Wednesday, May 28, 2025

মুক্তি পাওয়া জিম্মি: ‘ভয় ছিল ইসরায়েলই হত্যা করে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের ওপর দায় দেবে’

‘হামাস নয়, ইসরায়েলি হামলাই ছিল সবচেয়ে বড় আতঙ্ক’—অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় জিম্মি অবস্থায় কাটানো দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এমনটাই বলেছেন নামা লেভি, যিনি চলতি বছর জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তি চুক্তির আওতায় গাজা থেকে মুক্তি পেয়ে ইসরায়েলে ফেরেন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের খবরে জানা গেছে, হামাসের হাতে আটক আইডিএফের (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) পাঁচ নারী সেনার একজন ছিলেন নামা লেভি।

জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে তেল আবিবের জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, গাজায় জিম্মি থাকার সময় সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা ছিল নিজ দেশের বিমান হামলা। তার ভাষায়, প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল হামাস থেকে নয়, বরং ইসরায়েলি বোমা বর্ষণ থেকেই।

মুক্তি পাওয়া লেভি বলেন, প্রতিটি বোমা হামলা ছিল বিভীষিকাময়। প্রতিবার মনে হতো, এটাই শেষ। আর হয়তো কোনো দিন পৃথিবীর আলো দেখতে পারব না। তিনি বলেন, কোনো সতর্কতা ছাড়া হঠাৎই এক ধরনের বাঁশির মতো শব্দ শোনা যেত, যা ছিল বোমা আছড়ে পড়ার পূর্বসংকেত। ওই শব্দ শুনলেই শরীর ঠান্ডা হয়ে আসত। মনে হতো, এই বুঝি শেষ। তারপর আসত বিকট বিস্ফোরণের শব্দ, যা এত তীব্র ছিল, কয়েক ঘণ্টা অনুভূতিশূন্য হয়ে যেতাম।

একবার তার আশ্রয়স্থলের ওপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান লেভি। যেদিকে আমি ছিলাম, সেদিকে আঘাত হানে না ক্ষেপণাস্ত্রটি। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পাই। জিম্মিদশায় আপনি কোথাও পালাতে পারবেন না, নিজেকে একেবারে অসহায় মনে হয়,—বলেন তিনি।

খাবার ও পানির সংকটের কথাও তুলে ধরেন এই নারী সেনা। জানান, কখনো খাওয়ার কিছু ছিল না। এমনকি পানিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একদিন বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে হামাস সদস্যরাই আমাকে দেয়। ওই এক চুমুক পানিই সেদিন মনে হয়েছিল যেন জীবন ফিরে পাওয়া।

নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেভি বলেন, আমি কখনোই ভাবিনি, আমাদের অবস্থার ভয়াবহতা জেনেও সরকার আমাদের উদ্ধারে নিষ্ক্রিয় থাকবে। প্রথম দফার মুক্তিপ্রাপ্তদের অভিজ্ঞতা শুনেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

লেভির এই বক্তব্যের আগে চলতি মাসেই আরেক মুক্তিপ্রাপ্ত জিম্মিও একই রকম আশঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, আমাদের ভয় ছিল হামাস নয়, ইসরায়েলই আমাদের হত্যা করবে। আর তারপর দায় চাপাবে হামাসের ওপর।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে অন্তত ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়। বর্তমানে তাদের মধ্যে ৫৮ জন এখনো হামাসের কাছে জিম্মি রয়েছেন। 

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ইসরায়েল

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে—এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’আর।

তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে ইসরায়েল একতরফাভাবে পশ্চিম তীর ও জর্ডান উপত্যকায় নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, অর্থাৎ ওই অঞ্চলগুলো দখলে নেবে।

সোমবার (২৬ মে) ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা, ইসরায়েলি দৈনিক ‘ইসরায়েল হায়োম’-এর বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

গিদিওন সা’আর বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নেওয়া যে কোনো একতরফা পদক্ষেপের জবাবে আমরাও একতরফা সিদ্ধান্ত নেব। তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে ইসরায়েল পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলের পথে হাঁটবে।

তিনি আরও সতর্ক করেন, যেসব দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভাবছে, তাদের পদক্ষেপ ইসরায়েলকে পশ্চিম তীরের বসতি ও জর্ডান উপত্যকা একতরফাভাবে দখলের দিকে ঠেলে দেবে।

এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ আগামী জুন মাসের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। সৌদি আরবের সমর্থনে আয়োজিত এই সম্মেলনের লক্ষ্য—ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক সহমত গড়ে তোলা।

কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘ইসরায়েল হায়োম’ জানায়, ১৮ জুন সম্মেলন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ওই দিনই একাধিক দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই সম্ভাবনায় ইসরায়েলি সরকার চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তারা অভিযোগ করেছে, প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। এখন সে অবস্থান থেকে সরে এসে ‘প্রতারণা’ করেছেন তিনি—এমনটাই দাবি তেল আবিবের।

প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪৯টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এছাড়া, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) একটি ঐতিহাসিক রায়ে জানায়, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। আদালত ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করে এবং অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইসরায়েলি বসতি সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায়।

সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর, ওয়াফা, ইসরায়েল হায়োম

চলতি বছর জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিমুক্তি চুক্তির আওতায় গাজা থেকে মুক্তি পাওয়া বাঁ থেকে প্রথম নামা লেভি। ছবি : সংগৃহীত
চলতি বছর জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিমুক্তি চুক্তির আওতায় গাজা থেকে মুক্তি পাওয়া বাঁ থেকে প্রথম নামা লেভি। ছবি : সংগৃহীত

গাজায় ‘বর্বরতা’: প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে তিরস্কার করলেন জার্মান চ্যান্সেলর

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘আর গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস।

মঙ্গলবার (২৬ মে) ফিনল্যান্ডের তুরকু শহরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, হামাসবিরোধী যুদ্ধের কথা বলে গাজায় যে বোমাবর্ষণ চলছে, তা আর কোনো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। খবর রয়টার্স

ম্যার্ৎসের এই মন্তব্যকে জার্মান রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম কঠিন অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এটাই সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা, যখন হামাসের হামলার পর ইসরায়েল ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায়। ঐতিহাসিকভাবে নাৎসি যুগের পাপের দায় থেকে ইসরায়েলের প্রতি ‘বিশেষ দায়বদ্ধতা’ মেনে চলা জার্মানির জন্য এ এক নজিরবিহীন অবস্থান।

ম্যার্ৎস বলেন, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলা আর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না। এই মুহূর্তে যা ঘটছে, তা আমি খুব সমালোচনামূলকভাবে দেখছি। এখন সময় এসেছে যখন আমাকে এটা প্রকাশ্যে বলতে হচ্ছে—এই হামলা আর যুক্তিসঙ্গত নয়।

বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়ের পর ম্যার্ৎস ঘোষণা দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বার্লিনে স্বাগত জানাবেন। এমনকি তার কার্যালয়ে এখনও ঝুলছে ইসরায়েলের জিকিম সমুদ্রসৈকতের ছবি, যেখানে ২০২৩ সালে হামাসের হামলা হয়েছিল।

ম্যার্ৎসের কণ্ঠে এই পরিবর্তনের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় আরও স্পষ্টভাবে, যখন তিনি জানান, চলতি সপ্তাহেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার কথা হবে—যদিও ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে কোনো মন্তব্য তিনি করেননি।

চ্যান্সেলরের কড়া সমালোচনার পরপরই জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুলও একই সুরে বক্তব্য রাখেন। সরকারের শরিক সমাজতান্ত্রিক ডেমোক্র্যাটদের (এসপিডি) পক্ষ থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র রফতানি বন্ধের দাবিও তোলা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সিভি জরিপ’ বলছে, ৫১ শতাংশ জার্মান নাগরিক ইসরায়েলে অস্ত্র রফতানির বিপক্ষে। ২০২১ সালে যেখানে ৪৬ শতাংশ জার্মান ইসরায়েলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন, ২০২৫ সালের মে মাসে বার্টেলসমান ফাউন্ডেশনের জরিপে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩৬ শতাংশে।

জার্মানির ইহুদি বিদ্বেষবিষয়ক কমিশনার ফেলিক্স ক্লেইন বলেন, হোলোকাস্টের কারণে যে সমর্থন ইসরায়েল পায়, তা সব কিছু মেনে নেওয়ার বৈধতা নয়।

ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ মোশে জিমারম্যানের মতে, সাধারণ জার্মানদের মধ্যে আজ যে মনোভাব, তা বিশ্বের অন্য জনগোষ্ঠীর মতোই। তবে রাজনৈতিক অভিজাতরা এখনও নাৎসি যুগের অতীত থেকেই তাদের অবস্থান নির্ধারণ করে থাকেন।

ইসরায়েলের বার্লিন দূতাবাস ম্যার্ৎসের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেয়নি। প্রতিক্রিয়ায় তারা জানিয়েছে, ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস আমাদের বন্ধু। তিনি যখন এমন সমালোচনা করেন, আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের ভূমিকায় বড় পরিবর্তন আসছে। কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে গাজায় চলমান মানবিক সংকট নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছে। এখন সেই কণ্ঠে যোগ দিলো জার্মানি, যাদের সমর্থন এতদিন ধরে তেল আবিবের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত ছিল।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। ছবি : সংগৃহীত

জেরুজালেমে ইসরাইলিদের র‌্যালি, মুসলিমবিরোধী স্লোগান

রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে মুসলিমদের আবাসিক এলাকার ভিতর দিয়ে র‌্যালিতে অংশ নিয়েছে ইসরাইলি হাজার হাজার ইহুদি। সেখানে তারা বর্ণবাদী স্লোগান দিতে থাকে। বলতে থাকে- গাজা আমাদের, আরবরা নিপাত যাক এবং তাদের বাড়িঘর পুড়ে যাক। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পূর্ব জেরুজালেম ও পবিত্র স্থাপনাগুলোকে দখল করার বার্ষিকী উপলক্ষে এই র‌্যালি করে তারা। এতে অর্থায়ন ও উৎসাহ দেয় জেরুজালেম শহরের সরকার ব্যবস্থা। কিন্তু ওই সময়ে ফিলিস্তিনিদের যেসব জায়গা ও স্থাপনা দখল করে ইসরাইল, তার কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়, ওল্ড সিটিতে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় সোমবার অনুষ্ঠিত হলো বার্ষিক ফ্ল্যাগ মার্চ। এ ঘটনায় সোমবার সকালের দিকেই মুসলিম এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী পোশাক পরা যুবকরা হিজাব পরিহিত নারীদের গালাগালি ও থুতু ছুঁড়ে দেয়, দোকান থেকে পণ্য চুরি করে, ক্যাফে তছনছ করে এবং কমপক্ষে একটি বাড়িতে জোর করে প্রবেশ করে।

ক্যাফে মালিক রেমন্ড হিমো যখন তরুণদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন তখন এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে হুমকি দিয়ে বলেন, এখনই দোকান বন্ধ করো, না হলে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারব না। ফলে দুপুর ১টার মধ্যেই বেশির ভাগ দোকান বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা দরজা-জানালা আটকে ঘরে আশ্রয় নেন। জেরুজালেমভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘ইর আমিম’-এর গবেষক আবিভ তাতারস্কি বলেন, এই মিছিল মানুষকে জীবিকা থেকে বঞ্চিত করে, নিজের শহরে অনিরাপদ করে তোলে এবং মূলত এই বার্তাটাই দেয়- তোমাদের এখানে থাকার অধিকার নেই, এই জায়গা আমাদের।

মধ্যাহ্নের পর থেকে আরও বড় দল শহরে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন স্থানে চিৎকার করতে থাকে ‘তাদের গ্রাম পুড়ুক’, ‘আরবদের মৃত্যু হোক’। দামাস্কাস গেট এলাকায় একটি বিশাল ব্যানারে লেখা ছিল, ‘জেরুজালেম ১৯৬৭, গাজা ২০২৫’-  যা গাজার সম্পূর্ণ সামরিক দখলের হুমকি নির্দেশ করে। আরেকটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘নাকবা ছাড়া বিজয় নেই’- যা ১৯৪৮ সালে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক বিতাড়নের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। এই মিছিলের আয়োজক ‘আম ক’লাভি’ নামের সংগঠনের সভাপতি বারুখ কাহানে। তিনি ইহুদি আধিপত্যবাদী ও নিষিদ্ধ কাচ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মেইর কাহানের ছেলে। মিছিলকারীদের অনেকেই কাচ পার্টির প্রতীকসহ টি-শার্ট পরেন। কিছু গ্রুপ যায় স্কুলের ব্যানার নিয়ে। পূর্বে বহুবার সহিংসতা ঘটলেও এবার পুরনো শহরে পুলিশি উপস্থিতি ছিল অপেক্ষাকৃত কম এবং তারা অনেক ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করেনি। কেবল ‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’ নামের একটি সংগঠনের কর্মীরাই বেগুনি জ্যাকেট পরে মুসলিমদের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সহিংসতা ঠেকানোর একমাত্র নাগরিক প্রতিরোধ হিসেবে। ইসরাইলের অতি-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও মিছিলে অংশ নেন। তিনি এর আগে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে এক উস্কানিমূলক ‘প্রার্থনা সফর করেছিলেন, যদিও সেখানকার নিয়মানুযায়ী ইহুদিদের ধর্মীয় আচার নিষিদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই আরও বিতর্ক সৃষ্টি করেন যখন তিনি তার মন্ত্রিসভার বৈঠক বসান পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায়। বর্তমানে এটি ফিলিস্তিনি পাড়া এবং একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ‘বাইবেলিকাল জেরুজালেম’-এর অংশ।

ইসরাইলি আইনজীবী ও জেরুজালেম বিশেষজ্ঞ ড্যানি সাইডম্যান এই বৈঠককে ‘রাজনৈতিক অগ্নিকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই এলাকায় অতীতকে অস্ত্র বানানো হচ্ছে, যাতে বর্তমান ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে একটি কৃত্রিম প্রাচীন ইসরাইল পুনর্গঠন করা যায়। এই পতাকা মিছিল পূর্বেও সহিংসতা ও যুদ্ধের সূচক হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালে একই আয়োজন থেকে শুরু হয় ১১ দিনের ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ। বিশ্লেষকদের মতে, এমন মিছিল এবং সরকারের অবস্থান ইসরাইলের ধর্মীয় আধিপত্যবাদকে বৈধতা দেয়, যা শুধু জেরুজালেম নয়, গোটা অঞ্চলের জন্য চরম বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।

mzamin

ইসরাইলি হামলার মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় উড়ল ফিলিস্তিনের পতাকা

ইসরাইলি হামলার তীব্রতার মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে ফিলিস্তিনের পতাকা উত্তোলনের অনুমতি পেল ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি দল। সোমবার অনুষ্ঠিত ভোটে প্রতীকী এই বিজয়টি ফিলিস্তিনি দূতের মতে, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের স্বীকৃতির পথে একটি বড় অগ্রগতি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন। চীন, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশের তোলা প্রস্তাবটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক সম্মেলনে গৃহীত হয়। এর পক্ষে ভোট পড়ে ৯৫টি, বিপক্ষে ৪টি। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে ইসরাইল, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র ও জার্মানি। ২৭টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। লেবাননের প্রতিনিধি রানা এল-খৌরি গাজায় ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, এই ভোটের ফল সাহসী ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটুখানি আশার আলো, যাদের কষ্ট এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরাইল এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ভোট দাবি করে। তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ভোটে অংশ নেয়নি।

ওদিকে সোমবার গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ৫২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৩ জনই নিহত হয়েছেন একটি স্কুলে আশ্রয় নেয়া অবস্থায়। গাজা শহরের সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল জানান, ফাহমি আল-জারজাওয়ি স্কুলে ভোররাতে চালানো এক বিমান হামলায় কমপক্ষে ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে বহু। এর বেশিরভাগই শিশু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে পোড়া লাশ ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তোলা হচ্ছে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ওই ভবনটি হামাস ও ইসলামিক জিহাদের পরিকল্পনা ও হামলা সংগঠনের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ফারাহ নুসসাইর বলেন, স্কুলে ছিল সাধারণ মানুষ-  শিশু, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ। তারা শুধু একটু নিরাপত্তা ও খাদ্য চেয়েছিল। তিনি আরও বলেন, আমরা দক্ষিণে পালিয়ে গিয়েছিলাম, ওরা সেখানেও বোমা ফেলল। আমরা উত্তরে ফিরলাম, সেখানেও বোমা। স্কুলে এলাম, তাও নিরাপদ নয়। এখন কোথাও নিরাপদ নয়-  না স্কুল, না হাসপাতাল, কোথাও না। উত্তর গাজার জাবালিয়ায় আরেকটি হামলায় কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছে বলে বাসসাল জানিয়েছেন।

এই ঘটনার মধ্যেই গাজায় মানবিক সহায়তা দেওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এক সংস্থার। কিন্তু এর প্রধান জ্যাক উড রোববার হঠাৎ পদত্যাগ করেছেন। সোমবার থেকে কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও, পদত্যাগের মাধ্যমে মানবিক নীতিমালা বজায় রাখা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। জ্যাক উড বলেন, সংস্থাটি মানবিক নীতিমালা- মানবতা, নিরপেক্ষতা, পক্ষপাতহীনতা এবং স্বাধীনতা, অনুসরণ করতে পারছে না। এই সংস্থা গাজায় খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের জন্য বেসরকারি ঠিকাদার ও ইসরাইলি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। সোমবার থেকেই তাদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। সপ্তাহের মধ্যে ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে সহায়তা পৌঁছানোরও কথা। সংস্থাটি ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবারগুলোকে যাচাই করে সাহায্য দেবে বলে জানা গেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সোমবার জানায়, গাজায় যুদ্ধের কারণে শতকরা ৫ ভাগেরও কম চাষযোগ্য জমি ব্যবহার উপযোগী আছে। এপ্রিলে শতকরা ৮০ ভাগ জমি ক্ষতিগ্রস্ত এবং শতকরা ৭৭.৮ ভাগ জমি অনুপযোগী হয়ে পড়ে। মাত্র ৬৮৮ হেক্টর (১,৭০০ একর) জমি এখন চাষের উপযুক্ত।

ওদিকে, হামাস যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যস্থতায় একটি নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে বলে এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এই প্রস্তাবে ৭০ দিনের যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ১০ জন জীবিত ইসরাইলি জিম্মির মুক্তি এবং গাজা থেকে আংশিক সেনা প্রত্যাহার অন্তর্ভুক্ত আছে। এছাড়া, ইসরাইলের জেলে থাকা শত শত ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু ইসরাইলের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, কোনো দায়িত্বশীল সরকার এমন চুক্তি মেনে নিতে পারে না। হামাস আদতে কোনো চুক্তিতে আগ্রহী নয়।

ওদিকে ইসরাইলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করে ইউরোপীয় নেতারা চাপ সৃষ্টি করছেন। সোমবার জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মাৎসে বলেন, সত্যি বলতে, এখন আমি আর বুঝতে পারছি না ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকায় কী করছে, তাদের লক্ষ্য কী। তিনি জার্মান পাবলিক সম্প্রচার মাধ্যম ডব্লিউডিআর’কে বলেন, আমি আর ইসরাইলের উদ্দেশ্য বুঝতে পারছি না।

mzamin

এটিএম আজহার বেকসুর খালাস

মানবতা-বিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করে তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন উচ্চ আদালত। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য ছয় বিচারপতি হলেন- বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি ইমদাদুল হক, বিচারপতি মো. আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। আদালতে এটিএম আজহারের পক্ষে ছিলেন- আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিক, ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। প্রসিকিউশন পক্ষে ছিলেন- আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন- অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনিক আর হক।

রায় ঘোষণার আগেই সকাল ৯টার দিকে আপিল বিভাগে আসেন জামায়াতে ইসলামীর  নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’সুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের, এভাকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, মাওলানা আব্দুল হালিম, এভাকেট মতিউর রহমান, মাসুদ সাঈদী, জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমীর ড. হেলাল উদ্দিন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন, জামায়াত নেতা কামাল হোসাইন, ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. ফখরুদ্দিন মানিকসহ শীর্ষ নেতারা।

আদালতের পর্যবেক্ষণ: সকাল ৯ টা ৫০ মিনিটে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সাত বিচারপতি এজলাসে ওঠেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম আইনি বিষয় তুলে ধরেন। এরপর রায় ঘোষণা শুরু হয় ৯টা ৫৫ মিনিটে। রায় ঘোষণার আগে আপিল বিভাগ বলেন দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, যেসব তথ্য প্রমাণ হাজির করা হয়েছিল আগের আপিল বিভাগ তা সঠিকভাবে পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলশ্রুতিতে এটিএম আজহারুল ইসলামকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। আজহারের ফাঁসির রায় ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বিচারের নামে অবিচার। শিশির মনির আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। বলেন, পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই বিচারে উপমহাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার পদ্ধতি ও রীতিনীতি পাল্টে দেয়া হয়েছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণ অ্যাসেসমেন্ট ছাড়াই আজহারুল ইমলামকে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছিল। নজিরবিহীনভাবে বিচারের নামে অবিচার করা হয়েছিল।  দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, যেসব তথ্য-প্রমাণ হাজির করা হয়েছিল আগের আপিল বিভাগ সঠিকভাবে পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলশ্রুতিতে এটিএম আজহারুল ইসলামকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে।  শিশির মনির বলেন, এই মামলার আগের রায়ে বাংলাদেশেসহ এই ভারতীয় উপমহাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা বদলে দেয়া হয়েছিল, যেটা ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। এছাড়া আদালতের সামনে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ কোনো অ্যাসেসমেন্ট ছাড়াই এটিএম আজহারুল ইসলামকে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছিল। যেটি ছিল বিচারের নামে অবিচার। আর যে সমস্ত তথ্য প্রমাণ আদালতের সামনে হাজির করা হয়েছিল, অতীতের আপিল বিভাগ সেটা সঠিকভাবে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়।

অতীতের রায়গুলোও পুনর্বিবেচনা করা উচিত: শিশির মনির
আজহারুলের আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আমরা মনে করি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অতীতের অনেক রায় সম্পর্কে এ রায়ে অনেক পর্যবেক্ষণ থাকবে। আমরা মনে করি সরকারের উচিত হবে এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর একটি রিভিউ বোর্ড গঠন করে অতীতের রায়গুলোকে পুনর্বিবেচনা করা, যেন মৃত্যু পরবর্তীতে হলেও যাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে, অবিচার করা হয়েছে, তাদের পরিবার, তাদের দল ও এ দেশের মানুষ ন্যায়বিচার পেতে পারে। এই রায় শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে আমরা মনে করি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সত্য বিজয়ী হয়েছে, মিথ্যা পরাভূত হয়েছে। এই রায়ের ফলে সিন্ডিকেটেড অবিচারের অবসান হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন যা বলেন:
দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়কে মেনে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ। রায় ঘোষণার পর হাইকোর্টের সামনে তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে আমরা মেনে নিয়েছি এবং আমরা এটি মেনে নিতে বাধ্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আজ এটিএম আজহারুল ইসলামের মামলার রায়ের দিন ধার্য ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমরা রায় গ্রহণের জন্য আপিল বিভাগে উপস্থিত ছিলাম। একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক প্রদত্ত কোনো রায়ের ব্যাপারে মন্তব্য করাকে আমি আইনসিদ্ধ মনে করি না। তবে আমরা শুনানিতে যে প্রসঙ্গে কথা বলেছিলাম, আজকের এই রায়ে আমরা তারই প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি। গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, এটিএম আজহারুল ইসলামের পক্ষে তাদের যে মূল সাবমিশনটা ছিল, সেটি হলো- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে জাজমেন্ট ৫ই আগস্টের আগে হয়েছে, সেগুলোতে আন্তর্জাতিক আইনের প্রযোজ্যতা ছিল না। আপিল বিভাগও এটিকে অ্যাফার্ম করেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে আন্তর্জাতিক আইনের প্রযোজ্যতা প্রয়োজন নেই। এই যুক্তিতর্কের ব্যাপারে প্রসিকিউশন প্রথম থেকেই বলেছে, এই যুক্তি-তর্কের ব্যাপারে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কারণ এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এখানে আন্তর্জাতিক আইনের ডেফিনেশন অব ক্রাইমস এবং মুডস অব লায়্যাবলিটির প্রযোজ্যতা প্রয়োজন। তা না হলে আমরা যে সমালোচনা আগে ট্রাইব্যুনালের রায়ের ক্ষেত্রে করেছি, এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নয়, সেটি বহাল রয়ে যায়। এজন্য আমরা আপিল বিভাগে সাবমিশন রেখেছিলাম, আন্তর্জাতিক আইনের প্রযোজ্যতা প্রয়োজন। এটি যে প্রসিকিউশন এবং বর্তমান সরকার চায়, তার প্রমাণ হলো আমরা প্রসিকিউশনে যোগদানের পর পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ কে সংশোধন করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রযোজ্যতাকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এজন্য আজ আপিল বিভাগ যখন বলেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে আন্তর্জাতিক আইনের প্রযোজ্যতা প্রয়োজন, এই ব্যাপারে আমাদের প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এখনো একমত পোষণ করছি এবং এই রায়ের পক্ষে এখনো কথা বলছি। তিনি আরও বলেন, আজহারুলের মামলায় যে মেরিটগুলো ছিল, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা আপিল বিভাগে বলেছিলাম, এটি আপ টু ইউর লর্ডশিপ ডিসিশন। লর্ডশিপ এই মেরিট বিবেচনায় এটিএম আজহারুল ইসলামকে খালাস দিয়েছেন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে রায়কে আমরা মেনে নিয়েছি এবং আমরা এটি মেনে নিতে বাধ্য।

মিলতে পারে হাসপাতাল থেকেই মুক্তি: প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম জানান, গতকাল বিকালেই মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়া আজহারুল ইসলামের আদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে। এরপর ট্রাইব্যুনাল মুক্তির আদেশ কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। কারাবন্দি ওই নেতা বর্তমানে কেরানীগঞ্জ কারাগারের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন।  সেখান থেকেই সকালে মুক্তি পাবেন বলে জানা গেছে। শিশির মনির বলেন, ইনশাআল্লাহ্‌, আশা করি বুধবার সকালে এটিএম আজহারুল ইসলাম মুক্তি পাবেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের  জেলার একেএএম মাসুম বলেন, এটিএম আজহারুল ইসলামের আপিল মঞ্জুরের কাগজপত্র এলে যাচাই-বাছাই করে সবকিছু ঠিক থাকলে উনাকে হাসপাতাল থেকেই মুক্তি দেয়া হবে।

মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার মামলায় ২০১৪ সালের ৩০শে ডিসেম্বর এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০১৯ সালের ৩১শে অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর ওই রায় রিভিউ চেয়ে ২০২০ সালের ১৯শে জুলাই আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। চলতি বছরের ২৬শে ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ রিভিউ শুনানি শেষে এটিএম আজহারুল ইসলামকে আপিলের অনুমতি দেন। পাশাপাশি দুই সপ্তাহের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে বলা হয়। পরে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দেয়া হয়। আপিলের ওপর শুনানি শেষে গত ৮ই মে রায়ের জন্য  দিন ঠিক করে দেন আপিল বিভাগ। সে অনুযায়ী গতকাল রায় দেয়া হয়।

mzamin

শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার

কুষ্টিয়ায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সেনাবাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মঙ্গলবার আনুমানিক ভোর ৫টায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত একটি বিশেষ অভিযানে কুষ্টিয়া জেলা থেকে শীর্ষ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ ওরফে আবু রাসেল মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে, তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে সুব্রত বাইন এর অপর দুই সহযোগী শুটার আরাফাত এবং শরীফকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানকালে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড অ্যামোনিশন এবং ১টি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতদের নামে বিভিন্ন থানায় হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কার্যক্রম সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, সুব্রত বাইন এবং মোল্লা মাসুদ সেভেন স্টার সন্ত্রাসী দলের নেতা এবং ‘তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের’ অন্যতম। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। অভিযান দলের দক্ষতায় কোনো রূপ ক্ষয়ক্ষতি এবং নাশকতা ছাড়াই অভিযানটি সম্পন্ন হয় এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। উক্ত সফল অভিযান বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ফরমেশন, দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং বাংলাদেশ পুলিশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে কুষ্টিয়া শহরের কালিশংকরপুর এলাকার একটি বাড়ি থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে কুষ্টিয়া শহরের কালিশংকরপুর এলাকার সোনার বাংলা সড়কের পুরাতন তিনতলা একটি ভবন ঘিরে ফেলেন সেনা সদস্যরা। ওই সড়কে সেনাবাহিনীর ৬টি গাড়ি দেখতে পান তারা। পরে সকাল ৭টার দিকে সেনা সদস্যরা বাড়ির ভেতরে অভিযান শুরু করেন। স্থানীয় কয়েকজন জানান, যে বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে, সেটির সামনে পৌরসভার সাইনবোর্ডে বাড়ির মালিকের নাম লেখা মীর মহিউদ্দিন। তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলার মেসে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ১৮ জন ছাত্র থাকেন।

মেসের কয়েকজন ছাত্রের ভাষ্যমতে, নিচতলায় এই বাড়ির পেছনের বাড়ির এক স্থানীয় বাসিন্দা প্রায় ৫ মাস আগে ভাড়া নেন। ১২-১৫ দিন আগে অতিথি পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তিকে রেখে যান। নিচতলায় কী হয় বা কারা থাকেন, তা কখনো দেখেননি তারা। তবে একজনকে দিনে দু’একবার শুধু খাবার খাওয়ার সময় বের হতে দেখেন। ছাত্ররা জানান, মঙ্গলবার ভোর ৫টার পর বাড়ির সামনে সেনাবাহিনীর ৫-৬টি গাড়ি আসে। গাড়ির বহরে একটি কালো মাইক্রোবাসও ছিল। ২০-৩০ জন সেনা সদস্য বাড়ির তালা খুলতে বলেন। তালা খোলার পর তারা দোতলা ও তিনতলায় ওঠেন। এরপর মেসের সব বাসিন্দাকে দ্বিতীয়তলার একটি ও তৃতীয়তলার একটি কক্ষে রাখেন। পরে অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে সুব্রত বাইনকে ধরিয়ে দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম এই সুব্রত বাইন।

নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় সুব্রত বাইনের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের উত্থান ঘটে। চলে দখলবাজিও। তখন থাকতেন নয়াটোলা আমবাগানে। একপর্যায়ে তিনি হয়ে ওঠেন মূর্তিমান এক আতঙ্ক। ঢাকার মগবাজার এলাকায় সুব্রত বাইন ছাড়াও মোল্লা মাসুদের পৃথক বাহিনী তৎপর ছিল। সুব্রতর নামে ৩০টিরও অধিক খুনের মামলা রয়েছে। যার প্রায় সবগুলোতেই সাজাপ্রাপ্ত। এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্র এবং চাঁদাবাজিসহ প্রায় ১০০ মামলার আসামি সে। ২০০১ সালে ঢাকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা করা হলে সুব্রত ও মাসুদ ভারতে পালিয়ে যায়।

শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের হাত ধরেই মোল্লা মাসুদ অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে। তবে চারদলীয় জোট সরকারের আমলেই সে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০০৩ সালের পরে তাকে আর বাংলাদেশে দেখা যায়নি। ভারতে সে আবু রাসেল মো. মাসুদ নামে পরিচিত হয়। ভারতীয় নাগরিক রিজিয়া সুলতানাকে বিয়ে করে সেখানে বসবাস করছিল।

mzamin

গাজায় ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ দিতে ইসরায়েলকে চাপ দেওয়ার আহ্বান জার্মানি ও ফিনল্যান্ডের

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েল যেন জরুরিভিত্তিতে ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি দেয়, সে জন্য দেশটির ওপর চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জার্মানি ও ফিনল্যান্ড। মঙ্গলবার ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে এমন আহ্বান জানান জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেত্তেরি অর্পো।

বিগত সপ্তাহগুলোয় গাজা উপত্যকায় হামলা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে সেখানে ১১ সপ্তাহ ধরে ত্রাণ প্রবেশ করতে দেয়নি ইসরায়েলি বাহিনী। সম্প্রতি গাজায় সীমিত পরিসরে ত্রাণ ঢুকতে দেওয়া হলেও তা ঠিকমতো হাতে পাচ্ছেন না ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েলের এই নৃশংসতার নিন্দা জানিয়ে আসছেন বিভিন্ন দেশের নেতারা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মের্ৎসও।

হেলসিঙ্কিতে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মের্ৎসের পাশে ছিলেন পেত্তেরি অর্পোও। গাজায় অবিলম্বে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর বলেন, ‘ভুক্তভোগী মানুষের কাছে যেন সত্যিকার অর্থে ত্রাণ পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে আমাদের অবশ্যই ইসরায়েলের ওপর চাপ দিতে হবে।’

ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, ‘গাজায় আমরা যা দেখেছি, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ ইসরায়েলের হামলায় উপত্যকাটির বেসামরিক লোকজনের ওপর ‘মাত্রাতিরিক্ত’ প্রভাব পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় হত্যাকাণ্ড ও মানুষের দুর্দশা বন্ধ করার আহ্বান জানান মের্ৎস।

গাজায় জরুরিভিত্তিতে ত্রাণ সরবরাহের কথা বলেন অর্পোও। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই অবিলম্বে ত্রাণ প্রবেশ করতে দিতে হবে। আর ত্রাণ প্রবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের ইসরায়েলের ওপর চাপ দিতে হবে। তবে এগুলো ফিলিস্তিনিদের হাতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে হামাস যেন বাধা না দিতে পারে, তা–ও নিশ্চিত করা লাগবে।’

এদিকে মঙ্গলবার ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে সুইডেন। গাজায় বাধাহীন ও দ্রুত ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ইসরায়েলকে বলেছে দেশটি। এক বিবৃতিতে সুইডেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরায়েলের নিজেদের রক্ষা করার অধিকার রয়েছে। তবে বর্তমানে যুদ্ধ যেভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ফাইল
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ফাইল ছবি: রয়টার্স

গাজায় ৫৪ হাজার ফিলিস্তিনি হত্যা -আল জাজিরা

ইসরায়েলের বোমা কেড়ে নিয়েছে মা ও ছয় ভাই–বোনের প্রাণ। উত্তর গাজার সাত বছর বয়সী শিশু ওয়ার্দ শেখ খলিলের মুখে এখন একটাই কথা, ‘আমি তো সবাইকে হারিয়েছি।’ ইসরায়েলের নৃশংসতায় এখন উপত্যকাটির ঘরে ঘরে প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা। হামলা শুরুর পর থেকে গাজায় ৫৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় নৃশংশ হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। আগামীকাল বুধবার তার ৬০০ দিন পূর্ণ হচ্ছে। দুই মাসের যুদ্ধবিরতি ছাড়া এ সময়টাতে প্রায় প্রতিদিনই উপত্যকাটিতে নৃশংসতা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। আজও নির্বিচার হামলা চালানো হয়েছে। এদিন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগের ২৪ ঘণ্টায় উপত্যকাটিতে অন্তত ৭৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৬৩ জন।

এ নিয়ে ১৯ মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামলায় গাজায় নিহত হয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৬ জন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক হিসাবে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি শিশু। নিহত ফিলিস্তিনিদের বড় আরেকটি অংশ নারী। একই সময়ে আহত হয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ধরলে নিহতের সংখ্যাটা ৬১ হাজারের কাছাকাছি বলে জানিয়েছে গাজার জনসংযোগ কার্যালয়।

হামলার ৬০০ দিনের ঠিক আগে ইসরায়েলের নৃশংসতা বন্ধে বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকারী সংগঠন হামাস। আজ এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন, তাদের নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস ও অনাহারে রাখার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিশ্বের সব শহরের সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরেও চলছে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের নির্মম নিপীড়ন। গতকাল সোমবার কট্টরপন্থী ইসরায়েলিরা আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ ও জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) কার্যালয়ে আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে ঢুকে পড়েন। জেরুজালেমের মুসলিম–অধ্যুষিত এলাকায় মিছিল করার সময় ‘আরবদের মৃত্যু হোক’ বলে স্লোগান দেন কিছু ইসরায়েলি।

হত্যাযজ্ঞের মধ্যে গাজায় ত্রাণের তীব্র সংকট তৈরি করেছে ইসরায়েল। ১১ সপ্তাহ অবরোধের পর সম্প্রতি উপত্যকাটিতে সীমিত পরিসরে খাবার প্রবেশের অনুমতি দিলেও তা ঠিকমতো ফিলিস্তিনিদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত সংগঠন গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) গাজায় ত্রাণ সরবরাহ শুরুর কথা বলেছে। তবে এ বিষয়ে অবগত নয় জাতিসংঘ।

ইউএনআরডব্লিউয়ের মুখপাত্র জুলিয়েট টোউমা আজ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘গাজায় জিএইচএফ আসলেই কোনো ত্রাণ দিচ্ছে কি না, তা আমরা জানি না। তবে আমরা জানি, কী প্রয়োজন। গাজায় প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ থেকে ৬০০ ট্রাক ত্রাণ সরবরাহের প্রয়োজন। শুধু খাবার নয়, মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, টিকা, জ্বালানি, পানিসহ জরুরি পণ্য দিতে হবে।’

গাজায় ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জার্মানি ও ফিনল্যান্ড। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি সফরের সময় সোমবার জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, ত্রাণ যেন সত্যিকার অর্থে ফিলিস্তিনিদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের ওপর চাপ দিতে হবে। একই বিষয় নিয়ে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে সুইডেন।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কাছে একটি খোলাচিঠি লিখেছেন দেশটির ৮২৩ আইনজীবী ও সাবেক বিচারক। তাতে ইসরায়েলের মন্ত্রী ও সামরিক–বেসামরিক কর্মকর্তাদের ওপর অর্থনৈতিক ও অভিবাসন–সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের বর্তমানে যেসব বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে।

ইসরায়েলের এ চরম নির্মমতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন একটি পোস্ট দিয়েছেন ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত ফ্রান্সিসকা আলবানিজ। তিনি লেখেন, ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবন্ত পুড়তে দেখার পর আগুনের দিকে আর তাকাতে পারেন না তিনি। আলবানিজের ভাষায়,‘ফিলিস্তিনিরা আমাদের ক্ষমা করুক।’

ইসরায়েলের নৃশংস হামলায় আহত হয়েছে ছোট্ট শিশুটি। শরীরে রক্তের ছাপ। তাকে কোলে নিয়ে যাচ্ছেন এক স্বজন। কাঁদছেন তিনি। আজ উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায়
ইসরায়েলের নৃশংস হামলায় আহত হয়েছে ছোট্ট শিশুটি। শরীরে রক্তের ছাপ। তাকে কোলে নিয়ে যাচ্ছেন এক স্বজন। কাঁদছেন তিনি। আজ উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায়। ছবি: এএফপি

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের অপমানের রাজনীতি by জাস্টিস মালালা

গত বুধবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আলো কমিয়ে দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাকে সামনে বসিয়ে একটি ভিডিও চালান ট্রাম্প। ভিডিওটি ছিল তথাকথিত ‘শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা’ নিয়ে। কিছুদিন আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে ডেকে অপদস্থ করার চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। এবার তিনি তাঁর অতিথি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টকে বিব্রত ও অপমান করতে চাইলেন।

ভিডিও চালিয়ে দিয়ে ট্রাম্প খুশি মনে বললেন, ‘এটা এক ভয়ানক দৃশ্য, এমনটা আমি আগে কখনো দেখিনি।’ আর দাবি করলেন, এটি নাকি দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের ওপর গণহত্যার প্রমাণ। সবটাই মিথ্যা। ভিডিওতে যে ক্রুশগুলো দেখা যাচ্ছিল, তা কোনো কবরের চিহ্ন নয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দুটি খুনের ঘটনার পর এই স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছিল। এই স্মৃতিস্তম্ভে বিগত বছরগুলোতে নিহত শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। কিন্তু একে ‘গণহত্যা’ বলা একেবারেই অসত্য।

গত ১০ বছরে বহুবার এই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করা হয়েছে। ট্রাম্পের নিজের পররাষ্ট্র দপ্তরই ২০২০ সালের শেষ দিকে এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০১৮-১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় মোট ২১ হাজার ২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে মাত্র ৪৭ জন কৃষক নিহত হয়েছেন; অর্থাৎ মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।

এ রকম নাটকীয় দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারিতে। সেবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকেও একইভাবে অপমান করার চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প।

এসব থেকে কী বোঝা যায়? বোঝা যায় যে কী ভয়ংকর অদক্ষতা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও জ্ঞানের ঘাটতি নিয়ে ট্রাম্প বিশ্বকে পরিচালনা করছেন। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বের জন্য বিপদের ইঙ্গিত। তাই রামাফোসাকে অপমান করা নিছক আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি বার্তা। এতে দেখা যায় যে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখন বাস্তবতা ও বিজ্ঞানের চর্চাশূন্য, একটি নাটকীয় রিয়েলিটি টিভি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখানে সত্যের কোনো মূল্য নেই। মিথ্যাই রাজত্ব করছে।

আমি জন্মেছি দক্ষিণ আফ্রিকায়, ভয়ংকর বর্ণবাদী সমাজের মধ্যে। আমি এই বর্ণবাদ জানি। আমি তা প্রতিদিন অনুভব করেছি, সহ্য করেছি। আজকের স্বাধীন, অবর্ণবাদী, গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেউ যদি সেই সন্ত্রাসী ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে, তাহলে আমার গা ঘিন ঘিন করে। অথচ ট্রাম্প ঠিক তা-ই করেছেন। ট্রাম্প শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাকে অপমান করছেন না, তিনি মিথ্যা প্রচার করে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেই কলুষিত করছেন। ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ড শুধু ভয়ংকর নয়, এই মুহূর্তে যা সবচেয়ে উদ্বেগজনক, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের জনমনে এসব ঘটনার বিরুদ্ধে এক নীরবতা বিরাজ করছে।

আমি আজ দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতি অবিচার নিয়ে ক্ষুব্ধ নই। আমি দুঃখিত ও শোকাহত আমার নিজের জন্য। আমি দুঃখিত আমাদের মতো মানুষদের জন্য—যারা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের মধ্যে বড় হয়ে বিশ্বাস করেছি যে যুক্তরাষ্ট্র সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকবে। কিন্তু আজ একজন প্রেসিডেন্ট আগের যুগের রাজার মতো সুপ্রিম কোর্টের আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান। সত্যের ধার না ধেরে সিদ্ধান্ত নেন।

আজ যখন ছাত্রদের মুখে কাপড় বেঁধে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র আর গণতন্ত্রের বাতিঘর থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে আমার দেখা অতীতের বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা। যেখানে সামান্য একটু বিরুদ্ধ চিন্তাই ডেকে আনে গুম, নিখোঁজ বা মৃত্যু।

বুধবারের ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল, যা ট্রাম্পের নৈতিক দেউলিয়াপনা উন্মোচন করে দেয়। এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, তিনি কেন কাতারের কাছ থেকে ‘উপহার হিসেবে’ একটি বিমান নিচ্ছেন? এই বিমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বিমান এয়ারফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

ট্রাম্প প্রশ্নকারী সাংবাদিককে ‘বোকা’ ও ‘অজ্ঞ’ বলে গালাগাল দেন। বলেন, ‘একটা দেশ যদি মার্কিন বিমানবাহিনীকে বিমান দেয়, তাহলে সেটা তারা আমাদের সাহায্য করার জন্যই দিচ্ছে।’

এরপর রামাফোসা হেসে বলেছিলেন, ‘দুঃখিত, আমার কাছে এমন কোনো বিমান নেই, যা আপনাকে দিতে পারি।’ ট্রাম্প বোঝেননি, সেই কথায় রামাফোসার কী বিদ্রূপ লুকিয়ে ছিল; বরং তিনি নিজের দুর্নীতিপরায়ণতা আরও খোলাসা করে বললেন, ‘ইশ্‌, যদি থাকত! আপনি দিলে কিন্তু আমি সেটা নিয়ে নিতাম।’

এই তো ট্রাম্প! নগ্ন সম্রাট। এমন একজন নেতা, যিনি টাকাপয়সার পূজারি। যিনি জানেনই না নিজের কাজগুলো বিশ্বের চোখে কতটা অনৈতিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেখায়।

জাস্টিস মালালা রাজনীতি বিশ্লেষক ও লেখক
- দা গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ 

হোয়াইট হাউসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গে বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প
হোয়াইট হাউসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গে বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স

গাজায় হত্যাযজ্ঞ: ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৮০০ বিচারক-আইনজীবীর চিঠি

ফিলিস্তিনের গাজায় ‘গণহত্যা’ চালানোর দায়ে ইসরায়েল সরকার ও মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কাছে চিঠি দিয়েছেন দেশটির ৮০০-এর বেশি আইনজীবী, শিক্ষক ও সাবেক বিচারপতি। চিঠিতে ইসরায়েলের সংঘটিত ‘আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ বন্ধে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, গাজায় গণহত্যা চালানো হচ্ছে। সেখানে গণহত্যার একটি গুরুতর ঝুঁকি বিদ্যমান। এতে আরও বলা হয়েছে, গাজায় যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।

প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, গাজাবাসীর নিশ্চিহ্ন হওয়া ঠেকাতে জরুরি ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

চিঠিতে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের সাম্প্রতিক মন্তব্য তুলা ধরা হয়। সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, ‘(গাজা) উপত্যকার সব ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় ইসরায়েল। হামাস নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত গাজা দখল, খালি করা ও অবস্থান চলবে।’

যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট ও অন্যান্য আদালতের সাবেক বিচারপতিসহ বিশিষ্ট আইনজীবীরা ওই চিঠিতে সই করেছেন। সেখানে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতাদের সাম্প্রতিক একটি বিবৃতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে এসব দেশের নেতারা গাজায় চলমান ভোগান্তিকে ‘অসহনীয়’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, এই বিবৃতি ইঙ্গিত দেয় সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো প্রয়োজনে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

চিঠিতে যুক্তরাজ্যের সরকারকে মৌলিক আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গাজায় অবিলম্বে নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য জরুরি, নিঃশর্ত ও বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা আবার চালু করতে সব ধরনের উপায় ব্যবহার করা উচিত।

এসব বিষয় বাস্তবায়নে ‘অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত’ ইসরায়েলের মন্ত্রী, অন্যান্য বেসামরিক ও সামরিক ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যুক্তরাজ্যের সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সম্পর্ক পর্যালোচনা, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পিত রোডম্যাপ স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্য গত সপ্তাহে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নতুন বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা স্থগিত করেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এ হামলার অন্যতম বড় লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে স্কুল ও হাসপাতালগুলো। এর আগে গত বছরের আগস্টে গাজা নগরের আল-তাবিন স্কুলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী। এ হামলায় ফজরের নামাজ আদায় করতে স্কুলটিতে জড়ো হওয়া শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন।

আজ মঙ্গলবার সকালে উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায় একটি পরিবারের বাড়িতে হামলা চালানো হলে আরও ১৯ জন নিহত হন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৫৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এ নিয়ে উপত্যকাটিতে ৫৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ফিলিস্তিনি।

ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৫৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন
ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৫৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের আগ্রাসন: মা ও ৬ ভাই–বোন হারিয়ে জ্বলন্ত স্কুলভবন থেকে বেরিয়ে এল ফিলিস্তিনি শিশু ওয়ার্দ

ইসরায়েলি হামলায় ধসে পড়া ভবনজুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তার ভেতর থেকেই হেঁটে বেরিয়ে আসছে একটি শিশু।

গতকাল সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওতে দেখা যাওয়া ফিলিস্তিনি শিশুটির নাম ওয়ার্দ শেখ খলিল।

ওয়ার্দ তার মা ও ছয় ভাই–বোনের সঙ্গে গাজা নগরীর ফাহমি আল-জারজাউই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিল। স্থানীয় সময় গত রোববার রাতে ওই স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলায় স্কুলের প্রায় অর্ধেক অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। হামলায় অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮টি শিশু রয়েছে।

ওয়ার্দের বয়স সাত বছর। যদিও কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার বয়স পাঁচ বা ছয় বছরও বলা হয়েছে।

আগুনের ভেতর থেকে ওয়ার্দকে হেঁটে বেরিয়ে আসতে দেখে উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন বলে জানিয়েছে সিবিসি নিউজ।

গতকাল সিবিসি নিউজকে ওয়ার্দ বলেন, ‘আমি আগুন দেখে খুব ভয় পেয়েছিলাম। পুরো স্কুলে আগুন জ্বলছিল।’

সিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, স্কুলে হামলায় ওয়ার্দের মা ও পাঁচ (আল–জাজিরা ছয় বলেছে) ভাই–বোন নিহত হয়েছেন। ভাই-বোনদের বয়স ২ থেকে ১৮ বছর। তাঁরা সবাই হামলার সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। ওয়ার্দের বাবা ও এক ভাই গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি, তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

একজন প্যারামেডিক এবং ওয়ার্দের চাচা আইয়াদ আল-শেখ খলিল ভিডিওতে জ্বলন্ত স্কুলভবনের ভেতর দেখা যাওয়া শিশুটি ওয়ার্দ বলে নিশ্চিত করেছেন।

আইয়াদ আল-শেখ খলিল সিবিসি নিউজকে বলেছেন, তিনি স্কুলে হামলার খবর পেয়েছিলেন। পরে বুঝতে পারেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে থাকা শিশুটি তাঁর ভাইয়ের মেয়ে ওয়ার্দ।

হামলার পর ওয়ার্দ বলেছে, ‘ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের আঘাত করে ও স্কুলে আগুন ধরে যায়। আমার পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের হামলার অন্যতম লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়েছে স্কুল ও হাসপাতালগুলো। এর আগে গত বছরের আগস্টে গাজা নগরীর আল-তাবিন স্কুলে বড় হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী। সেই হামলায় ফজরের নামাজ আদায় করতে স্কুলটিতে জড়ো হওয়া শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন।

জ্বলন্ত স্কুলভবনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ফিলিস্তিনি শিশু ওয়ার্দ শেখ খলিল
জ্বলন্ত স্কুলভবনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ফিলিস্তিনি শিশু ওয়ার্দ শেখ খলিল। ছবি: বিবিসির স্ক্রিনশট