Friday, October 16, 2015

জেরুজালেমে সহিংসতা : জরুরি বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদ

ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করতে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ আজ শুক্রবার এক জরুরি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় (গ্রিনিচ সময় ১৫০০টা) এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনীতিকরা একথা জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার আরব বিশ্বের রাষ্ট্রদূতদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য জডার্নের অনুরোধে এ জরুরি বৈঠক হতে যাচ্ছে। বৈঠকে রাষ্ট্রদূতরা জেরুজালেমের অবনতিশীল পরিস্থিতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি-মুন কয়েক সপ্তাহের সহিংসতার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে শান্ত থাকার জন্য বারবার আহবান জানান। সেখানে এ সহিংসতায় কমপক্ষে ৩০ জন ফিলিস্থিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেখানের পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ’ এবং তিনি পরিস্থিতি শান্ত করতে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদকে অর্পিত দায়িত্ব পালনের আহবান জানান।
বৃহস্পতিবার জেরুজালেমে ব্যাপকভাবে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

নাইজেরিয়ায় মসজিদে বোমা হামলা : নিহত ৩০

নাইজেরিয়ার একটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ৩০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। বৃহস্পতিবার রাতে উত্তরাঞ্চলের বোর্নো রাজ্যের একটি মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় দুটি আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। দেশটির জরুরি সংস্থার বরাতে এই খবর জানিয়েছে বিবিসি। প্রথম বিস্ফোরণটি হয় মসজিদের ভেতরে। আর দ্বিতীয়টি হয়েছে বাইরে। এ ব্যাপারে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে শুক্রবার জানানো হয়, নামাজের সময় আত্মঘাতী হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এখনো কোনো সংগঠন এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। যদিও নিরাপত্তা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টরা এ জন্য সন্দেহ করছে সশন্ত্র সংগঠন বোকো হারামকে। কারণ গত কয়েক মাসে এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে সংগঠনটি। এর আগে মঙ্গলবার মাইদুগুরিতে তিনটি বোমা বিস্ফোরণে অন্ততপক্ষে চারজন নিহত হন। গেল সেপ্টেম্বর মাসে একই শহরে তিনটি বিস্ফোরণে ডজনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে ছিলেন।

ভূগর্ভে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করে রেখেছে ইরান

প্রথমবারের মতো ভূগর্ভে অবস্থিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের কারখানা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ প্রদর্শন করেছে ইরান। ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি’তে প্রদর্শিত ফুটেজে দেখানো হয়েছে, ভূগর্ভস্থ একটি টানেলে সারি সারি উৎক্ষেপণ মঞ্চে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে। অবশ্য ভূগর্ভস্থ এ টানেল ইরানের কোথায় অবস্থিত প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয় নি। তবে বলা হয়েছে, এসব টানেল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার গভীরে অবস্থিত।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র অ্যারোস্পেস ডিভিশনের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আলী হাজিজাদেহ এ টানেলকে পানির উপরে দৃশ্যমান একটি বরফখণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, পানির নীচে এই বরফের বিশাল বহর রয়েছে। তিনি বলেন, সমগ্র ইরানে ভূগর্ভের অনেক গভীরে এমন অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র ঘঁটি রয়েছে।
জেনারেল হাজিজাদেহ আরো বলেন, ইরানের সব ঘাঁটিতে নানা পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর দিকে তাক করে ছোঁড়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী নির্দেশ দিলেই এ সব ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হবে। তিনি আরো বলেন, অনেকে নিজেদের টেবিলে ইরান বিরোধী বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে ভেবে আশাবাদী হচ্ছেন। তাদেরকে আমরা আমাদের টেবিলের নীচে কি কি বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছি সেদিকে নজর দেয়ার আহ্বান জানাবো।
পরমাণু সমঝোতার মধ্য দিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে সীমিত হয়ে যাবে বলে পশ্চিমা কোনো কোনো দেশ যখন দাবি করছে তখন এই ভিডিও ফুটেজ প্রচার করা হলো।
সূত্র : রেডিও তেহরান

শাকুর শাহ্-এর ‘কিংবদন্তি ভাবনা’

ছবির শরীরে লোককলার নানা উপাখ্যান ও অলংকার। টেরাকোটা-ছাঁদের অঙ্কন থেকে শুরু করে, কাটা-ছেঁড়া কাগজ জুড়ে লোকজ-কোলাজ, গ্রামীণ নারীদের নকশিকাঁথার আলংকারিক উপাদান—কী নেই তাতে! তাঁর ঐতিহ্যপ্রীতির সরল প্রকাশ যেন ডানা মেলেছে উত্তর-আধুনিক শিল্পভাবনার সঙ্গে। দুইয়ে মিলে আমাদের দিচ্ছে ভিন্ন এক ভুবনের সন্ধান। আবদুস শাকুর শাহ্-এর চিত্রসৃজন সম্পর্কে এ কথা তো বলাই যায়। তাঁর সৃষ্টি সমাহারে হাজার বছরের লোকায়ত বাংলার সংস্কৃতি ও লোকমুখে প্রচলিত গীতিকাব্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। ৯ অক্টোবর থেকে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে ‘মিউজ অব মিথ’ অর্থাৎ ‘কিংবদন্তি ভাবনা’ শিরোনামে খ্যাতিমান এ শিল্পীর একক চিত্র প্রদর্শনী। এটি তাঁর ২২তম একক প্রদর্শনী। কাগজ ও ক্যানভাসে কোলাজ, জলরং আর অ্যাক্রিলিক রঙে সাম্প্রতিক কালে আঁকা ৪৮টি চিত্রকর্ম জায়গা পেয়েছে এবারের প্রদর্শনীতে। শাকুর শাহ্-এর জন্ম ১৯৪৬ সালে বগুড়ায়। ১৯৭০ সালে ঢাকায় তৎকালীন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে নিয়েছেন স্নাতক পাঠ। ১৯৭৭-৭৮ সালে পড়েছেন ভারতের বরোদার মহারাজ সোয়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ সময় শিক্ষক হিসেবে সান্নিধ্য পেয়েছেন গুণী শিল্পী কে জি সুব্রামানিয়ানের। মূলত তাঁরই উৎসাহে বরেণ্য অগ্রজ যামিনী রায়, কামরুল হাসান ও কাইয়ুম চৌধুরীদের চর্চিত লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর চিত্র নির্মিতির পথে পা বাড়িয়েছেন শাকুর শাহ্। তবে এ নির্মাণে যেমন ঐতিহ্যনির্ভরতা মূর্তমান, তেমনি নিজস্ব কৌশলে শাকুর এর মধ্যে পুরে দিয়েছেন আধুনিকতা ও স্বক্রিয়তা—তথা শাকুরীয় ভঙ্গিও। গত শতকের নব্বই দশক থেকে তাঁর চিত্রপটে উঠে আসতে থাকে লোককাহিনির চরিত্ররা। এরই ধারাবাহিকতায় মৈমনসিংহ গীতিকার নদের চাঁদ, মহুয়া, মলুয়াসহ প্রাণীচরিত্রের দেহাবয়বকে সরল অঙ্কনরীতিতে তুলে ধরার কৌশল বাংলাদেশের চারুশিল্পচর্চায় শাকুরকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। চিত্রপটে এসব চরিত্রের পাশাপাশি তাদের আখ্যানের গীতিকবিতা থেকে আহরিত অংশবিশেষের লিপিকলার প্রয়োগে শাকুর শাহ্-এর চিত্রপট হয়ে উঠেছে বাঙালির স্বরূপ চেতনার অন্যতম অনুঘটক।
মৈমনসিংহ গীতিকা নিয়ে দীর্ঘকাল কাজ করে এখন আলোচ্য শিল্পী আমাদের দেশের প্রচলিত আরও নানা লোকজ ফর্ম আধুনিক কায়দায় উপস্থাপন করছেন, যা জায়গা পেয়েছে চলমান এই প্রদর্শনীতে। কাগজ কেটে, গামছা ও কাপড়ের টুকরো জোড়া লাগিয়ে ছোট আকৃতির নানা কোলাজ কাজের পাশাপাশি গোয়ােশ তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে লোকজ সংস্কৃতির প্রতি নিজের ভালো লাগাকে আবার যেন নতুন করে উন্মোচন করতে চেয়েছেন শাকুর। ‘ঐতিহ্য’ শিরোনামে করা নতুন এ নির্মিতিতে চার-পাঁচটি সমান্তরাল প্যানেলে নকশার সরল সৌকর্য তুলে ধরেছেন নকশিকাঁথার ধরনে। তবে গড়নে-গঠনে এবং বর্ণ প্রকরণে এখানে স্পষ্ট আধুনিকতার ছাপ। সরলতার অসীম সৌন্দর্য অবলোকনের প্রাঞ্জল চোখ আমাদের সামনে খুলে দিয়েছেন শাকুর শাহ্। প্রদর্শনী উদ্বোধনের দিনে শিল্পীর ভাষ্য, ‘আমি চেয়েছি সহজকে সহজে আঁকতে। সোজাসাপটা করে বলতে চেয়েছি, ধরতে চেয়েছি আমার দেশের অসম্ভব সুন্দর লোকজ গীতিকাব্যের চরিত্রের নান্দনিকতাকে। এগুলো দেশে ও দেশের বাইরে আমার দেশ ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরে মানুষের কাছে।’ এবারের কতগুলো ছবিতে শাকুর শাহ্-এর বর্ণ প্রলেপ বেশ উষ্ণ। ‘রূপবতী’, ‘বন্ধু’ ও ‘গ্রামীণ গাথা’ শিরোনামে আঁকা কয়েকটি ছবির আবহে কমলা ও হলুদাভ রং ভারী করে প্রয়োগ করেছেন শিল্পী। আর এর মাধ্যমে লোকশিল্পীর রঙের উজ্জ্বলতাকে যেন আরও শক্তি ও সাহসের সঙ্গে ব্যবহার করলেন শাকুর। এই প্রদর্শনীতে তাঁর কাজের নতুনত্ব মূলত এটিই। আর অন্য বাদবাকি ছবির উপস্থাপনায় ফুটে উঠেছে শিল্পীর সেই চিরচেনা ধাঁচ। শেষে বলি, চিরকালীনতার নিরিখে আবদুস শাকুর শাহ্ আমাদের শিল্পকলার ইতিহাসে অনিবার্য হয়ে রইলেন, আজ এ কথা বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। প্রদর্শনীটি শেষ হবে ২৯ অক্টোবর।

স্থানীয় সরকার কাজ করেনি দলীয় লোক না থাকায়? by মিজানুর রহমান খান

রাজনীতির শাস্ত্রে ‘পার্টিয়ার্কি’ শব্দটির নতুন প্রচলন ঘটেছে। কারণ দলীয় ভিত্তিতে মনোনয়ন আর দূষিত দলীয় ভিত্তিতে (পার্টিয়ার্কি) মনোনয়ন এক কথা নয়। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদাসহ অনেকেই দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইনকে সমর্থন করছেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের ধারণা বিকশিত হওয়ার মূলমন্ত্র হওয়ার কথা ছিল বিকেন্দ্রীকরণ। তবে কখনো এ কথা শুনেছি বলে মনে পড়ে না যে আমাদের স্থানীয় শাসন কার্যকর হতে না পারার বড় কারণ হলো এর নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হতে না পারা। বরং এ কথাই সবার জানা, এই ব্যবস্থা কখনো গতিশীল হতে পারেনি। কারণ, তোপখানা থেকে ক্ষমতার তোপ দাগানোর অভ্যাস কেউ ত্যাগ করতে রাজি হননি।
প্রথম কথাটা শুনেছি ২০০৮ সালে। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ মত দেন যে ‘রাজনৈতিক দল’ যেহেতু সংবিধানে আছে, তাই তাকে স্থানীয় নির্বাচনে বারিত করা সাংবিধানিক নয়। তাই ওই বিধিনিষেধ বাতিল করা হলো। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কার্যত ‘রাজনৈতিক দল’ হিসেবে গড়ে উঠল কি না, সেটা তো আমরা ভুলে থাকতে পারব না। অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, এগুলো এখনো দল নয়, সমাগম বা সম্মেলন।
১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্ট অনধিক ছয় মাসের মধ্যে সব স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আসীনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। এরপর সম্প্রতি আমরা জেলায় জেলায় দলীয় প্রশাসক পেলাম। কেন সুপ্রিম কোর্টের রায় তাঁরা মানতে পারেননি, তার কারণ হিসেবে কখনো শোনা যায়নি যে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন না থাকার কারণে সরকার এটা করতে পারছে না। বিএনপি কান্নাকাটি শুরু করেছে। কিন্তু তারা কেন রায় অগ্রাহ্য করেছিল, সে জন্য তওবা করতে নারাজ। উপজেলায় ইউএনওকে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা করে রাখাই তো গতির প্রতীক। সেই যে উপজেলা চেয়ারম্যানরা সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে গিয়েও পারলেন না। স্থানীয় সাংসদেরা সরকারের খাস পলিটিক্যাল এজেন্ট হিসেবে উল্লেখযোগ্য জেলা ও বড় শহরগুলো ছলেবলে কবজায় রাখছেন।
কী বা কোন পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় শাসনের ভোটে দলীয় প্রতীক জাতির কাঁধে চাপছে, সেটা আমরা সতর্কতার সঙ্গে মনে রাখব। আইয়ুবের মৌিলক গণতন্ত্র থেকে কি আমরা সত্যি নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছি? আজ দুই প্রধান দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এতটাই নাজুক যে তারা গোপন ব্যালটে কমিটি করতে পারে না। এমনকি বহু জায়গায় পকেট কমিটিও করতে পারছে না। সে কারণে সমাজের যে দু-চারজন ভালো লোক, যাঁরা এখনো পল্লির নিভৃতে দলনিরপেক্ষ থেকে তা বজায় রেখে চলার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, তাঁরা হারিয়ে যেতে পারেন। এই আইন তাই সামাজিক নেতৃত্ব গঠনে একটি রূপান্তর ঘটাতে পারে। অবশ্য যাঁরা দলীয় রাজনীতি থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিলেন, তাঁরা ঠেকায় পড়ে দলমুখীও হতে পারেন। আবার মোসাহেবি ও পেশিশক্তির প্রতিযোগিতায় অনেকে শামিল হতে চাইবেন না।
শান্তিপ্রিয় লোকজনের অনেকে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। নির্দলীয় হিসেবে তাঁরা স্বপ্ন দেখতেন স্থানীয় সরকারে টিকে থাকার। এখন তাঁদের সেই ভরসায় আরও চিড় ধরতে পারে। তবে দলকে এমনভাবে পরিচালনা করা সম্ভব, যাতে ষাটের দশকের সেই দিনগুলো ফিরে আসে, যখন বিবাদে জড়িয়ে পড়া লোকজন থানা বা কোর্টকাছারিতে না ছুটে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে আগে ছুটতেন। এ ধরনের রাজনৈতিক নেতারা এখন স্বীকৃত সংখ্যালঘুদের চেয়েও ভীষণ সংখ্যালঘু হয়ে গেছেন।
দলীয় কর্মী ও নেতা মানেই অধিকতর সম্মানিত, দায়িত্বশীল, বিবেচক ও ন্যায়বিচারক। এই দিকে আমাদের গন্তব্য স্থির করতে পারলে সমস্যা নেই। নিরপেক্ষ ÿথাকার নামে বড় দল মানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে যোগ্যতমদের দূরে থাকাটাকে আত্মঘাতী বলেই মনে হচ্ছে। ভালোমন্দ যা-ই থাক, মানুষকে দলমুখী হতে হবে। দল বাঁচলে রাজনীতি, সরকার—সবই বাঁচবে। কিন্তু সে জন্য সরকারি দল যাতে ‘প্লুরালিজম’ বা বহুদলীয় মতে বিশ্বাস করে, সেই আস্থা তৈরি করতে হবে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সেটা কতটুকু সম্ভব বা বাস্তবসম্মত?
গ্রাম আদালত ব্যবস্থা যেখানে ভালো কাজ দিচ্ছে, সেখানে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মধ্যে যাঁরা দলনিরপেক্ষ ÿবা দলে থেকেও নিষ্ঠাবান, তাঁদের প্রতিই কিন্তু জনগণের আস্থা বেশি। এখন খুব বেশি খারাপ লোকের দলীয় টিকিটের জোরে নির্বাচিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। এতে গ্রাম আদালত আরও নির্জীব হবে। তাই ব্যালট পেপারে ‘না’ ভোট চালু করতে হবে। কারণ, ভোট না পচানোর যে জনপ্রিয় মনোভাবের কারণে সংসদে স্বতন্ত্র প্রার্থী কম জেতেন, সেটা এবার বড় আকারে স্থানীয় সরকারে ফিরে আসতে পারে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আরও কম জিতবেন। ভালো মানুষের কণ্ঠ আরও ক্ষীণতর হবে। আসলে ক্ষমতাসীন দলের জন্য তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থীদের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীদের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জিতে আসা হজম করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সুতরাং ক্ষমতাসীন দল দৃশ্যত এক ঢিলে অনেক পাখি শিকার করল।
এ টি এম শামসুল হুদা ও কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ উভয়ের কমিশনের অধীনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বিরোধী দল–সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, ক্ষমতাসীনেরা অস্বস্তি চেপে সেটা প্রচারও করেছে। কিন্তু তারা সম্ভবত এই দৃশ্যপট পাল্টাতে চাইছে। দলে গণতন্ত্র না থাকলে ‘বিদ্রোহ’ বাড়ে, তারা এর রাশ টানতে চাইছে। তারা ভাবছে, মনোনয়নে আনুষ্ঠানিকতা থাকলে বিদ্রোহীর সংখ্যা কমবে।
এখন দলগুলো যদি তাদের প্রতিটি স্থানীয় স্তরে গোপন ব্যালটে বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কোনো উপায়ে কমিটি-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়, তাহলে সেটা একটা বড় সান্ত্বনা। অনেকে বলছেন, দলীয় লোক হয়ে দলীয় মুখোশটা আড়াল করার কী যুক্তি থাকতে পারে? হতে পারে এটাই হয়তো আমাদের স্বাস্থ্যসম্মত রাজনীতি এনে দেবে। তবে আমরা জাতীয় পর্যায়ে এবং রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন হতে দেখছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই উদ্যোগ কী ফল দেয়, সেটা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
সাবেক সিইসি শামসুল হুদা আনন্দিত। কারণ এটা তাঁর ভাষায় ‘দ্বৈতনীতি’ ঘোচাবে। কিন্তু এ কথা মানতে হবে যে যখন আইন ছিল নির্দলীয়ভাবে করার, তখন তাঁরা তা মানাতে পারেননি। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, দলীয় ভিত্তিতে হলেই বা কী করে নির্বাচিত ব্যক্তিরা শক্তিশালী হবেন? এ বিষয়টি পরিষ্কার নয়। তবে আওয়ামী লীগের মাহবুব উল আলম হানিফ পরিষ্কার করেছেন। বার্তাটা পরিষ্কার: দলীয় ব্যক্তি নির্বাচনে জয়ী হলে, সেখানে বড় অঙ্কের বরাদ্দ মিলবে! এই বরাদ্দের রাজনীতি তো বিএনপির গন্ধ লেগে থাকা চট্টগ্রামের বিদায়ী মেয়র দেখিয়ে গেছেন।
দলের টিকিটে ভারত ও ব্রিটেনে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়। আরও বহু উন্নত গণতন্ত্রে হয়। আসুন আমরা এই কীর্তির সপক্ষেÿ যুক্তি দিতে তাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করার আগে আরও কতগুলো, অন্তত ওই সব দেশের দল কীভাবে চলে, সেটাও রপ্ত করতে আরম্ভ করি। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তাঁর এক রায়ে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন করার পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা আজও যে দুর্বলতম রয়েছে, তার জন্য আর যা-ই হোক, দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন না করাকে দায়ী করা চলে না। আর দলের ভিত্তি হলো সেই ভিত্তি, যেখানে কার্যত দলীয় সংখ্যালঘু ব্যক্তিরা দলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠকে দাবড়ে বেড়াচ্ছেন। একদলীয় চীনও স্থানীয় সরকারে দলের প্রার্থী মনোনয়নে যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তাদের ‘ইউপি চেয়ারম্যান’, অর্থাৎ ভিলেজ কমিটি ইলেকশন পদের জন্য মনোনয়নে দল সফল হলো কি না, তা বিচারের একটি অন্যতম মৌলিক মানদণ্ড হলো, সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যক্তিটিকে তারা বেছে নিতে পারল কি না। দীর্ঘ প্রচারণা চলে না। পোস্টার, চিকা আর মাইকেরও ব্যবহার নেই। ভোটের ঠিক কয়েক দিন আগে প্রার্থীরা গ্রামের একটি উন্মুক্ত স্থানে বক্তব্য দেন, যদিও নীরবে বাড়িতে বাড়িতে প্রচারণার কাজ চলে।
এখন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড পুনর্গঠন ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সংসদ সদস্যরা যেভাবে মনোনয়ন পাচ্ছেন, গণতন্ত্রবিমুখ থেকে দল চালালে সেই ধারা তো বদলাবে না। এটা তাই অনেক ক্ষেত্রে দলের জনপ্রিয় বা বিদ্রোহীদের স্তব্ধ করার কাজে ব্যবহৃত হবে।
আর কেন জানি না, মুখে যতই জনপ্রতিনিধির কথা বলুক, শাসকের পছন্দ প্রশাসক। মেয়াদ উত্তীর্ণ জনপ্রতিনিধি সহ্য হয় না, প্রশাসক সহ্য হয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আমাদের থানাগুলো প্রশাসকেরাই চালিয়েছিলেন, তখন না হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত ছিলাম। এখন?
প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ১৯৯২ সালে ওই উপজেলা মামলায় যা লিখেছিলেন, তার একটি অংশ প্রণিধানযোগ্য: ‘ব্রিটিশ আমল থেকেই আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দলীয় (পার্টিয়ার্কি অর্থে) রাজনীতি বা স্বৈরশাসকদের অশুভ রূপকল্পের (ইভিল ডিজাইন) শিকার হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি কর্মকর্তা কিংবা ÿক্ষমতাসীন দলের মনোনীত চাকরবাকর (হেনশম্যান) দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এটাই যদি করা হয়, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান থাকা বা না থাকার কোনো মানে হয় না। এতে তারা যে সময়ে সময়ে পরিবর্তন আনে, তা জনগণ ও আন্তর্জাতিক নেতাদের ধাপ্পা দেওয়ার জন্য।...সভ্যতার এই পর্যায়ে স্বৈরশাসক তা তিনি হোন রাজনৈতিক নেতা বা সামরিক ব্যক্তি, তাঁরা বিশ্বময় নিন্দা ও হাসিঠাট্টার পাত্র। একটি স্বৈরশাসন তা দেখতে যতই শক্তিশালী মনে হোক, তারা চেতনাগতভাবে অত্যন্ত দুর্বল এবং জনবিচ্ছিন্ন থাকে। এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যে তাদেরও ভয়ংকর বিপদে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সুতরাং স্বৈরশাসকেরা একধরনের রাজনৈতিক ভিত প্রত্যাশী হয়, আর সেই উদ্দেশ্যে প্রকৃত গণতন্ত্র (!) প্রতিষ্ঠার জন্য তারা গ্রাম, ইউনিয়ন ও থানায় ছুটে যায়।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

বিদ্যালয়ের ফটকে ছাত্রী হত্যা- শুধু শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়

কবিতা মনি দাস
বিদ্যালয়ের ফটকের কাছে রক্তমাখা একটি ছুরি। রক্ত ১৬ বছরের এক কিশোরীর, যে আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এখন সে হাসপাতালের মর্গে। আর কোনো দিন ওই বিদ্যালয়ের ফটকে তার পা পড়বে না। ঘাতক বিক্রম নামের ২২ বছরের এক তরুণ। লোকজন তাঁকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দিয়েছেন। তাঁকে একমাত্র আসামি করে একটা হত্যা মামলা করেছেন কিশোরীর বাবা। হত্যাকারী হত্যাকাণ্ডের সময়ই হাতেনাতে ধরা পড়ায় আইনানুগভাবে তাঁর শাস্তি নিশ্চিত করা পুলিশের পক্ষে কঠিন হওয়ার কথা নয়। তবে সে জন্য যেসব প্রত্যক্ষদর্শী তাঁকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দিয়েছেন, তাঁরা যেন আদালতে সাক্ষ্য দিতে যান, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গত মঙ্গলবার দুপুরের এই হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে আমরা কিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলতে চাই। ঘটনার বিবরণ থেকে ধারণা করা যায়, তরুণটি ওই কিশোরীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। কিন্তু আসলে তিনি কী চেয়েছিলেন? তিনি কি কিশোরীটিকে ভালোবাসতেন? ভালোবাসা কি জবরদস্তি করে পাওয়ার বিষয়? এবং ভালোবাসলে কি শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার মানুষটিকে খুন করা যায়?
আবার এটাও সত্য যে তরুণটি পেশাদার খুনি নন, এর আগে তিনি কোনো ফৌজদারি অপরাধ করেননি। তিনি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জীবনে তাঁর নিশ্চয়ই কিছু আশা ও স্বপ্ন ছিল। তাহলে এমন একটা গুরুতর, বিভীষিকাময় কাজ কীভাবে তিনি করতে পারলেন? কেন তিনি আর দশজন স্বাভাবিক শিক্ষিত তরুণের থেকে হঠাৎ রূপান্তরিত হলেন একজন নৃশংস খুনিতে?
এসব কথার উদ্দেশ্য এই তরুণের অপরাধকে লঘু করা নয়। তাঁর অবশ্যই আইন অনুযায়ী কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে অন্য কেউ এমন পথে যাওয়ার সাহস না পায়। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ রকম প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতাবোধ, নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি—এসব ক্ষেত্রে গলদ রয়ে গেছে কি না, থাকলে সেগুলো কীভাবে দূর করা যায়, সেসবও ভাবতে হবে।
বিদ্যালয়ের ফটকে ছাত্রী হত্যা
আপডেট: ১৪ অক্টোবর  ২০১৫
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ের ফটকে ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছে কবিতা মনি দাস (১৬) নামের এক ছাত্রী। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত কবিতা কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর এলাকার বোর্ডঘর বিজয় সরণি উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। সে ঢাকার ধামরাই উপজেলার সাটুরিয়া গ্রামের সাগর মনি দাসের মেয়ে। সূত্রাপুরে নানার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করত কবিতা।
গ্রেপ্তার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেন কালিয়াকৈরের উত্তর কাঞ্চনপুর পশ্চিমপাড়া এলাকার বিক্রম চন্দ্র সরকার (২২)। তিনি সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র।
কবিতার পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দশম শ্রেণির ছাত্রী কবিতার নির্বাচনী পরীক্ষা চলছে। অন্যান্য দিনের মতো গতকাল দুপুরেও সে পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়। বেলা দেড়টার দিকে বিদ্যালয়ের ফটকে পৌঁছানোর পর বিক্রম তার গতিরোধ করেন। এ সময় দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে বিক্রম একটি ধারালো ছুরি দিয়ে কবিতার পেটে ও কাঁধে আঘাত করেন। কবিতার চিৎকার শুনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও আশপাশের লোকজন গিয়ে বিক্রমকে আটক করে পুলিশে দেন। কবিতাকে উদ্ধার করে কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ লাশ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম বলেন, স্কুলছাত্রী কবিতার পেটে, বুকে ও হাতে ছুরির তিনটি আঘাত রয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।
কবিতার নানা ননি গোপাল বলেন, বিক্রম অনেক দিন ধরে কবিতাকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন। চার-পাঁচ মাস আগে একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় কবিতার হাত ধরে টানাটানি করেন তিনি। পরে বিষয়টি নিয়ে বিক্রমের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করা হয়। এরপর থেকে প্রতিদিন কবিতাকে স্কুলে দিয়ে ও নিয়ে আসতেন তাঁর নানি। কিন্তু নানি অসুস্থ থাকায় কয়েক দিন ধরে সে বান্ধবীদের সঙ্গে স্কুলে-যাওয়া আসা করছিল।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান জানান, হত্যার ঘটনার পর গতকালের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল কবীর ও কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ওসি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিক্রমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

তৈরি পোশাকখাতে সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদুত মার্সিয়া ব্লুম বার্ণিকাট বলেছেন, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে গত দুই তিন বছরে বেশ সক্ষমতা অর্জন করেছে। বিশেষত শ্রমিকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি হয়েছে, আরো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। আমরা আজ এখানে দেখতে আসছি বাংলাদেশের শ্রমিকরা এবং তাদের শিশুরা কিভাবে জীবন যাপন করছে। আমার দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিবিড়ভাবে দেখতে পাচ্ছে যে, শ্রমিকরা তাদের অধিকার পাচ্ছে এবং তারা একত্রিত হতে পারছে।
রাষ্ট্রদূত শুক্রবার সকালে গাজীপুর মহানগরীর বোর্ড বাজার এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট শিল্পপার্ক লিমিটেড এ কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারি ও  শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রদুত আরো বলেন, বৈশ্বিক ক্রেতারাও জানে যে কীভাবে একজন শ্রমিক কাজ করছে। এ প্রচেষ্টা তখনই সফল হবে, যখন মালিক ও শ্রমিকরা একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। পরিবর্তন কখনই সহজ নয়।
তিনি শিল্পায়নের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্য থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারি ও শ্রমিকদের সন্তানদের যে শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করছে তার জন্য ইস্ট ওয়েস্ট কারখানার মালিক পক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
ইস্ট ওয়েস্ট শিল্প পার্কের পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুন অর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গাজীপুর স্থানীয় সরকার বিভাগের উ পপরিচালক জামিল আহমেদ, কারখানার উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোমানা রশীদ, পরিচালক তানভির জেট রশিদ, আওলাদ হোসেন, বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু, কারখানার পরিচালক মামুনুর রশীদ প্রমুখ।
পরে ইস্ট ওয়েস্ট ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পার্কের উদ্যোগে নার্গিস-রশীদ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তিনটি গ্রুপে ১১৩জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়।

শিশুশ্রমের ঘামে দামি প্রসাধন

ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের খনি এলাকায় শিশুশ্রমিকদের
পাথর ভেঙে অভ্র আহরণ। ছবি: এএফপি
‘আমি তো স্কুলে যেতে চাই, কিন্তু ঘরে খাবারই নেই, আবার স্কুল! কাজেই আমাকে কাজের কাছেই ফিরে আসতে হয়।’
আট বছরের ছোট্ট শিশু ললিতা কুমারী এভাবেই জানায় তার কচিমনের কষ্টের কথা। তার সারা মুখ ধুলোয় ভরা, ঘামে লেপ্টে আছে চুল। এদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। একমনে সে এমন এক খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করে চলেছে, যা দিয়ে তৈরি করা হয় নেইলপলিশ ও লিপস্টিকের মতো সাজসজ্জার উপকরণ।
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ঝাড়খন্ড রাজ্যের খনিতে ললিতা আরও অনেক শিশুশ্রমিকের সঙ্গে যে কাজটি করে, তা হচ্ছে খনিজ পদার্থ মিকা বা অভ্র আহরণ। রাজ্যের প্রায় হাজারো শিশু এভাবে অভ্র আহরণ করে পরিবারে জীবিকার উপায় করে দিচ্ছে। পাউডার, লিপস্টিক ও নেইলপলিশসহ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধন সামগ্রীর উপাদান এই অভ্র।
ললিতা কুমারী জানায়, খনিজ পাথর ভেঙে অভ্র আহরণ ছাড়া জীবনে আর কিছু থাকতে পারে বলে জানা নেই তার। চার বছর বয়স থেকেই সে জীবনে একটা বিষয়ই জেনেছে, তা হলো পাথর ভেঙে অভ্র সংগ্রহ করা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, পরিবেশ দূষণের কারণে দুই দশক আগে রাজ্য সরকার খনি বন্ধ করে দিলেও হাজার হাজার টন খনিজ পাথর রয়ে গেছে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায়। গ্রামের দরিদ্র মানুষেরা একবেলা পেটপুরে খাওয়ার আশায় সেই পাথর ভেঙে অভ্র সংগ্রহ করছে। ল’রিয়েল ও রেভলনের মতো প্রসাধন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অল্প দামে সেই অভ্র কিনে নিয়ে মেয়েদের রূপ সুন্দর করার প্রসাধন সামগ্রী তৈরি করে।
রাজ্যের একজন অধিকার কর্মী জানান, গ্লিটার, পাউডার, মাসকারা ও লিপস্টিক তৈরিতে অভ্র ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের দামি ব্র্যান্ডের প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অল্প দামে এই খনিজ উপাদান লুফে নেয়। রাজ্যের ছোট ছোট শিশু হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অভ্র সংগ্রহ করে তা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। পরে ওই ব্যবসায়ীরা বড় ব্যবসায়ীদের কাছে তা সরবরাহ করেন।
পাথর ভেঙে অভ্র আহরণ। ছবি: এএফপি
২০০৯ সালে শিশুদের শ্রমে মিকা সংগ্রহ করে তা ল’রিয়েল ও রেভলনের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করার দায়ে জার্মান প্রতিষ্ঠান মেয়াখের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘২০০৯ সালের পর থেকে মিকা সংগ্রহে এই প্রতিষ্ঠান শিশুশ্রম বন্ধ করে দিয়েছে।’
তবে ওই অধিকার কর্মী বলেছেন, রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সব সময় পর্যবেক্ষণ করাটা অসম্ভব। তাই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বলা যাবে না যে, মিকা সংগ্রহে শিশুশ্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বাচপান বাঁচাও আন্দোলনের কর্মী ভুবন রিভু বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যাপারে দায় এড়াতে পারে না। এটা আসলে সবার সমষ্টিগত দায়িত্ব, এই অঞ্চল থেকে যারা মিকা সংগ্রহ করবে, শিশুদের স্কুলে যাওয়ার বিষয়টি তারাই নিশ্চিত করবে।
ভারতের প্রচলিত আইনে শিশুর বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ বছরের নিচে। এই বয়সের কেউ শ্রম দিলে তা শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য হবে, যা অবৈধ। কেউ এই অবৈধ কাজে উৎসাহ দিলে ভারতীয় আইনে তার জেল-জরিমানা হবে। তবে এই আইন এখনো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। বাস্তবে দেখা নেই।
ললিতার মতো শিশুরা কাজ করতে করতে প্রায়ই ধারালো যন্ত্রে হাত-পা কেটে ফেলে। খনিজ ধুলোবালিতে দেখা দেয় শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা। বর্ষাকালে খনি এলাকায় সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। এ থেকে সর্পদংশনেরও ঝুঁকি থাকে। খনিজ পাথরের স্তূপ ধসে অনেক শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে।
জেলা শ্রম তত্ত্বাবধায়ক রাম বচন পাসোয়ান বলেন, ‘যেসব এলাকায় দারিদ্র্যের হার বেশি, সেসব এলাকার শিশুদের স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে তাদের বাবা-মাকে বোঝানো অনেক কঠিন। এ ছাড়া কাগজে-কলমে এখানকার এই খনির কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই এখানে আমাদের আইনি কাজ করাটাও বেশ চ্যালেঞ্জিং।’
ঝাড়খন্ড রাজ্যের চার সন্তানের বাবা শিবু যাদব বলেন, তাঁর সন্তানেরা খনিতে কাজ করে পরিবারটিকে টিকিয়ে রেখেছে। তাঁর চার সন্তান মিকা সংগ্রহ করে মাসে এক হাজার রুপি আয় করে। তিনি বলেন, ‘এটাই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উৎস। যদি তারা এ কাজ না করে, তাহলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’

জাতিসংঘ বাহিনী চায় ফিলিস্তিন

তছনছ করা আসবাব, পোশাক ও
খেলনার মাঝে দাঁড়িয়ে কিছু একটা দেখছে
ফিলিস্তিনি শিশুটি। গতকাল পশ্চিম তীরের
নাবলুস শহরের কাছে একটি গ্রামে অভিযান
চালানোর সময় ইসরায়েলি বাহিনী ওই বাড়িতে
তল্লাশি চালায় l ছবি: এএফপি
ইসরায়েল অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ‘জাতিসংঘ থেকে সুরক্ষা বাহিনী’ মোতায়েন চায় ফিলিস্তিন। জাতিসংঘে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের দূত রিয়াদ মনসুর গত বুধবার এ কথা জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন আরও দুই ফিলিস্তিনি। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দেশটির শহরাঞ্চলে সেনা মোতায়েন ও পূর্ব জেরুজালেমে আরব-অধ্যুষিত এলাকায় সড়ক অবরোধ আরোপের পর নতুন করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটল। খবর আল-জাজিরার।
ফিলিস্তিনি দূত রিয়াদ মনসুর বলেন, ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘর্ষ বন্ধে জাতিসংঘে একটি খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। ওই প্রস্তাবের সঙ্গে জাতিসংঘ থেকে সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনার প্রস্তাব সংযুক্ত থাকবে। ফিলিস্তিনি দূত বলেন, ইসরায়েল অধিকৃত এলাকাগুলো এখন ‘অত্যন্ত বিস্ফোরণোন্মুখ’ অবস্থায় রয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে অবশ্যই ফিলিস্তিনিদের ‘সুরক্ষা দেওয়ার’ পথ খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, ‘অধিকৃত জেরুজালেমের ওল্ড সিটি এবং পবিত্র আল-আকসা মসজিদ চত্বর এলাকার চলমান পরিস্থিতি আমাদের জনগণের সুরক্ষার দাবিকে ন্যায্যতা দেয়।’
রিয়াদ মনসুর বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, পর্যবেক্ষক পাঠানো বা আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন ওই এলাকায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার নিশ্চয়তা হতে পারে, যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরাও সুরক্ষা পাবে।’
এদিকে আরব দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের গতকাল জাতিসংঘে বৈঠকে বসার কথা। ওই বৈঠক থেকে চলমান সহিংসতা নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকার আহ্বান জানানো হবে। রিয়াদ মনসুর বলেন, আরব দেশগুলোর বৈঠকে একটি খসড়া প্রস্তাবের মাধ্যমে উত্তেজনাপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং পবিত্র আল-আকসা মসজিদ চত্বরে সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানানো হতে পারে।
দুই ফিলিস্তিনি নিহত: জেরুজালেমের দামেস্ক গেটের প্রবেশমুখে বুধবার বিকেলে এক তরুণ ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলি পুলিশ। ২০ বছর বয়সী ওই তরুণ হেবরনের বাসিন্দা। ইসরায়েলি পুলিশ দাবি করে, নিরাপত্তার খাতিরে ওই তরুণের কাছে গেলে তরুণটি তাদের ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করে। যদিও এ ঘটনায় ইসরায়েলি হতাহত হওয়ার কোনো খবর মেলেনি।
এর চার ঘণ্টা পর পশ্চিম জেরুজালেমে ২৩ বছর বয়সী আরেক ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তাঁকে হত্যার ব্যাখ্যায় ইসরায়েলি পুলিশ বলে, ওই ফিলিস্তিনি এক ইসরায়েলি নারীকে ছুরিকাঘাতে আহত করার পর বাসে উঠে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। এ সময় গুলি করে ঘটনাস্থলেই তাঁকে হত্যা করা হয়।
রিয়াদ মনসুর
সংগ্রামে সমর্থন আব্বাসের: সহিংসতা শুরুর পর ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে মাহমুদ আব্বাস বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘শান্তিপূর্ণ ও জনপ্রিয়’ সংগ্রামে সমর্থন রয়েছে তাঁর।
এদিকে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ভাষণে মাহমুদ আব্বাস ইসরায়েলিদের কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এমনকি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শিশুদের হত্যার অভিযোগ তোলেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সোমবার ইসরায়েলি পুলিশের হামলার শিকার হওয়া ১৩ বছর বয়সী এক শিশুর উদাহরণ টানেন তিনি। তবে ওই শিশু হাসপাতালে জীবিত আছে বলে দাবি করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বলে, ফিলিস্তিনি নেতার বক্তব্য ‘মিথ্যা ও উসকানিমূলক’। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৩২ জন ফিলিস্তিনি ও সাত ইসরায়েলি নিহত হয়েছে।

টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ কমছে -জিএসএমএর গবেষণা by আশরাফুল ইসলাম

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমছে বলে মনে করছে মোবাইল অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন গ্রুপ স্পেশাল মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন বা জিএসএমএ। সংগঠনটি বলছে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে যত এফডিআই এসেছে তার ৬০ শতাংশ টেলিযোগাযোগ খাতে এলেও ২০১৪ সালে তা কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
জিএসএমএর ‘ডিজিটাল ইনক্লুশন ও মোবাইল সেক্টর ট্যাক্সেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতে এফডিআই এসেছে ৫৮ কোটি মার্কিন ডলার, আর ২০১৪ সালে তা কমে ২৮ কোটি ডলার হয়েছে।
মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিনিয়োগ কমে যাওয়ার এ বিষয়টি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যেও উঠে এসেছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিদেশি মালিকানাধীন চার বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর ৫ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ বিনিয়োগ ছিল সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। তবে তৃতীয় প্রজন্মের (থ্রিজি) লাইসেন্স ফি পরিশোধের জন্য ২০১৩ সালে অপারেটরদের বেশি বিনিয়োগ করতে হয়।
এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে উচ্চ কর, গ্রাহকপ্রতি গড় নিম্ন আয়, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলোকে তুলে ধরা হয়েছে জিএসএমএর প্রতিবেদনে। ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতে বাংলাদেশের পিছিয়ে যাওয়াকে বিদেশি বিনিয়োগ কমার আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৯, আর ২০১৪ সালে তা ১৭০ হয়েছে।
বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে থ্রিজি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে জিএসএমএর প্রতিবেদনে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগের মতো মৌলিক অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে মোবাইল ফোন অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জিএসএমএর হিসাব অনুযায়ী, গ্রাহকপ্রতি গড় আয়ের (এআরপিইউ) দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের তিন শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটরের এআরপিইউ বর্তমানে ১ দশমিক ৮ ডলার বা ১৪৪ টাকা। থ্রিজি ও চতুর্থ প্রজন্মের (ফোরজি) নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের খরচের তুলনায় আয় তেমন না হওয়ায় বিনিয়োগ কম হওয়ার আরেকটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশে মোবাইল ফোন অপারেটরদের উচ্চ কর হার এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ কমার আরেকটি কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। দেশে মুঠোফোন অপারেটরদের বর্তমান করপোরেট কর হার ৪৫ শতাংশ। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অপারেটরের ক্ষেত্রে এ হার ৪০ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সহনশীলতা (ফ্লেক্সিবিলিটি) খুব গুরুত্বপূর্ণ। টেলিযোগাযোগ খাতের যে প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ কর দিচ্ছে, তাদের ওপর নানাভাবে অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হচ্ছে। এভাবে স্বল্প সময়ের জন্য বেশি আয় হলেও তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

হিলারি-স্যান্ডার্স তীব্র বাগ্যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে
মনোনয়ন-প্রত্যাশী বার্নি স্যান্ডার্স (বাঁয়ে) ও হিলারি
ক্লিনটন গত মঙ্গলবার এক বিতর্কে অংশ নেন। এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রাথমিক বিতর্কে হিলারি ক্লিনটন এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বার্নি স্যান্ডার্সের মধ্যে কথার লড়াই হয়েছে। লাস ভেগাসে গত মঙ্গলবার রাতে তাঁরা মার্কিন আগ্নেয়াস্ত্র আইন, সিরিয়া যুদ্ধ, পুঁজিবাদ, জনকল্যাণ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে বিতর্কে অংশ নেন। খবর বিবিসির। স্যান্ডার্সের বিরুদ্ধে ওই বিতর্কে আত্মবিশ্বাসী ও সাবলীল বক্তব্য দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক ফার্স্ট লেডি হিলারি। এতে মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে তিনি কিছুটা এগিয়ে গেলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে স্যান্ডার্স মোটেও কঠোর অবস্থান নেননি বলে অভিযোগ করেন হিলারি। গোলাগুলির বিভিন্ন ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রনির্মাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকারও করেন তিনি। অন্যদিকে স্যান্ডার্সও হিলারিকে আক্রমণ করে বলেন, সিরিয়ায় একটি অঞ্চলে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ করতে হিলারি যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা গুরুতর সমস্যা তৈরি করবে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে স্যান্ডার্সের সমর্থনে বড় বড় সমাবেশ হয়েছে।
তাই তাঁর সঙ্গে মনোনয়নের লড়াইয়ে হিলারিকে কিছুটা বেগ পেতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওরেগন অঙ্গরাজ্যের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক গোলাগুলির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। মঙ্গলবারের বিতর্কে এ দুজন ছাড়াও আরও তিন মনোনয়নপ্রত্যাশী অংশ নেন। তাঁরা হলেন ম্যারিল্যান্ডের সাবেক গভর্নর মার্টিন ও’ম্যালে, ভার্জিনিয়ার সাবেক সিনেটর জিম ওয়েব এবং রোড আইল্যান্ডের সাবেক সিনেটর লিঙ্কন চাফি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও মঙ্গলবারের বিতর্কে অংশ নেবেন বলে আশা করছিলেন তাঁর সমর্থকেরা। তবে শেষ পর্যন্ত ওই অনুষ্ঠানের মঞ্চে তিনি হাজির হননি। হিলারি ও স্যান্ডার্স দুজনেই পুঁজিবাদের বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে কথা বলেন। স্যান্ডার্স একটি রাজনৈতিক বিপ্লবের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কংগ্রেস ওয়াল স্ট্রিটকে নিয়ন্ত্রণ করে না। ওয়াল স্ট্রিটই কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু স্যান্ডার্স আরও বলেন, নরডিক (স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল) দেশগুলো শ্রমজীবী জনগণের জন্য অনেক কিছু করেছে। সেদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তাকানো উচিত। জবাবে হিলারি ক্লিনটন বলেন, ‘আমাদের দেশটা ডেনমার্ক নয়। আমি ডেনমার্ক ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের দেশের নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।’ হিলারির ই-মেইল বিতর্কের প্রসঙ্গ উঠলে স্যান্ডার্স বলেন, এ নিয়ে যথেষ্ট হয়েছে। আমেরিকার জনগণ এটা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। হিলারি ২০০৮ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে অন্তত ২০টি বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ওই বছর বারাক ওবামাই দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন ও জয়ী হন।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছিলেন নেহরু!

জওহরলাল নেহরু
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছিলেন। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সাবেক কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বইয়ে এ কথা লিখেছেন। খবর দ্য হিন্দুর। রিডেলের বইটির নাম জেএফকে’স (জন এফ কেনেডি) ফরগটন ক্রাইসিস: তিব্বত, দ্য সিআইএ অ্যান্ড দ্য সিনো-ইন্ডিয়ান ওয়ার। বইতে রিডেল লিখেছেন, যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কাছে যুদ্ধবিমান চেয়েছিলেন নেহরু। চীনের আক্রমণ ঠেকাতেই নেহরু কেনেডির দ্বারস্থ হন।
যুদ্ধে ভারত একের পর এক এলাকা হারাচ্ছিল। আর বড় ধরনের ক্ষতির মুখেও পড়েছিল। সেই অবস্থায় ১৯৬২ সালের নভেম্বরে নেহরু চিঠি লেখেন কেনেডিকে। চিঠিতে নেহরু লেখেন, ‘চীনের আগ্রাসন রুখতে ভারতের পরিবহন ও যুদ্ধবিমান দরকার। এই আগ্রাসন বন্ধ করতে হলে আমাদের এবং আমাদের সব বন্ধুর আরও প্রচেষ্টা দরকার।’ এরপরও নেহরু কেনেডিকে আরেকটি চিঠি লেখেন। ১৯ নভেম্বর সেই চিঠিটি হাতে পৌঁছে দেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ব্রজকুমার নেহরু। রিডেল লিখেছেন, সহায়তা চেয়ে নেহরু মূলত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যোগ দিতে আহ্বান জানান। সেই অনুরোধ একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

আত্মহত্যার অর্থনীতি- নোবেল বিজয়ী অ্যাঙ্গাস ডিটনের ভিন্ন ধরনের এক গবেষণা by জাহিদ হোসেন

চলতি ২০১৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অ্যাঙ্গাস ডিটন গতানুগতিক তাত্ত্বিক গবেষণার বাইরেও কিছু কাজ করেছেন। তেমনই এক অপ্রথাগত গবেষণায় তিনি মানুষের ‘আত্মহত্যা, বয়স ও ভালো থাকার’ মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে এনেছেন। তত্ত্বের চেয়ে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেশি জোর দিয়েই গবেষণাটি করেন তিনি।
‘আত্মহত্যা, বয়স ও ভালো থাকা: একটি পর্যবেক্ষণমূলক অনুসন্ধান’ শীর্ষক এই গবেষণায় তাঁর সহ-গবেষক ছিলেন অ্যানি কেস। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাঁরা এই গবেষণা করেন। তা থেকে আকর্ষণীয় কিছু দিক নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো। আত্মহত্যার অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী স্বতঃসিদ্ধ ধারণা হলো, মানুষ তখনই এ পথ বেছে নেয়, যখন তার কাছে মরে যাওয়াটাকেই বেঁচে থাকার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কিন্তু মরার আগেই মরার পথে কেন যেতে হবে, তা ভেবে আমি অবাক হই।
অর্থনৈতিক তত্ত্বের একটি বিকল্প যুক্তি হলো, কখনো কখনো মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ব্যাপক চিন্তা না করেই বর্তমান কোনো আবেগে তাড়িত হয়ে আত্মহত্যা করে থাকে। এটাকেই আমার যৌক্তিক মনে হয়।
অ্যাঙ্গাস ডিটনের গবেষণামতে, নারীদের চেয়ে পুরুষেরা প্রায় চার গুণ বেশি আত্মহত্যা করে। সম্ভবত নারীরা বেঁচে থাকাটাকেই পুরুষদের চেয়ে বেশি সুখের মনে করে বলে এমনটি হয়ে থাকতে পারে।
পুরুষেরা সাধারণত মধ্য বয়সেই সবচেয়ে কম আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে নারীরা তরুণ ও বৃদ্ধ বয়সের চেয়ে মধ্য বয়সেই বেশি আত্মহত্যা করে।
ডিটনের গবেষণা অনুযায়ী বিয়ে করলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে। আমি মনে করি, বিয়েটাই তো একটা আত্মহত্যা! সুতরাং আপনার পুনরায় অর্থাৎ দ্বিতীয়বার আত্মহত্যা করার দরকার নেই!
গবেষণামতে, যুক্তরাষ্ট্রে সপ্তাহের সব দিনই সমান হারে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে না। সেই দেশের মানুষ আত্মহত্যা করতে সোমবারকেই সবচেয়ে বেশি বেছে নেন। এরপর মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। রোববার সামান্য বাড়ে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এ প্রবণতা প্রযোজ্য। সপ্তাহের সব দিনেই জীবনের মূল্য সমান। তবে অন্য দিনগুলোর তুলনায় উইক এন্ড বা সপ্তাহের শেষ দিনে যেমন অধিকতর হাসিঠাট্টা, আনন্দ, সুখ বেশি অনুভূত হয়, তেমনি দুঃখ, দুশ্চিন্তা, চাপ, রাগ ও শারীরিক যাতনার মাত্রা কম হয়। রোববার থেকে আবার সুখের মাত্রা কমে আসে। পরিণতিতে সোমবারে আত্মহত্যা বেশি হয়। যারা আত্মহত্যা করে তারা সম্ভবত সপ্তাহান্তে আনন্দ ও সুখভোগের পরই এ পথ বেছে নেয়!
ডিটন তাঁর গবেষণাটির উপসংহার টেনেছেন এভাবে, বেদনা বা যন্ত্রণা খুব নিবিড়ভাবেই আত্মহত্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যারা দীর্ঘদিন ধরে রোগজনিত যন্ত্রণায় ভোগে, তারা অনেক সময় আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কারণ, কোথাও কোথাও প্রবল রোগ-যন্ত্রণার পরিস্থিতিতে আত্মহত্যাকে আইনগতভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়।
কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণাই শুধু নয়, সামাজিক কলঙ্ক বা ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশাও তো মানুষকে অমন পথে ঠেলে দিতে পারে।
লেখক: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ।

সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি সংখ্যালঘুরা সহিংসতার শিকার

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি।  অর্ধেকেরও বেশি আসনে প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি তার ১৮ দলীয়  রাজনৈতিক জোট নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৬টিতে। এর বেশির ভাগ হামলা করেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর  সঙ্গে সংশ্লিষ্ট  ব্যক্তি বা গ্রুপ। ভূমি দখলের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় পুলিশ, জাতীয় সংসদের কিছু সদস্য সহ রাজনৈতিক নেতারা। সব সম্প্রদায় এতে আক্রান্ত হলেও হিন্দুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তাদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য এমনটা করা হয় অনেক সময়। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ অভিযোগ করে আসছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিসহ সরকারের কিছু সাফল্য থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে এমন ভাষা ব্যবহার করে। এতে ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত উত্তেজনা কমানোর পরিবর্তে তাকে উস্‌কে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার  কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ বা ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অধ্যায়ে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, নির্বাচনের পর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়েছে সংখ্যালঘু  অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি লুট করা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে। অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। শত শত হিন্দু তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও টার্গেটে পরিণত হয়েছে। ২৩৭ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ অংশে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব সহিংসতার পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু যে রিপোর্ট বেরিয়ে এসেছে তাতে দেখা যায় সরকার আক্রান্ত এলাকায় যেসব পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষীদের পাঠিয়েছে তারা সেখানে সহিংসতা বন্ধ করতে পারে নি। এমনকি কিছু এলাকায় তারা নিজেরাই সহিংসতায় অংশ নিয়েছে। দেশের ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মানুষই সুন্নি মুসলিম। মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯.৫ ভাগ হলো হিন্দু। বাকি শতকরা এক ভাগেরও কম রয়েছে খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সহ অন্য ধর্মের মানুষ। ইউনাইটেড স্টেট কমিশন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ) প্রকাশিত ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে তাদের একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করেন। রিপোর্টিংকালে ঢাকার রাজপথে আলাদাভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় দু’জন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারকে। তার একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিনি অভিজিৎ রায়। তাকে এ বছরের ২৬শে ফেব্রুয়ারি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রীকে করা হয় মারাত্মক আহত। এ বছরের মার্চের শুরুতে এ ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে একজনকে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩০শে মার্চ ওয়াশিকুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। রিপোর্টিংকালে তিনজন নাস্তিককে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। তারা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের অপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত যুদ্ধাপরাধ আদালত নিয়ে ব্লগ প্রকাশের পর তাদেরকে গ্রেপ্তার করে অভিযোগ গঠন করা হয় যে, তারা  ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত দিয়েছেন। বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি সরকারকে ৮৪ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার বিষয় তদন্ত করতে হবে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে ভেস্টেট প্রপার্টি রিটার্ন অ্যাক্ট করা হয় যাতে ১৯৭১ সালে বা তার পরে যেসব হিন্দুর জমি বা সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হয়েছিল তা ফেরত দিতে হবে অথবা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে হিন্দু সম্প্রদায় ও  কিছু এনজিও অভিযোগ করে যে, এই আইন এতটাই সংকীর্ণ যে, এর প্রয়োগ প্রক্রিয়া অসুবিধাজনক ও দীর্ঘমেয়াদি। সামান্য মাত্রায় এসব সম্প্রতি ফেরত দেয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তার কাছে বলেছেন, ভূমি দখল একটি উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশজুড়ে এমন ঘটনা ঘটছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুরা দৃশ্যত অসমভাবে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের টার্গেটে থাকলেও ভূমি দখলের ফলে সব সম্প্রদায় আক্রান্ত হচ্ছে। ভূমি দখলে কোন কোন ক্ষেত্রে জড়িত স্থানীয় পুলিশ, জাতীয় সংসদের কিছু সদস্য সহ রাজনৈতিক নেতারা। অথবা তারা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বিচারের হাত থেকে দূরে রাখছেন। রাস্তার পাশে অথবা শিল্প এলাকায় যেখানে জমির দাম বেশি সেখানে ভূমি দখল হয় সবচেয়ে বেশি। ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন কিনা তা নির্ধারণ করা জটিল।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি একটি রাজনৈতিক চুক্তি। এ চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশ সরকার, আদিবাসী প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল ও ওই এলাকার আদিবাসীদের মধ্যে। সেখানে শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বাংলাদেশ সরকার ইউএসসিআইআরএফ’কে যে তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি অনুচ্ছেদের মধ্যে ৪৮টি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৫টি আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। ৯টি এখনও বাস্তবায়ন করতে হবে। ওই এলাকার প্রতিনিধিরা বলেছেন, চুক্তির মাত্র ২৫টি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই এলাকায় বিদেশী নাগরিকদের, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে। দৃশ্যত এর মাধ্যমে স্থানীয় লোকদের সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্বে লিপ্তদের মধ্যেকার বিরোধ নিয়ে রিপোর্ট সীমিত করার চেষ্টা করাই উদ্দেশ্য। রোহিঙ্গা সম্প্রদায় সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে গ্রহণ করেছে। তারা বসবাস করছে সরকার পরিচালিত কক্সবাজারে দুটি শিবিরে। এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের কাছে। এ ছাড়া প্রায় দুই থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম এসব শিবিরের বাইরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে। তাদেরকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখা হয়। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার একটি জাতীয় কৌশল নেয়। এর মধ্যে রয়েছে অধিক মানবিক সহায়তা ও সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে অধিকতর যোগাযোগ। গত বছর নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন যে, জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন সমর্থিত দুটি শরণার্থী শিবিরে শরণার্থীদের বর্তমান জীবনমানের উন্নয়ন করা হবে। বলা হয়, তারা অমানবিক অবস্থায় বসবাস করছে। তার এ ঘোষণাকে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন স্বাগত জানায়। একই সঙ্গে তারা ইঙ্গিত দেয় যে, এ উদ্যোগ বেশ ব্যয়বহুল হবে। এতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ও উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ইউএনএইচসিআর রিপোর্ট করে যে, এসব শিবিরের বাইরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলিমরা কোন এজেন্সির পক্ষ থেকে কোন সহায়তা পায় না। তাই তারা শোচনীয় পরিস্থিতিতে বসবাস করেন।
ওই প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে ইউএসসিআইআরএফ তার সুপারিশে বলছে যে, ধর্মীয় বিভক্তি সৃষ্টি করে এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সহিংসতা ও হয়রানির বিষয়ে প্রকাশ্যে এবং বার বার নিন্দা জানাতে হবে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি অন্য সব কর্মকর্তাদের। স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ অফিসার ও বিচারকদের আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করতে হবে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে কিভাবে ধর্মীয় সহিংসতার বিষয় অনুসন্ধান করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ইউএসসিআইআরএফ আহ্বান জানায় ভূমি দখলের অভিযোগ তদন্ত করার, এনজিওগুলোর ওপর পার্বত্য চট্টগ্রামে যাওয়ার ওপর কড়াকড়ি তুলে নেয়ার ও ব্লাসফেমি আইন বাতিল করার জন্য।

জেরুসালেমের গণআন্দোলনের প্রতি গাজার সমর্থন

ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, পূর্ব আল-কুদস বা জেরুসালেমের ইহুদিবাদী ইসরাইল বিরোধী ইনতিফাদা গণআন্দোলনের প্রতি সমর্থন দিচ্ছে অবরুদ্ধ গাজা।
তিনি বলেন, অবরোধের কারণে গভীর দুঃখ-কষ্টের শিকার এবং দুই অঞ্চলের মধ্যে দূরত্ব বজায় থাকা সত্ত্বেও জেরুসালেমের লড়াইয়ে সমর্থন অব্যাহত রাখবে গাজা। তিনি আরো বলেন, গাজাই হলো জেরুসালেমের ইনতিফাদার হৃদপিণ্ড।
গাজা সীমান্তে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ইসরাইলী সেনাদের গুলিতে আহত চিকিৎসাধীন ফিলিস্তিনিদের দেখতে যেয়ে এ সব কথা বলেন তিনি। আশ-শিফা হাসপাতালে আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা চলছে।
তিনি আরো বলেন, আল-আকসা মসজিদ এবং জেরুজালেম রক্ষার ভূমিকা থেকে গাজা কখনোই পিছে হটবে না। অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব আল-কুদসের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক সংঘর্ষকে গত সপ্তাহে তেল আবিবের বিরুদ্ধে ইনতিফাদা হিসেবে উল্লেখ করেন হানিয়া।

পাকিস্তানের পরমাণু স্থাপনায় ভারতের হামলার আশঙ্কা করেছিলেন রিগ্যান

পাকিস্তানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে ভারত হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। তবে পাকিস্তান যাতে পরমাণু বোমা বানানোর জন্য পর্যাপ্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে না পারে, সে আশ্বাসও পেয়েছিলেন ওই সময়ের পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকের কাছ থেকে। বিনিময়ে পাকিস্তানকে বিপুল আর্থিক ও সামরিক সহায়তা করেছিলেন রিগ্যান। অতি সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গোপন নথিতে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ইউএস ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের প্রকাশিত নথিতে দেখঅ যায়, জেনারেল জিয়াউল হক ওই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগ্যানকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, পাকিস্তান ৫ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না। এর বিনিময়ে পাকিস্তান বিপুল আর্থিক ও আধুনিক সামরিক সহায়তা পেয়েছিল। রিগ্যান ১৯৮৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জিয়াকে এক চিঠিতে বলেন, আপনি রাষ্ট্রদূতকে ৫ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করার যে আশ্বাস দিয়েছেন, আমি তার প্রশংসা করছি। ওই চিঠিতেই রিগ্যান আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, পাকিস্তানের পরমাণু স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে অন্যান্য দেশ আগাম হামলা চালাতে পারে।

ক্ষমতার চুষনি মুখে রাগী যুবকেরা by ফারুক ওয়াসিফ

কী রাগী যুবকদের কাল এল রে বাবা। মানুষের ওপর কেউ খেলে গাড়ি নিয়ে, কেউ খেলে গুলিখেলা। কেউ লাঠি নিয়ে খেলতে খেলতে মেরে ফেলে খুঁটিতে বাঁধা শিশুকে। রাগী তরুণেরা কী দারুণ জোশে গাড়ি ছোটায় দুর্গতিময় ঢাকার রাস্তায়। ঠেকানোর নাইরে পুলিশ নাইরে রেড সিগন্যাল। মানুষ মরে বা আহত হয়। কত কত পারিবারিক অ্যালবামে দুঃসহ শোকের রং লাগে। কর্তারা পাষাণ, তাঁদের মন গলে না। দেশ তরতর করে তবু নাকি কোথায় এগিয়ে চলে।
গুলশানের রাস্তায় রেসিং কার ছোটাল যে ছেলে দুটি, তারা তো বেচারি, দুর্ভাগ্যের শিকার। তাদের গাড়ির ধাক্কায় যারা আহত হয়েছে, তারাও দুর্ভাগা। সবই দুর্ঘটনা, কপালের লিখন। ওই ছেলে দুটিরও দুর্ভাগ্য, কেন তাদের মতো মজারুদের আনন্দ-বিনোদনের অভয়ারণ্য করা হয়নি রাজধানীকে? ভিডিও গেমের মতো একটা বাস্তবতা পাওয়া গেলে কতই-না ভালো লাগত খেলতে?
সত্যিই তাদের দোষ দেওয়া চলে না। অপরাধ প্রমাণিত হলে বড়জোর তাদের বয়সোচিত অজুহাতে কারাগারে না পাঠিয়ে সংশোধনাগারে পাঠানো হবে। যদি বিচারই না হয়, তাহলে তো তাদের ‘সংশোধনের’ দরকারই থাকল না। যুব বয়সে অপরাধ করে ছাড় পেয়ে বড় ক্ষমতাধর হয়েছেন, এমন নজিরের অভাব নেই সোনার বাংলাদেশে।
সুন্দরগঞ্জের বীর সাংসদ লিটনের গাড়ির সামনে পড়ে গিয়েছিল এক শিশু। তাঁরও বিরক্তি হয়েছিল। তাই তিনি সঠিক নিশানায় তার দুই পায়ে গুলি করেন। ভাগ্যিস নিশানা সঠিক, নইলে ‘ভুল’ করে বুকে লাগলে শিশুটি নির্ঘাত মারা পড়ত! ক্ষমতার বরপুত্রদের চলার পথে কেন কালা-কুৎসিত হাভাতে গরিবেরা পড়ে? এত স্বাধীনতা তাদের কে দিল? এঁদের চলার পথে কেন এত মানুষ ও যানবাহন থাকবে?
অতএব হাওয়া গরম করার কিছু নেই। আবহমানকাল থেকে এ দেশে এ রকমই ঘটে আসছে। আগে তো জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে জুতা-জামা পরে ছাতা মাথায় হাঁটাই যেত না। এখন একই রাস্তায় আমির ও ফকির একসঙ্গে চলতে পারে, এটাই কি স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ নয়? সুতরাং যারা মরে, তাদেরই দোষ। কবি শঙ্খ ঘোষের ভাষায় বলা যায়, গরিবগুলো এত্ত খারাপ, একটুতেই মরে যায়!
হ্যাঁ, এসব রাগী তরুণ-যুবারা জানেন, দেশটাই তো টাকা ও ক্ষমতার লীলাখেলার ময়দান। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অক্ষয়-অটুট থাকলে তা ভাববেনই না কেন? রাগে-দুঃখে সাধারণ মানুষ কপাল চাপড়ায়, আর এঁরা মদ খেয়ে গাড়ি দৌড়ান বা গুলি ফোটান বা নারায়ণগঞ্জের ত্বকীর মতো নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করেন। সবই তো ফান। আর হাউ ফানি এই আমজনতা! কদিন আগে প্রতাপশালী যে সাংসদের পুত্র রাজপথে এলোপাতাড়ি গুলি করে প্রাণ হরণ করেছিলেন দুজনের, তাঁরও নিশ্চয় সবকিছু ফানি লেগেছিল! ক্ষমতার সামনে সকল স্পেসে অপমান আর আঘাত সয়ে চুপ থাকাই কি বাঁচার তরিকা হলো বাংলাদেশ?
গ্রামে বাঘ ঢুকে পড়লে মানুষ যেভাবে পালায়, রাস্তায় ছোট প্রাণী তথা রিকশা, সাইকেল কিংবা কেবল পদাতিক, তাদেরও উচিত বাঘের মতো গোঁ গোঁ করা গাড়ি দেখলে সভয়ে দূরে সরে যাওয়া। এ রকম ছুটন্ত বীরবাচক গাড়ির ভয়ে লাফ দিয়ে সরে যেতে যেতে ‘আরেকটু হলেই মরতাম’ ভেবে এত্তগুলা খুশি থাকা। অপমান, লাঞ্ছনার কথা নাহয় বাদ। এসব কি পথসন্ত্রাস নয়? মর্যাদাবোধের কথাও থাক, ছোট ও নির্ধন মানুষদের দেহে প্রাণ-মন থাকতে নেই? থাকতে নেই কানের পর্দা নামক নাজুক বস্তুটি। এই প্রাণ পিষ্ট হলে, গুলি খেলে মরে যায়; কানের পর্দা উৎকট আওয়াজে ফেটে যায় বা শোনার ক্ষমতা হারায়।
গতি নাকি নেশাময়, তার সঙ্গে মিশেছে তরল নেশার তাপ। আর এই উদগ্র আনন্দের সাক্ষী থাকে মোবাইলের সেলফি। গতির নেশা, তরলের নেশা, ফুর্তির নেশায় মত্তদের আসল নেশা হলো ক্ষমতা। ক্ষমতা মস্তিষ্কের এমন রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়, তখন আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। ক্রিকেটার শাহাদাতও এমন এক রাগী তরুণ। রাগের বশে গৃহপরিচারিকা শিশুর পা ভেঙে দিয়েছেন। ব্যাধি শুধু রাজনীতিতে না, সবখানেই।
দিন আসলেই বদলেছে। এ ধরনের অন্যায় ক্ষমতার চুষনি মুখে বেড়ে উঠছে অনেক অনেক রাগী বাঘের বাচ্চা। এদের মুখ থেকে ক্ষমতার চুষনি না সরালে সাধারণ পদাতিকেরা বাঁচব কী করে এই বুধবারের প্রথম আলোর সংবাদ, ‘গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর এলাকার বিজয় সরণি উচ্চবিদ্যালয়ের ফটকে কবিতা রানী দাস (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। অভিযোগ প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় বিক্রম চন্দ্র সরকার নামের এক যুবক এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। পুলিশ বিক্রমকে আটক করেছে।’ বিক্রম তাঁর নামের সার্থকতা প্রমাণ করলেও শেষ পর্যন্ত আটক হয়েছেন, কিন্তু গুলশানের ধনীর দুলালেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজনীতিতে রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়াদের জীবন যায়, এদিকে বাঘের বাচ্চাদের আনন্দের খাতিরেও রক্ত ঝরে মানুষের বাচ্চার। এই রাগী তরুণেরা ছাত্র-যুব নেতা হয়ে খুনখারাবি নির্যাতন চালাতে কসুর করেন না। কী দেশ কী কালচার বানালাম আমরা?
দেশে এ রকম বীর সাংসদ, নেতা, ধনকুবের, খ্যাতিমান ব্যক্তি বিস্তর আছেন। আর এটা রাগী যুবকদেরও কাল। নো ভ্যাট আন্দোলনের এক সংগঠক আরিফ চৌধুরী আন্দোলনের অপরাধে দুই দফা পিটুনি খেয়েছেন। প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর যা–তা রাগ ঝেড়েছেন পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য। রাগীরাই এখন রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার। এঁদের সবাই যে ধনী ও বড় ক্ষমতার মালিক, তাও না। ক্ষমতার হাই ভোল্টেজ লাইনের সঙ্গে সংযোগ থাকলেই হলো। যেকেউ পূর্ণমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা দেখাবেন। তখন ১০০ হাত দূরে থাকাই নিয়ম।
গতিবেগ এঁদের আবেগ কেড়ে নিয়েছে, ক্ষমতার ছায়া এঁদের করেছে অমানুষ। গতিই নাকি সুখ, আরও সুখ অপরকে কষ্ট দিতে পারলে। বাংলাদেশের রাস্তাগুলো ক্ষমতা ও বৈষম্যের তুমুল প্রদর্শনী। কেউ সেখানে ছোটেন দ্রুতগতিতে; অন্যরা পিপীলিকা প্রায়। কেউ একাই বিরাট গাড়িতে ১০ জন বাসযাত্রীর জায়গা দখল করে থাকবেন, বাকিরা সরে তাঁকে জায়গা দেবেন। নো প্রবলেম।
একসময় ঢাকার সিনেমার নায়কেরা ছিলেন মৃদু ধরনের স্বপ্নবান যুবক। সাইকেল বা পায়ে হাঁটলেও তাঁদের নায়কই লাগত। নৌকার মাঝি হওয়া তো ছিল আরও রোমান্টিক। এরপর এল গোঁ গোঁ করে ছোটা মোটরসাইকেল। এখনকার নায়কদের বড় দামি গাড়ি থাকতে হয়। আর থাকতে হয় অনেক রাগ। তাঁরা হন অনেক পুরুষালি, অনেক রাগ-ক্ষোভ তাঁদের। এভাবে এখনকার বাণিজ্যিক অ্যাকশন ছবির নায়কদের রাগী ও দুর্ধর্ষ করে দেখিয়ে তরুণদের সামনে মডেল হিসেবে খাড়া করা হয়। এমনকি প্রেমের ছবির নায়কদেরও অনেক রাগ। কাহিনির প্রয়োজনে তাঁরাও নায়িকাদের দু-একটা চড়-থাপড় না মেরে পারেন না।
অথচ বিপ্লবের মহানায়ক ক্ষুদিরাম ও চে গুয়েভারা থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, নব্বইয়ের নূর হোসেনরাও কিন্তু রাগী ছিলেন। তাঁদের রাগ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আর আজকের ক্ষমতাবিত্তের জাতকদের রাগের প্রকাশটাই এক চূড়ান্ত অন্যায়। দিন আসলেই বদলেছে। এ ধরনের অন্যায় ক্ষমতার চুষনি মুখে বেড়ে উঠছে অনেক অনেক রাগী বাঘের বাচ্চা। এদের মুখ থেকে ক্ষমতার চুষনি না সরালে সাধারণ পদাতিকেরা বাঁচব কী করে?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

তুরস্ককে ইইউ-এর তিন প্রস্তাব

তুরস্ক থেকে শরণার্থীদের ইউরোপ যাত্রা ঠেকাতে আঙ্কারাকে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এগুলো হলো- তুরস্ককে ৩৪১ কোটি ডলারের অর্থসহায়তা, তুর্কিদের জন্য ইউরোপের দেশগুলোতে ভিসা সহজ করার সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ইইউতে তুরস্কের যোগদানের জন্য আলোচনা। ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের এক সম্মেলনে শুক্রবার এ প্রস্তাব দেয়া হয়।
ইইউ নেতারা বলছেন, তারা তুরস্কে আশ্রয় নেয়া ২০ লাখ সিরীয় শরণার্থীর জীবনমান উন্নয়নে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের ‘অ্যাকশন প্ল্যানের’ সাথে একমত হয়েছেন। ইইউ নেতারা আরো একমত হয়েছেন যে এশিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে ইউরোপগামী শরণার্থীদের ঢল ঠেকাতে সীমান্ত পাহারায় আরো সমন্বয় আনা হবে।
তুরস্কে বর্তমানে ২০ লাখের বেশি সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় নিয়েছে। এদের বেশিরভাগই সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের নাগরিক। তুরস্ক হয়ে ডিঙ্গি নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই প্রবণতা ব্যাপকহারে বেগেছে।

বিউটির ময়নাতদন্তে ছাত্রলীগের বাধা

দিনভর নানা নাটকীয়তা, দফায় দফায় বৈঠক, ছাত্রলীগ ও ইন্টার্নি ডাক্তারদের বাধা ও বিক্ষোভ উপেক্ষা করে অবশেষে পুলিশের দৃঢ় অবস্থানের ফলে খুলনা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী আরমনি সুলতানা বিউটির (২৪) ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। হিমঘর থেকে গতকাল সকাল ৯টার দিকে লাশ ফরেনসিক বিভাগে হস্তান্তর করা হলেও ছাত্রলীগ ও ইন্টার্নি ডাক্তারদের একাংশের বাধার কারণে বিকালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের ভাই মোহা. ইকবাল হোসেনের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে ময়নাতদন্ত করাকে কেন্দ্র করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়। ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার আসল রহস্য বের হতে পারে এমন আশঙ্কায় এমন ঘটনা ঘটেছে বলে নিহতের সহপাঠীরা অভিযোগ করেছেন। খবর পেয়ে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা থেকে বিউটির বড় ভাই মো. ইকবাল হোসেন বুধবার রাতে খুলনায় এসে পৌঁছান।
পারিবারিক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ জানান, বিউটি ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের ভক্তিয়াপাড়া চারপীর আউলিয়া (রহ.) উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ২০১০ সালে খুলনা মেডিক্যালে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। তার পিতার নাম মোহা. ইদ্রিস মিয়া এবং মায়ের নাম রাজিয়া সুলতানা মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি বিবরণী ফরমে অভিভাবক হিসেবে দেয়া রয়েছে।
অপরদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়,  নিহতের বড় ভাই মো. ইকবাল হোসেন সকালে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে আসলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতা, ইন্টার্নি চিকিৎসক পরিষদের একাংশ ও ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হয়। একপর্যায়ে দুপুরে নিহতের ভাই ইকবালও বলেন, ময়নাতদন্ত ছাড়াই আমার বোনের লাশ নিয়ে যেতে চাই। এরপর সে ও কলেজের উপাধ্যক্ষ এসকে বল্লভ প্রথমে সোনাডাঙ্গা থানা ওসি ও কেএমপি কমিশনারের কাছে গেলে সেখান থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ হস্তান্তর করা যাবে না বললে নিরুপায় হয়ে বিকালে ময়নাতদন্ত করা হয়। ফরেনসিক বিভাগের  প্রধান ডা. আতাউর রহমানের নেতৃত্বে ডা. জাহিদ মাহমুদ, আসিফ রায়হান ও মুসলিমা ইয়াসমিন সুইটি ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে আসরবাদ মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে জানাযা শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে লাশ নিয়ে এম্বুলেন্সযোগে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বন্দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
এদিকে বেলা ১১টার দিকে সাংবাদিকরা মেডিক্যাল কলেজে গেলে ছাত্রলীগ ও ইন্টার্নি চিকিৎসকদের একাংশের বাধার কারণে ঢুকতে পারেনি। এ সময় তাদের ওপর মারমুখী হলে পুলিশ সাংবাদিকদের উদ্ধার করে নিরাপদে পাঠিয়ে দেন। মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মীরা কলেজ গেটে বিক্ষোভ করে।  লাশ ঘরের সামনে তারা সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত অবস্থান নেয়। এ সময় তারা এ ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকরা বেশি বাড়াবাড়ি করছে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। তারা বলে আমরা থাকতে এই লাশের ময়নাতদন্ত করতে দেবো না। ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এ ব্যাপারে কলেজ সাধারণ সম্পাদক আপেল মাহমুদ বলেন, আমরা চেয়েছিলাম ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে। তিনি দাবি করেন, আত্মহত্যাকারী ছাত্রীর সঙ্গে কোন শিক্ষকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। তবে আত্মহত্যার কারণ কি তা আমি বলতে পারবো না।
তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সরদার ইব্রাহিম হোসেন সোহেল বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছে। গতকাল সকাল ৯টা ১০ মিনিটে হিমঘর থেকে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন। কিন্তু কিছু সংখ্যক ছাত্রদের বাধার কারণে ময়নাতদন্ত করতে বিলম্ব হয়। পুলিশের দৃঢ় অবস্থানের কারণে ময়নাতদন্তের বাধাপ্রদানকারীরা ব্যর্থ হয়। বিকাল  ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের কাজ শুরু হয়। সন্ধ্যায় লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি বলেন, আত্মহত্যার ক্লু উদ্ধার করতে তার ব্যবহৃত মোবাইলসহ কিছু মালামাল জব্দ করা হয়েছে।  তিনি বলেন, ইতিমধ্যে মোবাইল মেসেজে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো ধরে তদন্ত করলে আত্মহত্যার আসল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।
খুমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের (ইউনিট-২) রেজিস্ট্রার ডা. মৃণাল কান্তি দাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিউটি তার সরাসরি ছাত্রী ছিল। গত কয়েকদিন সে ক্লাস করেনি। কয়েকদিন আগেও সে প্যারাসিটামল, ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। সব সময় তার মধ্যে একটি স্নায়ুচাপ বিরাজ করতো। নিজে নিজে কয়েকবার হাতও কেটেছে। কোন একটা হতাশা তার মধ্যে কাজ করতো।’
খুলনা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল মাহবুব স্বাক্ষরিত এক শোক বার্তায় বলা হয়, এমবিবিএস কোর্সে অধ্যয়নরত ৫ম বর্ষে ছাত্রী আরমনি সুলতানা বিউটির মৃত্যুতে কলেজ কর্তৃপক্ষ গভীর শোক প্রকাশ করছে এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে।

তাভেলা হত্যায় জঙ্গি সম্পৃক্ততা পায়নি পুলিশ

ইতালিয়ান নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জঙ্গি সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়নি মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তবে গতকাল পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত সুনির্দিষ্টভাবে সে বিষয়ে পুলিশ কোন তথ্য দিতে পারেনি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তারা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া কিলারদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাদের গ্রেপ্তার করা গেলেই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা মদদদাতা রয়েছে তাদের শনাক্ত করা যাবে। এদিকে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া হুমায়ুন কবির হীরাকে দ্বিতীয় দফায় ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘ইতালিয়ান নাগরিক হত্যার সঙ্গে কোনো ধরনের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তবে এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তি থাকতে পারে।’ ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খুনিদের ব্যাপারে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। পুরো প্রমাণ পেলেই তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।’ কমিশনার বলেন, ‘আমাদের সময় দেন, আমাদের উপর আস্থা রাখেন, সফলতা আসবে।’
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইতালিয়ান নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়া ব্যক্তিদের ঘিরে তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে। ওই তিনজনের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। তাদের ধরতে একাধিক টিম কাজ করছে। কিলারদের ধরতে পারলে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত মোটরসাইকেল ও অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব হবে। এরপরই হত্যার নেপথ্য কারা ছিল তা জানা যাবে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ১৫৫টি ভিডিও ক্লিপ পর্যালোচনা করে তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীসহ ঘটনার আনুষঙ্গিক সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাদের নাম-পরিচয় এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তবে অল্প সময়ের মধ্যে সফলতা আসবে বলে মনে করেন তারা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত জঙ্গি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, তারা মূলত কিলারদের ধরতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। কিলারদের ধরতে পারলে তারাই বলবে কে তাদের হত্যা করতে পাঠিয়েছিল।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ইতালিয়ান নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তদন্তে রাজনৈতিক বিষয়টি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের যোগসূত্র রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ২৮শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর গুলশানের কূটনৈতিক জোনের ৯০ নম্বর রোডে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ইতালিয়ান নাগরিক সিজার তাভেলা। নিহত সিজার আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি সংস্থার প্রুফ (প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। এঘটনায় তার সহকর্মী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে গুলশান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
কুনিও হত্যায় ফের রিমান্ডে হীরা: এদিকে উত্তরাঞ্চলীয় বিভাগীয় শহর রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া হুমায়ুন কবির হীরাকে জিজ্ঞাসাবাদেও জন্য দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল তাকে আদালতে সোপর্দ করে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। রংপুরের বিচারিক হাকিম আবু তালেব শুনানি শেষে পাঁচদিনের রিমান্ডই মঞ্জুর করেন। এর আগে গত ৫ই অক্টোবর হিরাকে প্রথম দফায় ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। বুধবার ওই রিমান্ডের মেয়াদ শেষ হয়।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুনিও হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত দু’জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। একজন কুনিওর ব্যবসায়িক সহযোগী হিরা। অন্যজন রংপুর মহানগর বিএনপি’র সদস্য রাশেদ-উন-নবী খান ওরফে বিপ্লব। বিপ্লব ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের ভাই। গত ৫ই অক্টোবর হিরার সঙ্গে বিপ্লবকেও ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। তবে রিমান্ডের পঞ্চম দিনেই গত ১০ই অক্টোবর তার রিমান্ড বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়। এদিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কুনিওর বাড়িওয়ালা গোলাম জাকারিয়া ওরফে বালা, রিকশাচালক মুন্নাফ আলী ও প্রত্যক্ষদর্শী মুরাদ হোসেন এখনও পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৩রা অক্টোবর সকালে রংপুর শহরের উপকণ্ঠে কাচু আলুটারি গ্রামে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি তার খামারে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন।