Thursday, October 16, 2014

চট্টগ্রামে শেখ মহিউদ্দিন হত্যার এক বছরে মামলার অগ্রগতি নেই by ওমর ফারুক

গত বছরের ৭ অক্টোবর চরপাথরঘাটায় শেখ মহিউদ্দিনকে (৪৮) প্রকাশ্য কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। অপরাধ ছিল গায়ে ফুটবল পড়া নিয়ে শিশুদের মারধরের প্রতিবাদ ও পরে সালিশি বৈঠকে মাতবরদের দাবি মোতাবেক দুই লাখ টাকা জামানত প্রদানে অস্বীকৃতি। এ কারণে ক্ষুদ্ধ স্থানীয় মহব্বত আলী গং তাকে খুন করে। শত বছর আগে ভিন্ন জেলা থেকে কর্ণফুলীর চরপাথরঘাটায় বসত গড়ে ছিলেন শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের পূর্বপুরুষেরা। মহিউদ্দিন হত্যা এক বছরে মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। নিহতের পরিবার বহিরাগত ও খুনিরা স্থানীয় ইস্যু তৈরি করে মামলায় রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব তৈরি করা হয়েছে।
ঘটনার আগে ৫ আগস্ট খেলার সময় পথচারীর গায়ে ফুটবল পড়াকে নিয়ে দুই পরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার রেশ ধরে হত্যা করা হয় শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে। হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কুখ্যাত সন্ত্রাসী মহব্বত আলীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হলেও স্থানীয় ও বহিরাগত ইস্যুর প্রভাবে কর্ণফুলী থানা পুলিশের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। এ কারণে বাদি পরিবারের আপত্তিতে মামলাটি তদন্তের জন্য হস্তান্তর করা হয় নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে; কিন্তু গত এক বছরে অধিকাংশ আসামি রয়ে গেছে অধরা। তবে এলাকাতেই আছেন মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা। আসামিদের অবস্থানের ব্যাপারে সংবাদ দেয়া হলেও তাদের গ্রেফতারে পুলিশের কোনো সাড়া মিলছে না।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ রাজনৈতিক ও বিত্তবানদের তদবিরে মূল ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা করছে। মামলার এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামিকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশের সাথে আসামিদের এ সংক্রান্তে গোপন চুক্তি হওয়ার বিষয়ে এলাকায় গুঞ্জন উঠেছে। আর আসামিরা চলাফেরা করছে প্রকাশ্যে। এমনকি তারা রাতে নিজ নিজ বাড়িতেও অবস্থান করছে; কিন্তু পুলিশকে সংবাদ দেয়া হলে পুলিশ বাদি পরিবারকে এ ব্যাপারে নাক না গলানোর এবং তাদের বিরক্ত না করার পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ করেন বাদি পরিবারের সদস্য ও নিহতের ছোট ভাই শেখ মোহাম্মদ ফয়সল। তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, আসামিদের সাথে পুলিশ আঁতাত করে এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার পরামর্শ মোতাবেক আসামিরাই মোহাম্মদ সালাউদ্দিন নামে অন্য এক আসামিকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে পুলিশ তাকে আদালতে উত্থাপন করেন। আদালতের কাছে ওই আসামি পুলিশের শিখিয়ে দেয়া মোতাবেক ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়। তাতে মূল পাঁচ-ছয় আসামি এ ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন না বলে আদালতের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তিতে জানান তিনি। এর মাধ্যমে আসামিদের বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ ছাড়া গত এক বছরে আটক তিন আসামির মধ্যে একজনকেও রিমান্ডে না নেয়ার অভিযোগ করা হয়। তারা বলেন, আসল ঘটনা পুলিশ উদঘাটন করেছে বলেই হয়ত আসামিদের রিমান্ডে নেয়নি; কিন্তু এক বছরে মামলার চার্জশিটও দেয়া হয়নি। কিন্তু কেন সময়পেণ করা হচ্ছে তা-ও অজানা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্ট ইছানগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশে শিশুরা খেলার সময় বলটি নুরুল আলম নামে এক ব্যক্তির গায়ে পড়ে। এরই সূত্র ধরে শিশুদের মারধরের প্রতিবাদ করায় কয়েক যুবকের সাথে মহব্ববত আলীর অনুসারীদের হাতাহাতি ও পরে সংঘর্ষ হয়। ঘটনার পর থেকে উভয় পরে মধ্যে সালিস মীমাংসার জন্য বৈঠক হয়। সালিসে মহিউদ্দিনের কাছ থেকে সালিসকারীরা দুই লাখ টাকা জামানত দাবি করেন; কিন্তু প্রতিপ মহব্বত আলী থেকে কোনো জামানত চাওয়া হয়নি। এ কারণে দাবিকৃত টাকা মহিউদ্দিন জমা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ুব্ধ হয় প্রতিপ। এর পরে একটি মামলার নির্ধারিত দিনে আদালতে হাজিরা দিতে সকাল ৯টায় ঘর থেকে বের হয়ে রিকশায় কর্ণফুলী নদীর ঘাটে যাওয়ার পথে প্রকাশ্যে মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে ও গলা কেটে খুনের পর পাশের ড্রেনে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় দু’টি গ্র“পে মোট ১৮-২০ সদস্য কিলিং মিশনে অংশ নেয়। ঘটনার দিন সকালে মহিউদ্দিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তার গতিবিধির ওপর নজরদারি করা হয়। কর্ণফুলী ডকইয়ার্ড গেটে পৌঁছামাত্র হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

নিহতের পরিবারের সদস্য লামিয়া তাবাচ্ছুম নয়া দিগন্তকে জানান, এ ঘটনার পর স্থানীয়রা খুনিদের বিচার দাবি করে এলাকায় ব্যাপক পোস্টারিং, সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন; কিন্তু তাতেও প্রশানের টকন নড়েনি। নিহতের ভাই শেখ মোহাম্মদ ফয়সল অভিযোগ করেন, আসামিরা মামলা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাদের হত্যার ভয় দেখাচ্ছে। তারা প্রকাশ্যে ঘুরছে আর নিহতের পরিবারের সদস্যদের রাস্তাঘাটে দেখলে উসকানিমূলক ও ব্যঙ্গ করে কথাবার্তা বলছে।
এ বিষয়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দেবাশিষ কোনো মন্তব্য করেননি।

চলতি থেরাপি- আফটার ঈদ by ইকবাল খন্দকার

ঈদের আগে আমি কোনোভাবেই বিয়ের পিঁড়িতে বসব না। তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, ঈদের পর হলে তার কী এমন সুবিধা, আর ঈদের আগে হলে কী এমন অসুবিধা

ক’দিন আগেও ঈদ আসি আসি করছিল। অবশেষে ঈদ এলো, এসে আবার চলেও গেল। আহ, ঈদের জন্য কত প্রস্তুতিই না ছিল আমাদের। ঈদের-পরবর্তী অবস্থা নিয়ে কথা বলার আগে সেই সব প্রস্তুতির কথা একটু বলে নিই। ঈদের আগে আবু বকর ভাইয়ের বাড়িতে গেলাম জরুরি একটা কাজে। গিয়ে দেখি তিনি বাড়ি নেই। ভাবীকে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় গেছেন। ভাবী বললেন বাজারে গেছেন। রেইনকোট কিনবে। রেইনকোট কিনবে! বলেন কী? রেইনকোট কেন? বর্ষার সিজন তো চলে গেছে সেই কবে। এই অফ সিজনে রেইনকোট দিয়ে কী করবে? ভাবী বললেনÑ ঈদে কাজে লাগানোর জন্য। আমি বিস্ময়ের চরম সীমানায় পৌঁছে বললামÑঈদে রেইনকোট কী কাজে লাগাবে? ভাবী বললেনÑ গত ঈদে সেমাই খেতে গিয়ে একটা জামাও ভালো রাখেনি। সব ক’টার মধ্যে সেমাইয়ের ঝোল লাগিয়ে বিনাশ বানিয়ে ফেলেছে। এবার যাতে জামায় সেমাইয়ের ঝোল লাগতে না পারে, এ জন্য সেমাই খেতে বসার আগে রেইনকোট গায়ে দিয়ে নেবে। এবার বলা যাক জব্বার ভাইয়ের কথা। জব্বার ভাইয়ের মাথায় জব্বর চুল। কিন্তু ঈদের তিন দিন আগে মাথা কামিয়ে ফেললেন। আমরা জিজ্ঞেস করলামÑ কেন জব্বার ভাই, মাথা কামালেন কেন? চুলে উকুনটুকুন হয়েছে নাকি? জব্বার ভাই বললেনÑ গত রোজার ঈদে প্লেটে চুমুক দিয়ে সেমাই খেতে গিয়ে চুলে সেমাইয়ের রস লাগিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর যখন ঘুমাতে গেলাম, চুলে উঠল পিঁপড়া। বাপরে বাপ, সে কী কামড়! এবার সেমাই খাওয়ার সময় যাতে চুলে সেমাই লাগতে না পারে, তাই মাথাই কামিয়ে ফেলব।
এবার বলা যাক আমার এক দাদার ঘটনা। দাদার মন খুব খারাপ। জিজ্ঞেস করলাম মন খারাপ কেন? দাদা বিশাল বড় একটা শ্বাস ফেলে বললেনÑ কোরবানির ঈদ গেল তো, তাই মনটা খারাপ। আমি অবাক হয়ে বললামÑ বুঝলাম না বিষয়টা। দাদা বললেনÑ কোরবানির ঈদের দিন দুপুরে আমি গরুর  গোশত দিয়ে ভাত খেতে বসেছি। গোশতটা খুব একটা সুবিধার ছিল না। কেমন জানি রাবারের মতো ছিল। তাই টেনে টেনে ছিঁড়তে হচ্ছিল। এক সময় আমি গোশতে কামড় দিয়ে বেশ জোরে একটা টান মারলাম। ব্যস, আমার চাপার একটা দাঁত খুলে পড়ে গেল। দাঁত খুলে গেছে, তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই বা ছিল না। দুঃখ একটাইÑ দাঁতটা খুলে গিয়ে ঠাস করে বাড়ি লাগল তোর দাদীর চমশার কাচে। তোর দাদী আমার পাশে বসেই খাচ্ছিল কি না। তো আমার দাঁতের বাড়ি লেগে তোর দাদীর চশমার কাচটা আর আস্ত থাকল না রে! শখের চশমার জন্য তোর দাদীর সে কী কান্নাকাটি!
আমার এক খালাতো বোনের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল বেশ ক’মাস ধরেই। অবশেষে মুরব্বিরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, ঈদের দু-একদিন আগেই বিয়ের কাজটা সম্পন্ন করে ফেলা হবে। মুরব্বিদের এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না খালাতো বোন। সে বললÑ বিয়ে হলে হতে হবে ঈদের পর। ঈদের আগে আমি কোনোভাবেই বিয়ের পিঁড়িতে বসব না। তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, ঈদের পর হলে তার কী এমন সুবিধা, আর ঈদের আগে হলে কী এমন অসুবিধা। খালাতো বোন বললÑ ঈদের আগে হলে শুধু অসুবিধাই না, রীতিমতো জীবনের ঝুঁকি। ঈদের আগে সবার বাড়িতেই  কোরবানির গরু থাকে। আর ষাঁড় গরু লাল কাপড় দেখলে তেড়ে আসে। বিয়েতে আমি লাল বেনারসি পরি আর ষাঁড়ের হাতে মারা পড়ি আর কী!
এবার আরেকটা ঘটনা বলে শেষ করা যাক। ঈদের পরদিন দুলাভাইয়ের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে দেখি তাদের আলমারিতে একটা হ্যান্ডমাইক। কী ব্যাপার দুলাভাই, হ্যান্ডমাইক কেন? হকারি করবেন নাকি? দুলাভাই বললÑ গত বছর কোরবানির গরু নিয়ে বাজার থেকে ফেরার পথে মানুষের কাছে গরুর দাম বলতে বলতে গলা ভেঙে ফেলেছিলাম। এবার যাতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তাই হ্যান্ডমাইক কিনেছিলাম। ভালোই উপকার দিয়েছে। বলেছি আস্তে করে, সাউন্ড হয়েছে জোরে। গলার ওপর কোনো চাপ পড়েনি।

জামিল সাবের মেমোরি by নুসরাত শ্রাবণী

সত্তরোর্ধ্ব জামিল সাহেব রিটায়ার্ড ব্যাংক অফিসার। দীর্ঘ তিরিশ বছর দাপটের সাথে অ্যাকাউন্ট সেকশনে কাজ করেছেন। স্মৃতিশক্তি ভীষণ ভালো ছিল। কেউ কোনো দিন তার কাজের ভুল ধরতে পারেনি। কলিগরা ষড়যন্ত্র করেও পারেনি। এ নিয়ে জামিল সাহেবের মনে খানিকটা অহঙ্কার বোধ আছে। মাঝে মধ্যে এই নিয়ে আশপাশের মানুষের কথা শোনাতেও ছাড়েন না। এমনকি তার পঞ্চাশোর্ধ্ব স্ত্রী নাহার বেগমের সাথেও তার লেগে যায়।
কিন্তু এখন বয়স সত্তর। ইদানীং অনেক কিছুই ভুলে যান, কিন্তু মানতে চান না। তার ধারণা স্মৃতিশক্তি আগের মতোই আছে। সবাই তাকে হিংসা করে তো, তাই অপবাদ দেয়। এই তো সেদিন সকালে খবরের কাগজ খুঁজে পাচ্ছেন না, দিলেন এক চিৎকার :
#নাহার বেগম, পত্রিকা কোথায়?
# বারান্দায় তো দিয়ে এলাম, ভালো করে খুঁজে দেখেন।
রুমে এসে দেখলেন পত্রিকা বিছানার ওপর। তার মেজাজ সপ্তমে উঠল।
#মূর্খ মহিলা! হাজারবার বলছি কাজ ঠিকমতো করবা, ঠিকমতো বলবা। রাখো এক জায়গায় বলো এক জায়গায়। আমার চেয়ে বয়স কি বেশি হয়েছে তোমার?
নাহার বেগম রুমে এসে দেখলেন খালি চায়ের কাপ আর পত্রিকা দুটোই শোয়ার ঘরে। তখনই বুঝে গেলেন ঘটনাটা। জামিল সাহেব চায়ের কাপ হাতে পত্রিকা পড়তে পড়তে এই ঘরে এসে দুইটাই রেখে গেছেন। তারপর আবার রুম থেকে বেরিয়ে পত্রিকার কথা ভুলে গেছেন। কিন্তু এ কথা এখন জামিল সাহেবকে বলা যাবে না। তাহলে তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবেন। বলবেন,
#অ্যাঁ, এত বড় কথা! মূর্খ মহিলা!
তাই নাহার বেগম চুপ করে থাকেন। জামিল সাহেবের বড় মেয়ে সুমি এসেছে শ্বশুরবাড়ি থেকে। বাবার এই অবস্থা দেখে জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। জামিল সাহেব তো যাবেনই না। যা হোক, বহু কষ্টে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার চেকআপ করে বললেন, তেমন কিছু না, বয়স হয়েছে তো। একটু লেখালেখি করবেন। যে বিষয়গুলো ভুলে যান সেগুলো লিখে রাখবেন। ঠিক হয়ে যাবে।
#অ্যাঁ! এত্ত সাহস তোমার! সে দিন পাস করে বের হয়েছ আর আসছ আমাকে জ্ঞান দিতে! আমার মেমোরি এখনো তোমার চেয়ে ভালো আছে।
#আঙ্কেল, আপনি একটু শান্ত হোন...
#আমি কি হবো না হবো সেটা তোমার বলা লাগবে না... জামিল সাহেব তেড়ে ওঠেন।
#বাবা চলো তো, চলো এখান থেকে। সুমি অনেক কষ্টে তার বাবাকে সরিয়ে নিয়ে আসে।
বাসায় ফিরে মেয়ের ওপরে আরেক দফা আগুন ঝাড়লেন, তুইÑ তুই প্রমাণ করতে চাস যে তোর বাপের মেমোরি নষ্ট হয়ে গেছে?
#বাবা প্লিজ, একটু শান্ত হও তো। প্লিজ শান্ত হও, আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসি।
#হুম, চায়ের সাথে টোস্ট আনিস।
রান্নাঘরে বাসনকোসন নাড়াচাড়ার শব্দ শোনা গেল। জামিল সাহেব আর নাহার বেগম চুপচাপ বারান্দায় বসে আছেন। কেউ কারো সাথে কথা বলছেন না।
কিছুক্ষণ পর সুমি এক প্লেট মুড়ি-চানাচুর নিয়ে বারান্দায় এসে তার বাবাকে বলল, নাও তোমার মুড়িমাখা। নাহার বেগম আশ্চর্য হয়ে বললেন- সুমি, তোরও কি তোর বাবার মতো...
গিন্নির কথা শেষ করার আগেই জামিল সাহেব চিৎকার করে উঠলেন, আমার মেমোরি নষ্ট হয়েছে না? তুই এইটা কী আনছিস? আমি কি মুড়িমাখা আনতে বলছি? আমি তো তোকে পাউরুটি আর জেলি আনতে বললাম।

হট থেরাপি- যেসব ক্ষেত্রে আমরা নোবেল পেতে পারি by মহসিন মিজি

সম্প্রতি নোবেল প্রাইজ ঘোষণার পর খেয়াল হলো এই তালিকায় কোনো বঙ্গসন্তান নেই। কিন্তু বঙ্গসন্তানও নোবেল পাওয়ার অধিকার রাখে একাধিক ব্যাপারে। কী সেই বিষয়গুলো জানাচ্ছেন মহসিন মিজি

চাপাবাজি : চাপাবাজিতে বাংলাদেশের মানুষের সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশে^র আনাচে-কানাচে। এমনকি এলিয়েন অর্থাৎ ভিনগ্রহের বাসিন্দারাও পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের চাপাবাজি সম্পর্কে সম্যক অবগত রয়েছেন। এই ‘চাপাবাজি’ ক্যাটাগরিতে নোবেল প্রাইজ দেয়া হলে বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের মানুষ পাবেÑ সেটা শুধু মানুষ কেন, দুনিয়ার অন্য কোনো প্রাণীও বিশ^াস করবে বলে মনে হয় না!
দুর্নীতি : বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়ে বলা শুরু করলে মুখব্যথা হয়ে কথা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, শ্রোতার কান শুনতে শুনতে বধির হয়ে যেতে পারে- মাগার দুর্নীতিবিষয়ক কথা তবু শেষ হওয়ার নয়! দুর্নীতিতে আমাগো দেশের অগ্রগতি ও সাফল্য বিশ^ স্বীকৃত। এমনকি পরপর কয়েক দফা দেশটা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সৌভাগ্যও অর্জন করে ফেলেছে। সুতরাং চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়, যে ক্ষেত্রে আমাদের দেশ একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হলো, সে ক্ষেত্রে মানে ‘দুর্নীতি’তে যদি নোবেল দেয়া হতো তবে অবশ্যই বাংলাদেশই পেত।
স্বল্প সময়ে ধনী : ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’Ñ এই উক্তিটি শুধু কথার কথা নয়, আমাদের ‘চিরদরিদ্র’ রাষ্ট্রটির জন্য পুরোপুরি সত্য। এমনকি কখনো কখনো আঙুল ফুলে কলাগাছ নয় বটগাছ হওয়ার ঘটনাও এই আজব দেশটাতে ঘটে গেছে। আপনার আশপাশেই লক্ষ করলে দেখবেন হঠাৎ কেউ কেউ দামি গাড়িতে চলাফেরা শুরু করেন, রাজধানীতে কয়েকটি ফ্যাটের মালিক হয়ে যান। যদিও ছয় মাস আগেও এসবের কিছুই ছিল না তার। এত অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার নজির বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথায় পাবে নোবেল কমিটি? আর তাই ‘স্বল্প সময়ে ধনী’ ক্যাটাগরিতে নোবেল পুরস্কারটা বাংলাদেশই যে পেত এই বিষয়ে টেনশন না করে নাক ডেকে ঘুম দিতে পারেন, সাথে খাঁটি সরিষার তেলও ব্যবহার করতে পারেন।
ধোঁকাবাজি : ধোঁকা দেয়া কিংবা ধোঁকা খাওয়াÑ এর সাথে অঙ্গাঙ্গি জড়িত দেশের প্রত্যেকটি মানুষ। জীবনে এর শিকার হননি এমন কাউকে অণুবীক্ষণ অথবা দূরবীক্ষণ কোনো যন্ত্র দিয়েই খুঁজে পাওয়া যাবে না এ দেশে। ধরুন, আপনি ফল কিনলেন বাজার থেকে ভিটামিনের চাহিদা মেটানোর জন্য। কিন্তু দোকানি আপনাকে ফরমালিনযুক্ত ফল দিয়ে ভিটামিনের বদলে বিষ খাওয়াচ্ছে! কিংবা ধরুন, আপনার এলাকার সেবা করবে বলে যাকে ভোট দিলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তিনিই আপনার জমি-জমা সব দখল করে নিলেন আপনার চোখের সামনেই! ব্যাপক চেষ্টাতদবির করেও তার ক্ষমতার কাছে হয়তো হেরেই গেলেন শেষ পর্যন্ত।
এভাবেই প্রতিনিয়ত ধোঁকা খাচ্ছে দেশের মানুষ হাটবাজারে, অলিতে-গলিতে, গ্রামেগঞ্জে নানান জায়গায় নানান রকমে। এ রকম ধোঁকাবাজির হিস্টোরি বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশ থেকে পাবে নোবেল কমিটি? তাই ধোঁকাবাজিতে নোবেল প্রাইজ দেয়ার নিয়ম থাকলে সব কিছু দেখেশুনে নোবেল কমিটি বাংলাদেশকেই সেই প্রাইজ দিয়ে নিজেদের ধন্য মনে করত।

আমরাও পারি by রিজবাহ উদ্দিন রিজবী

 আমরা যদি কখনো মুক্ত জ্ঞানচর্চা করতে চাই তবে বই পড়ার বিকল্প নেই। বই পড়া ছাড়া মুক্ত জ্ঞানচর্চা কখনো সম্ভব নয়। আর আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা যে জ্ঞানার্জন করতেছি তা দিয়ে কখনো উন্নত সভ্যতার ধারে কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। আর গ্রন্থগত এই বিদ্যার দৌড় চাকরি পর্যন্ত। তা আমাদের এনে দিতে পারে না সভ্যতা, আমাদের মাঝে সৃষ্টি করতে ব্যর্থ এক মননশীল পরিবেশ। এই গ্রন্থগত বিদ্যার কাছে আমরা বন্দী একমাত্র জীবিকার নিমিত্তে। তা আমাদের সৃজনীলতাকে বদ্ধ দ্বারে রুদ্ধ করে রাখে। বই তো পড়তেই হবে। মহিলা গণিতবিদ হাইপেশিয়া সমাজের নিয়মনীতি ভঙ্গ করে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি সসম্মানে আজো গণিতবেত্তাদের কাছে স্মরণীয়। এমনকি তাকে আজীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য চাঁদের একটি অংশের নামকরণ করা হয়েছে হাইপেশিয়া।  আমাদের কার্ল মার্কস যে একাধারে দার্শনিক, গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ। তিনি বই পড়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই তার হাতে সৃষ্টি হয়েছে অর্থনীতির অন্যতম সহায়ক উধং পধঢ়রঃধষ-এর মতো একটি বই যা সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে নাড়া দিয়েছিল। কার্ল মার্কস বই পড়ার জন্য নির্যাতিত হয়েছিলেন তার স্ত্রী-সন্তানদের কাছে। চরম দরিদ্র ভোগ করতে হয়েছিল তাকে। কারণ সে সূর্য ওঠার সাথে সাথেই লাইব্রেরিতে চলে যেতেন আর ফিরতেন সন্ধ্যায়। ঘরে তো তুমুল কাণ্ড। ছেলেমেয়েদের আহাজারি। চাল নেই, তরকারি নেই।
হাতের কাছে যা আছে বিক্রি করে চাল, ডাল কিনছেন। এভাবে কত দিন পারা যায়? শেষ পর্যায়ে চেনা-জানাদের কাছে ভিক্ষা মাগতেন। কিন্তু তবুও বই পড়া থেকে বিরত থাকেননি। আমাদের অন্যতম গণিতবিদ রামানুজন যে, ম্যাট্রিক পাস করেননি। কিন্তু সেই পেয়েছিল ‘সিনোপসিস অব পিওর ম্যাথম্যাটিক্স’ নামে একটি বইয়ের সন্ধান যার থেকেই খুঁজে পেলেন বই পড়ার প্রেরণা। বই পড়েছিল বলেই তিনি আজ আমাদের শ্রেষ্ঠ ১০ জন গণিতবিদের একজন। মাইকেল ফ্যারাডেকে কে না চিনি!!! আনুষ্ঠানিক পড়ালেখা তো দূরের কথা, কাজ করত এক ছাপাখানায়। বিভিন্ন লেখক বই দিতেন ছাপানোর জন্য। ফ্যারাডে সাহেব তা পড়ে পড়ে হয়ে উঠলেন একজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী।
বই আমাদের কী-ই বা দেয় না? দেখা যাচ্ছে বই আমাদের সব কিছুই দেয়। সভ্যতা, মননশীলতা। আমাদের আরো দেয় যশ-অর্থ। আরো কত কী? তাহলে কেন আমরা বই থেকে দূরে থাকি? কেন নিজেকে বিরত রাখি সুন্দর থেকে? কথায় বলে- ‘মানুষ সুন্দরের পূজারী’। কিন্তু কই? বইয়ের মতো সুন্দর তো আমি কিছু দেখি না। অথচ মানুষ কত মাইল দূরে থাকে এই সুন্দর থেকে। যেন পারমাণবিক বোমা! ফাটলেই মরে যাবে। আহা! বই না পড়ে পড়ে তারা যে নিজেরাই এক একটা পারমাণবিক বোমাতে পরিণত হয়েছে তা তারা জানে না। কারণ হাতির শরীর নাকি হাতি দেখে না। তাদের বিস্ফোরণে আজ কলুষিত দেশ। কলুষিত আমাদের সভ্যতা। আজ ম্রিয়মানে আমাদের সংস্কৃতি। বিপর্যস্ত আমাদের চিন্তা-চেতনা। আমরা না পারছি এগোতে, না পারছি নিজেদের বদলাতে। এখন আমাদের অবস্থা খুব সঙ্কটাপন্ন। তার একমাত্র কারণ আমরা বই পড়া থেকে বিরত, মুক্ত জ্ঞানচর্চা থেকে পিছিয়ে। আমাদের এসব কাটিয়ে উঠতে বই পড়া ছাড়া বিকল্প আর কোনো পথ নেই। বই-ই আমাদের উত্তরণের একমাত্র মাধ্যম।
অনেকেই বলে বই পড়ার সময় পায় না। সত্যি তাই! বই পড়ার সময় কেমনেই বা পাবে? আমাদের যে বাজারে বাজারে ঘুরতে হয়, বালিকা বিদ্যালয়ের গেট পাহারা দিতে হয়। বাংলাদেশের মানুষ একটু বেশি দরদি। একটু বেশি বন্ধুভাবাপন্ন। রাত-দিন ফেসবুকে বন্ধুদের সময় দিতে হয়। তো এখানে আমাদের বই পড়ার সময় কোথায়? আর মেয়েরা? হঠাৎই বলে সমাজ তাদের বাধা দেয়। আমি তো আগেই বলেছি হাইপেশিয়ার কথা। এ রকম আরো আছে সোফিয়া কাভালভসকাইয়া, রোকেয়া, ডরোথি হজকিন। যারা মানেনি সমাজের ফালতু নিয়ম। যারা কাটায়নি সময় বর্তমান মেয়েদের মতো শপিংয়ে, মোবাইলে কথা বলে বলে, অপ্রয়োজনে পার্কে ঘুরে ঘুরে। আমরা বয় ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ডকে সময় দিতে পারি, কিন্তু কেন বই পড়ার সময় দিতে পারি না? তারা কি আমাকে মাদামকুরি, হাইপেশিয়ার মতো যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে? কোনো এক মনীষী বলেছেনÑ ‘মদ, রুটি পুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে, কিন্তু বই অনন্ত যৌবনা’। পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের সব চাওয়া-পাওয়াই হোক বই, বই, বই, বই আর বই। আচ্ছা আমরা কী কখনো সপ্তাহে দুটো করে বই কেনার একটা সংস্কৃতি গড়তে পারব না?
কুতুবদিয়া, কক্সবাজার

১ দিনের পুলিশ কমিশনার শিশু সাদিক by শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

১০ বছরের শিশু সাদিকের ইচ্ছে পুলিশ কমিশনার হওয়ার। তাই তাকে খাঁকি টুপি আর পুলিশের পোশাক পরিয়ে বসিয়ে দেয়া হলো কমিশনারের চেয়ারে। ঘটনাটা ঘটেছে বুধবার ভারতের হায়দারাবাদে। সাদিকের বাড়ি তেলেঙ্গানার করিমনগর জেলায়। দীর্ঘদিন ধরে সে ব্লাড ক্যান্সারে ভোগছে। ছোটবেলা থেকেই তার ইচ্ছে পুলিশে চাকরি করার। বাবা, মা ও স্বজনদের কাছ থেকে শুনেছে পুলিশে চাকরি করলে অনেক গুণ্ডাদের শাস্তি দেয়া যায়। তাই স্বপ্ন ছিলো একদিন পুলিশ হবেই।  এবং মন দিয়ে কাজ করে সে হয়ে উঠবে পুলিশ কমিশনার।

>> এক দিনের পুলিশ কমিশনার সাদিক যা আদেশ করবে তাই পালন করবে সবাই। ওর পাশে বসে আদেশের অপেক্ষায় থাকলেন মাহেন্দ্র রেড্ডি।
কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো ভাগ্য। সাদিকের শরীরে বাসা বাঁধলো ব্লাড ক্যান্সার। কঠিন এ রোগটি তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। কিন্তু এভাবে শেষ হয়ে গেলে তো পুলিশ কমিশনার হওয়া যাবে না। সাদিক হয়তো মনে মনে ভেবেছে, যদি একটা ইচ্ছেপূরণ দৈত্য পাওয়া যেতো। দৈত্যটাকে বললেই যে কোনো দিন এসে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। এবং গুন্ডাদের ধরার জন্য পুলিশ কমিশনার বানিয়ে দেবে। তখনো সে জানতো না, সত্যি সত্যিই যে একটা ইচ্ছেপুরণ দৈত্য আছে। হঠাৎ একদিন ওর দরজায় হাজির হলো দৈত্যটা। জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি হতে চাও?
সাদিক জানালো ইচ্ছের কথা। অমনি ওটা সব ব্যবস্থা করে ফেললো এবং তাকে পুলিশ কমিশনারও বানিয়ে দিলো। সাদিকের সেই ইচ্ছেপুরণ দৈত্যটার নাম ‘উইশ ফাউন্ডেশন’। দেখতে কিন্তু দৈত্যের মতো নয়, অনেকগুলো মানুষ মিলে এ ফাউন্ডেশনটি তৈরি করেছে। এরা সাদিকের মতো অসুস্থ শিশুদের ইচ্ছেপুরণ করার জন্য কাজ করে। সাদিকের জন্যও এরা কাজ করলো। কথা বললো হায়দারাবাদের পুলিশ কমিশনার মাহেন্দ্র রেড্ডির সাথে। তিনিও সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। অবশেষে সব আয়োজন করে বুধবার সাদিককে বসিয়ে দেয়া হলো কমিশনারের চেয়ারে। সে তখন এক দিনের জন্য পুলিশ কমিশনার। সে যা আদেশ করবে তাই পালন করবে সবাই। ওর পাশে বসে আদেশের অপেক্ষায় থাকলেন মাহেন্দ্র রেড্ডি। সামনে, পেছনে অসংখ্য পুলিশ। সবাই মিলে স্যালুট করলো সাদিককে।
কিন্তু এতটুকু সাদিক আর কি আদেশ করবে? সবাই তাকে জিজ্ঞেস করলো, কমিশনার হিসাবে সে এখন কি করতে চায়? ও সোজা সাপটা বলে দিলো ছোটবেলার সেই ইচ্ছের কথা ‘আমি গুণ্ডাদের ধরতে চাই।’ সাদিককে কমিশনারের চেয়ারে বসিয়ে আনন্দিত মাহেন্দ্র রেড্ডিও। তিনি বললেন, আমি অসুস্থ ছেলেটির ইচ্ছে পুরণ করতে পেরে তৃপ্তি পাচ্ছি। ইচ্ছেপুরণ দৈত্য অর্থাৎ উইশ ফাউন্ডেশনের একজন পুষ্প দেবি। তিনি বললেন, আমরা অসুস্থ শিশুদের ইচ্ছেপুরণের জন্য চেষ্টা করি। ওরা যেন বেঁচে থাকার বাকি দিনগুলো আনন্দে কাটাতে পারে। আমাদের এ ফাউন্ডেশন অনেক শিশুদেরই ইচ্ছে পুরণ করেছে। শিশুদের কেউ পছন্দের তারকাদের সাথে আড্ডা দিতে চেয়েছে। আবার কেউ রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সময় কাটাতে চেয়েছে।
তিনি জানান, গত আগস্টে তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে. চান্দরশেখর রায় এক অসুস্থ ছেলের সাথে হাসপাতালে মিটিং করে তার ইচ্ছে পূরণ করেছেন। পুষ্প দেবি জানালেন, তেলেঙ্গানার খাম্মাম জেলার এক অসুস্থ মেয়ের ইচ্ছে অভিনেতার সাথে দেখা করার। তিনি  মেয়েটার ইচ্ছে পুরণ করার জন্য তেলেগুর অভিনেতাদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন।

হিন্দুস্তান টাইমস, গালফ নিউজ অবলম্বনে শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

শহীদ মিনার কোন গোষ্ঠী বিশেষের সম্পদ নয় : শত নাগরিক

শহীদ মিনার কোন বিশেষ গোষ্ঠীর সম্পদ নয় বলে মন্তব্য করেছে নাগরিক সমাজের বৃহত্তম সংগঠন শত নাগরিক। সংগঠনটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, শহীদ মিনারে অধ্যাপক পিয়াস করিমের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়ে যারা বিরোধীতা করছেন, তারা সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, অধ্যাপক ড. পিয়াস করিমের মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত। তাঁর মৃত্যুতে শিক্ষাঙ্গনে যে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবার নয়। ড. পিয়াস করিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমাজ বিজ্ঞানে পিএইচ.ডি করে সে দেশেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা করেছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের এক উজ্জল সন্তান। দেশের টানে বিদেশের আরাম আয়েশের জীবন ত্যাগ করে তিনি ফিরে আসেন এবং অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকনোমিক্স এন্ড সোস্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে অধ্যাপনা করেছিলেন। তিনি তার ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন।
অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি একজন যথার্থ পাবলিক ইনটেলেকচুয়াল হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা শাণিত যুক্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে ব্যক্ত করতেন। অচিরেই তিনি জনমানুষের অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠেন। তার স্ত্রী অধ্যাপক আমেনা মোহসিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগে একজন কৃতি শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।
ড. পিয়াস করিমের মৃত্যুর পর এ দেশের বোদ্ধা সমাজ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য তার মরদেহ শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। চিন্তা ও চেতনার জগতে ড. পিয়াস করিম ছিলেন একজন প্রগতিশীল ও খোলা মনের মানুষ। এরকম একজন কৃতি পুরুষ আমাদের সমাজে বিরল। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় একটি মহল শহীদ মিনারে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের বিরোধিতা করে মত প্রকাশ করেছে। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং সংকীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যারা এই দূর্ভাগ্যজনক মত প্রকাশ করেছেন তারা বুঝতে পারছেন না এর ফলে একটি খারাপ নজির স্থাপিত হচ্ছে। আমরা আশা করব, তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবেন।
দর্শনগত অবস্থানের জন্য কারো সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়। কিন্তু কোনোক্রমেই তার প্রতি মৃত্যুর পর অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা যায় না। শহীদ মিনার কোনো গোষ্ঠী বিশেষের সম্পদ নয়। এটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। আমরা ড. পিয়াস করিমের বিদেহী আত্মার প্রতি পরম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং তার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।
বিবৃতিদাতারা হচ্ছেন, প্রফেসর ড. এমাজউদ্দিন আহমদ, প্রফেসর ডা. এম এ মাজেদ, বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ, কবি আল মাহমুদ, ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী, ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী, কবি ফরহাদ মজহার, ড. মাহবুব উল্লাহ, মোহাম্মদ আসাফউদদৌলা, সাদেক খান, ড.এসএমএ ফায়েজ, ড. ইউসুফ হায়দার, ড. সদরুল আমিন, শফিক রেহমান, মাহফুজ উল্লাহ, ড. তুহিন মালিক, ড. তাজমেরী এস ইসলাম, ড. মুশতাহিদুর রহমান, ড. জিন্নাতুননেসা তাহমিদা খাতুন, ড. আখতার হোসেন, ড. আমিনুর রহমান মজুমদার, ড. দিলারা চৌধুরী, ড. মুশতাহিদুর রহমান, ড. সলিমুল্লাহ, ড. আবদুল লতিফ মাসুম, কবি আল মুজাহিদী, কবি আবু সালেহ, কবি কেজি মোস্তফা, কবি এরশাদ মজুমদার, কবি হাসান হাফিজ, কবি আবদুল হাই শিকদার, রুহুল আমিন গাজী, শওকত মাহমুদ, রিয়াজ উদ্দিন আহমদ, আমানুল্লাহ কবির, কামাল উদ্দিন সবুজ, এম এ আজিজ, ডা. এজেডএম জাহিদ, ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, কৃষিবিদ আনোয়ারুন্নবী বাবলা, জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, কাদের গণি চৌধুরী, ড. তাহমিনা ইসলাম টফি, ড. দিল রওশন জিনাত আরা নাজনীন, চাষী নজরুল ইসলাম, ড. শাহেদা রফিক, ড, সুকোমল বড়ূয়া, ড. মামুন আহমেদ এলাহী নেওয়াজ খান, খন্দকার মনিরুল ইসলাম, হাসান জাকির তুহিন, ড. হারুনুর রশিদ, ড. আজহার আলী, ড. ইফতেখার মাসুদ, ড. হাসান মোহাম্মদ, ড. সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী, ড. মুনীর আহমদ চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার আবু সুফিয়ান, অধ্য সেলিম ভূইয়া ও ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম।

শুক্রবার পিয়াস করিমকে দাফন :শহীদ মিনারে অনুমতির সুযোগ নেই -ঢাবি কর্তৃপক্ষ

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মরহুম অধ্যাপক পিয়াস করিমের লাশ শুক্রবার দাফন করা হবে। মরহুমের ছোট ভাই জহির করিম আজ সন্ধ্যায় জানান, শুক্রবার সকাল দশটার দিকে তার ভাইয়ের লাশ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে বের করে ধানমন্ডির ৭ নম্বরের বাসায় নেয়া হবে। এরপর সেখানে মরহুমের কফিন দুই ঘণ্টা রাখা হবে। কেউ চাইলে পিয়াস করিমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে নেয়া হবে পিয়াস করিমের কফিন। জুমার নামাজ শেষে সেখানে জানাযার নামাজ হবে। সবশেষে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। তবে পরিবারের অনিচ্ছার কারণে কফিন শহীদ মিনারে নেয়া হবে না বলে জানান জহির করিম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এদিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মরহুম পিয়াস করিমের কফিন রাখার অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং দু’টি সংগঠন আগে থেকেই শুক্রবার শহীদ মিনারে কর্মসূচী পালনের অনুমতি নেয়ায় কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, শ্লোগান একাত্তর এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড নামের দু’টি সংগঠন আগে থেকেই শহীদ মিনারে কর্মসূচী পালনের জন্য অনুমতি নিয়ে রেখেছে। সে কারণে আর কাউকে সেখানে শুক্রবার কোন কর্মসূচী বা অন্য কোন কর্মকান্ড পালনের অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া পিয়াস করিমের লাশ সেখানে রাখার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদসহ বেশ কিছু সংগঠন। যে কারণে লাশ নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সেখানে লাশ রাখার অনুমতি দেয়া সম্ভব হবে না বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, গত সোমবার ভোরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ড. পিয়াস করিম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৫৬ বছর। ওই দিন ভোরে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা অ্যাম্বুলেন্সে করে ধানমন্ডির বাসা থেকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেয়ার পর সকাল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।
বরেণ্য শিক্ষক পিয়াস করিমের মৃত্যুতে দেশের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক মহল সহ সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। মরহুমের তিন বোন সহ অন্যান্য স্বজনেরা বিদেশে অবস্থান করায় চারদিন পর আজ বাদ জুমা তার লাশ দাফন করা হবে বলে পিয়াস করিমের ভাই জহির করিম জানিয়েছেন।
শুক্রবার বিএনপির শোক দিবস
মরহুম পিয়াস করিমের মৃত্যুতে শুক্রবার সারাদেশে শোক দিবস পালন করবে বিএনপি। শোক দিবস পালন উপলক্ষে দেশব্যাপী সকল পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, দলীয় পতাকা অর্ধ:নমিতকরণ এবং দলের নেতা-কর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করবে। ড. পিয়াস করিমের মৃত্যুতে দেশব্যাপী শোক দিবস কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের জন্য বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদেরকে অনুরোধ করা হয়েছে।

না জানার দোষ-গুণ by সাযযাদ কাদির

জাকারিয়া শিরাজী, আমাদের জ্যাক ভাই, আজ নেই, ভাবছি তিনি থাকলে কি বলতেন! প্রতি বছর, সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ ঘোষণার আগের রাত ১১-০০টার দিকে, ফোন করে ভবিষ্যদ্বাণী করতেন সম্ভাব্য বিজয়ী সম্পর্কে। প্রথমে নামটি বলতেন, তারপর বলতেন, ‘কাল এই নামটি দেখবেন পত্রিকায়।’ আমাকেও বলতেন ভবিষ্যদ্বাণী করতে। নানা কথা বলে সে বিপদ এড়াতে হতো তখন। জ্যাক ভাই সব সময়ই বলতেন ঔপন্যাসিকদের নাম, এ প্রশ্নে প্রায়ই দ্বিমত হতো তাঁর সঙ্গে। মনে আছে ২০০৫ সালে তিনি বলেছিলেন ইংরেজ ঔপন্যাসিক জন ফাউলস-এর নাম। এর কিছু আগে থেকে ফাউলস-এর ‘দ্য ম্যাগাস’ (১৯৬৫) ও “দ্য ফ্রেঞ্চ লেফটেন্যান্ট’স উয়োম্যান” সম্পর্কে বলছিলেন জ্যাক ভাই, কবি কায়সুল হক সম্পাদিত ‘শৈলী’তে কিছু লিখেছিলেনও সম্ভবত। সে রাতে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি সর্বান্তঃকরণে আস্থা জানিয়েছিলাম আমি। কারণ ফাউলস-এর নভেলেট ও ছোটগল্প সঙ্কলন ‘দি এবোনি টাওয়ার’ আমার সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর একটি। পরদিন নাম ঘোষণা হলো বৃটিশ নাট্যকার হ্যারল্ড পিনটার-এর। মাসখানেক পরে, ৫ই নভেম্বর, মারা গেলেন জন ফাউলস। জ্যাক ভাইকে বললাম, আন্তন চেখভ, তলস্তয়, জেমস জয়েস, ভারজিনিয়া উলফ, আরথার মিলার, ভ্লাদিমির নবোকভ, গ্রাহাম গ্রিন, হরহে লুই বরহেস সহ অনেকেই পান নি নোবেল। তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারপর এক দীর্ঘ তালিকা দিয়ে বললেন, এঁরাও পান নি। আরও বললেন, চারচিল পেলে মাও চ’তোং পাবেন না কেন? গত ২২শে জানুয়ারি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন জ্যাক ভাই। তাঁর বিদায়ের সঙ্গে-সঙ্গে আমার জন্যও বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্ববাতায়নের উদার উন্মুক্ততা। তাঁর মাধ্যমেই পরিচিত হয়েছি আমেরিকান ঔপন্যাসিক করম্যাক ম্যাককারথি (‘ব্লাড মেরিডিয়ান’, ‘নো কানট্রি ফর ওল্ড মেন’), ডন ডিলিলো (‘হোয়াইট নয়েজ’, ‘লিবরা’), টমাস পিনচন (“গ্র্যাভিটি’স রেইনবো”, ‘মেসন অ্যান্ড ডিকসন’) প্রমুখের সঙ্গে। এঁরা সবাই নোবেল পেতে পারেন বলে জ্যাক ভাইয়ের মতো আমিও বিশ্বাস করি দৃঢ়ভাবে। তবে অজ্ঞাতদের প্রতি বিশেষ ঝোঁক থাকায় যোগ্যতায় উঁচুতে অবস্থান করলেও অনেকের দিকে তাকায় না নোবেল কমিটি। এবার জাঁ পাতরিক মোদিয়ানো’র নোবেল প্রাপ্তিতে এ সব বিষয় নিয়েই ঘুরেফিরে আলোচনা হচ্ছে বিশ্বসাহিত্য-মহলে। অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করছেন আমেরিকান ঔপন্যাসিক ফিলিপ রথ, বৃটিশ ঔপন্যাসিক সলমান রুশদি, কানাডিয়ান কবি-ঔপন্যাসিক মারগারেট অ্যাটউড, চেক লেখক মিলান কুনদেরা, জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামি কবে বা আদৌ পাবেন কিনা নোবেল। জ্যাক ভাই আজ থাকলে জিজ্ঞেস করতেন, জানেন নাকি পাতরিক মোদিয়ানো  এবার নোবেল পেলেন সাহিত্যে? হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, কে? জ্যাক ভাই বলতেন, ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার প্রতিক্রিয়া যথার্থ হয়েছে, কারণ আপনি ফরাসি নন। অবশ্য ফরাসি হলেও যে তাঁকে সঙ্গে-সঙ্গে চিনে ফেলতেন - তা-ও নয়।
তা উনি ঔপন্যাসিক নাকি? আপনি তো আবার ঔপন্যাসিকদেরই নোবেল পাওয়া সমর্থন করেন!
মানে... মোদিয়ানো তো চিত্রনাট্য লেখেন, বাচ্চাদের বই লেখেন। তবে হ্যাঁ, উপন্যাসের জন্যই তাঁর পরিচয় বেশি। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘মিসিং পারসন’ (১৯৭৮)। সেটা এক গোয়েন্দা কাহিনী।  ইংরেজিতে মাত্র কয়েকটি বই অনুবাদ হয়েছে তাঁর, এর মধ্যে ওটাও হয়েছে।
তাহলে তার অবদান, কীর্তি?
নোবেল কমিটি বলেছে, মোদিয়ানো পুরস্কার পেয়েছেন ‘সেই স্মৃতিশিল্পের জন্য যা দিয়ে তিনি জাগিয়ে তোলেন সবচেয়ে ধারণাতীত মানবিক নিয়তি এবং অধিকৃত জীবনবিশ্বের উদঘাটন’।
অধিকৃত... মানে নাৎসি অধিকৃত প্যারিস, ফ্রান্স নাকি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বুঝেছেন! দখলমুক্ত হওয়ার ক’ সপ্তাহ আগে মোদিয়ানো’র জন্ম হয় প্যারিসে। ওর বাবা ইহুদি, চোরাকারবারি... সম্ভবত জার্মান গেসটাপোদের সহযোগী। মোদিয়ানো’র অনেক লেখায় পাবেন নাৎসি অধিকৃত জীবনের নানা জটিলতা ও আপসমুখিতার কথা। তাঁবেদার ভিশি সরকারের আমল সম্পর্কে একালে যে ব্যাপক বিস্মৃতি... মোটামুটি সেটাই তাঁর বিষয়।
এই তো বেশ নোবেল-নোবেল ব্যাপার...!
আসল কথা তিনি ফরাসি। এ পর্যন্ত ১৫ জন ফরাসি নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হলেন তাঁকে নিয়ে।
কোনও যোগসাজশ নেই তো?
মনে হয় না। ‘তিরিশ বছরের যুদ্ধ’ (১৬১৮-১৬৪৮)-এর পর থেকে সুইডেনের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল, তবে এখন তো দু’জনই বলছে ‘ও সব অতীতের ব্যাপার’। তাহলেও একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার নিয়ে খোঁচাখুঁচি করার মতো সম্পর্ক যে নেই তা বলা যায় নিঃসন্দেহে। আহা, অর্থনীতির নোবেল-ও তো গেল ফ্রান্সের ঘরে।
মোদিয়ানো এখন কি করবেন?
এই ১.১ মিলিয়ন পাউন্ড পুরস্কার আরও ধনী করেছে তাঁকে। এখন থেকে কর দেবেন আগের চেয়ে বেশি। তারপর তাঁর যা অভ্যাস... মিডিয়া যেমন এড়িয়ে চলেন তেমনই চলবেন।
তাহলে আমি যে তাঁর নাম জানতাম না, এতে দোষ হয় নি তো?
মোটেও না। প্রায় কেউই তো জানে না!
জ্যাক ভাই নেই, এবার আমার কাছে কারও কোনও জিজ্ঞাস্যও নেই।
১৫.১০.২০১৪

মালালা তুমি কার! by মাসুদ মজুমদার

প্রথমেই বিবেচনায় নিতে হবে, মালালারা প্রত্যেক দিন জন্ম নেন না। প্রতিদিন এক দু’টি করে মালালা সৃষ্টিও করা যায় না। মালালা এ সময়ের আলোচিত কন্যা। তাকে নিয়ে বিতর্ক করার জায়গা অনেক প্রশস্ত। আবার নন্দিত চোখে দেখার সুযোগও অবারিত। যুক্তিবাদী মানুষের কাছে মালালা নন্দিত চরিত্রও বটে! তাকে বহুভাবে মূল্যায়নের সুযোগ আছে, তাই স্থূলভাবে দেখা কিংবা মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়। প্রতিষ্ঠিত ধারণা হচ্ছে, প্রগতিশীল মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিক্রিয়াশীলরা প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের মধ্যে আটকে থাকে। মালালাকে নিয়ে অতি উচ্ছ্বাস যেমন বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক, নির্র্লিপ্ত থাকাও অসঙ্গত। মালালা এখনো বালিকা। প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা। আবার প্রভাবক হওয়ার মতো কিছু বিষয় ভাবনা তার ভেতর আছে। যারা ভাবেন মালালাকে নোবেল দিয়ে নোবেলের ভাবমর্যাদা নষ্ট করা হয়েছে, তারাই নোবেল না পেলে মন্তব্য করতেন মুসলিম মেয়ে বলেই তাকে প্রাপ্য সম্মান দেয়া হয়নি। গেলবার আলোচিত হয়েও না পাওয়ার কারণে এমন মন্তব্যই শুনেছি।
আমাদের আলোচিত পাকিস্তানি কিশোরী মালালা ইউসুফজাই এবার শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। নারী অধিকার রক্ষার সংগ্রামে নিজ বিশ্বাসের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। তাকে পুরস্কার দেয়ার ব্যাপারে নোবেল কমিটির যুক্তিগুলো হয়তো ঠুনকো নয়, কিন্তু তার প্রতিবাদী লড়াইকে সামনে এনে তাকে তালেবানের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অন্তহীন চেষ্টাও লক্ষণীয়; যার সাথে সত্য ও সততার সম্পর্ক দুস্তর। এ কারণেই নিজ দেশ পাকিস্তানে প্রশ্ন উঠেছেÑ মালালা তুমি কার! নিজ দেশে তিনি অনেকটা ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে রয়েছেন। দেশটির অনেক মানুষ তাকে সন্দেহ করেন। ভাবেন পশ্চিমারা তাকে ও তার বাবাকে ব্যবহার করছে। পাকিস্তানিদের মধ্যে কারো কারো ধারণা, পাকিস্তানের ভাবমর্যাদা ুণœ করতে তাকে দাঁড় করানো হয়েছে দেশটির জাতীয় আদর্শ ইসলামের বিরুদ্ধে। এ যুক্তি খণ্ডন করে বক্তব্য দেয়ার লোকও পাকিস্তানে রয়েছে। মালালার ইসলাম বিরোধিতার কোনো প্রমাণ নেই। তালেবান প্রশ্নে তার পরস্পর বিপরীতধর্মী দু’টি মত পাওয়া যায়; যার সাথে ইসলামবিদ্বেষের কোনো সংশ্রব নেই। তা ছাড়া মালালা কখনো নিজেকে ইসলামের প্রতিনিধিও দাবি করেননি।
মালালার বয়স এখন ১৭ বছর। পশ্চিমা মিডিয়া ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছে, নারীশিক্ষার অধিকারের পক্ষে জোরালো আবেদন জানানোর কারণেই ২০১২ সালে অদৃশ্য হামলায় মারাত্মক আহত হন তিনি। বন্দুকধারীদের ওই লক্ষ্যভেদী হামলায় মালালা প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এরপর তার প্রতি মমত্ববোধ ও সহমর্মিতা সর্বত্র প্রদর্শিত হয়েছে, যা মানবিক কারণেই প্রত্যাশিত ছিল। এ সময় বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন মালালা। পশ্চিমারা সেই থেকে মালালাকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পশতুন উপজাতীয় এলাকায় তৎপর চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একজন প্রতীকে পরিণত করতে সচেষ্ট রয়েছেন। একই যুক্তিতে মার্কিন সরকার পাকিস্তানে ড্রোন হামলার বৈধতা আদায় করতে চাচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, শিক্ষাদীক্ষায় পশ্চাৎপদ অঞ্চলটিতে নারীরা পর্দা মেনে চলেন। নিজেদের লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেন। নারীশিক্ষা সীমাবদ্ধ রাখেন একটি গণ্ডির ভেতর। তারপরও তালেবানদের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত ফুঁসিয়ে তুলতে তিলকে তাল করতে কেউ কেউ সচেষ্ট। সেখানে ছেলেদের শিক্ষাও শনৈঃশনৈ এগোবার স্তরে নেই। নানামুখী প্রচারণার সবটুকু সত্যও নয়। লোকজ ঐতিহ্য এবং নিজস্ব জাতিগত মূল্যবোধগুলোকে ভুলভালভাবে প্রচার করা হয় তালেবানদের অন্ধকার যুগের মানুষ প্রমাণ করার জন্য। অথচ এই তালেবানদেরই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকাতে আধুনিক যোদ্ধা এবং লড়াকু স্বাধীনতাকামী হিসেবে তুলে ধরেছে। সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকজুড়ে সোভিয়েত ব্লক ছাড়া বিশ্বজোড়া তালেবান ছিল নন্দিত নাম। তালেবান বা ছাত্ররা তাদের ঈমান ও দেশ রক্ষার সংগ্রাম করে জিতেছে। হেরেছে আগ্রাসনবাদী সোভিয়েত ইউনিয়ন। মাঝখানে ফায়দা তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সত্য ওরা জানে, আমরা ভুলে গেছি। সোভিয়েত আগ্রাসন মোকাবেলায় তালেবানেরা রাবাত থেকে জাকার্তা, ঢাকা থেকে জেদ্দাÑ সর্বত্র সমর্থন পেয়েছে। পরে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে মুসলিম বিশ্বও সমর্থন পাল্টায়।
পরবর্তী সময়ে তারা হেরে গেছে পশ্চিমা কূটকৌশলের কাছে। এখন তাদেরই চিত্রিত করা হচ্ছে হায়েনা কিংবা হিংস্ররূপে। পশ্চিমারা সময়ের সাথে সাথে বন্ধু পাল্টায়। শত্রুও নতুনভাবে আবিষ্কার করে। এখন মালালা বন্ধু, ক’দিন আগেও ভিসা পাওয়ার অযোগ্য নরেন্দ্র মোদিও এখন বন্ধু। লাদেনও তাদের বন্ধু ছিল। মুরসি, গাদ্দাফি, সাদ্দামও শত্রু ছিলেন না। কথায় আছে যুক্তরাষ্ট্র কারো বন্ধু হলে তার আর শত্রুর প্রয়োজন পড়ে না। এই সত্যের মুখোমুখি মালালা এখনো হননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিলাস ও বন্ধুদের সাথে নিষ্ঠুরতার ইতিহাস পাকিস্তানিরা জানে। জানে আফগানরাও। ইরাকের জনগণ, ফিলিস্তিনবাসী, লিবীয় মানুষও এই বন্ধুত্বের মাজেজা বোঝে। বোঝে তিউনিস, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া ও মিসরবাসী। এসব তিক্ত সত্যটা মালালা জানেন না। মালালা জানেন না গুয়ান্তানামো বে’র মার্কিন বীভৎসতা সম্পর্কেও।
গত বছর জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে মালালা বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসীরা ভেবেছিল তারা আমাদের লক্ষ্যকে পরিবর্তন করে দেবে, আমাদের আকাক্সাকে অবদমিত করবে কিন্তু তারা আমার জীবনের কিছুই পরিবর্তন করতে পারেনি বরং মৃত্যু ঘটিয়েছে আমার দুর্বলতা, ভয় ও হতাশার আর জন্ম নিয়েছে শক্তি, ক্ষমতা ও সাহস।’ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এ বক্তব্য অবশ্যই নন্দিত হওয়ার মতো। অথচ তার আরো বক্তব্য রয়েছে যা শোনানো হয় না। বিশ্বের বহু মানুষের জন্য মনোমুগ্ধকর ওই ভাষণে মালালা আরো বলেছিলেন, ‘এমনকি যে তাকে গুলি করেছিল তাকেও আমি ঘৃণা করি না। এমনকি আমার হাতে যদি বন্দুকও থাকে এবং সে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় তাহলেও আমি তাকে গুলি করব না।’ মালালার এসব সংবেদনশীল বক্তব্যের সাথে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়; কিন্তু তার জাতি ও ধর্ম নিয়ে আরো যেসব বক্তব্য রয়েছেÑ সেসব ব্যাপারে পশ্চিমা মিডিয়া আগ্রহ দেখায় না কেন?
মালালা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার পুরস্কার পেয়েছেন। গত বছরও তিনি নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রার্থী ছিলেন। বর্তমানে ব্রিটেনে অবস্থানকারী মালালা একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। স্কুলে থাকা অবস্থায় তিনি নোবেল পাওয়ার সংবাদটি পান। সময় ও পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রহের কারণে মালালা নারীর শিক্ষা অধিকার ও অন্যান্য মানবাধিকার বিষয়ে একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বে উন্নীত হয়েছেন। পশ্চাৎপদ মুসলিম দেশগুলো নিয়ে তার আগ্রহ প্রচুর। মালালার জন্মস্থান সোয়াত উপত্যকার মানুষ এখনো তাকে নিয়ে কোনো উপসংহার টানেনি। সন্দেহ, আশঙ্কা আর ঈর্ষার সংমিশ্রণে তাদের মধ্যে রয়েছে দ্বিধা। তাদের কন্যা মালালার ওপর হামলাকে তারা ঘৃণা করে। আবার তাদের কন্যাটিকে পশ্চিমারা তাদেরই মর্জিমতো ব্যবহার করছে কি না, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছে না। পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী চরিত্র ও নীতি সম্পর্কে পাকিস্তানিরা বেশি খবর রাখে। কারণ, তাদের তারা বন্ধু হিসেবে দেখছে। আবার শত্রু হিসেবেও দেখছে। একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ব্যবহার করেছে। এখন নিত্য ড্রোন হামলা উপহার দিচ্ছে। তারাই একসময় তালেবানদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে, এখন তাদের ধ্বংস কামনা করে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে।
 যেকোনো আলোচিত মানুষকে নিয়ে সমালোচনা হয়। তাকে নানা দেশের চর ভাবা হয়। কে কখন আইএসআইয়ের কিংবা সিআইএ’র দালাল সেজে যান বা সাজানো হয় তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। মালালাকে এখন সিআইএ কিংবা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর চর বলা সহজ কিন্তু তাকে চর সাজালেই সব কথা ফুরিয়ে যাবে না। মালালার সামনে অনেক পথ। দীর্ঘ পথচলায় মালালা কোথায় গিয়ে থিতু হবেনÑ সেটা আজ বলে দেয়া সম্ভব নয়। লাদেন চরিত্র পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে পশ্চিমাদের, তারাই তাকে খলনায়ক সাজিয়েছে। তাই মালালাকে নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি।
মালালা ছোটবেলা থেকেই পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবর পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সোয়াতের মিঙ্গোরা শহরের স্কুলে পড়তেন। ওখানেই তার হাতেখড়ি। সেখানে নারীশিক্ষা নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। নারীশিক্ষা নিয়ে প্রচারণা ও বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে ভাবলে মালালাই সত্যের সাক্ষ্য হয়ে যাবেন। কারণ মালালা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হননি। অভিযোগ তোলা হয় মতের স্বাধীনতা রক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ুব্ধ হয়েছেন। এটা ঠিক, সে সময় ভূ-রাজনীতির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই উপত্যকায় ক্ষমতায় ছিল তালেবান। সেখানে তারা কিছু ‘শরিয়তি আইন’ও প্রবর্তন করেছিল। নারীশিক্ষার ব্যাপারে তাদের নিজস্ব কিছু দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল। প্রায়ই বলা হয়, যা মালালার কাছে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতো না। তারপরও মাথায় ওড়না টেনে চলাফেরায় অভ্যস্ত মালালাকে ইসলামের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ নেই, যুক্তিও নেই। কারণ তার এই দেড় যুগের জীবন তাকে আলোচিত মানুষে পরিণত করেছে, এখনো জীবনের পূর্ণ উপলব্ধি দিয়ে গড়ে তোলেনি। তারপরও বলব, মালালা জীবন ও জগৎকে অবারিত চোখে দেখার ও বোঝার সুযোগ পেতে শুরু করেছেন। সময় বলে দেবে মালালা কার সম্পদ, কার বোঝা।
জাতিসঙ্ঘে মালালা মুসাবিদা করা ভাষণে বলেছিলেন, ‘জ্ঞানীরা বলে থাকেন, কলম তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী, তাদের সে কথা সত্য। চরমপন্থীরা বই ও কলমের ভয় পায়। শিক্ষার ক্ষমতায় তারা ভীতসন্ত্রস্ত থাকে।’ তার এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। বক্তব্যের প্রথম অংশ হাদিস বিধৌত। যে ধর্ম নারী পুরুষ নির্বিশেষে জ্ঞান অর্জনকে ফরজ বলে, সেই ধর্মের অনুরাগী ও অনুসারী মালালা এই সত্যটি জানেন। সবার মাথায় এ সত্যটি রাখা ভালো।
মালালার নোবেল জয়ে পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্তরা ছাড়া সবাই খুশি হবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। নোবেল যারা পাইয়ে দেন তাদের মহৎ উদ্দেশ্যের সাথে রাজনৈতিক এজেন্ডাও থাকে এবং যারা পান তারা কেউ দোষ-গুণের ঊর্ধ্বে নন। তারপরও বিজ্ঞান-সাহিত্য-অর্থনীতি দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়। শান্তি একটি আপেক্ষিক প্রসঙ্গ। কারো কাছে যা সন্ত্রাস সেটা কারো কাছে মুক্তিযুদ্ধ। কারো কাছে যা বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান কারো কাছে সেটাই স্বাধীনতার কামনা। তাই শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক অপ্রাসঙ্গিক নয়। কোনো শান্তি পুরস্কারই অবিতর্কিত থাকেনি। তারপরও মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারটি তৃতীয় বিশ্বের মাত্র সতের বছর বয়সের একজন মুসলিম বালিকার গৌরবময় অর্জনকে ম্লান করে দেয় না।

যে ফোন পাল্টে দিয়েছিল মেসির জীবন

১ মে ২০০৯। শুক্রবার। ছুটির দিনেও পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার অনুশীলন মাঠে তাঁর অফিসে। রাত হয়ে গেছে। পরদিন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা ম্যাচ। এল ক্লাসিকোতে রিয়াল মাদ্রিদের মুখোমুখি বার্সা। কিন্তু গার্দিওলার অফিস ছাড়ার কোনো তাড়া নেই। তিনি যেন কিছুটা উদ্বিগ্ন। তার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চিত। ঘরে মৃদু আলো। মৃদু একটা বাজনাও বাজছে। এমন পরিবেশই গার্দিওলার পছন্দ। ভাবতে ভীষণ সুবিধা হয়।

অবশেষে সিদ্ধান্তটা তিনি চূড়ান্ত করেই ফেললেন। ফোন তুলে ডায়াল করলেন। এক-দুবার রিং হতেই ওপ্রান্তে চেনা কণ্ঠস্বর ‘হ্যালো’ বলে উঠল। গার্দিওলা উত্তর দিলেন, ‘লিও, পেপ বলছি। আমি গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস দেখেছি, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তোমাকেও দেখাতে চাই। এখানে চলে আসবে একটু, প্লিজ, এখনই!’
গার্দিওলার কণ্ঠে ছিল রোমাঞ্চ। কিছু একটা আবিষ্কারের। মেসি ছুটে এলেন। রাত সাড়ে ১০টায় গার্দিওলার দরজায় মৃদু কড়া নাড়লেন। ভেতরে ঢুকলেন ২১ বছর বয়সী মেসি। মেসি তখনো জানতেন না, গার্দিওলার কক্ষে নয়, তিনি পা দিতে চলেছেন তাঁর জীবনেরই নতুন এক অধ্যায়ে। যে অধ্যায় পুরোপুরি পাল্টে দেবে তাঁর জীবন। শুধু মেসি? পাল্টে দেবে ফুটবলের মানচিত্রও!
কোনো ভণিতা না করে খোলাখুলি গার্দিওলা মেসিকে তাঁর নতুন আবিষ্কার বুিঝয়ে বললেন, ‘কালকে মাদ্রিদের ম্যাচে তুমি বরাবরের মতো উইংয়েই শুরু করবে। কিন্তু যে মুহূর্তে আমি তোমাকে ইশারা করব, তুমি মাঝমাঠের ওপরের দিকে সরে আসবে...।’
গুরু-শিষ্যের মধ্যে আরও কিছুক্ষণ বাতচিত চলল। তৈরি হলো ফুটবলের নতুন পজিশন ‘ফলস নাইন’। এর আগে উইংয়ে খেলে আসা মেসি এখন থেকে খেলবেন ছদ্ম-স্ট্রাইকার হিসেবে। পুরোদস্তুর স্ট্রাইকার না হলেও মেসিই এখন থেকে দলের আসল স্ট্রাইকার!
২ মে মাঠে বাস্তবায়িত হয়েছিল গার্দিওলার এই রণকৌশলের। যে আবিষ্কার প্রতিপক্ষের জন্য ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। আকস্মিক। সেদিন যে িরয়ালের মাঠে পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল কে। হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো বিধ্বস্ত হয়েছিল রিয়াল। নিজেদের মাঠে বার্সেলোনার কাছে হেরে গিয়েছিল ৬-২ গোলে!
ম্যাচের দশম মিনিটে গার্দিওলা তাঁর সেই বিশেষ ‘ইশারা’টি করেন। ফরোয়ার্ড থেকে ডান উইংয়ে সরে আসেন স্যামুয়ের ইতো। আর ইতোর জায়গা নেন মেসি। এই পরিবর্তন একেবারেই প্রত্যাশা করেনি রিয়াল রক্ষণ। ফ্যাবিও ক্যানাভারোর মতো অভিজ্ঞ রক্ষণসেনা পর্যন্ত থ মেরে গিয়েছিলেন। সে সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করে ক্যানাভারোর রক্ষণ-সঙ্গী ক্রিস্তোফ মেৎজেলদার বলেছিলেন, ‘ফ্যাবিও আর আমি কেবল মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলাম। আমরা এখন কী করব? আমরা কি এগিয়ে গিয়ে ওকে মাঝমাঠে সামলাব, নাকি নিচেই অপেক্ষা করব মেসির উঠে আসার? আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’
শুধু ক্যানাভারো না, মেসিকে হুট করে ফলস নাইন পজিশনে তুলে নিয়ে আসা গার্দিওলার এই টোটকা আর কেউই সামলাতে পারেনি। বদলে গিয়েছিলেন মেসি নিজেও। একের পর এক গোলবন্যায় স্নাত করেছেন একেকটি মৌসুম।
১ মে রাতের সেই ফোন কলটাই এভাবে বদলে দিয়েছিল মেসির জীবন। ফুটবলকেও! সূত্র: টেলিগ্রাফ।

সমাজে ঈর্ষা ও পরনিন্দা প্রসঙ্গে by এ কে এম শামছুল হক রেনু

আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সা:-এর আবির্ভাবের আগে আরবের মহাদুর্যোগ ও ঘোর অমানিশার যুগকে আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগ, অন্ধতার যুগ, অজ্ঞতার যুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়। সেই সময় কন্যাসন্তান হলে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। রাসূল সা:-এর ওফাতের পর ইসলাম ধর্মের ওপর নেমে আসে চরম বিপত্তি, বিদ্রোহ, বিপর্যয়। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর পিকে হিট্টি History of Arab-এর এক জায়গায় বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, Had there been no Abu Baker (R.) Islam would be melted way by compromise with the Bedween tribes। অর্থাৎ হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওফাতের পর হজরত আবু বকর রা: না থাকলে ইসলাম বেদুইনদের সাথে আপস করে ধ্বংস হয়ে যেত। সে সময় এর পেছনে ছিল গিবত, হিংসা, মুনাফেকির বিরাট ভূমিকা ছিল। সামনে চাটুকারিতা ও পেছনে মুনাফিকতা। এ অবস্থা রাজনীতি, সমাজ, প্রশাসনসহ সব জায়গায় দাবানলের আকার ধারণ করে রয়েছে। নিয়মনীতি, আদর্শের বালাই নেই। স্বার্থই তাদের নীতি ও আদর্শ। এ প্রবণতা সব সময় মতাসীন পরিমণ্ডলেই ব্যাপক আকার ও রূপ পরিগ্রহ করে থাকে।
মুনাফিক ও বেঈমানদের সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের আলোকে অপো করেছে চরম ও কঠিন শাস্তি। তবে গিবতখোর, পরনিন্দুক ও হিংসুকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, তারা আপন মৃত ভাইয়ের পচা মাংস চিবিয়ে খায় এবং তাদের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বেহেস্তের দরজায় সিলগালা মেরে দিয়েছেন। পৃথিবীর কোনো প্রাণী তাদের স্বজাতির মাংস খায় না। ‘ইতিহাসের জনক’ হেরোডোটাস লিখেছেন, প্রাচীন বিশ্বের অনেক জায়গায় কারো বাবা-মা মারা গেলে মৃত ব্যক্তির ছেলেমেয়েরা মহাধুমধামে তাদের বাবা-মায়ের মাংস রান্না করে খেয়ে ফেলত। গিবতযেমনি গিবতখোরদের সম্পর্কে আপন মৃত ভাইয়ের পচা মাংস খাওয়ার উল্লেখ রয়েছে সহি হাদিসে। হিরো ডেটাস বলেছেন, মানুষের রুচিবোধ নিয়ে যেমন ভালো ভালো উপমা রয়েছে, তেমনি নিচুতা নিয়েও নিকৃষ্টতম উদাহরণ, যার অন্ত নেই।
উপমাটি আরব্য উপন্যাস থেকে সংগৃহীত। এক মহিলা তার জীবদ্দশাতে গিবত বলে অনেক মানুষের তি করেছিল। সাজানো গোছানো সংস্কার থেকে আরম্ভ করে চাকরির বেলায়ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপরে দৃষ্টিতে এমন কিছু মিথ্যা ও সাজানো অপলাপ তুলে ধরত, যার ফলে অনেক ন্যায় নিষ্ঠাবান কর্মজীবীদের চাকরি হারাতে হতো। মহিলা বৃদ্ধ হওয়ার পর তার কাছে কেউ যেত না, এমনকি সেও বার্ধক্যের কারণে কোথায়ও যেতে পারত না। একদিন মহিলাকে রাস্তার চার মাথার মোড়ে রেখে আসা হলো। সেখানেও পথচারীদের ডেকে এনে চিরাচারিত গিবতই করত। বৃদ্ধ বয়সেও তার স্বভাবের পরিবর্তন না হওয়ায়, একদিন তার হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হলো। ডুবের যাওয়ার আগ মুহূর্তে সে চীৎকার করে বলছে হে দয়ালু আল্লাহ তুমি আমাকে রা করো। এ দৃশ্য দেখে তাকে নদী থেকে তোলা হলো এবং বাকি জীবনে গিবত করবে না বলে প্রতিশ্র“তি করলেও সে কিছু দিন পর স্থান পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় গিয়ে গিবতের পথই অনুস্মরণ করল। পরশ্রীকাতরতা, হিংসা ও গিবতের বেড়াজালে নিজের থেকে এমন একটি ঘটনার কিঞ্চিত উল্লেখ করা হলো। এক-এগারোর সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারমান, সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, দুর্নীতি প্রতিরোধে সারা দেশের প্রায় জেলা উপজেলায় সেমিনার ও আলোচনা সভা করতে গিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা কালেক্টরেট প্রাঙ্গণেও একটি সভার আয়োজন করেন। সভায় জেলা বারের সভাপতি এবং উপস্থিত সুধীজনদের মধ্যে হতে তার (দুদক চেয়ারম্যান) ইচ্ছায় একজনকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হবে বলে, তিনি আসার পাঁচ-ছয় দিন আগেই শোনা যাচ্ছিল। আমার একান্ত পরিচিত সরকারি-বেসরকারিপর্যায়ের কয়েকজন শুভার্থী বললেন, অনুষ্ঠানে আপনার বক্তব্য দিতে হবে। বলেছিলাম, আমার বক্তব্য দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুনেছি, বক্তাদের ব্যাপারে একটি নীতিমালা রয়েছে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর আল্লাহ মেহেরবান, দুদক চেয়ারম্যানের আহ্বানেই এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিলাম। পরে জানতে পালাম পরশ্রীকাতর, পরনিন্দুক ও গিবত সাম্রাজ্যের এক-দুইজন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে জানতে চাইলেন, তাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ লোকদের বাদ দিয়ে আমাকে কিভাবে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ দেয়া হলো। পরে শুনেছি, দু’জনেই নাকি বলেছিলেন, এটা আমাদের বিষয় নয়। দুদক চেয়ারম্যান সাহেবকে জিজ্ঞাসা করুন। আল্লাহর রহমত থাকলে গিবত বলে, কাউকেও খাটো করা যায় না। ১৯৮২ সালের জুলাই মাসের ঘটনা, তখন দেশে সামরিক শাসন। ঢাকার হোটেল শেরাটনে কনফারেন্স রুমে বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী, মেজর জেনারেল আবদুর রহমান, প্রথিতযশা সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সুধীজনদের উপস্থিতিতে ‘অন্যায়ের প্রতিরোধ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ ঘটে। সেখানে বক্তব্যে বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী বলেছিলেন, ‘দেশের ভালো মানুষগুলো আজ বড় অসহায়, তবে খারাপ ও দুর্নীতিবাজরা মাথার ওপর চেপে বসেছে।’ মেজর জেনারেল আবদুর রহমান বলেছিলেন, ‘তোষামোদ ও অতি প্রশংসাকারী যেমন জাতির ক্যান্সার, তেমনি সমাজের গিবতখোর, পরশ্রীকাতর ও নিন্দুকেরাও দুর্নীতিবাজদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’ এ দু’টি শ্রেণী পেশার লোকদের ব্যাপারে পদপে নেয়াটাও অন্যায়ের প্রতিরোধ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠারই নামান্তর। সম্ভাবনাময় ও উন্নয়নশীল স্বাধীন এ দেশটি পিছে থাকার এটিও কারণ বলা চলে।

সংবিধান ও রাজনীতি- সংবিধানের প্রস্তাবনা কী বলে? by ইকতেদার আহমেদ

 প্রস্তাবনা শব্দটির ইংরেজি Preamble বাংলায় এ শব্দটির অর্থ সাধারণ কোনো পুস্তকের ক্ষেত্রে ‘ভূমিকা বা উপক্রমণিকা’ হলেও সংসদ প্রণীত আইন বা সংবিধানের ক্ষেত্রে ‘কারণ ও উদ্দেশ্য সংবলিত বক্তব্য’। ১৯৭২ সালে প্রণীত আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনা পাঁচটি অনুচ্ছেদ সমন্বয়ে গঠিত। মূল প্রস্তাবনাটিতে আছেÑ আমরা বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছি;
আমরা অঙ্গীকার করছি যে, যেসব মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদের প্রাণ উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলÑ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেসব আদর্শ এ সংবিধানের মূলনীতি হবে;
আমরা আরো অঙ্গীকার করছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠাÑ যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে;
আমরা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করছি যে, আমরা যাতে স্বাধীন সত্তায় সমৃদ্ধি লাভ করতে পারি এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা-আকাক্সার সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারি, সে জন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিরূপে এ সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুণœ রাখা এবং এর রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য;
এতদ্বারা আমাদের এ গণপরিষদে, অদ্য ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসের ১৮ তারিখ মোতাবেক ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসের ৪ তারিখে আমরা এ সংবিধান রচনা ও বিধিবদ্ধ করে সমবেতভাবে গ্রহণ করলাম।
উল্লেখ্য, গণপরিষদে সংবিধান ১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর গৃহীত হলেও এ সংবিধান কার্যকর হয় ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
এরপর ৪২ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসে এ প্রস্তাবনাটি দু’বার সংশোধিত হয়। প্রথম সংশোধন হয় দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চম সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮-এর মাধ্যমে। সে সময় দেশে সামরিক শাসন ছিল। এ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবনার উপরিভাগে-বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম (দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে) শব্দগুলো সন্নিবেশিত হয় এবং প্রথম অনুচ্ছেদে জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের শব্দগুলো জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের শব্দগুলো দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়।
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার শব্দগুলো সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারের শব্দগুলো দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়।
পরে পঞ্চদশ সংশোধনী দিয়ে আগের ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে গেলেও প্রস্তাবনার উপরিভাগের বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম (দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহের নামে) শব্দগুলো অক্ষুণœ রেখে এর নিচে পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে শব্দগুলো সন্নিবেশিত হয়।
প্রস্তাবনাটি অবলোকনে প্রতীয়মান হয় এতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। স্বাধীনতা ঘোষণা বিষয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় জনগণের স্বাধীনতা ঘোষণার বক্তব্য থাকায় ধরে নিতে হবে এ দেশের সব শ্রেণী-পেশা তথা আপামর জনগণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। সুতরাং প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে কে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, এ বিতর্কে না গিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার কৃতিত্ব জনগণকে দেয়া উচিত। আর যদি একান্ত বিতর্কে যেতেই হয় তবে নানা প্রশ্ন উদয় হতে বাধ্য। যদিও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন মর্মে সিদ্ধান্ত দিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটানোর প্রয়াস নিয়েছেন; কিন্তু বিষয়টি ইতিহাসের বিষয় হওয়ায় ইতিহাসের নিজ ধারাবাহিকতায় প্রশ্নটির সুরাহা হওয়া বাঞ্ছনীয়। অনেকের জিজ্ঞাস্য, আদালত সিদ্ধান্ত দিয়ে প্রশ্নটির কি সুরাহা করেছেন? সুরাহা হয়নি বলেই দেখা গেল তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ স্বাধীনতা ঘোষণা বিষয়ে তার বই ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’-তে উল্লেখ করেছেনÑ ‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ মার্চের ভয়াল কালরাতে আব্বু গেলেন মুজিব কাকুকে নিতে, মুজিব কাকু আব্বুর সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবেন সে ব্যাপারে আব্বু মুজিব কাকুর সাথে আলোচনা করেছিলেন, মুজিব কাকু সে ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী আত্মগোপনের জন্য পুরান ঢাকার একটি বাসাও ঠিক করে রাখা হয়েছিল। বড় কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আব্বুর উপদেশ গ্রহণে মুজিব কাকু এর আগে দ্বিধা করেননি। আব্বুর সে কারণে বিশ্বাস ছিল যে, ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুজিব কাকু কথা রাখবেন। মুজিব কাকু আব্বুর সাথেই যাবেন। অথচ মুহূর্তে মুজিব কাকু অনড় রয়ে গেলেন। তিনি আব্বুকে বললেন, ‘বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো, পরশু দিন (২৭ মার্চ) হরতাল ডেকেছি’। মুজিব কাকুর তাৎক্ষণিক এ উক্তিতে আব্বু বিস্ময় ও বেদনায় বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এ দিকে বেগম মুজিব ওই শোয়ার ঘরেই স্যুটকেসে মুজিব কাকুর জামাকাপড় ভাঁজ করে রাখতে শুরু করলেন। ঢোলা পায়জামায় ফিতা ভরলেন। পাকিস্তানি সেনার হাতে মুজিব কাকুর স্বেচ্ছাবন্দী হওয়ার এসব প্রস্তুতি দেখার পরও আব্বু হাল না ছেড়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে মুজিব কাকুকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন। তিনি কিংবদন্তি সমতুল্য বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উদাহরণ তুলে ধরলেন, যাঁরা আত্মগোপন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু মুজিব কাকু তাঁর এ সিদ্ধান্তে অনড় হয়ে রইলেন। আব্বু বললেন যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য হলো পূর্ব-বাংলাকে সম্পূর্ণরূপেই নেতৃত্বশূন্য করে দেয়া। এ অবস্থায় মুজিব কাকুর ধরা দেয়ার অর্থ হলো আত্মহত্যার শামিল। তিনি বললেন, ‘মুজিব ভাই বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হলেন আপনি। আপনার নেতৃত্বের ওপরই তাঁরা সম্পূর্ণ ভরসা করে রয়েছে।’ মুজিব কাকু বললেন, ‘তোমরা যা করবার কর। আমি কোথাও যাব না।’ আব্বু বললেন, ‘আপনার অবর্তমানে দ্বিতীয় কে নেতৃত্ব দেবে এমন ঘোষণা তো দিয়ে যাননি। নেতার অনুপস্থিতিতে দ্বিতীয় ব্যক্তি কে হবে, দলকে তো তা জানানো হয়নি। ফলে দ্বিতীয় কারো নেতৃত্ব প্রদান দুরূহ হবে এবং মুক্তিযুদ্ধকে এক অনিশ্চিত ও জটিল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হবে।’ আব্বুর সে দিনের উক্তিটি ছিল এক নির্মম সত্য ভবিষদ্বাণী।
‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্বু স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে নিয়ে এসেছিলেন এবং টেপ রেকর্ডারও নিয়ে এসেছিলেন। টেপে বিবৃতি দিতে বা স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর দিতে মুজিব কাকু অস্বীকৃতি জানান। কথা ছিল যে, মুজিব কাকুর স্বাক্ষরকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে (বর্তমান শেরাটন) অবস্থিত বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে এবং তাঁরা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করবেন। আব্বু বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে, কারণ কালকে কী হবে, আমাদের সবাইকে যদি গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তাহলে কেউ জানবে না, কী তাদের করতে হবে। এ ঘোষণা কোনো-না-কোনো জায়গা থেকে কপি করে আমরা জানাব। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায়, তা হলে সেটাই করা হবে। মুজিব কাকু তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে’।
২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দীন আহমদ ছাড়াও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন এবং অগত্যা তাদের সাথে আত্মগোপনে যেতে বলেছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ কন্যা শারমিন আহমদ স্বাধীনতা ঘোষণা না করার ব্যাপারে এবং আত্মগোপনে না যাওয়ার ব্যাপারে তার রচিত বইয়ে বঙ্গবন্ধুর যে অনড় অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও সাক্ষাৎকারে এর থেকে ভিন্নতর কিছু পাওয়া যায়নি।
শারমিন আহমদের বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত হলেও বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা না করার ব্যাপারে তার বইয়ে উল্লেখিত বক্তব্য খণ্ডন করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ধরনের বিবৃতি দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে বিবৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে যে কালক্ষেপণ করছে তাতে প্রতীয়মান হয় এ বিষয়ে শারমিন আহমদের বর্ণনা বস্তুনিষ্ঠ।
স্বাধীনতা ঘোষণা বিষয়ে বাংলাদেশের অন্য বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির অবস্থান আওয়ামী লীগের অবস্থান থেকে ভিন্নতর। বিএনপি জোটে যেসব শরিক দল রয়েছে, এ বিষয়ে তাদের অবস্থানও বিএনপির অনুরূপ। যদিও দাবি করা হয় ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা বিষয়ে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু বাস্তব সত্য হলো বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এ বার্তাটি শোনেনি, বরং এ দেশের ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক জনতার একটি বড় অংশ স্বাধীনতার যে ঘোষণাটি দিয়ে উজ্জীবিত হয়েছেন সেটি উচ্চারিত হয়েছিল চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে। এটি ঐতিহাসিক সত্য, তিনিই প্রথমে নিজেকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট দাবি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এখানে উল্লেখ্য, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার আগে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন বলে শোনা যায়।
বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় সংবিধান প্রণীত হলেও তখন সংবিধানে কে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন, এ ধরনের কোনো কিছু উল্লেখ ছিল না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ নং ১৫০-এ দফা (২) সংযোজনের মাধ্যমে অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি বলা হয়Ñ ‘ষষ্ঠ তফসিলে বর্ণিত ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার টেলিগ্রাম উক্ত সময়কালের জন্য ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি বলে গণ্য হবে।’
পঞ্চদশ সংশোধনী-পূর্ব সংবিধানে চারটি তফসিল ছিল, যার মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত দ্বিতীয় তফসিল আগেই বিলুপ্ত হয়েছিল। স্পষ্টত সংবিধানের প্রস্তাবনায় বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা ঘোষণাপূর্বক স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে মর্মে উল্লেখ থাকায় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ নং ১৫০(২)-এ এবং ষষ্ঠ তফসিলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার উল্লেখ সাংঘর্ষিক।
সংবিধান প্রণয়নকালে প্রস্তাবনায় জনগণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন মর্মে উল্লেখ থাকায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, এ বিষয়ে জাতি দ্বিধাবিভক্ত হওয়ায় এ ধরনের বিষয়ের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় এর সংবিধানে সন্নিবেশন অহেতুক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাই এটির পরিহার উত্তম ছিল। তা ছাড়া এ বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন সংবিধান প্রণয়নকালে সংবিধানের অন্যান্য অনুচ্ছেদের মতো প্রস্তাবনা সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশের ভোটে সংশোধনযোগ্য ছিল। পরে দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চম সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮-এর মাধ্যমে প্রস্তাবনাসহ অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮ ও ৫৬ সংশোধন বিষয়ে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের অতিরিক্ত গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদনের বিধান জুড়ে দেয়া হয়। অতঃপর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের বিধান রহিত করত সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ প্রথম ভাগের সব অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সব অনুচ্ছেদ, নবম ক-ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদগুলোর বিধানাবলি সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সব অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোর বিধানাবলি সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধন অযোগ্য করা হয়।
সংবিধান একটি আইন। মানুষের প্রয়োজনে আইন, আইনের প্রয়োজনে মানুষ নয়। স্বাধীনতার ঘোষণা বিষয়ে প্রস্তাবনার সাথে অনুচ্ছেদ নং ১৫০(২) এবং ষষ্ঠ তফসিলের যে সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি হয়েছে তা প্রস্তাবনাকে সংশোধন অযোগ্য ও ক্রান্তিকালীন বিধানাবলির সময়সীমা সীমাবদ্ধকরণের মধ্যে বিতর্কের অবসান ঘটাবে, এমনটি যদি কেউ আশা করে তবে তা হবে জন-আকাক্সার প্রতি অসম্মান ও অশ্রদ্ধা। তাই যেকোনো ঐতিহাসিক বিষয়কে আইনের জটিল ঘোরপ্যাঁচে আবদ্ধ না রেখে ইতিহাসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হতে দেয়ার মধ্যে নিহিত আছে যেকোনো ধরনের বিতর্কের অবসানসহ জন-আকাক্সার প্রতিফলনে দেশের স্থিতিশীলতা এবং সুখ ও সমৃদ্ধি।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com

স্মৃতিতে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন by শামসুল হুদা

ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন- একটা নাম, একটা ইতিহাস। চলে গেলেন না ফেরার দেশে গত ৮ অক্টোবর। ১৯৪৮-৫০ সালে ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখার প্রতিনিধিত্ব করার সময় থেকে মতিন ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়। এরপর ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর ছাত্রনেতা হিসেবে ভাষা আন্দোলনের সব কর্মসূচি, সভা-মিছিলে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে আমরা ঘনিষ্ঠ হই। তখন মতিন ভাইকে দেখেছি ভাষা আন্দোলনে আপসহীন নেতা হিসেবে। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সরকার চিঠির খাম, চিঠির কার্ড, মানি অর্ডার ফরম, স্ট্যাম্প ইত্যাদিতে বাংলা বাদ দিয়ে কেবল উর্দু ভাষা ব্যবহার করা শুরু করলে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় আবদুল মতিন এতে সোচ্চার হয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে  প্রতিষ্ঠিত করার শপথ গ্রহণ করেন।
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় এবং কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তখন আমাদের ছাত্রসমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল এবং আবদুল মতিন এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি গঠিত হয়েছিল। তা দিন দিন যখন অকার্যকর হয়ে পড়ে তখন দল-মত নির্বিশেষে ছাত্রদের একটি সভায় সক্রিয়ভাবে আন্দোলন পরিচালনার উদ্দেশ্যে ১৯৫০ সালে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় এবং মতিন সাহেব এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালে যে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল তিনি তার  অন্যতম সদস্য হন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকায় এসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করে বলেছিলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। ফলে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে সফল ধর্মঘট পালন শেষে মতিন সাহেবের নেতৃত্বে ছাত্রদের পক্ষ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী তীব্রতর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হয়। সরকার আমাদের আন্দোলন বানচাল করার উদ্দেশ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। এতে ছাত্রসমাজ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। ১৪৪ ধারা অমান্য করার ব্যাপারে ছাত্রদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়। বেশির ভাগ ছাত্রনেতা অমান্য করার বিপক্ষে ভোট দেন; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আবদুল মতিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সপক্ষে অটল ছিলেন এবং সাধারণ ছাত্ররা তাকে সমর্থন দিয়ে ১৪৪ ধারা অমান্যের পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। গাজীউল হককে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কলা ভবনের সমাবেশে সভাপতি নির্বাচন করে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে উপেক্ষা করে দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে। পুলিশি হামলার শিকার হয়ে হাবিবুর রহমান (উত্তরকালে প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান) এবং এস এম হলের ভিপি শামসুল হক (পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত)সহ আমাদের অনেককেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে রফিক, জব্বার, সালাম ও বরকতসহ আরো অনেকে শহীদ হন। মতিন সাহেবের নেতৃত্বে আমরা সে দিন ১৪৪ ধারা অমান্য করার এ সিদ্ধান্ত না নিলে হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো এ দেশের ইতিহাস। তাই বলা যায়, ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলন কার্যকর না হলে হয়তো বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতো না। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অনিশ্চিত ও কঠিন হয়ে যেত। প্রত্যেক জাতির জীবনে ইতিহাস এক অমূল্য সম্পদ। এ অমূল্য সম্পদের সৃষ্টি হয়ে থাকে কোনো এক দুর্লভ মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। একুশে ফেব্রুয়ারি তেমন এক দুর্লভ মুহূর্ত, যার ফলে এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এ মহান একুশের-ই সুবর্ণ ফসল।
আবদুল মতিন তার চোখের কর্নিয়া অন্ধজনের আলোর জন্য সন্ধানীকে এবং দেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য দান করে গেছেন। শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, বামপন্থী রাজনীতিবিদ হিসেবে সুস্থ ধারার রাজনৈতিক চর্চায়ও কমরেড আবদুল মতিনের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক, আত্মত্যাগী ও নির্লোভ মানুষ। তিনি আজীবন সাধারণভাবে জীবন যাপন করে গেছেন। কোনোরূপ লোভ-লালসা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ভাষা আন্দোলনে আবদুল মতিনের অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক -শামসুল হুদা: ভাষাসৈনিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত

স্মরণ- অধ্যাপক এম এ হাদী by ডা: মো: সাইফুল ইসলাম সেলিম

১৬ অক্টোবর খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা: এম এ হাদীর মৃত্যুবার্ষিকী।  ২০০৭ সালের এই দিনে অবৈধ শাসকদের বিশেষ বাহিনীর চরম মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ৬৮ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।  অত্যন্ত উজ্জ্বল শিাজীবনের অধিকারী মরহুম ডা: এম এ হাদী তার শিাজীবন শুরু করেন ময়নসিংহের গফরগাঁও বাতেনিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায়। ১৯৫৬ সালে গফরগাঁও ইসলামিয়া হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৯ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস, ১৯৭৩ সালে এফসিপিএস সার্জারি, ১৯৯৩ সালে এফআইসিএস (ইউরোলজি), ১৯৯৫ সালে রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স, এডিনবার্গ থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৯ ও ২০০৫ সালে পাকিস্তানের কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স ও গ্ল্যাসগোর রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স থেকে যথাক্রমে এফসিপিএস ও এফআরসিএস সার্জারি ডিগ্রি লাভ করেন। শিাজীবনের প্রতিটি পরীায় ছিলেন মেধা তালিকার শীর্ষে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও সদালাপি। একজন শিক হিসেবেও তিনি সফল। অধ্যাপক ডা: এম এ হাদী ১৯৭৩ সালে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে কনসালট্যান্ট সার্জন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ১৯৮১ সালে যোগদান করে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত একই সাথে প্রফেসর অব ইউরোলজি বিভাগ ও প্রিন্সিপাল ছিলেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিনের ডিন ও ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত ডাইরেক্টর, কনটিনিউনিং মেডিক্যাল এডুকেশন প্রোগ্রাম ছিলেন। অবসরের পরপরই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) আহ্বায়ক এবং পরে এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) পরপর দু’বার সভাপতি ছিলেন। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) পরপর দু’বার সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টার পদে ছিলেন। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম প্রধান প্রণেতা হিসেবে আধুনিক, কার্যকর ও গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা গবেষণার ব্যাপক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স ও সার্জন্সের দীর্ঘকালীন কাউন্সিলর ও দু’দফায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি কর্মজীবনে অনেক পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি দেশের প্রয়োজনে সাহসী পদপে ও সিদ্ধান্ত নিতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পদপেগুলো সমালোচিত হলেও পরবর্তীকালে দেশ ও জনগণ এর সুফল পেয়েছে। চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে অসংখ্য গুণগ্রাহীর প থেকে তার মাগফিরাত কামনা এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছি।
ডা: মো: সাইফুল ইসলাম সেলিম

পুরান ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ফাইলবন্দী by হামিম উল কবির

আধুনিক শহরে রূপান্তরের উদ্দেশ্যে পুরান ঢাকার জন্য নতুন পরিকল্পনা ফাইলবন্দী হয়ে আছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জমা দেয়া ফাইলটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে ধুলো জমে আছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে কোনো মিটিং হচ্ছে না। মোগল আমলে গড়ে ওঠা পুরান ঢাকা পরিণত হয়েছে ঘিঞ্জি শহরে। পুরান ঢাকার ভেতরে এমন অনেক রাস্তা আছে, যেখানে পাশাপাশি দু’জন মানুষ হেঁটে যেতে পারে না। বাংলাদেশের বিপজ্জনক শহরগুলোর মধ্যে পুরান ঢাকাকে অন্যতম হিসেবে ধরা হয়। ২০১০ সালের জুন মাসে পুরান ঢাকার নিমতলীর নবাব কাটরায়  সংঘটিত আগুনে কমপক্ষে ১১৮ জন মানুষ মারা যায়, আহত হয়েছিল শতাধিক। এরপরেই রাজউক পুরান ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর কথা বলে; কিন্তু কাজে গতি পায়নি। এ বিষয়ে রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) শেখ আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, পুরান ঢাকাকে আধুনিক শহরে রূপান্তরের একটি পরিকল্পনা রাজউক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। পরিকল্পনায় ১৯৫৩ সালের টাউন ইমú্রুভমেন্ট অ্যাক্ট পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এই অ্যাক্টটি পরিবর্তন করা না হলে পুরান ঢাকার জন্য কোনো কিছু করা সম্ভব হবে না।

পুরান ঢাকার চার থেকে পাঁচ ফুট রাস্তা দিয়ে কোনোমতে রিকশায় করে, ঠেলাগাড়ি দিয়ে অথবা মাথায় করে প্রয়োজনীয় মালামাল আনানেয়া করতে হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরেই রয়েছে ঢাকা শহরের ৪০০ বছরের স্মৃতিচিহ্ন। এ শহরটিকে আধুনিক করার জন্য রাজউক পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে রাজউকের পরিকল্পনাবিদদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। কারণ ঘনবসতি ও ঘিঞ্জি শহর হলেও এটাকে বাংলাদেশের ‘বিজনেস হাব’ ধরা হয়। কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয় এখানে। এখানে রয়েছে কয়েক হাজার বড়-ছোট কারখানা। রয়েছে শতাধিক প্লাস্টিক কারখানা, জুতার কারখানা। নানা ধরনের রাসায়নিকের ব্যবসা আছে। দাহ্য পদার্থ যেমন ইথানল, মিথানল, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, লুব্রিকেন্ট তেল, নানা ধরনের স্পিরিট, কস্টিক সোডা, নানা ধরনের আঠা, প্লাস্টিক গ্র্যানিউলস ইত্যাদি ব্যবসা রয়েছে। নানা ধরনের যন্ত্রপাতির ব্যবসা রয়েছে, আছে যন্ত্রপাতির তৈরির কারখানা। একটি বিশাল ব্যবসাকেন্দ্র এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে ঢেলে সাজিয়ে নতুন ও আধুনিক শহরে রূপান্তর করতে হলে সব দিক বিবেচনা করেই সামনে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন পরিকল্পনাবিদরা।
পরিকল্পনাবিদেরা পুরান ঢাকাকে সিঙ্গাপুরের আদলে নতুন করে গড়ার সুপারিশ করেছেন। বিশিষ্ট পরিকল্পনাবিদ শেলটেকের এমডি ড. তৌফিক এম সেরাজ জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরকে যেভাবে আধুনিক শহরে রূপান্তর করা হয়েছিল আমাদের পুরান ঢাকাকে সেভাবেই আধুনিক করে গড়ে তোলা যায়। সেজন্য সবদিক বিবেচনা করে পরিকল্পনা করতে হবে। নতুন একটি জায়গায় কয়েক হাজার অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করে, এর সাথে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে যে এলাকাকে নতুন করে গড়তে হবে সে এলাকার মানুষকে নির্মিত অ্যাপার্টমেন্টে স্থানান্তর করা হয় সিঙ্গাপুরে। এরপর খালি করে দেয়া এলাকাকে নতুন করে গড়ে পুরনোদের আবার তাদের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়। এভাবেই সিঙ্গাপুরকে রূপান্তর করা হয় আধুনিক শহরে।
এ ব্যাপারে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো: নুরুল হুদা জানিয়েছেন, পুরান ঢাকাকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য রাজউক কামরাঙ্গীরচরকে মডেল হিসেবে নিয়েছে। এ এলাকায় সরকারের অনেক খাস জমি রয়েছে। এখানে কিছু এপার্টমেন্ট নির্মাণ করে পুরান ঢাকার যে অংশকে ভাঙা হবে সেখানকার বাসিন্দাদের পুনর্বাসন করা হবে। পুরান ঢাকার নির্দিষ্ট অংশ নতুন করে গড়ে তোলা হলে সেখানে সাবেক বাসিন্দাদের নতুন এপার্টমেন্টে তুলে দিয়ে আবারো পুরান ঢাকার অন্য অংশ ভাঙা হবে। এভাবে ধাপে ধাপে পুরান ঢাকাকে আধুনিক শহরে রূপ দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এ উদ্দেশ্যে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিট স্টাডি) করা হয়েছে।

ভারতে দলিত কিশোরকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা

ভারতে এক দলিত কিশোরকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছে উচ্চ বর্ণের চার ব্যক্তি। ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার বিকেলে বিহারের কর্কট থানার মোহনপুর গ্রামে। ওই কিশোরের অপরাধ, তার একটি ছাগল উচ্চ বর্ণের এক ব্যক্তির কৃষি জমিতে ঢুকে পড়েছিল। জানা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী কুমকুম সিং তার তিন সহযোগীকে নিয়ে দলিত সম্প্রদায়ের জনৈক জিতু রামের বাড়িতে জোর করে ঢুকে পড়ে। এরপর তার ১৫ বছর বয়সী ছেলে সাই রামের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এর আগে ওই কিশোরকে ব্যাপক মারধর করে তারা। কিন্তু সে কোনোভাবে পালিয়ে আত্মরক্ষা করলেও তাকে অনুসরণ করে বাড়িতে চলে আসে ওই দুর্বৃত্তরা। বিক্রমগঞ্জের এসডিপিও অশোক কুমার দাস জানান, ছেলেটির শরীরের প্রায় ৯০ ভাগ পুড়ে গেছে। তাকে হাসপাতালে আনা হলেও একটু পর সে মারা যায়। তিনি আরো জানান, এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়েছে। দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারে চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। টাইমস অব ইন্ডিয়া

আমরা স্বৈরাচার ছিলাম, কিন্তু মানুষ শান্তিতে ঘুমাতো -হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বলেছেন, আমরা স্বৈরাচার ছিলাম কিন্তু মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারতো। এখন দেশে গণতন্ত্র এসেছে, কিন্তু মানুষ ঘুমাতে পারে না। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে তাতী দলের নেতা-কর্মীদের সাথে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এরশাদ এ মন্তব্য করেন। জাতীয় পার্টির বনানীর কার্যালয়ে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরশাদ বলেন, যে গণতন্ত্র মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে না সেটা গণতন্ত্র নয়। এই গণতন্ত্র মানুষ চায় না। মানুষ সত্যিকারের গণতন্ত্র চায়।

আজ দেশে সংঘাত চলছে, রক্ত ঝড়ছে, দু:শাসনে ও দুর্ণীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় গেলে সত্যিকারের গণতন্ত্র কায়েম হবে। তিনি দেশের মানুষকে তার পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে বলেন, আপনারা আমার পাশে এসে দাঁড়ান, আমার হাতকে শক্তিশালী করুন, দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র কায়েম হবে, শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন। এরশাদ বলেন, আমরা সংসদে আছি, রাস্তায় আছি, সর্বত্রই আমরা আছি। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে আমরা অনশন করবো এবং আন্দোলন করবো।
তিনি বলেন, আমরা সন্ত্রাসে বিশ্বাস করি না। আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি। দেশে আজ নেতৃত্বের সংঘাত চলছে, সন্ত্রাসীতে ভরে গেছে রাজনৈতিক দলগুলো।
এরশাদ বলেন, মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমরা চাই সুশাসন কায়েম হোক এবং এর মাধ্যমে মানুষের অন্ন বস্ত্রের ব্যবস্থা হোক।
তিনি তাতীদের বর্তমান দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে তাতীদের সুদিন আবার ফিরিয়ে আনা হবে। তারা আবারও আগের মতো কর্মব্যস্ত দিন কাটাতে পারবেন।
সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে এরশাদ বলেন, সর্বত্রই সন্ত্রাস ও লুটপাট চলছে। এসব বন্ধ করতে হবে। জনগণকে শান্তিতে থাকতে দিতে হবে।

মামলা থেকে মুক্ত হলেন লিমন

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গুলিতে পা হারানো ঝালকাঠির রাজাপুরের তরুণ লিমন হোসেন অবশেষে তাঁর বিরুদ্ধে করা সব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার র‌্যাবের করা দ্বিতীয় মামলা থেকেও অব্যাহতি পাওয়ায় এখন তিনি মামলামুক্ত। এতে মামলার বোঝা নিয়ে লিমন যে অভিশপ্ত জীবন কাটাচ্ছিলেন, তা থেকে মুক্ত হলেন তিনি।  সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলা থেকে দীর্ঘ তিন বছর সাত মাস পর আজ লিমনকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। সহকারী সরকারি কৌঁসুলি মো. হোসেন আকনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঝালকাঠির মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. আবু শামীম আজাদ আজ এ আদেশ দেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪(ক) ধারা অনুযায়ী লিমনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শুনানির সময় আদালতের এজলাসকক্ষে ছিলেন লিমন। তাঁর মা হেনোয়ারা বেগম ছিলেন আদালতের সামনে। পরে প্রথম আলোকে লিমন বলেন, ‘আমি যে নির্দোষ এবং র‌্যাব যে আমার বিরুদ্ধে সাজানো মামলা করেছিল, তা আজ প্রমাণিত হয়েছে।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে দেওয়া হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দাবি করেন লিমন। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে তিনি এখন ঢাকার অদূরে সাভারে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) পর্বে পড়ছেন। গত বছরের ২৯ জুলাই র‌্যাবের করা অস্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পান লিমন। ঝালকাঠির বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক কিরণ শঙ্কর হালদার অব্যাহতির ওই আদেশ দেন। গত বছরের ৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিমনের বিরুদ্ধে র‌্যাবের করা দুটি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশ ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কাছে পৌঁছায়। জেলা প্রশাসক মামলা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল মান্নানকে অনুরোধ করেন। ২১ জুলাই সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন পিপি। ওই আবেদনের ওপর ভিত্তি করে আদালত ২৯ জুলাই শুনানি গ্রহণ করে লিমনকে অস্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতির আদেশ দেন। মামলা করার প্রায় আড়াই বছর পর অস্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পান তিনি।
লিমনের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধাদানের মামলাটি ঝালকাঠির মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে বিচারাধীন ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মুখ্য বিচারিক হাকিমের পদ শূন্য থাকায় মামলাটি থেকে অব্যাহতি পাননি লিমন। এ সম্পর্কে ঝালকাঠির পিপি আবদুল মান্নান বলেন, গত বছরের জুলাই মাসে ঝালকাঠির মুখ্য বিচারিক হাকিম বদলি হয়ে যান। প্রায় দেড় বছর পর গত মাসের ১০ সেপ্টেম্বর ওই পদে বিচারক আবু শামীম আজাদ যোগ দেন। বিচারক যোগ দেওয়ার পর দ্বিতীয় তারিখে আজ লিমনকে অব্যাহতি দেওয়া হলো। লিমনের আইনজীবী মানিক আচার্য্য জানান, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকেলে বাড়ির কাছে মাঠে গরু আনতে গেলে একাদশ শ্রেণীর ছাত্র লিমনকে ধরে নিয়ে পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে র‌্যাব। এ কারণে লিমনের পা কেটে ফেলতে হয়। এ ঘটনার পর বরিশাল র‌্যাব-৮-এর তৎকালীন উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) লুৎফর রহমান বাদী হয়ে লিমনসহ আটজনের নামে রাজাপুর থানায় দুটি মামলা করেন। একটি মামলা অস্ত্র আইনে, অন্যটি সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে। এ নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে।
অন্যদিকে লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম তাঁর ছেলেকে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে র‌্যাবের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২০১২ সালের ১৪ আগস্ট পুলিশ এ মামলায় র‌্যাব সদস্যদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। একই বছরের ৩০ আগস্ট এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে হেনোয়ারা বেগম নারাজি আবেদন করেন। ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এই নারাজি আবেদন খারিজ করে দেন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম।
একই বছরের ১৯ মার্চ নারাজি খারিজের বিরুদ্ধে ঝালকাঠির জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়ের করেন হেনোয়ারা বেগম। এক বছর নয় মাস পার হলেও ওই রিভিশনের শুনানি হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত ১১ বার রিভিশনের শুনানির তারিখ পিছিয়েছে।

এক দিনের পুলিশ কমিশনার শিশু সাদিক

ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ১০ বছর বয়সী বালক সাদিক। সে চেয়েছিল পুলিশ কমিশনার হতে। তার সে ইচ্ছে পূরণ হয়েছে গতকাল। এদিন তাকে বানানো হয়েছিল একদিনের জন্য পুলিশ কমিশনার। পরনে খাকি ইউনিফর্ম আর মাথায় টুপি পরা হায়দরাবাদের এই একদিনের পুলিশ প্রধানকে যখন সেখানকার পুলিশ কর্মকর্তারা স্যালুট ঠুকলো, তখন তার মুখে ছিল এক দীপ্তিময় হাসি। এক বাহুর মাঝে লাঠি নিয়ে ক্যামেরার দিকে ফিরে টুক করে একবার স্যালুট দিতেও ভুলল না সে। করিমনগরের সাদিকের অনেক আত্মীয়স্বজন আছেন পুলিশ বাহিনীতে। তাই ‘মেইক অ্যা উইশ ফাউন্ডেশন’কে যখন নিজের ইচ্ছার কথা জানাতে গিয়ে সে পুলিশ কমিশনার হওয়ার কথা জানালো, তখন খুব অবাক হতে হয়নি। ‘মেইক অ্যা উইশ ফাউন্ডেশন’ মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। হায়দরাবাদের এই একদিনের পুলিশ কমিশনার নিজের জনাকীর্ণ অফিসে বসে বললো, আমি শান্তি বজায় রাখতে ও অপরাধীদের ধরতে চাই। হায়দরাবাদ পুলিশ প্রধান মাহেন্দার রেড্ডি একদিনের জন্য শিশু সাদিককে ছেড়ে দিয়েছেন তার পদ। তিনি বললেন, এ ছোট্ট সাদিকের ইচ্ছা পূরণ করতে পেরে তিনি অনেক খুশি। গত আগস্ট মাসে তেলেঙ্গানা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কে. চন্দ্রশেখর রাও একটি হাসপাতালে এক ছোট্ট শিশুকে দেখতে গিয়েছিলেন। শিশুটি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। ‘মেইক অ্যা উইশ ফাউন্ডেশন’ কর্তৃপক্ষ ভারতের দক্ষিণী জনপ্রিয় চিত্রতারকা পাওয়ান কল্যাণের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, তেলেঙ্গানার খাম্মাম জেলার এক মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে, যে কিনা ব্রেইন টিউমারে ভুগছে।

দণ্ড আমিরাতে ভোগ বাংলাদেশে by দীন ইসলাম

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) দণ্ডপ্রাপ্ত হলেও প্রবাসী বাংলাদেশীরা দণ্ড ভোগ করবে নিজ দেশে। বাংলাদেশ সরকারের ব্যয়ে এসব বন্দিকে ফিরিয়ে আনা হবে। ওই দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রবাসী বাংলাদেশীরাও এর বাইরে থাকবেন না। এমন বিধান যোগ করে আগামী ২৫শে অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর ইউএই সফরকালে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তর’ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোন নাগরিকের ক্ষেত্রে এর ভিন্নতা ঘটবে। ইতিমধ্যে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে সংশোধনী নিয়ে নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে মতদ্বৈততা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের তৈরি করা খসড়া চুক্তিতে বলা হয়েছে, এক দেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অপর দেশের নাগরিকদের নিজ দেশে দণ্ড ভোগ করতে পারবে। বাংলাদেশের খসড়ায় বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও হস্তান্তরযোগ্য হবে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের খসড়ায় এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের বিনিময়-সংক্রান্ত ব্যয় হস্তান্তর গ্রহণকারী রাষ্ট্র বহন করবে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রেরক রাষ্ট্র কর্তৃক বহনের জন্য প্রস্তাব করা হয়। আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানালেন, একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এটা নিশ্চিত। দ্বিতীয়টি নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে। কারণ দেশের স্বার্থের বাইরে কিছু করবো না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছে। এদের মধ্যে কারাগারে প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি বাংলাদেশী দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছে। এ সব বন্দির মধ্যে ১৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং ১০৪ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছে। ওই দেশে বসবাসকারী প্রবাসীদের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগ বাংলাদেশী। এদের মধ্যে শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মামলায় বাংলাদেশীরা জড়িত। বাংলাদেশী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত অপরাধপ্রবণতা, কর্মক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, শ্রমিক নিয়োগ বা পাঠানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তাদের ক্রমবর্ধমান হারে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় ওই দেশে শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমিরাত কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশীদের জন্য তাদের ভিসা পদ্ধতি কঠোর করেছে। এ কারণে আরব আমিরাতে বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের প্রথম দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ‘এগ্রিমেন্ট অব কো-অপারেশন বিটুইন দ্য গভর্নমেন্ট অব দি ইউনাইটেড আরব আমিরাত অ্যান্ড দ্য গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল’স রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ এবং ‘এগ্রিমেন্ট অন ট্রান্সফার অব সেন্টেনসড প্রিজনস’ স্বাক্ষরের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করে। এর মধ্যে প্রথম চুক্তিটি হলে দুই দেশ পরস্পরকে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, অপরাধ দমন, মরণাস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য, ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের অবৈধ পাচার রোধ, মানব পাচার, আর্থিক ও অর্থনৈতিক অপরাধ ইত্যাদি রোধে পরস্পরকে সহায়তা করতে পারবে। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে তারা জানায়, চুক্তি দু’টি স্বাক্ষরিত হলে ওই দেশে আবার বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ শুরু করা সম্ভব হবে। এর ভিত্তিতে গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে শ্রমবাজার ফের উন্মুক্ত করতে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রস্তাবিত দু’টি চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে প্রক্রিয়া করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে একই বিষয়ে ৩রা এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় চুক্তি দু’টিতে বেশ কিছু সংশোধনীর প্রস্তাবসহ দু’টি প্রাথমিক খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। এরপর সংশোধনীসহ খসড়া দু’টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে পাঠানো হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন পর সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সংশোধনী শেষে খসড়া দু’টি পাঠায়। এর মধ্যে আমিরাত ‘এগ্রিমেন্ট অব কো-অপারেশন বিটুইন দ্য গভর্নমেন্ট অব দি ইউনাইটেড আরব আমিরাত অ্যান্ড দ্য গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল’স রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’- এ চুক্তিতে সংশোধনীগুলো ঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে দ্বিতীয় চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি দু’টির বিষয়ে নেগোসিয়েশন ও দলিল চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে ওই দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু ঈদের ছুটিসহসহ নানা কারণে আরব আমিরাতের কাছ থেকে তারিখ পায়নি সরকার। ইতিমধ্যে ২০-২১শে অক্টোবর ওই দেশের কর্তৃপক্ষ খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খানের নেতৃত্বে একটি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল আরব আমিরাত সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে বলে জানা গেছে।

সবাই আমাকে ‘আউটসাইডার’ ভাবে -তসলিমা নাসরিন

একা থাকতে থাকতে বদঅভ্যাস হয়ে গেছে। মানুষের ভিড় থেকে নিজেকে আলগোছে সরিয়ে একাই থাকি। বেড়াল পুষতে পুষতে এখন বেড়াল দেখলেই পুষতে ইচ্ছা করে। একা থাকা মেয়েরা নাকি বেশ বেড়াল পোষে। এখানে সেখানে পুড়তে পুড়তে এইটুকু জেনেছি যে, পুরুষ পোষার চেয়ে বেড়াল পোষা ভাল। বিবিসিকে দেয়া দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে এ সব কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, কুড়ি বছরে কত কিছু ঘটেছে, কত শহরে থেকেছি, কত দেশে থেকেছি। আবার শহর পাল্টিয়েছি, দেশ বদল করেছি। কোথাও মনে হয়নি যে, আমি ভাল আছি বা কোথাও মনে হয়নি যে, আমার দেশ। যদিও ইউরোপের নাগরিকত্ব পেয়েছি, কিন্তু ইউরোপকে সত্যিকার আমার নিজের দেশ বলে মনে হয় নি। সব সময় মনে হয়েছে যে, আমি নিজের দেশে যাবো। আবার এখন কুড়ি বছর পর মনে হয় দেশ বলে বোধহয় আমার কিছু নেই। মানুষ, যারা আমাকে ভালবাসে, যারা আমার লেখা পড়ে, বোঝে, যারা শ্রদ্ধা জানায়, তাদেরকেই আমার দেশ বলে মনে হয়। এ রকম লোক পৃথিবীর সব জায়গাতেই আছে। যখন আমি ইতালি যাচ্ছি, যখন আমি নরওয়ে যাচ্ছি। ফ্রান্সে কত মেয়ে আমার কাছে আসে। ফ্রেঞ্চ মেয়েরা বলে যে, তোমার লেখা পড়ে আমরা শক্তি পাই। তুমি আমাদের অনুপ্রেরণা। তারা ভালবাসে আমাকে। তাদের দেশকেই আমার মনে হয় আমার দেশ। এখন দেশ বলতে আমি শুধু মাটি, গাছপালা, বাড়িঘর, যেখানে আমার জন্ম হয়েছিল বা যেখানে আমি বড় হয়েছি, সেটাকেই যে দেশ বলে মনে হয়, তা নয় কিন্তু। আমি কিন্তু তারপরও দেশে ফেরার অধিকারের জন্য লড়াই করবো- যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন।

প্রশ্ন: পছন্দে হোক বা অপছন্দে হোক ধরুন গত তিন-চার বছর ধরে আপনার ঠিকানা দিল্লি। আপনি যে বললেন বহু শহরে ঘুরতে হয়েছে। ঠাঁইহারা হতে হয়েছে বারবার। কিন্তু এ শহরগুলোকে কতটা আপন করে নিতে পেরেছেন? ধরুন দিল্লি প্রসঙ্গে যদি বলি। আপনি কতটা ‘দিল্লিআইড’ হতে পেরেছেন? আপনি কি চাঁদনী চকে যান, বিরিয়ানি খান কারিমসে, বা দিল্লি হাটে বাজার করেন?
উত্তর: সেটা আমি সব শহরেই করি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, পৃথিবীর সব জায়গায়ই আমার। ফ্রান্স আমার দেশ নয়, বাংলাদেশ আমার দেশ, যেহেতু আমি জন্ম নিয়েছি, তা কিন্তু নয়। এবং এই যে দেখুন দিল্লির কথা বলছেন। দিল্লির যে জায়গাগুলোর কথা বলছেন, ওগুলোতে আমি যাই এবং দিল্লি হাটে গিয়ে বাজার করি। আমি ইন্ডিয়া গেটে আইসক্রিম খাই। কারিমসে গিয়ে বিরিয়ানিও খাই। কিন্তু এগুলো তো দোকানপাট। না? এগুলো তো রাস্তাঘাট। আসলে ‘দিল্লিআইড’ হতে যেটা দরকার সেটা হচ্ছে মনে হয় দিল্লির মানুষ আমাকে কতটা আপন করে নিয়েছে, না? তবে যেখানেই যাই, আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, সবাই আমাকে ‘আউটসাইডার’ ভাবে। আমি যতই এখানকার মানুষ হতে চাই, মানে ‘লঙ্গিং টু বিলং’, বাট সবাই আমাকে ভাবে যে, ও তুমি তো অন্য দেশের। তুমি তো আমাদের নও।
প্রশ্ন: মানে এখন আপনি বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিতা লেখিকা, এই পরিচয় আপনার?
উত্তর: হ্যাঁ, এখনও। যদিও আমি ভারতে থাকতে থাকতে, ধরুন ভারতের বিষয়টা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি জানি। এখানকার নিউজপেপার আসছে সকালবেলা, এখানকার টিভি খুলছি। সুতরাং এ খবরগুলো আমার কাছে বেশি আসছে। বাংলাদেশের খবরগুলো তো আসছে না আমার কাছে। তাছাড়া এমনি বিশ্বের খবর তো আমি জানছি, না? বিবিসি, সিএনএন দেখছি। ওতে তো আর বাংলাদেশের খবর অত করে আসছে না, যদি কোন বড় দুর্ঘটনা না ঘটে। তবে সব জায়গাতেই কিন্তু আমাকে বলা হয় যে, তুমি অন্য দেশের। সুতরাং আমি যতই আপন করে নিই যে কোন শহরকে বা মানুষকে, তারা কিন্তু একটা দেয়াল রাখে। সে সব দেশেই দেখেছি। এখানকার কোন প্রবলেমে আমি যখন প্রতিবাদ করি, তখন কিছু মানুষ আমার বিরুদ্ধে লেগে যায়। বলে যে তুমি বাইরের লোক। তুমি আমাদের ভেতরের ব্যাপার নিয়ে কথা বলবে না। আরে আমি তো নিজেকে পৃথিবীর লোক ভাবি। তাই আমি পৃথিবীর সব ব্যাপারেই কথা বলি। আমেরিকায় উল্টোপাল্টা হলে, আমি আমেরিকাকে গালাগালি করি। ইউরোপের কিছু প্রবলেম দেখলে ওটা নিয়ে কথা বলি। তো ভারতে থাকছি, ভারত নিয়ে কথা বললে তোমাদের এত গা জ্বলে কেন, না? আবার বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বললে, ওখানকার লোকও বলে, কি! এদেশ নিয়ে কথা বলার তোমার কোন রাইট নেই। এ দেশ তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যস! যে দেশে থাকছো, সে দেশ নিয়ে কথা বলো। কিন্তু তার মানে আমি তো আর থেমে থাকি না। আমি যেখানেই থাকি পৃথিবীর, আমি লিখে যাচ্ছি। বই লিখছি, তারপর আমার ব্লগ লিখছি। এসবই আমার...।
প্রশ্ন: এ লেখার প্রসঙ্গেই বলি। প্রধানত তো আপনি একজন লেখক এবং বাংলা ভাষায় আপনি লেখালিখি করেন। কিন্তু বাংলা ভাষার সে পরিমণ্ডল থেকে, এতদিন ধরে বাইরে থাকতে হচ্ছে। আপনার কি মনে হয় লেখালেখিতে তার কোন প্রভাব পড়ছে?
উত্তর: শুনুন। আমাকে যখন বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দিলো ১৯৯৪ সালে, তখন তো ইউরোপে গিয়ে পড়লাম। খুব চেষ্টা করতাম দেশে ফেরার জন্য। কিন্তু দেশে ফেরা তো সম্ভব হচ্ছিল না। কলকাতায় ফিরতে চাইলাম। কিন্তু ভারত সরকার আমাকে ভিসা দেয়নি ছ’ বছর। ছ’ বছর পর যখন ১৯৯৯-এর ডিসেম্বরের দিকে সম্ভবত, আমাকে ভিসা দেয়া হলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে চলে এলাম কলকাতায়। কিছুদিন থাকলাম, তারপর আবার ভিসা শেষ হয়ে গেল, চলে যেতে বাধ্য হলাম। তারপর আবার ফিরে ফিরে আসতাম। প্রতি বছর আসতাম। এটা হচ্ছে কি, আমি চাইতাম আমি একটা বাংলা পরিবেশে থাকি। মানুষগুলো বাংলা ভাষায় কথা বলছে, আমিও বাংলা ভাষায় তাদের সঙ্গে কথা বলবো। কারণ আমি বাংলা ভাষায় লিখি। আমি যদি বাংলা ভাষা থেকে দূরে থাকি, বাইরে থাকি, আমার পক্ষে বোধ হয় লেখা সম্ভব হবে না। এটা আমি বিদেশে বসেই অনুভব করছিলাম। কারণ এত ইংরেজিতে কথা বলতে হতো, অনেক সময় বাংলায় লিখতে গেলে আমি কোন শব্দ হয়তো খুঁজে পেতাম না। হাতড়াতে হতো। এজন্য বিদেশের সমস্ত কিছু ছেড়ে, আমি কলকাতায় বাস করতে শুরু করলাম যখন আমাকে রেসিডেন্স পারমিট দেয়া হলো ২০০৪ থেকে। কেউ কি প্যারিস ছেড়ে কলকাতায় থাকে? কিন্তু আমি থাকলাম আমার ভাষার জন্য, আমার লেখার জন্য। কিন্তু তা বাংলার মানুষ বুঝলেও সরকার তো বোঝে নি, তাদের কিচ্ছু যায় আসে না। আমাকে যদি এই রাজনৈতিক ফুটবল বানানো হয়, আমাকে লাত্থি দিয়ে তাড়িয়ে দিলে যদি তাদের দু’টো ভোট জোটে! সে কারণে যদি আমার সর্বনাশ ঘটিয়ে, যদি আমি ভাল বই লিখতে না পারি, যদি আমি বাংলায় না থাকি, কিন্তু সে কথা কে বুঝলো? তাড়িয়ে দিলো।
প্রশ্ন: এ তাড়ানোরও কুড়ি বছর হয়ে গেল। কুড়ি বছরের ‘হাইস অ্যান্ড লোজ’ যদি বলি- তারও তো নিশ্চয়ই ওঠা-পড়া অনেক ছিল এ সময়টার মধ্যেও। কোনটা ওঠা, কোনটা পড়া বলে মনে হয়?
উত্তর: দেখুন, বিদেশ বিভূঁইয়ে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষার মধ্যে থাকলে না, অনেক সময় হতাশ হয়ে পড়ে মানুষ। আমি যদি কোন মানুষকে খুন করে, আমি যদি সত্যিই একজন ক্রিমিনাল হতাম, হ্যাঁ দেশ থেকে তাড়িয়েছে, আমার একটা সান্ত্বনা থাকতো। কিন্তু মানুষের ভালর জন্য লিখলাম, মানবতার কথা লিখলাম, মেয়েদের সমানাধিকারের কথা লিখলাম, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লিখলাম, এটা কি এতই অন্যায় কাজ করেছি, যে জন্য আমাকে তাড়াতে হবে? এখন ধরুন, অনেক পুরস্কার পেয়েছি, যেগুলো আমি কখনও কল্পনাও করিনি। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট থেকে শাখারভ পুরস্কার মুক্তচিন্তার জন্য। সিমন দ্য ব্যুভোর, যিনি নারীবাদী, এত বড় নারীবাদী, তার পুরস্কার পেয়েছি ফরাসি সরকারের কাছ থেকে। এগুলো তো খুব বড় পুরস্কার। এগুলোর চেয়েও বেশি বড় পুরস্কার আমার কাছে ছিল, যখন মানুষ আমার কাছে এসে চোখের জল ফেলে, বলে যে তুমি আমাদের প্রেরণা। ওইটা মনে হয় অনেক বেশি আমাকে সপর্শ করেছে।
প্রশ্ন: পেছন ফিরে তাকিয়ে কখনও কি এমন মনে হয়েছে যে, আমি যদি অন্যভাবে লিখতাম, আমার লেখায় যদি ঝাঁঝ এতটা কম হতো, তাহলে আমি তো বাংলাদেশে থাকতেই পারতাম। আর পাঁচটা লোকের মতো মহানন্দে নিজের দেশে, নিজের ভাষার মধ্যে থাকতে পারতাম। এতটা বাড়াবাড়ি করা হয়তো উচিত হয়নি বা না করলেও হতো। এরকম কি কখনও মনে হয়? এরকম ভাবনা আসে?
উত্তর: না, এরকম ভাবনা আসে না। কারণ আমার আগেও যারা মিনমিন করে নারীবাদের কথা বলতো, ওদের কথা কেউ শুনতো না, সমাজটাকে ধাক্কা দিতো না। ধাক্কা দেয়ার দরকার ছিল। আমার নিজের জীবন দিয়ে আমি সইলাম সেটা। কিন্তু মানুষ তো কিছুটা ভেবেছে এবং এই প্রসঙ্গগুলো নিয়ে তো আলোচনা হয়েছে। এখন ধরুন প্রচুর মেয়েরা লিখছে বা ছেলেরা লিখছে। ঠিক আমি দেখি যে সেই যে ২৩ বছর আগে যা লিখেছিলাম সেই নির্বাচিত কলাম, সেগুলোই লিখছে এখন। তখনকার যে রাগ ছিল আমার, যেভাবে আমি বলতে চেয়েছি সেভাবেই বলেছি। আর মানুষের রাগ থাকা উচিত। অ্যাঙ্গারের প্রয়োজন আছে।
প্রশ্ন: এত রাগ নিয়ে আপনার মনে হয়, কোনদিন আবার বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন? মানে আমি যদি বাস্তববাদী হয়ে চিন্তা করতে বলি...।
উত্তর: আমার মনে হয় না যে, বাংলাদেশে আমাকে কেউ ফিরতে দেবে আর। যদি দেয়, সে তো খুব ভালো। কিন্তু বাংলাদেশে যতদিন এই ধর্মান্ধ লোকগুলো আস্ফালন করবে বা ধর্মান্ধ লোকগুলো যতদিন আছে, তাদেরকে একটা ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আমি কিছুই অনুতাপ করি না। যা লিখেছি তা-ই লিখবো। এখন আমার যদি নতুন করে জন্ম হয়, অনেকে বলে যে, নতুন করে হলে কি তুমি একটু অন্যরকমভাবে লিখবে? না, আমি ঠিক ওভাবেই লিখবো, যেভাবে লিখেছি। আমাকে ভুগতে হয়েছে। পজিটিভ জিনিসটা হচ্ছে আমি অনেক দেশে অনেক কিছু দেখেছি, অনেক লেখক আমাকে কাছে টেনেছে। আমি আরও অনেক বড় করে পৃথিবীটা দেখতে পারছি। হয়তো বাংলাদেশে থাকলে যে চোখটা আমার হয়েছে, যে মনটা আমার হয়েছে, সেটা হয়তো এতটা হতো না।
প্রশ্ন: ভারতে একটা নতুন সরকার এসেছে। বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে তারা সমপর্ক উন্নয়নে আগ্রহী, এমনটাই বলছেন। আপনার কি মনে হয় যে, নতুন সরকার যদি বাংলাদেশের সঙ্গে আপনার এই ইস্যুটা উত্থাপন করে তাহলে এটাতে একটা ‘ব্রেক থ্রু’ হলেও হতে পারে?
উত্তর: আমি সত্যিই চাই যে, ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলুন। কারণ আমি ভারতে আছি, বলছি যে আমি বাংলাদেশে ফিরতে চাই। সেই সময়ে ভারত সরকার যদি বলেন আমি খুবই কৃতজ্ঞ থাকবো। আমি এমনকি কংগ্রেস সরকারকেও বলেছিলাম যে, আপনারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা বলুন। কারণ আপনারা ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন’কে মূল্য দিচ্ছেন, আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন। সেখানে বাংলাদেশ এত কিছু নির্ভর করছে আপনাদের ওপর, আপনারা তো এই শর্তটা দিতে পারেন যে, তোমরাও ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনকে মূল্য দাও, আমরা যেমন দিচ্ছি।
প্রশ্ন: কিন্তু সদ্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘুরে এলেন বাংলাদেশে। ভিসা থেকে শুরু করে মৈত্রী এক্সপ্রেস, তিস্তা, স্থল-সীমান্ত চুক্তি, অনেক বিষয়ে আলোচনা হলো। তসলিমা নাসরিন কিন্তু সে আলোচনায় এসেছে, এরকম কথা আমরা শুনিনি।
উত্তর: না না। তসলিমা তো আসবে না। তসলিমা খুব ছোট ব্যাপার এখানে। তিস্তা এ সবের আর যা কিছু রাজনৈতিক সমপর্ক, সেখানে তো তসলিমা কোন প্রসঙ্গ আসতেই পারে না। আমি খুবই ছোট মানুষ। এখন আমি বলেছি যে, আমি খুব কৃতজ্ঞ থাকবো যদি বলেন। কারণ এটা হচ্ছে আসলে আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারের চেয়েও এটা গণতন্ত্রের ব্যাপার। এটা গণতন্ত্রের প্রধান যে পিলার, সেই বাক-স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের অধিকারের ব্যাপার।
প্রশ্ন: কোন অঙ্কই যদি না মেলে, তসলিমা নাসরিনকে যদি, আমি বলতে চাইছি, আরও কুড়িটা বছর নির্বাসনেই কাটাতে হয়, তসলিমা নাসরিন কিভাবে কাটাবেন সেটা কিছু ভেবেছেন?
উত্তর: আমি তো আগে থেকে প্ল্যান করে কিছু চলি না। আমি যখন যা ইচ্ছে হয় তাই করি। করতে চেষ্টা করি, সবসময় তো সম্ভব হয় না। যেমন ধরুন এখন আমার কলকাতায় যেতে ইচ্ছে করছে, আমি কি যেতে পারবো? না, আমাকে যেতে দেয়া হবে না। তো কুড়িটা বছর কিভাবে যাবে, তা তো আমি আগে প্ল্যান করে রাখি না। আমি হয়তো দু’দিন পর মরে যাবো। তবে যেখানেই থাকি, আমি লিখে যাবো। এইটুকুই জানি। যতদিন বাঁচি, যতদিন আমার মাথা কাজ করছে, ততদিন আমি যে কথাগুলো বলছিলাম, সে কথাগুলো বলবো এবং আরও যদি নতুন আইডিয়া আসে, সে সব প্রকাশ করবো।

৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ইতিহাসের অস্বাভাবিক ঘটনা -এটিএম শামসুল হুদা by লুৎফর রহমান ও তামান্না মোমিন খান

দেশে বিদ্যমান সঙ্কটের মূলে বয়কটের রাজনীতি বড় কারণ উল্লেখ করে এ থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা। তিনি বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ছিল ঐতিহাসিক বিচ্যুতি। এ নির্বাচন রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক দেশে অতীতে এমন নির্বাচন হয়নি। বর্তমানে নির্বাচন ব্যবস্থা রাজনৈতিক পক্ষের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ কারণে এক পক্ষ কোনভাবেই ক্ষমতা ছাড়তে চায় না আর অন্য পক্ষ যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় আসতে চায়। দলগুলোর এই মানসিকতা সঙ্কট তৈরি করছে। নির্বাচন হয়ে উঠছে বাঁচা-মরার লড়াই। দেশের ইতিহাসে সফল একটি নির্বাচন পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক এই সিইসি বলেন, কেবল নির্বাচন হলেই দেশে গণতন্ত্র আসে না। শুধু নির্বাচনকেই গণতন্ত্র বলা যায়। আমরা পশ্চিমা দেশের গণতন্ত্র অনুসরণ করি। কিন্তু তাদের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মানি না। তাহলে তো আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না। মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা ড. এটিএম শামসুল হুদা এখন অনেকটা সময় কাটাচ্ছেন একান্তে। রাজনৈতিক আলোচনা থেকে যথাসাধ্য নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে দূরে থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

তিনি জানিয়েছেন, রাজনীতি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়, অনেক আলোচনা- সমালোচনা হয়। কিন্তু দেশের রাজনীতির কোন পরিবর্তন হয় না। অথচ সত্য কথা বলতে গিয়ে অনেকে অপমানিত হন, অপদস্ত হন। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে দেশটা ভীষণভাবে বিভাজিত। আমাদের দেশে যারা নির্বাচনে বিজয়ী হয় তারাই সব পারে। দেশের সবকিছু তাদের হয়ে যায়। এখানে বিরোধী দলের কোন জায়গা নেই। যার ফলে নির্বাচন বাঁচা-মরা, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বৈধ উপায়ে হোক বা অবৈধ উপায়ে হোক বিজয় ছিনিয়ে আনার প্রতিযোগিতার ডামাডোলে অনেক অপসংস্কৃতি ও অনাচার সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দশম সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া কোন নির্বাচনই সুন্দর  হয় না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনার জন্য ইসি’র চেষ্টা যথার্থ  ছিল বলে মনে হয় না। একটি প্রধান দল যখন নির্বাচন বয়কট করে আন্দোলনে গেল তখন নির্বাচন কমিশনের আইন প্রয়োগেরও সুযোগ কমে গেল। ১৫৪টি আসনে নির্বাচনই হলো না। তখন পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। বিরোধী দল বললো তত্ত্বাবধায়ক না হলে নির্বাচনে আসবে না। নির্বাচনকেন্দ্রিক যে কোন বিষয় নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার বিষয় তো সরকারের হাতে থাকে না। এমন অবস্থায়ই নির্বাচন করতে হয়েছে। তবে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ছিল অতি অস্বাভাবিক একটি বিষয়। কোন নির্বাচনে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি। দুনিয়ার কোন দেশে এমন নির্বাচন হয়েছে বলেও মনে হয় না।
তিনি বলেন, যোগ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ না দিয়ে যদি দলীয় লোকদের নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে এধরনের বিচ্যুতি বারবারই ঘটবে। ’৯১ সালের পর থেকে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু পরাজিত দল কখনওই এটি গ্রহণ করেনি।
ড. হুদা বলেন, পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রকে অনুসরণ করছি আমরা। কিন্তু গণতন্ত্রের ব্যবহার ও বাধ্যবাধকতা আমরা মানছি না। বাংলাদেশের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে এই পরস্পর বিরোধিতা। এটিও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের বড় বাধা।
তিনি বলেন, পারতপক্ষে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতার জন্য পারে না। সমস্যা হচ্ছে, অনেক কমিশনে সঠিক লোক নিয়োগ করা যায় না। এটা একটা দুঃখজনক বিষয়। নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, তাদের দলীয় পরিচয় কি, চারিত্রিক দৃঢ়তা, যোগ্যতা এসব বিষয় নিয়ে কেউ পর্যালোচনা করে না। নিয়োগ দেয়ার সময় কথা বলে না। প্রতিবাদ হয় না। এমনকি বিরোধী দলও এ বিষয়ে কথা বলে না। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তানে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে বিরোধী দলের বয়কটের রাজনীতির কারণেও সঠিক সময় সঠিক প্রতিবাদও হয় না।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন নিয়ে মাঝপথে আন্দোলন না করে যখনই কমিশনকে নিয়োগ দেয়া হয় তখনই প্রতিবাদ করা উচিত। তখন কেউ কিছু বলে না। ভারতে মনমোহন সিং-এর সরকার একজনকে দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগ দিলো। তখন বিরোধী দল ব্যাপক হইচই শুরু করে দিলো। সরকার বাধ্য হলো ওই নিয়োগ বাতিল করতে।
তিনি বলেন, নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রথম সোপান। আমরা যদি ধরেও নেই বাংলাদেশে ভাল নির্বাচন হয়েছে তারপরও পরিণত গণতন্ত্র পেতে আরও অনেক কিছুর দরকার। পরিণত গণতন্ত্রে আসতে হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। দায়িত্বশীল আমলাতন্ত্র গড়ে তুলতে হবে। এটি না করতে পারলে ভাল নির্বাচন করলেও ভাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচন হলেই বলা হয় গণতন্ত্র কায়েম হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের দেশে গণতন্ত্রের বাকি মৌলিক বিষয়গুলো পরিপোষণ করার চেষ্টা করছি না আমরা। নির্বাচনকেই গণতন্ত্রের একমাত্র মাধ্যম মনে করছি।
সাবেক এ সিইসি বলেন, বৃটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে ভাল ভাল প্রতিষ্ঠান পেয়েছি। ভাল বিচার ব্যবস্থা ছিল এবং বেশ কিছু আইন পেয়েছিলাম যা বৃটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল এমনকি  বাংলাদেশ হওয়ার সময়ও ছিল। যে কোন উপায়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে এই মানসিকতা থেকেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের আয়ত্তে আনার চেষ্টা করা হয়। যখন যে দলই এসেছে সেই দলই এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের করে নেয়ার চেষ্টা করেছে। দলীয় লোক বসিয়ে অধিকার করা হয়েছে। এতে প্রাইমারি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষায় মেধার কোন জায়গা থাকছে না।
সাংবিধানিক পদে যোগ্য লোক নিয়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, সংবিধানে বলা আছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে লোক নিয়োগ করতে তারা কি ধরনের হবে, তাদের যোগ্যতা কি হবে সে সম্পর্কে আইন তৈরি করতে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন আইন হয়নি। আমরা নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি আইনের খসড়া জমা দিয়েছিলাম। সেটি আলোর মুখ দেখেনি। শুধু যে নির্বাচন নিয়ে সমস্যা হচ্ছে তা নয় দেশে সুশাসনের ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে। আমরা আগের কমিশনের ভালো দিকগুলো গ্রহণ করেছিলাম। রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ সবার সঙ্গে আলোচনা করে ইসি’র সংস্কার করেছিলাম। আমরা বর্তমান কমিশনের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা করে রেখে এসেছিলাম। আমাদের প্রত্যাশা ছিল কমিশন এটিকে এগিয়ে নেবে। কিন্তু মনে হচ্ছে বর্তমান কমিশন আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। এমনকি আমরা যেসব কাজ করে এসেছি তারা তা করছে না। বিএনপির অনেক বাধার মুখেও আমরা ইভিএম দিয়ে নির্বাচন করেছি। আমরা খুব আশাবাদী ছিলাম ইভিএম নিয়ে। পৃথিবীর বহু দেশে ইভিএমে নির্বাচন হচ্ছে। ভারতেও হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ হলে অনেক সমস্যার সমাধান হতো। মান্ধাতার আমলের সিলগালা আর মোমবাতি দিয়েতো এখন আর নির্বাচন চলে না। এতে ঝক্কি ঝামেলা অনেক বেশি। প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাচন করতে আরও অনেক সমস্যা আছে। যার অনেক কিছুই বাইরে প্রকাশ হয় না। আমরা নিজেরাও বলি না। ইভিএমে ভোটগ্রহণ হলে এসব সমস্যা থাকার কথা না।
ড. হুদা বলেন, বর্তমান কমিশন নিয়ে আমি সমালোচনা করতে চাই না। তবে আমাদের কমিশন যে সংলাপের শুরু করেছিল তা থেকেও সরে এসেছে বর্তমান ইসি। গায়ের জোরে অনেক আইন করা যায়। তবে আইনের বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতর।
তিনি বলেন, নির্বাচন সংক্রান্ত আইনের ৯১/ই ধারা বাতিল করতে চেয়ে তারা খামোখা নিজেরাই বিতর্কিত হয়েছে। আমরা যে ধারাটা রেখে এসেছিলাম সেই ধারাটা তারা ধরে রাখতে পারেনি, আমরা যেভাবে উপজেলা নির্বাচন করেছিলাম তা তারা অনুসরণ করেনি। আমরা উপজেলা নির্বাচনে এমপিদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলাম। নির্বাচন কমিশনের কঠোর মনোবল ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব না। আমরা যখন উপজেলা নির্বাচন করলাম তখন কয়েকজন এমপিকে আইনের ভয় দেখিয়ে বিধি লঙ্ঘন থেকে বিরত রেখেছি।
উপজেলা নির্বাচন ধাপে ধাপে করায় সহিংসতা বেড়েছে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ধাপে ধাপে উপজেলা নির্বাচন হলে আরও সুষ্ঠু হওয়ার কথা। এতে লোকবল বেশি পাওয়া যায়। নির্বাচনী এলাকা ছোট হলে এতে বেশি জনবল নিয়োগ করা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কড়া নজরদারি রাখতে পারে। নির্বাচন কমিশনও ভালভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কিন্তু কেন তা হলো না জানি না। গত জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ না থাকার পেছনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ’৯০ পরবর্তী সবগুলো নির্বাচনে ৭০ ভাগের বেশি ভোট পড়েছে। যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য ঈর্ষণীয় বিষয়।
কিন্তু মানুষ তখনই ভোটে যায় না যখন  ভোটাররা মনে করে নির্বাচনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সংখ্যালঘু এবং নারী ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন না। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ভোটের এই হার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে শামসুল হুদা বলেন, একতরফা নির্বাচনে এমনই হয়। যতই কমিশন ভোট বাড়াতে চায় না কেন কেউ এটি গ্রহণ করবে না। কারণ মানুষ সব দেখেছে। কাজেই তারা যা বলছে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। এটি নিয়ে আলোচনা করেও কোন লাভ নেই। এই আলোচনার কোন মূল্য নেই।
দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সঙ্কট চলছে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আসলে সমস্যাটা রাজনৈতিক। সমস্যার মূলে বয়কটের রাজনীতি। একটি পক্ষ নির্বাচন বয়কট করে এখন ফেঁসে গেছে। বয়কট কখনও ভাল ফল বয়ে আনতে পারে না। আর এখন যে সমস্যা চলছে তা সমাধানে আলোচনার মধ্যেই যেতে হবে। বিরোধী দল যে প্রতিবাদ করছে তাদেরটা অব্যাহত থাকবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেই তাদের সামনে এগোতে হবে। মানুষ জ্বালাও-পোড়াও পছন্দ করে না। এগুলো যারাই করবে তাদের প্রতি জনসমর্থন থাকবে না।
তবে আলোচনা না হলে সমাধান বের হবে না। তিনি বলেন, রাজনীতির বাইরে বড় সঙ্কট নেই। সাধারণ মানুষ দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিচ্ছে। ব্যক্তিখাতের প্রসার ঘটছে। মোট কথা হলো মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়, জীবনের নিরাপত্তা চায়।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় নাগরিকরা সেবা পাচ্ছেন না। আইনের মারপ্যাঁচে যাকেই প্রশাসন দেয়া হচ্ছে তিনি তিন মাসের বেশি থাকতে পারছেন না। আমরা ঢাকার ভোটার তালিকা করতে পারিনি। পারলে তখনই নির্বাচন করে ফেলতে পারতাম। সিটি করপোরেশনের আইনে আছে সময়ের মধ্যে থাকলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করতে পারে। তবে ব্রেক হয়ে গেলে নির্বাচন করতে হলে সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনেও এমন অবস্থা হয়েছে। এখন সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া নির্বাচন করা যাবে না। তিনি বলেন- প্রশাসক দিয়ে ডিসিসি চলতে পারে না, এ কারণে নির্বাচন জরুরি।