Tuesday, April 23, 2019

যৌন কেলেঙ্কারিতে ফেঁসেছেন ভারতের প্রধান বিচারপতি?

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ যাতে পদত্যাগ করেন, সে জন্যই তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার সাজানো অভিযোগ আনা হয়েছে। সেই ষড়যন্ত্রে দেশের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি জড়িত। উৎসব সিং বাইন্স নামের এক আইনজীবী এই গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টে এক হলফনামায় তিনি এই অভিযোগ করেন। আজ মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট ওই আইনজীবীকে নোটিশ পাঠিয়ে বলেছে, তিনি যেন তাঁর দাবির সমর্থনে প্রমাণ দাখিল করেন। উৎসবকে কাল বুধবার আদালতে প্রমাণসহ ব্যক্তিগতভাবে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অরুণ মিশ্র, বিচারপতি আর এফ নরিম্যান ও বিচারপতি দীপক গুপ্ত এই নির্দেশ দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ বিষয় এটা। মামলাটি ফেলে না রেখে বুধবার সকালেই তাই উৎসবকে প্রমাণসহ হাজির হতে বলা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সম্প্রতি এক নারী যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই নারী সুপ্রিম কোর্টের এক সাবেক কর্মী। তিনি প্রধান বিচারপতির বাড়ির অফিসে জুনিয়র কোর্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে গগৈ তাঁকে যৌন হেনস্তা করেন। প্রতিবাদ করায় তাঁকে প্রথমে ওই অফিস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, পরে চাকরি থেকেও। এই অভিযোগ জানিয়ে ওই নারী সুপ্রিম কোর্টের ২২ জন বিচারপতির কাছে হলফনামা পেশ করেন।
এই অভিযোগ শোরগোল ফেলে দেয়। প্রধান বিচারপতি সঙ্গে সঙ্গেই সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিচারপতি গগৈ বলেছেন, দেশের বিচার ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে কাজ হাসিলের উদ্দেশ্যেই বড় কোনো শক্তি এই চক্রান্ত করেছে। সর্বোচ্চ আদালতের মোট ২৭ জন বিচারপতির সমর্থনই তিনি পেয়েছেন। তাঁর সমর্থনে ব্লগ লিখেছেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অরুণ জেটলি। তিনি লিখেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতাবস্থা নষ্ট করাই এই ধরনের অভিযোগের উদ্দেশ্য। অভিযোগের শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছেন। স্বয়ং প্রধান বিচারপতি রয়েছেন ওই বিশেষ বেঞ্চে। আর আছেন বিচারপতি অরুণ মিশ্র ও সঞ্জীব খান্না। অভিযোগের তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ।
এই অবস্থাতেই চাঞ্চল্য ফেলে দিয়েছেন আইনজীবী উৎসব সিং বাইন্স। তাঁর দাবি, প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করাতেই এই অভিযোগ আনা হয়েছে। যৌন হেনস্তার মিথ্যা মামলা সাজাতে অজয় নামের এক ব্যক্তি তাঁকে দেড় কোটি টাকা দিতে চেয়েছিলেন। এই অভিযোগ জানাতে একটা সাংবাদিক বৈঠকের আয়োজন করার কথাও তাঁকে বলা হয়েছিল।
উৎসব ওখানেই থেমে থাকেননি। সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া নিজের হলফনামায় তাঁর দাবি, জেট এয়ারওয়েজের প্রতিষ্ঠাতা নরেশ গয়াল ও দাউদ ইব্রাহিমের মতো দাগি অপরাধীরা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। যুক্ত আছেন রমেশ শর্মা নামের এক ব্যক্তি, যিনি দাউদ ইব্রাহিমের লোক এবং ‘টাকার বিনিময়ে মামলার রায় প্রভাবিত’ করে থাকেন। তাঁর দাবি, জেট এয়ারওয়েজে দাউদের লগ্নি রয়েছে। এই বেসরকারি বিমান সংস্থাটি সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে।
উৎসব বাইন্স তাঁর হলফনামায় বেশ কিছু প্রমাণ থাকার কথা জানিয়েছেন। সেই সব প্রমাণ তাঁকে দাখিল করতে বলা হয়েছে। কর্পোরেট দুনিয়ার বড় বড় ব্যক্তি ও দাউদ ইব্রাহিমের মতো অপরাধীর নাম প্রকাশ করে দেওয়ায় উৎসব প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন। হলফনামায় বলেছেন, তাঁকে হত্যা করা হতে পারে।

সাক্ষাৎকারে ফেরদৌস: বৈশাখের র‌্যালি ভেবে সেদিন গিয়েছিলাম by ওয়ালিউল বিশ্বাস

ভারতে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিতর্কের মধ্য দিয়ে ১৬ এপ্রিল ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন নায়ক ফেরদৌস। স্থগিত হয়েছে তার ভারতীয় ভিসা। আর এ কারণে টলিউডে এখন হুমকির মুখে পড়েছে তাকে নিয়ে নির্মিতব্য ছবিগুলো। এমনটাই জানান দিচ্ছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। আটকে গেছে ‘দত্তা’সহ নতুন বেশক’টি চলচ্চিত্রের কাজ। কেন সেদিন নির্বাচনি প্রচারণায় গিয়েছিলেন ফেরদৌস বা কাদের কথায় সেখানে গিয়েছিলেন—তা নিয়ে এবার মুখ খুললেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এ নায়ক। পত্রিকাটিতে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সেদিনের ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলে ধরলেন তিনি। বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের জন্য থাকলো তা-
প্রশ্ন: ভারতের রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্ত হলেন কীভাবে?
উত্তর: আমি আসলে তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্ত ছিলাম না। আমার এক প্রযোজক বন্ধু রায়গঞ্জ (নির্বাচনি এলাকা) থাকেন। যখনই তিনি ঢাকা আসেন আমরা একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। খুবই ভালো সম্পর্ক আমাদের। মূলত তিন বছর আগে তার নির্মিত ‌‘ছেড়ে যাস না'  ছবিতে আমি কাজ করেছিলাম। সেই থেকে তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। সেদিন অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল আমরা চলচ্চিত্রের ডিজিটাল রাইট নিয়ে কথা বলছিলাম। পাশাপাশি আমরা নতুন চলচ্চিত্র নিয়েও আলোচনা করছিলাম। অঙ্কুশ ও পায়েলও সেখানে ছিল। আমার কিছু সহকর্মী পহেলা বৈশাখের র‌্যালিতে যাওয়ার কথা বলে। আমি বলি, বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখে বেশ বড় আকারে র‌্যালি করা হয়। বলি, চলো মজা হবে। সরল মনে, আগেপিছে কিছু না ভেবে সেখানে গিয়েছিলাম আমি। তাদের র‌্যালি প্রসঙ্গে আমি পুরোপুরি জানতাম না। এটি পূর্বনির্ধারিত ছিল না এবং কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের প্রদর্শনী ছিল না এবং আবার কারও প্রতি কোনও অসম্মান প্রকাশও ছিল না সেটা।
প্রশ্ন:  র‌্যালিটি (পহেলা বৈশাখ) যে রাজনৈতিকভাবে আয়োজিত, এ বিষয়টি আপনি কখন জানতে পারলেন?
উত্তর: র‌্যালি শেষে আমি ফিরে আসছিলাম। তখন রাত হয়ে গিয়েছিল। প্রযোজক বন্ধুর বাসায় নৈশভোজ শেষ করে ফিরছিলাম। তখন দেখি আমার মোবাইলে মেসেজ আসা শুরু হয়েছে। অনেকে জানতে চাইছেন, যার র‌্যালি মাত্র করে এসেছি তৃণমূল কংগ্রেসের সেই প্রার্থী কানাইয়ালাল আগারওয়ালকে আমি চিনি কিনা? সত্যি বলতে, আমি তাকে চিনতাম না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখলাম আমার ছবি ভাইরাল হয়ে গেছে। এর পরদিনই আমি কলকাতা চলে আসি। এবং ঢাকায় চলে আসার জন্য প্রস্তুতি নিই। ততক্ষণে বুঝতে পারি, এটা বিশাল বড় একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এরপর আমি টিকিট অনুযায়ী ঢাকা ফেরত আসি।
প্রশ্ন: আপনি ভারতের কালো তালিকাভুক্ত হয়েছেন। একজন শিল্পীর জন্য এটা বড় বাধা। আর আপনার জন্য এটি অনেক বড় বিষয়ও। কারণ, আপনি একসঙ্গে দুই বাংলায় কাজ করেন। বিষয়টি নিয়ে কী ভাবছেন?
উত্তর: দুই দশক ধরে আমি কলকাতা ও বাংলাদেশে কাজ করছি। আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ ১৯৯৮ সালে দুই বাংলায় মুক্তি পায়। চলচ্চিত্র ছাড়াও নানা উৎসবে আমি কলকাতায় আমন্ত্রিত হয়েছি। সেখানে আমাকে কখনও বিদেশি মনে হয়নি। কারণ, তারা আমাকে সেভাবেই ‘ট্রিট’ করত। কলকাতায় চলচ্চিত্রের অনেক বন্ধুই আমার আছে। আমি বাংলাদেশি, কিন্তু কলকাতা আমার দ্বিতীয় বাড়ি। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভারতের ভিসা সংক্রান্ত নিয়মের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আমার বোকামির জন্যই এমন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তাই আমি তাদের সব শর্ত বা আরোপের প্রতি সম্মান জানাবো।
প্রশ্ন: দেশের ফেরার পর কেমন প্রতিক্রিয়া পেলেন?
উত্তর: বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমার ভালোবাসা অবিরাম এবং আমি তাদের আবেগকে সম্মান জানাই। আমার মনে হয়, দর্শকদের আমার অনভিপ্রেত ভুল প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দিতে পেরেছি। আমি বাংলাদেশের নাগরিক, তাই অন্য যে কোনও দেশে নির্বাচনি প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করাটা আমার জন্য ভুল। আমি এই অপ্রত্যাশিত ভুলের জন্য নিঃশর্তভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। পাশাপাশি, আমি চাই না যে আমার জন্য দুই দেশের সম্পর্ক শীতল হোক। 'কালো তালিকাভুক্ত' হচ্ছে আমার ভুলের শাস্তি। আমি মনে করি, সময়ই সবকিছু ঠিক করে দেবে এবং সবকিছু আগের মতোই হবে।
প্রশ্ন: আপনার বেশ কিছু অসম্পূর্ণ কাজ রয়েছে কলকাতায়। এগুলোর বিষয়ে তাহলে সিদ্ধান্ত কী হবে?
উত্তর: আমার দু’টি চলচ্চিত্র ‘সাধের জোনাকি’ ও ‘তুই যদি আমার হতিস’-এর কাজ শেষ। এখন এ দুটি মুক্তির অপেক্ষায় আছে। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের সঙ্গে ‘দত্তা’ ছবির কাজ মাত্র শুরু করেছিলাম। আমি তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে আমার যদি কোনও অবদান থাকে, সেখানের দর্শকরাও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি। আমার ভুলের লোকসান প্রযোজকের দেওয়ার কোনও যুক্তি আমি দেখি না।
উল্লেখ্য, ভারত সফরে গিয়ে গত ১৪ ও ১৫ এপ্রিল রায়গঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়ালের হয়ে স্থানীয় চলচ্চিত্র শিল্পীদের সঙ্গে ভোট প্রচারে গিয়েছিলেন ফেরদৌস। স্থানীয় বিজেপি দাবি তোলে, বাংলাদেশের অভিনেতা টুরিস্ট ভিসা নিয়ে এসে এভাবে ভোটের প্রচার করতে পারেন না। এতে যেমন নির্বাচনি বিধি ভঙ্গ হয়েছে, তেমনই ভিসার শর্তও লঙ্ঘন হয়েছে। মঙ্গলবার নির্বাচনি কর্মকর্তার দফতরে গিয়ে বাংলাদেশের অভিনেতা ফেরদৌসকে গ্রেফতারের দাবিও জানান বিজেপি নেতারা। এছাড়াও রায়গঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দফতরে তার বিরুদ্ধে নালিশ করা হয়। 
পরে জানা যায়, ‘দত্তা’ নামের একটি সিনেমার শুটিংয়ের জন্য সম্প্রতি বিজনেস ভিসায় ভারতে গিয়েছিলেন দুই বাংলার জনপ্রিয় এই অভিনেতা।
এদিকে ঢাকায় ফিরে গতকাল (১৭ এপ্রিল) পুরো বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন ফেরদৌস। বললেন, ‘ভারতের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়াটা আমার ভুল ছিল। এর জন্য আমি দুঃখিত।’

রক্তাক্ত লঙ্কা পেছনে কারা?

এত্ত লাশ! এত্ত নৃশংসতা! মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারদিকে। তার মাঝে যারা বেঁচে ছিলেন তাদের কারো হাত নেই। কারো উড়ে গেছে পায়ের অংশবিশেষ। রক্তাক্ত শার্ট গায়ে কেউবা হামাগুড়ি দিচ্ছিলেন বাঁচার আশায়। চারদিকে কাকুতি। রক্তে রঞ্জিত শ্রীলঙ্কা। এ এক বীভৎস দৃশ্য। সন্ত্রাসী হামলায় রক্তে ভেসে গেছে পবিত্র উপাসনালয় গির্জা ও পাঁচ তারকা হোটেল।
সেই সঙ্গে রক্ত ঝরেছে শ্রীলঙ্কান তো বটেই, সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে। শোকে স্তব্ধ চারপাশ। গৃহযুদ্ধে শ্রীলঙ্কানরা লাশ দেখেছেন অকাতরে। কিন্তু তারপর একসঙ্গে এত্ত লাশ, এত্ত বীভৎসতা সম্ভবত তারা দেখেন নি আর কখনো। বেদনায় মুষড়ে পড়েছে মানুষ। ধর্ম বর্ণ, নির্বিশেষে মানুষ এমন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। মানবতার সেবায় এগিয়ে গিয়েছেন সব জাতির মানুষ। তার প্রমাণ মিলেছে রক্ত দেয়ার লাইনে। রক্ত দিতে মানুষের ভিড় পড়ে গিয়েছিল। সেখানে ছিলেন মুসলিমরাও।  রোববার সিরিজ বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ২৯০। আহত হয়েছেন প্রায় ৫০০ মানুষ। তার মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এজন্য নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
সোমবার, হামলার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি সংগঠন জামায়াত আল তাওহীদ। সংগঠনটির পূর্ন নাম জামায়াত আল-তাওহীদ আল ওয়াতানিয়া। তাদের দায় স্বীকারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে রুশ বার্তা সংস্থা তাস। এ ছাড়া সৌদি আরবের আল-অ্যারাবিয়া চ্যানেল সবার আগে দায় স্বীকারের খবর প্রকাশ করে। ইসলামপন্থী এ  সংগঠনটি শ্রীলংকা ভিত্তিক বলে জানা গেছে। দায় স্বীকার সম্পর্কে কোন বিস্তারিত তথ্য জানায়নি আল-অ্যারাবিয়া। এর আগে সংগঠনটির নাম ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত বা এনটিজে বলে জানা গিয়েছিলো। ধারণা করা হচ্ছে, জামাত আল তৌহিদ আল ওয়াতানিয়া এনটিজের কোন গ্রুপ হতে পারে। হামলার একদিন পর সংগঠনটি দায় স্বীকার করল।
রোববার অভিজাত গির্জা ও পাঁচ তারকা হোটেলে ওই হামলার পর দেশটিতে আরো সন্ত্রাসী হামলার হুঁশিয়ারি দেয়া সত্ত্বেও সোমবার সকালের দিকে প্রত্যাহার করা হয় কারফিউ। পরে অনলাইন বিবিসি জানায়, নিরাপত্তার জন্য সরকার নতুন করে স্থানীয় সময় সোমবার রাত ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৪টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেছে। ভয়াবহ এই হামলার পর আরো হামলা হতে পারে- এমন আতঙ্কে সরকার লোকজনকে ঘর হতে বের না হতে পরামর্শ দেয়। রাস্তায় রাস্তায় টহল দিতে দেখা যায় সেনাবাহিনীকে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত নিরাপত্তা রক্ষী। একদিকে শোক। আর একদিকে আতঙ্ক। সব মিলিয়ে অন্যরকম এক দৃশ্য শ্রীলঙ্কায়।
সরকারের ফরেনসিক বিভাগের সিনিয়র কর্মকর্তা ও তদন্তকারী আরিয়ানন্দ ওয়েলিঙ্গা বলেছেন, গির্জা ও হোটেলে ভয়াবহ ওই হামলা চালিয়েছে সাত আত্মঘাতী বোমারু। তার মধ্যে সাংগ্রি-লা হোটেলে নিজেদেরকে উড়িয়ে দেয় দুই আত্মঘাতী। অন্যরা তিনটি গির্জা ও দু’টি হোটেলে হামলা চালায়। এ ছাড়া চতুর্থ একটি হোটেল ও একটি বাড়িতে টার্গেট করা হয়েছিল। তবে কীভাবে এসব হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে সরাসরি সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ওয়েলিঙ্গা বলেছেন, এ বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
রোববার সকালে ইস্টার সানডে উপলক্ষে গির্জায় যখন মানুষ প্রার্থনার জন্য সমবেত হয়েছিল, ঠিক তখন দু’টি গির্জায় সন্ত্রাসীরা আত্মঘাতী বোমা হামলা করে। ২০ মিনিট সময়ের মধ্যে রাজধানী কলম্বো ও এর আশপাশের চারটি হোটেলেও হামলা হয়। চারটি বোমা হামলা হয় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে। এরপর ২০ মিনিটের মধ্যে অন্য হামলাগুলো হয়। এতে রক্তে রঞ্জিত হয় ওইসব স্থান। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৩৬ জন বিদেশি। আছেন বৃটিশ, মার্কিনি, তুর্কি, ভারতীয়, চীনা, ড্যানিশ, ডাচ্‌, পর্তুগীজ নাগরিক। সকাল ৮.৪৫ মিনিটে একই সঙ্গে চারটি স্থানে বিস্ফোরণ ঘটে। এগুলো হলো কলম্বোর সাংগ্রি-লা হোটেল, কলম্বোর কোচ্চিকাড়েতে অবস্থিত সেইন্ট অ্যান্থনি চার্চ, নেগোম্বোতে অবস্থিত সেইন্ট সেবাস্তিয়ান ক্যাথলিক চার্ট ও কিংসবারি হোটেলে। এর দু’ঘণ্টা পরে হামলা হয় নিউ ট্রপিক্যাল ইন হোটেল ও কলম্বোর দেমাতাগোড়ায় একটি এপার্টমেন্টে। এসব স্থান থেকে খবর আসতে থাকে লাশের সংখ্যা বাড়ছে।
হামলার সময় প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা ছিলেন বিদেশে। দ্রুত তিনি দেশে ফিরে আসেন। তার ফিরে আসার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রোববার দিনের শেষে কলম্বো বিমানবন্দরের রুট পরিষ্কার করছিল সেনাবাহিনী। এ সময় বিমানবন্দরের ডিপার্চার গেটের কাছেই একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে তা ধ্বংস করে দেয়া হয়। সোমবার প্রেসিডেন্ট দেশের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী রণিল বিক্রমাসিংহে।
হামলার নেপথ্যে কে?: শ্রীলঙ্কার সরকার বিশ্বাস করে স্থানীয় একটি ইসলামপন্থি সন্ত্রাসী সংগঠন রোববারের ভয়াবহ সিরিজ হামলার সঙ্গে জড়িত। ন্যাশনাল তাওহীদ জামায়াত (এনটিজে) নামের ওই সংগঠনটি এর আগেও শ্রীলঙ্কায় বেশকিছু সামপ্রদায়িক হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। শ্রীলঙ্কা সরকারের মুখপাত্র রাজিথা সেনারত্ন সোমবার এক বিবৃতিতে এ কথা জানান। সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য সেনারত্ন আরো বলেন, ইতিমধ্যে সরকার ওই হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মদত রয়েছে কিনা সে বিষয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে দায় স্বীকার করেছে জামায়াত আল-তাওহীদ। বলা হচ্ছে এটি এনটিজে এর পরিবর্তীত নাম কিংবা এর কোনো শাখা। তবে এ নামে আরও কয়েকটি সংগঠন থাকায় এ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক অসপষ্টতা।
শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান পুজুথ জয়াসুন্দরা ১০ দিন আগেই দিয়েছিলেন সতর্কবার্তা। তিনি শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে ১১ই এপ্রিল সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তাতে বলা হয়েছিলো উগ্রপন্থি মুসলিম গোষ্ঠী ন্যাশনাল তাওহীদ জামায়াত (এনটিজে) শ্রীলঙ্কার প্রধান গির্জাগুলোতে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করছে। কলম্বোতে ভারতীয় হাইকমিশনেও হামলার পরিকল্পনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও কেন ওই আত্মঘাতী হামলা হলো তা তদন্ত করছে দেশটি। কেন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যর্থ হলো তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী রণিল বিক্রমাসিংহে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে এ হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী হচ্ছেন মৌলভী জাহরান হাশিম। তাকে এনটিজের একজন ইমাম হিসেবে দাবি করেছে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো। সিএনএন জানিয়েছে, হাশিম ৪ঠা এপ্রিল ওই হামলার পরিকল্পনা করে। ইউটিউবে প্রকাশিত তার কিছু ভিডিওতে উস্কানিমূলক বক্তব্যও পাওয়া যায়। তবে রোববারের হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে এনটিজে। একইসঙ্গে, এ হামলার তীব্র নিন্দাও জানিয়েছে সংগঠনটি। তাই হামলার নেপথ্যে কে রয়েছে তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশার।
এদিকে, হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে হাশিমের নাম ছড়িয়ে পড়ার সমালোচনা করেছেন আল-জাজিরা সাংবাদিক সাইফ খালিদ। তিনি বলেন, মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো ইসলাম ভীতির পরিচয় দিচ্ছে। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতেই মুসলিমদের ওপর দোষ চাপানোকে ‘ইসলামোফোবিক’ আচরণ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। খালিদ একই সঙ্গে এ হামলার পর ভারতীয় গণমাধ্যমের আচরণকে অমার্জিত বলে আখ্যায়িত করেন।
রোববার হামলার পর বিকালে কলম্বোতে একটি এপার্টমেন্ট ঘেরাও করে পুলিশ। সেখানে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এ সময় তিন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ২৪ জনকে। তারা সবাই শ্রীলঙ্কার নাগরিক। আরো সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে বড় বড় হোটেল ও বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে অবস্থান নিয়েছে সেনাবাহিনী। রোববার দেশটির প্রধান বিমানবন্দরে আটকে পড়া বিপুল সংখ্যক মানুষ সোমবার বিমানবন্দর ছাড়ে। হামলার পর পরই সরকার ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সহ সব বড় বড় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দেয়।
উগ্রবাদী সংগঠন তাওহীদ জামায়াত সমপর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। গত বছর দেশটির একটি বুদ্ধ ভাস্কর্য ধ্বংসের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে সংগঠনটি। ধারণা করা হচ্ছে হামলার পর আটক ২৪ জনই এনটিজের সদস্য। তবে তাদের সাংগঠনিক শক্তি দেশজুড়ে এত বড় সিরিজ হামলা চালানোয় সক্ষম কিনা সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশটির সরকারের দাবি স্থানীয় সংগঠনগুলো এত বড় হামলা পরিচালনায় সক্ষম নয়। সেনারত্ন বিবৃতিতে বলেন, এককভাবে স্থানীয় কোনো সংগঠন এভাবে হামলা চালাতে পারে না। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জড়িত। আন্তর্জাতিক হাত না থাকলে এ হামলা সফল হতো না।
এদিকে হামলার দায় এখনো কেউ স্বীকার করেনি এবং হামলার পর কারো থেকে কোনো ধরনের বার্তাও পাওয়া যায়নি। ফলে নিশ্চিতভাবে কোনো গোষ্ঠী বা মতাদর্শকে দায়ী করা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কায় হামলার প্রেক্ষিতে ভোট চেয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হামলার পেছনে পার্শ্ববর্তী কোনো দেশের হাত রয়েছে কিনা সে সন্দেহের কথাও তুলে ধরেছেন অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী। একইসঙ্গে আগাম তথ্য থাকার পরও এত বড় হামলা আটকাতে কেনো ব্যর্থ হলো শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দারা সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হলো কীভাবে?: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে শ্রীলঙ্কার  প্রেসিডেন্সিয়াল সেক্রেটারিয়েটের উপদেষ্টা ও সমন্বয়কারী সেক্রেটারি শিরাল লাকথিলাকা বলেছেন, এরই মধ্যে কয়েকজনকে কলম্বোর সিনামন গ্রান্ট হোটেলে বিস্ফোরণের আগে একটি গাড়িতে সন্দেহজনক গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের উত্তাল সময়েও এমন সিরিজ বোমা হামলা ও এত মানুষ নিহতের ঘটনা ঘটে নি। ২০১১ সালে নাইজেরিয়া ও ২০১৮ সালে পাকিস্তানে যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল শ্রীলঙ্কার হামলা তারই মতো বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
রাজধানী কলম্বোতে একটি এপার্টমেন্টে পুলিশি তল্লাশির সময় গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদেরকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়া হয়েছে। ফলে এখনই তাদেরকে হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলা যাচ্ছে না। হামলাকারীরা যেখানে অবস্থান করছিল, সেই এপার্টমেন্টে তাদেরকে দেখা গেছে। তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন এখনো দুই বা তিনের অধিক বোমা অবিস্ফোরিত অবস্থায় রয়েছে। তা কোথাও পুঁতে রাখা হতে পারে।
শিরাল লাকথিলাকা হামলার পর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ এসব তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি সাক্ষাৎকারে আরো বলেছেন, আমরা কলম্বোর উত্তরাঞ্চলে দেমাতাগোদা এলাকায় একটি এপার্টমেন্টে তাৎক্ষণিকভাবে একটি গাড়ি চিহ্নিত করতে পারি। ওই ভবনটি পরে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা ঘিরে ফেলেন। সেখানে তৃতীয় তলায় তল্লাশি চালাতে কর্মকর্তারা যখন প্রবেশ করবেন তখনই সেখানে আত্মঘাতী এক বোমারু বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে স্পেশাল টাস্কফোর্সের একজন কর্মকর্তা ও দু’জন কনস্টেবল নিহত হন।
নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ঘাটতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সব বিষয়েই বিস্তারিত তদন্ত হবে। এখনই নিরাপত্তায় ঘাটতি নিয়ে কথা বলা ঠিক নয়। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভেদ করতে পেরেছে সন্ত্রাসীরা। আমরা সন্দেহ করছি এ হামলায় আন্তর্জাতিক চক্রের ভূমিকা আছে। তবে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে এই ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী করতে পারছি না।  দেশের সব হোটেল ও উপাসনালয়ে নিরাপত্তা কঠোর করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনী। যেকোনো সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত তারা।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আশঙ্কা: রোববারের হামলার পর শ্রীলঙ্কায় নতুন করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। কিন্তু দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করায় বড় কোনো দাঙ্গার খবর আসেনি। তবে রোববার দিনশেষে একটি মসজিদে বোমা হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আরো বলা হয়েছে, মুসলিম মালিকানাধীন দু’টি দোকানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। দেশটিতে মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে আছে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম, হিন্দু।
হামলাকারী আজম ছিল ব্রেকফাস্ট বুফের লাইনে: পাঁচ তারকা হোটেল সিনামন গ্র্যান্ড হোটেল। রোববার সকালে ব্রেকফাস্ট বুফের লাইনে দাঁড়ানো লোকজন। লম্বা সেই লাইনে অন্য সবার মাঝে ছদ্মবেশ ধারণ করে দাঁড়িয়েছিল এক আত্মঘাতী হামলাকারী। সেই ওই হোটেলের রেস্তোরাঁয় বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। ওই হোটেলের একজন ম্যানেজার এ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, স্থানীয় সময় রোববার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ব্রেকফাস্ট বুফের লাইনে অন্য সব মানুষের সঙ্গে দাঁড়ানো ছিল এক আত্মঘাতী হামলাকারী। সেই ওই হোটেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায়। তার আগে চেকপোস্টে সে মিথ্যে ঠিকানা দেয়। দাবি করে, কলম্বোতে ব্যবসার জন্য গিয়েছে সে।
তারপরই ওই লাইনে দাঁড়িয়ে হামলা চালায় সে। ওই ম্যানেজার আরো বলেছেন, হামলার আগের রাতে হামলাকারী নিজেকে মোহাম্মদ আজম বলে নাম নিবন্ধন করে। সে ব্রেকফাস্ট বুফের লাইনে দাঁড়ানোর পর যখন তাকে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে তার পেছনে বেঁধে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে সে নিজে ও হোটেলের অনেক অতিথি নিহত হন।
ওই ম্যানেজার ঘটনার বর্ণনা দেন এভাবে- বেশ বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছিল। তখন ছিল সকাল সাড়ে আটটা। সবাই ব্যস্ত ছিলেন। পরিবার নিয়ে এসেছেন বেশির ভাগ মানুষ। এ সময় ওই হামলাকারী লাইনে এসে প্রবেশ করে। আস্তে আস্তে সে সামনে চলে যায়। যখন খাবার দেয়া হবে তার ঠিক পূর্ব-মুহূর্তে সে বিস্ফোরণ ঘটায়। অতিথিদেরকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন আমাদের ম্যানেজাররা। তাদের একজনও তাৎক্ষণিকভাবে মারা গেছেন।
অল্পের জন্য রক্ষা অভিনেত্রী রাধিকার: অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন বিখ্যাত তামিল অভিনেত্রী রাধিকা শরৎকুমার। তিনিও সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলে ছিলেন। বোমা হামলার সামান্য আগেই তিনি বেরিয়ে পড়েন সেখান থেকে। এ বিষয়ে ১৪ লাখ টুইটার অনুসারীর কাছে তিনি লিখেছেন, আমি কলম্বোর সিনামন গ্র্যান্ড হোটেল ত্যাগ করার পর পরই সেখানে বোমা হামলা হয়েছে। এই ভয়াবহতা বিশ্বাস করতে পারছি না।
এ নিয়ে টুইট করেছেন তার স্বামী, অভিনেতা ও ভারতে তামিল রাজনৈতিক দল দ্য অল ইন্ডিয়া সামাথুভা মাক্কাল কাটছি দলের প্রতিষ্ঠাতা আর শরৎকুমারও। তিনি বলেছেন, ভয়াবহ এক সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে কলম্বোতে। এটা নিন্দনীয়। নিরপরাধ যেসব মানুষ প্রাণ হরিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা।
জাতিসংঘ মহাসচিবের ঐক্যের আহ্বান: শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। তিনি সব ধর্মীয় উপাসনালয়ের পবিত্রতা রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন। আশা প্রকাশ করেছেন, এই হামলায় দায়ীদের দ্রুততার সঙ্গে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। বিবৃতিতে তিনি হতাহতদের পরিবার, শ্রীলঙ্কার জনগণের প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। এই হামলার সময়ে তিনি শ্রীলঙ্কার জনগণ ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব জাতির এই কঠিন সময়ে শ্রীলঙ্কার জনগণ ও সরকারের প্রতি সমর্থন ও সহমর্মিতা পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিশ্বনেতাদের নিন্দা: শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হওয়ায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সারা বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে, আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবারি জাস্টিন ওলেবি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, বৃটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন, পোপ ফ্রাঁসিস ও অন্যান্য নেতারা। নিন্দা জানিয়েছেন ওআইসি’র মহাসচিব ইউসেফ আল ওতাইমিন।
নিন্দা জানিয়েছে শ্রীলঙ্কার মুসলিম কাউন্সিল। তারা একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, খ্রিস্টান ভাইবোনেরা তাদের পবিত্র ইস্টার সানডে পালনের সময় তাদের উপাসনালয়ে ও কলম্বোর হোটেলে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। উগ্রপন্থি ও সন্ত্রাসীদের হামলার কারণে নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানিতে আমরা শোকাহত। এ হামলার মাধ্যমে তারা ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়।
আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেবে সরকার: হামলায় নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেবে শ্রীলঙ্কা সরকার। সোমবার সরকারের মুখপাত্র রজিথা সেনারত্নে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিজন নিহতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচ হিসেবে এক লাখ শ্রীলঙ্কান রুপি দেবে সরকার। এ ছাড়া নিহত প্রতিজন প্রতি তার পরিবারকে ১০ লাখ রুপি দেবে সরকার। আহতদের ক্ষতের অবস্থা বিবেচনা করে এক লাখ থেকে তিন লাখ রুপি করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত সব গির্জা মেরামতের খরচ পুরোটাই বহন করবে সরকার। নবায়ন কাজ করবে সরকারই।

বিদেশে শ্রমিক যাচ্ছেন কম, শ্রমবাজার মন্দা by মহিউদ্দিন

*জনশক্তি রপ্তানি।
*মধ্যপ্রাচ্যের বাজার সংকুচিত।
*বন্ধ হয়ে আছে মালয়েশিয়ার দুয়ার।
*সংকট সমাধানে সরকারি তৎপরতা মন্থর।
*দেশের শ্রম রপ্তানি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ৮০%।
*সৌদি আরবে বেকারত্ব বেড়ে এখন ১২%।
*দেশে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
*বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া।
*গত বছর জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ১,৭৫,৯২৭।
*গত সেপ্টেম্বরের পর নতুন করে ভিসা দেয়নি দেশটি।
বিদ্যমান শ্রমবাজারে সংকট তৈরি হওয়ায় ২০১৮ সালে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশ। এ বছরের প্রথম তিন মাসেও নিম্নমুখী ধারায় আছে শ্রম রপ্তানি। এর থেকে উত্তরণের জন্য নতুন বাজার খোঁজার বিকল্প নেই। কিন্তু সেখানেও লক্ষণীয় কোনো উদ্যোগ নেই।
দেশের শ্রম রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। বড় শ্রমবাজারের অন্যতম সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া। সৌদি আরবে বেকারত্ব বেড়ে এখন ১২ শতাংশ। ফলে সে দেশে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আরব আমিরাতের বাজার খুললেও তা সীমাবদ্ধ শুধু গৃহশ্রমিক খাতে। মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ আছে প্রায় ৬ মাস। এই তিন বড় বাজারে সংকটের কারণে জনশক্তি রপ্তানি কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে বৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৮১ জন কর্মী কাজ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান। আগের বছর এটি ছিল ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন। আবার গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) জনশক্তি রপ্তানি ছিল ২ লাখ ৪ হাজার ২০১ জন। এ বছর তা ১৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৯ জন।
তবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহান প্রথম আলোকে বলেন, সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রতি উপজেলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ চলছে। পুরোনো শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংকুচিত হচ্ছে পুরোনো শ্রমবাজার
অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব কমাতে ১২ ধরনের কাজে কোনো বিদেশি নেবে না সৌদি আরব। এসব কাজে যুক্ত পুরোনো প্রবাসীরাও দেশে ফিরে আসছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আরব আমিরাতের বাজার খুলে যাওয়ার দাবি করা হলেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। পুরুষ শ্রমিকদের বাজার সেখানে কার্যত বন্ধ। গত বছর সেখানে শ্রম রপ্তানি ছিল ১ শতাংশের কম। এ বছর তিন মাসে গেছেন মাত্র কয়েক শ নারী শ্রমিক। তবে দুই দেশের সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, ধীরে ধীরে ১৯টি পেশায় পুরুষ কর্মী নেওয়ার কথা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার দুয়ার খুলেও খুলছে না
অনিয়মের জের ধরে থমকে গেছে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়ার দুয়ার। গত বছর দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯২৭ জন। গত সেপ্টেম্বরের পর থেকে নতুন করে আর ভিসা দেয়নি মালয়েশিয়া। গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি হয়েছে ৩৮ হাজার ৮৬৫ জন। আর এ বছর ওই সময়ে গেছে ৫০ জনের কম।
গত বছর মালয়েশিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পর আগের কর্মী নিয়োগ পদ্ধতি (মাত্র ১০ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো) বাতিল করে সে দেশের সরকার। এ খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফরে গেলে বিষয়টির দ্রুত সমাধান হতে পারে।
বাড়তি বিমান ভাড়ায় ব্যাহত মধ্যপ্রাচ্য যাত্রা
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান ভাড়া বেড়ে গেছে দ্বিগুণের বেশি। ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার ভাড়া ৬০ হাজার টাকা হয়ে গেছে। ভিসা পেয়েও অতিরিক্ত ভাড়ার জন্য অনেক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে যেতে পারছেন না বলে জানিয়েছে জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)।
বাড়তি বিমান ভাড়ার বিষয়টি সমাধান করতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এতে আকাশপথের ভাড়া নিয়োগকর্তার বহন করার নির্দেশনা আছে। বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং শ্রম শাখাগুলোতে তা পাঠানোও হয়েছে। কিন্তু এখনো তার কোনো ফল আসেনি।
জাপান ও থাইল্যান্ডে সম্ভাবনা
নতুন সম্ভাবনাময় বাজার হতে যাচ্ছে জাপান। বিএমইটি সূত্র জানায়, গত বছর জাপানে গেছেন ১৬৩ জন। এ বছর প্রথম তিন মাসে গেছেন ৪০ জন। তবে ইতিমধ্যেই জাপান যেতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ২৬টি স্থানে প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। চলমান এ প্রক্রিয়ায় কয়েক মাসের মধ্যেই জাপানে জনশক্তি রপ্তানি বাড়তে পারে।
থাইল্যান্ডে বেকারত্বের হার বর্তমানে দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে সেখানে বাইরের লোকের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে নার্সের সহকারী, গৃহশ্রমিক, নির্মাণকাজ ও মাছ ধরার ট্রলারে শ্রমিকের চাহিদা আছে। এই সংখ্যা প্রায় তিন লাখ হতে পারে বলে মনে করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। বায়রার এক শীর্ষ নেতা জানান, থাইল্যান্ডের ব্যবসায়ীরা বিমান ভাড়াসহ তিন মাসের প্রশিক্ষণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
সূত্র জানায়, এর আগেও একবার থাইল্যান্ডের বাজার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুই সরকারের মধ্যে চুক্তির প্রস্তাব দিলে বিষয়টি থেমে যায়।
সার্বিক বিষয়ে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, এ খাতের উন্নয়নে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কোনো নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া পরিস্থিতির উত্তরণও হবে না।

সুদানের গণঅভ্যুত্থানের মুখ by মিসবাহুল হক

বিক্ষোভকারী লাখো মানুষের মাঝে একটি সাদা রঙের প্রাইভেট কারের ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন অভিজাত পোশাক পরিহিতা নারী আলা সালাহ। উচ্চস্বরে স্লোগান দিয়ে উজ্জীবিত করছেন আন্দোলনকারীদের। তার কানের দুলে প্রতিফলিত হচ্ছে অস্তপ্রায় সূর্যের ছবি। সেটি যেন সুদানে দীর্ঘ ৩০ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অবশেষে সত্যিই লাখো সুদানির আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেছে। পর পর দুইদিনে দু’দফা সরকার পতনের বিরল কৃতিত্ব দেখিয়েছে তারা। আর এতে সরব অংশগ্রহণ করেছে আলা সালাহর মতো হাজার হাজার সুদানি নারী।
সফল আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পর এই আলা সালাহ পরিচিতি পেয়েছেন কান্দাকা বা নুবিয়ান রানী হিসেবে।
সুদানের প্রাচীন কুশ সাম্র্রাজ্যের রানীদেরকে কান্দাকা বলা হতো। এর অধিবাসীরা নুবিয়ান জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ওই সাম্র্রাজ্যের রানীরা সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হতেন। সুদানীরা তাদের প্রাচীন সেই রানীর সঙ্গে আলা সালাহর মিল খুঁজে পেয়েছেন। তাকে আখ্যায়িত করেছেন এ যুগের কান্দাকা বা নুবিয়ান রানী হিসেবে।
বৃহস্পতিবার তীব্র আন্দোলনের মুখে সুদানে ওমর আল বশিরের ৩০ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। তাকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। কিন্তু সেই সরকারের প্রধানও ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্টের অনুগত হওয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যায় সুদানিরা। উপায়ান্তর না দেখে অবশেষে সেই সরকারও শুক্রবার বিদায় নেয়। আর এর মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছে সুদানিদের অসাধারণ বীরত্বগাথা। যাতে আরো একবার ফুটে উঠেছে সুদানি নারীদের সাহসিকতার গল্প।
খার্তুমের আর্মি হেড কোয়ার্টারের সামনে স্ল্লোগানরত আলা সালাহর একটি ছবি অনলাইন জগতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান তিনি। তার সাহসিকতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয় গোটা বিশ্ব। এক সাক্ষাৎকারে বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, এদেশের বিপ্লবগুলোতে সবসময়ই নারীরা অংশ নিয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আপনি দেখবেন, আমাদের সব রানীই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। এই বিপ্লবে অংশ নিয়ে আমি খুবই গর্বিত। আশা করি, আমাদের বিপ্লব কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করবে।
সুদান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার বিভাগের শিক্ষার্থী আলা সালাহ রাতারাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি একটি টুইটার অ্যাকাউন্টও চালু করেছেন তিনি। এতে ভক্তদের ধন্যবাদ জানিয়ে টুইটও করেছেন। বলেছেন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ সুদান গঠনে সংগ্রাম অব্যাহত রাখবেন তিনি। আরেকটি টুইটে বলেছেন, আমি তরুণদের পক্ষে কথা বলতে চেয়েছিলাম। আমি সামনে এগিয়ে বলতে চেয়েছি, সুদান সবার জন্য। আলা সালাহর এসব কথার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ভক্তরা। জাতীয় বীর, আদর্শ নেতা- এ জাতীয় মন্তব্যে ভরে উঠেছে তার টুইটার অ্যাকাউন্ট।
তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, গত বৃহস্পতিবার সকালে এক বার্তায় তিনি জানান, ছবি ভাইরাল হওয়ার পর হত্যার হুমকি পেতে শুরু করেছেন তিনি। টুইটারে এ খবর জানিয়ে তিনি লেখেন, আমি মাথা নত করবো না। আমার কণ্ঠরোধ করা যাবে না।
প্রসঙ্গত, সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের পতনের দাবিতে প্রায় চার মাস ধরে আন্দোলন চলছিল। বৃহস্পতিবার এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আওয়াদ বিন আউফের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করে সেনাবাহিনী। অভ্যুত্থানের পরেও আবারো বশিরের অনুগত প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে দেশের প্রধান হিসেবে মানতে পারেনি সুদানের জনগণ।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে খার্তুমের সেনা সদর দপ্তরের সামনে অবস্থান নেয় হাজার হাজার মানুষ। দীর্ঘ এই আন্দোলনে নারীদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গত শনিবার থেকে আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপকহারে বাড়তে থাকে। আলা সালাহ বলেন, এ ধরনের আন্দোলনে নারীরা শুধু নিজেদের অধিকারের জন্য না, বরং পুরো সমাজের অধিকার রক্ষার দাবিতে অংশ নেয়। নারী ও সমাজের অধিকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সুদানের নারীরা সবসময়ই তাদের তরুণ সন্তানদেরকে সংগ্রামে উৎসাহিত করেন। এটা প্রাচীন সুদানের ইতিহাসের অংশ।
সালাহ আরো জানান, ১৯শে ডিসেম্বর আন্দোলন শুরুর পর থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে এতে অংশ নিয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে শুরু হওয়া ওই আন্দোলন ক্রমেই বশির বিরোধী জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। গ্রাম, গঞ্জ, শহর সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের ঢেউ। এর পরেও বশির ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করেন। দীর্ঘ এই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৯ জন। তবে কোনো কিছুতেই শেষ রক্ষা করতে পারেননি বশির।

ব্রুনাইয়ের সঙ্গে ৬ সমঝোতা সইঃ প্রধানমন্ত্রী-সুলতান বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার বিশেষ করে এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহসহ ৬টি বিষয়ে ব্রুনাই দারুস সালামের সঙ্গে পৃথক সমঝোতা স্মারক সই এবং একটি নোট বিনিময় করেছে বাংলাদেশ। দেশটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় সফরে গতকাল ওই চুক্তিগুলো সই হয়। বাংলাদেশের সরকার প্রধান দেশটির সুলতানসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেন। সেখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। আসিয়ান জোটের প্রভাবশালী সদস্য ব্রুনাই ওই জোটের অন্যতম শরিক মিয়ানমারের ওপর তাদের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করে ঢাকা। অবশ্য ব্রুনাই’র সুলতান তার গুড অফিস ব্যবহারের আশ্বাস দিয়েছেন। মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফেরত পাঠাতে ‘সব ধরনের উদ্যোগ’ নেয়া উচিৎ বলে মনে করেন ব্রুনাই’র সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়া।
দেশটির রাজধানী বন্দর সেরি বেগওয়ানে গতকাল সোমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সুলতান বলকিয়ার এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
সুলতানের বাসভবন ইস্তানা নুরুল ইমানের চেরাদি লায়লা কেনচানায় ওই বৈঠক হয়। পরে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন। সচিব বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুলতান অনেক কথা বলেছেন। তিনি যে বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন তা হলো- সবাই মিলে একটা সমাধানে পৌঁছানো উচিৎ। সচিব বলেন, সুলতান মনে করেন আমাদের সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ, যাতে বাস্তুচ্যুতরা ফিরে যেতে পারে। শহীদুল হক বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যুতে আসিয়ানের বড় ইনভলভমেন্ট চেয়েছেন। তিনি এ ব্যাপারে ব্রুনাই’র সুলতানের সহযোগিতা কামনা করেছেন। সচিব বলেন, সুলতানও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আসিয়ানের ইনভলভমেন্টের কথা বলেছেন আসিয়ান হিউম্যানেটেরিয়ান সেন্টারের কনটেক্সটে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘শক্তিশালী’ করার ব্যাপারে ব্রুনাই সবসময় সহায়তা করে যাবে- এমন আশ্বাস সুলতানের তরফে পাওয়া গেছে বলেও জানান পররাষ্ট্র সচিব।
এদিকে সমঝোতা সই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, প্রাণি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ উপস্থিত ছিলেন।
নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট গঠনের প্রস্তাব: এদিকে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য পাঁচটি দেশের সমন্বয়ে নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। ব্রুনাই’র সুলতান হাজী হাসানাল বলকিয়ার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রস্তাব দেন বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। শহীদুল হক বলেন, প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ফোরাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (সিয়াকো) এর সদস্য হবে দক্ষিণ এশিয়া থেকে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই। পররাষ্ট্র সচিব জানান, প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ব্রুনাইয়ের সুলতান আশ্বস্ত করেন যে, তিনি বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবেন। ব্রিফিংকালে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম ও বক্তৃতা লেখক নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সুলতানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটসহ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্থান পায়। মিস্টার হক বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রুনাইয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার জন্য প্রধানমন্ত্রী আরও কিছু প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ী সমপ্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং এ লক্ষ্যে একটি অগ্রাধিকার বাণিজ্য ব্যবস্থার সম্ভাব্যতা যাচাই করার প্রস্তাবও দিয়েছেন। শেখ হাসিনা দু’দেশের মধ্যে যৌথ কমিশন গঠনের বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব করেন। তিনি পাট ও পাটজাত পণ্য, সফটওয়্যার, কৃষি পণ্য, সিরামিক ও টেবিলওয়্যার, জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও পর্যটন ক্ষেত্রে সহযোগিতার উপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার শিল্প পার্ক স্থাপন করছে যেখানে ব্রুনাইয়ের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে পারে।
তিনি দ্বৈত কর পরিহার করার পাশাপাশি পারস্পরিক প্রচার এবং বিনিয়োগের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক সমপ্রসারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন সুলতান। পররাষ্ট্র সচিব জানান, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর বিষয়টি দুই নেতার কথাতেই এসেছে। প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যাপারে একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ করার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নন-উইপেন রিলেটেড অঞ্চলে সামরিক সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। যার মধ্যে ছিল হিউম্যানিটি, অপারেশন্স, নলেজ শেয়ারিং। সুলতান শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অবদানের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ব্রুনাইয়ের সুলতান ও তার স্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে সুলতান তা গ্রহণ করেন বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। রোববার ব্রুনাই পৌঁছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে বাংলাদেশ হাই কমিশনারের দেয়া নৈশভোজে অংশ নেন। আজ মঙ্গলবার সকালে ব্রুনাইয়ের রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা জালান কেবাংসানে বাংলাদেশ হাই কমিশনের নতুন চ্যান্সেরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন শেখ হাসিনা। পরে তিনি রয়েল রেজালিয়া জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। সেদিন স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় ঢাকার উদ্দেশে ব্রুনাই ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় তার ঢাকা পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে অভিন্ন যাত্রায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমপ্রদায়ের সঙ্গে একটি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য ব্রুনাইয়ের ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার বিকেলে হোটেল এম্পায়ার এন্ড কান্ট্রি ক্লাবে আয়োজিত বাংলাদেশ-ব্রুনাই বিজনেস ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে অভিন্ন যাত্রায় আমাদের ব্যবসায়ী সমপ্রদায়ের সঙ্গে একটি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বাংলাদেশে উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যও আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যয়, মানব সম্পদ, অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য সুবিধা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক স্থান হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে উদার বৈদেশিক বিনিয়োগ সুবিধাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এসব সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে আইন দ্বারা বিদেশী বিনিয়োগের সুরক্ষা, উদার কর নীতি এবং যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর সুবিধাজনক শুল্ক ব্যবস্থা। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ১০০% বৈদেশিক ইক্যুইটি, অবাধ প্রস্থান, লভ্যাংশ ও মূলধন পূর্ণ প্রত্যর্পণ সুবিধা প্রদান করে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইইউ, কানাডা ও জাপানসহ অধিকাংশ বিশ্ব বাজারে অগ্রাধিকার প্রবেশ সুবিধা ভোগ করি। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিায়ায় বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং জিডিপির পরিপ্রেক্ষিতে অবস্থান বিশ্বে ৪১ তম। তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতি একটি সুদৃঢ় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, গতিশীল বেসরকারী খাত এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

পিউ রিসার্চের জরিপ: শতকরা ৮২ ভাগ মার্কিনী মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা বেশি বৈষম্যের শিকার

অন্য গ্রুপগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে মনে করেন অধিক মার্কিনী। প্রতি ১০ জন মার্কিনীর মধ্যে ৮ জনেরও বেশি এমনটা মনে করেন। পিউ রিসার্স সেন্টারের জরিপে সোমবার এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ব্যবস্থায় এসব মুসলিম অন্যদের তুলনায় নুন্যতম হলেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ খবর দিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে অনলাইন সিএনএন।
পিউ রিসার্চের জরিপে বলা হয়েছে, যারা জরিপে অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে শতকরা কমপক্ষে ৮২ ভাগ বলেছেন, হিস্প্যানিক, সমকামী পুরুষ বা নারীর মতো অন্য আরো গ্রুপের তুলনায় মুসলিমরা বেশি বৈষম্যের শিকার। এর চেয়ে সামান্য কম অর্থাৎ শতকরা ৮০ ভাগ বলেছেন, কৃষ্ণাঙ্গরা ন্যূনতম বৈষম্যের শিকার। মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত ডেমোক্রেট দলের প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য, মুসলিম নারী ইলহান ওমরকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের টুইটের পর এই জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
জরিপটি করা হয়েছে ট্রাম্পের ওই টুইটের আগে।  ট্রাম্প তার টুইটে ইলহান ওমরের গত মাসের একটি বক্তব্যের ভিডিও যুক্ত করেছেন। ওই ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হয় বলে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন ইলহান। তার এই ভিডিওটির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সন্ত্রাসী হামলার ক্লিপ যুক্ত করেছেন। ক্যাপশনে ট্রাম্প লিখেছেন, আমরা কোনোদিন ভুলে যাবো না।
ট্রাম্পের এই টুইটকে অনেকেই দেখছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে। ইলহান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্টের এমন টুইটের পর অনেক বেশি হত্যার হুমকি পেয়েছেন তিনি। কংগ্রেসনাল ব্লাক ককাস বলেছে, ইলহান ওমরের জীবনকে বিপদে ফেলে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ডেমক্রেট ও ডেমোক্রেটপন্থি নিরপেক্ষদের তিন-চতুর্থাংশ বলেছেন, মুসলিমরা অনেক বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ২০১৩ সালে এমনটা মনে করতেন তাদের শতকরা ৫৬ ভাগ। ওদিকে রিপাবলিকান ও রিপাবলিকানপন্থি নিরপেক্ষরা প্রায় একই অবস্থানে আছেন। ২০১৩ সালে তারা এমনটা মনে করতেন শতকরা ৩১ ভাগ। বর্তমানে এ হার ৩৪।
জরিপে দেখা গেছে, আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মনে করছেন ইহুদিরাও বৈষম্যের মুখে। ২০১৯ সালে শতকরা ২৪ ভাগ মার্কিনি বলেছেন, মার্কিন সমাজে ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রচুর বৈষম্য রয়েছে। ২০১৬ সালে এ হার ছিল শতকরা ১১। এ ছাড়া নারীর বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও বলা হয়েছে। আগে এমনটা মনে করতেন শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ। বর্তমানে এই হার শতকরা ৬৯ ভাগ।
পিউ রিসার্চ সেন্টার এই জরিপ চালিয়েছে ২০ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত। এ সময়ে দেশের ১৫০৩ জন মার্কিনীর সঙ্গে ল্যান্ডফোনে বা সেল ফোনে যোগাযোগ করে তাদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়।

রক্তে রঞ্জিত উৎসব

দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কায় খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের আজকের সকালটি শুরু হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশে। খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসীদের জন্য খুবই আনন্দের ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন ‘ইস্টার সানডে’। সে উপলক্ষে গির্জায় সমাগম ঘটেছিল বহু মানুষের। অথচ পবিত্র এই দিনটি রক্তাক্ত হলো সহিংসতার হিংস্র থাবায়। তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে একাধিক বোমা হামলায় ২০৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ছোট্ট, সুন্দর দেশটিতে। চাপা উত্তেজনায় কেটেছে প্রতিটি মুহূর্ত, উদ্ধার হয়েছে একের পর এক লাশ। বিশ্বজুড়ে বয়ে গেছে নিন্দার ঝড়, আক্রান্ত শ্রীলঙ্কার প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেছে পুরো পৃথিবী।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
একের পর এক ভয়াবহ বোমা হামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে শ্রীলঙ্কার পুলিশ। শেষ খবর অনুযায়ী এই ঘটনায় ২০৭ জন নিহত ও ৪০০ এরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। হামলার তদন্তকাজের সুবিধার্থে আজ সন্ধ্যা ছয়টা থেকে কারফিউ জারি করেছে দেশটির সরকার। ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুয়ান বিজয়াবর্ধনে জানিয়েছেন, আগামীকাল সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এই কারফিউ জারি থাকবে।
হামলার সূত্রপাত
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে রাজধানী কলম্বো থেকে ২০ মাইল উত্তরের শহর নেগোম্বোতে সেন্ট সেবাস্তিয়ান চার্চে প্রথম হামলাটি চালানো হয়। এরপর একে একে আরও দুটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে পালাক্রমে বোমা হামলা চালানো হয়। রক্তাক্ত গির্জার ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আটটি হামলার মধ্যে দুটি হামলা আত্মঘাতী ছিল বলেও জানা গেছে। বিস্ফোরণের ধরন ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত নন দেশটির কর্মকর্তারা। তবে ইস্টার সানডের আয়োজনকে কেন্দ্র করে এই হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা। নিহতদের মধ্যে ৩৫ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন বলেও জানিয়েছে দেশটির পুলিশ।
দেশটির উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা যা বলছেন
নৃশংস এই হামলার পর দেশবাসীকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। তদন্তকাজে সহায়তা করার জন্যও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ঘটনার পরপরই জরুরি সভা ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুয়ান বিজয়াবর্ধনে হুমকি দিয়েছেন, দেশে কোনো প্রকার উগ্রবাদী দলের অস্তিত্ব থাকলে তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।
বিশ্বনেতাদের নিন্দা
বর্বরোচিত এই হামলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী নেতা। শ্রীলঙ্কার পক্ষে সহমর্মিতা জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্দা আহডার্নসহ আরও অনেকে।
শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাস
স্বাধীন দেশের জন্য ২৬ বছর লড়াই করার পর তামিল টাইগারদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালে শেষ হয় শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে শ্রীলঙ্কায় বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিংহল সম্প্রদায়ের আক্রমণের শিকার হয়েছে মসজিদ। এর জের ধরে ২০১৮ সালের মার্চে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার ৭০.২% বৌদ্ধ, ১২.৬% হিন্দু, ৯.৭% মুসলিম ও ৭.৪% খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী।

ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ

ম্যালেরিয়া নির্মূলে আশাব্যঞ্জক সাফল্য থাকলেও এখনো দেশের প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৩টি জেলায় এর প্রাদুর্ভাব বেশি। জেলাগুলো হচ্ছে- রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট,  হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর এবং কুড়িগ্রাম। এই জেলা গুলোর মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি সীমান্তবর্তী, পাহাড় ও বনাঞ্চলবেষ্টিত হওয়ায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ সেখানে। মোট ম্যালেরিয়া রোগীর শতকরা প্রায় ৯১ ভাগই সংঘটিত হয়ে থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস-২০১৯ উপলক্ষে আয়োজিত মিডিয়া ওরিয়েন্টেশনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। আগামী ২৫শে এপ্রিল বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবসকে সামনে রেখে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা- বাংলাদেশ, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থাসমূহ এ ওরিয়েন্টেশনের আয়োজন করে।  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক ও কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল এর লাইন ডাইরেক্টর অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা সভাপতির বক্তব্যে বলেন, এই কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডার নিয়ে একত্রে কাজ করলে অবশ্যই আমরা একদিন এই দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূল করতে পারব। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।
ব্র্যাকের কমিউনিকেবল ডিজিজেস ও ওয়াশ কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, যে ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে, তা এক সঙ্গে নির্মূল করা সম্ভব নয়।
কারণ, প্রত্যেকটি অঞ্চলে জনগোষ্ঠীর ধরণ ও শরীরের বৈশিষ্ট্য আলাদা। আপাতত আমরা তিন পার্বত্য জেলাকে ম্যালেরিয়া নির্মূলে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি। অনুষ্ঠানে আয়োজকরা জানান, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকার জনগোষ্ঠীর মাঝে এ পর্যন্ত ১০ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হয়েছে। ২০১৮ সালে সর্বমোট ১০,৫২৩ জন ম্যালেরিয়া রোগী সনাক্ত করে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে এবং ৭ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে।
২০০৮ সালের তুলনায় ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা শতকরা ৮৮ ভাগ এবং মৃত্যুর হার প্রায় ৯৫ ভাগ কমাতে সক্ষম হয়েছে। এতে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়। এগুলো হচ্ছে- পার্বত্য এলাকাগুলো দূর্গম হওয়ায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোগনির্ণয় করতে না পারা এবং চিকিৎসা প্রদান দুঃসাধ্য হওয়া, আন্তঃসীমান্ত চলাচল/পারাপারকারীদের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের প্রবণতা, সকল ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীদের ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার আওতায় আনা ইত্যাদি। অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, এবারই প্রথমবারের মতো সারা দেশের ৬৪টি জেলায় একযোগে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস পালিত হবে।
এ উপলক্ষে থাকছে র‌্য্যালি, আলোচনা সভা, স্বাস্থ্য ক্যাম্প ও ডক্যুমেন্টারি প্রদর্শনী এবং বেসরকারি ও সরকারি টেলিভিশনে বিশেষ টক শো। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (বাংলাদেশ)-এর মেডিকেল অফিসার ডা. মিয়া সাপাল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এ ফয়েজ, ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সাবেক লাইন ডাইরেক্টর অধ্যাপক বেনজীর আহমদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (বাংলাদেশ)-এর সাবেক ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. এ মান্নান বাঙ্গালী প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান। এবারের ম্যালেরিয়া দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে-‘আমিই করব ম্যালেরিয়া নির্মূল।’

শিগগিরই চালু হচ্ছে ‘বিকিনি এয়ারলাইন’

ভাবুন তো বিমানে বসে আছেন। আর আপনার সামনে দিয়ে বিকিনি পরা বিমানবালা হেঁটে বেড়াচ্ছেন। আপনার কাছে জানতে চাইছেন কি কি সেবা দিতে পারেন। না, লাজুক হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটাই সত্যি হতে যাচ্ছে একটি বিমানে। এমন বিমান উড়বে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি থেকে। কোথাও বিরতি না দিয়ে তা সরাসরি উড়ে যাবে নয়া দিল্লিতে। এতে যেসব বিমানবালা থাকবেন তারা বিকিনি পরা।
এ জন্য এ বিমান সংস্থাটিকে বিতর্কিত করে বলা হয় ‘বিকিনি এয়ারলাইন’। প্রকৃত নাম ভিয়েতজেট এয়ার। এটি পরিচালনা করছেন নারী উদ্যোক্তা নগুয়েন থি ফুওং থাও। সপ্তাহে চারদিন হো চি মিন সিটি ও নয়া দিল্লির মধ্যে চলাচল করবে এ বিমানটি। তবে যৌন সুড়সুড়ি সৃষ্টিকারী বলে এরই মধ্যে ব্যাপক সমালোচনায় পড়েছে ভিয়েতজেট এয়ার। তারা এরই মধ্যে বার্ষিক একটি ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছে। তাতে বিমানবালা, পাইলট ও সমতলে দায়িত্ব পালনরতদের বিকিনি পরা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইট আউটলুক ইন্ডিয়া। 
২০১১ সালের ডিসেম্বরে শুরু এই এয়ারলাইনটির যাত্রা। আকাশে উড়ার প্রথম বছরেই তারা চোখে পড়ার মতো লাভ করেছে। বিবিসি রিপোর্ট করেছে যে, আগে এই বিমান সংস্থাটি মাঝে মাঝে সংবাদ শিরোনাম হতো। বিমানবালা বা অন্যরা যাত্রীদের সেবা দিচ্ছেন এমন একটি পোশাক বা ইউনিফর্ম পরে, যা বিকিনির চেয়ে সামান্য মার্জিত। তবে তাকে বিকিনি বলাই ভালো। এ জন্য আগে তাদেরকে নিয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।
কিন্তু ২০১২ সালে হঠাৎ করেই বিমান সংস্থাটি নিজেদেরকে সমালোচনার একেবারে তুঙ্গে নিয়ে যায়। ওই সময় বিমান যখন কোনো একটি ফ্লাইটের মাঝপথে ঠিক তখন সুন্দরী প্রতিযোগিতার মতো করে এর ভিতর নাচের আয়োজন করা হয়। আর তাতে নাচ করেন বিকিনি পরা ৫ বিমানবালা। এ খবর বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়ে। বিমানের ভিতরে এমন কা- ঘটনোর জন্য ভিয়েতজেট এয়ার দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেয় নি। এ জন্য তাদেরকে ৬৭৮.২০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়।
তবে এবার দিল্লি পর্যন্ত তারা এমন যে ফ্লাইট চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে যে বিকিনি পরা বিমানবালা থাকবেন, এ বিষয়ে সেখানকার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া হয়েছে কিনা তা জানা যায় নি। প্রকাশ করা হয় নি কোন তারিখ থেকে শুরু হবে এমন ফ্লাইট। তবে কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, খুব শিগগিরই শুরু হবে এ ফ্লাইট। বর্তমানে ভিয়েতনাম ও ভারতের মধ্যে সরাসরি কোনো ফ্লাইট চালু নেই। সম্প্রতি ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ট্রান ডাই কুয়াং ভারত সফরে আসেন। তখন ইন্ডিয়া-ভিয়েতনাম বিজনেস ফোরাম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমন ফ্লাইট চালু করার ঘোষণা দেয়া হয়। 
বর্তমানে ভিয়েতজেট এয়ারলাইনের ৫৫টি বিমান আছে। তারা ভিয়েতনাম ও আন্তর্জাতিক ৮২ টি রুটে প্রতিদিন ৩৮৫টি ফ্লাইট পরিচালনা করে।

চট্টগ্রামেও এত ধর্ষণ!

বৈশাখের প্রথম দিনে প্রেমিকের সঙ্গে চট্টগ্রামে বেড়াতে আসেন পটিয়া আরেফিন টেক্সটাইল মিলের এক পোশাককর্মী। চট্টগ্রামের কোনো এক জায়গায় বন্ধুর বাসায় রেখে তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে সেই প্রেমিক ও তার বন্ধু। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয় ওই পোশাককর্মীকে। এদিকে গতকাল চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানার কাঠগড় মাইজপাড়া রাজাপুকুর এলাকায় শাহিনা আক্তার (৩০) নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। সকাল ১১টার দিকে শাহিনা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বৈশাখের প্রথম পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে ঘটে আরো ৯টি ধর্ষণের ঘটনা। রয়েছে মাদরাসার এক শিশুকে বলৎকার ও  চলন্ত বাসে চবি ছাত্রীসহ ৪টি যৌন হয়রানির ঘটনা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, নগরীর চারটি থানায় দায়ের করা ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির মামলা থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
শুধু পাঁচ দিন নয়, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত তিন মাস ও ২০১৮ সালে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনার প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির এ তথ্য পাওয়া যায়। যাকে মহামারী বলে আখ্যায়িত করেছেন জেলা লিগ্যাল এইড ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। জেলা লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম অফিস সহকারী এরশাদুল ইসলাম বলেন, দরিদ্র ও অসহায় নির্যাতিত নারীদের আইনি পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে থাকি আমরা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ধারণ ক্ষমতার প্রায় চারগুণ বেশি আইনি পরামর্শ ও সহায়তার জন্য আবেদন পাচ্ছি। এক পরিসংখ্যানে তিনি বলেন, ২০১৭ সালে ৭৮৮টি, ২০১৮ সালে ৯০৮টি, ২০১৯ সালে গত তিন মাসে ৩১১টি নারী নির্যাতন মামলার আইনি পরার্মশ দিয়েছি আমরা। যার শতভাগই ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণ এখন মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে চট্টগ্রামে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন চট্টগ্রামের বিশেষ প্রতিনিধি আমিনুল হক বাবু বলেন, চট্টগ্রামে ধর্ষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা মহামারী আকারে রূপ নিয়েছে। দিনে গড়ে ৩-৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রামে। সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিকতা স্খলন, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে বিকৃত রুচির মানুষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সামাজিক এই অপরাধ বাড়ছে। এক্ষেত্রে শুধু পুরুষ নয়, নারীরাও দায়ী। 
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) সমন্বয়ক ডা. মাফরুহা নিগার জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত চমেক হাসপাতালের ওসিসিতে ১১ জন নারী ও ২ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। যারা ধর্ষণের শিকার। এরমধ্যে পটিয়া উপজেলার আরেফিন টেক্সটাইলের পোশাককর্মীর কথা উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, ১৬ বছরের এই কিশোরী বৈশাখের প্রথম দিন ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এখনো সে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে।
কিশোরীর ভাই জানান, পটিয়া উপজেলার কচুয়াই গ্রামের রিপন (২৬) বৈশাখের প্রথম দিনে বেড়াতে নিয়ে এসে চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক জায়গায় তার বন্ধুর বাসায় আমার বোনকে রেখে তারা ধর্ষণ করে। এদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা আমার বোনকে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে বোনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে দেয়া হয়।
এদিন চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজীদ থানার একটি মাদ্রাসায় হাবিবুর রহমান হাবিব নামে ১২ বছরের এক শিশুকে বলাৎকারের পর মাদ্রাসার মসজিদের জানালার গ্রিলে বেঁেধ ঝুলিয়ে মারা হয়। এ ঘটনার মাদ্রাসার ৫ শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরের দিন সোমবার ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর থানা হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের মহানগর গ্রামের রূপক কান্তি দের স্ত্রী মামুনি দে কে (২৪) ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে একই গ্রামের সানি দে, চয়ন দে ও জয় দে। এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে বলে জানান ভুজপুর খানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মো. আবদুল্লাহ।
এদিকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক পোশাক কর্মীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের কথা ফাঁস করে দেয়ার কথা বলায় তার শরীরে জলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা এবং খারাপ মেয়ে অপবাদ দিয়ে মাথার চুল কেটে দেয়। সে চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ মীর ফ্যাশন নামে এক প্রতিষ্ঠানের কর্মী।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার অভিযান চালিয়ে তার কথিত প্রেমিক নিজাম উদ্দিন (৩০) সহ নির্যাতনকারী ৬ নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদিন কর্ণফুলী ও সাতকানিয়া উপজেলায় ঘটে আরো দুটি ধর্ষণের ঘটনা। এরমধ্যে ধর্ষিতা তার প্রেমিক জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী থানায় মামলা দায়ের করে।
কর্ণফুলী থানার ওসি আলমগীর মাহমুদ জানান, জামাল উদ্দীন কর্ণফুলী উপজেলার ফজল সওদাগরের বাড়ির মৃত রহমত আলীর পুত্র। বুধবার ধর্ষিতার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
তরুণীর অভিযোগ, বিগত এক বছর আগে জামাল উদ্দীন তার সঙ্গে প্রেমের সমপর্ক গড়ে তুলে। এরপর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। নিরুপায় ওই তরুণী তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করে। একই দিনে সাতকানিয়ায় এক কিশোরীকে (১৫) অপহরণের পর ধর্ষণ করে। এ অভিযোগে মোহাম্মদ বাবুল প্রকাশ জাহাঙ্গীর (৩৫) নামে একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ সময় ওই বাড়ি থেকে অপহৃত কিশোরীকেও উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার বাবুল বাঁশখালীর গন্ডামারা ইউনিয়নের বাদামতলী এলাকার মৃত আবদুর রহমানের ছেলে বলে জানান সাতকানিয়া থানার এসআই নজরুল ইসলাম। এছাড়া গতকাল পতেঙ্গা থানার কাঠগড় মাইজপাড়া রাজাপুকুর এলাকায় শাহীনা আক্তার নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটে। আগুন নেভানোর পর পুড়ে প্রায় ছাই হওয়া শাহীনা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। পতেঙ্গা ফায়ার স্টেশনের অফিসার শামসুল আলম বলেন, তিন কক্ষবিশিষ্ট সেমিপাকা বসতঘরে দুই ভাই গফুর মিয়া ও আব্দুস সাত্তার পরিবার নিয়ে থাকেন। সেখানে আগুন লাগে। যা নেভাতে ১০ মিনিট সময় লেগেছে। বাসাটির একটি কক্ষ থেকে শাহীনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শাহীনার স্বামী মুছার অভিযোগ, শাহীনা বড় বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। বড় বোনের স্বামী গফুর চরিত্রহীন। শাহীনাকে ধর্ষণের পর পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি মামলা করবেন বলে জানান।  
ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার দায়িত্বে থাকা পুলিশ উপপরির্দশক আবুল বাসার জানান, গত রোববার থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর আগের ১৩ দিনে ২৭টি, মার্চ মাসে ৯৪টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৭৩টি, জানুয়ারি মাসে ৭৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০১৮ সালে ৬৪৯টি, ২০১৭ সালে ৪৯৭টি ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে।