Saturday, April 12, 2014

সাজ হওয়া চাই মানানসই by শর্মী চক্রবর্তী

খোঁপায় লাল গোলাপ। কপালে লাল টকটকে টিপ। হাতে চুড়ি। লাল-সাদার শাড়ি। এমনটাই ছিল বাঙালির চিরন্তন বৈশাখী সাজ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাজেও এসেছে নতুনত্ব। এখন আর লাল-সাদায় সীমাবদ্ধ নেই বৈশাখ। বৈশাখী সাজে এসেছে নতুন মাত্রা। প্রাচ্য এবং পাশ্চত্যের মিশেল। কেউ হয়তো একেবারে ভিন্ন রঙের পোশাক পরে কপালের টিপ হাতের চুড়িতে রাখছেন লাল।

ত্রিমুখী চাপে এরশাদ by নিয়াজ মাহমুদ

দলে দুই পক্ষের বিপরীত অবস্থান, সরকারের কৌশলী পরামর্শ। এই ত্রিমুখী চাপে অসহায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। চাপ আর কৌশলে মার খেয়ে কোথাও নেই তিনি। সর্বশেষ হঠাৎ পার্টির মহাসচিব পরিবর্তন করার মধ্য দিয়ে তার অসহায়ত্বই ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন পার্টির ত্যাগী নেতাকর্মীরা। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় বিভেদ আর বিক্তক্তি দলটি খাদের কিনারে দাঁড় করায়।

হিলারিকে জুতা নিক্ষেপ

লাস ভেগাসে গত বৃহস্পতিবার এক নারী
জুতা ছুড়ে মারলে নিজেকে বাঁচাতে
একদিকে সরে যান হিলারি। এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে লক্ষ্য করে একজন নারী জুতা ছুড়ে মেরেছেন। তবে হিলারি নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় জুতা তাঁর গায়ে লাগেনি। গত বৃহস্পতিবার লাস ভেগাসে এক অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। গোয়েন্দা সংস্থার মুখপাত্র জর্জ অগিলভিয়ে বলেন, জুতা নিক্ষেপকারী ওই নারী বিনা টিকিটে ম্যান্ডেলা বে হোটেলের ওই সম্মেলনে ঢুকে পড়েছিলেন। গোয়েন্দা সদস্য ও হোটেলের নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁর দিকে এগিয়ে গেলে তিনি হিলারিকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করেন। এ ঘটনার পরই ওই নারীকে আটক করা হয়।
দ্য লাস ভেগাস রিভিউ-জার্নাল-এর এক খবরে বলা হয়, হিলারি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ায় জুতাটি তাঁর গায়ে লাগেনি। বিষয়টি নিয়ে হিলারি পরে রসিকতা করেন এবং বক্তব্য চালিয়ে যান। মঞ্চে দাঁড়ানো হিলারি অতিথিদের উদ্দেশে বলেন, ‘কেউ কি আমার দিকে কিছু ছুড়ে মারছেন?’ ধাতু পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে ওই সম্মেলনে অন্তত এক হাজার অতিথি ছিলেন। রয়টার্স।

সুচিত্রায় ভর করে জিততে পারবেন মুনমুন?

বাঁকুরায় সমাবেশে মুনমন সেন ষ ভাস্কর মুখার্জি
মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের একমাত্র মেয়ে তিনি। ৬০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগু, মারাঠি, কন্নড়, মালায়ালম ভাষার সিনেমায় ছিল তাঁর সমান বিচরণ। টিভি সিরিয়ালেও দেখা গেছে। কিন্তু কখনো রাজনীতিতে আসেননি। মায়ের মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই তাঁর রাজনীতিতে আবির্ভাব। তিনি মুনমুন সেন। মমতার হাত ধরে সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিতে আসেন মুনমুন। তিনি সিপিএমের ঘাঁটি বলে পরিচিত বাঁকুড়া লোকসভা আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী। তাঁর বিপক্ষে আছেন সিপিএমের বর্তমান সাংসদ বাসুদেব আচারিয়া, বিজেপির সুভাষ সরকার ও কংগ্রেসের নীল মাধব গুপ্ত। মুনমুন নির্বাচনী প্রচারণায় মূল হাতিয়ার করেছেন মা সুচিত্রা সেনকে। সব কর্মিসভা আর সমাবেশে তাঁর একটি কথা, ‘আপনারা যদি মহানায়িকাকে ভালোবাসেন, তবে আমাদের প্রিয় মুখ্যমন্ত্রী ও নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি ভোট দেবেন। আপনাদের সুখে-দুঃখে থাকব।’ গত বুধবার মুনমুন বাঁকুড়ার হীরাবাঁধ এলাকায় একটি কর্মিসভা করেন।
সেখানে বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী মুনমুনকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে বলে, ‘সিনেমা ও টিভিতে আপনাকে দেখেছি। এবার সামনাসামনি দেখে আমরা ধন্য।’ মুনমুন যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই তাঁকে দেখতে মানুষ ভিড় করছেন। তিনি জয়ের ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী। বুধবার ওই এলাকায় ঘুরে দেখা গেল, জনগণ মুনমুনের ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত। এক দল বলছে, এবার তারা নতুন মুখ দেখতে চায়। আরেক দল বলছে, বাসুদেব আচারিয়া ভূমিপুত্র। বিপদে-আপদে তাঁকে পাশে পাওয়া যায়। মুনমুনকে কি সেভাবে পাওয়া যাবে? এক ভোটার তো বলেই ফেললেন, ‘এই তো কাগজে দেখলাম, তিনি তাঁর ফোন সাইলেন্ট করে রাখেন। সাধারণত ধরেন না। বাড়িতে গেলেও কি তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে?’ মুনমুনকে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বাঁকুড়ার সর্বত্র। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, সিপিএমের দুর্দিনের কারণে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলে জয়ী হতে পারেন মুনমুন। তবে রাজ্যে মমতাবিরোধী হাওয়া বইছে। ফলে বিজেপি ও কংগ্রেস উল্লেখযোগ্য হারে ভোট টানলে বাসুদেব আবার লোকসভায় যেতে পারেন। এখন দেখার বিষয়, মুনমুন বাম ঘাঁটিতে কতটা আঘাত করতে পারবেন।

বেশি ভোট পরিবর্তনের ইঙ্গিত?

বিভিন্ন রাজ্যে ভোট পড়ার হিসাব
দিনের শুরু যদি সারা দিনের পূর্বাভাস হয়; তাহলে বলতেই হবে, ভারতের এবারের নির্বাচন আগের অনেক ভোটের শতাংশের হিসাবকে ছাপিয়ে যাবে। এবার বিপুল ভোট পড়ার রহস্য কী এবং তাতে কাদের লাভ, তা নিয়েই শুরু হয়ে গেছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। গত বৃহস্পতিবার তৃতীয় দফায় দেশের ১৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সর্বত্রই ভোটের হার অনেক বেশি। শুধু বেশিই নয়, কোনো কোনো রাজ্যে ৫-৬ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ভোট পড়েছে। নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার রাতে প্রদত্ত ভোটের যে হার জানিয়েছে, চূড়ান্ত গণনার পর তা আরও কিছুটা বাড়বে। সব সময়েই তা হয়। কারণ, সারির শেষ ব্যক্তিটির ভোটদান পর্যন্ত অপেক্ষা করা জরুরি। তা ছাড়া ডাকের ব্যালটের হিসাবও হয় পরে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, দিল্লিতে সাত কেন্দ্রের ভোটের হার ৬৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। শেষ হিসাবে এই সংখ্যা ৬৬ শতাংশে যেতে পারে। যদি নাও বাড়ে, এই হার ১৯৮৪ সালের প্রদত্ত ভোটের হারের প্রায় সমান। ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পর দিল্লিতে ভোট পড়েছিল ৬৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অবশ্য রাজধানীতে ১৯৭৭ সালে সবচেয়ে বেশি ৭১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে যে দুবার বেশি ভোট পড়েছে, দুবারই মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। ১৯৭১ সালে কংগ্রেসকে পাল্টে জনতা দলের সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, ১৯৮৪ সালের ভোটে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল ইন্দিরার চিতার ওপর দিয়ে। গত ডিসেম্বরে দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট পড়েছিল ৬৭ শতাংশের মতো। সেবারও কিন্তু বেশি ভোট দেওয়ার মাধ্যমে দিল্লির মানুষ কংগ্রেসকে ছেড়ে আম আদমি পার্টিকে (এএপি) সমর্থন দিয়েছিল। দিল্লির মতোই অন্য রাজ্যগুলোতেও এবার ভোট পড়েছে যথেষ্ট বেশি। কেরালায় পড়েছে ৭৬ শতাংশ। ২০০৯ সালে পড়েছিল ৭৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
চণ্ডীগড়ে ৭৪ শতাংশ (২০০৯-এ ৬৫ দশমিক ৫১)। হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, ছত্তিশগড়েও একই চিত্র। লোকসভার সেক্রেটারি জেনারেল সুভাষ কাশ্যপ মনে করেন, ‘দিল্লিসহ অন্যত্র মানুষের আগ্রহের মধ্য দিয়ে এটুকু অন্তত বোঝা যায়, মানুষ অন্য এক উৎসাহ নিয়ে এবার ভোট দিয়েছে।’ সেই উৎসাহের অর্থ কি সরকারের বিরোধিতা? কংগ্রেসের শাকিল আহমেদ তা মনে না করলেও বিজেপির মীনাক্ষী লেখি বলেন, ‘বিধানসভার ভোট দেখলেই তা বোঝা যাবে। বিধানসভায় দিল্লির মানুষ দলে দলে ভোট দিয়েছে কংগ্রেসকে সরাতে। লোকসভায় ভোট দিচ্ছে মোদির সরকারকে আবাহন করতে।’ সাধারণভাবে মনে করা হয়, বেশি ভোটদানের মাধ্যমে মানুষ একটা বার্তা দিতে চায়। সেই বার্তা সাধারণভাবে সরকারবিরোধী হয়ে থাকে। কিংবা ১৯৮৪ সালের মতো যদি আবেগঘন কোনো বিষয় হয়। এ ক্ষেত্রে জনপ্রিয় বিশ্বাস, এই বিপুল ভোটদান প্রধানত কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণেই। কিন্তু সেই বিরোধিতা কি মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে আবাহন? কিন্তু উত্তর প্রদেশের মুসলমানরা কী ভেবে ভোট দিলেন? মুজাফফরনগরে এবার ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে, যা বহু বছর দেখা যায়নি। ফল বেরোলে বোঝা যাবে, বিজেপিকে রুখতে রাজ্যের মুসলিম জনতা কোন দলকে বেছে নিল। পাশাপাশি মোদিকে ঘিরে হিন্দু মেরুকরণ হলো কি না।
বিভিন্ন রাজ্যে ভোট পড়ার হিসাব
২০০৯ লোকসভা ৫২%
২০১৩ বিধানসভা ৬৫.৯%
দিল্লি ৬৬%
রাজ্য (আসন) ২০১৪ ২০০৯
কেরালা (২০) ৭৩.৪ ৭৩.২
হরিয়ানা (১০) ৭০.৮ ৫৭.৯
ওডিশা (১০+৭০*) ৬৭.০ ৬৫.৩
জম্মু-কাশ্মীর (১) ৬৬.৩ ৪৯.৭
উত্তর প্রদেশ (১০) ৬৫.০ ৫১.৩
মধ্যপ্রদেশ (৯) ৬০.০ ৫৩.৮
ঝাড়খন্ড (৪) ৫৮.০ ৫০.৯
মহারাষ্ট্র (১০) ৬২.৪ ৫৫.৭
বিহার (৬) ৫৫.০ ৪১.৬
ছত্তিশগড় (১) ৫১.৫ ৪৭.৩
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (আসন) ২০১৪ ২০০৯
লাক্ষ্মাদ্বীপ ৮০.০ ৮৫.৯
চণ্ডীগড় (১) ৭৪.০ ৬৪
আন্দামান ও নিকোবর (১) ৬৭.১ ৬৪.২
ইসির দেওয়া হিসাব *বিধানসভা শতাংশে হিসাব

কারো রক্তচক্ষু পরোয়া করে না প্রজন্ম আন্দোলন গণজাগরণ মঞ্চ by কবির য়াহমদ

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ প্রজন্ম চত্বর, শাহবাগ থেকে সারাদেশের মানুষের দাবিকে সামনে নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ঘোষিত হয়, ৬টি দাবি সম্বলিত আল্টিমেটাম।

অনুমিতভাবেই এ দাবি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। গণজাগরণ মঞ্চ আশা করছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার আওয়ামী লীগ সরকার এই গণদাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করবে।

কিন্তু, সময়ের ব্যবধানে আশাটুকু আশাবাদের ফাঁকা বুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জামাত-শিবির নিষিদ্ধকরণ প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য দাবিগুলোর বাস্তবায়ন সুদূরপরাহত, যা সত্যিকার অর্থেই একদিকে যেমন লজ্জাজনক ঠিক তেমনিভাবে হতাশাজনকও বটে।

কসাই কাদের ওরফে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায়ের অব্যবহিত পর প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলন একটানা ১৭ দিন চলার পর আল্টিমেটাম এসেছিল। সব যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সারাদেশের মানুষ একাট্টা হয়েছিল শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে।

এই আন্দোলন শাহবাগ থেকে শুরু হলেও মুহূর্তে এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এমনকি দেশের বাইরেও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। দীর্ঘ ৪২ বছরের জঞ্জাল সাফ করতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। দেশের সব শ্রেণীর মানুষের মুখ থেকে প্রতিধ্বনিত হয় একাত্তরের সেই জ্বালাময়ী স্লোগান 'জয় বাংলা'।

এই সেই স্লোগান যা মুখে নিয়ে যে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল স্বাধীন এক দেশের, সেই স্লোগান আবারও ফিরে আসে জনমানুষের মাঝে।

দীর্ঘদিন পর 'জয় বাংলা' স্লোগান দলীয় সংকীর্ণ গণ্ডি অতিক্রম করে গণস্লোগানে রূপ নেয়। তরুণ-যুবা-বৃদ্ধ কেউ বাকি থাকেননি। প্রবল আত্মবিশ্বাসে উচ্চারণ করেন গগনবিদারী কণ্ঠে- 'জয় বাংলা'।

এ যেন এক দ্রোহের রূপ। এর সঙ্গে তুমুল ধিক্কার আর ঘৃণায় মানুষ জামায়াতিদের বর্জন করে 'তুই রাজাকার' ধ্বনিতে, যা গত ৪২ বছরের ইতিহাসে ছিল এক ধরনের তুমুল ভয় জাগানিয়া এক শব্দযুগল! রাজাকারদের 'রাজাকার' বলে ধিক্কার দেওয়ার এই সাহস সঞ্চারিত করেছে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলন।

২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ মার্চ ২০১৩ গণজাগরণ মঞ্চের সুস্পষ্ট দাবি সম্বলিত আল্টিমেটামের সময়কাল। একটু পেছন ফিরে দেখা যাক কী ছিল এই আল্টিমেটাম:

দাবি-১. ঘাতক জামাত শিবিরের সন্ত্রাসী হামলায় শহীদ রাজীব হায়দার, জাফর মুন্সী, বাহাদুর মিয়া, কিশোর রাসেল মাহমুদ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আগামী সাতদিনের মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে।

দাবি-২. ২৬ মার্চের পূর্বে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক সন্ত্রাসী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যায় নেতৃত্বদানকারী জামায়াতে ইসলামের বিরুদ্ধে সংশোধিত আইনের অধীনে অভিযোগ গঠন এবং নিষিদ্ধের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

দাবি-৩. অবিলম্বে সংগঠনগুলোর আর্থিক উৎস, যেসব উৎস থেকে সকল প্রকার জঙ্গিবাদী এবং দেশবিরোধী তৎপরতার আর্থিক যোগান দেওয়া হয়, সেগুলো চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।

দাবি-৪. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল ও অব্যাহত রাখতে অবিলম্বে আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইব্যনালকে স্থায়ীরূপ দিতে হবে।

দাবি-৫. গণমানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও তাণ্ডব বন্ধে অবিলম্বে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে সকল সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ গোপন আস্তানাসমূহ উৎখাত করতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এদের ভয়ঙ্কর রূপ প্রকাশ করে দিতে হবে।

দাবি-৬. যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষক এবং হত্যা ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতা গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই সময়ে পদ্মার জল গড়িয়েছে অনেক দূর। দেশে ঘটেছে অনেক কিছুই, ইতিবাচক-নেতিবাচক। ইতিবাচক কিছুর দিকে তাকালে দেখা যাবে উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হয়েছে এবং অনেক জল্পনা-কল্পনা এবং অনিশ্চয়তা উপেক্ষা করে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো রাজাকারের চূড়ান্ত রায় কার্যকর হয়েছে। এটা গণজাগরণ মঞ্চ তথা গণমানুষের একটা অর্জন।

গণজাগরণ মঞ্চের ৬টি দাবি বাস্তবায়নের আল্টিমেটামের প্রথম দাবিতে উল্লেখ ছিল জামায়াত-শিবিরের হাতে নিহতদের খুনিদের গ্রেফতারের দাবি। কিন্তু, অবাক করার ব্যাপার হলো গত এক বছরে ব্লগার রাজীব হায়দারের খুনিদের বিচারের মুখোমুখি করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে রাজীব হায়দারের বাসায় গিয়ে সহমর্মিতা জানাবার সঙ্গে সঙ্গে বিচারের আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিলেন।

উপরোন্তু, মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু নাম। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, গোলাম আযমের মামলার অন্যতম সাক্ষী সুরকার মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ছোট ভাই এবং সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী জগতজ্যোতি তালুকদার। এখানেও ব্যর্থ প্রশাসন। তারা না দিতে পেরেছে নিরাপত্তা, না করতে পেরেছে খুনিদের গ্রেফতার!

দ্বিতীয় দাবিটি জনমানুষের মুখে মুখে মুখে উচ্চারিত যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধকরণের। কিন্তু দীর্ঘ এক বছরাধিক কাল অতিক্রমের পরও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়নি। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন যখন তুঙ্গে ছিল, তখন সরকার এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে এ নিয়ে কিছুটা ইতিবাচক কথা শোনা গেলেও কালক্রমে তা মিইয়ে এসেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আওয়ামীলীগ সরকার এটাকে উপলক্ষ করে রাজনীতি করতে চায়। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের কিছু নেতার মুখে এই দাবির সপক্ষে কথা শোনা গেলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি গত বছর মহান জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে অনির্ধারিত আলোচনা হয়েছিল।

কিন্তু অবাক করার ব্যাপার যে সংসদ সদস্যরা প্রস্তাব তুলবেন, তারা নিজেরাও দাবি জানিয়ে গেছেন। ফলাফল তথৈবচ! এর মধ্যে অবশ্য জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়ে হাইকোর্টে রাজনৈতিক দল হিসেবে দলটির নিবন্ধন চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট মামলা ফের আলোচনায় এসেছে। হাইকোর্টের আদেশে জামায়াতের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের বৈধতা হারিয়েছে। এখন তারা দলগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ হারালেও তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে সদ্যসমাপ্ত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে, যেখানে তাদের অনেক প্রার্থী জয়লাভও করেছেন।

তবে আশার কথা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াতে ইসলামী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠিত হয়েছে এবং তারা দলগতভাবে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে।

আমাদের সংবিধানের ৩৮(গ), ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২০(১) এবং ২০০৯ সালের সন্ত্রাস দমন আইনেই জঙ্গি সংগঠন হিসেবে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন ছিল সরকারের সদিচ্ছা। কিন্তু এর অভাব প্রকট বলে দৃশ্যমান হচ্ছে। সাঈদীর রায় পরবর্তী সময়ের সন্ত্রাস, দেশকে গৃহযুদ্ধের হুমকি ইত্যকার নানা বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকৃতই সন্ত্রাসনির্ভর জঙ্গি সংগঠন। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমনের অঙ্গীকারের দিকে দৃষ্টিপাত করলে তাদেরকে নির্বাহী আদেশেই নিষিদ্ধ করা যেতো। এটা ব্যতিক্রমী কোনো দৃষ্টান্ত হিসেবেও পরিগণিত হয় না। কারণ, এর আগে নির্বাহী আদেশে আরো কয়েকটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়ছিল।

তাছাড়া যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্রমাণিত দল জামায়াতে ইসলামী, সে ঘোষণাও দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রায়ের আদেশে। দেশের স্বাধীনতা এবং জন্মের যারা বিরোধিতা করে তাদের এই দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার থাকতে পারে না।

জামায়াত-শিবির শুধুমাত্রই সন্ত্রাসের মাধ্যমেই দেশের অগ্রগতির যাত্রাপথকে রুদ্ধ করছে তা নয়, তাদের পরিচালিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সারাদেশে তাদের সন্ত্রাস এবং জঙ্গি অর্থায়নের মূল উৎস।

ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ তারা জঙ্গিদের অর্থায়নে ব্যয় করছে। গণজাগরণ মঞ্চের উত্থাপিত দাবির মধ্যে ছিল এসব প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে এর উৎস খুঁজে বের করে প্রয়োজনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা, যাতে করে জঙ্গি অর্থায়নের জন্য তা ব্যয়িত না হয়। গত এক বছরে এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উপরোন্তু, সরকার যখন জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্বরেকর্ড করার ঘোষণা দিলো, সেখানে ইসলামী ব্যাংক তিন কোটি টাকার অনুদান দিলো এবং সরকারও সেটা গ্রহণ করলো।

পরবর্তীতে অবশ্য সরকার বাধ্য হয়েছে জাতীয় সঙ্গীত অনুষ্ঠানে জাতীয় ব্যাংকের টাকা ব্যবহার করবে না বলে ঘোষণা দিতে। তবু তারা টাকাগুলো ফিরিয়ে দেয়নি এবং জামায়াতের প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা'র প্রস্তুত করা খাবার স্যালাইন সরবরাহ করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এই মুহূর্তে যে সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, তারাই সর্বশেষ চিহ্নিত রাজাকার নয়। এর বাইরেও আরো অনেক যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার রয়েছেন। আরো কয়েকটি অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে বলে জানা গেছে এবং পর্যায়ক্রমে তাদের বিচারও হবে।

গণজাগরণ মঞ্চ দাবি করেছে, এই ট্রাইব্যুনালকে স্থায়ী রূপদানের। কারণ, কেবলমাত্র স্থায়ী রূপদানের মাধ্যমে এই আদালত স্থায়িত্ব পেতো। ফলে, সরকার পরিবর্তন হলেও এই আদালত একইভাবে একই ধরনের অপরাধের জন্য বিচার করতে পারতো। কলঙ্কমোচনের একটা চিরস্থায়ী রূপের জন্য যা খুবই প্রয়োজন ছিল।

আল্টিমেটামের এক বছর অতিক্রমের পরেও এ নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে আশার কথা, আরো কিছু অভিযোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে উত্থাপনের অপেক্ষায় এবং একটা সময়ে হয়ত স্থায়ী রূপ দেওয়ার চিন্তাভাবনা আসতে পারে।

আরব বিশ্বসহ বেশ কিছু মুসলিম প্রধান দেশের কাছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের একমাত্র ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন। ফলে, সেখান থেকে তারা প্রচুর পরিমাণে অর্থ সাহায্য পেয়ে আসছে, যা খরচ করছে সারাদেশে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে। দেশের মধ্যকার তাদের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীরূপ বাইরে প্রচার হয় না বলে তাদের জন্য সুবিধা হয়েছে। ভেতরের রূপ বাইরে প্রকাশ না হওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক লবিংয়ের মাধ্যমে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। সারাদেশে রয়েছে তাদের সুশৃঙ্খল ক্যাডার বাহিনী; যাদের হাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র।

ফলে, তারা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠছে ক্রমশ। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে তারা এই রকম পেশিশক্তি অর্জনে সমর্থ হয়েছে। কোনো সরকারই তাদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসেনি; বরং উল্টো লালন-পালন করেছে।

গণজাগরণ মঞ্চের একটা অন্যতম দাবি ছিল তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার। কিন্তু গত এক বছরে দৃশ্যমান কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। সাঈদীর রায়ের পর যে সন্ত্রাস পরিচালিত হয়েছে তাদের দ্বারা এটা তাদের সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের একটা অন্যতম নজির। উপরোন্তু, রয়েছে দেশের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের হুমকি। এত কিছুর পরেও তাদের বিপক্ষে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তাছাড়া গত জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক হামলা পরিচালিত হয়েছিল। সাতক্ষীরাসহ বেশ কয়েকটি জায়গাকে মিডিয়া 'মিনি পাকিস্তান' বলেও খবর প্রকাশ করেছিল।

গণজাগরণ মঞ্চের ৬ দফা দাবির মধ্যে ছিল যুদ্ধাপরাধীদের দোসর মিডিয়া এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতা মিডিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ, মিডিয়া জনমত সংগঠনের ব্যাপক ভূমিকা রাখে। কিছু মিডিয়া বিশেষ করে মাহমুদুর রহমানের 'আমার দেশ', 'সংগ্রাম', 'ইনকিলাব', 'নয়াদিগন্ত' এবং 'দিগন্ত টিভি' সংবাদের নামে যা প্রচার করছে, তা স্রেফ মিথ্যাচার।

উল্লিখিত মিডিয়াগুলো বিশেষ করে 'আমার দেশ' পত্রিকা সংবাদের নামে হলুদ সাংবাদিকতাকে ধারণ করতো। তাদের উস্কানিতে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সারাদেশে হেফাজতে ইসলামের আড়ালে জামায়াত-শিবির ব্যাপক সন্ত্রাস করেছে, হামলা করেছে শহীদ মিনারে, ছিঁড়েছে জাতীয় পতাকা এবং ভাঙচুর করেছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপিত তারুণ্যের অবিনশ্বর কীর্তি গণজাগরণ মঞ্চ। এর নেপথ্যে রয়েছেন মাহমুদুর রহমান।

তাকে গ্রেফতার করতে বিভিন্ন সময়ে দাবি জানানো হলেও সরকার প্রথম দিকে কর্ণপাত করেনি। যখন গ্রেফতার করলো তার আগেই অনেক সর্বনাশ হয়ে গেছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে  সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে সাতক্ষীরায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানকে দৈনিক ইনকিলাব প্রচার করেছিল র‌্যাব এবং ভারতীয় বাহিনীর যৌথ অভিযান বলে। পরে তারা সে খবর প্রত্যাহার করে নিলেও আদতে অনেক ক্ষতি হয়ে যায় তার আগেই।

সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো এসব মিডিয়া দেশে সাম্প্রদায়িক উস্কানির সঙ্গে সঙ্গে আস্তিক-নাস্তিক ধুয়া তুলে জাতিকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা করছে। এক শ্রেণীর মৌলবাদীকে উস্কানি দিয়ে মুক্তমতের মানুষের ওপর হামলাকে বৈধতার চাদরে লেপ্টে দিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশের।

গণজাগরণ মঞ্চের আল্টিমেটাম এবং এক বছর সময়ে সার্বিক পরিস্থিতি খেয়াল করলে অনেকেই সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ দেখে হতাশই হবেন হয়ত। এই শাহবাগ আন্দোলন যেমন কারো একার উদ্যোগে গড়ে ওঠেনি এবং কেউ একা এর মূলেও না। এক থেকে পাঁচ হয়ে এই আন্দোলন এখন সারাদেশের মানুষের দাবিকে প্রতিনিধিত্ব করে। প্রান্তিক মানুষ নিজেরাই নির্ধারণ করে নিচ্ছে, আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি। তাই, সরকার যেখানে ব্যর্থ কিংবা দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করে কিংবা অপারগ, সেখানে মানুষ নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে।

আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে যেমন কেউ গভীরভাবে ভাবছেন না, তেমনিভাবে জাগরণকে আগামী দিনের পাথেয় হিসেবে দেখছে, সবাই।

গণজাগরণ আন্দোলনে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল। এর মধ্যে অনেকেরই রাজনৈতিক পরিচয় ছিল কিন্তু স্লোগানে স্লোগানে সবাই এক মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছিল। গণজাগরণ মঞ্চ শুধু ফাঁসির দাবি নিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি গণমানুষের আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে রানা প্লাজার অসহায় মানুষদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সাম্প্রদায়িক হামলায় অসহায় মানুষদের পাশে গিয়ে বলেছিল, তারাও মানুষ এবং মানুষের পাশে মানুষই দাঁড়ায়, ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে না। পাকিস্তান যখন কাদের মোল্লার ফাঁসির পর ন্যাক্কারজনক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, তখন গণজাগরণ মঞ্চ মানুষের কাছে গিয়ে বলেছিল- আমাদের জন্মশত্রু পাকিস্তানি পণ্য বর্জন করতে।

'গুন্ডে' সিনেমাতে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য সন্নিবেশ হয়েছিল, তখন গণজাগরণ মঞ্চ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ভারতীয়দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রত্যাহার করতে।

গত এক বছরে গণজাগরণ মঞ্চের ছয় দফা দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। তবে এই দাবি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সন্দেহ নেই। তীব্র অপপ্রচার উপেক্ষা করে মানুষ জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চাইছে। কিন্তু সরকার তা খুব বেশি আমলে নিচ্ছে না। উপরোন্তু, সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করলে দেখা যাবে, সরকার গণজাগরণ মঞ্চকে তার প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করেছে।

ছাত্রলীগ গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে অনেক দিন ধরেই। সর্বশেষ ৩ এপ্রিল ২০১৪ তারা শাহবাগে মঞ্চকর্মীদের হামলা করে। পরের দিন পুলিশ হামলা করে, গ্রেফতার করে নিয়ে যায় অন্তত ৬ জন কর্মীকে। হামলার দায় একদিকে ছাত্রলীগ অস্বীকার করে আবার অন্যদিকে হাস্যকরভাবে প্রমাণ করতে পারলে জাতীয় প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে ক্ষমা প্রার্থনার ঘোষণা দেয়।

একইভাবে আওয়ামী লীগ দলীয় নেতারা মঞ্চ বন্ধ করে দেওয়ারও নসিহত প্রদান করেন। অথচ তারা ভুলে গেছেন কারো ডাকে গণজাগরণ গঠিত হয়নি এবং একইভাবে কারো ডাক-আহ্বানে তা বন্ধ হওয়ারও নয়। সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন নিজেরাই দাবি করে, তারা গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে গণজাগরণ মঞ্চ ত্যাগ করেছে। মঞ্চ ছাড়ার এক বছর পর কেন তারা কোন যুক্তিতে আবারও গণজাগরণ মঞ্চের পেছনে লেগেছে, সেটা প্রশ্নের উদ্রেক করে বৈকি!

বিপ্লব কিংবা আন্দোলন হয়ত শুরু হয় হুট করে কিন্তু এর ফল আসে ধীরে ধীরে। ধীরে আসা ফলের স্থায়িত্বও দেশি। কেউ ভাবেনি বায়ান্ন'র ভাষা আন্দোলনের পর বাংলাদেশের স্বাধীন হতে সময় লাগবে আরো বছর ঊনিশ! ঠিক তেমনিভাবে হয়ত রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে যে আন্দোলন শুরু হলো ২০১৩-তে, তার চূড়ান্ত ফল আসবে কবে কেউ কী জানে?

তবে আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস বলে বাঙালি হারে না। তারা জেতে এবং জেতেই চলে! বাঙালির এই বিজয়রথ আগেও যেমন কেউ থামাতে পারেনি; এখনো পারবে না!

মানুষ শাহবাগ আন্দোলনের মাধ্যমে 'জয় বাংলা' স্লোগান যেমন নিজেদের দখলে নিতে পেরেছে তেমনিভাবে পেরেছে সমুচ্চ ধিক্কার জানিয়ে বলতে 'তুই রাজাকার'। মানুষের মাঝে একাত্তরের চেতনা আর দেশপ্রেম যেভাবে জেগে উঠেছে, সেটাকে যদি অর্জন হিসেবে ধরে নিই, তবে বলে দেওয়া যায়, এই দেশের জনগণ যেমন হারেনি একাত্তরে, তেমনিভাবে হারবে না এই সময়েও! সরকার আসবে-যাবে, কিন্তু চেতনা রয়ে যাবে আজন্ম। এই চেতনার মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এর হাত ধরেই!

কারো রক্তচক্ষু পরোয়া করেনি বাঙালি; কারো রক্তচক্ষু পরোয়া করে না প্রজন্ম আন্দোলন গণজাগরণ মঞ্চ!

কবির য়াহমদ, ব্লগার অ্যাক্টিভিস্ট: Kabiraahmed007@gmail.com

অসময়েই চলে গেলেন কিংবদন্তি মূসা by ড. এম. আনিছুর রহমান

সত্যনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃত এবিএম মূসা (৮৩) ওরফে মূসা ভাই আমাদের রেখে আজ চলে গেলেন এক অজানার দেশে (ইন্না লিল্লাহে ..........ইলাইহে রাজিউন)। গত মঙ্গলবার চিকিৎসকদের 'হিজ কন্ডিশন ইজ ভেরি ক্রিটিক্যাল' বক্তব্যেই অনেকটা আঁচ করতে পারছিলাম, তিনি ওই অজানার দেশের পথিক হয়ে গেছেন। এরপরও আশা করেছিলাম মূসা ভাই আবারও আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন, ভাঙ্গা গলায় টেলিভিশনের পর্দায় সত্য তীক্ষ্ণ কথাগুলো বলবেন। কিন্তু সেটা আর হলো না।

বলা যায়, জাতির বড় অসময়েই চলে গেলেন এই বরেণ্য সাংবাদিক। আমরা হারালাম জাতির এক মহান বিবেককে। আর সব দলমতের সাংবাদিক সমাজ হারালো তাদের অভিভাবককে। ফলে কিংবদন্তি সাংবাদিককে হারিয়ে গোটা জাতি আজ শোকাহত।

এবিএম মূসা সবচেয়ে বেশি অসাধারণ ছিলেন তার সততায়। পেশাদার সাংবাদিক হলেও কখনোই তিনি পেশাদারিত্বের অযুহাতে নিজের আদর্শ ও নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল থাকার কথা অকপটেই স্বীকার করে গেছেন। এরপরও তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের কঠোর সমালোচক ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করায় শাসক দলের নেতানেত্রীরা তাকে স্বাধীনতা বিরোধী বলেও আখ্যায়িত করেন। এ জন্য আওয়ামী লীগের অনেক নেতার, এমন কী খোদ বঙ্গবন্ধুর  পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও কটু কথা শুনতে হয়েছে তাকে।

বাংলাদেশের কিছু সম্পাদক-সাংবাদিক নিজেদের আদর্শিক অসততা স্খলনের জন্য বলেন, পেশাদারিত্বের কারণে তিনি নিজে যা বিশ্বাস করেন না, সেটা লিখতে বা বলতে বাধ্য হয়েছেন। এবিএম মূসা এই আচরণের বিরোধী ছিলেন। তিনি নিজে যা বিশ্বাস করতেন সেটা তিনি গোপন করতেন না। নির্দ্বিধায় বলতেন ও লিখতেন।

জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে যে গুটিকয়েক ব্যক্তি সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। ১১ জানুয়ারি ২০০৭ বা ওয়ান-ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। তিনি মনে প্রাণে সামরিক শাসনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে সামরিক শাসকদের সহযোগিতাকারী তথাকথিত মাইনাস টু ফর্মুলার উদগাতা ও সমর্থক সম্পাদক-সাংবাদিকদের সঙ্গে এবিএম মূসার বড় পার্থক্যটা ছিল এখানেই। সেই সময়ে সেনাবাহিনীর বন্দুকের নলের ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে প্রতিনিয়ত টেলিভিশনের টকশোতে যেতেন এবং  গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতেন।

এভাবে মূসা ভাই অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত রাতের পর রাত জেগে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনের টকশো ও সংবাদ বিশ্লেষণ অনুষ্ঠানে গিয়ে একজন নির্ভিক দেশপ্রেমিক হিসেবে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলে গেছেন।

বলা যায়, এখনো বাংলাদেশে যেটুকু গণতন্ত্রের নামগন্ধ টিকে আছে তার পেছনে এবিএম মূসার কর্মতৎপরতার সাহসী অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তাঁর জীবদ্দশায় সরকারের ত্রুটি বিচ্যুতি হলে তা ধরিয়ে দিতেন বরেণ্য সাংবাদিক এবিএম মূসা। কোনো ভুল হলে নিজ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তার সমালোচনা করতেন। সংশোধনের পথও দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সরকার সেটা কীভাবে নিতো সেদিকে তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। অবিরাম তিনি গণমানুষের পক্ষেই কথা বলে যেতেন।

ল্যাবএইড হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. বরেণ চক্রবর্তীর ভাষ্যমতে, এবিএম মূসা দীর্ঘদিন থেকেই অসুস্থ ছিলেন। সোমবার মধ্যরাত থেকে তাকে ডেঞ্জার পয়েন্টে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

এ চিকিৎসক আরও জানান, বছর দুয়েক আগেও তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল। কিন্তু সে অবস্থা থেকে তাকে ফেরানো সম্ভব হয়েছিল। এবারের অবস্থাটা আগের মতো ছিল না। আরও একটু জটিল। সোমবার রাত আড়াইটার দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয় এবিএম মূসাকে। কোনোভাবেই তার শরীরে রক্ত স্বাভাবিক কাজ করছিল না। বারবার রক্ত দিলেও তার দেহে রক্তকণিকা ভেঙে যাচ্ছিল।এ রোগের নাম মাইলো ডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম- যা ব্লাড ক্যান্সারের মতোই।

ল্যাবএইড হাসপাতালে সিসিইউতে সার্বক্ষণিকভাবে এবিএম মূসার তদারককারী অপর কনসালট্যান্ট হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, এবিএম মূসার হার্টের পাম্পিং মঙ্গলবার পর্যন্ত মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।  ৬০ শতাংশ হলে আশঙ্কা কম থাকতো।এরপরও পাম্পিং থেমে থেমে হচ্ছিল। কিডনিও ড্যামেজ ছিল। ফুসফুসেও জীবাণু সংক্রমণ (ইনফেকশন) ছিল।

চিকিৎসক হাবিবুর সাংবাদিকদের আরও জানান, এর আগে মূসার হার্টে বাইপাস হয় এবং পেসমেকারও বসানোর প্রয়োজন পড়ে। সব মিলিয়ে জটিলতা বেড়ে গিয়েছিল। তিনি অনেকটা মনের জোরে চলছিলেন। তবে চলমান এই সিনড্রোমের কারণে গত ছয় মাস ধরে মূসার অবস্থার অবনতি হতেই থাকে।

এবিএম মূসার ছেলে ডা. নাসিম মূসা জানান, জানুয়ারি থেকেই তার বাবার শরীরটা খারাপ হতে শুরু করে। গত শনিবার তার ফুসফুস ও হার্টে ত্রুটি দেখা দেয়। পরে সোমবার রাতে অবস্থা বেশি খারাপ হওয়ায় ল্যাবএইডে ভর্তি করা হয়। এবিএম মূসার মেয়ে পারভীন সুলতানা ঝুমা জানান, তার মাও (মূসার স্ত্রী সেতারা মূসা) শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। তিনি প্যারালাইজড হয়ে আছেন।

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এবিএম মূসা
বর্ষীয়ান সাংবাদিক এবিএম মূসা ১৯৩১ সালে ফেনী জেলার ধর্মপুর গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে সাংবাদিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। ১৯৫০ সালে দৈনিক ইনসাফ দিয়ে তার সাংবাদিকতা শুরু। ওই বছর তিনি ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভারে যোগ দেন। পাকিস্তান অবজারভারে রিপোর্টার, স্পোর্টস রিপোর্টার, বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার অবজারভার বন্ধ করে দিলে তিনি সংবাদ-এ যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে তিনি অবজারভারে ফিরে আসেন। '৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসি, সানডে টাইমস প্রভৃতি পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে রণাঙ্গন থেকে সংবাদ পাঠাতেন।

বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবিএম মূসা। তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে তিনি দৈনিক যুগান্তর-এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

এবিএম মূসা জাতীয় প্রেসক্লাবে চারবার সভাপতি ও তিনবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এবিএম মূসা একুশে পদক ও দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কারে ভূষিত।

তাঁর অনন্য কর্ম ও সত্যনিষ্ঠ লেখনী-ভাষ্য দলমত নির্বিশেষে সবার হৃদয়ে স্থান করে গেছেন। দেশের আপদকালীন সময়ে তাঁর সত্যনিষ্ঠ বক্তব্য ও ভুমিকা সবার কাছে প্রসংশনীয়। তিনি 'মুজিব ভাই' বলে একটি বইও রচনা করেন। দেশ ও জাতির গর্ব বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এবিএম মূসার চিকিৎসার বিষয়ে আমরা কী দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পেরেছি? আমাদের দেশের সরকার কী তাঁর কর্মের প্রতি ন্যুনতম সৌজন্যবোধ দেখাতে পেরেছে? এবিএম মূসা ভাই'র বিভিন্ন সময়ের সত্যনিষ্ঠ বক্তব্য-ভাষ্যে অসন্তুষ্ট হয়ে থাকলেও দেশ-জাতির স্বার্থের কথা বিচেনায় নিয়ে সব কিছু ভুলে গিয়ে আমাদের উচিত ছিল তাঁর উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। কিন্তু সংকীর্ণতার কারণে আমরা সেটা করতে পারিনি। এ জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি মরহুম মূসা ভাইয়ের পরিবারের কাছে লজ্জিত। মরহুম এবিএম মূসা ভাইয়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। আল্লাহ পাক তাঁকে সর্বোচ্চ পুরুস্কার দান করুন। সেই সঙ্গে মরহুমের শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সহমর্মিতা প্রকাশ করছি- আল্লাহ পাক তাদের এই শোক সইবার শক্তি দান করুন। সবশেষে মরহুম এবিএম মূসার অসুস্থ স্ত্রীর আশু রোগ মুক্তি কামনা করছি।

মূসা ভাই আমাদের মাফ করবেন। আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি। আমরা আপনার কর্মের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারিনি। আপনার কর্মের ঋণ কোন দিনও শোধ করবার নয়। 

ড. এম. আনিছুর রহমান: গবেষক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, sarderanis@gmail.com

অভিনন্দন, বাংলাদেশের মানুষদের

মাত্র চার-পাঁচ মাস আগেও আমরা জানতাম না, আদৌ কি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কিংবা এশিয়া কাপ বাংলাদেশে হতে পারবে? কী সব দিনই না আমরা পার করেছি। লাগাতার অবরোধ— বাসে-ট্রাকে পেট্রলবোমা ছোড়া হচ্ছে, রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে ফেলায় দুর্ঘটনায় পড়ছে ট্রেন। নাগরিকেরা বেঁচে থাকবেন কি থাকবেন না, এই নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, এই দেশে এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট হবে কি হবে না, সেটা একেবারেই গৌণ প্রশ্ন। সেই বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিলজুড়ে হলো এশিয়া কাপ আর বিশ্বকাপের বড় আসর এবং সুসম্পন্ন হলো কোনো রকম দুর্ঘটনা ছাড়াই। তারও আগে এল শ্রীলঙ্কা দল, বড় একটা সিরিজ হয়ে গেল বাংলাদেশের সঙ্গে। এসব খেলায় দল হিসেবে মোটেও ভালো করেনি বাংলাদেশ, কিন্তু দারুণ ভালো করেছে আয়োজক, স্বাগতিক হিসেবে। এ জন্য বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য, এ নিয়ে আমরা গৌরব বোধ করতে পারি। কারওয়ান বাজারের চায়ের ঝুপড়িগুলো বন্ধ। একটা দোকানই খোলা, তা-ও ছোট পরিসরে। সেই চা-বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, অন্য দোকানগুলো গেল কই? দোকানি বললেন, ‘বিশ্বকাপ হচ্ছে তো, সেই জন্য এগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’ আমার মনে পড়ল, ২০১১ সালে বাংলাদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজনের সময়ও এই চায়ের দোকানগুলো তুলে দেওয়া হয়েছিল ফুটপাত থেকে। একটা বড় আয়োজন যখন করতে হয়, তখন সব মানুষেরই তাতে অবদান, অংশগ্রহণ থাকে। কাজেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, একই সঙ্গে নারী ও পুরুষের, আয়োজন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে সক্ষমতার পরিচয় দিল, তার কৃতিত্ব দেশের সব নাগরিককেই দিতে হবে। দিতে হবে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ফুটপাতের ফেরিওয়ালাকেও।
অভিনন্দন অবশ্যই প্রাপ্য সরকার ও বিসিবির; আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ ও সংগঠন, প্রশাসন ও সংস্থার। তবে একটা বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য কিন্তু বিরোধী দলেরও, কারণ তারা এই সময়টায় কোনো কর্মসূচি দেয়নি। তারা নিশ্চয়ই দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নটাকেই সবার ওপরে স্থান দিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন ট্রফি হাতে রিকশায় বসে আছেন শ্রীলঙ্কা পুরুষ দলের অধিনায়ক লাসিথ মালিঙ্গা কিংবা অস্ট্রেলিয়া নারী দলের অধিনায়ক মেগ ল্যানিং—এই দৃশ্য নিশ্চয়ই বাংলাদেশের একটা বড় বিজ্ঞাপনও। সব দেশই এ রকম বড় আয়োজনের স্বাগতিক হতে চায়। অলিম্পিক কিংবা বিশ্বকাপ ফুটবল কোথায় হবে, এই নিয়ে তো এক যুগ আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রচারপর্ব, প্রস্তুতি। কারণ, এ ধরনের আয়োজন সারা বিশ্বে দেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তুলে ধরে, পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও স্বাগতিক দেশ লাভবান হয়। বাংলাদেশের এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সফল, নির্বিঘ্ন, নির্ঝঞ্ঝাট আয়োজন নিঃসন্দেহে শতমুখে অভিনন্দন জানানোর যোগ্য। আমরা নিজেদের মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক ছোটখাটো ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা করব, করাই উচিত ভবিষ্যতের শিক্ষার জন্য। যেমন এ আর রাহমান আর অ্যাকনের কনসার্টটা কি আদৌ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল? তাহলে সেটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে ব্যর্থই হয়েছে। আসলে তো সেটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিলই না। কাজেই সেটাকে সে হিসেবেই দেখতে হবে। এ ধরনের বিশ্ব আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সব দেশই নিজেদের গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্যই তুলে ধরে, আমরা কি একটা সুযোগ হারালাম না? তবে আরেকটা বড় ধন্যবাদ প্রাপ্য দর্শকদের। বাংলাদেশের দর্শকেরা দলে দলে স্টেডিয়ামে গেছেন, গ্যালারি ভরে তুলেছেন,
নিজের দেশের খেলা না থাকলেও গেছেন। নিজের দলের বিরুদ্ধে কেউ সেঞ্চুরি করলেও হাততালি দিয়েছেন। নিজের দেশের খেলোয়াড়েরা হেরে ফিরে আসছেন, তার পরও দর্শকেরা দাঁড়িয়ে তালি দিয়েছেন—‘ওয়েল প্লেইড।’ অন্য দেশের সমর্থকেরা তাঁদের মতো করে সেজে গ্যালারিতে বসেছেন, তাঁদের এ দেশের মানুষ সম্মান দেখিয়েছেন, যত্ন করেছেন। বাংলাদেশ খারাপ করেছে, একটা ঢিলও পড়েনি, একটা কাচও ভাঙেনি। স্বাগতিক হিসেবে এই দেশের দিলদরিয়া মানুষের ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তাই কেবল আমরা প্রদর্শন করেছি। বাংলাদেশ থেকে যখন কোনো বিদেশি বিদায় নেন, তাঁকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, এই দেশের কী তোমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে? উত্তর পাওয়া যায়: এই দেশের মানুষ। এই দেশের মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তার কোনো তুলনা নেই। আর এই দেশের মানুষের হার না-মানা জীবনযজ্ঞ। তাঁরা বলেন, কক্সবাজার নয়, এমনকি সুন্দরতম সুন্দরবন নয়, আমাদের মুগ্ধ করে শাঁখারীবাজার। একটা ছোট গলিতে কত কী যে ঘটছে। জীবন এখানে কত প্রাণবন্ত, কত বিচিত্র। একই সঙ্গে আমাদের বোধ হয় আরেকটা বিষয় নিয়ে গৌরব করতে হবে, স্বাধীনতা দিবসে আমরা অনেকে মিলে একসঙ্গে জাতীয় সংগীত গেয়েছি। আরেকবার, আরেকটা বড় আয়োজনে, সম্ভবত বেইজিং অলিম্পিকের সময়ে, বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংগীত বিষয়ে একটা শীর্ষ তালিকা করা হয়েছিল, তখন পৃথিবীর ১৯০-ঊর্ধ্ব দেশের মধ্যে আমার সোনার বাংলার স্থান হয়েছিল ২ নম্বরে। বলা হয়েছিল, এই সংগীতটায় কোনো হামবড়া কথা নেই, আমার দেশই সেরা বলে অন্ধ অভিমান নেই, আছে নিজের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাব্যময় বর্ণনা আর আছে তাকে ভালোবাসার কথা। সত্যি, আমাদের জাতীয় সংগীতের কথা অনবদ্য, এই গান আমি যতবার গেয়েছি, আপনা-আপনিই আমার চোখ জলে ভিজে উঠেছে। গত ২৬ মার্চ সকালে আমি প্যারেড ময়দানে যেতে পারিনি, কিন্তু দেশ টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে যাই। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আমরা শ খানেক মানুষ একই সময়ে জাতীয় সংগীত গাই গলা খুলে। একই সময়ে বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা একত্র হয়ে জাতীয় সংগীত গেয়েছেন।
জাতীয় প্যারেড ময়দানের জাতীয় সংগীতে দুই লাখ ৫৪ হাজার ৫৩৭ জন অংশ নিয়েছেন বলে গিনেস রেকর্ড বুকে লেখা থাকছে, কিন্তু এর বাইরেও হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন, যাঁরা ভেতরে ঢুকতে পারেননি। অভিনন্দন বাংলাদেশ, একটা নতুন রেকর্ড গড়ার জন্য। জানি, এই আয়োজন নিয়েও নানা কথা হয়েছে। গিনেস বুকে নাম তোলার দরকারই বা কী, এই বইয়ে তো সবচেয়ে বড় গোঁফওয়ালার নামও থাকে, কতটা সাপের সঙ্গে কে কত বেশিক্ষণ ধরে যাপন করল তা-ও থাকে। তার জন্য এত টাকা খরচ করারই বা দরকার কী! এটা দিয়ে কতগুলো স্কুল হতো বা টিউবওয়েল হতো। কিংবা এত টাকা কেন দরকার হবে, আর তা খরচ করাই বা হলো কীভাবে? ব্লগ-ফেসবুকে এ নিয়ে কথা উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো এই দেশের বাক্স্বাধীনতা ও ব্যক্তি মানুষের মতপ্রকাশের একটা অভূতপূর্ব ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, এটাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তবে সব সময় এসব মাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়। যেমন বলা হলো, গিনেস বুকে আমাদের জাতীয় সংগীতের রেকর্ডটা গ্রহণ করা হবে না। আমি বলি, একটু ধৈর্য ধরে থাকলে কী ক্ষতি, কিংবা কোনো মত প্রচারের আগে তথ্যটা যাচাই-বাছাই করে নেওয়া কি উচিত নয়? যা-ই হোক, নাগরিকদের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়া কিন্তু সরকারের কাজ। আমার মনে হয়, যেকোনো সাংবাদিক তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে জানতে চাইতে পারেন, জাতীয় সংগীত গাইতে কত টাকা উঠল, কীভাবে খরচ করা হলো, বাকি টাকা কীভাবে খরচ করা হবে। রবীন্দ্রনাথের একটা উক্তির সারমর্ম হলো, মানুষ সাড়ে তিন হাত লম্বা। কিন্তু ঘরটা সে সাড়ে তিন হাত উঁচু করে না, আরও বড় করে। সবাই মিলে জাতীয় সংগীত গাওয়ার জন্য বেসরকারি অনুদান নিলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। এটা অনেক পুরোনো বিতর্ক, যা আমাদের কোনো কাজে লাগে না, এমন জিনিসের চর্চা আমরা করব কি না। এই বিতর্কের বহু আগেই অবসানও ঘটে গেছে। যেমন, কুমড়ো ফুল আমাদের কাজে লাগে, আমরা তা দিয়ে বড়া বানিয়ে খাই, আর গোলাপ ফুল কোনো কাজে লাগে না, তা এমনকি ফল কিংবা বীজও উৎপাদন করতে পারে না। তবু বিশ্বব্যাপী চিরটাকাল গোলাপেরই কদর। কবিতা নিয়েও এই প্রশ্ন আছে, কবিতা কী করতে পারে, তা কি শেয়ারবাজারের দরপতন, স্টেডিয়ামের উইকেট পতন, কিংবা যুদ্ধরত দেশের শিশুদের ওপরে ক্লাস্টার বোমার পতন রোধ করতে পারে? ‘সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে বাঁচা, বিচিত্রভাবে বাঁচা।’ অন্ধকারের বিরুদ্ধে আপনি তরবারি দিয়ে লড়াই করে জিততে পারবেন না, আপনাকে আলো জ্বালাতে হবে। সংস্কৃতির চর্চাই হতে পারে সবচেয়ে বড় আলোর উৎস। আমি তো ভীষণ খুশি যে চার-ছক্কা হই হই নিয়ে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে রংপুরের স্কুলটিতে ফ্লাশমব হয়েছে, সম্ভবত পৃথিবীতে একটা গান নিয়ে এত বেশি ফ্লাশমবের নজির আর নেই। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যদি পারে, সারা দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জোয়ার তৈরি করে দিক। স্কুলে স্কুলে পাড়ায়-মহল্লায় পাঠাগার আন্দোলন, খেলাধুলার আয়োজন আর একটা বড় সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ তৈরি করতে পারলে বহু লড়াইয়ে আপনা-আপনিই জয়লাভ করা সম্ভব হবে। ‘আমার সোনার বাংলা’ সবাই মিলে গাইতে আমার কোনোই আপত্তি নেই, বরং যতবার বলা হবে, ততবারই আমি যেখানে আছি, সেখানে দাঁড়িয়েই আন্তরিকভাবে গাইব, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

জবাবদিহির জন্য দাঁড়াতে হবে

সমাজে প্রত্যেক মানুষ তার কর্মফলের জন্য নিজেই দায়ী। পার্থিব জীবন শেষে আল্লাহর কাছে প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কোনো লোকের দুর্নীতি, অপকর্ম বা পাপে অন্য কেউ বা তার আত্মীয়স্বজন বা বংশ দায়ী হবে না। মানুষকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথভাবে পালন করতে হবে। বিভিন্ন কাজকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশের উপযুক্ত তত্ত্ব-তথ্য, আয়-ব্যয়, হিসাব-নিকাশ ও লেনদেনকে সুস্পষ্টভাবে জানার জন্য উন্মুুক্ত করাই হলো স্বচ্ছতা। আর প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজ নিজ অধীন ব্যক্তিদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়াই জবাবদিহি। ইসলামে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ইহকালীন ও পারলৌকিক উভয় জগতেই লক্ষ করা যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘অনন্তর যে ব্যক্তি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে (জবাবদিহি) ভয় করে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সূরা নাজিআত, আয়াত: ৪০) প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের যে ক্ষমতা বা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা পালন করার সন্তোষজনক কৈফিয়ত প্রদানকে জবাবদিহি বোঝায়। শাসক বা নেতাকে যেমন অধীনস্থ প্রজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, তেমনি আপামর জনসাধারণকেও তাদের কর্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
সুতরাং শাসনকর্তা যিনি জনগণের রক্ষক, তিনি স্বীয় অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন আর প্রত্যেক পুরুষ স্বীয় পরিবারের লোকদের রক্ষক এবং তিনি নিজের অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। আর প্রত্যেক নারী স্বীয় স্বামীর পরিবারের লোক ও তাঁর সন্তানদের দায়িত্বশীল এবং তিনি তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। কোনো লোকের চাকর স্বীয় মনিবের সম্পদের রক্ষক এবং সে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম) জবাবদিহির সীমাবদ্ধতার ফলে একদিকে যেমন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, নিরপেক্ষতার অভাব, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও হতাশা ব্যাপকভাবে বিদ্যমান; অপর দিকে স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, অদক্ষতা, তোষামোদ, কাজে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি নিয়মশৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একজন সাধারণ মানুষ যেমন তার দায়দায়িত্বের জন্য পরকালে জিজ্ঞাসিত হবে, ঠিক তেমনি একজন ধর্মপ্রাণ বান্দাও তার নির্ধারিত কাজের জন্য জিজ্ঞাসিত হবে। পরিবারের রক্ষক ও অভিভাবক পুরুষকে যেমন তার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, তেমনি সংসারের কর্ত্রী স্ত্রীকেও তার স্বামীর ঘর-সংসার ও সন্তানসন্ততিদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কোনো লোকের চাকর বা শ্রমিককে তার কর্তব্য তথা মালিকের বা সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেকেই তার অধীনস্থ ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি দায়িত্বশীল রয়েছে এবং সবাই ভালোমন্দ কাজের জন্য দায়বদ্ধ হবে। তাই সমানভাবে বিচারের জন্য তাদের স্বীয় অধীনস্থ ব্যক্তিদের সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
পরকালে আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মান ও মর্যাদা প্রাপ্তির লক্ষ্যে প্রত্যেকের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে আত্মসচেতন, কর্তব্যপরায়ণ ও কর্মতৎপর হতে হবে। নিজেকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত করে তুলতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির মনে ইমানি চেতনায় মানসিক দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। স্বচ্ছতার ফলে অধীনস্থ ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট সম্মান পাওয়া যায়। মানবজীবন জবাবদিহির একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। এটি ইহকাল ও পরকালে কল্যাণ বয়ে আনে। এ জন্য সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিরপেক্ষতার সঙ্গে সবাইকে সমাজজীবনে যথাযথভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে স্বচ্ছতা অবশ্যই একটি উত্তম প্রক্রিয়া। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে সর্বমহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমূর্তি বেড়ে যায়। তাই জাতীয় জীবনে প্রত্যেক মানুষকে লোভ-লালসা ও ভোগ-বিলাসিতার মাধ্যমে নয়, বরং ন্যায়নিষ্ঠা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা খুবই প্রয়োজন। চাকরি, ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্রে কাজের জন্য কোনো একজনের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। দেশের জনগণ প্রশাসনে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের ওপর যে গুরুদায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পণ করেছে, তা যথাযথভাবে পালন করা সবার অবশ্যকর্তব্য। দায়বদ্ধতা বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অনন্য কৌশল জবাবদিহি। দক্ষ ও উন্নত নৈতিকতাসম্পন্ন প্রশাসনের জন্য জবাবদিহির বিকল্প নেই। একজন সফল আদর্শ নেতা ও জাতি গঠনকারী হিসেবে সরকারের দায়িত্ব ও জবাবদিহি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘যাকে আল্লাহ তাআলা প্রজা সাধারণের ওপর শাসক বানিয়েছেন, সে যদি তাদের পূর্ণভাবে কল্যাণ কামনা না করে, তবে সে জান্নাতের সুবাসও পাবে না।’ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে দুর্নীতি প্রতিরোধে জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধির প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের আবশ্যকতা রয়েছে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

অবশেষে যশোদাবেনকে স্ত্রী স্বীকার করলেন মোদি

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী গুজরাট মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অবশেষে যশোদাবেনকে নিজের স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন। এতদিনে নিজেকে বিবাহিত বলে কবুল করলেন নরেন্দ্র মোদি। লোকসভা নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে নিজের স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করলেন যশোদাবেনের নাম। ২০০১, ২০০২, ২০০৭, ২০১২...পর পর চারটি বিধানসভা নির্বাচনে লড়তে নেমেও এই স্থানটি ফাঁকাই রেখেছিলেন মোদি। কিন্তু সেই তিনিই এবার ভাদোদারা থেকে লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে গিয়ে মেনে নিলেন নিজের বৈবাহিক সম্পর্কের কথা। জানালেন, প্রথা মেনেই তার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল যশোদাবেনের। তবে স্ত্রীর রোজগার বা সম্পত্তির খতিয়ান দিতে পারেননি তিনি। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এ ব্যাপারে তার কোনো ধারণা নেই। কিন্তু কোনোদিন যাকে স্বীকৃতি দেননি, হঠাৎ কী কারণে তার নামোল্লেখ? রাজনৈতিক পরিদর্শকরা মনে করছেন, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চিরাচরিত উদ্দেশ্য।
যৌবনে নরেন্দ্র মোদির (১৮) সঙ্গে ব্রাহ্মণওয়াড়া গ্রামের যশোদাবেনের (১৭) বিয়ে হয়। তবে সেই দাম্পত্যের বয়স মাত্র দুসপ্তাহ। তারপর থেকে আর কোনোদিন স্ত্রীর কাছে ফিরে যাননি মোদি। অথচ তিনি ফিরে আসবেন এই আশাতেই তিন বছর শ্বশুরবাড়ির মাটি আঁকড়ে ধরে পথ চেয়েছিলেন যশোদাবেন। পরে বাবার বাড়িতে ফিরে স্বামীর দেয়া সধবার জীবন শুরু করেন যশোদাবেন। চারটি বিধানসভা নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে স্ত্রী সম্পর্কিত সব প্রশ্নে নিরুত্তর থেকেছেন। অন্যদিকে, যশোদাবেনও এ নিয়ে কখনও প্রকাশ্যে বিবৃতি দেননি। ব্যাপারটা নিয়ে আদৌ জলঘোলা হতো না যদি না ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার তিন মাস পরে রাজকোট-২ কেন্দ্র থেকে উপনির্বাচনে লড়ার সময় প্রতিপক্ষ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে মোদির দাম্পত্য জীবনের কথা ফলাও করে প্রচার করা হতো। ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে কালি ছিটানোর উদ্দেশ্যেই মোদি ও যশোদাবেনের সম্পর্ক নিয়ে কুৎসা রটিয়ে পুস্তিকা ছাপায় কংগ্রেস। এবারের নির্বাচনে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিরোধীদের অপপ্রচারের সুযোগ না দিতেই মনোনয়নপত্রে স্ত্রীর উল্লেখ করেছেন মোদি, মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। মোদির ছোটবেলায় তার গরিব বাবা যশোদাবেনের সঙ্গে তার বিয়ে দেন।