Friday, November 15, 2013

কালের পুরাণ- হাসিনা কি গণতন্ত্রের ভাষা বুঝবেন? by সোহরাব হাসান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি খতিব ও ইমামদের সম্মেলনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন, যা বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের সূত্র হতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, শান্তি চাই। আমি জনগণের দুর্ভোগ সহ্য করতে পারি না।’

অরণ্যে রোদন- আমরা কি মানুষ? by আনিসুল হক

এই ছবিটা দেখুন। ওই বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকান। ও আপনার-আমার যে কারও বাচ্চা হতে পারে। আমাদেরও বের হতে হয় হরতালে। উঠতে হয় রিকশায়, গাড়িতে, বাসে, টেম্পোতে, বেবিট্যাক্সিতে, রিকশাভ্যানে। যেকোনো সময় আগুন দেওয়া হতে পারে আমাদেরও বাহনে।

গল্প- লাল সাইকেল by নাদিরা মুসতারী

সেদিনও অন্তু বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। এমন সময় হিরু ভাই এসে হাজির।
তোমরা যাচ্ছ তো দৌড় প্রতিযোগিতায়?’
অন্তু হুড়মুড়িয়ে উঠে বসল। দৌড় প্রতিযোগিতা!

কুফা ডিপটি by সেলিম হোসেন

ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরল নিশার।
এমনি এমনি ফেরেনি, ধাক্কায় ফিরেছে।
মুখের ওপর পানি ছিটাল কে যেন। চোখ কুঁচকে মাথা ঝাঁকাল নিশা। অমনি একজন চুল ধরে টেনে বসিয়ে দিল ওকে।

রহস্য গল্প- অনুসরণ by মশিউল আলম

হেমন্তের হিমেল বাতাস, সকাল দশটার ঝলমলে রোদ, ঢাকার রাস্তার কালো পিচ, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস, পথচারী—সবাই যেন ভয় পেয়েছে। সবখানে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে চাপা এক আতঙ্ক।

রহস্য গল্প- সংকেত by শেখ আবদুল হাকিম

পাহাড়ি ঢালে বাগানসংলগ্ন খুব পুরোনো বাড়ি, মেরামত করার পর আধুনিক সরঞ্জাম আর ফিটিংস যোগ করলে চমৎকার একটা রিসোর্ট তৈরি হয়ে যাবে। আজকাল শুধু সাগর দেখতে নয়, গাঢ় সবুজ জঙ্গলে মোড়া পাহাড় দেখতেও এদিকটায় ভিড় করছে পর্যটকেরা।

আইনের শাসন বনাম ত্রাস সৃষ্টিতে আইনের ব্যবহার by মাহফুজ আনাম

(ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের এই মন্তব্য প্রতিবেদন আজ ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সময়ের এবং বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে লেখাটি হুবহু অনুবাদ প্রকাশ করা হলো। লেখার শেষে ইংরেজি প্রতিবেদনের লিংক দেওয়া হলো। এখানে ক্লিক করে মূল প্রতিবেদনও পড়তে পারবেন।)

Commentary- Rule of law vs use of law to intimidate: AL is behaving as if it will never be in opposition by Mahfuz Anam

We have seen an inordinate rise of violence in opposition politics — injuring, burning and killing of ordinary people during hartal.

‘দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্বর্তী সরকারের পথে বাংলাদেশ’ by কাউসার মুমিন

একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের পথে এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থা। ‘রিসেট বা একটি দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থাকেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান হিসেবে বেছে নিতে হতে পারে’

সামিরার খোলামেলা মন্তব্য

বলিউডের সেক্সসিম্বল অভিনেত্রী সামিরা রেড্ডি ইতিমধ্যে অনেক অভিনেতার বিপরীতেই কাজ করেছেন। যদিও একজন অভিনেত্রী হিসেবে তেমন একটা সফলতা অর্জন করেননি তিনি এখন পর্যন্ত। তারপরও ব্যাপক খোলামেলা হয়ে নিয়মিত কাজ করে বলিউডে হট অভিনেত্রীর তকমাটা ঠিকই পেয়েছেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন: কোন আপস করার কোন সুযোগ নেই

বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, কোন আপস নয়। আপস করার কোন সুযোগ নেই। কারণ, আপস করা মানে অন্যায় করা, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া এবং অন্যায় মেনে নেয়া। আমরা ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন করছি।

আমরা কি মানুষ?

এই ছবিটা দেখুন। ওই বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকান। ও আপনার-আমার যে কারও বাচ্চা হতে পারে। আমাদেরও বের হতে হয় হরতালে। উঠতে হয় রিকশায়, গাড়িতে, বাসে, টেম্পোতে, বেবিট্যাক্সিতে, রিকশাভ্যানে। যেকোনো সময় আগুন দেওয়া হতে পারে আমাদেরও বাহনে। আমাদের যেকোনো কারও চামড়া ঝলসে যেতে পারে, চোখের পাপড়ি আর চুল পুড়ে যেতে পারে, মাংস পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতে পারে, দগদগে ঘা হতে পারে শরীরজুড়ে, দুই চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। আমরা লাশ হয়ে উঠে পড়তে পারি লাশবাহী গাড়িতে, পড়ে থাকতে পারি মর্গে। কিংবা কোনো রিকশাভ্যানে আশ্রয় নিয়ে সদ্য পোড়া যন্ত্রণাবিদ্ধ শরীর নিয়ে ছুটে যেতে পারি বার্ন ইউনিটে, কাতরাতে পারি, আর্তনাদ করতে পারি। তখন কী করবে আপনার-আমার সন্তান? কী করবে স্ত্রী কিংবা স্বামী? মা কিংবা বাবা? কিংবা বের না হলেই কি রেহাই আছে! বাচ্চারা বাড়ির পেছনের উঠানে খেলতে যেতে পারে, টেপে মোড়ানো টেনিস বল ভেবে হাতে তুলে নিতে পারে হাতবোমা। উড়ে যেতে পারে তার হাত, পা, চোখ। কিংবা হরতালের দিনেই যে কেবল আমাদের যে কারও জীবনে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, তাও তো নয়। হরতালের আগের দিন তো বেরোনোর মানা নেই। কিন্তু হরতালের আগের দিনেও আক্রমণ করা হয় গাড়িতে,
বারুদ ছিটিয়ে আগুন দেওয়া হয়, বোমা ছোড়া হয়, পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। আমরা কী জবাব দেব চট্টগ্রামের সেই স্কুলছাত্রীকে, যে মায়ের সঙ্গে রিকশায় স্কুলে যাওয়ার পথে শিকার হয়েছিল বোমার। আমরা কী জবাব দেব গত ১৯ দিনে প্রতিবন্ধীসহ নিহত-আহত ৭৬ জন ও তাঁদের স্বজনদের। আমরা বর্বরতার কোন সীমায় পৌঁছালাম যে প্রতিবন্ধী মানুষটি দেখল পুড়ে যাচ্ছে তার ক্রাচ, আর সে জ্বলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে নিজেই হলো দগ্ধ-আহত! ওই শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখুন। কী বলবেন তাকে? সে কি বিএনপি, নাকি আওয়ামী লীগ? আর যারা গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন দিল ওই বাসে, তারা কী? আমাকে শোনাতে আসবেন না যে তারা বিরোধী দলের হতে পারে, সরকারি দলের হতে পারে, এজেন্ট হতে পারে। বলতে আসবেন না যে ওই সরকার তার আগের সরকার তার আগের সরকারের আমলেও গান পাউডার ছিটিয়ে বাসে আগুন দিয়ে হরতালে বা হরতালের আগের দিনে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই, যারা আগুন দিয়েছে, তারা মানুষ কি না? তাদেরও মাতৃগর্ভে জন্ম হয়েছিল কি না? মাতৃস্তন্য সে পান করেছিল কি না? তাদেরও ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন আছে কি না? তারাও এই বাংলাদেশের রোদে-বৃষ্টিতে-হাওয়ায় বড় হয়েছে কি না?
এদের কী বলব? পশু? কী করে পশু বলব? আজ পর্যন্ত কোনো পশু কোনো পশুশালায় আগুন দিয়েছে? বনে আগুন দিয়েছে? মানুষ আজ পশুর চেয়েও অধম। মাত্র দেড় হাজার টাকা থেকে তিন হাজার টাকা দিলেই নাকি বাসে আগুন দেওয়ার লোক ভাড়া করা যায়। এই তাহলে অবস্থা? তার পরেও বলব, সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সরকারেরই। বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। এটা একেবারেই সন্ত্রাসবাদী কাজ, একেবারেই টেররিস্টের কাজ। কে মারা যাচ্ছে, তা বিচার না করে মানুষ মারার নামই টেররিজম। যারা এই কাজ করছে, তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই বিচার্য নয়। তারা অপরাধী, তাদের ধরতে হবে, শাস্তি দিতে হবে। আর বিরোধী দলকে বলি, এই দেশের বেশির ভাগ মানুষই সমর্থন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। এটা নিয়ে আমরা সারা পৃথিবীর বুকে গর্ব করেছি। কিন্তু দুই বছর ধরে কী আন্দোলন করলেন যে মানুষের সম্পৃক্ততা নেই। বোমা ফাটালে, আগুন জ্বালালে সেই আন্দোলনে মানুষ কেন আসবে?
আর যে আন্দোলনে মানুষ আসে না, সেই আন্দোলনে সফলতারও কোনো সুযোগ নেই। একটা জনপ্রিয় দাবিকে জনবিরোধী কৌশল প্রয়োগ করে আপনারা নষ্ট করেছেন। আর মানুষ বুঝে গেছে যে এটা হলো দুটো বড় রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি, মারামারি। তাতে তারা আসবে কেন? সরকারি দলের নীতিনির্ধারকদের একটা কথা বলতে চাই। রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার গ্রামে গিয়েছিলাম, ৭ নভেম্বরের প্রথম আলোয় আমার লেখায় তার বর্ণনা ছাপা হয়েছে, দেখতে পারেন। গ্রামের মানুষ আমাকে বলেছেন, তাঁদের গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু, সব বাচ্চা স্কুলে যায়, সবার বাড়িতে স্যানিটারি ল্যাট্রিন আছে, গ্রামে কোনো চোর নেই, তাঁদের কোনো অভিযোগ নেই। আজকে দেশে লোডশেডিং দেখা যাচ্ছে না। ঢাকায় অনেক জায়গায় যানজট কমেছে। কৃষিক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে এই সরকারের সাফল্যের কথা শত্রুও স্বীকার করবে। তার পরেও সর্বশেষ জরিপে কেন দেখা যাচ্ছে, ভোট হলে লোকে বিএনপিকে ভোট দিতে চায়। দুর্নীতির কারণে? দুর্নীতি উভয় জোটের আমলেই হয়েছে, বিদেশিরা বিএনপির মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও সংবাদ সম্মেলন করেছিল। শেয়ারবাজার, ডেসটিনি, হল-মার্ক—এসব তো আছেই। কিন্তু আসলে মানুষ সরকারি জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে নেতা-কর্মীদের হম্বিতম্বির কারণে। মানুষ জানে, তাদের মন্ত্রী-এমপিরা সব সুযোগ নেন,
তাঁরা ঈদে ট্রেন-বাসের টিকিটের কোটা নেন, স্টেডিয়ামের টিকিটের কোটা নেন, প্লট নেন। গণতন্ত্রে সবাই সমান, কিন্তু মন্ত্রী-এমপিরা একটু বেশি সমান। দলীয়করণ, দলীয় কর্মীদের সন্ত্রাস ও দৌরাত্ম্যে মানুষ বিরক্ত, কোথাও কোথাও ত্যক্ত-বিরক্ত। কিন্তু জনগণের বিরাগের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, ক্ষমতাসীনদের আত্মম্ভরিতা! জনগণ একটা দিন সব হম্বিতম্বির জবাব দিতে পর্দাঘেরা গোপন কক্ষে ঢোকে, সে তো ভোটের দিন। ওই দিনে সে-ই তো রাজা। তার সামনে এসে দাঁড়াতে হবে করজোড়ে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তুলে দিয়ে মানুষের এক দিনের রাজা হওয়ার সুযোগটা কেড়ে নেওয়াই এই সরকারের জনপ্রিয়তা কমার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ। গত কয়েক দিনে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জাতীয় সরকার গঠন করতে চেয়েছেন, বিরোধী দলের কাছে নাম চেয়েছেন। তার জবাব দেওয়া হয়েছে আপসহীনতার ভাষায়। প্রধানমন্ত্রী ফোন করেছেন বিরোধী নেত্রীকে, সেই আলোচনা পরিণত হয়েছে তপ্ত তর্কে। দেশের মানুষ দেখছে, হম্বিতম্বিতে বিরোধী দলও কম যায় না।
এখন জনপ্রিয়তার জরিপ করলে হয়তো দেখা যাবে, বিরোধী দলের পারদ নামতে শুরু করেছে। আমার পরামর্শ হলো উভয় জোটের নেতাদের কাছে, দেওয়ার বেলায় এগিয়ে থাকুন। বিনয়ের প্রতিযোগিতা করুন। দেশের স্বার্থে যিনি বড় ছাড় দেবেন, তিনি এবার জনতার ভালোবাসা বেশি করে পাবেন। সরকারি জোট যদি জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে চায়, এই হলো সুযোগ। বড় বড় কথা না বলে সত্যিকারের আন্তরিকতা নিয়ে বিরোধী দলকে কাছে আনার চেষ্টা করুন। দরকার হলে, প্রধানমন্ত্রী চলে যেতে পারেন বিরোধী নেত্রীর বাড়িতে। মহাসচিব পর্যায়ে তো যাওয়া যেতেই পারে। আর বিরোধী দলের নেতাদেরও বলি, দেশের স্বার্থে একটা ন্যূনতম সমঝোতায় আসুন। বাংলাদেশের মানুষের ভোটের প্যাটার্ন হচ্ছে একবার এই জোট, আরেকবার ওই জোট। এবার আপনাদের পালা। আপনারা কেন এই সুযোগ ছেড়ে দিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পথটাকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে নিচ্ছেন? একটা মানুষের প্রাণও তো প্রাণ।
একটা মানুষের চোখও তো চোখ। কত কষ্ট হচ্ছে মানুষের। ডেইলি স্টার -এ ছবি দেখলাম, দুগ্ধ উৎপাদনকারী চাষিরা দুধ রাস্তায় ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছে হরতালের কারণে। রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন জ্বলছে, এই ছবি দেখে বুক কেঁপে উঠেছে। এটা কোন রাজনীতি যে রেললাইন উপড়ে ফেলে ট্রেনকে দুর্ঘটনার মুখে ফেলবেন! আপনারা একটা জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনের নির্বাচন করুন। তাতে জনগণ যাদের ভোট দেবে, তারা ক্ষমতায় আসবে। আমি এ কথা বিশ্বাস করি না যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থাকবে কি থাকবে না, এই ভোট তার শেষ পরীক্ষা। আপনি দুর্নীতি করবেন, আর মুক্তিযুদ্ধের কথা বলবেন, তা হবে না। আপনি সন্ত্রাস করবেন, লুটপাট করবেন, আর ধর্মের দোহাই দিয়ে ভোট চাইবেন, জনগণ সেই ধোঁকাতেও সাড়া দেয় না। এই দেশের ভোটারদের মন সাদা কাগজের মতো পরিষ্কার, তুমি সুশাসন দাও, আমি তোমাকে ভোট দেব, না দিতে পারলে বিদায় হও। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশই থাকবে, তা ভোটে যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন। দেশের মুক্তমনা জাগ্রত তরুণসমাজই এই দেশকে ইতিহাসের অন্ধকারের দিকে ফিরে যেতে দেবে না। যদি প্রয়োজন হয়, রাজপথে থেকেই সেই প্রশ্নের ফয়সালা করতে হবে।
বাংলাদেশ সব দিক থেকে ভালো করছে। দেশের চাকাকে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এই দেশের কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, সৃজনশীল তরুণসমাজ, সরকারি-বেসরকারি সংগঠন— সবাই মিলে। এত সুন্দর একটা দেশকে শুধু আত্মম্ভরিতার দ্বন্দ্বে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দেবেন না। দয়া করুন। একটা সন্ধির পথ বের করুন। সবাই মিলে নির্বাচনে আসুন। আমরা ভোটের উৎসব চাই, দেশকে পুড়িয়ে মারার বহ্নুৎসব চাই না। আপনার-আমার সন্তানের মঙ্গলের জন্য আপনারা আগুন নিয়ে খেলা বন্ধ করুন। আর বন্ধ করুন নির্বিচারে আগুন জ্বেলে বোমা মেরে পেট্রল ঢেলে মানুষ মারা। পশুর চেয়েও অধিক পশুত্ব আমরা এরই মধ্যে দেখিয়ে ফেলেছি, একবার শিশুদের মুখের দিকে তাকান, একবার আপনার মায়ের মুখের দিকে তাকান, একবার হাত রাখুন সন্তানের মাথায়—দোহাই লাগে, মানুষের মতো আচরণ করুন।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

কারবালার শিক্ষা

আরবি চান্দ্রবর্ষ তথা হিজরি সালের মর্যাদাপূর্ণ মহররম মাসের ১০ তারিখ পবিত্র আশুরা ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল ও ব্যাপক তাৎপর্যময় দিবস। এ দিন অন্যায়ের প্রতিবাদ ও ন্যায়ের আদর্শের জন্য আত্মত্যাগের মহিমান্বিত স্মৃতিবিজড়িত কারবালার শোকাবহ, মর্মস্পর্শী, হূদয়বিদারক ও বিষাদময় ঘটনা সংঘটিত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ/৬১ হিজরি সালে ১০ মহররম আশুরার দিনে ইরাকের কুফা নগরের অদূরে ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন বিন আলী (রা.) বিশ্বাসঘাতক অত্যাচারী শাসক ইয়াজিদের নিষ্ঠুর সেনাবাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ ও পরিবেষ্টিত হয়ে পরিবার-পরিজন এবং ৭২ জন সঙ্গীসহ নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন।
বয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক তৃষ্ণার্ত নারী-পুরুষ, শিশু সদস্য একবিন্দু পানি থেকে বঞ্চিত হয়ে নিদারুণ অমানবিক অবস্থায় কারবালার অন্যায়-অসম যুদ্ধে এবং শিশুপুত্র তাঁর কোলেই শত্রুর নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত তিরের আঘাতে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ বিসর্জন দেন। আহত অবস্থায় হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) একাকী শত্রুবাহিনীর ওপর বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং অসীম সাহসিকতার সঙ্গে খণ্ড যুদ্ধ করে শহীদ হন। আধিপত্যবাদ, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর সুমহান আদর্শের জন্য আত্মত্যাগের বেদনাবিধুর ও শোকবিহ্বল ঘটনার স্মরণে প্রধানত আশুরা পালিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে ফজিলতময় আশুরা বিভিন্ন ঘটনাপুঞ্জে সমৃদ্ধ থাকলেও সর্বশেষে সংঘটিত কারবালা প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতই এ দিবসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আশুরা দিবসে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কারবালায় অন্যায়, অবিচার, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের জন্য রণাঙ্গনে অকুতোভয় লড়াই করে শাহাদতবরণ করেছিলেন; কিন্তু তিনি অসত্য, অধর্ম ও অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি।
ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বাজি রেখে সপরিবারে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। ইসলামের সুমহান আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য তাঁর এ বিশাল আত্মত্যাগ ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার মুসলিম উম্মাহর জন্য এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। কারবালার ঘটনা থেকে মানবগোষ্ঠীর জন্য যেসব শিক্ষা রয়েছে, তন্মধ্যে প্রধান হচ্ছে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তবু ক্ষমতার লোভে ন্যায়নীতির প্রশ্নে আপস করেননি। খিলাফতকে রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তরে ইয়াজিদের বলপ্রয়োগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চক্রান্তের প্রতি আনুগত্য স্বীকার না করে তিনি প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত হন। বিশ্ববাসীর কাছে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ন্যায়ের পক্ষে প্রতিরোধ সংগ্রামের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। কারবালা প্রান্তরে সত্য ও ন্যায়কে চির উন্নত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগের অতুলনীয় আদর্শ স্থাপন করেছেন। ঐতিহাসিক ১০ মহররম চিরকাল বিশ্বের নির্যাতিত, অবহেলিত এবং বঞ্চিত মানুষের প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এভাবে পৃথিবীতে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আশুরার দিবসে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদত এক অনন্য, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। ইসলামের কালজয়ী আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্যই কারবালায় নবীবংশের আত্মত্যাগ হয়েছিল। মূলত আশুরার দিনে মুসলমানরা ন্যায় প্রতিষ্ঠাকল্পে আত্মত্যাগের এক অনুপম আদর্শ শিক্ষা গ্রহণ করেন। ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতালিপ্সা ও মসনদের লোভ-মোহের ঊর্ধ্বে উঠে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) বুকের তাজা রক্ত প্রবাহিত করে ইসলামের শাশ্বত নীতি ও আদর্শকে সমুন্নত করলেন। কারবালার রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়েই ইসলামের পুনরুজ্জীবন ঘটে। কারবালা ট্র্যাজেডির বদৌলতেই ইসলাম স্বমহিমায় পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। তাই যথার্থই বলা হয়, ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালা কি বাদ’ অর্থাৎ ইসলাম জীবিত হয় প্রতি কারবালার পর। সত্যের জন্য শাহাদতবরণের এ অনন্য দৃষ্টান্ত ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মাহাত্ম্য তুলে ধরার মধ্যেই নিহিত রয়েছে ১০ মহররমের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। আশুরা দিবসে কারবালার শিক্ষণীয় ও করণীয় হলো, অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামীদের সামনে প্রতিপক্ষের তরফ থেকে কোনো সময় অর্থ, বিত্ত ও সম্মানের লোভনীয় প্রস্তাব এলেও ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে আপসহীন মনোভাবের মাধ্যমে ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে।
কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মৃতিতে ভাস্বর আশুরার শাশ্বত বাণী তাই অন্যায় প্রতিরোধ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা জোগায়। আশুরা এ মহান শিক্ষা দিয়েছে যে সত্য কখনো অবনত শির হতে জানে না। বস্তুত, কারবালা ছিল অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রাম, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণতন্ত্রের লড়ই। ইসলামি আদর্শকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.); কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে আপস করেননি। জীবনের চেয়ে সত্যের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার জন্য নবী-দৌহিত্রের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ জগতের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা। কারবালার শোকাবহ ঘটনায় চিরন্তন সত্যের মহাবিজয় হয়েছিল এবং বাতিলের পরাজয় ঘটেছিল। সুতরাং আশুরার এ মহিমান্বিত দিনে শুধু শোক বা মাতম নয়, প্রতিবাদের সংগ্রামী চেতনা নিয়ে হোক চির সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন লড়াই, প্রয়োজনে আত্মত্যাগ—এটাই মহররমের অন্তর্নিহিত শিক্ষা।
কারবালার কথকতা শুধু শোকের কালো দিবসই নয়, এর মধ্যে সুপ্ত রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য কঠিন শপথ নেওয়ার সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা। মহররমের ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হওয়ার শিক্ষা যাবতীয় অন্যায়-অবিচার-অসত্য ও স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে সব সময় রুখে দাঁড়ানো। কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করাই হোক কারবালার মূলমন্ত্র! আশুরা দিবসে কারবালার ত্যাগের শিক্ষা, অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার শিক্ষা আমাদের চিরন্তন আদর্শ ও অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত। তাই মর্সিয়া ক্রন্দন নয়, কারবালার বাস্তব শিক্ষা, অর্থাৎ সত্যের জন্য আত্মত্যাগের যে অতুলনীয় শিক্ষা, তা সাদরে গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’ আশুরার চেতনা জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হোক এবং সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতনসহ সব অনাচার দূর হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক!
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।

শিশুদের নিয়ে অশ্লীল ছবি ও ভিডিওচিত্র - বিভিন্ন দেশ থেকে গ্রেপ্তার ৩৪৮

শিশুদের নিয়ে অশ্লীল ছবি ও ভিডিওচিত্র নির্মাণ এবং প্রচারের অভিযোগে বিশ্বের কয়েকটি দেশ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার ৩৪৮ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কানাডার নেতৃত্বাধীন তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার হওয়া এসব ব্যক্তির মধ্যে শিক্ষক, প্রশিক্ষক ও চিকিত্সক রয়েছেন।
রয়টার্সের খবরে জানানো হয়, টরন্টো পুলিশ জানায়, শিশুদের নিয়ে পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে পুলিশি এই অভিযানে কানাডা থেকে ১০৮, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৬ ও স্পেন থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত কয়েকটি দেশের ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শিশুদের এসব অশ্লীল ছবি ও ভিডিওচিত্র পরিবেশনে থাকা অ্যাজোভফিল্মস ডটকম বলে পরিচিত টরন্টোর একটি প্রতিষ্ঠানে তিন বছর ধরে তদন্ত চালানোর পর এই গ্রেপ্তার অভিযান চলে।

২০১০ সালে পুলিশ অ্যাজোভফিল্মস ডটকম নামের টরন্টোর এক প্রতিষ্ঠান ও এর মালিক ব্রায়ান ওয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। মার্কিন পোস্টাল ইনভেস্টিগেশন সার্ভিস প্রতিষ্ঠানটির প্রক্রিয়া ও পর্নোগ্রাফের গ্রাহকদের চিহ্নিত করার জন্য এর তথ্যভান্ডারে নজর রাখে। তদন্তের সময় শিশুদের যৌন নির্যাতনবিষয়ক ৩৫ হাজার ছবি ও নয় হাজার ভিডিওচিত্র পাওয়া যায়। অ্যাজোভফিল্মস ডটকম ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

টরন্টোর সেক্স ক্রাইম ইউনিটের প্রধান জোয়ানা বেভেন-ডেসজারদিন জানান, যেসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরা শিশুদের সংস্পর্শে ছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪০ জন স্কুলশিক্ষক নয়জন চিকিত্সক ও সেবিকা, ৩২ জন শিশুদের স্বেচ্ছাসেবক, ছয়জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও তিনজন পালক পিতামাতা রয়েছেন।

রানা প্লাজার প্রেতাত্মা

সময়ের হিসাবে নিউইয়র্কের তুলনায় ক্যালিফোর্নিয়া তিন ঘণ্টা পিছিয়ে। সে হিসাব না করেই আমি জেসন মটলাঘকে সকালে ফোন করেছিলাম। হয়তো তখনো ঘুমোচ্ছিলেন। বিকেলের দিকে তাঁর ফিরতি ফোন পেলাম। জেসন এ বছরের গোড়ার দিকে ও গত আগস্টে তাজরীন তৈরি পোশাক কারখানায় ও রানা প্লাজায় মারাত্মক দুর্ঘটনার ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে এসেছেন। পুলিৎজার সেন্টার অন ক্রাইসিস রিপোর্টিংয়ের জন্য প্রস্তুত তাঁর সর্বশেষ লেখাটি ছাপা হয়েছে নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক নেশন পত্রিকায়। সে লেখা ‘বাংলাদেশে মৃতদের কোনো সুবিচার নেই’—পড়েই জেসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা। তাঁর লেখার মতো কথায়ও গভীর বেদনার সুর। ‘আমি একদম নিঃস্ব এমন একদল মানুষ দেখেছি, যাদের আশা করার মতো কোনো আশ্রয় নেই, কোনো জায়গা নেই। যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রতিটি মৃত শ্রমিকের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দেবে, তারা সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। টেলিভিশন ক্যামেরা নেই, ফলে বড় কর্তারাও উধাও।’ রশিদা নামে এক নারীর কথা বললেন জেসন।
তাঁর লেখায়ও রশিদার কথা আছে আগাগোড়া। সাভারের অতিদরিদ্র দিনমজুরের স্ত্রী, তাঁদের ১৬ বছরের কন্যা ফাতেমা রানা প্লাজার এক পোশাক কারখানায় কাজ করত। প্রতি মাসে বেতন ছিল প্রায় ১১০ ডলার। বিধ্বস্ত ভবনের নিচে তার লাশ, কিন্তু সে লাশ এমন ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল যে সঠিকভাবে তাকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্থানীয় এক পরীক্ষাগারে নমুনা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দুর্ঘটনার ছয় মাস পরেও পরীক্ষার ফল মেলেনি। রশিদা প্রতিদিন রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের সামনে আরও কয়েক শ স্বজনহারা নারী-পুরুষের সঙ্গে জমায়েতে যোগ দিয়েছেন, বুকের ওপর ফাতেমার ছবি। বিদেশি সাংবাদিক জেনে জেসনের কাছে ছুটে এসেছেন, তাঁর হাত ধরে মিনতি করেছেন একটা কিছু করতে। অক্ষম সাংবাদিক, কাগজে নিজের নাম লিখে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু এখনো সে মহিলার আহাজারি তাঁর কানে বাজে। প্রতিশ্রুতির অবশ্য কমতি নেই। বলা হয়েছিল প্রতিটি মৃতের জন্য প্রাথমিকভাবে এক হাজার ২০০ ডলারের মতো সাহায্য দেওয়া হবে। বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের জানের মূল্য এক লাখ টাকা, তা দিতেই আমাদের কর্তাবাবুদের নাভিশ্বাস। কিন্তু সে টাকা পেতে হলে মৃতের পরিচিতি সুনিশ্চিত করতে হবে। সে পরিচয় সুনিশ্চিত করা যাচ্ছে না, ফলে প্রতিশ্রুত লাখ টাকাও মিলছে না রশিদা ও তার স্বামীর। এ রকম অসংখ্য রশিদার সঙ্গে জেসনের দেখা হয়েছে। কারও নাম মনে আছে, কারও নাম জানাই হয়নি। জানা নেই, শোনা নেই, অথচ তাদের প্রত্যেকে মনে হয় নিকটাত্মীয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় যে হরহামেশা আগুন ধরে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, জেসন তার জন্য শুধু বাংলাদেশের পোশাক কারখানার মালিক ও সরকারের ওপর ক্ষিপ্ত নন। বিদেশি আমদানিকারক, যারা ইচ্ছা করলেই পোশাক কারখানার নিরাপত্তার প্রশ্নটি অগ্রাধিকার নিয়ে বিবেচনায় আনতে পারত, তাদেরও সমানভাবে দোষী ভাবেন। শুধু সমান কেন, তারা হয়তো একটু বেশিই দোষী। একদম পানির দামে তৈরি পোশাক আসছে আমেরিকার সাজানো দোকানে। ওয়াল-মার্ট, সিয়ার্স, ডিজনি ইত্যাদি নামজাদা সব কোম্পানি বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের ক্লায়েন্ট। যেসব কারখানায় পোশাক তৈরি হচ্ছে, তার নিরাপত্তা যে খুবই নড়বড়ে, এ কথা তো তারা খুব ভালো করেই জানে। তার পরেও এ প্রশ্নে মালিকপক্ষের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট দাবি তোলেনি। কারণটা সহজ, সে প্রশ্ন তুললেই দাবি উঠবে তৈরি পোশাকের ক্রয়মূল্য বাড়াও। আমেরিকার কোম্পানিগুলোর তুলনায় ইউরোপীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে। গত বছর দেশি-বিদেশি শ্রমিক অধিকার সংস্থাসমূহের উদ্যোগে ও বিভিন্ন দাতা দেশের সমর্থনে যে অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তা চুক্তি প্রস্তুত হয়, ইউরোপের অধিকাংশ প্রধান তৈরি পোশাক আমদানিকারকেরা তাতে স্বাক্ষর করেছে। আইনত বলবৎযোগ্য এই চুক্তি অনুসারে কারখানার মালিকেরা কারখানা ভবনের নিরাপত্তার জন্য দায়ী থাকবেন, তা রক্ষায় ব্যর্থ হলে বিদেশে পণ্য রপ্তানির অধিকার হারাবেন।
পাঁচ বছর মেয়াদি এই চুক্তি অনুসারে কারখানার মালিকেরা প্রতিটি কারখানায় অগ্নিরোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন এবং নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষার ব্যবস্থা করবেন। এ জন্য চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী বিদেশি কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সাহায্য প্রদানে সম্মত হয়েছে। খুবই সামান্য সে অর্থের পরিমাণ, তবে কাজ শুরুর জন্য তার গুরুত্ব অপরিসীম। এ পর্যন্ত শ খানেক বিদেশি কোম্পানি চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু তাদের মধ্যে মার্কিন এমন কোম্পানির সংখ্যা মোটে তিন (অ্যাবারক্রম্বি অ্যান্ড ফিচ, পিভিএইচ ও আমেরিকার ইগল)। ওয়াল-মার্টসহ ১৫টি মার্কিন কোম্পানি অবশ্য একটি ভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তাতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার থাকলেও চুক্তিটি আইনত বলবৎযোগ্য নয়। অর্থাৎ, প্রথম চুক্তির মতো এই দ্বিতীয় চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতের কোনো অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার জন্য আইনগত ব্যবস্থার সম্মুখীন হবে না। ইউরোপীয় কোম্পানিসমূহ কারখানার নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে অর্থ সংস্থানে সম্মত হয়েছে, কিন্তু মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের স্বাক্ষর করা চুক্তি অনুসারে বড়জোর কারখানার মালিক ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ‘যৌথ দায়িত্ববোধ’ অনুসরণ করবে। সোজা কথায়, শ্রমিকস্বার্থ রক্ষায় তারা কোনো দায়দায়িত্ব নিতে রাজি নয়।
বলাই বাহুল্য, মার্কিন কোম্পানিসমূহের একমাত্র লক্ষ্য মুনাফা। জেসনের মতো সাংবাদিকেরা সে-কথা খুব ভালো করেই জানেন। বাংলাদেশে তৈরি পোশাকে শ্রমিকের রক্তের দাগ রয়েছে, এই অভিযোগ তুলে সে পণ্য বয়কটের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে। আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পণ্যের বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেসন আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, বাংলাদেশে প্রস্তুত তৈরি পোশাক এ দেশে বিনা শুল্কের সুবিধা কখনো পায়নি। ফলে এই অর্থহীন হুমকির কোনো মানে নেই। তবে বাংলাদেশের জন্য তা এক ধরনের হুঁশিয়ারি বটে। ইউরোপীয়রাও যদি সেই পথ অনুসরণ করে, তাহলে সংকটের সৃষ্টি হবে। জেসনের ধারণা, ‘ব্যাড পাবলিসিট’-এর পরেও আমেরিকায় বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বিঘ্নিত হবে না। ‘এত সস্তায় তৈরি পোশাক আর কে দেবে, বলুন?’ জেসন ফিরে ফিরে আমাকে রশিদার মতো অসহায় মানুষের কথা বলছিলেন। যে শান-শওকতের সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা জীবনযাপনে অভ্যস্ত, সে তুলনায় পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কার্যত নিঃস্ব। তাঁদের ন্যূনতম বেতন পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা করতেই এই মালিকদের তা মানতে বুক ফেটে যাচ্ছে। কাদের ঘামের ওপর তাঁদের ইমারত গড়ে উঠেছে,
সে কথা কি তাঁরা কখনো ভাবেন? আমি জানতে চেয়েছিলাম, পোশাকশ্রমিকদের প্রতি কারখানার মালিক ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে কি একধরনের শ্রেণীবৈষম্য রয়েছে? রানা প্লাজা বা তাজরীনের ভুক্তভোগীদের নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে এখন আর কোনো উচ্চবাচ্য নেই। একদম ভিখারি এমন একদল মানুষের ভাগ্য নিয়ে ভাবার মতো বাড়তি সময় বাংলাদেশি মিলের মালিকদের তো নেই-ই, তথ্যমাধ্যমেরও নেই। সে কথা মাথায় রেখেই এই প্রশ্ন। জেসন আমার প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দিলেন না, পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী ভাবো? উত্তরে আমি কী বলেছিলাম, সে-কথা বলার বদলে আমি বরং আপনাদেরই সে-কথা জিজ্ঞেস করি। সত্যি কি রানা প্লাজার নিহত শ্রমিকদের অথবা তাঁদের অসহায় স্বজনদের বিপন্ন অস্তিত্বের কথা আপনাদের কারও মনে পড়ে? নির্বাচনের আয়োজনে পুরো বাংলাদেশ এখন মশগুল। ডান-বাম বা মধ্যপন্থী কোনো রাজনৈতিক দলের কর্তাব্যক্তিরা কি তাঁদের সমস্যার সঙ্গে আদৌ পরিচিত? তাঁদের কারও আগাম নির্বাচনী ঘোষণায় তো এ নিয়ে একটি বাক্য ওপরে লিখিত হয়েছে, তা নজরে আসেনি। এই গরিব মানুষগুলোকে চোখের যত দূরে রাখা যায়, তাতেই কি আমরা অধিক স্বস্তি বোধ করি না? জানতে ইচ্ছা করে, দুঃখী রশিদা কি শেষ পর্যন্ত নিহত কন্যার জানের বদলা হিসেবে সামান্য কয়েক হাজার টাকা পেয়েছেন? তাঁর স্বামী মজিদ একটি চায়ের দোকান দেবেন, ফাতেমার আয়ের ওপর ভরসা করেই সে স্বপ্ন তাঁরা দেখেছিলেন। সে দোকান কি তাঁর হলো? আমেরিকা থেকে একজন জেসন মটলাঘ আবার বাংলাদেশে এসে খবর না করা পর্যন্ত এ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথাই হয়তো নেই।

কুফা ডিপটি by সেলিম হোসেন

ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরল নিশার। এমনি এমনি ফেরেনি, ধাক্কায় ফিরেছে। মুখের ওপর পানি ছিটাল কে যেন। চোখ কুঁচকে মাথা ঝাঁকাল নিশা। অমনি একজন চুল ধরে টেনে বসিয়ে দিল ওকে। নড়ানো যাচ্ছে দেখে বুঝল, হাত-পা খোলাই আছে, বাঁধে নাই। প্রয়োজন বোধ করে নাই, অবলা মেয়েমানুষ! কোথায় যেন প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারছে না। একটু পরে বুঝল—মাথার পেছনটায়, হাত দিয়ে অনুভব করল চুলের ভেতরে আলু। হঠাৎ করেই সব মনে পড়ল নিশার, বুঝে গেল ও কোথায়। ঝামেলাটা লাগিয়েছে ডিপটি নামের কিপটা লোকটা, জাকি ভাইয়ের ম্যানেজার। কেন তাকে কিপটা মনে হয়—জানে না নিশা, তবে ওর জন্য সে একটা মহা কুফা লোক—যতবার দেখা হয়েছে ততবারই কোনো বিপদে পড়তে হয়েছে। একটা শনি যেন! এবার অবশ্য তেমন কিছু করেনি সে, শুধু একটা বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে। হাওয়ায় ভেসে একটা খবর এল—ইয়াঙ্গুন থেকে ইয়াবাসম্রাট জ্যাকব আসছে ঢাকায়। সবাই তৈরি, কিন্তু এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন থেকে বের হওয়ার পর পরই কীভাবে যেন হারিয়ে গেল সে।
তক্ষুনি জাকি ভাইয়ের নির্দেশে ডিপটি তার নিজস্ব আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক দিয়ে পাত্তা লাগিয়ে খুঁজে পেল তাকে, উত্তরার এক বাসায় গোপন বৈঠকে বসেছে। রিপোর্ট করল বস জাকি ভাইয়ের কাছে। ঠিক তারপর থেকে নিশাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো ওই ব্যাপারটা খতিয়ে দেখে রিপোর্ট করার জন্য। দেরি না করে তখনই কাজে লেগে গেল নিশা। ঠিকানামতো বাড়িটার সামনে গিয়ে কীভাবে ঢুকবে সেটা ভাবছে মাত্র, হঠাৎ দেখে—কার্টুন চরিত্র হিল্লোলের মতো চেহারার বিদ্ঘুটে এক লোক এলোমেলো পায়ে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বেরিয়ে আসছে। গাড়িতে উঠল। ভাবনা-চিন্তার বেশি সময় পেল না নিশা, নিলও না। নিজের ষষ্ঠেন্দ্রিয়কে গুরুত্ব দিয়ে দ্বিতীয় চিন্তা না করে তক্ষুনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—ওদের মাইক্রোবাসের পেছনে পেছনে যেতে থাকল অফিসের দেওয়া ঝকঝকে প্রাডো চালিয়ে। পিছু নিয়ে নিকুঞ্জের কাছে একটা প্যাকেজিং ফ্যাক্টরিগোছের এই কারখানার কাছে এসে থামল।ওরা সবাই ভেতরে ঢুকছে। গাড়িটা একটু দূরে রেখে হেঁটে ফিরে এসে ভেতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না ভেবে উঁকিঝুঁকি মারছিল নিশা। হঠাৎ পেছন থেকে আঘাত এল। বেমক্কা এক বাড়িতেই পড়ে গেল নিশা। একদম আনাড়ির মতো। এবং তারপর এখন মেঝেতে পড়ে থেকে চারদিকে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করছে পরিস্থিতির গুরুত্ব। প্রায় গোল হয়ে চেয়ার, টুল এবং একটা লম্বা বেঞ্চে বসে আছে বিভিন্ন বয়সের কয়েকজন লোক—ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন স্তরের মাফিয়া চক্রের কর্মী-সদস্য কিংবা সরদার। সাদা লুঙ্গি পরা কালো কুচকুচে পেটমোটা যেমন আছে, আবার ফ্যাশনেবল জামাকাপড়ের টাই পরা সুদর্শনও আছে। নিশার মোবাইলটা পকেট থেকে তুলে নিয়ে ওদের দিকে দেখিয়ে ‘এইটা ছাড়া আর কিছু নাই’ বলে ‘অল ক্লিয়ার’ ভঙ্গি করল পানি ছিটানো লোকটা।
কেন নিশাকে ভেতরে নিয়ে এসেছে তাই নিয়ে বকাবকি করল একজন। ‘আমি বাইয়ের লাইগা সিগারেট লইয়া আইতাছি, দেহি এই, বিত্রে ঢুকনের পায়তারা করতাছে।’—কৈফিয়ত দিল লোকটা। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল বলে তার কৈফিয়ত কেউ পাত্তা দিল না। কিন্তু চলে যেতেও বলল না, কেউ এখানে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। বেখাপ্পা চেহারার লোকটার কথা মন দিয়ে শুনছে সবাই। ও কি এখানে তাদের ব্যবসা বাড়াতে এসেছে? ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ কথাটা মনে পড়তে হাসি পেল নিশার, বিজনেস অ্যাম্বাসেডর! কথায় কিছুটা যেন চাটগাঁইয়া টান আছে লোকটার। আসলে শিখেছে তো ওই সীমান্ত অঞ্চলের জেলেদের ভাষা। ‘আর ইম্পোর্ট করতে হবে না, এখন অঁনেরাই অইবেন ইন্ডাস্ট্রির মালিক। টাকা লাগিবো অতি সামান্য—দরেন মাত্র...ফাইব মিলিয়ন ডলার।’ তারপর দ্রুত আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে যোগ করল সে, ‘পরে দেবেন, মাল বেচি মুনাফারতুন টাকা শোধ দিবেন। একবার প্রডাকশনে যাইতেন পাইরলেই ত টাকা আর টাকা!’—ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলতে লাগল, ‘দরেন, এই দ্যাশে কত লোক? প্রতিদিন যদি এক কোটি লোকও আমাদের মাল কেনে...দাম কমাই দি সস্তা করি ফালান, তাতে ইয়ুজ বাড়ি যাইব, তো যদি এক টাকা করিও আমনের প্রফিট থাকে, প্রতি-দি-ন এ-ক-কো-টি টাকা! কত খাইবেন, খান না! ‘হ্যাহ্ হ্যাহ্ হ্যাহ্্ শুধু ইয়ং জেনারেশন নয়, একবার মজা পাই গেলে বুড়ারাও খাইব হ্যাহ্ হ্যাহ্।’ ‘এবং বেশি জায়গারও দরকার নাই, এই রকম একটা কার্টন ফ্যাক্টরিই যথেষ্ট।’ ব্রিফকেস খুলে একটা ফাইল বের করল লোকটা, ভেতর থেকে বের হলো একটা ড্রয়িং প্রিন্ট, ভাঁজ খুলে বোঝাতে লাগল সে,‘এই হইতেসে ফ্যাক্টরি লে-আউট, দেখেন কত কম জায়গা লাগে, এইখানে মেশিনের অপারেটিং সিস্টেম,
ফ্লো ডায়াগ্রাম...সব দেওয়া আসে, দেখলেই বুঝবেন। কাঁচামাল ত আমরাই দিমু, একদম সাধারণ প্যাকেজে চাউলের বস্তা কিংবা ওই ধরনের মালের লগে আইব। আমেন খালি বস্তা খুইলবেন, মেশিনের ওই দিকে ঢাইলবেন আর এইদিক দিয়া আবার প্যাকেটে ভইরবেন, ব্যস, কোটিপতি!’ আস্তে নড়ছে নিশা। ও কখনো এ ধরনের কাজে বুকে বা কোমরে কিছু রাখে না, কারণ তল্লাশি করতে ওখানেই সবার আগে হাত যায়। বাঁ পায়ে গোড়ালি পর্যন্ত উঁচু জুতার ভেতরের দিকে আটকানো ছুরিটা এ মুহূর্তে দরকার নাই, ডান পায়ের জিনসটা একটু তুলে ভেতরের দিকে ফিতা দিয়ে আটকানো ছোট্ট পিস্তলটা আলগা করল সে অনেক সময় নিয়ে। বের করে হাতের মুঠোয় ধরল শক্ত করে। পুরোটা সময় খেয়াল রাখল, নিশ্চিত হয়ে নিল—ওকে কেউ দেখছে না। ধীরেসুস্থে লক্ষ্য স্থির করে পানি ছিটানো লোকটার পায় গুলি করেই এক লাফে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল নিশা কোনার দিকে একটা সুবিধামতো জায়গায়। হকচকিত হয়ে পড়ার সুযোগ নিয়ে সবাইকে নির্দেশ দিল দুই হাত সামনে মেলে দিয়ে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে। একটু এগিয়ে নিচু হয়ে রক্তাক্ত পায়ের ব্যথায় কাতরাতে থাকা লোকটার পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে নিল। গুলির শব্দ, রক্তের দৃশ্য এবং সঠিক নিশানার চাক্ষুষ প্রমাণ সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক মতোই চলছিল, সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে নির্দেশ মেনে মাটিতে এক লাইনে শুয়ে পড়েছে, শুধু... জাকি ভাইকে ফোন করার জন্য সেটের কি-প্যাড লক খুলে কুইক ডায়াল বাটন চাপছে নিশা। হঠাৎ নড়ে উঠল একটা ছায়া, ভাঁজ পড়ল দামি জুতায়, দুলে উঠল সুন্দর টাই। নিশার কাছেই ছিল লোকটা,
মুহূর্তের অন্যমনস্কতার সুযোগে হামাগুড়ি অবস্থা থেকে স্রেফ একটা ব্যাঙের মতো লাফ দিল অর্বাচীন। পিস্তল, মোবাইল দুটোই হাতছাড়া হয়ে গেল অপ্রস্তুত নিশার। কিন্তু এ যে নিশা! ভগ্নাংশ সেকেন্ডে স্প্রিঙের মতো নড়ে উঠল উৎকণ্ঠ নিশার টানটান শরীর, কোথায় কীভাবে কিসের আঘাত লাগল বুঝে ওঠার আগেই পড়ে গেল সুদর্শন, উঠে বসতে গিয়ে দড়াম করে লাথি খেল পেটের পাশে। দেখাদেখি উঠে পড়েছিল আরেকজন, হঠাৎ দেখল নাকের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে একটা ঘুষি; কিন্তু স্বস্তি পাওয়ারও সময় পেল না বেচারা, মুষ্টির অপর প্রান্তের কনুই এসে কানের পাশে এমন জোরে বাড়ি খেল—মাথার ভেতরে মগজ নড়ে গেল তার। সেখান থেকেই এক গড়ান দিয়ে নিজের পিস্তলটা কুড়িয়ে নিল নিশা, গুলি করল আরেক আগুয়ানকে। এবার আর কেউ তেমন একটা বীরত্ব দেখাবে বলে মনে হচ্ছে না। জ্যাকব শুয়েই আছে, চেয়ে আছে সতর্ক বিড়ালের মতো। সরে গিয়ে সাবধানে ফোনটা মাটি থেকে তুলে নিল নিশা ওদের থেকে চোখ না সরিয়ে। কাঁপছে সাইলেন্ট মুডে থাকা ফোন। কে ফোন করেছে দেখার জন্য একঝলক তাকাল স্ক্রিনে। ওফ, আবার সেই কুফা!—একমুহূর্ত ভাবল সে। ‘হ্যাঁ, ডিপটি ভাই বলেন,’ বাটন চেপে সাড়া দিল।  ম্যাডাম, আপনে কই? আমরা ফুল গ্যাঙ আছি এয়ারপোর্টের সামনে, আপনে অহনে কুন জায়গায়? আমরা আমু?’ এবার হাসি এলেও ওদের গম্ভীরভাবে এই জায়গাটা নির্দিষ্ট করে বুঝিয়ে দ্রুত চলে আসতে বলল নিশা।

অনুসরণ by মশিউল আলম

হেমন্তের হিমেল বাতাস, সকাল দশটার ঝলমলে রোদ, ঢাকার রাস্তার কালো পিচ, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস, পথচারী—সবাই যেন ভয় পেয়েছে। সবখানে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে চাপা এক আতঙ্ক। বিরামহীন ৮৪ ঘণ্টা হরতালের আজ প্রথম দিন। মাত্র পাঁচ দিন আগেই ১৪ জন মানুষের প্রাণের ওপর দিয়ে বুলডোজারের মতো গড়িয়ে গেছে টানা ৭২ ঘণ্টার হরতাল। সকাল সাড়ে ১০টায় কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের সার্ক ফোয়ারার চৌমাথায় দাঁড়িয়ে ভাবছি, গ্রিন রোডের শেষ মাথায় ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল পর্যন্ত হেঁটে যেতে কতটা সময় লাগতে পারে। এ সময় এক তরুণ রিকশাচালক জিজ্ঞাসা করে আমি কোথায় যাব। আমার বিরক্তি বোধ হয়; মনে মনে বলি, আমি কোথায় যাব সেটা জিজ্ঞাসা করার তুমি কে? মানতে পারি না যে রিকশাচালকদের এটা স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা। বিরক্তিটা অবশ্য প্রকাশ করি না; কোনো কথা না বলে পান্থপথের ফুটপাত ধরে গ্রিন রোডের দিকে হেঁটে যেতে আরম্ভ করি। পুরোটা পথ হেঁটেই যাব। প্রাণের ভয়ে। হরতালকারীরা যাত্রীসুদ্ধ রিকশায় আগুন ধরিয়ে দিতে উৎসবের আনন্দ পায়। কিন্তু পান্থপথ আর গ্রিন রোড যেখানে পরস্পরকে ছেদ করেছে, সেই চৌরাস্তায় পৌঁছে মনে পড়ল, আমি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি রক্তচাপ ওঠানামার একটা বিহিত করতে। এতটা পথ হেঁটে গিয়ে ডাক্তারের সামনে হাজির হলে তিনি যখন আমার রক্তচাপ মাপবেন, সম্ভবত বিভ্রান্ত হবেন। তাতে আমারই ক্ষতি। স্বাভাবিকের থেকে ১০ টাকা বেশি ভাড়ায় আমি একটা রিকশায় উঠে বসলাম। ‘আপনি যদি দিনে মাত্র একটা সিগারেটও খান, আপনি স্মোকার। আপনার হাইপারটেনশন, আর আপনি স্মোক করেন, আমি কেন, পৃথিবীর কোনো ডাক্তারই আপনার ব্লাডপ্রেশার কন্ট্রোলে আনতে পারবেন না।
কোনো ওষুধেই কোনো কাজ হবে না...’ ডাক্তারের কথা শুনতে শুনতে আমি মনে মনে বললাম, ‘আপনি তো ভালো ডাক্তার নন! মাঝেমধ্যে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দুই-একটা সিগারেট খেলেই যদি ব্লাডপ্রেশার কন্ট্রোলের বাইরে চলে যায়, আর সেটা কন্ট্রোলে আনার কোনো ওষুধই যদি আপনার জানা না থাকে, তাহলে আপনি ভালো ডাক্তার হন কীভাবে?...’ আমাকে সম্ভবত অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। হঠাৎ লক্ষ করি ডাক্তার কথা থামিয়ে স্থির চেয়ে আছেন আমার মুখের দিকে। চোখাচোখি হতেই আমি লজ্জা পেলাম, আর আমার মনে হলো, লজ্জা বোধ হয় তিনিও পেলেন। কিন্তু কী কারণে লজ্জা, আমার এবং তাঁর—আমি জানি না। তারপর ডাক্তার জানতে চাইলেন আমার ঘুম কেমন হয়। আমি বললাম, ভালো হয় না। আরও বললাম যে উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ‘কী ধরনের উল্টাপাল্টা স্বপ্ন?’ আমি মনে মনে ইংরেজি ‘বিজার’ শব্দটার জুতসই একটা বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজতে খুঁজতে ভুলে যাই যে ডাক্তারের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত; বরং আমার সব সময়ই যেটা হয়, এত ঘন ঘন চিন্তা ও মনোযোগের বিষয় বদলে যায় যে এক কথা শেষ না করে আরেক কথায় চলে যাই, বাক্য সম্পূর্ণ হয় না; বলি যে আমার ভয় লাগে, কিসের ভয় আমি জানি না, অথবা জানি, যেমন, আমার ছেলেমেয়েদের জন্য, ওদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। কারণ, ওরা অরক্ষিত, পাখির ছানাদের মতো, অথবা ওদের দিকে তাকিয়ে আমার এমন বোধ হয় যেন আমার হূৎপিণ্ডটা বুকের ভেতর থেকে বের করে রেখে দেওয়া হয়েছে একটা খোলা জায়গায়, কখন কাক বা চিল এসে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায়...শুধু এ রকম ভয় না, আমার নিজের জন্যও ভয় লাগে, সহকর্মীদের জন্য, বন্ধুদের জন্য, ভয় লাগে যে কিছু একটা ভয়ানক ব্যাপার ঘটে যেতে পারে, এমন ভয়ানক যা আগে কখনো ঘটেনি.... ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে দেখি রাস্তা আগের থেকে অনেক বেশি নির্জন। হাসপাতালের এক কোণে লাইটপোস্টের নিচে পান-সিগারেটের একটি দোকান দেখে মনে হলো, শেষ সিগারেটটা খেয়ে নিই।
তারপর ডাক্তারকে বলব, ‘এবার? এখন ব্লাডপ্রেশার কন্ট্রোল হচ্ছে না কেন?’ সিগারেট খেতে খেতে হঠাৎ চোখে পড়ল, বেশ দূরে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, চেয়ে আছে আমার দিকে। হালকা-পাতলা, বেশ লম্বা একটা লোক। এক হাত কোমরে রাখা, আরেক হাতে সিগারেট। কিছুক্ষণ পর পর সিগারেটে টান দিচ্ছে আর অপলক চেয়ে আছে আমার দিকে। আমি তাকে চিনি না; কিন্তু সে এমনভাবে আমাকে দেখছে যেন সে আমাকে চেনে। আমি অফিসের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করি গ্রিন রোডের ফুটপাত ধরে। কিছুদূর এগোনোর পর পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি সেই লোকটিও আসছে আমার পিছু পিছু। আমি জোরে পা চালিয়ে হাঁটতে থাকি আর খালি রিকশার সন্ধানে রাস্তার দিকে ঘন ঘন তাকাই। এবার রোদটাকে বেশ তীব্র মনে হয়, গা ঘেমে ওঠে। আমি রোদ এড়াতে রাস্তা ক্রস করে পুব পাশের ছায়াময় ফুটপাতে উঠি। কিছুদূর যাওয়ার পর আবার পেছনে তাকিয়ে দেখি, সেই লোকটিও ফুটপাত পরিবর্তন করে আমার পিছু পিছু আসছে। একবার মনে হলো, থেমে লোকটার মুখোমুখি হই; জিগ্যেস করি কেন সে আমাকে এভাবে অনুসরণ করছে। কিন্তু আমার দুই পা থামে না, ছুটতে থাকে আরও দ্রুতগতিতে। কিছুক্ষণ পর একটি খালি রিকশা পেয়ে ভাড়া ঠিক না করেই তাতে উঠে বসি, চালককে কারওয়ান বাজারের দিকে দ্রুত যেতে বলি। পেছনে তাকিয়ে দেখি লোকটি ফুটপাতের কিনারে দাঁড়িয়ে রাস্তার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে সন্ধানী চোখে। আমার রিকশা ছুটছে পান্থপথ ধরে কারওয়ান বাজারের দিকে।
পেছনে তাকিয়ে দেখি, একটি রিকশা সেই লোকটিকে নিয়ে যেন উড়ে আসছে আমার দিকে। কারওয়ান বাজারে অফিসের গেটে রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দিতে দিতে পেছনে তাকাই। সেই লোকটির দেখা আর পাই না।সন্ধ্যায় অফিস থেকে বেরিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করি। সার্ক ফোয়ারার চৌরাস্তা পার হয়ে সোনারগাঁও হোটেলের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলি বাংলামোটরের দিকে। হাতিরঝিলের পাড় ঘেঁষে নতুন রাস্তায় ঢোকার মুখে হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখি সেই লোকটা আসছে আমার পিছু পিছু। আমার বুক কেঁপে ওঠে। আমি রিকশা খুঁজতে শুরু করি। কিন্তু একটিও খালি রিকশার দেখা পাই না। হাতিরঝিলের ধার ঘেঁষে দ্রুত পা চালিয়ে এগোতে থাকি। ভয় লাগছে বলে নিজের ওপরেই বিরক্ত হচ্ছি: এত ভীরু হলে চলবে কী করে? কেন আমি লোকটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে জিগ্যেস করতে পারছি না সে কেন আমাকে অনুসরণ করছে? সন্ধ্যা ছয়টা পার হয়ে গেছে, আঁধার নেমেছে। রাস্তার পাশের বাতিগুলো জ্বলছে বটে, কিন্তু তার ফলে আঁধার একটুও দূর হচ্ছে না। বরং পরিব্যাপ্ত অন্ধকারের সমুদ্রে হলদে, রোগাটে বৈদ্যুতিক বাতিগুলোকে ক্ষীয়মাণ একেকটা বিন্দু বলে মনে হচ্ছে, যেন তারা নিভে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।  হাতিরঝিলের পাড় ধরে আঁকাবাঁকা রাস্তাটি গড়ে উঠেছে আমারই চোখের সামনে; এই পাড়ায় আমার নিজের বাসস্থান, অথচ এখন এই পথ, এই ফুটপাত আমার অচেনা মনে হচ্ছে। দিলু রোডে পানির ট্যাংকের কাছে রাস্তাটি যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে একটা চিকন গলি ঢুকে গেছে পাড়াটির ভেতরে।
আমি সেখানে একটু থামি, পেছনে তাকাই। সেই লোকটি, অন্ধকারে সে এখন লম্বা একটা ছায়ার মতো, এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমি গলির ভেতরে ঢুকে যাই। এই গলি থেকে আরও কয়েকটা গলি এগিয়ে গেছে এদিকে-ওদিকে। ওইসব গলির কোনো একটার মধ্যে হারিয়ে যাব আমি, লোকটি আর খুঁজে পাবে না আমাকে। দুই পাশে ঘনবদ্ধ বাড়িঘর, গলি সরু এবং অন্ধকার। আমি দ্রুত পা চালিয়ে সরু গলিটা পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত চওড়া একটা রাস্তায় উঠি, যেটি আঁকাবাঁকা হয়ে শেষে গিয়ে মিশেছে বাংলামোটর থেকে মালিবাগের দিকে যাওয়ার বড় রাস্তায়। সেই রাস্তার পাশে আমার পরিচিত এক ওষুধের দোকানে যাচ্ছি এখন; আমার পিছু পিছু লোকটিও যদি সে পর্যন্ত যায়, তাহলে আমি সেখানে তাকে থামাব, তার মুখোমুখি হব; আশপাশের সব দোকানের লোকজন আমার পরিচিত; তাদের সঙ্গে নিয়ে আমি লোকটাকে আটকে ফেলব। সবাইকে বলব, এই লোকটা আমাকে ফলো করছে সেই সকাল থেকে। কে সে? কেন আমার পিছু লেগেছে? কী তার উদ্দেশ্য?
একটি বাড়ির সীমানা-প্রাচীরের ধার ঘেঁষে কী একটা গাছ, সে গাছের ধারে একটা লাইটপোস্টের মাথায় বাতি জ্বলছে। গাছের পাতা ও শাখা-প্রশাখার ছায়া পড়েছে রাস্তায়। আমার পা দুটো মন্থর হয়ে আসে; একটু থেমে দম নিই, পেছনে তাকাই—সেই ছায়াটি হেলেদুলে এগিয়ে আসছে যথারীতি। আমি সামনে ঘুরে পা বাড়াই। হঠাৎ দুপাশ থেকে দুটি মানুষ আমাকে ঘিরে ধরে। একজন আমার ডান হাতের মুঠি থেকে মোবাইল ফোনটা কেড়ে নেয়, অন্যজন খুলে নেয় বাম হাতের ঘড়ি; একই সঙ্গে সে হাত ঢুকিয়ে দেয় প্যান্টের সাইড পকেটে, অন্যজন হিপ-পকেট থেকে বের করে নেয় মানিব্যাগ। আমি ‘ছিনতাই’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠতেই হাড্ডিসার একটা হাত বেড় দিয়ে ধরে আমার গলা; বেশ চওড়া একটা ছুরিতে বিদ্যুতের আলো ঝলকে ওঠে; এক নিমেষে সেটা ঢুকে যায় আমার বুকের ঠিক মাঝখানে; আমার চারপাশটা ঝলকে উঠল এক বিদ্যুচ্চমকে। আমার বুকের ভেতর থেকে কামানের গোলার মতো বেরিয়ে এলাম আমি, ছিটকে পড়লাম হাত দশেক দূরে এবং পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, দুটি লোক উন্মত্তের মতো ছুরি মেরে চলেছে আমার বুকে; আমি আর্তনাদ করে চলেছি, চারপাশ থেকে লোকজন ছুটে এসেছে; তারা গোল হয়ে ঘিরে দেখছে রক্তাক্ত ছুরির খেলা; তাদের ভিড়ে সেই লোকটিও, যে আমাকে অনুসরণ করছে সেই সকাল থেকে। আমি ঘুরে দৌড়াতে শুরু করলাম বাসার দিকে; পেছনে উপর্যুপরি ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে একটি মানুষ। তার প্রাণফাটা আর্তনাদে বিদীর্ণ হচ্ছে দিলু রোডের আকাশ-বাতাস। হাঁপাতে হাঁপাতে কলবেলের বোতামে চাপ দিলাম। দরজা খুলে গেল। আমার সামনে সেই লোকটি, যে আমার পিছু নিয়েছে সেই সকাল থেকে।

ফিলিপিন্সে গণকবরের প্রস্তুতি

দানবীয় ঝড়ে বিধ্বস্ত ফিলিপিন্সের ত্যাকলোবান শহরের সরকারি ভবনের বাইরে বৃহস্পতিবার বিপুলসংখ্যক মৃতদেহ ব্যাগের মধ্যে রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ মৃতদেহগুলো গণকবর দেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এদিকে ছিন্নমূল টাইফুন দুর্গতরা যে কোনো ধরনের সাহায্যের জন্য আবেদন জানাচ্ছে। ফিলিপিন্সে মধ্যাঞ্চলে দেশটির ইতিহাসের প্রলয়ংকরী ঝড়টি আঘাত হানার এক সপ্তাহ পর সরকারি ভবনটির বাইরে সারিবদ্ধভাবে প্রায় ২০০টি মৃতদেহ রাখা হয়েছে। এদের অনেকের পরিচয় জানা যায়নি। ত্যাকলোবানের মেয়র আলফ্রেড রমুয়েলদেজ বলেন, ‘অনেক এলাকায় এখনও অনেক মৃতদেহ রয়েছে।
এটা ভীতিকর।’ তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) একটি এলাকার হতে ৫ থেকে ১০টি মৃতদেহ সংগ্রহ করার অনুরোধ আসে। আমরা ওই এলাকায় পৌঁছে দেখতে পাই যে, সেখানে ৪০টি মৃতদেহ রয়েছে।’ ক্রমবর্ধমান এই সংকট মোকাবেলায় সহায়তাকারী সংস্থাগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজ করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এদিকে ফিলিপিন্সে সুপার টাইফুন হাইয়ান আঘাত হানার ছয় দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমেরিকার সাবেক এশীয় ঔপনিবেশের দুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য মার্কিনিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছে, ফিলিপিন্সে দুর্গতদের সহায়তায় বিলম্বে হলেও তারা ত্রাণ সরবরাহ শুরু করেছে। একটি মার্কিন বিমানবাহী জাহাজ দেশটিতে পৌঁছে গেছে। এদিকে জাতিসংঘ স্বীকার করেছে যে ফিলিপিন্সে টাইফুন আঘাত হানার পর সেখানকার দুর্গত মানুষের সহায়তায় সংস্থাটি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। ফিলিপিন্সে দুর্গত ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষ এখনও কোনো সহায়তা পায়নি। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলোর মধ্যে অসুস্থ ও আহত মানুষ অসহায়ভাবে শুয়ে আছে। যাদের শরীরে শক্তি অবশিষ্ট রয়েছে তারা এই নরকতুল্য স্থান ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থার প্রধান ভ্যালেরি আমোস বলেন, ‘পরিস্থিতি হতাশাজনক।’ বুধবার তিনি ত্যাকলোবান সফর করেন। ম্যানিলার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যারা ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে চলে যেতে পেরেছেন, তারা চলে গেছেন।
আরও অনেকে সেখান থেকে অন্যত্র চলে যেতে চেষ্টা করছেন। মানুষ মরিয়া হয়ে সাহায্য চাইছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তাদের কাছে এখনই সাহায্য পাঠানো উচিত। তারা এর মধ্যেই জানিয়েছেন, সেখানে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। দ্রুত তাদের কাছে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা আমাদের প্রথম কাজ।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেখানকার পরিবেশ ভীতিকর ও হতাশাজনক।’ বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের এরিয়া ম্যানেজার এফরেন নাগরামা বলেন, ‘শত শত মানুষকে প্রতিদিন বিমানবন্দরে আসতে দেখবেন। মানুষ কোনো কিছু না খেয়ে কয়েকদিন ধরে হেঁটে এখানে পৌঁছেন। তাদের খাবার পেতে কয়েক ঘণ্টা এমনকি কয়েক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ ত্রাণ সরবরাহকারী বিমান দেখতে পেলেও তাতে চড়তে বা খাবার পায় না। সেখানে বিশৃংখলা চলছে।’ মেয়র রমুয়েলদেজ বলেন, ‘আমাদের আরও লোকবল ও সরঞ্জাম প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ সকালে আমি মৃতদেহ সংগ্রহ করার জন্য কোনো ট্রাক না পেয়ে বিকেলে এটাকে আমি ত্রাণ বিতরণের কাজে ব্যবহার করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আসুন আমরা রাস্তার ওপর থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করি। এগুলো সেখানকার পরিবেশকে ভীতিকর ও হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে।’ নগর কর্মকর্তারা জানান, তারা এ পর্যন্ত আনুমানিক দুই হাজার মৃতদেহ সংগ্রহ করেছেন। তবে তারা স্বীকার করেছেন আরও বহু মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। শুধু ত্যাকলোবান শহরেই ১০ হাজার লোক মারা গেছে বলে জাতিসংঘের আশংকা। প্রেসিডেন্ট বেনিগনো একুইনো এই সংখ্যাকে ‘অনেক বেশি’ বলে অভিহিত করেছেন।
ত্রাণ চাপে একুইনো জাহাজ পাঠাচ্ছে জাপান : প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হাইয়ানে বিধ্বস্ত ফিলিপিন্সে দুর্গতদের ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করা নিয়ে চাপের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট বেনিগনো একুইনো।
ত্রাণের জন্য মরিয়া হয়ে থাকা মানুষদের জন্য দ্রুত খাবার, পানি ও ওষুধ সরবরাহ করা নিয়ে একুইনোর ওপর চাপ বাড়ছে। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার সচল রাখা এবং আইন-শৃংখলা বজায় রাখা নিয়েও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। বুধবার আইন-শৃংখলা রক্ষায় সেনা মোতায়েনের পরও ফিলিপাইনে চালের গুদাম ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী লুটপাট হয়েছে। ফিলিপাইনে ত্রাণ কাজের সহায়তায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদার হলেও স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত লোকবল এবং পরিবহনের অভাবে সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ সরবরাহ এবং উদ্ধারকাজও করা যাচ্ছে না। এসব কাজে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ও অন্যান্য জাহাজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাতেই ফিলিপিন্স উপকূলে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা। ওদিকে, জাপানও ফিলিপাইনে ত্রাণ কাজের সহায়তায় ১ হাজার সেনাসহ নৌজাহাজ ও বিমান পাঠাচ্ছে। দুর্গত মানুষদের জন্য খাবার, পানি ও ওষুধ সরবরাহের কাজে সহায়তার জন্য জাপানের সেলফ ডিফেন্স ফোর্স থেকে ফিলিপাইনে ১ হাজার সেনা পাঠানো হচ্ছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইতসুনোরি ওনোনদেরা। এছাড়া জাপান এরই মধ্যে ফিলিপিন্সকে ১ কোটি ডলার তহবিল সাহায্যসহ ২৫টি জরুরি চিকিৎসাসেবা দল এবং ৫০ সেনা সহায়তা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক এ সহায়তা ত্রাণবিতরণে গতি সঞ্চার করবে।
উল্লেখ্য, শুক্রবার ভোরে বিশ্বে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড়গুলোর অন্যতম হাইয়ান ফিলিপিন্সের মধ্যবর্তী উপকূলীয় প্রদেশ লেইতি ও সামার এ আঘাত হানে।