Tuesday, November 4, 2014

প্রভুর কাছে হাজিরা by মাসুম খলিলী

প্রথম মানুষ হজরত আদম আ: ইবলিসের বিভ্রান্তিতে পড়ে বেহেশত থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর প্রভুর কাছে মার্জনা লাভ এবং মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম আ: স্ত্রী-পুত্রকে মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় নির্বাসন দেয়া ও প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে প্রভুর নির্দেশে কোরবানির পবিত্র স্মৃতিধন্য হজের জন্য আগত আল্লাহর মেহমানরা সৌদি আরব থেকে বিদায় গ্রহণ করছেন। নভেম্বরের ৮ তারিখে হাজীদের সর্বশেষ ফাইটটি জেদ্দা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। ইউরোপ থেকে আসা হাজীরা বিদায় নিয়েছেন অনেক আগেই। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার হাজীরা বেশ কিছুটা বেশি সময় অবস্থান করেন পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায়। দুই হারাম শরিফে তাদের পদচারণাই এখন বেশি দেখা যায়।
সর্বাধিক ইন্দোনেশিয়ার, পঞ্চম বাংলাদেশ
২০১২ সাল ছিল ইতিহাসে সর্বাধিক হজযাত্রীর হজ পালনের বছর। সেই বছর ৩১ লাখ ৬০ হাজার মুসলিম হজ পালন করেন, যার মধ্যে ১৪ লাখ ছিল সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আর বাকিটা বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত। হজ পালনের অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগের কারণে পরের বছর বিদেশী হজযাত্রী ২০ শতাংশ এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ হজযাত্রী ৫০ ভাগ কমিয়ে আনা হয়। ২০১৪ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা থেকে যায় আগের বছরের প্রায় একই পর্যায়ে। এবার ২১ লাখ হাজীর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা হলো ১২ লাখ ৯৭ হাজার আর মহিলা হাজীর সংখ্যা ছিল আট লাখ ৮৩ হাজার। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে সর্বাধিক দুই লাখ ৯৩ হাজার মুসলিম (২১ শতাংশ) হজ করতে সৌদি আরব যান। এরপর পাকিস্তান থেকে এক লাখ ৮৯ হাজার, ভারত থেকে এক লাখ ৫১ হাজার ৫০০, মিসর থেকে এক লাখ ২৬ হাজার ৬০০ এবং বাংলাদেশ থেকে এক লাখ দুই হাজার ৯০০ মুসলিম হজ করেন। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ হাজীদের মধ্যে মিসর ও পাকিস্তানিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
পৃথিবীর পবিত্রতম নগরী
হজের মূল কেন্দ্র হলো মক্কা। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম নগরী হিসেবে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন মক্কাকে। পবিত্র কুরআনের সূরা নাহলের ৯১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘(বলুন) আমি আদিষ্ট হয়েছি এই নগরীর প্রভুর ইবাদত করতে, যিনি একে করেছেন সম্মানিত, সব কিছুর মালিক তিনিই। আমি আরো আদিষ্ট হয়েছি যেন আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হই।’ সূরা বাকারার ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যখন আমি এই ঘরকে (কাবা) মানবজাতির মিলনকেন্দ্র এবং নিরাপত্তাস্থল বানিয়েছিলাম এবং (বলেছিলাম) ইব্রাহিমের দাঁড়ানোর স্থানকে (মাকামে ইব্রাহিম) নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো এবং ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যে তোমরা দু’জনে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।’ আমাদের প্রিয়নবীও মক্কার তাৎপর্য নিয়ে বলেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা। হজরত আবদুল্লাহ বিন আদি বিন আল হামরা আজ জুহরি থেকে বর্ণিত এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রাসূল সা: সাওয়ারির ওপর আরোহণ অবস্থায় মক্কাকে লক্ষ্য করে বলেছেন, নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহর দুনিয়ায় সর্বোত্তম নগরী এবং আল্লাহর কাছে পৃথিবীর অধিক প্রিয় ভূমি, যদি আমি তোমার কাছ থেকে বহিষ্কৃত না হতাম তাহলে আমি বের হতাম না।’ ইবনে আব্বাস রা: বর্ণিত এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রাসূল সা: বলেছেন, তোমার (মক্কা) চেয়ে অধিক পবিত্র এবং আমার কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো নগর নেই। যদি আমার স্বজাতি আমাকে বের করে না দিত তাহলে তোমাকে ছাড়া অন্য কোথাও আমি বসবাস করতাম না।’
পাপ মার্জনার আরাফাহ
শুধু বায়তুল্লাহ শরিফই নয়, হজের প্রতিটি পবিত্র স্থানই হলো প্রথম মানব হজরত আদম আ: থেকে শুরু করে হজরত ইব্রাহিম, ইসমাইল ও শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর নানা স্মৃতি ও ঘটনাধন্য পুণ্য এলাকা। হজের মূল স্থান হলো আরাফাহ, যেখানে অবস্থান করা হজের চার ফরজের একটি। অন্য তিন ফরজ হলোÑ ইহরাম, তাওয়াফ ও সায়ি করা। বেলা হেলে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর কাছে দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ স্থান হলো আরাফাহ। এটি ছিল বেহেশত থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর হজরত আদম আ: ও হাওয়ার পুনর্মিলনস্থল এবং আল্লাহর কাছে তাদের ক্ষমা প্রার্থনা কবুলের স্থান। আরাফার জাবালে রহমত হিসেবে পরিচিত ইলাল পাহাড়ে দাঁড়িয়েই বিদায় হজের সেই বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন মহানবী সা:। মক্কার নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতে আসার আগে কুরাইশরা আরাফায় অবস্থান করার পরিবর্তে মুজদালিফায় অবস্থান নিত। বাইরের আরবরা অবস্থান করত আরাফায়। কুরাইশদের যুক্তি ছিল আরাফাহ হারাম এলাকার বাইরে বলে এর চেয়ে বেশি মর্যাদা হারামের ভেতরের মুজদালিফার। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে লাত, মানাতের আরাধনার মতো আরাফাকে উপেক্ষা করার কাফের কুরাইশদের চেষ্টা সফল হয়নি। আর আল্লাহর নির্দেশে আরাফার উন্মুক্ত প্রান্তরেই হাজীরা দুই হাত তুলে প্রভুর কাছে বিচ্যুতির জন্য মার্জনা ভিক্ষা করেন। ২০ লক্ষাধিক হাজী এবারো পরম করুণাময়ের কাছে গুনাহ মাপের জন্য তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এখানে। আরাফায় দোয়া কবুলের ব্যাপারে কোনো ধরনের সংশয় না করতে বলেছেন আল্লাহ তায়ালা। বলা হয়েছে, এখানে বান্দাহ প্রভুর কাছে যে দোয়া করে সেটি কবুল হয়; কিন্তু কেউ এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করলে সেই গুনাটি যুক্ত হয় তার হিসাবে।
আরাফাতের এই সুবিশাল প্রান্তরে এসে প্রতি বছরই বিভিন্ন দেশের হাজীরা বাংলাদেশের কথাও স্মরণ করেন। এই বিশাল মরুপ্রান্তরে লাখ লাখ নিমগাছ লাগিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন বাংলাদেশেরই একজন খ্যাতিমান সাবেক রাষ্ট্রপতি। এই বৃক্ষ সারি তার মূল নাম হারিয়ে হয়ে গেছে কারো কাছে জিয়া ট্রি, আবার কারো কাছে বাংলাদেশ ট্রি।
মুজদালিফার উন্মুক্ত প্রান্তর
মিনার দিকে আরাফাতের সীমান্ত ছাড়ালেই মুজদালিফা। আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৯৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করলে তাতে তোমাদের পক্ষে কোনো অপরাধ নেই। অতঃপর তোমরা যখন আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তিত হও তখন পবিত্র (মাশায়ারে হারাম বা মুজদালিফা) স্মৃতি স্থানের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করো। এবং তিনি তোমাদেরকে যেরূপ নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে তাকে স্মরণ করো। নিশ্চয়ই তোমরা এর আগে বিভ্রান্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলে।’ এই মুজদালিফায় রাতের কিছু সময় অবস্থান করা ওয়াজিব। কারো কারো মতে, সুবহে সাদেকের পর কিছু সময় থাকতে হবে এখানে। সূর্যাস্তের পর আরাফাহ প্রান্তর ছেড়ে লাখ লাখ হাজী যখন একসাথে মুজদালিফার দিকে ছুটতে থাকেন তখন সৃষ্টি হয় অনন্য দৃশ্য। হাজার হাজার যানবাহনের একমুখী যাত্রায় আর লাখ লাখ মানুষের পদমিছিলে যানজটও হয় ব্যাপক। এসব কষ্ট প্রভুর করুণা বা সন্তুষ্টির কাছে কিছুই মনে করে না তার দরবারে হাজিরা দিতে আসা মেহমানরা। এ দিন রাতে মুজদালিফার পাহাড় প্রান্তর রাস্তার দুই পাশ সাদা ইহরাম পরা মানুষের অবস্থানে এক অনন্য শুভ্ররূপ ধারণ করে। যুগে যুগে দ্বীনের দাওয়াত দিতে যে কষ্ট নবী-রাসূলরা করেছেন, তার অনুভব আসে সবার মধ্যে। আরাফাতের ময়দানে যেখানে জোহর ও আসরের নামাজ একসাথে আদায় করতে হয়, সেখানে মুজদালিফায় আদায় করতে হয় মাগরিব ও এশা একসাথে। এখান থেকে হাজীরা জামারায় শয়তানকে লক্ষ্য করে মারার জন্য সংগ্রহ করেন পাথরকণা।
জামারায় পাথর, মিনায় কোরবানি
মুজদালিফায় রাত কাটানোর পর ফজর আদায় করে শুভ্র কাপড় পরা হাজীদের মিছিল রওনা করে মিনার উদ্দেশে। হাজীরা এখান থেকে জামারায় পাথর নিক্ষেপ করে আগে থেকে অবস্থান নেয়া মিনার তাঁবুতে যান। আবার অনেকে তাঁবুতে ফিরে সেখান থেকেই যান শয়তানকে পাথর মারতে। এ দিন কেবল পাথর মারতে হয় বড় শয়তানকে। পরের দু’দিন পাথর মারতে হয় সব জামারায়। হজরত ইসমাইল আ:-এর স্মৃতিকে স্মরণ করেই এটিকে হজের অংশ (ওয়াজিব) করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এক সময় মুজদালিফা থেকে হেঁটে এসে জামারায় শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর মারার কাজে অতিরিক্ত ভিড়ে অনেক হাজীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটত। এখন জামারার পাথর মারার বহুতল ব্যবস্থা ও চমৎকার শৃঙ্খলা স্বস্তি নিয়ে এসেছে হাজীদের জন্য।
বড় শয়তানকে পাথর মারার পরই হজরত ইব্রাহিম আ:-এর স্মৃতিময় কোরবানি। আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি দেয়ার জন্য তিনি নিয়ে এসেছিলেন এই মিনার প্রান্তরে। প্রভুর হুকুমে ইসমাইলের পরিবর্তে কোরবানি হয় পশু। মিনার পাহাড়ের সেই স্মৃতি স্থানটি এখনো প্রত্যক্ষ করেন হাজীরা। হজে মিনার প্রধান তিন কাজ হলোÑ রাত যাপন, পাথর নিক্ষেপ ও হাদি বা পশু কোরবানি। প্রথম দিনের পাথর নিক্ষেপ আর কোরবানির পর মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম খুলে ফেলেন হাজীরা। এর পর অনেকে মক্কায় চলে যান পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফের উদ্দেশ্যে। অনেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন জামারায় পাথর মেরেও কাবা তাওয়াফের জন্য যান। মিনা সেই স্মৃতিময় স্থান, যেখানে মহান প্রভু তার পবিত্র ঘর কাবাকে ধ্বংস করতে আসা আবরাহাকে ছোট্ট আবাবিল পাখির কঙ্কর দিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। মিনার সেই অভিশপ্ত স্থানটি হাজীরা দ্রুত অতিক্রম করেন। সেখানে হাজীদের থাকার জন্য কোনো তাঁবুও নির্মাণ করা হয়নি।
কাবায় তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ায় সায়ি
কাবায় তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ায় সায়ি হজের অন্যতম অপরিহার্য কাজ, যা না করলে হজ পালন হবে না। কাবা হলো আল্লাহর সেই পবিত্র ঘর ও মুসলিমদের কেবলা, যেটাকে মহান প্রভু তাঁর নবী ইব্রাহিম আ:কে নির্মাণ ও উঁচু করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এক হাদিস অনুসারে এটি হলো পৃথিবীতে নির্মিত আল্লাহর প্রথম ঘর। এর ৪০ বছর পর দ্বিতীয় ঘর বায়তুল মোকাদ্দাস নির্মিত হয়েছে, যেখান থেকে আল্লাহ তার প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ সা:কে মেরাজে (ঊর্ধ্ব গগনে) নিয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কাবাকে বিরাট বৈশিষ্ট্যময় করেছেন, এ ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ না পড়লে সেটি আদায় হয় না। আর বর্গাকৃতির বিস্ময়কর আল্লাহর নিদর্শনের চার পাশে ঘড়ির কাঁটার উল্টো গতিতে সাতবার না ঘুরলে (তাওয়াফ) হজ আদায় হবে না। পৃথিবীতে আল্লাহ কেবল এই একটি ঘরকে তাওয়াফের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম আ: পৃথিবীর মানুষের প্রতি পবিত্র কাবাঘরে হজ করার আহ্বান করেছিলেন। মহান প্রভু সেই আহ্বানকে সবার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। সেই থেকেই জারি রয়েছে হজ ও তাওয়াফ এই কাবাঘরকে ঘিরে। কাবার অলৌকিক নিদর্শনের একটি হলো হাজরে আসওয়াদ। বেহেশতের এই শুভ্র পাথরটি আদমসন্তানদের পাপ শুষে নিতে নিতে এখন নিকষ কালো বর্ণ নিয়েছে। কাবার যে কোনায় এই পাথর বসানো হয়েছে, সেখান থেকেই ‘আল্লাহু আকবর’ বলে তাওয়াফ শুরু করতে হয়। সাতবার প্রদক্ষিণের পর শেষও করতে হয় সেখানে। হজের ভিড়ে সাধারণভাবে এই পাথরে চুমু দেয়া অথবা এর আগের কোনায় রুকনে ইয়ামেনি স্পর্শ করা হাজীদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। সে ক্ষেত্রে হাজরে আসওয়াদের প্রতি ইশারা করে দিতে হয় চুমু। কাবার আরেকটি নিদর্শন হলো আল হিজর (হাতিম)। কাবাঘরের উত্তর পাশের বৃত্তাকার এই এলাকা কাবার অংশ হিসেবে চিহ্নিত। এটিকে কাবার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া না হলেও আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাজীদের তাওয়াফ করতে হয় কাবার সাথে এটাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের চেষ্টা থাকে সবার। মাকামে ইব্রাহিম হলো কাবাঘরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এটি হলো সেই পাথর, যার ওপর হজরত ইব্রাহিম আ: দাঁড়িয়েছিলেন, যখন কাবার নির্মাণকাজ ওপরে উঠলে পাথর নেয়া কষ্টকর হচ্ছিল। এ সময় হজরত ইসমাইল আ: পিতাকে পাথর এগিয়ে দিচ্ছিলেন। এই পাথরের ওপর দাঁড়িয়েই হজরত ইব্রাহিম আ: আজান ও হজের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘তার মধ্যে প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ বিদ্যমান রয়েছে, মাকামে ইব্রাহিম উক্ত নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আর যে এর মধ্যে প্রবেশ করে সেই নিরাপত্তা লাভ করবে।’ তাওয়াফের পর মাকামে ইব্রাহিমের সামনে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন হাজীরা।
তাওয়াফের পর সায়ির আগে হাজীরা পান করেন সেই বরকতময় কূপের পানি, যেটি বিশ্বব্যাপী জমজম হিসেবে প্রসিদ্ধ। হজরত ইব্রাহিম আ: তার বার্ধক্যবেলার প্রিয় সন্তান শিশু ইসমাইলকে মা হাজেরার সাথে আল্লাহর নির্দেশে যখন মক্কার এক অনুর্বর উপত্যকায় রেখে যান, তখন মা হাজেরা পানির জন্য সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ছোটাছুটি করছিলেন। এই স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে সাফা-মারওয়ার সায়িকে হজের অংশ করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। মা হাজেরা পানির সন্ধানে সাফা থেকে মারওয়ায় সাতবার আসা-যাওয়ার পর দেখতে পান শিশুপুত্র ইসমাইলের পা দাপাদাপির স্থান থেকে এক অলৌকিক প্রস্রবণ প্রবাহিত হচ্ছে। সেই অলৌকিক পানির প্রস্রবণই হলো জমজম। প্রতি বছর হজ ও ওমরায় আসা কোটি মানুষ এই কূপের পানি পান করছেন, নিয়ে যাচ্ছেন প্রিয়জনদের জন্যও। তবুও এই কূপে পানির ধারা অবিরাম প্রবহমান রয়েছে। আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, জমিনের উপরিভাগের সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হলো এই জমজমের পানি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায়ও প্রমাণিত হয়েছে, এটিই হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পানি। খাদ্যের মতোই পানকারীকে পরিতৃপ্ত করে এই পানি। সহি মুসলিমের এক হাদিসে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ বিন সামেত আবু জর রা: ৩০ দিন-রাত এই পানি পান করে বায়তুল্লায় কাটিয়েছেন। তিনি রাসূল সা:কে জানিয়েছেন, এ সময় ক্ষুধার লেশমাত্র তিনি অনুভব করেননি, বরং তার পেটের চামড়া মোটা হয়ে ভাঁজ পড়ে গেছে।
হজকে আল্লাহ এক অপরিহার্য ইবাদত করে দিয়েছেন শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের জন্য। এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীতে আল্লাহর পাঠানো নবী-রাসূলদের একত্ববাদ প্রচারের অনেক স্মৃতি। এটি মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধের এমন এক মহড়া, যেখানে শিয়া-সুন্নি অথবা বিভিন্ন মাজহাব নির্বিশেষে সবাই একসাথে এক কাতারে অভিন্ন ইমামের পেছনে আদায় করেন নামাজ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একসাথে পালন করেন তাওয়াফ-সায়ি। এক অলৌকিক মমত্ব সবাইকে অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ করে। সবার মধ্যেই থাকে এক আকুতি, সেটি হলোÑ আল্লাহর ইচ্ছার কাছে তার নৈকট্য লাভের জন্য নিজেকে সমর্পণ করা।
প্রসঙ্গ বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরই লক্ষাধিক হজযাত্রী হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা-মদিনা যান। একসময় এর বেশির ভাগ যেতেন সরকারি ব্যবস্থাপনায়। এখন একেবারে স্বল্পসংখ্যক যান সরকারিভাবে। এবার ১০ হাজার হজযাত্রী সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যাওয়ার কথা থাকলেও গেছেন সব মিলিয়ে হাজার দেড়েক। বাকিরা বেসরকারি হজ এজেন্টদের ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করেছেন। হজব্রত পালনের বিভিন্ন সুবিধার সাথে যুক্ত থাকে আর্র্থিক সংশ্লেষ। স্বাভাবিক অবস্থায় সৌদি আরব আসা-যাওয়ার জন্য যেখানে বিমান ভাড়া ৫২ হাজার টাকার মতো, সেখানে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া দিতে হয় এক লাখ ২০ হাজার টাকার মতো। বলা হয়, লোকসানি বাংলাদেশ বিমানকে রক্ষার জন্য এভাবে হজযাত্রীদের ওপর দ্বিগুণের বেশি বিমান ভাড়া চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সৌদিয়া ও বাংলাদেশ বিমানের জন্য হাজী পরিবহন নির্দিষ্ট করে দেয়ায় অন্য এয়ারলাইন্সে অনেক কম ভাড়ায় হাজীদের যাতায়াত সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ ক্ষেত্রে হজের সময় একমুখী পরিবহনের যে যুক্তি দেখানো হয়, সেটি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না কেউই। বিমানের অনেক ফাইটই অর্ধেক খালি বা সামান্য যাত্রী নিয়ে আসা-যাওয়া করে; কিন্তু তাদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া দাবি করা হয় না। অস্বাভাবিক ভাড়া নেয়া হয় কেবল হাজীদের কাছ থেকে। এর সাথে সরকারের উচ্চ মহলের নানা স্বার্থবাদীদের স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন সময় প্রকাশ হয়ে পড়ে। বিমান ভাড়াকে যৌক্তিক করা হলে অনেক কম খরচে হজ পালন করা সম্ভব হতো। এখানকার সাশ্রয়ী অর্থ মক্কায় বাড়ি ভাড়ায় ব্যয় করা হলে হারাম শরিফের কাছাকাছি হোটেলে থেকে সহজে ও নিয়মিত নামাজ আদায় করতে পারত বয়স্ক এবং মহিলারাও। এখন অনেক এজেন্সি এত দূরে হজযাত্রীদের রাখে যে, সেখান থেকে বয়স্ক বা মহিলাদের হারাম শরিফে নিয়মিত আসা সম্ভব হয় না। কিছু কিছু এজেন্সির ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা অথবা বেশি লাভ করার মানসিকতার কারণেও ভোগান্তির শিকার হতে হয় হাজীদের। মক্কা থেকে মিনা, মিনা থেকে আরাফাহ এবং আরাফাহ থেকে মুজদালিফা আর মক্কা থেকে মদিনায় আসা-যাওয়ার পরিবহনের দায়িত্ব মূলত সৌদি মুয়াল্লেমদের। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশী হাজীদের এসব ক্ষেত্রে পরিবহন সঙ্কটে পড়তে হয়। বিশেষত আরাফাহ থেকে মুজদালিফায় আসার সময় এক গাড়িতে চাপাচাপি করে শতাধিক হাজীকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আবার অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ির অভাবে আরাফাতে আটকা পড়তে হয়। এবার হাজার হাজার বাংলাদেশী হাজী আরাফাতের ময়দানে মুয়াল্লেমের গাড়ি না আসায় আটকে থাকতে হয়। অনেকেই হেঁটে চলে যান মুজদালিফায়; কিন্তু মহিলা ও বয়স্কদের পক্ষে সেটি সম্ভব হয়নি। অন্য সব দেশের হাজীরা গাড়ি পেলেও বাংলাদেশীদের কেন এই দুরবস্থা, তার কোনো জবাব এজেন্সির ব্যবস্থাপক বা হজ মিশনের কর্মকর্তাদের কাছে ছিল না। তারা কেবলই সৌদি মুয়াল্লেমদের দোষারোপ করেছেন। শেষ পর্যন্ত সৌদি পুলিশ ও হজ মন্ত্রণালয়ের লোকজন এখান-সেখান থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করে রাত শেষ হওয়ার আগেই আরাফাত থেকে মুজদালিফায় হাজীদের পাঠিয়েছেন; কিন্তু এতে হাজার হাজার হজযাত্রী কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। তাদের অনেকে হজের আনুষ্ঠানিকতা ঠিকমতো পালন করতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে হজ এজেন্সিগুলোর করণীয় কিছু থাকলে সেটি যেমন বাংলাদেশের হজ মিশন কর্তৃপক্ষ বা ধর্ম মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করতে পারত, তেমনিভাবে সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের সাথেও আলোচনা করে এর একটি স্থায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারত। এসব না করায় বাংলাদেশের হজযাত্রীদের যতটা অসহায় অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, ততটা মুসলিম সংখ্যালঘু অনেক দেশের হাজীদেরও দেখা যায় না। এর বাইরে বাড়তি বিড়ম্বনা হিসেবে দেখা দিয়েছে সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর হজ নিয়ে ঔদ্ধ্যত্যপূর্ণ মন্তব্য। এটি সৌদি পত্রপত্রিকায় বেশ ফলাওভাবে প্রচার হয়েছে। এতে সরকার ও দেশের ভাবমর্যাদার হয়েছে অপরিমেয় ক্ষতি।
mrkmmb@gmail.com

ইরানি নারী রেইহানার মৃত্যুদণ্ড প্রকৃত ঘটনা by সিরাজুল ইসলাম

আজ ক’দিন ইরানের রেইহানা জাব্বারি নামে এক মহিলার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপক প্রচার চলছে; এর বাইরে নেই বাংলাদেশও। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ঝড় উঠেছে ওই নারীর পক্ষে যারা সত্য অনুসন্ধান করতে চান তারা সত্যের সন্ধান পাবেন, আর যারা চান না তাদের জন্য নিশ্চয়ই কুতর্কের খোরাক হবে।
প্রথমেই বলে নিই- বাংলাদেশের বেশির ভাগ গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা হলো, বিদেশী খবর যাচাই-বাছাই করার সুযোগ নেই। সে কারণে পশ্চিমা গণমাধ্যম, বিশেষ করে এএফপি, রয়টার্স, এপি, ভোয়া বা বিবিসি যা দেয় তাই চোখ বন্ধ করে গিলতে হয়। আর মিডিয়ার শীর্ষপর্যায়ে যারা বসে আছেন তারাও সাধারণত এগুলো নিয়ে এত মাথা ঘামান না অথবা ঘামালেও শেষ পর্যন্ত পশ্চিমাদের প নিয়ে থাকেন। আর নারী বা কথিত মানবাধিকার ইস্যু হলে তো কথাই নেই। অবশ্য এর কারণও অনেক। নানা সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করেন তারা। এ ছাড়া ইসলাম বা ইরানবিদ্বেষী লোকের অভাব নেই। এ ধরনের খবর পেলেই তারা বলেন, বিবিসি বা ভোয়া বা অমুক বার্তা সংস্থা দিয়েছে তো! তাহলে কি এসব সংবাদমাধ্যম কখনো খবর বা সত্য বিকৃত করে না! মিডিয়াকর্মী হিসেবে খুব কাছ থেকেই জানি তাদের তথ্যবিকৃতির ধরন।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে বলা হচ্ছে, রেইহানাকে ‘অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেয়া হয়েছে’। আরো বলা হচ্ছে, ‘ধর্ষণ থেকে আত্মরা করতে গিয়ে তিনি ওই লোকটিকে খুন করেছেনÑ অর্থাৎ নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে, ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুনের ঘটনাটি ঘটাতে হয়েছে। তার পরও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে!’ তার মানে হচ্ছে, নারীর এই প্রতিরোধকে স্বীকার করা হলো না, নারীর অধিকারকে স্বীকার করা হলো না। কেউ কেউ বলছেন, এই বিচারের মাধ্যমে ধর্ষণকে উৎসাহ দেয়া হলো।
বাস্তবে রেইহানা ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুন করেননি। ঘটনাটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ইরানের বিচার বিভাগ এতটা নারীবিদ্বেষী নয় যে, অন্যায়ভাবে একজন নারীকে ফাঁসি দেবে। হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল। ওই মহিলা নিজের দোষও স্বীকার করেছেন আদালতে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণেও ব্যর্থ হয়েছেন।
ঘটনাটি হলো, দু’জনের অবৈধ সম্পর্কের জেরে একপর্যায়ে তাদের মধ্যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয় এবং এই খুনের ঘটনা ঘটে। সে েেত্র, পুরুষ লোকটি যে ভালো মানুষ ছিলেন, তা বলারও সুযোগ নেই। বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার কারণে রেইহানা লোকটিকে খুনের সিদ্ধান্ত নেন। এর দুই দিন আগে রেইহানা নতুন ছুরি কিনেছিলেন এবং তার এক বান্ধবীকে এসএমএস করেছিলেন যে, ‘খুনের ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে।’ এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার; তা হলোÑ এই মহিলার সাথে ইরানের আদালতের এমন কোনো বিরোধ ঘটেনি যে, তাকে ফাঁসি দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতে হবে। অথবা এই মহিলা ইরানের জন্য কোনো হুমকি ছিলেন না, যে কারণে তার ফাঁসি কার্যকর করতে হলো। বরং যদি এমন হতো যে, খুন হয়নি বরং অবৈধ সম্পর্ক বা ধর্ষণের ঘটনার বিচার হচ্ছে, তাহলে ওই পুরুষ লোকটাও মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়তেন। এ ক্ষেত্রেও ইরানের আইন অনুসরণ করা হতো। দেখা হতো না, কে পুরুষ আর কে নারী; যেমনটি দেখা হয়নি রেইহানার ক্ষেত্রে।
সাত বছর আগের ঘটনা এটি; এমনটি নয় যে, তাড়াহুড়া করে একজন নারীকে ফাঁসি দিয়ে আদালত বিরাট কিছু করে ফেলছেন। যেভাবে মিডিয়ায় খবরটি এসেছে, এটা নিতান্তই মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা গণমাধ্যম ও কথিত মানবাধিকারকর্মীদের প্রচারণা। আমি তো ইরানে থাকি, এখানকার নারীরা যে কতটা স্বাধীনতা ভোগ করেন, তা বেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হচ্ছে। ইরানের সমাজে নারীর যে কেমন মূল্যায়ন তা অনেকের জানা নেই এবং জানলেও হয়তো প্রকাশ করবেন না; বরং বলার চেষ্টা করবেন, ইসলামি সরকার এতটা বর্বর এবং এ কারণে একজন নারীকে ফাঁসি দিলো ইত্যাদি। কল্পনা করা যাকÑ যদি ঘটনাটা পুরুষের বেলায় ঘটত তাহলে কি পুরুষ লোকটা বেঁচে যেতেন ফাঁসির হাত থেকে? নিশ্চয়ই নয়। ইরানের আইনের মূল ভিত্তি হচ্ছে ইসলামি বিধান। যে অন্যায় ঘটেছে তার জন্য নারী-পুরুষ মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় হচ্ছে আইন ও তার প্রয়োগ। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর বহু খুনের ঘটনার বিচার হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে দোষীদের। সেখানে নারী-পুরুষ কখনো বিবেচ্য বিষয় হয়ে ওঠেনি, বিচার হয়েছে অপরাধের।
২০০৭ সালে সংঘটিত হয় আলোচ্য হত্যাকাণ্ডটি। ঘটনাটি সাত বছর ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করে তারপর ইরানের আদালত রায় দিয়েছেন। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে পরে আবার বিচার হয়েছে এবং তারা রায় বহাল রাখেন। তার পরও এক মাস দেরি করা হয়েছে যে, ভিক্টিম পরিবার যদি মাফ করে দেয় তাহলে ফাঁসিটি কার্যকর করা হবে না; কিন্তু ওই পরিবার মাফ করেনি। ইরানের বিচারব্যবস্থায় খুনের ঘটনায় কারো মৃত্যুদণ্ড হলে ভিক্টিম পরিবার ছাড়া কারো পে সে রায় পাল্টানোর সুযোগ নেই। এমনকি প্রেসিডেন্ট বা সর্বোচ্চ নেতাও তা পারেন না। এটা ইসলামের বিধান; তা কারো ভালো লাগুক আর না লাগুক। মনে রাখতে হবে, ইরান সম্পূর্ণ স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। ইসলামি আইন হচ্ছে এখানকার বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি। কারো কথায় বিচার বিভাগ প্রভাবিত হয় না; কারো কথায় আদালতের রায় পাল্টায়ও না। ইরান আমেরিকাকে পাত্তা দেয় না বলেই তারা বিষয়গুলো নিয়ে বেশি পানি ঘোলা করে। মানবাধিকারকে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়; কিন্তু আমেরিকার মানবাধিকার পরিস্থিতি কী? গতকালও একটা নিউজ বের হয়েছে, ২০১২ সালে আমেরিকায় ৪৯ বছর বয়সী মিল্টন হল নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে আট পুলিশ ঘিরে ধরে ৪৫টি গুলি করে হত্যা করেছে, যেন ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। সোমবার তার ভিডিও ফুটেজ বের হয়েছে। যে দেশের প্রেসিডেন্ট নিজে কৃষ্ণাঙ্গ, সেই দেশের অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে অন্য সময় কী হবে আর বাস্তব অবস্থা কতটা শোচনীয়! গুয়ানতানামো কারাগারের কথা কেন তুলে ধরি না। সেখানে বছরের পর বছর বিনাবিচারে শত শত মুসলমানকে আটকে রাখা হয়েছে সন্ত্রাসবাদের অজুহাতে। তারা অনশন করেন বলে নাকের ভেতর দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে জোর করে খাওয়ানো হচ্ছে; কিন্তু এসব নিয়ে বেশির ভাগ মিডিয়া খবর দেয় না। এগুলো তো আর পশ্চিমা মিডিয়া সচরাচর প্রচার করে না। যা হোক, কথিত নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে জাব্বারির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাটি দেখলে সত্য এড়িয়ে যাওয়া হবে। ইরানে নারীবাদ বা পুরুষবাদ বলে কিছু নেই। পরিশেষে বলবÑ বিশেষ করে সংবাদকর্মীদের জানা থাকার কথা, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো কেমন করে খবর বিকৃত করে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করে। আর মানবাধিকার যেন তাদের পৈতৃক সম্পত্তি; এটি তারা ছাড়া রা করার আর কেউ নেই। ইরাক-আফগানিস্তানে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে এরা; কিন্তু ভাবখানা এমন যে, তা কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় পড়ে না। মানবাধিকার ইস্যুকে তারা স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। কারণ, এটা না করলে যে তাদের সব অন্যায় ধরা পড়ে যাবে, বুঝে ফেলবে বিশ্ববাসী। আমরা তাদের এমন প্রতারণার শিকার বৈকি।

আশুরার ইতিবৃত্ত ও গুরুত্ব by মাওলানা ফয়সল আহমদ জালালী

‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারাহ’ ধাতু থেকে এসেছে। ‘আশারাহ’ শব্দের অর্থ হলো, মহররমের দশ।  দশম দিবসে পালিত হয় বলে একে আশুরা বলে। কেউ কেউ মনে করেন, এই দিন আল্লাহ তায়ালা দশজন নবীকে সম্মানিত করেছিলেন বলে একে আশুরা নামে অভিহিত করা হয়। আশুরা দিবসটি প্রাচীনকাল থেকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। ইহুদিরা আশুরা দিবসে রোজা রাখত। কারণ এই দিন নবী মুসা আ: ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। মক্কার মুশরিকেরাও আশুরা দিবসে সাওম পালন করত। কারণ  নিজেদের দাবি করত ইবরাহিম আ:-এর অনুসারী। হজরত ইবরাহিম আ: এই দিনে জন্মলাভ করেছিলেন; এই দিনেই তিনি নমরুদের আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। আশুরা দিবসে আর যেসব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছিল তা হলো : এ দিন আদি পিতা হজরত আদম আ:-এর তওবা কবুল হয়েছিল। হজরত নূহ আ:-এর জাহাজ তীরে ভিড়েছিল। ঈসা আ:-এর জন্ম এই দিনে এবং আসমানে এই দিনেই তাকে উত্তোলন করা হয়েছিল। ইউনুস আ:কে মাছের পেট থেকে মুক্ত করা হয়েছিল এবং তার কওমকে আজাব থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল একই দিনে। হজরত ইউসুফ আ:কে কুয়া থেকে উঠানো হয়েছিল এই দিন। হজরত আইয়ুব আ: দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে এই দিন আরোগ্য লাভ করেছিলেন। এই দিনে হজরত ইদরিস আ:কে আসমানে উত্তোলন করা হয়েছিল। হজরত সুলায়মান আ: এই দিন সিংহাসনে পুনরায় অধিষ্ঠিত হন।
আশুরা দিবসে সাওম পালনের জন্য রাসূলুল্লাহ সা: নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার সাওম ফরজ ছিল বলে ধারণা করা হয়। দ্বিতীয় হিজরি সনে রমজানের সাওম ফরজ হওয়ার বিধান নাজিল হলে আশুরার সাওম ঐচ্ছিক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবুও তার সাওয়াবে কমতি নেই। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বাধিক উত্তম সিয়াম হলো মহররম মাসের সিয়াম। আর ফরজের পরে সর্বাধিক উত্তম সালাত হলো তাহাজ্জুদের সালাত’ (মুসলিম আস-সাহিহ, ১ম খণ্ড, ৩৫৮)। আরো বর্ণিত আছে, ‘আশুরা দিবসের সাওম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা:কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘এর ফলে পূর্ববর্তী বছরের গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়’ (মুসলিম, প্রাগুক্ত)।
আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘জাহিলিয়া যুগে কুরাইশরা আশুরা দিবসে সাওম পালন করত। রাসূলুল্লাহ সা:ও সে কালে সাওম পালন করতেন। মদিনায় এসেও তিনি সাওম পালন করতে লাগলেন এবং অন্যদেরও নির্দেশ দিলেন। রমজানের সাওমের আদেশ নাজিল হলে আশুরা দিবসকে বর্জন করা হয়। এখন কেউ চাইলে তা পালন করুক আর চাইলে তা বর্জন করুক’ (বুখারি, আস-সাহিহ, ১ম খণ্ড, ২৬৮)।
হজরত আবু মুসা আল আশআরি রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আশুরা দিবসকে ইহুদিরা ঈদ হিসেবে গণ্য করত। নবী কারিম সা: তা দেখে মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন, তোমরা এই দিন সাওম পালন করো’ (বুখারি, প্রাগুক্ত)।
আশুরা সাওমের অবস্থান সম্পর্কে খোদ সাহাবায়ে কেরামের যুগে বিতর্ক জমে উঠেছিল। কেউ একে ওয়াজিব, কেউ সুন্নত আবার কেউ এর বিপরীত একে হারাম বা মাকরুহও আখ্যায়িত করেছিলেন। এক হজের মওসুমে মুআবিয়া রা: বিশেষ করে মদিনার আলেমদের ডেকে বললেন, (কারণ এদের মাঝে এর চর্চা ছিল বেশি) হে মদিনাবাসী, তোমাদের আলেমেরা কোথায়? আমি রাসূলুল্লাহ সা:কে বলতে শুনেছি তিনি এ দিবসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘এটি আশুরা দিবস। আল্লাহ এ দিবসের সিয়াম তোমাদের ওপর ওয়াজিব করেননি। তবে আমি এই দিনে সাওম পালনকারী কারো ইচ্ছা হলে সাওম পালন করবে আর কারো ইচ্ছা হলে তা বর্জন করবে’ (বুখারি, প্রাগুক্ত, সাওম অধ্যায়)।
আশুরার দিবস কোনটি : আশুরা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কিছু মতানৈক্য রয়েছে। হাদিস শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ভাষ্যকার আল্লামা আইনি বলেন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িন ও পরবর্তীকালের জমহুর ওলামার মতে, আশুরা হলো মহররম মাসের দশম দিবসে। তবে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা:-এর মতে, তা হলো, নবম দিবসে। কোনো কোনো সাহাবির মতে, তা হলো, মহররমের একাদশ দিবসে। আবু ইসহাক উপরিউক্ত তিন দিনই সাওম পালন করতেন। আর বলতেন, আশুরা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কায় এ তিন দিন সাওম পালন করি। (পাদটীকা সহিহ বুখারি, ১ম খণ্ড, ২৬৮)।
বর্ণিত আছে আশুরায় মদিনার ইহুদিদের সাওম পালন করা দেখে রাসূলুল্লাহ সা: এর কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তারা বলেছিল, এটি একটি পুণ্যময় দিবস। বনু ইসরাইলকে আল্লাহ তায়ালা এই দিন শত্রুদের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন বলে মুসা আ: এই দিন সাওম পালন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা: শুনে বললেন, ‘তোমাদের থেকে আমি মুসার অনুসরণের উপযুক্ত বেশি’ (বুখারি, প্রাগুক্ত)।
তবে হুবহু ইহুদিদের অনুকরণ রাসূলুল্লাহ সা: পছন্দ করতেন না। তাই তিনি মুসলমানদের বলেছিলেন, ‘তোমরা আশুরা দিবসে সাওম পালন করো। সেই সাথে এর আগে এক দিন অথবা পরে এক দিন সাওম পালন করো। সাওম পালনে তোমরা ইহুদিদের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করো না’ (তাহাবি, শারহু মাআনিল আছার, ১ম খণ্ড, ২৮৬)। এ কারণে আল্লামা ইবনুল আবিদিন শামি ও ইবনুল হুমামের মতে, শুধু আশুরা দিবসে সাওম পালন মাকরুহে তানজিহি (ইদাহুল মিশকাত, ২য় খণ্ড, ৬৭৭)।
হোসাইন রা:-এর শাহাদত : আশুরার মহিমা বহু আগ থেকে চলে আসছে। কিন্তু ইসলামি ইতিহাসের একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা শাহাদতে হোসাইন রা: এ মহান দিনেই সংঘটিত হয়েছিল। ঘটনাটি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি মহা বিষাদময়। আশুরার মহিমাকে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা কালিমাযুক্ত করে দিয়েছে। বাতিলের বিরুদ্ধে আপসকামী না হওয়ায় ইরাকের কারবালা প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসাইনকে শির দিতে হয়েছিল। আজ অনেকের কাছে আশুরা বলতে কারবালার এ নির্মম ঘটনাকেই বোঝায়। আল্লাহর লীলাও বোঝা বড় কঠিন। যে দিন বিশ্বের মহা প্রতাপশালী জালিম ফেরাউনের হাত থেকে আল্লাহ তায়ালা সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক মুসা আ:কে নিষ্কৃতি দিলেন, সেই দিনই ঘটল ইসলামের ইতিহাসের এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড। ফেরাউন ও মুসা আ:-এর দ্বন্দ্ব ছিল আল্লাহর রুবুবিয়্যাত নিয়েÑ আল্লাহকে স্বীকার করা ও অস্বীকার করা নিয়ে। আর হোসাইন রা:-এর লড়াই ছিল মুসলিম নামধারী জালিমশাহির বিরুদ্ধে।
তবে আশুরা দিবসে ইয়াজিদকে গালাগাল করার মধ্যে কোনো সওয়াব নেই। বরং হোসাইনি চেতনা ধারণ করার মধ্যে রয়েছে ঈমানি শক্তির উপাদান। এ উপলক্ষে বিশিষ্ট সাহাবি মুআবিয়া রা:কেও কিছু লোক সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে থাকে। কারণ তিনি ছিলেন ইয়াজিদের পিতা। সাহাবিদের গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকতে রাসূলুল্লাহ সা: স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তাজিয়া মিছিল সর্বজনগ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি নয়।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা, কারবালা ও এ ধরনের ঘটনার ব্যাপারে মধ্যপন্থী। অনেককে দেখা যায়, আশুরা দিবসে সাওমের পরিবর্তে খিচুড়ি খাওয়ার অনুষ্ঠান করে তা বিলিয়ে দেন। এটিও সুন্নাহর বিপরীত ।
লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, গবেষক ও ইসলামী বিশ্বকোষের অন্যতম প্রণেতা, ই.ফা.বা

সিসার নেশা by ডক্টর তুহিন মালিক

এক. মারাত্মক এক নতুন মাদক সংস্কৃতিতে ভুগছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। পাড়া-মহল্লা স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র মাদকের রমরমা বাণিজ্য। এ যেন এক অদ্ভুত আধুনিক মাদক সংস্কৃতিতে ভুগছি আমরা। শহরের অভিজাত রাস্তায় এখন নানা রকমের লাউঞ্জ আর সিসা ক্যাফেতে চলছে নারী-পুরুষের অবাধ সিসা সেবন। অ্যামিউজমেন্ট কাব নামে প্রকাশ্যে চলছে মদের বেচাকেনা। বড়লোকদের আভিজাত্যের কাছে যেন হালাল হয়ে গেছে এ সব কিছু। গভীর রাত পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা জম্পেশ আড্ডা দিয়ে রোমান্টিক আলোর মূর্ছনায় সেবন করছে নীল নেশা। সমাজের উঁচু শ্রেণীর কাবগুলো যেন নিরাপদ ও শান্তিতে মদ্যপানের অভয়াশ্রম। এদের জন্য নেই কোনো ড্রাগ, নারকোটিকস, লিকার আইন! সাধ্য আছে কারো এ প্রশ্ন করার?
দুই. পত্রিকার রিপোর্টে উঠে এসেছে এ রকম এক সিসা ভয়াবহতার রোমাঞ্চকর কাহিনী। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, উত্তরা, বেইলি রোড, ধানমন্ডি, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ অন্যান্য অভিজাত এলাকায় একেকটি বারে মাসে গড়ে ১০ লাখ টাকার সিসা বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে বারের মালিকেরা মাসে আট লাখ টাকা আয় করছেন। অর্থাৎ বছরে ৯৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন একেকজন। এর জন্য কোনো ট্যাক্স, খাজনা বা শুল্ক পরিশোধ করার আইন নেই। সরকারি কর্তৃপরে কাছ থেকে কোনো নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেয়ারও প্রয়োজন নেই তাদের। সিসার সাথে গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবা মেশানো হয় বলে রিপোর্টে প্রকাশ। আমাদের দেশের আইনে সিসা নাকি এখনো মাদকই নয়। কেননা ১৯৯০ সালের তফসিলভুক্ত না হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নাকি এ েেত্র কিছুই করার নেই। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ধূমপানের চেয়ে সিসা সেবন মানবদেহের জন্য বেশি তিকর। সিসা সেবনের একটি আসরে যে পরিমাণ ধোঁয়া বের হয়, তা ২০০ সিগারেটের ধোঁয়ার সমান। একবার সিসার ধোঁয়া ফুসফুসে টেনে নিলে যে পরিমাণ নিকোটিন ও কার্বন মনো-অক্সাইড মানুষের দেহে প্রবেশ করে, তা ২০টি সিগারেটের চেয়ে বেশি। তামাকসংবলিত সিসার তিকর প্রতিক্রিয়া তামাকের চেয়েও তিকর।
তিন. দেশের নীতিনির্ধারক ও কর্তাব্যক্তিরা এ ব্যাপারে যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন দিব্যি। তাদের নাকের ডগায় বসে প্রকাশ্যে বাণিজ্য হচ্ছে এসব মাদকের। বেশির ভাগ েেত্রই তাদের বড় একটা অংশ হচ্ছে এদের সহযোগী। তাদের অনৈতিক আয়ের প্রধান অংশই আসে এই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে কথিত সমাজসেবীদের অনেকেই মাদক ব্যবসায়ে প্রত্য বা পরোভাবে জড়িত। সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রোগীদের ৮০ শতাংশই ইয়াবায় আসক্ত। আশির দশকের শেষ দিকে ফেনসিডিল ছড়িয়ে পড়ে মাদক রাজ্যে। নব্বই দশকের শেষে মাদক হিসেবে ইয়াবা প্রথম ধরা পড়লেও আজ সেই ইয়াবা নেশার রাজ্যকে শাসন করছে। প্রতিদিন ইয়াবার মারণনেশা গ্রহণ করছে ১২ লাখ মানুষ। দেশে প্রকৃত মাদকসেবীর সংখ্যা কত তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে এদের মধ্যে বড় অংশ তরুণসমাজ। এদের শতকরা ৮০ জনের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। দেশে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা লাধিক। এদের মধ্যে ১০ শতাংশ নারী। মহিলা ও শিশুদের মাদক ব্যবসায়ের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
চার. দুই বছর আগে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্ট থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কমিটি ১০ দফা সুপারিশে সিসা বারগুলোকে অবৈধ বললেও দৃশ্যত এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যক্রম নিতে আমরা দেখিনি। সমাজের উঁচু শ্রেণীর এই সিসাবিলাস আমাদের আইনকে হয়তো এখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তবে স্পর্শ করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের সন্তানেরাও যে এই বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্ত রয়েছে, তা জোর দিয়ে বলা দুরূহ। আমরা কি প্রতিনিয়ত এভাবেই আলো থেকে এক অন্ধকার ঘরের দিকে ধাবিত হতে থাকব? দেশের সমাজপতি বা রাজনীতিবিদদের কি এতে কিছুই করার নেই? কাদের জন্য আমাদের এসব রাজনীতি আর উন্নয়ন। যাদের জন্য আমাদের রাজনীতি তারাই যদি বেঁচে না থাকে তাহলে কিসের স্বার্থে এই উন্নয়ন?
পাঁচ. অটোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যের প্রতীক হুক্কা এখন খোদ তুরস্কে নিষিদ্ধ। আর এটাকে সাদরে সম্ভাষণ জানিয়ে আমাদের সিসা আর হুক্কা সেবনের নানারকমের পার্লার, লাউঞ্জ আর ক্যাফের জৌলুশ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর বিরুদ্ধে কথা বলার সাধ্য যেন কারো নেই। কিন্তু কেন নেই? এগুলোর মালিক কারা? এগুলো নিয়ন্ত্রণই বা করে কে? অন্ধকার ঘরের মিটিমিটি আলোর মধ্যে তরুণ-তরুণীদের এ ধরনের ধূম্রসেবন নাকি এ যুগের আধুনিকতা! এই আধুনিকতাই হয়তো একদিন আমাদের অনেক পরিবারকে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। অন্ধকার ঘরের সংস্কৃতি কোনো জাতির জন্য কখনো শুভকর হয়নি। রাষ্ট্রের আগে আমাদের পরিবারেরও এই দায়কে অবশ্যই কাঁধে নিতে হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় না হলে রাষ্ট্রের দৃঢ়তা আসবে কোত্থেকে? গভীর ঘুমের মধ্যে আছে পুরো জাতি। এমন না হয় যেন ঘুম থেকে জেগে দেখি সব শেষ হয়ে গেছে আমাদের। আমরা হয়তো ভাবছি আমার সন্তান তো নেশাখোর নয়। আমি কেন ভাবব? সবার অজান্তেই কিন্তু সূচনা হয় মাদকের। ধীরে ধীরে পুরো পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অবশ করে দেয় এই মারণনেশা। ধ্বংসই যার একমাত্র পরিণতি।
লেখক : আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
malik.law.associates@hotmail.com

যুক্তরাজ্যে পার্লামেন্ট নির্বাচনে লড়বেন ৬ বাংলাদেশী ব্রিটিশ by আবদাল হোসেইন

২০১৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচন। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন ক্ষমতাসীন টোরি পার্টি নানা পরিকল্পনা আর পলিসির ঝুলি নিয়ে জনগণের দুয়ারে হানা দিচ্ছে, ঠিক একইভাবে বিরোধী লেবার পার্টিও নিজেদের নানা পরিকল্পনার কথা জনগণকে জানান দিচ্ছেন। বসে নেই ক্ষমতার আরো এক অংশীদার লিবডেমও। এই তিন দল এখন মরিয়া আগামীর নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসীনের জন্য। সেজন্য বিশ্বখ্যাত নির্বাচনী মাস্টার মাইন্ড এক্সেল রড, জিম ম্যাসিনা, লিনটন ক্রসবির মতো এডভাইজরদের মোটা অংকের বিনিময়ে হায়ার করে ব্রিটেনে নিয়ে এসেছেন তারা।

ব্রিটেন হলো বহু বর্ণের মিশ্রণে এক সমাজ, যেখানে প্রতিটি দেশের নানান বর্ণ আর মিশ্রণের মানুষ একত্রিত হয়ে বাস করলেও রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নমত ও পথের সমর্থক। বাংলাদেশি কমিউনিটির অবস্থান অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক শক্ত এক ভিতের উপর দাঁড়িয়ে। এখনকার বাঙালিদের এক বৃহৎ অংশই ব্রিটেনের মূলধারার রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আইন ও বিচার ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, সমাজনীতির সাথে মিলে মিশে ব্রিটিশ রাজনীতি, অর্থনীতি ও সোসাইটিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাঙালিদের পদচারণায় ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতিতে অভিষিক্ত হওয়া।
যখন এক ঝলক আলোকবর্তিকা দেখা দেয়, তখনি ব্রিটিশ সোসাইটির সবচাইতে প্রভাবশালী দ্য টাইমস আর লন্ডন ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড তাদের সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করে বসে, অদূর ভবিষ্যতে ব্রিটেন হয়তো কালোদের মধ্য হতে প্রধানমন্ত্রী পেয়েও যেতে পারে।
স্মরণ রাখা দরকার ২০১৫ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচন। কিন্তু এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনী তোড়জোড়। প্রধান দুই পার্টি লেবার ও ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ এবং মধ্যপন্থী লিবডেম তাদের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্টের প্রার্থী মনোনয়ন পেতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে তৃনমূলের পার্টির সক্রিয় কর্মীর, ক্যাম্পেইনার, লিফলেট বিতরণ, ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন, টেলিফোন ক্যাম্পেইন ইত্যাদি নানান কর্মসূচীর সাথে সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ থাকতে হয়। একইভাবে পার্টির ইলেক্টোরাল ভোটারদের ভোট ছাড়াও পার্টির সিলেকশন বোর্ডের কাছে নানান পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। একজন প্রার্থীর বহুমুখী প্রতিভার ও সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই এবং ব্রিটেনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পলিটিক্স, ফরেন পলিসি, ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই তিনি মনোনয়নের চূড়ান্ত টিকেট লাভ করেন। এখানে প্রার্থী মনোনয়নের জন্য টাকা, পেশী শক্তি, কোন ধরনের সুপারিশ অথবা পার্টি প্রধানের কাছের বা আস্থাভাজনের কোন দাম নেই। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আমাদের রোশনারা আলী অনেক আগেই নাম লিখিয়েছেন এবং বেশ সুনামের সাথেই তিনি কাজ করে চলেছেন। রোশনারার পথ ধরেই এবার ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে টিউলিপ সিদ্দিকী, ড. রূপা হক, মিনা রহমান, ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া, ফয়সাল চৌধুরী এমবিই চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন লাভ করেছেন।
সিলেটের বিশ্বনাথে জন্মগ্রহনকারী বাংলাদেশী বংশদ্ভুত ব্রিটিশ নাগরিক রোশনারা আলী মাত্র কিছুদিন আগেই শ্যাডো মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে যিনি সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিলেন, তিনি হলেন বর্তমান এমপি- আগামী ২০১৫ সালের নির্বাচনেও লেবার দলের প্রতিদ্বন্দ্বী রোশনারা আলী। রোশনারা একদিকে যেমন রাজনীতিবিদ, অন্যদিকে অনন্য এক সমাজকর্মী হিসেবেও নিজেকে সর্বদা নিবেদিত রেখেছেন। লন্ডনের ইস্ট এন্ডে বড় হওয়া রোশনারা স্কুল জীবন কেটেছে টাওয়ার হামলেটসের ম্যালবেরী গার্লস হাই স্কুলে, পড়েছেন বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ডে। সেখানে তিনি দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। পুঁথিগত বিদ্যা ও বাস্তবতার সমন্বয় করে তিনি বারা বেথনাল গ্রিন এবং বো এলাকার জনগণের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে, দেশ ও জনগণের কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে জড়িয়ে পড়েন লেবার পার্টিতে। সেখানে নিজের যোগ্যতা আর কর্ম অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ লেবার পার্টির টিকেট নিয়ে ২০১০ সালে সাধারণ নির্বাচনে বেথনাল গ্রিন-বো এলাকা থেকে বিপুল ভোটে প্রথম বাঙালি এমপি হিসেবে পার্লামেন্টে নিজের আসন পাকাপোক্ত করে নেন। এমপি হবার আগে, ২০০২ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রোশনারা কৃতিত্বের সাথে কাজ করেন হোম অফিসে টিম লিডার হিসেবে। সেখান থেকে তিনি যোগ দেন দ্য ইয়ং ফাউন্ডেশনে, এখানে তিনি এসোসিয়েট ডাইরেক্টর হিসেবে যোগ দেন ২০০৫ সালে এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। তারও আগে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ইনস্টিটিউট ফর দ্য পাবলিক পলিসি রিসার্চে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। উল্লেখ্য এটা অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা- যেকোনো গ্র্যাজুয়েট/পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের জন্য পাবলিক পলিসি রিসার্চ এ রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করা বিরাট সৌভাগ্যের। যেখানে নিজের কর্মদক্ষতা ছাড়াও অনেক জ্ঞানী-গুনীজনের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ ছাড়াও রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় যেমন অবগত হওয়া যায়, তেমনি অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং যাচাই-বাছাই ছাড়াও এগুলো বিশ্লেষণ এবং ইমপ্লিমেন্টেশনের প্রায়োজনীতা সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। নীতি-নির্ধারণী বিষয়, আইন-কানুন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, জনপ্রশাসনে জনকল্যাণের লক্ষ্যে কর্ম-পরিকল্পনা মূলত হাতে খড়ি এখান থেকেই তিনি শুরু করেন। তৎকালীন লেবার দলীয় নীতি-নির্ধারণী, কর্মী-সমর্থক আর নির্বাচকম-লী রোশনারার কর্মদক্ষতা আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় অভিভূত হয়ে তাকে বেথনাল-গ্রিন-বো এলাকায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য যথার্থই উপযুক্ত মনে করেছিলেন, ফলশ্রুতিতে আজকের ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এর তিনি প্রথম নির্বাচিত ব্রিটিশ বাংলাদেশি সদস্য।
মিনা রহমান তিনি খুব ছোটবেলায় প্রায় ২১ দিনের শিশু অবস্থায় বাবা মায়ের সাথে ব্রিটেনে আসেন। আদি জন্মস্থান সুনামগঞ্জের ছাতকের এক প্রত্যন্তÍ গ্রামে। ধীরে ধীরে ব্রিটেনের স্কুল জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেন- প্রায় সংগ্রামী এক নারীর মতোই। একদিকে সংসার জীবন অন্যদিকে ছেলে মেয়েদের মানুষ করা, তার উপর নিজের লেখা পড়ার খরচ যোগানোর জন্য এনএইচএসের চাকরি- এমন তেজোদীপ্ত স্বাবলম্বী এক বিদূষী বাঙালি রমণী। এভাবেই পড়া লেখার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন কনজারভেটিভের রাজনীতির সাথে। একমসময় ছিলেন কনজারভেটিভ দলের মুখপাত্রের মতো গুরুদায়িত্ব পালনের গৌরবের অধিকারী। বর্তমানে পূর্ব লন্ডনের একটি হাউজিং কোম্পানির ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন। লন্ডনের বার্কিং আসন থেকে আগামী ২০১৫ সালের নির্বাচনে তিনি কনজারভেটিভ দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি ২ কন্যা ও ২ পুত্রের জননী। তার স্বামী সিলেটের বাসদ রাজনীতির অন্যতম পুরোধা গয়াছুর রহমান গয়াছ। মিনা রহমানের এই তথ্যে সহায়তা করেছেন তার মিডিয়া অফিসার মতিয়ার চৌধুরী।
টিউলিপ সিদ্দিকী লেবার পার্টির ৯শ সদস্যদের ভোটাভুটিতে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে লন্ডনের হ্যাম্পস্ট্যাড এন্ড কিলবার্ন এলাকা থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকী মনোনয়ন লাভ করেন। ২০১০ সালে টিউলিপ প্রথম কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। বর্তমানে টিউলিপ সিদ্দিক ক্যামডেন বারার রিজেন্টস পার্ক ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং ক্যামডেন কাউন্সিলেরকমিউনিটিজ এন্ড কালচারাল ক্যাবিনেট মেম্বার। উচ্চশিক্ষিতা টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের মেরটন কাউন্সিলের মিটচাম এলাকায় ১৯৮২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ, ব্রুনাই, ভারত, সিঙ্গাপুর, স্পেন এ বাল্যকাল কাটিয়েছেন। পশ্চিম লন্ডন থেকে ১৯৮৮ সালে তিনি উত্তর লন্ডনে চলে আসেন এবং এ-লেভেল সম্পন্ন করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন থেকে ইংরেজি সাহিত্যের উপর আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রী এবং কিংস কলেজ অব লন্ডন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ২০১১ সালে তিনি পলিটিক্স, পলিসি এন্ড গভর্নমেন্টের উপর দ্বিতীয়বারের মতো মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফিলিপ গ্লাউড এসোসিয়েশটস, সেভ দ্যা চিলড্রেন, বেথনাল গ্রিন এন্ড বো আসনের সাবেক লেবার এমপি ওনা কিং, টুটিং এলাকার লেবার এমপি ও সাবেক মন্ত্রী সাদেক খান, লেইটন ওয়ানস্টেড এলাকার সাবেক লেবার এমপি হেরী কোহেনের সঙ্গে কাজ করেছেন।
ড. রূপা হক পুরো নাম রূপা আশা হক, পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সোসিওলজির শিক্ষক। শিক্ষকতা করছেন লন্ডনের কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে। এর আগে তিনি ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন। পিএইচডি করেছেন কালচারাল স্টাডিজের উপর। রূপা নিয়মিত গার্ডিয়ান, দ্য স্টেটসম্যান, ট্রাইবুনসহ নানা পত্রিকা ও জার্নালে কলাম লিখে থাকেন। তার বিখ্যাত বই বিয়ন্ড কালচার ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়, যা ২০০৭ সালে ফিলিপস আব্রাহাম মেমোরিয়াল প্রাইজের জন্য শর্ট লিষ্টেড হয়। রূপা হক ২০০৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভের সেইফ সিট বাকিংহাম শায়ারের চিজহাম-আমেরশাম সিটে শেরিল গিলানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। ২০১০ সালে তিনি লন্ডন বারা অব ইলিং এর ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আগামী ২০১৫ সালের সাধারণনির্বাচনে ইলিং সেন্ট্রাল ও একটন সংসদীয় আসন থেকে লেবার দলের পক্ষে পার্লামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য পার্টির চূড়ান্ত মনোনয়ন লাভ করেছেন। রূপা হকের আরো দুই বোন রয়েছে। সকলেই কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তার বড় বোন নোরা হক আর্কিটেক্ট। ছোট বোন কনি হক বিখ্যাত বিবিসি প্রোগ্রাম ব্লু পিটারের জনপ্রিয় উপস্থাপিকা।
ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া লেবার দল গত ৯ মার্চের বার্ষিক সভায় সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়াকে হ্যাটফিল্ড আসন থেকে আগামী ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে লড়ার জন্য মনোনীত করে। আনোয়ার বাবুল মিয়া পেশায় আইনজীবী। গ্রেটার লন্ডনের গ্রেট জেমস স্ট্রিট চেম্বার্সের নিয়মিত আইনজীবী,ইমিগ্রেশন ও মানবাধিকার আইনের উপর বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ বাংলাদেশি চেম্বার অব কমার্সের ডিরেক্টর। এছাড়াও ব্রিটিশ বাংলাদেশি প্র্যাক্টিসিং ব্যারিস্টার এসোসিয়েশনেরও প্রেসিডেন্ট তিনি। ২০১১ সালে ব্রিটিশ বাংলাদেশি হুদজ হোদর সেরা বাংলাদেশিদের তালিকায় ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল নিজের অবস্থান করে নিয়েছিলেন।
এডিনবারার বাংলাদেশী উজ্জ্বল তরুণ ব্যবসায়ী ফয়সল চৌধুরী বর্তমানে এডিনবারা এবং লোথিয়ানা রেইস ইক্যুয়ালিটি কাউন্সিলের চেয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পরপর তিনবার ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ এই কাউন্সিলের চেয়ারের দায়িত্ব পেয়েছেন। ফয়সল চৌধুরী ২০০৪ সালে তার সামাজিক অর্থনৈতিক কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক এমবিই খেতাব পান। এছাড়াও ব্রিটেনের প্রথম বাংলাদেশি কমিউনিটি চ্যানেল ‘চ্যানেল এস’ কর্তৃক কমিউনিটি এওয়ার্ডপান ২০০৬ সালে। তিনি বাংলাদেশী রেস্টুরেটার ইন স্কটল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট,বাংলাদেশ সমিতি এডিনবারার চেয়ারম্যান, কাউন্সিল অব বাংলাদেশিজ ইন স্কটল্যান্ড এর সাধারণ সম্পাদক, যুক্তরাজ্য নবীগঞ্জ এডুকেশন ট্রাস্টের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সাইক্লোন আপিল এবং ২০০৮ সাইক্লোন সিডর আপিলেও তার ভূমিকা ছিল। ফয়সল চৌধুরীর নেতৃত্বে ২০০৯ সালে প্রথমবারের মত স্কটল্যান্ডে এডিনবারা কাউন্সিল কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হয় এবং ঐদিন স্কটিশ পার্লামেন্টে এ নিয়ে একটি মোশন উত্থাপিত হয়।

প্রাণভিক্ষা চাইবেন না কামারুজ্জামান

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন না বলে জানিয়েছেন তার বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সরকার আমাদের প্রতি যদি ভদ্র আচরণ করতো, তবে হয়তো প্রাণভিক্ষার ব্যাপারে আবেদন করার একটা রাস্তা থাকত। বাবা প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন না।
ওয়ামী বলেন, সরকার যেখানে রায়ের রিভিউ আবেদনের সুযোগ দিচ্ছে না, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি প্রকাশ করার অপেক্ষা রাখছে না। সেখানে কীভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন তিনি। তিনি জানান, মঙ্গলবার সকালে বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য গাজীপুর কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ বলেছে, আজ ছুটির দিন, তাই দেখা করার কোন সুযোগ বিধান নেই। এর কিছুক্ষণ পর জানতে পারি, বাবাকে গাজীপুর কারাগার থেকে ঢাকায় নেয়া হচ্ছে। সরকার তড়িঘড়ি করে আমার বাবাকে হত্যা করতে চাইছে।

হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অস্থির সরকার, বুধবারও হরতাল : জামায়াত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এবং তিনিসহ জামায়াতের নেতাদের মুক্তির দাবিতে আগামীকাল বুধবার ভোর ৬টা থেকে শুক্রবার ভোর ৬টা পর্যন্ত আবার ৪৮ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি দিয়েছে জামায়াত। দলের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান গতকাল এক বিবৃৃতিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
জামায়াতের আমির মাওলানা নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়ার প্রতিবাদে এবং তার মুক্তি দাবিতে জামায়াতের পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার, রোববার ও গতকাল সোমবার দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। এ ছাড়া রোববার জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতে তার প্রতিবাদে এবং তার মুক্তির দাবিতে জামায়াত আগামী বৃহস্পতিবার হরতালের কর্মসূচি দিয়েছিল।
বিবৃতিতে জামায়াত নেতৃদ্বয় বলেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দকে হত্যা করার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে। ১৯৭১ সালে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। এ বয়সের একজন তরুণের বিরুদ্ধে সরকারের আনীত অভিযোগ কত গভীর ষড়যন্ত্রমূলক তা সবার কাছে স্পষ্ট। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে দেশবাসী হতাশ। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর মুহাম্মদ কামারুজ্জামান রিভিউ দায়ের করবেন। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলে তার রিভিউ গৃহীত হবে বলে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে হত্যার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে এবং এই মুহূর্তে তার মুক্তির দাবিতে জামায়াত ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার পবিত্র আশুরার দিন মুহাম্মদ কামারুজ্জামানসহ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে দেশব্যাপী দোয়ার অনুষ্ঠান এবং ৫ নভেম্বর বুধবার সকাল ৬টা থেকে ৭ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত দেশব্যাপী ৪৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি হরতালের আওতামুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

উড়ন্তর পর এবার ডুবন্ত গাড়ি

এবার পানির নিচেও চলবে গাড়ি। ‘সাবমেরিন স্পোর্টস কার’ নামের এই ডুবন্ত গাড়ি বাজারে আনতে চলেছে হ্যামশাল কেমার। কিছু দিন আগেই জানা গিয়েছিল উড়ন্ত গাড়ির কথা। এই গাড়ি রাস্তায় চলার পাশাপাশি আকাশে উড়তেও সক্ষম। তবে এবার এই ডুবন্ত গাড়ি চমকে দিয়েছে বিশ্বের গাড়ি বাজারকে। জেমস বন্ডের ছবি ‘দ্য স্পাই হু লাভড মি’ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই গাড়িটি তৈরি করা হয়েছে বলেই জানিয়েছে হ্যামশাল কেমার নামের সংস্থাটি। বৈদ্যুতিক মোটরচালিত এই গাড়ি রাস্তায় চলার পাশাপাশি পানির নিচে ঘণ্টায় ১২১ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম। গাড়িটির দাম ধার্য করা হয়েছে ২০ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৫ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা)। সূত্র : ইন্টারনেট।

২ হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার সন্ধান

দুই হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার খোঁজ মিলেছে উত্তর মেক্সিকান শহরে। টিয়োটিহকান ছিল ব্যস্ত শহর প্রাগ কলোম্বিয়া যুগে। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০ সালে মেক্সিকান সভ্যতার উত্থান হয়। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিয়োটিহকান ছিল মেক্সিকোর প্রাণকেন্দ্র। এখানে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। মনে করা হতো ওই সময় পৃথিবীর ষষ্ঠতম বড় শহর ছিল টিয়োটিহকান। সে ক্ষেত্রে এই খননকাজকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সার্জিও গোমেজ ও তার দল প্রায় ৩৪০ ফুট লম্বা গুহার শেষ প্রান্তে খননকাজ চালাচ্ছেন। উদ্ধার হয়েছে বিভিন্ন মূর্তি, দানা, মাটির পাত্র, সামুদ্রিক খোলক। সব থেকে বিস্ময়কর, ৫৯ ফুট ভেতরে পাওয়া গেছে প্লামড সার্পেন্টের মন্দির। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মনে করছেন, শহরে অভিজাত পরিবারের সমাধিক্ষেত্র হলো এই মন্দির। সূত্র : জি নিউজ।

হারানো মানিক ফিরল বুকে by শাহ আলম

২০১০ সালের ১৯ আগস্ট। রোজার মাস। আইসক্রিমবিক্রেতা শাহিন আলীর শুয়ে-বসে সময় কাটছিল ঘরে। স্বামী ও দুই সন্তান শারমিন (৮) ও নিশানকে (৫) ঘরে রেখে ছয় মাসের পুত্রসন্তান হজরতকে নিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়েন রেশমা খাতুন। অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ শেষে খাবার নিয়ে সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরে আসেন। কিন্তু বুকের মানিক শারমিন আর নিশানকে ঘরে পেলেন না। ইফতার না করেই স্বামী-স্ত্রী বেরিয়ে পড়েন ছেলেমেয়ের সন্ধানে। যে খাবারের জন্য এত সংগ্রাম, সেই খাবার পড়ে থাকে ঘরে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরাও পাগলের মতো খুঁজতে থাকে শারমিন ও নিশানকে। কিন্তু কোথাও সন্ধান নেই। এরপর একে একে চারটি বছর কেটে গেছে। নিখোঁজ দুই সন্তানকে সর্বক্ষণ খুঁজে বেড়ানো, মাজার-দরগায় গিয়ে মানত করা, পত্রপত্রিকায় খবর ছাপানো—কোনো কিছুই বাদ দেয়নি হতদরিদ্র পরিবারটি। অবশেষে গত রোববার এক নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে নিখোঁজ মেয়ে শারমিনের সন্ধান পান শাহিন ও রেশমা।
জমিজমা নেই। পরিবার নিয়ে বাস্তুহারা শাহিনের ১৫ বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাটকালুগঞ্জে বসবাস। দুই সন্তানকে হারিয়ে এত দিন যে ছোট্ট ঘরে ছিল শুধুই কান্না আর দীর্ঘশ্বাস, এখন সেই টিনের চাল ও মাটির দেয়ালঘেরা ঘরেই একটুখানি আনন্দ। যদিও নিখোঁজ নিশানের সন্ধান এখনো মেলেনি। পরিবার সূত্র জানায়, মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার খবর পেয়ে শাহিন ও রেশমা রোববার রাতেই বেরিয়ে পড়েন। ছুটে যান জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার ডাউকী ইউনিয়নের ডাউকী গ্রামের বাসিন্দা আনসার সদস্য আরমান আলীর বাড়িতে। মা-মেয়ে একে অপরকে দেখে চিনতে পারেন। আবেগে কেঁদে ফেলেন দুজনেই। এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শারমিনকে গতকাল সোমবার সকালে হাটকালুগঞ্জে নিয়ে আসা হয়। চার বছর পর হারানো মানিককে খুঁজে পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। স্বজন, প্রতিবেশীরা ভিড়তে থাকে শাহিন-রেশমার ঘরে। গতকাল সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, শৈশবের খেলার সাথি সানজিদা খাতুন (১২), ফরিদা খাতুন (১২) ও জামেলা খাতুনের (১১) সঙ্গে খেলছে শারমিন। তাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা তার বন্ধুরা।
শারমিন জানায়, ঘটনার দিন সে ও তার ভাই নিশান একই সঙ্গে ঘর থেকে বের হয়। দুজনেই হাঁটতে হাঁটতে তিন কিলোমিটার দূরে চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনে যায়। এরপর খেয়াল বশে সে ঢাকাগামী একটি বাসে চড়ে বসে। আর নিশান থেকে যায়। ঢাকায় পৌঁছে গাবতলী বাস টার্মিনালে কান্নাকাটি করলে সেখানে কর্মরত আনসার সদস্য আরমান আলীর নজরে আসে সে। পরে তিনিই শারমিনকে ঢাকার নিকেতনে তাঁর বাসায় নিয়ে যান। সেখানে এক মাস থাকার পর তাকে আরমানের গ্রামের বাড়ি ডাউকীতে পাঠানো হয়। আরমান আলীর দুই পুত্রসন্তান। তাঁর মেয়ে না থাকায় শারমিন মেয়ের আদরেই মানুষ হতে থাকে সেখানে। তাকে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয়। বর্তমানে ডাউকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। শারমিন জানায়, ছোট ভাই নিশানের বিষয়ে সে কিছুই জানে না। শারমিনের মা রেশমা জানান, তাঁর ননদ বুলবুলি খাতুনের বাড়ি আলমডাঙ্গার ডাউকী ইউনিয়নের বিনোদপুর গ্রামে। সেই সূত্রে লোক মারফত মেয়ের সন্ধান পেয়েছেন তিনি। শারমিনের বাবা শাহিন বলেন, ‘আল্লাহ মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ ছেলেকেও ফিরে পাব।’

এসআই জাহিদের বান্ধবী নিয়ে রাতযাপন : অস্ত্র ৯ দিনেও উদ্ধার হয়নি

পাবনা সদর থানার দারোগা এসআই মো: জাহিদুল ইসলাম কথিত বান্ধবীকে নিয়ে রাত্রিযাপন করতে গিয়ে আট রাউন্ড গুলি ভর্তি ম্যাগজিনসহ সরকারী অস্ত্র খোয়ানোর ৯ দিন পার হলেও এখনো তা উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনসহ সর্বত্র ব্যাপক তোলপাড় হচ্ছে। দোকানপাট, চায়ের দোকান, রেলষ্টেশনসহ সকলের মুখে এসআই জাহিদের পরকীয়া প্রেম ও সরকারি অস্ত্র খোয়ানোর ঘটনা। একইভাবে জাহিদ, তার কথিত প্রেমিক ও যে বাসাতে এ ঘটনা তার মালিক হেলথ ভিজিটর সাজেদা খাতুন রিনার জীবন কাহিনী নিয়েও নানা তথ্য বেড়িয়ে আসছে। পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রে থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বরখাস্তকৃত এসআই জাহিদুল ইসলাম বিবাহিত এবং ২ সন্তানের জনক। তার বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। সিরাজগঞ্জে কর্মরত থাকা অবস্থায় সিরাজগঞ্জ জেলার খোকশাবাড়ী ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা অফিসের হেলথ ভিজিটর ফরিদা খাতুনের (৩৫) সঙ্গে তার পরিণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এর আগে তারা প্রায়ই মিলিত হতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসআই জাহিদুল পাবনা সদরে বদলি হয়ে এলে পাবনায় তারা ওই বাসায় মিলিত হতেন। এরই ধারবাহিকতায় গত ২৭ অক্টোবর পাবনা শহরের শালগাড়িয়া টিবি হাসপাতালের পিছনের হেলথ ভিজিটর সাজেদা খাতুন রিনার বাসায় রাত যাপন করেন। এরই একপর্যায়ে ৮ রাউন্ড গুলি ভর্তি ম্যাগজিনসহ জাহিদুলের পিস্তলটি খোয়া যায়। ঘটনার দুই দিন পর ২৯ অক্টোবর বুধবার থানায় অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ বাড়ি ওয়ালার ছেলে এলাকার চিহিৃত সন্ত্রাসী কাজী সালাউদ্দিন সুজন (২৮) ও কথিত বান্ধবী ফরিদাকে (২৫) আটক করে থানায় দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জেল হাজতে পাঠানো হয়। এসআই জাহিদুলের কথিত বান্ধবী ফরিদা ইয়াসমিন সিরাজগঞ্জ শহরের সোনালী ব্যাংকের অফিসার শহিদুল ইসলামের স্ত্রী। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।

এলাকাবাসী ও পুলিশ জানায়, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত সাজেদা খাতুন রিনার বাসায় প্রায়ই অসামাজিক কাজ হয়ে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এলাকার সকল সমাজবিরোধী এবং মাদক ব্যবসায়ীরা রাতে ওই বাড়িতে আড্ডা দেন। কোনো কোনো পুলিশ অফিসার ওই বাড়িতে রাত কাটায় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার অনেকে জানায়। এর আগে ওই রিনা খাতুনের বেশ কয়েকটি বিয়ে হয়। কিন্তু নানা কারণে কোনটিই টেকেনি। সর্বশেষ তার বর্তমান স্বামী ফরিদপুরে নদী গবেষণা অফিসে কর্মরত কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। রিনার ছেলে কাজী সালাউদ্দিন ওরফে সুজন চিহিৃত সন্ত্রাসী। সে হত্যা, চাঁদাবাজী, নারী নির্যাতনসহ বহু মামলার আসামি বলে থানার রেকর্ড থেকে জানা যায়।
পাবনা শহরের শালগাড়িয়া এলাকার কয়েকজন কথিত গডফাদারের আশ্রয় প্রশয়ে সুজন ও তার মা রিনা এ সব অপকর্ম করতেন বলে পুলিশ জানায়। পাবনা থানার এসআই নাজমুল সাংবাদিকদের জানান, একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন উঠতি নেতা ওই বাড়িতে অসামাজিক কাজ করতেন। সুজনের মাধ্যমে তাদের হাতে এই অস্ত্রটি চলে যেতে পারে। এ ছাড়া ওই সব নেতাদের নির্দেশে সুজন এর আগে বেশ কয়েকটি অপকর্ম করে বলে পুলিশ জানায়। গ্রেফতারকৃত কাজী সালাউদ্দিন সুজনের মা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত সাজেদা খাতুন রিনা বলেন, ‘একই বিভাগে চাকরি করার সুবাদে সিরাজগঞ্জ পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত ফরিদা ইয়াসমিনের সাথে ৫ বছর পূর্বে আমার পরিচয় হয়। ২৭ অক্টোবর সোমবার রাত ৯টার দিকে স্বামীসহ ফরিদা আমার বাসায় আসে এবং তারা দুজন একসঙ্গে রাত কাটায়। সকালে ফরিদার স্বামী জানায় তার পিস্তল হারিয়ে গেছে।’
পাবনা সদর থানার এসআই জাহিদ অন্য নারীর সাথে রাত কাটানোর সময় অস্ত্র হারানোর বিষয়টি জানাজানি হলে শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এদিকে ৯ দিনেও পিস্তলটি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এ মামলার তদন্তকারী অফিসার ও পাবনা সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো: বদরূদ্দোজা জানান, এসআই জাহিদের কাছ থেকে আট রাউন্ড গুলি ভর্তি ম্যাগজিনসহ খোয়া যাওয়া সরকারি  অস্ত্রটি উদ্ধারের জোর চেষ্টা চলছে।

মুসার অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদক

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)  শীর্ষ অস্ত্র ব্যবসায়ী ও ড্যাটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে। সোমবার কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক মীর  মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীকে এ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুন মাসে বিজনেস এশিয়া নামের একটি ম্যাগাজিনে মুসা বিন শমসেরকে নিয়ে  প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এ অনুসন্ধানের  সিদ্ধান্ত নেয় হয়। ওই ম্যাগাজিনে এ ব্যবসায়ীর জবানিতে তার জীবনযাত্রা, আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি নানা বিষয় উল্লেখ করা হয়। ম্যাগাজিনে তার সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করা হয় সাত বিলিয়ন ডলার (৫৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা প্রায়)। এ প্রসঙ্গে দুদক কমিশনার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ”প্পু বলেন, প্রতিবেদনে মুসা বিন শমসের তার আয়, আয়ের উৎস, জীবনযাপনের কথা যেভাবে  প্রকাশিত হয়েছে, তা দুদকের অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তাই এই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দুদক সূত্র আরও জানায়, ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, মুসা বিন শমসেরের সম্পত্তি প্রায় ১২ বিলিয়ন ইউএস ডলারের বেশি। তিনি অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। পাশাপাশি ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে অনুদান দিতে চেয়ে আলোচনায় উঠে আসেন। লেবার পার্টির টনি ব্লেয়ার নির্বাচনী  প্রচারণা চালানোর জন্য তার পাঁচ মিলিয়ন ডলার অনুদান অবশ্য প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এ উপমহাদেশে  মুসা  শীর্ষ স্থানীয় বর্ণাঢ্য ব্যক্তি যিনি এক বিলিয়ন পাউন্ড উপার্জন করেছেন ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান ও  ক্ষেপণাস্ত্র  বেচাকেনার ব্যবসা করে।  সম্প্রতি প্রিন্স মুসার জন্মদিন পালিত হয়েছে। ওই সময় এক বিবৃতিতেও তাকে  বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র ব্যবসায়ী বলে দাবি করা হয় তার পক্ষ থেকে। সূত্র আরও জানায়, ২০১১ সালের ২৪শে জুন ড. মুসা বিন শমসেরের ব্যাংক হিসাব তলব করেছিল  কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে তার নো ইউর কাস্টমার (কেওয়াইসি) ফর্মের সব তথ্য জানতে  চেয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময়  কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাত কার্যদিবসের মধ্যে ড. মুসার সব ব্যাংকের স্থায়ী, চলতি, সঞ্চয়ী, ডিপিএস, এসপিডিএস, এফডিআর বা অন্য কোন পদ্ধতিতে হিসাব পরিচালিত হয়েছে বা হচ্ছে কি না, সে সম্পর্কে তথ্যসহ হিসাব খোলার দিন থেকে হালনাগাদ হিসাব বিবরণী দাখিল করতে তফসিলিভুক্ত ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল। দুদকের নির্দেশ আমলে নিয়ে  কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রিন্স মুসার হিসাব তলব করলেও পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

বদি বরণে ১০০০ গাড়ির শোডাউন, ২ শতাধিক তোরণ

বরের মতই বরণ করা হলো কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) এর বহুল আলোচিত সরকার দলীয় এমপি আবদুর রহমান বদিকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় ১৮ দিন কারাভোগ শেষে গত ৩০ অক্টোবর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আজ কক্সবাজার আসেন তিনি। তাকে বরণ করতে  বিশাল গাড়ীর বহর নিয়ে বিমানবন্দরে উপস্থিত হন দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। প্রায় ১০০০ গাড়ীর বিশাল বহর নিয়ে বিমানবন্দরে উপস্থিত হন কর্মী-সমর্থকরা। এসময় বিমানবন্দরে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন এমপি বদি। বলেন, সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে তিনি জনতার মাঝে ফিরে এসেছেন। সেখান থেকে রওনা দেন  নিজের বাড়ী টেকনাফের দিকে। পথিমধ্যে উখিয়ার মরিচ্যা, উখিয়ার সদর ষ্টেশন, পালংখালী ষ্টেশন, টেকনাফের হ্নীলা ও টেকনাফ ষ্টেশনে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখেন। আর তার এই আগমনকে কেন্দ্র করে পথে পথে তৈরী করা হয় ২ শতাধিক তোরণ।  কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের উখিয়া-টেকনাফের অংশের ৬০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরী করা হয় এসব তোরণ। উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আদিলউদ্দিন চৌধুরী জানান, এমপি বদিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উখিয়ার বিভিন্ন অংশে দলীয়ভাবে প্রায় ১০০টি তোরণ ও ৫টি মঞ্চ তৈরী করা হয়েছে। এছাড়া অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও তোরণ তৈরী করেছেন। তিনি জানান, উখিয়ার আওয়ামীলীগ নেতারা নিজ নিজ এলাকায় রাস্তায় অবস্থান করে এমপি বদিকে অভ্যর্থনা জানান। বদির সম্মানে টেকনাফেও শতাধিক তোরণ তৈরী করা হয়েছে।। টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি অধ্যাপক  মোহাম্মদ আলী জানান, গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা উখিয়া সফরে এসে দলীয় জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে (শেখ হাসিনাকে) স্বাগত জানিয়ে তখন উখিয়া-টেকনাফে এত তোরণ হয়নি।

বাংলাদেশে বিরামহীন মৃত্যুদণ্ডাদেশ গভীর উদ্বেগজনক : অ্যামনেস্টি

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে অব্যাহত মৃত্যুদণ্ডাদেশ গভীর উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছে। মৃত্যৃদণ্ড বাতিল করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অবিলম্বে ফাঁসির ওপর স্থগিতাদেশ আরোপের আহ্বানও জানিয়েছে সংগঠনটি। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখার প্রেক্ষাপটে অ্যামনেস্টি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই আহ্বান জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টির বাংলাদেশ গবেষক আব্বাস ফয়েজ বলেন, বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অব্যাহতভাবে আরোপ করা গভীর উদ্বেগজনক। গত মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার ৯ মাস বিরতির পর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তিনটি ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হলো। অ্যামনেস্টি বলে, বাংলাদেশকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অবিলম্বে ফাঁসির ওপর স্থগিতাদেশ আরোপ করতে হবে এবং এটা নিশ্চিত করতে হবে যে বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না।
আব্বাস ফয়েজ বলেন, ফাঁসি স্বাধীনতা যুদ্ধের শিকার লাখ লাখ লোকের জন্য ন্যায়বিচার বয়ে আনার বদলে কেবল সহিংসতার স্থায়ী চক্রই সৃষ্টি করবে। অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ২ নভেম্বর আরেক জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এর আগে ২৯ অক্টোবর জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীকেও মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়।
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইসিটি যে ১২টি আদেশ দিয়েছে, তার সবই বিরোধী দলের সদস্যদের (প্রধানত জামায়াতে ইসলামীর সাথে সম্পৃক্তদের) বিরুদ্ধে। এগুলোর মধ্যে ৯টি মৃত্যুদণ্ডাদেশ। অ্যামনেস্টি জানায়, সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ রিভিউ আবেদন করতে পারে। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য এর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ায় রিভিউ আবেদন করার অধিকার দৃশ্যত থাকছে না। অ্যামনেস্টি জানায়, এখন পর্যন্ত ১৪০টি দেশ মৃত্যুদণ্ড আইনগতভাবে বা প্রথা হিসেবে বাতিল করেছে। যে মাত্র ৯টি দেশ ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ফাঁসি কার্যকর করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অ্যামনেস্টি সবক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে।

জলে পেতেছেন শয্যা by দীপক আহমেদ

হামাগুঁড়ি দেয়া অবুজ শিশু নাছিমাকে যখন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তার খোঁজে বাড়ির মানুষ যখন পাগল প্রায়, তখন খবর আসে বাড়ির পাশে পুকুরের পানিতে জলকেলীতে ব্যস্ত সে। ৪৩ বছর আগের সেই দৃশ্য শুধু নাছিমার বাড়ির মানুষকেই নয়, পাড়া-প্রতিবেশীদেরও অবাক করেছিল। দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়েছিল উপস্থিত সবার। সেদিন সেই অবুজ শিশু নাছিমাকে নিয়ে এলাকায় হৈ চৈ পড়ে যায়। তাকে দেখতে মানুষের ভিড় বাড়ে নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলা সদরের চিকনমাটি গ্রামের পল্টন পাড়ায়। তাকে নিয়ে নানা কল্প কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। সেকি মানুষরূপী অন্যকিছু, নাকি দেবদেবী। হাঁটি হাঁটি পা পা করে শিশু নাছিমা কৈশোরে পা দেয়। সরকারি চাকুরে পিতা আরব আলী মেয়েকে সাঁতার শেখানোর জন্য কলাগাছের ভেলা বানিয়ে পুকুরের শান্ত জলে নামিয়ে দিতো। কি তাজ্জব ব্যাপার! নাছিমা পানিতে ভেসে আসে একাকী। ভেলা ছাড়াই কখনও চিৎ হয়ে কখনও উপুড় হয়ে কোন নড়াচড়া না করেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরের জলে ভেসে থাকছে নাছিমা। এভাবে দিন মাস বছর পেরিয়ে কেটে গেছে অনেকটা সময়। সেদিনের সেই নাছিমা আজ ৪৩ বছরে পড়েছে। তার কোলজুড়ে আসা ২ ছেলে আর ৩ মেয়ের সংসারেও এসেছে ৪ ছেলে মেয়ে। কিন্তু নাছিমা বেগম আজও পুকুরের জলে সাঁতার কাটেন। একাকী পুকুরের জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে থাকেন। পুকুরের পানি কাঁপে না। পুকুরও জানে না কে আমার ওপর শয্যা পেতেছে। তার এই জলকেলি দেখতে আশপাশের গ্রামের এমনকি দূরদূরান্তের নানা বয়সী মানুষ প্রতিদিন আসেন। নাছিমাও কোন রাখঢাক না করেই বাড়ির পাশের পুকুরে চিৎ হয়ে ভেসে থাকার ম্যাজিক দেখান সবাইকে। এ নিয়ে নাছিমা জানান, তিনি নিজেও জানেন না কিভাবে পুকুরের গভীর জলে ভেসে থাকেন। তিনি একটানা সারাদিন পুকুরের পানিতে ভেসে থাকতে পারবেন বলেও জানান। আর এই ভেসে থাকাটাকে তিনি প্রকৃতির দান বলে মনে করেন। আর এই জলকেলীতে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তার ব্যবসায়ী স্বামী সেলিম রেজা।

হামলার দায় স্বীকার দুই সংগঠনের

ওয়াগাহ সীমান্ত তোরণে গতকাল সতর্ক পাহারায় ভারতীয়
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক সদস্য।ছবি: এএফপি
পাকিস্তানের ওয়াগাহ সীমান্তে গত রোববারের আত্মঘাতী হামলায় ৬০ জন নিহত হওয়ার পর ওই সীমান্ত দিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। তবে তিনদিনের জন্য স্থগিত করার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত গতকাল সোমবার দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রথাগত জমকালো কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিকে পাকিস্তানের কট্টরপন্থী সংগঠন জানদাল্লাহ এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সহযোগী সংগঠন জামাত-উল-আহরার পৃথকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। খবর রয়টার্স, এনডিটিভি ও ডনের। আত্মঘাতী হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল সোমবার সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলসংলগ্ন এলাকা থেকে গতকাল আরও বিস্ফোরক ও আত্মঘাতী হামলা চালানোর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসবাদী কাজ’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন তিনি। চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের একমাত্র পাঞ্জাবের ওয়াগাহ সীমান্তেই প্রতিদিন বর্ণাঢ্য সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশের হাজারো মানুষ প্রতিদিন ওই আয়োজন দেখতে যান। বোমা হামলার পর পর উভয় পক্ষ কুচকাচওয়াজ তিনদিনের জন্য বন্ধে সম্মত হয়। শেষ পর্যন্ত কুচকাওয়াজ সত্যিই বন্ধ থাকলে তা হতো ১৯৭১ সালের পর প্রথমবারের মতো স্থগিত করার ঘটনা। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পাকিস্তানের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কুচকাওয়াজসহ পতাকা নামানোর অনুষ্ঠান স্থগিত করতে সম্মত হয়েছিল। তবে গতকাল উভয় দেশের বেশ কিছুসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ওয়াগাহ সীমান্তের দুই দেশের শুল্ক কর্মকর্তারা জানান, হামলার পর পর বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। আরও দুই দিন তা বন্ধ থাকতে পারে। দুই দেশেই সীমান্ত ক্রসিংয়ে ফল, সবজি ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে শত শত ট্রাক আটকে রয়েছে। তবে আত্মঘাতী হামলা সত্ত্বেও লাহোর-দিল্লি বাস চলাচল অব্যাহত রয়েছে। দিল্লি পরিবহন করপোরেশনের (ডিটিসি) মুখপাত্র আরএস মিনহাজ আইএএনএসকে বলেন, ‘বাস চলাচল স্থগিত করার বিষয়ে সরকারি কোনো নির্দেশনা পাইনি। সোমবার সকালে দিল্লি থেকে বাস যথাসময় লাহোরের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।’ রোববার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে ভারত-পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমারেখা থেকে পাকিস্তানের ৫০০ মিটার ভেতরে ভয়াবহ ওই আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে।
এতে হতাহতদের বেশির ভাগই কুচকাওয়াজ দেখে বাড়ি ফিরছিলেন। হামলায় শতাধিক মানুষ আহত হয়। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক মুশতাক সুখেরার বরাত দিয়ে ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানায়, এটা আত্মঘাতী হামলা। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, অল্প বয়সী একজন তরুণ এই হামলা চালিয়েছে। হতাহতদের বেশির ভাগ বেসামরিক লোক। নিহতদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষী বাহিনী পাকিস্তান রেঞ্জার্সের সদস্য। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতের টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভি জানায়, আত্মঘাতী হামলার আশঙ্কায় ১৫ দিন আগে সীমান্তসংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে দেওয়া হয়। সতর্ক বার্তা পেয়ে উভয় দেশই নিরাপত্তা জোরদার করেছিল। পাকিস্তানের বিস্ফোরক নিস্ক্রিয়করণ স্কোয়াডের একজন সদস্যের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে আট কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া বোমা তৈরির সরঞ্জাম বল, বিয়ারিং ও আত্মঘাতী হামলার পোশাক উদ্ধার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার নিন্দা জানিয়ে হতাহতদের পরিবার ও পাকিস্তান সরকারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

দুই অঙ্গরাজ্যে দ্বিতীয় দফা ভোট হবে?

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবন l ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মার্কিন আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটের নির্বাচনই বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে—এমনটা আগেই আভাস পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, লুইজিয়ানা ও জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে দুইয়ের বেশি প্রার্থী থাকায় দ্বিতীয় দফায় ভোটের প্রয়োজন হতে পারে। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের। নিয়ম অনুযায়ী প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশ না পেলে কোনো প্রার্থীকেই জয়ী ঘোষণা করা হবে না।
সে ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীদের নিয়ে দ্বিতীয় দফায় আবার ভোট নেওয়া হয়। জর্জিয়ায় ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী মিশেল নানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডেভিড পারডিউ। এখানে আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন উদারপন্থী প্রার্থী আমান্ডা সফোর্ড। এই অঙ্গরাজ্যে ভোটারদের মধ্যে সফোর্ডের বেশ প্রভাব রয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, তিন প্রার্থীর সমর্থন খুবই কাছাকাছি। তাই বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, আজকের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের মধ্যে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট কোনো প্রার্থীই নাও পেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ৬ জানুয়ারি আবার ভোটের প্রয়োজন হবে। জর্জিয়ার রিপাবলিকান নেতা চিপ লেক বলেন, ‘এই অঙ্গরাজ্যে এর আগে কখনোই এতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি।’ লুইজিয়ানায় ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর প্রার্থী মেরি এল. ল্যান্ডরিউয়ের বিপরীতে আছেন রিপাবলিকান প্রার্থী বিল ক্যাসিডি। এখানে আরেক রিপাবলিকান নেতা রব ম্যানেসও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিমানবাহিনীর সাবেক কর্নেল ম্যানেসের প্রতি কট্টরপন্থী রিপাবলিকানদের ‘টি পার্টির’ সমর্থন রয়েছে। সমর্থনকারীদের মধ্যে আছেন ২০০৮ সালে রিপাবলিকান পার্টি মনোনীত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সারাহ পেলিন। এসব সমর্থকের কারণেই ম্যানেসের বাক্সে ভালোই ভোট পড়বে।
আর এ কারণেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, কোনো প্রার্থীই জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভোট পাবেন না। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, আজকের নির্বাচনে এই দুটি অঙ্গরাজ্যের সিনেটর নির্বাচন চূড়ান্ত না হলে কেন্দ্রে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তাও ঝুলে থাকতে পারে। সিনেটে ১০০ আসনের মধ্যে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্রেটিক পার্টির ৫৩ ও বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টির ৪৫ আসন রয়েছে। অন্য দুটি আসনে স্বতন্ত্র সিনেটর। কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে চলছে নানা ধরনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নিম্নমুখী জনপ্রিয়তার কারণে এ নির্বাচনের হাওয়া মোটের ওপর রিপাবলিকানদের অনুকূলে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের ৩৬ আসনে ভোট হচ্ছে। এ ছাড়া পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫ আসনের সবগুলোতে এবং ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদের জন্য ভোট হবে। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২৩৩ ও ডেমোক্র্যাটদের ১৯৯ আসন রয়েছে। এখানে তিনটি আসন শূন্য রয়েছে।

‘কিস অফ লাভ’ নিয়ে ভারতে সংঘাত

ধর্মীয় সংকীর্ণতা যে শুধু ইসলামিক স্টেট বা ইরানের মোল্লাতন্ত্রের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়, তা ভারতের হিন্দু ও মুসলিম সংগঠনগুলি মনে করিয়ে দিল। দক্ষিণের কেরালা রাজ্যে চলছে এই নিয়ে ঘাত-প্রতিঘাত। কেরালা রাজ্যে সাক্ষরতার হার শতকরা একশোভাগ। গডস ওন কান্ট্রি হিসেবে পরিচিত এই রাজ্যে বিশ্বের প্রায় সব ধর্মই প্রাচীনকাল থেকে উপস্থিত। সেই রাজ্যেই ধর্মীয় সংগঠনগুলির এমন তা-বের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বৈকি। ঘটনার সূত্রপাত ভারতীয় যুব মোর্চা নামের এক সংগঠনের এক হামলার ঘটনা থেকে। অনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ করতে গত সপ্তাহে তারা একটি হোটেলের কফি শপ-এ হামলা চালিয়েছিল। সেখানে নাকি প্রকাশ্যে চুম্বন খাওয়া হচ্ছিল। সেই ঘটনার ভিডিও প্রচার করে একটি স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল। তারই প্রতিবাদে কিস অফ লাভ নামের এক প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়েছে। এই সমাবেশের নাম রাখা হয়েছে কিস কার্নিভাল। প্রকাশ্যে যুবক-যুবতীরা চুমু খেয়ে স্বঘোষিত নীতিবাগীশদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখাচ্ছেন। এক প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের ছবি সহ টুইটার ব্যবহারকারী দেবদত্ত পট্টনায়েক লিখেছেন, যারা এই আন্দোলনের বিরোধী, তারা আসলে প্রত্যাখ্যাত, লজ্জিত। তাদের হৃদয় ভেঙে গেছে, ভালোবাসা পায়নি এবং ক্ষুব্ধ। নিজেদের তারা মরাল বলে মনে করে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যদিও সেই পাতাটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতের ফার্স্টপোস্ট অনলাইন সংবাদপত্র টুইটারে লিখেছে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও মরাল পুলিশ পুলিশ অনুমতি না দেওয়া সত্ত্বেও প্রতিবাদ চলছে। রবিবারও পুলিশ প্রায় ৫০ জন প্রতিবাদকারীকে আটক করে মনোরমা অনলাইন সংবাদপত্র পুলিশ ভ্যানের মধ্যে চুম্বনরত অ্যাক্টিভিস্টদের ছবি প্রকাশ করেছে। কিস অফ লাভ-এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে একাধিক হিন্দু ও মুসলিম সংগঠন। তাদের মতে, এর ফলে রাজ্যে যৌন অরাজকতা সৃষ্টি হবে। শিবসেনা দলের কর্মীদের হিংসাত্মক তা-ব ছিল দেখার মতো। তারা এই প্রচেষ্টাকে লাভ জিহাদ-এর অঙ্গ হিসেবে তুলে ধরছে। ভারতীয় যুব মোর্চা ছাড়াও সংঘ পরিবারের সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ এবং বজরং দল তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। মুসলিম সংগঠনগুলির মধ্যে রয়েছে সুন্নি সংগঠন এসওয়াইএস এবং সোশ্যাল ডেমক্র্যাটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া। তারা সবাই নিজেদের অ্যান্টি কিস বা চুম্বন-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরছে। এমন প্রেক্ষাপটে স্কুপহুপ লিখেছে, ভারতে প্রকাশ্যে প্রস্রাব করা চলে, কিন্তু চুমু খাওয়া ঠিক নয়!

মুখ্যমন্ত্রীর আসন ইকোনমি ক্লাসে

বিমানের কম দামের টিকিটের শ্রেণি ‘ইকোনমি ক্লাসে’ ভ্রমণ করে সাধারণ যাত্রীদের অবাক করে দিলেন ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি বিমানবন্দর থেকে গত রোববার বিকেলে তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে নাগপুরে যান। বলা হয়েছে, রাজ্যের ওপর তিন লাখ কোটি রুপি ঋণের বোঝা থাকায় এই কৃচ্ছ্রসাধনের পথ বেছে নেন মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবিশ। ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, মন্ত্রী যে শুধু ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণ করেছেন, তা নয়; নিজেরসহ সবার টিকিট কেটেছেন পকেটের টাকায়।
এ ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর সহযাত্রীরা উচ্ছ্বসিত। সঞ্জয় পান্ডে নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মহারাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা প্রথম। এর আগে কোনোদিনই কোনো মুখ্যমন্ত্রী এভাবে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে একই ক্লাসে যাত্রা করেননি। আর নিজের টাকায় টিকিট কেনা তো দূরের কথা।’ সম্প্রতি কেন্দ্রীয়ভাবে কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি নির্দেশনা জারি করেন। এতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আমলাদের প্রথম শ্রেণিতে ভ্রমণ ও পাঁচতারা হোটেলে সরকারি অনুষ্ঠান আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

ঘুষ দুর্নীতির বরপুত্র ছাতকের ওসি শাহজালাল by হাবিব সরোয়ার আজাদ

সুনামগঞ্জের শিল্পনগরী ও প্রবাসী অধ্যুষিত ছাতক থানা এখন ঘুষ-বাণিজ্য, লুটপাট আর হয়রানির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মামলার ফাঁদে ফেলে থানার ওসি (অফিসার ইনচার্জ) ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে লুটে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। ঘুষের টাকায় অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা ওসি শাহজালাল মুন্সীর নানা অপকর্মের বিবরণসহ ইতিমধ্যে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তদবির করে দ্বিতীয়বারের মতো ছাতক থানায় যোগদান করেই ওসি শাহজালাল মুন্সী নিয়মিত মাসোয়ারা দিয়ে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। প্রবাসী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অনৈতিক সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজচক্র, গরুচোর সিন্ডিকেটসহ থানায় আসা মামলার তদবিরবাজ দালালদের সঙ্গে অচিরেই গাঁটছড়া বেঁধে ফেলেন। মামলা রুজু, তদন্ত, চার্জশিট দেয়া, চার্জশিট থেকে আসামির নাম বাদ দেয়া, মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া, গ্রেফতার বাণিজ্য থেকে শুরু করে নানা উপায়ে ইতিমধ্যে বেপরোয়া ঘুষ-বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার গ্রেফতার বাণিজ্য থেকে রেহাই পায়নি এক মা ও তার কিশোরী কন্যাও। সাজানো চাঁদাবাজির মামলায় ওসির গ্রেফতার বাণিজ্যের জালে গ্রেফতার হয়ে মা-বাবা ও দুই ভাইয়ের সঙ্গে শনিবার থেকে জেলা কারাগারে আটক রয়েছে ওই কিশোরী।

ছাতক প্রেস ক্লাবে শনিবার সন্ধ্যায় উপজেলা চেয়ারম্যান ওলিউর রহমান চৌধুরী বকুল এক সংবাদ সম্মেলনে ওসির এমন বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরেন। লিখিত বক্তব্যে উপজেলা চেয়ারম্যান জানান, লন্ডন প্রবাসী একটি পরিবারের কাছ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে এক মামলায় এক কিশোরীসহ একই পরিবারের নিরীহ ৫ জনকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করে ওসি তার নির্লজ্জ ঘুষ বাণিজ্যের জানান দিয়েছেন সর্বমহলে। ক্ষমতার এমন অপব্যবহারের ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ছাতকের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন। উপজেলার জাউয়াবাজার ইউনিয়নের দেবেরগাঁও গ্রামের বয়োবৃদ্ধ ঈমান আলী, তার কিশোরী কন্যা ও স্ত্রী-পুত্রসহ পরিবারের ৫ জনকে চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণের ঘটনা জন্ম দিয়েছে নানা রহস্য। ওসি মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে ঈমান আলীর বসতভিটা দখল করার উদ্দেশ্যে এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাসরত ঈমান আলী ও তার পরিবারকে শুক্রবার বিকালে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তালা লাগিয়ে দেয়ার পর তাদের গ্রেফতার করা হয়। ওসি শাহজালাল মুন্সী তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই ঈমান আলীর পরিবারের প্রতি চরম অমানবিক আচরণ করেছেন। ওসির এহেন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে উপজেলাবাসী। ওসির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিত বক্তব্যে প্রশ্ন রাখেন, ঈমান আলীর বসতভিটা নিয়ে আদালতে মামলা চলা অবস্থায় কোন ক্ষমতা বলে ওসি শাহজালাল মুন্সী বিনা তদন্তে বসতঘর তালাবদ্ধ করে তাদের গ্রেফতার করলেন। যে মামলায় এক কিশোরী কন্যাসহ একই পরিবারের ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই মামলার অভিযোগপত্র পাঠ করলে ওসি শাহজালাল মুন্সী কতটুকু নির্লজ্জ ও অমানবিক তা অনুধাবন করা যাবে বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন উপজেলা চেয়ারম্যান।
লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ওয়ারেন্টভুক্ত গরুচোর ধরতে আইনশৃংখলা কমিটির সভায় বলা হলেও এসব বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে ওসি তার ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। মামলা রুজু ও তদন্তের বিষয়ে ওসি নিজেই থানা ভবনের পেছনে তার কোয়ার্টারে একটি বিশাল বাণিজ্যের দোকান খুলে বসেছেন বলে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আলোচিত মুক্তিযোদ্ধার পুত্র রাকিব আলী হত্যা মামলায় ঘুষ না দেয়ার কারণে থানায় অভিযোগ গ্রহণ করেননি ওসি শাহজালাল মুন্সী। তার এহেন কর্মকাণ্ডে সাধারণ জনগণের কাছে সরকার ও পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন উপজেলা চেয়ারম্যান ওলিউর রহমান চৌধুরী বকুল। ওসির বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ অসংখ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। ওসির বিরুদ্ধে খোদ ছাতক থানায় কর্মরত অনেক পুলিশ সদস্যও ক্ষুব্ধ। ওসির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সায় না দেয়ায় ইতিপূর্বে ছাতক থানা থেকে যখন-তখন বদলি হয়ে যেতে হয়েছে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কনস্টেবলকে। বর্তমানেও যারা রয়েছেন তারাও ওসির ভয়ে তটস্থ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের শাসনামলে তদবির করে শাহজালাল মুন্সী ছাতক থানার ওসি হিসেবে বদলি হয়ে আসেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই শুরু হয়ে যায় তার বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তাকে ২০১২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জেলা পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়। পরে বিশ্বনাথ থানায় ওসি (তদন্ত) হিসেবে তাকে বদলি করা হয়। মাত্র ৪ মাসের ব্যবধানে ২০১৩ সালের ১২ জানুয়ারি আবারও তদবির করে ওসি হিসেবে ছাতক থানায় বদলি হয়ে আসেন শাহজালাল মুন্সী। এরপরই সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। পুনরায় ছাতক থানায় যোগ দেয়ার পর ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শাহজালাল মুন্সী থানায় যোগদানের পর রেকর্ড হওয়া এবং ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া, মামলার চার্জশিট থেকে আসামির নাম বাদ দেয়াসহ সব মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হলে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল তার বক্তব্যে দাবি করেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে ওসি শাহজালাল মুন্সীর বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

ভারতে অভিনব প্রতিবাদ হাজারো মানুষের চুমু

নৈতিকতার নামে প্রেমিক-প্রেমিকা বা প্রণয়ী দম্পতিদের ওপর জুলুম চালানোর প্রতিবাদে ভারতের কেরালা রাজ্যের শহর কোচিতে হাজার হাজার নারী-পুরুষ গতকাল প্রকাশ্যে ‘ভালবাসার চুম্বনে’ আবদ্ধ হয়েছেন। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। এতে আরও বলা হয়, অভূতপূর্ব এ ইভেন্টের নামকরণ করা হয়েছে ‘কিস অব লাভ’,  যাতে রোববার সন্ধ্যায় কোচির মেরিন ড্রাইভে প্রণয়ীরা পরস্পরকে চুমু খেয়েছেন একে অন্যের হাত ছুঁয়ে। অন্য কোনভাবে ভালবাসার প্রকাশ দেখিয়েছেন। কয়েক দিন আগে কোঝিকোড়ের একটি ক্যাফেতে যুবক-যুবতীরা অশালীন কাজকর্ম চালাচ্ছে- এই অভিযোগে সেখানে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। অভিযোগ করা হয়েছে, দেশের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির যুব শাখা ভারতীয় যুব জনতা মোর্চার সদস্যরাই এই হামলার পেছনে ছিল। কোচির সমুদ্রতটে চুমুর এই অভিনব আয়োজনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ভারতের নামজাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইটি মুম্বইয়ের একদল ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাও অনুরূপ প্রয়াশে সামিল হন। কেরালা রাজ্যের পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, তারা কোচিতে কিস অব লাভ ইভেন্টের জন্য কোন অনুমতি দেয়নি। বস্তুত কয়েক দিন ধরেই ফেসবুক বা টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়াতে ‘কিস অব লাভে’ সামিল হওয়ার জন্য তুমুল প্রচার চালানো হয়েছে। কোঝিকোড়ের ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর সূত্রেই কিস অব লাভ ইভেন্টের অবতারণা, যার উদ্যোক্তোরা বলছেন- ভালবাসার ওপর জুলুম ঠেকাতেই তারা এই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন। কিস অব লাভ ইভেন্ট নিয়ে কেরালার রাজনৈতিক বিতর্কও তুঙ্গে উঠেছে। কেউ কেউ একে সমর্থন জানালেও অনেকেই এর বিরোধিতাও করছেন।

বাঘের হুঙ্কার শুনছে জিম্বাবুয়ে by রাশিদুল ইসলাম

খুলনায় এসে এবার টাইগারদের আক্রমণের শিকার হবে জিম্বাবুয়ে। লাকি ভেন্যুতে সুন্দরবনের টাইগাররা জিতবেই। কোনভাবেই বাঘের থাবা থেকে রক্ষা পাবে না জিম্বাবুয়ে। খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে দ্বিতীয় টেস্ট দেখতে আসা দর্শকরা গ্যালারিতে বসে চিৎকার করে তাদের অনুভূতি এভাবে প্রকাশ করেন। একে অপরকে বলতে থাকেন ওরা বাঘ দেখেছে, কিন্তু হুঙ্কার তো শোনেনি। এবার বুঝতে পারবে বাঘের গর্জন কাকে বলে।
স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়: খুলনার আবু নাসের স্টেডিয়ামে কোন ওয়ানডে ম্যাচ হচ্ছে না। হচ্ছে পাঁচ দিনের আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ। কিন্তু তাতে কি? দর্শকদের উপস্থিতি এতটুকুও কমতি ছিল না। গ্যালারি ছিল দর্শকে টইটমু্বর। তবে দর্শকদের অধিকাংশই ছিল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। কড়া রোদও দর্শকদের উল্লাস থামাতে পারেনি। কিন্তু মাত্র ৭ ওভারে দলীয় ৬ রানের মাথায় ব্যক্তিগত ২ রানে এলটন চিগুম্বরার বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন শামসুর রহমান শুভ। শুভ আউট হলে গ্যালারিতে নীরবতা নেমে আসে। শুভর জায়গায় মোমিনুল হক ব্যাটিংয়ে নামলে বাংলাদেশের খেলায় ছন্দ ফিরে আসে। সেই সঙ্গে প্রাণ ফিরে পায় দর্শকরা।

গ্যালারিতে টাইগার: খুলনার মাঠে খেলা হচ্ছে, আর এই স্টেডিয়ামে বাঘ থাকবে না, তা কি করে হয়! খুলনার সুন্দরবন তো বাঘের কারণেই বিশ্ববিখ্যাত। সুন্দরবনে বিচরণ করছে শৌর্য-বীর্যের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই সুন্দরবন থেকে মাত্র কিছু দূরে অবস্থান খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম। সে কারণে দর্শকরা জীবন্ত বাঘ না আনতে পারলেও ‘হাতে তৈরি বাঘ’ আনতে মোটেও ভুল করেনি। এই তৈরি বাঘও ছিল শিল্পীর নিপুণ হাতে তৈরি। যা খেলা দেখার পাশাপাশি দর্শকদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। এই তৈরি বাঘ নিয়ে কড়া রোদ উপেক্ষা করে খেলা দেখেছে খুলনা পাবলিক কলেজের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র শাদমান। তার মাথায় ছিল জাতীয় পতাকা সংবলিত স্টিকার ও দু’ গালে ছিল বাঘের প্রতিকৃতি। শুধু শিশু শাদমানই নয়, রাজধানীর মালিবাগ আর ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলা থেকে খেলা দেখতে এসেছেন ফাহিমুল হক টাইগার মিলন ও মেহের আলী। সারা শরীরে বাঘের ছবি অঙ্কিত অবস্থায় খেলা দেখেছেন তারা। উৎসুক দর্শকদের কৌতূহলী চোখও ছিল তাদের দিকে।
টিকিটের জন্য বিক্ষোভ: ম্যাচের দুই দিন আগেই টিকিট বিক্রি শুরু হয় খুলনায়। তারপরও শত শত ক্রিকেটভক্ত টিকিট সংগ্রহ করতে পারেনি। অনেকে আশায় ছিলেন তারা ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে  স্টেডিয়ামের কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু তার কোন ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যায়। আবার অনেককে টিকিট না  পেয়ে স্টেডিয়াম সংলগ্ন খান-এ-সবুর রোডে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়।
স্টেডিয়ামের গেটে হাতি: স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকের সামনে সকাল থেকে দুইটি হাতি দেখা যায়। এই হাতি দেখতেও দর্শকদের উৎসাহের কমতি ছিল না। বিশেষ করে স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে এ উৎসাহ ছিল আরো বেশি। অনেক দর্শকই ক্যামেরা দিয়ে হাতির সঙ্গে ছবি তুলেছেন। এ সময় অনেককেই বলতে শোনা যায়, খেলা দেখার সঙ্গে বাড়তি হাতি দেখাও হলো। আবার অনেকে মন্তব্য করেন স্টেডিয়ামের ভেতরে আছে টাইগার আর বাইরে হাতি। এ যে সোনায় সোহাগা।
প্রমীলাদের ভিড়: টেস্ট ম্যাচ দেখতে যে শুধু কিশোর-কিশোরীরাই ভিড় করেনি, প্রমীলা দর্শকদের ভিড়ও ছিল লক্ষণীয়। প্রায় সব গ্যালারিতেই কিশোরীদের পাশাপাশি রমণীদের ভিড় ছিল যথেষ্ট। অনেকেই ভাই-বন্ধুদের দিয়ে খেলা দেখার জন্য টিকিট সংগ্রহ করেছেন। আবার অনেকে সরাসরি নিজেই টিকিট কিনেছেন।
খুলনা সিটি কলেজের ছাত্রী শারমিন আক্তার টুম্পা জানালেন, তিনি ক্রিকেটের ভক্ত। তাই টিকিট কেনার জন্য আগেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কাঙিক্ষত টিকিটও তিনি পেয়েছেন। সকাল নয়টার আগেই তিনি স্টেডিয়ামে হাজির হন। মায়ের সঙ্গে স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসেন নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির খুলনা ক্যাম্পাসের এমবিএ’র ছাত্রী ফারিয়া পিংকি। পিংকি জানান, খুলনায় টেস্ট ম্যাচ হবে শুনেই মা-বাবার কাছে আবদার ছিল খেলা দেখার। অনেক কষ্টের  পর  রোববার মধ্য রাতে আমরা দুটি টিকিট কিনতে পেরেছি। আজ  (গতকাল সোমবার) মাকে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছি।

৫ মিনিটে সূর্যের ১,৫০০ ছবি তুলবে নাসার মহাকাশযান

মাত্র ৫ মিনিটে ১ হাজার ৫০০ ছবি তুলতে সক্ষম একটি মহাকাশযান আজ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা। প্রতি সেকেন্ডে ৫টি ছবি তুলতে সক্ষম যানটি। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমূহের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে এ নভোযানটি। র‌্যাপিড অ্যাকুইজিশন ইমেজিং স্পেক্টোগ্রাফ এক্সপেরিমেন্ট (আরএআইএসই) মিশনটি সূর্যের সবচেয়ে সক্রিয় এলাকাসমূহের কাছে এক সেকেন্ডের বিভিন্ন ভাগে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো ঘটে, সেগুলো বিশেষভাবে ক্যামেরায় ধারণ করবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আইএএনএস। নাসার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ এলাকাগুলোয় তীব্র ও জটিল চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে, যা সূর্যে বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাত সৃষ্টি করতে পারে। শক্তিশালী এ চৌম্বকক্ষেত্রগুলো থেকে সবদিকেই শক্তি ও কণিকা প্রবল বেগে বিচ্ছুরিত হয়। মিশনটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে, সূর্য নিয়ে গবেষণায় বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের ল্যাস ক্রুসেস অঞ্চলের কাছে অবস্থিত হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জ থেকে ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড সময় দুপুর ২টা ৭ মিনিটে মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে নাসার।

৫ মিনিটে সূর্যের ১,৫০০ ছবি তুলবে নাসার মহাকাশযান

মাত্র ৫ মিনিটে ১ হাজার ৫০০ ছবি তুলতে সক্ষম একটি মহাকাশযান আজ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা। প্রতি সেকেন্ডে ৫টি ছবি তুলতে সক্ষম যানটি। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমূহের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে এ নভোযানটি। র‌্যাপিড অ্যাকুইজিশন ইমেজিং স্পেক্টোগ্রাফ এক্সপেরিমেন্ট (আরএআইএসই) মিশনটি সূর্যের সবচেয়ে সক্রিয় এলাকাসমূহের কাছে এক সেকেন্ডের বিভিন্ন ভাগে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো ঘটে, সেগুলো বিশেষভাবে ক্যামেরায় ধারণ করবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আইএএনএস। নাসার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ এলাকাগুলোয় তীব্র ও জটিল চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে, যা সূর্যে বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাত সৃষ্টি করতে পারে। শক্তিশালী এ চৌম্বকক্ষেত্রগুলো থেকে সবদিকেই শক্তি ও কণিকা প্রবল বেগে বিচ্ছুরিত হয়। মিশনটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে, সূর্য নিয়ে গবেষণায় বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের ল্যাস ক্রুসেস অঞ্চলের কাছে অবস্থিত হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জ থেকে ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড সময় দুপুর ২টা ৭ মিনিটে মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে নাসার।

উত্তর ধূরুংয়ে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১১ ঘর ভস্মিভূত : ক্ষতি দেড় কোটি by হাছান কুতুবী

কুতুবদিয়ায় এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১১ বসতঘর সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উপজেলা সদর থেকে ১৬ কি.মি. দূর্ঘম এলাকা উত্তর ধূরুংয়ের জহিজ্যার পাড়া মিয়া মাতবরের ফজুবাপের বাড়ীতে সোমবার রাত দেড়টায় সংঘটিত অগ্নিকান্ডে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, আসবাবপত্র, জীবন্ত ছাগল, হাঁস-মুরগী ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শিরা জানিয়েছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্তরা হলেন মাওলানা জাকের হোছাইন, আখতার হোছাইন, সাবেক ইউপি মেম্বার নুর মুহাম্মদ, মুহাম্মদ রিদোয়ান, মাওলানা নুরুল আলম, মাষ্টার নুরুল আমিন, রমিজ আহমদ, নাছির উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, আব্বাছ উদ্দিন ও রিনা আখতার।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বাঁশের বেড়ায় টিনসেট এক বিশাল বাড়ীতে প্রথম ৬ পরিবার ও অপর টিনসেট কাঁচাবাড়ীতে ৫ পরিবার বসবাস করেন। আগুন লাগার ধরণ থেকে কেবা কারা শত্রুতাবসত এ ধব্বংশাত্বক কাজটি করেছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। বহু টাকার ফিশিংবোটের জাল, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার পুড়ে যাওয়ায় নির্বাক দেখা গেছে জাকের ও তার ভাই আখতারকে। ইউএনও মমিনুর রশিদ, ভাইস চেয়ারম্যান হুমায়ুন হায়দার, কুতুবদিয়া বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান শাহরিয়ার চৌধূরী, ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজদৌল্লাহ, ফিরোজ খাঁন চৌধূরী, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হাছান কুতুবী, আ.লীগ ও বিএনপি নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা করেন বলে স্থানিয় মেম্বার নুরুন্ নবী জানিয়েছেন।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

আটচল্লিশ
বাংলার লোকধর্ম একটি নির্দিষ্ট কাঠামো পেল আর্যদের আগমনের পর। আর্যরা ধর্মগ্রন্থ বেদ নিয়ে প্রবেশ করেছিল। বেদ নির্দেশিত তাদের ধর্ম বৈদিক ধর্ম নামে প্রতিষ্ঠা পায়। বৈদিক ধর্ম বাংলায় প্রবেশ করেছিল অনেকটা বিলম্বে। কারণ আর্যরা ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারতে প্রবেশ করে। পাঞ্জাব ও আশপাশের অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তৃত হয়। বাংলার স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতিরোধে প্রায় দেড় শতক বাংলায় প্রবেশ করতে পারেনি তারা। বাংলার উত্তরাঞ্চল ভারতীয় মৌর্য রাজাদের অধিকারে আসার সূত্রে তারা বাংলায় প্রবেশ করে। বাংলায় আর্য অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হলেও শুরুতে আর্য ধর্ম প্রবলভাবে জেঁকে বসতে পারেনি। বৈদিক ধর্মের নামাবরণে আদি ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ভারতে প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে আর্য আগমনের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই। তিন শতকে পূর্ব-ভারতে গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলায় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ক্রমে তার অবস্থান শক্ত করে নেয়। তবে ইতিমধ্যে তার ধরন-ধারণে কিছু রূপান্তর এসেছিল। বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চেয়ে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণ্য ধর্মে পৌরাণিক ধর্মের আচরণই ছিল স্পষ্ট। কিন্তু পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বাংলা সুস্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মচিন্তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে। এ পথ ধরেই বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আজীবিক, জৈন ও বৌদ্ধধর্ম।
খ্রিস্টপূর্ব ছয় থেকে চার শতকের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সংস্কারবাদী চেতনা লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় ধর্মের ইতিহাসে এই কালপর্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ সময় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়। ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের একাধিপত্য আর কেউ মানতে চাচ্ছিল না। ক্ষমতাধর বৈদিক ব্রাহ্মণরা যাগযজ্ঞের নামে নানাভাবে করারোপ করে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল। এ প্রেক্ষাপটে বৈদিক ধর্মের দার্শনিক গ্রন্থ ‘উপনিষদ’ মানুষের সামনে প্রকাশিত হয়। উপনিষদের মুক্তচিন্তা নিপীড়িত জনগণকে আলোড়িত করে। ফলে যাগযজ্ঞ আর পশুবলিতে মানুষের আগ্রহ কমে যায়। ধর্মীয় চিন্তায় সাধারণ মানুষের মর্যাদা বাড়তে থাকে। এর ভেতর থেকে ভক্তিবাদী আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই ভক্তিবাদী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য থাকলেও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি।
এ প্রেক্ষাপটের ভেতর থেকেই পূর্ব-ভারতে ধর্মক্ষেত্রে একটি ভিন্ন আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যা সরাসরি প্রভাব ফেলে বাংলার ধর্মচিন্তায়। নতুন চিন্তার অনুসারীরা বৈদিক ধর্মের অনেক কিছুই অস্বীকার করে। বেদের দর্শন সব ক্ষেত্রেই তারা গ্রহণ করেনি। তারা সমাজে পুরোহিতদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে। ধর্মীয় যজ্ঞ হিসেবে পশুবলি, রক্তপাত ইত্যাদি ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে। ঈশ্বর সম্পর্কেও তারা হয়ে পড়ে নীরব। এই নতুন ধর্ম-দর্শনের অনুসারীদের প্রধান নীতি ছিল সৎকর্মের মধ্য দিয়ে অহিংস নীতি প্রতিষ্ঠা করা। এভাবে ধর্মক্ষেত্রে যে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তার অনুপ্রেরণা ছিল উপনিষদ। উপনিষদ জীবনের মৌল সমস্যা সম্পর্কে মানুষকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। তাই অনেক রক্ষণশীল বৈদিক ধ্যান-ধারণা তারা মেনে নিতে পারেননি। বৈদিক ধর্ম মূলত জটিল আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকলাপ ও যাগযজ্ঞের বিধানে পূর্ণ ছিল। এসব অনুষ্ঠান ক্রমে মানুষের কাছে অযৌক্তিক মনে হতে থাকে। এই আধ্যাত্মিক আলোড়নের ভেতর থেকেই আজীবিক, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিল।

চট্টগ্রামে সব টেন্ডার ছাত্রলীগ-যুবলীগের by নাসির উদ্দিন রকি ও আহমেদ মুসা

চট্টগ্রামের একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামধারী ক্যাডাররা। এসব ক্যাডারের ভয়ে তটস্থ থাকেন সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা। এতে প্রকৃত ঠিকাদাররা থাকেন অসহায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামে টেন্ডার সন্ত্রাসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দিদারুল আলম দিদার, মহানগর যুবলীগ নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান দিদার, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদের, মহানগর ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আলম মিয়া, সাইফুল আলম লিমন এবং ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মহিউদ্দিন সোহেল। তারা রেলওয়ে, পিডিবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিটি কর্পোরেশন ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিসহ বিভিন্ন দফতরে স্থানীয় গ্র“পগুলোকে টেন্ডার সন্ত্রাসে সহায়তা করে থাকে। এদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় রয়েছে একাধিক মামলা। আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদের সম্প্রতি একটি মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
সিটি কর্পোরেশন: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াটি জিম্মি করে রেখেছে ক্ষমতাসীন দলের একটি সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটকে সহায়তা করছে কর্পোরেশনের তিন ক্ষমতাধর কাউন্সিলর। কর্পোরেশনে তালিকাভুক্ত ২৩শ’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে চসিকে টেন্ডারবিহীন যেসব কাজ হয় তা নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে ভাগবাটোয়ারা করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারকে চসিক ঠিকাদার সমিতির সভাপতি ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু জানান, চসিকে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও অনেক সমস্যা রয়েছে। তবে অন্যান্য স্থানে যে রকম টেন্ডার সন্ত্রাস চলছে এখানে তুলনামূলকভাবে সমস্যা কম হচ্ছে। প্রধান নর্বাহী কর্মকর্তা আলী আহমেদ জানান, টেন্ডার সন্ত্রাস চসিকে অনেক কম। বন গবেষণা ইন্সটিটিউট: সম্প্র্রতি ৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ে তুলকালামকাণ্ড ঘটিয়েছে ছাত্রলীগ নামধারী ক্যাডাররা। তাদের বাধায় টেন্ডারে কেউ অংশ নিতে পারেনি। জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলের আওতায় সিমেন্ট বন্ডেড পার্টিকেল বোর্ড কারখানা নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্পটির টেন্ডার জমা দিতে না পারায় পুরো প্রকল্পটি এখন বন গবেষণা ইন্সটিটিউটের হাতছাড়া। নিচু অঞ্চলে লোকজনের বাড়িঘর বন্যার হাত থেকে রক্ষায় সিমেন্ট বন্ডেড পার্টিকেল বোর্ড কারখানা নির্মাণ সংক্রান্ত এ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। নগরীর কালুরঘাটে বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের জায়গায় এ কারখানা স্থাপনের কথা ছিল। তবে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের ভয়ে ওই প্রকল্পে কেউ টেন্ডার জমা দিতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের সাবেক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে এখানে টেন্ডার সন্ত্রাস চলছে বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছে। তবে তিনি বন গবেষণা ইন্সটিটিউটে ঠিকাদারি করেন না বলে দাবি করেন। কর্মকর্তারা জানান, বন গবেষণা ইন্সটিটিউটের ছোটখাটো সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্রলীগ নামধারী ক্যাডাররা। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, বন গবেষণা ইন্সটিটিউটে কাজ তেমন একটা হয় না। যেগুলো হয় তা কম টাকায় ছোট প্রকল্প। জলবায়ু ফান্ডের আওতায় প্রায় ৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ঝামেলার কারণে হয়নি। পরে কাজটি বাতিল হয়ে যায়।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল: রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রাম কার্যালয়ের বেশিরভাগ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামধারী চারটি গ্র“প। এসব গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মহানগর যুবলীগের সদস্য হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, ছাত্রলীগের সাইফুল আলম লিমন, অজয় ও অসীম। তারা পূর্বাঞ্চল রেল কার্যালয়ে ফোর স্টার হিসেবে পরিচিত। তাদের সঙ্গে আঁতাত না করে কেউ টেন্ডারে কাজ পেয়েছে এমন নজির গত ৬ বছরে সিআরবিতে ঘটেনি। প্রতি কাজের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ টাকাই তাদের দিয়ে দিতে হয়। আর তা না হলে কাজ পাওয়া তো দূরে থাক টেন্ডারের শিডিউলও জমা দিতে পারেন না সাধারণ ঠিকাদাররা। এসব ক্যাডার বাহিনীর সঙ্গে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা জড়িত থাকারও অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোনো ঠিকাদার টেন্ডার ফরম সংগ্রহ করলে কিংবা জমা দেয়ার চেষ্টা করলে তা মোবাইল ফোনে সন্ত্রাসীদের অবহিত করে দেন রেলের কতিপয় কর্মকর্তা। আগামী ৮ নভেম্বর প্রধান প্রকৌশলীর দফতর এবং ১২ নভেম্বর সিসিএম দফতর থেকে আরও কয়েকটি উন্নয়ন কাজের টেন্ডার জমা দানের শেষদিন রয়েছে। ওইসব টেন্ডার নিয়ে ভাগিয়ে নিতে সন্ত্রাসীরা সংশ্লিষ্ট দফতরের সামনে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। পূর্বাঞ্চল রেলে তালিকাভুক্ত প্রায় এক হাজারের বেশি ঠিকাদার রয়েছে। কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দিদারুল আলম দিদার জানান, আমি কোনো প্রকার টেন্ডার সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নই। রেলে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করেন হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। প্রতিটি কাজে তাকে ১০ শতাংশ করে টাকা দিতে হয় বলে শুনেছি। এ প্রসঙ্গে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর জানান, রেলে টেন্ডারের সঙ্গে আমি কখনও জাড়িত ছিলাম না, এখনও নই। এগুলো মানুষের অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাই জানান, চট্টগ্রামে কাজ করাটা খুব কষ্টকর। আমি নতুন এসেছি। তারপরও এখানকার টেন্ডার নিয়ে পুরনো ইতিহাস অন কর্মকর্তাদের কাছে শুনেছি।
চট্টগ্রাম পলিটেকনিক: চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে টেন্ডার সন্ত্রাস এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন কাজের যে কোনো টেন্ডারকে ঘিরে বিবধমান গ্রুপগুলোর মধ্যে প্রায় সময় ঘটছে সহিংস ঘটনা। টেন্ডার সন্ত্রাসের মূল হোতা ছাত্রলীগ নেতা শামীম। বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। শামীম কারাগারে থাকলেও তার অনুসারী আবদুল্লাহ, মাসুদ ও শরীফসহ আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে টেন্ডার সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি চলছে। এছাড়া পলিটেকনিক ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন নামে অপর এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট টেন্ডার সন্ত্রাসে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মহিউদ্দিন দাবি করেন, আমি ঠিকাদারি করলেও পলিটেকনিকে টেন্ডার নিয়ে কখনও মারামারি করিনি। পলিটেকনিক ক্যাম্পাসে আজ পর্যন্ত টেন্ডার নিয়ে কোনো মারামারি হয়নি। যা হয়েছে তা আধিপত্য বিস্তার নিয়ে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন: কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিেিটডে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের পাশাপাশি রয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ক’জন নেতাও। এ প্রতিষ্ঠানে ২শ’ তালিকাভুক্ত ঠিকাদার রয়েছেন। এর মধ্যে উন্নয়ন কাজ পায় হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সাধারণ ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় টেন্ডার সিন্ডিকেটের মধ্যে জড়িত রয়েছেন মুজিব, খোরশেদ, ফারুক, জসিম উদ্দিন, মাকসুদুর রহমান ও সেলিম উদ্দিন। কাজ তারা করুক কিংবা বাইরের অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করুক তাদের দিতে হয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করে কমিশন। এ প্রসঙ্গে মাকসুদুর রহমান জানান, আমি দীর্ঘদিন ধরে সিবিএর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। কোনো সময়ে টেন্ডারবাজিতে জড়িত ছিলাম না, এখনও নই।
অভিযুক্তদের বক্তব্য: মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল আলম মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেন্ডারের বিষয়ে কোনো কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করে বন্ধ পাওয়ায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু জানান, টেন্ডার, চাঁদাবাজিতে ছাত্রলীগ জড়িত নয়। ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ এসব করছে। ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে থাকার প্রমাণ মিলে তাহলে নিয়ম অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।