Friday, May 9, 2025

অপারেশন সিঁদুর কি পেলো!

অপারেশন সিঁদুর। মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর গর্জে উঠলো ভারতের যুদ্ধবিমান। একের পর এক টার্গেটে হামলা চালাতে লাগলো। তাতে পাকিস্তানে ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরে কমপক্ষে ৩১ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে বেশ কিছু স্থাপনা। এসব টার্গেটে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে মসজিদ ও বাড়িঘর। কেন এই হামলা চালালো ভারত? এ প্রশ্নের জবাবে অনলাইন বিবিসি লিখেছে, ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অপারেশন সিঁদুর নামে এই হামলাগুলো ২২শে এপ্রিল ভারত-শাসিত কাশ্মীরের  পেহেলগামে হামলার জন্য দায়ীদের ‘জবাবদিহি’ করার প্রতিশ্রুতির অংশ। এই হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে পাকিস্তান। এর জবাবে ভারত যে হামলা চালিয়েছে তাকে ‘বিনা উস্কানিতে’ করা হয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। তিনি বলেছেন- এই জঘন্য আগ্রাসনের শাস্তি থেকে অব্যাহতি পাবে না। বুধবার তিনি বলেন,  পেহেলগাম হামলার সঙ্গে পাকিস্তান সম্পর্কিত নয়। তার দেশকে ভুল কারণে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে হামলায় কমপক্ষে ৩১ জন নিহত এবং ৫৭ জন আহত হয়েছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সীমান্তে তাদের পাশে পাকিস্তানি গোলাগুলিতে কমপক্ষে ১৫ জন বেসামরিক লোক নিহত এবং ৪৩ জন আহত হয়েছেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা পাঁচটি ভারতীয় বিমান এবং একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। ভারত এই দাবির কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এর প্রেক্ষিতে বুধবার রাতে শরীফ বলেন, বিমান বাহিনী তাদের প্রতিহত করেছে- যা ছিল ‘আমাদের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি একটি জবাব’।

ভারত কোথায় আঘাত করেছিল?
বুধবার ভোরে দিল্লি জানিয়েছে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর এবং পাকিস্তান উভয় স্থানেই নয়টি ভিন্ন স্থান টার্গেট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই স্থানগুলো ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’। এসব স্থানে হামলা পরিকল্পিত এবং নির্দেশিত ছিল।
তারা জোর দিয়ে বলেছে, পাকিস্তানি  কোনো সামরিক স্থাপনায় আঘাত করেনি ভারত। হামলার প্রাথমিক পর্যায়ে পাকিস্তান বলেছে, তিনটি ভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে। তা হলো- পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের মুজাফ্‌ফরাবাদ ও কোটলি এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের ভাওয়ালপুর। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আইএসপিআরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী পরে বলেছেন, ছয়টি স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। বুধবার ভোরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জিওটিভিকে বলেন, বেসামরিক এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে, তিনি আরও বলেন, ভারত যে  ‘সন্ত্রাসী শিবির লক্ষ্যবস্তু’ করার দাবি করেছে, তা মিথ্যা।

ভারত কেন আক্রমণ শুরু করলো?
মনোরম রিসোর্ট শহর পেহেলগামে গুলিবর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পর এই হামলা চালানো হয়েছে। ২২শে এপ্রিল একদল সন্ত্রাসীর হামলায় ২৬ জন নিহত হন। দুই দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের উপর এটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণ। ২০১৯ সালে ভারত ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এটিই প্রথম বড় আক্রমণ। ৩৭০ ধারায় কাশ্মীরকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছিল। তা বাতিলের সিদ্ধান্তের পর, এ অঞ্চলে বিক্ষোভ দেখা দেয়। কিন্তু উগ্রপন্থা হ্রাস পায়। পর্যটকদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সেখানে হত্যাকাণ্ড ভারতে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, দেশটি ‘পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত’ সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করবে এবং যারা এটি পরিকল্পনা করেছে এবং বাস্তবায়ন করেছে তাদেরকে ‘তাদের কল্পনার বাইরেও শাস্তি দেয়া হবে’। তবে, ভারত প্রাথমিকভাবে পেহেলগামে হামলার পেছনে কোনো গোষ্ঠীর হাত আছে বলে মনে করেনি।

কিন্তু ভারতীয় পুলিশ অভিযোগ করেছে, হামলাকারীদের মধ্যে দু’জন পাকিস্তানি নাগরিক। দিল্লি অভিযোগ করেছে, পাকিস্তান এসব উগ্রপন্থিদের মদত দিচ্ছে। ইসলামাবাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, ২২শে এপ্রিলের হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ৭ই মে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, পাকিস্তান-ভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। এরপর থেকে দুই সপ্তাহে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কূটনীতিকদের বহিষ্কার, ভিসা স্থগিত করা এবং সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করা। কিন্তু অনেকেই আশা করেছিলেন, এটি সীমান্ত পার হয়ে কোনো ধরনের হামলার দিকে এগিয়ে যাবে। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পরে এমনটা দেখা গেছে।
কাশ্মীর কেন দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে?
ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পুরো কাশ্মীরের মালিকানা দাবি করে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতার পর বিভক্ত হওয়ার পর থেকে উভয় দেশই কেবল আংশিকভাবে এর শাসন করে। তারা এ নিয়ে দুটি যুদ্ধ করেছে। কিন্তু সম্প্রতি সন্ত্রাসী আক্রমণ দু’টি দেশকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ১৯৮৯ সাল থেকে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। সেখানে উগ্রপন্থিরা নিরাপত্তা বাহিনী এবং বেসামরিক নাগরিক উভয়কেই লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। ২০১৬ সালে উরিতে ১৯ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর ভারত নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ‘জঙ্গি ঘাঁটি’ লক্ষ্য করে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক শুরু করে। ২০১৯ সালে পুলওয়ামায় বোমা হামলায় ৪০ জন ভারতীয় আধা-সামরিক সদস্য নিহত হন। তার ফলে বালাকোটের গভীরে বিমান হামলা চালানো হয়। ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলার পর এটিই প্রথম এ ধরনের অভিযান।

mzamin

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে যমুনার সামনে এনসিপির অবস্থান

আওয়ামী লীগের বিচার ও দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান নিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা কর্মীরা। দলটির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এই অবস্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অবস্থানকারীরা আওয়ামী লীগের বিচার ও দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে নানা স্লোগান দিচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার রাত দশটার পর অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, জুলাই ঐক্য, ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা।  প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে পুলিশ-র‍্যাব সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।  অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান করছেন। তারা নানা স্লোগান দিচ্ছেন।

শিক্ষার্থীদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনের সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে পুলিশ। সেখান দিয়ে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

কর্মসূচিতে এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার তুষার, মনিরা শারমীন,  আব্দুল কাদের, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের সদস্যসচিব জাহিদ আহসান, জুলাই ঐক্যের এবি জুবায়ের, মুসাদ্দিক আলী ইবনে মুহাম্মদ প্রমুখ উপস্থিত রয়েছেন।

রাত দশটা থেকে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুক পোস্টে জানান, গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না পাওয়া পর্যন্ত আজ রাত দশটা থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি চলবে। যার এজেন্ডায় গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সুস্পষ্ট বয়ান নাই, তার সাথে আমরা নাই। এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, হাসনাতের সাথে যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিন। নয় মাসে সোজা আঙ্গুলে কাজ হয়নি। এখন সময় আঙ্গুল বাঁকা করার।

যার এজেন্ডায় আওয়ামী লীগের বিচার নাই তার সঙ্গে আমরা নাই

সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘যার এজেন্ডায় গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের বিচার নাই, যার এজেন্ডায় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নাই, তার সঙ্গে আমরা নাই।’

গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা জানান।  

তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পোস্ট প্রসঙ্গে হাসনাত লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগের বিচার প্রশ্নে যারা মাহফুজ আলমের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন, তারা হয় অন্যের খেলার ঘুঁটি হচ্ছেন নাহলে তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। মাহফুজ, আসিফ, নাহিদরা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই লীগের বিচার ও নিষিদ্ধ ঘোষণা চায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে কারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করুন। মূল সমস্যা চিহ্নিত না করে, সে ব্যাপারে কথা না বলে ব্যক্তিগত ক্ষোভ, ঈর্ষা বা গোষ্ঠীগত স্বার্থোদ্বারের জন্য যারা মাহফুজদের টার্গেট করছেন, আওয়ামী লীগ ফিরে আসার দায় নিতে হবে আপনাদেরও।’

একই দিনে আরেক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘চলতি মাসেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ও হাইকমিশন বাংলাদেশের সরকারি বেসরকারি ও সামরিক পর্যায়ে অন্তত তেইশটা মিটিং করেছে। লিখে রাখেন আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দিতেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিচারের নামে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। একটা পর্যায়ে বলা হবে, একসময়ের জন সমর্থিত রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা আমাদের কাজ নয়।’

সাবেক রাষ্ট্রপতির দেশত্যাগ প্রসঙ্গে আরেকটি স্ট্যাটাসে এনসিপি’র এই নেতা লিখেছেন, ‘খুনিকে দেশ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়, পুলিশ আসামি ধরলেও আদালত থেকে জামিন দেয়া হয়। শিরীন শারমিনকে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বাসায় গিয়ে পাসপোর্ট করে দেয়া হয়। দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল জানুয়ারিতে হওয়ার কথা থাকলেও মে মাসে এসেও শুরু হয়নি। আর আপনারা বলছেন, আওয়ামী লীগের বিচার করবেন?’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি লিখেন, ‘তা ইন্টেরিম, এখন পর্যন্ত কী কী বিচার ও সংস্কার করেছেন?’
mzamin

ভারত পাকিস্তান পাল্টাপাল্টি

শহীদের প্রতিটি রক্তবিন্দুর হিসাব নেবে পাকিস্তান। ভারতে সর্বদলীয় বৈঠক থেকে সেনাবাহিনীর অভিযানে সমর্থন দেয়া হয়েছে। এমন অবস্থায় পাল্টাপাল্টি লড়াই চলছেই পারমাণবিক অস্ত্রধর এই দুই দেশের  মধ্যে। উত্তেজনার পারদ ক্রমশ বাড়ছে। এরই মধ্যে পাকিস্তানের লাহোরে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়ার দাবি করেছে ভারত। তারা বলেছে, পাকিস্তান ভারতের কমপক্ষে ১৫টি শহরে হামলা চালিয়েছে। টার্গেট করেছে সামরিক স্থাপনা। ভারতের একটি ড্রোন রাওয়ালপিন্ডি স্টেডিয়ামের কাছে আঘাত করেছে। ফলে ওই স্টেডিয়ামে করাচি-পেশোয়ারের ক্রিকেট ম্যাচ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। বার বার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সংযত না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

মঙ্গলবার রাতে অপারেশন সিঁদুরের পর বুধবার রাতেও ব্যাপকভাবে পাকিস্তানে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ভারত। পাকিস্তান তার ২৫টি গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছে। ভারত দাবি করেছে তারা পাকিস্তানের এয়ার ডিফেন্স রাডার ও বেশ কিছু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছে। এগুলোর অবস্থান লাহোরে। তাদের দাবি, ভারতের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে টার্গেট করেছে পাকিস্তান। তারা শ্রীনগর, পাঠানকোট, অমৃতসর, লুধিয়ানা, চণ্ডিগড় এবং অন্য স্থানগুলোতে টার্গেট করে হামলা করেছে। পাকিস্তানের হামলায় কমপক্ষে ১৬ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হওয়ার তথ্য মিলেছে। ভারতের মিডিয়াগুলোতে বলা হয়েছে, হামলায় পাকিস্তানে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০০ মানুষ। তবে পাকিস্তান এ সংখ্যা ৩১ বলে উল্লেখ করেছে। এ পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার ভারতে সর্বদলীয় বৈঠক করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। এ সময় সব বিরোধী দল ভারতের সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়েছে। পাকিস্তান আইএসপিআরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেছেন, ভারত অপারেশন সিঁদুরের পর ড্রোন পাঠিয়ে আবারো নগ্ন আগ্রাসন চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভারত-পাকিস্তানকে থামার আহ্বান জানালেও কাজ হচ্ছে না। ওদিকে এই লড়াইয়ে চীনের কোনো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে দেশটি। ভারত দাবি করেছে, জম্মু-কাশ্মীর, পাঞ্জাব এবং গুজরাট সহ দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের ১৫টি শহরে সামরিক স্থাপনাকে টার্গেট করেছে বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার খুব সকালে। এর জবাবে পাকিস্তানের এয়ার ডিফেন্স রাডার সিস্টেম ধ্বংস করে দিয়েছে ভারত। ওদিকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত পর্যন্ত করাচি বিমানবন্দরের সকল ফ্লাইট স্থগিত করে পাকিস্তান বিমানবন্দর রেগুলেটর। বিবিসি জানাচ্ছে, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি মিথ্যা তথ্যের বিষয়ে কথা বলতে চান। সবাইকে তিনি স্মরণ করিয়ে বলেন, ভারত বিষয়টিকে উত্তেজনাকর করে তুলতে চাইছে না। কিন্তু ২২শে এপ্রিলের ভয়াবহ ছিল আসল উত্তেজনা। আর মঙ্গলবার রাতে যে বিমান হামলা করা হয়েছে, সেটা ছিল তার জবাব। তবে তিনি পাকিস্তানের বেশ কিছু অভিযোগের জবাব দেননি। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, পাকিস্তানি সেনারা ভারতীয় ৫০ সেনাকে হত্যা করেছে। এ বিষয়ে তাকে প্রশ্নও করা হয়নি। নিজে থেকেও বিক্রম মিশ্রি এ বিষয়ে কথা বলেননি। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারতের ৫টি যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছে পাকিস্তান।

এ বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি বিক্রম মিশ্রি। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে উপযুক্ত সময়ে অফিসিয়াল তথ্য জানানো হবে। ভারতের কিছু মিডিয়ার রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে, অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানে কমপক্ষে ১০০ উগ্রপন্থি নিহত হয়েছেন। এ বিষয়েও তিনি কোনো বক্তব্য রাখেননি। তিনি বলেন, বিমান হামলার মাত্র ৩৬  ঘণ্টা পার হয়েছে। বিস্তারিত জানতে অপেক্ষা করতে হবে। ভারত দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানের লাহোরে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। বিক্রম মিশ্রির কাছে জানতে চাওয়া হয় ভারত কী এমন অন্য কোনো সিস্টেম টার্গেট করেছে। জবাবে তিনি বলেন, অপারেশন নিয়ে বিস্তারিত বলবেন না। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে এক বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, প্রত্যাঘাতের পর পরিস্থিতি আরও জটিল করতে আগ্রহী নয় নয়াদিল্লি। তবে পাকিস্তান সামরিক আক্রমণ করলে ভারত তার যোগ্য জবাব দেবে।  

জাতির উদ্দেশ্যে শেহবাজ, শহীদের প্রতিটি রক্তবিন্দুর হিসাব নেয়া হবে: ভারতের হামলার জবাবে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেয়া টেলিভিশন ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ বলেছেন- শহীদদের প্রতিটি রক্তবিন্দুর হিসাব নেয়া হবে। তিনি ভারতের এই ‘আগ্রাসন’কে মারাত্মক ভুল হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ভারত ভেবেছিল পাকিস্তান পিছু হটবে। কিন্তু তাদের (ভারত) এই ভুলের মূল্য চুকাতে হবে। শেহবাজ বলেন, ভারত ভুলে যায়, পাকিস্তানের বীর সন্তানেরা মাতৃভূমির সম্মান রক্ষায় নিজেদের রক্তের শেষ ফোঁটা দিয়ে লড়াই করেছে এবং করবে। তিনি জানান, পাকিস্তান বিমান বাহিনী এক ঘণ্টার লড়াইয়ে পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করে, যা একসময় ভারতের গর্ব ছিল। এখন সেগুলো শুধু ছাই ও ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় বাহিনীর হামলার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী  শেহবাজ শরীফ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে টেলিভিশনে ভাষণ দেন। এতে তিনি বলেন, শহীদ ইরতেজা আব্বাস মাত্র সাত বছর বয়সী একটি শিশু। সে নিজের ঘরে পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছিল। সেখানে স্প্লিন্টারের আঘাতে শহীদ হয়। একটি কোমল ফুল ঝরে  গেছে। কিন্তু সে শহীদের মর্যাদা পেয়েছে।

শেহবাজ শরীফ আরও বলেন, ভীরু শত্রু নিরীহ মানুষের ওপর আঘাত করছে। পাকিস্তান দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়। তিনি পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, মার্শাল এম এম আলমের বজ্রধ্বনি যেন আজও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব জয়েন্ট চিফসের চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল অসিম মুনির, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির বাবর সিদ্দিক এবং নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফ সহ সব অফিসার ও সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, পেহেলগাম হামলা নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

পাকিস্তান একটি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছিল, যা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম ভেঙে হামলা চালিয়েছে। কাশ্মীর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী কাশ্মীর একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত বিরোধপূর্ণ এলাকা ছিল এবং থাকবে। ভারত যত সিদ্ধান্তই নিক, বাস্তবতা বদলাতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ, যেখানে প্রায় ৯০,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৫২ বিলিয়ন ডলার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারতের আগ্রাসন আমাদের দৃষ্টি সন্ত্রাসবাদ নির্মূল থেকে সরাতে পারবে না। সবশেষে তিনি বলেন, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণ একতাবদ্ধ। জাতি তার বীর সেনাবাহিনীর পাশে আছে এবং সম্মিলিতভাবে শত্রুকে পরাজিত করবে।

দিল্লিতে সর্বদলীয় বৈঠকে বিরোধী নেতাদের সমর্থন ঘোষণা: ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার মধ্যে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সর্বদলীয় বৈঠকে দেশের প্রধান বিরোধী নেতারা সরকারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বৈঠকে পাকিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চালানো বিমান হামলার বিষয়ে বিরোধী দলগুলোকে অবহিত করেন। সংবাদ মাধ্যমকে এ কথা জানিয়েছেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তিনি আরও বলেন, বিরোধী নেতারা এ বিষয়ে নানা পরামর্শও দিয়েছেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে সংবাদ সংস্থা এএনআই’কে জানান, সরকার বলেছে- কিছু বিষয় জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গোপন রাখা প্রয়োজন। আমরা সবাই বলেছি, আমরা সরকারের পাশে আছি।

অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দলের প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি জানান, তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, ভারত যেন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’-এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার চালায়। দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টকে ভারত গত মাসে পেহেলগামে ভারতীয় পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী করেছে। ভারত সরকারের মতে, দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট হলো পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বার একটি শাখা। একে জাতিসংঘ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পাকিস্তানে ১০০ হত্যার দাবি রাজনাথের: এনডিটিভি’র খবরে বলা হয়, সর্বদলীয় বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, পাকিস্তানে ভারতের সামরিক জবাবে কমপক্ষে ১০০ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, অপারেশন সিঁদুর চলমান অপারেশন। এর অর্থ হলো পাকিস্তান কোনো ‘উত্তেজনা’ সৃষ্টি করলে তার জবাব দিতে প্রস্তুত আছে ভারতের সেনাবাহিনী। তিনি বলেন, যদি শত্রুরা আর হামলা না করে তাহলে ভারত আর কোনো সামরিক পদক্ষেপে যেতে চায় না।

ভারতের ৫০ সেনা নিহত, দাবি পাকিস্তানের: ভারতের ৫০ সেনা সদস্য নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে পাকিস্তান। দেশটির তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, ভারত শাসিত ও পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরকে বিভক্তকারী নিয়ন্ত্রণ রেখায় গোলাগুলির সময় ৪০ থেকে ৫০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের আইএসপিআর জানিয়েছে, ৬ মে পাকিস্তানের পাল্টা বিমান হামলায় ভারতের পাঁচটি আধুনিক যুদ্ধবিমান, একাধিক ড্রোন ধ্বংস এবং সেনা হতাহতের ঘটনায় ভারত ‘ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে’ এসব ড্রোন হামলার আশ্রয় নেয়।

mzamin

মোদি–শাহ জুটির যুদ্ধ উন্মাদনা ভারতকে যেভাবে বদলে দেবে by আলতাফ পারভেজ

মঙ্গলবার মধ্যরাত পেরিয়ে বুধবারের শুরুতে পাকিস্তানে ভারতের সর্বশেষ আকাশ-হামলা দুঃখজনক হলেও অবাক হওয়ার মতো নয়। গত দেড় দশকে এবং বিশেষভাবে পেহেলগামের সন্ত্রাসী ঘটনার পর ভারতীয় জনসমাজে যেভাবে যুদ্ধ-উত্তেজনা ছড়িয়েছে, তাতে পাকিস্তানে এক দফা হামলা অবধারিত ছিল।

পাকিস্তানিরাও সেটা জানত। ভারতের হামলার আশঙ্কায় তাদের শেয়ারবাজার ক্রমে পড়ছিল। এই হামলার মাধ্যমে বিজেপি সরকার তাদের জনগণের যুদ্ধক্ষুধার কিছুটা মেটাল। রাজনৈতিকভাবেও বেশ মুখরক্ষা হলো তাদের। তবে এই হামলা ভারতকে অধিক নিরাপদ করল কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়? যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, বন্ধ করা ঠিক তত কঠিন।

হামলার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন কম

পেহেলগামে নির্মম রক্তপাত বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছিল। কিন্তু ঘটনার দুই সপ্তাহ পরও ভারত এই হামলার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত–পরবর্তী সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরতে পারেনি। সেই কারণে গত ১৫ দিন চেষ্টা করেও তারা পাকিস্তানকে দোষারোপের প্রচারণায় আন্তর্জাতিক সমর্থন পায়নি তেমন। তাদের মিত্র রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রও এই ঘটনায় যুক্ত থাকার দায়ে পাকিস্তানের নিন্দা করেছে—এমন ঘটেনি। এ কারণে পাকিস্তানে ভারতের ৬ মের ‘প্রতিশোধমূলক’ হামলা ‘আগ্রাসন’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বাস্তব কারণ রয়েছে।

পেহেলগামের হামলায় যে ২৬ জন নিহত হয়েছেন, তাঁরা যেমন বিনা অপরাধে খুনের শিকার, তেমনি পাঞ্জাব ও আজাদ কাশ্মীরে ভারতের বোমায় নিহত ব্যক্তিরাও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে খুন হলেন বলে যাঁরা বলছেন, তাঁদের বক্তব্যের যুক্তি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতীয় হামলার প্রত্যুত্তরে পাকিস্তানের ছোড়া গোলাগুলিতে যেসব ভারতীয় নাগরিক মারা যাচ্ছেন, তাঁরাও চলমান যুদ্ধ-উন্মাদনার নির্মম বলিমাত্র।

উভয় দেশে এসব মৃত্যুর জন্য যাঁরা দায়ী, সেসব শাসক, জেনারেল, মিডিয়া মালিক কেউ সীমান্তে যুদ্ধ করতে যাবেন না, অতীতেও যাননি। উভয় দেশের সীমান্তে এবং সীমান্তের ভেতরে যাঁরা মরবেন, আহত হবেন, সব সমাজের দরিদ্র মানুষ—কেউ উর্দি পরা থাকবেন, কেউবা উর্দিহীন। দুর্ভাগা এসব মানুষকে নিয়ে ইউটিউবজুড়ে প্রচুর আবেগ ছড়ানো হবে, আর এই ফাঁকে উভয় দেশের সামরিক বাজেট আরেক দফা বাড়বে, সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব অতীতের চেয়ে দৃঢ় হবে এবং সমাজজুড়ে ধর্মীয় ও জাতিগত উন্মাদনা নতুন উচ্চতায় উঠবে। পাশাপাশি যুদ্ধে সরাসরি কোনো স্বার্থ না থাকার পরও সাধারণ হিন্দু, মুসলমান, শিখরা আবার পরস্পরকে নতুন করে সন্দেহ-অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শুরু করবে।

পাকিস্তান ইতিমধ্যে পাঞ্জাব ও আজাদ-কাশ্মীরের বহু এলাকায় স্কুল-কলেজ, হাটবাজার বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতের ভেতরও বহু জায়গায় এ রকমটি করতে হবে শিগগির। তাৎক্ষণিকভাবে বললে, এই যুদ্ধ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সমাজজীবনে দক্ষিণপন্থার প্রভাব আরও বাড়বে এবং এই যুদ্ধ দরিদ্রদের স্বার্থের জন্য প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ক্ষতিকর হবে।

আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে রাজনীতিতে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের যে জোয়ার চলছে, তারা এই যুদ্ধে নিজেদের দক্ষিণ এশীয় মিত্রদের উত্থান দেখতে পাবে। ওই সব দেশের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ব্যবসাও এ কারণে চাঙা হবে। ট্রাম্প ও ইসরায়েল প্রশাসন গাজায় তাদের নির্মমতা থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ বেশ ভালোভাবেই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থানান্তর করতে পারল মোদি প্রশাসনের সহায়তায়। মুখে ট্রাম্প যা–ই বলুন, তাঁদের জন্য ৬ মের ‘অপারেশন সিঁদুর’ আনন্দদায়ক হয়েছে।

মোদি-শাহ জুটির প্রভাব নতুন উচ্চতায়

চলতি যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ায় কীভাবে দক্ষিণপন্থার জয়পতাকা নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, তার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় ভারতজুড়ে সেক্যুলার শক্তিকে দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা বের করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে পুনঃ পুনঃ। আবার দেশটির প্রধান বিরোধী দল নিজে থেকে পাকিস্তানে হামলায় সরকারকে আগে থেকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে রেখেছে। তারা ইতিমধ্যে হামলার জন্য অভিনন্দনও জানিয়েছে। রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য তাদের এই করুণ প্রচেষ্টা শেষ বিচারে বিজেপি-আরএসএস পরিবারের শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিকে শক্তি জোগাবে প্রবলভাবে।

ভারতের প্রায় সব মিডিয়া পাকিস্তানে হামলাকে ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটি’তে হামলা হিসেবে প্রচার করছে। মনে হচ্ছে, পাকিস্তানের সবাইকে তারা সন্ত্রাসী হিসেবে দেখে। এ রকম বিপজ্জনক মনোভাব দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু বিপরীত দিকে, এ মুহূর্তে ভারতজুড়ে আরএসএস-বিজেপি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মতাদর্শিকভাবে সম্পূর্ণ চ্যালেঞ্জহীন অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ-উত্তেজনাকে তার রাজনীতির সমার্থক এবং ভারতের জন্য একমাত্র পথ হিসেবে হাজির করতে পেরেছে।

উদ্বেগের দিক হলো, বিজেপি এই যুদ্ধাবস্থাকে ব্যবহার করে আগাম নির্বাচন দিয়ে লোকসভায় বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসে সংবিধান সংশোধন করে দেশকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলে সেখানকার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর কিছুই করার থাকবে না।

অতীতে ভাষ্যকারেরা বলতেন, রাজনীতির যেখানে শেষ, সেখানে যুদ্ধের শুরু। কিন্তু এ–ও সত্য, অনেক রাজনৈতিক মতাদর্শই যুদ্ধ নিয়ে আসে। রক্ত দিয়ে অনেক রাজনীতির চাষাবাদ হয়েছে ইতিহাসে।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একটা বিষয় খেয়াল করার আছে যে আগামী বছর আরএসএসের শত বছর পূর্তি হচ্ছে। তাদের এখনকার তাত্ত্বিক ও আদর্শিক এজেন্ডা একটাই। সেটা হলো, ভারতকে একটা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে আইনগতভাবে ঘোষণা করা। এটা তাদের কোনো গোপন অভিলাষ নয়। বিজেপি পরবর্তী লোকসভায় সাড়ে তিন শ থেকে চার শ আসনের জন্য চেষ্টা করছে। বাবরি মসজিদের জায়গায় দৃষ্টিনন্দন মন্দির গড়েও তারা উত্তর প্রদেশে প্রত্যাশিত ফল পায়নি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে নতুনভাবে তারা নিজেদের রণনীতি-রণকৌশল পুনর্বিন্যাস করেছে।

এখন তাদের প্রয়োজন পাকিস্তান ও মুসলমানবিরোধী তীব্র এক যুদ্ধ–পরিস্থিতি। এই কৌশলে সামাজিকভাবে বিজেপি ইতিমধ্যে কংগ্রেসসহ প্রধান প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলেছে। রাহুল গান্ধী অনেকটাই মোদি-অমিত শাহ জুটির রাজনৈতিক-সামরিক কৌশলের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন। পেহেলগাম অধ্যায়কে সর্বোত্তম পন্থায় নগদায়ন করতে নেমেছে সংঘ পরিবার।

দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণপন্থা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এগিয়ে রাখবে

মোদি সরকারের সর্বশেষ পদক্ষেপ মার্কিন প্রশাসনের জন্যও সুবিধাজনক হয়েছে। যদিও তারা আপাতদৃষ্টে এই যুদ্ধ থেকে একটু দূরে থাকার নীতি নিয়েছে এবং ট্রাম্প ভারতের হামলাকে হতাশাজনক বলেছেন, কিন্তু এই যুদ্ধে চীন যত বেশি পাকিস্তানের পক্ষ নেবে, তত যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ভারতের কাছাকাছি আসবে। ভারতেরও যুক্তরাষ্ট্রকে দরকার হবে। আন্তর্জাতিক মুরব্বি দেশগুলোর এ রকম মেরুকরণ চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আক্রমণাত্মক বিদেশনীতিরই পার্শ্বফল হিসেবে দেখা যায়।

ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে ভূকৌশলগত লক্ষ্য পূরণের পর যুক্তরাষ্ট্র চীনকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে যেভাবে তাদের সমাজকে নতুন মানসিকতায় প্রস্তুত করছে, ভারতের পাকিস্তাননীতি তাতে সহায়ক অবদান রাখবে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় ও আরব সাগরে যেভাবে সামরিক উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, তা এই অঞ্চলের স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও নষ্ট করবে। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর যে তাগিদ তৈরি করেছিল, এই যুদ্ধ তাতে বিধ্বংসী বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি বহুমুখী

চলতি যুদ্ধের আঁচ লাগবে বাংলাদেশেও। যুদ্ধরত উভয় দেশ বাংলাদেশকে তাদের দিকে টানবে। বাংলাদেশের জন্য সংকটের দিক হলো, এখানে নির্বাচিত সরকার নেই। জনপ্রতিনিধিদের মতামত রাখার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ফোরামও নেই এ মুহূর্তে। কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে এখানকার সাধারণ মানুষের যেকোনো প্রতিক্রিয়া ভারত ও পাকিস্তান তাদের প্রতি সমর্থন বা বৈরিতা হিসেবে দেখবে।

ভারতজুড়ে ইতিমধ্যে সাত-আট মাস ধরে বাংলাদেশবিরোধী তীব্র প্রচারণা চলছে। এসব প্রচারণা প্রযোজকেরা এখন চেষ্টা করবে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকেও প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারতবাসীর সামনে হাজির করতে। ফলে এই যুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখানোর বেলায় বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি উভয় তরফে সতর্কতা প্রয়োজন। মিয়ানমারের সঙ্গে মানবিক করিডরের আলাপটিও আপাতত একদম স্থগিত থাকা দরকার। সীমান্তে হঠাৎ করে পুশ–ইন নিয়েও বাংলাদেশের জরুরি সতর্ক প্রস্তুতি দরকার।

* আলতাফ পারভেজ ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

(ছাপা পত্রিকায় শিরোনাম: দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্ভাগ্যের আরেক অধ্যায়)

*মতামত লেখকের নিজস্ব

উভয় দেশের সীমান্তে এবং সীমান্তের ভেতরে যাঁরা মরবেন, আহত হবেন, সব সমাজের দরিদ্র মানুষ
উভয় দেশের সীমান্তে এবং সীমান্তের ভেতরে যাঁরা মরবেন, আহত হবেন, সব সমাজের দরিদ্র মানুষ। রয়টার্স

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কে কেন এই বিপর্যয় by শশী থারুর

জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সম্প্রতি যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল চোখে পড়ার মতো। আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের প্রায় সবাই ভারতীয়। সংখ্যায় ২৬ জন।

তালেবান বলেছে, এমন হামলা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তারা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানকেই দোষারোপ করেছে। কারণ, হামলাকারীদের মদদদাতা যে পাকিস্তান, তা অজানা নয়। এটি প্রথম নয়, তালেবান ও তাদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার আরও আগের বহু ইঙ্গিত রয়েছে।

গত বছরের শেষ নাগাদ এই সম্পর্ক এতটাই খারাপ পর্যায়ে গিয়েছিল যে দুই পক্ষের উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানের আফগানিস্তান–বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ সাদিক খানকে তালেবান নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য কাবুলে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সে সময়, ২৪ ডিসেম্বর, পাকিস্তানের বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের পাক্তিকা প্রদেশে বোমা হামলা চালিয়েছিল। তারা পাকিস্তানি তালেবানের (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি) ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে আঘাত হানে। এতে ৪৬ জন নিহত হন। হামলাটি ছিল ২১ ডিসেম্বর টিটিপির একটি হামলার জবাব, যেখানে ১৬ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হন।

তিন দিন পর পাকিস্তানের আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী একটি করুণ পরিসংখ্যান দেন। তিনি বলেন, গত এক বছরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে পাকিস্তানের ৩৮৩ জন কর্মকর্তা ও সৈন্য নিহত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, এ সময়ে প্রায় ৯২৫ জন জঙ্গিকে হত্যা করা হয়েছে, যাঁদের অনেকে টিটিপির সদস্য। তিনি জানান, টিটিপি সরাসরি পাকিস্তান ও পাকিস্তানের নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং তারা আফগানিস্তানে আশ্রয় পাচ্ছে।

এ বক্তব্যে প্রচণ্ড দ্বৈততা ফুটে ওঠে। কারণ, অতীতে পাকিস্তানই মার্কিন বাহিনী ও আগের আফগান সরকারকে উৎখাত করতে আফগান তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্ককে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে এসেছে। এসবেরই ফলে ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানে আবার ক্ষমতায় আসে। কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে।

২৮ ডিসেম্বর এই দ্বন্দ্ব আরও বেড়ে যায়, যখন আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একাধিক স্থানে পাকিস্তানের ভেতরে হামলার ঘোষণা দেয় এবং এর দায় স্বীকার করে। তারা জানায়, এটি ছিল পাকিস্তানের আগের বিমান হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়া। যদিও আফগান সরকার সরাসরি পাকিস্তানের ভূখণ্ডে হামলার কথা স্বীকার করেনি, তারা বলেছে ‘কাল্পনিক রেখার’ ওপারে হামলা চালানো হয়েছে। এখানে ‘কাল্পনিক রেখা’ বলতে বোঝানো হয়েছে ঔপনিবেশিক যুগের সেই সীমান্তরেখাকে (ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত), যেটিকে আজ পর্যন্ত কোনো আফগান সরকারই স্বীকৃতি দেয়নি।

তার পর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে, পাকিস্তান তাদের পুরোনো মিত্র তালেবানের ওপর আর আগের মতো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বহু বছর ধরে তালেবানকে গড়ে তুলেছে—তাদের আশ্রয় দিয়েছে, অস্ত্র ও অর্থ দিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে। পাকিস্তান আফগানিস্তানে নিজের প্রভাব বজায় রাখতে এবং ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য এদের ব্যবহার করত।

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুল দখল করলে পাকিস্তান প্রকাশ্যেই উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিল। কিন্তু এ ঘটনা এখন তাদের জন্য উল্টো বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড. ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্পের মতো নিজের বানানো দানবকে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পাকিস্তান এখন বুঝতে পারছে, চাপ সৃষ্টি করে বা কূটনীতির মাধ্যমে কথা বলে—কোনোভাবেই তারা আর তালেবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

সমস্যা হচ্ছে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে তালেবানপন্থী অনেকে এখন যথার্থ ‘ইসলামপন্থী’ মনে করে না। ফলে পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপি এখন পাকিস্তানে সেই একই কাজ করতে চায়, যা একসময় তালেবান আফগানিস্তানে করেছিল। অর্থাৎ টিটিপি ক্ষমতা দখল করে দেশকে কট্টর ইসলামি শাসনের আওতায় নিয়ে আসতে চায়। আর তালেবান ও টিটিপির মধ্যে যে আদর্শগত মিল আছে, তাতে অনেকেই মনে করছেন, আফগান তালেবানও হয়তো এই কাজে টিটিপিকে সহায়তা করছে।

ফলে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন একধরনের কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে দেশের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা চাপের মুখে পাকিস্তান সরকারের কিছু অংশ এখন এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়ার কথাও ভাবছে।

এমনকি আফগানিস্তানে জঙ্গিদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ড্রোনঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। এটা একধরনের পরিহাস। যে জঙ্গিবাদ মূলত পাকিস্তানের নিজস্ব যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নীতির ফল, এখন সেই জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন ও উন্নত অস্ত্রের সাহায্য চায়। এই চিন্তা একসময় অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু এখন আর তা অসম্ভব কিছু নয়।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির যেন নিজেই তাঁর দেশের দোটানায় পড়া অবস্থার প্রতিচ্ছবি। তিনি নিজে একজন ধর্মভিত্তিক চিন্তাধারার মানুষ, যিনি আফগান সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন যেন তারা টিটিপিকে বেশি গুরুত্ব না দেয়, বরং পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের পুরোনো বন্ধুত্বের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু তিনি আবার একসময় এমন কথাও বলেছিলেন, পাকিস্তানের একজন মানুষের নিরাপত্তার জন্য দরকার হলে পুরো আফগানিস্তান ধ্বংস হয়ে যাক, তাতেও কিছু আসে–যায় না।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে এই উত্তেজনা শুধু সীমান্ত পার হওয়া জঙ্গি হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে রয়েছে জমি নিয়ে বিরোধ আর জাতীয় পরিচয় ঘিরে সংঘাত।

আফগান তালেবান যদি টিটিপিকে সমর্থন দিয়ে চলে, আর ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকে, তাহলে পাকিস্তানে এমন ভয় থেকেই যায়—আফগানিস্তান একসময় পাকিস্তানের ভূখণ্ড দাবি করে বসবে।

এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান এখনো তালেবান নেতৃত্বাধীন কাবুল সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি; বরং তারা টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চাইছে। কারণ, এই গোষ্ঠী পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও সামরিক কর্তৃত্বের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে পুরোনো ক্ষোভ, ভুল কূটনীতি আর আদর্শগত দ্বন্দ্ব। একসময় আফগানিস্তানকে পাকিস্তান কৌশলগত সম্পদ মনে করত। এখন সেটাই হয়ে উঠেছে ভয়াবহ বোঝা।

ভারতের এখন অপেক্ষা করে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। তাদের পশ্চিম সীমান্তে এই সংঘাত কীভাবে শেষ হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

* শশী থারুর ভারতের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির নির্বাচিত এমপি

- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে পুরোনো ক্ষোভ, ভুল কূটনীতি আর আদর্শগত দ্বন্দ্ব।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে পুরোনো ক্ষোভ, ভুল কূটনীতি আর আদর্শগত দ্বন্দ্ব। ফাইল ছবি

আবার ভারত–পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি হামলা

কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলার পর দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা কমছে না। গতকাল বৃহস্পতিবারও দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার খবর পাওয়া গেছে। একে অপরের বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ এনেছে ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লি। এ দিন রাতেই একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে।

দুই দেশের মধ্যে এ উত্তেজনার শুরু ২২ এপ্রিল। সে দিন পেহেলগামে হামলায় ২৬ জন নিহত হন। এর দায় পাকিস্তানের ওপর চাপিয়েছে ভারত। তবে তা নাকচ করেছে পাকিস্তান। এ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পাকিস্তান ও দেশটির নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নয়টি স্থানে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে অভিযান চালায় ভারত। ওই রাতেই দেশটির পাঁচটি যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করে পাকিস্তান।

নিজেদের যুদ্ধবিমান হারানোর কথা যদিও স্বীকার করেনি ভারত। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দুই কর্মকর্তা গতকাল রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে মঙ্গলবার রাতে ভারতের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে পাকিস্তান। সেগুলোর মধ্যে অন্তত একটি ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান ছিল।

এরই মধ্যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র আহমেদ শরিফ চৌধুরী গতকাল বলেন, করাচি, লাহোর, রাওয়ালপিন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় ভারতের ২৯ ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। ড্রোনগুলো ইসরায়েলের তৈরি। এর মধ্যে একটি ড্রোন লাহোরের কাছে একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চার সদস্য আহত হন।

অন্যদিকে বুধবার রাতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাকিস্তানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়ার দাবি করেছে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এর জবাবে গতকাল পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও রাডার লক্ষ্য করে হামলা চালায় ভারত। হামলায় লাহোরে একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।

পরে গতকাল রাতে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জম্মু অঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। রয়টার্সের এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের সময় চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে। শহরটিতে শোনা যায় সাইরেনের শব্দ। এ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে বিভিন্ন অঞ্চল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

তবে পাকিস্তানই এ হামলা চালিয়েছে বলে সন্দেহ করছে ভারতের সামরিক বাহিনী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তান থেকে জম্মু অঞ্চলের সাতওয়ারি, সাম্বা, রণবীর সিং পুরা ও আরনিয়া এলাকা লক্ষ্য করে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগে সেগুলোর সব কটি ধ্বংস করেছে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

এদিকে পাকিস্তানের হামলায় গতকাল পর্যন্ত ভারতে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এ সময় আহত হয়েছেন প্রায় ৫৯ জন। অপরদিকে মঙ্গলবার রাতে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরুর পর পাকিস্তান ও দেশটির নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরে ৩২ জন নিহত এবং ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদ।

‘আমরা যুদ্ধ চাই না’

গতকাল রাতে জম্মুতে বিস্ফোরণের ঘটনার আগে বুধবার রাতে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে নয়াদিল্লি। গতকাল এক বিবৃতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী বলেছে, এদিন রাতে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর কুপওয়ারা, বারামুলা, উরি ও আখনুর এলাকায় পাকিস্তানি সেনাচৌকি থেকে গুলি এবং কামানের গোলা বর্ষণ করা হয়।

এই উত্তেজনার মধ্যে ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে অবস্থিত পুঞ্চ জেলার বহু মানুষ তাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। সেখানকার বাসিন্দা সুফরিন আখতার বিবিসিকে বলেন, তাঁর বাড়ির সামনে এসে একটি গোলা পড়ে। এরপর তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। হামলার শিকার আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘যা গড়েছিলাম, সব ধ্বংস হয়েছে। আমরা যুদ্ধ চাই না।’

পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে গতকাল পাকিস্তানের করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদের বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করা হয়। ১০ মে পর্যন্ত ভারতের ২০টির বেশি বিমানবন্দরের কার্যক্রম গতকাল থেকে স্থগিত করা হয়েছে। এই বিমানবন্দরগুলোর বেশির ভাগই উত্তর ভারতে। এর আগে বুধবার ভারতের ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়।

এ ছাড়া পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সব হাসপাতালে গতকাল জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। আপত্কালীন পরিস্থিতির জন্য হাসপাতালগুলোর অর্ধেক বিছানা বরাদ্দ রেখেছে দেশটির সরকার। এ ছাড়া রাজধানী ইসলামাবাদের সব হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসাকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুস্তফা কামাল।

ভারত সরকারের প্রতি বিরোধীদের সমর্থন

পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান এই সংঘাতে ভারত সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন দেশটির বিরোধী দলের নেতারা। গতকাল নয়াদিল্লিতে সর্বদলীয় বৈঠকে এমন প্রতিক্রিয়া জানান তাঁরা। বৈঠক শেষে ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু তথ্য প্রকাশ করেনি সরকার। যাই হোক, বিরোধী সব দল সরকারের সঙ্গে রয়েছে।

ইন্ডিয়া টু ডে ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, ওই বৈঠকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, পাকিস্তান ও দেশটির নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিভিন্ন ‘সন্ত্রাসী শিবিরে’ হামলা চালিয়ে অন্তত ‘১০০ সন্ত্রাসীকে’ হত্যা করেছেন তাঁরা। তবে অপারেশন সিঁদুর নিয়ে বিস্তারিত বলেননি তিনি। কারণ, এই অভিযান এখনো চলমান রয়েছে।

সর্বদলীয় এই বৈঠকের দিনই গতকাল নয়াদিল্লিতে ভারত ও ইরানের এক যৌথ কমিশনের বৈঠকে অংশ নেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘নয়াদিল্লি সংঘাত বাড়াতে চায় না। তবে আমাদের ওপর যদি সামরিক হামলা হয়, তাহলে কোনো সন্দেহ নেই যে তার কঠিন জবাব দেওয়া হবে।’ আর দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রয়েছে বলে মনে করেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, কারণ, এই সংঘাতের যে পরিণতি হতে পারে এবং অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা শুধু পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, আন্তর্জাতিক সীমানাও অতিক্রম করে যাবে।

শেয়ারবাজারে অস্থিতিশীলতা

পেহেলগামে হামলার পর একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নেয় ভারত ও পাকিস্তান। ১৯৬০ সালে হওয়া সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত সরকার। এ ছাড়া পরস্পর ভিসা বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ, বন্দর ব্যবহার বন্ধসহ নানা ব্যবস্থা নেয় দুই দেশ। এরই মধ্যে হামলার কারণে উত্তেজনা যে নতুন মাত্রা নিয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে দুই দেশের শেয়ারবাজারেও।

গতকাল ভারতের শেয়ারসূচক ওঠানামা করেছে। দেশটির বাজার বন্ধের সময় প্রধান দুই সূচক সেনসেক্স ও নিফটির দর প্রায় আধা শতাংশ পতন হয়। ভারতের মুদ্রাবাজারেও চলছে অস্থিতিশীলতা। গতকাল মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দামও ১ শতাংশের বেশি কমেছে। এতে বিগত তিন বছরের মধ্যে দেশটির মুদ্রার সবচেয়ে বড় পতন হলো।

চলমান উত্তেজনার কারণে ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানের অবস্থা আরও শোচনীয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। গতকাল বড় ধরনের পতনের পর দেশটির শেয়ারবাজারে লেনদেন স্থগিত হয়ে যায়। এদিন পাকিস্তানের কেএসই-১০০ সূচকে ৬ শতাংশের বেশি পতন হয় বলে বিবিসির খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংযত থাকার আহ্বান

চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবারও বলেছেন, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত তিনি। আর শান্তি ও স্থিতিশীলতার বৃহৎ স্বার্থের কথা মাথায় রেখে পাকিস্তান ও ভারতকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চীন।

গতকাল নয়াদিল্লি সফরে গিয়ে পাকিস্তান ও ভারতকে সংযত থাকার আহ্বান জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, এই অঞ্চলে উত্তেজনা যে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা কমাতে এগিয়ে আসবে ভারত ও পাকিস্তান।’ এ দিনই নয়াদিল্লিতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-জুবেইরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন এস জয়শঙ্কর।

ভারত ও পাকিস্তান সংঘাতের প্রতি ইঙ্গিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী পাকিস্তানি তরুণী মালালা ইউসুফজাই। তিনি লেখেন, ‘ঘৃণা ও সহিংসতা আমাদের অভিন্ন শত্রু। আমরা একে অপরের শত্রু নই। উত্তেজনা কমাতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ভারত ও পাকিস্তানের নেতাদের প্রতি আমি জোর আহ্বান জানাচ্ছি।’

ভারতের ২৫টি ড্রোন ধ্বংসের দাবি করেছে পাকিস্তান। এমনই একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে দেখছেন পুলিশ সদস্যরা। এ সময় সেখানে ভিড় করেন স্থানীয় লোকজন। গতকাল করাচিতে
ভারতের ২৫টি ড্রোন ধ্বংসের দাবি করেছে পাকিস্তান। এমনই একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে দেখছেন পুলিশ সদস্যরা। এ সময় সেখানে ভিড় করেন স্থানীয় লোকজন। গতকাল করাচিতে। ছবি: এএফপি

থাইল্যান্ডে আবদুল হামিদ: সাবেক রাষ্ট্রপতির দেশত্যাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা আবদুল হামিদের দেশত্যাগ নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি গত বুধবার রাতে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এ ঘটনায় চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।

বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আবদুল হামিদ বুধবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে থাই এয়ারওয়েজের ব্যাংককগামী একটি ফ্লাইটে যাত্রা করেন।

পারিবারিক একটি সূত্রে জানা গেছে, আবদুল হামিদ চিকিৎসার জন্য বিদেশ গেছেন। তাঁর সঙ্গে গেছেন ছোট ছেলে রিয়াদ আহমেদ ও শ্যালক ডা. নওশাদ খান।

সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও গুলি করার ঘটনায় কিশোরগঞ্জ থানায় করা একটি মামলার আসামি। মামলাটি করা হয়েছিল গত ১৪ জানুয়ারি। তাতে শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদসহ মোট ১২৪ জনকে আসামি করা হয়।

এ রকম একটি মামলার আসামি হয়েও সাবেক এই রাষ্ট্রপতি কীভাবে বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে গেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনা নিয়ে সরকার ও সরকারের বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিবিষয়ক মতবিনিময় সভায় যোগ দিতে দিনাজপুরে গিয়েছিলেন সরকারের স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। আবদুল হামিদের দেশত্যাগে সহায়তাকারীদের পদত্যাগ ও শাস্তির দাবিতে শতাধিক শিক্ষার্থী সেখানে উপদেষ্টার পথরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সেখানে বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেশত্যাগে সহায়তাকারীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, ‘তাঁদের (আবদুল হামিদকে বিদেশে যেতে সহায়তাকারীদের) কোনো অবস্থায় ছাড় দেওয়া যাবে না। আর যদি শাস্তির আওতায় না আনি, তাহলে আমি সে সময় চলে যাব।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই ঘোষণার পর গতকাল রাত আটটার দিকে আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইমিগ্রেশন পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের কথা গণমাধ্যমকে জানানো হয়। একই সঙ্গে আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জের সদর থানার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) একজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথাও বলা হয়।

এরপর রাত ৯টার দিকে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় অতিরিক্ত আইজিকে (প্রশাসন) প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই ঘটনায় কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারকে (এসপি) প্রত্যাহার করা হয়েছে।

দেশত্যাগের ঘটনার নেপথ্যে কী

আবদুল হামিদের দেশত্যাগের নেপথ্যের ঘটনা সম্পর্কে জানতে বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা এবং সরকারের এ-সংক্রান্ত তদারকির দায়িত্বে থাকা অন্তত ১২ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের কেউই নাম প্রকাশ করে এ ঘটনা সম্পর্কে কথা বলতে চাননি। তবে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া গেছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানায়, আবদুল হামিদ বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট ব্যবহার করে ফ্লাইটে উঠেছেন। ভিআইপি গেট ব্যবহার করার বিষয়টি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিভিল এভিয়েশন) অগোচরে হওয়ার সুযোগ নেই। ভিআইপি গেট ও লাউঞ্জ ব্যবহারকারীদের ওপর বিমানবন্দরে কর্তব্যরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বাড়তি নজরদারি থাকে। কোনো একটি সংস্থার আপত্তি থাকলেও ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে বাধাহীনভাবে কারও দেশত্যাগের সুযোগ থাকে না।

ইমিগ্রেশন পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আবদুল হামিদের দেশত্যাগে আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও তাঁর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে কোনো চিঠি দেননি। কোনো গোয়েন্দা সংস্থারও আপত্তি ছিল না। এ কারণে আবদুল হামিদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা হয়েছে।

তবে ইমিগ্রেশন পুলিশের এমন বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এ ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য হলো, আদালতের নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বিভিন্ন সংস্থার আপত্তির কারণে অনেকের বিদেশযাত্রা আটকে দেওয়া হয়। কোনো একটি সংস্থা আপত্তি করলেই কারও বাধাহীনভাবে দেশত্যাগের সুযোগ থাকে না। হত্যা মামলার আসামি হওয়ার পরও আবদুল হামিদের নাম কোনো সংস্থার তালিকায় কেন ছিল না, তা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

পাশাপাশি এই আলোচনাও রয়েছে যে ইমিগ্রেশন হচ্ছে বিদেশযাত্রার অনুমতির শেষ ধাপ। কিন্তু বিমানবন্দরে আসার আগপর্যন্ত এ রকম একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির গতিবিধি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার জানার কথা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভিভিআইপি, ভিআইপি বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি দেশ ছাড়লে তাঁর বিষয়ে বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে কর্মরত ব্যক্তিরা তাঁদের ঊর্ধ্বতনদের জানিয়ে থাকেন।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আবদুল হামিদের দেশত্যাগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন না।

আবদুল হামিদ ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এরপর তিনি ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। বঙ্গভবন ছাড়ার পর আবদুল হামিদ রাজধানীর নিকুঞ্জে তাঁর বাসায় উঠেছিলেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ফাইল ছবি