Thursday, December 5, 2013

থামাও আগুন, বন্ধ করো গুলি- আর কত প্রাণহানি

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের পাঁচ দিনের অবরোধে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৭ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এর আগের ৭১ ঘণ্টার অবরোধে মারা গিয়েছিল ২২ জন।
এই যে মানুষের অস্বাভাবিক ও নিষ্ঠুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলেছে, হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ মানুষ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে, এর শেষ কোথায়? আর কত দিন চলবে এই মৃত্যু, এই ধ্বংস? শনিবার থেকে শুরু হওয়া অবরোধ আজ বিকেল পাঁচটায় শেষ হওয়ার কথা। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সময়সীমাকে আলটিমেটাম হিসেবে বিবেচনা করে এ সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সামনে তবে কী অপেক্ষা করছে?

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মৃত্যু ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা চালানো হচ্ছে সংবিধান রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে। সরকারি দল সংবিধানের বাইরে এক পাও নড়বে না বলে প্রধান বিরোধী দলকে বাদ দিয়েই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর বিরোধী দল সেই নির্বাচন ঠেকাতে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে। দেশের সাধারণ মানুষ কেন তাদের এই দ্বৈরথের শিকার হয়ে বেঘোরে প্রাণ হারাবে? কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এই কাণ্ড চলতে পারে না।
বিরোধী দলের নেতারা জনগণকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে বলেছেন। নিরীহ মানুষের ওপর হামলা না চালাতে দলীয় কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তার পরও বাস্তবতা হলো, হামলা-নাশকতা চলছেই। গতকালও গাইবান্ধায় ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে চারজন মারা গেছেন।
সরকারের দাবি, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। তাদের এই দাবিই যদি সত্য হয়, তাহলে নিরীহ মানুষ কেন বোমার ঘায়ে, আগুনে পুড়ে মারা যাচ্ছে? বিরোধী দলের কোনো নেতা-কর্মী এ ধরনের নাশকতা ঘটালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব তাদের পাকড়াও করে বিচারে সোপর্দ করা। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, সেটা সবার দাবি। কিন্তু বিরোধী দলের মিছিলে বা সমাবেশে গুলি করে মানুষ মারা তাদের কাজ হতে পারে না।
প্রথমেই সরকারকে স্বীকার করতে হবে যে, সমস্যাটি রাজনৈতিক। রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। শক্তি প্রয়োগ করে বিরোধী দলের কণ্ঠ স্তব্ধ করলে তার পরিণাম হবে আরও ভয়াবহ। অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি যতই যৌক্তিক হোক না কেন, আগুন জ্বালিয়ে বা গাড়ি পুড়িয়ে মানুষ মেরে যে আন্দোলন তারা করছে, তাতে জনসমর্থন পাওয়া যাবে না। হরতাল-অবরোধের মতো আন্দোলনে সরকারের তেমন ক্ষতি হয় না, বরং দেশের সাধারণ মানুষের জীবনই হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত।
তাই, বিরোধী দলের এমন কর্মসূচি নেওয়া উচিত, যাতে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত না হয়। এ প্রসঙ্গে থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলন আদর্শ হতে পারে। সরকারের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই।
সর্বোপরি, দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলকে সংযম ও সহিষ্ণুতার পথেই এগোতে হবে। গায়ের জোরে একতরফা নির্বাচন যেমন কাম্য নয়, তেমনি আন্দোলনের নামে গাড়ি পোড়ানো এবং রেললাইন উপড়ে ফেলারও যুক্তি নেই।

শিশুখাদ্য, রোগীর পথ্য- অবরোধ থেকে মুক্ত থাকুক by মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী

৪৮ বছর ধরে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সমাদৃত মিল্ক ভিটা। মানুষের পুষ্টি রক্ষায়, খাদ্যনিরাপত্তায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে মিল্ক ভিটার অবদান অনন্য।
একদিকে রোগীর পথ্য ও শিশুখাদ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা, অন্যদিকে দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জীবিকার ব্যবস্থা—এ মহতী কাজে নিয়োজিত মিল্ক ভিটা। দেশে সমবায় বিপ্লবের মাধ্যমে প্রান্তিক চাষিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যেই মিল্ক ভিটার সৃষ্টি হয়েছিল। মিল্ক ভিটা একক কোনো ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি জাতীয় সমবায় প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ১৩ লক্ষাধিক সমবায়ী ও তাঁদের পরিবার। তাঁরাই মিল্ক ভিটার প্রাণ। তাঁদের পরম স্নেহে লালিত-পালিত হচ্ছে হাজার হাজার উন্নত জাতের গাভি। এসব গাভির দুই থেকে আড়াই লাখ লিটার দুধ দীর্ঘ গ্রামীণ রাস্তা বা নদীপথ পাড়ি দিয়ে ট্রাক্টর, নৌকা, ট্রলার বা ট্রলিযোগে মিল্ক ভিটার কাছে পৌঁছে দেন সমবায়ীরা। অতঃপর এ দুধ মিল্ক ভিটার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ট্যাংকারে দুই-চার শ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক অতিক্রম করে আসছে ঢাকায়।

বাংলাদেশে পাস্তুরিত দুধ উৎপাদনের সূচনা মিল্ক ভিটার হাতেই। মিল্ক ভিটার ভোক্তা শিশু, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ, রোগী, চিকিৎসকসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। প্রতিদিন দুই হাজার প্রাথমিক সমবায় সমিতির এক লাখ খামারি গড়ে কমবেশি দুই থেকে আড়াই লাখ লিটার দুধ মিল্ক ভিটায় সরবরাহ করেন। এ দুধ প্রক্রিয়াজাত হয়ে প্যাকেটজাত তরল দুধ, ঘি, মাখন, দই, আইসক্রিম হিসেবে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে ভোক্তাদের কাছে যায়। সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটার নিয়মিত গ্রাহক।
গরুর দুধ উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য, যা শিশু, রোগী, বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষের জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্যরক্ষা ও শিক্ষার্থীদের মেধা গঠনে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে দুধ আবশ্যকীয়। ফরমালিন ও ভেজালের আতঙ্কে মানুষ যেখানে ফলমূল খাওয়া বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে, সেখানে বিশুদ্ধ দুধই একমাত্র অবলম্বন। দুধেই রয়েছে শিশুদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ, প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরের ক্ষয়পূরণ এবং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা। বিশুদ্ধ দুধ সরবরাহের প্রতিষ্ঠান হিসেবে মিল্ক ভিটার ওপর সবার আছে ব্যাপক আস্থা। শুধু দুধ উৎপাদন নয়, পাশাপাশি মিল্ক ভিটা ঋণের মাধ্যমে গাভি সরবরাহ, বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, প্রতিষেধক ও ওষুধ সরবরাহ এবং কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশে শ্বেত বিপ্লব ঘটাচ্ছে।
জনগণের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা সাম্প্রতিক অবরোধ ও হরতালে এখন স্থবির। শিশু, শিক্ষার্থী এবং রোগীদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না দুধ। রোগীদের দুর্ভোগ, শিশুদের কান্না এবং শিক্ষার্থীদের বেদনা কি সংশ্লিষ্ট অবরোধকারীদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না? অথচ দুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়া মৌলিক মানবিক অধিকার। অবরোধের কারণে খামারিরা দুধ সরবরাহ করতে না পেরে অবলীলায় নদী-নালা, খালে-বিলে দুধ ফেলে দিচ্ছেন। শুধু চট্টগ্রামের পটিয়ায় দৈনিক চার-পাঁচ হাজার লিটার দুধ ফেলে দিচ্ছেন খামারিরা। সড়কপথে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে মিল্ক ভিটার দুধ সংগ্রহ ও বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। অবরোধে শুধু খামারিদের ক্ষতি নয়, দুধ পরিবহনে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি, দুধ বিক্রির সঙ্গে জড়িত পরিবেশক এবং তাঁদের কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও বন্ধ। এভাবে মিল্ক ভিটার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও শ্রেণীর জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে আছে। এমনকি গোখাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় গবাদিপশুর খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। গোখাদ্যের সংকটে পড়ে খামারিরা অসহায় এবং তাঁদের পালিত অবলা পশুরাও এখন নিরুপায়। এখন সারা দেশে পরীক্ষার মৌসুম। এ সময় শিক্ষার্থীদের দুধ পানের প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু দুধ না খেয়ে শিক্ষার্থীরা ছুটছে পরীক্ষার হলে। এ পুষ্টিহীনতা অনিবার্যভাবে বয়ে আনবে মেধাহীনতা।
হরতাল-অবরোধে বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দৈনিক মিল্ক ভিটার আর্থিক ক্ষতি ৫০ লাখ টাকা, সমবায়ী কৃষকদের ক্ষতি ৩০ লাখ টাকা, সমিতির কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধজনিত ক্ষতি চার লাখ টাকা, দুধ পরিবহনকারী শ্রমিকদের মজুরি বন্ধজনিত ক্ষতি ৪.৫ লাখ টাকা, পরিবেশকদের আর্থিক ক্ষতি ৪.২৬ লাখ টাকা, খুচরা বিক্রেতাদের আর্থিক ক্ষতি ১০.৭০ লাখ টাকা, ভ্যানচালক-শ্রমিকদের মজুরি বন্ধজনিত ক্ষতি ২.৫ লাখ টাকা। এভাবে প্রতিদিন সম্মিলিত আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা।
তরল দুধের এ সংকটে অপরিহার্যভাবে গুঁড়া দুধের আমদানি ও ব্যবহার বেড়ে যাবে। গুঁড়া দুধে ভেজাল, তেজস্ক্রিয়তা ও মেলামিনের ঝুঁকি থাকে। দেশের জনসংখ্যার মাথাপিছু দৈনিক দুধের প্রাপ্তি মাত্র ৬০-৭০ মিলিলিটার অথচ ন্যূনতম চাহিদা ২৫০ মিলিলিটার। অব্যাহত অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত সমবায়ীরা গাভি পালন এবং দুধ উৎপাদন থেকে সরে দাঁড়ালে হারিয়ে যাবে সম্ভাবনাময় এ শিল্প। অথচ কৃষিজমি সাশ্রয় এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য দুগ্ধ শিল্প বিকাশের বিকল্প নেই, যা পরিবেশবান্ধব শিল্প। যেখানে ইটভাটার লেলিহান শিখায় গ্রামগঞ্জে পরিবেশ বিপন্ন, সেখানে একমাত্র দুগ্ধ শিল্পের মাধ্যমে জাতির স্বাস্থ্যরক্ষা এবং দূষণমুক্ত পরিবেশের নিশ্চয়তা সম্ভব। ১৯৯০ সাল থেকে মিল্ক ভিটা এযাবৎ ১০০ কোটি ৪২ লাখ লিটার কাঁচা তরল দুধ সমবায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে মূল্য বাবদ তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছে দুই হাজার ২৫২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। একই সঙ্গে সম্পূরক দুগ্ধ মূল্য (প্রণোদনা) দিয়েছে ৭৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
মিল্ক ভিটার সামনে অনেক স্বপ্ন, অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু আছে পর্বতপ্রমাণ প্রতিকূলতা। সে প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে কোমলমতি শিশু, কিশোর, শিক্ষার্থী ও রোগীদের জীবন, মেধা ও স্বাস্থ্যরক্ষার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মানবিকতার চেতনা নিয়ে এগিয়ে আসার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি এ ক্রান্তিলগ্নে।
মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মিল্ক ভিটা।
mmunirc@gmail.com

খোলা হাওয়া- আতঙ্কতন্ত্র by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

২৩ বছর আগে স্বৈরশাসনকে বিদায় জানিয়ে আমরা যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, এত দিনে তা রূপ নিয়েছে আতঙ্কতন্ত্রে।

রাজনীতি- একতরফা সংবিধান সংশোধনের ফল by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখন বিরাট সংকট চলছে। এই সংকটের সমাধান কীভাবে হবে, তা কেউ বলতে পারে না।

এ তোমার, এ আমার পাপ by বিমল সরকার

ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে নিজের বা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিল কিংবা রক্ষা করার জন্য আমাদের দেশের রাজনীতিকরা কী করতে পারেন আর কী না করতে পারেন, তা কি আর নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে? ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এবং একবার কোনোরকমে ক্ষমতায় যেতে পারলে তা ধরে রাখার জন্য যে কোনো উপায় অবলম্বন করা তাদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি যত বড় দলের শীর্ষ নেতাই হোন আর মাঝারি বা সাধারণ স্তরের কোনো নেতাই হোন, বলতে গেলে সবার ক্ষেত্রে (বিশেষ করে গত তিন দশক যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন) কথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তামাশা কম হয়নি। তিন দফা তফসিল পরিবর্তনের পর শেষ পর্যন্ত রমজান মাসে অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচনটি। অন্য দল বা স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থী না দাঁড়ানোয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ৪৮টিতেই ক্ষমতাসীন বিএনপি দলীয় প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই সারা দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। সরকার ও বিরোধী পক্ষ একেবারে মারমুখো হওয়ায় জনজীবনে দেখা দেয় চরম অনিশ্চয়তা। নির্বাচনের আগে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত খবরের কয়েকটি শিরোনাম এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি : ১. বিপুল সংখ্যায় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার জবাব দিতে হবে- প্রধানমন্ত্রী, ২. ১৫ ফেব্র“য়ারি কোনো নির্বাচন হবে না, হতে পারে না, হতে দেয়া হবে না- শেখ হাসিনা, ৩. ১৫ তারিখের আগেই এ সরকারের পতন ঘটাতে হবে- জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, ৪. প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াই এখন দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা- মুফতি ফজলুল হক আমিনী, (ইনকিলাব, ১৩.০২.১৯৯৬)। ইনকিলাবেরই পরদিনের সংখ্যার আরও কয়েকটি খবরের শিরোনাম- ১. বিবিসির খবর : উত্তরাঞ্চলে একশ’ প্রার্থীর পলায়ন, ২. বিএনপি প্রার্থীদের ব্যাপক নির্বাচনী তৎপরতা : এ নির্বাচন স্বাধীনতা গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার নির্বাচন, ৩. রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে নির্বাচনের পর আলোচনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে- প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ৪. নির্বাচনী দায়িত্ব এড়াতে ২৩ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছুটি চেয়েছেন, ৫. নিরাপত্তার অভাবে স্বতন্ত্র ও অনেক দলীয় প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, ৬. নির্বাচনের পর সংলাপের নামে বিএনপি জাতিকে ধোঁকা দিতে চাচ্ছে- জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল (ইনকিলাব, ১৪.০২.১৯৯৬)। আর ভোটের দিন (১৫.০২.১৯৯৬) ইনকিলাবে শিরোনাম হয়- ১. দাতা দেশসমূহের কাছে অনুরোধ অবৈধ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবেন না- শেখ হাসিনা, ২. এ পর্যন্ত সহিংসতায় একজন সহকারী পুলিশ কমিশনারসহ ৪ জন পুলিশ সদস্যের মৃত্যু, ৩. নরসিংদীতে দিগম্বর করে ফেলায় শাড়ি পরে প্রধান শিক্ষকের পলায়ন, ৪. যশোরে ৩০ জন প্রার্থীই ভয়ে এলাকা ছেড়ে আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে গেছেন। এ খবরটিতে উল্লেখ করা হয়, যশোরের ৬টি আসনের মোট ৩৮ জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপি ও বিএনপির বিদ্রোহী গ্র“পের ৮ জন প্রার্থী ছাড়া কার্যত কোনো প্রার্থী পোলিং এজেন্ট পর্যন্ত দিতে পারেননি। নির্বাচনের পরদিন ইনকিলাবে প্রকাশিত কয়েকটি খবরের শিরোনাম- ১. দেড় শতাধিক কেন্দ্রে নির্বাচন পণ্ড, ২. রংপুরে প্রবল প্রতিরোধ : ৪৮৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৮৫টিতে কোনো ভোট হয়নি, ৩. ভোয়ার খবর : বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের পরিমাণ মাত্র ৫ থেকে ১০ ভাগ। ঢাকায় ভোটদানের পর সাংবাদিকদের কাছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেদিন বলেছিলেনন, ‘আমার খুব ভালো লাগছে।’ বেগম জিয়া অপর এক বিবৃতিতে সাধারণ নির্বাচনে ‘শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটদান করার জন্য দেশবাসীকে অভিনন্দন জানান।’
আশির দশকে এরশাদের অধীন অনুষ্ঠিত চতুর্থ সংসদ নির্বাচন এবং নব্বইয়ের দশকে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের দুঃসহ সব স্মৃতি বোধকরি দেশবাসীর মন থেকে এখনও মুছে যায়নি। ভুলে যায়নি কেউ ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির ঘোষিত নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতির কথাও (যা অনুষ্ঠিত হয় ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮)। আর দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সাম্প্রতিক একের পর এক যা ঘটে চলেছে তা তো এখনও হিসাব-নিকাশের বিষয় হয়েই রয়েছে। তিন প্রধান দলের নেতারা ক্ষমতায় থেকে সংসদ নির্বাচন নিয়ে যা যা বলেছেন বা বলছেন কিংবা করেছেন বা করছেন, বিরোধী দলে থেকে তারা সবাই মোটামুটি একই বয়ান শুনিয়েছেন বা শোনাচ্ছেন। কম-বেশি সবাই সংবিধানের পাঠ শেখান। স্বাধীনতার পর কয়েকটি বছর যেতে না যেতেই, বিশেষ করে আশির দশকের শেষার্ধ থেকে উচ্চাভিলাষী রাজনীতিকরা সংবিধানের এ ধরনের ‘পাঠ’ আমাদের জাতীয় নির্বাচনের ‘সিলেবাসে’ অন্তর্ভুক্ত করেন। একেকটি সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওই ‘পাঠদানের’ জন্য তারা সদলবলে উঠেপড়ে লেগে যান। জানি না কথিত ওই সিলেবাসের পাঠদান কবে নাগাদ শেষ করতে পারবেন আমাদের রাজনীতিকরা। আর ‘গুরুদক্ষিণা’ হিসেবে তাদের উদ্দেশে আরও কী পরিমাণ রক্তইবা উৎসর্গ করতে হবে গোটা জাতিকে (!)।
পরিশেষে জাতির সংকটকালে রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হতে চাই- ‘কার নিন্দা করো তুমি, কারে দাও শাপ/এ তোমার এ আমার পাপ।’
বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

বিএনপির নির্বাচন বর্জনে কার লাভ, কার ক্ষতি by বদিউর রহমান

নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগের দিন সমঝোতার জন্য সময় দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেও পরদিন সোমবার তফসিল ঘোষণা করে আমাদের হতবাকই করেছেন বটে। দেখা গেল, তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকেই সরে গেলেন। তারপর আবার বললেন, সমঝোতা হলে পুনঃতফসিল ঘোষণা করা যাবে। সমঝোতা হলে তো সাংবিধানিক মেয়াদের পরও তফসিল ঘোষণা অসম্ভব নয়। এরশাদবিরোধী ’৯০-র গণঅভ্যুত্থানের সময় কি আমরা আপসে আজগুবি কাজ করিনি? প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপরাষ্ট্রপতি করার জন্য মওদুদকে পদত্যাগ করিয়ে পরে সাহাবুদ্দীন সাহেবকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করে কাজ চালিয়ে আবার নির্বাচন শেষে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে কৃতকর্মকে জায়েজ করে তাকে আবার প্রধান বিচারপতি পদে আসীন করার ব্যবস্থা করিনি? আপসে কী না হয়! কিন্তু তেমন জটিল এক অবস্থা সৃষ্টির আগে তো সিইসি সাহেব তফসিল ঘোষণায় আরও কয়েক দিন সময় নিয়ে সমঝোতার সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে অপেক্ষা করতে পারতেন এবং সেটা হতো উত্তম। বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচির জীবননাশের, সহিংসতার দায়ভার হয়তো তখন তার ওপর বর্তাতো না। ২৪ জানুয়ারি শেষ সময় বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্য সময় দিলে তার কথা বলার সুযোগ থাকত যে, কমিশন শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে।
যাক, যে কারণেই তিনি তার কথার বরখেলাপ করে তফসিল ঘোষণা করুন না কেন, কপালের লিখন বা দুর্দশা আমাদের মেনে নিতেই হচ্ছে। দেশ রসাতলে যাক, ১৮ কেন ১৮০০ বা ১৮০০০ মরলে, আগুনে পুড়লেও দুই নেত্রীর কী বা যায় আসে। তাদের তো ক্ষমতা চাই, কেবল ক্ষমতা। তবে দোহাই হবে- একজনের সাংবিধানিক ধারা উপহার দেয়ার, আরেকজনের দেশ রক্ষার। তাদের জয়-পুতুল কিংবা তারেক-কোকো তো ককটেলের আগুনে পুড়ে মরছে না। তারা দু’জনও স্বজন হারিয়েছেন, তাদেরও কষ্ট আছে; কিন্তু বার্ন ইউনিটে পুড়ে মরা দেখা কেমন, তা যদি জয়-পুতুল-তারেক-কোকোকে দিয়ে তারা বাস্তবে দেখতেন, তাহলে এই অপরাজনীতি থেকে তারা সরে আসতেন কি-না আল্লাহ মালুম।
থাকগে, তফসিল যেহেতু ঘোষিত হয়েছে, নির্বাচন হবে বলা যায়। বাজাদ (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) কিংবা সম্মিলিতভাবে অন্য বিরোধী সব দল যদি আন্দোলনের মাধ্যমে, জ্বালাও-পোড়াওয়ের মাধ্যমে, নৃশংস হত্যার মাধ্যমে, দেশ অচল করার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে সরাতে না পারে, অথবা কোনো প্রকার সমঝোতার মাধ্যমে যদি সমস্যার সমাধান না করতে পারে, তাহলে হয়তো একতরফা নির্বাচনই হবে। বাজাদ এবং অন্য বিপক্ষ দলগুলোর একমাত্র লক্ষ্য এখন শেখ হাসিনাকে বাদ দেয়া। তার অধীনে নির্বাচন নয়। শেখ হাসিনারও সাংবিধানিক জেদ তার অধীনে নির্বাচন হতে হবে। জেদাজেদি যা-ই চলুক, নির্বাচন নিয়ে এখন আমার মতে তিনটি অবস্থা বিদ্যমান। এক. বাজাদসহ নির্বাচন হওয়া; দুই. বাজাদ বাদে নির্বাচন হওয়া; তিন. নির্বাচন না হয়ে তৃতীয় কোনো শক্তির দখলে শাসনভার চলে যাওয়া। দেখা যাক কোন অবস্থায় কার লাভ-ক্ষতি কতটুকু।
প্রথমে আমরা ধরে নেই, চমকপ্রদভাবে একটা সমঝোতা হয়ে গেল, বাজাদ নির্বাচনে অংশ নিল। শেখ হাসিনার অধীনেই হোক বা অন্য কারও নেতৃত্বেই হোক, একটা সফল নির্বাচন হয়ে গেল। বিভিন্ন জরিপ কিংবা পাঁচ সিটির মেয়র নির্বাচনের ফলাফল, প্রচুর উন্নয়ন সত্ত্বেও আলীর প্রতি জনগণের নেতিবাচক মনোভাব, শেয়ার কেলেংকারি, হলমার্ক-ডেসটিনি-বিসমিল্লাহ-পদ্মা মিলে নেতিবাচক জনপ্রিয়তায় বাজাদ জয়ী হয়ে গেল। এতে লাভ বেশি কার- আলীর না বাজাদের? সহজ-সরল উত্তর হবে, বাজাদের। বাজাদ বড় গলায় বলতে পারবে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ছাড়াও তারা বিজয়ী হয়েছে, তাদের জনপ্রিয়তা আর কাকে বলে, আরও কত কী! কিন্তু আমি বলব, এক্ষেত্রে প্রকৃত জয়টি হবে আলীর (আওয়ামী লীগের)। আলী তখন বিরোধী দলে গিয়েও বুক ফুলিয়ে বলবে, তাদের অধীনে তাদের দ্বারাই নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। বাজাদ জামায়াত-শিবিরের সহযোগিতায় অযথা দেশে এতদিন নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে, জীবন ও সম্পদের হানি ঘটিয়েছে- এসবের জন্য তাদের বিচার হওয়া দরকার। বাজাদ সরকার তখন আরেক মুশকিলে পড়বে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে। তখন জামায়াত থেকে চোখ-ফেরানো ছাড়া তাদের গত্যন্তর থাকবে না। বিচারের ধারাবাহিকতা না রাখলে বা রায় কার্যকর না করলে অল্প সময়ের মধ্যে বাজাদের বিরুদ্ধে আলীর আন্দোলন চাঙ্গা হবে এবং বাজাদ সরকার বড় বেকায়দায় পড়বে। অপরদিকে জামায়াত-শিবির থেকে মুখ ফেরালে বাজাদ আলী, জামায়াত সবার চাপে আরও চ্যাপটা হয়ে যাবে। বাজাদের ১৮ দলীয় শরিক এবং অন্য সমর্থকদের যথা- কামাল, বদরুদ্দোজা, অলি, রব, কাদের গংদের চাওয়া-পাওয়ার সম্মান দিতেও বাজাদ হিমশিম খাবে। কত বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় যাবে বাজাদ তাও এক বিবেচ্য। সংবিধান সংশোধনের মতো গরিষ্ঠতা না পেলে আলীর সংশোধিত পঞ্চদশ সংশোধনের ‘উপকারিতা’ই তাদের ভোগ করতে হবে। আরও কত যে ঝামেলা থাকবে বাজাদের! আলীকে সামাল দেয়া হবে এক মহাঝামেলা। কিন্তু সবচেয়ে বড় গলা থাকবে আলীর, তারা কথা রেখেছে- সফল নির্বাচন করে দিতে পেরেছে, নয় কি?
এবার মনে করি সমঝোতা হবে না, বাজাদ নির্বাচনে এলো না, কিন্তু আলী একা নির্বাচন সেরে ফেলল। এ নির্বাচন অবশ্যই ১৫ ফেব্র“য়ারির ’৯৬ মার্কা হবে না। কেননা এতে জাপা, জেপি, ইনু-মেননরা তো অন্তত আছেন। সংখ্যা বাড়ানোর জন্য দীলিপ বড়–য়াকে বাদ দেব কেন? যদিও অতি সম্প্রতি জাতীয় পার্টি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। সেক্ষেত্রে এরশাদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ইনু, মেনন মাঠে কম বড় নন, ভোটে না হোক, কণ্ঠে তো অন্তত। এর মাঝে যদি আরও কাউকে ভেড়ানো যায় তা তো আরও ভালো। বিএনএফ যদি একটা ফ্যাক্টর হয় এবং বাজাদের অনেকে যদি এদিক-সেদিক করে নির্বাচনে শামিল হয়ে যায় অথবা তাদের শামিল করানো যায়, তাহলে তো একটি ভালো গ্রহণযোগ্যতা এসে যাবে, নাকি? নির্বাচনমুখী বাজাদের অনেক নেতাকর্মী কি সাত বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর আবারও আরও পাঁচ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকতে ধৈর্যশীল হবে? আমার তো অন্তত মনে হয় না। হাল-সময়ের হরতাল-অবরোধে বাজাদের বড় নেতাদের কি আমরা মাঠে দেখছি? খালেদা জিয়ার নির্দেশে কি কোনো কাজ হচ্ছে? এটা কিসের আলামত? অবশ্যই বাজাদের নেতাকর্মীরা নির্বাচন চান, দলের বর্তমান জনপ্রিয়তায়, হোক না তা আলী-বিরাগে নেতিবাচক, তারা কেন ক্ষমতায় আসার সুযোগ নেবে না? অতএব বাজাদ স্বীকৃতভাবে নির্বাচনে না এলেও তাদের অনেক নেতা ভিন্নভাবে নির্বাচনে আসবে। ফলে বাজাদে আবার ভাঙন ধরবে, দল বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এতে আবারও লাভবান হবে আলী। শেখ হাসিনা কিন্তু সংস্কারপন্থীদের র‌্যাটস (জঅঞঝ) থেকে শেষ মুহূর্তে হলেও স্টার (ঝঞঅজ) করে দিয়েছেন। বেঁচে থাকলে রাজ্জাকও (জ) এ সুবিধায় আসতেন, বেঁচে না থেকেও তিনি এখন স্টারভুক্তই হলেন। খালেদা জিয়া কিন্তু এখনও তাদের অর্থাৎ তার দলের সংস্কারপন্থীদের পুরো পুনর্বাসন করেননি। জিয়ার বাজাদ ভেঙে বদরুদ্দোজার বিকল্প ধারা, কর্নেল অলির এলডিপি, জাহানারাদের বিএনএফ, ব্যানাহুদার সমর্থক- কত ভাগ যে হয়ে গেল! এবার নির্বাচনে না এলে হয়তো আরও ভাঙন হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, একবার নির্বাচন হয়ে গেলে আলী ক্ষমতায় এসে এরশাদকে বিরোধী দলে বসিয়ে সরকারের নৈতিক অধিকার পেয়ে আরও শক্ত হয়ে যাবে। তখন কি আর বাজাদের আন্দোলনের বড় কোনো নৈতিক অধিকার বা ইস্যু থাকবে? এখন অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও বাজাদ ফলপ্রসূ কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, বরং বলা চলে, আলীর বাজাদের হাতে তুলে দেয়া বড় বড় ইস্যুকেও যেখানে বাজাদ কাজে লাগাতে পারেনি, তখন আর কি পারবে? আমার তো মনে হয় না। আলী এ মেয়াদে অনেক ভালো কাজ করেছে, উন্নয়ন করেছে, আলী তখন উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় মনোযোগী হবে এবং পূর্বতন ভুল না করার জন্য সচেষ্ট হবে। ফলে আলীর পরবর্তী সরকার শিগগিরই জনসমর্থন পেতে কার্যকরভাবে সফল হয়ে যাবে। শেখ হাসিনা তখন সত্যি সত্যি লৌহমানবী হওয়ার ভূমিকায় যাবেন। তখন বর্তমান আন্দোলনের সহিংসতা, মৃত্যুর দায় সবই যাবে বাজাদ নেতাদের ওপর। কী কী মামলা যে হবে তখন, তা সহজেই ধারণা করা যায়। তখন নিশ্চয়ই সামান্য হাতুড়ি দিয়ে নয়াপল্টনের বাজাদ কার্যালয় ভাঙার ছেলেমানুষি করবে না পুলিশ, যা হবে বেশ ভারিই হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের রায় যথারীতি দ্রুত বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। বাজাদের আন্দোলনের শক্তি জামায়াত-শিবির শেষের খাতায়। তাহলে বাজাদ আর আন্দোলন করবে কাকে নিয়ে? ছাত্রদল তো এখনই নেই, তখন তাদের পাবে কোথায়? অতএব, ৫+২+৫=১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে বাজাদ কোথায় যে যাবে বোঝা মুশকিল। মনে রাখা দরকার, বাজাদ কিন্তু আলী নয় যে, ২১ বছর পরও বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতা হারিয়ে আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে? খালেদা না থাকলে বা অসুস্থ হয়ে গেলে তারেক আর একা কতটা কী করবেন? সিনিয়র নেতাদের মাথার উপরে চেপে বসা তারেককে তখন তারা আর মানবেন? অতএব আলীর এ অবস্থায়ও লাভ, বরং নিশ্চিত বড় লাভ। বাজাদ নির্বাচনে না এলেই বরং আলী মহাখুশি হবে। এমনটি ভাবা বোধহয় এখন সহজ বিষয়। এমন সুযোগ আলীকে না দেয়ার জন্য বাজাদের নির্বাচনে আসাই উত্তম হবে।
সর্বশেষ অবস্থা যদি এমন হয়, হাসিনা-খালেদার জেদ ও অনড় অবস্থানের কারণে দেশজুড়ে জীবনহানি এবং সহিংসতা এমন পর্যায়ে গেল যে জরুরি অবস্থা জারি করতে হল, তাহলেও লাভ আলীর। আলী আরও সময় ক্ষমতায় থাকল। আর তা না হয়ে যদি তৃতীয় শক্তি শাসনক্ষমতা দখল করে নেয়, তাহলেও লাভ আলীরই। কারণ আলীকে বাজাদের কাছে হারতেও হল না। পরাজয়ও মেনে নিতে হল না। তৃতীয় শক্তি দু’-চার বছর যা-ই থাকে, আলী চুপ থাকল। তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক জনঅসন্তোষ ধীরে ধীরে কমে গেল। পরবর্তী সময়ে একটা গ্রহণযোগ্য অবস্থায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আবার নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে আলী ফের পহেলেছে শুরু করে মাঠে নামবে। এ ফাঁকে তারা তাদের ক্ষয়িষ্ণু জনপ্রিয়তা আবার ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হবে। তাদের অপকর্ম মানুষ অনেকাংশে ভুলে যাবে। তবে বাজাদ পড়ে যাবে আরও ফাঁকে। অতএব এতেও লাভ আলীর। আমার বিবেচনায় তিন অবস্থায়ই আলী লাভবান হচ্ছে। অতএব, নিজের ক্ষতি না করে নির্বাচনে আসাই বাজাদের জন্য লাভজনক।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

আজ তার উপস্থিতি বড় প্রয়োজন ছিল by সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী

দেশের কিংবদন্তি সাংবাদিক এবং আমাদের বড় ভাই সৈয়দ মোহাম্মদ আলীর (এসএম আলী) ৮৫তম জন্মদিন আজ। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় ভাইয়ের ভূমিকা অনন্য। ছোটরা তাকে ভয় পায়, কারণ তিনি একাধারে ভাই ও অভিভাবক। কিন্তু আমাদের বড় ভাই তার ভদ্র, নম্র ও মধুর ব্যবহার দিয়ে আমাদের হৃদয় জয় করেছিলেন। তাকে আমরা ভয় পেতাম কম, শ্রদ্ধা করতাম বেশি। ছাত্রজীবন থেকেই তার সাংবাদিক হওয়ার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল ও বিভিন্ন কাগজে লিখতেন। ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করার পর সাংবাদিক জীবনে পুরোপুরি প্রবেশ করেন। পঞ্চাশের দশকে সাংবাদিকদের জীবন মসৃণ ছিল না। ছিল না অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা। আমাদের বাবা ও চাচা আসাম সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ আমলা। সে যুগে আমলাদের ছিল অপরিসীম ক্ষমতা। কিন্তু ক্ষমতার আকর্ষণ ত্যাগ করে সাংবাদিকের অজানা ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনে প্রবেশ করলেন তিনি। প্রথমে ঢাকার বিভিন্ন কাগজে কাজ করে পরে করাচিতে পাড়ি দিলেন। প্রথমে ‘ইভিনিং স্টার’ ও পরে প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ডনে’ কাজ করে লন্ডন পাড়ি দিলেন ১৯৫৩ সালে। সেখানে পেশাগত শিক্ষা গ্রহণ করে, কিছুদিন বিবিসিতে কাজ করে ঢাকায় ফিরলেন ১৯৫৬ সালের শেষের দিকে। ঢাকায় ফিরে যোগ দিলেন ‘পাকিস্তান অবজারভারে’। একাধারে বিভিন্ন বিদেশী কাগজেও লেখা শুরু করলেন।
সাংবাদিকতা পেশায় তিনি তার স্বকীয়তা প্রমাণ করলেন ও পুরো মহাদেশের সাংবাদিক জগতে বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেন। ব্যাংককের তদানীন্তন সান্ধ্য পত্রিকা ‘ব্যাংকক পোস্ট’ তাকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দিল। তিনি অচিরেই ‘ব্যাংকক পোস্ট’কে একটি নিয়মিত দৈনিকে পরিণত করলেন। অচিরেই সেই পত্রিকা এ অঞ্চলের সর্বাধিক পঠিত কাগজ হিসেবে সমাদৃত হল। বড় ভাইকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একে একে সিঙ্গাপুরের ‘নিউ নেশন’, হংকংয়ের ‘হংকং স্ট্যান্ডার্ড’ ও তখন ম্যানিলায় অবস্থিত প্রেস ফাউন্ডেশন অব এশিয়ার কর্ণধার হিসেবে কাজ করলেন। এ ফাউন্ডেশনের প্রধান কাজ ছিল এই মহাদেশের তরুণ সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আধুনিক সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তোলা।
আশির দশকের গোড়ার দিকে তিনি ইউনেস্কোর আঞ্চলিক যোগাযোগ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিতে কুয়ালালামপুরে গেলেন। সেখানে একাধারে কাজ করলেন এক যুগ। অবসর নিয়ে ঢাকায় ফিরে এলেন ১৯৯০-এর শেষের দিকে। উদ্দেশ্য, ঢাকা থেকে একটা উচ্চমানের ইংরেজি পত্রিকা বের করা। ইচ্ছা করলে ইউনেস্কোর পেনশন নিয়ে তিনি এ অঞ্চলের যে কোনো শহরে অবসর জীবনযাপন করতে পারতেন। ব্যাংকক, হংকং, সিঙ্গাপুর ও কুয়ালালামপুরে তখন সাংবাদিকতার জগতে কাজ করার সুযোগ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক, যার দৃঢ় সংকল্প ছিল মৃত্যুর আগে দেশের জন্য কিছু করার। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে তার সর্বশেষ সৃষ্টি ‘ডেইলি স্টার’ প্রকাশিত হল দেশের সাংবাদিকতার জগতে এক অনন্য ‘তারকা’ হিসেবে। অচিরেই তা পাঠক সমাজে সমাদৃত হল। তার নিজস্ব কলাম ‘মাই ওয়ার্ল্ড’ ও প্রতিদিনের সম্পাদকীয়ই এই পত্রিকাটির প্রধান আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এত খাটাখাটি সইল না। ১৯৯৩ সালের ১৭ অক্টোবর বড় ভাই মৃত্যুবরণ করেন।
বড় ভাই ছিলেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক। তিনি তার পেশাগত নৈতিকতা পালন করতেন অত্যন্ত কঠোরভাবে। অনেক বিশ্বনেতা তাকে একান্তে যেসব ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথা বলতেন, তা তিনি কখনও প্রকাশ করতেন না। দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীরা তাকে অনেক কিছুই বলেছেন সম্পূর্ণ তার বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে। তার উপদেশ নিয়েছেন। আমরা ভীষণ পীড়াপীড়ি করলেও তিনি এসব ব্যাপারে মুখ খুলতেন না।
ঢাকায় যে বাড়িতে তিনি ভাড়া থাকতেন, সেটা ছিল তদানীন্তন ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিবের নিজস্ব বাড়ি। তিনি নিচতলায় থাকতেন ও বড় ভাই থাকতেন দোতলায়। তদানীন্তন সরকারের কোনো ভুল পদক্ষেপের জন্য কড়া সমালোচনা করতেন বড় ভাই। তদানীন্তন মন্ত্রিসভার সদস্যদের বার্ষিক কর্মসম্পাদন রিপোর্ট লিখতেন তার কাগজে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে। একবার তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে গ্রেড দিলেন ‘বি-মাইনাস’। মন্ত্রী সাহেব কিছুটা দুঃখিত হলেন। আমি মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক হিসেবে কিছুটা বিব্রত হই। কিন্তু বড় ভাইয়ের এক কথা- ‘আমার একমাত্র দায়বদ্ধতা আমার পাঠকের কাছে, আর কারও কাছে নয়।’
একইভাবে তদানীন্তন বিরোধী দলের মহাসচিব তার কড়া সম্পাদকীয় পড়ে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। বড় ভাই তার কলামে লিখলেন ‘কাউকে খুশি করার জন্য তিনি সম্পাদকীয় লেখেন না।’ সোজা কথায়, তার লেখা ছিল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, বাস্তবধর্মী ও পেশাগত। সেখানে আপসের কোনো সুযোগ ছিল না।
আজ দেশ এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। গ্রেফতার, হরতাল ও অবরোধ এক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। জনজীবন আজ বিপর্যস্ত। আজ সারা দেশে একজন সর্বগ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ লোক পাওয়া যাচ্ছে না, যার লেখা সবাই পড়বে, যার উপদেশ সবাই মানবে। এ ধরনের জাতীয় সংকটকালে বড় ভাই সব সময় বলতেন, ‘আমরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম নিয়ে এগিয়ে এলে দেশের যে কোনো সমস্যার সমাধান নিশ্চয়ই খুঁজে পাব।’
বড় ভাই, আজ আপনার খুব প্রয়োজন বোধ করছি। আপনার জন্মদিনে আপনার চির শান্তি কামনা করি।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র সচিব

কমিশন, না পলিটিক্যাল কসমেটিক্স? by পলাশ কুমার রায়

দেশে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একাধিক কমিশন রয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, আইন কমিশন ইত্যাদি। এসব কমিশন থেকে সাধারণ নাগরিকরা কতটা উপকৃত হয়েছে? যে কারণে সরকার এসব কমিশন গঠন করেছিল, তার কতটুকুই বা বাস্তবায়িত হয়েছে বা হচ্ছে? জাতীয় মানবাধিকার কমিশন : জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থাকা সত্ত্বেও নাগরিকদের ন্যূনতম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভবপর হয়নি। প্রতিদিনই অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ, ঝালকাঠির লিমন হোসেনকে ২০১১ সালের ১৩ মার্চ র‌্যাব প্রকাশ্যে গুলি করে একটি পা পঙ্গু করে দিলেও লিমন মানবাধিকার কমিশনের মানবীয় প্রেম-সহানুভূতি ছাড়া অন্য কোনো ধরনের পরিষেবা পায়নি। মানবাধিকার কমিশন স্বউদ্যোগে র‌্যাবের এহেন অমানবিক কাজের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি। এদিকে ২০১১ সালের ১৫ জুলাই রাতে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের খালার বাসা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবদুল কাদের ফজলুল হক হলে ফেরার সময় সেগুনবাগিচায় পুলিশ তাকে ডাকাত বলে আটক করে। খিলগাঁও থানার ওসি হেলাল উদ্দিন তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন এবং মিথ্যা মামলা দেন। লিমন ও কাদেরের মতো হাজার হাজার নিরীহ-নিরপরাধ ব্যক্তি দেশের কোনো না কোনো এলাকায় প্রতিদিনই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশন গণমাধ্যমে বিবৃতি আর ভুক্তভোগীকে সামান্য সান্ত্বনা দেয়া ছাড়া আর কিছুই করিনি। নাগরিক সমাজের পক্ষে সুপারিশ করা হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী করতে মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ সংস্কার করার। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাই কমিটি, শৃংখলা বাহিনীর ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি, কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা, কমিশনের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে এমন আইনের সংশোধনী, কমিশনের চাহিদানুযায়ী জনবল নিয়োগ ও নিজস্ব ভবন না থাকা ইত্যাদি বিষয় নিষ্পত্তি না করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে কাক্সিক্ষত সেবা না পাওয়ারই কথা। এ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আইনের দুর্বলতা আমরা প্রথম দিন থেকেই জানতাম। যদি কাজ করার ক্ষমতাটা বিস্তৃত করা যায়, তাহলে জনগণকে আমরা আরও বেশি করে প্রতিকার দিতে সক্ষম হব’। কমিশন চেয়ারম্যানের এ ধরনের হতাশাজনক বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও ক্ষমতায়িত করা কতটা জরুরি।
তথ্য কমিশন : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতা নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। জনগণ প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক ও জনগণের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক; তাই সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত এবং সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ও সরকারি এবং বিদেশী অর্থায়নে সৃষ্ট ও পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ২০ নম্বর আইন) পাস করে। এই আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী আইন জারির ৬০ দিনের মধ্যে তথ্য সরবরাহের নিমিত্তে প্রত্যেক কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রদান ইউনিটের জন্য একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করার কথা। কিন্তু এখনও সব প্রতিষ্ঠানে তথ্য প্রদানকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়নি। তথ্য অধিকার আইন সম্বন্ধে না জানার কারণে অধিকাংশ মানুষ তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তথ্য কমিশন বাংলাদেশের জনসাধারণকে তথ্যপ্রাপ্তির সহজলভ্যতা সম্পর্কে অবহিত করার লক্ষ্যে আরও ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
দুর্নীতি দমন কমিশন : ২০০৪ সালে পাস হওয়া দুদকের মূল আইনের ২৪ ধারায় বলা আছে, দায়িত্ব পালনে দুদকের স্বাধীনতা থাকবে। কিন্তু ১০ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন সংশোধনী বিল-২০১৩ পাস করা হয়। সংশোধিত আইনের ৩২(২) ও ৩২(ক) ধারায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত ও মামলা দায়েরে সরকারের পূর্ব অনুমতির বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মকর্তা কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হলে সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন না। কোন আদালতে এই মামলার বিচার হবে, তা সরকার নির্ধারণ করে দেবে। ১১৫ বছরের পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা দুদক আইনে ঢুকিয়ে দুদককে নখ-দন্তহীন বিড়ালে পরিণত করা হল। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দুদককে কার্যকর করার প্রতিশ্র“তি দিলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারি কর্তাব্যক্তিদের খুশি রাখতে সেই অঙ্গীকার থেকে সরে এসে দুর্নীতিবাজ সরকারি আমলাদের পক্ষাবলম্বন করল বৈকি! যদিও আগের আইনে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে দুদকের একক ক্ষমতা ছিল।
আইন কমিশন : দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রবর্তন ও বিভিন্ন আদালতে বহুসংখ্যক মামলা দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকার পরিপ্রেক্ষিতে এবং মৌলিক মানবাধিকার পরিস্থিতির আইনগত দিকসমূহ পুনঃনিরীক্ষণ ও আইন শিক্ষার মানোন্নয়নসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান করার লক্ষ্যে অচল আইনসমূহ বাতিল, প্রচলিত অন্য আইনসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আইনগুলোর যুগোপযোগী সংস্কার অথবা ক্ষেত্রমতো নতুন আইন প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করার জন্য একটি স্থায়ী আইন কমিশন প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় সরকার ১৯৯৬ সালে আইন কমিশন প্রতিষ্ঠা করে। আইন কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কমিশন ১২৫টি আইন সংক্রান্ত সুপারিশ সরকারকে প্রদান করেছে। কমিশনের ওইসব প্রস্তাব সরকার খুব বেশি আমলে নেয়নি। এ বছরের ২৩ জুলাই সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছেন। কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য আইন বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক ড. শাহ আলম স্যারের কাছে বিনীত অনুরোধ এই যে, ২০০১ সালে মিথ্যা মামলা (প্রতিরোধ ও প্রতিকার) শীর্ষক প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর করা হোক। এই আইনটি কার্যকর হলে নিু আদালত থেকে হাজার হাজার মিথ্যা ও কাল্পনিক ঘটনা সাজিয়ে মিথ্যা মামলা করার প্রবণতা দূর হয়ে যাবে। নিরীহ বিচারপ্রার্থীরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। আইন কমিশন কি জনসাধারণের বৃহত্তর স্বার্থে এই উদ্যোগটি গ্রহণে তৎপর হবে না?
এভাবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা কমিশনগুলো সরকারের আজ্ঞাবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং জনসাধারণ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাশিত পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তা ছাড়া অনাকাক্সিক্ষত যে কোনো দুর্ঘটনার কারণ জানতে চেয়ে সরকার প্রায়শই দি কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট ১৯৫৬ অনুযায়ী কমিশন গঠন করে থাকে। অভিযোগ আছে, কমিশন গঠিত হওয়ার পর সেই কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশে নাটকীয়ভাবে গোপনীয়তা রক্ষা করার কারণে জনগণ ওই কমিশনের চূড়ান্ত অবস্থান সম্বন্ধে জানতে পারেন না। জনসাধারণকে বোকা ভেবে এই কর্মযজ্ঞ সুদীর্ঘকাল থেকেই চলে আসছে। সুনির্দিষ্ট আইন দ্বারা গঠিত এসব কমিশন জনসাধারণের কতটা উপকারে আসে? জনসাধারণের করের টাকায় ওইসব কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করা হলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না বলে প্রায়শই অভিযোগ শোনা যায়। তাহলে ঢাকঢোল পিটিয়ে ওইসব কমিশন রাখার প্রয়োজন কী? সরকার ওইসব কমিশনকে আইন দ্বারা ক্ষমতায়িত করে জনসাধারণের কল্যাণে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেবে এমনটাই প্রত্যাশা। আর কমিশনগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের শুধু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই নয়, বরং সামাজিক ও মানবীয় মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও জনসাধারণের ন্যায়সঙ্গত এবং যৌক্তিক প্রয়োজনে অকৃপণভাবে এগিয়ে আসার মানসিকতা ধারণ করতে হবে।
পলাশ কুমার রায় : আইনজীবী; আহ্বায়ক সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন (সুপ্রা)

একজন স্বাধীন নাগরিকের সাহস ও বলিষ্ঠতা প্রকাশ পেয়েছে তার কথায় by মইনুল হোসেন

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পড়ে আমরা গর্বিত বোধ করেছি এটা জেনে যে পেট্রল বোমা হামলার শিকার এক নারী তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে সত্যিকার দেশপ্রেমিকের সাহস দেখিয়েছেন। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী ঢাকার একটি হাসপাতালে পেট্রল বোমা হামলার অসহায় শিকারদের অবস্থা পরিদর্শন করতে গেলে ভদ্রমহিলা তার মুখের ওপর বলেন, ‘আমরা অসুস্থ সরকার চাই না।’ এ কথা বলার পর না থেমে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি অস্পষ্টতার আশ্রয় না নিয়ে বলেছেন, ‘আপনাদের আমরা তৈরি করেছি, আপনারা আমাদের তৈরি করেননি। আমরা আপনার কাছে বা বেগম খালেদা জিয়ার কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাততে যাইনি, কিন্তু আপনারা আমাদের জীবন নিয়ে খেলা করছেন। যারা ককটেল ছুড়ছে এবং মানুষকে আগুনে পোড়াচ্ছে তাদেরও একইভাবে সাজা হওয়া উচিত।’ অজ্ঞাত পরিচয় অগ্নিদগ্ধ যে মহিলা এসব কথা বলেছেন তার নাম হচ্ছে গীতা সেন। তাকে আমাদের জাতীয় সম্মানে ভূষিত করা উচিত। আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না, তার হৃদয়মথিত আবেদন প্রধানমন্ত্রী ও অন্যদের ওপর কোনো প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে কি-না। বুদ্ধিবৃত্তিতে পিছিয়ে থাকা একজন নারীর এই বলিষ্ঠতা সেই শিক্ষিত লোকদের লজ্জায় ফেলা উচিত, যারা দীর্ঘকাল ধরে একের পর এক অসুস্থ সরকার গঠন করার জন্য সক্রিয়ভাবে অসুস্থ রাজনীতিকে উৎসাহিত করে আসছেন। তারা এটা নির্লজ্জভাবে করে আসছেন নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য। তারা এতই বেপরোয়া যে এতে দেশের বা জনগণের কী লাভক্ষতি হল, তা নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই।
আমাদের এখনকার রাজনৈতিক নেতারা জনগণকে তাদের প্রভু হিসেবে দেখার পরিবর্তে অসহায় মানুষ হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। অথচ তারা রাজকীয় জীবনযাপন করেন জনগণের টাকায়। নির্বাচনে কে বিজয়ী হবে আর কে পরাজিত হবে, সেটা বর্তমান সংকটের আসল কারণ নয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা, যার মাধ্যমে তারা নিজেরা প্রভূত সম্পদশালী হতে পেরেছেন। এ এমন এক ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থায় দুর্নীতিবাজদের খুঁজে পাওয়া কঠিন এবং তাদের বিচার করা আরও দুঃসাধ্য। একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘাতে নিরপরাধ লোকদের অমানবিক যন্ত্রণা ও বেদনা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। আমাদের দলীয় রাজনীতি যে পেশিশক্তি ও পুলিশি শক্তির ওপর ভিত্তিশীল, এটা তো সবারই জানা।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি দমন করার জন্য কেবল সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রীয় শক্তি বিশেষ করে সীমান্ত রক্ষীদের সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার যখন জোরালো গলায় তার জনপ্রিয়তা দাবি করছে, তখন কেন স্বীকৃত একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যাবে না, এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। জাতিসংঘের মহাসচিবসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ বারবার আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু ২০ বছর আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে অপরিবর্তনীয় পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি চালু করেছে, সেই রাজনীতিতে সংলাপ কখনও জায়গা করে নিতে পারেনি। দেশের ভেতরে বিরোধী দলকে একতরফা নির্বাচন ও সহিংস সংঘাতের রাজনীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ দেখা যাচ্ছে। সুশীল সমাজের সদস্যরাও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিচ্ছেন। কিন্তু সবই অরণ্যে রোদন।
গত রোববার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার নেভি পিল্লাই রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উভয় পক্ষের রাজনীতিকদের ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করার তাগিদ দিয়েছিলেন। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব দলকে হিংসাÍক পথ ছেড়ে সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়েছিল, যাতে সব ক’টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। কেবল তখনই তারা নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করবে।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংহ ঢাকা এসেছেন। তার এ সফরকে পরিচিতিমূলক বলা হয়েছে। এর অব্যবহিত পর ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের প্রতিনিধি বাংলাদেশ সফরে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে তারা আসছেন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সম্ভাবনা আছে কি-না সেটা মূল্যায়ন করার জন্য।
সরকারের আসল চালিকাশক্তি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গ্র“প। এই উপদেষ্টাদের ভেতরে আবার সবচেয়ে প্রভাবশালী হচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত আমলারা। উপদেষ্টা নামে অথবা অন্য কোনো নামে তাদের অত্যন্ত সক্রিয় দেখতে পাওয়া যাবে সরকারের পক্ষে নির্বাচন তদারকির কাজে। বলা হচ্ছে, এই আমলা-উপদেষ্টারাই নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয় লাভের বিষয়টি নিñিদ্র করার পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। কোনো কিছুই তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা থেকে পিছু হটাতে পারবে না।
প্রতিবাদকারীদের যখন বলা হচ্ছে নিরীহ লোকদের হত্যা করা, আগুনে পুড়িয়ে মারা গণতান্ত্রিক রাজনীতি নয়, তখন সে কথা তাদের কানে ঢুকছে না। তারা আমাদের চেয়ে বেশি জানেন এবং সেই জানাটা হচ্ছে, ‘গণতন্ত্র’ দুটি দলের কারোরই বিবেচনার বিষয় নয়। বস্তুত সরকার ও বিরোধী পক্ষ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগের উদ্দেশ্যে তাদের নিজ নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে লিপ্ত।
কিন্তু রাজনীতি যখন এতটা নিষ্ঠুর এবং জনকল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কহীন, তখন আমাদের কাছে জরুরি হচ্ছে জনগণকে রক্ষা করা, দেশকে বাঁচানো।
একসময় ছিল যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্তফা দিলে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ব্যাপারে সমাধান সহজ হতো। প্রধানমন্ত্রীও বলেছিলেন, তার কাছে প্রধানমন্ত্রিত্বই সবকিছু নয়। চরম হিংসাত্মক আন্দোলনের মুখে এখন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিতে রাজি হলেও যে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যদিও শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করবেন এমনটি আশা করতে ভরসা পাচ্ছি না আমরা।
যখন দুই নেত্রী একমত হতে পারবেন না, তখন বোধহয় সর্বোত্তম পন্থা হবে বাংলাদেশের একটা দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থায় থাকা, যেমনটি সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম সুপারিশ করেছিলেন এবং কিছুদিন আগে তার এই সুপারিশ এখানকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
দলীয় রাজনীতির জন্য নয়, সার্বভৌম জনগণের জন্য যা সর্বোত্তম হবে, এই মুহূর্তে সেটাকেই বিবেচনায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

আতঙ্কতন্ত্র

২৩ বছর আগে স্বৈরশাসনকে বিদায় জানিয়ে আমরা যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, এত দিনে তা রূপ নিয়েছে আতঙ্কতন্ত্রে। ধান-পাট-গমের পাশাপাশি বাংলাদেশের বড় উৎপাদন এখন আতঙ্ক। ফসল উৎপাদনের জন্য অবশ্য নির্দিষ্ট মৌসুম থাকে, কিন্তু আতঙ্ক উৎপাদন করা যায় সারা বছর। দিন-রাতের যেকোনো সময়। এই আতঙ্কের শিকার স্কুলের ও স্কুলের বাইরের শিশুরা, খেটে খাওয়া মানুষেরা; পথচারী অথবা পরিবহনশ্রমিকেরা; ট্রেন অথবা বাসযাত্রী অথবা অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে হাসপাতালের পথে রওনা হওয়া রোগীরা। এক বছর থেকে ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে আতঙ্কের তীব্রতা এখন এতটাই যে, পথে বেরোলে প্রাণ নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবে কি না, এ কথাটাও জোর দিয়ে কেউ বলতে পারে না, এমনকি শুক্রবারেও। একসময় টেস্ট ক্রিকেটে তৃতীয় অথবা চতুর্থ দিনটি থাকত বিশ্রামের দিন। সত্তর-আশির দশকের দিকে বিশ্রামের এই দিনটি বাতিল করে দেওয়া হয়। আমাদের হরতাল-অবরোধের ব্যাপকতা যে রকম বাড়ছে, তাতে আতঙ্ক-খেলোয়াড়েরা শুক্রবারটাকে আর বেশি দিন হয়তো সম্মান দেখাবে না। সপ্তাহের ছয় দিন বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে যাদের চিত্তসুখ হয়, শুক্রবারেও নিশ্চয় তাদের হাত নিশপিশ করে। এই আতঙ্ক-খেলোয়াড়েরা ধরাছোঁয়ার বাইরের মানুষ। পুলিশ তাদের খুঁজে পায় না। তারা সুরক্ষিত ঘরে বসে খেলার ছক কষে; আদেশ দেয়, টাকাপয়সার জোগান দেয়। মাঠে আতঙ্ক উৎপাদনের জন্য তারা নিয়োগ করে আতঙ্ক-শ্রমিকদের।
এই শ্রমিকেরা বোমা ফাটায়, ককটেল ও গান পাউডার ছুড়ে মারে, আগুন লাগায়। সারা দেশের শহরে-বন্দরে-গঞ্জে এই শ্রমিকদের পদচারণ; মিডিয়ায় তাদের সবাইকে দেখতে একই রকম লাগে। কৃষিকাজের মতো তাদের উৎপাদনপদ্ধতিও সর্বত্র একই রকম। এখন টিভি খুললেই দেখা যায় কোথাও না কোথাও সহিংস মিছিল হচ্ছে, টায়ার পোড়ানো হচ্ছে, ককটেল ফাটানো হচ্ছে। কোনো টিভি চ্যানেল যদি ক্যামেরা ও প্রতিবেদক-সংকটে ভোগে, তাহলে সমস্যা নেই। এক মাস আগের ছবি চালিয়ে দিলেই চলে। এখন বাংলাদেশের চোখজুড়ে শুধু একটাই ছবি—আতঙ্ক উৎপাদন-প্রক্রিয়া ও তার অভিঘাতের ছবি। আতঙ্ক যদি রপ্তানিযোগ্য কোনো পণ্য হতো, তাহলে আমাদের বার্ষিক গড় আয় এত দিনে হাজার হাজার ডলারে পৌঁছে যেত। যদিও গড় আয়ুর ঘরে বড়সড় টান পড়ত, যেহেতু আতঙ্ক উৎপাদনের একটা উপকরণ মানুষের প্রাণ। গত এক মাসে অন্তত ৩০টি তরুণ প্রাণ আতঙ্ক-সন্ত্রাসের বলি হয়ে অকালে ঝরে পড়েছে। প্রথম আলোয় একটি ছবি দেখে মনে হয়েছে, এ রকম ছবি যে দেশে ছাপা হয়, সে দেশের মানুষ বোধ হয় মানুষ নামের যোগ্যতা হারায়।
আগুনে বাবাকে হারিয়ে একটি শিশু নিষ্পলক তাকিয়ে আছে—তার কষ্ট, যন্ত্রণা, হারানোর বেদনা, অসহায়ত্ব একটি বর্ণনা-অসম্ভব অনুভূতি হয়ে তার দৃষ্টিকে ঢেকে দিয়েছে। এই শিশুটির চোখের দিকে যদি আমাদের আতঙ্ক-খেলোয়াড়েরা তাকাত, তাহলে তাদের পাথরের মতো হূৎপিণ্ডে নিশ্চয় কিছুটা চিড় ধরত। কিন্তু তারা যে পত্রিকা পড়ে অথবা টিভি দেখে, সে ব্যাপারটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আতঙ্কতন্ত্র এখন তরুণদের বিধ্বংসী হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান দিই, পরিবর্তনের রাজনীতির ঘোষণা দিই, কিন্তু প্রতিদিন হাতে-কলমে অসংখ্য তরুণকে তালিম দিই, কীভাবে ঠান্ডা মাথায় যাত্রীভর্তি বাসে আগুন লাগাতে হয়। যে আতঙ্কটি আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, তা হচ্ছে এই হন্তারকের দলে নাম লেখানো তরুণদের নিয়ে। এরা কি আর কোনো দিন সুস্থ জীবনে ফিরে যাবে? যারা রাস্তায় নেমে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তারা কি আর কোনো দিন শৃঙ্খলাকে সম্মান করবে? শিক্ষাকে ভালোবাসবে? গুরুজনকে মান্য করবে? মাদকের নেশার মতো ধ্বংসের নেশা থেকে ফেরত আসাটা কষ্টসাধ্য, অসম্ভব না হলেও। কিন্তু আমরা কি সেই মানবিক সমাজ তৈরি করেছি, যে সমাজ এই তরুণদের পুনর্বাসনের সময় ও বিনিয়োগ দেবে?
ধ্বংস থেকে সৃষ্টির পথে এদের নিয়ে আসতে পারবে? এখন আমাদের আতঙ্কতন্ত্রের পূর্ণ উৎপাদন হচ্ছে ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়াকে কেন্দ্র করে। আমাদের যদি গণতন্ত্র থাকত, তাহলে এই পালাবদলটা হতো একটা উৎসবের আমেজে। প্রকৃত গণতন্ত্রে ক্ষমতায় যাওয়া হচ্ছে জনসেবা ও দেশসেবার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ। যেখানে দেশ বড়, সেখানে পদ্ধতি নিয়ে কোনো তর্ক হয় না, ঝগড়া হয় না। তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি ভালো, নাকি নির্বাচনকালীন একদলীয় অথবা বহুদলীয় সরকারপদ্ধতি ভালো, এ নিয়ে একটি দেশের ভবিষ্যৎ জিম্মি করার চিন্তাও তখন কেউ করে না। প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে পদ্ধতি-নির্বিশেষে নির্বাচন হতো, নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হতো, বিনা বাক্যব্যয়ে নির্বাচনের ফল সবাই মেনে নিত, সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হতো। প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে প্রতিবাদ হতো, সমালোচনা হতো, সংশোধন-সংযোজন হতো, দেশের প্রশ্নে নানা ইস্যুতে ঐকমত্য হতো। টেবিলের দুই দিকে বসে বিস্তর আলোচনা হতো। নীতি ও কর্মপরিকল্পনা এবং প্রকল্পের ধারাবাহিকতা থাকত। সত্তর-আশি পেরোনো রাজনীতিবিদেরা পার্কে বসে পত্রিকা পড়তেন, আড্ডা মারতেন আর প্রয়োজনে উপদেশ-অভিমত দিতেন; তাঁদের জায়গা তাঁরা ছেড়ে দিতেন তরুণদের কাছে। প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে দলের ভেতর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতো এক নম্বর কাজ। ফলে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে দলের, নির্বাচনের, নানা কমিটির প্রার্থী ও সদস্য নির্বাচিত হতো। সবচেয়ে বড় কথা, প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে আতঙ্ক-অনিশ্চয়তা-আত্মঘাতী-প্রবণতা থাকত না। কিন্তু বাংলাদেশের দুঃখী কপালে গণতন্ত্রের সুখ লেখা নেই; যা আছে, তা আতঙ্কতন্ত্র।
আতঙ্কতন্ত্রে দলগুলো থাকে স্বৈরতান্ত্রিক। তৃণমূলকে প্রয়োজন পড়ে শুধু ভোটের সময়। আতঙ্কতন্ত্রে সাংসদ হওয়া এক বিশাল প্রাপ্তির নাম; শুল্কমুক্ত গাড়ি থেকে নিয়ে নানা পদ-পদবি পাওয়া, মন্ত্রী-ভিআইপি হওয়া আর ব্যবসা-বাণিজ্য-বিদেশভ্রমণের প্রচুর সুযোগ পাওয়ার এক চাবিকাঠির নাম। ঢাকায় কেউ রাজউকের ১০ কাঠার প্লট পেলে যে রকম তাঁকে ভাগ্যবান বলতে হবে, বড় দলের সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নটাও যেন তা-ই। সে জন্য ‘মনোনয়নবঞ্চিতরা’ রাস্তায় নামেন, হরতাল করেন, ধ্বংসযজ্ঞ চালান। যদি এমন হতো যে সাংসদ হওয়া মানে ২৪ ঘণ্টা জনসেবার কাজে লেগে থাকা, নাওয়া-খাওয়া ভুলে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-যোগাযোগ-দারিদ্র্য নির্মূলের কাজে কোমর বেঁধে নেমে পড়া, তাহলে ছবিটা নিশ্চয় উল্টো হতো। অথবা কে জানে, দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে মনোনয়নবঞ্চিতরা প্রতিবাদ মিছিল করে ঘোষণা দিতেন, আগামী পাঁচ বছরে মনোনয়নপ্রাপ্তদের থেকে তাঁদেরই বেশি দেখা যাবে মাঠের কাজে, মানুষের সেবায় ইত্যাদি। গণতন্ত্রের অনেক আবশ্যকতার মধ্যে নির্বাচন তো মাত্র একটি। নির্বাচনের পর সংসদ রয়েছে; সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও হাতভর্তি উন্নয়নের নানা কাজ রয়েছে; সর্বোচ্চ মানের বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিসহ ১০০ রকমের সামাজিক-রাজনৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ব্যাপার রয়েছে; দলগুলোকে গণতন্ত্রচর্চার মডেলে রূপান্তরের বিষয়টি রয়েছে, দলগুলোর ভেতর তৃণমূল থেকে নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্বচ্ছ যোগাযোগ ও কথোপকথনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ছায়া সরকার প্রতিষ্ঠা এবং সরকার ও বিরোধী দলের ভেতর ক্রমাগত সংলাপ ও জাতীয় ইস্যু এবং নীতির প্রশ্নে ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, নেতা-নেত্রীদের ভেতর সৌজন্য ও সৌহার্দ্যেরও দরকার রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে এলে আমাদের দেশে যে রকম আন্দোলন শুরু হয়, তাতে মনে হয়, নির্বাচনই যেন গণতন্ত্রের একমাত্র শর্ত।
নির্বাচনে জিতে গেলে তো হলোই, তখন পাঁচ বছর শুধু ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ। বিপত্তিটা হয় হেরে গেলেই, তখন নানা ছুতায় সংসদ বর্জন (বেতন-ভাতা, শুল্কমুক্ত গাড়ি, বিদেশভ্রমণ বর্জন যদিও নয়)। নির্বাচনকে দেশসেবার সুযোগ হিসেবে না দেখে শুধু ক্ষমতায় আরোহণের উপায় হিসেবে দেখার কারণে গণতন্ত্র তার চরিত্র হারিয়েছে। হারিয়ে এখন তা রূপ নিয়েছে আতঙ্কতন্ত্রে। এই আতঙ্কতন্ত্রের মাত্রা বাড়াচ্ছে উগ্রবাদীরা, জঙ্গিরা। এখন ধর্মের নামে আতঙ্ক ছড়ায় অনেক দল ও গোষ্ঠী। আতঙ্কতন্ত্রে নাম লেখাচ্ছেন পেশাজীবী ও দলীয় বুদ্ধিজীবীরাও। যাঁরা তীব্র কণ্ঠে আতঙ্কতন্ত্রের অবসান চাইতে পারতেন, তাঁরা যখন আতঙ্কতন্ত্রকে মেনে নেন, তখন আমাদের কীই-বা করার থাকে। তবে আতঙ্কতন্ত্রকে মেনে নিতে পারে না সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া লোকজন, ভুক্তভোগীরা। অবরোধের আগুনে ঝলসে যাওয়া বাসযাত্রী গীতা সেনকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে তিনি বলেছেন, ‘আমরা অসুস্থ সরকার চাই না’। ‘আপনারা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন’। বুধবার সকালের খবরের কাগজের একটি শিরোনাম, 
যথেষ্ট হয়েছে, এবার থামতে হবে’। দাবিটি জানিয়েছে ‘সহিংসতা প্রতিরোধে জনতা’। এই দাবিটি এখন ঘরে ঘরে। মানুষ আতঙ্কতন্ত্র চায় না, গণতন্ত্র চায়। এই গণতন্ত্র আমাদের জাতিসংঘ দিতে পারে না, কোনো ত্রাতা দেশও দিতে পারে না। গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারেন একমাত্র রাজনীতিবিদেরাই। তাঁদের সাহায্য করার জন্য মানুষ প্রস্তুত। এখন তাঁরা এগিয়ে এলেই হয়। সারা শরীর আগুনে পুড়ে যাওয়া মনির যখন গাজীপুর চৌরাস্তায় বসে ছিল, হয়তো নিস্তব্ধ বসে বোঝার চেষ্টা করছিল, কেন তাকে এভাবে কোন অপরাধে, অবেলায়, অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় চলে যেতে হবে; তার পাশে বসে তার বাবা নিজের চোখে জীবনের সবচেয়ে বড় সর্বনাশটা দেখছিলেন। ওই ছবিটি ডেইলি স্টার-এ উঠেছিল। অন্যান্য কাগজও ছাপিয়েছিল। আমাদের নেতা-নেত্রীদের অনুরোধ, ছবিটি দেখুন। হয়তো ব্যস্ততার কারণে ছবিটি আপনাদের চোখে পড়েনি। কিন্তু পড়া উচিত। ছবিটি দেখে নিশ্চয় আপনাদের চোখে পানি আসবে। তখন নিশ্চয় মনির ও তার মতো অসংখ্য শিশু-কিশোর এবং আগুনে-গুলিতে-চাপাতির আঘাতে না-ফেরার দেশে চলে যাওয়া অসংখ্য মানুষের জন্য আপনারা গণতন্ত্রে ফেরার কাজটি শুরু করবেন।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

অবরোধ থেকে মুক্ত থাকুক

৪৮ বছর ধরে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সমাদৃত মিল্ক ভিটা। মানুষের পুষ্টি রক্ষায়, খাদ্যনিরাপত্তায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে মিল্ক ভিটার অবদান অনন্য। একদিকে রোগীর পথ্য ও শিশুখাদ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা, অন্যদিকে দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জীবিকার ব্যবস্থা—এ মহতী কাজে নিয়োজিত মিল্ক ভিটা। দেশে সমবায় বিপ্লবের মাধ্যমে প্রান্তিক চাষিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যেই মিল্ক ভিটার সৃষ্টি হয়েছিল। মিল্ক ভিটা একক কোনো ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি জাতীয় সমবায় প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ১৩ লক্ষাধিক সমবায়ী ও তাঁদের পরিবার। তাঁরাই মিল্ক ভিটার প্রাণ। তাঁদের পরম স্নেহে লালিত-পালিত হচ্ছে হাজার হাজার উন্নত জাতের গাভি। এসব গাভির দুই থেকে আড়াই লাখ লিটার দুধ দীর্ঘ গ্রামীণ রাস্তা বা নদীপথ পাড়ি দিয়ে ট্রাক্টর, নৌকা, ট্রলার বা ট্রলিযোগে মিল্ক ভিটার কাছে পৌঁছে দেন সমবায়ীরা। অতঃপর এ দুধ মিল্ক ভিটার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ট্যাংকারে দুই-চার শ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক অতিক্রম করে আসছে ঢাকায়। বাংলাদেশে পাস্তুরিত দুধ উৎপাদনের সূচনা মিল্ক ভিটার হাতেই। মিল্ক ভিটার ভোক্তা শিশু, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ, রোগী, চিকিৎসকসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। প্রতিদিন দুই হাজার প্রাথমিক সমবায় সমিতির এক লাখ খামারি গড়ে কমবেশি দুই থেকে আড়াই লাখ লিটার দুধ মিল্ক ভিটায় সরবরাহ করেন।
এ দুধ প্রক্রিয়াজাত হয়ে প্যাকেটজাত তরল দুধ, ঘি, মাখন, দই, আইসক্রিম হিসেবে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে ভোক্তাদের কাছে যায়। সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটার নিয়মিত গ্রাহক। গরুর দুধ উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য, যা শিশু, রোগী, বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষের জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্যরক্ষা ও শিক্ষার্থীদের মেধা গঠনে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে দুধ আবশ্যকীয়। ফরমালিন ও ভেজালের আতঙ্কে মানুষ যেখানে ফলমূল খাওয়া বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে, সেখানে বিশুদ্ধ দুধই একমাত্র অবলম্বন। দুধেই রয়েছে শিশুদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ, প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরের ক্ষয়পূরণ এবং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা। বিশুদ্ধ দুধ সরবরাহের প্রতিষ্ঠান হিসেবে মিল্ক ভিটার ওপর সবার আছে ব্যাপক আস্থা। শুধু দুধ উৎপাদন নয়, পাশাপাশি মিল্ক ভিটা ঋণের মাধ্যমে গাভি সরবরাহ, বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, প্রতিষেধক ও ওষুধ সরবরাহ এবং কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশে শ্বেত বিপ্লব ঘটাচ্ছে। জনগণের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা সাম্প্রতিক অবরোধ ও হরতালে এখন স্থবির। শিশু, শিক্ষার্থী এবং রোগীদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না দুধ। রোগীদের দুর্ভোগ, শিশুদের কান্না এবং শিক্ষার্থীদের বেদনা কি সংশ্লিষ্ট অবরোধকারীদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না? অথচ দুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়া মৌলিক মানবিক অধিকার। অবরোধের কারণে খামারিরা দুধ সরবরাহ করতে না পেরে অবলীলায় নদী-নালা,
খালে-বিলে দুধ ফেলে দিচ্ছেন। শুধু চট্টগ্রামের পটিয়ায় দৈনিক চার-পাঁচ হাজার লিটার দুধ ফেলে দিচ্ছেন খামারিরা। সড়কপথে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে মিল্ক ভিটার দুধ সংগ্রহ ও বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। অবরোধে শুধু খামারিদের ক্ষতি নয়, দুধ পরিবহনে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি, দুধ বিক্রির সঙ্গে জড়িত পরিবেশক এবং তাঁদের কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও বন্ধ। এভাবে মিল্ক ভিটার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও শ্রেণীর জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে আছে। এমনকি গোখাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় গবাদিপশুর খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। গোখাদ্যের সংকটে পড়ে খামারিরা অসহায় এবং তাঁদের পালিত অবলা পশুরাও এখন নিরুপায়। এখন সারা দেশে পরীক্ষার মৌসুম। এ সময় শিক্ষার্থীদের দুধ পানের প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু দুধ না খেয়ে শিক্ষার্থীরা ছুটছে পরীক্ষার হলে। এ পুষ্টিহীনতা অনিবার্যভাবে বয়ে আনবে মেধাহীনতা। হরতাল-অবরোধে বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দৈনিক মিল্ক ভিটার আর্থিক ক্ষতি ৫০ লাখ টাকা, সমবায়ী কৃষকদের ক্ষতি ৩০ লাখ টাকা, সমিতির কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধজনিত ক্ষতি চার লাখ টাকা, দুধ পরিবহনকারী শ্রমিকদের মজুরি বন্ধজনিত ক্ষতি ৪.৫ লাখ টাকা, পরিবেশকদের আর্থিক ক্ষতি ৪.২৬ লাখ টাকা, খুচরা বিক্রেতাদের আর্থিক ক্ষতি ১০.৭০ লাখ টাকা,
ভ্যানচালক-শ্রমিকদের মজুরি বন্ধজনিত ক্ষতি ২.৫ লাখ টাকা। এভাবে প্রতিদিন সম্মিলিত আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা। তরল দুধের এ সংকটে অপরিহার্যভাবে গুঁড়া দুধের আমদানি ও ব্যবহার বেড়ে যাবে। গুঁড়া দুধে ভেজাল, তেজস্ক্রিয়তা ও মেলামিনের ঝুঁকি থাকে। দেশের জনসংখ্যার মাথাপিছু দৈনিক দুধের প্রাপ্তি মাত্র ৬০-৭০ মিলিলিটার অথচ ন্যূনতম চাহিদা ২৫০ মিলিলিটার। অব্যাহত অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত সমবায়ীরা গাভি পালন এবং দুধ উৎপাদন থেকে সরে দাঁড়ালে হারিয়ে যাবে সম্ভাবনাময় এ শিল্প। অথচ কৃষিজমি সাশ্রয় এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য দুগ্ধ শিল্প বিকাশের বিকল্প নেই, যা পরিবেশবান্ধব শিল্প। যেখানে ইটভাটার লেলিহান শিখায় গ্রামগঞ্জে পরিবেশ বিপন্ন, সেখানে একমাত্র দুগ্ধ শিল্পের মাধ্যমে জাতির স্বাস্থ্যরক্ষা এবং দূষণমুক্ত পরিবেশের নিশ্চয়তা সম্ভব। ১৯৯০ সাল থেকে মিল্ক ভিটা এযাবৎ ১০০ কোটি ৪২ লাখ লিটার কাঁচা তরল দুধ সমবায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে মূল্য বাবদ তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছে দুই হাজার ২৫২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। একই সঙ্গে সম্পূরক দুগ্ধ মূল্য (প্রণোদনা) দিয়েছে ৭৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। মিল্ক ভিটার সামনে অনেক স্বপ্ন, অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু আছে পর্বতপ্রমাণ প্রতিকূলতা। সে প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে কোমলমতি শিশু, কিশোর, শিক্ষার্থী ও রোগীদের জীবন, মেধা ও স্বাস্থ্যরক্ষার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মানবিকতার চেতনা নিয়ে এগিয়ে আসার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি এ ক্রান্তিলগ্নে।
মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মিল্ক ভিটা।
mmunirc@gmail.com

অবরোধবাসীর দিনমান

কিছুদিন আগে আমার পিতা প্রয়াত হয়েছেন। মা একটি মফস্বল শহরে একাকী নিঃশব্দ জীবন যাপন করেন। তিনি ঢাকাতেও আসবেন না, বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থাকবেন। আজ যাওয়ার কথা ছিল আমার। কাল সব প্রস্তুতি সমাপন হয়েছে। ওখান থেকে যাব জীবিকার কাজে। একটি শুটিংয়ে। সপ্তাহ পার করে ঢাকায় ফিরব। অকস্মাৎ অজ্ঞাত স্থান থেকে নির্দেশ এল, বৃহস্পতিবার নাগাদ অবরোধ। ১৬ কোটি মানুষ মেনে নিল। আন্দোলনকারীদের নেতৃত্ব একটুও ভাবলেন না এই শ্বাসরুদ্ধকর অবরোধের বলি কারা? সাধারণ জনগণ এবং জনগণ। যাঁদের বিরুদ্ধে লড়াই তাঁদের কেশও স্পর্শ করতে পারছে না। অফিস, আদালত, মন্ত্রী, সচিব, উচ্চপদস্থ আমলা, সাংসদ—সবাই যাঁর যাঁর কাজ করছেন। কোনো কিছুই বাতিল হচ্ছে না। এ রকম অদ্ভুত আন্দোলন কখনো দেখিনি, যেখানে আন্দোলনকারীরা রাজপথে নেই, তাঁদের অফিসেও নেই। আত্মরক্ষার ভয়ে সবাই পলাতক। আন্দোলন করবেন; জেলে যেতে ভয়, নিপীড়নের ভয়! কিন্তু মানুষকে ঠিক ভয় দেখিয়ে ছাড়ছেন। এ কৌশল পৃথিবীতে বিরল ও নতুন। চোরাগোপ্তা হামলা করে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে এমন একটা প্যানিক সিনড্রোম তৈরি করা হয়েছে যে গণমানুষ ভয় পেয়ে গেছে। একই সময়ে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর পতদ্যাগের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। সেখানকার বিরোধী দল রাজপথে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলছে।
লক্ষ্যবস্তু সরকার এবং সরকার। সাধারণ মানুষ, দোকানপাট, হাসপাতাল, পথিক, স্কুল-কলেজে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা কিছু জায়গায়। পুলিশ সরকারি ভবন রক্ষায় মরিয়া, আন্দোলনকারীরাও মরিয়া। জেল-জুলুম গুলি—সবই চলছে। আন্দোলনের নেতারাও রণক্ষেত্রে উপস্থিত। কিন্তু এখানে কেউ কোথাও নেই। অথচ অবরোধ হয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনের চরিত্রটাই গণবিরোধী। যে বিরোধী দলের লক্ষ্যবস্তু সাধারণ মানুষ, সেই দল গণসমর্থন আশা করে কী করে? আবার সরকারও সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার বিধান করতে পারছে না। রাস্তায় রিকশা চলে, সিএনজি চলে, বাসও কিছু চলে, কিন্তু গাড়ি চলে না। সরকারি দলের সাংসদ, সদস্য অনেকেরই তো একাধিক গাড়ি আছে, তাঁরা গাড়ি নিয়ে চলেন না কেন? তাহলে তো কয়েক হাজার প্রাইভেট কার যান দেখা যেত। দূরপাল্লার বাস-ট্রাককে নির্বিঘ্ন করতে বাধা কোথায়? সামান্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও সাহস দিলে জনগণ এসব মানবে না। নাশকতার কাজগুলো তো পার্টির নেতারা করেন না। করে ভাড়াটে মাদকাসক্ত দুর্বৃত্তরা। সম্প্রতি দুজন সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে এবং তারা স্বীকার করেছে, চারজনকে বারো শ টাকা দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীরা ক্লোজআপে ছবি তুলেছেন পেট্রল ঢালার, আগুন জ্বালানোর। যথার্থ দায়িত্ব পালন করেছেন বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলে আরও একটা দায়িত্ব পালন হয়ে যায়। একদিকে আন্দোলনের নামে অবরোধ চলছে, অন্যদিকে গার্মেন্টস কারখানায় আগুন দেওয়া হচ্ছে।
পুড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। এই যে সহজলভ্য গান পাউডারের আমদানি ও সহজ উপায়ে ভ্রান্তপথে দাবি আদায়ের চেষ্টা, তার পরিণাম কী হবে, তা কি ক্ষমতালোভী রাজনীতিকেরা ভাবতে পারেন? আমাদের দেশের শিক্ষিতজনদের মধ্যে একদল মানুষ আছেন, যাঁরা ভাবেন আজকের সূর্যাস্তই পৃথিবীর সর্বশেষ সূর্যাস্ত। অতএব যা কিছু করার, যা কিছু ভোগ করার, এখনই করতে হবে। পরদিন সূর্য ওঠার বৈজ্ঞানিক সূত্রটি তাঁরা ভুলে যান। দ্রুত রাজনীতিক হয়ে ওঠা, দ্রুত অর্থের মালিক হওয়া, দ্রুত পদোন্নতি—সবকিছু আজই চাই। তাই সেই নিষ্ঠুর রথের চাকায় ধ্বংস হচ্ছে জনমত, ধুলায় লুণ্ঠিত হচ্ছে মানুষের পৃথিবী। শাসকগোষ্ঠীর কোনো অসুবিধা নেই। বাইরের জানালা তাঁর খোলা। কিন্তু পুড়ে মরবে, না খেয়ে মরবে দেশের মানুষ। হায় রে ওয়েজ... মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে, মালয়েশিয়ায়, ইউরোপে, আমেরিকায়, অস্ট্রেলিয়ায় যাঁরা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিচ্ছেন; একচিলতে স্বপ্ন, সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠা নিয়ে যাঁদের দিনরাত, তাঁদের কথা কেউ কি ভাবছেন? হায় রে গার্মেন্টস কর্মী রানা প্লাজার ধসে যাঁরা প্রাণ দিলেন, অঙ্গ হারালেন, অনিশ্চিত জীবনে সামান্য আশা নিয়ে বেঁচে আছেন, ঘটনার রেশ না কাটতেই বিশাল অগ্নিকাণ্ডে আবার হাজার হাজার গার্মেন্টস কর্মী বেকার। তাঁদের কথা কে ভাববে? হায় রে কৃষক পাঁজর ভাঙা কৃষককুল। ফসলের দাম পাবেন কি? পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বীজ নিয়ে আশা, ঠিকমতো বোনার কাজটি কি হবে? হতভাগ্য শিশু-কিশোর তরুণ শিক্ষার্থী প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, আবার জীবন থেকে খসে যাওয়া দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, কোথায় ফিরে পাবে এ দিনগুলো? আমার একটা প্রশ্ন। যাঁদের আমরা ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাই, নেতা বলে মেনে নিই, তাঁরাই তো এসব নিষ্পত্তি করবেন। এত বড় একটা সংসদ ভবন করে ফিরেছি।
বিনা শুল্কে গাড়ি দিয়েছি, তাঁদের হোস্টেল থাকা সত্ত্বেও দিয়েছি ন্যাম ভবনগুলোতে থাকার ব্যবস্থা, বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দিয়েছি, বিদেশে যাওয়ার কত সুযোগ করে দিয়েছি। এত সব সত্ত্বেও কেন বছরের পর বছর রাজপথ ব্যবহার করতে হবে? আন্দোলনে কোনো রুটি-রুজির বা জীবনের মান উন্নয়নের বিষয় নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটা বানচাল করার একটা গুরুতর ব্যাপার আছে এর মধ্যে। তাই ভয়ভীতি দেখিয়ে মানুষ পুড়িয়ে ওদের বাঁচাতে হবে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি এখন জামায়াত। তাই অন্য সব ইস্যু মুখ্য নয়। জামায়াত দেশকে দুঃস্বপ্নের জায়গায় নিয়ে গেছে। মহান সুফি সাধকদের যে বিনম্র শান্তির ধর্মচিন্তা, যাতে স্থানীয় সংস্কৃতিকে উৎসাহ দেওয়ার প্রবণতা ছিল, তার বিপরীতে জামায়াত নেমেছে কৃষ্টি ধ্বংসের মহোৎসবে। এই অবরোধে যেমন মানুষের অর্থনৈতিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি সংকটাপন্ন হয়েছে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি। দুটি দলই ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী। এতে দোষের কিছু নেই। আওয়ামী লীগে অনেক ত্যাগী কর্মী আছেন, হয়তো অনেকেই নিষ্ক্রিয়। বিরোধী দলের সেদিক থেকে ত্যাগী কর্মীর সংখ্যা কম। দুই দলের কর্মীদের মধ্যেই রাজনীতি সম্পর্কে অনেক ইতিবাচক কথা শুনেছি। কিন্তু তাঁর ফল শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় না। আমার মনে হয় তাঁরা কেউই সংঘাত চান না। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারও চান না। দেশের মানুষের, ত্যাগী কর্মীদের বুকভাঙা বার্তা শীর্ষ নেতাদের কানে কবে পৌঁছাবে। আজকেই যদি পৌঁছে যায়, তাহলেই মঙ্গল। দেশের কোটি কোটি সন্তান যেন নির্বিঘ্নে মায়ের কাছে ফিরে যেতে পারে, সেই ব্যবস্থা চাই। আমাদের সন্তানদের দুধে ভাতে উপদ্রব বন্ধ হোক।
মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব।

থাইল্যান্ডে বিরোধীদের জয়

থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা বিজয় দাবি করেছে। রাজধানী ব্যাংককের সরকারি ভবন ও পুলিশ সদর দফতরের বাইরে তাদের বিক্ষোভের অনুমতি দেয়ার পর মঙ্গলবার তারা এ বিজয় দাবি করল। বিক্ষোভকারীরা বলেছে, পুলিশ যদি ব্যারিকেড তুলে না নিত তাহলে বহু মানুষ হতাহত হতো। এর আগে, ১১ নভেম্বর থেকে থাইল্যান্ডে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপকমাত্রায় টিয়ার গ্যাস, পানি কামান ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এর মধ্য দিয়েই তারা বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় দখর করে নেয় এবং পুলিশ সদর দফতর দখলের চেষ্টা করে। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার সরকারি বাসভবন গভর্নর হাউসেও চড়াও হয় বিক্ষোভকারীরা। ১১ নভেম্বর সরকারের আনা একটি বিল থাই সিনেট নাকচ করে দেয়ার পর দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে। ওই বিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ক্ষমা করে দেশে ফিরে আসার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বলছে- ইংলাক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ করলেও কার্যত নির্বাসনে থেকে দেশ চালাচ্ছেন তার ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তারপর থেকে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। এদিকে প্রতিবাদকারীরা প্রধানমন্ত্রীর দফতর এবং নিকটবর্তী মহানগর পুলিশের সদর দফতর ভাংচুর করার চেষ্টা করলেও তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ না করার প্রতিশ্র“তি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক। মঙ্গলবার সকালে একটি হেলিকপ্টার এসে প্রতিবাদকারীদের ওপর লিফলেট বিলি করে যায়। তাতে প্রতিবাদকারীদের স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়, তাদের নেতা সুথেপ থাগসুবানকে বিদ্রোহের অভিযোগে খোঁজা হচ্ছে।
লিফলেটে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘তাই অনুগ্রহ করে, থাগসুবানের থেকে দূরে থাকুন এবং আইন অমান্যকারী জটলা থেকে বিরত থাকুন।’ থাকসিনের তীব্র বিরোধিতাকারী সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী থাগসুবান সোমবার রাতে নিজের উৎফুল্ল সমর্থকদের সামনে পুলিশের তীব্র সমালোচনা করে পরদিন পুলিশ সদর দফতর দখল করা হবে বলে ঘোষণা দেন। তবে পুলিশের সদর দফতর বা এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দফতর গভর্নমেন্ট হাউস দখল করলেও ইংলাক সরকারের বৈধতায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না সরকারবিরোধী প্রতিবাদকারীরা। কিন্তু আরও বিশৃংখলা ও সহিংসতা বাড়লে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সেনাবাহিনী দায়িত্ব নিতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। ক্রমেই কমে আসছে থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা। সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থেকেও পিছু হটতে শুরু করেছে বিরোধীরা। সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত সপ্তাহের শেষ দিক ও সোমবারের সহিংসতার পর ব্যাংককে সংঘাত আগের চেয়ে মঙ্গলবার অনেক বেশি কম দেখা গেছে। যদিও বিক্ষোভকারীদের নেতা সুথেপ থাউগসুবান লড়াই করে সরকার উৎখাতের অঙ্গিকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর আগে, সোমবার টেলিভিশনে দেয়া এক জরুরি ভাষণে বিরোধীদের পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। অনির্বাচিত পিপলস পরিষদকে ক্ষমতায় বসানো অসাংবিধানিক ও অবৈধ হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরাসরি সংলাপ সমঝোতায় বসতে প্রস্তুত তার সরকার।
ইংলাক সিনাওয়াত্রা
পুলিশের সদরদফতর এমনকি প্রধানমন্ত্রীর গর্ভনমেন্ট হাউস দখল করলেও সরকারের বৈধতায় কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না
সুথেপের বিজয় ভাষণ
আমরা বিজয় উল্লাস করতে পারি সানন্দে কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে আমরা যেন লক্ষ্যচ্যুত না হই।
থাই ছাত্রসমাজের প্রতিক্রিয়া
দ্য নেটওয়ার্ক অব স্টুডেন্টস অ্যান্ড পিপল ফর থাইল্যান্ডস রিফর্ম’র (এনএসপিটিআর) সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে। এনএসপিটিআর নেতা উথাই ইয়োদম্যানি মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে আমরা বিজয় ঘোষণা করেছি ঠিকই কিন্তু তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ চলবেই।