Wednesday, May 23, 2018

সাগরপাড়ে বিদায় রাগিণী by জনি হক

একই মুখ! অ্যাক্রেডিটেশন ফটকের বাইরে গাইডের দায়িত্ব পালন করেন যারা, তাদেরকে গত তিনবারের মতো এবারও দেখেছি। কান উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের মূল ফটকে ঢোকার সময় যারা স্ক্যানার যন্ত্র দিয়ে সাংবাদিকসহ অংশগ্রহণকারী সবার ব্যাজ পরীক্ষা করেন, তাদেরও চিনতে কষ্ট হলো না। প্রেস রুমের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আয়োজকদের প্রতিনিধি আর ভেতরের সমন্বয়করাও চেনা। সংবাদ সম্মেলন কক্ষে ঢোকার আগে স্ক্যানার যন্ত্র দিয়ে যারা ব্যাজ পরীক্ষা করেন তাদেরকেও চিনি। সংবাদ সম্মেলন চলাকালে প্রশ্নকর্তাদের সমন্বয় যিনি করেন, তার সঙ্গে গত তিন আসরের মতো এবারও প্রায় প্রতিদিনই দেখা-সাক্ষাৎ হলো। প্রশ্নকর্তাদের কাছে মাইক্রোফোন পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত যে তরুণীরা, তারাও চেনা।
বছর যায়, কিন্তু বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সম্মানজনক এই আয়োজনের সঙ্গে যারা যে দায়িত্বে নিয়োজিত, তারা ফিরে আসেন প্রতিবার। তাই কান সৈকতে ঘুরেফিরে চোখে পড়ে একই মুখ! এজন্য এবার এমনও হয়েছে, মূল ফটকে যারা আর্চওয়ের সামনে ভবনে প্রবেশরত মানুষের ব্যাগ পরীক্ষা করেন, তারা শেষের কয়েকদিন তো ব্যাগ দেখাতে গেলেই ‘নো নিড’, ‘নো নিড’ বলতেন। তবুও আনুষ্ঠানিকতা মেনে ব্যাগ খুলতে গেলে বিব্রতবোধ করলেন তারা। একজন জানালেন, খুব বেশি প্রয়োজন না হলে আর আমার ব্যাগ খুলে জিনিসপত্র দেখানোর দরকার নেই।
এখানে যিনি যে দায়িত্বেই আছেন, আন্তরিকতার কমতি দেখিনি। একটা ঘটনা বলি। প্রেস রুমের কম্পিউটারগুলো ব্যবহারের জন্য পৃথক লগ-ইন নম্বর ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হয় সাংবাদিকদের। তবে এখন যে কম্পিউটারে বসে কাজ করলাম, সংবাদ সম্মেলন কিংবা অন্য যে কোনও কাজ করে ফিরে সেই একই ডেস্কটপ ফাঁকা পাওয়া যায় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। তবে লগ-ইন নম্বর একই থাকলে যে কোনও পিসি থেকে নিজের সেভ করা ছবি বা ডকুমেন্টস পাওয়া যায়। লালগালিচায় তারকা ও নির্মাতাদের প্রতিবাদ নিয়ে একটা ফটোস্টোরি করার জন্য কিছু ছবি সেভ করে রেখেছিলাম। কিন্তু পাচ্ছিলাম না। হয়তো তড়িঘড়ি করতে গিয়ে ডিলিট হয়ে গিয়েছিল। প্রেস রুমে আইটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানানোর পর দলবল নিয়ে উঠেপড়ে লাগলেন। প্রায় আধঘণ্টা ঘাম ঝরানোর পর সেগুলো কীভাবে যেন খুঁজে এনে দিলেন তারা।
প্রেস রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আশপাশে তাকিয়ে খুব একটা ভিড়ভাট্টা চোখে পড়লো না। সমাপনী দিনে কিছুটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে সব। ভবনের সামনের অংশ প্রায় ফাঁকা। আশেপাশে জনসমাগমও খুব কম। ইনভাইটেশন প্রত্যাশীরাও নেই। চারদিকে কেমন যেন নীরব শূন্যতা। স্কেটিংয়ের মাধ্যমে যেতে যেতে তিন তরুণী পত্রিকা বিলি করছে। হলিউড রিপোর্টার, গ্রাজিয়া, ভ্যারাইটিসহ চলচ্চিত্র বিষয়ক বিখ্যাত পত্রিকাগুলো প্রতিদিনই কান উৎসব নিয়ে বিশেষ সংখ্যা ছাপিয়ে বিনামূল্যে সাংবাদিকসহ সিনেমানুরাগীদের বিলিয়ে দিয়েছে।
তবে শেষ দিন হওয়ায় পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের তিনতলার ম্যাগাজিন রাখার তাকগুলো ফাঁকা। দোতলার প্রেস রুমের মতো তিন তলার সংবাদ সম্মেলন কক্ষ, ওয়াইফাই জোন আর প্রেস লকারের সামনেও সাংবাদিকদের আনাগোনা খুব কম। সম্মেলন কক্ষের বাইরে গত ১১ দিন তারকাদের অটোগ্রাফ নেওয়া ও তাদের ছবি তোলার যে ভিড় ছিল, তার ছিটেফোঁটাও নেই।
প্রেস রুমে ফিরে দেখা হলো ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক রড্রিগোর সঙ্গে। গত তিনবারও আমাদের দেখা হয়েছে। আমরা আড্ডায় পাম দ’রের ভবিষ্যদ্বাণী করলাম কিছুক্ষণ। বিকালে ফিপরেস্কি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে চীনা সাংবাদিক শুশাঙ রাঙের সঙ্গে কথা হলো। তার সঙ্গেও গত তিনবার আড্ডা হয়েছিল। এবারও পাম দ’র নিয়েই প্রেডিকশন। তাকে কেন যেন বললাম, এবার স্বর্ণ পাম এশিয়ায় আসবে! কিন্তু তিনি খুব একটা আশাবাদী হলেন না এ বিষয়ে। পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের চতুর্থ তলায় সাল দো আম্বাসেডরে ফিপরেস্কি দেওয়া হয়। এই জায়গাটা তখন ছিল লোকে লোকারণ্য। সঙ্গে শ্যাম্পেনের গ্লাস।
সাল দো অ্যাম্বাসেদরে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে ভূমধ্যসাগরের সৌন্দর্য চলে আসে দৃষ্টির সীমানায়। সাগরের তীরে আছে হেলিপ্যাড। তার ওপরে অসংখ্য কবুতর। কানের এখানে-সেখানে অসংখ্য কবুতর চোখে পড়ে। লর্ড ব্রোগহাম স্কয়ারের সামনেও বেশকিছু কবুতরের আনাগোনা থাকে। ১৮৬৮ সালের মে মাসে কানে মৃত্যুবরণ করেন গ্রেট ব্রিটেনের এই লর্ড চ্যান্সেলর। তার সম্মানে তৈরি করা হয়েছে একটি ভাস্কর্য, এর সামনে ছোট জলবাগান। অন্য পাশে একটি পানির ফোয়ারা। এ দুটি স্থাপনার পাশেই ম্যাকডোনাল্ড’স। প্রতিদিন সেখানে খেতে গেলে কবুতরগুলো স্বাগত জানায়।
লাঞ্চ সেরে হেঁটে এগোলাম রিভিয়েরার (ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল) দিকে। কান উৎসবকে লক্ষ্য রেখে সাগরের তীর ঘেঁষে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত টিভি ও চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠানের প্রমোদতরীগুলো (ইয়ট)। কানের চারদিকেই সাগরপাড়, সবই দেখতে বেশ নয়নাভিরাম। চোখের সামনে ভূমধ্যসাগরের কী অবিশ্বাস্য সুন্দর! দূর পাহাড়ের গায়ে থোক থোক ঘরবাড়ি। নিচে সুনীল জলরাশি। এখানকার সৌন্দর্য দেখে আনমনা হয়ে যাবেন যে কেউ। প্রকৃতি তার ঐশ্বর্য যেন দু’হাত ভরে দিয়েছে ফরাসি সমুদ্র উপকূলকে। শহরটা এককথায় রূপবতী। আকাশছোঁয়া পাহাড় আর মায়াবী সাগরের রূপ যেন বেঁধে রাখতে চায়!
কান উৎসবের আরেক মায়াবী জায়গা টকটকে লালগালিচা। সেখানে বিশ্ব চলচ্চিত্রের তারকা-মহাতারকাদের পায়চারির ছবি বিক্রি হয় এমন একটি বুটিক শপ প্রতিবারই দেখেছি। এই দোকানের ভেতরে মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তোলা বারণ। এখানে গত ৮ মে উৎসবের উদ্বোধনী থেকে শুরু করে প্রতিদিনের লালগালিচার ছবি সাজানো আছে তারিখ অনুযায়ী। ছোট আকারের একেকটি ছবির জন্য নেওয়া হচ্ছে ২৫ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই হাজার টাকারও বেশি)। মাঝারি আকারের প্রতিটির মূল্য ৩০ ইউরো (তিন হাজার টাকারও বেশি)। আর একটু বড় আকারের ছবি নিতে গেলে গুনতে হবে ৪০ ইউরো করে (চার হাজার টাকারও বেশি)। ইমেইল, সিডি কিংবা পেনড্রাইভে চাইলেও এখান থেকে লালগালিচায় তারকাদের পা মাড়ানোর ছবি কেনা যায়। এজন্য প্রতিটি ছবির বেলায় লাগবে ৩০ ইউরো।
উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দো ফেস্টিভ্যালে ফিরে সিঁড়ি বেয়ে নিচতলায় নেমে দেখি মার্শে দ্যু ফিল্ম আর শর্ট ফিল্ম কর্নার প্রায় নিষ্প্রাণ। সবাই ইতোমধ্যে ছেড়ে গেছেন কান। চারপাশে বিদায় বিদায় ভাব। ততোক্ষণে সমাপনী অনুষ্ঠান শুরুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। শেষ সময়টা কাটলো তুমুল ব্যস্ততায়। ইচ্ছে ছিল প্রতিটি পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণার পরেই নিউজ পাঠিয়ে দেবো। বিশ্বের যে কোনও সংবাদমাধ্যমের আগে তা প্রকাশের একটা নিরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। বাংলা ট্রিবিউনে যথাসময়ে নিউজগুলো প্রকাশের পর বিখ্যাত সংবাদ সংস্থাগুলো ঘেঁটে দেখলাম- আমরাই সবার আগে, আমরা সফল!
সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে মূল প্রতিযোগিতার বিচারক ও বিজয়ীরা বেরিয়ে এলেন গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরের বাইরে। তখন স্টিং আর শ্যাগি গাইতে শুরু করেছেন। আমজনতার মধ্যে হৈচৈ, কোলাহল আর উন্মাদনার হাওয়া বয়ে গেলো। প্রেস রুম থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সবাইকে। আগের ১১ দিন এখান থেকে ভিডিও করলে দায়িত্বরত কর্মীরা বাধা দিতেন। শেষবেলায় তারা আর বললেন না ‘নো ভিডিও।’
দক্ষিণ ফরাসি উপকূলের শহর কানে এবার থাকলাম ১৬ দিন। দিনভর ছবি দেখা, সংবাদ সম্মেলনে যাওয়া, এদিক-সেদিক ঘোরাফেরার ফাঁকে লিখে রাতে হোটেলে ফিরে আবারও বসে পড়তে হতো ল্যাপটপ নিয়ে। রাতে সব মিলিয়ে ঘুমানোর সুযোগ ছিল মাত্র চার ঘণ্টা। ভোর হলেই আবার দে ছুট! উৎসব শেষে মনে হলো শরীর জুড়ে ক্লান্তির পাহাড়।
২০ মে সকালেই চলে এলাম কানে। ট্রেনে চড়ে প্যারিস যাবো। দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে ছাড়বে ট্রেন। গার দি কানে (ট্রেন স্টেশন) পৌঁছার সময় রোজ দেখা হয়েছে মেরিলিন মনরোর সঙ্গে! রিভিয়েরা হোটেলের দেয়ালজুড়ে প্রয়াত কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীর বিশাল ছবি দেখে মনে হবে তিনি জীবন্ত! শেষ দিনেও মনরোর চোখে চোখ পড়লো।
ট্রেন আসতে ঘণ্টাখানেক বাকি। এই ফাঁকে পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের সামনে একচক্কর দিয়ে এলাম। গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরের সামনে রেড কার্পেট নেই। আশপাশে হাতেগোনা কয়েকজন পথচারীকে চোখে পড়লো। গত ১২ দিন কান উৎসবকে ঘিরে মাতামাতি দেখে মনে হয়েছে এটাই চলচ্চিত্রের তীর্থস্থান। ৮ মে থেকে সেখানে ছিল জনারণ্য। ১৯ মে এই মহাযজ্ঞের পর্দা নামার পরদিনই সব হয়ে পড়েছে নিষ্প্রাণ। মার্শে দ্যু ফিল্ম ভবন ও বিভিন্ন দেশের প্যাভিলিয়নের অংশে এসে দেখি সব শুন্য। সাগরপাড়ের সবখানে যেন বিদায় রাগিণী।

সৌদি ফেরত বাংলাদেশি নারীদের মুখে লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা by রোকনুজ্জামান পিয়াস

ভালো নেই সৌদি আরবে কাজের সন্ধানে যাওয়া গৃহকর্মীরা। গৃহকর্তার নির্যাতনে তাদের কারো হাত ভেঙেছে, কারো পা। কারো শরীরে ইস্ত্রির ছ্যাঁকা দেয়া হয়েছে। নির্মম নির্যাতনে কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। আবার কেউ নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এদের মধ্যে দু’একজন মারাও গেছেন।
নির্যাতনে কারো কারো শরীরে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। তবে, শারীরিক এই নির্যাতনের বাইরে সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ, অধিকাংশ নারীই মারত্মক যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন দেশটিতে। একই পরিবারের একাধিক পুরুষ সদস্যের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ। এমনকি বাবা-ছেলে মিলেও ধর্ষণ করে গৃহকর্মীকে। নির্যাতন এতটাই ভয়াবহ যে, এতে করে জড়ায়ুতে ক্ষত তৈরি হয়েছে। গৃহকর্তার এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকে সুযোগ বুঝে পালিয়ে আসছেন। আর যারা এ সুযোগ পাচ্ছেন না তারা প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন। আড়ালেই  থেকে যাচ্ছে হতভাগ্য ওই নারীদের ঘটনা। এদিকে এসব ঘটনার শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা অনেক নারী কর্মীই পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে পড়েছেন। সামাজিকভাবেও নানা নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন তারা। এমনকি স্বামী ও পিতা-মাতার সংসারেও ফিরতে পারছেন না কেউ কেউ। সূত্র বলছে, গত চার মাসে প্রায় আড়াই হাজার নারী কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরমধ্যে শতকরা ৮০ জনই ভয়াবহ রকমের যৌন নির্যাতনের শিকার। ফিরে আসা নারীরা দেশটিতে আর কোনো নারী কর্মী না পাঠাতেও অনুরোধ করছেন। এদিকে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি নারী কর্মীদের পাঠাচ্ছে তারাও এসব ঘটনার দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। নির্যাতিতদের ফিরে আনা হচ্ছে সরকারি তহবিলের টাকা খরচ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এনজিওর সহযোগিতায় তারা দেশে ফিরছেন। অপরদিকে মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের মধ্যেই দেশটিতে নারী কর্মী পাঠানো অব্যাহত রয়েছে। বিএমইটি সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিলে সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে ৮ হাজার ৪৯২ জন নারী কর্মী পাঠানো হয়েছে। আর চলতি বছরের গত চার মাসে গেছে ৩০ হাজারের ওপরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদিতে গৃহকর্মী পাঠানো উচিত কি না- সে ব্যাপারে এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় হয়েছে।
জানা গেছে, নির্যাতনের কারণে অনেক আগেই সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ। এরমধ্যে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কা অন্যতম। এইসব দেশ তাদের নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়ার পর সৌদি আরবে চাহিদা বাড়ে বাংলাদেশের নারী কর্মীদের। এজেন্সিগুলো নারী কর্মী পাঠানোর দিকেই ঝুঁকে পড়ে। কারণ একজন নারী কর্মীর বিনিময়ে তার সৌদির সংশ্লিষ্ট গৃহকর্তার কাছ থেকে বিপুল পরিমান অর্থ পেয়ে থাকে। যার ফলে বিনা পুঁজির ব্যবসার মতো তারা দেদারছে পাঠাচ্ছেন নারী কর্মী।
সূত্রমতে, দেশটিতে নারী কর্মী পাঠানোর পর থেকেই একের পর এক নানা অভিযোগ আসতে থাকে। নারী কর্মীরা অভিযোগ করেন, তাদেরকে ঠিকমতো খেতে দেয়া হয় না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে দেয়া হয় না। টানা ২০ ঘণ্টাও কাজ করতে হয় কখনো কখনো। এ ছাড়া এক বাড়িতে কাজের কথা বলে নিয়ে গেলেও একাধিক বাড়িতে তাদের কাজ করানো হয়। অপরাগতা দেখালে নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিনের পর দিন অসুস্থ থাকলেও অনেকের ভাগ্যে  জোটে না চিকিৎসা। এমনকি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করতে দেয়া হয় না। একই পরিবারের একাধিক সদস্য মিলে যৌন নির্যাতন চালায়। নির্যাতিত নারী কর্মীরা অনেকেই পালিয়ে গিয়ে দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সেইফ হোমে আশ্রয় নেন। অনেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। এরপর জেল জীবন শুরু হয় তাদের। পরে নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে কেউ দেশে ফেরার সুযোগ পান। আবার আইনি জটিলতায় অনেকেই মাসের পর মাস জেলে অথবা দূতাবাসের সেইফ হোমে কাটাচ্ছে। তবে, সম্প্রতি এই অভিযোগের মাত্রা বেড়েছে। ফিরে আসা নারীদের সংখ্যাও বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ফিরে আসছেন নারী কর্মীরা।
সর্বশেষ গত রোববার রাতে সৌদি থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফেরেন ২১ নির্যাতিত নারী। এর আগের দিন ফেরেন আরো ৮১ নারী। রোববার ফিরে আসা হবিগঞ্জের একজন জানান, তিনি ১৫ দিন আগে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আবর গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যে বাসার কাজে তাকে দেয়া হয়েছিল সেই বাসার মালিক লুইচ্চা। বলেন, ম্যাডাম বাসায় না থাকলে মালিক তার ওপর যৌন নির্যাতন চালানোর চেষ্টা করতো। তিনি রাজি না হওয়ায় মারধর করতো। ক্ষতের দাগ দেখিয়ে এই নারী বলেন, এটা ইস্ত্রির দাগ। তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গরম ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, মধ্যবয়সী গৃহকর্তা একদিন কফি বানাতে বলে। তার কথা মতো রান্না ঘরে গেলে সে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। চিৎ করে ফেলে দেয়। পরে হাতে কামড় দিয়ে ছাড়া পান। কিন্তু পরক্ষণে আবারো একই কাজ করে। তখন হাতে থাকা গ্যাস লাইট দিয়ে তার পাঞ্জাবিতে আগুন ধরিয়ে দিই। পরে নিজেই তা নিভিয়ে ঘরের দরজার বাইরে থেকে সিটকিনি দিয়ে পালিয়ে আসি। পরে এক বাংলাদেশির সহযোগিতায় সেইফ হোমে যাই। সেখান থেকেই দেশে ফিরেছি। তিনি বলেন, আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই। তার বাড়ি থেকেও কেউ ফিরিয়ে নিচ্ছে না। রোবাবর হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে থাকা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের মিডিয়া কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন একাধিকবার ফোন করেও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাননি। তার স্বামীও তাকে নিতে চাননি। এই অবস্থায় রাতভর তিনি বিমানবন্দরেই কাটান। পরে ব্র্যাকের সহযোগিতায় তাকে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের শেল্টার হোমে পাঠানো হয়। হবিগঞ্জের এই নারীসহ বিমানবন্দরে প্রত্যেকে তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। এদিকে বিভিন্ন সময় ফিরে আসা নারীদের সঙ্গে কথা বলে ভয়াবহ তথ্য জানা গেছে। রেশমা (ছদ্মনাম) নামের এক নারী বলেন, তিনি যে বাড়িতে কাজ করতেন সেই বাড়িন গৃহকর্তা ও তার ছেলে দু’জনেই যৌন নির্যাতন চালাতো। পরে পালাতে গিয়ে তার পা ভেঙে যায়। আকলিমা (ছদ্মনাম) জানান, তাকে সৌদি নিয়ে যাওয়ার পর জেদ্দার যে বাড়িতে রাখা হয়, সেখানে শুধু ১০-১২ জন পুরুষ ছিল। তারা তার ওপর অমানাবিক নির্যাতন চালাতো। আনোয়ারা নামের একজন জানান, শারীরিক নির্যাতন শেষে তাকে দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি থেকে ফেলে দেয়া হয়। ফলে পা ভেঙে যায়। সে জানায়, প্রথমে পালানোর সময় ধরা পড়ে। এরপর থেকেই তার ওপর চলতে থাকে নির্যাতন। বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার এক নারী জানান, গত বছর জুন মাসে সৌদি আরব যান তিনি। সেখানে ছয় মাস নিয়োগকর্তা ও তার ছেলের যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি। কোনো উপায় না পেয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন দূতাবাসে। মুন্সীগঞ্জের এক নারী জড়ায়ুতে ইনফেকশন নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। ফরিদপুরের অপর এক নারীর হাতের হাড় ভেঙ্গে অন্য স্থান দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। ১০ মাস অবস্থান কালে আট মাসের বেতন ছাড়াই ২৬ জন নারীর সঙ্গে তিনিও ফিরেছেন।
সৌদির গৃহকর্মীর বর্তমান অবস্থা ও এ ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, গত ২-৩ মাসে তারা ১১৮ পরিবারের কাছ নির্যাতেনের অভিযোগ পেয়েছেন। ইতিমধ্যে ব্র্যাকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৭১ জনকে ফেরত আনা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাপারে তিনি বলেন, ২০১৫ সালে যখন বিভিন্ন দেশ সৌদি আরবে তাদের নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়, তখন বাংলাদেশের নারী কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়। ওই সময় নির্যাতনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছিল। তারা (সৌদি) সে সময় নির্যাতিত হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, যারা ফেরত আসছে তারা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং দিনকে দিন এ সমস্যা বাড়ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, আমরা তাদেরকে (সৌদির নিয়োগকর্তা) কিছুই বলছি না। এতে করে তারা ভেবে নিয়েছে- বাংলাদেশের নারীদের যা ইচ্ছা তাই করা যায়। এমনকি সেইফ হোমে নির্যাতিত যেসব নারীরা আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই নিয়োগ কর্তার বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। শরিফুল হাসান আরো বলেন, আমরা শুধু সংখ্যার বিচার করছি। কিন্তু কতজন নির্যাতিত হচ্ছে, কতজন ফেরত আসছে, সে হিসাব আমাদের কাছে নেই। শুধুমাত্র যারা ফেরত আসছে তাদের কাছ থেকেই ঘটনাগুলো জানতে পারছি। তিনি বলেন, সংখ্যা না দেখে, তাদের সেফটির বিষয়টি ভাবা উচিত। তিনি আরো বলেন, যেসব নারীরা ফেরত আসছে তারাও ভালো নেই। অনেকে ট্রমাটাইজড্‌ হয়ে যাচ্ছে। এই অভিবাসী অধিকার কর্মী বলেন, এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেয়ার- সেখানে আমরা নারী কর্মী পাঠাবো, না কি পাঠাবো না। অন্য দেশে পাঠালেও সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর  ব্যাপারে নতুন করে ভাবা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রতিবাদের হাতিয়ার লালগালিচা

রূপবতীদের মেলা, নজরকাড়া পোশাক আর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দুর্দান্ত কিছু নতুন ছবির সুবাদে কান অনেক বছর ধরেই চলচ্চিত্রানুরাগীদের কাছে তীর্থস্থান। সিনেমার এই বৈশ্বিক মঞ্চের অন্যতম আকর্ষণ লালগালিচা। শুধু রূপের জৌলুস নয়, বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই উৎসবের ৭১তম আসরের লালগালিচা হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। রাজনৈতিক ইস্যুতে শক্তিশালী বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন তারকারা। এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী হলো দক্ষিণ ফ্রান্সের শহর কান। চলুন ফিরে দেখি-
১. গাজা সীমান্তে ৬০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যার প্রতিবাদ জানান সিরিয়ার ‘মাই ফেভারিট ফেব্রিক’ ছবির অভিনেত্রী মানাল ইসা। ‘সলো: অ্যা স্টার ওয়ার্স স্টোরি’র প্রিমিয়ারে অংশ নিতে এসে ২৬ বছর বয়সী এই ফরাসি-লেবানিজ তারকা দু’হাত উঁচু করে একটি কাগজ তুলে ধরেন। এতে লেখা ছিল ‘গাজায় হামলা বন্ধ করুন!!’ জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস খোলার প্রতিবাদ করায় বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মমভাবে গুলি চালায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
1 ‘মাই ফেভারিট ফেব্রিক’ ছবির অভিনেত্রী মানাল ইসা
২. ‘ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান’ ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগে পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের সামনে লালগালিচায় দুটি আংটি পরে আসেন স্পাইক লি। এর একটিতে লেখা ছিল ‘লাভ', অন্যটিতে ‘হেট’। আংটি জোড়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ বিভাজনের মনোভাবকে নিন্দা জানান তিনি।
3
আংটি জোড়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ বিভাজনের মনোভাবকে নিন্দা
৩. লালগালিচায় স্পাইক লি'র পায়ে ছিল একজোড়া নাইকি জুতা। এর একটি সাদা, অন্যটি কালো। দুটি জুতাতেই উল্লেখ ছিল নিজের ছবির নাম ‘ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান’। বর্ণবাদী মানুষদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তার ওই জুতাজোড়া।
2.
স্পাইক লি'র পা
৪. কান উৎসবের লালগালিচায় নারীদের পায়ে উঁচু হিল থাকতেই হবে, এমন একটা অঘোষিত নিয়ম আছে। সেই ফ্যাশন নীতিকে বিদ্রূপ করেছেন ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট। ‘ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান’ ছবির প্রিমিয়ারের আগে উঁচু হিল খুলে খালি পায়ে কানের লালগালিচায় হেঁটেছেন ‘টোয়াইলাইট’ তারকা।
4
ফ্যাশন নীতিকে বিদ্রূপ
৫. কান চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচায় একত্রিত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্র শিল্পে যুক্ত ৮২ জন নারী। তাদের মধ্যে ছিলেন জেন ফন্ডা, সালমা হায়েক, কেট ব্ল্যানচেট, মারিয়ন কঁতিয়া, নন্দিতা দাসের মতো তারকারা। বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে সংগ্রামরত নারীদের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠস্বরের ডাক দিতে সমবেত হলেন তারা।
5 (1)
সম্মিলিত প্রতিবাদ
5 (3)
সম্মিলিত প্রতিবাদে তারকারা
5 (4)
দু’হাত তুলে সম্মিলিত প্রতিবাদে
5 (2)
সম্মিলিত প্রতিবাদের পুরো চিত্র
৬. ২০২০ সালের মধ্যে লিঙ্গ সমতা আনার লক্ষ্যে হলিউডে চলছে ফিফটি/ফিফটি আন্দোলন। লালগালিচায় এর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন ইতালিয়ান অভিনেত্রী অ্যালবা রোরওয়াচার।
6
ফিফটি/ফিফটি আন্দোলন
৭. পর্তুগালের জোয়াও সালাভাজা ও ব্রাজিলের নারী নির্মাতা রেনে নাদের মেসোরার ‘দ্য ডেড অ্যান্ড দ্য আদারস’ ছবির কলাকুশলীরা লালগালিচায় দু’হাত উঁচু করে কয়েকটি লাল কাগজে তুলে ধরেন। এসবে কালো অক্ষরে লেখা ছিল বিভিন্ন বার্তা। কেউ তুলে ধরেন, ‘আদিবাসীদের জমি বুঝিয়ে দিন এখনই।’ কারও হাতের কাগজে ছিল, ‘আদিবাসীদের ওপর গণহত্যা বন্ধ করুন।’ আরেকজনের বার্তায় দেখা গেছে, ‘সীমানা নির্ধারণ হোক এখনই।’ কেউবা বলেছেন, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জমি নির্ধারণ করুন।’ ছবিটির গল্প আদিবাসীদের ঘিরে।
7 (1)
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিবাদ
৮. কান উৎসব চলাকালে প্রকাশিত হয়েছে ‘ব্ল্যাক ইজ নট মাই জব’ নামের একটি গ্রন্থ। এটি সম্মিলিতভাবে লিখেছেন ১৬ জন কৃষ্ণাঙ্গ নারী। লালগালিচায় তারা সমবেত হয়ে বর্ণবাদ বিরোধী বার্তা ছড়িয়েছেন।
8
‘ব্ল্যাক ইজ নট মাই জব’-এর বিশেষ কাজ!
৯. ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহিকে গৃহবন্দি করে রেখেছে ইরান সরকার। ‘থ্রি ফেসেস’ ছবির প্রদর্শনীর আগে তার ছেলেমেয়ে সোলমাজ পানাহি ও পানাহ পানাহি লালগালিচায় একসঙ্গে হাজির হয়ে মনে করিয়ে দিলেন সেই বার্তা।
9
জাফর পানাহির জন্য প্রতিবাদ
১০. রুশ নির্মাতা কিরিল সেরেব্রেনিকভকে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গৃহবন্দি করে রেখেছে রাশিয়ার সরকার। তাই প্রতিবাদ জানাতে তার নতুন ছবি ‘লেটো’র প্রিমিয়ারের আগে লালগালিচায় ‘কিরিল সেরেব্রেনিকভ’ লেখা বড় কাগজ হাতে নিয়ে আসেন অভিনেত্রী ইরিনা স্তাশেনবাউম। লালগালিচায় হাঁটার পর পরিচালকের নাম লেখা বড় কাগজটি সহশিল্পীদের হাতে দিয়ে দু’হাতে ভালোবাসার চিহ্ন দেখান ইরিনা। ‘লেটো’র কলাকুশলীরা লালগালিচায় পা মাড়িয়ে সিঁড়িতে উঠে দাঁড়ালে ‘কিরিল সেরেব্রেনিকভ’ লেখা বড় কাগজটি আলোকচিত্রীদের দিকে তুলে ধরেন কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো। আরেকজন ‘ফ্রি সেরেব্রেনিকভ’ কাগজ হাতে নিয়ে লালগালিচায় হেঁটে সংহতি প্রকাশ করেন। আর কিরিলের একটি ছবি থাকা মনোগ্রাম একহাতে প্রদর্শন করেন ‘লেটো’র অভিনেতা টিও ইও।
10 (1)
কিরিল সেরেব্রেনিকভর জন্য প্রতিবাদ
10 (5)
কিরিল সেরেব্রেনিকভর জন্য প্রতিবাদ

ফিস্টুলায় আক্রান্ত ৭০ হাজার নারী: ভুল অস্ত্রোপচারে বাড়ছে রোগী by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

বাংলাদেশে ৭০ হাজারের বেশি নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত। প্রতিদিনই এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আর বাড়ার বহরে গতি জোগাচ্ছে ভুল অস্ত্রোপচারজনিত ফিস্টুলা। দেশে প্রতিবছর দুই থেকে তিন হাজার নতুন ফিস্টুলা রোগী যোগ হচ্ছেন। বছরে তিন শতাধিক রোগীকে অপারেশন করান চিকিৎসকরা। এনজেন্ডারহেলথ্‌ বাংলাদেশের ‘ফিস্টুলা কেয়ার প্রকল্প’র গবেষণা প্রতিবেদন মতে, প্রতি হাজার বিবাহিত নারীর বিপরীতে বাংলাদেশে ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীর সংখ্যা ১ দশমিক ৭ জন। উপযুক্ত বয়সের আগে বিয়ে ও গর্ভধারণকারী নারীদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা বেশি বলেও এতে উল্লেখ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রসবজনিত (বাধাগ্রস্ত প্রসব) কারণে ৭৬ শতাংশ এবং অস্ত্রোপচারজনিত কারণে ২৪ শতাংশ নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আর অস্ত্রোপচারজনিত কারণে ৮০ শতাংশ (জরায়ু অপসারণের ফলে) এবং ২০ শতাংশ সিজার পরবর্তী আঘাতের কারণে ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা অপারেশনের মাধ্যমে ৮০ থেকে ৮৩ ভাগ ফিস্টুলা ঠিক করা সম্ভব বলে তারা মত দিয়েছেন। তারা বলছেন, দেশে ইতিপূর্বে জাতীয় পর্যায়ে ফিস্টুলা বিষয়ে কোনো জরিপ চালানো হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা গত ১০ বছরে দেশে ফিস্টুলা রোগী দ্বিগুণ হয়েছে।  ফিস্টুলা প্রতিরোধ না করে শুধু চিকিৎসা দিয়ে এ জটিলতা দূর করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশে চিকিৎসকদের মধ্যে গাইনি চিকিৎসক বেশি। এদের মধ্যে ফিস্টুলা চিকিৎসক নেই বললেই চলে। এই সংখ্যা মাত্র ২৫ থেকে ৩০ জন সার্জন রয়েছেন। দেশে ৬৪ থেকে ৬৫ শতাংশ মায়েদের ডেলিভারি এখনো বাড়িতে হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যেসব দেশে দক্ষ ব্যক্তির সহায়তা ছাড়া বাড়িতে ৫০ শতাংশের বেশি  সন্তান প্রসব হয় এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি, সেসব দেশে বছরে দুই হাজার নারী নতুন করে ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন। এ হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই হাজার ফিস্টুলা রোগী বাড়ছে। তবে নারীরা লজ্জা পান এবং গোপন রাখেন বলে ফিস্টুলার সঠিক পরিসংখ্যান জানা কঠিন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ মতে, বিশ্বে আনুমানিক ২ মিলিয়নেরও বেশি অর্থাৎ ২০ লাখ নারী ফিস্টুলা রোগে আক্রান্ত এবং প্রতিবছর আনুমানিক এক লাখেরও বেশি নারী নতুন করে এতে আক্রান্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর মাত্রা বেশি।
সূত্র জানায়, ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বছরে ২৫০ থেকে ৩০০ ফিস্টুলা রোগী সেবা নিচ্ছেন। এখানে আগে ১৬টি বেড ছিল। কিন্তু দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণে বর্তমানে বেড সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৫ উন্নীত করা হয়েছে। অন্যদিকে, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) সি-ব্লকে ৬টি বেড নিয়ে আলাদাভাবে ফিস্টুলা সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে গত ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে এ সেন্টার থেকে রোগীদের সেবা দেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, অসচেতনতার কারণে মূলত নারীরা ফিস্টুলা রোগে আক্রান্ত হন। বাংলাদেশ শিশু মৃত্যুর হারে সাফল্য অর্জন করলেও নিরাপদ প্রসব এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। অসতর্কতা, মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া, অদক্ষ দাইয়ের হাতে সন্তান প্রসব, সঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে না যাওয়া এবং পরিবারের অবহেলার কারণে এখনো দেশের অনেক মা প্রসবকালীন সময়ে সঠিক সেবা পান না। ফলে নারীরা ফিস্টুলা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
গত ১৯ বছর ধরে ফিস্টুলা রোগে ভুগছেন আকলিমা। এখন বয়স ৪৬ বছর। প্রথম বাচ্চা সিজার করতে গিয়ে এই রোগের সৃষ্টি হয়। একটি বেসরকারি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই রোগের সৃষ্টি। প্রসব ব্যথা ওঠার ৫ দিনের মাথায় ক্লিনিকে নেয়া হয় তাকে। ততক্ষণে পেটের বাচ্চাটিও মারা যায়। এরপর আর সন্তান হয়নি আকলিমার। তিনি বলেন, কোনো ছেলেমেয়ে নেই। স্বামী তাকে সহযোগিতা করছেন।
চিকিৎসকদের মতে, ফিস্টুলা একটি নিরাময়যোগ্য শারীরিক সমস্যা। দক্ষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এ সমস্যা নিরাময় সম্ভব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা অপারেশনের মাধ্যমে ফিস্টুলা ঠিক করা যায়। বাল্যবিয়েকে নারীজনিত ফিস্টুলার অন্যতম কারণ বলা হয়। বাল্যবিয়ে বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কম বয়সে গর্ভধারণ করলে ফিস্টুলা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই উপযুক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করে পরিণত বয়সে সন্তান নেয়া উচিত। উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর সহায়তায় প্রসব করালে ফিস্টুলা ঝুঁকি কম থাকে। বাধাগ্রস্ত প্রসবের ক্ষেত্রে দ্রুত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিতে হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জাতীয় ফিস্টুলা সেন্টারসহ দেশের ১১টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ঢাকা এবং যশোরের আদ-দ্বীন হাসপাতালে, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতালে এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ল্যাম্বসহ ৮টি বেসরকারি হাসপাতালে এনজেন্ডারহেলথ্‌? ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছে। ঢাকায় এই রোগীদের জন্য একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রও পরিচালিত হচ্ছে। সূত্র জানায়, নগরের ১৮/২ বকশীবাজারে প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোগী চিকিৎসা, আরোগ্য ও পুনর্বাসন প্রকল্পের কার্যালয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ইউএনএফপিএ’র সহায়তায় পরিচালিত প্রকল্পের আওতায় এ পুনর্বাসন কেন্দ্রে ২৮ জন নারীর থাকার ব্যবস্থা আছে। কেন্দ্রের ভেতরেই বেকারি, সেলাই, রান্না, সবজির বাগান তৈরি, হাঁস-মুরগি পালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার ব্যবস্থা আছে। প্রশিক্ষণ পেয়ে এক সময়ে সমাজচ্যুত এই নারীরা এখন অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী।
ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের  সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. ফেরদৌসি ইসলাম লিপি জানান, বাড়িতে বাধাগ্রস্ত প্রসব কমাতে দরকার দক্ষ ধাত্রী। তাহলে ফিস্টুলা কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রসবের সঠিক সময়ে পাটোগ্রাফ ব্যবহার করতে হবে। থাকতে হবে পূর্ব প্রস্তুতিও। মানুষের মধ্যে সচেতনতাই পারে এ রোগ থেকে মুক্তি দিতে। বিলম্বিত প্রসব রোধ করতে মায়েদের পার্শ্ববর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করতে হবে। তিনি আরো বলেন, বাধাগ্রস্ত ফিস্টুলা কিছুটা কমলেও গাইনোকোলজিক্যাল অস্ত্রোপচারে বাড়ছে ফিস্টুলা। এজন্য চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ পরিস্থিতিতে ২৩শে মে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি নানা আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ব ফিস্টুলা দিবস পালন করা হবে।

বিচার পেতে ধর্ষিতাদের যন্ত্রণাদায়ক লড়াই by মরিয়ম চম্পা

এ এক দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক লড়াই। বিচার চাওয়াও যেন ধর্ষিতাদের অপরাধ। পদে পদে ভোগান্তি আর হয়রানি। কখনো সইতে হয় উল্টো অপবাদ। যথাযথ মেডিক্যাল পরীক্ষা না হওয়ায় ন্যায় বিচারও নিশ্চিত করা যায় না বহুক্ষেত্রে। আদালতের পরিবেশও থাকে না নারীর প্রতি সহায়ক। ধর্ষণের শিকার হওয়াদের জীবনটাই যেন  এক নরকযন্ত্রণা।
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ধর্ষণের ঘটনা যতটা শুনি বা প্রচার হয় শাস্তির ঘটনা ততটা শুনি না। একজন ধর্ষিতা নারীকে থানা পুলিশ থেকে শুরু করে কোর্ট প্রতিটা স্তওে হেনস্থার শিকার হতে হয়। তাকে খারাপ মেয়ে হিসেবে দেখা হয়। থানায় মামলা করতে বা আসামি পক্ষের আইনজীবী যেভাবে প্রশ্ন করে তখন কিন্তু তার মনোজগত ভেঙে যায়। তাকে বারবার একই হয়রানির শিকার হতে হয়। যেন ধর্ষিতা হওয়াই তার অপরাধ। ফলে ভুক্তভোগী নারীরা মামলা করতে চায় না। সম্প্রতি বাংলাদেশে টু ফিঙ্গার টেস্ট পদ্ধতিটা বাতিল করা হয়েছে যেটা নিঃসন্দেহে ভালো সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া হাইকোর্টে একটি নতুন রুল জারি হয়েছে যেটা বাস্তবায়ন হলে কোর্টে আসামির উকিল নির্যাতিতাকে আজে বাজে প্রশ্ন করে হয়রানি করতে পারবে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কো-অর্ডিনেটর ডাক্তার বিলকিস বেগম বলেন, শারীরিক পরীক্ষা যথাসময়ে না হলে ধর্ষণ প্রমাণ ও বিচার পাওয়া কঠিন। আইনি লড়াইয়ের জন্য এই সার্টিফিকেটটা খুবই দরকার। এই সার্টিফিকেট না হলে কোনো বিচারই হবে না। নিপীড়নের শিকার নারীরা বেশিরভাগ সময়ই আসতে দেরি করে ফেলে। ফলে আমরা ঠিকমতো ফাইন্ডিংস পাই না। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে এসব ঘটনা ওরা ম্যানেজ করার চেষ্টা করে, গুরুত্বপূর্ণ সময়টা কিল করে ফেলে।
একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের কাছে এক নারী বর্ণনা করেছেন ধর্ষণের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে তাকে কী কী ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। মাদরাসার একজন শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিলেন। ওই নারী বলেন, তিনি আমার টিচার ছিল। ঘটনার পরপরই আমরা পুলিশের কাছে যাই নাই। অনেক পরে জানাজানি হইছে। আমার ফ্যামিলিও জানতো না। আমারে ভয় দেখানো হইছিল। আর আমি তখন কিছুই বুঝতাম না। জানার পরে আমার আব্বু কোর্টে মামলা করে। মেডিক্যাল রিপোর্টে আসছিল আমি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছিলাম। এই ঘটনা জানাজানির পরই নিরাপত্তার জন্য আমি মহিলা আইনজীবী সমিতির শেল্টারে ছিলাম। এ ভিকটিম তার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় জানায়, সমাজে ধর্ষণের শিকার নারীকেই দোষী করার একটা প্রবণতা আছে। আমার এলাকার মানুষও সবসময় আমার বিরুদ্ধে ছিল। তারা চাইছিল আমাদের এলাকা থেকে বের করে দিতে। ধর্ষণের শিকার নারীকে বার বার ঘটনার বিবরণ দেয়া এবং নানান প্রশ্নের মুখে বিব্রত হতে হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি কোর্টে দুই বার গেছি। আমি মিথ্যা বলছি এমন প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে। কোর্টের মাঝখানে এত মানুষের সামনে কথা বলতে আমার খুব আনইজি লাগছিল। এতগুলা মানুষের সামনে এত পারসোনাল বিষয়ে এতকথা বলা! তারপর এক একজন এক এক কথা বলে একেকটা মন্তব্য করে। যেমন এটা মিথ্যা হইতে পারে বা আমি খারাপ। চার বছর মামলা চলার পর ধর্ষকের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে।’
গত বছর যে ঘটনাটি খুব বেশি সমালোচিত হয়েছে, সেটি ঢাকায় দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে এনে ধর্ষণের ঘটনাটি। সন্দেহভাজন ধর্ষকরা বিত্তবান পরিবারের সন্তান। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় মাস পর ওই ছাত্রীরা ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে, পুলিশ প্রথমে অভিযোগ নিতেই চাইনি। ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানার ব্যারাকে নিজ কক্ষে শরীরে আগুন দেন কনস্টেবল হালিমা। ওইদিনই সন্ধ্যায় হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু হয় তার। আত্মহত্যা করার আগে হালিমা তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখে রাখেন যে তার আত্মহত্যার একমাত্র কারণ তারই একজন সহকর্মী পুলিশ অফিসার। যিনি হালিমাকে ধর্ষণ করেন মার্চ মাসের ১৭ তারিখে রাত ২টায়। হালিমা আরো লেখেন, তার অভিযোগ গ্রহণ করেনি অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) । হালিমার বাবা অভিযোগ করেন, একে তো হালিমা নিজ ব্যারাকে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তারপর সহকর্মীরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে। এভাবেই কনস্টেবল হালিমা, হযরত আলী এবং আয়েশারা বিচার না পেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সারা দেশে ৮টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সেলিং, পুলিশি ও আইনি সহায়তা দেয়া হয়। ২০০১ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত এসব কেন্দ্র থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চার হাজার ৩৪১টি যৌন নির্যাতনের মামলা হয়েছে। যার মধ্যে ৫৭৮টি বিচার হয়েছে এবং সাজা হয়েছে মাত্র ৬৪টির।
ধর্ষিতা নারীদের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা বাধা। সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে হাইকোর্টের বিচারক বিচারপতি জিনাত আরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। ‘যৌন সন্ত্রাসবিরোধী গণকনভেশনের’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জিনাত আরা বলেন, ‘ভিকটিমদের মধ্যে দেখা যায়, ধর্ষণের পরপর তারা মনে করে অপবিত্র হয়ে গেছে। যে কারণে সঙ্গে সঙ্গে বার বার গোসল করতে থাকে তারা। এর জন্য অনেক ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্টের সঠিক ফলাফল পাওয়া যায় না। ‘আমাদের এখানে ডিএনএ টেস্ট সব জায়গায়তে সঠিকভাবে করাও হয় না। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারি পরীক্ষাও করা হয় না। গেলেও অনেক সময় দেখা যায় ইনফ্লুয়েন্সিয়াল ব্যক্তিদের চাপে সঠিক রিপোর্ট অনেক ক্ষেত্রে আসে না। ধর্ষণের মামলা আদালতে যাওয়ার আগে আরো বেশ কিছু বাধা ও সমস্যার চিত্র তুলে ধরেন এই বিচারপতি।
তিনি বলেন, ‘দেখা যায় প্রথমে গ্রামের লোকজন বাধা দেয় যাতে মামলা করা না হয়। আর যদি ইনফ্লুয়েন্সিয়াল হয় তাহলে মামলা দায়েরের পূর্বে অথবা পরে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে ফেলে। তারপরও যেটা হয় নিপীড়িতার পক্ষে কোর্টে এসে সাক্ষ্য দেন না। তখন সাক্ষী না থাকায় বিচারকরা অনুমানের ওপর শাস্তি দিতে পারেন না। বিচারকালে আমাদের এসব প্রচুর সমস্যা ফেস করতে হয় বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, পরিস্থিতির বদল করতে চাইলে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষ করতে হবে। ১৫ দিনের মধ্যে মামলার চার্জশিট দিতে হবে। এ ছাড়া ভিক্টিমের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের সঠিক চর্চা করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, সমাজ থেকে ধর্ষণ কমাতে হলে মানসিক পরিবর্তন দরকার। কারণ একজন নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আমাদের সমাজ ওই নারী কি ধরনের কাপড় পরে, কি খায়, কার সঙ্গে চলে, তার জীবন যাপন কেমন ১৪ পুরুষ তুলে ধরে যেটা অন্য মামলার ক্ষেত্রে দেখা যায় না। একজন খুনির কথাই ধরা যাক, খুন করার পর তার জীবন বৃত্তান্ত একজন ধর্ষিতার জীবন বৃত্তান্তের মতো তুলে ধরা হয় না। তাই ধর্ষণ বন্ধে শুধুমাত্র সামাজিকভাবে বা বিভিন্ন সংগঠন পর্যায়ে নয় রাষ্ট্রিয়ভাবে এর জোরালো প্রতিবাদ দরকার।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট ব্লাস্টে কর্মরত আইনজীবী শারমিন আক্তার বলেন, সামাজিকভাবে ধর্ষণ কমাতে হলে মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। ধর্ষণের জন্য আমরা অধিকাংশ সময়ই ধর্ষিতার পোশাককে দোষ দিয়ে থাকি। বলা হয় সে ওয়েস্টার্ন পোশাক পড়েছে তাই ধর্ষিত হয়েছে। অথচ একজন বোরকা পড়া মেয়েও কিন্তু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কাজেই পোশাকের দোষ নয় মানসিক পরিবর্তনটা এক্ষেত্রে বেশি জরুরি। একজন ধর্ষিতা আদালত পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে একসময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এবং প্রত্যেক পর্যায়ে হয়রানি ও হাসির পাত্র হয়। এক্ষেত্রে বিচার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত পুলিশ, ডাক্তার, উকিল, বিচারক সবাইকে বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে। যাতে করে ধর্ষিতা সাহস নিয়ে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারে।
এ ব্যাপাওে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, ধর্ষণ কথাটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। যদিও আমাদের দেশে ধর্ষণ মামলায় পুলিশ কেইস, তদন্ত এবং মেডিকেল পরীক্ষা পদ্ধতি অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ একজন নারীর ধর্ষণের বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর হওয়ায় মামলা, ডাক্তারি পরীক্ষা, আদালত সবক্ষেত্রেই তাদের প্রতি আমাদের মানবিক হতে হবে। এক্ষেত্রে ডাক্তারের মেডিকেল সার্টিফিকেটর ওপর নিপীড়িতার মামলার ভালো মন্দ নির্ভর করে। একই সঙ্গে আইনের প্রয়োগের চেয়ে, আইন মেনে চলার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
২০১৬ সাল এবং ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় চার হাজার ৮শ’র বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। ২০১৬ সালে সারা দেশে ৩ হাজার ৬৪৮ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। ২০১২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭০০, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৮৯১, ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৬৪৭ ও ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬২২। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘটনার তুলনায় মামলা কম হয় আর মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয় অনেক কম।

চট্টগ্রামে ইয়াবায় রাতারাতি শ’শ’ কোটিপতি by ইব্রাহিম খলিল

ইয়াবার কল্যাণে চট্টগ্রামে শ’শ’ কোটিপতি গজে উঠছে রাতারাতি। যাদের নামের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে পুলিশের খাতায়ও। চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তালিকায় দামি গাড়ি এবং একাধিক ফ্ল্যাটধারী এমন অনেকেরই খোঁজ মিলছে। ইয়াবা যাদের ভাগ্য খুলে দিয়েছে। আর তাদের হাতে ধ্বংস হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেড়ে উঠা কিশোর-তরুণরা। কোটিপতি ব্যবসায়ীরাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পার্ট টাইম জব হিসেবে অনেক ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যম কর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষদের আয়েশি জীবনের টোপ দিয়ে কাছে টেনে নিচ্ছে। যাদের বেশির ভাগই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, পটিয়া ও সাতকানিয়ার। এছাড়া রয়েছে কুমিল্লা ও বরিশাল জেলার লোক। যারা সড়ক, সমুদ্র ও আকাশপথ দিয়ে নিয়মিত ইয়াবা পাচারে জড়িত।
চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি বন্দর) মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ইয়াবা পাচারকারীদের তালিকা তৈরি করতে গিয়ে চট্টগ্রামে শ’শ’ কোটিপতির সন্ধান মিলেছে। এ নিয়ে গঠিত তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে সে মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের কাছে সামপ্রতিক যে তথ্য আছে সেটা হচ্ছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এখন পরিবহন খাতে বিনিয়োগ করছেন। পণ্য পরিবহন তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। পণ্যের আড়ালে ইয়াবা পাচারই হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কারণে প্রথাগত পরিবহন ব্যবসায়ী যারা আছেন তারাও বিপাকে পড়ছেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, ইয়াবা ব্যবসা চলছে এখন মুঠোফোনে। টেকনাফের বিশেষ একজনকে জানাতে হয় কী পরিমাণ ইয়াবা লাগবে, পাঠাবেই বা কোথায়। নির্দিষ্ট পরিমাণ ইয়াবা চলে যায় সেই ঠিকানায়। লেনদেন হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। টেকনাফ থেকে ইয়াবা তাই চট্টগ্রাম হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে।
তিনি বলেন, ২০০৬ সাল থেকেই মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে ইয়াবার চালান আসতে থাকে এ দেশে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কয়েক বছর আগেও টেকনাফে পেশা হিসেবে যারা জেলে, রিকশাচালক, বেকার যুবক, পিঠা বিক্রেতা, কৃষক বা ক্ষুদ্র লবণচাষি ছিলেন, তাদের প্রায় অধিকাংশই এখন সচ্ছল, কেউ কেউ কোটিপতি, গাড়ি হাঁকিয়ে চলেন। গ্রামের রাস্তার দু’পাশে সব সুরম্য বাড়িঘর। এরমধ্যে অন্যতম টেকনাফের নাজিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এজাহার মিয়ার ছেলে নূরুল হক ওরফে ভুট্টো। একটি রিকশা কেনার সামর্থ্য ছিল না নূরুল হকের। বসতবাড়ি বলতে ছিল গোলপাতার একটি ঘর। সেই নূরুল হক এখন নাজিরপাড়ার দুটি বাড়ির মালিক। চট্টগ্রাম ও খুলনায় তার ফ্ল্যাট আছে। আছে তিনটি গাড়িও। জমিজমাও কিনেছেন অনেক। নাজিরপাড়ায় রাস্তার পাশে এখন একটি মার্কেটও নির্মাণ করছেন।
নূরুল হক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। নূরুল হক একাই শুধু নন, সঙ্গে আছেন তার পিতা এজাহার মিয়া, ভাই নুর মোহাম্মদ ওরফে মংগ্রী, ভগ্নিপতি নূরুল আলম, ভাগিনা জালাল উদ্দিন, বেলাল, আবছার উদ্দিন, হেলাল, হোছেন কামাল ও নুরুল আমিন ওরফে খোকন। তারা সবাই ইয়াবা মামলার আসামি। চলতি বছরের ৮ই এপ্রিল চকরিয়ার নূরুল হুদা নামে এক যুবক ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। সাত বছর আগে যে ছিল বাসের হেলপার। আর এখন চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত এলাকার যে ফ্ল্যাটে তার পরিবার থাকে, সেটির ভাড়া ৩৫ হাজার টাকা। আয়ের উৎস একটাই, ইয়াবা। মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। গাড়ি আছে দুটি। বিউটি পার্লার খুলে দিয়েছেন স্ত্রীকে। রয়েছে মুঠোফোনের দোকান। জমি কিনেছেন কক্সবাজার শহরে, ফ্ল্যাট কিনেছেন চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম শহরের ২ নম্বর গেট এলাকা থেকে ব্যক্তিগত গাড়িসহ হুদাকে গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সেদিন হুদার গাড়িতে ১০ হাজার ইয়াবা ছিল। হুদা এখন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে দুবার তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। কিছুদিন পরই জামিনে বেরিয়ে যান তিনি। তার অর্থবিত্তের বিষয়টি এতদিন অজানা ছিল।
আনোয়ারা গহিরাকেন্দ্রিক ইয়াবা সিন্ডিকেটের প্রধান মোজাহের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর এলাকার চান মিয়ার ছেলে। মুখোশের আড়ালে তিনি ইয়াবা পাচারের কাজ করতেন। র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ইয়াবা সিন্ডিকেটের প্রধান মো. মোজাহারের নগরীতে আছে ছয়তলা বাড়ি। এর দ্বিতীয় তলায় তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন। ইয়াবা ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান নয়-দশ বছর আগেও ছিলেন বেকার। টেকনাফ মৌলভীপাড়ার চোরাচালানের ঘাট নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর ইয়াবা পাচার শুরু করেন। এখন দুটি মাইক্রোবাস ও চারটি ভারতীয় বিভিন্ন মডেলের দ্রুতগামী মোটরসাইকেলের মালিক। একটি আলিশান বাড়িও বানিয়েছেন। তার ছোট ভাই আবদুর রহমান ও কামাল হোসেন ইয়াবা ব্যবসায় সক্রিয়। গ্রীনলাইন পরিবহনের এসি বাসে কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাওয়ার সময় নতুন ব্রিজ এলাকায় তল্লাশির সময় মহিলা ক্রিকেটার মুক্তা ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন ৩০শে এপ্রিল সকালে। তিনি প্রায়ই কক্সবাজার যাওয়া-আসা করতেন। মুক্তা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্সের ছাত্রী ছিলেন। মাদকাসক্ত হওয়ার পর অনিয়মিত হয়ে পড়ায় তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়। তিনি ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ, মহিলা ক্রিকেট লীগে নিয়মিত অংশ নেন। মহিলা ক্রিকেট আনসার টিমের
তিনি একজন নিয়মিত ক্রিকেটার বলে জানান বাকরিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরী। ওসি জানান, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন, কক্সবাজারে গিয়ে প্রায়ই তিনি নাহিদ নামে এক লোকের কাছ থেকে ইয়াবা নিয়ে ঢাকায় রিপন নামে আরেকজনকে সরবরাহ করতেন। ৪ঠা মে শুক্রবার চট্টগ্রামের হালিশহরের শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির একটি ফ্লাটে ধরা পড়ে ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালান। নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে এই অভিযানে ১৩ লাখ ইয়াবাসহ মো. আশরাফ (৩৪) ও হাসান (২৪) নামে দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরমধ্যে আশরাফ ছিলেন সৌদি আরব প্রবাসী। তাদের বাড়ি বান্দরবান পার্বত্য জেলায়।
অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, আশরাফ প্রবাস জীবনে তেমন উন্নতি করতে না পারলেও দেশে এসে মাত্র এক দুই বছরে ইয়াবা পাচার করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির ওই ফ্লাট ছাড়াও নাসিরাবাদে একটি ফ্লাট ও বাকলিয়ায় একটি প্লটের মালিক তিনি। রয়েছে দুটি গাড়িও।
গত বছর ৩১শে আগস্ট সিদ্দিকুল ইসলাম নামে এক ইয়াবা ব্যসায়ীর খোঁজ মিলে। যার কৌশলের কাছে বারবার পরাস্ত হতে হয়েছিল পুলিশের কৌশল। তবে শেষরক্ষা হয়নি তার। ইয়াবা পাচারে সিদ্দিকুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন পারিবারিক সিন্ডিকেট।
সূত্র জানায়, ইয়াবার চালান টেকনাফ থেকে ঢাকায় আনা এবং ঘাটে ঘাটে পৌঁছে দিতে চারটি জিপ ব্যবহার করেন সিদ্দিকুল ইসলাম। একটি জিপে টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চালান আনা হয়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনতে ব্যবহার করেন দুটি জিপ। আর ঢাকায় ঘাটে ঘাটে ইয়াবার চালান পৌঁছে দিতে বাকি জিপটি ব্যবহার করা হয়। ইয়াবাবাহী জিপ পুলিশ রাস্তায় আটকালে অনেক সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের গাড়ি বলে পরিচয় দিয়েও রক্ষা পান তারা। গাড়ি চালানোর জন্য রয়েছে বেতনভুক্ত চারজন দক্ষ চালক। প্রতি চালানেই তাদের আবার দেয়া হয় ঝুঁকি ভাতা।
সিদ্দিকের তিন ছেলের দু’জনই ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। স্ত্রী রশিদা খাতুনও গ্রেপ্তার হয়েছেন দু’দফা। টেকনাফ থেকে ঢাকায় ইয়াবার চালান নিয়ে আসেন সিদ্দিকের দুই ছেলে রবিউল ইসলাম ও ফরিদুল ইসলাম। একেক সপ্তাহে একেক ছেলে এই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তার আগে নেয়া হয় অভিনব এক কৌশল। চালান আনতে যাওয়ার আগে রবিউল কিংবা ফরিদুল নিজের মোবাইল নম্বরটি কয়েকদিন আগেই বন্ধ করে দেন। তখন ব্যবহার করেন নতুন সিম ও ফোন সেট। পাশাপাশি ঢাকার কোনো একটি থানায় সিদ্দিক বা তার স্ত্রীর পক্ষ থেকে নিখোঁজ জিডি করা হয়। যেন চালানসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও আদালতে দেখাতে পারেন, যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনি তিনদিন বা চারদিন আগেই নিখোঁজ হয়েছেন। এমন তথ্যই বের হয়ে এসেছে তাদের গ্রেপ্তারের পর। আর এ পদ্ধতিতে আদালত থেকে সহজেই জামিন পেয়ে যান তারা। এরমধ্যে ছেলে রবিউল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যদিও ঠিকমতো ক্লাস করেন না, বাবার ইয়াবা ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত তিনি। নিয়ন্ত্রণ করেন ইয়াবা সিন্ডিকেট।
টেকনাফের নাজিরপাড়ার নুরুল আলম ভালো ফুটবল খেলতেন। আর্জেন্টাইন ফুটবলারের নাম অনুসারে লোকে তাকে ডাকতেন ডি মারিয়া বলে। সাত-আট বছর আগেও নুরুল আলম রিকশা চালাতেন। এখন ইয়াবার কারবার করেন। তার ভাই ফরিদুল আলমের ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে দেড় কোটি টাকা। তাকে নারায়ণগঞ্জের দুটি ইয়াবার মামলায় আটক করা হলে তিনি জামিনে ছাড়া পান। গত বছর ১৮ই সেপ্টেম্বর ১০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আতিকুল ইসলাম তারেক তার ভগ্নিপতির হাত ধরে মাদক কারবারে জড়িয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তারেক (২০) চট্টগ্রামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির এলএলবি সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি টেকনাফে। তার বাবা টেকনাফের মহেশখালীয়া পাড়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম একজন ব্যবসায়ী। গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, তারেকের এক বোনের স্বামী টেকনাফের মৌলভীপাড়ার বাসিন্দা ফজর আলী। ফজর আলী ও তার ছোট ভাই মোহাম্মদ আলী পুলিশের তালিকাভুক্ত ইয়াবা বিক্রেতা। মাস খানেক আগে চট্টগ্রামে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে ফজর।
কামরুজ্জামান বলেন, তারেক একাই একটি ফ্ল্যাট নিয়ে চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো এলাকায় থাকেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় সচ্ছল পরিবারের ইয়াবা আসক্ত ছেলেদের সঙ্গে তার উঠাবসা সহজ ছিল। ইয়াবা কেনাবেচা করে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীতে পরিণত হওয়া ব্যক্তিরা পরিবহন ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে বলে তথ্য দিয়েছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান কিনে নিজেরা পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়ে সেই গাড়িতে কৌশলে বিশেষ চেম্বার বানিয়ে পাচার করছে ইয়াবা। নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (বর্তমানে কোতোয়ালি থানায় বদলিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, সংঘবদ্ধ ইয়াবা পাচারকারী চক্র তাদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। ২১টি ট্রাক কিংবা কাভার্ড ভ্যান কিনে তারা নিজেদের পরিবহন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। সেই পরিবহনে তারা সাধারণত পচনশীল দ্রব্য যেমন মাছ পরিবহন করছে। মূলত পণ্য পরিবহনের মতো করে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ইয়াবা চলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িতদের একটা তালিকা জমা দেয়া আছে। এক সংসদ সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাসহ প্রায় সব পেশার লোকের নাম ওই তালিকায় উল্লেখ আছে; কিন্তু সব শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়িত থাকায় প্রশাসন এখন এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে কাছে পেয়ে আপ্লুত রোহিঙ্গা কিশোরীরা

ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দ্বিতীয় দিনের মতো পরিদর্শন করেছেন। এসময় তার কাছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীরা। গতকাল সকালে তিনি টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। এসময় রোহিঙ্গা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে ঘণ্টাব্যাপী খেলাধুলায় সময় কাটান। ফাঁকে ফাঁকে রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের নিকট জানতে চান, তারা এখানে কেমন আছে? জবাবে রোহিঙ্গা কিশোরীরা প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে বললেন, মিয়ানমারের নিজ বসতবাড়িতে গিয়ে এভাবে খেলাধুলা করে দিনযাপন করতে পারলে আরো ভালো লাগতো। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া উখিয়ার বালুুখালী ক্যাম্প-১ এর কর্মরত কোডেক ও ইউনিসেফ যৌথ পরিচালিত শিশুবান্ধব কেন্দ্রে অবস্থানকালে রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের মনের আকুতি-চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে অবহিত হন।
এসময় তিনি শিশুদের সঙ্গে লুডু, ভাগাডুলি, রান্নাবাটি, রশি নিয়ে লাফালাফি, ক্যারম, স্বাস্থ্যলুডু, দাবা, পৃথিবী ভ্রমণসহ মাঠে নেমে শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলেন। পরে রোহিঙ্গা শিশু, কিশোর-কিশোরীদের হাতে আঁকা বিভিন্ন ছবি দেখেন এবং তাদের অনুভূতি জানতে চান।
প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বালুখালী রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে প্রতিষ্ঠিত কোডেক ও ইউনিসেফ পরিচালিত শিশুবান্ধব কেন্দ্রে বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের দক্ষতা যাচাই করেন। এসময় প্রিয়াঙ্কা চোপড়া মিয়ানমারে সামরিক জান্তা কর্তৃক নির্যাতনের কথা জানতে চাইলে শিশুবান্ধব কেন্দ্রের ছাত্রী, মিয়ানমার বলি বাজারের বাসিন্দা খুরশেদা খাতুন (১৪) বলিউড অভিনেত্রীকে জানান, মিয়ানমারে তাদেরকে অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। যে জন্য তারা সপরিবারে এখানে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। এসময় একই গ্রামের শিশুবান্ধব কেন্দ্রের আরেক ছাত্র মনজুর আলী (১৩) প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে খুব কাছ থেকে জানান, মিয়ানমার সেনারা তাদের চোখের সামনে মা, বোনকে ধর্ষণ করেছে। গ্রামের লোকজনকে কুপিয়ে, গুলি করে হত্যা করেছে। শিশুদের আগুনে নিক্ষেপ করে মেরেছে। এসব লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা শুনে সাবেক এই বিশ্ব সুন্দরী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে তিনি শিশুবান্ধব কেন্দ্রের কিশোর-কিশোরীদের বলেন, তিনি তার দক্ষতা, ক্ষমতার সার্বিক প্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা যেন মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারে সেজন্য ইউনিসেফের পক্ষ হয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে এ দাবিটুকু তুলে ধরবেন। এসময় শিশুবান্ধব কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক নাছির উদ্দিন, যোগাযোগ কর্মকর্তা লুৎফুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, এখানে রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েরা কি ধরনের সেবা পাচ্ছে? প্রতি উত্তরে তারা বলেন, মিয়ানমারে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের মাঝে যে আতঙ্ক বিরাজমান ছিল শিশুবান্ধব কেন্দ্রে বিভিন্ন খেলাধুলার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অন্তর থেকে ক্রমশ সেই ভয়াবহ নির্যাতনের কথা ভুলে যেতে বসেছে। তারা এখানে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পড়ালেখা ও খেলাধুলা করতে পেরে আনন্দবোধ করছে।
বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা লালু মাঝি বলেন, ‘রাখাইনে শিক্ষার হার কম হলেও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুর সঙ্গে তারা পরিচিত। টিভি, ভিসিডি ও মোবাইল নেটওয়ার্কিং সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে ভারতীয় নানা ছবিতে ছেয়ে গেছে রাখাইন প্রদেশ। এ কারণে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রোহিঙ্গাদের খুবই পরিচিত মুখ। এর আগে মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী, উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ সময় ইউনিসেফ কর্তৃক পরিচালিত রোহিঙ্গা শিশুবান্ধব কেন্দ্র ঘুরে দেখেন এবং নির্যাতিত শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে কথা বলেন। বলিউডের অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে দেখতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ভিড় জমাতে দেখা গেছে। এর আগে সকাল ৯টায় টেকনাফের হারিয়াখালী ত্রাণ কেন্দ্র ও রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন প্রিয়াংকা চোপড়া। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মেরিন ড্রাইভ হয়ে টেকনাফের হারিয়াখালী রোহিঙ্গা ত্রাণকেন্দ্র ও লেদা রোহিঙ্গা ক্যামপ পরিদর্শন করেন। ত্রাণকেন্দ্রে পরিদর্শনে গিয়ে শাহপরীরদ্বীপ ভাঙ্গা এলাকায় যান প্রিয়াংকা চোপড়া। এসময় সেখানে শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বেশ কয়েকজন শিশুর স্বাস্থ্য ও পড়ালেখার খোঁজখবর নেন।
উল্লেখ্য, সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আকাশপথে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। এরপর সড়কপথে তিনি ইনানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে ওঠেন। সেখান থেকে বিকাল ৪টার দিকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে এবং খোঁজখবর নিতে টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।

দুই নারীর গর্ভে সাত শিশুর জন্ম

রাজধানীর ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই নারীর গর্ভে সোমবার জন্ম নেয়া সাত নবজাতকের কেউ শঙ্কামুক্ত নয়। তাদের প্রত্যেকের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। শুধু তাই নয়, নবজাতকরা শ্বাসপ্রশ্বাস জটিলতা ও রক্তের সংক্রমণজনিত সমস্যায় ভুগছে। ‘নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট’ বা নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) চিকিৎসাধীন এসব নবজাতকের কমপক্ষে চার জনকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস (লাইফ সাপোর্ট) দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার আগে সাত নবজাতক আদৌ বাঁচবে কি-না তা নিশ্চিত করা বলা সম্ভব নয়। গতকাল ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের এনআইসিইউতে কর্তব্যরত সহকারী অধ্যাপক ডা. রোজিনা আক্তার সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।  তিনি জানান, সোমবার বিকালে অধ্যাপক ডা. রুমানা শেখের অধীনে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সুইটি খাতুনের গর্ভে জন্ম নেয়া তিন নবজাতকই টেস্টটিউব বেবি।
তারা আগেই জানতেন সুইটি খাতুন গর্ভ ধারণের মাত্র ২৬ সপ্তাহেই মা হয়েছেন। দুই কন্যা ও এক ছেলে নবজাতকের প্রত্যেকেরই ওজন খুবই কম। একজন স্বাভাবিক নবজাতকের ওজন ২ হাজার ৫০০ গ্রাম হলেও তার তিন সন্তানের প্রথম জনের ওজন ৯০০ গ্রাম, দ্বিতীয় জনের ওজন ৯০০ গ্রাম এবং তৃতীয় জনের ওজন মাত্র ৭০০ গ্রাম। রোজিনা আক্তার বলেন, ‘এর আগেও সুইটি খাতুনের দুটি সন্তান ২৫ সপ্তাহে জন্মগ্রহণ করে মারা যায়। তাদের হাসপাতালে সাড়ে ৮শ’ গ্রাম ওজনের নবজাতকের বেঁচে থাকার রেকর্ড থাকলেও এক্ষেত্রে এই তিন শিশুর ব্যাপারে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। এদিকে বেসরকারি একটি এনজিওতে কর্মরত সুইটি খাতুনের স্বামী মাহবুবুর রহমান জানান, তাদের সন্তান টেস্টটিউব পদ্ধতিতে নয় ভারতীয় এক চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধপত্র খেয়ে স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করেছে। নবজাতকের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডাক্তার সাহেব আল্লাহ আল্লাহ করতে বলেছেন।’ সুইটি খাতুনের মামা জানান, হাসপাতালের আইসিইউতে ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গতি তাদের নেই।
এ সময় তিনি বিকল্প কোথাও কম খরচে চিকিৎসা করানো যায় কি-না বারবার তা জানতে চাইছিলেন। উল্লেখ্য, সোমবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমার অধীনে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপর সনিয়া আক্তারের গর্ভে জন্ম নেয়া চার নবজাতকের (৩ জন ছেলে ও ১ জন কন্যাশিশু) ওজনও স্বাভাবিক চেয়ে অনেকটাই কম। প্রথম জনের ওজন ১ কেজি ৯০০ গ্রাম, দ্বিতীয় জনের ১ কেজি ৬০০ গ্রাম, তৃতীয় জনের ১ কেজি ৫৬০ গ্রাম ও চতুর্থ জনের ২ কেজি ১০০ গ্রাম। এনআইসিইউ’র চিকিৎসক ডা. রোজিনা আক্তার জানান, সনিয়া আক্তারের চার নবজাতকই রক্তে সংক্রমণ ও শ্বাস প্রশ্বাসজনিত সমস্যায় ভুগছেন। ৭২ ঘণ্টা না গেলে তারা বেঁচে থাকবে কি-না তা বলা সম্ভব না।

ক্ষতবিক্ষত শ্রীমঙ্গলের পাহাড় by এম ইদ্রিস আলী

একসময় শ্রীমঙ্গলকে বলা হতো নির্জন প্রকৃৃতির আঁধার। ছিল সারি সারি সবুজ পাহাড়-টিলা। প্রকৃতির সবুজ সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়িয়েছে গোটা দেশে। আর এসব পাহাড়-টিলার সর্বাঙ্গ জুড়ে ছিল জীব-বৈচিত্র্যের সমাহার। কিন্ত গেল কয় বছরে রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা, ঘরবাড়ি এবং চা আর ফল বাগান সৃজনের নামে ছেঁটে ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছে এখানকার বেশিরভাগ পাহাড়-টিলা। বর্ষায় প্রবল বৃষ্টিপাতে ক্রমশ ক্ষয়ে ছোট হয়ে আসছে অবয়ব। এতে এখানকার নানা প্রজতির উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সরকারি প্রশাসনে পাহাড়ের এই বোবা কান্না শোনার যেন কেউ নেই।
বহুতল ভবন, রিসোর্ট, লজ, গেস্ট হাউস, বাসাবাড়ি, ফল বাগান থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক নানা স্থাপনা নির্মাণে কাটা হচ্ছে সুউচ্চ টিলা-পাহাড়। পরিবেশবিদদের দাবি গত ৩০ বছরের ব্যবধানে মোট ভূমির ৩০ ভাগ পাহাড়ই কেটে ফেলা হয়েছে। কোনো ধরনের নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অনেকে আবার পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছেন। নির্বিচারে পাহাড় কাটায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত শতাধিক পরিবার এই মুহূর্তে পাহাড় ধ্বসের আশঙ্কার মধ্যে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করছেন। প্রায় ৭ বছর আগে শহরতলির ডলুবাড়ী এলাকায় পাঁচতারকা হোটেল গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গল্ফ নির্মিত হওয়ার পর পর্যটন এলাকা হিসেবে শ্রীমঙ্গলের পরিচিতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উদ্যেক্তারা পাহাড়ের জমি কিনতে হামলে পড়েন। একের পর এক রিসোর্ট-মোটেল নির্মাণে নির্বিচারে শুরু হয় পাহাড় কাটা। সবুজ পাহাড় ঘেরা প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে রিসোর্ট গড়ে তোলার মানসিকতার ইচ্ছেমতো কাটাছেঁড়া হচ্ছে পাহাড়-টিলা। উপজেলার মোহাজিরাবাদ এলাকায় সুউচ্চ পাহাড় কেটে নির্মিত হয় বিলাসবহুল ‘নভেম ইকো রিসোর্ট’। সেময় স্থানীয় প্রশাসন পাহাড় কাটায় পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অপরাধে অভিযুক্ত করা হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। অভিযোগ রয়েছে ২০১৫ সালে স্থানীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু জরিমানা আদায় করে পাহাড় কাটার দায় থেকে অব্যাহতি দেন। যদিও পরিবেশ অধিদপ্তর নভেম ইকো রিসোর্টকে পরিবেশছাড়পত্র দিতে এখন পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। একই ভাবে পাহাড় ধ্বংস করে রিসোর্ট-মোটেল গেস্ট হাউস গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে, হেরিটেজ গেস্ট হাউস, এসকেডি রিসোর্ট, হিমাচল গেস্ট হাউস, লেমন গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্ট, জঙ্গলবাড়ি কটেজ, শান্তিবাড়ি ইকো কটেজের বিরুদ্ধে। বর্তমানে এক ডজনেরও বেশি নির্মাণাধীন রিসোর্ট রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে পাহাড় ধ্বংস বা পাহাড়ের আকার পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। রিসোর্ট তৈরি ছাড়াও পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে নানা স্থাপনা ও বাণিজ্যিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া উপজেলার পাহাড়ি জনপথ বিষামনী, মহাজিরাবাদ, রাধারনগর, মির্জাপুর, হোসনাবাদ এলাকাগুলোতে বেশিরভাগ প্রভাবশালী লোকে বাড়ি তৈরি ও মাটি বিক্রির উদ্দ্যেশে পাহাড় কেটে উজাড় করেছে। পাহাড় কাটার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে ব্যবসায়ী আজম জে চৌধুরীর মালিকানধীন ফিনলে চা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ২০১৫ সালের ৩ ও ৪ঠা অক্টোবর ভাড়াউড়া মৌজার বিশাল আয়তনের একটি পাহাড় ভারি যন্ত্রপাতি দিয়ে কেটে সৌন্দর্যহানিসহ গোটা এলাকার পরিবেশ নষ্ট করে।
সরজমিন রাধানগর এলাক ঘুরে দেখা যেছে, অনেক স্থান ঘেরাও দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণযজ্ঞ চলছে। কোনটা রিসোর্ট কোনটা লজ আবার কোনটা গেস্ট হাউজ। এখানকার এস কেডি নামে নির্মাণাধীন বহুতল রিসোর্ট নির্মাণে প্রাকৃতিক ছড়ার (ছোট খাল) গতিপথ পরিবর্তন করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় এক টাইলস মিস্ত্রি আলী আকবর বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের মোট জমির ৮০ ভাগই তো পাহাড়। এখানে গড়ে উঠা সব রিসোর্টের ৯৯ ভাগই তৈরি হচ্ছে পাহাড় কেটে’। উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের পশ্চিম মোহাজিরাবাদ এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয়রা পাহাড়ি খাস জমি লিজ বন্দোবস্ত নিয়ে লেবু-আসারসের বাগান সৃজনে জমি তৈরিতে পাহাড় ছেঁটে ফেলছে। এখানে উঁচু একটি পাহাড় নির্দয়ভাবে কেটে স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। মোহাজিরাবাদ এলাকায় বেশ কয়েকটি পরিবার পাহাড়ের নিচে ঘরবাড়ি তৈরি করেছেন। সুউচ্চ কাটা পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে বাড়িঘর তৈরি করে ১০-১২টি পরিবার বিপজ্জনক অবস্থায় বসবাস করছেন। এসব পরিবারের এক সদস্য ফারুক মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টিপাতে পাহাড় ধ্বসে আশঙ্কায় আমরা পরিবার নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি’। বয়োজ্যেষ্ঠ ছানু মিয়া বললেন, ‘গত বছর বর্ষা মওসুমে ইউএনও অফিস থেকে মাইকিং করে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু বাড়িঘর ছেড়ে পরিবার নিয়ে কোথায় দাঁড়াবো?’। এমনিভাবে উপজেলার বিষামণি, রাধানগর, দিলবরনগর, ডলুছড়া এলাকায় এরকম প্রায় শতাধিক পরিবার পাহাড় ধ্বসের আশঙ্কার মধ্যে বসবাস করছেন।
স্থানীয় পাহাড় রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির সিলেট বিভাগীয় চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পাহাড়ের বোবা কান্না কে শোনে? চোখের সামনেই তো পাহাড় কেটে আমাদের সবুজ প্রকৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করছি। অফিসে-দপ্তরে চিঠি দিচ্ছি, কিন্তু পাহাড় রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবশে অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় সহকারী পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, ‘এখানে জনসচেতনার অভাব রয়েছে। পাহাড় কাটার ঘটনায় আমরা সব সময় সক্রিয় আছি। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও আদালতে মামলা, ঢাকাস্থ এনফোর্সমেন্ট শাখার মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অধিদপ্তরের জনবলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, চাইলে সবসময় সব কিছু করা যায় না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ সচেতন হলে পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংস করা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভবপর হবে’। জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেট বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম বলেন, নগরায়নের ফলে গত ৩ দশকের ব্যবধানে এ অঞ্চলের ৩০ ভাগ এবং বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ৫০ ভাগ পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। বাগান সৃজনে পাহাড়ী জমির রূপ পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়া লাউয়াছড়াসহ আশপাশের পাহাড়ের গাছপালা ও মাটি কেটে উজার হচ্ছে। এর সঙ্গে বৃষ্টিপাত প্রবণ শ্রীমঙ্গলে প্রবল বৃষ্টিতেও মারাত্মক ভূমি ক্ষয় হচ্ছে। এতে করে ছড়া বেয়ে নেমে যাওয়া পাহাড়ি ঢলে হাওর-বিল ভরাট হচ্ছে।
প্রাকৃতিক প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, পাহাড় কাটার ফলে পরিবেশ আজ বিপর্যস্ত। সরকার পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রেখেছে। কিন্তু সেই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় পাহাড় খেকোরা ইচ্ছেমতো পাহাড় কেটে সাবাড় করছে।

মরা পশুর মাংস সরবরাহ হত বাংলাদেশেও

পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তল্লাশি চালিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ভাগাড়ের মরা পশুর মাংস হোটেল ও রেস্টুরেন্টে সরবরাহ করার অভিযোগে। এই মরা মাংস সরবরাহের কারবারে যুক্ত অনেক রাঘব বোয়াল। কল্যানী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এক সাবেক পুর কাউন্সিলরকে। যোগ পাওয়া গেছে, নামী সংস্থারও। সেইসঙ্গে ধৃতদের জেরা করে পুলিশ জানতে পেরেছে এই পঁচা মাংস সরবরাহ করা হত বাংলাদেশেও। আর তাই রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারির নির্দেশ দেয়া হয়েছে সীমান্তবর্তী জেলাগুলির পুলিশ সুপারদের।
বৃহষ্পতিবার কলকাতার বুকে একটি কোল্ড স্টোরেজে ৭০ টন পচা মাংস মজুত রাখার খবর ফাঁস হওয়ার পর শুক্রবার নিউটাউন থেকে হদিশ পাওয়া গেছে, মরা মুরগির মাংসের অবৈধ কারবারের। সর্বত্রই পঁচা মাংসগুলি বেশ আধুনিক ব্যবস্থাপনায় ফ্রিজারে রাখা হত বলে পুলিশ জানতে পারে। বজবজের ভাগাড়ের মাংস কান্ডের অন্যতম মূল অভিযুক্ত-সহ আরও যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের জেরা করে ভয়ানক সব তথ্য জানতে পারছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করা মাংসের মধ্যে কুকুরের মাংসও আছে বলে জেরায় স্বীকার করেছে ধৃতরা। ভাগাড় থেকে মাংস এনে প্রথমে কোল্ড স্টোরেজে রাখা হত। সেখানেই মেশানো হত নানান রাসায়নিক, যাতে পঁচা মাংসও টাটকার মতো দেখায়। তার পর সেই মাংস প্যাকেট করে পৌঁছে যেত বাজারে। মিশে যেত টাটকা মাংসের সঙ্গে। গত বৃহষ্পতিবার দক্ষিন ২৪ পরগণার বজবজে এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত একটি চক্রকে প্রথম স্থানীয মানুষ হাতে নাতে ধরে ফেলেন। অভিযুক্তরা স্বীকার করেছে তাদের অপরাধ।

অভিনেত্রীর মন্তব্যে চীনে ‘ঋতুস্রাব’ নিয়ে শোরগোল

আপনি যদি নারী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার জন্য একটি প্রশ্ন আছে। আপনার ঋতুস্রাব বা মাসিক বা পিরিয়ড চলার সময় কতটা খারাপ পরিস্থিতিতে থাকার কথা আপনি কল্পনা করতে পারেন? বেশিরভাগ নারীই মনে করেন, এই সময়টায় কাজে বা স্কুলে যাওয়াটাই ঢের কঠিন। বিছানায় এপাশ ওপাশ করা কিংবা স্বস্তিকর খাবার খেয়েই সময়টা পার করতে ইচ্ছে করে। এবার চিন্তা করুন, ঋতুস্রাব চলাকালে আপনার গায়ে বরফ শীতল পানি ঢেলে দেয়া হচ্ছে। আর সেই ঘটনা আবার সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে টিভিতে। আরো চিন্তা করুন, এই ঘটনাটা এমন জায়গায় হচ্ছে যেই দেশে ট্যাম্পন বা ন্যাপকিন ব্যবহৃত হয় খুব কম।
গেল সপ্তাহে ঠিক এই ধরনেরই একটি পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল চীনের অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলবেবিকে, যার আসল নাম হলো ইয়ুং উইং।
‘কিপ রানিং’ নামে একটি টিভি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। রিয়েলিটি শো ঘরানার এই অনুষ্ঠানে সব প্রতিযোগীকেই বারবার পানিতে ভিজতে হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু দর্শক লক্ষ্য করলেন, অ্যাঞ্জেলবেবিকে মাত্র একবার ভিজতে হয়েছে। এ নিয়ে অনেকে তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যঙ্গ করেন। কেউ বলছিলেন, তাকে ‘বিশেষ সুবিধা’ দেয়া হচ্ছে। এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, ‘কিপ রানিং অনুষ্ঠান আপনার জন্য নয়। বাসায় যান।’ কেউ কেউ আবার বরফ শীতল পানি মারার একটি দৃশ্যে এই অভিনেত্রীর ‘মাত্রাতিরিক্ত’ ও বিরক্তিকর মুখাবয়ব নিয়ে হাসাহাসি করেছেন।
গত রোববার এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী তার ৮ কোটি ৫০ লাখ অনুসারীকে জানান কেন এমনটা আসলে ঘটেছিল। তিনি বলেন, ওই অনুষ্ঠান চলাকালে তিনি ছিলেন পিরিয়ডের প্রথম দিনে। তার ওই পোস্ট ৫২ হাজারেরও বেশি বার শেয়ার করা হয়েছে। মন্তব্য এসেছে ৬০ হাজারেরও বেশি।
তিনি লিখেন, ‘ওইদিন ছিল আমার পিরিয়ডের প্রথম দিন। আমি খুবই অস্বস্তিকর বোধ করছিলাম। আমি কিন্তু একবারও বলিনি যে, আমি পানিতে নামতে পারবো না। তবে ওই চেয়ারে বসে থাকাটা মজার কিছু ছিল না।’ চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ওয়েইবোতে তিনি আরো লিখেন, ‘আমি খুবই ঠাণ্ডা অনুভব করছিলাম ও ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ আপনি জানেন না এই পানি থেকে কোন কথা বলাবলি শুরু হয়।’ ব্যঙ্গের শিকার হওয়া নিয়ে তার ভাষ্য, ‘আমি যেটা করতে পেরেছিলাম তা হলো এসব নিষ্ঠুর কথা হজম করা এবং সেসবকে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরিত করা।’
তার এই কাহিনী তুলে ধরেছে বিবিসি। বিবিসি’র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চায়না হলো এমন দেশ যেখানে ঋতুস্রাব বা ন্যাপকিনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে মানুষ কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করে। তা সত্ত্বেও, অ্যাঞ্জেলবেবির ওই পোস্টে অনেক মন্তব্যদাতা তার প্রতি সমর্থন জানান। এর আগেও একবার ওই কঠোর নিয়মকানুনের অনুষ্ঠানটিতে তিনি লড়েছিলেন। মাঝখানে তার গর্ভে আসে সন্তান। তারপরও তিনি ফের ফিরে যান কিপ রানিং শোতে। এ নিয়েও কেউ কেউ তার প্রশংসা করেছেন।
তার ওই পোস্টে মন্তব্য হিসেবে একজন লিখেছেন, ‘ঋতুস্রাব চলার সময় মেয়েদের যন্ত্রণা শুধু মেয়েরাই বুঝবে। অথচ আমরা মেয়েরাই অন্য কারও মধ্যে পরিপূর্ণতা খোঁজার চেষ্টা করি। হৃদয়ে আরেকটু বেশি ভালোবাসা ও একটু কম কালিমা থাকা দরকার আপনার।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘এটা আসলেই সহজ নয়। কেউ যখন পিরিয়ডে থাকেন, তখন খুবই কষ্ট হয়। মাঝেমাঝে এটা এতটাই যন্ত্রণাদায়ক যে, আপনি কী করছেন তা নিয়েই আপনার সন্দেহ হবে। আর এই অবস্থায় ওই পানিতে নামার মানে হলো আপনাকে আরো কষ্ট সহ্য করতে হবে। আমি হলে এটা সামলাতে পারতাম না।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘এই সমাজ নারীদের প্রতি একটু বেশিই নির্মম। ঘুরে দাঁড়ান, প্রিয়।’
তবে কেউ কেউ অ্যাঞ্জেলবেবির সমালোচনাও করেছেন। একজন সন্দেহ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘আমরা কীভাবে জানবো যে আদৌ তিনি পিরিয়ডে ছিলেন কিনা? তাকে এত সহজে বিশ্বাস করা কেন?’ আরেকজন প্রশ্ন করেছেন, ‘এত অসুবিধা বোধ করলে তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন কেন, পানিতেই বা গেলেন কেন?’
তবে ঋতুস্রাবের ইস্যু নিয়ে চীনে এই প্রথম যে শোরগোল শুরু হলো তা নয়। ২০১৬ সালের অলিম্পিকে দেশটির তারকা সাঁতারু ফু ইয়ুয়ানহুই বলেন, পিরিয়ড থাকায় তিনি শক্তভাবে পারফর্ম করতে পারেন নি এবং তিনি ক্লান্ত বোধ করছিলেন।

প্রিন্স হ্যারির বিশেষ অতিথি একজন আফ্রিকান বন্ধু

বৃটিশ রাজপরিবারের প্রিন্সের বিয়ে নিয়ে হৈ চৈ হবে না, তা কি হয়? প্রিন্স হ্যারি আর মেগান মার্কেলের বিয়েতেও অবধারিতভাবে আলোচনা হয়েছে দুনিয়াজুড়ে। এই বিয়েতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন বহু নামিদামি তারকা আর দেশ বিদেশের অগণিত অতিথি। তবে, সবাইকে ছাপিয়ে বোধহয় একটি আমন্ত্রণের ভিন্ন মর্মার্থ আছে। প্রিন্স হ্যারি ও মার্কেলের বিয়েতে দাওয়াত পেয়েছেন মুতসু। তিনি আফ্রিকার দেশ লেসোথোর বাসিন্দা। আজ থেকে ১৪ বছর আগে প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়।
তখন মুতসু ছিলেন অনেক ছোট। এতিম। তখনই মুতসুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় প্রিন্স হ্যারির। সেই মুতসু পোটসেইন বৃটিশ রাজপুত্রের বিয়েতে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে বিশেষ নজর কেড়েছেন। বিয়ে উপলক্ষে ১৮ বছর বয়সী এই যুবককে লেথসো থেকে বৃটেনে উড়িয়ে আনেন প্রিন্স হ্যারি। এমনকি যেসব অতিথি সবার আগে রাজকীয় দম্পতিকে শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মুতসু। এ খবর দিয়েছে ডেইলি মেইল। ১৪ বছর আগে দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকান দেশ লেথসোতে মুতসু পোটসেইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ডিউক অব সাসেক্স প্রিন্স হ্যারির। তখন মুতসু ছিলেন ৪ বছর বয়সী শিশু। খুব দ্রুতই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। এতগুলো বছর তারা নিয়মিতই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। প্রিন্স হ্যারির দাতব্য সংস্থা সেন্টেবেইল থেকে যেই ১০ জন প্রতিনিধি বিয়েতে দাওয়াত পেয়েছেন, তাদের একজন মুতসু। প্রকৃতপক্ষে এই দাতব্য সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা হলেন তিনি। ২০০৬ সালে প্রিন্স হ্যারি ও মুতসু মিলে এই সংস্থা গড়ে তোলেন। সেন্টেবেইল শব্দের মানে হলো ‘আমাকে ভুলো না।’ স্থলবেষ্টিত লেথসোতে মরণব্যাধী এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত হাজার হাজার শিশু ও তরুণদের জন্য কাজ করে এই সংস্থা। রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স সেইসো বলেন, ‘২০০৪ সালে প্রথম লেথসোতে যান তরুণ হ্যারি। আর এখন তিনি পূর্ণ যুবক। বিয়ে করছেন।’ প্রিন্স হ্যারির বিয়েতে আমন্ত্রিত ২৪৬০ জন ব্যক্তির মধ্যে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার মোট ২০০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সেন্টেবেইল-এর চেয়ারম্যান জনি হর্নবি বলেন, নববিবাহিত দম্পত্তি যখন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে সেইন্ট জর্জ চ্যাপেল ত্যাগ করছিলেন তখন তাদেরকে যেই অতিথির দল প্রথমে শুভেচ্ছা জানিয়েছে, তাদের মধ্যে ছিলেন মুতসু। তিনি আরো বলেন, মুতসু এখন কিছুটা লাজুক। তবে সে অনেক ভালো করছে। স্কুল শেষ করার পথে। প্রিন্স মুতসুকে একটি নীল ওয়েলিংটন বুট উপহার দেন। এই বুট পাওয়ার ইচ্ছা মুতসুর অনেকদিনের। এই বিয়ের আগে দুই বছর আগে আইটিভির একটি তথ্যচিত্রেও এই দুই বন্ধুর দেখা হয়। দেখার সঙ্গে সঙ্গে তারা দীর্ঘক্ষণ কোলাকুলি করেন। তখন হ্যারি বলেন, ‘তাকে এত খুশি দেখতে খুব ভালো লাগছে। আমাদের গাছ টিকে আছে। বড় হয়েছে। তার চারপাশে যেই বেষ্টনী দিয়েছি, সেটাও এখনো আছে।’

পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়ন করেছে ইরান: প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে আমেরিকা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত ৮মে ট্রাম্পের এ ঘোষণায় পরমাণু সমঝোতার ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছেন তার কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেছেন, এ সমঝোতা নাকি আমেরিকার স্বার্থ বিরোধী। অথচ ইরান যে পরমাণু সমঝোতা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেছে সে বিষয়ে ট্রাম্প তার বক্তব্যে কিছুই উল্লেখ করেননি। এ থেকে বোঝা যায় ওয়াশিংটন ভালো করেই জানে ইরান তার প্রতিশ্রুতি পালন করেছে এবং দেশটির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার কোনো অজুহাত আমেরিকার হাতে নেই। কার্ণেগির গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষক রিচার্ড সোকোলেস্কু বলেছেন, "মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহুজাতিক পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের তৎপরতা বন্ধের লক্ষ্যে যে পন্থা অবলম্বন করেছেন তা থেকে তার অদূরদর্শিতাই ফুটে উঠেছে।" ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে আমেরিকা এটি বাস্তবায়নের পথে নানা বাধা সৃষ্টি করেছে এবং এমনকি বহু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা থেকেও দেশটি বিরত ছিল কিংবা চুক্তির নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে ইরান বিরোধী নিষেধাজ্ঞা ফের বলবত করেছে এবং আরো নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের এ পদক্ষেপকে কাণ্ডজ্ঞানহীন ও বড় ধরণের ভুল বলে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএও ট্রাম্পের এ পদক্ষেপকে অনেক বড় ক্ষতি বলে মন্তব্য করেছে।
দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে কঠিন ও শ্বাসরুদ্ধকর আলোচনার পর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ভিয়েনায় ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের পরমাণু সমঝোতা সই হয় এবং পরের বছর জানুয়ারি থেকে তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব রয়েছে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ'র ওপর। এ সংস্থা পরমাণু বাস্তবায়ন শুরুর পর মোট ১০বার স্বীকার করেছে ইরান তার প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেছে। আইএইএ'র প্রধান ইউকিয়া আমানোও বহুবার বলেছেন, পরমাণু সমঝোতা অনেক বড় একটি সাফল্য এবং ইরানের পরমাণু তৎপরতার ওপর আইএইএ'র পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ইরান পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়ন করছে কিনা তার ওপর আন্তর্জাতিক কঠোর নজরদারি থাকার কারণে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির আর কোনো অজুহাত পায়নি আমেরিকা। এ কারণে ক্ষুব্ধ ও হতাশ মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের তৎপরতা এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মতো অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে অজুহাত করে পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। অথচ সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, "আমিরা নিশ্চিত যে ইরান পরমাণু সমঝোতা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেছে।"  
পরমাণু সমঝোতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ২২৩১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর আইএইএ এই সংস্থার নির্বাহী বোর্ড ও নিরাপত্তা পরিষদে চারটি প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে বলা হয় ইরান পরমাণু সমঝোতা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরের দিন অর্থাৎ ৯মে আইএইএ আবারো জানিয়েছে ইরান তার ওয়াদা ভঙ্গ করেনি। আইএইএ'র প্রধান ইউকিয়া আমানো বলেছেন, "ইরানের পরমাণু সংক্রান্ত প্রতিটি কার্যক্রমের ওপর তার সংস্থা নজর রেখেছে অথচ আমেরিকা ইরানের পরমাণু কার্যক্রমের ওপর আইএইএ'র নজরদারিকে যথেষ্ট নয় বলে দাবি করেছে।" তিনি আরো বলেছেন, "ইরান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা কমিয়ে আনার পাশাপাশি আরাক হেভিওয়াটার প্রকল্পের কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে এবং সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ অন্য দেশে স্থানান্তর করেছে।"
ছয় জাতিগোষ্ঠীর অন্যতম শরীক হিসেবে পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়নে আমেরিকা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া সত্বেও তারা তা মানেনি। বাস্তবায়ন শুরুর পর গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে আমেরিকা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, নানা গড়িমসি ও নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে এই চুক্তিকে বানচাল করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। এ প্রসঙ্গে, মার্কিন কংগ্রেসে 'ইরান বিরোধী নিষেধাজ্ঞা আইন' নবায়ন, ইরান সফরকারী বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আমেরিকায় ভিসা না দেয়া, নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা প্রভৃতির কথা উল্লেখ করা যায়। এ ছাড়া, আমেরিকা অন্য দেশের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করারও চেষ্টা করেছে যাতে পরমাণু সমঝোতার ফলে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা ইরান পেতে না পারে। আমেরিকা ইরানের কাছে যাত্রীবাহী বিমান বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ছাড়াও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন অর্থবিভাগের নিষেধাজ্ঞার কারণে অন্যান্য দেশ ইরানের সঙ্গে কোনো লেনদেন করতে পারছে না এবং তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব আচরণ পরমাণু সমঝোতার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
আমেরিকার পক্ষ থেকে পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘনের আরো কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন, বেআইনিভাবে তারা পরমাণু সমঝোতা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছিল। এর অন্যথায় পরমাণু সমঝোতা প্রত্যয়ন করবে না বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ দেশটির অন্যান্য কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে পরমাণু সমঝোতার বিরুদ্ধে বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছেন যা ছিল পরমাণু সমঝোতার নীতিমালার লঙ্ঘন। এ ছাড়া, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েও আমেরিকা পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে যাতে পরমাণু সমঝোতার কোনো ধরণের সুফল ইরান পেতে না পারে। ইউরোপ পরমাণু সমঝোতাকে যৌক্তিক অভিহিত করলেও আমেরিকা এ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ায় এখন এ চুক্তির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোগেরিনি বলেছেন, "এটি দ্বিপক্ষীয় কোনো চুক্তি নয় যে একতরফাভাবে এ থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে।" তিনি বলেন, "এ সমঝোতার প্রতি জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন রয়েছে।"
আমেরিকা পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় চীন, রাশিয়া ও ইউরোপের তিনটি দেশ একদিকে এবং আমেরিকা একা একদিকে রয়েছে। ইউরোপীয়রা পরমাণু সমঝোতাকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর নজরদারির জন্য ভালো সুযোগ বলে মনে করে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি শুধু পরমাণু সমঝোতার ওপর নজরদারি করলেই চলবে না ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের তৎপরতার বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে হবে এবং তেহরানকে আমেরিকার দাবি মানতে হবে। কিন্তু ইরানের কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো আপোষ করা হবে না।

খুলনা ‘শান্তিপূর্ণ কারচুপির’ নির্বাচনের নতুন মডেল

দেশে কয়েকটি ভালো নির্বাচনের পর খুলনা সিটি করপোরেশনে একটি অস্বচ্ছ ও ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বলে মনে করছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের পর সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, খুলনায় শান্তিপূর্ণ কারচুপি হয়েছে যা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় নতুন মডেল। এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে বলেও মনে করে সুজন। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘বিজয়ীদের তথ্য উপস্থাপন ও সুজনের দৃষ্টিতে নির্বাচন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সুজনের সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান। এতে লিখিত বক্তব্যে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায় খুলনা ছাড়া সব নির্বাচন ভালো হয়েছে। তবে কয়েকটি ভালো নির্বাচনের পর খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি অস্বচ্ছ ও ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। নির্বাচনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রতীকে অবৈধভাবে সিল দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। যে ব্যালটগুলোতে কোনো স্বাক্ষর ছিল না। কিন্তু আগে থেকে সিল দেয়া ও স্বাক্ষরবিহীন ব্যালটকেও বৈধ ভোট হিসেবে গণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। নির্বাচনে দৃশ্যত বড় কোনো ধরনের অঘটন ও সহিংসতা ছাড়া অনুষ্ঠিত হলেও স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেননা, অনেক ভোট কেন্দ্রে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট না থাকা, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান, কেন্দ্রের সামনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর কর্মীদের জটলা সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি, ভোটের আগেই বিরোধী দলের প্রার্থী-সমর্থকদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে রিটার্নিং অফিসারের ওপর যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে সহায়তাকারী হিসেবে নিয়োগ করা, নির্বাচন পর্যবেক্ষক নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তার ওপর চড়াও হওয়ার মতো ঘটনাবলী এই নির্বাচনকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। নির্বাচনে ইসির প্রস্তুতি ভালো ছিল বলা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের আগে রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তখন রিটার্নিং অফিসারকে সহায়তার জন্য যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজনকে খুলনা পাঠানো হয়। বিষয়টি একদিকে যেমন নজিরবিহীন, পাশাপাশি তা কতটুকু যৌক্তিক ও আইনসম্মত তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। এর মাধ্যমে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছে। 
সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম শর্ত হলো অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বিকাশ ঘটবে। কিন্তু দিন দিন আমরা এই গণতান্ত্রিক বিকাশের চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যে সব প্রার্থী হলফনামার মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেয়া। নির্বাচনে যে সব অনিয়ম হয়েছে তার জন্য কারও অভিযোগ দায়ের করার অপেক্ষা না করে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থা নেয়াটা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে আমরা তা করতে দেখিনি। সত্যিই এটা হতাশাজনক। সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুজন নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রগুলো পর্যবেক্ষণ না করলেও পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছে। এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, তথা স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। কমিশন প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেনি এবং হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিরদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজনের নির্বাহী সদস্য ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, সদ্য সমাপ্ত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পিচফুলি রিগিং (শান্তিপূর্ণ কারচুপি) হয়েছে। এটিকে একটি নতুন মডেলের নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করা যায়। নির্বাচনে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া বা সহিংসতা হয়তো ততটা দেখা যায়নি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নানা ধরনের অনিয়ম ঠিকই হয়েছে। নির্বাচনে পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তার অভাব দেখা যায় এবং ভোটারদের এক ধরনের ত্রাসের মধ্যে রাখা হয়েছিল। যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে তারাও তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেনি। কারণ তাদের সরকারের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন করে সংস্থা চালাতে হয়। তবে মিডিয়া এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। মিডিয়াগুলোকে অনেক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন করতে দেখা গেছে, যা ইতিবাচক। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে ইসি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্র ভোট দিয়েছে। তার ভোট দেয়ার কথা ছিল আরো ১২ বছর পরে। খুলনা সিটি নির্বাচন আয়োজন করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তারা তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয়মাস আগে এই নির্বাচনটা ছিল কমিশনের জন্য একটা পরীক্ষা। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করার ক্ষেত্রে তাদের যে সাহস দেখানো দরকার ছিল তা তারা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এই নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে পারবে এটা জনগণ মনে করে না, আমিও করি না।

অপারেশনের চার বছর পর প্রসূতির পেট থেকে গজ উদ্ধার

বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশনের চার বছর পর পেট থেকে  গজের পুঁটলি বের করা হয়েছে। গত ১১ই মে হাসপাতালের সার্জন অধ্যাপক এস.এম.আর ইসলাম অপারেশন করে গজের পুঁটলিটি বের করেন। তবে এই সময়ের মধ্যে রোগীর পেটে প্রচণ্ড ব্যথার কারণে এর আগে একই হাসপাতালে আরো দুই দফা অপারেশন করা হয়েছে। চার দফা অপারেশনে রোগীর পরিবারকে মোট এক লাখ ৫ হাজার টাকা ফি গুণতে হয়েছে। এ ব্যাপারে গত ২০ই মে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জনের কাছে ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কটিয়াদী উপজেলার চান্দপুর ইউনিয়নের গোয়ালিয়া পাড়ার সৌদি প্রবাসী পণ্ডিত মিয়ার স্ত্রী সালমা আক্তার (৩০) কে সন্তান প্রসবের সময় ২০১৪ সালের ২৯শে জুন বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে সিজারিয়ান অপারেশন করানো হয়। অপারেশন করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. লায়লা নূর।
এরপর ২১ হাজার ৩৭ টাকা ফি রেখে রোগীকে রিলিজ দেয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হলে ২০১৬ সালের ১৬ই জুন পুনরায় একই হাসপাতালে রোগিকে ভর্তি করানো হয়। রোগীর পরীক্ষানিরীক্ষা করে সহযোগী অধ্যাপক ডা. কেএবিএম তাইফুল আলম ও সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহীনুর রহমান দ্বিতীয়বার অপারেশন করেন। এবার ৩৪ হাজার ৮০২ টাকা ফি রেখে রোগীকে তিনদিন পর ১৯শে জুন রিলিজ দেয়া হয়। সম্প্রতি আবারো প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলে পুনরায় গত ২রা মে একই হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসকরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে রোগীর পাইলস হয়েছে বলে জানান। পরে অধ্যাপক ডা. সর্দার মো. রেজাউল ইসলাম তৃতীয়বার অপারেশন করেন। ২০ হাজার ৯১০ টাকা ফি রেখে ৬ই মে রোগীকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। বাড়ি আনার পর রোগীর অবস্থার আরো অবনতি হতে থাকে। ফলে ১১ই মে পুনরায় একই হাসপাতালে ভর্তি করালে সার্জন অধ্যাপক এস.এম.আর ইসলাম অপারেশন করে পেটের ভেতর থেকে গজের একটি পুটলি বের করেন। সার্জন জানান, চার বছর আগে সিজার করানোর সময় এই গজের পুটলি ভেতরে রেখেই সেলাই করে ফেলা হয়েছিল। এর জন্যই এতদিন রোগীকে এই কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। এবার ২৮ হাজার এক টাকা পরিশোধ করে ১৭ই মে রোগীকে বাড়ি নেয়া হয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, চারবারের অপারেশনে মোট এক লাখ ৫ হাজার ৯০ টাকা ফি দিতে হয়েছে। হয়রানিসহ আনুষঙ্গিক খরচ তো আছেই। সিজারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করা হয়। চিকিৎসকরা পরের দুইবারের অপারেশনেও গজের সন্ধান করতে পারেননি। চতুর্থবার গজের সন্ধান পেয়ে তা বের করেন। অথচ এর জন্য কারো কোন জবাবদিহিতা নেই।
এদিকে বোগীর সর্বশেষ অপারেশনের পর ছাড়পত্রেও রেক্টামে ফরেন বডি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমানকে প্রশ্ন করলে তিনি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন বলে জানিয়েছেন। জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক বাহার উদ্দিন ভূঁইয়া এ ব্যাপারে মোবাইলে ফোনে বলেন, রোগী পক্ষ আমার কাছে একটি আবেদন করলে তদন্তের ব্যবস্থা করবো। তদন্তে বেরিয়ে আসবে কোন চিকিৎসক অপারেশনের সময় গজ রেখে সেলাই করে ফেলেছিলেন।