাসের যোগসূত্র নতুন নয়। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্যই তাদের এই জঙ্গি কানেকশন। তবে আল-কায়েদা ও লস্কর-ই-তৈয়বা যে হুমকি দিক না কেন, বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের চারণভূমি হতে দেওয়া হবে না। জঙ্গিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলা হবে।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইতিহাস সংরক্ষণ প্রকল্প আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১৩ জনকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য বদরুল আলম স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্য নাজু, সাহসিকতার জন্য ঝর্ণা বেগম, তাজুল ইসলাম, কিশোর বেলাল, সেবায় জয়নাল আবেদিন, ভাষাসৈনিক আফজালুন্নেসা, ডা. শরফুদ্দিন আহমেদ, ডা. সাঈদ হায়দার, ড. আহমদ রফিক, বিশেষ কৃতিত্বের জন্য ডা. চৌধুরী হাফিজুল আহসান, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, রাফিদ আহমেদ ও জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়।
বিশিষ্ট চিকিত্সক মির্জা মাজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি, ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী।

ফখরুলের উদ্দেশে হানিফ- ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না

আল-কায়েদা নেতা জাওয়াহিরির অডিও বার্তার সঙ্গে বিএনপিসহ যাঁদের সম্পর্ক পাওয়া যাবে, তাদের বিচার হবে বলে হুঁশিয়ার করলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সক্রিয় হোন

জন কেরি
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবদান রাখার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়া সফররত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। গতকাল রোববার জাকার্তায় এক ভাষণে তিনি বলেছেন, এটা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও হুমকি। জন কেরি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণাম রোধ করার সময় এখনো আছে। তবে সেই সময় ফুরিয়ে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস। আর এই গ্যাস নির্গমন করা দেশের তালিকায় সবার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দেশ দুটি গত শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে এই গ্যাস নির্গমন কমিয়ে আনার জন্য আরও বেশি চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই দুটি দেশের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অর্থ এই নয়, অন্যদের আর কিছু করার দরকার নেই। গ্রিনহাউস গ্যাস কম নির্গমনকারী দেশগুলো অতীতে যে ভুল করেছে, সেই ভুল যেন তারা আর না করে। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়া দিয়ে এশিয়ার এই অঞ্চলে সফর শুরু করেন জন কেরি। সেখান থেকে তিনি যান চীনে, এর পর ইন্দোনেশিয়া। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর গুরুত্ব কমিয়ে এশিয়ার এই অঞ্চলের দিকে বেশি নজর দেওয়ার পররাষ্ট্রনীতি ২০১২ সালে শুরু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেই নীতির অংশ হিসেবেই ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর। গতকাল জাকার্তায় দেওয়া ভাষণে জন কেরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এশিয়ার দেশগুলোর বিপদের বিষয়ে জোর দেন। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য ভয়ংকর প্রভাব নিয়েও তিনি কথা বলেন। আগামী বছর জলবায়ু পরিবর্তনবিরোধী একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার ইচ্ছার কথা জানান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণ কমানোর অঙ্গীকার থাকতে পারে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে মার্কিন প্রশাসন যথেষ্ট আন্তরিক নয়। তবে প্রেসিডেন্ট ওবামা গত বছর নতুন একজন উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন জলবায়ু পরিবর্তনবিরোধী নীতিনির্ধারণ করার জন্য। কেরি গতকাল ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম ইশতেকলাল মসজিদ পরিদর্শন করেন। এ সময় মসজিদের ইমাম তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কেরি মসজিদটিকে ‘অসাধারণ স্থান’ উল্লেখ করে তাঁকে এই বৃহৎ মসজিদ পরিদর্শন করার সুযোগ দেওয়ায় ইমামের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। বিবিসি ও এএফপি।

রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালেন মুকতাদা

মুকতাদা আল-সদর
ইরাকের শিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেতা মুকতাদা আল-সদর রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের অবসানের পর ইরাকের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আল-সদর। আল-সদরের একটি লিখিত বিবৃতি গতকাল রোববার প্রকাশিত হয়। এতে তিনি বলেন, এখন থেকে তিনি সব ধরনের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিচ্ছেন। সরকারের বাইরে বা ভেতরে এবং পার্লামেন্টের কোনো কার্যক্রমে তিনি যুক্ত থাকবেন না। আর তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনের সব কার্যালয়ও বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তবে সমাজকল্যাণ, গণমাধ্যম ও শিক্ষাভিত্তিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। ইরাকের পার্লামেন্ট নির্বাচনের দুই মাস আগে আল-সদর রাজনীতি ত্যাগের ঘোষণা দিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দলটি বর্তমানে মন্ত্রিসভায় ছয়টি পদে রয়েছে। ৩২৫ সদস্যের পার্লামেন্টে তাঁর দলের ৪০ সদস্য রয়েছেন। আল-সদরের ঘোষণাটি সাময়িক নাকি স্থায়ী তা অস্পষ্ট। তাঁর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কর্মী-সমর্থকেরাও এ ঘোষণায় বিস্মিত হয়েছেন। আল-সদরের রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপ্তি এক দশকের কিছু বেশি। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন দখলদার বাহিনীর হামলার কঠোর সমালোচনা করে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। মুকতাদা পরে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিসভায় তাঁর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। এএফপি।

বিশ্বের বয়স্কতম পরিবার?

মাঞ্জা পরিবারের সদস্যদের কয়েকজন
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকের শিকোগা জেলার কারগাল এলাকায় থাকতেন প্রয়াত শংকরানারায়ণা মাঞ্জা। তাঁর মোট ১৪ সন্তানের মধ্যে জীবিত ১৩ জনের সম্মিলিত বয়স ৮৮০ বছর। সেই হিসাবে বিশ্বের বয়স্কতম পরিবার হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতিলাভের আশা করছেন তাঁরা। বর্তমানে বয়স্কতম পরিবারের স্বীকৃতিটি যুক্তরাজ্যের ব্রুডনেল পরিবারের দখলে। তাঁদের সম্মিলিত বয়স ৮৫৫ বছর। তাই কারগালের মাঞ্জা পরিবারের ওই ভাইবোনেরা নিজেদের দাবি গিনেস কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা ও চেন্নাইয়ের ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেসের অবসরপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রামাকৃষ্ণা মাঞ্জা বলেন, ‘ব্রুডনেলস ভাইবোনদের ব্যাপারে জানার পর আমি নিজের ভাইবোনদের সম্মিলিত বয়স যোগ করে দেখি, ৮৮০ বছরের বেশি।
তাই গিনেস কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি লিখেছি।’ মাঞ্জা পরিবারের জীবিত ভাইবোনদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম শ্রীনিবাস মাঞ্জার বয়স এখন ৭৯ বছর। আর ছোট সদস্যের বয়স ৫৬ বছর। বংশতালিকা খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল বিপত্তি। ১০১ জনের নাম কালানুক্রমে স্মরণ করা খুব সহজ কাজ নয়। শ্রীনিবাসদের বাবা শংকরানারায়ণা মাঞ্জা ১৯৪০-এর দশকের শুরুর দিকে কর্ণাটক বিদ্যুৎ বোর্ডের লাইনম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। মাঞ্জা পরিবারের ভাষ্য, শৈশবে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই সত্ত্বেও তাঁরা প্রত্যেকেই সুস্থ ও সুখী জীবনযাপন করছেন। গোটা পরিবারটির সদস্যসংখ্যা এখন নাতি-নাতনি মিলিয়ে ১০১ জন। বাবা শংকরানারায়ণার মৃত্যুর (কয়েক দশক আগে) পর সবাই মিলে একসঙ্গে প্রথমবার ছবি তুলেছেন তাঁরা। সর্বশেষ গত এপ্রিলে প্রতিমা নামের এক বোনের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে শিমোগায় পারিবারিক সম্মিলন হয়েছিল। রামাকৃষ্ণা বলেন, তাঁরা এখন ভাইবোনদের প্রত্যেকের জন্মতারিখের পক্ষে প্রমাণ জোগাড় করছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

ঘটনার চেয়ে চেতনাই প্রধান

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের চলে যাওয়ার আগে থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের সরকারি ভাষা কী হবে তা নিয়ে আলোচনা হতে থাকে দুই দেশেরই রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর অনুসারীদের প্রস্তাব হিন্দি হবে সে দেশে সরকারি ভাষা। মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ইচ্ছা উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। দুটিই বহু ভাষাভাষী মানুষের দেশ। হিন্দি ও উর্দু কোনো দেশেরই সর্বজনীন ভাষা নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ তো নয়ই, সিকি মানুষের মুখের ভাষাও নয়। ভারতে হিন্দিকে একমাত্র অফিশিয়াল ভাষা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। বাংলা, উর্দু ও তামিলের পক্ষে ওকালতি হয়েছে। তবে কোনো আন্দোলন হয়নি, যেমনটি হয়েছে পাকিস্তানের পূর্ব বাংলায়। ১৯৬৫ সালে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দা আকাশবাণী থেকে বলেছিলেন, আজ থেকে সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দি চালু হলো। তাঁর এই বক্তব্যে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। চেন্নাইয়ে (মাদ্রাজ ছিল তখনকার নাম) ১২ জন তামিল ভাষার দাবিতে শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতি দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পরিস্থিতি সামাল দিয়ে টিকে যান। প্রাপ্ত দলিলপত্রে দেখা যায়, পূর্ববাংলার দলমত-নির্বিশেষে নেতারা ও বুদ্ধিজীবী সমাজ বাংলাকেই পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছে। ঢাকার নবাব পরিবারের কেউ কেউ এবং দু-চারজন মৌলবাদী দালাল গোছের লোক ছাড়া বাংলার পক্ষে ছিল গোটা পূর্ব বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা উর্দু হবে না হিব্রু হবে,
পাঞ্জাবি হবে না সিন্ধি হবে—তা নিয়ে বাঙালিদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তখনকার কাগজপত্র দেখে মনে হয়, কেন্দ্রীয় সরকার বা জিন্নাহ যদি বলতেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ ও পাখতুন—তাতেও বাঙালিরা আপত্তি করতেন না। তাঁদের দাবি ছিল তাঁদের ভাষার অধিকার রক্ষিত হোক, ওপারের দুম্বা বা উটের তাঁরা গলা কাটবেন না লেজ কাটবেন, তা তাঁদের ব্যাপার। বিপত্তি বাধালেন জিন্নাহ। খুবই বুদ্ধিমান মানুষ, কিন্তু নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিলেন। ওই গুজারাতী ও খোজা মুসলিম নেতার সুন্নি ও সুফিবাদী মুসলমানদের দেশ বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সে জন্য তাঁকে বিশেষ দোষও দেওয়া যায় না। তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় নেতা। গান্ধীজি ছাড়া সবার সঙ্গেই কথা বলতেন ইংরেজিতে। বাঙালি নেতারা বরং তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন উর্দুতে। তাতে তাঁর ধারণা হয়ে থাকবে যে পূর্ব বাংলার সবাই বাংলা-টাংলা কিছু একটা বললেও উর্দু বোঝে এবং বলতে পারে। তাঁর বাংলা সম্পর্কে ভুল ধারণা ও ঔদ্ধত্যের কারণে পরোক্ষভাবে বাঙালির উপকারই হয়েছে: জন্ম নেয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। জিন্নাহর একটি উদ্ধৃতি ভুলভাবে ব্যবহূত হচ্ছে বহুদিন ধরে। তা হলো তাঁর সেই কুখ্যাত উচ্চারণ: উর্দু অ্যান্ড উর্দু শ্যাল বি দ্য...। মূল ভাষণটি আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। তাঁর কথাটি ছিল এ রকম: ‘লেট মি টেল ইউ ইন দ্য ক্লিয়ারেস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ,... আলটিমেটলি ইট ইজ ফর ইউ, দ্য পিপল অব দিস প্রভিন্স, টু ডিসাইড হোয়াট শ্যাল বি দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব ইওর প্রভিন্স। বাট লেট মি মেক ইট ভেরি ক্লিয়ার টু ইউ দ্যাট দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান ইজ গোয়িং টু বি উর্দু অ্যান্ড নো আদার ল্যাঙ্গুয়েজ।’ কথাটার অর্থ অবশ্য একই দাঁড়ায়, তবে উদ্ধৃতি হিসেবে ভুল।
তিনি বলেছিলেন: সুস্পষ্ট ভাষায় আমি তোমাদের বলছি,...শেষ পর্যন্ত সেটা তোমাদের বিষয়, এই প্রদেশের মানুষের বিষয় যে তোমাদের ভাষা কী হবে। কিন্তু আমি তোমাদের পরিষ্কার করে বলতে চাই যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অন্য কোনো ভাষা নয়। অর্থাৎ তিনি বলেছিলেন, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা যাবে না, বাংলা প্রাদেশিক ভাষা হয়ে থাকতে পারে। এটি ছিল একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি। তাঁর আশপাশে যাঁরা থাকতেন তাঁদের জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল: মাননীয় কায়েদে আজম, আপনি যে বক্তৃতাটা করলেন সেটাও তো উর্দুতে করেননি, করেছেন ইংরেজিতে। আপনাকে উর্দুতে কখনো কিছু লেখালেখি করতে দেখিনি। তাহলে আগ বাড়িয়ে উর্দু উর্দু করছেন কেন? জিন্নাহ যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিলেন, তাতে শেষ পর্যন্ত কোনো বড় রকমের অগ্নিকাণ্ড ঘটত না। কিন্তু তাতে ঘি ঢেলে দেন খাজা নাজিমউদ্দিন, যার ফলে সারা পূর্ব বাংলায় দাবানলের সৃষ্টি হয়। যদিও মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন থেকে লীগের সব নেতাই ছিলেন বাংলার পক্ষে। নূরুল আমীন ১৪ আগস্টের কয়েক সপ্তাহ আগেও কলকাতায় এক আলোচনা সভায় পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা বাংলা করার পক্ষে মত দিয়ে বক্তৃতা করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন রক্তপাত পর্যন্ত গড়ায় কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর হঠকারিতার কারণে, কিন্তু তার দায়দায়িত্ব বর্তায় মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের সরকারের ওপর। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির আগেও পুলিশের গুলিতে এখানে শ্রমজীবী মানুষ নিহত হয়েছেন, কিন্তু সে মৃত্যু আর একুশের শাহাদত এক রকম নয়। একুশের জীবনদান পূর্ব বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের কাজটির সূচনা ঘটায়।
শুধু সাংস্কৃতিকও নয়, বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার, তার গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে একুশের রক্তাক্ত ঘটনা। বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য যে মহৎ কোনো কিছুরই সে সদ্ব্যবহার করতে পারে না। তা থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে গিয়ে জাতিগতভাবে পায় না বিশেষ কিছু। বাঙালির এক একটি উপলক্ষ এক একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দেয়। সেই উপসর্গের ধাক্কা চলে বহুদিন। সেই ধাক্কায় ঘটনাটিই বড় হয়ে ওঠে, তার ভেতরের আসল জিনিসটি হারিয়ে যায়। যদিও ঘটনা নয়, চেতনাই আসল। বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি সাংস্কৃতিক কর্মীদের শুধু নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আবেগের সৃষ্টি করত, স্বাধীনতার পর থেকে তা হারিয়ে যায়। সারা দেশ থেকে একুশের সংকলন প্রকাশিত হতো। সেসব সংকলনের লেখায় বিচ্ছুরিত হতো জাতীয়তাবাদী চেতনা। বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের সড়ক তৈরিতে সেসব সংকলনের লেখা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা শুধু রাজনীতিকদের সৃষ্ট নয়, অগণিত অজানা সাংস্কৃতিক কর্মীর অবদান তাতে সবচেয়ে বেশি। আমরা আজিমপুর শেখ সাহেব বাজার এলাকায় ছিলাম বলে দেখেছি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবগাম্ভীর্য। সেই পরিবেশ এখন বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তখন মানুষের বাহারি কাপড়চোপড় ছিল না।
২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকেই নেমে আসত সারা দেশে শোকের ছায়া—কৃত্রিম নয়, আসল শোক। পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকেই সারা দেশের অফিস ও দোকানপাটের সাইনবোর্ডের যেগুলো ইংরেজিতে লেখা তার ওপর হয় কাগজ সেঁটে দেওয়া হতো, নয়তো কাপড়ে বাংলায় লেখা হতো। সেটা করা হতো শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে। বিশে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের পর থেকে নগর এক নতুন রূপ ধারণ করত। ফজরের আজানের সময় থেকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়সনির্বিশেষে নারী-পুরুষ খালি পায়ে যেত আজিমপুর শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে। কোনো শব্দ নেই, ধাক্কাধাক্কি নেই, পিঁপড়ার মতো লাইন ধরে সবাই যাচ্ছে আজিমপুর কবরস্থানে। সেখান থেকে শহীদ মিনারে। তখন ফুলের চাষ হতো না। শহরে ফুল বিক্রি হতো অল্প কয়েকটি জায়গায় এবং খুবই সামান্য। আমরা ফুল জোগাড় করতাম বড়লোকদের বাড়ির বাগান থেকে। সেদিন তাঁরাও উদারভাবে উদ্যান উন্মুক্ত করে দিতেন। যাঁরা শহীদ মিনার বা কবরস্থানে যেতেন না, তাঁরাও রাস্তায় বের হতেন খালি পায়ে—তা তিনি যত সম্ভ্রান্ত ও বিত্তবানই হোন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে খালি পায়ে হাঁটার যে সুখ, তা এখনকার মানুষদের বোঝানো সম্ভব নয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে সবার জামায় ও শাড়িতে এক টুকরা কালো কাপড় সাঁটা থাকত। আজ শহীদ মিনারে ভিড় হয় বেশি, গাম্ভীর্য কম। আশির দশক থেকে এক নতুন উপসর্গ শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারি এলেই দৈনিকগুলোর এক কোনায় এক কলামে ‘আ-মরি বাংলা ভাষা’ বা ‘মোদের গরব মোদের আশা’ জাতীয় শিরোনামে একুশে ফেব্রুয়ারির বৃত্তান্ত বর্ণনা। সেই একই ব্যাপার। ঘটনাটিই প্রাধান্য পায়—চেতনা নয়।
এর মধ্যে ‘ভাষাসৈনিক’ অভিধাটি উদ্ভাবিত হয়। শুরু হয় তাঁদের জনা কয়েকের স্মৃতিচারণা ও সাক্ষাৎকার। সেকালের কাগজপত্রে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত ভাষার জন্য যাঁরা সংগ্রাম করেছেন তাঁদের নাম রয়েছে। তাঁরা কেউ নন, সেকালের যাঁদের কাগজপত্রে নাম ছিল না, স্মৃতিচারণায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায় তাঁদের। আটটি বছর বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের জন্য যাঁরা নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, তাঁদের নাম আমরা ভুলে গেছি। এখনকার মানুষ দেখতে পাচ্ছে, বাংলা ভাষার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন মাত্র কয়েকজন। অনেক লড়াই-সংগ্রামের পর পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা স্বীকৃতি পায়। সংবিধানের ২১৪(১) অনুচ্ছেদে লেখা হয়: ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা’। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খান যে সংবিধান প্রবর্তন করেন, তার ২১৫(১) অনুচ্ছেদে লেখা হয়: ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা ও উর্দু’; কিন্তু এই অনুচ্ছেদকে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধকরূপে কাজে লাগানো যাবে না, বিশেষত ইংরেজি-ভাষা পরিবর্তনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই ভাষা সরকারি ও অন্যান্য উদ্দেশ্য প্রতিপালনের জন্য ব্যবহূত হতে পারবে।’ আজ ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কৃতিত্ব নেওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। কিন্তু একটি বিষয় আমরা আড়াল করে রাখছি। বাংলাকে অন্যতর সরকারি ভাষা করার জন্য লেখক-বুদ্ধিজীবীরা লেখালেখি ও আলোচনা করছিলেন। তাঁদের সে ভূমিকার মূল্য রয়েছে। কিন্তু আলোচনার বিষয়কে একটি আন্দোলনের বিষয়ে পরিণত করেন শ্রমজীবীরা।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যখন পোস্টাপিস প্রভৃতির বিভিন্ন কর্মে ইংরেজির সঙ্গে উর্দু লেখা হলো তখনই চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীরা বুঝতে পারেন উর্দু না জানলে তাঁদের চাকরি থাকবে না। ঢাকার ইডেন বিল্ডিং বা প্রাদেশিক সচিবালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরাই প্রথম সরকারি কাগজে উর্দু ব্যবহারের প্রতিবাদ করেন এবং সূচনা ঘটান ভাষা আন্দোলনের। তাঁদের সেই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বাইরের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ। আন্দোলন একটি মিলিট্যান্ট রূপ নিতে থাকে। কেন বুদ্ধিজীবীরা নন, শ্রমজীবী ও ছাত্র-যুবসমাজ আন্দোলন শুরু করেন? কারণ বিষয়টি শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট। শুধু উর্দু সরকারি ভাষা হলে অল্প শিক্ষিত বাঙালিরা সরকারি চাকরি পাবেন না, সব চাকরি পাবেন উর্দুভাষী মোহাজেররা। একুশের শহীদদের শ্রেণীচরিত্র দেখলেই ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব। ভাষা আন্দোলন জাতিকে উপহার দিয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা, যা থেকে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। কিন্তু ভাষা আন্দোলন যে বলিষ্ঠ জাতি গঠনের দীক্ষাও দিয়েছিল, সে দীক্ষার সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। আমরা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে রেখেছি ঘটনাকে। খুব বড় অনুষ্ঠানের মধ্যে ঘটা করে একুশকে উদ্যাপন করছি দেশের মধ্যে শুধু নয় দেশের বাইরেও, কিন্তু একুশের চেতনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ অতি কম। যদিও চেতনাই প্রধান।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।