Friday, October 24, 2025

ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় সংলাপে বসবে হামাস

ফিলিস্তিনের সকল স্বাধীনতাকামী দলের সঙ্গে জাতীয় সংলাপের ঘোষণা দিয়েছে হামাস। বৃহস্পতিবার এ ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। জানিয়েছে, তারা গাজার সব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় সংলাপে অংশ নিতে প্রস্তুত। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আনাদোলু। এতে বলা হয়, মিশরের রাজধানী কায়রোতে হামাস ও ফাতাহ প্রতিনিধিদলের বৈঠক চলাকালীন এ ঘোষণা দেয়া হয়। সেখানে গাজার যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ ও উপত্যকার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হামাস খোলা মন ও আন্তরিকতার সঙ্গে জাতীয় সংলাপে যাচ্ছে। আমরা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য জাতীয় শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চাই। কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনের অবিচ্ছেদ্য প্রতিষ্ঠান- তাদের বাদ দিয়ে কোনো সমাধান সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, এখন জাতীয় ঐক্যের সময়। আমাদের দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কাসেম সতর্ক করে বলেন, বর্তমান সময়টি শুধু হামাসের জন্য নয় বরং গাজা ও পশ্চিম তীরের সব ফিলিস্তিনির জন্যই অত্যন্ত সংকটময়। হামাস মুখপাত্র জানান, সংগঠনটি গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকে ইসরাইলের ওপর চাপ দিতে হবে যাতে তারা চুক্তির সব শর্ত মেনে চলে। কাসেম জানান, হামাস দিনরাত আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নে কাজ করছে এবং ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে বেশ কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে।

তার ভাষায়- তুরস্ক, মিশর, কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা স্পষ্ট নিশ্চয়তা পেয়েছে যে যুদ্ধ কার্যত শেষ হয়েছে এবং চুক্তির সব শর্ত বাস্তবায়নই এর পূর্ণ সমাপ্তি নির্দেশ করে। তিনি আরও জানান, প্রথম ধাপের শর্ত অনুযায়ী হামাস জীবিত বন্দী ও কিছু মৃতদেহ ইসরাইলের কাছে হস্তান্তর করেছে। বাকি অংশও ধীরে ধীরে সম্পন্ন করা হচ্ছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/186288_Kaium-6.webp

যুদ্ধবিরতির পরও গাজার মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা দূর হচ্ছে না: ডব্লিউএইচও

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দুই সপ্তাহ পরও গাজায় ক্ষুধার সংকট বিপর্যয়কর পর্যায়ে আছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

গতকাল বৃহস্পতিবার ডব্লিউএইচওর প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস গাজার মানুষের ক্ষুধা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এ সতর্কবার্তা দেন।

এদিকে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থার পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

ত্রাণ সংস্থাগুলো বলেছে, অবরুদ্ধ গাজায় যে পরিমাণ খাদ্যসরবরাহ করা হচ্ছে, তা সেখানকার মানুষের পুষ্টিচাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলেছে, গাজায় প্রতিদিন দুই হাজার টন ত্রাণসহায়তা পৌঁছানোর কথা থাকলেও এর চেয়ে অনেক কম পৌঁছাচ্ছে। এর কারণ, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে বর্তমানে মাত্র দুটি প্রবেশদ্বার খোলা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান গেব্রেয়াসুস বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনো বিপর্যয়কর পর্যায়ে আছে। কারণ, যা প্রবেশ করছে, তা একেবারেই যথেষ্ট নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘পর্যাপ্ত খাদ্য না থাকার কারণে ক্ষুধাজনিত সংকটে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’

গত বুধবার জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, গাজার অন্তত এক-চতুর্থাংশ মানুষ প্রচণ্ড রকমের অনাহারে ভুগছেন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীও আছেন। জাতিসংঘ বলেছে, অপুষ্টিজনিত এ সংকট গাজায় ‘পুরো এক প্রজন্মের ওপর’ ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) উপনির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু স্যাবারটন গত বুধবার বলেন, গাজায় এখন নবজাতকদের ৭০ শতাংশই অপরিণত অবস্থায় বা কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে এ হার ছিল ২০ শতাংশ।

স্যাবারটন আরও বলেন, ‘অপুষ্টির প্রভাব শুধু মায়ের ওপর নয়, নবজাতকের ওপরও পড়ে। এ কারণে শিশুটি সারা জীবন দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যায় ভুগতে পারে এবং তার জন্য দীর্ঘসময় ধরে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হতে পারে।’

গত আগস্টে গাজা শহর ও এর আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়। ওই সময় ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) বলেছে, গাজা অঞ্চলের পাঁচ লাখের বেশি মানুষ ‘বিপর্যয়কর অবস্থার’ মুখোমুখি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে উপত্যকাটিতে মানবিক সহায়তা প্রবেশের পরিমাণ বাড়ানোর কথা ছিল। সে অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার টন সহায়তা প্রবেশ করানোর কথা জাতিসংঘের। তবে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি গত মঙ্গলবার বলেছে, প্রতিদিন গাজায় মাত্র প্রায় ৭৫০ মেট্রিক টন খাবার পৌঁছাচ্ছে। কারণ, গাজায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন মাত্র দুটি ক্রসিং চালু আছে। এগুলো হলো, দক্ষিণে কারেম আবু সালেম ও মধ্যাঞ্চলে আল-কারারা ক্রসিং।

ফিলিস্তিনি এনজিও পিএআরসির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক পরিচালক বাহা জাকুত বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পরও গাজা অঞ্চলের পরিস্থিতি বিপর্যয়কর অবস্থায় আছে।’

জাকুত উদাহরণ দিয়ে বলেন যে বাণিজ্যিক ট্রাকে বিস্কুট, চকলেট ও সোডা ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বীজ ও জলপাইয়ের মতো পণ্যগুলো এখনো সীমিত পরিমাণে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। যেসব পণ্য প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে সেসব শিশু, নারী ও সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকা জনসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পুষ্টিমান পূরণ করে না।

এ কর্মকর্তা আরও বলেন, কিছু ফলমূল ও সবজি গাজায় প্রবেশ করলেও সেগুলোর দাম অত্যন্ত বেশি। এক কেজি টমেটো আগে যেখানে ১ শেকেলে পাওয়া যেত, তা এখন প্রায় ১৫ শেকেলে বিক্রি হচ্ছে।

এরই মধ্যে অক্সফাম, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলসহ ৪১টি ত্রাণ সংস্থা গতকাল একটি খোলাচিঠি প্রকাশ করেছে। যেখানে তারা অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল অবৈধভাবে গাজায় ত্রাণসামগ্রী প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ইসরায়েল সরকার নিয়মিতভাবে তাদের (সংস্থাগুলোর) মানবিক কার্যক্রম শুরুর আবেদন প্রত্যাখ্যান করছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গাজায় ত্রাণ বিতরণে ১০ থেকে ২১ অক্টোবরের মধ্যে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর ৯৯টি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। নাকচ করা হয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর ছয়টি আবেদনও।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে আছে—তাঁবু ও ত্রিপল, কম্বল, গদি, খাদ্য ও পুষ্টিসামগ্রী, স্বাস্থ্য কিট, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশনের সামগ্রী, সহায়ক যন্ত্রপাতি এবং শিশুদের পোশাক। যুদ্ধবিরতির সময় এসব সামগ্রীর ওপর থেকে সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া দরকার বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-24%2Fnwtvv4er%2FWHO.webp?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ফিলিস্তিনি শিশুরা গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে একটি দাতব্য সংস্থার কাছ থেকে খাবার সংগ্রহ করতে জড়ো হয়েছে। ২১ অক্টোবর ২০২৫ ছবি: এএফপি

গাজায় গণহত্যা: ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানালেন বিশ্বখ্যাত ইহুদিরা

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের ‘বিবেকবর্জিত’ কর্মকাণ্ডকে গণহত্যার শামিল আখ্যায়িত করে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বের খ্যাতিমান ইহুদি ব্যক্তিরা। একটি খোলাচিঠিতে জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতাদের প্রতি তাঁরা এ আহ্বান জানিয়েছেন।

এই চিঠিতে সাবেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা, অস্কারজয়ী, লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ ৪৬০ জন সই করেছেন। তাঁরা গাজা, দখলকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

আজ বুধবার এমন সময় চিঠিটি প্রকাশ পেল, যখন পরদিনই ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারা বৈঠকে বসছেন। ইইউ নেতারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবগুলো স্থগিত রাখার পরিকল্পনা করছেন বলে জানা গেছে।

খোলাচিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা লিখেছেন, ‘আমরা ভুলে যাই না যে হলোকাস্টের প্রতিক্রিয়ায় সব মানুষের জীবনের রক্ষাকবচ ও সুরক্ষার জন্য অনেক আইন, সনদ এবং কনভেনশন প্রণীত হয়েছে। ইসরায়েল সেই সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাগুলো ক্রমাগত লঙ্ঘন করে চলেছে।’

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক পার্লামেন্ট (নেসেট) স্পিকার আব্রাহাম বুর্গ, সাবেক ইসরায়েলি শান্তি আলোচক দানিয়েল লেভি, ব্রিটিশ লেখক মাইকেল রোজেন, কানাডীয় লেখক নাওমি ক্লেইন, অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা জোনাথন গ্লেজার, মার্কিন অভিনেতা ওয়ালেস শন, এমিজয়ী ইলানা গ্লেজার ও হান্না এইনবাইন্ডার এবং পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী বেঞ্জামিন মোজার।

খোলাচিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা বিশ্বনেতাদের প্রতি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রায় মেনে চলার, ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকার, সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শান্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করারও অনুরোধ জানান এই ইহুদি ব্যক্তিত্বরা।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘যখন প্রমাণ জড়ো হতে শুরু করেছে যে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার আইনি সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায়, তখন অপরিমেয় শোকে আমাদের মাথা নত হয়ে আসে।’

এমন সময় ইহুদি ব্যক্তিত্বরা এ আহ্বান জানালেন, যখন গত কয়েক বছরে মার্কিন ইহুদি এবং ভোটারদের বৃহত্তর অংশের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে জনমতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ মার্কিন ইহুদি বিশ্বাস করেন, ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধাপরাধ করেছে আর ৩৯ শতাংশ মনে করেন, দেশটি গণহত্যা চালাচ্ছে।

আমেরিকান জনগণের বৃহত্তর অংশের মধ্যে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনকে ৪৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে। অন্যদিকে আগস্ট মাসে চালানো কুইনিপিয়াকের এক জরিপে দেখা যায়, মার্কিন ভোটারদের অর্ধেকই একই মত পোষণ করেন, যাঁদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আরও রয়েছেন আমেরিকান কৌতুক অভিনেতা এরিক আন্দ্রে, অস্কারজয়ী সাংবাদিক ও ডকুমেন্টারিয়ান ইয়ুবাল আব্রাহাম এবং ইসরায়েলি দার্শনিক ওমরি বোয়েম।

স্বাক্ষরকারীরা আরও লিখেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের প্রতি আমাদের সংহতি ইহুদি ধর্মের প্রতি কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং এটি তাঁর পূর্ণতা। যখন আমাদের পণ্ডিতেরা শিখিয়েছিলেন যে একটি জীবন ধ্বংস করা মানে গোটা বিশ্বকে ধ্বংস করা, তখন তাঁরা ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো ব্যতিক্রম রাখেননি। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত থামব না, যতক্ষণ না এই যুদ্ধবিরতি দখলদারি ও জাতিবিদ্বেষের সমাপ্তি ঘটাবে।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় কমপক্ষে ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি। জাতিসংঘের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, গাজার বাসিন্দাদের ৯০ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

গত সেপ্টেম্বরে তথ্য অনুসন্ধানমূলক এক মিশনে অঞ্চলটি পরিদর্শন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডেমোক্র্যাট সিনেটর—ক্রিস ভ্যান হলেন ও জেফ মের্কলি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ইসরায়েল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ‘ধ্বংস ও জাতিগতভাবে নির্মূল করার জন্য একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত।

এ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বেসামরিক অবকাঠামোর প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস, খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার এবং মানবিক সহায়তা বিতরণে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়ার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

মাদুরের ওপর শুয়ে আছে অপুষ্টিতে ভোগা দুই বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু ইয়াজান। গাজা নগরীর পশ্চিমে আল-শাতি শরণার্থীশিবিরে। ২৩ জুলাই, ২০২৫
মাদুরের ওপর শুয়ে আছে অপুষ্টিতে ভোগা দুই বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু ইয়াজান। গাজা নগরীর পশ্চিমে আল-শাতি শরণার্থীশিবিরে। ২৩ জুলাই, ২০২৫ ছবি: এএফপি

নেপালের গণ–অভ্যুত্থান ভারতের মাথাব্যথা বাড়াল by আনবারাসান এথিরাজন

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের ঝড় উঠেছে। এবার ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু নেপাল। সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়। এটি দ্রুতই ভয়াবহ রূপ নেয়। অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনে হামলা চালান এবং একাধিক রাজনীতিবিদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে।

অনেকের কাছে কাঠমান্ডুর এই দৃশ্য ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা কিংবা ২০২৪ সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের পুনরাবৃত্তিকে মনে করিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশেই গণবিক্ষোভ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পতন এবং রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থার এক ধরনের মিল পাওয়া যায়।

ভারতের বিশেষ দুশ্চিন্তা

নেপালের সংকট ভারতের জন্য শুধু প্রতিবেশীর অস্থিরতা নয়, বরং কৌশলগত দুশ্চিন্তার কারণ। নেপাল ভারতের একেবারে ঘনিষ্ঠ দেশ। ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের বন্ধনে দুই দেশ নিবিড়ভাবে যুক্ত।

নেপালের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত ১,৭৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই সীমান্ত পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। এসব সীমান্ত পুরোপুরি উন্মুক্ত। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভিসা বা পাসপোর্ট ছাড়াই এপার-ওপার যাতায়াত করেন। দুই দেশের মানুষ পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত। এমনকি গ্রামীণ স্তরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনও তাঁদের মধ্যে গভীর।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের ঘটনাবলি নিয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ লিখেছেন, ‘নেপালের সহিংসতা হৃদয়বিদারক। বহু তরুণ প্রাণ হারিয়েছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক। নেপালের স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ একই সঙ্গে তিনি নেপালের জনগণকে শান্তিপূর্ণ পথে এগোনোর আহ্বান জানান। পরে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের নিয়ে তিনি জরুরি নিরাপত্তা বৈঠকও করেন।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেমন শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের গণ-অভ্যুত্থানে দিল্লি অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়েছিল, নেপালের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল। বিশেষত, প্রধানমন্ত্রী পিকে শর্মা ওলির শিগগিরই দিল্লি সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন সব ভেস্তে গেল।

কৌশলগত হিসাব

ভারতের জন্য নেপালের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর দিকে চীনের ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড নেপালের সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি। দক্ষিণে নেপালের ভৌগোলিক পথ দিয়েই সরাসরি ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রবেশ সম্ভব। তাই নেপাল শুধু প্রতিবেশী নয়, বরং ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত হিসাবের কেন্দ্রবিন্দু।

তা ছাড়া ভারতের ভেতরে বিপুলসংখ্যক নেপালি প্রবাসী রয়েছেন। সরকারি হিসেবে এই সংখ্যা ৩৫ লাখ। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তাঁরা শ্রমবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষ চুক্তির আওতায় নেপালের প্রায় ৩২ হাজার গোর্খা সেনা বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করছেন।

নেপাল হিন্দু তীর্থস্থান হিসেবেও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিনাথ মন্দিরসহ বহু পবিত্র স্থানে প্রতিবছর হাজার হাজার ভারতীয় তীর্থযাত্রী ভ্রমণ করেন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও নেপাল ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের সঙ্গে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার বেশির ভাগই নেপালের আমদানি—বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি।

কূটনৈতিক জটিলতা

যদিও কাঠমান্ডুতে বুধবার থেকে কিছুটা শান্তি ফিরেছে, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে রয়েছে জনগণের গভীর ক্ষোভ। নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল—ওলির নেতৃত্বাধীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল), শের বাহাদুর দেউবার নেপালি কংগ্রেস, এবং পুষ্প কমল দাহালের (প্রচণ্ড) নেতৃত্বাধীন মাওবাদী কেন্দ্র—সব কটির প্রতিই জনগণের আস্থা কমে গেছে। অথচ ভারতের সঙ্গে এই তিন দলেরই দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিক্ষোভকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন নেতৃত্ব কে হবেন? যতক্ষণ না তা পরিষ্কার হচ্ছে, ততক্ষণ দিল্লি কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সতর্ক থাকবে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঙ্গীতা থাপলিয়াল বলেছেন, ‘ভারত চাইবে না নেপালে বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি হোক। তাই তারা সংযত ও সতর্ক পদক্ষেপ নেবে।’

এখানে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও উঠে আসে। দিল্লির সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। কিন্তু হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটা শীতল। কারণ দিল্লি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে।

ভারত-নেপালের সম্পর্কেও আগের টানাপোড়েন এখনো মীমাংসিত হয়নি। ২০১৯ সালে ভারত যে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছিল, সেখানে নেপালের দাবি করা কিছু ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নেপাল পাল্টা নিজস্ব মানচিত্র প্রকাশ করে। সম্প্রতি ভারত ও চীন নেপালের দাবি করা লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহার করে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়। ওলি গত মাসে চীন সফরে গিয়ে এই বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।

ভারতের করণীয়

এমন জটিল প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য করণীয় হলো একদিকে নেপালের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করা, অন্যদিকে তরুণ জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করা। কারণ বিক্ষোভের মূল চালিকা শক্তি হলো তরুণেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত নেপালি শিক্ষার্থীদের জন্য ফেলোশিপ বাড়াতে পারে, কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারে, যাতে তরুণ প্রজন্ম ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক অনুভব করে।

কিন্তু ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) কার্যত অচল হয়ে আছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। বাংলাদেশে নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনের। মিয়ানমার ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে আছে। আর এখন নেপালের অস্থিরতা দিল্লির কূটনৈতিক বোঝা আরও বাড়াল।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অশোক মেহতা এই প্রেক্ষাপটে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ভারত তার মহাশক্তি হওয়ার স্বপ্নে এতটাই মগ্ন যে কাছের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে নজর দিতে ভুলে গেছে। অথচ মহাশক্তি হওয়ার প্রথম শর্ত হলো একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল প্রতিবেশ।’

নেপালের সাম্প্রতিক অস্থিরতা তাই শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি, আর ভারতের জন্য বিশেষ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। দিল্লিকে এখন একদিকে প্রতিবেশী নেপালের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ প্রশমিত করতে হবে। নইলে নেপালের মতো ছোট দেশেও ভারতের প্রভাব ক্ষয়ে যেতে পারে। আর সেটি হলে তা দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যে চীনকে এগিয়ে দেবে।

* আনবারাসান এথিরাজন, বিবিসির সাউথ এশিয়া রিজিওনাল এডিটর
- বিবিসি নিউজ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

নেপাল সরকারের প্রধান প্রশাসনিক ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা
নেপাল সরকারের প্রধান প্রশাসনিক ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এএফপি

রোগ ও দুর্ভিক্ষের মারাত্মক আঘাতে প্রজন্মগত সংকটে গাজা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেইসাস গাজার পরিস্থিতিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রজন্মগত সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, গাজায় ফিলিস্তিনিদের খাদ্য সংকট, ব্যাপক অভিঘাত, স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন এবং খাবার পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ধ্বংসের ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত দীর্ঘ হবে।

সম্প্রতি বিবিসি রেডিও ৪-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ড. টেড্রোস। সেখানে তিনি বলেছেন, এই সংকটকে কোনো শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটি একটি ভয়াবহ সংমিশ্রণ। যা গাজায় পুরোপুরি বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। তিনি আরও বলেন, যেহেতু গাজার জনগণের খাদ্যাভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা গুরুতর তাই এটি বহু প্রজন্মের ওপর ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে।

১০ অক্টোবর থেকে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ইসরাইল গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। ড. টেড্রোসের মতে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে ব্যাপক সহায়তার প্রয়োজন। বলেছেন, প্রত্যাশার তুলনায় সহায়তা প্রবেশের পরিমাণ খুবই সামান্য। প্রতিদিন ৬০০টি সহায়তাকারী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করা উচিত। কিন্তু বর্তমানে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি ট্রাক প্রবেশ করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সেখানে জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য দরকারি সরঞ্জামাদি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও হাসপাতাল নির্মাণ উপকরণ প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে, যেগুলোর ব্যবহার নির্ধারণে ইসরাইল সমস্যা তৈরি করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে হামাসের হামালার পর গাজার এক লক্ষের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং ৬৮ হাজারেরও বেশি নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বারবার আবেদন জানিয়েছে, যাতে গাজার জনগণের জন্য আরও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।

ড. টেড্রোস বলেন, যতটুকু সহায়তা পৌঁছেছে, তা দিয়ে গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থা পুনর্গঠন সম্ভব নয়। সহায়তার প্রবাহ বাড়ানোর জন্য ইসরাইল কর্তৃপক্ষকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গাজার জন্য ৭০ বিলিয়ন ডলার পুনর্গঠন তহবিলের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশের মতো খরচ হবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুনর্গঠনে।  এই সংকটের মধ্যে ড. টেড্রোস শান্তির গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, শান্তি হলো সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং যেকোনো মুহূর্তে আবারও সহিংসতা শুরু হতে পারে। গাজার জনগণের জন্য শান্তি ও সহায়তার দিকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

mzamin

কিংমেকার ‘পি কে’ চাইছেন বিহারের রাজা হতে by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

আগামী দিনে ভারতীয় রাজনীতি কোন খাতে বইবে, নভেম্বরের বিহার বিধানসভার নির্বাচন সেই হদিস দেবে। ভোটের ফল বোঝাবে, ৩৫ বছরের বিহারি ভোট-রাজনীতি দ্বিমুখী চরিত্র ছেড়ে প্রকৃত অর্থে ত্রিমুখী হবে কি না। ২০ বছর ধরে ৯ বারের সমাজতন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেবেন কি না, সম্ভবত তা–ও বোঝা যাবে। বয়সের ভার ও অসুস্থতার কারণে নীতীশ ন্যুব্জ। বিজেপির কেউ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বিহার শাসন করতে পারবেন কি না, সেটাও নির্ধারিত হবে এই ভোটে এবং অবশ্যই বোঝা যাবে, বিহার জিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোট সর্বভারতীয় স্তরে মোদির বিজেপিকে কোণঠাসা করতে পারবে কি না।

উঁকিঝুঁকি মারা এতগুলো সম্ভাবনার অভিমুখ একাধিক হলেও এবার যাঁর উপস্থিতি সবার মনে নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তাঁর নাম প্রশান্ত কিশোর পান্ডে ওরফে ‘পি কে’। ১০ বছর ধরে নামটি পরিচিতি পেয়েছে ভোট পরিচালনার দক্ষতার কারণে। ৪৮ বছরের এই বিহারি ব্রাহ্মণ, রাজনীতিসচেতন ভারতীয়রা যাঁকে ‘মাস্টার স্ট্র্যাটেজিক’ বা ভোটকুশলী হিসেবে জানে, পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এই প্রথম তিনি ভোটযুদ্ধে নেমেছেন অন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরির বাসনায়।

ভোটের বাকি মাত্র তিন সপ্তাহ। ৬ ও ১১ নভেম্বর দুই দফার ভোট। ফল ঘোষণা ১৪ তারিখ। অথচ এখনো সবচেয়ে বড় হেঁয়ালি হয়ে শীতের কুয়াশার মতো ঝুলে রয়েছেন পি কে। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন। যাবতীয় রাজনৈতিক রহস্যও তাঁকে ঘিরেই।

কোনো ভোটে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে নিয়ে এমন আগ্রহ বিরল। পি কে সেই আগ্রহ সঞ্চার করেছেন তাঁর কৃতিত্বের কারণে। ভোটকুশলী হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর আবির্ভাব নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোট তাঁর হাতেখড়ি। এর পর থেকে পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিক হিসেবে তাঁর গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। মোদির দিল্লি জয়ের পর তিনি দায়িত্ব নেন পাঞ্জাবে কংগ্রেসের অমরিন্দর সিংয়ের নির্বাচনী প্রচারের। ২০১৫ সালে মুখ্যমন্ত্রী হন অমরিন্দর। ২০১৯ সালে অন্ধ্র প্রদেশে জগনমোহন রেড্ডি, ২০২০ সালে দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিনকে জেতাতে তাঁর কৌশল স্বীকৃত। ব্যর্থ হয়েছেন একবারই। ২০১৭ সালে। উত্তর প্রদেশ বিধানসভার ভোটে কংগ্রেসকে তিনি তরাতে পারেননি। সেই পি কে অন্তরাল থেকে বেরিয়ে কিংমেকারের ভূমিকা ছেড়ে নিজেই রাজা হতে চাইছেন। বিহারের ভাগ্যবিধাতা হতে তিন বছর আগে গড়েছেন ‘জন সুরাজ পার্টি’। তিন বছর ধরে রাজ্য চষেছেন। ২৪৩ আসনেই প্রার্থী দেবেন। যদিও জানিয়েছেন, নিজে প্রার্থী হবেন না; দলীয় প্রার্থীদের প্রচারের স্বার্থে।

এমন ঝুঁকি অনেকেই নেন। তাহলে পি কে-কে ঘিরে এত আগ্রহের কারণ কী? কারণটা তাঁর রাজনৈতিক প্রচার। তিন বছর ধরে নিরলস জনসম্পর্কের সময় একটা কথাই তিনি বলছেন—বিহারকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজনীতিকে জাতপাতের বেড়া ভেঙে এগোতে হবে। বিহারবাসীকে জাতের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে বুঝতে হবে, কারা কীভাবে তাদের ব্যবহার করছে। শোষণ করছে। জাতভিত্তিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা ভেঙে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম না দিলে বিহারিদের কষ্ট ঘুচবে না। তারা অন্যের হাতের পুতুল হয়েই নাচবে।

তিন বছর ধরে এসব বলে চলা পি কে এত বছরের ভোট পরিচালনার অভিজ্ঞতার আলোয় যা করতে চলেছেন, তাতে সফল হবেন কি না অজানা। তবে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, তাঁর প্রচারে উপচে পড়া জনতার ৮০ শতাংশ তরুণ। জাতপাতের আগল ভেঙে নতুন বিহার তারা গড়তে চায় কি না পরের কথা, পি কে যদিও তাদের চোখে স্বপ্ন দেখছেন।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা নেতা হিসেবে পি কেই হয়ে উঠেছেন মিডিয়ার সেরা আকর্ষণ। তাঁর মতো এত সাক্ষাৎকার আর কেউ দিচ্ছেন না।

তৃতীয়ত, তিনি নিজেকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে জাহির করেছেন। বলছেন, কাউকে হারিয়ে কাউকে জেতানো তাঁর লক্ষ্য নয়। তিনি চান বিহারকে জেতাতে। তাই ভোটের পর কোনো জোটের দিকে তিনি ঢলবেন না।

চতুর্থত, শুধু এসব বলা নয়, সদিচ্ছার প্রমাণও রাখছেন। মোদির বিজেপিকে যেমন রেয়াত করছেন না, তেমনই তুলাধোনা করছেন নীতীশ-লালু-তেজস্বী-রাহুলদের রাজনীতি। সমালোচনার ধার এতটাই যে সাধারণ মানুষ যেমন তা শুনতে পছন্দ করছে, তেমনই তা আকর্ষণ করছে মিডিয়াকেও। ফলে ভোটের প্রাক্কালে পি কে হয়ে উঠেছেন মূল আকর্ষণ।

রাজনৈতিক আক্রমণের নমুনা দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। মোদি সম্পর্কে বলছেন, উনি চান না বিহারে শিল্প হোক। কারণ, তা হলে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু সস্তার শ্রমিক পাবে না। প্রধানমন্ত্রী গুজরাটে গিয়ে বুলেট ট্রেন চালানোর কথা বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরির কথা বলেন, অথচ বিহারে বলেন সস্তায় আরও বেশি খাদ্য দেবেন। আরও বন্দে ভারত ট্রেন চালাবেন। আরও ট্রেন মানে আরও বেশি সস্তার বিহারি শ্রমিকের ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া। একের পর এক জনসভা ও সাক্ষাৎকারে মোদিকে আক্রমণ করে পি কে বলছেন, ১১ বছরে বিহারকে তিনি কিচ্ছুটি দেননি।

পি কে একটা সময় জেডিইউ নেতা নীতীশ কুমারের ঘর করেছিলেন। সহসভাপতি হয়েছিলেন। বেরিয়ে এসেছেন সাড়ে তিন বছর আগে। নীতীশ প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, তাঁর রাজনীতি শেষ। আর মুখ্যমন্ত্রী হবেন না। এবার ২০টি আসনও জেডিইউ জিততে পারবে না। বলছেন, পরিতাপ এটাই, সৎ হয়েও যে সরকার নীতীশ চালাচ্ছেন, বিহারের ইতিহাসে তত দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার কখনো আসেনি। কংগ্রেস সম্পর্কে বলছেন, বিহারে দলটার নিজস্ব বলতে কিছুই নেই। তারা লালু প্রসাদের উচ্ছিষ্টভোগী। লালুপুত্র তেজস্বী সম্পর্কে বলছেন, বাবার জঙ্গলরাজেই তিনি আবদ্ধ। পি কের দৃষ্টিতে তেজস্বী ও রাহুল দুজনেই টবে পরিচর্যা করা বাহারি গাছ।

ভোটের আবহে এসব কথা শুনতে ভালো লাগলেও পি কের ক্ষমতা ঘিরে দুটি প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে। প্রথমত, জনসমর্থনকে ভোটে পরিণত করার মতো সাংগঠনিক শক্তি তিনি আয়ত্ত করতে পেরেছেন কি না। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর দানখয়রাত নীতির মোকাবিলা কীভাবে করবেন। শাসক এনডিএ রাজ্যের ১ কোটি ২১ লাখ নারীকে স্বনির্ভর হতে এককালীন ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দিচ্ছে। শিক্ষিত বেকার যুবাদের দিচ্ছে মাসিক ২ হাজার টাকা করে ভাতা। তেজস্বী প্রতি পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেবেন বলেছেন। পি কের প্রতিশ্রুতি সেখানে স্রেফ ‘পলায়ন’ রোধ।

 বিহারের জনসংখ্যার ৭ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিক। ভিনরাজ্যে কাজের সন্ধানে যাওয়া তাঁর কাছে ‘পলায়ন’। শুধু এতে চিড়ে ভিজবে? এই পুঁজি নিয়ে রাজ্য দখলের স্বপ্ন দেখা কি আকাশকুসুম কল্পনা নয়? জবাবে পি কে বলেছেন, ‘হয় দেড় শ আসন পাব, নয়তো দশেরও কম। ফল যা–ই হোক, থেমে যাব না।’

কিছু পরিসংখ্যান জরুরি। গতবার এনডিএ ও ইন্ডিয়ার প্রাপ্ত ভোটের পার্থক্য ছিল মাত্র ১২ হাজার। ২০ কেন্দ্রে জয়–পরাজয়ের ব্যবধান ছিল ১ হাজারের কম ভোটে। ৩২ কেন্দ্রে ব্যবধান ৫ হাজার। কেন্দ্রপিছু ২ থেকে ১০ হাজার ভোট টানলে কার কপাল পুড়িয়ে কার হাসি চওড়া করবেন পি কে? তাঁর জবাব, প্রতিষ্ঠিতদের সর্বনাশ না হলে বিহারে পৌষ মাস আসবে না।

১৯৮৩ সালে অন্ধ্র প্রদেশের এন টি রাম রাও, ১৯৮৫ সালে আসামের প্রফুল্ল মহন্ত, ২০১৩ সালে দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো ভোট-ভাগ্য নিয়ে পি কে কি হবেন বিহারের নতুন রংধনু? নাকি ‘ভোট–কাটুয়া’ সেজে এনডিএ বা ইন্ডিয়ার কাউকে ভাসাবেন, কাউকে ডোবাবেন?

* সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

প্রশান্ত কিশোর পান্ডে
প্রশান্ত কিশোর পান্ডে। ছবি: এএনআই

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি সমর্থন করেন বেশিরভাগ আমেরিকান

রয়টার্স/ইপসস জরিপঃ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতিকে সমর্থন করছে বেশির ভাগ আমেরিকান। সম্প্রতি রয়টার্স/ইপসস এর এক জরিপে উঠে এসেছে এ তথ্য। জরিপ বলছে, ৮০ শতাংশ আমেরিকান ডেমোক্রেটিক এবং ৪১ শতাংশ রিপাবলিকান এই স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের ৫৯ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির পক্ষে মত দিয়েছেন, যেখানে ৩৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন এবং বাকি অংশ এ বিষয়ে অনিশ্চিত বা উত্তর দেননি। রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকÑ অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির বিরুদ্ধে মত দিয়েছেন তবে ৪১ শতাংশ এর পক্ষে।

সম্প্রতি বৃটেন, কানাডা, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যা ইসরাইলের কড়া প্রতিক্রিয়া ডেকে এনেছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর লাখো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন এবং শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত।

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের আকস্মিক হামলার পর ইসরাইল গাজায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালায়, ফলে গাজার অধিকাংশ এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশ মনে করেন, গাজায় ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া অতিরিক্ত ছিল। অন্যদিকে ৩২ শতাংশ এ মতের বিরোধিতা করেন। বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সাধারণত ইসরাইলের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। তবে তিনি চলতি মাসে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছেন, যা শান্তির সম্ভাবনা জাগিয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, যদি শান্তি পরিকল্পনা সফল হয়, তবে অনেক মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পকে কৃতিত্ব দিতে রাজি। অংশগ্রহণকারীদের ৫১ শতাংশ বলেছেন, সফল হলে ট্রাম্প ‘উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের’ দাবিদার হবেন। ৪২ শতাংশ এতে একমত নন। যদিও মাত্র প্রতি ২০ জন ডেমোক্রেটের মধ্যে একজন ট্রাম্পের সামগ্রিক কার্যকালকে সমর্থন করেন। আর প্রতি ৪ জনের মধ্যে একজন মনে করেন যে তিনি শান্তি আনতে সক্ষম হলে কৃতিত্ব প্রাপ্য।

তবে পরিস্থিতি এখনো জটিল। সপ্তাহান্তে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে কূটনৈতিকভাবে ইসরাইল ও হামাসের ওপর চাপ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতির প্রতি জনসমর্থন কিছুটা বেড়েছে। সর্বশেষ জরিপে তার সমর্থন ৩৮ শতাংশ, যেখানে কয়েক সপ্তাহ আগেও তা ছিল ৩৩ শতাংশ। এটি জুলাই মাসের পর তার সর্বোচ্চ বৈদেশিক নীতির জনপ্রিয়তা।

mzamin

পশ্চিম তীর সংযুক্ত করলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সমর্থন হারাবে ইসরাইল: ট্রাম্প

ইসরাইল যদি পশ্চিম তীর সংযুক্ত করার পথে এগোয়, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সমর্থন হারাবে বলে কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। টাইম সাময়িকীর সঙ্গে ১৫ অক্টোবরের এক সাক্ষাৎকারে এমন হুঁশিয়ারি দেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে।

আলোচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাস করা হয়, ইসরাইলের জোট সরকারে যারা পশ্চিম তীরের পুরোটা বা অংশবিশেষ সংযুক্ত করার দাবি তুলছেন, তাদের বিষয়ে তার অবস্থান কী। জবাবে ট্রাম্প বলেন, এটা হবে না, এটা হবে না। আমি আরব দেশগুলোর কাছে কথা দিয়েছি- এখন এটা করা সম্ভব নয়। আমরা আরব বিশ্বের দারুণ সমর্থন পেয়েছি। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তাই এটা ঘটবে না। যদি ইসরাইল এমন কিছু করে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সবরকম সমর্থন হারাবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইসরাইলি সংসদে কট্টর-ডানপন্থী কয়েকজন সংসদ সদস্য পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের একটি প্রস্তাবের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছেন। ওয়াশিংটন ও আরব দেশগুলো এই পদক্ষেপকে শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য বড় বাধা হিসেবে দেখছে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল

পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণ নিয়ে ইসরাইলকে সতর্ক করলেন মার্কো রুবিও

পার্লামেন্টে পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণ বিল পাস করায় ইসরাইলকে সতর্ক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এতে গাজা শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। রুবিও বলেছেন, ইসরাইলি সংসদে পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের প্রস্তাব আনা এই মুহূর্তে সমর্থনযোগ্য নয়। সংযুক্তিকরণের প্রচেষ্টা শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি তৈরি করবে। ইসরাইল সফরে যাওয়ার আগে বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এতে বলা হয়, সম্প্রতি ইসরাইলি পার্লামেন্টে কট্টর-ডানপন্থী কয়েকজন সংসদ সদস্য প্রতীকীভাবে একটি বিলের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছেন, যা ইসরাইলের সঙ্গে পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের পথ খুলে দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বিব্রত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইলের দখলে থাকা পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনিরা তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত- আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত গত বছর রায়ে ইসরাইলের দখল অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
নেতানিয়াহু আগে পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের পক্ষে কথা বললেও, যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তিনি তা বাস্তবায়নের পথে এগোননি। তবে তার জোট সরকারের অতিরাষ্ট্রবাদী দলগুলো বারবার প্রকাশ্যে সংযুক্তিকরণের দাবি জানিয়ে আসছে।

২৫-২৪ ভোটে বিলটির প্রাথমিক অনুমোদন হয়েছে। তবে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। প্রধানমন্ত্রী চাইলে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত বা ঠেকাতে পারেন।

ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেসেটের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি ভূমির ওপর কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। ইসরাইল এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি বসতি স্থাপন করেছে, যেখানে প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসবাস করছে। একই অঞ্চলে প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ বলে ঘোষিত।

রুবিও বলেন, পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণ শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য বিপরীত ফল বয়ে আনবে এবং বর্তমান যুদ্ধবিরতির অগ্রগতি ঝুঁকিতে ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স এবং দুই বিশেষ দূতের সফরের পরপরই ইসরাইল সফরে যাচ্ছেন রুবিও। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন গাজার শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু করার চেষ্টা করছে।

প্রথম ধাপে যুদ্ধবিরতি, ইসরাইলি বাহিনীর আংশিক প্রত্যাহার ও মানবিক সহায়তা প্রবাহ এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। যদিও দুই পক্ষই একে অপরকে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ করেছে। তবে যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে। রুবিও বলেন, প্রতিদিনই এর প্রতি হুমকি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু আমরা নির্ধারিত সময়সূচির চেয়ে এগিয়ে আছি। সপ্তাহান্তে চুক্তি টিকে থাকায় আমি আশাবাদী।

দ্বিতীয় ধাপে গাজায় একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলায় দক্ষিণ ইসরাইলে প্রায় ১২০০ জন নিহত ও ২৫১ জন জিম্মি হন। এরপর গাজার নারী, শিশু তথা উপত্যকাটির সমগ্র বেসামরিক মানুষের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় ইসরাইল। এতে এখন পর্যন্ত ৬৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যার তথ্য জাতিসংঘ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/186144_Kaium-1.webp
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও

গুলি করে হত্যা ও গণভবনে কবর: শেখ হাসিনার মনস্তত্ত্ব by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

২০২৪ সালের ৪ থেকে ৫ আগস্টের সকাল পর্যন্ত ঢাকার গণভবনে ঘটে এক নাটকীয় ও ইতিহাস নির্ধারণী ঘটনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম উন্মোচন করেছেন—সরকার ও সামরিক শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যে সেই উত্তেজনাপূর্ণ রাত ও সকালের ঘটনাগুলো।

৫ আগস্ট সকালে, শীর্ষ সামরিক নেতৃবৃন্দ যখন শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে পদত্যাগের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন—‘আমাকে গুলি করে মেরে ফেলো এবং গণভবনে কবর দিয়ে দাও।’ এই সংক্ষিপ্ত উক্তি শুধু সংকটকালের আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া নয়; এটি এক শাসকের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবয়বের নগ্ন স্বীকারোক্তি। এখানে রাষ্ট্রক্ষমতা শুধুমাত্র শাসনের হাতিয়ার নয়—এটি অস্তিত্বের একমাত্র স্বীকৃত রূপে পরিণত হয়েছে। মৃত্যু কাম্য, কিন্তু ক্ষমতা কখনও পরিত্যাজ্য নয়।

শেখ হাসিনার এই উক্তি আমাদের সামনে এনে দেয় এক গভীর রাজনৈতিক চেতনার ছবি, যেখানে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সীমানা বিলীন, গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট এবং ফ্যাসিবাদী মনস্তত্ত্বের ছায়া কাজ করে। দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের Being-towards-death তত্ত্বে বলেছেন, মৃত্যু সম্পর্কে সচেতনতা মানুষকে তার অস্তিত্বের প্রকৃত উপলব্ধি দেয়। কিন্তু শেখ হাসিনার উক্তিতে মৃত্যু ও ক্ষমতা একত্রিত হয়। ক্ষমতা হারানো মানে মৃত্যু এবং মৃত্যুর স্থানও হতে হবে ক্ষমতার প্রতীক—গণভবন।

‘গণভবনে কবর’—এই বাক্যাংশের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, ক্ষমতার প্রতীক ও ভূখণ্ডে নিজের চিরস্থায়ী উপস্থিতি রেখে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। এটি কোনো ব্যক্তিগত বাসনা নয়, বরং এক রাজনৈতিক দর্শনের প্রকাশ, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতীক আর ব্যক্তির মরদেহ একাকার। এই উক্তি আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এক নির্মম রাজনৈতিক স্বীকারোক্তি। তিনি মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু ক্ষমতা ছাড়তে পারেন না। ক্ষমতার প্রতি এই অন্ধ আসক্তি—আত্মবিনাশী হলেও স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার অক্ষমতা—এক বিকৃত রাজনৈতিক মানসিকতার নিদর্শন। এই কারণেই এটি শুধু সংকটকালীন প্রতিক্রিয়া নয়, বরং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।

শেখ হাসিনার বক্তব্য স্পষ্ট—নাগরিকের জীবন নয়, ক্ষমতাই তার অগ্রাধিকার। জুলাই জুড়ে ২১ দিনে ‘কয়েক হাজার’ মানুষের মৃত্যু, ২৬ হাজার আহত, রক্তাক্ত রাজপথ, মায়ের আহাজারি—এসব কিছুই তার বিবেচনায় ছিল না। ছিলো কেবল ক্ষমতা রক্ষা। এটি ভয়ঙ্কর এক ফ্যাসিবাদী মনোভাব, যেখানে ক্ষমতা রক্ষাই মুখ্য, জনগণ নয়। গণতন্ত্রে ক্ষমতা আসে ও যায়, কিন্তু এখানে তা স্থায়ী দখলদারিত্বে রূপ নিয়েছে।

যদি তিনি সত্যিকারের গণমানুষের প্রতিনিধি হতেন, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও নৈতিক হতেন, তাহলে বলতেন—‘আমি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবো, যেন জনগণের রক্ত আর না ঝরে।’ কিন্তু তিনি তা বলেননি। অর্থাৎ তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে হত্যা থামানোর ন্যূনতম নৈতিক দায় স্বীকার করেননি। এর মধ্যে রয়েছে দায়িত্বহীনতা ও নিষ্ঠুরতা, যা গণতান্ত্রিক নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই অবস্থান নৈতিকভাবে অপরাধপ্রবণ এবং অমানবিক।

মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে প্রমাণ হয়—শেখ হাসিনা আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ক্ষমতার একাত্মতা পোষণ করতেন। ক্ষমতা ছাড়া বাঁচার চিন্তাই তার ছিলো না। ক্ষমতা হারানো তার কাছে আত্মহননের সমতুল্য। এটি Thanatos of Power—এক ধরনের মৃত্যুবিনাশী ক্ষমতাবোধ, যেখানে জীবনের চেয়ে ক্ষমতাই বড়। তার সিদ্ধান্তগুলো আধিপত্যের ভিত্তিতে নেয়া, অধিকারের নয়।

মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড Thanatos বা মৃত্যুবৃত্তির কথা বলেছেন, মানুষের মধ্যে আত্মবিনাশী তাড়না কাজ করে, রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়, এ ক্ষেত্রে শাসক ক্ষমতা হারানোর চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেন।

হিটলার ১৯৪৫ সালে বার্লিন বাঙ্কারে আত্মহত্যা করেছিলেন, পরাজয় স্বীকারের বদলে। তার আত্মহত্যা ছিলো এক চূড়ান্ত শাসকসুলভ কর্ম, যেখানে নিজের মৃত্যু দিয়ে ইতিহাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই ছিলো মূল লক্ষ্য। জীবন নয়, ক্ষমতাই ছিলো তার আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র। এমনকি মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিলো, যাতে দেহ পাওয়া না যায়। এতে শারীরিক অনুপস্থিতি অদৃশ্য হলেও চিরন্তন প্রতীকী উপস্থিতি রক্ষা পায়। এই মৃত্যু প্রতিরোধ নয়, বরং ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রদর্শন। শেখ হাসিনার ‘গণভবনে কবর’ কথাটি হিটলারীয় অনুষঙ্গের সঙ্গে তুলনীয়। দু’জনেই চেয়েছেন মৃত্যুর মধ্যেও রাষ্ট্র ও ভবনের সঙ্গে একীভূত থাকতে।

‘আমাকে হত্যা মানেই রাষ্ট্রকে হত্যা’—এই ভাবনাটি নিছক আত্মরক্ষার ভাষা নয়, এটি রাষ্ট্র, ভবন ও নিজস্বতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংমিশ্রণ। শেখ হাসিনার এই মনোভাব যেন—রাষ্ট্র নয়, আমিই রাষ্ট্র; জনগণ নয়, আমার ইচ্ছাই সার্বভৌম। তিনি ক্ষমতাকে ব্যক্তিসত্তার অংশে পরিণত করেছেন, যেখানে ‘আমি’ আর ‘ক্ষমতা’ এক। গণভবন সেই একাত্মতার প্রতীক।

ইতালীয় দার্শনিক ও ভাষাতত্ত্বজ্ঞ উমবের্তো একো Ur-Fascism প্রবন্ধে বলেছেন, ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো নেতা ও জাতির অবিচ্ছেদ্য একত্ব। ‘গণভবনে কবর’—ধারণাটির মধ্যেও সেই একত্ববাদ প্রবল। ফ্যাসিবাদী শাসক মনে করে—আমি জাতি, আমিই রাষ্ট্র। আমার মৃত্যু মানেই রাষ্ট্রের মৃত্যু। শেখ হাসিনা এই মনস্তত্ত্বেই লালিত, তাই সে বলতে পেরেছে—আমাকে কবর দাও গণভবনে, আমি সেখানেই চিরস্থায়ী হবো। এটি আত্মঘাতী ও প্রতীকী ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত নিদর্শন। মিশরের ফারাও রাজাদের থেকে শুরু করে উত্তর কোরিয়ার কিম পরিবার পর্যন্ত—ভয়ঙ্কর এই ফ্যাসিবাদী মানসিকতায় আক্রান্ত। এরা মৃত্যুকে প্রতীকী মহিমায় রূপ দিয়ে থাকেন।

শেখ হাসিনার বক্তব্যেও সেই ফ্যাসিসিজমের ছায়া—‘আমার দেহ গণভবনে থাকুক, কারণ আমিই ভবন, আমিই রাষ্ট্র।’ এটি এক ধরনের Symbolic immortality—যেখানে মৃত্যু-পরবর্তী অস্তিত্বও প্রতীকী ক্ষমতার মাধ্যমে টিকে থাকে। এই মনোভাব জনসাধারণের জন্য এক ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করে—তিনি গুলি খেতে রাজি, কিন্তু জনগণকে রক্ষা করতে চান না। তিনি মরতে পারেন, কিন্তু ক্ষমতা ছাড়তে পারেন না। এমন শাসক গণতন্ত্রের প্রতিনিধি হতে পারে না। বরং তিনি যেনো হয়ে উঠেছেন রাষ্ট্রযন্ত্রের এক চিরস্থায়ী প্রতীক, যিনি নিজের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন—যা ধ্বংসাত্মক, ফ্যাসিবাদী ও আত্মবিনাশী।

গণহত্যার রক্তাক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা পদত্যাগের চিন্তাও করেননি। ক্ষমতার তৃষ্ণা এত গভীর ছিলো যে, গণহত্যার দায়ভার নিয়ে কোনো বিচার বা পরিণতির মুখোমুখি হতে চাননি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে পালিয়ে গেছেন—এক কাপুরুষোচিত নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে। শেখ হাসিনার এই আত্মরক্ষামূলক পলায়ন—ইতিহাসে এক স্বৈরাচারী শাসকের নৈতিক ও রাজনৈতিক পতনের চূড়ান্ত অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে।

‘আমাকে গুলি করে মেরে ফেলো, গণভবনে কবর দিয়ে দাও’—এই বাক্যটি কেবল সংকটের মুহূর্তে উচ্চারিত আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া নয়; এটি ক্ষমতার প্রতি ব্যক্তির অবচেতনে নির্মিত এক গভীর দর্শন, যেখানে রাষ্ট্র, নিজস্বতা ও মৃত্যু পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। মৃত্যুর পরেও প্রতীকী ক্ষমতার আসনে থাকার বাসনা এক বিপজ্জনক মনস্তত্ত্বের নিদর্শন। এটি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে নৈতিক সীমা ভেঙে ফেলার এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টা—যেখানে নেতৃত্ব নয়, কর্তৃত্ব; দায় নয়, নিয়ন্ত্রণ; জনগণ নয়, নিজের অস্তিত্বই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু।

ক্ষমতা ছিলো তার আয়না—সেখানে নিজের প্রতিচ্ছবি ছাড়া কিছুই কল্পনাযোগ্য ছিলো না। নিজেকে ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবা ছিলো, তার কাছে আত্মবিলুপ্তির প্রতীক। ফলে মৃত্যুর পর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় পিতার সমাধির পাশে কবরস্থ হওয়ার ইচ্ছে না করে, গণভবনকেই বেছে নিয়েছেন। এটি যেন শেষ মুহূর্তেও রাষ্ট্রকে দখলে রাখার অবচেতন আকাঙ্ক্ষা।

শেখ হাসিনার ‘গণভবনে কবর’ চিন্তা রাষ্ট্রকে মৃত্যুর প্রতীকে পরিণত করে। অথচ রাষ্ট্র মানুষের জন্য, জীবনের জন্য—একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যেখানে স্বাধীনতা ও মর্যাদা বিকশিত হয়। তাই জীবনের পক্ষে দাঁড়ানো আজ শুধু আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, এটি নৈতিক শপথ ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব, যা থেকে সরে দাঁড়ানো মানে ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে সমর্পণ করা।

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com

mzamin