Sunday, June 29, 2014

নারায়ণগঞ্জ উপনির্বাচন- স্বতঃসিদ্ধ ​বিষয় হয়ে উঠছে ব্যতিক্রমী by আলী রীয়াজ

জাতীয় সংসদের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনের ফলাফল যে রকম হবে বলে অনুমান করা হয়েছিল, তা থেকে ভিন্ন হয়নি। এক অর্থে ৫ জানুয়ারির সঙ্গে এই ফলাফলের অসংগতি নেই। এই নির্বাচনের আগে সংঘটিত ঘটনাবলি, বিশেষ করে সাত খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে কারও কারও মনে এই আশা তৈরি হয়েছিল যে সেখানকার সাধারণ ভোটাররা সম্ভবত ভিন্ন কোনো ফল তৈরিতে অগ্রণী হবেন। এই আশার পেছনে অতীতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে হারিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয়ের বিষয়টিও কাজ করেছে। কিন্তু ফলাফল এবার আর নাটকীয় হয়নি। সাধারণভাবে এই নির্বাচনের বড় দিক হলো এই যে সেখানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। ভোটে কারচুপি হয়েছে বলে পরাজিত প্রার্থীর বক্তব্যকে আমরা যদি ধর্তব্যের মধ্যে না-ও নিই, তাও বলতে হবে যে এই নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন রকম হওয়ার প্রত্যাশা বিরাজমান রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী নিজে যেখানে একটি পরিবারের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, সেখানে এই পরিবারের কোনো সদস্যের পরাজয়ের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবোচিত তা কম-বেশি সবাই বুঝতে পারেন।

>>নারায়ণগঞ্জ–৫ উপনির্বাচনে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় একটি ফাঁকা ভোটকেন্দ্র
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলের চেয়ে বেশি যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে তা হলো একজন পুলিশ অফিসারের বক্তব্য। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ‘ভোটকেন্দ্র দখলের সুযোগ না দেওয়ায়’ নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. বশিরউদ্দীনকে মুঠোফোনে হুমকি ও গালিগালাজ করেছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করে পুলিশ কর্মকর্তাকে কাবু করার চেষ্টা করেন বলেই পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্যে মনে হয়। এই ধরনের চাপের মুখে এএসপি বশিরউদ্দীন তাঁর অবস্থান থেকে সরে যাননি। তিনি যে ভূমিকা নিয়েছেন তা এখন অনেকের আলোচনার বিষয়, সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে বিস্তর প্রশংসাও করা হচ্ছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কেবল যে অস্বীকারই করেছেন তা-ই নয়, তিনি জানিয়েছেন যে ওই পুলিশ কর্মকর্তার ‘অনৈতিক কাজের’ ব্যাপারে তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলকে জানিয়েছেন। সাংসদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ডিপার্টমেন্টাল ইনকোয়ারি শুরু হয়েছে এবং তারা মনে হয় কিছু প্রমাণও পেয়েছে।’ বাংলাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ব্যাপারে এত দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের উদাহরণ আর কতটা আছে তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।

পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী তিনি যে কথাগুলো বলেছেন তার মধ্যে তিনটি বিষয় রয়েছে, যা সবার ভালো করে লক্ষ করা দরকার; কেননা এর মধ্যেই আছে সবার গ্রহণযোগ্য এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের সূত্র। প্রথমত, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বলেছেন যে নির্বাচনের দিনে তিনি একজন ভোটার এবং এর বেশি কিছু নন। তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগে যেমন কেউ বাধা দিতে পারেন না, তেমনি তিনিও অন্য কারও ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দিতে পারেন না। নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া আর সব নাগরিকের পরিচয় যে ভোটারের চেয়ে বেশি কিছু নয়, সেটা হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রথম শর্ত। এর ব্যত্যয় মানেই হলো নির্বাচনের ওপরে শক্তিশালী গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার; সেখানে ক্ষমতাসীনেরা বেশি সুবিধা পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, তিনি সংসদ সদস্যকে বলেছেন যে তিনি নির্বাচন কমিশনের অধীন, ফলে অন্য কারও আদেশ-নির্দেশ শুনতে তিনি বাধ্য নন। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রশাসনকে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দিলে যে চিত্রটি দাঁড়াবে আমরা তাঁর বক্তব্য থেকে বুঝতে পারি। তৃতীয়ত, তিনি বলেছেন আমি প্রজাতন্ত্রের চাকরি করতে এসেছি। সরকারি কর্মকর্তারা যে আসলে কোনো দলের নন; এমনকি নির্বাচিত সরকারের অন্যায্য কাজেরও তল্পিবাহক নন, সেটা নিশ্চিত করা গেলে কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন নয়, সুশাসনও নিশ্চিত হবে। এই তিনটি বিষয়কে আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনা না করে এগুলোকে একত্রে বিবেচনায় নিয়ে একবার ভেবে দেখুন একটি নির্বাচনের কী রূপ দেখতে পাবেন।

অনেকেই বলবেন যে এগুলো কোনো নতুন বিষয় নয়; আমরা সবাই তা জানি। এটাই বলবেন যে এমন অবস্থা বাংলাদেশে যে ছিল না তা-ও নয়। নিঃসন্দেহে এগুলো সবার জানা বিষয়। যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এগুলো স্বাভাবিক বলেই বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো এই, যা হওয়ার কথা অতি-স্বাভাবিক, সেই কথা বলার জন্যই এখন একজন সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা খবরে পরিণত হয়েছেন এবং সবার প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। যা হওয়ার কথা স্বতঃসিদ্ধ, তা হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী; এতেই বিরাজমান পরিস্থিতির চিত্রটি বোঝা যায়। তার চেয়েও বড় বিষয় হলো যে ভবিষ্যতে যদি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হয়, তবে এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করার আর কোনো বিকল্প নেই। ৫ জানুয়ারিতে যেমন তা নিশ্চিত হয়নি, তেমনি একটি উপনির্বাচনেও তার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। এই বৃত্তচক্র থেকে বেরোবার পথ কী—সেটা যেমন প্রশ্ন, তেমনি প্রশ্ন হলো, এই অবস্থার সুবিধাভোগীরা তা থেকে বেরোতে দিতে চান কি না।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

এক ভাগ্যবিড়ম্বিত নায়কের প্রস্থান by সাজেদুল হক

প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা। কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। শনিবারের রাত এক ভাগ্যপ্রবঞ্চিত নায়কের জন্য শেষ পর্যন্ত তাহলে দাহই লিখে রেখেছিল। খেলা শুরু আর শেষের দৃশ্য আপনি কিভাবে মেলাবেন? ফুটবল কখনও কখনও খুবই নিষ্ঠুর? কান্না আর অশ্রুও বিশ্বকাপ কম দেখেনি। তাই বলে খেলা শেষে দুই দলের খেলোয়াড়রাই যোগ দেবেন একই স্রোতে? ভেঙে পড়বেন কান্নায়? তাও কি আবার হয়? যদিও দুই দলের কান্নার উৎস আলাদা। ক্রসবারে লেগে ইতিহাস থেকে দুই ইঞ্চি দূরে আটকে যাওয়ার শোকে মূহ্যমান চিলির খেলোয়াড়রা। আর ব্রাজিলিয়ানদের কান্না? এতো মুক্তির আনন্দ অশ্রু। বেলো হরিজন্তের মিনেইরো স্টেডিয়ামে যে ট্র্যাজেডি হতে হতেও হলো না।

ব্রাজিল তো ব্রাজিলই। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপে বারবার ব্রাজিলের কাছে পর্যুদস্ত হয়েই বিদায় নিতে হয়েছে চিলিকে। তবে এবার নতুন করে ইতিহাস লেখার পণ করেছিল চিলি। বিশেষ করে আলেক্সিস সানচেজ। চিলির ইতিহাসে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় তিনি। রেকর্ড দামে বার্সোলোনায় নাম লেখানো সানচেজ যদিও লিওনেল মেসি অথবা পাবলো নেইমারের মতো অতো প্রচারের আলোয় আসতে পারেননি। শনিবার রাতে খেলতে নামার আগে কিছুক্ষণ খোশগল্পে মেতে উঠেছিলেন বার্সা সতীর্থ নেইমার আর দানি আলভেজের সঙ্গে। তবে সানচেজ জানতেন প্রবল-প্রমত্ত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কিছু করতে হলে ম্যাজিক তাকেই দেখাতে হবে। খেলা শুরুর পরপরই অবশ্য ঢেউয়ের মতো চিলির রক্ষণদুর্গে একে একে হামলে পড়ছিলো ব্রাজিলের আক্রমণ। শুরুতেই গোলের দেখা পেয়ে যায় ব্রাজিল। প্রথমার্ধের ১৮ মিনিটের সময় ডেভিড লুইস গোল করে এগিয়ে দেন ব্রাজিলকে। হলুদ উৎসবে মেতে ওঠে মিনেইরো স্টেডিয়াম। এ গোলের পরই মরিয়া হয়ে ওঠেন সানচেজ। ৩২ মিনিটে সে সুযোগ এসে যায়। ব্রাজিলের রক্ষণের ভুলে বল পেয়ে যান চিলির ভারগাস। তার থ্রু ধরে অসম্ভব ঠা-ামাথায় বল ব্রাজিলের জালে পাঠান সানচেজ।
গোলই ফুটবলে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গোলই সব নয়। অন্তত ফুটবল রোমাঞ্চ পিপাসুদের কাছে তো নয়ই। আর স্কিল বলুন, প্রতিভা বলুন, জিনিয়াস বলুন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয় সবচেয়ে কঠিন সময়ে, সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই। ব্রাজিল-চিলির ম্যাচটিকে অনেকেই অভিহিত করেছিলেন নেইমার বনাম সানচেজ ম্যাচ হিসেবেও। যদিও ম্যাচের প্রায় প্রতিটি ক্ষণেই উজ্জ্বলতার দিক থেকে নেইমার ম্লান ছিলেন সানচেজের কাছে। দুই-তিনজন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিং করেও বল নিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে সানচেজকে। এ যেন বলকে পোষ মানানো এক শিল্পীর মায়ার প্রদর্শনী। যদিও এটা সত্য নেইমারের মতো ওতো ট্যাকল তাকে সহ্য করতে হয়নি। নকআউট পর্বের এ ম্যাচে যখনই নেইমারের পায়ে বল গেছে তখন তাকে ট্যাকল করে সামলানোর চেষ্টা করেছেন চিলির ফুটবলাররা। বেশ কয়েকবারই অসহ্য যন্ত্রণায় কোকড়াতে দেখা গেছে এই তারকাকে। তবে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটাইতো গ্রেটদের কাজ। শনিবার রাতে চিলির প্রায় প্রতিটি আক্রমণেরই উৎস ছিলেন সানচেজ। যেন যেখানে বল সেখানেই এই প্লে-মেকার। সানচেজ হয়তো জানতেন একমাত্র তিনিই পারেন ব্রাজিলিয়ানদের চ্যালেঞ্জ করতে। তবে দুর্ভাগ্য তাকেও তাড়া করে ফিরেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কখনও কখনও দেরিও করেছেন। যদিও গোলের সুযোগ ব্রাজিলিয়ানরাই পেয়েছিলেন বেশি। ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটন। ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি যতটা বিরক্তিকর ছিলেন সাংবাদিক হিসেবে ততটাই আকর্ষণীয়। আত্মজীবনী ‘ওপেনিং আপ’-এ তিনি লিখেছেন, তার সময়ে শুধু দু’জন খেলোয়াড়ের মধ্যে তিনি টাচ অব জিনিয়াস খুঁজে পেয়েছেন। তাদের একজন ব্রায়ান লারা, আরেকজন মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন। রেকর্ডবুক নিশ্চিতভাবেই ব্রায়ান লারার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে, মোহাম্মদ আজহার উদ্দিনের পক্ষে নয়। কিন্তু যারা আজহারউদ্দিনের খেলা দেখেছেন তারা মানবেন, রেকর্ডই সব নয়। ব্যাটসমান পরিচয় ছাপিয়ে আজহার উদ্দিন পরিণত হয়েছিলেন একজন ব্যাটিং শিল্পীতে। যার ব্যাটিং দেখে মনে হতো তিনি বলকে আদর করছেন।
আলেক্সিজ সানচেজ অবশ্যই আজহার উদ্দিন নন। কিন্তু ফুটবল বলুন আর ক্রিকেট বলুন, খেলাতো খেলাই। শেষ পর্যন্ত রেকর্ড ছাপিয়ে খেলার নান্দনিক সৌন্দর্যই মনে রাখে মানুষ। যে কারণে শনিবার রাতে সানচেজের খেলায় ফোটে টাচ অব জিনিয়াসের সৌন্দর্য। ২৫ বছর বয়সী এ বার্সোলোনা তারকাকে নিয়ে এরই মধ্যে আর্সেনালসহ ইংলিশ ক্লাবগুলো টানাটানি শুরু করেছে। চিলি-ব্রাজিল ম্যাচে রাতভর মাঠ মাতিয়ে রাখলেও শেষ পর্যন্ত সানচেজ এক ট্র্যাজিক হিরোর নাম। পেনাল্টি স্পেশালিস্ট হওয়ার পরও কাল টাইব্রেকারে গোল মিস করে বসলেন তিনি। এ যেন এক নান্দনিক ফুটবলারের সঙ্গে নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস। ২৮শে জুন রাতটি অন্যরা যেভাবেই মনে রাখুন না কেন, চিলির মানুষ একে মনে রাখবে ইতিহাস থেকে দুই ইঞ্চি দূরত্বে থেমে যাওয়ার রাত হিসেবে। কিন্তু কেন? অতিরিক্ত সময় শেষ হতে তখন আর দুই মিনিট বাকি। চিলির পিনিলার শটটি বারে না লাগলে তো ব্রাজিলিয়ান ট্র্যাজেডি কাল লেখাই হয়ে যেতো। এক ভাগ্যবিড়ম্বিত নায়ক সানচেজের বিদায়ে রাতে ব্রাজিল ট্র্যাজেডি আর লেখা হয়নি। লেখা হয়েছে এক ট্র্যাজিক হিরোর প্রস্থানের গল্প।

তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটরাই পারেন by মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী

তরুণ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ে আমি খুব স্বপ্ন দেখি। প্রশাসনে তাঁরা নতুন এবং বয়সে ঝকঝকে তরুণ। তাঁদের মনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যত আভা, তার চেয়ে অনেক বেিশ জাতির প্রত্যাশা। ক্ষুদ্র শাসনক্ষমতা নিয়ে যে ম্যাজিস্ট্রেটদের আত্মপ্রকাশ, পরবর্তী কালে শীর্ষ আমলা হিসেবে ঘটে তাঁদের পরিপূর্ণ বিকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিিগ্রপ্রাপ্ত মেধাবীরা সামাজিক মর্যাদার আকর্ষণে সিভিল সার্ভিসে আসেন।
প্রশাসনের প্রারম্ভিক পদে এসে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অপরাধ উদ্ঘাটনে এবং অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা পান। জনগণের প্রত্যাশা, মোবাইল কোর্ট অভিযান স্বজনপ্রীতি, ভীতি ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকবে। অপরাধীদের শুধু শাস্তি দেওয়া মোবাইল কোর্টের ম্যান্ডেট নয়। অপরাধ নির্মূল, অপরাধীর সংশোধন এবং পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া মোবাইল কোর্ট নিষ্ফল অভিযানে পরিণত হতে বাধ্য।
ভেজাল খাদ্য ও পরিবেশদূষণ নিয়ে মানুষের যে অন্তহীন যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ, তার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট এক শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ। মানুষের অসহায়ত্বের সমব্যথী হয়ে ভেজালের বিষাক্ত ছোবল এবং পরিবেশদূষণের নরকযন্ত্রণা থেকে নাগরিকদের মুক্ত করাই ম্যাজিস্ট্রেটদের ম্যান্ডেট।
প্রশাসনে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রশিক্ষণে বারবার শপথ করানো হয়, ‘অন্যায় প্রভাববলয় থেকে মুক্ত থেকে নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রভাবশালীর ভয়ে অপরাধীকে ছাড় দেওয়া যাবে না।’ শঙ্কাতাড়িত হয়ে অনেকে প্রশ্ন করেন, সৎ থেকে একক ভূমিকায় কীভাবে যুদ্ধ করবেন? কর্মস্থলে তাঁদের কী নিরাপত্তা? বিপদে তাঁদের সঙ্গী কে? নৈতিক সমর্থন দিয়ে তাঁদের বলি, নিষ্ঠা ও সততাই ম্যাজিস্ট্রেসির শক্তি এবং নিকষ অন্ধকারে আলোক রশ্মি।
সততা এমন শক্ত শিরস্ত্রাণ, যেখানে আঘাত করার সাহস কেউ পায় না। দৃঢ় মনোবল ও অদম্য সাহস থাকলে হিমালয়ের মতো উঁচু হয়ে দাঁড়ানো যায়। অপরাধী প্রভাবশালী বা আত্মীয়-পরিজন হলেও রেহাই দেওয়া যাবে না। সততা-নৈতিকতার এখানেই অগ্নিপরীক্ষা, শুধু ঘুষ না নেওয়াই সততা নয়। বিবেক, সততা ও মেধাই রুখবে সব দুর্লঙ্ঘ্য বাধা। মোবাইল কোর্টের আদেশ শিরোধার্য। এ আদেশ কোনো অনৈতিক চাপে পরিবর্তন হবে না। তাৎক্ষণিক অভিযান, দণ্ড প্রদান এবং তাৎক্ষণিক সমাধান।
২০১১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক অভিযানে ধলেশ্বরী নদী থেকে মাত্র অাট ঘণ্টার মধ্যে একটি ইটভাটা চূর্ণবিচূর্ণ করে ১৭ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে নদী দখলমুক্ত করেছিলাম। ২০০৪ সালে চট্টগ্রামের চাক্তাইয়ে রাতভর অভিযান চালিয়ে নয়টি ভেজাল সেমাই কারখানা ধ্বংস করে নাগরিকদের ভেজাল খাদ্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছিলাম।
২০১২ সালে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে প্রভাবশালী এক সাংসদ ও ছাত্রনেতার কারখানায় অভিযান চালিয়ে দূষণ বন্ধে বাধ্য করে ৬১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছিলাম। এসব উপমা দিয়ে তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রেরণা জোগাই। মনেপ্রাণে চাই, ম্যাজিস্ট্রেট এন্টোনিও ডি পিয়েত্রার নেতৃত্বে যে সাতজন ম্যাজিস্ট্রেট অসীম সাহসিকতায় ইতালিকে মাফিয়ামুক্ত করেছিলেন, তেমনি শক্তি ও সাহস নিয়ে তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটরা যেন এ দেশকে পরিবেশ ও খাদ্যে ভেজালের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেন।
মোবাইল কোর্টের দায়িত্ব কী? প্রকৃত অপরাধীদের ধরা এবং বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। রাঘববোয়ালদের ছেড়ে চুনোপুঁটিদের সাজায় অপরাধ কমবে না। অদম্য সাহস নিয়ে দুর্ধর্ষ অপরাধী এবং দুর্দান্ত প্রভাবশালীদের চোখে চোখ রেখে শাস্তি দেওয়া এবং অপরাধের শিকড় উৎপাটন করতে পারাটাই ম্যাজিস্ট্রেসির সার্থকতা। নতুবা অপরাধ ও অভিযান সমান্তরালে চলবে যুগ যুগ ধরে। পূর্ণ পেশাদারত্বের সৎ কর্মকর্তারাই দেশের সম্পদ, দেশ প্রয়োজনেই তাঁদের খুঁজে নেবে। সততার প্রকৃত মূল্যায়ন এখানেই। অর্থ, ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার পশ্চাতে যারা ধাবিত, তাদের সততা উদ্বায়ী। লোভে পড়ে অন্যের কৃপা বা করুণার পাত্র হয়ে যাওয়ার চেয়ে মাটিতে মিশে যাওয়া শ্রেয়। অন্যায় ক্ষমতা প্রয়োগে গৌরব নেই, ক্ষমতাকে পরিণত করতে হবে জনসেবায়। যারা ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনৈতিক পথে সম্পদ অর্জন করেছে, তাদের সঙ্গে আছে মানুষের অভিসম্পাত, অশ্রুপাত এবং দীর্ঘশ্বাস।
পরিবেশদূষণ এবং খাদ্যে ভেজালের যে সন্ত্রাস, এ মুহূর্তে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সামনে এটিই বড় চ্যালেঞ্জ। সুস্থ পরিবেশ ও নির্ভেজাল খাদ্যেই নির্ভর করছে জাতির টিকে থাকা। আমাদের একই কাতারে অবস্থান করা চীন, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করেছে শুধু আইনের শাসন নিশ্চিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর আদলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষাকে মোবাইল কোর্টের কঠোর বেষ্টনীতে আনতে হবে। এ দুটি ক্ষেত্রে ভয়ানক বিপর্যয়ে জাতিকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। অপরাধ চাক্ষুষ দেখেও নৈর্ব্যক্তিক পর্যবেক্ষকের মতো নীরবতায়-উদাসীনতায় থাকা কিংবা নয়টা-পাঁচটা চুপিসারে ছকবাঁধা চাকরি করার মধ্যে কোনো সার্থকতা নেই।
মৃত্যুপথযাত্রী নদনদী, জলাশয়কে দখল ও দূষণের ছোবল থেকে এবং পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটার কবল থেকে গ্রামবাংলাকে রক্ষা করা, খাল-বিল ও জলাশয় ভরাটের উন্মত্ততা রোধ করা এবং ভেজাল ও দূষিত খাদ্যের অভিশাপ থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা মোবাইল কোর্ট আইনে পর্যাপ্ত ক্ষমতাপ্রাপ্ত।
আইনের ব্যবহারিক প্রয়োগে চাই সততা, নৈতিকতা এবং নিরপেক্ষতা। দুর্নীতিতে জড়াবে না। প্রলোভনে পা দেবে না। অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকবে। অন্যায় চাপে মাথা নত করবে না। ন্যায়ের দণ্ড সমুন্নত রেখে আইনের প্রয়োগ ঘটাবে—এটাই তরুণ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে প্রত্যাশা৷
মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী: (সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট, চট্টগ্রাম), বর্তমানে এমডি, মিল্ক ভিটা৷
mmunirc@gmail.com

নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা হারালে মানুষ ভোট বর্জন করে- কেরি কেনেডি

রবার্ট এফ কেনেডি সেন্টার ফর জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট কেরি কেনেডি বাংলাদেশের নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, যখন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় না, নির্বাচন কমিশন ক্ষমতসীন দলের অঙ্গ হিসেবে কাজ করে, নির্বাচনী কর্মকর্তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধাপ্রাপ্ত হন এবং যখন অনেক লোক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা হারান, তখন তারা ভোট বর্জন করেন। আর এমন পরিস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। গতকাল সোশ্যাল বিজনেস ডে উপলক্ষে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে এসব কথা বলেন। কেরি তার প্রবন্ধে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ না করলেও অনুষ্ঠান শেষে সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, তার বক্তব্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই দেয়া। অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা, অস্ট্রেলিয়া, মিশর, দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত, জাতিসঙ্ঘের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টরসহ বিশ্বের ৩১টি দেশের ২৭৫ জন অতিথি অংশ নেন।
কেরি কেনেডি তার প্রবন্ধে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী অব্যাহতি পেলে, গুম এবং বিচারবর্হিভূত হত্যাকা-ের বিচার না হলে, জুলুম-নির্যাতন নিয়মিত ঘটনা হলে, বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে এবং বিচারকরা বিক্রি হলে অথবা স্বাধীনভাবে কাজ করতে গেলে হুমকি অথবা চাকরি হারানোর সম্মুখীন হলে, তখন তা ন্যায়বিচারের চ্যালেঞ্জ হিসেবে আর্বিভূত হয়।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতি তার দেশের সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে কেরি বলেন, পাকিস্তানি সেনারা যখন বাংলাদেশে গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন সে সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিন, অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ মার্কিন স্বার্থবিরোধী। সে সময়ে কেনেডি বাংলাদেশের জনগণকে সমর্থন ও সহযোগিতা দেয়ার ক্ষেত্রে কেরি পরিবারের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ব্যবসা কিভাবে অবদান রাখতে পারে, তা বিবেচনা করা উচিত। ড. ইউনূস ও তার সামাজিক ব্যবসা যে অন্যদের চেয়ে আলাদা, সেটি সর্বস্তরে আলোচিত।  লাখ লাখ দরিদ্র মা-বাবা দারিদ্র্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। তাদের আমাদের সহায়তা করা উচিত।

কেরি বলেন, স্বাধীন মত প্রকাশ নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ। সাংবাদিকদদের কারারুদ্ধ করা, সংবাদপত্র আর টিভি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়া ও সংবিধানে বিতর্কিত সংশোধনী আনা এবং এনজিওর লাইসন্স বাতিলের হুমকি দেয়া একটি মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া সমালোচকদের বাকরোধ করার জন্য দমন-পীড়ন নীতির আইন ব্যবহার করা হয়। এছাড়া শাসক গোষ্ঠীর জন্য হুমকিস্বরূপ যাদের মনে করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে চালানো হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অব্যাহত নোংরা প্রচারণা। এগুলোর মধ্যে এমনভাবে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়, যা একজন মানুষের চরিত্র হননের শামিল। তিনি বলেন, এরপর আইনের মারপ্যাঁচে ঘটনার শিকার ব্যক্তির অবস্থান কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। যেন ক্ষমতার লোভীরা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
কেরি কেনেডি বলেন, সমাজে নারীদের ক্ষমতায়নেও রয়েছে চ্যালেঞ্জ। তাদের ১৫০% বেতন বাড়ছে। অথচ তারা সচ্ছলভাবে জীবন ধারণ করতে পারছে না। তাদের যৌতুক প্রথা, এ সংক্রান্ত সহিংসতা ও এসিড নিক্ষেপের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষা, শিশু বিবাহ ও কম বয়সে অধিক সন্তানের মা হওয়ার বিড়ম্বনা।

সুষমার সফর- ভারতের বার্তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের বার্তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সুষমার ঢাকা সফর দুই দেশের জন্যই ইতিবাচক। এই সফরের মাধ্যমে ভারত বার্তা দিয়েছে যে, একক কোন দলের সঙ্গে নয় বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় ভারতের নতুন সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানের কোন পরিবর্তন হবে না। তারা সব সময়ই তাদের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করবে। তবে অতীতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব পরিলক্ষিত হলেও সামনে হবে না- এমন প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তারা। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কূটনীতিক ফারুক চৌধুরী। তিনি বলেন, মোটের ওপর সফর ভাল হয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে মোদি সরকারে মনোভাব পরিষ্কার হয়েছে। এটা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাবে। ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির বিষয়গুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়। এগুলো একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে। বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে ফারুক চৌধুরী বলেন, বিএনপি যে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল তার ব্যাপকতা প্রকাশ পেয়েছে এই সাক্ষাতের মাধ্যমে।
সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফর প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, এই সফরে একটি বার্তা সুষমা নিশ্চিত করে গেছেন। তাহলো বাংলাদেশের একক কোন দলের সঙ্গে নয়, বরং বাংলাদেশের দুই বড় দলের সঙ্গেই সমান সম্পর্ক রাখতে চায় ভারত ? তিনি বলেন, এদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বার্তা দিয়েছে ভারত- যা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ? এর মাধ্যমে সুষমা স্বরাজের এই সফরে পরিষ্কার হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট সম্পর্কে তারা যথেষ্ট সচেতন? তিনি বলেন, সুষমার এবারের সফর একদমই শুভেচ্ছা সফর। তিনি ভারতের যে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই সরকার কেবলমাত্র এক মাস হলো ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। আর এক মাস বয়সী একটি সরকারের পক্ষে চাইলেও এখনই বড় কিছু করা সম্ভব নয়। ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, সুষমার সফরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। তাহলো বাংলাদেশের কোন নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না ভারতের নতুন সরকার। যেমনটি কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে সরে গিয়ে বিজেপি সরকার বলতে চায়, সম্পর্ক হবে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে। তিনি বলেন, সেমিনারে দেয়া সুষমার বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ? সেই বক্তব্যে সুষমা বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সহনশীলতার সংস্কৃতি, অংশগ্রহণ ও ভিন্নমতের বিকাশ প্রয়োজন। অনুরোধ পেলে এ ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা ও অনুসৃত আদর্শ সানন্দে বিনিময় করবো। এখন দেখা দরকার যে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে কোন পরিবর্তন আসে কিনা। তিনি বলেন, আমি আশাবাদী, এক ধরনের সংলাপ হয়তো শুরু হতে পারে। আওয়ামী লীগের এখন উচিত হবে, যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা শুরু করে দেয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম. শাহীদুজ্জামান সুষমার সফর প্রসঙ্গে বলেন, ভারত সব সময় তাদের নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। সুষমার সফরে সীমান্ত চুক্তি ও তিস্তা চুক্তি সম্পর্কে ইতিবাচক কোন আশ্বাস পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রাজ্য সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ। কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি কেন্দ্রীয় সরকারের বাস্তবায়নের কথা। কংগ্রেস সরকারের চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সময় এটি চিন্তা করা উচিত ছিল। ভারত সবসময়েই বাংলাদেশের ইস্যুগুলো নিয়ে অনীহা প্রদর্শন করেছে। সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গে সুষমার বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে তথাকথিত বিরোধী দলকে বৈধতা দেয়ার মতো। মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, মোদি সরকার বাংলাদেশের জন্য ভাল কোন বার্তা দিচ্ছে বলে মনে হয় না।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মনে করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান। তিনি বলেন, দেশের জনগণ আশা করেছিল- তিস্তা চুক্তিসহ দুই দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলবেন সুষমা। তাই তার এই সফরে প্লাস পয়েন্টের চেয়ে মাইনাস পয়েন্টই বেশি। তিনি বলেছেন, সুষমার এই সফরের পর ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ। কারণ তারা জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখবে। তিনি বলেন, ভারতে আরও কিছু পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের প্রত্যাশা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ঢাকা সফরে এ সব নিয়ে সুষমা কোন কথাই বলেননি। তাই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের মধ্যদিয়ে গুডউইল তৈরি ছাড়া আর কিছুই পায়নি বাংলাদেশ। ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা জনগণকেই সমাধান করতে হবে’- বিমানবন্দরে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের বিষয়ে  ড. রেহমান বলেন, এটা ছিল তার কূটনৈতিক বক্তব্য। একটি দেশ অন্য কোন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। তবে অতীতে ভারত হস্তক্ষেপ করেছে। ভবিষ্যতে করবে কিনা- এটাই এখন দেখার বিষয়। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তারা সবসময় জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখবে। কারণ ইতিমধ্যে বর্তমান সরকার ভারতে অনেকগুলো সুবিধা দিয়েছে। ত্রিপুরা দিয়ে খাদ্যশস্য রপ্তানির জন্য কোন ধরনের শুল্ক দেবে না ভারত। এছাড়া তাদের পণ্য বহনের জন্য নিজেদের অর্থে রাস্তাঘাট ও ব্রিজ করে দেবে বাংলাদেশ সরকার। আর তাতেই ভারত খুশি।

স্বতঃসিদ্ধ ​বিষয় হয়ে উঠছে ব্যতিক্রমী

নারায়ণগঞ্জ–৫ উপনির্বাচনে বৃহস্পতিবার
বেলা ১১টায় একটি ফাঁকা ভোটকেন্দ্র
জাতীয় সংসদের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনের ফলাফল যে রকম হবে বলে অনুমান করা হয়েছিল, তা থেকে ভিন্ন হয়নি। এক অর্থে ৫ জানুয়ারির সঙ্গে এই ফলাফলের অসংগতি নেই। এই নির্বাচনের আগে সংঘটিত ঘটনাবলি, বিশেষ করে সাত খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে কারও কারও মনে এই আশা তৈরি হয়েছিল যে সেখানকার সাধারণ ভোটাররা সম্ভবত ভিন্ন কোনো ফল তৈরিতে অগ্রণী হবেন। এই আশার পেছনে অতীতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে হারিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয়ের বিষয়টিও কাজ করেছে।
কিন্তু ফলাফল এবার আর নাটকীয় হয়নি। সাধারণভাবে এই নির্বাচনের বড় দিক হলো এই যে সেখানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। ভোটে কারচুপি হয়েছে বলে পরাজিত প্রার্থীর বক্তব্যকে আমরা যদি ধর্তব্যের মধ্যে না-ও নিই, তাও বলতে হবে যে এই নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন রকম হওয়ার প্রত্যাশা বিরাজমান রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী নিজে যেখানে একটি পরিবারের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, সেখানে এই পরিবারের কোনো সদস্যের পরাজয়ের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবোচিত তা কম-বেশি সবাই বুঝতে পারেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলের চেয়ে বেশি যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে তা হলো একজন পুলিশ অফিসারের বক্তব্য। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ‘ভোটকেন্দ্র দখলের সুযোগ না দেওয়ায়’ নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. বশিরউদ্দীনকে মুঠোফোনে হুমকি ও গালিগালাজ করেছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করে পুলিশ কর্মকর্তাকে কাবু করার চেষ্টা করেন বলেই পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্যে মনে হয়। এই ধরনের চাপের মুখে এএসপি বশিরউদ্দীন তাঁর অবস্থান থেকে সরে যাননি। তিনি যে ভূমিকা নিয়েছেন তা এখন অনেকের আলোচনার বিষয়, সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে বিস্তর প্রশংসাও করা হচ্ছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কেবল যে অস্বীকারই করেছেন তা-ই নয়, তিনি জানিয়েছেন যে ওই পুলিশ কর্মকর্তার ‘অনৈতিক কাজের’ ব্যাপারে তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলকে জানিয়েছেন। সাংসদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ডিপার্টমেন্টাল ইনকোয়ারি শুরু হয়েছে এবং তারা মনে হয় কিছু প্রমাণও পেয়েছে।’ বাংলাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ব্যাপারে এত দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের উদাহরণ আর কতটা আছে তা খুঁজে দেখা যেতে পারে। পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী তিনি যে কথাগুলো বলেছেন তার মধ্যে তিনটি বিষয় রয়েছে, যা সবার ভালো করে লক্ষ করা দরকার; কেননা এর মধ্যেই আছে সবার গ্রহণযোগ্য এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের সূত্র।
প্রথমত, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বলেছেন যে নির্বাচনের দিনে তিনি একজন ভোটার এবং এর বেশি কিছু নন। তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগে যেমন কেউ বাধা দিতে পারেন না, তেমনি তিনিও অন্য কারও ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দিতে পারেন না। নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া আর সব নাগরিকের পরিচয় যে ভোটারের চেয়ে বেশি কিছু নয়, সেটা হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রথম শর্ত। এর ব্যত্যয় মানেই হলো নির্বাচনের ওপরে শক্তিশালী গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার; সেখানে ক্ষমতাসীনেরা বেশি সুবিধা পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, তিনি সংসদ সদস্যকে বলেছেন যে তিনি নির্বাচন কমিশনের অধীন, ফলে অন্য কারও আদেশ-নির্দেশ শুনতে তিনি বাধ্য নন। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রশাসনকে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দিলে যে চিত্রটি দাঁড়াবে আমরা তাঁর বক্তব্য থেকে বুঝতে পারি। তৃতীয়ত, তিনি বলেছেন আমি প্রজাতন্ত্রের চাকরি করতে এসেছি। সরকারি কর্মকর্তারা যে আসলে কোনো দলের নন; এমনকি নির্বাচিত সরকারের অন্যায্য কাজেরও তল্পিবাহক নন, সেটা নিশ্চিত করা গেলে কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন নয়, সুশাসনও নিশ্চিত হবে। এই তিনটি বিষয়কে আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনা না করে এগুলোকে একত্রে বিবেচনায় নিয়ে একবার ভেবে দেখুন একটি নির্বাচনের কী রূপ দেখতে পাবেন। অনেকেই বলবেন যে এগুলো কোনো নতুন বিষয় নয়; আমরা সবাই তা জানি। এটাই বলবেন যে এমন অবস্থা বাংলাদেশে যে ছিল না তা-ও নয়। নিঃসন্দেহে এগুলো সবার জানা বিষয়। যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এগুলো স্বাভাবিক বলেই বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো এই, যা হওয়ার কথা অতি-স্বাভাবিক, সেই কথা বলার জন্যই এখন একজন সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা খবরে পরিণত হয়েছেন এবং সবার প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। যা হওয়ার কথা স্বতঃসিদ্ধ, তা হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী; এতেই বিরাজমান পরিস্থিতির চিত্রটি বোঝা যায়। তার চেয়েও বড় বিষয় হলো যে ভবিষ্যতে যদি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হয়, তবে এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করার আর কোনো বিকল্প নেই। ৫ জানুয়ারিতে যেমন তা নিশ্চিত হয়নি, তেমনি একটি উপনির্বাচনেও তার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। এই বৃত্তচক্র থেকে বেরোবার পথ কী—সেটা যেমন প্রশ্ন, তেমনি প্রশ্ন হলো, এই অবস্থার সুবিধাভোগীরা তা থেকে বেরোতে দিতে চান কি না।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

রাজনীতি কাদের হাতে

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ জন্য তিনি পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক ​শাসন ও শাসকদের দায়ী করে বলেছেন, তাঁদের কারণেই রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।  স্বীকার করতে হবে যে তাঁর এই বক্তব্যে মুদ্রার এক পিঠই উঠে এসেছে। অন্য পিঠে দেখা যাচ্ছে, সেই সামরিক শাসকদের উর্দি খুলে রাজনীতিতে নিয়ে আসায় ‘বনেদি’ রাজনীতিকেরাও কম ভূমিকা রাখেননি। সামরিক শাসকদের পুনর্বাসন করার কাজটি কি বর্তমানে যাঁরা বিরোধী দলে আছেন, শুধু তাঁরাই করেছেন? ক্ষমতাসীনদের কোনোই ভূমিকা ছিল না? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আওয়ামী লীগের বহু নেতা ও কর্মী অতীতে দলীয় আদর্শ বিসর্জন দিয়ে সামরিক শাসকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। কেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত দলটি ‘বনেদি’ নেতা-কর্মীদের ধরে রাখতে পারল না, সেই প্রশ্ন না এসে পারে না। গভীর দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে মহৎ​ মানুষেরা নির্দিষ্ট ন​ীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন বা রাখতে সচেষ্ট হন, তাঁদেরই আমরা রাজনীতিক বলে অভিহিত করি। আমাদের দেশেও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু​ শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনীতিকেরা রাজন​ীতিতে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাঁরা দেশ ও জনগণের স্বার্থকে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতেন। কিন্তু বর্তমানে সরকারি ও বিরোধী দলের রাজনীতিকদের মধ্যে কজন সত্যিকারভাবে তাঁদের অনুসরণ ক​রছেন?
যাঁরা এখন রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই বলে আক্ষেপ করছেন, তাঁদেরই দেখা গেছে সামরিক–বেসামরিক সাবেক আমলা ও ব্যবসায়ীদের দলে নিয়ে আসার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে। তাই, বনেদি রাজনীতিক এবং ভুঁইফোড় রাজনীতিকের সীমারেখাটি কেবল রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেওয়ার​ দিনক্ষণ দিয়ে না মেপে কাজ দিয়ে পরিমাপ করাই সমীচীন বলে মনে করি। ​সব পেশায়ই পরিচ্ছন্ন চরিত্রের মানুষ যেমন আছেন, তেমনি কলুষিত চরিত্রের মানুষও আছেন। রাজনৈতিক দলগুলো কঠোরভাবে নীতি ও আদর্শ মেনে চললে দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের পরিশুদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে উল্টোটিই ঘটে চলেছে। রাজনীতিতে বহিরাগত সমস্যার চেয়েও রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতন্ত্রচর্চা না হওয়া এবং নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়াই বড় সমস্যা। বিশেষ করে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে বিভিন্ন দলে একশ্রেণির মাস্তান ও সন্ত্রাসী পোষা হয়​; যারা নিজেদের আইনকানুনের ঊর্ধ্বে মনে করেন।  সবাই চায় রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতেই থাকুক। কিন্তু সেটি কীভাবে সম্ভব, যেখানে আড়াই দশক ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ তথা ছাত্র নেতৃত্ব ​নির্বাচনের ​প্রথাটিকেই বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বনেদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব আকাশ থেকেও পড়বে না আর মাটি ফুঁড়েও বের হবে না। এর জন্য একটি প্রক্রিয়া থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের বিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ​সেই প্রক্রিয়া শুরু না করে অন্ধকারেই ঢিল ছুড়ে চলেছেন। 

ছাত্রলীগের ভর্তি–বাণিজ্য

রাজধানীর ঢাকা কলেজ ও রাজশাহীর সিটি কলেজে অকৃতকার্য ছাত্রদের ভর্তি করানোর জন্য ভাঙচুর চালিয়েছে ছাত্রলীগ৷ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভর্তি করে মেধার ভিত্তিতে আর ছাত্রলীগ ভর্তি করতে চায় অর্থের ভিত্তিতে৷ ‘মেধাবীদের’ সংগঠন বলে দাবি করলেও ছাত্রলীগে মেধার চেয়ে অর্থের কদরই যে বেশি, এ দুটি ঘটনায় তা-ই দেখা গেল৷ বলা বাহুল্য, এগুলো নতুন কিছু নয়, এটাই সরকার–সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের আসল পরিচয়৷ ঢাকা কলেজে অপেক্ষমাণ তালিকার পেছনের সারির কয়েকজন ছাত্রকে ভর্তির জন্য প্রশাসনের ওপর চাপ দিচ্ছিল ছাত্রলীগ৷ রাজনৈতিক বিবেচনায় ভর্তির সেই চাপে কাজ না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার তারা ​কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে৷ যথারীতি কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি ঘটনাটিকে কিছু ‘জুনিয়র’ ছাত্রের বিচ্ছিন্ন কাজ বলে অভিহিত করেছেন৷ অন্যদিকে রাজশাহীর ​ি​সটি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বলেছেন, ওই কলেজে ভাঙচুরের সঙ্গে ছাত্রলীগ জড়িত নয়! প্রথমত, ছাত্রলীগ ভর্তি–প্রক্রিয়ায় কোনো রকম হস্তক্ষেপই করতে পারে না৷ দ্বিতীয়ত, সংগঠনের কেউ যদি তা করে, তাহলে তাদের সাংগঠনিক শা​িস্ত দেওয়ার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়৷ তৃতীয়ত, কলেজ প্রশাসনের উচিত ছিল তদন্ত করে দুর্বৃত্ত ছাত্রদের প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া৷ তারা তা করেনি৷
পুলিশও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি৷ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদেরও এদিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময় বা মর্জি আছে বলে মনে হয় না৷ সুতরাং, অনিয়ম, সন্ত্রাস, আইন লঙ্ঘন, ভর্তি–বাণিজ্য—কোনো কিছুর জন্য শাস্তি ​দূরের কথা, এগুলোকে মোকাবিলা করারও কাউকে পাওয়া গেল না৷ একদিকে এ সরকারের আমলে ​পরীক্ষাব্যবস্থাকে খেলো করে ফেলা, অন্যদিকে ছাত্রলীগের ভর্তি–বাণিজ্য; এই দুই সমস্যা থেকে শিক্ষাব্যবস্থার মুক্তি পাওয়ার কোনো রাস্তাই আর রইল না৷ প্রতিকারহীন এসব অন্যায় কুরে কুরে খেয়ে ফেলেছে শিক্ষার সম্ভাবনা৷ এ ঘটনাগুলো আবারও দেখাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা আসলে কী৷ এমনকি ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি স্থগিত হলেও তাদের প্রতাপ কিছুমাত্র কমেনি৷ ছাত্রলীগের শাখা নেতারা যাকে বলছেন ‘রাজনৈতিক’ বিবেচনা, তা আসলে টাকার বিবেচনা৷ সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিতে ভরপুর ছাত্রলীগ থেকে প্রধানমন্ত্রী নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন৷ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগও গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ছাত্রলীগকে অঙ্গসংগঠনের সম্পর্ক থেকে মুক্ত করে৷ কিন্তু কার্যত, ছাত্রলীগ আরও বেপরোয়া হয়েছে৷ আর কত রসাতলে গেলে সরকারের বিবেক জাগবে?

কৈরালার ক্যানসার

প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা
নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা (৭৫) ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন৷ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে তাঁর চিকিৎসা চলছে৷ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক কারবির নাথ যোগীর বরাত দিয়ে তথ্যমন্ত্রী মিনেন্দ্র রিজাল কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকাকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়েছে৷ তবে সংক্রমণ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে৷ তাঁকে গতকাল শুক্রবার থেকে রেডিওথেরাপি দেওয়া শুরু হয়েছে৷ আগামী দুই সপ্তাহ ধরে থেরাপি দেওয়া হবে৷ সুশীল কৈরালা গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন৷ এর পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয় তাঁর দল৷ তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তাঁকে জোট সরকার গঠন করতে হয়৷ রয়টার্স৷

মডেল হচ্ছেন অ্যাসাঞ্জ

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
মডেল হচ্ছেন উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ৷ লাখ লাখ মার্কিন গোপন সরকারি নথি ফাঁস করে বিশ্বব্যাপী হইচই ফেলে দেওয়া অ্যাসাঞ্জ আগামী সেপ্টেম্বরে লন্ডন ফ্যাশন উইকে মডেলিং করবেন৷ খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। দুই বছর ধরে লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসেই আছেন অ্যাসাঞ্জ৷ ফ্যাশন শোটিও অনুষ্ঠিত হবে ওই দূতাবাসের ভেতরে৷ কারণ, বাইরে বের হলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে৷ সেখানে রাগবি ফুটবলার বেন ওয়েস্টউডের নকশা করা পোশাকে হাজির হবেন অ্যাসাঞ্জ। অ্যাসাঞ্জ যাতে সবার মনোযোগ থেকে হারিয়ে না যান, সে জন্যই বেনের এই উদ্যোগ৷ তিনি বলেন, ‘অ্যাসাঞ্জ দুই বছর ধরে ওই দূতাবাসের ভেতরে রয়েছেন৷ তিনি এভাবে যাতে আড়াল হয়ে না পড়েন, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমি তাঁর অবস্থা তুলে ধরতে চাই। তাঁর সঙ্গে যা হচ্ছে, তা পুরোপুরি অন্যায়।’ ২০১২ সালের জুন থেকে অ্যাসাঞ্জ ইকুয়েডর দূতাবাসে অবস্থান করছেন৷ যুক্তরাজ্য সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে সুইডেনের হাতে তুলে দিতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে তিনি সেখানে অবস্থান নেন৷ অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সুইডেনে যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে৷ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে ওই দূতাবাসের বাইরে সার্বক্ষণিকভাবে মোতায়েন রয়েছেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সদস্যরা৷ তবে অ্যাসাঞ্জ দূতাবাস থেকে বের না হওয়ায় তাঁরা তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারছেন না৷ ইকুয়েডরের ওই দূতাবাসের বাইরে এই পাহারায় যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতিদিন গড়ে খরচ হচ্ছে নয় হাজার পাউন্ড৷

ইইউ–ইউক্রেন ঐতিহাসিক চুক্তি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে অবশেষে সেই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করল ইউক্রেন৷ মুক্ত বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সহযোগিতাবিষয়ক এই চুক্তি করা না-করা নিয়ে দ্বন্দ্বে এরই মধ্যে ওলটপালট হয়ে গেছে দেশটি৷ ডুবে গেছে গভীর সংকটে৷ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত ইউক্রেন ইইউর সঙ্গে চুক্তি করার পর রাশিয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, এই চুক্তির ‘পরিণতি হবে মারাত্মক’৷ খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির৷ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অপর দুই দেশ জর্জিয়া এবং মলডোভাও ইইউর সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করেছে৷ এর ফলে ইউরোপের এই তিন দেশের বাসিন্দাদের জন্য ইইউর নিবিড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশের পথ প্রশস্ত হবে৷ একপর্যায়ে দেশগুলো ইইউর সদস্য পদ পাবে৷ বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গতকাল শুক্রবার চুক্তি সই অনুষ্ঠান শেষে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো বলেন, ‘ইউক্রেন তার ইউরোপীয় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গত কয়েক মাসে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছে৷’ তিনি এই চুক্তিকে ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন৷ অন্যদিকে, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হারম্যান ভান রমপুয়ে শুক্রবারের দিনটিকে বর্ণনা করেছেন ‘ইউরোপের জন্য মহান দিবস’ হিসেবে৷ ইউক্রেন, জর্জিয়া ও মলডোভার নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ইইউ আজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে৷’ রাশিয়ার ক্ষতি হতে পারে, এমন কিছুই ওই চুক্তিতে নেই বলেও দাবি করেন হারম্যান৷ তবে চুক্তির ঘটনায় যারপরনাই খেপেছে মস্কো৷ কেননা, সাবেক এই সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে জোট করে ইইউ ও ন্যাটোকে মোকাবিলা করার বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের স্বপ্নের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেল৷ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরপরই রাশিয়ার পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে৷
চুক্তির নিন্দা জানিয়ে দেশটির ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রিগোরি কারাসিন গতকাল বলেন, ইউক্রেনের জন্য এই চুক্তি ‘মারাত্মক পরিণতি’ বয়ে আনবে৷ আর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইইউর সঙ্গে ইউক্রেন, জর্জিয়া ও মলডোভার ওই চুক্তির ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হলে মস্কো ব্যবস্থা নেবে৷ ইউক্রেনের রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ রাশিয়ার চাপে গত বছরের নভেম্বর মাসে ইইউর সঙ্গে এই চুক্তি সই করা থেকে শেষ মুহূর্তে পিছু হটলে দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়৷ কয়েক মাস ধরে আন্দোলনের মুখে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হন৷ এরপর রাশিয়া ইউক্রেনের রুশ ভাষাভাষী স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ক্রিমিয়াকে নিজেদের অংশ করে নিলে ইউক্রেন সংকট আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে৷ ওই ঘটনার পর রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়৷ পরে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের রুশ ভাষাভাষী অন্য এলাকাগুলোতেও রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়৷ সেখানে মধ্য-এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সহিংসতায় অন্তত ৪২০ জনের প্রাণহানি হয়েছে৷ সরকার গত সপ্তাহে ওই এলাকায় একতরফা অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেয়, যার মেয়াদ গতকাল শেষ হয়৷ অবশ্য অস্ত্রবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ব্যাপারে আলোচনা চলছিল৷