Tuesday, August 7, 2018

পশ্চিমা দুনিয়ার তুলনায় স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে রোগজনিত মৃত্যুর প্রকোপ বেশি by অদিতি খান্না

পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর হার অনেক বেশি। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য। ‘ন্যাচার’ নামে একটি জার্নালে অসংক্রমক রোগের ওপর করা ওই গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ধনী দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্যান্সার, হার্টের রোগ ও স্ট্রোকে বেশি প্রাণহানি ঘটে।
অসংক্রামক রোগ বলতে এসব সব রোগকে বুঝায় যা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। এসবের মধ্যে রয়েছে ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের সমস্যা, স্মৃতিভ্রমের মতো স্নায়বিক অবস্থা ও মানসিক অসুস্থতা।
লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক মাজিদ ইজ্জাতি এবং ডা. জেমস বেনেট এই গবেষণায় দেখান যে, স্বল্প ও মাঝারি আয়ের দেশগুলোতে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার পশ্চিমা দুনিয়ার চেয়ে বেশি।
অধ্যাপক ইজ্জাতি বলেন, সাধারণ ধারণা হলো গরিব দেশগুলোতে সাধারণত সংক্রমণ ও ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। আর হৃদরোগ বা ক্যান্সারের মতো রোগগুলো ধনী দেশগুলোতে বেশি হয়। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ধনী দেশগুলোর তুলনায় স্বল্প আয়ের দেশগুলোর মানুষ দুরারোগ্য রোগে বেশি ভুগে থাকে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, স্বল্প ও মাঝারি আয়ের দেশগুলোতে প্রতি লাখে ৯০ জন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আর উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার ৬১ জন। স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর হারও প্রতি লাখে গরিব দেশে ৪৯ জন আর উন্নত দেশে ২২ জন।
গলা, পেট ও লিভার বা যকৃত ক্যান্সারের হারও ধনী দেশের তুলনায় গরিব দেশে বেশি। গবেষকরা বলছেন, এসব ক্যান্সারের অনেকগুলোই ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, গলার ক্যান্সারের অন্যতম কারণ হলো হিউম্যান পাপিলোমা ভাইরাস বা শরীরের আচিল।
ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুর হার স্বল্প ও মাঝারি আয়ের দেশে প্রতি লাখে ৩২ জন। যেখানে উচ্চ আয়ের দেশে এই সংখ্যা প্রতি লাখে ১১ জন।
গবেষকরা পশ্চিমা দেশগুলোর মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্যাদির সঙ্গে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের ক্রান্তীয় দেশগুলোর মৃত্যুর সংক্রান্ত তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। যেসব দেশের অর্ধেক বা তার বেশি কর্কটক্রান্তি রেখা ও  মকরক্রান্তি রেখার মধ্যে পড়েছে সেসব দেশকেই ক্রান্তীয় দেশের মধ্যে ধরা হয়েছে। সেই হিসাবে আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের প্রায় ৮০টি দেশ এই তালিকায় রয়েছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বয়সের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে মৃত্যুহার সমন্বয় করা হয়েছে।
গবেষকরা দেখেছেন, ২০১৬ সালের এই ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে ২ কোটি ৫৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মানুষের প্রায় ৩৪ শতাংশেরই মৃত্যুর কারণ বিভিন্ন সংক্রামক ও জীবাণুঘটিত রোগ, গর্ভাবস্থা ও জন্মদান সংক্রান্ত এবং অপুষ্টিজনিত রোগ। ৫৫ শতাংশ রোগের কারণ ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যার মতো অসংক্রমক রোগ।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো দেরিতে রোগ ধরা পড়া, বেশি মারাত্মক পর্যায়ে ধরা পড়ার পরও কম কার্যকর চিকিৎসা। কারণ পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এসব দেশে দূরারোগ্য রোগের চিকিৎসা দুর্লভ।
হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো কার্ডিওভাসকুলার রোগ স্বল্প ও মাঝারি আয়ের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি রোগজনিত মৃত্যুর কারণ। আক্রান্ত প্রতি চারজনের অন্তত একজন এই রোগে মৃত্যুবরণ করেন। এসব কার্ডিওভাসকুলার রোগের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো উচ্চ রক্তচাপ। গবেষণায় বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে উচ্চ রক্তচাপের হার বেশি। আর সবচেয়ে বেশি উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে সাব-সাহারান আফ্রিকা বা আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দেশগুলোতে।
গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে, তাদের বিশ্লেষণে কিছু দেশের তথ্য অনেক শক্তিশালী। তবে সামগ্রিক চিত্র প্রায় একই।
অধ্যাপক ইজ্জাতি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ক্যান্সার ও হৃদরোগের এমন উচ্চহারের অন্যতম কারণ হলো এসব দেশে ধূমপান ও অ্যালকোহল ব্যবহারের মাত্রা বাড়ছে। এই বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই একটি ভূমিকা রাখে। তবে চূড়ান্তভাবে এর মূল কারণ দারিদ্রতা, বাসস্থান ও পুষ্টির অভাব, অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা। এসব কারণে হৃদরোগের মতো অসুখগুলোর চিকিৎসাই শুরু হয় দেরিতে।  এছাড়া ওই সময়ে তাদের দেওয়া চিকিৎসাও থাকে অপর্যাপ্ত।
গবেষকরা স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার কমানোর জন্য ২৫টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যালকোহল ও তামাকের ব্যবহার কমানো, ভালো আবাসন ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের যোগান দেওয়া।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নিকাটকে কী বললেন?

মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটকে ডেকে প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা কথা বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। মন্ত্রীর ইস্কাটনস্থ সরকারি বাসভবনের ওই বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক ছাড়াও মার্কিন দূতাবাসের পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কাউন্সেলর বিল মুয়েলার উপস্থিত ছিলেন। বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা পৌনে ৭টা অবধি চলা পররাষ্ট্র ভবনের বৈঠক শেষে সরকার বা দূতাবাস কোনো পক্ষেরই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র ভবনের গেটে দাঁড়িয়ে সচিব ও রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা উভয়ে এড়িয়ে যান। বৈঠক প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে- নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে গত শনিবার রাতে আচমকা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে।
মোহাম্মদপুরে একটি ফেয়ারওয়েল ডিনার বা বিদায়ী নৈশভোজ থেকে ফেরার পথে জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মার্শা বার্নিকাটের গাড়ি বহরে হামলার ঘটনায় বিস্মিত কূটনৈতিক সম্প্রদায়। এ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন এবং হতাশ। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি জানার পরদিন সরকারের তরফে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের খোঁজ নেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকারও রোববার বাংলাদেশ সরকারকে নোট ভারবার পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অবহিত করে এবং ঘটনার স্বচ্ছ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জোর দাবি জানায়। মার্কিন দূতের গাড়িতে হামলাকারী অস্ত্রধারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার তাগিদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। মার্কিন দূতাবাসের তরফে রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার ঘটনার পাশাপাশি শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে রোববার পৃথক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জরুরি বৈঠক আহ্বান করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যার ফলে সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র ভবনে বৈঠকটি হয়।
কর্মকর্তাদের মতে নানা কারণে ইস্কাটনের বৈঠকটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ হিসাবে তারা যেটা বলার চেষ্টা করেন তা হলো- সরকারের বিদেশ নীতি ও পলিসি বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখ্য ৩ প্রতিনিধির (মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের) সঙ্গে মার্কিন দূতের এমন বৈঠক এর আগে কখনও হয়নি। তাদের ধারণা সেখানে নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার বিষয়ে কথা হয়েছে। মন্ত্রী হয়ত রাষ্ট্রদূতের মুখ থেকেই ঘটনাটি শুনতে চেয়েছেন এবং এ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে যেন কোনো রকম টানাপড়েন বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। ঘটনার বিষয়ে গত ৩৬ ঘণ্টায় সরকার যা জেনেছে তা-ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা হয়ত শেয়ার করতে পারেন। কোটা আন্দোলনে সমর্থন প্রশ্নে বিদেশি কূটনীতিক ও দূতাবাসের বিবৃতিকে সরকার ভালোভাবে নেয়নি।
কূটনৈতিক ব্রিফিং ডেকে এ নিয়ে মন্ত্রী সরকারের অসন্তোষ এবং হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। চলামান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতিকেও স্বাভাবিক কারণেই সরকার ভালোভাবে নিচ্ছে না জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন- হয়ত সেটি নিয়ে মন্ত্রী কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ওই বৈঠকে সুনির্দিষ্টভাবে কি কি বিষয়ে কথা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব যৌথভাবে রাষ্ট্রদূতকে কি বলেছেন? সেটি তারাই ভালো বলতে পারবেন। বৈঠক শেষে আমেরিকাস অনুবিভাগে কাজ করা এক কর্মকর্তা বলেন- বৈঠক হবে সেটি শুনছিলাম। কিন্তু সেখানে কি আলোচনা হয়েছে তা বলতে পারছি না। তবে ধারণা করতে পারি সম-সাময়িক বিষয় নিয়েই কথা হয়েছে। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার পরদিন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো, বৃটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেইক এবং কানাডার হাইকমিশনার বেনোয়েট প্রিফন্টেইন যৌথভাবে পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র সচিব) মো. শহীদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটসহ সম-সাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন- মার্কিন দূতের গাড়িতে হামলার ঘটনাটি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এ নিয়ে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু করেছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশ সরকারের তদন্তের ফল দেখার অপেক্ষায় রয়েছে- এমনটাই জানিয়েছেন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র।

আমরা বড়রা উপদেশ দেয়ার যোগ্যতা হারিয়েছি by মুহাম্মদ ইউনূস

দুই সহপাঠীর অপঘাত মৃত্যুর প্রতিবাদে স্কুলের শিশু-কিশোররা রাস্তায় নেমেছে। রাস্তায় তারা  শুধু শোক প্রকাশ করে থেমে থাকেনি- এরকম শোক যাতে ভবিষ্যতে কাউকে করতে না হয়, তার জন্য ব্যবস্থা চায় তারা। তারা নিরাপদ সড়ক চায়। সড়ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তারা প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে- শুধু তাই নয়, তারা নিজেরা এই ব্যবস্থাপনায় নেমে গিয়ে দেখাতে চেয়েছে যে, আইনের প্রয়োগের অভাবেই মূলত সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
তারা বাংলাদেশের মূল রোগটাকে সবার সামনে নিয়ে এসেছে। তারা আইনের প্রয়োগ চায়। যে প্রয়োগের নমুনা দেখানোর জন্য তারা গাড়িচালকের লাইসেন্সের পেছনে লেগেছে। ফিটনেস সার্টিফিকেটের সন্ধানে লেগেছে। আইনের প্রয়োগ করা যে সহজ বিষয় এবং সমাজে সবার সমর্থন পাওয়ার বিষয়, সেটাও তারা দেখিয়ে দিলো। যারা আইনের প্রয়োগকারী তারা নিজেরাই যে আইন মানছে না, সেটাও তারা দেখিয়ে দিলো। তা-ও কোনো বাহাদুরি করার জন্য নয়, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। আজ পর্যন্ত তাদের কারো মুখে বড়াই করতে শুনিনি, পত্রিকায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ গর্ব করে বলেনি যে আজ আমি এতজন লাইসেন্সবিহীন চালককে ধরতে পেরেছি।
তাদের শৃঙ্খলা দেখে হতবাক হয়েছি। বালখিল্যতার লেশমাত্র নেই কোথাও। প্রগাঢ় পরিপক্কতার চিহ্ন সর্বত্র। বিভিন্ন স্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লেখা প্ল্যাকার্ডগুলো ইতিহাসে স্থান পাওয়ার মতো। তারা ম্যানেজমেন্ট থিউরির মূল প্রতিপাদ্যকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে সুশৃঙ্খলভাবে তাদের কাজ নিয়ে এগিয়ে গেছে নিজ নিজ উদ্যোগে, কেন্দ্রীয় কোনো উদ্যোগ ছাড়া। তারা কোনো কমান্ড-কাঠামো তৈরি করেনি, কোনো কম্যুনিকেশন চ্যানেল স্থাপন করেনি, কোনো প্রশিক্ষণের অপেক্ষায় থাকেনি, নীতিমালা তৈরি করার প্রয়োজন বোধ করেনি, কোনো কনসালটেন্টের স্মরণাপন্ন হয়নি। তারা তাদের মতো করে সুশৃঙ্খলভাবে একমনে কাজ করে গেছে।
সরকার তার সমস্ত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এখন শিশু-কিশোরদের হাত থেকে রাজপথ মুক্ত করার কাজে লেগেছে একনিষ্ঠভাবে। সরকার একটা বিরাট সুযোগ হাতছাড়া করে ফেললো। রাজপথ মুক্তির অভিযানে না গিয়ে সরকার সুন্দরভাবে শিশু-কিশোরদের, তাদের বাবা-মাদের, দেশের সব মানুষের ক্ষোভমুক্তির কাজে নামলে রাজপথও মুক্ত হতো, শিক্ষার্থীরাসহ সব মানুষের বাহবা পেতো। লাইসেন্সবিহীন চালক এবং ফিটনেস সার্টিফিকেটবিহীন গাড়ি চিহ্নিত করা কি এতই কঠিন কাজ?
রাস্তায় নামা শিশু-কিশোরদের দেখে সবাই অভিভূত হয়েছে। এই স্মৃতি জাতি কখনো ভুলবে না। তারা কান্নাকাটি করার জন্য বা শোকের মাতম করার জন্য রাস্তায় নামেনি। তারা সমাধান নিয়ে নেমেছে। অত্যন্ত পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে নেমেছে। সুশৃঙ্খলতার সঙ্গে তারা কাজ করে গেছে। কোনো গলাবাজি ছিল না, রাতব্যাপী নিজেদের মধ্যে বক্তব্য বা কর্তব্য স্থির করার জন্য বাকবিতণ্ডা হওয়ার কথা শুনিনি। কারো মুখে এমন কোনো ভাব দেখিনি, যাতে মনে হয়েছে যে, কিশোর-কিশোরী অজানা কাজের দায়িত্ব পেয়েছে বলে কোনো অনিশ্চয়তায় ভুগছে। যাকে যেখানেই যে কাজে দেখেছি, মনে হয়েছে যেন একজন প্রশিক্ষিত দক্ষ কর্মকর্তা তার দায়িত্ব পালন করেছে। তার হাতে কোনো ওয়াকি-টকি নেই। অস্ত্র নেই। শুধু আছে বৃষ্টিতে ভেজা স্কুলের পোশাক, সারা দিন না খেতে পাওয়া শুকনা মুখ, পিঠে বইয়ের ব্যাগ।
এরা কারা? এরা কোন গ্রহের বাসিন্দা? এরা কি আমাদেরই সন্তান? এরা কি আমাদের মেরুদণ্ডহীন অস্তিত্বের পরিবেশে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্ম? বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না। তাহলে কি আমাদের মেরুদণ্ড আসলে হারিয়ে যায়নি? শুধু কৌশলগত কারণে লুকিয়ে রেখেছি? তাহলে কি আমাদের শিশু-কিশোররা বড়দের এই মেরুদণ্ড লুকানোর খেলাটা বুঝতে পারার আগেই মা-বাবার দেয়া আনকোড়া নতুন মজবুত মেরুদণ্ড নিয়ে রাজপথে নেমে গেছে? তাদের দেখে চোখে আনন্দাশ্রু এসে পড়েনি এ-রকম মা-বাবা কি দেশে পাওয়া যাবে?
দুই.
শিশু-কিশোরদের রাস্তায় নামার পর থেকে আমার কাছে নানাজনে অনুরোধ পাঠাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন, কিছু উপদেশ দিন, তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দিন। আমি তাদের দিকে তাকালে বুঝে উঠতে পারি না কী উপদেশ দেবো? পরে বুঝতে পারলাম কেন কোনো উপদেশ আমার মাথায় আসছে না। আমরা বড়রা তাদের উপদেশ দেয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা গর্তের ভেতর থাকা মানুষ। গর্তের ভেতরে থেকে উপদেশ দেয়া যায় না।
তাদের প্রতি আমার একটাই পরামর্শ। তোমরা আমাদের উপদেশ শুনবে না। অন্ধ মানুষ চক্ষুষ্মানকে চলার উপদেশ দিতে পারে না। তাদেরকে বলবো: তোমরা আমাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ দিও না। যদি একবার এ সুযোগ দাও, তাহলে তোমাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে আমাদের গর্তে না ঢোকানো পর্যন্ত আমরা আর থামবো না।
আমরা এখন আর চোখে দেখি না। চোখের উপর একটা আস্তরণ টেনে দিয়েছি স্বেচ্ছায়। নানা ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের এই ইচ্ছাকৃতভাবে না-দেখাটা যাতে ধরা না-পড়ে আমরা তার নিরন্তর প্রচেষ্টায় থাকি। তোমরা আমাদের মতো স্বেচ্ছা অন্ধের কথায় কর্ণপাত করো না। কর্ণপাত করো না বলেই তোমরা রাস্তার দায়িত্ব নিতে পেরেছো। যারা নিজেরা পথ চেনে না, তারা পথ দেখাবে কী করে। আমাদের পরামর্শ নিলে তোমরাও গর্ত বানানোর কাজে লেগে যেতে।
তোমরা পথ বের করেছো। তোমরা তোমাদের পথেই থাকো। তোমরা তোমাদের প্ল্যাকার্ডে অত্যন্ত সুন্দর করে তোমাদের সব কথা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছো। তুমি বলেছো, ‘তুমি বাংলাদেশ।’ সেটাই সবচেয়ে খাঁটি কথা। অন্য কোনো বাংলাদেশকে তুমি স্বীকার করো না। তোমার মতো করে তুমি তোমার বাংলাদেশকে বানিয়ে নাও। তুমি বলেছো: ‘তুমি যদি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, তুমি যদি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ।’ তুমি রুখে দাঁড়িয়েছো, তাই তুমি বাংলাদেশ। তুমি বলেছো: ‘আমরা যদি না-জাগি মা, ক্যামনে সকাল হবে।’ তোমরা জেগেছো, এবার সকাল হবে। আমরা যারা চোখে দেখেও দেখিনা তাদের চোখের পর্দা এই ভোরের জ্বলন্ত আলো দিয়ে কেটে দাও। আমাদেরকে তোমাদের সঙ্গে থাকার উপযুক্ত করে নাও। তুমি যেমন বাংলাদেশ, আমাকে তোমার মতো করে বাংলাদেশ হওয়ার মতো উপযুক্ত করে নাও।
গর্তে গুঁজে থাকা আমাদের শীতল নিস্তেজ শরীরে তোমরা আগুন ছড়িয়ে দাও। যদি আগুনের কোনো ছিটেফোঁটা আমাদের শরীরে এবং মনে এখনো থেকে থাকে, তবে হয়তো তোমার আগুনে সেটা আবার উত্তাপ ফিরে পাবে।
তোমরা রাতের অন্ধকার থেকে জ্বলন্ত সকালকে টেনে বের করে আনার ব্রতে নেমেছো। তোমরাই পারবে আমাদের হিমশীতল অস্তিত্ব থেকে টগবগে বাংলাদেশকে বের করে আনতে।
তুমিই বাংলাদেশ!
তোমার চোখেই দেখতে চাই বাংলাদেশকে। তোমার মনের রং মেখে রাঙিয়ে দিতে চাই আমাদের মনগুলোকে।

অবিরাম হামলা টিয়ারশেল, জলকামান

টানা তৃতীয় দিনের মতো রাজধানীতে হামলার শিকার হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বাড্ডার আফতাব নগরে এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিছিলে টিয়ারশেল ও জলকামান থেকে পানি ছুড়েছে পুলিশ। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বাড্ডায় বেসরকারি ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভাঙচুরও করে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি পালন করতে গেলে পুলিশ তাদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এসময় সরকারদলীয় স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা করে, শিক্ষার্থীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুপুরের পর থেকে থেমে থেমে সন্ধ্যা পর্যন্ত হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পুরো এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করে।
উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে রাতে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এদিকে আগের দিন পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে শাহবাগের দিকে গেলে তাদের ওপর টিয়ারশেল ও জলকামান থেকে পানি ছুড়ে পুলিশ। পরে ওই এলাকা থেকে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করে থানায় রাখা হয়। এদিকে রোববার ধানমন্ডিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। শনিবার আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে।
পুলিশের সামনেই বাড্ডায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা: আফতাব নগরে পুলিশের সামনেই ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ভাঙচুর ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে একদল দুর্বৃত্ত। সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত দফায় দফায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় পুলিশ, র‌্যাব ও আর্মড পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা কোন বাধা দেয়নি। বরং ওই যুবকদের সঙ্গে তারাও শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল ছুড়ে। এ ঘটনায় অন্তত ১০-১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন। সে সঙ্গে সাতজনকে আটক করে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী।
নিরাপদ সড়কের দাবি এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাসের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। হঠাৎ সেখানে একদল যুবক অতর্কিত হামলা শুরু করে। তারা শিক্ষার্থীদের ওপর ইটপাটকেল ছোড়ে। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরাও তাদের পাল্টা ধাওয়া করে। এ সময় পুরো আফতাব নগর এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। সকাল থেকেই বেরাইদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা আফতাব নগরের গেটে অবস্থান নেয়। এসময় সেখানে কোনো পুলিশের উপস্থিতি ছিল না। সকাল ১০টায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে যায়। এসময় শিক্ষার্থীরা তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। তারপরও বহিরাগতদের ইটপাটকেল ছোড়া থেমে ছিল না। তারা একের পর এক ঢিল ছুড়ে ক্যাম্পাসের কয়েকটি জানালার গ্লাস ভাঙচুর করে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের লোকজনের এই হামলায় পুলিশের কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি।
বরং বেলা বারোটার দিকে যখন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতর থেকে ঢিল ছুড়ছিল তখনই পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছোড়ে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একজন নারী সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে তাকেও হেনস্থা করে স্থানীয় যুবলীগ কর্মীরা। তবে এ ব্যাপারেও পুলিশের কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। সকাল ১১টার পর থেকে ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত অবস্থার মধ্যেই থাকতে হয়। দুপুর ২টার পর রামপুরা ব্রিজের জহুরুল ইসলাম সিটির গেটে বেশ কয়েকজন অভিভাবক সন্তানদের খোঁজে আসেন। ক্যাম্পাসের ভেতরে নিজের সন্তান আটকের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বায়েজিদ আহমেদ নামের এক শিক্ষার্থীর মা জানান, দুপুর ১টার পর আমার ছেলে ফোন দিয়েছিল। এরপর তার আর কোনো খবর জানি না। শুনেছি ওকে পুলিশ নিয়ে গেছে। এখন ফোনও বন্ধ। বায়েজিদের মা বলেন, বায়েজিদ ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইলেট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। এসময় আরো কয়েকজন শিক্ষার্থীর খোঁজে তাদের অভিভাবকরা ক্যাম্পাসের সামনে এসে ভিড় করেন। এদিকে বেলা আড়াইটার দিকে ক্যাম্পাস এলাকায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রায় ২শ’ শিক্ষার্থী লাঠিসোটা নিয়ে এগিয়ে আসেন ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করতে। এসময় কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ব্র্যাকের শিক্ষার্থীরা যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীদের কয়েকজনকে মারধরও করেন। পরে যুব-স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস থেকে সরে যায়। ব্র্যাকের শিক্ষার্থীদের ওপর কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে তাদের ধাওয়া করে পুলিশ। পরে একদল যুবক হেলমেট পরিহিত অবস্থায় ক্যাম্পাসে এলে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়। স্থানীয় লোকজনের সূত্রে জানা যায়, তারা বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তারা লাঠিসোটা নিয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। এ সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। দেশ টিভি, বৈশাখী টিভিসহ কয়েকটি টিভি চ্যানেলের ভিডিও সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। বিকাল চারটার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। সোয়া চারটার দিকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. ফরাস উদ্দিন ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করেন। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ফরাস উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি এখন বেশ শান্ত।
সকাল থেকে বহিরাগতরা হামলা করেছে। এ বিষয়ে বাড্ডা জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) আহমেদ হুমায়ুন বলেন, সকাল থেকে এখানকার পরিস্থিতি ভালো ছিল না। এখন অনেক শান্ত। শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরে যেতে পারছেন। তবে শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতরা কেন হামলা করেছে বা পুলিশ কেন তাদের ওপর টিয়ারশেল ছুড়েছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে চাননি। এদিকে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টির বেশকিছু কাচের গ্লাস ভাঙচুর হয়েছে। বহিরাগতের হামলায় কয়েকটি জানালা ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে।
হামলা-সংষর্ষে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা রণক্ষেত্র: সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশের জেরে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় দফায় দফায় হামলা সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশের টিয়ারশেল ও ছাত্রলীগের হামলায় ৭ শিক্ষার্থী আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১০টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে খণ্ড খণ্ড মিছিল সহকারে গ্রামীণফোনের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এগোতে থাকলে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা ধাওয়া দেয়। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে এ সময় ফাঁকা গুলি করতেও দেখেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
পরে শিক্ষার্থীরা আবারও সংগঠিত হয়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে ধাওয়া দেয়। শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ। শিক্ষার্থীরা পুলিশের টিয়ারশেলের জবাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের টিয়ারশেলের সঙ্গেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের খবর পেয়ে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির যেসব শিক্ষার্থী ক্লাসে ছিলেন সেইসব শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন। উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। পুলিশ রায়ট কার দিয়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান লক্ষ্য করে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। হামলা সংঘর্ষে ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুপুর পৌনে ১২টায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে বসুন্ধরা গেট ও এ্যাপোলে হাসপাতালের গেটে উভয়স্থানে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সদস্যরা অবস্থান নেয়। আর এ্যাপোলো হাসপাতালের বামপাশের চৌরাস্তার মোড়ে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়। তখন কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ফেসবুকে লাইভ করতে দেখা যায়। তারা ফেসবুক লাইভে সেখানে তাদের সাহায্য করার জন্য অন্য শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। দুপুর পৌনে ১টার দিকে পুলিশ আবারও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। ওই সংঘর্ষ থেমে থেমে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত চলতে থাকে।
সংঘর্ষ চলাকালে আবাসিক এলাকার সড়কে যান ও জন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্কে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই বাসার মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সীমান্ত জানান, আমরা খণ্ড খণ্ড মিছিলসহকারে ক্যাম্পাস থেকে গ্রামীণ ফোনের কার্যালয়ের সামনে যাই। একপর্যায়ে সেখান থেকে বসুন্ধরা গেটের সামনে গেলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। পুলিশও আমাদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।
রনি নামে আরেক শিক্ষার্থী জানায়, বিনা উস্কানিতে পুলিশ ও ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। গুলশান জোনের পুলিশের এডিসি আব্দুল আহাদ মানবজমিনকে জানান, শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছে এমন খবর পেয়ে পুলিশ উপস্থিত হয়। তারা যাতে মূল সড়কে আসতে না পারে এজন্য পুলিশ তাদের বাধা দেন। শিক্ষার্থীরা আগে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
শাহবাগে পুলিশের টিয়ারশেল নিক্ষেপ: শাহবাগ এলাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই আহত হয়েছেন। বিকাল তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাহবাগ মোড়ের দিকে আসা মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে এ সংঘর্ষ ঘটে। এ সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে টিয়ারশেল ছোড়ে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ হয়নি। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পুলিশের টিয়ারশেল, জলকামান উপেক্ষা করে স্লোগান দিতে দিতে শাহবাগ মোড়ের দিকে এগিয়ে যায়। তখন লাঠিচার্জ শুরু করে পুলিশ। লাঠিচার্জ ঠেকাতে শিক্ষার্থীরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছোড়ে। এতে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়। লাঠিচার্জ আর টিয়ারশেল থেকে বাঁচার জন্য দৌড়াতে গিয়ে ১০/১২ শিক্ষার্থীও আহত হতে দেখা গেছে। লাঠিচার্জের সময় পুলিশ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। বিকাল সাড়ে তিনটায় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে শিক্ষার্থীদের টিএসসির দিকে পাঠিয়ে দেয়। তারপর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শ’ শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান করতে চায়। এ সময় পুলিশি বাধায় তারা ফিরে যায়। পরে তারা টিএসসি, কার্জনহল, শহীদ মিনার, কলাভবন, পাবলিক লাইব্রেরিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন হল প্রদক্ষিণ করে মিছিল করে। বিকাল তিনটার দিকে হঠাৎ করে আনুমানিক পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে শাহবাড় মোড়ের দিকে আসতে থাকে। এ সময় তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ‘ নিরাপদ সড়ক চাই’ ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা জালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও’ ‘নৌমন্ত্রীর পদত্যাগসহ নানা স্লোগান দেন। তখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের ফিরে যেতে বলে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শাহবাগ থানা পার হয়ে জাদুঘরের ঠিক উল্টোপাশে আসার পর তাদেরকে ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। শিক্ষার্থীরা তখন পুলিশের ব্যারিকেড ভেদ করে শাহবাগ চত্বরের দিকে এগুতে চায়। তখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছুড়তে শুরু করে। সংঘর্ষের পরে তাৎক্ষণিক এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, গত কয়েকদিন ধরে শাহবাগ মোড়ে শিক্ষার্থীরা অবস্থানের কারণে এই এলাকায় কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। শাহবাগে দেশের দুইটি বড় হাসপাতালসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এখানে রয়েছে। যানবাহন চলাচল করতে না পেরে অনেক রোগী ও সাধারণ মানুষের অনেক ভোগান্তি হয়েছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি শাহবাগ মোড়ে আর কাউকে অবস্থান করতে দেব না।
শাহবাগ থানা ফটকে স্বজনদের ভিড়: এক আত্মীয়কে রক্ত দানের উদ্দেশ্যে রামপুরা থেকে সিএনজিযোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন রাহাত ও লিমন। পথিমধ্যে শাহবাগ এলাকায় পৌঁছালে তাদের আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। রাহাত বেসরকারি চাকরি করেন এবং আরাফাত রহমান লিমন যশোরের একটি কলেজে পড়েন। সোমবার সন্ধ্যায় রাহাত ও লিমনের পরিবারের সদস্যরা থানার ফটকের সামনে অবস্থান করছিলেন। তারা অভিযোগ করেন, তাদের সন্তানেরা কোনো আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত না। পুলিশ জোর করে থানায় নিয়ে এসেছে। শাহবাগে আসার পরই তাদের গতি রোধ করে পুলিশ। তল্লাশির কথা বলে তাদেরকে নিয়ে আসা হয় শাহবাগ থানায়। তাদের নামে মামলা দেয়া হচ্ছে। এদিকে রক্ত না পেয়ে এবং আত্মীয়ের আটকের খবর শুনে থানার গেটের সামনে এসেছে অসুস্থদের স্বজনরাও। রোববার দিনভর আন্দোলনকারী সন্দেহে এরকম অনেককেই আটক করে পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগ থানার সামনে অবস্থানরত স্বজনরা অভিযোগ করেন, তাদের পরিবারের তরুণ-কিশোরদের রাস্তা থেকে ধরে এনে মামলা দেয়া হচ্ছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলায় গ্রেপ্তার নেই: নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। গুরুতর আহত অনেক সাংবাদিক রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপরে এসব হামলার ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে, সাংবাদিকদের ওপরে হামলার বিষয়ে তাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ করলে তারা গ্রেপ্তার করবেন। আহত সাংবাদিক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সচিত্র খবর থেকে জানা যায়, গত শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত জিগাতলা, সায়েন্সল্যাব, আফতাবনগর এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীরা দায়িত্বপালনরত সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। অনেক সাংবাদিকের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন নিয়ে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। অনেকের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন থেকে অনেক তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি আরো অনেককে বেধড়ক পেটানো হয়।
আওয়ামী লীগের মামলা: এদিকে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলার ঘটানায় দুটি মামলা করা হয়েছে। দলের উপদপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় অজ্ঞাতনামা প্রায় সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে গতকাল এ মামলা দুটি করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ। গত শনিবার একদল দুর্বৃত্ত আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়।

গুণ্ডাতন্ত্র চলছে আমাকে গুলি করে মারা হোক: প্রতিরোধের ডাক ড. কামাল বি. চৌধুরী, ফখরুল, মান্নার

গণফোরাম সভাপতি ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। দেশে গুণ্ডাতন্ত্র চলছে। লাঠিসোঁটা নিয়ে নিরীহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে গুণ্ডামি ছাড়া আর কিইবা বলা যেতে পারে। এমন অন্যায় হামলাকে ব্যক্ত করার জন্য বাংলায় এর চেয়ে ভালো আর কোনো শব্দ কি আছে? আর পুলিশের পাশে এসব লাঠিয়াল কেন। পুলিশের পাশে থেকে কারা ছাত্রদের ওপর হামলা করেছে। তারা নাকি পুলিশকে সহায়তা দিচ্ছে। এতে তো পুলিশকেও অপমান করা হচ্ছে। আমরা পুলিশের পাশে গুণ্ডা দেখতে চাই না। আমরা গুণ্ডামুক্ত বাংলাদেশ চাই। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। ড. কামাল বলেন, আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেয়া হোক। গুলি করে মেরে ফেলুন আমাদেরকে। তাহলে অন্তত বলতে পারবো। গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে মারা গেছি। সৃষ্টিকর্তার বড় দান হলো বিবেক। দেশে তরুণ সমাজ আজ জাগ্রত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য বড় শক্তি।
পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আইজি সাহেব, আপনি সরকারের চাকর নন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করছেন। অফিসে আইজি-ডিআইজির পাশে চেয়ারে কেন গুণ্ডারা বসবে। পুলিশের পাশে সাদা পোশাকের গুণ্ডারা কেন সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করবে। আপনি দায়িত্ব পালন করুন, নয়তো পদত্যাগ করুন।
সভাপতির বক্তব্যে জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমাদের সমস্যা কত গভীরে তা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি। দু’দিন আগে ধামরাইয়ে দুর্ঘটনায় ৫জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জনই ছাত্র। গত ২৯শে জুলাই নিহত দু’ছাত্রের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে। এভাবে যদি দিতে যান গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সাত সহস্রাধিক পরিবারকে দিতে লাগবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। দিন না তাদের সবাইকে। আর ১৬ লাখ ফিটনেসবিহীন গাড়িকে লাইসেন্স দেয়া শুরু করলে, দিনে ২০০ করে দিলে কত দিন লাগবে দেখুন। চলমান ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে তিনি বলেন, এখন বলা হচ্ছে ছাত্ররা স্কুলে ফিরে যাক। তা জবাব হতে পারে না। জবাব হতে পারে, রাষ্ট্রের মেরামত হোক।
ওই সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ছেলেরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এ আন্দোলন সবাইকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় ঐক্য ছাড়া এই ভয়ংকর সময় থেকে আমাদের মুক্তির উপায় নেই। ছেলেরা আমাদের সেই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন আমরা রাজনীতিবিদরা সেই জায়গায় আসবো কিনা সিন্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে।
সমাবেশে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো জাতি উদ্বিগ্ন। শুধুমাত্র দেশপ্রেমেই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে। তারা ৯ দিন ধরে রাস্তায়। পুলিশের সহায়তায় সরকারি গুণ্ডাবাহিনী সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছে। দা-লাঠি নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করছে। আমাদের সন্তানদের রক্তাক্ত করার অধিকার কারো নেই। গুণ্ডাদের নেই। এমন পরিস্থিতি দেখে আমাদের লজ্জা হয়।
তিনি আরো বলেন, যারাই এ আন্দোলনে সমর্থন দিচ্ছে তাদেরকে রাজনীতি করা হচ্ছে বলে অপবাদ দেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ তোলা হচ্ছে। রাজনীতি তো করবেই। দেশে কি রাজনীতি নিষিদ্ধ? এখন পুলিশ তোড়জোড় করে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করছে। পুলিশ আগে ঠিক করুক তাদের লাইসেন্স আছে কি না? এখন ১৪ দল ক্ষমতায়। অথচ তাদের মধ্যে ভারসাম্য নেই বলেই আওয়ামী লীগ যা ইচ্ছা তাই করছে।
সমাবেশে চলমান ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ছাত্রদের আন্দোলন অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত। ভাবতাম তরুণরা ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত। এখন দেখতে পাচ্ছি তারা সমস্যা নিয়েও সচেতন। তারাই আমাদের বাঁচাবে। কিন্তু এখন দেখছি তারা বঞ্চনার শিকার।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ছাত্ররা লিখেছে ‘রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্রের মেরামত কাজ চলছে।’ কিন্তু জিগাতলায় ১০ থেকে ১৫ বছরের সেই শিশুদের ওপর হামলা করা হয়েছে। আমরা কী তাদের চিনি না? কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তিন মাস আগে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। ব্যবস্থা নেয়ার নামে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। একইভাবে তিন মাস পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গেও প্রতারণা করা হবে। কথা দিয়ে যদি কথা না রাখে, কাজ না করে তাহলে একযোগে নেমে পড়। এটা বিনা ভোটের সরকার। বিনা ভোটে ক্ষমতায় থাকতে দেব না। অধিকাংশ যানবাহনেরই ফিটনেস এবং গাড়ি ও চালকের লাইসেন্স নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, জিগাতলায় ছাত্র ও সাংবাদিকদের ওপর যে আক্রমণ হয়েছে তা মেনে নেয়া যায় না। কারো অনুমতি নিয়ে তো আর আন্দোলন হয় না। অনুমতি তো দিবে না। অনুমতি নিয়ে তো পরিবর্তন আসবে না। হাইকোর্টের রায়েও তা আসবে না। লক্ষ্যবস্তু ঠিক রেখে, তার ওপর অবিচল থেকে এগিয়ে যেতে হবে।
সমাবেশ সঞ্চালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল। এ সময় তিনি বলেন, রাজপথ এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ২০ জন মানুষ খুন হচ্ছে। স্বাভাবিক দুর্ঘটনা হলে তাকে মৃত্যু বলা যেত। কিন্তু গাড়ির লাইসেন্স না থাকা, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, মাতাল হয়ে বেপরোয়াভাবে চালানোয় যে মৃত্যু, খুন ছাড়া তা আর কী। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ ও সরকারি গাড়িতে লাইসেন্স নেই। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপিরা তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিত্তবৈভবের জন্য নিয়ন্ত্রণহীন বাস রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আন্দোলনে তৃতীয়পক্ষ ঢুকে পড়েছে। এই তৃতীয়পক্ষ হলো ছাত্রলীগ-যুবলীগ। তিনি আরো বলেন, ছাত্ররা গাড়ির লাইসেন্স চেক করছে। এর মধ্য দিয়ে এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার লাইসেন্স আছে কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছে। দুর্নীতির লাইসেন্স আছে কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছে। সবক্ষেত্রে বৈধতার প্রশ্ন তুলেছে তারা। তাদের আন্দোলনকে ফেসবুকে সমর্থন করলেও বলা হচ্ছে ষড়যন্ত্র। হচ্ছে ৫৭ ধারায় মামলা। ছাত্র ও কোটা আন্দোলন যারা করে তারা গুম-খুনের শিকার হয়। কিন্তু যারা হামলা, ব্যাংক লুট এসব করে তারা গুম হয় না।
সংহতি সমাবেশে ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা সাবেক এমপি এসএম আকরাম বক্তব্য রাখেন। বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর আবদুল মান্নান, গণফোরামের অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।