Showing posts with label মানবাধিকার. Show all posts
Showing posts with label মানবাধিকার. Show all posts

Thursday, July 30, 2026

যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়ছে গাজার হাসপাতাল, চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

গাজার আল-শিফা হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটে প্রতিদিন একই দৃশ্য। এক মুহূর্তের জন্যও থামে না ডায়ালাইসিস মেশিন। সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা রোগীদের শরীরে সংযুক্ত থাকে চিকিৎসা-যন্ত্রের নল। সীমিত সময়ের জন্য হলেও এসব মেশিনই তাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখছে। সেই সারির এক কোণে বসে আছে উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার ১৪ বছর বয়সী রুওয়া মুনতাসির আবদুল করিম। ছোট্ট শরীরের মেয়েটি ভরা ওয়ার্ডেও আলাদা করে চোখে পড়ে। তার বাম হাত ডায়ালাইসিস মেশিনের সঙ্গে যুক্ত। চিকিৎসাকর্মীদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও পুরো সময়টায় একটি কথাও বলে না সে। দীর্ঘ চিকিৎসা আর অসুস্থতা তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। পাশেই বসে আছেন পিতা মুনতাসির। তিনি বলেন, অসুস্থ হওয়ার আগে আমার মেয়ে হাঁটত, খেলত। অস্ত্রোপচার আর ডায়ালাইসিস শুরু হওয়ার পর তার পুরো জীবন বদলে গেছে। প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেশনই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। একটি সেশন বাদ গেলেই সে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

রুওয়াকে বাঁচিয়ে রাখা হাসপাতালের এই বিভাগটিও এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছে। ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বারবার হামলা এবং গাজায় চিকিৎসা-সরঞ্জাম প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে চিকিৎসাসেবা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোডিয়াম বাইকার্বোনেটের তীব্র সংকটের কারণে গাজার ৫০ শতাংশ ডায়ালাইসিস মেশিন সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে কিডনি রোগীদের চিকিৎসার জন্য গাজায় সাতটি হাসপাতাল ছিল। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে চারটিতে।

নোরা আল-কাবি ডায়ালাইসিস সেন্টারের মতো কিছু কেন্দ্র যুদ্ধেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে কিডনি রোগীদের মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের আগে গাজায় কিডনি বিকল হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০। ফিলিস্তিন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ডায়ালাইসিস না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে ৪৭০ জনের বেশি রোগী মারা গেছেন। বর্তমানে বেঁচে আছেন প্রায় ৭০০ জন।
মধ্য গাজার আল-আকসা হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান ওসামা আবু রাহমা জানান, তাদের হাসপাতালে ৫১টি ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও ২৫টি সম্পূর্ণ বিকল। তিনি বলেন, ২৪০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালকে সপ্তাহে ডায়ালাইসিসের সংখ্যা এবং প্রতিটি সেশনের সময় দুটিই কমিয়ে দিতে হয়েছে। এর ফলে রোগীদের মধ্যে দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতা এবং রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় পটাশিয়াম বেড়ে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। আবু রাহমার ভাষায়, এই পরিস্থিতি শত শত রোগীর জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
আল-শিফা হাসপাতালে রুওয়া চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ওয়ার্ডের অনেক বয়স্ক রোগী ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার পিতা মুনতাসির চিকিৎসা যন্ত্রের মনিটরের দিকে তাকিয়ে মেয়ের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করেন। তিনি জানান, একসময় রুওয়ার ওজন ছিল ৬৫ কেজি। এখন তা কমে ৩৫ কেজিতে নেমে এসেছে। আগে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস হতো, এখন মাত্র দু’বার করা সম্ভব হচ্ছে। রুওয়ার স্থায়ী চিকিৎসা হলো কিডনি প্রতিস্থাপন। মুনতাসির বলেন, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। তার মা কিডনি দিতে রাজি। সব পরীক্ষাও মিলে গেছে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার অনুমতি এখনো দেয়নি ইসরাইল। ছয় মাস ধরে আবেদন ঝুলে আছে। গাজার বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়। তাই রুওয়াকে শুধু অপেক্ষা করেই থাকতে হচ্ছে।

ডায়ালাইসিসের সংকট গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার একমাত্র সমস্যা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, যুদ্ধে ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ এমনভাবে আহত হয়েছেন, যা তাদের জীবন স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে। এদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। চিকিৎসার পরও তাদের সামনে নতুন সংকট পুনর্বাসন এবং কৃত্রিম অঙ্গের অভাব। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট আয়া আল-শালতুনি বলেন, কৃত্রিম অঙ্গ, হুইলচেয়ার এবং ক্রাচের ঘাটতি এখন রোগীদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। তিনি বলেন, অনেক রোগী দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও কিছুই পান না। তার মতে, এটি শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, মানুষের পুরো জীবনই বদলে দিচ্ছে।

উত্তর গাজার ৬০ বছর বয়সী কৃষক জাকি জুমা সালেম আবু হারব ২০২৫ সালের মার্চে এক হামলায় একটি পা হারান। তিনি বলেন, এক মুহূর্তেই আমার পুরো জীবন বদলে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সম্প্রতি তিনি একটি কৃত্রিম পা পেয়েছেন। তবে তিনি জানান, হাজারো মানুষ এখনো সেই সুযোগ পাননি। ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধের কারণে ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন। জাকি বলেন, অনেকের হুইলচেয়ার নেই, ক্রাচও নেই। তারা গাছের গুঁড়ি বা কাঠের টুকরো ভর করে চলাফেরা করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, অনেক শিশু তাদের হাত-পা হারিয়েছে। তাদের ঠিকমতো হাঁটার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রও নেই। এটা দেখলে মনে হয়, তাদের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়েছে।

যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়ছে গাজার হাসপাতাল, চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

গাজায় সীমানা বাড়াচ্ছে ইসরাইল, ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার

বিবিসির অনুসন্ধানঃ গাজায় নিজেদের প্রভাব তৈরি করতে প্রতিনিয়ত নতুন মাটির দেয়াল ও কনক্রিটের বেড়া তৈরি করছে ইসরাইল। সামরিক বাহিনীর এমন পদক্ষেপের কারণে গাজা উপত্যকার শত শত পরিবার আবারও ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক শর্ত তোয়াক্কা না করে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ সীমানা গাজার ভেতরের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের স্থান দিন দিন আরও সংকুচিত হয়ে আসছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

ক্রমান্বয়ে এলাকা দখলের নতুন কৌশল: উত্তর গাজার আল-তুফাহ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা দেখতে পান, তাদের চলাচলের প্রধান সড়ক সালাহ আল-দিনের ওপর আগের চেয়ে পশ্চিম দিকে সরিয়ে আনা হয়েছে হলুদ রঙের কনক্রিটের ব্লক। সেই সাথে প্রায় তিন মিটার উঁচু একটি বিশালাকার মাটির বাঁধ তৈরি করে তার ওপর উড়ানো হচ্ছে ইসরাইলি পতাকা। বাস্তুচ্যুত হওয়া মোহাম্মদ আল-শাওইশ আফসোস করে জানান, বোমার আঘাতে তাদের আসল বাড়িটি আগেই ধ্বংস হয়েছিল। এরপর তাঁবু টাঙিয়ে কোনোমতে পরিবার নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেও তাদের সরে যাওয়ার বার্তা দেওয়া হয় এবং হামলায় সেই তাঁবুটিও ধ্বংস হয়ে যায়।

যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, সেখানে ইসরাইলি বাহিনীকে একটি নির্দিষ্ট সীমানার পেছনে অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী গাজার ৫৩ ভাগ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি প্রকাশ্যে দাবি করেন, তাদের বাহিনী বর্তমানে গাজার ৬০ ভাগেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি একে ৭০ ভাগে উন্নীত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত চিত্রে দেখা গেছে, গাজায় বর্তমানে ৪২ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে মাটির বাঁধ ও সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।

ধ্বংসযজ্ঞ ও তীব্র মানবিক সংকট: নিরাপত্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ মেয়াদী সামরিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্যই এসব স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলছে। এসব সীমান্ত ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের রাস্তা পরিষ্কার করতে খান ইউনূস, দেইর আল-বালাহ ও জেইতুন এলাকায় নিয়মিত বুলডোজার চালানো হচ্ছে। ভেঙে ফেলা হচ্ছে হাজারো ঘরবাড়ি, গ্রিনহাউস ও শতবর্ষী জলপাই বাগান। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্থায়ী আশ্রয়ের অভাবে বর্তমানে গাজার ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিত্যদিনের এই স্থানান্তরের কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ ফিলিস্তিনিরা।

গাজায় সীমানা বাড়াচ্ছে ইসরাইল, ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার

Monday, July 27, 2026

মামদানির বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা’ ছড়ানোর অভিযোগ তুললেন আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানি তাঁকে একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করে এবং গাজা যুদ্ধের জন্য নিউইয়র্কে এলে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসলে ‘ঘৃণা’ ছড়াচ্ছেন। আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত এই আসামি নিউইয়র্কে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

মেয়র সংবর্ধনা জানাবেন না বলে ইঙ্গিত দেওয়া সত্ত্বেও গতকাল রোববার নেতানিয়াহু বলেছেন, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে তিনি নিউইয়র্কে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন।

গত বুধবার নিউইয়র্কে মামদানি বলেছিলেন, নিউইয়র্ক নগরের হাতে বিশ্বের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আইনি ক্ষমতা না থাকলেও তিনি বিষয়টি কার্যকর করতে ফেডারেল সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।

ফক্স নিউজ চ্যানেলের ‘সানডে মর্নিং ফিউচারস উইথ মারিয়া বার্টিরোমো’ অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, তাঁর (মামদানি) তো নিউইয়র্কের সব নাগরিক—ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুসলিম সবার মেয়র হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি এক গোষ্ঠীকে অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ক্রমেই বিতর্কিত এক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাস যোদ্ধাদের হামলার পর গাজায় নির্বিচার ও নৃশংস হামলা শুরু করে। ইরান–সমর্থিত হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরুর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে।

নেতানিয়াহু তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগগুলো ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেছেন। তিনি আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন আচরণের অনিয়মের অভিযোগের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি মূল বিষয় থেকে মনোযোগ সরানোর একটি চেষ্টামাত্র।

তবে গাজায় যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর নির্দেশে পরিচালিত নৃশংস হামলায় ২০ হাজারের বেশি শিশুসহ প্রায় ৭৩ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের প্রায় সবাই বেসামরিক নাগরিক।

সর্বশেষ ফক্সে নেতানিয়াহুর মন্তব্যের বিষয়ে জোহরান মামদানির কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

গতকাল উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু আরও অভিযোগ তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি অতীতে যে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক সমর্থন ছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে মামদানির রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত প্রগতিশীল এবং উগ্র-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটদের বিভাজনের কারণে।

নির্বিচার গাজাবাসীকে হত্যার অভিযোগ আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশে ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষ সম্পর্কেও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইহুদি জনসংখ্যার শহর নিউইয়র্কের মানুষের সঙ্গে যখন তিনি কথা বলেন, তখন ‘ইহুদিরা সেখানে চরম অস্বস্তি বোধ করে’।

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমি মনে করি এটি ভুল। পুরো ব্যাপারটাই ভুল।’

২০২৫ সালের মেয়র নির্বাচনী প্রচারজুড়ে মামদানি বলেছিলেন, গাজা যুদ্ধে নেতানিয়াহুর ভূমিকার জন্য আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে তিনি শহরের পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করবেন।

গত বুধবার এক ভিডিও বার্তায় মামদানি বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিউইয়র্ক নগরে স্বাগত জানানো হবে না এবং অন্য কোনো পলাতক যুদ্ধাপরাধীকেও নয়।’

মামদানি নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের উদ্দেশে বলেন, তিনি তাঁদের ক্ষোভ বুঝতে পেরেছেন এবং প্রতিবাদ প্রকাশ এমন একটি বিষয়, যা এই শহর ‘সব সময় সম্মান করবে’।

হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক আদালত নেতানিয়াহু, তাঁর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং হামাসের প্রয়াত নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবস্থায় আপনাকে কোনোভাবেই, কোনো রূপেই গ্রেপ্তার করা হবে না।’

নেতানিয়াহু আজ সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এবং রিপাবলিকান পার্টির প্রয়াত সিনেটর ইসরায়েলপন্থী লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে যাচ্ছেন।

ইসরায়েলের সব ধরনের অন্যায় ও নৃশংসতার ঘোর সমর্থক লিন্ডসে গ্রাহাম ১১ জুলাই আর্টারি বা ধমনি ফেটে গিয়ে হঠাৎ মারা যান। নেতানিয়াহু তাঁকে একজন ‘মহান দেশপ্রেমিক’এবং ইসরায়েলের ‘অন্যতম সেরা বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন।

নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানি
নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স

Thursday, July 23, 2026

ইরানের স্কুলে ভয়াবহ মার্কিন হামলার হৃদয়বিদারক গল্প

শ্রেণিকক্ষ থেকে কবরস্থানে ১২০ শিশু। দক্ষিণ ইরানের ছোট শহর মিনাবের শাজারে তাইয়্যেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কয়েক মাস পরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেদিনের বিভীষিকা ভুলতে পারছেন না শিক্ষক আমিনেহ নাদেমি।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই হামলায় ১২০ শিশুসহ মোট ১৫৬ জন নিহত হয়েছেন। মিনাব প্রসিকিউটরের কার্যালয় হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের দাবি, বিদ্যালয়ের পাশের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি স্থাপনায় হামলা চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী স্কুলটিতে আঘাত হানে।
যদিও ওয়াশিংটন এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সামরিক তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা- পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের কারণে ভুলবশত স্কুলটিকে সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় স্কুল
৩৩ বছর বয়সী শিক্ষক আমিনেহ নাদেমি বলেন, সেদিনও অন্য দিনের মতোই ক্লাস শুরু হয়েছিল। রমজান মাস হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রথমে নামাজকক্ষে কোরআন তিলাওয়াত করে। এরপর তিনি প্রথম শ্রেণির ছাত্রীদের ফারসি বর্ণমালার নতুন একটি অক্ষর শেখাতে শুরু করেন। ঠিক তখনই ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের প্রথম হামলা শুরু হয়।
স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়ে যেতে বলা হয়। আমিনেহ জানান, তার ১৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তখন মাত্র পাঁচজন শ্রেণিকক্ষে ছিল। হঠাৎ একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর তিনি শিশুদের নিতে ফিরে যান।

তিনি বলেন, আমি বের হওয়ার ঠিক মুহূর্তেই একটি ক্ষেপণাস্ত্র স্কুলে আঘাত হানে। আমার মাথায় এবং শিশুদের মাথায় আঘাত লাগে। আমরা সবাই ছিটকে পড়ি।
এরপর পুরো শ্রেণিকক্ষ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। শ্বাস নেয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর পুরো ভবন ধসে পড়ে। আমার আর শিশুদের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, বলেন তিনি।
ধোঁয়া কিছুটা সরে গেলে আহত শিশুদের নিচে থাকা লোকজনের কাছে নামিয়ে দেন তিনি। পরে ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে স্কুলের ফটকে গিয়ে দেখেন, অসংখ্য অভিভাবক খালি পায়ে ছুটে এসেছেন। তখনও তিনি বুঝতে পারেননি যে অধিকাংশ মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।

নিহতদের মধ্যে শিক্ষক ও বহু শিক্ষার্থী
ছয় বছর ধরে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা আমিনেহ জানান, হামলায় তার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আদ্রিনা, দ্বিতীয় শ্রেণির ফাতেমেহ, ষষ্ঠ শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক এবং কোরআনের শিক্ষক নিহত হন।

উদ্ধারকর্মীদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্ধারকর্মী রেজা বাশারাতি বলেন, হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি জানান, আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কাউকে জীবিত পাওয়া যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কাউকেই জীবিত পাইনি।

রেজার ভাষ্য, অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত ছিল যে শুধু হাত, পা বা শরীরের খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে। অনেক পরিবার সন্তানদের জুতা বা পোশাক দেখে তাদের শনাক্ত করেছে।
তিনি বলেন, আমার এক আত্মীয় বারবার বলছিলেন, আমার ছেলেকে খুঁজে দাও। কিন্তু আমি বলতে পারিনি যে তার ছেলে আর বেঁচে নেই। আমরা সবাই কাঁদছিলাম।

তদন্তে কী উঠে এলো
হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রথমে এ ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং মার্কিন বাহিনী কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় না।

তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে যে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার পুরোনো তথ্যের কারণে স্কুলটিকে আইআরজিসির সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্কুলের পাশের আইআরজিসি কমপ্লেক্সে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। একই সঙ্গে স্যাটেলাইট চিত্রে স্কুল এবং পাশের কয়েকটি ভবনেও হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ২০১৬ সাল থেকে স্কুলটি আইআরজিসি কমপ্লেক্স থেকে আলাদা দেয়াল দিয়ে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং এর নিজস্ব প্রবেশপথ ও খেলার মাঠ ছিল। এছাড়া এটি একটি স্কুল- এ তথ্যও হামলার আগেই অনলাইনে প্রকাশ্যে ছিল।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, তদন্ত এখনও চলমান এবং এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

মোজা দেখে শনাক্ত করা হয় ৯ বছরের শিশুকে
ধ্বংসপ্রাপ্ত ওই বিদ্যালয় থেকে অল্প দূরেই রয়েছে কবরস্থান, যেখানে নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনেককে দাফন করা হয়েছে। প্রতিদিন সেখানে যান মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি। তার নয় বছরের মেয়ে সেতায়েশ ওই হামলায় নিহত হয়।
তিনি বলেন, স্কুল বলে কিছুই আর ছিল না। চারদিকে শুধু ধোঁয়া, শিশুদের চুল, একদিকে হাত, অন্যদিকে পা পড়ে ছিল। সবাই টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল।

মাসুমেহ জানান, পরদিন ভোর পর্যন্ত মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে মেয়ের ক্রিম রঙের মোজা দেখে তার মরদেহ শনাক্ত করা হয়। তিনি বলেন, সেতায়েশ বড় হয়ে শিক্ষক হতে চেয়েছিল। সে ঘরে পুতুল সাজিয়ে বলত- ‘আমি তোমাদের শিক্ষক।’

শোকের সঙ্গে ক্ষোভ
এই হামলাকে ইরান সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বারবার তুলে ধরছে। এমনকি আলোচক বহনকারী একটি বিমানের নামও রাখা হয়েছিল ‘মিনাব-১৬৮’, যা নিহতের আগের সরকারি সংখ্যার প্রতি ইঙ্গিত।
স্থানীয়দের মতে, এ হামলা ইরানের মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।
মেয়ের কবরের পাশে বসে মাসুমেহ বলেন, এই শিশুদের অপরাধ কী ছিল? তাদের হাতে কি অস্ত্র ছিল? তাদের হাতে ছিল শুধু পেন্সিল, বই, খাতা আর স্কুলব্যাগ। তারা যুদ্ধ করতে যায়নি, তারা শুধু শিখতে গিয়েছিল।

ইরানের স্কুলে ভয়াবহ মার্কিন হামলার হৃদয়বিদারক গল্প

Wednesday, July 22, 2026

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের ৭০ শতাংশ মুসলিম: সমীক্ষার তথ্য

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) জেরে যেসব ভোটার ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় রয়েছেন, তাঁদের ৭০ শতাংশের বেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি বাঙালি। এ কারণে ধরে নেওয়া যেতে পারে, বাদ পড়া ভোটারের অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম। সম্প্রতি এক সমীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করে এ কথা জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠিত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সবর ইনস্টিটিউট।

এসআইআরে বাদ যাওয়া ও পশ্চিমবঙ্গের ‘বিচারাধীন’ তালিকায় থাকা ২৭ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে ৭০ দশমিক ১৭ শতাংশ মুসলিম এবং মোট ৫১ শতাংশ নারী। তাঁদের অধিকাংশকেই তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা ‘যৌক্তিক অসংগতি’র কারণে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই যৌক্তিক অসংগতির বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে চালু করা হয়েছিল, যার জেরে এত মানুষ ভোট দিতে পারেননি।

এই ২৭ লাখ মানুষ ছাড়াও আরও প্রায় ৬৪ লাখ ভোটারের নাম ‘সাপ্লিমেন্টারি’ বা অতিরিক্ত তালিকা থেকে বাদ গেছে। এর মধ্যে স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত, মৃত বা দ্বৈত (ডুপ্লিকেট) ভোটার বলে তাঁদের নাম কাটা হয়েছে। বর্তমানে এই ৬৪ লাখ ভোটারের তথ্যও নতুন করে বিশ্লেষণের কাজ চলছে।

গোটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সবর ইনস্টিটিউট একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার বা ‘ওপেন ডেটাবেজ’ প্রকাশের কাজ করছে। সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি এই ডেটাবেজে ধর্ম ও লিঙ্গ অনুযায়ী সব তথ্য সাজানো থাকবে। এর ফলে সাধারণ নাগরিক ও গবেষকেরা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাতিল হওয়ার ফলে নির্দিষ্ট কোন সম্প্রদায় কীভাবে সমস্যায় পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত মুসলিম সমাজের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বলা হয়েছে, এই তদন্ত জরুরি। কারণ, ২৭ লাখের বেশি মানুষকে ‘অত্যন্ত আপত্তিকর ও অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে’।

যেমন কোনো দম্পতির ছয়জন বা এর বেশি সন্তান থাকলে তাঁদের নাম সাধারণভাবে বাদ পড়েছে। আবার মা–বাবার নামের বানানে সামান্য অমিল থাকলে বা মা–বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের কম হওয়ার মতো অদ্ভুত কারণ দেখিয়েও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে সবর ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে।

পশ্চিমবঙ্গে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় একেবারে গোড়াতেই প্রায় ৬১ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ‘সাপ্লিমেন্টারি’ তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, মোট প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে গেছে। এর ফলে গত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ কমে যায়। গত বিধানসভা নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৪ লাখ।

নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল, মূলত মৃত, স্থানান্তরিত বা যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাঁদের নামই বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত চিত্র ছিল অন্য রকম। বহু প্রকৃত ও বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ায় তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ও হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে এসআইআর ট্রাইব্যুনাল গঠন করে কাজ শুরু হয়।

নির্বাচন শুরুর আগে এবং হেরে যাওয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেস জোর দিয়ে বলেছে, ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ দিয়ে, বিশেষত মুসলিম সমাজের মানুষের নাম বাদ দিয়ে তাদের হারানো হয়েছে।

অবশ্য বিজেপির তরফে বলা হয়, তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের মতো করে ভোটার তালিকা বানিয়ে এবং তাতে অসংখ্য ভুয়া ভোটারের নাম ঢুকিয়ে গত নির্বাচনে জিতেছিল। এবার তারা সেটা করতে না পারায় হেরে গেছে।

নির্বাচনপ্রক্রিয়া চলাকালে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। এরপর বাতিল হওয়া ভোটারদের প্রায় ৩৪ লাখ আবেদন সেখানে জমা পড়ে। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। এত বিশালসংখ্যক মানুষের আবেদন বিবেচনা করতে ঠিক কত দিন সময় লাগতে পারে, সে সম্পর্কে কারও কাছেই কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।

দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল, সংখ্যালঘু–অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই বেছে বেছে ভোটারদের নাম বেশি কাটা হয়েছে। উপযুক্ত তথ্য–প্রমাণের অভাবে এ নিয়ে জোরালো বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু সবর ইনস্টিটিউটের এ প্রতিবেদন প্রমাণ করছে, নির্দিষ্টভাবে মুসলিমপ্রধান অঞ্চল থেকেই ভোটারদের নাম অন্তত এ নির্বাচনে ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

কারণ হচ্ছে, মুসলিম ভোটারদের বড় অংশই তৃণমূল কংগ্রেসকে এত দিন ভোট দিয়েছে এসেছে। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, এই ভোট না পাওয়ার কারণেই হেরেছে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক ক্ষমতাসীন দল। এই ভোটাররা কবে ভোটার তালিকায় ফিরবেন এবং ভোট দিতে পারবেন, সে বিষয় এখনো অনিশ্চিত।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনায় দলের এগিয়ে থাকার খবর শোনার পর ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির সমর্থকেরা উল্লাস শুরু করেন। ৪ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনায় দলের এগিয়ে থাকার খবর শোনার পর ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির সমর্থকেরা উল্লাস শুরু করেন। ৪ মে ২০২৬ ছবি: এএফপি

‘যুদ্ধাপরাধীদের ঠাঁই নেই,’ ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওকে ঘিরে তোপ

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংস্থা আসিয়ান (ASEAN)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিতে বর্তমানে ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অবস্থান করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার এই সফরের প্রতিবাদে এবং ইরান যুদ্ধে তার ভূমিকার নিন্দা জানিয়ে সম্মেলনস্থলের বাইরে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন অসংখ্য আন্দোলনকারী। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, যুদ্ধাপরাধীদের স্বাগতম নয়, ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ করো! রুবিওকে নিষিদ্ধ করো! ইত্যাদি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

মানবাধিকার কর্মী ক্রিস্টিনা পালাবে বিক্ষোভের বিষয়ে বলেন, বিশেষ করে ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান যুদ্ধাপরাধীতে পরিণত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন সরকার ফিলিস্তিন, ইরান, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষকে বোমা মেরে হত্যা করার জন্য পরিচিত, যেখানে তাদের স্থায়ী উপস্থিতি রয়েছে এবং সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে যাচ্ছে। আরেক বিক্ষোভকারী মং পালাতিনো ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের সরকারকে রুবির সাথে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার এই সফরের ফলে ফিলিপাইনে আরও বেশি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হবে এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ আরও বেশি লুটপাটের শিকার হবে। তাই মার্কিন সরকারের সাথে হাত মেলানোর জন্য তারা মার্কোস সরকারের তীব্র নিন্দা জানাতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের বার্ষিক এই সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ছাড়াও চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য অংশীদার দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা নিয়েই সম্মেলনজুড়ে প্রধান আলোচনা চলছে। এ প্রেক্ষাপটেই ফিলিপাইনের সাধারণ নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে ম্যানিলার রাজপথে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

‘যুদ্ধাপরাধীদের ঠাঁই নেই,’ ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওকে ঘিরে তোপ

Monday, June 29, 2026

বাবরি মসজিদ ভেঙে মোদির গড়া রাম মন্দিরে দুর্নীতির মহা কেলেঙ্কারি

উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বর্তমানে যে রাম মন্দির দাঁড়িয়ে আছে, সেই স্থানেই একসময় ছিল ষোড়শ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। ১৯৯২ সালে হিন্দু উগ্রপন্থীদের হাতে মসজিদটি ভেঙে ফেলার ঘটনা গোটা ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্ম দেয়। সেই দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম।

পরবর্তীতে ওই স্থানকে কেন্দ্র করেই বিজেপি-সমর্থিত হিন্দুত্ববাদী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়। আড়াই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন রাম মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন। বহু হিন্দুর বিশ্বাস, এ স্থানই ভগবান রামের জন্মভূমি।

তবে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ইতিহাসের পর ভক্তদের কাছে ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠা এই মন্দির এখন বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায়। গত এক মাস ধরে অভিযোগ উঠেছে, ভক্তদের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অনুদান ও মূল্যবান উপহার আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মন্দির পরিচালনাকারী ট্রাস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।

ভক্ত ব্রজেশ কুমার আল জাজিরাকে বলেন, তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তার ভাষায়, যারা ধর্মের নামে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, তারাই সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছেন।

অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে।

রাম মন্দির উদ্বোধনের পর থেকেই ভারতের অন্যতম ব্যস্ত ধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। মন্দিরটি পরিচালনা করে স্বাধীন সংস্থা ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’। যদিও ট্রাস্টটি সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নয়, এর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিজেপির আদর্শিক সংগঠন আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।

চলতি মাসে ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মহিপাল সিং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলেও আল জাজিরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

এদিকে বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতা ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেন, মন্দিরের অনুদানের কোটি কোটি রুপি গায়েব হয়ে গেছে। বিরোধীদের চাপের মুখে উত্তর প্রদেশ সরকার তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি ইতোমধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিলেও সেটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

এরই মধ্যে পুলিশ ফৌজদারি মামলা দায়ের করে অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনুদানের নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজনও রয়েছেন।

শুধু তাই নয়, আরও অনেক ভক্ত দাবি করেছেন, তারা ট্রাস্টের কাছে জমা দেওয়া রুপার ইট, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মূল্যবান উপহারের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না।

ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শুক্রবার ট্রাস্টের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়সহ কয়েকজন প্রভাবশালী ট্রাস্টি পদত্যাগ করেন। রাম মন্দির আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হওয়ায় চম্পত রায়ের পদত্যাগ ঘটনাটিকে আরও অভিযোগগুলো আরো শক্তিশালী করে তুলেছে।

তবে পদত্যাগের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। হাজারো ভক্তের পাশাপাশি বিজেপির একাংশের সমর্থকরাও নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন এবং অনুদানের অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছেন।

সূত্র: আল জাজিরা

বাবরি মসজিদ ভেঙে মোদির গড়া রাম মন্দিরে দুর্নীতির মহা কেলেঙ্কারি

Tuesday, June 9, 2026

২০২৫ সালে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাতের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা ও প্রাণহানির ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়ের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রকাশিত অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বার্ষিক ‘কনফ্লিক্ট ট্রেন্ডস’ নামের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর বিশ্বে অন্তত একটি রাষ্ট্র জড়িত ছিল এমন ৬৫টি সংঘাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাতও ৮০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ ধরনের সংঘাত দ্বিগুণ হয়ে আটটিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ, আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত বিরোধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান।

প্রতিবেদনটির গবেষক সিরি আস রুস্তাদ বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইতিবাচক কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত আমি পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা হলেও আশাবাদী দিক বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু এবার সংখ্যাগুলো সত্যিই বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ছিল স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তৃতীয় সর্বাধিক প্রাণঘাতী বছর। গত বছর যুদ্ধ ও সংঘর্ষে সরাসরি প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৬ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বেসামরিক নাগরিকদের সরাসরি লক্ষ্য করে চালানো হামলায়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার ২০০।

বেসামরিক প্রাণহানির এই বড় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে সুদানের সংঘাতকে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে চলমান যুদ্ধে দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহরে অবরোধ ও গণহত্যার ঘটনায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর কেবল ১৯৯৪ ও ২০২১ সালে এর চেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা এবং ২০২১ সালে ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চলের যুদ্ধ সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনার জন্য দায়ী ছিল।

রুস্তাদ বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে একসঙ্গে একাধিক বড় যুদ্ধ ও সংঘাত চলতে দেখা যাচ্ছে। একটি সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হচ্ছে। বিশ্ব কোনো বিরতি পাচ্ছে না। আগের সময়ের সঙ্গে এটাই বড় পার্থক্য। এখন বৈশ্বিক সংঘাতের উচ্চমাত্রার তীব্রতা প্রায় অব্যাহতভাবে চলছে।

উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন উপসালা কনফ্লিক্ট ডাটা প্রোগ্রামের তথ্যের ভিত্তিতে পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি সংঘাতকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে, রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাত, অ-রাষ্ট্রীয় সংঘাত এবং বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে একতরফা সহিংসতা।

রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ছিল আফ্রিকা, যেখানে ২৯টি সংঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর রয়েছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা মহাদেশ ও ইউরোপ।

রুস্তাদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দেশগুলোর একটি হলো ইসরায়েল। গাজা, সিরিয়া, লেবানন, ইরান এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সংঘাতে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দিকেও ইঙ্গিত করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, বাণিজ্যিক বাধাও বেড়েছে।

রুস্তাদ বলেন, সহযোগিতার পথ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকরভাবে কাজ করছে না। বিশ্ব আরও বেশি মেরুকৃত হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

সূত্র : এএফপি 

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত
গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত

Tuesday, March 24, 2026

ভারতে অসুস্থ যুবকের ‘পরোক্ষ মৃত্যুর’ পক্ষে রায় দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

প্রকাশ ১২ মার্চ ২০২৬ঃ নজিরবিহীন রায় দিলেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিছানায় অসাড় শুয়ে থাকা ৩১ বছরের যুবক হরিশ রানার মা–বাবার অনুরোধ মেনে ছেলের ‘নিষ্কৃতি মৃত্যু’ বা পরোক্ষ মৃত্যুর (প্যাসিভ ইউথানেসিয়া) অবেদনে সাড়া দিলেন সুপ্রিম কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পর্দিওয়ালা ও বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বুধবার এই রায় দিয়ে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি মনোযোগী হওয়া। মর্যাদার সঙ্গে নিষ্কৃতি মৃত্যু নিশ্চিত করতে আইন আনা দরকার।

বাইরের জগৎ কিংবা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে চেতনাহীন কোনো ব্যক্তি, যাঁকে সুস্থ করে তোলার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা চিকিৎসাশাস্ত্রে নেই, কৃত্রিম উপায়ে যাঁর শরীরে প্রাণবায়ুটুকু শুধু অবশিষ্ট রয়েছে, তাঁর নিষ্কৃতি মৃত্যু বা পরোক্ষ মৃত্যুর অধিকার থাকা নিয়ে ভারতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। আইন–আদালত এই অধিকার নিয়ে সহমত হননি। সরকারও আইন প্রণয়ন করেনি। এ বিবেচনায় গতকাল হরিশ রানার মা–বাবার আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের সম্মতিদান নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

রায়ে বলা হয়েছে, হরিশকে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এইমস) ভর্তি করাতে হবে। সেখানেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় মর্যাদার সঙ্গে তাঁকে দেওয়া জীবনদায়ী ব্যবস্থা (লাইফ সাপোর্ট) সরিয়ে ফেলতে হবে। তা করার আগে চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত বোর্ডকে অবশ্য জানাতে হবে, রোগীর সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

পাঞ্জাবের চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন হরিশ। ২০১৩ সালে ছাত্রাবাসের পাঁচতলা থেকে পড়ে তিনি মাথায় গুরুতর চোট পান। চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টায় প্রাণে বাঁচলেও ক্রমেই তিনি ‘কোয়াড্রিপ্লেজিয়া’ বা সর্বাঙ্গ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। শ্বাস–প্রশ্বাস চালানো, খাওয়াদাওয়া—সবই চলতে থাকে কৃত্রিম উপায়ে। প্রথমে হাসপাতাল, তারপর নিজের বাড়িতে রেখেই চলতে থাকে হরিশের চিকিৎসা।

১৩ বছর ধরে চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে নিজের বাড়িও বিক্রি করে দিতে হয়েছে হরিশের মা–বাবাকে। হরিশের ছোট ভাইয়ের রোজগারে কোনোরকমে সংসার চালানো ওই দম্পতি ছেলের মৃত্যুর অধিকার পেতে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আগেও বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এসেছেন।

২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট হরিশের পরিবারের আবেদন গ্রাহ্য করেননি। সে সময় শীর্ষ আদালত এই মামলাকে ‘অত্যন্ত কঠিন সমস্যা’ বলেছিলেন। বলেছিলেন, রোগীকে বাড়িতে রাখতে হবে। চিকিৎসকেরা তাঁকে নিয়মিত দেখতে যাবেন।

অবশেষে সর্বোচ্চ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ হরিশের মা–বাবার আবেদন মেনে নিলেন। বৃদ্ধ মা–বাবার আরজি ছিল, তাঁদের অবর্তমানে অসুস্থ ছেলেকে কে দেখবে, কীভাবে আসবে চিকিৎসার খরচ—সেই ভাবনায় তাঁরা অস্থির। দিন দিন অসুস্থতাও বেড়ে চলেছে।

আরজিতে বলা হয়েছিল, এ অবস্থায় ছেলের কষ্ট লাঘবের জন্য মৃত্যুই একমাত্র উপায়। তবে সেই মৃত্যু যেন প্রত্যক্ষ না হয়। অর্থাৎ কোনো ইনজেকশন বা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নিয়ে মৃত্যুদানের অনুরোধ জানিয়েছিলেন হরিশের মা–বাবা। বিচারপতিরা সেই অনুরোধই মেনে ‘প্যাসিভ ইউথানেসিয়া’র পক্ষে রায় দেন।

ভারতে প্রত্যক্ষ মৃত্যু বা অ্যাকটিভ ইউথানেসিয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ। প্যাসিভ বা পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকারও এত দিন আদালত দেননি। গতকাল রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিরা বলেন, হরিশের চিকিৎসাব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি ও তাঁর ভবিষ্যৎ এবং রোগীর পক্ষে কোনটা মঙ্গল, তা বিবেচনা করে এই মৃত্যুতে তাঁরা সায় দিয়েছেন।

২০১৮ সালে ‘কমন কজ’ বনাম কেন্দ্রীয় সরকার মামলারও উল্লেখ করেন বিচারপতিরা। সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলার রায়ে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

হরিশ রানার শয্যাপাশে বাবা
হরিশ রানার শয্যাপাশে বাবা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

Thursday, January 22, 2026

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ঘৃণার রাজনীতি জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল by মীনাক্ষী গাঙ্গুলি

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাংলাদেশে দীপু কুমার দাসকে পিটিয়ে হত্যা করেছে জনতা। পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির এক কর্মকর্তা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বার্ষিক বড়দিনের মধ্যাহ্নভোজে হামলা চালান। জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মিথ্যা অভিযোগ তুলে এক অন্ধ নারীকে লাঞ্ছিত করেন। নেপালে এক দলিত যুবককে মোবাইল চুরির ভ্রান্ত অভিযোগে মারধরের পর তার মৃত্যু হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সহিংসতা ও মানবিক দুর্ভোগের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র এগুলো। যা স্পষ্টভাবে আইনের শাসন ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে যখন রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতার স্বার্থে নির্যাতন ও প্রতিশোধের চক্রকে ব্যবহার করেন। তারা অনুসারীদের তথাকথিত ‘শত্রুদের’ বিরুদ্ধে উসকে দেন- হোক তা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, শরণার্থী, অভিবাসী কিংবা প্রতিবেশী দেশ। তাদের আশা থাকে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে দিলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা থেকে মানুষের মনোযোগ সরানো যাবে।

এই ঘৃণামূলক ভাষ্য সীমান্ত ছাড়িয়েও ছড়িয়ে পড়ে। বহু ভারতীয় বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার নিন্দা করেছেন, আবার অনেক বাংলাদেশি ভারতে মুসলমানদের ওপর চলমান আক্রমণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ক্ষোভ এমনকি খেলাধুলার জগতেও ঢুকে পড়ে। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড জাতীয়তার অজুহাতে প্রিমিয়ার লিগের একটি দলকে বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দিতে বাধ্য করে। এর জবাবে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দেয়, ভারতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তাদের জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।

ভারত-পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্কের কারণে ক্রিকেট ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বহু আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এপ্রিল মাসে জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গিদের হাতে পর্যটক নিহত হওয়ার পর সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। দুই দেশের মানুষই ক্ষোভ প্রকাশ করে, যার বড় অংশই তাদের নেতাদের উসকানিতে সৃষ্ট।

অনলাইনে ঘৃণার বিস্তার
এখন স্পষ্ট যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে রাজনৈতিক মতাদর্শীরা ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যালগরিদমের অপব্যবহার করে অসন্তোষ উসকে দিতে পারে। তারা প্রচার করে যে আইন মেনে চলা, মানবাধিকারকে সম্মান করা কিংবা ভিন্ন পরিচয় ও মতকে গ্রহণ করা- সবই নাকি অপ্রয়োজনীয় ‘তুষ্টিকরণ’। যখন এই কৌশল ব্যর্থ হয়, তখন রাজনীতিকরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথে হাঁটেন এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেন, যেগুলো তাদের লাগাম টেনে ধরতে পারত।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনে অতিষ্ঠ জনগণ অজনপ্রিয় শাসকদের ক্ষমতা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত, পাকিস্তান বা মালদ্বীপের মতো দেশে ভীত শাসকগোষ্ঠী বিক্ষোভ দমিয়ে রাখার পথ বেছে নিয়েছে। ঘৃণা উসকে দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার বদলে নেতারা চাইলে অধিকারভিত্তিক উন্নয়নের কঠিন পথ বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তারা সে পথে যেতে অনিচ্ছুক।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের দমনপীড়নের পর সরকারি চাকরির কোটাবিরোধী ছোট একটি আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলেও দ্রুতই তারা পথ হারায় এবং জনতার প্রতিশোধমূলক দাবির কাছে নত হয়। সরকার ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করে। ফলে আবারও বাংলাদেশের মানুষ পছন্দের নেতৃত্ব বেছে নেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। পরিস্থিতি কার্যত আগের তিনটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি, যখন হাসিনা সরকারের অধীনে বিরোধী দলগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

নেপাল ও শ্রীলঙ্কা
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে সেপ্টেম্বরে হওয়া বিক্ষোভে ৭৬ জন নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং ‘জেন জি’ বিক্ষোভকারীদের পছন্দে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে। কিন্তু পরিবর্তনের আশায় থাকা তরুণরা আবারও হতাশ। তাদের মতে, পুরোনো দুর্নীতিবাজ নেতারাই আবার নির্বাচনে ফিরবে।

শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে গোটাবায়া রাজাপাকসেকে উৎখাত করা গণআন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট হন অনূঢ়া কুমারা দিসানায়েকে। তিনি দুর্নীতি দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গৃহযুদ্ধের সময়কার অপরাধের জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মতে, তার সরকার এখনও কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করছে, যা মূলত তামিল ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে প্রয়োগ করা হয়। হেফাজতে নির্যাতন, নজরদারি, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের হয়রানিও অব্যাহত রয়েছে।

ভারতের বাস্তবতা
ভারতে দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পরও বিজেপি ভোটের স্বার্থে বিষাক্ত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি নেতারা ঘৃণামূলক বক্তব্য দেন এবং উসকানি দেয়ার পর সমর্থকদের থামাতে অনিচ্ছুক থাকেন- যখন তারা মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করে, খ্রিস্টানদের উপহাস করে বা শিখ ও দলিতদের লাঞ্ছিত করে। প্রতিবাদ হলে কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো দমনমূলক আইনে মানুষকে কারাবন্দি করে এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দেয়।

শেষ কথা
রাজনৈতিক নেতাদের বুঝতে হবে- ঘৃণা ছড়ানো, পক্ষপাতদুষ্ট বিচারব্যবস্থা বা মানবাধিকার স্থগিত রাখা কেবল আরও নির্যাতন ডেকে আনে। এক সময় এই ক্ষোভ এমন জনরোষে রূপ নিতে পারে, যা স্বৈরাচারী নেতাদের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করবে। এর বদলে তাদের উচিত সমতা প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনগণের অধিকার রক্ষা করা। মানুষের জীবনে প্রকৃত উন্নয়ন- রাজনৈতিক কৌশলের নামে বিভাজন নয়, এটাই সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।

(মীনাক্ষী গাঙ্গুলি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক। তার এ লেখাটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

mzamin

দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ঘৃণার রাজনীতি জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল

দক্ষিণ এশিয়ায় সামপ্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় আইন শাসনের ভাঙনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে (যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়) এক হিন্দু ব্যক্তিকে মুসলিম জনতার গণপিটুনিতে মৃত্যু, ভারতে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র এক নেতার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বার্ষিক বড়দিনের অনুষ্ঠানে হামলা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে এক অন্ধ নারীকে লাঞ্ছিত করা, কিংবা নেপালে মোবাইল চুরির মিথ্যা অভিযোগে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাগুলো তারই উদাহরণ।

দুঃখজনকভাবে, রাজনৈতিক স্বার্থে যখন নেতারা নিপীড়ন ও প্রতিশোধের চক্রকে ব্যবহার করেন, তখনই এ ধরনের ঘটনার জন্ম হয়। সংখ্যালঘু সমপ্রদায়, শরণার্থী, অভিবাসী কিংবা প্রতিবেশী দেশকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে অনুসারীদের উস্কে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য একটাই- অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়া।

নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন।

‘এ ক্রস সাউথ এশিয়া, লিডারস আর প্রমোটিং হেইট টু ডিসট্র্যাক্ট সিটিজেনস ফ্রম ইকোনমিক ইনসিকিউরিটি’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে মিনাক্ষী গাঙ্গুলি লিখেছেন, ঘৃণার এই রাজনীতি অনেক সময় দেশের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে হিন্দুর ওপর হামলার অভিযোগে ভারতের বহু নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করেন, আবার ভারতে মুসলমানদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সরব হন বাংলাদেশিরা। এমনকি খেলাধুলার অঙ্গনও এর বাইরে থাকেনি। জাতীয়তার কারণে বাংলাদেশের এক ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে বাদ দিতে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশের পর বাংলাদেশ সরকার জানায়, ভারতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে তাদের জাতীয় দল নিরাপদ নাও থাকতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের কারণে ক্রিকেট ও সংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরে হিন্দু পর্যটকদের ওপর হামলার জেরে পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। দুই দেশের জনগণের ক্ষোভে ঘি ঢেলেছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

অনলাইন ঘৃণা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে অ্যালগরিদমকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যবহার করে রাজনৈতিক মতাদর্শীরা যে অসন্তোষ উস্কে দিচ্ছেন তা এখন স্পষ্ট। আইন মানা, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা করা কিংবা বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করাকে তারা ‘অপ্রয়োজনীয় তোষণ’ হিসেবে তুলে ধরছেন। এসব কৌশল ব্যর্থ হলে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ বেছে নেন, আগেই ভেঙে ফেলেন সেই প্রতিষ্ঠানগুলো, যেগুলো তাদের লাগাম টানতে পারতো।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সামপ্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে অর্থনৈতিক স্থবিরতায় জর্জরিত জনগণের ক্ষোভে ক্ষমতাসীন নেতারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। আবার ভারত, পাকিস্তান কিংবা মালদ্বীপের মতো দেশে শঙ্কিত শাসকরা বিক্ষোভ দমনে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছেন।

ঘৃণা ছড়িয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা না করে নেতারা চাইলে অধিকার রক্ষা করে বাস্তব উন্নয়নের কঠিন পথ বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা তা করতে অনিচ্ছুক।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের দমননীতির পর সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে একটি ছোট আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তবে সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারও দ্রুত দিশা হারায়, জনতার প্রতিশোধমূলক দাবিতে তারা অচল হয়ে পড়ে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দেয়ায় বাংলাদেশিরা আবারো পছন্দের নেতা নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। যা আগের তিনটি নির্বাচনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি।

তরুণদের বিক্ষোভ: নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ৭৬ জন নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন, ‘জেন-জি’ আন্দোলনকারীদের পছন্দে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু পরিবর্তন না আসায় হতাশ আন্দোলনকারীরা আবার রাজপথে নেমেছেন। তাদের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনে সেই পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারাই ক্ষমতায় ফিরবেন।
শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে গণ-অভ্যুত্থানে গোটাবাইয়া রাজাপাকসের সরকার উৎখাতের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট হন অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। তিনি দুর্নীতি দমন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, তার সরকার এখনো কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করছে, যা মূলত সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলমানদের লক্ষ্য করে ব্যবহৃত হয়। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন, নজরদারি, ভয়ভীতি ও মানবাধিকারকর্মীদের দমন অব্যাহত রয়েছে।

ভারতে দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পরও বিজেপি ভোটের রাজনীতিতে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদকে আরও উস্কে দিচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে নেতাদের ঘৃণামূলক বক্তব্যের পর সমর্থকরা মুসলমান হত্যা, খ্রিষ্টান বিদ্রূপ, শিখ ও দলিতদের নিপীড়নে জড়িয়ে পড়লেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহী। বিক্ষোভ দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগ ও আদালতের আদেশ অমান্য করে সম্পত্তি ভাঙচুরও ঘটছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘৃণা ছড়ানো, পক্ষপাতদুষ্ট বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার স্থগিত রাখলে সহিংসতা আরও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে কোনো শাসককে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। নেতাদের উচিত বিভাজন নয়, বরং সাম্য প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করা। মানুষের জীবনে বাস্তব উন্নতিই বিভাজন নয়।

mzamin

Friday, January 16, 2026

আসামের ‘দেশহীন’ মানুষরা: ২৪ ঘণ্টার নোটিশে ভারত ছাড়তে বলা হয়

স্ক্রলের প্রতিবেদনঃ পিতা তাহের আলিকে নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন হাসান আলি। ৫৮ বছর বয়সী এই মানুষটি এখন কেমন আছেন? বিদেশের মাটিতে কীভাবে বেঁচে আছেন? জানুয়ারির কনকনে ঠাণ্ডায় তিনি কী করছেন? কী ধরনের বিপদের মুখোমুখি হচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলোই প্রতিদিন তাড়া করে বেড়াচ্ছে হাসান আলিকে। গত আট মাসে আসামের নগাঁও জেলার কৃষক তাহের আলিকে শুধু একবার নয়, তিনবার ভারত থেকে বের করে বাংলাদেশ সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ ঠেলে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দু’বার বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে বলে জানান ৩১ বছর বয়সী সবজি বিক্রেতা হাসান আলি। এ নিয়ে তিনি ভারতের অনলাইন স্ক্রলের সঙ্গে কথা বলেছেন।

তাহের আলি একজন ‘ঘোষিত বিদেশি’। অর্থাৎ সারাজীবন আসামেই বসবাস করা সত্ত্বেও তিনি রাজ্যের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হলো আধা-আদালতসদৃশ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার আসামবাসীকে নাগরিকত্বহীন ঘোষণা করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য না শুনেই একতরফা আদেশ দেয়া হয়েছে। তাহের আলির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যারা ট্রাইব্যুনালে মামলায় হেরে যান, তাদের উচ্চ আদালতে আপিল করার অধিকার রয়েছে। অনেককে রাজ্যের ডিটেনশন বা হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়। কিন্তু গত বছরের মে মাসের আগে পর্যন্ত সাধারণত তাদের বাংলাদেশে ‘ডিপোর্ট’ করা হতো না। কারণ ট্রাইব্যুনালের রায় মানেই তারা অন্য দেশের নাগরিক- এমন প্রমাণ নয়।

কিন্তু মে মাসের পর থেকে বিজেপিশাসিত আসাম সরকার আইনি ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে ‘ঘোষিত বিদেশি’দের রাতের অন্ধকারে বন্দুকের মুখে সীমান্ত পার করিয়ে দিচ্ছে- যাকে বলা হচ্ছে ‘পুশব্যাক’। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই জোরপূর্বক বহিষ্কারকে বৈধতা দিতে ১৯৫০ সালের একটি আইন ব্যবহার করছেন। নভেম্বর থেকে রাজ্য সরকার কমপক্ষে ২২ জন ঘোষিত বিদেশিকে নির্দেশ দিয়েছে- ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে যেতে হবে’। ফলে তাদের আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগই থাকছে না। কিন্তু বাংলাদেশ যখন তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না, তখন তাহের আলির মতো মানুষরা আটকে পড়ছেন এক নিষ্ঠুর চক্রে- বারবার ঠেলে দেয়া আর আবার ফিরিয়ে আনার মধ্যে।
তাহের আলি একা নন। স্ক্রলের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯ ডিসেম্বরের পর কমপক্ষে সাতজন আসামবাসীকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের ঢুকতে না দিলে তারা ফিরে যান। কিন্তু আবারও জোর করে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়। এর মধ্যে চারজন বর্তমানে বাংলাদেশের পুলিশ হেফাজতে আছেন বলে সে দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাহের আলি ছাড়াও কমপক্ষে আরেকজনকে তিনবার জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
স্ক্রল সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছে- ১৯৫০ সালের আইনে বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের কি বারবার বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হচ্ছে এবং তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়েছে কি না। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উত্তর পাওয়া যায়নি। উত্তর পেলে প্রতিবেদন হালনাগাদ করার কথা জানানোর কথা। আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, আসাম সরকারের এই নতুন নীতি আন্তর্জাতিক আইন ও ভারতের সংবিধানের পরিপন্থী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাগরিকত্ব বিষয়ে গবেষক অভিষেক সাহা বলেন, এটা রাষ্ট্রহীনতা তৈরি করার প্রক্রিয়া। ভারত এই মানুষগুলোকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ আবার তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। দুই দেশের মাঝে এদের টেনিস বলের মতো ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

দিল্লিভিত্তিক আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, এই ধরনের হঠাৎ ও খামখেয়ালি বহিষ্কার ভারতের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি বলেন, যে কোনো ডিপোর্টেশনের আগে নাগরিকত্ব যাচাই বাধ্যতামূলক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। এখানে সেই প্রক্রিয়ার কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না।

হাসান আলি প্রশ্ন করেন, কেন তার পিতাকে দুই দেশের মধ্যে এভাবে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার দেশ বলছে আমার পিতা বাংলাদেশের বিদেশি। কিন্তু বাংলাদেশ তো তাকে দু’বার ফিরিয়ে দিয়েছে। তাহলে আমাদের দেশ কোনটা? আমাদের কি আদৌ কোনো দেশ আছে?

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে নগাঁও জেলার একটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাহের আলিকে একতরফা রায়ে নাগরিক নন বলে ঘোষণা করে। ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি তেজপুর ডিটেনশন সেন্টারে চার বছর কাটান। ২০২৫ সালের মে মাসে পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার পর আসাম সরকার ঘোষিত বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে তাহের আলিকে তার গ্রাম গোরইমারি থেকে তুলে নিয়ে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। স্ক্রলের আগের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শত শত ঘোষিত বিদেশিকে পুলিশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়, যারা বন্দুকের মুখে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তাহের আলিও সেই ১০৯ জনের মধ্যে ছিলেন, যাদের মাটিয়া ট্রানজিট ক্যাম্পে নেয়া হয়। এটি ভারতের সবচেয়ে বড় ডিটেনশন সেন্টার। মে মাসে তাহের আলি ফোন করে ছেলেকে জানান, তাকে জোর করে সীমান্ত পার করানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে ঢুকতে দেয়নি। তাকে আবার ভারতে ফিরিয়ে এনে কোকরাঝাড় হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়। হাসান আলি বলেন, আমরা তখন স্বস্তি পেয়েছিলাম।
এরপর আইনি লড়াই, নতুন করে গ্রেপ্তার, আবার পুশব্যাক- এভাবেই চলতে থাকে নিষ্ঠুর চক্র।

mzamin

Tuesday, January 13, 2026

‘হলুদ লাইন’ যেভাবে গাজার জনজীবনে চাপ বাড়াচ্ছে

গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি সেনাদের নতুন লাইন নির্দেশকারী হলুদ রঙের কংক্রিট ব্লকের কয়েক মিটার দূরে চার সন্তানের পিতা জায়েদ মোহাম্মদ তার পরিবারসহ ছোট একটি ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। এই হলুদ লাইন হলো সেই সীমারেখা যেখানে ইসরাইলি সেনাদের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া গাজা শান্তি চুক্তির প্রথম ধাপে সরতে হয়েছিল। ইসরাইলি সামরিক মানচিত্র অনুযায়ী, লাইনটি গাজার পূর্বসীমা থেকে ১.৫ কিমি থেকে ৬.৫ কিমি  ভেতরে বিস্তৃত এবং আনুমানিক ৫৮ শতাংশ এলাকা জুড়ে। এই লাইন গাজাকে দুই অংশে ভাগ করেছে। পূর্বাঞ্চল- ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিমাঞ্চল। সেখানে ফিলিস্তিনিরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। তবে তারা ক্রমাগত বিমান হামলা ও জোরপূর্বক স্থানান্তরের হুমকির মুখোমুখি। এ খবর দিয়ে অনলাইন আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ লিখেছেন, জায়েদের ত্রাণ শিবির ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে মাটির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, গাজায় ৬ কোটি টনের বেশি ধ্বংসাবশেষ সরাতে সাত বছরেরও বেশি সময় লাগবে। ইসরাইলের দুই বছরেরও বেশি গণহত্যার যুদ্ধ গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন বেশির ভাগ মানুষ তীব্র ঝড়, বিমান হামলা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য।

জায়েদ আল-জাজিরাকে বলেন, শেলিং এবং গুলির আওয়াজ সারাক্ষণ শোনা যায়। তিনি পূর্ব দিগন্তের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এখান থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে ইসরাইলি সৈন্যরা অবস্থান করছে। মাঝে মাঝে আমরা দেখছি বুলডোজার বাড়ি ধ্বংস করছে বা ফসলের জমি সমতল করছে। এক দু’ধাপও এগোনো বিপজ্জনক।
হলুদ লাইনের কাছে বসবাসকারীরা বলেন, তারা প্রায়ই গোলাগুলি বা ছোট বিস্ফোরণের শব্দে জাগেন। জায়েদ বলেন, রাতে পুরোপুরি অন্ধকারে থাকেন তারা। কারণ বিদ্যুৎ নেই। তবে সৈন্যরা ফ্লেয়ার ব্যবহার করে আকাশ কিছু সময়ের জন্য আলোকিত করে।

জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলি জানিয়েছে, এই শত্রু এলাকা যুদ্ধের সময় বারবার প্রসারিত, স্থানান্তরিত ও সংকুচিত হয়েছে। ফলে এটি কার্যত অভ্যন্তরীণ সীমারেখার মতো কাজ করছে। ডিসেম্বরে গাজার সফরে ইসরাইলি সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির স্পষ্টভাবে বলেছেন, হলুদ লাইন হলো একটি নতুন সীমারেখা। এই লাইন প্রায় ৬০ শতাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, যার মধ্যে দক্ষিণের রাফাহ এবং উত্তরের বেইত হানুন শহর অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধের সময় ইসরাইলি জোরপূর্বক স্থানান্তরের মাধ্যমে হলুদ লাইন তৈরি হয়েছে। অনেক সময় স্থানান্তরের নোটিশ দেয়া হতো পত্রিকা, ফোন মেসেজ বা অনলাইন মানচিত্রে, তখনই বোমা বিস্ফোরণ চলছিল। ফলে ফিলিস্তিনিদের নিরাপদে চলে যাওয়ার সময় খুব কম থাকতো।

জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় অফিস জানিয়েছে, যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে গাজার ৭০ শতাংশের বেশি এলাকা জোরপূর্বক ত্যাগ বা নিরাপদ নয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। হলুদ লাইন হল গাজার পরিবর্তনশীল সামরিক এলাকা। মানচিত্রে এগুলো স্থানান্তরিত, সম্প্রসারিত বা অদৃশ্য হলেও নাগরিকদের জন্য সব সময় উপস্থিত। এই লাইন নির্ধারণ করে- কোন রাস্তা নিরাপদ, কোন বাড়ি খালি, কখন পালাতে হবে। অনেক জায়গায় দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। ফিলিস্তিনিরা নির্ভর করে অনুভুতি, শব্দ ও স্মৃতির ওপর। একদিন নিরাপদ মনে হওয়া এলাকা পরের রাতেই বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে। পরিবার দ্রুতই প্যাক করে চলে যায়, অনেক সময় বাড়ি খালি থাকে, যদিও স্থাপনাটি এখনও আছে। অধিকাংশ মানুষ অন্তত একবার, অনেকে একাধিকবার স্থানান্তরিত হয়েছেন। এভাবে থাকা মানসিক চাপ বাড়ায়। 

mzamin

Sunday, January 4, 2026

ইসরায়েলের কারাগার ও গাজায় শান্তির আশা by ডেডিভ হার্স্ট

ইসরায়েলের হাতে আটক ফিলিস্তিনি বন্দীরা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হলেও বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই। সব ফিলিস্তিনিকে মুক্তি না দিলে কেন শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা করা যায় না, তা নিয়ে লিখেছেন ডেডিভ হার্স্ট

রোবেন আইল্যান্ডের প্রবেশদ্বারে একটি ফলকে তার সবচেয়ে বিখ্যাত বন্দী ৪৬৬৬৪ নম্বর কয়েদির একটি উক্তি খোদাই করা আছে; ‘কারাগারের ভেতর না গেলে কোনো জাতিকে সত্যিকার অর্থে চেনা যায় না। জাতি নিজের সেরা নাগরিকদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দিয়ে নয়; বরং সবচেয়ে নিচের অবস্থানে থাকা মানুষদের প্রতি তার আচরণ দিয়ে বিচার করা উচিত।’ নেলসন ম্যান্ডেলার এই কথাগুলো আজ যেন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর মৃত্যুঘণ্টার মতো বাজছে।

দুই বছর আগে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের সময় ‘নিখোঁজ’ হওয়া ৩৪৫ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ এখন খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মরদেহগুলো এমনভাবে বিকৃত যে মাত্র ৯৯ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের সাংবাদিক মাহা হুসাইনি যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে গাজা থেকে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন; তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে পরিবার ও ফরেনসিক চিকিৎসকেরা শোকাবহ পরিস্থিতিতে দেহ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন, যদিও মৃত ব্যক্তিরা কীভাবে মারা গেছেন তা জানার মতো তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই।

► জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের ‘ব্যাপক ও সংগঠিত নির্যাতনের একটি বাস্তবিক রাষ্ট্রীয় নীতি’ আছে।

► ইসরায়েল এমন একটি পথে হাঁটছে, যা রাষ্ট্রটিকে স্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সঙ্গেও।

মুহাম্মদ আয়েশ রামাদান তাঁর ভাইয়ের দেহাবশেষ শনাক্ত করেন। আহমেদে যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই নিখোঁজ ছিলেন। তিনি দেখতে পান, দেহটি পুড়ে গেছে, ছয় বা সাতটি গুলিবিদ্ধ চিহ্ন রয়েছে এবং বুক থেকে নিচে দীর্ঘ উল্লম্ব চেরা দাগ আছে। তাঁর ভাইয়ের একটি পায়ের আঙুলও কাটা ছিল।

ফিলিস্তিনি চিকিৎসকদের মতে, ডিএনএ পরীক্ষার অজুহাতে ইসরায়েলি চিকিৎসকেরা নিয়মিতভাবেই বন্দীদের হাতের ও পায়ের আঙুল কেটে ফেলেন। অন্যান্য মরদেহেও নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। উত্তর গাজার বেইত হানুনের জয়নাব ইসমাইল শাবাত জানতে পারেন যে তাঁর ৩৪ বছর বয়সী নিখোঁজ ভাই মাহমুদের তর্জনী কাটা, হাত দুটি পেছনে বাঁধা, ধাতব কিছু দিয়ে বেঁধে রাখার চিহ্ন পায়ে দাগ ফেলে দিয়েছে। তাঁর মুখ এমনভাবে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত যে খুলি ভেঙে গেছে, আর গলায় ঝোলানোর দাগ ছিল।

জয়নাব ইসমাইল শাবাত বলেন, ‘স্পষ্ট ছিল যে তাঁকে বাঁধা অবস্থায়ই হত্যা করা হয়েছে। তাঁর শরীর সম্পূর্ণ উলঙ্গ ছিল। ঊরুতে গুলির চিহ্ন ছিল; আর বুকে ছোট ছোট কাঠের টুকরো পাওয়া গেছে।’

ধর্ষণ ও নির্যাতন

গত দুই বছরে ইসরায়েলি হেফাজতে কত ফিলিস্তিনি মারা গেছেন, তার হিসাবে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-ইসরায়েলের কাছে সেনাবাহিনী ও কারা কর্তৃপক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সংখ্যাটা ৯৮। তবে সংস্থাটি বলছে এটি মারাত্মকভাবে কম দেখানো হয়েছে, গাজা থেকে আসা আরও শত শত বন্দী এখনো নিখোঁজ।

বেঁচে ফেরা বন্দীরা ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বিটসেলেমের কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে বলা হয়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে কেতসিওত কারাগারের এক সেলে বিশেষ বাহিনী ঢুকে বন্দীদের মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়।

বিশেষ বাহিনী ৩৮ বছর বয়সী থায়ের আবু আসাবের ওপর হামলা চালায়, যতক্ষণ না তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁর দেহ এক ঘণ্টা মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরে তাঁকে সরিয়ে নিয়ে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরদিন শিন বেত সব বন্দীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অভিযোগ তোলে যে, তারা নাকি আবু আসাবকে আক্রমণ করে দায় কারারক্ষীদের ওপর চাপাতে চেয়েছে।

সদে তেইমান একটি বন্দিশিবির বিশেষভাবে ধর্ষণ, নির্যাতন ও মৃত্যুর জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠেছে। ইব্রাহিম সালেম প্রায় আট মাস আটক থাকার পর আগস্টে মুক্তি পান। তিনি সেই কারাগারে ৫২ দিন আটক থাকার পর সেটিকে জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন বলেছেন। তিনি বলেন, একটি চেয়ার তাঁর বুকে ভেঙে ফেলা হয়। তাঁর যৌনাঙ্গে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা হয়। অন্য বন্দীদের নারী সেনারা ‘ধর্ষণ’ করেছিল।

এ ক্ষেত্রে বন্দীকে একটি টেবিলের ওপর ঝুঁকিয়ে সামনে হাতকড়া লাগানো অবস্থায় রাখা হতো। পেছনে দাঁড়ানো নারী সেনা তাঁর পায়ুপথে আঙুল ও অন্যান্য বস্তু প্রবেশ করাত। বন্দী প্রতিক্রিয়া দেখালে বা সরে গেলে সামনে থাকা সেনা তাঁর মাথায় আঘাত করে আবার ঝুঁকতে বাধ্য করত।

ইসরায়েলি কারাগার ও আটককেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো নির্যাতনের চিত্র নিয়ে আধুনিককালে এত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যে একটি ছোট লাইব্রেরি তাতে ভর্তি হয়ে যাবে।

ভয়াবহ সংকট

জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের ‘ব্যাপক ও সংগঠিত নির্যাতনের একটি বাস্তবিক রাষ্ট্রীয় নীতি’ আছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্মম প্রহার, কুকুর লাগিয়ে দেওয়া, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা, ওয়াটার বোর্ডিং, দীর্ঘ সময় চাপের ভঙ্গিতে দাঁড় করানো ও যৌন সহিংসতা।

ইসরায়েলের নিজস্ব পাবলিক ডিফেন্ডারস অফিস—যা বিচার মন্ত্রণালয়ের অংশ—ফিলিস্তিনি বন্দীদের গাদাগাদি করে রাখা, অনাহার এবং প্রায় প্রতিদিন মারধরের বর্ণনা দিয়েছে। তারা বলেছে, এ পরিস্থিতি ‘রাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ আটক সংকটগুলোর মধে৵ একটি।’

বন্দী নির্যাতনের এত বিপুলসংখ্যক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মাত্র একজন ইসরায়েলি সেনার বিচার হয়েছে। তিনি মাত্র সাত মাসের সাজা পেয়েছেন। ফুটেজ ফাঁস হওয়ার পর আরও পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে সদে তেইমানে নির্যাতন ও গুরুতর শারীরিক আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

লক্ষণীয়, ইসরায়েল সেনাবাহিনীর আইনজীবী ইফাত তমার-ইয়েরুশালমির ফাঁস করা সেই ভিডিওতে নির্যাতনের অপরাধগুলো নিজে থেকে কোনো ক্ষোভের কারণ হয়নি; বরং ইসরায়েল সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়া নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ওই আইনজীবীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত সেনারা সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে ‘তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট’ হওয়ার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

ইসরায়েলের উচ্চ আদালতের বাইরে অভিযুক্ত সেনারা সংবাদ সম্মেলন করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার এড়াতে ‘মুখোশ’ পরিহিত ছিলেন। সেখানে তারা গর্বভরে জানায় যে তারা এখনো মুক্ত এবং ঘোষণা করে, ‘আমরাই জয়ী হব।’

অভিযুক্ত সেনারা বলেন, ‘তোমরা আমাদের ভাঙতে চেয়েছিলে; কিন্তু একটি বিষয় ভুলে গেছ, আমরা ফোর্স ১০০।’ এটি তাদের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের প্রতি একটি ইঙ্গিত।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ হামলার নিন্দা জানাননি; বরং তিনি ফুটেজ ফাঁস হওয়াকে অভিহিত করেছেন ‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েল যে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রচারণা ও আক্রমণের শিকার হয়েছে, এটি সম্ভবত তার মধে৵ একটি।’ হিসেবে। তাঁর উদ্বেগ ছিল ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নিয়ে, ভিডিওতে নির্যাতিত মানুষের জন্য নয়।

হারেৎজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ আইনি কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করা এড়িয়ে গেছেন। কারণ, ডানপন্থী শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভয় ছিল।

মৃত্যুদণ্ডের পথে

এদিকে ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অ্যাডভোকেসি সংগঠনগুলোর হিসাবে নভেম্বর মাসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২৫০। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০০ জনের বেশি ‘প্রশাসনিক’ বন্দী; যাদের বিরুদ্ধে না আছে কোনো অভিযোগ, না আছে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া।

তাদের ‘বন্দী’ বলা আসলে শব্দটির অর্থই বিকৃত করা। তারা ইসরায়েলের রাতের অভিযানে ধরে আনা জিম্মি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ এ নিয়ে কোনো কথা বলে না।

কারাগারে অনাহার ও মারধর চালু করার পরও থেমে নেই জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির। এখন তিনি নেসেটে এমন একটি বিল চাপিয়ে দিচ্ছেন, যাতে ‘রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

এই সংজ্ঞা এমনভাবে তৈরি করা, যাতে ইহুদিরা বাদ পড়ে। কারণ, চরম ডানপন্থীদের মতে, সন্ত্রাসবাদের চর্চা শুধুই আরবদের কাজ। বিলটির অন্যতম প্রস্তাবক, এমকে লিমর সন হার-মেলেখ বলেছেন, ‘ইহুদি সন্ত্রাসী বলে কিছু নেই।’

১৯৫৪ সালে ইসরায়েল হত্যা মামলার জন্য মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছিল; কিন্তু হলোকাস্ট ও গণহত্যা-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি আইনে বহাল রেখেছিল। ইতিহাসে ইসরায়েল মাত্র একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে; ১৯৬২ সালে হলোকাস্টের প্রধান পরিকল্পনাকারী অ্যাডলফ আইখম্যানকে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক আদালতগুলোর জন্য মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছিল; কিন্তু কখনো প্রয়োগ করা হয়নি। এটি নিয়ে বহুবার বিতর্ক হয়েছে এবং শিন বেত ও সেনাবাহিনীর প্রধানেরা নিয়মিতভাবে এর বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছেন।

আজ সেই বাধাগুলো সব তুলে নেওয়া হয়েছে। শিন বেতের বর্তমান প্রধান জায়ানিস্ট মেজর জেনারেল ডেভিড জিনি বিলটির সমর্থক এবং
বেন–গভিরের নির্বাহী ক্ষমতায় পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দিয়েছে।

ইসরায়েলে যা একসময় ডানপন্থী উসকানি হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন তা রাষ্ট্রের মূলধারার নীতি। প্রথম দফায় বিলটি পাসের পর বেন–গভির আনন্দের সঙ্গে মিষ্টি বিলিয়েছেন এবং ধারণা করা হচ্ছে এটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হবে।

ম্যান্ডেলার ‘উত্তরাধিকার’

দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ইসরায়েলি কারাগারেও রয়েছেন সেই প্রধান ফিলিস্তিনি নেতারা, যাঁরা চাইলে সংঘাতের অবসান নিয়ে আলোচনায় বসতে পারেন। এর মধ্যে আছেন ফাতাহর জে৵ষ্ঠ নেতা মারওয়ান বারগুতি। তিনি পাঁচটি যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন। তিনি মাহমুদ আব্বাসের জায়গায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো জনপ্রিয়। তাঁর সঙ্গে আছেন আবদুল্লাহ বারগুতি—হামাসের সামরিক নেতা, যিনি ৬৭টি যাবজ্জীবন সাজায় দণ্ডিত।

হামাসের কমান্ডার ইব্রাহিম হামেদ ৫৪টি যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন আর পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের সাধারণ সম্পাদক আহমাদ সা’দাত ৩০ বছরের সাজা খাটছেন। অন্যান্য প্রভাবশালী হামাস নেতা হাসান সালামেহ (৪৮টি যাবজ্জীবন), আব্বাস আল-সাইয়্যেদ (৩৫টি যাবজ্জীবন) এখনো কারাগারে।

বারগুতির মুক্তির দাবিতে একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলন শুরু হয়েছে—দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন যেমন ম্যান্ডেলার মুক্তিকে প্রধান দাবি করেছিল। ম্যান্ডেলা নিজে বলেছিলেন, ‘শুধু মুক্ত মানুষই আলোচনা করতে পারে। বন্দীরা কোনো চুক্তি করতে পারে না।’

ম্যান্ডেলার মুক্তি তখন শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তিনি আলোচনার নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯৪ সালের প্রথম বহুজাতিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথ খুলে দেন, যেখানে তাঁর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বিপুল ভোটে জয়ী হয়।

কিছু সাবেক শিন বেতপ্রধান, যাঁরা অনেক আগেই ক্ষমতার বাইরে এবং কোনো বাস্তব প্রভাব নেই—এ বাস্তবতা বোঝেন; কিন্তু বেন–গভিরের নেতৃত্বে ইসরায়েল এমন একটি পথে হাঁটছে, যা রাষ্ট্রটিকে স্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সঙ্গেও।

একই সময়ে এই যুদ্ধের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে; ভূখণ্ডকেন্দ্রিক সংঘাত থেকে এটি পরিণত হচ্ছে ধর্মযুদ্ধে। অতীতে এই ভূমি দখলের জন্য চালানো সব ক্রুসেডের পরিণতি যেমন হয়েছে, এটিও তার ব্যতিক্রম হবে না। আরও ভয়াবহ পরিণতির আগে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সত্যিই এখনই এই সংঘাতের অবসান চায়, তবে সব ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তির বিষয়টি প্রধান দাবি হতে হবে।

যেসব মানুষ প্রতিদিনের মারধর, ধর্ষণ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও উদ্‌যাপন করে; তাদের বিচারও ঠিক সেভাবে হওয়া উচিত, যেভাবে আইখম্যানের বিচার হয়েছিল। কারণ, তারা সত্যিই তাঁর উত্তরাধিকার বহন করছে।

ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং এডিটর ইন চিফ। তিনি গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদকীয় লেখক ছিলেন এবং বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-06%2F5qg1ql2e%2FC01.jpg?rect=103%2C0%2C1490%2C993&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজা থেকে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি : রয়টার্স

Saturday, January 3, 2026

ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১৮ হাজার ফিলিস্তিনিকে দাফন করেছেন বৃদ্ধ গোরখোদক হাতাব by উজ্জ্বল হোসেন

গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলায় নিহত প্রায় ১৮ হাজার মরদেহ দাফন করেছেন ৬৫ বছর বয়সী গোরখোদক ইউসেফ আবু হাতাব। আর এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে রইলেন তিনি। বার্তা সংস্থা আনাদোলুর এক প্রতিবেদনে হাতাবের খবর খননের বিষয়টি উঠে এসেছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের কবরস্থান পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ফাটা হাতে কোদাল নিয়ে একের পর এক মরদেহ দাফন করেছেন তিনি। এই কবরগুলোর অধিকাংশ মরদেহের কোনো নাম–পরিচয় ছিল না। কারণ, ইসরায়েলেরর নির্বিচার বোমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শরীরের দেহাবশেষ কেবল এসব কবরে রাখা হয়েছিল।

আনাদোলুকে আবু হাতাব বলেন, ‘অকল্পনীয় চাপের মুখে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হওয়ায় আমরা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে গণকবর, ব্যক্তিগত কবর এবং হাসপাতালের ভেতরে মরদেহ দাফন করেছি।’

হাতাব জানান, ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে একবার তাঁকে একটি গর্তেই ১৫টি মরদেহ দাফন করতে হয়েছিল।

২০০৫ সালে শুরু হওয়া হাতাবের কর্মজীবনে এবারের ইসরায়েলি হামলাই ছিল সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। তিনি বলেন, ‘পুরো যুদ্ধজুড়ে আমি ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার ফিলিস্তিনির দাফন কাজ পরিচালনা করেছি।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই নৃশংস যুদ্ধে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় ৭১ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ।

গত ১০ অক্টোবর ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তেব ইসরায়েল চুক্তি লঙ্ঘন করে বারবার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে যুদ্ধবিরতি চুক্তি।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪০৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গণকবর ও লাশের স্তূপ

আবু হাতাব প্রতিদিন ভোর ৬টায় কাজ শুরু করেন এবং কখনো কখনো সূর্যাস্তের পরও কাজ চালিয়ে যান। সরঞ্জাম ও উপকরণের অভাবে তিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়িয়ে আনা পাথর ও টাইলস ব্যবহার করে কবর মেরামত করেন এবং মৃতদের সম্মান জানানোর চেষ্টা করেন।

হাতাব আক্ষেপ করে বলেন, ‘পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে কবর তৈরির সামগ্রী, কাফন বা প্রয়োজনীয় কোনো সরঞ্জাম নেই।’

হাতাব বলেন, যুদ্ধবিরতির পর দাফনের সংখ্যা আগের তুলনায় কমলেও প্রতিদিন এখনো বেশ কিছু মরদেহ আসছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি করে মরদেহ দাফন করতে হতো। গত বছর খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ইসরায়েলি অবরোধের সময় তিনি একাই সেখানে প্রায় ৫৫০টি মরদেহ দাফন করেছিলেন।

ইসরায়েলি হামলার কারণে গাজাবাসী পাড়ামহল্লা, উঠান, বিয়ের হল এবং খেলার মাঠে অস্থায়ী কবর তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৬০টি কবরস্থানের মধ্যে ৪০টিই ইসরায়েলি বাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ১ হাজারের বেশি মরদেহ চুরি করেছে। এ ছাড়া হাসপাতালের গণকবর থেকে ৫২৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১০ হাজার বেশি মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

কান্নার শব্দ ও দুঃসহ স্মৃতি

কর্মীর অভাব ও সম্পদের স্বল্পতার কারণে আবু হাতাব একাই মৃতদেহ ধোয়ানো, কাফন পরানো, দাফন এবং দাফনের তথ্য নথিবদ্ধ করার কাজ করছেন। তিনি সবকিছু নিজের মুঠোফোনে রেকর্ড করে রেখেছেন।

আবু হাতাব বলেন, কখনো কখনো পাথর বা সিমেন্ট না থাকায় শুধু ব্যাগ দিয়েই মরদেহ দাফন করতে হয়েছে। ১৯৮৮ সালে এবং এবার ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিজেও আহত হয়েছেন।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করে এই ফিলিস্তিনি গোরখোদক বলেন, একবার তিনি একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী নারী ও তাঁর চার সন্তানকে দাফন করেছিলেন। এর দুই মাস পর কিছু অজ্ঞাত দেহাবশেষ পাওয়া গেলে তিনি সেগুলোও একই স্থানে দাফন করেন। এ ছাড়া রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহ, যা প্রাণীরা খুবলে খাচ্ছিল, সেগুলোও তাঁকে দাফন করতে হয়েছে।

এই ভয়াবহ দৃশ্যগুলো দেখার পর হাতাব রাতে ঘুমাতে পারতেন না। তিনি বলেন, ‘এমন অনেক রাত যায় যখন আমি একদমই ঘুমাতে পারি না। জানাজার শব্দ, মানুষের চিৎকার আর বোমার আওয়াজ সারাক্ষণ আমার মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।’

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ছবি: রয়টার্স

Friday, December 5, 2025

গাজায় নতুন গণকবরের সন্ধান: হত্যার পর বুলডোজার দিয়ে বালি চাপা

গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের নতুন গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। যারা মানবিক সহায়তা সংগ্রহ করতে গিয়ে নিহত হন তাদেরকে বুলডোজার দিয়ে বালি চাপা দিয়েছে দখলদার ইসরাইল বাহিনী। সম্প্রতি এক অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন। এতে বলা হয়, উপত্যকার জিকিম ক্রসিংয়ের কাছে সহায়তা নিতে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং নিহতদের মৃতদেহ বুলডোজার দিয়ে বালিতে চাপা দেওয়ার প্রমাণ সামনে এসেছে।

জুনে পরিবারের জন্য আটা আনতে গিয়ে নিখোঁজ হন গাজার বাসিন্দা আম্মার ওয়াদি। যাওয়ার আগেই ফোনের স্ক্রিনে লিখে রেখেছিলেন- আমার কিছু হলে আমায় ক্ষমা করে দিয়ো মা। আমার ফোন যিনি পাবেন, পরিবারকে জানাবেন আমি মাকে খুব ভালোবাসি। পরে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি সেই ফোনটি খুঁজে পেয়ে বার্তাটি তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন। যা ছিল তাদের শেষ খবর। সিএনএন জানিয়েছে, জিকিম সীমান্তের আশপাশে গুলিবর্ষণে নিহতদের দেহ অনেক ক্ষেত্রেই মিলিটারি জোনে ফেলে রাখা হয়। অনেক সময় বুলডোজার চালিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়, আর অনেক দেহ উদ্ধার না হওয়ায় খোলা জায়গায় পচে-গলে পড়ে থাকে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃতদেহ এভাবে পরিচালনা করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে- গ্রীষ্মজুড়ে জিকিম এলাকায় ব্যাপক বুলডোজার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। জুনে ঘটে যাওয়া এক হামলার পরের ভিডিওতে দেখা যায় উল্টে যাওয়া একটি ত্রাণ ট্রাকের চারপাশে আংশিক মাটিচাপা পড়ে থাকা দেহ। সাবেক দুই আইডিএফ সদস্য সিএনএনকে জানিয়েছেন, গাজার অন্যান্য অঞ্চলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তারা বর্ণনা করেছেন কিভাবে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের মৃতদেহ অগভীর কবরস্থানে বুলডোজার দিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী আইডিএফ দাবি করেছে- তারা মৃতদেহ সরানোর জন্য বুলডোজার ব্যবহার করেনি। তবে তা দিয়ে কবর দেওয়া হয়েছিল কি না সে প্রশ্নের উত্তর তারা এড়িয়ে গেছে। আইডিএফ বলেছে, এলাকা সুরক্ষা, বিস্ফোরকের ঝুঁকি মোকাবিলা কিংবা রুটিন ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্য বুলডোজার ব্যবহৃত হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিশেষজ্ঞ জানিনা ডিল বলেন, যুদ্ধরত পক্ষগুলোর দায়িত্ব নিহতদের এমনভাবে কবর দেওয়া যাতে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়। মৃতদেহ বিকৃত করা বা অসম্মানজনকভাবে কবরস্থ করা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ। জিকিম এলাকায় গুলির মাঝে ত্রাণ বহনকারী ফিলিস্তিনিদের ছুটে আসার একাধিক ভিডিও সিএনএন যাচাই করেছে। এক ভিডিওতে দেখা যায়- একজন ত্রাণ বহনকারীকে পিছন থেকে গুলি করা হচ্ছে। আরেকটিতে আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে আবার গুলি চলছে। এক ত্রাণ ট্রাক চালক বলেন, জিকিম দিয়ে গেলে প্রতিবারই লাশ দেখতে পাই। ইসরাইলি বুলডোজারগুলোকে মৃতদেহ মাটিচাপা দিতে দেখেছি। আরেকজন বলেন- এটা যেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল। সেখানে কী ঘটে কেউ জানে না।

জুনের মাঝামাঝি এক ঘটনায় একটি ত্রাণ ট্রাক ঘিরে ধরেন ক্ষুধার্ত মানুষজন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তখনই আইডিএফ গুলি চালায় এবং বহু মানুষ ট্রাকের নিচে পড়ে মারা যান। কয়েক দিন পর সিভিল ডিফেন্সের অ্যাম্বুলেন্স গিয়ে ১৫টি লাশ উদ্ধার করতে পারে, কিন্তু প্রায় ২০টি দেহ উদ্ধার না করেই ফিরে আসতে হয়। কারণ অ্যাম্বুলেন্স ভর্তি হয়ে গিয়েছিল।

এক আইডিএফ সদস্য জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে তাদের ঘাঁটির পাশে দুদিন ধরে পড়ে থাকা নয়টি মৃতদেহ বুলডোজার দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়। তিনি বলেন, কুকুরগুলো লাশ টেনে খাচ্ছিল। যে দৃশ্য দেখা ছিল অসহনীয়। মৃতদেহের পরিচয় নথিভুক্ত করার মতো কোনো চেষ্টা হয়নি। ইসরাইলি সৈন্যদের বয়ান সংগ্রহকারী সংগঠন ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-ও জানিয়েছে- এ ধরনের আরও অনেক সাক্ষ্য তাদের কাছে এসেছে।
আম্মার ওয়াদির পরিবার এখনো তার খোঁজ পায়নি। তার মা নাওয়াল মুসলেহ বলেন, ছেলের কথা মনে পড়লেই চোখের পানি থামে না। আমরা যা-ই হোক মেনে নেব। শুধু জানতে চাই, তার কী হয়েছিল। গাজার সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল এখন নিখোঁজদের কবরস্থান হয়ে উঠেছে। যেখানে বহু মানুষ যে পথ ধরে ত্রাণ নিতে গিয়েছিলেন, সেই পথই তাদের শেষ যাত্রাপথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

mzamin

Saturday, November 29, 2025

গণহত্যা বন্ধ হয়নি, গাজায় হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল: অ্যামনেস্টির সতর্কর্তা

ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মাঝেও গাজায় হামলা ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক সতর্কবার্তায় বলেছে, গাজায় এখনও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব। সংস্থাটির দাবি গত সাত সপ্তাহে ইসরাইল ৫০০ বার যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে অ্যামনেস্টির সেক্রেটারি-জেনারেল অ্যাগনেস কালামার্ড বলেন, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন এনেছে এমন প্রমাণ নেই। বরং মানবিক সহায়তা ও জরুরি সেবার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ফিলিস্তিনিদের শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে দেশটি। তার ভাষায়, বিশ্বের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই যে ইসরাইলের গণহত্যা এখনো শেষ হয়নি।

এদিন সকালে গাজার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বুরেইজ শরণার্থী শিবির ও খান ইউনিসের পূর্বাংশে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এসব হামলা যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেই পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি গাজা সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের।

এদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ক্বালকিলিয়া, তুবাস, হেবরন, তুলকারেম ও নাবলুসে নতুন করে অভিযান চালিয়ে বহু ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইল। তুবাসে অভিযানের সময় অন্তত ২৫ জনকে মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দক্ষিণ গাজার ইয়েলো লাইন-এর ইসরাইল অধিকৃত অংশের টানেলে আটকে থাকা কয়েক ডজন হামাস যোদ্ধার পরিস্থিতি উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ইসরাইলের দাবি, গত সপ্তাহে এদের অন্তত ২০ জনকে তারা হত্যা করেছে। হামাস বলছে, এসব আক্রমণ যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।

গাজায় আন্তর্জাতিক অস্ত্রধারী স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন, গাজায় একটি অস্থায়ী আন্তর্জাতিক প্রশাসন এবং পুনর্গঠন পরিকল্পনা- এসব নিয়ে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা চলছে। কায়রোতে তুরস্ক, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতাকারীরা বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তবে ইসরাইলের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো মোহাম্মদ শেহাদার মতে, ইসরাইল এখনো গাজাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অযোগ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেনি।

অ্যামনেস্টির কালামার্ড আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি যেন ইসরাইলের চলমান নৃশংসতার আড়াল না হয়। তার আহ্বান- ইসরাইলের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা, গাজা থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং পূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা। 

mzamin

Thursday, October 16, 2025

ইউরোপের কঠোর নিয়ম যেভাবে পরিবারগুলোকে আলাদা করে দিচ্ছে

গার্ডিয়ানের রিপোর্টঃ জুন মাসে জার্মান সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে আহমেদ শেখ আলি অশ্রু সংবরণ করছিলেন। হাতে তুলে ধরেন তার তিন বছরের ছেলের অস্পষ্ট একটি ছবি। দুই বছরেরও বেশি আগে আলেপ্পো থেকে পালিয়ে আসার পর থেকে তিনি সবকিছু করেছিলেন ছেলের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য। হ্যানোভার শহরে বসবাস শুরু করেন। পূর্ণকালীন চাকরি পান। আর পরিবারকে কাছে আনার জন্য কাগজপত্রের অসংখ্য ঝামেলা পেরিয়ে আসেন। সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। তিনি প্রায় পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। তার আবেদনটির আগে মাত্র দুটি মামলা বাকি ছিল। কিন্তু হঠাৎই জার্মান সংসদের নিম্নকক্ষ জুনে একটি বিল পাস করে।

তাতে বলা হয় তার মতো অভিবাসীদের জন্য পারিবারিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া অন্তত দুই বছরের জন্য স্থগিত থাকবে। কান্নাভেজা কণ্ঠে আহমেদ জানান, এই সিদ্ধান্ত জানার পর থেকে আমি ঘুমাতে পারি না। জীবন চালিয়ে নিতে পারি না। যখন আমি ছেলেকে রেখে আসি, সে হামাগুঁড়ি দিত। সে এখন হাঁটছে। অনলাইন গার্ডিয়ানে তার এই দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একই অবস্থা আরও অনেকের। রিপোর্টে বলা হয়, এটি কেবল এক ব্যক্তির কষ্ট নয়। কয়েক মাসে ইউরোপের একাধিক সরকার এমন পরিবারের পুনর্মিলনের সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, রাজনীতিবিদরা নিজেদের ‘অভিবাসন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণকারী’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সেভ দ্য চিলড্রেন ইউরোপের ফেদেরিকা তোসকানো বলেন, এটি আসলে কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। রাজনীতিবিদরা একদিকে বলছেন অভিবাসনকে সুশৃঙ্খল, ন্যায্য আর পরিকল্পিত করতে চান। আর পরিবারগুলোর পুনর্মিলনই তো সবচেয়ে সুরক্ষিত, আইনসম্মত আর সমাজে একীভূত হওয়ার অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি।
মার্চে অস্ট্রিয়া প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে শরণার্থীদের জন্য পরিবারিক পুনর্মিলন সাময়িকভাবে স্থগিত করে। অজুহাত দেয় সমাজসেবার ওপর বাড়তি চাপের কথা। পরে জার্মানি, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড এবং বেলজিয়ামও একই পথে হাঁটে। বেশ কয়েকটি সরকার জরুরি পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। অথচ এসব পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন ও ইইউ চার্টারে স্বীকৃত ‘পারিবারিক জীবনের অধিকার’-এর সঙ্গে।

তোসকানোর ভাষায়, পারিবারিক ঐক্য আমাদের সমাজে এক মহান মূল্যবোধ। কিন্তু বিদেশিদের পরিবার হলে সেটি যেন কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। সেভ দ্য চিলড্রেন ফিনল্যান্ডের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পারিবারিক পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া গড়ে সাড়ে ছয় বছর সময় নেয়। কেউ কেউ এমনকি ১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেছেন। এদিকে পারিবারিক পুনর্মিলনের মাধ্যমে আসা মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রিয়ায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পারিবারিক পুনর্মিলন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১৮০০০ মানুষ গিয়েছে। এর মধ্যে ১৩০০০ই শিশু। তারা অনেকেই বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে দীর্ঘ, বেদনাদায়ক সময় পার করেছে। তোসকানোর মতে, যত বেশি সময় এই প্রক্রিয়া নেয়, তত বেশি মানসিক আঘাত সঞ্চিত হয় শিশুদের মনে।

mzamin

Friday, September 19, 2025

দলিত জনগোষ্ঠীকে আর কত পিছিয়ে রাখা হবে by ফারাহ্ কবির

বাংলাদেশে দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও মানবাধিকারের প্রশ্নটি আমাদের জাতীয় বিবেকের সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জনগোষ্ঠী সামাজিক বঞ্চনা, জাতিগত বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার। তাদের প্রতি ‘অস্পৃশ্যতা’ বা ‘অচ্ছুত’ ধারণা এখনো সমাজের গভীরে প্রোথিত, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লাভে প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী যে বৈচিত্র্যময়, আমরা কি এই বৈচিত্র্যের শক্তি ধরে রাখতে পারছি? একশনএইড বাংলাদেশ, দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছে। এ অভিজ্ঞতার আলোকে, দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য এবং এর সমাধানে একটি কার্যকর পথরেখা তুলে ধরা এ লেখার মূল উদ্দেশ্য।

অদৃশ্য জনগোষ্ঠী: কারা এই দলিত

‘দলিত’ শব্দটি সংস্কৃত এবং হিন্দি ভাষায় ‘ভগ্ন’ বা ‘ছিন্নভিন্ন’ অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা নিপীড়িত ও অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীকে নির্দেশ করে। বাংলাদেশে এই জনগোষ্ঠী বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন হরিজন, বেদে, ঋষি, মেথর, ধাঙড়, নাপিত, ধোপা, পাটনী, কামার, কুমার, জেলে, চামার ইত্যাদি; যাদের পেশা প্রায়ই সমাজের নিম্নস্তরের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্রিটিশ আমলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, চা-বাগানের কাজ, পয়োনিষ্কাশন ইত্যাদি কাজের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দরিদ্র দলিতদের এ দেশে আনা হয় এবং কাজের স্থানেই কলোনিতে তাদের থাকতে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও ভিন্নতা বিদ্যমান, যা তাদের জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়নে একটি বড় বাধা। বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ৪৫ লাখ থেকে ৬৫ লাখ পর্যন্ত হতে পারে, এমনকি গণমাধ্যমের কোনো কোনো প্রতিবেদনে তা ৭৫ লাখও উল্লেখ করা হয়েছে। এই অস্পষ্টতা দলিতদের ‘অদৃশ্য’ করে রাখে, যা ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মূলনীতির পরিপন্থী। যদি সরকারের কাছে তাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকে, তাহলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা আবাসনের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব?

বৈষম্যের বহুমুখী চিত্র

দলিত জনগোষ্ঠী সমাজে এখনো গভীর বৈষম্যের শিকার। তাদের অস্পৃশ্য মনে করার কারণে সব জায়গায় প্রবেশে বাধা, একই জায়গায় বসতে অনীহা, জমি বিক্রি না করা বা ঘরবাড়ি ভাড়া না দেওয়ার মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। ৩৮ শতাংশ দলিত হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। জন্ম ও জাতপাতের কারণে শত বছরের বঞ্চনা তাদের মধ্যে একধরনের বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি জন্ম দিয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবেও তারা চরম দুর্বল। মাত্র ৩৯ শতাংশ দলিত আয়মূলক নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে সংযুক্ত, যার বেশির ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অস্থায়ী। ৫৬ শতাংশ দলিত পরিবারের মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার কম, যা দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব। ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ দলিত ঋণগ্রস্ত, যাঁদের ৫৮ শতাংশ শুধু খাবারের খরচ মেটানোর জন্য ঋণ করেছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বিশ্বায়নের ফলে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো সংকুচিত হচ্ছে, বাড়ছে বেকারত্ব।

শিক্ষাক্ষেত্রে দলিতদের অবস্থা উদ্বেগজনক। প্রায় ৬৩ শতাংশ দলিত শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে, যার প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য। মাধ্যমিক পর্যায়ে দলিত শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের হার মাত্র ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, উচ্চশিক্ষায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের প্রতি অবজ্ঞা ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। একশনএইডের সহায়তায় দলিত সংস্থা কাজ করে দলিত শিশুদের উপবৃত্তিপ্রাপ্তি ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও দলিতরা পিছিয়ে। ৪৪ শতাংশ দলিত প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন না। দলিত ও আদিবাসী গর্ভবতী নারীদের টিকা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত না করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। ৭০ শতাংশ দলিত নারী স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়েন। একজন দলিত নারীর গড় আয়ু ৪০ বছর, যেখানে উচ্চবর্ণের নারীদের আয়ু ৫৫ বছর, যা এক বিশাল বৈষম্য। ২৫-৪৯ বছর বয়সী ৫৬ শতাংশ দলিত নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেও অস্পৃশ্যতার চর্চা দেখা যায়।

দলিত নারীরা তিন স্তরে বৈষম্যের শিকার: দলিত হওয়ার কারণে, নারী হওয়ার কারণে এবং দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে। জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাঁরা অমানবিক কর্মপরিবেশ, মজুরিবৈষম্য ও যৌন হয়রানির সম্মুখীন হন। ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ দলিত নারী গৃহিণী হিসেবে কাজ করেন। কারণ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাঁদের ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা, যাঁদের অধিকাংশই দলিত, সমাজে অবহেলিত এবং তাঁদের সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। তাঁদের বেতন অন্যান্য চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের তুলনায় নামমাত্র। পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রীর অভাব, শোভন কর্মপরিবেশের অভাব, বিশ্রামাগারের অভাব এবং পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের ভয় তাঁদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।

সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও আইনের দীর্ঘসূত্রতা

বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিকের জন্য সমতা ও বৈষম্যহীনতার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২–সহ অন্যান্য ধারায় আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী–পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধকরণ, সরকারি নিয়োগে সুযোগের সমতা এবং আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার–সংশ্লিষ্ট প্রধান সনদগুলোকেও স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবে সংবিধানের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বৈষম্য দূরীকরণের জন্য দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই, যা আইনি প্রতিকার লাভে বাধা সৃষ্টি করে। ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ প্রণয়নের দাবি নিয়ে অনেক সংগঠন ২০০৭ সালে কাজ শুরু করে। ২০১৪ সালে আইন কমিশন এর খসড়া সুপারিশ করে। ২০১৮ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন খসড়াটি পরিমার্জন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। অবশেষে ২০২২ সালে সংসদে ‘বৈষম্যবিরোধী বিল ২০২২’ উত্থাপন করা হয়। এই বিলের উদ্দেশ্য ছিল সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, জাতীয় নির্বাচনের কারণে বিলটি আর আইন আকারে পাস হয়নি। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ করার দাবি জানানো হলেও উত্থাপিত আইনে ‘বিরোধী’ শব্দের অবতারণা করা হয়েছে। এ ছাড়া এই আইনে ‘দলিত’দের সংজ্ঞা নেই, যা থাকা উচিত বলে মনে করা হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা ও শব্দগত পার্থক্য আইনের কার্যকারিতা ও এর চূড়ান্ত লক্ষ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নেপালে ২০১১ সালে ‘কাস্ট বেজড ডিসক্রিমিনেশন অ্যান্ড আনটাচেবিলিটি (অফেন্স অ্যান্ড পানিশমেন্ট) অ্যাক্ট’ প্রণীত হয়েছিল এবং তার বাস্তবায়নের জন্য একটি দলিত কমিশনও গঠিত হয়েছিল, যা বাংলাদেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

করণীয়: একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পথে

দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা কেবল তাদের মৌলিক অধিকার নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এ সমস্যার সমাধানে একটি সমন্বিত ও বহুমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন। একশনএইড বাংলাদেশ, ফারাহ্ কবিরের নেতৃত্বে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিরন্তর অ্যাডভোকেসি ও মাঠপর্যায়ের কাজ করে যাচ্ছে।

১. আইনি ও নীতিগত সংস্কার:

• বৈষম্য বিলোপ আইন দ্রুত পাস: ‘বৈষম্যবিরোধী বিল ২০২২’–কে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ দ্রুত ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ হিসেবে পাস করা সময়ের দাবি। এই আইনে ‘দলিত’দের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা এবং ‘বিলোপ’ শব্দটি ব্যবহার করা উচিত।

• দলিত কমিশন গঠন: দলিতদের অধিকার সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে একটি স্থায়ী দলিত কমিশন গঠন করা জরুরি। কমিশনের প্রথম কাজ হবে দলিতদের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ শুমারি করা।

• সাংবিধানিক স্বীকৃতি: দলিতদের পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা উচিত।

• শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তিকরণ: পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাঁদের কাজের নিশ্চয়তা ও নির্দিষ্ট বেতন স্কেল নিশ্চিত করা।

২. শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন:

• শিক্ষায় কোটা ও উপবৃত্তি: দলিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে কোটা রাখা এবং উপবৃত্তি নিশ্চিত করা।

• কারিগরি প্রশিক্ষণ: দলিতদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান, যা তাঁদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।

৩. স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়ন:

• কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা: দলিত পাড়াগুলোতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এবং বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন–সুবিধার অপর্যাপ্ততা দূর করা।

• আবাসন ও পুনর্বাসন: ভূমিহীন দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাসজমির বন্দোবস্ত করা। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য মহানগর ও পৌরসভায় আবাসনের ব্যবস্থা করা। পুনর্বাসন ছাড়া দলিত কলোনি/বসতি উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করা।

৪. অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা:

• বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি: দলিতদের জন্য ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি’র আওতায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা এবং এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

• কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি: দলিতদের জন্য ঐতিহ্যগত পেশা সংকীর্ণ হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

৫. সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিনিধিত্ব:

• জনপরিসরে অভিগম্যতা: দলিতদের জনপরিসরে প্রবেশে বাধা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।

• স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব: স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন কমিটিতে দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। দলিত নারীদের নেতৃত্বে আনা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো।

• সচেতনতা বৃদ্ধি: বৈষম্য দূর করতে সমাজে সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।

৬. তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা:

• সঠিক পরিসংখ্যান: দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক জনসংখ্যা নির্ধারণে জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

• পৃথক ডেটাবেজ: দলিত জনগোষ্ঠীকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের জন্য একটি পৃথক ডেটাবেজ তৈরি করা।

বাংলাদেশে দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা কেবল তাদের মৌলিক অধিকার নয়; বরং দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন ও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। সংবিধানের অঙ্গীকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

জন্মগতভাবে প্রত্যেক মানুষ পূর্ণ মানবাধিকার ও সমমর্যাদার অধিকারী। প্রায় ৬৫ লাখ দলিত মানুষ, যার প্রায় অর্ধেকই নারী, জাতপাত ও পেশাগত পরিচয়ের কারণে নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হন। এমন বঞ্চনার প্রতিকারে কোনো আইনি সুরক্ষা না থাকাটা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান বহুমুখী বৈষম্য দূরীকরণে একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহ এবং তাদের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন ও মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হবে। সর্বোপরি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অস্পৃশ্যতার মতো প্রথাগত বৈষম্য বিলোপে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা অপরিহার্য।

একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার পথে দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের কান্না শুনতে পাওয়া এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।

* ফারাহ্ কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও ভিন্নতা বিদ্যমান, যা তাদের জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়নে একটি বড় বাধা।
বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও ভিন্নতা বিদ্যমান, যা তাদের জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়নে একটি বড় বাধা। ফাইল ছবি

Friday, September 5, 2025

বাবাকে নজরবন্দী, ভাইদের আটক—সৌদি রাজতন্ত্রে যেভাবে ক্ষমতাধর হয়ে উঠলেন মোহাম্মদ বিন সালমান

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৫ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পরে ২০১৭ সালের ২১ জুন ক্রাউন প্রিন্স হন। সৌদি আরবে এখন কার্যত বাদশাহ তিনি। কিন্তু তাঁর আগে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে যুবরাজ করা হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে তিনি সৌদি যুবরাজ পদে বসেছেন। সৌদি আরবে তাঁর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা নিয়ে পশ্চিমা লেখক ডেভিড বি ওটাওয়ে ও বান হার্ভাড বই লিখেছেন। দুজনের বইয়ে রয়েছে অনেক অজানা তথ্য। এসব নিয়ে বিবিসি হিন্দিতে লিখেছেন রেহান ফজল। ৩ সেপ্টেম্বর লেখাটি বিবিসি বাংলার অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে।

বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর সৌদি সাম্রাজ্যের নতুন বাদশাহ হন সালমান বিন আবদুল আজিজ। ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন বাদশাহ আবদুল্লাহ।

শুরুতে যুবরাজ (ক্রাউন প্রিন্স) হিসেবে সৎভাই মুকরিন বিন আবদুল আজিজের নাম ঘোষণা করেছিলেন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। সে সময় মুকরিনের বয়স ছিল ৬৮ বছর।

কিন্তু মাত্র তিন মাস পরেই সালমান বিন আবদুল আজিজ বরখাস্ত করেন সৎভাইকে। পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ওই জায়গায় আনেন। সম্পর্কে তিনি বাদশাহর ভাইপো। পাশাপাশি ২৯ বছরের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন তিনি।

প্রায় ৯ বছর আগে যখন একের পর এক এসব ঘটনা ঘটছিল, সে সময় মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম সৌদি আরবের রাজনীতিতে কেউ শোনেননি। তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতেনও না কেউ।

অন্যদিকে মোহাম্মদ বিন নায়েফের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল মার্কিন প্রশাসন। তিনি প্রতিরক্ষা বিষয়ে এফবিআইয়ের (যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো) কোর্স করেছিলেন। নিয়েছিলেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে সন্ত্রাস দমন কৌশলের প্রশিক্ষণও; কিন্তু ২০০৯ সালের আগস্টে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। ওই হামলার জন্য সে সময় দায়ী করা হয়েছিল আল-কায়েদাকে।

সৌদি বাদশাহর ‘দ্বাররক্ষক’

মোহাম্মদ বিন সালমান এমবিএস নামে বহুল পরিচিত। লেখক ডেভিড বি ওটাওয়ে তাঁর বইয়ে মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি (মোহাম্মদ বিন সালমান) বাদশাহর গেটকিপার (দ্বাররক্ষক) হওয়ার জন্য নিজের পদকে ব্যবহার করতে শুরু করেন।’ উদ্দেশ্য ছিল, বাবাকে নজরে রাখা।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দ্রুতই মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর বাবাকে পরিবার ও বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের থেকে আলাদা করে ফেলেন। এমনকি এ–ও বলা হয় যে বাদশাহকে তাঁর স্ত্রী, মানে এমবিএসের মায়ের সঙ্গেও দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়।

ডেভিড বি ওটাওয়ের বইয়ে দাবি করা হয়েছে, মোহাম্মদ বিন সালমান কার্যত তাঁর মা ও দুই বোনকে গৃহবন্দী করেন এবং বাবাকে এ সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পেতে দেননি।

বাদশাহ নিজের স্ত্রীর কথা জিজ্ঞাসা করলেই বলা হতো চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে তাঁকে।

ইয়েমেন আক্রমণ

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দ্রুতই নিজের প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন মোহাম্মদ বিন সালমান। তাঁর তত্ত্বাবধানে সে বছরের ২৬ মার্চ (২০১৫ সাল) হুতি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানাকে মুক্ত করতে হামলা চালায় সৌদি বিমানবাহিনী।

ওটাওয়ে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘প্রাথমিকভাবে সৌদি জনগণ ওই হামলার প্রশংসা করেছিলেন। ভেবেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ইরানের সম্প্রসারণবাদী প্রবণতার বিরোধিতা করার সাহস দেখিয়েছে তাঁদের দেশ।’

’কিন্তু কিছুদিন পর এ হামলা বাদশাহ, মোহাম্মদ বিন সালমান ও সৌদি আরবের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটিকে মোহাম্মদ বিন সালমানের পররাষ্ট্রনীতির গাফিলতি হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে।’

মোহাম্মদ বিন নায়েফকে আটক

কাছাকাছি সময়েই তৎকালীন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে অপসারণ করে ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স করার সিদ্ধান্ত নেন বাদশাহ সালমান।

পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিকে ২০১৫ সালের ২০ জুন রাতে রাজপরিবারের একাধিক সদস্য পবিত্র মক্কায় জড়ো হন। সেই রাতে, রাজনৈতিক ও সুরক্ষাবিষয়ক কাউন্সিলের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, যার সভাপতিত্ব করার কথা ছিল মোহাম্মদ বিন নায়েফের; কিন্তু বৈঠক শুরুর কিছুক্ষণ আগেই তিনি একটি বার্তা পান। সেখানে বলা হয়েছিল, বাদশাহ সালমান তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান।

তড়িঘড়ি হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে বাদশাহর সঙ্গে দেখা করার জন্য সাফা মহলে পৌঁছান বিন নায়েফ। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই দেহরক্ষী।

লেখক বেন হাবার্ড তাঁর বই ‘দ্য রাইজ টু পাওয়ার, মোহাম্মদ বিন সালমান’-এ উল্লেখ করেছেন, ‘মোহাম্মদ বিন নায়েফ ও তাঁর দুই রক্ষী বাদশাহর সঙ্গে দেখা করার জন্য লিফটে উঠেছিলেন। দোতলায় লিফটের দরজা খুলতেই বাদশাহর সৈন্যরা এগিয়ে গিয়ে নায়েফের রক্ষীদের অস্ত্র ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেন।’

‘পাশের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় নায়েফকে। তিনি চলে যেতে উদ্যত হলে, বাধা দেওয়া হয় এবং ক্রাউন প্রিন্স পদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হতে থাকে। কিন্তু তাঁদের কথা শুনতে নারাজ ছিলেন বিন নায়েফ।’

নায়েফের পদত্যাগ

ওই রাতেই বিন নায়েফকে গৃহবন্দী করা হয় এবং রয়্যাল কোর্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়্যাল কাউন্সিলের সদস্যদের ডেকে জানতে চান, তাঁরা মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ বানানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে একমত কি না।

কাউন্সিলের ৩৪ সদস্যের মধ্যে ৩১ জন সমর্থন জানান। তাঁদের ফোনকল রেকর্ড করা হয় এবং মোহাম্মদ বিন নায়েফকে জানানো হয়, তাঁর কতজন আত্মীয় বাদশাহর এ সিদ্ধান্তে সমর্থন করেছেন।

বেন হাবার্ড তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘বিন নায়েফ ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। কিন্তু সে রাতে তাঁকে ওষুধ দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত পরদিন সকালে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য তৈরি হয়ে যান।’ তাঁকে পাশের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে বাদশাহ সালমান ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা ক্যামেরাসহ হাজির ছিলেন।

বিন নায়েফকে অভ্যর্থনা জানান বাদশাহ এবং তাঁর হাতে চুম্বন করেন। নায়েফ খুব নিচু স্বরে সালমানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তাঁদের এই সাক্ষাতের ভিডিও সৌদি টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে সময় বারবার সম্প্রচার করা হয়।
‘এরপর মোহাম্মদ বিন নায়েফ কক্ষ থেকে বেরোনোর পর অবাক হয়ে দেখেন যে তাঁর রক্ষীরা সেখানে নেই। জেদ্দায় নিজের প্রাসাদে পৌঁছানোর পর তাঁকে সেখানে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।’

বিন নায়েফের নীরবতা

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রশ্নের জবাবে রয়্যাল কোর্টের একজন মুখপাত্র অবশ্য ওই রাত সম্পর্কে ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে ক্রাউন প্রিন্সের পদ থেকে মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়েছিল রয়্যাল কাউন্সিল। রয়্যাল কোর্ট আরও জানায়, তাঁকে বরখাস্ত করার কারণগুলো গোপন রাখা হয়েছে এবং সেগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।

ঘটনার প্রায় এক মাস পর নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সৌদি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, মরফিন ও কোকেনে আসক্ত থাকার কারণে বিন নায়েফকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাদশাহ।

ওই বছরের শেষের দিকে বিন নায়েফের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়। তাঁর প্রতি এমন আচরণ নিয়ে মোহাম্মদ বিন নায়েফ অবশ্য প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেননি।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে ১৯৮৫ সালের ৩১ আগস্ট জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ বিন সালমানের পোস্টার সৌদি আরবের সর্বত্র দেখা যায়। তিনি সৌদি রাজপরিবারের অন্যতম যুবরাজ, যিনি বিদেশে পড়াশোনা করেননি। তিনি কখনোই সৌদি সেনাবাহিনী বা বিমান বাহিনীর সদস্য ছিলেন না। রিয়াদের রয়্যাল অ্যান্ড সেকেন্ডারি স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি।

মোহাম্মদ বিন সালমানের ইংরেজি শিক্ষক রশিদ সেকাই বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদ বিন সালমান ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলেন। ইংরেজি পড়ার চেয়ে ওয়াকিটকিতে প্রাসাদের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলতেই বেশি আগ্রহ ছিল তাঁর।’
স্নাতক হওয়ার পর ২০০৭ সালে সারা বিনতে মাশুরকে বিয়ে করেন মোহাম্মদ বিন সালমান। এই যুগলের চারটি সন্তান রয়েছে।

পিয়ানোতে ধ্রুপদি সুর

মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তাঁকে নিজের বাড়িতে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।

বইয়ে সে প্রসঙ্গে বেন হাবার্ড লিখেছেন, পুরো সন্ধ্যাটাই কেরির সঙ্গে কথা বলে কাটান মোহাম্মদ বিন সালমান। সে সময় বিন সালমানের চোখ পড়ে সেখানে রাখা পিয়ানোর ওপর।

জন কেরি বিন সালমানের কাছ থেকে জানতে চান, ‘আপনি পিয়ানো বাজাতে জানেন? পিয়ানোতে ধ্রুপদি সুর বাজিয়ে তাক লাগিয়ে দেন মোহাম্মদ বিন সালমান।’
‘ঘরে উপস্থিত সবাই অবাক হয়েছিলেন। যেহেতু ‘‘ওয়াহাবি ঘরানার’’ মানুষেরা সংগীত অপছন্দ করে, ফলে জন কেরি আশা করেননি যে মোহাম্মদ বিন সালমান পিয়ানো বাজাবেন।’

বিচারকের টেবিলে বুলেট

শুরু থেকেই যুবরাজ বিন সালমানের ঝোঁক ছিল বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার দিকে।

সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস পর্যবেক্ষক রিচার্ড লেসি লিখেছেন, ‘মোহাম্মদ বিন সালমান তখনো ক্রাউন প্রিন্স হননি। রিয়াদে একটি মূল্যবান জমির ওপর নজর পড়ে তাঁর বাবার। কিন্তু জমির মালিক সেটি বিক্রি করতে চাইছিলেন না।’

‘এ নিয়ে চাপ দিতে একজন বিচারকের কাছে যান মোহাম্মদ বিন সালমান। বিচারকও এ নিয়ে কথা বলতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তখন মোহাম্মদ বিন সালমান বিচারকের টেবিলে রিভলবারের একটি বুলেট রাখেন। ইঙ্গিত ছিল, বিচারক তাঁর কথা না মানলে হয়তো তাঁকে গুলি করা হবে।’

যুবরাজের এহেন আচরণ সম্পর্কে বাদশাহ আবদুল্লাহর কাছে অভিযোগ করেন বিচারক। এ খবর কখনো অস্বীকার করেননি সালমান। এরপর ২০১১ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ যখন মোহাম্মদ বিন সালমানের বাবাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন, তখন শর্ত দিয়েছিলেন যে এমবিএস যেন কখনোই মন্ত্রণালয়ের ভবনে প্রবেশ না করে।

নারীদের গাড়ি চালানোর স্বাধীনতা

মোহাম্মদ বিন সালমানের বাবা যখন সৌদি আরবের বাদশাহ হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৭৯ বছর। শোনা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই আলঝেইমারে ভুগছিলেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষমতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন মোহাম্মদ বিন সালমান।

সৌদি আরবের যুবক ও নারীদের মন জয় করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন বিন সালমান। তিনি ২০১৮ সালে নারীদের জন্য প্রচলিত ড্রেস কোড (পোশাকবিধি) শিথিল করে বলেছিলেন, প্রকাশ্যে নারীদের ‘আবায়া’ পরার দরকার নেই।

সেই বছরই নারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা নিজেরাই কাজে বা কেনাকাটার জন্য গাড়ি চালিয়ে যেতে পারেন। এ জন্য সঙ্গে পুরুষ অভিভাবক রাখার প্রয়োজন নেই।

লেখক মার্ক থম্পসন তাঁর ‘বিয়িং ইয়ং, মেল অ্যান্ড সৌদি’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, ‘অর্থনৈতিক কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, নারীদের স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য নয়।’ তাঁর মতে, ‘নারীরা পুরুষের অনুমতি ছাড়াই যাতে কাজ করতে ও উপার্জন করা অর্থ ব্যয় করতে পারেন, সে কথা মাথায় রেখেই নেওয়া হয় এ পদক্ষেপ।’

‘শুরা’র সমাপ্তি

সৌদি আরববিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে ‘শুরা’ ও জ্যেষ্ঠ প্রিন্সদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঐতিহ্যে বিরাম টেনেছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। ‘শুরা’ বলতে পরামর্শমূলক পরিষদকে বোঝায়। এর বদলে নিজেকে এক ও একমাত্র শাসক হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

নিজের সিদ্ধান্ত ও রাজনীতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিবাদ বা সমালোচনা যে বিন সালমান বরদাস্ত করবেন না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।

চেজ ফ্রিম্যান ১৯৯০-এর দশকের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি আরবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর মতে, ‘সৌদি রাজপরিবারের ঐক্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো শুরার ধারণার প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা।’

বিলাসবহুল সামগ্রীর প্রতি আকর্ষণ

ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার আগেও দামি সামগ্রীর প্রতি আকর্ষণের জন্য পরিচিত ছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি ৪৪০ ফুট লম্বা বিলাসবহুল ইয়ট কিনতে ৫০ কোটি ডলার খরচ করেছিলেন। এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে লেওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম কেনার জন্য ৪৫ কোটি ডলার খরচ করেন।

সমালোচনা এড়াতে বিন সালমান প্রথমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ওই বিখ্যাত চিত্রকর্ম আবুধাবির জাদুঘরে দিয়ে দেবেন; কিন্তু তেমনটা হয়নি। এর কিছুদিন পরই তাঁর বিলাসবহুল নৌযান ‘সেরিন’-এ দেখা যায় ওই চিত্রকর্ম।

একের পর এক গ্রেপ্তার, হারিরির পদত্যাগ

বলা হয়, সৌদি আরবে অন্তত ১০ হাজার প্রিন্স রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। তাঁদের সবাইকে সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। সর্বনিম্ন ভাতা ৮০০ ডলার এবং সর্বোচ্চ পৌনে ৩ লাখ ডলার।

ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করার পরই এ ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেন মোহাম্মদ বিন সালমান।

২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর মোহাম্মদ বিন সালমান সরকারি তহবিল তছরুপের অভিযোগে প্রিন্স, ব্যবসায়ী ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা মিলিয়ে ৩৮০ জনকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন।

বেন হাবার্ড লিখেছেন, ‘তাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ১১ জন প্রিন্স ছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আদিল ফিকিয়া এবং অর্থমন্ত্রী ইব্রাহিম আবদুল আজিজও ছিলেন।’

‘তাঁদের সবার মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং পাঁচ তারকা রিটজ-কার্লটন হোটেলে নিয়ে গিয়ে গৃহবন্দী করা হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা অর্থ সরকারকে ফেরত দেওয়ার পর তাঁদের সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁরা মোট ১০০ কোটি ডলার জরিমানাও দেন।’

একই ভাবে সৌদি আরব সফরে যাওয়া লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরিকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে বিন সালমানের বিরুদ্ধে। সে সময় ওই অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়।

বেন হাবার্ড লিখেছেন, ‘আল-হারিরি মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে দেখা করতে এলে তাঁকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর গাড়িবহরে থাকা ব্যক্তিদের বাইরে থাকতে বলা হয়। ওই কক্ষেই হারিরিকে পদত্যাগ করতে বলা হয়।’

‘আল-হারিরি লেবাননের পতাকার পাশে দাঁড়িয়ে পদত্যাগের ঘোষণা করেন এবং একটা বিবৃতি পাঠ করেন। সে বিবৃতি বিশ্বজুড়ে টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছিল।’

আল–হারিরিকে বলতে শোনা যায়, তাঁর পদত্যাগ লেবাননকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করে তুলবে। এই বিবৃতি পাঠের সময় তিনি বেশ কয়েকবার থামেন এবং এমন একটা ইঙ্গিত দেন যে ওই বিবৃতি তিনি নিজে লেখেননি।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ‘হারিরি যদি পদত্যাগই করতে চাইতেন, তবে বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে কেন পদত্যাগ করলেন?’

এর কয়েকদিন পর আল-হারিরি দেশে ফেরেন এবং তাঁর সেই পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এই অদ্ভুত ঘটনার নেপথ্যের কাহিনি অবশ্য কখনোই জানা যায়নি।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১৮ সালের মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি সরকার ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ২ হাজার ৩০৫ জনকে আটক করেছে, যাঁদের মধ্যে ২৫১ জন তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁদের কখনো বিচারকের সামনে হাজির করা হয়নি।

শুধু তা–ই নয়, নিউইয়র্কভিত্তিক ‘কমিটি ফর দ্য প্রটেকশন অব জার্নালিস্ট’ও তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সৌদি আরবে ২৬ জন সাংবাদিক বন্দী রয়েছেন। এ সংখ্যা চীন ও তুরস্কের পর বিশ্বে সর্বোচ্চ। আবার ২০১৯ সালে এক হাজার সৌদি নাগরিকের ওপর ভ্রমণ–নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।

জামাল খাসোগি হত্যা মামলা

মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর ব্যাপার ছিল, যখন তুরস্কের সৌদি দূতাবাসে গিয়ে এমবিএসের অন্যতম সমালোচক সাংবাদিক জামাল খাসোগি খুন হন।

খাসোগি আরব নিউজ ও আল-ওয়াতানের মতো সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন। সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ বিন সালমান এক বছর ধরে ওই হত্যার দায় অস্বীকার করেন।

ডেভিড বি ওটাওয়ে লিখেছেন, ‘মোহাম্মদ বিন সালমানের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর তত্ত্বাবধানে এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে সিআইএ এ সিদ্ধান্তে আসে যে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ স্বয়ং যুবরাজই দিয়েছিলেন।’

‘যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) মোহাম্মদ বিন সালমানের একটা পুরোনো রেকর্ডিং খুঁজে পায়, যেখানে সৌদি আরবে না ফিরলে খাসোগিকে গুলি করার কথা বলেছিলেন তিনি।’

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক নোরা ডোনেল যুবরাজকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি খাসোগিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন?’

জবাবে মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন, ‘একেবারেই না। এটি একটি জঘন্য অপরাধ। কিন্তু সৌদি আরবের নেতা হিসেবে আমি এর সম্পূর্ণ দায় নিচ্ছি। বিশেষত, যখন অপরাধীরা সৌদি সরকারের হয়ে কাজ করছিল।’

এরপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের এক আদালত সাংবাদিক খাসোগিকে হত্যার দায়ে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে ২৪ বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে ২০২০ সালের ২০ মে প্রয়াত সাংবাদিকের পুত্র সালেহ খাসোগি তাঁর বাবার হত্যাকারীদের ক্ষমা করে দেন।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ফাইল ছবি: রয়টার্স