Friday, March 14, 2014

দেবযানীকে অব্যাহতি দিলেন মার্কিন আদালত

দেবযানী খোবরাগাড়ে
ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দায়ের করা মামলা খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। কূটনৈতিক দায়মুক্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মার্কিন আদালত গত বুধবার দেবযানীকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। তবে মার্কিন কৌঁসুলিরা দেবযানীর বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করার কথা বিবেচনা করছেন। এটা করার আইনি এখতিয়ার আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ম্যানহাটনের মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ সিরা সেইন্ডলিন গত বুধবার দেবযানীকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বলেন, কূটনৈতিক দায়মুক্তি থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলা চলতে পারে না। একই সঙ্গে মামলার নিষ্পত্তিও ঘোষণা করেন আদালত। এর আগে দেবযানী গত ৯ জানুয়ারি কূটনৈতিক অব্যাহতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেছিলেন। বিচারক গতকাল বলেন, দেবযানীর বিরুদ্ধে যখন মামলা দায়ের হয়, তার আগেই তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনে ভারতের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাই তিনি কূটনীতিক দায়মুক্তি পেয়েছেন। দেবযানী আপাতত অব্যাহতি পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে আবারও মামলা করার কথা বিবেচনা করছেন মার্কিন কৌঁসুলিরা।
ম্যানহাটনে মার্কিন অ্যাটর্নি প্রিত ভারারের মুখপাত্র জেমস মার্গোলিন বলেন, আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কিন্তু দেবযানীর বিরুদ্ধে নতুন মামলা করতে কোনো বাধা নেই। যথাযথভাবে সেই মামলা করার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, আদালতের সিদ্ধান্তের নথি দেখে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। নিউইয়র্কে ভারতীয় কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় গত ডিসেম্বরে দেবযানীর বিরুদ্ধে ভিসা জালিয়াতি ও তাঁর গৃহকর্মীর বেতন সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। দেবযানীকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্ক পুলিশ তাঁকে হেনস্তা করে বলে অভিযোগ ওঠে। এর আগে দেবযানীর মার্কিন আইনজীবী আরসাক দাবি করেছিলেন, দেবযানীর বিরুদ্ধে ভিসা জালিয়াতি ও গৃহকর্মীর বেতন নিয়ে আসলে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। আরসাকের দাবি ছিল, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে তাঁর মক্কেলের গৃহকর্মী সঙ্গীতা রিচার্ডের মাসিক বেতন উল্লেখ করা হয়েছে সাড়ে চার হাজার মার্কিন ডলার, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মূলত সঙ্গীতার বেতন এক হাজার ৫৬০ মার্কিন ডলার। সঙ্গীতা এই বেতনেই দেবযানীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ব্যাপক টানাপোড়েন শুরু হয়। এক পর্যায়ে দেবযানীকে বাঁচাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনে ভারতের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয় নয়াদিল্লি। পাল্টা জবাব হিসেবে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন একজন কূটনীতিককেও ফেরত পাঠায় ভারত সরকার। রয়টার্স।

এএপির টিকিটে লড়বেন সাবেক মিস ইন্ডিয়া

গুল পানাগ
সাবেক মিস ইন্ডিয়া ও বলিউড অভিনেত্রী গুল পানাগ লোকসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির (এএপি) হয়ে লড়বেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দলটির পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। গুল পানাগ গতকালই অরবিন্দ কেজরিওয়ালের এএপিতে যোগ দেন। লোকসভা নির্বাচনে চণ্ডীগড় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তিনি। গুল পানাগ ১৯৯৯ সালে মিস ইন্ডিয়ার মুকুট জেতেন। ফ্যাশনের জগতেও সুপরিচিত তিনি। এর মধ্যে আবার হলিউডে পা রেখেছেন।
৩৫ বছরের এই তারকা টুইটারেও সক্রিয়। সেখানে তাঁর অন্তত আট লাখ অনুসারী আছে। এবার তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হলেন। এএপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণার আগেভাগেই গুল পানাগ নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। গতকাল চণ্ডীগড় শহরে ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বাড়ি আমার চণ্ডীগড়ে। এখানেই আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। আপনাদের মতো আমিও চাই পরিচ্ছন্ন রাজনীতি। আর এ জন্যই আমি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছি। আপনাদের কাছে আবেদন, কলুষমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির এ লড়াইয়ে অংশ নিন।’ এনডিটিভি।

মৃত্যুর পর হিমঘরে ‘ধ্যানমগ্ন’ গুরু

আশুতোষ মহারাজ
ভারতে একজন গুরুর মৃত্যুর পরও তাঁকে প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে আশ্রমের হিমঘরে রেখে দেওয়া হয়েছে। ভক্তদের বিশ্বাস, তিনি ‘গভীর ধ্যানমগ্ন’ অবস্থায় আছেন। আবার তিনি ফিরে আসবেন। আশুতোষ মহারাজ (৭০) নামের ওই গুরুকে গত ২৯ জানুয়ারি মৃত ঘোষণা করা হয়। তিনি আকস্মিক হূদেরাগে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু তাঁর মরদেহ রেখে দেওয়া হয়েছে পাঞ্জাব রাজ্যের ছোট শহর নূরমহলের একটি আশ্রমে। সেখানে তাঁর অনুসারীরা গিয়ে নিজ নিজ প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় অংশ নিচ্ছেন। আশুতোষ মহারাজ দিব্য জ্যোতি জাগ্রতি সংস্থান নামের একটি সংগঠনের প্রধান। সংগঠনটির মুখপাত্র স্বামী বিশালানন্দ দাবি করেন, তাঁদের নেতা মারা যাননি। তিনি সমাধিতে (ধ্যানের সর্বোচ্চ পর্যায়) রয়েছেন। তাই এখনো তাঁর চেতনা রয়ে গেছে। ভক্ত-অনুসারীরা তাঁর ধ্যান ভাঙার অপেক্ষায় রয়েছেন। হিমালয় পর্বতমালায় শূন্যের নিচে তাপমাত্রার মধ্যে অনেক সাধক মাসের পর মাস ধরে ধ্যানমগ্ন থাকার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন।
ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বিশালানন্দ দাবি করেন, মহারাজজি তাঁর ধ্যানমগ্ন অনুসারীদের বার্তা পাঠিয়ে বলেছেন, তিনি ফিরে না আসা পর্যন্ত যেন তাঁর দেহটি সুরক্ষিত রাখা হয়। আশুতোষ মহারাজের মরদেহ হিমাগারে রাখার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে এক ব্যক্তি আদালতে পিটিশন করেছেন। নিজেকে মহারাজের সাবেক গাড়িচালক দাবি করে ওই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, কয়েকজন অনুসারী মহারাজের সম্পত্তির ভাগ দখলের লক্ষ্যে তাঁর মরদেহ ছাড়তে চাইছেন না। তবে আদালত ওই পিটিশন খারিজ করে দেন। পাঞ্জাবের অতিরিক্ত প্রধান সরকারি আইনজীবী রীতা কোহলি বলেন, আশুতোষ মহারাজ মারা গেছেন। এখন তাঁর মরদেহ কী করা হবে, তা নির্ধারণের ভার অনুসারীদের ওপর। পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গুরিন্দর সিং ধিলন বলেন, আদালত যেখানে রুলিং দিয়েছেন, সেখানে পুলিশ ‘হস্তক্ষেপ করতে পারে না’। আশুতোষ মহারাজ ধ্যানমগ্ন থাকাকালে তাঁর পাশে থাকার জন্য ভক্ত-অনুসারীদের ধন্যবাদ জানানো হয়ছে তাঁর ওয়েবসাইটে। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আশুতোষের সংগঠনটির শাখা রয়েছে বিশ্বজুড়ে। এএফপি।

বিদ্যুৎও চাই, অযথা বেশি দামও নয়

কয়েক বছরে ষষ্ঠবারের মতো বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রস্তাব নিয়ে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ৪ থেকে ৬ মার্চ গণশুনানি করেছে। দাম বাড়ার বিষয়ে পিডিবি যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রস্তাবে যাঁরা কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন (৪০০ ইউনিট পর্যস্ত) তাঁদের প্রতি ইউনিট প্রায় দেড় টাকা ও যাঁরা বেশি ব্যবহার করেন (৬০০ ইউনিটের বেশি) তাঁদের দুই পয়সা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কৃষিতেও প্রতি ইউনিট দাম দেড় টাকা বাড়াতে বলা হয়েছে। প্রভাবশালী বিত্তবান অনেকেই আছেন, যাঁদের কাছে বিদ্যুতের দাম বাড়া অর্থহীন, কেননা তাঁরা বিদ্যুতের বিল কমই পরিশোধ করেন। অন্যদিকে যাঁদের ওপর এর চাপ পড়বে তাঁদের শুধু যে বিদ্যুতের বিল বেশি দিতে হবে তা-ই নয়, এর কারণে অন্য অনেক পণ্যও কিনতে হবে বেশি দামে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সব ধরনের পণ্য উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। দাম বাড়লে কৃষকসহ মূল উৎপাদকশ্রেণী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গণশুনানির ফলাফল কী হবে, তা অবশ্য আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্যে পাওয়া গেছে। তাঁরা বিদ্যুতের দাম বাড়ার কথাই বলেছেন। এর প্রায় এক সপ্তাহ আগে জাতীয় সংসদে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তাঁর দুটো যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ; প্রথমত, ‘বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়লে তো বিদ্যুতের বেশি দাম দিতেই হবে।’ দ্বিতীয়ত, ‘বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই বিদ্যুতের দাম সবচেয়ে কম। সুতরাং বাড়ালে অসুবিধা কী?’
এগুলো আপাতদৃষ্টে খুবই শক্তিশালী যুক্তি। কিন্তু ঘটনা যদি এমন হয়, প্রধানমন্ত্রীর দুটো যুক্তিই ভুল বা খণ্ডিত তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাহলে? জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও ভুল নীতির কারণে যদি বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, তাহলে জনগণ কেন তার দায় বহন করবে? আর ‘বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম সবচেয়ে কম’ বলার সময় প্রধানমন্ত্রী কি মজুরি, বেতন, অন্যান্য পণ্যের দাম বিচার করেছেন? উপরন্তু যদি দেখা যায়, প্রাথমিক জ্বালানি বাবদ খরচ অনুযায়ী বাংলাদেশে কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর আপত্তি কী? তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা তো দেখি, সঠিক নীতি গ্রহণ করলে আরও কম দামে নিরবচ্ছিন্নভাবে আরও বেশি বিদ্যুৎ জোগান দেওয়া সম্ভব। ২০১২ সালে যখন পিডিবি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন কয়েক বছরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণগুলো সম্পর্কে সেখানে যথার্থই বলা হয়েছিল, ‘তরল জ্বালানির ব্যবহার, বেসরকারি খাত হতে বিদ্যুৎ ক্রয় এবং জ্বালানি ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস বাবদ ব্যয় যেখানে শূন্য দশমিক ৮৩ টাকা, সেখানে ডিজেল বাবদ ব্যয় ১৫ দশমিক ৮০ টাকা। ২০০৯ সালে জ্বালানি তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল শতকরা ৪ দশমিক ৬৮ ভাগ, ২০১৩ সাল নাগাদ তা হয়েছে ২৭ দশমিক ৯৮ ভাগ। এই প্রায় ১৯ গুণ বেশি ব্যয়ের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর একটি বড় কারণ, আরেকটি কারণ অবশ্যই মুনাফামুখী বেসরকারি খাতের অনুপাত বৃদ্ধি। এই দুটো আবার পরস্পর যুক্ত। বিদ্যুৎ যদি ব্যবসার বিষয় হয়, তাহলে মুনাফার চাহিদায় তার দাম বাড়বে, জনগণের ওপরই তার চাপ পড়বে। এতে অধিকাংশ শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ হিসাবে (১০ মার্চ ২০১৪, ওয়েবসাইট) দিনের বেলা সর্বোচ্চ প্রকৃত উৎপাদন চার হাজার ২১৪, সন্ধ্যায় পাঁচ হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট। গ্যাসস্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না ৭১৯ মেগাওয়াট, তেল জোগান না দেওয়ায় হচ্ছে না এক হাজার ৫০ মেগাওয়াট এবং যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য উৎপাদিত হচ্ছে না এক হাজার ৩০২ মেগাওয়াট। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ছিল গড়ে দুই টাকা, এখন তা ছয় টাকার বেশি। এই তিন গুণেরও বেশি উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পেছনে কারণগুলো অনুসন্ধান করলে বিভিন্ন সরকারের ভুলনীতি ও দুর্নীতির খবরই পাওয়া যায়। মোটা দাগে এগুলোর মধ্যে আছে ১. গ্যাসস্বল্পতার অজুহাতে, বিকল্প থাকা সত্ত্বেও, একের পর এক বেসরকারি ভাড়াভিত্তিক (রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল) তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তি। এরা সময়মতো বিদ্যুৎ না দিয়েও বিল পাচ্ছে, অনেকের নবায়ন হচ্ছে। কোনো কোনো কোম্পানির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কখনো কখনো ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এরাই বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় পুরো টাকা খেয়ে ফেলছে। ২. গ্যাসপ্রাপ্তির জন্য, স্বল্প মেয়াদেও বিদেশি কোম্পানি যুক্ত করায় কয়েক গুণ ব্যয়বৃদ্ধি, আবার দীর্ঘসূত্রতা তৈরি। ৩. বেশি দামে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস ক্রয়, তার অনুপাত ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির ফলে ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি। ৪. বহুজাতিক কোম্পানির হাতে বেশির ভাগ ব্লক তুলে দেওয়ার পর বাজারের অভাবের অজুহাতে তাদের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বন্ধ রাখা গ্যাস-সংকটের অন্যতম কারণ। তার ফলে নতুন জোগান কম। ৫. রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলো মেরামত ও নবায়ন করলে বিদ্যমান গ্যাস জোগানেই শতকরা কমপক্ষে আরও ২০ থেকে ৩০ ভাগ উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব ছিল, এর জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করা।
বিদ্যুৎ একদিকে যেমন চূড়ান্ত পণ্য, অন্যদিকে তেমনি আরও অনেক পণ্য ও সেবার প্রাথমিক শর্ত। সুতরাং বিদ্যুৎ যদি সুলভে সবার কাছে পৌঁছানো যায়, তাহলে সমগ্র অর্থনীতিই অনেক অপ্রয়োজনীয় বোঝা থেকে মুক্ত হয়, অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান বাড়ে। তাহলে সবগুলোর মূলে হলো প্রাথমিক জ্বালানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, এবং তা যাতে সুলভে ও বেশি দিন পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা। ভুল নীতির কারণে এই কাজ নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভুল নীতির বিষয়টি এই সরকারের একক নয়, এটি ধারাবাহিকভাবে চলছে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আনা হয়। আশির দশক থেকে বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইডি, এডিবি প্রভৃতি এই পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করেছে। আর এসব পরিবর্তিত নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ক্রমান্বয়ে বহুজাতিক ও বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া। এই নীতি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ আর গণপণ্য নয়, অন্য সব পণ্যের মতোই মুনাফামুখী বাণিজ্যিক খাত। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের এতে লাভ হলেও অন্য সবার জন্যই তা উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে থাকে, এই খাতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিও দিন দিন বাড়তে থাকে। এ ভর্তুকি কমানোর যুক্তিতেই প্রতিবার দাম বাড়ানো হয়। তবে বাংলাদেশের তেলনির্ভরতা বাড়ানো হলেও গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়েনি, বরং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা তেলের মূল্য হ্রাসের সম্ভাবনাই প্রাক্কলন করেছেন। তার পরও মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকারের এ মুহূর্তে এত গরজ কেন? এর দুটো কারণ পাওয়া যায়: ১. সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে আইএমএফের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের শর্ত পূরণ, এবং ২. দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী ও কমিশনভোগী, বিদ্যুতের দাম যত বাড়ে তত যাঁদের লাভ, তাঁদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ স্বার্থ রক্ষা করা। সরকারের বিদ্যমান নীতি, কমিশননির্ভর তৎপরতা,
দুর্নীতির এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে কিছুদিন পর পরই আমরা দেখব, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকার জোরদারভাবে এই ধারাতেই অগ্রসর হচ্ছে। তার দৃষ্টান্ত—১. রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল চুক্তির মেয়াদ ২০২০ পর্যন্ত বৃদ্ধি ২. বঙ্গোপসাগরে আরও বেশি দামে গ্যাস কেনার শর্তসহ চুক্তি সম্পাদন ৩. রামপালে উচ্চ আর্থিক মূল্যে এবং অত্যধিক অপূরণীয় ক্ষতি অনিবার্য করে কয়লাভিত্তিক প্ল্যান্ট চুক্তি এবং ৪. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সব দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িত অপরাধীদের আইনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ২০১০ সালে প্রণীত দায়মুক্তি আইন অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বহাল রাখা। তাই সমাধান আছে, কিন্তু বর্তমান পথে তা আসবে না। তেলভিত্তিক রেন্টাল পাওয়ারের চুক্তি বাতিল, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট মেরামত ও নবায়ন করা, ‘খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধকরণ আইন’ গ্রহণ করে দেশের কাজে শতভাগ সম্পদ বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করা, পিএসসি-প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান, বিদ্যুৎকে গণপণ্য হিসেবে বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বৃহৎ বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনে অগ্রাধিকার এবং নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি মিলিয়ে বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করে অগ্রসর হলে সমাধান অবশ্যই সম্ভব। সরকার ও কোম্পানিমুখী লোকজনের মুখে শুনি, ‘বিদ্যুৎও চাইবেন আবার বেশি দামও দেবেন না, তা কী করে হয়?’ উত্তরে বলব, ‘হ্যাঁ, বিদ্যুৎও চাইব আবার বেশি দামও দেব না। কারণ, কম দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ খুবই সম্ভব।’ তবে নিশ্চয়ই, কমিশনভোগী তৎপরতা দিয়ে এটি সম্ভব হবে না।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস: নির্মাণ ও বিনির্মাণ

বলিউডকে যাঁরা ইতিহাসের উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন, তাঁদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা একদম অযৌক্তিক নয়। বলিউডি ফিল্ম মানেই গাঁজায় দম দিয়ে বানানো গল্প। বাস্তব অথবা সত্যের সঙ্গে যে ফিল্মের যোগ যত কম, সে ফিল্ম তত বেশি জনপ্রিয়। লোকজন সেসব দেখতে ভিড় জমায় ইতিহাস বইয়ে কী লেখা আছে বা বাস্তবে কী ঘটে, তা জানতে নয়; বরং দুদণ্ড সব ভুলে স্বপ্নের জগতে ঠাঁই নেওয়া যাবে, সে জন্য। ঠিক সে কারণে বলিউডের গুন্ডে ছবি নিয়ে বাংলাদেশে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা কিছুটা কৌতুকপ্রদ মনে হতে পারে। ছবিটির প্রথম কয়েক মিনিট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কল্পকাহিনি সাজানো হয়েছে, যার প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়ায় মহাতুলকালাম ঘটে যায়। ফেসবুক মুখ্যত তরুণদের দখলে, ফলে তারা যা খুশি বলবে, লিখবে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু একদম সরকারি পর্যায়ে তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া উঠবে, তা ভাবিনি। তর্ক-বিতর্কের উত্তাপ এতটা ছড়িয়ে পড়ে যে আমেরিকার অতি-সিরিয়াস ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পর্যন্ত নাক গলাতে বাধ্য হয়। ব্যাপারটা উপেক্ষার সঙ্গে দেখাও খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তরুণেরাই এ নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু সেটি পরিহাসের বিষয় নয়। এ থেকে বরং বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধকে এই প্রজন্মের সদস্যরা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। এই যুদ্ধের ইতিহাস, তার স্মৃতি, আগলে রাখার কাজ, যা আমরা বুড়োরা যোগ্যতার সঙ্গে করেছি বলা যাবে না।
নব প্রজন্মের সদস্যরা তাকে নিজেদের অস্তিত্বের সংগ্রাম বলে মনে করে। চলচ্চিত্রমাধ্যমের শক্তির সঙ্গে এদের পরিচয় আছে। নিজের জন্মের ইতিহাসের এই বিকৃত চলচ্চিত্রায়ণ দেখে তারা প্রতারিত বোধ করেছে। প্রতিবাদের তীব্রতাও সে কারণে এমন প্রবল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও তার ন্যারেটিভ শুধু একটি, এ কথা আমি বলি না। ইতিহাস মানেই কোনো কাল, সময় অথবা ঘটনার ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত স্মৃতি। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান, সেই ইতিহাসের এই তিন প্রধান কুশীলব, যার যার নিজস্ব চশমায় সে ন্যারেটিভ নির্মাণ করবে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই ইতিহাসের বহির্গত চরিত্র রয়েছে, তার কুশীলব ভিন্ন। নাকের ওপর ভিন্ন চশমা গুঁজে তাঁরা যখন এই ইতিহাস লিখতে বসেন, তার বহিরঙ্গটি যায় বদলে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বয়স এখনো অর্ধশতক পূর্ণ হয়নি। ফলে ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিকতা অর্জনের জন্য সময়ের যে দূরত্ব প্রয়োজন, তা অনুপস্থিত। ফলে, জাতিগত ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভের মধ্যে যদি বৈপরীত্য অথবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়ে যায়, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। অধিকাংশ ভারতীয় লেখকের বিবরণে একাত্তর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক বিজয় ভিন্ন অন্য কিছু নয়। অতিসম্প্রতি প্রকাশিত শ্রীনাথ রাঘবনের গ্রন্থ ১৯৭১, এ গ্লোবাল হিস্টরি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ গ্রন্থেও বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের কোনো পরিচয় নেই। পাকিস্তানি লেখকের হাতে ১৯৭১-এর ইতিহাস বাঙালি মুসলমানের বিশ্বাসঘাতকতা ও কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা কমান্ডারের মূর্খতা ও অযোগ্যতা ছাড়া আর কিছু নয়।
যেমন একাত্তরের ওপর ফজল মুকিম খানের লেখা বই পাকিস্তানস ক্রাইসিস ইন লিডারশিপ। পরাজিত সমরনায়ক নিয়াজির গ্রন্থের নাম দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান। মার্কিন অথবা ইউরোপীয় লেখক যাঁরা এই প্রতিদ্বন্দ্বী ন্যারেটিভে কোনো আনুভূতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেননি বলে ভাবা স্বাভাবিক, তাঁরা একাত্তরকে বরাবরই ভারত ও পাকিস্তানের লড়াই এই দুই দেশের মধ্যে সংঘটিত তৃতীয় যুদ্ধ হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। যে গ্রন্থটিকে একাত্তরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ বলে কেউ কেউ রায় দিয়েছেন, মার্কিন গবেষক রিচার্ড সিসন ও লিও রোজ-এর লেখা ইন্ডিয়া, পাকিস্তান অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, সেখানেও ‘বাংলাদেশ যুদ্ধ’কে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধ হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। যাঁরা দৃশ্যত নিরপেক্ষ, যেমন ইংরেজ লেখক রবার্ট জ্যাকসনের সাউথ এশিয়ান ক্রাইসিস-এও, একাত্তর বড়জোর বাঙালির বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন, তার বেশি নয়। হেনরি কিসিঞ্জারের মতো আত্মপ্রেমী মেকি-ইতিহাসবিদের চোখে একাত্তরের প্রকাশ ঘটে পরাশক্তিত্রয়ের, অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ হিসেবে। তাঁর সুবিশাল হোয়াইট হাউস ইয়ার্স গ্রন্থে একাত্তরের ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করতে ৮০ পাতার যে অধ্যায়টি তিনি লিখেছেন, বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের কোনো পরিচয়ই তাতে নেই। কিসিঞ্জার সে পরিচ্ছদের শিরোনাম দিয়েছেন ‘দ্য টিলট: দি ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ক্রাইসিস অব ১৯৭১’। অতিসম্প্রতি মার্কিন সাংবাদিক ও গবেষক গ্যারি বাস ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে একাত্তরের যে বিকল্প ইতিহাস রচনা করেছেন, তাতেও অনুসন্ধিৎসু আলোটি পড়েছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ওপর নয়, একাত্তরে যে গণহত্যা হয়, তা রোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার ওপর। কিন্তু বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস, তার প্রধান চরিত্র যেমন তার, তার কথকও সে নিজে, অন্য কেউ নয়। বাঙালির অভিজ্ঞতা ও সম্মিলিত স্মৃতির ভিত্তিতে নির্মিত এ ইতিহাস। তার একমাত্র কুশীলব বাঙালি, এ কথা আমি বলি না।
কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের জন্য বাঙালির সংগ্রামের এই ইতিহাস লিখতে হলে আসল নজর থাকতে হবে বাঙালির অভিজ্ঞতার ওপর। এর আনুপূর্বিক বিবরণ ও বিশ্লেষণ ছাড়া সে ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হবে না। ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজের হাতে আমাদের ইতিহাস লিখিত হয়েছিল। ইংরেজ দাবি করেছে, সভ্যতার দায়দায়িত্ব নিয়ে সে উপমহাদেশে এসেছে, ফলে তার লিখিত ইতিহাসে নির্বিকার শোষণের বদলে শ্বেত প্রভুর সভ্যতার জয়ডঙ্কা শোনা গেছে। ম্যাকলের মতো লেখকের হাতে যখন সে ইতিহাস লিখিত হয়, তাতে ইংরেজের নগ্ন শোষণের পক্ষে কৃত্রিম নৈতিকতার সাফাইও শোনা গেছে। আবার পাকিস্তানি আমলে যে নব্য উপনিবেশের সূচনা হয়, তাতে বিজাতীয় প্রভুদের হাতে রচিত ইতিহাসে বাঙালির স্থান হয় দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে, সেখানে বাঙালি চিত্রিত হয় ভীরু ও প্রভু তোষণপ্রিয় জাতি হিসেবে। এসব সমীকরণই বদলে যায় একাত্তরে। বাঙালি জাতিসত্তার উদ্ভব হয়েছিল অনেক আগেই। একাত্তরের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয় বাঙালির জাতিরাষ্ট্র সত্তার। অন্তর্গত বোধন ছাড়া যে অর্জন অসম্ভব ছিল। বিদেশি লেখক বা চলচ্চিত্রকার তা সে ভারতীয়, পাকিস্তানি বা আমেরিকান—যে-ই হোক, বাঙালির আত্ম-আবিষ্কার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দীর্ঘ সংগ্রামের ঘটনাবলি বিষয়ে অবহিত হলেও তার আনুভূতিক অভিজ্ঞতার অংশীদার তারা কখনোই হবে না। ঠিক এ কারণেই বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাঙালিকেই লিখতে হবে। অন্য যারা সে ইতিহাস লিখবে, উৎস হিসেবে তাদের বাঙালির লেখা আকর গ্রন্থের দিকেই হাত বাড়াতে হবে। এই ইতিহাস রচনায় বাঙালির অধিকার কেবল স্বতঃসিদ্ধ ও মৌলিকই নয়, বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকদের দায়িত্বও বটে।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।