Sunday, August 25, 2013

রাষ্ট্রপতিকে খোলা চিঠি by আল-নাহিয়ান

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এ চিঠি লেখা আমার জন্য খুবই দুঃসাহসী একটি কাজ। কারণ যাদের নিয়ে লিখছি, আমার পরীক্ষার নম্বর নির্ভর করছে তাদের ওপর। তারপরও দিনের পর দিন আমাদের পিতৃতুল্য শিক্ষকদের আন্দোলনের জন্য যেখানে ক্লাস-পরীক্ষাই হচ্ছে না, সেখানে নম্বর নিয়ে চিন্তা করে কী লাভ? আগে তো পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা হোক!
মাননীয় রাষ্ট্রপতি, এই চিঠির মাধ্যমে আমি উপাচার্য স্যারের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতে চাই না। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মতো হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও আমাদের অভিভাবকদের কথা আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমাদের দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হয়েছিল। বলতে চাই তাদের কথা, যারা লাখো শিক্ষার্থীর ভিড়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে, কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষক কিংবা উপাচার্য স্যার কেউই ভাবছেন না তাদের নিয়ে। আগে জানতাম শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয় ছাত্রদের পড়ানোর জন্য। স্কুল-কলেজে তা-ই দেখে এসেছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সেই ধারণায় আমূল পরিবর্তন হল। বিশ্ববিদ্যালয় (শুধু জাহাঙ্গীরনগর নয়) এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে শুধু শিক্ষকদের অধিকার আর দাবি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন শিক্ষকরা। যাই হোক, আমাদের ক্যাম্পাসে বর্তমানে উপাচার্য স্যার অবরুদ্ধ আছেন। ফলে এখন ক্লাস-পরীক্ষার তেমন একটা বালাই নেই। কিন্তু উপাচার্য অবরুদ্ধ হওয়ার চারদিন অতিবাহিত হলেও সরকারকে এখনও পর্যন্ত ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন স্যার উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিগত প্রায় দেড় বছরে এখানে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে মোটে চার থেকে পাঁচ মাস। নিজের ব্যর্থতার জন্যই হোক অথবা উপাচার্যকে শিক্ষকরা সহযোগিতা না করার জন্যই হোক, অনেক চেষ্টা করেও উপাচার্য মহোদয় শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেননি।
বর্তমান উপাচার্যকে সরাতে সাধারণ শিক্ষক ফোরামের প্রায় ৩৭০ জন শিক্ষক কর্মবিরতি আর ধর্মঘট পালনের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা নিচ্ছেন না। অপরদিকে শিক্ষক মঞ্চের ব্যানারে প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষক উপাচার্যের পক্ষ নিয়ে শিক্ষকদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছেন, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না। না উপাচার্য পদত্যাগ করছেন, না আমাদের ক্লাস হচ্ছে। উপাচার্যের বিরুদ্ধে আমাদের শিক্ষকরা আন্দোলনের ১৮টি কারণ দাঁড় করিয়েছেন। কিন্তু আমরা মনে করি এগুলো কোনোটিই প্রকৃত কারণ নয়। আন্দোলনের প্রথম কারণ বর্তমান উপাচার্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নন। দ্বিতীয়ত, তিনি সব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দেন, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কিছু সংস্কৃতি আছে যার ফলে এখানকার শিক্ষকরা বিষয়টি প্রথম থেকেই ভালো চোখে দেখেন না। এছাড়া উপাচার্য নিজেও অনেকবার অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার মাধ্যমে এবং যখন-তখন যাকে-তাকে এমনকি আওয়ামীপন্থী একজন প্রভাবশালী শিক্ষককে শিবির বলার মাধ্যমে বারবার শিক্ষকদের তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সুযোগ করে দিয়েছেন। ছাত্রদের হলে ঢুকে পুলিশের গুলি চালানো, মৃত এক শিক্ষার্থীকে শিবির বলা, অপরাধ ভালোভাবে না শুনেই ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কার করার কথা দেয়া এবং চাপের মুখে তা প্রত্যাহার করাসহ একজন পত্রিকার হকারের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে এই উপাচার্যের আমলেই। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত উপাচর্যের পদত্যাগের দাবি উঠেছে তিনবার। এর মধ্যে একবার তিনি পদত্যাগও করেছিলেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বর্তমান উপাচার্য নিয়োগ পদ্ধতির পরিবর্তন না হলে এ ধরনের জটিলতা চলতেই থাকবে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তারা রাজনৈতিক বিবেচনায় তাদের পছন্দমতো উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে থাকে। শিক্ষক নিয়োগেও দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এতে একদিকে যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক থেকে বঞ্চিত হয় শিক্ষার্থীরা, যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি এখন দল থেকে উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিভক্ত শিক্ষক রাজনীতির কারণে মারাÍকভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষকদের এ আচরণে কলুষিত হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ। রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোনো অঘটনের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তায়। সরকারকে এটা অনুধাবন করতে হবে। স্কুল-কলেজের প্রধান শিক্ষক নিয়োগের যে পদ্ধতি, তার থেকে অনেক নিুমানের পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেন আপনারা। উপাচার্য নির্বাচনে যিনি প্রথম হবেন, তাকে বাদ দিয়ে যদি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় কাউকে উপাচার্যের দায়িত্ব দেয়া হয় তবে কেন এই নির্বাচন, সেটাই আমার বোধগম্য নয়। আর ৭৩-এর অধ্যাদেশের মাধ্যমে শিক্ষকদের যে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, তা যেন স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ না নেয় সে জন্য আইনটিতে কিছু পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা সবাই বলি। সেই পরিবর্তন আনা সম্ভব না হলে ডিজিটাল বাংলাদেশের মুখ আমরা কোনোদিন দেখব না, যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে তরুণ প্রজন্ম বর্তমান সরকারকে নির্বাচিত করেছিল। যে তরুণ প্রজন্ম ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তারা আপনার কাছে তাদের মূল্যবান শিক্ষাজীবন আর বাবা মায়ের দেখানো স্বপ্ন ভিক্ষা চাইছে। কে উপাচার্য হলেন অথবা হলেন না, তা নিয়ে কথা বলে আমরা দোষী হতে চাই না। উপাচার্যকে শিক্ষকরা তার অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখায় আমরাও আমাদের হলের রুমে বন্দি হয়ে গেছি। উপাচার্যকে পদত্যাগ করিয়েই হোক অথবা আন্দোলনকারী শিক্ষকদের আন্দোলন থেকে সরিয়েই হোক- মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনি আমাদের শিক্ষা জীবনকে এ অনিশ্চয়তা থেকে দ্রুত মুক্ত করবেন, আপনার কাছে আমরা এ প্রত্যাশাই করি।
আল-নাহিয়ান : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ দেশের সম্পদ এ দেশের মানুষের by আনু মুহাম্মদ

আগামীকাল ২৬ আগস্ট ‘ফুলবাড়ী দিবস’। সাত বছর আগে এই দিনে ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জসহ উত্তরবঙ্গের মানুষ ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। জীবন দিয়েছিলেন শুধু দেশের সম্পদ রক্ষার জন্যই নয়, দেশের নিশানা বদলে দেয়ার জন্য। ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থান দেশ ও দেশের সম্পদের ওপর লুটেরাদের থাবা মুচড়ে দিয়েছিল। তাদের বার্তা এখনও ধরে আছেন মানুষেরা : এ দেশের সম্পদ এ দেশের মানুষের। দেশী-বিদেশী লুটেরাদের স্বার্থে নয়, দেশ ও জনগণের স্বার্থে তার শতভাগ ব্যবহার করতে হবে। এখনও কেউ কেউ নানাভাবে এ কথা বলতে চান যে, অনভিজ্ঞ বিদেশী কোম্পানি এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প- যা একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য মাত্র শতকরা ৬ ভাগ রয়্যালটি, শতকরা ৮০ ভাগ রফতানি ও মাটি-পানি-মানুষবিনাশী উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি সংবলিত বিদেশী বিনিয়োগ- সেই প্রকল্পই বাংলাদেশের কয়লা সম্পদ ব্যবহারের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট পথ। এ প্রকল্প যে উন্নয়নের নামে ধ্বংসের একটি প্রকল্প; তা যে শুধু ফুলবাড়ী, বিরামপুরসহ ছয় থানা নয়, দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জন্যই, সেটি আমরা বহুবার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছি। আর দেশের খনিজ সম্পদের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো দেশের সার্বভৌমত্বই অচল। এই কর্তৃত্ব ছাড়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সম্ভব নয়, সম্ভব নয় অন্যান্য ক্ষেত্রেও যথাযথ বিকাশ। ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুরসহ ছয় থানা অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম বলে জমি তিন ফসলি এবং এই অঞ্চল বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার বলে পরিচিত। যখন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিপর্যস্ত, দেশের ভেতরে ও বিশ্বব্যাপী খাদ্য ঘাটতি বাংলাদেশে এক ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি করছে, তখন এই বিশাল অঞ্চল, উর্বর তিন ফসলি কৃষিজমি ধ্বংসের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যের কথা চিন্তাও করা যায় না। শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়, পানিও এই অঞ্চলে এক বিরাট সম্পদ। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের প্রায় সর্বত্র পানিতে আর্সেনিক থাকলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি সম্পূর্ণ আর্সেনিকমুক্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্মুক্ত খনি হলে এই পানিও আর পানযোগ্য থাকবে না, বিষাক্ত হয়ে যাবে। ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বিচার-বিশ্লেষণ করে মত দেয়ার জন্য সরকার থেকে প্রফেসর নূরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টে পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতামত সংকলিত করা হয়েছে। সেখানে এই প্রকল্প বিচার-বিশ্লেষণ করে পানি প্রত্যাহারের সম্ভাব্য কুফল সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার সার কথা হল : বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি প্রত্যাহারের ফলে খনি এলাকা ঘিরে বহুদূর পর্যন্ত পানির স্তর এমনভাবে নেমে যাবে, যা উত্তরবঙ্গজুড়ে আবাদ সংকট, খাবার পানির সংকট তৈরি করবে। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপকভাবে আর্সেনিক ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক দ্বারা দূষণের শিকার হবে, যা বিস্তৃত এলাকায় মানবিক বিপর্যয় ঘটাবে। উপরের মাটির আবরণ সরানোর ফলে বৃষ্টি ও জালের মতো ছড়ানো নদনদী, খালবিল দিয়ে দূষণ পুরো উত্তরবঙ্গ তো বটেই, দেশের অন্যান্য অঞ্চলকেও আক্রান্ত করবে, পুরো উপত্যকা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত হবে (বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট, সেপ্টেম্বর ২০০৬)। পরবর্তী সময়ে পাটোয়ারি কমিটি (২০০৭-০৮) ও মোশাররফ কমিটিও (২০১১-১২) প্রায় একই সিদ্ধান্ত টেনেছে।
১৯৮৭-১৯৯১ সময়কালে যুক্তরাজ্যের খনিজ অনুসন্ধান ও কনসালট্যান্সি ফার্ম হিসেবে খ্যাত মেসার্স ওয়ার্ডেল আর্মস্ট্রং বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ওপর আর্থ-প্রাযুক্তিক একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। সেই সমীক্ষা শেষে তারা বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি কারিগরি কারণেই সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। তাদের হিসাব অনুযায়ী ৩০ বছরের খনি জীবনে প্রতি সেকেন্ডে সেখানে ৮ থেকে ১০ হাজার লিটার পানি প্রত্যাহার করতে হবে। এত দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে ভূগর্ভস্থ পানি প্রত্যাহারের যে ফলাফল, তা যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটাতে পারে সেটা কোনো খনির জন্যই অনুকূল নয়। এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পেও এই হারেই ভূগর্ভস্থ পানি প্রত্যাহার মানে দিনপ্রতি ৮০ কোটি লিটার পানি তোলার কথা বলা হয়েছিল। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে কৃষি আবাদের জন্য বছরে এর একশতমাংশেরও কম পানি তোলা হয়। এটিকে কৃষি ও ভূবিজ্ঞানীরা সেই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। এর ফলে এখনই এ অঞ্চলের শতকরা ৩০ ভাগ টিউবওয়েল অচল হয়ে পড়েছে। সেখানে দিনপ্রতি ৮০ কোটি লিটার পানি ওঠালে প্রতিক্রিয়া কী হবে তা চিন্তা করতেও ভয় হয়। কৃষকরা আরও ভালো বোঝেন। দিনাজপুরের এক গ্রামে একজন প্রবীণ কৃষক এসব কয়লা খনির কথা তুলে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কয়লারই কি কেবল দাম আছে? পানির কি কোনো দাম নাই? পানি যদি না থাকে আমরা কী করে থাকব, আবাদই কী হবে আর আপনারাই বা কী করে বাঁচবেন?’
পেট্রোলিয়াম ও খনিজ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী একেএম শামসুদ্দীন উত্তরাঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও পানির স্তর পরীক্ষা করে বলেছেন, ‘এভাবে ভূগর্ভস্থ পানি প্রত্যাহার আকুইফার বা ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাকে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বিপর্যস্ত করে পুরো এলাকারই মরুকরণ ঘটাবে।’ পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) মহাপরিচালক প্রকৌশলী ইনামুল হকও বিশ্লেষণ করে একই সিদ্ধান্তে এসেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ড. বদরুল ইমাম ও ড. আফতাব আলম খান, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাদের বিভিন্ন লেখা ও বক্তব্যে। তাছাড়া খনি অঞ্চলে বিপুল জনবসতি। দেশের গড় জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০৭৯, যেখানে তা অস্ট্রেলিয়ায় ৩, যুক্তরাষ্ট্রে ৩২, ইন্দোনেশিয়ায় ১২০, চীনে ১৩৯, জার্মানিতে ২৩৭ এবং ভারতে ৩৬৩। সারাদেশে জনঘনত্ব এত বেশি থাকার ফলে এক অঞ্চল থেকে সরিয়ে বসতি এবং সমাজ জীবন প্রতিস্থাপন একেবারেই অসম্ভব। বিষয়টি শুধু ফুলবাড়ী অঞ্চলের নয়। সমগ্র উত্তরবঙ্গে যদি কৃষি আবাদ, পানি ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়, তাহলে এই পুরো অঞ্চলই মানুষের বসবাস ও আবাদের অযোগ্য হয়ে যাবে। তাদের সবার জন্যই ভিন্ন আবাস, কৃষি আবাদ আর সমাজ জীবন প্রতিস্থাপন করতে হবে। সেটা কোথায়? আর অবিরাম খাদ্য উৎপাদনের এলাকা ধ্বংস হয়ে খাদ্য উৎপাদনের যে ঘাটতি হবে তার সমাধান কী হবে?
উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি একের পর এক দেশে হয় জনপ্রতিরোধের মুখে অথবা রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান দ্বারা নিষিদ্ধ অথবা সীমিত হচ্ছে। কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, অর্জেন্টিনা, এমনকি ভারতেও অনেক প্রকল্প বাতিল হয়েছে। ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট সংবিধান সংশোধন করে প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকায় উন্মুক্ত খনন নিষিদ্ধ করার জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকছেন। অন্যদিকে হন্ডুরাসের ন্যাশনাল কংগ্রেস দেশের খনি আইন পরিবর্তন করছে, যেখানে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নিষিদ্ধ হচ্ছে। এ প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, তবে কয়লা সম্পদ ব্যবহার হবে কিভাবে? কোন ব্যবহার দরকার, কোন পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য তা নির্ভর করে কার স্বার্থ সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে তার ওপর। বিদেশী কোম্পানির জন্য কয়লা যত তাড়াতাড়ি তুলে দেশী বা বিদেশী বাজারে নেয়া যায় ততই লাভজনক; মানুষ, প্রকৃতি, খাদ্য, বাসস্থান নিয়ে তার কী? কিন্তু দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা চাইব, এই অনবায়নযোগ্য সম্পদের প্রতিটি বিন্দু আমাদের কাজে লাগবে। যতদিন সম্ভব এর ব্যবহার করব আমরা এবং তা করব এমনভাবে, যাতে মাটির নিচের সম্পদ তুলতে গিয়ে মাটি ও তার উপরের সম্পদ নষ্ট না হয়; পুরো অঞ্চল ধ্বংসস্তূপ, বিরান বিষাক্ত অঞ্চলে পরিণত না হয়। মানুষই যদি না থাকতে পারে, তাহলে বিদ্যুৎ কে ভোগ করবে? ওই অঞ্চলে মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, পুকুর, নদী, খাল, মাছ, হাঁস-মুরগি, কৃষিজমি, ফল, ফুল, সবজি, পুরাকীর্তি আছে, আছে কয়লা। ব্যবসায়ী কোম্পানির চোখে সবকিছু অদৃশ্য হয়ে বিপুল মুনাফার উৎস কয়লায় গিয়ে চোখ আটকে থাকতেই পারে। স্বাধীন মানুষের তা হবে কেন? মানুষ তো সবকিছু দেখে-বুঝেই বিচার-বিবেচনা করবে।
তাহলে পথ কী? ভূমি, মাটি, পানি, পরিবেশকে কোনো ক্ষতি না করে কয়লা সম্পদ কিভাবে ব্যবহার করা যায়, তার জন্য অনেক দিন থেকেই গবেষণা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে গ্যাসে রূপান্তরিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্লান্ট বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পদ্ধতিই কয়েক দশকের মধ্যে কয়লা ব্যবহারের প্রধান পদ্ধতি হয়ে উঠবে। তবে এটাই শেষ কথা নয়। এটি নিয়েও প্রশ্ন আছে। আরও নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঠিকঠাকমতো অগ্রসর হতে গেলে এদেশেও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। সবকিছু বিবেচনায় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হল, নিজেদের কর্তৃত্বে যদি কয়লা সম্পদ থাকে এবং নিজেদের জাতীয় সক্ষমতা তৈরির ব্যবস্থা যদি করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য কয়লা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের পথ বের করা ঠিকই সম্ভব হবে। কিন্তু এর জন্য দরকার জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা ও চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যে এই সম্পদের মালিক, সেটাও মনে রাখতে হবে। ঘাড় থেকে দুর্বৃত্ত না সরালে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হবে না। সে জন্য ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নই সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের পথ দেখাতে পারে। ফুলবাড়ীর মানুষ রক্ত দিয়ে এই বার্তাটিই দিয়ে গেছেন যে, জনগণের সম্পদ জনগণের মালিকানায়, দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে শতভাগ ব্যবহার হতে হবে। দুর্বৃত্ত লুটেরাদের লুট আর পাচারের কোনো প্রকল্প মানুষ গ্রহণ করবে না। তাহলেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে।
আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

পরীক্ষার ফলাফল ও সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে কথা by বিমল সরকার

সৃজনশীল পদ্ধতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন সংযোজন। উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান স্তরে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে এবং মাধ্যমিক স্তরে আরও আগে থেকেই দেশে এ পদ্ধতিটি চালু হয়। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করার সময় থেকেই সচেতন মহলে এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও লক্ষ্য করা যায়। ৩ আগস্ট এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে আবার নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। প্রশ্ন উঠেছে, সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়েও। বর্তমান সরকার আসার পর প্রথম ৪ বছরে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এবার সরকারের মেয়াদের শেষ বছরে এসে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের ক্রমবর্ধমান গতিটি বাধাগ্রস্ত হয়। কেউ কেউ এটাকে ফলাফল বিপর্যয় বলে অভিহিত করেছেন। যদিও এরকম ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এসএসসি, এইচএসসি বা ডিগ্রির মতো এক-একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠান এবং এসবের ফলাফল নিয়ে আমরা বড় দুঃসময় অতিক্রম করে এসেছি। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অন্য অনেক কিছুর মতো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে। সদ্য স্বাধীন দেশে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চরম অস্থিরতা এবং শত বাধাবিপত্তি ও অব্যবস্থার মাঝে বোর্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এক-একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সঙ্গত কারণেই পরীক্ষাগুলোতে হয় ব্যাপক হারে গণটোকাটুকি। পাসের হার উঠে দাঁড়ায় ডিগ্রিতে ৬৫ বা ৭০ শতাংশ এবং এসএসসি বা এইচএসসিতে ৮০, ৯০, এমনকি ৯৮ শতাংশ। কিন্তু কোনো পাবলিক পরীক্ষায় অর্জিত সর্বকালের সর্বোচ্চ এই পাসের হার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ক্রমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অস্থিরতা এবং বাধা-বিপত্তিগুলো কমে আসায় শিক্ষা ক্ষেত্রেও স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে থাকে। ফলে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই অনুষ্ঠিত এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার নেমে আসে ২৮, ৩০ বা ৩২ শতাংশে এবং ডিগ্রিতে ৬, ৭ কিংবা ৯ শতাংশে। গোটা আশির দশকই কাটে বলতে গেলে রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চরম অস্থিরতার মাঝ দিয়ে। বিএনপি সরকারের আমলে এবং আওয়ামী লীগের আমলে (১৯৯৬-২০০১) বোর্ড-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোতে নতুন করে অনিয়ম, অব্যবস্থা ও নৈরাজ্য পরিলক্ষিত হয়। এ সময়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পরীক্ষায় ব্যাপক গোলযোগ, গণটোকাটুকি, এমনকি পরীক্ষা কেন্দ্রে গুলি ছোড়ার মতো ঘটনাও সংঘটিত হয়েছে। কোনো বিষয়ের একটিমাত্র পত্রের পরীক্ষায় ৫ হাজার, ১০ হাজার করে পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত মোট ৩০ বা ৪০ হাজারের মতো পরীক্ষার্থী বহিষ্কার করার দৃষ্টান্তও রয়েছে। বহিষ্কার ছাড়াও প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়ায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষাদানে বিরত থাকে আরও মোট ২০-২৫ হাজার কিংবা এরও বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থী। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কার ও বিরত থাকা পরীক্ষার্থীর মোট সংখ্যা ৫০, ৬০ এমনকি ৭০ হাজারও ছাড়িয়ে যায় কখনও কখনও। মাস্টার্স শেষ পর্ব পরীক্ষা চলাকালে ব্যাপক হারে নকল করায় একটি কেন্দ্রের মোট ১৬০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম দিনই চার শতাধিক পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করার ঘটনাও অনেকের মনে থাকার কথা। ভুলে যাওয়ার কথা নয় এক-একটি বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় ৩০, ৪০ কিংবা ৬০-৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজনও পাস না করার স্মৃতি। এভাবে নব্বইয়ের দশকের শেষ ও দশের দশকের শুরুর দিকে এক-একটি পরীক্ষায় পাসের হার ২০, ২৫ কিংবা ৩০-৩২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এখন আমরা অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসেছি। গত ৫-৬ বছর ধরে বহিষ্কার ও বিরত থাকা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অবিশ্বাস্য হারে কমে গেছে। পাসের হার ৬০, ৭০ ও ৮০-র ঘরে সামান্য ওঠানামা করে। এমন পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষায় গত বছরের তুলনায় ৩-৪ ভাগ কম পাস করা কিংবা ৫০-৬০ হাজার জিপিএ-৫ এর স্থলে ২-৩ হাজার কমে যাওয়াকে ‘কিছুটা খারাপ’ বলা গেলেও আর যাই হোক কোনোক্রমেই ‘ফলাফল বিপর্যয়’ বলা যাবে না।
এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব বিএনপি ও জামায়াতের ডাকা উপর্যুপরি হরতালকে প্রধানত দায়ী করে বক্তব্য রেখেছেন। আবার বিএনপি ও জামায়াত নেতারা পাল্টা বলেছেন, হরতাল নয়, সরকারের অদক্ষতা ও অনুসৃত শিক্ষানীতিই ফলাফল খারাপের মূল কারণ। এদিকে ফলাফল নিয়ে ফেল করা এবং কাক্সিক্ষত ফলাফল থেকে বঞ্চিত দাবিদার পাস করা পরীক্ষার্থীদের মাঝে হতাশা, অসন্তোষ ও ক্ষোভের অন্ত নেই। এসব পরীক্ষার্থী তাদের ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এবং দেশের আরও কয়েকটি স্থানে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে। বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা তাদের দাবি-দাওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও শিক্ষামন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে। বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা অবশ্য ফলাফল খারাপের জন্য বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে হরতাল নয়, তড়িঘড়ি করে উত্তরপত্র মূল্যায়নকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে ফলাফল খারাপের জন্য রাজনীতি ও পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতির বাইরে থেকে নির্দ্বিধায় ও নিঃসংকোচে বলা যায়, সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে যদি এখন থেকেই আন্তরিকভাবে না ভাবা হয় তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে আগামীতে সবাইকে খুবই ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করতে হবে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে কেবল বাংলা বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়। পরে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে বাংলা ছাড়াও রসায়ন, পৌরনীতি, ব্যবসায়নীতি ও প্রয়োগ এবং ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে সৃজনশীল পদ্ধতির আওতা বাড়িয়ে পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস, সমাজকল্যাণ, হিসাববিজ্ঞানসহ আরও কয়েকটি বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেক শিক্ষক এ পদ্ধতি সম্পর্কে রয়েছেন একেবারেই অন্ধকারে। প্রশিক্ষণ তো দূরের কথা, এ বিষয়ে নেই অনেকের ন্যূনতম ধারণা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ অনুসরণ করে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করে যাচ্ছেন! কেবল পাঠদানই নয়, একই সঙ্গে তারা অভ্যন্তরীণ সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্রও মূল্যায়ন করছেন! এ নিয়ে যে বিপত্তি ঘটছে না, তা কিন্তু নয়। একটি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণীর নির্বাচনী পরীক্ষায় পৌরনীতি বিষয়ের ২৪৮টি উত্তরপত্র বিভাগের দু’জন শিক্ষক মূল্যায়ন করলেন। তাদের মধ্যে একজন ১২৪টি উত্তরপত্রের মধ্যে ১০১টিতে পাস নম্বর দিলেন আর ফেল নম্বর পেল বাকি ২৩ জন। অপর শিক্ষক ১২৪টি উত্তরপত্রের মধ্যে পাস নম্বর দিলেন মাত্র ২২ জনকে। বাকি ১০২ জনই তার দেয়া নম্বরে ফেল করেছেন। এটি কোনো সাজানো গল্প নয়, ‘সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরিশোধন ও মূল্যায়ন’ শীর্ষক তিনদিনের প্রশিক্ষণ পাওয়া ও প্রশিক্ষণ না পাওয়া দু’জন কলেজ শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি ও দক্ষতার পার্থক্যের দৃষ্টান্তমাত্র।
এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা কিছুটা ব্যক্ত করি। ইতিহাস বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হচ্ছে- খবরটি জানার পর থেকে আমার মাঝে কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে মনে নানা ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জাগে। বিভিন্ন কলেজে কর্মরত কাছের এবং পরিচিত সহকর্মীদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে তারা সবাই আমাকে আশ্বস্ত করেন এবং জানান, প্রশিক্ষণ নিলে সবকিছুই সহজ মনে হবে। শুরু হল প্রশিক্ষণের জন্য ডাকার অপেক্ষা করার পালা। কিন্তু অনেকের ডাক পড়লেও আমার আর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয় না। এ ব্যাপারে অন্যান্য বিষয়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকর্মীদের সাহায্য নিয়ে কিছুটা বুঝে আর কিছুটা না বুঝে প্রথম ও পরে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করি। এ নিয়ে গ্লানিবোধ ও বিড়ম্বনার মাত্রা বাড়তে থাকে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী এবং বাইরে সহকর্মী, এমনকি অধ্যক্ষের কাছে অসংখ্যবার আমার সীমাবদ্ধতা ও বিড়ম্বনার কথা ব্যক্ত করি। অনেক ভাবনার পর ‘সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে তামাশা!’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখি, যা ২০১২ সালের ১ নভেম্বর যুগান্তরে প্রকাশিত হয়। চলতি বছরের মার্চ মাসে আমার বিষয়সহ বিষয়ভিত্তিক বেশ কিছুসংখ্যক শিক্ষককে তিনদিনের প্রশিক্ষণের জন্য ময়মনসিংহে ডাকা হয়। কিন্তু সর্বশেষ ব্যাচেও আমার নাম নেই জানতে পেরে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ি। কারণ বিগত ৯টি মাস ধরে সৃজনশীল পদ্ধতির নামে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের কী পড়িয়েছি জানি না। অধ্যক্ষ এবং এক বন্ধুর সহযোগিতায় আমার কলেজের একই বিষয়ের অন্য একজন সহকর্মীসহ নাম তালিকাভুক্ত করাতে সক্ষম হই। যথারীতি প্রশিক্ষণ নিই। আমার কাছে মনে হয়েছে, সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজটি সহজ নয়। তবে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও চর্চার মাধ্যমে তা সহজ হয়ে উঠতে পারে। এ কাজে তিনদিনের প্রশিক্ষণ পর্যাপ্ত তো নয়ই, বরং তা শিক্ষকদের কৌতূহল ও প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
২০১৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার বাকি আর মাত্র ৭ মাস। তখন অনেক বিষয়েরই পরীক্ষা হবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে। সারাদেশে কোন কোন বিষয়ের মোট কয়জন শিক্ষক এখনও প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছেন, এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে কি-না জানি না। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর আর যাতে কেউ বলার সুযোগ না পায় যে, সৃজনশীল পদ্ধতিতে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকরা অদক্ষ- সেদিকে কর্তৃপক্ষের নজর আছে কি?
বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি by ড. মাহবুব উল্লাহ্

পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর রাজনৈতিক আকাশে ঘূর্ণিঝড় উঠবে বলে অনেকেই আশংকা করেছিলেন। বিশেষ করে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঈদের ছুটির শেষ প্রান্তে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডাকায় এ আশংকা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এটা ছিল জামায়াতের একক কর্মসূচি। এর প্রতি প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বা অন্য কোনো দল সমর্থন জানায়নি। ঈদুল ফিতরের পরপরই রাজনীতি প্রবল সংঘাতময় হয়ে উঠবে বলে আমার মনে হয়নি। এ ব্যাপারে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে আমি আমার মত ব্যক্ত করেছিলাম। আমাদের মতো দেশে বিক্ষোভ-আন্দোলন হুট করে দানা বাঁধে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় পূর্বপ্রস্তুতি এবং ব্যাপক জনমত গঠন। এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি ব্যাপক জনগ্রাহ্যতা পেয়েছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার জনমত জরিপেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। তারপরও কথা থেকে যায়। জনগণ যা শ্রেয় ও কাম্য মনে করেন, তার জন্য তারা যে কোনো সময় তাদের দাবি উচ্চকিত করতে রাজপথে নেমে আসেন। এর জন্য প্রয়োজন হয় মানসিক প্রস্তুতি এবং আঘাত হানার সঠিক সময়টি নির্ধারণ। সময় আসার আগে আঘাত হানতে গেলে সেটি রাজনৈতিক অ্যাডভেঞ্চারিজমে পরিণত হয়। ফল হয় ব্যর্থতা। আবার অন্যদিকে আঘাত হানতে বিলম্ব করলে সেটি হয়ে যায় রাজনৈতিক সুবিধাবাদ। সে ক্ষেত্রেও ব্যর্থতা অনিবার্য। এ কারণে রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য সঠিক সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য প্রয়োজন হয় তীক্ষœ বিচার-বুদ্ধি। বিএনপি গত সাড়ে ৪ বছরে হরতালের মতো কিছু কর্মসূচি দিয়েছে। হরতালে দোকানপাট বন্ধ থাকলেও এবং গাড়ি-ঘোড়া প্রায় না চললেও ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায়নি। জনসমর্থন ও জনসহানুভূতি এক কথা, কিন্তু জনসম্পৃক্ততা ভিন্ন কথা। জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে শুধু দলের সক্রিয় কর্মীরাই নয়, ব্যাপক গণমানুষও মাঠে নেমে আসে। আন্দোলন-সংগ্রামে জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে ব্যাপক গণসম্পৃক্ততা ঘটেছিল বলেই ওইসব আন্দোলনে সাফল্য অর্জিত হয়েছিল। তুলনামূলক বিচারে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পূর্ব উল্লিখিত আন্দোলনগুলোর মতো ব্যাপক গণসম্পৃক্ততা ঘটেনি। তারপরও আন্দোলন সফল হয়েছিল। এরশাদের পতন হয়েছিল। কারণ এরশাদের ক্ষমতার মূল ভিত্তি সামরিক বাহিনী তার প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।
এসব অভিজ্ঞতার আলোকে বিএনপি এ মুহূর্তে কোনো সংঘাতধর্মী আন্দোলনে যাচ্ছে না। তারা জনসংযোগ ও জনমত গঠনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। মানুষের ভেতরকার সুপ্ত সমর্থনকে জাগিয়ে তোলাই হচ্ছে এ জনসংযোগ ও জনমত গঠনের মূল লক্ষ্য। তারা এই ধারা ঈদুল আজহার পরও অব্যাহত রাখবে। তবে তাদের জন্য সময় খুব একটা হাতে নেই। কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বিল পাস না হলে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান চালু করার সুযোগ নাও থাকতে পারে। অবশ্য সংসদ ভেঙে না দেয়া হলে সেই সুযোগ আরও কিছুকাল থাকবে। অনেকের ধারণা, অক্টোবরেই সংসদ ভেঙে দেয়া হতে পারে। আবার অনেকে মনে করেন, এ কাজটি করার জন্য সাংবিধানিক সংশোধনী প্রয়োজন হবে। যাই হোক, বিএনপি এ মুহূর্তে নিঃশ্বাস ফেলার যতটুকু সুযোগ পেয়েছে সেটাকে তারা জনমত গঠন ও সক্রিয়করণের কাজে ব্যবহার করতে চায়। একটি কথা আছে, লোহা যখন উত্তপ্ত হয়ে লাল টকটকে হয়ে ওঠে তখনই আঘাত হানতে হয়। সম্ভবত বিএনপি এমন একটি অবস্থার জন্যই অপেক্ষা করছে। এতে হয়তো খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে তাদের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতে পারে। তবে বাস্তবে কী ঘটবে, সেটা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। এমনকি যুদ্ধমান বিএনপি ও আওয়ামী লীগও বলতে পারেনি।
বিএনপি গত কিছুদিন ধরে সংলাপের কথা বলে আসছে। সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ব্যাপক জনগণের আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন। বারবার সংলাপের আওয়াজ তুলে বিএনপি প্রমাণ করতে চাইছে, তারা অকারণে সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চায় না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে দিয়েছেন তিনি সংবিধান থেকে একচুলও নড়বেন না, ব্যাস। তার এই বক্তব্যের দু’রকম মানে করা যা। একটি হল, সংবিধান এখন যেভাবে লিপিবদ্ধ আছে তার থেকে একচুলও না নড়া। আবার একটু কল্পনাবিলাসী হলে বলতে হয়, জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করলে এবং তার ভিত্তিতে নির্বাচন করলে সেটাও হবে সংবিধান থেকে একচুলও না নড়া। তবে অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ধরে নিয়েছেন, তিনি বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থা থেকে একচুলও নড়বেন না। এ কারণে বিরোধীদলীয় নেত্রী তার দলের একটি অঙ্গ সংগঠনের সমাবেশে কিছুটা বিদ্রুপের ছলে বলেছেন, ‘একচুল তো দূরের কথা, আন্দোলনের এমন বাতাস বইবে যে, সব চুল এলোমেলো হয়ে যাবে। এমনকি অস্তিত্বও বিপন্ন হতে পারে।’ কথার পিঠে এমন কথা ওঠা আমাদের দেশের রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য। যেটুকু কথা হয়েছে সেটাকে বিদ্রুপের হুল ফুটানোর অতিরিক্ত কিছু বলা যাবে না। কেউ কেউ এমন বাক্যবাণ নিক্ষেপকে চুলাচুলি বলতেও আড়ষ্টবোধ করেননি। আসলে এরকম মন্তব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ঘোলাটে ও জটিল করে তোলে।
বাংলাদেশের ঘটনাবলী নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বিগ্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কিছু অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। তারা সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চান। জাতিসংঘের তৎপরতাও আমরা লক্ষ্য করছি। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। বোঝাই যাচ্ছে বিশ্বসংস্থাটি কত উদ্বিগ্ন! জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের একটি প্রবল উপস্থিতি রয়েছে। সম্ভবত এ কারণে জাতিসংঘ নিজেকে স্টেকহোল্ডার বলে গণ্য করে। চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুনও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। চৈনিক কূটনীতি বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের কূটনীতির মতো নয়। বিশ্বায়নজনিত রেওয়াজ সত্ত্বেও চীনারা পারতপক্ষে অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করতে চায় না বা নাক গলায় না। কনফুসীয় ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেই চীনের কূটনৈতিক আচরণ গড়ে উঠেছে। কিন্তু এ যাত্রা চীনের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের ব্যাপারে মুখ খোলার পর ব্যাপারটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত বলে মনে হয়। সরকারকে ঘটনাপ্রবাহের এসব বাঁক-পরিবর্তনের দিকেও নজর রাখতে হবে। অন্যথায় সরকারের আচরণ দায়িত্বহীন বলে প্রতীয়মান হবে। একমাত্র প্রতিবেশী ভারতের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি এ মুহূর্তে অন্যরকম বলে বোধ হয়। ভারতীয় মিডিয়াতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ক্ষমতা থেকে বিদায়কে ভারতের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারতের এই ভিন্ন অবস্থান বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত বাংলাদেশের সন্নিকটবর্তী প্রতিবেশী। ভারত একটি বৃহৎ শক্তিও বটে। সুতরাং ভারত তার জাতীয় স্বার্থে অন্য রাষ্ট্রগুলোকে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে চাইবে। যাই হোক, বিএনপি এ মুহূর্তের শান্তিপূর্ণ অবস্থাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো যাতে কাজে লাগাতে পারে তার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। বিএনপি যদি এখনই বড় ধরনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কযুক্ত রাষ্ট্রগুলো তাদের কাম্য ভূমিকা পালনে অস্বস্তি ও অসুবিধা বোধ করত। বিএনপির এই মুহূর্তের কৌশল হল, দেশের ভেতরে ও বাইরের জনমতকে নিজের পক্ষে আরও অনুকূল করে তোলা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুনকে জানিয়েছেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে বিরোধীয় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সংসদের অধিবেশন যেভাবে পরিচালিত হয় সেখানে এ ধরনের বিরোধীয় বিষয় নিয়ে গঠনমূলক কিছু হওয়া সম্ভব নয়। শুধু কথার পিঠে কথাই হবে। তিক্ততা বাড়বে। এছাড়া সমস্যার ফয়সালা করতে হলে সংবিধান সংশোধনের জন্য সরকারি দলকেই বিল আনতে হবে। কারণ সরকারি দলেরই রয়েছে বিল পাস করার মতো নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। বিলটি কী হবে সে ব্যাপারে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাপ-আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে। এটি হতে হবে একান্ত আলোচনার মাধ্যমে। উভয় পক্ষ বিভিন্ন ফর্মুলা দিতে পারে। এমনকি দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও তাদের পরামর্শ দিতে পারেন। এর ফলে উভয় পক্ষের জন্যই ফর্মুলা বাছাই করার চৌহদ্দি অনেক বিস্তৃত হবে। আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকলে কোনো একটি ফর্মুলা উভয়ের জন্যই সম্মানজনক সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এদিকে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচনের কথা বলেছেন। ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে অনেক কথা বললেও দেশের রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। এই প্রথম তিনি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে মুখ খুললেন। মিসরের নোবেলজয়ী এল বারাদি যদি তার দেশের বিষয়ে কথা বলতে পারেন কিংবা ইরানের শিরিন এবাদি যদি তার দেশ নিয়ে অভিমত ব্যক্ত করতে পারেন, তাহলে ড. ইউনূস কেন পারবেন না? তিনিও তো এ দেশেরই একজন নাগরিক। তার ১৬ আনা নাগরিক অধিকার রয়েছে দেশ সম্পর্কে কথা বলার। ড. ইউনূসের বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দারুণ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। এর ফলে সহনশীলতার অভাবই পরিলক্ষিত হয়েছে। ড. কামাল হোসেন বলতে চেয়েছেন, ‘যিনি রেফারি তিনিই আবার খেলোয়াড়, এটা কেমন কথা?’
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, দেশের ভেতরে ও বাইরে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন ব্যবস্থাধীনে হবে সে ব্যাপারে একটা সহমতের ধারা গড়ে উঠছে। এটি একটি শুভ লক্ষণ। এর ফলে রক্তপাত পরিহারের সম্ভাবনা জোরদার হচ্ছে। সবার যদি সুমতি হয়, যদি এটি রক্তপাতহীন সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাহলে তা হবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি বড় পাওয়া। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

মানুষ আর পশুর অসাধারণ ভালোবাসা

মানুষ আর পশুর অসাধারণ ভালোবাসা