Showing posts with label সাহিত্য. Show all posts
Showing posts with label সাহিত্য. Show all posts

Tuesday, June 23, 2026

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ by অনুরুদ্ধ গোস্বামী

"যে রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তা আমার চিন্তাধারার ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ অমান্য করে, নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে মাঝারি কর্তাদের বিধিনিষেধ মেনে আর রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই, প্রবৃত্তিই নেই। এই ব্যাপারে যুক্তিহীন কতগুলি নিয়ম যতদিন বলবৎ থাকবে, ততদিন নিজেকে দূরে সরিয়েই রাখব"— দেবব্রত বিশ্বাস, (ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত, পৃ. ১৩০)

এই কথাগুলোই ছিল দেবব্রত বিশ্বাসের সমগ্র সংগীতজীবনের সারসত্য। প্রতিষ্ঠানের চোখে তিনি ছিলেন ব্রাত্য, কিন্তু মানুষের কাছে ছিলেন অনিবার্য। তাঁর ভরাট কণ্ঠ, স্বতন্ত্র গায়কি আর আবেগময় পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীতকে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে নিয়ে এসেছিলেন সাধারণ মানুষের জীবনে, পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।

রবীন্দ্রসংগীতের 'শুদ্ধতা' রক্ষার নামে তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন একা, ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে এবং আপসহীনভাবে। সমালোচনা, বিতর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, তবু থেকেছেন নিজ দর্শন ও বিশ্বাসে অবিচল। অর্থ, খ্যাতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মোহ—এসবের কোনো কিছুই দেবব্রত বিশ্বাসকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। যা তিনি অন্তরে ধারণ করতেন, সেই বিশ্বাসেই গেয়ে গেছেন আমৃত্যু।

১৯১১ সালের ২২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার বরিশালে এক ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম নেন দেবব্রত বিশ্বাস। বাবা দেবেন্দ্রকিশোর বিশ্বাস, মা অবলাদেবী। পিতৃপুরুষের ভিটা ছিল কিশোরগঞ্জের ইটনা গ্রামে। তাঁর ঠাকুরদা ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেই বিতাড়নের উত্তাপ পরবর্তী প্রজন্মেও পোহাতে হয়েছে দেবব্রতকে। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখে তিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ'। শৈশবের এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অপমান পরবর্তী জীবনে অন্যায় ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল তাঁকে। 'জর্জ' নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত—জন্মের সময় ইংল্যান্ডের সিংহাসনে ছিলেন পঞ্চম জর্জ, সেই অনুষঙ্গেই বাবা এই নামটি রেখেছিলেন।

কিশোরগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, আনন্দমোহন কলেজ হয়ে কলকাতা সিটি কলেজে আই.এ., তারপর বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। ১৯৩৪ সালে যোগ দেন হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে, যা পরে জীবনবিমা নিগম নামে পরিচিতি পায়। সেখান থেকেই ১৯৭১ সালে অবসর নেন। সংগীতে কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তাঁর—মায়ের কণ্ঠে ব্রহ্মসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে বেড়ে ওঠা। ১৯২৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের শতবার্ষিকী উৎসবে প্রথমবার দেখেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীচৌধুরানীর হাত ধরে। পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে পিয়ানোর সাহচর্যে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের ভেতরের আলোটুকু অনুভব করতে শিখলেন। বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পরিচালনায় কনক দাসের সঙ্গে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত "সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান" এবং "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব"—গান দুটির মাধ্যমে প্রথম দ্বৈত রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডের মাধ্যমে এই জগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু।

১৯৩৮ সালে পিতৃবিয়োগ ও তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যেই দেবব্রতর জীবনচেতনা বামপন্থার দিকে দৃঢ়ভাবে ঝুঁকতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলায় গড়ে ওঠা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মঞ্চে তিনি নিয়মিত গাইতে শুরু করলেন স্বদেশি গান ও রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গানগুলো। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা গানে সুরারোপ করলেন দেবব্রত—ঐতিহাসিকভাবে যার নাম হলো 'নবজীবনের গান'।

দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই গান। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক 'নবান্ন' এবং গণনাট্য সংঘের ছায়ানাটক 'শহীদের ডাক'-এর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মতো প্রতিভাধর মানুষদের সঙ্গে এই সময়েই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গণনাট্যের তরুণ গায়ক কলিম শরাফীকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে—যে পূর্ববঙ্গের মাটিতে জন্ম ও শৈশব, তা রাতারাতি 'বিদেশ' হয়ে যাওয়া তিনি মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে নতুন রেকর্ডের মাধ্যমে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পর জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছালেন দেবব্রত। কিন্তু ১৯৬৪ সাল থেকে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নিতে থাকে। বোর্ড একের পর এক রেকর্ড অননুমোদিত করতে লাগল—কখনো অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে, কখনো গানের গতি নিয়ে, কখনো স্বরলিপির প্রশ্নে। কিন্তু ঠিক কোথায় কী ভুল, তা কখনো স্পষ্ট করা হয়নি। বিচারটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতিনির্ভর, কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

১৯৭৪ সালে বোর্ডের সেক্রেটারিকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে দেবব্রত রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাই তুলে ধরলেন। গায়কের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, "গানের গতি অনেকখানি তরল, কাজেই তাতে গায়ককে খানিকটা স্বাধীনতা তো দিতেই হবে।" আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি তিনি তুলে ধরলেন— "সরস্বতীকে শিকল পরাইলে চলিবে না... সংসারে কেবল মাঝারির রাজত্বেই এমন নিদারুণতা সম্ভব।"

যে রবীন্দ্রনাথের নামে নিয়মের বেড়াজাল তৈরি হচ্ছিল, সেই রবীন্দ্রনাথই যে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন—এই সত্যটাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দেবব্রত। ১৯৭৭ সালে বোর্ড কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। দেবব্রত তখন জানালেন, বোর্ডের পরীক্ষকরা বয়সে ও অভিজ্ঞতায় তাঁর চেয়ে কম—তাদের হাতে নিজের ব্যাখ্যা ও প্রকাশের স্বাধীনতা তুলে দিতে রাজি নন তিনি। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বস্ত বন্ধু জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রকে রেকর্ড অনুমোদনের দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু ২৫ অক্টোবর ১৯৭৭-এ জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রয়াত হলেন—বন্ধ হয়ে গেল শেষ সম্ভাবনাটুকুও। বোর্ডের অনুমোদন না পেয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে রচিত নিজের 'গুরু বন্দনা' গানটিও প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। পাহাড়সম বেদনার ভার বুকে নিয়ে ১৯৮০ সালে লিখলেন— "কে রে হেরা আমারে গাইতে দিল না।"

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বদেশে স্বজনদের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও সুরে দুটি গান রেকর্ড করেন দেবব্রত বিশ্বাস। ওপার বাংলার জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও একাধিকবার এসে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেছেন।

জীবনের শুরুতে যিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ', শেষ জীবনে নিজেই বললেন রবীন্দ্রসংগীত জগতে তিনি হয়ে গেছেন 'হরিজন'। এই বিচিত্র পরিহাসই তাঁর গোটা জীবনের প্রতীক হয়ে উঠল। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট, ৬৯ বছর বয়সে কলকাতায় দেবব্রত বিশ্বাসের দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। দেবব্রত বিশ্বাস আজও প্রথাবিরোধী মানুষের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর শিল্পীস্বাধীনতার এক অবিনশ্বর নাম— সফদার হাশমির মতো তাই দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়েও একই কথাই বলা যায়, দেবব্রত বিশ্বাস মানে জাগা, জেগে থাকা, জাগানো।

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ
দেবব্রত বিশ্বাস

Monday, June 15, 2026

গল্প- ফুলি

ফজলুর শুধু মনে আছে বাসটা চলছিল একটা বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষে, ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্য দিয়ে। বাঁশঝাড়ে ভূত থাকে বলে দাদি ভয় দেখাতেন, ভয়টা সে পেতও, তবে সন্ধ্যার আঁধার নামলে। কিন্তু সেদিন বাসটা চলছিল ভরদুপুরে, তাছাড়া সে বসেছিল মার হাত ধরে। মা অনেক হাসতেন, তার হাসি ফজলুর সব ভয় দূর করে দিত। ভয় ছিল না বলে ফজলু বাঁশঝাড়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। একসময় নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছিল, যেমন ঘুমিয়ে পড়েছিল বাসের ড্রাইভার, অথবা সেরকমই আমাদের ধারণা। একটা শব্দে তার ঘুমটা ভেঙেও গেল। শব্দটা ছিল তার ছয় বছরের জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার।

পাহাড় ভাঙার জন্য দাদি বজলুকে, অর্থাৎ  ফজলুর বাবাকে দোষ দিতেন। কেন সে ভরা বর্ষায় বন্ধুর বিয়ে খেতে ছেলে-বউসহ একটা ভাঙা বাসে চড়ে নিয়ামতপুর রওনা হবে? সেই বন্ধুকে দাদি কখনো চোখে দেখেননি, এমনি দূরে দূরে থাকত লোকটা। অনেকদিন ধরে সৌদিতেও ছিল লোকটা। দশদিনের ছুটিতে এসে কেন বজলুকেই ডাকতে হবে বিয়েতে যেতে?

দাদি বলেন, ফজলুর বাবা-মার লাশ লোকটাই অবশ্য বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল; ফজলুকেও – অথবা যেটুকু ফজলু তখনো জাগা ছিল। দাদির ধারণা, ফজলু যে কোনোদিন মানুষ হয়নি, সেটি ওই বর্ষাদিনে তার জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার জন্য।

তোরে আমি অনেক চেষ্টা করছি ফজলু, মানুষ করতে। পারলাম না, দাদি ফজলুকে বললেন। আমাদের হিসাবে হাজার তিনশোবারের  মতো।

ফজলু পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি তুলে একটা কাটা ড্রামে রাখছে। ড্রামের পাশে দাদির প্রিয় গরুটা ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গোসল দিতে হবে। গরুটা একটা গাভী, দাদি যার একটা নাম দিয়েছেন, ফুলি। তার কড়া বাদামি চামড়ায় সাদা কিছু দাগ, দেখলে মনে হয় কোনো বুনো ফুল। গাভীটা বিষণ্ণ, তার বাছুরটা মারা গেছে। ফজলু সকাল সকাল গাভীটার দুধ দুইয়েছে। সেই দুধ কিছু গরম করে সে খেয়েওছে। এখন তাকে গোসল দিলে তার বিষণ্ণতা কমবে। দাদি তাকে বলেছেন।

পাড়ার লোক ফজলুকে ভয় পায়। ছেলেটা একটা গুন্ডা, তার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব, কাউকে সে পরোয়া করে না, এমন কথা প্রতিবেশী ইন্তাজ আলি সবাইকে বলেন, বিশেষ করে ফজলুদের বাড়ির তিনটি মরাগাছ তিনি লোক লাগিয়ে লাকড়ির জন্য কেটে নেওয়ার পর সে যেভাবে তার বাড়িতে গিয়ে তা-ব চালিয়েছিল, তারপর। পাড়ার লোক অবশ্য এখন খুশি, ফজলু নারায়ণগঞ্জ থাকে। মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে খুব একটা বেরোয় না। আগে যখন গ্রামে ছিল, মানুষ তার সামনে পড়তে চাইত না। ফজলুর এক মামা, যিনি পুলিশে চাকরি করতেন, এবং চাকরি চলে গেলে বাড়িতেই থাকেন, তাকে গুন্ডা থেকে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এই মামাই তাদের দেখাশোনা করেছেন, তাদের বাড়িটা যে দখল হয়ে যায়নি, সেটিও তার জন্য। ফজলু সেজন্য মামার সামনে বেয়াদবি করে না; কিন্তু তার কোনো কথা শোনার দায় তার আছে, তা বিশ্বাস করে না।

একটা মানুষের সামনেই শুধু ফজলু কখনো মেজাজ দেখায় না এবং তিনি হচ্ছেন তার দাদি। তার জীবনের ওপর পাহাড় ধসে পড়ার পর তাকে টেনেটুনে তুলেছেন দাদি। তাকে আগলে রেখেছেন। তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সেবা দিয়েছেন। তার দিকে তাকিয়ে দাদি বললেন, বাপের মতো অত চওড়া-লম্বা হইতে গেলি কেনরে ফজলু? চওড়া লম্বা ছিল বইলা তো জানালায় আটকায়া গেল, বাইর হইতে পারল না।

গরুটার গা ডলতে ডলতে ফজলুর মন কিছুটা খারাপ হলো। বাছুরটা মুখে ফেনা তুলে আচমকা মরে গেল। ফজলু নারায়ণগঞ্জ ছিল। খবর পেয়ে বাড়ি আসতেই দাদি বললেন, ফুলির বাচ্চাটা মইরা গেছেরে ফজলু, এই দুঃখে ফুলিও যদি এখন যায়?

ফুলি কি বাসে করে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিয়ামতপুর যাচ্ছিল?

তবে ফজলু জানে, কারো মারা যাওয়ার দুঃখে যদি কেউ মারা যেত, তবে সে-ই তো অনেক আগে যেত। অনেক বছর মার মুখটা তার যখন-তখন মনে ভেসে উঠত, তার হাসিটা কানে বাজত। তখন সে ঠিক থাকতে পারত না। চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে থাকত – ফুলি এখন যেমন থাকে, চোখে পানি নিয়ে – না হয় বাইরে গিয়ে পুকুরের কোনার বাঁশঝাড়টাতে একটার পর একটা রাগী ঢিল মারত।

একসময় ঝিম মারা থেকে বেরিয়ে সে রাগের ঝাপটায় পড়ল। রাগটা কার ওপর, সে জানে না। হয়তো বাঁশঝাড়গুলির ওপর, অথবা বাঁশঝাড়ে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা ভূতগুলির ওপর। একসময় তার বিশ্বাস হলো নিয়ামতপুর যাওয়ার পথের বাঁশঝাড়ের ভূতগুলিই তার ওপর ভেঙেপড়া পাহাড়টা কেটেছিল, এজন্য এক সন্ধ্যায় সে সাইকেল চালিয়ে ওই বাঁশঝাড়ে গিয়ে তা-ব করেছে। ঢিল ছুড়েছে। বাঁশ কেটেছে। কচি বাঁশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে। তাতে আগুন না জ্বললেও ধোঁয়া হয়েছে বেশ। রাতঘুমে থাকা পাখিগুলি জেগে উঠে হইচই করেছে।

ঘণ্টাদুয়েক বাঁশঝাড়ে তুফান তুলে সে ফিরেছে। সাইকেলটা বন্ধু মনুকে ফেরত দিয়ে বাড়িতে এসে দা-টা রান্নাঘরের দেয়ালে গুঁজে পুকুরে নেমে গোসল করেছে। গোসল করতে করতে তার চোখে ভেসেছে একটা ডোবা। ফজলুর ওপর নেমে আসা পাহাড়টা ওই ঝিরঝির বৃষ্টিদিনের বাসটাকে এক ধাক্কায় বাঁশঝাড়ের উল্টোদিকের ডোবায় ফেলে দিয়েছিল। গত তিন-চার বছরে তাকে কয়েকবার নিয়ামতপুর যেতে হয়েছে। তার বাবার বন্ধু তাকে টাকা-পয়সা দিয়েছেন, জামা-জুতা দিয়েছেন, একবার দাদির জন্য শাড়ি দিয়েছেন। ফজলু নিয়েছে, কিন্তু দাদি ছুঁয়েও দেখেননি সেই শাড়ি। সেটি গেছে রইসুন বুয়ার ভাগে। রইসুন বুয়া আরেক মানুষ, যিনি ফজলুর রাগটা তেমন দেখেননি। নিয়ামতপুরে যাওয়া-আসার পথে ফজলু শুধু বাঁশঝাড়ের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। কোনো ডোবার দিকে তার চোখ যায়নি।

ফুলির গা ডলতে ডলতে ফজলু খেয়াল করল, গাইটা চোখ বুজেছে, এবং চোখের কোনা বেয়ে পানি পড়ছে। ফজলু বুঝল, গাইটা এখন তার মতোই স্মৃতির ঝাপটা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চোখ বোজার রাস্তা নিয়েছে।

গরুর কি কোনো স্মৃতি থাকে? থাকলে কি তার মতো টুকরো টুকরো, এলোমেলো?

দাদি বসে ডাঁটাশাক বাছছেন। ডাঁটাশাক ফজলুর প্রিয় খাবার। আর ট্যাংরা মাছ। রইসুন বুয়ার হাঁটতে কষ্ট হয়, তারপরও ট্যাংরা মাছ এনে দিয়ে গেছেন, সাত সকালে। দাদি জিজ্ঞেস করলেন, তুই যেহানে থাহিস, জায়গাটার নাম কী?

বন্দর। অনেকবার কইছি দাদি।

হ। তা বন্দরে কোনো সুন্দর মাইয়া নাই? চোহে পড়ে না? এই প্রশ্নটা দাদি তাকে গত কয়েকমাসে অন্তত ত্রিশবার জিজ্ঞেস করেছেন। ফজলু হাসল, বলল, চোহে পড়লে তোমারে জানাইমু, দাদি।

হ। এই গেরামের, আশপাশের কুনু গেরামের, কুনু মাইয়া তো তোরে বিয়া করব না।

বিষয়টা ফজলুর জন্য স্বস্তির। সে কথা বাড়ায় না।

পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বাজে। ফজলু ধরে, এবং ফুলিকে চোখ বুজে স্মৃতির ঝাপটা সামলাতে দিয়ে একটু দূরে হেঁটে যায়। ফোন করেছে তার বন্দরের বন্ধু, নাম খাদেম। সে বলল, ওরে ফজলু, ভালো খবর। ম্যানেজ করা গেছে। অহন সব মোটামুটি কিলিয়ার। তুই আইতে পারিস।

ঠিকাসে, ফজলু বলল।

শুন, শুন, কথা আছে, খাদেম বলল, মনুরে ছুটাইবার রাস্তা পাওয়া গেছে। অবশ্য তাতে খরচ দেড় লাখ। বস আধা দিবেন, বাকিটা আমাগো ম্যানেজ করতে হইব। তোর ভাগে পড়ছে দশ। টেহাটা কাইল লাগব। একটা নম্বর এসেমেস কইরা দিতাছি। ওই নম্বরে বিকাশ কইরা দিস। দুইবারে করিস, সকালে একবার, বিকালে আরেকবার।

খাদেমরে, আমার টাকা নাই। একশ টাকাও নাই। দশ হাজার কইত্থে দেই? কাতর কণ্ঠে বলল ফজলু।

না দিলে বস রাগবো। বস রাগলে মনুও ফৌত। তুইও। তোরে কিলিয়ার করতে বসের কত লাগছে জানিস তো। আইচ্ছা রাখি।

খাদেম ফোন রেখে দিলে ফজলু চিন্তায় পড়ল। গ্রামে তার একটাই বন্ধু, মনু। ফজলুকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার পর মনুই তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সিনেমা দেখতে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেছে। মনু মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে পালায়। তার মা আছে, আবার সৎমাও আছে। সৎমা এক খতরনাক মহিলা, তার বাবাকে পোষ মানিয়ে একটা ফাউল মানুষ করে ফেলেছে। মনু এসব কথা যখন ফজলুকে বলেছে, তার গলায় অবশ্য রাগ ছিল না। কারণ তার মা আছেন। কিন্তু রাগের বদলা মনুর গলায় একটা দুঃখ বেজেছে। এখন সেটা নেই। দুই বছর ধরে বন্দরে থাকতে থাকতে, ফজলুর সঙ্গে মেসের একটা ঘর ভাগ করতে করতে, তার মনে রাগ এসেছে। একদিন বাড়ি এসে সৎমাকে বলেছে, আমার মারে আর একটা খারাপ কথা কইলে আফনারে আর আফনার পোলাডারে আমি ডোবায় ফালাইয়া চুবাইমু। চুবাইয়া চুবাইয়া দম আটকাইয়া মারমু, বুঝলেন?

ফাউল মানুষ বাবা ঘরের দাওয়ায় বসে মনুর রাগী গলা শুনেছেন। এই রাগ তিনি কোনোদিন দেখেননি। একে তাৎক্ষণিক সামাল দেওয়াটাও তার জ্ঞানের ভেতর নেই। তিনি চুপ করে থাকলেন।

মনু তার মাকে একটা মোবাইল ফোন দিয়েছিল। সে মাকে বলল, একদিনও যদি তোমারে একটা বদ কথা কয়, আমারে জানাইও মা। চললাম।

সেই থেকে মনুর মা স্বস্তিতে আছেন। ফাউল মানুষটাও মাঝেমধ্যে তার বিছানায় আসেন; কিন্তু মা স্বস্তিতে গেলেও মনুর রাগটা থাকল। এটি সে ফজলু থেকে সারা জীবনের মতো কর্জ নিয়েছে।

বন্দরের তারা মিয়ার ক্যাডার বাহিনীতে মনুই প্রথম নাম লিখিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা দেখতে এসে খাদেমের সঙ্গে তার পরিচয়ের সুবাদে। তারা মিয়ার ক্যাডার হলেও তাদের বস আরেকজন, যিনি থাকেন নারায়ণগঞ্জে এবং বন্দরে আসেন মাঝে মধ্যে, শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিয়ে। তার স্পিডবোট আছে। গাড়িও আছে। তাকে কেউ ডাকে ডন সাহেব, কেউ জিয়া সাহেব। তারা মিয়া তাকে সমীহ করেন। লোকটার নিশ্চয় অনেক টাকা, কারণ মনুদের চার-পাঁচজনকে তিনি ভালোই পয়সা দেন। তারা মিয়া লোকটা কিপ্টা। হাড্ডি কিপ্টা, কিন্তু বস হাতখোলা হওয়ায় তারা মিয়াকে মনুরা ছেড়ে যায়নি। বসের কেন তারা মিয়াকে দরকার, যেখানে তাকে পুলিশও দেখলে সালাম দেয়, হেসে হেসে কথা বলে, থানায় ডেকে চা খাওয়ায়, এ-প্রশ্নটি মনু একদিন করেছে খাদেমকে। উত্তরে খাদেম বলেছে, বড় দালানের খুঁটি লাগে না মনু? বন্দুক সগিরের পিস্তল লাগে না?

ফজলু জানে, বসের সাম্রাজ্য শীতলক্ষ্যা পার হয়ে নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে ঢাকা পর্যন্ত ছড়ানো। তবে বন্দর তার কাছে পয়া। এখানে অনেক জমি এখন তার দখলে, যার বেশিরভাগ তারা মিয়ার ক্যাডারেরা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বসের সঙ্গে তারা মিয়ার পার্থক্যটা ফজলু বুঝেছে এভাবে : বসের যেখানে বন্দরে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে, তারা মিয়ার আছে কিনা ঝুট ব্যবসা, যে-কাজে তার নির্ভরতা আবার ক্যাডারদের ওপর। খাদেম বলে, এখন অবশ্য তারা মিয়ার ইয়াবা ব্যবসা ঝুট ব্যবসা থেকেও বেশি পয়মন্ত।

বস এবং তারা মিয়া সম্বন্ধে মনুর উৎসাহটা বেশি। ফজলুর আবার কোনো মানুষকে নিয়ে উৎসাহটা কম। কারো সম্পর্কে কথা উঠলে সে শোনে, মনে মনে নোট করে নেয়, ব্যস। তাছাড়া, এখন ভাবাভাবির সময়টা কম। কারণ একটু সমস্যা যাচ্ছে তারা মিয়ার ক্যাডারদের। থানার ওসি পাল্টালে কিছুদিন তাদের দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। এই তিনমাস যেমন। থানায় নতুন ওসি এসেছেন, একদিন বস থানায় গিয়ে ওসির সাক্ষাৎ না পেয়ে তারা মিয়ার গদিতে বসে গজর গজর করেছেন। তারা মিয়ার সিমেন্ট ব্যবসা, খুবই নিরীহ ধরনের, তাও একদিন ওসি এসে দেখে গেছেন। তাকে বলেছেন সাবধান হয়ে যেতে। তিনি তারা মিয়াকে চোখে চোখে রাখবেন। যেদিন একটা পা বিপথে ফেলবেন তারা মিয়া, তাকে আইনের দড়ি দিয়ে বাঁধবেন।

তারা মিয়া বিগলিত হেসেছেন। এই হাসিটা অভিনয়ের, কিন্তু অভিনয়টা এমনই নিপুণ, ওসিও বুঝলেন না। তিনি কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। ওসি চলে গেলে তারা মিয়া যা বললেন তা ওসির কানে গেলে কী হতো কে জানে। তিনি চোখ সরু করে বললেন, আমার পথ তো একটাই ওসি সাহেব। দেখি এই পথ আপনি কতদিন আগলে রাখতে পারেন।

ঝুট ব্যবসায় মারামারি, এমনকি খুনাখুনিও হয়। কিন্তু তারা মিয়া এই ব্যবসা করেন শান্তিতে। কারণ তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। নতুন ওসি আসার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এলো, একদিন মারধরও হলো। তাতে মাথা ফেটে একজন হাসপাতালে গেল, পেটে গুলি লেগে আরেকজন গেল ঢাকা মেডিক্যালে। গুলিটা খাদেমের পিস্তলের। পিস্তলটা তাকে ভাড়ায় দিয়েছে বন্দুক সগির, যাকে প্রটেকশন দেন বন্দরের এক সরকারি দলের নেতা।

পুলিশ এসে হানা দিলো। খাদেম পালাল। মনু ধরা পড়ল। ফজলুকে নারায়ণগঞ্জ একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন তারা মিয়া, সে বেঁচে গেল। বন্দর না ফিরে সে সোজা বাড়ি গেল।

খাদেম তাকে ফোনে জানাল, বাড়িতেই যেন থাকে, আর অকারণে বাইরে না যায়। ওসির প্রমোশন হয়েছে, বন্দর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন। গেলে একটা কিছু হবে, না হলে রূপগঞ্জ না হয় আড়াইহাজারে বস তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।

বছরখানেক আগে একটা জমি দখল করতে গিয়েছিল তারা মিয়ার ক্যাডারদল। তাদের সঙ্গে ছিল বন্দুক সগির। লোকটা ছোটখাটো, কিন্তু বিরাট তার তেজ। জমিটা ছিল সোনার, এর জন্য বস অনেকদিন চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরকম জমি সহজে দখলে আসে না। দখলের ব্যবস্থাটা সেজন্য বস পাকাপোক্ত করে রেখেছিলেন, শুধু একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আরেকটা পার্টি নেমেছিল মাঠে, যাদের হাতটা ছিল অনেক লম্বা। পুলিশ শুধু না, প্রশাসনেও সেই হাত পৌঁছেছিল।

জমিতে পৌঁছানোর আগেই খাদেম ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। সে বন্দুক সগিরকে বলেছিল, ভাইজান, আইজকা থাক। আইজ প্যাঁচটা বড়।

সগির শোনেনি।

পুলিশ সগিরকে ধরেছিল, ফজলুকেও। আরো দু-একজনকে। খাদেম পালানোতে ওস্তাদ। সে পালিয়েছিল। বসকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবাইকে ছাড়িয়ে নিতে। জীবনে প্রথম জেলের ভাত খেয়েছে ফজলু। দাদি অবশ্য কিছুই টের পাননি। প্রতিদিন দাদিকে ফোন করে সে। সূর্য ওঠা-ডোবার মতোই নিয়মে। জেলে বসেও প্রতিদিন তার কথা হয়েছে দাদির সঙ্গে। ব্যবস্থাটা তারা মিয়া করে দিয়েছেন।

তারপরও অন্তত আধামণ চালের জেলের ভাত তাকে খেতে হয়েছে।

অবাক কা-, ফজলু বেরিয়ে দেখল, জমিটাতে বিরাট সাইনবোর্ড, যাতে বড় করে কোম্পানির নাম লেখা। কোম্পানির নাম ডন ভ্যালি। খাদেম বলে, এটা রিয়াল ইস্টেট।

হেলাফেলা, মোড়ামুড়ি বস পছন্দ করেন না, ফজলু জানে। জেল থেকে মনু তাকে ফোনে বলেছে, জেলে এবার বিপদ। গেল বছর কিছু লোককে মেরে তক্তা করেছিল তারা মিয়ার ক্যাডাররা। তাদের দুজন এখন একই জেলে। তারা মনুকে বলেছে বাড়িতে মিলাদ পড়াতে। তার জান এবার শেষ।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে, মনু বলেছে, যা পারো তোমরা করো।

আর আজ সকালে খাদেমের ফোন। এখন সে কী করে? হাতে আছে একটা দিন। সে কি পিয়ারু মামার কাছে যাবে? পিয়ারু-পুলিশ মামার কাছে? নাকি বাবার বন্ধুর বাড়ি যাবে নিয়ামতপুর? দাদির হাতে টাকা নেই। তাকে যত টাকা সে দিয়েছে, তার কিছু তিনি খরচ করেছেন, বাকিটা জমিয়েছেন। কিন্তু কোথায় রেখেছেন, ফজলু জানে না। তারপরও দাদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ফজলু শ-পাঁচেক টাকা চাইলে নিশ্চয় দাদি দিতেন, কিন্তু একসঙ্গে দশ হাজার সে কী করে চায়।

দুপুরে তার জন্য দাদি ভাত বেড়ে দিলে সে অবশ্য কথাটা তুলেছে। জরুরি দরকার, সে দাদিকে বলেছে।

টাকা দিলে তুই কই যেন কুনখানে থাহিস সেইখানে চইলা যাবি?

হ। ফজলু আসেত্ম করে বলেছে।

দাদিকে দেখলে মনে হতে পারে ভুলাভালা মানুষ, কেউ ঠকালেও বোঝেন না, লোকের চালাকি ধরতে পারেন না; কিন্তু আমরা জানি দাদি সহজ মানুষ নন। তিনি বোঝেন। ফজলু কোনো কারণে একটা বিপদে আছে, তিনি সেটা টের পেয়েছেন। দাদির মন। মাস দুই নাতিটা আছে তার সঙ্গে, তার মনটা ভরে আছে। টাকা দিলে সে চলে যাবে। তিনি উদাসীনভাবে বললেন, হাতে টাকা নাইরে ফজলু। যা ছিল আছিয়ারে কিছু দিছি। কিছু জমা আছে সুফিয়া বইনের কাছে।

আছিয়া ফজলুর চাচাত বোন। পিয়ারু চাচার বড়ভাই আজমত মুন্সির মাদ্রাসা পাশ মেয়ে। বিধবা। জীবনটা কাটে কষ্টে। ফজলু তাকে দেখেছে কদাচিৎ।

দাদির ওপর ফজলুর কখনো রাগ হয় না, আজো হলো না, তবে তার রাগ গিয়ে পড়ল আছিয়ার ওপর। আছিয়া বুবুকে দাদি বলেছিলেন তার কাছে চলে আসতে। দুই ছেলেমেয়েসুদ্ধ। কিন্তু আছিয়া পড়ে থাকল শ্বশুরবাড়ি, আধাপেটা খেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার সয়ে। ফজলুর ইচ্ছা হয় একদিন বুবুর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওই দুই বুড়া-বুড়িকে সাইজ করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।

দাদি বললেন, ফুলিটা গোসল কইরা আরাম পাইল ফজলু। কিন্তু তারপর ঘাস-বিচালি কিছুই খায় নাই। উপোস করতেছে। ফুলিটার বুকে দুধ, ছাওয়ালটা নাই। সকালে দুধ দুইলে ওর পরানটা কান্দে। শূন্য হয়। ফুলি বাঁচবে না।

খাওয়া শেষ করে উঠানে নামল ফজলু। বদনার পানি ঢেলে হাত ধুলো। ফুলিকে চোখে পড়ল। সজনেগাছের নিচে বসে আছে ঝিম মেরে। স্মৃতির ঝাপটা কি একটা গাইকেও এমন উদাসী করে দেয় যে কিছু খেতে তার ইচ্ছা হয় না?

ফজলু যেমন মিষ্টি খায় না। খেতে না পেরে মরে গেলেও, এবং আধাসের ম-া অথবা রসগোল্লা পৃথিবীর শেষ খাদ্য হলেও, না, সেদিন থেকে, যেদিন তাকে দাদি বলেছিলেন, তোর মা মিষ্টির পোকা ছিলরে ফজলু, মিষ্টি পাইলে আর কিছু না খাইলেও তার চলত।

ফুলির বোজা চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো। মনে মনে একটা হিসাব করল। দাদি ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুমাতে যাবেন, তিনটার দিকে। তার আগেই তার চিন্তাটা পাকা করতে হবে। আজ হাটবার। প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার হাটটা খুব জমে। আজ শেষ মঙ্গলবার।

-----দুই-----

হাটের যেখানটায় গরুর বেচাকেনা হয়, সেখান পর্যন্ত ফুলিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে একবারও কোনো সমস্যা হলো না ফজলুর। দাদি ঘুমিয়ে গেলে ফুলিকে যখন সে জাগিয়ে তুলল, এবং ফুলি উঠে দাঁড়াল, সে যেন বুঝল তাকে নিয়ে ফজলুর কোনো মতলব আছে। ফজলু ভেবে দেখেছে, না খেয়ে ফুলি যখন মরেই যাবে, তাকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিলেই তো হলো। এমনিতে ফুলি তরতাজা, একটা তিন-সাড়ে তিন বছরের গাই যেমন হয়। গরুর দাম এখন ভালো, কম করে হলেও পঞ্চাশ-ষাট হাজার তো পাওয়া যাবেই। দশ হাজার বিকাশ করে বাকিটা রেখে দিলেই হবে। ফুলিকে দাদি ভুলে গেলে তার হাতে টাকাটা একসময় সে তুলে দেবে।

ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর খদ্দের পাওয়া গেল। খদ্দের ইমামগঞ্জের। ফজলু স্বস্তি পেল। সে তাকে চেনে না, ফজলুও তাকে চেনে না। খাদেমের দেওয়া নম্বরে সে আজ পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবে। বাকিটা কাল সকালে। তারপর সে বাসে উঠবে বন্দরের পথে।

যতক্ষণ ফুলিকে ধরে ফজলু দাঁড়িয়ে ছিল, ফুলি ঝিম মেরেই ছিল। কিন্তু খদ্দেরের হাতে তাকে তুলে দিলে ফুলির মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিলো। সে বুঝতে পারছিল না, তার চেনা পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ কেন তাকে ধরেছে। ফজলুই বা কেন এটি করতে দিচ্ছে। খদ্দেরটা একটা দড়ি লাগিয়েছে ফুলির গলায়, এবং দড়িটা যেন তাকে বাস্তবে জাগিয়ে দিলো। একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি মেলল সে ফজলুর দিকে। তারপর তার চাঞ্চল্য চলে গেল। একটা অবসাদ যেন নামল তার শরীরে। চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। ফজলু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। কেন জানি তার ধারণা হলো ফুলির সঙ্গে তার আর চোখাচোখি হবে না। হলোও না। ফজলু দাঁড়িয়ে থাকলেও খদ্দেরের তাড়া ছিল, সে চলে গেল।

ফুলি চোখ খুলল না। অথবা খুলল এমন চিকন করে, মাটির দিকে, যেন ফজলুর ছায়াটাও তার চোখে না লাগে।

বাড়ি ফিরে ফজলু দেখল, দাদি দাওয়ায় বসে আছেন। তার প্রিয় বেতের মোড়ায়। তার সামনে যেতে যেতে সে তার বিলাপ শুনল।

বিলাপের সুরে দাদি বললেন, তুই কই ছিলিরে ফজলু? আমার ফুলিটা চইলা গেছে।

চইলা গেছে? কোথায়? অবাক হওয়ার ভান করল ফজলু।

জানি না। দাদি বললেন, তারপর চোখ বুজলেন।

ফজলুর কেন জানি খুব রাগ হলো। না দাদির ওপর না, নিজের ওপরও না। কিসের ওপর তাও সে জানে না। কিন্তু তার রাগ হলো, সবাই কেন তাকে দেখে চোখ বুজবে? দাদি কি সব বুঝেছেন? তিনি কি জানেন ফুলি যায়নি, তাকে ফজলুই নিয়ে গেছে?

অবাক, সে কোথায় ছিল এতক্ষণ, একবারও দাদি জিজ্ঞেস করলেন না। তাকে শুধু বললেন, ফুলিটা চইলা গেল। তুইও কি যাবি?

এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন তার ভুলাভালা দাদি?

আমি একটু খুইজ্জ্যা দেহি, দাদি? সে বলল।

দাদি বন্ধ চোখেই একটুখানি হাসলেন। বললেন, ফুলি চইলা গেছে। এখন তুইও চইলা যাবি। তয় যা।

-----তিন-----

সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল, যদি না যাই দাদি, ক্যামনে কী হইব? খামু কী?

খাওনের অভাব হইবে নারে ফজলু, দাদি বললেন। তোর তাগড়া শরীর। বাপদাদার ভিটা আছে। একটুখানি জমি আছে, একটা পুকুর আছে।

ফুলি যেখানে বসে বসে ঝিমাচ্ছিল গতকাল, দাদি ঠিক ওই জায়গায় বসেছেন মোড়া পেতে।

তৈরি হয়ে তার রংওঠা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে দাদির সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, কেউ যাইতে চাইলে তারে আটকানো যায় নারে ফজলু। তোর বাপেরে পারি নাই। তোরেও পারমু না। যা।

ফজলু হাঁটা দিলো।

কিছুদূর গিয়ে সে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মাটিতে রাখল। তারপর একটা গাছের সঙ্গে মাথা ঠুকল। এবার রাগটা তার নিজের ওপর।

কপাল দিয়ে রক্ত বেরুলো। রক্ত মিশল চোখের পানির সঙ্গে।

-----চার-----

বন্দরে মেসঘরে পৌঁছল সে বেলা বারোটায়। বেশ ক্ষুধা লেগেছে, কিন্তু ফুলির মতো সে একটা সিদ্ধান্ত নিল, আজ কিছুই খাবে না।

খাদেম তাকে জিজ্ঞেস করল, কপাল ফাটল ক্যামনে?

ফজলু উত্তর দিলো না। খাদেমও দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল না। জিজ্ঞেস করে নষ্ট করার মতো সময় তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে বেরুতে হবে আজ রাতে। বস পইপই করে বলে দিয়েছেন, কাজটা ঠিকঠাক করতে হবে।

কী কাজ?

পরে বলব। এখন খা। খাইয়া ঘুমা। তিনটায় উঠিস। তিনটায় মিটিং, খাদেম বলল, তারপর চলে গেল।

ফজলু খেলও না, ঘুমালও না। শুধু বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকল।

তিনটায় মনু এলো। জেলে থেকে সে শুকিয়ে গেছে। রংটাও কালো হয়ে গেছে। মনুর পেছন পেছন উত্তম এলো – উত্তম বসের খাস মানুষ। ওর সঙ্গে পিস্তল থাকে। ফজলু বুঝল আজকের কাজটা সহজ নয়। উত্তম যেখানে যায়, খবর তৈরি করে দিয়ে আসে।

থানার ওসি চলে গেছেন। এখনো নতুন ওসি আসেন নাই। বস এই সময়টা বেছে নিয়েছেন তার কাজের জন্য। খাদেম জানালো বসের সোনার মতো দামি জমিটা সাত কোটি টাকায় রফা করেছিলেন এক পেপার মিলের সঙ্গে। কিন্তু সেটা কাল হঠাৎ দখলে নিয়েছে গোদনাইলের হাজি এহসান। লোকটা ঘাঘু। বন্দুক সগিরকে সে কৌশলে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে সেখানে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন উত্তম ভরসা।

উত্তমের কথা শুনে মনে হলো, লাশ পড়বে। মনু শিউরে উঠল। ফজলু অবশ্য উত্তমের কথা শুনেছে আবার শোনেওনি। তার মন পড়ে আছে দাদি আর ফুলির বোজা চোখে। সে ঠিক জেনেছে, দাদি সব বুঝেছেন। সব বুঝে দাদি রেগে বাড়ি মাথায় তুললে সে খুশি হতো, তাকে চেলা কাঠ দিয়ে পেটালে সে আরাম পেত, তিনি দাওয়ায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদলে তার স্বস্তি হতো। কিন্তু দাদি এসব কিছু না করে শুধু চোখ বুজেছেন।

কেন?

সন্ধ্যার মধ্যেই খবর এলো, সর্বনাশ! ওসি ফিরেছেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে খাদেম বলতে পারল না। মধু নামের উত্তমের এক সঙ্গী বলল, ওসি কঠিন মানুষ, একটা মেরামতি চালাচ্ছিলেন বন্দরে, সেইটা শেষ করতে ফিরে এসেছেন। এক সপ্তা থাকবেন।

উত্তমের, খাদেমের ফোন বাজতেই থাকল। একজন কেউ জানালো বন্দুক সগিরকে নিয়ে পুলিশ বন্দরে এসেছে, আরেকজন বলল, ডন সাহেব নারায়ণগঞ্জ ফিরে গেছেন। খাদেম নিজেই একটা নাম্বারে ফোন করে শুনল, বসের এক ইস্পিশাল ক্যাডারকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে পাঠিয়েছে এহসানের লোকজন। লোকটা বাঁচে কিনা সন্দেহ।

এহসানের লোকজনকে নিয়ে অবশ্য ভয় নেই তারা মিয়ার ক্যাডারদের। ঢাকা থেকে কঠিন কিছু লোক তিনি আনিয়েছেন, তারাই তাদের সামাল দেবে। তাদের ভয়টা ওসিকে নিয়ে। এ লোক তার মেরামতির কাজে কাউকে তোয়াক্কা করে না।

তারা মিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় ফোন করলেন খাদেমকে, বললেন কিছু একটা করতে। পুলিশ তার গদি ঘিরে রেখেছে।

খাদেম বেরিয়ে গেল। মধুও গেল। উত্তমও একসময় উঠল। যাওয়ার আগে সে ফজলুকে বলল নিতাইবাবুর আড়তের পেছনের খালটা পার হয়ে ইনাম মার্কেটের গেটে কিসলুর চায়ের দোকানে চলে যেতে। সে মনুকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।

ফোনটা খোলা রাখিস, সে বলল।

কিন্তু বাড়ির সামনের গলিটার মোড়েও হয়তো উত্তম পৌঁছাতে পারল না, পুলিশের বাঁশি বাজা শুরু হলো। একই সঙ্গে দ্রুতপায়ে দৌড়াদৌড়ি। দরজা খুলে ফজলু দেখল, গলিটায় সাত-আট পুলিশ। দুই পুলিশ তাদের মেসবাড়ির দিকেই আসছে। তাদের হাতে বন্দুক উঁচু করে ধরা। গলিতে আলো নেই, কিন্তু একটা ফাজিল চাঁদ উঠে আলোর অভাবটা অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। ফজলু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ভেতর থেকে একটা তাড়া আসছে, পালা, পালা, ডাইনে দৌড়  দে। না-হয় ঘরে ঢুইকা পিছনে যা, পিছনের পাঁচিল বাইয়া পালা। কিন্তু তার পা গলির ইট আর খোয়ায় আটকে গেছে। পা নড়ে না। সে দেখল দুই পুলিশ দৌড়ে আসছে বন্দুক তাক করে। পুলিশ নিশ্চয় জানে তারা মিয়ার ক্যাডাররা কোথায় থাকে। ওসি তো জানতেন। এই দেড়তলা আধাপাকা দালানে, চার কামরার মেসবাড়িতে।

চাঁদের আলোটা স্থির, দুধ-ঘোলা সাদা। গলির রাস্তার দুই দিকে দুটা নিমগাছ, কে কবে লাগিয়েছিল কে জানে, কিন্তু কেউ কাটে না, গাছ দুটা নাকি গলিটার হাওয়া পরিষ্কার করে। নিমগাছের পাতায় চাঁদের আলো তিরতির করে। উলটো দিকের গাছটার নিচে দু-একটি ভাঙা চেয়ার, তক্তা, কেরোসিন কাঠের বাক্স। মোক্তার অ্যান্ড সন্সের পরিত্যক্ত তৈজসপত্র। দোকানটা মেরামত হয়েছে কদিন আগে, আবর্জনাগুলি সরানো হয়নি। সেই আবর্জনার ওপার থেকে হঠাৎ একটা ছায়া রাস্তাটা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা গরু। কড়া বাদামি পিঠ আর গা, চাঁদের আলোয় কিছুটা অস্পষ্ট, কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেও সাদা সাদা কিছু অবিন্যস্ত টুকরো আভা জেগেছে, যা দেখলে হঠাৎ বুনোফুল বলে মনে হতে পারে।

ফুলি! ফজলু নিজেকেই বলল। ফুলি এখানে কী করে এলো? এও কি সম্ভব? নাকি চাঁদের আলো তার চোখে বিভ্রম ছড়িয়েছে?

সে চাঁদটার দিকে তাকাল। চাঁদের ওপর কিছু সাদা মেঘ হালকা চাদর বিছিয়েছিল। সেই চাদর এখন সরে গেছে। চাঁদটা তাজা। যেমন তাজা গরুটাও। গরুটার দিকে চোখ নামাতে হলো ফজলুর। এটি এখন মাথাটা শক্ত করে সামনে মেলে বেশ তেজে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পুলিশের দিকে, যেন তার মাথাটা ঢাল, অথবা একটা কামানের নল।

পুলিশ দুজন ভড়কে গেল। তারা গরুটার দিকে তাকাল। তারা বুঝতে চেষ্টা করল, কেন তাদের দিকেই এটি ধেয়ে আসছে। তারা বন্দুক চালাতে পারত, বন্দুক তো তাক করাই ছিল। কিন্তু তারা গ্রামের ছেলে, একটা গাভীকে বন্দুকের গুলিতে মারার কথা ভাবতে পারে না। তারা বরং গাভীটা থেকে দূরে সরে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু গাভীটা তেজি, তার চোখে পানি নেই, তার শরীরেও অবসাদ নেই। সে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল। গলিতে কয়েকজন পথচারী ছিল, মোক্তার অ্যান্ড সন্সের কর্মচারী ছিল। তারা অবাক হয়ে দেখল, গাভীটা এক পুলিশের সামনে গিয়ে মাথা তুলে তার বন্দুকে একটা হালকা টোকা দিলো। তারপর জিভ বের করে বন্দুক ধরা হাতটা চাটতে লাগল।

মোক্তার অ্যান্ড সন্সের এক কর্মচারী শব্দ করে হাসল। বলল, পুলিশভাই, গরুটা আপনারে পছন্দ করেছে।

পুলিশটার জন্য বিব্রতকর অবস্থা। অন্য পুলিশটাও এই অবাক দৃশ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের চোখ এখন গাভীটার দিকে। সেটি এখন স্থির দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। অন্য পুলিশটার দিকে তাকিয়ে যেন জানতে চাইছে, তোমার হাতটাতে একটু আদর করে দিলে রাগ করবে?

চাঁদের আলোয় দুই পুলিশ, একটি গাভী, কিছু মানুষ যেন একটা শান্ত ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর চাঁদের সামনে ক্ষক্ষরের দেয়াল তুলে দিতে একটা মেঘ এগিয়ে এলো। হেলতে দুলতে।

এই দৃশ্য দেখার জন্য ফজলু অবশ্য আর দাঁড়িয়ে ছিল না। গাইটা তেজি ভাব নিতেই তার পায়ে চাঞ্চল্য এসেছে, সে ঘরে ঢুকে দুপুরে কাঁধে ঝুলিয়ে আনা ব্যাগটা তুলে নিয়েছে, যার ভেতরের একটা পকেটে এখনো কাল হাটে পাওয়া বাকি টাকাগুলি আছে। তারপর পেছনের পাঁচিল টপকে হাওয়া হয়ে গেছে।

বন্দর পার হতে হতে সে চাঁদটার দিকে আবার তাকিয়েছে। চাঁদটা ক্ষক্ষরের পাঁচিলের পেছনে বন্দি। আলোটা অস্পষ্ট। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের হুটোপুটি।

-----পাঁচ----

বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেল ফজলুর। সে জানে দাদি ততক্ষণে উঠে যাবেন, নামাজ পড়বেন, কিছুক্ষণ উঠানে হাঁটবেন। হয়তো নিচুস্বরে বিলাপ করবেন – তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য, হয়তো ফুলি এবং ফজলুর জন্য। অথবা চুপ করে মোড়াটাতে বসে থাকবেন।

গত সন্ধ্যার ঘটনা ফজলুকে বিমূঢ় করে রেখেছে। যে-গাইটা তাকে বাঁচিয়ে দিলো দুই পুলিশের হাত থেকে, সে কোত্থেকে এলো। সে কি ফুলি? যদি ফুলি হয়, দুনিয়ায় এর থেকে অসম্ভব কথা আর কে  কবে শুনেছে?

মেসবাড়ি থেকে পালিয়ে সে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছে, খবর নিয়েছে। তার মোবাইলে ফোন করেছে মনু, বলেছে খাদেম মারা পড়েছে, বস আটক হয়েছে। মনু বলেছে, তুই পালা। বন্দরে আর জীবনে না। মনু যাবে চাঁদপুর। তার এক মামার ইলিশের আড়ত আছে সেখানে।

বাড়ির কাছাকাছি এসে ফজলুর ইচ্ছা হয়েছে, একটা গাছে তার মাথাটা ঠুকবে। কিসের জন্য, সে বলতে পারবে না। ঠুকতে ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু ঠুকল না, কারণ কপালে রক্ত জমলে দাদি দেখলে ভয় পাবেন। এমনিতেই গতকালের রক্তের দাগটা কপালে আছে।

দাদি রক্ত ভয় পান। বাবা-মার লাশ যখন বাড়িতে আসে, তার পুলিশ মামা তাকে বলেছেন, তাদের গায়ে রক্ত ছিল। রক্ত দেখে দাদি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।

বাড়িতে ঢুকতেই দাদিকে দেখা গেল। তিনি বেতের মোড়া পেতে বসে আছেন ফুলি যেখানে ঝিম মেরে থাকত সেখানে। ফজলুর বুকটা একটা মোচড় দিলো। হালকা পায়ে সে এগোল। কিন্তু সামনে তাকাতেই তার চোখটা কপালে উঠল। ফুলি! নাকি অন্য কোনো গাই? একটু এগিয়ে সে দেখল গাইয়ের চামড়াটা কড়া বাদামি, ভোরের হালকা আলোতেও যা বোঝা যাচ্ছে। এবং এখানে-সেখানে সাদা দাগ। যেন বুনোফুল। গাইটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা টুকরিতে ঘাস, বিচালি। কিন্তু সে খাচ্ছে না, শুধু তার চোয়াল নড়ছে।

ফজলুর পায়ের শব্দে দাদি তাকালেন। গত সন্ধ্যার চাঁদটার মতো একটা আলোময় হাসি দিয়ে বললেন, ফজলু, তুই আইলি? দ্যাখ। আমার ফুলিও ফিরা আইছে। যা, এখন পুকুরে গিয়া একটা ডুব দিয়া আয়। তোর পেটে ক্ষুধা, ফুলিটার মতো। তুই কাইল থাইক্ক্যা কিছু খাস নাই। তুই খাইলে ফুলিও খাইব।

Friday, May 15, 2026

বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ by ভি এস নাইপল

অনুবাদ : মোজাফ্ফর হোসেন।
প্রায় তিনজন করে ভিক্ষুক প্রতিদিনই নিয়ম করে আমাদের মিগুয়েল স্ট্রিটের বাড়িটায় আসত। দশটার দিকে ধুতি ও সাদা জ্যাকেট পরিহিত একজন ভারতীয় এলো, আমরা তাকে এক মগ চাল দিয়ে বিদায় করলাম। বারোটার দিকে একজন বয়স্ক মহিলা এলো, এক টাকা নিয়ে চলে গেল। দুটার দিকে একজন অন্ধ ভিখারি এক বালককে লাঠি বানিয়ে হাজির হলো, তাকেও এক টাকা দিয়ে বিদায় করলাম। মাঝেমধ্যে কিছু ধূর্ত প্রকৃতির ভিক্ষুক আসত। একদিন এক ভিখারি দরজায় বাড়ি দিয়ে বলল যে, তার খুব খিদে পেয়েছে। আমরা তাকে খেতে দিলাম। তারপর সে একটা সিগারেট চাইল, এবং আমি তার সিগারেটে আগুন না দেওয়া পর্যন্ত নড়ল না। তাকে আর কোনোদিন দেখা যায়নি। একদিন বিকেল চারটার দিকে আজব প্রকৃতির একজন দরজায় এসে দাঁড়াল। আমি সবে স্কুল থেকে ফিরেছি।

‘শোনো বাবা, আমি কি ভিতরে আসতে পারি?’ সে আমাকে বলল। লোকটি বেশ খাটো, পরনে সাদা শার্ট ও কালো ট্রাউজার। মাথায় টুপি।

‘আপনি কি চান?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘তোমাদের মৌমাছিগুলো একবার দেখতে চাচ্ছিলাম।’ সে বলল।

আমাদের উঠোনে চারটি পামগাছ ছিল, সেখানে বেশ কয়েকটি মৌমাছির চাক ছিল। আমি ঘরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে চেঁচিয়ে বললাম – ‘মা, দরজায় একজন লোক আছে, আমাদের মৌমাছিগুলো একবার দেখতে চায় বলছে!’

মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লোকটির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে কর্কশ গলায় বললেন – ‘কি চাওয়া হয়?’

‘আপনাদের মৌমাছিগুলো দেখতে চাচ্ছিলাম।’ লোকটি বলল।

তার ইংরেজি খুব গোছানো। বোঝাই যাচ্ছিল এটা তার মাতৃভাষা নয়। মাকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। মা আমাকে বললেন – ‘যতক্ষণ উনি থাকেন, তুই এখান থেকে এক পাও নড়বি না।’

‘ধন্যবাদ ম্যাডাম! আপনার অশেষ মেহেরবানি।’ সে খুব ধীরে ধীরে গুছিয়ে কথাটা বলল, যেন প্রতিটি শব্দ তার টাকা দিয়ে কেনা! আমরা পামগাছের নিচে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে মৌমাছিগুলো দেখলাম।

‘মৌমাছি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তোমার কেমন লাগে?’ লোকটি বলল।

‘আমার অত সময় নেই।’ বললাম আমি।

সে গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকালো। ‘আমি এ-কাজই করি। এটা-ওটা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। শুধু পিঁপড়ে দেখতে দেখতেই আমি দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারি। তুমি কি কখনো পিঁপড়েদের লক্ষ করে দেখেছ? কিংবা মাকড়সা, কেন্নোই – এদের ভালো করে দেখছ?’

আমি মাথা নাড়ালাম। ‘আপনি আসলে কী করেন, বলুন তো?’

সে উঠে দাঁড়াল – ‘আমি কবি’।

‘খুব ভালো কবি?’ আমি কোনোরকম ভণিতা না করেই জানতে চাইলাম।

‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবি।’ সে অকপটে বলল।

‘আপনার নামটা কি একবার বলবেন?’

‘বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ।’

‘বি মানে কি বিল?’

‘ব্ল্য­াক। ব্ল্য­াক ওয়ার্ডসওয়ার্থ। সাদা ওয়ার্ডসওয়ার্থ ছিলেন আমার ভাই। আমাদের আত্মা একটাই। আমি খুব ক্ষুদে একটা ফুলকেও সকালের মতোই শুভ্র ও মহৎ মনে করি; আর সেটা দেখে আমার কান্না পায়।’

‘কেন? এতে কান্না পাওয়ার কি আছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘বুঝলে না বালক! তুমি যখন বড় হবে তখন বুঝবে। তুমিও যে একজন কবি, তুমি কি জানো সেটা? এবং একজন কবি যখন-তখন যে-কোনো কারণে কাঁদতে পারে!’

আমি না হেসে পারলাম না!

‘তুমি তোমার মাকে পছন্দ করো?’ সে জানতে চাইল।

‘করি, তবে আমাকে যখন মারে না, তখন।’

সে তখন তার পেছনের পকেট থেকে একটা ছাপা কাগজ বের করে বলল – ‘এই কাগজে মাকে নিয়ে লেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আছে। আমি এটা বিক্রি করব। কোনো দরদাম চলবে না, একদাম – চার টাকা।’

আমি ভেতরে গিয়ে মাকে বললাম – ‘মা, তুমি কি চার টাকা দিয়ে একটি কবিতা কিনবে?’

মা রেগে গিয়ে ভদ্রতার মাথা খেয়ে বলল – ‘ওই ফালতু লোকটাকে গিয়ে বল, ও যদি এখনই আমার সীমানা থেকে বেরিয়ে না যায়, আমি তার লেজ টেনে ছিঁড়ে ফেলব; কি, কানে যায় আমার কথা?’

‘মার কাছে এখন চার টাকা নেই।’ আমি বাইরে এসে বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থকে বললাম।

‘এখানেই তো কবির ঐতিহাসিক পরাজয়!’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল।

তারপর সে তার কাগজটি যথাস্থানে রেখে দিলো। মার কথায় কিছু মনে করেছে বলে মনে হলো না।

আমি বললাম – ‘এভাবে কবিতা বিক্রি করে বেড়ানো কি ভালো দেখায়? খুব বেশি কি বিক্রি হয়?’

‘এখন পর্যন্ত এক কপিও হয়নি।’

‘তাহলে আপনি এভাবে ঘুরেঘুরে কবিতা বেচে বেড়াচ্ছেন কেন?’

‘এর ফলে আমি অনেক কিছু দেখার সুযোগ পাই। আর আমি সবসময় কবিদের সাক্ষাৎ পেতে চাই।’

‘আপনি কি সত্যি সত্যিই আমাকে কবি মনে করেন?’

‘তুমি আমার চেয়ে কোনো অংশে কম নও।’ সে উত্তরে বলল।

বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ চলে যাওয়ার পর আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম যেন তার সঙ্গে ফের আমার দেখা হয়।

এক সপ্তাহ পর, আমি যখন স্কুল থেকে ফিরছিলাম তখন মিগুয়েল স্ট্রিটের এক বাঁকে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

‘আমি অনেকক্ষণ থেকে তোমার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।’

‘এ কয়দিনে একটা কবিতাও কি বিক্রি করতে পারলেন?’ আমি জানতে চাইলাম।

সে মাথা নাড়াল। বলল – ‘আমার উঠোনে এই অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ আমগাছটি আছে। এখন গাছে আম পেকে টসটস করছে। আমি তোমাকে আম খাওয়ার দাওয়াত দিতে এসেছি।’

সে আলবার্তো স্ট্রিটের এক মোড়ে এক কামরাবিশিষ্ট একটি বাসায় বসবাস করত। বাড়ির সামনেটা সবুজে ভরা। সেখানে বিশাল এক আমগাছ আছে, আর আছে নারিকেল ও তালগাছ। জায়গাটি জঙ্গল হয়ে আছে, দেখে মনে হয় শহরের বাইরে কোথাও এসেছি। এখান থেকে রাস্তার ওপারের বিশাল বিশাল দালানকোঠা দেখা যায় না।

সে একটুও বাড়িয়ে বলেনি, আমগুলো সত্যিই চমৎকার। আমি প্রায় আটটা সাবাড় করে ফেললাম। আমের হলুদ রস আমার কনুই চুইয়ে জামায় লেগে গেল। আমি যখন বাড়ি ফিরলাম, মা বললেন – ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলি, হতচ্ছাড়া? ভেবেছিস খুব বড় হয়ে গেছিস, যেখানে খুশি যেতে পারবি, তাই না? যা, আমার জন্য একটা কঞ্চি কেটে আন।’

মা আমার কাটা কঞ্চি দিয়ে আমাকেই পেটালেন – আচ্ছা পিটুনি পেটালেন! আমি কাঁদতে কাঁদতে রেগেমেগে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম। প্রতিজ্ঞা করলাম – আর কিছুতেই বাড়ি ফিরব না। বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের বাড়িতে গেলাম। আমার নাক রাগে লাল হয়ে গিয়েছিল।

বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল – ‘কান্না এবার থামাও। চলো কোথাও ঘুরে আসি।’

আমার কান্না থেমে গেল। তখনো বেশ জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছিলাম। আমরা হাঁটতে বের হলাম। এসটি অ্যাভিনিউয়ের ভেতর দিয়ে সাভান্নাহ হয়ে রেসকোর্সে চলে গেলাম।

বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল – ‘এসো, দুজনে ঘাসের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। আমি চাই তুমি এখন চিন্তা করে দেখবে ওই তারাগুলো আমাদের থেকে কত দূরে অবস্থান করছে।’

তার কথামতো আমি চিন্তা করা শুরু করলাম। তার উদ্দেশ্যটা একটু পরই পরিষ্কার হলো। নিজেকে খুব হালকা মনে হচ্ছিল। একই সঙ্গে খুব মহান আর বিশাল মনে হচ্ছিল, ঠিক ওই আকাশটার মতো; জীবনে আর কখনো কোনোদিন এই অনুভূতি হয়নি। আমি আমার সমস্ত ক্রোধ, অশ্রু ও আঘাতকে ভুলে গেলাম। যখন আমি বললাম যে, আমার খুব ভালো লাগছে, সে তখন এক-এক করে তারাদের নাম বলতে লাগল। তখনই একটা টর্চের আলো এসে আমাদের মুখের ওপর পড়ল। দেখলাম – পুলিশের লোক, ঘাস থেকে উঠে দাঁড়ালাম।

‘তোমরা এখানে কী করছ?’ পুলিশটি জিজ্ঞেস করল।

বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ উত্তরে বলল – ‘নিজেকে আমি চল্লিশ বছর ধরে এই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ফিরছি।’

আমরা খুব দ্রুত বন্ধু হয়ে গেলাম। সে আমাকে বলল – ‘তুমি কাউকে কখনো আমার সম্পর্কে বলবে না। আমার ওই গাছগুলো সম্পর্কেও নয়। সমস্ত বিষয়টা গোপন রাখবে। কাউকে বললেই আমি কিন্তু ধরে ফেলব, কারণ আমি কবি।’

আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম, এবং আজ অবধি আমি আমার কথা রেখেছিলাম। তার ছোট্ট বাড়িটি আমার ভালো লাগত। এত সুন্দর, গোছানো ও পরিষ্কার! তবে বেশ নিঃসঙ্গ দেখাত। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম – ‘আপনি উঠানের আবর্জনাগুলো কেটে ফেলেন না কেন? জায়গাটা আরো স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে।’

‘শোনো, তোমাকে তাহলে ঘটনাটা বলেই ফেলি – একদা একটা মেয়ে আর একটা ছেলের সাক্ষাৎ ঘটল এবং তারা পরস্পরের প্রেমে পড়ে গেল। ফলে তারা বিয়ে করে ফেলল। ছেলেটি শব্দ বুনতে ভালোবাসত, আর মেয়েটি ভালোবাসত ঘাস, ফুল আর গাছপালা। তারা একটি কক্ষে বেশ সুখেই দিনযাপন করছিল। তারপর একদিন মেয়েকবিটি ছেলেকবিকে বলল – আমরা পরিবারে আর একজন কবিকে পেতে চলেছি। কিন্তু সেই কবির আর জন্ম হয়নি; কারণ মেয়েটি মারা গেল। এবং শিশুকবিটি মায়ের সঙ্গে, মায়ের ভেতরে সমাধিস্থ হলো। ছেলেটি খুব কষ্ট পেল। সে প্রতিজ্ঞা করল যে বাগানের একটি জিনিসও সে আর কোনোদিন স্পর্শ করবে না। কাজেই বাগানটি রয়ে গেল, বেড়ে উঠল, তারপর একসময় জঙ্গলে পরিণত হলো।’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ গল্পটি এখানেই শেষ করল।

আমি মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকালাম। তাকে আরো বয়স্ক দেখাচ্ছিল। আমি তার গল্পটি বুঝতে পারলাম। আমরা সেদিন দীর্ঘ পথ হেঁটেছিলাম। বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেলাম, তারপর গেলাম রক গার্ডেনে। সন্ধের আগ দিয়ে চ্যান্সেলর হিলে উঠলাম, দেখলাম – সমস্ত জায়গাটাকে অন্ধকার কেমন করে গিলে ফেলল। তারপর আবার শহরের বাতিগুলো শহরটাকে অন্ধকারের হাত থেকে উদ্ধার করল।

সে প্রতিটি কাজ এমন মনোযোগ দিয়ে করত, মনে হতো যেন জীবনে প্রথম সেই কাজটি করছে। আর মনে হতো, যেন ঈশ্বরের উদ্দেশে সবকিছু করছে। সে আমাকে বলত – ‘এখন আইসক্রিম খেলে কেমন হয়?’ এবং আমি যখন বলতাম – ‘মন্দ হয় না’। সে খুব গম্ভীর হয়ে বলত – ‘এখন আমরা কোন দোকানের সেবা গ্রহণ করব?’ যেন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সে এটা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলত – ‘আমার মনে হয়, ওই দোকানের সঙ্গে এ-ব্যাপারে আলোচনায় বসা যেতে পারে!’ তখন পৃথিবীকে আমার খুব উপভোগ্য বলে মনে হতো।

একদিন, যখন আমি তার উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমাকে বলল – ‘আমার খুব গোপন একটা বিষয় আজ তোমাকে বলব।’

‘খুউব গোপন কিছু?’ – আমি জানতে চাইলাম।

‘এ মুহূর্তে তা তো বটেই।’

আমি তার দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকে তাকাল। আমি ভেতরে ভেতরে বেশ শিহরিত হলাম। সে বলল – ‘মনে রেখো, এটা শুধু তোমার আর আমার ভিতরে। একটি কবিতা লিখছি।’

ওহ, সেই কথা! বেশ হতাশ হলাম শুনে। আমি আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু শোনার অপেক্ষায় ছিলাম।

‘কিন্তু এটা ভিন্ন ধাঁচের একটি কবিতা।’ সে বলল। ‘এটা পৃথিবীর সব থেকে মহৎ একটি কবিতা।’

আমি শিস দিলাম।

সে আরো বলে – ‘এটা নিয়ে আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছি। আজ থেকে বাইশ বছর পরে কবিতাটি শেষ করব। তাও সেটা সম্ভব হবে আমি যে গতিতে এখন লিখছি সেটা ধরে রাখতে পারলে।’

‘তুমি তাহলে প্রচুর লেখ?’ আমি বললাম।

‘এখন আর না। এখন আমি প্রতিমাসে একটা করে লাইন লিখি। তবে নিশ্চিত করি যেন ওটাই শ্রেষ্ঠ লাইন হয়।’

‘গত মাসের শ্রেষ্ঠ লাইনটা কী?’ আমি জানতে চাইলাম।

সে আকাশের দিকে তাকাল, তারপর বলল – ‘অতীত বড় বিধুর, বিষণœময়।’

‘বেশ ভালো লাইন।’ আমি বললাম।

‘আমি আমার একটি মাসের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে জ্বালিয়ে কবিতার একটি লাইনে ঘনীভূত করতে চাই। তাই বাইশ বছর পরে আমি যে-কবিতাটি লিখব সেটা বিশ্বমানবতার সংগীত হয়ে উঠবে।’

আমি খুব বিস্মিত হলাম।

আমাদের হাঁটা চলতেই থাকল। একদিন ডকসাইটে সি-ওয়ালের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আমি বললাম – ‘ওয়ার্ডসওয়ার্থ, যদি আমি এই পিনটি পানিতে ফেলে দিই, তোমার কি ধারণা এটি ভেসে থাকবে?’

‘পৃথিবীটা বড় আজব। ওটা ফেলে দাও, দেখি কী ঘটে!’ সে বলল।

পিনটি ডুবে গেল।

আমি বললাম – ‘এ-মাসের লাইনটি কতদূর?’

সে আর কোনো লাইন শোনায়নি। শুধু বলত – ‘এই তো চলে এসেছে … হয়ে যাবে …।’

আমরা তখন সি-ওয়ালের ওপরে বসে যাত্রীবাহী জাহাজগুলোকে বন্দরে ভিড়তে দেখতাম। পৃথিবীর সেই শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আমার আর শোনা হয়নি।

আমার মনে হতো, সে একটু জলদিই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে।

‘তুমি কীভাবে বেঁচে আছ?’ – একদিন জানতে চাইলাম।

‘মানে, তুমি বলতে চাইছ আমি কীভাবে আয়-রোজগার করি?’

আমাকে তোতলাতে দেখে সে মৃদু হেসে বলল – ‘আমি ক্যালিপসোর সময়ে ক্যালিপসো গেয়ে বেড়াই।’

‘তাতেই তোমার হয়ে যায়?’

‘খুব ভালোমতোই।’

‘কিন্তু তুমি যখন পৃথিবীর বিখ্যাত কবিতাটি লেখা শেষ করবে তখন তো তুমি বেশ ধনী হয়ে যাবে?’

সে কোনো উত্তর করল না।

একদিন তাকে আমি তার সেই ছোট্ট ঘরটিতে দেখতে গেলাম। সে শুয়ে ছিল। খুব বয়স্ক আর ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার এই অবস্থা দেখে আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছিল।

‘কবিতাটি আসতে আসতে কোথায় যেন থমকে গেছে।’ সে বলল।

সে তখন জানালা দিয়ে বাইরের নারিকেল গাছটির দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমার উপস্থিতি টের পায়নি। ‘যখন আমার বয়স বিশের কাছাকাছি ছিল, নিজের ভিতরে একটা শক্তি অনুভব করতাম।’ তারপর আমার চোখের সামনেই তাকে আরো বুড়িয়ে ও ক্ষয়ে যেতে দেখলাম। ‘কিন্তু, সেটা ছিল অনেক অনেক দিন আগে।’

তার কথা শুনে, সবকিছু এতটাই তীব্রভাবে আমার চেতনায় এসে ধরা দিলো যে, মনে হলো মা আমার গালে কষে একটা থাপ্পড় মারল। মৃত্যু তার সংকুচিত হয়ে আসা মৃতপ্রায় মুখম-লে জীবন্ত হয়ে উঠল – এটা যেন সবার জন্যই উপস্থিত হয়েছিল।

সে আমার দিকে তাকাল, আমার চোখে পানি দেখে উঠে বসল।

‘এদিকে এসো।’ বলল সে। আমি তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম।

সে আমার চোখের দিকে তাকাল, বলল – ‘তুমিও তাহলে এটাকে দেখতে পাচ্ছ? আমি জানতাম, তোমার চোখদুটো কবির চোখ।’

তাকে একটুও চিন্তিত দেখাচ্ছিল না। তার বোকার মতো শান্ত চেহারা দেখে আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম।

সে তার শুকনো বুকে আমাকে টেনে নিল। ‘তুমি কি চাও আমি তোমাকে এখন একটা মজার গল্প বলি?’ তারপর আমার ভেতরে উৎসাহ জোগাতে হেসে উঠল। কিন্তু আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

সে বলল – ‘যখন আমি গল্পটি বলা শেষ করব, আমি চাই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে এবং আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তুমি এখন আমাকে প্রতিশ্রুতি দেবে।’

আমার কণ্ঠস্বর যেন রুদ্ধ হয়ে আসছিল!

সে বলল – ‘বেশ, তবে শোনো। আমি তোমাকে ওই ছেলে কবি ও মেয়ে কবিকে নিয়ে যে-গল্পটা বলেছিলাম, তোমার মনে পড়ে? ওটা সত্য ছিল না। গল্পটা আমি তোমাকে বানিয়ে বলেছিলাম। তোমাকে কবিতা এবং আমার বিখ্যাত কবিতাটি নিয়ে যে-সমস্ত কথা বলেছি তাও সত্য নয়। এটা তোমার জীবনে শোনা সব থেকে মজার বিষয় হলো না?’

কিন্তু তার কণ্ঠস্বর আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে লাগল।

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। একজন কবির মতো যা কিছু দেখলাম তাই দেখে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ছুটে এলাম।

এক বছর পরে এলবার্তো স্ট্রিট ধরে একা হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওই কবির বাড়ির কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। এটা ঠিক অদৃশ্য হয়েও যায়নি, মনে হচ্ছে কে বা কারা যেন গুঁড়িয়ে ফেলেছে। বেশ বড় দোতলা একটি ভবন জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। সেই বিশাল আমগাছটিসহ, নারিকেল ও তালগাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে। এখন সেখানে শুধু ইট, পাথর আর লোহা দেখা যাচ্ছে – যেন বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ কোনোদিনই ছিল না এখানে।

Sunday, May 10, 2026

গল্প- মা তোমাকে ভালোবাসি by রোমেন রায়হান

সব মা–ই সেরা! তোমার কাছে যেমন তোমার মাকে সবচেয়ে ভালো মা মনে হয়, দেখবে তোমার বন্ধুরাও তা–ই ভাবে। আবার আশপাশে তাকিয়ে দেখো, শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিরাও মাকে ভীষণ ভালোবাসে। দেখবে বিড়ালছানা কেমন মায়ের বুকে গুটিসুুটি মেরে থাকে। চড়ুইয়ের ছানা
‘চিঁচিঁ’ করে ডাকে মাকে! আজ রোববার মা দিবস। তাই আজ মাকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন।

পাশে যে ছবিটা দেখছ, এটা এঁকেছে আবির শেখ। সে নাটোর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে
রুহামদের বাসায় পাঁচটা পিঁপড়া থাকে। মা পিঁপড়া, তার দুই ছেলে আর দুই মেয়ে। বাচ্চা পিঁপড়ারা খুব লক্ষ্মী। সব সময় মায়ের কথা শোনে। এই যেমন মা পিঁপড়া বলে দিয়েছে, ‘রুহামকে কখনো কামড় দিয়ো না।’
ওরা মায়ের কথা শুনেছে। এক বছর ধরে ওরা রুহামদের বাসায় থাকছে, এক দিনও রুহামকে কামড় দেয়নি।
রুহামদের বাসায় আজকে বড় অনুষ্ঠান হলো। অনেক মেহমান এসেছিল। একটা কেক আনা হয়েছিল। রুহাম সেই কেক কাটল। রুহামের জন্মদিন ছিল যে!
পিঁপড়ারাও কেকের ভাগ পেল। মা পিঁপড়া পেট পুরে খেয়ে ঘুমাতে গেল। ওদিকে চার ভাইবোন পিঁপড়া বসে বসে গল্প করছিল। সবচেয়ে ছোট পিঁপড়া বোনটা বলল, ‘আমার মন খারাপ।’
বাকি তিন ভাইবোন একসঙ্গে বলে উঠল, ‘কেন, কেন?’
‘এই যে আমরা মোটে তিন-চার বছর বাঁচি!
ছোট ভাই পিঁপড়া বলল, ‘তাতে কী?’
‘আমরা তো চাইলেও দুই-তিনটার বেশি জন্মদিন পালন করতে পারব না।’
বড় বোন বলল, ‘আচ্ছা আমরা জন্মদিন পালন করি না কেন?’
জবাবটা কেউ দিতে পারল না। হঠাৎ সবার মন খারাপ হলো। মায়ের একটার বেশি জন্মদিন পালন করতে পারবে না।
সবাই ঠিক করল মায়ের জন্মদিন পালন করবে। তবে আগে থেকে মাকে কিছুই জানাবে না। চমকে দেবে।
পিঁপড়া মায়ের জন্মদিন ১১ মে। নানু পিঁপড়ার কাছ থেকে ওরা শুনেছিল।
মে মাস তো চলেই এল। সারা দিন চার ভাইবোন ফিসফিস করে। জন্মদিনে কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা।
মে মাসের ১০ তারিখ এসে পড়ল। অনুষ্ঠান করার জন্য ড্রয়িংরুমের একটা কোনাকে বেছে নিল ওরা। এই ঘরে মা পিঁপড়া সাধারণত আসে না। তাই আগে থেকেই মায়ের চোখে পড়বে না। পিঁপড়া ভাইবোনেরা একেকজন একেক কাজে লেগে পড়ল।
বড় ভাই পিঁপড়া বাগানে গেল একটা ফুল আনতে। এত দূর থেকে কাঁধে করে একটা ফুল নিয়ে আসা তো সহজ কাজ না! কিন্তু মায়ের জন্য আনছে বলে তার একটুও কষ্ট লাগল না।
বড় বোন পিঁপড়া গেল রুহামের পড়ার ঘরে। পড়তে বসলেই রুহামের শুধু খিদে পায়। তাই রুহামের আম্মু ওর পড়ার টেবিলে সব সময় কিছু না কিছু খাবার রেখে দেয়। টেবিলের কাছাকাছি গিয়ে দেখল রুহাম পড়া ফেলে বিস্কুট খাচ্ছে। টেবিলের নিচে কার্পেটের ওপর একটা বিস্কুট পড়ে আছে। রুহাম এভাবে খাবার-দাবার গুছিয়ে খায় না বলে অন্য দিন পিঁপড়ারা বিরক্ত হতো। আজকে হলো না। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পিঁপড়া বড় বোন বিস্কুটটা নিয়ে রওনা হলো। আরেকটু হলে রুহামের পায়ের নিচে চাপা পড়ছিল!
রুহামের বাবা গতকাল বাজার থেকে স্ট্রবেরি এনেছিল। ছোট ভাই পিঁপড়াটা গেল রান্নাঘরে। গিয়ে দেখে ফ্লোরে এক টুকরো স্ট্রবেরি পড়ে আছে। সে ওই টুকরোটা নিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে রওনা হলো।
জিনিস জোগাড় হয়ে গেছে। পিঁপড়া ছোট বোনটা এবার বসল কেক বানাতে। সব ভাইবোন মিলে ক্রিম দিয়ে জোড়া দেওয়া দুই বিস্কুট আলাদা করে ফেলল। তারপর ক্রিম লাগানো অংশটার ওপর বসাল স্ট্রবেরির কাটা টুকরো। ছোট বোন বলল, ‘এই নাও, হয়ে গেল জন্মদিনের কেক!’ কেক দেখে সবাই খুশি। আনন্দে হাততালি দিল।
আয়োজন শেষ করতে করতে দেখে রাত ১১টা বেজে গেছে। তার মানে মা ঘুমিয়ে গেছে।
রাত ১২টা বাজার একটু আগে সব ভাইবোন গেল মায়ের কাছে। গভীর ঘুম থেকে ডেকে তোলায় মা পিঁপড়া প্রথমে ঘাবড়ে গেল। চোখ কচলে বলল, ‘কী হয়েছে?’
বড় ছেলে মুখ হাসি হাসি করে বলল, ‘কিছু না।’
‘তাহলে এত রাতে ডাকতে এলি কেন?’
ছোট মেয়ে মায়ের হাত টেনে বলল, ‘চলো তো, মা।’
‘কোথায়?’
‘ড্রয়িংরুমে। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।’
ড্রয়িংরুমে এসে মা তো অবাক। কেক! ফুল! জিজ্ঞেস করল, ‘এগুলো কী রে?’
বড় মেয়েটা কিছু বলবে বলে মুখ খুলতে যাচ্ছিল। অমনি রুহামদের বাসার দেয়াল ঘড়িটা ঢং ঢং করে বেজে উঠল। মানে রাত ১২টা বেজে গেছে। সব ছেলেমেয়ে একসঙ্গে সুর করে গেয়ে উঠল:
‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ...হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ...হ্যাপি বার্থ ডে ডিয়ার মা...হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।’
মা পিঁপড়া ভ্যাবাচ্যাকা খেল। এটা দেখে ছোট ছেলে বলল, ‘মা, আজকে মে মাসের ১১ তারিখ! আজকে তোমার জন্মদিন।’
বড় ছেলে মায়ের হাতে ফুল তুলে দিল। মা ফুল হাতে নিল। সবাই মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা, তোমাকে ভালোবাসি।’
‘আমিও তোদের অনেক ভালোবাসি।’
সবাই দেখল মায়ের চোখ ভেজা। চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সব ছেলেমেয়ের চোখও ঝাপসা হয়ে আসছে।
তারপর সবাই মিলে গোল হয়ে বসল। কেক খেল। খেতে খেতে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করল। গল্প শেষ করে ছেলেমেয়েরা অনে-এ-এ-ক দিন পর ছোটবেলার মতো মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমুতে গেল।

Sunday, December 21, 2025

অন্য এক পৃথিবীর ক্যালেন্ডার by ওথমান হুসেইন

এই শব্দগুলো লেখা হচ্ছে যখন, তখন ২৪তম দিনটি নিজেই নিজের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে। অপরাধগুলো ইতিহাসের মুখে ছুড়ে দিয়ে বিদায় নিচ্ছে এ দিনটি। দুপুর থেকে যে নিস্তব্ধতা শুরু হয়েছিল দিনের শেষ দুই ঘণ্টায় আমি সেই একই ধরনের নিস্তব্ধতা অনুভব করলাম। এই নিস্তব্ধতা টিকে থাকবে ২৫তম দিনের সন্ধ্যা পর্যন্তও। আগামীকাল একটি নতুন দিনের সূচনা হবে। একটি নতুন সংখ্যা সামনে আসবে। আমরা জানি না এদিনের কি স্মৃতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

ড্রোনের গুঞ্জন চারদিকে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দটি অবিরাম শোনা যাচ্ছে। তাতে অন্যরকম এক পটভূমি হয়ে উঠেছে। আমাদের জীবনের প্রতিটি কোণে প্রবেশ করেছে তা। আমাদের দিনগুলোর অন্তঃস্থলে জায়গা করে নিয়েছে এই ড্রোনের গুঞ্জন। বাহিয়া আজ রাতে কোনো বিস্ফোরণের ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করেনি আমাকে; হয়তো এটা জিজ্ঞাসা করলে এবং এর ব্যাখ্যা শুনলে তার মেজাজ নষ্ট হয়ে যেত। সে এখন একটি পছন্দের গান গুনগুন করে গাইছে। তার পাশে ফোন রাখা। তার উপস্থিতি পুরো ঘরটিকে দখল করে রেখেছে।
অবিরাম খবর আসছে অবিরাম। খবরের পর খবর। থামার কোনো নামই নেই। সকাল থেকে বিমানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি সেই শব্দ। মানবিক সহায়তার করিডর নিয়ে অনেক কথা চলছে- এই প্রতারণাময় নীরবতাই কি সেই করিডরের প্রস্তুতি?

যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই আমরা গণনা শুরু করেছি। আশঙ্কা উপরের দিকে বাড়তে থাকা এক গণনা। দিনগুলো কেবল সংখ্যায় পরিচিত হয়ে উঠলো। উদাহরণস্বরূপ, আমার বাড়িতে আর্টিলারি গোলার আঘাত করা হয় তৃতীয় দিনে। অন্য সব দিনও বাঁধা রইল বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে- এইদিন বা সেই দিনের ভেতরে সংঘটিত বিভীষিকার স্মৃতিতে।
বিশতম দিনে, বিশ্ব দেখেছিল কীভাবে গোটা পরিবার নাগরিক নিবন্ধন থেকে মুছে দেয়া হয়েছে এক নিদারুণ ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে। এখানে প্রতিটি দিন নাগরিকরা রেজিস্ট্রি ধ্বংসের সাক্ষী হয়ে উঠছিল। পুরো পাড়া-মহল্লা মুছে গেছে মানচিত্র ও ইতিহাস থেকে এবং বিশ্ব সেই ধ্বংসযজ্ঞও প্রত্যক্ষ করেছে।
৩০ অক্টোবর, ২০২৩
(লেখক ওথমান হুসেইন গাজার রাফাহভিত্তিক একজন ফিলিস্তিনি কবি। তিনি ‘আশিতার’ সাহিত্য পত্রিকার সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘আশিতার এসোসিয়েশন ফর কালচারাল অ্যান্ড আর্টস’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্যালেস্টাইনি রাইটার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও বিসান মিডিয়া ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিসান মিডিয়া ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ‘রাফাহ অ্যালফাবেট অব ডিসট্যান্স অ্যান্ড মেমরি (১৯৯২)’। ‘দ্য সিজ অ্যাপোলোজাইজ ফর ড্রোউনিং (১৯৯৩)’। ‘হু উইল কাট দ্য হেড অব দ্য সি (১৯৯৬)’। ‘ফর ইউ (২০০০)’। ‘দ্য থিংস লেফট টু দ্য ব্লু (২০০৪)’। ‘অ্যাজ ইফ আই অ্যাম রোলিং গ্যালাক্সিজ (২০১২)’। ‘দ্য ভিকটিমস গার্ডিয়ান (২০২৩)’। দক্ষিণ গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় তার পারিবারিক ঘরটি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও তিনি যুদ্ধ চলাকালীন গাজাতেই থেকে গেছেনÑ শব্দের ভেতর বেঁচে আছেন, ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কবিতার কণ্ঠস্বর হয়ে। লেটারস ফ্রম গাজা বই থেকে)।

লেখক: ওথমান হুসেইন অনুবাদ: মোহাম্মদ আবুল হোসেন

https://mzamin.com/uploads/news/main/183103_2.webp

Sunday, November 23, 2025

ছোট গল্প- হায়েনা by নিজাম কুতুবী

একবার একটি হায়েনার ইচ্ছে হয়েছিল মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে। হায়েনাটি মানুষের মত করে মানুষের রূপে মানুষের শহরে বসবাস পাততে চেয়েছিল। হায়েনাটি সেই উদ্দেশ্যে পাতাল পুরি থেকে হাজার মাইল পথ-ঘাট-নদী মাঠ পেরিয়ে হাজির হলো একটি মানুষের শহরে।

এই শহরে এসে সে দেখতে পেলো, কিছু মানুষ একজন মানুষের পদার্পনের অপেক্ষা করছে। লোকটির আগমনের বার্তায় ফুলের পাঁপড়ি ছিটাচ্ছে তার পদপ্রান্তে। ঠিক এমুহুর্তে হাজির হলো একটি লাল মোটর কার। চারদিক থেকে চারজন ছুটে এসে দরজা খুলে দিল। লাল মোট গাড়ি থেকে বের হলো লাল পোশাকে আচ্ছাদিত একটা লাল মানুষ। হায়েনাটির মনে হলো, মানুষটির পরনে কোন কাপড় নেই। তার কোন হৃদয়ও নেই। হয়ত মানুষটি কোন দিন সূর্যের আলো দেখেনি। জোøারাতও তার নজর কাড়েনি। চাঁদের আলোয় ভেজেনি তার শরীর। মানুষটি হেঁটে হেঁটে একটি বিরাট অট্টালিকায় প্রবেশ করলো যা আকাশ ছুঁয়েছে। মানুষটা একটা উঁচু আসনে বসলো যা মানুষের হাড় আর খুলি দিয়ে তৈরী।

আরো একটু পরে হায়েনাটি একটা রোমহর্ষক দৃশ্য দেখল। অট্টালিকার ভেতর একটা খুঁটিতে একজন মানুষ বাঁধা আর পাশেই রাম-দা হাতে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা মানুষ। মানুষটা রাম-দার এক কোঁপে বাঁধা লোকটার একটা হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো তার আর্তচিৎকারে। কাটা হাতের দিকে তাকিয়ে লাল মানুষটা তা কামড়াতে শুরু করল। হায়েনাটি ভয়ার্ত চোখে দৃশ্যটি দেখে নিজের মনে বলে উঠল, “আমার অনেকদিন মাংস খাওয়া হয়নি, আর এখানে মানুষ মানুষের মাংস খাচ্ছে...।”

হায়েনাটি অস্থির হয়ে ছুঁটতে লাগল। ছুঁটতে ছুঁটতে থমকে দাঁড়ালো মাঝপথে-কতগুলো মানুষ একজন লম্বা চুলের মানুষকে রাস্তা দিয়ে টেনে হিচঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। লম্বা চুলের মানুষটার বসন আলগা হয়ে পড়েছে। কালো পিচের রাস্তায় বয়ে গেছে রক্তের চোপ। লম্বা চুলের মানুষটার আর্তনাদ ঢেকে গেলো মানুষগুলোর আদিম উল্লাসে। হায়েনাটির প্রাণ হাঁসহাঁস করতে লাগল। সে প্রাণপণে ছুঁটতে লাগল। তার চোখে বিস্ময় ও প্রশ্নের চিহ্ন। শহরের শেষ প্রান্তে এসে হায়েনাটি নিজের দাঁত দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। এবং একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আমার স্বজাতি অনেক উত্তম ছিল। এসব দানব মানুষদের র্কীতিকলাপ দেখে বেঁচে থাকতে লজ্জা হচ্ছে...। তাই কবর খুঁড়ছি।”

Tuesday, October 7, 2025

পৃথিবী ঘুমায় গাজার মানুষ মুখোমুখি হয় বিশ্বাসঘাতক দখলদারের by দোহা খালুত

আমাদের রাত বড় দীর্ঘ। এই রাতে আমরা সান্ত্বনা দিই লোনা স্মৃতিগুলোকে। পার হই এক অনন্ত আকাক্সক্ষার পথ- যার তীব্রতা কখনো ম্লান হয় না। দিনে আমরা ছুটে বেড়াই নানা সমস্যার পেছনে- যা শুরু হয় এক গ্লাস পানি থেকে, শেষ হয় ক্লান্তির সঙ্গে মেশানো এক টুকরো রুটিতে। ভাববার সময় নেই- আমি কে? এখানে এসে পড়লাম কীভাবে? এই দিনগুলো টিকে থাকতে আমাকে আর কতো কিছু হারাতে হবে? অতীতটাও তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবে। তাই যা সময় বাকি আছে, তা আমরা স্মৃতিচারণে ব্যয় করি- ভয়ে, যদি সেগুলোও মুছে যায়।

আমরা প্রশ্নের এক অবিরাম স্রোতের পিছু ছুটি, তারপর ঘুমিয়ে পড়ি মাথায় ঘূর্ণায়মান অগণিত প্রশ্ন নিয়ে- উত্তর খোঁজার ব্যর্থ প্রচেষ্টায়।
কীভাবে এত প্রশ্ন জমে গেল?

৭ই অক্টোবর, ২০২৩। এই দিনেই গাজাবাসীর চারপাশে প্রশ্নের অবরোধ শুরু হয়। যেদিকেই তাকায়, একগুঁয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলে থাকে। কেউ কিছুই বুঝতে পারে না, আটকে থাকে সকাল সাড়ে ছয়ের ঘড়ির কাঁটায়- একই দুই প্রশ্নে: ‘কী হচ্ছে?’ ‘এর পরিণতি কী হবে?’
পরদিন সকালে দখলদার বাহিনী নিজেদের উত্তর পাঠায়- অচেনা অস্ত্রের গর্জনে, ঘরবাড়ি ধ্বংসের নীতিতে, আর অমানবিক বক্তব্যে, যা আমাদের ভয়ে স্তব্ধ করে দেয়। যখন সামান্য বিদ্যুৎ থাকতো, টেলিভিশনের সামনে বসে আমরা ব্রেকিং নিউজের লাল ফিতা পরতাম, নিজেদের মধ্যে বলতাম-‘ওখানে আমাদের কে আছে?’
আর ‘ওখানে’ বলতে বোঝানো হতো সেই জায়গা, যেখান থেকে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘বোমা হামলার শিকার।’

কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য আমরা নাম ধরে প্রার্থনা করতাম। খবরের বন্যা চারদিকে। তারই মাঝে একদম খুব কাছে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র সব নীরবতা ভেঙে দেয়। শরীর অবশ লাগে। মনে হয় দুঃস্বপ্ন দেখছি- চোখ খুললেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু চেতনা ফিরে পেলে শোনা যায় কম্পমান কণ্ঠস্বর-
‘তুমি বেঁচে আছো? তোমার বোন আর ভাই তোমার সঙ্গে আছে?’
কথা বের হয় না। গলা শুকিয়ে যায়। এক অকল্পনীয় ভয় তোমাকে গিলে নেয়।
একই দৃশ্য, একের পর এক দিন।
সাতদিন ধরে একই প্রশ্ন, একই ভয়, একই নিঃশব্দ ডাক।
ভাবতে শুরু করো- সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছো। কিন্তু না- শত্রুর হাতে এখনো অজানা অনেক দৃশ্যপট বাকি।
এসব প্রশ্ন কীভাবে জমা হলো

১৩ই অক্টোবরের সকাল। গাজাবাসী জেগে উঠলেন এক ‘নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিতে মোড়া’ বাস্তুচ্যুতির নির্দেশনায়। দখলদার বাহিনীর অফিসিয়াল ঘোষণায় বলা হলো- উত্তর গাজার বাসিন্দারা যেন ‘নিরাপদ দক্ষিণে’ চলে যায়। কারণ উত্তরে ‘ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্র’।
তখন প্রতিটি ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো একটাই প্রশ্ন: ‘কোথায় যাবো?’
যাদের আত্মীয় ছিল দক্ষিণে, তারা দেরি না করে রওনা দিলো। যাদের কেউ ছিল না, তারা সামান্য জিনিস, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যেদিকে বাতাস, সেদিকেই চললো। রাস্তায় ভাঙা ঘরের টুকরো বহন করা গাড়ির ভিড়ে মানুষের মুখে লেখা ছিল ভয়- আর কাঁধে ছিল প্রশ্নের ভার। অনেকেই হাঁটতে হাঁটতে দক্ষিণে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল শুধু হালকা কাপড় আর মনের ভেতর ঘরবাড়ির স্মৃতি- যার জন্য প্রতি রাতে কাঁদেন তারা।
শিশুরা জিজ্ঞেস করতো- ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
তাদের প্রশ্নে অভিভাবকরা জড়িয়ে ধরতেন। কিন্তু উত্তর দিতেন না।
‘নিরাপদ’ দক্ষিণের অনিরাপদ কাহিনী:
দক্ষিণে এসে নতুন সব কষ্টের গল্প শুরু হয়। অনেক মা তাদের সন্তানকে বুকে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু স্বামী বা অন্য কোনো সন্তান নেই সঙ্গে। তারা অস্থায়ী তাঁবু গেঁড়ে বসবাস শুরু করেন। পরিষ্কার রাখেন। জিনিসপত্র সাজান যেন ঘরের মতো লাগে। আর প্রতিদিন দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন কোনো চেনা কণ্ঠের জন্য।
ইখলাস, বয়স ৪২। স্বামী ও চার সন্তান নিয়ে আশ্রয়শিবিরে থাকেন। তার চোখে একটাই প্রশ্ন- ‘আমার ছেলে মুহাম্মদ এখন কেমন আছে?’
সে রয়ে গেছে উত্তর গাজায়। নেটওয়ার্ক পেলে একটুখানি খবর আসে, তাতে কাঁপে মা-ছেলের মন। এমন হাজারো মা- খালি চোখে, ঝুলন্ত হৃদয়ে বেঁচে আছেন।
৬০ বছর বয়সী ফায়জা উত্তর গাজা ছেড়ে যাননি। প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করে সন্তানদের নিয়ে ঘর থেকে ঘরে পালিয়েছেন। তার একমাত্র ছেলেকে গ্রেপ্তার করে নিখোঁজ করা হয়। ৪০ দিনেরও বেশি কোনো খোঁজ নেই।

স্বামী নিহত হয়েছেন। ছেলে মুক্তি পেলেও তাকে দক্ষিণে পাঠিয়ে দেয়া হয় মায়ের নাগালের বাইরে। এখন তিনি একা, সঙ্গী শুধু বিষাদ আর অশান্ত চিন্তা।
শুরুকের বয়স ২৫। কিন্তু মুখে শৈশবের কোমলতা এখন নিঃশেষ। তাঁবুর দরজায় বসে থাকেন সারাক্ষণ, কোলে শিশু, চোখে অশ্রু। এক বছর তিন মাসের বিবাহিত জীবন তার। এরপরই স্বামী নিহত হয়েছেন। তাদের ঘর, হাসি, শিশুর কান্না- সবই এখন শুধু স্মৃতি। মা বলেন-  মেয়ে বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। প্রতিদিন অপেক্ষা করেন স্বামীর ফেরার জন্য, শিশুকে দেখাবে বলে। এটা কি আশা, নাকি উন্মাদনা?
কোনো উত্তরই যথেষ্ট নয়: এই দীর্ঘ রাতে, জমে থাকা প্রশ্নগুলো ভেঙে পড়ে আমাদের ওপর। প্রতিটি ছবিতে, প্রতিটি স্মৃতিতে ফিরে আসে এক প্রশ্ন- ‘আমাদের ঘর কি আবার হাসবে? আগের দিনগুলো কি ফিরে আসবে?’ উত্তর জানা নেই। তবু আশার প্রতারণায় বিশ্বাস করি- হয়তো ফিরবে। মন জ্বালিয়ে দেয় নতুন প্রশ্ন- এই যুদ্ধ কতোদিন চলবে? আমরা কি আজীবন এমনই থাকবো? এই চিন্তা দূর করতে আমরা হাসাহাসি করি- ‘ফিরে গেলে আবার দেখা হবে।’ কেউ মজা করে যোগ করে- ‘যদি কখনো ফিরি।’
সবাই থেমে যায়।
বাঁচা এখন একমাত্র লক্ষ্য।
এই যুদ্ধ আমরা বেছে নিইনি- তবু এরই শিকার। আমরা ভালোবাসি আমাদের জমি, ঘর, কাজ, রাস্তাঘাটের অভিযান। বঞ্চনার অভিজ্ঞতা আবার সহ্য করা যায় না। ‘কখন? কার সঙ্গে? কোথায়?’- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেলে মুক্তি নেই। আর তখনই মাথায় আসে এক ভারী প্রশ্ন- ‘বিশ্ব কি আমাদের দেখে?’
কোনো উত্তরই যথার্থ লাগে না।
যদি দেখে, তবে কোথায় তারা? আর যদি না দেখে, তবে তারা করছে কী?
সময় গড়িয়ে যায়- চার ঋতু কেটে গেছে। আমরা এখন এমন এক জায়গায়, যা আমাদের চেনে না, আমরাও যাকে চিনি না। শরৎ আসে, শীত যায়, বসন্ত পেরিয়ে যায়- কিন্তু আমরা এখনো অপরিচিত এক জীবনে বন্দি। প্রতি মাসে ভাবি, আরেক মাস টিকবো তো? তারপর সেই মাস আসে- আর যুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। প্রতিদিন একই প্রশ্ন, একই ব্যথা- ‘গাজাবাসী কীভাবে এত কষ্ট সহ্য করে?’ ভয়, ক্ষুধা, বিয়োগ- সবই তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। তবু পরের দিনের সূর্য যেন আবারো ধুয়ে দেয় আগের দিনের দুঃখ। এই সহনশীলতা হৃদয়ের অভাব নয়- বরং অবিরাম বেদনা মানুষকে শক্ত করে তোলে, অনুভূতি চেপে রাখতে শেখায়।
বেঁচে থাকা এখানে এক যুদ্ধ- সকালের তাপ থেকে শুরু, রাতে ঠাণ্ডায় শেষ। বিশ্ব জানে এর সামান্যই- কিছু ছবি, কিছু ভিডিও, কিছু আর্তনাদ। তারা ভাবে- আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ভাবতে চায়, আমাদের দৃঢ়তা নাকি এক ‘নায়কোচিত’ কাহিনী। এভাবেই তারা নিজের অপরাধবোধ ধুয়ে ফেলে। কখনো কিছু সহায়তা আসে, আবার থেমে যায়। বিশ্ব তখন শোনে আমাদের মৃত্যুর গল্প- কখনো বিস্ময়ে, কখনো আপত্তিতে। আর যখন পৃথিবী ঘুমায়, গাজার মানুষ তখন মুখোমুখি হয় এক বিশ্বাসঘাতক দখলদারের- আর জেগে থাকে সেই এক প্রশ্ন নিয়ে- ‘আমরা কতোটা একা?’

(দোহা খালুত গাজার কবি ও শিক্ষক। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আশবাহ’ প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালে। তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ও ইনস্টিটিউট ফর আইডিয়াজ অ্যান্ড ইমাজিনেশনের যৌথ উদ্যোগে প্যারিসের রিড হল-এ শিল্পী আবাসনের জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি আগ্রাসনে রাফাহ সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে যেতে পারেননি। বর্তমানে তিনি গাজার মধ্যাঞ্চল দেইর আল-বালাহ-তে অবস্থান করছেন, সেখান থেকেই নিজের লেখা বিশ্বে পাঠাচ্ছেন। তার মূল লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন হাইথাম আল ওয়ারডানি।  লেটারস ফ্রম গাজা- বই থেকে) লেখক: দোহা খালুত অনুবাদ: মোহাম্মদ আবুল হোসেন
https://mzamin.com/uploads/news/main/183495_3.webp

Monday, September 15, 2025

গল্প- ঠান্ডা রক্ত বা এনআরসির দিনে প্রেম by মিথিলেশ ভট্টাচার্য

ওই যে লালমাটির ছোট্ট গলিপথ, পুরোটা না, শুধু মুখটুকু, কোনো কোনোদিন বেশ রঙিন, ফুরফুরে আর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সিক্তার উপস্থিতিতে। সিক্তা ঝলমলে সালোয়ার-কামিজে, নির্ভার মেজাজে, ছাতা মাথায় এসে দুদ- দাঁড়ায় গলিমুখে একটা অটোরিকশা ধরার আশায়। তবে রোজই এখানে দাঁড়িয়ে তার ভাগ্যে রিকশা জোটে না। খানিকটা পথ উজিয়ে মেইন রোডে গিয়ে রিকশা ধরতে হয়। মাঝেমধ্যে লালমাটি-গলিপথের বিপরীত গলির যতীনের গাড়িতে কখনো লিফট পেয়ে যায় সে; দুজনের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় যদি মিলে যায় তবে। যেমন আজ -।

যতীনের লাল রঙের সেকেন্ডহ্যান্ড ফিয়াট গলিমুখে পড়ে রোজকার মতো ক-মুহূর্ত স্থির ও সতর্ক, রাস্তার দুপাশের পথচারী ও ছোট-বড় গাড়ির সম্ভাব্য আনাগোনার ব্যস্ততায়, আর সে-সময় ওর দৃষ্টি পড়ে সিক্তার ওপর বা গলিমুখে সিক্তার খানিক ফুটে ওঠা তার চাতকদৃষ্টি চুম্বকের মতো টেনে নেয়। আর ওদিকেও, সিক্তার লম্বাটে ফেসিয়াল করা মসৃণ চেহারায়, রক্তরাঙা ঠোঁটে স্মিত হাসির ঝিলিক -।

গাড়িটা রাস্তার ওপাশে নিয়ে গিয়ে চালক সাজু সিক্তার সামনে দাঁড় করায়। ওকে নিতে হবে বিলক্ষণ জানে সে। যতীন দরজা খুলে যথারীতি সিক্তাকে আহ্বান করে : এসো! আজ আবার ওর সঙ্গে একটু জরুরি দরকারও আছে তার। তবে এক্ষুনি কথাটা বলে আবহাওয়াকে ভারী করতে চায় না সে।

এই যে সিক্তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া, তা কিন্তু রোজ রোজ ঘটে না। মাঝেমধ্যে সকালবেলা বাজারে যাওয়ার সময় সিক্তার সঙ্গে গলিমুখে বা রাস্তার পাশে দেখা হলে যতীন অবশ্যই তাকে তুলে নেয় গাড়িতে। যে-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে সিক্তা, তা বড়জোর দুই কিলোমিটার দূর এবং এটুকু পথ তাকে প্রায়ই দশ টাকা অটোভাড়া খরচ করে পাড়ি দিতে হয়। মাসের মধ্যে দু-চারদিন যতীন গাড়িতে লিফট দেয় তাকে।

ওদের দুজনের পরিচয় দেখতে দেখতে বেশ কবছর হয়ে গেল। মুখোমুখি গলির বাসিন্দা হলেও দুজনের মধ্যে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা কিছুই হয়তো হতো না। একই পাড়ায় পাশাপাশি বাস করেও অনেকেই তো বছরের পর বছর পরিচিত মুখ হয়েও অপরিচিত থেকে যায়। যতীন আর সিক্তার মধ্যেও ওরকম সম্পর্কই হতো যদি না এক নেমন্তন্নবাড়িতে সিক্তার তার প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠা, পাশে দাঁড়ানো, ঘনিষ্ঠ আচরণভঙ্গি, স্মিত হাসির বাক্সময় দৃষ্টি ওসব চোখে না পড়ত। এখন যতীনের মনে হয়, হঠাৎ করে তার প্রতি ওরকম মনোযোগী হয়ে ওঠেনি সিক্তা। ব্যাপারটি নিশ্চয় বহুদিন থেকেই ওর মনের কোনো অতল কোণে জন্মেছিল, যার প্রকাশ ঘটে নেমন্তন্নবাড়ির খোলা পরিবেশে।

নেমন্তন্নবাড়িতে খাবার পর মুখ ধোয়ার জায়গা করা হয়েছিল মেইন রোডের পাশে। দু-তিনটি বালতিতে জল ও কয়েকটি মগ রাখা ছিল। যতীন যখন মগ নিয়ে হাতে জল ঢালতে যাবে, তখন একটু চমকে দেখতে পেয়েছিল পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানো সিক্তাও তার সুডৌল হাতটি ধারার নিচে পেতে দিয়েছে। ওর শ্যামলা চেহারায় স্মিত হাসির ঝিলিক।

তারপর থেকে পথে কোথাও দেখা হলে বা হঠাৎ করে দুজন মুখোমুখি পড়ে গেলে সিক্তার হাসিমাখা ঝলমলে চেহারা ও কৌতূহলী দৃষ্টি যতীনকে সবিশেষ আলোড়িত ও উজ্জীবিত করে দিত। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, পথচলতি অন্যমনস্ক তার দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টির সিক্তাকে হঠাৎ লক্ষ করে অবাক যতীন খুব উৎফুল্লও বোধ করেছে।

এবং তারপরের ঘটনাক্রম দিয়েই আজকের এই কাহিনির শরীর তৈরি হয়েছে।

গলিপথ ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে এসে তেল নেওয়ার জন্য সাজু গাড়ি ঢোকাল সত্যম পেট্রল পাম্পের প্রশস্ত চত্বরে। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো পাম্পের এপাশ-ওপাশ একপলক চেয়ে দেখে সিক্তা যতীনকে বলে, এনআরসির ফরম ফিলাপ করেছেন?

না। করিনি এখনো। অবহেলা-মেশানো উদাস সুরে বলে যতীন।

আমাদেরটা হয়ে গেছে -। ভারমুক্ত কণ্ঠে বলে সিক্তা।

তাই, কে করেছে? এবার একটু আগ্রহের গলায় জানতে চায় যতীন।

কে আবার, বাবা নিজেই করেছে।

তোমার বাবা ওসব জানেন?

জানে তো। পাড়ার বেশকজনকে হেল্পও করেছে।

কিন্তু ফরমের অনেক কলম তো আমার কাছে বেশ কনফিউজিং লেগেছে, – দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলে যতীন।

তাহলে বাবার কাছে চলে আসুন!

বলছ – ? যতীন সিক্তার চোখে চোখ রাখে।

হ্যাঁ। বাবা বুঝিয়ে দেবে আপনাকে – উৎসাহের সুরে বলে সিক্তা।

ঠিক আছে যাব। তোমার মোবাইল নম্বরটা দাও তো, – প্যান্টের পকেটে হাত ভরে নিজের মোবাইল বের করে আনে যতীন। অনেকদিন থেকেই একান্তে কথা বলার অভিপ্রায়ে সিক্তার মোবাইল নম্বরটা জানার সুতীব্র কৌতূহল তার। কিন্তু সেরকম সুযোগ হচ্ছিল না। আজ হাতের কাছে সুযোগ এসেছে।  ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করে যতীন।

হাতের মুঠোয় ধরা নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সিক্তা বলে, আমারটা কেন, ঘরের ল্যান্ড নম্বর দিচ্ছি, পাশে আমার নামটা লিখে রাখবেন – !

এ-কথা শুনে একটু দমে যায় যতীন। ওর নম্বরটি দিতে চাইছে না কেন। ঠিক আছে, বলো, – মিয়ানো কণ্ঠে বলে যতীন।

আচ্ছা, সিক্তা নিজের মোবাইল নম্বরটি দিতে চায় না কেন, ওর কি যতীনের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে ইচ্ছা করে না? তবে তাকে দেখতে পেলে কেন হাসিমুখে সাড়া দেয়, নির্বিবাদে চড়ে বসে গাড়িতে? যত দুর্বলতা তো ও-ই দেখিয়েছিল প্রথমে। তবে কি যতীনের মতো মধ্যবয়স্ক, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে লাভ নেই ভেবে সিক্তার ওরকম আচরণ? সুঠামদেহী, সুদর্শন যতীনের রূপই ওকে শুরু থেকে পতঙ্গের মতো আকর্ষণ করেছে, এখন হয়তো বাস্তব সত্যের মুখোমুখি হয়ে ক্রমে মোহভঙ্গ হচ্ছে ওর!

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীনের ঘন শিহরণ ফড়িঙের ডানার মতো চঞ্চল মনে সহসা কিম্ভূত সব শব্দ ও ভাষায় আকীর্ণ এনআরসি ফরমের কথা মনে পড়ে। কারো সঙ্গে ভাগ করতে ইচ্ছা করে ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা সব চিন্তা ও প্রশ্নের আঘাতকে। পাশে বসে থাকা সিক্তার দিকে একপলক তাকায় যতীন। ও কি ওসব চিন্তা ও প্রশ্নের সুবিচার করতে পারবে?

পিতৃ-মাতৃ কেন, মুরব্বি কেন? কী ধরনের বাংলা শব্দ ওগুলো? পিতৃ-মাতৃর মতো তৎসম শব্দ তো বাংলায় ব্যবহার হয় না। আর আঞ্চলিক সিলেটি শব্দ ‘মুরব্বি’ তো শিষ্ট ভাষায় কেউ লেখে না। ‘প্রাতিষ্ঠানিক মুুরব্বি’, ‘আইনি অভিভাবক’, ওরকম ক্লিশে শব্দবন্ধ কেন? কথাগুলো ভেবে মনে মনে বেদনাবোধ করেছে যতীন। এনআরসি নিয়ে সবাই এত উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত যে, ওসব কথা নিয়ে ভাবনার, কথা বলার অবকাশ কারো নেই!

বলবে কি সে-কথাগুলো সিক্তাকে, ও কি বুঝতে পারবে তার অন্তর্গত ক্ষোভ ও বেদনার গূঢ় কারণ? সিক্তা তো একশভাগ বাঙালি। ও কি খবরের কাগজ পড়ে, নিজের ভাষা নিয়ে ভাবে? ওকে দেখলে কিন্তু ওরকম মনে হয় না। দেখেছে সে বর্তমান প্রজন্মকে, সবাই জীবিকা আর ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে, অন্যদিকে তাকানোর মতো অবকাশ নেই যেন। আসন্ন অস্তিত্ব-সংকট যে কত গভীর ও ব্যাপক সে-সম্পর্কে সবাই কেমন অজ্ঞান, উদাসীন!

পাম্প ছেড়ে পথে বেরোতেই ওপারের একটি দোকানের শোকেস আড়াল বিজ্ঞাপনে চোখ পড়ে যতীনের : এখানে এনআরসির জন্য ফটো তোলা হয়। শুধু এই দোকানটিই নয়, শহরের যত্রতত্র এমন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে। যতীনের নিজের পাড়ায় নিজামের দোকানের একটি বিজ্ঞাপন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক : এখানে বিনামূল্যে এনআরসির ফরম ফিলাপ করা হয়। সৌজন্যে, হরেকেষ্ট দাস। অতিপরিচিত রাজনৈতিক পার্টির সক্রিয় সদস্য!

এনআরসির ফরম সংগ্রহের দিনের একটি ঘটনার কথা প্রায়ই মনে পড়ে যতীনের। সেদিন দুপুরবেলা সেও অন্যদের মতো পাড়ার ক্লাবঘরে গিয়েছিল ফরম আনতে। নানা বয়সের পরিচিত মহিলা ও পুরুষে ক্লাবঘর গমগম করছিল। ভিড়ের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ, পাড়ার সম্মানিত বাসিন্দা উমাপদবাবুও লাঠিহাতে হাজির ছিলেন। সরকারি কর্মচারী যারা টেবিল-চেয়ার পেতে বসে কাজ করছিল, তিনি সেখানে ফরম হাতে নিয়ে সহসা কাঁপা-গলায় আবেগভরা সুরে অতিবিখ্যাত কবিতার দুটি লাইনের একটি শব্দ বদল করে আবৃত্তি করে উঠেছিলেন :

কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে

কভু পার্টিশন-বিষে (আশী বিষে) দংশেনি যারে!

ভেতরের সুতীব্র মর্মবেদনার এমন মোক্ষম বহিঃপ্রকাশ যতীনকে আমর্ম কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সত্যি, সাপের বিষ যেমন লহমায় গোটা শরীরে ছড়িয়ে মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়; পার্টিশন বিষও তো তেমনি লাখো কোটি লোকের এমনই দশা করেছে। যে ভয়ংকর কূটাঘাত ছিন্নমূল মানুষকে শুধু শুধু তাড়িয়ে মারছে – !

লক্ষ করেছে যতীন, এনআরসি নিয়ে শহর-গ্রামে তুমুল উথালপাথাল, হইহই কা-, আতঙ্ক, এমনকি আত্মহননের মতো চরম দুঃখজনক ঘটনা! জীবন-জীবিকা নির্বাহের রক্ত জল করা-বিবিধ কাজকামের ভেতরে, অবকাশ যাপনের স্বল্প অবসরে উচ্চ-নিচ সবার একমাত্র চর্চা এনআরসি। এই ভূম-লে লাখো মানুষের বর্তমান অস্তিত্বের অমোঘ নিয়ন্তা হয়ে যেন দেখা দিয়েছে এনআরসি। বুড়োবুড়ি, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া সবাই আগপাশতলা তটস্থ ওই একটিমাত্র বজ্রনির্ঘোষের দোর্দ-প্রতাপে!

ঘুম থেকে উঠেই ইস্ত্রি করা পাটভাঙা জামাকাপড় পরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছুটছে এনআরসির জন্য ফটো তোলার তাগিদে, ফরম ফিলাপের জন্য হন্যে হয়ে একে-তাকে অনুনয়-বিনয় করতে বা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করতে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বাংলায় ছাপা ফরম দেখে বিরক্ত। ইংরেজিতে হলেই যেন ভালো ছিল – এরকম মনোভাব। নিজের মাতৃভাষা যে-লোক ভালো জানে না, সে আবার ইংরেজিতে কেমন করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, ভেবে পায় না যতীন!

এনআরসির জন্য ফটো উঠিয়েছেন যতীনদা? সিক্তা কৌতূহলী সুরে যতীনকে শুধায়।

না। এখনো উঠাইনি। তুমি – তোমরা?

আমি এখনো ফটো তুলিনি। বাবা আর মা একসঙ্গে গিয়ে ফটো উঠিয়ে এসেছে গতকাল।

সিক্তা এখনো ফটো তোলেনি জেনে হঠাৎ করে যতীনের মনে একঝলক রোমান্টিক হাওয়া ওঠে। সে সিক্তার দিকে তাকিয়ে ঝটিতি প্রস্তাব দেয়, এখন ফটো ওঠাবে নাকি?

এখন? একটু বিস্ময়ের কণ্ঠে বলে সিক্তা।

হ্যাঁ, এখন! উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে যতীন। তাদের যৌবন-বয়সে তো ওরকম ছিল, প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে যুগলে ফটো তোলা। সিনেমাহলের অন্ধকারে পাশাপাশি সিটে বসে সিনেমা দেখা, হাতে হাত রাখা, কখনো-বা প্রেমিকার উন্নত বুকে কনুই দিয়ে চকিত সুখস্পর্শ, – কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীন আড়চোখে সিক্তার সুডৌল স্তনের দিকে তাকায়। ক্লিভেজের আলো-আঁধারে মুখ গুঁজতে বড্ড সাধ হয় মুহূর্তে।

এখন তো অফিসে যাব, পরে ওঠাব। সিক্তা যতীনের প্রস্তাব এড়ানোর চেষ্টা করে।

এখন হলেই তো ভালো ছিল, দুজনে একসঙ্গে ফটো ওঠাতাম।

ফটো তো সিঙ্গল ওঠাতে হবে -। সিক্তা সামান্য হেসে বলে।

জানি। তবে তোমার সঙ্গে একটা ফটো ওঠানোর বড্ড ইচ্ছা। এরকম সুযোগ তো সবসময় হবে না।

কেউ যদি দেখে ফেলে?

দেখবে কেন, নিজের কাছে রেখে দিলেই হবে।

না না। মা সবসময় আমার ব্যাগ খুলে দেখে, আপনার সঙ্গে ফটো দেখতে পেলে হাজারটা প্রশ্ন করবে! একটু ভীতু সুরে বলে সিক্তা।

ঠিক আছে, ফটোটা না হয় আমার কাছেই থাকবে। যতীন নাছোড়বান্দা।

আপনার ঘরেও তো লোক আছে দেখার, তখন? সিক্তা যতীনের স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে কথাটা বলে।

তা আছে। সেটা আমি ম্যানেজ করে নেব। যতীন প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে।

ঠিক আছে, তবে আজ না, আরেকদিন -।

আরেকদিন কবে হবে। যতীন ঈষৎ হতাশ গলায় বলে।

খুউব শিগগির – সিক্তা হালকা হাসে।

সত্যি বলছ তো? সন্দিগ্ধ সুরে যতীন প্রশ্ন করে।

আরে বাবা বললাম তো, – আচ্ছা, আপনি লিগ্যাসি ডাটা জোগাড় করেছেন – ? সিক্তা দ্রুত প্রসঙ্গান্তরে যায়।

ওসব জোগাড় হয়ে গেছে। লিগ্যাসি ডাটা, পুরনো ভোটার লিস্ট,  মাইগ্রেশন কার্ড – শেষের দুটি নথির কথা উচ্চারণ করেই বেশ ক-মুহূর্তের জন্য দূরমনস্ক হয়ে পড়ে যতীন।

ভোটার লিস্টে কত পুরনো পরিচিত সব নাম! নামগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে যতীনের স্মৃতিতে বহুকালের পুরনো পাড়ার শান্ত-সুন্দর ছবি ভেসে উঠেছিল। সে-সময়ের কত কত নামিদামি নির্লোভ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, খেলোয়াড়, সমাজসেবকের নাম পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিল যতীন। সেই সোনার দিনকাল আর সহজ-সরল লোকেরা যে কোথায় হারিয়ে গেল! সবচেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিল সে ‘উদ্বাস্তু তালিকাভুক্ত ফরম’ নামক সেই পোকায় কাটা কাগজখানা দেখে। কী যে মায়া হচ্ছিল তার! বাবার নাম, মায়ের নাম, দিদি ও দাদার নাম, ছোটভাইয়ের নাম – সব মৃত মানুষ মুহূর্তের তরে জেগে উঠেছিল যতীনের চোখের সামনে। পরম মমতায় নামগুলোর ওপর হাত বোলাচ্ছিল সে, যেন একদার ফেলে আসা দেশ-বাড়ির শরীর হাতড়াচ্ছিল। এক দেশের মাটিতেই এপার-ওপার – লাখো কোটি নিঃস্ব, রিক্ত মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল; আজো ওই ছোটা বিরামহীন – !

----দুই----

আর অল্পদূর এগোলেই সিক্তার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ওখানে সে নেমে যাবে। কিন্তু যতীন ওর সঙ্গ ছাড়তে চাইছিল না। কেন জানি আজ ওর পাশে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিল। যদিও সিক্তার মনোভাব বোঝার কোনো উপায় নেই। যতীনের দেখা পেলে, সঙ্গ পেলে সিক্তা বেশ উৎফুল্ল হয়, এটা সে বেশ বুঝতে পারে। তবে শুধু ওটুকুই, এর বেশি গণ্ডি পেরোতে চায় না সিক্তা। অথচ আগল ভেঙে বেরিয়ে আসার এটাই ছিল উপযুক্ত সময় – ভাবে যতীন। চারদিক এনআরসির ঝড়ে ল-ভ-। বিভ্রান্ত, দিশেহারা মানুষ। কোনোদিকে দৃষ্টি স্থির করে তাকানোর অবসর নেই কারো। সে আর সিক্তা এই উথালপাথাল সময়েই তো ভেসে যেতে পারে উন্মাদ প্রেমের জোয়ারে। যদিও এ-মুহূর্তে ভাবনাটা খুবই স্বার্থপরের মতো, তবু ভেতরে জেগে ওঠা বিপুল প্রেমের আবেগকে কীভাবে বাগ মানাবে যতীন – !

আমি আজ তোমার ওখানে যাব ভাবছি – সহসা বলে ওঠে যতীন।

কেন – ? সিক্তা সপ্রশ্ন-দৃষ্টিতে তাকায় যতীনের মুখের দিকে।

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে যতীন সিক্তার দিকে দুদ- স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু সুরে বলে, জানো, ইদানীং আমার একটা অদ্ভুত ফিলিং হচ্ছে – !

কী রকম?

কাউকে কথাটা বলিনি এখনো। একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে যতীন।

আমাকে বলতে পারেন, যদি আপত্তি না থাকে।

আপত্তি কেন হবে, আমার কাজটা যে তোমার ওখানেই, শুধু ভাবছি কথাটা তুমি বিশ্বাস করবে কি না – !

বলেই দেখুন, বিশ্বাস করা না করা তো পরের ব্যাপার -।

জানো, বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ করছি আমার শরীরের কোথাও কেটে গেলে যে-রক্ত বেরোয় তা বেশ ঠান্ডা – !

ঠান্ডা? প্রশ্নের ঢংয়ে ঈষৎ চমকের সঙ্গে শব্দটা উচ্চারণ করে সিক্তা।

ভাবছি শরীরের ভেতরে কোনো বড় রোগ বেঁধে গেল কি না! ভয় ও চিন্তা-মেশানো সুরে বলে যতীন।

এ-কথার পিঠে চট করে কোনো কথা না বলে সিক্তা যতীনের বিষণœ ও গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে।

কিছুদিন আগে নারকেল কাটতে বসে হঠাৎই দায়ের কোপ পড়ে যায় আমার বাঁহাতের পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। আমি ডানহাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরি। আর তখনই টের পাই রক্তটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা – ! শুধু ওই হাতই নয়, আমার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা হোঁচট লেগে ফেটে যায়, তখনো লক্ষ করেছি রক্তটা বেশ ঠান্ডা – !

সিক্তার মুখে কোনো কথা জোগায় না। সে নির্বাক ভঙ্গিতে চোখ বড় করে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে যতীনের দিকে।

এতদিন তো জানতাম ব্যাঙের রক্ত ঠান্ডা। মানুষের শরীরের রক্ত তো সবসময়ই গরম আর এখন তো পরিস্থিতির চাপে আরো বেশি গরম, আমার শরীরের রক্তও তো বেশি গরম হওয়া উচিত, কী বলো – । জানো, আমার কেমন ভয় হচ্ছে, অস্বস্তি হচ্ছে – !

থামে যতীন। গাড়ির জানালাপথে বাইরে তাকায়।

তারপর আবার সিক্তার দিকে ফিরে সামান্য উত্তেজিত গলায় বলে, মাঝেমধ্যে আমার কী মনে হয় জানো সিক্তা, ওই যে লোকগুলো সব এনআরসির জন্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে, ওদের রক্তও কি আমার মতো ঠান্ডা, সবাইকে ধরে ধরে পরীক্ষা করলে কেমন হয় – !

Wednesday, July 30, 2025

চারুশিল্প- রশীদ আমিনের রং-রাগ by শামসেত তাবরেজী

এখন শ্রাবণ মাস। শিল্পী রশীদ আমিন এই শ্রাবণের সাক্ষীস্বরূপ গানের গলা না ভেঁজে রঙের সুর তুলেছেন নানা মাত্রার কাগজের ওপর—জলরঙে ও ছাপচিত্র মাধ্যমে। তাঁর চিত্ররাগের নামও হয়েছে ‘মেঘমল্লার’। রশীদ আমিনের এই ভীমসেন জোসি বাজছে ৩ আগস্ট থেকে, চলবে ১৬ আগস্ট, প্রতিদিন ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে। কিন্তু এই রাগ কানে না শুনে চোখ দিয়ে শুনতে হবে। শ্রাবণ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে শ্রবণের প্রসঙ্গ। এখন শ্রুতি ও নজরের সম্মিলনে যে লাবণ্যসুন্দর বাংলার বর্ষা তিনি এঁকেছেন, একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে আমিনের জলরঙে আঁকা বর্ষার মেঘ ঠিক কবি কালিদাসের মতো ব্যস্ত ডাকপিয়ন নয়। বরং শ্রাবণমেঘ জলভারানত গম্ভীর গর্ভিণীর মতো। সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় প্রায় সন্নিকটে, চোখেমুখে তারই এক রাহস্যিকতা খেলে বেড়াচ্ছে আর মোটা তুলিতে ধোঁয়া ছড়িয়ে যাওয়া রং বা পীতাভ পানির সুর চোখ ছাপিয়ে শ্রুতি পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

সাধারণত আমরা যখন গ্যালারিতে ছবি দেখি, আমাদের চোখের ডগায় মগজ বেঁধে নিতে হয়, কিছুটা বুদ্ধি খরচের ক্লেশ হয়, যদিও তার স্বাদ আরেক মাত্রার। আমিনের ‘মেঘমল্লার’ শিরোনামের এই সিরিজের ছবিগুলোতে বুদ্ধি-ব্যায়াম না করে শুধু নজরভ্রমণ করেই বর্ষাযাত্রার আনন্দ উপভোগ করা যায়। তবে মেঘমল্লার রাগের মিড়, ঘাটগুলো মনের অজানায় চালান করে দেওয়ার জন্য একটু দাঁড়িয়ে থাকার দাবি রাখে। ছবিগুলো যেমন শান্ত, তেমনি দর্শকও যদি শান্ত হয়ে ছবিগুলো দেখেন, তা আরও বেশি উপভোগ্য হবে।

আমি যতবার ছবিগুলো দেখেছি, ততবারই তীব্র এক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছি। জলরঙের ছবিগুলোর উৎসভূমি আমিনের জীবনেরই অংশ—টাঙ্গাইলে তাঁর বাড়িটি। এ বাড়ির সঙ্গে সংগত কারণে আমার পরিচয় রয়েছে। ঘন বাঁশবন, ভেতর দিয়ে নানা মাত্রার জ্যামিতি করা বোঝা যায়, বোঝা যায় না এমতো ফাঁকফোকর, অথচ পটভূমির অধিকাংশ জায়গাজুড়েই ঘনবদ্ধ পীতাভ সবুজ, কখনো আবার হঠাৎ হলুদ লাগা নরম আলো, নীল ঢেউয়ের সহজ গতির উচ্ছ্বাস।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, আর্দ্রতাঘন জমিনের সারল্যকে সহজ রেখা দিয়ে বিভেদরঞ্জিত করেছেন আমিন। ছবির জমিনের ওপর মূল রেখাগুলোর বেশির ভাগ রেখাই এঁকেছেন উল্লম্ব। এতে বর্ষার প্রকৃতি আরও গাঢ় হয়ে ধরা পড়েছে। যখন আমরা দেখি এই উল্লম্বতা ভেঙে ছবিকে ছন্দ দিতে এবং দৃশ্যব্যঞ্জনাময় করার তাগিদে মোটা তুলিতে দৈগন্তিক রেখা টেনে ছবির জ্যামিতিকে সুবিন্যস্ত করেছেন, তখন আনন্দ আরও বিশেষ হয়ে ওঠে। বৃষ্টিসিক্ত বাংলার এই প্রকৃতিরূপ দেখার সৌভাগ্য হলো অনেক দিন পর।

প্রিন্ট মাধ্যমটি মনে হয় এই আর্দ্রতাস্বভাবকে খুব গ্রাহ্য করে না, কিন্তু শিল্পীর দক্ষতায় সবুজের সঙ্গে মিল খাওয়া অন্যান্য রং বা রঙের স্তরপরম্পরার এই ছবিগুলোও বর্ষাকে ধারণ করে রোমান্টিকতায়, যদিও তা অত পেলব নয়, বরং দার্ঢ্য, যেন বেশ কয়েক দিন বিরামহীন বৃষ্টির পর সামান্য সময়ের বিরতি পেয়েছে। জলরঙের ছবিগুলো ঠিক যে কথা বলতে চায়, প্রিন্টগুলো ঠিক তা-ই বলে না। ফলে, আমরা বর্ষার বৈচিত্র্য বা দ্বন্দ্বও খানিকটা ছুঁয়ে ফেলতে পারি। এই দ্বন্দ্ব ঠিক বিরোধ নয়, বরং সহোদরার মতো, দুই বোনের চেহারা নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে আলাদা। এখন এই বিষয়টা নির্ভর করবে গ্যালারিতে একাধিক মাধ্যমের ছবিগুলো কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হবে বা হয়েছে, তার ওপর।

আমিন তাঁর ছবিতে বহুবিচিত্র রং ব্যবহার করেননি। গাঢ় বঙ্গীয় সবুজ, কদম-আভাষিত হলুদ, নরম রোদের কমলা, স্মৃতিকাতর নীল—মোটামুটি এই তাঁর রংবাহার। সেসব রং প্রযুক্ত হয়েছে খুব যে নিপুণ ড্রয়িংয়ে, তা নয়, আমার বিবেচনায় বর্ষার শুদ্ধ মূর্ততাকে তিনি হাজির করেননি ইচ্ছা করেই। বরং রোমান্টিক থরথরতা, বিনয়ী অপটুতা বরং ছবিগুলোকে এবং বর্ষাকে অধিকতর প্রকাশসম্ভব করে তুলেছেন এক বিরল বিমূর্ত শর্তে। দরকার শুধু দর্শকের চিদ্‌মুহূর্তের জন্য ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য সময় দেওয়া। অনেকটা আলোকচিত্রী কার্তিয়ার ব্রেসঁ যেমন বলেন ‘নির্ধারক মুহূর্ত’, তার জন্য অপেক্ষা করা। কেননা, নিবিড় সময়-বিরতিই রতিসংক্রমণের মুহূর্তটি এনে দেয়, যেহেতু আমিনের ছবি শুধু দেখার নয়, শোনারও। যেন ভীমসেন জোসির কম্বুকণ্ঠে মেঘমল্লারের সুর: গরজে ঘটা ঘন কারে রি...।
‘মেঘমল্লার ১’,শিল্পী: রশীদ আমিন

Saturday, July 19, 2025

আল মাহমুদের কাব্যচিন্তা ও গ্রামে প্রত্যাবর্তনের অর্থবহতা by সুহৃদ সাদিক

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কবিতায় গ্রামে প্রত্যাবর্তনের আকুতি নিছক ‘আত্মজৈবনিক অনুভব’ কিংবা ‘স্মৃতিনির্ভর নস্টালজিয়া’ নয়; বরং তা এক সুগভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। তার কবিতায় গ্রাম একটি প্রতীকী পরিসর, যা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও নগরভিত্তিক পুঁজিতান্ত্রিক জীবনের কৃত্রিমতা, বিকার এবং সংস্কারমূলক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক বিকল্প জীবনচেতনা ও কৌম-সচেতনতার জোরালো অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে। ‘সোনালি কাবিন’ সহ বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে আল মাহমুদ যে গ্রামীণ জগৎ নির্মাণ করেছেন, তা কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য বা আবেগঘন স্মৃতির পুনরাবৃত্তি নয়-বরং তা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ-নির্মাণ। পাশ্চাত্যনির্ভর নাগরিক জীবনযাপনের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মশূন্যতার বিপরীতে তিনি বপন করতে চেয়েছেন এক প্রাণময়, শেকড়-সংলগ্ন লোকায়ত জীবনের স্বপ্ন। এভাবে তার কবিতা হয়ে ওঠে এক বিকল্প কাব্যতাত্ত্বিক প্রকল্প-যেখানে ঔপনিবেশিকতার চেতনা, ঐতিহ্যনিষ্ঠ জীবনবোধ এবং আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম একসূত্রে গাঁথা। আল মাহমুদের কাব্যচিন্তা নিছক সাহিত্যিক প্রবণতা নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা, যা আধুনিকতাবাদের চাপিয়ে দেয়া একমাত্রিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আত্মনির্ভর, স্বদেশভিত্তিক কাব্যভুবনের দাবি তুলে ধরে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তার কবিতাকে ঔপনিবেশায়ন ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদবিরোধী সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে।

আল মাহমুদের সময়কাল ছিল এক গভীর সংকটের সময়-স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে একদিকে রাজনৈতিক দিশাহীনতা। অন্যদিকে ছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ তথা ইউরোপকেন্দ্রিক কিংবা কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকতার প্রাবল্য। তিরিশের কবিদের নাগরিকতা ও ইউরোপীয় নিঃসঙ্গতাবাদকে অনুসরণ করে বাংলা কাব্যে যে ভঙ্গুর, আত্মবিচ্ছিন্ন এবং নির্জীব নগরজীবনের অনুরণন তৈরি হয়েছিল, আল মাহমুদ তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জোরের সঙ্গেই। শহুরে নাগরিকতার বিপরীতে তিনি ‘গ্রামে ফেরা’-এই কাব্যিক অভিপ্রায়কে রচনা করেছেন এক সাংস্কৃতিক আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রকল্প হিসেবে। তার ভাষায়: “আমি আমার কবিতায় প্রথম থেকেই গ্রামকে উত্থাপন করতে চেয়েছি... গ্রামকেই প্রাধান্য দিয়েছি; কারণ যাকে বলে ধনতান্ত্রিক নাগরিক জীবন... আমি তেমন পরিবেশে বেড়ে উঠিনি।” এই বক্তব্য কেবল জীবনবোধের ভিন্নতা নয়, এটি মূলত ঔপনিবেশিক আধুনিকতার একচেটিয়া সাংস্কৃতিক প্রতিমূর্তি বা মেট্রোপলিটন মডেলের প্রতিবাদী প্রকল্পও বটে। আল মাহমুদের কবিতায় গ্রাম কেবল একটি ‘স্থান’ নয়, এটি একটি ‘ঐতিহাসিক চেতনার ক্ষেত্র’ যেখানে লুকিয়ে আছে জাতির আত্মপরিচয়, লোকজ স্মৃতি, নৈতিক চর্চা, প্রেম, দ্বন্দ্ব এবং শৌর্যের উপাখ্যান। তিনি আধুনিকতার বয়ানে বিস্মৃত ‘সাবঅল্টার্ন’ গ্রামীণ জীবন ও লোকায়ত ঐতিহ্যকে দৃশ্যমান করে তোলেন। ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিক শ্রেণির দৃষ্টিতে যা ‘আধুনিকতার অন্তরায়’, আল মাহমুদের কাছে তা ‘ঐতিহ্যগত শক্তি’। তার কবিতায় দেখা যায়: “কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী... কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিংবা নাড়ার দহন।” এই কবিতার চিত্রকল্পগুলো সাংস্কৃতিক আত্মোন্মোচনের গূঢ় কৌশল। এখানে কবি একটি বিকল্প জগৎ রচনা করছেন যা আধুনিক, পুঁজিবাদী ও শহুরে সংস্কৃতির বিরুদ্ধ ধারায় প্রবাহিত। ঔপনিবেশিক শক্তি কেবল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নয়, তা সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকেও সচেষ্ট থাকে। তারা স্থানিক সংস্কৃতিকে ‘লোকাচার’ বা ‘প্রাক-আধুনিক’ আখ্যা দিয়ে পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষানীতি ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক জীবনবোধ চাপিয়ে দেয়। আল মাহমুদের কবিতায় এই প্রক্রিয়ার বিপরীতে প্রবল আপত্তি পাওয়া যায়। ‘খড়ের গম্বুজ’ কিংবা ‘পলাতক’ কবিতায় তিনি দেখান নগরজীবনের অন্তঃসারশূন্যতা এবং তার কদর্যতা-যা গ্রামীণ আত্মপরিচয়ের বিপরীত।

নগরের ‘নিভাঁজ পোশাক’, ‘সেলাই’, ‘কঠিন প্যান্ট’ ইত্যাদি কবিতার চিত্রকল্পের পরতে পরতে আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিক জীবনচর্চার কৃত্রিমতা এবং দাসত্বপ্রবণতা স্পষ্ট। আল মাহমুদের ‘প্রত্যাবর্তন’ নিছক বাস্তব ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়; এটি আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিক বিশ্বদৃষ্টির একটি কাব্যিক পাল্টা আঘাত। ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ কবিতায় দেখা যায় গ্রামে ফেরার জন্য কবি মোটেই লজ্জিত নন; বরং নাগরিক কৃত্রিমতা ত্যাগ করে নিজ শেকড়ে ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি আনন্দিত। তিনি লেখেন: “আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলবো।”এই পঙ্ক্তিটি সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে আত্মমুক্তির প্রতীক। এই ‘ফেরার ইচ্ছা’ উপনিবেশবাদবিরোধী লেখকদের এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যেখানে তারা পশ্চিমা আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির পরিবর্তে নিজেদের ভাষা, মাটি ও ঐতিহ্যে আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে সচেষ্ট হন।

আল মাহমুদের কবিতায় ‘গ্রাম’ একটি সক্রিয়, প্রতিরোধী, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কাঠামো। তিনি বলেন: “গ্রাম বলতে আমি যূথবদ্ধ আদিম মানবজীবনকে বুঝি না... ধনতান্ত্রিক নগরসভ্যতার বিরুদ্ধে গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছেন... তারা আসলে গ্রামেরই লোক।” এখানে গ্রাম প্রতিরোধের প্রতীক, এক বিপ্লবী চেতনার ঘাঁটি। এটি গভীরভাবে উপনিবেশায়নবাদী অবস্থান। ইউরোপকেন্দ্রিক বয়ানে ‘গ্রাম’ যে পশ্চাৎপদতা বা অনুন্নয়নের প্রতীক, আল মাহমুদ তা প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার অবস্থান পুনর্গঠন করেন। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সাংস্কৃতিক অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ স্থাপন করে থাকে-যেখানে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ‘নগর’-কে প্রাধান্য দেয়, আর ‘গ্রাম’-কে প্রান্তিক করে তোলে। আল মাহমুদ তার কবিতায় এই সাংস্কৃতিক উপনিবেশের বিরুদ্ধে জাতিগত আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে ‘গ্রাম’, ‘লোকজ সংস্কৃতি’, ‘ভাষা’ এবং ‘ঐতিহ্য’-কে পুনঃস্থাপন করেন। তার কবিতা ‘স্বপ্নের সানুদেশে’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক স্বপ্নরাজ্য নির্মাণ করে যেখানে নগরের স্থানে গ্রাম উঠে আসে: “স্বপ্নের সানুদেশে আমরা শস্যের বীজ ছড়িয়ে দেবো...”এটি রূপক মাত্র নয়, এটি কবির সংস্কৃতিচেতনার রাজনৈতিক রূপায়ণ।

আল মাহমুদের কবিতায় গ্রামে প্রত্যাবর্তনের আকুতি নস্টালজিক রোমান্টিসিজমের প্রকাশ না হয়ে একটি সুগভীর ঔপনিবেশিক কাব্যচেতনার বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে। তিনি ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ছাঁচে কবিতা লেখেননি, বরং গ্রামীণ লোকজীবনের ভাষা, ছন্দ, অনুভব ও বাস্তবতার ভেতর থেকে নির্মাণ করেছেন নিজের কাব্যভাষা-যা নগরভিত্তিক আধুনিকতার কৃত্রিমতা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তার কবিতায় ‘গ্রাম’ শুধুমাত্র ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী অনুঘটক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ক্ষেত্র। এই লোকজ-গ্রামীণ সংস্কৃতিই তার কবিতায় হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক। ফলে আল মাহমুদের কবিকণ্ঠ হয়ে উঠেছে উপনিবেশোত্তর বাংলার সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদবিরোধী সাহিত্যধারার এক বলিষ্ঠ ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। জীবনানন্দের প্রতীকী নিঃসঙ্গতা বা জসীমউদ্‌দীন লোকগাথার নান্দনিক অভিব্যক্তিকে ছাড়িয়ে আল মাহমুদ গ্রামকে দেখেছেন প্রতিরোধ, সংগ্রাম ও পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনায়। এই ভাবনাই তাকে আধুনিক বাংলা কবিতায় ‘লোকায়ত রাজনৈতিক কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে তার কবিতা হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক মুক্তির জ্বলন্ত ও ভারবাহী ভাষ্য।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

mzamin

Sunday, June 22, 2025

জন্মদিনে স্মরণ- ইরানি সিনেমার কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামি by মুমিত আল রশিদ

আব্বাস কিয়ারোস্তামি—আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ নামগুলোর একটি। একাধারে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, কবি, চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক ও আলোকচিত্রী। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন শুভ্র তুষারের বুনো সৌন্দর্যের আলবোরর্জ পর্বতমালার পাদদেশে গ্রীষ্মের প্রথম দিনে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। দার্শনিক কবি ওমর খৈয়াম পরবর্তী পাশ্চাত্যে সবচাইতে বেশি জনপ্রিয়—কিয়ারোস্তামি।

২০১৬ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী তেহরানে ৩৫তম আন্তর্জাতিক ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে কিয়ারোস্তামির ৭৫তম জন্মজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে উৎসব থিম হিসেবে ‘বন্ধুর বসত এখানে’ (খনে দুস্ত ইনজাস্ত) চিত্তাকর্ষক বাক্যটি ব্যবহার করে। আয়োজক কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল কিয়ারোস্তামির ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত?’ (Where Is the Friend’s House? ১৯৮৭ খ্রি.) চলচ্চিত্রটির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা অনুধাবন ও অনুরণন।

ইরানি চলচ্চিত্রের মহান কবি আশির দশকের শেষভাগে নির্মাণ করেন বিশ্ববিখ্যাত অমর চলচ্চিত্র খনে দুস্ত কোজাস্ত। এর মাধ্যমে শুধু নিজেরই নন, বিশ্ব দরবারে ইরানি চলচ্চিত্রেরও কদর বাড়িয়ে দেন বহুগুণ। সিনেমাটি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দারুণ সাড়া ফেলে। বিশ্বের তরুণ পরিচালকদের মধ্যে তুমুল আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। ইরানের সিনেমার পথচলাও শুরু হয় নতুনভাবে।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি আবারও তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন ক্লোজ আপ বা নামায়ে নাজদিক (১৯৯০ খ্রি.) ও মাশক্বে শাব (Homework, ১৯৮৯ খ্রি.) সিনেমা দিয়ে। এ দুটো চলচ্চিত্র প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের আঙিনায়ও তাঁর অনন্য দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। চলচ্চিত্র দুটোর বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে আমরা দেখব, এতে ফারসি সাহিত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি দিক ‘রেভায়াত পারদাজি’র সফল প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। রেভায়াত পারদাজি বলতে বোঝায়—গল্পের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ছকে কথা বলা, লেখা, গান, সিনেমা, টেলিভিশনের কোনো কাজ, কম্পিউটার গেম, আলোকচিত্র, থিয়েটার বা কোনো সিকোয়েন্সে সংঘটিত গল্প অথবা অনাগত ভবিষ্যতের কাল্পনিক কোনো গল্প যা এখনো সংঘটিত হয়নি—এ রকম কিছু। আব্বাস কিয়ারোস্তামি উপর্যুক্ত দুটি চলচ্চিত্রের মধ্যে রেভায়াত পারদাজির অত্যন্ত সফল চিত্রায়ণ করেছেন। তাঁর ক্লোজ আপ চলচ্চিত্র বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে—বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও সিনেমা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপরিহার্য একটি বিষয় হিসেবেও স্থান করে নিয়েছে।

এই চলচ্চিত্র ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার, লেখক ও কবি ক্রিস মার্কার ও স্পেনের চলচ্চিত্রকার লুইস বুনুয়েল এবং অন্যান্য প্রসিদ্ধ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকারের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের মতো দর্শকের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—নিগূঢ় সত্য কী? বা বস্তুনিষ্ঠ বিষয় কী? অবশ্য সব বাস্তবতা, যুক্তি-দলিল, আধুনিকতার বিবেচনা আমাদের শেষ পর্যন্ত এই ফলাফলে পৌঁছতে সাহায্য করে যে, বিষয়বস্তু হচ্ছে বিশ্বাস। বিশ্বাসের কোন দিকটি ভয়ংকর? বিশ্বাস কি প্রশান্তি দেয়? কোনো মুক্তি বা উপহারের বার্তা দেয়?

অন্যদিকে আব্বাস কিয়ারোস্তামি তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতায় প্রায় কাছাকাছি গল্পে নির্মাণ করেন মাশক্বে শাব। ‘আভভালি হা’ ও ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত’ চলচ্চিত্র দুটি নির্মাণের মাধ্যমে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন কিয়ারোস্তামি। বিশেষ করে, খনে দুস্ত কোজাস্ত নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রচুর প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করেন। গ্রামের সহজ-সরল শিশুদের চিন্তার সুপ্ত বিকাশমান ধারা, একে-অপরের প্রতি ভালোবাসা, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, কষ্টসহিষ্ণু জীবনধারা, নির্লোভ জীবনের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি দেশকাল ভেদ করে চলচ্চিত্রটির প্রতি দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। উল্লেখ্য, এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের নজির যদিও পূর্বে ছিল না, কিন্তু ‘ইয়েক ইত্তেফাক্বে ছদেহ’ (A Simple Event, ১৯৭৪ খ্রি.) চলচ্চিত্রে ছোট্ট শিশুটির কাস্পিয়ান সাগর-তীরবর্তী এলাকা থেকে মাছের থলে কাঁধে নিয়ে দৌড়ানোর দৃশ্য দেখে, স্কুলের কাজ দেখে, মায়ের প্রতি কর্তব্যবোধ দেখে অনেকেই হয়তো আব্বাস কিয়ারোস্তামির হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস?-এর নায়ক আহমাদের সহপাঠী বন্ধু নেয়ামতযাদেহর কর্তব্যবোধের কারণে বারবার পাহাড়ের একপাশের গ্রাম থেকে অন্যপাশের গ্রামে দৌড়ে ছুটে যাওয়ার কথা স্মরণ করতে পারেন। শুধু কি তাই? ছোট্ট মনের আকুতি-মিনতির এই পার্থিব অর্থকে অনেক বিজ্ঞ চলচ্চিত্র সমালোচক ইহজাগতিক তৃষ্ণা থেকে পরমাত্মার যাত্রার কথাই ইঙ্গিত করেছেন।

হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের নামটি ইরানের কবি সোহরাব সেপেহরির (জন্ম ১৯২৮ খ্রি.- মৃত্যু ১৯৮০ খ্রি.) বিখ্যাত কবিতা ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত?’ থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পর লেখক বেহরুজ তাজুর দাবি করেন যে, সিনেমার গল্পটি তাঁর ছোট গল্প ‘চেরা খানম মোআল্লেম গেরিয়ে কার্দ?’ (নারী শিক্ষক কেন কান্না করেছেন?) থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিয়ারোস্তামি প্রদর্শনীর সময় সিনেমার গল্পটি বেহরুজের গল্প থেকে নেওয়া হয়নি বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।

সিনেমার পটভূমি, লোকেশন, কলাকুশলী নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে যিনি সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়েছেন, সেই কিউমারছ পুর আহমাদি চমকপ্রদ কিছু তথ্য দিয়েছেন। কিউমারছ পুর আহমাদি পরবর্তীকালে সিনেমা ও টেলিভিশন মাধ্যমে ইরানিদের মাঝে মাজিদ নামের নস্টালজিক চরিত্রের রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের বিহাইন্ড দ্য সিনের বাস্তবচিত্র অঙ্কন করেছিলেন, যা খনে দুস্ত কোজাস্ত নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। এই সময়ে কিয়ারোস্তামি জেন্দেগি ভা দিগার হিচ (Life, and Nothing More, ১৯৯২ খ্রি.) ও জিরে দেরাখ্‌তনে জেইতুন (Through the Olive Trees, ১৯৯৪ খ্রি.) নামে আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। দুটি চলচ্চিত্রই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে সকলের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো হয়্যার ইজ মাই ফ্রেন্ড’স হোম চলচ্চিত্রের পর এই দুইটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় গিলান প্রদেশে।

সত্তরের দশকের আগে ইরানের শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র যেভাবে যাত্রা শুরু করেছিল, বিপ্লবের পরও তা অব্যাহত ছিল। এ সময় অসাধারণ সব চলচ্চিত্রকারের আগমন ঘটে। শিশু ও কিশোরদের জন্য অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এ ক্ষেত্রে যিনি বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁর আরেকটি বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘তামে গিলাছ’ (‘Taste of Cherry’, ১৯৯৭ খ্রি.)। চলচ্চিত্রটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া অন্য সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘জিরে দেরাখ্তনে জেইতুন’ (‘Through the Olive Trees’, ১৯৯৪ খ্রি.), ‘মেছলে ইয়েক আ’শেক্ব’ (‘Like Someone in Love’, ২০১২ খ্রি.) উল্লেখযোগ্য।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি তত দিনে ইরান ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত একজন চলচ্চিত্রকার। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বিশ্বব্যাপী প্রশংসার জোয়ারে ভাসছিল। এই সময়ে নির্মাণ তিনি করেন ‘বদ ম রা খহাদ বোর্দ’ (‘The Wind Will Carry Us’, ১৯৯৯ খ্রি.), ‘তামে গিলাছ’ (‘Taste of Cherry’, ১৯৯৭ খ্রি.), ‘এবিছি আফ্রিকা’ (ABC Africa, ২০০১ খ্রি.) ও ‘দাহ’ (‘Ten’, ২০০২ খ্রি.)। ‘টেস্ট অব চেরি’ এর মধ্যে সবচেয়ে দেদীপ্যমান সিনেমা, যেটির মাধ্যমে কিয়ারোস্তামি আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচিত হন। আব্বাস কিয়ারোস্তামি ফ্রান্স-ইতালিতে নির্মিত ‘কপি বরাবর আছলি’ (‘Certified Copy’, ২০১০ খ্রি.) নিয়ে ২০১০ সালে কান উৎসবে অংশগ্রহণ করেন এবং চলচ্চিত্রটির নায়িকা জুলিয়েত বিনোশ সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। এ সিনেমার মাধ্যমে একটি যুগের অবসান হয়।

আব্বাস কিয়ারোস্তামিও বিশ্বখ্যাত গায়ক জিম মরিসন, ঔপন্যাসিক অস্কার ওয়াইল্ড, ভিক্টর হুগো, দার্শনিক রুশোর মতো— প্যারিসকে অন্তিম যাত্রার জন্য বেছে নেন। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই প্যারিসেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোয় ইরানি চলচ্চিত্রের বিস্তৃত এক বেলাভূমির সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত সারা বিশ্বের দর্শক, সমালোচক, চলচ্চিত্রপ্রেমীরা অবগাহন করছেন। ৮৫তম জন্মদিনে তেহরানের অদূরে লাভাসানের ছোট্ট মফস্বল শহরে ঘুমিয়ে থাকা এ মহান শিল্পীর প্রতি একরাশ মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

Sunday, June 15, 2025

গল্প- তুমি মরো আমি বাঁচি by মঞ্জু সরকার

জীবনের শেষ কথাটি বলার জন্য তিনবার দমফাটা হিক্কা তুলে, উড়ে যাওয়ার আগে প্রাণপাখি চোখে চরম সতর্কবার্তা পাঠালে বৃদ্ধা ঘরে উপস্থিত একমাত্র জীবিত প্রাণী ছোটবউয়ের দিকে কাতর-ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকায়, তাকিয়ে থাকে, কয়েক সেকেন্ড মাত্র। চোখের আলো নিভে গেলে দৃষ্টি স্থির ও শরীর যখন নিস্পন্দ, রহিমা জিজ্ঞেস করে, ‘ও আম্মাজান, কী হইল!’

এতো কাছে থেকে মানুষকে আগে মরতে দেখেনি রহিমা। শাশুড়ি সাড়া না দেওয়ায় গায়ে হাত দেয়, নাকের ওপর হাত রেখে নিশ্চিত হয়, বুড়ির প্রাণপাখি এইমাত্র তার চোখের সামনেই উড়ে গেল! আর এমন এক সময়ে শাশুড়ির অন্তরাত্মা দেহছাড়া হলো, বাড়িতে যখন সে ছাড়া উপস্থিত নেই কেউ। এখন তার কী করা উচিত? রহিমা মৃতার চোখদুটি বুজিয়ে দেয় আলতো স্পর্শে।

বড়বাড়ির মুরবিব মরবে, বয়স হয়েছে, রোগে-দুর্ভোগে বিছানায় পড়ে থাকার বদলে এখন মরলেই তার শান্তি। সবাই জানত এবং এরকম বলাবলি করত। কিন্তু আজ সকালেও তো লাঠি ঠুকঠাক করে উঠানে হেঁটে বেড়িয়েছে মানুষটা। বাথরুমেও গেছে একা। রহিমা যথারীতি তার ঘরে খাবার দিয়ে এসেছে। মিষ্টিকুমড়ার ঘ্যাঁটে স্বাদ বাড়াতে কয়েক টুকরা বাসি মাংস দিয়েছিল সে। বেছে বেছে বুড়ির জন্য এক টুকরা হাড় দিয়েছিল আজ । দাঁতে অসমর্থ মানুষটাকে শক্ত হাড্ডি দেওয়ার সময় ফোকলা মুখে-গলায় হাড় আটকে তার মরণ কামনাও মনে উঁকি দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু রহিমার মনে শুধু হিংসের বিষ নয়, হাড্ডিটা পেঁচিয়ে এক পোঁচ মাংসও ছিল এবং দেখেশুনেই দিয়েছে রহিমা, বুড়ি যাতে খেতে পারে। জোহরের নামাজ পড়ে ভাতও খেয়েছে বুড়ি। খাওয়ার পর বিছানায় যেমন গড়ায়, আজো শুয়ে ছিল।

শাশুড়ির এঁটো থালাবাটি আনার জন্য ঘরে ঢুকে রহিমা হিক্কার আওয়াজ শুনে তার বিছানার দিকে এগিয়ে এসেছে, শেষ কথাটি শোনার জন্য তার মুখের ওপর ঝুঁকেও ছিল, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আজগুবি মরে গেল মানুষটা! চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত মরণ দেখে বুকের ভেতরে নিজের আত্মাটাও ধকধক করছে। এখন রহিমা কী করবে? নির্জন বাড়িতে শাশুড়ির আকস্মিক মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষী হতে চায় না সে। লোকে বলবে, ছোটবউ খোঁজখবর নেয়নি, যত্নআত্তি করেনি ঠিকমতো। খাবারে বিষ মিশিয়ে হাড়-জ্বালানি শাশুড়িকে মারার চিন্তা যেহেতু তার মনেও এসেছিল, সন্দেহটা জাগতে পারে বুড়ির সন্তানদের মনেও। শকুনিবুড়ির জান নিতে আল্লাহর কাছে অসংখ্যবার ফরিয়াদ জানিয়েছিল রহিমা। তার নীরব প্রার্থনা আল্লাহ না শুনুক, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বুড়ির অন্য ছেলেমেয়েদের কানে না যাক, মনের খবর বুড়ির ছোট ছেলে তথা রহিমার গুণধর স্বামী ঠিকই জানে এবং সমর্থনও করেছে অনেক সময়, বউয়ের ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের সুখ নিষ্কণ্টক রাখার গরজে। কিন্তু এখন মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেলে স্বামী আজ খুশি হওয়ার বদলে নির্ঘাৎ অভিযোগ করবে, মায়ের শরীর খারাপ তো আমাকে ফোন দাওনি কেন?

রহিমা এক ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্বামীর নম্বর টেপে। সাধারণত স্বামীকে প্রতিটি ফোনকলে কানে পাওয়ার সময় শহরে তার অবস্থান নিয়ে মনে নানারকম সন্দেহ জাগে; কিন্তু আজ ফোন ধরতে বিলম্বের মুহূর্তগুলোতে মোটরসাইকেলে স্বামীর কোমরজড়ানো সন্দেহজনক নারীকে দেখে ভূত দেখার মতো ভয় পায় এবং ভয়কাঁপা কণ্ঠে খবরটা জানায় সে, ‘আম্মাজান কেমন যেন করছে! একজন ডাক্তার নিয়া জলদি আসো বাড়িতে।’

‘মা কেমন মানে কী করছে? আমি তো সকালেও ভালো দেখে আসলাম। শবরি কলা আর গ্যাসের ঔষধ নিতে কইছে, রাতে নিয়া যাবখন।’

মায়ের কলা খাওয়ার দিন শেষ হওয়ার খবরটা চেপে রাখায়, অব্যক্ত সত্যের ভারে স্বামীকে দেওয়া ধমকটাও এবার ভারি হয়ে ওঠে, ‘যা বললাম তাই করো আগে, আমি দেখি এদিকে।’

বজ্রপাতের মতো খবরটা গোপন রেখে নির্জন বাড়িতে একা স্বাভাবিক থাকতে পারে না রহিমা। মৃত্যুর অসহ্য চাপ এড়াতে জীবন্ত কিছু আঁকড়ে ধরতে বালকপুত্রকে চেঁচিয়ে ডাকে, ‘ও রুম্মান, বাবা রুম্মান! খেলতে কোথায় মরতে গেছিস হারামজাদা?’ রুম্মানকে খুঁজতে খুঁজতে রহিমা বাড়ি ছেড়ে রাস্তার দিকে যায়। ছেলের বদলে রাস্তায় বুড়ির সেবায় নিযুক্ত কাজের মেয়ে পড়শি জামেনাকে দেখতে পায়। জামেনা রোজ তিন-চার বেলা আসে এ-বাড়িতে। আজ সকালেও এসেছিল, বুড়ির গোসলের পানি রেডি করে দিয়েছে, কাপড় কেচে দিয়ে পানসুপারিও পিষে দিয়ে গেছে।

‘ও জামেনা, জলদি আয় তো বাড়িতে। আম্মাজানের কী হইল, দেখ তো আসি।’

‘খানিক আগেই না বুড়ির জন্য পানসুপারি পিষে দিয়া গেইনু চাচি!’

হামানদিস্তায় বুড়ির পানসুপারি বেটে দেওয়ার কাজটি করতে গিয়ে জামেনার নিজেরও পানটা খাওয়া চলে। কিন্তু আজ একটাও সুপারি অবশিষ্ট ছিল না বলে বুড়ির পেশা সুপারি একটু মুখে দিয়েছে। বুড়ো মানুষের পেশা সুপারি খেয়ে মোটেও তৃপ্তি হয় না। এখন সাবান কেনার পয়সার সঙ্গে একটা পান খাওয়ারও মতলব নিয়ে দোকানের দিকে যাচ্ছিল সে, বিরক্তি নিয়ে অনিচ্ছাতেও বড়বাড়িতে ঢোকে আবার।

বুড়ির ঘরে ঢোকার আগেই, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিতে দাঁড়িয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে জামেনা, ‘ও দাদি, গুয়াপান খায়া মন ভরে নাই? তোর লাঠির ঠুকঠকানি আর উড়ুনগাইনের ঢকঢকানি না শুনলে ছোটবউয়ের খালি মরার চিন্তা আইসে।’

অতঃপর ঘরে ঢুকে বিছানায় মৃতাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার মুখ থেকে পানের গন্ধও পায় জামেনা, মুখের কোণে রক্ত-পিত্তের মতো লোল গড়িয়েছে, ওই দুর্গন্ধ রসটুকু ছাড়া বুড়ির শরীরে প্রাণের কোনো সাড়া না পেয়ে জামেনাই প্রথম বিস্ময়কাঁপা গলায় ঘোষণা করে, ‘ও আল্লা রে, বুড়ি না মরি গেইছে! মুখ থাকি এলাও মোর পেশা গুয়ার গন্ধ বারায়! হায় আল্লা, কোনবেলা কেমনে মরল চাচি? ও আল্লা রে!’

টেবিলের ওপর ভাতের পেস্নটবাটি দেখে জামেনা আবারো মৃতার জ্যান্ত দশা সম্পর্কে আগ্রহ দেখায়, ‘ভাত খায় নাই এলাও?’

ছোটবউয়ের রান্না খাওয়ার পরই ভালো মানুষটা আজ মরে গেল কেন? এমন প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা রহিমা দিশেহারা শোকের মাঝেও অনুভব করে জামেনার ওপর পালটা অভিযোগ চাপায়, ‘তোর জর্দা  দেওয়া পানসুপারি মুখে নিয়া আম্মাজান আইজ মরি গেল ক্যানে?’

শোকের আবেগে নিজের ঘরে দৌড়ে গিয়ে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে আবারো স্বামীর কানে খবরটা কোনোমতে ছুড়ে দেয় সে, ‘আম্মাজান আর নাই!’

স্বামীর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইলটা উঠানে ছুড়ে দেয় রহিমা, তারপর শাশুড়ির আত্মা যে আসমানে উড়ে গেছে সেদিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে, ‘ও আল্লাহ রে! বড়বাড়ি ধুয়া করিয়া হামার আম্মাজান মরি গেল রে!’

এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর এটাই রহিমার প্রত্যাশিত প্রথম মৃত্যুশোক যাপন। এখন তার অনেক কাঁদা উচিত, গলা ছেড়ে কাঁদতে না পারলেও শোকের আবেগে দাঁতকপাটি লেগে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত। স্বজনপড়শি সবাই দেখার জন্য ছুটে আসতে শুরু করবে। রহিমার আগে তার মোবাইল ফোনটাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে মনে হয়, খবরটা অন্তত বড় ননদকে তারই জানানো উচিত। মায়ের খবর নিয়মিত নেওয়ার জন্য মোবাইল ফোনটা ননদই তাকে গিফট দিয়েছে। বুড়ি ফোন চালাতে পারত না, তার ওপর কানেও শোনে কম, এ-কারণে ফোনের সঙ্গে মায়ের পক্ষে মোবাইল-অপারেটরের চাকরিটাও দিয়েছিল ননদ। গরিব পড়শি জামেনাকেও টাকা দিয়ে মায়ের সেবায় নিযুক্ত করেছে সে-ই। জামেনা ননদকে ফোন করার আগে তারই ফোন করা উচিত। ফোনটা হাতে নিয়ে শরীর-উথলানো কান্নাসহ বড় ননদকে কোনোমতে জানায় শুধু, ‘ও আপা, আম্মাজান আর নাই।’ খবরটা দিয়েই সে ফোন হাতে নিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবার।

ততক্ষণে জামেনাও গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে এবং প্রতিবেশীরাও সরব কৌতূহল নিয়ে ছুটে আসতে শুরু করেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে সবাই জানে এবং জামেনাও সেদিন ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলেছে, ‘বুড়ি মরলে বড়বাড়ির আসল রানি হইবে ছোটচাচি। মাথার উপরে খ্যাচম্যাচ করার জন্য কেউ থাকপে না, ছোটবউয়ের হুকুমেই চলবে সব।’ শোকের মাঝেও এসব কথা মনে করে রহিমার শোকের আবেগ দ্বিগুণ বেগে উথলে ওঠে।

-----দুই-----

মানুষের মরণ যতই নীরবে-নিভৃতে ঘটুক, টাটকা মৃত্যুকে নিয়ে জীবিতদের প্রতিক্রিয়া জীবন্ত হয় তৎক্ষণাৎ। জনবহুল এ-গ্রামটাতে সব বাড়ির নবজাতকের ক্ষীণকণ্ঠের কান্না সবার কানে যায় না, গর্ভবতী মেয়েরা যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখে পেটের খবর, কিন্তু কোনো বাড়িতে কেউ মরে গেলে স্বজনদের মড়াকান্নায় ভারি হয়ে ওঠে গাঁয়ের বাতাস। দিশেহারা গ্রামবাসীও নিজেদের অন্তিম গন্তব্য স্মরণে এলে বিহবল হয়, পরিচিত একজন সেই গন্তব্যে যাত্রা করেছে শুনলেই ছুটে আসে দেখতে।

মড়াকান্না ছাড়াও গ্রামসমাজকে নাড়া দিয়ে ইদানীং ভিড় তৈরির দায়িত্ব পালন করে গাঁয়ের মসজিদের মাইকটি। ঘড়ির টাইম মেনে রোজ পাঁচবার আজান শুনেও শোনে না বে-নামাজিরা, বড়জোর বেলা সম্পর্কে সচেতন হয়; কিন্তু সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করে মাইকটি কারো মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করলেই কান খাড়া করে সবাই। চেনা মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে দেশি ভাষায় মৃতের পরিচয় জেনে মাইকের ইন্নালিল্লাহি রাজিউন দোয়ার সঙ্গেও কণ্ঠ মেলায়।

আজান ছাড়াও মাইকে গ্রামবাসীর ইমেত্মকাল-সংবাদ ঘোষণার দায়িত্ব পালন করে যে মুয়াজ্জিন হামিদুল, সে আসরের আজান দিতে মসজিদে যাওয়ার মুখে বড়বাড়িতে ক্রন্দনরোল শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। বড়বাড়ির বড় অভিভাবক ও গাঁয়ের মুরবিব বৃদ্ধার মৃত্যু-আশঙ্কাটি মনে আসতেই জীবিত বেশে সামনে দাঁড়ায় সে। আজ সকালেও হামিদুল এ-বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়ি হাতের লাঠি উঁচিয়ে তাকে ডেকেছিল, ‘আল্লাহর ঘরে আজান দিস, একটা সত্য কথা বল তো আমাকে। এ-বাড়ির সয়-সম্পত্তি উড়িয়া যায় কোথায় রে?’

বুড়ি আসলে মরহুম স্বামীর রেখে যাওয়া জায়গা-জমির বেহাল দশা ও বখাটে ছেলে কাফির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল, ‘শুনলাম, তোর বেটার কাছেও নাকি কাফি ভুঁই বন্ধক থুইয়া দুই লাখ টাকা নিছে, কথা কি সত্য?’

হামিদুল সত্যের মুখোমুখি হয়ে সমস্যায় পড়েছিল। কারণ টাকা নেওয়ার সময় কাফি সতর্ক করেছে খবরটা মাকে না জানাতে। অথচ গ্রামবাসী সবাই জানে, বড়ভাইদের অনুপস্থিতি এবং বুড়ি মায়ের পক্ষপাতের সুযোগ নিয়ে কাফি একাই পৈতৃক বিষয়সম্পত্তি যাচ্ছেতাই ভোগ করছে। চাষাবাদ করে বড়বাড়ির গোলাঘর ভরলে কারো কিছু বলার ছিল না, কাফি একের পর এক জমি বন্ধক রেখে নিজের ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড় করেছে। মোটরসাইকেল দাবড়ে রোজ শহরে যায়। শহরে সে কি ব্যবসা করে, নাকি নেশাফুর্তি করে টাকা ওড়ায়, সঠিক কেউ জানে না। তবে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে, টাউনে সম্প্রতি সে আরেকটা বিয়েও করেছে, তার মোটরসাইকেলের পেছনে সে-বউকে দেখেছে গাঁয়েরই দুজন শহরবাসী।

বাঁকা কোমর নিয়ে লাঠিভর মেয়েমানুষের পক্ষে বখাটে ছেলের কা-কীর্তি কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। তবে কালা কানেও সব খবর বাজে। শাসন করার জন্য ছেলেকে হাতের নাগালে না পেয়ে বউয়ের সঙ্গেও গজগজ করে সারাদিন। হামিদুল সত্যি বললে কাফি রেগে যাবে, আবার মিথ্যে বললে তার বন্ধকের টাকা মার যাওয়ার ভয়। উভয় সংকটে পড়ে জবাব দিয়েছিল সে, ‘আম্মা, এই বয়সে জায়গাজমির খোঁজ নিয়া আর কী করেন। চোখ বুজলে তো বেটারাই খাইবে সব।’

‘হ্যাঁ, বুড়ি চোখ মুদলে ভূঁইয়ার জায়গাজমিও কাগজের মতো বাতাসে উড়ি যাবে রে। বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চোখে দেখবি তোরা, কয়া রাখলাম কথাটা, দেখিস।’

সকালে বুড়িকে দেখার জীবন্ত স্মৃতি মাথায় নিয়ে হামিদুল আজ বড়বাড়ির ভেতরে ঢোকে, আঙিনায় কাফির বউ ও জামেনাসহ পড়শি মেয়েদের কান্নার প্রতিযোগিতা দেখে বৃদ্ধার ঘরেও যায়। বিছানায় শায়িত কাঁথা-মোড়ানো লাশ দেখে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ইন্নালিল্লাহি দোয়া পড়ে হামিদুল, তারপর ছুটে যায় মসজিদে। আজ দেড় মিনিট বিলম্বে আসরের আজানটা দেয়, এবং আজান শেষ হলে মাইকের সুইচ অফ করার আগেই সে দুটি ফুঁ দিয়ে একটি শোকসংবাদ ঘোষণা করতে থাকে : ‘ভূঁইয়া বাড়ির মুরবিব, মরহুম নাসির ভূঁইয়ার স্ত্রী ও কাফি ভূঁইয়ার মাতা এইমাত্র ইমেত্মকাল ফরমাইলেন।’ ইন্নালিল্লাহি পড়ার পর মনে হয়, গ্রামের অনেকেই তার কণ্ঠে খবরটা জানছে ঠিক, কিন্তু বুড়ির প্রবাসী ও শহরবাসী ছেলেমেয়েরা খবর পায়নি এখনো। ছেলেরা সবাই বাড়িতে না এলে মৃতার জানাজা ও কুলখানি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ জানানো সম্ভব নয়। শুধু শোকসংবাদটি আবারো জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করে সে নামাজের জন্য মসজিদে উপস্থিত ছয় মুসলিস্নর কাতারে শরিক হয়।

মুয়াজ্জিনের মৃত্যুঘোষণার রেশ এবং মৃতাকে ঘিরে বড়বাড়ির সাড়ম্বর স্মৃতি মাথায় নিয়ে গাঁয়ের নামাজি লোক কয়েকটি আজ আল্লাহর দরবারে হাজির হয়েছে। যেহেতু বড়বাড়ি মসজিদের নিটকবর্তী বাড়ি এবং মেয়েমানুষরা আল্লাহর আরশে পৌঁছানোর জন্য কান্নার আওয়াজ সপ্তমে তুলতে পারে বটে, নামাজে দাঁড়িয়েও বড়বাড়ির মড়াকান্নার আওয়াজ শুনতে পায় মুসলিস্নরা এবং হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাও আজ আকুল ও একাগ্র করে তুলতে সচেষ্ট হয়।

মোনাজাতশেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে মুসলিস্নরা সবাই আজ বড়বাড়ির দিকে হাঁটে। গাঁয়ের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই ছুটে আসছে বড়বাড়িতে। বাড়ির উঠানে শোকের মাতম মুখর করে তুলেছে মূলত গাঁয়ের মেয়েরাই। উৎসবের আনন্দে পালাপার্বণে গীত গাওয়ার সুযোগ পায় না তারা, কিন্তু আত্মীয়স্বজনকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়ার সময় কেউ কারো চেয়ে কম কাঁদে না, কান্নাও সুরেলা গীত হয়ে ওঠে অনেকের কণ্ঠে। বাড়িতে মৃতার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনির অনুপস্থিতিও পড়শিদের শোক ও কান্নার দায়িত্ব খানিকটা বাড়িয়ে তোলে বটে।

শোকের ঝড়ে সমবেত গাঁয়ের পুরুষরা মেয়েদের মতো কাঁদতে পারে না, ক্রন্দনরত মেয়েদের এড়িয়ে তারা আলাদা ভিড় তৈরি করে। পাথারের ক্ষেতের কাজ ফেলেও ছুটে এসেছে কয়েকজন কামলা। মৃত্যুকে ঘিরে গ্রামসমাজ ত্বরিত সংঘবদ্ধ হওয়ার মূলে মৃত্যুকে ঠেকানোর এবং শোক-সহানুভূতি প্রকাশের আদিম প্রবৃত্তি তো আছেই, সেইসঙ্গে বড়বাড়িতে চটজলদি গ্রামবাসীর ছুটে আসার মূলে তাদের কৌতূহলও কম দায়ী নয়। গ্রামবাসী জানে, নিজের এক ইঞ্চি আবাদি জমি নেই, এমন চাষিমজুরের সংখ্যা গ্রামদেশে নেহায়েত কম নয়। নিজেরা চাষবাস না করেও বড়বাড়ির ভূঁইয়াদের অন্তত পাঁচ হালের জমি এখনো। এমন নিয়ম আইনে টিকলেও আল্লাহর ন্যায়বিচারে টিকবে? স্বয়ং ভূঁইয়ার বিধবা স্ত্রীও বড়বাড়ির সম্পত্তি কাগজের মতো আসমানে উড়ে যাওয়ার কথা বলে গেছে। বুড়ি মরলেই বড়বাড়ি ভেঙে অন্তত বারো টুকরা হবে। নদীতে ভাঙবে না, বানে ডুববে না; কিন্তু এ-বাড়ির সমস্ত জমি গিলে খাবে ওয়ারিশরাই। ছোটছেলে কাফির কা-কীর্তিও যে গ্রামসমাজে নানা গল্প ও প্রশ্ন জমিয়ে রেখেছিল, মৃতাকে ঘিরে নানারকম মন্তব্যের মধ্যেও তা ধরা পড়ে।

‘আহা রে, স্বামী মরি যাওয়ার পরও এতকাল লাঠি ঠুকঠুক করিয়া সবাইকে শাসন করছে। বুড়িমা ছিল বলিয়াই এই বাড়ি আর বিষয়-সম্পত্তি রক্ষা হইছে। কিন্তু এখন কে রক্ষা করবে? রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারা বুড়িমায়ের সেবাযত্ন দূরে থাউক, খোঁজটাও নেয় নাই ঠিকমতো। আর একজন তো বাড়িতে থাকিয়াও মৃত্যুকালে মায়ের মুখ দেখতে পাইল না! মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়িতে আসতে কতক্ষণ লাগে?’

কাফি ও তার বড়ভাইদের সঙ্গে যাদের ফোন-যোগাযোগ হওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা আছে, তারা আগাম সহানুভূতি জানাতে মোবাইল বের করে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। আর মুয়াজ্জিন হামিদুল সকালে বুড়ির সাক্ষাতের স্মৃতি স্মরণ করে তার শেষ কথাটি সবাইকে শোনায় – ‘আজ সকালেই লাঠি হাঁকে ডাকল মোকে, কানের মধ্যে এলাও বাজে তার গলা, হামদুরে আল্লাহর ঘরে আজান দিস, তোকেও কয়া গেনু শেষ কথাটা। মুই মরতে না মরতে বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চক্ষক্ষ দেখপেন সগাই।’

বৃদ্ধার শেষ কথার সমর্থনে উপস্থিত মানুষগুলো যুক্তি দেওয়ার আগে, মেয়েদের ভিড় থেকে ছুটে আসা এক বালক পুরুষ ভিড়ে উপস্থিত তার বাবাকে খবর জানায়, ‘রুম্মানের মা কাঁদতে কাঁদতে নিজেও মনে হয় মরি গেইছে।’

রুম্মানের মা তথা কাফির বউকে দেখতে পুরুষ ভিড়ের অনেকেই উঠানে কান্নাকুল মেয়েদের দিকে এগোয়।

আঙিনায় রহিমার কান্নায় ততক্ষণে শরিক হয়েছে অন্তত পনেরোজন মহিলা ও শিশু। কান্নার চেয়ে কিছু শিশুর কৌতূহলই প্রবল। তারা ঘরে ঢুকে মৃতাকে দেখে, মৃতাকে ঘিরে একটা মাছি উড়তে দেখেও ভয় পায়। আরেকটি বালক ক্রন্দসী ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে সহাস্য মন্তব্য করে, ‘কাঁদতে কাঁদতে কাঁয়বা পাদি ফেলাইছে রে।’

অন্যরা গলা ছেড়ে কাঁদছে বলে রহিমাকে চেঁচিয়ে কাঁদতে হয় না আর। নিজের কান্নাবিকৃত শরীর আঙিনায় লুটিয়ে পড়েছে, মাটিতে মুখ লুকিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ভাবারও সুযোগ পায়। মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেলেই তাকে আবার কান্না শুরু করতে হবে, শোকের তীব্রতায় আবারো দাঁতকপাটি লেগে জ্ঞান হারাতে হবে। কান্না ছাড়া আগামী তিনদিন তার কাজ নেই। গাঁয়ের নিয়মে মৃতের বাড়িতে তিনদিন চুলা জ্বলবে না। আত্মীয়স্বজনই রান্না করা খাবার দিয়ে যাবে। বুড়ি কবরে ঢুকতে না ঢুকতে একে একে তার রক্তসম্পর্কের স্বজনরা বাড়িতে আসবে। বড় ননদ হয়তো ফোনে এতক্ষণে সবাইকে জানিয়েছে খবরটা। কিন্তু বুড়ি কবরে আড়াল হলেই কি বড়বাড়ির মাটির ওপরে খাড়া হয়ে স্বপ্নের স্বাধীন সংসার ফিরে পাবে রহিমা?

বিধ্বস্ত দেহে চোখ বুজে চুপচাপ এসব কথাই ভাবছিল রহিমা। হঠাৎ চেনা মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়ে এবং সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জন্য মনকে ভাবনাশূন্য করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে সে।

------তিন-----

বুড়ির দাফন হওয়ার পরও তার কাঁচা কবর ঘিরে বড়বাড়িতে শোকপালন যেন অনেকটা উৎসবে রূপ নেয়। একে একে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে পাঁচ ছেলে এবং চার মেয়ে। ছোট কাফি ছাড়া বড় চার ভাইয়ের দুজন ঢাকায়, একজন নীলফামারীতে এবং অস্ট্রেলিয়াতেও আছে একজন। মেয়েরাও নানা ঠিকানায় নিজ নিজ স্বামী-সংসার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সপরিবার এসেছে সবাই। দাফন হয়ে যাওয়ার পরও এসেছে এক মেয়ে এবং অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ছেলে একা এসেছে কুলখানির দিনে। বাড়িতে পৌঁছে যথারীতি মাকে না দেখে ‘মা মা’ বলে কেঁদেছে সবাই, অন্য ভাইবোনরাও শরিক হয়েছে সেই কান্নায়; কিন্তু কান্না ও শোকের পরিবেশ জমাট বাঁধতে দেয় না তাদের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাই। মৃত্যুশোকে শরিক হয়েও দাদুবাড়ি কি নানাবাড়িতে বেড়াতে আসার মজা লুটতে ছোটাছুটি, খেলাধুলা ও হাসিতামাশাও করে তারা। তিনদিন রান্নাঘর থেকে মুক্ত থাকার কথা ভাবলেও আতিথেয়তার দায় মেটাতে রহিমাকে শাশুড়ির দাফনের পরপরই চুলা জ্বেলে রান্নাঘরেই অনেকটা সময় কাটাতে হয়।

তিনদিন পর মায়ের কুলখানিতে একটি গরু ও চারটি খাসি জবাই করা হয়। পেশাদার মৌলবি-সংকটে বিশজন মাদ্রাসাছাত্র এসে কোরান খতম দেয়। মিলাদ, কবর জিয়ারত ও দোয়া-খায়েরে শরিক হয় গাঁয়ের বয়স্ক সব পুরুষ মানুষ। ভোজনপর্বে শরিক হয় আরো বেশি সংখ্যক। মড়ার বাড়ির মজলিসি খাওয়া-দাওয়ার ভিড় কোলাহল থেমে যাওয়ার পরও বাড়িটির দিকে গ্রামবাসীর মনোযোগ ও কৌতূহল কমে না। কারণ মরে গিয়ে বুড়ি তার ছেলেমেয়েদের বাড়িতে জড়ো করেছে, তার উদ্দেশ্যটা বেঁচে থাকতেই ছোটবউ-ছেলেকে ঝগড়া করে অনেকবার জানিয়ে রেখেছে, সবাই এলে এবার বিষয়-সম্পত্তির ভাগাভাগি হবে অবশ্যই।

মায়ের মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে যে-ঝগড়াটা অনিবার্য ছিল, ভূসম্পত্তি ঘিরে স্বাভাবিক ঝগড়াঝাঁটি দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল যারা, তাদের অনেকটা হতাশ করে দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে ঝগড়াটা শুরু হয় আসলে ভাইবোনের পুনর্মিলনীর আদলে। বড়ভাইয়ের আহবানে মায়ের ঘরে জড়ো হয় সব ভাইবোন। বিছানায় ও চেয়ার টেনে বসে সবাই। পরকালযাত্রার শোক ও মাথায় টুপি রেখেই বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে বড়ভাই, ‘মা নাই। কিন্তু আমরা রক্তসম্পর্কের ভাইবোনরা আছি, এই বাড়ি ও পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার আমাদের প্রত্যেকেরই আছে। স্বয়ং আল্লাহ এ-বিষয়ে কোরানে আইন করে দিয়েছে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর এক যুগের মধ্যেও আমরা ভাগাভাগির ওপর জোর দেইনি। কারণ মা বেঁচে ছিল এবং ছোট কাফি তেমন লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি করেনি। তাকে বিয়েও করানো হয়েছে গ্রামের ঘরগেরস্থালি দেখার উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে। আমরা চেয়েছি বড়বাড়ির সংসার ও কৃষিকাজ দেখাশোনা করে কাফি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নিক। কিন্তু সে দশ বছরে কী করেছে, কমবেশি তোমরা সবাই শুনেছো, গ্রামবাসীও সবাই জানে।’ কাফিই প্রথম উত্তেজিত কণ্ঠে শোকসভায় প্রতিবাদ করে, ‘কী করেছি আমি? তোমাদের ভাগের জমি গিলে খেয়েছি, নাকি নিজের নামে করে নিয়েছি?’

বড়বোন শাসনের গলায় বলে, ‘মা বেঁচে থাকতে তুই আর তোর বউয়ের কীর্তিকলাপের খবর আমাদের জানিয়েছে। এত বছর বাড়ি থেকে যে আয়-উন্নতি হয়েছে, তার ভাগ কি তুই আমাদের দিয়েছিস?’

কাফির সব যুক্তি তো জমাট ক্ষোভ হয়ে ছিল, বিস্ফোরণ ঘটলে তা আর থামতে চায় না, ‘আমি চাকরের মতো তোমাদের বাড়িসম্পত্তি পাহারা দিয়েছি। বড়বাড়ির চাষাড়ি কাজ করাতে আমাকে গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করিয়েছো, আমার বউ দাসিবাঁদির মতো খেটেছে। মা আমার সংসারেই ছিল দশ বছর, কিন্তু তোমাদের সবার এতো সচ্ছল অবস্থা, আমার জন্য কি কেউ এক কানাকড়ি দিয়ে সাহায্য করেছো? বরং আমি যাতে মানুষ হতে না পারি, এজমালি জায়গাজমিতে সারাজীবন খেটে মরি, সেটাই চেয়েছো সবাই।’

এক ভাই জানতে চায়, ‘মানুষ হওয়া মানে কি মোটরসাইকেল দাবড়ে প্রতিদিন শহরে যাওয়া, ব্যবসায়ের নামে বদনেশা করে টাকা অপচয় করা? রোজ কী করিস তুই টাউনে গিয়ে?’

মেজোভাই জানতে চায়, ‘সংসারের কৃষিকাজ থেকে যে-আয় হয়েছে, তার ভাগ কেউ চায়নি, চাইবেও না। কিন্তু ভাগাভাগির আগে তুই বহু জমি বন্ধক রেখে কেউ বলে বিশ লাখ, কেউ বলে ত্রিশ লাখ, এতো টাকা নিয়ে টাউনে কী ব্যবসা ফেঁদেছিস? ব্যবসা করবি ভালো কথা, কিন্তু বন্ধক খুলবে কে?’

কাফি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, ‘সময়মতো আমি খুলে দেব। ভাগাভাগি করে দাও, আমার ভাগ বেচে দিয়ে বউ নিয়ে শহরে আলাদা বাসা করে স্থায়ীভাবে থাকব আমি। তোমাদের বারোয়ারি সম্পত্তি পাহারা দেওয়া আমার কাজ না। তোমরা যেভাবে ভাগাভাগি করো আমার আপত্তি নেই। আমি এখন চলি, চারদিন আমার ব্যবসা দেখিনি, জরুরি ফোন এসেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে।’

বড়দের অনুমতির তোয়াক্কা না করে কাফিই প্রথম সভাস্থল ত্যাগ করে। উঠানে নেমেই মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয় সে, একাধিক ভাইবোনের ধমক ও স্নেহমেশানো হাঁকডাকও তাকে আর ফেরাতে পারে না। কাফির মোটরসাইকেলের গর্জন মিলিয়ে যাওয়ার পরও বড়বাড়ির পারিবারিক সভার উত্তাপ-উত্তেজনা থেমে যায় না। বড়ভাইদের অনুপস্থিতিতে কাফি রক্ষক হয়ে শুধু ভক্ষক নয়, দুর্বৃত্ত-দস্যুর মতো আচরণ করেছে, তার প্রমাণ দিতে থাকে। মাকে কীরকম মানসিক কষ্ট দিয়েছে, সে-কথাও জোর গলায় বলে কেউ কেউ। কিন্তু কাফির বউ রহিমা কী ভূমিকা রেখেছে?

কাফিকে না পেয়ে তার স্ত্রী তথা রুম্মানের মা তথা রহিমাকেই ডাকে সবাই।

শাশুড়ির দাফন হওয়ার পরও বাড়িতে মেহমান হয়ে আসা স্বামীর ভাইবোনদের সেবায় এতটা ব্যস্ত যে, রহিমা দম ফেলারও সময় পায় না। ঘরে সভা বসলে রান্নাঘরে সবার জন্য চা করছিল সে। জামেনার কাছে সেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে ভাসুর-ননদের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরে আসে এবং দাঁড়িয়েই থাকে।

বড়ভাইয়েরা তার কাছে জানতে চায়, কত জমি বন্ধক রেখেছে কাফি? কীভাবে ল-ভ- করেছে সংসার? রহিমা কি জানত না? স্বামীকে শাসন করার চেষ্টা করেনি? শহরে কিসের দোকান দিয়েছে? কী ব্যবসা করে? অনেকে বলেছে টাউনে যায়, সেখানে নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে সে?

ভাসুর-ননদের নানারকম প্রশ্নের মুখে রহিমা নতমুখে একই জবাব দেয়, ‘আমি কিছুই জানি না। আমাকে তো টাউনে নিয়ে গিয়ে কিছুই দেখায়নি।’

বড়ভাই এবার সিদ্ধান্ত জানায়, ‘আমি মাকেও কথা দিয়েছিলাম, রিটায়ার করার পর বাড়িতেই পাকাপোক্ত থাকব। আর মোটে বছরখানেক বাকি। রফিকও রিটায়ারমেন্টের পর বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকবে বলছে। এবারে তো সম্ভব হবে না, তোমরা একটা ডেট ঠিক করে আসো, যার যেটা পাওনা, শান্তিপূর্ণ এবং আইনসংগতভাবে বাটোয়ারা করে দেব আমি। এলাকার চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং উকিল সবাইকে ডাকব। ভাগের পর তোমরা যদি কেউ নিজেদের ভাগ কাফিলকে দিয়ে যেতে চাও, আমার কোনো আপত্তি নেই।’

এক বোন প্রতিবাদ করে, ‘ওকে দেবো কেন? এ-বাড়িতে আমাদের অধিকার নেই, আমাদের ভবিষ্যৎ নেই?’

রহিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, ‘আমি আপনাদের জন্য চা করছি, নিয়ে আসি।’

-----চার-----

মায়ের পারলৌকিক শান্তি এবং নিজেদের ইহকালীন স্বার্থ রক্ষায় ভাগবাটোয়ারার বিষয়টা পাকা করে ওয়ারিশগণ একে একে চলে যায়। বড়বাড়ি হঠাৎ বেশ ফাঁকা এবং অচেনা লাগে রহিমার কাছে। আগে দিনভর শাশুড়ির খ্যানখ্যানে গলা ও লাঠি-ঠুকঠুক মাতবরি অসহ্য লাগত, এখন তার বদলে নানারকম ভুতুড়ে ভয়। শাশুড়ি মরলে রহিমা বড়বাড়ির মালিক হবে বলেছিল যারা, তারা এখন সাজাপ্রাপ্ত আসামির মতো রহিমাকে দেখে মজা পায়। ওয়ারিশরাই ব্যবস্থা করে গেছে, মৃতা মায়ের ঘরবাড়ি পাহারা দিয়ে রাখবে জামেনাও। জামেনা তার মেয়েকে নিয়ে রাতে এখন বড়বাড়িতে থাকে। এছাড়া যে বাঁধা কামলা করমালি চাষাড়ি কাজকাম তত্ত্বাবধান করে, সেও যেন বড়বাড়ির মালিক হয়ে উঠেছে একজন। জোরগলায় হাসিমুখে রহিমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘ও ছোটভাবি, বড়ভাই অর্ডার দিছে, ভাগাভাগির পর তার ভাগের জমি হামাকেই দেখাশুনা করা লাগবে। মেজোভাই তার ভাগ আধি দেবে মনে হয় হাকিমুদ্দিকে। আর তোমার জন তো টাউনে বাসা করার কথা ডিক্লেয়ার দিছে। আমি এখন কোন দিকে যাই, কন দেখি কী জ্বালা!’

এসব জ্বালার কথা বলার সময় করমালির মুখে হাসি ধরে না। শাশুড়ি মরতে না মরতেই শহরে রহিমার সতিনের সংসার কল্পনা করে কিংবা বড়বাড়িতে তার আসন্ন ফকিরনি দশা জানতেও সম্ভবত, লোকজন তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করে। রহিমা কোনো জবাব দেয় না। বিয়ের আগে থেকেই জানত সে, ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগাভাগি হলে বড়বাড়ি একদিন ছিন্নভিন্ন হবেই। এ শুধু হিংসুক গ্রামবাসীর কামনা নয়, শাশুড়িও রহিমাকে প্রায় রোজই বোঝানোর চেষ্টা করে গেছে।

রহিমাও তো গাঁয়ের গেরস্তঘরের মেয়ে, জমির মায়া যে কী সাংঘাতিক জিনিস, নিজের বাপ-চাচার ঝগড়া দেখে ছোটবেলাতেই বুঝে গেছে। সেই বাবা মেয়েকে বড়বাড়ির বউ করে পাঠানোর সময় বেকার ও নেশাখোর জামাইকেও মেনে নিয়েছিল তাদের বিস্তর জায়গাজমি দেখেই। ভাইয়েরা সবাই দেশ-বিদেশে চাকরি করে, বাড়ির আবাদি ফসলের ভাগ নেওয়া দূরে থাক, নিজেদের জমিটাও পর্যন্ত চেনে না। বাড়ির কৃষি থেকে ম্যালা আয় হয় বলেই ছোটছেলে চাকরিতে ঢোকেনি। এই সুযোগে রহিমা যদি নিজের সংসার গুছিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো অভাব থাকবে না তার। বিয়ের পর থেকে রহিমা সেই চেষ্টাই করে গেছে। শহরবাসী ভাসুর-ননদের মতো নিজেও শহরে ঝামেলামুক্ত সংসার গড়ে ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নপূরণের পথে শাশুড়ি ছিল বড় বাধা, শাশুড়ি মরে যেতে না যেতেই অচেনা সতিন মস্ত বাধা হয়ে উঠবে কল্পনাও করেনি সে।

বাড়ি ফাঁকা হওয়ার পরও কাফি ব্যবসায়ের কাজের দোহাই দিয়ে টানা তিনদিন বাড়িতে ফেরেনি। ফোনে রহিমাকে জানিয়েছিল ব্যবসায়ের কাজে ঢাকায় যাবে। ভাগ নিয়ে বড়ভাইয়ের সঙ্গেও প্রাইভেট কথা বলবে। মা বেঁচে থাকতেও অনেকদিন রাতে বাড়িতে ফিরত না সে। মাত্র এক ঘণ্টায় মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়ি ফেরা যায়, কিন্তু তারপরও কী এমন কাজের ব্যস্ততা যে রাতেও স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরার গরজ থাকে না। সন্দেহ অবশ্য আগেও জেগেছিল, রাতে বাড়িতে ফিরলেও স্বামীর ভালোবাসার উত্তাপ খুঁজে পায়নি। তারপরও শহরে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নটা আঁকড়ে রেখেছিল রহিমা। কাফি ভাইদের কাছে শহরে বাসা নিয়ে থাকার ঘোষণা দিলে স্বপ্নপূরণের আশাও জেগেছিল।

তিনদিন পর রাতে বাড়িতে ফেরে কাফি। দমবন্ধ অবস্থায় অপেক্ষা করে রহিমা। স্বামীকে রাতের খাবার দিয়ে সরাসরি কথা তোলে, ‘আম্মাজানের মৃত্যুর পর এ-বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। রুম্মানকে টাউনের স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। তুমি এ-মাসেই আমাদের নিয়ে টাউনের বাসায় উঠবে।’

যুদ্ধ করার জন্য কাফির প্রস্ত্ততি তো দীর্ঘদিনের, জবাব দেয় সে, ‘আমার রক্তসম্পর্কের শত্র‍ুরা, গ্রামের হিংসুক শয়তানরা তোমাকে জানায় নাই, টাউনে আর একটা বিয়া করব আমি?’

‘আমি বিশ্বাস করি নাই।’

‘অবিশ্বাস করার কী আছে? আমার বাপ ও দাদারও ছিল দুই পরিবার। মুসলমানের ছেলে আমি, চারটা না হোক, প্রয়োজনে দুই বউ রাখা আমার আইনি অধিকার। বড়বাড়ির গেরস্থালি কাম সামলানোর জন্য তুমি এ-বাড়িতে এসেছ, তুমি সেই কাজই করবে।’

খাওয়ার পর সিগারেট ধরিয়ে কাফি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সান্তবনা দেয়, ‘ভাগাভাগির পর রুম্মানকে নিয়ে এ-বাড়িতেই থাকবে তুমি। এ-বাড়ির গেরস্তি কামকাজ করলে ভাতের অভাব হবে না তোমার।’

বুড়ি শাশুড়ি মরে যাওয়ার পর রহিমা কেঁদে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে গ্রামের মানুষ জড়ো করেছিল, কিন্তু নিজের জীবনের এমন সর্বনাশা ঘটনার মুখেও টুঁ-শব্দটি করতে পারে না আজ। মনে হয় স্বামী সর্বশক্তি দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেছে দমবন্ধ করে মারার জন্য।

বউকে সারারাত নির্ঘুম, পাথরের মতো স্তব্ধ এবং একা রেখে, সকালে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে কাফি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

বাপের মতো ছেলে রুম্মানও যথারীতি খেলার নেশায় বাড়ির বাইরে ছুটে বেড়ায় দিনমান। বাড়িতে একা হয়েও কোনো কাজেই মন বসে না রহিমার। বিয়ের পর থেকে কাজই তো করে গেছে রহিমা। নিজের হবে না জেনেও বাড়ির উঠান ঘরদুয়ার ঝাঁট দিয়েছে। শাশুড়ির সেবাযত্ন ছাড়াও তার চৌদ্দগোষ্ঠীকে রান্নাবাড়া করে খাইয়েছে। গোলায় ধান তোলা, ধান উঠানো, রোদে শুকানো এবং ভিটায় মাচান বেঁধে এন্তার লাউ-শিম-কুমড়া ফলানো – এসব করে চাষিবাপের নাম ফাটিয়েছে। পোষা গাইটি ও মুরগিগুলোর তত্ত্বতালাশ করেছে। এতো কাজের পরও এ-সংসারে স্বামীর প্রাপ্য গালমন্দ মুখ বুজে হজম করেছে নিজের সুখের সংসার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মা মরলেই আলাদা হয়ে শহরের বাসায় ভালো চলবে তাদের, স্বামীও আশ্বাস দিয়েছিল এরকম।

শাশুড়ির মৃত্যুতে বাড়িতে লোকদেখানো এত কান্নাকাটির পরও, শাশুড়ির কথা ভেবে রহিমার সত্যি কান্না পায় আজ। বেঁচে থাকলে ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনলে বুড়ি আজ রহিমার পক্ষে থাকত অবশ্যই। ছেলেবউয়ের সঙ্গে যতই খ্যাচম্যাচ করুক, চোখের সামনে একমাত্র নাতি রুম্মান ছিল বলে তার ওপর টানটাও ছিল বেশি বুড়ির। রুম্মান দাদির হাতের লাঠি নিয়েও খেলত। মরার দুদিন আগেও খেলার জন্য দাদিকে কানা বুড়ি সাজিয়েছিল। অন্ধ সেজে বুড়ি লাঠি ধরলে, অন্য প্রান্ত ধরে রুম্মান উঠানে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা চেয়েছিল, ‘কানা ফকিরকে ভিক্ষা দেন মা-সকল।’ এই দৃশ্য দেখে হাসি লুকাতে রান্নাঘরে ছুটে গিয়েছিল রহিমা। সেই হাসির কথা স্মরণ করেও আজ চোখের জল ফেলে। শহরে ব্যবসা করার নামে কাফি পিরিতের সংসার ফেঁদেছে জানলে লম্পট ছেলেকে বাড়িছাড়া করে, বুড়ি নিশ্চয় ছোটছেলের প্রাপ্য ভাগের জমি ছোটবউ ও নাতির নামে দেওয়ার সুপারিশ করত বড়ছেলেদের কাছে। করত নাকি?

রহিমা এখন শাশুড়ির ফোনটা থেকে ভাসুর-ননদকে কল দিয়ে জরুরি কথা বলতে চাইলে, শুনবে তারা। কিন্তু তাতে লাভ কী হবে? প্রতারক ভাইয়ের বদমায়েশি ও শহরে ব্যবসায়ের নামে দ্বিতীয় সংসার ফাঁদার খবরটা তারা রহিমার আগেই জেনেছে। কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়েও স্বামীকে কৃষিকাজে ধরে রাখতে পারেনি রহিমা, উলটো নিজেও শহরে সংসার ফাঁদার স্বপ্ন দেখেছে। ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড়ে স্বামীকে এজমালি জমি বন্ধক রাখতে এবং গোলার ধান ও ভিটার গাছপালা বেচতেও উৎসাহ দিয়েছে। যার জন্য এত করেছে রহিমা, সে-ই হয়তো ভাইদের কাছে ছোটলোক বউয়ের হাজারটা গিবত গেয়ে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতিও জোগাড় করেছে ভাইদের কাছে। রহিমা বিয়ের পর শহরে এক ননদের বাসায় বেড়াতে গেলে সে তার কাজের বুয়ার কাছে পরিচয় দিয়েছিল, আমাদের গ্রামের বাড়ির সব কাজ এই মেয়ে একাই সামলায়। তার মানে কী? রহিমাও তাদের কাছে তুচ্ছ কাজের লোক ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও বড় ননদের কাছে ফোন করে শাশুড়িবিহীন বাড়িতে একা হওয়ার কান্না নিয়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবরটা জানায় রহিমা। ননদ সহানুভূতি দেখাবে কী, উলটো রহিমাকেই ধমক দিয়ে বলে, ‘কেমন মেয়ে রে তুই, স্বামী শহরে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়, আর তুই এতদিন মুখ বুজে ছিলি! থাক, তুই বড়বাড়ির কাজকর্ম নিয়েই থাক।’ ননদের কথার প্রতিবাদে এই মুহূর্তেই এ-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভাবে রহিমা। কিন্তু গরিব বাপ জমি বেচে বড়ঘরের জামাইকে মোটরসাইকেল যৌতুক দিয়েছিল। সংসার-ভাঙা মেয়েকে চিরদিনের জন্য আশ্রয় দেওয়ার সংগতি নেই তার। রহিমার ভাইয়েরাও বলে দিয়েছে, ভাগাভাগিতে পৈতৃক জমির কড়াক্রান্তিও পাবে না সে। না, বাপের বাড়িতে ফিরবে না রহিমা। তারচেয়ে বিষ খেয়েই বড়বাড়ির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ঘুচাবে। রহিমার আপন খালাতো বোন প্রেমিককে বিয়ে করতে না পেরে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বড়বাড়ির কৃষিতেও কীটনাশকের ব্যবহার দেখলে কথাটা মনে পড়ত রহিমার। নিজে লাউ-শিমের মাচায় স্প্রে করার জন্য করমালিকে দিয়ে বাজার থেকে কীটনাশক কিনে আনিয়ে ছিল, সেই বিষ দেখেও মনে পড়েছিল আত্মঘাতী বোনটির কথা। তাই বলে নিজে তার অনুগামী হওয়ার কথা বিয়ের আগে বা পরে কোনোদিন ভাবেনি রহিমা। নির্দোষ বোনের আত্মহত্যার জন্য দায়ী প্রেমিক ছেলেটির কোনো শাস্তি হয়নি, বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে সংসার করছে এখন। রহিমাও বিষ খেয়ে মরলে দ্বিতীয় বউ নিয়ে স্বামীর সুখের সংসার আরো নিষ্কণ্টক হবে। বিষ হাতে নিয়েও রহিমা মোটরসাইকেলের পেছনে বসা কল্পিত যুবতীকে স্বামীর আলিঙ্গনে সুখের হাসি হাসতে দেখে। সতিনের সুখ দেখে রহিমা যদি আজই মরে, তার অনাথ সন্তান কোথায় ঘুরে বেড়াবে? আপাতত বিষ রেখে রুম্মানকে খোঁজার জন্য রহিমা বাড়ির বাইরে বেরোয়।

নিজের মৃত্যুকামনা নিয়ে রহিমা অ্যাক্সিডেন্টে স্বামীর মৃত্যুর কথাও ভাবে। মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে একদিন মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে। আবারো যদি সেরকম কোনো দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয় দয়াময় আল্লাহ, স্বামীশোকে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলবে না রহিমা। স্বামী মরলেই বরং বড়বাড়িতে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে রুম্মান এবং স্ত্রী হিসেবে রহিমাও পাবে দুই আনা অংশ। স্বামীর ভাগ পেলে বড়বাড়িতেও নিজের আলাদা সংসার এবং পিতৃহারা ছেলের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে দিতে পারবে সে একাই। বিধবা শাশুড়ি যেমন বড়বাড়িকে একান্ত নিজের ভেবে দেখেশুনে রেখেছে আজীবন, নিজে বিধবা হলে রহিমাও স্বামীর সম্পদ আরো ভালোভাবেই রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু স্বামী বেঁচে থাকলে নিজের ভাগ বেচে দিয়ে শহরে সতিনের সংসারে ঢালবে অবশ্যই। তালাক দিয়ে রহিমাকে বড়বাড়ি থেকে বের করে দিতে এক মিনিটও সময় লাগবে না তার। তখন কোথায় যাবে রহিমা? অসহায় এক নারীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আল্লাহ যদি নেশাখোর দুশ্চরিত্র এক পুরুষকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়, সেটা কি অবিচার হবে? সুবিচার পাওয়ার জন্য রহিমা গোপনে চোখের জলের সঙ্গে আল্লাহর কাছে জরুরি আবেদন-নিবেদন জানাতেই থাকে।

মরা-বাঁচার সংকটে তার স্বামী অপ্রত্যাশিতভাবে ঘুমানোর সময়ে রাতে বাড়িতে ফেরে আজ। বাড়িতে এসেও অকারণে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজায়। সাধারণত বাড়িতে ফিরলে এরকম রাতেই ফেরে সে, কিন্তু আসবে না মনে করে রহিমা তার জন্য ভাত রাখেনি। কী মনে করে কে জানে ছেলের জন্য আজ একটা খেলনা কার এনেছে কাফি। খেলনা কার পেয়ে রুম্মান মহাখুশি, ঘুমানো স্থগিত রেখে বিছানাতেও কার চালায়। আর রহিমাকে ধমকের গলায় হুকুম দেয় কাফি, ‘ভাত দে। খিদে লেগেছে।’

রহিমা বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে যায়। আধঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজের তরকারি ও ভাত গরম করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেয়। স্বামীর সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, তার দিকে একবারও না তাকিয়ে বিছানায় ছেলের পাশে গিয়ে শোয় আবার। মানুষটা খাচ্ছে খাক, রহিমা ঘুমন্ত ছেলের পাশে মৃতা শাশুড়ির মতো অসাড় পড়ে থাকে।

আরো আধঘণ্টা পরে স্বামীর বিকৃত কণ্ঠের চিৎকার শুনে বিছানায় উঠে বসতে বাধ্য হয় রহিমা। যন্ত্রণাবিকৃত গলায় চেঁচিয়ে বলছে মানুষটা, ‘হারামজাদি খাবারের মধ্যে বিষ মিশায় দিছিস নাকি? আমার এতো বুক জ্বলে কেন? এতো পেট জ্বলে কেন?’

আকস্মিক দুর্ঘটনায় পড়ার মতো স্বামী ফোনটা হাতে নিয়ে যন্ত্রণায় মৃত মাকে ডেকে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে থাকলে রহিমা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে এবার আল্লাহকেই ডাকে, ‘হায় আল্লা! রুম্মানের আববার কী হইল? টাউন থাকি কী বিষ খায়া আসছে আজ? বিছানায় গড়াগড়ি দেয় ক্যানে? ও জামেনা, ও উমেদভাই, আমার কপালে ফের কী আগুন লাগল!’

মধ্যরাতে বড়বাড়িতে নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে একজন-দুজন করে প্রতিবেশী ছুটে আসতে থাকে। পাড়ার দোকানে টিভি দেখছিল যারা, তাদের কয়েকজনও টিভি দেখা বাদ দিয়ে ছুটে আসে বড়বাড়িতে। অসুস্থ কাফির আর তখন কথা বলারও শক্তি নেয়, দাঁতে দাঁত চেপে শারীরিক যন্ত্রণা হজম করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে উঠানে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে রহিমা।

কান্না কোলাহলের মাঝেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছুটে আসে একটি অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসার জন্য কাফিই তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিল। কাফিকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়। এদিকে আঙিনায় গড়াগড়ি দিতে থাকা রহিমার কান্নার আওয়াজ তীব্রতর হয়ে ওঠে। রাতের আঁধার চিরে ছুটে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সখানা লাল আলো চটকে আর পোঁ-পোঁ সাইরেন বাজিয়ে কার মরণ কামনা করে, রহিমা বুঝতেও পারে না।