Friday, August 21, 2015

সরকার বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করার ষড়যন্ত্র করছে : খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে একে একে কারাগারে অন্তরীণ করে দলকে নেতৃত্বশূন্য করার ষড়যন্ত্র করছে ।
আজ শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিএনপি কখনো সন্ত্রাসের রাজনীতি করেনি এবং সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয়ও দেয়নি। বিএনপি সবসময় দেশের অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করার লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ পথে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছে। কিন্তু আন্দোলন চলাকালে সরকারি এজেন্টরা, শাসক দলীয় লোকেরাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে তার দায় বিরোধী দলের কাঁধে চাপানোর অপপ্রয়াস নিয়েছিল তা কারোরই অজানা নেই। বিগত আন্দোলনে সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর সাথে শাসক দলীয় ক্যাডারদের জড়িত থাকার ঘটনাও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের জড়িয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে শাসক গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বিরোধী দলের চরিত্র হননের হীন ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে এবং বিরোধী নেতাকর্মীদের হয়রানি করেই চলছে। সরকারের এ ধরণের ফ্যাসিবাদী-অগণতান্ত্রিক ভূমিকা ও দুবৃত্তায়ন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যার পরিণতিতে দেশের মানুষের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
খালেদা জিয়া বলেন, এই সরকার কোনোভাবেই জনগণের নির্বাচিত সরকার নন। কিন্তু দুঃখের বিষয় পাঁচ বছর ক্ষমতায় বহাল থাকার আকাঙ্খা ব্যক্ত করে ‘জনগণই যে সকল ক্ষমতার উৎস’ সে সত্য কথাটি সরকার ক্রমাগত অস্বীকার করে চলেছেন। কারণ এ সরকার জানে, তাদের সাথে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নেই। তাই তাদের অনৈতিক ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে গিয়ে আজ তারা মরিয়া হয়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদের প্রতি দমন-নিপীড়ণের পথ বেছে নিয়েছে।
দমন-নিপীড়ন ও গ্রেফতার করে পৃথিবীতে কোনো ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে পারেনি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন বেগম জিয়া।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মান্নান, যুগ্ম-মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, মিজানুর রহমান মিনু, অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সম্পাদক ও কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি মেহেদী আহমেদ রুমী, পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও জয়পুরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি মোজাহার আলী প্রধান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউস, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল হোসেন খান, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চান, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন, ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম নুপুর, বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহীন, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাজীব আহসানসহ আটক সব নেতাকর্মীর অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেন বেগম খালেদা জিয়া।
তিনি বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা না দিয়ে, দলন-নিপীড়নের পথ থেকে সরে এসে মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের বদ্ধ কপাট খুলে দেয়ার আহবান জানান।

পরিবারের দাবি ‘র‍্যাব ধরেছে’, র‍্যাব বলছে ‘জানা নেই’

কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজকে আজ শুক্রবার ভোররাতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ধরে নিয়ে গেছে বলে তাঁর পরিবার দাবি করছে। কিন্তু র‍্যাব বলছে, বিষয়টি তাদের জানা নেই। গত ১৫ আগস্ট সকালে কুষ্টিয়ায় শোক দিবসের র‍্যালি শেষে জেলা আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের মধ্যে সংঘর্ষে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন। ওই ঘটনায় করা মামলায় সাজ্জাদ হোসেন প্রধান আসামি। আজ সকাল সাড়ে দশটার দিকে কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবে সাজ্জাদ হোসেনের পরিবারের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে মা শাহিদা খাতুন দাবি করেন, আজ ভোর চারটার দিকে গাজীপুরের ড্রিম স্কয়ার রিসোর্টের অপারেশন ম্যানেজার শিমুল আহমেদ মুঠোফোনে জানান, র‍্যাব সদস্যরা গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রিসোর্টে অভিযান চালায়। এ সময় তারা সেখানকার নিরাপত্তা প্রহরীদের আটক করে। পরে রিসোর্ট মালিক মনির হোসেনকে বাড়ি থেকে তুলে আনে। মনিরকে আনার পর রিসোর্টের একটি কক্ষ থেকে সাজ্জাদ হোসেন সবুজ ও তাঁর সঙ্গে থাকা কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান লাবুকে আটক করে র‍্যাব। পরে তারা সাজ্জাদ, লাবু ও মনিরকে গাড়িতে করে নিয়ে যায়।
শাহিদা খাতুন দাবি করেন, আটক তিনজনকেই র‍্যাবের প্রধান কার্যালয়ে রাখা হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। সাজ্জাদের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জিনিয়া বলেন, ‘আমার স্বামী কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি। সাজ্জাদ যদি প্রকৃত দোষী হয়, তবে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যেদের মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হোক। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই আকুতি জানাচ্ছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‍্যাব-১২ কুষ্টিয়া ক্যাম্পের কমান্ডার মোসাদ্দেক ইবনে মুজিব বলেন, ‘এ রকম কিছু আমাদের জানা নেই। অনেকেই আমাদের কাছে বিষয়টি জানার জন্য ফোন দিচ্ছে। জানতে পারলে আপনাদের জানাব।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা জঘন্য সন্ত্রাসী কার্যক্রম : নজরুল

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাকে জঘন্য সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে অভিহিত করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
আজ দুপুরে সদ্য কারামুক্ত বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদুকে নিয়ে শেরে বাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পমাল্য অর্পন করেন নজরুল ইসলাম খান।
পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা একটি জঘন্য ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম। এটা যেই করে থাকুক, আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই- উপযুক্ত ও সঠিক তদন্ত করে যারা সত্যিকারভাবে দায়ী তাদের বিচার করা হউক। সেটা যে-ই হউক না কেনো। এ কথা বার বার বলার পরও আওয়ামী লীগ দায়ী করে। এটা রাজনৈতিক কারণে দায়ী করে।
নজরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করে। এই রাজনীতিতে সন্ত্রাসের কোনো স্থান নাই। অতএব আমরা কোনো হত্যার রাজনীতির সাথে জড়িত নই। বিএনপি কোনো জড়িত নয়।
আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীদের অভিযোগ খণ্ডন করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আওয়ামী লীগ তো অভিযোগ করবেই। এটা জনগণ বিশ্বাস করে না। তারা (আওয়ামী লীগ) যে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার কণ্ঠ আমরা শুনেছি, সেই জিয়াউর রহমানকে বলে পাকিস্তানের অ্যাজেন্ট। আওয়ামী লীগ কাদের সিদ্দিকীকেও বলে রাজকার। তাদের পক্ষে বললে মুক্তিযোদ্ধা, তাদের বিপক্ষে বললে রাজকার। কাজেই আওয়ামী লীগ কী বলে তাতে কিছু আসে যায় না।
তিনি বলেন, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটা দল। বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। বিএনপি প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ কিংবা সন্ত্রাসের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আমরা জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বাস করে রাজনীতিতে সন্ত্রাসের কোনো জায়গা নেই।
জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে জাতীয়তাবাদীবাদী ঘরানার তিন আইনজীবী গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমি এ বিষয়ে জানি না। তবে সরকার চিহ্নিত করার চেষ্টা করতেছে বিএনপি সন্ত্রাসকে মদদ দেয়, বিএনপি সন্ত্রাসী দল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এদেশের জনগন জানে এই কথা সত্য নয়। আমরা বিএনপি করে তার চেয়ে বেশি জানি, এই অভিযোগ অসত্য, অন্যায় এবং প্রতিহিংসামূলক।
সরকারের দমনীতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এম কে আনোয়ার, শওকত মাহমুদ, আমান উল্লাহ আমান, রহুল কবির রিজভীর মতো নেতাদের বিরুদ্ধে পেট্রলবোমা, গাড়ি পোড়ানোর অদ্ভুত সব মামলা কারাগারে মাসের পর মাসের আটক করে রাখা হয়েছে। সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানকে দীর্ঘদিন আটক করে রাখা হয়েছে । এই পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন। জনগণের সরকার প্রয়োজন। কোনো দলবাজী সরকার নয়।
তিনি বলে, এখন যে সরকারটি ক্ষমতায় আছে, তারা জনগনের ভোটে নির্বাচিত নয়। তারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষকে ভোট দেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। আমরা সেজন্য দাবি করছি, জনগনকে ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হউক। তারা ভোট দিয়ে যাদের নিবার্চিত করবেন, তারাই সরকার গঠন করবে, জনগনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। আমরা ওইরকম একটি সরকারের জন্য দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন করছি।
কৃষক দলের সভাপতি ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যিনি দীর্ঘদিন কারাভোগে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন, তার রোগমুক্তির জন্য দোয়াও চান নজরুল।
এ সময়ে বিএনপির সহ তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, সহ দপ্তর সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম, নির্বাহী কৃষক দলের তকদীর হোসেন জসিম, নাসির হায়দার, শাহজাহান মিয়া সম্রাট, ফেরদৌস আহমেদ পাটোয়ারি, জামাল উদ্দিন খান, জিয়াউল হায়দার, শরীফুল ইসলাম মোল্লা, গোলাম মোস্তফা, মিজানুর রহমান লিটু প্রমূখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা-তারেক জড়িত, সন্দেহ নেই: হাসিনা

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমান জড়িত ছিলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ শুক্রবার বিকেলে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যেমন জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন, একইভাবে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া ও পুত্র তারেক রহমান জড়িত, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’ তিনি বলেন, এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িতদের বিচার হতেই হবে। তা না হলে সন্ত্রাস বাড়তেই থাকবে। খুনিরা কেউ রেহাই পাবে না।
এর আগে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের নিচে স্থাপিত অস্থায়ী বেদিতে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পরে দলীয় সভানেত্রী হিসেবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ১৪-দল এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শেখ হাসিনা নিহতদের পরিবারের সদস্য ও আহতদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে কাছে পেয়ে স্বজন ও আহতরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
নৃশংস গ্রেনেড হামলার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তখন বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায়। এ ঘটনার আলামত রক্ষা করা তো দূরের কথা, আলামত নষ্ট করে দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের গাড়ি এনে ঘটনাস্থল পরিষ্কার করে ফেলা হয়। দুটো অবিস্ফোরিত গ্রেনেড সংরক্ষণ না করে নষ্ট করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতা তখন এ ঘটনায় উল্টো আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছিল। আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে সভাস্থলে গিয়েছিলাম।’ তিনি বলেন, এ ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল তাদের বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যারা তখন বাংলাদেশকে তালেবান রাষ্ট্র করার স্লোগান দিয়েছিল, খালেদা জিয়া তাদের সমর্থন দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ‘সেদিন সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ করতে গিয়ে আমরা ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার শিকার হই। যে গ্রেনেড যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, সেই গ্রেনেড আমাদের সভায় ছোঁড়া হয়। এ ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়।’ তিনি বলেন, ‘২০১৩ ও ২০১৫ সালে পেট্রলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এ জন্য খালেদা জিয়া কোনো লজ্জাবোধ করেনি। তিনি (খালেদা) বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত না করে ঘরে ফিরবেন না। বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, মানবাধিকার বিশ্বাস করে না।’
বিএনপি-জামায়াত হত্যা করতে চেয়েছিল, আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেট্রলবোমা হামলা ও পরিকল্পনাকারীদের শাস্তি দিতেই হবে। হত্যাকারী যেই হোক, যে দলেরই হোক, তাদের উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না, দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারে নাই। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি যখন গণতন্ত্রের কথা বলে তখন আমার খারাপ লাগে। কারণ যারা গণতন্ত্রের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারে তাদের মুখে গণতন্ত্র মানায় না।’
খালেদা হাসপাতালে গেলে আইভির ছেলে-মেয়েদের ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল
শেখ হাসিনা বলেন, গ্রেনেড হামলায় আহত আইভি রহমানকে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসার নামেও অনেক রহস্যজনক ঘটনা ঘটেছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যখন সিএমএইচে যান, তখন আইভি রহমানের ছেলে-মেয়েদের পাশের ঘরে তালাবদ্ধ করে আটকে রাখা হয়েছিল। এর পেছনে রহস্য কি ছিল আমরা তা জানি না। দেখতে যাওয়ার সময় ছেলে-মেয়েদের সান্ত্বনা না দিয়ে উল্টো ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হলো কেন? এর জবাব কে দেবে?
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরত দিচ্ছে না, তারা মানবাধিকারের কথা বলে
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর কয়েকজন হত্যাকারী আমেরিকা, কানাডা ও পাকিস্তানে পালিয়ে আছে। তারা খুনিদের ফেরত দিচ্ছে না। অথচ তাদের মুখে মানবাধিকারের কথা শুনতে হয়। নারী, শিশু ও অন্তঃসত্ত্বাকে হত্যা কারীদের প্রশ্রয় দেওয়া হলে তাদের মানবাধিকার কোথায় থাকে? ২১ আগস্টের ঘটনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর বোমা হামলাসহ সন্ত্রাসের প্রতিবাদে শান্তি সমাবেশ করতে এসেছিলাম। বক্তৃতাও শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ফটো সাংবাদিকেরা বললেন, “আপা ছবি পাইনি”। এর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে একের পর এক গ্রেনেড হামলা করা হয়। আমার পাশে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফসহ অনেকে মানবঢাল তৈরি করে আমাকে রক্ষা করেন। সেই হামলায় কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভী রহমান, আমাদের সকলের প্রিয় আদা চাচাসহ ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী নিহত হন। গ্রেনেডের স্প্লিন্টারবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হন অনেকে। অনেকেরই স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয়নি।’
আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দলীয় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননসহ ১৪ দলের নেতারা।

ছাত্রলীগের আস্তানা পশু হাসপাতাল! by উজ্জ্বল মেহেদী

সিলেট জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের আঙিনায়
এভাবে বেঞ্চ পেতে বসেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
গত শনিবার তোলা ছবি l প্রথম আলো
ভেটেরিনারি (পশুরোগবিষয়ক) হাসপাতাল! নাম শুনলেই গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ পোষা প্রাণীর চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের আনাগোনার চিত্র চোখে ভেসে ওঠে। তবে সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় পশু হাসপাতাল নামে পরিচিত জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের চিত্র ভিন্ন। হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীর ঘেরা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কক্ষ, বারান্দায় তাঁদের অবস্থান। প্রতিদিন অফিস সময়সূচির পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চেয়ার, বেঞ্চে বসে চলে হইহুল্লোড়। ব্যবহৃত হয় হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষ।
গত শুক্রবার রাতে এ চিত্র একনজর দেখে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, এভাবে এক দিন-দুদিন নয়, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে পশু হাসপাতালে আস্তানা গেড়েছেন সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের একাংশের নেতা-কর্মীরা। সরকারি হাসপাতালের প্রাঙ্গণ সরকারি দল হিসেবে ব্যবহার চলছে রীতিমতো দলীয় কার্যালয়ের মতো। যেন ছাত্রলীগের ঠিকানা এখানে পশু হাসপাতাল।
নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় ২৩ শতক জায়গার ওপর হাসপাতালটি অবস্থিত। দোতলা ভবনের নিচতলায় রয়েছে ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের চেম্বারসহ হাসপাতাল। অন্যদিকে হাসপাতালের অফিসকক্ষ। দোতলায় হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়কের আবাসন। ভেটেরিনারি চিকিৎসকের চেম্বারগুলো তালাবদ্ধ থাকায় সেখানকার বারান্দা ও আঙিনায় বেঞ্চ ও চেয়ার ফেলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বসেন। অফিসকক্ষ তালাবদ্ধ থাকলেও সেগুলোর তালা ভেঙে কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছে। হাসপাতালে কর্তব্যরতদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে নিজেদের অসহায়ত্বের বিষয়টি প্রকাশ করেন। ‘ছাত্রলীগের ছেলেরা এভাবে থাকলে এটিকে কি আর হাসপাতাল বলা চলে?’ এমন প্রশ্ন তুলে ক্ষোভও প্রকাশ করেন কেউ কেউ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের নতুন কমিটি হয়েছে, এ জন্য প্রথমে এক সপ্তাহ তাঁরা এখানে অবস্থান করবেন বলে জানান। গত ২৯ জুলাই এক সপ্তাহ পর আরও এক মাস থাকতে হবে জানিয়ে নতুন বেঞ্চ এনে হাসপাতালের পশুর শেডে রাখা হয়। এরপর থেকে হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষসহ বিভিন্ন অফিসকক্ষ অবাধে ব্যবহার শুরু হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ছাত্রলীগ ক্যাডার পীযূষকান্তি দেসহ নগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাশ ওরফে অনিকের পক্ষের কর্মীরা হাসপাতালে এভাবে অবস্থান করছেন। পীযূষকান্তি ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতাল থেকে সরতে বললে তাঁরা উল্টো হুমকি-ধমকি দেন। ‘পশু হাসপাতাল তো খালিই পড়ে থাকে। হাসপাতাল সরকারি, আমরাও সরকারি দল—অসুবিধা কী,’ এসব বলে শাসান তাঁরা।
গত শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের অফিসকক্ষের কলাপসিবল ফটক খুলে পীযূষকান্তিসহ ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী বসে আছেন। সম্মেলনকক্ষে কেউ বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার কেউ বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওই দিন জাতীয় শোক দিবস থাকায় বঙ্গবন্ধুর ছবি-সংবলিত বড় একটি ব্যানার হাসপাতালের সাইনবোর্ড আড়াল করে সাঁটানো দেখা গেছে।
ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের মদন মোহন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের একটি পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা পীযূষকান্তি দে। ২০০৩ সালে মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদে ছিলেন তিনি। এরপর তিন দফা নগর কমিটি হলেও পীযূষ কোনো পদে না থেকেও নগর ছাত্রলীগের একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর নগরের তালতলা এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে গিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন পীযূষ। প্রায় এক মাস জেল খেটে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হলেও সম্প্রতি কেন্দ্র ঘোষিত ছাত্রলীগের নগর কমিটিতে তাঁর পক্ষের সজল দাশ সাংগঠনিক পদ পাওয়ায় নিজের পক্ষকে নিয়ে ফের সক্রিয় হন।
পীযূষ পক্ষের কয়েকজন কর্মী জানান, গত ২২ জুলাই সিলেট মহানগর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে চার সদস্যের নাম ঘোষণার পর থেকে পীযূষ দলবল নিয়ে ওই হাসপাতালে অবস্থান করছেন। হাসপাতালটি নিরিবিলি স্থানে ও নগরের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় তাঁরা ব্যবহার করছেন।
গত রোববার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে পীযূষ ও সজল হাসপাতালে অবস্থান করার বিষয়টি স্বীকার করেন। পীযূষের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে অবস্থান করছেন তাঁরা। সরকারি হাসপাতালে অনুমতি নিয়েও কি তাহলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে পীযূষ বলেন, ‘আমরা তো চিরস্থায়ী না, এই একটা মাস থাকব। পরে চলে যাব।’ সজল দাশও একই সুরে বলেন, ‘আমরা হাসপাতালে নয়, বাইরে খোলা আকাশের নিচে বসি। তাতে তো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।’
এ ব্যাপারে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁদের (ছাত্রলীগ) ডেকে বলে দিয়েছি চলে যেতে। বলেছি এটা সরকারি হাসপাতাল, এভাবে থাকতে পারেন না। তাঁরা সময় নিয়েছেন, বলেছেন এক মাস পর চলে যাবেন।’ সরকারি কোনো হাসপাতালের প্রাঙ্গণ এভাবে ব্যবহার করার নজির আছে কি না, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।

আগুন by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ঢাকায় এখন সময় হিসাব করে কেউ রাস্তায় বেরোতে পারে না। সময়টা মানুষ ছেড়ে দিয়েছে দৈবের হাতে। মাঝরাতেও এখন ট্রাফিকের জট লাগে রাস্তায়, আর মানুষের মূল্যবান সময় ছিনতাই হয়ে যায়। কালাম মিয়া এই বিষয়টা হাড়ে হাড়ে টের পান। কালাম সিএনজি স্কুটার চালান, যানজটে পড়লে যাত্রীদের হাহাকার শোনেন, নিজেরও। এক যাত্রী গাছ থেকে পড়ে জখম হওয়া বাচ্চাকে নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালে। যানজটে পড়ে সে শুধু কপাল চাপড়াতে থাকল, ‘আল্লা, দয়া করো, বাচ্চাটারে বাঁচাও।’ আল্লাহ দয়া করেছিলেন, কালাম তাঁর সিএনজি ফুটপাতের ওপর তুলে দিয়ে, তাঁর আদরের বাহনের বডিতে বাচ্চার জখমগুলো তুলে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছলেন। বাচ্চাটা যে বাঁচল, কালামকে সেটি খোঁজ নিয়ে জানতে হয়নি। যে মুহূর্তে বাচ্চাটার বাবা তাকে কোলে তুলে দৌড় দিল ইমারজেন্সির দিকে, কালাম মিয়ার জানা হয়ে গেল।
কীভাবে, জিজ্ঞেস করলেন?
শুনুন। কালাম মিয়া ছেলেটার ঘোলাটে-সাদা চোখ দুটো দেখেছিলেন। সেখানে তিনি একটা ছোট আলোর নাচন দেখেছিলেন। কালাম মানুষের চোখ দেখেন; চোখ দেখাটা তাঁর একটা বড় কাজ বলে মনে করেন। আনন্দ পান—তবে সব চোখ না, মোটেও না। বরং আনন্দের তুলনায় তাঁর ভয়, আতঙ্কটাই বেশি হয়। কিন্তু যেটুকু ছিটেফোঁটা আনন্দ তিনি পান, তাকেই যথেষ্ট মানেন। যেমন আজকে। বৃষ্টির দিন, একটু যেন ধোঁয়াশা চারদিকে। বাস-ট্রাক ধোঁয়া ছড়াচ্ছে, তাতে বৃষ্টির বাষ্প মিশে একটা ফিনফিনে মশারি যেন মেলে দিয়েছে চারদিকে। এ রকম মশারির ভেতর দিয়ে মানুষের চোখ পড়াটা কঠিন হয়। তারপরও পড়ার চেষ্টা করেন তিনি। এই চেষ্টার একটা সময়ে হঠাৎ একটা মেয়ের চোখ দেখে তিনি চমকে উঠলেন। একবার দেখলেন, দুবার—বারবার দেখলেন; এবং যানজটকে, সামনের থেমে থাকা বাহনগুলোকে ধন্যবাদ জানালেন দেখার সময়টা তাঁকে করে দেওয়ার জন্য। মেয়েটা রাস্তার পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে, দৃষ্টি সামনে মেলে। আমি-আপনি দেখলে মেয়েটার মুখে অসহায়তার একটা ছবিই দেখতাম, চোখ দুটোতে জমে থাকা কষ্টের ছায়াটা দেখতাম; এবং আমাদের মনেও কষ্ট জমত। কিন্তু কালাম মিয়া কেন কষ্ট না পেয়ে চমকে উঠলেন? আনন্দও পেলেন—গভীর আনন্দ, যে আনন্দ তিনি একসময় পেতেন দিন শেষে ঘরে ফিরে স্ত্রী নুরুন্নাহারের হাসিভরা চোখ দেখে; যদিও স্ত্রী হঠাৎ এক মাঝরাতে, কোনো ছেলেমেয়ে না রেখে একটা ভিনজগতে চলে গেলেন, যে জগৎ থেকে কেউ কখনো ফিরেছে বলে জানা যায়নি। কিছুদিন থমকে থেকে জীবনের টুকরোগুলো কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে কালাম পথে নামলেন, তাঁকে বাঁচিয়ে দিল মানুষের চোখ দেখার চর্চাটা। কালাম চমকে দেখলেন, মেয়েটার চোখে আগুন। যে আগুন তিনি মানুষের চোখে খোঁজেন, কিন্তু পান না, অথবা কালেভদ্রে পান। কী সেই আগুন, কালাম মিয়াকে জিজ্ঞেস করলে হাসবেন, কিছু বলবেন না। তাঁর হয়ে নাহয় আমরাই বলি: যে আগুন মানুষকে চারদিকের পতন থেকে, হিংসা-অসূয়া থেকে, হতাশা-বিপন্নতা থেকে বাঁচায়। আগুনের ধর্ম ওপরের দিকে লাফিয়ে ওঠা, মানুষের চোখে আগুন থাকলে তাকে ওপরে টেনে তোলে সেই আগুন। মানুষের ধর্ম বলে পুড়ে শুদ্ধ হওয়ার কথা। আগুন মানুষের ধর্মকে শ্রদ্ধা করে। চোখের আগুন মানুষকে বাঁচায় আরও নানাভাবে। তবে সেগুলো সব বলার দরকার নেই। ফুটপাতে দাঁড়ানো মেয়েটির কাছে গেলে সেসব জানা হয়ে যাবে আপনাদের।
২. মেয়েটির নাম জামিলা। শনির আখড়ার ধনু মিয়ার গলিতে একটা আড়াই ঘরের ভাড়া বাড়িতে বাবা, দুই ভাই, সৎমা ও সৎমায়ের আগের সংসারের এক মেয়ের সঙ্গে সে থাকে। জামিলা কলেজ পাস করেছিল যেন আর কোনো জীবনে। তারপর পড়াশোনার পাট চুকে গেছে। এই জীবনে যে আর তার সম্ভাবনা নেই, জামিলা তা জানে। বিয়ের বয়সে পড়েছে সে, কিন্তু বিয়ে দিচ্ছে না বাবা। কারণ, সৎমা কাজ করেন গার্মেন্টসে। জামিলাকে দেখাশোনা করতে হয় তাঁর মেয়েকে, এক ভাইকে। রান্না করতে হয়। কাপড় ধুতে হয়। বড় ভাইটা চাকরি করে এক ফার্নিচার দোকানে, ধনু মিয়ার গলির মোড়ে। এক বছর থেকে তার আচার-আচরণে উগ্রতা দেখা দিয়েছে। জামিলা ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় একটা পা দিলেই সে তাকে মারে। জামিলাকে বাবাও মারেন রান্না মনমতো না হলে, কোনো আবদার ধরলে। অনেক দিন সে অবশ্য কোনো আবদার ধরে না, শেষবার এক ঈদে একটা নতুন জামার জন্য মৃদু একটা আবদার করে মার খাওয়ার পর। সৎমাও এই মার দেওয়ার দলে জুটেছেন কদিন হলো। অবাক কাণ্ড, জামিলার থেকে সাত-আট বছরের মাত্র বড়, অথচ তাকে মারেন; যেন মার দেওয়াটা তাঁর জন্মগত একটা অধিকার। এখন জামিলার দিন কাটে ঘরের কাজে। তার রাত আর দিনের মধ্যে তফাত সামান্যই—রাতটা বেশি অন্ধকার, এটুকুই যা। তাহলে আজ বাইরে বেরোল যে জামিলা, কীভাবে? বড় ভাইটার চোখ ফাঁকি দিয়ে? না, জামিলা বেরিয়েছে বাবার তালাশে। বড় ভাইটাও বেরিয়েছে, কিন্তু তার আগেই হদিস পেয়ে গেছে জামিলা। বাবা সবজি ব্যবসায়ী। মাঝরাতে তাঁর কাজ শুরু। কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি সবজি কিনে পলাশি-ঠাটারি বাজারে সাপ্লাই দেন। দুপুরের পর বাসায় ফেরেন। মেজাজ থাকে চড়া। তাঁর এই ফেরার সময়টাতে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে জামিলা। কিন্তু গতকাল বাবা ঘরে ফেরেননি। বড় ভাইটা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে খেয়ে কাজে চলে গেছে। রাতে যখন ফিরেছে, জামিলাকে অনেক রাগ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছে, ‘আব্বা কই? অহনও আসে নাই ক্যান?’
তার রাগী প্রশ্ন শুনলে আপনার মনে হবে, যেন দোষটা জামিলার, যেন সে বাবাকে লুকিয়ে রেখেছে। রাতে কেউ ঘুমাতে পারেনি। ভোর হতে হতেই বড় ভাই বেরিয়ে গেছে। সৎমাও বেরিয়েছেন, বাচ্চাকে প্রতিবেশী মোমেনা বানুর কাছে রেখে। কড়া গলায় জামিলাকে বলেছেন, ‘বাবারে তালাশ করো।’ জামিলার মা মারা যাওয়ার আগে তাকে তার জীবনের সঞ্চয় বারো শ টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর আশা ছিল মেয়ে পড়াশোনা করবে। সেই টাকা যখের ধনের মতো আগলে-লুকিয়ে রেখেছিল জামিলা। সেখান থেকে এক শ টাকা নিয়ে সে বেরোল। এবং বাড়ির বাইরে পা দিয়ে তার হঠাৎ কেন জানি খুব আনন্দ হলো। হঠাৎ উধাও হওয়া বাবাকে নিয়ে তার একটা উদ্বেগ থাকার কথা ছিল, কিন্তু অবাক, তার কোনো উদ্বেগ হলো না। একা রাস্তায় বেরোনোর আনন্দ, নিজেই নিজের সঙ্গী হয়ে খোলা আকাশের নিচে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে পথ হাঁটার উচ্ছ্বাস তাকে দোলাতে থাকল। কিন্তু ধনু মিয়ার গলিটা শুধু পার হয়েছে, পেছন থেকে একটা শক্ত হাত তার কাঁধে একটা চাপ দিল। জামিলা চমকে ফিরে তাকাল। মিজু মিয়া। বড় ভাই যে ফার্নিচার দোকানে চাকরি করে তার ম্যানেজার। নোংরা লোক। তার চোখ পড়েছে জামিলার ওপর, তাকে সে বিয়ে করতে চায়, একটা বউ থাকা সত্ত্বেও। বড় ভাইটার আপত্তি নেই; সে চায় জামিলা লোকটাকে বিয়ে করুক। তাতে তার নিজের অনেক লাভ। তা ছাড়া লোকটা থাকেও এই গলিতে, ফলে বাবা আর অন্যদের দেখাশোনাও জামিলা করতে পারবে। যদি জামিলার বাবা রাজি হয়ে যেতেন, তার আর কোনো উপায় থাকত না। মেয়েটার ভাগ্য ভালো, বাবা কী কারণে যেন দেখতে পারেন না লোকটাকে। লোকটাও ভয় পায় জামিলার বাবাকে। আজ যখন সেই বাবা উধাও, লোকটার সাহস তো বাড়বেই। এ কারণে সে বসে ছিল জামিলার জন্য। সে জানত, জামিলা বেরোবে বাবার খোঁজে। সাহসটা এমনি বেড়েছে লোকটার যে জামিলার কাঁধেই হাত দিয়ে বসেছে। নোংরা হাত। হাতটা সরিয়ে জামিলা পা বাড়াল। কিন্তু নোংরা হাত বলে কথা। লোকটার এক হাতে একটা ছাতা মেলা। সেটি দিয়ে হঠাৎ সে জামিলাকে আড়াল করে ফেলল। গলিতে সকালে তেমন ভিড় নেই, থাকলেও ছাতার আড়ালে জামিলা আর লোকটাকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগত। ওইটুকু সময়ই যথেষ্ট লোকটার জন্য। তার সচল হাতটা অনেক কিছু করত, কিন্তু একটা চিৎকার দিল জামিলা এবং একটা ধাক্কা দিল লোকটাকে। লোকটা হড়কে গিয়ে পড়ল একটা বন্ধ দোকানের শাটারে। ছাতাটা ছিটকে পড়ল হাত থেকে। সে হতভম্ব হয়ে কী করবে, ভাবার আগেই জামিলা দৌড় দিল। কিন্তু গলি পার হওয়ার আগেই সে একটা গালি শুনল এবং একটা হুংকার। গালিটা ঊহ্যই থাকুক। এটি সভ্য সমাজের জন্য নয়।
৩. একটা বাসে উঠে জামিলা মাথাটা ঠান্ডা করল। মাথা ঠান্ডা করার চর্চাটা সে শিখেছে মায়ের কাছ থেকে। ঠান্ডা মাথায় সে ভাবল। না, বাবার শত্রু নেই, লোকজন তাঁকে পছন্দই করে। তাঁর টাকাপয়সাও তেমন নেই। বেআইনি কিছুও তিনি করেন না। বড় ভাইটা শত্রু-টত্রুর চিন্তা থেকেই খোঁজে নেমেছে। কেন, সে-ই জানে। সৎমা গেছেন এক নারীর খোঁজে, যে তার মতোই টার্গেট করেছিল জামিলার বাবাকে। বাবা দেখতে-শুনতে ভালো। জামিলাও বাবার মতোই। সৎমা জানেন, ওই মেয়েটি শেষমেশ তার কাছে হেরে গেলেও আশা ছাড়েনি, একদিন সে দেখেছে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েটা হেসে কথা বলছে তার স্বামীর সঙ্গে। জামিলাকে মারলেও সৎমা আসলে ভিতু টাইপেরই। স্বামীকে তিনি যথেষ্ট ভয় পান। সে জন্য তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি। জামিলা ভেবেছে, ঢাকা মেডিকেলে খোঁজ নেবে প্রথম। তারপর আরও দু-তিন হাসপাতালে। জামিলা ঠিকই ভেবেছে। ঘণ্টা খানেক খোঁজাখুঁজি করে সে একটা ওয়ার্ডে তার বেহুঁশ বাবাকে আবিষ্কার করল। হাতে-মাথায় ব্যান্ডেজ। এক নার্সের পেছনে কিছুক্ষণ লেগে থেকে জানল, হুঁশ আসার সম্ভাবনা আছে, তবে তার জন্য বাইরে থেকে ওষুধ আনতে হবে। নার্স তাকে জিজ্ঞেস করল, কীভাবে হাসপাতালে ঢুকল সে। এখন তো ঢোকার সময় না। জামিলা দূরে এক ওয়ার্ডবয়কে দেখিয়ে বলল, ‘ওই ভাই ঢুকতে দিছেন।’ বয়ের দিকে তাকিয়ে নার্স বলল, ‘লোকটা বদ। তুমি আমার সঙ্গে চলো।’ নার্স তাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। কিন্তু রাস্তা পর্যন্ত যাওয়া হলো না জামিলার, বদ ওয়ার্ডবয়টা তাকে ধরে ফেলল। হাত থেকে ওষুধের নাম লেখা কাগজটা নিয়ে বলল, ‘এই ওষুধের দাম আট শ টাকার কম না। তোমার পয়সা আছে?’ জামিলা হাত বাড়িয়ে কাগজটা ছিনিয়ে নিল। বয়টা বলল, ‘ওষুধটা আমি তোমারে দিমু।’ জামিলা অবাক হয়ে তাকাল। বয়টা বলল, ‘ওইহানে আমার ঘরত ওষুধ আছে। চলো।’ জামিলা বলল, ‘আপনার ঘরে আপনি যান। গিয়া শুইয়া থাহেন।’ তারপর জোরে পা চালাল সে। বুঝল, তার জন্য শনির আখড়ার ঘরের ভেতরটার সঙ্গে বাইরের জগতের কোনো তফাত নেই। তার চোখ হঠাৎ জলে ভরে গেল। চোখ দুটো পুড়তে থাকল। সেই জলে ভরা পুড়তে থাকা চোখ নিয়ে সে দাঁড়াল বাসস্টপে। কালাম মিয়া যখন তাকে দেখেন, পুড়তে পুড়তে চোখের জল শুকিয়েছে জামিলার। তিনি জামিলার চোখে আগুন দেখলেন। আমরা দেখলে অবশ্য আগুনটা আমাদের চোখে ধরা পড়ত না। কালাম মিয়ার হঠাৎ কী যে হলো, তিনি সিএনজিটা থামালেন। যাত্রীকে বললেন, ‘স্যার, নামতে হবে। একটু সমস্যা হচ্ছে।’ যাত্রী নেমে পয়সা না দিয়ে হাঁটা দিলেন। বাসটা ছাড়লে সিএনজি নিয়ে তার পিছু নিলেন কালাম মিয়া। বাস বদলাল জামিলা। সেই বাসের পেছন পেছনও তিনি গেলেন। জামিলা ধনু মিয়ার গলিতে ঢুকল। তিনিও ঢুকলেন। জামিলাকে আড়াল দিল তাঁর সিএনজি। ফার্নিচার দোকানের ধূর্ত লোকের চোখটাও বুঝল না, জামিলা তাকে ফাঁকি দিল। জামিলার বাসাটা দেখে গেলেন কালাম মিয়া।
৪. মাস খানেক পর জামিলার চোখটা কলাম মিয়ার স্বপ্নে হানা দিল। স্বপ্নেই খুব আনন্দ পেলেন তিনি। কিন্তু কেন জানি তাঁর একটু আতঙ্কও হলো। তাঁর মনে হলো, কোথায় যেন একটা সর্বনাশ ঘাপটি মেরে আছে। সেটি যখন সক্রিয় হবে, একটা ঘূর্ণি হয়ে ছুটবে, সেই ঘূর্ণিতে কি জামিলা পড়বে?
স্বপ্নে তিনি সর্বনাশের ঘূর্ণি দেখলেন। আগুনও দেখলেন। জেগে উঠে ভাবলেন, কিছু একটা করতে হবে। কী করতে হবে, ভাবতে ভাবতে বিকেল হয়ে গেল। বিকেলে তিনি সিএনজি নিয়ে ছুটলেন ধনু মিয়ার গলিতে। যেতে যেতে একটা সাহস এল তাঁর মনে। জামিলা পারবে। সর্বনাশের ঘূর্ণি তাকে টেনে তার গভীরে নিতে পারবে না। দরজায় টোকা পড়লে জামিলার বাবাই খুললেন, ‘কী চাই?’ জানতে চাইলেন তিনি। কালাম মিয়া বিপদে পড়লেন। ‘মেয়েটা আপনার কে?’
‘কোন মেয়েটা?’
কীভাবে বোঝাবেন মেয়েটা কে—ভাবতে ভাবতেই জামিলাকে পেছনে দেখা গেল। হাতে একটা চা-ভর্তি গ্লাস। কালাম মিয়া জামিলাকে আঙুল তুলে দেখালেন।
‘কী চান আপনে? আমার মাইয়ার তালাশ করেন ক্যান?’
জামিলার বাবার একটা হাত এখনো গলায় টানানো গুলতিতে ঝুলছে। অন্য হাতটাও বেশ দুর্বল। সেই দুর্বল হাত তুলেই তিনি তেড়ে গেলেন কালাম মিয়ার দিকে। কালাম মিয়ার মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেল। স্পষ্টতই তিনি ভড়কে গেছেন। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ‘মেয়েডার একটা বিপদ সম্পর্কে জানাইতে আইছি’—বা এ রকম কিছু। কথাটা তিনি শেষ করতে পারলেন না, অর্ধেকটাও শোনাতে পারলেন না। এতে বিপদ যা হলো, এই বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো জামিলার বাবার কানে শোনাল ‘মেয়েডার জন্য একটা সম্পর্ক নিয়া আইছি।’ তাঁর মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। এবার দুর্বল হাতটা দিয়েই ধাক্কা দিলেন কালাম মিয়াকে। কালাম মাটিতে পড়লেন। প্রতিবেশী মোমেনা বানুর স্বামী ছুটে এল। ‘কী অইছে ভাইজান? লোকটা কে?’ সে জিজ্ঞেস করল। ‘হারামজাদা, আমার মাইয়ারে বিয়া করতে চায়।’ জামিলার বাবা বললেন এবং কালাম মিয়ার দিকে তাকিয়ে হুংকার দিলেন, ‘তোর বিয়া করার খায়েশ মিটামু।’ খায়েশ মেটানোর কাজটা অবশ্য মোমেনার স্বামীই শুরু করল। কালাম অবাক চোখে তাকালেন লোকটার দিকে, ‘ভাই, আমারে মারেন কেন? আমি তো মাইয়াডারে...’
এবারও তিনি বাক্যটা শেষ করতে পারলেন না; বরং যা করলেন, তিন-চারজন মানুষের কাছে প্রমাণই করে ফেললেন, তিনি জামিলাকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। মোমেনার স্বামী অবশ্য দু-একটা কিলঘুষি মেরে ছেড়ে দিত। কিন্তু দৃশ্যে এবার ঢুকল ওই ফার্নিচার দোকানের ম্যানেজার মিজু মিয়া। সে দোকান থেকে বাড়ি যাচ্ছিল। জটলা দেখে এগিয়ে এসে শুনল, কালাম মিয়া জামিলার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। শুনেই তার রাগ চড়ল। কালামকে দু-ঘা মেরে জামিলার বাবাকে সে বলল, ‘আমার প্রস্তাবটা তো ভালো লাগল না। এখন এই সব লাফাঙ্গা লোকরে সামলান।’ জামিলা তার বাবাকে বলল, ‘আব্বা, কাজটা ঠিক হইতেছে না। লোকটারে বাঁচান।’ এই ছোট আবদারে বাবার মারের হাত উঠল জামিলার ওপর। মেয়ের গালে চড় মেরে তিনি একটা গালি দিলেন। গালিটা শুনলে সভ্য সমাজের গাল লাল হবে। এবং বললেন, ‘এইটা কইত্থে জুটাইছিস?’ তারপর মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের দরজায় নিয়ে বললেন, ‘এই যে মিজু মিয়া, এই ফকিরটার থাইকা মিজু মিয়াও তো ভালো।’ তাঁর রাগ আকাশ ছুঁয়েছে। কাঁপতে কাঁপতে মিজুকে তিনি বললেন, ‘লাফাঙ্গা সামলানো আমার কাম না। আইও, কাইল আইও। কথা কমু। মুরুব্বি নিয়া আইও।’ ফার্নিচার দোকানের ম্যানেজার মিজু মিয়া নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারল না। তবে সে বুঝল, এটি তার যথাসময়ে যথাপাত্রে বিনিয়োগের ফসল। জামিলার বাবার চিকিৎসার জন্য সে যে যথেষ্ট টাকা দিয়েছে তার ভাইকে, জামিলার বাবা সেটি জানেন। হয়তো তিনি এভাবেই তা ফেরত দিচ্ছেন। মিজু এবার আনন্দে-উৎসাহে কালাম মিয়াকে পেটাতে লাগল। প্রথমে হাত দিয়ে, পরে কালাম মিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়লে, পা দিয়ে। কালাম ভাবলেন, তিনি হয়তো জীবন নিয়ে ফিরতে পারবেন না। তিনি চোখ বন্ধ করলেন, অথবা করতে গেলেন। কারণ, তখনই তিনি দেখলেন জামিলাকে—জামিলার চোখ দুটি। আগুন। তিনি কিছুটা স্বস্তি পেলেন। তারপর চোখ বুজলেন। তখনই ঘটল ঘটনাটা, যা কালাম মিয়া তার স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। জামিলা দরজায় দাঁড়িয়ে তাকিয়েছে মিজু মিয়ার দিকে। মিজু মিয়ার চোখ হাসছে—বিজয়ে, তৃপ্তিতে। কিন্তু সেই হাসিটা থামিয়ে, তৃপ্তি ছারখার করে একটা আগুনের নাচন শুরু হলো তার চারদিকে। প্রথমে সে আগুন জাপটে ধরল তার হাত। তারপর তার ধর্ম মেনে উঠল ওপরের দিকে। উঠতে উঠতে শুধুই পোড়াল তাকে। শেষে চুল খামচে ধরল, মিজু পা হড়কে মাটিতে পড়ল। লোকজন আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে পালাল। মোমেনা বানু এক কলসি পানি ঢাললেন মিজু মিয়ার ওপর। আগুন নিভল। কিন্তু আগুন এবার জামিলার বাবার সামনে কিছুক্ষণ নাচল, তারপর ছুটল মোমেনার স্বামীর দিকে। মোমেনা ঘরে ঢুকে আরেক কলস পানি নিয়ে ছুটলেন স্বামীর পেছন পেছন ছুটতে থাকা আগুনের পেছনে। জামিলা চোখ বন্ধ করল। তারপর কালাম মিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁকে টেনে তুলল। ‘আপনি কে?’ সে জিজ্ঞেস করল। ‘আমার নাম আবুল কালাম মিয়া। আমি সিএনজি চালাই। তোমারে জানাইতে আইছিলাম, মামণি, তোমার চক্ষে আগুন আছে। সেইটা ব্যবহার করো। তোমার দুঃখ থাকব না।’ জামিলা হাসল। ‘না থাকব না,’ আস্তে করে সে বলল, তারপর উঠে ঘরের ভেতর ঢুকল। মিনিট তিনেকের মধ্যে ফিরল সে, হাতে একটা ছোট ব্যাগ। কালাম মিয়া উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে গোছাচ্ছিলেন। জামিলাকে দেখে বললেন, ‘কই যাবা?’
‘জানি না’, সে বলল, ‘আপনার সিএনজি সঙ্গে আছে?’
‘আছে’, কালাম মিয়া বললেন। কালাম মিয়াকে এক হাতে ধরে গলিতে পা রাখল জামিলা। তাড়াহুড়ার জন্য আমরা জামিলার মুখটা দেখতে পেলাম না। কিন্তু কালাম মিয়ার মুখে একটা হালকা ভরসার হাসি দেখতে পেলাম। তবে গলির লোকজনের মতো আমরাও সে হাসিটা পড়তে পারলাম না।

প্রাণহীন বাঘ প্রাণ নিল ভ্যানচালকের

কাত হয়ে পড়ে আছে বাঘ। ছবি: জাহিদুল করিম
রাজধানীর কারওয়ানবাজারে সড়কদ্বীপের ওপর বসানো বাঘের ভাস্কর্য পড়ে মোহম্মদ আলী (৪২) নামের এক রিকশা–ভ্যানচালক মারা গেছেন। আজ শুক্রবার ভোররাত সাড়ে তিনটার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আগে তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ভাস্কর্যটি বসানো হয়েছিল। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এটির দেখভাল করছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মী মো. শহীদের ভাষ্য, বাঘের ভাস্কর্যের পাশে রিকশা–ভ্যানের ওপর চালক মোহম্মদ আলী ঘুমিয়েছিলেন। বাঘের ভাস্কর্যটি ভ্যানের ওপর আচমকা কাত হয়ে পড়ে। এ সময় চালক নিচে চাপা পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসা কর্মকর্তা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর লাশ ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা হয়েছে।
কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সৈয়দ ইমরুল শাহেদের তথ্যমতে, নিহত মোহম্মদ আলীর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। তিনি ঢাকার হাজারীবাগে থাকতেন। ভোররাত সাড়ে তিনটার দিকে বাঘের ভাস্কর্যটি ভ্যানটির ওপর পড়ে। ওই সময় মোহম্মদ আলী পলিথিন মুড়িয়ে ভ্যানে ঘুমিয়ে ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাঘের ভাস্কর্যটি পড়ে যায়।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মোহম্মদ আলীর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে ভাস্কর্যটি সরিয়ে নিতে নেওয়ার জন্য খবর দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রাশেদ চৌধুরী by রাহীদ এজাজ

রাশেদ চৌধুরী,মোসলেম উদ্দিন
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের একজন এ এম রাশেদ চৌধুরীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আরেক খুনি মোসলেম উদ্দিনও যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েও পাননি। আর মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অবস্থানের কারণে নুর চৌধুরীকে বাংলাদেশের কাছে ফেরত দেবে না কানাডা।
আত্মস্বীকৃত ছয় খুনির অপর তিনজন খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম ও আবদুল মাজেদ কোথায় আছেন, তা সরকার জানে না। এ পরিস্থিতিতে পলাতক ছয় খুনিকে দেশে ফেরানোর আশা ক্রমেই ফিকে হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চান তিনি। জবাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন রাশেদ চৌধুরী। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলেও আমরা রাশেদ চৌধুরীকে ফেরানোর জন্য আবেদন জানাতে পারি। রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিলের দাবি জানাতে পারি। এ জন্য আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।’
আগে কেন আবেদন জানানো হয়নি, জানতে চাইলে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘বিষয়টি আমরা আগে পরিষ্কারভাবে জানতাম না। তবে আগেও আবেদন জানানো হয়েছিল। সে উদ্যোগ সফল হয়নি বলে আমরা নতুন করে উদ্যোগী হয়েছি। মার্কিন রাষ্ট্রদূত এ ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এ জন্য তিনি কিছু তথ্য চেয়েছেন। আমরা তাঁদের সেগুলো দেব।’
জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাশেদ চৌধুরীর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের বিষয়টি এই প্রথম শুনলাম। কারণ, রাষ্ট্রদূত থাকার সময় আমি তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো পর্যায়ের রাজনৈতিক আলোচনায় খুব স্বাভাবিকভাবেই রাশেদ চৌধুরীর প্রসঙ্গ আসত। তবে সব সময় দেশটি এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও রাশেদ চৌধুরীর ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি।’ তিনি বলেন, মার্কিন ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী এ ধরনের কোনো মর্যাদা পাওয়ার বিষয়ে তথ্য জানাতে নিষেধ আছে।
ছয় খুনির দেশে ফেরা অনিশ্চিত হলেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল দাবি করেছেন, এ সরকারের মেয়াদেই অন্তত একজনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তবে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফেরানো বিষয়ক টাস্কফোর্সের সভাপতি ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা জানান।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে রাশেদ চৌধুরী এখন ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের আরেকজন মোসলেম উদ্দিনও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। সর্বশেষ তিনি ভারতে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন তরেন, তা খারিজ হওয়ার পর তিনি সেখানে থাকার জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোন অঙ্গরাজ্যে আছেন, তা জানা যায়নি।
নুর চৌধুরীসহ পালিয়ে থাকা অন্য খুনিদের দেশে ফেরানোর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে নুর চৌধুরীর আবেদনের বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি। কানাডার আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে নিজের দেশে ফেরত পাঠানো হয় না। এরপরও ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
শাহরিয়ার আলম স্বীকার করেন, অন্য তিন খুনি শরিফুল হক ডালিম, আবদুর রশিদ ও আবদুল মাজেদের অবস্থানের ব্যাপারে সরকারের কাছে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।

যন্ত্রণা এখনো সঙ্গী by আনোয়ার হোসেন

‘আজাদ ছিল বেশ আমোদপ্রিয়। এ জন্য আমাদের বিয়েটা হয়েছিল ১৯৯৫ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইটে। এক মেয়ে ও এক ছেলে এল সংসারে। আনন্দেই দিন কাটছিল। কিন্তু এক বিকেলেই সব অন্ধকার হয়ে গেল। এখন আছে কেবল স্মৃতি, আজাদের ক্ষতবিক্ষত দেহের ছবি আর রক্তমাখা জামা।’
কথাগুলো মাকসুদা আজাদের। কান্না থামিয়ে দিল তাঁর কথা। পাশে বসা শাশুড়ি আনোয়ারা বেগম, মেয়ে মাহফুজা আজাদ ও ছেলে আল আমিন আজাদও কান্না চেপে রাখতে পারল না। স্মৃতি মনে করে তাঁর জন্য তিন প্রজন্মের অঝোর কান্না।
আজাদের পুরো নাম আবুল কালাম আজাদ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলায় নিহত ২২ জনের একজন তৎকালীন ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। নিহত অন্যদের মতো তাঁর স্বজনেরাও প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক-ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছেন, আঁকড়ে আছেন স্মৃতি। আর ওই হামলায় আহত অনেক নেতা-কর্মীর এখনো সঙ্গী দুঃসহ যন্ত্রণা। কারও পা অচল, কেউ হারিয়েছেন চোখ, কেউ শ্রবণশক্তি। ওই হামলায় আহত হয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।
নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও আহত কয়েকজন বলেছেন, ওই গ্রেনেড হামলায় আহত ব্যক্তিদের আওয়ামী লীগ থেকে চিকিৎসা খরচসহ এককালীন ও মাসিক ভাতা দেওয়া ছাড়াও চিকিৎসা করানো হয়। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের ও আহত ব্যক্তিদের ১০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র দেন। এ থেকে মাসে ১০ হাজার ৭০০ টাকা আসে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে দেওয়া হয় মাসে পাঁচ হাজার টাকা। নিহত কয়েকজনের স্বজন বললেন, সরকার একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিলে সবচেয়ে উপকার হয়।
সেই দিনের কথা: আজাদের মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকে বালুঘাটের বারানটেকে। মিরপুর উড়ালসড়ক দিয়ে মানিকদী গিয়ে ভাঙা সড়ক ধরে এগোলে বালুঘাট বাজার, সেখান থেকে বেশ কিছুটা গেলে বারানটেকে আজাদদের বাড়ি। গত বুধবার ওই বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়ে আজাদের মা বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম ছেলের বাঁধানো একটা ছবিতে পরম মমতায় হাত বোলাচ্ছেন। ছেলের কথা জানতে চাইলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। একপর্যায়ে বলেন, ‘ওই দিন যে জামাকাপড় পরে আজাদ সমাবেশে গিয়েছিল, সেগুলো যত্ন করে রেখেছি। এগুলোতে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র। স্প্লিন্টারগুলো ঢোকার সময় কত কষ্টই না পেয়েছে আমার সোনার চান।’ স্বামীর ভিটায় একতলা বাড়ির একাংশে তিনি আজাদের বিধবা স্ত্রী মাকসুদা ও দুই সন্তান মাহফুজা ও আল আমিনকে নিয়ে থাকেন। আনোয়ারার আরও তিন ছেলে ও দুই মেয়ে আছে।
বাবাকে হারানোর সময় মাহফুজার বয়স ছিল পাঁচ বছর, আল আমিনের দুই বছর। মাহফুজা এখন বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী। ২০০৪ সালের ওই দিনটি সম্পর্কে সে প্রথম আলোকে বলে, ‘আমি তখন মানিকদী গ্রিন হ্যাভেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে নার্সারিতে পড়ি। স্কুল শেষে বেরিয়ে দেখি, বাবা ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে গেটে অপেক্ষা করছেন। বাসায় আসার পথে বাবা আমাকে একটা পুতুল কিনে দেন। এটাই বাবার দেওয়া শেষ উপহার।’ বলতে বলতে ফুঁপিয়ে ওঠে মাহফুজা।
মাকসুদা বলেন, ‘সেদিন সন্ধ্যার দিকে টিভিতে দেখি আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা হামলা হয়েছে। তখনই মনটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। আজাদ তো আওয়ামী লীগের সমাবেশ মিস করে না। শাশুড়িকে বললাম পাড়ায় খোঁজ নেন। অনেকে জানাল, আজাদ সমাবেশে গেছেন। সর্বনাশ হয়ে গেছে ভেবে আমি প্রায় অজ্ঞান। এরপর তো ঘটেই গেল।’
গ্রেনেড হামলার পর আজাদ হতাহত অসংখ্য মানুষের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ভেবে তাঁকে মর্গে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় নড়ে ওঠেন। তখন ওই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। খবর পেয়ে ছুটে যান স্বজনেরা। পরে তাঁকে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নেওয়া হয়। চোখ খোলা থাকলেও ছিলেন নির্বাক, অচেতন। ওই অবস্থায় বেঁচে ছিলেন ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। স্বজনেরা গ্রেনেডে ক্ষতবিক্ষত দেহটা দেখেছেন, কিন্তু কথা বলতে পারেননি।
আজাদের স্ত্রী বলেন, ‘দল (আওয়ামী লীগ) ও শেখ হাসিনা আর্থিক সহায়তা করেছেন। অবস্থার সামান্য উন্নতি হলে আজাদকে উন্নত চিকিৎসা করানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উন্নতি হয়নি। আসলে আমার ভাগ্যই খারাপ। সবার সহানুভূতিই পাচ্ছি। কিন্তু স্বামীকে তো পাচ্ছি না। সন্তানেরা বাবা ডাকতে পারছে না।’
বিয়েবার্ষিকী করা হয়নি আইরিনের: মোস্তাক আহমেদ (সেন্টু) ও আইরিন সুলতানার বিয়েবার্ষিকী ২২ আগস্ট। ঘরোয়া হলেও প্রতিবছরই দিনটি পালন করতেন এই দম্পতি। ২০০৪ সালেও কিছু প্রস্তুতি ছিল তাঁদের। কিন্তু ২১ আগস্টের বিকেলেই সব শেষ হয়ে যায়। গ্রেনেড কেড়ে নেয় স্বামীকে।
আইরিন বলেন, ‘সাত বছরের সংসার। রাত ১২টার পর বিয়েবার্ষিকী। ঘটনার দিন বিকেলেও আমাকে বলে গেল, তুমি প্রস্তুতি নিয়ে রেখো। আমি আগে আগেই বাসায় আসব। কিন্তু তাঁর আর আসা হলো না। বিয়েবার্ষিকী আর স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকী এখন একাকার।’ তিনি বললেন, মোস্তাক আহমেদ ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করতেন। ২০০৪ সালের ১৫ আগস্ট গ্রামের বাড়ি বরিশালে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে ২০ আগস্ট ঢাকায় ফিরেছিলেন। ২১ আগস্ট দুপুরের পরই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে যোগ দেন।
আইরিন বলেন, গ্রেনেড হামলা হওয়ার পর তিনি স্বামীর খোঁজে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে যান। সেখানে না পেয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করেন। এরপর খবর পান, পঙ্গু হাসপাতালে আছেন। কিন্তু মারা গেছেন তা জানতেন না। রাত নয়টায় পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে জেনেই জ্ঞান হারান।
মোস্তাক ও আইরিন দম্পতির একমাত্র সন্তান আফসানা আহমেদ। চার বছর বয়সেই বাবাকে হারানো আফসানা এখন আইডিয়াল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।
আইরিন আহমেদ বলেন, ‘মেয়েটা এখন সবই বোঝে। তবে সেদিনের স্মৃতি মনে করতে পারে না। আমরাও তাকে মনে করাই না। কারণ, আমাদের মনে যে ব্যথা, সেটা তার মধ্যে সংক্রমিত হোক তা চাই না।’
মোস্তাক আহমেদের মা অন্য ছেলেদের সঙ্গে থাকেন। আইরিন মেয়েকে নিয়ে থাকেন তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে। স্বামীর মৃত্যুর পর আইরিন মার্কেন্টাইল ব্যাংকে চাকরি পেয়েছেন।
দৌলতুন্নাহার অনেকটা ঘরবন্দী: ওই গ্রেনেডে হামলায় বাঁ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন দৌলতুন্নাহার। পা দুটিতে অসংখ্য স্প্লিন্টারের দাগ, দুটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। তাঁর সঙ্গে কথা হয় পল্লবীর বাসায়। একেবারে অচল হয়ে যাননি। তবে অনেকটাই ঘরের মধ্যে বন্দী। তিনি বললেন, গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বাঁ চোখে লাগার পরই তিনি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনের ড্রেনে পড়ে যান। এরপর আর কিছু মনে নেই। লাশের সঙ্গে তাঁকে মর্গে ফেলে রাখা হয়েছিল। মর্গ থেকে তাঁকে খুঁজে বের করেন এক স্বজন। বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করান। পরে দলীয়ভাবে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়।
দৌলতুন্নাহার বলেন, ‘প্রাণে বেঁচে গেলেও জীবন বলতে যা বোঝায় তা নেই। মাস ছয়েক আগে অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা উঠেছিল। কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার পর চিকিৎসক অস্ত্রোপচারে রাজি হচ্ছিলেন না। কারণ, সারা শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার। অস্ত্রোপচার করতে গেলে যদি কোনো বিপত্তি বাধে। যা-ই ঘটুক এর দায় আমার—এ নিশ্চয়তা পেয়ে পরে চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেন।’
দৌলতুন্নাহার বলেন, ‘রাতে যখন স্প্লিন্টারের জন্য ব্যথা শুরু হয়, তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। হাত, পা, মাথা সর্বত্রই ব্যথা হয়। পুরো শরীরই যেন অবশ হয়ে পড়ে।’
শরীফের ব্যবসায় ভাটা: গেন্ডারিয়ার ধুপখোলা মাঠের পাশে হার্ডওয়্যার ও মেশিনারির কারখানা আছে শরীফ হোসেনের। নিজেই এসব তৈরি করে বিক্রি করেন। গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার আগে ব্যবসা ভালোই ছিল। আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী শরীফ দলের অন্য মিছিল-সমাবেশের মতো ২০০৪ সালের ২১ আগস্টও যোগ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে। কিন্তু সেদিনের গ্রেনেড হামলায় তাঁর শ্রবণশক্তি প্রায় চলে গেছে। পা দুটিও গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। কোনোরকমে চলাফেরা করতে পারেন।
বর্তমানে ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শরীফ বলেন, প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়, পরে নেওয়া হয় পঙ্গু হাসপাতালে। এরপর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে। তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্মচারী দিয়ে ব্যবসা চালিয়েছেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে নিজে যখন ব্যবসার হাল ধরতে গেলেন, তখন আর আগের অবস্থা নেই। কোনোমতে ব্যবসা টিকে ছিল। এখনো চলছে কোনোমতে। অর্ডার পেলে কিছু কিছু মালামাল সরবরাহ করেন। তাঁর দুই মেয়ে সম্মানের ছাত্রী, ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

শিশু ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে সুশীল সমাজ ও করপোরেট খাতের ভূমিকা

২ জুলাই ২০১৫, প্রথম আলোর আয়োজনে ‘শিশু ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে সুশীল সমাজ ও করপোরেট খাতের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো।
আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুম: ভিক্ষাবৃত্তি সমাজের অভিশাপ। একটি শিশুর শৈশবকাল ভিক্ষাবৃত্তিতে অতিবাহিত হতে পারে না। আমাদের কারোর এটা কাম্য নয়। এটি মানবাধিকার ও শিশু অধিকারের লঙ্ঘন। দেশ ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে। অথচ সমাজের অসংখ্য শিশু ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করছে। শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি এখনই বন্ধ হওয়া উচিত।
তবে কেবল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এককভাবে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। পেশাজীবী, সুশীল সমাজ, নীতিনির্ধারক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ সবার সম্মিলিত প্রয়াসই কেবল এই অমানবিক ভিক্ষাবৃত্তি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে পারে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র একটি মানবাধিকার সংস্থা। তারা এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। আমাদের সবার উদ্দেশ্য সমাজ থেকে যেন শিশু ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন হয়। এখন এ বিষয়ে আলোচনা করবেন সুলতানা কামাল।
সুলতানা কামাল
সুলতানা কামাল
শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আমরা কেউ চাই না এরা ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করুক। িশশু ভিক্ষাবৃত্তি কারোরই পেশা হতে পারে না। এই কাজ যখন শিশু বয়স থেকে শুরু হয়, তখন আমরা বুঝতে পারি সমাজে শিশুদের প্রতি কত অবহেলা। এ বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। রাষ্ট্রের একার পক্ষে এটা হয়তো সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কাজ করতে হবে। অনেক সময় ভিক্ষাবৃত্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমস্যার সঙ্গে তুলনা করা হয়। পুলিশ দিয়ে এদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। হয়তো কোথাও আটকে রাখা হয়, অথবা কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
এখানে দেখতে হবে, কেন তারা ভিক্ষা করছে। তাদের কী সমস্যা। কে তাদের এই পথে আনছে। এসব সমস্যা না দেখে অন্যভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। ফলে এই চেষ্টা কাজে আসছে না।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র একটা মানবাধিকার সংগঠন। অনেক দিন ধরে আমরা শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তির বিষয়ে কাজ করছি। আমরা দেখেছি, অসংখ্য শিশু ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। দারিদ্র৵, নির্যাতনসহ ভিক্ষাবৃত্তির হয়তো বিভিন্ন কারণ রয়েছে। অনেক সময় সংঘবদ্ধ চক্রের কথা শুনে থাকি। বিভিন্নভাবে এরা শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করে।
শিশুসহ কেউ ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ করে না। তারপরও তাকে কেন এটা করতে হয়? এ বিষয়ে সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। সমাজ থেকে শিশু ভিক্ষাবৃত্তি দূর করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। শিশুরা সমাজের অনিয়ম ও বৈষম্যের শিকার। শিশুদের মানসিকভাবে বিকাশের সুযোগের বৈষম্য রয়েছে। দেশে লাখ লাখ কর্মজীবী শিশু রয়েছে। তাদের ৫৫ শতাংশ শুধু ঢাকা শহরে কাজ করে।
কর্মজীবী শিশুদের ৯ শতাংশ ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত; বাংলাদেশের জনসংখ্যার হিসাবে একটি বড় অংশ। তাই এ বিষয়ে আমাদের সবাইকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
গীতা চক্রবর্তী
গীতা চক্রবর্তী
২০১৩ সাল থেকে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত শিশুদের নিয়ে কাজ করছি। দেশের উন্নয়ন সত্ত্বেও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কিন্তু একেবারে কমে যায়নি। এক হিসাবে দেখা যায়, এখনো বাংলাদেশের ৬ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র৵সীমার মধ্যে বাস করে। তাদের অনেকেই উপায়হীন হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে আসে। তারা ভিক্ষাবৃত্তিকে একটি সহজ পেশা মনে করে।
আমরা জাতিতে একটু বেশি আবেগপ্রবণ। একজন শিশু যখন কারও কাছে ভিক্ষা চায়, তখন আমরা অনেকেই তাকে সহানুভূতি থেকে ভিক্ষা দিই। অনেক দরিদ্র মা-বাবা শিশুদের সঙ্গে নিয়ে ভিক্ষা করে। কারণ, বড়দের থেকে মানুষ শিশুদের বেশি ভিক্ষা দেয়। এভাবে আমরা অনেকে হয়তো ভিক্ষাকে উৎসাহিত করছি। অনেকে শিশুদের ভাড়া করে এনেও ভিক্ষাবৃত্তির কাজ করায় বলে জানি। আবার যারা প্রতিবন্ধী, তারা পরিবার ও সমাজে অবহেলিত। তাদের জীবনধারণ অনেক কষ্টকর। অবশেষে তারা ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিতে বাধ্য হয়।
আমরা সুস্থ মানুষকে ভিক্ষা দিতে চাই না। কিন্তু প্রতিবন্ধী হলে আমরা ভিক্ষা দিই। এভাবেও ভিক্ষাকে উৎসাহিত করছি।
অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ও সংঘবদ্ধ চক্র কিছু মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তিতে পরিচালিত করে থাকে বলে আমরা জানি। ভিক্ষাবৃত্তির কারণ যা-ই হোক না কেন, এটা কোনোভাবেই একজন মানুষের পেশা হতে পারে না। মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে কোনোভাবেই আমরা এটা মেনে নিতে পরি না।
ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন কনভেনশনেও ভিক্ষাবৃত্তিকে কোনোভাবে সমর্থন করা হয়নি। আমাদের নিজস্ব এক অনানুষ্ঠানিক জরিপে দেখা গেছে, ২০০ জন ভিক্ষুক শিশুর মধ্যে ১৮৩ জনের বয়স ১০ বছরের নিচে। আমরা অবাক হয়েছি যে এত ছোট বয়স থেকে একজন শিশুকে ভিক্ষা করতে হচ্ছে! এদের মধ্যে চারজন বলেছে, তারা ইচ্ছা করে ভিক্ষা করে। অন্যরা বলেছে, কেন ভিক্ষা করছে তারা তা জানে না। অর্থাৎ, কেউ না কেউ তাকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করছে। এরা প্রতিদিন ৫০ থেকে ২০০ টাকা করে পায়।
আমরা এসব শিশুকে সৃজনশীল ও দক্ষতামূলক শিক্ষার আওতায় এনেছি। এক বছরের একটা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পর তাদের প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ করে দিই। এ জন্য তাদের মা-বাবাকে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। আমাদের সাইকো সোশ্যাল কাউন্সেলর মা-বাবাকে বোঝান, ভিক্ষাবৃত্তি সম্মানজনক পেশা নয়। তাই মা–বাবাকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় এনেছি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র শিশু ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে একটি অবস্থানপত্র তৈরি করে, যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রদান করা হয়। ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের জন্য কমিউনিটি দায়িত্ব নিতে পারে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করতে হবে। শিশু ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
নিশাত ফাতেমা রহমান
নিশাত ফাতেমা রহমান
পথশিশু যারা ভিক্ষা করে, অনেককেই লক্ষ করা যায়, তাদের কোনো নড়াচড়া নেই, শুধু শুয়ে আছে। জন্মের প্রথম তিন বছর শিশুদের বিকাশ সবচেয়ে বেশি হয়। আমার মনে হয়, তাদের ঘুমের বড়ি খাইয়ে বা অন্য কোনোভাবে অচেতন করে রাখা হয়। চারপাশের এত শব্দের মধ্যে তাদের ঘুমিয়ে থাকার কথা না। যে সময় তারা পরিবেশকে জানবে, সবকিছু দেখবে, শেখার চেষ্টা করবে, এই গুরুত্বপূর্ণ সময় তো তাদের ঘুমিয়ে কাটতে পারে না।
ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানের রাস্তায় এ দৃশ্য দেখা যায়। এদের বয়স যখন পাঁচ–ছয় বছর হচ্ছে, তখন এরা যৌন বিষয়গুলো জেনে যাচ্ছে। খুব ছোটবেলা থেকেই এসব শিশু মাদকে আসক্ত হয়। অর্থাৎ, এদের জীবনের ধরনটাই বদলে যায়। প্রতিনিয়ত পথেঘাটে যৌন হয়রানির শিকার হয়। এদের মানসিক–শরীরিক সব ধরনের বিকাশ প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে এদের তেমন কোনো বুদ্ধিবিবেচনার বোধ থাকে না। তারা জানে না অন্য মানুষের সঙ্গে তাদের আচরণ কী হবে, চলাফেরা কী হবে। এরা সমাজিকভাবে কারও সঙ্গে থাকতে পারে না। আচার–আচরণ, চলাফেরা করতে পারে না। ফলে বিভিন্ন মানুষ এদের মাদকসহ অনেক ধরনের খারাপ কাজে ব্যবহার করে। বস্তি এলাকার ২০ শতাংশ শিশু হারিয়ে যায়। এসব শিশু খুবই অরক্ষিত অবস্থায় চলাফেরা করে। ঘুম থেকে উঠেই এরা রাস্তায় চলে আসে।
এ শিশুগুলো আসলে কোথায় যায়? এরা কখনো চুরি হয়, বিক্রি হয় অথবা হারিয়ে যায়। আমরা একবার খোঁজাখুঁজি করে মহাখালীর একটা শিশুকে পেলাম মোহাম্মদপুরে। এসব ক্ষেত্রে মা-বাবা একেবারেই সচেতন না। এ জন্য আমরা বস্তি এলাকায় ৩০টি ডে কেয়ার সেন্টার করেছি।
দারিদ্র৵ এমনভাবে তাদের বিপর্যস্ত করে যে তারা কোনো কিছু ঠিকভাবে করতে পারে না। মা-বাবাকে তাদের শিশুদের দেখে রাখার কথা বললে তারা বলে, ‘খাবার জোগাড় করব, নাকি শিশুদের দেখে রাখব?’ ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন করতে হলে এসব শিশুর মা–বাবাকে বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।
মাহবুবা নাসরীন
মাহবুবা নাসরীন
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উপস্থাপনা থেকেই বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা গেছে। এ নিয়ে অনেক গবেষণা আছে। জাতিসংঘের একটা প্রতিবেদন করার জন্য পথশিশুসহ এদের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরাও এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে। ঢাকা মহানগরের পথশিশুর ভিক্ষুক কত, এদের কোনো পরিসংখ্যান নেই।
এক হিসাব থেকে জানা যায়, ঢাকা মহানগরের ৪ লাখ ৫০ হাজার পথশিশু আছে। এদের মধ্যে ১০ শতাংশ সরাসরি যৌনকর্ম ও ৯ শতাংশ ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। ছেলেশিশুরা একটু বড় হলেই বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় চলে যায়। মেয়েশিশুদের বাল্যবিবাহ হয়। অনেকে বাসাবাড়িতে কাজ করে।
অধিকাংশ পথশিশুর অভিভাবক আছে। এ জন্য এদের কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে গেলে অভিভাবক ও শিশুরা উভয়ই চিৎকার–কান্নাকাটি করে। পথশিশুদের ৭০ শতাংশের বেশি অভিভাবকদের সঙ্গে থাকে।
সত্যিকার অর্থে অভিভাবকদের স্বাবলম্বী করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে এ কাজ করছে না। কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতাকে এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর মনে করছি না। এখানে বিনিয়োগের প্রয়োজন। এটাকে একটা বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
আজ বিদেশিরা কিছু এলাকায় সভা করতে চায় না। কারণ, পথশিশুরা তাদের পোশাক ধরে টানাটানি করে। বিদেশিরা এটা বলেও থাকে। পথশিশুদের জন্য পর্যটনশিল্পের ওপরও প্রভাব পড়ে। অনেক সময় বিদেশিরা পর্যটনে নিরুৎসাহিত হয়। এটা বিদেশি বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব ফেলে। যে দেশে শিশুশ্রম বেশি, সেখানে বিদেশিরা বিনিয়োগ করতে চায় না।
মানুষ কেন শহরে এসে উদ্বাস্তু হচ্ছে, সেটাও খুঁজে দেখতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিল খুব কম। তারপর এগুলো প্রকল্পভিত্তিক। যেকোনো সময় প্রকল্প বন্ধ হতে পারে। তাই সত্যিকার বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে সমাজের মূলধারায় পুনর্বাসিত করতে হবে। এসব শিশুকে শিক্ষা, বিনোদন, খেলাধুলাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
ফারুক মঈনউদ্দীন
ফারুক মঈনউদ্দীন
২০১০ সালে কামরাঙ্গীরচরে একটি শিশুকে অঙ্গহানি করে ভিক্ষাবৃত্তিতে আনা হয়েছিল। ভিক্ষাবৃত্তি রোধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—২০১১ সালে উচ্চ আদালতের এমন একটি নির্দেশ ছিল। চার বছর পরও এ বিষয়ে আর কিছু জানতে পারিনি। ৫৩৫টি প্রতিষ্ঠানে সিএসআর (কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা) বাজেট আছে। সিএসআরের মধ্যে অনেক ফাঁকি আছে। ব্যাংককে সবাই সিএসআরের সহজ উৎস মনে করে। কারণ, ব্যাংকের লাভ সবাই দেখতে পায়। আয়করের কাঠামোতে সত্যিকার অর্থে সিএসআরের ওপর আয়কর রেয়াত পাওয়া যায় না। আয়কর রেয়াতের সুবিধা পেলে ব্যাংকগুলো সিএসআরে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হবে। সিএসআর দিয়ে কেন ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন করতে হবে? ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের কাজটি করতে হবে বিনিয়োগের মাধ্যমে। এটি হবে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ। যেমন প্রথম আলো অদম্য মেধাবীদের সহযোগিতা দিয়ে থাকে। এদের মধ্য থেকে একসময় অনেক বড় মানুষ, বড় নেতা বেরিয়ে আসবে। তাই কাজগুলোকে বিনিয়োগের আওতায় আনতে হবে।
আমরা যশোরসহ শিশুদের কয়েকটি পুনর্বাসনকেন্দ্রে সহযোগিতা দিয়ে থাকি। তবে সিএসআরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্র৵ান্ডিংয়ের বিষয়টি থাকে বলে সিএসআর কতটা কার্যকর হয়, সেটি নিয়ে হয়তো প্রশ্ন করা যেতে পারে। আমি মনে করি, কাজটি আন্তরিকতার সঙ্গে করতে পারলে নিশ্চয়ই একটি জনগোষ্ঠীর কল্যাণ হবে।
শাগুফা আনোয়ার
শাগুফা আনোয়ার
চলার পথে প্রতিনিয়ত আমরা ভিক্ষুক দেখি। মাঝেমধ্যে বিরক্ত হই। কখনো গাড়ির জানালার কাচ টেনে দিতে হয়। আবার কিছু ভিক্ষুক দেখে মনে হয়, তারা এটাকে ইচ্ছে করে পেশা হিসেবে নিয়েছে। এদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হবে না।
সমাজ থেকে যদি ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন করতে হয়, তাহলে তিন–চার বছরের একটি পরিকল্পনা করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে করলে এ ক্ষেত্রে সফলতা আসবে না। কাজটি পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। অনেক কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা আছে। সব সংস্থার প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংগঠন করতে হবে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের দিক থেকে কাজ করবে।
সমন্বিতভাবে কাজটি করতে হবে। যেমন আমি স্বাস্থ্যগত বিষয়টি দেখতে পারি। সিটি করপোরেশন এদের স্কুলে ভর্তির দায়িত্ব নিতে পারে। একজন দিবাসেবার বিষয়টি দেখতে পারে। সব ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সিটি করপোরেশন ওয়ার্ডভিত্তিক ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের উদ্যোগ নিতে পারে। একটি ওয়ার্ডের দায়িত্ব ওয়ার্ড কমিশনারসহ ওই ওয়ার্ডের সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি নিতে পারেন। তাঁরা শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করবে।
িসটি করপোরেশন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়—এ দুটি সংস্থা আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলে ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন করা কঠিন হবে না। আবার যারা সহযোগিতা করবে, তারাও যদি কিছুটা খোঁজখবর নেয় যে তাদের অর্থ কোনো ভালো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তাহলে আরও কেউ যদি তাদের প্রতিষ্ঠানের ব্র৵ান্ডিংয়ের জন্য সহযোগিতা করে, তাতে দোষের কিছু নেই।
পৃথিবীর কোনো মা–বাবা চাইতে পারেন না তাঁদের সন্তান ভিক্ষা করুক। অতএব, আমরা যদি ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত শিশুদের মা-বাবাকে ঠিকভাবে বোঝাতে পারি, তাহলে অবশ্যই তাঁরা সন্তানদের মানুষ করার জন্য এগিয়ে আসবেন। তবে এসব ক্ষেত্রে সবার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করা জরুরি।
আক্তার বাবু
আক্তার বাবু
ভিক্ষুকদের বিভিন্ন শ্রেণি বিভাগ রয়েছে। কিছু আছে পেশাদার ভিক্ষুক। আবার কিছু মৌসুমি ভিক্ষুক। আর সংঘবদ্ধ চক্র কিছু মানুষকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করে। জানার চেষ্টা করেছিলাম, কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। অনেকে বলেছেন, এদের এতিমখানায় দেওয়া যেতে পারে। এখানে তাদের অন্ন–বস্ত্রের জন্য সহযোগিতা দেওয়া যেতে পারে। আসলে এটা কোনো সমাধান হতে পারে না। এতিমখানা একটা নির্দিষ্ট সময় পর এদের বের করে দেয়। এদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা–দীক্ষা খুব একটা হয় না। সিএসআরের ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এখানে ৫৩৫টি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে, যারা সিএসআর করতে পারে। মনে করি, যে কেউ সিএসআর করতে পারে। এটা আরও বেশি ফলপ্রসূ সিএসআর হতে পারে—যেমন কেউ দুজন শিশু বা অন্তত একজন শিশুরও দায়িত্ব নিতে পারেন।
তিনি এসব শিশুর থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, সবশেষে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। সমাজে এখন অগণিত বিত্তবান মানুষ আছেন। তাঁরা এভাবে দায়িত্ব নিতে পারেন। তাহলে প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায়, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সমাজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন হবে।
যেকোনো পণ্য উৎপাদন কোম্পানি ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শিশুদের কল্যাণে যুক্ত হতে পারে। যেমন তারা যেকোনো পণ্যের মূল্যের প্যাকেটে লিখে দিতে পারে যে এই মূল্যের একটা নির্দিষ্ট অংশ ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শিশুদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। এভাবেও তারা সিএসআর হতে পারে। এ ব্যাপারে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি।
টেলিকম কোম্পানিগুলোর বাজেট অনেক বিশাল। তারা ক্ষুদ্র একটা অংশ শিশুদের কল্যাণে ব্যয় করলে শিশুদের সাফল্যজনকভাবে পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কোনো গঠনমূলক প্রস্তাব নিয়ে হয়তো আমরা যেতে পারছি না। কোনো কল্যাণকর প্রস্তাব ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারলে অনেকেই সাড়া দেবে বলে মনে করি।
শাবনাজ জেহরীন
শাবনাজ জেহরীন
আমরা দেশের সব শিশুর সমান অধিকারের বিষয়ে গুরুত্ব দিই। ১৮ বছর পর্যন্ত সবই শিশু। সবার অধিকার সমান। ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শিশুদের জন্মনিবন্ধন নেই। এরা দেশের নাগরিক কি না, এটা বোঝা কষ্টকর হয়। দেশে আইন আছে, জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে প্রত্যেক শিশুকে জন্মনিবন্ধন করাতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মা-বাবা, নীতিনির্ধারক, প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের প্রত্যেক ওয়ার্ড কমিশনার গুরুত্ব দেবেন তাঁর ওয়ার্ডের শিশুদের জন্মনিবন্ধন হচ্ছে কি না। বাল্যবিবাহ, শিশু অপরাধ—এসব ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা শিশু জন্মের পর প্রথম অধিকার হচ্ছে তার জন্মনিবন্ধন। এ ক্ষেত্রে শহরের বস্তিগুলো ধরে এগোতে হবে। কারণ, বস্তির শিশুরা বেশি ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত। আমাদের এক অভ্যন্তরীণ জরিপে দেখেছি, ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সের ছেলেশিশুরা বেশি ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত।
মা-বাবা মনে করেন, ভিক্ষাবৃত্তি আয়ের সবচেয়ে সহজ উপায়। এসব কারণে ভিক্ষাবৃত্তিতে শিশুরা আসছে। পরিবারকে পুনর্বাসন করার কাজটি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। আইন ও সালিশ কেন্দ্র এ কাজ করছে।
মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করি। প্রতি মাসে একটা শিশুকে—যে ভিক্ষাবৃত্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত—সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনি। এদের মাসে দুই হাজার টাকা দিই, যাতে ভিক্ষাসহ যেকোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত থাকে। স্কুলে যায়। পরিবারের সঙ্গে থাকে।
ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে সফল হয়েছে। আবার কে কীভাবে সিএসআর করছে, সে ক্ষেত্রে একটা তদারক সংস্থা থাকা দরকার, যাতে িসএসআরের অর্থ কল্যাণকর কাজে ব্যয় হয়।
হাসনা হেনা খান
হাসনা হেনা খান
ভিক্ষাবৃত্তি কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, এটা শিশু অধিকারেরও লঙ্ঘন। শিশুরা কেবল তাদের বেঁচে থাকার জন্যই ভিক্ষা করছে না, অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে মুনাফার জন্য শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের পঙ্গু করা হয়, যাতে তারা আরও বেশি আয় করতে পারে।
আমরা চাইলে এদের দক্ষ জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করতে পারি। ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে সুনির্দিষ্ট নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ দুটোর কোনোটিই এ ক্ষেত্রে নেই। কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের কাজ করছে। আজ আলোচনায় এসেছে, প্রতিদিন ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে। তাহলে আমাদের পদক্ষেপগুলো কতটুকু কার্যকর হচ্ছে, সেটিও একটি প্রশ্ন। ভিক্ষাবৃত্তির সমস্যাটি বেশ গভীর। তাই এই সমস্যা নিরসনে কেবল সরকার নয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে একটি সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে।
বিচ্ছিন্নভাবে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে এর ফল তেমন সুদূরপ্রসারী হয় না। আজ আমাদের সঙ্গে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আছেন। তিনি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
আমরা ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শিশুদের পুনর্বাসনের কথা হয়তো বেশি ভাবছি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এদের পরিবারগুলোকে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আয়মূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করা। তা না হলে এ সমস্যার সমাধান খুব একটা কার্যকর হবে না।
এম এম সুলতান মাহমুদ
এম এম সুলতান মাহমুদ
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৩০ লাখ বয়স্ক মানুষকে প্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। বিধবা ও অসহায় ১৪ লাখ নারীকে ভাতা দেওয়া হয়। দেশে মোট ১৬ লাখ প্রতিবন্ধী আছে। ছয় লাখ প্রতিবন্ধীকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। ৬০ হাজার শিক্ষার্থীকে ভাতা দেওয়া হয়। হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য আমাদের আট কোটি টাকা বরাদ্দ আছে।
হিজড়াদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষের জন্য বরাদ্দ আছে ১৮ কোটি টাকা। প্রতি মাসে এদের ৪০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। চিকিৎসাসেবার জন্য বরাদ্দ আছে ২০ কোটি টাকা। আমরা অসহায় রোগীদের ৫০ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা দিই। চা–শ্রমিকদের ১০ কোটি টাকা ভাতা দিই।
ঢাকা শহরের ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য ময়মনসিংহে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হলো। কিন্তু তারা পালিয়ে আবার ঢাকায় আসে। এদের জন্য আমাদের বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। ইউনিসেফের সহায়তায় সাতটি বিভাগে আমরা কিছু কেন্দ্র করেছি। এখানে ভিক্ষুকদের থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।
৮৫টি সরকারি ও প্রায় চার হাজার বেসরকারি শিশু পরিবার আছে। সরকারি শিশু পরিবারের প্রতিটিকে দুই হাজার টাকা ও বেসরকারি শিশু পরিবারের প্রতিটিকে এক হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র ভিক্ষুকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাহলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও আমাদের ভালো অভিজ্ঞতা নেই। ভাষানটেকে দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য ফ্ল৵াট বানিয়েছিলাম। যেসব লোক কাজের দায়িেত্ব িছলেন, তাঁরাই দরিদ্র সেজে এসব ফ্ল৵াট দখল করেছেন।
আমরা যাদের ভাতা দিই, তাদের নির্বাচন করেন স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যান। এখানেও দুর্নীতি হয়। ভিক্ষুকদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের–আপনাদের সবাইকে কাজ করতে হবে।
আনিসুল হক
আনিসুল হক
অনেক রকমের আলোচনা হয়েছে। কিন্তু করণীয় কী? কোনো কিছুর কোনো তথ্য নেই। ভিক্ষুকেরা এক জায়গায় থাকে না। এসব ক্ষেত্রে কে কাজটি করবে? কীভাবে করবে? অনেক প্রশ্ন এখানে আসতে পারে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ইউনিসেফ, ঢাকা সিটি করপোরেশন—এমন অনেক প্রতিষ্ঠানই হয়তো কাজ করছে। কিন্তু সমন্বিত কোনো উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে নেই।
১৯৯৪ সালে আমাদের পোশাকশিল্পে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবী দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা পোশাকশিল্পে শিশুশ্রম বন্ধ করেছিলাম। শিশুদের স্কুলিং ও অভিভাবকদের কাজের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। দুই বছরের মধ্যে শিশুশ্রম বন্ধ হয়েছিল। আজ এই ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত শিশুদের স্কুলিং এবং তাদের অভিভাবকদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।
এখানে অনেক শিশুর নাম, ঠিকানা ও অভিভাবক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটা একটা সমস্যা হতে পারে। উপস্থাপনায় দেখলাম কিছু পরিবারকে রান্নাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এখানে খরচ বেশি না। কিন্তু এটা টেকসই কোনো ব্যবস্থা কি না, সেটা বুঝতে হবে। যদি টেকসই ব্যবস্থা হয়, তাহলে এ উদ্যোগ নেওয়া কঠিন কোনো কাজ না।
কেউ যদি এ পরিবারগুলোকে এভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেন, তাহলে আমরা তহবিলের ব্যবস্থা করতে পারব। অনেকে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বের কথা বলেছেন। আমাদেরও দায়িত্ব আছে, সেটা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের জনবল এত কম যে আমাদের পক্ষে এখন এ কাজ করা কঠিন। দুই হাজার জনবলের জায়গায় আছে মাত্র ১ হাজার ২০০ জন। কিন্তু কেউ যদি দায়িত্ব নেন, তাঁকে আমরা সহযোগিতা করতে পারি।
ছোট শিশুদের স্কুলের ব্যবস্থা করতে পারব। এফবিসিসিআইতে থাকার সময় প্রায় ১ হাজার ৬০০ পরিবারকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা করেছি। ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত সব শিশুর অভিভাবকদের উদ্যোক্তা করার ক্ষেত্রে কেউ যদি দায়িত্ব নেন, আমরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করব। সবাই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আমার বিশ্বাস।
সুলতানা কামাল: আলোচনায় এসেছে, এটা মানবাধিকার ও শিশু অধিকারের লঙ্ঘন। এটা একটা প্রচণ্ড অসম্মানজনক কাজ। আমরা সবাই এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই। ভিক্ষাবৃত্তি শেষ করতে চাই। আইন ও সালিশ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। আমরা বিশ্বাস করি বিন্দু থেকে সিন্ধু।
ভবঘুরে কেন্দ্রগুলোয় শিশুদের মানসিক বিকাশের সুযোগ নেই। তাদের কোনো স্বাধীনতা নেই। অনেকটা জেলখানার মতো। তাহলে শিশুরা এখানে কেন থাকবে?
সিএসআরের টাকার ওপর আয়কর রেয়াতের বিষয়টি আবার তোলা যেতে পারে। আয়কর রেয়াতের সুবিধা পেলে সিএসআর বেশি হবে। ঢাকায় আমরা একবার গৃহকর্মীদের হিসাব বের করেছিলাম। এ ক্ষেত্রে ওয়ার্ড কমিশনাররা ব্যাপক সহযোগিতা করেছিলেন। এ অভিজ্ঞতা আমরা ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শিশুদের বেলায়ও কাজে লাগাতে পারি।
শিশুরা যাতে পরিবারের মধ্যে থেকে বিকশিত হতে পারে, সেটার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারের বাইরে বা ভবঘুরে কেন্দ্রসহ অন্যান্য জায়গায় থাকলে শিশুদের সমাজের মূলধারায় আনার যে পরিকল্পনা, সে উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
সরকার অনেক কিছু করছে। কিন্তু সঠিক তদারকসহ বিভিন্ন বিষয়ের অভাবে কাজগুলো কতটা টেকসই হচ্ছে সেটি একটি প্রশ্ন। শিশু অধিকার ফোরামের সঙ্গে সমন্বিতভাবে শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের কাজটি করা যেতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো যে কাজই করা হোক না কেন, সেটা টেকসই হবে কি না।
অনেকে বলেন, শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। আমরা বলি, শিশুরা দেশের বর্তমান। তাদের বর্তমানকেই সুন্দর ও আলোকিত করতে হবে। তা না হলে এসব শিশুর সত্যিকার অর্থে কোেনা ভবিষ্যৎই থাকবে না।
আব্দুল কাইয়ুম: যত দ্রুত সম্ভব সমাজ থেকে শিশু ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে সবাইকে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ কিছু সংগঠন কাজ করছে। তবে সবাই কাজটি সমন্বিতভাবে করলে ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের উদ্যোগ বেশি ফলপ্রসূ হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেবে বলে আশা করি। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
শিশুর ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন ও অভিভাবকদের পুনর্বাসন
ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন এবং ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের পুনর্বাসন করতে সরকার, সুশীল সমাজ ও করপোরেট খাতের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন
* শ্রমজীবী শিশুদের ৫৫ শতাংশ ঢাকায় বাস করে। এদের ৯ শতাংশ ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত
* ভিক্ষা করছে এমন ২৩৯ জন শিশুর মধ্যে ১৮৩ জনের বয়স ১০ বছরের নিচে
* আইএলও কনভেনশন ১৯৯৯ অনুযায়ী শিশু ভিক্ষাবৃত্তি বাজে ধরনের শিশুশ্রম
সূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র
আলোচনায় সুপারিশ
* সমাজ থেকে শিশু ভিক্ষাবৃত্তি দূর করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে
* ভিক্ষাবৃত্তির কারণ যা–ই হোক না কেন, এটা কোনোভাবেই একজন মানুষের পেশা হতে পারে না
* ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের জন্য কমিউনিটি দায়িত্ব নিতে পারে—এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে
* সিটি করপোরেশন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়—এ দুটি সংস্থা আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলে ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন করা কঠিন হবে না
* ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে সুনির্দিষ্ট নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন
যাঁরা অংশ নিলেন
আনিসুল হক : মেয়র, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন
সুলতানা কামাল : নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র
এম এম সুলতান মাহমুদ : যুগ্ম সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
মাহবুবা নাসরীন : সমাজবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নিশাত ফাতেমা রহমান : সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেেভলপমেন্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
ফারুক মঈনউদ্দীন : অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিটি ব্যাংক
হাসনা হেনা খান : প্রোগ্রাম অফিসার, ইকো কো-অপারেশন
শাবনাজ জেহরীন : শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ
শাগুফা আনোয়ার : প্রধান, কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ইউনাইটেড হাসপাতাল
আক্তার বাবু : পরিচালন প্রধান, সময় টেলিভিশন
গীতা চক্রবর্তী : সিনিয়র ডেপুটি ডিরেক্টর, আইন ও সালিশ কেন্দ্র
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

যেভাবে ফাঁসলেন ব্যারিস্টার শাকিলা!

তুখোড় মেধাবী শাকিলা ফারজানা দেশে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করেছেন। পরে লন্ডন থেকে অর্জন করেন ব্যারিস্টার অ্যাট ল ডিগ্রি। সাত বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে সুনামের সঙ্গে বিভিন্ন মামলা পরিচালনা করে আসছেন।
আইনজীবী পরিচয়ের বাইরে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার একটি রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে। তিনি বিএনপির মনোনয়নে চট্টগ্রামের হাটহাজারী আসন থেকে নির্বাচিত প্রাক্তন সাংসদ ও হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কন্যা। ব্যক্তিজীবনে বিবাহিতা ব্যারিস্টার শাকিলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামেরও একজন নেত্রী।
সুপ্রিম কোর্টের পরিচিত মুখ শাকিলা ফারজানা চট্টগ্রামকেন্দ্রিক জঙ্গি সংগঠন ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’কে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন।
মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ঢাকার ধানমন্ডি থেকে তাকে গ্রেফতার করে চট্টগ্রাম র‌্যাব-৭-এর একটি দল। একই সময় গ্রেফতার করা হয় তার দুই সহযোগী আইনজীবীকেও। র‌্যাবের দাবি, ব্যারিস্টার শাকিলা ও তার দুই সহযোগী হামজা ব্রিগেডের ব্লু গ্রুপের নেতাকে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা দিয়েছেন। তবে তার পারিবারিক সূত্র ও সহকর্মী আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামলা পরিচালনার অর্থ লেনদেনের অংশ হিসেবে ওই আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে।
যেভাবে ফাঁসলেন শাকিলা :
চট্টগ্রাম র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ জানান, ব্যারিস্টার শাকিলা যে শহীদ হামজা ব্রিগেডকে অর্থায়ন করেছেন, তার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই দুই সহযোগীসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। র‌্যাব অধিনায়ক বলেন, ‘জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেড-এর অন্যতম সংগঠক মনিরুজ্জামান ডনের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা এবং আদালতে তার দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে এই আইনজীবীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। হামজা ব্রিগেডের ব্লু গ্রুপের নেতা মনিরুজ্জামান ডনের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে গ্রেফতারকৃতরা অর্থ সহায়তা করতেন। শাকিলা ফারজানা ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা করতেন বলেও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ডন স্বীকার করেছেন।’
র‌্যাব অধিনায়ক জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি টাকা ব্যাংকে জমা দিলে ফরম পূরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা সেই সব ফরম পূরণ করেই অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিতেন।
র‌্যাবের তদন্তে দেখা গেছে, শহীদ হামজা ব্রিগেডের ব্লু গ্রুপের নেতা মনিরুজ্জামান ডনের অ্যাকাউন্টে মোট ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা জমা হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন ব্যারিস্টার শাকিলা ও তার সহযোগী দুই আইনজীবী। শাকিলা দুই দফায় মোট ৫২ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম দফায় ২৫ এবং দ্বিতীয় দফায় ২৭ লাখ টাকা দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া অ্যাডভোকেট লিটন ৩১ লাখ টাকা ও অ্যাডভোকেট বাপন দিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা। লিটন আর বাপন যে টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন, সেই টাকাও শাকিলাই দিয়েছেন বলে র‌্যাবের ধারণা। হামজা গ্রুপের নেতার হিসাব নম্বরে জমা হওয়া ওই টাকা দিয়েই হামজা ব্রিগেডের নেতা-কর্মীদের বাসাভাড়া, থাকা-খাওয়া, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র কেনাসহ যাবতীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
শাকিলাকে ফাঁসানোর অভিযোগ :
এদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ব্যারিস্টার শাকিলাকে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবী এবং চট্টগ্রামের সাবেক জেলা পিপি অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ছোটকাল থেকেই অত্যন্ত মেধাবী শাকিলা নিজ যোগ্যতায়ই সুপ্রিম কোর্টে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনায় নিয়োজিত হয়েছেন। তিনি হেফাজতে ইসলামের নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কয়েকটি মামলাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনা করছেন। এসব মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে মক্কেলের সঙ্গে তার বিভিন্ন দফায় আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এসব আর্থিক লেনদেনকে জঙ্গি অর্থায়ন হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যারিস্টার শাকিলাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
অ্যাডভোকেট কফিল আরো বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের কয়েকটি বড় মামলা পরিচালনা এবং জেলে থাকা আসামিদের জামিনের জন্য একজন তদবিরকারী ব্যারিস্টার শাকিলার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ জন্য ফি বাবদ শাকিলাকে বড় অঙ্কের টাকাও প্রদান করেন ওই ব্যক্তি। পরবর্তী সময়ে শাকিলা ওই মামলা পরিচালনায় অপারগতা প্রকাশ করে তদবিরকারীকে ওই টাকা তার হিসাব নম্বরে ফিরিয়ে দেন।
সম্প্রতি র‌্যাবের অনুসন্ধানে তদবিরকারী ওই ব্যক্তি শহীদ হামজা ব্রিগেডের নেতা ও সংগঠক হিসেবে শনাক্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা কর্তৃক ওই ব্যক্তির হিসাবে ফিরিয়ে দেওয়া টাকাকে জঙ্গি অর্থায়ন হিসেবে চিহ্নিত করে শাকিলা ফারজানাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
ব্যারিস্টার শাকিলার আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুস ছাত্তার বলেন, ‘মিথ্যা মামলায় শাকিলা ফারজানাকে ফাঁসানো হয়েছে। ব্যারিস্টার শাকিলা যদি প্রকৃতই জঙ্গি অর্থায়নে সংশ্লিষ্ট হতেন, তাহলে তিনি কখনোই নিজের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ব্যাংকে টাকা জমা দিতেন না। শাকিলা একজন আইনজীবী হিসেবে ক্লায়েন্টের সঙ্গে পেশাগত আর্থিক লেনদেন করেছেন। এই স্বাভাবিক লেনদেনকে জঙ্গি অর্থায়ন বলছে র‌্যাব।’
উল্লেখ্য, জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা ও তার দুই সহযোগী আইনজীবী বর্তমানে চার দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। বাঁশখালীর লটমনি পাহাড়ে শহীদ হামজা ব্রিগেডের জঙ্গি আস্তানা ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ ঘাঁটির সন্ধান ও অস্ত্র উদ্ধার মামলায় তাদের তিনজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

আচমকা গৃহবন্দী, হঠাৎ মুক্তি: ভারত-পাকিস্তান বৈঠকের আগে কাশ্মীরি নেতাদের নিয়ে নাটক

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বন্ধ থাকা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরুর আগে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের নিয়ে একপ্রস্থ নাটক হয়ে গেল। গতকাল বৃহস্পতিবার কাশ্মীরের হুরিয়াত নেতাদের আচমকাই গৃহবন্দী করা হয়। আবার দুই ঘণ্টা পরে তাঁদের মুক্তিও দেওয়া হয়।
কেন গৃহবন্দীর নির্দেশ, আর কেনই বা মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত, তার কোনো ব্যাখ্যা সরকারিভাবে দেওয়া হয়নি। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করতে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ রোববার দিল্লি আসছেন।
গত বছর জুলাই মাসে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকের ঠিক আগে এই হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিত। প্রতিবাদে ভারত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বাতিল করে দেয়। ভারতের সেই সিদ্ধান্ত প্রশ্নের মুখে পড়েছিল, কারণ হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানের আলোচনা নতুন কিছু নয়। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আগে-পরে একাধিকবার কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে পাকিস্তানের কথা হয়েছে। তাহলে সেই অজুহাতে কেন ভারত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বন্ধ করল, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা নরেন্দ্র মোদির সরকার দিতে পারেনি।
রাশিয়ার উফা শহরে নরেন্দ্র মোদি ও নওয়াজ শরিফের মধ্যে গত জুলাই মাসে বৈঠকে ঠিক হয়, বন্ধ থাকা আলোচনা আবার শুরু করা হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠক স্থির হয়েছে। কিন্তু তার আগেই পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবার হুরিয়াত নেতাদের দিল্লি আসার আমন্ত্রণ জানান। স্পষ্টতই এটা একধরনের চ্যালেঞ্জ। বৈঠক বাতিল হলে পাকিস্তান তার দায় আবার ভারতের ওপর চাপাতে পারবে। বৈঠক বাতিল না করলে পাকিস্তান এটা বোঝাতে পারবে, ভারতের আগেরবারের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। সেই সঙ্গে হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও একধরনের বৈধতা পেয়ে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে হুরিয়াত নেতাদের গৃহবন্দী করা এবং মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত। কূটনৈতিক ব্যাখ্যা হলো, পাকিস্তান যতই কাশ্মীরি নেতাদের গুরুত্ব দিক, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোনো স্থান নেই। স্থান নেই কোনো তৃতীয় পক্ষেরও। সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ ওমর ফারুক ও ইয়াসিন মালিককে পাকিস্তান দিল্লি আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। গিলানি আগে থেকেই গৃহবন্দী। বাকি নেতাদের ধরে ও ছেড়ে দিয়ে ভারত বোঝাতে চাইল, রাষ্ট্রের ইচ্ছাই প্রথম ও শেষ কথা।
উফার যুগ্ম বিবৃতিতে কাশ্মীরের উল্লেখ ছিল না। যার ফলে দেশে ফেরার পর নওয়াজ শরিফকে বিস্তর সমালোচনা সহ্য করতে হয়। হুরিয়াত নেতাদের ডাকার মধ্য দিয়ে সেই সমালোচনার রাস্তা বন্ধেরও একটা চেষ্টা পাকিস্তানের ছিল। ভারত আবার এই বৈঠকে পাকিস্তানের মদদে সন্ত্রাসী কাজকর্মের আরও একটা তালিকা সারতাজ আজিজের হাতে তুলে দেবে। মুম্বাইয়ে ২৬/১১র হামলার পর নতুন করে কোথায় কোথায় কত সন্ত্রাসী শিবির তৈরি হয়েছে, তার বিস্তারিত উল্লেখ ওই তালিকায় থাকবে। ভারতের দাবি, পাকিস্তান এই তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিক। সম্প্রতি উধমপুরে বিএসএফের কনভয়ের ওপর সন্ত্রাসী হামলায় ধৃত পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ নাভেদের স্বীকারোক্তি থেকে যেসব তথ্য মিলেছে, সেগুলোও পাকিস্তানকে তুলে দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভারত চাপ দেবে। ভারত চাইছে এই বৈঠককে শুধু সন্ত্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে। পাকিস্তান টানবে কাশ্মীরকে।

আ.লীগের ভেতরে অস্থিরতা, মাঠে আতঙ্ক–উৎকণ্ঠা

দুই দিনের ব্যবধানে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তিন নেতা কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি দলের সাংসদসহ কোনো কোনো নেতা প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থানও নিয়েছেন।
দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় সরকারের শক্ত অবস্থান কেউ কেউ সমর্থন করলেও অনেক নেতা আবার সমালোচনাও করছেন। তাঁরা বলছেন, বন্দুকযুদ্ধের নামে নেতা-কর্মীদের হত্যা করার মধ্যে কোনো সমাধান নেই। এঁদের কেউ কেউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফোন করে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দুর্বলতায় ফাঁকা মাঠ পেয়ে একশ্রেণির নেতা-কর্মীর খুনোখুনি, আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধপ্রবণতায় ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে সরকারি দল। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়ে দেন যে অপরাধী দলের হলেও ন্যূনতম কোনো সহানুভূতি দেখানো হবে না। অপরাধী যে-ই হোক, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
গত সোম ও মঙ্গলবার দুই দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ছাত্রলীগের তিন নেতা নিহত হয়েছেন। সরকার এ পদক্ষেপের মাধ্যমে সারা দেশে দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভয়-শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও প্রবীণ সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া ছাত্রসংগঠন। তাদের বিচ্যুতি আছে, থাকতেই পারে। তবে তার সমাধান ক্রসফায়ার নয়। রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। নেতা-কর্মীদের নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে তৈরি করে সমাধানে পৌঁছাতে হবে।
কথিত বন্দুকযুদ্ধে রাজধানীর হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আরজু মিয়ার নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন, বন্দুকযুদ্ধ নয়, আরজুকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে র্যাব। বন্দুকযুদ্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা একটা তথাকথিত গৎবাঁধা কথা। এটার কোনো মানে হয় না। এটা বিশ্বাসযোগ্যও না।
এ ছাড়া হাজারীবাগের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরজু মিয়ার নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ করা হয়েছে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও এ ঘটনাকে র্যাবের বাড়াবাড়ি বলে মন্তব্য করা হয়েছে। আরজু মিয়ার ক্রসফায়ার সম্পর্কে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো হত্যাকাণ্ডকে আমরা সমর্থন করি না। বিষয়গুলো তদন্ত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কেউ অপরাধে সম্পৃক্ত হলে ন্যূনতম ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনকি সংগঠনের কারও বিরুদ্ধে অপরাধ নিশ্চিত হওয়া গেলে ক্রসফায়ারে দেওয়ার ব্যাপারেও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সবুজ সংকেত আছে। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানকে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রলীগসহ দলীয় নেতা-কর্মীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অপরাধে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বলেন, ‘অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। খুব দ্রুত এ প্রবণতা কমে যাবে।’
আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, মুষ্টিমেয় কিছু নেতা-কর্মীর অপকর্মের ভার দল নেবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের যেকোনো পদক্ষেপ দল সমর্থন করে। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। কমিটির কেউ কোনো অপরাধ করলে তাঁকে বহিষ্কার করে দিই।’
কয়েক দিন ধরেই সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে একশ্রেণির নেতা-কর্মীর উদ্দেশে সতর্কতা ও হুঁশিয়ারিমূলক বক্তব্য দিচ্ছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক অনুষ্ঠানে নেতা-কর্মীদের ‘খাই খাই’ স্বভাব ছাড়ার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সে রকম পরিবেশ যাতে আর সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তিনি নেতা-কর্মীদের অনুরোধ করেন। একইভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে বক্তব্য দেন।
জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের এ ধরনের সতর্কতার মধ্যেও বাড্ডায় ঝুট ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের তিন নেতা হত্যা, জাতীয় শোক দিবসের দিন কুষ্টিয়ায় যুবলীগের এক নেতা হত্যা, চাঁদপুরের কচুয়ায় চাঁদার দাবিতে স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রীদের ওপর যুবলীগের হামলা, হাজারীবাগে এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এর আগে মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে স্বীকার করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যখন দৃশ্যমান থাকে না, তখন তা বিপজ্জনক। এ কারণেই এখন দলীয় নেতা-কর্মীদের সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিছু নেতা-কর্মীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তবে তাঁরা এ কথাও বলছেন, কিছু নেতা-কর্মী নিজ স্বার্থেই অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছেন। আগামী বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাবনা থাকায় তাঁরা এলাকায় আধিপত্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তাই মারামারি হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ নেতা ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এ বিষয়ে গত রাতে বিবিসিকে বলেছেন, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবশ্যই সরকারের জিরো টলারেন্স, যে দলেরই হোক। কঠোরভাবে দমনই সরকারের উদ্দেশ্য। কোনো কিছুই ছাড় দেওয়া হবে না। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’ এ ক্ষেত্রে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ঘটা প্রাণহানি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ তুলে সেখানকার স্থানীয় নেতারা নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তামিলদের সমর্থনে হচ্ছে বিক্রমাসিংহের সরকার

কলম্বোতে নিজ বাসভবনের সামনে হাস্যোজ্জ্বল
প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে ও তাঁর স্ত্রী
মাইথ্রি বিক্রমাসিংহে। এএফপি
সংখ্যালঘু তামিলদের সমর্থন নিয়ে গতকাল বুধবার নতুন সরকার গঠনের কাজ শুরু করেছেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে। বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়ে দেশটির সব দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সংস্কারবাদী এই নেতা। খবর এএফপির। গত সোমবার অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহের সংস্কারমূলক কর্মসূচির পক্ষে বড় ধরনের সমর্থন মিলেছে। তাঁর রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) মোট ২২৫টি আসনের মধ্যে ১০৬টি পেয়েছে। সংখ্যাটা আগের নির্বাচনের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। এর মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। রাজাপক্ষের দল ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্স (ইউপিএফএ) পেয়েছে ৯৫টি আসন। রাজাপক্ষে নিজেও একটি আসনে জয়ী হয়েছেন। রাজাপক্ষের আমলেই শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করায় পশ্চিমাদের সমর্থন হারান তিনি। তবে ওই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে সক্ষম হওয়ায় রাজাপক্ষে সংখ্যাগুরু সিংহলি সম্প্রদায়ের একটা অংশের কাছে আজও নায়ক। মূলত এই বিভাজনের রাজনীতি করায় ক্রমেই জনসমর্থন হারিয়েছেন তিনি।
বিভাজনের রাজনীতির অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহে। রাজধানী কলম্বোয় সরকারি বাসভবনে গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। দেশের কথা ভাবুন, জনগণের কথা ভাবুন। আমরা এ দেশে ঐক্য অর্জন করতে সক্ষম। কেউই বিভাজনের রাজনীতিতে ফিরবেন না। আমরা তা হতে দেব না।’ বিক্রমাসিংহের দল ইউএনপি মোট ১০৬টি আসন পেলেও ২২৫ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে সরকার গঠনে দরকার অন্তত ১১৩টি আসন। তবে সংখ্যালঘু তামিলদের সমর্থন পাওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সমস্যা হবে না। ১৬টি আসন পাওয়া তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (টিএনএ) এরই মধ্যে ইউএনপিকে ‘ইস্যুভিত্তিক’ সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। টিএনএর এমপি ধর্মলিংগাম সিথাদথান গতকাল বলেন, ‘আমরা বিরোধী দলের আসনে বসলেও সরকারের প্রতি সমর্থন দেব। এটা হবে ইস্যুভিত্তিক সমর্থন। কিন্তু আমরা মনে করি, আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে পারব।’ মূলত এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তামিলরা একটা অবস্থান তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছে। কারণ, তাদের দলের সমর্থন ছাড়া সরকার গঠনের সুযোগ নেই। বিক্রমাসিংহের ইউএনপি বলেছে, তারা রাজাপক্ষের নির্দেশে ২০০৯ সালে কমবেশি ৪০ হাজার বেসামরিক তামিলকে হত্যার অভিযোগ তদন্ত করবে। ওই বছর গৃহযুদ্ধে তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজাপক্ষে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করার আন্তর্জাতিক আহ্বানগুলো অবজ্ঞা করে আসছিলেন। আজন্ম সংস্কারবাদী: সবে গত জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী হন ৬৬ বছর বয়সী বিক্রমাসিংহে। এই সময়েই পাশ্চাত্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশ ভারতের কাছ থেকেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছেন মুক্তবাজার অর্থনীতির এই সমর্থক।
গত ৮ জানুয়ারির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শ্রীলঙ্কার দীর্ঘদিনের নেতা মাহিন্দা রাজাপক্ষে তাঁরই সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাইথ্রিপালা সিরিসেনার হাতে অপ্রত্যাশিতভাবে ধরাশায়ী হওয়ার পর ভাগ্য খুলে যায় বিক্রমাসিংহের। সিরিসেনা রাজাপক্ষের সঙ্গ ত্যাগ করে বিক্রমাসিংহের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নির্বাচন করে সাফল্য পান। দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর সিরিসেনা প্রধানমন্ত্রী করেন বিক্রমাসিংহেকে। নতুন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে আরও বেশি ক্ষমতাবান হচ্ছেন বিক্রমাসিংহে। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। জানুয়ারি মাসে দেওয়া সংস্কার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সিরিসেনা প্রেসিডেন্টের অনেকগুলো নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ফিরিয়ে দেবেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে রাজাপক্ষে এসব ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন। বিক্রমাসিংহে প্রায় সাংবাদিকই হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৩ সালে তাঁর পরিবারের মালিকানাধীন পত্রিকাটি সরকার নিয়ে নেওয়ায় সাংবাদিকতার পেশা থেকে বঞ্চিত হন তিনি। এরপর তিনি মনোযোগ দেন রাজনীতিতে। এর আগে ১৯৯৩ সালে ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিক্রমাসিংহে। এ ছাড়া ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিক্রমাসিংহের জেতার সম্ভাবনা ছিল। তবে নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে আত্মঘাতী হামলায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা আহত হন। এরপর ভোটারদের সহানুভূতি পেয়ে সামান্য ব্যবধানে জয়ী হন চন্দ্রিকা।