Thursday, December 25, 2014

বাংলাদেশে যাও নয় হিন্দু হও

ভারতে বসবাসরত বাংলাদেশীদের অবশ্যই ধর্মান্তরিত হয়ে যেতে হবে। না হয় তাদের ভারত ছাড়তে হবে। এমন হুশিয়ারি দিয়েছে ভারতের উগ্রপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন বজরং দল। এ দলের মিরাট শাখার আহ্বায়ক বলরাজ দুঙ্গার এমন হুমকি দিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া।
ধর্মান্তর করানোর ব্যাপারে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দ্বিমত থাকলেও অবৈধ বাংলাদেশীদের ভারত ছাড়ার ব্যাপারে তারা একাট্টা।
বলরাজ দুঙ্গার বলেছেন, ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের অবশ্যই ভারত ছাড়তে হবে। যদি তারা এ দেশ থেকে ফিরে না যায়, তবে তাদের হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করা হবে। তবে আমাদের প্রথম দাবি তারা দেশ ত্যাগ করুক। তারা আমাদের সম্পদের অপব্যবহার করছে। এরপরও তার যদি ভারতে থাকতে চায়, তবে তাদের হিন্দু বানানো হবে এবং আমাদের জীবনাচরণ মেনে চলতে হবে।
উত্তর প্রদেশের প্রাচীন শহর মিরাটে রাষ্ট্রীয় স্বংয়ংসেবক সংঘ ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (আরএসএস) পরিচালিত ঘর ওয়াপসি (ঘরে ফেরার) কর্মসূচিকে সমর্থন করে মঙ্গলবার বক্তব্য দেন বলরাজ দুঙ্গার। ঘরে ফেরা কর্মসূচি হলো- যেসব হিন্দু ভারতের মুসলিম শাসনামলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের আবার হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তর করা। এই ঘরে ফেরা কর্মসূচি নিয়ে দেশটির বর্তমান সরকার দেশী-বিদেশী চাপের মুখে পড়েছে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো পার্লামেন্টে এ নিয়ে ধারাবাহিক নিন্দা প্রস্তাব জানিয়ে যাচ্ছে। ধর্মান্তর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি মৌখিকভাবে পার্লামেন্টে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো মোদির লিখিত বিবৃতির দাবিতে সংসদে কয়েকবার ওয়াকআউটও করেছে।
কিন্তু সেই ধর্মান্তরকরণকেই সমর্থন জানিয়ে এবার বাংলাদেশীদের ধর্মান্তরের হুমকি দিলেন বলরাজ দুঙ্গার। ঘরে ফেরা কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছেন এবং এখনও তা চলছে। বলরাজ দুঙ্গার আরও বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পার হয়ে গেলেও ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশীরা এখনও এ দেশে বসবাস করছে। তাদের এখন ফিরে যাওয়া উচিত। কারণ, তারা অবৈধ অভিবাসী।

যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করল আইএস

সিরিয়ার রাক্কায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে স্বঘোষিত ইসলামিক স্টেট-আইএস। ভূপাতিত ওই বিমানের পাইলটকেও আটক করেছে তারা। বুধবার রাক্কায় আইএস যোদ্ধারা ওই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে পাইলটকে আটক করেছে বলে নিশ্চিত করেছে একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, ‘রাক্কা শহরের কাছে বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর জর্দানের এক পাইলটকে আটকের বিষয়ে আমাদের কাছে নিশ্চিত তথ্য রয়েছে।’ এদিকে, রাক্কার আইএস যোদ্ধারা একজন পাইলটকে ঘিরে রেখেছে এমন বেশ কয়েকটি ছবি নিজেদের সাইটে প্রকাশ করেছে আইএস। এতে ওই পাইলট জর্ডানি বলে দাবি করা হয় এবং ক্যাপশনে তার নাম লেফটেন্যান্ট মোয়াজ ইউসুফ আল কাসাকে উল্লেখ করা হয়। আইএস দাবি করেছে, ‘হিট সিকিং মিসাইল’র সাহায্যে তারা বিমানটি ভূপাতিত করেছে। এই প্রথম মার্কিন জোটের কোনো বিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হল আইএস। জর্ডানের সামরিক বাহিনী বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এখন পর্যন্ত সরকার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সিরিয়া এবং ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে বিমান হামলার মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম সদস্য জর্ডান। সিরিয়ায় গত তিন মাসে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিমান হামলায় এক হাজার ১০০র বেশি জিহাদি নিহত হয়েছে। নিহতদের প্রায় সবাই ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গি।
মানবাধিকার সংগঠন সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে আরব ও আন্তর্জাতিক বাহিনীর বিমান হামলায় কমপক্ষে ১ হাজার ১৭১ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১১৯ জন আইএস ও আল নুসরা ফ্রন্টের সদস্য।
নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৪৬ জন আইএসের সদস্য। আইএস জঙ্গিরা গত জুলাই মাসে সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে ইসলামী খেলাফত ঘোষণা করে। জঙ্গিগোষ্ঠীটিকে থামাতে দেশ দুটির সরকার কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। গণহত্যা, শিরñেদ, ধর্ষণ, অপহরণের মতো সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়ে বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছে আইএস। সংগঠনটির ৩০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন জানায়, ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস জঙ্গিদেরই বিমান হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে ৭২ জন সিরিয়ায় আল কায়দার শাখা আল নুসরা ফ্রন্টের সদস্য বলে জানা গেছে।
এছাড়া আরও একজন জিহাদি নিহত হয়েছে। এএফপি।

তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল নয়

খেলাপি ঋণে ভারাক্রান্ত ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল না দেয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় পে-কমিশন। পাশাপাশি সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পৃথক বেতন কাঠামোর আওতায় আনা সমীচীন হবে না বলে মন্তব্য করেছে কমিশন। এসব প্রতিষ্ঠানের বেতন স্কেল সরকারি বেতন কাঠামোর আদলে রাখতে বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য আলাদা বেতন স্কেল দেয়ার প্রস্তাব করেছে কমিশন।
অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এসব তথ্য। এই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) বিশেষ মর্যাদা দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও যেসব প্রতিষ্ঠানের বেতন কাঠামোর বিষয়ে কমিশন বিভিন্ন সুপারিশ করেছে, সেগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এছাড়া আছে সরকারি মঞ্জুরিপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রাম বন্দর, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড এবং স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই কমিশনের কাছে পৃথক বেতন কাঠামো দেয়ার দাবি করেছিল।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নয় : কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রবর্তনের দাবি রয়েছে। কিন্তু এদের বার্ষিক দায়দেনা ও সম্পদের হিসাবে দেখা গেছে, বড় ধরনের খেলাপির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ভারাক্রান্ত। এ ঋণ কোনো দিন আদায় হবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। এসব দায়ভার বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা ফুটে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান দায়ভার সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার হয়ে আর্থিক সচ্ছলতায় ফিরে না আসা এবং নিজের আয়ের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেতন-ভাতা সরকারি বেতন কাঠামোর অনুরূপ রাখা প্রয়োজন।
জানা গেছে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ২৪ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ শতাংশ হচ্ছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলের। মোট খেলাপি ঋণের ৮০ শতাংশই মন্দ হয়ে পড়ায় প্রভিশনের পরিমাণ বাড়ছে।
বিভিন্ন সুপারিশ
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক বেতন কাঠামো সমীচীন নয় : সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে সরকারি মঞ্জুরির ওপর নির্ভরশীল। তাই কমিশন মনে করে সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য উচ্চতর স্কেলে আলাদা বেতন কাঠামো প্রণয়ন সমীচীন হবে না।
স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বেতন কাঠামো : এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কমিশন মনে করে, যেসব প্রতিষ্ঠান স্বাবলম্বী অর্থাৎ সরকারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়। নিজস্ব তহবিল থেকে চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতাসহ সব ব্যয় নির্বাহ করতে সক্ষম। ওইসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে পারবে। আর লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যবস্থা সম্ভব না হলে লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিরাষ্ট্রীয়করণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল : বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদের সম্মতিক্রমে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়নের পর অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে। এমন সুপারিশ করেছে কমিশন। তবে বেতনের গ্রেড ও স্কেলের সংখ্যা জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবিত ১৬টির কম বা বেশি হওয়া সমীচীন হবে না বলে মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে। সুপারিশে আরও বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুষ্ঠু দায়িত্ব পালনের ওপর দেশের অর্থনীতির সঠিক গতিধারা অনেকাংশেই নির্ভরশীল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ভূমিকা রাখতে হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিজীবীদের যোগ্যতাকে সমুন্নত রাখতে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।
গবেষণা সংক্রান্ত প্র্রতিষ্ঠানের সুবিধা বৃদ্ধি : ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে (বাপশক) চাকরিজীবীরা গবেষণার কাজে জড়িত আছে। এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, ব্রি ও বাপশক উভয় সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল সংস্থা। এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে পৃথক বেতন স্কেল প্রদান করলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান একই দাবি করবে। এতে সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাবে। দুটি প্রতিষ্ঠানের কিছু পদ রয়েছে যাদের বেতন বাড়লে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের একই পদধারী চাকরিজীবীদের সঙ্গে বেতন বৈষম্যের সৃষ্টি হতে পারে। কাজেই কমিশনের মতে, এ প্রতিষ্ঠান দুটির পৃথক বেতন কাঠামো প্রদান করা সমীচীন হবে না।
এ দুটি প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার জন্য বিশেষ কোনো পদে তিন বছরের মেয়াদে উচ্চতর বেতন স্কেলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এক্ষেত্রে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করতে হবে। তবে সন্তোষজনক হলে সংশ্লিষ্টদের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া কৃষি ও বিজ্ঞানসহ যে কোনো ক্ষেত্রে গবেষণার মাধ্যমে নতুন আবিষ্কার, উদ্ভাবন ও উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য এককালীন আকর্ষণীয় আর্থিক পুরস্কার, বিশেষ করে ৬ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রদানের সুপারিশ করা হয় জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে।

জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের রিপোর্ট ৩১ ডিসেম্বর

সুন্দরবনের দুর্ঘটনাস্থল শ্যালা নদী ও এর আশপাশে আগামী ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ করবে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল। ৩১ ডিসেম্বর সুন্দরবন বিষয়ে সরকারকে একটি প্রাথমিক সুপারিশ করা হবে। বুধবার সকালে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্দারমানিক এলাকায় এমএল ফ্লোটিং হোম নামের একটি লঞ্চে করে পরিদর্শনের সময় ‘জয়েন ইউএন গভর্নমেন্ট ওয়েল স্পিল রেসপন্স মিশন’র প্রধান অ্যামেলিয়া ওয়ালস্ট্রম সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
শ্যালা নদীতে ফার্নেস অয়েল নিঃসরণে সংকটাপন্ন ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের অবস্থা দ্বিতীয় দিনের মতো সরজমিনে পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ করছে জাতিসংঘের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ২৫ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল।
অ্যামেলিয়া ওয়ালস্ট্রম বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সুন্দরবনে তেলের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করতে। আমাদের ২৫ সদস্যের এ বিশেষজ্ঞ দলে ১১ জন আন্তর্জাতিক এবং ১৪ জন জাতীয় পর্যবেক্ষক রয়েছেন। তারা সবাই তেল দুষণ রোধ, বন ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞ এবং এ দেশের বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমাদের দলে সদস্যরা মোট ৬টি ভাগে ভাগ হয়ে কাজ করছে।
এর মধ্যে একটি গ্রুপ পর্যবেক্ষণ করছে যে তেল ছড়িয়ে পড়েছে তার বিস্তৃতি কতখানি, ২য় গ্রুপটি তেলের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব, ৩য় গ্র“পটি পানিতে প্রাণিজ ও উদ্ভিদের ওপর তেলের প্রভাব, ৪র্থ গ্র“পটি বন্যপ্রাণীর ওপর প্রভাব, ৫ম গ্র“পটি বন সংলগ্ন মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ৬ষ্ঠ গ্র“পটি ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমের ওপর তেলের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নমুনাও সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদের পর্যবেক্ষণ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলেও তিনি জানান।
প্রতিনিধি দলের প্রধান আরও বলেন, মাত্র ৭-১০ দিনে এ ধরনের একটি ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা সম্ভব নয়। পরবর্তীতে এর একটি ফলোআপ আকারে আসবে, সে সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি ও করণীয় সম্পর্কে তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, অনেকে মনে করছেন জাতিসংঘের একটি দল এসেছে তারা এখনই ক্ষয়ক্ষতি তুলে ধরবেন। কিন্তু এটি আসলে তা নয়। এটি খুব কঠিন একটি কাজ। আমাদের এ সাত দিনে কাজ একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ, যা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সহায়তা করবে। সুন্দরবনে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব পর্যবেক্ষণে জাতিসংঘের ওই বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দলটি সোমবার বিকালে বাগেরহাটের মংলায় আসে। ওইদিন রাত থেকে তারা এমএল ফ্লোটিং হোম নামে লঞ্চটিতে সুন্দরবনে অবস্থান করছেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলটি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন ও নমুনা সংগ্রহ করছেন।
অপরদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদী বুধবার বিকালে বাগেরহাটের মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের খনন কাজ পরিদর্শন করেন এবং খনন কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। এ সময়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ফার্নেস অয়েলবাহী ট্যাংকার দুর্ঘটনার পর ওই চ্যানেলটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের নৌ চলাচলের সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে। আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা করেই যাতে বর্তমান কর্মকাণ্ড চলমান রাখতে পারি সে জন্য সরকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। কম সময়ের মধ্যে মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের খনন কাজ যাতে শেষ করা যায় সে বিষয়ে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। খনন কাজের পরিদর্শন কালে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান কমডোর এইচ আর ভূঁইয়া, বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব মাহমুদুর রহমান প্রমুখ।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর বাগেরহাটের মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল সংলগ্ন খালের বাঁধ অপসারণ ও ২৩ খাল পুনর্খননের কাজ শুরু হয়। মঙ্গলবার সকালে রামপাল উপজেলা সদরের ওড়াবুনিয়া খালের বাঁধ কেটে এই কাজের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার আবদুল খালেক। গত ৯ ডিসেম্বর শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনার পর থেকে ওই নৌরুট বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়েছে মংলা বন্দরে। এ দিকে বুধবার বিকালে সার্বিক অবস্থা দেখতে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজিবুর রহমান সুন্দরবন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদী মৃগামারী, আন্দারমানিক ও জয়মনির গোল এলাকায় জেলে এবং বনরক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তিনি সুন্দরবনে অবস্থানরত জাতিসংঘের আন্দারমানিক শ্যালা নদীতে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বড়দিনের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সুন্দরবন পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে প্রধান বনসংরক্ষক মো. ইউনুছ আলী, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক রইসুল আলম মণ্ডল, খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক কার্তিক চন্দ্র সরকার, সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের ডিএফও আমীর হোসেন চৌধুরী ও পশ্চিম বিভাগের ডিএফও জহিদ উদ্দিন, চাঁদপাই রেঞ্জের এসিএফ মো. বেলায়েত হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সুন্দরবন ত্যাগ করেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং তার সফরসঙ্গীরা।

সংঘর্ষে রণক্ষেত্র বকশিবাজার

ছাত্রলীগ ও পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে বুধবার বকশিবাজার, চানখাঁরপুল, নাজিমউদ্দিন রোড ও পলাশী এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এতে আহত হয়েছে বিএনপির অর্ধশত নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে ২৮ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। পুলিশ ২৪ জনকে আটক করেছে। বিক্ষুব্ধ বিএনপি কর্মীরা বকশিবাজার থেকে চানখাঁরপুল ও নাজিমউদ্দিন রোডে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ সময় পুলিশ ৫০ রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস শেল, রায়টকার থেকে ব্যাপক রাবার বুলেট, শটগানের ফাঁকা গুলি ও জলকামান নিক্ষেপ করে। বিক্ষুব্ধ বিএনপি কর্মীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে নেত্রকোনা-১ আসনের এমপি ছবি বিশ্বাসের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও তার ওপর হামলা করে। তার মাথা ফেটে গেছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গাড়িতে আগুন দেয়ার অভিযোগে মোবাইল কোর্ট ছাত্রদলের এক কর্মীকে দুই বছরের সাজা দিয়েছেন। হামলা-সংঘর্ষের ঘটনায় শাহবাগ ও চকবাজার থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
বুধবার পুরান ঢাকার বকশিবাজার এলাকার আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে দুটি দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার হাজিরা দেয়াকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির সূত্রপাত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খালেদা জিয়ার হাজিরাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীরা আদালতের বাইরে অবস্থান নেয়। চকবাজার, শাহবাগ ও লালবাগ থানা পুলিশ ছাড়াও বকশিবাজার এলাকায় এপিবিএনসহ অতিরিক্ত পুলিশ, রায়টকার, জলকামান মোতায়েন করা হয় ভোর থেকে। নগরীর অন্যান্য এলাকায়ও নেয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা। সকাল থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতাকর্মী ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফজলে রাব্বী হলের সামনের চৌরাস্তায় রাস্তা বন্ধ করে সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগের নেতৃত্বে ৬০-৬৫ জন নেতাকর্মীর একটি মিছিল পলাশী মোড় হয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দিক থেকে বকশিবাজারের দিকে এগোতে থাকে। মিছিলে মুখোশ ও হেলমেট পরা কয়েকজনের হাতে পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। অন্যদের হাতে ছিল বাঁশের বড় লাঠি, হকিস্টিক, রড, ইটসহ দেশীয় অস্ত্র। মিছিলটি বুয়েট ক্যাম্পাস পার হয়ে বকশিবাজার চৌরাস্তায় বিএনপির নেতাকর্মীদের জমায়েতের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করতে থাকে। বিএনপি ও ছাত্রদলের কর্মীরাও পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে চরম সংঘর্ষ বেধে যায়। প্রায় ২০ মিনিট ধরে সংঘর্ষ চলতে থাকলেও পুলিশ অ্যাকশনে যায়নি। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে বকশিবাজার, চানখাঁরপুল, নাজিমউদ্দিন রোড, বুয়েট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায়। এ সময় উভয় পক্ষ লঠিসোটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় ১০ থেকে ১২টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ১২টা ২২ মিনিটে বিএনপি চেয়ারপারসন আদালতের উদ্দেশে বকশিবাজার চৌরাস্তা অতিক্রম করেন। বিএনপির কর্মীরা তার গাড়ির চারপাশে বলয় সৃষ্টি করে আদালতের দিকে এগিয়ে দেয়। একই সময় বঙ্গবাজারের মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের গোড়া থেকে বকশিবাজার পর্যন্ত রাস্তার কয়েকটি স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও বিক্ষোভ করতে থাকে বিএনপির কর্মীরা।
এদিকে সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করতে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ টিয়ার শেল, জলকামান ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ শুরু করে। পুলিশ ও ছাত্রলীগের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে বিএনপি নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তারা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। এ সময় বিএনপির কর্মীরা প্রায় ২৫-৩০টি গাড়ি এবং কয়েকটি দোকান ভাংচুর করে। প্রায় ৩ ঘণ্টা বকশিবাজার, নাজিমউদ্দিন রোড ও চানখাঁরপুল এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। এতে আশপাশের সড়কগুলোতে ব্যাপক যানজট দেখা দেয়। বেলা পৌনে ২টায় সংঘর্ষ বন্ধের পর বঙ্গবাজার থেকে চানখাঁরপুল হয়ে বকশিবাজার, পলাশী, বকশিবাজার আলিয়া মাদ্রাসা, বকশিবাজার থেকে জগন্নাথ হল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের সড়কে শুধু ইট, পোড়া টায়ারসহ হামলার ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ হাসপাতালের ভেতরে অবস্থান নেয়। সেখানেও নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের ঢাকা মেডিকেল ইউনিট। এ হামলায় কয়েকজন আহত হন। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদল কর্মীরা গেটের বাইরে নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসের জাতীয় সংসদের স্টিকার লাগানো গাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বুয়েটের নির্মাণাধীন একটি ভবনের শ্রমিক আতিক হোসেন জানান, ১২টার আগে থেকেই কিছু যুবক পলাশী মোড়ে অবস্থান নেয়। তাদের কয়েকজনের কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধা ও মাথায় হেলমেট পরা ছিল। বেশ কয়েকজনের হাতে পিস্তল দেখা গেছে। তারা নির্মাণাধীন ওই ভবন থেকে বাঁশের খুঁটি ও ইট নিয়ে মিছিলে হামলা করে। তাদেরকে গুলি ছুড়তেও দেখেছেন আতিক। তিনি আরও বলেন, পুলিশকেও ছাত্রলীগের সঙ্গে এক জোট হয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে দেখা গেছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাদের আটকে রেখে মারধর করেছে। অনেকের টাকা-পয়সা ও ঘড়ি-মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া হয়েছে। ছাত্রদলের দফতর সম্পাদক আ. সাত্তার পাটোয়ারী বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) হাজিরাকে কেন্দ্র করে ড. ফজলে রাব্বী হলের সামনে আমাদের ওপর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে হামলা করেছে। হামলায় আহত মিরপুর থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ফিরোজ আহমেদ বলেন, আমরা নেত্রীর জন্য বসেছিলাম। ছাত্রলীগ অতর্কিতে আমাদের ওপর হামলা করে।
লালবাগ জোনের উপপুলিশ কমিশনার মফিজ আহম্মেদ যুগান্তরকে জানান, কারা প্রথমে হামলা করেছে সেটি তদন্তের পর বলা যাবে। তবে পুলিশ কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রায় ৫০ রাউন্ড টিয়ার শেল, ২০ রাউন্ড শটগানের গুলি ও এপিসি থেকে কিছু ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছে।
ছবি বিশ্বাসের গাড়িতে আগুন : হামলা চলাকালে গুরুতর আহত হয়েছেন সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাস। হামলাকারীরা তার ব্যবহৃত কালো রঙের নোহা ভক্সি গাড়ি (ঢাকা-মেট্রো-চ-১৫-৬১৯৯) পুড়িয়ে দিয়েছে। লাঠির আঘাতে ছবি বিশ্বাসের মাথা ও কানে গুরুতর জখম হয়েছে। তাকে হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের ডা. রাজিউল হকের তত্ত্ব¡াবধানে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মোজাম্মেল হক যুগান্তরকে জানান, ধাওয়া খেয়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে পড়ে। তারাই এমপির গাড়িতে হামলা চালিয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী যুগান্তরের ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিনিধি সোহেল রহমান জানান, ছবি বিশ্বাস একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। বিএনপির নেতাকর্মীরা জরুরি বিভাগের ফটকের সামনে তার গাড়িতে হামলা চালায়। এমপির গাড়িচালক মোহাম্মদ হাসনাইন জানান, গাড়িতে এমপিসহ ৮ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশের পর গণ্ডগোল দেখে এমপি গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে বলেন। কিন্তু ফটক দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় সংসদের স্টিকার দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ৩০/৪০ জন যুবক লাঠিসোটা নিয়ে গাড়িতে হামলা করে। এমপি ছবি বিশ্বাস গাড়ি থেকে নামামাত্র তাকেও বেধড়ক পেটানো হয়েছে। এরপর হামলাকারীরা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা গাড়ির আগুন নেভান।
ছবি বিশ্বাস বলেন, ‘আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আরেকজন মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম। এখন হামলার শিকার হয়ে নিজেকেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তিনি কোনোভাবেই এই হামলা বা সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা : চকবাজার থানার ওসি আজিজুল হক জানান, এমপির গাড়িতে হামলার ঘটনায় পুলিশ ৬ জনকে আটক করেছেন। গাড়ি পোড়ানোর দায়ে আফজাল হোসেন (২২) নামের এক যুবককে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম যুগান্তরকে জানান, গাড়িতে আগুন দেয়ার অপরাধ স্বীকার করায় অভিযুক্ত আফজালকে দুই বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। আফজালের বাবা ফার্নিচার ব্যবসায়ী আবুল হোসেন জানান, তার ছেলে যাত্রাবাড়ীর দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তার ছেলে রাজনীতিতে জড়িত নয়। বন্ধুর সঙ্গে সে ঢাকা মেডিকেলে রোগী দেখতে গিয়েছিল।
হামলায় আহত ২৮ জন হাসপাতালে : হামলায় আহত হয়ে ২৮ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে ২০ জনের নাম জানা গেছে। তারা হল- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কর্মী আবদুল জলিল, যুবদলের মহানগর কর্মী এমএন ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, পথচারি শহীদ, কবি নজরুল কলেজের ছাত্রদল কর্মী ইমরান হোসেন, আবদুস সাত্তার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল কর্মী তানজিল হাসান, সোহেল রানা, গোলাম রাশেদ, হাবীব, মিলন রায়, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্রদল কর্মী এমএম ইমরান খান, তিতুমীর কলেজের ছাত্রদল কর্মী কাওসার, ফিরোজ কবির, জাহির হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল কর্মী শামসুল আরেফীন, মিরপুর থানা ছাত্রদলের কর্মী ফিরোজ আহমেদ, ঢাকা কলেজের ছাত্রদল কর্মী আতিক ও খোকন।
দুই থানায় আটক ২৪ : সংঘর্ষ চলাকালে ২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। এদের মধ্যে শাহবাগ থানায় ১৮ জন ও চকবাজার থানায় ৬ জন। চকবাজার থানার ওসি আজিজুর রহমান যুগান্তরকে জানান, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দু’টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি তদন্ত হাবিল হোসেন জানান, এ ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে। আটককৃতদের ওইসব মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে।
ঢাবিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র মহড়া : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, হামলার আগে ও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সশস্ত্র মহড়া দেয় ছাত্রলীগ। বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার কাছে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। অনেকের হাতে ছিল জিআই পাইপ, রড ও লাঠি। হামলা শেষে ক্যাম্পাসে ফাঁকা গুলি ছুড়ে উল্লাস প্রকাশ করে।
ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৯টা থেকে অঘোষিতভাবে নেতাকর্মীদের মধুর ক্যান্টিনে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বের হন ছাত্রলীগ সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ। মিছিলটি শহীদ মিনারের কাছাকাছি গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষ শেষে বেলা ১টার দিকে রাজু ভাস্কর্যে আসে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তারা বিএনপি ও ছাত্রদলবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগ সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সহ-সভাপতি জয়দেবন নন্দী, জিসান মাহমুদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, হাসান তারেক, সাংগঠনিক সম্পাদক শিহাবুজ্জামান শিহাব, সমাজসেবা সম্পাদক কাজী এনায়েত, পরিবেশ সম্পাদক সাইফুর রহমান সোহাগ, ক্রীড়া সম্পাদক আবিদ আল হাসান, ছাত্র বৃত্তিবিষয়ক সম্পাদক ইমতিয়াজ বুলবুল বাপ্পি, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফ প্রমুখ।
সমাবেশ শেষে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ঢাবি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা রাজু ভাস্কর্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রসংলগ্ন ডাস-এ অবস্থান নেয়। এ সময় ছাত্রদল সন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে আটক করে তারা। পরে ছাত্রদল করে এমন প্রমাণ না পেয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। সড়ক দ্বীপেও অবস্থান নেয় নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ। টিএসসিতে অবস্থান নেয় মহানগর ছাত্রলীগ। আড়াইটার দিকে তারা সবাই মধুর ক্যান্টিনে যায়। পরে বেলা ৩টার দিকে প্রত্যেকটি ইউনিটকে চলে যেতে বলা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রলীগ কর্মীরা মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে জড়ো হয়। মিছিলের বেশিরভাগই ছিল সশস্ত্র। বেলা ২টা সাত মিনিটে টিএসসিতে থাকা মহানগর ছাত্রলীগের অবস্থানস্থল থেকে চার রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি আনিসুর রহমান আনিস এ গুলি ছোড়েন। তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রদল সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন মহল্লা থেকে লোক নিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে জড়ো হন। তারা ঢাকা মেডিকেলে ফজলে রাব্বি হল, ঢাবির শহীদুল্লাহ হল, একুশে হল, সুফিয়া কামাল হলে হামলা চালায়। শুনে আমরা সেখানে যাই। পরে তারা আমাদের ওপর হামলা করলে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। তিনি আরও বলেন, আমরা সংঘাত চাই না। তবে তারেক জিয়া ক্ষমা না চাইলে গাজীপুরে সমাবেশ প্রতিরোধের বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্তে আমরা অনড়।
ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার স্বার্থে সমবেত হয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ-র‌্যাবের ছত্রচ্ছায়ায় ছাত্রলীগ আমাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে হামলা চালায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এম আমজাদ আলী যুগান্তরকে বলেন, ক্যাম্পাসে কোনোভাবেই অস্ত্র কাম্য নয়। তবে সংঘর্ষে যাদের কাছে অস্ত্র ছিল বলে শুনেছি তারা কেউ আমাদের ক্যাম্পাসের না। যদি কেউ ক্যাম্পাসে অস্ত্র নিয়ে আসে তাদের ব্যাপারে আমরা সতর্ক থাকব। পুলিশকে বলে দেয়া আছে, কারও কাছে অস্ত্র পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করার জন্য।

হিন্দু হোন, নয় ভারত ছাড়ুন

ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের এক নেতা ভারতে বসবাসকারী তথাকথিত বাংলাদেশিদের ভারত ছেড়ে যেতে, নয়তো হিন্দু হয়ে যেতে বলেছেন। এই হুংকারের পাশাপাশি আরেক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ঘোষণা দিয়েছে, আগামী মাসে তারা চার হাজার মুসলিমকে হিন্দু ধর্মে ‘ফিরিয়ে আনবে’।
এই হুংকার নরেন্দ্র মোদির সরকারকে ফেলে দিয়েছে এক অদ্ভুত সংকটের মুখে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর এ সিদ্ধান্তে ভারতের শিল্পমহল শঙ্কিত। তারা মনে করছে, এর ফলে সরকারের উন্নয়নের কর্মসূচিগুলো পিছিয়ে পড়বে। মাথাচাড়া দেবে উগ্র হিন্দুয়ানা। বাধা পাবে দেশের উন্নয়ন। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
গত মঙ্গলবার বজরং দলের মিরাট শাখার আহ্বায়ক বলরাজ দুঙ্গার বলেন, ‘আমাদের প্রথম দাবি হলো বাংলাদেশিরা ভারত ছেড়ে যাক। কারণ, ওরা আমাদের সম্পদ নষ্ট করছে। তবে কেউ যদি ভারতে থাকতেই চায় তবে তাদের হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হতে হবে।’
দুঙ্গারের দাবি, ৪৩ বছর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশিরা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এখন তাদের ফিরে যেতে হবে।’
সংঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠন ইদানীং ‘ঘর ওয়াপসি’ (ঘরে ফেরা) নামে এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অন্য ধর্মের মানুষকে ধর্মান্তরের মাধ্যমে হিন্দু করে তোলাই এই কর্মসূচির একমাত্র লক্ষ্য। এ কর্মসূচি প্রসঙ্গে দুঙ্গার বলেন, ‘এ উদ্যোগ আগের ইউপিএ সরকারের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। এটি চলছে, চলবে।’ দুঙ্গারের কথা, ‘বাংলাদেশিরা হিন্দু হয়ে গেলেও তাদের বৈধতা দেওয়া যাবে না। কারণ, এর ফলে তারা আমাদের জনসংখ্যা বাড়াতে সহায়তা করবে।’
দুঙ্গার বলেন, ‘সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। তাদের সবাইকেই ভারতে ত্যাগ করতে হবে।’
দুঙ্গারের এই হুংকারের সময় গত মঙ্গলবারই ভিএইচপি নেতা সাবেক বিজেপি সাংসদ রাম বিলাস বেদান্তি বলেন, আগামী মাসে তাঁরা ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচির আওতায় অযোধ্যায় চার হাজার মুসলিমকে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনবেন।
যেসব পরিবারকে ধর্মান্তরিত করা হবে তাদের পরিচয় দিতে অবশ্য অস্বীকার করেন বেদান্তি। কারণ, ধর্মান্তরিত করার খবর শুনলে প্রশাসন তাতে বাগড়া দিতে পারে। তবে তিনি জানান, যাঁরা ধর্মান্তরিত হবেন তাঁদের বেশির ভাগই ফৈজাবাদ, আম্বেদকর নগর, গোন্ড এলাকার বাসিন্দা।
বেদান্তির এ ঘোষণা নিয়ে ফৈজাবাদ জেলা পুলিশের ডিআইজি সঞ্জয় কাক্কার বলেন, যারা এ ধরনের কথা বলে তারা এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াতে চায়। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারতের শিল্পমহল এ ঘটনাপ্রবাহকে মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের আর্থিক বিকাশের জন্য যেভাবে এগোতে চাইছেন, তাতে এ কর্মসূচিগুলো বাধা হয়ে দাঁড়াবে। দেশের প্রধান বণিক সভা ‘ফিকি’র সভাপতি জ্যোৎস্না সুরি বলেছেন, ‘এ ধরনের কাজকর্ম অবাঞ্ছিত। নিশ্চিতভাবেই এ কর্মসূচি সরকারের লক্ষ্যচ্যুতি ঘটাবে। উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।’ তিনি বলেন, সরকারকে অবশ্যই এ অস্বস্তি দূর করতে হবে।
ধর্মান্তরকে কেন্দ্র করে সংসদের অচলাবস্থাতেও শিল্পমহল চিন্তিত। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার ব্যাহত হচ্ছে। বণিকসভা সিআইআইয়ের সভাপতি অজয় শ্রীরাম মনে করেন, ‘সংসদ কাজ না করতে পারলে দেশেরই ক্ষতি।’ এইচডিএফসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান দীপক পারেখ বলেছেন, ‘আমরা গণতন্ত্র চাই, অকর্মণ্য গণতন্ত্র নয়। এ ধরনের কাজ দেশের উন্নতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
সংঘ পরিবার কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তে অটল এবং নরেন্দ্র মোদিও মুখে কুলুপ এঁটেছেন। আদর্শের সঙ্গে সুশাসনের এ বিরোধের মোকাবিলা কীভাবে করবেন এখনো তার কোনো ইঙ্গিত তিনি দেননি। এ পরিস্থিতিতে অখিল ভারত হিন্দু মহাসভা ৩০ জানুয়ারি ‘শৌর্য দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই দিন মহাত্মা গান্ধী নিহত হয়েছিলেন। সংগঠনের নেতা কমলেশ তিওয়ারি জানিয়েছেন, ‘২০টি শহরে এ দিনটি উদ্যাপিত হবে। মানুষের জানা উচিত, নাথুরাম গডসে নিজের স্বার্থের জন্য গান্ধীকে হত্যা করেননি।’
১৯ কথিত বাংলাদেশির কারাদণ্ড: ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের তিরুপতির একটি আদালত অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে ১৯ জন কথিত বাংলাদেশিকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এদের প্রত্যেককে ৫০ টাকা করে জরিমানা হয়েছে। গত আগস্ট মাসে নারী ও শিশুসহ ৩১ বাংলাদেশিকে অন্ধ্রের চিত্তর জেলার রেনিগুনতা রেলস্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, পাসপোর্ট ছাড়া তারা ভ্রমণ করছিল। পাসপোর্ট না থাকার দায়ে উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগরের পুলিশও গত মঙ্গলবার কথিত চার বাংলাদেশি নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে। গত অক্টোবর মাস থেকে তারা ভারতে আছে বলে পুলিশের দাবি।

বিটিভিকে সরকারের মুখপাত্র করতে চাই না: প্রধানমন্ত্রী

‘বাংলাদেশ টেলিভিশনকে (বিটিভি) শুধু সরকারের মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাই না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর রামপুরায় বিটিভির প্রধান কার্যালয়ের চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে এসব কথা বলেন। বিটিভি ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিটিভিকে শুধু সরকারের মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাই না। এটার কার্যক্রম আরও বিস্তারিত হবে। এটার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে এবং এটা আরও বেশি শিক্ষণীয় হবে। বিনোদনের ক্ষেত্রটা আরও সম্প্রসারিত হবে, সেটাই আমরা চাই।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইতিমধ্যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছি। এটা যেহেতু জাতীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, এই প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটুক। জন্মলগ্ন থেকে যাঁরা কর্মরত রয়েছেন, তাঁদের অভিনন্দন জানাই।’
পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিটিভির নানা দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখানে লাভ-লোকসানের বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে গণসচেতনা বৃদ্ধি হচ্ছে কি না। মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্র প্রসারিত করা এবং দেশকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা। ঠিক সেইভাবে বিটিভির অনেক দায়িত্ব রয়েছে। সেই সঙ্গে বিনোদনের কাজও তাদের করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিটিভির উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। বিটিভিকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। বিটিভিকে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংসদ টেলিভিশনের কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিটিভিকে অনুরোধ করতে চাই, সারা দিন আসলে সংসদ টেলিভিশন বন্ধ থাকে। শুধু সন্ধ্যার পরে সেখান সংসদের কার্যক্রম হয়। এখানে শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ নানা অনুষ্ঠান প্রচার করা যায়। সংসদ টেলিভিশনের যৌথ উদ্যোগেও বিটিভি নানা কর্মসূচি নিতে পারে। বিনোদনের সাথে সাথে শিক্ষামূলক এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা বেশি মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারব।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, শিক্ষার মান উন্নত করার জন্য আমরা একটা করছি। ঢাকা শহরের নামকরা স্কুলের ইংরেজি, বিজ্ঞান ও অঙ্ক বিষয়গুলোর কতগুলো ক্লাস বিটিভিতে প্রচার করা হয়। এটা প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ যেন দেখতে পারে। এটা সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে দেখানো যেতে পারে।’ নানা কারিকুলামের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেধাবীদের তুলে নিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ বাংলাদেশ টেলিভিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

রাত্রীর যাত্রীতে নায়লা নাঈম

রাত্রীর যাত্রীতে নায়লা নাঈম

‘বিএনপি নেতাদের উপরও হামলা হতে পারে’ -হানিফ

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আপনাদের উপরও হামলা হতে পারে। তবে তার দায় আপনাদেরই নিতে হবে। আজ দুপুরে ধানম-িস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সম্পাদকম-লীর সদস্যদের এক জরুরি বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হানিফ বলেন, বিএনপিকে বলবো সন্ত্রাস বন্ধ করুন। একজন সজ্জন লোকের (ছবি বিশ্বাস) ওপর হামলা করেছেন। এদেশে অনেক জনগণ আছে যারা আপনাদের ও আপনাদের গাড়িতেও হামলা করতে পারে। এর দায়ভারও আপনাদেরই নিতে হবে। তিনি  বলেন, গতকাল ছবি বিশ্বাসের ওপর যে হামলা হয়েছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। ছাত্রদলের যেসব সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত সেসব সন্ত্রাসীদের যেন সরকার অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসে। সংবাদ সম্মেলনে হানিফ আরও বলেন, প্রত্যেক দলে রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। সে হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাও সরকার দেখবে। ছাত্রলীগের কর্মীদের দ্বারা ছাত্রদলের কর্মীদের আহত হওয়ার বিষয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের কর্মসূচি ছিল। ছাত্রদল ছাত্রলীগের ওপর আগে হামলা করেছে। তবে ছাত্রলীগের কেউ যদি সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত থাকে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ প্রমুখ।

সবচেয়ে সুন্দরী বালিকা সুপার মডেল ক্রিস্টিনা পিমেনোভা

মাত্র আট বছর বয়সেই রাশিয়ার সুপার মডেল ক্রিস্টিনা পিমেনোভা। স্বীকৃতি মিলেছে বিশ্বের সেরা সুন্দরী বালিকারও। কিন্তু এসব খ্যাতি বা স্বীকৃতির কিছুই মেয়েকে বুঝতে দিতে চান না মা গ্লিকেরিয়া পিমেনোভা। এক সময়কার মডেল এই মায়ের চাওয়া, আর দশটা সাধারণ শিশুর মতোই বেড়ে উঠুক তাঁর সন্তান। আজ বৃহস্পতিবার এএফপির খবরে জানানো হয়, ক্রিস্টিনা এর মধ্যে ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান আরমানি ও রোবার্তো কাভালির হয়ে মঞ্চে ক্যাটওয়াক করেছে। ডাগর নীল নয়ন আর জাদুকরী হাসি দিয়ে জিতে নিয়েছে হাজারো ভক্তের হৃদয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার সরব উপস্থিতি। যদিও এগুলো ক্রিস্টিনা নয়, তার মা পরিচালনা করে থাকেন। ফেসবুকে ক্রিস্টিনার ভক্তের সংখ্যা ২৫ লাখ, আর ইন্সটাগ্রামে তার প্রায় পাঁচ লাখ অনুসারী। মা গ্লিকেরিয়া পিমেনোভা বলেন, ‘মেয়ে আমার নিরহংকারী। সে তারকা-ম্যানিয়ার বিষয়টি বোঝে না। সে কখনো জনপ্রিয়তা শব্দটি আমাদের কাছ থেকে শোনেনি। আমরা বাড়িতে এমন শব্দ কখনোই ব্যবহার করি না।’ তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ক্রিস্টিনা পিমেনোভার কিছু ছবির ব্যাপারে ভক্তরা আপত্তি জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, বয়সের তুলনায় তার এই ছবিগুলো বেমানান। খানিকটা আপত্তিকরও বটে। কোনো কোনো ভক্ত আবার তাকে ‘শিশু’ থাকার পরামর্শ দিয়েছে। তবে এ ধরনের সমালোচনা নাকচ করে দিয়েছেন ক্রিস্টিনার মা। এ ব্যাপারে মা বললেন, ‘কেউ ছবি দেখে আপত্তি জানালে সেটা তার সমস্যা। এই ২৭ ডিসেম্বর নয় বছরে পা দিতে যাওয়া ক্রিস্টিনা শুধু শিশুদের পোশাকেই থাকে, মডেলিংয়ে ছবি তোলার সময় কালেভদ্রে ম্যাকআপ ব্যবহার করে। এ কারণে ফটো সেশনে তার অনেক কম সময় লাগে। যদি সে পোশাক-ম্যাকআপ নিয়ে ব্যস্ত থাকত তাহলে তাকে সারা দিনই কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো।’ শিশু ক্রিস্টিনার ছবি নিয়ে আপত্তি বা সমালোচনার বিষয়ে কথা বলেছেন মার্কিন অভিনেত্রী, মডেল ও সাবেক শিশু তারকা ব্রুক শিল্ডস। এ মাসের শুরুর দিকে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক এক টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ওই বয়সে আমারও এমন ছবি ছিল। তবে সামাজিক যোগাযোগের এই জমানায় ছবি প্রকাশের বিষয়টি খানিকটা বিপদও ডেকে আনতে পারে। আমার মনে হয় না ক্রিস্টিনার ছবিগুলো খারাপ। তবে কে কীভাবে দেখছে, সেটা তার বিষয়।’ ক্রিস্টিনার জন্ম ২০০৫ সালে মস্কোতে। তবে জন্মের পরপরই সে বাবা-মায়ের সঙ্গে চলে যায় ফ্রান্সে। তার ফুটবলার বাবা রুসলান পিমেনোভা এফসি মেটসের হয়ে খেলতেন। ক্রিস্টিনার মা জানালেন, ছোটবেলা থেকেই সে জিমন্যাস্টিকস পছন্দ করত। এটা তার কাছে শখের চেয়েও বেশি কিছু। দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় সে শারীরিক কসরত করে কাটাত। সঙ্গে তিনি যোগ করলেন, ক্রিস্টিনা খুবই সাধারণ এক বালিকা। মস্কোর এক সাধারণ বিদ্যালয়ে সে পড়াশোনা করে। তবে তাকে অনেক ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। স্কুল শেষে সে জিমন্যাসটিকস ক্লাসে যায়। সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত আটটা কিংবা তার চেয়েও বেশি বেজে যায়। সপ্তাহে একদিন মাত্র ছুটি মেলে তার। অন্য শিশুদের মতোই ভালোবাসে পিৎজা ও প্যানকেক খেতে। ‘অ্যালিইস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’, গ্রিক পৌরাণিক কাহিনি, ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ পড়ে বা আইফোনে ছোট ছোট চলচ্চিত্র বানিয়ে অবসর সময় কাটায়। কারণ, ছোট্ট ক্রিস্টিনা স্বপ্ন দেখে অভিনেত্রী বা চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার। মেয়ে ক্রিস্টিনাকে নিয়ে মা গ্লিকেরিয়া পিমেনোভার মন্তব্য, ‘ক্রিস্টিনার ভেতরে অসম্ভব সৌন্দর্য আছে। অন্যরা তা উপলব্ধি করতে পারে। সম্ভবত এ কারণেই তার মুখমণ্ডল বহু মানুষকে আকর্ষণ করে।’

বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী চিন্তাবিদের তালিকায় পঞ্চম ড. ইউনূস

ক্ষুদ্র ঋণের প্রবক্তা ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল জয়ী অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। জুরিখভিত্তিক ‘গোত্তিলেব ডাটওয়েইলার ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিকস অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজ’ এবং ‘এমআইটি স্লোয়ান স্কুলে’র গবেষক পিটার গ্লুরের যৌথভাবে পরিচালিত ‘গ্লোবাল থট লিডার ২০১৪’ জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের তালিকার পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছেন ইউনূস। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন পোপ ফ্রান্সিস। এরপর রয়েছে ‘ইন্টারনেটের পোপ’ হিসেবে পরিচিত টিম বারনার্স-লী। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন ভারতের নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং চেক রিপাবলিকের লেখক মিলান কুন্দেরা রয়েছেন চতুর্থ স্থানে। এরপরই অর্থাৎ বিশ্বের শীর্ষ ১০০ প্রভাবশালী চিন্তাবিদের তালিকার পঞ্চমে রয়েছেন ডক্টর মুহম্মদ ইউনূস। বিশ্বের ২৩৬ জন শীর্ষ প্রভাবশালী চিন্তাবিদের তালিকা থেকে সেরা ১০০ জনকে বেছে নেয়া হয়। গতকাল ইউনূস সেন্টারের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পদ্ধতিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ প্রভাবশালী চিন্তাবিদকে নির্বাচিত করা হয়। জরিপটি পরিচালনায় বিশেষ সফওয়্যারের সাহায্য নেয়া হয়েছে। এর সাহায্যে বিশ্বে সৃষ্টিশীল মননের প্রভাবের গুরুত্ব পরিমাপ করা যায়। ইউনূস সেন্টারের পক্ষ থেকে দেয়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজ আমাদের চিন্তাধারায় যারা প্রভাব বিস্তার করেছেন, যাদের ধারণা আমাদের ধারণাকে নির্ধারণ করছে এবং যাদের ধ্যান-ধারণা বারংবার মানুষকে সম্পৃক্ত করছে, সেই সব ব্যক্তিত্বদের ওই তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে।

‘ছবি বিশ্বাসকে হত্যাই ছিল উদ্দেশ্য’ -স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বকশীবাজারে বিএনপিই অরাজকতা করেছে, আর এর উদ্দেশ্য ছিল এমপি ছবি বিশ্বাসকে হত্যা করা। হাসপাতালের মতো নিরাপদ স্থানেও এমপিদের মধ্যে অত্যন্ত ভদ্র ছবি বিশ্বাসকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়। তাদের (বিএনপি) অভ্যাস এমনই। আজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নেত্রকোনা-১ আসনের এমপি ছবি বিশ্বাসকে দেখতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। ছাত্রলীগ সভাপতির নেতৃত্বে হামলা হয়েছে, বিভিন্ন গণমাধমে আসা খবর ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ কোথায় হামলা করেছে? তারাই (বিএনপি) তো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এমপিকে হত্যা করতে চেয়েছিল। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা হলেও পুলিশ তা ব্যর্থ করে দিয়েছে। আদালতের মতো নিরাপদ স্থানে হাজার হাজার নেতাকর্মী আসার কি প্রয়োজন ছিল? উদ্দেশ্য ছিল বিচার কাজকে ভুল করা। বুধবার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরা দেয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির জমায়েতে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে ৬০০জন আহত হয় বলে দাবি করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুইপক্ষের সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিএনপি সমর্থকদের হামলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে আহত হন নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাস।

যুক্তরাষ্ট্রে ফের শ্বেতাঙ্গ পুলিশের গুলিতে নিহত কৃষ্ণাঙ্গ

এবার যুক্তরাষ্ট্রের সেইন্ট লুইস শহরের বার্কলিতে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন ১৮ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ টিনএজ কিশোর অ্যান্টোনিও মার্টিন। পুলিশের পক্ষ থেকে আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, অস্ত্রধারী ওই কিশোর এক পুলিশ কর্মকর্তার দিকে পিস্তল তাক করায় আত্মরক্ষার জন্য তিনি গুলি চালাতে বাধ্য হন। ৩৪ বছর বয়সী ওই পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। বার্কলির মেয়র থিওডর হসকিন্স বলেন, ফার্গুসন কিংবা নিউ ইয়র্কে এরিক গার্নারের ঘটনার সঙ্গে এ ঘটনাকে কোনভাবে তুলনাও করা যায়না। হসকিন্স জানিয়েছেন, এর আগে ফার্গুসনে পুলিশের গুলিতে মাইকেল ব্রাউন নিহতের ঘটনায় কোন ভিডিও ফুটেজ না থাকলেও, অ্যান্টোনিও মার্টিনের পিস্তল বের করার দৃশ্য ধরা পড়েছে গোপন নজরদারির জন্য ব্যবহৃত ক্যামেরায়। একটি দোকানে চুরির বিষয়ে মার্টিন ও অপর আরেক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করছিলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। এক পর্যায়ে ওই কিশোর পিস্তল বের করে। এদিকে এ ঘটনা নতুন করে ক্ষোভ উস্কে দিয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ জনসাধারণের মধ্যে। গত মঙ্গলবার অ্যান্টোনিও মার্টিনকে গুলি করে হত্যার পর প্রায় ৩০০ জন গ্যাস স্টেশনের কাছে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পুলিশের সঙ্গে তাদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। অনেকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারেন পুলিশের অবস্থান লক্ষ্য করে। এ ঘটনায় সেইন্ট লুইস শহরতলির মেয়র সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল রাতে তুলনামূলকভাবে অল্প সংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে জড়ো হন। মহাসড়কেও বিক্ষোভ করেন অনেকে এবং কিছু সময়ের জন্য স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে তিনি আরও একটি তুলনার বিষয় তুলে ধরেন বার্কলির মেয়র। তিনি জানান, ফার্গুসনে কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গ পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, তার শহরের পুলিশ কর্মকর্তাদের ৯ হাজার জনই কৃষ্ণাঙ্গ। এর মধ্যে শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। এর আগে ফার্গুসনের কাছে মাইকেল ব্রাউন নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা। এরপর অবৈধভাবে সিগারেট বিক্রির অভিযোগে এরিক গার্নার নামে অপর এক কৃষ্ণাঙ্গকে মাটিতে ফেলে তাকে সজোরে চেপে ধরেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এক পুলিশ কর্মকর্তা তার গলায় চেপে ধরলে, শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান তিনি। এতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভে নামেন মানুষ।

আন্ডারওয়ার চোর প্রেমিকা!

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ‘সিআর-৭’ আন্ডারওয়ারের প্রতি তার প্রেমিকা ইরিনা শায়েকের নাকি প্রবল ঝোঁক। এমন কি, রোনালদোর আন্ডারওয়ার নিয়মিতই তার মডেল প্রেমিকা চুরি করেন বলে জানালেন তিনি। বড়দিন ও বছরের শেষ উপলক্ষে ২ সপ্তাহ ছুটিতে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এ পর্তুগিজ উইঙ্গার। ছুটি কাটাতে ইতিমধ্যে তিনি পর্তুগালে নিজ শহর মাদেইরাতে গেছেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সেখানে ফুরফুরে মেজাজেই সময় কাটাচ্ছেন। এরই মধ্যে এক মজার তথ্য দিলেন এ তারকা খেলোয়াড়। আপনার প্রেমিকা আপনার কোন জিনিস চুরি করেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রোনালদো বলেন, ‘সে সব সময় আমার ‘সিআই-৭’ বক্সার (আন্ডারওয়ার) চুরি করে। একবার সে বাড়িতে ছিল না। আমি তার ওয়ারড্রোব খুলে দেখি, আমার অনেকগুলো ‘সিআর-৭’ আন্ডারওয়ার সেখানে। আমার আন্ডারওয়ারের প্রতি তার প্রবল ঝোঁক। বিষয়টি খুবই মজার ও হাস্যকর।’ ক’দিন আগে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতেছে রিয়াল মাদ্রিদ। তবে সেমিফাইনালে মেক্সিকোর ক্লাব ক্রুজ আসুল ও ফাইনালে আর্জেন্টিনার ক্লাব সান লরেঞ্জোর বিপক্ষে গোল করতে পারেন নি ২৯ বছর বয়সী রোনালদো। এ বছর আর কোন ম্যাচ নেই। আগামী বছর রিয়ালের প্রথম লড়াই নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে। ৭ই জানুয়ারি কোপা দেল রে’র শেষ ষোলোয় মুখোমুখি হবে তারা।

বাংলাদেশে বড়দিন: কতটা স্বচ্ছন্দ খ্রীষ্টানরা?

বিশ্বব্যাপী নানা দেশের মত বাংলাদেশেও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা পালন করছেন বড়দিনের উৎসব।কিন্তু এদেশে ঈদ ও পূজা যতটা স্বাচ্ছন্দ্য ও আড়ম্বরের সাথে পালিত হয়, সেই তুলনায় খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য বড়দিন পালন করা কতটা সহজ বা কঠিন? ঢাকার বাসিন্দা জ্যানেট বাবলি হালদার বলছিলেন, বাংলাদেশে যেহেতু মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং এখানে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা খুবই কম, তাই এদেশে বড়দিন পালন করাটা খুব একটা সহজ নয়। জ্যানেট বাবলি হালদার তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বড়দিন রাজধানী ঢাকায় এবং গ্রামের বাড়ি বরিশালে উৎযাপন করে থাকেন।তিনি বলছিলেন, বড়দিনের ছুটিতে কেক, পিঠা খেয়ে আর নতুন কাপড়চোপড় পড়ে সাধারণত: পরিবারের সাথেই সময় কাটান বাংলাদেশের খ্রিষ্টানরা।বিশেষ এই দিনটিতে সকালে গির্জায় জড়ো হয়ে প্রার্থনা করেন তারা। মূলত: গির্জাতেই একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করার বড় সুযোগটি হয় বাংলাদেশের খ্রিষ্টানদের। পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্রিসমাস ডে বা বড়দিন পালনের জন্য বেশ আগেভাগেই শুরু হয়ে যায় নানা তোরজোড়। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এখন বাংলাদেশেও আগের তুলনায় বড়দিনের আমেজ বেড়েছে বলেই জানাচ্ছিলেন তিনি। এমনকি শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই নয়, জ্যানেট বাবলি হালদার বলছিলেন, দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও এখন অনেক স্বাচ্ছন্দ্যেই বড়দিন পালন করতে পারছেন বাংলাদেশের খ্রিষ্টানরা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

কী ঘটবে ৫ জানুয়ারি? by আহমেদ সুমন

আগামী ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হতে চলছে। দিনটি সামনে রেখে সংসদের বাইরের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আবারও নতুন করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এ কথা পুনর্বার বলার প্রয়োজন নেই যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বর্জন এবং প্রতিরোধের মুখে জাতীয় সংসদের প্রায় ভোটারবিহীন দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দশম সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির প্রাক্কালে ওই নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে বিভিন্ন মহল থেকে ‘সঠিক’ বা ‘ভুল’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। বক্ষমাণ নিবন্ধে এ সঠিক কিংবা ভুলের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হবে।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে সেই সময়কার প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীসহ অপরাপর দলের অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ অনেক শীর্ষ নেতাই এখনও মনে করেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত ভুল নয়; বরং সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। কারচুপির একটি নীলনকশার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে শেখ হাসিনা সরকারকে বৈধতার সুযোগ দেয়ার কোনো মানে হয় না। সংসদে পুনর্বার বিরোধী দল হওয়ার কোনো অর্থ হয় না।’ আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ না ‘সঠিক’, সে সম্পর্কে অল্প সময়ে যথার্থ মন্তব্য করা যায় না। ঘটনা পরম্পরায় সিদ্ধান্ত ভুল বা সঠিক প্রমাণিত হয়। ঘটনা যত বেশি পুরনো হয়, ইতিহাসের মূল্যায়ন ততই সঠিক হয়।
বিএনপির বর্জনের মুখে যেনতেনভাবে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পরপরই বিএনপি দেশব্যাপী তাদের লাগাতার আন্দোলন এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করে। আন্দোলন স্থগিত করে বিএনপি নির্বাচন বাতিলের দাবি জানায় এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন করে নির্বাচনের দাবিতে সরকারকে আলোচনা শুরু করার দাবি অব্যাহত রাখে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনোত্তর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে সহসাই নতুন করে নির্বাচন দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগ্রহ দেখান। রাজনীতিকে অনেকেই ‘গেম’ বলে অভিহিত করে থাকেন। এ গেমে নির্বাচনের পরপরই বিএনপি দম নিতে থাকে। আওয়ামী লীগ বিএনপির দম নেয়ার সুযোগ নিয়ে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করে ৫ বছর আগে নির্বাচন না দেয়ার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করে। বিএনপি একটু দম নিয়ে সংলাপ এবং নতুন করে নির্বাচনের দাবিতে বিগত দুটি ঈদেই ‘ঈদের পর’ সরকারবিরোধী আন্দোলনের হুমকি-ধামকি দিয়েছে। সেসব হুমকি-ধামকি কার্যত ‘অসার’ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এখন আসছে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখটি ঘিরে নতুন করে আন্দোলনের হুমকি-ধামকি দেয়া শুরু করেছে। যেহেতু বিএনপি বিগত এক বছরে সব হুমকি-ধমকিতে ফ্লপ মেরেছে, তাই সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিএনপিকে কাগুজে বাঘ বলে মনে করে। বিগত সময়ে বিএনপি আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও ছাড়া কার্যত কিছু করতে পারেনি। বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে নামেনি। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিএনপির ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পুরোপুরি ফ্লপ হয়েছে। দলীয় এ নাজুক অবস্থা অনুধাবন করে বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের ক্ষেত্রে অনেকটা নমনীয় হয়ে সর্বশেষ শেখ হাসিনা বাদে অন্য কাউকে সর্বদলীয় সরকারের প্রধান করা হলে তা মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মানসিকতা দেখিয়েছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও একটি বড় রাজনৈতিক দল। বিগত সময়ের সংসদ নির্বাচনে এ দুই দলেরই প্রাপ্ত ভোটের হার চল্লিশ শতাংশের ওপরে। বিএনপি ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। বিএনপির অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে এক প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। ভারত ব্যতিরেকে অনেক বিদেশী রাষ্ট্র নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেসব রাষ্ট্র মনোভাব পাল্টাতে শুরু করেছে। নির্বাচন প্রশ্নে চীন, কোরিয়া, জাপানের মনোভাব পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেসব দেশ সফরে গিয়ে বর্তমানে তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার বিষয়টি ঘষামাজা করে ঠিক করে ফেলেছেন। বলা যায়, নির্বাচন প্রশ্নে এখনও নেতিবাচক মনোভাব অটুট রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা, মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন করেই যাচ্ছেন। এমনকি ড্যান মজিনার যিনি স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন, মার্শিয়া বার্নিকাটও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি আশা করেছিল, তারা দেশী-বিদেশী চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার অধীনে নতুন করে নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হবে। তাদের এ আশা যে অচিরেই পূরণ হবে, তারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো বৃহৎ রাষ্ট্র ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নে কঠোর মনোভাব বজায় রাখেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা মাঝামাঝি অবস্থান নিয়েছে। তারা আগামী সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে সংলাপ শুরুর আহ্বান জানাচ্ছেন। হিসাব অনুযায়ী আগামী সংসদ নির্বাচন হতে আরও চার বছর বাকি, তাই সরকার এ বিষয়ে এখনই তাগিদ বোধ করছে না। সময় হলে এ নিয়ে তারা সংলাপ শুরু করতে পারে। আবার সেই সংলাপে যে বিএনপির দাবির প্রতিফলন ঘটবে, তেমন আশা ক্ষীণ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘নির্বাচনকালীন সরকারে’ যোগ দিয়ে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে যারা সঠিক বলে মনে করেন তাদের ধারণা, ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও বিজয় নিশ্চিত ছিল না। অন্তত বিএনপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ের ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াত। ফলে বিএনপি জোটের সরকার গঠনের ভাবনা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। এ মতের সমর্থকদের আরও ধারণা, আওয়ামী লীগ কমপক্ষে ১৫১ আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে সব ধরনের ক্যারিকেচার করত। নির্বাচনকালীন মন্ত্রিপরিষদে বিরোধী দলের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে যতই চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স করা হোক, প্রশাসনিক শক্তি ও গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর সমতুল্য আর কেউ হতে পারেন না। এ অবস্থায় নির্বাচনে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে নির্ভাবনায় থাকা যায় না। বিএনপি নিশ্চয় এ উপলব্ধি থেকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে না পারলেও বর্জন করার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মনে করছে। বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গণতন্ত্রের নামে যেভাবেই হোক রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতায় স্থায়ী হওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করা। রাজনীতির এ খেলায় আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে। তারা সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষার নামে দায়সারা গোছের নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে সরকারের সাংবিধানিক মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ করতে চাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সরকার নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপির দেশী-বিদেশী সব ধরনের পরিকল্পনা ব্যর্থ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বিগত এক বছরে বিএনপি কয়েক দফায় আন্দোলন কর্মসূচি দিলেও তা হালে পানি পায়নি। সরকার বরং বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা অব্যাহত রেখে তাদের দৌড়ের ওপর রেখেছে। বিদেশী প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক ভালো আছে।
পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচনোত্তর পরিবেশ-পরিস্থিতি এখন সরকারের অনুকূলে। এ পরিবেশ দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক, বিএনপির নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। বিএনপি প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়েছে। ভালো কী মন্দ কিংবা স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যা-ই হোক না কেন, বর্তমান সরকারের যদি হঠাৎ বিদায় ঘটে বা বিএনপির দাবি মেনে নিয়ে সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়, সেক্ষেত্রে নির্বাচন বর্জনের বিএনপির সিদ্ধান্ত সঠিক বলে গণ্য হতে পারে। লক্ষণীয়, ধারণাগত দিক দিয়ে বিএনপির নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও সরকার বিএনপিকে কোণঠাসা অবস্থায় রেখে প্রমাণ করতে চলেছে, নির্বাচন বর্জন বিএনপির ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তবে ইতিহাস এখানে কী সাক্ষ্য দেবে, তা দূর ভবিষ্যতে বলা যাবে।
আহমেদ সুমন : গবেষক, বিশ্লেষক

ভারতে ঘর ওয়াপাস্ : শেষ কোথায়? by ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

ভারতে মুসলমান ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করার এক জোরদার তৎপরতা শুরু হয়েছে। কয়েকদিন আগে তাজমহলের নগরী আগ্রায় ৫০টি মুসলমান পরিবারকে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তর করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদে বলা হচ্ছে, অতিশয় দরিদ্র এই ব্যক্তিদের রেশন কার্ড, বাসস্থান এবং তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একটি পূজা অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে পূজা আয়োজকরা বলছেন, এই ব্যক্তিরা আগে হিন্দু ছিল। ৩০ বছর আগে তাদের মুসলমান করা হয়। তারা স্বেচ্ছায় পূজায় অংশ নিয়েছে এবং পূজা শেষে স্বেচ্ছায় হিন্দুত্ব বরণ করে নিয়েছে। তারা তাদের পুরনো ধর্মে ফিরে এসেছে। এটা ধর্মান্তর নয়, স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন, ঘর ওয়াপাস্। যদিও এই কথিত ঘর ওয়াপাসিতে অংশ নেয়া কয়েকজনকে টেলিভিশনে পরস্পরবিরোধী কথা বলতে শোনা গেছে। একজনকে বলতে শুনেছি, তিনি বুঝেশুনেই এ কাজ করেছেন। আবার আরেকজন বলেছেন, তাদের বলা হয়েছিল পূজায় অংশ নিলে খেতে দেয়া হবে এবং তারা অনেক সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তাদের হিন্দু বানানো হবে তা বলা হয়নি। একজন তো চিৎকার করে বলেছেন, আমরা তো মুসলমান, হিন্দু হব কেন? মরে গেলেও হব না।
এ ঘটনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গুজরাটে অনুরূপ একটি অনুষ্ঠানে ২০০ জন উপজাতীয় খ্রিস্টানকে হিন্দু বানানো হয়েছে।
ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনৈতিক সহযোগী আরএসএস এবং বজরং দল এই গণ-ধর্মান্তর কর্মসূচির উদ্যোক্তা।
আগ্রার পর এখন আলীগড়ে আরও বড় আকারে অনুরূপ ধর্মান্তর অনুষ্ঠান আয়োজনের তোড়জোড় চলছে। ২৫ ডিসেম্বর সেখানে ৪০০০ খ্রিস্টান পরিবার ও ১০০০ মুসলমান পরিবারকে একযোগে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথ সেই অনুষ্ঠানে থাকবেন।
বিজেপির আরেক শীর্ষ নেতা সুব্রহ্মনিয়াম স্বামী বলেছেন, বিগত নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতের জনগণ হিন্দুত্ববাদের পক্ষে রায় দিয়েছে। এই বিজয় হিন্দুত্বের বিজয়। কারণ বিজেপির নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর কেন্দ্রীয় ইস্যু ছিল হিন্দুত্ব। খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ভগবত গীতাকে রাষ্ট্রীয় ধর্মগ্রন্থ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। আরেকজন বিজেপি নেতা মোহনলাল বলেছেন, ভগবত গীতা সংবিধানের ওপরে। আরও এক কাঠি এগিয়ে বিজেপির এক রাষ্ট্রমন্ত্রী স্বাধ্বী নিরঞ্জনা জ্যোতি বলেছেন, যারা রামকে মানে না তারা জারজ (বাস্টার্ড)!
নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী বিজেপি এবং তার সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের এই মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি স্বাভাবিকভাবেই ভারতজুড়ে অহিন্দু সংখ্যালঘু জনগণকে চরম শংকা ও অস্থিরতায় নিক্ষেপ করেছে।
আশার কথা, ভারতের প্রায় সব কটি বিরোধী দল এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ভারতের লোকসভায় বিরোধী দলের ১৪০ জন সদস্য এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এ ধরনের গণধর্মান্তরকে বেআইনি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, এর ফলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি বিনষ্ট হবে এবং দেশজুড়ে নৈরাজ্য ও হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের উদ্ভব হবে। তাদের প্রতিবাদের মুখে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পার্লামেন্টের কাজে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ পরিস্থিতিতে চরম বিব্রত অবস্থায় পড়েছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আলীগড়ে ধর্মান্তর অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়া হবে না। কিন্তু ওই অনুষ্ঠানের আয়োজকরা পিছু হঠতে নারাজ। তারা বলছেন, অনুষ্ঠান হবেই। আয়োজকরা ঘোষণা দিয়েছে, ধর্মান্তরে অংশ নিয়ে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করলে বছরে প্রত্যেক মুসলমানকে ৫ লাখ রুপি এবং প্রত্যেক খ্রিস্টানকে ২ লাখ রুপি দেয়া হবে। এই ঘোষণা সংবলিত প্রচারপত্র ব্যাপকভাবে বিলি করা হচ্ছে।
ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ স্পষ্ট। তবে আরএসএস, বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো বিজেপির পেছনের শক্তিগুলোর এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিজেপির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্য সমর্থনের দায় মোদি সরকারকেই বহন করতে হবে।
ভারতে সাম্প্রদায়িকতার এই নব-উত্থান সমগ্র উপমহাদেশের সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে শংকিত করছে। বিশেষ করে উগ্রবাদকবলিত পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দুরা এতে নিরাপত্তাহীনতার আশংকায় আছেন বলে খবর হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে। ভারত সরকারকে আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে দেয়া দরকার। এ ধরনের ঘটনার প্রতিক্রিয়া কোথায় কখন কীভাবে ঘটে বলা মুশকিল।
২.
ধর্মান্তর নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর সব ধর্মেই অতি উৎসাহী ধর্মান্ধ ব্যক্তিরা নিজ ধর্মকে একমাত্র সত্যধর্ম মনে করে। তারা অন্যসব ধর্মের লোকদের নরকবাস সুনিশ্চিত মনে করে এবং অন্য ধর্মের একজনকেও ধর্মান্তরিত করে সঠিক পথে আনতে পারলে নিজের স্বর্গপ্রাপ্তি নিশ্চিত মনে করে। এই পুণ্য অর্জনে তাদের আগ্রহের সীমা থাকে না। সে কারণেই যুগে যুগে ধর্মযুদ্ধে কতই না রক্ত ঝরেছে! কত প্রাণ নিঃশেষ হয়েছে! প্রায়শ এতে রাজনীতি জড়িয়ে যায়। রাজ্য জয় এবং প্রজাদের ওপর কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করার জন্য ধর্মের বন্ধনকে কাজে লাগানো হয়েছে যুগে যুগে। পৃথিবীর বুকে প্রায় সব ধর্মমতই প্রচারিত হয়েছে সমকালীন সামাজিক অবক্ষয় ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে। তাতে মানব সমাজ উপকৃত হয়েছে। কিন্তু এক পর্যায়ে সেই ধর্ম রাজশক্তির প্রজা-শাসনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম, হিন্দুধর্ম কোনোটাই ব্যতিক্রম নয় (সাম্প্রতিককালে মহামতি বুদ্ধের অহিংসার ধর্মের অনুসারীরাও সেই কাতারে শামিল হয়েছে)। কিন্তু আধুনিক কালের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সম-নাগরিকত্বের ধারণার সঙ্গে ধর্ম নিয়ে তেমন বাড়াবাড়ি মোটেই খাপ খায় নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব নাগরিকের নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অবাধ অধিকার
নিশ্চিত থাকবে সেটাই প্রত্যাশিত। দুনিয়ার সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই সেই নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের ঘোষণাও দ্ব্যর্থহীন।
এ অবস্থায় ভারতে এ ধরনের ঘটনা সাড়ম্বরে ঘটছে এবং তা আরও ব্যাপকভাবে ঘটার আশংকা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি যে কোনো বিবেকবান মানুষকেই চিন্তিত করবে।
ভারতে এই গণ-ধর্মান্তরের কারিগরদের বক্তব্য- তারা কাউকে প্রলুব্ধ করে বা জোরজবরদস্তি করে ধর্মান্তরিত করছেন না। কিন্তু বাস্তবে তারা যে প্রলোভন দেখাচ্ছেন এবং চাপ সৃষ্টি করছেন, তা মোটেই লুকায়িত থাকছে না।
কেউ যদি কোনো ধর্মীয় মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বুঝেশুনে নতুন ধর্মে দীক্ষা নিতে চান তাকে বাধা দেয়া নিরর্থক। কিন্তু সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র ও অভুক্ত-অর্ধভুক্ত মানুষকে খাদ্য বা কোনো প্রকার বৈষয়িক সহায়তার বিনিময়ে ধর্মান্তরে রাজি করা জবরদস্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। সেটা সব ধর্মের জন্যই প্রযোজ্য। এ নিয়ে বিশ্বে বিবেকবান মানুষ বরাবর আপত্তি জানিয়ে আসছেন। পশ্চিমের অনেকে খ্রিস্টধর্মের প্রচারকদের ধর্মপ্রচারের জোরালো প্রয়াসকে aggressive proselytisation আখ্যা দিয়ে এর তীব্র বিরোধিতা করে থাকেন। সাম্প্রতিককালে সিরিয়া ও ইরাকের কথিত ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রের মুখে ধর্মান্তরের অভিযোগ উঠেছে। এই কথিত রাষ্ট্র কারা কোন উদ্দেশ্যে করেছে তা স্পষ্ট নয়। এই রাষ্ট্র বিশ্বসভার সমর্থন বঞ্চিত এবং তার শোচনীয় পরিসমাপ্তি খুব দূরে আছে বলে মনে হয় না। মানব সভ্যতার বুকে এই দুষ্টক্ষতটি যত শিগগির দূর হয় ততই মঙ্গল।
বলা হচ্ছে, অতীতে এই উপমহাদেশে সবাই হিন্দু ছিল। মুসলমান শাসকদের আমলে শক্তিবলে এখানকার মানুষকে মুসলমান বানানো হয়েছে। এ বক্তব্য কতটা সঠিক সে বিতর্কে যাব না। ক্ষেত্রবিশেষে রাজশক্তি বা শক্তিমান পক্ষ তেমন কিছু ঘটনা ঘটিয়ে থাকতেও পারে। তবে দুদিন আগে ভারতের এনডিটিভিতে একজন আলোচক যা বলেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। ৮০০ বছর এদেশ পরাধীন ছিল, তখন জোরজবরদস্তি করে মানুষকে মুসলমান করা হয়েছে- এমন
এক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, শক্তি বা প্রলোভন বশে নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা
থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই দলে দলে মানুষ সুযোগ পেয়ে অন্য ধর্মে চলে গেছে।
পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশের জনসমর্থিত ক্ষমতাসীন দল অতীত বা বর্র্তমানের কু-দৃষ্টান্ত তুলে ধরে একই পথে চলতে চাইলে তার চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। একটি অন্যায় আরেকটি অন্যায়ের ছাড়পত্র হতে পারে না। এটা ভারতের জন্যই আত্মঘাতী হবে। কারণ আজকের ভারতে মুসলমান, খ্রিস্টানসহ প্রায় ৩০ কোটি অ-হিন্দু মানুষের বাস। ৩০ কোটি জনসংখ্যাকে সংখ্যালঘু বিবেচনা করা যুক্তিসিদ্ধ নয়। এ ধরনের কর্মসূচিতে ৩০ কোটি মানুষকে ধর্মান্তরিত করতে গেলে তার প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি কী হতে পারে সেটা অনুধাবন করা কঠিন কিছু নয়। তদুপরি, সারা বিশ্বে, বিশেষ করে ভারতের চারপাশে হিন্দুর চেয়ে অ-হিন্দুর সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। সেখানেও ধর্মান্ধতার কোনো কমতি নেই, যেখানে অবধারিতরূপেই প্রত্যাঘাত মাথাচাড়া দিতে পারে।
বিশ্ববাসী আশা করবে, ভারতের জনগণ এই ভয়ংকর পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবেন।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক

শ্বাস যদি নেই সুখে জীবন থাকবে আনন্দে by শুভাগত চৌধুরী

মনে হতে পারে স্বাভাবিকভাবেই যা হয়, যা ঘটে জীবনে, তা আবার শিখতে যাওয়া কেন? শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল ঠিকমতো জানলে, শিখলে জীবন আমূল পালটে যেতে পারে। এই তো এক্ষুনি শরীরের মধ্যে বিশেষ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।
যেদিন জন্ম হল সেদিন থেকেই তো সেই ঘটনার শুরু। নবজাতক শিশুটি কেঁদে উঠল শ্বাসক্রিয়া সূচনার আনন্দেই, নয় কি?
আমরা শ্বাস নিচ্ছি, ছাড়ছি।
প্রশ্ন করি, নিজেকেই, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্যকর তো?
দেহে তো অনেক কিছুই ঘটছে, এর মধ্যে একটি হল শ্বাসক্রিয়া। আমাদের ফুসফুস ভরে যায় বাতাসে, সজীব হয়ে ওঠে আমাদের দেহে প্রবাহিত রক্তস্রোত মহামূল্যবান অক্সিজেনের সঙ্গে মিশে। সম্পূর্ণ জীবনে তো এ কাজই চলছে, কিন্তু শ্বাসক্রিয়ার একজন বিশেষজ্ঞ বলে নিজেকে দাবি করা যায় না তো। আমরা অনেকেই জানি না, অক্লেশে, অনেক সাবলীলভাবে শ্বাসক্রিয়া ঘটতে সাহায্য করে কোন পেশিটি? প্রতিটি নিঃশ্বাস কতক্ষণই বা স্থায়ী হয়? আমরা কি আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে একটু মনোযোগী হয়েছি? মনে হয়, শ্বাসকর্ম সম্বন্ধে আর একটু বেশি করে জানি।
শ্বাসক্রিয়া পুরো শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়াকে দেখার চেষ্টা করি।
শ্বাসগ্রহণ শ্বাস গ্রহণের জন্য ব্যবহার করতে হয় মধ্যচ্ছদা পেশি। একে আবিষ্কার করা চাই। প্রথমে বক্ষফলক, এরপর একটু নিচে যাই কয়েক ইঞ্চি, এরপর আর কোনো হাড় নেই, বক্ষপিঞ্জরের নিচে, তবে নাভির উপর পর্যন্ত।
মধ্যচ্ছদা বা diaphragm হল শ্বসনপেশি, কিন্তু একে আমরা ব্যবহার করি না। বরং আমরা শ্বাস নেই একটু ওপরে বুকের মধ্যে, এতে অনেক চেষ্টা প্রয়োজন আর শ্বাসও বেশ অগভীর হয়। এ যেন পা দুটি না ভেঙে ভারি কোনো কিছু উত্তোলন করা, ভূমি থেকে। আমাদের পিছ-কোমরের ওপর কোনো চাপ না ফেলে আমাদের পা দুটি ভারি ওজন তুলতে কতই না সাহায্য করে। সামান্য কষ্ট ও টেনশন ছাড়াই এ মধ্যচ্ছদা পেশির সাহায্যে গভীর তৃপ্তিকর শ্বাসকর্ম ঘটে যায় অক্লেশে। শ্বাস যখন নেই, শরীরে যে চেতনা বা অভিজ্ঞতা হয়, একে নজর করা চাই। নাকের দুটি ফুটোর মধ্য দিয়ে বাতাস ঢুকছে, অনুভব করি, লক্ষ করি মধ্যচ্ছদা পেশিকে, যখন ধীরে ধীরে এটি ঠেলে ওঠে এবং প্রসারিত করে পাকস্থলীকে।
এরপর বিরতি এ ধাপকে অনেকেই বেশ এড়িয়ে যায়। শ্বাসগ্রহণ বা বর্জনের মধ্যে সামান্য যে সময়, সেই সময়ের মধ্যেই প্রধান সব রাসায়নিকগুলোকে শুষে নেয় ফুসফুস। এ ছাড়া এ সময়টুকু, এই ক্ষণকাল হতে পারে শ্বাসক্রিয়ার সবচেয়ে আনন্দময় অংশ। ফুসফুস দুটি বাতাসে ভরপুর, বিশ্ব তখন সুখে। মহাকাশে মহাপ্যারাসুট থেকে লাফ দেয়ার মুহূর্ত। যেন সময় এখানে স্থির, ওম্ শান্তি ওখানে।
শ্বাস ত্যাগ শ্বাস ত্যাগ করার সময় মধ্যচ্ছদা যখন আরামে পেছনে নিচে যায় তখন ওদিকে নজর করি, পাকস্থলী তো চ্যাপটা হতে চলেছে তখন। লক্ষ করি, নাকের ফুটো দিয়ে বাতাস বের হওয়া শ্বাস ত্যাগের শেষে শুরু হল পরবর্তী শ্বাসকর্ম, শ্বাস ত্যাগের পর খুব বেশি অপেক্ষা গলে পরবর্তী শ্বাসগ্রহণ হতে পারে কষ্টকর।
শ্বাসকর্মের অভিজ্ঞতা শ্বাসক্রিয়ার ধাপে ধাপে এ অগ্রসর যাত্রার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে আমাদের। প্রতিটি ক্ষেত্রে আরও অভিজ্ঞতা হোক- গভীরতা এই শ্বাস হবে পুষ্টিকর ও তৃপ্তিকর। শ্বাস বর্জনের পর পরিতৃপ্তি আসে না? খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে বাইরের সতেজ বাতাস বুক ভরে টেনে নিই। সারা দিনের শ্রেষ্ঠ শ্বাসক্রিয়া ঘটবে তখন।
সময়ের দৈর্ঘ্য পূর্ণ শ্বাসচক্র কত সময় স্থায়ী হয়? সাধারণত মধ্যচ্ছদাপেশিকে ব্যবহার করে একটি গড় শ্বাসগ্রহণে সময় লাগে দু’সেকেন্ড, এক সেকেন্ডে বিরতি এবং আরও দু’সেকেন্ড শ্বাস বর্জন। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস গ্রহণ বর্জন চলুক। বল প্রয়োগের প্রয়োজন নেই।
আরামে আরামে শ্বাসকর্মটি খুব কি চাপের মধ্যে? বেশ ক্লেশকর কি? শরীরের কোনো অংশে কি বেদনা হল? কোনো পেশি কি ক্লান্ত শ্রান্ত? শ্বাসক্রিয়া হওয়া উচিত আয়েশে। অনায়াসে।
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী : পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস, বারডেম

মিলন ও সম্প্রীতির উৎসব by ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী... কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।
৩২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে প্রতিবছর গোটা বিশ্বের খ্রিস্টবিশ্বাসীরা ২৫ ডিসেম্বর যিশুখ্রিস্টের জন্মতিথি পালন করে আসছে। আত্মিক তাৎপর্যের বিবেচনায় খ্রিস্টের পুনরুত্থান উৎসবই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মণ্ডলীর শুরু থেকে যিশুখ্রিস্টের পুনরুত্থান পর্ব বা ইস্টারই সবচেয়ে বড় পর্ব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে ক্রিসমাস বা বড়দিনটিই বেশি জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়। যিশুখ্রিস্টকে খ্রিস্টবিশ্বাসীরা মানবজাতির কাছে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তা বা মুক্তিদাতা বলে বিশ্বাস করে। তাই তন্ন দিন পালন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বড়দিনের পূর্ববর্তী চার সপ্তাহব্যাপী প্রস্তুতিকালকে বলা হয় পবিত্র আগমনকাল। এ সময় খ্রিস্টের তিনটি আগমন-এর কথা স্মরণ করা হয় : ১. ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ২০০০ বছর আগে বেথলেহেমে যিশুখ্রিস্টের জন্ম, ২. সমকালীন ইতিহাসে প্রতিদিন আমাদের জীবনে তার আগমন এবং ৩. জগতের শেষদিনে তার গৌরবময় পুনরাবির্ভাব। আগমনকাল হচ্ছে খ্রিস্টীয় উপাসনাবর্ষের অন্যতম প্রধান প্রস্তুতিকাল। এ প্রস্তুতি মূলত আধ্যাত্মিক, আর এর মূল কথা হচ্ছে মন পরিবর্তন। অন্তরে গভীর প্রত্যাশা নিয়ে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ ও বিশ্ব সৃষ্টির মাঝে মুক্তিদাতাকে বরণ করার আহ্বান জানানো হয় এ আগমনকালে। তার জন্মের প্রত্যাশায় যুগ যুগ ধরে মানবজাতি যে প্রস্তুতি নিয়েছিল, তা-ই স্মরণ করে এ আগমনকাল পালন করা হয়।
ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করে পাপ করার ফলে মানুষের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে; ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে মানুষ পরস্পরের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে তার নিজের অন্তরের পরিবেশও কলুষিত হয়ে পড়েছে। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সর্বত্র : মানুষের মাঝে যে ঘৃণা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ¡-সংঘাত, অমিল, দলাদলি, কলহ-বিবাদ, মারামারি, হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি চলছে, তা-ই এর প্রমাণ। গোটা পৃথিবীটাই হয়ে পড়েছে অশান্ত। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তিলাভের জন্য মানুষ আজ ব্যাকুল। মানুষ চায় শান্তি; তার অন্তরের গভীরতম আকাক্সক্ষা হচ্ছে শান্তি। কিন্তু এ শান্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে ন্যায্যতা, মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমা দেয়া-নেয়ার মাধ্যমে ভগ্ন সম্পর্কের নিরাময়, পুনর্মিলন ও সম্প্রীতি স্থাপন। এজন্যই যুগে যুগে প্রবক্তা ও মহর্ষিরা ভাবী ত্রাণকর্তাকে শান্তিরাজ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং মানুষের মনে তাকে বরণ করার প্রত্যাশা জাগিয়েছেন। প্রবক্তা যিশাইয়া যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৭৪০ বছর আগে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন : “একটি শিশু আমাদের জন্য আজ জন্ম নিয়েছেন, একটি পুত্রকে আমাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। তার স্কন্ধের ওপর ন্যস্ত রয়েছে সবকিছুর আধিপত্যভার। তার নাম : অনন্য মন্ত্রণাদাতা, শক্তিমান ঈশ্বর, শাশ্বত পিতা, শান্তিরাজ! এবার শুরু হবে ... অন্তবিহীন শান্তির যুগ!... ন্যায় ও ধর্মিষ্ঠতার ভিত্তিতে, আজ থেকে চিরকালের মতো।” (যিশাইয়া ৯:৬-৭)। প্রবক্তা যিশাইয়া আরও বলেছিলেন, “শোন, কুমারী কন্যাটি হবে গর্ভবতী; সে এক পুত্র-সন্তান জন্ম দেবে। একদিন সবাই তাকে ইম্মানুয়েল নামে ডাকবে (নামটির অর্থ হল : ঈশ্বর আমাদের সঙ্গেই আছেন।” (যিশাইয়া ৭:১৪)। যিশুখ্রিস্টের মধ্যে এ ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন বলে খ্রিস্টানদের বিশ্বাস। যিশুর জন্মের আগে মহাদূত গাব্রিয়েল মারিয়ার কাছে দেখা দিয়ে বলেছিলেন, ভয় পেয়ো না, মারিয়া! তুমি পরমেশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করেছ। শোন, গর্ভধারণ করে তুমি একটি পুত্রের জন্ম দেবে। তার নাম রাখবে যিশু। তিনি মহান হয়ে উঠবেন, পরাৎপরের পুত্র বলে পরিচিত হবেন। প্রভু পরমেশ্বর তাকে দান করবেন তার পিতৃপুরুষ দাউদের সিংহাসন (লুক ১:৩০-৩২)। যিশুর ঐশী পর স্বর্গদূত রাখালদের কাছে দেখা দিয়ে বললেন, ভয় পেয়ো না! আমি এক মহা আনন্দের সংবাদ তোমাদের জানাতে এসেছি; এই আনন্দ জাতির সব মানুষের জন্যই সঞ্চিত হয়ে আছে। আজ দাউদ-নগরীতে তোমাদের ত্রাণকর্তা জন্মেছেন... তিনি সেই খ্রিস্ট, স্বয়ং প্রভু। এ চিহ্নে তোমরা তাকে চিনতে পারবে : দেখতে পাবে কাপড়ে জড়ানো, জাবপাত্রে শোয়ানো এক শিশুকে (লুক ২:১০-১২)। যিশুতে ঐশী-প্রতিশ্রুতির এ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করেই বড়দিনের উৎসব পালিত হয়। প্রতীকী ভাষায় ঘটনার নাটকীয় বর্ণনার অন্তর্নিহিত ভাব ও তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করাই বড়দিন উৎসব পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
বড়দিনের উৎসবমুখর দিনগুলোতে খ্রিস্টবিশ্বাসীরা যেসব বিষয় নিয়ে ধ্যানমগ্ন বা সমাহিত হয়ে থাকেন তা নিুরূপ-
১. যিশু ত্রিব্যক্তি ঈশ্বরের দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি পাপে পতিত মানবজাতিকে পাপের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছেন। এজন্য তাকে বলা হয় মসিহ বা ত্রাণকর্তা। ঈশ্বরের পুত্র (লুক ১:৩২) বলে তিনি ঈশ্বরকে পিতা বলে ডাকেন এবং তার ওপর বিশ্বাসী মানুষকেও তিনি তা করতে শিক্ষা দেন। খ্রিস্টানদের শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা বলে পরিচিত প্রভুর প্রার্থনায় সন্তানসুলভ মনোভাব নিয়ে যিশু তার আত্মিক বা রূহানি প্রেরণায় সঞ্জীবিত হয়ে ঈশ্বরকে পিতা বলে ডাকতে শিখিয়েছেন, যাতে মানব পরিবারের সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জন্ম নিতে পারে।
২. যিশু ঈশ্বরের জীবনময় বাণী বা কালাম। যোহন তার মঙ্গল সমাচারের শুরুতেই বলেন, আদিতে ছিলেন বাণী; বাণী ছিলেন ঈশ্বরের সঙ্গে, বাণী ছিলেন ঈশ্বর। আদিতে তিনি ঈশ্বরের সঙ্গেই ছিলেন। তার দ্বারাই সবকিছু অস্তিত্ব পেয়েছিল এবং যা কিছু অস্তিত্ব পেয়েছিল, তার কোনোকিছুই তাকে ছাড়া অস্তিত্ব পায়নি (যোহন ১:১-৩)। শয়তান কর্তৃক পরীক্ষিত হওয়ার সময় যিশু বলেছেন, শুধু রুটি খেয়ে নয়, বরং ঈশ্বরের শ্রীমুখে উচ্চারিত প্রতিটি বাণীকে সম্বল করেই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় (মথি ৪:৪)। প্রয়াত পোপ ২য় জন পল তার এক সর্বজনীন পত্রে বলেছেন, মানব পরিবারের সদস্যরা এ বাণী অনুসরণ না করার কারণেই বর্তমানে মানুষের মাঝে গড়ে উঠছে জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুর কালচার বা মৃত্যুর সভ্যতা। বর্তমান বিশ্বে বিরাজমান সহিংসতা, সন্ত্রাস, আÍঘাতী বোমা হামলা, মারণাস্ত্র তৈরি ও ব্যবসা ইত্যাদি সেই ধ্বংসাÍক কালচারের নিদর্শন।
৩. যিশু সত্য। তিনি বলেন, আমিই সত্য (যোহন ১৫:৬)। সৎ বা ভালো যা কিছু তার উৎস একমাত্র ঈশ্বর। আর একমাত্র সত্যই মানুষকে মুক্ত করতে পারে। তোমরা যদি আমার বাণী পালনে নিষ্ঠাবান থাক, তাহলেই তো তোমরা আমার যথার্থ শিষ্য; তাহলেই তো সত্যকে তোমরা জানতে পারবে আর সত্য তখন তোমাদের স্বাধীন করে দেবে (ওই, ৮:৩১-৩২)। বর্তমান সমাজে যে অন্যায়-অসত্য বিরাজ করছে, তা কেবল সত্যের দ্বারাই নির্মূল করা সম্ভব। কূটচাল, ধূর্ততা, বাকচাতুরী দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায় ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত কল্যাণ বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠা করতে হলে সত্যকে অনুসরণ করার কোনো বিকল্প নেই।
৪. যিশুই জীবন। তিনি বলেন, আমিই জীবন (যোহন ১৫:৬), আমি এসেছি যাতে মানুষ জীবন পায়, পুরোপুরিভাবেই পায়! (ওই, ১০:১০)। এখানে জীবন বলতে কোনো জৈবিক সত্তাকে বোঝায় না, বরং মানুষের মনুষ্যত্ব ও আত্মিক বা আধ্যাত্মিক জীবনকে বোঝায়, যার গুণে মানুষ অন্যান্য পশুপক্ষী বা জীবজন্তু থেকে স্বতন্ত্র হয়। এই জীবনের উৎস ও ভিত্তি স্বয়ং ঈশ্বর। যিশু বলেন, আমি আপনাদের সত্যি সত্যিই বলছি, যে আমার কথা শোনে আর যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাকে যে বিশ্বাসও করে, সে শাশ্বত জীবন পেয়েই গেছে। তাকে আর অপরাধীর মতো বিচারে দাঁড়াতে হবে না, বরং এর মধ্যেই সে মৃত্যু থেকে জীবনে উত্তীর্ণ হয়েছে (যোহন ৫:২৪)।
৫. যিশু আলো। তিনি বলেন, আমি জগতের আলো। যে আমার অনুসরণ করে, সে কখনও অন্ধকারে চলবে না; সে তো জীবনেরই আলো লাভ করবে (যোহন ৮:১২)। পাপ-পুণ্য, আলো-অন্ধকার ও ভালো-মন্দের দ্বন্দ¡ অনস্বীকার্য। অন্ধকারকে জয় করতে হলে আলো জ্বালাতেই হবে। বর্তমান সময়ে তাই অনেককেই বলতে শোনা যায়, সমাজের তমসা দূরীভূত করতে হলে আলোকিত মানুষ দরকার।
৬. যিশুখ্রিস্ট মহাযাজক। তিনি ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে একমাত্র মধ্যস্থতাকারী। আমরা তো পেয়েছি এক পরম মহাযাজককে, যিনি আকাশমণ্ডল অতিক্রম করে গেছেন : তিনি ঈশ্বরপুত্র যিশু। ... আমরা এই যে মহাযাজককে পেয়েছি, তিনি আমাদের দুর্বলতার সমব্যথী থেকে অক্ষম নন; বরং আমাদের মতোই তিনিও সবদিক দিয়ে পরীক্ষিত হয়েছেন, কিন্তু থেকেছেন নিষ্পাপ (হিব্রু ৪:১৪-১৫)। খ্রিস্টও তেমনি নিজেই নিজেকে মহাযাজক হওয়ার গৌরবে ভূষিত করেননি; করেছেন তিনিই, যিনি তাকে বলেছিলেন : তুমি আমার পুত্র; আমিই আজ তোমাকে জন্ম দিয়েছি! আবার আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন : যাজক তুমি চিরকালের মতো, মেলখিসেদেকের রীতি অনুসারে (হিব্র“ ৫:৫-৬)। তিনি যাজক হয়েছেন দেহগত জন্মের কোনো নিয়মের জোরে নয়, বরং অবিনশ্বর এক জীবনেরই শক্তিতে (প্রাগুক্ত ৭:১৬)। যিশু যেহেতু চিরজীবী, তার যাজকত্বও চিরস্থায়ী। আর তাই যারা তার মধ্য দিয়ে পরমেশ্বরের কাছে যায়, চিরকালের মতোই তিনি তাদের পরিত্রাণ করার ক্ষমতা রাখেন; কারণ পরমেশ্বরের কাছে তাদেরই হয়ে আবেদন জানানোর জন্য তিনি যে নিত্যই রয়েছেন।
৭. যিশু ভালোবাসা। পরমেশ্বর জগৎকে এতই ভালোবেসেছেন যে, তার একমাত্র পুত্রকে তিনি দান করে দিয়েছেন, যাতে, যে কেউ তাকে বিশ্বাস করে, তার যেন বিনাশ না হয়, বরং সে যেন লাভ করে শাশ্বত জীবন। পরমেশ্বর জগৎকে দণ্ডিত করতে তার পুত্রকে এই জগতে পাঠাননি; পাঠিয়েছিলেন, যাতে তার দ্বারা জগৎ পরিত্রাণ লাভ করে (যোহন ৩:১৬-১৭)। আমাদের প্রতি পরমেশ্বরের ভালোবাসা এতেই প্রকাশিত হয়েছে যে, তিনি তার একমাত্র পুত্রকে এই জগতে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তার দ্বারাই আমরা জীবন লাভ করি (১ যোহন ৪:৯)। যে ভালোবাসে না সে ঈশ্বরকে জানে না। ঈশ্বর ও মানুষকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়, তা আমরা যিশুর জীবন ও কাজের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। তিনি মানুষকে ভালোবেসে নিজের জীবন দান করেছেন এবং আমাদেরও আদেশ দিয়েছেন পরস্পরকে ভালোবাসতে। আমাদের কাছে যিশুর আদেশ হচ্ছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ভালোবাসা, এমনকি শত্র“কেও ভালোবাসা।
৮. যিশু আনন্দ। যিশুর জন্মলগ্নে স্বর্গদূত বললেন, আমি এক আনন্দের সংবাদ তোমাদের জানাতে এসেছি। এই আনন্দ জাতির সব মানুষের জন্যই সঞ্চিত হয়ে আছে (লুক ২:১০)। বড়দিনের আনন্দ তখনই সার্থক হয় যখন আমরা শুধু মৌখিক প্রচারের মাধ্যমে নয়, বরং অপরের সঙ্গে সহভাগিতার মাধ্যমে তা প্রচার করি। যিশু বলেন, পিতা যেমন আমাকে ভালোবেসেছেন, আমিও তেমনি তোমাদের ভালোবেসেছি। তোমরা আমার ভালোবাসার আশ্রয়ে থেকো। যদি আমার সব আদেশ পালন কর, তবেই তোমরা আমার ভালোবাসার আশ্রয়ে থাকবে, আমিও যেমন পিতার সব আদেশ পালন করেছি আর আছি তার ভালোবাসার আশ্রয়ে। এসব কথা তোমাদের বললাম, যাতে আমার আনন্দ তোমাদের অন্তরে থাকতে পারে এবং তোমাদের আনন্দ যেন পরিপূর্ণ হতে পারে (যোহন ১৫:৯-১১)।
৯. যিশু শান্তি। যিশু ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি শান্তিরাজ (যিশাইয়া ৯:৬)। যিশুর জন্মের রাতে স্বর্গের দূতবাহিনী গেয়ে উঠেছিল : জয় ঊর্ধ্বলোকে পরমেশ্বরের জয়! ইহলোকে নামুক শান্তি তার অনুগৃহীত মানবের অন্তরে (লুক ২:১৪)। ঈশ্বর প্রদত্ত এ শান্তি অন্তরে গ্রহণ করলেই মানুষের মন থেকে সব রকম ঘৃণা-বিদ্বেষ দূর হতে পারে। যে সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ মানুষের একান্ত কাম্য তাই বড়দিন উৎসবের অন্যতম প্রধান আশীর্বাদ। মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের পরে শিষ্যদের দেখা দিয়ে যিশু দুবার বলেছিলেন, তোমাদের শান্তি হোক (যোহন ২০:১৯-২১)। তবে যিশুর দেয়া শান্তি আর মানুষের দেয়া শান্তির মধ্যে অনেক পার্থক্য। যিশু বলেন, তোমাদের জন্য শান্তি রেখে যাচ্ছি, তোমাদের দিয়ে যাচ্ছি আমারই শান্তি; অবশ্য এ সংসার যেভাবে শান্তি দেয়, সেভাবে আমি তোমাদের তা দিয়ে যাচ্ছি না (যোহন ১৪:২৭)। যিশুর দেয়া শান্তি হচ্ছে পবিত্র আত্মা বা পাক রূহের বশে চলার ফল (গালাতীয় ৫:২২)। এর বিপরীত হচ্ছে রিপু বা পাপ-স্বভাবের বশে চলা। এর ফলে মানুষের ব্যক্তিজীবনে ও সমাজে নেমে আসে অশান্তি ও অরাজকতা। বড়দিন উৎসবে শান্তি-শুভেচ্ছা বিনিময় যদি কেবল মৌখিক শিষ্টাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে আমরা শান্তি-আশীর্বাদ পেতে পারি না।
মঙ্গল সমাচারে যিশুর জন্ম কাহিনীর বর্ণনায় অনেক প্রতীক ও রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। বড়দিন উৎসবের সময় এ প্রতীকগুলোর অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আকাশে উদিত উজ্জ্বল তারকা প্রকাশ করে যে যিশু হচ্ছেন জগতের আলো। জগতের অন্ধকার দূর করতেই তিনি ইম্মানুয়েল বা আমাদের নিত্যসঙ্গী ঈশ্বর। পূর্বদেশের তিন পণ্ডিত বলতে বোঝায় অযিহুদী। অর্থাৎ যিশু কেবল কোনো এক জাতি বা গোষ্ঠীর ত্রাণকর্তা নন, তিনি সব মানুষেরই মুক্তিদাতা।
আজকাল মুসলমানদের ঈদ ও হিন্দু-বৌদ্ধদের পূজা-পার্বণের মতো বড়দিন উৎসবও কেবল খ্রিস্টানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অখ্রিস্টান প্রতিবেশী ভাইবোন এবং বন্ধু-বান্ধবও বড়দিনের উৎসবে আমন্ত্রিত হন। সবার সঙ্গে বড়দিনের আনন্দ সহভাগিতা করার ফলে আনন্দের মাত্রা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে সব ধর্মের লোকের মাঝে শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড়দিন উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমার দেশবাসী সবার কাছে বড়দিনের শান্তি-শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা, সিএসসি : উপাচার্য, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

চতুর্থ প্রহরে ওবামার চার ছক্কা

বারাক ওবামা
তিন মাস আগেও ভাবা হয়েছিল, ইতিহাসে তাঁর নাম আমেরিকার ব্যর্থতম প্রেসিডেন্টের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু এই বছর শেষ হওয়ার আগেই, তাঁর ক্ষমতার চতুর্থ প্রহরে (দুই মেয়াদে আট বছরের শেষ দুই বছর), প্রবল ছক্কা হেঁকেছেন বারাক ওবামা। একটা নয়, পর পর চারটি। গত সপ্তাহে বর্ষশেষ সংবাদ সম্মেলনে ওবামা মৃদু হেসে বলেছেন, খেলা এখনো বাকি আছে। এ বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ওবামার দল, ডেমোক্রেটিক পার্টি, প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানদের বেধড়ক মারে কার্যত ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ বা সিনেট চলে যায় রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। এই বিপর্যয়ের জন্য সব দোষ পড়েছিল ওবামার ঘাড়ে।
চার বছর আগে, ওবামার শাসনামলের দ্বিতীয় বছরে, মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের হাতছাড়া হয়। সে পরাজয়ের জন্যও তর্জনী তুলে ওবামাকে নির্দেশ করা হয়েছিল। বিপুল ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট হলে কি হবে, কংগ্রেসের সহযোগিতা ছাড়া তাঁর একার পক্ষে করার খুব সামান্যই আছে। ফলে, ধরেই নেওয়া হয়েছিল কংগ্রেসের উভয় কক্ষ হারিয়ে এই লোকটি এখন আস্ত জিন্দা লাশ। সবাইকে ভুল প্রমাণিত করলেন ওবামা। প্রথমে চীনের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা করলেন। এরপর রিপাবলিকান প্রতিবাদ সত্ত্বেও কলমের এক খোঁচায় আমেরিকার ৫০ লাখ অবৈধ অভিবাসীর বৈধকরণের পথ খুলে দিলেন। সে চমক কাটতে না কাটতেই কিউবার সঙ্গে ৫০ বছরের শত্রুতা মিটিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। ভাবা হয়েছিল, বছরের শেষ মাথায় এসে সরকার চালু রাখার জন্য নতুন বাজেট বরাদ্দে রিপাবলিকান নেতৃত্ব সম্মত হবে না। উল্টো, সামান্য গাঁইগুঁই করে সে বাজেটও পাস হলো। ওবামার থলিতে পড়ল চতুর্থ বিজয়। এর সঙ্গে যোগ করুন রাশিয়ার প্রতি ওবামার কঠোর অবস্থান। ওবামা ও তাঁর ইউরোপীয় মিত্ররা ক্রিমিয়া দখল ও ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগে পুতিনের রাশিয়ার বিরুদ্ধে একযোগে যে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেন, তার ফলে সে দেশের অর্থনীতির এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। পুতিন তাঁর হম্বিতম্বি থামাননি, তবে কোনো সন্দেহ নেই, মস্কো এখন সমঝোতার পথ খুঁজছে।
এই সাফল্যও ওবামার থলিতে পড়েছে। দেশের অর্থনীতি থেকেও তাঁর জন্য ভালো খবর এসেছে। বেকারত্ব এখন ৬ শতাংশের কোঠায়, বাজেট ঘাটতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম, মুদ্রাস্ফীতি নামমাত্র। সবচেয়ে বড় কথা, ওবামার সময়ে প্রায় এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। গত চার বছরে প্রতি মাসে গড়ে সোয়া দুই লাখ নতুন চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। আমেরিকার মন্দাবস্থার এক বড় কারণই ছিল গৃহনির্মাণ খাতের কাহিল অবস্থা। সেই খাতেও নতুন গতি এসেছে। ফলে ওবামা মুচকি হাসি তো দিতে পারেনই। এখন ওবামা বেকার বিমা পুনরায় চালু করতে চান, জেলব্যবস্থার সংস্কার চান, ঘণ্টাপ্রতি সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করতে চান ও প্রাক-কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ে শিশু শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার চান। তবে এসব করা খুব সহজ হবে না। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এর কিছু কিছু অর্জন হয়তো সম্ভব, কিন্তু কংগ্রেসের সম্মতি ছাড়া তিনি আর কতটুকুই এগোতে পারবেন। তবে মেঘের আড়ালে আলোকরেখাও রয়েছে। ইতিমধ্যে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যেসব সিদ্ধান্ত ওবামা নিয়েছেন, আমেরিকার মানুষ তাঁকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রমাণ, ওবামার ঊর্ধ্বমুখী জনসমর্থন। দুই মাস আগেও ওবামার জনসমর্থনের হার ছিল ৪০ শতাংশ। বছর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশে।

সিরিয়ায় ধ্বংস হচ্ছে সভ্যতা

সিরিয়ার প্রাচীন শহর পালমিরার একাংশ। দেশটিতে চলমান
যুদ্ধে পালমিরার মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যময় অনেক স্থাপনা
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত ১৪ মার্চ তোলা ছবি। এএফপি
সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধে প্রায় ৩০০ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যময় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থাপনাগুলোর মূল্যবান জিনিসপত্রও লুটপাট হয়েছে। এসব স্থাপনা মানবসভ্যতার প্রথম দিকের ইতিহাস জানান দিত। জাতিসংঘের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইউনিটার) গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানায়। খবর এএফপি ও রয়টার্সের। প্রতিবেদনে বলা হয়, উপগ্রহের মাধ্যমে সিরিয়ার ২৯০টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যময় স্থাপনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে ১৮৯টি স্থাপনা। আর ৭৭টি স্থাপনা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিটার বলেছে, সিরিয়ায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি উদ্বেগজনক বার্তা দেয়। মানবজাতির জন্যই এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এসব স্থাপনার মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনাও রয়েছে। আলেপ্পোর ঐতিহাসিক উমায়াদ মসজিদ,
মরুশহর পালমিরার মন্দিরসহ প্রাচীন বেশ কিছু স্থাপনা ব্যাপক হামলার শিকার হয়েছে। ইউনিটার বলছে, সিরিয়ার সরকারি বাহিনী কিংবা বিরোধীরা, যে যেখানে পেরেছে প্রাচীন দুর্গগুলো নিজেদের সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। এ কারণে প্রতিপক্ষের হামলার লক্ষ্যস্থলও ছিল এগুলো। উদাহরণ হিসেবে আলেপ্পোয় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একটি দুর্গের কথা বলা হয়। সরকারি বাহিনী এটাকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। এ ছাড়া প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো ক্রাক দেশ চেভ্যালিয়ার্স দুর্গে অবস্থান নিয়েছিল বাশারবিরোধী বাহিনী। টানা কয়েক মাস বোমা হামলা চালানোর পর গত মার্চে এর দখল নিতে সক্ষম হয় সরকারি বাহিনী। কিন্তু হামলায় এটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সিরিয়ার প্রাচীন নিদর্শন ও জাদুঘরগুলোর দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রধান কর্মকর্তা মামুন আবদুল করিম বলেন, প্রাচীন অনেক নিদর্শন সুরক্ষায় সেগুলো বিশেষ গুদামে রাখা হয়েছে। এসব নিদর্শনের মধ্যে ১০ হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক নিদর্শনও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পদত্যাগের দাবিতে ২০১১ সালে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা গৃহযুদ্ধে গড়ায়।

করাচিতে ১৩ তালেবান ও আল–কায়েদা নিহত

পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগর করাচিতে গত সোমবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে সন্দেহভাজন অন্তত ১৩ তালেবান ও আল-কায়েদা সদস্য নিহত হয়েছে। এ ছাড়া আজ বুধবার পাকিস্তানে সন্ত্রাস দমনবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সংসদীয় দলের নেতাদের এক বৈঠক আহ্বান করেছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। খবর এএফপি, ডন ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার। করাচির মালির এলাকার জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার (এসএসপি) রাও আনোয়ার জানান, সোমবার দিবাগত রাতে সিন্ধুর রাজধানী করাচির সোহরাব গোথ এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গিদের এক গোপন আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। তাঁর দাবি, অভিযানকালে সেখানে নিষিদ্ধঘোষিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও আল-কায়েদার সদস্যরা বৈঠক করছিল। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, অভিযানের সময় জঙ্গিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করলে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। শুরু হয় দুপক্ষের সংঘর্ষ। এ সময় ওই ১৩ জঙ্গি নিহত হয়। পুলিশ কর্মকর্তা রাও আনোয়ারের ভাষ্য, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নয়জন টিটিপির ও চারজন আল-কায়েদা সদস্য। অভিযানে একজন আত্মঘাতী হামলাকারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, জঙ্গিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক পরিহিত ছিল। অভিযানে আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহৃত জ্যাকেট, গ্রেনেডসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয়। নগরে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এই জঙ্গিরা। পেশোয়ারে ১৬ ডিসেম্বর তালেবানের নৃশংস হামলার পর পাকিস্তানজুড়ে সন্ত্রাসীদের ধরতে জোরালো অভিযান শুরু করেছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। ওই হামলায় ১৩২ স্কুল শিশুসহ ১৪১ জন প্রাণ হারায়।
সন্ত্রাস দমন কর্মপরিকল্পনা: ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাসভবনে আজ সংসদীয় দলের নেতাদের এক বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। সন্ত্রাসী ও চরমপন্থী কার্যকলাপ ঠেকাতে এক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে এ বৈঠকে। দেশের সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনাটি তৈরি করছে সংসদীয় কমিটি। এটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফের সঙ্গেও শলাপরামর্শ করবেন বলে জানা গেছে। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলীর নেতৃত্বে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পার্লামেন্টে সন্ত্রাস দমনবিষয়ক কার্যকরী কমিটির বৈঠক চলছিল। বৈঠকে সংসদীয় সব দলের সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সবাইকে সুরক্ষার আশ্বাস: নওয়াজ গতকাল আশ্বাস দিয়েছেন, প্রত্যেক নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে তাঁর দেশ। এ ক্ষেত্রে কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রগত পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপেক্ষা পবিত্র অন্য কিছু হতে পারে না। পাকিস্তানে সন্ত্রাসের ভয়াল থাবার বিস্তার নিয়ে এক বৈঠকে আলোচনাকালে এই আশ্বাসের কথা জানান নওয়াজ। তিনি আরও বলেন, ‘পেশোয়ার, কোয়েটা ও ওয়াগায় যেসব নৃশংস কর্মকাণ্ড ঘটেছে, আমরা সেগুলো ভুলতে বা ক্ষমা করতে পারব না।’ ইমরান খানের পরিদর্শন: খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পেশোয়ারে গত সোমবার দিনভর সফর করেছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতা ইমরান খান। তিনি তালেবানের হামলার শিকার আর্মি পাবলিক স্কুল এবং হামলায় প্রাণ হারানো শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি যান। এ সময় পরিবারগুলোর শোকসন্তপ্ত সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।

একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা: প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

ভালুকা উপজেলা লবণকোড়া গ্রামে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার প্রধান আসামি হাফিজুর রহমান ওরফে তনুকে (৩৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার রাতে টঙ্গী এরশাদ নগর থেকে লুটের মালামাল ও হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত দা’সহ তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তনু পুলিশের কাছে হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মঈনুল হক তার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, তনু জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানান, সে শ্রমিকদল নেতা বাচ্চুকে (৩৫) দেড় বছর আগে গাড়ির ব্যবসার করার জন্য ৮০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু লাভ-আসল কোন টাকা পরিশোধ না করায় অর্থ কষ্টে দিন কাটান সে। এনিয়ে বিরোধ চলছিল। পাওনা টাকা না পেয়ে এক পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দুই দিন আগে থেকে বাচ্চুর সঙ্গে অবস্থান করেন তিনি। গত ১৫ই ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাস নিয়ে বাড়িতে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতেই দা দিয়ে কুপিয়ে রফিকুল ইসলাম বাচ্চুকে হত্যা করেন। পরে ঘরে প্রবেশ করে বাচ্চুর স্ত্রী পারুল আক্তারকে (২৮) কুপিয়ে হত্যা করেন। তাদের শিশু কন্যা জিনিয়া আক্তার (৬) ও রিভা আক্তারকে (১৮মাস ) শ্বাসরোধ হত্যা করেন তনু। হত্যার পর তার ভায়রা ভাই রফিকুল ইসলামের সহয়োগীতায় নিহত বাচ্চুর ঘরের টিভি, নগদ টাকা, কাপড়-চোপড় ও স্বর্নালংকার নিয়ে ভোর রাতে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ভালুকায় থানায় হত্যা মামলা দায়েরের পর ১৭ই ডিসেম্বর ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে নেত্রকোনা শহর ও জেলার পুর্বধলায় অভিযান চালিয়ে মূল হত্যাকারী গার্মেন্ট শ্রমিক তনুর স্ত্রী হোসনা, ভায়রা ভাই রফিকুল ইসলাম রফিক ও তার স্ত্রী জোসনাসহ ৩জনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তাদের তথ্য মতে তনুর শ্বশুরবাড়ি নেত্রকোনা সদর উপজেলার মৌজাবালি থেকে লুট হওয়া একটি টেলিভিশন, একটি টেপরেকর্ডার ও কাপড়-চোপড় উদ্ধার করা হয়। হাফিজুর রহমান তনু যশোর জেলা সদরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়া (আমতলা মোড়) এলাকার বাসিন্দা মৃত খন্দকার শামছুর রহমানের পুত্র।

ভারতে জোর করে ধর্মান্তর

‘চোর এখন ধরা পড়েছে। আমার মাল চোরের কাছে। আর এটা বিশ্ব জানে। আমি আমার মাল ফেরত নেব। এটা এমন কী বড় ব্যাপার।’ কথাগুলি বলেছেন ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতা মোহন ভাগবত। ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ আর এস এসের প্রধান। রাজনৈতিক ইস্যু করতে মানুষকে ‘মালের’ সঙ্গে তুলনা করার জন্য শুধু এই বিবৃতি আপত্তিজনক নয়, এতে রয়েছে তাবৎ সংখ্যালঘু মানুষদের প্রতি সরাসরি হুমকি। ভাগবত আরও বলেছেন, ‘খামোকা আমরা ভয় পেতে যাব কেন? আমরা তো অণুপ্রবেশকারী নই, আমরা বিদেশীও নই। এটি একটি হিন্দু রাষ্ট্র।’ কয়েক দশক আগে ভাগবতের পূর্বসূরি মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার লিখেছিলেন ‘উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’। আমরা বা আমাদের জাতিত্বের সংজ্ঞা। হিটলার তার কাছে ছিল নায়ক। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোদি হিটলারকে মনে করেন প্রেরণা, লিখেছেন তার জীবনী। আর এস এসের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকার বলেছিলেন, বিদেশীদের জন্য দু’টি পথই খোলা আছে: হয় ভারতীয় জাতির সঙ্গে মিশে যেতে হবে, গ্রহণ করতে হবে তার সংস্কৃতি, অথবা থাকতে হবে দয়ার উপর। ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ হিসেবে। এবং এখানে ‘ঘর ওয়াপসি’তে কোনো ভুল নেই। তথাকথিত ‘ঘরে ফেরার কর্মসূচি’, যার আগ্রাসী অনুশীলনে মরিয়া সঙ্ঘপরিবার। যা গোলওয়ালকারের ‘মিশে যাওয়ার’ তত্ত্বের নতুন পরিশব্দ। এই ধর্মান্তর হচ্ছে চোখ রাঙিয়ে, হুমকি দিয়ে। এই ধর্মান্তর হচ্ছে সামাজিক ও শারীরিক চাপ প্রয়োগ করে। কলকাতার সভায় ভাগবতের এই বিবৃতি সংবিধান বিরোধী। দু’টি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ তৈরির দায়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উচিত ছিল তার বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩(এ) উপধারায় মামলা করা। সমস্ত ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচিই একইভাবে বেআইনি এবং আইনের লঙ্ঘন। ‘ঘর ওয়াপসি’তে নেই কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস। এটি সরাসরি একটি রাজনৈতিক স্লোগান। হিন্দুত্বের বিকৃত চোখে ইতিহাস দর্শন। যার দাবি, সমস্ত ভারতীয়র রয়েছে ‘হিন্দু শিকড়’, ‘হিন্দুদের জোর করে ইসলাম ও খ্রীস্টান ধর্মে’ ধর্মান্তর করা হয়েছে, যা ‘বিদেশীদের’ ধর্ম, সেকারণে সবাইকে হিন্দুত্ব পরিবারের ‘ঘরে’ ফিরিয়ে আনা হলো জাতীয় কর্তব্য। বিজেপি শাসিত রাজ্যে ধর্মান্তর-বিরোধী আইনের লক্ষ্য খ্রীস্টান ও মুসলিম ধর্মান্তরকরণ, যেখানে তথাকথিত ঘরে ফেরার ডাক, ‘শুদ্ধিকরণ’ কর্মসূচি নিয়মিত হচ্ছে আইনের আড়ালে। ভাগবত যখন অমিত শাহ, ভেঙ্কাইয়া নাইডুর মতো ‘ধর্মান্তর-বিরোধী আইন’ বিরোধীদের মেনে নিতে বলেন, তখন স্বাভাবিক প্রশ্ন: তারা কি ঘর ওয়াপসি-কে ‘বলপূর্বক ধর্মান্তর’ বলে তাতে যুক্ত করবেন? তাদের জবাব দিতে হবে ভারতীয় সংবিধানের ২৫নম্বর ধারাকে কি তারা ঊর্ধ্বে তুলে ধরবেন? আসলে ধর্মান্তরকরণ সম্পর্কে দ্বিচারিতার পথ নিয়েছে বি জে পি এবং আরএসএস। দু’মুখো কথা বলছে। একদিকে পুনর্ধর্মান্তরকরণ প্রচার চালাচ্ছে, আবার একইসঙ্গে বলপূর্বক ধর্মান্তর নিষিদ্ধ করতে একটি আইন তৈরির দাবি জানাচ্ছে। বাস্তব হলো ভারতে এমন কোনো আইনের আদৌ প্রয়োজন নেই। কারণ চলতি আইনেই এই অন্যায় মোকাবিলার সংস্থান রয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ২৫নম্বর ধারায় ‘ধর্মাচরণ, ধর্মীয় বিশ্বাস বেছে নেওয়া ও অনুসরণের অবাধ অধিকার এবং ধর্মীয় প্রচারের স্বাধীনতা’ স্বীকৃত হয়েছে। বলপূর্বক ধর্মান্তরের কোনো ঘটনা ঘটলে তা ইতোমধ্যেই ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩(এ) উপধারায় আনার সংস্থান রয়েছে। এই উপধারা অনুযায়ী ধর্মের নামে বলপ্রয়োগ করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। বরং, এই আইন প্রয়োগ করেই আর এস এস মদতপুষ্ট পুনর্ধর্মান্তরকরণ প্রচার অবিলম্বে নিষিদ্ধ করা উচিত। ঘর ওয়াপসিকে বেআইনি ঘোষণা করা উচিত। কারণ এই ধরনের অপতৎপরতা গোটা উপমহাদেশেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং সঙ্কটের জন্ম দেবে।

সংঘ পরিবারের মুখে লাগাম পরাতে পদত্যাগের হুমকি মোদির

বিজেপির এমপিদের মুখ থেকে বেরুনো কুরুচিকর মন্তব্যকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করলেও সংঘ পরিবারের সংগঠনগুলোর নেতাদের হিন্দুত্বের জিগির নিয়ে প্রবল অস্বস্তিতে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ধর্মান্তরকরণ নিয়ে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু মহাসভা ও বজরং দলের নেতারা যেভাবে মেদিনী কাঁপাতে শুরু করেছেন তাতে সরকারের ভাবমূর্তিতে যে কালি লাগছে সেটা মোদি ভালই বুঝতে পারছেন। আর তাই সংঘ পরিবারের নেতাদের মুখে লাগাম পরাতে এবার পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। কয়েকদিন ধরে ধর্মান্তরকরণ ইস্যুতে সংঘ  পরিবার যত তাদের নাছোড়বান্দা মনোভাব দেখিয়েছে, সংসদে তত বিপাকে পড়েছে বিজেপি। গেরুয়া বাহিনীর জোর করে ধর্মান্তরণের তীব্র প্রতিবাদ করে বারবার সংসদ অচল করেছে বিরোধীরা। নিশানায় স্বভাবতই বিজেপি। আর এতেই বেজায় চটেছেন মোদি। বারবার বলা সত্ত্বেও মুখ বন্ধ করতে রাজি হন নি সংঘ নেতারা। এর পরেই মোদি স্বমূর্তি ধারণ করেছেন বলে খবর দিয়েছে একটি মারাঠি সংবাদপত্র। মহারাষ্ট্র টাইমসে প্রকাশিত একটি খবরে দাবি করা হয়েছে, আরএসএস নেতাদের সঙ্গে একটি বৈঠকে এই বিষয়ে নিজের হতাশা জানিয়েছেন মোদি। প্রধানমন্ত্রী এই বৈঠকে জানিয়েছেন সংঘ  নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে যদি তার সরকারের ইমেজে কালি পরে তাহলে পদত্যাগ করতেও তিনি পিছপা হবেন না। এই খবরেই জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর হুমকিতে নাকি আপাতত কিছুটা পিছু হটেছে আরএসএস। ক্ষমতায় আসার পর ভোট বাক্সের দিকে নজর দিয়ে উপর উপর নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর বিজেপি। ‘আচ্ছে দিন’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিল্লির মসনদ দখল করেছিল বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ। বিজেপি নেতাদের মতে, আরএসএস-এর ‘ধর্ম জাগরণ মঞ্চ’-এর ‘ঘরে ফেরা’-র জিগিরে নষ্ট হচ্ছে সেই ভাবমূর্তি। সংঘ নেতাদের একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বিজেপির গায়ে আবার এসে সাঁটছে হিন্দু ধর্মান্ধতার তকমা। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পদত্যাগের হুমকির কথা সত্যিও হয় তা আসলে মোদির এক নয়া গিমিক। তবে মোদি  এখন উন্নয়নের ইস্যু থেকে দেশবাসীর চোখ সরাতে নারাজ। নিজেদের অবস্থান বজায় রেখে অন্যান্য রাজ্য দখলের লড়াই জারি রাখতেই সংঘ নেতাদের মুখ বন্ধ চান তিনি।

দেশরক্ষায় সেনাবাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে -প্রধানমন্ত্রী

চট্টগ্রামে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি আয়োজিত লংকোর্স ও রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ রক্ষায় সেনাকর্মকর্তাদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনা সদস্যদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরকে নিঃস্বার্থভাবে জনগণের সেবা করতে হবে। কখনওই পিছপা হওয়া যাবে না।  তিনি গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত ৭১তম বিএমএ লংকোর্স এবং ৪২তম বিশেষ কোর্সের রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের ভাষণে এসব কথা বলেন। এই সময় অন্যান্যের মধ্যে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া ও বিএমএ কমান্ড্যান্ট মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিবর্গ, উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবর্গ, কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকেই অংশ নেন। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশে ও বিদেশে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে তাদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের জন্য সকল মহলের প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বের যেকোন এলাকার জনগণ বাংলাদেশ  সেনাবাহিনীকে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে জানে। তারা সব সময় দেশের যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অসহায় মানুষের পাশে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায়, সড়ক, ফ্লাইওভার এবং অবকাঠামো নির্মাণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও ট্রাফিক জ্যাম নিরসন, হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন, ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট তৈরিতে দক্ষতা ও সফলতা দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বে এখন একটি প্রতিশ্রুতিশীল ও শান্তিপূর্র্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আমাদের দেশ এখন জাতিসংঘ শান্তি মিশনে সর্বোচ্চ সংখ্যক সৈন্য পাঠিয়ে বিশ্বে শান্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শেখ হাসিনা সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৯৯৬-২০০১ সালের মেয়াদকালে তার সরকার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড  টেকনোলজি, সশস্ত্র বাহিনী  মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ পিস সাপোর্ট অপারেশনের  ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, এনসিও একাডেমি, বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টার ও ট্রাস্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে।
তিনি বলেন, পাশাপাশি এরিয়া সদর দপ্তরসহ ৬টি নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া রামুতে একটি নতুন ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।  দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এ ধরনের একটি ডিভিশন গঠন করা হবে। পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা ও তদারকির জন্য ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে নতুন ট্যাংক, এপিসি, মাল্টি-ব্যারেল রকেট লাঞ্চারসহ বহু অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সংযোজন করার কথা জানান।