Wednesday, September 17, 2025

গাজায় এবার স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল, নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চলছে

গাজা নগরী দখলের লক্ষ্যে স্থল আক্রমণের আগে ইসরায়েলি সেনারা কয়েক লাখ ফিলিস্তিনিকে শহর খালি করার নির্দেশ দেয়
গাজা নগরী দখলের লক্ষ্যে স্থল আক্রমণের আগে ইসরায়েলি সেনারা কয়েক লাখ ফিলিস্তিনিকে শহর খালি করার নির্দেশ দেয়। ছবি: রয়টার্স। গাজায় ইসরায়েল জাতিগত নিধন চালাচ্ছে বলে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পর গাজা নগরীতে স্থল অভিযান শুরু করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ভোরে ইসরায়েলি দুই কর্মকর্তা সিএনএনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জাতিসংঘ এই প্রথম বলেছে, গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নিধন চালাচ্ছে ইসরায়েল। আজ মঙ্গলবার জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন ৭২ পাতার একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গাজা নগরী দখল ও এর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে একটি পরিকল্পনা গত মাসে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। দেশটির যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভায় ওই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। গাজা নগরীকে হামাসের সর্বশেষ ঘাঁটি বলে বিবেচনা করে ইসরায়েল। হামাসকে পরাজিত করে গাজা নগরীর সম্পূর্ণ দখল নিতে এবার শহরের উপকণ্ঠে স্থল অভিযান শুরু হয়েছে ইসরায়েল, গত সপ্তাহ থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে নির্বিচারে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে চালাচ্ছিল। তাদের হামলার প্রধান নিশানা গাজা নগরীর সুউচ্চ ভবনগুলো। ইহুদি রাষ্ট্রটির এক কর্মকর্তা বলেন, শুরুতে ধাপে ধাপে এবং পর্যায়ক্রমে স্থল অভিযান চলবে।
ইসরায়েল ১৪ সেপ্টেম্বর বিমান হামলা চালিয়ে গাজা নগরীর একটি বহুতল ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। গৃহহীন ফিলিস্তিনিরা ওই ভবনে আশ্রয় নিয়েছিল
ইসরায়েল ১৪ সেপ্টেম্বর বিমান হামলা চালিয়ে গাজা নগরীর একটি বহুতল ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। গৃহহীন ফিলিস্তিনিরা ওই ভবনে আশ্রয় নিয়েছিল ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলি মন্ত্রীর দম্ভোক্তি: গাজা জ্বলছে
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ মঙ্গলবার দম্ভোক্তি করে বলেন, ‘গাজা জ্বলছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সন্ত্রাসী অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে এবং জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত ও হামাসকে পরাজিত করতে কাজ করছে।’ শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো খালি করে ফেলার পর গাজা নগরীতে ইসরায়েলি বাহিনীর স্থল অভিযান শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত শহরের খুব কম এলাকা খালি করা সম্ভব হয়েছে। গত মাসে জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, গাজা নগরীতে স্থল অভিযানের যে পরিকল্পনা ইসরায়েল করছে, তাতে সেখানে বসবাস করা ১০ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। গতকাল সোমবার একজন ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ২০ হাজার ফিলিস্তিনি গাজা নগরী থেকে পালিয়ে গেছেন।

ঐতিহাসিক বৃটেন সফরে ট্রাম্প

জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় আতিথেয়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বুধবার বৃটেন সফর শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে লন্ডনে এটি তার দ্বিতীয় সফর। ট্রাম্পের এই সফর ঐতিহাসিক সফর বলে অভিহিত করেছে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সফরকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বৃটেন সরকার। কেননা, দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমটি। এদিকে এই সফরে প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগের ঘোষণা এবং দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

রয়টার্স বলছে, লন্ডনের অদূরে অবস্থিত বার্কশায়ার কাউন্টিতে অবস্থিত উইন্ডসর প্রাসাদে যান ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া। এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম সচল দুর্গ। প্রায় ১০০০ বছর ধরে এটি বৃটিশ রাজপরিবারের বাসস্থান। ট্রাম্পকে বরণ করতে এখানে রাজকীয় লাল গালিচা সংবর্ধনা, ঘোড়ায় টানা গাড়ির শোভাযাত্রা, বন্দুক স্যালুট, সামরিক বাহিনীর ফ্লাইপাস্ট এবং এক রাজকীয় ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছে। বৃটিশ সরকার জানিয়েছে, এটি জীবন্ত ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক আনুষ্ঠানিকতা।

ট্রাম্প নিজেকে ‘রাজতন্ত্র-অনুরাগী’ হিসেবে পরিচয় দেন। প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নন, বরং প্রথম কোনো নির্বাচিত রাজনীতিবিদ হিসেবে দুইবার বৃটিশ সম্রাটের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে বৃটেন গিয়েছেন ট্রাম্প। যা নিয়ে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত। বৃটেনে পৌঁছানোর পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিনি বৃটেনকে ভালোবাসেন।  কেননা, এটি তার কাছে বিশেষ একটি জায়গা।
বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার ট্রাম্পের এই ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বিশেষ সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে চাইছেন। তার সরকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা, শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, শুল্ক নিয়ে আলোচনা এবং ইউক্রেন ও ইসরাইল ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে। ইতিমধ্যে এই সফরের ফলস্বরূপ দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন প্রযুক্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, গুগল এবং ওপেনএআই-এর মতো সংস্থাগুলো আগামী কয়েক বছরে বৃটেনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং বেসামরিক পারমাণবিক শক্তিতে ৩১ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

শুল্ক নিয়ে আরও অগ্রগতির আশা করছেন স্টারমার। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, বাণিজ্যিক আলোচনার ওপর জোর দেবেন তিনি। কেননা, এর মাধ্যমে বৃটেন চুক্তিগুলো আরও পরিমার্জন করার চেষ্টা করবে। তিনি আরও বলেন, তারা (বৃটেন) আরও ভালো চুক্তি পেতে চায়, তাই আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলবো। কিন্তু স্টারমার যতই রাজকীয় আকর্ষণ ব্যবহার করে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করুন না কেন, তার সামনে বেশ কিছু বিপদ আছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প বৃটেনে খুব অজনপ্রিয়। স্টারমার নিজেও তার নিজের সমর্থন এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে চাপের মুখে আছেন। তাই তাকে দেখাতে হবে যে, রাজকীয় এই কৌশল ফলপ্রসূ হচ্ছে।

প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইন সম্পর্কিত অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। গত সপ্তাহে স্টারমার এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে পিটার ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বৃটেনের রাষ্ট্রদূত পদ থেকে সরিয়ে দেন। এটি স্টারমার এবং ট্রাম্পÑ উভয়ের জন্যই প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।

উইন্ডসরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, মঙ্গলবার সেখানে বিক্ষোভ হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভ থেকে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছেন তারা। উইন্ডসর দুর্গের একটি টাওয়ারে ট্রাম্পের পাশে এপস্টাইনের ছবি প্রদর্শন করেছে বিক্ষোভকারীরা। যদিও সে সময় ট্রাম্প উইন্ডসরে ছিলেন না।

এদিকে বুধবারও লন্ডনে ট্রাম্পবিরোধী বৃহৎ বিক্ষোভ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যার জন্য ১৬০০ পুলিশ অফিসার মোতায়েন করা হয়েছে। এই সফর নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ ট্রাম্পের সফরে ক্ষুব্ধ, আবার কেউ এটিকে স্মার্ট রাজনীতি এবং বৃটেনের জন্য ভালো মনে করছেন।

mzamin

দ্য প্রিন্টের নিবন্ধ: ভারত জানিয়ে দিল, নেপাল নীতিতে ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেয়া হয়েছে by ঋষি গুপ্ত

ভারত কবে শেষবার প্রকাশ্যে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেছে? সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কসংক্রান্ত বিরোধও গিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি কোনো মন্তব্য ছাড়া-  কেবল কৃষকের অধিকার রক্ষার প্রসঙ্গ বাদ দিলে। তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটল। মণিপুরে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকিকে অভিনন্দন জানালেন এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য শুভেচ্ছা জানালেন। মোদি তার বক্তব্যে কারকিকে নেপালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান এবং একে নারীর ক্ষমতায়নের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত বলে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেন যে কারকি নেপালে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবেন।

দুই প্রতিবেশী দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বন্ধনের প্রেক্ষাপটে মোদির এই বার্তাটি ছিল গঠনমূলক। বিশেষত যখন নেপাল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ‘ওল্ডিগার্কি’- বৃদ্ধ নেতৃত্বের শাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে।

কেন মোদি নেপালের প্রসঙ্গ তুললেন?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মোদির এক্স পোস্টের মাধ্যমে বার্তা ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল। তাহলে কেন মণিপুরের জনসভায় মোদি নেপালের কথা বললেন? এর উত্তর নিহিত রয়েছে নেপালের জেনারেশন জেডের (জেন-জি) ভূমিকায়। তারাই ‘ওল্ডিগার্কি’র অবসান ঘটিয়ে কারকির নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নয়াদিল্লি বুঝে গেছে, নেপাল নীতিতে এখন নতুন সূচনা প্রয়োজন। এতদিন ভারত মূলত নেপালের ঐতিহ্যবাহী দল ও বৃদ্ধ নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের সমালোচনা ছিল যে নয়াদিল্লি প্রতিবেশী দেশগুলোতে বহুমুখী সংযোগ গড়ে তোলেনি। তার নির্দিষ্ট প্রিয়পাত্র- বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও নেপালে শের বাহাদুর দেউবার নেপালি কংগ্রেস। কিন্তু সঙ্কট বা রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় নতুন নেতৃত্বকে সঙ্গে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ত। এখানেই ভারত নীতি পরিবর্তন করছে। মোদি তার বক্তব্যে নেপালের তরুণদের প্রশংসা করেন, যারা অস্থির সময়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, তরুণরা ৮-৯ সেপ্টেম্বরের আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত শহর পরিষ্কার করেছে এবং ভবনগুলো সাদা রঙে রাঙিয়েছে। এভাবেই ভারত জানিয়ে দিল, নেপাল নীতিতে ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেয়া হয়েছে এবং তরুণ নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে সম্পৃক্ত হওয়া হবে।

নতুন প্রজন্ম ও ভারতের চ্যালেঞ্জ
জেন জি ইতিহাসের বোঝা বহন করে না। তারা বাস্তববাদীভাবে বিদেশনীতি চালাবে এবং সুযোগ ও অর্থনৈতিক সুবিধা যেখান থেকে আসবে সেখানে ঝুঁকবে। ভারতের উচিত তাদের স্বাভাবিক পছন্দ হওয়া, কারণ ভারত নেপালের উন্নয়নে বড় অংশীদার, তৃতীয় দেশের বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং সংকটে (যেমন ২০১৫ সালের ভূমিকম্প) প্রথম সাড়া দিয়েছে। তবে তরুণ প্রজন্ম ভারতের সঙ্গে ২০১৫ সালের কথিত সীমান্ত অবরোধ ও ২০২০ সালের লিপুলেখ-কালাপানি বিরোধ দেখেছে। ঐতিহ্যবাহী দলগুলো এসব ইস্যুকে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে ভোটের কাজে লাগিয়েছে। তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব নিয়ে আরও সরব হতে পারে। হ্যাশট্যাগ ব্যাক অব ইন্ডিয়া এবং হ্যাশট্যাগ গো ব্যাক ইন্ডিয়া ট্রেন্ডে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণই তার প্রমাণ।

চীনের প্রভাব
চীন গত এক দশকে নেপালি তরুণদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে শিক্ষা বৃত্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ইত্যাদির মাধ্যমে। সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে নেপালি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। তরুণদের একাংশ মনে করে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নেপালের উন্নয়নের সুযোগ। চীন আপাতত চুপচাপ থাকলেও, তরুণ নেতৃত্বাধীন নেপালকে স্বাগত জানাতে পিছপা হবে না। ভৌগোলিকভাবে নেপালকে চীন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশেরদ্বার হিসেবে দেখে।

নেপালে জেন জি যখন মূলধারার ভূমিকায় আসছে, ভারত দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে ইতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে। তরুণদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়ে নয়াদিল্লি স্পষ্ট করছে যে নেপাল নীতিতে পুনর্গঠন ঘটেছে এবং তরুণদের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততা এখন অপরিহার্য।

mzamin

চিন্ডিয়ার চেতনা জেগে উঠছে, টিকবে তো? by শশী থারুর

আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে অনেক সময় উচ্চকণ্ঠ ঘোষণার চেয়ে নীরব পরিবর্তনের ইঙ্গিতগুলো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই বিবেচনায় বলা যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক বেইজিং সফর (সাত বছরের মধ্যে প্রথম) এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক কোনো যুগান্তকারী সাফল্য না আনলেও এর তাৎপর্য মোটেও ছোট নয়। এই সফর আসলে দ্বন্দ্ব থেকে সংলাপে ফেরার এক সচেতন পদক্ষেপ।

পাঁচ বছর আগে গালওয়ান উপত্যকায় ২০ জন ভারতীয় সেনার প্রাণহানি দুই দেশের সম্পর্ককে গভীর সংকটে ফেলেছিল। অমীমাংসিত ও অস্থির সীমান্ত হয়ে উঠেছিল বৃহত্তর কূটনৈতিক অচলাবস্থার প্রতীক। ওই ঘটনার পর বাণিজ্য ধীর হয়ে যায়, বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয় আর এশীয় সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি বহনকারী সেই আশাবাদী শব্দবন্ধ—‘চিন্ডিয়া’ সন্দেহ আর অবিশ্বাসের কাছে হার মানে। কিন্তু আজ আবার সম্পর্ক পুনর্গঠনের যন্ত্র সচল হচ্ছে।

প্রতীকী পরিবর্তনগুলো চোখে পড়ার মতো। ভারতীয় তীর্থযাত্রীরা আবার তিব্বতের হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম–সম্পর্কিত পবিত্র স্থানে যাচ্ছেন। সরাসরি ফ্লাইট চালু হচ্ছে। ভিসা শর্ত সহজ হচ্ছে। বিতর্কিত সীমান্তে টহলদারি আবার শুরু হয়েছে। দুই দেশ এখন উচ্চপর্যায়ের নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে বরফ গলানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব পদক্ষেপ ছোট মনে হলেও আসলে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো প্রমাণ করে—দুই দেশই অতীতের দোষারোপ পেছনে ফেলে সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাতে চায়।

ভারত-চীন সম্পর্কের ইতিহাস অনেক পুরোনো; প্রায় দুই হাজার বছরের। তখনকার ‘গোল্ডেন রুট’ আর সিল্ক রুট শুধু রেশম, মসলা ও রত্নপাথরের বাণিজ্যের পথই ছিল না; বরং ছিল গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আদান-প্রদানের সেতু। ভারতবর্ষে জন্ম নেওয়া বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়ে চীনে, ভিক্ষু ও পণ্ডিতদের যাত্রার মাধ্যমে। প্রাচীন ভারতীয় অর্থশাস্ত্রে চীনা দ্রব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। চীনা শিক্ষার্থীরা পড়তে যেতেন নালন্দায়। ভারতীয় ভিক্ষু বোধিধর্মা মার্শাল আর্টকে নিয়ে যান চীনের বিখ্যাত শাওলিন মন্দিরে।

২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আবারও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসনের ছায়া থেকে বেরিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পর ভারত চীনকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম অ-কমিউনিস্ট দেশগুলোর একটি হয়। ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে বিজ্ঞান, শিক্ষা ও কূটনীতিতে দুই দেশের প্রাণবন্ত আদান-প্রদান শুরু হয়। তারা অংশ নেয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বড় আয়োজনগুলোতেও—১৯৪৭ সালের এশিয়ান রিলেশন্স কনফারেন্সে ও ১৯৫৫ সালের বান্দুং কনফারেন্সে।

এসব ক্ষেত্রে জওহরলাল নেহরুর ভারত বিশ্বের সামনে কমিউনিস্ট চীনকে তুলে ধরে। যদিও পরবর্তী সময়ে সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়, তবু এই যুগ পারস্পরিক সম্মান আর ‘হিন্দি-চীনি ভাই ভাই’-এর আশাবাদ দিয়ে চিহ্নিত। এর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে সেই ভিত্তি, যেখানে আজও পুরোনো বন্ধন আর নতুন আকাঙ্ক্ষার ভারসাম্য খোঁজা হয়। মোদি-সি বৈঠকের মূল বার্তা ছিল সহজ—ভারত ও চীন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, উন্নয়নের সহযোগীও হতে পারে। ‘পার্থক্য যেন বিরোধে রূপ না নেয়’—এ কথা নিছক কূটনৈতিক স্লোগান নয়, বরং সচেতন প্রয়াস।

২০২০ সালের পর থেকে যখন চারদিকে শোনা যাচ্ছিল ‘হিন্দি-চীনি বাই বাই’, তখন এই নতুন অবস্থানকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে, যখন হঠাৎ বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয় আর জোটের সমীকরণ দ্রুত পাল্টে যায়, তখন এমন স্পষ্টতা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। তবে এই নতুন বোঝাপড়ার ওপরে ভেসে বেড়াচ্ছে আমেরিকার শুল্কনীতির কালো ছায়া। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন। এটি ১৪৫ শতাংশে তোলার হুমকিও তিনি দিয়েছেন। ভারতীয় রপ্তানির ওপরও ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়েছে। এতে নয়াদিল্লি নতুন করে কৌশল ভেবে দেখতে বাধ্য হয়েছে।

যে ভারত একসময় আমেরিকার কাছে মূল্যবান অংশীদার ছিল, আজ ওয়াশিংটনের কট্টর বাণিজ্যপন্থীদের চোখে সেই ভারত হয়ে উঠেছে ‘ক্রেমলিনের টাকা সাদা করার আস্তানা’। এর প্রভাব মারাত্মক। এতে ভারতের রপ্তানি কমেছে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে, চাকরি গেছে এবং আরও নানা দিক থেকে ঝুঁকিতে আছে। অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি ভেস্তে গেছে।

ভারতীয় পণ্য কেনা, ভারতে দ্রুত বিনিয়োগ করা আর ভারতকে আমেরিকার ধমকানি দেওয়ার প্রকাশ্য সমালোচনা করে চীন যে ভারতকে কাছে টানার চেষ্টা করছে, তার পেছনে শুধু সুযোগ বুঝে স্বার্থ উদ্ধার করার মানসিকতা দেখলে হবে না; এর ভেতর একটা বড় সত্যি আছে। সেটি হলো এশিয়ার এই বড় দুই দেশ বুঝে ফেলেছে, আজকের এই বহুমাত্রিক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে তাদের একে অপরকে পাশে পাওয়া দরকার।

এ কারণেই ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা এখন আর কেবল ফাঁকা বুলি নয়; বরং এটা দুই দেশের জন্য বাস্তবিকভাবে বাঁচার পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে বাস্তবতাকেও অস্বীকার করা যায় না। দুই দেশের সীমান্ত এখনো বারুদের স্তূপ হয়ে আছে। ২০২০ সালের এপ্রিলের আগের পরিস্থিতিতে ফিরতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। চীনের সঙ্গে ভারতের বিশাল বাণিজ্যঘাটতি রয়ে গেছে। উপরন্তু ভারতীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে চীনের নানা অশুল্ক–বাধা সেই বাণিজ্যঘাটতিকে আরও বাড়িয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কে যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসমতা রয়েছে, তা সহজে মুছে যাবে না।

এ বাস্তবতার এক সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো ফক্সকনের কারখানা থেকে ৩০০ জনের বেশি চীনা প্রকৌশলীর চলে যাওয়া। তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে আইফোন ১৭ তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই কারখানা।

ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, চাইলে বেইজিং কতটা সহজে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। চীন বিরল খনিজ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে তার আধিপত্য কাজে লাগিয়ে ভারতের জন্য এসব খনিজ ও চুম্বক (যা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইলেকট্রনিকসের জন্য অপরিহার্য) রপ্তানি সীমিত করেছে। শুধু তা–ই নয়, ইলেকট্রনিকস অ্যাসেম্বলির যন্ত্রপাতি, ভারী টানেল বোরিং মেশিন, সৌর সরঞ্জামসহ উচ্চমানের বহু পুঁজিসামগ্রী রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে চীন। এসব ভারতের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাই আসল পরীক্ষা লুকিয়ে আছে শীর্ষ বৈঠকের প্রতীকী অঙ্গভঙ্গিতে নয়। আসল পরীক্ষা লুকিয়ে আছে দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার বাস্তবতায়।

এখনো আশার আলো আছে। ভারত আর চীন আবার বসে কথা বলা শুরু করেছে, মানুষের মধ্যে যোগাযোগও ফিরিয়ে আনছে আর আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোয় একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে। এর মানে, তারা একে অপরকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে না, বরং সমস্যার সমাধান খুঁজতে আলোচনার সঙ্গী হিসেবেও ভাবছে।

আজকের দুনিয়ায় প্রতিযোগিতা এমনভাবে চলছে যে একজনের লাভ মানেই আরেকজনের ক্ষতি—মানে একেবারে শূন্য-সাম্যের খেলা। কিন্তু ভারত-চীনের এই বদলানো দৃষ্টিভঙ্গি দেখাচ্ছে, তারা একসঙ্গে জেতার পথ খুঁজছে। তাই এটাকে একধরনের বিজয় বলা যায়।

মনে হচ্ছে, ‘চিন্ডিয়া’র চেতনা আবারও জেগে উঠছে। জেগে উঠছে ধীরে ধীরে। সতর্কভাবে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই। আশা করা যায়, এই চেতনা দীর্ঘস্থায়ী হবে।

* শশী থারুর, ভারতের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান
- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

সাংহাই কো–অপারেশন সম্মেলনে সি চিন পিং ও নরেন্দ্র মোদি
সাংহাই কো–অপারেশন সম্মেলনে সি চিন পিং ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স

পুতিনের সঙ্গে বসে ট্রাম্প যে ভুল করলেন by টিমোথি স্নাইডার

প্রাচীনকালে মানুষ ‘আলটিমা থুলে’ নামের একটি কল্পিত জায়গার কথা বলত। কল্পলোকের সেই জায়গা ছিল পৃথিবীর একেবারে উত্তর প্রান্তে। পৃথিবীর একেবারে শেষ সীমায়।

আলাস্কায় গিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখা করলেন, তখন মনে হচ্ছিল, ট্রাম্প তাঁর নিজের পররাষ্ট্রনীতির আর্কটিক স্বপ্নরাজ্যের সীমান্তে থাকা কল্পলোকের ‘আলটিমা থুলে’-তে পৌঁছে গেছেন।

ট্রাম্প ভেবেছিলেন, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি আর অহমিকাভরা হুমকি দিয়ে তিনি আমেরিকানদের যেভাবে বশ মানাতে পারেন, বিদেশি সব নেতাকেও একইভাবে সামলাতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব কল্পকাহিনি আমেরিকার বাইরে কাজ করে না।

আদতে ‘সুন্দর ভবিষ্যতের’ ফাঁপা কথা শুনে কোনো স্বৈরশাসক থেমে যায় না। কারণ, সে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে অপরাধ করেই এগোতে চায়। আর যারা যুদ্ধ ও হামলার শিকার, যারা নিজেদের জমি–সম্পদ রক্ষা করছে ও পরিবারকে আগ্রাসন থেকে বাঁচাচ্ছে, যাদের শিশুদের অপহরণ করা হচ্ছে, যে সাধারণ মানুষকে মারা ও নির্যাতন করা হচ্ছে, তাদের কাছে এসব মিষ্টি কথা কোনো কাজে আসে না।

পুতিনের কাছে ট্রাম্পের কথিত ‘সুন্দর ভবিষ্যৎ’-এর কোনো মূল্য নেই। তাঁর নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট—ইউক্রেনে এক পুতুল সরকার বসানো, ভয়ভীতি দিয়ে মানুষকে চুপ করানো, দেশপ্রেমিকদের গণকবর দেওয়া, আর ইউক্রেনের সম্পদ রাশিয়ার কবজায় নেওয়া।

ট্রাম্প মনে করেন, তাঁর হুমকি বিদেশেও কাজ করে, কিন্তু আসলে তা হয় না। এটা ঠিক, অনেক আমেরিকান তাঁকে ভয় পায়। তিনি নিজের দলে যাদের পছন্দ নয়, তাদের সরিয়ে দিয়েছেন, আর ভয় দেখিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এমনকি তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীকে পুলিশের মতো ব্যবহার করেছেন। এ কাজ তিনি প্রথমে করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ায়, তারপর ওয়াশিংটন ডিসিতে।

বিদেশি শত্রুরা ট্রাম্পের এসব কাজকে আমেরিকানদের মতো ভয় বা আতঙ্কের চোখে দেখে না। যেসব ব্যাপার আমেরিকানদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়, সেগুলো দেখে বরং আমেরিকার শত্রুরা মজা পায়। যেমন মস্কো (রাশিয়ার দিক থেকে) মনে করে, আমেরিকার ভেতরে সেনা নামানো আসলে শক্তি নয়, বরং দুর্বলতার চিহ্ন।

আমেরিকায় ট্রাম্পের বড় বড় কথা অনেকের কাছে দারুণ শোনালেও বাস্তবে তা শুধু ফাঁপা কথা, কাজ নয়। আমেরিকানরা অনেক সময় কথা আর কাজকে এক মনে করে। কিন্তু রাশিয়ার নেতারা এসবকে আসল শক্তি ভাবেন না; বরং এসব কথাকে তাঁরা আমেরিকার দুর্বল বৈদেশিক নীতি লুকানোর চেষ্টা মনে করেন।

ট্রাম্প রাশিয়াকে বড় বড় ছাড় দিয়েছেন, অথচ বিনিময়ে কিছুই পাননি। বরং রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে আর তাদের সরকারি টিভিতে ট্রাম্পকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছে।

ট্রাম্প আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেই রাশিয়ার জন্য বড় ছাড় দিলেন। এর মাধ্যমে তিনি ক্রেমলিনের ওপর পশ্চিমাদের তিন বছরের বেশি সময়ের কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেন। ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ট্রাম্প আসলে এই বার্তাই দিলেন, ইউক্রেনে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন আর শিশু অপহরণের মতো অপরাধগুলো তাঁর কাছে কোনো ব্যাপার নয়।

আলাস্কাকে বৈঠকের জায়গা হিসেবে ঠিক করাটাও ছিল রাশিয়ার জন্য একধরনের ছাড়, আর সেটা বেশ অদ্ভুতও। কারণ, রাশিয়ানরা, বিশেষ করে তাদের সরকারি মিডিয়ার বড় বড় লোকজন প্রায়ই আলাস্কাকে রাশিয়ার ভূখণ্ড বলে দাবি করে থাকেন। এরপরও ট্রাম্প আলাস্কায় অবস্থিত আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে এ ধরনের লোকদের আমন্ত্রণ করলেন।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যুদ্ধের শুরুটা করেছে যে রাশিয়া, ট্রাম্প সেই রাশিয়াকে ডাকলেন, কিন্তু যাদের দেশ আক্রান্ত হয়েছে, সেই ইউক্রেনের কাউকে একেবারেই ডাকলেন না। এ ঘটনাকে ট্রাম্পের পুরোপুরি ‘আলটিমা থুলে’ বা কল্পনার জগতে চলে যাওয়া বলা যেতে পারে।

এর চেয়েও গুরুতর ছাড় ট্রাম্প আগেই দিয়ে ফেলেছেন। তিনি কখনোই রুশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কথা বলেন না; রাশিয়ার যে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত, তা নিয়েও তিনি কথা বলেন না।

উল্টো ট্রাম্প স্বীকার করেন, ন্যাটো সদস্যপদ প্রশ্নে ইউক্রেন আর আমেরিকার বৈদেশিক নীতি রাশিয়া ঠিক করবে। এমনকি তিনি মানতে রাজি যে রাশিয়ার আক্রমণ শুধু মাঠের বাস্তবতায় নয়, আইনিভাবেও এই যুদ্ধ সীমান্ত পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

যদি রাশিয়ার আক্রমণকে বৈধভাবে সীমান্তবদলের উপায় হিসেবে ধরা হয়, তাহলে গোটা বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে যাবে। আবার যদি রাশিয়াকে অন্য দেশের বৈদেশিক নীতি ঠিক করার অধিকার দেওয়া হয়, তবে সেটা রাশিয়ার মতো দেশকে আরও আগ্রাসী হতে উৎসাহিত করবে। আর যুদ্ধাপরাধের জন্য যে স্বাভাবিক শাস্তি বা প্রতিকার হওয়া উচিত (যেমন ক্ষতিপূরণ দেওয়া বা অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা), তা যদি না করা হয়, তাহলে সারা বিশ্বে যেন যুদ্ধ করা বৈধ হয়ে যাবে।

ট্রাম্প বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু আসলে তাঁর হাতে তেমন ক্ষমতা নেই। তিনি মনে করেন, শুধু কথায় সমস্যার সমাধান হবে। এ কারণে তিনি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে পুতিন যা বলেন, সেটাই শেষ কথা হয়ে যায়। তাই ট্রাম্পকে আলাস্কা পর্যন্ত গিয়ে শুধু ‘শোনার ভান’ করতে হয়েছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনে বারবার দেখা গেছে, তিনি পুতিনের কথা শোনেন, তারপর আবার সে কথাই বলেন।

ট্রাম্প আর পুতিন দুজনই ভবিষ্যতে খুব বড় নেতা হিসেবে স্মরণীয় থাকতে চান। পুতিন বিশ্বাস করেন, যুদ্ধের মাধ্যমেই সেটা সম্ভব, আর মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করাও তাঁর পরিকল্পনার অংশ। অন্যদিকে ট্রাম্প ভাবেন, যদি তাঁর নাম শান্তির সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তবে তাঁর উত্তরাধিকার গড়ে উঠবে। কিন্তু নীতি বানাতে তিনি নিজে সক্রিয় নন; তাই শেষ পর্যন্ত তিনি পুতিনের নিয়ন্ত্রণে চলে যান।

আর যখন ট্রাম্প রাশিয়ার কথা হুবহু বলে দেন, তখন পুতিন যুদ্ধ থামাতে আরও নিরুৎসাহিত হন। তাঁকে তখন কোনো অস্পষ্ট ‘সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন’ দিয়েও ফাঁদে ফেলা যায় না। কারণ, তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট—ইউক্রেনকে ধ্বংস করা।

আলাস্কায় এসে ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত ‘আলটিমা থুলে’তে পৌঁছালেন। তিনি তাঁর কল্পনার দুনিয়ার শেষ সীমায় চলে গেলেন। সেখানে তাঁর সামনে ছিল খুব সহজ একটি প্রশ্ন—পুতিন কি ট্রাম্পের দাবিমতো নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি মেনে নেবেন?

পুতিন আলাস্কাতেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি যুদ্ধবিরতি মানবেন না। এর পাশাপাশি রাশিয়া ট্রাম্পের দাবির উল্টো একটি অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি হলো ইউক্রেনকে এমন কিছু জমি আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার কাছে দিতে হবে, যা রাশিয়ার দখলে নেই; বরং ইউক্রেন সেখানে নিজেদের প্রতিরক্ষা তৈরি করেছে। রাশিয়ার এই প্রস্তাব মেনে নেওয়া হলে রাশিয়া আবার আরও ভালো অবস্থান থেকে আক্রমণ চালাতে পারবে।

পুতিন জানেন, ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার চান। তাই তাঁর চাল হলো—ট্রাম্পকে বলা, যুদ্ধ একদিন শেষ হবে, আর তখন কৃতিত্ব পাবেন ট্রাম্প। শর্ত একটাই, তাঁরা যেন আলাপ চালিয়ে যান। আলাস্কা ছাড়ার আগে পুতিন বলেও ফেললেন, ‘পরেরবার মস্কোয়?’ পুতিন ঠিক করেছেন, তিনি একদিকে আলোচনা চালাবেন, অন্যদিকে ইউক্রেনে বোমা ফেলতেই থাকবেন।

এখন যেহেতু ট্রাম্প রাশিয়ার কাছ থেকে কোনো নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি আনতে পারেননি, তাঁর সামনে দুটি পথ আছে। এক. তিনি কল্পনার দুনিয়ায় পড়ে থাকবেন। দুই. তিনি যুদ্ধকে পুতিনের জন্য কঠিন করবেন, আর এর মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি এগিয়ে আনবেন।

যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত রাশিয়ার প্রতি এসব অদ্ভুত ছাড়কে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ট্রাম্প চাইলে এখনই এক সংবাদ সম্মেলনে সব তুলে নিতে পারেন। আমেরিকার হাতে যুদ্ধের গতিপথ পাল্টানোর জন্য যথেষ্ট নীতি-অস্ত্র আছে; প্রয়োজনে তা ব্যবহারও করা যেতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প তা করবেন বলে মনে হয় না।

ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, পুতিন যদি নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি না মানেন, তবে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ হবে। কিন্তু এগুলো কেবল কথার কথা। এখন আলাস্কায় এসে পরিষ্কার হয়েছে—এটিই তাঁর ‘আলটিমা থুলে’, এটিই তাঁর কল্পনার জগতের সীমান্ত। এখান থেকে ট্রাম্প কোথায় যাবেন?

- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* টিমোথি স্নাইডার, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঙ্ক স্কুল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসির মডার্ন ইউরোপিয়ান হিস্ট্রির চেয়ার।

পুতিনের কাছে ট্রাম্পের কথিত ‘সুন্দর ভবিষ্যৎ’-এর কোনো মূল্য নেই।
পুতিনের কাছে ট্রাম্পের কথিত ‘সুন্দর ভবিষ্যৎ’-এর কোনো মূল্য নেই। ছবি : রয়টার্স

দীর্ঘমেয়াদে ‘একঘরে’ হয়ে পড়তে পারে ইসরায়েল, স্বীকার করলেন নেতানিয়াহু

গাজা উপত্যকায় প্রায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলবিরোধী ক্ষোভ বাড়ছে। এমন অবস্থায় ইসরায়েল দীর্ঘ মেয়াদে কূটনৈতিকভাবে ‘একঘরে’ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল সোমবার তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দেশটি এমন এক ‘বিচ্ছিন্ন’ অবস্থার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, যা বছরের পর বছর স্থায়ী হতে পারে। এমন অবস্থায় ইসরায়েলের স্বনির্ভর হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এ কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েলকে বিদেশি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।

নেতানিয়াহু বলেন, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে যেসব গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে, তার একটি অস্ত্র বাণিজ্য। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল বিদেশি অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হতে পারে।

যুদ্ধবাজ নেতা নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদের অস্ত্রশিল্পকে উন্নত করতে হবে। আমরা হব এথেন্স ও স্পার্টা শহরের মিলিত রূপ। অন্তত আগামী কয়েক বছরের জন্য আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ, ওই সময় আমাদের একঘরে করে দেওয়ার চেষ্টাটা মোকাবিলা করতে হবে।’

নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, গাজায় যুদ্ধ তীব্র করার কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা তিনি স্বীকার করছেন। নেতানিয়াহুর এ ধরনের স্বীকারোক্তির ঘটনা বিরল।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থা সতর্ক করার পরও ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু তাঁর যুদ্ধ কৌশল পাল্টাতে রাজি নন। জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থা সতর্ক করে বলে আসছে, গাজা নগরীর ওপর অব্যাহত হামলার ঘটনা আরও মৃত্যু ও ধ্বংস ডেকে আনবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় জাতিগত নিধনযজ্ঞ (জেনোসাইড) চালানোর অভিযোগ তীব্র হচ্ছে। তবে ইসরায়েল দৃঢ়ভাবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালিসহ আরও কিছু দেশ ইসরায়েলের ওপর আংশিক বা পুরোপুরিভাবে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে ইসরায়েলে আমদানি করা অস্ত্রের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলেও দেশটি এখনো এ ধরনের কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। তারা অন্য দেশগুলোকেও এমনটা না করার ব্যাপারে সতর্ক করেছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদকালে ইসরায়েলের জন্য নির্ধারিত ২০০০ পাউন্ডের একটি বোমার চালান বিলম্বিত করা হয়েছিল। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন দ্রুত এর অনুমোদন দেয়।

ইসরায়েলের সাধারণ মানুষ, জিম্মিদের পরিবার, এমনকি দেশটির সেনাবাহিনীও যুদ্ধ আরও জোরদার করার বিপক্ষে মত দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে জিম্মিদের জীবন আরও ঝুঁকিতে পড়বে এবং মানবিক বিপর্যয় বেড়ে যাবে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অনড় রয়েছেন।

বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা হতো। এর বড় কারণ তাদের হাইটেক শিল্প। তবে গাজায় চলমান যুদ্ধ ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এটি এখন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ।

যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর মতে, ইসরায়েলের এই বিচ্ছিন্নতার জন্য আংশিকভাবে একটি ‘চরম ইসলামপন্থী এজেন্ডা’ দায়ী, যা ইউরোপের পররাষ্ট্রনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এই উগ্র ইহুদি নেতা আরও অভিযোগ করেন, কাতারসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্য দিয়ে বিশ্বজনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। এতে ইসরায়েল কূটনৈতিকভাবে একধরনের বিচ্ছিন্ন অবস্থার মধ্যে পড়ছে।

গাজায় জাতিগত নিধনের প্রধান অভিযুক্ত নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে এবং অস্ত্র ও অস্ত্রের যন্ত্রাংশ আমদানিতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।’

ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ নেতানিয়াহুর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। ইসরায়েল বিচ্ছিন্নতার দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করায় নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলেছেন লাপিদ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লাপিদ লেখেন, ‘বিচ্ছিন্নতা কোনো নিয়তি নয়, এটি নেতানিয়াহুর ত্রুটিপূর্ণ ও ব্যর্থ নীতির ফল।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-16%2Fw6q4vz17%2FNetanyahu.jpg?rect=0%2C0%2C952%2C635&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। রয়টার্স ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্য সংকট: হামাসমুক্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে ভোট

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অধিকাংশ সদস্যদেশ। এই প্রস্তাবকে ‘নিউইয়র্ক ঘোষণা’ বলা হচ্ছে। প্রস্তাবে ফিলিস্তিন–ইসরায়েল দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রচেষ্টায় তৎপরতা আনার কথা বলা হয়েছে। এ–ও বলা হয়েছে যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে, সেখানে হামাসের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকবে না।

কাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এ ভোটাভুটি হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে সাধারণ পরিষদের ১৪২টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে মাত্র ১০টি দেশ। তাদের মধ্যে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে। ভোটদানে বিরত ছিল ১২টি দেশ। সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল ফ্রান্স ও সৌদি আরব।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন থেকে গাজায় নৃশংস হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার নিন্দা না জানানোর জন্য জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছে ইসরায়েল। তবে গতকাল উত্থাপন করা প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে হামাসের নিন্দা জানানো হয় এবং অস্ত্রসমর্পণ করতে বলা হয়।

নিউইয়র্ক ঘোষণার প্রতি এরই মধ্যে সমর্থন দিয়েছে আরব লিগ। গত জুলাইয়ে আরব দেশসহ জাতিসংঘের ১৭টি সদস্যদেশ এতে সই করেছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গাজা সংঘাত বন্ধ করতে হবে। এ জন্য হামাসকে অবশ্যই উপত্যকাটির শাসন থেকে সরে যেতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) কাছে সমর্পণ করতে হবে।

এই ভোটাভুটি এমন সময় অনুষ্ঠিত হলো যখন চলতি মাসের ২২ তারিখে রিয়াদ ও প্যারিসের সভাপতিত্বে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। সেখানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বর্তমানে সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৪৯টি দেশই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়।

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ পরিষদের সমর্থনকে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোর্সটেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, নিউইয়র্ক ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করছে ইসরায়েল। সাধারণ পরিষদ ‘বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক রাজনৈতিক সার্কাসে পরিণত হয়েছে’।

তবে এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন আল–শেখ। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, সেটিকে আমি স্বাগত জানাই। এর মাধ্যমে আমাদের মানুষের অধিকারের সমর্থনে আন্তর্জাতিক আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।’

এমন এক সময় প্রস্তাবটি গৃহীত হলো যখন গাজায় নৃশংস হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গত মাস থেকে সেখানকার সবচেয়ে বড় শহর এলাকা গাজা নগরী দখলের উদ্দেশ্যে তীব্র হামলা চালাচ্ছে তারা। এর জেরে সেখান থেকে লাখ লাখ মানুষ পালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গত ২৩ মাসে গাজায় ৬৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল।
‘কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র থাকবে না’

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি বাড়াতে চান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে একটি চুক্তিতে সই করেছেন তিনি। চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দখলকৃত পশ্চিম তীর দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

নেতানিয়াহু ওই চুক্তিতে সই করেন গত বৃহস্পতিবার, মালে আদুমিম বসতি এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে। এলাকাটি জেরুজালেমের পূর্বে অবস্থিত। অনুষ্ঠানে দম্ভ প্রকাশ করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র থাকবে না—এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে যাচ্ছি আমরা। এই জায়গা আমাদের।’

ইসরায়েলের নতুন ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নতুন ৩ হাজার ৪০০টি বাড়ি নির্মাণ করা হবে। এর ফলে পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিম তীরের বেশির ভাগ অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফিলিস্তিনিদের কাছে পূর্ব জেরুজালেমের বড় গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে এই এলাকা চান তাঁরা।

১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীরে বসতি গড়ছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক আইনে এই বসতিগুলোকে অবৈধ বিবেচনা করা হয়। বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) মুখপাত্র নাবিল আবু রুদেইনেহ বলেন, এই অঞ্চলে শান্তির জন্য পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহুর নতুন পদক্ষেপের পর দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ‘অনিবার্য’ হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পুরো এলাকাকে ‘নরকের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে উল্লেখ করে নাবিল আবু রুদেইনেহ বলেন, জাতিসংঘের ১৪৯টি সদস্যদেশ এরই মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। যেসব দেশ এখনো স্বীকৃতি দেয়নি, সেগুলোকে দ্রুত এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ইসরায়েলি হুমকির মুখে গাজা নগরী থেকে দক্ষিণ দিকে পালিয়ে যাচ্ছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। গত মাস থেকে শহর এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল গাজা নগরীতে
ইসরায়েলি হুমকির মুখে গাজা নগরী থেকে দক্ষিণ দিকে পালিয়ে যাচ্ছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। গত মাস থেকে শহর এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ১২ সেপ্টেম্বর গাজা নগরীতে ছবি: রয়টার্স

কাতারে ইসরায়েলি হামলা মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ করে দিল by দাউদ কাত্তাব

কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের আলোচকদের ওপর ইসরায়েলের বিমান হামলা কোথা থেকে শুরু হলো এবং যুক্তরাষ্ট্র এ হামলাকে কতটা জানত, তা পরিষ্কার নয়। তবু একটি জিনিস স্পষ্ট, ইসরায়েল এখন এমন এক অবস্থান গ্রহণ করেছে যে দেশটি প্রায় যা ইচ্ছা তা–ই করে ফেলছে।

বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেও সাজার বাইরে থাকার অভ্যাসের কারণে এখন ইসরায়েল কোনো বাধা-শর্ত দেখে কাজ করে না।

এ হামলায় অনেক মানুষ হতাহত হয়েছেন, কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে এবার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মানুষের বিশ্বাস কমে গেছে। ইসরায়েল, যাকে বছরে কোটি কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা দেওয়া হয়, দেশটি এ হামলাকে কোনো লুকোছাপা ছাড়াই উদ্‌যাপন করেছে। এমনকি ইসরায়েলের প্রধান দলের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়ার লাপিদও বিমানবাহিনী, আইডিএফ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘অসাধারণ অভিযান’ বলেই অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ইসরায়েল এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইচ্ছেমতো হামলা চালানোর মতো স্বাধীন হয়ে গেছে, যেন কারও অনুমতি নেওয়ার দরকার নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ক্রমে কমছে। ইরাক আক্রমণের পর থেকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এতটা নিচে নেমে যায়নি বলেই মনে করা হচ্ছিল। দোহা হামলার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ইসরায়েল ঠিক তাঁদেরই টার্গেট করল, যাঁরা দোহায় বসে মার্কিন প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য এসেছিলেন। ফলে আলোচনা ভেঙে গেল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেল।

এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। প্রায় ৭৭ বছর আগে জেরুজালেমে জাতিসংঘের শান্তিদূত সুইডিশ কূটনীতিক ফলকে বর্নাডোটকে ইহুদি উগ্রপন্থীরা হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছিলেন। তখনকার কিছু নেতা-প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইজতজাক শামির, যিনি পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন। তাই শান্তির জন্য যাঁরা এগিয়ে আসেন, তাঁদের ওপর এমন আক্রমণ নতুন কিছু না হলেও তার ক্ষতি সব সময়ই বড় ও ধ্বংসাত্মক।

ফিলিস্তিনিরা বারবার দেখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই ইসরায়েলকে দায়দায়িত্ব থেকে বাঁচিয়ে দেয়। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক (বাইডেন হোক বা ট্রাম্প) তারা ইসরায়েলের বোমা হামলা, সাংবাদিক বা ত্রাণকর্মীদের টার্গেট করা, যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ বা গাজার ওপর অবরোধের ঘটনাগুলোকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করেছে। এমনকি তারা ফিলিস্তিনি কূটনৈতিক কার্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে এবং জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে আমন্ত্রিত ফিলিস্তিনি নেতাদের ভিসাও প্রত্যাখ্যান করেছে। এসবই ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

বাতিল হওয়া ওই মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি মূলত ইসরায়েলের অনুকূলে ছিল। প্রস্তাবটি অনুযায়ী, প্রথম দিনেই বাকি সব ইসরায়েলি বন্দীকে মুক্ত করা হবে এবং বদলে যুক্তরাষ্ট্র লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা ইসরায়েলকে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার ও যুদ্ধ শেষ করাতে চাপ দেবে। কিন্তু স্পষ্ট যে ইসরায়েলের পরিকল্পনা আলাদা ছিল। যাঁরা বন্দীদের মুক্ত করার চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের হত্যা করলে নিজের লোকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায়ই নষ্ট হয়ে যায়।

আরও বড় সমস্যা হলো ইসরায়েলের সেই হত্যানীতি কখনো প্রতিরোধ বন্ধ করতে সক্ষম হয়নি। তারা বারবার হামাসের নেতাদের হত্যা করেছে, কিন্তু তাঁদের বদলে অন্যরা উঠে এসেছেন। অনেক সময় আরও কঠোর ও চরমপন্থী নেতা এসেছেন। ২০২৪ সালে হামাসের এক শীর্ষ নেতাকে হত্যা করার পর ঠিক এমনটাই ঘটেছিল এবং সে অভিযানে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বও লঙ্ঘিত হয়েছিল।

মানুষ আগে বিশ্বাস করত যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি করলে তা বাস্তবায়ন করাতে পারবে। কিন্তু এবার দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে কাছের মিত্র ইসরায়েলকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। হামাসের যাঁরা মার্কিন প্রতিশ্রুতির সত্যতা যাচাই করছিলেন, তাঁদেরই লক্ষ্য করে ইসরায়েল হামলা চালাল। এতে শুধু ওই প্রস্তাব ভেঙে গেল না, ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি হওয়ার পথও বন্ধ হয়ে গেল। অনেকের মতে, এটা সম্ভবত নেতানিয়াহুর নিজের সুবিধার জন্য করা হয়েছে। কারণ, যুদ্ধ শেষ হলে তাঁর রাজনৈতিক শক্তি ও ক্যারিয়ার দুর্বল হয়ে যেত।

একবার কেউ বিশ্বাস হারালে তা ফেরত আনা খুবই কঠিন। কাতার (যেখানে অঞ্চলের বড় একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিও আছে) ইতিমধ্যে বলেছে, তারা যদি বিশ্বাস হারায়, তাহলে তারা মধ্যস্থতা বন্ধ করে দিতে পারে। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা মধ্যস্থতা করতে না পারে, তাহলে অন্য কারও পক্ষে চুক্তি করানো সম্ভব হবে না। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এমন একটি চুক্তি আনতে বিশ্বে আর কোনো একক শক্তিই যথেষ্ট ক্ষমতাসম্পন্ন নয়।

ট্রাম্প হয়তো মনে করেন, বিশ্বাসযোগ্যতার বড় কোনো গুরুত্ব নেই, কিন্তু বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যদি অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের ওপর বিশ্বাস না করে, তাহলে আলোচনাগুলো শুরু হওয়ার আগেই ভেঙে পড়ে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কেবল গাজায় নয়, বিশ্বব্যাপীও কমছে। যেমনটি ইউক্রেন সমস্যায় ‘প্রথম দিনেই’ সমাধান আনতে না পারার ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বলেছিলেন, ‘বিশ্বাস করো, কিন্তু যাচাই করো।’ অর্থাৎ চুক্তি করতে হলে কেবল কথায় বিশ্বাস নয়, তা পরীক্ষাযোগ্য হতে হবে। কিন্তু নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সঙ্গে বিশ্বাস গড়া কঠিন। এখন একমাত্র বাস্তব পথ হলো স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ—ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে পুরোপুরি ও পরীক্ষাযোগ্যভাবে প্রত্যাহার এবং বিনিময়ে ইসরায়েলি বন্দী ও ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি। এর চেয়ে কম কিছু হলে কেবল খালি বাক্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, কোনো ফল হবে না।

ইসরায়েল ও তার আমেরিকান–সমর্থকেরা এখন এমন এক গভীর সীমাবদ্ধতায় পড়েছে যে কেবল বক্তৃতা দিয়ে তারা বেরিয়ে আসতে পারবে না। প্রয়োজন বাস্তবে যাচাইযোগ্য, কার্যকর পদক্ষেপ।

দাউদ কাত্তাব, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

কাতারের দোহায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত ব্যক্তিদের জানাজা
কাতারের দোহায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত ব্যক্তিদের জানাজা। ছবি: এএফপি

নারী আসন নিয়ে পুরুষদের এত আপত্তি কেন by সোহরাব হাসান

সব সম্ভবের বাংলাদেশ। এখানে যাঁরা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠ, তাঁদের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পর্ক ক্ষীণ। যাঁরা কৃষকের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, তাঁরা কৃষকের সমস্যাটাই জানেন না। শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে তাঁরাই মাঠ গরম করেন, যাঁদের ছাত্রত্ব অনেক আগেই শেষ হয়েছে।

চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে যে নারী সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, রাষ্ট্র সংস্কারে তারাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হলো। সরকার গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে নারী অধিকারসংক্রান্ত কমিশন ছাড়া কোনোটির প্রধান পদে নারী ছিলেন না। অন্যান্য কমিটিতে নারী বা সংখ্যালঘু ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নারীর অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ম্যারাথন আলোচনা করলেও কমিশনে কোনো নারী প্রতিনিধি ছিলেন না। এ ছাড়া তারা যেসব দলের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের মধ্যেও নারী প্রতিনিধি ছিলেন খুবই কম। অর্থাৎ জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনাটি হয়েছে কার্যত নারীকে বাদ দিয়ে। আর এত দীর্ঘ আলোচনার পর জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে যে সিদ্ধান্ত হলো, তা পর্বতের মূষিক প্রসব ছাড়া আর কিছু নয়।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল, নারী আসন ১০০ করা ও সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা করা। বর্তমানে সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন আছে, যা দলীয় আসনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় রাজনৈতিক দলগুলো আসন বাড়ানোর বিষয়ে একমত হলেও ভোটের পদ্ধতি নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেনি। এদের মধ্যে এমন দলও আছে, যারা নারীর প্রতিনিধিত্বেই বিশ্বাস করে না।

কিছু রাজনৈতিক দল ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে অতিরিক্ত ১০০ আসনে সরাসরি ভোট করার পক্ষে ছিল, যা অনেকটা মহিলা পরিষদের দেওয়া প্রস্তাবের কাছাকাছি। মহিলা পরিষদ বিদ্যমান ৩০০ আসনের মধ্যে ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে সরাসরি ভোটের প্রস্তাব দিয়েছিল। সংবিধান সংস্কার কমিশন আসন বাড়িয়ে ৪০০ করার কথা বলেছে। বিএনপিসহ বেশ কিছু দল এই প্রস্তাব নাকচ করে এই যুক্তিতে যে নতুন করে আসনবিন্যাস করতে হলে নির্বাচন পিছিয়ে যাবে।

শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিদ্যমান ৫০ আসনের পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে নারী প্রার্থী বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়, যা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো খুব আপত্তি করেনি। নারী সংগঠনগুলোর মূল আপত্তিই ছিল সংরক্ষিত আসনব্যবস্থায়; যেখানে জনগণের ভোট নয়, দলীয় নেতৃত্বের কৃপায় এমপি হতে হয়।

নারী সংগঠনগুলোর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার জবাবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ কমিশনের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, সংসদে নারীদের জন্য আসন বাড়ানো ও সেসব আসনে সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া হলেও তারা তা শোনেননি। দলগুলো ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে।

তাঁর ভাষ্য থেকে আমরা আরও জানতে পারি, ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন ১০০ আসন বাড়িয়ে সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এটাকে নতুনভাবে নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণ করে নির্বাচন পেছানোর অজুহাত বলা শুরু করে। আমরা এমনও বলেছি, সংরক্ষিত আসন বাতিল করে দেন। দল থেকে ৩৩ শতাংশ নারীকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়ন দেন। তাতেও দলগুলো রাজি হয়নি।’

আসলে রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের সংস্কার না হলে নারীর ক্ষমতায়ন যে সম্ভব নয়, তা আবারও তারা প্রমাণ করল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তে নারী সংগঠনগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। শনিবার ব্র্যাক সেন্টারে ‘নারীকে বাদ দিয়ে নারীর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় নারী অধিকারকর্মীরা কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের কোনো সুপারিশ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গ্রহণ করেনি। নারী অধিকারকর্মীদের দেওয়া প্রস্তাবও উপেক্ষা করা হয়েছে।’

তাঁদের মতে, নারী অধিকারকর্মী ও নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে সেসব আসনে সরাসরি নির্বাচন করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ঐকমত্য কমিশন এই সুপারিশ গ্রহণ করেনি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী নারী হলেও ঐকমত্য কমিশনে নারীর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। কমিশন নারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। তারা শুধু রাজনৈতিক দলের কথায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রশ্ন আসে সরকার যদি নারীদের ক্ষমতায়নে এত দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, তাহলে ঢাকঢোল পিটিয়ে কমিশন গঠন করল কেন? সংসদে নারীদের জন্য আসন বাড়িয়ে ১০০ করে সেসব আসনে সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছিল নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সংসদের আসন বাড়িয়ে ৬০০ করে ৩০০টি আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রেখে সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছিল।

ঐকমত্য কমিশন যেসব দলের সঙ্গে আলোচনা করেছে, সেসব দল নারীর প্রতিনিধিত্ব করে কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন নারী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, ‘যেসব রাজনৈতিক দল সেখানে আলোচনা করেছে, তারা কোনোভাবে নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে না। নারীদের বাদ দিয়ে সংস্কার হলে আগামী নির্বাচনে নারীরা ভোট দেবেন না।’

অন্যদিকে মহিলা পরিষদ এক বিবৃতিতে ২০৪৩ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদে মনোনয়নের মাধ্যমে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন বহাল রাখার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তকে ‘পশ্চাৎপদ’ বলে অভিহিত করে।

জাতীয় সংসদে নারীর আসনসংখ্যা ও নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে যখন বিতর্ক চলছে, তখন চট্টগ্রাম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রামের সাবেক মুখপাত্র ফাতেমা খানমের ফেসবুকে দেওয়া বার্তাটি চোখে পড়ল। তিনি বলেছেন, ‘চট্টগ্রামে যাঁদের সঙ্গে জুলাই আন্দোলন করেছি, তাঁরাই আজ নারীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বয়ান (ন্যারেটিভ) তৈরির চেষ্টা করছেন। নারীদের ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন। এগুলো নেওয়া যায় না।’

গত শুক্রবার রাত ১০টা ৪৪ মিনিটে নিজের ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে আসেন ফাতেমা খানম। এ সময় তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের কিছুসংখ্যক মানুষের স্বার্থের কাছে, তাঁদের চাওয়া-পাওয়ার কাছে আমাদের রাজনীতি হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছেন আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকা অনেকে। এখন বলতে গেলে কেউই নেই। এই সবকিছুর জন্য কিছুসংখ্যক ভাই-ব্রাদার দায়ী। তাঁরা কেন্দ্রের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে চট্টগ্রামে একটার পর এক কোরাম বানিয়েছেন। এর দায় আপনাদের নিতে হবে।’

এই অভিযোগ ও আর্তি কেবল ফাতেমা খানমের নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশ নেওয়া অনেক নারী নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছেন, হতাশা ব্যক্ত করেছেন। অনেকে সামাজিকভাবে হেনস্তারও শিকার হয়েছেন। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারক কিংবা আন্দোলনের পুরুষ সহযাত্রীরা তাদের পাশ দাঁড়িয়েছেন, এ রকম উদাহরণ খুব বেশি নেই। বরং আমরা দেখছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সভাসমাবেশে একশ্রেণির লোক নারীদের হেনস্তা ও অসম্মান করতে পারলেই পুলকিত হন।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংসদে নারীর আসন ও নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে যে উপসংহারে এল, তা কোনোভাবে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

* সোহরাব হাসান, কবি ও প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

অভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ অনন্য হলেও রাজনীতিতে নারীর জায়গা ছেড়ে দিতে নারাজ রাজনৈতিক দলগুলো
অভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ অনন্য হলেও রাজনীতিতে নারীর জায়গা ছেড়ে দিতে নারাজ রাজনৈতিক দলগুলো। ছবি : প্রথম আলো