Monday, September 30, 2013

কন্যা শিশুর বিয়ে নয় by সফিউল আযম

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর, জাতীয় কন্যা শিশু দিবস। কন্যা মানেই বধূ নয়; করবে তারা বিশ্বজয়Ñ এই প্রতিপাদ্যকে ঘিরে সারাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। সাধারণত একটি দিবস সামনে আসে এবং একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ বছর কন্যাশিশু দিবসটির প্রতিপাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু এবং এদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই কন্যাশিশু। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও আজও দেশের অধিকাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের আগেই। আজ সময় হয়েছে শিশুবিয়ে নামক অভিশাপকে সমাজ থেকে দূর করার। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে-২০০৭ এর তথ্য অনুযায়ী দেশে এখনও ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে এবং দুই দশক ধরে এ হারের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আর ১৯ বছরের আগেই গর্ভবতী হচ্ছে ৬৬ শতাংশের এক শতাংশ। বাংলাদেশে নারীর গড় বিয়ের বয়স ১৫ বছর ৩ মাস। ইউনিসেফের তথ্যমতে, শিশু বিবাহের হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। গত ৩০ বছরে শিশুবিবাহ আনুপাতিক হারে হ্রাস পেলেও বিশেষত গ্রামাঞ্চলে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমস্যাটা প্রকট। আইসিডিডিআরবি এবং প্ল্যান বাংলাদেশের যৌথ জরিপ-২০১৩ মতে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষিত শতকরা ২৬ জনের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগেই এবং নিরক্ষর নারীদের ক্ষেত্রে এই হার শতকরা ৮৬।
১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটি সংশোধন করা হয় ১৯৮৪ সালে। এ আইন অনুযায়ী পুরুষের বিয়ের আইনসম্মত বয়স ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর। এর ব্যতিক্রম হলে বিয়ের সঙ্গে জড়িত বর-কনের অভিভাবক, আত্মীয়, ইমামসহ সবার শাস্তির বিধান রয়েছে। জড়িত পুরুষদের এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। বর ও কনে দুজনই নাবালক হলে তাদের কোনো শাস্তি হবে না। ছেলে সাবালক ও মেয়ে নাবালক হলে ছেলের এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। একথা ঠিক যে, বেশিরভাগ সময় বর ও কনে পক্ষের সমঝোতার কারণে বিয়ে নথিভুক্ত হয় না এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর নজরে আসে না। কারণ পরিবারগুলো মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকে। অজ্ঞতা, অসচেতনতা, কুসংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, যৌন হয়রানি, কন্যা শিশুর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রভৃতি কারণে বাল্যবিয়ে বেশি হচ্ছে এ কথা বলা যায়।
একটি কথা প্রচলিত আছে, শিশুবিয়ে মানে শিশুর পেটে শিশুর জন্ম। বাস্তবে দেখা যায়, সন্তান জন্ম দেয়া ও লালন-পালন করা অল্পবয়স্ক একজন মেয়ের পক্ষে অনেকাংশে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এ অবস্থায় মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। ২০০৮ সালের পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক কৌশলপত্রে জানা যায়, কিশোরীদের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ এবং শিশুমৃত্যু জাতীয় গড়ের প্রায় ৩০ গুণ। শিশুবিয়ের শিকার মেয়েরা বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকে, স্বাস্থ্যহীনতা, পুষ্টিহীনতা ও দুর্বলতায় ভোগে। ফলে জন্ম নেয়া শিশুটি পরবর্তী সময়ে নানা সমস্যায় পতিত হয়। অল্প বয়সে সন্তান ধারণের ফলে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। ফলে পুরুষদের মধ্যে বহুবিবাহের আশংকা থেকে যায়। ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলো কার্যকর করা হলে শিশুবিয়ের মাত্রা কমে যাবে অনেকাংশে। এটি প্রতিরোধে করণীয় এবং এর শাস্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের বিলবোর্ড, পোস্টার প্রকাশ এবং তৃণমূলে তা ছড়িয়ে দেয়া জরুরি। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিশুবিয়ে বন্ধ করতে পরিবার থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। পাঠ্যপুস্তকে শিশুবিয়ের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে সচেতনতামূলক প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিশুরা অল্প বয়সে বিয়ের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক হয়ে যাবে। সরকারি-বেসরকারি নেটওয়ার্ক করে জাতীয়ভাবে প্রতিরোধ কর্মসূচি গড়ে তোলা, থানা ও জেলা পর্যায়ে শিশুবিয়ে বিষয়ক প্রতিরোধ ও তথ্য সংরক্ষণ সেল তৈরি করা এবং এ বিষয়ে পরিসংখ্যানগত তথ্য আপডেট করা এবং তা গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা, গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও জনপ্রতিনিধিদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান, শিশুর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা, যাতে শিশুর প্রকৃত বয়স নির্দিষ্ট করা যায়। প্রত্যেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে শিশুবিয়ে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করা হলে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। আসুন, সবাই মিলে শিশুবিয়ে নামক সামাজিক ব্যধিটিকে সমাজ থেকে দূর করি।
সফিউল আযম : উন্নয়নকর্মী

একটি দরকারি নির্বাচনী ইশতেহার by ড. কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির

রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তা, জনসভা, টকশো, পত্রপত্রিকা বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার নড়াচড়া দেখে মনে হয় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পালে মৃদু হাওয়া লেগেছে। যদিও অনেকের সন্দেহ এখনও কাটেনি নির্বাচন আদৌ হবে কিনা অথবা হলে কিভাবে হবে। যাই হোক, দলগুলো কম বেশি ব্যস্ত যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার কাজে। সঙ্গে সঙ্গে চলছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনসংযোগ, জনগণের কাছে করছেন বিভিন্ন ধরনের ওয়াদা। চমক লাগানো নির্বাচনী ইশতেহার সাজাতে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা, উপদেষ্টা বা থিংকট্যাংকদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে বলা যায়। দেশ ডিজিটাল না এনালগ হবে এ নিয়ে বিশ্লেষণের শেষ নেই। ক্ষমতার মসনদে অধিষ্ঠিত থাকা বা হওয়ার চেষ্টায় নেই গাফিলতি। অভিযোগ আছে- জেতার পর বেশিরভাগ নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের নিজ নির্বাচনী এলাকায় যান কদাচিৎ। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বলেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষায় রাজধানীতে না থাকলে, আলোচনা-বাহাস না করলে এলাকার জন্য অর্থ বরাদ্দ কিভাবে আসবে। কথায় যুক্তি একেবারে নেই বলা যাবে না। যাই হোক, গণতান্ত্রিক দেশ বলে কথা। জনগণের ভোটেই হবে চূড়ান্ত ফয়সালা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এদেশের গণতন্ত্র অনেকটা ভোটাভুটি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। জনগণের কথা যাদের ভাবার কথা তারা খুব কমই ভাবেন বলে মনে হয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে অপরিপক্ব বললে অত্যুক্তি হবে না। অপরিপক্বতার পাশাপাশি সীমাহীন দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অপশাসন, হত্যা, গুম, খুন ইত্যাদির কথা আমরা সবাই কম-বেশি জানি। এত কিছুর পরও দেশ ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়েছে দেশ। তিন বেলা না খেয়ে থাকতে রাজি কিন্তু এক ঘণ্টা মোবাইল, ফেসবুক ও টুইটার ছাড়া থাকতে পারি না। খাদ্যপণ্য সংরক্ষণে এসেছে যুগান্তকারী সাফল্য, যার কল্যাণে দেশে এখন পচা ফল পাওয়া কঠিন। আবিষ্কৃত হয়েছে ফরমালিন পদ্ধতি, কার্বাইড পদ্ধতি, কীটনাশক পদ্ধতি আরও কত কী! সব পদ্ধতির রয়েছে ক্যারিশমাটিক গুণ। তাই এগুলো দেদারসে ব্যবহার হচ্ছে আমাদের মৌসুমি ফল, শাকসবজি, খাদ্যশস্য, শিশুখাদ্য, পানীয়, মুড়ি, বেকারি পণ্য, জিলাপি, ফাস্ট ফুড, পশুখাদ্য, ওষুধ ইত্যাদিতে।
সম্প্রতি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমার লেখা ‘খাদ্যে ভেজাল : একটি ভিন্ন রকম পর্যালোচনা ও করণীয়’ শীর্ষক একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বোঝানোর চেষ্টা করেছি খাদ্যে ভেজালের কারণে কিভাবে আমরা তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছি। নিকষ-কালো অন্ধকারের দিকে গোটা জাতি কিভাবে একটু একটু করে ধাবিত হচ্ছে। বর্ণনা করেছি দেশে বর্তমানে ভেজালের মাত্রা কত ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। ভেজালের ব্যাপ্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চার, পাঁচ বা ছয়স্তরবিশিষ্ট কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী বা দুর্ভেদ্য গ্রিন জোনও এর আওতামুক্ত নয়। ভেজাল এক নীরব ঘাতক হয়ে জাতির ওপর খড়গ হয়ে দেখা দিয়েছে। অবস্থার ভয়াবহতা এমন যে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত সচেতন হয়েও ভেজালের হাত থেকে রেহাই পাওয়া অসম্ভব। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা বিষ-মিশ্রিত খাবার নাকি খাবার মিশ্রিত বিষ খাচ্ছি। ভেজালের কারণে খাদ্য-চিকিৎসার সঙ্গে অন্যসব মৌলিক চাহিদাও কোনো না কোনোভাবে প্রভাবান্বিত হচ্ছে। চিকিৎসক ও গবেষকদের ভাষ্যমতে, অনেক সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে খাদ্যে ভেজাল, যা নৈতিকতার অবক্ষয় থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক চাপ পর্যন্ত সুবিস্তৃত।
নির্বাচন এলে জনগণ অনেক আশা নিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পেলেই জনগণ খুশি। অনেককে বলতে শুনেছি- জীবনধারণের খাদ্যেরই যদি নিরাপত্তা না থাকল, তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কিনে কী হবে? সহজ সমীকরণে বলা যায়, দেশের জনগণই যদি ভালোমতো না বাঁচল, ডিজিটাল বা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দিয়ে কী হবে? দেশের মানুষ যদি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষই হয়ে গেল, তাহলে ভিশন-২১ বা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়ে কী হবে? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম (দেশের শিশুরা) যদি স্টুপিড হয়ে বেড়ে ওঠে, তাহলে দেশের প্রবৃদ্ধি বা রিজার্ভ গগনচুম্বী হয়ে কী লাভ? গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ২০২১ সালে দেশের সিংহভাগ মানুষ ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হবে। দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা। খাদ্যপণ্যে ভেজালের সঙ্গে আপস করার নজির পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। দুঃখজনক যে আমাদের দেশে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবে ভেজালবিরোধী অভিযান অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। আমাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। বুঝে না বুঝে আমরা যারা নিজ হাতে ভেজাল মেশাই, খাদ্যপণ্যে বিভিন্ন ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা কীটনাশক ব্যবহার করি, কেউই ভেজালের বিস্তৃত জাল থেকে রেহাই পাচ্ছি না- এটা সত্যিকারভাবে আমরা কদাচিৎ অনুধাবন করি।
বিষয়টা এমনও নয় যে, সরকারি দলের সমর্থকরা ক্ষমতার জোরে সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহ পরিণতি থেকে বেঁচে যাবে আর বিরোধী দল ভেজাল খেয়ে মরবে। এ রকম হলে সবার আগে আমাদের দেশে সে চর্চা শুরু হতো- অবস্থা দৃষ্টে সে রকমই মনে হয়। বস্তুত ধর্ম-বর্ণ সবার স্বার্থ এখানে সমানভাবে জড়িত। তাই বিষয়টি অনেক গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। খাদ্যে ভেজালের অন্তর্নিহিত কারণগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সমাধান করার বাস্তবসম্মত অঙ্গীকার হতে পারে আগামী নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। অনেকের মতে, অন্য অনেক ইশতেহারের চেয়ে এর গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি। কাজেই ১৪ বা ১৮ দলীয় জোটের সবাইকে সত্যিকারভাবে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে এবং নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সত্যিকারভাবে অনুধাবন করতে পারলে নিশ্চয় তা শুধু ওয়াদার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সহজেই বাস্তবায়িত হবে। কয়েক দিন আগে বিরোধীদলীয় নেতা এক জনসভায় সমাজ থেকে মাদক নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছেন। মাদক সমাজকে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে- সন্দেহ নেই। অবশ্যই মাদকের কবল থেকে সমাজের ঐশীদের বাঁচাতে হবে। সময়োচিত এ ধরনের ওয়াদা বা সিদ্ধান্তের জন্য সাধুবাদ জানাই। মাদকের মাধ্যমে বিশেষ করে দেশের যুবসমাজের একাংশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে ভেজালের মাধ্যমে মাদকসেবীর সঙ্গে অন্য সবাই ধ্বংস হচ্ছে। গর্ভের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ- সবাই ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কাজেই ভেজালের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। ইচ্ছা করলে অনেক কঠিন কাজও যে অসম্ভব নয়, তা বিগত জোট সরকারের শিক্ষাঙ্গনকে নকলমুক্ত করার কৃতিত্ব থেকেই বোঝা যায়- যা সব মহলে হয়েছিল প্রশংসিত। বিরোধীদলীয় নেতার সময়োপযোগী ওয়াদার সূত্র ধরে জনসাধারণের একজন হিসেবে আশা করতে চাই, ১৮ দলীয় জোট যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে সমাজ থেকে সত্যিকারভাবে মাদক দূর হবে। তেমনিভাবে আশা থাকবে, আগামীতে যে জোটই ক্ষমতায় আসুক, খাদ্যে ভেজালরূপী জাতীয় বিপর্যয়কে সমাজ থেকে দূর করতে প্রয়াস পাবে।
দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে সামনে রেখে, মানুষের চাহিদা বা দেশের সার্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার নিরিখে, এক কথায় তাৎক্ষণিক বা সুদূরপ্রসারী জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে। খাদ্যে ভেজাল একটি বড় ধরনের জাতীয় সমস্যা- এটা অনস্বীকার্য। সার্বিক বিবেচনায় খাদ্যে ভেজাল রোধ দেশের সচেতন মহলের গণদাবিতে পরিণত হয়েছে বলে অনেকের মতো আমারও মনে হয়। পাশাপাশি অচেতনদেরও দরকার সমানভাবে। দারুণ এ সুযোগকে যে কোনো দলের লুফে নেয়ার কথা। আশা করব, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে স্থান দেবে। সেই সঙ্গে সত্যিকারভাবে সে ওয়াদা বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবে, অন্তত নিজের স্বার্থের কথা ভেবে হলেও।
ড. কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির : সহযোগী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; গবেষক, ইয়াংনাম ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া

একতরফা নির্বাচন করার ক্ষমতা নেই সরকারের by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

ইতিহাসের নজিরবিহীন কূটনৈতিক তৎপরতা ও দেশের সুধীসমাজের প্রাণান্তকর চেষ্টার পরও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী দলের কোনো সংলাপ ও সমঝোতার সম্ভাবনা দৃশ্যমান হচ্ছে না। দু’পক্ষই পয়েন্ট অব নো রিটার্নের রাজনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। ক্ষমতাসীন দল হয়তো মনে করছে, বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসলেই তাদের রাজনীতির বারোটা বেজে যাবে; মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা রাজপথ ছেড়ে ঘরে ঢুকে যাবে, ফলে নির্বাচনে তাদের করুণ পরাজয় ঘটবে। যার জন্য তারা কোনো সংলাপ-সমঝোতায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। একটা একতরফা নির্বাচনের পথে ক্ষমতাসীন দল হাঁটছে। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একতরফা নির্বাচন করার মুরোদ ক্ষমতাসীন দলের নেই, ক্ষমতার একবারে শেষ পর্যায়ে তারা নির্দ্বিধায় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারাবেন। বাংলাদেশের অনেক জেলায় তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, যেমনটা থাকেনি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর। ওই সময় বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি জেলা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ আরও অনেক জেলা বলতে গেলে বেশ কয়েক দিন রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ওই সব জেলার সরকারদলীয় কর্মী তো বটেই, জেলা প্রশাসকরা পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। কাজেই বিরোধী জোট ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুললে, অন্তত ওই সব জেলায় একতরফা নির্বাচন করা সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে দুরূহ হবে।
বিরোধী দল মনে করছে, সংলাপ-সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার না হলে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গিয়ে তারা কোনো সুবিধা করতে পারবে না। কাজেই চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ আর খোলা নেই। তাতে আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনীতিকে পয়েন্ট অব নো রিটার্নের দিকে ঠেলে দেয়া ক্ষমতাসীনদের কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। কেননা এ থেকে চূড়ান্তভাবে তারা কোনো সুবিধা পাবেন বলে মনে হয় না। উপরন্তু তারা চরম বেকায়দায় নিপতিত হবে। কারণ রাজনৈতিকভাবে তারা ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একমাত্র সমঝোতার রাজনীতিই এ বেকায়দা থেকে তাদের বের করে আনতে পারে। ২০০৬ সালে বিএনপি যদি সমঝোতার রাজনীতির পথে হাঁটত, বিরোধী দলের দাবি মেনে নিত; তাহলে তারাই আবার হয়তো ক্ষমতায় যেত; ওই সময় সমঝোতা ও বিরোধী দলের দাবি না মেনে বিএনপি ইতিহাসের নজিরবিহীন বেকায়দায় নিপতিত হয়েছে। নিকট অতীতের এমন একটি দৃষ্টান্ত ক্ষমতাসীনদের সামনে দৃশ্যমান থাকলেও, তারা এ থেকে কোনো শিক্ষা নিচ্ছেন না। তারা রাজনীতিকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা কি একবার ভেবে দেখেছেন তাদের চার পাশের চিত্র? তাদের মন্ত্রী-এমপিরা জনরোষের শিকার হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশেও।
১০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যে আক্রমণের শিকার হন তখ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, ২৮ ডিসেম্বর নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুতা-বৃষ্টির শিকার হন, ৮ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের ভাসানী হলে পাটমন্ত্রী লতিফ ছিদ্দিকী দলীয় কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন, ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে শিবির কর্মীদের হামলার মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রীর গাড়িবহর, এতে এক পুলিশ সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হন, ১৪ নভেম্বর আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের গাড়িবহরে হামলা চালায় শিবির কর্মীরা, এ হামলায় মন্ত্রীর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের বাড়িতে হামলা চালায় স্থানীয় জনতা, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী রাজু উদ্দিন আহাম্মেদ রাজু ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন নিজ দলের বিক্ষুব্ধ কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। তা ছাড়া বেশ কয়েকজন এমপিও জনতার হাতে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, বরিশালের ২ আসনের এমপি মনিরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া ১ আসনের এমপি আফসার উদ্দিন আহাম্মেদ, নারায়ণগঞ্জের এমপি কবরী সারোয়ার ও নজরুল ইসলাম বাবু, ঢাকার এমপি সানজিদা খানম, নড়াইলের এমপি ফজিলাতুন্নেছা, গফরগাঁওয়ের এমপি গিয়াসউদ্দিন, যশোরের এমপি আঃ ওহাব প্রমুখ। সুতরাং এসব বিবেচনায় নিলে কোনোভাবেই রাজনীতিকে অশ্চিয়তায় ঠেলে দেয়ার যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না; বরং দল ও দেশের স্বার্থে, সমঝোতার রাজনীতিই ক্ষমতাসীনদের জন্য অধিকতর মঙ্গল বয়ে আনবে। বিএনপির আন্দোলন করার মুরোদ নেই, বিএনপি সরকার উৎখাতের শক্তি রাখে না- এসব অযাচিত ও অনাকাক্সিক্ষত মন্তব্য করাও সমীচীন নয়। বিএনপি সরকার উৎখাত করতে যাবে কোন দুঃখে? বিএনপি বর্তমান সরকারের প্রথম থেকেই ইতিবাচক রাজনীতির পথে হাঁটছে। সরকার অগণিত ইস্যু তৈরি করলেও বিএনপি এগুলোকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলেনি। উদাহরণ দিতে গেলে এমন বহু দেয়া যাবে। একমাত্র শেয়ার মার্কেট বিপর্যয়কে বিএনপি যদি রাজনৈতিক ইস্যু বানাত, তাহলে অবধারিত বেকায়দায় পড়ত সরকার। বর্তমান সরকারের সময়ে বিএনপির এ ইতিবাচক রাজনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য মাইলস্টোন হয়ে থাকবে। কিন্তু বর্তমানে পয়েন্ট অব নো রিটার্ন আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া বিএনপির সামনে বিকল্প পথ কী? ক্ষমতাসীনরা জাতিসংঘের আবেদনে সাড়া দিচ্ছেন না, আমেরিকার আবেদনে সাড়া দিচ্ছেন না, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করছেন। তা ছাড়া চীন, ভারত, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ ইতিহাসের এক নজিরবিহীন কূটনেতিক তৎপরতার পরও সরকারের বোধোদয় হচ্ছে না, তাদের টনক নড়ছে না।
বিরোধী দলের চাওয়াটা কি বড় কিছু? তারা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চাচ্ছেন মাত্র। এটা দেয়ার মতো মনমানসিকতা যাদের নেই, তাদের দ্বারা দেশের কী উপকার আশা করা যায়? যারা শুধু ক্ষমতাকেই বড় করে দেখেন, জনগণের চাওয়া-পাওয়ার কোনো মূল্য দেন না বা দিতে জানেন না, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার পাশাপাশি অযাচিত হস্তক্ষেপ ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মধ্যে পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে চান কেন? এবং বিরোধী দলকে অলআউট আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেনই-বা কেন? এ প্রশ্ন আজ সমগ্র জাতির। প্রধানমন্ত্রী আজ কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন। কিন্তু ১৯৯৫ সালে তার তত্ত্বাবধায়ক দাবিও তো অসাংবিধানিক ছিল। দেশের স্বার্থে বিএনপি কি সেই অসাংবিধানিক দাবি মেনে নেয়নি? তাহলে আজ এত প্রশ্ন কেন? প্রশ্ন এ জন্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে চেনে না। অন্যের চাওয়া-পাওয়ার মূল্য আওয়ামী লীগের কাছে গৌণ।
রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া থাকে। এসব দাবি নিয়ে বিতর্কও থাকে। কিন্তু বিরোধী দলের নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি নিরেট গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন দাবি। এ দাবি না মানলে সরকার অনিবার্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, ২০০৬ সালে একজন বিচারপতিকে নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নেয়া হয়নি; তাহলে একজন দলীয় প্রধানকে বিরোধী দল মেনে নেবে কোন যুক্তিতে? সে যুক্তিটা জাতির সামনে দাঁড় করানো প্রধানমন্ত্রীর অবশ্যই দায়িত্ব। পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হারার পর আগামী জাতীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত করাই যদি ক্ষমতাসীন দল একমাত্র সান্ত্বনা মনে করে, তাহলে করও কিছু বলার নেই। কিন্তু পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অন্য কোনো দল অংশ নেবে না। এরই মধ্যে মহাজোটের শক্তিশালী শরিক জাতীয় পার্টি ঘোষণা দিয়েছে সব দল নির্বাচনে না এলে তারাও নির্বাচনে অংশ নেবে না। আর কিছু দিন ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করার পর ইনু-মেননরাও হয়তো উল্টো সুরে কথা বলবেন। তখন হয়তো দেখা যাবে ক্ষমতাসীনদের বাগাড়ম্বর ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেছে। তখন তাদের বোধোদয় হলে হতেও পারে। কিন্তু এতে তাদের লোকসানের পাল্লাটা অনেক ভারী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিরোধী দলে যারা থাকেন, তারা এমনিতেই একটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন; আর সরকার যদি তাদের উস্কে দেয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই।
নির্বাচনে জয়পরাজয় অনিবার্য, অবিশ্যম্ভাবী; এ বাস্তবতা মেনেই রাজনীতি করতে হয়। নির্বাচনে হারব বলে সংলাপ করব না, সমঝোতা করব না, তা হতে পারে না। রাজনীতিতে পরাজয়কে সহজভাবে মেনে নিতে হবে এবং বিজয়কে সহিষ্ণুতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। আপনি কত বড় রাজনীতিবিদ সেটি বড় কথা নয়, আপনার কর্মকাণ্ড ও দৃষ্টিভঙ্গি দেশের জন্য কতটা ইতিবাচক ও মঙ্গলজনক জাতির কাছে সেটিই বড় বলে বিবেচ্য। কেউ যদি বিশ্বের সব ক্ষমতা পেয়ে যান আর আত্মাকে হারান তাতে কোনো প্রশান্তি নেই। শুধু ক্ষমতার জন্য বন্ধু, শুভাকাক্সক্ষী ও উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রের মতামতকে অগ্রাহ্য ও দেশের সুধীসমাজ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অপমান-অপদস্থ করা কোনো বড় মনের পরিচয় হতে পারে না। কোনো পেশাদার রাজনীতিক এমন জঘন্য ভুল করতে পারেন না। এটার একটা নেতিবাচক ফল রাজনীতির জন্য অবশ্যই আছে, যার শিকার হতে হবে সব রাজনীতিবিদের।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান সরকার একদলীয় ও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে একটি ভুল গল্পের নাটক মঞ্চস্থ করতে যাচ্ছে। এটা দেশের জন্য, তাদের দলের জন্য, সর্বোপরি দেশের গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা ও সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য কোনোভাবেই ভালো ফল বয়ে আনবে না। এর ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তাতে নিঃসন্দেহে ফায়দা লুটবে ওৎ পেতে থাকা দেশী-বিদেশী অপশক্তি।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিএনপির নতুন ধারার রাজনীতিটা কী? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বিএনপি ঘোষণা দিয়েছে তারা আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে দেশকে নতুন ধারার রাজনীতি উপহার দেবে। এই নতুন ধারার রাজনীতিটা কী তা অবশ্য এখনও তারা খোলাসা করে বলেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা না হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, তা অনেকের কাছেই এখনও স্পষ্ট নয়, কিন্তু খালেদা জিয়া ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রচারণা অভিযানে নেমে গেছেন এবং এই প্রচার অভিযানে তার একটি কথা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বারবারই বলছেন, ‘বিএনপি আর প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি করবে না।’ ‘দেশনেত্রী’কে তার উপদেষ্টারা এ কথাটা বুঝিয়ে দিয়েছেন কিনা জানি না যে, ‘বিএনপি আর প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না’, এই কথা দ্বারা দলনেত্রী স্বীকার করে নিলেন, তারা এতদিন প্রতিহিংসার রাজনীতি করেছেন। এটা যদি খালেদা জিয়ার সরল স্বীকারোক্তি হয় এবং তার দল জামায়াত, হেফাজতসহ উগ্র মৌলবাদী চক্রগুলোর সন্ত্রাসী রাজনীতির বাহুবন্ধন ত্যাগ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুস্থ ও প্রসারিত মধ্যপথে নেমে আসবে তার ইঙ্গিত হয়, তাহলে বিএনপি নেত্রীর নতুন ধারার রাজনীতির ঘোষণাটির তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। তা না হলে দলনেত্রীর এই ঘোষণা হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই প্রমাণিত হবে- এটা নতুন বোতলে পুরনো মদ ঢেলে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা। আমি বিএনপির নেতৃস্থানীয় একাধিক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা নতুন ধারার রাজনীতি বলতে কী বোঝাচ্ছেন। তারা আমাকে স্পষ্ট করে কিছু বোঝাতে পারেননি। কেবল বলেছেন, বিএনপি আর অতীতের ধারায় রাজনীতি করবে না। আমার প্রশ্ন, দলটির এই অতীতের ধারা কী? দেশের অনেক নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতেই, বিএনপির চরিত্র ও রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হল (ক) একজন সেনাপ্রধানের ক্ষমতায় থাকার প্রয়োজনে সেনা ছাউনিতে সেনাশাসনের সিভিল ফেস হিসেবে বিএনপির জন্ম নেয়া। (খ) পাকিস্তানে যেমন মস্ক এন্ড মিলিটারির মিলনে একটি অগণতান্ত্রিক এবং আরও সাম্প্রদায়িক শাসক শক্তি গড়ে উঠেছিল, বাংলাদেশেও তার অনুকরণ করা হয় এবং বিএনপির পেছনে একদিকে ক্যান্টনমেন্ট এবং অন্যদিকে স্বাধীনতার যুদ্ধে পরাজিত সাম্প্রদায়িক ও কট্টর মৌলবাদী দলগুলো জড়ো হয়।
(গ) স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত হওয়া মুসলিম লীগের রাজনীতির উত্তরাধিকার বিএনপি গ্রহণ করে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই অসাম্প্রদায়িক নামটি তার পরিচয় হয়। ভারতে এই একই কাজটি করেছে কট্টর সাম্প্রদায়িক বিজেপি। মহাÍা গান্ধীকে হত্যার পর হিন্দু মহাসভা নামক ঘাতক দলটি নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভারতীয় জনতা দল বা বিজেপি এই অসাম্প্রদায়িক নামের খোলসে এই দলটির আবির্ভাব ঘটে। শিবসেনা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ইত্যাদি জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী উপদলগুলোর সংমিশ্রণে বিজেপি আরও উগ্র সাম্প্রদায়িক দলে পরিণত হয়। অতীতের হিন্দু মহাসভার চেয়েও বিজেপির সাম্প্রদায়িক উগ্রতা বেশি। যদিও দলটির বাইরের খোলস হচ্ছে বাংলাদেশের বিএনপির মতো গণতান্ত্রিক। তারা গণতান্ত্রিক সেজে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় গিয়ে একাধিকবার দেশ শাসনও করেছে। কিন্তু এই দলের হাতেই গুজরাটের গোধরা হত্যাকাণ্ড এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসসহ সংখ্যালঘু নিপাত বা এথনিক ক্লিনসিংয়ের জঘন্য মানবতাবিরোধী ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং বর্তমানেও তারা গুজরাটে মুসলিম নিধনের হোতা এবং বুচার অফ গুজরাট নামে পরিচিত নরেন্দ্রনাথ মোদিকে আগামী সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী করার ঘোষণা দিয়েছে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি এই অসাম্প্রদায়িক নামের আড়ালে দলটি অতীতের মুসলিম লীগ রাজনীতির উত্তরাধিকার গ্রহণ করে। অতীতের মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে উগ্র মৌলবাদীদের অনুপ্রবেশ ঘটেনি; কিন্তু বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতিতে তা ঘটেছে এবং এখন তার চেহারা প্রকাশ্য।
অতীতে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ রাজনীতি বর্তমানের বিএনপি রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও মৌলবাদমুক্ত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে নূরুল আমিনের সর্বশেষ মুসলিম লীগ সরকার ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে গুলি চালিয়েছে, প্রাদেশিক পরিষদের ৩৫টি উপনির্বাচন ঠেকিয়ে রেখেছে, ৪৫ হাজার রাজনৈতিক বন্দিতে কারাগার ভরে ফেলেছে এ কথা সত্য; কিন্তু ১৯৫৪ সালে সম্পূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ যে নির্বাচনটি তারা অনুষ্ঠান করেছে, তার নজির কী বিএনপির কুষ্ঠিনামায় নেই।
গোটা মুসলিম লীগ সরকার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনসহ প্রদেশের ওই নির্বাচনে শুধু পরাজিত হওয়া নয়, জামানত হারিয়েছে; কিন্তু নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার জন্য তারা প্রশাসনকে ব্যবহার করেনি; রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালায়নি, নির্বাচনের সময় নির্যাতন চালিয়ে হিন্দু ভোটদাতাদের দেশ ছাড়া করেনি। সবচেয়ে বড় কথা, তখনকার ছোট-বড় মৌলবাদী দলগুলোকে নির্বাচনের সময় তাদের পক্ষে টানার চেষ্টা করেনি। ’৫৪-এর নির্বাচনের সময় শক্তিশালী না হলেও জামায়াত দলটি ছিল। শক্তিশালী মৌলবাদী দল ছিল নেজামে ইসলাম। নেজাম বরং হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্টে যোগ দিয়েছে। মুসলিম লীগের পক্ষে যায়নি। মুসলিম লীগের এই কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এই দলটিরই ঐতিহ্য ও রাজনীতির উত্তরাধিকারী বিএনপির কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ভারতে বিজেপি যেমন অতীতের হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক নীতির সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদের যোগ ঘটিয়েছে; বাংলাদেশেও তেমনি মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিএনপির হাতে উগ্র মৌলবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশটির গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এক সর্বনাশা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
সেনা ছাউনিতে জন্ম নিয়ে বিএনপি বহুকাল সেনাশাসনের সিভিল ফেস হিসেবে কাজ করেছে। তার ক্ষমতার পেছনে ছিল পাকিস্তানের মতো ‘মিলিটারি এন্ড মস্ক’। বর্তমানে তার সর্বাধিক নির্ভরতা জামায়াতের মতো ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী এবং হেফাজতের (পেছনে হিজবুত ইত্যাদি হিংস্র মৌলবাদী সংস্থা) ওপর। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির একাধিকবার কারসাজি ও জালিয়াতি; তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিকৃত ও কলুষিত করা, নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার, তাদের শাসনামলের অসংখ্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনকালে (২০০১) প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নির্বাচনপ্রার্থী, কর্মী, সমর্থক- বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটদাতাদের ওপর নির্মম অত্যাচার আজ প্রমাণিত ইতিহাস। বিএনপির নেতানেত্রীরা আজ তা গলার জোরে অস্বীকার করতে পারেন; কিন্তু তাতে ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না।
এটা উপমহাদেশের ইতিহাসের এক চরম ট্রাজেডি- দুই শতাব্দীর বিদ্রোহ, বিপ্লব ও আন্দোলন দ্বারা যে উপমহাদেশ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই উপমহাদেশের বিরাট অংশ ভারতে আজ উগ্র হিন্দু মৌলবাদী বিজেপি দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এবং যে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় জাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত লড়াই করে স্বাধীন হয়েছে সেই বাংলাদেশে আজ সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র মৌলবাদনির্ভর বিএনপি দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। তারা একাধিকবার ক্ষমতায় গেছে। দেশটির মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ও সেক্যুলার চরিত্রকে ধ্বংস করেছে এবং তাদের আবারও ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা (আশংকা) আছে।
বাংলাদেশের জনমানসে এখন একটা অদ্ভুত পরস্পরবিরোধী মানসিকতা কাজ করছে। যাদের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয় তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির জয় এবার ঠেকানো যাবে না।’ সঙ্গে সঙ্গে তারাই আবার বলেন, ‘এবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশ শুধু আধা তালেবানি রাষ্ট্র হবে না; সেক্যুলারিস্ট দলগুলোর ওপর এমন নির্যাতন নেমে আসবে, নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর এমন অত্যাচার শুরু হবে, যা ২০০১ সালের বর্বরতাকেও হার মানাবে, বিএনপির সহযোগী জামায়াত শুধু ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের জেল থেকে খালাস করে আনবে না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী যে মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী এখনও সরব ও সক্রিয় তাদের হয় ’৭১-এর মতো নিপাত, না হয় দেশ ছাড়া করার ব্যবস্থা করবে। একই মুখে এ ধরনের পরস্পরবিরোধী কথা শুনে আমি তাদের বলি, আপনারা দেশের সচেতন মানুষ যদি এই আশংকাই করেন যে, বিএনপি (দোসর জামায়াত-হেফাজত) আবার ক্ষমতায় আসতে পারে এবং এলে আফগানিস্তানের মতো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে, তাহলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের যত বড় দোষত্র“টিই থাকুক, তার বিরোধিতায় আপনারা এমন উচ্চকণ্ঠ কেন? আপনারাই তো বিএনপি-জামায়াতের আবার ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করে দিচ্ছেন। আমার এই কথার সদুত্তর অধিকাংশ বন্ধুর কাছ থেকে পাই না।
অদ্ভুত এক সাইকি এখন কাজ করছে দেশের এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মনে। তারা আওয়ামী লীগ সরকারকে আর পছন্দ করছেন না। আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশে কী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটবে সেই ভয়ে তারা ভীত। এই ভয় থেকে তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হলে বিএনপিকে ভোট দেবেন কিনা তাও এখন পর্যন্ত এক সন্দেহের বিষয়। সম্ভবত দেশের এক বিপুলসংখ্যক ভোটদাতার মনের এই সন্দেহ ও ভয়ের কথা অনুমান করেই বিএনপি নেত্রী এখন তার নির্বাচনী প্রচারণায় ‘আর প্রতিহিংসার রাজনীতি করব না’ এই কথাটি বারবার বলে এই সন্দেহ ও ভয় দূর করার চেষ্টা করছেন এবং বিএনপি নতুন ধারায় রাজনীতি করবে বলে দেশবাসীর মনে নতুন ধাঁধা সৃষ্টি করতে চাইছেন। কিন্তু বিএনপির রাজনীতির এই নতুন ধারাটি কী হবে, তা জানতে চেয়ে বিএনপির নেতৃস্থানীয় একাধিক বন্ধুর কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাইনি। এই নতুন ধারাটি কি তাহলে সোনার পাথর বাটি?
বিএনপি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। অবশ্যই ইচ্ছা করলে সে তার রাজনীতিতে নতুন ধারার জন্ম দিতে পারে। এই ধারাটি হল- সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র মৌলবাদী রাজনীতি ত্যাগ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির উদার ও মধ্যপথে অবিলম্বে চলে আসা। জামায়াত, হেফাজত ইত্যাদি স্বাধীনতা-বিরোধী ও গণবিরোধী চক্রগুলোর জোট থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছোট-বড় দলের সঙ্গে নতুন করে জোট গঠন করা। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা গ্রহণ না করা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সুস্পষ্ট কর্মসূচিভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা; আওয়ামী-বিরোধিতার নামে গোটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়া। সহিংস ও সন্ত্রাসী রাজনীতি পরিহার করে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে দাবি-দাওয়া আদায়ের চেষ্টা করা। সংসদে ফিরে যাওয়া। পারবেন বিএনপি নেতানেত্রীরা এই শর্তগুলো পূরণ করে সুস্থ, স্বাভাবিক, গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন ধারা সৃষ্টি করতে? বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি তা পারবে তা আমার মনে হয় না। এটা পারার আন্তরিকতাও তাদের মধ্যে নেই। থাকলে জামায়াতের সহিংস ও সন্ত্রাসী রাজনীতির সঙ্গে মিতালি তারা আরও দৃঢ় করতেন না। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার মুখে সমর্থন করেও সেই বিচার ও দণ্ড ভণ্ডুল করার জন্য হেফাজতি তাণ্ডবে সমর্থন জানাতেন না এবং তাদের দ্বারা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের নীলনকশা তৈরি করতেন না।
বিএনপি নতুন ধারার রাজনীতি করবে ঘোষণা দেয়ার পর যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হওয়ার পর তাকেসহ যুদ্ধাপরাধী, মানবতার শত্র“দের রক্ষার জন্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের নেতৃত্বে তাদের আইনজীবীদের ঝাঁপিয়ে পড়া কোন নতুন ধারার রাজনীতির আভাস দেয়? সব শেষে অক্টোবর মাসের শেষ দিক থেকে আবার হরতালের নামে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও সন্ত্রাসের রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া কি হবে বিএনপির নতুন ধারার রাজনীতি? আর এই রাজনীতি দ্বারা কি বিএনপি দেশবাসীকে বেশিদিন বিভ্রান্ত করে রাখতে পারবে?

সংলাপ, না অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণাম by বদিউল আলম মজুমদার

প্রথম আলো থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি
‘আমি সংবিধানে বিশ্বাস করি। যা হবে সংবিধান মোতাবেক হবে। তার থেকে একচুলও নড়া হবে না’—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (১৮/০৮/১৩)।
‘তাদের সঙ্গে কিসের সংলাপ? যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে কেক কেটে ফুর্তি করে, তাদের সঙ্গে আপস হবে না’—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (১৫/০৮/১৩)।
‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আগামী নির্বাচন নিয়ে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা-ও তাঁদের বলা হয়েছে। আমরা তাঁদের জানিয়েছি সবকিছুই হবে সংবিধানের আলোকে’—পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি (১৯/০৮/১৩)।
‘আলোচনাই সমাধানের একমাত্র পথ, এর বিকল্প যুদ্ধ’—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (১৮/০৬/১১)।

এটি সুস্পষ্ট যে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি ঐকমত্যে পৌঁছার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তার মত পরিবর্তন করেছে, যদিও সংলাপ ও সমঝোতার পক্ষে সারা দেশে ব্যাপক জনমত বিরাজ করেছে। অতীতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ আগ্রহী ছিল। এমনকি কয়েক মাস আগেও সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বিরোধী দলকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়ের মাত্র কয়েক মাস আগে কেন হঠাৎ করে এই মত পরিবর্তন? এটি কি শুধু সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে খালেদা জিয়ার কেক কেটে জন্মদিন পালনের জন্য? নাকি অন্য কোনো কারণে?
নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকীতে ঘটা করে বিরোধী দলের নেতার জন্মদিন উদ্যাপন অন্তত অশোভন ও দৃষ্টিকটু। এর মাধ্যমে জাতির জনকের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়, যা আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কাম্য নয়। আশা করি, তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাববেন এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্ম থেকে বিরত থাকবেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: খালেদা জিয়ার এমন আচরণের প্রতিক্রিয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সৈয়দ আশরাফ কি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দূর করার লক্ষ্যে সংলাপে বসার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারেন? জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেখানে জড়িত, সেখানে সংলাপের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেওয়া তাঁদের বক্তব্য কি যৌক্তিক? এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সংলাপের সঙ্গে জন্মদিন পালনের সম্পর্কই বা কী? খালেদা জিয়ার ওপর রাগ করে কি তাঁরা পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারেন? এটি কি তাঁদের নিজেদের এবং তাঁদের দলের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ?
যথাসময়ে ও সবার অংশগ্রহণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন যথাসময়ে না হলে—যে আশঙ্কা নিয়ে নাগরিকদের বিরাট অংশের মধ্যে ইতিমধ্যেই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে, কিংবা এতে প্রধান বিরোধী দল অংশ না নিলে, সারা দেশে সংঘাত অনিবার্য। এমনি পরিস্থিতিতে অতীতের মতো আমাদের গণতান্ত্রিকব্যবস্থা আবারও ভেঙে পড়তে পারে। আবারও অনির্বাচিত ব্যক্তিরা ক্ষমতা দখল করতে পারে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে। অতীতে আমরা দেখেছি যে এ ধরনের সরকার জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বয়ে আনেনি। ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম হবে বলে আমাদের মনে হয় না। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন, খালেদা জিয়ার ওপর অভিমান করে আওয়ামী লীগ কি পুরো জাতিকে ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো বিরাট ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?
এ ছাড়া খালেদা জিয়া তো এ বছরই প্রথম ১৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন পালন করছেন না। প্রায় গত দুই দশক থেকেই তিনি এই কাজটি করে আসছেন। তাই এ অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টি নতুন নয়। এই ইতিহাস জেনেই আওয়ামী লীগ তার ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সংঘাতময় রাজনীতির ঐতিহ্য পেছনে ফেলা’ এবং ‘সংকটের আবর্তে’ নিমজ্জমান অবস্থা থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ, সুখী-সুন্দর জীবন গড়ে তোলাই...বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একমাত্র ব্রত হিসেবে ঘোষণা করে। দিনবদলের সনদে আরও সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করে যে ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবে।’
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও ৩১ ডিসেম্বর ২০০৮ অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দল সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন: ‘অবশ্যই খালেদা জিয়ার সহযোগিতা চাইব। কারণ, তিনিও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, দেশ চালিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা আছে। সংসদে সকলের অভিজ্ঞতা নিয়েই চলতে হবে...বিরোধী দল সম্মত থাকলে মন্ত্রিত্ব দেব...বিরোধী দলকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করব না।’ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিরোধী দল থেকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেওয়ারও অঙ্গীকার করেন।
লক্ষণীয় যে সংবাদ সম্মেলনে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যেহেতু বিজয় অর্জন করেছি, তাই সবকিছু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে।’
শেখ হাসিনা বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান: ‘আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করি। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিরোধী দলের ইতিবাচক সমালোচনা, পরামর্শ এবং সংসদকে কার্যকর করতে তাদের ভূমিকা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখব।’
তিনি জাতিকে আশ্বস্ত করেন: ‘আমরা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। হানাহানির রাজনীতি পরিহার করতে চাই। দেশে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে চাই’ (প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি ২০০৯)।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর এসব অঙ্গীকার রক্ষা করতেন, তাহলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ঘটত এবং সমাজে সত্যিকারের দিনবদলের সূচনা হতো। আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হতো। জনগণও হাঁফ ছেড়ে বাঁচত, কারণ, তারা অতীতের অপশাসন ও সংঘাতের রাজনীতি নিয়ে অতিষ্ঠ এবং এখন তা আবারও ফিরে আসার আশঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্ত। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে হানাহানির রাজনীতির অবসান তথা দিনবদলের প্রত্যাশায় জনগণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে ২০০৮ সালে ভূমিধস বিজয় উপহার দিয়েছিল।
এটি সুস্পষ্ট যে গত নির্বাচনে জেতার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সবার, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দলের সহযোগিতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্যও বদ্ধপরিকর ছিল। এখন মেয়াদের শেষ দিকে এসে তারা বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপেও বসতে চায় না। এমনকি এটা করতে গিয়ে তারা রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতেও দ্বিধান্বিত নয়! কিন্তু কেন? অনেকের আশঙ্কা যে এ ধরনের আচরণ পরিবর্তনের পেছনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য পরাজয়ের ভয়ই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একের পর এক সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ ভয় স্বাভাবিকভাবেই আরও তীব্র হয়েছে।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ এখন সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা বলছে এবং এ জন্য যেকোনো মূল্য দিতেও যেন তারা প্রস্তুত। ১৯৯৫-৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও একইভাবে সংবিধান মানার কথাই বলেছিলেন। বস্তুত, আওয়ামী লীগ-বিএনপি নির্বিশেষে সব সরকারি দলের আচরণই এক—ক্ষমতায় থাকলে তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। আর বিরোধী দলে গেলে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে। আর এ ধরনের সুবিধাবাদের রাজনীতিই আমাদের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।
লক্ষণীয় যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায় প্রতিনিয়তই জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনলে তারা আর সহজে ক্ষমতা ছাড়বে না এবং তাদের পেছনের সামরিক শক্তি দীর্ঘমেয়াদিভাবে আমাদের ওপর জেঁকে বসবে। কিন্তু সমঝোতার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার পেছনে সামরিক শক্তি থাকতে হবে কেন? এ ছাড়া আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু ভিন্ন। ২০০৭ সালে সংবিধানে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান না থাকত, তাহলে মহাজোটের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার পর আমাদের দেশে সামরিক শাসন জারি হতো। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির জন্যই কি আজ আমাদের অপেক্ষা করতে হবে?
পরিশেষে, খালেদা জিয়াকে অতীতে আমরা বলতে শুনেছি, ব্যক্তির চেয়ে দল বড় এবং দল থেকে দেশ বড়। তাঁকে আজ জাতির সামনে প্রমাণ করতে হবে যে এ কথা তিনি আসলেই বিশ্বাস করেন। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীকেও জাতির সামনে দৃশ্যমান করতে হবে যে ব্যক্তিগত আবেগ ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে তিনি কষ্টকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কারণ, ব্যক্তি শেখ হাসিনা এখন সরকারপ্রধান এবং তাই তাঁকে শুধু পরিবার ও দলের নয়, এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। এ ছাড়া সংলাপ ও সমঝোতা করতে হয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে, সুহূদদের সঙ্গে নয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

Sunday, September 29, 2013

অনুত্তীর্ণদের জন্য প্রশংসা-বচন by শাহনেওয়াজ বিপ্লব

মাঝে মাঝে ভাবি আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ সত্যিই এক আশ্চর্য দেশ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংস্কৃতি থেকে একেবারেই আলাদা। সম্ভবত এটাই একমাত্র দেশ, যেখানে পরাজিতের কথা কেউ মনে রাখে না। পাঠান-মুঘল-ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে যেসব সৈনিক দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের অনেকেরই যথাযথ জায়গা হয়নি বাংলার ইতিহাসে। ওই সব যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যেসব সৈনিক রক্তাক্ত হয়ে ফিরে এসেছেন, সেসব পরাজিত সৈনিকের জন্য কোনো শোকগাথা নেই আমাদের। পরাজিতদের ভুলে যাই আমরা খুব দ্রুত। স্মৃতির কোনো কক্ষে আমরা তুলে রাখি না পরাজিতদের স্মৃতিচিহ্ন। পরাজিতের কবরে আমরা উৎসর্গ করি না কোনো রক্তগোলাপ। আসলে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিটাই এমন যে, ব্যর্থ আর সাফল্যহীনদের মনে রাখি না আমরা। আমরা কেবল মুক্তোর মালা পরিয়ে দিই, যারা সফল তাদের গলায়। কথাটা মনে হল এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সৌভাগ্য দেখে। এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়ে গেছে এখন থেকে দেড় মাস আগে। আর ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সমাজ বদলের স্লোগানধারী দেশের অন্যতম একটি দৈনিক, নানা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক আর টেলিভিশন চ্যানেলগুলো জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধিত করে চলেছে আজ অবধি। এর বাইরে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো উল্লাসরত ছাত্রছাত্রীদের ছবি ছেপেছে। নিয়মিত সংবাদ প্রচার করেছে এসব সফলের স্বপ্ন আর সম্ভাবনা নিয়ে। সব সংবাদ প্রতিবেদনের গৎবাঁধা সুর ছিল একই : শিক্ষার মান বাংলাদেশে বেড়েছে, বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থীর হার আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা এগিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি নানারকম কেচ্ছা-কাহিনী।
বাংলাদেশে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল ১০ লাখ ২ হাজার ৪৯৬ জন পরীক্ষার্থী। তার ভেতরে পাস করেছে ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৮৯১ জন। সবচেয়ে বেশি ফেল করেছে চট্টগ্রামে। শতকরা ৩৯ জন পাস করতে পারেনি ওই বোর্ডে। পাসের এ রমরমা সময়ে চট্টগ্রামে প্রতি ১০০ জনে ৩৯ জন কেন পাস করতে পারল না, অথবা সারাদেশে সম্মিলিত হিসেবে বাকি ২৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী কেন পাস করতে পারল না? ইউরোপের দেশগুলোতে প্রশ্নটি এভাবেই তোলা হয়। জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় প্রতিবছর পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর দৈনিক পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের মতোই সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তবে বাংলাদেশের মতো করে নয়। পরীক্ষায় যেসব ছাত্রছাত্রী অকৃতকার্য হয়, সাংবাদিকরা জানতে চায় ওই সব অকৃতকার্য ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে, কী দুঃখ ছিল তাদের মনে, কেন তারা পাস করল না? যারা ফেল করেছে তারা কি পাস করা ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে স্বভাবে ও চারিত্র্যে ব্যতিক্রম? কী অভাব ছিল ফেল করা ছাত্র বা ছাত্রীটির? তার কি বইয়ের অভাব ছিল অথবা খাবারের? ঘরে কি তার মা নেই অথবা বাবাকে হারিয়েছে ছোটবেলায়?
কিন্তু আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত কোনো সাংবাদিক এইচএসসি বা এসএসসিতে যারা ফেল করেছে যারা, তাদের কথা কোনো দিন ভাবেনি। তাদের কোনো সাক্ষাৎকার কোথাও ছাপা হয়নি। পরীক্ষায় ফেল করে যে আত্মহত্যা করেছে, তার কথা হয়তো লিখেছে সংবাদপত্রগুলো। কিন্তু গভীরে গিয়ে জানতে চায়নি কী দুঃখে ওই এইচএসসি ফেল করা ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে? কেন ছাত্রছাত্রীরা বেশি ফেল করে আমাদের দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারগুলোতে? সে কথা জানতে চায় না কেউ। না মা-বাবা, না বন্ধু-বান্ধবী, সমাজ-সাংবাদিক- কেউই। যারা ফেল করে, আমাদের সমাজ তাদের জন্য বরাদ্দ রেখেছে শুধু নিন্দা আর মন্দ।
বলা হয়ে থাকে, জন্ম মানুষের ভাগ্যকে অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে। যে ছাত্র বা ছাত্রীটি আজ চট্টগ্রামে কোনো গরিব মা-বাবার ঘরে জন্ম নিয়ে অভাব-অনটনের সংসারে প্রয়োজনীয় শিক্ষা-সুবিধা না পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছে, সে যদি আমেরিকায় কোনো ধনী মা-বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করত, তাহলে তার জীবন তো অন্যরকম হতে পারত। এ কথাটি আমরা বুঝতে চাই না। অথচ এমন এক গরিব দেশে জন্ম আমাদের, দারিদ্র্য আর অনটনের শিকার হয়ে বেশির ভাগ গ্রামীণ শিক্ষার্থী এসএসসি বা এইচএসসি পর্যন্ত কোনো রকমে লেখাপড়া চালিয়ে যায়। তাদের অনেকের হয়তো উপার্জনক্ষম কেউ নেই সংসারে। খাবার জোগানোর জন্য হয়তো দিনভর কাজ করতে হয়েছে ওসব ছাত্রছাত্রীকে। তাই যারা এবার এইচএসসিতে ফেল করেছ, তাদের বলছি- তোমরা হতাশ হয়ো না। সামর্থ্যে কুলালে পরের বার আবার চেষ্টা কর তোমরা। পৃথিবীতে বড় মনীষীরাও তো ফেল করেছে। আইনস্টাইন অংকে ফেল করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরীক্ষা-ভীতি ছিল। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যায়।
পরিশেষে একটি কথা : যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাদের নিয়ে উল্লাস করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যেন আমাদের ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের কথা ভুলে না যাই; সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ সমাজ বদলের অধিকার শুধু জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের একচ্ছত্র নয়, বরং যারা ফেল করেছে তাদেরও আছে সমাজ বদলের সমান অধিকার। বিষয়টি সমাজ বদলের স্লোগানদাতারা ভেবে দেখবেন- এই আশা করছি।
শাহনেওয়াজ বিপ্লব : কবি, গল্পকার ও অস্ট্রিয়া প্রবাসী গবেষক

এমন ঘটনা আর কখনও যেন না ঘটে by ড. সুকোমল বড়ুয়া

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩। এ দিনটি গত বছর ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক ট্রাজেডির ভয়াল সেই রাতের কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। বৌদ্ধ পুরাতত্ত্ব ও ঐতিহ্যের অন্যতম তীর্থভূমি পর্যটন নগরী কক্সবাজারের রামু, যেখানে শত শত বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও নানা ভাস্কর্য-সংস্কৃতি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেখানেই ঘটে গিয়েছিল স্মরণাতীতকালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিপর্যয়ের এক কালো থাবা। আমাদের প্রিয় রম্যভূমি রামু সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল জনপদ- যেটি আরাকান সংলগ্ন প্রাচীন ব্রহ্মদেশীয় সব থেরবাদী আদর্শকে ধারণ করে এসেছে। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের তীর্থস্থানের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ও প্যাগোডাই শুধু নয়; রাস্তার পাশে মন্দির ও বিহারের পার্শ্ববর্তী অনেক স্থাপনা ও বসতবাড়ি সেদিন রাতে সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। শুধু রামুর কেন্দ্রীয় সীমা বিহার নয়, খুবই নামকরা প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার লালচিং ও সাদাচিং এবং উত্তর মিঠাছড়ির শত ফুট দীর্ঘ সিংহশয্যা শায়িত বুদ্ধমূর্তিই নয়, উখিয়ার দীপাংকুর বিহার, জেতবন বিহার ও আর্যবংশ প্রভৃতি ২২টি বৌদ্ধ বিহার এবং চট্টগ্রামের পটিয়ার লাখেরা ও কোলাগাঁও সর্বজনীন বৌদ্ধ বিহার, টেকনাফের হোয়াইক্যাং ও রামু-উখিয়ার ৪০টিরও বেশি বসতবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। দু’শতাধিক রৌপ্য ও স্বর্ণের মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি লুটপাট হয়ে যায়। প্রাচীন পুঁথিপুস্তক, পাণ্ডুলিপি ও ভিক্ষুসংঘের মূল্যবান ব্যবহার্য জিনিসপত্র এবং অনেক ধাতব দ্রব্য জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসব ঐতিহ্য দেশ-বিদেশের গবেষকদের বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানের মূল্যবান উপাদান ছিল। আগামীতে হয়তোবা অনেক নতুন জিনিস পাওয়া যাবে, কিন্তু এসব দুর্লভ গবেষণা ঐতিহ্যের উপাদান আর কোনো দিন পাওয়া যাবে না। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর এ যেন স্মরণকালের ইতিহাসের এক ভয়ানক বর্বরোচিত হামলা। এ হামলাকে কেউ মেনে নিতে পারেনি, আগামীতেও পারবে না।
সবাই বলছে, এটা এদেশের বৌদ্ধদের ওপর বৌদ্ধ স্থাপনা ও ঐতিহ্যের ওপর চরম আঘাত। অন্তত মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া কয়েকশ’ বছরের ইতিহাসে বৌদ্ধদের ওপর এ রকম সাম্প্রদায়িক আঘাত আর কখনো আসেনি। তাই বলতে দ্বিধা নেই যে, সেদিনের সেই ধংধ্বযজ্ঞের ভয়ানক দৃশ্য এ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে এক বিরাট আঘাত হেনেছে। সেদিন আমরা আমাদের হাজার বছরের ধর্ম ও সংস্কৃতির এক অনুপম ঐতিহ্যকে হারিয়েছি। আমাদের মনে হয়েছে, এ যেন বিশ্ব মানবতার এক করুণ বিপর্যয়। তাই আজ দিনটিকে গভীর হৃদয় দিয়ে, আর অন্তরের শোক ও সহানুভূতি দিয়ে স্মরণ করছি। সেদিন এ নৃশংস বর্বরতায় যাদের ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে; ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে, তাদের প্রতি জানাই গভীর সহানুভূতি। আর যারা গৃহহারা হয়ে বহু কষ্টে বাইরে ছিল, তাদের প্রতি জানাই গভীর মমত্ববোধ ও সমবেদনা।  আমরা বিশ্বের যেখানেই যাই না কেন, সেখানে গর্ব করে বলি ‘বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’। এ যেন আমাদের শত সহস্র বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য। এ দেশে জন্মগ্রহণ করে আমরা ধন্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও ছিল তাই। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রধান এ চারটি ধর্ম ছাড়াও রয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষুুদ্র নানা জাতিগোষ্ঠী ও নৃ-সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করেছে। আর বৌদ্ধদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাতত্ত্ব তো এ দেশের মাটির গভীরে পরতে পরতে মিশে আছে। এমন একটি সামাজিক বন্ধন, সবার সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানে, আর সাম্যের ভিত্তিতে যে দেশ গড়ার প্রত্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা যেন সেদিন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সে যেন এক অদৃশ্য শক্তির কারণে।
মহামতি বুদ্ধ কোনো ধর্মের প্রতিপক্ষ নন। তিনি এক মহামানবতার প্রতীক, অহিংস ও সাম্যের প্রতীক। আর বৌদ্ধরাও কোনো ধর্মগোষ্ঠীর কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষ নন। তাহলে কেন সেদিন বৌদ্ধদের ওপর এ আঘাত হানা হয়েছিল? কী দোষ ছিল তাদের? ফেসবুকে সাজানো কোরআন অবমাননাকর একটি মিথ্যা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ রকম আঘাত আসতে পারে না। সবাই জানে, বৌদ্ধরা অতি নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় সম্প্রদায়। এদেশে বৌদ্ধদের ওপর এ রকম আঘাত কারও কাম্য ছিল না। দেশ-বিদেশে বৌদ্ধদের অনেক সুনাম ও মর্যাদা আছে বেশ উঁচুতে। সে জন্যই তো সেদিন এ ঘটনায় বিশ্ববিবেক জেগে উঠেছিল। দেশজুড়ে মানবতার ঝড় বয়েছিল। এহেন জঘন্য কাজ যারা করেছে, তাদের ঘৃণা ও নিন্দা জানিয়েছে। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকেও নিন্দা জানিয়েছে তারা তাদের দায়িত্ব রক্ষা করতে পারেনি বলে। সে এক সহমর্মিতার অপূর্ব নিদর্শন যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, সব শ্রেণী-পেশার মানুষ জড়ো হয়ে সভা-মিছিল করেছে, প্রতিবাদ জানিয়েছে। গোটা দেশ বৌদ্ধদের পাশে দাঁড়িয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। সেদিন আমাদের মনে হয়েছে, আমরা যেন আবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাকে ফিরে পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে যেমন কোনো ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ছিল না, বৈষম্য ছিল না- ঠিক সে রকম মনে হয়েছে আমাদের এই একাত্মতার মধ্যে।
এ সন্ত্রাসী হামলায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা, ডব্লিউএফবিসহ দেশ-বিদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, এমনকি অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানও ধিক্কার জানিয়েছেন। দেশের সুশীল সমাজসহ সর্বস্তরের জনগণের ধিক্কার তো ছিলই। সরকারও বিব্রতবোধ ও বেশ চাপে ছিল। সেদিন সরকার বলুন, আর প্রশাসনই বলুন, আমরা কেউ এ সম্প্রীতি বিনষ্টের লজ্জা ঢাকতে পারিনি, পারবও না। কারণ দেশ-বিদেশের কূটনৈতিক মিশনসহ সারাবিশ্বের চোখ ছিল আমাদের প্রতি নিবদ্ধ। সেদিন সবার প্রশ্ন ছিল সরকারের আইন-শৃংখলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতা দেখেও জাতি সেদিন স্তম্ভিত হয়েছে। এখনো সে প্রশ্ন বারবার উঠে আসে। ঘটনার খুব কাছাকাছি থেকেও কেন তারা অগ্রসর হয়নি, কেন দেখে ও জেনে-শুনে আইন রক্ষাকারী সংস্থা ও প্রশাসন দায়িত্ব পালন করেনি সেটাই জনগণের প্রশ্ন। অতি নিকটে ছিল রামু থানা, উপজেলা নির্বাহী অফিস, চার-পাঁচশ’ গজ দূরে ছিল সেনা ক্যাম্প, বর্ডার সিকিউরিটি গার্ডসহ সরকারের আইন-শৃংখলা ও স্থানীয় প্রশাসন এবং ৭-৮ কিলোমিটার দূরে ছিল জেলার হেডকোয়ার্টারগুলো। ঘটনার আগে ও পরে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাও ছিল যেন নীরব। এ প্রশ্ন শুধু স্থানীয় বৌদ্ধদের নয়, আন্তর্জাতিক মহলসহ দেশ-বিদেশের সব মহলের, তদন্ত সংস্থারও।
খুবই দুঃখের বিষয় যে, সেদিন জনতার মিছিলে আরও দেখা গেছে সরকারদলীয় স্থানীয় নেতাদের। এ তথ্য বারবার পত্রপত্রিকায় এসেছে। এমনকি থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাও তাদের সঙ্গে মিশে উস্কে দিয়ে সে সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। সবার ধারণা, এটা পূর্বপরিকল্পিত। সেখানকার প্রশাসনের সম্পৃক্ততা ছাড়া এহেন নাশকতামূলক কাজ সম্পাদন করা কারও পক্ষে কখনো সম্ভবপর নয়। এখনো সেই জঘন্য কর্মকাণ্ডের কোনো সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করা হয়নি। স্থানীয় জনগণ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, নিরীহদের নিয়ে থানায় মামলা হয়েছে, এখনো হয়রানি চলছে। অথচ প্রকৃত দোষীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা প্রতিদিন সরকারদলীয় নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছে, বক্তব্য দিচ্ছে। ৩ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন নতুন করে নির্মিত বিহার উদ্বোধন করেন, সে সময়ও তারা নাকি মঞ্চের আশপাশে ছিল।
সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভস্মীভূত সেই বৌদ্ধ বিহারগুলো দৃষ্টিনন্দন করে পুনঃনির্মাণ করে দেয়ার জন্য। এ জন্য সেনাসদস্যরা রাত-দিন খেটেছেন। আসলে তাদের দায়িত্বেই বিহারগুলো পুনঃনির্মিত হয়েছে। তারা বেশ শ্রম দিয়েছেন। কাজে যতœবানও ছিলেন। তাদেরও জানাই ধন্যবাদ। কিন্তু আজ এ শোকাবহ দিনে একটি প্রশ্ন- ভস্মীভূত প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর সুন্দর ও সৌকর্যমণ্ডিত বৌদ্ধ বিহার তৈরি করা হয়েছে, আগুনে পুড়ে যাওয়া গৃহহীনের ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে, তারপরও কি ‘মধুপূর্ণিমা’ রাতের সেই আগুনের ভয়াল দৃশ্য ও সন্ত্রাসীদের বীভৎস তাণ্ডবতা সেখানকার শিশু-কিশোর, ভিক্ষু-শ্রমণ, যুবক-যুবতী, আবালবৃদ্ধবনিতা কখনো ভুলতে পারবে? আরও প্রশ্ন, সেদিন বৌদ্ধদের হৃদয়ে যে আঘাত ও ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেটা কি কখনো ভোলা যাবে, কখনো পুনঃনির্মাণ করা যাবে? তাই এমন ঘটনা আর কখনো যেন না ঘটে সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

অনেক কিছুই বদলে যাওয়ার কথা ছিল- বদলায়নি by মোকাম্মেল হোসেন

আমি বসেছি বাসের একেবারে পেছনের একটা সিটে। নিয়ম অনুযায়ী এই বাসে সিটের অতিরিক্ত কোনো যাত্রী উঠানোর কথা না। এরা সেই নিয়মটা মানছে না। তাই নিয়ে সামনে বসা যাত্রীরা কন্ডাকটরের সঙ্গে হইচই করছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে আজকাল সিটিং সার্ভিসের নামে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এটাও সে ধরনেরই একটা বাস সার্ভিস। নাম নবকলি পরিবহন প্রাইভেট লিমিটেড। নামের সঙ্গে বাসের চেহারার মিল খুঁজতে গিয়ে আমার হাসি পেল। আমাকে হাসতে দেখে পাশের যাত্রী বললেন-
: ভাই, ডোন্ট মাইন্ড। কী জন্য হাসলেন জানতে পারি?
- হাসলাম দুঃখে।
: স্যরি! আমি আরও ভাবছি মজার কোনো জিনিস দেইখ্যা...
- দুঃখটা মজা থেইক্যাই উৎপন্ন হইছে।
: কীরকম!
- মালিকপক্ষ এই বাসটার নাম রাখছে নবকলি, অথচ বাইরে যেমন-তেমন, এর ভিতরের অবস্থাটা একবার দেখেন। অর্ধেক সিটই ভাঙা। এর মধ্যে কয়েকটা আবার দড়ি দিয়া বাইন্ধা রাখছে। কী তার নাম আর কী তার চেহারা!
: এই ধরনের জিল্লতিরে কী বলে জানেন?
- কী বলে?
: বলে- ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম।
- হাঃ হাঃ হাঃ। হানড্রেড পার্সেন্ট সত্য কথা বলছেন। আইচ্ছা, আমারে একটা কথা বলেন তো, লোকাল সার্ভিস হিসেবেও রাস্তায় চলার যোগ্য না, এইরকম লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা একটা বাস সিটিং সার্ভিসের অনুমোদন পাইল কীভাবে?
: এর উত্তর খুবই সোজা। অনুমোদনের ক্ষমতা যাদের হাতে ন্যস্ত, তারা বাসের নাট-বল্টু ঠিক আছে কিনা সেইটা লইয়া মাথা ঘামায় না! তারা শুধু দেখে, প্রতিমাসে তাদের হাতে টাকার যে বান্ডিলটা ধরাইয়া দেওয়া হয়, সেইগুলার মধ্যে ছেঁড়াফাটা কোনো নোট আছে কিনা! আপনে জানেন, কয়েকদিন আগে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটছিল?
- কী?
: এই কোম্পানির একটা বাস মহাখালী রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় হঠাৎ ঘুমাইয়া পড়ছিল। বাসের ড্রাইভার হাজার চেষ্টা কইরাও সেইটারে সজাগ করতে পারে নাই। শেষে একটা ট্রেন আইসা দুই ফাল্টা করার পর বাসটা টের পাইছে- কোনখানে সে বিছানা পাতছিল!
- বলেন কী! এই বাস নিচে গেছিল কী করতে? এইটার তো ফ্লাইওভারের উপর দিয়া চলাচল করার কথা।
: নিচে দিয়া গেছিল যাত্রী টুকাইতে।
- কেউ আহত-নিহত হয় নাই?
- ধুসমুস কইরা নাইম্যা যাওয়ায় কোনো যাত্রী আহত-নিহত হওয়ার চান্স পায় নাই। তবে আশপাশে থাকা জনাছয়েক পথচারী ও দোকানদার আহত হইছে। শুনছি, তাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা গুরুতর...
নবকলির শুধু চেহারাই খারাপ না, চরিত্রও খারাপ। কারও চরিত্রে দোষ থাকলে দশজন দশরকম কথা বলার সুযোগ পায়। এর বেলায়ও তাই ঘটল। কন্ডাকটরের উদ্দেশে একজনকে বলতে শুনলাম-
: অই হারামজাদা, এইটা সিটিং সার্ভিস, না চিটিং সার্ভিস?
লোকটার কথা শুনে কন্ডাকটর সরু চোখে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল-
: গালি দেন ক্যা!
পাশ থেকে অন্য একজন বলে উঠল-
: গালি তো তর জন্য কম হইয়া যায়। তর পাছায় কইষ্যা একটা লাত্থি দেওন দরকার।
- দেন লাত্থি!
ভদ্রলোক উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন-
: লাত্থি দিলে কী করবি তুই?
- আগে দিয়া দেখেন না!
ভদ্রলোক জামার হাতা গুটিয়ে প্রস্তুতি নিলেন। তারপর উচ্চস্বরে বললেন-
: অই ফকিন্নির পুত! তরে কি আমার শনি-মঙ্গলবার দেইখ্যা তারপর লাত্থি দেওন লাগব ভাবছস?
- আমি ফকিন্নির পুত- ঠিক আছে! কিন্তু আপনে জমিদারের পুত হইয়া বাসে উঠছেন ক্যান? প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে পারেন না!
: আমি কিসে চলাফেরা করব এইটা তুই বলার কে? এমন চড় দিব- বাড়িতে যাওয়ার পর তর বৌ তর মুখে কোনো দাঁত খুঁইজ্যা পাবে না।
- এইটা পারবেন! একবার লাত্থি মারবেন- একবার চড় মারবেন! তবে ওস্তাদের মাইর শেষরাইতে। মাইর-গুতা যাই দেন- আমরা একবার ধরলে কিন্তু আর ছাড়ি না। বৈশাখীর ভুইল্যা গেছেন?
পাশে বসা সেই ভদ্রলোক ফিসফিস করে আমার কাছে জানতে চাইলেন-
: বৈশাখ মাসে কী ঘটছিল?
বৈশাখী পরিবহনের ঘটনাটা আমি জানি। বিষণœকণ্ঠে বললাম-
: বৈশাখ মাস না, ও বলছে সাভার থেইক্যা গুলশান-নতুনবাজার রুটে চলাচলকারী বৈশাখী পরিবহনের কথা। ওই বাসে একদিন এইরকম কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের মারামারি লাইগ্যা যায়। এর জের ধইরা পরিবহন শ্রমিকরা ৭ জন বাসযাত্রীকে পিটাইয়া মাইরা ফেলছিল।
: আরে! এ তো সাংঘাতিক লোক! খুন করার কথা কেমন বুক ফুলাইয়া বলতেছে দেখছেন!
- সাংঘাতিকের দেখছেন কী! এই ব্যাটা তো এখন অন্যদের খুনের গল্প শুনাইতেছে। দুইদিন পরে নিজেই মানুষ খুন করার কারবারে নাইম্যা পড়বে।
: কীভাবে!
- নিজেরে ড্রাইভার ঘোষণা করার মাধ্যমে।
: বলেন কী!
- জ্বি।
ভদ্রলোক আমার দিকে স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর কন্ডাকটরের দিকে ইশারা করে বললেন-
: এই লোক টাকা গুনতে-গুনতে ড্রাইভার হইয়া যাবে! ড্রাইভার হওয়ার জন্য মৌলিক কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়বে না?
- না, পড়বে না। রাস্তায় গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়ার আগে তারে শুধু জিজ্ঞাসা করা হবে-
: তুমি গরু চেন?
- জ্বে স্যার, চিনি।
: বল তো, গরুর কয়টা মাথা?
- মাথা তো স্যার আপনের মতো একটাই!
: গুড। কয়টা লেজ?
- লেজও স্যার একটাই।
: ভেরিগুড। তুমি তো দেখতেছি হেভি ট্যালেন্ট। আইচ্ছা, এইবার বল- ছাগলের কয়টা চোখ?
- দুইটা।
: কয়টা ঠ্যাং?
- চাইরটা।
: ওয়েলডান। যাও, সমগ্র বাংলাদেশের যে কোনো রোডে গাড়ি চালাইতে তোমার আর কোনো বাধা নাই...
আমার কথা ও অভিনয় দেখে ভদ্রলোক মজা পেয়ে হো হো করে উঠলেন। হাসতেই হাসতেই বললেন-
: বাস্তবে সত্যি সত্যি এইরকম হয় নাকি?
- হয় না মানে? আপনে পরিসংখ্যানের দিকে তাকান। পরিসংখ্যান বলছে- সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেইক্যা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হইল দ্বিতীয়। এর কারণ কী জানেন? এর কারণ হইল এই দেশে এইভাবে ড্রাইভার হওয়া যায় বইল্যা। দেশে এইরকম ড্রাইভারের সংখ্যা কম কইরা হইলেও ৭ লাখ। আমাদের দেশে সড়কপথে প্রতিবছর অন্তত ৫ হাজার দুর্ঘটনা সংঘটিত হইতেছে। এসব দুর্ঘটনায় মারা যায় কমপক্ষে ৪ হাজার মানুষ ও পঙ্গুত্ব বরণ করে এর দ্বিগুণ। যদি আপনে এর আর্থিক ক্ষতি পরিমাপ করেন তাইলে তা টাকার অংকে দাঁড়ায় কমপক্ষে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া সড়কপথে সংঘটিত প্রতিটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারাজীবনের অপূরণীয় বেদনা ও আর্থিক সংকটে নিপতিত হওয়ার কারণ হওয়ায় আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রী ভাড়া কম দেয়ার সূত্র ধরে বাসের পরিবেশ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এ কথা সে কথা বলার পর কন্ডাকটর তাকে বলল-
: ধুনপুন না কইরা ৩২ টাকা ভাড়া দেন।
- কোন দুঃখে ৩২ টাকা দিব?
: ভাড়া ৩২ টাকা।
- শ্যামলী থেইক্যা শেওড়া পর্যন্ত ৩২ টাকা ভাড়া নেওয়ার পারমিশন তরে কে দিছে?
: এইটা সিটিং সার্ভিস।
- অই চিটার, তর এই বাস সিটিং সার্ভিস হইলে আমি দাঁড়াইয়া রইছি কীজন্য?
: আমি কি আপনেরে জোর কইরা উঠাইছি? আপনে নিজের ইচ্ছায় উঠছেন।
- দরজা খোলা পাইছি, তাই উঠছি। দরজা বন্ধ থাকলে উঠতাম?
: ক্যাচাল কইরেন না তো! ভাড়া দেন।
- ভাড়া তো দিছি।
: আরও দেওন লাগব।
- অসম্ভব। তুই আমার হাতে তেল ধরাইয়া দিয়া বলবি- ঘিয়ের দাম দেন, এইটা তো হইতে পারে না! যেমন দই, তেমন পয়সা।
শেওড়া পৌঁছার পর সেই যাত্রী বাস থেকে নামার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই কন্ডাকটর তাকে আটকাল। যাত্রী ভদ্রলোক ক্ষেপে গিয়ে বললেন-
: তুই আমার হাত ধরছস ক্যান?
- আগে টাকা দেন, তারপর নামেন।
: টাকা না দিলে কী করবি? বাস থেইক্যা নামতে দিবি না? আয়, সাহস থাকলে আটকা।
ভদ্রলোক কন্ডাকটরকে ধাক্কা দিয়ে বাসের দরজার কাছে যেতেই সে চিৎকার করে ড্রাইভারের উদ্দেশে বলল-
: ওস্তাদ, গাড়ি টান দেন। আবদুল্লাহপুরের আগে গাড়ি বেরেক হবে না।
ড্রাইভার গাড়ির গিয়ার বদল করতেই সেই যাত্রী লাফ দিয়ে ড্রাইভারের পাশে দাঁড়াল। তারপর ড্রাইভারের গালে একটা চড় মেরে বলল-
: এই- গাড়ি থামা।
চড় খেয়ে ড্রাইভার কয়েক সেকেন্ড থ মেরে তার দিকে চেয়ে রইল। তারপর ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো একবার ডানে একবার বামে বাস ঘোরাতে লাগল। শেওড়ার পরের স্টপেজ বিশ্বরোড। আমার এখানেই নামার কথা। কুড়িল ফ্লাইওভার চালু হওয়ার পর বিশ্বরোডের এ জায়গাটায় এখন যানবাহনের ভিড় অনেকটাই কমে গেছে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে ড্রাইভার বাসের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
: সবগুলারে খালে ডুবাইয়া মারমু...
ড্রাইভারের কাণ্ড দেখে বাসের মহিলা ও শিশুরা ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল। বাসটা যখন খিলক্ষেত স্টপেজেও থামল না, তখন যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের আতংক দেখা দিল। আমি অবাক হয়ে ড্রাইভারের কারবার দেখছিলাম আর মাত্র কিছুদিন আগে পাস হওয়া একটা আইনের কথা ভাবছিলাম। সে আইনে বলা হয়েছে- দুর্ঘটনায় যানবাহনের যাত্রী মারা গেলে কোনো ড্রাইভারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা যাবে না। এ মুহূর্তে এ বাসের ড্রাইভার সব যাত্রীকে রাস্তার পাশের খালে ডুবিয়ে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। ড্রাইভার যদি সত্যি সত্যি এ কাজ করে, তারপরও তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা যাবে না! কী ভয়াবহ ব্যাপার!
সবাই মিলে অনেক অনুরোধ আর অনুনয় করার পর শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরের সামনে এসে ড্রাইভার বাস দাঁড় করাল। আমাকে এখন রাস্তার ওপাশে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা একটা বাস ধরে বিশ্বরোড যেতে হবে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য ফুটওভার ব্রিজে উঠে দাঁড়ালাম। কোথাও শৃঙ্খলা নেই। যতদূর চোখ যায়- এলোমেলো-বিশৃঙ্খল একটা অবস্থা। দৃশ্যপটটা এরকম হওয়ার কথা ছিল না। দিন বদলের প্রতিশ্র“তি দিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। শাসক দলের প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী অনেক কিছুই বদলে যাওয়ার কথা ছিল- বদলায়নি। অনেক কিছু পাওয়ার কথা ছিল- পাওয়া যায়নি। আমি ঝাপসা চোখে হিসাবের খাতাটার দিকে তাকালাম। দেখলাম- সেখানে একটা গুবরেপোকা হামাগুড়ি দিচ্ছে...
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

সড়ক দুর্ঘটনার ওপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফরমান by বদরুদ্দীন উমর

সম্প্রতি বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিবহন মালিক ও পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে ঘোষণা করেন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে ৩০২ ধারায় যেসব হত্যা মামলা করা হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা ও প্রত্যাহার করা হবে, কারণ এ দুর্ঘটনাগুলো ইচ্ছাকৃত নয় এবং সেই হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে হত্যা হিসেবে চিহ্নিত ও আখ্যায়িত করাও যাবে না! সব দুর্ঘটনা যে ইচ্ছাকৃত নয় এ কথা কে না জানে? কিন্তু এ কথাও কে না জানে যে, সারা বছর ধরে সড়ক দুর্ঘটনায় যে হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হয়, তার অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে দুর্ঘটনা বলতে যা বোঝায় তা নয়। এ তথাকথিত দুর্ঘটনাগুলোর বিপুল অধিকাংশই ঘটে এমন কারণে, যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। প্রশাসন থেকে নিয়ে পরিবহন মালিক ও ড্রাইভাররাই এর জন্য দায়ী। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা দরকার, বাংলাদেশের সড়কপথে যে লাখ লাখ বাস-ট্রাক চলাচল করে, সেগুলোর ড্রাইভারদের অধিকাংশেরই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। যে সরকারি সংস্থা থেকে এদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হয়, সেগুলো হল দুর্নীতির আখড়া। কাজেই যাদের নামমাত্র কিছু ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ আছে, এমনকি কোনো প্রশিক্ষণই যারা কোথাও গ্রহণ করেনি এমন লোকদেরও ঘুষ খেয়ে লাইসেন্স দেয়া হয়। এ ধরনের অপ্রশিক্ষিত অথবা সামান্য প্রশিক্ষিত লোকদের মালিকরা অল্প মজুরিতে নিযুক্ত করে। মজুরি অল্প হওয়ার কারণে অনেক সময় ড্রাইভারদের ওভারটাইম বা অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। তাদের যথেষ্ট বিশ্রাম হয় না এবং তার ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনাকে ইচ্ছাকৃত হত্যা না বললেও এটা বোঝার কোনো অসুবিধা নেই যে, দুর্নীতি এবং মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফার লোভের কারণেই এ দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে এবং এর জন্য উপযুক্ত তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী মালিক-শ্রমিক যেই হোক, তাদের উপযুক্ত শাস্তি দরকার।
বাংলাদেশে হাজার হাজার নতুন বাস, ট্রাক, মোটরগাড়ি নিয়মিত রাস্তায় নামছে। এগুলো চালানোর জন্য উপযুক্ত ড্রাইভার প্রয়োজন। উপযুক্ত ড্রাইভার আকাশ থেকে পড়ে না অথবা ঘুষ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেলেই তারা যোগ্যতা অর্জন করে না। তারা যাতে এ যোগ্যতা অর্জন করতে পারে তার জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন সারাদেশে শত শত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যাতে স্থাপিত হয় সেটা দেখা। শুধু তাই নয়, এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ড্রাইভিংয়ের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে কি-না, প্রশিক্ষণের পর তাদের পরীক্ষা ঠিকমতো হচ্ছে কি-না সেটাও দেখা। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা বড় আকারে কমিয়ে আনার জন্য এ কাজ যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নিজের দায়িত্ব মনে করে না। এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথাও সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য শোনা যায় না। এ প্রাথমিক এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হওয়ার কারণেই অল্পশিক্ষিত ড্রাইভাররা দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড বলা না গেলেও এটা যে এক ধরনের হত্যাকাণ্ড তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি ড্রাইভাররা দায়ী হলেও মালিক এবং সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ও এর জন্য দায়ী। সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং তা যথাযথভাবে কার্যকর করা হলে যে এ দুর্ঘটনার অধিকাংশই রোধ করা যায় এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যত কথাবার্তা হয়, তাতে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হতে কোনোভাবেই দেখা যায় না। এটা যে একটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য ব্যাপার এবং এ নিয়ন্ত্রণ যে সরকারের দায়িত্ব, এ বোধ আজ পর্যন্ত কোনো সরকারের ক্ষেত্রেই দেখা যায়নি।
প্রায়ই দেখা যায়, দূরপাল্লার সড়কপথে যেসব বাস, ট্রাক, মিনিবাস চলে, সেগুলোর ড্রাইভাররা একে অপরকে ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার জন্য বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়। এ কাজ করতে গিয়ে গাড়ি উল্টে যাওয়ার ঘটনা তো ঘটেই, কিন্তু তার থেকে বেশি ঘটে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ। মদ খেয়ে বাস-ট্রাক চলাচলের থেকে ড্রাইভারদের এভাবে বেপরোয়া গাড়ি চালানোই অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এ সমস্যা সমাধানের একটা কার্যকর উপায় হচ্ছে দূরপাল্লার রাস্তা বা হাইওয়েগুলোতে ডিভাইডার দিয়ে যাওয়া-আসার পথকে পৃথক করা। এটা করা হলে সামনাসামনি সংঘর্ষে দুর্ঘটনা শতভাগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। ঢাকা, চট্টগ্রাম ইত্যাদি শহরে রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে পথচারীদের দায়িত্বহীন আচরণ অনেক সময় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হয়। তারা ফুটব্রিজ বা জেব্রাক্রসিং ব্যবহারের পরিবর্তে ইচ্ছামতো রাস্তা পারাপার করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। তবে দেশে মোট দুর্ঘটনার তুলনায় এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক কম। সড়ক দুর্ঘটনা এবং তা রোধ করার উপায় বিষয়ে অনেক আলোচনা হতে পারে, যা প্রয়োজন। অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু সে সবের ধারেকাছে না গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার দায়-দায়িত্ব থেকে ড্রাইভারদের একেবারে মুক্ত ঘোষণা করে যা করেছেন তার থেকে দায়িত্বহীন কাজ কমই হতে পারে। এর সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক আছে কিনা সেটাও এক বিচার্য বিষয়।
ড্রাইভিংয়ের প্রশিক্ষণের অর্থ শুধু গাড়ি চালানোর শিক্ষা নয়। গাড়ি চালানোর সঙ্গে যত কিছুর সম্পর্ক আছে, সব বিষয়ের শিক্ষাও এর অন্তর্গত। গাড়ির ড্রাইভাররা যেভাবে বেপরোয়া হয়ে গাড়ি চালায়, যেভাবে সামনের গাড়ি ডিঙিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে- এসব বিষয়ে তাদের কোনো শিক্ষা ও সচেতনতাই দেখা যায় না। এর কারণ এ নিয়ে কোনো শিক্ষার ব্যবস্থাই তাদের নেই। সেটা থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা যে সংখ্যায় হয় সেটা হতো না। এ কারণে যেসব সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে সেগুলোকে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড না বলা হলেও এগুলো হত্যাকাণ্ড অবশ্যই। এ হত্যাকাণ্ড কীভাবে বড় আকারে কমিয়ে আনা সম্ভব সে বিষয়ে যে সংক্ষিপ্ত ও সামান্য আলোচনা ওপরে করা হল তার থেকেই বোঝা যায় যে, এর জন্য ড্রাইভাররা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী মালিক ও সরকার পক্ষ। মালিক শুধু অদক্ষ ড্রাইভার নিযুক্তির মাধ্যমেই এসব দুর্ঘটনার শর্ত তৈরি করে না, গাড়িগুলোর প্রয়োজনীয় মেরামত এবং সেগুলোকে চলাচলের উপযুক্ত অবস্থায় না রেখে রাস্তায় নামানোর ফলে যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কোনো সরকারি ল’ থাকার বিষয়ে আগেই বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কতকগুলো জটিল কারণে ঘটে চললেও সে ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য না করে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করার কোনো চেষ্টা না করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ড্রাইভারদের ও সেই সঙ্গে গাড়ির মালিকদেরও যেভাবে দায়মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন, এর থেকে দায়িত্বহীন কাজ সরকারের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর আর কী হতে পারে? তা ছাড়া তিনি যেভাবে দুর্ঘটনার জন্য ড্রাইভারদের দায়মুক্ত করেছেন এবং মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়ার কথা বলেছেন, এটা কোনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নয়। এ হল আদালতের কাজ। দুর্ঘটনা হলে তার জন্য মামলা হতেই পারে এবং সে মামলা নিষ্পত্তির দায়িত্ব আদালতের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পূর্ণভাবে নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ড্রাইভারদের দায়মুক্ত করার ফরমান জারি করেছেন, তাতে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসার পরিবর্তে আরও বেড়ে যাবে। ড্রাইভারদের আইনের আওতার বাইরে এভাবে থাকা সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে এক মহাবিপজ্জনক ব্যাপার। দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি গদিতে বসে থাকা একজন মন্ত্রীর এহেন কাজ যে নৈতিকতাবিহীন এক বড় অপকর্ম এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ ও বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

Saturday, September 28, 2013

পরীক্ষার ফল নিয়ে বিষোদ্গার নয় by বিমল সরকার

চাটুকারিতা ও তোষামোদী যে একটি জাতিকে দিনে দিনে কী অন্ধকার ও গভীর অতলে নিয়ে যেতে পারে, এর প্রচুর দৃষ্টান্ত আমাদের চারপাশে রয়েছে। চাটুকার ও তোষামোদকারীদের কাজই হচ্ছে কারও বা কোনো কিছুর আসল রূপ, চিত্র, পরিবেশ বা পরিস্থিতিকে আড়াল করে রেখে সবাইকে বিভ্রান্ত করা। যে কোনোভাবেই হোক কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করাই তাদের আসল লক্ষ্য। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর ওই ফলাফলকে কেন্দ্র করে সরকারের একেবারে উচ্চমহল থেকে শুরু করে বিরোধী দল এবং বলতে গেলে সর্বত্র এবার যত আলোচনা, সমালোচনা, মন্তব্য ও অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে অতীতে কোনো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এমনটা লক্ষ্য করা যায়নি। ফলাফলের ব্যাপারে রাজনীতিকদের পরস্পরবিরোধী মন্তব্য রাজনীতির ক্ষেত্রে সাময়িক কিছুটা প্রভাব ফেললে ফেলতেও পারে, তবে তা ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।
প্রধানমন্ত্রী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ কমার জন্য সরাসরি বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছেন। গত ৩ আগস্ট এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন নিজের সরকারি কার্যালয় গণভবনে ফলাফলের কপি গ্রহণকালে তিনি বলেন, পরীক্ষা চলাকালে বিরোধী দলের হরতালের কারণে ৩২টি বিষয়ের পরীক্ষার সূচি পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ফলাফল খারাপের জন্য পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকরা দায়ী নন। এর জন্য বিএনপি ও জামায়াত-শিবির দায়ী। যাদের ফলাফল খারাপ হয়েছে, তারা আগামীতে ভালো করবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। পরবর্তী সময়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিবসহ দায়িত্বশীল আরও অনেকেই। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এসব মন্তব্যের রেশ ধরে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষস্তরের বেশ কয়েকজন নেতা পৃথকভাবে এবারের ফল বিপর্যয়ের জন্য সরকারের নতুন শিক্ষানীতি, সৃজনশীল পদ্ধতির ব্যাপারে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং ক্ষমতাসীন দলকে দায়ী করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন। বিরোধী শিবিরের নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতির বিপরীতে শিক্ষামন্ত্রী এ নিয়ে পাল্টা বিবৃতিও দিয়েছেন।
এদিকে এইচএসসির ফলাফল নিয়ে ফেল করা এবং কাক্সিক্ষত ফলাফল থেকে বঞ্চিত দাবিদার পাস করা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা, অসন্তোষ ও ক্ষোভের অন্ত নেই। এসব পরীক্ষার্থী ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এবং দেশের আরও কয়েকটি স্থানে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে। বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা তাদের দাবি-দাওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও শিক্ষামন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে। এসব বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীর কর্মকাণ্ড এতদিনে অবশ্য অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, উপর্যুপরি হরতালের যাঁতাকলে গোটা জাতির একেবারে নাভিশ্বাস উঠলেও উল্লিখিত পরীক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছে, হরতাল নয়, তাদের পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার আসল কারণ তড়িঘড়ি করে খাতা দেখা।
আসলে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এ পর্যন্ত যারা বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন কিংবা মন্তব্য বা অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তারা অনেকটাই আবেগপ্রবণ অথবা কারও না কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তা করেছেন বলে মনে হয়েছে। যার ফলে এসবের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় সামান্যই। আমাদের দেশে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সার্বিকভাবে কখনও সুখকর ছিল না, এখনও নেই। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এক একটি পরীক্ষা এবং এগুলোর ফলাফলের দিক দিয়ে গত ৪২ বছরে আমরা খুবই দুঃসময় অতিক্রম করে এসেছি। আর এসব কিছুর জন্য প্রধানত দায়ী শিক্ষার সঙ্গে জড়িত নানা স্তরের কর্তাব্যক্তিরা। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব কর্তাব্যক্তি নিজেরা কখনও কোনো কিছুর দায় স্বীকার করতে চান না। বছরের পর বছর তাদের অবহেলা, উদাসীনতা, খামখেয়ালিপনা ও দায়িত্বহীনতার মাশুল গুনতে হয় হাজার হাজার, লাখ লাখ শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের। নিজেদের কৃতকর্ম, বিশেষ করে দুর্বলতা, ব্যর্থতা ও ত্র“টি-বিচ্যুতিগুলোকে আড়াল করে রাখার জন্য অতিউৎসাহী ওই কর্তাব্যক্তিরাই দেশে চালু করেছেন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার আগে সরকার প্রধানের হাতে ফলাফলের কপি তুলে দেয়ার রীতি- যা বিশ্বের ইতিহাসে একেবারেই নজিরবিহীন! ভাবটা এমন যে, আমরা কেন ফলাফলের ব্যাপারে বলব (যেখানে সাধারণত নেতিবাচক বিষয়ই বেশি থাকে), যা বলার প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলুন।
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত স্বল্পকালীন রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এখন তারা সবাই মহাব্যস্ত আসল রাজনীতি নিয়ে। আর একটি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে হয়তো এ নিয়ে রাজনীতিকদের কেউ মুখ খুলবেন না। তবে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা যদি বরাবরের মতো কেবল চুপ করে বসেই থাকেন, তাহলে আমাদের এগোনোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলাফল প্রকাশের দিন তারা যা বুঝিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবে প্রধানমন্ত্রী তাই বলেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে অব্যক্ত ও অপ্রিয় কথাগুলোও তো কাউকে না কাউকে বলতে হবে। হরতাল নয়, পরীক্ষার ফলাফল খারাপের কারণ হিসেবে যারা তড়িঘড়ি করে খাতা দেখাকে বড় করে দেখেছেন, তাদের ব্যাপারে আমার কিছুই বলার নেই। উপর্যুপরি হরতালের কারণে মোট ৫৮ দিনের পরীক্ষাসূচির মধ্যে ৩২টি বিষয় বা পত্রের পরীক্ষা যেখানে পেছাতে হয়েছে কিংবা ইংরেজির মতো একটি বিষয়ের পরীক্ষা পরপর চারবার পিছিয়ে শেষ পর্যন্ত টানা দেড় মাস পর অনুষ্ঠিত হলেও হরতালকে যারা গৌণ করে দেখেন, তাদের ব্যাপারে মন্তব্য করে কোনো ধরনের বিতর্কে জড়ানোর ইচ্ছাও আমার নেই। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর ডাকা হরতালকেই যারা ফলাফল খারাপের বড় কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন তারাও বোধ করি বিস্মৃত হয়ে পড়েছেন, হরতালের মধ্যেই পরীক্ষা দিয়ে এবার কোনো কোনো সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ৭৯.১৩ ভাগ বা ৭৭.৬৯ ভাগ সফলতা লাভের গৌরব অর্জন করেছে। আরও স্মরণযোগ্য, এবারের পরীক্ষাতেই মাদ্রাসা বোর্ডে ৯১.৪৬ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৫.০৩ ভাগে গিয়ে পৌঁছেছে।। প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে, ফলাফল খারাপের জন্য পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকরা দায়ী নন, এবার যাদের ফলাফল খারাপ হয়েছে আগামীতে তারা ভালো করবে। কিন্তু কথা হল, আগামীতে পরীক্ষা দিয়ে আসলেই কি তারা সবাই ভালো করবে, ভালো করতে পারবে? আমার তো মনে হয় অকৃতকার্য পরীক্ষার্থী কেবল হাজার হাজার নয়, অঙ্কটি একেবারে লাখের কাছাকাছি উঠে যেতে পারে, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে কোনো দিনই যাদের পাস করা সম্ভব হবে না। প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়, তাহলে এরা এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় অবতীর্ণ হল কেন এবং কীভাবে? এসব প্রশ্নের যথার্থ উত্তর কাউকে না কাউকে তো দিতে হবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, হরতালের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ফলাফল খারাপের জন্য পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একেবারে দায়মুক্ত করে দিলেন! ফলে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের যে মোটামুটি একটি রেওয়াজ রয়েছে, তার মধ্যেও নাকি দেখা দিয়েছে অনেকাংশে ভাটা। অন্য সব বিষয়ের মতো শিক্ষাক্ষেত্রে যদি আস্থা ও বিশ্বাসে চিড় ধরে, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না। অথচ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এমনকি যুগের পর যুগ আমরা এরূপ সংশয়, সন্দেহ, অনাস্থা, অবিশ্বাস ও অস্বাচ্ছন্দ্যের মধ্য দিয়ে পথ হেঁটে চলেছি। এসব থেকে কোনোভাবেই যেমন মুক্ত নয় খোদ সরকার, তেমনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ আরও অনেকেই সহজে এর দায় এড়াতে পারবেন না। তবে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য, শিখিয়ে দেয়া বুলি- যা গোটা জাতিকেই বিভ্রান্ত করতে পারে- এসব ব্যাপারে সবাইকে সব সময় সচেতন থাকতে হবে।
বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

মোদিকে কেন ভয় by আসফি রশীদ

ভারতে আগামী বছরের মে মাসে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি তার প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদির নাম ঘোষণা করার পর দেশটির মুসলমান সম্প্রদায় এবং বিপুলসংখ্যক সেক্যুলার হিন্দু, খ্রিস্টান ও শিখ নাগরিক উদ্বিগ্ন। যদিও এ নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভ এখনও নিশ্চিত নয়। নির্বাচনে কোনো দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের সম্ভাবনা প্রায় নেই। কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কোয়ালিশন বিজেপির নেতৃত্বে হলে তবেই প্রধানমন্ত্রী হবেন নরেন্দ্র মোদি। তারপরও তাকে নিয়ে দেশে-বিদেশে উৎকণ্ঠার শেষ নেই। মোদিকে বিজেপি ও দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর একজন কট্টর নেতার প্রতিকৃতি হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। ২০০২ সালে গুজরাটে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগ এখনও তাড়া করে ফিরছে তাকে। ওই ঘটনায় হাজারের ওপর নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়, যাদের সিংহভাগই ছিল মুসলমান। নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি হল, ওই ঘটনায় তার প্রশাসন জড়িয়ে পড়েছিল অথবা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। নিরীহ মানুষদের হত্যার দায়ে প্রায় ৩০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবল এখনও কারাভোগ করছেন। সম্প্রতি একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ওই বিচারবহির্ভূত গণহত্যা ছিল নরেন্দ্র মোদিকে একজন শক্তিশালী হিন্দু নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে গুজরাট সরকারের একটি পরিকল্পিত নীতির বাস্তবায়ন।
স্বভাবতই ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশে এমন একজন সাম্প্রদায়িক নেতার সরকারের শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার আশংকায় দেশটির মুক্তবুদ্ধি ও উদারপন্থী মানুষ উদ্বিগ্ন। যে বহু মত, পথ, ভাষা, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের ওপর ভিত্তি করে ভারত রাষ্ট্রটি দাঁড়িয়ে আছে- সেই আদর্শের বিরুদ্ধপথের একজন যাত্রী প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাবেন- এ প্রশ্ন অনেকেরই। প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মোদির নাম ঘোষিত হওয়ার পর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, তিনি মনে করেন না নরেন্দ্র মোদি একজন ভালো প্রধানমন্ত্রী হবেন। তার সেক্যুলার ইমেজ না থাকায় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হোন তা তিনি (অমর্ত্য সেন) চান না। ভারতের কন্নড়ভাষী প্রখ্যাত লেখক ড. ইউ আর আনানথামুরথি বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি যে দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেই দেশে তিনি (আনানথামুরথি) থাকবেন না। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। লক্ষেèৗয়ের দারুল উলুম নাদওয়াতুল শিক্ষায়তনের ইসলামবিষয়ক পণ্ডিত সালমান আল নাদভি বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি ভারতের মুসলমানদের এক নম্বর শত্র“।
কেবল নিজ দেশে নয়, নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে তার সঙ্গে বহির্বিশ্ব বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক কী হবে, সে প্রশ্নও উঠছে। মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশংকা করছেন অনেকেই। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের বৈদেশিক নীতি প্রণয়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বড় ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মোদির বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বের মনোভাব বরাবরই নেতিবাচক। ২০০২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ (অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি) ঘোষণা করে গুজরাটে তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোদির ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তবে এটিও সত্য, যুক্তরাষ্ট্র তার নিজ স্বার্থেই বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যে পাঁচ ব্যক্তিকে তিনি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেন, তাদের একজন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। কিন্তু ডেমোক্র্যাট বারাক ওবামা রক্ষণশীল হিন্দু জাতীয়তাবাদী নরেন্দ্র মোদিকেও কি বন্ধু মনে করবেন? মোদিই বা কিভাবে ভুলে যাবেন তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত আচরণের কথা?
মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি হতে পারে। ইসরাইল ইতিমধ্যেই ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার। ১৯৯২ সালে কংগ্রেস সরকার ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও পরবর্তী সময়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েই ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, সে সম্পর্ক শুধুই নিরাপত্তাবিষয়ক অংশীদারভিত্তিক ছিল না, বরং এর সঙ্গে একধরনের ধর্মীয় ও আদর্শগত অনুভূতিও কাজ করেছিল উভয় সরকারের মধ্যে। ২০০৩ সালে ওয়াশিংটনে মার্কিন ইহুদি সম্প্রদায়ের এক সমাবেশে বক্তৃতাদানকালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইসরাইলের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, ‘বর্তমান সময়ের কুৎসিৎ দর্শন সন্ত্রাসবাদ যৌথভাবে মোকাবেলা করা।’ ওই বক্তৃতায় ব্রজেশ মিত্র বলেছিলেন, মারাত্মক সন্ত্রাসবাদী প্ররোচনার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাজনৈতিক ও নৈতিক ক্ষমতা থাকবে প্রস্তাবিত এ জোটের। সে বছরেরই সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন ভারত সফর করেন। সেটাই ছিল কোনো ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর।
সাধারণত ভারতীয় রাজনীতিকরা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভোট হারানোর ভয়ে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক এড়িয়ে চলেন। সে দেশে সফরে যান না অথবা কোনো ইসরাইলি নেতাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানান না। তবে মোদি হলেন মুষ্টিমেয় ভারতীয় রাজনীতিকদের একজন, যিনি ইসরাইল সফরে গিয়েছিলেন। কাজেই তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়াটাই স্বাভাবিক, যার পরিণামে মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শীতল হয়ে উঠতে পারে। মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারতের প্রধান বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশংকা প্রবল। আগের বিজেপি শাসনামলে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত দু’দফা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোদির তুলনায় অনেক বেশি উদারপন্থী অটল বিহারি বাজপেয়ি। তার সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে কূটনৈতিক উদ্যোগও নিয়েছিল, যে নীতি বর্তমান কংগ্রেস সরকারের সময়েও অব্যাহত আছে। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে এ পরিস্থিতি কি পাল্টে যাবে?
ভারতে যেমন বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশে একই সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপির। এর আগে বিএনপি (২০০১-০৬) ও বিজেপি (১৯৯৯-২০০৪) ক্ষমতায় থাকার সময়ে দু’দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত শীতল পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের এত অবনতি আর হয়নি। এ সময় ভারতের একটি বড় অভিযোগ ছিল, সে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়। তৎকালীন বিএনপি সরকার এ অভিযোগ বারবার অস্বীকার করলেও ভারতের বিজেপি সরকার তা বিশ্বাস করেনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় এ কারণটি দূর করে এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করে ভারতের হাতে তুলে দেয় বলেও খবর রয়েছে। বস্তুত বর্তমানে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং ভারতে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকায় মনে করা হয়েছিল, এটি দু’দেশের সম্পর্কোন্নয়নের জন্য সবচেয়ে অনুকূল সময়। দুর্ভাগ্যজনক যে, তা সত্ত্বেও দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হয়নি। এজন্য ভারত সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিরোধী দল বিজেপিও অনেক ক্ষেত্রে বাগড়া দিয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ ভারতের পার্লামেন্টে সীমান্ত চুক্তি বিল পাসে বাধা দেয়া। নরেন্দ্র মোদি ইতিপূর্বে একাধিকবার তার ভাষায় ‘অবৈধ বাংলাদেশীদের প্রবেশে বিএসএফ কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ায়’ ভারত সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সীমান্তে বাংলাদেশীদের প্রতি বিএসএফের আচরণের কথা সবাই জানেন- যা শুধু বাংলাদেশের নয়, ভারতের নাগরিকদের কাছেও সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছে। তারপরও সেটা যদি ‘কঠোর ব্যবস্থা’ না হয়ে থাকে, তাহলে মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের আচরণ কী হবে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে- এসব নিয়ে বাংলাদেশেরও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে বৈকি। আগামীতে যিনিই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হোন না কেন, আমরা তার কাছ থেকে সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ প্রত্যাশা করি।
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা বলতে কী বোঝায় by ড. হারুন রশীদ

শৃংখলমুক্ত স্বাধীন গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, দেশে গণমাধ্যম এখন অনেকটাই স্বাধীনতা ভোগ করছে। গণমাধ্যমের বর্তমান কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে একটি বড় পরিবর্তন আসে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি থাকাকালে মুদ্রণ এবং প্রকাশনা আইন সংশোধন করেন। ফলে কোনো সরকার চাইলেও এখন আর পত্রিকার প্রকাশনা (ডিক্লারেশন) বন্ধ করতে পারে না। এটা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বহুলাংশে নিশ্চিত করেছে। আর যে সমাজে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম অনেকাংশেই হ্রাস পায় এবং একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের গুরুদায়িত্ব হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের গণমাধ্যম দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এ কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। সরকারি দল, বিরোধী দলের নেতাকর্মী কিংবা যত বড় শক্তিশালী ব্যক্তিই হোন না কেন, তাদের হাঁড়ির খবর বের করে আনতে গণমাধ্যম বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। এর কারণ গণমাধ্যমকে প্রতিনিয়ত পাঠকের কাছে জবাবদিহি করে টিকে থাকতে হয়। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তার স্বাধীন সত্তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা ব্যতিরেকে বিকল্প কিছু নেই। যারা এ দৌড়ে শামিল হবেন না, তারা পিছিয়ে পড়বেন, প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না এবং এক সময় সেসব গণমাধ্যমের অপমৃত্যু হবে। এটাই তাদের নিয়তি।
বলতে গেলে এক্ষেত্রে এক ধরনের নীরব কিংবা প্রকাশ্য প্রতিযোগিতাও আছে। কারা কোন খবরটি কত তাড়াতাড়ি পাঠকের কাছে কতটা নির্ভুলভাবে পৌঁছাতে পারে- এই মানসিকতা তাদের নিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। এ প্রতিযোগিতা পেশাদারিত্বেরই একটি অংশ। পেশাদারি মনোভাব না থাকলে গণমাধ্যম তার সঠিক চরিত্র বজায় রাখতে পারবে না। এই পেশাদারিত্ব হচ্ছে আসলে পাঠকের কাছে দায়বদ্ধতা। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে অনেক সময় সঠিকভাবে সঠিক সংবাদ উপস্থাপন সম্ভব হয় না। এখানেই দায়বদ্ধতার ঘাটতির বিষয়টি চলে আসে। এছাড়া অনেক বিষয় আছে যা জনসম্মুখে (পাবলিকলি) আসা উচিত নয়। কিন্তু প্রতিযোগিতার দৌড় কখনও কখনও পরিবেশকে অসুস্থ করে তোলে। ফলে গণমাধ্যম কখনও সমাজে ক্ষতির কারণ হয়। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক এবং বাহক হতে হবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিতে বিভাজিত সমাজ ব্যবস্থায় এর অন্যথা দেখা যায় এখানে। কোনো কোনো গণমাধ্যম দল ও গোষ্ঠীর পক্ষ হয়ে কাজ করে স্বার্থসিদ্ধির জন্য। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও কোনো কোনো গণমাধ্যম পক্ষপাতমূলক আচরণ করে কখনও কখনও। বিশেষ করে গণমাধ্যমের মালিক যে নীতি ও আদর্শ দ্বারা পরিচালিত, সেই গণমাধ্যমে সেই নীতি-আদর্শের প্রতিফলন দেখা যায়। এটা গণমাধ্যমের নীতি-আদর্শের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই সেই দেশের সংবিধান এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকেই প্রতিষ্ঠিত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। কিন্তু আদালতের কার্যক্রম গণমাধ্যমে বিশেষভাবে উঠে আসছে না। কোনো কোনো গণমাধ্যম বরং উল্টো অবস্থান নিয়েছে, যা স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা এবং নীতি-আদর্শের বলিদান ছাড়া আর কিছুই নয়। বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণে যেভাবে উঠে আসছে, অনেক গণমাধ্যমই সেগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরছে না। একাত্তরে ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের চরিত্র নতুন প্রজন্মর কাছে তুলে ধরা গণমাধ্যমের অন্যতম দায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি দেশ সঠিক ইতিহাস আশ্রয়ী হয়ে না চলতে পারলে তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছানো কখনোই সম্ভব নয়।
আমাদের দেশে গণমাধ্যমের আরেকটি প্রধান চরিত্র হল সরকারবিরোধিতা। কোনো কোনো সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম অকারণে সরকার বিরোধিতায় এতটাই মেতে উঠে যে, সরকারকে তারা জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম নেয়, যা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দেখা দেয়। গণমাধ্যমে অবশ্যই সরকারের সমালোচনা থাকবে। বিশেষ করে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের রাজনীতি যেখানে কালচারে পরিণত হয়েছে, সেখানে গণমাধ্যম কার্যত রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিরোধী দলের ভূমিকায়ই পালন করছে। বস্তুত গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের ভিতকে আরও মজবুত করতে পারে। গণমাধ্যমকে এমন আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে যাতে বিশেষ কোনো দল বা গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ না পায়। অনেক সময় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এমন সংবাদ পরিবেশন করা হয় যা বিদ্বেষপূর্ণ, চরিত্রহনন ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে এই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন। পরে যদি ভুল স্বীকার করা হয়, তাহলেও কিন্তু ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ মাধ্যমে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়।
দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখা হওয়া উচিত গণমাধ্যমের মূল নীতি। কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থই বড় হয়ে ওঠে। কোনো কোনো গণমাধ্যম মালিকের স্বার্থকেই বড় করে দেখে। কারণ মালিকের বিপুল অর্থলগ্নির কারণেই তো ওই গণমাধ্যমটি আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে। তাই টিকে থাকার স্বার্থে তাকে আপস করতে হয়। মালিক যদি ঋণখেলাপি হন তাহলে ওই গণমাধ্যমে ঋণখেলাপি সম্পর্কে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হবে না। যদি হাউজিং ব্যবসায়ী হন, তাহলেও ওই সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো সংবাদ প্রকাশিত হবে না। যদি কালো টাকার মালিক হন, কর ফাঁকি দেন তাহলেও এ সংক্রান্ত কোনো সংবাদ প্রকাশিত হবে না। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে এক রকম জিম্মি অবস্থায় আছে গণমাধ্যম। বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান যত অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গেই জড়িত থাকুক না কেন, প্রচার সংখ্যার জোর না থাকলে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একটি শব্দও প্রকাশিত হবে না। স্বাধীনতা বলি আর দায়বদ্ধতা বলি দুটোই এক্ষেত্রে অচল। পেশাদারি উৎকর্ষ এবং দক্ষতাও একটি প্রধান বিষয়। গণমাধ্যমের একটি ভুল শব্দ অনেক বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। শুধু তাই নয়, কোনটি খবর নয় আর কোনটি খবর, কোন খবরের কতটা গুরুত্ব দেয়া উচিত এ ব্যাপারেও গণমাধ্যমের সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা যায়।
কুকুর মানুষকে কামড়ালে তা কোনো খবর হবে না, কিন্তু মানুষ কুকুরকে কামড়ালে সেটা খবর। কিন্তু এখন প্রায় সবই খবর। কোনো গণমাধ্যমের মালিক জেলখানা থেকে মুক্তি পেলে সেটাও ওই গণমাধ্যমে ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখানো হয়। অথচ সার্বিকভাবে ওই ঘটনাটির কোনো সংবাদমূল্য আছে কি-না, সেটি বিবেচনায় নেয়া হয় না। বলা হয়ে থাকে ‘তোমার স্বাধীনতা আমার নাকের ডগা পর্যন্ত। এ পর্যন্ত তুমি ছড়ি ঘোরাতে পার। কিন্তু তোমার ছড়ি আমার নাক বা শরীর স্পর্শ করলে সেখানেই স্বাধীনতা বিপন্ন হয়।’ ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তিও স্মরণযোগ্য- ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত নাও হতে পারি কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য আমি জীবনও দিতে পারি।’
এই স্বাধীনতা তখনই সার্থক হবে যখন তাতে জনকল্যাণের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। প্রসঙ্গত নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একটি নিবন্ধের শরণ নেয়া যায়। সম্প্রতি দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ভারতীয় মিডিয়ার গৌরব ও কলঙ্ক’ শিরোনামাঙ্কিত নিবন্ধে তিনি বলেছেন- ‘এখানকার সমস্যা অবশ্য মিডিয়ায় তেমন স্থান পায় না। কেননা সামাজিক বিভাজনই সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে এই পক্ষপাতিত্ব জোগায়। অথচ ভারতের বাস্তবতা অবিরত জনগণের দৃষ্টিগোচরে রাখার জন্য মিডিয়া অধিকতর গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবাদ পরিবেশনায় এই পক্ষপাতিত্ব পাঠকের কাছে কোনোভাবে অপ্রীতিকর মনে না হলেও তা ভারতের সুবিধাবঞ্চিতদের চরম বঞ্চনার প্রতিকার সাধনে রাজনৈতিক অনীহা সৃষ্টিতে প্রভূত অবদান রেখে থাকে। ভাগ্যবান গোষ্ঠীর মধ্যে যেহেতু শুধু ব্যবসায়ী নেতারা ও পেশাজীবী শ্রেণীগুলোই নয়, দেশের বুদ্ধিজীবীদেরও এক বিরাট অংশ রয়েছে, তাই জাতির ব্যতিক্রমধর্মী অগ্রগতির খবর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে খুব বেশি প্রচার লাভ করে থাকে এবং যা কিনা বড়জোর অতি পক্ষপাতদুষ্ট এক কাহিনীমাত্র। সেটাকেই কথিত বাস্তবতায় রূপ দেয়া হয়।’ এখানে ‘ভারতের’ জায়গায় ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করলে অবস্থাটি কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে একই থেকে যায়। অমর্ত্য সেনের আরও একটি উক্তি স্মরণযোগ্য। তার মতে, গণমাধ্যম থাকলে দুর্ভিক্ষও দূর করা সম্ভব। কেননা কোথাও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সেটা যদি গণমাধ্যমে উঠে আসে, তাহলে সরকার বা রাষ্ট্র সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। ফলে কেউ না খেয়ে মরবে না। একদিকে মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করে তাকে বিকশিত করা, অন্যদিকে শুধু ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে পাঠককে খদ্দেরে পরিণত করা- গণমাধ্যম যদি এই ধরনের দ্বিচারিতায় লিপ্ত হয়, তাহলে তার স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার জায়গাটি ভীষণভাবে নষ্ট হয়। এতে আর যাই হোক, সাধারণ মানুষের কোনো কল্যাণ হয় না।
ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক, কলামিস্ট

রাষ্ট্রপতির ক্ষমার আইনসিদ্ধতা by ইকতেদার আহমেদ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আনীত ৬টি অভিযোগের মধ্যে ১, ২ ও ৩নং অভিযোগের প্রতিটিতে ১৫ বছরের কারাদণ্ড, ৪নং অভিযোগে অব্যাহতি এবং ৫ ও ৬নং অভিযোগে পৃথকভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি প্রণীত হয় ২০ জুলাই, ১৯৭৩ এবং এ আইনটি প্রণয়নকালে ধারা নং ২১-এ এ আইনের অধীনে দণ্ডিত ব্যক্তিকে দণ্ডের বিরুদ্ধে দণ্ড প্রদানের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়েরের অধিকার দেয়া হয়েছিল। আইনটিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের দ্বারা রাষ্ট্র বা সরকার পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে প্রতিকার প্রার্থনার কোনো সুযোগ না থাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক কাদের মোল্লাকে ৪নং অভিযোগ থেকে অব্যাহতি এবং ৬নং অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ায় সরকার পক্ষ সংক্ষুব্ধ হয়। সরকার পক্ষের সংক্ষুব্ধতার প্রতিকার প্রদানে রায় ঘোষণা পরবর্তী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী এনে অব্যাহতি বা খালাসের বিরুদ্ধে এবং সাজা বৃদ্ধিকল্পে সরকার পক্ষের আপিল দায়েরের বিধান প্রণয়ন করে আইনটিতে সংশোধনী এনে ২০০৯ সাল থেকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়।
রায় ঘোষণা পরবর্তী ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী এ আইনের অধীনে দণ্ডিত আসামি কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি-না এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের পরবর্তী প্রশ্নটি উত্থাপিত হলে আপিল বিভাগ সুপ্রিমকোর্টের সাতজন প্রবীণ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে নিয়োগ দেন। আপিল বিভাগে এ সাতজন অ্যামিকাস কিউরির বক্তব্য বিবেচনায় প্রতীয়মান হয়, প্রযোজ্য হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে তাদের মতামতে ভিন্নতা রয়েছে যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত প্রযোজ্য হওয়ার পক্ষেই দেয়া হয়েছে।
অ্যামিকাস কিউরিদের কাছে আরও একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল আর সেটি হল- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিচারের ক্ষেত্রে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (Customary International Law) প্রযোজ্য হবে কি-না? এ বিষয়টিতেও দেখা যায় অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত অভিন্ন নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন পূর্ববর্তী সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭নং অনুচ্ছেদে দফা নং (৩) এবং ৪৭ক অনুচ্ছেদ সন্নিবেশ
করা হয়।
৪৭নং অনুচ্ছেদের দফা নং (৩)-এ বলা হয়েছে, এ সংবিধানে যা বলা হয়েছে তা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোনো সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য বা অন্য কোনো ব্যক্তি, ব্যক্তি সমষ্টি বা সংগঠন কিংবা যুদ্ধবন্দিকে আটক, ফৌজদারিতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করার বিধান সংবলিত কোনো আইন বা আইনের বিধান এ সংবিধানের কোনো বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য বা তার পরিপন্থী- এ কারণে বাতিল বা বেআইনি বলে গণ্য হবে না কিংবা কখনও বাতিল বা বেআইনি হয়েছে বলে গণ্য হবে না।
দৃশ্যত ৪৭নং অনুচ্ছেদে দফা নং(৩) সন্নিবেশনে প্রতীয়মান হয় সামরিক বা বেসামরিক যে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে প্রণীত কোনো আইন এবং ওই আইনের অধীন বিচার ও দণ্ডের বিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও তার প্রাধান্য অক্ষুণ থাকবে।
সংবিধানে ১ম সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ৪৭ক অনুচ্ছেদে দুটি দফা রয়েছে। (১) নং দফায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইন প্রযোজ্য হয়, সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীন নিশ্চয়কৃত অধিকারগুলো প্রযোজ্য হবে না।
সংবিধানের ৪৪নং অনুচ্ছেদ পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, এ অনুচ্ছেদটির মাধ্যমে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎ করার জন্য এ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়ের করার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হলেও ৪৭ক (১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত হবে।
৪৭ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এ সংবিধানে যা বলা হয়েছে, তা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইন প্রযোজ্য হয়, এ সংবিধানের অধীন কোনো প্রতিকারের জন্য সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করার কোনো অধিকার সে ব্যক্তির থাকবে না।
দফা নং (২) অনুধাবনে প্রতিভাত হয়, যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফা প্রযোজ্য হবে, তিনি এ সংবিধানের অধীনে প্রতিকার প্রাপ্তির নিমিত্ত আবেদন করার অধিকারী হবেন না, যদিও ৪৭(৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইনের অধীনে প্রতিকার প্রার্থনা এ উপদফার বিধান দ্বারা বারিত নয়।
উল্লেখ্য, সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তৃতীয় ভাগে প্রদত্ত অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী রিট মামলা দায়েরের পরিবর্তে ৪৪নং অনুচ্ছেদে সাংবিধানিক আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন প্রতিষ্ঠা বিষয়ে বিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল। যদিও উক্তরূপ আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন প্রতিষ্ঠা পূর্ববর্তী দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ বলে ৭২-এর সংবিধানের ৪৪নং অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনপূর্বক সাংবিধানিক আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান রহিত করা হয়।
সংবিধানে যদিও উল্লেখ রয়েছে, সংবিধানের সঙ্গে অপর কোনো আইন সাংঘর্ষিক হলে সে আইন বাতিল হবে কিন্তু কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এবং কী পদ্ধতি অবলম্বনপূর্বক সে আইন বাতিল বিষয়ে কার্যক্রম বা পদক্ষেপ নেয়া হবে সে বিষয়ে সংবিধান নিশ্চুপ বিধায় প্রায়ই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, সংবিধান ও আইন রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ নিয়ে শপথের ব্যত্যয়ে শপথ গ্রহণ করাকালীন সংবিধান ও আইনের বিধানাবলীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণযোগ্য কি-না? এ ধরনের বিতর্ক অবসানে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত ৪৪নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত সাংবিধানিক আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন যে কার্যকর সমাধান, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে অনাহুত ও অযাচিত পরিস্থিতি পরিহার সম্ভব- এমনই অভিমত সৎ, যোগ্য, দক্ষ, মেধাবী ও অভিজ্ঞ আইনজ্ঞদের। আমাদের প্রচলিত আইনে কোনো ব্যক্তি সাজা বা খালাসপ্রাপ্ত হলে অথবা সাজা অপ্রতুল বিবেচিত হলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সাজা বা খালাস বা অপ্রতুল সাজার বিরুদ্ধে নিকটবর্তী আপিল আদালতে আপিল দায়ের করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনে কোনো ব্যক্তি সাজা বা খালাসপ্রাপ্ত বা সাজা অপ্রতুল হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা পক্ষ আইনে বর্ণিত বিধানাবলীর আলোকে প্রতিকার প্রার্থনা করতে পারেন। এক্ষেত্রে স্পষ্টত সাধারণ আদালতে যে বিধানাবলী অনুসৃত হয়, তা অনুসরণের সুযোগ অনুপস্থিত।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ শুনানি পরবর্তী ৪-১ বিভক্ত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে ১, ২, ৩ ও ৫নং অভিযোগের সাজার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও ৪নং অভিযোগের অব্যাহতির আদেশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর এবং ৬নং অভিযোগের খালাসের আদেশের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজাকে মৃত্যুদণ্ডে বর্ধিত করেন। আপিল শুনানিকালে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের পূর্বাপর সাজার সপক্ষে অপ্রতুল সাক্ষ্যের যুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় পরবর্তী আইনের পরিবর্তনের মাধ্যমে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতার বক্তব্য আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হয়। স্পষ্টত সর্বোচ্চ আদালতের সর্বোচ্চ সাজার আদেশটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও বিভক্ত আদেশ হওয়ায় যেসব বিতর্কের সূত্রপাত করেছে, সে বিভক্তির প্রতিফলন জাতীয় জীবনে ঘটলে তা আমাদের অগ্রযাত্রা ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত করবে- এ কথা ভেবে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর অনেকেই শংকিত।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা বৃদ্ধি করে তাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়ায় অনেকের মধ্যে অনুসন্ধিৎসু প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে- সর্বোচ্চ আদালত সর্বোচ্চ দণ্ড দেয়ায় আইনগত বা বিচারিক প্রতিকারের ব্যবস্থা না থাকলে সংক্ষুব্ধতা নিরসনের কোনো পথ কি থাকবে না? এ প্রশ্নের জবাবে অনেকের অভিমত- সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন। আবার অনেকের অভিমত- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক শুধু আপিল দায়েরের অধিকার থাকায় ৪৭ক (২) অনুচ্ছেদ পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখা দেবে। সংবিধানের ১০৫নং অনুচ্ছেদে পুনর্বিবেচনা সংক্রান্ত যে বিধান রয়েছে তাতে বলা হয়েছে, সংসদের যে কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোনো বিধি সাপেক্ষে আপিল বিভাগের কোনো ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা ওই বিভাগের থাকবে।
দেওয়ানি কার্যবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, প্রথমোক্ত বিধিতে দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে একই আদালত কর্তৃক রায় পুনর্বিবেচনার অধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক আদালতকে সন্তুষ্ট করতে হবে যে, কোনো নতুন বিষয়ের উদ্ঘাটন হয়েছে যা আদালতে বিচার চলাকালীন জ্ঞানের সীমায় ছিল না এবং এমন কোনো ভ্রান্তি বা ভুল হয়েছে যা নথিদৃষ্টে প্রতিভাত। এ দুটি কারণের যে কোনো একটির অস্তিত্ব যখন বিদ্যমান শুধু তখনই পুনর্বিবেচনার অবকাশ সৃষ্টি হয়। পুনর্বিবেচনার এ সুযোগটি ফৌজদারি কার্যবিধিতে অনুপস্থিত থাকলেও আপিল বিভাগ রুলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ধরনের মামলার ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনার অধিকার প্রদান করা হয়েছে এবং সেটি আইন ও আদালতে অনুসৃত প্রথা সাপেক্ষে যদিও ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে নথিদৃষ্টে প্রতিভাত ভ্রান্তি বা ভুলকেই পুনর্বিবেচনার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আইন মানুষের জন্য, আইনের জন্য মানুষ নয়। তাই সংক্ষুব্ধ পক্ষের প্রতিকার না থাকার কারণে আইন সংশোধন করে যদি ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যায়, তবে সেক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনায় আগের সিদ্ধান্তের যে কোনো ধরনের পরিবর্তন অত্যন্ত সীমিত হলেও পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই- এ ধরনের বিতর্ক পরিহার উত্তম। এরপর আরও একটি প্রশ্ন আসে আর সেটি হল রাষ্ট্রপতির ক্ষমা, যা সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ দ্বারা স্বীকৃত। এ বিষয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। এর একটি হল- রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা চাইতে হলে দোষ স্বীকার করে তা চাইতে হবে। আর অপরটি হল- আইনের ভুল অনুধাবনের জন্য সাজার কারণ ঘটেছে। ইতিপূর্বে যারা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে অনুকম্পা পেয়েছেন, তাদের সবাই কি দোষ স্বীকার করেছিল? আর যদি আইনের অপপ্রয়োগ বা ভুল ব্যাখ্যার কারণে সাজা হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে দোষ স্বীকারের অবকাশ কোথায়? তাই পুনর্বিবেচনা ও রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা উভয় বিষয়ে আইনগত সিদ্ধান্ত যে কোনো ধরনের বিতর্ক নিরসনে আশ্বস্ত হওয়ার পথ উন্মুক্ত করতে পারে।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট

Friday, September 27, 2013

সরল গরল- এক ‘ছোট্ট পরি’র মায়ের মৃত্যু by মিজানুর রহমান খান

ভাবলেশহীন চোখে বাবার কোলে নুসরাত সামিয়ার একটি হূদয়বিদারক আলোকচিত্র ২৫ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে।

গ ল্প- ঘুড়িযাত্রা by শোয়ায়েব মুহাম্মদ

নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসেনদের বাড়িতে।

রাশেদ চৌধুরী- হাওয়াই দ্বীপে কীর্তিমান বাংলাদেশি by ইফতেখার মাহমুদ

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জবাসীর কাছে বাংলাদেশের ছেলে রাশেদ চৌধুরীর নাম অতটা পরিচিত নয়।

গল্প- এক ঢিলে দুই পাখি by আদনান মুকিত

এই মুহূর্তে টুশির মনটা খারাপ। মন খারাপ হওয়ারই কথা। কার্টুন দেখার সময় হয়ে গেছে, অথচ দেখতে পারছে না। টিভির রিমোটটা ক্যাডবেরি চকলেটের মতো আগলে রেখেছেন টুশির মামা।

খোলা চোখে- আমেরিকার কূটনীতিতে পালাবদল? by হাসান ফেরদৌস

প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর পঞ্চমবারের মতো জাতিসংঘের বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ দিলেন বারাক ওবামা।

সাদাসিধে কথা- অস্ট্রেলিয়ায় ঝটিকা সফর by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১. যখন বয়স কম ছিল তখন দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর একটা শখ ছিল। এখন আর নেই। পৃথিবীর নানা বিচিত্র দেশের চেয়ে নিজের এই সাদামাটা দেশটাকেই বেশি ভালো লাগে।

ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিতের কথা থাকুক ইশতেহারে by ডঃ কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কথাবার্তা-জনসভা, টক-শো, পত্র-পত্রিকা বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার নড়াচড়া দেখে মনে হয় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পালে মৃদু হাওয়া লেগেছে।

ফেনসিডিল, ইয়াবা ও ভারতীয় টিভি চ্যানেল by তুষার আবদুল্লাহ

ভারতীয় চ্যানেল দেখার সময় সংঘবদ্ধ দর্শক গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক। এরকম খবর কবে গণমাধ্যমে দেখা যাবে? অপেক্ষায় আছি এ ধরনের খবর প্রচারের।

কলে যদি সাড়া না দেই? by তুষার আবদুল্লাহ

সংবাদকর্মী হিসেবে আমাদের টেলিফোন নম্বরটি’র গোপনীয়তা নেই। অনেকটা ‘চাহিবা মাত্র নম্বর জানাইতে বাধ্য’র মতো অবস্থা।

আতাউস সামাদ: তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক গুরু by পলাশ মাহবুব

লেখালেখির অভ্যাসটা আগে থেকেই ছিলো। সেই পালে একটু হাওয়া লাগলো স্থায়ীভাবে ঢাকায় আসার পর। চোখে স্বপ্ন আর বুকের সাহস ছিলো পূঁজি।

গার্মেন্ট মালিকরা, শ্রমিকের কান্না কি শুনিতে পাও? by পীর হাবিবুর রহমান

ভাগ্যের চাকা ঘোরে গার্মেন্ট মালিকদের। পোশাকশিল্পের বিকাশ তাদের জন্য সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দেয়।

বিশেষ লেখা- ১০০ ডলার কি বেশি চাওয়া? by ইমদাদুল হক মিলন

আমার জাপানি বন্ধু তাকাহাসির বাংলাদেশ নিয়ে গভীর আগ্রহ। বাংলাদেশের যেকোনো দুর্ঘটনায় সে খুব বিচলিত হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে, মানুষের মৃত্যু নিয়ে দিশাহারা হয়।

মনক্ষুণ্ন হলেও নৌকাতেই ভোট দেবে জনগণ

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকেই মানুষ ভোট দিয়ে জয়ী করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

দেশ ছাড়লেও গান ছাড়ছি না: নাওমি by কামরুজ্জামান মিলু

শুনলাম গান ছেড়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। আরে না না.. কে বলল, এসব কথা। আমি দেশ ছেড়ে গেলেও গান ছেড়ে যাচ্ছি না।

পর্নো জগতে এষা গুপ্তা!

মহেশ ভাটের একাধিক ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বর্তমানে কাজ করছেন সেক্সসিম্বল অভিনেত্রী এষা গুপ্তা। এসব ছবিতে ইমরান হাশমি ও রণদীপ হুদার বিপরীতে কাজ করছেন তিনি।

শুধু দেহ দেখাতে রাজি নন ফ্রিদা পিন্টো

শুধু দেহ দেখাতে রাজি নন তিনি। সুন্দরী, আকর্ষণীয়া, গালে টোল, মাথায় কোঁকড়া কালো চুল…এইসবেই খুশি ফ্রিডা পিন্টো৷

এবার নগ্নতার বৈধতা চাইলেন শার্লিন চোপড়া!

প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাইলেন।