Showing posts with label গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক. Show all posts
Showing posts with label গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক. Show all posts

Thursday, May 20, 2021

চাকুরী থেকে ছাঁটাই ও বরখাস্ত: কি বলা আছে শ্রম আইনে? by শাহনাজ পারভীন

বাংলাদেশে পোশাক খাতে গত দুই মাসে অন্তত সাড়ে সাত হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে দাবি করছে ট্রেড ইউনিয়নগুলো।
বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে চাকুরী হারানো কোন ব্যাপারই নয়, এমন একটি অভিযোগ রয়েছে।
বলা হয় সামান্য একটু দোষে অথবা মালিকের পছন্দ অপছন্দের কারণে আপনার জীবিকা নাই হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী হিসেবেও নানা কারণে আপনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন।
জেনে নিন শ্রমিক ও কর্মীদের চাকুরিচ্যুত করা প্রসঙ্গে কি বলা আছে বাংলাদেশের আইনে, বাস্তবতা কি আর বিচারে কোথায় যাবেন।
বরখাস্ত, ছাঁটাই, চাকুরীর অবসান
শ্রম আদালতের বার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট একেএম নাসিম বলছিলেন পৃথিবীর সব দেশেই ছাঁটাই, বরখাস্ত, চাকুরিচ্যুতি সম্পর্কে নানা ধরনের নিয়ম আছে। বাংলাদেশে এই সবগুলোর আলাদা ব্যাখ্যা আছে।
বাংলাদেশে শ্রম আইন ২০০৬-এর চ্যাপ্টার দুইতে এ সম্পর্কিত পদক্ষেপ নিয়ে আলাদা আলাদা নিয়মের উল্লেখ রয়েছে। এর সবগুলোর মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম তফাৎ।
অ্যাডভোকেট নাসিম বলছেন, "চাকুরী হারানোর সবচাইতে বড় শাস্তি ধরা হয় বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টিকে। কোন শ্রমিক যদি কোন ধরনের অন্যায়, অপরাধ, অসদাচরণ করে তাহলে এটা করা হয়ে থাকে। সে অন্যায় নানা রকম হতে পারে।"
"আরেকটি হল টার্মিনেশান বা চাকুরীর অবসান। সেটি হল কোনও মালিকের আপনাকে পছন্দ হচ্ছে না কিন্তু সে আপনাকে বরখাস্ত করার কোন কারণ দিতে পারছে না। সেটিকে বলা হয় টার্মিনেশান।"
ছাঁটাই সম্পর্কে অ্যাডভোকেট নাসিম ব্যাখ্যা করে বলছিলেন, "ছাঁটাই হল যেমন ধরুন কোন মালিকের একশ জন শ্রমিক আছে। তিনি যদি মনে করছেন তার একশ জন শ্রমিকের মধ্যে দশজনকে দরকার নেই। অথবা তিনি তাদের বেতন দিয়ে কর্মী হিসেবে রাখার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। তাহলে তিনি সবচাইতে পরের দিকে নিয়োগ দেয়া দশজন কর্মীকে ছাঁটাই করতে পারেন। এটিকে বলে রিডানডেনসি"
প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সুরক্ষা কম?
অ্যাডভোকেট নাসিম বলছেন শ্রমিক কারা হবেন আর কর্মী কারা হবেন তারও ব্যাখ্যা দেয়া আছে।
কাজের ধরনের উপর নির্ভর করে শ্রমিক ও কর্মী নির্ধারিত হয়।
কর্মীরা সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক খাতে অফিস আদালতে কাজ করেন বলে মনে করা হয়।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যালয়েও শ্রমিক থাকতে পারেন। শ্রম আইন শুধু শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই কাজে আসবে।
তিনি বলছেন, চাকুরী হারানোর ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের যারা কর্মী তাদের সুরক্ষা সবচাইতে কম।
চাকুরীতে নিয়োগের সময় চাকুরী-দাতার সাথে চুক্তিতে কতটা দর-কষাকষি আপনি করতে পেরেছেন তার উপর নির্ভর করবে চাকুরী চলে গেলে আপনি কতটা সুবিধা পাবেন বা চাকুরী যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন গুলো কি হবে।
সাধারণত এসব ক্ষেত্রে নানা অফিসে নিয়ম আলাদা।
শ্রম আইনে চাকুরিচ্যুতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নিয়ম করা আছে।
মি. মোল্লা বলছেন, বাংলাদেশে এমন কর্মীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন আইন করা হয়নি।
তাদের সুরক্ষাও কম। সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কিছু নিয়ম আছে।
তবে বিশ্বব্যাপী একটি নিয়ম হল এক মাসের নোটিশ দিতে। সেটি মানেন প্রায় সবাই।
বরখাস্ত, ছাঁটাই, চাকুরীর অবসানের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী কি ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবেন সেটিও নির্ভর করে চাকুরী-দাতার সাথে চুক্তির উপর।
এই ব্যাপারেও বাংলাদেশে নির্দিষ্ট কোন আইন নেই।
চাকুরী হারানো শ্রমিকে যেসব সুবিধা প্রাপ্য
আইনে শ্রমিকদের জন্যেও বলা রয়েছে অনেক কিছু। ছাঁটাই হলে শ্রমিককে এক মাস আগে জানাতে হবে।
ঐ প্রতিষ্ঠানে প্রতি এক বছর চাকুরীর জন্য এক মাসের বেসিক বেতন পাবেন শ্রমিক।
যেমন দশ বছর চাকুরী করলে সে দশ মাসের বেসিক বেতন পাবে। ক্ষেত্র বিশেষে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক ক্ষতিপূরণও পেতে পারেন।
তবে বরখাস্ত হওয়া শ্রমিক কোন ধরনের বেতন ভাতা ছাড়াই চাকুরী হারাবেন।
কিন্তু তাকে বরখাস্তের আগে কারণ দর্শাও নোটিস করতে হবে, অন্যায়ের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, তদন্তে শুধু মালিকের পছন্দের ব্যক্তি নয় শ্রমিক পক্ষের ব্যক্তিও থাকতে হবে।
সেই সাথে শ্রমিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এরপর যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয় তবেই তাকে বরখাস্ত করা যাবে।
চাকুরীর অবসান বা টার্মিনেশান হলে শ্রমিককে অন্তত চার মাস আগে জানাতে হবে।
অথবা মালিক কোন নোটিশ ছাড়াই যদি তাকে চলে যেতে বলেন তাহলে তাকে চারমাসের বেতন দিতে হবে।
বাস্তবতা কেমন?
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের পরামর্শক আবু ইউসুফ মোল্লা বলছেন, "যেমন পোশাক খাতে বরখাস্ত না করে ছাঁটাই করা হয় বেশি। টার্মিনেশান ক্লজটাও তারা ব্যবহার করেন। তবে ছাঁটাই করার প্রবণতাই বেশি। এতে কম বেনিফিট দিতে হয়। আবার শ্রমিক এটিকে আইনত কোন চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। আর এসব তারা আইনজীবীদের পরামর্শেই করে থাকেন।"
তিনি বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্রের বালাই নেই সেখানে মৌখিক কথাতেই চাকুরিচ্যুতি হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সকল প্রতিষ্ঠানই আইনি বিষয়ে পরামর্শক নিয়োগ করে থাকে।
মি. মোল্লা বলছেন, "পোশাক খাতে আজকাল তারা বরখাস্ত করার দরকার পরলে তদন্ত করে। আগের মতো এক পাক্ষিক তদন্তও হয়না। কমপ্লায়ান্সের কারণে তাদের এটা করতে হয়।"
অন্যায় হলে কোথায় যাবেন?
বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে সাতটি শ্রম আদালত রয়েছে।
আপনি যদি মনে করেন আপনার সাথে অন্যায় হয়েছে তাহলে সেখানে আপনি মামলা করতে পারেন।
তবে বাংলাদেশে এই আদালতগুলোতে অভিযোগ মীমাংসা হতে এতটাই সময় লাগে এবং যে পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে হয় তাতে শ্রমিক পর্যায়ের একজন ব্যক্তি সেখানে যাননা।
অথবা তারা এমন আদালত বিষয়ে কিছু জানেনই না। তবে শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য সরকারি একটি সেল রয়েছে।
কিন্তু তার কার্যক্রম বাস্তবে খুবই সীমিত।
আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মী পর্যায়ে যারা আছেন তাদের জন্য বিচার পাওয়ার সুযোগ বাংলাদেশে সীমিত।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রচুর শ্রমিক ছাঁটাই করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।

Sunday, May 9, 2021

নারী পোশাক শ্রমিকদের যৌন হয়রানি: বাংলাদেশের পোশাক কোম্পানিগুলো কি দায়িত্বপালন করছে? by শাহনাজ পারভীন

অনেক শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করেন না
পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে বিশ্বের নামকরা পোশাক কোম্পানিগুলোর অবস্থান কী? - এমন প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
একটি বিশেষ নিবন্ধে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক সংস্থাটি ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া এবং বাংলাদেশসহ পোশাক খাতে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর শ্রমিকদের পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।
বিশ্বব্যাপী পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানির মাত্রা গুরুতর বলে উল্লেখ করছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
এই প্রতিবেদনে রয়েছে কিভাবে ভারত বা পাকিস্তানে নারী শ্রমিকেরা যৌননিগ্রহের শিকার হয়েও ভয়ে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
কম্বোডিয়ার উদাহরণ দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, দেশটিতে শুধু কারখানাতেই নয়, কর্মকর্তারা কারখানার বাইরেও নারী শ্রমিকদের হয়রানি করে থাকেন।
মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, কর্মকর্তারা নারী শ্রমিকদের পার্টিতে যেতে আমন্ত্রণ জানান, আর তারা না গেলে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
এসব দেশে নারী শ্রমিকেরা কোন ভয়ভীতি ছাড়া কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ নিয়ে যাবেন এমন পরিবেশ নেই বলে সংস্থাটি মনে করছে।
এরকম বেশ কিছু উদাহরণও তুলে ধরেছে সংস্থাটি তাদের নিবন্ধে।
বাংলাদেশের অবস্থা কী?
বাংলাদেশে পোশাক কারখানার ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নি-নিরাপত্তা এবং বেতন ভাতা - এসব নিয়ে বেশ আলাপ-আলোচনা হয়। কাজের পরিবেশ নিয়ে নানা ধরনের শর্তও মানতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো তৈরি পোশাকের উৎস দেশগুলোতে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানির বিষয়টি 'কমপ্লায়ান্স'-এর অংশ হিসেবে কি আরও গুরুত্ব পেতে পারে?
অন্যদিকে, বিশ্বের নামীদামী পোশাক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের মতো দেশের উপর অনেক অনেক শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু নিজেরা তাদের দায়িত্বটুকু কতটা পালন করছেন?
ঢাকার আশেপাশের কয়েকটি কারখানার কয়েকজন পোশাক শ্রমিকের সাথে কথা বলেছিলাম বিষয়টি বুঝতে। তারা খোলামেলা কথা বলেছেন, তবে স্বভাবতই কেউ-ই নাম প্রকাশ করতে চাননি।
কয়েকজন শ্রমিকের অভিজ্ঞতা
তাদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের বক্তব্যে বেশ অনেকটাই মিল পাওয়া গেলো - অর্থাৎ অভিযোগগুলো মোটামুটি একই ধরণের।
ঢাকার উত্তরা এলাকার একটি কারখানায় কাজ করতেন এমন একজন শ্রমিক বলেছেন, "আমাকে ম্যানেজমেন্টের একজন কু-প্রস্তাব দিছিলো। তার সাথে হোটেলে রাত্রে যাইতে হবে। আমারে বলছে যদি না যাও, তাইলে তোমার চাকরী থাকবে না। আমি নালিশ করছিলাম। আমারেই তারা ফ্যাক্টরি থেকে বের কইরা দিছে।"
এই নারী শ্রমিকেরা যে অভিযোগগুলো করেছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিবন্ধে একই ধরনের বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্য কোন সংস্থা, যেমন কোন কর্পোরেট অফিসে নারীকর্মীদের সাথে এমন শব্দ ব্যবহার বা আচরণ করার সাহস কেউ করবেন কি-না।
পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকেরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মূলত দরিদ্র পরিবারগুলো থেকে আসেন। কাজ চলে গেলে মারাত্মক বিপদে পড়তে হয় - এবং একই সাথে শ্রমকাঠামোতে এসব নারীদের অবস্থানগত কারণেই এমন আচরণ করা হয় বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করছেন।
কী ধরনের যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে?
কারখানার মাঝারি পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই যৌন হয়রানি করার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। তবে নারী শ্রমিকেরা পুরুষ শ্রমিকদের দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মৌখিক নোংরা কথাবার্তার অভিযোগ আসে হরহামেশাই।
কয়েকটি এনজিও'র তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম 'সজাগ কোয়ালিশন' গেল বছর একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো।
চারটি এলাকার আটটি কারখানার শ্রমিকের ওপর করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২২ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন যে তারা কখনো-না-কখনো যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
কমবেশী ৮৩ শতাংশ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করেন না।
যৌন হয়রানি হিসেবে কারখানায় প্রবেশের সময় নিরাপত্তা কর্মীদের অস্বস্তিকরভাবে দেহ তল্লাশি, পুরুষ সহকর্মীর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা যৌন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা, সম্পর্ক তৈরি না করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন - এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
শ্রমিকদের ৬৮ শতাংশ জানান, কর্মক্ষেত্রে তেমন কার্যকর কোন যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নেই।
এই গবেষণাটির প্রধান ছিলেন মাহিন সুলতান। তিনি বলছেন, "আমরা বলতে চাচ্ছি, একটা ফ্যাক্টরিতে কমপ্লেন আসলে তা যদি সুষ্ঠুভাবে ডিল করা হয়, তা কিন্তু ফ্যাক্টরির জন্য একটা ক্রেডিট, যে সেখানে শ্রমিকরা সাহস করে কমপ্লেন করার পরিবেশ পাচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "প্রশাসনের তদন্তের ভিত্তিতে যদি একটা অ্যাকশন নেয়া হয়, তাহলে সবাই বুঝবে যে এই ফ্যাক্টরিতে যে কাঠামো থাকা উচিৎ, যেভাবে কাজ করা উচিৎ, সেটা কাজ করছে।"
শ্রমিকদের নেতৃবৃন্দ কী ভুমিকা রাখে?
বাংলাদেশে ৪০ লক্ষের বেশি পোশাক শ্রমিক রয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী।
তাই তাদের প্রতি আচরণ কতটা সম্মানজনকে হওয়া উচিত, বা একজন শ্রমিক কতটা নিরাপদ বোধ করবেন - এসব কিছুই কি কাজের পরিবেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত?
শ্রমিক নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এটি নিশ্চিত করা গেলে তাদের কাজের দক্ষতা আরও বাড়বে।
পোশাক খাতের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর একটি প্ল্যাটফর্ম, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কার্যকরী সভাপতি কাজী রুহুল আমিন জানান, "আমাদের কাছে বিভিন্ন সময় নারী শ্রমিক বোনেরা আসে। কারখানায় নানাভাবে এটা ঘটে। ম্যানেজমেন্ট থেকে যেমন ঘটে তেমনি পুরুষ শ্রমিকদের দ্বারাও ঘটে।"
তিনটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা ব্যাপারটা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র - এদের কাছে সাধারণত রেফার করি।"
কিন্তু শ্রমিকদের সংগঠনগুলো যে কতটা সরাসরি শ্রমিকদের সহায়তা করে সেটি বোঝা মুশকিল, কেননা তারা হয়রানির ঘটনাগুলোর সমন্বিত কোন হিসেব রাখে না।
মি. আমিন বলছেন, "বায়াররা এমন কোন ঘটনা পেলেই সেটাকে ইস্যু করে বারগেইনিং শুরু করে দেয়। তারা অনেক বেশি লাভ করে কিন্তু কাপড়ের জন্য সেই পরিমাণ মূল্য আমাদের দেয় না।"
মালিকদের পক্ষ অবশ্য নিজেদের লাভ ছাড়া শ্রমিকের ভালোমন্দ নিয়ে কতটা ভাবেন, এমন প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই উঠছে।
মালিকরা কি বলছেন?
এনিয়ে কথা বলেছিলাম পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সাথে। তিনি বলেন, বিজিএমইএর অবস্থান এই ব্যাপারে একদম জিরো টলারেন্স।
"শুধু গুটিকয়েক ফ্যাক্টরির জন্য আমাদের পুরো সেক্টরের বদনাম হবে এবং যার কারণে আমাদের বিজনেসে একটা নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট হবে, এটা বিজিএমইএ'র চেয়ারে বসে আমরা একেবারেই দেখতে চাই না।"
তিনি আরও বলেন, "আমরাও মেম্বারশীপের ক্ষেত্রে খুব চুজি হয়ে গেছি। রানা প্লাজার পরে আমরা শুধু সেফটি ইস্যুই দেখি না, আমরা সোশাল ইস্যুও দেখি।"
তিনি বলেন, ফ্যাক্টরিগুলোতে বিদেশি ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো শ্রমিকদের বেছে নিয়ে যায় কথা বলার জন্য। সেখানে ম্যানেজমেন্টের কেউ থাকে না। তারা নির্ভয়ে সেখানে সব বলতে পারে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, শ্রমিকদের উচিত মুখ খোলা।
কিন্তু যে পোশাক শ্রমিক চাকুরী চলে যাওয়ার ভয়ে মুখ খুলতে পারে না, তার জন্য ন্যায়বিচার কিভাবে নিশ্চিত হবে? কিংবা সেজন্য একটি সঠিক ব্যবস্থা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়?
এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে একটা মেকানিজম আছে। তবে সেটাকে আরও হেলদি করতে হবে।"
"যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তিনি যদি সামনে এগিয়ে না আসেন, তাহলে তো সমস্যার সমাধান হবে না। আর চাকরীর কথা বলছেন? দক্ষ শ্রমিকের চাকরীর কোন সমস্যা নাই," বলছেন মাহমুদ হাসান খান।

Monday, December 23, 2019

ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা by পিয়াস সরকার

দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন তীব্র যন্ত্রণা। প্রতিটা মুহূর্ত কাটে এক অজানা আতঙ্কে। চোখের পাতা এক হলেই যেন ধেয়ে আসে মরণ যন্ত্রণা। চোখের সামনে ভেসে আসে দুঃসহ সেই স্মৃতি। নিলুফা বেগমের জীবনটাই যেন এক নরক। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একাই বললেন তিনি। বলেন, ভোররাতে ঘুম আসলেও খানিক বাদেই তা ভেঙ্গে যায়। পায়ে অসহ্য ব্যথা বয়ে বেরাচ্ছেন ৬ বছর ধরে।
সাভারের রানা প্লাজা তার জীবনকে তছনছ করে দিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, জীবন্মৃত হয়ে বেঁছে আছেন তিনি। তাইতো তিনি বলেন, এভাবে বেঁছে থেকে কি লাভ? তার চেয়ে দেয়াল চাপায় মারা গেলে এ যন্ত্রণা সইতে হতোনা।
নিলুফা চাকরি করতেন রানা প্লাজায়। ভবনের অষ্টম তলায় প্যান্টন অ্যাপারলেস কারখানায়। ছিলেন সুইং অপারেটর। ২০১৩ সালের ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় তার পায়ের উপর পড়েছিলো বিম। আটকা পড়েছিলেন প্রায় ৯ ঘণ্টা। সেই বিমের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয় তার ডান পা। এরপর থেকে বিছানাই তার সঙ্গি। নিলুফার বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। স্বামীর নাম শাহিদুল ইসলাম। পেশায় চা দোকানদার। তারা থাকেন সাভারের আমতলা বস্তিতে। তিন সন্তানের জননি তিনি। বড় ছেলে পড়েন নবম শ্রেণিতে। মোজো মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে। আর ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। এই দুই মেয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন মায়ের।
সকাল ৮টায় দুই মেয়ে সকালের রান্না সেরে চলে যায় স্কুলে। আর তাদের বাবা সকাল ১০টায় বেরিয়ে যান দোকানের উদ্দেশ্যে। তিন ছেলে মেয়ে ও স্বামী বাইরে চলে যাবার পর একাই অবস্থান করেন বাড়িতে। দুপুর নাগাদ ছেলে মেয়েরা ফেরে বাড়িতে। বাড়িতে এসে দুই মেয়েকেই করতে হয় বাড়ির কাজ। দুপুরের রান্না। দুপুরে বাবা খেতে আসেন। এরপর ছেলেকে নিয়ে যান দোকানে কাজে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে।
পায়ে ব্যাথা নিয়েই কেটে যাচ্ছিল নিলুফার জীবন। তবে ইদানিং ঘটছে নতুন বিপত্তি। পায়ে নতুন করে ধরেছে পচন। ডাক্তার দেখিয়েছেন। বলেছেন অস্ত্রোপচার করে পা কেটে ফেলতে। তবে পারছেন না টাকার অভাবে।
রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এই টাকার অধিকাংশ চলে যায় তার চিকিৎসার পিছনে। এই টাকা থেকে তার স্বামী দিয়েছেন একটি চায়ের দোকান। সেখানে খরচ হয়ে যায় প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এখন প্রতিদিন ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকার ওষুধ প্রয়োজন হয়। যা মাস শেষে দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার টাকায়। এই টাকার যোগান দেবার পর পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটির।
ইয়াসমিন সুলতানা। বাড়ি রংপুর পীরগঞ্জ উপজেলার দোহাটা গ্রামে। কয়েকটি পোশাক কারখানায় চাকরি করে শেষে যোগ দেন রানা প্লাজার একটি পোশাক কারখানায়। ধীরে ধীরে মিলছিলো তার অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তুতার জীবনে নেমে আসে অশুভ ছায়া। পড়ে যান রানা প্লাজা ধ্বসের মাঝে। হাতে ও পায়ে আঘাত পান। চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিলো প্রায় প্রায় বছর খানেক।
এরপর থেকেই ভাইয়ের বাসায়। সেখানে অসহায় হয়ে পড়ে আছেন। সহযোগিতা পেয়েছেন প্রায় লাখ দুয়েক টাকার মতো। তা পুরোটাই ব্যয় হয় চিকিৎসার পেছনে। এখন চলাফেরা সীমিত তার। তারপর করেন হাতের কাজ। এই দিয়ে ভাইয়ের সংসারে যদি একটু হেল্প করা যায়?
রানা প্লাজায় নির্মম দুর্ঘটনায় বাম হাত হারিয়েছেন লাবনি খানম। তিনি এখন থাকেন খুলনায় দৌলতপুরে। রানা প্লাজার পাঁচ তলায় ফ্যান্টম গার্মেন্টের চিকিৎসা কেন্দ্রের নার্স ছিলেন তিনি। সেদিনের দুর্ঘটনার কথা মানুষকে বলতে বলতে কিছুটা বিরক্ত। তারপরেও বলেন, দুর্ঘটনার আগের দিন ২৩শে এপ্রিল রানা প্লাজায় ফাটল ধরেছিলো। আমরা কাজে যাবো কি যাবো না এই নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম। রান্না প্লাজায় গেলেও আমরা সেদিন অফিসে যাই নাই। কিন্তু পরদিন বেতন যাতে না কাটে সেই ভয়ে ছিলেন তারা। এরপর পরদিন সকালে অফিসে প্রবেশের ১০ মিনিটের মাথায় ধ্বসে পড়ে ভবনটি। তার হাতের উপর ছিলো একটি বিম। হাত কেটেই তাকে বের করা হয় সেখান থেকে। এখন তিনি ঢাকা ছেড়ে এলাকাতে থাকেন।
নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জের নীলুয়া পাড়া গ্রামে থাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া শিশু সবুজ। মাকে হারিয়ে দাদা বাড়িতে হয়েছে আশ্রয়। তার মা কাজ করতেন রানা প্লাজায় আর বাবা চালাতেন রিকশা। সেদিনের ঘটনায় মাকে হারিয়ে ফেলে সবুজ ইসলাম।  তার মায়ের স্মৃতি বলতে শুধুই এক টুকরা ছবি। যে ছবিতেও দাগ পড়েছে। ভালো করে বোঝা যায় না মুখটা। তখন তারা থাকতেন সাভারে। বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র সন্তান সবুজ। মারা যাবার আগের দিন তাকে ভাত খাইয়ে গিয়েছিলো মা। ঘটনার পর থেকে তার মা নিখোঁজ। দেখতে পারেননি মায়ের লাশটাও।
এভাবেই দুঃখের সাগরে বাবার সঙ্গে মায়ের লাশ খুজতে কেটে যায় মাস ছয়েক। এরপর ফের বিয়ে করেন বাবা। আর সবুজকে রাখা হয় তার দাদা বাড়িতে। দাদা বাড়িতে বাবা মা ছাড়া সবুজের দিন কাটে বিষণ্নতায়। সবুজ মাঝে মধ্যেই রাতের বেলা আম্মা আম্মা বলে চিৎকার করে উঠে।

Thursday, November 7, 2019

আসছে রোবট প্রযুক্তি: বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কি টিকে থাকতে পারবে? by মোয়াজ্জেম হোসেন

রোবট দখলে নিচ্ছে শ্রমিকদের জায়গা
উজ্জ্বল আলোর নীচে লাইন ধরে বসানো সারি সারি সেলাই মেশিন। কাজ করছেন শত শত নারী শ্রমিক। বাংলাদেশের যে কোন গার্মেন্টস কারখানার চিরচেনা দৃশ্য।
এখনো হয়তো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ বা চট্টগ্রামের বড় বড় কারখানায় এমন দৃশ্য দেখা যাবে।
কিন্তু দশ বছর পরের দৃশ্য কল্পনা করা যাক। কেমন হবে তখন বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানা?
নিউইয়র্কের শিমি টেকনোলজি নামের একটি প্রযুক্তি কোম্পানীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সারাহ ক্রেসলির কাছে ভবিষ্যতের ছবিটা পরিস্কার।
"দশ বছর পরের পোশাক কারখানায় খুব অল্প শ্রমিকই আসলে কাজ করবে। রোবটিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি তখনো আমরা হয়তো কিছু কর্মীকে কাজ করতে দেখবো। কারখানা জুড়ে তখন বেশি থাকবে নানা ধরণের স্বয়ংক্রিয় রোবটিক যন্ত্রপাতি। থাকবে অনেক কম্পিউটার। কারখানার বড় অংশ জুড়ে থাকবে ডিজাইন রুম। বেশিরভাগ কর্মী কাজ করবে এই ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে।"
সারাহ ক্রেসলি এর আগে কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল বা গাড়ি নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে। যেভাবে অটোমেশন গাড়ি নির্মাণ শিল্পকে পাল্টে দিয়েছে, এবার পোশাক শিল্পে তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে বলে মনে করেন তিনি।
যে শিল্পে বাংলাদেশে কাজ করে প্রায় চল্লিশ লাখ মানুষ, গত কয়েক দশক ধরে যে খাতে তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বেশি কাজ, তার অবস্থা তাহলে কী দাঁড়াবে?
"এদের ৬০ হতে ৮৮ শতাংশ তাদের কাজ হারাবে অটোমেশনের কারণে। অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হবে। এটা আমার হিসেব নয়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসেব", জানালেন সারাহ ক্রেসলি।
তার মতে, বাংলাদেশের সামনে বিপদ অনেক রকমের।
প্রথমটা হচ্ছে এই অটোমেশন, যেটা ইতোমধ্যে ঘটতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বদলে যাওয়া ফ্যাশন ট্রেন্ড, যেটা বিরাট প্রভাব ফেলছে পোশাকের ব্রান্ডগুলোর ওপর। আর সবশেষে আছে অটোমেশনের চূড়ান্ত ধাপে পোশাক শিল্পের 'রিশোরিং' বা 'নিয়ারশোরিং।' অর্থাৎ যেখান থেকে এই পোশাক শিল্প বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এসেছে, এই শিল্পের সেখানেই ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি।

ভবিষ্যৎ কী

যে দেশের অর্থনীতির প্রধান ইঞ্জিন হয়ে উঠেছে এই পোশাক শিল্প,তার ভবিষ্যৎ তাহলে কী? ব্যাপারটা নিয়ে কি আসলেই নড়ে-চড়ে বসার সময় এসেছে?
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তাদের একজন ফজলুল হক। বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি। পোশাক শিল্প খাতে অটোমেশনের যে ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে তিনি বিপদ হিসেবে দেখতে রাজী নন। তবে অটোমেশন যে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে, সেটা স্বীকার করলেন তিনি।
"একটা মাঝারি আকারের কারখানার কাটিং সেকশনে দেড়শো-দুশো লোক লাগতো। সেখানে এখন অটোমেটিক কাটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে শ্রমিক লাগে দশ থেকে বারো জন। অর্থাৎ দশ ভাগের এক ভাগ লোক লাগে। এরকম অটোমেশন কিন্তু চলছেই। আগামী দশ বছরে এই শিল্পে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।"
তবে ফজলুল হক বলছেন, বাংলাদেশে অটোমেশনের কারণে যত লোক কাজ হারাচ্ছেন, তাদের আবার এই শিল্পেই কোন না কোনভাবে কর্মসংস্থান হয়ে যাচ্ছে। কারণ বাংলাদেশে এখনো এই শিল্পের আকার বাড়ছে।
এর সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করলেন গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার। ট্রেড ইউনিয়ন করতে প্রতিদিন নানা ধরণের কারখানায় তার যাতায়াত। অটোমেশন যে শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে, সেটা তিনি নিজ চোখেই দেখতে পান প্রতিদিন।

রোবট আসছে!

"বাংলাদেশে এখন যত বড় ফ্যাক্টরি আছে, বিশেষ করে এ এবং বি ক্যাটাগরির যত ফ্যাক্টরি, সেখানে অনেক নতুন মেশিন আনা হয়েছে। এসব মেশিনে এমন বহু কাজ হচ্ছে, যেগুলো আগে শ্রমিকদের করতে হতো।"
"সূতা কাটা, আয়রন করা, কাটিং, ড্রয়িং, লে-আউট, লোডিং-আনলোডিং - কোন কাজই এখন মেশিন করছে না। বিভিন্ন ধরণের মেশিন চলে আসছে, যেখানে আর আগের মতো শ্রমিকের দরকার হচ্ছে না," বলছেন তিনি।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে এই পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে তিন-চার বছর আগে থেকে। এই খাতের একজন শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা ফজলুল হক জানালেন, তিনি নিজের কারখানাতেও এরকম প্রযুক্তি চালু করেছেন।
"কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের প্রতিটি কারখানায় বেশিরভাগ মেশিনে দুজন করে লোক লাগতো। একজন মেশিনটি চালাতেন, আরেকজন উল্টোদিকে বসে সাহায্য করতেন। গত তিন চার বছরে পর্যায়ক্রমে হেল্পারের পদ খালি হয়ে গেছে। মেশিন ঐ জায়গা দখল করে নিয়েছে।"
একটি মাঝারি মাপের কারখানার কাটিং বিভাগে আগে প্রায় দেড়শো-দুশো কর্মীর দরকার হতো। সেখানে এখন অটোমেটিক কাটার মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে যেখানে মাত্র দশ-বারোজন লোক দিয়েই কাজ চালানো যায়। অর্থাৎ দশ ভাগের একভাগ লোক দিয়েই এখন কাজ চালানো যায়।
ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি কারখানাই এখন কম-বেশি এরকম অটোমেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে কী ধরণের মেশিন বা যন্ত্রপাতি আমদানি করা হচ্ছে, তা নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে ঢাকার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ। প্রতিষ্ঠানটির ফেলো অর্থনীতিবিদ ড: মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, একটা পরিবর্তন যে শুরু হয়েছে, সেটা স্পষ্ট।
"আগে যে ধরণের মেশিন আমদানি করা হতো, তার চেয়ে অনেক ভিন্ন ধরণের মেশিন এখন আনা হচ্ছে। অনেকে রোবটও আনছেন। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়বে।"
ডঃ রহমানের মতে, এর একটা কারণ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসলে তখন আর বিনা শুল্কের সুবিধা আর পাবে না। তখন তাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। তখন কারখানা মালিকরা প্রযুক্তির দিকেই ঝুঁকবেন।

কমছে নারী শ্রমিক

গার্মেন্টস নেত্রী নাজমা আক্তার বলছেন, মালিকরা নতুন প্রযুক্তির ব্যাপারে এত আগ্রহী হওয়ার কারণ, এটি তাদের আরও বেশি মুনাফার সুযোগ করে দিচ্ছে।
"গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, তারা বলে চারটা লোক যে কাজ করে, একটা মেশিনেই এখন সেই কাজ হয়। একজন শ্রমিককে ন্যূনতম আট হাজার টাকা মজুরি দিতে হয়। চারজন শ্রমিকের পেছনে যায় প্রায় ৩২ হাজার টাকা। কিন্তু এখন নাকি আট হাজার টাকাতেই একটি মেশিন পাওয়া যায়। কাজেই মালিকরা সেই পথেই যাচ্ছেন।"
নাজমা আক্তারের মতে, অটোমেশনের প্রথম শিকার হচ্ছেন কারখানার নারী শ্রমিকরা।
"অনেক কারখানাতেই যেখানে এক হাজার শ্রমিক ছিল। এখন সেখানে হয়তো বড়জোর তিনশো শ্রমিক আছে। বেশিরভাগ জায়গায় নারী শ্রমিকরাই কাজ হারাচ্ছেন।"
গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে পোশাক শিল্পে। এখন সেটি স্তিমিত হয়ে আসছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ছাঁটাই শুরু হয়েছে বলে দেখেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ড: মুস্তাফিজুর রহমান।
"এর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা নারী কর্মীদের ওপরই পড়ছে। প্রথাগতভাবে এই শিল্পে নারী কর্মীরাই বেশি কাজ করেন। একসময় পোশাক শিল্পে আশি বা নব্বু্ই শতাংশই ছিলেন মহিলা কর্মী। এখন সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে সেটা কমে ষাট শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। এটা আরও কমবে। কারণ অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন মহিলার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না। সেজন্যে নতুন মেশিনে কাজ করার জন্য ছেলেদেরই অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।"

অফশোরিং বনাম নিয়ার শোরিং

বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটতে শুরু করেছিল আশির দশকের মাঝামাঝি। শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে এধরণের শিল্প যখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল তখন তার নাম দেয়া হয়েছিল অফশোরিং।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসি কনসালটেন্সি তাদের এক রিপোর্টে বলছে, অটোমেশনের ফলে এসব শিল্প এখন অনশোরিং, অর্থাৎ আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া, কিংবা নিয়ারশোরিং, অর্থাৎ কাছাকাছি কোন দেশে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে পোশাক শিল্প উদ্যোক্তা ফজলুল হক মনে করেন, এরকম আশংকা তিনি দেখছেন না।
"যেটা বলা হচ্ছে রোবট এসে সব দখল করে নেবে এবং এর ফলে এই শিল্প আর বাংলাদেশে থাকবে না, ইউরোপ-আমেরিকাতেই ফিরে যাবে। কিন্তু এই কথার মধ্যে আমি একটা ফাঁক দেখছি। মানুষের জায়গায় রোবট বসালে তার খরচ কী দাঁড়াবে এবং সেই বিনিয়োগ সবাই করতে পারবে কীনা বা এই রোবটের অপারেশনাল খরচ কী হবে- এগুলোর কোন পরিস্কার জবাব কিন্তু এখনো আমি কোন স্টাডিতে দেখিনি।"
অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমানও মনে করেন, এই শিল্পকে বাংলাদেশে ধরে রাখার সুযোগ এখনো আছে।
"আমি আবার এধরণের আশংকাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাই না কয়েকটি কারণে। এই শিল্প বাংলাদেশে থাকবে কি থাকবে না, সেটা শেষ বিচারে উৎপাদনশীলতা এবং খরচ কী পড়বে, তা দিয়েই নির্ধারিত হবে। এটা এখনো শ্রমঘন শিল্প। এরকম শিল্প নিয়ারশোরিং করতে গেলে সেটা একটা বিরাট বড় চ্যালেজ্ঞ। কারণ এত বিপুল পরিমাণে তৈরি পোশাক সরবরাহ করা কিন্তু সহজ নয়, সেই সক্ষমতা গড়ে তোলা অনেক সময়ের ব্যাপার।"
আরেকটি বিষয়ের প্রতি তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। বিশ্ব বাজারে পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে চীন আছে শীর্ষস্থানে। তারা মোট চাহিদার তিরিশ শতাংশ সরবরাহ করে। আর এরপর দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশ সরবরাহ করে মাত্র ছয় শতাংশ।
"আমি মনে করি বাংলাদেশের ব্যবসা বাড়ানোর অনেক সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। ঠিক কৌশল নিতে পারলে বাংলাদেশের সুযোগের সীমা কিন্তু এখনো অনেক দূর বিস্তৃত করা সম্ভব।"

কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

কিন্তু এই যে বিরাট প্রযুক্তিগত পরিবর্তন গার্মেন্টস শিল্পকে আমূল বদলে দিচ্ছে, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ? শিমি টেকনোলজিসের সারাহ ক্রিসলি বলছেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশের সামনে কোন বিকল্প নেই।
তার আশংকা, যদি এর পেছনে সত্যিকারের কোন বিনিয়োগ করা না হয়, বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। তখন এসব প্রতিষ্ঠান অন্যান্য পোষাক রফতানিকারক দেশে চলে যাবে।
"কিন্তু আমি আসলে চাই না এটা ঘটুক। আমি দেখেছি, বাংলাদেশ গত পাঁচ বছরে কত ধরণের কাজ করেছে। আমি গত ছয় বছর ধরে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করছি। কারখানাগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য তারা কত কাজ করেছে, সেটা আমি দেখেছি। আমি চাই বাংলাদেশ পোশাক সরবরাহকারী দেশের শীর্ষে থাকুক। কিন্তু সেজন্যে এই বিষয়টাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং আমি আশা করি তারা সেই সিদ্ধান্ত নেবে।"
সারাহ ক্রেসলির প্রতিষ্ঠান মূলত গার্মেন্টস শিল্পকে অটোমেশনের যুগের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। গত প্রায় ছয় বছর ধরে এ কাজেই তিনি বাংলাদেশে যাতায়ত করছেন। সেখানে তার প্রতিষ্ঠান পাঁচটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বাংলাদেশে সর্বশেষ সফর থেকে নিউইয়র্কে ফেরার পর তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল টেলিফোনে।
"আমরা নিজেদেরকে একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের অবস্থানে রেখে কল্পনা করে এই কর্মসূচী তৈরি করেছি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ গার্মেন্টস শ্রমিকের খুব কমই আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ আছে। আমরা আমাদের লার্নিং টুলগুলো তৈরি করেছি একটা গেমের মতো করে। আমরা একটা ভিডিও গেমের মতো ইন্টারফেস তৈরি করেছি, তার সঙ্গে যোগ করেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।"
"এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাংলা শেখানো হবে। ফলে কারখানার কর্মীরা বাংলায় কথা বলে তাদের নির্দেশ দিতে পারবে। এবং হাতের স্পর্শ দিয়েও এসব মেশিন চালানো যাবে।"
শিমি টেকনোলজিসের পাইলট প্রকল্পে গার্মেন্টসের নারী কর্মীরা ডিজিটাল প্যাটার্ন মেকিং এর বেসিকস শিখছে। শিখছে আরও নানা কিছু। এর মাধ্যমে গার্মেন্টস কর্মীরা ডিজিটাল যুগের জন্য তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করেন তিনি।
প্রযুক্তি ভিত্তিক যে নতুন শিল্পবিপ্লবের ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশে, তার ধাক্কায় গার্মেন্টস শিল্প যে আমূল বদলে যেতে চলেছে, তা নিয়ে এই খাতের কারও মনেই কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু রোবটিক প্রযুক্তি যে লাখ লাখ কর্মীর কাজ নিয়ে নেবে, তার কর্মসংস্থান কোথায় হবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
চীনের একটি কারখানা। শুধুই রোবট, খুব বেশি কর্মীর দরকার হয় না এমন কারখানায়

Saturday, October 19, 2019

৮৮ পাউন্ডের লুলুলেমন, নির্মাতারা নির্যাতিত by সারা মার্শ ও রেদোয়ান আহমেদ

লুলুলেমন একটি পোশাকের ব্রান্ড নাম। মেয়েদের পোশাক লেগিন্স বিক্রি করে তারা । যারা ইয়োগা করেন, তারা লেগিন্স পরেন। সেলিব্রিটিদের টপ ফেভারিট। যেসব সেলিব্রিটি ইনস্টাগ্রামে ঝড় তোলেন তাদের গায়ে এই জমকালো লেগিন্স দেখা যায়। ৮৮ পাউন্ড দাম।
কিন্তু তাদের এই পোশাক কোত্থেকে আসছে, তার অনুসন্ধানে দেখা গেছে , এই পোশাক তৈরি করেছেন যারা, তারা বাংলাদেশী কারখানায় কর্মরত নারী । যারা প্রায় নিয়মিতভাবে কারখানাগুলাতে প্রহৃত এবং শারীরিকভাবে নির্যাতিত হন ।
জাতিসংঘ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সম্প্রতি কানাডিয় কোম্পানি লুলুলেমনের একটি অংশীদারিত্ব চুক্তি সই হয়েছে।
যার লক্ষ্য হচ্ছে নারী সাহায্য কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন করা । তাদের উপর মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করা।
কিন্তু বাংলাদেশের কারখানায় কর্মরত মেয়ে কর্মীরা মজুরি বঞ্চনার এক দুঃখজনক উপাখ্যান তুলে ধরেছেন । তারা কম বেতন পান। শারীরিক সহিংসতার শিকার হন। আর তাদের যারা ম্যানেজার, তারা সবসময়ই তাদেরকে অবজ্ঞার চোখে দেখেন। এমনকি হরহামেশা তাদেরকে বেশ্যা বলতেও তাদের বাধে না।
শ্রমিকরা যেসব অভিযোগ করেন:
কারখানা শ্রমিকরা যদি কখনো কোনো নিয়ম ভাঙ্গেন, অথবা প্রত্যাশিত সময়ের কাজ করার চেয়ে যদি আগে কর্মস্থল ত্যাগ করেন, তাহলে ম্যানেজাররা তাদেরকে বকাঝকা করেন। এমনকি চড়-থাপ্পড় দিতেও ছাড়েন না । অনেক শ্রমিক বলেছেন, ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও তাদেরকে অনেক সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
অনেক শ্রমিককে মাসে মাত্র ৮৫ পাউন্ড বা ৯১০০ টাকা পরিশোধ করা হয় । এটা হল একজোড়া লেগিন্সের চেয়ে কম। কারণ একজোড়া লেগিন্স কিনতে খরচ পড়ে ১৩৮ দশমিক ৫০ পাউন্ড। ইউনিয়নগুলো নূণ্যতম মজুরি হিসেবে দাবি করে ১৬ হাজার টাকা। সেই দাবি করা টাকা থেকেও এটা যথেষ্ট কম। আর তাদের ন্যায্য মজুরি হিসেবে যা অনুমান করা হয়, সেই হার থেকে ঢের কম।
তাদেরকে ওভারটাইম করতে বাধ্য করা হয়, যাতে তারা টার্গেট পূরণ করতে পারে । এমনকি অনেক সময় উৎপাদনের টার্গেট পূরণ করা না পর্যন্ত তারা কেউ অসুস্থ হলেও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতে পারে না।
লুলুলেমন অবশ্য বলেছে, কর্মস্থলে কি ধরনের আচরণ করা হবে, সেই বিষয়ে প্রণীত কোড অনুসরণে তারা অত্যন্ত সতর্ক থাকেন এবং এর কোনো লংঘন তারা সহ্য করেন না । কোম্পানিটি বলেছে, বাংলাদেশে যে এই অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে তারা অনতিবিলম্বে তদন্ত শুরু করবে। একজন মুখপাত্র বলেছেন, অভিযুক্ত ফ্যাক্টরির জন্য বর্তমানে কোন ক্রয় ফরমায়েশ দেওয়া নেই। এবং আমরা তদন্তের ভিত্তিতে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
জাতিসংঘ ফাউন্ডেশনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি সব শ্রমিকদেরকেই সমানভাবে এবং ন্যায্যতার সঙ্গে ব্যবহার করা হবে। এবং আমরা বাংলাদেশে লুলুলেমনের তদন্তের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
ওই কারখানার একজন শ্রমিক দাবি করেছেন, একটু আগে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার জন্য তাকে থাপ্পড় মারা হয়েছিল । কারণ তার শরীর খারাপ লাগার কারণে সে আগে যেতে চেয়েছে। ওই নারী কর্মী বলেন, আমি আসলে অসুস্থ ছিলাম । একদিন আমি বিকেল পাঁচটায় কর্মস্থল ত্যাগ করি। কিন্তু আমি সেটা লাইন সুপারভাইজারকে জানিয়ে যাই । কিন্তু সে তার বসকে বলেছিল, আমি কাউকে কিছু না বলে কর্মস্থল ত্যাগ করেছি । পরের দিন আমি যখন কাজে যাই, আমার লাইন টেকনিশিয়ান আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল । সেই থাপ্পর এতটাই জোরালো ছিল যে , আমার গাল লাল হয়ে যায় এবং প্রত্যেকে আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেছে , কি ঘটেছে। আমি তাদের কাউকে বলিনি প্রকৃত কি ঘটেছে। আমি তাদের বলেছিলাম, আমার এলার্জি উঠেছে । ওই নারী শ্রমিক আরও দাবি করেছেন, তিনি এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি । কারণ তিনি জানেন, এ বিষয়ে অভিযোগ করে কোন লাভ নেই ।
ওই নারী কর্মীটি আরো বলেছেন , গত রমজানে কারখানাটি একটি নতুন লাইন তৈরি করে । আর সেজন্য তারা নতুন মেয়েদেরকে নিয়োগ দিয়েছিল । একদিন একজন টেকনিশিয়ান একজন লেবেল অপারেটরকে বুকে যথেষ্ট জোরালোভাবে আঘাত করেছিল । আমরা দেখেছি সারাদিন সে কিভাবে ব্যথায় কুঁকড়ে থেকেছে । লাইনের পেছনে সে কয়েক ঘন্টা শুয়ে থাকে। কিন্তু তার বিষয়ে আমাদের বসরা কোন কিছুই করেননি।
গত ৮ অক্টোবর জাতিসংঘ ফাউন্ডেশন (ইউএনএফ) এর সঙ্গে একটি অংশীদারিত্বের চুক্তি করেছে লুলুলেমন । তারা বলেছে গত তিন বছর ধরে লেগিন্স কোম্পানি এবং ইউএনএফ একটি এভিডেন্স ভিত্তিক মাইন্ডফুলনেস ইয়োগা এবং সেলফ–কেয়ার প্রশিক্ষণ কারিকুলাম ডেভলপ করার চেষ্টা করছে ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আটটি দেশের পাচশ জনেরও বেশি সাহায্যকর্মীদের উপরে তারা এই বিষয়ে পাইলট টেস্টিং করেছে।
লুলুলেমন সম্প্রতি তাদের ব্যবসা ভবিষ্যতে আরও কত বড় হবে, তার একটা ধারণা দিয়েছে । এই কোম্পানিটি তাদের ব্যবসা ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০১৯ সালের শেষে ৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে পারবে। ১৯৯৮ সালে ক্যানাডিয়ান বিজনেসম্যান চিপ উইলসন লুলুলেমন শুরু করেছিলেন । সেই থেকে তারা এই ব্যবসা ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারিত করে চলছে। কিন্তু তারা এই পোশাক কিনছেন এমন সব দেশ থেকে, যেখানে শ্রম সস্তা । আর এসব দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা , কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম।
লুলুলেমন তার ওয়েবসাইটে বলেছে , আমাদের ভেন্ডর কোড অফ এথিক্স বাংলাদেশসহ যেখানেই পণ্য উৎপাদন হয়, সবার জন্য প্রযোজ্য এবং তা নিশ্চিত করছে যে আইনগত এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য নির্বিশেষে আমরা একটি অভিন্ন নীতি অনুসরণ করছি।
লুলুলেমন ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সেফটি অ্যাকর্ড সই করতে মাসের-পর-মাস কাটানো নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল । ১১৩৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল রানা প্লাজা দুর্ঘটনায়। আর তার পরপরই ওই সেফটি চুক্তিতে তাকে সই করতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল । তখন একটা পিটিশন প্রকাশ করা হয়েছিল যাতে তারা তাদের ইথিকস এবং দায়িত্বশীলতার বিষয়ে সজাগ থাকে।
দি গার্ডিয়ান একজন পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছে । ওই শ্রমিকটি দাবি করেছে, তিনি প্রত্যক্ষদর্শী যে, নারী শ্রমিকদেরকে সাধারনত ’’’প্রস্টিটিউট এবং হোর, স্লাট’’ হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে । তার আরও অভিযোগ, পুরুষ কর্মীদেরকেও অবজ্ঞার চোখে দেখে থাকে তারা। অনেক সময় তারা পুরুষ কর্মীদেরকে উপহাস করে । তার কথায়, আমি নিজে কখনো মার খাইনি কিন্তু অন্যদেরকে প্রহৃত হতে দেখেছি।
শ্রমিকরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, তারা যখন কর্মক্ষেত্রে কিছুটা অসুস্থ বোধ করেন, তখন তারা চাইলেই কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারেন না । মেডিকেল টিম একটি মেয়েকে তার জন্ডিস হওয়ার কারণে তাকে কর্মবিরতির সুবিধা দেয়। তাকে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু তার প্রোডাকশন ম্যানেজার তাকে জানিয়ে দিয়েছে , তাকে অবশ্যই কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। শ্রমিকরা আরও দাবি করেছে, তারা অনেক সময় দেখতে পায় যে , তারা ইচ্ছে করে কম কর্মী নিয়োগ করে। তাদের উপরে তখন কাজের চাপ অনেক বাড়িয়ে দেয়া হয়। তাদের প্রতি নির্দেশনা থাকে , তাদেরকে অবশ্যই টার্গেট পূরণ করতে হবে । একজন শ্রমিকের কথায়- সুতরাং শ্রমিকদের কোন উপায় থাকে না । তাদেরকে বাড়তি কাজ করতে হয়। তারা খাবার সময় পায়না। বিশ্রাম পায় না । যা খুবই খারাপ।
টুমো পুটিয়ানিন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলওর) কান্ট্রি ডিরেক্টর। তিনি বলেছেন, যেকোনো ধরনের বাংলাদেশ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটা মোকাবেলায় সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়া বাঞ্ছনীয়।
লেবার বাহাইন্ড দ্যা লেভেল’’ একটি ক্যাম্পেইন গ্রুপ। এই সংগঠনের এ্যাডভোকেসি পরিচালক আন্না ব্রেহার। তার কথায়, একটি সাপ্লাই চেইনের একেবারে তলানিতে থাকা নারীদেরকে যেভাবে ফ্যাশন তৈরীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, তাদের শ্রম শুষে নেওয়া হয়, সেটা আসলেই একেবারে একটা অবসিন( অশ্লীল) ঘটনা। তার কথায়, এইসব গল্প খুবই মর্মান্তিক এবং তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় । বাংলাদেশের যেসব নারীরা আমাদের জন্য কাপড় তৈরি করে তারা রুটিনমাফিক পদ্ধতিগতভাবে হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন । তিনি আরো বলেছেন,
আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর যারা বাংলাদেশে শ্রমিকদের কে ব্যবহার করে সস্তায় কাপড় তৈরি করেন, তাদের কর্মক্ষেত্রে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮০ ভাগ বাংলাদেশি শ্রমিক বলেছেন তারা কর্ম ক্ষেত্রে কোন না কোন ভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
লুলুলেমন কোম্পানির একজন মুখপাত্র বলেছেন, আমরা একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান এবং এথিকসের প্রয়োজনে আমরা সজাগ। আমরা যেখান থেকেই আউটসোর্সিং করি না কেন, এথিক্স আমরা সমুন্নত রাখব। এটাই আমাদের বৈশ্বিক অবস্থান এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল খাতে সব থেকে শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধ আমরা মেনে চলি। আমরা কখনোই এই কোডের ভায়োলেশন সহ্য করি না । বাংলাদেশে একটি কারখানা সম্পর্কে এ ধরনের রিপোর্ট জানতে পেরেই আমরা তদন্ত শুরু করেছি । বর্তমানে আমরা ওই কারখানাকে আর কোন ধরনের অর্ডার দেইনি । এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
এদিকে ইয়ংগাল কর্পোরেশন বলেছে, তারা কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সব ধরনের ন্যায্য আচার-আচরণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ । বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে কর্মীদেরকে তারা তাদের মতামত এবং তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখার বিষয়টি উৎসাহিত করে থাকে । কোম্পানিটি আরো বলেছে ,যখন কারো কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় , তারা তা প্রতিকারের উদ্যোগ নেন এবং শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন । যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
>>>দি গার্ডিয়ানে ১৪ অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তর্জমা

Friday, October 18, 2019

চট্টগ্রামে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা by ইব্রাহিম খলিল

চট্টগ্রামে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে  পোশাক কারখানা। এ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন তৈরি পোশাক শিল্পমালিক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরীর ঝাউতলায় বিজিএমইএ ভবনের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় বলে জানান, বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি এম এ সালাম। সভায় পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার দশ কারণও খুঁজে বের করেন তারা। এম এ সালাম বলেন, চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ হলো- এলায়েন্স ও অ্যাকর্ড এর ফর্মুলা অনুযায়ী সংস্কার করতে না পারা, নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে অক্ষমতা, পণ্যের যথাযথ মূল্য না পাওয়া, বিদেশি বায়ারদের চট্টগ্রাম বিমুখতা, কিছু বায়ার ও বায়িং হাউসের প্রতারণা, চট্টগ্রামে অবকাঠামোগত সমস্যা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ব্যাংক ঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, বড় বড় প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকা ও অসম প্রতিযোগিতা। এসব সমস্যা সমাধান করতে না পারলে অচিরেই পোশাক কারখানার ৩০ লাখ শ্রমিক হুমকির মুখে পড়বে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক তানভীর বলেন, একটা সময় বৈদেশিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে বিপুল ক্রয়াদেশ (অর্ডার) পাঠাতো। কিন্তু এখন তা অনেক কমে গেছে।
তারা (ক্রেতারা) এখন ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও শ্রীলংকাকে ক্রয়াদেশ দিচ্ছে। এটা আমাদের জন্য হুমকি। আমরা নির্দিষ্ট কিছু প্রোডাক্টই পর্যায়ক্রমে উৎপাদন করে আসছি। আরো প্রোডাক্ট বাড়াতে হবে। আমরা ৬৪টি প্রোডাক্ট উৎপাদান করছি। অন্যদিকে, চায়না প্রায় এক হাজারেরও বেশি প্রোডাক্ট উৎপাদন করছে। তাদের পণ্যের যোগান যেমন বেশি বায়ারদের ক্রয়াদেশও ওখানে বেশি। তাই আমাদের এই শিল্পকে বাঁচাতে ভেতর ও বাহিরের সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে হবে।
বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপাতি আবু তৈয়ব বলেন, পোশাক শিল্প কারখানার মালিকরা এখন যে সমস্যাগুলোর মধ্যে পড়ছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে লিড টাইম। বন্দরে কন্টেইনার আটকে থাকছে, সময় মত পণ্য পৌঁছানো যায় না। এতে অর্ডার হারাচ্ছি আমরা। তাছাড়া পণ্য উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধি করতে অটো মেশিন ব্যবহার করতে হবে।
তিনি জানান, বিদেশি ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের আরোপিত শর্ত পূরণ করতে না পেরে গত চার বছরে চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে গেছে দেড় শতাধিক তৈরী পোশাক কারখানা, যেগুলোর অধিকাংশই যথাসময়ে অন্যত্র কারখানা স্থানান্তর করতে পারেনি। বন্ধ কারখানার মালিকদের কেউ কেউ মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন করে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও অধিকাংশই অর্থাভাবে নতুন করে কারখানা স্থাপন করতে পারছে না।
বিজিএমইএর তথ্যমতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিজিএমইএর ৬৮৬ সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখন চালু আছে মাত্র ৩৫১টি। এর মধ্যে সরাসরি পোশাক রপ্তানির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০০টি। ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে কয়েকটি কারখানার ১২৪ জন পোশাককর্মী নিহত হওয়ার ঘটনার পর কারখানার কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে কাজ শুরু করে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। এরপর থেকে চার বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ১৫৩টি প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রামে সর্বশেষ গত সপ্তাহে বন্ধ হয়ে যায় এঞ্জেলা ফ্যাশন লিমিটেড। নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন আসকারাবাদ এলাকার এ পোশাক কারখানাটিতে শ্রমিক ছিল ২২৫ জন। এই কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ এম জিয়াউল করিম বলেন, যে ভবনে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম চলছিল, সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই কারখানাটি বন্ধ করা হয়েছে। সংস্কার শেষে পুনরায় কারখানা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কয়েক বছর আগে বন্ধ হওয়া একই ভবনে অবস্থিত পোশাক কারখানা সাদাফ ফ্যাশন লিমিটেডের এমডি এস এম জাহিদ চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ইতালি ও সুইডেনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল আমাদের কারখানায় উৎপাদিত পোশাকের ক্রেতা। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের পরিদর্শক দল কারখানা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যায়িত করে সেখান থেকে সরানোর শর্ত দিলে উপযুক্ত জায়গা না পাওয়া এবং আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কারণে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই।
তিনি বলেন, বন্ধ হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৭ বার ভূমিকমপ হয়েছে। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকমপও ছিল। কিন্তু ভবনটির কিছু হয়নি। অথচ তারা বলেছে, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, একসময় আমি কোটি কোটি টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছি, আজ আমি কপর্দকশূন্য। বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানা অন্যত্র স্থানান্তরে যে আর্থিক সক্ষমতা দরকার-তা আমাদের নেই। মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক জোনে বন্ধ কারখানা স্থাপনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে প্রত্যেক প্লটের জন্য এক বছরের মধ্যে এক কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে, যেটা সবার সামর্থ্যে নেই। ব্যবসায়ীরা জানান, নগরীর কালুরঘাটে গড়ে ওঠা দেশ গার্মেন্ট দিয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরের দুই দশক ভালো অবস্থানেই ছিল চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শিল্প। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে চট্টগ্রামে ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে এ খাতটি।
বিজিএমইএর পরিচালক ও ও এম এস ওয়্যারিং অ্যাাপারেলস লিমিটেডের এমডি আ ন ম সাইফুদ্দিন বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর ২০১৩ সাল থেকে এদেশের তৈরী পোশাক খাতে বিদেশি ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স ও এনএপি (ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান) নীতিমালার আলোকে কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
তিনি বলেন, ভবন নিরাপত্তা ও অগ্নি নিরাপত্তার শর্তপূরণ করতে অক্ষম হওয়ায় সারা দেশেই একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গার্মেন্ট কারখানা। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের দেড় শতাধিকসহ সারা দেশে প্রায় ৯০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও এ খাতের শ্রমিকরা বেকার বসে নেই মন্তব্য করে সাইফুদ্দিন বলেন, এমনিতে আমাদের শ্রমিকের সংকট ছিল। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের বেশিরভাগ অন্য কারখানায় কাজ নিয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে বেশ কিছু গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। এসব কারখানায় অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

Thursday, October 10, 2019

রপ্তানির ৬০ ভাগই যায় ইউরোপে by টিপু সুলতান ও মজিবুল হক

দেশে যত রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার (গেঞ্জি, টি-শার্ট) শিল্পকারখানা রয়েছে, তার ৬০ ভাগই নারায়ণগঞ্জে। এখান থেকে বছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার (৪০০ কোটি ডলার) রপ্তানি হয় বলে শিল্পমালিকেরা জানিয়েছেন।
দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে নিটওয়্যার এবং ওভেনের (শার্ট-প্যান্ট) বাজার এখন প্রায় সমান সমান। সরকারি হিসাবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট নিটওয়্যার রপ্তানি হয় ১ হাজার ৫১৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ২১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার। একই বছর ওভেন রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৫৪২ কোটি ডলার বা ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৬০ কোটি টাকার।
রপ্তানি আয় তথা দেশের অর্থনীতিতে যাদের এমন ভূমিকা, তারা আছে নানামুখী সমস্যায়। নারায়ণগঞ্জে নিটওয়্যারের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র বিসিক শিল্পনগরী এলাকার রাস্তাঘাটের ভয়ংকর ভগ্নদশা। নর্দমাব্যবস্থা নেই বললেই চলে। পুরো এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরা। যানবাহনের জট লেগে থাকে সারা দিন। বিদ্যুতের সমস্যা অনেকটা মিটলেও গ্যাসের চাপ কম। আছে পানিসংকট। নানা অজুহাতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি তো রয়েছেই।
শতভাগ রপ্তানিমুখী এই শিল্পের যাত্রা শুরুই হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ থেকে গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। নব্বইয়ের দশকে এ শিল্প বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, তাদের সদস্যভুক্ত রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পের সংখ্যা দেড় হাজার। এর ৬০ ভাগই নারায়ণগঞ্জে, বাকিগুলো গাজীপুর ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। এর বাইরেও কিছু নিটওয়্যার কারখানা আছে, যারা বিজেএমইএর সদস্যভুক্ত।
বিকেএমইএর নেতারা জানান, শতভাগ রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার পণ্য তৈরিতে যেসব উপাদান ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় ৮০ ভাগই দেশীয় সামগ্রী। বাকিটা আমদানি করা সামগ্রী। আর ওভেনে (শার্ট-প্যান্ট) ৬০-৭০ ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ওভেনের পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
নিটওয়্যার রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ। দেশের উৎপাদিত নিটওয়্যারের প্রায় ৬০ ভাগই যায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও চীনেও রপ্তানি হয়।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ব্যবসা ছিল রমরমা, তখন নারায়ণগঞ্জকে স্কটল্যান্ডের বস্ত্র ও পাটকলসমৃদ্ধ ড্যান্ডি শহরের সঙ্গে তুলনা করে ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ বলা হতো। পাটের সেই দিন নেই। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ এখন দেশের নিটওয়্যার তৈরির রাজধানীতে পরিণত হয়েছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ নিটওয়্যারের সূতিকাগার। এর কারণ উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল। এখানকার শত বছরের পুরোনো হোসিয়ারি শিল্পের হাত ধরেই নিটওয়্যার শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। এখন এখানে প্রায় আট লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তিনি জানান, নিটওয়্যার শিল্পের পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে নিটিং ও ডায়িং কারখানা। প্রায় ৯০ ভাগ দেশীয় সুতা ব্যবহার করা হয় এখানে।
নারায়ণগঞ্জের নিটওয়্যারের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র বলা যায় পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীকে। মূলত হোসিয়ারিশিল্পের জন্য এটি করা হয়েছিল, কিন্তু তারা আসেনি। পরবর্তীকালে নিটওয়্যার শিল্পমালিকেরা এখানে কারখানা গড়ে তোলেন। বিসিক শিল্প মালিক সমবায় সমিতি সূত্রে জানা গেছে, এখানে নিটওয়্যার কারখানা আছে ৫০০, যা সারা দেশের মোট নিটওয়্যার শিল্পের এক-তৃতীয়াংশ। এর বাইরে ওভেন গার্মেন্টস, নিটিং, পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প আছে এখানে।
বিসিক শিল্প মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, এখান থেকে বছরে ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। কাজ করেন প্রায় তিন লাখ শ্রমিক। অথচ এখানে সমস্যার অন্ত নেই। অবকাঠামোগত সমস্যা সবচেয়ে বড় সমস্যা। ময়লা ফেলার কোনো জায়গা নেই। রাস্তাগুলো ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নেই। যেসব কারখানায় পানির সংযোগ আছে, তারা পানি পায় না, কিন্তু বিল দিতে হয়।
সরেজমিন বিসিক শিল্প এলাকা ঘুরে এর প্রমাণও পাওয়া গেল। ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট। তাতেই চলছে পণ্যবাহী বড় বড় কাভার্ড ভ্যান বা ট্রাক। বেশির ভাগ রাস্তাই আবর্জনায় ভরা। নর্দমার পানি উপচে পড়ছে রাস্তায়। মানুষ পানি টপকে চলাফেরা করছে। যানজট তো আছেই। একজন বড় ব্যবসায়ী বলেন, যানজটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা আসতে চান না। তাঁদের হেলিকপ্টারে করে আনতে হয়।
আর আছে চাঁদাবাজির অভিযোগ। তবে এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর হাতে ব্যবসায়ীরা জিম্মি। নানা অজুহাতে বড় বড় কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করা হয়। তারপর ওই প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ স্থানীয় বড় এক মাস্তান শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে আসেন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করতে। বড় অঙ্কের টাকা না দিলে মীমাংসা হয় না। একই অবস্থা সিদ্ধিরগঞ্জের কারখানাগুলোতেও। সেখানে একই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অনুগত আরেক মাস্তান রাজত্ব করে। এসব নানা কারণে অনেক কারখানা এখান থেকে অন্যত্র চলে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে।
বিসিক শিল্পনগরী সিটি করপোরেশনের বাইরে। এটি এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদের অধীন। ব্যবসায়ীদের হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে হয় ইউনিয়ন পরিষদকে। কিন্তু প্লটপ্রতি কর ধার্য না করে পরিষদপ্রতি বর্গফুট অনুযায়ী হোল্ডিং কর নেয়। কর পরিশোধ না করলে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন হয় না। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ কোনো সেবা দেয় না। এমনকি ময়লা সরানোর কাজটাও করে না তারা।
এটা স্বীকারও করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানকার উন্নয়নকাজ করার দায়িত্ব বিসিকের। তবে ময়লা সরানোর বিষয়ে আমি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু ময়লা ফেলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। একটা বড় জায়গা পেলে ময়লা নেওয়ার কাজটা ইউনিয়ন পরিষদ করবে।’ তবে কবে নাগাদ বড় জায়গা পাওয়া যাবে, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
এসব সমস্যা নিয়ে কথা হয় বিসিকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাঁদের দাবি, তাঁরা পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ পান না, তাই এসব সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না। পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীর এস্টেট কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সমস্যা আমরাও বুঝি, আমরা ওপরে লেখালেখি করছি। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সমস্যার সমাধান করা যাবে।’ তিনি জানান, এ বছর তাঁরা ৬৮ লাখ টাকার মতো বরাদ্দ পেয়েছেন। এই টাকায় ৫৫০ ফুট ড্রেনের কাজ করা হয়েছে। ৩৮৬ ফুট রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে।
তবে বিসিক শিল্প মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বিসিক কর্তৃপক্ষ বলে বাজেট নেই। কিন্তু এখানকার শিল্পকারখানাগুলো যে সার্ভিস চার্জ দেয়, সেটার একটা অংশ ব্যয় করলেও এই করুণ দশা থাকে না। এ নিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে বহু চিঠি দিয়েছি। সংসদীয় কমিটিতে বক্তব্য দিয়েছি, শিল্পসচিবকে বলেছি। কোনো কাজ হয়নি।’ এ রকম একটি রপ্তানিমুখী শিল্পপল্লির সমস্যা সমাধানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন মোহাম্মদ হাতেম।

Friday, October 4, 2019

মিটু’র ঢেউ গার্মেন্টেও by জেনিফার চৌধুরী

বয়স মাত্র ১৬। নাম ডলি আক্তার। গার্মেন্টে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেছে। যেখানে সে কাজ করতো, সেখানকার উৎপাদিত পোশাক পশ্চিমা দেশগুলোতে বিক্রি হয়। কিন্তু যা সে আশা করেনি সেটা হলো যৌন হয়রানি। তিনি তার কারখানার বিবাহিত লাইন ম্যানেজারের যৌন নিগ্রহের কবলে পড়েন। তার জীবনের প্রথম কারখানার ম্যানেজার। তার সঙ্গে বিছানায় যেতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ডলি বলেন, তখন আমি ভয় পেয়েছিলাম। তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। আরেকটি খুঁজে নেন। কিন্তু সেখানেও একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অন্য কারখানার ব্যবস্থাপনাও একটা অভিশাপ। আমাকে তা আঘাত করে। ওরা আমাদের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়।

ডলি একদিন যৌন নিগ্রহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সিদ্ধান্ত নেন আর পিছু হটা নয়। তাকে লড়তে হবে। ডলি কারখানায় একটি ইউনিয়ন গড়ে তোলেন। যাতে কর্মক্ষেত্রে তরুণীরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারে। কিন্তু কারখানাটির ব্যবস্থাপনা যখন তার এই উদ্যোগের কথা জানতে পারে, তখন তার সুপারভাইজার তাকে একটা অফিসকক্ষে বন্দি করে রাখে। তাকে তার পদত্যাগপত্রে সই দিতে বাধ্য করে। কারখানা মালিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যারা প্রতিবাদী হবে, তখন তারা এটাও নিশ্চিত করে যে, তুমি যেখানেই যাও না কেন, তুমি অন্য কারখানায় কাজ পাবে না। ডলি বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নেই, আমি আজ থেকে শুধু শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করব, ব্যবস্থাপনার পক্ষে আর কখনো কাজ করবো না।’

এক দশক পরে ডলি এমন একটি সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ে উঠে এসেছেন, যাদের কাজ হলো যৌন নিপীড়ন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে কর্মরত নারীদের কাছে এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় ২৫ লাখ শ্রমিক। এর অধিকাংশই নারী। বাংলাদেশের ৪২শ’র বেশি কারখানায় তারা কাজ করে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ঘটে। যেখানে ১ হাজারের বেশি শ্রমিক প্রাণ হারায়। আর তখনই বাংলাদেশ সরকার এবং পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো অঙ্গীকার করে যে, তারা কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার দেবে এবং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা উন্নত করবে। কিন্তু ওই ঘটনা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ওপর তেমন আলো ফেলেনি। নারী শ্রমিকরা আগের মতোই বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়ে চলছেন। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, কর্মরত নারী গার্মেন্টস কর্মীদের ৮০ ভাগই কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কমসংখ্যকই যৌন নিপীড়নের প্রতিকার চেয়ে কোথাও রিপোর্ট করেছে। ডলি বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবন ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব লঘু। নারীরা যৌন নিগ্রহের শিকার হয়। কিন্তু তারা সাধারণত সেটা গোপন করে। তারা সেটা প্রকাশ করতে অপারগ থাকে। ২০১৫ সালের মধ্যে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে ডলি পরিচিতি পান। এটা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন।

কুড়ি বছর বয়স্ক হাফসা বেগম তাদেরই একজন, যারা সাহায্য চেয়েছেন ডলির কাছে। হাফসা যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছিল রাজধানী ঢাকায় গত মে মাসে। তিনি রাত্রিকালীন শিফটের কাজ শেষ করেছিলেন। বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর সামনে ছিল ঈদের ছুটি। হাফসা বেগম বলেছেন, আমি সেদিন অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলাম। সকাল ৮টা থেকে কাজ শুরু করি। আর সন্ধ্যার পর থেকে কাজের গতি কমতে থাকে। কারখানা থেকে বেরুতে অন্যান্য মেয়েরা আমাকে একটু পেছনে রেখে বেশ কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছিল। আর তখনই লাইন ম্যানেজার সেই সুযোগটি নেয়। ‘আমি তাকে লাথি মারি। থাপ্পড় দেই। কিন্তু তারপরও সে আমাকে একটা অন্ধকার জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আর সেটা ছিল কারখানার কাছেই। সে আমাকে জোরপূর্বক চুমু দেয় এবং তাকে স্পর্শ করে। লাইন ম্যানেজার তার উদ্দেশ্যে বলেছিল, ‘আমি না তোমাকে বলেছি, তুমি আমার হতে যাচ্ছ।’

সাত মাস ধরে হাফসা বেগম ওই কারখানায় কাজ করছিল। জুনিয়র মেশিন অপারেটরদের উপরে ওই লাইন ম্যানেজারের অনেক ক্ষমতা। ম্যানেজার আমাকে বলেছিল, ‘আমার সঙ্গে শুতে যেতে হবে। আমি তখন বলেছি, যাব না। আর তখন সে আমার জীবনকে দোজখে পরিণত করে।’ লাইন ম্যানেজারকে যত শক্তি দিয়ে সে বাধা দিয়েছে, ততই তার প্রতি হুমকি বেড়ে গেছে। সে আরো ভয়ানক হয়ে উঠেছে। ম্যানেজার তাকে সতর্ক করে দিয়েছিল যে, যদি তার সঙ্গে সে বিছানায় যেতে না চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই চাকরি হারাতে হবে। হাফসা বলেন, ‘পরদিন সকালে কাজে যাইনি। আমি এতটা ভয় পেয়েছিলাম। আমি জানতাম না আমাকে কি করতে হবে। আর তখনই আমার মনে পড়ে ডলির কথা। অনেকেই জানেন তিনি একজন ইউনিয়ন সংগঠক। যারাই কারখানায় যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, তারা তার সাহায্য পেয়েছে।’

ডলি বিষয়টি স্থানীয় শিল্প পুলিশকে অবহিত করেন। তার পরিচিতদের নজরে আনেন। এবং সেই কারখানায় ব্যক্তিগতভাবে হাজির হন। আর কয়েক ঘণ্টার আলোচনা শেষে ওই লাইন ম্যানেজারকে চাকরিচ্যুত করাতে সক্ষম হন। তার প্রতি হুমকি আসতে থাকে। তাকে তার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে যেতে হয়। রাজধানীর অন্য একটি প্রান্তে তাকে ঠাঁই নিতে বাধ্য করা হয়।
‘‘এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। আমি যেসব মেয়েদের যৌন নিগ্রহ থেকে রক্ষা করেছি তারা এখনো বিপদমুক্ত নয়। নিজেকে ভালো রাখার বিনিময়ে তাদের বহু কিছু উৎসর্গ করতে হয়। তাদের ভয়ের মধ্যে কাটাতে হয়। এটা একটা চ্যালেঞ্জ। গভীরভাবে প্রোথিত সামাজিক লজ্জা আর প্রতিশোধস্পৃহা বাংলাদেশের গার্মেন্ট কর্মীদের যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে অসহায় করে রাখছে। তাদের নীরব রাখছে।’’ মন্তব্য করেছেন অরুনা কাশ্যপ। তিনি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নারী-অধিকার বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী। কাশ্যপ বলেছেন যদি গার্মেন্টকর্মীরা তাদের যৌন হয়রানি প্রকাশ করার জন্য প্রতিশোধের মুখে না পড়তেন, তাহলে অনেকেই চিৎকার করতেন। তাদের ফুসফুসের গভীরে মিটু।’’ ২০১৭ সালের রিপোর্টে অরুনা এই মন্তব্য করেছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টকর্মীরা যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি সংকটেরই একটি অংশ। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বলে কম আলোচিত কিন্তু এইসব ঘটনা যা ঘটছে তা অবশ্যই হলিউড, মিডিয়া বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সংশ্লিষ্ট হাইপ্রোফাইল সব ঘটনার চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ২০১৮ সালের মে মাসের কথা। এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ অ্যালায়েন্স এবং গ্লোবাল লেবার জাস্টিস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে, উল্লেখযোগ্য ব্রান্ডের এশীয় সাপ্লাই চেইনে বিরাট রকম যৌন সহিংসতা চলছে। কোম্পানিগুলো বলেছে, যেসব অভিযোগ উঠেছে তা তদন্ত করে দেখবে। কিন্তু অরুনা দাবি করেছেন, ব্র্যান্ডগুলো যদিও তদন্তের কথা বলছে। বলছে কর্মক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা রোধে তারা ব্যাপক পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু তারা আসলে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এটা যদি সফল করে তুলতে হয়, তাহলে তাদেরকে ব্যবস্থাপনা কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে।

সাপ্লাই চেইনগুলোর ওপর মনিটরিং বাড়াতে হবে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির দিকে তাদের নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ গার্মেন্টকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিষয়ে রাজনৈতিক আগ্রহ ও উদ্বেগ সামান্য। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বিষয়ে গাইডলাইন প্রকাশ করেছে। কিন্তু এই গাইডলাইন অনুসারে নারীরা অভিযোগ করতে পারেন, এমন প্রক্রিয়া বা এমন জায়গা এখনো কম।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গার্মেন্ট শিল্প অন্যতম বৃহত্তম অবদান রেখে যাচ্ছে। ২০১৭ এবং ২০১৮ সালের বার্ষিক রাজস্বের ৮০ ভাগের বেশি এসেছে গার্মেন্ট থেকে। অথচ কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হয়রানি বন্ধে বা তা স্বীকার করতে রাজনৈতিক ইচ্ছা বা অর্থনৈতিক কোনো প্রণোদনা একদম দেখা যায় না। কারখানার মালিকরা অভিজ্ঞ ম্যানেজারকে স্বপদে বহাল রাখতে আগ্রহী। কারণ ওই সব ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। কিন্তু মেশিন অপারেটর কিংবা শ্রমিকদের তারা সহজেই পরিবর্তন করতে পারে। গত ১৬ই মার্চ একটি কারখানার সামনে নারীকর্মীরা অনশন ধর্মঘটে গিয়েছিল। একজন সহকারী প্রোডাকশন ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তারা যৌন হয়রানির অভিযোগে সোচ্চার হয়। ওই ঘটনায় ১৮ বছর বয়সী একটি মেয়ে যৌন লাঞ্ছনার শিকার হন। যদিও কারখানাটি দাবি করেছে যে, ম্যানেজারকে তারা চাকরিচ্যুত করেছে। কিন্তু কারখানার শ্রমিকরা সে কথা মানতে নারাজ। সংশ্লিষ্ট প্রতিবাদী নারী বলেছেন, এটা এমন কোনো গুরুতর পদক্ষেপ নয়। কিন্তু ভিকটিমসহ আরো ১৬ জন প্রতিবাদকারীকে তারা চাকরিচ্যুত করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে তারা কর্মক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। তাদের এমনকি মজুরিও শোধ করা হয়নি। নারী শ্রমিকরা কোনো পুলিশ রিপোর্ট করেননি। তার কারণ প্রতিশোধের ভয়ে তারা মামলার পথে যান নি। ডলি বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি নারী শ্রমিক নির্ভর। অথচ আমরা এসব থেকে রক্ষা পাই না।

গত পাঁচ বছরের বেশি সময়ের ব্যবধানে যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়াদের কয়েকজনের সঙ্গে ডলি যুক্ত থেকেছেন। ভিকটিমদের সঙ্গে বেশিরভাগ সময় তিনি গোপনে দেখা করেছেন। যাতে গার্মেন্ট কমিউনিটির অন্যান্য লোকেরা বিষয়টি না জানতে পারে। কিন্তু এই বিষয়ে পুলিশের কাছে মামলা দায়ের করা ছাড়া ভুক্তভোগী নারীর পক্ষে দাঁড়িয়ে কার্যকর কিছু সাহায্য দেয়া সত্যিই কঠিন। নারীরা মুখ খুলে তাদের সম্মান হারাতে নারাজ। আমি সর্বদাই সুপারিশ করি, তাদের উচিত পুলিশের কাছে যাওয়া। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তারা এতে সম্মতি দিয়ে থাকে। আর সে কারণে আমি বেশিরভাগ সময় যেটা করি, যাতে দুষ্কৃতকারীরা চাকরি হারায়, সেই ব্যবস্থা করি। ডলি সীমিতভাবে হলেও যাতে নারীর ক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটে সে জন্য তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেন। ইউনিয়নে যোগ দিতে বলেন। শ্রম আইনের বিভিন্ন ধারা এবং ইউনিয়ন গঠনের বিষয়ে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেন। এভাবে তাদের শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করেন।

যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়া নারীদের পাশে দাঁড়ানোর প্রভাব ডলির পারিবারিক জীবনে পড়েছে। ‘‘আমি আমার ছেলের সঙ্গে মাতৃত্বের সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেনি। কারণ বেশিরভাগ সময় সে গ্রামে আমার মায়ের সঙ্গে থেকেছে। ছুটির দিনগুলোতে সে যখন আমার কাছে আসে, তখনই আমি তাকে দেখতে পাই। কিন্তু আমাদের মা-ছেলে সম্পর্কে টানাপড়েন রয়েছে। আমরা পরস্পরকে কমই জানতে পারি। কিছুদিন আগে এক মধ্যরাতে আমি একটি ফোন কল পাই। এক লোক আমাকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে। বলেছে, আমি যেন মেয়েদের ‘নোংরা বিষয়গুলো’ নিয়ে তাদেরকে উস্কানি দেয়া থেকে বিরত থাকি। আমি তার সঙ্গে সাহসের সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু সত্যটা এই যে আমি জানি, নারী এবং তরুণীরা তাদের নিজ নিজ কারখানায় এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা প্রতিবাদী হতে পারে না। কারণ প্রতিবাদী হওয়া তাদের জন্য বেশ ভয়ঙ্কর। (দি গার্ডিয়ানে ১০ই সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনের তরজমা)

Thursday, September 26, 2019

বাংলাদেশের বিলিয়ন ডলার রফতানি, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ভারতের শিল্প মহলে by শুভজ্যোতি ঘোষ

এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে ভারতে বার্ষিক রফতানির পরিমাণ ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
ভারত সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বাংলাদেশ থেকে ভারত ১০৪ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে, যা একটি রেকর্ড।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করা হলেও ভারতের বিশেষত গার্মেন্ট শিল্প এই প্রবণতায় খুবই উদ্বিগ্ন।
বিপুল রফতানি বৃদ্ধির পেছনে কৃতিত্ব মূলত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেরই
বাংলাদেশ থেকে রফতানিতে রাশ টানার জন্য তারা সরকারের কাছে জোরালো দরবার করছেন।
কিন্তু ভারতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান রফতানি সে দেশে কেন আর কী ধরনের 'ব্যাকল্যাশ' তৈরি করছে?
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আছে দুনিয়ার প্রায় ৬৭টি এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশের, তার মধ্যে অ্যাঙ্গোলা বা মোজাম্বিক ছাড়া কখনও কোনও দেশ থেকে বার্ষিক রফতানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি।
বাংলাদেশ সেই বিরল তালিকায় ঢুকে পড়েছে মূলত তৈরি পোশাক রফতানিতে ভর করেই, গত অর্থ বছরে যার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ।
উদ্বিগ্ন ভারতীয় গার্মেন্ট নির্মাতারা এখন বাংলাদেশী পণ্যের ডিউটি-ফ্রি অ্যাক্সেস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
যদিও দিল্লির গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইকরিয়েরে'র (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশনস) অধ্যাপক অর্পিতা মুখার্জি বলছেন, শুধু শুল্কে ছাড় পাওয়াটাই বাংলাদেশের একমাত্র অ্যাডভান্টেজ নয়।
দক্ষিণ ভারতের তিরুপুরে ভারতের একটি গার্মেন্ট কারখানা
তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "গার্মেন্ট খাতে ভারত কিন্তু আর বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জায়গাতেই নেই। থ্রিডি প্রিন্টারে ডিজাইনিং থেকে শুরু করে নানা প্রযুক্তিতে তারা ওখানে প্রচুর বিনিয়োগও করেছে, তার সুফলও পাচ্ছে।"
"একটা তুলনামূলকভাবে ধনী দেশ হয়েও আপনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন, আর বলবেন বাংলাদেশের রফতানি কীভাবে বাড়ছে - তা তো হয় না।"
"আমাদের শ্রমশক্তিও আর শস্তা থাকছে না। বাংলাদেশ এসিইজেড বা বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের ফায়দা তুলছে, ওদিকে আমাদের এসিইজেড-কে আমেরিকা চ্যালেঞ্জ করে বসে আছে!"
"সুতরাং আমাদের কোনও পলিসিরই ঠিকঠাক নেই। ফলে দোষটা তো পলিসির, বাংলাদেশের এক্সপোর্টের তো আর দোষ হতে পারে না", বলছেন ড: মুখার্জি।
প্রেমাল উদানি ভারতের শীর্ষস্থানীয় গার্মেন্ট শিল্পপতি, অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি।
ভারতে বাংলাদেশ থেকে রফতানির পরিসংখ্যান
বিবিসিকে তিনি আবার বলছিলেন, "বাংলাদেশ থেকে ভারতে তৈরি পোশাক রফতানি এখন খুব তীব্র গতিতে বাড়ছে - বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে।"
"কিন্তু আমাদের মূল অভিযোগ হল, সার্টিফিকেট অব অরিজেনের নিয়মকানুন কিন্তু বাংলাদেশ মানছে না!"
"মানে চীন বা অন্য কোনও জায়গা থেকে ফেব্রিক কিনে নিজের দেশে সেলাই করে সেটাই তারা ভারতে ডিউটি-ফ্রি রফতানি করছে।"
"বাজার এগুলোতে ছেয়ে যাচ্ছে, জিনস-বেসিক শার্ট-বা চিনো প্যান্টের মতো কোর প্রোডাক্টে দেশী নির্মাতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ন।"
"আমাদের বক্তব্য হল, বাংলাদেশকে শুল্ক ছাড় দেওয়ার নামে আমরা তো চীনা পণ্যকে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকতে দিতে পারি না - একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তো থাকা উচিত", বলছেন মি উদানি।
প্রেমাল উদানি কেটি কর্পোরেশন নামে যে অ্যাপারেল সংস্থার মালিক, তাদের মূল কারখানা তামিলনাডুর তিরুপুরে।
তামিলনাডুর ওই শহরকে ঘিরে অজস্র গার্মেন্ট কারখানা আছে, এই শিল্পমালিকদের সংগঠনও খুব শক্তিশালী।
বাংলাদেশ থেকে যেসব তৈরি পোশাক ভারতে আসছে, বাজারে সেগুলোর সরাসরি প্রতিযোগিতা এই শিল্পাঞ্চলে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গেই।
বাংলাদেশে তৈরি জিনস ভারতের বাজার ছেয়ে ফেলছে বলে ভারতীয় শিল্প মালিকদের বক্তব্য
দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্ক রিসার্চ অ্যান্ড ইনফর্মেশন সিস্টেমে অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে কিন্তু মনে করছেন, ভারতের গার্মেন্ট শিল্পে শক্তিশালী দক্ষিণ ভারতীয় লবি চাইলেও বাংলাদেশী পণ্যে নতুন করে শুল্ক বসানো সম্ভবই নয়।
তার কথায়, "ভারতে আনব্র্যান্ডেড গার্মেন্টের মূল হাবটাই হল এই তিরুপুর। কিন্তু তারা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারছে না।"
"এখন তিরুপুর লবি বাংলাদেশের ডিউটি ফ্রি অ্যাকসেস বন্ধ করতে চাইলেও সেটা তো করা যাবে না। অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে ওরা আমাদের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব আরবিট্রেশনেও টেনে নিয়ে যেতে পারে।"
"ভারতীয়রা যেটা করতে পারেন তা হল নিজেদের প্রোডাক্টে আরও ভ্যালু অ্যডিশন করে সেটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন, কম্পিটিটিভিনেস বাড়াতে পারেন কিংবা প্রোডাকশনের খরচ কমাতে পারেন।"
"পাশাপাশি নতুন একটা ট্রেন্ড শুরু হয়েছে, বেশ কিছু ভারতীয় টেক্সটাইল সংস্থা আফ্রিকাতে গিয়েও কারখানা গড়ছেন। আফ্রিকাতে ওয়েজ আরবিট্রেজের (কম পারিশ্রমিক) সুবিধা নিয়ে উৎপাদন করে সেটাই আবার ভারতে রফতানি করছেন।"
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল
"একইভাবে ভারতের কোম্পানি অরবিন্দ মিলস বাংলাদেশে গিয়ে কারখানা তৈরি করে ওখান থেকে ব্যবসা করছেন", জানাচ্ছেন ড: দে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকতে হলে এগুলোই এখন ভারতীয় শিল্পপতিদের জন্য একমাত্র রাস্তা বলে মনে করছেন তিনি।
অধ্যাপক অর্পিতা মুখার্জিও তার সঙ্গে একমত -ডিউটি-ফ্রি অ্যাকসেসের সুবিধা ভারত নানা কারণে প্রত্যাহার করতে পারবে না।
অর্থনীতিবিদ ড: প্রবীর দে
তিনি বলছিলেন, "ডিউটি বাড়িয়ে ইমপোর্ট বন্ধ করা যায় না। সাময়িকভাবে গেলেও পাকাপাকিভাবে যায় না। বিদেশি মোবাইল ফোনে বিপুল ডিউটি বসিয়েও ভারতে কিন্তু মোবাইল ফোনের বিক্রিবাটা কমানো যায়নি।"
"আসলে সমস্যাটা আমাদের নিজস্ব - আমাদের ইন্ডাস্ট্রি খুব খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এখন কি বাংলাদেশের ওপর ডিউটি বসিয়ে আর চীনকে জিরো ডিউটি দিয়ে আমাদের সমস্যার কোনও সমাধান হবে?
"বাংলাদেশ আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী। দক্ষিণ এশিয়ায় যে ভারত নিজেকে নেতার ভূমিকায় দেখতে চায় সত্যিই কি তারা সেখানে বাংলাদেশকে ট্যাক্স করতে পারবে?", প্রশ্ন ড: মুখার্জির।
ফলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রফতানি, বিশেষ করে গার্মেন্ট, আরও বাড়বে এটা ধরে নিয়েই ভারতীয় নির্মাতাদের নিজেদের স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

আর সেখানে সম্ভবত ভারত সরকারের বিশেষ কিছু করণীয়ও নেই।

অরবিন্দ মিলসের কর্ণধার সঞ্জয় লালভাই, যিনি বাংলাদেশে কারখানা চালু করেছেন

Wednesday, September 25, 2019

‘রোবট শ্রমিক’ নিয়ে সামনে বড় শঙ্কা

দেশের পোশাক খাতে ইতিমধ্যেই বেশকিছু কারখানায় অটোমেশন চালু আছে। তাতে কিছুটা হলেও শ্রমিকদের বেকারত্বে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু আসছে রোবট শ্রমিক বা প্রযুক্তি পোশাক শিল্পে যুক্ত হলে উৎপাদন বাড়বে, তবে লাখ লাখ শ্রমিক জবলেস বা চাকরিচ্যুত হতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন এ শিল্পের সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি সৃষ্টি হতে পারে সামাজিক বিশৃঙ্খলা।
বর্তমানে দেশের কারখানার চিত্র হচ্ছে- এক ছাদের নিচে লাইন ধরে বসানো সারি সারি সেলাই মেশিন। এতে কাজ করছেন শত শত নারী শ্রমিক। কিন্তু যেভাবে প্রযুক্তির পরিবর্তন আসছে। দশবছর পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার এই চিত্র নাও থাকতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ রপ্তানিকারক এসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমাদের দেশে এখনো রোবটিক প্রযুক্তি চালু হয়নি। তবে বর্তমানে বেশকিছু নামিদামি কারখানায় অটোমেশন চালু আছে। এই অটোমেশন চালু হওয়াতেই একটা লেভেলে কিছু শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে। রোবটিক প্রযুক্তি নিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি চালু হলে আমাদের হয়তো উৎপাদন বাড়বে। কিন্তু লাখ লাখ শ্রমিক জবলেস হয়ে পড়বে। এর ফলে তখন সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ইতিমধ্যেই যেসব দেশে রোবট শ্রমিক চালু হয়েছে, তাতে দেখা গেছে একজন শ্রমিক একাই ১০টি মেশিন চালাচ্ছেন। যেখানে একই কাজ আগে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক করতেন। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি বর্তমানে খুবই ব্যয়বহুল। আমাদের উদ্যোক্তাদের কতজনের এই সক্ষমতা আছে তা ভেবে দেখতে হবে। কারণ এমনিতেই ক্রেতারা আমাদের পোশাকের দাম কম দিচ্ছেন। দাম বাড়াচ্ছেন না। এই অবস্থায় রোবটিক প্রযুক্তির দিকে যাওয়া কঠিন হবে। তবে সময়ই বলে দেবে কখন কি করতে হবে।
এদিকে বিবিসি’র এক খবরে নিউ ইয়র্কের শিমি টেকনোলজি নামের একটি প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সারাহ ক্রেসলি বলেন, ১০ বছর পরের পোশাক কারখানায় খুব অল্প শ্রমিকই আসলে কাজ করবে। রোবটিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি তখনো আমরা হয়তো কিছু কর্মীকে কাজ করতে দেখবো। কারখানাজুড়ে তখন বেশি থাকবে নানা ধরনের স্বয়ংক্রিয় রোবটিক যন্ত্রপাতি। থাকবে অনেক কম্পিউটার। কারখানার বড় অংশ জুড়ে থাকবে ডিজাইন রুম। বেশির ভাগ কর্মী কাজ করবে এই ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে। তার মতে, যেভাবে অটোমেশন গাড়ি নির্মাণ শিল্পকে পাল্টে দিয়েছে, এবার পোশাক শিল্পে তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব দিয়ে সারাহ ক্রেসলি জানান, বর্তমানে পোশাক শিল্পে কাজ করে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। এদের ৬০ হতে ৮৮ শতাংশ তাদের কাজ হারাবে অটোমেশনের কারণে। তার মতে, বাংলাদেশের সামনে বিপদ অনেক রকমের। প্রথমটা হচ্ছে এই অটোমেশন, যেটা ইতিমধ্যে ঘটতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বদলে যাওয়া ফ্যাশন ট্রেন্ড, যেটা বিরাট প্রভাব ফেলছে পোশাকের ব্র্যান্ডগুলোর উপর।
বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, অটোমেশন এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। একটা মাঝারি আকারের কারখানার কাটিং সেকশনে দেড়-দুইশ’ লোক লাগতো। সেখানে এখন অটোমেটিক কাটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে শ্রমিক লাগে ১০ থেকে ১২ জন। অর্থাৎ ১০ ভাগের এক ভাগ লোক লাগে। এ রকম অটোমেশন কিন্তু চলছেই। আগামী ১০ বছরে এই শিল্পে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ফজলুল হক বলেন, দেশের প্রতিটি কারখানাই এখন কম-বেশি এ রকম অটোমেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
গার্মেন্ট শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, অটোমেশন শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে, সেটা তিনি নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছেন প্রতিদিন। তিনি বলেন, সুতা কাটা, আযরন করা, কাটিং, ড্রয়িং, লে-আউট, লোডিং-আনলোডিং কোনো কাজই এখন মেশিন করছে না। বিভিন্ন ধরনের মেশিন চলে আসছে, যেখানে আর আগের মতো শ্রমিকের দরকার হচ্ছে না। তার মতে, কয়েক বছর আগেও প্রতিটি কারখানায বেশির ভাগ মেশিনে দু’জন করে লোক লাগতো। একজন মেশিনটি চালাতেন, আরেকজন উল্টোদিকে বসে সাহায্য করতেন। গত তিন-চার বছরে পর্যায়ক্রমে হেল্পারের পদ খালি হয়ে গেছে। মেশিন ওই জায়গা দখল করে নিয়েছে।
নাজমা আক্তার বলেন, মালিকরা নতুন প্রযুক্তির ব্যাপারে এত আগ্রহী হওয়ার কারণ, এটি তাদের আরো বেশি মুনাফার সুযোগ করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, তারা বলে চারটা লোক যে কাজ করে, একটা মেশিনেই এখন সেই কাজ হয়। একজন শ্রমিককে ন্যূনতম আট হাজার টাকা মজুরি দিতে হয়। চারজন শ্রমিকের পেছনে যায় প্রায় ৩২ হাজার টাকা। কিন্তু এখন নাকি আট হাজার টাকাতেই একটি মেশিন পাওয়া যায়। কাজেই মালিকরা সেই পথেই যাচ্ছেন। তার মতে, অটোমেশনের প্রথম শিকার হচ্ছেন কারখানার নারী শ্রমিকরা।
পোশাক শিল্প উদ্যোক্তা ফজলুল হক মনে করেন, যেটা বলা হচ্ছে রোবট এসে সব দখল করে নেবে এবং এর ফলে এই শিল্প আর বাংলাদেশে থাকবে না, ইউরোপ-আমেরিকাতেই ফিরে যাবে। কিন্তু এই কথার মধ্যে আমি একটা ফাঁক দেখছি। মানুষের জায়গায় রোবট বসালে তার খরচ কী দাঁড়াবে এবং সেই বিনিয়োগ সবাই করতে পারবে কি-না বা এই রোবটের অপারেশনাল খরচ কী হবে, এগুলোর কোনো পরিষ্কার জবাব কিন্তু এখনো আমি কোনো স্টাডিতে দেখিনি।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে চীন আছে শীর্ষস্থানে। তারা মোট চাহিদার ৩০ শতাংশ সরবরাহ করে। আর এরপর দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশ সরবরাহ করে মাত্র ছয় শতাংশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যবসা বাড়ানোর অনেক সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। ঠিক কৌশল নিতে পারলে বাংলাদেশের সুযোগের সীমা কিন্তু এখনো অনেক দূর বিস্তৃত করা সম্ভব।
প্রযুক্তিভিত্তিক যে নতুন শিল্পবিপ্লবের ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশে, তার ধাক্কায় গার্মেন্টস শিল্প যে আমূল বদলে যেতে চলেছে, তা নিয়ে এই খাতের কারও মনেই কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রোবটিক প্রযুক্তি যে লাখ লাখ কর্মীর কাজ নিয়ে নেবে, তার কর্মসংস্থান কোথায় হবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
>>>বিবিসি

Thursday, September 19, 2019

যেসব কারণে চরম দুরবস্থায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনকারী এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত- তৈরি পোশাক শিল্প। বিগত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি শিল্পোন্নত দেশগুলোতে শ্রমঘন এ শিল্পটি যখন পাততাড়ি গুটাতে শুরু করে তখন বাংলাদেশে শুরু হয় এ শিল্পের বিকাশ। চারদশক রমরমা বাণিজ্য করা দেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাত এখন চরম দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে।

গত পাঁচ বছরে বন্ধ হয়েছে অন্তত ১,৩০০ কারখানা। আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও হাতে কাজ না থাকায় সাময়িকভাবে উৎপাদনে নেই আরো অন্তত দেড় হাজার কারখানা। এতে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন লাখ লাখ শ্রমিক। নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রফতানি আয়ে।

এ প্রসঙ্গে সরকারপন্থি বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি রেডিও তেহরানকে জানান, তৈরি পোশাক খাতের এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এখনই জরুরি ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে কারখানা বন্ধ হয়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ছাড়াও মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরী বোর্ডের এ সদস্য।

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ প্রতি বছর গড়ে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। বিপরীতে উৎপাদিত পণ্যের দাম না বেড়ে প্রতিনিয়ত কমছে। এ সময়ে প্রধান রফতানি বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের দরপতন হয়েছে ৭ শতাংশের বেশি। ইউরোপে দরপতন হয়েছে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এছাড়া ডলারের বিপরীতে প্রতিযোগী দেশগুলোর মুদ্রা অবমূল্যায়ন হলেও বাংলাদেশে স্থিতিশীল রয়েছে। এসবের প্রভাবে দুর্যোগের ঘনঘটা বাজছে রফতানি বাণিজ্যে ৮৪ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী দেশের সম্ভাবনাময় তৈরি পোশাক শিল্পখাতে।

ব্যবসায়ী কর্তৃপক্ষের মতে, তৈরি পোশাক শিল্পখাতের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা শ্রমিক অসন্তোষ। এ সমস্যাও ততটাও জটিল হতো না যদি শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে পানি ঘোলা করায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষ তৎপর না থাকত।

দুর্নীতি বিরোধী গবেষণা সংস্থা টিআইবি সম্প্রতি জানিয়েছে, বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকরা সবচেয়ে কম মজুরী পান। বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০১ ডলার, সেখানে ভারতে ১৬০ ডলার, কম্বোডিয়ায় ১৯৭ ডলার, ভিয়েতনামে ১৩৬ ডলার ও ফিলিপাইনে ১৭০ ডলার।

প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে আসার ঘটনায় উদ্বিগ্ন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মালিকেরা ২৫ হাজার শ্রমিককে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন। এখন সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সেক্টরকে টিকিয়ে রাখা কঠিন।

বন্ড-সুবিধা অপব্যবহার

ওদিকে, বন্ড-সুবিধার অপব্যবহারে অভিযুক্ত ৬৬টি গার্মেন্টসের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। বন্ড-সুবিধার অপব্যবহার ইস্যুতে ৬৬টি গার্মেন্টস কারখানার একাটি তালিকা বিজিএমইএ’র কাছে পাঠিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ইতোমধ্যে ২৬টি কারখানা বিজিএমইএ’র কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে ব্যাখ্যা দিয়েছে।

অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান খোলাবাজারে কাপড় বিক্রিসহ গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত, তাদের বিষয়ে উভয়পক্ষ পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এই প্রবণতা বন্ধের পদক্ষেপ নেবার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিজিএমইএ'র পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যেসব কারখানার বিরুদ্ধে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেটা বিজিএমইএর নিজস্ব টিম দিয়ে গোপনে পর্যবেক্ষণের অনুরোধ জানিয়েছে শুল্ক কর্তৃপক্ষ।

Sunday, August 4, 2019

চার শতাধিক গার্মেন্টসকে সতর্কবার্তা দিল অ্যাকর্ড

অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে দেড় শতাধিক পোশাক কারখানার প্রতিনিধিদের নিয়ে ওয়ার্কশপের আয়োজন করে বিজিএমইএ। এতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাকর্ডের প্রধান নিরাপত্তা পরিদর্শক স্টিফেন কুইন। এ সময় অগ্নি নিরাপত্তা ইস্যুতে চার শতাধিক পোশাক কারখানাকে সতর্ক করে নোটিশ পাঠিয়েছে ইউরোপের ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড।

পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সঙ্গে শর্ত ভঙ্গ করে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ পাঠানোয় তারা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দেশের পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা তৈরি হয়েছে।

শনিবার (৩ আগস্ট) রাজধানী একটি স্থানীয় হোটেলে এক কর্মশালায় এ সব অভিযোগ করেন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক।

তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে অগ্নি নিরাপত্তা ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করতে বিজিএমইএর সঙ্গে সমঝোতা সাক্ষর (এমওইউ) করে অ্যাকর্ড। কিন্তু গত ২৯ জুন বিজিএমইএর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই অ্যাকর্ডের স্টিয়ারিং কমিটি কারখানা পরিদর্শনে নতুন প্রটোকল তৈরি করে।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘সে অনুযায়ী এক তরফাভাবে পোশাক কারখানাকে সতর্কতার নোটিশ পাঠাতে শুরু করে। নোটিশ পাঠানোয় ওই সব প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, অ্যাকর্ড চুক্তির মূল উদ্দেশের বর্তমান কাজের সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা অ্যাকর্ড একচ্ছত্রভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিজিএমইএকে পাশ কাটিয়ে। এভাবে চলতে থাকলে যে লক্ষে আমরা পৌঁছাতে চাই সেটা দূর থেকে দূরে চলে যাবে।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় বহু শ্রমিক হতাহতের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানা সংস্কারের জোর দাবি উঠে।এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরই ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের কাছে রফতানি করে- এমন দুই হাজার দুইশ’ কারখানা সংস্কারে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে দুটি সংস্থা কারখানা সংস্কারে কাজ শুরু করে। সোয়া দুইশ' ক্রেতা ও ব্র্যান্ড অ্যাকর্ডের সঙ্গে কাজ করছে। আর দেশের ১৬শ' কারখানা অ্যাকর্ডের সঙ্গে কাজ করছে।

এদিকে, ড. রুবানা হক আরো বলেন, ২০১৩ সালে অ্যাকর্ড কার্যক্রম শুরু করলেও ২০১৭ সালে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র পরীক্ষায় একটি সংস্থাকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওই সংস্থা সংস্কার নতুন নতুন কাজে খুত বের করছেন, সেগুলো শতভাগ পূরণ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘তাছাড়া অ্যাকর্ডভুক্ত ১ হাজার ৬০০ কারখানার মধ্যে গত ৬ বছরে মাত্র ২৪০টি কারখানাকে সার্টিফিকেট দিয়েছে। এতে ধীরগতিতে কাজ চলতে থাকলে বাকি কারখানাগুলোকে সময় দিতে আরও কত সময় লাগবে?’

বিজিএমইএ সভাপতি  বলেন, ‘যে সব কারখানাকে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে, সেগুলো অবকাঠামো এবং ইলেকট্রিক্যাল সেফটি কাজ শেষ করেছে। কিন্তু অগ্নি নির্বাপক ইস্যুতে টেস্টিং অ্যান্ড কমিশনিংয়ে আপত্তি দিচ্ছে।’

Thursday, July 18, 2019

ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য হতে পারে আশীর্বাদ by অরুন দেবনাথ

গত ৩০ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম বাংলাদেশভিত্তিক তৈরী পোশাক প্রস্তুতকারী নিউএইজ গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রির সুযোগ পেতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এ জন্য ধন্যবাদ দিতে হয় চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধকে।
হেনেস অ্যান্ড মরিজ এপির অন্যতম সরবরাহকারী নিউএইজ তিন দশক ধরে ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর সাথে কাজ করছে। এখন তারা ম্যাসিস ইন্ক, গ্যাপ ইনকর্পোরেটের সাথে কাজ করার সম্ভাবনা দেখছেন বলে এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন নিউএইজ গ্রুপের ভাইস-চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম। প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েলিটেক্স গ্রুপের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ১ জুলাই শুরু হওয়া বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক রফতানি দ্বিগুণের বেশি হয়ে বছরে ২৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে।  গ্রুপের চেয়ারম্যান ডেভিড হাসানাত এ তথ্য দিয়েছেন।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ ৩০ জুন সমাপ্ত বছরে রেকর্ড ৪০.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে। ট্রাম্প ২০০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ ভাগ করায় বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীনও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ফলে ১,৯৮১টি শুল্ক-সংশ্লিষ্ট পণ্যের অর্ধেকের বেশি ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ থেকে রফতানি হয়েছে।
নিউএইজের ইব্রাহিম বলেন, খুচরা বিক্রেতারা তাদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য বাংলাদেশ থেকে আমদানির চিন্তা করছে।
ম্যাসিস মে মাসে জানিয়েছে, তারা চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নিতে কিছু দিন ধরেই কাজ করছে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০২৪ সাল নাগাদ মোট রফতানি ৭২ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে চীনের ৪১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক বাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আর এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের মতে, আগামী দুই বছরে পোশাক খাতে ব্যবসা রেকর্ড ৮ ভাগ বাড়বে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতে ৪০ লাখ লোক কাজ করে, এই খাত থেকে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১৩ ভাগ আসে।
চীনের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফসল তুলতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম তৈরী বলে মনে করা হচ্ছে। এ দুটি দেশই হতে পারে মার্কিন আমদানিকারকদের প্রধান টার্গেট।
চাহিদা বাড়ার কারণে নিউএইজ কালিয়াকৈরে ২০ মিলিয়ন ডলারের একটি পোশাক কারখানা খুলতে এক চীনা বিনিয়োগকারীর সাথে চুক্তি করেছে। চার মাসের মধ্যে এই কারখানা উৎপাদনে যাবে।
তবে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক কারখানাগুলোর জন্য কিছু সমস্যাও আছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল কমপেটিটিভনেস ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবকাঠামোর র‌্যাংক ১০৩ নম্বরে। অথচ চীনের স্থান ২৯-এ। ফলে বাংলাদেশকে সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নত করতে হবে, পোশাক কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে, নতুন নতুন মহাসড়ক নির্মাণ করতে হবে, আরো ক্রেতা আনতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মে মাসে চট্টগ্রামের পথে চার লেনের দুটি সেতু উদ্বোধন করেছেন, মার্চে করেছিলেন আরেকটি। ফলে চট্টগ্রাম যেতে সময় অর্ধেক কমে গেছে। মহাসড়কগুলোর গতিও বাড়াচ্ছে সরকার। তারপরও ঢাকা থেকে মালামাল জাহাজে পাঠাতে রফতানিকারকদের লাগে ১৬৮ ঘণ্টা। অথচ সাংহাইতে লাগে মাত্র ২৩ ঘণ্টা।
রফতানিকারকদের উৎপাদনশীলতাও বাড়াতে হবে বলে মনে করেন ঢাকাভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য আমাদের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও অটোমেশন করতে হবে। কয়েকটি কোম্পানি অটোমেশন করলেও এই সেক্টরে আরো অনেক কিছু করা বাকি রয়ে গেছে।
তবে বাংলাদেশে কিছু মূল্য সুবিধাও আছে। চীনা রফতানি করা পোশাকের দাম পড়ে প্রায় ২.৩ ডলার, আর বাংলাদেশে পড়ে ২.৭৯ ডলার, কম্বোডিয়ায় ২.৫২ ডলার। এই হিসাব বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হকের। চীনের মূল্য সুবিধা ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই তাদেরকে এই শিল্পে এগিয়ে দিচ্ছে।
তবে এখন বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো আছে সবচেয়ে ভালো অবস্থায়। আমেরিকান ফ্যাশন লেবেলস টমি হিলফিগার ও ক্যালভিন ক্লেইনের মালিক পিভিএইচ করপোরেশনসহ ভিয়েলাটেক্স ক্লায়েন্টদের প্রায় ৩০ ভাগ এখন আমেরিকান, অথচ এক বছর আগে ছিল ২০ ভাগ।
ভিয়েলাটেক্সের চেয়ারম্যান হাসানাত বলেন, আমরা আমেরিকান কোম্পানিগুলো থেকে বেশি বেশি ব্যবসায়িক অর্ডার লাভ করার জন্য প্রস্তুত।
বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানায় কর্মকরত শ্রমিকরা, ছবি: ব্লুমবার্গ