Sunday, February 8, 2015

বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ : শেষ মুহূর্তের গোলে মালয়েশিয়া চ্যাম্পিয়ন

বাংলাদেশকে হারিয়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা জয় করেছে মালয়েশিয়া। আজ বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে স্বাগতিক বাংলাদেশকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় সফরকারী দলটি। ম্যাচ শেষে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ী দলের হাতে শিরোপা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ম্যাচের শুরু থেকেই বেশ গোছানো খেলা শুরু করে মালয়েশিয়া। তবে আক্রমণের দিক থেকে এগিয়ে ছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বড় দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখা দেয় জাহিদের ইনজুরি। খেলার ৮ম মিনিটেই ইনজুরির শিকার হন বাংলাদেশ দলের ওয়েঙ্গার জাহিদ হোসেন। বদলি হিসেবে মাঠে আসেন আবদুল বাতেন মজুমদার। শুরুতে একাদশের এই রদবদলে স্বাগতিক দলের ম্যাচ পরিকল্পনায় কিছুটা ফাটল ধরে। তারপরও আক্রমণে ছিল তারাই। ১১তম মিনিটে রায়হানের লম্বা থ্রোয়ের বলে মালয়েশিয়ার গোল পোস্টে জটলার সৃষ্টি হয়, সেখান থেকে এমিলি হেড করলে বল লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়। ১৪তম মিনিটে ফের লম্বা থ্রো করেন রায়হান। এবারও জটলা থেকে জামাল ভুইয়া শট নিলে বল বার ঘেষে বাইরে চলে যায়। ১৬ মিনিটের সময় প্রতি আক্রমণে যায় মালয়েশিয়া। এবার লম্বা থ্রো করেন মিডফিল্ডার মোহাম্মদ আরিফ ফারহান। বল কাড়াকাড়ির সময় বাংলাদেশ গোলপোস্টের সামনে জটলার সৃষ্টি হলেও একজন ডিফেন্ডার বল কিায়ার করেন। ম্যাচের বয়স যখন ৩১ মিনিট তখন বাংলাদেশ দলের ডি বক্সের বাইরে মালয়েশিয়ার এক খেলোয়াড়কে বাধা দিতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনে স্বাগতিক দলের ডিফেন্ডাররা। ফলে বেজে ওঠে রেফারির বাঁশি। ফ্রি কিক থেকে সফরকারী দলের স্ট্রাইকার কুমারান অন্তত ৪০ গজ দূর থেকে বাঁকানো শটে বাংলাদেশের গোল পোস্টে বল পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন ১-০ ব্যবধানে। ৩৮তম মিনিটে বাংলাদেশের আরো একটি আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয় সফরকারী ডিফেন্ডাররা। কিন্তু ৪১ মিনিটে গিয়ে ফের ভুল করে বসে স্বাগতিক দলের রক্ষণ বিভাগ। এসময় দুই ডিফেন্ডারের মাঝে দাঁড়ানো কুমারান ফের বল পেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে গিয়ে স্বাগতিক গোলরক্ষক শহিদুল হককে বোকা বানান প্লেসিং শটে । ফলে ২-০ গোলে এগিয়ে যায় মালয়েশিয়া। এসময় দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কিছুটা পেশী শক্তি ব্যবহারের চেষ্টা পরিলতি হয়। এরপর অবশ্য স্বাগতিকরা একাধিক আক্রমণ রচনা করলেও দেখা পায়নি গোলের। ফলে ০-২ গোলে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে মামুনুল বাহিনী। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে যেন পাল্টে যায় বাংলাদেশ দলের চেহারা। দারুণ উদ্যাম নিয়ে খেলতে থাকে তারা। এর ফলাফল হিসেবে ১০ মিনিটের মধ্যেই দুই গোল পরিশোধ করে খেলায় সমতা ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধের ৩ মিনিটের মধ্যেই ১ম গোল পরিশোধ করে তারা। ম্যাচের ৪৮তম মিনিটে সেই রায়হানের লম্বা থ্রো থেকে দুর্দান্ত এক হেডের সাহায্যে গোল করে ব্যবধান কমিয়ে দেন এমিলি (২-১)। ৫৩তম মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে পাওয়া কর্নার থেকে মামুনুল শট নিলে চলন্ত বলে হেড করেন ডিফেন্ডার ইয়াসিন খান। এতে ২-২ গোলে সমতায় ফিরে বাংলাদেশ। এরপরও আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে লুডভিক ডি ক্রুইফের শীষ্যরা। তবে সম্ভব হয়নি এগিয়ে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে কর্নার থেকে ফের গোল করে এগিয়ে যায় মালয়েশিয়া। অতিরিক্ত তিন মিনিটের শেষ মিনিটে (৯২ মিনিটে) মোহাম্মদ সিজওয়ানের কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেড করেন সতীর্থ খেলোয়াড় মোহাম্মদ ফাইজাত। এতেই ফের ৩-২ গোলে এগিয়ে যায় মালয়েশিয়া। শেষ পর্যন্ত ওই লীড নিয়েই মাঠ ছাড়ে মারয়েশিয়া। ম্যাচ সেরার পুরস্কারও লাভ করেছেন ম্যাচ জয়ী গোলদাতা ফাইজাত। টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার লাভ করেছেন স্বাগতিক দলের মিডফিল্ডার জামাল ভুঁইয়া।
সূত্র : বাসস।

রাজধানীতে ৩ গাড়িতে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণে আহত ৮

রাজধানীর পৃথকস্থানে তিনটি গাড়িতে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গাড়িতে আগুনের ঘটনায় কোন হতাহতের খবর না পাওয়া গেলেও ককটেল বিস্ফোরণে ৮ জন আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন, ফারাবী (২৪), সবুর (২৪), শম্পা আক্তার (২৪), তামান্না (২৪) নিয়াজ হাসানাত (২৩), ইমন (২৩) ও রকিবুল ইসলাম (৩২) পথচারীরা আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। সূত্র জানায়, সন্ধ্যা পৌঁনে ৭ টায় তেজগাঁও থানাধীন সাতরাস্তা এলাকায় গুলিস্থান টু গাজিপুরগামী একটি যাত্রীবাহী বাসে দৃর্বৃত্তরা আগুন দেয়। এতে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় রমনার সুগন্ধ্যা গেটের সামনে একটি হুলুদ ক্যাবে দুর্বৃত্তরা আগুন দেয়। এই দুটি আগুনের ঘটনায় কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার গোলাম মোস্তফা জানান, রাজধানীতে কোন গাড়িতে আগুনের ঘটনা ঘটেনি। এদিকে, সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় শহীদ মিনারের সামনে দুর্বৃত্তরা পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ফারাবী, সবুর, শম্পা আক্তার ও অজ্ঞাত যুবক আহত হয়। আহত চারজন শহীদ মিনারের সামনে চা পান করছিলেন। প্রায় একই সময় টিএসসির মোড়ে দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে তামান্ন, নিয়াজ ও ইমন গুরুতর আহত হন। অন্যদিকে, সন্ধ্যা ৭ টায় মৎস ভবনের সামনে মিরপুরগামী বিহঙ্গ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে দৃর্বৃত্তরা। এতে ওই বাসের যাত্রী রকিবুল ইসলাম আহত হন। পথচারীরা আহত ৮ জনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকের কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

নাশকতা মোকাবেলায় দ্বিতীয় ফ্রন্ট অবশ্যই দরকার by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) গণজাগরণ মঞ্চের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গণজাগরণ দিবস পালিত হলো। এবারের সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ বদ্ধমুষ্টি উঁচিয়ে শপথ গ্রহণ করেছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের নতুন যুদ্ধ_ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। ঢাকার রাজপথে তারা মিছিল করেছে; দেশের সর্বত্র সন্ত্রাসকে প্রতিহত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিএনপি-জামায়াতের নাশকতামূলক কাজে যখন দেশ জর্জরিত, তখন তার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের একটা অংশের মাথা তুলে দাঁড়ানো আশার লক্ষণ।
দু'বছর আগে যে প্রলয়োল্লাসের শক্তি নিয়ে শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের আবির্ভাব, সেই শক্তি এখন অবশ্য তার নেই। কিন্তু মঞ্চের অস্তিত্ব এখনও রয়েছে এবং তার আবেদনও দেশের তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল অংশের মধ্যে রয়ে গেছে। এটা দেশের মানুষের কাছে ভরসার কথা। আওয়ামী লীগ সরকার যদি গণজাগরণ মঞ্চের জনপ্রিয়তাকে ভয়ের চোখে না দেখত এবং মঞ্চের তরুণ নেতৃত্ব যদি প্রথম দিকে নীতিনির্ধারণে কিছু ভুল না করত, তাহলে সরকার ও তরুণ প্রজন্মের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে চূড়ান্ত পরাজয় থেকে মৌলবাদের হিংস্র দানব আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারত না এবং বিএনপির কাঁধে চড়ে সারাদেশে আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারার এই বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু করতেও সক্ষম হতো না।
এটা আমাদের গণতান্ত্রিক শিবিরের বহুবারের পদস্খলন। যখনই তারা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং গণতন্ত্রবিরোধী চক্রকে চূড়ান্ত পরাজয়ের দিকে ঠেলে দেয়, ঠিক সেই মুহূর্তে কী এক জাদুযন্ত্রে যেন গণতান্ত্রিক শিবিরে ঐক্য ভেঙে যায়। তারা আত্মঘাতী বিবাদে লিপ্ত হন। ফলে হিংস্র ও ঘাতকচক্র সুযোগ পেয়ে নিজেদের পরাজয় ঠেকায় এবং গণতান্ত্রিক শিবিরের বিজয় সহজেই ছিনিয়ে নেয়। এটা আমরা '৫৪ সালে দেখেছি। '৫৭ সালে (আওয়ামী লীগে ভাঙন ও ন্যাপের জন্ম) দেখেছি। স্বাধীনতার পর '৭৫ সালে দেখেছি। '৯০ সালে দেখেছি এবং এখনও দেখছি।
২০১৩ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া চলার মুহূর্তে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম। এই মঞ্চে নানা দলমতের তরুণদের সমাবেশ ঘটেছিল এবং ছিল যৌথ নেতৃত্ব। ফলে এই মঞ্চের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছু ভুলভ্রান্তি হয়তো ছিল। তবু আওয়ামী লীগ সরকারের পরোক্ষ সমর্থন এই মঞ্চের পেছনে ছিল এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগও এই মঞ্চে এসে কাতারবন্দি হয়েছিল। তখন ঢাকায় মহাগণজাগরণের যে সমদ্রোচ্ছ্বাস জেগেছিল, তা অভূতপূর্ব। মনে হয়েছিল, স্বাধীনতা ও মানবতার শত্রুপক্ষ এবার চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করতে যাচ্ছে, নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছে।
কিন্তু তারা পরাজিত হলো না। নিশ্চিহ্ন হওয়া দূরের কথা, মঞ্চের ঐক্য বিভক্তির মুখে দাঁড়াল। ছাত্রলীগ সহসা মঞ্চ থেকে দূরে সরে গেল। পাল্টা মঞ্চ খাড়া করার প্রচেষ্টা শুরু হলো। মঞ্চের নেতৃত্বকে নানা অপবাদ দিয়ে তাদের ক্রেডিবিলিটি নষ্ট করা শুরু হলো। মঞ্চের নেতৃত্বও যে কিছু কিছু ভুল করেননি তা নয়। তারাও আওয়ামী লীগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন এবং এমন কিছু কর্মসূচি নিয়েছেন, যা ছিল স্বাধীনতার শত্রুশিবিরের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার শামিল। গণজাগরণ মঞ্চের ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি করার জন্য শত্রুশিবিরের চক্রান্ত তো ছিলই। এমনকি দেশের বিগ এনজিওর মুখপাত্রগুলোও নিজেদের স্বার্থে এই চক্রান্তে জড়িত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার গণজাগরণ মঞ্চের জনপ্রিয়তাকে ভয় পেল আর গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বও হয়তো ভাবলেন, আওয়ামী লীগের সর্বগ্রাসী গ্রাস থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে যাওয়া বুঝি প্রয়োজন। এ বুদ্ধিটা কেউ তাদের জুগিয়ে থাকলে কে জুগিয়েছে তা আমি জানি না। সিপিবির নেতারা? ড. কামাল হোসেন অথবা ইউনূস শিবিরের লোকেরা? আমি এবার ঢাকায় থাকার সময় প্রশ্নটা মঞ্চনেতা ডা. ইমরানকে করেছিলাম। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ড. কামাল হোসেন বা ইউনূস শিবিরের সঙ্গে কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি এখনও আওয়ামী লীগকেই মিত্রপক্ষ ভাবেন। স্বাধীনতা ও মানবতার সন্ত্রাসী শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সহযোগিতা চান।
তাহলে আওয়ামী লীগ ও গণজাগরণ মঞ্চের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ঘটেছিল কেন? যা দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের ঐক্য ও শক্তি খর্ব করেছে। পাল্টা হেফাজতি অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে। সন্দেহ নেই, প্রতিবিপ্লবী ও প্রতিক্রিয়াশীল হেফাজতি অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল বিএনপি ও জামায়াতের নীলনকশা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্বলতা এবং আপসবাদী ভূমিকাও যে তার পেছনে উৎসাহ জুগিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগের এই আপসবাদী ভূমিকা এবং পাল্টা গণজাগরণ মঞ্চ খাড়া করার পেছনে উৎসাহদান বিএনপি-জামায়াতকে আবার গত ৬ জানুয়ারির পর পশুশক্তি নিয়ে সন্ত্রাসে নামার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
আমি আওয়ামী লীগ সরকারকে তাদের ভ্রান্তনীতি সম্পর্কে আগেই সতর্ক করেছি। গণজাগরণ মঞ্চের নেতাদেরও বলেছি, স্বাধীনতার শত্রু এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ। একইভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গেও সমদূরত্বের অবস্থান নিলে তারা ভুল করবেন। এটা সিপিবির মতো বর্তমানের গণবিচ্ছিন্ন ও তত্ত্বসর্বস্ব দলের নীতি হতে পারে; কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের মতো 'ব্রড চার্চের' নীতি হতে পারে না। আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো কোনো ভুল কাজের প্রতিবাদ তারা জানাতে পারেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান তারা নিতে পারেন না।
বিএনপি-জামায়াত তো গণজাগরণ মঞ্চের ঐক্য ভাঙার জন্য সতত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভেতরেও একটা কট্টর ডানপন্থি গ্রুপ আছে, মঞ্চের নাম ও কর্মসূচি যাদের কাছে অ্যালার্জি। তাদের গোপন উৎসাহেই পাল্টা মঞ্চ তৈরি হয় এবং মঞ্চের সভা-সমাবেশ নষ্ট করার জন্য এরা চেষ্টা চালায়। বিস্ময়ের কথা এই যে, মঞ্চ যখন স্বাধীনতার শত্রুদের বিরোধিতা করার জন্য সভা-সমাবেশ ডাকে, তখন আওয়ামী লীগের সমর্থিত বলে কথিত এই গ্রুপগুলোই তাতে বাধা দিতে পাল্টা সমাবেশ ডাকে, মাইক বাজায় এবং নানা উপদ্রব সৃষ্টি করে। এটা আত্মঘাতী নীতি। বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশে যারা বাধা সৃষ্টি করার সাহস দেখায় না বা তাদের সন্ত্রাস রুখতে এগিয়ে যায় না; তারা স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী গণজাগরণ মঞ্চের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে গিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসেই যে শক্তি জোগাচ্ছে তা কি তারা বুঝতে পারে না?
সুখের কথা, এবার ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গণজাগরণ দিবস পালনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সমর্থক গ্রুপ হিসেবে কথিত অথবা পরিচিত দল বা দলগুলো বাধা সষ্টি করার কাজে এগিয়ে আসেনি বা আসতে পারেনি। তাদের পেছনে জনসমর্থনের (নবজাগ্রত তরুণদের) অভাব আছে এবং শেখ হাসিনারও এবার নাকি শক্ত নির্দেশ ছিল, এরা যেন গণজাগরণ দিবসের সমাবেশে উৎপাত সৃষ্টি করতে না যায়। আমার ধারণা, অন্তত শেখ হাসিনা এ কথা উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশকে হিংস্র মৌলবাদের ছোবল থেকে রক্ষা করে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে গণজাগরণ মঞ্চ তথা দেশের নবজাগ্রত তারুণ্যের সমর্থন তার দরকার। এরা আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ নয়; বরং আওয়ামী লীগের সম্পূরক শক্তি।
গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সংগ্রামে যে একটি দ্বিতীয় ফ্রন্ট প্রয়োজন, এ কথা বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন গত শতকের ষাটের দশকে ছয় দফার আন্দোলনের সময়। ছয় দফা ঘোষিত হওয়ার পর বাম ছাত্রসমাজ থেকে ১১ দফা দাবি ঘোষিত হয়। তখনও আওয়ামী লীগের ভেতরের একটা কট্টর ডানপন্থি কোটারি বঙ্গবন্ধুকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল, ১১ দফা হচ্ছে ছয় দফার পাল্টা প্রস্তাব। ছয় দফার আন্দোলনকে নষ্ট করাই এর লক্ষ্য। সুতরাং ১১ দফার দাবিদারদের আগে মোকাবেলা করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু তাদের সঙ্গে একমত হননি। তিনি বলেছেন, ১১ দফা হলো ছয় দফার সম্পূরক দাবি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি ১১ দফাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানান ও বলেন, 'এই ছয় ও ১১ দফার ভিত্তিতে যৌথ আন্দোলন গড়ে উঠবে এবং তা হবে আমাদের দাবি আদায়ের অপরাজেয় শক্তি।' বঙ্গবন্ধুর কথা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। ছয় দফা ও ১১ দফার সম্মিলিত আন্দোলনেই দেশে সামরিক শাসনবিরোধী বিশাল গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল।
বর্তমান বাংলাদেশেও গণজাগরণ মঞ্চকে আওয়ামী লীগের উচিত হবে, স্বাধীনতার শত্রু ও সন্ত্রাস দমনের আন্দোলনে সহায়ক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মঞ্চকে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার ব্যাপারে উৎসাহিত করা। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সমাবেশে মঞ্চ সারাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত হবে, এই অভিযানে যাতে বাধা সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
ছাত্রলীগ এখনও দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বড় ছাত্র প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তার ক্রেডিবিলিটি আত্মকলহ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও লাইসেন্সবাজির জন্য এখন অনেকটাই নষ্ট। ফলে জনজীবনে আন্দোলন করার আবেদন সে সৃষ্টি করতে পারছে না। গণজাগরণ মঞ্চের সন্ত্রাসবিরোধী কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়ে এবং সহায়তা দিয়ে ছাত্রলীগ তার নষ্ট ক্রেডিবিলিটি উদ্ধার করতে পারে। তাতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান আরও শক্তিশালী হবে। বিষয়টি ছাত্রলীগ নেতারা ভেবে দেখুন।
৫ ফেব্রুয়ারির গণজাগরণ দিবসের সমাবেশকে দুই বছর আগের বিশাল সমাবেশের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তুলনা করা উচিতও নয়। তখনকার রাজনৈতিক পরিবেশ এখন নেই। সেই গণঐক্য নেই। অবিরাম ব্যর্থ হরতাল, অবরোধের ডাক এবং অগি্নকাণ্ড ও বোমাবাজি দ্বারা নিরীহ মানুষ হত্যার তাণ্ডবে জনজীবনে একটা ভীতিকর ও বিভ্রান্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। কিন্তু এই প্রতিকূল অবস্থা এবং ভেতরের ও বাইরের নানা বাধা সত্ত্বেও আমাদের প্রতিবাদী তরুণ প্রজন্মের সংগ্রামী ভূমিকা যে দমিত হয়নি, গত ৫ তারিখের সমাবেশ তার প্রমাণ। এই সমাবেশ দেশে বিরাজিত ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে একটি সাহস ও আশার আলো।
গণজাগরণ মঞ্চের বর্তমান নীতি ও নেতৃত্ব অপরিবর্তিত থাকলে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের যে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার কর্মসূচি তারা নিয়েছেন তা জনসমর্থন পাবে এবং সফল হওয়ার পথে অবশ্যই এগিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'বর্তমান সন্ত্রাস দমনে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় হয়নি।' আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সহমত পোষণ করি। ছিঁচকে সন্ত্রাস যত নৃশংস ও বর্বর হোক, তা দমনে কামান দাগানোর প্রয়োজন নেই। সরকার সন্ত্রাসীদের দমনে আরও কঠোর হোক এবং এই সন্ত্রাস মোকাবেলার জন্য তরুণ প্রজন্মের যে অংশ আজ উন্মুখ ও সক্রিয়, তাদের সহায়তা দিক। গণশত্রু দমনে গণজাগরণই হচ্ছে মোক্ষম দাওয়াই।
লন্ডন, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার

পয়েন্ট অব নো রিটার্ন by মিনার রশীদ

সব আলামত দেখে মনে হচ্ছে যে, সরকার চরম বেকায়দায় পড়ে গেছে। বিএনপি এবং জামায়াত এ দু’টি দলকেই ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ ঠেলে দেয়া হয়েছে ও সরকার যেসব অপকৌশল প্রয়োগ করে এত দিন বিরোধী দলগুলোকে দমিয়ে রেখেছিল, একে একে তার সবগুলোই ভোঁতা বা অকেজো হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনোটি সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে পড়েছে। আন্দোলনে এমন একটা পদ্ধতি বেরিয়ে এসেছে যে, মধ্যসারির নেতাদের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই টপ নেতৃত্ব আন্দোলন পরিচালনা করতে সম হচ্ছেন। এ বিষয়টি আন্দোলনের চেহারা ও মেজাজ আমূল বদলে দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, কিছু সুযোগসন্ধানী নেতাকে নিয়ে বিকল্প বিএনপি তৈরির সরকারের পরিকল্পনাটিও মাঠে মারা গেছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা মেরে সাতজন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। পুলিশ পাশ থেকে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছে, কিন্তু আগুন নেভাতে এগিয়ে যায়নি বলে অভিযোগ এসেছে। এ বিষয়ে জনগণের সন্দেহের তীরটি সরকারের দিকেই বেশি করে আপতিত হয়েছে ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ বিঘিœত হওয়ায় এমবেডেড মিডিয়ার ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাস এমনিতেই উঠে গেছে। সরকার ও পদলেহী মিডিয়ার দুর্বোধ্য বীজগণিত মানুষ বুঝতে পারে না। তার পরিবর্তে সহজ পাটীগণিতের হিসাব কষে হত্যাকারীদের মোটিভ ও চেহারা ধরে ফেলেছে। ভবিষ্যতে অন্য কেউ নিজের ফাঁসি চেয়ে কিছু জানিয়ে দিলে মানুষ মূল রহস্যটি জানতে পারবে। অন্যথায় রোজ কেয়ামত পর্যন্ত অপো করতে হবে। সাধারণ মানুষের বিশ্লেষণী শক্তি এখন আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে গেছে। কাজেই বিরোধী দলের আন্দোলনের প্রতি জনগণকে বিুব্ধ বানাতে সরকারের এই পরিকল্পনাটিও বুমেরাং হয়ে পড়েছে। কারণ, মূল ধারার মিডিয়াকে নিজেদের হাতে নিয়ে ফেললেও বিকল্প সামাজিক মিডিয়ার শক্তি ও কর্মকৌশল সম্পর্কে সরকার সম্যক ধারণা করতে পারেনি। অন্য দিকে বহির্বিশ্বে সরকারের একমাত্র আশা ও ভরসার জায়গাটিও নড়ে গেছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পইে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। খবরটি বাড়াবাড়িকারীদের পায়ের নিচের মাটি অনেকটাই সরিয়ে দিয়েছে। হিন্দুত্ববাদীদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তারা যে একটা পর্যায়ের নিচে নামতে পারবেন নাÑ তা স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ অবৈধ কাউকে টিকিয়ে রাখতে যতটুকু নিচে নামা দরকার কংগ্রেস সরকার ততটুকুই নিচে নামত। কিন্তু বিজেপি সরকার হুবহু ততটুকু যে নামবে না, এটা বোঝা যাচ্ছে। অনৈতিক ক্ষমতা চর্চাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলতে এতটুকুই যথেষ্ট। তা ছাড়া একটা অস্থিতিশীল বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ। ইন্ডিয়া নিজের স্বার্থেই এ দেশে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেবে না। ইন্ডিয়ার নেতৃত্ব আমাদের মতো মগজহীন নয়। এ দেশে গৃহযুদ্ধ বাধলে ইন্ডিয়ার কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, এটা তারা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি চায়নার জন্য বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা ইন্ডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের স্বার্থের সম্পূর্ণ বিপরীতে চলে যাবে। কাজেই তারা কেউ নিজের নাক কেটে আমাদের গণতন্ত্রের যাত্রাটি বন্ধ করবেন না। নিজের গরজেই তাদেরকে আমাদের গণতন্ত্রের পে কাজ করতে হবে। এখানেও সরকার একটা পর্যায়ে এসে আটকে যেতে বাধ্য। যে পুলিশ ও র‌্যাবের ওপর নির্ভর করে এ সরকার টিকে আছে, তারাও ভেতর-বাইরে থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরী বাহিনীতে আমাদের অংশগ্রহণ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জাতিসঙ্ঘের এক মুখপাত্র ইতোমধ্যেই একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছেন। মতলববাজ মিডিয়া এ সংবাদটিকে ফিল্টারড করে ফেললেও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে দেশের ভেতরে প্রায় সবার কাছে পৌঁছে গেছে। এখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভাবনা বা হিসাবটিও স্ট্রেট ফরোয়ার্ড। নিজের দেশে যারা অশান্তি সৃষ্টি করে তারা অন্য দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। নিজের দেশে যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, অন্য জায়গায় তারা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। ডিজিটাল এই যুগে একটি ঘটনা মুহূর্তের মধ্যেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পুলিশ ও র‌্যাবের অফিসাররাও নতুন হিসাব-নিকাশে পড়ে গেছেন। সরাসরি গুলির নির্দেশ তাদের নিয়ন্ত্রণহীনতা ও সার্বিক অসহায়ত্বকেই তুলে ধরেছে। যেসব অতিউৎসাহী অফিসার এসব কাজ করছেন, তারা দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর মনিটরিংয়ে পড়ে গেছেন। তাদের কয়েকজনের নামে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোর্টে মামলা হয়েছে। মামলার এ ধারাটি অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের অমানবিক কাজে জড়িতদের কেউ রেহাই পাবেন না। গত ৫ জানুয়ারিতে সরকার যে ভুলটি করেছে এখন পর্যন্ত তার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে বিএনপি এবং জামায়াত জোট। মাঝখানে কোকোর মৃত্যু সরকারকে দারুণভাবে উৎফুল্ল করে তুলেছিল। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় মনোবল এবং কোকোর নামাজে জানাজায় স্মরণকালের বৃহত্তম জনসমাবেশ পুরো আন্দোলনকে নতুন জীবনীশক্তি দান করেছে। এই শোক এখন মহাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। সব দিক বিবেচনায় এই সরকারের জন্য সার্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির অনিবার্যতা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
minarrashid@yahoo.com

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন হিসাব-নিকাশ by মোহাম্মদ এজাজ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফর এবং একই সঙ্গে মোদি সরকারের সঙ্গে রাশিয়া, চীন, জাপান, ইসরায়েলসহ পরাশক্তিগুলোর ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ হাজির করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক একচ্ছত্র আধিপত্য সৃষ্টি হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু একই সময়ে চীন, ভারতও বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে শক্ত অবস্থান, একশ' কোটির অধিক জনসংখ্যার অপার সম্ভাবনাময় বাজার ভারতকে বিশ্বদরবারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে বর্তমানে বিশ্বের 'এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি' চীনও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে তার চার হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। আর পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া ছাড়াও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থল হওয়ায় পাকিস্তান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, তেল-গ্যাস পাইপলাইনের ক্ষেত্রে কৌশলগত দিক থেকে সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে। এই তিন দেশের বিদেশনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে থাকছে যুক্তরাষ্ট্র।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক পরিসরে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্ব্বী না থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবসা-বাণিজ্য ও তার আদর্শিক অবস্থান পুঁজিবাদী চিন্তা-চেতনার প্রসার এত দ্রুত বিস্তার লাভ করে যে, দুনিয়ার প্রায় সব অঞ্চলে তার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা মনে করতে থাকে, কোনো আঞ্চলিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মার্কিন আদলেই হতে হবে। ভিন্ন মত ও পথের কোনো অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক শক্তি তার নিজ দেশের এবং ওই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে 'গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও উন্নত' করতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিকে নিয়ে নানা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক মৈত্রী ও কৌশলে আবদ্ধ হয়ে থাকে। কিন্তু এশিয়ায় চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক উত্থান, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের জের, ইউক্রেন সংকট, চীনের আগ্রাসী অর্থনৈতিক ও সামরিক নীতি প্রভৃতি কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে খুব হিসাব করে এগোতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো আন্তর্জাতিক কর্তৃত্বের অভিলাষ না থাকলেও ভারত নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে চায়। এজন্য প্রায় সব দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতে চায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের সঙ্গে নিরাপত্তা কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ভারত তার সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ রাশিয়ার কাছ থেকে বেশি নিয়ে থাকে। ইসরায়েল ও ফ্রান্স দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানের সরবরাহকারী দেশ।
এর ভিত্তিতেই ভারত তার ঘরোয়া ও বিদেশ নীতি সাজিয়েছে। মনমোহন সিং ক্ষমতায় থাকাকালে সার্ক দেশগুলো, চীন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ ও বৈঠক করেছেন। অপরদিকে নরেন্দ্র মোদি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে ভারতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যেতে চান। এগুলো হচ্ছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা। সম্প্রতি মোদি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রদবদল ও আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি তারই বহিঃপ্রকাশ।
এখনও শীর্ষ পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রই কেবল পারে এই পাঁচটি বিষয়ে সহায়তা দিতে। অন্যদিকে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে পাল্লা দিতেও ভারতকে কাছে পাওয়া দরকার যুক্তরাষ্ট্রের। ভারতকে এ অঞ্চলের মোড়ল বানালে ফলত যুক্তরাষ্ট্রেরই লাভ এবং এখানকার আঞ্চলিক দেশগুলোর রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব ও নাক গলানো বস্তুত আমেরিকার নীতিরই সমর্থন। ভারত এখানে আমেরিকার পক্ষ হয়েই স্থানীয় অঞ্চলের বিদেশ নীতির বাস্তবায়ন করবে। ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে প্রকাশ্যেই এই অঞ্চলের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দিয়ে দিয়েছে। শ্রীলংকার নির্বাচনে ভারত-মার্কিন যৌথ কূটনীতিক সমর্থনে রাজাপাকসের বিদায় ও নতুন সরকারের ক্ষমতায় আরোহণ এবং চীনের বিনিয়োগ বাদ দিয়ে ভারত ও মার্কিন বিনিয়োগের প্রতি নতুন সরকারের আগ্রহ সেই আভাসই দেয়।
চীনের সঙ্গেও ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুবই গভীর। বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সহযোগী চীন। সম্প্রতি ওয়েন জিয়াবাওয়ের ভারত সফরে চীন-ভারত দু'দেশের বাণিজ্যকে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পেঁৗছানোর জন্য একমত হয়েছেন। ভারত চীনের সঙ্গেও বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার চুক্তিতে আবদ্ধ। ভারত ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক-সামরিক সহায়তা অনেক গভীর। প্রতি বছর এ দেশগুলোর সঙ্গে ২০ বিলিয়নের অধিক বাণিজ্য করে থাকে চীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে রকম ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সহায়তা করছে ঠিক তেমনি পাকিস্তানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন চীনের সহায়তায় হচ্ছে, যা কি-না পরবর্তীকালে উভয় দেশের মিলিটারি, বিশেষ করে সামরিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম তৈরিতে কাজে লাগবে। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট-বড় দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপালকে কম সুদে অর্থনৈতিক সহায়তাও চীন দিয়ে থাকে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপালের সামরিক সরঞ্জামের অন্যতম বৃহৎ জোগানদাতাও চীন। অতিসম্প্রতি পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে চীনের সামরিক সরঞ্জামাদির অতিমাত্রায় সহায়তার জন্য দিলি্ল তার আপত্তি উত্থাপন করেছে। এদিকে দিলি্লর যুক্তরাষ্ট্র, জাপানের মিলিটারি সহযোগিতা নেওয়ায় চীনও উদ্বেগ জানিয়েছে।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানেরও দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও সবচেয়ে বড় ট্রেডিং পার্টনার। পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান মধ্য এশিয়া, ইরান, ভারত ও চীনের সঙ্গে সরাসরি হওয়ায় এর বাণিজ্যিক, সামরিক ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক অপরিহার্য। ন্যাটোভুক্ত দেশ না হয়েও পাকিস্তান একটি প্রধান ন্যাটো সহযোগী দেশ। এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের যেমন নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান এরকম কাছাকাছি সম্পর্ক এ অঞ্চলে মার্কিনিদের সঙ্গে আর কারও নেই ।
এমন জটিল পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাশিয়া ভারতের অনেক পুরনো বন্ধু এবং ভারতীয় মিলিটারির সবচেয়ে বড় রসদ সাপ্লাইয়ার। আর ওবামা চান এবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে দেখা রুশ অস্ত্রগুলোর জায়গায় মার্কিন অস্ত্র আসুক। প্রধানমন্ত্রী মোদি মার্কিনিদের এই প্রত্যাশা কীভাবে মেটাবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়। চীনকেও ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে এবং সেটা সহজ নয়। সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়া এখন এক 'গেম চেঞ্জিং' পর্যায় অতিক্রম করছে। সব পক্ষই ব্যস্ত নতুন হিসাব-নিকাশে।
গবেষক
ezazbd@gmail.com

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আবার কেজরিওয়াল! কংগ্রেসের ভরাডুবি

কংগ্রেসের নাক কাটা যেতে পারে, আর তাতেই বিজেপির যাত্রাভঙ্গ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা! শনিবার দিল্লিতে বিধানসভা ভোটের বুথ ফেরত সমীক্ষায় ইঙ্গিত, গত বারের তুলনায় বিজেপির ভোট বাড়ছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি বাড়ছে আম আদমি পার্টি আপের ভোট। কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কের অনেকটাই চলে যাচ্ছে তাদের দখলে। ফলে আবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন অরবিন্দ কেজরিয়াল। ৭০ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠন করতে দরকার ৩৮ আসনের। আপ এর চেয়ে বেশি পাবে বলেই বেশির ভাগ এক্সিট পোলে দেখা যাচ্ছে।
শনিবার এবিপি নিউজ-এসি নিয়েলসেন তাদের বুথ ফেরত সমীক্ষায় জানিয়েছে, কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি পেতে পারে ৪৩টি আসন, বিজেপির কপালে জুটতে পারে ২৬টি আসন এবং কংগ্রেস মাত্র একটি আসন পেয়ে তলানিতে ঠেকতে পারে। অন্য প্রায় সব ক’টি বুথ ফেরত সমীক্ষাতেই এর কাছাকাছি পূর্বাভাস দেখা গিয়েছে।
কিন্তু আসল ছবিটা ধরা পড়েছে শতাংশের হিসেবে। দিল্লিতে ২০১৩ সালে বিধানসভা ভোট হয়। সে বার বিজেপি পেয়েছিল ৩১.১ শতাংশ ভোট। এ বার এবিপি নিউজের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, শতাংশের হিসেবে ভোট বাড়ারই সম্ভাবনা গেরুয়া বাহিনীর। তারা পেতে পারে ৩৪ শতাংশ ভোট। উল্টো দিকে, ২০১৩ সালে আপ পেয়েছিল ২৯.৫ শতাংশ ভোট। বুথ ফেরত সমীক্ষা বলছে, এ বার তাদের ৪১ শতাংশ ভোট পাওয়ার কথা। অর্থাৎ তাদের ভোট সাড়ে ১১ শতাংশ বাড়তে পারে। এবং এর জন্য মূলত দায়ী কংগ্রেস!
ঝাড়খণ্ড ভোটের মতো দিল্লিতেও ‘একলা চলো’ নীতি নিয়েছিলেন রাহুল গান্ধি। দলের প্রচারে নিজে প্রধান মুখ হিসেবে দিল্লি ঘুরেও বেড়িয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ যে কিছু হয়নি, সেটা জানিয়ে দিচ্ছে এবিপি নিউজের বুথ ফেরত সমীক্ষা। ২০১৩ সালে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস পেয়েছিল ২৪.৬ শতাংশ ভোট। এবিপি নিউজ জানাচ্ছে, এ বারে তারা পেতে পারে ১৫ শতাংশ ভোট। এই সমীক্ষা যদি ঠিক হয়, তা হলে গত দুই বছরে কংগ্রেসের ভোট কমছে সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি। আর সমীক্ষা থেকে এটাও পরিষ্কার, এর পুরো লাভটাই তুলতে পারে কেজরিওয়ালের আপ।
বুথ ফেরত সমীক্ষার ফল যে সব ক্ষেত্রে মেলে, তা নয়। ২০১৩ সালে দিল্লি বিধানসভা ভোটের সময়ও কিছু ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফলের সঙ্গে বুথ ফেরত সমীক্ষার তফাত দেখা গিয়েছে। তবে মানুষের রায় কোন দিকে যেতে পারে, তার একটা আভাস দিতে অনেক সময় এই সমীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ বারে দিল্লির ক্ষেত্রে শুধু বুথ ফেরত সমীক্ষাই নয়, ভোটের আগে জনমত সমীক্ষাতেও আভাস ছিল, বিজেপির থেকে কয়েক কদম এগিয়ে রয়েছে আপ। আট মাস আগে লোকসভা ভোটে দেশ জুড়ে নরেন্দ্র মোদি হাওয়া দেখা গিয়েছিল। তাতে তখন শরিক হয়েছিল দিল্লিও। সেই হিসেব ধরলে দিল্লির ৬০টি বিধানসভা কেন্দ্রে এগিয়ে ছিল বিজেপি, আপ মোটে ১০টিতে। লোকসভা ভোটের পরেও মোদির নামে জয়রথ এগিয়ে নিয়ে চলেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, জম্মু-কাশ্মীর, ঝাড়খণ্ড বেশির ভাগ জায়গায় হয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিজেপি, নয়তো উঠে এসেছে অন্যতম প্রধান দল হিসেবে। শনিবার বুথ ফেরত সমীক্ষাগুলোর ফল সামনে আসার পরে মনে হচ্ছে, এই প্রথম ধাক্কা খেতে চলেছে মোদি-অমিতের সেই রথ। যার পিছনে বড় কারণ, কংগ্রেসের আরো ভূমিক্ষয়।
মাত্র ৪৯ দিন সরকার চালানোর পরে ক্ষমতা ছেড়েছিলেন কেজরিওয়াল। দু’বছর আগে সে সময় তার যথেষ্ট সমালোচনা হয়েছিল। তার পরে আপ ভেঙে অনেকেই বেরিয়ে গিয়েছেন। কেজরিওয়ালের তেমনই একদা সমযোগী কিরণ বেদিকেই এ বারে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরে ভোটে নেমেছে বিজেপি। প্রশ্ন উঠেছে, এই অবস্থায় আপ কী এমন করেছে, যাতে দিল্লির মানুষের বড় অংশ তাদেরই আবার তখতে দেখতে চাইছে?
আপের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, লোকসভা ভোটের ফল দেখার পর থেকে তাদের কর্মীরা নিঃশব্দে মহল্লায় মহল্লায় মাটি কামড়ে জনসংযোগের কাজটি করতে শুরু করে দেয়। আপের বক্তব্য, তাদের ৪৯ দিনের সরকার যে ভাবে পুলিশি জুলুম বন্ধ করেছিল, তাতে আমজনতা খুশি। নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা সে জন্য এখনও আপ-পন্থী। সেই ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়েই তৃণমূলস্তরে মানুষের কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলেন আপের কর্মীরা। দলীয় নেতৃত্বের মতে, সেই লক্ষ্যে যে তারা যে সফল, তা ধরা পড়েছে বিভিন্ন সমীক্ষায়। এমনকী, বুথ ফেরত সমীক্ষাতেও।
বিজেপিতেও অনেকে মনে করছেন, দিল্লির বিধানসভা ভোট করতে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে। লোকসভা ভোটের পরপরই এই নির্বাচন হলে ছবিটা অন্যরকম হতেই পারত। গত আট-ন’মাসে মোদির সরকার কিছুটা পুরনো হয়েছে। তাকে ঘিরে আবেগ কমেছে। একই সঙ্গে দিল্লিতে ঘাঁটি গেড়ে বসে প্রচার চালাতেও দেরি করে ফেলেছে দল। তাই বিজেপির বাড়বৃদ্ধি হলেও আপের তুলনায় সেটা কম।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসল কারণ হল কংগ্রেসের প্রতি মানুষের হতাশা। গত বারেও ৮টি আসন পেয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু এ বারে তা কমে এক বা দুইয়ে ঠেকতে পারে বলে জানিয়েছে বেশির ভাগ বুথ ফেরত সমীক্ষা। আর সেই হতাশারই ফসল তুলতে পারে আপ।
কংগ্রেসের এমন ভরাডুবির আশঙ্কা কেন করা হয়েছে সমীক্ষাগুলোতে? দিল্লির রাজনীতিকদের অনেকেই বলছেন, দিল্লির ভোটাররা আড়াআড়ি ভাবে ভাগ হয়ে গিয়েছে। এক দিকে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা, যারা মোদি সরকারের আর্থিক থেকে বিদেশ, সব নীতিকেই কমবেশি সমর্থন করছেন। অন্য দিকে আছেন নিম্নবিত্ত এবং গরিবরা, যাদের দৈনন্দিন পুলিশি জুলুম থেকে বাঁচিয়েছিল আগের আপ সরকার। এই দ্বিতীয় অংশ এ বারে আর কোনোভাবেই কংগ্রেসকে জন্য বোতাম টিপে নিজেদের ভোট ‘নষ্ট’ করতে নারাজ। তারা চান, আবার আপ-ই আসুক। তাদের আশা, তাতে পুলিশি দৌরাত্ম্য কমবেই, পানি-বিদ্যুৎ মাসুলেও ফের রাশ টানবেন অরবিন্দ।
এ দিন বুথ ফেরত সমীক্ষা দেখার পরে বিজেপির অনেক নেতাই বলছেন, আপের এগিয়ে থাকার এটাই বড় কারণ। এই ভোটে কিরণ বেদিকে মুখ্যমন্ত্রী-মুখ হিসেবে তুলে ধরলেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মোদি-ই। নিজের নাম করে ভোট চেয়েছিলেন দিল্লির ভোটারদের কাছ থেকে। তিন দিন আগে থেকে অবশ্য দলের নেতারা বলতে শুরু করেছেন, দিল্লি বিধানসভা নির্বাচন মোদির নামে নয়। এ কথাটা বিজেপি নেতারা আজও আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।
বাইরে এ কথা বললেও দলের অন্দরে সম্ভাব্য হারের আরো একটা কারণ তুলে ধরেছেন বিজেপি নেতারা। তাদের বক্তব্য, কিরণ বেদীকে মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরে যে মোক্ষম চাল দিতে চেয়েছিল মোদি-অমিত জুটি, তাতে আদতে হিতে বিপরীত হবে বলেই মনে করা হচ্ছে এখন। বিজেপি নেতৃত্ব বলছেন, গত কয়েক মাস ধরে অন্তর্কলহে দীর্ণ দল অনেক চেষ্টা করেও কোনও এক জনের নাম ঠিক করে উঠতে পারেনি। ফলে কেজরীর প্রাক্তন সহযোগী কিরণকে এনে চাল দিয়েছিলেন নেতৃত্ব। কিন্তু কিরণের দাপটে বীতশ্রদ্ধ দিল্লির অনেক বিজেপি নেতাই আর শেষমেশ ভোটে সক্রিয় ভাবে অংশ নেননি। দলের এক নেতা এ দিন কবুল করেন, “আমরা তো মনেপ্রাণে চাইছি, বিজেপি এ বারে হেরে যাক! তাতে অন্তত মোদি-শাহ জুটির একচেটিয়া সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ হবে! দলে অন্তত কিছুটা গণতন্ত্র আসবে। খোঁজ নিয়ে দেখুন, কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকের মতও তাই।”
এই অবস্থায় যে অস্বস্তিকর প্রশ্ন বিজেপিকে ভাবাচ্ছে, সেটা হলো : দিল্লিতে হারলে কি তার প্রভাব বিহার বা পশ্চিমবঙ্গে পড়বে? আর শুধু এই দুই রাজ্যই তো নয়, আগামী দু’বছরে ভোট রয়েছে তামিলনাড়ু, কেরল, অসম, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, গুজরাত, পঞ্জাব ও গোয়ায়। এতগুলি রাজ্যের জন্য এ বারে কোন কৌশল নিয়ে এগোবে বিজেপি, সেটাই এখন দলের সামনে বড় প্রশ্ন।
কিরণ বেদি অবশ্য বুথ ফেরত সমীক্ষার হিসেব দেখার পরে ভাঙা গলায় সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, ১০ তারিখের ফলে সব বদলে যাবে। আর যদি পরাজয় হয়, তার দায় শুধু তারই। কিরণের আশা, যেভাবে বিজেপি শেষ বেলায় অমিত শাহের নেতৃত্বে বুথের ‘মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট’ করেছে, তাতে বুথ ফেরত সমীক্ষার ফল মিলবে না। শুক্রবার রাত থেকে অমিত গোটা দিল্লিতে সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির সাড়ে চারশো নেতাকে নামিয়ে দিয়েছেন প্রতিটি বুথের ভোটারকে ভোটদানে উৎসাহিত করার জন্য। সে জন্য এ বারে ভোটও অনেক বেশি পড়েছে। বিজেপির মতে, এই বেশি ভোট তাদের পক্ষেই যাবে। নিজের দফতরে বসে প্রতি মুহূর্তে সেটি নজরদারি করেছেন খোদ অমিত শাহ।
বাকিটা বলবে ১০ তারিখ সকাল।

ফেসবুক ব্যবহারের ফলে হিংসা, বিষণ্নতা

ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে ব্যবহারকারীরা বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। বুধবার প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। ফেসবুক ব্রাউজ করা আজ লাখো মানুষের দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। গবেষকরা চিহ্নিত করেছেন, কিভাবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে আবেগীয়ভাবে জড়িয়ে আছেন ব্যবহারকারীরা। এছাড়া এর নিত্য ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে, তা-ও বের হয়ে এসেছে ওই মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের একটি গবেষণায়। এ খবর দিয়েছে দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহারকারীদের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারের ফলে অন্য ব্যবহারকারীর প্রতি ঈর্ষা বা হিংসার জন্ম নিলে তা থেকে বিষণ্নতাবোধের জন্ম হতে পারে। গবেষণার সঙ্গে জড়িত অধ্যাপক মার্গারেট ডাফি বলেন, যেভাবে ফেসবুক ব্যবহার করেন ব্যবহারকারীরা, তার ফলে এর প্রতি নিজেদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, যদি ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এর ভাল দিকগুলো বেছে নিয়ে নিজের পরিবার ও পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং জীবনের মজার ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেন, তাহলে ফেসবুক হতে পারে বেশ মজার ও স্বাস্থ্যকর কর্মকাণ্ডের জায়গা। তবে পরিচিত কেউ অর্থনৈতিকভাবে কতটা ভাল আছে, বা পুরনো কোন বন্ধু তার সম্পর্ক নিয়ে কতটা সুখে আছে, তা দেখার জন্য যারা ফেসবুক ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে ঈর্ষা বা হিংসার জন্ম নিতে পারে। এর ফলে তাদের মধ্যে ক্রমেই বিষণ্নতাবোধের সৃষ্টি হতে পারে। এ গবেষণার জন্য ৭০০ তরুণ ফেসবুক ব্যবহারকারীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। দেখা গেছে, এদের মধ্যে যারা ফেসবুক অনেকটা ‘নজরদারির’ কাজে ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে বিষণ্নতাবোধের লক্ষণ রয়েছে। অন্যদিকে যারা যোগাযোগ রাখার জন্য ফেসবুক ব্যবহার করেন, তারা এর নেতিবাচক প্রভাবে ভোগেন না। বন্ধুদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কে কতটা ভাল অবস্থানে রয়েছে, এসব দেখতে অনেকে ফেসবুক ব্যবহার করেন। একে গবেষণায় নজরদারিমূলক ফেসবুক ব্যবহার বলে বোঝানো হয়েছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নজরদারির কাজে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে, বন্ধু বা পরিচিত কারও বিলাসী ছুটির দিন, নতুন গাড়ি বা বাড়ি, এমনকি সুখী সম্পর্ক নিয়ে করা ফেসবুক পোস্টের ফলে ঈর্ষা বা হিংসার বোধ জন্মায়। গবেষকরা জানিয়েছেন, এ বোধের ফলে ক্রমেই বিষণ্নতাবোধের শিকার হন ওই ব্যবহারকারীরা। অধ্যাপক ডাফি বলেন, অনেক মানুষের জন্য ফেসবুক খুবই ইতিবাচক দিক হতে পারে। কিন্তু অপর একজনের সঙ্গে নিজের জীবনযাপনের তুলনার জন্য যদি ফেসবুক ব্যবহার করা হয়, তাহলে এর খুব নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের আচরণ এড়ানোর জন্য ফেসবুক ব্যবহারকারীদের উচিত এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

খালেদার কার্যালয়ের কাছে বিক্ষোভ, উঠে গেছে শ্রমিকদের অবস্থান, ‘নিরাপত্তায়’ কাঁটাতারের বেড়া দিল বিএনপি

(বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদারে আজ সীমানাপ্রাচীর ও ফটকের ওপর কাঁটাতারের বেষ্টনী দেওয়া হয়। ছবি: সাইফুল ইসলাম) বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের কাছে বিক্ষোভ করেছে দিনমজুর সমিতির ব্যানারে শতাধিক লোক। অবরোধ-হরতাল তুলে নেয়ার দাবিতে ঘণ্টাব্যাপী তারা এ বিক্ষোভ করে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের কাছে ৮৬ নম্বর সড়কের দক্ষিণপ্রান্তে কোদাল-ঝুড়ি হাতে তারা অবস্থান নেন। অবরোধ ও হরতালবিরোধী নানা  স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তৃণমূল দিনমজুর সমিতির ব্যানারে এই বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন গোলখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল হক মিন্টু। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমরা অবরোধ ও হরতালের কারণে কাজ পাচ্ছি না। গত এক মাস ধরে আমাদের কোন কাজ-কর্ম নেই। এসব কর্মসূচি আমাদের ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য প্রতিবাদ জানাতে আমরা এখানে এসেছি। এদিকে বিক্ষোভে অংশ নেয়া দিনমজুরদের কয়েকজন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানান, মিন্টু তাদের নিয়ে এসেছেন।
ওদিকে অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে গুলশান-২ গোলচত্বরে কাফনের কাপড় পরে দুদিন ধরে অবস্থান করা পরিবহন চালক ও শ্রমিকরা অবস্থান গুটিয়ে চলে গেছেন। অভিজাত ওই এলাকায় রাস্তার একপাশ বন্ধ করে গত দুদিন ধরে অবস্থান করে আসছিলেন তারা। রাস্তায় অস্থায়ী মঞ্চ বানিয়ে সেখানে সংগীত অনুষ্ঠান চলে দিন-রাত। তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন- অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। শুক্রবার রাতে গান পরিবেশন করা নারী বাউল শিল্পীদের গায়ে টাকা ছড়িয়ে দিয়ে ফুর্তি করেন অবস্থানকারীরা। মধ্যরাতে অবস্থানের পাশে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর ভোররাতে অবস্থান গুটিয়ে চলে যান চালক ও শ্রমিকরা। একইসঙ্গে সেখানকার অস্থায়ী মঞ্চও গুটিয়ে ফেলা হয়। এদিকে গতকালও গুলশান কার্যালয়ে প্রবেশে পুলিশি কড়াকড়ি  ছিল। কার্যালয়ের প্রবেশমুখে রেজিস্ট্রার খাতা নিয়ে বসে আছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। যারাই কার্যালয়ে প্রবেশ করছেন তাদের নাম-ঠিকানা লিখে রাখছেন তারা। এছাড়া গতকালও বিচ্ছিন্ন ছিল কার্যালয়ের ফোন-ফ্যাক্স, ক্যাবল টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ। কার্যালয়ে আশপাশে মোতায়েন ছিল পোশাকধারীসহ সাদা পোশাকের পুলিশ। ফলে দলের কোন নেতাকর্মী কার্যালয়মুখী হতে দেখা যায়নি। উল্লেখ্য, গত ৩রা জানুয়ারি থেকে গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হওয়ার পর সেখানে অবস্থান করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
খালেদার জিয়ার কার্যালয়ে কাঁটাতারের ঘের
গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের ওপর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আজ রোববার বিএনপির পক্ষ থেকে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর গুলশান-২-এর ৮৬ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর ভবনটি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়। গত ৩ জানুয়ারি থেকে ওই কার্যালয়ে অবস্থান করছেন খালেদা জিয়া। তাঁর কার্যালয়ের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে দুটি ভবন রয়েছে। আর পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে রাস্তা। ওই দুই পাশে সীমানাপ্রাচীরের ওপর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়। এমনিতে সীমানাপ্রাচীরের ওপর লোহার কাঁটা দেওয়া আছে। এই কাঁটার ওপর নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয়েছে। ওই কার্যালয়ে অবস্থানরত বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুষ্কৃতকারীরা যাতে দেয়াল টপকে ভেতরে যেতে না পারে, সে জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দুদিন আগে একজন দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। আজ দুপুরেও একজন একই ধরনের চেষ্টা করেছিল। খালেদা জিয়ার কার্যালয় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ এখন আর নেই। তবে কারা কার্যালয়ে যাতায়াত করছেন, তা লিখে রাখছে গোয়েন্দা পুলিশ। অবশ্য গত তিন দিনে দলের উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। ৩১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে কেব্‌ল টেলিভিশন (ডিশ) ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কও দুর্বল। এটা পুনঃস্থাপন করা হয়নি। ফলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও ফ্যাক্স ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তবে সরকারি মালিকাধীন মুঠোফোন কোম্পানি টেলিটকের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। অবশ্য টেলিটক থেকে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যায় না।

সংলাপ হবে না -১৪ দল

(পেট্রলবোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর ১৪ দলের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সামনে আজ মানববন্ধন করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা) স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মানুষ হত্যা ও জঙ্গিবাদের নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘পেট্রলবোমার বিরুদ্ধে মানবতার শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি। একাত্তরের ঘাতকদের যেভাবে পরাজিত করেছি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীদেরও সেভাবে পরাজিত করব।’
পেট্রলবোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর ১৪ দলের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সামনে অবস্থান নিয়ে নাসিম এসব কথা বলেন।
মানববন্ধনে দানবের সঙ্গে মানবের সংলাপ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি বলেন, ‘আগুন-সন্ত্রাসীদের নিঃশর্ত আত্মসর্পণ করতে হবে অথবা চূড়ান্তভাবে দমন করতে হবে। দানবের সঙ্গে মানবের সংলাপ হয় না।’
ইনু বলেন, ‘একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী বলছেন আগুন-সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য। সব আলোচনা হবে, তবে এখনই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। আগুনে পোড়াদের মাড়িয়ে আমরা সংলাপ করতে পারি না। আগুন-সন্ত্রাসীদের নিয়ে তারা বাংলাদেশে আন্দোলন পরিচালনা করছে। তাই এ আগুন-সন্ত্রাসী ও গুপ্তহত্যার বিরুদ্ধে এখনই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এবং বাংলাদেশে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, তিনি পোড়ামাটির নীতি অবলম্বন করছেন, ঠিক যেভাবে হানাদার বাহিনী একাত্তর সালে এই নীতি অবলম্বন করেছিল। বিএনপির এক নেতা বলেছেন, পরীক্ষা দিয়ে কী হবে। তাহলে প্রশ্ন, তারা বাংলাদেশের মানুষকে পড়ালেখা করতে দেবে কি না। সহিংসতায় নিহত সবার দায়িত্ব খালেদা জিয়াকে নিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেন, ‘এই সংকট রাজনৈতিক সংকট বা আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়। এটা হচ্ছে “ইনসার্জেন্সির” সংকট। গণতন্ত্র রক্ষার সংকট। “ইনসার্জেন্সি” মোকাবিলা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা সম্ভব নয়। এ জন্য সবাইকে একসঙ্গে তাদের মোকাবিলা করতে হবে।’
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, ‘বোমা মেরে মানুষ খুন করা হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে।’
বেলা তিনটা থেকে শুরু হওয়া এ মানববন্ধন গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, জাতীয় সংসদ, রাসেল স্কয়ার, বসুন্ধরা সিটি, সোনারগাঁও হোটেল, শাহবাগ, মৎস্য ভবন, প্রেসক্লাব, পল্টন, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি শেষ হয় বিকেল চারটায়। মানববন্ধনে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতা, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন।

৯ দিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন খালেদার কার্যালয়

৯ দিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়। গত ৩০ জানুয়ারি ভোরে কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পর্যায়ক্রমে ডিশ লাইন, ইন্টারনেট, টেলিফোন, ফ্যাক্স লাইনও কেটে দেয়া হয়। দুর্বল করে দেয়া হয় দু’টি ছাড়া অন্য সব মোবাইল কোম্পানির নেটওয়ার্ক। ফলে ৯ দিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়। যদিও ২০ ঘণ্টা পর ৩১ জানুয়ারি রাত ১০টায় বিদ্যুতের সংযোগ আবার দেয়া হয়েছে। কিন্তু ডিশ, ইন্টারনেট প্রভৃতি যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলশান কার্যালয়ের সামনে রেজিস্টার খাতা খুলে বসেছে পুলিশ। কেউ কার্যালয়ে প্রবেশ করলে তাকে সেই রেজিস্টার খাতায় নাম, ঠিকানা এবং প্রবেশের কারণ লিখতে হবে।
খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে সরেজমিন দেখা যায়, কার্যালয়ের মেইন গেটের সামনে চেয়ার ও টেবিল নিয়ে বসেছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) দুইজন সদস্য। টেবিলে মোটা আকৃতির একটি রেজিস্টার খাতা রাখা। কোনো ব্যক্তি কার্যালয়ে প্রবেশ করতে চাইলে সেই খাতায় নাম, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা এবং ভেতরে যাওয়ার কারণ লিখতে হবে। তা না হলে প্রবেশ করতে পারবে না। তবে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের কোনো নেতাকর্মীকে কার্যালয়ের আশপাশে দেখা যায়নি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ডিশ লাইন, ইন্টারনেট, টেলিফোন ও ফ্যাক্স সংযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ই আছে। টেলিটক ও সিটিসেল ছাড়া অন্য সব মোবাইল নেটওয়ার্ক সেখানে কোনো কাজ করে না। ৯ দিন হলেও এসব সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়নি।
খালেদা জিয়ার মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদার ও শায়রুল কবির খান নয়া দিগন্তকে বলেন, যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বিচ্ছিন্ন থাকায় আমাদের দাফতরিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। ডিশ লাইন না থাকায় ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) টেলিভিশন দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পত্রিকা পড়ে অবহিত হচ্ছেন। এ ছাড়া কার্যালয়ের প্রবেশপথে পুলিশের রেজিস্টার খাতা খোলা অগণতান্ত্রিক, অন্যায় বলে মন্তব্য করেন প্রেস উইংয়ের এই দুই কর্মকর্তা।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পেছালো নাইজেরিয়ার

নানা বিতর্কের মুখে অবশেষে ছয় সপ্তাহ পেছানোর সিদ্ধান্ত নিল নাইজেরিয়ার নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে নাইজেরিয়ায় আগামী শনিবারের (১৪ ফেব্রুয়ারি) নির্ধারিত প্রেসিডেন্ট ও সাংবিধানিক নির্বাচন ছয় সপ্তাহ পিছিয়ে দিয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
বর্তমানে নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বড় একটি অংশ বোকো হারামের দখলে থাকায় সেখানে বাস্তুহারা হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান আদৌ সম্ভব কিনা তা নিয়ে বেশ বিতর্ক চলছিল।
নাইজেরিয়ায় আগামী শনিবারের অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন বাতিল করা হবে কিনা সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের এক ঘোষণার আগে দেশটির বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল।
ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছিলেন, বোকো হারামের হুমকির মুখে নির্বাচনের দিন জনসাধারণকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়ার কোন নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না তারা।
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে তারা। সেখানকার বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন লাখ লাখ বাসিন্দা। এই অবস্থায় একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়ায় নানা বিতর্কের মুখে অবশেষে ছয় সপ্তাহ পেছানোর সিদ্ধান্ত নিল নাইজেরিয়ার নির্বাচন কমিশন। আগামী মাসের ২৮ তারিখে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের নতুন তারিখ ধার্য করা হয়েছে।
নাইজেরিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ড: জিবরিন ইব্রাহিম শনিবার নির্বাচন কমিশনের সাথে একটি বৈঠকে যোগ দেন।
বিবিসিকে তিনি বলেন, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা সমাধানেই ব্যস্ত হয়ে পড়ায় নির্বাচন পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। শনিবার পর্যন্ত নাইজেরিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেয়ার সবধরণের প্রচেষ্টাই নাকচ করে আসছিল কর্তৃপক্ষ।

সব দলকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে আবারও উঠে এলো বাংলাদেশ পরিস্থিতি। ওই মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেরি হার্ফ আবারও জানিয়ে দিলেন বাংলাদেশে চলমান অস্থিরতা ও সহিংসতায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তিনি শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ড চালাতে অত্যাবশ্যকীয় সুযোগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এ সময়ে কোন সহায়তা দিচ্ছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত নন মেরি হার্প। এর আগে ৫ই ফেব্রুয়ারি তিনি একটি বিবৃতি দেন। তাতেও তিনি বাংলাদেশে সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সরকারের প্রতি আহ্বান জানান রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দিতে। এর পরদিন ৬ই ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে অংশ নেন তিনি। এখানে তা প্রশ্ন-উত্তর আকারে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: বাংলাদেশ প্রসঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে একটি প্রশ্ন আছে। দেশটিতে সহিংসতা ও অন্যান্য অনেক কিছু সহ বহু ঘটনা ঘটছে। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সরকার কি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোন রকম সহায়তা চেয়েছে?
উত্তর: আমার জানামতে তারা তা চায়নি। বাংলাদেশে চলমান অস্থিরতা ও সহিংসতায় অবশ্যই আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিবেকহীন হামলার ঘটনা ঘটছে সেখানে। পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বাস। লাইন থেকে বিচ্যুত করা হচ্ছে ট্রেন। এতে অনেকে নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। এরা নিরপরাধী, ঘটনার শিকার হচ্ছেন। আমরা সব দলকে তাদের সদস্যদের সহিংসতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অত্যাবশ্যকীয় সুযোগ দিতে হবে। সহায়তার বিষয়টি নিয়ে আমাদের টিমের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারি। কিন্তু আমার মনে হয় না যে, কোন রকম সহায়তা আমরা দিচ্ছি।
প্রশ্ন: রাজনৈতিক সহিংসতা ও অন্য যেকোন রকম ঘটনাই হোক সরকার বলছে, এগুলো হলো সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?
উত্তর: ভাল কথা। আপনি এটাকে যে ভাবেই দেখেন না কেন অবশ্যই এটা বন্ধ হওয়া উচিত।

সংলাপের বিকল্প নেই -ঐক্য প্রক্রিয়ার গোলটেবিলে নাগরিক সমাজ

দেশের চলমান সঙ্কটে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সঙ্কটের সমাধানে সংলাপের পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। বলেছেন, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে সংলাপ ছাড়া সঙ্কট নিরসনের কোন বিকল্প নেই। সংলাপ হতে হবে দেশের সকল সক্রিয় রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণী- পেশার মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তারা বলেছেন, বাংলাদেশে একদল আরেক দলকে নির্মূল করতে চায়। কিন্তু তা কখনও হবে না। কেউ কাউকে নির্মূল করতে পারবে না। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কেউ কেউ বলেছেন, দেশের অভিভাবক হিসেবে প্রেসিডেন্ট এগিয়ে আসতে পারেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য তিন থেকে পাঁচজন নাগরিকের কমিটি করে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সংলাপের প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষেও মত আসে।
গতকাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ‘জাতীয় সঙ্কট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ক গোলটেবিলে বৈঠকে তারা এসব কথা বলেন। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের সঞ্চালনায় প্রথম পর্বের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন- সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। আর দ্বিতীয় পর্বে সভাপতিত্ব করেন- সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা। অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। বৈঠকে বেশকিছু প্রস্তাব রাখেন আলোচকরা। আয়োজকরা জানান, কিছুদিনের মধ্যে আরেকটি বৈঠক করে এসব প্রস্তাবনা দুই নেত্রীর কাছে পাঠানো হবে। এতে সাড়া না পেলে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের শরণাপন্ন হবেন তারা। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ‘জাতীয় সঙ্কট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’- শীর্ষক প্রস্তাবে বলেন, দেশে আজ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সঙ্কট উত্তরণের মাধ্যমে জনগণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে আগ্রহী। আলোচনায় অংশ নেন, সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, সিএম শফি সামি, রাশেদা কে. চৌধুরী, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, জেএসডি’র সভাপতি আ স ম আবদুর রব, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ডাকসু’র সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, পুলিশের সাবেক আইজি নুরুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রুবাইয়াত ফেরদৌস প্রমুখ।
গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের চলমান সঙ্কটে আমরা উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত। এই সঙ্কট উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। নিয়মের মধ্য থেকেই তা করতে হবে। এই তাগিদ থেকে আলোচনা হওয়া দরকার। তিনি আরও বলেন, বাঙালি অসাধারণ জাতি। একাত্তরে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। জাতির সামনে এখন চ্যালেঞ্জ। ১৬ কোটি মানুষ এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না এটা ঠিক না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের ম্যান্ডেলা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু তিনি হত্যার শিকার হয়েছেন। রুগ্‌ণ রাজনীতি থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য আমাদের এখন ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের মানুষের পরিচয় দিতে হবে।
ড. আকবর আলি খান বলেন, দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল একে-অপরকে নির্মূলে মেতে উঠেছে। তারা সম্পূর্ন অবাস্তবতার ওপর নির্ভর করে লড়াই চালাচ্ছেন। কেউ কাউকে নির্মূল করতে পারবেন না।  যে অবস্থা চলছে তা থেকে উত্তরণের পথ অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। এর জন্য আগে দু’দলের রাজনীতিবিদদের গালিগালাজ বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, দুই রাজনীতিক জোট একে-অপরকে যে ভাষায় কথা বলছে তাতে মনে হয় না তারা একসঙ্গে বসতে পারবে। এরজন্য তিনি অন্তত এক সপ্তাহ গালিগালাজ বন্ধ করার আহ্বান করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, যেভাবে সব পেশার লোক দলীয়করণ হচ্ছে তাতে সুশীল সমাজ বলে কিছু নেই। বতর্মানে সুশীল সমাজ অ-সুশীল হয়ে গেছে। কোর্ট, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি চাকরিজীবী সব খানেই যারা সুশীল হিসেবে কাজ করবে তারাই দলীয় হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সুশীল সমাজ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। তাই আগে সুশীল সমাজের রাজনীতিকরণ বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনীতিবিদরেই ভূমিকা রাখতে হবে। এজন্য তৃণমূল থেকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এই পরিস্থিতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তা করতে না পারলে পরণতি আরও ভয়ানক হবে। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত কি হবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে আশাবাদী এ কারণে যে জাতি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে সে জাতি পথ হারাবে না।
এম. হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনীতিবিদদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। এখানে ম্যান্ডেলার কথা বলা হচ্ছে। তবে আমাদের দেশে ম্যান্ডেলার মতো কোন নেতা নেই। তিনি বলেন, সংলাপের জন্য দুই দলকে বাধ্য করতে হবে। নাগরিক সমাজকে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এজন্য আমাদের সবাইকে সোচ্চার ও একমত হতে হবে।
রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, এদেশের ভোটাররা সুযোগ পেলে দুই তৃতীয়াংশকে এক তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনতে পারে। কিন্তু তাদের তো সেই সুযোগ দেয়া হয় না। তিনি বলেন, বিনাশী বিভাজন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিভাজন নেই। আমরা শান্তি চাই। মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সহিংসতা দিয়ে সহিংসতা প্রতিরোধ করা যায় না। প্রতিপক্ষকে এখন শত্রু বানিয়ে ফেলা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সব ধরনের লাইন কেটে দেয়া হয়েছে। এতে আমাদের ভাবমূর্তি কোথায় যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি শিখছে? তিনি বলেন, দলীয় রাজনীতির খপ্পরে পড়ে সিভিলিয়ানরা আনসিভিলিয়ান হয়ে যাচ্ছে। তাই বর্তমানের সঙ্কট সমাধান রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে।
ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেন, দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট হয়। এরপর সেনাশাসন আসে। সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। একই অবস্থা চলে আসছে। ক্ষমতা হস্তান্তর সব সময় একই প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না। তার মানে এ প্রক্রিয়া শুদ্ধ নয়। এতে গলদ আছে। যতদিন এ প্রক্রিয়া শুদ্ধ হচ্ছে না ততদিন এ সমস্যা থেকেই যাবে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথা বলে রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে এ নিয়ে কোন কাজ করেন না। একটা নির্বাচন দিয়ে এর সমাধান হবে না। স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি সমাধান দাবি করেন তিনি। এক্ষেত্রে তিনি রাষ্ট্রের মৌলিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন থাকতে হবে বলে জানান। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী, ইসি, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, বিচার ব্যবস্থা সুনিয়ন্ত্রিত হতে হবে। এগুলোকে রাজনীতিকরণ করা যাবে না। সাবেক এই প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, আলোচনার জন্য দুই দলকেই বারবার বেছে নেয়া হয়। নির্বাচন কমিশনে দেখেছি দুই দলকে ভোটাররা এক তৃতীয়াংশ করে ভোট দেয়। বাকি ভোট পান অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। এসব দল যদি রাজনীতিতে সুযোগ না পান তাহলে অসম্পূর্ণতা থাকে।
বিকল্প ধারার মহাসচিব এমএ মান্নান বলেন, বর্তমানের আন্দোলন ১৯৯৬ সালের অসহযোগ আন্দোলনের মতো। তবে ডাইমেনশন পরিবর্তন হয়েছে। এতে নতুন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটা ভয়াবহ ও নিন্দনীয়। এর স্থায়ী সমাধান লাগবে। যারাই ক্ষমতায় আসে তারাই ক্ষমতা স্থায়ী করতে চায়। আসলে ক্ষমতার পালাবদল হয় তবে সঙ্কটের সমাধান হয় না। এজন্য তিনি সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন।
আ স ম রব বলেন, আজকের যে জাতীয় সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তা রাজনৈতিক। এটা অস্ত্র দিয়ে, মানুষ হত্যা করে এর সমাধান সম্ভব না। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে- রাষ্ট্র শুধুমাত্র দুই দলের। ২০৪১ সাল পর্যন্ত একদল ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করছে। আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলবো এজন্যই মুক্তিযুদ্ধ করেছি। পুরো দেশ জ্বলছে, অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে। আমরা নিশ্চুপ থাকতে পারি না। জাতীয় সংলাপ মানে শুধু দুই দল সংলাপে থাকবেন- তা হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে ১৬ কোটি মানুষের আস্থা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। সংবিধানকে খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছে। পুলিশ গুলি করতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অনুমতি নিতে হয়। এটা সংবিধানে আছে। ক্ষমতার জন্য দেশটাকে জাহান্নামে রূপান্তরিত করেছে। বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছে বলেই সরকার জনগণকে ভয় পায়। ক্ষমতায় থাকলে সবাই সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলেন। আর ক্ষমতার বাইরে গেলে সহিংসতা করেন। পাঁচ সদস্যের নাগরিক কমিটি করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সংলাপ হতে হবে। সেটা হবে জাতীয় সংলাপ। বল সরকারের কোর্টে। কারণ সাংবিধানিক ক্ষমতা বিরোধী জোটের হাতে নাই। দেশের নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর গ্যারান্টি পাওয়ার অধিকার সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু কি এমন সমস্যা হলো যে, তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করতে হলো। বল প্রধানমন্ত্রীর কোর্টে। বৈধ হোক আর অবৈধ হোক তিনি প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান সমস্যা সমাধানে তাকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সঙ্কটের এমনভাবে সমাধান করতে হবে যেন কোন পক্ষই সুবিধা বঞ্চিত না হন। খালেদা জিয়াকে অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে সংলাপের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে হবে। যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত বাদ দিয়ে যেসব নেতা গ্রেপ্তার রয়েছেন তাদের মুক্তি দিতে হবে। সংলাপ চলাকালীন বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে কোন প্রকার বিক্ষোভ করা যাবে না। আমাদের মধ্যে নেলসন ম্যান্ডেলা নাই এ কথা ঠিক না। আমাদের মধ্যে ড. ইউনূস ও রেহমান সোবহানের মতো মানুষ আছেন। তিনি আরও বলেন, সংলাপ ছাড়া কোন গুলি, কোন বোমা সমস্যার সমাধান করতে পারে না। জনগণের শক্তি বড় শক্তি। মান্না আরও বলেন, বর্তমান সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বাস ও আস্থার সঙ্কটের কারণে। বিরোধী জোট অবরোধ প্রত্যাহার করলে সরকার যদি সংলাপ আয়োজন না করে সে গ্যারান্টি পাচ্ছে না।
সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, রাজনীতির নামে বর্তমানে বলি খেলা চলছে। অনেকে রাজনীতিবিদদের গালাগালি করেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- তাদের নেতৃত্ব ছাড়া জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব না। বাংলাদেশ ইস্যুতে মধ্যস্থতা প্রয়োজন ওবামা ও মোদির। বর্তমান সঙ্কটের বীজ পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশে পুলিশি ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে।
সাবেক অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বলেন, বিরোধী জোটকে পেট্রলবোমা মারা বন্ধ করতে হবে। আর সরকারকে সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এডভোকেট সুব্রত রায় চৌধুরী বলেন, প্রশাসনে সর্বত্র দলীয়করণ হয়েছে। দলবাজির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা হচ্ছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করে শেখ হাসিনা সারা বিশ্বে রোল মডেল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সিএম শফি সামি বলেন, দেশে বিনাশী ও বিভাজনের রাজনীতি চলছে। গণতন্ত্র মানেই সহনশীলতা, সহিষ্ণুতা। ভিন্ন মতাদর্শের হলেও তাদের সঙ্গে সংলাপ করতে হবে। সাধারণ মানুষ কেন মরবে। তারা তো রাজনীতি করে না। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। লোকজন আস্থা হারিয়ে ফেলছে। তাদের অভিযোগগুলো খণ্ডনে প্রয়োজন। ভারতের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। আর বাংলাদেশে প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবে। যে জাতি মাত্র চার দশক আগে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল সেই জাতি সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এক হতে পারবে না এটা অবিশ্বাস্য। রাজনীতিক বিভাজন অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা ধ্বংস করে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেজা কিবরিয়া বলেন, আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ জনগণ শাসন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এর ফলে রাষ্ট্র অকার্যকর হওয়ার ভয় থাকে। বর্তমানে যে সঙ্কট চলছে এর প্রভাব অর্থনীতির ওপর আগামী দুই বছর পর্যন্ত থাকবে। সমস্যা সমাধানে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু দমনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব না। দলগুলোর সঙ্গে বসে আলোচনা করে সমাধান করতে হবে।
অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের সঙ্কট ও সমস্যা ভিন্নধর্মী। এর সমাধানও ভিন্নধর্মী হবে। ইতিহাসের বাঁক বদল হয়েছে বলেই আমরা এই জায়গায় এসেছি। সেই ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। এই মুহূর্তে দেশে রাজনীতি বলতে কিছু দেখছি না। রাজনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী রাজনীতিবিদদের সুবচনে ঘাটতি রয়েছে। দৈব কিছু না ঘটলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সংলাপ করবে না। সুতরাং দু’টি বিবাদমান পক্ষ সমাধানে আসতে না পারলে তৃতীয় পক্ষকে ভূমিকা রাখতে হয়। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে সুশীল সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সুশীল সমাজের রাজনৈতিক দর্শন থাকতে পারে তবে তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য নেই। এই সমাবেশের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নাগরিকদের মধ্য থেকে ৩-৫ জনের একটি কমিটি করতে হবে। সেই কমিটি দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কাছ থেকে নাম চাইবে। তারা তৃতীয় পক্ষে একটি সংলাপ করবে। পরোক্ষ সংলাপের আয়োজন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ্‌উদ্দিন আহমেদ বলেন, সমস্যার উপসর্গ নিয়ে আলোচনা করলে চলবে না। এর মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। সমস্যার সমাধান এমনভাবে করতে হবে দু’পক্ষই যেন কিছু অর্জন করে।
শাহদীন মালিক বলেন, আদালতের কাজ হলো- আইনি বিতর্কের সমাধান দেয়া। আইনি বিতর্কের সমাধান করা। ইদানিংকালে আদালত রাজনৈতিক ব্যাপারে সুরাহা করার চেষ্টা করছে। এতে দেশের কল্যাণ হয় না। একটি রায়ের পর থেকে এ সঙ্কট শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে কোন ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত দিতে গেলে সেটা আইনের ব্যাপার না রাজনৈতিক ব্যাপার- সেটি ভেবে দেখা দরকার।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশে অদ্ভুত এক বিতর্ক চলছে। সরকার বলছে দেশের অবস্থা স্বাভাবিক। আরেকদল বলছে দেশে স্বাভাবিক আন্দোলন চলছে। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের কাছে এটা অস্বাভাবিক। যারা দায়িত্বে থেকে অস্বাভাবিক অবস্থার কথা স্বীকার করে না তাদের পক্ষে এর সমাধান করা সম্ভব না। যে দল যত অনিষ্ট করতে পারে সে দল তত মূল্যায়ন পায়। কিন্তু আন্দোলন করার জন্য মানুষকে কাছে টেনে নিতে হয়। বিএনপি’র উচিত তাদের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেয়া যেন তারা পেট্রলবোমা হামলাকারীদের ধরিয়ে দেয়।
রুবাইয়াত ফেরদৌস বলেন, অনেকে বলেন- দেশে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। বিভাজনের মধ্যে আমি কোন দোষ দেখি না। গণতন্ত্রে চিন্তা ও মতাদর্শে ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু সহনশীলতা থাকতে হবে। বর্তমান প্রেসিডেন্টকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব না। এতে আমাদের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। কারণ আমাদের চিন্তায় দৈন্যতা রয়েছে।
সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, সমস্যা ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতায় যাওয়ার মধ্যেই আবতির্ত হচ্ছে। এর জন্য ভারসাম্যপূর্ণ সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করা দরকার। জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার পরিবর্তন করে আনুপাতিক হারে সংসদে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা চালু করা দরকার।

বিচার বিভাগের ওপর সরকারের আস্থা নেই -খুশী কবির

বিচার বিভাগের ওপর সরকারের আস্থা নেই বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির। তিনি বলেছেন, সারা দেশে সহিংসতা চলছে। সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন। সরকার সঙ্কট নিরসনে পদক্ষেপের নামে মানুষ হত্যার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিদিন ট্রাকের নিচে চাপা দিয়ে, কথিত বন্দুকযুদ্ধসহ নানা পদ্ধতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানুষ হত্যা করছে। বলা হচ্ছে, তারা সহিংসতা সৃষ্টিকারী। যদি তারা সত্যিই নাশকতায় অভিযুক্ত হন, তবে সরকারের উচিত তাদের দ্রুত বিচার আইনের আওতায় বিচারের ব্যবস্থা করা। বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে সরকার প্রমাণ করছে বিচার বিভাগের ওপর তাদের আস্থা নেই। শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধে জনতা’র ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, পারভেজ আলম, মাহফুজা হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাহানারা নূরী।
খুশী কবির বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলের নানা কর্মসূচি থাকবে। তবে এ কর্মসূচির নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা, নাশকতা করে জনজীবন বিপর্যস্ত করা ঠিক নয়। এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি প্রত্যাহার করা উচিত। এ ধরনের কর্মসূচির ক্ষেত্রে যারা নির্দেশনা দিচ্ছেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। লিখিত বক্তব্যে জাহানারা নূরী বলেন, গত এক মাসে এ পর্যন্ত সহস্রাধিক মানুষ পেট্রলবোমার শিকার হয়েছেন। এতে মৃত্যু হয়েছে ৫০ জনের, ৮১ জন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। এদের কয়েকজন এখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। সংবাদ সম্মেলনে সহিংসতা নিরসনে সরকারের প্রতি পাঁচ দফা দাবি পেশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে হত্যা ও ধ্বংসের অপরাজনীতি বন্ধ করে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া, সহিংসতায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা।

বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৬২ জন- দর্শনার্থীদের ভিড় কমানোর পরামর্শ, শুটিংয়ের চেষ্টা

সামপ্রতিক সময়ে হরতাল ও অবরোধে সহিংসতায় আহত হয়ে ৬২ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি আছেন। তাদের উন্নত চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের চিকিৎসাসেবা উন্নত ও নির্বিঘ্ন করতে ওই ইউনিটে ভিড় কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। গতকাল সকালে ইউনিটের পঞ্চম তলায় কনফারেন্স রুমে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বার্ন ও সার্জারি ইউনিটের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ খন্দকার জানান, অবরোধ ও হরতালে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দগ্ধ হয়ে ১২৩ জন পুরুষ ও নারী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। দগ্ধদের অনেকেরই আবার হাত ও পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বার্ন ও সার্জারি ইউনিটের বিভিন্ন বিভাগে মোট ৬২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া, চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ৫২ জন বাড়িতে চলে গেছেন। মারা গেছেন নয় জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৬২ জনের মধ্যে আইসিইউতে ৭ জন, ২০১ এর ওয়ার্ড বারান্দায় ১৯ জন, মেইল পেইং ওয়ার্ডে ১২ জন, এইচডিইউতে ৮ জন, ২০১ নম্বর ওয়ার্ডে ৯ জন, পোস্ট অপারেটিভে ৫ জন ও কেবিনে ২ জন চিকিৎসাধীন আছেন। দগ্ধদের মধ্যে জাহাঙ্গীর, রাকিব, মরিয়ম, রাজিব ও নূরুন্নবীর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সাজ্জাদ খন্দকার জানান, বেশি দগ্ধ রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনার পরিমাণ ক্ষীণ। কেননা, তাদের  শরীরের ফুসফুস ও কিডনি কাজ করে না। শরীর নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন টিস্যুগুলো নিস্তেজ হয়ে যায়। এতে তারা বাঁচা ও মরার সন্ধিক্ষণে থাকে। ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে যারা আহত হচ্ছেন তাদের অধিকাংশই ঢাকার বার্ন ইউনিটে ভর্তি হচ্ছেন। উন্নত চিকিৎসা হওয়ায় বিত্তশালীরাও এখানে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এতে ইউনিটে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর বেশি দর্শনার্থী হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। তিনি রোগীদের স্বার্থে এবং তাদের উন্নত চিকিৎসা নির্বিঘ্ন করার জন্য দর্শনার্থীদের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভিড় কমানোর পরামর্শ দেন। ঢাকার বাইরে বার্ন ইউনিটকে শক্তিশালী করার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের ৩০ জন চিকিৎসক ও নার্সকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে তারা আবার নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাবে। তিনি আরো বলেন, গাইবান্ধার বাসে পেট্রলবোমা হামলায় আগুনে ঘটনাস্থলেই ৪ জন এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে ১জন মোট পাঁচজন মারা গেছেন। এ ঘটনায় আরো ১৯ জন আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ঢাকার বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা আহতদের উন্নত চিকিৎসার বিষয়ে সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।
চিকিৎসাধীন মরিয়ম খাতুন রূপার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তার বয়স কম। দগ্ধ হওয়ার পরিমাণ ৪৫ শতাংশ। তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। তাকে সুস্থ করে তোলার যথাযোগ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বার্ন ও সার্জারি ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান ডা. প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ, অবৈতনিক উপদেষ্টা ডা. সামন্ত লাল সেন ও আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শঙ্কর পাল প্রমুখ।
বার্ন ইউনিটে আবারো শুটিংয়ের চেষ্টা: গতকাল দুপুর ১২টায় ‘ভ্রাম্যমাণ শুটিং দল’ নামে একনারীসহ ছয়জন বার্ন ও সার্জারি ইউনিটের অবজারভেশন ওয়ার্ডে  শুটিং করতে যায়। এসময় ওই ওয়ার্ডে ভর্তিরত কয়েকজন রোগীর স্বজন চিৎকার করতে থাকে। খবর পেয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকরা ওই শুটিং দলের সদস্যদের চলে যেতে বলেন। এসময় সেখানে থাকা ফটো সাংবাদিকদের সঙ্গে শুটিং দলের সদস্যদের কথা কাটাকাটি হয়। অবজারভেশন ওয়ার্ডে ভর্তি আহতের স্বজন খাদিজা বেগম জানান, ‘এটা চিকিৎসা দেয়ার স্থান। কোন নাটকের স্থান নয়। শুটিং দলের সদস্যরা ওয়ার্ডে ক্যামেরা নিয়ে ঢোকামাত্র আমরা চিকিৎসকদের খবর দেই। বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শঙ্কর পাল জানান, খবর পেয়ে আমরা অবজারভেশন ওয়ার্ডে যাই। তাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে এবং বার্ন ইউনিটে আর না আসতে বলা হয়েছে।

শিবির নেতাসহ ঢাকা, কুমিল্লা ও যশোরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৩

নিহত শিবির নেতা জসিম উদ্দিন
ঢাকা, কুমিল্লা ও যশোরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এক শিবির নেতা ও এক বিএনপি নেতাসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। শনিবার গভীররাত থেকে রোববার ভোর ৪টার মধ্যে এসব বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এছাড়া কুমিল্লায় দুই জামায়াত নেতাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নয়া দিগন্তের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার তালতলা নতুন রাস্তা এলাকায় পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে শিবিরের মিরপুর পূর্ব থানা সংগাঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন (২৩) নিহত হয়েছেন। শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। নিহত জসিম উদ্দিনের বাবার নাম আবদুর রাজ্জাক। তিনি রাজধানীর কাজী পাড়া মাদরাসায় লেখাপড়া করতেন। তার বাড়ি বরিশাল সদর উপজেলার পূর্ব কোন্দেলপাড়ায়। রাজধানীর মিরপুরের মনিপুরে থাকতেন তিনি।
নিহতের ভাই আনিসুর রহমান জানান, শনিবার সকালে লোক মারফত খবর পাই পুলিশ তার ভাই জসিম উদ্দিনকে ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু কোথা থেকে ধরে নিয়ে গেছে তা জানা যায়নি। পরবর্তীতে শেরেবাংলানগর, মিরপুর ও কাফরুল থানায় যোগাযোগ করলে পুলিশ আটকের কথা অস্বীকার করে। সকালে শেরেবাংলানগর থানা থেকে জানানো হয়, ঢাকা মেডিক্যালে একজনের লাশ পড়ে আছে, সেখানে খোঁজ নিতে পারেন। পরে ঢাকা মেডিক্যালে এসে লাশ শনাক্ত করেন আনিস।
তিনি আরো জানান, জসিম উদ্দিনের চোখের উপরে কপালের নিচে একটি এবং বুকে আরো আটটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। বুকে লাগা গুলিগুলো পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়।
শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুর রব জানান, রোববার ভোর ৪টার দিকে তালতলা নতুন রাস্তা এলাকায় ঘটনাস্থল থেকে জসিমের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার শিবিরের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গতকাল বাসায় ফেরার পথে শেরেবাংলানগর থানা পুলিশ রাজধানীর শ্যামলীতে একটি লেগুনা গাড়ি থেকে জসিম উদ্দিনসহ চার শিবির নেতাকর্মী আটকের কথা জানানো হয়। তবে পুলিশ গতকাল আটকের কথা অস্বীকার করে। অপর তিনজন হলেন- ঢাকা পলিটেকনিকের ১ম বর্ষের ছাত্র সজিব, ঢাকা সিটি কলেজের ছাত্র আব্দুল মান্নান ও আব্দুল্লাহ।
এদিকে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি ওয়াহিদ আলম আজ দুপুরে জানান, শনিবার শ্যামলীতে পুলিশ সার্জেন্টের ওপর ককটেল হামলার অভিযোগে জসিমসহ চারজনকে আটক করা হয়। রোববার ভোরে ডিবি ও পুলিশের একটি যৌথ টিম তালতলা ডাম্পিং স্টেশনের কাছে আটকৃতদের নিয়ে অভিযানে গেলে দুর্বত্তরা তাদের ওপর গুলি চালায়। পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে জসিম মারা যায়।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে শিবির নেতা এমদাদ উল্লাহকে গ্রেপ্তারের পর অস্বীকার করে পুলিশ। পরে তিনিও কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
যশোর অফিস জানায়, যশোরে র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে রাজু ওরফে ভাইপো রাজু (২৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত রাজু যশোর শহরের গাড়িখানা রোড এলাকার আজিবর রহমানের ছেলে।
র‌্যাব জানিয়েছে, রাতে রাজুকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে রাজুর সহযোগীরা র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি করে। এ সময় র‌্যাবও গুলি চালায়। গুলি বিনিময়কালে নিজের সহযোগীদের গুলিতে মারা যায় রাজু।
র‌্যাব যশোর ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর আশরাফ উদ্দিন জানান, একাধিক হত্যা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি রাজুকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে তার কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করে। রোববার শেষ রাতের দিকে র‌্যাব সদস্যরা তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে বের হয়। ভোর পাঁচটার দিকে শহরতলীর মুড়লিতে যশোর-খুলনা মহাড়কের পাশে পেট্রোল পাম্পের বিপরীতে  ইট ভাটার কাছে পৌঁছা মাত্রই রাজুর সহযোগীরা র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলি বিনিময়কালে পালাতে গিয়ে নিজের সহযোগীদের গুলিতে জখম হয় রাজু। এসময় তার সহযোগীরা পালিয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মেজর আশরাফ আরো জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশী রিভলবর ও একটি শার্টার গান এবং দুইটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে যশোরের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এজেডএম ফিরোজের একমাত্র ছেলে অর্নব হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
কুমিল্লা সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লায় পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে স্বপন মিয়া নামে এক বিএনপি নেতা নিহত হয়েছেন। শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। একই রাতে জেলার নাঙ্গলকোটে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কারা ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে স্থানীয় জামায়াত নেতা বেলায়েত ও বেলালাকে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি প্রশান্ত পাল জানান, রাত দেড়টার দিকে সদর দক্ষিণ উপজেলার ভাটপাড়া এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ স্বপন মিয়া (৪০) নিহত হয়েছেন। শনিবার সকালে সদর কোর্টবাড়ি এলাকা থেকে স্বপনকে গ্রেফতার করা হয়। রাত দেড়টার দিকে তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে বের হলে ভাটপাড়া এলাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে স্বপনের সহযোগীরা। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। উভয়পক্ষের গোলাগুলিতে স্বপন গুলিবিদ্ধ হন। রাত ২টার দিকে সদর দক্ষিণ থানার এসআই সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আহত স্বপনকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন স্বপন বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত এবং স্থানীয় নেতা। এসময় ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কয়েক রাউন্ড গুলিসহ একটি পিস্তল উদ্ধার করেছে। রাত ৩টার দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। নিহত স্বপন উপজেলার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার উত্তর রামপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার দৌলখাঁ ইউনিয়নের দুই জামায়াত নেতাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের একজন হচ্ছেন বাম গ্রামের মজুমদার বাড়ির আবদুল হালিম মজুমদারের ছেলে বেলায়েত হোসেন মজুমদার দুলাল (৪৮)। অপরজন হচ্ছেন একই গ্রামের পন্ডিত বাড়ির আলী হায়দার পন্ডিতের ছেলে বেলাল হোসেন পন্ডিত (৪০)।
পুলিশ জানায়, তাদেরকে লদুয়া এলাকা থেকে ১২টি ককটেল ও একটি পেট্রলবোমাসহ আটক করে পুলিশ। শনিবার দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে তাদের আটক করা হয়। নাঙ্গলকোট থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সালাউদ্দিন জানান, লদুয়া এলাকায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা করছিলেন। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযানে গেলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। এসময় পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে নেতাকর্মীরা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে ককটেল ও পেট্রলবোমাসহ পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ওই দু’জনকে আটক করা হয়।
অন্যদিকে আহতদের পরিবার জানায়, পুলিশ তাদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। রোববার সকালে তারা জানতে পারেন বেলায়েত ও বেলালকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কুমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতে ইসলামী এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত স্থানীয় জামায়াত নেতা বলায়েত হোসেন দুলাল ও বেলাল হোসেনকে পুলিশ গভীর রাতে ঘুম থেকে জাগিয়ে নাঙ্গলকোট থানায় নিয়ে আসে। পরে তাদের পায়ে গুলি করে গুরুতর আহত অবস্থায় নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। বেলায়েত হোসেন দুলাল কুমিল্লা ইবনে তাইমিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক এবং বেলাল হোসেন ব্যবসায়ী। তারা দুইজনই স্থানীয় জামায়াতের নেতা বলে জানানো হয়েছে। কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শে পরে তাদেরকে রাত ৩টার দিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার। আহত বেলায়েত ও বেলালকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কারা ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।

‘যে ঘোড়ার পিঠে চড়েছি আমরা দুই দল’

নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী ফেসবুকে লিখেছেন, ভারতে বসে বসে মিটিংয়ের ফাঁকে ফেসবুকের প্রোফাইলে প্রোফাইলে বাংলাদেশকে খুঁজেছি। সচরাচর অন্যের প্রোফাইল দেখার সুযোগ হয় না। ঘুরে ঘুরে যে ছবি দেখেছি তা চরম আশাবাদী মানুষকেও হতাশ করে তুলবে। আওয়ামী লীগের বন্ধুদের প্রোফাইলে গিয়ে দেখি ওরা যুদ্ধে আছে। বিএনপির বন্ধুদের প্রোফাইলে গিয়ে দেখি ওরাও যুদ্ধে আছে। আর আমি শুধু দেখি অন্ধকার। মুখোমুখি বসিবার কেউ নেই। আছে শুধু অন্ধকার। যে ঘোড়ার পিঠে চড়েছি আমরা দুই দল, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এ এক অন্ধ ঘোড়া যার কেবল পতনের রাস্তাটাই চেনা আছে। আর আমরা যারা যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে চলেছি তাদের চোখে যাদুকর পড়িয়ে দিয়েছে এক ঠুলি আর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে তর্কশাস্ত্রের বাহাত্তর খন্ড পুস্তক। আমাদের দিলে তাই রহম নাই, আমাদের দেশে প্রজ্ঞা বলে কোনো শব্দ নাই, আমাদের অভিধানে ক্ষমা বলে কোনো বস্তু নাই। আমাদের ধর্মের নাম নির্মূল ধর্ম। আমি তোমাকে, তুমি আমাকে - চলো নির্মূল নির্মূল খেলি। কখনো গ্রেনেড, কখনো পেট্রল বোমা, কখনো রাজার বন্দুক, কখনো জ্ঞান ব্যাপারীর কলম। চলো মারি অবিশ্বাসীরে। আর এই করতে গিয়ে যুদ্ধের ময়দানে যদি কিছু অযোগ্য অপদার্থ সাধারণ প্রাণ পুড়ে কয়লা হয় হোক। ওসব ইতিহাসের জ্বালানি। আহ্! আহ্!
আমরা ভারতের কাছ থেকে এতো কিছু শিখি, একটু গণতন্ত্র শিখতে পারি না? বিরুদ্ধ মত নিয়া পাশাপাশি চলা, রাজনৈতিক, সামাজিক, আর প্রাতিষ্ঠানিক সৌজন্য দেখানোর উপায় শিখতে পারি না?

জলছন্দের জলকাব্য by মুজিবুল হক

(কালার প্লেট আয়োজিত জলরঙের প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন দর্শকেরা l সৌরভ দাশ) নীল আকাশে সাদা তুলো মেঘ। নদীর পাড়ে বাঁধা সারি সারি মাছ ধরার নৌকা। পড়ে আছে ছড়ানো-ছিটানো গাছের গুঁড়ি। ওপারে কুয়াশাচ্ছন্ন গাঢ় সবুজ পাহাড়। লাল, নীল, খয়েরি, ধূসর রঙের ব্যবহারে নিসর্গের ছবিটি এঁকেছেন শিল্পী তন্ময় চক্রবর্তী। কালার প্লেটের আয়োজনে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমীর আর্ট গ্যালারিতে আয়োজিত জলছন্দ শিরোনামে প্রদর্শনীতে স্থান পায় ছবিটি। ১০ জন শৌখিন শিল্পী ও ৪৭ জন শিক্ষার্থীর ৫৭টি জলরং নিয়ে এ যৌথ চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয় ৫ ফেব্রুয়ারি। গত বছরের ২২ থেকে ৩১ ডিসেম্বর জলরং নিয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের চিত্রকর্ম নিয়ে এই প্রদর্শনীর আয়োজন।
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক নাসিমা আখতার। অতিথি ছিলেন অধ্যাপক মনসুর উল করিম, শিল্পী জসিম উদ্দিন ও খাজা কাইয়ূম।
প্রদর্শনীতে দেখা গেছে, শিল্পীরা যেন হুবহু নিসর্গের রং হাজির করেছেন তাঁদের ক্যানভাসে। প্রকৃতির বাস্তব আকৃতিকেই ছবির বিষয় করেছেন অনেকে। কিছু ছবিতে স্পেস, রং আর জলরঙে ধোয়া কাজে এনে দিয়েছে ছন্দ। চারপাশের নিসর্গের ছুটে চলা সৌন্দর্য হাজির হয়েছে নিজস্ব ভঙ্গিতে।
গ্যালারিতে ঢোকার পর চোখে পড়বে ফুলদানিতে একগুচ্ছ ফুল। গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেলী, অর্কিড, ডালিয়া ও সবুজ পাতা বাহারি ফুলের উপস্থাপন করা হয়েছে সাদা কাগজের বুনট অংশে (হ্যান্ডমেড পেপার)।
ছবিটি অলক কুমার সরকারের। উজ্জ্বল রঙের পরিমিত ব্যবহার আর শান্ত রঙের উপস্থিতি ছবিটিতে স্থিতি তৈরি করেছে। এ ছাড়া নিসর্গের ছবি এঁকেছেন অনিমেষ মজুমদার, এম এ হাসান, হ্লাবাসু চৌধুরী, রাজীব শীল, সাদিয়া আফরিন, সজীব সেন, জয়তু চাকমা ও মো. নাজিমউদ্দীন। তাঁদের কাজে নির্দিষ্ট কিছু রঙের ব্যবহার স্পষ্ট হয়ে দেখা যায়।
জড় জীবন করেছেন কনক দে, মরিয়ম বেগম, রাবেয়া, রীনা চাকমা, তানজিনা আহমেদ, পারমিতা সরকার, প্রাচী সাহা ও নাজমুল হোসেন। তাঁদের কাজে দেখা যায় রং-রেখা আর ছন্দের সরল উপস্থাপন।
শিল্পকলার শেষ কক্ষের দেয়ালে প্রশিক্ষকদের মধ্যে রাসেল কান্তি দাশ, বখতিয়ার হোসেন, সঞ্চয় সরকার, আনিসুজ্জামান, শেখ মোহাম্মদ জনের কাজ নজর কাড়ছে। এই প্রদর্শনীতে দর্শক দেখতে পেয়েছেন শিল্পীদের চোখে দেখা নিসর্গের অভিধান। শিল্পকর্মগুলো আমাদের ভাবনার দুয়ারে সতেজ প্রকৃতিকে নতুন করে কড়া নাড়াতে সক্ষম।
প্রদর্শনী সম্পের্ক কালার প্লেটের সংগঠক মিঠু মুৎসুদ্দী ও সজলচন্দ্র নাথ বলেন, চট্টগ্রামে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চারুকলা চর্চা শুরু হওয়ার পর থেকে এখানকার নিসর্গ ছবি জলরঙে উঠে এসেছে সহজ মাধ্যম হিসেবে। সময়ের পথপরিক্রমায় শিল্পে যুক্ত হয়েছে নানা মাধ্যম, করণ ও কৌশল। যার ফলে জলরঙের শিল্প আজ অবহেলিত, কিন্তু জলরং খুব সহজে ও কম ব্যয়ে করা সম্ভব। এই শিল্প খুব সহজে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।
তিন দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী শেষ হয় ৭ ফেব্রুয়ারি।

রংপুর মেডিকেলের বার্ন ইউনিট- ‘হামরা গরিব, হামাক কেনে মারে?’ by আরিফুল হক

(পেট্রলবোমায় দগ্ধ স্ত্রী ও ছেলে মারা গেছেন। নিজে দগ্ধ হয়েছেন। সেই যন্ত্রণা তুচ্ছ করে পাশে পোড়া দেহে কাতর মেয়ের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তারা মিয়া। ছবিটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে গতকাল বিকেলে তোলা l মঈনুল ইসলাম) শরীর ৭ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে তারা মিয়ার (৪০)। মেয়ে তানজিনার (৮) ৮ শতাংশ। বাবা-মেয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে একই বিছানায় শুয়ে। নিজের কষ্ট ভুলে নির্বাক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা মিয়া। তখনো তিনি জানেন না, স্ত্রী সোনাভানু (৩৩) ও ছেলে সুজন (১৩) এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ছেলে গতকাল শনিবার সকাল সাতটায়, আর স্ত্রী ভোররাত সোয়া তিনটায় মারা যান। একই পরিবারের এই চার সদস্য গত শুক্রবার দিবাগত রাতে বাসে করে ঢাকায় যাওয়ার পথে গাইবান্ধার তুলসীঘাট এলাকায় পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হন। তারা মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুরের পাইকপাড়া গ্রামে। তিনি দিনমজুর। স্ত্রী ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। তারা মিয়া স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তাঁদের আরও দুই সন্তান ঢাকায় তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় বিমানবন্দরের পাশে একটি এলাকায় থাকেন তারা মিয়া।
বার্ন ইউনিটের শয্যায় কাতরাতে কাতরাতে তারা মিয়া বললেন, ‘কিছু বুঝি উঠবার আগোত বাসোত দেখি দাউ দাউ করিয়া আগুন জ্বলতোছে। দিগ্বিদিক না পায়া মোর সিটের সাথোত থাকা একটা ছাওয়াক নিয়া জানালা দিয়া বের হবার পারছি। কিন্তু বউ আর একটা ছাওয়ার খবর জানোও না। তবে শুনছোও এই হাসপাতালোত আছে।’
ভারী হয়ে উঠেছে বার্ন ইউনিটের বাতাস: এদিকে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আহত দগ্ধদের আহাজারিতে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কিছু একটা জানতে চাইলে বোমা হামলায় দগ্ধ পোশাককর্মী সুজান মিয়া (৩০) চিৎকার করে বলেন, ‘হামার কাছোত কেনে জাইনবার চান? যারা রাজনীতি করে ওমারগুলার কাছোত জাইনবার চান। হামরা সবায় গরিব মানুষ। হামাক কেনে মারে?’
গাইবান্ধার তুলসীঘাটে চলন্ত বাসে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ১৮ জনের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। এই পাঁচজন হলেন সুন্দরগঞ্জের চণ্ডীপুর এলাকার রিকশাচালক সাজু মিয়া (২৮), তাঁর ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তিনি ঢাকায় রিকশা চালান। একই এলাকার দিনমজুর আবুল কালামের (৪০) ৫৫ শতাংশ, কামারের ভিটা এলাকার রিকশাচালক মোতালেবের (৫০) ৩০ শতাংশ ও শান্তিধাম এলাকার রিকশাচালক জাহাঙ্গীরের (৩৪) ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন সাইদুল ইসলাম (৩৫) ঢাকায় রিকশার গ্যারেজে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার সাথে সাথে আমি জানালা দিয়া বের হতে পারছি বলে কম পুড়ছি। যারা দরজা দিয়া বের হওয়ার চেষ্টা করছিল, তাদের বেশি ক্ষতি হইছে।’
বিজিবির সিপাহি বদিউজ্জামান (২৪) বলেন, ‘বাড়ি আসছিলাম, ছুটি শেষ, চাকরিতে জয়েন (যোগদান) করতে হবে। তাই এই বাসে চড়ে ঢাকা যাচ্ছিলাম। কে জানে যে এত বড় ঘটনা ঘটবে।’
এদিকে চিকিৎসাধীন দগ্ধ ১৮ জনের মধ্যে অধিকাংশই রিকশাচালক, দিনমজুর, তৈরি পোশাক কারখানার কর্মী। এদের অধিকাংশের বাড়িও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়। তারা সবাই একসঙ্গে একই বাসে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। অন্য আহত ব্যক্তি হলেন রফিকুল ইসলাম (২৫), নজরুল ইসলাম (৩০), কায়সার আলী (৪০), বিজয় (১০), তানজিনা (৮), মঞ্জুরুল ইসলাম (৩০), জ্যোৎস্না (২২), সাইফুল (২৫), গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এলাকার আমিনুর (২৪), কুড়িগ্রামের চিলমারীর বুলবুলি (২৩)।
হাসপাতালের পরিচালক আবদুল কাদের খান বলেন, সারা রাত ধরে চিকিৎসক ও সেবিকারা দগ্ধদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না এখানে। দগ্ধদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

২০১৩ সালে দগ্ধ- এক বছরে চিকিৎসায় আড়াই লাখ টাকা by গোলাম মর্তুজা

দুই হাতে সাদা ছোপ ছোপ দাগ। বাঁ হাতটা ডান হাতের চেয়ে কিছুটা সরু। বাঁ কানের পেছনে চামড়া কোঁচকানো। ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় পেট্রলবোমায় দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন মিনিবাসচালক মাহাবুব আলমের পুরো শরীরেই। চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করেও পুরো সুস্থ হতে পারেননি মাহাবুব। ওই খরচ জুগিয়েছেন স্বজনদের আর্থিক সহায়তায়, গ্রামের বসতবাড়ির একাংশ বিক্রি করে। পোশাকশ্রমিক স্ত্রীর বেতনের টাকা ও স্বজনদের সহায়তায় কোনোমতে চলছে তিনজনের সংসার। গত জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে শিশুপার্কের সামনে বিহঙ্গ পরিবহনের মিনিবাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়েছিলেন চালক মাহাবুবসহ ২৯ জন। তাঁদের মধ্যে পরে আটজন মারা যান। পোড়ার যন্ত্রণা, কষ্টের কথা মাহাবুব বললেন গত ৩০ জানুয়ারি মিরপুরের দুয়ারীপাড়ায় তাঁর বস্তিঘরে বসে।
মাহাবুব বলেন, ওই সন্ধ্যায় যাত্রীসহ মিনিবাস নিয়ে মিরপুর যাওয়ার পথে শিশুপার্কের সামনে পেট্রলবোমা হামলা হয়। পুরো শরীরে আগুন নিয়ে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েন তিনি। তাঁকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। প্রথম কয়েক দিন তাঁর জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান ফিরলে দেখেন চিকিৎসক-সেবিকারা খুব যত্ন করছেন, গণমাধ্যমকর্মীরা সাক্ষাৎকার নিয়ে যাচ্ছেন। ১৪ ডিসেম্বর বার্ন ইউনিট থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
মাহাবুব বলেন, ‘আমি তখনো সুস্থ না, হাঁটপার পারি না। আমার বউ আর আমি খুব জোরাজুরি করলাম আরও কিছুদিন হাসপাতালে থাকার জন্য। কিন্তু তারা একরকম জোর করি বাড়িত পাঠাল।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক (অবৈতনিক) সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম হওয়ার কথা নয়। তবে এখানে যেহেতু রোগীর খুব চাপ, তাই এখানে ‘ক্রস ইনফেকশন’-এর শঙ্কাও বেশি। তাই কিছু রোগীকে মোটামুটি সুস্থ করে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিছু রোগী নিজেরাই একটু সুস্থ হলে বার্ন ইউনিট ছাড়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন।
মাহাবুব জানান, ক্ষত কাঁচা থাকায় এবং অসুস্থ বোধ করায় ১৫ ডিসেম্বর ভর্তি হন মিরপুর ১০ নম্বরের গ্যালাক্সি হাসপাতালে। চিকিৎসার বিপুল খরচ আর কুলাতে পারছিলেন না। ২৬ জানুয়ারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে তিন দিন পর পর আসতে বলে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। খরচ জোগাতে গাইবান্ধা সদরে গ্রামের বাড়ির পাঁচ শতাংশ জমিও বেচেছেন। বাবা-ভাই-চাচারা সাহায্য করেছেন। তিনি বলেন, ছয়-সাত মাস পর মোটামুটি সুস্থ হন। বাঁ হাতের শক্তি কমে যাওয়ায় আর বাস চালাতে পারবেন না। তাই গাড়িচালকের চাকরির জন্য এ পর্যন্ত পাঁচবার সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি হয়নি। তিনি বলেন, ‘লোকে কয়, আমার হাত-মুখ দেইখা বাড়ির ছোট বাচ্চারা ভয় পাইব। এহন আমারে যদি কেউ একটা চাকরি ধইরা দেয়, তাইলেই আমি বাঁইচা যাই, ভাই।’
মাহাবুবের স্ত্রী শাহনাজ জানান, স্বামী দগ্ধ হওয়ার পরের মাসে তিনি পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়েছেন। তাঁর বেতন, স্বজনদের সহায়তায় সংসার চলছে। জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ডেকে তাঁকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এই দম্পতির একমাত্র ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

উভয় নেত্রীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর যুক্তি প্রযোজ্য

দুটি অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া দেখানো ছাড়া বাংলাদেশে আর কিছুই অগ্রাধিকার পেতে পারে না। একটি রাজনৈতিক দাঙ্গায় একটি বাসে আগুনে বোমা ফেলা হয়েছে। এতে সাত জন মানুষ জীবন্ত দগ্ধ এবং আরো ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আরেকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ঢাকার একটি প্লাস্টিক কারখানায় এবং এতে ১৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে। বিষাক্ত ধোঁয়া ও গলিত প্লাস্টিক থেকে আরো বিপুলসংখ্যক লোক আহত হয়েছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে হামলার ঘটনায় উস্কানি দানের জন্য সরকার বিরোধীদলীয় নেত্রীকে অভিযুক্ত করেছে। নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে সহিংস দাঙ্গা বাধানোর দায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার বিএনপি নেতা খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করেছে। জিয়া ও তার দল গত বছর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে সরকার কারচুপি করবে- এই অভিযোগ এনে বয়কট করেছিলেন।
এই ঘটনা দুই নেতার মধ্যকার দীর্ঘকালীন তিক্ত উপাখ্যানের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। তাদের মধ্যকার বৈরিতার তল মাপা সাধারণ জ্ঞান দিয়ে অনুভব করা যাবে না। তাদের দেশের উত্তম স্বার্থের নিরীখে বিবেচনা করলেও তাদের বৈরিতা যে কারো বর্ণনা শক্তির সীমা ছাড়িয়ে যাবে। হাসিনা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে দেন। এই নির্বাচনকালীন সরকার আমলা ও টেকনোক্রাটদের নিয়ে গঠন করা হতো। যারা নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে কেবল দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদন করতো এবং নির্বাচনের আয়োজন করতো। খালেদা জিয়া তখন প্রতিবাদ করেছিলেন যে, এই ব্যবস্থা বিলোপ করার লক্ষ্য হচ্ছে হাসিনা নির্বাচনে কারচুপি করবেন। আইনি চ্যালেঞ্জ ব্যর্থ হয়েছিল। এর ফল হিসেবে খালেদা জিয়া ও তার দল নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং হাসিনা ক্ষমতায় থেকে যান। যখনই ব্যালটবাক্স অপসারণ করা হয়েছে, তখনই সহিংস রাজনৈতিক প্রতিবাদ দারুণভাবে অবধারিত হয়ে ওঠে। হাসিনা যখন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছিলেন তখনই এটা জানতেন। খালেদা জিয়াও এটা জানতেন যখন তিনি নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থেকেছিলেন।
এই দুইয়ের মাঝামাঝি বেছে নেয়ার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। যদি সত্যিই বাসে হত্যাকাণ্ডের জন্য খালেদা জিয়ার কাঠগড়ায় দাঁড়ানো উচিত বলে গণ্য হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর যুক্তি প্রযোজ্য। হতাশাগ্রস্ততা এবং আরো বেশি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে নাগরিকের ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে খেলা করার চলমান নৈরাশ্যকর চেষ্টা থেকে উভয় রাজনীতিকের বিরত থাকা উচিত।
বিয়োগান্তুক দিক হলো প্রকৃত ইস্যুর দিকে নজরদারি উপেক্ষিত হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশটির ভিড় উপচে পড়া বহুতলবিশিষ্ট গার্মেন্ট কারখানাগুলোর নিরাপত্তা। এসব কারখানা কলঙ্কিত অবমাননা হিসেবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জন্য মৃত্যু ও জখম হওয়ার ফাঁদে পরিণত হয়ে আছে।
সর্বশেষ নাসিম প্লাস্টিক হাউসে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে বিরাট ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে। আগেই যেমনটা বহু কারখানায় ঘটেছে, তেমনি এখানেও অগ্নি নির্বাপনী ব্যবস্থাদি সম্পূর্ণরূপে অপ্রতুল এবং জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা অকার্যকর বলেই প্রমাণিত হয়েছে। বহু শ্রমিক আতঙ্কে ছুটোছুটি করে কারখানা থেকে বেরিয়ে প্রাণে বাঁচতে চেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, ওই কারখানায় এর আগে একটি বারের জন্যও অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত কোন মহড়া অনুষ্ঠিত হয়নি। বসদের কাছে এমনকি কোন রেকর্ডও পাওয়া যায়নি যে, যা থেকে ওই কারখানায় কর্মরতদের সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যাবে। এখনও পর্যন্ত এটা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয়নি যে, ওই অগ্নিকাণ্ডে কত জনকে হত্যা করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডই এই ঘটনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত শব্দ। ২০১৩ সালে রানা প্লাজায় ১১শ’ কর্মী জীবন্ত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল। এটাই আমাদের জানা মতে ইতিহাসের বৃহত্তম কর্পোরেট হত্যাকাণ্ড। যেসব কারখানার মালিক খরচ কমানোর জন্য বেপরোয়া, যেসব পরিকল্পনাবিদ দুর্নীতিগ্রস্ত তাদের বিরুদ্ধে ক্রাকডাউন চালাতে সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও আজও বাংলা দেশের বহু সংখ্যক কারখানা মৃত্যু ফাঁদ হয়ে আছে।
কারণ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতার জন্য অশোভন ঘুষাঘুষিতে লিপ্ত। তাই প্রকৃত ইস্যুগুলো যা জরুরি মনোযোগ দাবি করে তা উপেক্ষিতই থাকছে। বাংলাদেশ তার রাজনীতিকদের কাছ থেকে উত্তম কিছু লাভ করার যোগ্যতা রাখে।
সূত্র: গত ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত ‘সৌদি গেজেট’ পত্রিকায় ‘তিক্ত বৈরিতায় বাংলাদেশ নেতৃবৃন্দ অন্ধ’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়টির হুবহু তরজমা