Friday, June 15, 2018

১১ বছরের অবরুদ্ধ জীবনে গাজাবাসীর ঈদ

কদিন আগেই জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থাপনকে কেন্দ্র করে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলেন গাজাবাসী। দুনিয়ার বৃহত্তম এ উন্মুক্ত কারাগারে শুধু গত মে মাসেই ৩১৯ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। আর গত মার্চের শেষ দিক থেকে এ পর্যন্ত দখলদার বাহিনীর হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১৩ হাজার ফিলিস্তিনি। এমন পরিস্থিতিতেই শুক্রবার ঈদ উদযাপন করছেন ১০ বছরের ধরে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা।
২০০৭ সালের সালের ওই অবরোধে এমনিতেই অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের কবলে রয়েছেন গাজা উপত্যকার ২০ লাখ বাসিন্দা। তার ওপর রয়েছে যখন তখন হানাদার বাহিনীর তাণ্ডব। অবরোধের কারণে খাবার, জ্বালানি এবং ঔষধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত দুনিয়ার বৃহত্তম এ উন্মুক্ত কারাগারের বাসিন্দারা। আর এসব বঞ্চনাকে সঙ্গী করেই ঈদ উদযাপন করেন সেখানকার মানুষ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আনাদোলু এজেন্সি জানান, ব্যবসায়ীরা যৌক্তিক দামে,  এমনকি ছাড় দিয়ে তাদের পণ্য বিক্রি করলেও বেশিরভাগ মানুষই অর্থসংকটে কেনাকাটা করতে পারছেন না।
এক ব্যবসায়ী বলেন, বেশিরভাগ মানুষই বাজারে আসেন। তবে সাধ্যের বাইরে হওয়ায় কোনও কেনাকাটা ছাড়াই তারা ফিরে যান।
শিশু কন্যাকে নিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন সোহা আহমেদ। কিন্তু পছন্দের খেলনা কিনে দিতে না পারায় মেয়েটি কাঁদছিল। সোহা আহমেদ আনাদোলু এজেন্সিকে বলেন, ৫০ শেকেল (ফিলিস্তিনি মুদ্রা) দিয়ে মেয়ের জন্য জামা কিনতে এসেছি। খেলনা কেনার জন্য আমার হাতে আর কোনও অবশিষ্ট অর্থ নেই।
এই নারী বলেন, ‘আমার স্বামী রামাল্লায় একজন সরকারি চাকরিজীবী। এক সপ্তাহ আগে তিনি আংশিক বেতন পেয়েছেন। কিন্তু এ টাকা থেকে আগের মাসের দেনা পরিশোধ করতে হবে।
মুসলিম দেশগুলোতে ঈদের মৌসুমে সাধারণত খেলনার দোকানগুলোতে ভিড় থাকে। ছোট ছোট শিশুরা তাদের পছন্দের নানা খেলনা কিনে থাকে। কিন্তু গাজার ২৮ বছরের ব্যবসায়ী ইব্রাহিম হাবৌশের দোকানে সেই জৌলুস নেই। তার দোকানে ক্রেতারই অভাব।
ইব্রাহিম হাবৌশ জানান, এ বছর তার দোকানের মাত্র ২০ শতাংশ সামগ্রী বিক্রি হয়েছে।
গাজা উপত্যকার ২০ লাখ মানুষের মধ্যে ১০ লাখই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আরব ও মুসলিম দেশগুলোর ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। গাজা চেম্বার অব কমার্সের মুখপাত্র মাহের আল তাব্বা বলেন, উপত্যকায় দারিদ্র্যের হার ৫৩ শতাংশে পৌঁছেছে। আর খাদ্য নিরাপত্তার বাইরে রয়েছেন গাজার ৭২ শতাংশ বাসিন্দা।

ভূমিধ্বস, বন্যার ঝুঁকিতে ২ লাখ রোহিঙ্গা

বর্ষা মৌসুম তার আগমন বার্তা জানান দিয়েছে বাংলাদেশে। দেশটির কক্সবাজার জেলার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ইতোমধ্যে মৌসুমি বর্ষণে পর্যুদস্ত। জাতিসংঘ সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এসব ক্যাম্পগুলোতে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে আনুমানিক ২ লাখ ভূমিধ্বস ও বন্যায় ঝুঁকিতে রয়েছে। আর এর মধ্যে অর্ধেকের বেশিই শিশু। টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
রিপোর্টে আরো বলা হয়, কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো ও অনানুষ্ঠানিক আশ্রয় শিবিরগুলো মৌসুমের প্রথম বর্ষণ হয় গেল সপ্তাহে। এতে সেখানকার বেশিরভাগ রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিলের এক বিবৃতি অনুযায়ী, এক শিশু ভূমিধ্বসে মারা গেছে।
ইউনিসেফের অনুমান মতে ভারী বর্ষণে ৯০০ আশ্রয় শিবির ও ২০০ ল্যাট্রিন ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি বরবাদ হয়ে গেছে। ক্ষতির এই পরিসংখ্যার আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেননা, পরবর্তী কয়েক মাস নিয়মিত মৌসুমি বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। আগস্ট মাস নাগাদ বর্ষার আধিক্য কমতে থাকে। তবে এরপর শুরু হয় সাইক্লোনের মৌসুম।
গেল আগস্টে কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলার পর মিয়ানমার সামরিক বাহিনী চড়াও হয় রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর। এরপর প্রাণ বাঁচাতে নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ওই অভিযান ‘গণহত্যার সকল বৈশিষ্ট্য বহন করে’ বলে আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘ। এই শরণার্থীরা আসার আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ১৩ হাজার।
ইউনিসেফ বলছে, এ জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যে তাদের ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছে। তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এখন প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের মধ্যে তারা অরক্ষিত।
বাংলাদেশে ইউনিসেফ প্রতিনিধি এদুয়ার্দ বেইগবেদার বলেন, ‘হাজারো শিশু ও তাদের পরিবার গাছপালা-বিহীন পাহাড়ি এলাকায় নির্মিত আশ্রয় শিবিরে দিনাতিপাত করছে। সেই সাথে পাথুরে, বালুমাটির জায়গাগুলো এখন কর্দমাক্ত। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পানির স্তর দ্রুত ওপরে উঠতে থাকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সবথেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে অবস্থান করা শরণার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়াটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বহু পরিবার যারা কিনা বিগত মাসগুলোতে বার বার দূর্দশাগ্রস্থ হয়েছে, তারা এখন নিজেদের অস্থায়ী আবাস ছেড়ে যেতে নারাজ।’
ভূমিধ্বস ও অকস্মাৎ বন্যার বিপদ ছাড়াও বর্ষা মৌসুমে কলেরা ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, বাঁশ-খুঁটি দিয়ে কোনমতে নির্মিত এসব আশ্রয়কেন্দ্রগুলো মেরামত করতে আইরন প্যানেল ও তারপুলিন জড়ো করতে কাজ করছে সংস্থাটি।

ইরানের শিশুরা যেভাবে রমজান পালন করে থাকে

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শিশুরা উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র মাহে রমজান পালন করে থাকে। শিশুদের অনেকে এবারই প্রথম রোজা রেখেছে। তাদের আনন্দের যেন শেষ নেই।
রোজার মাসে করণীয় সম্পর্কে ইরানে শিশুদের নানা রকম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
ইফতার তৈরি ও সাজিয়ে রাখা, কোনো মেহমান এলে তাকে ইফতার দেয়া, বাড়ির আশেপাশে প্রতিবেশী; এমনকি মসজিদে সমবেত মুসল্লীদের জন্য ইফতার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইরানের শিশুরা ভূমিকা রাখে।
তারা কুরআন তেলাওয়াত ও কুরআন বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। রেডিও-টেলিভিশনে শিশুদের অংশগ্রহণে নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়।
শবে ক্বদরের দিনগুলোতে ইরানি শিশুরা মসজিদে সমবেত মুসল্লিতে মধ্যে পানি, খেজুর ও মিষ্টি বিতরণ করার দায়িত্ব পালন করে।
এছাড়া, কুরআন বিতরণের কাজও তারা করে থাকে। রমজান মাসটিতে তারা মূলত সওয়াব ও প্রশিক্ষণের মাস হিসেবে গ্রহণ করে।

মেহেদি রাঙা হাত: শখ থেকে পেশা by সঞ্চিতা সীতু

মেহেদি রাঙা হাতে ছড়িয়ে যাচ্ছে ঈদ আনন্দ
রাজধানীর অনেক মার্কেটের সামনে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে মেহেদির রঙ ছড়াচ্ছেন অনেকে। সাধারণত ২৭ রমজান থেকেই বসতে শুরু করেন তারা। প্রথম দিন কম মানুষ এলেও চাঁদরাতে দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়। হাতে মেহেদি আঁকতে মানুষের দীর্ঘ সারিও দেখা যায় কোথাও কোথাও। তাদের কথা ভেবে মেহেদি আঁকা অনেকের শখ থেকে পরিণত হয়েছে পেশায়।
এমন একজন উদ্যোক্তা শারমিন আজাদ লুবনা। ছোটবেলা থেকেই মেহেদির নকশার প্রতি তার শখ ছিল। শুরুর দিকে ফুরসত পেলেই নিজের হাতে নকশা করতেন। এরপর মেহেদির রঙে আঁকার জন্য ধরতেন পরিবারের সদস্যদের হাত।
লুবনা কলেজে পড়ার সময় আশেপাশের অনেকে মেহেদি রাঙা হাতের জন্য আসতেন তার কাছে। শখের বসেই বেইলি রোডের একটি বিপণি বিতানের সামনে চেয়ার-টেবিল বসতে শুরু করেন তিনি। কয়েক বছর ধরে ঈদের আগের তিন দিন সেখানে বসেই মেহেদির রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। হাতে হাতে মেহেদি রঙ দিয়ে ঈদের খুশি ছড়িয়ে দিতে খুবই ভালো লাগে তার।
শখ থেকে এখন মেহেদি আঁকা পরিণত হয়েছে লুবনার পেশায়। তিনি কর্মরত আছেন একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানে। অফিসের কাজের ফাঁকে মেহেদির কাজগুলো করেন। খুলেছেন লুবনাজ মেহেদি ওয়েব পেজ।লুবনা বাংলা ট্রিবিউনকে জানালেন, এভাবে প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হয় তার।
ঈদের আগের তিন দিনের প্রথম দুই দিন রাত ১০টার পর্যন্ত ব্যস্ততা থাকে লুবনার। তবে চাঁদরাতে এত ভিড় থাকে যে বাসায় ফিরতে ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে যায় রাত ১টার ঘর। তবুও নিরাশ করতে হয় অনেককে। কারণ তখন আর হাত চলে না। লুবনার কথায়, ‘মেয়েদের আগ্রহের কথা ভেবে কষ্ট হলেও কাউকে ফিরিয়ে না দিতে চেষ্টা করি। হাতে হাতে রঙ ছড়িয়েই যে আনন্দ আমার।’
একইভাবে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসেছেন নিভৃতা খান। তার ফেসবুক পেজের নাম ‘ইউনিক অ্যান্ড এক্সোটিক’। তিনি পড়াশোনা করছেন মালয়েশিয়ায়। বাংলাদেশে ঈদ উদযাপন করতে এলেই কাজিনদের নিয়ে মেহেদির কাজ করেন। তার কাছেও এটা ছিল শখ। এখন তা দাঁড়িয়েছে পেশায়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘মেহেদি আঁকার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ঈদের খুশি ছড়িয়ে দিতে ভালো লাগে।’
নিভৃতাকে সহযোগিতা করেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী নওশীন অঞ্জন ইতু ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানিয়া নিশিথা। তারা জানান, দিনে প্রায় ৮-৯ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয় তাদের।
ইতু বলেন, ‘ক্লাস সেভেন-এইট থেকেই পরিবারের সদস্যদের হাতে মেহেদি আঁকা দিয়ে শুরু। এরপর প্রতিবেশীরাও আসতো আমাদের কাছে। বন্ধুদের আগ্রহে এটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছি। পড়াশোনার ফাঁকে এই কাজে পরিবারের সহযোগিতা ছিল সবসময়।’
ইস্টার্ন প্লাস মার্কেটের সমানে একইভাবে মেহেদি আঁকছেন নূর। তিনিও মালয়েশিয়ার বাসিন্দা। স্কিন অ্যান্ড হেয়ার প্রবলেম সল্যুশন নামে তারও একটি ফেসবুক পেজ আছে। এবার তিন দিন ধরে বিপণি বিতানটির সামনে বসছেন তিনি।
গৃহিণী ফারজানা রহমান কয়েক বছর ধরে চাঁদরাতে ইস্টার্ন প্লাসে গিয়ে হাতে মেহেদির নকশা করে যান। একই স্থানে মেহেদি দিতে আসা পলি সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে জানালেন, তিনি কখনোই এভাবে মেহেদি দেননি। কিন্তু আজ বন্ধুদের অনুরোধেই হাতে মেহেদি আঁকালেন। তিনি বলেছেন, ‘খুবই ভালো লাগছে।’
ওদিকে বেইলি রোডে মেহেদি দিতে আসা ভিকারুননিসার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীর অর্পি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এই প্রথম তিনি এখানে মেহেদি দিতে এসেছেন। তার কথায়, ‘কেনাকাটার পাশাপাশি ফেরার পথে মেহেদি রাঙা হাত নিয়ে ঘরে ফিরছি। ভালোই লাগছে। এখন একটা ঈদের আমেজ চলে এসেছে চারদিকে।’

জর্ডানফেরত এক নারীর কান্না: গর্ভের সন্তানটি কী পরিচয়ে বাঁচবে by রোকনুজ্জামান পিয়াস

ভ্যানচালক পিতা বাজার-ঘাটে যেতে পারেন না। তার ভ্যানেও কেউ উঠতে চায় না। মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে। বাড়িতে মাকেও গালমন্দ শুনতে হয়। কথায় কথায় পাড়া-প্রতিবেশীর রোষানলে পড়েন তিনি। সমাজে এখন তারা একঘরে। কেউ মেশে না, কথা বলে না, কোনো ধরনের লেনদেন করতে চায় না তাদের সঙ্গে। এই অবস্থায় পৃথিবীর আলো-বাতাস তাদের কাছে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। কারণ, তাদের অবিবাহিত মেয়েটি সন্তানসম্ভবা। ৮ মাসের গর্ভবতী। মেয়েটি জর্ডানে গিয়েছিলেন বাবার সংসারের সচ্ছলতা আনতে। কিন্তু সেখানে একটি চক্রের হাতে পড়ে দীর্ঘদিন ধরে যৌন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে এসেছে তার গর্ভের এই সন্তান। এদিকে সন্তান প্রসবের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে পরিবারের সদস্যদের। এই সন্তান নিয়ে এখন তিনি  কোথায় যাবেন, কোন পরিচয়ে বেড়ে ওঠবে সন্তান? এ ভাবনা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। রোববার রাতে রাজধানীর আশকোনায় অবস্থিত ব্র্যাক লার্নি সেন্টারে কথা হয় মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার এ হতদরিদ্র পিতার এই হতভাগা মেয়ের সঙ্গে। কথা বলতে বলতে মাঝে মধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলছিলেন এই নারী। বারবারই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা জর্ডানফেরত মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি ২০১৪ সালের শুরুর দিকে জর্ডান গিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে। সেদেশে পৌঁছানোর পর তাকে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ দেয়া হয়। মাসিক বেতন নির্ধারিত হয় ১৫ হাজার টাকা। মালিক ভালো হলেও তার ছেলে প্রায়ই তাকে নির্যাতন করতো। মারধর করতো। এই নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে একদিন তিনি ওই বাসা থেকে পালিয়ে যান। এরপর আশ্রয় নেন পূর্বপরিচিত মানিকগঞ্জেরই আরেক মেয়ে সোনিয়া খাতুনের কাছে। সে তাকে কাজ দেয়ার কথা বলে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। নির্যাতিত মেয়েটি সেখানে গিয়ে দেখেন পাঁচ তলা বাড়ির পুরোটাই ভাড়া নিয়েছে সোনিয়া। ওই বাসাতেই প্রায় অর্ধশত মেয়ে। তিনি এত মেয়ে একসঙ্গে থাকার কারণ জানতে চান। সোনিয়া তাকে জানায়, এরা যে কাজ করে, তাকেও একই কাজ করতে হবে। তখন সেখান থেকে চলে যেতে চাইলে বাধা দেয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে সেখানেই থেকে যান তিনি। এরপর চলতে থাকে তাকে দিয়ে অসামাজিক কাজ করানোর চেষ্টা। রাজি না হলে চলে মারধর, নির্যাতন। জোর করে মদ খাওয়ানো হয়। এরপর একের পর এক পুরুষ পাঠানো হয় তার কাছে। বলেন, আমার কাছে প্রতিদিনই ৪-৫ জন করে পুরুষ মানুষ পাঠাতো। কখনো কখনো একসঙ্গে দু’জন করে আসতো। তাদের কাছে অনুনয়-বিনয় করেও রেহাই পাইনি। উল্টো মারধর করতো, জোর করে মদ খাওয়াতো। এতে করে মাঝে মাঝে বমিও করে দিতাম। কিন্তু নিস্তার পেতাম না। নির্যাতিত মেয়েটি জানান, প্রতি বৃহস্পতিবারে রাতে তাদের ওপর নির্যাতন বেশি হতো। ওইদিন রাতে খদ্দেররা আসতো, সারারাত থাকতো, এরপর শুক্রবার সকালে চলে যেতো। যারা আসতো তারা কারা- জানতে চাইলে মেয়েটি জানান, বিভিন্ন দেশের লোক ছিল এরা। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কান। দু’একজন বাংলাদেশিও যেতো তাদের কাছে। ওইসব খদ্দেররা তাকে কোনো টাকা পয়সা দিতো কিনা জানতে চাইলে বলেন, কোনো টাকা-পয়সা দিতো না। সব দিতো সোনিয়ার কাছে। সেই তাদের কাছে লোক পাঠাতো। বাড়িতে কিছু টাকা-পয়সা পাঠানোর জন্য অনুনয় বিনয় করলেও সোনিয়া কোনো টাকা দেয়নি তাকে। বরং উল্টো মারধর করতো। সোনিয়া মদ খেয়ে এসে তার বুট জুতা এবং কোমরের বেল্ট দিয়ে বেধড়ক পেটাতো। তার ইন্ডিয়ান স্বামী নিষেধ করলেও শুনতো না। এভাবে এক বছর পর সেখান থেকে পালিয়ে যাই। পাশেই এক দোকানে একটি বাঙালি মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সে তার মালিকের বাড়িতে নিয়ে যায়। তাকে অন্য একটি বাড়িতে কাজ দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর সোনিয়া তাকে সেখান জোর করে নিয়ে আসে। ওই বাড়িতে কাজ করার কোনো কাগজপত্র না থাকায় বাড়ির মালিকও তাকে বাধা দিতে পারেনি। এরপর তাকে ফিরিয়ে এনে বেদম মারধর করেছে। মেয়েটির বাবার কাছে ফোন দিয়ে বলেছে, তার মেয়ে কোথা থেকে আকাম করে আসছে। তাই মারধর করেছি। মেয়েটি বলেন, সোনিয়া তার বাড়িতে প্রায়ই ফোন দিয়ে বলতো তাদের মেয়ে পতিতাবৃত্তি করে। এ কথা বলার কারণ, তার পিতা-মাতা যেন তাকে গ্রহণ না করে। কথা বলার একপর্যায়ে মেয়েটি কেঁদে ওঠেন। বলেন, আমার প্রতিদিনই খুব কষ্ট হতো। বাধা দিলে আরো বেশি নির্যাতন চালাতো। এভাবে একসময় তিনি এই কষ্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এরমধ্যে সোনিয়া একবার দেশে আসে। ওই সময় চেষ্টা করেছিলো পালাতে কিন্তু বাড়ির মালিক তাকে পালাতে দেয়নি। সোনিয়ার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা দেখা করে। মেয়েকে ফেরত পাঠাবে বলে কথা দেয়। কিন্তু জর্ডান ফিরে গিয়ে কথা রাখেনি সে। একইভাবে নির্যাতন চালায়। বরং মাত্রা বাড়তে থাকে। এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে সোনিয়া তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর দু’মাস কাটে জেলে। পরে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নিপীড়িত মেয়েটি বলেন, গত ১৭ই এপ্রিল তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনি ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে আল্ট্রাসনোগ্রাম করালে চিকিৎসক জানান, তিনি ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ সময় গর্ভপাত করানোরও উপায় ছিল না বলে জানান তিনি। বলেন, তিনি এখন ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ঘটনাটি ইতিমধ্যে এলাকায় জানাজানি হয়েছে। সমাজ তাদের একঘরে করে রেখেছে। তার পিতা ভ্যান চালান। তিনি বাজার-ঘাটে যেতে পারেন না। তার ভ্যানেও কেউ ওঠতে চায় না। কথা বলে না। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে ও তার মাকে নানাভাবে গালমন্দ করে। তাদের বাড়িতে কেউ আসে না। তারা কোনো বাড়িতে যেতে পারেন না। তিনি বলেন, আব্বাও আমাকে খুব গালমন্দ করে। আমার খুব খারাপ লাগে। কথাটি বলতে বলতে, ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। পাড়ার মানুষ আরো খারাপ ভাষায় বলে। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর কী করবেন জানতে চাইলে তিনি অসহায় দৃষ্টিতে তাকান। এরপর বলেন, আমি তো রাখতে পারবো না। তিনি জানান, তার নানী বলে, তোর তো বিয়ে হয়নি, তুই ক্যামনে রাখবি এই সন্তান? বলেন, কাউকে পালতে দেবো। কাকে পালতে দেবেন জানতে চাইলে বলেন, তাও জানি না। মেয়েটিকে বিশেষভাবে দেখাশুনা করছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। তাকে আর্থিকসহ নানা ধরনের সহযোগিতাও দিচ্ছে তারা। সোমবার বিদেশফেরত নির্যাতিত যে ২২ জন নারীকর্মীকে জনপ্রতি এক লাখ টাকার চেক ও দু’টি নতুন শাড়ি দেয়া হয় জর্ডানফেরত এই নারীও তাদের মধ্যে একজন।

কাতার সংকট: যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে দুর্বল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের ওপর এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে তেহরানের প্রভাব রুখতে যেই জোট গঠন করেছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, সেই উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) কাতার সংকটের কারণে এখন অনেক বেশি বিভাজিত ও দুর্বল। ইতিমধ্যেই সামরিক মহড়া সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়ে কাতারের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। বার্তাসংস্থা এপির এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, জিসিসি গঠিত হয়েছে ৬টি সদস্যরাষ্ট্রের সমন্বয়ে: বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। গত বছরের ৫ই জুন একযোগে কাতারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর। এ ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে কাতারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের চরমপন্থী গোষ্ঠীসমূহের প্রতি কাতারের সমর্থনকে সম্পর্কচ্ছেদের কারণ হিসেবে তুলে ধরে ওই চার দেশ। শুধু তা-ই নয়, কাতারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ ও আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়। সৌদি আরব বন্ধ করে দেয় কাতারের একমাত্র স্থলসীমান্ত। কাতারের জাহাজের জন্য এই চার প্রতিবেশী দেশের বন্দর ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
এই ঢামাঢোলের মধ্যে কাতার ইরানের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। যুক্তরাষ্ট্র ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পরও, কাতার একটুও নতি স্বীকার করেনি। এ কারণে আঞ্চলিক উত্তেজনার এই সময়ে জিসিসি এখন অথৈ সাগরে।
জিসিসিকে সবসময়ই ইরানের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হতো। মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হতো এই জোটকে। বাহরাইনে যেমন মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহর অবস্থান করছে। কুয়েতে রয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে রয়েছে আমেরিকান যুদ্ধবিমান, ড্রোহ ও সেনা। দুবাইর জেবেল আলি বন্দর হলো মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যস্ততম বৈদেশিক বন্দর। কাতারের প্রকান্ড আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে রয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। ওমানে কোনো মার্কিন সেনা নেই। তবে দেশটি নিজের বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয় মার্কিন বাহিনীকে। ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মার্কিন ও পশ্চিমা কূটনীতিকদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও কাজ করে ওমান। সৌদি আরব আবার ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল।
সৌদি আরব ও প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাত সাম্প্রতিককালে বেশ কট্টরপন্থী পররাষ্ট্রনীতি হাতে নিয়েছে। যেমনটা তাদের ইয়েমেন হস্তক্ষেপ থেকে প্রতীয়মান হয়। আবুধাবির ক্ষমতাধর ক্রাউন প্রিন্স শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (৫৭) ও সৌদি আরবের জেদী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বাহরাইন অনেকদিন ধরেই সৌদি অর্থের ওপর নির্ভরশীল। সৌদির অবস্থান যা, তা-ই বাহরাইনের।
কুয়েত শাসন করছেন ৮৮ বছর বয়সী শেখ সাবাহ আল আহমাদ আল সাবাহ। তিনি এই সংকট নিরসন করতে চেয়েছিলেন। ডিসেম্বরে কুয়েত জিসিসি সম্মেলন আয়োজন করে। এই সম্মেলনে বিরোধ মীমাংসার প্রত্যাশা ছিল কুয়েতের। তবে শেষ অবদি সৌদি ও আমিরাতের কারণে তা আর হয়ে উঠেনি।
ওমানের শাসক ৭৭ বছর বয়সী সুলতান কাবুস বিন সাইদ। বৃহত্তর জিসিসি’র চেয়ে নিজস্ব কূটনৈতিক পরিচয় নিয়ে সবসময় সচেষ্ট ছিল ওমান। ওমান আবার কাতারের ওপর অবরোধে সম্মত হয়নি। এমনকি এই সংকটে ওমানের বন্দর ব্যবহার করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে কাতার।
কুয়েত ও ওমান দুই দেশই কূটনৈতিক এই দ্বন্দ্বের চাপ অনুভব করেছে। দেশ দু’টির বয়োজ্যেষ্ঠ বাদশাহ ও সুলতানের উত্তরাধিকার নির্বাচনের কোনো প্রস্তুতিই নেই। সুলতান কাবুসের কোনো স্পষ্ট উত্তরাধিকারী নেই। অপরদিকে শেখ সাবাহর মৃত্যুর পর কুয়েতের রাজপরিবারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে গৃহবিবাদ সৃষ্টি হবে এমন সম্ভাবনাই বেশি।
এছাড়া চলমান সংকটে সৌদি ও আমিরাতি সংবাদ মাধ্যমে কাতারের শাসক শেখ তামিম বিন হামাদের ব্যপক সমালোচনা করা হয়। এমনকি কাতার রাজপরিবারের নির্বাসিত সদস্যদেরকে দেশটির সম্ভাব্য ভবিষ্যত শাসক হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় সৌদি ও আমিরাতে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কোনো দেশের রাজপরিবারের প্রকাশ্যে সমালোচনা বেশ বিরল। নব্বইয়ের দশকে সীমান্ত নিয়ে যেই বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল, তখনও এমনটা দেখা যায়নি। সৌদি ও আমিরাতের এই আচরণ ওমান ও কুয়েতের শাসকদের নজর নিশ্চয়ই এড়ায়নি।
সংকট চলাকালে কাতারের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা প্রায়ই দেখা গেছে। সৌদি ও আমিরাতের যেই সৈন্য ও অস্ত্রসস্ত্র রয়েছে, সেই তুলনায় কুয়েত, ওমান ও কাতারের তেমন কিছুই নেই।
আশির দশকে পারশ্য উপসাগরে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের যেই ঘোষণা দিয়েছিলেন ততকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, তখন থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন বাহিনী এনে রেখেছে। মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি বানিয়ে দেওয়াটা ছিল এই দেশগুলোর জন্য অনেকটা রক্ষাকবচের মতো। ৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ও পরবর্তীতে ইরাক ও আফগান যুদ্ধে এই ঘাঁটি আমেরিকার জন্য ভীষণ উপকারী ছিল।
কিন্তু এখন যখন উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাই বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে, আমেরিকার বিকল্প কী, তা স্পষ্ট নয়। ওদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়েও ক্রমেই অস্বস্তিতে আছে উপসাগরীয় দেশগুলো। কাতার সংকট শুরুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প তাতে সমর্থন দেন। অবশ্য পরে তিনি পুরোনো অবস্থান থেকে সরে আসেন। অপরদিকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেই তদন্ত চলছে আমেরিকায় তাতে নাম এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারেরও। অপরদিকে সংকটে জড়িত যেসব দেশ, তাদের প্রত্যেকেই ওয়াশিংটনে লবিস্টের পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে।
এখন পর্যন্ত, এই সংকটের ফলে কাতার ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক ভালো হয়েছে। সংকট শুরুর সঙ্গে সঙ্গে কাতার এয়ারওয়েজের জন্য নিজের আকাশসীমা খুলে দিয়েছে ইরান। এছাড়া দোহায় পাঠিয়েছে খাদ্যসামগ্রী। বিনিময়ে কাতার দেশটির সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে।

সিঙ্গাপুর সামিটে জিতেছেন কিম জং by মিসবাহুল হক

কয়েক মাসের অপেক্ষার পর অবশেষে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠকে বসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বাণিজ্য রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর তাদের সেন্তোসা দ্বীপের ক্যাপেলা হোটেলে দুই নেতার মধ্যে বৈঠকের আয়োজন করে। এই দেশটি বহু বছর ধরেই উভয় পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশে কিম জং উনের আবাসনের খরচ দেয়া নিয়ে বেশ জটিলতা রয়েছে। তাই উত্তর কোরিয়ার নেতার আবাসন, বৈঠকের প্রস্তুতিসহ দুই নেতার নিরাপত্তার জন্য সিঙ্গাপুর প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। কিম জংকে পিয়ংইয়ং থেকে ৩ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত সিঙ্গাপুরে পৌঁছে দেয়ার জন্য এয়ার চাইনা’র একটি বিমান দিয়েছে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন। সিঙ্গাপুরে বিরোধপূর্ণ দু’দেশের নেতার মধ্যে ঐতিহাসিক বৈঠকের সংবাদ সংগ্রহ করতে সিঙ্গাপুরে জড়ো হন হাজার হাজার সাংবাদিক।
তবে এসব মহাযজ্ঞ ও বিশাল প্রত্যাশার পরেও সামিটের ফলাফল ব্যাপক হতাশাজনক। যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার দেয়া যৌথ বিবৃতি ছিল খুবই সাধারণ একটি নথি। যাতে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো বাস্তব সমঝোতার উল্লেখ নেই। সর্বোপরি, সামিটের মূল অর্জন এটা হতে পারে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে একজন কুখ্যাত স্বৈরশাসককে বৈধতা দিয়েছেন।
অকারণে হইচই: দু’জনই বৈঠকে বসার জন্য মরিয়া ছিলেন। তবে সম্ভবত ট্রাম্প বেশি আগ্রহী ছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বৈদেশিক কূটনীতির প্রথম সাফল্য অর্জন করতে চেয়েছেন। কেননা, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তার অধীনে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে ধস নেমেছে। সম্প্রতি বাণিজ্য নীতি নিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর শুল্ক আরোপ, রাশিয়াকে আবারো জি-৭ এ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাতিলের ব্যাপক সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এমন অবস্থায় অল্প সময়ের জন্য হলেও ট্রাম্পকে কূটনৈতিক উত্থানের সুযোগ দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা। কিমের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি দুই দেশের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য কিমকে প্রস্তাব দিয়েছেন। এর জবাবে তুলনামূলক কম আগ্রহী উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম বলেন, ‘আমরা আছি, সবকিছু ঠিক করে ফেলবো।’
পরে এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্প ও কিম জং স্থায়ী, শক্তিশালী ও শান্তিপূর্ণ কোরিয়া উপদ্বীপ গঠন করার অঙ্গীকার করেন। আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পিয়ংইয়ংয়ের নিরাপত্তা দেয়ার অঙ্গীকার করে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, কোরিয়া উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার জন্য দু’দেশ দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবির কথা উল্লেখ ছিল না। সেটি হলো উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনার পুরোপুরি, যাচাইযোগ্য ও অপরিবর্তনীয় নিরস্ত্রীকরণ। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র পিয়ংইয়ংকে ঠিক কি ধরনের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিচ্ছে সে বিষয়টিও স্পষ্ট করেন নি ট্রাম্প। খুবই সাধারণভাবে দুই নেতা কোরিয়া উপদ্বীপকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য তাদের দৃঢ় ও অবিচল অঙ্গীকারের কথা বলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরিয়া উপদ্বীপের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য কোনো চুক্তি হলে তা বাস্তবায়নের জন্য এক দশকেরও বেশি সময় লাগতে পারে। সম্ভবত এ জন্য সত্যিকার একটি ফলপ্রসূ চুক্তির চেয়ে বৈঠক নিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ক্ষণিকের আলোড়নই ট্রাম্পের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ সামিটের ফলাফল হিসেবে কয়েকটি ‘সাধারণ বিবৃতি’ ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া কষ্টকর। চূড়ান্ত একটি চুক্তি করার আগ পর্যন্ত পরবর্তী বছরগুলোতে দুই নেতা পরস্পরের দেশে সফর করবেন। ইতিমধ্যেই হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে আরো বৈঠক হতে পারে।
কিম জং উনের বিজয়: যেহেতু সামিটের পর দেয়া যৌথ বিবৃতিতে বাস্তবসম্মত কোনো বক্তব্য ছিল না, তাই কিম জংই বৈঠকের বিজয়ীপক্ষ হিসেবে গণ্য হবেন। তিনি বিশ্ব তারকা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সমর্থনে উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিয়ে কিম তার দেশের বৈধতা আরো পোক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই নিঃসন্দেহে এই সামিট উত্তর কোরিয়াকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। চীন থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে যুক্তরাষ্ট্রÑ সব প্রভাবশালী দেশেরই সামিটের সমঝোতা এগিয়ে নেয়ার দায়বদ্ধতা রয়েছে। এছাড়া, বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়া বন্ধ করার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। পাশাপাশি কোরিয়া উপদ্বীপ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনা করবেন তিনি।
সামিটের ঘোষণা সিউলে অসন্তোষ উস্কে দিয়েছে। কিন্তু এই ঘোষণা উত্তর কোরিয়ার কাছে সুমধুর লেগেছে।
কেননা, তারা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি পেয়েছে। ডনাল্ড ট্রাম্প বারবার কিম জংয়ের প্রশংসা করছেন। দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গল্প শোনাচ্ছেন। তখনও বিচ্ছিন্ন দেশটি আস্তে আস্তেÍ চুপিসারে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ট্রাম্প ও কিম জংকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়ারও কথা উঠেছে।
নিশ্চিতভাবেই (উত্তর কোরিয়ার) সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আর আলোচনার টেবিলে নেই। সময়ের পরিক্রমায় এটি যেকোনো বিষয়ের আন্তর্জাতিক সমাধানের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার ব্যাপারে অনেক দেশের আগ্রহ কমে যেতে পারে। তাই সিঙ্গাপুর সামিট প্রকৃতপক্ষেই কিম জংয়ের জন্য বড় বিজয়। যা তাকে কৌশলগত অবকাশ দিয়েছে। পরবর্তী মাসগুলোতে, উত্তর কোরিয়া দাবা খেলার মতো করে পরবর্তী পদক্ষেপ সাজাবে। দীর্ঘ সমঝোতার পর স্থায়ী ও চূড়ান্ত চুক্তির দিকে অগ্রসর হবে।
(আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে)

ঈদ ছুটিতে দেশের বাইরে রেকর্ড সংখ্যক কর্মকর্তা by দীন ইসলাম

প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ ছুটিতে রেকর্ড সংখ্যক কর্মকর্তা বিদেশ যাচ্ছেন। বিদেশ যাত্রায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সংখ্যাই বেশি। বেশির ভাগ কর্মকর্তা তীর্থস্থান ভ্রমণের জন্য ভারত যাচ্ছেন। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদ করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা  যাচ্ছেন। শিক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন পাঁচ শতাধিক সরকারি আদেশ জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ ও ১২ই জুন সবচেয়ে বেশি সরকারি আদেশ জারি করা হয়েছে। এছাড়া গতকালও কয়েকটি আদেশ জারি করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গতকালও কয়েক জন কর্মকর্তা ছুটিতে যাওয়ার সরকারি আদেশ পেয়েছেন। এদিন টিকিউআই-২ প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক ড. রেহেনা খাতুন ভারতে ভ্রমণের জন্য সাত দিনের ছুটি পেয়েছেন। একই দিন ইডেন মহিলা কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা তুজ জোহরা ওমান, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্স সফরের জন্য ১৬ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি পেয়েছেন। এছাড়া সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক মিতা ভট্টাচার্য্য ভারত সফরের জন্য ১৫ দিন, পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপক প্রফেসর ড. মো. শাহজাহান ভারত ও ভুটান সফরের জন্য ১১ দিন, টঙ্গী সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. আহমাদুল্লাহ মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর সফরের জন্য আট দিন, সরকারি তোলারাম কলেজের সহকারী অধ্যাপক খালেদা আক্তার ভারত সফরের জন্য আট দিন, সরকারি তিতুমীর কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গুলশান আরা বেগম যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের জন্য ২৭ দিন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া সফরের জন্য ইংরেজির সহকারী অধ্যাপক তামান্না মুস্তারী সাত দিন, বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যাপক জিনুন নাহার ভারত সফরের জন্য ১০ দিন, ঢাকা কলেজের পরিসংখ্যানের সহযোগী অধ্যাপক মোসাঃ রাফিজা বেগম যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের জন্য ১৫ দিনের ছুটিসহ অনেক কলেজ শিক্ষক ঈদের ছুটিতে দেশের বাইরে যাচ্ছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপকদের মধ্যে আরো তিন শতাধিক শিক্ষক ঈদের ছুটিতে বিদেশে গেছেন। কলেজ শিক্ষকদের বাইরেও ১১ই জুন গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফৌজিয়া আহমেদকে যুক্তরাষ্ট্র যেতে ১২০ দিনের ছুটি দেয়া হয়েছে। এছাড়া ১০ই জুন জারি করা দুইটি আদেশে সাত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে বিদেশ যাত্রার জন্য ছুটি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ জন কর্মকর্তা ভারতে তীর্থস্থান ভ্রমণের জন্য যাবেন। এদিকে রোজার সময় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে অনেক কর্মকর্তা ওমরাহ হজ করতে ছুটি নিয়ে গেছেন। এছাড়া অনেক কর্মকর্তা হজের জন্য আগাম ৪৯ দিনের ছুটি নিয়েছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মকর্তা ঈদের আগে ভারত, ভুটান, নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে গেছেন। আবার কোনো কোনো কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশে ঈদের ছুটি কাটাচ্ছেন। এ বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের মধ্যে রীতিমতো বিদেশ যাত্রার হিড়িক পড়েছে এবার। চিকিৎসকদের অনেকে এরই মধ্যে ভারতের ধর্মীয় স্থান আজমীর শরিফ ও দর্শনীয় স্থান আগ্রাসহ আরো কয়েকটি স্থানে যাওয়ার জন্য ঈদের আগে জিও নিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া আবেদনে কর্মকর্তারা ঈদের ছুটিতে ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পরিদর্শনে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ঈদের আগে এ সংক্রান্ত অন্তত ৩০টি সরকারি আদেশ জারি করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপকরা ঈদের ছুটিতে সবচেয়ে বেশি দেশের বাইরে গেছেন। তারা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও নিজের খরচে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার কথা আবেদনে উল্লেখ করেছেন। রমজানের শুরু থেকেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপ-সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব ও সহকারী সচিব পদমর্যাদার শতাধিক কর্মকর্তা এবার ঈদের ছুটিতে বিদেশে গেছেন। অধিকাংশ কর্মকর্তাই বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে বিদেশে গেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব বলেন, ঈদ এলেই কর্মকর্তারা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। এছাড়া ধর্মীয় ও দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করতেও অনেকে ছুটে যান। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের চার থেকে পাঁচজন প্রকৌশলী ঈদের ছুটিতে দেশের বাইরে রয়েছেন। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাও ঈদের ছুটিতে দেশের বাইরে গেছেন। তবে এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণপত্র সংগ্রহ করে তা ছুটির আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। অধিকাংশ কর্মকর্তার ছুটির প্রক্রিয়া শেষ করে সরকারি আদেশ জারি করা হয় ঈদের আগেই। এসব ক্যাডার পদে কর্মকর্তাদের বাইরে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, খাদ্য অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ ব্যুরো, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) শতাধিক কর্মকর্তা এবার ঈদের ছুটি দেশের বাইরে কাটাচ্ছেন। গতকাল সরকারিভাবে অফিস-আদালত খোলা থাকলেও এদের কেউ অফিসে হাজির হননি।

গন্তব্য কোথায়?

বাবার রক্তে মিশে থাকা রাজনীতির সূত্র ধরেই রাজনীতিতে নেমেছিলেন তিনি। ব্রত ছিল জনসেবার। কিন্তু এ পথটি যে বড়ই কণ্টকাকীর্ণ তা খুব অল্পতেই টের পেয়েছিলেন তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। আর তাই তো প্রথমে মন্ত্রিত্ব পরে জনপ্রতিনিধির তালিকা থেকে নাম কাটিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু ঠিক কী কারণে এতো অভিমান জমেছিল তরুণ প্রজন্মের এ নেতার মনে তার কিছুই খোলাসা হয়নি। হাওয়ায় নানা কথা ভেসে বেরিয়েছে। কেউ বলছেন, নিজের মতো করে কাজ করতে পারছিলেন না বলেই তিনি স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে নির্বাসনে যান।
কেউ বলছেন, সহকর্মীদের কারও কাছ থেকে রুষ্ট আচরণে মনোকষ্ট নিয়ে রাজনীতিতে দূরে সরে যান সোহেল তাজ। অনেক দিন পর্দার আড়ালে থাকা এই নেতার সাম্প্রতিক দুটি ফেসবুক স্ট্যাটাস নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রথম স্ট্যাটাসে নতুন প্রজন্মের জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছা পোষণ করার পর থেকে তাতে ব্যাপক লাইক কমেন্ট পড়ে। অনেকে জানতে চান কী নিয়ে আসছেন সোহেল তাজ। তিনি কী ফের রাজনীতিতে ফিরছেন নাকি অন্য কোনো উদ্যোগ নিয়ে তরুণদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন- এমন প্রশ্ন জেগেছে অনেকের মনে। সোহেল তাজের পরের স্ট্যাটাসে নতুন করে প্রশ্ন জেগেছে তার সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে। সেখানে তিনি লেখেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে আওয়ামী লীগের ভেতরে একটি কুচক্রী মহল তাজউদ্দীনের পরিবার ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে আওয়ামী রাজনীতি থেকে তাজউদ্দীন পরিবারকে সরিয়ে ফেলতে চায়। এদের প্রভাব দলের ভেতরে ও প্রশাসনের সর্বস্তরে। আমার প্রিয় কাপাসিয়াবাসীর কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা কাপাসিয়াতে কোনো অপরাজনীতি হতে দেবেন না।’ সোহেল তাজ তার ওই লেখার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমেদের একটি ছবি পোস্ট করেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সাড়ে ৯ হাজার মানুষ পোস্টটিতে রিঅ্যাক্ট করেছেন।
কমেন্ট এসেছে ৮২৩টি আর শেয়ার হয়েছে হাজার বারের বেশি। এর আগে গেল ৩১শে মে আরেকটি পোস্টে সোহেল তাজ লিখেছিলেন, অনেক দিন ধরেই মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্য, বিশেষ করে দেশের যুব সমাজের জন্য ভালো কিছু করার কথা ভাবছি। এই পোস্টটিতে রিঅ?্যাক্ট করেছেন ৪২ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী। এতে মন্তব্য রয়েছে প্রায় সাত হাজার আর শেয়ার হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩শ’ বারের বেশি। পোস্টে দেয়া মন্তব্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সোহেল তাজের ফেসবুক ফলোয়াররা তাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং এমন কোনো উদ্যোগে তার পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ফেসবুকে দেয়া দুই পোস্টের বিষয়ে সোহেল তাজের সমর্থকরা নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে সোহেল তাজ কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর তরুণ প্রজন্মের মাঝে তুমুল জনপ্রিয় এ নেতা রাজনীতিতে ফিরলে প্রবল প্রতাপেই ফিরতে চান। এজন্য আগে থেকেই বার্তা দিয়ে রাখছেন। অনেকে বলছেন- যাদের কারণে হতাশা নিয়ে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে গিয়েছিলেন তাদের উদ্দেশ্যেই হয়তো কোনো বার্তা দিতে চাইছেন সোহেল তাজ।
উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের পুত্র সোহেল তাজ ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে, মন্ত্রিত্ব পাওয়ার ছ’মাস পরই ৩১শে মে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে সোহেল তাজ বলেছিলেন, ‘মন্ত্রীর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারায় আমি স্বজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছি।’ যদিও দীর্ঘদিন তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি। পরে তিনি চিঠি দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে তার পদত্যাগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির অনুরোধ করেন। পরে ২০১২ সালের ২৩শে এপ্রিল তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকেও পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই রাজনীতি থেকে অনেকটা আড়ালে চলে যান সোহেল তাজ।

সিলেট সিটি নির্বাচন: সবাই চান অর্থমন্ত্রীর সুনজর by ওয়েছ খছরু

সিলেট নগরীতে গেল ৫ বছরে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। প্রায় ২৯ মাস জেলে ছিলেন মেয়র আরিফ। এরপরও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি। অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে তখনকার সিও এনামুল হাবিব নগরের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন। টাকা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আর কাজ করিয়েছেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ কারণে উন্নয়ন হয়েছে সিলেটে। এই উন্নয়নের সিংহভাগ ভাগীদার হয়েছেন মেয়র আরিফ। এ কারণে সিলেটের রাজনীতির মাঠে গুঞ্জন রয়েছে- আরিফের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর সখ্য রয়েছে। প্রায় তিন বছর আগে গাভিয়ার খাল উদ্ধারের সময় একসঙ্গে রিকশায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তারা দু’জন। এই সখ্যে এবার  নিজ দল আওয়ামী লীগের ভেতরে কদর বেড়েছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের। গেল নির্বাচনে দলের ভেতরে অর্থমন্ত্রীর তেমন গুরুত্ব ছিল না। তার গ্রুপের কর্মীরা মাঠে নামলেও জোরালো ভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সঙ্গে মাঠে নামেননি। অর্থমন্ত্রী বলয়ের প্রতি এই ক্ষোভ রয়েছে সিলেট সিটির সাবেক মেয়র কামরানের। আর আরিফ নির্বাচিত হওয়ার সিলেটের উন্নয়নে তিনি অর্থমন্ত্রীর সহায়তা চান। গত মঙ্গলবার সিলেট সিটি করপোরেশনের বাজেট বক্তৃতায়ও আরিফ অর্থমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। একই সঙ্গে তিনি তার দীর্ঘায়ুও কামনা করেন। বাজেটসহ নানা কারণে দীর্ঘ দিন সিলেটে অনুপস্থিত অর্থমন্ত্রী। সংসদে বাজেট ঘোষণার পর তিনি গতকাল সিলেটে আসেন। এলাকার সংসদ হলেও অর্থমন্ত্রী এতো দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থেকে সিলেটবাসীকে হতাশ করেননি। কিন্তু এবার ছিল তার ব্যতিক্রম। আর গতকাল সিলেটে আসার পর দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা এবার তার দিকে ঝুঁকছেন বেশি। এর অন্যতম কারন হচ্ছে- আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বর্তমান মেয়র আরিফকে নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। তিনি যেহেতু আরিফকে উন্নয়নের টাকা দিতে কার্পণ্যবোধ করেননি সেহেতু আরিফ অর্থমন্ত্রীর সুনজরে পেতে পারেন। ইতোমধ্যে সিলেটের অর্থমন্ত্রী বলয়ের নেতারাও সেই ভূমিকা পালন করছেন। সিলেট আওয়ামী লীগ থেকে এখন পর্যন্ত মেয়র পদে প্রার্থী হচ্ছে ৩ জন। এর মধ্যে মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত করে বসে আছেন সাবেক মেয়র ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন উদ্দিন আহমদ কামরান। তিনি গেল নির্বাচনে পরাজয় বরণের পর থেকে মাঠে রয়েছেন। নির্বাচনে টিকিট পেতে ইতোমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। সঙ্গে রয়েছেন সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মাহি উদ্দিন আহমদ সেলিম। মহানগর সম্পাদক আসাদ উদ্দিনের প্রতি রয়েছে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের সুনজর। এরপরও আসাদ উদ্দিন আহমদ নিজেকে যোগ্য প্রার্থী মনে করে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। তাকে ঘিরে একটি বলয়ও তৈরি হয়েছে। আর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক মাহিউদ্দিন আহমদ সেলিম অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সুনজর নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নামতে চান। মাহি সেলিম অর্থমন্ত্রী বলয়ের নেতা বলে সিলেট আওয়ামী লীগের কর্মীরা মনে করেন। অর্থমন্ত্রী বলয়ের নেতা শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ও বিজিত চৌধুরীর সঙ্গে টিমওয়ার্ক গড়ে সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনে কাজ করছেন তিনি। বাজেট পেশ করে গতকাল সিলেটে আসেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সঙ্গে আসেন তার ছোটো ভাই ড. একে আবদুল মোমেনসহ পরিবারের সদস্যরা। অর্থমন্ত্রী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এবার ঈদ পালন করবেন সিলেটে। তাকে বরন করতে বিমানবন্দরে ছুটে যান সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও মাহিউদ্দিন আহমদ সেলিম। তারা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে গতকাল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শরীক হন। এবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আর সম্পর্কের গ্যাপ রাখতে চান না কামরান। এ কারণে গেল নির্বাচন থেকে কামরান অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। বরং যতটুকু পেরেছেন নিজের মতো করেছেন। সিলেটে অর্থমন্ত্রীকে যন্ত্রনা দেয়ার মতো রাজনীতিতে নেই কামরান। তবে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়েছে। একই সঙ্গে আসাদউদ্দিন আহমদও ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন।

কল্পনা চাকমা ইস্যুতে রহস্যময় আচরণ by কাজী সোহাগ

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেত্রী কল্পনা চাকমা অন্তর্ধান হয়েছেন ২২ বছর আগে। আজও তার অন্তর্ধানের রহস্য খোলাসা হয়নি। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সেখানেও ইস্যুটি রয়েছে অমীমাংসিত। সর্বশেষ ২৫শে এপ্রিল রাঙ্গামাটি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে কল্পনা চাকমার কথিত অপহরণ মামলার শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত ৯ই জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। অথচ কল্পনা চাকমার বিষয়টি নিয়ে উপজাতিদের কয়েকটি সংগঠন পাহাড়ে আজও জল ঘোলা করার চেষ্টা করছে। নানা ধরনের উস্কানিমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে উত্তাপ ছড়িয়ে দেয়ার কৌশল করছে। এ নিয়ে বিদেশ থেকে ফান্ড আনারও অভিযোগ রয়েছে। সভা-সমিতি, বক্তৃতা আর বিবৃতির মাধ্যমে বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখছেন এ ইস্যুটি। একইসঙ্গে দেশের অখণ্ডতার ধারক-বাহক সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নেরও চেষ্টা হচ্ছে। শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ আড়াল ও সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ করতে এ চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই আলোচিত অপহরণ মামলার ব্যাপারে কল্পনা চাকমার পরিবার ও পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আচরণও রহস্যজনক। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে নারাজি দিয়ে কথিত অপহরণ মামলাটি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ১১ই জুন কল্পনা চাকমার অন্তর্ধান দিবস হিসেবে পালন করে আসছে উপজাতিদের কয়েকটি সংগঠন। ১৯৯৬ সালের এই দিনে কল্পনা চাকমা অন্তরালে যান বলে জানান। অবশ্য কেউ বলেন অপহরণ করে তাকে গুম করা হয়েছে আবার কেউ বলেন স্বেচ্ছায় অন্তর্ধান হয়েছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মূলত কল্পনা চাকমাকে পুঁজি করে অনেকেই এখন আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর সরকার সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল জলিলকে সভাপতি করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি কল্পনা চাকমা নিজ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক অপহৃত হয়েছে বলে মতামত দেন। কিন্তু কার দ্বারা অপহৃত হয়েছে তা নির্ণয় করতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। এ প্রেক্ষিতে তারা কারও বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেনি। ১৯৯৭ সালের ১৭ই জানুয়ারি বাঘাইছড়ি থানার মামলাটি জেলার বিশেষ শাখায় হস্তান্তর করা হয়। এরপর ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর মামলাটি আবারো বাঘাইছড়ি থানা গ্রহণ করে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে ২০১০ সালের ২১শে মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। মামলার বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা এর বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করলে আদালত ২০১০ সালের ২রা সেপ্টেম্বর মামলাটি তদন্তে সিআইডির চট্টগ্রাম জোনকে নির্দেশ দেয়। সিআইডি দীর্ঘ ২ বছর তদন্ত করে ২০১২ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু কালিন্দী চাকমা আবারো নারাজি দেন। আদালত তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপারকে তদন্ত ভার দিয়ে ৪ দফা নির্দেশনা দেয়। পুলিশ সুপার দীর্ঘ তদন্ত চালান। তদন্তের স্বার্থে কল্পনা চাকমার দুই বড় ভাইয়ের ডিএনএ সংগ্রহের জন্য অনুমতি চাইলে আদালত ২০১৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর নমুনা সংগ্রহের আদেশ দেন। কিন্তু কালিন্দী কুমার চাকমা এবং লালবিহারি চাকমা (ক্ষুদিরাম) ডিএনএ দিতে রাজি হননি। তারা ২০১৪ সালের ৬ই মার্চ আদালতের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেন। কিন্তু আদালত তার আদেশ বহাল রাখেন। পরে পুলিশ দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়েও কল্পনা চাকমার অপহরণ সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রমাণ এবং সাক্ষী পায়নি। এ প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৫ই সেপ্টেম্বর মামলার কার্যক্রম বন্ধের জন্য আদালতে আবেদন করে। আবেদনটি এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। এদিকে কল্পনা চাকমা ইস্যু নিয়ে কাজ করা একটি তদন্ত সংস্থা মানবজমিনকে জানিয়েছে, ঘটনার তদন্তে পুলিশ কল্পনা চাকমার বাসায় গেলে তার ব্যবহার্য পোশাক থেকে শুরু করে বই-পুস্তক, তৈজসপত্র কিছুই খুঁজে পায়নি। এমনকি কল্পনা চাকমার মা বাধুনি চাকমা পর্যন্ত বলেছিলেন যে, কল্পিত অন্তর্ধানের পরও তার মেয়ে দু’বার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের ১লা আগস্ট সে যোগাযোগ করেছিল। কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনা নিয়ে মামলায় বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ১১ই জুন রাত একটায় লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসের নেতৃত্বে একদল সৈনিক কল্পনা চাকমাসহ তার দুই ভাইকে অপহরণ করে। তার ভাইয়েরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ২৩ বছর বয়সী কল্পনা চাকমাকে গুম করা হয়েছে। কালিন্দী কুমার চাকমা ঘটনার পরদিন ১২ই জুন বাঘাইছড়ি থানায় যে মামলা করে (মামলা নং-২/৯৬১, তারিখ-১২.০৬.১৯৯৬ ইং, ধারা-৩৪৬) সেখানে কিছু অপরিচিত লোকের কথা থাকলেও সেনাবাহিনী এবং গোলাগুলির কথা বলা হয়নি। অথচ বিশেষ ওই মহলের ইন্ধনে ১৩ই জুন লালবিহারি চাকমা দাবি করেন যে, রাতের আঁধারে কিংবা টর্চ লাইটের আলোয় লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসসহ তিনজন সেনা সদস্যকে চিনতে পেরেছে। মামলায় এসব কথা যোগ করা হলে কয়েক দফা তদন্তে এর সত্যতা পায়নি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এ প্রসঙ্গে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মানবজমিনকে জানান, লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ঘটনার দিন সকালে নির্বাচন উপলক্ষে দায়িত্ব পালনের জন্য উগলছড়ি ক্যাম্পে আসেন। যা কল্পনা চাকমার বাড়ির কাছেই ছিল। আর সেই ক্যাম্পে লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস একা নয়, ক্যাম্পে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, একজন মেজরসহ আরো দু’জন অফিসার এবং প্রায় ৯০ জন সৈনিক ছিল। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও নির্বাচন পরিচালনা কাজে নিয়োজিত প্রিজাইডিং অফিসার জ্ঞানময় চাকমা, পুলিশের সুবেদার ইদ্রিস আলীসহ ৬ জন পুলিশ কনস্টেবল ওইদিন উগলছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাত যাপন করে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এতজন লোকের মাঝে লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস কয়েকজন সৈনিক নিয়ে একটা অপহরণের ঘটনা ঘটালো, গোলাগুলি করলো অথচ কেউ গোলাগুলির শব্দ শুনলো না বা চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দও শুনলো না? অথচ কে না জানে পার্বত্য এলাকার রাতের নিস্তব্ধ নিরিবিলি পরিবেশে এ ধরনের শব্দ অনেকদূর পর্যন্ত শুনতে পাওয়ার কথা। বলা হয়, কল্পনা চাকমার ভাইদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল।
সেক্ষেত্রে কারও গায়ে গুলির আঁচড় পর্যন্ত নেই কেন? তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রশ্ন আসতে পারে, সেনা ক্যাম্পে বেশ কয়েকজন অফিসার থাকতে কেন লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসকে নিয়ে এই অপপ্রচার। আসলে লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস-এর ওপরে শান্তিবাহিনীর ক্ষোভ অনেক পুরনো। সে সময়ে বাঘাইছড়ি এলাকায় অনেক সফল অভিযানের নায়ক তিনি। একারণেই তার ওপরে প্রতিশোধ নিতেই এ অপহরণ নাটকের দৃশ্যায়ন করা হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কল্পনা চাকমা ইস্যুতে বছরের পর বছর লাভবান হচ্ছেন এমন পাহাড়ি সংগঠনগুলো সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ আড়াল ও সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ করতে তাদের এ প্রচেষ্টা।

খুলনার রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া

বিভাগীয় সদর খুলনার রাজনীতি ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুলনার রাজনীতিতে পটপরিবর্তনের হাওয়া বইছে। খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনের অন্তত চারটিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নতুন প্রার্থীর আত্মপ্রকাশ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে সম্ভাব্য এসব প্রার্থীর সামাজিক কর্মকাণ্ডে এসব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অপরদিকে, রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি প্রায় একযুগ স্রোতের বিপরীতে। চেয়ারপারসনের কারামুক্তির ভাবনায় দলটির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী এ দুই দলের বাইরে সদ্য সম্পন্ন সিটি নির্বাচনে জামানত হারিয়ে চুপষে গেছে জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও সিপিবি। প্রকাশ্যে নেই জামায়াতে ইসলামী। তৎপরতা নেই বললেই চলে অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গেল ৩রা মার্চ খুলনা সার্কিট হাউজে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভার পর থেকেই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু’র ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি’র বক্তৃতার পর সাবেক ফুটবলার শিল্পপতি আবদুস সালাম মুর্শেদীর বক্তব্যে খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনের দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দেয়ার ঘোষণা দেন। মঞ্চে এ সময় উপস্থিত ছিলেন- আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলটির নীতি-নির্ধারকরা আলোচনায় আসেন সালাম মুর্শেদী। তিনি খুলনা-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের একটি অংশ এখন তাকে ঘিরে। নানান কারণে কোণঠাসা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান।
এদিকে, প্রায় বছরখানেক খুলনার রাজনীতিতে সক্রিয় কেন্দ্রীয় নেতা এসএম কামাল হোসেন। তিনি খুলনা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে দাবি তার কর্মী-সমর্থকদের। সাবেক প্রতিমন্ত্রী বর্তমান সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিয়ানকে সমপ্রতি দলীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নেতা-কর্মীদের খুব একটা চোখে পড়ছে না। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেকটা সুস্থ হয়ে ফিরেছেন খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা। শারীরিকভাবে উপযুক্ত থাকলে আগামী নির্বাচনেও তিনি অংশ নিবেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। তবে, কোনো ব্যত্যয় ঘটলে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামরুজ্জামান জামাল আসনটিতে মনোনয়ন প্রত্যাশী। খুলনা-৫ আসনে মৎস্য মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত হলেও আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন। খুলনা-৬ আসনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলটির প্রার্থী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর অথনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। এ রমজানে তিনি সুন্দরবন ঘেঁষা দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইফতার মাহফিলে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে বর্তমান সংসদ সদস্য এডভোকেট নুরুল হক এবং আন্তঃকোন্দলে অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা চাপে রয়েছেন। খুলনা-১ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য ননী গোপাল, উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ আবুল হোসেন, আশরাফুল আলম খান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদের ভ্রাতুষ্পুত্র হাদি উজ জামান (ইউপি চেয়ারম্যান) সম্ভাব্য প্রার্থী। এসব কারণে রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস।
নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক বললেন, ‘দল যাকে যেখানে প্রয়োজন মনে করে মনোনয়ন দেবে দলের প্রত্যেকটি নেতা-কর্মী তার হয়ে সেখানে কাজ করবো। এখানে অন্য কোন কথা নেই, আগে দলের সিদ্ধান্ত।’
এদিকে, বিএনপি’র সমর্থনে কেসিসি নির্বাচনে নির্বাচিতসহ ছয়-সাতজন কাউন্সিলর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান সময়ের ব্যাপার মাত্র বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ঈদের পর সুবিধাজনক সময়ে বা একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরে এসব কাউন্সিলরদের নগর আওয়ামী লীগের পদ-পদবীও দেয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন চলছে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এসএম কামাল হোসেন বলেন, আলোচনা চলছে। তারা আওয়ামী লীগের মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে দলে যোগদান করতেও পারেন।
অপরদিকে, আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে দলটির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। সদ্য সমাপ্ত কেসিসি নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা সামনে রেখে দলটি মূল ভাবনা এখন যেকোন মূল্যে দলীয় প্রধানের কারামুক্তি।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগরী সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বললেন, ‘দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বিএনপি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে সার্বক্ষণিক নির্বাচনমুখী। তবে সে নির্বাচন কোন ভোট ডাকাতদের অধীনে নয়, কোন রাজনৈতিক দলের অধীনে নয়; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে নয়। একটি সহায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যদিও আমাদের সামনে এখন বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তির আন্দোলন ব্যতীত অন্য কোন ভাবনা নেই। তার কারামুক্তির পরেই অন্য বিষয়ে ভেবে দেখবো।’

বিশ্ব কুদস দিবস: ইহুদিবাদের আতঙ্ক

ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ইহুদিবাদীদের দখলে যাবার প্রায় ৭১ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিনিদেরকে প্রতিদিনই নতুন নতুন অত্যাচার-নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফিলিস্তিন জবর দখলের ছয় দশক পার হবার পরও ইসরাইল বিপর্যয়কর নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রেখেছে।
তাদের এই ন্যক্কারজনক আগ্রাসনের প্রতি অকুণ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মজলুম জনতা তাদের দেশের ভূখণ্ডকে স্বাধীন করার তথা ইহুদিবাদী দখলমুক্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্রও হাল ছাড়ে নি। ইরানের জনগণ সেই বিপ্লব বিজয়ের আগে থেকেই ফিলিস্তিনের মজলুম জনগোষ্ঠীকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে।
এই পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের ঘটনা স্বৈরাচারী শাহ বিরোধী বিপ্লবী গণ-আন্দোলনের সময় এবং ইসলামী বিপ্লব বিজয় পরবর্তীকালে ইসলামী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয় ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইলের গালে মারাত্মক চপেটাঘাত। কেননা ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইসরাইলী স্বার্থে মারাত্মক আঘাত আসে বলে সে সময় বলা হয়েছিল। বিপ্লব বিজয় পরবর্তীকালের ঘটনাপঞ্জী এর সত্যতা ও যথার্থতা প্রমাণ করেছে। কেননা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) কেবল ইরানের জনগণকেই নয় বরং বিশ্বের সকল মুসলমান ও স্বাধীনচেতা মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন ফিলিস্তিনদের সাহায্যে এগিয়ে আসার।
ইরানে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ) ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বিষাক্ত টিউমার বা ক্যান্সার বলে অভিহিত করেছেন। ফিলিস্তিনের সংগ্রামী জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের অধিকারের প্রতি সাহায্য-সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার জন্যে রমযানের শেষ শুক্রবারে বিচিত্র কর্মসূচি, অনুষ্ঠান ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনীদের প্রতি পরিপূর্ণ সমর্থন ঘোষণার আহ্বান জানান।
বিশ্ববাসী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব তাঁর এই আহ্বানে ব্যাপক সাড়া দেয় এবং এই দিনকে কুদস দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে। প্রায় তিন দশক হতে চললো বিশ্বের মুসলমানরা রমযান মাসের শেষ শুক্রবারে মিছিল, মিটিং, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনীদের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে আসছে। একই দিনে বিশ্বজুড়ে জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ফিলিস্তিনীদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত রাখা এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানকারী শক্তিগুলো ভালো করেই জানে যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুদস দিবস পালনের ঘটনা প্রমাণ করে ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকারের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের সমর্থন আছে এবং ইসরাইলের প্রতি রয়েছে তাদের তীব্র ঘৃণা। বিশ্ব মুসলমানের এই সমর্থন ফিলিস্তিনীদের প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত ও প্রাণিত করে। তবে কোনো কোনো আরব এবং মুসলিম দেশ কুদস দিবস পালনের ব্যাপারে তেমন একটা সন্তুষ্ট নয়। এমনকি কোনো কোনো দেশ তো কুদস দিবসের কর্মসূচি পালনে বাধাই দেয়। মনে হয় কুদস দিবস পালনে বাধাদানকারী দেশগুলো এ বিষয়ে অসন্তুষ্ট যে,ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ফিলিস্তিনী জনগণের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী এই গণসচেতনতা সৃষ্টিকারী ও গণজাগরণমূলক পদক্ষেপ বা আন্দোলনের ঝাণ্ডা উত্তোলনকারী। কোনো কোনো আরব দেশ মনে করে ফিলিস্তিন সমস্যাটি একান্তই আরবদের ব্যাপার। তাই ফিলিস্তিনী জনগণের সমর্থনে ইরানের এই উদ্যোগকে তারা মেনে নিচ্ছে না। কিন্তু এই দেশগুলো যদি সত্যি সত্যিই ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তির চিন্তা করতো তাহলে তাদের উচিত ছিল ফিলিস্তিনীদের সমর্থনে এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে যে-কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন,সেই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো এবং সেইসব কর্মসূচিকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা করা।
অবশ্য কোনো কোনো আরব দেশের কুদস দিবস পালনের বিরোধিতার আরো একটি কারণ আছে তাহলো ইসরাইলের সাথে তাদের গোপন ও প্রকাশ্য যোগসাজশ। তারা মনে করে, ইসরাইলকে কিছুটা সুবিধা বা ছাড় দিলে দখলদার ইসরাইল ফিলিস্তিন ভূখণ্ড থেকে পিছু হটে যাবে এবং ফিলিস্তিনের ওপর তারা তাদের দমন অভিযান বন্ধ করে দেবে। কিন্তু ইসরাইলী আধিপত্যবাদীদের বিগত দিনের স্বভাব বা আচরণ প্রমাণ করেছে, তারা যে কেবল ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারেই নারাজ তাই নয়,বরং তারা চায় ফিলিস্তিনে বিভিন্ন প্রকার ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বংশনিধন করতে। এছাড়াও ইসরাইলী নেতারা বিভিন্ন আরব দেশ এবং ফিলিস্তিনী স্বাধীনতাকামী দলগুলোর সাথে যেসব চুক্তি করেছে সেগুলোকে ঠাণ্ডামাথায় পদদলিত করেছে।
আসলে ইসরাইল আন্তর্জাতিক কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কাই করে না। অসলো চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিন সরকারের অস্তিত্বকেই ইসরাইল আজ পর্যন্ত স্বীকার করে নি। এমনকি যেসব ফিলিস্তিনী ইসরাইলীদের অত্যাচারে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোনো দেশে শরণার্থী হিসেবে জীবনযাপন করছে,তাদেরকে পর্যন্ত তাদের স্বদেশ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন করতে দিচ্ছে না। উল্টো তারা অধিকৃত ভূখণ্ডে আরো বেশি ইহুদিবাদী বসতি গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইহুদিবাদী ইসরাইলের নির্যাতনের ইতিহাসের কালো পাতাগুলো উল্টালে দেখা যাবে যে, আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে কখনোই দমানো যায় নি,বরং কুদস দিবস পালন কিংবা মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ চাপের মাধ্যমে তাদেরকে কিছুটা দমানো সম্ভব হয়েছে।
মাসজিদুল আকসা হলো মুসলমানদের পবিত্রতম স্থানগুলোর একটি। কারণ এটি ছিল মুসলমানদের প্রথম কেবলা। অথচ ইহুদিবাদী ইসরাইল বেশ কবছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে মাসজিদুল আকসাকে ধ্বংস করে দিয়ে ঐ ধ্বংসাবশেষের ওপর তাদের উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করতে। সম্প্রতি মসজিদুল আকসা ধ্বংসের এ কার্যক্রম অনেক বেড়ে গেছে। পর্যটন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করাসহ বিভিন্ন অজুহাতে তারা মাসজিদুল আকসার নীচে দিয়ে টানেল তৈরির জন্যে খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ইহুদিবাদীরা কুদসকে তাদের রাজধানী মনে করে। তাই তারা সেখান থেকে যে-কোনো উপায়ে ফিলিস্তিনী মুসলমানদের বিতাড়িত করে ইহুদিবাদীদেরকে স্থলাভিষিক্ত করাতে চাচ্ছে। এরিমাঝে বায়তুল মুকাদ্দাসের সাংস্কৃতিক পরিচয় পরিবর্তনের লক্ষ্যে সেখানকার মুসলমানদের কবরগুলো ধ্বংস করতে শুরু করেছে । বর্ণবাদী প্রাচীর নির্মাণের কাজও দ্রুততার সাথে চলছে।
এতোসব ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম সত্ত্বেও কোনো কোনো আরব দেশ আধিপত্যবাদী ইসরাইলের সাথে সমঝোতাকে সম্ভব বলে মনে করে এবং চেষ্টা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাথে সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে। অথচ বাস্তবতা হলো ইসরাইল, আরব কিংবা ফিলিস্তিনীদের সাথে কোনো চুক্তিই এখন পর্যন্ত রক্ষা করে নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসরাইলীদের সাথে চুক্তির ফলে ফিলিস্তিনীদের জন্যে আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই অর্জিত হয় নি। তাই যথার্থ উপায় হলো অধিকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনীদের সুদৃঢ় উত্থান এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে কুদস দিবসের মতো বিভিন্ন উপলক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মুহূর্মুহু প্রতিবাদ জ্ঞাপন। এরকম প্রতিবাদের ফলে বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টি হবে এবং জনমতের চাপের মুখে ইসরাইলের অবস্থান আগের চেয়ে দুর্বল হবে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারে ঈদ আনন্দ নেই

রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া বা তুলে নেয়ার পর সন্ধান মিলছে না তাদের। কারও এক বছর, কারও দুই বা তিন বছর ধরে খোঁজ নেই। স্বজনেরা প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। কিন্তু তাদের সেই অপেক্ষা আর শেষ হয় না। এক দুঃসহ সময় কাটাচ্ছেন তারা। ঈদের আনন্দ নেই এসব পরিবারে। নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার আল-আমিনমরিয়ম চম্পা-
২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাজধানীর শাহিনবাগের ৫৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে সাজেদুল ইসলাম সুমন (৩৭)কে র‌্যাবের পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাদের স্বজনেরা র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো পক্ষই তাকে আটকের খবর নিশ্চিত করেনি। এরপর থেকে এই পরিবারের দিন কাটছে দুঃসহ যন্ত্রণায়। রাজধানীর শাহিনবাগের ৫৫৩ নম্বর বাসায় সাজেদুল ইসলাম সুমনের পরিবারের বসবাস। সুমনের দুই মেয়ে হাফসা ও আরোরা। বাবার অপেক্ষায় প্রহর কাটছে দুই মেয়ের। সুমনের স্ত্রী মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে, প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথাই বলেন না। সুমনের বৃদ্ধা মা হাজেরা খাতুন ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে শয্যাশায়ী। এবার ঈদের আনন্দ নেই সুমনের পরিবারে। সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে মানবজমিনকে জানান, তার ভাই শেয়ার ব্যবসা করতেন। ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর বাসা থেকে র‌্যাবের পোশাকধারী লোকজন তাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ মিলছে না।
তিনি বলেন, আমার ভাই ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। এটাই কি তার অপরাধ? এটা যদি তার অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে তার ভাইয়ের বিচার করা হোক। কিন্তু, হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না। তিনি জানান, তারা নিয়মিতভাবে প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্নস্থানে তাদের ভাইসহ গুম হওয়া সদস্যদের উদ্ধারের জন্য এখনো ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে সমাবেশ করছেন। তিনি তার ভাইকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।
রাজধানীর পূর্ব নাখালপাড়ার ৩২২/ডি নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মো. মাসুমের (২৮) পরিবারের কান্না থামছে না। ঈদ উপলক্ষে তাদের মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। তার বোন ফাওজিয়া ইসলাম জানান, তার ভাইকে ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর উত্তরার একটি প্রাইভেট কোচিং সেন্টার থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। মাসুম তীতুমীর কলেজের ফিন্যান্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। ফাওজিয়া আরো জানান, তার ভাই পড়াশোনার পাশাপাশি প্রাইভেট পড়াতো। কোচিংয়ে ক্লাস নিতো। সেই টাকা দিয়ে সংসারের সহযোগিতা করতো। কর্মক্ষম একজন মানুষ পরিবার থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কারণে পরিবারে অভাব অনটন নেমে এসেছে। তিনি বলেন, আমার ভাই যদি কোনো অপরাধ করে থাকে তাহলে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বিচার হোক। এভাবে একজন মানুষ গুম হয়ে থাকবে এটা মেনে নেয়া যায় না। ফাওজিয়া আরো জানান, তার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই বাবা ও মা অসুস্থ হয়ে গেছে। তারা প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্নস্থানে মানববন্ধনে তার ভাইকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বাড্ডার একেএম রহমতুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গলির একটি বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন আল আমিন। আল আমিনের বোন শারমিন খাতুন জানান, তার ভাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর র‌্যাব পরিচয় দিয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তার ভাই নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি আরো জানান, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গেলে তারা আল আমিনকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বার বার ধরনা দেয়ার পরও তারা কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। শারমীন খাতুন বলেন, আমার ভাই কোনো রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিল না। রাজধানীর তেজগাঁও ও বসুন্ধরা এলাকাসহ বিভিন্নস্থানে যে একসঙ্গে ৮ জন গুম হয়েছিল তার মধ্যে আমার ভাইও ছিল।
২০১৪ সালের ২৮শে নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজনৈতিক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নিখোঁজ হন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের ৫ কর্মী। এরমধ্যে সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মোল্লা, ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি খালেদ হাসান সোহেল, ৭৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি আনিসুর রহমান খান, একই ওয়ার্ডের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব ও ৮০ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দল সম্পাদক মিঠু। ১১ দিন পর মুন্সীগঞ্জে নিয়ে আনিসুর রহমান, বিপ্লব ও মিঠুকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু এখনো খোঁজ মেলেনি সম্রাট ও খালেদের। ২০১৩ সালের ২রা ডিসেম্বর রাজধানীর শিশুপার্ক এলাকা থেকে মাহফুজুর রহমান, সোহেল সরকার, বংশাল থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হাবিবুল বাশার জহির, ৭১নং ওয়ার্ডের সভাপতি পারভেজ হোসাইন ও ছাত্রদল কর্মী হোসাইন চঞ্চলকে সাদা পোশাকে কে বা কারা তুলে নিয়ে যায়। তারা এখনো নিখোঁজ। একই বছর ৪ঠা ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা থেকে ছয়জন নিখোঁজ হন। তারা হলেন- ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন, সুমনের খালাতো ভাই জাহিদুল করিম তানভীর, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, মো. আল আমিন ও আসাদুজ্জামান রানা, আবদুল কাদের ভুঁইয়া মাসুম। এদের মধ্যে তিনজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, ছাত্রদলের সাবেক নেতা আনিসুর রহমান তালুকদার খোকনসহ কয়েকজনকে খুঁজে পাওয়া গেছে। আবার কয়েকজনের লাশও পাওয়া গেছে। তবে দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরুসহ অনেককে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিএনপি ও নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরা বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, এসব গুমের পেছনে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত। নরসিংদী কলেজ ছাত্রদলের নির্বাচিত জিএস সিদ্দিকুর রহমান নাহিদ গত রমজানের শুরুতে নিখোঁজ হন। এখনো তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
২০১৫ সালের ১০ই মার্চ রাতে উত্তরার একটি বাসা থেকে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে বলে পরিবারের দাবি। পরে তাকে ভারতের শিলংয়ে খুঁজে পাওয়া যায়। ২০১৩ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি সমর্থক আইনজীবী সোহেল রানাকে উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টর থেকে ছাই রঙের মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। স্ত্রী আফরোজা সুলতানা জানান, তার স্বামী বিএনপি সমর্থক হলেও সক্রিয় নেতা নন। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুমের অর্ধযুগ পেরিয়ে গেছে। ইলিয়াস আলী ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল রাতে বনানীর বাসার কাছ থেকে ড্রাইভার আনসার আলীসহ নিখোঁজ হন। তাদের এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১০ সালের ২৫শে জুন রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা কমিশনার চৌধুরী আলম। তাকেও ফিরে পায়নি পরিবার। ওই বছরের ১৭ই এপ্রিল রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে অপহৃত হন ঝালকাঠির রাজাপুর থানা যুবদল নেতা মিজানুর রহমান জমাদ্দার এবং তার দুই সহযোগী মুরাদ ও ফোরকান। কয়েক মাস পর ফোরকান বেরিয়ে এসে তাদের নিখোঁজ হওয়ার কাহিনী মিডিয়ার সামনে তুলে ধরেন। এর কয়েকদিন পর আবারও নিখোঁজ হন ফোরকান।
ইলিয়াস আলীর স্ত্রী রুশদীর লুনা বলেন, ইলিয়াসকে ছাড়া ঈদের দিনের কষ্টের কথাতো আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। এটা কাউকে বোঝানো যায় না। পরিবারের একজন অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে যেভাবে আমাদের থাকার কথা আমরা তেমনই আছি। গত ৬ বছর ধরে আমাদের ঈদের কোনো প্রস্তুতি নেই। আমরা ঈদের সময় গ্রামের বাড়ি সিলেটে যাই। ওখানে আমার শাশুড়ি থাকেন। আমরা নিজেরা শপিং বলতে কিছুই করি না। যারা আমাদের হেল্পিং হ্যান্ড অর্থাৎ কর্মচারী বা সাহায্যকারী ও কিছু গরিব মানুষের জন্য ঈদের কেনাকাটা করি। ঈদের সময় দলের নেতাকর্মীরা বাসায় আসে দেখা করতে এই পর্যন্তই। এর বাইরে কোনো উদযাপন নেই আমাদের। আমাদের মতো স্বজনহারাদের কষ্টের কথা আসলে বোঝাতে পারবো না।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের দুই তিন মাস আগে দলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বেশি সক্রিয় হন ছাত্রদল নেতা চঞ্চল হোসেন। ২০১৩ সালের ২রা ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে দুপুর আড়াইটায় নিখোঁজ হন চঞ্চল হোসেন। আজ পর্যন্ত তার সন্ধান পায়নি তার পরিবার। চঞ্চলের স্ত্রী রেশমা আক্তার বলেন, ঈদ বলে আমাদের কাছে এখন কিছু নেই। কয়েক বছর ধরেই আমরা ঈদ উদযাপন করি না। চঞ্চলকে হারিয়ে ওর বাবা-মা, ভাই-বোন কারোর মনেই কোন শান্তি নেই। আমার ছেলে আহাদ প্রতি ঈদে বাবার অপেক্ষায় থাকে। আমাদের কোনো ঈদ নেই।
বংশাল এলাকার পারভেজ হোসেনসহ মোট ৪ জনকে ২০১৩ সালের ২রা ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে অপহরণ করা হয়। ওই দিন দুপুর ২টায় স্ত্রী ফারজানা আক্তারের সঙ্গে পারভেজের সর্বশেষ কথা হয়। কান্নাভেজা কণ্ঠে ফারজানা বলেন, আমাদের তো আর ঈদ নাই। ও যে দিন গেছে সেদিন থেকে আমাদের ঈদও চলে গেছে। ঈদের দিন বাসায় দরজা বন্ধ করে নীরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। আমাদের দুই ছেলে মেয়ে আদিবা ইসলাম ঋতু ও আরাফ হোসেন। বাবার ছবি নিয়ে প্রায়ই তারা আমার কাছে জানতে চায় বাবা কবে আসবে? ছেলের কথার কোনো জবাব দিতে পারি না। এ বছর ঈদে কোনো কেনা কাটা করিনি। প্রতি বছর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া টাকা দিতেন। ওটা দিয়ে বাচ্চাদের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতাম। এবছর তিনি জেলে আছেন। আত্মীয়স্বজনরা বাচ্চাদের টুকিটাকি জামা কাপড় কিনে দিয়েছে। এবার ওগুলো দিয়েই ঈদ পালন করবে বাচ্চারা।

ঠাঁই নেই বাসে-ট্রেনে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

নাড়ির টান মানুষকে আটকে রাখতে পারছে না। তাই ঘরমুখো মানুষ বাস, ট্রেন ও লঞ্চে ছুটছেন আপন মনে। ঘরমুখো যাত্রীদের আনন্দের গন্তব্য এখন শেকড়ে। বৃহস্পতিবার রাস্তায় রাস্তায় দেখা গেছে ব্যাপক জনস্রোত। এই স্রোত যেন বাঁধভাঙার মতোই। জনগণের স্রোত বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট আর রেলস্টেশনের দিকে। ট্রেন, বাস, লঞ্চ ও বিমানে যে যেভাবে পারছেন বাড়ির দিকে ছুটছেন। এসব পরিবহনে তাই তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই অবস্থা। পথে পথে রয়েছে হাজারো দুর্ভোগ। কিছু ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়। মহানগরসহ কোথাও কোথাও ছিল যানজট। অনেক যাত্রীর সময়মতো টিকিট না পাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অহরহ অভিযোগ করেছেন বহু যাত্রী। এমন আরো অনেক বাধা থাকার পরও বাড়ি ফিরছেন মানুষ। এক্ষেত্রে সড়ক, রেল, নৌপথের পাশাপাশি মানুষ ব্যবহার করছেন বিমানপথও। গতকাল সরকারি ও পোশাক শিল্পের কর্মীসহ বেসরকারি অফিসের কর্মীরা কোনো রকম হাজিরা দিয়েই বাড়ির দিকে রওয়ানা দিয়েছেন। এর আগে সরকারি অফিস বুধবার সরকারি ছুটি থাকায় কিছু চাকরিজীবী ঈদের ছুটির সঙ্গে বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়ে আগেই ঢাকা ছেড়েছেন।
আজ থেকে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বন্ধ হওয়ার ফলে চিরচেনা এই শহর অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। এদিকে গতকাল রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায় দেশের সব রুটে। মহাসড়কের কোথাও কোথাও খুবই ধীরগতিতে চলছিল যানবাহন। এ অবস্থায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল দূরপাল্লার যাত্রীদের। অন্যদিকে কমলাপুর এবং এয়ারপোর্ট স্টেশনে হাজার হাজার যাত্রী অপেক্ষার প্রহর গুনছেন বাড়িতে যাবার আশায়। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, ট্রেনগুলোতে প্রচণ্ড ভিড়। ছাদে চড়ে ও দরজায় দাঁড়িয়ে ভোগান্তি মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরছেন মানুষ। ট্রেনের ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই অবস্থা। বাধ্য হয়ে মানুষ প্রখর রৌদ্রের মধ্যে ট্রেনের ছাদে চড়ে পলিথিন মুড়িয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন। বেশি যাত্রী নিয়ে ট্রেনগুলোকে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেতে হয়েছে। কারণ আসন কিংবা টিকিট না পাওয়া গেলেও ঈদে বাড়িতে যে যেতে হবে। ট্রেনের দরজায় ঝুলে, ছাদে উঠে অনেকে গন্তব্যে গেছেন। ভিড়ের কারণে কেউ কেউ চেষ্টা করেও ট্রেনে উঠতে পারেননি। আর টিকিট করে সিট পেলেও অনেকে সিট খুঁজে পাননি। স্টেশনে পুলিশ যাত্রীদের ছাদে উঠতে বাধা দিলেও কিছুক্ষণ পর পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আবার ছাদে উঠেছেন ঘরমুখো মানুষ।
আর প্রতিদিনই শিডিউল বিপর্যয় হচ্ছিল। ঈদের বিশেষ ট্রেনের ক্ষেত্রে এ ঘটনা বেশি ঘটছে। ঈদ উপলক্ষে অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীরা ১০ই জুন থেকে যাত্রা শুরু করেছেন। কিন্তু বুধবার থেকে বিভিন্ন ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। গতকাল সকালেও অনেক ট্রেনই নির্দিষ্ট সময়ের ২০ থেকে ৩০ মিনিট দেরি করে ছেড়ে গেছে। কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফরমগুলোর কোথাও ফাঁকা ছিল না, সবদিকে যাত্রী আর যাত্রী। স্টেশনে পৌঁছানোর পর যারা কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের দেখা পেয়ে যাচ্ছেন তারা ছুটছেন গন্তব্যে, বাকিরা থাকছেন অপেক্ষায়। রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে করে বাড়ি যাচ্ছিলেন মোতাছিন মিয়া। বললেন, এসে স্ট্যান্ডিং টিকিট কেটেছি, কিন্তু ট্রেনের ভেতরে এত মানুষ যে ঢোকার মতো পরিস্থিতি নেই। বাধ্য হয়ে ছাদে উঠেছেন তিনি। সকাল ৮টার নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি কমলাপুর ছেড়েছে বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে। ট্রেনটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন আলমগীর সরদার। তিনি বলছিলেন নিজের ক্ষোভের কথা। এ ছাড়া বিলম্বে ছেড়েছে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস, ধূমকেতু এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস, লালমনি ঈদ স্পেশাল। ঈদযাত্রার সার্বিক বিষয় নিয়ে কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, সারা দিনে কমলাপুর থেকে ৬৯টি ট্রেন ছেড়ে যাবে। দুই-একটি ট্রেন বিলম্বিত হয়েছে। তিনি বলেন, অগ্রিম টিকিট বিক্রির দিনই আমরা ধারণা করতে পারছিলাম ১৪ই জুন উপচেপড়া ভিড় হবে। এরমধ্যেই চেষ্টা করছি শিডিউল ঠিক রাখতে। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে যাওয়া-আসার সময় স্টেশনে ওঠানামা করতে যেখানে ২ মিনিট অপেক্ষা করার কথা সেখানে ৫/১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ কারণে ট্রেনটি পৌঁছাতেও কিছুটা দেরি হচ্ছিল। তবে আমরা চেষ্টা করছি যেন সঠিক সময়েই সব ট্রেন ছেড়ে যেতে পারে।
এদিকে সকাল থেকেই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ছিল গ্রামমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরো তীব্র আকার ধারণ করে। যাত্রী বেশি থাকায় লঞ্চগুলো তাড়াতাড়ি ঘাট ছেড়েছে। সিট পাওয়ার জন্য অনেকেই রাত কাটিয়েছেন টার্মিনালে। এমন একজন ভোলাগামী যাত্রী কাইয়ুম। তিনি থাকেন গাজীপুর। গত বুধবার রাতে এসে টার্মিনালে ঘুমান। কারণ হিসেবে বললেন, সিট না পেলে অনেক কষ্ট হয়। তার পক্ষে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকার কেবিন নিয়ে বাড়ি ফেরা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বাড়িতে যেতে কষ্ট হলেও গ্রামে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ অন্যরকম মজা। রাস্তায় সিএনজি ভাড়া দ্বিগুণ। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী প্রায় সব লঞ্চের ছাদে যাত্রীদের দেখা গেছে। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদযাত্রায় বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ে লঞ্চ ছেড়েছে। শুক্রবারও রুটিন মেনেই লঞ্চ ছাড়বে।
অন্যদিকে ভোর থেকে গাবতলী-মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রীদের বেশ ভিড় ছিল। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের ইউনিক পরিবহনের কর্মকর্তারা বলেন, সকালে যাত্রীর বেশি চাপ ছিল। দুপুরে তেমন যাত্রী নেই। তবে রাতে চাপ বাড়বে। পর্যাপ্ত গাড়ি রয়েছে। সঠিক সময় ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে গাড়িগুলো। তবে ঈদযাত্রায় মূল সমস্যা হয় মহাসড়কে যানজট থাকলে। তবে এবার মানুষ ট্রেনে বাড়ি ফেরার প্রবণতা অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে।

লুঝনিকির মূর্ছনায় দুনিয়া মাত

সুরের মূর্ছনা ও নৃত্যের তালে তালে পর্দা উঠলো বিশ্বকাপ আসরের। গতকাল মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে খেলা শুরুর আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ মাতান বৃটিশ রক মিউজিক তারকা রবি উইলিয়ামস। অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন জনপ্রিয় রুশশিল্পী আইদা গারিফুলিনাও। এ সময় মাঠে উপস্থিত হন দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনাল্ডো নাজারিও ডি লিমা। মাঠে অংশগ্রহণকারী ৩২ দেশের জাতীয় পতাকা বহন করেন নৃত্যশিল্পীরা। অনুষ্ঠানের শুরুতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে ধরেন ২০১০’র চ্যাম্পিয়ন স্পেনের অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াস ও রুশ সুপার মডেল নাতালিয়া বদিয়ানোভা।
সাধারণত বিশ্বকাপের থিম সংয়ের গায়করা পারফর্ম করে থাকেন আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। গত ক’আসরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ মাতান পপশিল্পী রিকি মার্টিন, শাকিরা, জেনিফার লোপেজ, ব্যান্ড পিট বল। তবে প্রথা ভাঙলো এবার। এবারের বিশ্বকাপের থিম সং গেয়েছেন মার্কিন তারকা উইল স্মিথ, পুয়ের্তোরিকান নিকি জ্যাম ও আলবেনিয়ান শিল্পী এরা এসত্রেফি। প্রতিবছর কিকঅফের একঘণ্টা আগে শুরু হয় বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তবে এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যপ্তি ছিল ৩০ মিনিট। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। সারা বিশ্বের বিভিন্ন ঘরানার ক্লাসিক্যাল মিউজিককে প্রাধান্য দেয়া হয় এবার। অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০০ নৃত্যশিল্পী পারফর্ম করেন। তারা রাশিয়ান সংস্কৃতি তুলে ধরেন। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন ৮০ হাজার দর্শক। একই সময়ে শহরের বিখ্যাত রেড স্কয়ারে কনসার্টের আয়োজন করা হয়। নাচ-গান শেষে এবারের বিশ্বকাপ আসরের উদ্বোধন ঘোষণা করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। পরে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ব ফুটবল সংস্থার (ফিফা) সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত নিজের সুপারহিট ‘লেট মি এন্টারটেইন ইউ’ গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন ৪৪ বছর বয়সী রবি উইলিয়ামস। এ সময় মঞ্চে হাজির হন ১৯৯৪ ও ২০০২’র বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলিয়ান তারকা রোনাল্ডো। পরে লুঝনিকি স্টেডিয়ামকে সুরের মূর্ছনায় মাত করেন রুশ প্রখ্যাত বীণাবাদক আলেকজান্ডার বলদাশেভ। এরপর রবি উইলিয়ামসের সঙ্গে দ্বৈত সংগীতে মঞ্চ মাতান রুশ তারকা আইদা। ৩০ মিনিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিশ্বব্যাপী টেলিভিশনে উপভোগ করেন ৫০০ মিলিয়ন দর্শক। লুঝনিকি মাঠে পরে আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয় স্বাগতিক রাশিয়া ও সৌদি আরব। আসরের ৮৮ বছরের ইতিহাসে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে এশিয়ার কোনো দেশকে খেলতে দেখা গেল এই প্রথমবার।

জাতিসংঘের নিন্দা প্রস্তাব ফিলিস্তিনিদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে: হামাস

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিন্দা প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। বৃহস্পতিবার হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনিদের পক্ষের প্রস্তাব পাস হওয়ায় এবং মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় ফিলিস্তিনিদের বিজয় হয়েছে। আমেরিকা যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এর মধ্যদিয়ে সে বিষয়টিও প্রমাণিত হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
হামাসের বিবৃতিতে এসেছে, আমেরিকা ইহুদিবাদী ইসরাইলের অব্যাহত অপরাধযজ্ঞ আড়াল করার পাশাপাশি এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টার মাধ্যমে নিজেকে একঘরে করে ফেলেছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ এই প্রস্তাবের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের অবস্থান আরও জোরদার হবে বলে বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে গত বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিপুল ভোটে একটি নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছে। বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১২০টি দেশ এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছে মাত্র আটটি দেশ। ৪৫টি সদস্য ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিল।
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যাকার অধিবাসীরা গত ৩০ মার্চ থেকে  নিজেদের ভূমিতে ফেরার লক্ষ্যে গাজা সীমান্তে ইসরাইল বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল করে আসছে। এসব বিক্ষোভ মিছিলে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় এ পর্যন্ত ১৩১ ফিলিস্তিনি শহীদ এবং ১৩,৯০০ জন আহত হয়।
গতকাল সাধারণ পরিষদে আমেরিকা একটি পাল্টা প্রস্তাব তোলে যাতে গাজায় সহিংসতা সৃষ্টির জন্য ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে নিন্দা করা হয়। তবে পাল্টা প্রস্তাব পাস হয় নি।

সাইকেল চালিয়ে পদ্মা পাড়ি দিলেন সাইফুল

সাইকেল নিয়ে পদ্মা নদী পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন সাইফুলের বহু দিনের। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নিজের তৈরি সাইকেল চালিয়ে পদ্ম নদী পাড়ি দিলেন সাইফুল।
সাইফুলের বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সৌর শক্তি আলোর সালথা উপজেলা শাখার ব্যবস্থাপক তিনি।

সদর উপজেলার ধলা মোড় এলাকায় পদ্মা নদীর একটি ক্যানেলে গত ২৮ মে বেলা ১১টার দিকে সাইফুল ইসলামকে সাইকেলটি চালাতে দেখা যায়। সেখানে ঘণ্টাখানেক তিনি সাইকেল চালান। ২০০ মিটার ক্যানেল অতিক্রম করেন তিনি। এ সময় তাকে দেখতে নদীর পাড়ে অনেক মানুষ ভিড় করেন। সাইকেল চালিয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে স্থলপথে বাড়ি ফিরেন সাইফুল।
দীর্ঘ ছয় মাস চেষ্টা চালিয়ে সৌরবিদ্যুৎ চালিত এ সাইকেলটি তৈরি করেন সাইফুল ইসলাম। এটি জল-স্থলে চলতে পারে। বলা যায়, উভচরে চলে সাইফুলের সৌরবিদ্যুৎ চালিত সাইকেল।

তবে তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পুরোপুরি পূরণ করতে আরও আধুনিকায়ন করতে চান সাইকেলটি। স্বপ্ন দেখেন এমন একটি সাইকেল তৈরি করবেন, যা দিয়ে আকাশে ওড়া যাবে।
কিন্তু স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা অনেক। এই কাজ করতে গেলে যে টাকার প্রয়োজন তার সামর্থ্য নেই সাইফুলের। এর জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন বলে জানান সাইফুল।

সাইফুলের তৈরি সাইকেলের হ্যান্ডেল ও ক্যারিয়ারে সৌর বিদ্যুতের প্যানেল। দুই চাকার দুই পাশে চারটি গোলাকার টিউব। টিউবের সাহায্যে সাইকেলটি পানিতে ভেসে থাকে। সাইকেল চালাতে প্যাডেল ব্যবহার করতে হয় না। কারণ, এটি সৌরবিদ্যুতে চলে। শুধু পানিতে নয়, স্থলপথেও সাইকেলটি চালানো যায়। তখন টিউব চারটি চাকার দুই পাশে আটকে রাখা হয়।
এমন সাইকেল আবিষ্কারের বিষয়ে কথা হয় সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে বিশ্ব জাকের মঞ্জিল আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পাস করেন। পরের বছর ‘শক্তি সৌর আলো’তে যোগ দেন। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন যন্ত্রের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় পাটখড়ি, কাচ, কাগজ দিয়ে তিন হাত লম্বা ও এক হাত চওড়া একটি বাস তৈরি করেছিলাম।

সাইফুল ইসলাম বলেন, সাইকেলটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকার মতো। সময় লেগেছে ছয় মাস। বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ চালিত ধান কাটার যন্ত্র ও রিকশা চালানোর যন্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি ১৫ জন ধারণক্ষমতার সৌরচালিত স্পিডবোট বানানোর চেষ্টা করছি। যা জলের পাশাপাশি ডাঙায়ও চলবে। এমন একটি সাইকেল বানাতে চাই, যা দিয়ে আকাশে ওড়া যাবে। এছাড়া এমন এক জোড়া জুতা তৈরি করতে চাই, যা দিয়ে অনায়াসে পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবে।

সাইফুল বলেন, স্বপ্নপূরণের পথে বাধাও অনেক। এই কাজে অনেক টাকার প্রয়োজন। আমার সামর্থ্য তেমন নেই। এর জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। তবে আমার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না, জানি না।
স্থানীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হাসিবুল হাসান বলেন, সাইফুলের উদ্ভাবনটি বেশ সাড়া ফেলেছে। তবে বাহনটিকে আরও জনপ্রিয় করতে এটির ওজন আরও কমিয়ে আনতে হবে। নির্মাণব্যয় সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে হবে। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য এ সাইকেল বেশ কাজে লাগবে।