Monday, October 27, 2014

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপব্যবহার by মিজানুর রহমান খান

বিএনপি সরকারের আমলে তৈরি করা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মানহানি ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা–বিষয়ক ৫৭ ধারার আওতায় সারা দেশে মামলার সংখ্যা সংক্রামক ব্যাধির মতো দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এই ৫৭ ধারা কি সেই ৫৪ ধারা হতে চলেছে? সন্দেহের বশে পরোয়ানা ছাড়াই পাইকারি গ্রেপ্তারের হাতিয়ার হিসেবে দণ্ডবিধির ৫৪ ধারা কুখ্যাত হয়ে উঠেছিল। অবশ্য সাইবার অপরাধের ভয়াবহতাকে উপেক্ষা করা যাবে না। একে কঠোরহস্তেই দমন করতে হবে। কিন্তু আইনের অস্পষ্টতার কারণে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি। টেলিফোনে ২২ অক্টোবর আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে কথা হলো। তাঁকে জানালাম, ভারতের ২০০০ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭ ও ৬৬ক ধারার সঙ্গে আমাদের বিতর্কিত ৫৭ ধারার মিল পাবেন। এটা ধারণা করা যায় যে ভারতীয় আইনের ৬৭ ধারা তরজমা করতে গিয়ে ২০০৬ সালের খসড়া প্রস্তুতকারীরা দুরভিসন্ধির আশ্রয় নিয়েছিলেন। ওই ৬৭ ধারা কেবল অশ্লীলতাবিরোধী। অথচ তা নকল করতে গিয়ে বিএনপির সাংসদেরা তথ্যপ্রযুক্তি আইনে অশ্লীলতার সঙ্গে মানহানি, নীতিভ্রষ্টতা, ব্যক্তির ভাবমূর্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত অন্তর্ভুক্ত করেন। সবচেয়ে অভিনব ছিল মিথ্যাকে শাস্তিযোগ্য করা। আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের কথায়, ২০০ বছর আগেই মিথ্যার জন্য শাস্তির বিধান রহিত হয়ে গেছে। আদর্শলিপি বইয়ে লেখা ছিল মিথ্যা বলা মহাপাপ। এখন পাঠ্যপুস্তকে লেখা উচিত মিথ্যা বললে ১৪ বছর কারাবাস।

‘প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মুঠোফোনে কটূক্তি, বাবা-ছেলে গ্রেপ্তার’ শীর্ষক একটি খবর ১৯ অক্টোবর প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে। ১৩ বছরের সিজান সম্ভবত এই আইনের প্রথম কিশোর অভিযুক্ত। ২৪ অক্টোবরে মুঠোফোনে বগুড়ার কাহালু থানার ওসি সমিত কুমার কুন্ডু আমাকে জানালেন, মুঠোফোনটি শুকুর আলীর। তিনি হতদরিদ্র। বাদাম ফেরি করেন। ছেলেটি শীতলাই দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সে তার বাবার মুঠোফোনটি প্রকাশ্যে (পাবলিক প্লেসে) নয়, বাড়িতে বসে বাজাচ্ছিল। সেটি একটি ভিডিও। যাতে বিড়ালের ছবি আছে। কোনো মানুষের ছবি নেই। ওসি আরও নিশ্চিত করেন, কটূক্তিগুলোও কোনো মানুষের কণ্ঠে শোনা যায়নি। তাঁর দাবি, ‘এটা যান্ত্রিক, ডিজিটাল কণ্ঠস্বর।’ তিন কিলোমিটার দূরবর্তী থানা থেকে খবর পেয়ে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। আজ ২৭ অক্টোবর বাবা-ছেলের রিমান্ড শুনানি হবে। এই ‘অপরাধের’ প্রতিকার অন্য আইনে ছিল। মানহানির সাজা সর্বোচ্চ দুই বছর। দেশে এখন একই অপরাধের দুই রকম সাজা। আপনি যদি বিষয়টি ‘ইলেকট্রনিক’ মাধ্যমে ফেলতে পারেন, তাহলে কাউকে ১৪ বছর জেল খাটাতে পারবেন। দুই বছরের সাজা হবে ১৪ বছর।
প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্যাদা রক্ষার জন্য তো ওই আইনে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। কাহালুর ওসি নিজেই আসামি ধরতে গেছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, দুই দিন পরে যখন কেউ কাউকে ৫৭ ধারায় ফাঁসাতে চাইবে, তখন কি তিনি এভাবেই ছুটবেন? ওসি বললেন, ‘এখানে তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত।’ তাঁর কাছ থেকেই শুনলাম, নারায়ণগঞ্জে এই ৫৭ ধারায় একই ধরনের অভিযোগে নতুন গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। এটা আশার বিষয় কি না জানি না, তবে শুনলাম আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এই আইনের বিভিন্ন দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। যদিও তারা আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়ে গত বছরেই বিএনপির সৃষ্ট কালাকানুনকে আরও তীক্ষ্ণÿ হুলসম্পন্ন করেছিল। এই আইনে অপরাধকে অজামিনযোগ্য, ন্যূনতম শাস্তি ৭ ও সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছরে উন্নীত এবং জরিমানার অঙ্ক এক কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এর পরও আইনমন্ত্রীর মন্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছি। তিনি জানালেন যে আইনটি তিনি নিজেই খতিয়ে দেখছেন।
বিএনপি প্রতিপক্ষের জন্য গর্ত খুঁড়েছিল। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এম কে আনোয়ার এর প্রথম শিকার হলেন। এই আইনে প্রথম পেশাদার রাজনীতিক হিসেবে তাঁর বিচার শুরু হবে ৩০ নভেম্বর। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এটা কিন্তু দণ্ডবিধির ২৯৫ক ধারায় বিচার্য ছিল। সেখানে যেহেতু মাত্র দুই বছর জেল, তাই ওই মামলার বাদী (স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা) হয়তো সেদিকে যাননি। তবে আপাতত অধিকতর উদ্বেগজনক হলো, এটা প্রধানমন্ত্রীর অবমাননা আইনে পরিণত হচ্ছে। সাইবার ট্রাইব্যুনালের প্রথম সাজাও ঘটেছে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে। খুলনার এক সংখ্যালঘু তরুণের প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর জন্য ‘অবমাননাকর’ গান তৈরি ও তা প্রচারের জন্য সাত বছর জেল হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এখন পর্যন্ত যত মামলা হয়েছে তা প্রধানত প্রধানমন্ত্রীকে অবমাননাকেন্দ্রিক। কিন্তু এই সীমার মধ্যে বেশি দিন এটা থাকবে না। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ঘায়েলে আইনটির অপব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। সব খবর গণমাধ্যমে দ্রুত আসবে বলেও মনে হয় না। প্রচলিত অন্য আইনে একই অপরাধের বিচার করা গেলেও পুলিশ প্রশাসন এখন সুযোগ পেলেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা ঠোকার প্রবণতা দেখাবে। এর অজামিনযোগ্যতা, অন্তত সাত বছর জেলখাটা, এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান—ভয় দেখানোর জন্য সবই উপাদেয়।
প্রতিপক্ষ বা শত্রু ঘায়েলে এই আইনের আরেকটি অপপ্রয়োগের উদাহরণ দিই। গত ৩ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় ইমরান হোসেন আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁর এক আত্মীয় আমাকে বলেন, আরিফের বিরুদ্ধে এর আগে যারা চারটি মামলা করে পেরে ওঠেনি, তারাই এবার তাকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ফেলেছে। ফেসবুকে আরিফ লিখেছেন, ‘যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক বলা হয়, তাহলে শেখ হাসিনা আমার বোন ও তাঁর ছেলে আমার ভাগনে।’ তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, এ ধরনের মন্তব্য শাস্তিযোগ্য, তাহলে তাঁকে তিরস্কার বা সামান্য জরিমানা করা যেতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী এখন এই ৩৩ বছরের যুবককে ১৪ বছর জেল বা এক কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে। বাস্তবে আরিফের ক্ষেত্রে যদি তা না–ও হয়, তার পরও এ রকম একটি মধ্যযুগীয় আইন কেন আমাদের মাথার ওপর ঝুলবে? শুনলাম, স্থানীয় প্রশাসনের নানা অনিয়ম তিনি ফেসবুকে প্রকাশ করতেন। অভিযোগ উঠেছে, কুষ্টিয়া শহর যুবলীগের এক নেতা প্রশাসনের ইঙ্গিতে আরিফের বিরুদ্ধে এই মামলা দিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে মন্তব্য বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও কিন্তু অভিযুক্ত হচ্ছেন। ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ট্রেলিয়া সফররত একজন শিক্ষক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য করায় হাইকোর্ট তাঁকে তলব করেন। তিনি তা অগ্রাহ্য করলে তাঁকে ছয় মাস দণ্ড দেওয়া হয়। গত ১৯ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক উপপরিচালক শামসুজ্জোহাকে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ‘অবমাননাকর’ মন্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার করে। গত ৫ সেপ্টেম্বর নিউ এজ রিপোর্ট বলেছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এক ডজনের বেশি মামলা চলছে সারা দেশে। ট্রাইব্যুনাল গঠনের আগে শেখ হাসিনা সম্পর্কে ‘অশ্লীল ও অবমাননাকর’ উক্তির দায়ে ঢাকার দায়রা আদালত বুয়েটের সাবেক শিক্ষক হাফিজুর রহমান রানাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে এখানে উল্লেখ করা দরকার যে ভারতেও কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও তার অপপ্রয়োগ নিয়ে গণমাধ্যম সোচ্চার। গত বছর সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংসহ আরও দুজন নেতাকে নিয়ে ফেসবুকে কেরিকেচার করেছিলেন সঞ্জয় চৌধুরী। সে জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে রাজনৈতিক কার্টুন এঁকেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র। এটা মাইলফলক ঘটনাই বটে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬ক ধারা, যেটা আমাদের ওই ৫৭ ধারার সঙ্গে তুলনীয়, তার আওতায় গ্রেপ্তার করিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। এরপর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মানবাধিকার কমিশন যেটা করল সেটা আমাদের ‘স্বাধীন’ মানবাধিকার কমিশনের জন্য অনুসরণীয়। তারা এই ঘটনায় ‘অতি উৎসাহী’ দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের এবং অধ্যাপক মহাপাত্র ও তাঁর এক প্রতিবেশী, যাকে আটক করা হয়েছিল, তঁাদের ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করে।
এখন যেটা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার সেটা হলো, অতি উৎসাহীরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ‘লেসে মাজেস্টি’ জাতীয় একটা কিছু ইতিমধ্যে চালু করে দিয়েছে কি না। লেসে মাজেস্টি ফরাসি শব্দ। এর অর্থ হলো ‘রাজা বা রাষ্ট্রের মর্যাদার হানি ঘটানো।’ থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অনেক রাজতন্ত্রে এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এ জন্য সর্বত্র লঘুদণ্ড। থাইল্যান্ডে একসময় এই আইনে মামলা হু হু করে বাড়তে থাকলে থাই রাজা ভূমিবল একবার তাঁর জন্মদিনে বলেছিলেন, অবশ্যই আমার সমালোচনা করা যাবে। এমনকি আরও বলেছিলেন, ‘কিং ক্যান ডু রং।’
আশা করব, আওয়ামী লীগ তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার ছদ্মাবরণে দেশে ‘লেসে মাজেস্টি’ ধরনের রাজতন্ত্রের আইন চালু হতে দেবে না। ভারতে এর অপপ্রয়োগ বাড়ার পর সুপ্রিম কোর্ট রুল দিলে সরকার এ ব্যাপারে সারা দেশে একটি পরিপত্র জারির কথা জানায়। ভারত সরকারের সেই পরিপত্র অনুযায়ী গ্রাম ও শহরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করতে হলে ডিএসপি এবং মহানগরে মামলা দায়েরে আইজিপির অনুমোদন লাগবে। এ রকম একটা রক্ষাকবচ আমাদেরও দরকার।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপব্যবহার by মিজানুর রহমান খান

বিএনপি সরকারের আমলে তৈরি করা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মানহানি ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা–বিষয়ক ৫৭ ধারার আওতায় সারা দেশে মামলার সংখ্যা সংক্রামক ব্যাধির মতো দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এই ৫৭ ধারা কি সেই ৫৪ ধারা হতে চলেছে? সন্দেহের বশে পরোয়ানা ছাড়াই পাইকারি গ্রেপ্তারের হাতিয়ার হিসেবে দণ্ডবিধির ৫৪ ধারা কুখ্যাত হয়ে উঠেছিল। অবশ্য সাইবার অপরাধের ভয়াবহতাকে উপেক্ষা করা যাবে না। একে কঠোরহস্তেই দমন করতে হবে। কিন্তু আইনের অস্পষ্টতার কারণে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি। টেলিফোনে ২২ অক্টোবর আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে কথা হলো। তাঁকে জানালাম, ভারতের ২০০০ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭ ও ৬৬ক ধারার সঙ্গে আমাদের বিতর্কিত ৫৭ ধারার মিল পাবেন। এটা ধারণা করা যায় যে ভারতীয় আইনের ৬৭ ধারা তরজমা করতে গিয়ে ২০০৬ সালের খসড়া প্রস্তুতকারীরা দুরভিসন্ধির আশ্রয় নিয়েছিলেন। ওই ৬৭ ধারা কেবল অশ্লীলতাবিরোধী। অথচ তা নকল করতে গিয়ে বিএনপির সাংসদেরা তথ্যপ্রযুক্তি আইনে অশ্লীলতার সঙ্গে মানহানি, নীতিভ্রষ্টতা, ব্যক্তির ভাবমূর্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত অন্তর্ভুক্ত করেন। সবচেয়ে অভিনব ছিল মিথ্যাকে শাস্তিযোগ্য করা। আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের কথায়, ২০০ বছর আগেই মিথ্যার জন্য শাস্তির বিধান রহিত হয়ে গেছে। আদর্শলিপি বইয়ে লেখা ছিল মিথ্যা বলা মহাপাপ। এখন পাঠ্যপুস্তকে লেখা উচিত মিথ্যা বললে ১৪ বছর কারাবাস।

‘প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মুঠোফোনে কটূক্তি, বাবা-ছেলে গ্রেপ্তার’ শীর্ষক একটি খবর ১৯ অক্টোবর প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে। ১৩ বছরের সিজান সম্ভবত এই আইনের প্রথম কিশোর অভিযুক্ত। ২৪ অক্টোবরে মুঠোফোনে বগুড়ার কাহালু থানার ওসি সমিত কুমার কুন্ডু আমাকে জানালেন, মুঠোফোনটি শুকুর আলীর। তিনি হতদরিদ্র। বাদাম ফেরি করেন। ছেলেটি শীতলাই দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সে তার বাবার মুঠোফোনটি প্রকাশ্যে (পাবলিক প্লেসে) নয়, বাড়িতে বসে বাজাচ্ছিল। সেটি একটি ভিডিও। যাতে বিড়ালের ছবি আছে। কোনো মানুষের ছবি নেই। ওসি আরও নিশ্চিত করেন, কটূক্তিগুলোও কোনো মানুষের কণ্ঠে শোনা যায়নি। তাঁর দাবি, ‘এটা যান্ত্রিক, ডিজিটাল কণ্ঠস্বর।’ তিন কিলোমিটার দূরবর্তী থানা থেকে খবর পেয়ে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। আজ ২৭ অক্টোবর বাবা-ছেলের রিমান্ড শুনানি হবে। এই ‘অপরাধের’ প্রতিকার অন্য আইনে ছিল। মানহানির সাজা সর্বোচ্চ দুই বছর। দেশে এখন একই অপরাধের দুই রকম সাজা। আপনি যদি বিষয়টি ‘ইলেকট্রনিক’ মাধ্যমে ফেলতে পারেন, তাহলে কাউকে ১৪ বছর জেল খাটাতে পারবেন। দুই বছরের সাজা হবে ১৪ বছর।
প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্যাদা রক্ষার জন্য তো ওই আইনে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। কাহালুর ওসি নিজেই আসামি ধরতে গেছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, দুই দিন পরে যখন কেউ কাউকে ৫৭ ধারায় ফাঁসাতে চাইবে, তখন কি তিনি এভাবেই ছুটবেন? ওসি বললেন, ‘এখানে তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত।’ তাঁর কাছ থেকেই শুনলাম, নারায়ণগঞ্জে এই ৫৭ ধারায় একই ধরনের অভিযোগে নতুন গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। এটা আশার বিষয় কি না জানি না, তবে শুনলাম আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এই আইনের বিভিন্ন দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। যদিও তারা আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়ে গত বছরেই বিএনপির সৃষ্ট কালাকানুনকে আরও তীক্ষ্ণÿ হুলসম্পন্ন করেছিল। এই আইনে অপরাধকে অজামিনযোগ্য, ন্যূনতম শাস্তি ৭ ও সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছরে উন্নীত এবং জরিমানার অঙ্ক এক কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এর পরও আইনমন্ত্রীর মন্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছি। তিনি জানালেন যে আইনটি তিনি নিজেই খতিয়ে দেখছেন।
বিএনপি প্রতিপক্ষের জন্য গর্ত খুঁড়েছিল। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এম কে আনোয়ার এর প্রথম শিকার হলেন। এই আইনে প্রথম পেশাদার রাজনীতিক হিসেবে তাঁর বিচার শুরু হবে ৩০ নভেম্বর। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এটা কিন্তু দণ্ডবিধির ২৯৫ক ধারায় বিচার্য ছিল। সেখানে যেহেতু মাত্র দুই বছর জেল, তাই ওই মামলার বাদী (স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা) হয়তো সেদিকে যাননি। তবে আপাতত অধিকতর উদ্বেগজনক হলো, এটা প্রধানমন্ত্রীর অবমাননা আইনে পরিণত হচ্ছে। সাইবার ট্রাইব্যুনালের প্রথম সাজাও ঘটেছে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে। খুলনার এক সংখ্যালঘু তরুণের প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর জন্য ‘অবমাননাকর’ গান তৈরি ও তা প্রচারের জন্য সাত বছর জেল হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এখন পর্যন্ত যত মামলা হয়েছে তা প্রধানত প্রধানমন্ত্রীকে অবমাননাকেন্দ্রিক। কিন্তু এই সীমার মধ্যে বেশি দিন এটা থাকবে না। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ঘায়েলে আইনটির অপব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। সব খবর গণমাধ্যমে দ্রুত আসবে বলেও মনে হয় না। প্রচলিত অন্য আইনে একই অপরাধের বিচার করা গেলেও পুলিশ প্রশাসন এখন সুযোগ পেলেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা ঠোকার প্রবণতা দেখাবে। এর অজামিনযোগ্যতা, অন্তত সাত বছর জেলখাটা, এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান—ভয় দেখানোর জন্য সবই উপাদেয়।
প্রতিপক্ষ বা শত্রু ঘায়েলে এই আইনের আরেকটি অপপ্রয়োগের উদাহরণ দিই। গত ৩ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় ইমরান হোসেন আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁর এক আত্মীয় আমাকে বলেন, আরিফের বিরুদ্ধে এর আগে যারা চারটি মামলা করে পেরে ওঠেনি, তারাই এবার তাকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ফেলেছে। ফেসবুকে আরিফ লিখেছেন, ‘যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক বলা হয়, তাহলে শেখ হাসিনা আমার বোন ও তাঁর ছেলে আমার ভাগনে।’ তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, এ ধরনের মন্তব্য শাস্তিযোগ্য, তাহলে তাঁকে তিরস্কার বা সামান্য জরিমানা করা যেতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী এখন এই ৩৩ বছরের যুবককে ১৪ বছর জেল বা এক কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে। বাস্তবে আরিফের ক্ষেত্রে যদি তা না–ও হয়, তার পরও এ রকম একটি মধ্যযুগীয় আইন কেন আমাদের মাথার ওপর ঝুলবে? শুনলাম, স্থানীয় প্রশাসনের নানা অনিয়ম তিনি ফেসবুকে প্রকাশ করতেন। অভিযোগ উঠেছে, কুষ্টিয়া শহর যুবলীগের এক নেতা প্রশাসনের ইঙ্গিতে আরিফের বিরুদ্ধে এই মামলা দিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে মন্তব্য বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও কিন্তু অভিযুক্ত হচ্ছেন। ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ট্রেলিয়া সফররত একজন শিক্ষক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য করায় হাইকোর্ট তাঁকে তলব করেন। তিনি তা অগ্রাহ্য করলে তাঁকে ছয় মাস দণ্ড দেওয়া হয়। গত ১৯ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক উপপরিচালক শামসুজ্জোহাকে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ‘অবমাননাকর’ মন্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার করে। গত ৫ সেপ্টেম্বর নিউ এজ রিপোর্ট বলেছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এক ডজনের বেশি মামলা চলছে সারা দেশে। ট্রাইব্যুনাল গঠনের আগে শেখ হাসিনা সম্পর্কে ‘অশ্লীল ও অবমাননাকর’ উক্তির দায়ে ঢাকার দায়রা আদালত বুয়েটের সাবেক শিক্ষক হাফিজুর রহমান রানাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে এখানে উল্লেখ করা দরকার যে ভারতেও কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও তার অপপ্রয়োগ নিয়ে গণমাধ্যম সোচ্চার। গত বছর সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংসহ আরও দুজন নেতাকে নিয়ে ফেসবুকে কেরিকেচার করেছিলেন সঞ্জয় চৌধুরী। সে জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে রাজনৈতিক কার্টুন এঁকেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র। এটা মাইলফলক ঘটনাই বটে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬ক ধারা, যেটা আমাদের ওই ৫৭ ধারার সঙ্গে তুলনীয়, তার আওতায় গ্রেপ্তার করিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। এরপর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মানবাধিকার কমিশন যেটা করল সেটা আমাদের ‘স্বাধীন’ মানবাধিকার কমিশনের জন্য অনুসরণীয়। তারা এই ঘটনায় ‘অতি উৎসাহী’ দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের এবং অধ্যাপক মহাপাত্র ও তাঁর এক প্রতিবেশী, যাকে আটক করা হয়েছিল, তঁাদের ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করে।
এখন যেটা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার সেটা হলো, অতি উৎসাহীরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ‘লেসে মাজেস্টি’ জাতীয় একটা কিছু ইতিমধ্যে চালু করে দিয়েছে কি না। লেসে মাজেস্টি ফরাসি শব্দ। এর অর্থ হলো ‘রাজা বা রাষ্ট্রের মর্যাদার হানি ঘটানো।’ থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অনেক রাজতন্ত্রে এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এ জন্য সর্বত্র লঘুদণ্ড। থাইল্যান্ডে একসময় এই আইনে মামলা হু হু করে বাড়তে থাকলে থাই রাজা ভূমিবল একবার তাঁর জন্মদিনে বলেছিলেন, অবশ্যই আমার সমালোচনা করা যাবে। এমনকি আরও বলেছিলেন, ‘কিং ক্যান ডু রং।’
আশা করব, আওয়ামী লীগ তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার ছদ্মাবরণে দেশে ‘লেসে মাজেস্টি’ ধরনের রাজতন্ত্রের আইন চালু হতে দেবে না। ভারতে এর অপপ্রয়োগ বাড়ার পর সুপ্রিম কোর্ট রুল দিলে সরকার এ ব্যাপারে সারা দেশে একটি পরিপত্র জারির কথা জানায়। ভারত সরকারের সেই পরিপত্র অনুযায়ী গ্রাম ও শহরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করতে হলে ডিএসপি এবং মহানগরে মামলা দায়েরে আইজিপির অনুমোদন লাগবে। এ রকম একটা রক্ষাকবচ আমাদেরও দরকার।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

নূর হোসেনে আটকে আছে সাত খুনের বিচার! by সোহরাব হাসান

তুরস্কের বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন, বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু মাত্র এক বছর। একবিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু যে আরও কম, তা উপলব্ধি করলাম গত শনিবার নারায়ণগঞ্জে গিয়ে। গত এপ্রিলের শেষ দিনে যখন নারায়ণগঞ্জে যাই, সর্বত্র ছিল শোকের আবহ। সাত খুনের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ তো বটেই, গোটা দেশ তোলপাড়। বিচারের দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ মিছিল-সমাবেশ-মানববন্ধন করছেন। স্লোগান দিচ্ছেন, ঘাতকদের ফাঁসি চাই। সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা ছুটে যাচ্ছেন শোকসন্তপ্ত স্বজনদের কাছে। গণমাধ্যমের কর্মীরা ভিড় করছেন ডিসি-এসপির অফিসে, আদালত চত্বরে—যদি নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়। ছয় মাস পর যেন সবকিছু স্তিমিত হয়ে আসছে। সময় ও জীবনের দাবি শোককে ভুলিয়ে দিয়েছে। সাইনবোর্ড মোড় থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ সড়কের দুপাশে টানানো ব্যানারগুলো মলিন। পোস্টারগুলো বিবর্ণ। শনিবার বিকেলে প্রথম আলোর নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি আসিফ হোসেনকে নিয়ে আমরা যখন মিজমিজি উচ্চবিদ্যালয়ে পৌঁছাই, সবকিছু স্বাভাবিক লক্ষ করি। স্কুলের গেটে কাউন্সিলর নজরুল হত্যার বিচারের দাবি–সংবলিত একটি ব্যানার ঝুলছে। ভেতরে ভোটার আইডি কার্ড তৈরি ও নবায়নের কাজ চলছে। কিছুক্ষণ পর নজরুলের স্ত্রী কাউন্সিলর সেলিনা ইসলাম এলেন। সালোয়ার–কামিজের ওপর কালো বোরকা পরা ভদ্রমহিলাকে দেখে মনে হলো, তিনি একাই স্বামীর শোক ধারণ করে আছেন। সাত খুনের বিচারের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী, জানতে চাইলে তিনি কিছুটা হতাশার সুরে বললেন, হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আগে তদন্ত কর্মকর্তারা বলতেন, শিগগিরই নিয়ে আসা হবে। এখন বলছেন, আনার চেষ্টা হচ্ছে। তাঁকে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত বিচার হবে না বলে মনে করেন তিনি। সেখানে উপস্থিত নজরুলের অনুসারী আওয়ামী লীগের একাধিক কর্মী জানালেন, র্যাবের সদস্যদের বাইরে কোনো আসামিকে ধরার চেষ্টা করছে না পুলিশ। এমনকি আসামিদের বাড়িতে কোনো অভিযানও চালানো হয়নি। পুলিশ তাদের খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ ঈদের সময় আত্মীয়স্বজন এলাকায় এসে আসামিদের নামে কোরবানি দিয়ে চলে গেছেন। নজরুলের অনুসারীদের ধারণা, আসামিরা আশপাশে কিংবা ঢাকার কোথাও আত্মগোপন করে আছে।
২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালত ভবন থেকে বাড়ি ফেরার পথে র্যাব পরিচয়ে কাউন্সিলর নজরুলসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। সেদিনই নূর হোসেন, ইয়াসিন, হাসমত আসমত আলী, আমিনুল ইসলাম, ইকবাল হোসেন ও আনোয়ার হোসেনকে আসামি করে মামলা করেন নজরুলের স্ত্রী। এজাহারে তিনি র্যাবের পরিচয়ে তাঁদের অপহরণ করা হয়েছে বললেও পরে প্রমাণিত হয় যে নূর হোসেনের প্ররোচনায় র্যাব-১১–এর সদস্যরাই তাঁদের অপহরণ ও হত্যা করেন। আলাপকালে সেলিনা আরও বললেন, আসামিদের অনুসারীরা মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে। নূর হোসেনের অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য যারা দেখত, তারা ফের এলাকায় ফিরে আসছে। এ অবস্থায় তিনিও ভয়ে আছেন। আমরা যখন স্কুলের একটি কক্ষে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখনো মামলার দুই নম্বর আসামি ইয়াসিনের লোক মাঠে ঘেরাফেরা করছিল, জানালেন আওয়ামী লীগেরই স্থানীয় এক কর্মী।
কোনো মৃত্যুই জীবনকে থামিয়ে রাখতে পারে না। সেলিনা ইসলামের জীবনও থেমে নেই। নজরুলের শূন্য পদে তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর দুই ছেলে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় ঢাকার একটি স্কুলে পড়াশোনা করছে। চন্দন সরকারের পরিবারের বিষয়টি নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীরা নিজেদের বিষয় হিসেবে নিয়েছেন। জানতে চাই, অপর পাঁচ পরিবারের সদস্যরা কেমন আছেন। জবাবে সেলিনা বললেন, সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের পরিবার। জাহাঙ্গীর মারা যাওয়ার পর ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তান নিয়ে তাঁর স্ত্রী নিরুপায়। শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি চলে গেছেন। একইভাবে বিপদাপন্ন আওয়ামী লীগের কর্মী স্বপনের পরিবারও। এখন পর্যন্ত সরকার বা কোনো সংগঠন তাদের কোনো সহায়তা করেনি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিছু সহায্য দিয়েছেন।
ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী নিজে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন। বিএনপির নেত্রী পাশে থাকার কথা বলেছেন। তার পরও সেলিনা বিচারের ব্যাপারে আস্থা রাখতে পারছেন না। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, বাংলাদেশে কয়টা হত্যার বিচার হয়? এ প্রশ্ন শুধু নজরুলের স্ত্রীর নয়, এ প্রশ্ন প্রতিটি স্বজনহারার। ছয় মাস আগে যখন সাত হত্যার ঘটনা ঘটে, তখন পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত ছিল। এর পরও নানা অঘটন ঘটেছে। সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন যাঁর হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছেন, সেই নাসিম ওসমান মারা গেছেন গত এপ্রিলে। তাঁর শূন্য আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ছোট ভাই সেলিম ওসমান। সেই নির্বাচনেও চলেছে অপতৎপরতা। সেলিম ওসমানের পক্ষে আবদুস সালাম নামে একজন ইউপি চেয়ারম্যান বন্দর থানার মদনপুরের একটি কেন্দ্র দখল করতে গেলে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা এএসপি মোহাম্মদ বশিরউদ্দিন বাধা দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাংসদ শামীম ওসমান তাঁকে গালাগাল করেন, যা টিভি-পত্রিকার কল্যাণে সবাই দেখেছেন ও শুনেছেন। সেই পুলিশ কর্মকর্তাই সাত খুনের ঘটনার পর নগর ভবনের সামনে থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড উঠিয়ে দিয়ে প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পাঁচ মাস সেটি ধরে রাখতে পারলেও সম্প্রতি আবার সেখানে ট্রাকস্ট্যান্ড বসিয়ে চাঁদাবাজি চলছে। এখানে দিনে কমপক্ষে তিন লাখ টাকার চাঁদা তোলা হয়।
এ কথা ঠিক, সাত হত্যার পর নারায়ণগঞ্জে মোটামুটি শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়, এমন কিছু ঘটেনি। কিন্তু মানুষের মনের শঙ্কা যায় না, ভয় কাটে না। যে অপরাজনীতি নূর হোসেনের মতো দানব গড়ে তোলেন, যে অপরাজনীতি সাতটি মানুষকে দিনে দুপুরে হত্যা করে, সেই অপরাজনীতি পুরোপুরিই বহাল আছে। আছে চাঁদাবাজি, দখলবাজিও। সাত খুনের আগে নূর হোসেন সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথের (সওজ) জায়গা দখল করে চাঁদাবাজি করছিলেন, এখন অন্যরা একই কাজ করছেন। আর গডফাদারদের দৌরাত্ম্যও বেড়েছে, বৈ কমেনি। নারায়ণগঞ্জের একজন স্থানীয় সাংবাদিক বললেন, আগের সংঘটিত হত্যাগুলো বন্ধ করতে পারলে হয়তো ২০১৩ সালের ত্বকী হত্যার ঘটনা ঘটত না। আবার ত্বকী হত্যার বিচার হলে হয়তো সাত খুনের ঘটনা এড়ানো যেত। একটি হত্যা আরেকটি হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করে। আবার একটি হত্যার অপরাধীদের আড়াল করতে আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়, যাতে আগেরটির কথা মানুষ ভুলে যায়। সাত খুনের ঘটনা কিসের ইঙ্গিত দেয়?
সাত খুনের কারণ, পটভূমি এবং এর সামনের ও নেপথ্যের হোতাদের নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, এই বিচার হবে কি না। অপরাধীরা শাস্তি পাবে কি না। সাত খুনের ঘটনায় যেভাবে আবেগ ও আলোড়ন তৈরি হয়েছিল, তাতে অনেকের মনে আশা জেগেছিল, হত্যার বিচার হবে। কিন্তু বিচারের প্রক্রিয়া প্রথমেই হোঁচট খেল এফআইআর ও এক নম্বর তালিকাভুক্ত আসামি নূর হোসেনের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায়। সাত হত্যার ঘটনা ঘটে ২৭ এপ্রিল অপরাহ্ণ আড়াইটা-তিনটার মধ্যে। এরপর তিন দিন পুলিশ পুরোপুরি নীরব ছিল। যেদিন তারা নূর হোসেনের বাড়িতে তল্লাশি চালায়, তার আগেই তিনি ভারতে পালিয়ে যান। যাওয়ার আগে তিনি যে নারায়ণগঞ্জ-৪-এর সাংসদ শামীম ওসমানের আশীর্বাদ ও পরামর্শ নিয়ে গেছেন, সেই খবরও সবার জানা। তবে নারায়ণগঞ্জ পুলিশের কর্মকর্তারা মনে করেন, নূর হোসেন পালিয়ে গেলেও মামলা সঠিক খাতেই প্রবাহিত হচ্ছে। তাঁদের আশা, সাত হত্যার বিচার হবে এবং অপরাধীরাও শাস্তি পাবে। কীভাবে এতটা নিশ্চিত হলেন? এ প্রশ্নের জবাবে একজন কর্মকর্তা বললেন, যেখানে ১২ জন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন; তাঁদের বাইরেও অনেকের সাক্ষ্য পাওয়া গেছে, সেখানে অপরাধীদের রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, তদন্তের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই। এমনকি আভাসে-ইঙ্গিতেও কেউ কিছু তাঁদের বলেননি।
সাত খুনের মামলার তদন্ত তদারকের দায়িত্বে যিনি আছেন; তিনিই নরসিংদীর লোকমান হত্যা মামলার তদন্তকাজেরও তদারকের দায়িেত্ব ছিলেন। সেই তদন্ত প্রতিবেদন নির্ভুল বলেই দাবি করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তাই আশা করা যায়, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনারও ঠিকঠাক তদন্ত হবে। তবে তদন্ত সঠিক হলেই যে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, তা হলফ করে বলা যায় না। এর পর আছে সাক্ষ্য, সওয়াল–জওয়াব, আপিল ইত্যাদি। তাই, নীতিনির্ধারকদের অভয়বাণী কিংবা পুলিশের কর্মকর্তাদের আশ্বাস সত্ত্বেও নিহতদের পরিবার তথা নারায়ণগঞ্জবাসী পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না। তদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের এক কর্মকর্তা জানালেন, সাত খুনের ঘটনা তাঁদের কাছে যেমন নতুন অভিজ্ঞতা, তেমনি চ্যালেঞ্জও। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তঁারা প্রস্তুত আছেন। তবে পুলিশের কর্মকর্তারা যা-ই বলুন না কেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষ মনে করে, নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার ওপরই এ মামলার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করছে। সরকার প্রথম দিকে নূর হোসেনকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যত তৎপর ছিল, এখন মনে হচ্ছে তাতে ভাটা পড়েছে। নানা ধরনের গুজব শোনা যাচ্ছে। প্রভাবশালী মহলের কেউ কেউ নূর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নূর হোসেনকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে সাত খুনের মামলাও ঝুলে থাকবে। অপরাধীরা শাস্তি পাবে না। সরকার চাইলেই তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তি হয় ২০১২ সালে। চুক্তির আগেই যদি অরবিন্দ বাজখোয়াসহ দুর্ধর্ষ উলফা নেতাদের বাংলাদেশ ভারতের হাতে তুলে দিতে পারে, পুঁচকে নূর হোসেনকে কেন ভারত বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে পারবে না? ভারত সরকার চেয়েছিল বলেই বাজখোয়াকে সে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নূর হোসেনকে বাংলাদেশ সরকার ফিরিয়ে আনতে চায় কি না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

ইউরেশিয়া- ইউক্রেনের ভোট ও রাশিয়ার ভাগ্য by কার্ল বিল্ডট

ইউক্রেনের ভোটাররা গতকাল (২৬ অক্টোবর) ভোটে অংশ নিয়েছেন, এতে শুধু তাঁদের নিজেদের দেশেরই নয়, ইউরোপেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে। সহজভাবে বললে, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎই রাশিয়ার ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবে, আর রাশিয়ার ভবিষ্যৎ ইউরোপের ভবিষ্যতে বেশ বড়সড় প্রভাব ফেলবে। সেই দুই দশক আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে ইউক্রেন স্বাধীনতার পথ বেছে নেয়। তখন অনেকেই আশা করেছিলেন, তারা রাশিয়ার চেয়ে ভালো করবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন দিকে মোড় নিল।
নতুন শতকের প্রথম দশকে রাশিয়া সেই সোভিয়েত যুগের হাইড্রোকার্বন শিল্পের কারণে লাভবান হয়। ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কারণে এই শিল্প আরও কার্যকর হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যও বাড়ে। অর্থনীতিতে যে বহুমুখীকরণ প্রত্যাশিত ছিল, তা না হওয়া ও ‘আধুনিকায়ন’ একটি স্লোগানে পরিণত হওয়ার প্রভাব প্রাথমিকভাবে তেমন একটা অনুভূত হয়নি।
উল্টোদিকে, ইউক্রেন সোভিয়েত-উত্তর যুগের সবচেয়ে বাজে দেশে পরিণত হয়, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি দেশটির উৎপাদনশীলতা একদম ধসিয়ে দেয়। ফলে দেশটি ক্রমেই অন্যান্য কমিউনিজম-উত্তর দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। পোল্যান্ডের সঙ্গে ইউক্রেনের তুলনা করলে ব্যাপারটা বোঝা যায় দেশটি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার সময় দেশ দুটির মাথাপিছু গড় জিডিপি ছিল প্রায় সমান, আর আজ পোল্যান্ডের জিডিপি ইউক্রেনের চেয়ে তিন গুণ বড়। ২০০৪ সালের কমলা বিপ্লব ইউক্রেনের অধিকাংশ নাগরিকের জন্য ছিল ব্যর্থতার শামিল। অতীতের সঙ্গে সেই বহুপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদ আর ঘটেনি, দেশটির নতুন নেতাদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ২০০৪ সালটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যও ব্যর্থতার বছর। সে বছর তিনি ইউক্রেনে তাঁর পছন্দের মানুষ ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে ভোট জালিয়াতিতে সহায়তা করে তাঁকে দেশটির প্রেসিডেন্ট বানাতে চেয়েছিলেন। সেটা করতে ব্যর্থ হয়ে ক্রেমলিন বেজায় চটেছিল, তারা সেটা কোনো দিন ভুলতেও পারেনি, আবার যাদের কারণে তারা ব্যর্থ হয়েছিল, তাদের ক্ষমাও করতে পারেনি। এরপর ২০১০ সালে কমলা বিপ্লবের ব্যর্থতায় একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতায় আসেন। আর ২০১২ সালে পুতিন তৃতীয়বারের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। নতুন একটি ইউরেশিয়া ইউনিয়ন গঠন করা ছিল তাঁর প্ল্যাটফর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মধ্যে ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য ও অ্যাসোসিয়েশন অ্যাগ্রিমেন্ট করার জন্য দেনদরবার শুরু করে সেই ২০০৭ সাল থেকেই। এসব আলোচনা শেষ হয় ২০১২ সালের প্রথম দিকে। চুক্তিটি রাশিয়া-ইউক্রেনের বিদ্যমান মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হলেও সেটা পুতিনের ইউরেশিয়া প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই এক বছরের কিছু বেশি সময় আগে ক্রেমলিন ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তি থেকে সরিয়ে আনতে আক্রমণ শুরু করে­, যদিও ইয়ানুকোভিচ ও তাঁর পার্টি অব রিজিয়ন্স এ চুক্তিতে সায় দিয়েছিল। আর এর পরের অধ্যায় ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়েছে: ইয়ানুকোভিচের চুক্তি বাতিল করা, এর বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলনে তাঁর পতন, রাশিয়ার দুই দফা আক্রমণ ও দেশটির পূর্বাঞ্চল ডনবাসে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু।
ক্রেমলিন শুধু ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ ও ডনবাসে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে চায় না। সে আরও চায়, ইউক্রেন যেন পশ্চিমের দিকে না যায়। দরকার হলে, রাশিয়া জোর করে তাকে পূর্ব দিকে মোড় নেওয়াবে, আর তার পক্ষপুটে যে আন্দোলনের মাধ্যমে ইয়ানুকোভিচের পতন হয়েছিল, ভবিষ্যতে সে রকম আন্দোলনের সম্ভাবনা একদম অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে চায় রাশিয়া। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নানা রকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পুতিন যে ইউরোপের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন, তার জবাবে পশ্চিমারা রাশিয়ার ওপর নানা রকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু একটি দুর্বল রাশিয়াও তার নিকট প্রতিবেশীদের কাছে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবেই দেখা দেবে। তবে দিনের শেষে বলতে হয়, ইউক্রেনের শক্তি ও সংকল্পই রাশিয়ার উচ্চাভিলাষের রাশ টেনে ধরতে পারে।
ইউক্রেন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে ক্ষয়ে গেছে, আবার রাশিয়ার আগ্রাসনেও সে পর্যুদস্ত। ফলে দেশটির ঘুরে দাঁড়াতে হলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। গতকাল রোববারের নির্বাচনের মাধ্যমে এমন একটি সরকার গঠন হওয়া জরুরি, যারা সে দেশে মৌলিক সংস্কার আনবে। সে সরকারের উচিত হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় করা। প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে গেলে সংশোধিত ও কার্যকর আইএমএফ সহায়তা প্যাকেজ দরকার হবে। দেশটির জ্বালানি নীতি অযৌক্তিক, সেখানে গ্রাহক পর্যায়ে অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে—এটা একধরনের অপচয়। এটা বদলাতে হবে। আর এই সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কৃত চুক্তিটি ব্যবহার করতে হবে।
এই এজেন্ডা সফল হলে ক্রেমলিনের সংশোধনবাদী আকাঙ্ক্ষার অপমৃত্যু ঘটবে। এটা হলে রাশিয়াতেও সংস্কার জরুরি হয়ে উঠবে। কিন্তু এই সংস্কার ব্যর্থ হলে ক্রেমলিন তার নীতিতে অটল থাকবে, যতক্ষণ না তারা কিয়েভে তাদের অভীষ্টে পৌঁছায়। পুতিনের কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু তিনি ভালোভাবেই জানেন, তিনি কী চান।
আর পশ্চিমের ক্রমাগত হুমকির মুখে রাশিয়া আবার শেষমেশ ঘেরাওয়ের নীতিতে চলে যেতে পারে। অর্থনৈতিক ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে রাশিয়া তার সংশোধনবাদী কার্যক্রম আরও জোরদার করবে, এমন ঝুঁকিও অগ্রাহ্য করার নয়। যাঁরা রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমগুলোর আগ্রাসী জাতীয়তাবাদী অবস্থান সম্পর্কে অবগত, তাঁরা নিশ্চয়ই এর বিপদ টের পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ প্রকৃত বিপদের মুখে পড়তে পারে। ক্রেমলিন তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ঢাকতে দেশের বাইরে শক্তির মহড়া দিতে পারে, ফলে সংশোধনবাদের চাকা ঘুরে তা হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারের পথে চালিত হতে পারে।
তখন হয়তো বড়সড় যুদ্ধ আর এড়ানো সম্ভব হবে না। সে কারণেই দুই দশকের ব্যর্থতার পর ইউক্রেনের ঘুরে দাঁড়ানো খুবই জরুরি। তাদের একটি শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া দারকার। রোববারের এই নির্বাচন তাই ইউক্রেনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এর মাধ্যমে রাশিয়াও বৃহত্তর ইউরোপ পরিবারের প্রকৃত সদস্যে পরিণত হতে পারে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

কার্ল বিল্ডট: সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

তরুণ সমাজে বিভ্রান্তি মঙ্গলজনক নয় by এম সাখাওয়াত হোসেন

যে দেশে এখনো জাতিসত্তা বিভিন্ন কারণে বিকশিত হতে পারেনি, তার নরম মেরুদণ্ড ভাঙতে বেশি কিছু করতে হয় না। তরুণ সমাজকে বিভক্ত করে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দিলেই হয়। ক্ষমতার স্বাদ ও অর্থের নেশায় বিভ্রান্ত আমাদের তরুণ সমাজের একাংশ। এ অংশ ক্ষুদ্র হলেও সমাজে দারুণভাবে প্রভাব ফেলতে সক্ষম, কারণ এরা রাজনৈতিক দলের মদদপুষ্ট হয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও বলয় সৃষ্টিতে রত। যুবসমাজের মধ্য থেকেই দেশের সর্বক্ষেত্রে নেতৃত্ব গড়ে ওঠার কথা অথচ যে অবস্থানে বর্তমানে আমাদের তরুণ সমাজ রয়েছে, তাতে নেতিবাচক ধারণা জন্মানো স্বাভাবিক।
আমাদের তরুণদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুড় অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এসব অঙ্গসংগঠন রাজনৈতিক দলের তথাকথিত আদর্শ দ্বারা সংগঠিত বলে ওইসব দল থেকে দাবি করা হয়। ছাত্রসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা হয় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে। বৃহৎ দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রসংগঠনগুলোও রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির আবর্তে পড়েছে। বিভাজনের রাজনীতির মধ্যে অন্ধভাবে দলের অনুসরণ করতে গিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়েছে। হারিয়েছে অতীতের ছাত্ররাজনীতি অথবা যুব রাজনীতির পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি। দলের লেজুড়বৃত্তি করতে করতে বহু জায়গায় নৈতিক স্খলন হয়েছে। অর্থ, ক্ষমতা আর জবরদখল এখন তরুণ দলগুলোর লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে দলীয় নেতাদের ভাষার প্রতিধ্বনি অহরহ শোনা যাচ্ছে। তরুণ ছাত্ররা স্বকীয়তা হারিয়েছে যার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। এর উদাহরণ ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্রসংগঠন, সহযোগী সংগঠন এবং যুবদল ও যুবলীগের কর্মকাণ্ড। এসব দল যেভাবে তথাকথিত ছাত্রসহ অন্য অঙ্গসংগঠনগুলো তৈরি ও ব্যবহার করছে, তা বর্তমানে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আইনের পরিপন্থী। এ আইনের প্রয়োগও যেমন দেখছি না, তেমনি আইনের তোয়াক্কাও কোনো দলই করছে না। এসব আইন সংসদ দ্বারা অনুদিত হলেও তার প্রয়োগ নেই। যখন এ আইন সরকারি দলই মানছে না, তখন অন্য দল মানবে এটা কীভাবে আশা করা যায়।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বিএনপির কেন্দ্র থেকে। অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোতেও কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক চর্চা তো হয় না, এমনকি নেতৃত্ব নির্ধারণও হয় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা-নেত্রীদের পছন্দ-অপছন্দের ওপরে। ছাত্রদলের অভ্যন্তরে যা হচ্ছে তার দায়দায়িত্ব নেতৃস্থানীয় নেতাদের। এই দলটি সরাসরি বর্তমানে প্রচলিত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ধারা ৯০বি(১)(এ)-এর পরিপন্থী কাজ করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহল একেবারে নিশ্চুপ। এ আইন লঙ্ঘন করে (১) যে ক্ষতি করা হয়েছে, তার উদাহরণ ছাত্রদল। ছাত্রসংগঠনের একতরফাভাবে ছাত্রদলের পরিষদ গঠন করে যে ফলাফল হয়েছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিছুদিন আগে ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ অংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করে যে কর্মকাণ্ড করেছে, তাতেই প্রতীয়মান হয় যে এসব ছাত্রসংগঠন দলের দ্বারা শুধু পরিচালিতই নয়, নিজস্ব উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়াসেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। ছাত্রদল এখন মূল দলকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। মূল দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও অফিসকে আক্রমণ করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মূল দলের কেন্দ্রীয় অফিস ভাঙচুরের ঘটনা ইতিপূর্বে হয়েছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের আরও বিভক্তি দেখছি তরুণ সমাজের মধ্যে। এ অস্থিরতার জন্য দায়ী রাজনীতিবিদেরাই।
এখনকার ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর রাজনীতি কোনো দলের জন্যই সুখকর প্রমাণিত হয়নি। কারণ, বড় দলের মধ্যে যেমন গণতন্ত্রের চর্চা নেই, তেমনি আইনবহির্ভূতভাবে এসব সংগঠনকে নিয়ন্ত্রিত করতে গিয়ে গণতন্ত্রের চর্চার ধারেকাছেও নেই তরুণেরা। এ কারণেই বোধ করি তরুণেরা হয়ে পড়েছে সুবিধাভোগী লেজুড়বৃত্তির হাতিয়ার। তরুণ ও ছাত্রদের সংগঠনগুলো দলের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির প্রতি অনুগত বেশি, যার প্রমাণ দৃশ্যমান হয়েছিল ২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থার সময়। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের ওপর নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা, হাজতবাস ইত্যাদির সময় এসব ছাত্র তথা তরুণ সংগঠনকে টুঁ শব্দ করতে শোনা যায়নি। অথচ এখন শুধু দলই নয়, দেশ ও জাতি প্রায় জিম্মি হয়ে পড়েছে এসব ছাত্র ও তরুণ সংগঠনের কাছে। বর্তমানের তরুণ সমাজের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবিদারেরা নিজস্ব উজ্জ্বল ইতিহাসের প্রতিও যখন মোটেও সচেতন নন, সে ক্ষেত্রে জাতির ইতিহাস নিয়ে সচেতন কতখানি হতে পারে তা অনুমেয়। রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো ছাড়াও বিভিন্ন নামে গড়ে ওঠা যুব সংগঠনগুলোও এখন বিভক্তির রাজনীতিতে এমনভাবে জড়িয়েছে, যেখানে নিজস্ব চিন্তাচেতনার কোনো অবকাশ নেই। হারিয়ে ফেলেছে স্বকীয়তা। মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে প্রয়াত ড. পিয়াস করিমের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোকে ঘিরে কিছু কিছু যুব সংগঠন যে ধরনের পরিবেশ তৈরি করেছিল, তাতে সমূহ ক্ষতি হয়েছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের এবং জাতির ভবিষ্যতের। কারণ, দুঃখজনক হলেও সত্য যে তরুণ সমাজ সেখানে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে আরও বিভাজনের সৃষ্টি করেছে। পা রেখেছে অপসংস্কৃতির পথে।
প্রয়াত পিয়াস করিমের বক্তব্যে বা মতামতের সঙ্গে অনেকের মতো আমিও সব ক্ষেত্রে একমত হতে পারিনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাঁর মতকে বিভিন্ন রঙে রাঙানো উচিত। এতে প্রয়াত অধ্যাপকের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়নি, বরং যারা না বুঝে এ ফাঁদে পা দিয়েছে তারা নিজেরাই অসম্মানিত হয়েছে। ড. পিয়াস করিম এখন আর কারও সনদের মুখাপেক্ষী নেই। তবে এ ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে কীভাবে তরুণ সমাজকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এর আগে তরুণদের উদ্যোগে গঠিত গণজাগরণ মঞ্চকে রাজনৈতিক গ্রাসে পরিণত হতে দেশবাসী দেখেছে। একদা যাদেরকে পুলিশের প্রহরায় সমাবেশ ও চলাফেরা করতে দেখা গেছে, তাদের অনেককেই এখন প্রধান নেতাসহ পুলিশের প্রহার হজম করতে দেখা যায়। এটাই বাস্তবতা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পরিণতি এখন ওই মঞ্চের বেশির ভাগ তরুণকে বলা যায় ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ (ঘরেরও না আবার ঘাটেরও না)।
গণজাগরণ মঞ্চের মতো আরও কিছু কিছু স্বঘোষিত তরুণদের সংগঠন গড়ে উঠেছে। এরাও রাজনীতির আবর্তে পড়ে দিশেহারা বিভ্রান্ত। ড. পিয়াস করিমের মৃত্যু এবং শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর প্রস্তাবের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষান্ত হয়নি কয়েকটি তরুণ সংগঠন। আরও এক ধাপ এগিয়ে তাদের পিতাসম বয়সতুল্য কয়েকজন বরেণ্য ব্যক্তিকে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে দেশবাসীকে হতবাক করে দিয়েছে। এদের একটি সংগঠনের নাম পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ‘সিপি গ্যাং’। অভিনব নাম। ‘গ্যাং’ একটি নেতিবাচক শব্দ, যা এখন ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষায় ব্যবহৃত হয়। এ সংগঠনটি কোনো এক প্রগতিশীল দলের তথাকথিত সহযোগী সংগঠন বলে পত্রিকায় লেখা হয়েছে। এমন নামে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতে পারে তা জানা ছিল না।
এসব সংগঠনের নাম-পরিচয় যা-ই থাকুক দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এদের মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান বিভাজনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এর পেছনে কারা ইন্ধন জোগাচ্ছে তা স্পষ্ট নয়, তবে এ ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতির দায়দায়িত্ব রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের ওপরে বর্তায়। এটা সরকারের জন্যও বিব্রতকর, কারণ শহীদ মিনার জাতির গৌরবময় একটি প্রতীক। বিশ্বের কোনো দেশে জাতীয় প্রতীক কারও দখলে থাকে না। সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত। এ ধরনের নজির ভবিষ্যতের জন্য ভালো নয়। শহীদ মিনার কোনো দলের বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয় যে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় পরিচালিত হবে এবং নির্ধারিত হবে ব্যক্তিবিশেষের শহীদ মিনারে গমনের স্বাধীনতা।
আমরা আমাদের যুবসমাজকে ১৯৫২, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের মতো দেখতে চাই। রাজনৈতিক ফায়দা আর বৈষয়িক সুবিধাদি প্রাপ্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখতে চাই না। তরুণ সমাজকে জাতীয় ঐক্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমষ্টিগতভাবে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ী এবং স্বকীয় সত্তা বিকাশের আঙ্গিকে দেখতে চাই। আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে, তা নির্ভর করবে আমাদের তরুণ সমাজের মনমানসিকতা আর নৈতিক মূল্যবোধের ওপর। কারও দ্বারা প্রভাবিত বা ব্যবহৃত হয়ে দিগ্ভ্রষ্ট হলে জাতির ভবিষ্যৎ সংকটময় হবে। সে কারণেই রাজনৈতিক ঘুরপাকে নিমজ্জিত তরুণ সমাজের কাছে অনুরোধ যে তারা যেন লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বাদ দিয়ে স্বকীয়তা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে নিজেদের চলার পথ বেছে নেয়। তা না হলে আমরা যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছি, তা স্বপ্নই থেকে যাবে। যে তরুণ সমাজ তাদের অগ্রজ সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান দেখাতে পারে না, একদিন তাদের এ ধরনের অসম্মানের মুখোমুখি হতে হবে।
আমাদের তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব যে সমাজের রয়েছে তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক দল ও নেতাদের। দেশের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে মুক্তচিন্তা ও মননের তরুণ সমাজ গড়ে তুলতে না পারলে একটি জাতি বিকশিত হতে পারে না। তরুণেরাই রাষ্ট্রের শক্তি, এদের সঠিক পথে পরিচালিত না করতে পারলে তার খেসারত সমগ্র জাতিকেই দিতে হবে। পরিশেষে দেশের মুক্তচিন্তাশীলদের কাছে অনুরোধ, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তাদের মতো করে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করুন। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। নেতিবাচক ও বিভাজনের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে তরুণ সমাজকে।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

ধর্ম ভিন্ন, উদ্দেশ্য অভিন্ন by উম্মে মুসলিমা

লন্ডন টাইমস-এর ইহুদি সম্পাদক ডানিয়েল ফিঙ্কেলেস্টাইন বলেছেন, ‘ইসরায়েল লবি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, সুতরাং ইহুদিরাই পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করে।’ এমন যে ইহুদি জাতি যারা শিক্ষায়, সম্পদে, জ্ঞানে, ধূর্ততায় বিশ্বসেরা, তাদের মধ্যেও গোঁড়ামি রয়েছে। বলা হয় যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত গোঁড়ামিমুক্ত বা আলোকিত। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত নোবেল বিজয়ীদের শতকরা ২২ ভাগই ইহুদি। কিন্তু অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি নৃশংস হতে তারা কসুর করে না। সবাই নয়, সব ধর্মের কট্টরেরাই নিষ্ঠুর। আর এ নিষ্ঠুরতার শিকার ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে বেশির ভাগই নারী। গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের লক্ষ্য গর্ভবতী নারী। কারণ, ইসরায়েলের বিশ্বাস, এসব নারী আরও সন্ত্রাসী জন্ম দিতে যাচ্ছেন। অন্যদিকে মৌলবাদী ইহুদি পুরুষেরা তাঁদের স্ত্রীর গর্ভে যত বেশি সন্তান নেওয়া যায় নিতে থাকেন। তাঁদের ধারণা, ইহুদিদের জনবল বাড়লে তারা পৃথিবী শাসনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবে। তাই নারীরা যে শুধু যুদ্ধেরই বলি হচ্ছেন, তা-ই নয়, আপন ধর্মের বাতাবরণেও তাঁরা নিষ্পেষিত।
কট্টর ইহুদিদের দেখে এলাম কাছ থেকে। পুরুষদের কানের দুই পাশে কাঁধ অবধি ঝোলানো পেঁচিয়ে রাখা জন্মচুল। জন্মের পর থেকে কলিটুকু রেখে রেখে বড় করা হয়। বেশির ভাগের মাথায় হ্যাট, কালো পোশাক। স্বসম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলে না। এমনভাবে পথ চলে, যেন তারা সব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রজেশ্বর। যেন নোংরা পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলতে হচ্ছে তাদের। তাদের পরিচালিত দোকানে পণ্য কিনে টাকা বাড়িয়ে দিলে তারা হাতে নেয় না, টেবিলের ওপর রাখতে বলে। যদি হাতে অস্পৃশ্য ছোঁয়া লেগে যায়? সে দেশে পরিচিত-অপরিচিত বলে কথা নেই, চোখে চোখ পড়লেই সবাই মুচকি হেসে দেয়। কেউ হাসির জবাব হাসিতে না দিলে মনে মনে অভদ্র ভাবে। কট্টর ইহুদিদের নারী-পুরুষ কেউ এ আচরণ করেন না। তাদের নারীদের অবস্থা দেখে গোঁড়া মুসলিম নারীদের জন্য বেদনা কিছুটা লাঘব হলো। আমাদের নারীদের মাথা ঢাকতে বলা হয়, যাতে চুল না দেখা যায়। কিন্তু তাদের নারীদের বিয়ের দিন পুরো মাথা ন্যাড়া করে ফেলতে হয়। বিবাহিত জীবনে ঘনকৃষ্ণ কেশদামের আর স্ফুরণ ঘটতে দেওয়া হয় না। চুল দেখানো মানে নারীর অবমাননা। তবে কি তাঁরা নেড়াবেল হয়েই বাইরে যান? না। সামনাসামনি দেখলে জানা না থাকলে কেউ টের পাবেন না যে তাঁরা উইগ পরে আছেন। খোলা চুলের মাঝে নারীর মুখ আকর্ষণীয় দেখায় আর তাতে পুরুষ প্রলুব্ধ হন। ওটা করা যাবে না। কিন্তু উইগকে চুল বলেই বিভ্রম হয়। তাতে তাঁদের মুখ কম আকর্ষণীয় লাগে না। কিন্তু আসল চুল যে বের করে রাখেননি, তাতেই সান্ত্বনা খুঁজে নিচ্ছেন তাঁরা।
ছোটবেলায় আমার এক হিন্দু বন্ধুর বাড়ি যেতাম। তাদের দেয়ালে টাঙানো নিনচোর গোপালের ছবিসংবলিত ক্যালেন্ডারের পাশে ফ্রেমে বাঁধাই করা একটা নরকের ছবি, যেখানে একজন নারীকে আগুনে পুড়িয়ে মারার দৃশ্য ছিল। তাঁর চুলগুলো বাঁকানো সাপ হয়ে কপালে-মুখে-বুকে ছড়িয়ে আছে। মাসিমা মানে আমার বন্ধুর মা বলতেন, ‘পৃথিবীতে যে মেয়ে মাথায় ঘোমটা না দিয়ে চলবে, নরকে গিয়ে তার চুল সাপ হয়ে তাকে কামড়াবে।’ কিন্তু পুড়িয়ে মারা হচ্ছে কেন? কারণ সে ছিল পাপী। রোমান ক্যাথলিক নারীরাও মাথা ঢেকে রাখেন। নানদের তো চুলের কণাটিও দেখা যায় না। মুসলিম দেশগুলোয় বিশেষ করে আরব দেশে হিজাব বাধ্যতামূলক। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও নারীরা মাথা ঢেকে রাখছেন। এমনকি স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য মুসলমান অভিবাসী নারীরা যে দেশেই বসবাস করছেন, সেখানেও শিরবস্ত্র ব্যবহার করছেন। আফগানিস্তানে তালেবানরা বলেই দিয়েছে যে নারীর ভোটাধিকার ধর্মসম্মত নয়, নারীর শিক্ষার প্রয়োজন নেই, নারী গাড়ি চালাতে পারবেন না, নারী আপাদমস্তক আবরিত হয়ে থাকবেন। নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বোকো হারাম’ নারীদের ইংরেজি শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য মেয়েদের স্কুল থেকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে বন্দী করে রেখেছে। মুসলিম-খ্রিষ্টান-ইহুদি-বৌদ্ধনির্বিশেষে তাদের সবার মাথা ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
ধর্মের আলোচনার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু নারী, তিনি যে ধর্মেরই হোন না কেন। যেন নারীকে দমিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই সব ধর্মের সৃষ্টি। অথচ ধর্ম পৃথিবীতে এসেছে আপামর মানুষের শান্তির জন্য। অথচ এ কথা কে না বোঝে যে ধর্ম এখনো গণতন্ত্রের হাতিয়ার। ভারতের মতো বিশাল গণতান্ত্রিক দেশে বিজেপির মতো কট্টর দল জয়ী হয়, ধর্মের কথা শুনিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানরা আবার আসি আসি করছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য বা দেশের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য যেসব নেতা-নেত্রী দুনিয়া কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই ধর্মের জিগির তোলেন। সারা বিশ্বে এ প্রবণতা লক্ষণীয়। প্রাচীনকালে ধর্মীয় নেতারা দেশ চালাতেন। এখন দেশনেতারা সবাই ধর্মান্ধ। মাঝে উত্তরাধিকার বা গোলমালে অনেক দেশে নারীপ্রধান সরকার এসে গেলেও অদূর ভবিষ্যতে এ সংখ্যা কমবে বৈ বাড়বে না। নারীর বাড়বাড়ন্ত মেনে নিতে মোল্লাতন্ত্র অপারগ। ওদিকে যে হারে মোল্লাতন্ত্রের ইচ্ছা প্রতিফলনে নারীরা মরিয়া হয়ে উঠছেন, তাতে নিজের পায়ে কুড়াল মারতে আর বাকি নেই। এসব নারী বুঝতে পারছেন না তাঁদের পুরুষতন্ত্র পাকাপোক্ত করার কাজে ব্যবহার করে তাঁদের অভাবনীয় শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়াই পুরুষকুলের উদ্দেশ্য।
সব ধর্মের কট্টরেরা নিজেদের ধর্মকেই সেরা ধর্ম ভাবে। আর এই সেরা ভাবনাটাই সবচেয়ে ভয়াবহ। তাদের কাছে অন্য যেকোনো ধর্মের মানুষই অস্পৃশ্য। তাই ভূখণ্ডের দখল নিয়ে বাহ্যত দুই বা একাধিক দেশ/জাতি/গোষ্ঠীর মধ্যকার যে যুদ্ধ, তা মূলত দুটি ধর্মের/গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যকার যুদ্ধ, যেখানে ‘আমিই সেরা’—এ বোধটা আমৃত্যু একজন কট্টর যোদ্ধার অবলম্বন। আর যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন পুরুষ, নারীদের তাঁর অধীনে থাকতে হয়। না হলে নেতৃত্বদানের অপরাধে হয় নারীকে ডাইনি বা জোয়ান অব আর্কের মতো পুড়িয়ে মারা হয়। কিন্তু নারী-পুরুষ উভয়ই যদি হয় আশরাফুল মাখলুকাত, তাহলে একে অন্যের ওপর নেতাগিরি করাও তো ধর্মের বরখেলাপ, নাকি?
তাই দেখা যাচ্ছে, ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন হলেও এক জায়গায় সব ধর্মের গোঁড়ারা একমত, তা হচ্ছে নারীর প্রতি বিধিনিষেধ আরোপ। ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন হলেও সব ধর্মের অন্যতম লক্ষ্য যদি হয় এক, তাহলে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নারীর যুদ্ধও হোক অভিন্ন।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।

ষোল বছরেই ‘চাইল্ড পর্ন’ ছবির মাস্টারমাইন্ড!

বয়স মাত্র ষোল। কিন্তু মাথাটি এর মধ্যেই দর্শনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। অন্তত পুলিশের কাছে তো বটেই। না হলে এই বয়সী ছেলে-মেয়েরা সাধারণত যে সব চিন্তা-ভাবনা বা শখে অভ্যস্ত থাকে তার ধারে কাছ দিয়েও যায় না জারেড কাইল হেনরি। কী এমন করেছে সে? এই বয়সেই পর্ন ছবি নিয়ে যাকে বলে গবেষণা করে ফেলেছে বলা চলে। কারণ ১০০টিরও বেশি পর্ন ভিডিওতে মুখ দেখানো হয়ে গেছে তার। যেগুলো ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, যদি সোজা কথায় এ কাজে রাজি না হয়, তাহলে মারধর করতেও পিছপা হয় না জারেড! পুলিশের অনুমান, ১০০টি শুধু নজরে এসেছে। এমন আরো অনেক নাবালিকা রয়েছে যাদের জারেড জোর করে পর্ন ভিডিও তুলতে বাধ্য করেছে। ঘটনায় বিস্মিত তার বন্ধুরাও। নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক তারই এক বন্ধু জানায়, ‘আমি তো স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি জারেড এমন কাজ করতে পারে।’ আর পাঁচটা কিশোরের মতোই সে ফোরিডার প্লান্ট সিটি হাই স্কুলে পড়ে। আপাতপক্ষে তাকে দেখে এমনটা ঘুণারেও বোঝা যায় না যে, তার মগজের মধ্যে এমন ভয়ানক বুদ্ধি খেলা করে। অপরাধের মাত্র দেখে প্রাপ্তবয়স্কদের ধারায় তার উপর মামলা রুজু করা হয়েছে। অন্তত ৯২টি চাইল্ড পর্ন ভিডিও তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। যার মধ্যে চারবার সে শারীরিক অত্যাচর করে পর্ন ভিডিও তুলতে বাধ্য করেছে। জারেডের অনলাইনে চাইল্ড পর্ন আপলোড ঘটনাটি প্রথম রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের নজরে আসে। পরে তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দফতরকে জানায়। তার পর সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে তার বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। আপাতত জারেডের ঠিকানা হিলসবার্গ কাউন্টি জেল। প্রায় ৮ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের বন্ডের জামিন ধার্য করেছে। ফলে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার আশা নেই বললেই চলে।

খালি পকেটে বিশ্বভ্রমণ!

এক জার্মান এবং এক তুর্কি যুবক বিশ্বপরিক্রমার পরিকল্পনা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে পথে, কিন্তু তাদের পকেটে কানাকড়িটিও নেই৷ তা সত্ত্বেও গত দেড় মাসে ৯টি দেশ ওদের ঘোরা শেষ! জুল ভার্নের বিখ্যাত কাল্পনিক ভ্রমণ কাহিনী ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়র্ল্ড ইন এইটি ডেজ’-এর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। সেই কাহিনীর নায়ক, বিত্তবান বৈজ্ঞানিক ফিলিয়াস ফগ মাত্র ৮০ দিনে গোটা পৃথিবী পরিভ্রমণের এক উচ্চাকাক্সী সফরে রওনা হয়েছিলেন। এবার এই একুশ শতকের দুই বিশ্ব পরিব্রাজকের সঙ্গে আলাপ করুন। মিলান বিলমান এবং মুয়াম্মার ইলমাজ। ২৭ বছরের মিলান মিউনিখ শহরে থাকেন। আর জন্মসূত্রে তুর্কি ৩৯ বছর বয়সি মুয়াম্মরের নিবাস ফ্রান্স।

পর্যটকদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলার একটি ওয়েব-আড্ডায় তাদের আলাপ। যার পর মুয়াম্মার কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে আসেন জার্মানি, থাকেন মিউনিখে মিলানের বাড়িতে। তখনই ওরা বোঝেন, তাদের দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে পছন্দের মিল আছে। ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং একদিন তারা ঠিক করেন, জুল ভার্নের উপন্যাসের নায়কের মতোই তারাও ৮০ দিনে বিশ্বভ্রমণের একটা চেষ্টা করবেন। তবে ওই কল্পকাহিনীর নায়কের সঙ্গে তাদের একটা জায়গাতেই অমিল। ফিলিয়াস ফগ বিশাল বড়লোক ছিলেন, আর তাদের পকেটে ফুটো পয়সাটিও নেই!
ঠিকই পড়লেন। মিলান বিলমান এবং মুয়াম্মার ইলমাজ এটাই ঠিক করে পথে বেরিয়েছেন যে স্রেফ লোকের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর ভরসা করে, স্থানীয় মানুষের বদান্যতায় ট্রেন, বাস বা বিমানের টিকিট জোগাড় করে তারা বিশ্বভ্রমণ করবেন। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে বুঝি! তা হলে শুনুন, কপর্দকহীন অবস্থায় বেনারস থেকে, ট্রেনের অসংরক্ষিত সাধারণ কামরার মেঝেতে বসে ১৫ ঘণ্টা সফর করে কলকাতা এসেছিলেন দুজনে। তার পর তারা যখন ভাবছেন, তাদের পরের গন্তব্য থাইল্যান্ডে কী করে পৌঁছবেন, তখন দীপাবলি উৎসবের উপহারের মতোই তাদের হাতে এসেছে ব্যাংককের দুটি বিমান টিকিট। সৌজন্যে শহরের এক শিল্পপতি অমিত সারাওগি।
শ্রী সারাওগি তাদের কথা প্রথমে পড়েন খবরের কাগজে, তার পর কৌতূহলী হয়ে তাদের ফেসবুক পাতায় গিয়ে জানতে পারেন অর্থের অভাবে কলকাতায় তাদের যাত্রা থমকে যাওয়ার কথা। ‘স্টাক ইন ক্যালকাটা’- মিলান আর মুয়াম্মার নিজেদের ওয়েবসাইটে আর ফেসবুকে লিখেছিলেন। অমিত সারাওগি নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে প্রথমে তাদের ডিনার খাওয়ান, তার পর সেই রাতে ব্যাংককের প্লেন ধরাতে রওনা করিয়ে দেন নিজের গাড়িতে।
কলকাতায় দুই ভূপর্যটককে স্বেচ্ছায় অতিথি করেছিলেন ক্যালকাটা ওয়াক সংস্থার কর্ণধার ইফতিকার এহসান। তার সাথেও তাদের আলাপ হয়ে যায় নেহাত ঘটনাচক্রে এবং শহরে দুটি দিন তাদের থাকা-খাওয়া এবং কলকাতা ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্ব ইফতিকারই নিয়েছিলেন। এমন ঘটনা মিলান এবং মুয়াম্মারের সঙ্গে বারবারই ঘটেছে। ইরান থেকে তারা যখন পাকিস্তানের দিকে যাচ্ছেন, বহু লোক সাবধান করেছিল যে, যেও না, মারা পড়বে। তবু তারা সাহস করে গিয়েছিলেন এবং সাধারণ লোকের থেকে অসাধারণ আতিথেয়তা পেয়েছেন। কেউ নিজের বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন, কেউ খেতে দিয়েছেন, আবার কেউ সঙ্গে নিয়ে কিছুটা রাস্তা এগিয়ে দিয়েছেন।
এভাবেই ফ্রান্স থেকে অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান এবং ভারত হয়ে দুই যুবক এখন থাইল্যান্ডে। শুরু করেছিলেন ৯ সেপ্টেম্বর সকাল নটা নয় মিনিটে, প্যারিস থেকে। পথে প্রতিবন্ধকতা প্রচুর এসেছে, থমকে যেতে হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবার যাত্রা শুরু হয়েছে। থাইল্যান্ডের পর সিঙ্গাপুর এবং সেখান থেকে আমেরিকা গিয়ে বিশ্বভ্রমণ শেষ করবেন দুজনে। পেশায় আলোকচিত্রী এবং তথ্যচিত্র নির্মাতা মুয়াম্মার ইলমাজ প্রচুর ছবি তুলছেন তাদের এই অভিনব বিশ্বভ্রমণের। মিলান বিলমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ছাত্র, তার ভাণ্ডারে জমা পড়ছে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা।
আশা করাই যায়, জুল ভার্নের অমর উপন্যাসের মতোই আরো একটি বিশ্বপরিক্রমার আধুনিক উপাখ্যান লিখবেন দুজনে৷ তবে এবার এর কাল্পনিক ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, লেখা হবে বাস্তবের মহাকাব্য, স্পর্ধিত যৌবনের স্বপ্ন ছুঁতে পারার কাহিনী।
সূত্র : ডয়চে ভেল।

গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি হোক মূল লক্ষ্য by মো: আবুল হাসান ও খন রঞ্জন রায়

১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত নারী সম্মেলনে প্রদত্ত ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস। গ্রামীণ নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাদের অসামান্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই ঘোষিত হয় এ দিবস। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে-

১. গ্রামীণ নারীর অবস্থাকে তুলে ধরা, ২. গ্রামীণ নারীদের প্রচ্ছন্ন ভূমিকার প্রতি সরকার ও জনগণের অনুভূতি জাগ্রত করা, ৩. গ্রামীণ নারী কার্যক্রমে সমর্থন জোগানো, ৪. কৃষি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় গ্রামীণ নারীর ভূমিকাকে উন্নত করা এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘কোন কালে একা হয়নিক জয়ী পুরুষের তরবারী/শক্তি দিয়েছে, প্রেরণা দিয়েছে, বিজয় লক্ষ্মী নারী।’ লক্ষ্মী নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় শত বছরেরও বেশি সময় ধরে যে নারী আন্দোলন চলেছে নানা রূপে, নানা ছন্দে তার অন্যতম ফল হিসেবে ‘নারী’ শব্দটি আজ চলে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নারীর জীবন, নারীর জীবিকা, নারীর ভাবনা, নারীর কর্ম ইত্যাদি নানা বিষয়ে গবেষণা, নীতি, কর্মপরিকল্পনা পেয়েছে গুরুত্ব। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ‘নারী’ একটি আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন গ্রামীণ নারী প্রতিদিন যে গার্হস্থ্য কার্য সম্পাদন করেন; তার মতো ভোরবেলা শয্যাত্যাগ, হাতমুখ ধোয়া, ধর্মীয় উপাসনা, হাঁস-মুরগি বের করা ও খাবার দেয়া, গরু-ছাগল বের করা, উঠোন ঝাড়– দেয়া, গরুকে খাবার দেয়া, থালাবাসন, হাঁড়িপাতিল মাজা-ঘষা, নাশতা তৈরি করা, পরিবারের সদস্যদের নাশতা খাওয়ানো, কোলের সন্তানকে দুধদান করা, পানি আনা, ঘরদোর পরিষ্কার করা, জ্বালানি লাকড়ি-খড়ি সংগ্রহ ও রান্না করা, কাপড়চোপড় ধৌত করা, ছেলেমেয়েদের গোসল করানো ও নিজে করা। স্বামী ও আত্মীয়পরিজনের সেবাশুশ্রƒষায় নারীকে হতে হয় সুনিপুণ।
দেশে শত নারী দিবস পার করলেও এখনো শ্রমের স্বীকৃতি মেলেনি গ্রামীণ নারীদের। ঘরে-বাইরে নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা। সংসারে তো বটেই, বাইরে পরিশ্রম করেও নারী বলে হতে হচ্ছে অবমূল্যায়িত। সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামীণ নারী, কৃষি শ্রমিকেরা। দেশের গার্মেন্ট শিল্প থেকে সব শিল্পের ক্ষেত্রে নারীর অবস্থা থথৈবচ। অথচ দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ আড়াই কোটি নারীই দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির শিকার। এ ছাড়া আয়োডিন ঘাটতিতে ৩৪ শতাংশ এবং রক্তস্বল্পতার ভুগছেন ৪২ শতাংশ নারী। এই নারীদের ওপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সে দেশই তত বেশি উন্নত যে দেশের নারীরা যত বেশি সচেতন ও কর্মঠ। দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীসমাজই রাখতে পারেন অনবদ্য অবদান। গ্রামীণ নারীসমাজের কার্যক্রমের বাস্তবতাকে সমুন্নত রাখতে হবে। করতে হবে সুসংহত, যার হাত ধরে সম্ভব হবে নারীর ক্ষমতায়ন।
দেশে চলমান ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির বদৌলতে অর্থনীতিতে গ্রামীণ নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে; কিন্তু ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অবসান ঘটেনি; ঘটেনি সমাজে ও পরিবারে নারীর ক্ষমতায়ন। সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রমীণ নারীর শিক্ষায় মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে ছেদ পড়ে। ডিপ্লোমা শিক্ষার বিস্তার ছাড়া নারীর অগ্রগতি ও ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় সমান, ক্রমেই ওপরের দিকে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বেশি। এ জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে নারীদের কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে নারীর ভূমিকা হতে হবে অগ্রণী। কারণ যার ুধা তাকেই ভাবতে হবে। নারীকে সমাজে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে হলে তাকে অবশ্যই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে নিতে হবে।
নারীর আত্মকর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টির ও উন্নয়ন টার্গেট আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো যেন কাগুজে বিষয়ে রূপান্তরিত না হয়, সে জন্য তাকে প্রযুক্তিগত কর্মমুখী শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীর আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদায় শক্তিশালী হয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন ডিপ্লোমা শিক্ষা। গ্রামীণ নারীর ভাগ্যোন্নয়ন ও মর্যাদাশীলতা প্রতিষ্ঠায় নারীর জন্য কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে উন্মোচন হোক গ্রামীণ নারী দিবস পালনের মূল লক্ষ্য।

সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই by মো: আবদুস সালিম

গুল মাকাই যার ছদ্মনাম তিনি হলেন পাকিস্তানের নারীশিক্ষা আন্দোলনে সদা ব্যস্ত থাকা কিশোরী মালালা ইউসুফজাই। মালালাকে বলা হয়ে থাকে অকুতোভয় শিক্ষা সংগ্রামী তরুণী। অথচ এই মালালাই জঙ্গি বা সন্ত্রাসীদের গুলি খেয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন। এর পর থেকে আন্দোলনে আরো মনোযোগ বাড়ে তার। সারা বিশ্বের মানুষ এখন তাকে চেনে। নারীশিক্ষা আন্দোলনে মালালা নিজেকে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেন, যার কারণে অল্প বয়সে শান্তিতে নোবেল পান। মালালা ইউসুফজাইয়ের জন্ম ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় এক পাখতুন পরিবারে। তার বাবার নাম জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই। তিনি কবি। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার বাসনা বা ইচ্ছা ছিল মালালার। এখন ইচ্ছা হয়েছে রাজনীতিবিদ হওয়ার। তিনি মনে করেন, এ জগতে প্রবেশ করেও মানুষের সেবা করা যায়। অর্থাৎ মানবসেবাই যেন তার ইচ্ছা।
মালালা নারীশিক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন মাত্র ১১ বছর বয়স থেকেই। বিবিসির উর্দু বিভাগে লিখতে শুরু করেন ২০০৯ সালে। মনে করা হচ্ছে, বাবার লেখনী শক্তি পেয়েছেন মেয়ে মালালাও। শান্তির দূত মালালা পাকিস্তানের ‘জাতীয় যুব শান্তি পুরস্কার’ পান ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর। আর তারই নামে নামকরণ করা হয়েছে এ পুরস্কারটির। এটি হলো- ‘জাতীয় মালালা শান্তি পুরস্কার’। অর্থাৎ শান্তিতে নোবেল জয়ের আগেও এ সংক্রান্ত আরো পুরস্কার পেয়েছেন। মালালা নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন ২০১৩ সালে। আর তখন এ কিশোরীর বয়স ছিল মাত্র প্রায় ১৬ বছর। তবে তার হাতে ওঠেনি পুরস্কার। এবার তার হাতে উঠবে শান্তি পুরস্কার বাবদ (নোবেল) প্রায় সোয়া পাঁচ কোটি টাকা। অক্টোবর তার কাছে যেন এক বিশেষ মাস। যে মাসে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, সেই মাসেই পেলেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। অর্থাৎ এ মাসে যেমন আসে জীবনের ঝুঁকি, তেমনি আসে বড় ধরনের সফলতার পুরস্কার। এটি বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার। পুরস্কারের সূচনালগ্ন (১৯০১ সাল) থেকে আজ অবধি এত কম বয়সে এর আগে কেউ পায়নি নোবেল। এ দিকে তার নামে রয়েছে জাতিসঙ্ঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক দিবস। জাতিসঙ্ঘ ‘মালালা দিবস’ ঘোষণা দেয় ২০১৩ সালের ১২ জুলাই তার ১৬তম জন্মদিনে। এরই মধ্যে এ কিশোরী লিখেছেন আত্মজীবনী। তা প্রকাশ পেয়েছে বই আকারে। নাম ‘আই অ্যাম মালালা : হাউ ওয়ান গার্ল স্টুড আপ ফর এডুকেশন অ্যান্ড চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড’। বইটি অ্যামাজনের সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় ঠাঁই নিতে সক্ষম হয়। মালালা যখন নোবেল জয়ের খবর শুনতে পান তখন তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। এতে বুঝা যায় জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে কতটা আগ্রহী মালালা। শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষা উপকরণ প্রভৃতি যেন তার জীবন। মালালা বলেন, মারণাস্ত্র নয়, তার বদলে বই লও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের যেসব দেশে মেয়ে বা নারীরা সবচেয়ে কম সংখ্যায় শিক্ষাকেন্দ্রে যায়, সেগুলোর মধ্যে পাকিস্তান প্রায় তৃতীয়। সেই নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, নিয়মিত পড়ালেখার প্রতি মালালার কত বেশি ঝোঁক বা আগ্রহ। মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া একেবারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল সোয়াত উপত্যকায় জঙ্গিরা। তারা মেয়েদের বিদ্যালয়গুলো উড়িয়ে দিচ্ছিল একের পর এক বোমা মেরে। তাদের সহিংসতার হাত থেকে রেহাই পায়নি মালালাও। গুরুতর আহত মালালাকে প্রথমে পাকিস্তানে ও পরে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য। বলা যেতে পারে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান মালালা। এখনো তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। জঙ্গিরা শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম পরে শিক্ষাকেন্দ্রে যেতে বারণ করে। অথচ প্রার্থনার সময় তাদের রঙিন পোশাক পরতে নিষেধ আছে। মালালা কয়েক বছর ধরে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিতি পেয়েছেন একজন তরুণ শিক্ষানুরাগী হিসেবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মালালার এ বিশ্ব রেকর্ড ভাঙতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে। কারণ তিনি নোবেল পুরস্কারের মতো পুরস্কার পেয়ে বিশ্ব রেকর্ডে ভূষিত হলেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে। অপহৃত ছাত্রীদের মুক্তির দাবিতে মালালা প্রচারাভিযানে যান নাইজেরিয়ায়। তাদের জন্যও যেন মালালার ঘুম হারাম। জঙ্গিরা তাদের অপহরণ করে। এত ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে তাকে ভাবতে হচ্ছে নিজের পড়াশোনা নিয়েও। এত অল্প বয়সে এত বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন তো আর সবার ভাগ্যে জোটে না। অবশ্য এ জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হবে মনে করে ফেসবুক চালান না। এমনকি মুঠোফোনও নয়। মালালা মনে করেন, জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভালো কিছু করার। এ জন্য কৃচ্ছ্রতাও প্রয়োজন। মালালা এখন ভাসছেন অভিনন্দনের বন্যায়। সোস্যাল সাইট ফেসবুক, টুইটারে এখন যেন ‘টপ ট্রেন্ড’। তাকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছেÑ মহাকাশ থেকেও, যা আসে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন থেকে। পাকিস্তানে প্রতি মিনিটে পোস্ট করা হয়েছে গড়ে প্রায় ২০৪টি করে টুইট। এসবের মাধ্যমে মালালাকে নিয়ে গর্ব করছেন পাকিস্তানের অনেকেই।
মালালা মেয়ে শিশুদের শিক্ষার অধিকারের কথা বলে সাহস দেখিয়েছিল। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রমাণ দিলো, ইচ্ছা থাকলে ভালো অনেক কিছুই করা যায়। আলফ্রেড নোবেল (নোবেল পুরস্কারের জনক) মনে করতেন, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার তাদেরই দেয়া হবে, যারা অশান্তি কমাতে ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত হবেন। মালালা বলেন, আমি যে সংগ্রাম শুরু করেছি বলা যেতে পারে তার নতুন যাত্রা শুরু হলো। আমি চাই, পৃথিবীর প্রতিটি শিশু স্কুলে যাক। ওরা অধিকার আদায়ে সোচ্চার হোক। এভাবেই মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জন সহজ হবে। মালালা বলেন, আমার এই পুরস্কার পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর জন্য। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেন, মালালা সাহসী মেয়ে। শান্তির সুশীল প্রবর্তক। আর এ কারণেই সারা বিশ্ব এখন তাকে চেনে। মালালা নারীশিক্ষার পক্ষে প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন আন্তর্জাতিকভাবে। তিনি যুক্ত রয়েছেন একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সাথে। মালালা মনে করেন, সব কিছুতেই লাভের আশা করা ঠিক নয়। এত অল্প বয়সে দু’টি বইও লিখেছেন তিনি। এগুলোর কাটতিও বেশ ভালো। তিনি শুধু জঙ্গিদেরই সমালোচক নয়, বরং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সব সংস্কৃতিরও ঘোর বিরোধী। পশ্চিমা বিদ্যালয়ে পড়লেও পোশাকে ধরে রেখেছেন স্বাতন্ত্র্য ও শালীনতা। তুলনামূলক লম্বা স্কার্ট এবং মাথায় স্কার্ফ পরেন ইউনিফর্মের সাথে মিলিয়ে। ২০১৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে সাক্ষাতে স্বদেশে মার্কিন ড্রোন হামলার তীব্র সমালোচনা করেন। বলেন, সেনাদলের পরিবর্তে বই পাঠান, অস্ত্রের বদলে কলম দিন। জঙ্গিদের গুলিতে আহত হলে মালালা ব্রিটেনের বার্মিংহামে দীর্ঘ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন। এখন তিনি বার্মিংহামে এজবাস্টন হাইস্কুলের ছাত্রী।

প্যাপিরাস থেকে পেপার

সে অনেক আগেরই কথা। প্রথম যখন বর্ণ বা লিপি  আবিষ্কার হয় তখন কিসের ওপর লিখবে এ নিয়ে বেশ চিন্তিত হয় মানুষ। গাছের পাতা, বাকল, চামড়া, পাথর, মাটি ইত্যাদির ওপর শুরু হলো মানুষের প্রথম লেখা। মিসরের নীল নদের তীরে জন্মাতো নল-খাগড়া জাতীয় একধরনের গাছ। নাম প্যাপিরাস। এই গাছের কাণ্ড থেকে প্রাচীন মিসরীয়রা একধরনের কাগজ উৎপাদন করত। তারা এই গাছের কাণ্ডকে লম্বা লম্বা পাতের মতো করে কেটে নিত। প্যাপিরাস গাছের একেবারে মাঝখানের পাতটি সবচেয়ে বেশি মূল্যমানের। এসব পাতকে পাশাপাশি সাজিয়ে পানিতে ভিজিয়ে শুকিয়ে নিলে জোড়া লেগে পাতলা চাদর বা পাতের মতো হতো। এরপর পাত বা শিটগুলো হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে চ্যাপ্টা করে রোদে ভালো করে শুকানো হতো। পরে লেখার জন্য ব্যবহৃত হতো এসব পাত বা শিট।  লেখা শেষে সংরক্ষণের জন্য গুটিয়ে রাখা হতো। প্যাপিরাস গাছ থেকে  তৈরী বলে এ পাত বা শিটকে  পেপার বলা  হতো। পেপারের চৈনিক প্রতিশব্দ কায়গদ আর  আরবি প্রতিশব্দ কাগজ।

প্যাপিরাস গাছ এক থেকে তিন মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এ গাছের কাণ্ড অত্যন্ত নরম এবং গোড়ার দিকে মানুষের হাতের কবজির মতো মোটা। চূড়ার দিকে কাণ্ডটি ঝুঁকে থাকে। এ গাছের ডাল দেখতে অনেকটা কোঁকড়ানো খসখসে চুলের মতো। পাতা ছোট, মূল শক্ত ও সবল। মিসরীয়রা প্যাপিরাস গাছের সরু-লম্বা ডাঁটি দিয়ে মাদুর ও নৌকার পাল বানাত। কাণ্ডের ভেতরে অবস্থিত মজ্জা শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করত। গরিব মানুষ প্যাপিরাস গাছের মজ্জা সিদ্ধ করে ুধা নিবারণ করত। ইথিওপিয়া ও নীল নদের উজানে এখনো এই গাছ দেখা যায়। পূর্বে নীল নদের ব-দ্বীপ এলাকায় যত ব্যাপকভাবে এই গাছের চাষ হতো, তত এখন আর চাষ হয় না। আর প্রাচীন পদ্ধতিতে আজকাল কাগজও তৈরি করা হয় না।
গ্রন্থনা : সাহিদা শিল্পী

এ কি দুর্ঘটনা, নাকি হত্যা? by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
বনপাড়া সিরাজগঞ্জ মহাসড়কে এক ভয়াবহ দু’টি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে কিয়ামতের আলামতের সৃষ্টি হয়েছে। পত্রপত্রিকায় দেখেছিলাম রেজ্জুর মোড়ের দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা শতাধিক। দুই বাসে লোকই থাকে কত? এত লোক নিহত হয় কী করে? বুকটা কেঁপে উঠেছিল। প্রতিদিনই দেখছি সড়ক দুর্ঘটনা। সরকারি হিসাবে প্রতি বছর ১২ হাজার, বেসরকারি ১৮ হাজার, এনজিওদের হিসাবে ২৪ হাজারের ওপরে। যদি বছরে ২৪ হাজার হয় তাহলে প্রতিদিন মরে ৬৫ জন। কোনো কোনো েেত্র দুর্ঘটনায় যে জীবন হারায় শুধু সেই মরে না, তার পরিবার-পরিজন নিয়ে মরে। নাটোরের গুরুদাসপুরের শিধুলীতে এক কবরস্থানে ১৪ জনকে দাফন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে আর কোথাও সারিবদ্ধ ১৪ কবর দেখিনি। আজ মনে হচ্ছে, শিধুলী না গেলে বড় অন্যায় করতাম। মহাসড়কের যেখানে দু’টি বাস দুমড়েমুচড়ে রাস্তার দু’পাশে পড়ে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে, সরেজমিন না দেখলে কী অন্ধকারেই যে থাকতাম তোমাকে বলতে পারব না। খবর ছিল সড়ক দুর্ঘটনা, কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যদর্শীদের হৃদয়বিদারক বিবরণ শুনে আর দুর্ঘটনা বলে মন সায় দিতে চায়নি।
তোমার সময় যাতায়াতব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না, এত গাড়ি-ঘোড়া ছিল না। ঢাকা থেকে গুরুদাসপুর দু’দিনেও যাওয়া যেত না; কিন্তু এখন কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। ঢাকা থেকে নাটোরের গুরুদাসপুর ১৯০ কিলোমিটার। তাই ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলে রাত কাটিয়েছিলাম। ঘড়ির কাঁটায় তাল মিল রেখে ২৪ তারিখ শুক্রবার সকাল ৯টায় গুরুদাসপুরের রেজ্জুর মোড়ে রওনা হয়েছিলাম। পথে সিরাজগঞ্জ মোড়ে সানোয়ার হোসেন জজ মিয়াদের সাথে দেখা করে দু-চার কথা বলে পৌনে ১১টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছে যা শুনলাম, যা দেখলাম তা অবিশ্বাস্য। সেই ’৬০ সাল থেকে গাড়ি চালাইÑ কোনো দিন কল্পনাও করিনি সেই অকল্পনীয় অভাবনীয় ঘটনাই তোমাকে বলছি। ৩টা কয়েক মিনিট হবে নাটোরের অথৈই পরিবহনের একটি গাড়ি ওপর নিচে ঠাসা যাত্রী নিয়ে বনপাড়া থেকে সিরাজগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। সেই সময় একটি ট্রাক পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িটিকে ধাক্কা মেরে চলে যায়। মনে হয় অনেক বেশি যাত্রী থাকায় ড্রাইভার গাড়িটিকে সামলাতে পারছিল না। মাতালের মতো ডানে বামে মোচড়ামুচড়ি করে প্রায় দেড়-দুই শ’ গজ গিয়েছিল। সেই সময় ঢাকার দিক থেকে কেয়া পরিবহনের একটি দূরপাল্লার গাড়ি নাটোরের দিকে যাচ্ছিল। সামনের গাড়ির টালমাটাল অবস্থা দেখে কেয়া পরিবহনের চালক তার গাড়ি বাঁ পাশের বিকল্প পথে নামিয়ে দেয়। তুমি হয়তো জানো না, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মোড় থেকে বনপাড়া পর্যন্ত চলনবিলের মধ্য দিয়ে নির্মিত রাস্তার এক পাশে চমৎকার উপপথ তৈরি করা হয়েছে। যেখান দিয়ে ছোট ছোট গাড়ি, রিকশা, টেম্পো, নছিমন চলাচল করে। কেয়া পরিবহনের গাড়ি প্রায় এক দেড় ফুট নিচু উপপথে নামিয়ে দিতে গিয়ে চালক যখন দেখে তার গাড়ি বাঁ দিকে পড়ে যাচ্ছে, তখন সে আবার তার গাড়ি ডান দিকে টেনে রাখার চেষ্টা করে। এ সময় রাস্তার কয়েকটি সীমানা পিলার ভেঙে আবার মূল রাস্তায় উঠে অথৈই পরিবহনের ওপর প্রচণ্ড বেগে আছড়ে পড়ে। দূরপাল্লার কেয়া পরিবহনের ছাদে দু-চারজন থাকলেও অথৈই পরিবহনের ছাদে ৪০-৫০ জনের নানা বয়সী যাত্রী ছিল। একটি আর একটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে দুই গাড়ি সড়কের দুই দিকে ছিটকে পড়ে। দুই গাড়ির ছাদের প্রায় সব যাত্রী রাস্তার ওপর এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। অনেকেই আহত হলেও সবাই যে নিহত হয়েছিল তেমন নয়। কেউ কেউ অতও ছিল; কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যের একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে নির্মম ঘটনা ঘটে তারপর। কেয়া পরিবহনের পিছে পিছে ধেয়ে আসা হানিফ পরিবহনের একটি গাড়ি রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষদের দেখে না থামিয়ে তার ওপর দিয়ে চলে যায়। এ সময় কতজন যে নিহত হয়েছে কেউ বলতে পারে না। কারবালার প্রান্তরে সীমার যে নির্মমতার পরিচয় দিয়েছিল, গুরুদাসপুরে হানিফ পরিবহনের নির্মমতা তারচেয়েও জঘন্য বেদনাদায়ক। কেয়া এবং অথৈই পরিবহনের গাড়ির সংঘর্ষ দুর্র্ঘটনা হিসেবে মেনে নিলেও রাস্তার ওপরে পড়ে থাকা মানুষদের ওপর দিয়ে হানিফ পরিবহনের গাড়ি চালিয়ে দেয়াকেও কি দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে হবে? একে তো নির্মম গণহত্যা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে মন সায় দেয় না। তুমি তো জানোই, আমার প্রিয় ছোট একটি মেয়ে আছে। দিন দিন তার কর্তৃত্ব নেতৃত্ব বলিষ্ঠ থেকে বলিষ্ঠ হচ্ছে। সেই কুশিমণি যখন চার সাড়ে চার বছরের তখন ওর মা ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথায় যেন গিয়েছিল। হঠাৎই একটি কুকুর গাড়ির নিচে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। মা আমার বাসায় ফিরে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। আমার কাছে নালিশ করে, ‘আব্বু, যীশুকে বাদ দিয়ে দাও। ও কুকুর মারতে চায়। ও ভালো না, কুকুরটা মরলে কেমন হতো?’ আসলে কুশিমণির কথা ফেলতে পারি না। তার সব কথা মায়ের কথার মতো মেনে চলার চেষ্টা করি। অনেক বলে কয়ে বাবার দেয়া চালক যীশুর চাকরি সে যাত্রায় রা করা হয়েছিল। তারপরও
রাস্তাঘাটে গাড়ির সামনে ছাগল কুকুর বিড়াল পড়লেই কুশিমণি চিৎকার করে ওঠে, ‘যীশু, তুই কিন্তু কুকুর মারবি না।’ আসলেই যীশু কুশিকে নিয়ে সব সময় তটস্থ থাকে। ছোট্ট একটি শিশু, যার এখন সাড়ে সাত বছর বয়স। রাস্তার কুকুর বিড়াল পশুপাখির ওপর যাতে গাড়ি না ওঠে তার জন্য কত  চিন্তা, আর গুরুদাসপুরে রেজ্জুর মোড়ে দুর্ঘটনায় পতিত মানুষের ওপর দিয়ে হানিফের গাড়ি চলে গেল? মাননীয় নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের আশকারা পাওয়া ড্রাইভারের বুকে একটুও বাধলো না? তাহলে তার কিসের আত্মা? কোনো পশুর আত্মাও তো এমন হিংস্র্র হতে পারে না। কোথায় মনুষ্যত্ব, কোথায় মানবতা? এ তো হিংস্র্রতার চরম প্রকাশ।
ঘটনার এখানেই শেষ নয়, রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষদের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে অসংখ্য মানুষ খুন করলেও এখন পর্যন্ত হানিফ পরিবহনের সেই গাড়ি এবং ড্রাইভারকে শনাক্ত করতে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যে ট্রাক অথৈই পরিবহনকে ঘেঁষা দেয়ায় ঘটনার সূত্রপাত, সেই ট্রাককে যেমন শনাক্ত করা হয়নি। হানিফ পরিবহন কতজনকে যে হত্যা করেছে- তাকেও শনাক্ত করা হয়নি। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখলাম, বিআরটিসির বিজ্ঞাপনে দেখলাম যেহেতু তারা হানিফ পরিবহনের গাড়ি শনাক্ত করতে পারেনি সেহেতু জনসাধারণ যদি নাম্বার দিতে পারেন তাহলে ভালো হয়। কী নির্লজ্জ আহ্বান! একটা খুনি গাড়ি শনাক্ত করতে সরকারের খুব একটা বেশি সময় লাগে? ৩টা  সাড়ে ৩টার মধ্যে ঘটনাটি ঘটেছে। ওই সময় সিরাজগঞ্জ বনপাড়া দিয়ে হানিফ পরিবহনের কোন কোন গাড়ি গেছে অবলীলায় বলে দেয়া যায়। নাটোর-রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ ওই রাস্তায় হানিফ পরিবহনের ক’টা গাড়ি চলেÑ এটা খুঁজে বের করতে কতণ? ৫-১০-২০টা। যদি তাই হয় সব ক’টা গাড়ি ধরতেই-বা দোষ কোথায়? যে কেয়া পরিবহনের গাড়ি দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছে তার পেছনে হানিফ পরিবহনের কোন গাড়ি ছিল সহজেই তো তার খবর নেয়া যেতে পারে। যেখান থেকে ছাড়ে সেখান থেকে, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা মোড় থেকে সিরাজগঞ্জের মোড়ে ২টা আড়াইটায় হানিফের কোন গাড়ি রাস্তায় হোটেলে খাবার খেয়েছে এসব খোঁজ করলেই তো বেরিয়ে যায়; কিন্তু খোঁজ করবে কে? ইচ্ছা থাকতে হবে তো। গরিব মরলে সরকারের কী? শিধুলীর এক বাড়িতে সাত ভাইয়ের ছয়জনই মারা গেছে। তাদের সংসার এখন রাস্তায়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী গিয়েছিলেন নিহতদের চেক দিতে। এক সারিতে ১৪টি কবর দেখে আমি কিছুটা দিশেহারা হয়েছিলাম। তাই সাংবাদিকদের বলেছিলাম, মাননীয় মন্ত্রীর অদতা অযোগ্যতার জন্য এলাকার মানুষ তার কাছে অনুদান চায় না। তার পদত্যাগ চায়। অনেকেই বলেন পশ্চিমবঙ্গের এক সিনেমার নায়ক ফাটা কেষ্টের মতো তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, রাস্তা ঠিক হয় না। মন্ত্রীর কাজ কি রাস্তার সুপারভাইজারের মতো, ওভারশিয়ারের মতো ইট বালু দেখা? সে তো S.D-S.O.-এর কাজ, Exn-এরও কাজ না। সেখানে মন্ত্রী ঘুরলে সব ইঞ্জিনিয়ারও তার পিছে পিছে ঘোরে। কাজের কাজ কিছুই হয় না। তার কাজ ছিল হানিফ পরিবহনের খুনি গাড়িকে চিহ্নিত করা। যদি ধরা না যায়, তারা যদি ভালোয় ভালোয় স্বীকার না করে তাহলে সারা দেশের সব হানিফ পরিবহনের গাড়ি বন্ধ করে দেয়া উচিত। রাস্তার ওপর মানুষ থাকলে তার ওপর দিয়ে যে পরিবহনের নরঘাতক ড্রাইভারেরা গাড়ি চালিয়ে যেতে পারে, তাদের রাস্তায় মানুষ হত্যার অধিকার কেউ দেয়নি। এসব কোনো পদপে না নিয়ে তিনি গেছেন শিধুলীতে চেক দিতে। তাই প্রশ্ন উঠেছিল, সাধারণ মানুষ তার কোনো নিকটজনকে পায়ে পিষে হত্যা করে অনুদান দিলে তিনি কি খুশি হবেন? তিনি শিধুলী যেতে চেয়ে যাননি, তাতে মানুষ আরো ুব্ধ হয়েছে। তিনি রাস্তাঘাটের নিয়ন্ত্রণ আনতে পারেননি। আধুনিক জামানায়, মোবাইল অপারেটরদের বললে ওই রাস্তায় সেদিন হানিফের খুনি গাড়ির যাত্রীরা ওই ঘটনার পরপর ফোনে যে কথাবার্তা বলেছেন- সেটা ইন্টারসেপ্ট করেও গাড়ির সন্ধান করা বা চিহ্নিত করা কোনো ব্যাপার ছিল না। হাঁটুর বুদ্ধি নিয়ে আর যা কিছু হোক ভালোভাবে রাষ্ট্র চালানো যায় না।
বলি হারি যাই মানবতার মনুষ্যত্বের। হানিফের সেই দানবীয় গাড়িতে একটা মানবও কি ছিল না, যারা ড্রাইভারকে তিরস্কার করতে পারে, গাড়ি থেকে নেমে থানায় জানাতে পারে? আমি আহ্বান জানাব ঘাতক গাড়ির যে যাত্রীরা ছিলেন তারা যেন বিবেকের আদেশে অমন খুনি চালকের পরিচয় দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করেন। তারা না করলেও এই জঘন্য অপরাধ চাপা থাকবে না। আল্লাহর চোখে কোনো কিছু চাপা থাকে না। তিনি সবই দেখেন এবং জানেন।

মোসাদ ও ম্যাককেইন আইএসের জন্ম দিয়েছে by ফিদেল ক্যাস্ট্রো

নিঃসন্দেহে কারো অধিকার নেই নগরগুলোকে ধ্বংস, শিশুদের হত্যা, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং কোথাও সন্ত্রাস, ক্ষুধা ও মৃত্যুর কারণ সৃষ্টি করার। বিশ্বসম্প্রদায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনো শান্তির মুখ দেখেনি। অতীতে বিশেষ করে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (ইইসি) যখন যুক্তরাষ্ট্রের চরম নির্দেশনায় সিদ্ধান্ত নিলো যে, দু’টি বড় দেশের যা অবশিষ্ট আছে, তার একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে, তখন থেকে শান্তি আর নেই। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। এর অবসান ঘটাতে ওই দুটো দেশ বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে।
সাবেক রাশিয়ায় একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, যা নাড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীকে। প্রত্যাশা ছিলÑ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের মতো সর্বাধিক শিল্পায়িত দেশগুলোতেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটবে; কিন্তু তা ঘটে গেল রাশিয়ায়, যার ভূখণ্ড উত্তর ইউরোপ থেকে দক্ষিণ আলাস্কা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই আলাস্কা ছিল জার শাসিত অঞ্চল। এটা কিছু ডলারের বিনিময়ে এমন এক দেশের কাছে বেচে দেয়া হয়েছিল, যারা বিপ্লব ঘটে যাওয়া দেশগুলোতে হামলা ও ধ্বংসের দিকেই পরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। মানুষ যদি অন্যদের মাঝে তার ভাই-বন্ধুকে পেত এবং হত্যায় উদ্যত সশস্ত্র শত্রুকে দেখতে পেত না, তাহলে কি এই বিশ্বে অনেক বেশি ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত হতো না?
নগর ও বাড়িঘর ধ্বংস, শিশুহত্যা, সন্ত্রাস সৃষ্টি, খাদ্যাভাব ও মৃত্যু ডেকে আনাÑ এসব করার কোনো অধিকার কারো নেই। যখন সর্বশেষ বিশ্বযুদ্ধের হত্যাযজ্ঞের অবসান হয়েছিল, বিশ্ব আশার আলো দেখেছিল জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার মধ্যে। যদিও এই বিশ্বসংস্থার লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি তুলে ধরা হয়নি, তবুও মানবজাতির একটা বৃহৎ অংশ একে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল। তবে আজ যা দেখা যাচ্ছে, তা এক বিশাল প্রতারণা। কারণ, সঙ্কটের পর সঙ্কট জন্ম নিচ্ছে, যা বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এ যুদ্ধে এমন সব অস্ত্র ব্যবহৃত হতে পারে, যা মানবজাতির অস্তিত্বের বিনাশ ঘটাতে সক্ষম।
এখন বিশ্বরঙ্গমঞ্চে এমন সব কাণ্ডজ্ঞানহীন অপরিণামদর্শী লোকজন রয়েছে, যারা মৃত্যু ডেকে আনাকে মেধার পরিচয় মনে করে। ওরা নিজেদের অন্যায় সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিতে মানুষ হত্যা করাকে মনে করে বুদ্ধিমানের কাজ। ইউরোপে ন্যাটোর কিছু কর্তাব্যক্তির বক্তব্য শুনে অনেকেই অবাক হচ্ছেন। তাদের ধরন ও দৃষ্টিভঙ্গি নাৎসি এসএস বাহিনীর মতো। কোনো কোনো উপলক্ষে এরা এমনকি ভর গ্রীষ্মেও কালো স্যুট পরিধান করে।
আমাদের আছে বেশ শক্তিশালী এক বৈরী। তা হচ্ছে, নিকটতম পড়শি যুক্তরাষ্ট্র। আমরা হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলাম, তাদের অবরোধকে মোকাবেলা করবই, যদিও আমাদের দেশকে এ জন্য চড়া মাশুল গুনতে হবে। যে শত্রু কোনো কারণ, যুক্তি ও অধিকার ছাড়াই আপনাকে আক্রমণ করে বসে, তার কাছে নতিস্বীকার করার চেয়ে বড় ক্ষতি আর নেই। এটাই ছিল বিচ্ছিন্ন ও ুদ্র এক জনগোষ্ঠীর (কিউবা) অনুভূতি। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে, গোলার্ধের দেশগুলোর সরকার সেই শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদীর পক্ষেই ছিল। আমাদের ুদ্র জাতিটি শতাব্দীর শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়ে আসছিল। এর আগে আমরা পাঁচ শ’ বছর ধরে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনে দুর্ভোগের শিকার হয়েছি। তখন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিপুল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নপুংসক কংগ্রেসের ঘাড়ে সংবিধানের এমন এক সংশোধনী চাপিয়ে দিয়েছিল, যার অজুহাতে দেশটি কিউবায় সামরিক হস্তক্ষেপ চালানোর অধিকার পেয়ে যায়। কিউবার প্রায় পুরো ভূখণ্ড, বিস্তীর্ণ ভূমি, সর্ববৃহৎ চিনিকলগুলো, খনি ও ব্যাংকÑ সব কিছুর মালিক ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি কিউবার মুদ্রা ছাপানোর অধিকারও ছিল আমেরিকার। এমন এক অবস্থায় ওরা আমাদের প্রয়োজনমাফিক শস্য উৎপাদন করতেও দিত না। আমরা কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং সমাজতান্ত্রিক শিবির বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও প্রতিরোধ চালিয়ে গেছি। আমাদের বিপ্লবী রাষ্ট্র ও জনগণ স্বাধীনভাবে অগ্রযাত্রা রেখেছে অব্যাহত।
এত কিছু সত্ত্বেও আমাদের আধুনিক যুগের ইতিহাসকে নাটকীয় রূপ দিতে চাই না। বরং জোর দিয়ে এটাই বলব, মার্কিন নীতি এতই হাস্যকর যে, এটি ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে খুব বেশি বিলম্ব হবে না। লোভতাড়িত হিটলারের সাম্রাজ্য ইতিহাসের পাতা থেকে বিদায় নেয়ার পর যা ঘটেছে, তা হলোÑ ন্যাটোর আগ্রাসী বুর্জোয়া সরকারগুলোকে উসকে দেয়া। ওরা এখন শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের কাছে হাসির পাত্র। তাদের ইউরো ও ডলার শিগগিরই নিছক ভেজা কাগজে পরিণত হবে। ওদের নির্ভর করতে হবে ইয়েন ও রুবলের ওপর, যদি রাশিয়ার বিশাল অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্ভাবনার সাথে ঘনিষ্ঠতা রেখে চীনা অর্থনীতির উত্থান ঘটতে থাকে।
উন্নাসিক হামবড়া ভাব মার্কিন সাম্রাজ্যের অনুসৃত নীতির বৈশিষ্ট্য। এটা জানা আছে যে, ২০০৮ সালে জন ম্যাককেইন ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী। তাকে জনগণের সামনে তুলে ধরা হলো এই পরিচয়েÑ ভিয়েতনাম যুদ্ধে তিনি বোমারুবিমান চালিয়ে জনবহুল হ্যানয় নগরীতে বোমা ফেলেছিলেন। তখন মিসাইল নিক্ষেপ করে বিমানটি নামানো হয়। (তদানীন্তন উত্তর) ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের উপকণ্ঠে একটি হ্রদে গিয়ে পড়ে ম্যাককেইনসহ বিমানটি। সেই এলাকায় থাকতেন ভিয়েতনামের একজন অবসরপ্রাপ্ত সৈন্য। তিনি দেখলেন, একটি বিমান ভূপাতিত হয়েছে এবং পাইলট বাঁচার চেষ্টা করছেন। তিনি ছুটে এলেন বিমান চালককে সাহায্য করার জন্য। তখন হ্যানয়ের কিছু বাসিন্দা দৌড়ে এসে হাজির হলো। তারা মার্কিন বিমান হামলায় ক্ষতির শিকার হয়েছিল। লোকগুলো এই খুনি পাইলটের এসপার-ওসপার একটা বিহিত করতে চাইলো। অবসরপ্রাপ্ত সৈন্য তাদের বাধা দেন। কারণ, এ পাইলট ততক্ষণে বন্দী হয়ে গেছে বলে তাকে অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখা দরকার। এরপর মার্কিন কর্তৃপক্ষ ভিয়েতনাম সরকারের সাথে যোগাযোগ করে আবেদন জানায়, যাতে এই পাইলটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া না হয়।
ভিয়েতনাম সরকার যুদ্ধবন্দীদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রদানের নীতি অনুসরণ করত। তদুপরি, ধৃত মার্কিন পাইলট ছিল সে দেশের নৌবাহিনীর একজন অ্যাডমিরালের ছেলে। এই সেনাপতি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। তার ছেলে ভিয়েতনামে আটক হওয়ার সময়ও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন অধিষ্ঠিত।
ভিয়েতনামিরা সেদিন একটা ‘বড় মাছ’ই ধরেছিল ম্যাককেইনকে পাকড়াও করে। অপর দিকে শান্তি আলোচনা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অন্যায় যুদ্ধের অবসান ঘটাবেÑ এই বিবেচনায় তারা ম্যাককেইনের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছিল। এই সুযোগ ব্যবহার করতে পেরে ম্যাককেইন খুব খুশি হয়েছিলেন।
অবশ্য কোনো ভিয়েতনামি আমাকে এ ধরনের কথা বলেনি। আমি এ বিষয়ে পড়েছি। আমার অধ্যয়নলব্ধ এ জ্ঞান মিলে যায় ওই ঘটনা সম্পর্কে পরে জানা বিশদ বিবরণের সাথে। এটাও পড়ে জেনেছি যে, ম্যাককেইন লিখেছেনÑ তিনি ভিয়েতনামে বন্দী থাকাকালে নির্যাতিত হয়েছেন। তখন ভিয়েতনামে দায়িত্বরত ও স্প্যানিশভাষী মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছেন। তারা নির্যাতনকারীদের পরামর্শ দিচ্ছিল নির্যাতন কিভাবে চালাতে হবে, সে ব্যাপারে।
ম্যাককেইনের মতে, এই কণ্ঠস্বর কিউবার নাগরিকদের; কিন্তু ভিয়েতনামে কখনো কিউবা কোনো উপদেশদাতা পাঠায়নি। ভিয়েতনামি সামরিক বাহিনীর নিজেরই জানা ছিল, তাদের কিভাবে যুদ্ধ চালাতে হবে।
ভিয়েতনামের জেনারেল গিয়াপ আমাদের এ যুগের সবচেয়ে প্রতিভাবান সমরকুশলীদের একজন। তিনি দিয়েন বিয়েন ফুতে প্রত্যন্ত পার্বত্য জঙ্গলে মিসাইল লঞ্চার বসাতে সক্ষম হয়েছিলেন। অথচ ইয়াংকি (মার্কিন) আর ইউরোপিয়ান সেনা অফিসাররা ভেবেছিলেন, এটা অসম্ভব। এভাবে ভিয়েতনামিরা শত্রুর এত কাছ থেকে গোলাগুলি বর্ষণ করত যে, তাদের কাবু করা সম্ভব ছিল না। আর তা করতে গেলে আক্রমণকারী আমেরিকানদের নিজেদেরই ক্ষতি হতো। আরো অনেক কঠিন ও দুরূহ পদক্ষেপ নিয়ে ভিয়েতনামে অবরুদ্ধ শত্রুবাহিনীকে লজ্জাকর আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়েছিল।
খেঁকশিয়ালের মতো ধূর্ত, ম্যাককেইন মার্কিন ও ইউরোপিয়ানদের সামরিক পরাজয় থেকে যতটা সম্ভব ফায়দা লুটেছিলেন। তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন একদিন আয়েশি ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘হেনরি, আমরা কেন একটা হলেও ওই ছোট বোমাগুলো ফেলছি না?’ কিন্তু তার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার এই আইডিয়া গ্রহণ করেননি। আসলে ‘ছোট্ট বোমা’টি বর্ষিত হয়েছিল, যখন এই প্রেসিডেন্টের লোকেরা তাদের প্রতিপক্ষ দলের লোকজনের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি চালাতে চেষ্টা করেছিল।
যা হোক, মিস্টার ম্যাককেইন তার সবচেয়ে উন্নাসিক আচরণ দেখিয়েছেন নিকট প্রাচ্যের ক্ষেত্রে। মোসাদের ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত, ইসরাইলের এমন বন্ধুদের মধ্যে সিনেটর ম্যাককেইন সবচেয়ে নিঃশর্ত ভালোবাসা প্রদানকারী। এ দিক দিয়ে তিনি যে কত বেশি অগ্রসর, তা তার সবচেয়ে বড় শত্রুরও কল্পনা করা কঠিন। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জন্ম দেয়ার কাজে মোসাদ গোয়েন্দা সংস্থার সাথে ম্যাককেইনও অংশ নিয়েছেন। ইতোমধ্যেই আইএস ইরাকের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ এবং সিরিয়ার এক-তৃতীয়াংশ দখল করে নিয়েছে। আইএসের তহবিলে আছে অনেক মিলিয়ন ডলার। ওরা সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশকে হুমকির মুখে ফেলেছে, যারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বেশি জোগানদাতা।
লেখক : কিউবার বিপ্লবের নায়ক এবং দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট
ভাষান্তর : মীযানুল করীম
[মান্থলি রিভিউর সৌজন্যে]

এ কোন পথে সরকার! by গোলাপ মুনীর

সম্প্রতি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে এর  চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছেন আমাদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এর সপ্তাহ সময় ব্যবধানে ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সাবের হোসেন চৌধুরী। এ দু’টি নির্বাচনে এ দু’জনের সাফল্যের জন্য তারা ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখেন; কিন্তু এ সাফল্য তুলে ধরার জন্য বিলবোর্ড টানিয়ে এবং সভা-সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ আমাদের দেশের থলেতে এ সাফল্য জমা হয়েছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে, ৫ জানুয়ারি সম্পর্কে বিদেশীরা আর কোনো প্রশ্ন তুলছেন নাÑ এমনটি প্রচার এ সাফল্যের গুরুত্বকে অনেকটা ম্লান করে দিচ্ছে বলেই মনে হয়। আসলে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনে বাংলাদেশের কেউ চেয়ারপারসন নির্বাচিত হলে কিংবা ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশের কেউ নির্বাচিত হলেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে কিংবা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে বৈধতা সনদ পেয়ে গেছে, তা ভাবার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এর একটি উদাহরণ, যে দিন সাবের হোসেন চৌধুরী ইন্টারপার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, সে দিনটিতে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়ে বলেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল হতাশাজনক। গত ১৬ অক্টোবর যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে সে দেশের সরকারের এ অবস্থানের কথা জানানো হয়। এর আগে গত ২২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন একইভাবে এ হতাশার কথা জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ : কান্ট্রি কেস স্টাডি আপডেটেড’ শীর্ষক এ রিপোর্টে যুক্তরাজ্যের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি ছাড়াও বলা হয়Ñ বাংলাদেশের মিডিয়া বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিধিনিষেধের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারের সমালোচনাকারী বা ভিন্নমতাবলম্বীদের আটক করা হচ্ছে। এ বছরই তৈরি করা হয়েছে নতুন কিছু নীতি ও আইন। এতে সুশীলসমাজ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এমনই নানা অভিযোগ রয়েছে এ রিপোর্টে।
সরকার যতই বলুক, এ সরকার বিদেশী মহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেছে, এ সরকার ও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিদেশে কোনো প্রশ্ন নেই; বাস্তবে কিন্তু এর কোনো প্রমাণ মিলছে না। বরং বাস্তবে আমরা এমন সব ঘটনা ঘটতে দেখতে পাচ্ছি, যা সরকারপক্ষের দাবিকে মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য যথেষ্ট। সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিদেশী দাতারা। বর্তমান সংসদের পেছনে টাকা খরচ করাকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়েই প্রকল্প গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন দাতারা। বর্তমান সংসদে অর্ধেকেরও বেশি সদস্য অনির্বাচিত হওয়ার প্রসঙ্গটি সামনে এনেই তাদের এ অনাগ্রহের বিষয়টি দাতারা মৌখিকভাবে সংসদ সচিবালয়কে জানিয়ে দিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ। এরই মধ্যে ইউএনডিপি ও নেদারল্যান্ডসের অর্থায়নে পরিচালিত আইপিডি প্রকল্প বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি মাঝপথেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এটি অব্যাহত রাখার জন্য সংসদ সচিবালয়ের অনুরোধে দাতারা কোনো সাড়া দেননি। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ আরো কয়েকটি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আগ্রহ নেই দাতাদের। উপরন্তু চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে; কিন্তু সম্প্রতি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর দেশে ফিরে আমাদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী যখন বলেন, বর্তমান সংসদ নিয়ে দেশের বাইরে কারো কোনো প্রশ্ন নেই, তখন সংসদের প্রতি দাতাদের এই মুখ ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে কী জবাব দেবেন তিনি।
বর্তমান সরকার ও এর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্নের এখানেই শেষ নয়, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্নের শেষ এখানেই থেমে নেই। বাংলাদেশে বিরোধী দলমত ও ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের ওপর সরকার চরম দমনপীড়ন চালিয়ে দেশবাসীর মতামতকে উপেক্ষা করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছে। বিষয়টি এখন আর কোনো রাখঢাক করে বলা হচ্ছে না। বরং সরকারি দলের নেতারা বলছেন, যারা এর আগে নির্বাচনের কথা বলে তারা মূর্খ। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী রীতিমতো বিরোধী জোটের নেত্রীর প্রতি নানা ধরনের বাক্যবাণ ছুড়ে সরকারবিরোধীদের দমনে চরম কঠোরতার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন এবং বলছেন, ‘আর একজনের গায়ে হাত দিয়ে দেখুক, তার পরিণতি কী হয় দেখবে।’ সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে বর্তমান সরকার যে মরিয়া এবং এ কাজে দলীয়ভাবে র‌্যাব-পুলিশের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে, তা এখন দেশী-বিদেশী সব মহলের কাছে স্পষ্ট। সম্প্রতি ছাত্রদলের নতুন কমিটির ২২ জন নেতাকর্মী গ্রেফতারের পর গত পরশু আবার যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ ৬৩ জনের গ্রেফতার সরকারের সেই দমনপীড়ন পরিকল্পনারই অংশ বলে দেশবাসী মনে করে। বলা হচ্ছে, পুলিশের কাছে সন্দেহ হয়েছে, এরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। এভাবে সন্দেহের বশে এর আগে কত আটক-গ্রেফতার, মামলা-হামলা হয়েছে, অমানবিক পুলিশি নির্যাতন চলেছে; তার ইয়ত্তা নেই। বিদেশী মহল এ ব্যাপারে বারবার সরকারকে হুঁশিয়ার করে র‌্যাব-পুলিশকে দায়মুক্তি না দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে; কিন্তু সরকার ড্যামকেয়ার। বিদেশী বিভিন্ন মহলের উপরোধ-অনুরোধ আমলে নেয়নি, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে সরকার পুলিশ-র‌্যাবের ব্যবহার আরো জোরাল করে তুলছে সময়ের সাথে। এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে এবার বিভিন্ন দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলাদেশের পুলিশের কাছে আর কোনো অস্ত্র বিক্রি করবে না। গত ২০ অক্টোবর পত্রিকান্তরে খবরে প্রকাশ, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের পুলিশের ব্যবহারের অস্ত্র বিক্রি করতে রাজি নয়। সম্প্রতি মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের পুলিশের জন্য গোলাবারুদ রফতানিতে যুক্তরাজ্য এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশও জারি করেছে একই ধরনের অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। তবে এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের পর ইতালিও এই নিষেধাজ্ঞা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে। এ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর। বাধ্য হয়ে গোলাবারুদের বিকল্প বাজারের সন্ধানে নেমেছে সরকার। তবে ওইসব দেশের মতো মানসম্পন্ন গোলাবারুদ সরবরাহকারী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশে যে এখন গণতন্ত্রের আকাল, তা সরকারের বাইরে থাকা সব মহলই বলছে। মাঝে মধ্যে বর্তমান সরকারে থাকা শরিক দলের নেতাদের মুখ থেকে মুখ ফসকে তা বেরিয়ে আসছে। গত ১৬ অক্টোবর বর্তমান সরকারের শরিক দল, আবার একই সাথে অদ্ভুত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেনÑ ‘দেশে এখন একদলের গণতন্ত্র, প্রতিহিংসা ও জিঘাংসার গণতন্ত্র চলছে। দেশের কোথাও সুশাসন নেই। সর্বত্র দলীয়করণ, দুঃশাসন ও দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। যে গণতন্ত্রে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই, মানুষ নিরাপদে ঘুমাতে পারে না, তা জনগণের গণতন্ত্র নয়; এক পার্টির গণতন্ত্র। সেই গণতন্ত্র আমরা চাই না।’ কিন্তু সরকারে থেকে ও একই সাথে বিরোধী দলে থেকে গাছেও খেয়ে তলায়ও কুড়িয়ে সরকারের বিরুদ্ধে এ ধরনের সমালোচনা করার মতো অবস্থান ধরে রাখা অন্তত এ সরকারের আমলে সম্ভব হতে পারে না। ফলে এর মাত্র পাঁচ দিন পর এরশাদের মুখে শোনা গেল সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ উচ্চারণ। এবার তিনি শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সাবের হোসেন চৌধুরীর উল্লিখিত নির্বাচনী বিজয় উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় বলেছেন, ‘...বঙ্গবন্ধুর কারণে বাংলাদেশের পরিচয়, তেমনি শেখ হাসিনার জন্য বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পরিচয়...।’ আসলে আওয়ামী লীগের বাইরে সরকারি জোটে যারা আছেন, তাদেরকে এভাবেই তোতাপাখির বোল নিয়ে প্রতিদিন সরকারের গুডবুকে থাকার প্রয়াস চালাতে হয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, তার ৯ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ কি পরিচয়হীন ছিল? আর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে কি সে পরিচয় উদ্ধার করেছেন?
বিবেকবান সব মানুষের এক কথাÑ সব দলের অংশগ্রহণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকারের জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত আজকের বিদ্যমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার সমাধান। আর এ জন্য অপরিহার্য হচ্ছে রাজনৈতিক সংলাপে বসে সর্বমহলের কাছে সম্মত একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা। সূত্রায়ন, সরকারবিরোধী ২০ দলীয় জোটসহ সরকারের বাইরে থাকা বাকি সব রাজনৈতিক দল-গোষ্ঠীর দাবি এটিই; কিন্তু সরকারপক্ষের এক কথাÑ কোনো সংলাপ নয়, কোনো নির্বাচন নয়। নির্বাচন হবে ২০১৯ সালে, শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই। কেউ নির্বাচনে এলে আসবে, না এলে ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন, দলীয় সরকারের অধীনে। কিন্তু বিবেকবান মানুষের কথাÑ মধ্যবর্তী নির্বাচনের কারণ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দেশ-বিদেশে কারো কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। অর্ধেকেরও বেশি আসনের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। জনগণ এ নির্বাচন বর্জন করেছে বলেই এমনটি ঘটেছে। সরকার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের সর্বসম্মত পদ্ধতি বদলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করে অবাধ নির্বাচনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
সরকার বলছে, বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিএনপি নেত্রীর পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। বিএনপি দেউলিয়া হয়ে গেছে। তাই যদি হয়, তবে সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে ভয় পাচ্ছে কেন? সরকার সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনপদ্ধতি প্রণয়নের জন্য সংলাপে যেতে চাচ্ছে না কেন? আসলে সরকার মুখে যাই বলুক, বাস্তবে জানে সরকার নানা অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক কর্মকাণ্ডসহ দুর্নীতি-দুঃশাসনের সূত্রে নিজেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই অবাধ ও নিরপেক্ষ মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে সরকারের এত ভীতি ও অনীহা; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারের এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে জনসমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে গণতন্ত্রের পথেই হাঁটতেই হবে। নইলে জটিলতা আর জাতীয় দুর্ভোগ শুধু বেড়েই চলবে। আর সরকার নিজেই ডেকে আনবে নিজের জন্য বিপদের পর বিপদ। বিরোধী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমনপীড়নের মাধ্যমে এ জটিলতার কোনো সমাধান নেইÑ এটাই বাস্তবতা, এটাই শেষ কথা।
সরকার বুঝতে পারছে কি না জানি নাÑ জনগণ, এমনকি দেশের বাইরের মহলের মনেও প্রশ্ন উঠেছেÑ এ কোন পথে হাঁটছে সরকার? চার দিকে এত কথা, তবুও সরকার কিছুই আমলে নিচ্ছে না। সরকার যেন পণ করে বসেছে, বাইরের মানুষ যা বলবে, যে দিকে যেতে বলবে, যেতে হবে ঠিক এর উল্টো দিকে। এরই প্রতিফলন সরকারের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে, কথাবার্তায়। এর শেষ কোথায়, এর জবাব কারো জানা নেই। অতএব সময়ের অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
সব শেষে আরেকটি কথাÑ এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সব সরকারই দাবি করে আসছে বাংলাদেশ একটি উদার গণতন্ত্রের দেশ, এমনকি বর্তমান সরকারও তেমনটি দাবি করে থাকে। উদারবাদী গণতন্ত্রের ধারক-বাহক বলে আমরা যারা দাবি করি, তারা এই উদারবাদী গণতন্ত্র তথা লিবারেলিজমের সংজ্ঞা ও পরিধি সম্পর্কে কতটুকু সচেতন, সে প্রশ্ন অনায়াসেই তোলা যায়। আমরা মনে হয় ভুলে গেছি, লিবারেলিজম এখন একটি রাজনৈতিক দর্শন, যা গড়ে উঠেছে ‘লিবার্টি’ নামের অনুষঙ্গের ওপর। যে ‘লিবার্টি’ শব্দটিতে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয় কাসিক্যাল লিবারেলিজমে। সাধারণত এই ‘লিবার্টি’ বলতে নাগরিকসাধারণের জন্য নিশ্চিত রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা। ধর্মতত্ত্বে লিবার্টি হচ্ছে পাপের বন্ধন থেকে মুক্তি।
সাধারণ লিবারেলিজম (উদারবাদী) কিংবা কাসিক্যাল লিবারেলিজমই বলি, তা এমন একটি রাজনৈতিক দর্শন, যেখানে প্রাথমিক তাগিদ দেয়া হয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করার মাধ্যমে ব্যক্তিস্বাধীনতা বিকল্পহীনভাবে নিরাপদ করা। যুক্তরাষ্ট্রে বিংশ শতাব্দীর আগে কাসিক্যাল লিবারেলিজম নামের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দর্শনটি ছিল থমাস জেফারসন ও সে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণায় স্বাক্ষরকারীদের রাজনৈতিক দর্শন। তখনকার দিনে সেখানকার মানুষ বিশ্বাস করত, নাগরিকসাধারণের অধিকারের উৎস সরকার। মানুষ ভাবত তারা সে অধিকারই পাবে, যা নির্বাচিত সরকার তাদের দেবে; কিন্তু ব্রিটিশ দার্শনিক জন লকিকে অনুসরণ করে জেফারসন অভিমত দেন, বিষয়টি তা নয়। সরকারের দেয়া অধিকারের বাইরেও জনগণের অধিকার আছে। জনগণ সরকার গঠন করতে পারে এবং সরকার বাতিলও করতে পারে। আর একটি বৈধ সরকারের একমাত্র উদ্দেশ্য, জনগণের এসব অধিকার নিরাপদ করা। ভুললে চলবে না, এর ব্যত্যয় গণতন্ত্রের ব্যত্যয়। বিবেকবানেরা বলছেন, বাংলাদেশে বারবার এর ব্যত্যয় ঘটছে, সেই সূত্রে সৃষ্টি হচ্ছে একের পর এক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট; যার শিকার গোটা জাতি। এ থেকে উত্তরণের আন্তরিক প্রয়াসে প্রয়াসী ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেইÑ এ হুঁশিয়ারিটি বিবেকবান মানুষের।

ধর্মীয় উৎসব ও জাতির পরিচয় প্রসঙ্গ by হারুন আর রশিদ

‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ এ বাক্যটি সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মিডিয়ায় অনেকে উচ্চারণ করে থাকেন। আমরা মনে করি, এ কথাটা যথার্থ। এর পাশাপাশি আরেকটি কথা মাঝে মাঝে উচ্চারিত হয়, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’ এটা কতটা বাস্তব ও যৌক্তিক সে ব্যাপারে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। তারা বলেছেন, ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার। কারণ একেকজনের একেক রকম ধর্ম। তাদের সংখ্যা শতাংশে তা ৯০, ১০, কিংবা পাঁচ হতে পারে জনসংখ্যার মাপকাঠিতে। দেশের সব মানুষ এক ধর্মে বিশ্বাসী নয়। বিশ্বাসে পার্থক্য থাকবেই। ধর্মের মূল ভিত্তি ও বিশ্বাসের বিষয় যখন ভিন্ন, তখন উৎসবটাও ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে হয়। সে ক্ষেত্রে একটি ধর্মীয় উৎসবে অন্য ধর্মের মানুষও যদি একইভাবে মেতে ওঠেন তাহলে তার নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের আদর্শ ও নীতি থেকে কি বিচ্যুতি ঘটবে না? তবে বিষয়টি যদি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান না হয়ে জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান হয়Ñ (যেমন, বাংলা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, জাতীয় নেতার মৃত্যু ও জন্ম দিবস), তাহলে সেই ক্ষেত্রে উৎসব নিঃসন্দেহে সবার। রাষ্ট্রের ভিত্তি আরো মজবুত হয় সবাই মিলে সে দিবসগুলো উদযাপন করলে।
বিশ্বের কয়েক শ’ কোটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পার্থক্য বিদ্যমান। তাই একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর পক্ষে অপর কোনো ধর্মীয় উৎসবে অংশ নেয়া মূলত সম্ভব নয়। ধর্মীয় দিক থেকে সে উৎসবে অংশ নিলে নিজ ধর্মের প্রতি আনুগত্যশীল নয় বলে ধারণা করা অন্যায় হবে না। উদাহরণস্বরূপ ইসলাম ধর্মের মূল আকিদা বা বিশ্বাস হলো একেশ্বরবাদ। স্রষ্টার বহুত্বে তারা বিশ্বাসী নয়। সৃষ্টিকর্তা বলতে তারা নিরাকার একজনকেই বোঝেÑ তিনি হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। মূর্তিপূজা ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ। শুধু মূর্তি নয়Ñ গাছ, পাথর, মাজার বা ব্যক্তিকে পূজাও নিষিদ্ধ। আল্লাহর সৃষ্টি জগতের কোনো জীবকে পূজা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এসব ব্যাপারে কড়াকড়ি নির্দেশ রয়েছে। এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করা যাবে না।
ইসলাম ধর্মবিশ্বাসী এমন কোনো ব্যক্তি রাসূল সা:-কে শেষ নবী বা পয়গম্বর হিসেবে যদি মনেপ্রাণে বিশ্বাস না করেÑ সেই ব্যক্তিও মুসলমান বলে নিজেকে দাবি করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভÑ ঈমান, রোজা, নামাজ, হজ ও জাকাতে যদি পুরোপুরি বিশ্বাসী না হয়ে থাকে তাহলে তাকে মুসলমান হিসেবে গণ্য করা যায় না। মুমিন মুসলমান হতে হলে আল্লাহ এবং রাসূল সা:-এর বিধান কুরআন-হাদিসের বাণী তাকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে হবে এবং সেভাবে নিজের ও অন্যদের পরিচালিত করতে হবে। ধর্মকর্মের উৎসব সবার এক রকম হবে এবং তাতে একটি দেশের সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ থাকতে হবে, এটা কোনো বিধানে নেই। উৎসবের ভিন্নতাই ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’ মূর্ত করে তোলে এবং নিজ নিজ ধর্মের বন্ধনকে আরো মজবুত করে। জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেললে ধর্ম আর তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। ধর্মকে তার স্বাভাবিক নিজস্ব পথে চলতে দিতে হবে। এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না।
একটি জাতীয় দৈনিক ৫ অক্টোবর অমুসলিমদের পূজা অর্চনা ও ধর্মীয় উৎসব প্রসঙ্গে দেশের মুফতিগণের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। ২০১৪ সালে সারা দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩০ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় তিন গুণ বেশি বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার। এ বছর প্রধানমন্ত্রী পূজামণ্ডপগুলোর জন্য এক কোটি ৫০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। ৩০ হাজার পূজামণ্ডপের প্রতিটিতে গড়ে ১৩ হাজার টাকা মূল্যের চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ দিকে, ফতোয়া বোর্ড ও দ্বীনি পরামর্শকেন্দ্র জানায়, ‘ধর্ম যার যার, ধর্মীয় উৎসবও যার যার।’ ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত উৎসবের ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ধর্মীয় উৎসব নিষ্ঠার সাথে উদযাপন বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল।
যা হোক, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংখ্যালঘুদের সাথে উত্তম ব্যবহার ও সামাজিকতা বজায় রাখতে হবে। তাদের সাথে কোনো অন্যায় আচরণ করা যাবে না। তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান এবং ধর্ম পালন ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের পরিবেশ বজায় রাখা সংখ্যাগুরু ও সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। এ দিকে, হজের সময়ে একমাত্র বিটিভি ছাড়া প্রাইভেট চ্যানেলগুলো পক্ষপাতদুষ্ট কাজ করেছে। এবারের হজ শুক্রবারে হওয়ায় একে আকবরি হজ হিসেবে দেখেছে বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে পনেরো কোটি মুসলমান। টিভি চ্যানেলগুলো ৯০ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হজকে প্রাধান্য দেয়নি। একই সময়ে একের অধিক যদি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়Ñ সে ক্ষেত্রে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারকে প্রাধান্য দেয়া মিডিয়ার নৈতিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে কিছু মিডিয়া অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ। এটা নিঃসন্দেহে দৃষ্টিকটু ও একপেশে আচরণ। একটি পত্রিকায় লিখেছেÑ ওই দিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক হিন্দু ভাই বাংলাদেশে এসে দুর্গাপূজা উৎসবে অংশগ্রহণ করেছেন। তারা বলেছেন, গোটা ভারতবর্ষে এত জাঁকজমকভাবে দুর্গাপূজা উৎসব পালন হয় না। ভারতের মিডিয়াও বাংলাদেশের মতো এত ব্যাপকভাবে প্রচার করে না পূজার খবর। উপমহাদেশে ভারত ও নেপাল হলো হিন্দু রাষ্ট্র। অন্য দিকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ হলো মুসলিম রাষ্ট্র। মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে দুর্গাপূজা উৎসব পালনে বাংলাদেশ ভারতকেও পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করতে চায় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। দেশের ২৬টি চ্যানেলে হজ পালনকে প্রাধান্য দেয়া নীতিগতভাবে উচিত ছিল। মিডিয়ার একাংশের প্ক্ষপাতদুষ্ট আচরণে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে পারে। কাউকে বেশি উৎসাহ দেয়া, আবার কাউকে নিরুৎসাহ করা বা এড়িয়ে চলা যথার্থ হয়েছে বলে আমরা মনে করি না। একটি দেশের সব ধর্মের মধ্যে আনুপাতিক ভারসাম্য যাতে বজায় থাকে সেই জন্য যেমন সরকারের ভূমিকা রয়েছে, তেমনি প্রচারমাধ্যমগুলোরও এগিয়ে আসতে হবে।
সব রাষ্ট্রের মানুষ নিজের দেশের নামে জাতির পরিচয় দেয়। এখানে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, গোত্র, উপজাতি এসব প্রশ্ন গৌণ। একটি দেশের শিকড় শক্ত করতে হলে দেশগত পরিচয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হয়। মালয়েশিয়ার উন্নতির মূল কারণ দেশগত পরিচয়। বিভিন্ন ধর্মের লোক থাকলেও সেই দেশে আজ পর্যন্ত সমস্যার সৃষ্টি হয়নি; কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে। উপজাতিরা নিজেদের বাঙালি বলতে নারাজ। বাংলাদেশী বলতে আবার তাদের আপত্তি নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা নিজেদের ভারতীয় বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আসলে দেশের নাম অনুসারে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি হলে ‘আমরা বাংলাদেশী’Ñ এ কথায় দেশে সাম্প্রদায়িক চেতনার বিনাশ ঘটবে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে উঠবে, দেশও উন্নতি লাভ করবে। এ ক্ষেত্রে ভাষা ধর্ম যার যার, দেশ সবার এবং ধর্ম যার যার বিশ্বাস তার তারÑ এভাবে আমরা সবাই চিন্তা করলে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে কলহ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে না। জাতীয়তা নিয়েও বিভ্রান্তি দেখা দেবে না।
লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক
email:harunrashid1952@yahoo.com

সমাজদেহে ঘুণপোকার আক্রমণ by মর্জিনা আফসার রোজী

শত অবক্ষয়ের মতো জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাও আজ পতনের দিকে এগিয়ে চলেছে। নীতি আদর্শবান শিক্ষক-শিক্ষিকারা হতাশার সাগরে নিমজ্জিত। তাদের বিবেক অনিয়মের বোঝা বইতে বইতে কান্ত-পরিশ্রান্ত। সমাজের সর্বত্রই যেন একটি অদৃশ্য সাইনবোর্ডে এই লেখাটি জ্বলছেÑ ‘দেখার কেউ নেই’। হত্যা, গুম, খুন ও নির্যাতনের জাঁতাকলে অসহায় নাগরিকদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। দেশের এমন দৈন্যদশা চিরদিন ছিল না। এক সময় এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নতি, সমৃদ্ধি আর পবিত্রতা নিয়ে শির উঁচু করে সগৌরবে অবস্থান করত। দেশী-বিদেশী, স্বজাতি, ভিনজাতি অনেকেই সে সময়ের শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে বিকশিত হতে চেয়েছে। আজ শুধু দলকে মিথ্যা গৌরবে ভূষিত করার জন্য, কোটি জনতাকে বোকা বানিয়ে প্রতিপক্ষের কাছে মিথ্যা সাফল্য জারি করার নিমিত্তে শিক্ষাব্যবস্থার শক্ত মেরুদণ্ডটি ভেঙে খণ্ড খণ্ড করে দিয়েছে। তাতে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, দুর্বল ভঙ্গুর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য অপাঙক্তেয় হতে চলেছে, সে কথা ভাবার অবকাশ নেই। জাতীয় শিক্ষার অভ্যন্তরে দুর্নীতি প্রবেশ করায় আদর্শবান অভিজ্ঞ শিক্ষকেরা এ অবক্ষয় সহ্য করতে পারছেন না। গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত পাখির মতো ডানা ঝাপ্টাচ্ছে। অভিজ্ঞ বয়োজ্যেষ্ঠ এক শিক্ষক দগ্ধ হৃদয়ে ছলছল নয়নে বলেছিলেন, ‘আর শিক্ষকতা করতে মন চায় না। অনীহা ধরে গেছে এ পেশার ওপর। শিক্ষা নিয়ে এমন নোংরা রাজনীতি জীবনে কোনো দিন দেখিনি। বিবেককে গলা টিপে হত্যা করে অন্যায় করতে পারি না বলে এ বয়সেও কর্তৃপক্ষের কাছে অপমানিত হতে হয়। স্বচক্ষে কোমলমতি শিশুদের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে দেখে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সহ্য করতে পারি না। চরম অনিয়মই আজ নিয়মে পরিণত হয়েছে। নিজ হাতে বোর্ড পরীক্ষার সময় উত্তরে সহায়তা করতে হাত কাঁপে, বিবেক বাধা দেয়। তথাপি জীবন-জীবিকার তাগিদে এসব অন্যায় সওয়া ও করা দুটোই চলেছে। শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বারবার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ডেকে নির্দেশ দেন, পরীক্ষার খাতা কড়াকড়ি করে দেখা যাবে না। যে পরীক্ষার খাতায় আট পাবে, তাকে দশ বানিয়ে দিতে হবে। কোনো পরীক্ষায় ফেল করানো যাবে না। ন্যূনতম লিখলেই ভালো নম্বর দিতে হবে। নির্ধারিত নম্বরের সবটাই প্রদান করতে হবে। ছাত্রছাত্রী পরীক্ষার খাতায় যা-ই লিখুক না কেন নম্বর দিতেই হবে। পরীক্ষা চলাকালে হলের গার্ড শিথিল দৃষ্টিতে দেখতে হবে। না পারলে শিক্ষার্থীকে বলে দিতে হবে। নকল করলে দেখেও না দেখার ভান করতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় শাসনও করা যাবে না। মোট কথা হচ্ছে, যা শিখুক না কেন সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার; কিন্তু সরকারকে অধিক পাসের হার দেখাতে হবে। বাহবা কুড়াতে হবে। চলতি বছরে নিম্নমেধার ছাত্রছাত্রীরাও জিপিএ ৫ পেয়েছে। লাখের মতো জিপিএ ৫ দিয়ে অ প্লাস-এর সম্মান ভূলুণ্ঠিত করেছে। এবার নির্বাচনী পরীক্ষায় রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলে সাধারণ গণিত পরীক্ষার দিন প্রশ্নপত্রে ৪০টি অঙ্কের মধ্যে ১২টি অঙ্কই ভুল ছাপা হয়েছে। কোনোটির + নেই, কোনোটির Ñ নেই, কোনোটির শব্দ ঠিক নেই। এতটাই অবহেলা ভরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, এর কোনো প্রুফ সংশোধন করা হয়নি। অর্থাৎ অনিয়মের তীব্র স্রোতে শিক্ষকেরাও গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। অবশেষে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে শিক্ষকেরা এ আশ্বাস প্রদান করেছেন যে, ওই ১২টি অঙ্কের পূর্ণ নম্বর সবাইকে প্রদান করা হবে। তাহলে বোর্ড পরীক্ষার আগে মেধা যাচাই হলো কী করে। শিক্ষাব্যবস্থায় এমন দশা বিবেকবান মানুষকে ক্ষতবিক্ষত করে। যেহেতু ঢেলে নম্বর দিতে হবেই, সেখানে আর যাচাই-বাছাই করার কী দরকার। বোর্ডের কর্র্তাব্যক্তিরা শিক্ষকদের ডেকে এনে নাকি শতভাগ পাস করানোর নির্দেশনা দেন। যদি কেউ অপারগতা প্রকাশ করেন তাকে ভর্ৎসনা করা হয়। যে শিক্ষকের বিবেক জাগ্রত হবে তাকে এ পেশা থেকে চলে যেতে হবে। স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেছে অথচ বোর্ডে গিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার হলে স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিলেও শিক্ষক শাসন করতে পারবেন না? তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্ররা পর্যন্ত মোবাইলে পর্নোগ্রাফি তুলে নিয়ে স্কুলে আসে তবুও শিক্ষকদের সংশোধন করার অধিকার নেই। নির্দেশনাটি এমন, অন্যের সন্তান যা করুক আপনাদের কী। সবকিছু দেখার দরকার নেই। আর দৃষ্টি পড়লেও বলার প্রয়োজন নেই। সহপাঠীর লেখা অনুসরণ করলে কিংবা সমাধানপত্র সাথে আনলেও বাধা দেয়া যাবে না। ল্যাপটপে উত্তর তুলে এনে প্রকাশ্যেই পরীক্ষা দেয়া যায়। গার্ডরা কি শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখবেন? বাধা দেয়ার ক্ষমতা নেই। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের শাসন করার ক্ষমতাটুকুও হরণ করে নেয়া হচ্ছে। ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চরম অমর্যাদা হয়েছে। মানুষ হারিয়েছে ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করার অধিকার। জেল, জুলুম, হত্যা, গুম করে রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশ করার অধিকার হরণ করেছে। এমনকি বিচারপতিদের পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের কাছে দায়বদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। মানুষ আজ নিজ ইচ্ছায় স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারে না। আর এ সুযোগে খুনি-সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়েছে এ জনপদ। পেশাদার খুনিরা একটার পর একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কিছু দিনের জন্য গা ঢাকা দেয়। তারপর কিছুদিন অতিবাহিত হলে যে যার আগের কাজে ফিরে আসে। ভুক্তভোগীরা বিচার পায় না। আসল অপরাধী বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করে। এ কথা ভাবতেও লজ্জা হয়, একজন মৃত মানুষের শেষ ইচ্ছা পূরণের বিপক্ষে কোনো সরকারের অশুভ ইঙ্গিত থাকতে পারে। উদারতা আর পরমতসহিষ্ণুতার শেষ বিন্দুও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। দেশের আগামী প্রজন্ম সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে রাষ্ট্রীয় কর্ণধার হবে, উজ্জ্বল পথের কাণ্ডারি হয়ে দুঃখিনী বাংলার সোনার ছেলে হবে, সে পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের বেলায় শিথিলতা আর যৌন শিক্ষার ব্যাপারে চরম উদারতা। এ অসুস্থ মানসিকতার কুপ্রভাবে জনগণ কেন অস্বস্তিতে থাকবে?
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

কথায় কথায় মামলা by গোলাম রব্বানী

কার বিরুদ্ধে কয়টি : খালেদা জিয়া ৬টি ; মির্জা ফখরুল ৪৭টি ; খন্দকার মোশাররফ ২০টি ;ব্যারিস্টার মওদুদ ১৮টি ; হান্নান শাহ ১৬টি ; রফিকুল ইসলাম মিয়া ২৩টি ; মির্জা আব্বাস ৪১টি
কথায় কথায় মামলা দায়ের করা হচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। শীর্ষ নেতারাই এ ক্ষেত্রে মূল টার্গেট। যার যখন খুশি মামলা ঠুকে দিচ্ছেন থানায় কিংবা আদালতে। সরকারি দলের নেতাকর্মী ও পুলিশ বাদি হচ্ছেন এসব মামলায়। এতে বাড়ছে হয়রানি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে ক্রমান্বয়ে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। বহির্বিশ্বে একটি সন্ত্রাসী শক্তি হিসেবে বিরোধীদের দেখাতে চাইছে সরকার। সে জন্যই তারা বিরোধী শক্তির কথা বলাসহ মৌলিক অধিকারগুলো সঙ্কুচিত করে আনছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গত ২১ অক্টোবর একটি মামলা করা হয়। মামলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি সরাসরি দায়ের করা হয় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে। মামলার বাদি সরকার সমর্থক সংগঠন ‘জননেত্রী পরিষদ’র সভাপতি এ বি সিদ্দিকী। গত ১৪ অক্টোবর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এক অনুষ্ঠানে দেয়া বেগম জিয়ার বক্তব্য বিষয়ে অভিযোগ আনেন তিনি। মহানগর হাকিম বাদির বক্তব্য শুনে যথাযথ সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর অভিযোগ তদন্ত করে ১৯ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে শাহবাগ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। এ ছাড়াও বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে পাঁচটি দুর্নীতি মামলা রয়েছে। এই পাঁচটির মধ্যে দু’টি মামলার বিচারকাজ জোরেসোরে শুরু হয়েছে। মামলা দু’টি বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
বেগম জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, গত ১৪ অক্টোবর বেগম জিয়া কোনো ধর্মকে আঘাত করে কোনো বক্তব্য দেননি। তিনি আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেছেন। আওয়ামী লীগ কোনো ধর্মের মর্যাদাই রক্ষা করতে পারছে না। ব্যারিস্টার খোকন আরো বলেন, দেশে একটা অনির্বাচিত ও বিতর্কিত সরকার বিদ্যমান। তারা তাদের ক্ষমতাকে ধরে রাখার কৌশল হিসেবে এসব মামলা দিচ্ছে।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গত ১৯ অক্টোবর একটি মামলা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ। এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূর বাদির জবানবন্দী শোনেন। পরে বিচারক অভিযোগটি সরাসরি আমলে না নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে অভিযোগ তদন্ত করে ২৬ অক্টোবরের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘পাকবন্ধু’ বলায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এ ছাড়া আছে ১৪-১৫টি মামলা।
একটি মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ারের বিরুদ্ধে গত ২০ অক্টোবর অভিযোগ গঠন করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ জহুরুল হক অভিযোগ গঠন করে আগামী ২৩ নভেম্বর স্যা গ্রহণের দিন ধার্য করেন। গত বছর মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশে হামলার ঘটনায় পরদিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা দেবাশীষ বিশ্বাস বাদি হয়ে গত ৭ মে মামলাটি করেন। বিএনপির এই নেতার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা রয়েছে।
এ দিকে গত শনিবার বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ ৬১ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর লালমাটিয়ার আলালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, হরতালকে সামনে রেখে নাশকতার পরিকল্পনা হচ্ছিলÑ এমন গোপন খবরের পরিপ্রেেিত তাদের আটক করা হয়। তবে বিএনপি নেতারা দাবি করেন, আলাল তার লালমাটিয়া নিউ কলোনি মাঠের পশ্চিম পাশের বাসার নিচে সাংগঠনিক বৈঠক করছিলেন। আটকের পর ওই দিনই রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা করে পুলিশ। মোহাম্মদপুর থানার ওসি আজিজুল হক সাংবাদিকদের বলেন, লালমাটিয়ার ওই বাসার আন্ডার গ্রাউন্ডে তারা বৈঠক করছিলেন। এ সময় তাদের আটক করে পুলিশ।
এ দিকে আটকের পর তাদের মধ্য থেকে আলালসহ ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ড চায় পুলিশ। পরে আদালত তাদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ ছাড়াও বিএনপি নেতা আলালের বিরুদ্ধে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতাকর্মীর দায়ের করা শতাধিক মামলা রয়েছে।
এভাবে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেয়া হচ্ছে একের পর এক নতুন মামলা। এ ছাড়া পুরনো মামলাগুলোও সচল হচ্ছে একের পর এক। গত ৫ জানুয়ারির আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি জোটের আন্দোলনের সময় তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যা, বোমা হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে পুলিশ অসংখ্য মামলা করে। সেসব মামলায় চার্জশিট দাখিল ও বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে দায়ের হওয়া এসব মামলায় আদালতে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগপত্র জমা দিচ্ছে পুলিশ। এসবের ওপর ভিত্তি করে শুরু হচ্ছে বিচারকাজ।
দলটির স্থায়ী কমিটির ১৮ জন সদস্যের মধ্যে দু’জন বাদে সবার বিরুদ্ধেই রয়েছে মামলা। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী দীর্ঘদিন কারাগারে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে দণ্ডিত করেছেন ট্রাইব্যুনাল। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের হওয়া এক মামলায় কয়েক মাস ধরে জেলে। একাধিকবার জামিন নিয়েও মুক্তি মেলেনি তার। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ২০টির বেশি। ১৮ মামলার আসামি স্থায়ী কমিটির আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একটি মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছে দুদক। স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ ১৬ মামলার আসামি, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার বিরুদ্ধে আছে ২৩ মামলা, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে রয়েছে ৪১টি মামলা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে রয়েছে ৪৭টি। এ ছাড়া বেশ কিছু নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে শতাধিক মামলা।
এ  ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) সম্প্রতি মামলা নিয়ে বেশ সচল দেখা গেছে। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বিরোধীদলের বেশ কয়েকজন নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাসংক্রান্ত একটি আবেদন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য আগামী ২৭ নভেম্বর তারিখ ধার্য করেন চেম্বার বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। কিন্তু পরে এই লিভ টু আপিল আবেদনের শুনানি এগিয়ে আনতে আদালতে আবেদন করে দুদক। তাদের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আগামী ৬ নভেম্বর লিভ টু আপিলের শুনানির দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগ।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ যা করে তা সোজাসুজি করে না। তারা কৌশলে কাজ হাসিল করে। মানুষের কথা বলার অধিকার সঙ্কুচিত করে আনছে। তারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কথায় কথায় মামলা দিচ্ছে। তাহলে আমরা যারা সাধারণ নাগরিক তাদের নিরাপত্তা কোথায়? তিনি আরো বলেন, মামলা দায়েরের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্রমান্বয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা এই জোটকে একটি সন্ত্রাসী শক্তি হিসেবে দেখাতে চাচ্ছে। সন্ত্রাস কথাটি শুনলে সারা বিশ্বই চমকে উঠে। আওয়ামী লীগ এ ক্ষেত্রে সফল হতে চেষ্টা চালাচ্ছে। সে জন্য তারা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নির্যাতন করে যাবে। মূল উদ্দেশ্য বিএনপিকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেয়া।