Wednesday, December 10, 2025
ক্ষমতা না টাকা বানানোর জাদুর কাঠি? by বদিউল আলম মজুমদার
আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে একটি পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা যাক। অনেক পাঠকের মনে থাকার কথা যে ২০০৮ সালের জুন মাসে চারটি পুরোনো সিটি করপোরেশনের—বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট—নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে প্রথমবারের মতো হলফনামার মাধ্যমে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয়ের উৎস, অতীত ও বর্তমান মামলার বিবরণী, প্রার্থীর নিজের এবং প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদ ও দায়দেনার তথ্য হলফনামার মাধ্যমে তাঁদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়ার বিধান কার্যকর করা হয়।
‘সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে প্রার্থীদের এসব তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়। এসব তথ্য প্রদানের এবং প্রকাশের উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়িত করা, যাতে তাঁরা জেনে-শুনে-বুঝে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
এসব নির্বাচনের সব কটিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জয়লাভ করেন—বরিশালে শওকত হোসেন হিরণ, খুলনায় তালুকদার আবদুল খালেক, রাজশাহীতে এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন এবং সিলেটে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান জয়লাভ করেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা এগুলোতে পরাজিত হন। বরিশালে পরাজিত হন আহসান হাবীব কামাল, খুলনায় মো. মনিরুজ্জামান, রাজশাহীতে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন ও সিলেটে পরাজিত হন সালাউদ্দিন রিমন।
পাঁচ বছর পর ২০১৩ সালের ১৫ জুন তারিখে এসব সিটি করপোরেশনে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২০০৮ সালে মনোনীত সব প্রার্থীই ২০১৩ সালেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যদিও সিলেটে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত সব প্রার্থী জয়ী হন। এবারও প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে সাত ধরনের তথ্য জমা দিতে হয়।
প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া তথ্য থেকে দেখা যায়, দুই নির্বাচনে জয়ী-পরাজিত আটজন মেয়র পদপ্রার্থীর সবাই ছিলেন ব্যবসায়ী। তবে তালুকদার আবদুল খালেক নির্বাচিত হওয়ার পর ব্যবসায়ী হয়েছেন—তিনি ২০০৮ সালে প্রদত্ত হলফনামায় পেশা হিসেবে ‘বর্তমানে কোনো ব্যবসা নেই’ বলে উল্লেখ করেছেন।
হলফনামার তথ্য থেকে আরও লক্ষণীয় যে চারজন বিদায়ী মেয়রের প্রত্যেকেরই নিজের এবং নির্ভরশীলদের আয় তাঁদের ক্ষমতায় থাকার সময় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। খুলনার তালুকদার আবদুল খালেকের ও তাঁর নির্ভরশীলদের আয় বেড়েছে ৩,৬২,০০০ টাকা থেকে ৫,৩২,৬৬,৯৭৭ টাকা বা ১৪,৬১৫ শতাংশ। বরিশালের শওকত হোসেন হিরণ এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের আয় বেড়েছে ৫,৮০,২৫০ টাকা থেকে ৩,৪৯,১১,০৩০ টাকা বা ৫,৯১৬ শতাংশ। রাজশাহীর এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ও তাঁর নির্ভরশীলদের আয় বেড়েছে ২,৪৪,০০০ টাকা থেকে ৫৭,৭৫,৭৭২ টাকা বা ২,৩০৮ শতাংশ। সিলেটের বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের আয় বেড়েছে ২,১০,০০০ টাকা থেকে ১৫,৪৯,৯৮৮ টাকা বা ৬৩৮ শতাংশ—‘সম্মানী’ হিসেবে প্রাপ্ত নিজের আয় হলফনামায় দেখানো হয়নি বলে এটি অপেক্ষাকৃত কম। সর্বসাকল্যে চারজন মেয়র ও তাঁদের নির্ভরশীলদের গড় আয় বেড়েছে ৩,৪৯,০৬৩ টাকা থেকে ২,৩৯,০০,৯৮১ টাকা বা ৬,৭৪৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত তিন প্রধান প্রার্থীর মধ্যে দুজন এবং তাঁদের ওপর নির্ভরশীলদের আয় বেড়েছে এবং একজনের কমেছে। বরিশালের আহসান হাবীব কামালের আয় বেড়েছে ২০০৮ সালের ৭,০৮,০০০ টাকা থেকে ২০১৩ সালে ৯,৩০,০০০ টাকা বা ৩১ শতাংশ। খুলনায় মো. মনিরুজ্জামানের আয় কমেছে ৮,৩৬,০০০ টাকা থেকে ২,০০,০০০ টাকা বা ৭৬ শতাংশ। রাজশাহীর মোসাদ্দেক হোসেনের আয় বেড়েছে ১,৬৮,০০০ টাকা থেকে ১,৯২,০০০ টাকা বা ১৪ শতাংশ। এই তিন মেয়র প্রার্থীর পাঁচ বছরে আয় কমেছে ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সঙ্গে আয় বৃদ্ধির একটি যোগসূত্র রয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচিত মেয়র ও পরাজিত মেয়র পদপ্রার্থীদের সম্পদের দিকে তাকালেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বরিশালের মেয়র শওকত হোসেন হিরণ ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাঁচ বছরে বেড়েছে ২০,৮৫,৩২৬ টাকা থেকে ১০,৯৪,৩৯,১৫০ টাকা বা ৫,১৪৮ শতাংশ। খুলনার তালুকদার আবদুল খালেকের বেড়েছে ১,৮৫,৯৭,৫৫০ টাকা থেকে ১০,০৮,৪১,২৯২ টাকা বা ৪৪২ শতাংশ। রাজশাহীর খায়রুজ্জামান লিটনের বেড়েছে ৯৬,৭৫,০০০ টাকা থেকে ১,৯৪,৪৭,১৯৮ টাকা বা ১৩৩ শতাংশ। সিলেটের কামরানের বেড়েছে ২,১৪,৭৮,২৯০ টাকা থেকে ৫,০০,৬২,৬২৪ টাকা বা ১৩৩ শতাংশ। চারজন বিদায়ী মেয়র ও তাঁদের নির্ভরশীলদের মোট সম্পদ বেড়েছে ১,২৯,৫৯,০৪১ টাকা থেকে ৬,৯৯,৪৭,৫৬৬ টাকা বা ৪৪০ শতাংশ। উল্লেখ্য, চারজন বিদায়ী মেয়রের দায়দেনা ছিল কম, তাই তাঁদের নিট সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণও ছিল বেশি।
হলফনামার তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত তিন প্রধান প্রার্থীর মধ্যে দুজন ও তাঁদের ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদ বেড়েছে এবং একজনের কমেছে। বরিশালের আহসান হাবীব কামালের কমেছে ২০০৮ সালের ১,০৪,১১,৬৫০ টাকা থেকে ২০১৩ সালে ২৭,৭৩,০০০ টাকা বা ৭৩ শতাংশ। খুলনার মনিরুজ্জামানের বেড়েছে ১৬,১৩,১০০ টাকা থেকে ৩০,৫৫,৫৩৭ টাকা বা ৮৯ শতাংশ। রাজশাহীর মোসাদ্দেক হোসেনের বেড়েছে ১,৬৮,০০০ টাকা থেকে ১৯২,০০০ টাকা বা ১৪ শতাংশ। তবে ২০০৭ সালের নির্বাচনে পরাজিত খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী—এই তিন মহানগরের মেয়র পদপ্রার্থী ও তাঁদের ওপর নির্ভরশীলদের পাঁচ বছরে মোট সম্পদ কমেছে ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ সম্পদশালী হওয়া না-হওয়া নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৫ জুনের নির্বাচনে বিদায়ী মেয়রদের সবাই পরাজিত হয়েছেন এবং ২০০৮ সালে পরাজিত এ তিনজন মেয়র পদপ্রার্থী জয়ী হয়েছেন। আরও জয়ী হয়েছেন সিলেটের আরিফুল হক চৌধুরী।
উপরিউক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে ক্ষমতার সঙ্গে আয় ও সম্পদের মালিকানার গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে, যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রদত্ত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন বিদ্যমান। নির্বাচনে জয়ী হয়ে মেয়ররা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং এ ক্ষমতা তাঁদের ও তাঁদের ওপর নির্ভরশীলদের আয় ও সম্পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে জাদুর কাঠির মতো কাজ করেছে। তবে নির্বাচনে পরাজিতদের প্রতি ভাগ্যদেবীর প্রসন্নতা তেমন দৃশ্যমান নয়। তাই সংগতভাবেই প্রশ্ন করা যায়—আমাদের রাজনীতি, যার লক্ষ্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া—লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে কি না। রাজনীতি জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তির অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করছে কি না।
প্রসঙ্গত, আরও সাম্প্রতিক সময়ের সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রদত্ত হলফনামার তথ্য থেকে ক্ষমতার সঙ্গে জাদুর কাঠির সম্পর্ক আরও সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, যা পরবর্তী লেখায় তুলে ধরা হবে। তাই আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য নতুন ধরনের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার কাঠামো সৃষ্টি করা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে জরুরি হয়ে পড়েছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার, বিশেষত তাদের গণতন্ত্রায়ণ ও প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং মনোনয়ন–বাণিজ্য তথা টাকার অযাচিত প্রভাবের অবসান। আরও জরুরি হয়ে পড়েছে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের প্রদত্ত হলফনামার ছকে পরিবর্তন এবং এতে প্রদত্ত তথ্যের পরিপূর্ণতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কঠোরভাবে যাচাই করার। হলফনামার ছকে ইতিমধ্যে পরিবর্তন এসেছে।
* ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Sunday, November 30, 2025
রাজনীতিটা এখন ব্যবসায়িক জায়গায় পরিণত হয়েছে: বদিউল আলম মজুমদার
আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন বদিউল আলম মজুমদার। ‘ভয়েস নেটওয়ার্ক’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে বদিউল আলম মজুমদার ২০০৮ সালে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত মেয়রদের সম্পদের হিসাব তুলে ধরেন। তিনি জানান, নির্বাচনের পর পাঁচ বছরে খুলনা সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে সাড়ে ১৪ হাজার শতাংশের বেশি। বরিশাল সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ৫ হাজার ৯১৭ শতাংশ। রাজশাহী সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ২ হাজার ৩০৮ শতাংশ। আর সিলেট সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ৬০৮ শতাংশ।
বাংলাদেশের নির্বাচনী অঙ্গনকে অপরিচ্ছন্ন বলে উল্লেখ করেন বদিউল আলম মজুমদার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাকা দিয়ে কেনা যায়, এমন একটা গণতন্ত্র এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
সরকারের উপদেষ্টারা যদি নির্বাচনে অংশ নেন, তাহলে আরপিও (নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অনুযায়ী তা নিয়মের ব্যত্যয় হবে কি না, সে বিষয়ে সেমিনারে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।
দেশের রাজনীতিবিদদের চাহিদা অসীম উল্লেখ করে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরা বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মতো কাজ যতই করা হোক, মানসিকভাবে যদি আমরা আমাদেরকে অন্তর থেকে ধৌত করতে না পারি, তাহলে অন্য কোনো বিষয় দিয়ে কোনো কিছু হবে না।’
বিএনপির এই নেতা মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ যদি জাতি হিসেবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে না পারে, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে দেখলে নির্বাচনকে খুব সহজ মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে এটা অত্যন্ত জটিল সমীকরণ।
জেসমিন টুলি মনে করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। তাই সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আগেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
আগামী নির্বাচনে যাতে ফ্যাসিস্টরা কোনোভাবে অংশ নিতে না পারে, তা খেয়াল রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকিয়ে আছি নির্বাচন কমিশনের দিকে, তারা যাতে সুষ্ঠুভাবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।’
নির্বাচন ঘিরে গণমাধ্যমে যাতে সঠিক সংবাদ প্রচারিত হয়, সেই আহ্বান জানান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য। নির্বাচনের সময় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে সংঘর্ষের ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকে কমিশনের কার্যক্রম এখনো জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, বিশেষ করে সম্প্রতি যে নির্বাচন কর্মকর্তা অথবা ডিসি-এসপির যে নিয়োগগুলো হয়েছে, এগুলো কিছুটা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। কোনো একটি দলের দিকে তাঁরা হেলে পড়ছেন কি না, এই প্রশ্নটিও আসছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এখনো নিরপেক্ষতার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যেকোনো সময় সরকারের এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি মনে করেন, আগামী নির্বাচনে যদি কোনো জবরদখলের ঘটনা ঘটে, তা দেশের জন্য কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
বিগত সময়ে দেশের মানুষের ভোটাধিকার আইসিইউতে চলে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। তিনি বলেন, ‘এটা থেকে বের হওয়াটা এখন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
বিভিন্ন হেভিওয়েট প্রার্থীর পিএসকে থানার ওসিরা ‘স্যার’ ডাকেন বলে অভিযোগ করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও জনপ্রশাসন মূলত এখনো পেশিশক্তি যেদিকে, সেদিকে হেলে থাকে। একটা চাঁদাবাজির মামলা নেওয়ার আগে পুলিশ বারবার খোঁজ নেয়, তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না। তাঁদের এই হচ্ছে অভিজ্ঞতা।
অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে আহ্বান জানিয়ে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, আগামী নির্বাচনে যেন আওয়ামী লীগের কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীও অংশ নিতে না পারেন। ফ্যাসিবাদ ও তার দোসররা যাতে অংশ নিতে না পারে। ডামি নির্বাচনে যারা অংশ নিয়েছে, তারাও যাতে অংশ নিতে না পারে। এ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সাহাবুল হক। সভাপতিত্বে করেন ভয়েস নেটওয়ার্কের চেয়ারপারসন মো. জসীম উদ্দিন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।
আয়োজকেরা জানান, ভয়েস নেটওয়ার্ক নামের এই প্ল্যাটফর্মে ২১টি নিবন্ধিত পর্যবেক্ষক সংস্থা যুক্ত আছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সংলাপ, গবেষণা, বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা কাজ করবে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ারেছুল করিম, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি প্রমুখ।
![]() |
| ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার। আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে। ছবি: প্রথম আলো |
Wednesday, January 22, 2025
জুলাই গণহত্যায় জড়িতরা পুনরায় দেশ চালাবে জনগণ তা চায় না
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কাউকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাই না। এটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। যারা আমাদের প্রায় দেড়-দুই হাজার ব্যক্তি খুন করেছে, যারা গুম করেছে, যারা বিভিন্নভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, আমরা কি চাই তারা আবার এসে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনা করুক? আমি তো মনে করি অধিকাংশ জনগণই চায় না। আমরা তাই প্রস্তাব করেছি। সেগুলো গৃহীত হবে কি না হবে সেটা নির্ভর করবে আমাদের রাজনৈতিক দল ও সরকারের ওপর।
বদিউল আলম বলেন, একই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনও যে দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে গিয়েছে এজন্য আমরা যারা অপরাধী তারা যেন রাজনৈতিক দলের সদস্য না হতে পারে তার সুপারিশ করেছি। আমরা রাজনৈতিক দলের মেম্বারশিপ রোস্টার করার প্রস্তাব করেছি। এই মেম্বারশিপ রোস্টার ব্যবহার করেই তারা স্থানীয় পর্যায়ে তাদের দলীয় নেতাকর্মীরাই মনোনয়নের ব্যাপারে একটা প্যানেল দেবে এবং প্যানেল থেকে জাতীয় মনোনয়ন বোর্ড সেখান থেকে মনোনয়ন দেবে। যাতে রাজনৈতিক দলগুলো দায়বদ্ধ হয় তাদের সদস্যদের কাছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা বলেছি রাজনৈতিক দলগুলো যাতে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। আপনারা জানেন যে, আমি একটা মামলা করেছিলাম নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে, তথ্য কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলের হিসাবনিকাশ পাওয়ার ব্যাপারে। বহু হয়রানির পর শেষ পর্যন্ত আমি আদালতে গিয়েছি এবং একটা যুগান্তকারী রায় দিয়েছে আদালত। যেসব তথ্য তাদের কাছে এগুলো পাবলিক ইনফরমেশন এবং এগুলো তারা প্রকাশ করতে বাধ্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়বদ্ধ হতে হবে, স্বচ্ছ হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সদস্যদের কাছ থেকে যে সদস্য ফি নেবে, তাদের যে অনুদান আসবে তার একটি সীমা আমরা নির্ধারণ করে দিয়েছি। তার ভিত্তিতে তারা ব্যয় করবে। এর অডিট হিসাব তারা নির্বাচন কমিশনে দেবে এবং নির্বাচন কমিশন এগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য হবে।
রাজনৈতিক দলের আর্থিক স্বচ্ছতা, গণতন্ত্রের চর্চা এবং দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক অঙ্গন পরিচ্ছন্ন করার ব্যাপারে আমাদের সুপারিশ দিয়েছি এবং ইসিকে আমরা ক্ষমতায়িত করার চেষ্টা করেছি। যেমন প্রার্থী চূড়ান্ত করার ব্যাপারে ইসি’র নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, হলফনামা ছকের পরিবর্তনের কথা বলেছি। নির্বাচনের পরে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সঠিক হয়েছে এটা সার্টিফাই করবে। নির্বাচন সুষ্ঠু করার ব্যাপারেও কতোগুলো সুপারিশ করেছি আমরা।
তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য আমরা না ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করেছি, হলফনামার ছকের পরিবর্তন আনা এবং হলফনামা যাচাই-বাছাই করা এবং যাচাইয়ের সময় যদি অসত্য তথ্য বা তথ্য গোপনের অভিযোগ ওঠে তাদের মনোনয়ন বাতিল, নির্বাচন বাতিল এবং নির্বাচন একবার বাতিল হলে আদালতের মাধ্যমে তারা যেন আর নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে এর সুপারিশ করেছি। তিনি বলেন, আমরা ৪০ শতাংশের নিচে ভোট পড়লে পুনঃনির্বাচনের কথা বলেছি।

Saturday, November 30, 2024
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত
গতকাল রাজধানীর এফডিসিতে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী ও নাগরিকের ভূমিকা’ নিয়ে আয়োজিত ছায়া সংসদে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি। এতে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে যারা নির্বাচনী অপরাধ করেছে তাদের সবাইকেই বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রজাতন্ত্রের যেসব কর্মচারী নির্বাচনী অপরাধ করেছে তাদের বিচারের জন্য সুস্পষ্ট আইন রয়েছে। তবে শপথ ভঙ্গ করে যেসব নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী অপরাধে জড়িত ছিলেন তাদের বিচার কোনো প্রক্রিয়ায় হবে তা নির্ধারণ করা উচিত।’
এ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের স্বার্থে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধের উপায় বের করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আগামী নির্বাচন রাজনৈতিক চাপমুক্ত থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ থাকবে না, তাই কমিশন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করবে বলে আশা করা যায়।’
সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচন আয়োজন করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেছেন নির্বাচনের ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে, এটা আর থামবে না। কিন্তু এই ট্রেন শেষ স্টেশনে কখন পৌঁছাবে তা জনগণ জানতে পারলে ভালো হয়।
‘বর্তমান সরকারের বিবেচনায় নেয়া উচিত নির্বাচন বিলম্বিত হলে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার শঙ্কা রয়েছে। এজন্য নির্বাচনী ট্রেনের যাত্রা শুরু হওয়ার পাশাপাশি সরকারকে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।’
পতিত সরকার জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল উল্লেখ করে কিরণ বলেন, ‘বাংলাদেশে শতভাগ ভোট পেয়েও নির্বাচিত হওয়ার নজির রয়েছে। মৃত ব্যক্তিদের ভোট প্রদানের ঘটনাও ঘটেছে। পতিত সরকারের অধীনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাকশালী কায়দায় একতরফা নির্বাচন হয়েছিল। আমি আর ডামি, দিনের ভোট রাতে ও একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ এ দেশে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে।’
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের চেয়ে প্রার্থীসহ জনগণের ভূমিকাই বেশি’ শীর্ষক ছায়া সংসদে কবি নজরুল সরকারি কলেজের বিতার্কিকদের পরাজিত করে তেজগাঁও কলেজের বিতার্কিকরা বিজয়ী হয়। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মুহাম্মদ রইস, ড. এস এম মোর্শেদ, সাংবাদিক একরামুল হক সায়েম, সাংবাদিক সাইদুর রহমান ও সাংবাদিক মশিউর রহমান খান।

Sunday, November 17, 2024
বিপ্লবের পর সংবিধানের কার্যকারিতা নেই
সংবিধানের খসড়া প্রস্তাবনায় সালেহ উদ্দিন জাতীয় পরিষদ নিয়ে বলেন, জাতীয় পরিষদের সদস্য সংখ্যা হবে ২০০। তারা জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে অভিহিত হবেন। তাদের মধ্যে ৬৪ জন নির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ১২ জন নির্বাচিত সিটি করপোরেশনের মেয়র, ২৫ জন সংরক্ষিত মহিলা এবং ১০ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় ও তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ২৫ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন। অবশিষ্ট ৮৯ জন জাতীয় সদস্য নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন। এরূপ বণ্টনের ফলে যে রাজনৈতিক দল আনুপাতিক হারে যত আসন পাবে, এর ভিত্তিতে তারা মনোনয়ন দেবে। তবে শর্ত থাকে, রাজনৈতিক দলগুলো যত আসন পাবে, এর অর্ধেক সদস্য নিজ দলীয় সদস্যদের মধ্যে থেকে, বাকি অর্ধেক সদস্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করবে। তবে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না। সংরক্ষিত অপর ১০ জনকে প্রেসিডেন্ট সরাসরি মনোনয়ন দেবেন। এ মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট যতদূর সম্ভব সমতাবিধান করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় ও তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করবেন। খসড়ায় বলা হয়, জাতীয় পরিষদ হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও আইনপ্রণয়ন সভা, যা অর্থনৈতিক নীতি, জাতীয় নিরাপত্তা নীতি, বৈদেশিক সম্পর্কের নীতি এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিকাশে পথরেখা প্রণয়ন করবে। জাতীয় বাজেট (অর্থবিল) ছাড়া জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইন চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে জাতীয় পরিষদ। জাতীয় সংসদে বাজেট উত্থাপনের ছয় মাস আগে জাতীয় পরিষদে প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় পরিষদের মেয়াদ হবে চার বছর। জাতীয় সংসদ নিয়ে বলা হয়, জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা থাকবে ৩০০। কোনো সংরক্ষিত মহিলা আসন থাকবে না। তবে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল দশ ভাগ নারী সদস্যকে মনোনয়ন দিতে হবে। সরকার গঠন, সরকারের প্রতি অনাস্থা এবং অর্থবিল পাসের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে থাকবে। এর বাইরে রাষ্ট্রের সকল আইন প্রণয়ন জাতীয় সংসদের প্রাথমিক অনুমোদনের পর জাতীয় পরিষদ চূড়ান্ত অনুমোদন দিবে। জাতীয় পরিষদ এবং সংসদ নিজেদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিজেরাই বৃদ্ধি করতে পারবেন না। কোনো শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবেন না। তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আবেদন সাংবিধানিক আদালত বিবেচনা করবে। নাগরিকের অধিকার বিষয়ে বলা হয়, আদালতের অনুমতি ব্যতিরেকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ড হতে পারে-এমন অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে আদালতের অনুমতি ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তবে গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করবে-এমন সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি ছাড়া কাউকে আটক রাখা যাবে না। তবে সন্দেহের উপযুক্ত ভিত্তি থাকতে হবে। আদালতে হাজিরের সময় প্রতিবেদনে উপযুক্ত কারণগুলো উল্লেখ করতে হবে। অহেতুক হয়রানি করা যাবে না। আদালতের অনুমতি ছাড়া নাগরিকের গৃহে প্রবেশ ও তল্লাশিতে পুলিশের অধিকার থাকবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রস্তাবনায় তিনি বলেন, জাতীয় পরিষদের যেসব রাজনৈতিক দলের অরাজনৈতিক সদস্য আছেন তাদের এক জন করে প্রতিনিধি নিয়ে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধাবধায়ক সরকার গঠন’ বিষয়ক একটি সার্চ কমিটি গঠিত হইবে। ওই কমিটিতে সংসদের সরকারি দলের নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তাহাদের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। জাতীয় পরিষদের অধ্যক্ষ এই সার্চ কমিটির সভাপতি হইবেন। তাহারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিষদের একজন নির্দলীয় সদস্যকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এবং পনেরো জন উপদেষ্টার মধ্যে দশ জন নির্দলীয় জাতীয় পরিষদ সদস্যকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করিবেন। সুপারিশ পাওয়ার পর তিনি প্রধান উপদেষ্টা এবং দশ জন উপদেষ্টাকে নিয়োগ দিবেন। তারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা ও দশ উপদেষ্টার তালিকা চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হইলে কমিটির সদস্যদের দুই তৃতীয়াংশ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে। প্রধান উপদেষ্টা এবং দশ জন উপদেষ্টা নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা অন্যান্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে অবশিষ্ট পাঁচ জন উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে লিখিতভাবে সুপারিশ করিবেন। তাহারা জাতীয় পরিষদ অথবা জাতীয় সংসদের নির্দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকেও হইতে পারিবেন অথবা আইনসভার বাহিরে সমাজের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও হইতে পারবেন। তবে তাদের কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হইতে পারিবেন না। জাতীয় সংসদের কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতে পারিবেন না। সাংবিধানিক আদালত নিয়ে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি সাংবিধানিক আদালত থাকবে। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের তিন জন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এবং হাইকোর্টর দুই জন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি লইয়া এই আদালত গঠিত হইবে। সাংবিধানিক আদালতে কেউ মামলা দায়ের করতে পারবে না। আদালত শুধু নিজ উদ্যোগে সংবিধান লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা নিজ উদ্যোগে পর্যবেক্ষণ করিতে এবং এহেন কার্য হইতে বিরত রাখিতে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করিতে কিংবা এই ধরনের কোনো কার্যসম্পাদন হইলে তাহা অবৈধ ঘোষণা করিতে পারিবে। সংবিধানের কোনো ব্যাখ্যার প্রশ্ন উত্থাপিত হইলে প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পরিষদ অধ্যক্ষ ও স্পিকার সাংবিধানিক আদালতের মতামত গ্রহণ করিতে পারিবেন। এমনকি নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনের কোনো চাহিদা পূরণে অনীহা দেখালে কমিশন সাংবিধানিক আদালতে অভিযোগ করতে পারবে।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন নিয়ে বলা হয়, উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ দিবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশনে সদস্য হবেন আইনমন্ত্রী, আপিল বিভাগের একজন এবং হাইকোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারক। অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনজীবী সমিতির সভাপতি, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সরকারি ও বিরোধী দল ও জাতীয় পরিষদের অধ্যক্ষ মনোনীত একজন করে সদস্য থাকবেন। ভোটের অধিকার নিয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভোটের অধিকার নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করলে কিংবা ভোট প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটের ৫০ ভাগ প্রদত্ত না হলে নির্বাচন বাতিল হবে এবং পুনরায় দুই মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। জন্মসূত্রে বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক দেশে ১৮ বছর পর্যন্ত বসবাস করলে জাতীয় সংসদ ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে বলা হয়, রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক ও গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কমিটি গঠন হয় কিনা তা নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করবে। রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন বা ছদ্মনামে কোনো সংগঠন থাকবে না। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল নিয়ে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ রেখে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কাউন্সিলের প্রধান হবেন রাষ্ট্রপতি। সরকার প্রধান, আইন সভার অধ্যক্ষ, স্পিকার, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা, তিন বাহিনী প্রধান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব কাউন্সিলের সদস্য হবেন। ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে বলা হয়, সরকারের প্রতি আস্থা-অনাস্থা ভোট এবং অর্থ বিল ছাড়া আর সকল কিছুতে স্বাধীনভাবে মত প্রদান ও ভোট দেয়ার অধিকার আইন সভার সদস্যদের থাকবে। এ ছাড়াও সরকারি দপ্তরে নেতা-নেত্রী বা সরকারপ্রধানের বদলে জাতীয় পতাকা ও জাতীয় প্রতীক থাকবে। রাষ্ট্রের শত্রু ছাড়া কোনো নিবর্তনমূলক আইন থাকবে না। প্রেসিডেন্টের দণ্ড মওকুফের কোনো স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা থাকবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয় ভিত্তিতে। এক ব্যক্তি সংসদের একাধিক আসনে নির্বাচন করতে পারবে না। ন্যায়পাল থাকবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিপ্লবত্তোর বাংলাদেশে যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা সংবিধান সংশোধনের কথা ভাবছি সেটা তাদের (শহীদদের) প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা জানানো। কিন্তু আমাদের কিছু সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার বিষয় চিন্তায় রাখতে হবে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে যদি তাকাই তাহলে এই প্রস্তাবনাগুলো (খসরা) এই সরকারের জায়গা থেকে সংবিধান সংশোধনের কোনো সুযোগ আছে কিনা সেটা ভেবে দেখা দরকার। কেন না এই অনুচ্ছেদে আপনি সবকিছু করতে পারবেন শুধু সংবিধান সংশোধন ছাড়া। তিনি বলেন, এখন সংসদ নেই, গণভোট নেই- এসব প্রশ্নগুলো এখানে যৌক্তিক ও আইনগতভাবে আসবে। গণতন্ত্র যদি ঠিক থাকে, যদি ভোটাধিকার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সব ঠিক থাকবে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম. এ মতিন বলেন, যে সংবিধান ফ্যাসিস্টদের জন্ম দিয়েছে, বিপ্লবের পর সেই সংবিধান গুরুত্ব হারিয়েছে। কেন না বিপ্লব তো সংবিধানের আওতায় হয়নি। এই বিপ্লব ব্যর্থ হলে তো বিপ্লবীদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হতো। এখন যারা জীবন দিলো, তাদের যে চিন্তা-ভাবনা, তাদের যে চাওয়া-পাওয়া এগুলোকে ধারণ করে সংলাপের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা করা এবং একটি নির্বাচন করাই হোক লক্ষ্য। নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা এসে সংবিধানের বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। তাহলে আমরা একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যেতে পারবো। সংবিধানের আকার ছোট করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান পুনর্লিখন নাকি সংশোধন হবে, সেটা জনগণের সিদ্ধান্ত। তবে সেটা তো সংবিধানে লেখা থাকবে না। সবসময় মানুষের অলিখিত অধিকার অসংখ্য থাকবে, কিন্তু কিছু কিছু অধিকার থাকবে লিখিত। তবে লিখিত থাকার অর্থ এই নয় যে এর বাইরে আমাদের কোনো অধিকার থাকবে না।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ক কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধান শুধু আইনজ্ঞদের বিষয় নয়, এটি জনগণের বিষয়। এখানে নাগরিকদেরও মতামত থাকতে হবে। তিনি বলেন, সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। ওই সংশোধনী ছিল একটা ধৃষ্টতা। এর মাধ্যমে সংবিধানকে কলুষিত করা হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানের এক-তৃতীয়াংশ পরিবর্তন করে ফেলা হয়। এক সংসদকে আরেক সংসদের বেঁধে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে উচ্চ আদালতে চলমান মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সংশোধনী বাতিল হলেই তত্ত্বাবধায়ক ফিরে আসবে না। এজন্য পরবর্তী সংসদ বিষয়টি তুলতে হবে। বদিউল আলম মজুমদার জাতীয় সংসদে ৪৫০ আসন এবং এর মধ্যে নারীদের জন্য ১০০ আসন বরাদ্দ রাখার দাবি জানান। একই সঙ্গে শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন দেন। সংবিধানের পুনর্লিখন আদৌ সম্ভব নয় এবং সে প্রক্রিয়াও সংবিধানে নেই উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি অতিক্রম করেছে। এখন একটা নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। এখন সংবিধানের কিছু জায়গায় নতুন চিন্তা-ভাবনা হতেই পারে। তাই মৌলিক মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত কি কি ধরনের প্রতিকার আমরা পেতে পারি, ভবিষ্যতে কি করতে পারি সেটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। তিনি বলেন, একটা জিনিস আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, গণতন্ত্রে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তারাই তো সরকার গঠন করে। কিন্তু ওই অবস্থায় যারা সংখ্যালঘু, শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু নয়, ভিন্ন মত ও ভিন্ন গোষ্ঠীর যারা তাদের অধিকার তো রক্ষা করতে হয়। সেটার জন্যই কিন্তু সংবিধান এবং সেজন্য আমাদের সংবিধানে যারা সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক, সেটা ভাষার কারণে, লিঙ্গের কারণে, প্রতিবন্ধিতা ও জাতিসত্ত্বার কারণে হতে পারে, তাদের অধিকার শুধুমাত্র সংবিধানের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারবো। জেষ্ঠ আইনজীবী হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ৫৩ বছরে আমরা একটা ভালো নির্বাচনী ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। গত ১৫ বছরে আইন করে লুটপাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদকে একটা চুরির আইন বানানোর সংস্থায় পরিণত করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার চর্চার মতো পরিস্থিতি তৈরি না করলে কোনো চেষ্টাই ফলপ্রসূ হবে না। অনুষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদরা নাগরিকদের প্রজা মনে করেন। আমরা আসলেই প্রজা হয়ে গেছি। সংবিধান বার বার ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিকের ক্ষমতা নেই। তাই জনগণের ক্ষমতার চর্চার সুযোগটা আসেনি। সংসদ সদস্যরা যতক্ষণ পর্যন্ত জবাবদিহিতার আওতায় না আসবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের প্রজা হয়েই থাকতে হবে।

Friday, September 20, 2024
সাক্ষাৎকার: প্রথম অগ্রাধিকার হবে ইসি গঠন আইনের সংশোধন by কাজল ঘোষ
প্রশ্ন: নির্বাচন কমিশন সংস্কারে গঠিত কমিশনের প্রধান হিসেবে আপনার নাম ঘোষণায় প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কি ছিল?
আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করেছি। প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় আমিসহ পাঁচজনের নাম সংস্কারে গঠিত কমিশনগুলোর প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এটা শুধু সম্মানের নয়, বহুদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার কণ্ঠ ছিলাম। আমি ছাড়াও আমাদের অনেক সহযোগী, স্বেচ্ছাব্রতীরাও এ কাজের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাদের সকলের কাজেরই এটা স্বীকৃতি। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গণতন্ত্রকে কার্যকর করার এটা একটি বড় সুযোগ। সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে যে ধরনের রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার কারণে, একতরফা নির্বাচন হওয়ার ফলে। আমরা যদি একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন করতে পারি তাহলে যে ধরনের মর্মান্তিকতা ঘটেছে, ব্যাপক জনবিস্ফোরণ ঘটেছে, হাজারও মানুষের প্রাণহানি, হতাহতের ঘটনা, এতো মানুষের আত্মত্যাগে যে সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে এটার প্রথম পদক্ষেপ হবে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন। এটা বিরাট সুযোগ এবং একইসঙ্গে গুরুদায়িত্ব।
প্রশ্ন: টেবিলের ওপাশ আর এপাশ। দীর্ঘদিন আপনি ছিলেন বিরোধী আসনে এবার আপনিও চালক। জনগণ অপেক্ষায় আপনার কী ধরনের সংস্কার পদক্ষেপ নেবেন তা দেখার?
আমি এবং আমার একদল সহকর্মী আশাবাদী এই যে, আকাশচুম্বী সুযোগ আমরা পেয়েছি তা যেন কাজে লাগাতে পারি। আমরা যেন একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সুগম করতে পারি। আমরা কিছু আইন-কানুন, বিধি-বিধান এবং প্রক্রিয়া অবলম্বনে সেই পথটা সুগম করতে পারি।
প্রশ্ন: নির্বাচনী ব্যবস্থায় কী ধরনের সংস্কার আপনারা আনতে চান?
সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে আমাদের অনেকগুলো বাধা। বড় বাধা হচ্ছে- নির্বাচনে যারা অংশীজন তারা সঠিক ভূমিকা পালন করে না। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হয়েছে যেন তাদেরকে পদচ্যুতি না করতে পারে। নির্বাচন কমিশন নিয়ে অনেক বিতর্ক, অনেক অভিযোগ। তারা সবচেয়ে বড় অংশীজন হয়েও সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না। তারপর সরকারের অঙ্গ হিসেবে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না। এরপরই আসে রাজনৈতিক দলের কথা। তারা যদি সঠিকভাবে সহযোগিতা করে, ছলেবলে কৌশলে নির্বাচনী বৈতরণী পার না হতে চায় এবং গণমাধ্যম যদি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, সত্য তুলে ধরে, নাগরিক সমাজও নজরদারির যে ভূমিকা পালন করা দরকার তা গুরুত্ব দিয়ে পালন করে তাহলে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। এই সকল অংশীজনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কমিশন। দুঃখজনক হলেও সত্য বিগত তিনটি নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়েই ব্যাপক বিতর্ক ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে একটি আইন প্রণয়ন হয়েছে যা অগ্রহণযোগ্য। এই আইনের ফলেই সরকারের যারা অনুগত, খয়ের খাঁ তারা কমিশনে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। এই আইনের মধ্যেই একটি বিধান আছে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের। কিন্তু বর্তমান বিধানের আওতায় কয়েকটি সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা এই অনুসন্ধান কমিটির সদস্য হন। এসব ব্যক্তির নিয়োগই দেয়া হয় তারা যেন সরকারের প্রতি অনুগত থাকে। এই বিধানে আছে অন্তত দু’জন ব্যক্তিকে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেয়া। আর সরকারের পক্ষ থেকে তাদের অনুগতদেরই নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। তারা যাকে চায় তাকেই নিয়োগ দিতে পারে এই সার্চ কমিটিতে। গত তিনটি কমিশন এভাবেই গঠিত হয়েছে। এটা হয়ে থাকে কখনও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কখনও আইনের মাধ্যমে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা তো আর আম গাছ থেকে জাম পাবো না। আবারও যদি পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন হয়, মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন হয়, অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠিত হয় তাহলে তো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন পাবো না।
প্রশ্ন: কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনা আপনাদের প্রায়োরিটির মধ্যে আছে?
তাদেরই দায় সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। কাজেই প্রথম কাজ হবে নির্বাচন কমিশন গঠনের আইনি কাঠামোতে সংস্কার নিয়ে আসা। আমরা আইনটি সংস্কার করবো যাতে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠন করা যায়। কমিশন যেন কোনো দলের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গঠিত না হয়। প্রাথমিক চিন্তায় আছে, প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রতিনিধি, প্রধান বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি, তৃতীয় প্রধান দলের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি, গণমাধ্যমের একজন প্রতিনিধি থাকবে সার্চ কমিটিতে যাতে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা যায়। অনুসন্ধান কমিটি যেন সকলের মতের ভিত্তিতে এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয় তা আমাদের সংস্কারে অগ্রাধিকার পাবে। সার্চ কমিটি যাদের নাম প্রাথমিক বিবেচনায় নেবে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা এবং তাদের নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করা। এতে যারা পরিচ্ছন্ন নয়, তারা এ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকবে। এর মাধ্যমে যোগ্যদের নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মেচিত হবে।
প্রশ্ন: নির্বাচন কমিশন সচিব সরকারের নিয়োগকৃত থাকে বলে একটি টানাপড়েন রয়েই যায়? তার সুরাহা কীভাবে হবে?
২০০৭ সালে হুদা কমিশন গঠনের আগে এবং পরেও নির্বাচন কমিশনে কিছু কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কথা হচ্ছে- এরাই নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাদের মধ্য থেকে যদি সচিব নিয়োগ দেয়া হয়, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনবল থেকে যদি সচিব নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে এ সমস্যা দূরীভূত হবে। সচিব পদমর্যদার বা উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিরা যদি সরকারের পছন্দের লোক না হয় তাহলে নির্বাচনকালীন সংকটের নিরসন হবে। আগামী নির্বাচন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হবে তাই এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না বলেই মনে করি। আমি নিশ্চিত করেই বলতে চাই, আগামী নির্বাচন প্রভাবিত করবে সে রকম অপচেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকার করবে না। আগামী নির্বাচন যদি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হয় তাহলে পরবর্তী সরকার যারা গঠন করবে তখন নিয়োগকৃত সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সচিব নেয়া সম্ভব হবে বলে মনে করি।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকার বলে আপনি আশাবাদী কিন্তু এ সরকার তো সবসময় থাকবে না?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি আমাদের এ যাবৎকালে ১২টির মতো নির্বাচন হয়েছে। চারটি নির্বাচন হয়েছে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এরমধ্যে তিনটি নির্বাচন সকলের কাছে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এই নির্বাচনগুলোতে পূর্ববর্তী সরকার জনগণের ভোটের মাধ্যমে বিদায় হয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য বা পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টের ভিত্তিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এই দাবিতে আন্দোলন করেছিল বিএনপি প্রথমদিকে এটি না মানলেও পরে তারা সংবিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত করে পদত্যাগ করে। ২০১১ সালে একতরফা এবং বিতর্কিতভাবে আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন করে সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে এবং যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার থাকা দরকার তা তত্ত্বাবধায়ক বা অন্য যে কোনো নামেই হোক।
প্রশ্ন: আপনাদের সংস্কার প্রস্তাবনায় জাতীয় নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষ বডি দিয়ে করার সুপারিশ থাকবে কিনা?
আমরা হয়তো সুপারিশ করতে পারবো। এটা কার্যকর করার জন্য আমাদের সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তবে আশার কথা আমাদের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের জন্য একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। আমিসহ চারজন এই রিট করেছি শুধু এটি নয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে খায়রুল হকের যে রায় তা রিভিউয়ের জন্যও আমরা আবেদন করেছি। রায়গুলো আমাদের পক্ষে এলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার ফিরে আসবে। আমাদের সংবিধান সংস্কারে গঠিত কমিশন নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারে যে ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার তারা তা করবে।
প্রশ্ন: প্রেক্ষাপট বদলেছে, আদালতেও ভিন্ন পরিস্থিতি। এ অবস্থায় রিটে রায় পাবেন বলে আশাবাদী?
আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। আমাদের অকাট্য যুক্তি আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে সংবিধান লঙ্ঘন করে অযৌক্তিকভাবে। এ নিয়ে ভয়ানক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে রায় বাতিল করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছিল একটি রাজনৈতিক বিষয়। রাজনীতিকরা পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টের অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করা সমীচীন নয়। একেবারেই অগ্রহণযোগ্য যুক্তিতে তারা রায়টি বাতিল করেছেন যা ছিল ভুল। সংবিধানে কতগুলো বিষয় অলঙ্ঘনীয়। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এমন মৌলিক বিষয়গুলো সংশোধন কালেও বাতিল করা যাবে না। যারা রায় বাতিল করেছেন তাদের যুক্তি ছিল তিনমাসের অনির্বাচিত সরকার সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অথচ এর বিপরীতে এটি না থাকলেও আমাদের গণতন্ত্রে পাতানো নির্বাচনের খেলা চলে আসছে। খায়রুল হক তড়িঘড়ি করে অবসরে যাওয়ার আগে এই রায় দিয়েছিলেন যা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আর দু’টি বেঞ্চেই এই রায়টি ছিল বিভক্ত। অ্যমিকাস কিউরিদের আটজনের মধ্যে সাতজনই তত্ত্বাবধায়ক সরকার রেখেই রায় দেয়ার কথা বলেছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে ছিলেন। যদিও আপিল বিভাগের মেজরিটির রায়ে এটি চূড়ান্ত হয়। খায়রুল হক ১০ই মে ২০১১ তারিখে সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ভবিষ্যতের জন্য অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। রাষ্ট্র এবং জনগণের নিরাপত্তা বিবেচনায় ক্রান্তিকালীন ব্যবস্থা হিসেবে পরবর্তী দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। সংসদ চাইলে বিচারপতিদের বাদ দেয়ার জন্য ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে সংশোধন আনতে পারে। লক্ষ্যণীয় তিনি এটাকে সংশোধনের কথা বলেছেন এবং দুইবারের পর তা বাতিলের কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এই রায় নিয়ে বলেছেন, আমি তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করিনি, আদালত বাতিল করেছে। তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হলে সংসদের অনুমোদন লাগবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর, সত্যের অপলাপ। খায়রুল হকের রায়ও ছিল স্বার্থ প্রণোদিত। রায়ে উল্লিখিত দুইটি নির্বাচন যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতো তাহলে খায়রুল হক হতেন প্রধান উপদেষ্টা। তিন- চার লাইনের দেয়া শর্ট অর্ডার। শর্ট অর্ডারই চূড়ান্ত রায়। এটাই মূল সিদ্ধান্ত। আর বিস্তারিত রায় দেন ষোল মাস পরে। পরবর্তীতে বিস্তারিত রায়ে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বলেছেন তিনি তাই লিখে দিয়েছেন। এরমধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচন হয়ে যাওয়ায় খায়রুল হকের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকেই তিনি ফলো করেছেন আর এটা করতে গিয়ে তিনি আদালতের সঙ্গে জালিয়াতি করেছেন। তিনি পুনরায় শুনানি না করে, সকলের মত না নিয়ে রায় পাল্টে দিয়েছিলেন। খায়রুল হক নির্বাচনী ব্যবস্থার কবর দিয়েছিলেন। এর ফলেই ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালে পরপর তিনবার জালিয়াতির আর একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার থাকলে ভোটারবিহীন জালিয়াতির নির্বাচন করা সম্ভব হতো না। পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের উদ্দ্যেশ্যই ছিল ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা।
প্রশ্ন: সুজনের দেয়া সংস্কার প্রস্তাবের একটি হচ্ছে, কমিশন গঠনে রাজনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা।
কমিশন গঠন অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমেই হবে। অনুসন্ধান কমিটি এমনভাবে গঠিত হবে তা যেন সরকারের অনুগত না হয়। সরকার যাকে চাইবে তাকে যেন নিয়োগ না দেয়া হয়। পাতানো নির্বাচন কমিশন যাতে গঠিত না হয়। আগেই বলেছি, অনুসন্ধান কমিটিতে সরকার পক্ষের একজন, প্রধান বিরোধীদলের একজন, তৃতীয় প্রধান দলের একজন থাকবেন আর ইসি নিয়োগে তাদের একমত হতে হবে। এভাবেই আমরা রাজনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিতের কথা বলছি।
প্রশ্ন: সুষ্ঠুু নির্বাচন আয়োজনে প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তির সদ্বিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ কিনা? নিকট অতীতে ভারতে দেখা গেছে টিএন সেশন কমিশন আলোচনায় এসেছে ব্যক্তির কারণে।
ব্যক্তিও গুরুত্বপূর্ণ একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি সহযোগিতা না করে বিশেষ করে সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খবাহিনী যদি অসদাচরণ করে, পক্ষপাতদুষ্ট থাকে এবং গণমাধ্যম যদি একতরফা প্রচার-প্রচারণা চালায়, নাগরিক সমাজ যদি নজরদারির ভূমিকা পালন করতে না পারে- তাহলে মেরুদণ্ডসম্পন্ন নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। যে নির্বাচন আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক নয়, সেই নির্বাচন আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর জন্য সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিদায়ী নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, তাদের কাজ হচ্ছে নির্বাচন করা। কিন্তু আমি বলবো, তারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তারা পোস্ট অফিস নয়। তারা শপথ নিয়ে সংবিধান রক্ষার। অথচ তারা সংবিধানকে পদদলিত করেছে।
প্রশ্ন: আপনার একটি বক্তব্য আলোচনায়, আপনি বলেছেন- আওয়ামী লীগ অংশ না নিলে নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হবে না। প্রশ্ন থাকে, তাহলে তা কি সকলের অংশগ্রহণমূলক হবে?
নির্বাচন মানেই একটি প্রতিযোগিতা। বিকল্পের মধ্য থেকে বেছে নেয়া। নির্বাচনে বিকল্প থাকতে হবে। বিকল্প হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প। প্রশ্নটি ছিল হাইপোথ্যাটিক্যাল। উত্তরটি খণ্ডিতভাবে প্রচারিত হয়েছে। বক্তব্যটি ছিল, আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। এই নির্বাচনে অন্তর্বর্তী সরকার কাউকেই বাধা দেবে না। বর্তমানে আওয়ামী লীগের অনেকেই পলাতক, অনেকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। তারা যদি সংগঠিত হতে না পারে এবং নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে তাহলে নির্বাচন তো আটকে রাখা যাবে না। আমি আশা করি সবার অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।
প্রশ্ন: তিন মাসের মধ্যে কি আপনার প্রস্তাবনা দেয়া সম্ভব হবে?
সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। সব সংস্কার হবে না। সবগুলো দিক হয়তো আমরা গভীরভাবে পর্যালোচনা করার সময়ও পাবো না। তবুও আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করবো যেন এই তিন মাসের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সুপারিশমালা পেশ করতে পারি।

Sunday, February 3, 2019
চার আনা নিয়ে ঢাকায় আসা ছেলেটি by পিয়াস সরকার

ড. বদিউল আলম মজুমদার আজ কর্মগুণে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। তিনি একাধারে অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার-নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি। বর্তমানে তিনি ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া নাগরিক সংগঠন ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
তার বাবা হাইস্কুল শেষ করতে পারেননি অর্থনৈতিক কারণে। বাবা কাজ করতেন নবাব ফয়জুন্নেসার এস্টেটে নায়েব হিসেবে। মায়ের জ্ঞান নাম-স্বাক্ষর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ১৯৫৩ সালে গ্রামে ক্লাস টু’তে প্রথম লেখাপড়া শুরু করেন। এরপর লাকসাম হাইস্কুলে ভর্তি হন ক্লাস সেভেনে। আর নবাব ফয়জুন্নেসা কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। বাণিজ্য অনুষদে।
বদিউল আলম স্কুলজীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তার পাশের রুমে থাকতেন তোফায়েল আহমেদ। আব্দুল কুদ্দুস মাখন, খন্দকার মোশারফ হোসেন, মইন খান ছিলেন ব্যাচমেট। এখনকার জহুরুল হক হল তখন ছিল ইকবাল হল। সেই হলেই থাকতেন তিনি।
তিনি বলেন, আমি ঢাকায় যখন আসি তখন আমার পকেটে মাত্র ৪ আনা ছিল। হলে ক্যান্টিনের ছেলেদের পড়াতেন। এর মাধ্যমে বিনা পয়সায় খাবার খেতে পারতেন। পাশাপাশি করতেন টিউশনি।
বদিউল আলমের বাবা মারা যান ১৯৬৪ সালে। শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে প্যারালাইসড হয়ে দীর্ঘদিন বিছানায় পড়েছিলেন। এই সময় জায়গা-জমি বিক্রি করে করাতে হয় চিকিৎসা। নিজে চলার পাশাপাশি মাকেও পাঠাতেন টাকা।
তিনি হলে সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিতত হন। ষাটের দশকের শেষ দিকে গণ-আন্দোলনের সময় ছিলেন ইকবাল হলের সাধারণ সম্পাদক। আন্দোলনে রাখেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। বলেন, এই হল থেকেই মূলত আন্দোলন পরিচালিত হতো। ১৯৬৮ সালে প্রথম চাকরি শিক্ষক হিসেবে কায়েদে আযম কলেজে। বর্তমানে যে কলেজের নাম শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন ১৯৬৯ সালে। লেকচারার হিসেবে। আবার পরের বছরেই স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে যান আমেরিকায়। সেখানে করেন মাস্টার্স ও পিএইচডি।
আমেরিকায় যেতেও অনেক সমস্যার সম্মুখীন হন। ছাত্র রাজনীতি করার কারণে আটকে যায় পাসপোর্ট। এসময় তাকে সহযোগিতা করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী, প্রফেসর হাবিবুল্লাহসহ আরো অনেকে। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার গিয়ে ‘ক্যালরিমন্ট গ্রাজুয়েট স্কুল’ থেকে মাস্টার্স করেন এবং এরপর ‘কেস ওয়েস্টার্ন রিভেন্স ইউনিভার্সিটি’ থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটোল ইউনিভার্সিটি, ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি ও সেন্ট্রাল ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। পাশাপাশি তিনি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’-তেও কনসালটেন্ট ছিলেন।
বিদেশে গিয়েও দেশের প্রতি ভালোবাসা অক্ষুণ্ন ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকার রাজনৈতিক সদস্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য প্রচারণা চালান। ১৯৯১ সালে ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশে আসেন ছুটিতে। ছুটিতে এসে সিদ্ধান্ত নেন দেশে থেকে যাবেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মার্ক টোয়েনের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। ‘মানুষের জন্য দুটো দিন গুরুত্বপূর্ণ- যেদিন তার জন্ম হয় এবং আরেকটা দিন যেদিন সে অনুধাবন করে কেন তার জন্ম হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, আমি ওখানে ভালোই ছিলাম। ফুল টাইম প্রফেসর ছিলাম। আমি বাংলাদেশে ছুটিতে এসে বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। আমি চাইলে বিভিন্ন দেশে যেতে পারতাম। আমি অনুধাবন করি আমার দেশের জন্য অনেক কিছু করার আছে। গাড়ি বাড়ি সবকিছু রেখে চার সন্তানকে নিয়ে পা রাখেন মাতৃভূমিতে। প্রথম স্ত্রী ’৮৩ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। পরে তিনি আবার বিয়ে করেন।
দেশে এসে যোগ দেন ইউএসএআইডি’র একটি প্রজেক্টে প্রধান হিসেবে। তিনি বলেন, আমার সেসময় তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো। আমার ওপর বিভিন্ন চাপ ছিল। দুর্নীতি না করায় তাদের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আর টিকে থাকেনি। এরপর তিনি ১৯৯৩ সালে হাঙ্গার প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত হন। দারিদ্র্য দূর করাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। ওই বছরের শেষের দিকে করেন উজ্জীবক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দেখলাম অনেক মানুষ কাজ করছে। কেউ গাছ লাগাচ্ছে, কেউ অন্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, স্কুল গড়ে দিচ্ছে ইত্যাদি কাজে অংশগ্রহণ করতো।
আমরা দেখলাম তাদের মাধ্যমে অনেক কাজ হচ্ছে। তখন আমরা বেশ কিছু এলাকাকে হাঙ্গার ফ্রি জোন ঘোষণা করি। নীতি নির্ধারণে পরিবর্তন আনার জন্য ২০০২ সালে প্রফেসর মোজাফফর আহমেদসহ সৃষ্টি করলেন ‘সিটিজেন ফর ফেয়ার ইলেকশন’। ২০০৩ সালে স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সৎ মানুষ নির্বাচিত করার লক্ষ্যে প্রার্থীদের প্রোফাইল তৈরি করেন। তবে এতে অনেকইে তথ্য গোপন করেন। যার ফলে আমরা তাদের মুখোমুখি বসানোর ব্যবস্থা করি। এরপর আমদের উপলব্ধি হলো শুধু নির্বাচন নিয়ে কাজ করলে হবে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ২০০৩ সালে আমরা প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে রাখি ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’।
সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচন নিয়ে বদিউল আলম মজুমদারের মূল্যায়ন, এই নির্বাচন নিয়ে তো ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। সবার জন্য সমসুযোগ সৃষ্টি হয়নি। অভিযোগ আছে নির্বাচনে কারচুপির। নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিরপেক্ষ আচরণ না করে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়। অভিযোগ আছে বিরোধীদল সমসুযোগ পায়নি। তাদের ওপর হামলা হয়েছে, মামলা হয়েছে এবং ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে বাধা দেয়াসহ আগের রাতে ব্যালটপেপার ভরে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও টিআইবি’র রিপোর্টে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। আমি মনে করি, বর্তমান সরকারের উচিত আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতার রদবদল হয় এটা আমাদের কাম্য। তা নাহলে আমরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবো। তিনি আরো বলেন, অভিযোগ আছে বহু লোক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তারা ক্ষুব্ধ। তাদের মধ্যে বঞ্চনাবোধ থেকে কেউ কেউ বিপদগামী হতে পারে।
ড. মজুমদার বলেন, বাংলাদেশ অমিত সম্ভবনার দেশ। ১৯৭১ সালে আমাদের চেতনার জোয়ার ঘটেছিল। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম। বাংলাদেশ ও কোরিয়া ১৯৭০-৭১ সালের দিকে একই অবস্থানে ছিল। তাদের মাথাপিছু আয় ও আমাদের মাথাপিছু আয় প্রায় একই ছিল ১শ’ ডলারের মতো। কিন্তু আমাদের এখনো ২ হাজার ছাড়ায়নি। তাদের এখন মাথাপিছু আয় ২৬-২৭ হাজার ডলার। বাংলাদেশ অনেক সম্পদশালী আর কোরিয়ার আছে কিছু নিম্নমানের কয়লামাত্র। বাংলাদেশের অনেক সম্পদ যেমন উর্বর মাটি। মিষ্টি পানি। উঠতি বয়সের কর্মক্ষম জনগণ। এছাড়াও আমারা কঠোর পরিশ্রমী, অল্পতে সন্তুষ্ট, বহু বিরূপ পরিবেশে রয়েছে কাজ করার ক্ষমতা। আমাদের দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে অনেক লোক অর্থ পাঠাচ্ছে। আমাদের নারীরা তৈরিপোশাক শিল্পে ও কৃষকরা ব্যাপক অবদান রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু আমরা সেই সম্ভবনাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি। এই সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমাদের নীতিগত সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক স্বার্থপরতা, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, বিভক্তি, অপরাজনীতির কারণে এগিয়ে যেতে পারিনি। একটা বিভক্ত জাতি বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারে না।
দুর্নীতির বিষয়ে দুদকের সাম্প্রতিক কার্যক্রমকে ইতিবাচক হিসেবেই তিনি দেখছেন। তিনি বলেন, দুদকের কাজ আরো বেগবান করতে হবে। অনেক দুর্নীতিবাজ তাদের আশপাশে রয়েছে। যদি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হয়ে তবে, প্রথম ঘর থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তারাই এখন দলীয় নেতাদের মতো আচরণ করে। দলীয় নেতারাও সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এটা সুশাসনের জন্য বিরাট অন্তরায়। এসব বিষয়ে আমাদের নজর দিতে হবে। শুধু আর্থিক দুর্নীতি নয় সব দুর্নীতির ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে। নিজের স্বপ্ন নিয়ে বলেন, আত্মনির্ভরশীল গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ। যেখানে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। জনগণ সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পাবে- এটাই আমার আশা। আর এই প্রচেষ্টাতেই আমি ও আমার প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে।



Tuesday, August 14, 2018
কে এই বদিউল আলম মজুমদার?

কিন্তু কে এই বদিউল আলম মজুমদার? যাকে নিয়ে এতো হইচই। ড. মজুমদার বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজের একজন নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি। কর্মময় জীবনের বর্তমান পর্যায়ে তিনি ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি দলনিরপেক্ষ নাগরিক সংগঠন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
ড. বদিউল আলম মজুমদার নাগরিক সমাজের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি। মানুষের জন্য কথা বলার কারণে যিনি অনেক প্রায় সব সরকারের বিরাগভাজন হয়েছেন। কিন্তু এসব উপেক্ষা করেই সমাজের প্রয়োজনে তিনি ছুটেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মানুষের কল্যাণে সভা-সমিতি, এমনকি রাজপথের আন্দোলনে যেতেও দ্বিধাবোধ করেননি।
বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি আজ অনেকটাই বিভক্ত ও ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। রাজনৈতিক বিশ্বাস আর দেনা-পাওনার ভিত্তিতেই এ বিভাজন। এ রকম একটি সময়েও বিরুদ্ধ ¯স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশে দলনিরপেক্ষ সিভিল সোসাইটি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে সুজন-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার আগে ড. বদিউল আলম মজুমদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। দেশে ফিরে ড. মজুমদার ‘ইউএসএআইডি’ পরিচালিত ‘পলিসি ইমপ্লিমেন্টেশন এনালাইসিস গ্রুপ’ প্রকল্পে চিফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর হিসেবে প্রায় দু বছর (১৯৯২-৯৩) কাজ করেন। ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাব্রতী সংস্থা ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর সঙ্গে।
২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ড. মজুমদারকে ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী’ (বার্ড)-এর বোর্ড অব গভর্নরস্ এর সদস্য করেন। একই বছর তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটি’র একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
মজুমদার বর্তমানে টিআইবি’র উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য এবং ডেনিশ গভর্ণমেন্ট ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে পরিচালিত ‘হাইসাওয়া ফান্ড কোম্পানি’র বোর্ড অব ডিরের্ক্টস-এর সম্মানিত সদস্য এবং জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম-এর সভাপতি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার একজন স্বনামধন্য কলাম লেখক। আমেরিকান ইকোনমিক্স অ্যাসোসিয়েশন, কানাডিয়ান ইকোনোমিক্সসহ বহু প্রফেশনাল অধিবেশনে বিভিন্ন সময়ে তিনি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন এবং তাঁর গবেষণাপত্র বিভিন্ন খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, রাজনীতি ও সংবিধানসহ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক লেখালেখি ড. বদিউল আলম মজুমদারের নয়টি গ্রন্থ এবং তাঁর সম্পাদনায় আরও চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
ড. মজুমদার কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার পোলাইয়া গ্রামে ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জন্মগ্রহণ করেন। কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়াবস্থায় তিনি ছাত্র সংসদের ভিপি (সভাপতি) পদে নির্বাচিত হন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার ১৯৬৪ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয় দফার আন্দোলন গড়ে উঠলে সে আন্দোলনে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ড. মজুমদার ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ও পরবর্তীতে(১৯৬৭)জিএস নির্বাচিত হন। তিনি যখন হলের জিএস, তখন ছিল একটা উত্তাল পরিস্থিতি। ছয়দফার আন্দোলন তুঙ্গে। পরে ৬৯’র গণআন্দোলন। সে সময় প্রায় সব আন্দোলনই পরিচালিত হতো ইকবাল হল থেকে। যেহেতু সে সময় উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বঙ্গবন্ধু বহুবার গ্রেফতার হয়েছেন, তার প্রতিবাদে ড. বদিউল আলম মজুমদার-সহ ছাত্রনেতারা রাজপথে ছিলেন। ৬৯-এ ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনে তথা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও ড. বদিউল আলম মজুমদারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ড. মজুমদার ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের এক বছরের মাথায় ১৯৭০ সালে বৃত্তি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ক্ল্যারমন্ট গ্র্যাজুয়েট স্কুল থেকে এমবিইডিগ্রি অর্জন করেন এবং কেইস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটি থেকে মাত্র ৩১ বছর বয়সে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ড. মজুমদার ১৯৮০ সালে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায় যোগদান করেন। তিনি নাসার স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন প্রজেক্টে (Space Industralisation Project) কাজ করেন।
কিছু সময়ের জন্য তিনি সৌদি রাজপরিবারের পরামর্শক (Consultant) হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে দেশে ফিরে আসার আগে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এ অধ্যাপনা করছিলেন।
Thursday, August 9, 2018
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িবহর ও আমার বাড়িতে হামলা: ঘটনার বিবরণ -ড. বদিউল আলমের বিবৃতি

গত ৪ আগস্ট ২০১৮, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট আমার মোহাম্মদপুরস্থ ১২/২, ইকবাল রোডের বাসায় একটি নৈশভোজ শেষে ফেরার পথে বাসার সামনে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত কর্তৃক আক্রমণের শিকার হন। একই সময়ে দুর্বৃত্তরা আমার বাড়িতেও হামলা চালায়। এই হামলার ঘটনাটি নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্প ফাঁদছে এবং বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার এ অপচেষ্টার প্রেক্ষিতে আমি এর বিবরণ নিম্নে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরলাম।
ঘটনার প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাশা বার্নিকাটকে আমি এবং আমার স্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে বহুদিন থেকেই চিনি। গত ৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস পালন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আমি তাঁকে তাঁর বিদায়ের প্রাক্কালে আমার পরিবারের সঙ্গে একটি নৈশভোজে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানাই। রাষ্ট্রদূত তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং তারিখ নির্ধারণের লক্ষে তাঁর প্রটোকল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে ৯ জুলাই আমি তাঁর প্রটোকল কর্মকর্তাকে একটি ই-মেইল পাঠাই। একই দিনে আরেকটি ই-মেইলের মাধ্যমে তিনি আমাকে ০৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৭-৩০ টায় নৈশভোজটি আয়োজনের সময় দেন। দূতাবাসের প্রটোকল অনুযায়ী নৈশভোজের স্থান, সময় ও অংশগ্রহণকারীদের তালিকা সবই ইমেইলের মাধ্যমে তাদেরকে পাঠানো হয়। নৈশভোজের সময়, উদ্দেশ্য ও উপস্থিত অতিথিদের তালিকা নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের অপপ্রচার যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও সর্বৈব মিথ্যা তা এই ইমেইলগুলো দেখলেই যে কেউই বুঝতে পারবেন।
০৪ আগস্ট ২০১৮: যা ঘটেছিল :
০৪ আগস্ট ২০১৮, সন্ধ্যায় আমার বাসায় নৈশভোজে যোগ দেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, ড. কামাল হোসনে ও তার স্ত্রী ড. হামিদা হোসেন এবং জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান। এই দুই দম্পতির সঙ্গে পারিবারিকভাবে আমরা বহুদিন থেকেই ঘনিষ্ঠ। অসুস্থতার কারণে জনাব খানের স্ত্রী উক্ত নৈশভোজে যোগ দিতে পারেননি। উপরোক্ত চারজন ছাড়া আমি, আমার স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ ও দুই কন্যাসহ মোট দশজন নিয়ে ছিল এই নৈশভোজের আয়োজন।
রাত আনুমানিক ১১টার সময় রাষ্ট্রদূত যখন আমার বাসা থেকে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন, তখন একদল দুর্বৃত্তÑযাদের সংখ্যা আনুমানিক ৩০-৪০ জন তাঁর গাড়িতে হামলা করে। তারা তাঁর গাড়ি এবং আমার ছেলে, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের কোচ, ড. মাহবুব মজুমদারের ওপর আক্রমণ করে। দুর্বৃত্তরা জনাব বার্নিকাটের গাড়ির পেছন পেছন ধাওয়া করে এবং ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারে। তারা পিস্তল ও লাঠিসোটা বহন করছিল এবং জনাব রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে আগুন দেওয়ারও উস্কানি দিচ্ছিল।
রাষ্ট্রদূতের গাড়ি দ্রুততার সাথে স্থান ত্যাগ করার পর দুর্বৃত্তরা দোতলায় অবস্থিথ আমার বাসায় হামলা চালায়। তারা আমার বাসায় ইট-পাটকেল ছুঁড়ে জানালার কাঁচ ভাংচুর করে এবং গেট ভেঙ্গে বাসায় ঢোকারও চেষ্টা করে। যদি তারা আমাদের বাসায় ঢুকতে সক্ষম হত, তাহলে আরও গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। আমরা সাথে সাথে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস ‘৯৯৯’ নাম্বারে কল করি। দুর্বৃত্তরা প্রায় আধা ঘন্টা আমাদের বাসার সামনে অবস্থান করে ও তা-ব চালায় এবং আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করতে থাকে। তারা দিনের বেলায় আমাদেরকে দেখে নেয়ার হুমকি দিতে থাকে।
আমাদের ‘৯৯৯’ নাম্বারে কল করার প্রেক্ষিতে হামলা শেষ হবার পর পুলিশ আসলেও আমাদের সঙ্গে কথা না বলে এবং আমাদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না করেই চলে যায়, যদিও আমরা তখণ চরমভাবে আতঙ্কগ্রস্ত ছিলাম।
০৫ আগস্ট ২০১৮: অভিযোগ দাখিল:
০৫ আগস্ট ২০১৮, সকালে আমি আমার তিনজন সহকর্মীসহ উপরোক্ত ঘটনাটির বিবরণ তুলে ধরে মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করি। আমি তাঁকে জানাই যে, দুর্বৃত্তদের হামলার কারণে আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এছাড়া চিঠিতে ঘটনাটি সম্পর্কে একটি মামলা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানাই এবং একইসঙ্গে আমি এবং আমার পরিবারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদানেরও অনুরোধ করি। থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে তারা জানাবেন যে এ বিষয়ে মামলা হবে, না-কি এটি জিডি হিসেবে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে থানা থেকে আমাদেরকে কিছু জানানো হয়নি। যদিও আমরা গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পারি যে, আমার অভিযোগটিকে জিডি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হাজির করার অপচেষ্টা:
যদিও নৈশভোজের বিষয়টি ছিল নিতান্তই একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং এর তারিখ নির্ধারণ করা হয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোর বিক্ষোভ শুরুর ২০ দিন আগে, তথাপিও মহলবিশেষ এটিকে নিয়ে একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হাজির করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এটিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য গণমাধ্যমগুলোকে তারা ব্যবহার করছে এবং নৈশভোজটিকে ‘ষড়যন্ত্র সভা’, ‘গোপন বৈঠক’ বলে অভিহিত করছে। একইসঙ্গে সেই নৈশভোজের সাথে কোনো ধরনের সংস্রবহীন আরও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নাম তারা এতে জড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পুলিশের বরাত দিয়ে বিডিনিউজ২৪.কম (৬ আগস্ট ২০১৮) প্রকাশিথ এক প্রতিবেদনে আমার বাসার নৈশভোজে ড. কামাল হোসেন, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, এম হাফিজউদ্দিন খান, বিচারপতি আব্দুর রউফসহ বেশ কয়েকজন উপস্থিত ‘ থঅকার কথা বলা হয়। এটি একটি সর্বৈব অপপ্রচার, কারণ এই পারিবারিক অনুষ্ঠানে ড. হোসেন ও খান দম্পতি ব্যতীত বাইরের অন্য কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এবং কেউ উপস্থিতও ছিলেন না।
প্রসঙ্গত, আমার জানামতে রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখাশোনার দায়িত্ব ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপির) ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি ডিভিশনের। রাষ্ট্রদূত আমার বাাসয় যখন আসেন তখন তাঁর সাথে সিকিউরিটি প্রটেকশনের দুটি সরকারি গাড়ি ছিল এবং তাদের তৎপরতার ফলেই তিনি ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত প্রস্থান করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
রাষ্ট্রদূতের ওপর হামলা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্যে যেমন ক্ষতিকর, তেমিন এটিকে নিয়ে মহলবিশেষের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের আশ্রয় নেয়াও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি এই ন্যাক্কারজনক হামলা ও অপ্রপ্রচারের তীব্র প্রতিবাদ এবং সকল মহলকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে আমি এ ঘটনার দ্রুত বিাচর চাই এবং আমার ও আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাই।
Thursday, March 16, 2017
নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ by ড. বদিউল আলম মজুমদার

নবগঠিত নূরুল হুদা কমিশন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সফলতা অর্জন করতে হলে তাঁদেরকে এগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জের প্রধান উৎস হলো বিদায়ী রকিবউদ্দীন কমিশনের ব্যর্থতা। সরকারও অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের সংখ্যা। আমরা কমিশনের সামনের বড় চ্যালেঞ্জগুলো নিম্নে তুলে ধরছি।
কমিশনারদের সংখ্যা: রকিবউদ্দীন কমিশন ছাড়া অতীতের কোনো নির্বাচন কমিশনেই তিনজনের বেশি সদস্য ছিলেন না এবং এই তিনজনও অনেক সময় একত্রে কাজ করতে পারেননি। পাঁচ সদস্যের নবনিযুক্ত কমিশনারদের সবাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং তাঁদের প্রত্যেকের অনেক বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত থাকাই স্বাভাবিক। দুই-তিনজনের মতামতের মধ্যে সমন্বয় করা যত সহজ পাঁচজনের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি দুরূহ। তাই পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট বর্তমান কমিশনের ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকি হলো তাদের মধ্যে সম্ভাব্য মতানৈক্য। বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে আশা করি নবগঠিত কমিশন এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারবে।
কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা: পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশনের সামনে অন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হলো কমিশনের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা। অনেকেরই স্মরণ আছে যে, অতীতে কমিশনের সচিবালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আইনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়াও আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা দেয়া আছে। তবে সাংবিধানিক নির্দেশনা দিয়ে বা আইন করে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায় না। আর কমিশন নিরপেক্ষ হলেই সব দলের জন্য নির্বাচনী মাঠ সমতল হবে এবং সবাই নির্বাচনে অংশ নিবে। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন না হলে এবং ভোটারদের সামনে বিকল্প না থাকলে তাকে নির্বাচন বলা যায় না, কারণ ‘নির্বাচন’ মানেই বিকল্পের মধ্য থেকে বেছে নেয়া। এছাড়াও, কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব শুধু নির্বাচন করাই নয়, বরং যথাসময়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ তথা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। আশার কথা যে, আমাদের মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইতিমধ্যেই সংবিধানকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। আমরা আশাবাদী হতে চাই যে, তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সততা, নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতা প্রদর্শন করবেন।
প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগ: প্রধান নির্বাচন কমিশনার, অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার এবং একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়েই নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০০৮ এবং এর ২০১৬ সালের সংশোধনীও নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এই বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনের সচিব থেকে শুরু করে জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা পদে সরকারি কর্মকতাদের প্রেষণে বদলি করার বিধান রাখা হয়েছে। আর প্রেষণের মাধ্যমে সরকার পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের কমিশনের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হতে পারে, যা অতীতের সরকারগুলো করেছে। নতুন নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশেষত জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা-সহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে, যেসব পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা নির্বাচনী ফলাফল সরাসরিভাবে প্রভাবিত করতে পারে, কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদেরকে নিয়োগের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার সৃষ্টি করা আবশ্যক।
সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা: আগের শামসুল হুদা কমিশনের নেতৃত্বে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি আরো কঠোর করা হয়েছিল। ভোটারদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে তাদের জন্য তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ‘না-ভোটে’র বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। (প্রসঙ্গত, নবম জাতীয় সংসদ ‘না-ভোটে’র বিধান অনুমোদন করেনি এবং মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলের নেতা-কর্মীদের মতামতের প্রাধান্যকে খর্ব করেছে)। রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছিল। নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন নিষিদ্ধ করার বিধানও রাখা হয়েছিল। আরও বিধান রাখা হয়েছিল সকল রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখা বিলুপ্তির। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সকল কমিটিতে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখারও বিধান করা হয়েছিল।
এগুলো ছিল যুগান্তকারী রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংস্কার, যেগুলো প্রণয়নের ক্ষেত্রে সুজন নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেছিল। আমরা অনেকগুলো সংস্কার ভাবনা উত্থাপন করেছিলাম এবং একই সঙ্গে এগুলোর ব্যাপারে জনমত সৃষ্টি করেছিলাম। সুজন-এর পক্ষ থেকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের একটি খসড়াও নবগঠিত শামসুল হুদা কমিশনকে প্রদান করা হয়। আমাদের এবং অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত সংস্কার ধারণাগুলো নিয়ে শামসুল হুদা কমিশন তাদের নিজস্ব সংস্কার প্যাকেজ তৈরি করে এবং রাজনৈতিক দল (যদিও বিএনপি এতে অংশগ্রহণ করেনি), নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের পর সেগুলো রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ আকারে জারি করেন।
প্রসঙ্গত, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রণীত ‘দিনবদলের সনদ’- শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী সংস্কার প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছিল। রকিবউদ্দীন কমিশন এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। বরং তারা প্রার্থিতা বাতিলসহ তাদের নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করার উদ্যোগ নেয়, প্রবল সমালোচনার মুখে যা থেকে তারা বিরত হয়। এছাড়াও তারা স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করে, যা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে ভূমিকা রাখে এবং ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধিকে সীমিত করে। তাই নবগঠিত কমিশনের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা।
আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন: সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হলে আইনি কাঠমোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো হলো: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও); ভোটার তালিকা আইন, ২০১০; নির্বাচনী এলাকা সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০১০; রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১; জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪; নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে আচরণবিধি-সহ আরও অনেকগুলো বিধিমালা। উপরস্তু, স্থানীয় সরকারের সবগুলো আইনেই নির্বাচনী বিধান রয়েছে। এসব আইনে ও বিধি-বিধানে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা নতুন কমিশনের জন্য আইনি কাঠামোতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করছি:
(১) ‘না-ভোটে’র বিধানের পুনঃপ্রবর্তন; (২) মনোনয়নপত্র অনলাইনে দাখিলের বিধান; (৩) জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা ও আয়কর বিবরণী দাখিলের বিধান; (৪) সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে প্রদান; এবং (৫) রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সদস্যদের নাম ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও নিয়মিত আপডেট করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি।
আইনের প্রয়োগ: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আইন ও বিধি-বিধানে সংস্কার করলেই হবে না, নির্বাচন কমিশনকে সেগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এব্যাপারে আমাদের অতীতের নির্বাচন কমিশনগুলোর অপারগতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের জন্য তৃণমূল থেকে প্যানেল তৈরির যে আইনি বাধ্যবাধকতা তা প্রায় সব দলই উপেক্ষা করে আসছে। নির্বাচন কমিশনও এ ব্যাপারে কোনোরূপ উচ্চবাচ্য করেনি। এছাড়াও নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত করার বিধান আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলো ভ্রূক্ষেপও করছে না, যদিও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন শিক্ষা প্রতিষ্ঠনগুলোতে তাণ্ডব সৃষ্টি করেই চলছে। এছাড়াও আরপিও’র ৯০(গ) ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখা থাকা বেআইনি, যাও রাজনৈতিক দলগুলো অমান্য করেই চলছে। তাই নতুন নির্বাচন কমিশনকে আইন-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে।
ভোটার তালিকা: নির্ভুল ভোটার তালিকা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত এবং ভোটার তালিকা তৈরি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ২০০৮ সালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটি ছবিযুক্ত সঠিক ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যে তালিকায় পুরুষের তুলনায় ১৪ লাখের বেশি নারী ভোটার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভোটার তালিকায় হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ‘জেন্ডার-গ্যাপ’ দেখা দিয়েছে, অর্থাৎ পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সর্বশেষ খসড়া হালনাগাদের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭২ জন ভোটার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬০ জন, অর্থাৎ নারী-পুরুষের অনুপাত ৪০:৬০ এবং জেন্ডার-গ্যাপ ২০ শতাংশ (বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ৩ জানুয়ারি ২০১৭), যদিও হালনাগাদের মাধ্যমে মোট কত ভোটার তালিকায় সংযুক্ত হয়েছে তা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের হালনাগাদে প্রায় ৪৭ লাখ নতুন ভোটার ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছিলেন এবং তখন জেন্ডার-গ্যাপ ছিল ১২ শতাংশ। আমাদের জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের হার প্রায় সমান সমান। এছাড়াও আমাদের প্রায় এক কোটি নাগরিক বিদেশে কর্মরত, যাদের প্রায় সবাই পুরুষ এবং অধিকাংশই ভোটার নন। তাই এটি সুস্পষ্ট যে, হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ভোটার হওয়ার মতো অনেক যোগ্য নারী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এবং এর বিহিত করার লক্ষ্যে কমিশনকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সীমানা পুনঃনির্ধারণ: নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণও নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কয়েকটি সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা করা হয়, যার একটি হলো সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটার সংখ্যায় যতদূর সম্ভব সমতা আনা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ৮৭টি নির্বাচনী এলাকায় সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা হয়ছে এবং এরফলে ভোটার সংখ্যায় অসমতা আরো বেড়েছে, যা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উভয়েরই লঙ্ঘন। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের পর ২০০৮ সালে যেখানে গড় ভোটার সংখ্যার ক্ট২১ শতাংশের মধ্যেকার আসন সংখ্যা ছিল ৮৩টি, সেখানে ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০২টিতে। অর্থাৎ সীমানা পুনঃনির্ধারণের পর আসনওয়ারী ভোটার সংখ্যার তারতম্য আরো বেড়েছে। এছাড়াও রকিবউদ্দীন কমিশনের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে অনেক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল (প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩)। তাই নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের দিকেও কমিশনকে নজর দিতে হবে।
মনোনয়ন: শামসুল হুদা কমিশনের সময়ে অধ্যাদেশ আকারে যে আরপিও জারি করা হয় তাতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রত্যেক সংসদীয় আসনের জন্য একটি প্যানেল তৈরি করার এবং সেটি থেকে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড মনোনয়ন দেয়ার বিধান ছিল। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ কিছু নির্বাচনী এলাকায় এধরনের প্যানেল তৈরি করলেও, বিএনপি আইনের এবিধান সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে। তবে আওয়ামী লীগও সব ক্ষেত্রে তৈরি প্যানেল থেকে মনোনয়ন দেয়নি। তবে অধ্যাদেশটি অনুমোদনের সময়ে নবম সংসদ এ বিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডকে আর তৃণমূলে তৈরি প্যানেল থেকে মনোনয়ন দিতে হবে না, বোর্ডকে তা শুধু বিবেচনায় নিতে হবে। তাই সংসদ নির্বাচনে উড়ে এসে জুড়ে বসার সমস্যা দূর করতে হলে মনোনয়নের ক্ষেত্রে আগের অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত বিধানটি ফিরিয়ে আনা জরুরি এবং নতুন কমিশনকে এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
হলফনামা: সুজন-এর প্রচেষ্টায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছাড়া আর সব নির্বাচনেই ভোটারদের অবগতির জন্য প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয়ের উৎস, ফৌজদারি অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগের বিবরণ, নিজেদের এবং নির্ভরশীলদের সম্পদের হিসাব প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায়ে সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে এসব তথ্য ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও, কমিশন তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আমরা সুজন-এর পক্ষ থেকে প্রায় সব নির্বাচনেই হলফনামায় প্রদত্ত এসব তথ্যের তূলনামূলক চিত্র তৈরি করে তা বিতরণ করেছি, ভোটারদের কাছে যা ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। (দেখুন: যঃঃঢ়://াড়ঃবনফ.ড়ৎম)। গণমাধ্যমও এখন একাজে এগিয়ে এসেছে এবং আনন্দের কথা যে, এটি এখন একটি আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
তবে হলফনামার ছকে গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, এতে স্থাবর সম্পদের হিসাব ক্রয় মূল্যে প্রদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে, যাতে প্রার্থীর ও প্রার্থীর নির্ভরশীলদের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও আমরা মনে করি যে, হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে অসমাপ্ত হলফনামা প্রদানকারী, তথ্য গোপনকারী ও ভুল তথ্য প্রদানকারীর প্রার্থিতা বাতিল কিংবা তাদের নির্বাচন বাতিল করলে অনেক অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের নির্বাচনী অঙ্গন থেকে দূরে রাখা যাবে এবং আমাদের রাজনীতি বহুলাংশে কলুষমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। তাই নবগঠিত কমিশনকে আমরা হলফনামার ছকটিতে পরিবর্তন আনার এবং হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যগুলো কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করছি। একই সঙ্গে প্রার্থীরা যেন আয়কর বিবরণীর পরিবর্তে শুধুমাত্র প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে পার পেয়ে না যান, কমিশনকে তা নিশ্চিত করারও আমরা অনুরোধ করছি। নির্বাচন কমিশনকে প্রার্থী কর্তৃক হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যসমূহ ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করারও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
নির্বাচনী ব্যয়: নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ সীমা ক্রমাগতই বেড়ে যাচ্ছে - রকিবউদ্দীন কমিশন এই সীমাকে ১৫ লাখ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকা করেছে। তা সত্ত্বেও নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের খবর আমরা প্রতিনিয়ত শুনি। বস্তুত নির্বাচন- সব স্তরের নির্বাচন - এখন টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে এবং আমাদের গণতন্ত্র হয়ে পড়েছে ‘বেস্ট ডেমোক্রেসি মানি ক্যান বাই’ বা টাকা দিয়ে কেনা যায় এমন উত্তম গণতন্ত্র। ফলে শুধুমাত্র জাতীয় সংসদই নয়, এমনকি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত। বস্তুত আমাদের দেশে রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ হয়েছে এবং ব্যবসায়ের রাজনীতিকরণ হয়েছে। তাই নতুন নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে হবে এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ সীমা কমাতে হবে, যাতে ভোটাধিকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হবার অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রার্থী কর্তৃক পোস্টার-লিফলেট ছাপানো ও সকল ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রার্থীদের পোস্টার ছাপানো ও প্রচার এবং সকল প্রার্থীকে এক মঞ্চে এনে প্রজেকশন মিটিং আয়োজনের মধ্য দিয়েও নির্বাচনী ব্যয় হ্রাস করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
মনোনয়ন বাণিজ্য: মনোনয়ন বাণিজ্য আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আজ এক ধরনের প্রহসনে পরিণত করে ফেলেছে। অতীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা আমরা শুনেছি, কিন্তু দলভিত্তিক নির্বাচনের কারণে এ ব্যধি এখন স্থানীয় সরকার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে এর অবসান আবশ্যক এবং আমরা আশা করি যে, নতুন কমিশন এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। তৃণমূল থেকে মনোনয়ন প্রদানের বিধান কার্যকর হলেই মনোনয়ন বাণিজ্য ক্রমশ হ্রাস পাবে বলে আমরা মনে করি।
রাজনৈতিক দলের হিসাব-নিকাশ: নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের অডিট করা আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রতি বছর নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। আমরা তথ্য অধিকার আইনের অধীনে এগুলো কমিশনের কাছে চেয়েও পাইনি। এমনকি তথ্য কমিশনে গিয়েও এর প্রতিকার পাইনি। এরপর উচ্চ আদালতে গিয়ে আমরা যে রায় পেয়েছি তাতে বলা হয়েছে, যে কোনো ‘কর্তৃপক্ষে’র কাছে থাকা সব তথ্যই, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, ‘পাবলিক ইনফরমেশন,’ যেগুলো পাওয়ার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। (দেখুন: যঃঃঢ়://িি.িংঁঢ়ৎবসবপড়ঁৎঃ.মড়া.নফ/ৎবংড়ঁৎপবং/ফড়পঁসবহঃং/৮১৪৪৬২থড.চ৭৯৮ড়ভ২০১৫.ঢ়ফভ) আশা করি, কমিশন বিষয়টি স্মরণে রাখবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধে রাজনৈতিক দলের অর্থের উৎসের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেবে। প্রসঙ্গত, প্রতিবেশী ভারতে এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসা: সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনী বিরোধের দ্রুত মীমাংসা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচনী বিরোধ সংক্রান্ত মামলাগুলো নিষ্পত্তির ব্যাপারে ব্যাপক দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী মামলা সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও নিষ্পত্তি হয় না। এ ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা নির্বাচনী অপরাধকেই উৎসাহিত করে। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনী বিরোধ-মীমাংসার লক্ষ্যে বিশেষ (নির্বাচনী) ট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করার লক্ষ্যে কমিশনকে উচ্চ আদালতের সহায়তা নিতে হবে।
সহিংসতা বোধ: শামসুল হুদা কমিশনের সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা ছিল না বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। সেই কমিশনের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীরাও আইন-কানুন মানা শুরু করেছিল। কিন্তু রকিবউদ্দীন কমিশনের মেয়াদকালে নির্বাচনী সহিংসতা বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছে। যেমন, গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রায় ১৫০ জন নিহত হয়েছেন, বহু ব্যক্তি আহত হয়েছেন এবং ব্যাপক জানমালের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। তাই নতুন নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী সহিংসতা রোধেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আচরণবিধি: প্রত্যেক নির্বাচনের জন্যই নির্বাচন কমিশন একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করে, সংশ্লিষ্টরা তা মেনে চললে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু রকিবউদ্দীন কমিশনের মেয়াদকালে রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীরা আচরণবিধি অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করেছে এবং নির্বাচন কমিশনও এ ব্যাপারে কঠোরতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই পুনর্গঠিত কমিশনকে এ ব্যাপারে নজর দিতে হবে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১৯৯০ সালে প্রণীত ‘তিন জোটের রূপরেখা’য় অন্তর্ভুক্ত আচরণবিধিটি কাজে লাগানোর উদ্যোগও কমিশন নিতে পারে। উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করার প্রবণতা অনেকদিন থেকেই অব্যাহত রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার বিষয়টিও নির্বাচনী আচরণবিধির আওতায় আনা এখন জরুরি।
আইন ও বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা: রকিবউদ্দীন কমিশন আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের প্রতি চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভোটার তালিকা হালনাগাদের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের জন্য কয়েকটি সুস্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে: (১) প্রতিবছর ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হবে; (২) জানুয়ারি মাসে হালনাগাদের কাজটি সম্পন্ন করতে হবে; (৩) হালনাগাদের তথ্য সংগ্রহকারীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে; (৪) ১৮ বছরের কম বয়সীদের নিবন্ধন করতে কমিশনের আইনগত কোনো ক্ষমতা নেই; (৫) হালনাগাদ করা তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে; এবং (৬) কেউ ভোটার তালিকার কপি চাইলে কমিশনকে তা সরবরাহ করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত আইনি এসব বাধ্যবাধকতার একটিও রকিবউদ্দীন কমিশন মানেনি (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫)। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও নির্বাচনী অভিযোগ নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য তাদেরকে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনাও করতে হয়েছে। এছাড়াও, প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা এবং কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের ফলাফল সময়মতো এবং অনেক সময় কমিশনের ওয়েবসাইটে থাকে না। এদিকেও কমিশনের নজর দিতে হবে।
আইন প্রণয়ন: আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের বিধি-বিধান সুনির্দিষ্ট করার লক্ষ্যে একটি আইন করার নির্দেশনা রয়েছে, গত ৪৫ বছরেও যা বাস্তবায়িত হয়নি। বিগত নির্বাচন কমিশন এ লক্ষ্যে একটি আইনের খসড়া তৈরি করে রেখে গিয়েছে, যেটি সম্পর্কে রকিবউদ্দীন কমিশন কোনোরূপ উদ্যোগই নেয়নি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন অতি জরুরি, তাই নতুন কমিশনকে এ ব্যাপারে মনযোগী হতে হবে। ভবিষ্যতে কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিতর্ক এড়াতে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে কমিশনকে আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করতে হবে এবং এটিকে আইনে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকারকে রাজি করাতে হবে। প্রস্তাবিত আইনে মোটাদাগে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা আবশ্যক: (১) কমিশনের কার্যপরিধি, দায়িত্ব ও ক্ষমতা; (২) প্রধান নির্বাচন কমিশনারও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মানদণ্ড; (৩) অনুসন্ধান কমিটির গঠন পদ্ধতি; এবং (৪) কমিশনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা।
নির্বাচন ইভিএম-এর ব্যবহার: বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করা হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। এর একটি কারণ আস্থাহীনতা। আমরা মনে করি, তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই, কারণ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে হলে তথ্য-প্রযুক্তির মহাসড়কে দ্রুততার সাথে প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সকল দলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।
সরকারের ও রাজনৈতিক দলের সদাচারণ: সবচেয়ে নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও সাহসী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়, যদি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সরকার নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল আচরণ না করে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন না করে। বস্তুত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত বা ‘নেসেসারি কন্ডিশন’, কিন্তু যথেষ্ট বা ‘সাফিসিয়েন্ট কন্ডিশন’ নয়। অর্থাৎ নির্বাচনকালীন সরকারের সদাচারণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সহায়তা ও সদাচারণ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে একটি ঐকমত্য জরুরি।
পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে, বিগত রকিবউদ্দীন কমিশনের ব্যর্থতা আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে খাদে ফেলে দিয়েছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক জন-অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এরফলে আমাদের রাজনীতিতে অনেকগুলো জটিলতা দেখা দিয়েছে। ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আমাদের ঘাড়ে পড়তে শুরু করেছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ভবিষ্যতে বিতর্কিত নির্বাচন এড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা আশা করি, নবগঠিত নির্বাচন কমিশন তাদের সততা, নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতা প্রদর্শন করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হবেন। তাঁদের প্রতি আমাদের শুভকামনা ও সহায়তার আশ্বাস রইল। আর তাঁরা সফল না হলে এর দায় সরকার ও অনুসন্ধান কমিটিকেও নিতে হবে।
লেখক: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক
Wednesday, February 10, 2016
দলভিত্তিক ইউপি নির্বাচন কতটা যৌক্তিক by বদিউল আলম মজুমদার
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পৌরসভার মেয়র পদে
দলভিত্তিক নির্বাচনের পর ইউনিয়ন পরিষদেও চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে
নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। এ লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ আইনে প্রয়োজনীয়
সংশোধনী আনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও ইতিমধ্যে আচরণবিধি চূড়ান্ত করে
ফেলেছে বলে শোনা যায়। কিন্তু বিশেষত পৌর নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে
আমরা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা
খুঁজে পাই না।তবে দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন যৌক্তিক হতে পারে, যদি এর মাধ্যমে: (১) গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়; (২) জনকল্যাণ সাধনে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়; এবং/ অথবা (৩) ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর দলের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা তাঁদের দায়বদ্ধ আচরণ নিশ্চিত করবে।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদ হলো জনগণের দোরগোড়ার সরকার। তাই এর মাধ্যমেই ‘গ্রাস রুট ডেমোক্রেসি’ বা তৃণমূলে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আর নির্বাচনের মাধ্যমেই তা ঘটে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে নির্বাচন দলভিত্তিক না হলে কিছু আসে-যায় না। কারণ, গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন এবং এই সম্মতি অর্জিত হয় জনগণের ভোটের মাধ্যমে। তাই তৃণমূলে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনাবশ্যক।
অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, সম্পদ, দায়-দায়িত্ব ও ক্ষমতা যত জনগণের দোরগোড়ার সরকারের হাতে পৌঁছায়, তত বেশি তা তাদের কল্যাণে আসে। এর জন্য প্রয়োজন একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্পদ হস্তান্তর কর্মসূচি। তাই স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পদ, ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন প্রদানের মাধ্যমে শক্তিশালী ও কার্যকর করা হলেই এগুলো জনগণকে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান এবং তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দলভিত্তিক নির্বাচনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে বিকেন্দ্রীকরণ তথা নীতি-কাঠামোর এ ধরনের প্রয়োজনীয় সংস্কারের কোনো উদ্যোগই লক্ষ করা যায় না। এ ছাড়া বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্পদ হস্তান্তর কর্মসূচির জন্য দলভিত্তিক নির্বাচনের প্রয়োজন হয় না।
দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর দলীয় শৃঙ্খলা আরোপের অভিজ্ঞতাও আমাদের ইতিবাচক নয়। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি অংশ বর্তমানে অনেক গুরুতর গর্হিত কাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দলের পক্ষ থেকে এসব অপকর্মের হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তেমন কোনো দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে নেই। বস্তুত, অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, দলীয় শৃঙ্খলা বলতেই আমাদের দেশে কিছু নেই। বরং রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই আমাদের দেশে অধিকাংশ দুর্নীতি ও অপকর্ম হয়ে থাকে। আবার অনেকের মতে, আমাদের দেশে যথাযথ গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দলই গড়ে ওঠেনি এবং আমাদের প্রধান দলগুলো অনেকটা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের মতোই আচরণ করে। প্রসঙ্গত, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আফসোস করে বলেছিলেন, বাঙালি দলাদলিই করতে পারে, দল গড়ে তুলতে পারে না। তাই দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের দেশে দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যুক্তিও হালে পানি পায় না।
বরং দলীয় প্রতীকে নির্বাচন ভালোর পরিবর্তে মন্দই বয়ে আনতে পারে। সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতা অন্তত তা–ই বলে। দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে শুধু যে এক দলের সঙ্গে অন্য দলের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ হয় তা নয়, একই দলের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে চরম হানাহানি সৃষ্টি করতে পারে। গত পৌরসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ দিনে ৫০টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে এবং এক দিনেই ঘটেছে ১১টি। সাধারণত জয়-পরাজয়ের উত্তাপে নির্বাচনের দিনেই সহিংসতা ঘটে থাকে, কিন্তু গত পৌর নির্বাচনে অনেক আগ থেকেই তা শুরু হয়। আর বিএনপি যদি দুর্বল অবস্থানে না থাকত এবং গ্রেপ্তার ও বিভিন্ন ধরনের মামলা-হামলা, ভয়ভীতির কারণে তারা যদি পলায়নপর না হতো, তাহলে আমাদের প্রধান দুই দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-হানাহানি আরও অনেক বেশি হতো বলে অনেকের আশঙ্কা। অত্যন্ত ক্ষমতাধর সরকার তার প্রবল শক্তি ব্যবহার করে বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ না করলে সরকারি দলের অভ্যন্তরেও সহিংসতা আরও ব্যাপক হতো। আমাদের আশঙ্কা, চেয়ারম্যান পদে দলভিত্তিক মনোনয়নের কারণে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ক্ষমতাসীন দল থেকে চেয়ারম্যান পদে গড়ে অন্তত পাঁচজন প্রার্থী দলীয় মনোনয়নের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, (প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি ২০১৬)। এটা দলের মধ্যে হানাহানি ব্যাপকভাবে উসকে দিতে পারে। সারা দেশে ৪ হাজার ৫৫৩টি ইউনিয়নে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের কারণে সহিংসতা ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে বলে অনেকের ধারণা। ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করার অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কয়েক দিন আগে নারায়ণগঞ্জের আলীরটেক ইউনিয়নে বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানের সমর্থকদের মধ্যে সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে সংঘর্ষে ৩০ জন আহত হয়েছে (মানবজমিন, ২৬ জানুয়ারি ২০১৬)। প্রতিপক্ষ দলের সঙ্গে এবং একই দলের অভ্যন্তরে এ ধরনের অনৈক্য ও হানাহানি তৃণমূলে অহেতুক অস্থিরতাই সৃষ্টি করবে এবং সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করবে।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথেও বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক দলীয়করণ। দুর্ভাগ্যবশত, পক্ষপাতদুষ্টতার গুরুতর অভিযোগ আমাদের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও রয়েছে। অতীতে অধিকাংশ প্রার্থীর দলীয় পরিচিতি থাকলেও ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক ব্যবহৃত হতো না। তাই নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত দলবাজ কর্মকর্তারাও তাঁদের দলীয় প্রার্থীদের প্রতি একধরনের নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতেন। ফলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সুগম হতো। কিন্তু দলভিত্তিক নির্বাচনে দলান্ধ কর্মকর্তারা তাঁদের দল মনোনীত প্রার্থীদের জিতিয়ে আনা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, যা নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
দলভিত্তিক নির্বাচন প্রার্থীর সংখ্যাও কমিয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পৌরসভা মেয়র পদে গড় প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ১১। সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ০৩ শতাংশে। এর বড় কারণ নির্দলীয় প্রার্থীর অনুপস্থিতি। অতীতে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় অনেক ব্যক্তিকে স্থানীয় জনগণই নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দিতেন। কিন্তু পৌরসভা নির্বাচনে তাঁদের অনেকেই ভোটারদের প্রতীকের প্রতি আনুগত্যের কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উৎসাহিত বোধ করেননি। প্রার্থীর সংখ্যা কমে গেলে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি ছোট হয়ে যায়, কম যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া দলভিত্তিক নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ভিকটিম হবেন নারীরা। কারণ প্রধান দলগুলোর মনোনয়নপ্রাপ্তদের বাইরে খুব কম নারীই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এগিয়ে আসবেন।
পরিশেষে, দলভিত্তিক নির্বাচন একটি অত্যন্ত অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত। গত পৌরসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে আমরা দেশের একাধিক জায়গায় নাগরিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সংলাপ করেছিলাম। সব ক্ষেত্রেই সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা, যার মধ্যে সরকারদলীয় নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিও ছিলেন, বিপুলভাবে দলভিত্তিক নির্বাচনের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। উদাহরণস্বরূপ, গত ১৯ অক্টোবর ২০১৫ রংপুরে অনুষ্ঠিত একটি সংলাপে ২৮ জন বক্তার মধ্যে ২০ জনই পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের বিরোধিতা করেন, চারজন দলভিত্তিক নির্বাচনের পক্ষে মত দেন আর অন্য চারজনের মধ্যে দুজন বিষয়টি সম্পর্কে জনমত যাচাইয়ের পরামর্শ দেন। জনমতের কথা বলতে গেলে, ১৩ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে প্রথম আলোয় অনুষ্ঠিত একটি অনলাইন জরিপে অংশগ্রহণকারী ৩ হাজার ২০৮ জনের মধ্যে ৭৩ শতাংশই দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিপক্ষে মতামত দেন। আশা করি, আমাদের সম্মানিত রাজনীতিবিদেরা বিষয়টি আমলে নেবেন এবং জাতিকে আরও বিভক্ত করা থেকে বিরত থাকবেন। বিভক্তি কারও জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন।
Sunday, January 24, 2016
কেমন হলো পৌর নির্বাচন? by বদিউল আলম মজুমদার
নির্বাচন কমিশন ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বিএনপি নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। নাগরিক সমাজের মধ্যেও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একধরনের সন্দেহ লক্ষ করা যায়। সত্যিকারভাবেই কেমন হয়েছে এ নির্বাচন?
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণ করতে হলে কতগুলো মানদণ্ড ব্যবহার করা প্রয়োজন। আমাদের আইনে কিংবা আদালতের রায়ে কোনো মানদণ্ড দেওয়া নেই। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তিতে—যেমন, ‘সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’–এ ‘জেনুইন’ নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে এবং এর কিছু মানদণ্ডও দেওয়া আছে। যেমন: (১) ভোটার তালিকা প্রস্তুতের প্রক্রিয়ায় যাঁরা ভোটার হওয়ার যোগ্য ছিলেন, তাঁরা ভোটার হতে পেরেছেন; (২) যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী হতে পেরেছেন; (৩) ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী ছিল; (৪) যাঁরা ভোট দিতে চেয়েছেন, তাঁরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন; এবং (৫) ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।
ভোটার তালিকায় ত্রুটি
দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে ব্যবহৃত ভোটার তালিকা ছিল অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত। প্রথমত, ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ১১ (১) ধারা অমান্য করে নির্বাচন কমিশন ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের পরিবর্তে জুলাই মাসে হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করার কারণে ৪৩ লাখের বেশি নতুন ভোটার যথাসময়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি এবং তাঁদের অনেকেই সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি।
দ্বিতীয়ত, ২০০৮ সালের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ছিল সর্বাধিক নির্ভুল এবং সেই তালিকায় পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি ছিল ১৪ লাখের অধিক। এর কারণ হলো, আমাদের প্রায় এক কোটি নাগরিক বিদেশে কর্মরত, তাঁদের অধিকাংশই পুরুষ এবং অনেকেই ভোটার নন। কিন্তু ২০১৪ সালের হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় যে ৪৭ লাখের মতো নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছিল, তাতে নারী-পুরুষের অনুপাত ছিল ৪৪: ৫৬, যা ঘটেছে তথ্য সংগ্রহকারীদের বাড়ি বাড়ি না যাওয়ার কারণে (যুগান্তর, ২৬ জানুয়ারি ২০১৫)। তাই ২০১৪ সালের হালনাগাদ করা তালিকায়, যে তালিকা দিয়ে সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, অনেক নারী ভোটার বাদ পড়েছেন এবং তাঁদের অনেকেই এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা
সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে গ্রেপ্তার, মামলা-হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিরোধী দলের ও ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিএনপি অভিযোগ তুলেছে যে পৌর নির্বাচনের প্রাক্কালে এক সপ্তাহেই তাদের প্রায় তিন হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে (প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর ২০১৫)। ফলে বিএনপির অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের একটি নগ্ন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে ফেনীতে। ফেনীর তিনটি পৌরসভার ৪৮টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে ৪৪টি এবং তিনটি মেয়র পদের মধ্যে দুটিতেই সরকারি দলের মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীরা ‘এমপি সাব’-এর ফেনী ‘স্টাইলে’ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে যে জমা দেওয়ার আগের রাতে তাঁদের কাছে থেকে মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয় (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫)।
ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী
সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে সব ক্ষেত্রে বিকল্প প্রার্থী ছিল না। যেমন, সাতজন মেয়র পদপ্রার্থী, যাঁদের সবাই সরকারি দলের, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। একইভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ১৩৪ জন কাউন্সিলর, যা ছিল একটি অনন্য নজির।
এ ছাড়া দলভিত্তিক নির্বাচন, প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ফলে সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে পৌরসভা প্রতি গড়ে ৫ দশমিক ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯২।
স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের সুযোগ
সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে ভোটাররা সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্র দখল, অবৈধ প্রভাব বিস্তার, জাল ভোট প্রদান, সহিংসতাসহ নানা অনিয়মের দৃশ্য গণমাধ্যমে দেখা গেছে। এসব অনিয়মের কারণে ৩৯টি কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল স্থগিত করা হয়। তবে অনেকের আশঙ্কা, সমুদ্রে ভাসমান বরফখণ্ডের যেমন সামান্য অংশই দেখা যায়, তেমনিভাবে সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে দৃশ্যমান অনিয়ম ছিল অদৃশ্য কারসাজির তুলনায় অতি নগণ্য।
এমনকি ১২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাতটি পৌরসভার নির্বাচনও জালিয়াতিমুক্ত ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম আলোর প্রতিবেদন (১৩ জানুয়ারি) অনুযায়ী: ‘ভোটকেন্দ্র দখল আর বহিরাগতদের অবাধে জাল ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়ে...নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভা নির্বাচনে পুনঃভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে...১২টি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের আটজন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের এ ঘটনা ঘটে...দুপুর ১২টার পর মোট ১২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০টিই নৌকার সমর্থকেরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।’
সাধারণত নির্বাচনী সহিংসতা ঘটে নির্বাচনের দিনে, জয়-পরাজয়ের উত্তেজনায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনের আগেই অনেক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে ‘সুজন’ ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যকার ২০ দিনে ৫০টি সহিংস ঘটনা চিহ্নিত করে। আর সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২৬ ডিসেম্বর এক দিনেই ঘটে ১১টি সহিংস ঘটনা, যা অনেক ভোটারের মনে শঙ্কার উদ্রেক করেছে এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁদের নিরুৎসাহিত করেছে।
ভোট গ্রহণ-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা
২৬ নভেম্বর ২০১৫ প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজস্ব জনবল থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন ১৭৫টি পৌরসভায় সরকারি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। আর অভিযোগ উঠেছে যে, ‘আইন মানেন না রিটার্নিং কর্মকর্তারা...আইনে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের বিধান নেই। কিন্তু তা মানেননি খুলনার পাইকগাছা, মাগুরা ও বরগুনার বেতাগী পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা...একটি পৌরসভার মেয়র প্রার্থী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে থেকে নির্বাচন করলেও প্রার্থিতা বাতিল করেননি রিটার্নিং কর্মকর্তা’ (ইত্তেফাক, ৮ ডিসেম্বর ২০১৫)।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত ২৫৫টি পৌরসভা নির্বাচনে, যে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি, ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ (সমকাল, ১০ মার্চ ২০১১)। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ ঘোষিত ২০৭টি পৌরসভার ফলাফল অনুযায়ী সার্বিকভাবে ভোট পড়েছে ৭৩ দশমিক ৯২ শতাংশের মধ্যে। ৫টি পৌরসভায় ভোট প্রদানের হার ছিল ৯০ শতাংশের এবং ৭৪টি পৌরসভায় ৮০ শতাংশের বেশি, যা অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এবারকার নির্বাচনে ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া এ নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্য ও ভোট কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে আচরণবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। ২৩ জন এমপি-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও তাঁদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া পৌর নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়মের শতাধিক অভিযোগের তদন্ত না করারও অভিযোগ ওঠে কমিশনের বিরুদ্ধে (যুগান্তর, ৫ জানুয়ারি ২০১৬), যদিও এ ব্যাপারে কমিশনের এমনকি নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এসব নির্লিপ্ততা তাদের নিরপেক্ষতা এবং একই সঙ্গে নির্বাচন-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই সার্বিক বিবেচনায় গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ ও ১২ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনকে জেনুইন বা সঠিক নির্বাচন বলা যায় না।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনকে আরও দুটি মানদণ্ডের আলোকেও বিচার করা যায়। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নবম সংসদসহ আরও অনেকগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে কিছু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত সমস্যা ছাড়া এসব নির্বাচনই ছিল মোটামুটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আরেকটি মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যবশত এবারের পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতার বিচারে আগের এসব নির্বাচনের ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারেনি। বরং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং এর পরবর্তী উপজেলা ও ঢাকা-চট্টগ্রামের তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী মানে নিম্নমুখিতার যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই ধারাই অব্যাহত রয়েছে; তা থেকে উত্তরণ ঘটেনি এবং আমাদের নির্বাচনী-প্রক্রিয়া সুস্থধারায় ফিরে আসেনি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1966)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

